মাল্লারপুরে পৌছে রণিরা স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করে থানার ফোর্স নিয়ে অসীতবাবুর বাড়ি যখন পৌছলো তখন রাত তিনটে
বাজে। অসীতবাবু জেগেই ছিলেন। কড়া নাড়তেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। রণি জিজ্ঞেস
করলো,“কোথায়?” অসীতবাবু অবাক গলায় বললেন,“আপনি ধরতে পেরেছেন?” রণিমাথা নেড়ে বললো,“হুম
কোথায় আছে?” অসীতবাবু বললেন,“ একটু আগেই এসেছিল। দেখে মনে হলো প্রচন্ড রেগে আছে। মনে হয় যে পরিকল্পনা
করে বেরিয়েছিল সেটা ব্যর্থ হয়েছে। এইমাত্র মন্দিরের দিকে বেরোলো।আসুন আমার সাথে।”
বলে দরজা লাগিয়ে এগোলেন অসীতবাবু।
জঙ্গলের সামনে এসে রণি ওর সাথে আসা ফোর্সকে গোটা জঙ্গল ঘেরাটোপে ঘিরে দিতে বললো। যাতে কোনোভাবেই ও পালাতে না পারে। রণির ইশারা
করা মাত্র গোটা পুলিশ বাহিনী ছড়িয়ে পড়ে মিশে গেল অন্ধকরে। রণি ওর পিস্তলটা বের
করে সেফটি ক্যাচ খুলে নিলো। শব্দ শুনে অসীতবাবু ওর দিকে তাকাতেই শান্তস্বরে বললো,“কিছু
মনে করবেন না। যদি ও সারেন্ডার করে তাহলে এটার প্রয়োজন হবে না। নাহলে…” অসীতবাবু
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগোলেন। পেছন পেছন রণি পিস্তলটা হাতে নিয়ে অসীতবাবুর সাথে
প্রবেশ করলো জঙ্গলে।
******
জঙ্গলটা অন্যদিনের তুলনায় আজ একটু বেশীই শান্ত। অন্যদিন নাহয় ঝিঁঝিঁ ডাকে আজ
তো তাও ডাকছে না। তবে সেদিকে আজ তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আজ তার মাথায় আগুন
জ্বলছে। একটা নিষ্ফল আক্রোশে হাত দুটো নিশপিশ করছে। এত পরিকল্পনা,এত দিনের ধৈর্য, এতদিনের অপেক্ষা সব বৃথা গেছে। এতগুলো বছর পর সুযোগ
পেয়েছিল সে। ভেবেছিল পাবলিকের আক্রমনের সুযোগে ওর মন্দিরেই ওকে বলি দেবে। যেমন ওর
শিষ্যটাকে দিয়েছিলো।কিন্তু ঐ তান্ত্রিকটা সমস্ত পরিকল্পনা বাঞ্চাল করে ছোঁ মেরে
নিয়ে গেল শয়তানটাকে। এবার ধরা পড়লে শয়তানটা পুলিশের ঘেরাটোপে আটকে যাবে। আর ওর
নাগাল পাওয়া যাবে না।
সব সব ঐ তান্ত্রিকটার জন্য! ওকে রণি স্যারের বাড়িতে দেখেই ওর সন্দেহ
জেগেছিল। তারপর মর্গে দেখেই মনে হয়েছিল কোথাও গোলমাল আছে। ভুল হয়ে গেছে
তান্ত্রিকটাকে আনডারেস্টিমেট করেছিল সে।ওর জন্য একটা ব্যাকআপ প্ল্যান ভেবে রাখতে
হতো। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। ভাবতে ভাবতে মন্দিরের দিকে এগোয় সে।
মন্দিরের কাছে এসে থমকে যায় রাজু। একি মন্দিরে ওটা কে? অন্ধকারে চোখ সয়ে
আসায় কিছুক্ষন লোকটাকে লক্ষ্য করতেই স্থির হয়ে যায় রাজু। “একি? এতো!”মনে মনে বলে
উত্তেজনায় দুহাতের মুঠো শক্ত করে সে। এ যে মেঘ না চাইতেই জল! মা সত্যিই আছেন!
নাহলে নিজের খাবার কে এতদুর নিয়ে আনতে পারেন? আর নয় অনেক ধৈর্য ধরেছে এবার মা যা
চান তাই হবে। অমাবস্যা নেই তো কি হয়েছে? আজ সিদ্ধযোগ আছে শুনেছে। হাতের কাছে না
চাইতেই শিকার আবার ধরা দিয়েছে আর দেরী করবে না। ভাবতে ভাবতে ঠোটে হাসি ফুটে ওঠে
রাজুর। সে সোজা না গিয়ে ঘুরপথে এগোতে থাকে মন্দিরের এক নির্দিষ্ট কোণের দিকে।
******
লোকদুটোকে মন্দিরের সামনে নিয়ে এনে হাপাতে থাকে ভৈরব। বয়স হয়েছে, আগের মতো আর গায়ের জোর নেই। সন্ন্যাসীর চেলাটাকে আনতে
তেমন পরিশ্রম হয় নি। খাটনি হয়েছে ওর বন্ধুটাকে নিয়ে। একটা রোগা মানুষ এত ভারী কি
করে হয় কে জানে? হাপাতে হাপাতে মন্দিরের সিড়িতে বসে ভৈরব।
এই মুহুর্তে প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তার। নিজের উপর, বজুর উপর, বজুর খুনির উপর,এই সন্ন্যাসীর চেলাটার উপর রাগে গা
জ্বলে যাচ্ছে। নিজের উপর কারন ও বজুর কীর্তি টের পেলেও ওকে কড়াভাবে সাবধান করে নি
ফলে আজকে এই দিনটা দেখতে হলো। বজুটার খাই খাই বড্ড বেড়েছিল ওর নিষেধও মানতো না
যার ফলে যমের দুয়ারে যেতে হলো ওকে। আর খুনিটাও পারে। মারছিস মার, মেরে পুঁতে দে তা
না ওর সাধের ত্রিশুলটা নিয়ে…! আর এই সন্ন্যাসীর চেলাটাও মহাবদ। এই সব জেল পুলিশ কিছু ছিঁড়তে পারতো
না।কয়েকটা মন্ত্রীর টিক্কি বাঁধা আছে ওর হাতে ঠিক বেড়িয়ে যেত তার আগে এই
হারামজাদা বেজন্মাটা ওকে গরু-ছাগলের মতো গাড়িতে তুলে এই
অজানা মন্দিরে নিয়ে এলো। জ্ঞান ওর ফিরেছিল অনেক আগেই। কিন্তু কোথায় আছে ঠাহর করতে
পারছিল না। মন্দিরের সামনে নামাতেই হাতের কাছে একটা আধলা ইট পেয়েছিল। তারপর আলো
নিভতেই…নাহ এতদিনের যোগাভ্যাসটা বৃথা
যায় নি। চেলাটা পিছমোড়া করে বাঁধলেও শুধু কবজিদুটো বেঁধেছিল বাহু বাঁধেনি। তাই তো
পা গলিয়ে হাত সামনে আনতে কসরৎ করতে হয় নি।
ভৈরব উঠে গিয়ে উবু হয়ে বসে দেখলো চেলাটার জ্ঞান ফিরেছে কিনা। চেলাটা এখনও
অজ্ঞান হয়ে আছে দেখে একদলা থুতু ফেললো ওর মুখে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে সজোরে লাথী
কষালো চেলাটার মাথায়। সব হয়েছে এর জন্য। যেমন গুরু তেমন চেলা।সব সময় পরোপকার করার
চিন্তা। আরে পরোপকার করে আমার লাভটা কি? এই পৃথিবী হয় টাকার নয় ক্ষমতার ভাষা
বোঝে।যার যত টাকা, যত ক্ষমতা সে
তত শক্তিমান। সে ক্ষমতার পথ বেছে নিয়েছে।এই শক্তি আরোহন এত সহজে হয় না। অনেক
কৃচ্ছসাধনার পর আরাধ্য দেবী তুষ্ট হন। দেবীকে তুষ্ট করতে গিয়ে যদি ছোটোখাটো তুচ্ছ
বলিদান দিতে হয় তাতে কি এসে যায়? বৃহত্তর স্বার্থে এই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বলিদান
অবসম্ভাবী। কিন্তু ঐ সন্ন্যাসীর বহুত পরোপকারের ইচ্ছে ছিলো। আরে বাবা তুইও সাধক
আমিও সাধক আমি কি তোর পাঁকা ধানে মই দিয়েছি? না তো তোর এত মাথা ব্যাথা কেন?
সন্ন্যাসীর মৃত্যুর খবর পেয়ে যেমন দারুন খুশি হয়েছিল তেমনই আক্ষেপও করেছিল
সে। ক্ষমতা থাকলে সে নিজেই এই শুভকর্মটা করতো। যাক গে সেদিন পারেনি আজ করবে। গুরুর
কাজের প্রতিশোধ চেলার উপর থেকে নেবে সে। গুরু যে ক্ষতি করে গেছে তার দাম চেলা
দেবে। মন্দিরটার দিকে তাকায় ভৈরব। অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে। মন্দিরটা দেখে চিনতে
পারে সে। তেইশ বছর, তেইশটা বছর
কেটে গেছে।এই মন্দিরেই তার তান্ত্রিক জীবনে প্রথম বলি হয়েছিল।আজ নিয়তী আবার সেই
একই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। সেদিন সে ছিল শক্তিহীন পারিষদ পরিবেষ্টিত। আর আজ
শক্তিশালী, একা। কোনো প্রেত, অপছায়া তাকে স্পর্শ করতে
পারবে না। সেদিন ভয় পেয়ে পালিয়েছিল আজ স্বয়ং ঈশ্বর বাদে কাউকে ভয় করে না সে।
আজ তেইশ বছর পর আবার বলি হবে এই মন্দিরে। সে দেবে এই বলি। তবে কোনো খাঁড়া
দিয়ে নয়।বলির অস্ত্র হবে এই ইটটা।সে ঠিক করে লোক দুটোর মাথা থেঁতলে ছাতু করে দেবে।
যাতে কেউ চিনতে না পারে। এই জায়গাটা একেই পরিত্যক্ত, পারতপক্ষে কেউ আসে না মনে হয়। যদিও বা আসে এই দুজনকে চিনতে পারবে
না।ভাবতে ভাবতে একটা পৈশাচিক হাসি হাসে ভৈরব।
তারপর ইটটা হাতে তুলে নিয়ে ঠিক করে আগে সন্ন্যাসীর চেলাটাকে নয় ওর সাথীটাকে
মারবে। সেই মতো লোকটাকে সোজা করে শোয়ায়। তারপর মায়ের নাম করতে করতে লোকটার কপালে
ইটটা ঠেকায়। ইটটা তুলে সজোরে নামাতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে একটা লোহার শেকল এসে
পেঁচিয়ে যায় ভৈরবের গলায় আর সাথে সাথে পেছন থেকে কে যেন শেকলটায় একটা হ্যাচকা টান
মারে। হাত থেকে ইটটা খসে পড়ে তার। সারাদিনের এই হুজ্জোতিতে শরীরটা একটু দুর্বল
ছিলো ভৈরবের। তার উপর ক্লোরোফর্মের ঘোরটা এখনও কাটে নি। ফলে ঐ হ্যাচকা টানেই প্রায়
ছিটকে পেছনে আছড়ে পড়ে সে।সঙ্গে সঙ্গে একটা পুলিশি বুটের লাথী আছড়ে পড়ে ভৈরবের
পাঁজরে। লাথীটা খেয়ে সে কঁকিয়ে ওঠে।
সঙ্গে সঙ্গে একটা হিসহিসে কন্ঠস্বর বলে ওঠে,“দুর্বল,অচৈতন্যদের উপর আক্রমন
করতে ,নিরীহ, নিরস্ত্র
মানুষের উপর আঘাত হানতে খুব ভালো লাগে তাই না? কেন ঠাকুর? সে জাগ্রত হলে, সম্পুর্ণ সুস্থ সবল থাকলে পারবে না বলে? এ তো শেয়ালের ধর্ম ঠাকুর।
শেয়াল অতর্কিতে আক্রমন করে। নাকি পুরুষের সাথে সম্মুখ সমরে নামার সাহসটাই নেই
তোমার? যত জারিজুরি অচৈতন্য মেয়েদের উপর? বলি অনেক তো হলো। পাপের ঘড়া কানায় কানায়
পুর্ণ হয়ে গেছে আর কত পাপ করবে? তোমার পাপের জন্য যে তোমার সময় শেষ ঠাকুর! মায়ের ডাক এসে গেছে। এবার যে যেতে হবে!তবে ভয়
নেই ঠাকুর। ব্রাহ্মনসন্তান দ্বারাই তোমার মুক্তি হবে। তার সাথে এই পৃথিবী থেকেও
অনেকটা পাপভার কমবে। কি ভাগ্য বলো দেখি তোমার ঠাকুর? এত পাপ করেও পুন্যবানদের মতো
মৃত্যু হবে!এ কি কম সৌভাগ্য নাকি? আমার তো তোমাকে খুব
হিংসে হচ্ছে।অ্যা!? ”
বলে খিল খিল করে হাসতে থাকে সেই আগন্তুক শেকলধারী। ভৈরব এহেন আক্রমন আশা
করেনি সে প্রথমে অবাক হয়ে যায়। তারপর চেলার কথা মনে পড়ায় হাড়হিম হয়ে যায় তার। এই
কি তবে…! কোনো মতে তুতলে জিজ্ঞেস করে ভৈরব,“ক্ক কে? কে? ক্কে ত…তুমি?” একটু আনমনা হয়ে যায় আগন্তুক। তারপর নিজেকে সামলে
বলে,“কেন চিনতে পারছো না? আমি তোমার ফেলে
আসা পাপের ভুক্তভুগী গো! মনে করো আমি কে?”
ভৈরবের গুলিয়ে যায় সবটা। সে মনে করার চেষ্টা করে তারপর এক এক করে কয়েকজনের
নাম বলে। আগন্তুক মাথা নেড়ে হাসতে হাসতে বলে,“সেকি গো ঠাকুর? জীবনে এত পাপ করেছ
যে পাপের ভুক্তভুগীদের মনেই পড়ছে না?” বলে দাঁতে দাঁত চেপে আরেকটা লাথী কষায়
আগন্তুক। এবার ভৈরবের মুখ লক্ষ্য করে। বুটের আঘাতে নাক ফেটে যায় ভৈরবের।গলগল করে
রক্ত বেরোতে থাকে।
আগন্তুক উবু হয়ে বসে একটা সিগারেট ধরায়। তারপর দেশলাইয়ের আলোটা ভৈরবের মুখে
ফেলে বলে,“এহে! ইশ! কিছু মনে করো না ঠাকুর।আসলে মাঝে মাঝে ভুলে যাই যে পুলিশের বুট
পরে আছি। ইশ কতটা কেটে গেছে! নাকটা ফাটলো নাকি? এহে! মায়ের ভোগ এভাবে নষ্ট করা
উচিত না। মাগো ক্ষমা করো মা।” বলে ঈশরের উদ্দেশ্যে একটা প্রনাম ঠুকে দেশলাই কাঠিটা
ফেলে দেয় আগন্তুক। তারপর একটা বিরাশি শিক্কার ঘুষি বসিয়ে দেয় ভৈরবের চোয়ালে।ঘুষিটা
খেয়ে মাথাটা টলমল করে ওঠে ভৈরবের। শক্ত
মাটিতে মাথাটা ঠুকে যাওয়ায় অজ্ঞান হয়ে যায় সে।
জ্ঞান ফেরার সাথে সাথে সারাশরীরে একটা বিষব্যথা ছড়িয়ে পড়ে ভৈরবের।
চোয়ালটা এখনো চিনচিন করছে তার।নাক থেকে রক্ত গড়িয়ে শুকিয়ে গেছে। গলাটা এখন ভীষন
বাধো বাধো ঠেকছে তার। কোথা থেকে যেন একটা পচা গন্ধ ভেসে আসছে।একটু ধাতস্থ হয়ে
সামনে তাকাতেই সবটা মনে পড়ে যায় ভৈরবের কাছে।
প্রচন্ড আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে সে।
******
প্রায় আধঘন্টা হয়ে গেল রণি জঙ্গলে এগিয়ে চলেছে। সামনে অসীতবাবু পথ দেখিয়ে
চলেছেন। ক্রমশ ভেতর ভেতর অধৈর্য হয়ে উঠছে রণি। আর কত দুর? প্রায় আধঘন্টা ধরে সে
এগোচ্ছে তো এগোচ্ছে। পথ তো শেষ হবার নাম নিচ্ছে না। ভুল পথে এগোচ্ছে না তো তারা?
নাকি অসীতবাবু ইচ্ছে করেই ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছেন যাতে সে ওকে হাতেনাতে না ধরতে
পারে। অবশ্য সেটা করেও লাভ নেই কারন গোটা বনের চারপাশের অন্ধকারে মিশে আছে পুলিশ।
বনটাকে প্রায় চক্রব্যুহের মতো ঘিরে রেখেছে তারা। তাদেরকে সে আদেশ দিয়ে
রেখেছে। আততায়ী পালাতে চাইলেও পালাতে পারবে না। যদি ঘেরাটোপ থেকে বেরোয় হাইওয়ে বা
গ্রাম পর্যন্ত পৌছতে পারবে না সে। তার আগেই ফোর্সের গুলিতে ঝাঁঝড়া হয়ে যাবে।
কিন্তু আর কত দুর? অসীতবাবুকে জিজ্ঞেস করে সে ,“আর কত দুর? সেই কতক্ষন ধরে তো
হেটেই চলেছি। মন্দিরের তো চিহ্নও খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা ঠিক পথে এগোচ্ছি তো?”
অসীতবাবু উত্তর দেওয়ার আগে কিছুদুর থেকে একটা ক্ষীণ চিৎকারের শব্দ ভেসে এলো।
চিৎকারটা শুনে দুজনেই স্থির হয়ে দাঁড়ায়। রণি কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা
করে শব্দটা কোথা থেকে আসছে। তারপর অসীতবাবুর দিকে তাকায়। অসীতবাবুর মুখ ফ্যাকাশে
হয়ে গেছে। রণির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়েন তিনি। রণির সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে ওঠে।
শিকারের গন্ধ পেয়েছে সে।পিস্তলটা শক্ত মুঠোয় ধরে অসীতবাবুর সাথে সেই দিকে ছুটতে
থাকে সে। বেশীদুর যেতে হয় না। প্রায় মিনিট পনেরো এগোতেই একটা বিকট পচা গন্ধ হাল্কা
করে নাকে ঝাপটা মারে তার। গন্ধটা নাকে আসতেই সে নিশ্চিত হয় যে তারা ঠিক পথেই আছে।
গন্ধটা আরো বাড়তে থাকে। কিছু দুর গিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকে বেঁধে নেয়
সে। প্রায় পাঁচশো মিটার দুরে বনের মাঝে মশালের আলো দেখতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে
সে। তারপর ধীর পদক্ষেপে এগোতে থাকে।
******
ভৈরবের চিৎকার শুনে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে রাজুর ঠোটে। সে চোখ বুজে বন্দনাটা
শেষ করে,
“হম হম হম
হংসায়নম, হপিতাকালাহাকম মুক্তযোগাট্টহাসম।
ধম ধম ধম
নেত্ররূপম শিরামুকুটাজটাবন্ধবন্ধাগ্রহস্তম!
তম তম তম টঙ্কা
নাদম, ত্রিধাসলতালাতম, কামগর্ভপ হারম।
ভ্রুম ভ্রুম
ভ্রুম ভূতনাথম, প্রণমত শততম, ভৈরবম ক্ষেত্রপালম॥”
বন্দনা শেষ করে খাঁড়াটায় সিঁদুরের টিপ মেখে বেড়িয়ে আসে সে। তারপর ভৈরবের
সামনে এসে উবু হয়ে বসে বলে,“চেচাও। যত পারো চেচাও। কেউ তোমার চিৎকার শুনতে পাবে
না। আর শুনতে পেলেও এতরাতে এই জঙ্গলে কেউ আসবে না তোমায় বাঁচাতে। কাজেই এই চিৎকার
বৃথা ঠাকুর। তোমার অন্তিম সময় উপস্থিত। নিজের সমস্ত পাপের কথা মনে করো ঠাকুর।”
ভৈরব কোনো মতে বলে,“আমায় মেরো
না। আমায় বাঁচাও।আমি তোমায় অনেক টাকা দেবো।আমায় মেরো না।”রাজু
হেসে বলে,“সে কি ঠাকুর? তুমি ঘুষ দিচ্ছো! ”তারপর দাঁতে
দাঁত চেপে বলে,“মনে পড়ে? আজ
থেকে তেইশ বছর আগে এইভাবেই এক মা তার সন্তানের প্রাণ ভিক্ষে করেছিল? মনে পড়ে এক
সৎ নির্লোভী ব্রাহ্মণ নিজ সন্তানকে রক্ষা করতে এই হাড়িকাঠে মাথা দিয়েছিল? মনে
পড়ে সেই ষোড়শী মেয়েটাকে যাকে বলি দিয়ে ভোগ করে ভৈরবের মুর্তিতে ঝুলিয়ে চলে
গিয়েছিলে তোমরা? ব্যোমকেশ মিত্তিরকে যতই মিথ্যে বলো না কেন তোমার চেলা বজুকে চিনতে
আমি ভুল করি নি ঠাকুর। বজুই তো আসলে উমাপতি। তোমার পারিষদের মধ্যে একমাত্র অনুগত
কুকুর ছিল সে। ভাদ্রমাসের কুকুর। বাকি পারিষদেরা কেউকেটা হয়ে তোমায় ছাড়লেও উমাপতি
ছাড়েনি। ওর ঘাড়ের আবটাই ওকে চিনিয়ে দিয়েছিল।”
ঢোক গিলে ভৈরব বলে,“তার মানে তুমি…!”
“হ্যা আমি। আমিই পরপারে পাঠিয়েছি ওকে এবার তোমার পালা।আমায় চিনতে পেরেছ
ঠাকুর? কি বলছিলে যেন? আমায় টাকা, পয়সা দেবে? টাকা পয়সা চাইনা আমার।আমার পরিবার
ফেরত দিতে পারবে? আমার ছেলেবেলা ফেরত দিতে পারবে? আমার হারানো শৈশব, এতগুলো বছর যা
পাগলাগারদে নষ্ট হয়েছে ফেরত দিতে পারবে? তেইশটা বছর তেইশটা বছর ধরে তোমায় খুঁজেছি
ভৈরব ঠাকুর। নিজে হাতে শাস্তি দেবো বলে। আমি
রাজেশ্বর চক্রবর্তী। এ গাঁয়ের পুরোহিত সর্বেশ্বর চক্রবর্তী ওর পরমেশ্বরী
চক্রবর্তীর ছেলে। শ্যামাঙ্গিনী চক্রবর্তীর ভাই। তেইশটা বছর নাম পাল্টে, পাগল সেজে অজ্ঞাতবাসে ছিলাম যাতে তোমায় মারতে পারি। এত দিন এত সুযোগ
পেলেও তোমার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারিনি তবে আজ আর তুমি পার পাবে না। আজ তোমার বধ
হবেই! হবেই! চেয়ে দেখো তোমার
পারিষদদের দেহাংশ দিয়ে কত সুন্দর মহাকালভৈরবের আভূষণ বানিয়েছি। দারুণ লাগছে না?
চিন্তা নেই তোমার মাথাও কিছুক্ষন পর শোভা পাবে ওখানে। প্রস্তুত হও।জয় মহাকালভৈরব!”
বলে খাঁড়াটা তুলে ধরে রাজু। ঠিক সেই মুহুর্তে একটা মৃদুমন্দ্র কন্ঠস্বর
গর্জে ওঠে, “দাঁড়াও রাজু!” রাজু
থেমে যায়। তাকিয়ে দেখে ব্যোমকেশ উঠে বসেছে। ব্যোমকেশ বসে বসে বলে,“আমি জানি রাজু ভৈরব যে পাপ করেছে তার কোনো ক্ষমা হয় না। কিন্তু এইভাবে
তুমি যদি ওকে শাস্তি দাও তাহলে ওর আর তোমার মধ্যে তফাৎ কোথায়? এইভাবে আইন হাতে
তুলে নেওয়ার কোনো মানে নেই। ”
রাজু গর্জে ওঠে ,“আইন? কোথায় ছিলো এই আইন যখন আমি অনাথ হলাম? কোথায় ছিলো এই আইন যখন এই বাঞ্চোতটা একের পর এক মেয়ের
সর্বনাশ করছিল? কোথায় ছিলেন আপনারা যখন আমার নিরীহ বাবা-মাকে এই শুয়োরের বাচ্চাটা
বলি দিয়েছিল? সে দিন যখন আইন কোনো কাজে আসতে পারেনি তাহলে আজ আইনের কোনো অধিকার
নেই আমার আর এর মাঝে আসার। সরে দাঁড়ান ব্যোমকেশবাবু। আজ স্বয়ং মহাকালের সাধ্য নেই
যে একে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারে। একে আজ মরতেই হবে।”
বলে রাজু খাঁড়াটা আবার তুলে ধরে। এমন সময় বনের মধ্যে থেকে রণি বেরিয়ে
এসে চেঁচিয়ে ওঠে, “হল্ট! রাজীব খাঁড়াটা ফেলে দিয়ে সারেন্ডার করো।” রাজু থমকে দাঁড়ায়। রণি ওর পিস্তলটা রাজুর দিকে তাক করে
বলে,“ বোকামো করো না রাজীব। এই মুহুর্তে গোটা বন পুলিশ ঘিরে রয়েছে।প্রত্যেকের
হাতের অস্ত্র তোমার দিকে তাক করা। একটু ভুল করলেই মুহুর্তের মধ্যে তোমাকে ঝাঁঝড়া করে দেওয়া
হবে। তোমার ভালোর জন্য বলছি খাঁড়াটা ফেলে
দাও।”পেছন পেছন বেরিয়ে
আসেন অসীতবাবু। কাঁদো কাঁদো
গলায় বলেন,“ স্যার যা বলছেন সেটা কর রাজু। তোর ভালো হবে। ছেড়ে দে ওকে।”
ব্যোমকেশ এগিয়ে এসে বলে, “ প্রতিহিংসায় কারো কোনোদিন
উপকার হয়নি রাজু।প্রতিশোধে
কোনোদিন কারো ভাল হয় না। প্রতিহিংসায়
প্রথমে মনে হয় যা করছি ভাল করছি,ন্যায় করছি, কিন্তু
শেষপর্যন্ত এই মনোভাব আর থেকে না। থাকে একরাশ নিজের পাপের গ্লানি, আত্মস্লাঘা আর
অনুশোচনা।মানছি ভৈরব
আর ওর সাঙ্গপাঙ্গরা তোমার পরিবারে সাথে যা করেছে অন্যায় করেছে। এই অপরাধের শাস্তি ওদের পাওয়া উচিত
কিন্তু একবার ভেবে দেখো সেই শাস্তি তুমি নিজে হাতে দিয়ে কোনোভুল করছো না তো? ”
রাজু একটু থমকে যায়। তারপর খাঁড়াটা বাগিয়ে বলে, “ কোনোভুল করছি
না আমি! আমি আমার বাবার, আমার মায়ের
মৃত্যুর প্রতিশোধ নিচ্ছি। আমার দিদির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিচ্ছি। এতে আমার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। আমি এই পৃথিবী থেকে কয়েকটা নরকের
কীটকে সরিয়েছি মাত্র। এতে আমার
অনুশোচনা কেন হবে বলুন তো! গীতায় তো শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন ,
‘পরিত্রাণায় সাধুনাং, বিনাশায় চ দুস্কৃতাম/
ধর্ম সংস্থাপণার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥’না আমি নিজেকে
ভগবানের অবতার বলে দাবি করছি না। মাঝে মাঝে এমন সময় আসে যখন মানুষকে ভগবানের মুখাপেক্ষী না
হয়ে নিজেকেই অস্ত্র ধারন করতে হয়। কারন ভগবান সবসময় অবতার নিতে অক্ষম। কাজেই আমাকেই তার কাজটা করে দিতে
হল। কানাই,চাঁদু,
নীলু,কপিল, উমাপতিদের
মত রাক্ষসদের মেরে আমি কোনো পাপ করিনি। এই ধরাধামের ভার কমিয়েছি মাত্র। আর মাত্র একজন অবশিষ্ট আছে। একে মারলেই আমার এত দিনের প্রতিশোধ, প্রতিজ্ঞা,
পুজো সব সম্পন্ন হবে। আমার বাবার আত্মা শান্তি পাবে।আজ আমায়
আটকাবেন না। আজ আমার
পরিবারের আক্ষরিক অর্থে শ্রাদ্ধ। চিন্তা করবেন না স্যার আমি পালাব না। একে মেরেই আমি সারেন্ডার করবো।”
ব্যোমকেশ আরেকটু এগিয়ে এসে বললো, “ ভুল!
ভুল ভাবছ তুমি রাজু। এতে তোমার পিতার আত্মার মুক্তি হবে না বরং তোমার
পাপে তুমিই নিমজ্জিত হবে।তুমিই বলো তোমার বাবা বেঁচে থাকলে কি তোমার এই কাজ সমর্থন
করতেন? যতটুকু জেনেছি তাঁর সম্বন্ধে তিনি কোনোদিনও এই অন্যায় কাজকে সায় দিতেন না। বরং তোমার এই কাজের জন্য তিনি কষ্ট
পেতেন। তিরস্কার করতেন। কিন্তু এইকাজ কে তিনি কোনদিনও মেনে
নিতেন না।তাঁর স্বপ্ন
ছিল তুমি বড়ো হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে, সেই কারনে তিনি তোমায় আগলে রাখতেন। কোনো রকম ঝামেলায় জড়াতে দিতেন না। ফুটবলের ময়দানে যেরকম আক্রমন চলে
সেটার কথা ভেবে তোমায় খেলতে দিতে চাইতেন না। মানুষটা তোমায় বড় ভালবাসতেন রাজু।।তার ভালবাসার
এরকম অমর্যাদা করবে তুমি?”
এবার রাজু একটু বিচলিত হলো। কিছুক্ষন পর হাতের খাঁড়াটা নামিয়ে
আনলো নিচে। ব্যোমকেশ
এবার সময় নষ্ট না করে এগিয়ে এসে খাঁড়াটা নিজের হাতে নিয়ে নেয়।তারপর আরেকটা
হাত রাখে রাজুর কাঁধে। রাজু মাথা
নত করে কাঁদতে থাকে। চারজন
পুলিশ এগিয়ে এসে ভৈরবের বাঁধন খুলে নিজের কব্জায় নেয়। অসীতবাবু এগিয়ে আসেন রাজুর দিকে। রণি আমার দিকে এগিয়ে এসে বলে, “ একি এ টেঁসে
গেল নাকি হে?” আমি চোখ মেলে বললাম, “ সেই গুড়ে বালি রে হতভাগা। আমি বেঁচে আছি।শুধু মটকা মেরে পড়ে পড়ে তোদের তামাশা দেখছিলাম।” বলে উঠে
দাঁড়ালাম আমি।
রণি মুখ ভেটকে বললো,“শালা আমি ভাবলাম এত কিছুতেও নড়ছিস
না। ভৈরবের ইটটা সত্যি সত্যি মাথায় পড়লো নাকি। কিন্তু আমার সে সৌভাগ্য কোথায়? তা
লুকিয়ে লুকিয়ে স্পাইগিরিতো ভালোই শিখেছো চাঁদ! টানা বারোদিন ওর উপর নজর…!”
কথাটা বলার আগেই দড়াম করে একটা শব্দ হতেই আমরা ঘুরে তাকালাম। ব্যোমকেশের দিকে
তাকিয়ে দেখি সে চোয়াল শক্ত করে সামনে তাকিয়ে আছে। রাজীব মানে আমাদের রাজু মাটিতে
বসে।
ভৈরবকে যে চারজন ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো তাদেরই একজনের
অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে রিভলভার কেড়ে নিয়ে ফায়ার করে সে। লক্ষ্য অবশ্যই রাজু ছিল
কিন্তু শেষ মুহুর্তে অসীতবাবু সামনে এসে যাওয়ায় গুলিটা সোজা তাঁর মাথায় লাগে।
অসীতবাবুর মাথাটা প্রায় উড়ে গেছে। তাঁর মাথার ঘিলু ছিটকে পুরোটাই লেগেছে রাজুর
গায়ে। রাজু নতজানু হয়ে অসীতবাবুকে স্পর্শ করে বসে আছে। চোখ বোঁজা।
রণি এগিয়ে আসতেই ভৈরব রিভলবার তাক করে বললো,“আর এক পা
এগোলে সেটাই তোমার জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হবে অফিসার! পিছিয়ে যাও আর তোমার সাথীদের
সরে যেতে বলো।”রণি পিস্তলটা বাগিয়ে বললো,“পাগলামো করো না ভৈরব। তুমি এখান থেকে
কিছুতেই পালাতে পারবে না।রিভলবারটা ফেলে সারেন্ডার করো। ” ভৈরব খলখল করে বললো,“পালাবো তো নিশ্চয়ই অফিসার। তুমি আমায় পালাতে সাহায্য করবে না হলে আমার
ভক্তরা কাল সকালে তোমায় আর তোমার ডিপার্টমেন্টকে ছিঁড়ে খাবে। এক জায়গায় আমার
ভক্তরা আমার প্রতি বিরূপ হলে কি হবে? অন্য জায়গার ভক্তরা তো আছে।আর যখন আমি
জনসমক্ষে এটা বলবো যে আশ্রমের পাপকাজ করেছিল বজু। ওকে আমিই বধ করে মেয়েদের সম্মান
বাঁচিয়েছি। তখন আবার আমি রাতারাতি দেবত্বে উন্নীত হবো। তখন নিজের উর্দি, নিজের প্রাণ বাঁচাতে পারবে তো?”
ব্যোমকেশ ঘৃণাভরা মুখে বললো,“ছিঃ! ছিঃ! তুমি নরপশু এটা জানতাম। কিন্তু এতটা নীচ
তা জানা ছিল না। যে বজু সারাজীবণ তোমার অনুগামী হয়ে কাটিয়ে দিল। যে বজু তোমার সব
পাপ লুকিয়ে দিতো। সেই বজু যতই নরপশু হোক না কেন তোমার শিষ্য ছিল।তোমার সন্তানসম
ছিলো।ও যা করেছিলো তোমার আদেশে করেছিল। তাকে ব্যবহার করে নিজেকে দেবতা প্রমানিত
করতে তোমার ঘৃণা হবে না? যেখানে তোমরা দুজনেই সমান পাপী…।”
ব্যোমকেশকে থামিয়ে ভৈরব বলে উঠলো ,“না লাগবে না। কেন
জানো? যুদ্ধ,ভালোবাসা আর ব্যবসায় অন্যায় বলে কিছু নেই। আর আমি ব্যবসাটাই করছি।
ধর্মের ব্যবসা! এই মুর্খপৃথিবীতে যতদিন ধর্মান্ধতা থাকবে ততদিন এ ব্যবসা চলবে।
চিকিৎসায় ডাক্তারের কাছে না গিয়ে যতদিন মানুষগুলো আমাদের কাছে হত্যে দেবে ততদিন এই
ব্যবসা চলবে।যতদিন পাথরের নির্জীব ঈশ্বরের নামে এই মুর্খরা জয়গান দেবে ততদিন এই
ব্যবসা চলবে। আমরা সেই
সত্য-ত্রেতা-দ্বাপরেও ছিলাম, কলিতেও আছি ভবিষ্যতেও থাকবো। ঈশ্বরের মতো আমাদের
বিনাশ নেই। আমরা রক্তবীজের ঝাড়। একজন যাবে তো আরেকজন আসবে। এই ব্যবসা কোনোদিন
থামবে না। কেন জানো ? কারন মুর্খগুলো আজও কুসংস্কারে
বিশ্বাস করে।আর এই বিশ্বাস কোনোদিন যাবে না। অনেক জ্ঞানের কথা বলেছ।বাঁচতে চাইলে
এক পাও এগোবে না। হাতের অস্ত্রটা ফেলো। অফিসার তুমিও বন্দুকটা ফেলো নাহলে সবকটাকে
গুলি করে মারবো!”
এমন সময় রাজু চোখ বুঁজে বিড়বিড় করে বললো,“এরপরও আপনি
বলবেন যে এই নরাধমকে বাঁচানো উচিত? এরপরও?”
ব্যোমকেশ একমুহূর্ত ভৈরবের দিকে তাকালো তারপর চোখ বুঁজে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বললো,
“ করচরণ
কৃতং বাক্যায়জং কর্মজং বা।
শ্রবণনয়নজং
বা মানসং বাপরাধম।
বিহিতমবিহিতং
বা সর্বমেততক্ষমস্ব।
জয় জয়
করুণাব্ধে শ্রীমহাদেব শম্ভো॥”
বলে খাঁড়াটা ছুঁড়ে ফেলল মাটিতে। তারপর মুহুর্তের মধ্যে
যেটা ঘটল সেটা বিশ্বাস করতেও আমাদের মিনিট পাঁচেক লেগেছিল। একপলক ব্যোমকেশের দিকে তাকিয়ে
পরক্ষণে খাঁড়াটা মাটিতে পড়ার আগেই অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় সেটা লুফে নিয়ে চিতাবাঘের
মতো ভৈরবের দিকে ঝাপিয়ে পড়লো রাজু।আচমকা ওভাবে এগোতে দেখে ভৈরব গুলি চালিয়ে
দিল।রাজু তাও না থেমে একটা ডিগবাজি খেয়ে
হাওয়ায় প্রায় উড়ে ভৈরবের গলা লক্ষ্য করে সোজা খাঁড়াটা চালিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে
দড়াম করে একটা শব্দ গোটা বনের নিস্তব্ধতা খানখান করে দিল।
তাকিয়ে দেখলাম রণির পিস্তল থেকে ধোঁয়া উড়ছে। পরক্ষনেই
ভৈরবের কবন্ধ দেহটা ক্রমশ টলোমলো পায়ে এগিয়ে হাড়িকাঠের সামনে পড়ে গেল। আর ফিনকি
দিয়ে একগাদা রক্ত গিয়ে পড়লো পাশেই রাখা সরাতে। ব্যোমকেশ ছুটে গেল রাজুর দিকে।
রাজু তখনও মাটিতে নতজানু হয়ে বসে আছে । ব্যোমকেশ রাজুর
পাশে বসে ওর গায়ে হাত রাখতেই রাজুর নিস্পন্দ দেহটা ঢলে পড়লো ব্যোমকেশের কোলে। ব্যোমকেশ চোখ বুঁজে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধরা গলায় বললো,“মা নিজেই সব পাপের বিচার করে এই মা হারা ছেলেটাকে
অবশেষে মুক্তি দিয়ে নিজের কোলে তুলে নিলেন। ভৈরবের গুলি ফসকালেও রণির গুলি আর
ফসকালো না।”
ব্যোমকেশের পাশে আমিও নতজানু হয়ে বসে পড়লাম এই অভাগা
ছেলেটাকে দেখতে। রণির গুলিটা রাজুর বাঁদিকের পাঁজরে ঢুকে সোজা হৃদপিন্ডে প্রবেশ করেছে। বুঝলাম মাটিতে বসে পড়ার সাথে সাথে
বেচারার দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে গেছে। রণি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“আমি ভৈরবকে গুলি করেছিলাম। আচমকা ও সামনে এসে গেলো। আমি চাইনি বিশ্বাস
করো। আমি ওকে মারতে চাইনি।” বলে বসে পড়লো সেও। ততক্ষনে বনের চারপাশে আলোরণ সৃষ্টি
হয়েছে। ভোর হয়েছে। পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। দেখলাম চারদিক থেকে অনেকগুলো টর্চের আলো
আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
******
৫ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯, বৃহস্পতিবার, দুপুর দুটো,কলকাতা
ঘাট থেকে গঙ্গায় নেমে এক কোমর জলে দাঁড়িয়ে ঘটটার উপরের
আচ্ছাদনটা খুলে ফেলল ব্যোমকেশ।তারপর গঙ্গায় অস্থিটা বিসর্জন করে ঘটটা ভাসিয়ে গঙ্গায়
ডুব দিলো সে। স্নান সেরে উঠে দাঁড়ালো পাড়ে। আমি গামছাটা এগিয়ে দিলাম। গামছাটা
নিয়ে মাথা, শরীর মুছে ভিজে পোশাক ছেড়ে সাথে আনা ফতুয়া আর জিন্স
পড়ে নিয়ে বেঞ্চে বসলো ব্যোমকেশ। ফতুয়ার পকেট থেকেএকটা গাঁজার সিগারেট জ্বালিয়ে
গঙ্গার দিকে তাকিয়ে রইলো।
এখন আমরা নিমতলা শ্মশানঘাটে। সাতমাস পর আবার যে এখানে
আসতে হবে এটা কোনোদিনও ভাবিনি। সাতমাস আগে যখন এসেছিলাম তখন পুরোনো গ্লানি ভুলে
নতুন করে সব শুরু করার উৎসাহ তৈরী হয়েছিল। সেবার তন্নিষ্ঠর নতুন জীবনের শুরুর একটা
আনন্দ ছিল।আজ সব যেন শেষ মনে হচ্ছে।সেবার যেন মহালয়ার আবহে আগমনির সুর ছিল। আজ মনে
হচ্ছে যেন ভাসান হয়ে গেছে সেই উৎসাহের। ব্যোমকেশকে এইভাবে থম মেরে যেতে কোনোদিন দেখিনি।
রাজুর দেহ পোষ্টমর্টেমের হবার পর থেকে দাহ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত কারো সাথে
একটাও কথা বলেনি সে। এই ক’দিন নিজেকে সবার সাথে বিচ্ছিন্ন
রেখেছে। বাড়িতে মাটির উনুন বানিয়ে সেটায় নিজে হবিষ্যি রান্না করে খেয়েছে।
ব্যোমকেশ যখন রাজু আর অসীতবাবুর দেহ সৎকার করতে চাইলো
রণি এককথায় রাজি হয়ে গেল। আশ্চর্যের বিষয় রণিটাও পাল্টে গেছে। সেই হাসিখুশি প্রাণচঞ্চল
ভাবটাই আর নেই। কেমন যেন একটা উদাসীন চোখে তাকিয়ে থাকে।সত্যি বলতে একই অবস্থা
আমাদের সবার। কিন্তু রণির অবস্থা দুর্বিষহ। রাজুকে হত্যার দায়টা কিছুতেই ঘাড় থেকে
নামাতে পারছে না। ও নিজেকেই দায়ী করছে।
রাজুকে দাহ করার সময় রণি পাশে থেকে সব সাহায্য করলেও মুখাগ্নির সময় থাকেনি।
যেন রাজুর মৃতদেহ থেকে পালাতে চাইছে।
ব্যোমকেশ সিগারেট শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। তারপর আমরা
একসাথে বেড়িয়ে এলাম শ্মশান থেকে। বাইরেই দাঁড়িয়েছিলো উবের ক্যাব। সেটায় চেপে
আমরা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। গাড়িতে যেতে যেতে ব্যোমকেশ চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে
রইলো।এই ক’দিন ব্যস্ততায় কেটেছে এবার একটু বিশ্রাম নেবে ও। আমি জানি মৃত্যু ওর
কাছে সহজ জিনিস। কিন্তু এ ক’দিনে যা ঘটেছে তাতে ওর সব হিসেব,
সব ভাবনাচিন্তা ওলোটপালট হয়ে গেছে। নিজেকে গোছাতে ওর একটু সময়
দরকার। গুছিয়ে নিলেই মুখ খুলবে তার আগে নয়।
******
৮ই
সেপ্টেম্বর, ২০১৯, রবিবার, সন্ধে সাতটা, কলকাতা
রাজু মারা যাবার ঠিক দশ দিন পর আজ প্রথমবার বাইরে বেরোলো
ব্যোমকেশ৷ এ ক’দিন বাড়িতে বসে দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার৷ তাই ঠিক করেছিলাম একটু বাইরে বেরোবো৷ শর্মিকে
ফোন করবো ভেবে ফোনটা হাতে নিতেই শর্মির মেসেজ ঢুকলো ফোনে। হোয়াটসঅ্যাপ খুলে দেখলাম
ওরও একই অবস্থা। কোথাও বেরোতে চায়। কোথায় যাবো ভাবতে ভাবতে শর্মিই সাজেস্ট করলো
বালুর বাড়ি যাওয়া যাক। অনেকদিন হলো যাওয়া হয় না। আমি টুক করে রিপ্লাই
পাঠালাম,“ওকে।” সত্যি কথা বলতে বালুর বাড়ির আড্ডা আমিও
মিস করেছি এই ক’দিন।
তৈরী হয়ে একবার মনে হলো ব্যোমকেশকে ডাকি। পরক্ষনে মনে হলো কি লাভ? ওর মন মেজাজ
ভালো নেই।ওকে না ঘাটানোই ভালো।রেডি হয়ে ঘর থেকে বেরোতেই দেখলাম ব্যোমকেশ বারান্দায়
বসে।আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,“কোথাও বেরোচ্ছ নাকি?”বারান্দার কি হোল্ডার থেকে
বাইকের চাবিটা নিয়ে বললাম,“বালুদের বাড়ি যাচ্ছি।অনেকদিন যাওয়া হয় না। ভাবলাম আজ
রবিবার ঘুরে আসি।” ভেবেছিলাম ব্যোমকেশ উদাসীন ভাবে মাথা নাড়বে। কিন্তু আমায় অবাক করে ব্যোমকেশ বললো,“দুমিনিট
দাঁড়াও আমিও যাবোতোমার সাথে।” বলে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। বুঝলাম সব ধোঁয়াশা কেটে গেছে তার। ফোন করে
শর্মিকে ক্যাব ধরে বালুর বাড়ি আসতে বললাম। দুমিনিট নয় ঠিক দেড়মিনিটের মাথায় ও
বেরিয়ে এলো। ব্যোমকেশ পেছনে বসতেই আমি বাইকে স্টার্ট দিলাম।
******
“ব্যাপারটা হলো আমরা সবাই গোড়া থেকেই
ভুল পথে হাটছিলাম।” বলে গাঁজার সিগারেটে শেষটান দিয়ে সেটা অ্যাশট্রে তে গুঁজে সোফায়
হেলান দিয়ে বললো ব্যোমকেশ। আমরা এই একঘন্টা হলো বালুর বাড়িতে এসেছি। আর এসে যে
চমকটা পেলাম সেটার জন্য মোটেও রেডি ছিলাম না। আমরা সবাই একে একে বালুর বাড়িতে
এলেও শাম্ব একা এলো না। ওর সাথে দীপাকে দেখে আমি একটু অবাক হওয়ায় শর্মি বাকিটা
বুঝিয়ে দিলো। হতভাগাটা দীপাকে এতদিনে প্রপোজ করে দিয়েছে! আর
আমাদের দীপাও হ্যা বলেছে। এমনকি দুমাস পর ওদের বিয়ে। এই পুরো মাখো মাখো প্রেমের
সিনগুলো যখন হচ্ছিল আমি তখন বর্ধমানে ভৈরবকে নজরে রাখছি। কাজেই এই সিনটা মিস করায়
একটু মনক্ষুন্ন হলেও শাম্বটাকে নিয়ে খিল্লি না করে পারলাম না,“ কিরে আমিই নাকি ছুপারুস্তম প্রেমিক? তা এসব কি? তুমি তো গুরুদেব
লেভেলের বাওয়া? সোজা ডেস্টিনেশন ছাদনাতলা অ্যা?” শাম্ব
একটু লজ্জা পেয়ে বললো,“আরে বিয়েটা ওর প্ল্যান। আমি তো
প্রপোজ করে খালাস। বাকিটা উনি করছেন।”
দীপা সঙ্গে সঙ্গে শাম্বকে একটা রামচিমটি কেটে বললো,“বটে?
বটে? বিয়েটা নিজের সাথে করছি কিনা? সত্যি রে সামু(ব্যাকগ্রাউন্ডে আমি:-“উফ!” শর্মি:-“হাউ
রোমান্টিক!”)এত বছর গেল সেই ক্যালাসই রয়ে গেলি। তোকে
অবশ্য ভরসা নেই বিয়েতে লুঙ্গি পড়েও চলে
আসবি যদি তোর মা কাকিমা বা আমি সহায় না হই।” শাম্ব কাচুমাচু মুখে বললো,“আহা আবার ঐ
কথা কেন?” আমি বালুকে বললাম,“কিরে তুই তো বল?” বালু আড়চোখে প্রাচীর দিকে তাকিয়ে বললো,“জেনে
বুঝে কেউ হাড়িকাঠে গলা দিলে কি বলা যায়? তবে শাম্বটা বেচারা নির্যাতিত পুরুষ হয়ে
যাবে মনে হয়। বিয়ের আগেই রামচিমটি, রামধমক তো বিয়ের পরে রামগাট্টা, অর্ধচ…।” প্রাচীর দিকে
তাকিয়ে চুপ করে গেল বালু।
প্রাচী মুচকি হেসে বললো,“বলো। থেমে গেলে কেন? বলো! সত্যি তুমিও কম মিচকে নও। কোথায় ওরা নতুন জীবন শুরু করবে বলে একটু টিপস
দেবে তা না ভয় দেখাচ্ছো? পাজি লোক একটা।” বালু বললো,“বলেছিলাম!আমি বলেছিলাম! দেখ তোরা আমার বউ স্বামীকে পাজি
বলছে। এই তো জীবন আমার। কোর্টে জজের বকুনি ,বাড়িতে বউয়ের
ধ্যাতানি, আর তোদের খিল্লি। সালা কেন যে মরতে বিয়ে করেছিলাম?”
প্রাচী মুচকি হেসে বললো,“বন্ধ।” বালু ভ্রু কুঁচকে বললো,“অ্যাঁ?
ক ক্কি বন্ধ?” প্রাচী হেসে বললো,“আজ তোমার খাওয়া বন্ধ। আমি তো শুধু
মুখে মুখে তর্ক করি। তাহলে মুখরা বউয়ের রান্না খেয়ে কাজ নেই।” বালু এবার ভয়ার্ত
গলায় বলে,“আহা চটছো কেন? আমি তো এমনিই বলছিলাম। ও পুচুসোনা রাগ করো না।” প্রাচী
মাথা নেড়ে বললো,“যতই বলো মাখন গলছে না। আজকের বিরিয়ানী থেকে তোমার অংশ বাদ। ওটা
রণিকে দেবো।” রণি ফিস্ট পাম্প করে বললো,“আরিব্বাস! আজ সকালে কার মুখ দেখে
উঠেছিলাম?” এইভাবে সকলে মেতে উঠলাম আসতে আসতে। ব্যোমকেশও সহজ হয়ে উঠলো।
একথা সেকথার পর রণি বললো,“রাজীবকে মরনোত্তর সম্মান
দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। আজই ডিসি ডিডি আমাকে জানালেন।” একথার পর আমাদের সকলের মুখে
সত্যিকারের হাসি ফুটলো। আসলে সেদিনের মন্দিরের আসল ঘটনাটা মাত্র আমরা কজন জানি। আর
আমরা ঠিক করেছি এই কথা কেউ জানবে না। যদিও ব্যোমকেশ বলেছে চাইলে রাজুর নামটা
পাল্টে লিখতে পারি। তাই করবো ভেবেছি। বাইরের ফোর্সকে জানানো হয়েছিল রণির
ইন্সট্রাকশনেই রাজু কদিন আগে থেকেই আন্ডারকভার থেকে কাজ করছিলো।
রাজুর গার্জেন হিসেবে অসীতবাবুও পুলিশকে সাহায্য করে পথ
দেখাচ্ছিলেন। ব্যোমকেশরা ভৈরবকে নিয়ে রণিদের সাহায্যের জন্য ওখানে রাজুর কাছে
আনছিলো। মন্দিরে ভৈরব সুযোগ বুঝে হামলা করে ব্যোমকেশদের উপর। এবং খুন করে পালাবার পরিকল্পনা করে।
এমন সময় রাজু ও রণিরা এসে পড়ায় সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। কিন্তু অসাবধানতাবশত
রাজুর ফায়ারআর্মস কেড়ে সে রণিদের উপর গুলি চালায়। রণিরাও পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য
হয়। এই গোলাগুলিতে ভৈরবের গুলিতে অসীতবাবু নিহত হন। এবং ভৈরবকে আটকাতে গিয়ে রাজুও মারাত্মকভাবে
জখম হয়।
জখম হওয়া সত্ত্বেও রাজু হাল ছাড়েনি। সে চেষ্টা চালিয়ে
যায় ভৈরবকে কব্জা করতে। রাজুর সাথে হাতাহাতির সময় অসাবধানতাবশত ভৈরব পিছলে গিয়ে
খাঁড়ার উপর মুখ থুবড়ে পড়ে। এবং যার ফলে ভৈরবের মাথা কাটা পড়ে। রণি ঐ চারজন
কনস্টেবলকে রীতিমতো কনভিন্সড করেছিল মুখ বন্ধ রাখার জন্য। এছাড়া নিজের
ইনফ্লুয়েন্স খাটিয়ে কেসটাকে নিজের মতো করে দাঁড় করিয়ে পেশ করেছে কোর্টে। খুন হওয়া
ব্যক্তিদের সাথে ভৈরবের যোগাযোগ ছিলো এরা ব্ল্যাকমেল করতে পারে এই আশঙ্কায় প্রমাণ লোপাটের
জন্য বজুকে দিয়ে সে খুনটা করাতো প্রমাণ করতে বেগ পেতে হয় নি।
ব্যোমকেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“যাক! ছেলেটা অবশেষে
স্বীকৃতি পেল।রণি তোমায় অনেক ধন্যবাদ।ছেলেটা যা খেটেছিল সেটাকে জলে যেতে দাও নি।
অবশ্য এতে ওর ব্যক্তিগত স্বার্থও ছিলো।” রণি মাথা নাড়লো। এরপর ব্যোমকেশ বললো,“ব্যাপারটা
হলো আমরা সবাই গোড়া থেকেই ভুলপথে হাটছিলাম। আমরা ভাবছিলাম এটা বুঝি কোনো উন্মাদ তান্ত্রিকের
কাজ। এমনকি ভৈরবও
আমাদের মিসগাইড করতে মিত্থ্যে বলেছিল। কিন্তু… ।” শাম্ব এবার বললো,“কিন্তু
ওর স্বার্থটা কি ছিলও? আর ভৈরবেরই বা কিসের ভয় ছিলো?”
ব্যোমকেশ হেসে বললো,“এর পেছনেও ভৈরবের একটা ঘৃন্য পাপ
লুকিয়ে। এই গল্পটা অবশ্য দীপা বৌদিও জানেন।” বলে হাসলো সে। দীপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে
মাথা নাড়ল। ব্যোমকেশ আরেকটা গাঁজার সিগারেট ধরিয়ে বললো,“ এই খুনের সুত্রপাত আজ
থেকে তেইশ বছর আগে।মাল্লারপুরের একটা মন্দিরকে ঘিরে। একসময় বৌদ্ধধর্মের বৃদ্ধি
শুরু হয়েছিল গোটা বাংলায়।এ মন্দিরটা সে
সময়ের তৈরী। তবে এই মন্দিরের একটা বিশেষত্ব আছে। যারা এই মন্দির তৈরী করছিল তারা
এই মন্দিরে হিন্দুধর্মের প্রভাব বেশী রাখে। যার ফলে এই মন্দিরের অধিষ্ঠিত
বুদ্ধকপালকে অনেকটা মহাকালভৈরবের মতো দেখতে। এমনকি মন্দিরের পেছনে রঙ্কিনীদেবীর
ভাষ্কর্য সেটাই প্রমান করে। আর এনার জন্যই এত কান্ড। ”
“এই রঙ্কিনীদেবী একজন আঞ্চলিকদেবী।
এনাকে নিয়ে বিশেষ তথ্য জানা যায় না। তবে কয়েকটা লোককথা অনুযায়ী নানা স্থানে বসবাস
করার পর অবশেষে তারাপীঠের মা তারার মধ্যে লীন হয়ে তাঁর অন্যতম পার্ষদের পরিনত হন
তিনি।এই মন্দির যেহেতু বজ্রযানধর্মী। তাই এখানে উপাসনাও হতো আবার তন্ত্রসাধনাও
হতো। এবার আসি মুল গল্পে। বৌদ্ধধর্ম যেমন আচমকা বৃদ্ধি পেয়েছিল তেমনই ধীরে ধীরে
প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায় আর এই মন্দিরটাও ক্রমশ বনে ঢেকে যায়।”
“কিন্তু তন্ত্রসাধকরা এই মন্দিরের
অবস্থান ভোলেন নি। তারা শ্রুতিতে গুরুশিষ্য পরম্পরায় এটার অবস্থান বলে যেতেন। তবে
এই তন্ত্রসাধকদের মধ্যে যেমন উচ্চমার্গের সাধক আছেন। তেমনই আছে ভৈরবের মতো নিম্নশ্রেণীর পশ্বাচারী সিদ্ধাই। আর
দুর্ভাগ্যবশত এই মন্দিরের অবস্থান এরাও জানতে পারে। এরকমভাবে একদিন ভৈরব ওর গুরুর
কাছে জানতে পারে এই মন্দিরের কথা। সে ঠিক করে সেখানে গিয়ে তন্ত্রসাধনা করবে।
লেজুড় হিসেবে জোটে কানাইয়ের মতো কয়েকজন ভ্যাগাবন্ড শিষ্য। দুর্ভাগ্যবশত অসীতবাবুও
এদের সাথে ছিলেন। অবশ্য তাকে দোষ দেওয়া যায় না তিনি কি করে বুঝবেন কে কোন ধরনের
তান্ত্রিক ।”
“অসীতবাবুর সাথে এসে ভৈরব খোঁজ লাগিয়ে
জানতে পারে মন্দিরটার মালিকানা রাজুর বাবার নামে। ঐ অংশটা তিনি কিনেছেন অসীতবাবুর
বাবার থেকে। ধীরে ধীরে সে মিশতে শুরু করে রাজুর বাবার সাথে। অবশ্য মেশার আরেক কারন
ছিলো তাঁর মেয়ে শ্যামা। শ্যামাও আমাদের পাঞ্চালীর মতো দেবকন্যা। সিংহরাশীস্থ
বৃষলগ্না। ফলহারিনী কালীপুজোর দিন জন্ম তার। ভৈরবধীরে ধীরে সখ্যতা গড়ে তোলে রাজুর
পরিবারের সাথে। তারপর সুযোগ বুঝে মন্দিরের বিগ্রহ দর্শন করতে চায়। সর্বেশ্বরবাবু
মানে রাজুর বাবা রাজি না হওয়ায় সে নানারকম প্রলোভন,ভয় দেখায় এমনকি তাঁর মেয়েকেও
তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। সে সময় অসীতবাবুর ততপরতায় গ্রামের লোক এসে যাওয়ায়
রক্ষা পায় রাজুর দিদি। গ্রামের লোকের তাড়ায় ভৈরব পালাতে বাধ্য হয়। সর্বেশ্বরবাবু
আরো সাবধান হয়ে যান মন্দিরের সম্পর্কে।”
“এই ঘটনার মাসদুয়েক পর গ্রামের মাঠে
ফুটবলখেলা হওয়ায় গোটা গ্রামের লোকেরা মাঠে খেলা দেখতে ব্যস্ত থাকায় তাদের
অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভৈরব আবার গ্রামে প্রবেশ করে ওর দলবল নিয়ে আক্রমণ করে
সর্বেশ্বরবাবুর পরিবারের উপর। সৌভাগ্যবশত রাজু খেলতে যাওয়ায় বেঁচে যায়। সর্বেশ্বরবাবুকে
মেয়ের সর্বনাশের ভয় দেখিয়ে মন্দিরের দ্বার খুলতে বলা হয়। অনেকক্ষন নিজ সিদ্ধান্তে
অটল থাকলেও অবশেষে সর্বেশ্বরবাবু হার মানতে বাধ্য হন। মেয়েকে আর স্ত্রীকে ছেড়ে
দেওয়া হবে এই প্রতিশ্রুতিতে খুলে দেন মন্দিরের দরজা। কিন্তু ভৈরব তার প্রতিশ্রুতি রাখে নি।
সর্বেশ্বর বাবু ও তার স্ত্রীকে সে বলি
দিয়ে হত্যা করায়। এবং তার মেয়েকে প্রথমে পঞ্চমকারে পুজো করে তারপর কানাইদের হাতে
ছেড়ে দেয়। ”
“কানাইদের হাতে ছিন্নভিন্ন হবার পর
শ্যামাকেও বলি দেয় সে।তবে শুধু বলি দিয়েই ক্ষান্ত হয়না। শ্যামার মৃতদেহটাকে
বুদ্ধকপালের কোলে বসিয়ে দেয়। তারপর সর্বেশ্বরবাবু আর তাঁর স্ত্রীর দেহ পুঁতে দেয়
তাঁদের বাড়ির কলপাড়ের সামনে। এতটাই বর্বর আর নৃশংস এরা। পোঁতার সময় মাটিতে পড়া রক্ত ধোয়ার জন্য জল
ঢালতে ঢালতে রাজুর গলা শুনে আর তার পেছন পেছন অসীতকে আসতে দেখে পালায় ওরা। তারপরের
ঘটনা তো তোমাদের জানা।”
“পরিবারের এরকম বীভৎস মৃত্যু গভীরভাবে
দাগ কেটে যায় রাজুর মনে। সে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ে। টানা দশটাবছর তাকে পাগলাগারদে
কাটাতে হয়। দশটা বছর পর ডাক্তারদের প্রচেষ্টাতেই হোক আর অসীতবাবুর প্রার্থনার ফলেই
হোক রাজু সুস্থ হয়ে ওঠে। অসীতবাবু অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ওকে গ্রাজুয়েট করান। তারপর
স্পোর্টস কোটায় চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু ও সম্পুর্ণ সুস্থ হয় নি। মাঝে মাঝেই
সে অসুস্থ হয়ে পড়তো। বিশেষ করে
রেপজনিত ক্রাইম দেখলে অবস্থা গুরুতর হয়ে যেত ফলে প্রায় সিক লিভ নিয়ে সে মাঝে মাঝে
দীপা বৌদির কাছে যেত চিকিৎসা করাতে।”বলে থামলো ব্যোমকেশ।
রণি বললো, “এই জন্যেই তো ওকে ট্রেস করতে পারলাম
আমি। তোমার মুখে
মাল্লারপুরের নাম শুনে মনে পড়লো রাজীবের বাড়িও মাল্লারপুরে। খোঁজ নিয়ে জানলাম ও ছুটিতে বাড়িতে
গেছে আজ সকালে। তারপর সন্দেহ
হওয়ায় ওর ইনফো ফাইলটা ঘেটে দেখতেই দেখলাম একগাদা সিক লিভ অ্যাপ্লিকেশন।আর ওর গার্জেনের
নামে ওর বাবার নামের জায়গায় অসীতবাবুর নাম দেখে দুয়ে দুয়ে চার করতে সময় লাগেনি।“
আমরা সবাই নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। ঘড়িতে তখন সাড়ে নটা বাজে।
******
বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে ব্যোমকেশের ঘরে বসলাম। ব্যোমকেশ
আমার দিকে তাকাতেই বললাম,“কয়েকটা প্রশ্ন ছিলো।” ব্যোমকেশ গাঁজার সিগারেট ধরিয়ে বললো,“বলে
ফেলো।”আমি হাই তুলে বললাম,“রাজুর উপর তোমার সন্দেহ হলো
কখন?”
“মর্গে যাবার পর। কেসটা হাতে নেবার পর
বুঝেছিলাম এর সুতো অনেক লম্বা ছড়িয়ে। আর ভেতরেরই কেউ এটার ধামা চাপা দিচ্ছে।
মর্গে ওর ব্যবহার দেখে আমার সন্দেহ হওয়ায় রণির থেকে ওর আগের থানার খোঁজ নিই। তারপর
সেখান থেকে খোঁজ করে পৌছোই মাল্লারপুরে। মনে আছেমাল্লারপুরের সেই মন্দির
আবিস্কারের দিনটা। মাল্লারপুরে পঞ্চায়েতে ভোটার লিষ্টে রাজুর আসল নাম দেখে
সন্দেহটা পাকা হয়। রাজুদের বাড়ি ভেঙে গেলেও সেটায় নতুন তালা দেখে বুঝতে পারি
এখানে কেউ আসে। আর মন্দিরটা খুঁজে বের করা তো সোজা। গুরুদেবের নির্দেশমতো মন্দিরে
পৌছে হাড়িকাঠ দেখে সন্দেহটা বাড়ে। পুরোনো মন্দির অথচ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন।
হাড়িকাঠটাও নতুন। মন্দিরের পেছনে গিয়ে বাকিটা পরিস্কার হয় আমার কাছে। তুমি দেখোনি
তবে আমার চোখে পড়েছিল। রঙ্কিনীদেবীর পায়ের কাছে কালচে ছোপটা রক্ত না হয়ে যেত না।
তবে একটা ভুল হয়েছিল। আমরা অসীতবাবুর বাড়ি আগে পৌছেছিলাম জিজ্ঞাসাবাদ করতে সেটা
পরে করলেও হতো। ”
“অসীতবাবুর সন্দেহ হওয়াতে তিনি আমাদের
পিছু নেন। আর আমরা তাকে আততায়ী ভেবেছিলাম। তিনি আমাদের পিছু নিয়ে রামপুরহাটে চলে
আসেন। ঐ ছায়ামানুষটা আর কেউ নয় অসীতবাবুই ছিলেন। রামপুরহাট ছাড়ার আগে তাঁর এই
ভুলটা ভাঙাতেই তিনি সাহায্য করতে রাজি হন। এবং কলকাতায় এখানে এসে সবটা বলেন।
ভৈরবকে ফাঁদে ফেলতে তোমাদের পাঠিয়ে ওকে তুলে আনি কলকাতায়। ”
“সুতোর দুটো মাথা খুঁজে পেলেও কয়েকটা জট কাটছিলো না দীপাবৌদীর
জন্য। তিনি স্পোর্টস কোটায় চাকরির কথাটা বলে এবং রাজুর মানসিক অবস্থার কথা বলতেই
সবটা পরিস্কার হয়ে যায়। মোটিভটা স্পষ্ট হয়ে যায়। রাজুর চোখে এরা শুধু অপরাধীই নয়
নরপশুও বটে। তাই এদের মারতে সে দ্বিধা বোধ করেনি। এরা ওর চোখে অসুর। যাদের ভগবানও
শাস্তি দিতে অপারগ। তাই সে এই পশুদের উৎসর্গ করছে সেই ভগবানের সামনে যার সামনে
এরা পাপ করছে। কিন্তু এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না কারন ওর আল্টিমেট লক্ষ্য
ভৈরব। এবার ভৈরবের উপর নজর রাখতে তোমায়
পাঠিয়েছিলাম যাতে ওকে হাতে নাতে ধরতে পারি। কিন্তু বাধ সাধলো বজু ওরফে উমাপতি।
রাজুর সামনে সে নিজের পাপ ঢাকা দিতে গিয়ে ধরা পড়ে
গেল। ফলস্বরূপ বজুকে মরতে হলো। এদিকে পুলিশের জনসাধারনের ভীড়ে সে ভাবলো জনতার
সাহায্যে ওকে হত্যা করবে।একজন ভণ্ডকে ওভাবে হত্যা করলে
দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে আবার প্রতিশোধও নেওয়া হবে।কিন্তু এবার আমি বাধা হয়ে
দাঁড়ালাম। ভৈরবকে ভীড় থেকে বাঁচিয়ে ফাঁদ পাতলাম মাল্লারপুরে। অবশ্য ভৈরবের
আক্রমন আমি হিসেবে রাখিনি। আরেকটু হলে আমরা হয়তো আজ কোনো শেয়ালের পেটে হজম হতাম। এ
যাত্রায় রাজু আমাদের বাঁচালো।দুঃখ কি জানো? ছেলেটা একটা
বিদ্রোহের আগুন হতে পারতো কিন্তু নিয়তী বড়ো নিষ্ঠুর। ভৈরবের মৃত্যুর জন্যই
বেঁচেছিল ও।”
“তাই তুমি সেটা হতে দিলে।” বলে সটান
তাকালাম ওর দিকে। ব্যোমকেশ একটু অবাক হয়ে বললো,“মানে?”
“খাঁড়াটা ফেলার আগে বিড়বিড় করে একটা
শ্লোক বলে রাজুর দিকে তাকিয়েছিলে তুমি। তোমার চোখের ইশারা রাজুর সাথে আমিও
বুঝেছিলাম। আর মন্ত্রটা গুগলে ট্রান্সলেট করতে কতক্ষন?
‘করচরণ কৃতং
বাক্যায়জং কর্মজং বা।
শ্রবণনয়নজং
বা মানসং বাপরাধম।
বিহিতমবিহিতং
বা সর্বমেততক্ষমস্ব।
জয় জয়
করুণাব্ধে শ্রীমহাদেব শম্ভো॥’
হে করুনাধীশ মহাদেব , জ্ঞাতে অজ্ঞাতে, হাতে পায়েদ্বারা
কৃত, বাক্য, কর্ম,শ্রবণ,দর্শন,মানসকৃত যে যে পাপ করেছি বা
করতে চলেছি তার জন্য আমায় ক্ষমা করুন। খাঁড়াটা ও লুফে নেয় নি তুমিই তুলে দিয়েছিলে
ওর হাতে।”
ব্যোমকেশ কিছুক্ষন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তারপর
হেসে বললো,“মনে আছে বলেছিলাম জগতে আইন কানুনের চেয়েও একটা বড়ো ধর্ম আছে ন্যায়ধর্ম? আর এই বিবেক মহাশয়
অতিবদ। এই ন্যায়ধর্ম না মানলে বড্ড জ্বালান। ভৈরবের কথা শুনে মনে হয়েছিল ঠিকই তো
বলেছে সে! এটা তো ধর্মের ব্যবসাই ! এই
মুর্খপৃথিবীতে যতদিন ধর্মান্ধতা থাকবে ততদিন এ ব্যবসা চলবে। চিকিৎসায় ডাক্তারের
কাছে না গিয়ে যতদিন মানুষগুলো এদের কাছে হত্যে দেবে ততদিন এই ব্যবসা চলবে। যতদিন
পাথরের নির্জীব ঈশ্বরের নামে এই মুর্খরা জয়গান দেবে ততদিন এই ব্যবসা চলবে। এরা
রক্তবীজের ঝাড়। একজন যাবে তো আরেকজন আসবে। এই ব্যবসা কোনোদিন থামবে না। কারন মুর্খগুলো আজও কুসংস্কারে
বিশ্বাস করে। আর এই বিশ্বাস কোনোদিনও পুরোপুরি যাবে না।এরকম আরো কত অসুর ঘুরে
বেড়াচ্ছে বলো তো? এদের বধ করার মতো তো কেউ নেই। এই ভণ্ড সমাজের প্রতিভু
হচ্ছে এই ভৈরবের মতো লোকেরা। তখন মনে হলো
রাজুই ঠিক। এদের শাস্তি দেওয়া উচিত।
নিজেকে অসহায় মনে হলো। মনে হলো, এদের একটাকেও যদি শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন
করতে পারতাম। পরক্ষনে মনে হলো আমি নাহয় পারবো না একজন তো পারবে। তাই…। আচ্ছা বলো তো নীল এটা করে,
ন্যায়ধর্ম পালন করে কি আমি কোনো ভুল করেছি? এটাই তো ন্যায়ধর্ম।এতে কোথাও অন্যায় বা
ভুল ছিলো?”
বলতে বলতে আমার দিকে তাকালো ব্যোমকেশ। দেখলাম ওর চোখে
একসাথে ভালো কিছু করার প্রত্যয়ের আগুন আর তার সাথে একটা আশার আলো জ্বলছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে ওর কাঁধে হাত দিয়ে বললাম,“না!”
