“I'm in love with the shape of you/
We push and pull like a magnet do/
Although my heart is falling too/
I'm in love with your body”
ফোনের শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি তোয়ালে জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল উত্তরা। বিছানা থেকে ফোনটা তুলে দেখল স্ক্রিন জুড়ে জ্বলজ্বল করছে “Calling Parag” ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে একটা মোলায়েম অথচ গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এল, “ওকে আমি রাজি। কবে দেখা করবে?”
কথাটা শোনামাত্র উত্তরার মুখে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে হেসে বলল, “কাল বিকেল ছটায়। অ্যাক্রোপলিস মলের স্টারবাকস এর আউটলেটে।”
- “ অ্যা! না না আমি অতো বড়োলোক ছেলে নই। এক কাজ করো নন্দনে চলে এসো। সেখান থেকে কাছে পিঠে যাওয়া যাবে।”
- “বেশ কিন্তু বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারবো না কিন্তু বলে দিলাম!”
- “ওকে! ডান।”
- “তোমাকে চিনবো কি করে? ওয়েট এক কাজ করো। কাল তুমি নীল রংয়ের টিশার্ট পরে আসবে।”
- “বেশ। যো হুকুম রাণীসাহেবার। আর তুমি?”
- “আমি? কোরাল ব্লু রংয়ের কুর্তি পরবো।”
- “কোনটা? যেটা পরে একটু আগে রিল ছেড়েছ সেটা?”
- “ও! বাবুর সেটা দেখাও হয়ে গেছে? তা কেমন লাগলো?”
- “মন্দ নয়! তবে অ্যাবসের উপর একটু ফোকাস করতে হবে। ফ্লন্ট করতে গিয়ে হাল্কা Chubby লেগেছে।”
- “সেম পিঞ্চ! আর বলো না। কদিন ধরে ভাবছি ডায়েট করবো। ওয়েট পুট অন হচ্ছে। মাকে বলেছি দুপুরে রাইস খাবো না কিন্তু মা শুনলে তো!রোজ নানারকমের টেস্টি খাবার করবে। আর আমিও হ্যাংলার মতো গিলে ফেলি।”
- “মায়েরা ওরকমই হয়। মায়ের হাতের খাবার খেলে ডায়েট মনে থাকে না। যাকগে কাল ছটাতেই তো?”
- “হ্যা।”
- “ওকে বেবি! সি ইউ দেয়ার!”
- “ওকে।”
বলে কলটা কেটে ফোনটা বিছানায় রেখে বাথরুমে ঢোকে উত্তরা। সম্পুর্ণ নগ্ন হয়ে শাওয়ারের সামনে দাঁড়ায়। প্রাণভরে উপভোগ করে সর্বাঙ্গে আছড়ে পড়া প্রতিটা জলবিন্দুকে। চুলে শ্যাম্পু দিতে দিতে মনে করতে থাকে বিগত কয়েকবছর আগের ঘটনাগুলো। তখন সবে কলেজ পাশ করেছে সে। কলেজ ফেস্টে ফ্যাশন শোতে ওকে দেখে পছন্দ করেছেন বেশ কয়েকজন অ্যাডের ডিরেক্টর। কলেজের আগেই কয়েকটা ম্যাগাজিনে, ফ্লেক্সে মুখ দেখানো হয়ে গেছে তার। মেয়ের সাফল্যে বাবা খুশি হলেও মা শুরু থেকেই মেয়ের এই কাজে নারাজ। অবশেষে নিমরাজি হয়ে বলেছেন “যা খুশি করো কিন্তু অশালীন পোশাক পরে ছবি তোলা যাবে না। আর বিয়ে হলে ওসব বন্ধ করবে।” অগত্যা নিরুপায় হয়ে বোল্ড, সুইমওয়্যার শুট করা যাবে না এরকম টার্ম নিয়ে মডেলিং জগতে ঢুকতে হয়েছে। এ নিয়ে ফোটোগ্রাফারদের সাথে একটু বাদানুবাদ হলেও সে রাজি হয় নি। তবে অশালীন পোশাকের দরকার পড়ে নি। শুধুমাত্র দৃষ্টির মাদকতা আর একগাল মিষ্টি হাসিতেই মেয়ে বাজিমাত করে দিয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকে অনুরাগীদের ভীড় টেনে এনেছে ওই হাসি আর অভিব্যক্তিতে ভরা মুখ। সারাদিন মেসেঞ্জার, ডি.এমে উপচে পড়ছে নানারকমের প্রশস্তিবাক্য।
এরকমই একদিন দুপুরবেলা টিকটকের একটা ভিডিও ইনস্টাগ্রামে পোষ্ট করে শুয়ে শুয়ে ফেসবুক ঘাটছিল উত্তরা। আচমকা একটা পোষ্টে চোখ আটকে গেল তার। একটা লেকের ধারে একটা পাটাতনে একটা প্রেমিকযুগল পিঠ করে বসে আছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে অস্তগামী সুর্য ধীরে ধীরে লেকের জল স্পর্শ করেছে। সুর্যের আলোয় দুজনের দীর্ঘছায়া পড়েছে পাটাতনের উপর। একটা নৈস্বর্গিক দৃশ্য। অন্যদিন হলে লাইক করে উত্তরা স্ক্রল করতো পরের পোষ্টে। কিন্তু ওর চোখ আটকে গেল ক্যাপশনে। ক্যাপশনে একটা বেশ মিষ্টি প্রেমের গল্প লেখা। স্কুলবেলায় গল্পের বইয়ের পোকা ছিল সে। একটু আধটু লেখালেখিও করেছে স্কুল ম্যাগাজিনে। কয়েকটা লাইন পরেই সে বুঝতে পারল লেখার বাঁধুনি বেশ পোক্ত। সে বুঁদ হয়ে লেখাটা পড়তে লাগল। কিন্তু লেখাতে ডোবার আগেই লেখাটা শেষ হয়ে গেল। গল্পের শেষে বায়োতে ক্লিক করে বাকি লেখা পড়তে বলেছেন গল্পকার। তড়িঘড়ি পোষ্টদাতার প্রোফাইলে গেল সে। আর গিয়েই আরেকপ্রস্থ অবাক হল সে। পোষ্টদাতা লেখকও তার অনুগামীদের মধ্যে পড়েন। বন্ধুত্বের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন ইনিও।
রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট না করে বায়ো পড়তে লাগল সে। কয়েকটা তথ্যের মাঝে পেয়ে গেল ব্লগের লিঙ্কটা। সেখানে ক্লিক করে ঢুকে পড়লো পোষ্টদাতার ওয়েবসাইটে। তারপর খুঁজে খুঁজে গল্পটা পেয়ে পড়তে লাগল। লেখকের সব লেখা পড়ে উত্তরা যখন ব্লগ থেকে বেরোল ততক্ষণে দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে। ফেসবুকের প্রোফাইলের দিকে আরেকবার তাকালো সে। মুঠোফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে বাংলা হরফে লেখা নামটা, ‘পরাগরেণু দত্তগুপ্ত’। প্রোফাইল পিকে একটা চিনার পাতার ছবি। কভারে শান্তিনিকেতনের একটা নৈসর্গিক দৃশ্য। সাতপাঁচ না ভেবে রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করে উত্তরা। মেসেঞ্জারে গিয়ে মেসেজ করে, “ আপনার গল্পগুলো পড়লাম। দারুন লাগল।” বেশ কিছুক্ষণ পর ওপার থেকে একটা উত্তর আসে, “ধন্যবাদ!” তারপর অফলাইন হয়ে যায় পরাগ।
এই ব্যবহারে একটু হলেও অবাক হয় উত্তরা। অন্য কেউ হলে আহ্লাদে ডগমগ হয়ে মেসেজের বন্যা বইয়ে দিত। অথচ এই ছেলেটা শুধু একটা শুকনো ধন্যবাদ দিয়ে চুপ হয়ে গেল! অ্যাটিটিউড দেখাচ্ছে! এত সাহস! উত্তরা সিংহরায়কে অ্যাটিটিউড! বেশ থাকুক লেখকমশাই ওর ঔদ্ধত্য নিয়ে। ঐ তো ফলোয়ারের ছিরি। ওর থেকে বেশি ফলোয়ার ওর একটা পোষ্টে ঝাঁপায়। অভিমানে পরাগকে ব্লক করে ফোন বন্ধ করে উত্তরা।
কিন্তু বইপোকাদের একটা বড়ো দুর্বলতা হল ভালো গল্প। পৃথিবীতে একজন বইপ্রেমী যতই লেখকের প্রতি খাপ্পা হন না কেন, লেখকের লেখা যদি মনোগ্রাহী হয় তাহলে সেই লেখার টানে তিনি লেখকের লেখা পড়তে বাধ্য। উত্তরার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হল না। পড়বে না পড়বে না করেও সে ঠিক আবার চলে গেল পরাগের ব্লগে। আবারও একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে কমেন্টবক্সে গেল সে। তবে এবার পরাগের তরফ থেকে কাষ্ঠ জবাব পেল না সে। বরং পেল একটা মিষ্টি করে ক্ষমাপ্রার্থনার মেসেজ। সেই শুরু, তারপর কেটে গেছে প্রায় পাঁচবছর। এর মধ্যে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। মডেলিং এর সাথে সাথে দু-একটা ওয়েব সিরিজ, সিরিয়ালে মুখ দেখানো হয়ে গেছে উত্তরার। অনুগামীদের সংখ্যা বেড়ে হাজার থেকে লাখে দাঁড়িয়েছে। টিকটক ব্যান হবার পর ইনস্টাগ্রামে ভীড় বেড়েছে ভীষণ। ওদিকে পরাগের অনুগামীরাও বেড়েছে অল্প অল্প করে। যদিও এর পেছনে উত্তরার অবদান অপরিসীম। সে ক্রমশ প্রমোট করেছে পরাগের ব্লগটাকে। পেজ বানাতে, পেজ চালাতে সাহায্য করেছে। ক্রমাগত তাগাদা দিয়ে গেছে নতুন নতুন গল্পের জন্য।
এতকিছু করতে করতে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে অনেক। মেসেঞ্জার থেকে হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে ফোনে কথা বলেছে দুজনে। কিন্তু একটা জিনিস একই থেকে গেছে। পরাগের আড়ালে থাকা। এই ক’বছরে কাছে এলেও পরাগকে ঠিক কেমন দেখতে তা জানে না উত্তরা। মানে কন্ঠস্বর জানলেও পরাগকে স্বচক্ষে দেখে নি উত্তরা। হোয়াটসঅ্যাপে কতবার ছবি দিতে বলেছে সে। চেষ্টা করেছে ভিডিও কল করার কিন্তু কিছুতেই পরাগের চেহারা দেখতে পারে নি সে। পরাগের একটাই কথা, “চেহারা দেখে কী হবে? মানুষের পরিচয় তার কর্মে, তার রচনায়।”
এক আধবার উত্তরার মনে হয়েছে এই পরাগ বলে ছেলেটা সত্যিই আছে তো? নাকি কোনো ফেক আইডি? ক্রমশ ঝগড়া বাদানুবাদের পর উত্তরা ঠিক করেছে পরাগ যদি ওর সামনে না আসে তাহলে সে আর কোনো দিন কোনোরকম সম্পর্ক রাখবে না সে। পরাগকে সে কথা জানিয়ে সব জায়গায় ব্লক করেছে সে। তার পরিপ্রেক্ষিতে আজকে পরাগের ফোন।
মাথায় শ্যাম্পু দিতে দিতে ভাবতে থাকে উত্তরা। পরাগকে কেমন দেখতে? নিশ্চয়ই ভীষণ হ্যান্ডসাম, বা ভীষণ কিউট দেখতে! হতেই পারে! ফোনে ওরকম সেক্সি ভয়েসের অধিকারী মানুষ হ্যান্ডসাম হাঙ্ক না হয়ে যেতে পারেই না! কল্পনায় পরাগের সাথে কালকে দেখা করার দৃশ্য কল্পনা করে শাওয়ারের জলে ভিজতে থাকে উত্তরা।
*****
নন্দন চত্ত্বরে উত্তরা যখন পৌঁছল তখন বিকেল পৌনে ছটা বাজে। চারদিকে তাকিয়ে দেখল সে। নন্দনে এই বিকেলেই বেশ ভীড়। চারদিকে প্রেমিকযুগল বসে আড্ডা দিচ্ছে, কোথাও কোথাও কয়েকদল ছেলে মেয়ে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু এত জনের মধ্যে পরাগ কে? কোথায় ও? ভাবতে ভাবতে ফোন বের করে পরাগকে কল করল সে। আর ওকে চমকে প্রায় ওর কানের কাছে বেঁজে উঠলো অরিজিত সিংহের সুললিত কন্ঠের গান, “জো তুম না হো…” চমকে গিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই এক প্রকার ধাক্কা খেল সে।
ধাক্কাই বটে! কারণ ওর সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে। ছেলে বললেও আকারে বেশ একটা পাহাড়ের মতো ছেলেটা। বেশ নাদুসনুদুস গোলগাল দেখতে ছেলেটা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। উত্তরা ছেলেটা পাত্তা না দিয়ে ফোনে মনোযোগ দিতে যাচ্ছিল কিন্তু এমন সময় ছেলেটার কথায় সে সোজা তাকালো। ছেলেটা এক গাল হেসে বলল, “বাসবদত্তা আমি এসে গেছি!” কন্ঠস্বরটা, নামটা উত্তরার ভীষণ চেনা। পরাগের নতুন গল্পের নায়িকার নাম বাসবদত্তা। ইদানিং ওকে সেই নামেই সম্বোধন করে পরাগ। তারমানে এই হোঁতকা মোটা ছেলেটা পরাগ? উত্তরা ভালো করে তাকাল ছেলেটার দিকে। ছেলেটার পরনে নীল রঙের টি শার্ট আর ওভার সাইজড জিন্স। এই পোশাকই তো পরে আসতে বলেছিল সে! ছেলেটা এক পা এগিয়ে এসে বলল, “চিনতে পারো নি? আমি পরাগ!” কন্ঠস্বরটা শোনা মাত্র সম্বিত ফিরল উত্তরার। এ যে কেঁচো খুড়তে কেউটে বেরোল! সে স্বপ্ন দেখেছিল একটা হ্যান্ডসাম ছেলের সাথে ডেটের। কিন্তু এ যে একটা মোটকা নাড়ুগোপাল। ছেলেটাকে দেখে কেন যানে না ভীষণ হাসি পেয়ে গেল উত্তরার। সে হেসে ফেলল। নিজের ভাগ্যের জন্য, নিজের বোকামোর জন্য। ইস নির্ঘাত পরাগের কীর্তি এটা! নির্ঘাত প্র্যাঙ্ক করছে। নাহলে কোনো দুঃস্বপ্ন এটা। ভাবতে ভাবতে সে হেসে বলল, “বুঝতে পেরেছি! এটা নির্ঘাত পরাগের প্ল্যান তাই না? তা ও কোথায়? ধরতে পারলে মজা দেখা দেখাব ওকে।” কিন্তু ছেলেটা ওকে চমকে দিয়ে হেসে ফেলল।
ছেলেটাকে পাল্টা হো হো করে হাসতে দেখে হাসি বন্ধ হয়ে গেল উত্তরার। হাসি থামিয়ে হা করে সে তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে। আশেপাশের লোকজন ওদের দিকে তাকাচ্ছে। হাসির চোটে ছেলেটার থলথলে শরীরটা বারবার কেঁপে উঠছে। কিছুক্ষণ হাসার পর ছেলেটা নিজেকে থামিয়ে বলল, “মাপ করো। আসলে আমার এই একটা মুদ্রাদোষ। কাউকে হাসতে দেখলে নিজেকে আর সামলে থাকতে পারিনা। ফিক করে হেসে ফেলি। তাছাড়া হাসার সময় তোমার মুখটা এতোটাই মজার হয়ে উঠেছিল যে নিজেকে সামলাতে পারিনি। সরি।”
ভ্রুটা কুঁচকে গেল উত্তরার। এ কি পাগল টাগল নাকি? কাউকে হাসতে দেখলে হাসি পেয়ে যায়? তাও আবার সামান্য হাসি নয় একেবারে অট্টহাস্য! কোনোরকমে নিজেকে সামলে যতটা পারে সিরিয়াস মুখ করে উত্তরা বলে , “তাহলে কাজের কথায় আসা যাক!”
ছেলেটা সোজা হয়ে বসল তারপর বলল, “ আগে কোথাও বসি চলো। তার পর শুনবো তোমার কী জানার আছে? এসো।”
ইচ্ছে না থাকলেও একপ্রকার বাধ্য হয়েই ছেলেটার পেছন পেছন হাটতে লাগল উত্তরা। কাছেই ছেলেটার বাইক পার্ক করা ছিল। ছেলেটা সেটা বের করে এনে স্টার্ট করল। উত্তরা বাইকের পেছনের সিটে বসতেই ছেলেটা বাইক চালিয়ে দিল। কিছুদুর গিয়ে একটা রেস্তরাঁর সামনে ছেলেটা বাইক দাঁড় করাতেই নেমে পড়ল উত্তরা। দুজনে মিলে ঢুকলো রেস্তরাঁতে।
বেশ ছিমছাম, পরিপাটি রেস্তরাঁর ভেতরটা। আশেপাশের টেবিলে বেশ কয়েকজন বসে আছে। ভীড় হলেও তেমন শব্দ নেই। রেস্তরাঁতে বোধহয় ছেলেটার আগে থেকেই বুকিং করা ছিল। ওরা ঢোকামাত্র ওয়েটার এগিয়ে এল ওদের দিকে। তারপর নির্দিষ্ট টেবিলে বসিয়ে অর্ডারের অপেক্ষা করতে লাগল। ছেলেটা বোধহয় আগেও এসেছে এখানে। ওয়েটার জিজ্ঞেস করা মাত্র নিজের জন্য একপ্লেট ফ্রাই মোমো অর্ডার করল। উত্তরা শুধুমাত্র এককাপ কফি নিল। ওয়েটার চলে যেতেই ছেলেটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল,““তুমি শুধু কফিই খাবে? এখানকার হাক্কা নুডলসটাও দারুণ খেতে।”
উত্তরা মাথা নেড়ে বলে, “বাড়ি থেকে স্ন্যাকস খেয়েই বেড়িয়েছি। তাছাড়া কদিন ডায়েট চলছে। আমি কফিই খাবো।”
-“বেশ! তা এবার বলো। তোমার কী কী জানার আছে।”
-“তোমার নাম তো পরাগ। অন্তত আমি তাই জানি। ভালোনামটা...”
-“ অসীমাভ দত্তগুপ্ত।”
-“অসী...হোয়াট?”
-“অসীমাভ। নামটা শুনে মনে হয় না যে কোনো বুড়ো, বা জেঠু টাইপের লোকের নাম অথবা বাবা-কাকা টাইপের লোক? বিশ্বাস করো নামটা এতটাই ব্যাকডেটেড যে অফিশিয়াল কাজে বার বার বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে আমায়। তাই ফেসবুকে আমার ডাকনামটার সাথে মায়ের নামটা যোগ করে রেখেছি। আচ্ছা সত্যি করে বলো তো, তুমি সিরিয়াসলি ভেবেছিলে না যে আমি ফেক আইডি নিয়ে তোমার সাথে মজা করেছি বা তোমার সাথে কোনো নোংরা প্র্যাঙ্ক করা হয়েছে? কি তাই তো? জানতাম! অবশ্য এক্ষেত্রে তোমার কোনো দোষ নেই। কারন এর আগে অন্তত জনা পাঁচেক মহিলাও আমার আইডি দেখে ডেটে এসে বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে তাই ভেবেছিলেন। তারপর আমার বিরাট বপু এবং রাক্ষুসে চেহারা দেখে, বাস্তবের সম্মুখীন হয়ে কেউ মানে মানে কেটে পড়েছেন, কেউ বা ভিরমি খেয়েছেন, কেউ আবার মিটিং সেরে পরে না বলেছেন, কেউ আবার ঠকিয়েছি বলে আমাকে দেখে নেবেন বলে শাঁসিয়েছেন। ঠিক এই কারণেই আমি দেখা করতে চাই নি। কারণ বাস্তবের আমি আর ফেসবুকের আমির মধ্যে বিস্তর ফারাক। আমি চাই নি আমাদের বন্ধুত্বটা এইভাবে শেষ হোক তাই...। তবে এই নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই জানো? কারণ বাস্তবটাকে আমি মেনে নিয়েছি। এটাই আমি। বাস্তবের পরাগ দত্তগুপ্ত।” বলে ছেলেটা মলিন হাসি হাসে।
একটু বিব্রত হয়ে পড়ে উত্তরা। সত্যিকথা বলতে গেলে খানিকক্ষণ আগেও সে তাই ভাবছিল ঠিকই। কিন্তু এতটাও রুড ভাবে ভেবে দেখেনি। সে হাল্কা হেসে বলে, “না মানে আমি সেটা মিন করে বলতে চাই নি। আমি যেটা বলতে চাইছি তোমার ডাকনামের চেয়ে আসল নামটা বেশী ইউনিক। বেশ খটোমটোও বটে।”
-“ধন্যবাদ! তবে এর পেছনে আমার স্বর্গত ঠাকুমার অবদান অনস্বীকার্য। আসলে আমার দুই দাদার নামের সাথে মিল রাখতে গিয়ে বোধহয় তিনিও জানতেন না যে ভবিষ্যতে তার ছোটো নাতিকে নামবিম্ভ্রাটে পড়তে হবে। স্কুল-কলেজেও অসীমাভ নামটা অ্যাসিমভ থেকে অ্যাসি হয়ে গিয়েছিল। বলতে পারো কলেজে এই নামেই আমি ডিপার্টমেন্টে প্রসিদ্ধ ছিলাম। ভাগ্যিস আমার মা আমার ডাকনামটা রেখেছিলেন। নাহলে কী যে হতো?”
-“এ নামের মানে কী?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেটা বলে, “মানেটা একটু উদ্ভট। যে আলো বা আভা মাত্রাহীন। এবার তুমি বলবে আলো তো সীমাহীনই হয়। আমিও তাই জানি। কিন্তু ঠাকুমা কেন যে এই নামটা রেখেছিলেন সেটা উনিই বলতে পারতেন। কিন্তু দশবছর হলো তিনি স্বর্গে সেটল করে গেছেন অগত্যা এই রহস্যটাও তার সাথে চলে গেছে।”
উত্তরা আরো কিছু বলার আগে ওয়েটার অর্ডার নিয়ে টেবিলের সামনে হাজির হয়। ধোঁয়া ওঠা ফ্রাই মোমোর প্লেট, আর কফির কাপ নামিয়ে চলে যায়। অসীমাভ ওরফে পরাগ বলে, “তুমি শিওর আর কিছু খাবে না?”
উত্তরা মাথা নেড়ে কফির কাপে চুমুক দেয়। পরাগ শ্রাগ করে মোমো খেতে থাকে। উত্তরা কফি খেতে খেতে দেখতে থাকে পরাগের খাওয়া। কফিতে চুমুক দিয়ে বলে, “এই রেস্তরাঁর স্টাফেরা তোমার চেনা মনে হয়। যেভাবে খাতির যত্ন হচ্ছে।”
-“চেনা তো বটেই। আফটার অল আমাদেরই তো রেস্তরাঁটা ।”
এবার কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খায় উত্তরা। এতটা চমক সে আশা করে নি। সত্যিকথা বলতে গেলে এতদিন পরাগের লেখা নিয়েই কথা হয়েছে ওদের মধ্যে। এর বাইরে পরাগ নিজের ব্যাপারে না কিছু বলেছে, না ও জানতে চেয়েছে। জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে পরাগ মোমো খেতে খেতে বলে, “আমাদের তিন ভাইয়ের মিলিত ব্যবসা এই রেণুকণা’স কিচেন। বড়দা, আর মেজদাই মেন ব্যবসা সামলায়। আমার শেয়ার থাকলেও আমি লেখালেখিতেই ব্যস্ত। যদিও বাবা চান আমিও ব্যবসায় নামি। দাদাদের হেল্প করি। কিন্তু আমার এই হিসেবনিকেশের ঝামেলা ভালো লাগে না।”
উত্তরা জল খেয়ে চুপচাপ বসে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, “আন্টি মানে তোমার মা...”
-“মা এসব ব্যাপারে কুল। সত্যি কথা বলতে গেলে মা-ই আমাকে রক্ষা করে আসছে এসব থেকে। বাড়িতে সর্বময়কর্ত্রী আমার মা। বাড়িতে মায়ের কথাই শেষ কথা।”
বলে খাওয়া শেষ করে ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পরাগ। তারপর বলে, “তাই বলে আমি যে একেবারে অকম্মার ঢেকি, বা ওয়ার্থলেস স্পয়েল্ড মামাস বয় এমনটা নয়। রেস্তরাঁটার ইন্টিরিওর আমারই ডিজাইন করা। তারপর ওয়েটারদের পোশাক, রাঁধুনিদের হাইজিন সবটাই আমার মাথা থেকে বেরিয়েছে।”
এবার অবাক হয় উত্তরা। ছেলেটা কি থটরিডিং জানে নাকি? একটু আগেই মনে মনে ওকে মাকালফল ভাবতে যাচ্ছিল। খাবার শেষ করার পর ওয়েটার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “আর কিছু লাগবে স্যার?” পরাগ মাথা নেড়ে বলে, “না ম্যাডামকে জিজ্ঞেস কর। উনি তো কফি ছাড়া আর কিছুই খেলেন না।”
উত্তরা মাথা নাড়ে। পরাগ হেসে বলে ,“তাহলে বিলটা নিয়ে এস নিতাইদা।” নিতাই মাথা নেড়ে চলে যেতেই পরাগ বলে, “এটাও আমারই বানানো নিয়ম। নাথিং ইজ ফ্রি। তুমি যতই রেস্তরাঁর মালিক হও না কেন এটা তোমার বাবার হোটেল নয় যে ফ্রিতে খেয়ে যাবে। বিজনেস বিজনেসের জায়গায়, ফ্যামিলি ফ্যামিলির জায়গায়। আর এটা আমার রেস্তরাঁ হলেও এখন আমি এই রেস্তরাঁয় মালিক হয়ে নই বরং একজন কাস্টোমার হিসেবে এসেছি। কাজেই বিলটা কম্পালসারি।” বলতে বলতে নিতাই বিলবুকটা নিয়ে হাজির হয়। দুজনের বিল মিটিয়ে পরাগ বলে, “তাহলে এবার ওঠা যাক?” উত্তরা মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ছেলেটাকে যত বোকা মনে হয়েছিল তত নয়। বেশ চালাক চতুর। ব্যবসায়িক বুদ্ধিও আছে। মনে মনে উত্তরা বলে, “ইন্টারেস্টিং!”
রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে পরাগ বাইকটা স্টার্ট করে। উত্তরা পেছনে বসতেই পরাগ বলে, “এবার কোথায় যাবে?”
উত্তরা জবাব দিচ্ছে না দেখে পরাগ বোঝে পরপর দুটো ধাক্কা সামলাতে পারে নি মেয়েটা। সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া বিল মিটিয়ে আসার সময় কয়েকজন কাস্টোমার উত্তরাকে চিনে ফেলায় সেলফির আবদার মেটাতে হয় যার জন্য পরাগ নিজেও বিব্রত। এখানে এরকম হবে সে মাথাতেও আনে নি। সঙ্গী যদি পাবলিক সেলিব্রেটি হয় তাহলে বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। যাক গে! এখন এমন জায়গায় যেতে হবে যেখানে উত্তরার মন ঠিক হয়ে যায়। ভাবতে ভাবতে সে নিজেই ঠিক করে নেয় কোথায় যাবে। এমন একটা জায়গা যেখানে গেলে উত্তরার মন ফ্রি হবেই। সেই ভাবনা মতো বাইক চালায় সে।
নন্দন চত্ত্বরে ওরা যখন পৌঁছল ততক্ষণে অন্ধকার না হলেও দিনের আলো প্রায় মরে এসেছে। বাইরের দোকানগুলোতে পর্যটকদের ভীড় বাড়ছে। দেখে শুনে একজায়গায় বসে ওরা দুজনে। উত্তরা চুপ করে বসে থাকে। সত্যি কথা বলতে ওর সব কিছু গুলিয়ে গেছে। সকালে যে কার মুখ দেখে উঠেছিল কে জানে? ছেলেটাকে দেখে যতটা কবিগোছের মনে হয়েছিল ততটাও নয়। বেশ বাস্তববোধ সম্পন্ন মনে হচ্ছে। কিন্তু এই ছেলেটাই যে পরাগ এটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না সে। ছেলেটাকে আরেকটু পরখ করে দেখা দরকার। আরেকটু বাজিয়ে দেখা দরকার। কাজেই চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয় তার।
যেখানে ওরা বসেছিল সেখান থেকে কিছুটা দুরে একটা প্রেমিকজুটি খুনশুটিতে ব্যস্ত। আরেকদিকে কতগুলো ছেলেমেয়ে আড্ডা দিচ্ছে। উত্তরা সেদিকে তাকায়। উত্তরার দৃষ্টি অনুসরণ করে ওদের দিকে তাকিয়ে হাল্কা হাসে পরাগ। তারপর বলে, “মনে আছে? একবার তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে এই যে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে এত প্রেম, বন্ধুত্বর গল্পের অনুপ্রেরণা আমি কোথা থেকে পাই? এই যে সামনে ভীড়টা দেখছ এদের থেকে। ঐ যে দুরে দুজন প্রেম করছে ওদের পোশাক দেখে বোঝা যায় ওরা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে-মেয়ে। সদ্য কলেজে উঠেছে হয়তো। প্রথম প্রেমের স্বাদ পেয়েছে। বাস্তবে পাঁচ বছর পর যখন ছেলেটা চাকরির পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হবে, মেয়েটার সম্বন্ধ দেখতে একের পর এক পাত্র আসবে তখন এই প্রেমটা থাকবে না। কি তাইতো? সাধারণ যে কেউ তাই ভাববে। কিন্তু আমি মানুষটা এত নেগেটিভ নই। তাই এতটা ভাবতে পারি না। তাছাড়া আগামীকাল, পরের মুহূর্ত কে ই বা দেখেছে? আমার চোখে ধরা পড়ছে এখনকার মুহূর্তটা। সেটাকেই বন্দি করি শব্দে আর সেটা থেকেই পজেটিভ উপসংহার খুঁজি। যেমনটা করছে ঐ ছেলেমেয়ের দল। এদের কারো বাড়ি মফঃস্বলে, কারো হয়তো অনেক দুরে। এতদিন পর এতটা পথ পার করে এসেছে পরস্পরের সাথে দেখা করতে। কে জানে? হয়তো ভবিষ্যতে আর কোনোদিন দেখা নাও হতে পারে। তাই বিদায়বেলায় শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে পরস্পরকে। জড়িয়ে ধরছে শক্ত করে। মুঠোফোনে বন্দি করছে মুহূর্তটাকে। জীবনের কোনো ভরসা নেই। কখন কোন খাতে প্রবাহিত হবে কেউ জানে না। জীবনটা আমাদের হলেও এর পরিবর্তন আমাদের হাতেও নেই। যা আছে এই মুহূর্তটুকু। সেটাকেই বন্দি করে রেখে সারাজীবন বয়ে চলতে পারি আমরা।”
-“কিন্তু কিছু মুহূর্ত আছে যা প্রথমে মধুর মনে হলেও পরে কাঁটায় পরিণত হয়।” উত্তরা তাকায় পরাগের দিকে। সুযোগ বুঝে মোক্ষম কথাটা তোলে সে। এই কথার উত্তরেই প্রমাণিত হবে ছেলেটা সত্যিই পরাগ কিনা। কারণ পরাগ মুহূর্তগুলো ধরতে ভালোবাসলেও এই কন্টক মুহূর্তের কনসেপ্টটা পুরোপুরি মানে না।
উত্তরার কথায় হেসে পরাগ বলে, “সেটা ঠিক। তবে এর জন্য দায়ী থাকি আমরাই। আমরা মানুষ চিনতে ভুল করি। মানুষের মনের পরিচয় না নিয়েই তার সাথে থাকতে শুরু করি। মুহূর্তগুলো বন্দি করতে শুরু করি। পরে যখন ভুল বুঝতে পারি ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে যায়। তখন এই মুহূর্ত গুলো বিষে পরিণত হয়। তবে একদিকে এটা ভালো জানো যে আমরা মানুষের মনের তল বুঝতে পারিনা। পৃথিবীতে সকলের যদি মন বোঝার ক্ষমতা থাকত তাহলে মানুষের চেয়ে হিংস্র, নোংরা, নির্লজ্জ আর নিম্নমানের জীব আর দুটো থাকতো না। বিশেষ করে মানুষের মানুষের প্রতি বিশ্বাস, নারী-পুরুষের মুখোশ খুলে যেত। নারীরা পুরুষকে বিশ্বাস করে আর ঠকতো না। প্রকৃত পুরুষের নারীর সন্ধান হতো না। প্রেমে ব্যর্থতা থাকতো না। মানুষ ঠকতো না। শঠ, জোচ্চরদের টেকা দায় হত। সেটা যাতে না হয় তাই ঈশ্বর মানুষকে এ ক্ষমতা দেন নি। থাকলে দেখতে পেতে কেউই সুখী নয়।”
-“এরকম মুখোশধারী মানুষের সাথে দেখা হয়েছে তোমার?” অস্ফুটে আরেকটা মোক্ষম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে উত্তরা। আগের উত্তরটা একেবারে বুলসআইতে মেরেছে ছেলেটা। পরাগও তাই ভাবে। তারমানে এই কি?
-“বহুবার! এতবার ঠকেছি যে বিশ্বাস করতেও ভয় লাগে। এই কারণেই নিজেকে লোকসমাজের থেকে লুকিয়ে নিয়েছি। যাতে কেউ আর ঠকাতে না পারে। ঠাকুমাকে বেশি ভালোবাসতাম একদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখলাম ঠকিয়ে চলে গেল। প্রিয় মানুষটাকে না জানিয়েই ভালোবেসে গেলাম। ঠকিয়ে চলে গেল অন্যজনের সাথে। এত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছি যে মানুষকে আর বিশ্বাস করতে পারি না। ভয় হয় আবার যদি ঠকে যাই। এই ভয় তাড়াতেই লেখা নিয়ে মেতেছিলাম কিন্তু বোধহয় আর হবে না।”
-“কেন?” বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করে উত্তরা। আর কোনো সন্দেহ নেই। এই ছেলেটাই পরাগ! এবার সে রিলেট করতে পারছে কেন পরাগের গল্পে প্রেম থাকলেও এত যন্ত্রণার প্রচ্ছন্ন ছাপ থাকে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরাগ বলে, “আমরা যারা স্রষ্টা তাদের মাঝে মাঝে একটা রোগ হয় জানো? সৃজনশীলতা হারাবার রোগ, ফুরিয়ে যাবার রোগ। ধরো একটা প্লট মাথায় এল সেটা নিয়ে বসলে তুমি খাতা পেন নিয়ে। কিন্তু কিছুতেই আর লেখা আসছে না। মানে লেখা আসলেও গল্পটা দাঁড়াচ্ছে না। নাহলে মাথা খালি হয়ে যাচ্ছে।”
-“জানি। ওটাকে রাইটার্স ব্লক বলে।” নিভে যাওয়া গলায় বলে উত্তরা।
-“ঠিক তাই! আমি এখন রাইটার্স ব্লকে আক্রান্ত। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমার লেখা ফুরিয়ে গেছে, লেখা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আই অ্যাম ফিনিশড। এই যে প্রত্যেকটা পর্বে রিডার্সরা জিজ্ঞেস করে ‘তারপর?’ , ‘নেক্সট’ সত্যি কথা বলতে জবাব দিতে পারি না আমি কারণ আমি নিজেই জানি না পরে কী হতে চলেছে। জানি একটু অড লাগছে শুনতে কিন্তু এটাই সত্যি! যে আমি রাতের পর রাত জেগে লিখেছি, ‘অভিসার’, ‘দোস্তি ডট কম’ এর মতো গল্প। সেই আমিই রাতের পর রাত জেগে থাকি লেখা ভাবার জন্য। কতগুলো রাত ঘুমোই নি জানো? মাঝে মাঝে মনে হয় পাগল হয়ে যাব। মনে হয় সব যখন ফুরিয়েছে তখন নিজেকে রেখে লাভ কী? কিন্তু পারি না কেন জানো? মায়ের জন্য। আমার মৃতদেহ দেখার পর মায়ের মুখটা ঠিক কেমন দেখতে লাগবে সেটা কল্পনা করেই পিছিয়ে আসি।”
উত্তরা চুপ করে দেখে পরাগকে। ঠিক একের পর এক অডিশনে বাতিল হয়ে, আপোষহীন শর্তে একাধিক মডেলিংয়ের প্রোজেক্ট হাতছাড়া হবার পর কর্মহীনতায় সেও যে একই রকম অবসাদে ভুগছে। তেমনভাবে দেখতে গেলে ও আর পরাগ ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। তফাৎ শুধু এক জায়গায় পরাগ আত্মহত্যা করতে গিয়েও ফিরে এসেছে। আর সে দুবার মরতে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে। আর এই ফিরে আসাটা পরাগের লেখার কারণেই! এই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, কর্মহীন হওয়ার যন্ত্রণা সে বোঝে। নাহ আর কোনো সন্দেহ নেই। ওর মনের সব সন্দেহ দুর হয়ে গেছে। এই ছেলেটাই পরাগ। ওর প্রিয় লেখক! যার লেখা পড়ে ও বাঁচার মানে খুঁজে পেয়েছে। প্রথম দেখাতে মনে হচ্ছিল তার সে বোধহয় মানুষ চিনতে ঠকে গেছে। পরাগ ওকে ঠকিয়েছে। কিন্তু এখন ওর এই হতাশায় ভরা কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে যেন ওরই কথা নিজের জবানিতে বলছে পরাগ। বাইরে থেকে দেখলে দুজনকেই ভীষণ সুখী মনে হবে। একজন নামী মডেল, রোজ যার প্রোফাইলে উপচে পড়ে অনুরাগীদের ভীড়। বিবাহ প্রস্তাব আসে সব সময় ইনবক্স জুড়ে। ইন্ডাস্ট্রিতে ওর এই আপোষহীন শর্তের জন্য অনেকে গর্বিত, অনেকে খুশি কারণ মডেল মানেই যা খুশি পরে ছবি তুললাম যাতে সেটা ফ্যাশন হয়ে যায় এই মিথটা ভেঙেছে ও। আরেক দিকে পরাগ, বড়লোক বাড়ির আদুরে ছোটোছেলে। মায়ের প্রিয়। অঢেল টাকা, প্রতিশ্রুতিমান লেখক। পরিবারের এত সাপোর্ট, কি নেই ওদের কাছে? অথচ দুজনে ভেতর ভেতর কতটা একা। কতটা দুঃখী। ছেলেটাকে সে ঠকবাজ ভেবেছিল প্রথম দেখাতে । এখন মনে হচ্ছে এই ছেলেটা যেন তারই প্রতিবিম্ব। তারই দোসর। এমন ছেলেকেই তো তার চাই! যে তাকে বুঝবে, জানবে। বন্ধুর মতো পাশে থাকবে। নাহ সে ঠকে যায় নি। আর দেরী করা চলবে না। যা বলার জন্য এতদিন প্ল্যান করে এসেছিল ভাবতে ভাবতে সেই কথাটাই উত্তরা বলে ফেলে, “জীবন যদি আবার সুযোগ দেয় কাউকে বিশ্বাস করতে তাহলে কী তুমি আরেকবার বিশ্বাস করবে? শেষবারের মতো?”
পরাগ উত্তরার দিকে তাকায়। উত্তরা বলে, “যদি এবার সত্যিই প্রকৃত প্রেম তোমার জীবনে আসে পারবে তাকে ধরে রাখতে?”
পরাগ হেসে বলে,“নাহ! অতো সাহস আমার নেই। আর আমি নিজেকে ঠকাতে চাইনা।”
-“এই শেষবারের মতো বিশ্বাস করেই দেখ না! কে জানে এইবার আর ঠকলে না।”
-“আর যদি ঠকে যাই?”
-“তাহলে জানবে পৃথিবীতে প্রেম মিথ্যে, ভালোবাসা মিথ্যে, যে ভালোবাসার গল্প লেখ তুমি সেটা একটা অলীক কল্পনা।”
-“এই যাত্রা ঠকবো না বলছ?”
-“বলছি তো ঠকবে না।”
-“কিন্তু...!”
-“আমরা দুজনেই বাইরে থেকে আলাদা হলেও ভেতর থেকে এক পরাগ। একা, নিঃস্ব। যেমন তুমি লেখার জন্য সারারাত জেগেছ। আমিও জেগে হাউহাউ করে কেঁদে খোঁজ করেছি একটা হাতের জন্য। নিজের আপোষহীন শর্তের জন্য কাজ হারিয়ে একটু একটু করে ভেঙে গিয়ে তলিয়ে গেছি অবসাদে। লোকে দেখেছে ম্যাগাজিনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার হাসিটাকে। কিন্তু কেউ আমার চোখের উদাসীনতাকে, কষ্টকে খেয়াল করে নি। বাইরে লোক তো দুর আমার নিজের বাবা-মাই আমার মনের খোঁজ রাখে নি। সত্যি কথা বলতে আমার কাঁদার জন্য কাঁধ চাই না পরাগ। শুধু একটা হাত চাই। ভরসার, ভালোবাসার। আমি যখন ক্লান্ত হব তখন সে হাত আমাকে শক্তি জোগাবে। যখন ভেঙে পড়ব তখন ভরসা দেবে। এই ভীড়ের মাঝে আমরা মিশে থাকলেও সম্পুর্ণ একা আমরা। তবে আমি বিশ্বাস করি দুজন একা মানুষ যখন একসাথে পথ চলতে শুরু করে তখন তারা একা থাকে না। এবার বলো আমার সেই ভরসার হাত হবে? একসাথে পাশাপাশি পথে হাটবে? কথা দিচ্ছি এবার ঠকবে না।”
-“এতদিন যারা এসেছিল তারাও একই কথা বলেছিল বাসবদত্তা। কিন্তু তারপর? সকলই গরল ভৈল। বাস্তবটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলেছে ওদের জন্য আমি পারফেক্ট নই।” বলে মাথা নত করে কান্না সামলে অভিমানের সুরে বলে পরাগ।
পরাগের একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে উত্তরা বলে, “আমরা কেউই পারফেক্ট নই পরাগ। আমাদের সকলের মধ্যেই কিছু না কিছু ইমপারফেকশন আছে। তবে ভগবান সেটাকে পুষিয়ে দিয়েছেন আমাদের আরেক গুনকে সুন্দর করে সাঁজিয়ে। ঈশ্বর তোমাকে এই বিরাট দেহর সাথে দিয়েছেন একটা আবেগপ্রবণ, কল্পনাশ্রয়ী, সৃষ্টিশীল মন। তোমার রাগ, দুঃখ, কষ্ট তোমাকে প্রেরণা জোগায়, তোমাকে তাগিদ দেয় লেখার। তাই তুমি লেখ। তোমার সুন্দর মন বলে তোমার সৃষ্টিও সুন্দর হয়। এই যে ময়ুর যার জগৎজোড়া খ্যাতি পেখম মেলা নাচের জন্য, ঝলমলে রঙের জন্য কিন্তু বাস্তবে ময়ুরের পেখম বাদ দিলে কি থাকবে বলো তো? না গাইতে পারে, না ভালো উড়তে পারে। এই যে আমি, তোমার মতে আমি নাকি অসামান্যা সুন্দরী। তোমার প্রতিটা গল্পের নায়িকা চরিত্র নাকি আমাকে ভেবে লেখা। বাস্তবে যদি এতটাই সুন্দর হতাম তাহলে এত স্ট্রাগল করতে হত না। কাজেই তুমি সুন্দর নও এই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে তুমি যেমন তাতেই খুশি থাকো। স্বার্থপর পৃথিবীতে নিজেকে নিয়ে খুশি থাকাটা ম্যাটার করে পরাগ। আর এটাই আমরা করি না। আর রইল বাকিদের কথা সত্যি কথা বলতে মানুষের দৈহিক সৌন্দর্য আমার কাছে তেমন ম্যাটার করে না। তবে তোমার কন্ঠস্বর শুনে তোমাকে সুপুরুষ ভেবেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে তোমাকে যখন দেখলাম মনে হল একটু হলেও তুমি আমাকে ঠকিয়েছ। আমি তোমার দৈহিক গঠনের জন্য রাগ করিনি পরাগ। রাগ করেছি এই প্রবঞ্চনার জন্য। আর এখন...!”
“আর এখন?” বলে পরাগ তাকায় উত্তরার দিকে। উত্তরা পরাগের চোখে চোখ রেখে বলে, “এখন দেখলাম ঠিক ঠকে যাইনি। তোমার এই বিশাল দেহের ভেতরে যে বিশাল মনটা আছে সেটা কাউকে ইচ্ছে করে ঠকায় নি। সে আড়ালে থাকতে চেয়েছে। কিন্তু যখনই তাকে দেখার জন্য আমরা উঠে পড়ে লেগেছি, ততবার ঠকে গেছি। এই জগতে একটু খুঁজলেই ভালো মানুষ পাওয়া যায় পরাগ। কিন্তু ভালো মনের বন্ধু পাওয়া অসম্ভব। তোমার মধ্যে আমি সেই ভালো মনের বন্ধুকে পেয়েছি কাজেই হারাতে চাইছি না। এবার বলো বন্ধু হবে তো?”
পরাগ অশ্রুসজল চোখে শক্ত করে ধরে রাখে উত্তরার হাতটাকে। অনুভব করে উত্তরার মনের উত্তাপটাকে। উত্তরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর নাক শিটকে বলে, “তবে খুশি থাকা মানে এই নয় যে এতটা ফ্যাট নিয়ে খুশি থাকবে। এতটা ফ্যাট থাকাটা মোটেই ভালো নয়। ভবিষ্যতে নানান কম্প্লিকেশন আসতে পারে। কাজেই কালকেই তুমি আমার সাথে জিমে যাবে। আর এই সব তেলাক্ত আনহাইজেনিক ফুড ছাড়বে।”
কথাটা সোনা মাত্র আঁতকে ওঠে পরাগ,“ইরিক! মানেটা কী?”
-“মানেটা খুবই সহজ! কাল থেকে তোমার জাঙ্কফুড খাওয়া বন্ধ!”
-“এহ! বললেই হল! আমি খাবোই! দেখি কে আটকায়!”
-“বটে! আমিও দেখব তুমি কি করে খাও।”
বলে দুজনে ঝগড়া করতে করতে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাটতে হাটতে এগিয়ে যায় সামনের দিকে।
বাড়িতে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে অনলাইন হতেই টুং করে মেসেজ ঢোকে উত্তরার ফোনে। সে দেখে পরাগের মেসেজ, “বাড়ি পৌঁছে গেছ?”
উত্তরা চটজলদি টাইপ করে “হুম। একদম বাড়ির সামনে ক্যাবটা দাঁড়িয়েছিল।”
-“আজকের দিনটা সত্যিই দারুণ কাটলো বলো?”
-“সে আর বলতে! এক কাজ করবে? আজকে যে ছবিগুলো তুললাম সেগুলো একটু সেন্ড করবে?”
কিছুক্ষণ পর কয়েকটা ছবি এসে ঢোকে উত্তরার ফোনে। সেগুলো দেখে মেসেজ করে উত্তরা, “তাহলে কাল জিমে দেখা হচ্ছে?”
ওপাশ থেকে পরাগের মেসেজ আসে “রক্ষে করো মা!” সাথে একটা হাতজোড় করা ইমোজি। মেসেজটা দেখে ফিক করে হেসে উত্তরা টাইপ করে, “ওভাবে আমি ভুলছি না। কাল তোমাকে আমি জিমে ভর্তি করাবোই। দুমাসের মধ্যে ফিট না করিয়েছি তো আমার নামও উত্তরা সিংহরায় নয়।”
মেসেজটা পড়ে হাল্কা হাসে পরাগ। তারপর ফোনের নেট অফ করে চুপ করে গ্যালারী থেকে একটা ছবি বের করে বসে থাকে। উত্তরা সব ছবি পাঠাতে বললেও এই একটা ছবি সে পাঠায় নি। একান্ত গোপন করে রেখেছে। ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর একটা হাসি ফুটে ওঠে ওর মুখে। এসেছে! এসেছে! অবশেষে এসেছে! ভাবতে ভাবতে ল্যাপটপটা খুলে বসে। এতদিনে একটা নতুন প্লট এসেছে মাথায়। ওয়ার্ড ফাইল খুলে ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করে সে। ক্রমশ লেখায় বুঁদ হয়ে যায় পরাগ।
উত্তরা দেখে মেসেজটা সিন করে অফলাইন হয়ে গেছে পরাগ। বোঝে অবশেষে নির্ঘাত নতুন কোনো লেখার প্লট পেয়ে গেছে ছেলেটা। লিখুক গে! আর ওকে বিরক্ত করবে না সে। ভাবতে ভাবতে ফোনের সেটিংসে গিয়ে ফোনের রিংটোনটা বদলে একটা চিরনতুন রবীন্দ্র সংগীত রাখে উত্তরা। শুধুমাত্র একজনের জন্য। রিংটোনটা বদলে নিয়ে ফোনে হেডফোন লাগিয়ে গানটা শুনতে থাকে সে। হেডফোনের মাধ্যমে তার মগজের প্রতিটা কোষে ছড়িয়ে পড়তে থাকে একটাই কথা, “আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না।”
