অনুসরণকারী

রবিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২২

অস্তরাগ দ্বাবিংশতম পর্ব


এই পর্যন্ত বলে সিগারে শেষ টান দিয়ে চায়ের কাপে গুঁজে সোনার ব্যাকরেস্টে হেলান দেন রজতাভ। সুজাতা‌ মুখে হাত‌‌ দিয়ে বসে থাকেন। পাশে ঐশী সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকেন। কাপে থাকা সিগারটা থেকে তখনও সদ্য ধোঁয়া উঠছে। সেই ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বুঁজে আসা গলায় অভীক বলে ওঠে, “তারপর?”


অভীকের দিকে‌ তাকিয়ে ম্লান হাসেন রজতাভ, “তারপর আর কি?বিকেলের মধ্যে আমার জ্বর সেরে গেল! আরো চারদিন সেখানে থেকে ফিরে এলাম আমরা। তবে ফেরার সময় জানলাম আমরা একা নই। এই পৃথিবীতে আমার মতো আরেকজন আছে। যে সুখী না হয়েও সুখী থাকার অভিনয় করে চলেছে। অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা করছে। বিশ্বাস করো সেদিন সুজাতার আশ্বাসে আমার মনোবল অনেক বেড়ে গেল। আমি আবার সাহস পেলাম ঊর্মিকে ফিরিয়ে আনার। কাজিরাঙ্গা থেকে ফেরার পর প্রতি রবিবার সুজাতাদের ফোন করতাম আমরা। ঊর্মির সাথে অনবরত কথা বলত সুজাতা। সেখানে আমি কয়েকটা কথা বলেই দায় সাড়তাম। সুজাতার সাথে আমার কথা হত অন্যপথে। তখনকার দিনে এই হোয়াটসঅ্যাপ,মেসেঞ্জার ছিল না। ছিল চিঠি, পোষ্টকার্ড। সুজাতার সাথে প্রতি মাসে আমি চিঠিতে কথা বলতাম। রোজকার প্রগ্রেস, মনের ভাব লিখে রাখতাম কাগজে তারপর সেটা পাঠাতাম ওকে। সুজাতাও তাই করত। অবশেষে আমার তপস্যা সফল হল। ঊর্মিকে ফেরাতে পারলাম আমি। আমাদের জীবন আগের মতোই চলতে লাগল। তারপর একদিন ঊর্মি জানাল ঐশীর খবর। সেদিন আমার কি আনন্দ হয়েছিল বলে বোঝানো অসম্ভব। সেদিন রাতেই চিঠি লিখেছিলাম আমি। সুজাতাকে জানিয়েছিলাম খবরটা। তারপর সেটাকে পরদিন ডাকে ফেলে দিয়েছিলাম। সেই আমার পাঠানো শেষ চিঠি।”


রজতাভ হেসে বলেন, “কথায় আছে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার যতই চেষ্টা করো না কেন? একদিন না একদিন ধরা পড়বেই! সেদিন তাই হল। আমাদের এই চিঠি চালাচালি ধরা পড়ল। আর পড়বি তো পর একেবারে ঊর্মির হাতে।” 

"তখন ঊর্মি পূর্ণগর্ভা। ডাক্তারবাবু ডেট দিয়েছেন ১১ই ডিসেম্বর। আমরা ঐশীর আগমনের প্রহর গুনছি। ঊর্মির ইচ্ছে একটা মেয়ে হোক। আমি চাইছি একটা ছেলে। ঠিক করেছি মেয়ে হলে নাম দেব ঐশ্বর্য। ছেলে হলে নাম হবে অজয়। দুজনে বাজি রেখেছি এ নিয়ে। মোট কথা যে দাম্পত্য সুখ থেকে মাঝের কটা বছর বঞ্চিত ছিলাম ঊর্মি সেই সুখে ভরিয়ে দিয়েছে আমাকে। সুখের সাগরে ভাসছি দুজনে। এমন সময় চিঠিটা এসে পৌঁছল ঊর্মির হাতে। সেদিন ছিল ৯ ডিসেম্বর। দুদিন পর বিকেলে ঊর্মিকে হাসপাতালে অ্যাডমিট করার কথা। সেদিন সকালেই ঘটল ঘটনাটা।


******

মনের সুখে বাজার সেরে বাড়ি ফিরল রজতাভ। আজকের বাজারটা ঊর্মির মন মতো হবেই। ঊর্মি বোয়ালমাছ খেতে ভালোবাসে বলে অনেকটা বোয়ালমাছ নিয়ে এসেছে সে। ইচ্ছে আছে নিজে হাতে রান্না করে ঊর্মিকে খাওয়াবে।‌‌  সন্তানসম্ভবা হবার পর থেকে শুধু রান্নাঘর নয় রজতাভ ঊর্মিকে আর ঘরের সব কাজ থেকে ছুটি দিয়েছে। ঊর্মির কাজ শুধু আরাম করে শুয়ে বসে প্যাম্পারড হওয়া আর রজতাভর কাজ তদারকি করা। রজতাভ নিজেই রান্না করে ওকে ভালোমন্দ খাওয়ায়। আজ মাংস, কাল মাছ তো পরশু চাইনিজ,যাই হোক না কেন চটজলদি রান্না করে দেয় সে। শুধু খাবারই কেন? ঊর্মির যখন যেটা চাই একবার মুখ ফুটে বললেই হল, রজতাভ সঙ্গে সঙ্গে হাজির করে দেয়। যেমন একদিন হঠাৎ সন্ধ্যেবেলা ঊর্মির ইচ্ছে হল আইসক্রিম খাবে। ব্যাস! রজতাভকে বলতেই সে ছুটল বাজারে। আইসক্রিমের সাথে নিয়ে এল তেলেভাজা আর আচারও।‌ কারন এই সময় ঊর্মির মন বোঝা অসম্ভব। এই আইসক্রিমের ক্রেভিং হচ্ছে কিছুক্ষণ পর টক খেতে চাইবে। আর হয়ও তাই! আইসক্রিমের সাথে বাকি জিনিসগুলো রাখতেই ঊর্মি তুলে নেয় আচারের শিশিটাকে। আঙুলে করে অল্প আচার মুখে দিয়েই জিভে টক করে শব্দ করে টিভি দেখতে থাকে । আর রজতাভ লেগে পড়ে ঘরের কাজে।‌ 


কলিং বেলটা‌ বাজাতেই ঊর্মি দরজা খুলে দিয়ে চলে গেল ড্রয়িংরুমে। রান্নাঘরে ঢুকে বাজারের ব্যাগ থেকে মাছের প্লাস্টিকটা বের করে সিঙ্কে রাখল রজতাভ। তারপর জামার হাতা গুটিয়ে শুরু করল মাছ ধোয়া। মাছটাকে ধুয়ে নুন হলুদ দিয়ে ম্যারিনেট করতে করতে রজতাভ শুনতে পেল কলিংবেলের শব্দ। মাছটাকে ম্যারিনেট করে হাত ধুয়ে রজতাভ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখল ঊর্মি ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাতে ধরা একাধিক কাগজ আর একটা চিঠির খাম। খামটা খুলে ঊর্মি ততক্ষণে চিঠিটা পড়া শুরু করেছে। 


চিঠির খামটা দেখা মাত্র রজতাভ থমকে গেল। রজতাভ বুঝতে পারল ও ধরা পড়ে গেছে। আর কোনো উপায় নেই। সে চোখ বুঁজে বসে পড়ল সোফায়। ঊর্মি চিঠিটা শেষ করে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল রজতাভর দিকে। তারপর থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করল, “এটা কী?”


******

“চিঠিটাতে দেখতে গেলে তেমন কিছুই ছিল না। সামান্য কয়েকটা কথাবার্তা, কিছু খবর আর কয়েকটা একান্ত গোপন মনের কথা যা দুজন বন্ধুর মধ্যে থাকতে পারে। কিন্তু ঊর্মি সেটা বুঝতে চাইল না। ওর একটাই কথা, সুজাতা কেন আমায় চিঠি লিখল? এমন কী কথা আছে আমাদের মধ্যে যা ফোনে বলা যাবে না? আর এইসব কথার মানে কী?” বলতে বলতে আরেকটা সিগার ধরালেন রজতাভ। তারপর সোফায় সোজা হয়ে বসে বললেন, “ সেই দিনের চিঠিটা নিয়ে ঊর্মি ভীষণ রিঅ্যাক্ট করল। ওকে আমি কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না যে সুজাতা আর আমার মধ্যে কিছু নেই। আমরা দুজন বন্ধুমাত্র। যে বন্ধুত্ব আমাদের অজান্তেই গভীর হয়ে উঠেছে। যে বন্ধুত্বে কোনো নোংরামো নেই। কোনো প্রত্যাশা নেই! সুজাতা যেমন ঊর্মির বেস্টি হয়ে উঠেছে তেমনই আমারও অত্যন্ত কাছের একজন সুহৃদ হয়ে উঠেছে। ঊর্মি মানল না। আমাদের সম্পর্ককে ও সন্দেহ করতে শুরু করল। এমনকি নোংরা ইঙ্গিত করতেও বাধল না তার। তোমাদের সৌভাগ্য যে তোমরা ঊর্মির রাগ দেখোনি। রাগলে ঊর্মির যুক্তিবোধ লুপ্ত হয়ে যেত। আর সেই রাগটাকে ও পুষে রাখত বহুদিন। কিন্তু সেদিন ঊর্মির রাগ এতটাই বাড়ল যে শেষ পর্যন্ত সেটাই ওর কাল হয়ে গেল।”


বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রজতাভ। তারপর সিগারে আরেকটা টান দিয়ে বললেন, “রাগের মাথায় সেদিন আমাকে যা নয় তা বলে যেতে লাগল ঊর্মি। সুজাতাকে নিয়ে অজস্র নোংরা কথায় বিঁধতে লাগল আমাকে। আমি ওকে পাগলের মতো বোঝাতে চাইলাম। কিন্তু ও বুঝল না। যা নয় তা বলতে লাগল সুজাতার নামে। ক্রমে আমারও ধৈর্য্য কমে আসছিল। শেষে আমিও জড়িয়ে পড়লাম তর্কে। কথাকাটি ক্রমশ বাড়তে লাগল। শেষে বাধ্য হয়ে থাকতে না পেরে এত বছর যা করিনি তাই করে বসলাম আমি! হিতাহিত ভুলে ঊর্মির গায়ে হাত তুললাম আমি!”


বলতে বলতে রজতাভর গলা ধরে আসে। কথা বলা থামিয়ে মাখা নত করে তিনি বসে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে বলতে শুরু করেন, “তখন বুঝতে পারিনি চড়টা এত জোরে লেগে যাবে। চড়টা মারার সাথে সাথেই সম্বিত ফিরে আসতেই বুঝতে পারলাম কি ভুলটাই না করেছি আমি। চড় খেয়ে ঊর্মি গালে হাত‌ দিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। আমি নতজানু হয়ে বসে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। ঊর্মি প্রাণপণে আমাকে বাধা দিতে চাইলেও পারল না। কিল, ঘুষি, চড়, আচড় কিছুই বাদ গেল না। কিন্তু আমি ওকে কিছুতেই ছাড়লাম না। অনেক সংঘর্ষের পর এক সময় ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিল ঊর্মি। তারপর আমাকে আকড়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। আমি চুপ করে ওকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলাম অনেকক্ষণ।”


বলে সিগারে‌ শেষ‌ টান দিয়ে কাপে অবশিষ্টাংশটা গুঁজে রজতাভ বললেন, “ সেদিনের পর দুদিন আমরা পরস্পরের সাথে প্রয়োজন ছাড়া আর কোনো কথা বলিনি। বা বলা ভালো ঊর্মিই আমার সাথে কোনো কথা বলতে চায়নি। ঐ দুটো দিন পাগলের মতো ওর কাছে মাথা কুটেছি। ওর সাথে কথা বলার, আমার মতটা জানানোর অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঊর্মি আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা সুযোগও দেয়নি। বরং একটা মিথ্যে অভিমানে আমাকে আবার দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। ওকে আমি আর বোঝাতে পারিনি যে সুজাতা আর আমার মধ্যে কোনো অবৈধ্য সম্পর্ক নেই। আমাদের মধ্যে যেটা আছে‌ সেটা নিখাদ বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু নয়। সেই মিথ্যে অভিমানেই ঐশীকে জন্ম দিয়ে সেপ্টিসেমিয়ায় সাতদিনের মাথায় আমাকে একা রেখে চলে গেল ঊর্মি। আর সেই খবরটা জানার পর সুজাতাও সব সম্পর্ক ছিন্ন করে অজ্ঞাতবাসে চলে গেল। এই পৃথিবীতে আমি একেবারে একা হয়ে গেলাম। একবার মনে হয়েছিল নিজেকে‌ শেষ করে দিই। চিরতরে এই পৃথিবী থেকে মুছে দিই রজতাভ মজুমদারকে কিন্তু পারলাম না। ঐ যে সুজাতার পাশে বসে আছে মেয়েটা, ওই আমাকে শেষ হয়ে যেতে দিল না। আমাকে বাঁচার নতুন পথ দেখাল। মেয়েটাকে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করলাম আমি।”


ঐশীর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে মৃদু হাসলেন রজতাভ। ঐশী ততক্ষণে সুজাতাকে জড়িয়ে পাথরের মতো বসে আছে। দু গাল বেয়ে বেড়িয়ে আসছে অশ্রুধারা। অভীকের চোখও জলশূন্য নেই। কিছুক্ষণ পর ধরা গলায় অভীক জিজ্ঞেস করল, “তারপর?”


রজতাভ অভীকের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “তারপর আর কি? বাপ-মেয়েতে নতুন করে জীবনযাপন শুরু করলাম। ঊর্মির মারা যাবার তেরোদিন পর পারলৌকিক কাজ সেরে ঠিক করলাম যে কারনে ঊর্মি আমার উপর অভিমান করে চলে গেছে সেই স্মৃতিস্বরূপ চিঠিগুলোর কোনো চিহ্ন আমি রাখবো না। সুজাতা যখন নিজেই সব সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে গেছে তখন আমিও আর কোনো সম্পর্ক রাখবো না। ঠিক করলাম সুজাতাদের সাথে থাকা আমাদের সব স্মৃতি মুছে দেব। সেই মতো একদিন আমাদের সব ছবি, চিঠি খুঁজে বের করে পুড়িয়ে দিলাম আমি। শুধু পোড়ালাম না ঊর্মির ডাইরিগুলো। কারন ওগুলো ছিল আমার ঊর্মির শেষ স্মৃতি। ঠিক করলাম যে ডাইরির পাতায় সুজাতার উল্লেখ থাকবে সেই পাতাগুলো বাদ দিয়ে ডাইরিগুলো তুলে দেবো ঐশীর হাতে। আমাদের জীবনে যে সুজাতাদের কোনো অস্তিত্ব ছিল তা কিছুতেই জানতে দেব না ঐশীকে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক‌ আর হয় আরেক। নিয়তি আবার আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। যেকারনে আমি আর সুজাতা পরস্পরের থেকে দুরে সরে গিয়েছিলাম ঠিক সেই কারনে আমরা পরস্পরের সামনে চলে এলাম। আমরা দুজনেই চেয়েছিলাম আমাদের অতীতের ছায়া তোমাদের উপর না পড়ুক। অথচ দেখো ঠিক তাই হল। তোমাদের চারহাত এক হয়ে গেল। ঊর্মির এই ডাইরিটা তোমরা কোথা থেকে পেলে জানি না। কিন্তু ডাইরি পড়ে তোমরা যতটুকু জেনেছ তা অর্ধেক সত্যি। বাকিটুকু শোনার পরেও যদি তোমাদের মনে হয় আমরা অপরাধী তাহলে তোমরা যা শাস্তি দেবে মাথা পেতে নেব। শুধু দুটো কথাই বলার আছে। প্রথমত ঐ মানুষটার সাথে আমার কোনো অবৈধ্য সম্পর্ক নেই। কোনো কালেই ছিল না। যা ছিল তা সম্পূর্ণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আর এই সম্পর্ককে যদি তোমরা নোংরা মনে করো তাহলে আমার কিছু করার নেই। কিন্তু ঐ মানুষটাকে তোমরা কিছু বলো না। ঐ মানুষটার কোনো দোষ নেই। ও সম্পূর্ণ নির্দোষ।”


(চলবে...)

বুধবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২২

অস্তরাগ একবিংশতম পর্ব


(পাঠকের সুবিধার্থে খেই ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আগের পর্বের কিছু অংশ  তুলে দেওয়া হল।) 

রজতাভ বিরক্তিতে ভরা গলায় বলে, “দরকার নেই! আমার আর খিদে নেই!”

- সে তোমার নাই থাকতে পারে। কিন্তু আমার আছে। সকালে এক জোড়া পাউরুটি ছাড়া আর কিছু জোটেনি। আর দুপুরের কথা তো ছেড়েই দিলাম। অগত্যা ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য কিছু তো খেতে হবে! তাই আমি যাচ্ছি আমার জন্য ডিমটোস্ট বানাতে। তুমি বরং তোমার জামাটা পাল্টে নাও। ভাতে-ডালে মাখামাখি হয়ে গেছে। আমি চললাম।

বলে ট্রে হাতে সুজাতা চলে যায় রান্নাঘরে। কিছুক্ষণ পর সুজাতা যখন আবার ট্রে সাজিয়ে ফিরল ততক্ষণে রজতাভ পোশাক পাল্টে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। ট্রে-টা খাটের পাশে রেখে চেয়ারে বসে সুজাতা খেতে শুরু করল। শব্দ শুনে রজতাভ পিছন ফিরে সুজাতাকে দেখে  জিজ্ঞেস করল, “কি ব্যাপার? এ ঘরে বসে খাচ্ছ যে?”

- উপায় কী বলো রজতদা? ঊর্মি যে একটা বাচ্চা ছেলের দায়িত্ব দিয়ে গেছে। চোখের আড়াল করলে যদি আবার কিছু করে বসে!তাই চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে।

- উফ সুজাতা তুমি থামবে!

- যতক্ষণ তোমার এই ছেলেমানুষি না থামছে ততক্ষণ পর্যন্ত তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না!

- সুজাতা!

- ভদ্রমহিলার এককথা! মিছিমিছি জেদ করে লাভ নেই! এতে তোমারই ক্ষতি। ঊর্মি বড় ভালো মেয়ে রজতদা।

- ওকে বুঝিয়ে লাভ নেই সুজাতা! ও বুঝবে না। বরং তোমাকেও ভুল বুঝে বসবে।

রজতাভ চোখ থেকে হাত নামিয়ে তাকায় দরজার দিকে। সুজাতা এগিয়ে এসে বিছানায় বসে।

- কিছু ভুল বুঝবে না। আমি আছি তো! আমি ঠিক বুঝিয়ে বলব। তবে তার আগে জানতে চাই এই বন্ধুত্বের সম্পর্কে তুমি রাজি কিনা?

- রাজি যদি না হতাম তাহলে এতক্ষণে অনেক কিছুই করতে পারতাম সুজাতা। তুমি কিছু করতে পারতে না। এই গোটা বাড়িতে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। আর এই দুর্যোগে চিৎকার করলেও কেউ আসবে না। চাইলে আমি জোর করে অনেক কিছুই করতে পারতাম। তুমি যা ভেবেছ তা করতেও আমাকে কেউ আটকাতে পারতো না। কিন্তু তা আমি করিনি কেন জানো? আমার ভালোবাসার স্পর্শ, মনের দোসরের প্রয়োজন হলেও এতটাও চরিত্রহীন হয়ে উঠিনি যে আমার স্ত্রীর সহোদরা না হলেও বোনের চেয়ে কম নয় এমন স্ত্রীকে নিজের অঙ্কশায়িনী করবো। এতে যেমন বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে, তেমনই একাধিক সম্পর্ক নষ্ট হবে। নিজের চোখে আমি ছোটো হয়ে যাব। তুমি কি ভেবেছিলে? মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাওয়ার নামে…ছিঃ! তুমি আমাকে এতদিনে এই চিনলে সুজাতা? তুমি আমাকে দাদা ডাকো। এতটুকু বিশ্বাস নেই দাদার উপর? মেজর রজতাভ মজুমদারের চরিত্র অতোটাও নীচু নয় যে ঊর্মিকে ভালোবাসা সত্ত্বেও অন্য নারীর কাছে আশ্রয় চাইবে। তার সাথে শারীরিকভাবে… ছিঃ! তুমি আমাকে এত নীচ ভাবতে পারলে?

- না মানে আমি ওভাবে মিন করতে চাইনি। কিন্তু পুরুষজাতটাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি তো!

- বটে? তা এখন পর্যন্ত কটা পুরুষের সাথে সাক্ষাত হয়েছে শুনি? আমি তো জানতাম তুমি দুজনকেই চেন। নাকি ভেতর ভেতর আরো অনুরাগী আছে?

- ইস! তোমার মুখে কি কিছু আটকায় না?

- এই রাগ করলে নাকি? আমি কিন্তু মজা করছিলাম।

- তা রাগ করবো না? তখন থেকে আমার স্বামীর নামে যা নয় তা বলে চলেছ। এমনকি আমাকে আরেকটু হলে বিশ্বাসঘাতিনীতে পরিণত করতে। রাগ করার কারণ হিসেবে কম কী?

- সে তো এমনি এমনি বলছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি কোনো নোংরা ইঙ্গিত করিনি। আমি শুধু তোমার কষ্টটা ভাগ করে নিতে চেয়েছি। এক বন্ধুর মতো।

- সে কারণেই তো প্রস্তাবটা দিলাম। নাহলে সোজা কমপ্লেন করতাম ঊর্মির কাছে। ইস! আবার বাচ্চাদের মতো গোঁসা করেছে!

- ইচ্ছে করে করেছি নাকি? করেছি তো অভিমানে।

- ইস! আবার অভিমান করা হয়েছে! স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ওরকম একটু-আধটু ঝামেলা হয়। সেটাকে নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নিতে হয়। আমাকেই দেখো। তথাগতর সাথে রোজ অ্যাডজাস্ট করি আমি। সংসার মানে এক বিছানায় শোয়া, একছাদের নিচে একসাথে থাকা বা একে অপরের দায়িত্ব নেওয়া নয়! সংসার মানে হল অ্যাডজাস্টমেন্ট। কথাটা নাটকীয় শোনালেও হাড়ে হাড়ে সত্যি। আর এটা একপাক্ষিক নয়। দুই দিক থেকেই চাই। মানছি একটা মানুষ যতই কঠোর হোক না কেন দিনের শেষে তারও একটা আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় সে ঘরের মানুষটাকে ছেড়ে বাইরে আশ্রয় খুঁজে বেড়াবে। সেটা উচিতও নয়। প্রয়োজনে সেই মানুষটাকে বোঝাতে হবে! তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে ভুলটা কোথায়?

- তোমার কি মনে হয়? ঊর্মি বুঝবে?

- বুঝতে হবে! এবং সেটা তুমিই বোঝাবে। 

রজতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “বুঝলাম!”

“কি বুঝলে?” সুজাতা তাকায় রজতাভর দিকে। রজতাভ হেসে বলে, “বড়ো সড়ো ঝামেলা বাঁধতে চলেছে। যাকগে একটা কথা ছিল।”

- কী?

- ঝামেলা লাগার আগে একটু শক্তির প্রয়োজন। কারন ঊর্মিকে সামলানো ভীষণ চাপের। তাই বলছিলাম যে একটু খাবার হলে মন্দ হত না।

- থাক! ঢের অভিনয় হয়েছে। আমি জানতাম তুমি কথাটা তুলবে। তাই তোমার ভাগের খাবারটাও বানিয়েছিলাম। নিয়ে আসছি সেটা। চুপচাপ খেয়ে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করো।

বলে রান্নাঘর থেকে খাবারের প্লেটটা নিয়ে এনে রজতাভর হাতে ধরিয়ে দেয় সুজাতা। তারপর দুজনে খেতে বসে। সুজাতা দেখে রজতাভ গোগ্রাসে খাচ্ছে। দেখে বোঝাই যাচ্ছে ভীষণ ক্ষুধার্ত ও। প্লেটে থাকা পাউরুটি চিবোতে চিবোতে রজতাভর খাওয়া দেখতে থাকে সুজাতা।   

খাওয়া শেষ হলে প্লেট দুটো নিয়ে সুজাতা ঘরের বাইরে বেরোতে যাবে এমন সময় ঝপ করে ঘরের আলো নিভে যায় আর তার সাথে সাথে গোটা বাংলো কেঁপে ওঠে বাজের শব্দে, তারপর মুষলধারে বৃষ্টি নামে। আলো নিভে যাওয়ার সময় সুজাতা থমকে গেলেও বাজের শব্দে চমকে ওঠে। রজতাভ সঙ্গে সঙ্গে বিছানার পাশে থাকা পকেট টর্চ বের করে জ্বালিয়ে চিৎকার করে ডাকে, “সুজাতা?”

সুজাতা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “আমি ঠিক আছি রজতদা। তুমি শান্ত হয়ে বসো। বিছানা থেকে নামবে না। এদিকে এরকমই হয়। একটু বাজ পড়লে, বা বৃষ্টি হলেই কারেন্ট চলে যায়। এক কাজ করো, টর্চটা আমায় দাও। আমি প্লেটগুলো রেখে জেনারেটরের সুইচটা অন করে আসছি।”

রজতাভ টর্চ হাতে বিছানা থেকে নেমে বলে, “তুমি একা পারবে না। চলো আমি তোমাকে আলো দেখিয়ে দিচ্ছি।” সুজাতা মাথা নাড়ে, “একদম না! তুমি বিশ্রাম করো। আমি যাচ্ছি।”

- বললাম তো একহাতে প্লেট নিয়ে তুমি পারবে না। চলো আমিও যাচ্ছি তোমার সাথে। এখন আর অতো দুর্বল লাগছে না আমার।

- কোনো দরকার নেই! আমি পারবো। তুমি টর্চটা দাও।

রজতাভ সুজাতার কথায় পাত্তা না দিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায়। সুজাতা রজতাভর পেছন পেছন বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে খাবার প্লেটগুলো সিঙ্কে রেখে হাত ধুয়ে বেরিয়ে আসে সুজাতা। তারপর এগিয়ে যায় ড্রয়িংরুমের এককোণের দিকে। রজতাভ টর্চের আলো দিয়ে পথ দেখায় তাকে। ড্রয়িংরুমের এককোণে সুইচবোর্ডের সামনে এসে দাঁড়ায় সুজাতা। তারপর সুইচবোর্ডের পাশে থাকা একটা লিভারে হ্যাচকা টান দেয়। কিন্তু লিভার নামাতে পারে না। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পরেও ব্যর্থ হয়ে সুজাতা সরে দাঁড়ালে হাল ধরে রজতাভ। সুজাতা টর্চের আলো দেখায়। বেশ কয়েকটা হ্যাচকা টান দিতে গিয়ে সে বোঝে সুইচটা কোথাও জ্যাম হয়ে গেছে। রজতাভ তাও হাল ছাড়ে না। কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পর লিভারটা নামিয়ে দিতেই ড্রয়িংরুমের আলোটা জ্বলে ওঠে। 

আলোটা জ্বলে ওঠামাত্র কলিংবেল সশব্দে বেজে ওঠে। সুজাতা এক ছুটে দরজাটা খোলামাত্র তথাগতরা প্রবেশ করে ঘরের ভেতর। দুজনেই প্রায় কাকভেজা হয়ে ঘরে ঢুকেছে। রজতাভ ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে ওঠে, “ইস! দুজনে একেবারে ভিজে চিপ্পুস হয়ে গেছো দেখছি! কি দরকার ছিল এই ঝড়বৃষ্টি মাথায়‌ করে ফেরার? কোথাও একটু থেমে যেতে পারতে!”

সুজাতা দরজা আটকে দৌড়ে দুজনকে তোয়ালে এগিয়ে দেয়। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে দুজনে যে যার ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। তথাগত পোশাক পাল্টে ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে সিগারেট ধরিয়ে বলে,

-  আর বোলো না! স্পটে পৌঁছে কিছুক্ষণ ঘোরার সাথে সাথে দেখি আকাশের কোণে মেঘ জমেছে। মেঘের ধরণ দেখেই বুঝেছি এ ভোগাবে! সঙ্গে সঙ্গে ঊর্মিকে তাড়া দিলাম। এখানে মাঝে মাঝে এরকম অকাল বর্ষণ ঘটে বুঝলে? এমনিতে তেমন ভোগায় না তবে যখন হয় নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। ওসব এখন বাদ দাও। আগে বলো শরীর কেমন আছে এখন?

সুজাতার দিকে একবার তাকিয়ে রজতাভ বলে,“একটু ভালো। সকালের সেই কাঁপুনিটা নেই। আর তোমার সু যা সেবা করেছে সেটাতেই একবেলায় উঠে বসেছি। আর বারান্দার দরজা খুলে বৃষ্টিতে জুলজুল চোখে ওয়াইল্ডলাইফ দেখেছি।

- ধুস! ওটা আবার দেখা হলো নাকি! আসল দেখা তো আমরা দেখলাম। তুমি জানো না কি মিস করলে তুমি। 

- ও বাদ দাও! পরে আবার শরীর ঠিক থাকলে দেখব। তা ঊর্মির কি খবর?ও আনন্দ পেয়েছে?

- ওর থেকেই শুনে নাও! প্রথম প্রথম মনমরা ছিল ঠিকই তবে এখন দারুণ উপভোগ করছে চারদিক। ফেরার পথেই তো কত পশু দর্শন হল আমাদের! যাদের টাওয়ারে বসে দুরবীনে দেখার কথা তারা আজ ফেরার পথে গাড়ির আশেপাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। বলতে গেলে একদম কাছ থেকে দেখা।

তথাগতর কথা চলাকালীন ঊর্মি পোশাক পাল্টে একটা হাউজকোট পরে ড্রয়িংরুমে ঢোকে। রজতাভর পাশের সোফায় বসে গায়ে হাত দিয়ে জ্বর বোঝার চেষ্টা করে তারপর সুজাতাকে জিজ্ঞেস করে, “ক্যালপল কটার দিকে দিয়েছিলি?” 

সুজাতা হেসে বলে,“বাহ! এসেই  গিন্নিপনা চালু! ওরে তোর বর অক্ষত আছে! ক্যালপল দিয়েছিলাম বারোটার দিকে। তারপর ঘুমিয়ে কাটিয়েছে সারাদিন।”

ঊর্মি সুজাতার কথায় পাত্তা না দিয়ে রজতাভকে জিজ্ঞেস করে, “কিছু খেয়েছ?”

রজতাভ সুজাতার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মনে মনে ফিক করে হেসে বলে, “এই মাত্র খেয়ে উঠলাম। ”

- কী খেলে?

- আমার কথা রাখো। তোমরা কিছু খেয়েছ? দেখে তো মনে হচ্ছে ব্রেকফাস্ট ছাড়া আর কিছু জোটেনি। 

- আগে বলো কি খেলে?

রজতাভ ফিক করে হেসে বলে, “জ্বর মুখে ভাত-ডালে রুচি হচ্ছিল না বলে রাজকীয় ডিমটোষ্ট আর নুনছাড়া চিকেন স্টু গলাধঃকরণ করেছি। এবার তোমাদেরও যদি ভাত-ডালে রুচি না হয় তাহলে তোমরাও খেতে পারো। কি তথাগত? আপত্তি নেই তো?”

তথাগত চুপ করে রজতাভদের কার্যকলাপ দেখছিল। রজতাভর প্রশ্নে হেসে বলে, “না! তেমন আপত্তি নেই।‌ এই অবেলায় খিদে‌ মেটার‌ মতো খাবার পেটে পড়লেই হল।”

তথাগতর কথা শুনে সুজাতা উঠে দাঁড়ায়। তারপর পায়ে পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে তথাগতদের জন্য ডিমটোষ্ট,আর চিকেন স্টু নিয়ে ডাইনিং টেবিলে রেখে ডাক দেয়। তথাগতরা ড্রয়িংরুম থেকে ডাইনিং টেবিলে এসে বসে। সুজাতা পরিবেশন করে দেয় দুজনকে। তারপর টেবিলে বসে। 

টেবিলের এপাশ থেকে‌ সুজাতা দেখে রজতাভ হাসিমুখে‌ ঊর্মির সাথে‌ গল্প করে চলেছে। সুজাতা অপলকে দেখতে থাকে রজতাভকে। কি অদ্ভুত মানুষ এই রজতাভ! এই একটু আগে এই মানুষটাকেই  ঊর্মির থেকে মানসিকভাবে দুরে সরে যাওয়ার জন্য হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখেছে সে। দাম্পত্যজীবনে সুখের খোঁজ হারিয়ে ফেলে উদভ্রান্তের মতো প্রলাপ বকতে দেখেছে সে। অথচ সেই মানুষটাই এখন স্ত্রীর সাথে খুনশুটি করে চলেছে। নিজে হাতে খাই সত্যি! রজতাভ দারুণ অভিনেতা।‌ অবশ্য সেও বা অভিনয়ে কম কীসে? রোজ সেও যে একজন সুখী মানুষের চরিত্রে‌ অভিনয় করে। রজতাভদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুজাতা।

******

এই পর্যন্ত বলে সিগারে শেষ টান দিয়ে চায়ের কাপে গুঁজে সোনার ব্যাকরেস্টে হেলান দেন রজতাভ। সুজাতা‌ মুখে হাত‌‌ দিয়ে বসে থাকেন। পাশে ঐশী সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকেন। কাপে থাকা সিগারটা থেকে তখনও সদ্য ধোঁয়া উঠছে। সেই ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বুঁজে আসা গলায় অভীক বলে ওঠে, “তারপর?”

অভীকের দিকে‌ তাকিয়ে ম্লান হাসেন রজতাভ, “তারপর আর কি?বিকেলের মধ্যে আমার জ্বর সেরে গেল! আরো চারদিন সেখানে থেকে ফিরে এলাম আমরা। তবে ফেরার সময় জানলাম আমরা একা নই। এই পৃথিবীতে আমার মতো আরেকজন আছে। যে সুখী না হয়েও সুখী থাকার অভিনয় করে চলেছে। অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা করছে। বিশ্বাস করো সেদিন সুজাতার আশ্বাসে আমার মনোবল অনেক বেড়ে গেল। আমি আবার সাহস পেলাম ঊর্মিকে ফিরিয়ে আনার। কাজিরাঙ্গা থেকে ফেরার পর প্রতি রবিবার সুজাতাদের ফোন করতাম আমরা। ঊর্মির সাথে অনবরত কথা বলত সুজাতা। সেখানে আমি কয়েকটা কথা বলেই দায় সাড়তাম। সুজাতার সাথে আমার কথা হত অন্যপথে। তখনকার দিনে এই হোয়াটসঅ্যাপ,মেসেঞ্জার ছিল না। ছিল চিঠি, পোষ্টকার্ড। সুজাতার সাথে প্রতি মাসে আমি চিঠিতে কথা বলতাম। রোজকার প্রগ্রেস, মনের ভাব লিখে রাখতাম কাগজে তারপর সেটা পাঠাতাম ওকে। সুজাতাও তাই করত। অবশেষে আমার তপস্যা সফল হল। ঊর্মিকে ফেরাতে পারলাম আমি। আমাদের জীবন আগের মতোই চলতে লাগল। তারপর একদিন ঊর্মি জানাল ঐশীর খবর। সেদিন আমার কি আনন্দ হয়েছিল বলে বোঝানো অসম্ভব। সেদিন রাতেই চিঠি লিখেছিলাম আমি। সুজাতাকে জানিয়েছিলাম খবরটা। তারপর সেটাকে পরদিন ডাকে ফেলে দিয়েছিলাম। সেই আমার পাঠানো শেষ চিঠি।”

“শেষ চিঠি কেন?” ঐশী বলে ওঠে। রজতাভ হেসে বলেন, “কথায় আছে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার যতই চেষ্টা করো না কেন? একদিন না একদিন ধরা পড়বেই! সেদিন তাই হল। আমাদের এই চিঠি চালাচালি ধরা পড়ল। আর পড়বি তো পর একেবারে ঊর্মির হাতে।” 

(চলবে...)

শনিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২২

অস্তরাগ বিংশতম পর্ব




রজতাভ কোনো সাড়া দিচ্ছে না দেখে সুজাতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে যায় ডাইনিং রুমের দিকে। একটা প্লেটে নিজের খাবার বেড়ে নিয়ে খেতে শুরু করে। বাইরে মেঘের অন্ধকার আরো গাঢ় হয়েছে। ভাতের উপর ডাল ঢেলে ভালো করে মেখে প্রথম গ্রাস মুখে তোলে সুজাতা। আর প্রথম গ্রাস মুখে তোলামাত্র গা গুলিয়ে ওঠে তার। ইস! কী বাজে রান্না হয়েছে আজ! একেবারে মুখে তোলার অযোগ্য! অন্যদিন তো এরকম হয় না! মন দিয়েই সে রান্না করে। তবে আজ কেন এরকম হল? সব রজতদার জন্য! লোকটা ওকে এমন দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল যে রান্নাটাও ঠিকঠাক করতে পারেনি সে। অন্যদিন রান্না অল্পবিস্তর খারাপ হলেও মুখে তোলা যায়। আজ তো একেবারেই মুখে দেওয়া যাচ্ছে না! ইস! মিছিমিছি এতগুলো খাবার নষ্ট! পরক্ষণেই চমকে ওঠে সুজাতা। এই রে! এই একই খাবার তো সে রজতাভকেও দিয়ে এসেছে! রজতাভ এই খাবার মুখে তুললে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে! ভাবামাত্র উঠে দাঁড়ায় সুজাতা। তড়িঘড়ি হাত ধুয়ে ছুট লাগায় রজতাভদের ঘরের দিকে। ঘরের কাছাকাছি পৌঁছতেই শুনতে পায় কাঁচ ভাঙার শব্দ এবং তার সাথে ভেসে আসে রজতাভর কাশির শব্দ। ঠিক যেমন কেউ বিষম খেলে কাশে। সুজাতা একছুটে দৌড়ে এসে রজতাভদের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখে দৃশ্যটা। রজতাভর গোটা জামা আর বিছানার সামনের মেঝে ভাত-ডাল তরকারীতে মাখামাখি হয়ে আছে। বিছানার পাশের টেবিলে একটা কাঁচের গ্লাসে জল রাখা ছিল। সেটা ভেঙে গিয়ে ছত্রাখান হয়ে গেছে। তার মাঝে রজতাভ বিছানায় বসে বিষম খেয়ে কেশেই চলেছে।

সুজাতা সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে ডাইনিং রুমে। তৎক্ষণাৎ একটা গ্লাস আর জলের জগ নিয়ে ছুট লাগায় সে। ঘরে ঢুকে সাবধানে মেঝেতে ছড়ানো কাঁচের টুকরো পেরিয়ে গ্লাসে জল ভরে এগিয়ে দেয় রজতাভর দিকে রজতাভ হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিয়ে জল খেতে থাকে। সুজাতা বিষমটা কমানোর জন্য ফু দিতে থাকে রজতাভর মাথায়। কিছুটা জল খাবার পর রজতাভ শান্ত হয়। তারপর বলে, “ইস এত বাজে রান্না আমি বাপের জন্মে খাইনি! তরকারীতে এত নুন কে দেয়?”

- সরি! সরি! রজতদা বিশ্বাস করো। রান্নাটা এত বাজে হবে আমি ভাবতে পারিনি। আগে কোনোদিন এরকম হয়নি।

- নাকি ইচ্ছে করেই এরকম রান্না করেছ যাতে আমাকে শাস্তি দিতে পারো?

- একদমই না! রান্নার ব্যাপারে আমি যথেষ্ট সিরিয়াস থাকি রজতদা। খাবার নষ্ট করা তথাগত একদম পছন্দ করে না। সে কারনে রান্নার সময় আমাকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয় যাতে সব কিছু পরিমাণগত হয়।

- তাহলে আজ এর ব্যতিক্রম হল কেন?

রজতাভর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সুজাতা প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, “গ্লাসটা ভাঙল কী করে?” রজতাভ সুজাতার দিকে কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে থাকে তারপর বলে, “জ্বরের মুখে ডাল দিয়ে ভাতটা বিস্বাদ লাগছিল বলে তরকারী দিয়ে মেখেছিলাম। কিন্তু সে গ্রাস মুখে তোলামাত্র মনে হল যেন পেটের ভাত বেরিয়ে আসবে। কাশতে কাশতে হাত বাড়িয়ে জলের গ্লাসটা নিতে যেতেই হাত ফস্কে পড়ে গেল।” 

- কোনো মানে হয়? আমাকে ডাকলেই তো হত!

- কী লাভ হত? আর তুমি এলেই বা কী করতে? তাছাড়া তোমাকে আমি বিব্রত করতে চাইনি।

- তুমি আমার অতিথি রজতদা। তার উপর অসুস্থ। ঊর্মি তোমার দায়িত্ব আমার উপর দিয়ে গেছে।

- কোনো দরকার নেই আমার দায়িত্ব নেওয়ার। তাছাড়া ঊর্মিই বা কে তোমাকে দায়িত্ব দেওয়ার? আমি কি কোনো অমুল্য ধন  বা দুগ্ধপোষ্য শিশু নাকি?

- তা তোমার হাবভাবে তো তাই মনে হচ্ছে। যেরকম শিশুর মতো অভিমান করছ সেটা তো একটা বাচ্চাকেই মানায়। আর নামতে হবে না। গোটা ঘরের মেঝেতে কাঁচের গুড়ো ছড়িয়ে আছে। নামলেন পায়ে ফুঁটে যাবে। চুপচাপ খাটে পা তুলে বসো।

বলে ঘরের এক কোণ থেকে ঝাড়ু বের করে আনে সুজাতা। কাঁচের গুড়োগুলোকে ঝাড় দিয়ে ঘরের এককোণে জড়ো করে ঝাড়ুটা রেখে দেয় যথাস্থানে। তারপর বিছানা থেকে খাবারের প্লেটের ট্রে-টা তুলে বলে, “এটা আর খেয়ে কাজ নেই। দাঁড়াও ফ্রিজে বোধহয় ডিম পাউরুটি আছে। চটপট ডিমটোস্ট বানিয়ে আনছি।”

রজতাভ বিরক্তিতে ভরা গলায় বলে, “দরকার নেই! আমার আর খিদে নেই!”

- সে তোমার নাই থাকতে পারে। কিন্তু আমার আছে। সকালে এক জোড়া পাউরুটি ছাড়া আর কিছু জোটেনি। আর দুপুরের কথা তো ছেড়েই দিলাম। অগত্যা ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য কিছু তো খেতে হবে! তাই আমি যাচ্ছি আমার জন্য ডিমটোস্ট বানাতে। তুমি বরং তোমার জামাটা পাল্টে নাও। ভাতে-ডালে মাখামাখি হয়ে গেছে। আমি চললাম।

বলে ট্রে হাতে সুজাতা চলে যায় রান্নাঘরে। কিছুক্ষণ পর সুজাতা যখন আবার ট্রে সাজিয়ে ফিরল ততক্ষণে রজতাভ পোশাক পাল্টে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। ট্রে-টা খাটের পাশে রেখে চেয়ারে বসে সুজাতা খেতে শুরু করল। শব্দ শুনে রজতাভ পিছন ফিরে সুজাতাকে দেখে  জিজ্ঞেস করল, “কি ব্যাপার? এ ঘরে বসে খাচ্ছ যে?”

- উপায় কী বলো রজতদা? ঊর্মি যে একটা বাচ্চা ছেলের দায়িত্ব দিয়ে গেছে। চোখের আড়াল করলে যদি আবার কিছু করে বসে!তাই চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে।

- উফ সুজাতা তুমি থামবে!

- যতক্ষণ তোমার এই ছেলেমানুষি না থামছে ততক্ষণ পর্যন্ত তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না!

- সুজাতা!

- ভদ্রমহিলার এককথা! মিছিমিছি জেদ করে লাভ নেই! এতে তোমারই ক্ষতি। ঊর্মি বড় ভালো মেয়ে রজতদা।

- ওকে বুঝিয়ে লাভ নেই সুজাতা! ও বুঝবে না। বরং তোমাকেও ভুল বুঝে বসবে।

রজতাভ চোখ থেকে হাত নামিয়ে তাকায় দরজার দিকে। সুজাতা এগিয়ে এসে বিছানায় বসে।

- কিছু ভুল বুঝবে না। আমি আছি তো! আমি ঠিক বুঝিয়ে বলব। তবে তার আগে জানতে চাই এই বন্ধুত্বের সম্পর্কে তুমি রাজি কিনা?

- রাজি যদি না হতাম তাহলে এতক্ষণে অনেক কিছুই করতে পারতাম সুজাতা। তুমি কিছু করতে পারতে না। এই গোটা বাড়িতে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। আর এই দুর্যোগে চিৎকার করলেও কেউ আসবে না। চাইলে আমি জোর করে অনেক কিছুই করতে পারতাম। তুমি যা ভেবেছ তা করতেও আমাকে কেউ আটকাতে পারতো না। কিন্তু তা আমি করিনি কেন জানো? আমার ভালোবাসার স্পর্শ, মনের দোসরের প্রয়োজন হলেও এতটাও চরিত্রহীন হয়ে উঠিনি যে আমার স্ত্রীর সহোদরা না হলেও বোনের চেয়ে কম নয় এমন স্ত্রীকে নিজের অঙ্কশায়িনী করবো। এতে যেমন বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে, তেমনই একাধিক সম্পর্ক নষ্ট হবে। নিজের চোখে আমি ছোটো হয়ে যাব। তুমি কি ভেবেছিলে? মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাওয়ার নামে…ছিঃ! তুমি আমাকে এতদিনে এই চিনলে সুজাতা? তুমি আমাকে দাদা ডাকো। এতটুকু বিশ্বাস নেই দাদার উপর? মেজর রজতাভ মজুমদারের চরিত্র অতোটাও নীচু নয় যে ঊর্মিকে ভালোবাসা সত্ত্বেও অন্য নারীর কাছে আশ্রয় চাইবে। তার সাথে শারীরিকভাবে… ছিঃ! তুমি আমাকে এত নীচ ভাবতে পারলে?

- না মানে আমি ওভাবে মিন করতে চাইনি। কিন্তু পুরুষজাতটাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি তো!

- বটে? তা এখন পর্যন্ত কটা পুরুষের সাথে সাক্ষাত হয়েছে শুনি? আমি তো জানতাম তুমি দুজনকেই চেন। নাকি ভেতর ভেতর আরো অনুরাগী আছে?

- ইস! তোমার মুখে কি কিছু আটকায় না?

- এই রাগ করলে নাকি? আমি কিন্তু মজা করছিলাম।

- তা রাগ করবো না? তখন থেকে আমার স্বামীর নামে যা নয় তা বলে চলেছ। এমনকি আমাকে আরেকটু হলে বিশ্বাসঘাতিনীতে পরিণত করতে। রাগ করার কারণ হিসেবে কম কী?

- সে তো এমনি এমনি বলছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি কোনো নোংরা ইঙ্গিত করিনি। আমি শুধু তোমার কষ্টটা ভাগ করে নিতে চেয়েছি। এক বন্ধুর মতো।

- সে কারণেই তো প্রস্তাবটা দিলাম। নাহলে সোজা কমপ্লেন করতাম ঊর্মির কাছে। ইস! আবার বাচ্চাদের মতো গোঁসা করেছে!

- ইচ্ছে করে করেছি নাকি? করেছি তো অভিমানে।

- ইস! আবার অভিমান করা হয়েছে! স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ওরকম একটু-আধটু ঝামেলা হয়। সেটাকে নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নিতে হয়। আমাকেই দেখো। তথাগতর সাথে রোজ অ্যাডজাস্ট করি আমি। সংসার মানে এক বিছানায় শোয়া, একছাদের নিচে একসাথে থাকা বা একে অপরের দায়িত্ব নেওয়া নয়! সংসার মানে হল অ্যাডজাস্টমেন্ট। কথাটা নাটকীয় শোনালেও হাড়ে হাড়ে সত্যি। আর এটা একপাক্ষিক নয়। দুই দিক থেকেই চাই। মানছি একটা মানুষ যতই কঠোর হোক না কেন দিনের শেষে তারও একটা আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় সে ঘরের মানুষটাকে ছেড়ে বাইরে আশ্রয় খুঁজে বেড়াবে। সেটা উচিতও নয়। প্রয়োজনে সেই মানুষটাকে বোঝাতে হবে! তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে ভুলটা কোথায়?

- তোমার কি মনে হয়? ঊর্মি বুঝবে?

- বুঝতে হবে! এবং সেটা তুমিই বোঝাবে। 

রজতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “বুঝলাম!”

“কি বুঝলে?” সুজাতা তাকায় রজতাভর দিকে। রজতাভ হেসে বলে, “বড়ো সড়ো ঝামেলা বাঁধতে চলেছে। যাকগে একটা কথা ছিল।”

- কী?

- ঝামেলা লাগার আগে একটু শক্তির প্রয়োজন। কারন ঊর্মিকে সামলানো ভীষণ চাপের। তাই বলছিলাম যে একটু খাবার হলে মন্দ হত না।

- থাক! ঢের অভিনয় হয়েছে। আমি জানতাম তুমি কথাটা তুলবে। তাই তোমার ভাগের খাবারটাও বানিয়েছিলাম। নিয়ে আসছি সেটা। চুপচাপ খেয়ে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করো।

বলে রান্নাঘর থেকে খাবারের প্লেটটা নিয়ে এনে রজতাভর হাতে ধরিয়ে দেয় সুজাতা। তারপর দুজনে খেতে বসে। সুজাতা দেখে রজতাভ গোগ্রাসে খাচ্ছে। দেখে বোঝাই যাচ্ছে ভীষণ ক্ষুধার্ত ও। প্লেটে থাকা পাউরুটি চিবোতে চিবোতে রজতাভর খাওয়া দেখতে থাকে সুজাতা।   


(চলবে...)

মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২২

অস্তরাগ ঊনবিংশতম পর্ব





সুজাতা‌‌ মৃদু প্রতিবাদের সুরে বলে, “কী সব যা তা বলছ তুমি রজতদা! ভুলে যেও না তথাগত আমার স্বামী! মানছি আদরের সময় হুশ হারিয়ে ও একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলে। কিন্তু তাই বলে ওর নামে তুমি যা নয় তা বলবে, এটা হতে পারে না। এটা আমাদের স্বামী-স্ত্রীর একান্ত গোপনীয় আর নিজস্ব ব্যাপার! এখানে আমার স্বামীর ব্যাপারে বাইরের কারোর কোনো মন্তব্য আমি সহ্য করব না! নেহাত তুমি অসুস্থ নাহলে...তুমি বরং ঘুমোও রজতদা।‌ জ্বরের ঘোরে তুমি ভুলভাল বকছ। আমি এলাম।

 

বলে সুজাতা ট্রে নিয়ে খাট থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই শুনতে পায় রজতাভর কন্ঠস্বর, “পালিয়ে যাচ্ছ? যেই সত্যিটা ধরে ফেললাম ওমনি মুখ লুকিয়ে নিলে? কী ভেবেছ? পালিয়ে গেলেই সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে? হবে না! সুজাতা যতই অস্বীকার করো, যতই মুখ লুকিয়ে পালাবার চেষ্টা করো,সত্যিটা কোনোদিনও পাল্টে যাবে না। আর এটা তুমিও জানো! তুমি যাই বলো না কেন? দিনের শেষে‌ তথাগতর রূপে এই সত্যিটাই তোমার সামনে এসে দাঁড়াবে। প্রবল আদরের আঘাতে তোমাকে ক্ষতবিক্ষত করবে, ছিন্নভিন্ন করে দেবে তোমার সমগ্র দেহ,ধ্বংস করে দেবে তোমার এই সুখী দাম্পত্যের ভ্রমটাকে, টেনে ছিড়ে দেবে এই সুখের‌ মুখোশকে। সুখী দাম্পত্যের‌ অভিনয় করাটা যে কি ভীষণ বিষাক্ত আর যন্ত্রণার সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না সুজাতা। কারণ তুমি আমি একই পথের পথিক। ঊর্মি নিঃসন্দেহে একজন ভালো মেয়ে। ওর সাথে এতবছরের সংসার আমার। ওকে ভালোবাসী আমি! কিন্তু বিগত কয়েক বছরে আমার প্রতি ওর সমস্ত অনুভূতি মৃত। হ্যা আমরা একছাদের নিচে থাকি, এক বিছানায় শয়ন করি, কিন্তু একবারের জন্যেও এই কয়েক বছরে আমরা মিলিত হইনি। মিলিত হওয়া তো দুর! হাতে হাত রেখে পাশাপাশি হাটা,কারণে অকারণে জড়িয়ে ধরা, ক্লান্ত হয়ে কাঁধে মাথা রাখা, একটু আদরের স্পর্শ থেকেও বঞ্চিত আমি। এমনকি আমার ছায়ার স্পর্শেও যেন ঊর্মির তীব্র অনীহা। সামান্য একটা অ্যাক্সিডেন্টের কারণে আমার গোটা জীবন তছনছ হয়ে গেছে সুজাতা! একটা তুচ্ছ ভয়ে, একটা অকারণ, অবাস্তব, ভিত্তিহীন কুসংস্কারের জন্যে ঊর্মি সাথে আজ আমার যে দুরত্ব তৈরি হয়েছে তা কোনোদিনই মেটার নয়। কেন জানো? আমার ঊর্মিও যে তোমার তথাগতর মতো মানসিকভাবে অসুস্থ!

কথাগুলো শোনামাত্র সুজাতা ঘরের বাইরে বেরিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। রজতাভর বলা কথাগুলো যেন তার নড়ার শক্তিটুকু কেড়ে নিয়েছে। পা দুটো যেন পাথরের হয়ে গেছে আচমকা। এ কি শুনছে সে? ঊর্মিও মানসিকভাবে অসুস্থ মানে? তবে কী রজতদার সংসারেও অশান্তির ছোঁয়া লেগেছে? ওরা কী এই দাম্পত্যজীবনে সুখী নয়? কিন্তু কেন? কী কারণ এটার? কেন রজতদার মনে হচ্ছে ঊর্মিও মানসিকভাবে অসুস্থ? কী করেছে ঊর্মি? সুজাতা পিছন ফিরে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় রজতাভ ততক্ষণে বিছানায় শুয়ে পড়ে বিড়বিড় করে আপন মনে নিজের সাথেই কথা বলে চলেছে। সুজাতা কান পেতে শোনে রজতাভর স্বগতোক্তিগুলো। রজতাভ বলতে থাকে,

 

- ওর একটাই ভয়! একটাই কথা! ওকে স্পর্শ করলেই আমি নাকি মারা যাব। তুমি জানো না সুজাতা এতগুলো বছর ধরে ঊর্মিকে আমি পাগলের মতো বুঝিয়েছি। ওকে বলেছি এসব মিথ্যে, অমূলক ভাবনা। ওটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল! যে কারো সাথে হতে পারত! কিন্তু ঊর্মি আমার কোনো কথা মানতে চায়নি। এই যে জ্বরে ভুগতে দেখছ! তুমি জানো এটা নর্মাল, আমি জানি এটা নর্মাল! ঊর্মির কি মত জানো? কাল রাতে যেহেতু আমরা একে-অপরের কাছাকাছি এসেছিলাম সে কারণেই আজ জ্বর এসেছে। এরপরেও আমরা যদি আরো কাছাকাছি আসি তাহলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত! হ্যা মৃত্যু তো হয়েছে ঠিকই, তবে সেটা আমার ভালোবাসার! আমার বিশ্বাসের! এতবছরের চেষ্টার! এতবছর ধরে একটু একটু করে বুঝিয়ে তিলে তিলে যে ধারনা থেকে ওকে টেনে বের করেছিলাম আজ এই সামান্য একটা জ্বর সেই সমস্ত প্রচেষ্টা, সংগ্রামকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিল সুজাতা! দুমড়ে মুচড়ে দিল আমার ভালোবাসাটাকে! তোমরা শুধু জ্বরের ঘোরে পড়ে থাকা শরীরের উত্তাপটাকেই দেখলে! এদিকে আমার মন, আমার ইচ্ছে, ভালোবাসা পুড়ে ছাই হয়ে গেল সেটা কেউ টেরও পেলে না! ভালোবাসার অভাবে যে আগুনে এতবছর জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিলাম সে আগুন আজ গ্রাস করল আমার আশার শেষ বিশ্বাসটাকেওআবার প্রমাণিত হল এতগুলো বছর ধরে‌ একটা মৃত সম্পর্ক বয়ে বেড়াচ্ছি আমি! এর চেয়ে তো যুদ্ধক্ষেত্রে গুলি লেগে, বা সেদিন হার্ট অ্যাটাকটায় মরে গেলে ভালো হত! তাহলে এভাবে ক্ষতবিক্ষত হতে হত না সুজাতা! আমিও যে তোমার মতোই নিঃস্ব সুজাতা! দুজনেই ভালোবেসে ভালো থাকার, সকলকে ভালো রাখার অভিনয় করে যাচ্ছি। হাজার আঘাত পেলেও দাঁতে দাঁত চেপে হাসিমুখের মুখোশ পরে সুখী সংসারের অভিনয় করছি। খুব বেশী তফাত নেই আমাদের মধ্যে। না একটাই তফাত আছে! তোমার ক্ষতগুলো শারীরিক। অভিজ্ঞ চোখ দিয়ে দেখলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু আমার! আমার ক্ষতগুলো যে মানসিক সুজাতা! আমি না জানালে কেউ জানতেও পারবে না কী নিদারুন দগদগে ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি আমি! ভেবেছিলাম সময়ের প্রলেপে ক্ষতটা শুকিয়ে গেছে।‌ কিন্তু আজ বুঝলাম ক্ষতটা মোটেও শুকিয়ে যায়নি, বরং ভেতর ভেতর পচে গলে একটা বিষাক্ত গ্যাংগ্রিনে পরিণত হয়ে গেছে! আর এই ক্ষত বয়ে বেড়ানোর মতো মানসিক জোর আমার নেই! আমি ক্লান্ত! একটু বিশ্রাম চাই আমার! একটা আশ্রয় চাই। একটু ঘুমোতে চাই! শান্তির ঘুম। একটু আগে বলছিলে না ঘুমোলে সব ঠিক হয়ে যাবে? আমিও যে সেই ঘুমটাই চাই সুজাতা!

 

সুজাতা‌ নিঃশব্দে‌ দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যাপারটা সে আঁচ করেছিল সেদিন পিকনিক স্পটেই। কিন্তু সেটা যে এতদুর গড়িয়েছে বুঝতে পারেনি। কিন্তু এখানে তার কী ভূমিকা থাকতে পারে? কেন রজতদা ওকে এই কথাগুলো ওকেই বলছে? আর ওই বা কেন এত কথা শুনছে?ভাবতে ভাবতে সুজাতা পায়ে পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।

 

অন্যদিন গুনগুন করে দুপুরের রান্না সাড়লেও আর চুপচাপ রান্না করতে থাকে সে। ভাতের গন্ধে অন্যদিন খিদের পেলেও আজ আনমনা হয়ে পড়ে সুজাতা।  তার মাথায় ঘুরতে থাকে রজতাভর কথাগুলো, “আমিও যে তোমার মতোই নিঃস্ব সুজাতা! দুজনেই ভালোবেসে ভালো থাকার, সকলকে ভালো রাখার অভিনয় করে যাচ্ছি। হাজার আঘাত পেলেও দাঁতে দাঁত চেপে হাসিমুখের মুখোশ পরে সুখী সংসারের অভিনয় করছি। খুব বেশী তফাত নেই আমাদের মধ্যে।কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রান্নায় মন বসে না তার। বার বার রান্নায় ভুল করে বসে সে। ডালে ফোঁড়ন দিতে ভুল হয় তার। তরকারীতে দুবার নুন দিয়ে বসে সে। আগুনের আঁচে তরকারী কড়াইতে পোড়ার উপক্রম হয়। অবশেষে বিরক্ত হয়ে কোনো মতে রান্না শেষ করে গ্যাসের আগুন নিভিয়ে দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোয় সুজাতা।

 

বাথরুমে ঢুকে পরনের পোশাক খুলে সুজাতা তাকায় বাথরুমের ঝাপসা হয়ে আসা আয়নার দিকে। জলের ফোঁটায় ঝাপসা হয়ে আসা কাঁচে ফুটে ওঠা তার প্রতিবিম্বটা যেন আরো অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেন এটা সুজাতার প্রতিবিম্ব নয়, অন্য কোনো অচেনা মানবীর। এক হাতে কাঁচটাকে পরিস্কার করতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতিবিম্বটা। ফুটে ওঠে সুজাতার দেহের সমস্ত বিভাজিকা, চোখের ধেবড়ে যাওয়া কাজল, এতগুলো বছর ধরে বয়ে আসা তথাগতর আদরের স্মৃতিরূপী ক্ষতচিহ্নগুলোসেই চিহ্নগুলোর দিকে তাকিয়ে সুজাতা ক্রমশ অন্যমনস্ক হয়ে ওঠে। ওর মনে ভেসে ওঠে রজতাভর প্রশ্নটা, “তুমি কি অভিনয় করে লুকিয়ে যাচ্ছ সবটা?” অভিনয়! ঠিকই তো! এতদিন ধরে তো সে অভিনয় করেই এসেছে! ভালো স্ত্রী হবার অভিনয়, ভালো শয্যাসঙ্গিনী হবার অভিনয়, স্বামী সোহাগিনী হবার অভিনয়, সুখী দাম্পত্যের অভিনয়। সারারাত তথাগতর পাশবিক আদরের পর সকালে যেন কিছুই হয়নি এমন ভান করে প্রচণ্ড যন্ত্রণাকে চেপে হাসিমুখে থাকার অভিনয়। এত অভিনয় করে সেও যে ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে! তারও যে একটু বিশ্রামের প্রযোজন! একটু শান্তি, একটু আদরের স্পর্শের প্রয়োজন। ইদানীং তথাগতর সাথে ওর সম্পর্কটা কিছুটা যান্ত্রিক হয়ে গেছে। সব থাকলেও প্রাণ নেই! ভালোবাসা নেই! শুধু আছে দিনের শেষে অবাধ, বিকৃত যৌনতা! অথচ বিয়ের পর ছবিটা সম্পুর্ণ উল্টো ছিল। বিয়ের পর তথাগতর প্রেমের বহর দেখে নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবতী মনে হত তার। বিয়ের পর তথাগত মাসে একদিন হলেও ওকে নিয়ে শহরে বেড়াতে নিয়ে যেত, রেস্তরাঁয় একটা প্লেটে দুজনে মিলে খাবার ভাগাভাগি করে খেত, সিনেমা দেখত, বাজারে হাতে হাত ধরে হেঁটে হেঁটে জিনিসপত্র কিনত। ফেরার সময় গাড়িতে তথাগতর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোবার ভাণ করত সে। গাড়ির হাওয়ায় মাথার চুল এলোমেলো হয়ে মুখের সামনে এলে তথাগত নিজের হাতে চুল সরিয়ে দিত। রাতে উদ্দাম সঙ্গমের পর অনেকক্ষণ সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকত। নাইটল্যাম্পের আলোয় অপলকে চেয়ে দেখত সুজাতার ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মুখটাকে। কারণে-অকারণে চুমুতে ভরিয়ে দিত সুজাতার গোটা মুখ। কোনোদিন দুপুরে ফিরে এলে সুজাতাকে চমকে দিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে নাক ঠেকিয়ে প্রাণপণে আঘ্রাণ নিত সুজাতার চুলের সুবাসের। আর এখন? দিনের শেষে যন্ত্রের মতো মেকি হাসি নিয়ে দাম্পত্যজীবন পালন করে ওরা। রাতে অমানুষিক যৌনাচারে প্রায় বন্যজন্তুর মতো সুজাতার দেহটা ছিঁড়েখুঁড়ে ভোগ করে তথাগত। সুজাতার ইচ্ছে-অনিচ্ছে, মতামত, শরীর খারাপ, যন্ত্রণা কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ নেই তার। রোজ রাতে ছিন্নভিন্ন সুজাতার ক্ষতবিক্ষত দেহটাকে দীর্ঘক্ষণ ভোগ করে সুজাতার গর্ভে নিজের সমস্ত পৌরুষ, সমস্ত তেজ উজার করে দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে সে। পাশে ক্ষতবিক্ষত, ছিন্নভিন্ন সুজাতার প্রায় নিষ্প্রাণ দেহটা পড়ে থাকে একা।

 

শাওয়ারটা চালিয়ে দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সুজাতা। শাওয়ারের ঠাণ্ডা জল ভিজিয়ে দেয় তার সর্বাঙ্গ। ক্ষতচিহ্নগুলোয় জলের স্পর্শ লাগতেই শিঁউড়ে ওঠে তার সমগ্র শরীরটা। কৃত্রিম ঝর্ণার বারিধারায় ক্রমশ জলস্নাত হতে হতে তার মাথায় তখনও ঘুরতে থাকে রজতাভর কথাগুলো, “তুমি আমি একই পথের পথিক...আমিও যে তোমার মতোই নিঃস্ব সুজাতা! দুজনেই ভালোবেসে ভালো থাকার, সকলকে ভালো রাখার অভিনয় করে যাচ্ছি। হাজার আঘাত পেলেও দাঁতে দাঁত চেপে হাসিমুখের মুখোশ পরে সুখী সংসারের অভিনয় করছি। খুব বেশী তফাত নেই আমাদের মধ্যে...

 

রজতাভর কথা ভাবতে ভাবতে ক্রমশ উদাসীন হয়ে পড়ে সে। রজতাভও তার মতোই অভাগাভালোবাসার স্পর্শের অপেক্ষা করতে করতে ক্রমশ ক্লান্ত দুজনে। বাইরে থেকে সুখী মানুষের অভিনয় করলেও ভেতর ভেতর দুজনেই অনুভূতি শূন্য একটা মৃত মানুষ। কলের পুতুলের মতো নড়াচড়া করলেও ভেতরে প্রাণ নেই। বাইরে থেকে দুজনে সুখী মনে হলেও ভেতর ভেতর দুজনেই একা। দুজনেই ভালোবাসার কাঙাল। সত্যিই খুব বেশি তফাৎ নেই দুজনের মধ্যে। দুজনেরই চাই একটা ভালোবাসার স্পর্শ। যে স্পর্শে যৌন ইঙ্গিত থাকবে না। অকারণ জোর থাকবে না। যে স্পর্শকে ভরসা করা যাবে। সে স্পর্শকে বিশ্বাস করা যাবে। মন খারাপ হলে পরস্পরকে জড়িয়ে কাঁদা যাবে। অকারণ যৌনতা নয়, প্রেমের স্পর্শ।

 

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সম্বিত ফিরতেই মাথা ঝাকায় সুজাতা। এসব কী ভাবছে সে? তবে কি মনের কোনো গহীন কোনে রজতদার প্রতিনা! না! এ যে অসম্ভব! এ যে পাপ! এ যে অনাচার! তথাগত থাকতে সে রজতাভর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে কেন? সে তো নিজের ভবিতব্য মেনে নিয়েছে। তাহলে কেন বার বার ভাবছে সে রজতাভর কথা? সে যে বিবাহিত! একজন বিবাহিত মহিলা হয়ে পরপুরুষের প্রতি এইরকম ভাবনা যেছিঃ! ছিঃ! কেন বার বার দুর্বল হয়ে পড়ছে সে? কেন বার বার একটা কথাই তার কানে বেজে উঠছে? তবে কি রজতাভও তার মতো সুখী নয় বলে ভেতর ভেতর সে রজতাভর সাথে নিজেকে গুলিয়ে ফেলছে? কিন্তু কেন? রজতাভই বা ওকেই কেন এই কথাগুলো বলল? ও রজতাভর কে হয়? ওর উপর রজতাভর এতটা বিশ্বাস কেন? কেন মনে হচ্ছে বার বার সে রজতাভর কথায় প্রভাবিত হচ্ছে? কেন বার বার মনটা অবাধ্য হতে চাইছে?   

 

দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরে সে। শাওয়ারের জলের শব্দ ছাপিয়ে তার কানে বেজে ওঠে রজতাভর কন্ঠস্বর। একটা কথাই বার বার অনুরণন তোলে তার কানে, “খুব বেশী তফাত নেই আমাদের মধ্যে!” দুহাতে মাথা চেপে নতজানু হয়ে সে বসে পড়ে বাথরুমের মেঝেতে। হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “চুপ করো! চুপ করো! রজতদা দোহাই তোমাকে চুপ করো! এ কোন মায়ায় বেঁধে ফেলতে চাইছ আমাকে তুমি রজতদা? আমার জীবনটা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে! আর কোনো সর্বনাশকে ডেকে এনো না রজতদা! আমার জীবনে ভালোবাসা অনেক আগেই মরে গেছে। সেটাকে আবার জাগিয়ে তুলতে এসো না রজতদা! আমি আমার ভবিতব্যকে মেনে নিয়েছি রজতদা! তুমিও মেনে নাও! আমাকে আমার মতো করে বাঁচতে দাও! প্লিজ রজতদা! আমাকে আমার মতো বাঁচতে দাও।” বলে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে সুজাতা। শাওয়ারের জলের ওর চোখের জল সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

******

সুজাতা চলে যাবার পর জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল রজতাভ। সে ঘুম ভাঙল আবার সুজাতার ডাকে। ঘুম ভাঙার পর রজতাভ চারদিকে তাকিয়ে দেখল ঘর প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। তার মানে কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি নামল বলে। দূরে কোথাও মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। সুজাতা আবার ডাকল রজতাভকে, “রজতদা!” রজতাভ বুঝল সুজাতা দুপুরের খাবার এনেছে। কিন্তু ভেতরে ঢোকেনি, ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। রজতাভ বুঝল সুজাতা ওকে আর বিশ্বাস করতে পারছে না। রজতাভকে এড়িয়ে যেতে চাইছে মেয়েটা। আর কথাটা বোঝামাত্র একটা চাপা অভিমান জন্ম নেয় রজতাভর মনে। শেষমেশ সুজাতাও তাকে ভুল বুঝল! ও তো সুজাতার কাছে কিছুই চায়নি? আশ্রয়, ভালোবাসা কিছু না। সে তো চেয়েছিল সুজাতার সমব্যথী হতে। চেয়েছিল সুজাতার কষ্ট ভাগ করে নিতে। সুজাতাকে জানাতে চেয়েছিল এই পৃথিবীতে সে একা নয়! রজতাভও সুজাতার মতোই এই পৃথিবীতে নিঃস্ব, ভালোবাসার কাঙাল। সে বোঝাতে চেয়েছিল ভালোবাসা দেহাতীত নাহলেও বিকৃত যৌনাচারের নাম ভালোবাসা নয়। এভাবে চলতে থাকলে একদিন তথাগতর অত্যাচারে সুজাতা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সুজাতা কথাটা বুঝতে চাইল না। শুধু তাই নয় ওকে ভুল বুঝে চরিত্রহীন ভেবে বসল! কথাটা অনুধাবন করার পর রজতাভর ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। সুজাতার ডাকে সে ইচ্ছে করে সাড়া দেয় না।

সুজাতা আরো বার দুয়েক ডাকার পর বাধ্য হয়ে রজতাভদের ঘরে ঢোকে। ঘরের আলো জ্বালাবার পর দেখে রজতাভ বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। একটা হাত চোখের উপর রাখা। সুজাতা খাবারের ট্রে-টা বিছানার পাশের টেবিলে রেখে আবার ডাকে রজতাভকে, “রজতদা, খাবারটা খেয়ে নাও।রজতাভ এবারও সাড়া দেয় না। সুজাতা বোঝে রজতাভ ইচ্ছে করে ওর ডাকে সাড়া দিতে চাইছে না। সুজাতা বোঝে কারণটা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রজতাভর গায়ে পড়ে থাকা চাদরটা টেনে দেয় রজতাভর বুক পর্যন্ত। তারপর পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসে ঘরের বাইরে। দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে একবার পেছন ফিরে তাকায় সে। তারপর খানিকটা স্বগোতোক্তির ঢং-য়ে বলে, “যা কোনোদিনও হবার নয় তা নিয়ে এরকম ছেলেমানুষের মতো জেদ তোমাকে মানায় না রজতদা। জিনিসটাকে প্র্যাক্টিক্যালই ভেবে দেখ। আমি জানি তুমি সেভাবে মিন করতে চাওনিতুমি আমাকে বোঝাতে চেয়েছিলে রোজ রাতে তথাগত আমার সাথে যে আচরণটা করে সেটা ভালোবাসা নয়, ভালোবাসা হতে পারে না। তথাগত আমার সাথে যা করে তা হল বিকৃত যৌনাচার তাই তো? এ কথাটা আমি আগে থেকেই জানি রজতদা। একদম আমাদের বিয়ের প্রথম রাত থেকে। ফুলশয্যার রাতে যখন তথাগত আমাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ভোগ করল সেদিন থেকে জানি। কিন্তু আমার কোনোদিন তথাগতর এই আদরকে যৌনাচার বলে মনে হয়নি রজতদা। অন্তত মাসছয়েক আগে পর্যন্ত তো নয়ই! আমার মোহভঙ্গ হল ঠিক মাস ছয়েক আগে। কীভাবে? কেন? সেটা বলবো না। তবে এতটুকু বলতে পারি সেদিনের পর থেকে তথাগতর মুখোশ আমার সামনে খুলে গেছে। কিন্তু কী করব বলো? আমি ছাড়া যে এই পৃথিবীতে তথাগতর আপনজন আর কেউ নেই! মানছি মানুষটা বিছানায় বর্বর-দুর্দমনীয়, কিন্তু এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে মানুষটা আমাকে ভালোবাসে না। আমার কিছু হলে মানুষটা প্রায় উন্মাদ হয়ে যায়। আমি বেসামাল হলে কেউ আসুক বা না আসুক এই লোকটাই এগিয়ে আসে। জামায় বমি করে দিলে বিরক্ত হয় না। আদরের যন্ত্রণায় যখন ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ি, বা পিরিয়ড হয় তখন এই মানুষটাই আমাকে আগলে রাখে। আমার সেবা করে। আমার খোঁজ নেয়। আর আমরা নারীরা তো জানোই চোখের জল আর অনুতপ্ত মুখ দেখে গলে যাই। আর আমি তো চিরকালই বোকা। বলতে পারো ভালোবাসার কাঙাল। তাই তো প্রতিরাতে তথাগতর অত্যাচারে মরতে মরতে বেঁচে ফেরার পর তথাগতকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবলেও সকালে তথাগতর ক্ষমা চাওয়া, ওর সেবায় গলে যাই। যে ভালোবাসার পরশের জন্য আকুল হই সেই পরশের লোভ দেখিয়ে আমাকে আটকে দেয় তথাগত। আর আমি বোকার মতো মুখ বুঁজে থেকে যাই ওর সাথে এই চক্রব্যুহে। আমার কথা বাদ দাও রজতদা। আমি অভাগী মেয়ে, নিজের জীবন, নিজের ভবিতব্যকে মেনে নিয়েছি। আমাকে নিয়ে তোমাকে না ভাবলেও চলবে। তুমি বরং নিজেদের কথা ভাবো। তুমি যা চাইছ তা হবার নয়। কারন এর কোনো ভবিষ্যতই নেই! জানি তুমি চাইছ আমার সমব্যথী হতে, আমার দুঃখ ভাগ করে নিতে। কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ বলতে পারো? কোনো লাভ নেই! বরং ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। তথাগত আর ঊর্মি তো বটেই নিজেদের চোখেও আমরা ছোটো হয়ে যাবো। বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হব আমরা।  আমরা এক হলে যে চারটে জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড়ো কথা তুমি নাহয় বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হবে কিন্তু এর কলঙ্কের ভাগীদার আমাকেও হতে হবে। কলঙ্কিনীর দায় বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন। সে আমি পারব না। তার চেয়ে বরং আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কটাই থাকুক। একটা নিখাদ মিষ্টি বন্ধুত্ব। যার সাথে সব কথা শেয়ার করা যাবে। এমন কথা যা নিজের কাছের মানুষকেও বলা যায় না। যার কাছে মিথ্যে অভিনয় করতে হয় না। যতদুরেই থাকি না কেন মনে হবে আমরা একা নই। আমাদের মতো আরেকজনও আছে। আমরা বরং একে অপরের দোসর হয়ে উঠি। সেই ভালো হবে রজতদা। কোনো কথার আড়াল থাকবে না। দিনের শেষে একা মনে হলে যার কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারব। এমন একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক হলেই ভালো। এতে আমরা একে অপরকে যেমন স্পেস দিতে পারব তেমনই পারব একে অপরের কষ্টের ভাগীদার হতে। আর অভিমান করে থেকো না রজতদা। আমাকে আমার মতো বাঁচতে দাও। নিজেও নিজের মতো বাঁচো। ঊর্মি বড়ো ভালো মেয়ে। ওকে ঠকিও না। তেমন হলে আমি ওর সাথে কথা বলব। ওকে বোঝাবো।” 

(চলবে...)

 


শুক্রবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২২

অস্তরাগ অষ্টাদশতম পর্ব



এইটুকু বলে থামলেন রজতাভ। তাকিয়ে দেখলেন ঐশী আর অভীক তন্ময় হয়ে শুনছে। সুজাতা মাথা নামিয়ে‌ বসে আছেন। রজতাভ পকেট থেকে সিগারকেসটা বের করে একটা সিগার ধরালেন। ঐশীর জন্মানোর পর তে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, “সুজাতাকে দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে ও বিয়েতে সুখী নয়। সারাদিন এত হাসিখুশি, তথাগতর সাথে এত খুনসুটি করত ওর অভিনয় ধরে কার সাধ্য?লোকে ঠিকই বলে, সংসার জিনিসটা বড় বিচিত্রময়। এখানে খুব কম মানুষই সুখী হয়, বাকিদের শুধু ভালোবেসে ভালো রাখার অভিনয়। জানি অভি মানতে চাইবে না, হয়তো রাগ করবে। কিন্তু বাস্তবটা ভীষণ রূঢ়, আর ভয়ংকর। তথাগত বাইরের জগতের কাছে যতটা ডিসেন্ট, যতটা প্রাণখোলা ছিল। বিছানায় ছিল ততটাই বর্বর। অথচ তথাগতর এতে কোনো দোষ ছিল না। ওর Instinct-টাই ছিল এরকম। ছেলেটা ভালো হলেও ভেতরে ছিল এক বন্য কামুকপ্রকৃতির ছেলে। সেক্সুয়াল ব্রুটালিটি নিয়ে আজকাল অনেক কথা শোনা যায়। কারো কারো মতে এটা একটা মানসিক রোগও বলা চলে। একটা আপাতদৃষ্টিতে নিপাট,নিরীহ, শান্ত ভদ্রলোক। বাইরের জগতে অমায়িক, ভদ্র, মার্জিত ব্যবহার। মানুষটা বাস্তবিকই ভালো মনের মানুষ। অথচ শয্যাতে সেই মানুষটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বেশী নির্মম, বর্বর, হিংস্র। আবার কামতৃষ্ণা মেটার পর সেই মানুষটাই অনুতাপে দগ্ধ হয়। তথাগত ছিল সেই প্রকৃতিরই ছেলে। রোজ রাতে সুজাতাকে ছিবড়ে করে দেওয়ার পর নিজেই নতজানু হয়ে ক্ষমা চাইত। সুজাতাকে নিজের থেকেও বেশী ভালোবাসত ছেলেটা। আর সুজাতা ছেলেটার এই ভালোবাসার কাছে হেরে যেত বারবার। এই অত্যাচারে একদিন মরে যাবে জেনেও মুখ বুঁজে সহ্য করে যেত তথাগতকে। হয়তো কথাগুলো আড়ালেই থেকে যেত যদি সেদিন ঊর্মি আমাকে না জানাত।” 

সুজাতা দুহাতে মুখ ঢেকে বসেছিলেন। রজতাভর কথায় মুখ তুলে বললেন,“ওসব কথা থাক না রজতদা! আর শুনতে ইচ্ছে করছে না আমারপুরোনো দিনের কথা না তুললেই নয়?”

রজতাভ ম্লান হেসে বললেন,“ সত্যিটা একবার যখন বেরিয়ে এসেছে, তখন সবটা ওদের জানা দরকার সুজাতা। আমি চাই না অর্ধেক সত্যিটা জেনে ওদের চোখে সারাজীবনের মতো তুমিও কলঙ্কিনী হয়ে পড়ো। কারন সেদিন যা ঘটেছিল সবটা আমার দোষ ছিল। আমিই তো এসেছিলাম তোমার কাছে। সারাজীবন এই পাপের বোঝা বয়ে চলার মতো আর শক্তি বা মনের জোর আমার নেই! সেদিন দুজন মানুষ নিজের বিয়ে থেকে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পরস্পরের কাছাকাছি এলেও বাস্তবে‌ একজনই বাধ্য করেছিল অপরজনকে কাছে আসতে। সেদিন যদি আমি থেমে যেতাম তাহলে আজীবন এই গ্লানি নিয়ে চলতে হত না। গোটা জীবন তোমাকে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় কাটাতে হত না। কিন্তু আমরাও যে নিরুপায় ছিলাম! আর কোনো পথ খোলা ছিল না আমাদের কাছে। নাহলে হয়তো গুমড়ে গুমড়ে আমি মরে যেতাম একদিন।‌ একদিকে ঊর্মির সাথে আমার শীতল সম্পর্ক। অপরদিকে তথাগতর অত্যাচারে ক্ষত বিক্ষত তুমি। অথচ বেশী কিছু তো চাইনি আমরা! একটু ভালোবাসাই তো চেয়েছিলাম। শরীরের ভাজে থাকা, কামগন্ধী, প্রবল যৌন আদর নয়, আমরা চেয়েছিলাম হাতে হাত ধরে হাটতে, প্রবলভাবে ভেঙে পড়লে বা ক্লান্ত হলে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরতে। একটা ভরসার, ভালোবাসার সঙ্গী চেয়েছিলাম আমরা। সংসারে ভালো থাকার অভিনয় করা কুশীলব হতে চাইনি। অথচ আমাদের নিয়তী আমাদের কুশীলবে পরিণত করে তুলেছিল। ঊর্মির প্রত্যাখ্যান যেমন আমাকে ভেতর থেকে নিঃস্ব করে দিয়ে ভালোবাসার পরশের কাঙাল করে তুলেছিল। তথাগতর বন্য যৌন অত্যাচার তেমনই সুজাতার ভেতরের ভালোবাসার শেষ অনুভূতিটুকুকে মেরে ফেলেছিল। আমরা দুজন আলাদা মানুষ‌ হলেও ভেতরে কোথাও যেন এক হয়ে উঠেছিলাম। আর সেটার আভাস আমি পেলাম ঊর্মির কথায়। ঊর্মি সাধারণত সংসারের বাঁধাধরা গতের জীবন কাটানো আদর্শ গৃহবধূ । যে নিয়মের বাইরে বা out of the box ভাবত না। ভাবতে চাইত না। তাই ও বুঝতে পারেনি তোমার খামতিটা কোথায় ছিল। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম! ধরে ফেলেছিলাম তোমার কষ্টটাকে। সে রাতে তোমার মুখোশ অন্তত আমার কাছে খুলে গিয়েছিল।

সুজাতা আবার মুখ ঢেকে ফোপাতে থাকেন। ঐশী সুজাতার পাশে বসে তাকে জড়িয়ে সান্তনা দিতে থাকে। অভীক ধরা গলায় বলে,“ তারপর কী হল?” রজতাভ সিগারে টানা দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে তাকান অভীকের দিকে। তারপর সোফায় হেলান দিয়ে বসে বলেন, “পরদিন সকালে আমাদের সাফারি ঘোরার কথা ছিল। তথাগতও সেদিন ছুটি নিয়েছিল নিজে আমাদের সাফারি ঘোরাবে বলে। কিন্তু বাধ সাধল আমার শরীর। সিজন চেঞ্জে জ্বরের ধাচ আমার চিরদিনের। ঐশীও জানে সেটাকাজিরাঙ্গায় সেই জ্বর বাধিয়ে বসলাম আমি। ভোরের দিকে কাঁপুনি দিয়ে জ্বরটা এলো সকাল হতেই সেটা আরো বেড়ে গেল। ফলে যা হবার ছিল তাই হল। সাফারি বেড়ানো উঠল মাথায়, ঊর্মিরা ব্যস্ত হয়ে উঠল আমাকে নিয়ে। তথাগত ডাক্তার নিয়ে আসতেই তিনি পরীক্ষা করে জানালেন তেমন চিন্তার কিছু নেই। নর্মাল জ্বর, সেরে যাবে। আমিও ঊর্মিকে অভয় দিলাম, বললাম ঘুরে আসতে। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেতে চাইছিল না ও। অবশেষে ঠিক হল সুজাতা থেকে যাবে আমার দেখাশোনার জন্য। ঊর্মি প্রথমে প্রথমে কিন্তু কিন্তু করলেও অবশেষে নিমরাজি হয়ে চলে গেল তথাগতর সাথে সাফারিতে। আমি আর সুজাতা রয়ে গেলাম বাংলোতে।”

*****

ঊর্মিরা চলে যাবার পর রজতাভ কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল জানে না। ঘুম ভাঙল সুজাতার ডাকে। ঘরের চারদিকের আলো প্রায় মরে এসেছে দেখে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসতেই সুজাতা বাধা দিল।

- তুমি শুয়ে থাকো রজতদা। কিছু হয়নি। আসলে সকাল থেকে কিছু খাওনি বলে একটু চিকেন স্যুপ এনেছিলাম তোমার জন্য।

- ও! আমি ভাবলাম…! কটা বাজে এখন?

- সাড়ে বারোটা।

- সেকি! মাত্র সাড়ে বারোটাতেই এত অন্ধকার কেন?

- আকাশের অবস্থা ভালো নয়। সকালে আকাশ পরিস্কার থাকলেও এখন মেঘ জমেছে। বৃষ্টি নামল বলে।

- সেকি! তাহলে ঊর্মিরা…

- সেটাই তো চিন্তা। বৃষ্টি হলে ওরা আটকা পড়ে যাবে। তবে তথা যখন আছে তখন একটু হলেও ভরসা আছে। বুদ্ধি করে ওরা বৃষ্টির আগে ফিরে এলে ভালো। নাও স্যুপটা চটপট শেষ করে ওষুধটা খেয়ে নিয়ে একটা জম্পেশ ঘুম দাও। বিকেলে দেখবে, শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে।

বলে স্যুপের বাটিটা এগিয়ে দেয় রজতাভর দিকে। রজতাভ জ্বরের ঘোরে ঘোলাটে চোখে তাকায়। তারপর বিছানার ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে বসে কাঁপা কাঁপা হাতে স্যুপের বাটিটা নেয়। জ্বরের মুখে স্বাদ না পেলেও স্যুপটায় বেশ পরিমাণে গোলমরিচ গুঁড়ো দেওয়া হয়েছে এটা বোঝে। জ্বরের মুখে স্যুপটা মন্দ লাগে না তার। স্যুপটা শেষ করে ট্রে-তে রাখার পর সুজাতা দুটো ট্যাবলেট এগিয়ে দিতেই সেটাকে গলাধঃকরণ করে জল খেয়ে গ্লাসটা এগিয়ে দেয় সুজাতার দিকে। গ্লাস বাটি গুছিয়ে ট্রে-টা নিয়ে সুজাতা ওঠার চেষ্টা করতেই রজতাভ বাধা দেয়।

- কোথায় যাচ্ছ?

- আপাতত এগুলো রান্নাঘরে রাখতে। তুমি শুয়ে পড়ো রজতদা।

- থাক না ওগুলো। পরে নিয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং আমার সামনে বসো দেখি। কতদিন একসাথে বসে আড্ডা মারা হয় না। এখন আর চাইলেও ঘুম আসবে না আমার। তার চেয়ে বরং একটু গল্প করা যাক। কিছু কথা আছে তোমার সাথে।

- কী কথা?

- কথাটা তথাগত আর তোমাকে নিয়ে। কালরাতে ঊর্মি আমাকে সবটা জানিয়েছে।

- কী জানিয়েছে?

 বলে চমকে ওঠে সুজাতা। ঊর্মি কী জানতে পেরেছে ওর আর তথাগতর সম্পর্কে? কতটা জানতে পেরেছে? কীভাবে জানল? রজতাভ সুজাতার দিকে তাকিয়ে ওর অভিব্যক্তিগুলো লক্ষ্য করে। তারমানে আন্দাজে ঠিক জায়গাতেই ঢিলটা ছুঁড়েছে! রজতাভ সুজাতার দিকে তাকিয়ে বলে, “ সেদিন রাতে ঊর্মি তোমাকে রাতে বিড়বিড় করতে শুনেছে। তুমি নাকি ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে কার থেকে যেন মুক্তি চেয়েছিলে। বলছিলে যন্ত্রণায় সারা শরীর ফেটে যাচ্ছে, তোমার মুক্তি চাই।”

পলকে ঊর্মির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। সর্বনাশ! ঘুমের ঘোরে এইসব বলছিল নাকি? পরক্ষণে নিজেকে সামলে হেসে বলে, “আর তুমি বিশ্বাস করে নিলে? ধুর! কবে কোনদিন ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে কীসব বলেছি তার ঠিক নেই। আর তোমরা ভেবে নিলে আমার আর তথাগতর মধ্যে সমস্যা হয়েছে? সত্যি রজতদা! তোমরা পারোও বটে। ঊর্মিটার নাহয় মাথা খারাপ, তাই বলে তুমিও?”

বলে সুজাতা উঠতে গেলে বাধা দেয় রজতাভ। হেসে বলে “ঊর্মির না হয় মাথা খারাপ। কিন্তু এতটাও নয় যে ও বানিয়ে বানিয়ে বলবে। সত্যি করে বলো তো, এই বিয়েতে তুমি সুখী তো?”

- তোমার শরীর অসুস্থ রজতদা। এখন তোমার ঘুমের প্রয়োজন। জ্বরের ঘোরে ভুলভাল বকছ তুমি।

- নাকি তুমি অভিনয় করে লুকিয়ে যাচ্ছ সবটা? মানুষ চিনতে আমার সচরাচর ভুল হয় না সুজাতা। আর তোমাকে আমি আমাদের বিয়ের পর থেকে চিনি। এবং বেশ ভালো করেই চিনি।

- কীসব ভুলভাল বকছ তুমি রজতদা? তুমি যা ভাবছ তা নয় রজতদা। তথাগত আর আমার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই! আমরা অনেক সুখী।

- কাকে বোকা বানাচ্ছ সুজাতা? তোমার চোখ তো অন্য কথা বলছে।

- না রজতদা তুমি ভুল ভাবছ। ওরকম কিছু হয়নি। আমি বরং যাই। দুপুরের রান্না সেরে ফেলি। তুমি ঘুমোও।

বলে সুজাতা বিছানা থেকে উঠতে গেলে রজতাভ সুজাতার হাত ধরে আটকাবার চেষ্টা করে। কিন্তু সুজাতার হাত ধরামাত্র সুজাতা কঁকিয়ে ওঠায় চমকে ওঠে রজতাভ। সুজাতা প্রবল যন্ত্রণায় বিছানায় বসে পড়ে।

- একি! কী হল? ওভাবে কঁকিয়ে উঠলে কেন? দেখি হাতে কী হয়েছে?

- ও কিছু না। একটু মচকে গেছে।

- মচকে গেছে? কি করে?

- ও মেয়েমানুষদের একটু আধটু চোট লেগে থাকে।

- দেখি!

বলে সুজাতার হাজার বাধা দেওয়ার পরেও ব্যথার জায়গাটা ধরে রজতাভ। আর জায়গাটা দেখামাত্র চমকে ওঠে। সুজাতার হাতে কালশিটের দাগ। হাতের পাঁচটা আঙুলের ছাপ পড়ে গেছে হাতে। রজতাভ বিস্ফারিত চোখে তাকায় সুজাতার দিকে। আর তাকানো মাত্র দেখতে পায় সুজাতার কলারবোনের দিকে একটা কামড়ের দাগ। মানুষের কামড়ের দাগ! তবে কি তথাগত…? সন্দিহান চোখে রজতাভ তাকায় সুজাতার দিকে। সুজাতা নিজের হাত ছাড়িয়ে বলে, “কী দেখছ ওরকম করে?”

- এসব কী সুজাতা?

- ও কিছু নয়। জানোই তো এখানে পোকার উপদ্রব ভীষণ। তারই একটা কামড়েছে হয়তো।

- আমাকে কামড় চেনাতে এসো না সুজাতা। ওটা কোনো পোকার নয়, মানুষের কামড়ের দাগ। মাই গড সুজাতা! তারমানে তথাগত…

- একদমই না! ও আমাকে ভীষণ ভালোবাসে রজতদা। বলতে পারেন নিজের থেকেও বেশি। তবে বিছানাতেই একটু বন্য এই যা! তবে ওর ভালোবাসার কাছে এইটুকু যন্ত্রণা তুচ্ছ। তাছাড়া পুরুষ মানুষ একটু কঠোর নাহলে চলে না। আর ভালোবাসা কবে দেহাতীত থেকেছে বলো তো? সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর আমার কাছে মানুষটা একটু আশ্রয়ের খোঁজে আসে। সারাদিনের জমা রাগ উগড়ে দেয় আদর করার সময়। আবার সকালে ক্ষমাও চায়। ও যে ভীষণ একা রজতদা। এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর ওর কে আছে?

- সেটা আলাদা কথা সুজাতা! মানছি ভালোবাসা কোনোদিনই দেহাতীত হয় না। কিন্তু ভালোবাসার নামে নিজের প্রেমকে তিলে তিলে শেষ করাটা ভালোবাসা নয়। তোমার সাথে তথাগত প্রতিরাতে যা করে চলেছে তা ভালোবাসা নয়! এ যে বিকৃত যৌনাচার! তথাগত যে বিকৃত মনের মানুষ!

(চলবে...)

সোমবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২২

অস্তরাগ সপ্তদশতম পর্ব




পার্ক থেকে তথাগতদের ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। কোয়ার্টারে ফেরার পর নটবরকে রাতের খাবার তৈরীর কথা বলে তথাগতরা গুছিয়ে বসল বৈঠকখানায়। সুজাতা আর ঊর্মি চলে গেল ঊর্মির ঘরে।‌‌ একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশে একটা সুখটান দিয়ে তথাগত বলল,“বলো রজতাভ, কেমন লাগল আজকের অনুষ্ঠানটা?”

- অনবদ্য!‌ আমার তো এখনও চোখের সামনে ওদের নাচ ভেসে উঠছে। সত্যিই আমাদের দেশে প্রাচীন ট্র্যাডিশন, লোকনৃত্যগুলো এদের জন্যেই বেঁচে আছে।

- আরে এতো কিছুই নয়! এই যে‌ ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখলে এরা সবাই কিন্তু ট্রাইবের নয়। কয়েকজনের বাড়ি যথেষ্ট শহরে। অথচ এই নাচে ওরা এত ভালো ট্রেইনড যে এরা ট্রাইবের নয় এটা বিশ্বাস করা শক্ত। আসল ট্রাইবাল ড্যান্স দেখতে হলে ঝাড়খন্ডে যেতে হবে। এছাড়া তোমাদের ঐ যে লেখক, কী যেন নাম, আরে জঙ্গল নিয়ে বেশ গল্প লেখেন।‌ সুজাতার বেশ লাগে ওনার লেখা। হ্যা, মনে পড়েছে! বুদ্ধদেব গুহ! ওনার লেখায় এই ট্রাইবালদের ড্যান্স  নিয়ে অনেক লেখা পাবে। স্পেশালই অবুঝমারের  বাইসন হর্ন মারিয়াদের কথা। মধ্যপ্রদেশের বস্তারে ছিলাম যখন, একবার অবুঝমারে‌ গিয়েছিলাম এদের নাচ দেখতে। বুঝলে রজতাভ,তোমাদের ঐ বুদ্ধদেব গুহ যতটা লিখে গেছেন, বাস্তবে তার চেয়েও জমকালো, রঙিন আর ঝলমলে  ওদের নাচ। সমাজ এগিয়ে গেলেও ওরা এখনও সেই পুরোনো দিনে পড়ে আছে। কিন্তু ওদের থাকা, ওদের চালচলন, আচারবিচার যে কোনো পাশ্চাত্যের সভ্যতাকে গুনে গুনে দশগোল দেবে।  অবশ্য এর ফলে কিছুটা অসুবিধেতেও পড়ে ওরা।

- জানি। আমাদের সভ্যজগতে আমরা জীবন সঙ্গী বাছতে বিয়েতে ভরসা রাখি। আমাদের বাবা-মায়েরা নাহলে আমরা নিজেরাই নিজেদের জীবনসাথী বেছে নিয়ে বিয়েতে আবদ্ধ হই। ওরা সেই বিয়ের ধার ধারে না।  জুটি না মেলা পর্যন্ত একের পর এক সঙ্গীর সাথে মিলিত হতে থাকে। এই অবাধ যৌনাচারের ফলে নানান যৌনরোগে ভোগে।

- কারেক্ট! এই অবাধ যৌনাচারের অনেকের নাকও শিটকোয়, কেউ কেউ ওদের সহজলভ্য ভেবে অভব্যতাও করে বসে। তবে আমার মতে ওদের এই ব্যবস্থাটাই সেরা! যতক্ষণ তোমার মনের মতো নারী না পাচ্ছ ততক্ষণ ট্রায়াল দিতে থাকো। গোটা উপজাতির তরুণী তোমার হাতের কাছে। বুঝলে রজতাভ? গোটা উপজাতির! ইস! জীবন হোক তো এরকম! কোনো বন্ডেজ নেই, কোনো সীমা নেই! কোথায়‌ এরকম বনের পাখির মতো জীবন কাটাবো তার জায়গায় একজন নারীর সাথে বিয়ে নামক একটা  বন্ধন নিয়ে গোটা জীবন কাটাতে হচ্ছে।

বলে তথাগত চটুল হাসি হাসে। তথাগতর নোংরা ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধে হয় না রজতাভর। সে  ঊর্মির ঘরের দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে, “ একটু সামলে ভায়া! তোমার এই অদম্য ইচ্ছের কথা হোমমিনিস্ট্রি জানতে পারলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাইরে শুতে হবে তোমাকে। আর কী করা যাবে? বাঙালি হয়ে জন্মেছ যখন তখন এক স্ত্রীতেই সুখী থাকতে হবে। তবে এর একটা প্লাস পয়েন্ট কী জানো? তোমার মনের মানুষ, তোমার স্ত্রী শুধু তোমারই থাকবে। আর কারো অধিকার থাকবে না ওর উপর। কারও সাহস থাকবে না তাকে স্পর্শ করার। একবার ভেবে দেখ শুধু পুরুষরাই নয়,নারীরাও পুরুষদের  মতো সঙ্গী খোঁজার সুযোগ পায় তথাগত। যতক্ষণ সে উপজাতি থেকে তার মন মতো পুরুষ পাচ্ছে,যে তাকে শারীরিক, মানসিক দিক দিয়ে সুখী করতে সক্ষম ততক্ষণ এই খোঁজ চলে হে! এবার ভেবে দেখো তোমরা দুজনে যদি এই উপজাতিতে জন্মাতে তাহলে কী হতো? তুমি এদিকে জীবন সঙ্গী খুঁজতে উপজাতির সব মেয়েদের সাথে মিশতে শুরু করলে ওদিকে তোমার সুজাতাকে অন্য কেউ অরগ্যাজম দিয়ে তুলে নিল। ব্যাপারটা কীরকম হবে বলো তো?”

উদাহরণটা শুনে নড়ে চড়ে বসে তথাগত। রজতাভ বুঝতে পারে ঘটনাটা কল্পনা করে তথাগতর অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে গেছে। অন্তত ওর  নিভে যাওয়া মুখ দেখে তাই মনে হচ্ছে। তথাগত নিজেকে সামলে কোনো মতে সিগারেটে একটা টান দিয়ে হেসে‌ বলে, “না আমি সেটা বলতে চাইনি। আমি বলতে চেয়েছি  মাঝে মাঝে মনে হয় ওদের একজন হয়ে জন্মালেই বেশ হত! একটা অ্যাডভেঞ্চারময় জীবন কাটাতাম! বনে শিকার করে ফলমূল, মাংস খেয়ে দিন কাটতো। তা না বাঙালি হয়ে সেই থোড়বড়িখাড়া আর খাড়াবড়িথোড়! ধুস! কোনো অ্যাডভেঞ্চারই নেই! তাও ভাগ্যিস বনদপ্তরের চাকরিটা জুটেছিল বলে বাঁচোয়া! নাহলে কোনো সরকারি দপ্তরের কেরানীগিরি করে জীবনটা শেষ হয়ে যেত। বনের এই আদিম মাদকতার স্বাদই পেতাম না।

- রাখো তোমার জঙ্গলের জীবন!আর্মিতে থাকাকালীন ওদের মতোই টিকে থাকার ট্রেনিং নিতে হয়েছিল। সেই ট্রেনিং কতটা যন্ত্রণার বলে বোঝানো অসম্ভব। গোটা জঙ্গলে তুমি আর তোমার সঙ্গীরা, সঙ্গে বেঁচে থাকার আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র,যার ওজন তোমার দেহের ওজনের অর্ধেক হলেও সেটাকে কাঁধে করে বয়ে পথ চলতে হবে। বিপদের মোকাবিলা করতে একটা একহাত লম্বা চপার, নাহলে একটা বড়ো ছোরা, আর একটা কালাশনিকভ ভরসা। খাদ্য, পানীয়, গোলাবারুদ সীমিত। এই অবস্থায় বনের পথে হেটে চলো। পথে সাপ, জোক, বন্যজন্তুর অবাধ বিচরণ। এর মধ্যে বাঁচার জন্যে  রসদ না থাকলে শিকার করো, সেটাকে নিয়ে চলো।‌ কথাতে, লেখাতেই এই জীবন অ্যাডভেঞ্চারময় লাগে। বাস্তবে যখন এই অবস্থায় পড়লে বোঝা যায় স্নায়ুর উপর কতটা চাপ পড়ে। এই যে তুমি বললে বনদপ্তরের চাকরি পেলে বলে বেঁচে গেছ। তুমি তো জানবেই একটা বাঘ ধরতে গেলে যতটা প্রসিডিওরের দরকার তার থেকেও বেশি দরকার ইস্পাতের স্নায়ু হওয়ার। প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকতে হয়। এবার সিচুয়েশনটা কল্পনা করো, বনে একটা বাঘ ঘুরছে, আর তার বিরুদ্ধে তোমার হাতের চপার আর ট্রেনিং পিরিয়ডে শেখা আত্মরক্ষার কৌশল ভরসা। কেমন লাগবে?বনকে ভালোবেসে তার সৌন্দর্যতা উপভোগ করলেই চলবে না হে। বনের স্বরূপ বুঝতে হলে তার মাঝে থেকে তার রকমসকম বুঝে‌ তার মধ্যে বাঁচার রসদ খুঁজে নিতে হবে। যেমনটা ওর সন্তানেরা নেয়। বনকে প্রেমিকা করে নয়, মা ভেবে চলতে হবে। এক শহরকে জানতে হলে যেমন তার জন্য পড়াশোনা করতে হয়, তেমনই একটা বনকে জানতে হলে তাকে ঘুরে দেখতে হবে। সাফারি বা জিপে নয়, পায়ে হেটে। বনের শব্দের সাথে নিজের পদশব্দ মিলিয়ে, বনের গন্ধের সাথে নিজের দেহের গন্ধ মিলিয়ে মিশে যেতে হবে বনের মধ্যে। পোচারগুলো এই নিয়ম মেনে চলে বলেই এত পাহারার পরেও হামলা করতে পারে। ওরা জঙ্গলের হাওয়া বুঝে মিশে যায় বলেই পশুরা বুঝতে পারে না ওদের মৃত্যুফাঁদকে। আর সেই সুযোগে ওরা শিকার করে, যেমন আজ করবে।

তথাগত এতক্ষণ হা হয়ে রজতাভর কথা শুনছিল। রজতাভর শেষ কথায় চমকে ওঠে।

- কী বললে? আজ শিকার করবে ওরা?

ভুল না হলে আজকে হবার চান্স বেশি!

- কিন্তু কেন?

- কারণটা বললে বিশ্বাস করবে না।

- তবুও শুনি?

- কাল তোমরা যখন  মৃত গণ্ডারটা মানে ডেভিডের কথা বলছিলে তখন একটা ব্যাপার মাথায় ঘুরছিল। কিন্তু পরে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম। ব্যাপারটা হল ডেভিড একটা পুর্ণবয়স্ক গণ্ডার ছিল। শুধু তাই নয়, ডেভিড ছিল এখানকার গণ্ডারদের প্রমুখ। আর সেই নিয়ম অনুযায়ী ডেভিডের সঙ্গিনী থাকা...

- লায়লা! হ্যা! ডেভিডের সঙ্গিনী ছিল!

- শুধু তাই নয়, নটবরের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি লায়লার আকার ছোটো হলেও ওর নাকের খড়গ ডেভিডের মতোই প্রকাণ্ড।  শুধু তাই নয় লায়লা নাকি গর্ভবতীও বটে! তোমাকে বলা হয়নি ,ডেভিডের মৃতদেহ দেখার আগে আমরা দেখা পেয়েছিলাম লায়লার। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে  হলেও ওর মতো একটা পুর্ণবয়স্ক মাদি গণ্ডারকে একা ঘুরতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল। সকালে নটবরের সাথে কথা বলে বুঝলাম, ডেভিড ওদের টার্গেট ছিলই না।

- ডেভিড ওদের টার্গেট ছিল না?

- না! খামোখা একটা গণ্ডার যে কিনা এখানকার স্টার অফ অ্যাট্রাকশন তাকে মেরে গোটা বনদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ কে করতে যাবে? কাজটা বোকামো হয়ে যাবে না?

- তাহলে ওদের টার্গেট ছিল কে?

- ওদের টার্গেট ছিল লায়লা। কিন্তু অন্ধকারে ভুলবশত ওরা মেরে ফেলে ডেভিডকে। লায়লা আর ডেভিড একই প্রজাতির,একই আকারের খড়গ হওয়ায় ওরা ভুল করে বসে। ভুলটা করার পর ওদের খেয়াল হলেও তখন কিছু করার ছিল না। অগত্যা কাজ সেরে পালিয়ে গিয়েছিল।

- কিন্তু আজকেই যে হামলা করবে কি করে শিওর হচ্ছ?

- লায়লা যে পুর্ণগর্ভা! যেকোনো সময় প্রসব করতে পারে ও। আর সেই সুযোগটাই নেবে ওরা। লায়লা প্রসব করতে এক জায়গায় দাঁড়াবেই। আর আমি যতদুর জানি ও প্রসব করবে ডেভিডের মৃতদেহ যেখানে পেয়েছিলাম সেই জায়গাতেই। জায়গাটা নরম ঘাসে ভর্তি।

- তাহলে তো আমাদের হাতে সময় নেই! এখনই বেরোতে হয়!এখনই ফোর্সকে অ্যালার্ট করে দিচ্ছি।

- দাঁড়াও! লায়লাকে বাঁচাতে গেলে অতো হুড়যুদ্ধ করে নয়। বুদ্ধি করে এগোতে হবে। জায়গাটাকে কর্ডন করবে তোমরা, তবে নিশব্দে। যেভাবে ওরা করে। একটা পরিকল্পনা এসেছে মাথায়, দাঁড়াও বলছি!

বলে দুজনে বসে গভীর আলোচনায়। কিছুক্ষণ পর তথাগত ওর কোয়ার্টারের টেলিফোনে ফরেস্ট কনজার্ভেটর সাহেবের সাথে কিছু শলাপরামর্শ করে নেয়। ফোন রাখার সাথে সাথে নটবর জানায় খাবার তৈরী। খেতে বসলেই হল। নটবরের কথা শুনে তথাগত সুজাতাদের ডাকে। সুজাতারা এলে সকলে মিলে খেতে বসে। খাওয়ার টেবিলে তথাগত সুজাতাকে জানায় আজ রাতে সে একটু বেরোবে, ফিরতে দেরী হলে রাতটা একেবারে কাটিয়ে কাল সকালে  ফিরবে। সুজাতা অবাক হলেও তথাগতর গম্ভীর মুখ দেখে কিছু বলে না। ঊর্মি রজতাভকে ইশারা করে ব্যাপারটা জানতে চাইলে রজতাভ মাথা নাড়ে।

খাবার পালা শেষ হলে রজতাভ পোশাক পরে বেরিয়ে‌ পড়ে। ঊর্মি  ঠিক করে আজ রাতটা সে  সুজাতার সাথে শোবে। তথাগত বাধা দেয় না। সেই মতো রাতে যে যার ঘরে শুয়ে পড়ে।

কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করার পরেও ঘুম আসছে না দেখে উঠে পড়ে রজতাভ। বিছানার‌ পাশের টেবিলে রাখা হাত ঘড়িতে দেখে রাত সাড়ে বারোটা বাজে। ভীষণ গুমোট ঘরে। হয়তো একারণেই ঘুম আসছে না তার। তাছাড়া গণ্ডারটাকে নিয়ে একটা উত্তেজনা তো আছেই। বিছানা থেকে নামে রজতাভ। এই সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়টা ভীষণ গোলমেলে। এই গরম, আবার এই শীত। বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে জল দিয়ে বেরিয়ে  এসে ড্রেসিং টেবিলে রাখা সিগারকেস, অ্যাশট্রে আর লাইটার নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় রজতাভ। একটা সিগার ধরিয়ে আরামকেদারায় বসে সে। আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে।  আকাশে চাঁদের আলোয় কিছুটা হলেও অন্ধকারটা কমেছে। সেই আলোয় সে তাকিয়ে থাকে সামনের বনের দিকে। কান পেতে শোনার চেষ্টা করে একটা কাঙ্ক্ষিত শব্দকে। কিছুক্ষণ পর শোনা যায় সেই শব্দটা। বনের ঝিঁঝিঁপোকা, আর রাতচড়া পাখির ডাককে ছাপিয়ে, বনের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে ,চারদিক কাঁপিয়ে শব্দটা আসে।  একবার! দুবার! কয়েকবার! এ শব্দ তার ভীষণ চেনা! কতকাল পর শুনে মনে আনন্দের‌ সঞ্চার হয় তার। এ শব্দ‌ বন্দুকের গুলির! বনের এককোণে একাধিক রাইফেল গর্জে উঠেছে।  আরামকেদারায় হেলান দিয়ে আরাম করে সিগারটা শেষ করে রজতাভ। তারপর অবশিষ্ট অংশটা অ্যাশট্রে তে গুঁজে ঘরে ঢোকে। অ্যাশট্রেটা ড্রেসিং টেবিলে রেখে বিছানায় শোওয়ার তোড়জোড় করতেই দরজায় কড়াঘাতে শব্দ শোনে সে।  বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলতেই দেখতে পায় সুজাতারা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। চিন্তিত মুখে ঊর্মি জিজ্ঞেস করে,

- শুনেছ?

- হুম! শুনেছি! ওটা গুলির শব্দ। চিন্তা করার কিছু নেই। তোমরা শুয়ে পড়ো।

- কিন্তু রাতবিরেতে জঙ্গলে কে গুলি চালাতে যাবে?

- যারা সাধারণত চালায় তারা। নির্ঘাত পোচাররা চোরাশিকার করতে বেরিয়েছিল, গার্ডদের  নজরে পড়ে গেছে। তাই গোলাগুলি চলছে।

- সে জন্যেই তো চিন্তা হচ্ছে! তথাগত নেই। হুট করে রাতে বেরিয়ে গেল, তার উপর এত রাতে গুলির শব্দ।

- বললাম তো! ভয়ের কিছু নেই! পোচাররা অ্যামুনেশন খুব কম নেয়, বেশিরভাগ ট্র্যাংকুলাইজারই রাখে। তেমন রোগ জন্তর পাল্লায় পড়লে তখন গুলির দরকার পড়ে। তথাগত তো বলেই গেছে, ফিরতে রাত হবে। তেমন হলে কাল সকালে ফিরবে। যাও শুয়ে পড়ো।

- সুজাতা বলছিল, এখানে নাকি কোনোদিন গুলিগোলা চলেনি...

ঊর্মিকে একটু দ্বিধাগ্রস্থ দেখায়।‌‌ রজতাভ এবার বিরক্ত হয়ে বলে, “আশ্চর্য! গোলাগুলি চলেনি মানে কি কোনোদিনও চলবে না? আত্মরক্ষার জন্যে যে কেউ গুলি চালাতেই পারে! একজন এক্স আর্মি অফিসারের স্ত্রী হয়ে কী সব উল্টোপাল্টা বলছ?এত ভয় কীসের?”

তারপর সুজাতার দিকে তাকিয়ে বলে, “ভয়ের কিছু নেই! বন্দুকের শব্দ শুনে যা বুঝলাম তথাগত একা নয়, আরো অনেকে ওর সাথে আছে। তেমন হলে কাল তথাগত ফিরলে ওর থেকে সবটা জেনে নিও! আপাতত দুজনে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো,ভয় নেই!

সুজাতা মাথা নেড়ে ঊর্মিকে নিয়ে ওদের ঘরে চলে যায়। রজতাভ দরজা লাগিয়ে দেয়।

 পরদিন সকালে তথাগত ফিরলে সকলে মিলে ঘিরে ধরে তাকে। সারারাত জাগার ক্লান্তি কাটানোর জন্যে সুজাতা চটপট এককাপ কফি বানিয়ে দেয় তথাগতর জন্যে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসে তথাগত‌, তারপর সবটা বলার পর রজতাভর দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব ভায়া? তোমার অনুমান, এমনকি জায়গাটা পর্যন্ত একদম মিলে গিয়েছে! যেখানে ডেভিডের বডি আমরা পেয়েছিলাম, লায়লা ঠিক সেখানেই বাচ্চা প্রসব করতে এসেছিল! ভাগ্যিস আমরা স্পটে ছিলাম! নাহলে শুয়ারগুলো লায়লাকে তো মারতোই, ওর বাচ্চাটাকেও নিয়ে যেত! ফরেস্ট কনজার্ভেটর সাহেব তোমার ভীষণ প্রশংসা করেছেন! উনি চাইছেন তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে! কাজিরাঙার প্রাইড রক্ষা করার জন্য তোমাকে উনি সম্বর্ধনা দিতে চান!"

রজতাভ হেসে বলে, “এসবের কোনো দরকার নেই! একটা বন্যপ্রাণ রক্ষা পেল এটাই অনেক বড়ো পাওনা। ওনাকে বারন করো এসব করতে। আর যদি সম্বর্ধনা দিতেই হয় তাহলে তা তোমাদের মানে কাল যারা স্পটে ছিলে তাদের প্রাপ্য। আমি তো শুধু বুদ্ধি দিয়ে খালাস! সেটা ব্যর্থও হতে পারত। হয়নি তোমাদের জন্য। কারণ আমার  অবাস্তব বুদ্ধিটাকে বাস্তবায়িত করে, নিজের জীবন বাজি রেখে  তোমরা লড়েছ। আমি তো বুদ্ধি দিয়ে খেয়ে দেয়ে বিছানায় টানটান হয়ে ঘুম দিয়েছি। তা কজন পোচার ধরা পড়ল?"

- ছজন পোচার। প্রত্যেকে আর্মড ছিল। রাইফেল পেয়েছি ছটা। আট রাউন্ড ট্র্যাঙ্কুলাইজার ডার্ট,তিন রাউন্ড গুলি,দুটো কুকরি,চারটে চপার,একটা চিতাবাঘের ছাল,এক পলিপ্যাকে প্যাঙ্গোলিনের আঁশ, আর কী পেলাম জানো?

- ডেভিডের খড়গটা তো?

- একদম অক্ষত অবস্থায়!তোমার আন্দাজই সঠিক! ওরা ডেভিডের খড়গটা পাঁচার করতে পারেনি।

- তাই তো কাল রাতে আবার এসেছিল। লায়লা আর তার সন্তান কেমন আছে?

- দুজনেই সুস্থ। আপাতত জায়গাটা আমরা সিলড রেখেছি কয়েকদিন পর বাচ্চাটা একটু সবল হলে পাবলিকের সামনে আনবো। তা ভায়া একটা অনুরোধ তোমাকে রাখতে হবে।

- আবার কী?

- বাচ্চাটার একটা নামকরণ করে দিতে হবে তোমায়! না বলতে পারবে না।

- এতো আচ্ছা মুশকিলে ফেললে দেখছি! এসব আমি পারি নাকি? এটা আমাদের অর্ধাঙ্গিনী ডিপার্টমেন্টের কাজ।

- তাও একটা নাম তোমাকে দিতে হবেই।

- আচ্ছা বেশ! ডেভিডের সন্তান, যে মরণ থেকে বেঁচে ফিরেছে, বাপ-মায়ের যোগ্য উত্তরসূরী হুম! মাইকেল রাখতে পারো।

- মাইকেল?

- হুম, মাইকেল। বাইবেল অনুসারে ঈশ্বরের প্রথম পুত্র, প্রথম সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্ট স্বর্গের রক্ষকদের সর্বোচ্চ নায়ক, আর্চএঞ্জেলদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে কুশল ও ভয়ঙ্করতম যোদ্ধা, শয়তানকে ঈশ্বরের আদেশে যিনি নরকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। আমাদের ডেভিডের সন্তানও তাঁর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সে প্রায় মৃত্যুকে সাক্ষী করে, একাধিক উন্নত মস্তিস্কের শত্রুদের লোলুপদৃষ্টি এড়িয়ে পৃথিবীতে পা রেখেছে।

- বেশ! আজ থেকে ওর নাম হবে মাইকেল!

 সেদিনের ঘটনার দুই দিন পর, কাজিরাঙ্গা ফরেস্টের কনজার্ভেটর জনপ্রকাশ্যে নিয়ে এলেন ডেভিডের সন্তান মাইকেলকে। পর্যটকদের প্রায় ভীড় লেগে গেল গণ্ডারশাবকটিকে দেখার জন্য। সকলে দেখল মা লায়লার সাথে গুটিগুটি পায়ে হেটে চলেছে একটা খুদে গণ্ডারশাবক।

 সেদিন রাতে তথাগতরা আমন্ত্রণ পেল কনজার্ভেটর সাহেবের কাছে। পার্টিতে পৌঁছোবার পর কনজার্ভেটর সাহেব এগিয়ে এলেন ওদের অভ্যর্থনা করার জন্য।

- আরে আসুন! আসুন! মোস্ট ওয়েলকাম মেজর মজুমদার! মিসেস মজুমদার, মিসেস চৌধুরী, তথাগত ওয়েলকাম!

- সরি, আসলে একটু দেরী হয়ে গেল!

-  নো ইস্যুজ! আজকের পার্টিটা তো আপনাদের অনারেই আয়োজন করা! ভেতরে চলুন, আমার মিসেস আপনাদের সাথে দেখা করলে ভীষণ খুশি হবেন।

বলে ওরা সকলে মিলে বাংলোর ভেতরে প্রবেশ করেন।

পার্টি থেকে ফিরে পোশাক পাল্টে, ফ্রেশ হয়ে রজতাভরা যখন বিছানায় শয্যা নিল তখন বেশ রাত হয়েছে। বিছানায় শোয়ার পর ঊর্মি রজতাভর বুকে মাথা দিয়ে বলল, “আজকের দিনটা বেশ কাটল বল?”

রজতাভ ঊর্মির চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, “হুম!”

- আজকে পার্টিতে সুজাতাকে কি হাসিখুশি লাগছিল না?

- ওকে তো সব সময়ই হাসিখুশি লাগে।

- হুম। তা ঠিক! কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়, মেয়েটা সুখী নেই।

- কেন?

- সেটাই তো বুঝতে পারছি না কেন? এত ভালো একটা বর, এত ভালো একটা জীবন, অথচ মেয়েটাকে দেখে মনে হয় কী যেন একটা নেই ওর জীবনে। কী কারনে যেন ও সুখী নেই। ও যেন সুখী থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে। কীসের যে এত অভাব বুঝি না আমি। কালরাতে ঘুমের ঘোরে কীসব বিড়বিড় করছিল। সকালে জিজ্ঞেস করতেই চেপে গেল। কী যে চলছে কে জানে? কাল তেমন হলে তথাগতর সাথে কথা বলে দেখো তো?

- ঠিক আছে বলব।

বলতে বলতে হাই তোলে ঊর্মি। তারপর পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। রজতাভ ভ্রু কুঁচকে জেগে থাকে একা। ওর কানে বাজতে থাকে ঊর্মির কথাগুলো,‘এত ভালো একটা বর, এত ভালো একটা জীবন, অথচ মেয়েটাকে দেখে মনে হয় কী যেন একটা নেই ওর জীবনে। কী কারনে যেন ও সুখী নেই। ও যেন সুখী থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে।'

(চলবে...)

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...