“Ladies and gentlemen, may I
have your attention please? Thank you! আজ আমরা সকলে এখানে উপস্থিত
হয়েছি আমার প্রিয় বন্ধু প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী তথা লেখক প্রদীপ্ত সেনগুপ্তর নতুন
বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানে। আপনারা সকলেই জানেন এই Modern Abstract Art-এর যুগেও যে সব শিল্পীরা Classical Art-এর ধারা আজও
বজায় রেখেছেন তাদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য নাম হল প্রদীপ্ত সেনগুপ্ত। ওর আঁকা ‘Calcutta
Diaries ’, ‘Memories of Monsoon’, ‘Devi in Footpath’ ইতিমধ্যে
সাড়া ফেলে দিয়েছে শিল্পঅনুরাগীদের মধ্যে। শুধু তাই নয়, একজন
ইলাস্ট্রেটর হিসেবে বেশ কিছু বইয়ের অলঙ্করণের কাজও নজর কেড়েছে পাঠকমহলে। কিন্তু
আমার এই বন্ধুপ্রবরটি যে একজন ছবি আঁকিয়ে হওয়ার সাথে সাথে একজন ভালো লেখকও বটে,
সে কথা অনেকেরই অজানা।…”
স্টেজের সামনে বসে অভয়ের
কথাগুলো শুনতে শুনতে আনমনে হাই তুলছিল প্রদীপ্ত। অভয় ব্যাটা কথাগুলো বলে দারুণ, কিন্তু একবার
কারো প্রশংসা করতে শুরু করলে এমন রং চড়িয়ে বলে যে শ্রোতাদের মধ্যে আগে থেকেই একটা
এক্সপেক্টেশন তৈরী হয়ে যায়। অথচ ছাপানোর সময় বইটার বিষয়বস্তু নিয়ে সবার আগে সন্দেহ
প্রকাশ করেছিল অভয় নিজে।
*****
— অসম্ভব! এই
ট্র্যাশ লেখা আমি ছাপতে পারব না। মার্কেটে আমাদের পাব্লিকেশনের সামান্য হলেও একটা
ইমেজ আছে ভাই। এই বইটা পাবলিশ করলে সেটুকুও আর থাকবে না।
— তার মানে তুই
বলতে চাস এই লেখা ছাপলে কেউ পড়বে না।
— লেখা? কোথায় লেখা? এ তো কেচ্ছা! চটি বললেও ভুল হবে না।
মানে তুই আর সাবজেক্ট পেলি না? প্রেমের গল্প, রহস্য গল্প, ভূতের গল্প বাদ দিয়ে সোজা ইয়ের গল্প?
তাও আবার যার তার নয়, যার যার সাথে শুয়েছিস
তাদের সাথে তোর যৌনজীবনের গল্প! আবার প্রথম গল্পটাই জাহ্নবী
চক্রবর্তীকে নিয়ে! বইটা বেরোলে আমাদের কতটা হ্যারাসমেন্ট ফেস করতে হবে জানিস?
আর কেউ কিছু করুক বা না করুক, জাহ্নবী কিন্তু
তোকে ছেড়ে দেবে না। একটা বিচ্ছিরি স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে যাবি।
— সে কারণেই তো
স্থান-কাল-পাত্রের নাম পাল্টে দিয়েছি। তাছাড়া এটা তো ঠিক চটি
নয়। বলতে পারিস ইরোটিকার ধাঁচে Semi Auto-Biography লিখেছি।
— কিন্তু এই
সাবজেক্টই কেন? আর কোনো সাবজেক্ট ছিল না? আর তোর আত্মজীবনী মানে তো শুধু এই মেয়েগুলোর সাথে শোয়াটাই নয়!
শান্তিনিকেতনের কলাভবনে কাটানো ছেলেবেলার গল্প, যাদবপুর
ক্যাম্পাসে আমাদের কাটানো সেই দিনগুলো, তোর স্ট্রাগলিং
পিরিয়ড, আরো কত কিছু তো আছে! সেসব নিয়েও তো লেখা যেত।
— ও তুই বুঝবি না।
রহস্য গল্প, প্রেমের গল্পে প্লট হিসেবে তেমন কোনো নতুনত্ব
নেই। সেই হয় কোনো কাল্পনিক বা পৌরাণিক দেবী দেবতাকে নিয়ে রহস্য ফেঁদে জট পাকাও,
তারপর ওটাকে ছাড়াও। আর প্রেমের গল্পে তো কটা আবেগে গদগদ মুহূর্ত আর
কিছু Random সংলাপ
দিলেই গল্প হিট! কাজেই ও দুটো Genre আমার জন্য নয়। আর ভূতের
গল্প তো বাদই দিলাম। যে জিনিসটায় আমি বিশ্বাসই করি না সেটাকে নিয়ে গল্প লিখলে সেটা
কতটা খাজা হবে সে আমি জানি। আসল পরিশ্রম হয় ইরোটিকায়। আর এখানেই চটি আর ইরোটিকার মধ্যে বিশাল ফারাক। চটিতে দুটো চরিত্রের মধ্যে তুই
চাইলে যখন তখন রগরগে যৌন সুড়সুড়িমূলক সংলাপ কিংবা সরাসরি যৌনদৃশ্য যাকে বলে
Uncensored Sequence উপস্থাপন করতে পারবি। কিন্তু এই নিয়মটা ইরোটিকার বেলায় খাটবে না।
ইরোটিকায় তুই নিজের মতো করে পরিস্থিতিকে তৈরী করে চরিত্রদের সাজাতে পারলেও ওদের মধ্যে হওয়া ঘটনাক্রমটাকে যেমন তেমন করে সাজাতে পারবি না। এখানে তোকে পুরো দৃশ্যটাকে রূপক অর্থে
সাজাতে হবে। এর জন্য ভাষার উপর আর শব্দচয়নের উপর মারাত্মক রকমের
দখল চাই। মানে পাঠক বুঝতে পারবে যে দুটো চরিত্র সঙ্গমরত অবস্থায়
পরস্পরের দেহকে উপভোগ করছে, কিংবা কোনো চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা নারী চরিত্রের নগ্ন দেহের বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে অথচ শব্দচয়নের জোরে আর
গল্পের গতির-এর কারণে সেটাকে বিন্দুমাত্র অশ্লীল বলে মনে হবে না। এই জিনিসটা সকলে পারে না
বস! কারণ ইরোটিকা জিনিসটা এতটাই সুক্ষ্ম সুতোর উপর দাঁড়িয়ে যে একচুল এদিক ওদিক
হলে জিনিসটা বটতলার চটি হতে সময় নেবে না। লেখার জোরে ভীষণ বাজে কথাকেও শ্রুতিমধুর
করা যায় ব্রাদার! নাহলে এই পোড়া পৃথিবীতে কামসূত্র লেখা হত না। বিবর, প্রজাপতি, লেডি চ্যাটার্লিস লাভার–এর মতো কালজয়ী প্রাপ্তবয়স্ক সাহিত্য প্রকাশ পেত না। বুদ্ধদেব গুহ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা আর কলম ধরতেন না। অন্যান্য আর্টের মতো ইরোটিকাও এক
ধরনের আর্ট ব্রাদার। তফাৎ এই যে এই Genre-তে লেখার কেউ সাহস
করে না। তাছাড়া জাহ্নবী আমার সাথে যেটা করেছে সেটার একটা প্রতিকার না করা পর্যন্ত
আমার শান্তি হবে না। জনসমক্ষে বড্ড ভালোমানুষীর যে মুখোশটা ও পরে ঘুরে বেড়ায় সেই
মুখোশটা আমাকে খুলতেই হবে। লোকেও জানুক যাকে তারা পাশের বাড়ির মেয়ের নজরে দেখে,
ভালোবাসে সেই মানুষটা কত বড়ো সুবিধেবাদী আর লোভী। যাকে ওরা মাথায়
করে নাচে সেই মেয়েটা যে সুযোগ আর টাকা পেলে যার তার সাথে শুয়ে পড়তে পারে এটাও
জানুক সকলে! ও যে কত বড়ো ধড়িবাজ মহিলা সেটা জনগণকে জানাবার
সময় এসে গেছে।
— কিন্তু জাহ্নবী
যদি...
— আইনি পদক্ষেপের
কথা বলছিস তো? হবে না। ওর সাহস হবে না আমার বিরুদ্ধে কোনো
পদক্ষেপ নেওয়ার। নিজের ইচ্ছেতে কে কেচ্ছায় জড়াতে চাইবে বলতো? আরে বাবা পাবলিক ইমেজ বলেও তো একটা কথা
আছে নাকি? আমাকে ডিফেম করতে এলে উল্টে পাবলিক
বলবে “ও বাবা! গল্পের মেয়েটা তুমি? এটা
আসল ঘটনা? তার মানে তুমিও শুয়েছ এর
সাথে?” বিচ্ছিরি স্ক্যান্ডালে আমি জড়াবো না, জড়াবে ও। কেন জানিস? কারণটা
হল এই পোড়া সমাজে একটা ছেলে দশটা মেয়ের সাথে শুলে যেমন চরিত্রহীন হয়, একটা মেয়ে দশটা ছেলের সাথে শুলেও তেমনই চরিত্রহীন হয়। কিন্তু সমাজ
ছেলেটার দিকে আঙুল তোলে না। বরং তারা আঙুল তোলে মেয়েটার দিকে। আর জাহ্নবী এটা জানে বলে পাবলিকের কাছে নিজের ইমেজ ডাউন করতে চাইবে
না। বইপ্রকাশটাকে রীতিমতো নিমের পাঁচন গেলার মতো হজম করতে
হবে ওকে। সো সেদিক থেকে নো চাপ। তুই জাস্ট বইটা পাব্লিসড কর তো! বাকিটা পরে দেখা
যাবে।
*****
সেদিনের কথাগুলো ভাবতে
ভাবতে আচমকা প্রদীপ্তর খেয়াল হল ডায়াসে দাঁড়িয়ে অভয় বলছে, “ইরোটিকা জিনিসটা
এতটাই সুক্ষ্ম সুতোর উপর দাঁড়িয়ে যে একচুল এদিক ওদিক হলে জিনিসটা বটতলার চটি হতে
সময় নেবে না। লেখার জোরে ভীষণ বাজে কথাকেও শ্রুতিমধুর করা যায়। নাহলে এই পোড়া
পৃথিবীতে কামসূত্র লেখা হত না। বিবর, প্রজাপতি, লেডি চ্যাটার্লিস লাভার–এর মতো কালজয়ী প্রাপ্তবয়স্ক
সাহিত্য প্রকাশ পেত না। বুদ্ধদেব গুহ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা
আর কলম ধরতেন না। অন্যান্য আর্টের মতো ইরোটিকাও এক ধরনের আর্ট। তফাৎ এই যে এই Genre-তে লেখার কেউ সাহস করে না।”
কথাটা কানে যেতেই মনে মনে
ফিক করে হেসে ফেলে প্রদীপ্ত। তারপর অভয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে, “হতভাগা আমারই ডাইলগ ঝেপে আমারই বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানে বলা হচ্ছে! দাঁড়াও প্রকাশক
মশাই! বক্তৃতাটা একবার শেষ হোক তারপর তোমার হচ্ছে!”
বইপ্রকাশের অনুষ্ঠান শেষ
হবার পর সকলে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়ে হলের চারদিকে। পার্টির আয়োজক হিসেবে অতিথিদের
অভ্যর্থনা করার জন্য অভয় ছুটে বেড়াতে থাকে হলের প্রতিটা কোণে। ক্রমশ মানুষের
আড্ডা আর গসিপের উচ্ছ্বাসে গমগম করে ওঠে সমগ্র হলঘর। প্রদীপ্ত একটা অরেঞ্জ জুসের
গ্লাস নিয়ে ঘরের এককোণে বসে ভীড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে আর চুপচাপ তাড়িয়ে তাড়িয়ে
উপভোগ করে কতগুলো স্বার্থপর
মানুষের আড্ডাটাকে। স্বার্থপরের দল সব! আজ ভদ্রতার মুখোশ পরে হইহই
করে ফ্রিতে গিলতে চলে এসেছে। অথচ ওর Struggling Period-এর সময় এই মানুষগুলোই
ওর কাজের বিন্দুমাত্র কদর করেনি। বরং সিকিউরিটিকে দিয়ে অর্ধচন্দ্র দিয়েছে ওকে। আজ ওর
সাফল্য দেখে যতই ওরা গদগদ হোক না কেন? প্রদীপ্ত জানে ওর বইপ্রকাশ,
বা বইয়ের বিষয় নিয়ে এই লোকগুলো বিন্দুমাত্র উৎসাহী নয়। শতকরা ৯০%
এলিট পাবলিকদেরই তা থাকে না। বই তাদের কাছে জাস্ট একটা শোপিস মাত্র। জাস্ট শোকেসে
সাজিয়ে রাখলে আশেপাশের লোকজনের কাছে শোঅফ করা যাবে বলেই বই কেনে এরা। যে কারণে
সারাবছর কলেজস্ট্রিট প্রায় ফাঁকা হলেও বইমেলায় উপচে পড়া ভীড় হয় ফি বছর।
প্রকাশকেরাও এটা জানেন বলে তাদের স্টকে থাকা সবচেয়ে ঝলমলে বইটা বইমেলায় দারুণভাবে
প্রেজেন্ট করেন। আর এটা জানে বলেই সে এইভাবে বইপ্রকাশ করছে। জনপ্রিয় আর্টিস্টের
আঁকা ছবি তো সকলেই সাজিয়ে রাখে। এবার যদি সেই কালেকশনে আর্টিস্টের লেখা বই হয়
তাহলে তো সোনায় সোহাগা!
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে
জুসের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল প্রদীপ্ত। আচমকা একটা মহিলার কণ্ঠস্বরে ঘোরটা কাটতেই
সে তাকিয়ে দেখে ওর সামনে সুনেত্রা রায় এসে দাঁড়িয়েছে। সুনেত্রা এই শহরের একজন
উঠতি অভিনেত্রীদের একজন। ইন্ডাস্ট্রিতে ওর পাঁচ বছর হলেও ইতিমধ্যে দুটো মেগা
সিরিয়াল, চারটে ওয়েব সিরিজ, আর একটা সিনেমায় অভিনয় করে অনেকের
নজর কেড়েছে মেয়েটা। প্রদীপ্ত সুনেত্রার দিকে তাকাতেই মেয়েটা আবার বলে ওঠে,
“একা বসে আছেন যে?” প্রদীপ্ত মৃদু হেসে বলে
ওঠে, “প্রশ্নটা তো আমার করা উচিত। এত সুন্দর একটা বিকেলে
আপনার মতো একজন সুন্দরী একা কেন?” জবাবে মেয়েটা হেসে বলে,
“কী করব বলুন? কপাল মন্দ আমার। নাহলে এই
ভালোবাসার দিনেও একা একা ঘুরতে হয়?” প্রদীপ্ত মুচকি হেসে বলে,
“বলেন কী? এই ভালোবাসার শহরেও আপনার মতো
প্রেমিকা নিজের মনের মানুষ খুঁজে পায়নি?”
— পেলে কি আর
আপনাকে বিরক্ত করতাম নাকি মশাই?
— তাও বটে। অবশ্য
আমার কপালটাও আপনার মতোই পোড়া জানেন? লোকে বলে আমার মতো
বেরসিক মানুষ নাকি আর কোথাও নেই। যত প্রেম, যত প্যাশন সব ঐ
ক্যানভাসেই আঁকা থাকে। বাস্তবে আমি নাকি ভীষণ কাটখোট্টা আনরোমান্টিক মানুষ। প্রেম নাকি
আমার জীবনেই নেই।
— আপনি আর
আনরোমান্টিক? লোকে আপনাকে আড়ালে একালের রাজা রবি বর্মা বলে।
তিনি কেমন মানুষ ছিলেন জানেন তো?
— তাঁর বিন্দুমাত্র
গুণ পেলে তো বর্তে যেতাম মিস.রায়।
— সুনেত্রা ডাকলেও
আপত্তি নেই।
— আচ্ছা বেশ! কোথায়
ছিলাম যেন? হ্যাঁ রাজা রবি বর্মা। তাঁর বিন্দুমাত্র গুণ পেলে
তো বর্তে যেতাম সুনেত্রা। ওনার মতো প্রেমিক মানুষ সেকালে দুটো ছিল না। আর আমি?
একটা রসকষহীন আনরোমান্টিক একটা মানুষ। যে কিনা তাঁর আঁকা অনুকরণ করে
চলেছে প্রতিনিয়ত। খেয়াল করলে দেখবেন আমার সাম্প্রতিক কাজগুলোতে ওনার প্রভাব স্পষ্ট
বোঝা যায়।
— তা ঠিক। আপনার
এখনকার কাজে রাজা রবি বর্মার প্রভাবটা স্পষ্ট বোঝা যায়। তবে কী জানেন আপনার আগের
কাজ গুলো এখনকার চেয়ে বেশি ভালো ছিল? সত্যি কথা বলতে গেলে
আপনার প্রথমদিককার বেশ কিছু কাজ আমার ভালো লেগেছিল। তবে কাজগুলো এতটাই আন্ডাররেটেড
যে তেমন প্রচারে আসেনি। অথচ একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে আপনার আগের কাজগুলো আপনার
সাম্প্রতিক কাজের থেকে ফার বেটার।
— মানে? ঠিক বুঝলাম না।
— মানেটা হল আপনার
আগেকার কাজে ভাবনার অনেকটা পরিসর থাকতো। অনেকগুলো দৃশ্য থাকতো। একাধিক চিত্রের
মাধ্যমে একটা গোটা ল্যান্ডস্কেপ ফুটে উঠত ক্যানভাসে। একাধিক চিত্র এঁকে আপনি একটার
পর একটা লার্জার দ্যান লাইফ কনসেপ্ট ফুটিয়ে তুলতেন তুলি আর পেনসিলের আঁচড়ের
মাধ্যমে। এখনও তোলেন ঠিকই, বাট সেই আগের চার্মটা আর খুঁজে
পাই না। বরং একটা কেজো, নিরস ভাবটাই বেশি থাকে। যেন ভীষণ
তাড়াহুড়োয় শেষ করা।
প্রদীপ্ত এবার সুনেত্রার
দিকে ভালো করে তাকায়। বা বলা ভালো সুনেত্রাকে আপাদমস্তক জরীপ করে নেয় সে। ভীড়ের
মধ্যেও মেয়েটাকে একটু আলাদা বলে মনে হয় তার। চেহারাটা একটু বেটেখাঁটো হলেও বেশ চটক
আছে মেয়েটার মধ্যে। পরনের কালো শিফন শাড়ি আর ডিপনেক স্লিভলেস ব্লাউজে উপচে পড়ছে বাঁধভাঙা যৌবন।
প্রদীপ্ত সেদিকে একবার তাকিয়ে মনোনিবেশ করে মেয়েটার মুখের দিকে। মেয়েটার মুখটার
গড়ন ভারী মিষ্টি। পানপাতার মতো মুখের গঠন, পদ্মের পাপড়ির
মতো হাল্কা গোলাপি ঠোঁট, হাল্কা টিকালো নাক। তবে মেয়েটার
শরীরের চেয়েও বেশি আবেদনময় হল ওর চোখদুটো। মারাত্মক এক্সপ্রেসিভ অথচ ভীষণ মায়ায়
ভরা। সুনেত্রা, সার্থকনামাই বটে! সুনেত্রার দিকে তাকিয়ে
খানিকটা অবাক হয়ে প্রদীপ্ত বলে,
— হ্যাঁ, আসলে আগে ফ্রিল্যান্সার হবার কারণে আমি ছবি আঁকতাম মনের আনন্দে, ফলে কল্পনায় থাকা সব রং নিজের ইচ্ছে মতো উজার করে দিতাম ক্যানভাসে। পরে পাব্লিকেশন
হাউজে জব করার সময় নানারকমের ডেডলাইন আর রাইটার, এডিটরের পছন্দ-অপছন্দের কথা খেয়াল রাখার ফলে সেটা আর করা হয়ে ওঠত না। ইচ্ছে থাকলেও নিজের মতো ছবি আঁকতে পারতাম না। এডিটরের মন মতো ছবি
বা ইলাস্ট্রেশন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বা বলা ভালো তাড়াহুড়োয় এঁকে দিতে হত। পরে
জবটা ছাড়লেও দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলে সেই জিনিসটা থেকে গেছে। বাট আপনি বুঝলেন কী
করে? আপনিও ছবি আঁকেন নাকি? না মানে
এইভাবে আমার আঁকার বিশ্লেষণ করাটা একজন পোড়খাওয়া শিল্পী ছাড়া কারো পক্ষে সম্ভব
নয়।
— আঁকতাম। অনেক বছর
আগে। কলেজে পড়ার সময় আমার সাবজেক্টই ছিল ফাইন আর্টস।
— তাই নাকি?
তাহলে আঁকা ছাড়লেন কেন?
— ছাড়িনি তো! তবে আজকাল
আর বসা হয় না। সারাদিনের ব্যস্ত শিডিউল সামলে যখন বাড়ি ফিরি, আর ইচ্ছে করে না ক্যানভাসের সামনে দাঁড়াই।
— আমার পুরোনো
কাজের মধ্যে কোন কাজটা আপনার প্রিয় বললেন না তো।
— বললে বিশ্বাস
করবেন না। কারণ কাজটা সত্যিই ভীষণ আন্ডাররেটেড ছিল।
— বটে? তা কোন সিরিজটা শুনি?
— রাধারাণীর অভিসার
সিরিজ।
— হোয়াট?
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে
সুনেত্রার দিকে তাকিয়ে থাকে প্রদীপ্ত। স্বাভাবিকভাবেই ‘অভিসার’ সিরিজটা ওরও ভীষণ প্রিয় কাজ ছিল। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে প্রথম এক্সিবিশন,
প্রথমবার বাইরের লোকের কাছে নিজের শিল্পকে মেলে ধরা। যদিও এক্সিবিশন-টা তেমন সফল হয়নি তবে ওর কাজ অনেক গুণীজনের নজর কেড়েছিল। সেই দিনগুলোর কথা
ভাবতে ভাবতে প্রদীপ্ত বলে ওঠে,
— সে তো অনেক আগের
ঘটনা। তাও প্রায় বছরদশেক হবে। আমার একদম প্রথম দিকের কাজ! আপনার আজও মনে আছে?
— হুম। গোটা
সিরিজটার মূল কনসেপ্ট ছিল জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম্’। কাকতালীয়ভাবে যেটা আমারও
প্রিয় সাবজেক্ট ছিল। কলেজ লাইফে এই কনসেপ্টে অনেক পোট্রেট, ল্যান্ডস্কেপ
এঁকেছি। যদিও কোনোটাই আপনার মতো অতো ভালো নয়।
— ওয়াও! দ্যাটস
গুড! আপনার সাথে আলাপ করে বেশ ভালো লাগল সুনেত্রা। এই শহরে আপনার মতো একজন সুন্দরী
মহিলা আমার কাজের অনুরাগী, আমার কাছে এর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি
আর কিছু নেই।
— ইটস মাই প্লেজার
মি. সেনগুপ্ত।
— ইউ ক্যান কল মি
প্রদীপ্ত। আচ্ছা আমার একটা আবদার ছিল। অবশ্য আপনি যদি কিছু মনে না করেন।
— এমা! ছিঃ! ছিঃ!
মনে করার কী আছে? বলুন না!
— না মানে আপনার
যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আপনার আঁকা ছবিগুলো একটু দেখতাম আর কি।
— আপনি দেখবেন?
— ইচ্ছে তো আছে।
কিন্তু…
বলে থমকে যায় প্রদীপ্ত।
এইভাবে যেচে একজন সদ্যপরিচিত যুবতীর বাড়ি যেতে চাওয়াটা শোভন দেখায় না। অথচ বিষয়টা
ভীষণ প্রিয় বলে ভদ্রমহিলার আঁকাগুলো দেখার লোভটাও ঝেড়ে ফেলতে পারছে না সে।
সুনেত্রা সেটা বুঝতে পেরেই জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা আজ সন্ধ্যেবেলা আপনি কী করছেন?”
— তেমন কিছুই নয়।
ফাঁকাই আছি বলতে পারেন। কেন বলুন তো?
— না মানে তাহলে
একটা প্রস্তাব ছিল।
— কীরকম প্রস্তাব?
— বলছিলাম যে আপনার
তেমন আপত্তি বা কাজ না থাকলে পার্টি শেষে কিন্তু বেরিয়ে পড়তে পারি আমরা। যাবেন
নাকি?
সুনেত্রার প্রস্তাবে
হতবাক হয়ে যায় প্রদীপ্ত। নিজের কানকে বিশ্বাস হয় না তার। কোনোমতে নিজেকে সামলে সে
বলে, “কোথায়?” প্রদীপ্তর প্রশ্নের উত্তরে মুচকি হেসে
সুনেত্রা বলে, “অভিসারে!”
*****
— চমৎকার! মানে আমি
জাস্ট... এই আপনি এক্সিবিশন করেন না কেন বলুন তো? এত সুন্দর সুন্দর আর্টগুলো এখানে হেলায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে আর আপনি সেটা হতেও
দিচ্ছেন? That's not fair সুনেত্রা!
— জানি কিন্তু কী
করবো বলুন? পেশাগতভাবে আমি একজন সাধারণ পার্শ্ব-অভিনেত্রী।
আহামরি কিন্তু আয় হয় না আমার। কাজেই এক্সিবিশন করার মতো
সামর্থ্য বা অর্থ দুটোই আমার কাছে নেই। এদিকে প্যাশনটাও ছাড়তে পারি না। তাছাড়া
আঁকা আমার কাছে একটা stress relief-এর মতো। সারাদিনের ইঁদুর
দৌড়ের মাঝে একটুকরো শান্তি আর মন ভালো করার একটা মাধ্যম। যতই মনখারাপ হোক না কেন,
ক্যানভাসের সামনে রং তুলি নিয়ে দাঁড়ালে সমস্ত মনখারাপ ভুলে যাই
আমি। তখন কেন, কোন কারণে মনখারাপ হয়েছিল কিছু মনে থাকে না
আমার। আমি হারিয়ে যাই নিজের কল্পনায় থাকা দৃশ্যপটের জগতে। যাকগে বাদ দিন ওসব কথা।
নিজের প্রিয় শিল্পীকে নিজের কাজ দেখাতে পেরেছি এর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি আর কিছু হতে
পারে না।
কথা হচ্ছিল সুনেত্রার
ফ্ল্যাটের স্টুডিওতে দাঁড়িয়ে। পার্টিতে সুনেত্রার প্রস্তাবে প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পরে
লোভনীয় প্রস্তাবটা হাতছাড়া করতে মন চায়নি প্রদীপ্তর। কোন মতে অভয়কে ম্যানেজ করে
সুনেত্রাকে নিয়ে কেটে পড়েছিল সে। অভয় প্রথমে অবাক হলেও পরে মুচকি হেসে মাথা
নেড়েছিল। সে তার বন্ধুরত্নটিকে হাঁড়ে হাঁড়ে চেনে। প্রদীপ্তর কথা শুনেই সে
বুঝেছিল নির্ঘাত কোনো সুন্দরীর সাথে অভিসারে বেরোচ্ছে তার শিল্পী বন্ধুটি। তারপর
সুনেত্রাকে দেখে হাসিটা আরো চওড়া হয়েছিল তার। প্রদীপ্তকে চোখ টিপে ইশারা করে
অনুমতি দিয়েছিল সে। প্রদীপ্তরা বেরিয়ে যেতেই মুচকি হেসে সে বিড়বিড় করে আউড়ে
নিচ্ছিল প্রদীপ্তর খুবই প্রিয় দুটি পংক্তি, “রতিসুখসারে
গতমভিসারে মদনমনোহরবেশম্।/ ন কুরু নিতম্বিনি গমনবিলম্বনমনুসর তং হৃদয়েশম্।।”
সুনেত্রার ফ্ল্যাটে পৌঁছে
ওরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সোজা প্রবেশ করেছিল স্টুডিওতে। আর স্টুডিওতে প্রবেশ
করার সাথে সাথে ভেতরের দৃশ্য দেখে থমকে গিয়েছিল প্রদীপ্ত। তারপর মুগ্ধ হয়ে
তাকিয়েছিল ঘরে থাকা আঁকাগুলোর দিকে। গোটা ঘরে সুনেত্রার শিল্পকর্ম ছড়িয়ে ছিটিয়ে
আছে। ঘরের দেওয়ালের উপর গ্রাফিতি থেকে সুন্দর আলপনা, পটচিত্র থেকে ওয়াল আর্ট কোনোটাই
বাকি রাখেনি সুনেত্রা। এমনকি ঘরের এককোণে থাকা ডিভানের চাদরেও শিল্পের ছোঁয়া সুস্পষ্ট।
সুনেত্রা নিজের মনের মতো
করে সাজিয়েছে গোটা ঘরটাকে। ঘরের সাদা মার্বেলের মেঝে জুড়ে লাল রঙের একটা সুন্দর
মান্ডালা আর্ট করা হয়েছে। সেই আর্টকে ঘিরেই সাজানো সুনেত্রার আঁকা ক্যানভাসগুলো।
চিত্রগুলো প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা মনে হলেও একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে পরস্পরের
সাথে ওদের একটা যোগাযোগ আছে। আর সেই কারণেই চিত্রগুলোকে ক্রমান্বয়ে সাজানো হয়েছে।
ঠিক যেমনটা প্রথম প্রথম সে করত। ছোট ছোট চিত্রের সাহায্যে একটা বড়ো চিত্রের
নির্মাণ। প্রদীপ্তর মনে হচ্ছিল যেন সে ভুল করে কোনো exhibition-এ ঢুকে
পড়েছে। চিত্রগুলো দেখামাত্র সে বলে বসে, “চমৎকার! মানে আমি
জাস্ট... এই আপনি এক্সিবিশন করেন না কেন বলুন তো? এত সুন্দর সুন্দর আর্টগুলো এখানে হেলায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে আর আপনি সেটা হতেও
দিচ্ছেন? That's not fair সুনেত্রা!”
সুনেত্রার সাথে কথা বলতে
বলতে প্রদীপ্ত একটা ক্যানভাসের সামনে এসে দাঁড়ায়। এতগুলো চিত্রের মাঝে একটা সাদা
ক্যানভাস দেখে কিছুটা কৌতুহল হয় তার। কিছুক্ষণ চুপ করে ক্যানভাসটার দিকে থাকার পর
প্রদীপ্ত বলে ওঠে, “আচ্ছা একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
— বলুন।
— আচ্ছা এতগুলো
ছবির মাঝে এই একটা ক্যানভাস ফাঁকা কেন? না মানে ছবিগুলো যে ক্রমানুসারে সাজানো তাতে তো মনে হল আপনি ‘গীতগোবিন্দম্’-এর একটা বিশেষ সিন ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। আর আমি যতদূর আন্দাজ করতে পারছি
এটা সম্ভবত ‘গীতগোবিন্দম্’-এর সেই
রাসলীলার মুহূর্তটা। যখন রাধা কৃষ্ণের সম্মুখে আত্মসমর্পণ করবেন। কানাইয়ের চরণে
বসে উৎসর্গ করবেন নিজ মান, জীবন, নারীসুলভ
লজ্জা। আর কৃষ্ণ সাদরে গ্রহণ করবেন তাঁর রাধারানীকে। ক্রম
অনুযায়ী তো এখানে রাধা-কৃষ্ণের সেই অনুরাগের চিত্র থাকার কথা। সেটা আঁকেননি কেন?
— এমনি ইচ্ছে হয়নি।
— মানে? এত সুন্দর ছবিটা যে অসম্পূর্ণ থেকে গেল!
— সে যাক। সম্পূর্ণ
হয়ে গেলেই তো সব শেষ!
— কিন্তু তাও কেমন
যেন লাগছে আমার। ওটা থাকলে ভালো হত।
— জানি। কিন্তু
রাধাকৃষ্ণ আঁকতে হলে যে মডেল লাগবে মশাই। এমনি এমনি তো আর করা যেতে পারে না।
তাছাড়া ওটা নিয়ে আমার আলাদা প্ল্যান আছে।
— কী প্ল্যান?
মুচকি হেসে সুনেত্রা বলে, “সেটা তো বলা
যাবে না। বলতে পারেন ওটা আমার একান্ত গোপনীয় ইচ্ছে।” প্রদীপ্ত
কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে থাকে সুনেত্রার দিকে, তারপর একটা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনোনিবেশ করে পরের ছবিটার দিকে। সুনেত্রা কিছুক্ষণ স্টুডিওর সামনে
দাঁড়িয়ে থাকার পর বেরিয়ে আসে।
ছবি দেখার পালা শেষ হলে
প্রদীপ্ত স্টুডিও থেকে বেরিয়ে বৈঠকখানায় বসতে গিয়ে দেখে এর মধ্যেই সুনেত্রা ওদের
দুজনের জন্য কফি বানিয়ে ফেলেছে। সেন্টার টেবিলে প্লেটে সাজানো রয়েছে একাধিক কুকিজ, কেক, মিষ্টি। এতগুলো খাবার দেখে বিব্রত হয় সে।
— আরে করেছেনটা কী?
এতগুলো খাবার কে খাবে?
— এই প্রথমবার আমার
বাড়িতে এলেন। সামান্য কিছু মুখে না দিয়েই চলে যাবেন তা আবার হয় নাকি?
— তাই বলে এত
খাবার!
— কোথায় এত?
এ তো সামান্য খাবার। এইটুকুতে কিছু হয় না।
বলে একটা কফিমাগ আর
কুকিজের প্লেটটা প্রদীপ্তর দিকে এগিয়ে দেয় সুনেত্রা। প্রদীপ্ত একটা দীর্ঘশ্বাস
ফেলে মৃদু হেসে কফিমাগটা তুলে নেয়। তারপর একটা চুমুক দিয়ে বলে, “বললেন না তো!
ক্যানভাসটা নিয়ে আপনার কী প্ল্যান?” সুনেত্রা মৃদু হেসে বলে,
“বললাম তো! ওটা আমার একান্ত গোপনীয় ইচ্ছে। যাকগে সে সব কথা থাক।
গল্পগুলো কিন্তু আপনি বেশ ভালো লেখেন মশাই।” প্রদীপ্ত
কফিমাগে চুমুক দিয়ে চমকে ওঠে।
— সেকি! এর মধ্যেই
গোটা বই আপনার পড়া হয়ে গেছে? কখন পড়লেন?
— উঁহু! পুরোটা
পড়া হয়নি। আসলে আমার বদভ্যেস হল নতুন কোনো বই পেলেই সেটা পড়তে শুরু করে দিই।
সেটা কবিতার বই হোক বা উপন্যাস। বইটা হাতে পাবার পর পার্টিতেই বসে পড়ছিলাম। সবে
প্রথম গল্পটা পড়েছি। আর পড়ার সাথে সাথে বুঝেছি এগুলো নিছকই গল্প নয়, বাস্তব ঘটনা। চরিত্রদের নাম আর পটভূমি পাল্টে দিলেও জাহ্নবীদিকে চিনে নিতে
অসুবিধে হয়নি আমার।
— বটে! তা গল্পটা
পড়ে কেমন লাগল আপনার?
— কেমন আবার লাগবে?
ভালোই লাগল!
— ভালো লাগল?
Strange! আপনার গা ঘিনঘিন করা অনুভূতি বা কোনোরকম অস্বস্তি হল না?
— না। কেন বলুন তো?
প্রদীপ্ত কিছু একটা বলতে
গিয়েও থেমে যায়। সুনেত্রা হেসে বলে, “আমি জানি আপনি কী বলতে চাইছেন প্রদীপ্ত।
আপনি ভাবছেন একজন মহিলা হয়ে আরেকটা মহিলার জীবনের নোংরা কেচ্ছা ইরোটিকার আদলে
পড়ার পরেও জিনিসটাকে আমি এতটা frankly নিচ্ছি কী করে?
তাই তো? আপনার এই প্রশ্নের উত্তরটাও কিন্তু
আপনার লেখা গল্পগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।”
— কীভাবে?
প্রশ্নটা করে জিজ্ঞাসু
দৃষ্টিতে সুনেত্রার দিকে তাকায় প্রদীপ্ত। সুনেত্রা কফিমাগে একটা চুমুক দিয়ে বলে,
— সত্যি কথা বলতে গেলে
জাহ্নবীদিকে আমি আমার struggling period এর সময় থেকে চিনি। আর
কেউ বা না জানুক আমি জানি আপনার আর জাহ্নবীদির সম্পর্কের ব্যাপারটা।
এমনকি এটাও জানি জাহ্নবীদি কেন আপনাকে
ডিচ করল। বাইরের জগতের কাছে ওর ইমেজটা বড্ড ভালো মেয়ের হলেও বাস্তবে সুযোগ পেলে ও
কতটা ambitious হতে পারে সেটাও জানি। কাজেই এই বইটার
উদ্দেশ্য আমার অজানা নয় and I think she deserves it, আর
গল্পগুলো বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে লেখা হলেও সেখানে কাউকে defame, বা অপমান করা হয়নি। আপনি চাইলে সেটা করতে পারতেন। গল্পের ছলে আপনাদের
যৌনজীবনের যে কথা আপনি লিখেছেন, চাইলে আসল নাম ব্যবহার করে
কেচ্ছাটাকে আরো রসিয়ে লিখে লাইমলাইটে আসতে পারতেন। এতে আপনার প্রতিশোধ সফল হত ঠিকই
কিন্তু স্যাটিসফ্যাকশন থাকতো না। আমরা শিল্পী মানুষ। আমাদের প্রতিটা কাজেই নিজের
অজান্তেই একটা শিল্পের ছোঁয়া থেকে যায় প্রদীপ্ত। তা সে অভিনয় হোক বা অন্য কিছু।
সেই শিল্পীসত্ত্বার তাগিদেই হোক বা জিনিসটাকে রসিয়ে লেখার
লোভেই হোক আপনি আশ্রয় নিলেন ইরোটিকার। অবশ্য তার কারণও আছে। ইরোটিকার আসল মজা হল
তার শব্দমাধুর্য ও দৃশ্যপটের গতিতে। দৃশ্যপট যতই পরিণতমনস্ক বা অশ্লীল হোক না কেন
শব্দের মাধুর্যের কারণে সেটাকে কিছুতেই অশালীন বলে মনে হয় না। সে কারণেই ঘটনাগুলো
বাস্তব বুঝতে পারলেও, চরিত্রদের চিনতে পারলেও আমার একবারের
জন্যেও অস্বস্তিবোধ হয়নি। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে আপনি ফ্লাইং কালারে পাশ করে
গেছেন মশাই।”
প্রদীপ্ত একদৃষ্টে তাকিয়ে
তাকে সুনেত্রার দিকে। যে কথাটা অভয়কে বলে বলে বোঝাতে হয়েছিল, সেই সামান্য
কথাটা মাত্র একটা গল্প পড়ে ধরে ফেলেছে মেয়েটা। হ্যাঁ, ঠিক
এটাই করেছে সে। জাহ্নবী যখন ওকে ছেড়ে গেল তখন একটা বুনো রাগ চেপে বসেছিল ওর
মাথায়। সেই রাগের কারণেই তো এই বইটা লেখা! গল্পগুলো সে এমনভাবে লিখেছে যাতে সকলের
সামনে জাহ্নবীর মুখোশটাও খোলা যায়, অথচ জাহ্নবী কোনোরকম
পদক্ষেপ না নিতে পারে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সে চুমুক দেয় কফিমাগে।
তারপর মৃদু হেসে বলে, “থ্যাঙ্ক ইউ!”
— কীসের জন্য?
— আমার point
of view-টাকে বোঝার জন্য। আপনি তো আমাকে অবাক করে দিচ্ছেন সুনেত্রা।
যে জিনিসটা আমার প্রকাশক বন্ধুকে convince করাতে আমার প্রায়
একমাস লেগে গেল, সেই সহজ পয়েন্টটা মাত্র একটা গল্প পড়ে আপনি
ধরে ফেললেন। হুম! অভিনেত্রী, শিল্পী, মনযোগী
পাঠিকা। আর কী কী গুণ লুকিয়ে রেখেছেন বলুন তো?
প্রদীপ্তর কথায় খিলখিল
করে হেসে ওঠে সুনেত্রা। তারপর বলে, “কেন বলব? জানেন না
পুরাকালে নারীদের ৬৪টা কলা শিখতে হত। তারা একাধারে নৃত্যশিল্পী, গায়িকা, অভিনেত্রী, চিত্রকর,
পাঠিকা, লেখিকা, যোদ্ধার
মতো ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। এখন অবশ্য সেই রীতি নেই। এখন যে যেটা পারেন সেই
ক্ষেত্রে খ্যাতি পাবার চেষ্টা করেন। যাকগে বাদ দিন ও কথা। আচ্ছা একটা জিনিস জানার
ছিল।”
— বলুন।
— আপনি গল্পের
শুরুতে মানে আপনার আর জাহ্নবীদির মেক আউটের জায়গাগুলো আসার আগে বার বার ‘গীতগোবিন্দম্’ quote করেছেন কেন?
প্রশ্নটা শোনামাত্র মুচকি
হাসি খেলে যায় প্রদীপ্তর ঠোঁটে। সে মুচকি হেসে বলে, “সত্যিটা শুনবেন নাকি political
correct উত্তরটা?”
— সত্যিটাই বলুন।
কফিমাগে চুমুক দিয়ে কফিটা
শেষ করে মুচকি হেসে প্রদীপ্ত বলে, “ওটা আমার মুদ্রাদোষ। লাভমেকিং এর সময় জাহ্নবীকে
জাগরিত করতে ‘গীতগোবিন্দম্’-এর কোটেশন
ইউজ করতাম আমি।”
— হোয়াট?
উত্তরটা শোনামাত্র থমকে
যায় সুনেত্রা। পরক্ষণে ব্যাপারটা বোঝামাত্র ওর গালদুটো লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে।
প্রদীপ্ত হাসতে হাসতে সোফায় হেলান দিয়ে বসে, “এবার বুঝলেন? কেন
আমি আপনার আর্ট দেখে এত কৌতুহলী হচ্ছিলাম তখন? নিজের
অজান্তেই আপনি ‘গীতগোবিন্দম্’- এর আমার
সবথেকে প্রিয় জায়গাটাকেই ফুটিয়ে তুলেছেন ক্যানভাসে।” কথাটা
বলে আপনমনে হাসতে হাসতে সে বলে ওঠে,
— বিগলিতবসনং
পরিহৃতরসনং ঘটয় জঘনমপিধানম্।/কিশলয়শয়নে পঙ্কজনয়নে নিধিমিব হর্ষনিধানম্।।
লজ্জায় সুনেত্রার আরক্ত
মুখটা নিচে নেমে আসে।
*****
বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানের পর
প্রায় দুমাস কেটে গেছে। বইপ্রকাশের সময় প্রদীপ্ত আর জাহ্নবীর সম্পর্ক নিয়ে যতটুকু
কানাঘুষো, চাপা গুঞ্জন উঠেছিল সময়ের সাথে সাথে সেটাও থিতু হয়ে গেছে। পরে অবশ্য বইয়ের
স্টক নিয়ে অভয় একটু দুশ্চিন্তা করায় প্রদীপ্ত অভয়কে বলেছিল, “শোন, প্রতিটা পাবলিশিং হাউজের যেমন কিছু বেস্টসেলার
থাকে, ঠিক তেমনই কিছু খাজা বইও থাকে যা জাস্ট শোকেসে,
বইমেলায় তাক সাজানোর কাজে আসে। আমার এই বইটাও তাই। অতো ছাপতে হবে
না। জাস্ট ১০০টা কপি As a limited edition হিসেবে ছেপে রাখ।
বইপ্রকাশের পর একটু অ্যাড দিয়ে হাইপ ক্রিয়েট করলেই হবে।” প্রদীপ্তর
এই পরিকল্পনা অব্যর্থভাবে কাজে লেগে গেছে। বইপ্রকাশের দুমাসের মধ্যে সমস্ত কপি
বিক্রি হয়ে গেছে। অবশ্য সেটা নিয়ে এখন প্রদীপ্তর কোনো মাথা ব্যথা নেই। সে এখন তার
নতুন ছবির এক্সিবিশন-এর ইভেন্ট নিয়ে ব্যস্ত, বা বলা ভালো খানিকটা চিন্তিত। সামনের মাসের প্রথম রবিবার তার আঁকা
ছবিগুলোর এক্সিবিশন শুরু হতে চলেছে। এই প্রথমবার নিজের চেনা
ছক থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু করতে চলেছে সে। এবারের এক্সিবিশন-এর
থিমটা কিছুটা অফবিট। প্রদীপ্ত এক্সিবিশন-টার নাম দিয়েছে ‘স্বপ্নের ক্যানভাস’।
কফিশপে বসে কফি খেতে খেতে
ইভেন্টের কথাই ভাবছিল সে। এমন সময় সে শুনতে পেল খুব কাছ থেকে কে যেন বলছে, “পৃথিবীটা শুধু
গোলই নয় ছোটও বটে! আবার আমাদের দেখা হয়ে গেল দেখলেন?” প্রদীপ্ত
তাকিয়ে দেখল ওর টেবিলের সামনে সুনেত্রা এসে দাঁড়িয়েছে। পরনে একটা অফ হোয়াইট শার্ট,
জিন্স আর চোখে চশমা। আচমকা সুনেত্রাকে সামনে দেখামাত্র প্রথমে অবাক
হয় প্রদীপ্ত। এই দুমাসে এক্সিবিশন-এর চাপে সুনেত্রার কথা
প্রায় ভুলতে বসেছিল সে। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে মুচকি হেসে সে বলে, “তাই তো দেখছি। তা আপনি এখানে?” প্রদীপ্তর মুখোমুখি
বসে সুনেত্রা বলে,
— একটা ফটোশ্যুটের
জন্য এসেছিলাম। একটু আগেই শ্যুট শেষ হতেই ধরাচুড়ো ছেড়ে বেরোতে যাবো দেখি আপনি
এখানে বসে আছেন। যাক গে ওসব কথা বাদ দিন। কেমন আছেন বলুন? সামনেই
তো আপনার এক্সিবিশন না?
— ঐ চলে যাচ্ছে।
আপাতত এক্সিবিশন-এর চাপে জর্জরিত। সারাদিন ওটার পেছনেই
যাচ্ছে। ইভেন্ট অর্গানাইজার-দের সাথে মিটিং, বন্ধুবান্ধবদের, মিডিয়াদের নিমন্ত্রণ। জায়গাটার
ডেকোরেশন সব কিছুর পেছনে দৌড়তে দৌড়তে পাগল হয়ে যাচ্ছি। আপনার কী খবর? আঁকা কতদূর?
— আর আঁকা! সারাদিন
শ্যুটিং, ডাবিং, জিম আর ফটোশ্যুটের
ঠেলায় জেরবার হয়ে যাচ্ছি। দম ফেলার মতো সময় নেই আমার কাছে। সেই সকাল ৬টায় শ্যুটিং কল বলে ভোর বেলা উঠে কোনোমতে চোখেমুখে জল দিয়ে দৌড়োচ্ছি। ফিরতে ফিরতে
ঘড়ির কাঁটার সাথে সাথে শরীরেরও বারোটা বেজে যাচ্ছে। নিজের জন্যই সময় পাচ্ছি না।
— সেটাই তো
স্বাভাবিক! অভিনয় জগতে ছুটি বলে কিছু হয় না। এখানে যতটা খাটবেন, যতটা লড়াই করবেন তত আপনার পথ প্রশস্ত আর খুঁটি শক্ত হবে। আপনাদের লাইনে
মেয়েদের লড়াইটা ভীষণ টাফ। সবসময় নিজেকে presentable রাখতে
হয় খাপ খোলা তরবারির মতো। একটু ঢিলেমি দিলেই আপনাকে সরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র সময়
নেবে না পরিচালক, প্রযোজকরা।
— জানি। সেকারণেই
তো দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছি। এখন দেখা যাক ভাগ্য কতদূর পর্যন্ত সাথে থাকে। কম
দিন তো হল না ইন্ডাস্ট্রিতে।
ওদের কথার মাঝে একটা ছেলে
টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে, “ম্যাডাম, সুবিনয়দা আপনাকে
ডেকেছে।” সুনেত্রা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,
“তুমি যাও, আমি আসছি।” ছেলেটা মাথা নেড়ে, “হ্যাপি বার্থডে ম্যাডাম!” বলে ফিরে যায় দূরে
দাঁড়িয়ে থাকা দলটার মাঝে। প্রদীপ্ত অবাক হয়ে সুনেত্রার দিকে তাকিয়ে বলে, “এই আজ আপনার জন্মদিন নাকি?” সুনেত্রা লাজুক হেসে
মাথা নাড়ে।
— এই যা! আগে জানলে
আমি… যাই হোক জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
— ধন্যবাদ। চলুন
এবার।
— কোথায়?
— কেক কাটবো।
— না আপনি যান।
ওনারা আপনার জন্য আয়োজন করেছেন। সেখানে একজন অযাচিত মানুষ হিসেবে আমার থাকাটা…
না মানে ওনারা কী ভাববেন বলুন তো?
— কেউ কিছু ভাববে
না। আর আপনি কোনো অযাচিত মানুষ নন। আজকে আপনি আমার আমন্ত্রিত অতিথি কাম বন্ধু।
তাছাড়া জন্মদিনটা আমার, আমি যাকে খুশি নিমন্ত্রণ করতে পারি।
আপনি আসুন তো আমার সাথে।
— আপনি বুঝতে
পারছেন না সুনেত্রা।
— বুঝতে চাইও না।
আপনি আসুন আমার সাথে। একবার যখন পেয়েছি আজকে আর ছাড়ছি না আপনাকে। আর হ্যাঁ এবার
থেকে আমাকে তুমি করে ডাকবেন। আমিও আপনাকে তুমি করে ডাকবো। আপনি ডাকটা বড্ড ফর্মাল
শোনায়। আর বেশিক্ষণ কাউকে আপনি আজ্ঞে করার অভ্যেস আমার নেই।
— কতদিন হল চেনেন
আমাকে? এর মধ্যেই বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিচ্ছেন যে?
— কতদিন ধরে চিনি,
বা কতটা চিনি সেটা বন্ধুত্বে ম্যাটার করে না মশাই। ম্যাটার করে
ভাবনাচিন্তার আর দৃষ্টিভঙ্গির মিলটা। সেটা মিলে গেলেই এক ঘন্টার চেনা মানুষটাও পরম
কাছের হয়ে যায়। আবার ভাবনাচিন্তার মিল না হলে সারাজীবন পাশে থাকা মানুষটাও চরম
অচেনা একজনে পরিণত হয়। যাক গে এখন এসব তত্ত্বকথা বলতে আর ভালো লাগছে না। আপনি…
তুমি এসো তো!
— কিন্তু আমার কাছে
যে তোমাকে দেওয়ার মতো কোনো উপহারও নেই।
— সে আমি পরে চেয়ে
নেব। উফ! তুমি আসবে?
প্রদীপ্ত হা করে তাকিয়ে
থাকে সুনেত্রার দিকে। মেয়েটা হয় বড্ড সরল, নাহলে সরলতার অভিনয় চালিয়ে যাওয়া এক ধূর্ত
মানুষ। নাহলে মাত্র দুই দিনের দেখাতেই এভাবে কেউ কোনো অচেনা বা স্বল্প চেনা
মানুষকে কেউ আপন করে নেয়? মেয়েটা কতদিন হল চেনে ওকে? এর মধ্যেই গায়ে পড়ে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিচ্ছে। কে জানে? হয়তো এই বন্ধুত্বের পেছনেও কোনো স্বার্থ লুকিয়ে আছে। এই লাইনের মেয়েগুলোকে
সে হাঁড়ে হাঁড়ে চেনে। স্বার্থ ছাড়া কেউ
কাউকে অল্প পরিচয়ে এতটা আপন করে নিতে পারে না। আবার এমনটাও হতে পারে এটা একটা
ফাঁদ। মেয়েটা জাহ্নবীর পরিচিত। হয়তো জাহ্নবীই ওকে পাঠিয়েছে প্রতিশোধ নিতে। নাঃ!
কোনো সম্ভাবনাকেই ঝেড়ে ফেলা যাচ্ছে না। খুব সাবধানে খেলতে হবে। কথাগুলো ভাবতে
ভাবতে প্রদীপ্ত কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে সুনেত্রার দিকে, তারপর আলতো হেসে সুনেত্রার সাথে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় ভীড়টার দিকে।
জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষ
হতেই সকলে বেরিয়ে পড়ে যে যার গন্তব্যের দিকে। প্রদীপ্ত আর সুনেত্রা কফিশপ থেকে
বেরিয়ে পার্কিং-য়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রদীপ্ত পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে
জিজ্ঞেস করে, “তো এবার কোথায়? স্টুডিও নাকি জিম?” সুনেত্রা হেসে বলে, “আপাতত বাড়ি। আজকে আর জিম যেতে
ইচ্ছে করছে না।” প্রদীপ্ত কাঁধ নাচিয়ে বলে, “বেশ! এসো তোমাকে ড্রপ করে দিচ্ছি।”
*****
কেটে গেছে গোটা একটা বছর।
এই একবছরে প্রদীপ্তর জীবনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে। প্রথমত, পাঠকমহল থেকে
বারংবার ওর লেখা বইটার দ্বিতীয় মুদ্রনের দাবি আসায় অবশেষে অভয় প্রদীপ্তর অনুমতিতেই
দ্বিতীয় মুদ্রন ছাপতে শুরু করেছে। দ্বিতীয়ত, প্রদীপ্তর এক্সিবিশন
চুড়ান্তভাবে সফল হবার পর শিল্পীমহলে ওর কিছুটা খ্যাতি বেড়েছে। আর
তৃতীয়ত, প্রদীপ্তর জীবনে আবার আগমন ঘটেছে এক রহস্যময়ী নারীর।
যদিও মেয়েটা কে জানা যায়নি। এমনকি অভয় পর্যন্ত প্রদীপ্তকে চেপে ধরতেই সে হেসে
উড়িয়ে দিয়েছে। তবে কানাঘুষোয় শোনা যায় প্রদীপ্ত নাকি সুযোগ পেলেই মাঝেমধ্যেই এই
নারীর উদ্দেশ্যে অভিসারে বেরোয়। আজ এরকমই এক অভিসারের রাত। সন্ধ্যেবেলা অভয়ের
দোকান থেকে বেরিয়ে গাড়ি করে বাড়ি ফেরার বদলে সে সোজা চলে এসেছে সেই রহস্যময়ীর
বাড়িতে। তারপর সন্তর্পণে ঘরে ঢুকেই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে আদরে আদরে ভরিয়ে
দিয়েছে সেই রহস্যময় প্রেয়সীকে। মেতে উঠেছে আদিম যৌনতার খেলায়।
অনেকক্ষণ পরে যখন রাত
ক্রমশ গভীর হয়ে উঠেছে,
রাস্তায় গাড়িঘোড়ার আনাগোনা আস্তে আস্তে কমতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময় কোমরে একটা তোয়ালে জড়িয়ে ব্যালকনিতে বসে ওয়াইন খেতে খেতে
রাতের শহরটাকে দেখছিল প্রদীপ্ত। আলো-ছায়ায় ঘেরা শহরটার দিকে তাকিয়ে মনে করার
চেষ্টা করছিল নিজের struggling period এর সময়ের দিনগুলোর
কথা। সে সময় এই দু’কামরার ফ্ল্যাটের আরামপ্রদ জীবন, ঝাঁ চকচকে স্টুডিওর কথা ও ভাবতেও পারত না। যাদবপুরের সেই হোস্টেল, আর গ্রাজুয়েশনের পরে সন্তোষপুরের একটা এক কামরার ভাড়াবাড়িটাই ছিল ওর মাথা
গোঁজার আশ্রয়। আর শহরের রাস্তাঘাট, ফুটপাথে পড়ে থাকা
পরিবারগুলোই ছিল তার আঁকার সাবজেক্ট। খিদে পেলে রেস্তোরাঁয় যাবার দুঃসাহস না
দেখিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা চায়ের দোকানে টোস্ট, পাউরুটি,
কিংবা নুডলস দিয়ে খুন্নিবৃত্তি করতো সে। এই সময়়টাতেই জাহ্নবী ওর
জীবনে এসেছিল। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী জাহ্নবী ওর চেয়ে এক বছরের জুনিয়র ছিল। কলেজ
ফেস্টে একটা নাচের অনুষ্ঠানে সে প্রথম দেখেছিল জাহ্নবীকে। হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল মেয়েটাকে দেখে প্রথমে একটু বেশীই গায়ে পড়া মনে হয়েছিল তার।
অথচ এই গায়ে পড়া মেয়েটাই কীভাবে যে ওর মনের গহীনে প্রবেশ করল, তা আজও জানে না প্রদীপ্ত। ওর আজও মনে আছে ওদের প্রেম নিবেদন, প্রথম চুমু, প্রথম মিলনের দিনগুলোর কথা। ওর মনে আছে
মে মাসের এক উষ্ণ দুপুরে শান্তিনিকেতনের এক সস্তার হোটেলে প্রথমবার নিজেকে মেলে
ধরেছিল জাহ্নবী। চরম সুখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিল প্রদীপ্তকে। প্রদীপ্তও হাল
ছাড়েনি। নারীদেহরূপ নদীতে অবগাহন করতে করতে ক্রমশ জাহ্নবীকে পাগলিনী করে তুলেছিল
সে। আদরের চিহ্নে ভরিয়ে দিয়েছিল জাহ্নবীর দেহের প্রতিটা দেহকোষকে। আদরের চরম
মুহূর্তে জাহ্নবী আবদার করেছিল ওর একটা ন্যুড পোট্রেট এঁকে
দেওয়ার। প্রদীপ্ত সে আবদারও রেখেছিল। সঙ্গম শেষে বিছানায় শুয়ে থাকা রতিক্লান্ত
জাহ্নবীকে মনের মতো করে ফুটিয়ে তুলেছিল আঁকার খাতায়। হৃদয়ের রঙে ভরিয়ে তুলেছিল
জাহ্নবীর দেহের প্রতিটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে।
আজও সেই মুহূর্তগুলোর কথা
মনে করলে বুকটা হুহু করে ওঠে ঠিকই, কিন্তু প্রদীপ্ত জানে সেই মুহূর্তগুলো ওর
জীবনের সবথেকে সুন্দর মুহূর্ত ছিল। প্রথমে বুঝতে না পারলেও শেষের দিকে প্রদীপ্ত
বুঝতে পারছিল যে জাহ্নবীকে সকলে চেনে তার সাথে বাস্তবের জাহ্নবীর তফাৎ অনেকটাই।
বাইরে থেকে জাহ্নবীর যতটা হাসিখুশি, পরোপকারী ভাবমূর্তি
থাকুক না কেন বাস্তবে জাহ্নবী একজন আত্মকেন্দ্রীক, সুবিধেবাদী
আর ambitious মানুষ। নিজের ভালো ছাড়া কিছুই বোঝে না সে।
অভিনয় জগতে সুযোগ পাবার পর এই গুণগুলো আরো বেশী করে প্রকট হচ্ছিল প্রদীপ্তর সামনে।
কিন্তু জাহ্নবীর প্রেমে সে এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে ওদের সম্পর্কের ফাটলটা সে
টেরই পায়নি। টের পেল তখন যেদিন জাহ্নবী ওর বিবাহ প্রস্তাব নাকচ করে এক কথায় সমস্ত
সম্পর্ক ছিন্ন করে বেরিয়ে গেল। প্রদীপ্তর মনে হচ্ছিল ওর সমস্ত জগতের রং কেউ যেন এক
লহমায় শুষে নিয়েছে। সেদিন বুঝেছিল জাহ্নবীকে ভালোবেসে কতটা ঠকে গেছে সে। ভালোবাসার
উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল তার। তারপর ওর জীবনে অনেক নারী এসেছে, আবার প্রয়োজন ফুরোতেই চলেও গেছে। কেউই আর ওর মনের গহীনে প্রবেশ করতে
পারেনি। বলা ভালো প্রদীপ্ত নিজেই কাউকে আর প্রবেশ করতে দেয়নি। বরং প্রয়োজনের সুযোগ
নিয়ে নিজের শারীরিক খিদেটুকু মিটিয়ে নিয়েছে সে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে
রাস্তার দিকে একটু অন্যমনস্কভাবে তাকিয়েছিল প্রদীপ্ত, আচমকা ওর সম্বিত
ফিরল একটা ভীষণ চেনা ডাকে। পেছন ফিরে সে দেখল একটু আগে আদরের আতিশয্যে মেঝেতে
লুটিয়ে পড়া বেডশিটটা দিয়ে কোনোমতে নিজের নগ্ন দেহের লজ্জা নিবারণ করে সুনেত্রা ব্যালকনির
দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘরের মৃদু আলোয় ওর
ফর্সা নির্লোম দেহের অনাবৃত অংশের বেশ কিছু জায়গায় জ্বলজ্বল করছে খানিকক্ষণ আগে
ফেলে আসা প্রদীপ্তর আদরের চিহ্নগুলো। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসে প্রদীপ্ত।
গত একবছর ধরে যে রহস্যময়ী নারীর সাথে তার দুরন্ত প্রেমপর্ব চলছে সেই নারী আর কেউ
নয় সুনেত্রা নিজে। এই একবছরে দুজনের সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বেই আটকে থাকেনি। বরং
সেটা গহীন প্রেমে পরিণত হয়েছে। অথচ একবছর আগেই তার মনে হচ্ছিল মেয়েটা হয় বড্ড সরল,
নাহলে সরলতার অভিনয় চালিয়ে যাওয়া এক ধূর্ত মানুষ। নাহলে মাত্র দুই
দিনের দেখাতেই এভাবে কেউ কোনো অচেনা বা স্বল্প চেনা মানুষকে এতটা আপন করে নেয় নাকি?
সন্দেহ করেছিল এই গায়ে পড়ে মেলামেশা করার পেছনেও হয়তো কোনো স্বার্থ
লুকিয়ে থাকতে পারে। কিংবা হয়তো মেয়েটা জাহ্নবীরই পাঠানো কোনো ফাঁদ। যে এসেছে
জাহ্নবীর হয়ে প্রতিশোধ নিতে। এই বিনোদনের জগতের মেয়েদের সে হাঁড়ে হাঁড়ে চেনে। হাতে গোনা কয়েকজন বাদ দিলে প্রায়
সবকটাই স্বার্থপর। নিজের আখেরটা গুছোনোর জন্য সব করতে পারে। নিজের শরীরের বিনিময়ে
চেয়ে নিতে পারে একাধিক favor, কিংবা হয়তো ওকে সাফল্যের
সিড়ির মতো ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু এই একবছরে
মেয়েটাকে নানাভাবে পরখ করে সে বুঝেছে মেয়েটা সত্যিই সরল। ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে
এতগুলো বছর থাকার ফলে শারীরিক ছুঁতমার্গটা না থাকলেও এই বিনোদন জগতের নোংরা পাঁক
এখনও স্পর্শ করতে পারেনি মেয়েটাকে। আর এই সরলতাটাই মুগ্ধ করেছে প্রদীপ্তকে।
ভালবাসার উপর প্রদীপ্তকে আবার বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে মেয়েটা। বলা ভালো এই
সরলতার জন্যই মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেছে সে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটা
মৃদু হাসি হেসে গ্লাসে অবশিষ্ট ওয়াইনটুকু এক চুমুকে শেষ করে ঘরে ঢোকে প্রদীপ্ত। সুনেত্রাকে জড়িয়ে ধরে কপালে
নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায়। তারপর ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলে ওঠে, “কী হল? বার্থ ডে গার্ল-এর আদরের সাধ এখনও মেটেনি
বুঝি? আরো আদর চাই?” সুনেত্রা মুচকি
হেসে বলে, “দেহের সাধ তো মিটে গেছে, মনের
সাধ এখনও মেটেনি।” প্রদীপ্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে
সুনেত্রার দিকে, তারপর বলে, “মানে?”
— মানে আমি কিন্তু
এখনও আমার জন্মদিনের উপহার পাইনি।
— সেকি! গিফট দিলাম যে! পছন্দ হয়নি বুঝি?
— হুম! কিন্তু আমার
যে সোনাদানা বা শাড়ি চাই না।
— তাহলে কী চাই?
— যা চাইব দেবে?
— আগে তুমি চেয়ে তো
দেখো। আমার সাধ্যের মধ্যে থাকলে নিশ্চয়ই পাবে।
— আমার এখনই চাই কিন্তু!
— এখনই? কিন্তু এই মুহূর্তে তোমাকে একরাশ আদর ছাড়া আমার যে কিছু দেওয়ার নেই
সুনেত্রা।
— আছে গো আছে।
তোমার কাছে এমন জিনিস আছে যা আর কারো কাছে নেই। একমাত্র তুমিই দিতে পারবে আমাকে।
— বটে? তা কী চাই তোমার?
— তোমাকে আমার একটা
আবদার রাখতে হবে।
— আবদার? তা কীরকম আবদার শুনি?
— মনে আছে প্রথমবার
যখন আমার কাজগুলো দেখতে এসে সাদা ক্যানভাস দেখে তুমি অবাক হয়েছিলে। আমি বলেছিলাম
ওটা নিয়ে আমার একটা প্ল্যান আছে।
— হুম। মনে আছে।
— আমি চাই ছবিটা
তুমি পূর্ণ করো।
— হোয়াট?
— আমি চাই আমার
কাজে অন্তত আমার প্রিয় শিল্পী কাম প্রেমিকের হাতের ছোঁয়া থাকুক।
— কিন্তু ওটা তো
তোমার কাজ! তোমার স্বপ্ন! না সুনেত্রা এটা হয় না। একজন শিল্পীর কাজ আরেকজন শিল্পী
শেষ করতে পারেন না। তাছাড়া ‘রাধার অভিসার’ সিরিজটা আমি এক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভেবেছিলাম, আর তুমি
আরেক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভেবে এঁকেছ। এখন যদি আবার আমি তুলি ধরি তাহলে…
— আমি কিছু শুনতে
চাই না। তুমি ছবিটা আঁকবে ব্যস।
— কিন্তু…
— কোনো কিন্তু নয়।
এটাই আমার জন্মদিনের আবদার ব্যস। আর কিছু চাই না।
প্রদীপ্ত বার বার
সুনেত্রাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, একজন শিল্পীর অসমাপ্ত কাজ আরেকজন শিল্পী শেষ করতে
পারেন না। দুজন মানুষের চিন্তাভাবনার ফারাকটা ধরা পড়ে যায় আর্টে। কিন্তু সুনেত্রা
নাছোড়বান্দা। সে কিছুতেই ছাড়বে না। অগত্যা প্রদীপ্ত এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,
“আচ্ছা বেশ তুমি যখন চাইছ, তবে তাই হোক।”
— আমার আরেকটা
আবদার আছে।
— আরেকটা আবদার?
বেশ বলে ফেল।
— ছবিতে রাধা
হিসেবে তুমি আমাকে আঁকবে।
সুনেত্রার দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে প্রদীপ্ত। ওর মনে পড়ে যায় বহুকাল আগের এক গ্রীষ্মের দুপুরে কথা। জাহ্নবীও ঠিক এভাবেই আদর শেষে ওর কাছে একটা পোট্রেট চেয়েছিল। অনেক বছর পর আবার সুনেত্রা এভাবে আবদার করল। সুনেত্রা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, “কী হল? আঁকবে না?” মুচকি হেসে সুনেত্রার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে প্রদীপ্ত বলে ওঠে, “আচ্ছা বেশ! তাই হবে।”
*****
স্ট্যান্ডের উপর
ক্যানভাসটা বসিয়ে প্যালেটে কিছুটা রং ঢেলে তুলি দিয়ে ব্লেন্ড করতে করতে নিজের
কল্পনায় দৃশ্যপটটা ভাবছিল প্রদীপ্ত। এমন সময় সুনেত্রার কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে পেছন
ফিরে তাকিয়ে দেখে সুনেত্রা স্টুডিওর দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই এক বছরে
সুনেত্রাকে একাধিক সাজে দেখেছে সে। আর প্রতিটা সাজের মধ্যে প্রসাধনহীনা সাজেই বেশ
স্নিগ্ধ লেগেছে তার। সেই মতোই সে সুনেত্রাকে সেজে আসতে বলেছিল। প্রদীপ্ত তাকিয়ে
দেখে ওর কথা মতোই চোখে হাল্কা কাজল আর ঠোঁটে অল্প পরিমাণে লিপস্টিক পরেছে
সুনেত্রা। সদ্য ভেজা চুল,
আর কপালে লেগে থাকা জলবিন্দু দেখে বোঝা যাচ্ছে সদ্য স্নান সেরে
এসেছে সে। পরনে একটা লাল সুতোর কাজ করা শাড়ি ছাড়া সুনেত্রা সমগ্র শরীরে যে
বিন্দুমাত্র সুতো নেই সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না প্রদীপ্তর। কারণ শাড়ির আঁচল দিয়ে
সমগ্র শরীর ঢাকা থাকলেও সুনেত্রার দেহের প্রতিটা বাঁক ভেজা শাড়ির উপর থেকে
স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। এর আগেও অনেক নারীকে নিয়ে পোট্রেট এঁকেছে প্রদীপ্ত। কারো
কারো সাথে তো উদ্দাম সঙ্গমের পর সে মেতে উঠেছে শিল্পের খেলায়। তুলির কয়েকটা আঁচড়ে
ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছে নিজের শয্যাসঙ্গিনীদের নগ্ন দেহের অবয়বকে। সে সব কাজ দেখে
কেউ আনন্দে পুলকিত হয়েছে, কেউ বা বিরক্ত হয়েছে, আবার কেউ পুনরায় কামাবিষ্ট হয়ে নিজের দেহটাকেই ক্যানভাসের মতো মেলে ধরে
আবদার করেছে শিল্পটাকে দেহের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার জন্য। তারা প্রত্যেকেই
সুন্দরী হলেও কাউকেই এতটা মোহময়ী লাগেনি তার। তাদের কারো মধ্যেই এই মেয়েটার মতো
সারল্যে ভরা চাহনি ছিল না। এখানেই হয়তো একজন প্রেয়সী আর মডেলের মধ্যে
পার্থক্য।
কিছুক্ষণের জন্য
সুনেত্রার দিকে মোহাবিষ্টের মতো তাকিয়ে ছিল প্রদীপ্ত। সম্বিত ফিরতেই সে সুনেত্রাকে
সামনের ডিভানে বসতে বলে সে। প্যালেটে রংগুলো মেশাতে মেশাতে জিজ্ঞেস করে, “তুমি যে থিমের
কথা বলেছ সে অনুযায়ী তিনটে Posture হয়। Frontal,
Side face, Back view অবশ্য তুমি নিজেও একজন ফাইন আর্টসের
স্টুডেন্ট। এসব তো তুমি জানোই। এবার তুমি ঠিক করো কোন Posture-টায় তুমি নিজেকে flaunt করতে চাও।” প্রদীপ্তর কথামতো ডিভানে বসে কাঁধ থেকে আঁচলটা নামিয়ে নিয়ে বুকের কাছে জড়ো
করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে side face ভঙ্গিমায় নিজেকে মেলে
ধরে সুনেত্রা। প্যালেটে রং মেশাতে মেশাতে আড়চোখে ডিভানে বসা সুনেত্রার দিকে একবার
তাকিয়ে ক্যানভাসে মনোনিবেশ করে প্রদীপ্ত।
কতক্ষণ ধরে এক ভঙ্গিমায়
ঠায় বসেছিল জানে না সুনেত্রা। সময় যেন কাটতেই চাইছে না। এক একটা মুহূর্ত যেন এক
একটা ঘন্টার মতো মনে হচ্ছে তার। সারাদিন ডাবিং, শ্যুটিংয়ের চাপে আর বিশ্রামের সুযোগ পায়নি
সে। তার উপর বাড়ি ফিরে এসে ওরকম তুখোর প্যাশনেট সঙ্গম। সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে একটা
ক্লান্তি ক্রমশ গ্রাস করছে তাকে। এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে থাকায় কিছু মনে না হলেও
এখন একটানা বসে থাকার ফলে স্নায়ু আর মাংসপেশীগুলো ক্রমশ বিদ্রোহ করতে শুরু করেছে।
ক্যানভাসের ওপারের মানুষটার অবশ্য তাতে কোনো হেলদোল নেই। একজন ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো
বুঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে ওর পোট্রেট এঁকে চলেছে সে। মাঝে মাঝে আড়চোখে একঝলক তাকাচ্ছে ওর
দিকে, পরক্ষণেই আবার বুঁদ হয়ে যাচ্ছে ক্যানভাসে। এভাবে বেশ
কিছুক্ষণ চলার পর সুনেত্রা জিজ্ঞেস করে, “কতদূর হল?” ওপার থেকে জবাব আসে, “আর একটু বাকি। ওয়েট! একদম
নড়বে না।” সুনেত্রা চুপ করে বসে থাকে, আর প্রদীপ্ত একমনে প্যালেট থেকে রঙ নিয়ে অভ্যস্থ হাতে ক্যানভাসে তুলি
বোলাতে থাকে। সাদা ক্যানভাসের উপর ক্রমশ তিলে তিলে ফুটে ওঠে একটা অপূর্ব ছবি।
অনেকক্ষণ পর যখন সুনেত্রার সমগ্র দেহ যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ার উপক্রম ঠিক তখনই
প্রদীপ্তর কন্ঠস্বর শুনতে পায় সে, “And we are done!”
প্রদীপ্তর কথাটা
শোনামাত্র ছবিটা দেখার জন্য বুকের কাছে জড়ো করা আঁচলটা আবার গায়ে জড়িয়ে নিয়ে উঠে
দাঁড়াতে গিয়েও ডিভানের উপর বসে পড়ে সুনেত্রা। একটানা হাটু মুড়ে বসে থাকার কারণে
পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে। প্রদীপ্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরে রং-তুলি টেবিলে রেখে ছুটে আসে
সুনেত্রার কাছে। তারপর কোনো মতে সুনেত্রাকে জড়িয়ে ধরে পায়ে পায়ে নিয়ে আসে
ক্যানভাসের সামনে।
ক্যানভাসের সামনে
দাঁড়াতেই স্তব্ধ হয়ে যায় সুনেত্রা। ওর অন্যান্য আঁকা ছবিগুলোর মতো এই ছবিতেও কালো
আর নীল রঙের আধিক্য থাকলেও সেটা সম্পূর্ণ ক্যানভাস দখল করেনি। বরং গোটা ক্যানভাসের
চারদিকে থেকে একটা অপূর্ব মাধুর্যের সৃষ্টি করেছে। ছবিটার পটভূমি হচ্ছে নিধিবনের
মাঝে রাধা-কৃষ্ণের মিলন ঘটার আগের মুহূর্ত। কানাইয়ের বাঁশীতে পাগলিনী হওয়া
রাধারানী শ্বশুরবাড়ির মানসম্মান, কুলমর্যাদা, এমনকি নিজ
আত্মসম্মান ত্যাগ করে ছুটে এসেছেন নিধিবনে গোপন অভিসারে। কানাইয়ের চরণে বসে উৎসর্গ
করছেন নিজ মান, জীবন, নারী লজ্জা।
ত্যাগ করছেন নিজের দেহের প্রতিটা আভূষণ, এমনকি নিজ দেহের
লজ্জা নিবারণ হেতু অবস্থিত বস্ত্রের প্রতিও তার আর মোহ নেই। সেটাও তিনি অর্পণ
করছেন তার কানাইয়ের চরণে। স্খলিতবসনা রাধার এহেন আত্মসমর্পণে কৃষ্ণ অভিভূত। নত হয়ে
হাতের তর্জনী দিয়ে রাধার চিবুক ছুঁয়ে মুখটা নিজের দিকে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি।
ছবিটার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল
সুনেত্রা, এমন সময় সে টের পায় ওর ঘাড়ের কাছে প্রদীপ্ত ওর ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে
বলছে, “ধীরসমীরে যমুনাতীরে বসতি বনে বনমালী।/
পীনপয়োধরপরিসরমর্দ্দনচঞ্চলকরযুগশালী।।”
সুনেত্রা অনুভব করে ওর
ঘাড়ের উপর বয়ে চলা প্রদীপ্তর প্রশ্বাসের উত্তাপকে। মুচকি হেসে সে বলে চলে, “পততি পতত্রে
বিচলতি পত্রে শঙ্কিতভবদুপযানম্।/ রচয়তি শয়নং সচকিতনয়নং পশ্যতি তব পন্থানম্।।”
প্রদীপ্ত সুনেত্রাকে
নিজের দিকে ফিরিয়ে মুখটাকে কাছে এনে বলে, “বিগলিতবসনং পরিহৃতরসনং ঘটয়
জঘনমপিধানম্।/কিশলয়শয়নে পঙ্কজনয়নে নিধিমিব হর্ষনিধানম্।।”
সুনেত্রা এবার তাকায়
প্রদীপ্তর দিকে। ওদের দুজনের ঠোঁটের মাঝের ব্যবধান ক্রমশ কমে আসে। সুনেত্রা টের
পায় প্রদীপ্তর গরম প্রশ্বাস ধীরে ধীরে আছড়ে পড়ছে ওর ঠোঁটের উপরে। সে চোখ বুঁজে
বলে, “হরিরভিমানী রজনিরিদানীমিয়মপি যাতি বিরামম্।”
প্রদীপ্ত আর দেরী করে না।
মৃদু হেসে সুনেত্রার ঠোঁটের ফাকে নিজের ঠোঁট গুঁজে দেয় সে। তারপর সুনেত্রাকে কোলে
তুলে ডিভানের উপর শুইয়ে শরীর থেকে শাড়িটা একটানে খুলে মেঝেতে ফেলে দেয়।
অনেকক্ষণ পর রঙে মাখামাখি
হয়ে যাওয়া দুটো রতিক্লান্ত দেহ যখন পরস্পরকে ছেড়ে আলাদা হল ততক্ষণে রাত পেরিয়ে
ভোর হতে চলেছে। পাশ ফিরে শুয়ে ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বিধ্বস্ত, রতিক্লান্ত সুনেত্রা
বলে ওঠে, “ঘুমোলে নাকি?” পাশে চোখ
বোঁজা অবস্থায় শুয়ে থাকা প্রদীপ্ত চোখ বোঁজা অবস্থায় বলে ওঠে, “উঁহু!”
— ছবিটা কিন্তু
দারুণ হয়েছে। থ্যাঙ্ক ইউ! জন্মদিনে আমাকে এত সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার জন্য।
— হুম।
— আচ্ছা একটা
প্রশ্ন ছিল। করবো?
— উঁ?
— কি তখন থেকে উঁ
উঁ করে যাচ্ছো বলো তো?
— উফ! শান্তিতে
মুহূর্তটাকে উপভোগও করতে দেবে না এই মেয়েটা! খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন! এত প্রশ্ন আসে
কোথা থেকে? তোমার অভিনয়ে না গিয়ে সাংবাদিকতায় যাওয়া উচিত ছিল। আরে বাবা আদরের পর এত কথা বলতে নেই। চুপ করে পরস্পরের
উপস্থিতি আর স্পর্শটাকে অনুভব করতে হয়। নির্বাক হয়ে পরস্পরের হৃদস্পন্দন শুনতে হয়।
তা না খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন! আচ্ছা ঠিক আছে কী বলছিলে বলো?
— বলবো না। আমি তো
খালি বকবক করি তাই না! এখন তো আমার গলাকে অসহ্য মনে হবেই। আদরের পার্ট চুকে গেছে না!
— ফালতু কথা বলবে
না!
— কি? আমি ফালতু কথা বলি?
— বলোই তো! সারাদিন
খালি বক বক করতে থাকো বকবকম পায়রার মতো। কী হল যাচ্ছো কোথায়?
ডিভানের উপর উঠে বসে
সুনেত্রা। অভিমান ভরা গলায় বলে, “বেশ আমার কন্ঠস্বর যখন সহ্য হচ্ছে না। তখন আমি এখানে
থাকবো না।” সুনেত্রার হাত ধরে প্রদীপ্ত বলে ওঠে, “কোথাও যাবে না তুমি! আমার এখনও কথা শেষ হয়নি।”
— ছাড়ো আমাকে।
— আমি বলছি যখন
তুমি যাবে না। ব্যস।
— ইস! কী করবে শুনি?
— দেখবে? এই দেখো!
বলে সুনেত্রাকে নিজের
বুকের উপর টেনে নেয় প্রদীপ্ত। তারপর সুনেত্রাকে জড়িয়ে বিছানার উপর শুইয়ে দিয়ে
দুহাতে সুনেত্রার হাত চেপে ধরে। তারপর সুনেত্রার মুখের কাছে নিজের মুখ এনে বলে, “বললাম না। এখন
যাওয়া চলবে না!” প্রদীপ্তর বাহুডোরে ছটফট করতে করতে সুনেত্রা
বলে, “ছাড়ো আমাকে! গা ধুতে হবে। সারা গায়ে রং লেগে চ্যাট
চ্যাট করছে। তোমাকেও গা ধুতে হবে। নিজের চেহারাটা একবার আয়নায় দেখেছ? রং মেখে ভূত হয়ে শুয়ে আছে। কিম্ভুত কোথাকার! এরপর সারা শরীর কুটকুট করবে
তো!”
— করুক। আমি পরোয়া
করি না। তাছাড়া এই রং ধুয়ে কী হবে? আসল রংটাকে তো আর শতবার
ধুলেও তোলা যাবে না।
— কোন রংটাকে?
— কেন? আমাদের হৃদয়ের রংটাকে?
বলে প্রদীপ্ত অঝোর
বৃষ্টিধারার মতো নেমে আসে সুনেত্রার চোখে, গালে ঠোঁটের উপর। বাইরে তখন রাতের অন্ধকার
কেটে সূচনা হয় নতুন ভোরের।
