অনুসরণকারী

রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ প্রথম পর্ব


রেস্তরাঁর ছাদ থেকে অস্তপ্রায় সুর্যর দিকে তাকিয়ে মুখে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন রজতাভ।  “কিরে? আর কতক্ষণ?” বলে ঐশ্বর্যর দিকে তাকালেন রজতাভ। “এই তো বাপি আর পাঁচ মিনিট। অভি প্রায় এসে পড়লো বলে। আসলে আগেই আসতো। গলিটা একটুর জন্য মিস করে গেছে।” বলে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ঐশ্বর্য। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিমাগে চুমুক দিলেন রজতাভ।

এই নিয়ে পাঁচ দফায় কফি এসেছে। ঐশ্বর্যর কাপ খালি না হলেও রজতাভ আয়েশ করে কফি খেয়ে বসে আছেন। আজকের দিনটা ঐশ্বর্য ওরফে ঐশীর কাছে খুব স্পেশাল। আজ অভীকের সাথে ঐশী ওর বাপির আলাপ করিয়ে দেবে। অভীক ঐশীরই কলেজের সিনিয়ার। বর্তমানে কলেজ পাশ করে একটা স্থানীয় খবরের কাগজে চাকরি করছে তবে নেশায় একজন ফ্রিল্যান্স ফোটোগ্রাফার। ঐশীর সাথে নাকি ওর আলাপও নাকি এই ফোটো তুলতে গিয়ে। ঐশী ওর বাপিকে কালরাতে সবটা বলেছে। সবটা শুনে রজতাভ প্রথমে গম্ভীর হয়ে রাগ করার অভিনয় করেছিলেন পরে মেয়ের কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে ফিক করে হেসে আজ বিকেলে অভীককে ডাকতে বলেছেন।  আসলে রজতাভ ঐশীর কান্না সহ্য করতে পারেন না ঠিকই তবে নিজের ডাকাবুকো মেয়েকে মাঝে মাঝে বিপর্যস্ত হতে দেখে মজা লাগে তাঁর। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারেন না। ঐশী কাঁদো কাঁদো গলায়, “বাপি!” বলে ডাকলেই তাঁর সব স্থৈর্য্য শেষ হয়ে যায়।  তখন তিনি বুদ্ধি দিয়ে মেয়েকে উদ্ধার হবার পথ বাতলে দেন। 

আসলে উর্মি মারা যাবার পর থেকে ঐশীকে প্রায় নিজের মতো করে কোলে পিঠে মানুষ করেছেন রজতাভ। ফলে তার মেয়ে হয়েছে তাঁর মতোই ডাকাবুকো, হুল্লোড়ে আর খিল্লিবাজ। বয়কাট চুলে, পোশাকে কেউ সহজে ধরতে পারে না যে ঐশী আসলে মেয়ে। ক্রেডিটটা অবশ্য রজতাভর। তিনি নিজের গরজে মেয়েকে সাবলম্বী করে তুলেছেন। ক্যারাটে ক্লাসে, সাঁতারে, নাচে নিয়ে গেছেন। রীতিমতো ট্রেনার রেখে মেয়েকে তলোয়ার, পিস্তল চালানো শিখিয়েছেন। নিজে থেকে মেয়েকে বাইক থেকে কার চালানো দুটোই চালানো শিখিয়েছেন। আগেকারদিনে মেয়েদের চৌষট্টি কলা শিখতে হতো। সেই নিয়মে নিজের মেয়েকে একটা ছেলের মতোই ট্রিট করেছেন। একবার মনে আছে রজতাভর, সেবার ঐশীর ক্লাস নাইন। একদিন বিকেলে স্কুল থেকে বুকের দিকে ব্যাগ দিয়ে চাপা দিয়ে থমথমে মুখে বাড়ি ফিরেছিলো মেয়ে। বাড়িতে ফিরে ব্যাগটা নামাতে রজতাভ দেখতে পান মেয়ের জামার বুকের দিকটা কেমনভাবে যেন ছিঁড়ে গেছে। মুখে একাধিক আঘাতের চিহ্ন। যেন কারো সাথে মারপিট করে ফিরেছে। ফার্স্ট এইড করে মেয়েকে ধাতস্থ হবার সময় দিয়েছিলেন রজতাভ। পরে রাতে খাবার পর টিভি দেখতে দেখতে ঐশী নিজেই ধরা গলায় বলেছিলো সবটা। কয়েকদিন ধরেই ওদের স্কুলের কয়েকটা ছেলে স্কুল ছুটি হবার পর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওদের টন্ট করতো। ঐশীও বাদ ছিল না। কিন্তু সে কিছু না বলে চুপচাপ ইগনোর করে চলে যেত।‌ আজকে ছেলেগুলোর বাঁদড়ামি সহ্য না করতে পেরে অবশেষে সে রুখে দাঁড়ায়। প্রচণ্ড রাগে ছেলেগুলোর দিকে তেড়ে যেতেই একপ্রস্থ ঝামেলা বাঁধে। ওরা ভেবেছিল বাচ্চা মেয়ে, হাত চেপে ধরলে বা একটু ভয় দেখালে শান্ত হয়ে যাবে। কিন্তু ওদের দলের দুজন ধরাশায়ী হবার পর ওদের ভুল ভাঙে। তারপর ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়ের উপর। দাঁতে দাঁত চেপে ঐশী ওদের দলের বাকিদের জখম করে হারিয়ে দিলেও হাজার চেষ্টা করেও কিছুতেই ওদের দলের একটা ছেলের সাথে লড়ে উঠতে পারে নি। আর এই ছেলেটার ইন্ধনেই বাকি ছেলেরা মেয়েদের টন্ট করত। এই ছেলেটাই ছিল আসল দোষী। ছেলেটাকে সে প্রায় বাগে এনে ফেলেছিল কিন্তু মোক্ষম সময় ছেলেটার তার শার্টের বুকের দিকের কাপড় কীভাবে যেন ধরে ছিঁড়ে ফেলে। ফলে নিজের পোশাকের দিকে মনোযোগ চলে যায় তার। আর সেই সুযোগে ছেলেটা ওকে কষে একটা ঘুষি মেরে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিয়ে বলে মেয়ে হয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করতে। এরপর যদি সে বেশি কিছু করতে যায় আজ তো শুধু কাপড় ছিঁড়েছে, এরপর ওকে ওরা ন্যাংটো করে পাড়ায় ছেড়ে দেবে। 


সবটা শুনে চোয়াল শক্ত হয়েছিলো রজতাভর। অন্য কেউ সাহসী হলে পুলিশ ডাকতেন। নাহলে ঐশীকেই লড়তে যাবার জন্য দোষারোপ করতেন। এমন কি ওনার মতো কেউ এক্স মিলিটারিম্যান হলে নিজে গিয়ে ছেলেগুলোকে দু ঘা দিয়ে আসতেন। কিন্তু রজতাভ অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি চুপচাপ মেয়েকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে অ্যানিমাল প্ল্যানেট চালিয়ে দেখছিলেন। কথাগুলো বলতে বলতে ঐশীর গাল বেয়ে অশ্রুধারা বেরিয়ে আসলেও রজতাভ টের পাচ্ছিলেন মেয়ের কান্নাটা ছেলেগুলোর কথার জন্য নয়। নিজের হেরে যাবার জন্য। ঐশীর নিজেকে সামলাবার কিছু সময় দিয়ে টিভির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ধীর অথচ দৃঢ় গলায় বলেছিলেন, “সবটা বুঝলাম। কিন্তু আমি বলব এখানে তোরও ভুল কম ছিল না। ”

মেয়ে বজ্রাহতের মতো তাকিয়েছিল রজতাভর দিকে। টিভিটা মিউট করে সোফায় হেলান দিয়ে রজতাভ বলেছিলেন, “লড়াইয়ের প্রধান নিয়মটাই তুই ফলো করিস নি। লড়াই করার সময় শত্রুর উপর মনোযোগ রাখাটাই আসল নিয়ম। শত্রুর প্রতিটা মুভমেন্ট লক্ষ্য করে ওর আক্রমণ করার পদ্ধতি অনুধাবন করে নিজেকে বাঁচিয়ে লড়ে যেতে হয়। লড়াই করার সময় শত্রু বাদে আর কোনো বাহ্যিক বস্তুর উপর মনোযোগ দিতে নেই! ওটা লড়াইতে হেরে যাবার প্রথম পদক্ষেপ। আর তুই সেটাই করেছিস। তোর হারটা কখন হল জানিস? যখন ছেলেটা তোর শার্ট ছিঁড়ে দিলো আর তুই নিজের আব্রু ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়লি তখন। তার আগে তোর মনোযোগ সম্পুর্ণ ওদের উপর ছিলো। যে কারনে ওরা তোর বিরুদ্ধে বেশীক্ষণ দাঁড়াতে পারে নি। এমন কি যে ছেলেটা তোর শার্ট ছিঁড়ে দিল সেও প্রায় হেরেই যাচ্ছিল। তবে মানতে হবে ছোকরার এলেম আছে। এ তেমন লাথখোর এলেবেলে ছোকরা নয়। একজন মেল ইগোতে ভরা একটা ছেলে। যার কাছে মেয়েরা অবলা,শক্তিহীনা, ভোগ্যা। এতদিন সেই চিন্তাধারার বশেই চলছিল সে। বাকি ছেলেদের মধ্যে সেই চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিয়ে তোদের টন্ট করছিল। ভেবেছিল তোরা মুখ বুঁজে সহ্য করে যাবি। তোদের মধ্যেও যে একজন রুখে দাঁড়াতে পারে সেটা ওরা ভাবতে পারে নি। কিন্তু তুই যখন রুখে দাঁড়ালি, একে একে ওদের ধরাশায়ী করলি তখন তুই কিন্তু একদিক থেকে ওদের চিন্তাধারায় আঘাতটা করলি। আর এটাই ওদের কাছে বড়ো ধাক্কা হয়ে গেল। বিশেষ করে ওই ছেলেটার কাছে। একজন পুরুষ হয়ে একজন নারী তাও আবার একটা বাচ্চা মেয়ের হাতে হেরে যাচ্ছে, তাকে পরাজিত করতে পারছে না, বশে আনতে পারছে না, বরং বেদম মার খেতে হচ্ছে এটা হজম হচ্ছিল না ছেলেটার। কিন্তু এই জিনিসটাই বাস্তবে পরিনত হচ্ছে দেখে ছেলেটার মেল ইগো ক্রমশ হার্ট হচ্ছিল। সেই কারনে ও মরিয়া হয়ে এমন একটা স্পর্শকাতর আঘাত করে বসল যেটা একটা নারীর কাছে যেমন অবমাননাকর ঠিক তেমনই একজন লড়াকু নারীকে পরাজিত করার, মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করার ফাঁদও বটে। সহজাত সংস্কারের বশে শতকরা ৯৮% লড়াকু মেয়ে এই ফাঁদে পা দেয়। আর তুইও ঠিক সেটাই করলি। ওর ফাঁদে পা দিয়ে ওকে সুযোগ দিয়ে বসলি। যেই মুহূর্তে ছেলেটা তোর সম্মানে হাত দিলো সেই মুহূর্তে তোর মনোযোগ ছেলেটার থেকে সরে গিয়ে তোর শার্টের উপর গিয়ে পড়লো আর তুই সহজে হেরে গেলি।  যদি সেই মুহূর্তে তুই নিজের দিকে নজর না দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতিস তাহলে ছেলেটা সহজে হেরে যেত। আর হেরে যেত ওর পৌরুষের মিথ্যে অহংকারটা। তখন তোকে নগ্ন করার হুমকি দেওয়া তো দুরস্থ, ওর সাহস হতো না তোর চোখে চোখ রেখে কথা বলার। আর এটা আমার থেকে বেশি করে তুই জানিস। কি ঠিক তো?”

মেয়ে তন্ময় হয়ে তাঁর কথা শুনতে শুনতে মাথা নেড়ে কোলে মাথা রাখতেই রজতাভ হেসে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “ একটা কথা সবসময় মনে রাখিস মা। এই যে বাইরের জগতটা দেখছিস এটার সাথে এই অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটের জঙ্গলের জগতটার বেশী পার্থক্য নেই। এখানে দুটো দল আছে একদল ‘Preachers’ আর অপরদল হলো ‘Survivers’, মানে শিকারী এবং শিকার থেকে বেঁচে ফেরা প্রাণী। এই পৃথিবীতে বাঁচতে হলে তোকে এই দুটো দলের মধ্যে একটা হতেই হবে। হয় তোকে ‘Surviver’ হয়ে আজীবন এই শিকারীদের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে হবে, survive করতে হবে। নাহলে নিজেই শিকারী হয়ে এই শিকারীদের পাল্টা শিকার করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজে মেয়েরা দ্বিতীয় পথটা বেছে নিয়ে Surviver হতে গিয়ে এই শিকারীদের সহজ শিকারে পরিণত হয়। আর এটা বার বার হয় বলে ওরা ভেবে নেয় স্বভাবে তোরা নরমসরম বলেই তোরা ভীষণ দুর্বল। কিন্তু বাস্তবটা ভীষণ উল্টো। নারীদেহে কোমলতা, করুণা একটা গুণ, একটা Instinct, যেটা তোদের সহজাত। এই গুনগুলো তোরা সাথে নিয়ে জন্মাস। নারী মানে কোমল মনের হতে পারে কিন্তু সে অবলা নয়। সে যেমন আর্তের পাশে দাঁড়াতে পারে ঠিক তেমনই চাইলে সে শত্রুর টুটি টিপে ধরতে পারে। আর এইসব শিকারীরা যখন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয় তখন স্বাভাবিকভাবে ওদের সব নিয়ম, হিসেবনিকেশ পালটে যায়। এতদিন ধরে বিশ্বাস করে আসা মতবাদ এলোমেলো হয়ে যায়। তখন নিজের, সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে যেনতেন প্রকারেণ ভাবে এই হিসেবের বাইরে থাকা মেয়েদের দমানোর চেষ্টা করে। কখনো বাহুবলে, কখনো এই নারীদের সম্মানে আঘাত করে তাকে পরাজিত করার চেষ্টা করে। হ্যা সমাজ এই মেয়েদের একেবারেই  প্রাধান্য দেয় না তা নয়। সমাজ এদের প্রাধান্য তখনই দেয় যখন এই মেয়েরা বহির্বিশ্বে সম্মান পায়, স্বীকৃতি পায়। ততক্ষণ পর্যন্ত প্রাণপণে লড়ে যেতে হয়। তোকেও এরকম প্রাণপণে লড়ে যেতে হবে। আর রইলো পোশাক, তাহলে শোন যুদ্ধে পোশাক, আভূষণ, বা হাতের অস্ত্র Matter করে না। Matter করে যুদ্ধে অক্ষন্ড মনোযোগ, অন্তিমশ্বাস পর্যন্ত হার না মানা মনোভাব, আর শত্রুকে পরাজিত করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ঠান্ডা মস্তিক। যুদ্ধে এটা বড়ো কথা নয় কে প্রথম আঘাত করল, বরং যুদ্ধশেষে কে ধরাশায়ী হচ্ছে এটাই শেষ কথা। আর নারীদেহ হল নিজেই একটা চলন্ত অস্ত্র। ঠিক মতো এই অস্ত্রকে ব্যবহার করতে পারলে ভীষণ কড়া প্রতিপক্ষকেও পরাস্ত করা সম্ভব। তুই এখন ছোটো এসব বুঝবি না তাই শর্টে বলছি। জঙ্গলে যখন সুর্যোদয় হয় তখন একটা হরিণ ভাবে আজ যদি আমি প্রাণপণে না দৌড়োই তাহলে বিকেলের সুর্যাস্ত দেখার জন্য বেঁচে থাকবো না। আর একটা বাঘ ভাবে আজ যদি আমি হরিণের চেয়ে জোরে না দৌড়োই তাহলে না খেতে পেয়ে মারা পড়বো। মানে তুই শিকারী হোস বা শিকার দৌড়তে তোকে হবে। এবার তুই শিকারী হবি না শিকার সেটা তোর উপর নির্ভর করছে। কিন্তু মনে রাখবি শিকারের বেঁচে থাকাটা তার ভাগ্যের উপর নির্ভর করে। অনেক সময় অনেক চালাক শিকারও শিকারীর তীব্র অধ্যাবসায়ের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। কারন শিকারী বাঘ যখন শিকার করে তখন তার মনোযোগ সম্পুর্ণ ভাবে তার শিকারের উপর থাকে আর কোনোকিছুর উপর নয়। এমন কি তার নিজের উপরও নয়। এরপরও যখন শিকার ফস্কে যায় তখন সে আক্ষেপে গর্জন করে না। বরং সুযোগের প্রতিক্ষা করে। তেমনই আজকের ব্যর্থতায় যে নিজের উপর রাগটা জমেছে সেই রাগটাকে পুষে রাখতে শেখ। তারপর যখন শিকারকে হাতে পাবি তখন নিজের সমস্ত মনোযোগ তার উপরই দে। একমাত্র লক্ষ্য রাখ ওকে পরাজিত করার দিকে। দেখবি পরেরবার জয় তোরই হবে।”  

মেয়ে বাবার কোলে মাথা রেখে পুরো কথাটাই শুনেছিল। তারপর একসময় উঠে চলে গিয়েছিলো নিজের ঘরে। এক সপ্তাহ পরে আবার মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় বাড়িতে ফিরতে দেখলেও ফার্স্টএইড করার সময় মেয়ের ঠোঁটে বিজয়ের হাসিটা দেখে সবটা অনুমান করে নিতে কষ্ট হয় নি রজতাভর। তিনি বুঝেছিলেন এবার তাঁর মেয়ে নিজের আত্মরক্ষা করতে সক্ষম। আর তাঁর মেয়েকে আগলে রাখার প্রয়োজন হবে না। কিছুক্ষণ পরে ছেলেগুলোর মা, বাবা এসে ঝামেলা করতে এলে তিনি নিজে তাদের সাথে কথা বলতে বসেছিলেন। জানিয়েছিলেন পুরো ঘটনাটা। সবটা শোনার পর সবাই না হলেও দুজন ছেলের মা, বাবা ক্ষমা চেয়েছিলেন তাঁর কাছে। বাকিরা সমানে তর্ক করে চলেছিলেন ওনার সাথে। মেয়েকে মানুষ করতে তিনি ব্যর্থ এই কথাটাও ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিতে কসুর করছিলেন না তারা। অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি বলেছিলেন, “দেখুন! মেয়ে আমার, মেয়েকে মানুষ করার দায়িত্বও আমার। আমি কীভাবে আমার মেয়েকে মানুষ করব সেটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। কাজেই এই বিষয়টা আমার উপরই ছেড়ে দিন। আপাতত একটা কথাই বলব আমি।‌ আপনারা বরং আপনাদের ছেলেদের প্রকৃত পুরুষমানুষ হতে শেখান। এই বয়সটা পড়াশুনো করার সময়। প্রেম করার বা রাস্তাঘাটে মেয়েদের টিটকিরি মারার নয়। প্রেম করার জন্য ওদের গোটা জীবন পড়ে আছে। আর আপনাদের ছেলেরা ক্রিকেট খেলতে গিয়ে‌ মার খায় নি। ইভটিজিং করতে গিয়ে মার খেয়েছে।‌ আজ আমার মেয়ে মেরেছে। কালও যদি এরকম করে তাহলে পাবলিকের কাছেও হাটুরে মার খেতে পারে ওরা। তখন কী সবার বাড়িতেও এরকম সদলবলে চড়াও হবেন? আশা করি নিশ্চয়ই তা করবেন না।‌ আপনাদের ছেলেরা বয়সে ছোটো বলে আমি পুলিশ ডাকিনি। নাহলে ওরা যেটা করেছে তারজন্য অন্তত একটা দিন হাজতবাস ওদের দরকার। কিন্তু আমি চাই না ওদের জীবনে, কেরিয়ারে কোনো দাগ পড়ুক। ওরা ক্রিমিনালে পরিণত হোক। আমাকে সন্তান শিক্ষার পাঠ না দিয়ে বরং আপনাদের ছেলেদের কীভাবে একটা মেয়েকে সম্মান প্রদর্শন করতে হয় সেটা শেখান। প্রকৃত পুরুষের পরিচয় পুরুষাকারে নয় শিরদাঁড়ায় এটা শেখান, তাহলে দেখবেন ভবিষ্যতে পুরুষ হয়ে একজন নারীর কাছে মার খেতে হচ্ছে না তাদের। আর আপনাদেরও এই সামান্য বিষয় নিয়ে কারো বাড়িতে উঠে পড়ে ঝগড়া করতে যেতে হচ্ছে না। একবার ভেবে দেখুন তো এই ব্লকে, আপনাদের পাড়ায়, স্কুলে সকলে যদি জেনে যায় আপনাদের ছেলেরা ওদের চেয়ে বয়সে ছোটো বাচ্চা মেয়েদের টিটকিরি মারতে গিয়ে, ইভটিজিং করতে গিয়ে একটা মেয়ের কাছে বেধড়ক মার খেয়ে গেছে। ব্যাপারটা কিন্তু তেমন শ্রুতিমধুর হবে না বরং এতে আপনাদেরই অসম্মানটা বাড়বে। কাজেই এই বিষয়ে বেশি জলঘোলা না করাই ভালো। আশা করি বুঝতে পেরেছেন। ও ভালো কথা আপনারা প্রথমবার আমার বাড়িতে এসেছেন চা না খাইয়ে কিন্তু আপনাদের ছাড়ছি না। বসুন! সন্ধ্যাদি পাঁচ কাপ চা হবে?”  

ঘটনাটা ঘটার পরে ক'দিন তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে ফলো করেছিলেন মেয়েকে যাতে কোনো অঘটন না ঘটে।কিন্তু অঘটন ঘটার মতো কিছুই ঘটে নি। মেয়ে স্কুল থেকে ফেরার‌ পথে নিজে এগিয়ে গেছিল ছেলেগুলোর কাছে।‌ আগেরদিন মার খাবার পর স্বাভাবিকভাবেই ছেলেগুলো মেয়েকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। ওদের মধ্যে একজন বড়ো করে ছেলে মাথা নত করে ক্ষমা চেয়েছিল। মেয়ে অবশ্য আগের দিনের কোনো ঘটনা মনে রাখে নি। বরং সে নিজে এগিয়ে গিয়ে ছেলেগুলোর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো।ছেলেগুলো প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও পরে বন্ধুত্বের প্রস্তাবটা গ্রহণ করতে দেরী করেনি। সেই বন্ধুত্ব আজও টিকে আছে। 

মাঝে মাঝে তাঁর অবাক লাগে এই কি সেই ঐশী? যে ছোটোবেলায় তাঁর বুকের উপর কার্টুন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তো। সেই ঐশী , যার পরীক্ষার আগের দিন অহেতুক টেনশন করতেন তিনি। সেই ঐশী যে রাগ হলে নিজের ছোটো ছোটো হাত দিয়ে তার বাপিকে মারতো। সত্যি সময় বড়ো তাড়াতাড়ি বয়ে যায়। সেদিনের সেই ছোটো ঐশী আজ কলেজে পড়াশুনো শেষ করার দোরগোড়ায়। এরপর সে নিজেই ঠিক করবে তার ভবিষ্যতের প্ল্যান। তারপর একদিন বিয়ে করে চলে যাবে পরের ঘরে। তবে সেসব সুদূর ভবিষ্যতের কথা, আপাতত তিনি এখানে এসেছেন অভীক ছেলেটিকে একবার বাজিয়ে দেখতে। তিনি দেখতে চান কোন মন্ত্রবলে সে তাঁর ডাকাবুকো কন্যেকে জয় করলো। 

প্রায় আধঘন্টা হয়ে গেলো রজতাভরা এসেছেন। অথচ অভীকের পাত্তা নেই। ঐশীর মুখও প্রায় কাঁচুমাচু হয়ে গেছে। সে ক্রমাগত ফোন করে যাচ্ছে অভীককে। ভেতর ভেতরে ক্রমশ বিরক্ত হলেও নিজেকে সামলে তিনি বললেন, “কিরে আর কতক্ষণ? সেই বিকেল পাঁচটা থেকে বসে আছি তা তোর ঐ অভীকবাবাজি কোথায়? এই বললি গলি মিস করেছে। তা ঠিকঠাক ঠিকানা দিয়েছিলি তো?”

রজতাভর কথায় ঐশী কিছু বলতে যাবে এমন সময় রজতাভর পেছনে যেন কাকে দেখে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাত নেড়ে ইশারায় ওদের টেবিলের দিকে আসতে বলে। রজতাভ খেয়াল করেন একটু আগেও যে মেয়ের মুখ প্রায় কালো হয়ে এসেছিল হঠাৎ তার পিছনে কাকে দেখে আবার উজ্জ্বল হয়ে গেছে। রজতাভর একবার ইচ্ছে করল যে ছেলেটা ওদের দুজনকে এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছে সেই ছেলের মুখ একবার দর্শন করতে। কিন্তু পরক্ষণে নিজের কৌতুহল দমন করে কফির ষষ্ঠতম কাপে চুমুক দেন তিনি। কিছুক্ষণ পরেই একটা রোগামতো ভীষণ মিষ্টি দেখতে ছেলে ওদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতেই শুরু হয় ঐশীর মৃদুস্বরে বকাবকি। “তোর কি কোনোদিনও আক্কেল জ্ঞান হবে না? এতক্ষণ লাগে অফিস থেকে এখানে আসতে?” ছেলেটা কাঁচুমাচু মুখে কিছু বলার আগেই ঐশী ধমকায়, “একদম কোনো এক্সকিউজ দিবি না! গতবারের ডেটেও তুই এরকমই অজুহাত দিয়েছিলি!কী ভেবেছিস? চাকরি করিস বলে সাপের পাঁচ পা দেখে ফেলেছিস?” 

ব্যাপারটা ক্রমশ বিপজ্জনক দিকে এগোচ্ছে দেখে রজতাভ চটপট কফির কাপে চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলে রেখে একটু গলা খাকড়ে বলেন, “হয়েছে! হয়েছে! এবার থাম দুজনে! এটা পাবলিক প্লেস! ঝগড়া করার জন্য আরো অনেক জায়গা আছে। ছেলেটা এতক্ষণ পর এসেছে কোথায় ওকে বসতে বলবি তা না ঝগড়া করছে। বোস দুজনে!"

কথায় কাজ হয়। দুজনে চেয়ারে বসে। রজতাভ কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলেন, “ওয়েল! তুমিই তাহলে অভীক?" ছেলেটা মাথা নাড়ে। রজতাভ এবার গম্ভীর গলায় বলেন, “দেখো ছেলে যেহেতু আমি আর্মিতে ছিলাম সেকারনে টাইম মেন্টেন করতে পছন্দ করি। সময়ের অপচয় করা, পাংচুয়াল না হওয়া আমার পছন্দ হয় না। ঐশ্বর্যও আমার মতোই পাংচুয়ালিটি মেন্টেন করতে পছন্দ করে। কালরাত থেকে এখানে আসা পর্যন্ত ওর মুখে তোমার ব্যাপারে যতটুকু শুনেছি তাতে বুঝেছি তুমি এমনিতে পাংচুয়াল হলেও মাঝে মাঝে দেরী করো। এটা কিন্তু ভালো কথা নয়। ইউ শুড বি মোর কনসার্নড অ্যাবাউট দিস! তবে যেহেতু এটা আমাদের প্রথম দেখা তাই তোমাকে আমি অ্যালাউ করছি। তাছাড়া আমার মনে হয়েছে দেরী করার যথেষ্ট কারন তোমার কাছে আছে। আর আমার মনে হয় তোমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা সুযোগ দেওয়া যেতে‌ পারে। সো টেল আস অভীক! কী এমন কারন ছিল যে তোমার প্রায় আধঘন্টা লেগে গেল?”

ঐশী ফুঁসে উঠল, “একদম ওর কথা বিশ্বাস করবে না বাপি! প্রতিবার একই এক্সকিউজ দেয়। জানো গতবার কী বলেছিল?” হাতের ইশারায় মেয়েকে থামিয়ে রজতাভ বলেন, “আহ একটু চুপ কর! ওকে বলতে দে! হ্যা অভীক বলো।”

অভীক এতক্ষণ মাথা নীচু করে ছিল। রজতাভর কথায় মাথা তুলে বলে, “আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি স্যার!”

-“আঙ্কল! ইউ ক্যান কল মি আঙ্কল।”

-“‌ ওকে। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি ফর‌ বিইং লেট অন আওয়ার মিটিং। আসলে আমি ঠিক সময়ই বেরোব বলে অফিস থেকে হাফটাইমের পর লিভ নিয়েছিলাম। যেই আমি অফিস থেকে বেরোব অমনি মায়ের কল। হঠাৎ কাউকে না বলে কয়ে মা চলে এসেছে এখানে। আমি পড়লাম মহাবিপদে! একদিকে আপনারা আমার অপেক্ষায়। অন্যদিকে মা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। কী করব ভাবছি এমন সময় মা-ই উপায় বলে দিল। মা জানতো আমাদের আজকের মিটিংয়ের ব্যাপারে। মা বলল, “এককাজ কর তুই আমাকে এখান থেকে পিকআপ করে নিয়ে চল রেস্তরাঁতে। আমিও ঐশীকেই দেখতে এসেছি। এক যাত্রায় পৃথকফল হবে কেন? তারচেয়ে বরং ঐশীদের সাথে আলাপটাও সেরে নেব।”

কথার মাঝপথে অভীককে থামিয়ে দেন রজতাভ, “সেকি! তোমার মাও তোমার সাথে এসেছেন নাকি?”

অভীক মাথা নাড়তেই রজতাভ বলে ওঠেন, “সেকি! উনি কোথায়?বাইরে দাঁড়িয়ে নাকি? কি আশ্চর্য! তাকে সাথে করে নিয়ে আসবে তো!”

ঐশী পাশ থেকে ফুট কাটে ,“সাধে বলি? ক্যালাস!”

অভীক হেসে বলে, “অতোটাও নই! মাকে নিয়েই এখানে ঢুকেছি। ঐ তো! আপনাদের পিছনের টেবিলে মা বসে আছে।”বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যায় রজতাভদের পিছনের টেবিলে। টেবিলে বসা মহিলাকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটে ঐশী। ইশ! ভদ্রমহিলা একেবারে ওদের পাশাপাশিই বসেছিলেন, আর সে কিনা ওনার সামনেই ওনার ছেলেকে যা নয় তা বলে যাচ্ছিল! ভদ্রমহিলা হাসতে হাসতে টেবিলের সামনে এসে বললেন, “আহা! আবার আমাকে টানছিস কেন? বেশ তো চলছিল। আরেকটু চললে জমে যেত। খামোখা মজাটা নষ্ট করলি!” 

অভীক বলে ওঠে,“ আঙ্কল আলাপ করিয়ে দিই। ইনি আমার মা সুজাতা চৌধুরী। মা ইনি ঐশীর বাপি কর্নেল রজতাভ মজুমদার।” দুজনে দুজনকে নমস্কার জানান।

ঐশী‌ কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ সরি আন্টি! মানে আমি বুঝতে পারি নি আপনি এইভাবে...! আর অভীকও তো কিছু বলেনি!”

সুজাতা হেসে বললেন, “ওর কোনো দোষ নেই। আসলে তোমাদের সারপ্রাইজ দিতে আমিই কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে এসেছি! তবে এসে ভালোই হল দেখছি! এখানেও ওকে শাসন করার‌ লোক আছে দেখছি! যাক নিশ্চিন্ত হলাম! এই মেয়ে! একদম লজ্জা পাবে না! অভীক আমার ছেলে হলে কী হবে? ঠিক ওর বাবার মতোই জাত কুঁড়ে হয়েছে ও। জানো আমাদের বেলা তো আর এখনকার মতো ডেট, মিটিং হত না। আমাদের সময় ডেটের মানে সিনেমা দেখা, পার্কে যাওয়া। সেইসময়ও ওর বাবা এইরকমই দেরী করতো। আর আসার পর নানারকম অজুহাত দিতো। আমি নাহয় সহ্য করেছি তুমি কিন্তু একদম ‌সহ্য করবে না! এই আমি পারমিশন দিলাম গরুর গাড়িতে গরু বেচাল হলে যেরকম গারোয়ান গরুর ল্যাজ মুচড়ে দেয় তুমিও বেগোড়বাই দেখলে কানটা মুলে দেবে! বুঝেছ?” 

ঐশী ফিক করে হেসে মাথা নেড়ে বলে, “বেশ! ও নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না আন্টি! আমার হাতে যখন পড়েছে চটপটে করেই ছাড়ব।”

অভীক চারদিকে তাকিয়ে বলে, “মা প্লিজ! তুমি এখানে ঐশীকে দেখতে এসেছ নাকি আমার শাসনভার তুলে দিতে এসেছ?”

সুজাতা হেসে চেয়ারে বসে বলেন, “চুপ কর তো! যা করেছি বেশ করেছি!এতদিনে নিশ্চিন্ত আমি। যোগ্য লোকের হাতেই পড়েছিস‌ তুই! তোর জন্য ঐশীই ঠিক আছে। ওই পারবে তোকে শুধরোতে। কিন্তু একটা জিনিস বুঝছি না এত মিষ্টি একটা লক্ষ্মীমন্ত‌ মেয়ে তোর মতো অলসের পাল্লায় পড়ল কী করে?” বলে ঐশীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন তিনি।

এবার রজতাভ বলে ওঠেন ,“ওভাবে বলবেন না! আমাদের অভীকও বেশ ভালো ছেলে! অন্তত ওকে যতটা দেখছি। ওর ব্যাপারে যতটা শুনেছি তাতে বলব আজকালকার যুগে এরকম রত্ন খুবই কম পাওয়া যায়। হ্যা দোষের মধ্যে ও একটু অলস। তাতে কী?ওর লেখা, ওর ছবিতোলার হাতও বেশ ভালো। তাছাড়া ভুল করে সেটা স্বীকার করার সৎসাহসও আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে বেশি দেখি না। সেখানে সামান্য দেরী করার জন্য এতটা হনেস্ট কনফেশন দিয়েছে বেচারা। ওর আর লেগপুলিং করবেন না প্লিজ!”

ঐশী বলে ওঠে, “বাপি! তুমি কিনা শেষে দলবদল করছ? এই একটু আগে ওকে টাইম মেন্টেনিং নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছিলে এখন ওরই সাইড নিচ্ছ?”

রজতাভ হেসে বলেন, “মোটেই না। আমি শুধু ভালোটা বলছি। তুই তো কালরাত থেকে ওর ব্যাপারে বার বার বলে যাচ্ছিস! ‘বাপি জানো অভীক ছেলেটা মন্দ নয়...', ‘বাপি!অভীকের তোলা ছবি! কী সুন্দর লাগছে না আমাকে?’,‘বাপি এই যে অভীকের পেজ! দেখো কী ভালো লেখা! রিসেন্ট লেখাটা পড়ছি শোনো!’ আমার তো কান পঁচে যাবার জোগাড়। কিন্তু এখানে এসে দেখছি ছেলেটাকে সমানে লেগপুলিং করে যাচ্ছিস তুই! এতটা খিল্লি ও ডিজার্ভ করে না তাই বললাম। একি তুমি দাঁড়িয়ে কেন? বসো!” বলতেই অভীক চেয়ার টেনে রজতাভর পাশে বসে। 

ঐশী লজ্জা পেয়ে বলে, “বাপি!স্টপ! এটা পাবলিক প্লেস!”

এবার ফুট কাটে অভীক, “কেন এটা এতক্ষণ মনে ছিল না?” অভীকের কথা শুনে রজতাভ আর সুজাতা এবার হোহো করে হেসে ফেলেন। 

কিছুক্ষণ হাসিঠাট্টার পর ছেলে-মেয়ে দুজনকে একা ছেড়ে দিয়ে আলাদা টেবিলে বসেন দুজনে। চেয়ারে বসে সুজাতা বলেন, “সত্যিই এখানে না এলে আমি অনেক কিছু মিস করে যেতাম! তবে এখন আমি নিশ্চিন্ত জানেন? আমার ছেলেটা বাড়ি থেকে এতদুরে থেকেও অযত্নে নেই। ওকে দেখার লোকও আছে এই শহরে। আসলে ছেলেবেলা থেকে আমিই ওকে আগলে রেখেছি তো! বুঝতেই পারছেন।‌ ভীষণ আদরে মানুষ!”

রজতাভ হেসে বলেন, “জানি! বাবা-মা হল সন্তানের কাছে ছাদের দুটো স্তম্ভের মতো। একটা স্তম্ভ সরে গেলে পুরো নড়বড়ে ছাদের ভার অপর স্তম্ভের উপর পড়ে যায়। আপনার ছেলের মতো আমার মেয়েটারও ভাগ্য এক!অভীক তো তাও বাবার স্নেহ পেয়েছে পাঁচটা বছর। আমার মেয়েটা তো মায়ের আদর কাকে বলে জানেই না। জন্মের পর থেকে ওর কাছে আমিই বাবা, আমিই মা। তবে আপনার ছেলের মেধা, বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। তারচেয়েও বেশী প্রশংসনীয় আপনার গাইডেন্স! আজকালকার দিনে বাবা-মায়েরা কম্পিটিশনের দৌড়ে সন্তানকে মানুষ করাই ভুলে গেছে। একটা টিয়াপাখি পোষা আর সন্তানকে মানুষ করা সমার্থক হয়ে গেছে। সন্তানকে আর কিছু হোক না হোক প্রথম হতেই হবে। কত সন্তান যে এভাবে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে তার হিসেব নেই। কিন্তু আপনি তা হতে দেন নি! নিজের আদর্শে মানুষ করেছেন ছেলেকে। আজকালকার যুগে সিঙ্গল প্যারেন্টিং ভীষণ কষ্টকর। আর বহুল চর্চিতও বটে। আমি নিজে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মেয়েকে মানুষ করা সহজ নয়। কিছু কিছু সময় মেয়ের মাকেও প্রয়োজন হয়।‌ বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির সময়।‌ কিন্তু আমার মেয়েটার কপাল এত খারাপ কাউকে পাশে পায়নি ও। এমনকি ওর প্রথম পিরিয়ডের খবরও আমি টের পাই দুদিন পর। যন্ত্রণা, রক্তপাত লুকিয়ে দিব্যি হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল মেয়েটা। শেষে একদিন থাকতে না পেরে বাথরুমে অজ্ঞান হয়ে যায়। সে এক কান্ড! বলতে গেলে সারা দিন চলে যাবে। আমার মেয়েটা বরাবরই এরকমই! হাজার যন্ত্রণা পেলেও মুখ ফুটে বলবে না। আমি এমন একজন ছেলে চেয়েছিলাম যে আমার মেয়েকে বুঝবে, আমার মতোই আগলে রাখবে। আর অভীকই ‌সেই ছেলে আমি হলফ করে বলতে পারি। আমি মানুষ চিনতে পারি সুজাতাদেবী! আর আপনার ছেলেকে দেখে বুঝেছি এ ছেলে লাখে এক। হাজার আঘাত পেলেও আমার মেয়ের হাত ছাড়বে না। কাল যখন আমরা থাকবো না ওরা একে অপরকে ঠিক সামলে নেবে।”

সুজাতা রজতাভর দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমারও তাই মনে হয় জানেন? সেই কারনেই আমি এখানে এসেছি।”

রজতাভ এতক্ষণ ছলছলে চোখে তাকিয়েছিলেন মেয়ের দিকে। সুজাতার কথা শুনে সরাসরি তাকান।

সুজাতা ধীর কন্ঠে বলেন, “আমি চাই আমরা থাকতে থাকতেই ওদের পায়ে শেকল বেঁধে চারহাত এক করে দিতে। না মানে এখনই নয়। আগে ওরা নিজের পায়ে দাঁড়াক, প্রতিষ্ঠিত হোক। তারপর না হয় ওদের বিয়েটা হবে! তবে বেশী দেরী না করাই মঙ্গল। কারন ওরা যতই আমাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হোক না কেন আসলে তো আধুনিক যুগের ছেলেমেয়ে! এই প্রেম, তো এই ব্রেকআপ। কাজেই আমি চাই ওদের এক করে দিতে। ”

রজতাভ হেসে বলেন, “আইডিয়াখানা মন্দ নয়! আমিও এরকমই কিছু ভেবেই এসেছিলাম এখানে।‌ তেমন হলে আপনার সাথে যোগাযোগ করতাম। একদিকে ভালোই হল আপনি এলেন।”

-“তাহলে আপনার মেয়েকে আমার কোলে তুলে দিচ্ছেন তো?”

-“হুম। বেশ দিলাম! তবে দুটো শর্তে!”

-“কী শর্ত?

-“প্রথমত, আপনার ছেলেকে আমার কোলে দিতে হবে। মানে বিয়ে করে আপনার ছেলে যেমন আপনার কাছে মেয়ে নিয়ে যাবে। তেমনই আপনার ছেলে বিয়ের পর আমার ছেলের মতো আদর পাবে। 

-“বেশ! আর দ্বিতীয় শর্ত?”

-“আপাতত আজ রাতটা আপনাদের মা ছেলেকে আমার বাড়িতে কাটাতে হবে।”

এবার সুজাতা নড়ে বসেন, “সে কি কথা! না না কোনো দরকার নেই! আমি এসেছি একদিনের জন্য,আজ রাতটুকু থাকবো কাল সকালের বাসে ফিরে যাবো। শুধু শুধু আপনাদের কষ্ট হবে। আমি অভীকের কলেজেই গার্জেন কোয়ার্টারে থেকে যাব। একটা রাতের তো ব্যাপার!”

রজতাভ হেসে বলেন, “কোনো কষ্ট হবে না। আমাদের বাড়িটা এমনি ফাকাই পড়ে থাকে। বলতে গেলে আমরা বাপ-বেটিতে হানাবাড়িতে থাকি। চলুন না! আজ না হয় গল্প করে কাটাবো সবাই মিলে। লোকজন থাকলে বাড়িটাও সরগরম থাকবে। তাছাড়া আপনি আমাদের অতিথি কাম আমার হবু বেয়ান। এটুকু যদি না করতে পারি তাহলে কী করলাম?তাছাড়া ঐশীও ভীষণ খুশি হবে। ঐশীর জন্য চলুন প্লিজ!”

বলে ঐশীদের ডেকে প্রস্তাবটা দিতেই অভীক একটু কিন্তু কিন্তু করতে থাকে।‌ ঐশী এককথায় রাজি হয়ে খুশিতে ওর বাপিকে জড়িয়ে ধরে। তারপর বলে, “ সাউন্ডস গুড! এই কারনে বাপিকে আমি এত্তটা ভালোবাসি! প্লিজ আন্টি চলুন না! আমাদের বাড়িতে নাহয় আজ রাতটা থাকবেন! আমার রুমে কোনো অসুবিধে হবে না আপনার। তেমন হলে কাল সকালে আমি নিজে আপনাকে বাইকে করে বাসে তুলে দেবো! প্লিজ আন্টি না বলবেন না!”

ঐশীর আবদারে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন সুজাতা। তারপর অবশেষে মৃদু হেসে বলেন , “বেশ! চলো।"

(চলবে...)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...