অনুসরণকারী

বারোভাজা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বারোভাজা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ১২ আগস্ট, ২০২১

রূপে তোমায় ভোলাব না



“I'm in love with the shape of you/

We push and pull like a magnet do/

Although my heart is falling too/

I'm in love with your body” 

ফোনের শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি তোয়ালে জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল উত্তরা। বিছানা থেকে ফোনটা তুলে দেখল স্ক্রিন জুড়ে জ্বলজ্বল করছে “Calling Parag” ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে একটা মোলায়েম অথচ গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এল, “ওকে আমি রাজি। কবে দেখা করবে?”

 
কথাটা শোনামাত্র উত্তরার মুখে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে হেসে বলল, “কাল বিকেল ছটায়। অ্যাক্রোপলিস মলের স্টারবাকস এর আউটলেটে।”

- “ অ্যা! না না আমি অতো বড়োলোক ছেলে নই। এক কাজ করো নন্দনে চলে এসো। সেখান থেকে কাছে পিঠে যাওয়া যাবে।”

- “বেশ কিন্তু বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারবো না কিন্তু বলে দিলাম!”

- “ওকে! ডান।”

- “তোমাকে চিনবো কি করে? ওয়েট এক কাজ করো। কাল তুমি নীল রংয়ের টিশার্ট পরে আসবে।”

- “বেশ। যো হুকুম রাণীসাহেবার। আর তুমি?”

- “আমি? কোরাল ব্লু রংয়ের কুর্তি পরবো।”

- “কোনটা? যেটা পরে একটু আগে রিল ছেড়েছ সেটা?”

- “ও! বাবুর সেটা দেখাও হয়ে গেছে? তা কেমন লাগলো?”

- “মন্দ নয়! তবে অ্যাবসের উপর একটু ফোকাস করতে হবে। ফ্লন্ট করতে গিয়ে হাল্কা Chubby লেগেছে।”

- “সেম পিঞ্চ! আর বলো না। কদিন ধরে ভাবছি ডায়েট করবো। ওয়েট পুট অন হচ্ছে।‌ মাকে বলেছি দুপুরে রাইস খাবো না কিন্তু মা শুনলে তো!রোজ নানারকমের টেস্টি খাবার করবে। আর আমিও হ্যাংলার মতো গিলে ফেলি।”

- “মায়েরা ওরকমই হয়। মায়ের হাতের খাবার খেলে ডায়েট মনে থাকে না। যাকগে কাল ছটাতেই তো?”

- “হ্যা।”

- “ওকে বেবি! সি ইউ দেয়ার!”

- “ওকে।”

বলে কলটা কেটে ফোনটা বিছানায় রেখে বাথরুমে ঢোকে উত্তরা। সম্পুর্ণ নগ্ন হয়ে শাওয়ারের সামনে দাঁড়ায়। প্রাণভরে উপভোগ করে সর্বাঙ্গে আছড়ে পড়া প্রতিটা জলবিন্দুকে। চুলে শ্যাম্পু দিতে দিতে মনে করতে থাকে বিগত কয়েকবছর আগের ঘটনাগুলো। তখন সবে কলেজ পাশ করেছে সে। কলেজ ফেস্টে ফ্যাশন শোতে ওকে দেখে পছন্দ করেছেন বেশ কয়েকজন অ্যাডের ডিরেক্টর। কলেজের আগেই কয়েকটা ম্যাগাজিনে, ফ্লেক্সে মুখ দেখানো হয়ে গেছে তার। মেয়ের সাফল্যে বাবা খুশি হলেও মা শুরু থেকেই মেয়ের এই কাজে নারাজ। অবশেষে নিমরাজি হয়ে বলেছেন “যা খুশি করো কিন্তু অশালীন পোশাক পরে ছবি তোলা যাবে না। আর বিয়ে হলে ওসব বন্ধ করবে।” অগত্যা নিরুপায় হয়ে বোল্ড, সুইমওয়্যার শুট করা যাবে না এরকম টার্ম নিয়ে মডেলিং জগতে ঢুকতে হয়েছে। এ নিয়ে ফোটোগ্রাফারদের সাথে একটু বাদানুবাদ হলেও সে রাজি হয় নি। তবে অশালীন পোশাকের দরকার পড়ে নি। শুধুমাত্র দৃষ্টির মাদকতা আর একগাল মিষ্টি হাসিতেই মেয়ে বাজিমাত করে দিয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকে অনুরাগীদের ভীড় টেনে এনেছে ওই হাসি আর অভিব্যক্তিতে ভরা মুখ। সারাদিন মেসেঞ্জার, ডি.এমে উপচে পড়ছে নানারকমের প্রশস্তিবাক্য। 

এরকমই একদিন দুপুরবেলা টিকটকের একটা ভিডিও ইনস্টাগ্রামে পোষ্ট করে শুয়ে শুয়ে ফেসবুক ঘাটছিল উত্তরা। আচমকা একটা পোষ্টে চোখ আটকে গেল তার। একটা লেকের ধারে একটা পাটাতনে একটা প্রেমিকযুগল পিঠ করে বসে আছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে অস্তগামী সুর্য ধীরে ধীরে লেকের জল স্পর্শ করেছে। সুর্যের আলোয় দুজনের দীর্ঘছায়া পড়েছে পাটাতনের উপর। একটা নৈস্বর্গিক দৃশ্য। অন্যদিন হলে লাইক করে উত্তরা স্ক্রল করতো পরের পোষ্টে। কিন্তু ওর চোখ আটকে গেল ক্যাপশনে। ক্যাপশনে একটা বেশ মিষ্টি প্রেমের গল্প লেখা। স্কুলবেলায় গল্পের বইয়ের পোকা ছিল সে। একটু আধটু লেখালেখিও করেছে স্কুল ম্যাগাজিনে। কয়েকটা লাইন পরেই সে বুঝতে পারল লেখার বাঁধুনি বেশ পোক্ত। সে বুঁদ হয়ে লেখাটা পড়তে লাগল। কিন্তু লেখাতে ডোবার আগেই লেখাটা শেষ হয়ে গেল। গল্পের শেষে বায়োতে ক্লিক করে বাকি লেখা পড়তে বলেছেন গল্পকার। তড়িঘড়ি পোষ্টদাতার প্রোফাইলে গেল সে। আর গিয়েই আরেকপ্রস্থ অবাক হল সে। পোষ্টদাতা লেখকও তার অনুগামীদের মধ্যে পড়েন। বন্ধুত্বের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন ইনিও। 

রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট না করে বায়ো পড়তে লাগল সে। কয়েকটা তথ্যের মাঝে পেয়ে গেল ব্লগের লিঙ্কটা। সেখানে ক্লিক করে ঢুকে পড়লো পোষ্টদাতার ওয়েবসাইটে। তারপর খুঁজে খুঁজে গল্পটা পেয়ে পড়তে লাগল। লেখকের সব লেখা পড়ে উত্তরা যখন ব্লগ থেকে বেরোল ততক্ষণে দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে। ফেসবুকের প্রোফাইলের দিকে আরেকবার তাকালো সে। মুঠোফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে বাংলা হরফে লেখা নামটা, ‘পরাগরেণু দত্তগুপ্ত’। প্রোফাইল পিকে একটা চিনার পাতার ছবি। কভারে শান্তিনিকেতনের একটা নৈসর্গিক দৃশ্য। সাতপাঁচ না ভেবে রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করে উত্তরা। মেসেঞ্জারে গিয়ে মেসেজ করে, “ আপনার গল্পগুলো পড়লাম। দারুন লাগল।” বেশ কিছুক্ষণ পর ওপার থেকে একটা উত্তর আসে, “ধন্যবাদ!” তারপর অফলাইন হয়ে যায় পরাগ।

এই ব্যবহারে একটু হলেও অবাক হয় উত্তরা। অন্য কেউ হলে আহ্লাদে ডগমগ হয়ে মেসেজের বন্যা বইয়ে দিত। অথচ এই ছেলেটা শুধু একটা শুকনো ধন্যবাদ দিয়ে চুপ হয়ে গেল! অ্যাটিটিউড দেখাচ্ছে! এত সাহস! উত্তরা সিংহরায়কে অ্যাটিটিউড! বেশ থাকুক লেখকমশাই ওর ঔদ্ধত্য নিয়ে। ঐ তো ফলোয়ারের ছিরি। ওর থেকে বেশি ফলোয়ার ওর একটা পোষ্টে ঝাঁপায়। অভিমানে পরাগকে ব্লক করে ফোন বন্ধ করে উত্তরা। 

কিন্তু বইপোকাদের একটা বড়ো দুর্বলতা হল ভালো গল্প। পৃথিবীতে একজন বইপ্রেমী যতই লেখকের প্রতি খাপ্পা হন না কেন, লেখকের লেখা যদি মনোগ্রাহী হয় তাহলে সেই লেখার টানে তিনি লেখকের লেখা পড়তে বাধ্য। উত্তরার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হল না। পড়বে না পড়বে না করেও সে ঠিক আবার চলে গেল পরাগের ব্লগে। আবারও একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে কমেন্টবক্সে গেল সে। তবে এবার পরাগের তরফ থেকে কাষ্ঠ জবাব পেল না সে। বরং পেল একটা মিষ্টি করে ক্ষমাপ্রার্থনার মেসেজ। সেই শুরু, তারপর কেটে গেছে প্রায় পাঁচবছর। এর মধ্যে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। মডেলিং এর সাথে সাথে দু-একটা ওয়েব সিরিজ, সিরিয়ালে মুখ দেখানো হয়ে গেছে উত্তরার। অনুগামীদের সংখ্যা বেড়ে হাজার থেকে লাখে দাঁড়িয়েছে। টিকটক ব্যান হবার পর ইনস্টাগ্রামে ভীড় বেড়েছে ভীষণ। ওদিকে পরাগের অনুগামীরাও বেড়েছে অল্প অল্প করে। যদিও এর পেছনে উত্তরার অবদান অপরিসীম। সে ক্রমশ প্রমোট করেছে পরাগের ব্লগটাকে। পেজ বানাতে, পেজ চালাতে সাহায্য করেছে। ক্রমাগত তাগাদা দিয়ে গেছে নতুন নতুন গল্পের জন্য। 

এতকিছু করতে করতে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে অনেক। মেসেঞ্জার থেকে হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে ফোনে কথা বলেছে দুজনে। কিন্তু একটা জিনিস একই থেকে গেছে। পরাগের আড়ালে থাকা। এই ক’বছরে কাছে এলেও পরাগকে ঠিক কেমন দেখতে তা জানে না উত্তরা। মানে কন্ঠস্বর জানলেও পরাগকে স্বচক্ষে দেখে নি উত্তরা। হোয়াটসঅ্যাপে কতবার ছবি দিতে বলেছে সে। চেষ্টা করেছে ভিডিও কল করার কিন্তু কিছুতেই পরাগের চেহারা দেখতে পারে নি সে। পরাগের একটাই কথা, “চেহারা দেখে কী হবে? মানুষের পরিচয় তার কর্মে, তার রচনায়।” 

এক আধবার উত্তরার মনে হয়েছে এই পরাগ বলে ছেলেটা সত্যিই আছে তো? নাকি কোনো ফেক আইডি? ক্রমশ ঝগড়া বাদানুবাদের পর উত্তরা ঠিক করেছে পরাগ যদি ওর সামনে না আসে তাহলে সে আর কোনো দিন কোনোরকম সম্পর্ক রাখবে না সে। পরাগকে সে কথা জানিয়ে সব জায়গায় ব্লক করেছে সে। তার পরিপ্রেক্ষিতে আজকে পরাগের ফোন।

মাথায় শ্যাম্পু দিতে দিতে ভাবতে থাকে উত্তরা। পরাগকে কেমন দেখতে? নিশ্চয়ই ভীষণ হ্যান্ডসাম, বা ভীষণ কিউট দেখতে! হতেই পারে! ফোনে ওরকম সেক্সি ভয়েসের অধিকারী মানুষ হ্যান্ডসাম হাঙ্ক না হয়ে যেতে পারেই না! কল্পনায় পরাগের সাথে কালকে দেখা করার দৃশ্য কল্পনা করে শাওয়ারের জলে ভিজতে থাকে উত্তরা।

*****

নন্দন চত্ত্বরে উত্তরা যখন পৌঁছল তখন বিকেল পৌনে ছটা বাজে। চারদিকে তাকিয়ে দেখল সে। নন্দনে এই বিকেলেই বেশ ভীড়। চারদিকে প্রেমিকযুগল বসে আড্ডা দিচ্ছে, কোথাও কোথাও কয়েকদল ছেলে মেয়ে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু এত জনের মধ্যে পরাগ কে? কোথায় ও? ভাবতে ভাবতে ফোন বের করে পরাগকে কল করল সে। আর ওকে চমকে প্রায় ওর কানের কাছে বেঁজে উঠলো অরিজিত সিংহের সুললিত কন্ঠের গান, “জো তুম না হো…” চমকে গিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই এক প্রকার ধাক্কা খেল সে। 


ধাক্কাই বটে! কারণ ওর সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে। ছেলে বললেও আকারে বেশ একটা পাহাড়ের মতো ছেলেটা। বেশ নাদুসনুদুস গোলগাল দেখতে ছেলেটা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। উত্তরা ছেলেটা পাত্তা না দিয়ে ফোনে মনোযোগ দিতে যাচ্ছিল কিন্তু এমন সময় ছেলেটার কথায় সে সোজা তাকালো। ছেলেটা এক গাল হেসে বলল, “বাসবদত্তা আমি এসে গেছি!” কন্ঠস্বরটা, নামটা উত্তরার ভীষণ চেনা। পরাগের নতুন গল্পের নায়িকার নাম বাসবদত্তা। ইদানিং ওকে সেই নামেই সম্বোধন করে পরাগ। তারমানে এই হোঁতকা মোটা ছেলেটা পরাগ? উত্তরা ভালো করে তাকাল ছেলেটার দিকে। ছেলেটার পরনে নীল রঙের টি শার্ট আর ওভার সাইজড জিন্স। এই পোশাকই তো পরে আসতে বলেছিল সে! ছেলেটা এক পা এগিয়ে এসে বলল, “চিনতে পারো নি? আমি পরাগ!” কন্ঠস্বরটা শোনা মাত্র সম্বিত ফিরল উত্তরার। এ যে কেঁচো খুড়তে কেউটে বেরোল! সে স্বপ্ন দেখেছিল একটা হ্যান্ডসাম ছেলের সাথে ডেটের। কিন্তু এ যে একটা মোটকা নাড়ুগোপাল। ছেলেটাকে দেখে কেন যানে না ভীষণ হাসি পেয়ে গেল উত্তরার। সে হেসে ফেলল। নিজের ভাগ্যের জন্য, নিজের বোকামোর জন্য। ইস নির্ঘাত পরাগের কীর্তি এটা! নির্ঘাত প্র্যাঙ্ক করছে। নাহলে কোনো দুঃস্বপ্ন এটা। ভাবতে ভাবতে সে হেসে বলল, “বুঝতে পেরেছি! এটা নির্ঘাত পরাগের প্ল্যান তাই না? তা ও কোথায়? ধরতে পারলে মজা দেখা দেখাব ওকে।” কিন্তু ছেলেটা ওকে চমকে দিয়ে হেসে ফেলল। 

ছেলেটাকে পাল্টা হো হো করে হাসতে দেখে হাসি বন্ধ হয়ে গেল উত্তরার। হাসি থামিয়ে হা করে সে তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে। আশেপাশের লোকজন ওদের দিকে তাকাচ্ছে। হাসির চোটে ছেলেটার থলথলে শরীরটা বারবার কেঁপে উঠছে। কিছুক্ষণ হাসার পর ছেলেটা নিজেকে থামিয়ে বলল, “মাপ করো। আসলে আমার এই একটা মুদ্রাদোষ। কাউকে হাসতে দেখলে নিজেকে আর সামলে থাকতে পারিনা। ফিক করে হেসে ফেলি। তাছাড়া হাসার সময় তোমার মুখটা এতোটাই মজার হয়ে উঠেছিল যে নিজেকে সামলাতে পারিনি। সরি।”

ভ্রুটা কুঁচকে গেল উত্তরার। এ কি পাগল টাগল নাকি? কাউকে হাসতে দেখলে হাসি পেয়ে যায়? তাও আবার সামান্য হাসি নয় একেবারে অট্টহাস্য! কোনোরকমে নিজেকে সামলে যতটা পারে সিরিয়াস মুখ করে উত্তরা বলে , “তাহলে কাজের কথায় আসা যাক!”
ছেলেটা সোজা হয়ে বসল তারপর বলল, “ আগে কোথাও বসি চলো। তার পর শুনবো তোমার কী জানার আছে? এসো।”


ইচ্ছে না থাকলেও একপ্রকার বাধ্য হয়েই ছেলেটার পেছন পেছন হাটতে লাগল উত্তরা। কাছেই ছেলেটার বাইক পার্ক করা ছিল। ছেলেটা সেটা বের করে এনে স্টার্ট করল। উত্তরা বাইকের পেছনের সিটে বসতেই ছেলেটা বাইক চালিয়ে দিল। কিছুদুর গিয়ে একটা রেস্তরাঁর সামনে ছেলেটা বাইক দাঁড় করাতেই নেমে পড়ল উত্তরা। দুজনে মিলে ঢুকলো রেস্তরাঁতে।


বেশ ছিমছাম, পরিপাটি রেস্তরাঁর ভেতরটা। আশেপাশের টেবিলে বেশ কয়েকজন বসে আছে। ভীড় হলেও তেমন শব্দ নেই। রেস্তরাঁতে বোধহয় ছেলেটার আগে থেকেই বুকিং করা ছিল। ওরা ঢোকামাত্র ওয়েটার এগিয়ে এল ওদের দিকে। তারপর নির্দিষ্ট টেবিলে বসিয়ে অর্ডারের অপেক্ষা করতে লাগল। ছেলেটা বোধহয় আগেও এসেছে এখানে। ওয়েটার জিজ্ঞেস করা মাত্র নিজের জন্য একপ্লেট ফ্রাই মোমো অর্ডার করল। উত্তরা শুধুমাত্র এককাপ কফি নিল। ওয়েটার চলে যেতেই ছেলেটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল,““তুমি শুধু কফিই খাবে? এখানকার হাক্কা নুডলসটাও দারুণ খেতে।”


উত্তরা মাথা নেড়ে বলে, “বাড়ি থেকে স্ন্যাকস খেয়েই বেড়িয়েছি। তাছাড়া কদিন ডায়েট চলছে। আমি কফিই খাবো।”

-“বেশ! তা এবার বলো। তোমার কী কী জানার আছে।”

-“তোমার নাম তো পরাগ। অন্তত আমি তাই জানি। ভালোনামটা...”

-“ অসীমাভ দত্তগুপ্ত।”

-“অসী...হোয়াট?”

-“অসীমাভ। নামটা শুনে মনে হয় না যে কোনো বুড়ো, বা জেঠু টাইপের লোকের নাম অথবা বাবা-কাকা টাইপের লোক? বিশ্বাস করো নামটা এতটাই ব্যাকডেটেড যে অফিশিয়াল কাজে বার বার বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে আমায়। তাই ফেসবুকে আমার ডাকনামটার সাথে মায়ের নামটা যোগ করে রেখেছি। আচ্ছা সত্যি করে বলো তো, তুমি সিরিয়াসলি ভেবেছিলে না যে আমি ফেক আইডি নিয়ে তোমার সাথে মজা করেছি বা তোমার সাথে কোনো নোংরা প্র্যাঙ্ক করা হয়েছে? কি তাই তো? জানতাম! অবশ্য এক্ষেত্রে তোমার কোনো দোষ নেই। কারন এর আগে অন্তত জনা পাঁচেক মহিলাও আমার আইডি দেখে ডেটে এসে বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে তাই ভেবেছিলেন। তারপর আমার বিরাট বপু এবং রাক্ষুসে চেহারা দেখে, বাস্তবের সম্মুখীন হয়ে কেউ মানে মানে কেটে পড়েছেন, কেউ বা ভিরমি খেয়েছেন, কেউ আবার মিটিং সেরে পরে না বলেছেন, কেউ আবার ঠকিয়েছি বলে আমাকে দেখে নেবেন বলে শাঁসিয়েছেন। ঠিক এই কারণেই আমি দেখা করতে চাই নি। কারণ বাস্তবের আমি আর ফেসবুকের আমির মধ্যে বিস্তর ফারাক। আমি চাই নি আমাদের বন্ধুত্বটা এইভাবে শেষ হোক তাই...। তবে এই নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই জানো? কারণ বাস্তবটাকে আমি মেনে নিয়েছি। এটাই আমি। বাস্তবের পরাগ দত্তগুপ্ত।‌‌” বলে ছেলেটা মলিন হাসি হাসে।

একটু বিব্রত হয়ে পড়ে উত্তরা। সত্যিকথা বলতে গেলে খানিকক্ষণ আগেও সে তাই ভাবছিল ঠিকই। কিন্তু এতটাও রুড ভাবে ভেবে দেখেনি। সে হাল্কা হেসে বলে, “না মানে আমি সেটা মিন করে বলতে চাই নি। আমি যেটা বলতে চাইছি তোমার ডাকনামের চেয়ে আসল নামটা বেশী ইউনিক। বেশ খটোমটোও বটে।”

-“ধন্যবাদ! তবে এর পেছনে আমার স্বর্গত ঠাকুমার অবদান অনস্বীকার্য। আসলে আমার দুই দাদার নামের সাথে মিল রাখতে গিয়ে বোধহয় তিনিও জানতেন না যে ভবিষ্যতে তার ছোটো নাতিকে নামবিম্ভ্রাটে পড়তে হবে। স্কুল-কলেজেও অসীমাভ নামটা অ্যাসিমভ থেকে অ্যাসি হয়ে গিয়েছিল। বলতে পারো কলেজে এই নামেই আমি ডিপার্টমেন্টে প্রসিদ্ধ ছিলাম। ভাগ্যিস আমার মা আমার ডাকনামটা রেখেছিলেন। নাহলে কী যে হতো?”

-“এ নামের মানে কী?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেটা বলে, “মানেটা একটু উদ্ভট। যে আলো বা আভা মাত্রাহীন। এবার তুমি বলবে আলো তো সীমাহীনই হয়। আমিও তাই জানি। কিন্তু ঠাকুমা কেন যে এই নামটা রেখেছিলেন সেটা উনিই বলতে পারতেন। কিন্তু দশবছর হলো তিনি স্বর্গে সেটল করে গেছেন অগত্যা এই রহস্যটাও তার সাথে চলে গেছে।”

উত্তরা আরো কিছু বলার আগে ওয়েটার অর্ডার নিয়ে টেবিলের সামনে হাজির হয়। ধোঁয়া ওঠা ফ্রাই মোমোর প্লেট, আর কফির কাপ নামিয়ে চলে যায়। অসীমাভ ওরফে পরাগ বলে, “তুমি শিওর আর কিছু খাবে না?”

উত্তরা মাথা নেড়ে কফির কাপে চুমুক দেয়। পরাগ শ্রাগ করে মোমো খেতে থাকে। উত্তরা কফি খেতে খেতে দেখতে থাকে পরাগের খাওয়া। কফিতে চুমুক দিয়ে বলে, “এই রেস্তরাঁর স্টাফেরা তোমার চেনা মনে হয়। যেভাবে খাতির যত্ন হচ্ছে।”

-“চেনা তো বটেই। আফটার অল আমাদেরই তো রেস্তরাঁটা ।”

এবার কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খায় উত্তরা। এতটা চমক সে আশা করে নি। সত্যিকথা বলতে গেলে এতদিন পরাগের লেখা নিয়েই কথা হয়েছে ওদের মধ্যে। এর বাইরে পরাগ নিজের ব্যাপারে না কিছু বলেছে, না ও জানতে চেয়েছে। জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে পরাগ মোমো খেতে খেতে বলে, “আমাদের তিন ভাইয়ের মিলিত ব্যবসা এই রেণুকণা’স কিচেন। বড়দা, আর মেজদাই মেন ব্যবসা সামলায়। আমার শেয়ার থাকলেও আমি লেখালেখিতেই ব্যস্ত। যদিও বাবা চান আমিও ব্যবসায় নামি। দাদাদের হেল্প করি। কিন্তু আমার এই হিসেবনিকেশের ঝামেলা ভালো লাগে না।”

উত্তরা জল খেয়ে চুপচাপ বসে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, “আন্টি মানে তোমার মা...”

-“মা এসব ব্যাপারে কুল। সত্যি কথা বলতে গেলে মা-ই আমাকে রক্ষা করে আসছে এসব থেকে। বাড়িতে সর্বময়কর্ত্রী আমার মা। বাড়িতে মায়ের কথাই শেষ কথা।”

বলে খাওয়া শেষ করে ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পরাগ। তারপর বলে, “তাই বলে আমি যে একেবারে অকম্মার ঢেকি, বা ওয়ার্থলেস স্পয়েল্ড মামাস বয় এমনটা নয়। রেস্তরাঁটার ইন্টিরিওর আমারই ডিজাইন করা। তারপর ওয়েটারদের পোশাক, রাঁধুনিদের হাইজিন সবটাই আমার মাথা থেকে বেরিয়েছে।”

এবার অবাক হয় উত্তরা। ছেলেটা কি থটরিডিং জানে নাকি? একটু আগেই মনে মনে ওকে মাকালফল ভাবতে যাচ্ছিল। খাবার শেষ করার পর ওয়েটার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “আর কিছু লাগবে স্যার?” পরাগ‌ মাথা নেড়ে বলে, “না ম্যাডামকে জিজ্ঞেস কর। উনি তো কফি ছাড়া আর কিছুই খেলেন না।”

উত্তরা মাথা নাড়ে। পরাগ হেসে বলে ,“তাহলে বিলটা নিয়ে এস নিতাইদা।” নিতাই মাথা নেড়ে চলে যেতেই পরাগ বলে, “এটাও আমারই বানানো নিয়ম। নাথিং ইজ ফ্রি। তুমি যতই রেস্তরাঁর মালিক হও না কেন এটা তোমার বাবার হোটেল নয় যে ফ্রিতে খেয়ে যাবে। বিজনেস বিজনেসের জায়গায়, ফ্যামিলি ফ্যামিলির জায়গায়।‌ আর এটা আমার রেস্তরাঁ হলেও এখন আমি এই রেস্তরাঁয় মালিক হয়ে নই বরং একজন কাস্টোমার হিসেবে এসেছি। কাজেই বিলটা কম্পালসারি।” বলতে বলতে নিতাই বিলবুকটা নিয়ে হাজির হয়। দুজনের বিল মিটিয়ে পরাগ বলে, “তাহলে এবার ওঠা যাক?” উত্তরা মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ছেলেটাকে যত বোকা মনে হয়েছিল তত নয়। বেশ চালাক চতুর। ব্যবসায়িক বুদ্ধিও আছে। মনে মনে উত্তরা বলে, “ইন্টারেস্টিং!”

রেস্তরাঁ থেকে‌‌ বেরিয়ে পরাগ বাইকটা স্টার্ট করে। উত্তরা পেছনে বসতেই পরাগ বলে, “এবার কোথায় যাবে?”

উত্তরা জবাব দিচ্ছে না দেখে পরাগ বোঝে পরপর দুটো ধাক্কা সামলাতে পারে নি মেয়েটা। সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া বিল মিটিয়ে আসার সময় কয়েকজন কাস্টোমার উত্তরাকে চিনে ফেলায় সেলফির আবদার মেটাতে হয় যার জন্য পরাগ নিজেও বিব্রত। এখানে এরকম হবে সে মাথাতেও আনে নি। সঙ্গী যদি পাবলিক সেলিব্রেটি হয় তাহলে বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। যাক গে! এখন এমন জায়গায় যেতে হবে যেখানে উত্তরার মন ঠিক হয়ে যায়। ভাবতে ভাবতে সে নিজেই ঠিক করে নেয় কোথায় যাবে। এমন একটা জায়গা যেখানে গেলে উত্তরার মন ফ্রি হবেই। সেই ভাবনা মতো বাইক চালায় সে।


নন্দন চত্ত্বরে ওরা যখন পৌঁছল ততক্ষণে অন্ধকার না হলেও দিনের আলো প্রায় মরে এসেছে। বাইরের দোকানগুলোতে পর্যটকদের ভীড় বাড়ছে। দেখে শুনে এক‌জায়গায় বসে ওরা দুজনে। উত্তরা চুপ করে বসে থাকে। সত্যি কথা বলতে ওর সব কিছু গুলিয়ে গেছে। সকালে যে কার মুখ দেখে উঠেছিল কে জানে? ছেলেটাকে দেখে যতটা কবিগোছের মনে হয়েছিল ততটাও নয়। বেশ বাস্তববোধ সম্পন্ন মনে হচ্ছে। কিন্তু এই ছেলেটাই যে পরাগ এটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না সে। ছেলেটাকে আরেকটু পরখ করে দেখা দরকার। আরেকটু বাজিয়ে দেখা দরকার। কাজেই চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয় তার। 

যেখানে ওরা বসেছিল সেখান থেকে কিছুটা দুরে একটা প্রেমিকজুটি খুনশুটিতে ব্যস্ত। আরেকদিকে কতগুলো ছেলেমেয়ে আড্ডা দিচ্ছে। উত্তরা সেদিকে তাকায়। উত্তরার দৃষ্টি অনুসরণ করে ওদের দিকে তাকিয়ে হাল্কা হাসে পরাগ। তারপর বলে, “মনে আছে? একবার তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে এই যে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে এত প্রেম, বন্ধুত্বর গল্পের অনুপ্রেরণা আমি কোথা থেকে পাই? এই যে সামনে ভীড়টা দেখছ এদের থেকে। ঐ যে দুরে দুজন প্রেম করছে ওদের পোশাক দেখে বোঝা যায় ওরা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে-মেয়ে। সদ্য কলেজে উঠেছে হয়তো। প্রথম প্রেমের স্বাদ পেয়েছে। বাস্তবে পাঁচ বছর পর যখন ছেলেটা চাকরির পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হবে, মেয়েটার সম্বন্ধ দেখতে একের পর এক পাত্র আসবে তখন এই প্রেমটা থাকবে না। কি তাইতো? সাধারণ যে কেউ তাই ভাববে। কিন্তু আমি মানুষটা এত নেগেটিভ নই। তাই এতটা ভাবতে পারি না। তাছাড়া আগামীকাল, পরের মুহূর্ত কে ই বা দেখেছে? আমার চোখে ধরা পড়ছে এখনকার মুহূর্তটা। সেটাকেই বন্দি করি শব্দে আর সেটা থেকেই পজেটিভ উপসংহার খুঁজি। যেমনটা করছে ঐ ছেলেমেয়ের দল। এদের কারো বাড়ি মফঃস্বলে, কারো হয়তো অনেক দুরে। এতদিন পর এতটা পথ পার করে এসেছে পরস্পরের সাথে দেখা করতে। কে জানে? হয়তো ভবিষ্যতে আর কোনোদিন দেখা নাও হতে পারে। তাই বিদায়বেলায় শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে পরস্পরকে। জড়িয়ে ধরছে শক্ত করে। মুঠোফোনে বন্দি করছে মুহূর্তটাকে। জীবনের কোনো ভরসা নেই। কখন কোন খাতে প্রবাহিত হবে কেউ জানে না। জীবনটা আমাদের হলেও এর পরিবর্তন আমাদের হাতেও নেই। যা আছে এই মুহূর্তটুকু। সেটাকেই বন্দি করে রেখে সারাজীবন বয়ে চলতে পারি আমরা।”

-“কিন্তু কিছু মুহূর্ত আছে যা প্রথমে মধুর মনে হলেও পরে কাঁটায় পরিণত হয়।” উত্তরা তাকায় পরাগের দিকে। সুযোগ বুঝে মোক্ষম কথাটা তোলে সে। এই কথার উত্তরেই প্রমাণিত হবে ছেলেটা সত্যিই পরাগ কিনা। কারণ পরাগ মুহূর্তগুলো ধরতে ভালোবাসলেও এই কন্টক মুহূর্তের কনসেপ্টটা পুরোপুরি মানে না।

উত্তরার কথায় হেসে‌ পরাগ বলে, “সেটা ঠিক। তবে এর জন্য দায়ী থাকি আমরাই। আমরা মানুষ চিনতে ভুল করি। মানুষের মনের পরিচয় না নিয়েই তার সাথে থাকতে শুরু করি। মুহূর্তগুলো বন্দি করতে শুরু করি। পরে যখন ভুল বুঝতে পারি ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে যায়। তখন এই মুহূর্ত গুলো বিষে পরিণত হয়। তবে একদিকে এটা ভালো জানো যে আমরা মানুষের মনের তল বুঝতে পারিনা। পৃথিবীতে সকলের যদি মন বোঝার ক্ষমতা থাকত তাহলে মানুষের চেয়ে হিংস্র, নোংরা, নির্লজ্জ আর নিম্নমানের জীব আর দুটো থাকতো না। বিশেষ করে মানুষের মানুষের প্রতি বিশ্বাস, নারী-পুরুষের মুখোশ খুলে যেত। নারীরা পুরুষকে বিশ্বাস করে আর ঠকতো না। প্রকৃত পুরুষের নারীর সন্ধান হতো না। প্রেমে ব্যর্থতা থাকতো না। মানুষ ঠকতো না। শঠ, জোচ্চরদের টেকা দায় হত। সেটা যাতে না হয় তাই ঈশ্বর মানুষকে এ ক্ষমতা দেন নি। থাকলে দেখতে পেতে কেউই সুখী নয়।”

-“এরকম মুখোশধারী মানুষের সাথে দেখা হয়েছে তোমার?” অস্ফুটে আরেকটা মোক্ষম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে উত্তরা। আগের উত্তরটা একেবারে বুলসআইতে মেরেছে ছেলেটা। পরাগও তাই ভাবে। তারমানে এই কি?

-“বহুবার! এতবার ঠকেছি যে বিশ্বাস করতেও ভয় লাগে। এই কারণেই নিজেকে লোকসমাজের থেকে লুকিয়ে নিয়েছি। যাতে কেউ আর ঠকাতে না পারে। ঠাকুমাকে বেশি ভালোবাসতাম একদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখলাম ঠকিয়ে চলে গেল। প্রিয় মানুষটাকে না জানিয়েই ভালোবেসে গেলাম। ঠকিয়ে চলে গেল অন্যজনের সাথে। এত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছি যে মানুষকে আর বিশ্বাস করতে পারি না। ভয় হয় আবার যদি ঠকে যাই। এই ভয় তাড়াতেই লেখা নিয়ে মেতেছিলাম কিন্তু বোধহয় আর হবে না।”

-“কেন?” বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস‌ করে উত্তরা। আর কোনো সন্দেহ নেই।‌ এই ছেলেটাই পরাগ! এবার সে রিলেট করতে পারছে কেন পরাগের গল্পে প্রেম থাকলেও এত যন্ত্রণার প্রচ্ছন্ন ছাপ থাকে। 
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরাগ বলে, “আমরা যারা স্রষ্টা তাদের মাঝে মাঝে একটা রোগ হয় জানো? সৃজনশীলতা হারাবার রোগ, ফুরিয়ে যাবার রোগ। ধরো একটা প্লট মাথায় এল সেটা নিয়ে বসলে তুমি খাতা পেন নিয়ে। কিন্তু কিছুতেই আর লেখা আসছে না। মানে লেখা আসলেও গল্পটা দাঁড়াচ্ছে না। নাহলে মাথা খালি হয়ে যাচ্ছে।”

-“জানি। ওটাকে রাইটার্স ব্লক বলে।” নিভে যাওয়া গলায় বলে উত্তরা।

-“ঠিক তাই! আমি এখন রাইটার্স ব্লকে আক্রান্ত। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমার লেখা ফুরিয়ে গেছে, লেখা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আই অ্যাম ফিনিশড। এই যে প্রত্যেকটা পর্বে রিডার্সরা জিজ্ঞেস করে ‘তারপর?’ , ‘নেক্সট’ সত্যি কথা বলতে জবাব দিতে পারি না আমি কারণ আমি নিজেই জানি না পরে কী হতে চলেছে। জানি একটু অড লাগছে শুনতে কিন্তু এটাই সত্যি! যে আমি রাতের পর রাত জেগে লিখেছি, ‘অভিসার’, ‘দোস্তি ডট কম’ এর মতো গল্প। সেই আমিই রাতের পর রাত জেগে থাকি লেখা ভাবার জন্য। কতগুলো রাত ঘুমোই নি জানো? মাঝে মাঝে মনে হয় পাগল হয়ে যাব। মনে হয় সব যখন ফুরিয়েছে তখন নিজেকে রেখে লাভ কী? কিন্তু পারি না কেন জানো? মায়ের জন্য। আমার মৃতদেহ দেখার পর মায়ের মুখটা ঠিক কেমন দেখতে লাগবে সেটা কল্পনা করেই পিছিয়ে আসি।”


উত্তরা চুপ করে দেখে পরাগকে। ঠিক একের পর এক অডিশনে বাতিল হয়ে, আপোষহীন শর্তে একাধিক মডেলিংয়ের প্রোজেক্ট হাতছাড়া হবার পর কর্মহীনতায় সেও যে একই রকম অবসাদে ভুগছে। তেমনভাবে দেখতে গেলে ও আর পরাগ ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। তফাৎ শুধু এক জায়গায় পরাগ আত্মহত্যা করতে গিয়েও ফিরে এসেছে। আর সে দুবার মরতে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে। আর এই ফিরে আসাটা পরাগের লেখার কারণেই! এই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, কর্মহীন হওয়ার যন্ত্রণা সে বোঝে। নাহ আর কোনো সন্দেহ নেই। ওর মনের সব সন্দেহ দুর হয়ে গেছে। এই ছেলেটাই পরাগ। ওর প্রিয় লেখক! যার লেখা পড়ে ও বাঁচার মানে খুঁজে পেয়েছে। প্রথম দেখাতে মনে হচ্ছিল তার সে বোধহয় মানুষ চিনতে ঠকে গেছে। পরাগ ওকে ঠকিয়েছে। কিন্তু এখন ওর এই হতাশায় ভরা কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে যেন ওরই কথা নিজের জবানিতে বলছে পরাগ।‌ বাইরে থেকে দেখলে দুজনকেই ভীষণ সুখী মনে হবে। একজন নামী মডেল, রোজ যার প্রোফাইলে উপচে পড়ে অনুরাগীদের ভীড়। বিবাহ প্রস্তাব আসে সব সময় ইনবক্স জুড়ে। ইন্ডাস্ট্রিতে ওর এই আপোষহীন শর্তের জন্য অনেকে গর্বিত, অনেকে খুশি কারণ মডেল মানেই যা খুশি পরে ছবি তুললাম যাতে সেটা ফ্যাশন হয়ে যায় এই মিথটা ভেঙেছে ও। আরেক দিকে পরাগ, বড়লোক বাড়ির আদুরে ছোটোছেলে। মায়ের প্রিয়। অঢেল টাকা, প্রতিশ্রুতিমান লেখক। পরিবারের এত সাপোর্ট, কি নেই ওদের কাছে? অথচ দুজনে ভেতর ভেতর কতটা একা। কতটা দুঃখী। ছেলেটাকে সে ঠকবাজ ভেবেছিল প্রথম দেখাতে । এখন মনে হচ্ছে এই ছেলেটা যেন তারই প্রতিবিম্ব। তারই দোসর। এমন ছেলেকেই তো তার চাই! যে তাকে বুঝবে, জানবে। বন্ধুর মতো পাশে থাকবে। নাহ সে ঠকে যায় নি। আর দেরী করা চলবে না। যা বলার জন্য এতদিন প্ল্যান করে এসেছিল ভাবতে ভাবতে সেই কথাটাই উত্তরা বলে ফেলে, “জীবন যদি আবার সুযোগ দেয় কাউকে বিশ্বাস করতে তাহলে‌ কী তুমি আরেকবার বিশ্বাস করবে? শেষবারের মতো?”

পরাগ উত্তরার দিকে তাকায়। উত্তরা বলে, “যদি এবার সত্যিই প্রকৃত প্রেম তোমার জীবনে আসে পারবে তাকে ধরে রাখতে?”

পরাগ হেসে বলে,“নাহ! অতো সাহস আমার নেই। আর আমি নিজেকে ঠকাতে চাইনা।”

-“এই শেষবারের মতো বিশ্বাস করেই দেখ না! কে জানে এইবার আর ঠকলে না।”

-“আর যদি ঠকে যাই?”

-“তাহলে জানবে পৃথিবীতে প্রেম মিথ্যে, ভালোবাসা মিথ্যে, যে ভালোবাসার গল্প লেখ তুমি সেটা একটা অলীক কল্পনা।”

-“এই যাত্রা ঠকবো না বলছ?”

-“বলছি তো ঠকবে না।”

-“কিন্তু...!”

-“আমরা দুজনেই বাইরে থেকে আলাদা হলেও ভেতর থেকে এক পরাগ। একা, নিঃস্ব। যেমন তুমি লেখার জন্য সারারাত জেগেছ। আমিও জেগে হাউহাউ করে কেঁদে খোঁজ করেছি একটা হাতের জন্য। নিজের আপোষহীন শর্তের জন্য কাজ হারিয়ে একটু একটু করে ভেঙে গিয়ে তলিয়ে গেছি অবসাদে। লোকে দেখেছে ম্যাগাজিনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার হাসিটাকে। কিন্তু কেউ আমার চোখের উদাসীনতাকে, কষ্টকে খেয়াল করে নি। বাইরে লোক তো দুর আমার নিজের বাবা-মাই আমার‌ মনের খোঁজ রাখে নি।‌ সত্যি কথা বলতে আমার কাঁদার জন্য কাঁধ চাই না পরাগ। শুধু একটা হাত চাই। ভরসার, ভালোবাসার।‌ আমি যখন ক্লান্ত হব তখন সে হাত আমাকে শক্তি জোগাবে। যখন ভেঙে পড়ব তখন ভরসা দেবে।‌‌ এই ভীড়ের মাঝে আমরা মিশে থাকলেও সম্পুর্ণ একা আমরা। তবে আমি বিশ্বাস করি দুজন একা মানুষ যখন একসাথে পথ চলতে শুরু করে তখন তারা একা থাকে না। এবার বলো আমার সেই ভরসার হাত হবে? একসাথে পাশাপাশি পথে হাটবে? কথা দিচ্ছি এবার ঠকবে না।”

-“এতদিন যারা এসেছিল তারাও একই কথা বলেছিল বাসবদত্তা। কিন্তু তারপর? সকলই গরল ভৈল। বাস্তবটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলেছে ওদের জন্য আমি পারফেক্ট নই।” বলে মাথা নত করে কান্না সামলে অভিমানের সুরে বলে‌ পরাগ।

পরাগের একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে উত্তরা বলে, “আমরা কেউই পারফেক্ট নই পরাগ। আমাদের সকলের মধ্যেই কিছু না কিছু ইমপারফেকশন আছে। তবে ভগবান সেটাকে পুষিয়ে দিয়েছেন আমাদের আরেক গুনকে সুন্দর করে সাঁজিয়ে। ঈশ্বর তোমাকে এই বিরাট দেহর সাথে দিয়েছেন একটা আবেগপ্রবণ, কল্পনাশ্রয়ী, সৃষ্টিশীল মন। তোমার রাগ, দুঃখ, কষ্ট তোমাকে প্রেরণা জোগায়, তোমাকে তাগিদ দেয় লেখার। তাই তুমি লেখ। তোমার সুন্দর মন বলে তোমার সৃষ্টিও সুন্দর হয়। এই যে ময়ুর যার জগৎজোড়া খ্যাতি পেখম মেলা নাচের জন্য, ঝলমলে রঙের জন্য কিন্তু বাস্তবে ময়ুরের পেখম বাদ দিলে কি থাকবে বলো তো? না গাইতে পারে, না ভালো উড়তে পারে। এই যে আমি, তোমার মতে আমি নাকি অসামান্যা সুন্দরী। তোমার প্রতিটা গল্পের নায়িকা চরিত্র নাকি আমাকে ভেবে লেখা। বাস্তবে যদি এতটাই সুন্দর হতাম তাহলে এত স্ট্রাগল করতে হত না। কাজেই তুমি সুন্দর নও এই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে তুমি যেমন তাতেই খুশি থাকো। স্বার্থপর পৃথিবীতে নিজেকে নিয়ে খুশি থাকাটা ম্যাটার করে পরাগ। আর এটাই আমরা করি না। আর রইল বাকিদের কথা সত্যি কথা বলতে মানুষের দৈহিক সৌন্দর্য আমার কাছে তেমন ম্যাটার করে না। তবে তোমার কন্ঠস্বর শুনে তোমাকে সুপুরুষ ভেবেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে তোমাকে যখন দেখলাম মনে হল একটু হলেও তুমি আমাকে ঠকিয়েছ। আমি তোমার দৈহিক গঠনের জন্য রাগ করিনি পরাগ। রাগ করেছি এই প্রবঞ্চনার জন্য। আর এখন...!”

“আর এখন?” বলে পরাগ তাকায় উত্তরার দিকে। উত্তরা পরাগের চোখে চোখ রেখে বলে, “এখন দেখলাম ঠিক ঠকে যাইনি। তোমার এই বিশাল দেহের ভেতরে যে বিশাল মনটা আছে সেটা কাউকে ইচ্ছে করে ঠকায় নি। সে আড়ালে থাকতে চেয়েছে। কিন্তু যখনই তাকে দেখার জন্য আমরা উঠে পড়ে লেগেছি, ততবার ঠকে গেছি। এই জগতে একটু খুঁজলেই ভালো মানুষ পাওয়া যায় পরাগ। কিন্তু ভালো মনের বন্ধু পাওয়া অসম্ভব। তোমার মধ্যে আমি সেই ভালো মনের বন্ধুকে পেয়েছি কাজেই হারাতে চাইছি না। এবার বলো বন্ধু হবে তো?”

পরাগ অশ্রুসজল চোখে শক্ত করে ধরে রাখে উত্তরার হাতটাকে। অনুভব করে উত্তরার মনের উত্তাপটাকে। উত্তরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর নাক শিটকে বলে, “তবে খুশি থাকা মানে এই নয় যে এতটা ফ্যাট নিয়ে খুশি থাকবে। এতটা ফ্যাট থাকাটা মোটেই ভালো নয়। ভবিষ্যতে নানান কম্প্লিকেশন আসতে পারে। কাজেই কালকেই তুমি আমার সাথে জিমে যাবে। আর এই সব তেলাক্ত আনহাইজেনিক ফুড ছাড়বে।”

কথাটা সোনা মাত্র আঁতকে ওঠে পরাগ,“ইরিক! মানেটা কী?”

-“মানেটা খুবই সহজ! কাল থেকে তোমার জাঙ্কফুড খাওয়া বন্ধ!”

-“এহ! বললেই হল! আমি খাবোই! দেখি কে আটকায়!”

-“বটে! আমিও দেখব তুমি কি করে খাও।”


বলে দুজনে ঝগড়া করতে করতে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাটতে হাটতে এগিয়ে যায় সামনের দিকে।


*******

বাড়িতে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে অনলাইন হতেই টুং করে মেসেজ ঢোকে উত্তরার ফোনে। সে দেখে পরাগের মেসেজ, “বাড়ি পৌঁছে গেছ?”


উত্তরা চটজলদি টাইপ করে “হুম। একদম বাড়ির সামনে ক্যাবটা দাঁড়িয়েছিল।”


-“আজকের দিনটা সত্যিই দারুণ কাটলো বলো?”

-“সে আর বলতে! এক কাজ করবে? আজকে যে ছবিগুলো তুললাম সেগুলো একটু সেন্ড করবে?”
কিছুক্ষণ পর কয়েকটা ছবি এসে ঢোকে উত্তরার ফোনে। সেগুলো দেখে মেসেজ করে উত্তরা, “তাহলে কাল জিমে দেখা হচ্ছে?”

ওপাশ থেকে পরাগের মেসেজ আসে “রক্ষে করো মা!” সাথে একটা হাতজোড় করা ইমোজি। মেসেজটা দেখে ফিক করে হেসে উত্তরা টাইপ করে, “ওভাবে আমি ভুলছি না। কাল তোমাকে আমি জিমে ভর্তি করাবোই। দুমাসের মধ্যে ফিট না করিয়েছি তো আমার নামও উত্তরা সিংহরায় নয়।”

মেসেজটা পড়ে হাল্কা হাসে পরাগ। তারপর ফোনের নেট অফ করে চুপ করে গ্যালারী থেকে একটা ছবি বের করে বসে থাকে। উত্তরা সব ছবি পাঠাতে বললেও এই একটা ছবি সে পাঠায় নি। একান্ত গোপন করে রেখেছে। ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর একটা হাসি ফুটে ওঠে ওর মুখে। এসেছে! এসেছে! অবশেষে‌ এসেছে! ভাবতে ভাবতে ল্যাপটপটা খুলে বসে। এতদিনে একটা নতুন প্লট এসেছে মাথায়। ওয়ার্ড ফাইল খুলে ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করে সে। ক্রমশ‌ লেখায় বুঁদ হয়ে যায় পরাগ।

উত্তরা দেখে মেসেজটা সিন করে অফলাইন হয়ে গেছে পরাগ। বোঝে অবশেষে নির্ঘাত নতুন কোনো লেখার প্লট পেয়ে গেছে ছেলেটা। লিখুক গে! আর ওকে বিরক্ত করবে না সে। ভাবতে ভাবতে ফোনের সেটিংসে গিয়ে ফোনের রিংটোনটা বদলে একটা চিরনতুন রবীন্দ্র সংগীত রাখে উত্তরা।‌ শুধুমাত্র একজনের জন্য। রিংটোনটা বদলে নিয়ে ফোনে হেডফোন লাগিয়ে গানটা শুনতে থাকে সে। হেডফোনের মাধ্যমে তার মগজের প্রতিটা কোষে ছড়িয়ে পড়তে থাকে একটাই কথা, “আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না।”





 

শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১

জাল


টেবিলে বসে গুনগুন করতে করতে একমনে কাজ করছিল হেড কনস্টেবল শাশ্বত দাস। মনটা আজ ভালো আছে তার। কদিন ধরে বউ বাপের বাড়ি যাবে বলে বায়না ধরেছে। শাশ্বত বউকে বুঝিয়েও বোঝাতে পারেনি যে এখন ভোটের সময় এভাবে ছুটি পাওয়া যায় না। বউ বুঝতেই চাইছে না। এই সময়ে দুজনের মধ্যে অনেক মন কষাকষি হলেও শাশ্বত ঠিক করে রেখেছিল ভোটটা গেলেই সে আই.সি সাহেবের কাছে দরখাস্ত করবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ! কাল ভোটের রেজাল্ট বেরোতেই আজ সকালে থানায় এসেই আই.সি সাহেবের রুমে গিয়েছিল সে। আই.সি সাহেব দরখাস্তটা পড়ে একটু হেসে ছুটি মঞ্জুর করে দিয়েছেন। তবে একটা শর্তের বিনিময় ছুটিটা মঞ্জুর হয়েছে। ছুটি সে পাবে তবে কিছু কাজ বাকি থেকে গেছে তার, সেগুলো করে যেতে হবে আর এবেলার ডিউটিটা করে যেতে হবে। শাশ্বত তাতেই রাজি হয়ে থানায় ওর টেবিলে বসে কাজ করছিল। কাজ করতে করতে ভাবছিল ছুটি পেয়েছে জানলে বউ কী করবে? বউয়ের মুখটা কল্পনা করে ওর আনন্দ আর থামছিল না। ইচ্ছে করেই ফোন করে খবরটা জানায় নি সে। ফিরে গিয়ে একেবারে চমকে দেবে।

একমনে কাজ করছিল শাশ্বত। হঠাৎ তার মনে হলো সামনে কেউ দাঁড়িয়েছে। সে চোখ তুলে দেখলো একটা মেয়ে। বয়স বাইশ থেকে পঁচিশের মধ্যে হবে। বেশ সম্ভ্রান্ত চেহারা । ম্যাগাজিনে, রাস্তার হোর্ডিংয়ে দেখা মডেলদের মতো ছিপছিপে গড়ন। সাজপোষাকও মডেলদের মতো। একঝলক দেখে বড়োলোক বাড়ির মেয়ে মনে হচ্ছে। গায়ের রং ফরসার দিকে। এদিক ওদিক সন্তর্পণে তাকাচ্ছে মেয়েটা। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন চেনা মনে হলো শাশ্বতর। মনে হলো আগে কোথায় যেন দেখেছে। কিন্তু কোথায় মনে করতে পারছে না। মেয়েটার গলা খাকড়ানিতে হুশ ফিরলো শাশ্বতর। সে চমক ভেঙে নিজেকে সামলে বললো , “কাউকে খুঁজছেন?”মেয়েটা চমকে তাকালো শাশ্বতর দিকে। শাশ্বত আবার প্রশ্ন করলো, “কাউকে খুঁজছেন?” মেয়েটা মাথা নেড়ে বলল, “এই থানার ইনচার্জের সাথে কিছু কথা ছিল। উনি কোথায় বলতে পারবেন?”‌

শাশ্বত কাজ ফেলে মেয়েটার দিকে তাকালো। ব্যাপার কী? মেয়েটা সাহেবকে খুঁজছে কেন? ভ্রু কুঁচকে বললো ,“স্যার‌ তো রাউন্ডে বেরোলেন এই মাত্র। ফিরতে দেরী অনেক দেরী আছে । আপনার কোনো অভিযোগ থাকলে সেকেন্ড ইনচার্জের সাথে কথা বলতে পারেন। উনিই আমাদের মহিলা সেকশনের ওসি। ম্যাডাম ঐ রুমে আছেন এখনও। ” বলে অপালা ম্যাডামের ঘরটা দেখিয়ে দিলো শাশ্বত। মেয়েটা মাথা নেড়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। শাশ্বত কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো মেয়েটার চলে যাওয়াটা। তারপর আবার কাজে মন দিলো। কিন্তু ওর মনে বারবার একটা খটকা খোঁচা দিতে লাগলো। মেয়েটাকে সে আগেও দেখেছে। কিন্তু কোথায়‌ মন করতে পারছে না। একসময় মনে হলো যাকগে! বড়োলোকদের কেস, অফিসারদের ব্যাপার। তার এখানে মাথা ঘামিয়ে কাজ নেই। এই ভেবে ভাবনাটাকে ঝেড়ে সে কাজে লেগে পড়লো আবার।

নিজের টেবিলে বসে পুরোনো একটা পেন্ডিং কেসের প্রোগ্রেসে নজর বোলাচ্ছিল অপালা। কাল এস.পি. স্যারের কাছ থেকে তলব এসেছিল কয়েকজন অফিসারের। তাদের মধ্যে সেও ছিল। কয়েকটা পেন্ডিং কেসের জন্য কথা শুনতে হলো তাকে। যদিও কেস বলতে তেমন কিছু আহামরি নয়। ঐ ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, পণ নিয়ে বিয়ে, নাবালিকাকে বিয়ে, এরকমই সাদামাটা নারীজনিত কেস। কেন এতদিন ধরে পেন্ডিং জবাব দাও। তোমার আন্ডারেই তো কেসের ইনভেস্টিগেশন অফিসার। তার প্রোগ্রেস কেন এত ধীরে? আগে এরকম প্রশ্নবাণে রাগ হত, কষ্ট হত তার। দশবছরের সার্ভিস লাইফে এখন এসব গা সওয়া হয়ে গেছে। তাও কেস ফেলে রাখাটা মুর্খামি অগত্যা আজ সকালে এসেই বসে পড়েছে সব পেন্ডিং কেস নিয়ে। সকল ইনভেস্টিগেশন অফিসারদেরও রিপোর্ট করতে বলেছে।
রিপোর্টটা মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল অপালা, এমনসময় দরজায় টোকা পড়ল আর সাথে একটা প্রায় এক অষ্টাদশী কিশোরীর মতো মিহি স্বর ভেসে এল, “মে আই কাম ইন ম্যাডাম?" 

ফাইল থেকে চোখ না তুলেই অপালা জবাব দিলো, “কাম ইন।" তারপর ফাইল থেকে চোখ তুলে তাকালো সামনের দিকে। একটা মেয়ে তার টেবিলের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স বাইশ থেকে পঁচিশের মধ্যে হবে। অথচ‌ ভয়েসটা শুনে মনে হলো... অপালা দেখলো মেয়েটা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। অপালার একটু ভ্রু কুঁচকে গেল। সে মেয়েটার দিকে একবার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিলো। সাজপোশাক দেখে মনে হচ্ছে বড়োলোক বাড়ির বখে যাওয়া মেয়ে। চুলের সামনে দিক হাইলাইট করা। এই সকালেও চোখে একগাদা কাজল ধেবড়ে মেকাপ করে এসেছে। কব্জিতে উল্কি আঁকা। পরনে জিন্স আর একটা ঢলঢলে টিশার্ট। হয় বয়ফ্রেন্ডজনিত কেস, নাহলে কাল রাতে নির্ঘাত মদ গিলে পার্টি করে ফেরার সময় পুলিশের হাতে গাড়ি জমা করেছে। এসব মেয়েদেরকেও হ্যান্ডল করেছে এক সময় অপালা। বাপ রে! সে সব মেয়েদের কি তেজ, কি ঔদ্ধত্য! যেন সাক্ষাত সি.এম. বা পি.এমের কাছের কেউ । মাঝে মধ্যে এদেরকে চড়িয়ে লাল করে দিতে ইচ্ছে করলেও পেশার খাতিরে চুপ করে থেকেছে।

এই মুহূর্তে মেয়েটাকে দেখে রাগ হলেও পর মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে অপালা বলল, “বসুন।"
মেয়েটা টেবিলের সামনের একটা চেয়ার টেনে বসলো। অপালা জিজ্ঞেস করল, “বলুন কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?"

“আমি একটা রিপোর্ট লেখাতে এসেছি।"

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপালা বলল, “বেশ। তা কী বিষয়ে রিপোর্ট লেখাতে এসেছেন জানতে পারি কি?"

প্রশ্নটা শুনে মেয়েটা থমকে যায়। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে তারপর পার্স থেকে একটা ফোন বের করে বলে, “কদিন আগে আমার বয়ফ্রেন্ডের ফোন চুরি যায়। পুলিশের সাহায্যে সেটা রিকভারিও হয়। কিন্তু তারপর থেকে একটা অজানা নাম্বার থেকে আমার ফোনে হোয়াটসঅ্যাপে নোংরা সব মেসেজ, পিক আসতে শুরু করে। প্রথম প্রথম আমি পাত্তা দিই নি। কারণ এরকম মেসেজ আমার কাছে প্রায়ই আসে। সেক্ষেত্রে আমি ব্লক করে দিই নাম্বারটাকে। ফেসবুকে হলে রিপোর্ট। এটাকেও করেছিলাম। কিন্তু তারপরেই আরেকটা নাম্বার থেকে সেম মেসেজ আসতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, যখন তখন ভয়েস কল, ভিডিও কল আসতে থাকে। এরকম দু তিনটে আননোন নাম্বার ব্লক করার পরেও থামছে না দেখে আমি বয়ফ্রেন্ডকে জানাই। তারপর কল আসতেই বয়ফ্রেন্ড সেটা রিসিভ করে ভালো রকম দাবড়ানি দেয় কলারকে। তারপর কাল সকালে সেই নাম্বার থেকে একটা ক্লিপিং আর কিছু ফোটো আসে আমার ফোনে।" বলে ফোনটা এগিয়ে দেয় মেয়েটা। 

অপালা হাত বাড়িয়ে ফোনটা নেয়। বেশ দামি ফোনটা সন্তর্পণে দুহাতে ধরে ফোনটার পর্দায় চোখ রাখে। গোটা ইনবক্স জুড়ে অশ্রাব্য, অকথ্য ভাষার মেসেজ। সরাসরি যৌন প্রস্তাব দিয়েছে মেসেজ কর্তা। শুধু তাই নয়, নানারকম যৌন ফ্যান্টাসি,উত্থিত পুরুষাঙ্গের ছবিতে ভর্তি ইনবক্স। ঘেন্নায় গোটা শরীর রি রি করে ওঠে অপালার। তাও সে চোখ রাখে শেষ মেসেজের দিকে। আর সেদিকে চোখ রাখতেই অবাক হয়ে যায় সে। শেষের কয়েকটা ছবি আর কারো নয়, তার সামনে বসা মেয়েটার ছবি। দেখে বোঝা যাচ্ছে কোনো সমুদ্রসৈকতের পাশে তোলা। একের পর এক ছবিতে ক্রমশ নিরাভরণ হচ্ছে মেয়েটা। প্রথম ছবিতে শর্ট আর টিশার্ট থাকলেও শেষ ছবিতে মেয়েটার শরীরে একটা সুতো পর্যন্ত নেই। সম্পুর্ণ নিরাভরণ হয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা হাসছে।

ছবিটা দেখে একঝলক মেয়েটার দিকে তাকায় অপালা। তারপর ক্লিপিংটা চালু করে। তিরিশ সেকেন্ডের ক্লিপিংটায় দেখা যায় একটা ঘরে সঙ্গমরত যুগলের মুহূর্ত। দুজনে একে অপরের প্রতি প্রায় ভালুকের মতো ঝাপিয়ে পড়ছে, আর দ্রুতগতিতে রমণ করছে তারা। কলেজবেলায় অনেক পর্ণোগ্রাফিক ছবি , ভিডিও দেখেছে অপালা। এই ভিডিওটাও একরকমের পর্ণোগ্রাফিক ভিডিওই বটে। ভিডিওটা বেশ কাঁচাহাতে তোলা মানে অ্যামেচার ক্যাটাগরির। অপালা ভ্রু কুঁচকে ভিডিওটা দেখে। ভিডিওটার একদম শেষ মুহূর্তে সঙ্গমরতা তরুণীর মুখটা দেখে অবাক হয়ে যায় সে। ফোনটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বলে, “এই ভিডিও, ছবিগুলো..."

“লাস্ট‌ ইয়ারের নভেম্বরে Maldives-এ তোলা। আমিই ইনসিস্ট করেছিলাম মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখার জন্য। ভাবিনি এভাবে..." 

“আপনার বয়ফ্রেন্ড কী করেন?"

“হি ইজ ইন কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড। সারাদিন ইন্টারন্যাশনাল মিটিংএ ব্যস্ত। ওর নামটা কি বলতে হবে?"

“ ইনভেস্টিগেশনের স্বার্থে তো অবশ্যই বলতে হবে ম্যাডাম। তবে চিন্তা নেই এই তথ্য বাইরে যাবে না।"

“তাহলে শুরু থেকেই বলছি।"

“অবভিয়াসলি‌ ম্যাডাম।‌ একটা তথ্যও বাদ‌ দেবেন না।"

বলে অপালা চেয়ার থেকে উঠে গেটের বাইরে থাকা শাশ্বতকে বলে, “কেউ আমার খোঁজে এলে বলবে আমি ব্যস্ত। কাউকে এলাউ করবে না। আর আই.সি স্যার এলে তাকে আমার রুমে আসতে বলবে।" 

কথাগুলো বলে নিজের চেয়ারে এসে বসে অপালা। তারপর বলে, “নিন ম্যাডাম শুরু করুন।"
মেয়েটা সোজা হয়ে বসে। তারপর ধীর কন্ঠে বলে,“আমার নাম লিজা স্মিথ। আমার ড্যাডিকে আপনারা হয়তো চেনেন, তিনি একসময় বেঙ্গল ক্রিকেট টিমে খেলতেন। পরে সেখান থেকেই পুলিশে চাকরি পান। ইন্সপেক্টর ডেভিড স্মিথ। ড্যাডি শুনেছি রঞ্জি ট্রফির জন্যেও খেলেছেন। আমার ছেলেবেলা কেটেছে দার্জিলিং-য়ে বোর্ডিং স্কুলে। এখানে কেন জানি না পড়াতে চাননি ড্যাডি। দার্জিলিং-য়ে স্কুল ফাইনাল দিয়ে হায়ার সেকেন্ডারির জন্য আমি চলে আসি এখানে । ভর্তি হই এখানকারই এক কলেজে। আর কলেজেই আমার সাথে দেখা হয় ভিকির। মানে আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে। ভিক্টর ডি'সিলভা বা ভিকির সাথে আমার রিলেশন দশ বছরের। ইউ কান্ট বিলিভ মি বাট হি ইজ দ্যা মোস্ট কিউট এন্ড অ্যাডোরেবল গাই আই হ্যাভ এভার মেট। হি ওয়াজ সো পজেসিভ এন্ড প্যাশনেট অ্যাবাউট আওয়ার রিলেশনশিপ। আমরা একসাথে কলেজ কমপ্লিট করে যে যার মতো কেরিয়ার মেকিংয়ে নেমে পড়ি। হি জয়েনড হিজ ফাদার্স কোম্পানি । আর আমি জয়েন করি একটা প্রাইভেট ফার্মে। পার্ট টাইমে টুকটাক মডেলিংও করতে থাকি। এতদিন পরেও একবারের জন্যেও আমরা আমাদের রিলেশনে কোনোরকম গ্লিচ আসতে দিই নি। ফাইনালি দুজনেই সেটল হবার পর ঠিক করি আমরা বিয়ে করবো। আমাদের পেরেন্টসরাও সায় দেন আমাদের সিদ্ধান্তে। অল থিংস আর সর্টেড। উই আর রিয়ালি হ্যাপি অ্যাবাউট আওয়ার ম্যারেজ বাট...।"

ধরা গলায় কথাগুলো বলে থামে মেয়েটা। তারপর মাথা নিচু করে বসে থাকে। মেয়েটাকে ধাতস্থ হবার সময় দেয় অপালা। জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলে, “তারপর আপনারা ভ্যাকেশন কাটাতে Maldives- এ গিয়েছিলে?" মেয়েটা ধাতস্থ হয়ে একচুমুক জল খেয়ে মাথা নাড়ে। তারপর বলে,“লাস্ট ইয়ার লকডাউন ওঠার পর যখন সব নিউ নর্মালে ফিরলো আমরা ঠিক করলাম মাইন্ড ফ্রেশ করতে বাইরে কোথাও ঘুরে আসবো। ভিকি হয় গোয়া নাহলে কাশ্মীর ভেবেছিল। আমিই বলেছিলাম ওর চেয়ে বাইরে কোথাও যাওয়া হোক। Maldives-এর সাজেশনটাও আমিই দিই। ইট ওয়াজ লাইক আওয়ার প্রি-হানিমুন। সাতদিন ছিলাম আমরা। দোজ ডেজ আর বেস্ট মেমোরেবল ডেজ অফ আওয়ার লাইফ। আমরা ঐ সাতদিন নিজের মতো এঞ্জয় করেছি। কেউ বাধা দেওয়ার ছিল না । আমরা নিজেদের মতো ছিলাম। তারপর কি যে হয় গেল!"

“আচ্ছা আপনার বয়ফ্রেন্ড মানে ভিকি। সে কেমন মানুষ? মানে বিশ্বাসযোগ্য কি?"

“ডেফিনেটলি! ওর সাথে আমার সম্পর্ক সেই কলেজের সময় থেকে। আমরা যাকে বলে মেড ফর ইচ আদার, সোলমেটস। এতবছরের রিলেশনশিপে একবারের জন্যেও একে অপরকে আমরা চিট করিনি। আমাদের বন্ডিংটা বেশ শক্ত ইভেন একে অপরকে দেখলেই আমরা বুঝে যাই যে অপরজন কি বলতে চাইছে।" মেয়েটা এবার নিজেকে সামলে স্থিরভাবে উত্তর দেয়। অপালা বুঝতে পারে বয়ফ্রেন্ডও যে এসবে জড়িয়ে থাকতে পারে এটা মেয়েটা বুঝছে না। বা বলা বাহুল্য বুঝতে চাইছে না। নিজের চাকরি জীবনে এরকম অনেক কাপল দেখেছে অপালা। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েটা বা ছেলেটা যাকে ভরসা করে এসেছে এত বছর, ইনভেস্টিগেশনের শেষে সেই মানুষটাই মুল কালপ্রিট বেরিয়েছে। অপালার বার বার মনে হচ্ছে হোক না হোক এই ব্ল্যাকমেলের পেছনে ভিকির হাত আছে। সেটা‌ যাচাই করতেই অপালা একটু আগে করা প্রশ্নটাকে ঘুরিয়ে দেয়।

“আচ্ছা এই যে বললেন যে এই ছবিগুলো, ভিডিওটা আপনার কনসেন্টে তোলা। এ ব্যাপারে ভিকির কি সায় ছিল?"

“ প্রথমে ভিকি রাজি হয় নি। জায়গা, আর সময় দেখে ও পিছিয়ে গিয়েছিল। লোকভর্তি জায়গা, কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি হবে। তার উপর এই সব ক্লিপিংস যদি বাইরে লিকড হয় তাহলে একটা বিচ্ছিরি স্ক্যান্ডাল হবে। ওর যে একেবারে ইচ্ছে যে ছিল না তা বলবো না। ইভেন আমার ন্যুড ছবিটা ওর সাজেশন ছিল। আমি বিকিনি পরে কয়েকটা ছবি তুলে ওকে থামতে বলেছিলাম। ওই বলেছিল আরো বোল্ড পোজ দিতে। ভিকি চিরকালই ওয়াইল্ড আর বোল্ড স্বভাবের। এরকম অ্যাডভেঞ্চার ওর প্রিয়। তবে ওর কেসটা হল ঐ যে আপনাদের একটা প্রবাদ আছে না? পেটে খিদে মুখে লাজ। এটার লিভিং এক্সামপল হলো ভিকি। প্রথমে না না করলেও পরে নিমরাজি হবে,শেষে দেখা যাবে পুরো জিনিসটা ও উপভোগ করছে। " 

বলে কিছুক্ষণ থামে মেয়েটা তারপর মৃদু গলায় বলে,“আমি জানি আপনি কী মিন করতে চাইছেন। সেই আশঙ্কাটা আমার মনেও এসেছিল। পরে অবশ্য চিন্তা করে দেখেছি এসব করে ওর কী লাভ? মোটিভটাই বা কি?নিজের উড বি-র ন্যুড পিক, সেক্সটেপ লিক করে ওর কী লাভ? যেখানে ভিডিওতে ওকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হ্যা লাভ হতো কখন যখন এই ছবিগুলো নিয়ে ওকে আমি ব্ল্যাকমেল করতাম। কিন্তু ছবি আর ক্লিপিংসের কপি তো একমাত্র আমাদের কাছেই আছে। বাইরের কেউ পাবার চান্সই নেই। তাছাড়া এখানে তো ব্ল্যাকমেল আমাকে করা হচ্ছে।"

“ভিডিওটা কবে তোলা?"

“Maldives থেকে ফেরার দুদিন আগে। Maldives-এ আমরা হানিমুন কাপলের‌ মতোই ছিলাম। শুধু সেদিনই নয়। যতদিন ছিলাম উই মেড লাভ এভরিডে। ইভেন ছবিগুলো তোলার দিনও জঙ্গলে... ভিকি ওয়াজ সো ডেসপারেট। আমিই পুরো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আইল্যান্ডে। পুরো দ্বীপে টুরিস্ট ভর্তি এই সময় আমরা সেখানেই একটা গাছে...আমিই বলেছিলাম এই মুহূর্তগুলো ভীষণ গোপনীয়, ভীষণ কাছের, ভীষণ রোমান্টিক। মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখলে ভালো হতো। এমনি ফ্রাঙ্কলি বলেছিলাম। ও বলেছিল, “তুমি কি চাও? আমাদের ইন্টিমেট মোমেন্টগুলোও রেকর্ডেড থাকুক?পাগল নাকি?" এখন মনে হচ্ছে সেদিন কথাগুলো শুনলে আজ এই দিনটা দেখতে হতো না। এখন কেমন একটা আতঙ্ক লাগে জানেন? ভিকিকে আমি বিশ্বাস করলেও ওকে দেখলে মনে হয় ও আমাকে বিশ্বাস করছে না। ও আমার পাশে আছে এটা যতই ফিল করি না কেন কোথাও যেন একটা সুর কেটে গেছে। বার বার মনে হচ্ছে আমিই দায়ী। অথচ হি ওয়াজ অলসো দেয়ার! হি ওয়াজ অলসো এঞ্জয়েড দোজ ডেজ ।"

“এই স্ক্যান্ডালটার ব্যাপারে আর কেউ জানে?"

“না। জানতে পারলে‌ সব শেষ হয়ে যাবে। ড্যাডির রেপুটেশন, ভিকির বাবাদের রেপুটেশন সব নষ্ট হয়ে যাবে। আর একটা স্ক্যান্ডালকে কে ঘরে আনবে। ভিকির বাড়িতে জানলে ওরা জাস্ট এটাকে ডিনাই করে বেরিয়ে যাবে। ভিকির আচরণে এটা মনে হচ্ছে বার বার।"

“কেন মনে হচ্ছে এরকম? একটু আগেই তো বললেন আপনারা নাকি সোলমেটস। তো হঠাৎ কী হলো যে ভিকি এভাবে পাল্টে গেলেন?"

“সেটাই তো আমিও ভাবছি। ওকে মেসেজগুলো দেখানোর পর ফ্র্যাঙ্কলি হেসেছিল। কিন্তু সেদিন কলটা রিসিভ করে কথা বলার পর ওর বিহেভিয়ারটা পাল্টে গেছে। লোকটার সাথে কী কথা হয়েছে জানি না। বাট এমন একটা কিছু হয়েছে যার কারণে ও আমাকে আগের মতো পুরোপুরি বিশ্বাস করছে না। বার বার হাবেভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে ভুলটা আমারই। বা হয়তো ভাবছে আমিই ওকে ব্ল্যাকমেল করার জন্য এসব ড্রামা করছি। কিন্তু আমি এটা কেন করবো? ওর সাথে যদি আমার এমনি অ্যাফেয়ার থাকতো তাহলে একটা লজিক হতো যে ওকে ব্ল্যাকমেল করে বিয়ে করতে চাইছি। কিন্তু আমাদের তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! আমরা যে Maldives-এ গিয়েছিলাম সবাই জানে। এখানে কোনো লুকোছাপা নেই! আমি ওকে ব্ল্যাকমেল করে নিজের সর্বনাশ কেন ডেকে আনবো? এই ক্লিপিং আর ছবির কথা এই কারণে ওকে বলিনি। কারণ ও বিশ্বাস তো করবে না তার উপর ওর সন্দেহ বদ্ধমুল হবে।"

“তারমানে ভিকির প্রতি আপনার সম্পুর্ণ বিশ্বাস থাকলেও ভিকির আপনার প্রতি যে বিশ্বাস ছিল সেটা টাল খেয়েছে।"

মেয়েটা অশ্রুসজল চোখে অপালার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে।

অপালা আরো কিছু বলতে যাবে এমন সময় দরজায় টোকা পড়ে। অপালা বসে কাম ইন বলতেই আই.সি অগস্ত্য সেন ভেতরে ঢোকে। (অগস্ত্যর সাথে পাঠকের আগেও পরিচয় হয়েছে বারোভাজায়। “বারুদের বাড়ি" গল্পে তাই বিস্তারিত পরিচয় দিলাম না) অপালা উঠে দাঁড়ায়। অগস্ত্য অপালাকে হাতের ইশারায় বসতে বলে। তারপর মেয়েটার দিকে তাকায়। 

“রাউন্ড থেকে ফিরে শাশ্বতর কাছে শুনলাম একটা মেয়ে নাকি আমার খোঁজ করছিল। তাকে তোমার কাছে পাঠানো হয়েছে। মেয়েটার সাথে কথা বলে নাকি তুমিও আমারই খোঁজ করছো। সকাল বেলা দুই নারীর তলব উপেক্ষা করার সাহস হলো না আমার তাই চলে এলাম।"

অপালা লজ্জা পেয়ে বলে, “কি বলছেন স্যার! ওসব কিছু নয় আসলে এনার কেসটা...!"

অপালাকে‌ থামিয়ে দেয় অগস্ত্য। তারপর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলে, “বলতে হবে না। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে পুরোটা না শুনলেও যতটুকু শুনেছি তাতেই আন্দাজ করে নিয়েছি বাকিটা। তবে আউট অফ ইনভেস্টিগেশন দুটো কথাই বলব আপনাকে‌ মিস স্মিথ। সেটাকে জ্ঞান মনে করতে পারেন, মরাল পুলিশের ভাষণ বলতে পারেন। কথাদুটো হলো, প্রথমত, এই যে একান্ত আপন গোপনীয় মুহূর্তগুলোকে বন্দি রাখার এই প্ল্যান, এটা করার সময় আপনাদের কেয়ারফুল থাকা উচিত ছিল। এগুলো তোলা ক্রাইমই বটে কিন্তু যেখানে দুজনেই ইচ্ছে করে তুলেছেন সেখানে আউটপার্সন হয়ে আমার বলা উচিত নয়। তবে এগুলো এভাবে ফেলে রাখা উচিত হয় নি। ইউ শুড বি মোর কেয়ারফুল এন্ড সিকিওরড অ্যাবাউট প্রিসারভিং দ্যাট ডেটা। বিশেষত আজকের দিনে এই ডেটা হ্যাকারদের হাতে পড়লে সর্বনাশ হতে বেশী সময় লাগে না। আর দ্বিতীয়ত এইরকম মেসেজ যখন এসেছিল তখন একে হাল্কা ভাবে না নিয়ে তখনই পুলিশ স্টেশনে আসতে হতো। বিশেষত আপনার বয়ফ্রেন্ডের ফোন চুরি হবার পর আপনাকে আরো কনসার্ন হবার কথা। যেখানে আপনি জানেন এই বিষয়ে একটা সামান্য‌ ভুলের জন্য আপনার গোটা জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”

মেয়েটা মাথা নীচু করে বসে থাকে। বুঝতে পারে আই.সি কথাগুলো ভুল বলছেন না। সত্যিই তাই একটু কেয়ারফুল হলে, তখনই স্টেপ নিলে এত কিছু হতো না। কিন্তু তখন কি আর ও জানতো ব্যাপারটা এতদুর গড়াবে? আর এসব ব্যাপারে থানা পুলিশ হলে ড্যাডির রেপুটেশনটাও যেত। তাই ও ইচ্ছে করেই স্টেপ নেয় নি। ওখন মনে হচ্ছে ভিকির কাছে না গিয়ে এখানে এলেই ভালো হত।
মেয়েটাকে মনমরা হতে দেখে অপালা বলে, “আপনি...তুমি চিন্তা করো না। তোমাকে তুমি করেই বলছি। উই উইল ফাইন্ড দ্যাট বাস্টার্ড। তোমার নাম, ডিটেল সব পাবলিকের কাছ থেকে লুকোনো থাকবে। ওকে আমরা এক্সপোজ করে দেবো শুধু।কিছু শেষ হয়নি লিজা। চিয়ার আপ। থ্যাঙ্ক গড ব্লান্ডার হবার আগে তুমি এখানে এসেছ! আমরা বাকিটা সামলে নেব। ইউ আর এ ব্রেভ গার্ল! এরকম সাহস হলেই তো এইসব লোকদের ধরতে সুবিধে হয় আমাদের।"

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অগস্ত্য তাকায় লিজার দিকে। তারপর ধীরকন্ঠে বলে, “ব্লান্ডার হতে আর কিছু বাকি নেই! লোকটা অলরেডি সব শেষ করে ফেলেছে।"

“মানে?" চমকে অগস্ত্যর দিকে তাকায় অপালা। লিজাও রক্তশুন্য ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে তাকায় অগস্ত্যর দিকে। 

অগস্ত্য কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলে,“লোকটা ভিডিওটা লিজাকে কাল সকালে পাঠিয়ে দেখতে চেয়েছিল লিজার কি রিঅ্যাকশন হয়। লিজার থেকে নেগেটিভ রিঅ্যাকশন এবং পুলিশের থ্রেট পেয়ে রাগে কাল রাতেই পর্ণোগ্রাফিক সাইটে ভিডিওটা আপলোড করেছে,শুধু তাই নয় হি মেড দ্যাট ভিডিও সো মাচ ভাইরাল যে রাতারাতি অলমোস্ট গোটা পৃথিবীতে ভিডিওটা স্প্রেড করে গেছে। কোথাও অ্যাজ এ মিম, কোথাও জিআইএফ হিসেবে। হোয়াটসঅ্যাপে, মেসেঞ্জারে, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে সব জায়গায় ইতিমধ্যে ছড়িয়েছে ভিডিওটা। ইভেন আমাদের শাশ্বতও লিজাকে সেই ভিডিওর থ্রুতেই রিকগনাইজ করেছে।" 

অগস্ত্যর কথা শেষ হবার আগে লিজা দুহাতে মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করে। অপালা উঠে লিজার পাশে বসে ওকে শান্তনা দিতে শুরু করে। “কেঁদো না লিজা। বি স্ট্রং!আমরা ভিডিওটা আর ছড়াতে দেবো না। আমরা এর জন্য প্রপার স্টেপ নেব। দেন উই উইল ফাইন্ড দ্যাট বাস্টার্ড। কথা দিচ্ছি ওকে কঠিন শাস্তি না দিয়ে ছাড়বো না। বি স্ট্রং লিজা।"

লিজা কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আর খুঁজে কী হবে ম্যাডাম? যা সর্বনাশ করার করে ফেলেছে ওই লোকটা। এভরিথিং ইজ ফিনিশড ম্যাডাম। এভরিথিং ইজ ফিনিশড!"

বলতে বলতে কেঁপে ওঠে টেবিলে রাখা লিজার ফোনটা। লিজা কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা নেয়। আর ফোনটা হাতে নেওয়া মাত্র লিজার মুখটা আবার আতঙ্কে রক্তশুন্য হয়ে যায়। ফোনের দিকে ইশারা করে ও বলে, “ইটস হিম!মাই গড! কী চায় ও?এত কিছুর পরেও শান্তি হয় নি?"

“কাম ডাউন লিজা! কাম ডাউন! দেখাই যাক না ও কি চায়? লেট হিম টক টু ইউ! রিসিভ করো কলটা।"

অগস্ত্য ভাবলেশহীন কন্ঠে কথাগুলো বলে তাকায় লিজার দিকে।

“বাট?"

“কোনো কিন্তু নয়! ওকে ধরতে গেলে আগে জানতে হবে ও কী চায়? রিসিভ দ্য কল। আর স্পিকারে নেবে।"

লিজা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা রিসিভ করে।

“হ্যালো!"

ফোনের স্পিকারে একটা ভারী কন্ঠস্বর শুনতে পায় অগস্ত্য । স্পিকারে সেই কন্ঠস্বর হাল্কা হেসে বলে ওঠে, “কি বেবী ডল? বিশ্বাস হল যে আমি কী করতে পারি?"

“ হোয়াই? কেন আমার এত বড়ো সর্বনাশটা করলে তুমি!আমি তোমার কী ক্ষতি করেছি?" হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে লিজা। ওপারের লোকটা ঠান্ডা হেসে বলে, “এখনও তো কিছুই করিনি! ভিডিওটা জাস্ট লোকালে ছড়িয়েছি। যদি তুমি আমার কথা না শোনো তাহলে এর চেয়েও বড়ো স্টেপ আমি নেবো। তোমাকে এলাকায় ফেমাস করেছি। এরপর গ্লোবালই ফেমাস করে দেব। আর রইল ক্ষতির কথা। না তুমি আমার ক্ষতি করো নি বটে বাট ভবিষ্যতে করবে না তার কী গ্যারান্টি আছে? এই যে পুলিশ স্টেশনে তুমি আমার এগেনস্টে‌ রিপোর্ট লেখাতে গেছ।তুমি কি ভাবছো জানি না আমি?"

কথাটা শোনামাত্র লিজার হাত কেঁপে ওঠে । অগস্ত্য ভ্রু কুঁচকে অপালার দিকে তাকায়। অপালাও হা হয়ে অগস্ত্যর দিকে তাকায়। ফোনের ব্যক্তি বলে ওঠে,“তোমার প্রথম ভুল ছিল আমার কথা ইগনোর করা, দ্বিতীয় ভুল ঐ দুদুভাতু মডেলগোছের বয়ফ্রেন্ডকে দিয়ে আমাকে ভয় দেখানো, আর তৃতীয় ভুল হল পুলিশের কাছে যাওয়া। ইউ হার্ট মি ডার্লিং! আর এর জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে!শুধু এটাই নয়। আজকের পর যতবার একটা ভুল করবে ততবার তোমাকে শাস্তি পেতে হবে।‌ এবারে এই ক্লিপিংসের এক কপি যাবে তোমার বয়ফ্রেন্ডের কাছে, আরেক কপি তোমার বসের কাছে।"

“না, না! প্লিজ‌ এরকম করো না! আমার জীবন, কেরিয়ার সব শেষ হয়ে যাবে!"

“হয়ে যাক! অবাধ্য মেয়েরা যখন কথা শোনে না তখন তাদের শাস্তি দিয়ে পথে আনতে হয়। আর তোমার বসও তো শুনেছি তোমাকে কয়েকবার অ্যাপ্রোচ করেছিলেন, কিন্তু তুমি তাকে ঘোল খাইয়ে দিয়েছ! এবার তোমার অফিসের লোক, বাড়ির লোক, পাড়ার লোকেও জানুক যে তুমি কোন লেভেলের সতীলক্ষী!"

“প্লিজ না! আমার এতবড়ো সর্বনাশ করো না! আমার পরিবার কোথাও নিজের মুখ দেখাতে পারবে না।‌ তোমার কী চাই বলো সব দেব আমি! যতটাকা চাও সব দেব আমি। প্লিজ তুমি ভিডিওটা ডিলিট করে দাও!" লিজা অস্ফুটে বলে কেঁদে ওঠে।

“আমিও তো তাই চাই বেবী! তোমার ভিডিও, পিকস গুলো পাবলিক করে লাভ আছে কিন্তু আমি চাই না সেগুলো আরো ছড়াক। তবে তা তো আর ফ্রিতে করতে পারি না! এভরিথিং হ্যাজ এ প্রাইজ! তাই এই ভিডিও ডিলিট করার জন্য তোমাকেও মুল্য চোকাতে হবে। তবে টাকাপয়সা, সোনাদানা দিয়ে নয়।"

“কী চাই তোমার?" ফ্যাকাশে মুখে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে লিজা।

“ আমি কী চাই সেটা আগেও তোমাকে বলেছি বেবী!‌আই ওয়ান্ট ইউ। আই ওয়ান্ট টু স্পেন্ড সাম মোমেন্টস উইথ ইউ! বেশীক্ষণ নয়, জাস্ট একটা ঘন্টা। একটা ঘন্টা আমার সাথে কাটাতে হবে। আপাতত আগে থানা থেকে বেরোও! তারপর একটা লোকেশন সেন্ড করছি সেখানে চলে এসো। ট্রাস্ট মি! আই উইল গিভ ইউ মোর প্লেজার দ্যান ইউর বয়ফ্রেন্ড। তোমার ভিক্টরের চেয়ে আমিও বিছানায় কম যাই না। একবার ট্রাই করে দেখো, তোমার ভিক্টরকে ভুলে যাবে।" বলে হোহো করে হেসে ওঠে ফোনের ওপারের লোকটা।

টেবিলে থাকা পেপারওয়েটটা দৃঢ় মুঠোয় চেপে ধরে রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করে অগস্ত্য । অপালা প্রচন্ড রাগে ফুঁসে ফোনটা কেড়ে নিতে গেলে হাতের ইশারায় শান্ত হতে বলে অপালাকে। লিজা চিৎকার করে ওঠে, “শাট আপ! কী বলতে চাইছো তুমি?"

“ঠিকই বলছি বেবী ডল। আমার তোমাকে চাই। ভেবে দেখো এবার তোমার কেরিয়ার, জীবন সব নির্ভর করছে তোমার সম্মতির উপর। যদি রাজি হও তাহলে কথা দিচ্ছি সব ভিডিও ডিলিট করে দেবো। আর না হলে..." 

“কোনো প্রশ্নই ওঠে না!" আহত বাহিনীর মতো গর্জে ওঠে লিজা।

“বেশ! আমার কাছে আর কোনো পথ রইলো না তবে। তোমার সর্বনাশের জন্য তুমিই দায়ী রইলে বেবীডল!আমার কোনো দোষ থাকলো না। রাজি থাকলে তোমার ফিউচার, কেরিয়ার যেমন সিকিওরড থাকতো সাথে ফিজিকালি স্যাটিসফ্যাকশন বোনাস পেতে। বাট তোমার রিফিউজালটা...সো স্যাড! আমি শুধু ভাবছি তোমার ড্যাডি, তোমার বস আর ভিক্টর যখন এই ভিডিওটা দেখবে তখন ওদের কী রিঅ্যাকশন হবে?ওরা তো এই সময় বাইরে আছে। তোমার ড্যাডি পেনশন নিতে অফিসে। আর ভিক্টর ওর ড্যাডের সাথে একটা মিটিংয়ে। তাই তো?”

কথাটা শোনামাত্র লিজার শরীরটা কেঁপে ওঠে। ওপারের কন্ঠস্বর বিদ্রুপ করে ওঠে, “কি? এখন চুপ কেন?একটু আগে তো বেশ গর্জন করছিলে। লিজা‌ হতভম্ব হয়ে ফোনটার দিকে তাকায়। লিজা চুপ করে আছে দেখে অগস্ত্য চট করে পকেট থেকে কলম বার করে একটা কাগজে খসখস করে কিছু একটা লিখে এগিয়ে দেয় লিজার দিকে। লিজা লেখাটা পড়ে তাকায় অগস্ত্যর দিকে। অগস্ত্য মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। লিজা বলে, “ওয়েট! আমার ভাবার সময় চাই। আই নিড টাইম।"

“ওয়াইজ চয়েস বেবীডল। টেক ইয়োর টাইম তবে বেশী সময় নিলে তোমারই লস। কাল সকাল পর্যন্ত সময় দিলাম। রিমেমবার, তোমার কাছে মাত্র চব্বিশ ঘন্টা আছে ভেবে উত্তর দেওয়ার জন্য!তোমার কেরিয়ার, জীবন সবটা নির্ভর করছে তোমার সিদ্ধান্তের উপর। আশা করি নিজের সর্বনাশ ডেকে আনার মতো বোকা তুমি নও! কালকে তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো। বাই। মুয়াহ!"

কলটা কেটে যাবার পর লিজা দুহাতে মুখ ঢেকে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। ভ্রু কুঁচকে লিজার দিকে তাকায় অগস্ত্য। লোকটাকে যতটা এলেবেলে ভেবেছিল ততটা এলেবেলে নয়। লিজার উপর, ওর গোটা ফ্যামিলির উপর পুরোদস্তুর হোমওয়ার্ক করেছে সে। এ কোনো সাধারণ ছিঁচকে ঠগ হতে পারে না। এ পুরোদস্তুর ঠান্ডামাথার ক্রিমিনাল,শুধু তাই নয় ইন্টারনেটের জমিতেও অবাধ বিচরণ এর। কিন্তু এতটা গোপন তথ্য এ পাচ্ছে কোথা থেকে? কোথাও একটা খটকা থেকে যাচ্ছে। ভাবতে ভাবতে সে প্রশ্ন করে,

“তুমি শিওর? এর পেছনে তোমার কোনো পরিচিত লোক বা কোনো শত্রু নেই। কারণ কটাদিনের মাথায় এতটা হোমওয়ার্ক করা অসম্ভব । যদিও বা খোঁজখবর করে এই তথ্য পাওয়া যায় কিন্তু এই মুহূর্তে তোমরা কে কোথায় আছো তার অ্যাকুরেট তথ্য জানা ইমপসিবল। যেখানে তুমি কাউকে নিজের লোকেশন জানাও নি। আই থিঙ্ক হি ইজ ট্র্যাকিং ইউ। তোমরা কোথায় কখন যাচ্ছ, কার সাথে কথা বলছ ,কার সাথে মিশছ, কী খাচ্ছো সব তথ্যের খবর ও এমনভাবে রাখছে যেন ও তোমাদের সাথেই তোমাদের সামনেই আছে। খুব কাছের জন না হলে এটা অসম্ভব।"

নিজেকে সামলে চোখ মুছে লিজা বলে,“কিন্তু আমাদের তো তেমন কেউ ক্লোজ ফ্রেন্ড নেই। যারা আছে সবাই কলেজের পর আর কানেকশনে নেই।"

“মনে করে দেখো এমন কেউ যার সাথে রিসেন্ট তোমাদের কোনোভাবে ক্ল্যাশ হয়েছে।"

লিজা‌ মাথা নাড়ে। অগস্ত্য মাথা নামিয়ে ভাবতে থাকে। তারপর লিজাকে বলে, “এক কাজ করো, তুমি বাড়ি চলে যাও। আর যাবার আগে তোমার নাম্বার আর এই নাম্বারটা দিয়ে যাও। দেখি ট্র্যাক করে পাই কিনা।"

“কোনো লাভ নেই। সারাদিনে কিছুক্ষণের জন্যই অন থাকে নাম্বারটা তারপর সারাদিন একটাই কথা বাজে, ‘দিস নাম্বার ডাজনট এক্সিস্ট।' কালকে ভিডিওটা পাবার পর অনেকবার ট্রাই করেছি। পাই নি।"

“তাও দিয়ে যাও। আমরা দেখছি কী করা যায়।"

“ওকে তো সময় চাই বলে কাটিয়ে দিলাম। কাল ফোন করলে কী বলবো?"

“সেটা ভেবে নেওয়া যাবে। আপাতত ওকে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।"

বলে চেয়ারে হেলান দেয় অগস্ত্য । লিজা মাথা নেড়ে বেরিয়ে যায়। অগস্ত্য চেয়ারে বসে ভাবতে থাকে, “সেয়ানা পাবলিক বটে! ঠিক হ্যাই। আমিও দেখবো কত বড়ো সেয়ানা তুমি।" বলে বিড়বিড় করে অগস্ত্য।

*****
রাতের বেলা খাওয়াদাওয়ার পর ছাদে পায়চারি করছিল অগস্ত্য। এটা ওর বরাবরের অভ্যেস হয়ে গেছে। জঙ্গলমহলে থাকাকালিন(‘বারুদের বাড়ি' পড়ুন) এই অভ্যেসটা রপ্ত করেছিল সে। আদিবাসীদের পরবে নিমন্ত্রণ হলে সে সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করতো। ওদের পরব মানে দেদার খাওয়া আর নাচগান। মাঝে মাঝে গুরুপাক হলে সাইকেল চালিয়ে ফিরতো। জঙ্গলের এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় অতো দুর সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সব হজম হয়ে যেত। এছাড়া মাঝে মাঝে সাইকেলেই গ্রামে গ্রামে টহল দিতো সে। 

এখানে কাজের চাপে সারাদিন জিপেই ঘুরতে হয়। ফলে অভ্যেসটাকে রাতে ছাদে পায়চারি করে আর সকালে জিমের ট্রেডমিলের দৌড়ে আবদ্ধ করতে হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে সাইক্লিং করে না এমন নয়। কার্ডিও ওয়ার্কআউটের দিন মনে সুখে সাইক্লিং করে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটায় সে।
এমনিতে পায়চারি করার সময় সিগারেট খায় না অগস্ত্য কিন্তু আজকের দিনটা ব্যতিক্রম। আজকে কিছুতেই মনটাকে বাগে আনতে পারছে না সে। সকালে লিজার থেকে পাওয়া নাম্বারটা নিয়ে লালবাজারে গিয়েছিল সে। কিন্তু কিছুতেই কোনো ট্রেস পাওয়া যায় নি। এমন কি নাম্বারটাই নাকি এক্সিস্ট করে না। অগস্ত্য দ্রুত পায়চারি করতে লাগলো। কিছু একটা করতে হবে নাহলে কাল সকালে সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিন্তু কী করা যাবে? কোনো পথই তো খোলা নেই একটা বাদে! আর সেটা করা না করা সমান। ভাবতে ভাবতে মাথাটা গরম হয়ে উঠলো অগস্ত্যর। সিগারেট ধরিয়ে বুক ভরে একটা টান দিলো সে। তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ছাদের এককোণে বসে পকেট থেকে ফোনটা বের করে গ্যালারীটা খুললো। ওর হোয়াটসঅ্যাপেও ভিডিওটা এক অজানা নাম্বার থেকে এসেছে। ভিডিওটা চালু করে দেখতে লাগলো সে। 

ভিডিওটা দেখতে দেখতে হঠাৎ কি একটা জিনিস মনে হতে হোয়াটসঅ্যাপে গেল অগস্ত্য। একটা অজানা নাম্বার থেকে ভিডিওটা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু নাম্বারটার পাশে...ওটা কী? চট করে আরেকবার ভিডিওটা প্লে করলো অগস্ত্য। এবার একটু জুম করে দেখল। তারপর চ্যাটবক্সে‌ ফিরে চোখ বোলাতেই... মুচকি হেসে অগস্ত্য বেরিয়ে এলো ইনবক্স থেকে। তারপর কী মনে হতে ঢুকল লিজার ইনবক্সে।‌ আজ সকালে নাম্বার দিয়ে যাবার পর। নাম্বার দুটো নোট করেছিল অগস্ত্য। তখন খেয়াল করেনি, করলে এত খাটনি হত না। অগস্ত্য দেখল এত রাতেও লিজা অনলাইন বসে আছে।‌ চটপট টাইপ করে বার্তা পাঠালো অগস্ত্য। তারপর বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা চালিয়ে অফলাইন হয়ে নেমে এল নিজের ঘরে। 

*****
ফোনটা এল ঠিক সাড়ে এগারোটা নাগাদ। লিজা তখন অফিসে ছিল। ফোনটা আসতেই সে ফোনটা নিয়ে চেয়ার থেকে উঠে লেডিস ওয়াশরুমে ঢুকে রিসিভ করল।

“হ্যালো!"

“তা কী ঠিক করলে বেবিডল?"

উত্তরটা দিতে কয়েকমুহূর্ত ভাবল লিজা। তারপর থেমে থেমে বলল, “আমি রাজি! তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। ম্যাক্সিমাম আধঘন্টা! তবে আমার সামনে ভিডিওটা আর ওর সব সোর্স‌ ডিলিট করতে হবে। এই দুটো শর্তে রাজি থাকলে আমি আসবো।"

“ ওকে ডিল! আধঘন্টা এনাফ!"

“কোথায় আসতে হবে?"

“ ক্যাব পাঠানো হবে। ক্যাবে বেরোনোর সময় টেক্সট করো এই নাম্বারে। ক্যাব পৌঁছে দেবে। তোমাকে শুধু সেখানে এসে খোঁজ করতে হবে মি.গ্রেসনের।"

“কটার দিকে আসতে হবে?"

“রাত আটটার দিকে"

“হোয়াট! অতরাতে?"

“কলকাতার মতো শহরে রাত আটটা সন্ধ্যে বেবীডল!এতটা নখরা করার কিছু নেই। আটটার দিকে তোমার বাড়ির কাছে ক্যাব পৌঁছে যাবে।"
বলে ওপারের লোকটা কল কেটে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে লিজা আরেকটা নাম্বারে কল করে।‌ কথা বলার পর কলটা কেটে দাঁতে দাঁত চেপে কোনো মতে কান্না আটকে‌‌ লিজা আয়নার দিকে তাকায়।‌ খুটিয়ে দেখে নেয় মনের বিধ্বস্থ‌ ‌ভাবটা চেহারায় ফুটে উঠেছে‌ কিনা। না মনে হচ্ছে‌‌ না।‌ দু তিনবার আয়নার সামনে মেকি হাসির অভিনয় করে নেয় সে। মনের ভেতর যাই চলুক‌ বাইরের লোককে‌ বুঝতে দিলে চলবে না। বেসিনের কল চালিয়ে চোখে মুখে জল ছেটায় লিজা। তারপর যতটা সম্ভব সাজটাকে ঠিক করে একটা মেকি হাসি নিয়ে বেরিয়ে এসে নিজের কিউবিকলে বসে।

*****
ক্যাবটা যখন লিজাকে নিয়ে হোটেলটায় এসে পৌঁছল। তখন ঘড়িতে সাড়ে আটটা বেজে গেছে। লিজা ক্যাব থেকে নেমে হোটেলের সামনে দাঁড়াল। তাকিয়ে দেখল বেশ বড়ো আর অভিজাত হোটেল। তারমানে ইচ্ছে করেই লোকটা ওকে এখানে ডেকেছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে রিসেপশনের দিকে এগিয়ে গেল সে। কিন্তু রিসেপশন পর্যন্ত পৌঁছতে হল না তাকে। তার আগেই পেছন থেকে ওকে কে যেন নাম ধরে ডাকল। লিজা পেছন ফিরে দেখল হোটেলের একজন প্রৌঢ় স্টাফ তার দিকে এগিয়ে আসছে। লোকটা কাছে এসে বলল, “আর ইউ মিস.স্মিথ?"

লিজা মাথা নাড়তেই সে বলে, “কাম উইথ‌‌ মি। মি.গ্রেসন ইজ ওয়েটিং ফর ইউ।" বলে লোকটা হাটা দেয় লিফ্টের দিকে। চারদিকে একবার তাকিয়ে ধীরপায়ে লোকটাকে অনুসরন করে লিজা ঢোকে লিফ্টে। 

নির্দিষ্ট‌ তলায় পৌঁছনোর পর লিফ্ট থেকে বেরিয়ে লোকটা দেখিয়ে দেয় ঘরটা। তারপর “এঞ্জয় ইয়োরসেল্ফ!" বলে চলে যায়। লিজা কিছুক্ষণ লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর সামনের দিকে এগোয় । নির্দিষ্ট দরজাটার‌‌ সামনে দাঁড়িয়ে একমুহূর্ত দাঁড়ায় লিজা। তারপর কলিংবেলের বোতামটা টেপে। কিছুক্ষণ পর দরজাটা খুলে যায়। দরজার ওপারের মানুষটাকে দেখে অবাক হয়ে যায় লিজা। লোকটা হেসে সরে দাঁড়ায়। লিজা একদৃষ্টে লোকটার দিকে তাকিয়ে মন্থরপায়ে ঘরে ঢুকতেই দরজাটা বন্ধ করে দেয় লোকটা।

*****
দরজাটা খুলে একসাথে এত গুলো পুলিশ দেখে ঘাবড়ে যান মহিলাটি। অগস্ত্য গম্ভীর অথচ মৃদু কন্ঠে বলে ওঠে, “শ্যামবাজার থানা থেকে আসছি। মোহিত কী বাড়িতে আছে?"

মহিলা কোনোরকমে ঢোক গিলে বলেন,“হ্যাঁ কিন্তু কেন? কী করেছে ও?"

অগস্ত্য প্রশ্নটাকে পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করে,“ওর ঘরটা কোনদিকে বলবেন?"

কন্ঠস্বর শুনে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন একজন পুরুষ, “কি হয়েছেটা কী? আরে অগস্ত্য! কী ব্যাপার? "

লোকটাকে দেখে চিনতে পারে অগস্ত্য। মদনমোহনবাবু! সে এগিয়ে এসে বলে, “মোহিত কোথায় স্যার?"

“বাবু তো ওর নিজের ঘরে!"

“ওর ঘরটা কোনদিকে বলবেন স্যার?"

মদনমোহন দেখিয়ে দেন ঘরটা। “ইজ এনিথিং রং অগস্ত্য?"

“আপনাকে পরে বলছি।" বলে ঘরের দিকে এগোয় সে।

******
অগস্ত্যর গাড়ি যখন হোটেলে থামলো তখন রাত প্রায় পৌনে নটা। অগস্ত্যকে আসতে দেখে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এগিয়ে এলো অপালা। অপালাকে দেখে অগস্ত্য বলল, “কতক্ষণ এসেছ?"

“এই মিনিট পনেরো। লিজা ভেতরে গেছে স্যার। আপনার কথা মতো ওর ক্যাবটাকে আমরা ফলো করেছিলাম । কেউ টের পায়নি।" অপালা বলে ওঠে। 

“ওকে! লেটস গো!" বলে হোটেলের দিকে এগোয় অগস্ত্য । বাকিরা ফলো করে ওকে। হোটেলে ওকে ঢুকতে দেখে হাতে শ্যাম্পেনের বাকেট নিয়ে‌ এগিয়ে আসে সেই প্রৌঢ় কর্মচারীটি। অগস্ত্যর কাছে এসে লোকটা বলে, “সেভেন্থ ফ্লোর, রুম নাম্বার ৭০৪। দুজন আছে স্যার।" অগস্ত্য মাথা নেড়ে এগিয়ে যায় লিফ্টের দিকে। 

সেভেন্থ ফ্লোরে উঠে সবাইকে অ্যালার্ট হতে বলে দরজার সামনে দাঁড়ায় অগস্ত্য। তারপর কলিংবেল টেপে। ভেতর থেকে একটা জলদগম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে, “হুজ দেয়ার?" অগস্ত্য ইশারা করতেই প্রৌঢ় বলে ওঠে, “রুম সার্ভিস স্যার।" অগস্ত্যরা দরজা থেকে সরে আড়াল করে দাঁড়ায়। দরজাটা খুলে যায়। দরজার ভেতর থেকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ভদ্রলোক বাথরোব পরে বেরিয়ে‌ এসে বলে, “হোয়াট হ্যাপেনড?" প্রৌঢ় জানায় এই ঘর থেকে ওদের কাছে শ্যাম্পেনের অর্ডার এসেছে। ভেতরের ব্যক্তি বলে ওঠে, “আই থিঙ্ক ইউ হ্যাভ মিসটেকেন উইথ অ্যানাদার রুম। উই ডিড নট অর্ডারড এনি ড্রিঙ্ক। " বলে দরজাটা বন্ধ করতে যাবে এমন সময় দরজার সামনে প্রায় মাটি ফুড়ে উদয় হওয়ার মতো এসে দাঁড়ায় অগস্ত্য । স্পষ্ট অথচ গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে, “নো স্যার, উই হ্যাভ প্রপার ইনফরমেশন অ্যাবাউট দিস রুম।‌ ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড‌ ক্যান উই সার্চ ইয়োর রুম!"

লোকটা অগস্ত্যকে দেখে যতটা না ভড়কে গিয়েছিল তার চেয়ে বেশি ভড়কে যায় অগস্ত্যর কথা শুনে। কোনো মতে নিজেকে সামলে বলে, “সরি?"

অগস্ত্য এবার কেটে কেটে কথাগুলো বলে, “ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, ক্যান উই সার্চ‌ ইয়োর রুম?"

“হু দ্যা হেল আর ইউ? হোয়াই শুড আই লেট ইউ টু সার্চ‌ মাই রুম?" গর্জে ওঠে কৃষ্ণাঙ্গ।

“সরি টু বদার ইউ, বাট উই আর ইনফর্মড দ্যাট ইউ গাইজ‌ আর‌ ডেলিবারেটলি মেকিং পর্ণ ফিল্ম ইন দিস রুম।‌ দ্যাটস হোয়াই উই ওয়ান্ট টু সার্চ ইয়োর রুম। উই হ্যাভ এ সার্চ‌ ওয়ারেন্ট উইথ‌ আস।‌ নাউ ইফ ইউ প্লিজ লেট আস‌ এন্টার ইয়োর রুম ইট উইল বি বেটার ফর ইউ।"

জোকের মুখে যেন নুন পড়ে গেল এমন ভাব করে কাষ্ঠ‌হাসি হেসে কৃষ্ণাঙ্গ বলে ওঠে,

“আই থিঙ্ক ইউ হ্যাভ রং ইনফরমেশন অ্যাবাউট‌ মি। লিসেন অফিসার, আই এম এ রেসিডেন্ট অফ টরন্টো । আই কেম ইন্ডিয়া জাস্ট ফর ট্যুর পারপাস। ইফ ইউ ওয়ান্ট ইউ ক্যান চেক মাই পাসপোর্ট । আই রোমড মেনি কান্ট্রি ফর ট্যুরিজম । আই অ্যাম এ গ্লোবাল সিটিজেন। ইউ হ্যাভ নো রাইট টু ইন্টারফেয়ার মাই প্রিভেসি উইথ আউট দ্য পারমিশন অফ এমব্যাসি ! দিস ইজ আনএথিক্যাল!" 

“ হোয়াট ইজ এথিক্যাল এন্ড হোয়াট ইজ আনএথিক্যাল ইট ডিপেন্ডস অন ইয়োর বিহেভিয়ার মিস্টার গ্রেসন একেএ ম্যাডবুল! ইফ ইউ ডিডনট কো অপারেট উইথ আস দেন উই হ্যাভ টু অ্যারেস্ট ইউ ফর স্টপিং আস। নাও ইফ ইউ প্লিজ?"

এতগুলো লোককে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে লোকটা সরে দাঁড়ায়। অগস্ত্যরা এক এক করে ভেতরে ঢোকে। আর ভেতরে ঢোকা মাত্র বেডরুমের দৃশ্য দেখে রাগে ঘৃণায় সকলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ঘরের মাঝে একটা পেল্লাই কারুকার্য‌ করা খাট। তার চারদিকে রিফ্লেক্টর,ক্যামেরা, আলো দিয়ে সাজানো। যেন কোনো স্টুডিওতে ঢুকে পড়েছে তারা। রিফ্লেক্টরে আলো ঠিকরে এসে পড়ছে বিছানার শ্বেতশুভ্র চাদরে। কিন্তু এখানে কোনো সিনেমার শুটিং বা সিরিয়ালের শুটিং হচ্ছে না। অন্তত‌ বিছানায় যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে তাকে দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। বিছানার ঠিক মাঝখানে চিত হয়ে শুয়ে আছে চৈতন্যহীন লিজার দেহটা। খাটের চার বাজুতে শক্ত দড়ি দিয়ে লিজার হাত-পা বাঁধা। শরীরে সুতোর কোনো লেস মাত্র নেই।‌ বরং গোটা শরীর জুড়ে চপচপে করে লেপা হয়েছে এক ধরনের সুগন্ধী তেল। চারদিকের আলো সেই তেলে পড়ে লিজার দেহসৌষ্ঠবকে আরো চকচকে করে তুলেছে। লিজার মুখটা একটা বেল্ট দিয়ে বাঁধা। অগস্ত্য এক ঝলক সেদিকে তাকিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুড়িয়ে নেয়। অপালা চট করে মাটিতে পড়ে থাকা তোয়ালে দিয়ে লিজার দেহটা ঢেকে হাত-পায়ের বাঁধন খুলে গলার কাছে হাত রেখে মাথা নেড়ে জানায় লিজা অজ্ঞান হয়ে আছে।

অগস্ত্য পেছন ফিরে তাকায় কৃষ্ণাঙ্গ লোকটার দিকে। তারপর লোকটার কলার ধরে বলে, “সো দিস ইজ ইয়োর ট্যুর পারপাস? দিস ইজ ইয়োর প্রিভেসি মোমেন্ট হা? ইউ রোমড‌ মেনি কান্ট্রি ফর দিস? জাস্ট ফর ফাকিং ইনোসেন্ট গার্লস এন্ড আপলোড দেয়ার ভিডিওস উইথআউট দেয়ার কনসেন্ট?"

“বিলিভ মি অফিসার! আই ডিডনট ওয়ান্ট টু ডু দ্যাট। ইট ওয়াজ হার ফিয়ান্সেস প্ল্যান। দ্যাট ফাকিং কাকোল্ড‌ টোল্ড মি দ্যাট হি উইল ম্যানেজ হিজ গার্ল টু স্লেপ্ট উইথ মি! ইট ওয়াজ হিজ ফল্ট।"

“ডিড ইউ.....আই মিন..."

মাথা নাড়ে‌ কৃষ্ণাঙ্গ, “নো! আই হ্যাভন্ট‌ স্টার্টেড ইয়েট।‌ আই ওয়াজ জাস্ট গিভিং হার এ ইরোটিক ম্যাসাজ।" 

চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অগস্ত্য । তারপর জিজ্ঞেস করে, “হোয়্যার ইজ হি? দ্যাট ফাকিং বাস্টার্ড!" কৃষ্ণাঙ্গ বাথরুমের দিকে আঙুল দেখায়।‌ অগস্ত্য দরজাটায় ধাক্কা দিতেই খুলে যায় দরজাটা। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সেই ব্যক্তি যে এই সবকিছুর মূলে ছিল। লিজার বাগদত্ত হবু স্বামী, ওর এতবছরের বন্ধু, প্রিয়তম প্রেমিক ভিক্টর ডি'সিলভা।

******

“ভিকির উপর আমার সন্দেহ শুরু থেকে ছিল না। তবে ওকে বাইরেও রাখিনি।" বলে সিগারেটে শেষটান মেরে ফিল্টারটা মাটিতে ফেলে‌ পা দিয়ে‌ পিষে দেয় অগস্ত্য । কথা হচ্ছিল হোটেলে বসে। সারাদিন খাটাখাটনির পর‌ লিজাকে‌ উদ্ধার করে ওর বাড়িতে পৌঁছে, ভিক্টর আর ওর সাথী গ্রেসনকে জেলে পাঠিয়ে অবশেষে বাড়ি ফিরছে ওরা। গোটা রাস্তা লিজা হাউ হাউ করে কেঁদেছে। সেটাই স্বাভাবিক । ভিকির প্রতি লিজার বিশ্বাস অটুট ছিল। সেই বিশ্বাসটা ভেঙে যাওয়ায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে বেচারি। বাড়ি পৌঁছে অপালাকে জড়িয়ে হাউহাউ করে কাঁদছিল সে। ঘরে ঢোকার পর ভিকি একটা ড্রিঙ্ক অফার করে ওর সব কথা বলেছিল ওকে। রাগে ঘেন্নায় গা গুলোলেও ড্রিঙ্কের জন্য নেশাতে উঠে আসতে পারে নি সে। একসময় ঘুমে ঢলে পড়েছিল তারপর আর কিছু মনে নেই তার। লিজাকে বাড়িতে পৌঁছে রাস্তার ধারে‌ একটা হোটেলে খাওয়াদাওয়া সেরে সিগারেট ধরিয়েছে ওরা। ভিক্টর পুলিশের হাতে ধরা দিলেও পরে বেশ চিৎকার করে বলেছে সে দেখে নেবে পুলিশ ওকে কতদিন আটকে রাখবে। কোনো প্রমাণ নেই। 

“তবে যাই বলো মোহিত না থাকলে এটার কিনারা করা অসম্ভব ছিল। ও যদি সেই সময় ঐ ম্যাডবুলের খবর না দিতো কী হতো‌‌ বলো তো?" বলে সিগারেটে টান দেয় অপালা। 

“কী আর হত?আরেকটা রেপ কেস বাড়তো!কিন্তু তা হয়নি ওর একটা ছোট ভুলে। ভিডিওটা শেয়ার যখন করা‌ হয়েছিল তখন একটা জিনিস দেখে খটকা লেগেছিল। যে নাম্বারে ভিডিওটা এসেছিল‌ তার প্রোফাইল পিকটা ছিল একটা ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের। ছবিটা ভীষণ চেনা মনে হয়েছিল।‌ এদিকে ভিকিদের ছবিতে কোথাও না কোথাও এই গ্রেসনকে পেয়েছিলাম আমি। শুধু তাই নয় ভিকির মুখটাও চেনা লাগছিলো আমার।‌ লিজার ইন্সটাগ্রামেও ওদের কাপল পিকে ছবির কৃতজ্ঞতা গ্রেসনকে। ওর প্রোফাইলে যেতেই আমি অবাক! গোটা প্রোফাইল জুড়ে নগ্ন মডেলের ছবির ছড়াছড়ি! কিন্তু সবকটাই ক্যান্ডিড। তখনই আমি গুগলে সার্চ‌ মেরেছিলাম এই গ্রেসন বাবাজীকে নিয়ে।‌‌ ও বাবা দেখি ভদ্রলোক শুধু ছবিতুলিয়েই নন সাথে সাথে‌‌ একজন পর্ণতারকাও বটে!তখনই আমি চার্জ করি লিজাকে। এই গ্রেসন কে? জানতে পারি Maldives-এই আলাপ। ভদ্রলোক দারুন ছবি তোলেন, ভিকির কীরকম বন্ধু হন। আরো জানলাম ভদ্রলোক নাকি লিজাকে অ্যাপ্রোচ করেছিলেন । পাত্তা পান নি। তখনই আমার সন্দেহ হয়। একজন ব্যবসায়ীর বড়োলোক ছেলের সাথে পর্ণতারকার বন্ধুত্ব খারাপ না হলেও কেমন যেন দৃষ্টিকটুও বটে। লিজাকে গ্রেসনের ব্যাপারে সবটা জানিয়ে ওকে‌ বুঝিয়ে‌ বলি রাজি হতে। কিন্তু ওরা ক্যাব পাঠাবে এটা জানতাম না।‌ ফলে তোমাদের ফলো করতে বলে‌ বেরিয়ে আমি যাই মোহিতের কাছে। ছবিদুটো স্ক্রিনশট‌ তুলেছিলাম। সে দুটো‌ দেখাতেই মোহিত চিনে ফেলে জানায়। ভিকি ওর বাবার ব্যবসা সামলালেও আসলে এই গ্রেসনকে মেয়ে সাপ্লাই দিত পর্ণছবি শুট করার জন্য। কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারতো না ওরা ট্রিপের নামে কী করে বেড়াচ্ছে।”

“সত্যি! ভিকিকে দেখে বোঝা যায় না ও এত বড়ো একটা নোংরা কাজে যুক্ত!"

“ ওটাই তো! এতদিন সাথে থাকা লিজাও টের পায় নি এসবের। হয়তো আরো কটা দিন চলত এসব কিন্তু বাধ সাধল‌ লিজা।‌ Maldives-এ ওকে দেখে পাগল হয়ে গেল গ্রেসন। হবারই কথা। ভারতীয় হয়েও লিজার সৌন্দর্য্য পাশ্চাত্যের মেয়েদের দশ গোল দেবে। হয়তো অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বলেই এই সৌন্দর্য্য পেয়েছে সে। লিজাকে আধুনিকমনস্কা দেখে গ্রেসন একদিন কামনা করে বসল ওকে। কিন্তু লিজা ওকে জানাল ‌সে‌‌ ভিকির বাগদত্তা। প্রতিরোধ পেয়ে আহত পৌরুষ জেগে উঠল গ্রেসনের‌ সে দাবী করে বসল লিজাকে। ভিকি ব্যবসা বোঝে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ‌ আর একজন ভারতীয়র পর্ণগ্রাফিক ভিডিও‌র দর বিদেশে‌ মারাত্মক। সে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু লিজাকে‌‌ রাজি করা শক্ত।‌ অগত্যা এক ঘৃন্য ষড়যন্ত্রের জাল বুনলো‌ সে। ফোন চুরি থেকে লিজাকে‌ সেক্সটিং সবটা ওরই প্ল্যান ছিল মোটিভটা খাড়া করার জন্য। সেই জালে পা দিল লিজা। ভেবেছিল লিজাকে গ্রেসনের‌ হাতে তোলার পর ওকেও নিজের দলে টেনে নেবে। ইমেজের ভয়ে লিজাও রাজি হবে। কিন্তু মাঝখান থেকে ঘটে গেল আরেক ঘটনা। লিজা এলো‌ থানাতে আর‌ সবটা আমাদের জানাল। তারপর নামলাম আমরা। মোহিতের নামে সাইবার কেস‌ ছিল বটে তবে সেটা এথিক্যাল হ্যাকিংয়ের। সেই কারনে মোহিতের চাকরি হয় নি। তবে ও পুলিশ না হলেও পুলিশের সাহায্যে একপায়ে‌ খাড়া থাকে সবসময়। তোমাদের লোকেশন জানার পর ভিকির প্ল্যানটা শিওর হতে মোহিতকে জিজ্ঞেস‌ করলাম গ্রেসন এখন কোথায়? ও জানাল গ্রেসন ভারতেই আছে। এমন কি লোকেশন বের করে দিলো। সেটা নিয়ে রওনা হলাম আমরা।"

“যাক যার শেষ ভালো তার সব ভালো। ভাগ্যিস লিজা সাহস করে এসেছিল বলে‌ ওকে বাঁচাতে পারলাম!" বলে সিগারেটে শেষটান দিয়ে ফিল্টারটা ফেলে গাড়িতে উঠে বসে অপালা।‌" অগস্ত্য দাঁড়িয়ে থাকে‌ বাইরে কিছুক্ষণ তারপর স্বগোতোক্তির স্বরে বলে ওঠে,

“কষ্টের কথা কী জানো? লিজা সাহসটা করেছিল ব‌‌লে ওকে‌ বাঁচাতে‌ পেরেছি। কিন্তু লিজার মতো না জানি কত মেয়ে নিজের প্রেমিককে ভরসা করে নিজের জীবনের একান্ত গোপনীয় মুহূর্ত ফোনে বন্দি হতে দিচ্ছে। কিন্তু সেই ভরসার মূল্য‌ চোকাতে হচ্ছে সেই মুহূর্তকে সার্বজনীন হতে দেখে। আজকাল মোহিতের মতো বাচ্চাদের হাতে স্মার্টফোন, হাতের মুঠোয় দ্রুতগতির ইন্টারনেট, অথচ ওদের গাইড করা, ভালো খারাপ বোঝানোর কেউ নেই।‌ কেউ নেই খারাপ-ভালো স্পর্শ বোঝানোর। যৌনশিক্ষাও শেখানোর কেউ নেই। ফ‌‌‌লে‌ ওরা ঝুঁকছে আন্তর্জালের দিকে।‌ ক্লিক করলেই পেয়ে যাচ্ছে সেই নিষিদ্ধ বস্তু। যা খারাপ প্রভাব ফেলছে ওদের মনে। বয়ঃসন্ধিকালে যা করে ফেলছে পর্ণাশক্ত। ধীরে ধীরে গোটা একটা প্রজন্ম ভুলপথে চালিত হয়ে পরিণত হচ্ছে ক্রিমিনালে। অথচ‌ আমরা দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু করতে পারছি না। ‌লিজাদের মতো মেয়েরা ভালোবেসে‌‌ এদের কাছে সব উজার‌ করে দিচ্ছে আর এরা সেটার সুযোগ নিয়ে সর্বনাশের জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। লিজা তো বেঁচে গেছে। কিন্তু ওর মতো না জানি কত অভাগী না বলতে পেরে তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দিয়েছে। শেষ‌ করছে। আর আমরা নীরব দর্শকের মতো তা দেখছি। প্রেমের জালে জড়িয়ে একালের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করে তা আন্তর্জালে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এদের রক্ষার জন্য বাসুদেবও নেই।‌‌ আর আমরা পরাজিত পাণ্ডবের মতো নীরব হয়ে নির্লজ্জের মতো বসে আছি।‌ বসে বসে দেখছি।" বলে গাড়িতে বসে‌‌ মাথা নত করে অগস্ত্য । ওর অজান্তে চোখের কোণ বেয়ে বেড়িয়ে পড়ে দু ফোঁটা অশ্রু। 


সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...