অভীক হোস্টেলের রুমমেটকে জানিয়ে দিল সে আজ রাতে হোস্টেলে ফিরছে না। রুমমেট যেন তার খাবার না বানায়। চারজনে মিলে রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে গেলেন বিধান মার্কেটের দিকে। দিনের শেষে দেখা গেল ঐশীর সাথে সুজাতার ভাব বেশ গাঢ় হয়েছে। রজতাভ অবাক হয়ে দেখলেন একবেলার মধ্যে মেয়েটার পুরো ভোল বদলে গেছে। যে মেয়ে কোনোদিনও নিজের জন্য গয়না কেনে নি। জন্মদিন বা পুজোর সময় তাঁর আবদার রাখতে চেন, কখনো নেকলেস গলায় দিত,সেই মেয়ে ফুটপাথের এক দোকান থেকে একটা ঝুমকো পছন্দ করে কিনল! তাও আবার সুজাতাকে দেখিয়ে! যে মেয়ে বছরে একআধবার চোখে কাজল দেয়, সেই মেয়ে কসমেটিক্সের দোকানে গিয়ে সুজাতাদেবীর পরামর্শে একগাদা কসমেটিক্স কিনল! বিল পেমেন্ট করার সময় তিনি সুজাতাদেবীর কথা শুনতে পাচ্ছিলেন, “মেয়েদের ওরকম শ্রীহীন মুখ করে থাকতে নেই! মাঝে মাঝে অল্পসল্প সাজতে হয়। কাউকে দেখানোর বা কোনো অকেশনের জন্য নয়! নিজের জন্য, মনের খুশির জন্য! বুঝেছ মেয়ে? এমনিতে তোমাকে হাল্কা মেকাপে মানালেও মাঝে মাঝে নিজের জন্য সাজতে ক্ষতি কী? কেউ তো দেখছে না! নিজেকে একবার সাজিয়েই দেখ না, দেখবে নিজেকে নতুনভাবে আবিস্কার করেছ। নিজেকে আবিস্কার করার, সাজানোর আলাদা মজা আছে। মন খারাপ?সকাল থেকে মেজাজ খিঁচড়ে আছে?আয়নার সামনে বসে হাল্কা করে সেজে নাও। দেখবে মনখারাপ উবে গেছে। নিজেকে সাজতে দেখে মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। তোমার বাপি, অভি এমন কী পৃথিবীর কোনো পুরুষ এই আনন্দটা উপলব্ধি করতে পারেনা বলেই বোঝে না আমরা সেজে কী আনন্দ পাই? তাছাড়া এগুলো তোমার দরকার। রোদে, ধুলোয় ঘুরে ঘুরে চেহারার বারোটা বাজিয়েছ। গালে ব্রণ দেখা দিয়েছে,চোখের কোণে কালো দাগ। ঠোট ফেটে গেছে। সত্যি করে বলবে! নিজের স্কিনের যত্ন নাও না তাই না?অভি এগুলো দেখতে পায় না? ওর তো উচিত এসব কিনে দেওয়া।”
অভীক গলা নামিয়ে বলেছিল, “হুম কিনে দিই আর ও ক্যাৎ করে একটা লাথি মেরে দিক।” সুজাতা হেসে বলেছিলেন, “বেশ করে!তোর দম আমার জানা আছে! জানো ঐশী আমার বাড়ি থেকে বাজার বেশী নয় এই মিনিট দুয়েকের পথ। তো একবার বাবুকে পাঠিয়েছি সয়াবিনের বড়ি আনতে। ও কী এনেছিল জানো? এত বড়ো একটা সয়াসসের বোতল!” বলে মুচকি হেসেছিলেন সুজাতাদেবী। ঐশী মুখ ভেটকে বলেছিল, “সাধে বলি? ক্যালাস! পুরো ক্যালাস!”
মার্কেট থেকে কেনাকাটা করে, ফুটপাথের স্টলে স্টিম মোমো খেয়ে রজতাভর বাড়িতে যখন ওরা পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যে গড়িয়ে প্রায় রাত হয়ে গেছে। রাতের খাবার নিয়ে বেশী ঝক্কি পোয়াতে হল না রজতাভকে। ফ্রিজে ম্যারিনেট করা চিকেন ছিল সেটাকেই রান্না করা হল। ঐশী চটপট করে আটা মেখে রুটি তৈরী করে নিল। সুজাতাদেবী সাহায্য করার জন্য রান্নাঘরে যেতে চাইতেই বাবা-মেয়ে রে রে করে উঠল। রজতাভ সুজাতার পথ আগলে বললেন,“আপনি না আমাদের অতিথি? অতিথিকে দিয়ে কেউ কাজ করায়?অতিথি নারায়ণ বলে কথা! পাপ লাগবে তো!”
-“কিন্তু তাই বলে এভাবে বসে থাকাটাও তো দৃষ্টিকটু! খামোখা একজন অচেনা আগন্তুকের মতো হুট করে এসে আপনাদের ঝামেলা বাড়িয়ে দিলাম। আমার জন্য আপনাদের শুধু শুধু হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হচ্ছে এটা দেখার পরেও শুধু বসে থাকবো নাকি?”
-“ হ্যাঁ বসে থাকবেন! আর আপনার কথার উত্তরে বলতে পারি আপনি অচেনা আগন্তুক নন। চেনা লোক!আর ঝামেলার কিছু নেই! আপনি না এলেও আমাদের হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হত। ও নিয়ে ভাববেন না। আমাদের বাপ-বেটির অভ্যেস আছে। ”
-“কিন্তু রজতাভ! এতগুলো লোকের রান্না!”
-“কোথায় এত লোক? মাত্র তো চারজন আমরা!নিজেকে একদিন ছাড় দিন না সুজাতা! রোজই তো সারাদিন স্কুলে কাটিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে বাজার করে বাড়ি ফিরে হাত পুড়িয়ে রান্না করেন। একদিন নাহয় নিজেকে ছুটি দিলেন এই হেঁসেল থেকে! কাল নাহয় ফিরে আবার দাঁড়াবেন আগুনের সামনে। আর সাহায্য করেও লাভ কী? সেই তো কাল আবার আমাদেরকেই হাত পোড়াতে হবে। তার চেয়ে বরং আপনি ঐশীর ঘরে গিয়ে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিন। সারাদিন জার্নির ধকল গেছে একটু জিরিয়ে নিলে ভালো লাগবে। ঐ যে বাদিকের ঘরটা, দরজায় ময়ূরের ছবি আছে। ওটা ঐশীর ঘর। যান ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি ততক্ষণ এদিকটা সামলাচ্ছি। ভয় নেই! আমার রান্না আপনার মতো অতো ভালো না হলেও চালিয়ে নেওয়ার মতো। তাছাড়া হবু কুটুমের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন একটু সেবাটেবার সুযোগ দিন! কোথায় পায়ের উপর পা তুলে হুকুম করবেন, আরাম করবেন,তা না উনি এলেন সাহায্য করতে! কী শাশুড়ি হবেন আপনি?”
-“কিন্তু বিনা পরিশ্রমে অর্জিত খাবার আমার মুখে রোচে না রজতাভ! নিজে বাছাই করে সবজি, মাছ কিনে নিজের মতো রান্না করে খাবার সুখ কী...!”সুজাতার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রজতাভ বললেন,“সেটা ভালো করেই জানি বলেই হাত পুড়িয়ে রান্না করি! অন্যের হাতের রান্না পছন্দ হয় না বলে কাউকে হেঁসেলে ঢুকতে দিই না। ঐশীকেও এখানে ঢোকার জন্য আমাকে কনভিন্সড করার জন্য পরীক্ষা দিতে হয়েছে!ওসব অনেক বড়ো গল্প। আপাতত যান স্নানটা সেড়ে ফেলুন। আজ ভীষণ গরম পড়েছে। রান্না হলেই ডাকা হবে। ওদিকে বোধহয় চিকেনটা কড়াইয়ের তলায় লেগে গেল!”
-“উফ! আপনার সাথে কথায় পাল্লা দেওয়া অসম্ভব!”
-“ তো জানেনই যখন বাকযুদ্ধে নেমেছেন কেন?শুনুন! যত দেরী করবেন, রান্নায় তত দেরী হবে আর রান্নায় দেরী হলে খেতে দেরী হবে! অগত্যা দেরী না করাই ভালো!যান যান স্নান করে নিন! ওদিকে মাংসটা কড়াইতে লেগে গেল মনে হয়! ঐশীরে! মাংসটা দেখ!”
বলে রান্নাঘরে ছুটে গেলেন রজতাভ। সুজাতা কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে পরক্ষণে মুচকি হেসে চলে গেলেন ঐশীর ঘরে।
বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের তলায় দাঁড়াতেই একটা তৃপ্তির ঢেউ খেলে গেল সুজাতার আপাদমস্তক জুড়ে। সত্যিই আজ ভীষণ গরম পড়েছে!পাহাড়ে থাকাকালীন এই গরমটা তেমন টের পান না তিনি। সেখানে তিনটে কালই বিরাজ করে শীতকাল, বর্ষাকাল, আর শরৎকালের মতো নাতিশীতোষ্ণ কাল। দিনে হাল্কা সুতির পোশাক পরে কাজ চালালেও রাতে কম্বল লাগে। শাওয়ারের তলায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। শীতল বারিধারা ক্রমশ তাঁর সারাদিনের ধকল, ক্লান্তি ধুয়ে দিতে লাগল।
স্নান সেরে একটা নাইটির উপর সুতির হাউজকোট চাপিয়ে নিলেন সুজাতা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলেন এরমধ্যে ঐশী গোটাঘর গুছিয়ে রেখে বিছানার চাদর পাতছে। বিছানার চাদর পাতার পর মাথার বালিশ গুছিয়ে দিয়ে ঐশী বলল,“আন্টি! বিছানা তৈরী হয়ে গেছে!আপনি রেস্ট নিন। খাবার সময় হলে আমি ডাকবো।”
বিছানায় বসে সুজাতা ঐশীর হাত ধরে বলেন,“আমার ভীষণ লজ্জা করছে জানো? হুট করে তোমার বাবার কথা শুনে রাজি হয়ে বিপদে ফেলে দিলাম তোমাদের! আমার জন্য অসুবিধে হয়ে গেল তোমাদের। তোমরা হেল্পও করতে দিচ্ছ না। আমার ভীষণ গিল্টি ফিল হচ্ছে।” ঐশী বিছানায় বসে বলল,
-“আমাদের কিচ্ছু মনে হচ্ছে না আন্টি! বরং মজা লাগছে এই ভেবে যে অনেকদিন পর বাড়িটা আবার গমগম করছে। কতদিন হল আত্মীয়-স্বজনরা আসে না। বন্ধুবান্ধবরাও এখন যে যার কাজে ব্যস্ত। বাড়িটা ভীষণ ফাঁকা লাগে। মনে হয় এই চারটে দেওয়াল যেন গিলতে আসছে আমাকে। তাই তো সারাদিন বাড়িতে থাকি না আমি। সকালে বেরোই কলেজে। ফেরার পথে ক্যারাটে ক্লাসে ঢুকি। স্টুডেন্টদের ক্যারাটে শেখাই। বিকেলটা কটা টিউশনি পড়িয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে কোনোমতে দুটো রুটি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। সে যাকগে! আজকে কিন্তু আমরা অনেক গল্প করব! অভীকের অনেক কথা তোমাকে জানানোর আছে। আচ্ছা আমি এখন গেলাম। বাপি ওদিকে একা আছে। আপনি রেস্ট নিন। এসিটা চালানো আছে। আলোটা নিভিয়ে দেব?”
সুজাতা মাথা নাড়তেই ঘরের নাইটল্যাম্প জ্বালিয়ে ঝড়ের মতো বেরিয়ে যায় ঐশী। সুজাতা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন অন্ধকারে। তারপর নরম বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে চোখ লেগে আসে তাঁর। সারাদিনের ক্লান্তিতে ক্রমশ ঘুমের দেশে তলিয়ে যেতে যেতে আচমকা তাঁর মনে হতে লাগল কে যেন তাকে খুব কাছ থেকে ডাকছে। গলার স্বরটা তাঁর খুব চেনা। খুব চেনা স্বরে কে যেন ডাকছে তাকে। “সুজাতা! সুজাতা! সুজাতা!”
********
-“কাম অন সুজাতা! হানিমুনে বেড়াতে এসে ওভাবে পাড়ে বসে থাকলে চলবে? লোকে কী ভাববে? আমি কি একা স্নান করবো নাকি? এসো না! ইট উইল বি ফান!”
-“না না! আমি এখানেই ঠিক আছি।”
-“ও কাম অন সুজাতা! তোমার কথাতেই হানিমুনে দীঘা বেড়াতে এলাম আর তুমিই কিনা শেষে সমুদ্রে ভয় পাচ্ছ?
-“ভয় পাচ্ছি না আমি।”
-“তাহলে? সমুদ্রে নামছো না কেন?”
-“এমনি ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া কাল সারারাত জেগে জার্নি করে আমি ভীষণ টায়ার্ড তথাগত। আমি বরং কাল নামবো। এই দেখো মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে পড়ল! স্নান করো না তুমি!কে মানা করেছে? তুমি স্নান করলে আমাকেও করতে হবে কোথায় লেখা আছে? তাছাড়া আমরা পাঁচ দিন আছি দীঘাতে! সবে তো এলাম। একটু জিরোতে দাও! আরে কাল আমিও নামবো তো নাকি?”
-“বেশ তবে আমিও কাল নামবো!"
বলে সুজাতার পাশে ভিজে বালিতে বসে পড়ে তথাগত।”
-“দেখো কান্ড ছেলের! আরে আমি কি মানা করেছি নাকি? যাও না স্নান করে এসো। কাল আমিও নামবো তোমার সাথে।”
-“কাল হলে আজ নয় কেন?” বলে সুজাতার দিকে তাকায় তথাগত।
-“বললাম তো কারনটা। মাথাটা ভীষণ ধরেছে। কাল রাতে বাসের জানলার হাওয়াটা সরাসরি মাথায় লাগায় একটু সর্দি সর্দি ভাব এসেছে তাই।”
-“সেকি!” বলে সঙ্গে সঙ্গে সুজাতার কপালে গলায় হাত ঠেকায় তথাগত। দেখে সুজাতার গায়ে বেশ জ্বর। উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, “আগে বলো নি কেন? উফ! সু! তুমি না! আগে বললে বেরোতাম না। তেমন হলে প্যারাসিটামল দিতে পারতাম। না না আর এখানে থাকা ঠিক হবে না। সমুদ্রের হাওয়ায় সর্দি বাড়তে পারে। চলো আমরা হোটেলে ফিরে যাই।”
উদ্বিগ্ন তথাগতকে দেখে হেসে ফেলে সুজাতা। তারপর বলে,
-“চিন্তা করার কোনো কারন নেই মশাই! প্যারাসিটামল খেয়েই বেরিয়েছি। তাছাড়া জানোই তো আমার ঠান্ডার ধাত আছে। সর্দিগর্মি সহ্য হয় না। ও কিছু হবে না।”
-“তুমি চুপ করো! তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি! ‘ও কিছু হবে না' বলে পরে ভোগান্তি শুরু হয়। এখন সর্দি হচ্ছে পরে সেটা জমে মাইগ্রেনের ব্যথাটাও ধরবে। চলো আর বসতে হবে না। হোটেলে ফিরে যাই! রাস্তায় মেডিক্যাল শপ পেলে অ্যান্টিবায়োটিকও নিতে হবে। প্রোটেকশনটাও নিতে ভুলে গেছি তাড়াহুড়োয় সেটাও নিতে হবে।”
চারদিকে একবার সন্ত্রস্তভাবে তাকিয়ে তথাগতর হাতে একটা চাপড় মেরে বলে,“অ্যাই! ওভাবে অসভ্যের মতো চিৎকার করছো কেন! আশেপাশের লোক আছে তো নাকি?”
চারদিকে একবার অবজ্ঞার সাথে তাকিয়ে তথাগত বলে, “তাতে কী হয়েছে? বউকে নিয়ে হানিমুনে এসেছি তীর্থ করার জন্য নাকি? নাকি সাইটসিন করতে এসেছি?প্রোটেকশন তো লাগবেই!”
-“ইশ! অসভ্য কোথাকার! কেমন চিৎকার করছে দেখ! এই কারনে তোমার সাথে বেড়াতে যাই না।”
-“কী করি বলো তো? জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে জংলী হয়ে গেছি! আর জংলীদের খিদে কেমন হয় জানো না? আমাদের পেটে যেমন খিদে, তলপেটেও তেমনই...." বাকিটা বলার আগে দুহাত দিয়ে তথাগতর মুখ চেপে ধরে সুজাতা। কিন্তু বলিষ্ঠ চেহারার তথাগতর সাথে পারে না সে। তথাগত উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় কোলে তুলে নেয় সুজাতাকে। সুজাতা লজ্জায় বলে ওঠে, “ কি করছোটা কী? সবাই দেখছে তো! নামাও!”
তথাগত সুজাতার কোনো কথা না শুনে বলে, “জ্বরের একটা টোটকা কী জানো? হয় জলপট্টি, নাহয় ঠান্ডা জলে স্নান। ” বলে সুজাতার কোনো আপত্তি না শুনে সমুদ্রের জলে নেমে যায়। সুজাতা প্রথমে তথাগতর উপর রাগ করলেও পরে মেতে ওঠে জলক্রীড়ায়।
অনেকক্ষণ পর দুজনে যখন পাড়ে ফিরে এল। সুজাতা সত্যিই থর থর করে কাঁপছে আর হাসছে। তথাগত ওকে কোনোমতে হোটেলে নিয়ে গেল। নিজেদের রুমে ঢুকে চট করে ভেজা পোশাক খুলে তোয়ালে দিয়ে ভালো করে মুছে দিল সুজাতার মাথা, ওর সর্বাঙ্গ। আর মোছার পরেই সুজাতা এলিয়ে পড়লো বিছানায়। তথাগত সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় রাখা কম্বল দিয়ে ঢেকে দিল সুজাতার আপাদমস্তক। তথাগত বুঝতে পারল সুজাতার বারণ সত্ত্বেও ওকে জোর করে সমুদ্রে স্নান করানোটা উচিত হয় নি। কাজটা ভুল হয়েছে বুঝতে পেরে মনে মনে ভীষণ অনুতপ্ত হল সে।
ওষুধের কৌটোটা ড্রেসিং টেবিলের সামনেই রাখা ছিল। সেখান থেকে প্যারাসিটামলের পাতা বের করে ট্যাবলেট নিয়ে বিছানার কাছে এসে সুজাতাকে কোনো মতে তুলে খাইয়ে দিল। ওষুধটা খাওয়াবার সময় তথাগত টের পেল সুজাতার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। তথাগত সঙ্গে সঙ্গে সুজাতার পায়ের পাতা, হাতের চেটো ঘষতে লাগলো। সুজাতার জ্বর তাতেও কমছে না দেখে কী করবে ভাবছে এমন সময় তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে চটজলদি নিজের ভিজে পোশাক ছেড়ে বাথরুমে ঢুকে গেল সে। ঠান্ডা জলে স্নান সেরে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে ঢুকে গেল সুজাতার কম্বলের ভেতরে। জড়িয়ে ধরল সুজাতার জ্বরে তপ্ত অচৈতন্য নগ্ন দেহটাকে আষ্টেপৃষ্টে!বরফের মতো ঠান্ডা শরীরে শুষে নিতে লাগল সুজাতার প্রচণ্ডজ্বরের ফলে সৃষ্ট তীব্র লীনতাপ। আর অশ্রুসজল চোখে বলতে লাগল, “আই অ্যাম সরি সু! আর এরকম ভুল হবে না! আর আমি তোমার অবাধ্য হবো না। তুমি শুনতে পারছ? সু? সুজাতা! সুজাতা?”
******
-“সুজাতা?”
ডাকটা শুনে ঘুম ভাঙলো সুজাতার। চোখ মেলে দেখলেন রজতাভ মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘুমের ঘোরে কোথায় আছেন প্রথমে বুঝতে না পারলেও কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হতেই উঠে বসলেন তিনি।
-“ সরি! আসলে একটু চোখ লেগে গিয়েছিল।”
-“সেকারনেই আপনাকে ডিস্টার্ব করি নি। খাবার তৈরী হবার পর ঐশীকে পাঠিয়েছিলাম আপনাকে ডেকে পাঠাতে। ঐশী বলল আপনি ঘুমোচ্ছেন তাই ভাবলাম আপনাকে বিরক্ত করা আর ঠিক হবে না। ওদের খাইয়ে দিয়ে আপনাকে ডাকতে এলাম।”
-“সেকি! কটা বাজে? এবাবা! এগারোটা বেজে গেছে! ইশ এতক্ষণ ধরে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছি একবার ডাকবেন তো! ইশ! ছিঃ! ছিঃ! লোকের বাড়িতে এসে এভাবে হ্যারাস করলাম!আপনাদের খাওয়ার দেরি হয়ে গেল!”
-“আবার আপনি ভুল করছেন সুজাতা! এটা লোকের নয় আপনার কুটুমবাড়ি। দ্বিতীয়ত হ্যারাসমেন্টের কিছু হয় নি। কারন ঐশীর ফিরতে ফিরতে প্রায়ই রাত হয় আর এসময়ই আমরা খেতে বসি। কাজেই বেশী দেরী হয় নি। আর আপনার পরের প্রশ্নটার উত্তর আগেই দিয়েছি! ওরা খেয়ে নিয়ে ড্রইংরুমে আড্ডা মারছে। বাকি রইলাম আমি আর আপনি। চোখে মুখে জল দিয়ে চটপট চলে আসুন। আমি খাবার বেড়ে রাখছি।” বলে বেড়িয়ে গেলেন রজতাভ।
কিছুক্ষণ পরে দুজনে মিলে রজতাভর বানানো রুটি আর চিকেনের কারি খেয়ে নিয়ে জমিয়ে বসলেন বৈঠকখানায়। ধীরে ধীরে আড্ডা জমে উঠল চারজনের মধ্যে। নানা বিষয় নিয়ে চলতে লাগল আড্ডা। রাজনীতি থেকে বিনোদন, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে আবহাওয়া। ক্রমশ রাত বাড়তেই ঐশী আর অভীক যে যার ঘরে শুতে চলে গেল। বৈঠকখানায় বসে রইলেন রজতাভ আর সুজাতা। কথায় কথায় প্রসঙ্গ উঠল তথাগত, ঊর্মির। সেই কথা প্রসঙ্গেই রজতাভ বললেন, “জানেন? ঊর্মি সব সময় বলতো আমার মতো মানুষ নাকি দুটো নেই। আমি যেমন মানুষকে ম্যানুপুলেট করতে পারি তেমন নাকি তাকে দিয়ে কাজও করাতে পারি। আমি মানতে চাইতাম না।”
-“ভুল তো কিছু বলতেন না! আপনি সত্যিই তা করতে পারেন। এইতো আমার এখানে আসার পরিকল্পনা ছিল না। আপনি নিয়ে এলেন বাধ্য করে। শুধু কি তাই? এই যে আপনাকে হেল্প করতে চাইলাম আপনি কি করলেন? আমাকে কথার প্যাঁচে ফেলে বিশ্রাম নিতে পাঠিয়ে দিলেন। তবে আপনার দোষ নেই! তথাগতও তাই বলত আমায়! ‘সুজাতা! তোমাকে বোকা বানানো সহজ নয়। তবে ম্যানুপুলেট করা সম্ভব!যে কেউ করতে পারে! তাই সাবধান থেকো।’ অবশ্য ওর তো আর জানা ছিল না যে ন্যাড়া একবারই গাছ তলায় যায়। আমিও একবারই ঠকেছিলাম! তারপর আর কেউ পারেনি। ”
-“যাহ আপনাকে কে ঠকাতে পারে? আপনার মতো একজন বিচক্ষণ মহিলাকে ঠকিয়ে কার কী লাভ?”
-“ অথচ ঠকেছিলাম জানেন? তার উপর বিশ্বাস করে ভীষণ ঠকে গিয়েছিলাম। সে আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল বাঁচার,জীবনকে নতুন করে খুঁজে পাবার দিশা দেখিয়েছিল। কিন্তু যখন বুঝেছিলাম এই সব স্বপ্ন মিথ্যে। সে শুধু আশ্রয়ের খোঁজে আমার কাছে এসেছে। নিজের ক্ষত নিরাময় করতে এসেছে বিশ্বাস করুন ভালোবাসার উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। যাবার সময় সে কি বলে গিয়েছিল জানেন? ‘ভালোবাসা কখনও সত্যি হয় না। সকলকে ভালো রেখে চলার মিথ্যে মূকাভিনয় ছাড়া ভালোবাসা আর কিছুই নয়।’ তখন বয়স কম ছিল এসবের মানে বুঝিনি আজ বুঝি। তবে একটাই আক্ষেপ থেকে গেল জানেন? যে মানুষটা আমার কাছে সুখের খোঁজে এসেছিল। সে মানুষটা নিজে সুখ পেল কিনা জানা যায় নি। অথচ আমি সুখ পেয়েছি প্রচুর!” বলে মুচকি হাসেন সুজাতা ।
-“আচ্ছা যদি কোনোদিন এমন হয় যে মানুষটা একদিন আপনার কাছে এল। নিজের ভুলের ক্ষমা চাইতে। তাকে ক্ষমা করতে পারবেন?”
-“ এতবছর পর সে যদি সত্যিই অনুতপ্ত হয় তাহলে ক্ষমা করতে পারি। কারন সে আমাকে ছেড়ে গেলেও ফেরত দিয়ে গিয়েছিল আমার সংসারটাকে। যে মানুষ নিজের বিনিময় সংসার ফিরিয়ে দেয়,ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয় তাকে ক্ষমা করাই যায়। কিন্তু সে ক্ষমাটা যে অন্তর থেকে হবে না রজতাভ! কারন সে নিজের সাথে আমাকেও পাঁকে নামিয়েছিল।”
-সুজাতা...! মানে আমি... বলতে চাইছিলাম যে...!”
সুজাতার মুখ পলকে গম্ভীর হয়ে যায়। সোফায় সোজা হয়ে বসেন তিনি।
-“ প্লিজ রজতাভ। দয়া করে আর পুরোনো অতীতটাকে মনে করাবেন না। অনেক কষ্টে অতীত থেকে বেড়িয়ে এসেছি আমি। সেই মুহূর্তগুলো প্রথমে সুখের হলেও পরে তার বিষ আমাকে সারাজীবন অন্তর্দহনে জ্বালিয়েছে। প্রতি রাতে সেই আগুনে পুড়ে কষ্ট পেয়েছি। প্লিজ সেই আগুনে উসকে দেবেন না। অতীতটাকে মনে করে কষ্ট পেয়ে আর লাভ নেই। আর আমি পেতেও চাই না। কিছু জিনিস একান্ত ব্যক্তিগত থাকাই ভালো। তারচেয়ে বরং বর্তমানে আমরা কেমন আছি সেটা নিয়ে ভাবাটাই বড়ো কথা। আমি তো বেশ সুখে আছি। ছেলের বিয়ে বলে কথা! ”
-“কিন্তু...!”
-“অনেক রাত হল রজতাভ। আমার ঘুম পাচ্ছে। কাল সকাল সকাল ফিরতে হবে আমায়। আপনিও নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।” বলে উঠে পড়েন সুজাতা। পায়ে পায়ে এগিয়ে ঐশীর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। রজতাভ কিছুক্ষণ সুজাতার যাওয়ার পথে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিয়ে বসেন।
(চলবে...)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন