অনুসরণকারী

সোমবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২২

অস্তরাগ সপ্তদশতম পর্ব




পার্ক থেকে তথাগতদের ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। কোয়ার্টারে ফেরার পর নটবরকে রাতের খাবার তৈরীর কথা বলে তথাগতরা গুছিয়ে বসল বৈঠকখানায়। সুজাতা আর ঊর্মি চলে গেল ঊর্মির ঘরে।‌‌ একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশে একটা সুখটান দিয়ে তথাগত বলল,“বলো রজতাভ, কেমন লাগল আজকের অনুষ্ঠানটা?”

- অনবদ্য!‌ আমার তো এখনও চোখের সামনে ওদের নাচ ভেসে উঠছে। সত্যিই আমাদের দেশে প্রাচীন ট্র্যাডিশন, লোকনৃত্যগুলো এদের জন্যেই বেঁচে আছে।

- আরে এতো কিছুই নয়! এই যে‌ ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখলে এরা সবাই কিন্তু ট্রাইবের নয়। কয়েকজনের বাড়ি যথেষ্ট শহরে। অথচ এই নাচে ওরা এত ভালো ট্রেইনড যে এরা ট্রাইবের নয় এটা বিশ্বাস করা শক্ত। আসল ট্রাইবাল ড্যান্স দেখতে হলে ঝাড়খন্ডে যেতে হবে। এছাড়া তোমাদের ঐ যে লেখক, কী যেন নাম, আরে জঙ্গল নিয়ে বেশ গল্প লেখেন।‌ সুজাতার বেশ লাগে ওনার লেখা। হ্যা, মনে পড়েছে! বুদ্ধদেব গুহ! ওনার লেখায় এই ট্রাইবালদের ড্যান্স  নিয়ে অনেক লেখা পাবে। স্পেশালই অবুঝমারের  বাইসন হর্ন মারিয়াদের কথা। মধ্যপ্রদেশের বস্তারে ছিলাম যখন, একবার অবুঝমারে‌ গিয়েছিলাম এদের নাচ দেখতে। বুঝলে রজতাভ,তোমাদের ঐ বুদ্ধদেব গুহ যতটা লিখে গেছেন, বাস্তবে তার চেয়েও জমকালো, রঙিন আর ঝলমলে  ওদের নাচ। সমাজ এগিয়ে গেলেও ওরা এখনও সেই পুরোনো দিনে পড়ে আছে। কিন্তু ওদের থাকা, ওদের চালচলন, আচারবিচার যে কোনো পাশ্চাত্যের সভ্যতাকে গুনে গুনে দশগোল দেবে।  অবশ্য এর ফলে কিছুটা অসুবিধেতেও পড়ে ওরা।

- জানি। আমাদের সভ্যজগতে আমরা জীবন সঙ্গী বাছতে বিয়েতে ভরসা রাখি। আমাদের বাবা-মায়েরা নাহলে আমরা নিজেরাই নিজেদের জীবনসাথী বেছে নিয়ে বিয়েতে আবদ্ধ হই। ওরা সেই বিয়ের ধার ধারে না।  জুটি না মেলা পর্যন্ত একের পর এক সঙ্গীর সাথে মিলিত হতে থাকে। এই অবাধ যৌনাচারের ফলে নানান যৌনরোগে ভোগে।

- কারেক্ট! এই অবাধ যৌনাচারের অনেকের নাকও শিটকোয়, কেউ কেউ ওদের সহজলভ্য ভেবে অভব্যতাও করে বসে। তবে আমার মতে ওদের এই ব্যবস্থাটাই সেরা! যতক্ষণ তোমার মনের মতো নারী না পাচ্ছ ততক্ষণ ট্রায়াল দিতে থাকো। গোটা উপজাতির তরুণী তোমার হাতের কাছে। বুঝলে রজতাভ? গোটা উপজাতির! ইস! জীবন হোক তো এরকম! কোনো বন্ডেজ নেই, কোনো সীমা নেই! কোথায়‌ এরকম বনের পাখির মতো জীবন কাটাবো তার জায়গায় একজন নারীর সাথে বিয়ে নামক একটা  বন্ধন নিয়ে গোটা জীবন কাটাতে হচ্ছে।

বলে তথাগত চটুল হাসি হাসে। তথাগতর নোংরা ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধে হয় না রজতাভর। সে  ঊর্মির ঘরের দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে, “ একটু সামলে ভায়া! তোমার এই অদম্য ইচ্ছের কথা হোমমিনিস্ট্রি জানতে পারলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাইরে শুতে হবে তোমাকে। আর কী করা যাবে? বাঙালি হয়ে জন্মেছ যখন তখন এক স্ত্রীতেই সুখী থাকতে হবে। তবে এর একটা প্লাস পয়েন্ট কী জানো? তোমার মনের মানুষ, তোমার স্ত্রী শুধু তোমারই থাকবে। আর কারো অধিকার থাকবে না ওর উপর। কারও সাহস থাকবে না তাকে স্পর্শ করার। একবার ভেবে দেখ শুধু পুরুষরাই নয়,নারীরাও পুরুষদের  মতো সঙ্গী খোঁজার সুযোগ পায় তথাগত। যতক্ষণ সে উপজাতি থেকে তার মন মতো পুরুষ পাচ্ছে,যে তাকে শারীরিক, মানসিক দিক দিয়ে সুখী করতে সক্ষম ততক্ষণ এই খোঁজ চলে হে! এবার ভেবে দেখো তোমরা দুজনে যদি এই উপজাতিতে জন্মাতে তাহলে কী হতো? তুমি এদিকে জীবন সঙ্গী খুঁজতে উপজাতির সব মেয়েদের সাথে মিশতে শুরু করলে ওদিকে তোমার সুজাতাকে অন্য কেউ অরগ্যাজম দিয়ে তুলে নিল। ব্যাপারটা কীরকম হবে বলো তো?”

উদাহরণটা শুনে নড়ে চড়ে বসে তথাগত। রজতাভ বুঝতে পারে ঘটনাটা কল্পনা করে তথাগতর অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে গেছে। অন্তত ওর  নিভে যাওয়া মুখ দেখে তাই মনে হচ্ছে। তথাগত নিজেকে সামলে কোনো মতে সিগারেটে একটা টান দিয়ে হেসে‌ বলে, “না আমি সেটা বলতে চাইনি। আমি বলতে চেয়েছি  মাঝে মাঝে মনে হয় ওদের একজন হয়ে জন্মালেই বেশ হত! একটা অ্যাডভেঞ্চারময় জীবন কাটাতাম! বনে শিকার করে ফলমূল, মাংস খেয়ে দিন কাটতো। তা না বাঙালি হয়ে সেই থোড়বড়িখাড়া আর খাড়াবড়িথোড়! ধুস! কোনো অ্যাডভেঞ্চারই নেই! তাও ভাগ্যিস বনদপ্তরের চাকরিটা জুটেছিল বলে বাঁচোয়া! নাহলে কোনো সরকারি দপ্তরের কেরানীগিরি করে জীবনটা শেষ হয়ে যেত। বনের এই আদিম মাদকতার স্বাদই পেতাম না।

- রাখো তোমার জঙ্গলের জীবন!আর্মিতে থাকাকালীন ওদের মতোই টিকে থাকার ট্রেনিং নিতে হয়েছিল। সেই ট্রেনিং কতটা যন্ত্রণার বলে বোঝানো অসম্ভব। গোটা জঙ্গলে তুমি আর তোমার সঙ্গীরা, সঙ্গে বেঁচে থাকার আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র,যার ওজন তোমার দেহের ওজনের অর্ধেক হলেও সেটাকে কাঁধে করে বয়ে পথ চলতে হবে। বিপদের মোকাবিলা করতে একটা একহাত লম্বা চপার, নাহলে একটা বড়ো ছোরা, আর একটা কালাশনিকভ ভরসা। খাদ্য, পানীয়, গোলাবারুদ সীমিত। এই অবস্থায় বনের পথে হেটে চলো। পথে সাপ, জোক, বন্যজন্তুর অবাধ বিচরণ। এর মধ্যে বাঁচার জন্যে  রসদ না থাকলে শিকার করো, সেটাকে নিয়ে চলো।‌ কথাতে, লেখাতেই এই জীবন অ্যাডভেঞ্চারময় লাগে। বাস্তবে যখন এই অবস্থায় পড়লে বোঝা যায় স্নায়ুর উপর কতটা চাপ পড়ে। এই যে তুমি বললে বনদপ্তরের চাকরি পেলে বলে বেঁচে গেছ। তুমি তো জানবেই একটা বাঘ ধরতে গেলে যতটা প্রসিডিওরের দরকার তার থেকেও বেশি দরকার ইস্পাতের স্নায়ু হওয়ার। প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকতে হয়। এবার সিচুয়েশনটা কল্পনা করো, বনে একটা বাঘ ঘুরছে, আর তার বিরুদ্ধে তোমার হাতের চপার আর ট্রেনিং পিরিয়ডে শেখা আত্মরক্ষার কৌশল ভরসা। কেমন লাগবে?বনকে ভালোবেসে তার সৌন্দর্যতা উপভোগ করলেই চলবে না হে। বনের স্বরূপ বুঝতে হলে তার মাঝে থেকে তার রকমসকম বুঝে‌ তার মধ্যে বাঁচার রসদ খুঁজে নিতে হবে। যেমনটা ওর সন্তানেরা নেয়। বনকে প্রেমিকা করে নয়, মা ভেবে চলতে হবে। এক শহরকে জানতে হলে যেমন তার জন্য পড়াশোনা করতে হয়, তেমনই একটা বনকে জানতে হলে তাকে ঘুরে দেখতে হবে। সাফারি বা জিপে নয়, পায়ে হেটে। বনের শব্দের সাথে নিজের পদশব্দ মিলিয়ে, বনের গন্ধের সাথে নিজের দেহের গন্ধ মিলিয়ে মিশে যেতে হবে বনের মধ্যে। পোচারগুলো এই নিয়ম মেনে চলে বলেই এত পাহারার পরেও হামলা করতে পারে। ওরা জঙ্গলের হাওয়া বুঝে মিশে যায় বলেই পশুরা বুঝতে পারে না ওদের মৃত্যুফাঁদকে। আর সেই সুযোগে ওরা শিকার করে, যেমন আজ করবে।

তথাগত এতক্ষণ হা হয়ে রজতাভর কথা শুনছিল। রজতাভর শেষ কথায় চমকে ওঠে।

- কী বললে? আজ শিকার করবে ওরা?

ভুল না হলে আজকে হবার চান্স বেশি!

- কিন্তু কেন?

- কারণটা বললে বিশ্বাস করবে না।

- তবুও শুনি?

- কাল তোমরা যখন  মৃত গণ্ডারটা মানে ডেভিডের কথা বলছিলে তখন একটা ব্যাপার মাথায় ঘুরছিল। কিন্তু পরে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম। ব্যাপারটা হল ডেভিড একটা পুর্ণবয়স্ক গণ্ডার ছিল। শুধু তাই নয়, ডেভিড ছিল এখানকার গণ্ডারদের প্রমুখ। আর সেই নিয়ম অনুযায়ী ডেভিডের সঙ্গিনী থাকা...

- লায়লা! হ্যা! ডেভিডের সঙ্গিনী ছিল!

- শুধু তাই নয়, নটবরের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি লায়লার আকার ছোটো হলেও ওর নাকের খড়গ ডেভিডের মতোই প্রকাণ্ড।  শুধু তাই নয় লায়লা নাকি গর্ভবতীও বটে! তোমাকে বলা হয়নি ,ডেভিডের মৃতদেহ দেখার আগে আমরা দেখা পেয়েছিলাম লায়লার। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে  হলেও ওর মতো একটা পুর্ণবয়স্ক মাদি গণ্ডারকে একা ঘুরতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল। সকালে নটবরের সাথে কথা বলে বুঝলাম, ডেভিড ওদের টার্গেট ছিলই না।

- ডেভিড ওদের টার্গেট ছিল না?

- না! খামোখা একটা গণ্ডার যে কিনা এখানকার স্টার অফ অ্যাট্রাকশন তাকে মেরে গোটা বনদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ কে করতে যাবে? কাজটা বোকামো হয়ে যাবে না?

- তাহলে ওদের টার্গেট ছিল কে?

- ওদের টার্গেট ছিল লায়লা। কিন্তু অন্ধকারে ভুলবশত ওরা মেরে ফেলে ডেভিডকে। লায়লা আর ডেভিড একই প্রজাতির,একই আকারের খড়গ হওয়ায় ওরা ভুল করে বসে। ভুলটা করার পর ওদের খেয়াল হলেও তখন কিছু করার ছিল না। অগত্যা কাজ সেরে পালিয়ে গিয়েছিল।

- কিন্তু আজকেই যে হামলা করবে কি করে শিওর হচ্ছ?

- লায়লা যে পুর্ণগর্ভা! যেকোনো সময় প্রসব করতে পারে ও। আর সেই সুযোগটাই নেবে ওরা। লায়লা প্রসব করতে এক জায়গায় দাঁড়াবেই। আর আমি যতদুর জানি ও প্রসব করবে ডেভিডের মৃতদেহ যেখানে পেয়েছিলাম সেই জায়গাতেই। জায়গাটা নরম ঘাসে ভর্তি।

- তাহলে তো আমাদের হাতে সময় নেই! এখনই বেরোতে হয়!এখনই ফোর্সকে অ্যালার্ট করে দিচ্ছি।

- দাঁড়াও! লায়লাকে বাঁচাতে গেলে অতো হুড়যুদ্ধ করে নয়। বুদ্ধি করে এগোতে হবে। জায়গাটাকে কর্ডন করবে তোমরা, তবে নিশব্দে। যেভাবে ওরা করে। একটা পরিকল্পনা এসেছে মাথায়, দাঁড়াও বলছি!

বলে দুজনে বসে গভীর আলোচনায়। কিছুক্ষণ পর তথাগত ওর কোয়ার্টারের টেলিফোনে ফরেস্ট কনজার্ভেটর সাহেবের সাথে কিছু শলাপরামর্শ করে নেয়। ফোন রাখার সাথে সাথে নটবর জানায় খাবার তৈরী। খেতে বসলেই হল। নটবরের কথা শুনে তথাগত সুজাতাদের ডাকে। সুজাতারা এলে সকলে মিলে খেতে বসে। খাওয়ার টেবিলে তথাগত সুজাতাকে জানায় আজ রাতে সে একটু বেরোবে, ফিরতে দেরী হলে রাতটা একেবারে কাটিয়ে কাল সকালে  ফিরবে। সুজাতা অবাক হলেও তথাগতর গম্ভীর মুখ দেখে কিছু বলে না। ঊর্মি রজতাভকে ইশারা করে ব্যাপারটা জানতে চাইলে রজতাভ মাথা নাড়ে।

খাবার পালা শেষ হলে রজতাভ পোশাক পরে বেরিয়ে‌ পড়ে। ঊর্মি  ঠিক করে আজ রাতটা সে  সুজাতার সাথে শোবে। তথাগত বাধা দেয় না। সেই মতো রাতে যে যার ঘরে শুয়ে পড়ে।

কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করার পরেও ঘুম আসছে না দেখে উঠে পড়ে রজতাভ। বিছানার‌ পাশের টেবিলে রাখা হাত ঘড়িতে দেখে রাত সাড়ে বারোটা বাজে। ভীষণ গুমোট ঘরে। হয়তো একারণেই ঘুম আসছে না তার। তাছাড়া গণ্ডারটাকে নিয়ে একটা উত্তেজনা তো আছেই। বিছানা থেকে নামে রজতাভ। এই সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়টা ভীষণ গোলমেলে। এই গরম, আবার এই শীত। বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে জল দিয়ে বেরিয়ে  এসে ড্রেসিং টেবিলে রাখা সিগারকেস, অ্যাশট্রে আর লাইটার নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় রজতাভ। একটা সিগার ধরিয়ে আরামকেদারায় বসে সে। আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে।  আকাশে চাঁদের আলোয় কিছুটা হলেও অন্ধকারটা কমেছে। সেই আলোয় সে তাকিয়ে থাকে সামনের বনের দিকে। কান পেতে শোনার চেষ্টা করে একটা কাঙ্ক্ষিত শব্দকে। কিছুক্ষণ পর শোনা যায় সেই শব্দটা। বনের ঝিঁঝিঁপোকা, আর রাতচড়া পাখির ডাককে ছাপিয়ে, বনের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে ,চারদিক কাঁপিয়ে শব্দটা আসে।  একবার! দুবার! কয়েকবার! এ শব্দ তার ভীষণ চেনা! কতকাল পর শুনে মনে আনন্দের‌ সঞ্চার হয় তার। এ শব্দ‌ বন্দুকের গুলির! বনের এককোণে একাধিক রাইফেল গর্জে উঠেছে।  আরামকেদারায় হেলান দিয়ে আরাম করে সিগারটা শেষ করে রজতাভ। তারপর অবশিষ্ট অংশটা অ্যাশট্রে তে গুঁজে ঘরে ঢোকে। অ্যাশট্রেটা ড্রেসিং টেবিলে রেখে বিছানায় শোওয়ার তোড়জোড় করতেই দরজায় কড়াঘাতে শব্দ শোনে সে।  বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলতেই দেখতে পায় সুজাতারা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। চিন্তিত মুখে ঊর্মি জিজ্ঞেস করে,

- শুনেছ?

- হুম! শুনেছি! ওটা গুলির শব্দ। চিন্তা করার কিছু নেই। তোমরা শুয়ে পড়ো।

- কিন্তু রাতবিরেতে জঙ্গলে কে গুলি চালাতে যাবে?

- যারা সাধারণত চালায় তারা। নির্ঘাত পোচাররা চোরাশিকার করতে বেরিয়েছিল, গার্ডদের  নজরে পড়ে গেছে। তাই গোলাগুলি চলছে।

- সে জন্যেই তো চিন্তা হচ্ছে! তথাগত নেই। হুট করে রাতে বেরিয়ে গেল, তার উপর এত রাতে গুলির শব্দ।

- বললাম তো! ভয়ের কিছু নেই! পোচাররা অ্যামুনেশন খুব কম নেয়, বেশিরভাগ ট্র্যাংকুলাইজারই রাখে। তেমন রোগ জন্তর পাল্লায় পড়লে তখন গুলির দরকার পড়ে। তথাগত তো বলেই গেছে, ফিরতে রাত হবে। তেমন হলে কাল সকালে ফিরবে। যাও শুয়ে পড়ো।

- সুজাতা বলছিল, এখানে নাকি কোনোদিন গুলিগোলা চলেনি...

ঊর্মিকে একটু দ্বিধাগ্রস্থ দেখায়।‌‌ রজতাভ এবার বিরক্ত হয়ে বলে, “আশ্চর্য! গোলাগুলি চলেনি মানে কি কোনোদিনও চলবে না? আত্মরক্ষার জন্যে যে কেউ গুলি চালাতেই পারে! একজন এক্স আর্মি অফিসারের স্ত্রী হয়ে কী সব উল্টোপাল্টা বলছ?এত ভয় কীসের?”

তারপর সুজাতার দিকে তাকিয়ে বলে, “ভয়ের কিছু নেই! বন্দুকের শব্দ শুনে যা বুঝলাম তথাগত একা নয়, আরো অনেকে ওর সাথে আছে। তেমন হলে কাল তথাগত ফিরলে ওর থেকে সবটা জেনে নিও! আপাতত দুজনে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো,ভয় নেই!

সুজাতা মাথা নেড়ে ঊর্মিকে নিয়ে ওদের ঘরে চলে যায়। রজতাভ দরজা লাগিয়ে দেয়।

 পরদিন সকালে তথাগত ফিরলে সকলে মিলে ঘিরে ধরে তাকে। সারারাত জাগার ক্লান্তি কাটানোর জন্যে সুজাতা চটপট এককাপ কফি বানিয়ে দেয় তথাগতর জন্যে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসে তথাগত‌, তারপর সবটা বলার পর রজতাভর দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব ভায়া? তোমার অনুমান, এমনকি জায়গাটা পর্যন্ত একদম মিলে গিয়েছে! যেখানে ডেভিডের বডি আমরা পেয়েছিলাম, লায়লা ঠিক সেখানেই বাচ্চা প্রসব করতে এসেছিল! ভাগ্যিস আমরা স্পটে ছিলাম! নাহলে শুয়ারগুলো লায়লাকে তো মারতোই, ওর বাচ্চাটাকেও নিয়ে যেত! ফরেস্ট কনজার্ভেটর সাহেব তোমার ভীষণ প্রশংসা করেছেন! উনি চাইছেন তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে! কাজিরাঙার প্রাইড রক্ষা করার জন্য তোমাকে উনি সম্বর্ধনা দিতে চান!"

রজতাভ হেসে বলে, “এসবের কোনো দরকার নেই! একটা বন্যপ্রাণ রক্ষা পেল এটাই অনেক বড়ো পাওনা। ওনাকে বারন করো এসব করতে। আর যদি সম্বর্ধনা দিতেই হয় তাহলে তা তোমাদের মানে কাল যারা স্পটে ছিলে তাদের প্রাপ্য। আমি তো শুধু বুদ্ধি দিয়ে খালাস! সেটা ব্যর্থও হতে পারত। হয়নি তোমাদের জন্য। কারণ আমার  অবাস্তব বুদ্ধিটাকে বাস্তবায়িত করে, নিজের জীবন বাজি রেখে  তোমরা লড়েছ। আমি তো বুদ্ধি দিয়ে খেয়ে দেয়ে বিছানায় টানটান হয়ে ঘুম দিয়েছি। তা কজন পোচার ধরা পড়ল?"

- ছজন পোচার। প্রত্যেকে আর্মড ছিল। রাইফেল পেয়েছি ছটা। আট রাউন্ড ট্র্যাঙ্কুলাইজার ডার্ট,তিন রাউন্ড গুলি,দুটো কুকরি,চারটে চপার,একটা চিতাবাঘের ছাল,এক পলিপ্যাকে প্যাঙ্গোলিনের আঁশ, আর কী পেলাম জানো?

- ডেভিডের খড়গটা তো?

- একদম অক্ষত অবস্থায়!তোমার আন্দাজই সঠিক! ওরা ডেভিডের খড়গটা পাঁচার করতে পারেনি।

- তাই তো কাল রাতে আবার এসেছিল। লায়লা আর তার সন্তান কেমন আছে?

- দুজনেই সুস্থ। আপাতত জায়গাটা আমরা সিলড রেখেছি কয়েকদিন পর বাচ্চাটা একটু সবল হলে পাবলিকের সামনে আনবো। তা ভায়া একটা অনুরোধ তোমাকে রাখতে হবে।

- আবার কী?

- বাচ্চাটার একটা নামকরণ করে দিতে হবে তোমায়! না বলতে পারবে না।

- এতো আচ্ছা মুশকিলে ফেললে দেখছি! এসব আমি পারি নাকি? এটা আমাদের অর্ধাঙ্গিনী ডিপার্টমেন্টের কাজ।

- তাও একটা নাম তোমাকে দিতে হবেই।

- আচ্ছা বেশ! ডেভিডের সন্তান, যে মরণ থেকে বেঁচে ফিরেছে, বাপ-মায়ের যোগ্য উত্তরসূরী হুম! মাইকেল রাখতে পারো।

- মাইকেল?

- হুম, মাইকেল। বাইবেল অনুসারে ঈশ্বরের প্রথম পুত্র, প্রথম সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্ট স্বর্গের রক্ষকদের সর্বোচ্চ নায়ক, আর্চএঞ্জেলদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে কুশল ও ভয়ঙ্করতম যোদ্ধা, শয়তানকে ঈশ্বরের আদেশে যিনি নরকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। আমাদের ডেভিডের সন্তানও তাঁর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সে প্রায় মৃত্যুকে সাক্ষী করে, একাধিক উন্নত মস্তিস্কের শত্রুদের লোলুপদৃষ্টি এড়িয়ে পৃথিবীতে পা রেখেছে।

- বেশ! আজ থেকে ওর নাম হবে মাইকেল!

 সেদিনের ঘটনার দুই দিন পর, কাজিরাঙ্গা ফরেস্টের কনজার্ভেটর জনপ্রকাশ্যে নিয়ে এলেন ডেভিডের সন্তান মাইকেলকে। পর্যটকদের প্রায় ভীড় লেগে গেল গণ্ডারশাবকটিকে দেখার জন্য। সকলে দেখল মা লায়লার সাথে গুটিগুটি পায়ে হেটে চলেছে একটা খুদে গণ্ডারশাবক।

 সেদিন রাতে তথাগতরা আমন্ত্রণ পেল কনজার্ভেটর সাহেবের কাছে। পার্টিতে পৌঁছোবার পর কনজার্ভেটর সাহেব এগিয়ে এলেন ওদের অভ্যর্থনা করার জন্য।

- আরে আসুন! আসুন! মোস্ট ওয়েলকাম মেজর মজুমদার! মিসেস মজুমদার, মিসেস চৌধুরী, তথাগত ওয়েলকাম!

- সরি, আসলে একটু দেরী হয়ে গেল!

-  নো ইস্যুজ! আজকের পার্টিটা তো আপনাদের অনারেই আয়োজন করা! ভেতরে চলুন, আমার মিসেস আপনাদের সাথে দেখা করলে ভীষণ খুশি হবেন।

বলে ওরা সকলে মিলে বাংলোর ভেতরে প্রবেশ করেন।

পার্টি থেকে ফিরে পোশাক পাল্টে, ফ্রেশ হয়ে রজতাভরা যখন বিছানায় শয্যা নিল তখন বেশ রাত হয়েছে। বিছানায় শোয়ার পর ঊর্মি রজতাভর বুকে মাথা দিয়ে বলল, “আজকের দিনটা বেশ কাটল বল?”

রজতাভ ঊর্মির চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, “হুম!”

- আজকে পার্টিতে সুজাতাকে কি হাসিখুশি লাগছিল না?

- ওকে তো সব সময়ই হাসিখুশি লাগে।

- হুম। তা ঠিক! কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়, মেয়েটা সুখী নেই।

- কেন?

- সেটাই তো বুঝতে পারছি না কেন? এত ভালো একটা বর, এত ভালো একটা জীবন, অথচ মেয়েটাকে দেখে মনে হয় কী যেন একটা নেই ওর জীবনে। কী কারনে যেন ও সুখী নেই। ও যেন সুখী থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে। কীসের যে এত অভাব বুঝি না আমি। কালরাতে ঘুমের ঘোরে কীসব বিড়বিড় করছিল। সকালে জিজ্ঞেস করতেই চেপে গেল। কী যে চলছে কে জানে? কাল তেমন হলে তথাগতর সাথে কথা বলে দেখো তো?

- ঠিক আছে বলব।

বলতে বলতে হাই তোলে ঊর্মি। তারপর পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। রজতাভ ভ্রু কুঁচকে জেগে থাকে একা। ওর কানে বাজতে থাকে ঊর্মির কথাগুলো,‘এত ভালো একটা বর, এত ভালো একটা জীবন, অথচ মেয়েটাকে দেখে মনে হয় কী যেন একটা নেই ওর জীবনে। কী কারনে যেন ও সুখী নেই। ও যেন সুখী থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে।'

(চলবে...)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...