এইটুকু বলে
থামলেন রজতাভ। তাকিয়ে দেখলেন ঐশী আর অভীক তন্ময় হয়ে শুনছে। সুজাতা মাথা নামিয়ে
বসে আছেন। রজতাভ পকেট থেকে সিগারকেসটা বের করে একটা সিগার ধরালেন। ঐশীর জন্মানোর
পর তে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন,
“সুজাতাকে দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে ও বিয়েতে সুখী নয়।
সারাদিন এত হাসিখুশি, তথাগতর সাথে এত খুনসুটি করত ওর অভিনয়
ধরে কার সাধ্য?লোকে ঠিকই বলে, সংসার
জিনিসটা বড় বিচিত্রময়। এখানে খুব কম মানুষই সুখী হয়, বাকিদের
শুধু ভালোবেসে ভালো রাখার অভিনয়। জানি অভি মানতে চাইবে না, হয়তো
রাগ করবে। কিন্তু বাস্তবটা ভীষণ রূঢ়, আর ভয়ংকর। তথাগত
বাইরের জগতের কাছে যতটা ডিসেন্ট, যতটা প্রাণখোলা ছিল।
বিছানায় ছিল ততটাই বর্বর। অথচ তথাগতর এতে কোনো দোষ ছিল না। ওর Instinct-টাই ছিল এরকম। ছেলেটা ভালো হলেও ভেতরে ছিল এক বন্য কামুকপ্রকৃতির ছেলে।
সেক্সুয়াল ব্রুটালিটি নিয়ে আজকাল অনেক কথা শোনা যায়। কারো কারো মতে এটা একটা
মানসিক রোগও বলা চলে। একটা আপাতদৃষ্টিতে নিপাট,নিরীহ,
শান্ত ভদ্রলোক। বাইরের জগতে অমায়িক, ভদ্র,
মার্জিত ব্যবহার। মানুষটা বাস্তবিকই ভালো মনের মানুষ। অথচ শয্যাতে
সেই মানুষটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বেশী নির্মম, বর্বর, হিংস্র। আবার কামতৃষ্ণা মেটার পর সেই মানুষটাই অনুতাপে দগ্ধ হয়। তথাগত
ছিল সেই প্রকৃতিরই ছেলে। রোজ রাতে সুজাতাকে ছিবড়ে করে দেওয়ার পর নিজেই নতজানু
হয়ে ক্ষমা চাইত। সুজাতাকে নিজের থেকেও বেশী ভালোবাসত ছেলেটা। আর সুজাতা ছেলেটার
এই ভালোবাসার কাছে হেরে যেত বারবার। এই অত্যাচারে একদিন মরে যাবে জেনেও মুখ বুঁজে
সহ্য করে যেত তথাগতকে। হয়তো কথাগুলো আড়ালেই থেকে যেত যদি সেদিন ঊর্মি আমাকে না
জানাত।”
সুজাতা দুহাতে
মুখ ঢেকে বসেছিলেন। রজতাভর কথায় মুখ তুলে বললেন,“ওসব কথা থাক না রজতদা! আর শুনতে ইচ্ছে করছে না আমার। পুরোনো দিনের কথা
না তুললেই নয়?”
রজতাভ ম্লান
হেসে বললেন,“ সত্যিটা
একবার যখন বেরিয়ে এসেছে, তখন সবটা ওদের জানা দরকার সুজাতা।
আমি চাই না অর্ধেক সত্যিটা জেনে ওদের চোখে সারাজীবনের মতো তুমিও কলঙ্কিনী হয়ে
পড়ো। কারন সেদিন যা ঘটেছিল সবটা আমার দোষ ছিল। আমিই তো এসেছিলাম তোমার কাছে।
সারাজীবন এই পাপের বোঝা বয়ে চলার মতো আর শক্তি বা মনের জোর আমার নেই! সেদিন দুজন
মানুষ নিজের বিয়ে থেকে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পরস্পরের কাছাকাছি এলেও বাস্তবে একজনই
বাধ্য করেছিল অপরজনকে কাছে আসতে। সেদিন যদি আমি থেমে যেতাম তাহলে আজীবন এই গ্লানি
নিয়ে চলতে হত না। গোটা জীবন তোমাকে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় কাটাতে হত না।
কিন্তু আমরাও যে নিরুপায় ছিলাম! আর কোনো পথ খোলা ছিল না আমাদের কাছে। নাহলে
হয়তো গুমড়ে গুমড়ে আমি মরে যেতাম একদিন। একদিকে ঊর্মির সাথে আমার শীতল সম্পর্ক।
অপরদিকে তথাগতর অত্যাচারে ক্ষত বিক্ষত তুমি। অথচ বেশী কিছু তো চাইনি আমরা! একটু
ভালোবাসাই তো চেয়েছিলাম। শরীরের ভাজে থাকা, কামগন্ধী,
প্রবল যৌন আদর নয়, আমরা চেয়েছিলাম হাতে হাত
ধরে হাটতে, প্রবলভাবে ভেঙে পড়লে বা ক্লান্ত হলে পরস্পরকে
জড়িয়ে ধরতে। একটা ভরসার, ভালোবাসার সঙ্গী চেয়েছিলাম আমরা।
সংসারে ভালো থাকার অভিনয় করা কুশীলব হতে চাইনি। অথচ আমাদের নিয়তী আমাদের কুশীলবে
পরিণত করে তুলেছিল। ঊর্মির প্রত্যাখ্যান যেমন আমাকে ভেতর থেকে নিঃস্ব করে দিয়ে
ভালোবাসার পরশের কাঙাল করে তুলেছিল। তথাগতর বন্য যৌন অত্যাচার তেমনই সুজাতার
ভেতরের ভালোবাসার শেষ অনুভূতিটুকুকে মেরে ফেলেছিল। আমরা দুজন আলাদা মানুষ হলেও
ভেতরে কোথাও যেন এক হয়ে উঠেছিলাম। আর সেটার আভাস আমি পেলাম ঊর্মির কথায়। ঊর্মি
সাধারণত সংসারের বাঁধাধরা গতের জীবন কাটানো আদর্শ গৃহবধূ । যে নিয়মের বাইরে বা out
of the box ভাবত না। ভাবতে চাইত না। তাই ও বুঝতে পারেনি তোমার
খামতিটা কোথায় ছিল। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম! ধরে ফেলেছিলাম তোমার কষ্টটাকে।
সে রাতে তোমার মুখোশ অন্তত আমার কাছে খুলে গিয়েছিল।”
সুজাতা আবার
মুখ ঢেকে ফোপাতে থাকেন। ঐশী সুজাতার পাশে বসে তাকে জড়িয়ে সান্তনা দিতে থাকে।
অভীক ধরা গলায় বলে,“ তারপর
কী হল?” রজতাভ সিগারে টানা দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে
একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে তাকান অভীকের দিকে। তারপর সোফায় হেলান দিয়ে বসে বলেন, “পরদিন সকালে আমাদের সাফারি ঘোরার কথা ছিল। তথাগতও সেদিন ছুটি নিয়েছিল নিজে
আমাদের সাফারি ঘোরাবে বলে। কিন্তু বাধ সাধল আমার শরীর। সিজন চেঞ্জে জ্বরের ধাচ
আমার চিরদিনের। ঐশীও জানে সেটা। কাজিরাঙ্গায় সেই জ্বর
বাধিয়ে বসলাম আমি। ভোরের দিকে কাঁপুনি দিয়ে জ্বরটা এলো সকাল হতেই সেটা আরো বেড়ে
গেল। ফলে যা হবার ছিল তাই হল। সাফারি
বেড়ানো উঠল মাথায়, ঊর্মিরা ব্যস্ত হয়ে উঠল আমাকে নিয়ে। তথাগত ডাক্তার নিয়ে আসতেই
তিনি পরীক্ষা করে জানালেন তেমন চিন্তার কিছু নেই। নর্মাল জ্বর, সেরে যাবে। আমিও
ঊর্মিকে অভয় দিলাম, বললাম ঘুরে আসতে। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেতে চাইছিল না ও। অবশেষে
ঠিক হল সুজাতা থেকে যাবে আমার দেখাশোনার জন্য। ঊর্মি প্রথমে প্রথমে কিন্তু কিন্তু
করলেও অবশেষে নিমরাজি হয়ে চলে গেল তথাগতর সাথে সাফারিতে। আমি আর সুজাতা রয়ে গেলাম
বাংলোতে।”
*****
ঊর্মিরা চলে যাবার পর
রজতাভ কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল জানে না। ঘুম ভাঙল সুজাতার ডাকে। ঘরের চারদিকের আলো প্রায়
মরে এসেছে দেখে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসতেই সুজাতা বাধা দিল।
- তুমি শুয়ে থাকো রজতদা। কিছু
হয়নি। আসলে সকাল থেকে কিছু খাওনি বলে একটু চিকেন স্যুপ এনেছিলাম তোমার জন্য।
- ও! আমি ভাবলাম…! কটা
বাজে এখন?
- সাড়ে বারোটা।
- সেকি! মাত্র সাড়ে
বারোটাতেই এত অন্ধকার কেন?
- আকাশের অবস্থা ভালো নয়।
সকালে আকাশ পরিস্কার থাকলেও এখন মেঘ জমেছে। বৃষ্টি নামল বলে।
- সেকি! তাহলে ঊর্মিরা…
- সেটাই তো চিন্তা। বৃষ্টি হলে ওরা আটকা পড়ে যাবে। তবে তথা যখন আছে তখন একটু হলেও ভরসা আছে। বুদ্ধি করে ওরা বৃষ্টির আগে ফিরে এলে ভালো। নাও স্যুপটা চটপট শেষ করে ওষুধটা খেয়ে নিয়ে একটা জম্পেশ ঘুম দাও। বিকেলে দেখবে, শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে।
বলে স্যুপের বাটিটা এগিয়ে দেয় রজতাভর দিকে। রজতাভ জ্বরের ঘোরে ঘোলাটে চোখে তাকায়। তারপর বিছানার ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে বসে কাঁপা কাঁপা হাতে স্যুপের বাটিটা নেয়। জ্বরের মুখে স্বাদ না পেলেও স্যুপটায় বেশ পরিমাণে গোলমরিচ গুঁড়ো দেওয়া হয়েছে এটা বোঝে। জ্বরের মুখে স্যুপটা মন্দ লাগে না তার। স্যুপটা শেষ করে ট্রে-তে রাখার পর সুজাতা দুটো ট্যাবলেট এগিয়ে দিতেই সেটাকে গলাধঃকরণ করে জল খেয়ে গ্লাসটা এগিয়ে দেয় সুজাতার দিকে। গ্লাস বাটি গুছিয়ে ট্রে-টা নিয়ে সুজাতা ওঠার চেষ্টা করতেই রজতাভ বাধা দেয়।
- কোথায় যাচ্ছ?
- আপাতত এগুলো রান্নাঘরে
রাখতে। তুমি শুয়ে পড়ো রজতদা।
- থাক না ওগুলো। পরে নিয়ে
যাবে। তার চেয়ে বরং আমার সামনে বসো দেখি। কতদিন একসাথে বসে আড্ডা মারা হয় না। এখন
আর চাইলেও ঘুম আসবে না আমার। তার চেয়ে বরং একটু গল্প করা যাক। কিছু কথা আছে তোমার
সাথে।
- কী কথা?
- কথাটা তথাগত আর তোমাকে
নিয়ে। কালরাতে ঊর্মি আমাকে সবটা জানিয়েছে।
- কী জানিয়েছে?
বলে চমকে ওঠে সুজাতা। ঊর্মি কী জানতে পেরেছে ওর আর তথাগতর সম্পর্কে? কতটা জানতে পেরেছে? কীভাবে জানল? রজতাভ সুজাতার দিকে তাকিয়ে ওর অভিব্যক্তিগুলো লক্ষ্য করে। তারমানে আন্দাজে ঠিক জায়গাতেই ঢিলটা ছুঁড়েছে! রজতাভ সুজাতার দিকে তাকিয়ে বলে, “ সেদিন রাতে ঊর্মি তোমাকে রাতে বিড়বিড় করতে শুনেছে। তুমি নাকি ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে কার থেকে যেন মুক্তি চেয়েছিলে। বলছিলে যন্ত্রণায় সারা শরীর ফেটে যাচ্ছে, তোমার মুক্তি চাই।”
পলকে ঊর্মির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। সর্বনাশ! ঘুমের ঘোরে এইসব বলছিল নাকি? পরক্ষণে নিজেকে সামলে হেসে বলে, “আর তুমি বিশ্বাস করে নিলে? ধুর! কবে কোনদিন ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে কীসব বলেছি তার ঠিক নেই। আর তোমরা ভেবে নিলে আমার আর তথাগতর মধ্যে সমস্যা হয়েছে? সত্যি রজতদা! তোমরা পারোও বটে। ঊর্মিটার নাহয় মাথা খারাপ, তাই বলে তুমিও?”
বলে সুজাতা উঠতে গেলে বাধা দেয় রজতাভ। হেসে বলে “ঊর্মির না হয় মাথা খারাপ। কিন্তু এতটাও নয় যে ও বানিয়ে বানিয়ে বলবে। সত্যি করে বলো তো, এই বিয়েতে তুমি সুখী তো?”
- তোমার শরীর অসুস্থ
রজতদা। এখন তোমার ঘুমের প্রয়োজন। জ্বরের ঘোরে ভুলভাল বকছ তুমি।
- নাকি তুমি অভিনয় করে
লুকিয়ে যাচ্ছ সবটা? মানুষ চিনতে আমার সচরাচর ভুল হয় না সুজাতা। আর তোমাকে আমি
আমাদের বিয়ের পর থেকে চিনি। এবং বেশ ভালো করেই চিনি।
- কীসব ভুলভাল বকছ তুমি
রজতদা? তুমি যা ভাবছ তা নয় রজতদা। তথাগত আর আমার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই! আমরা অনেক
সুখী।
- কাকে বোকা বানাচ্ছ
সুজাতা? তোমার চোখ তো অন্য কথা বলছে।
- না রজতদা তুমি ভুল
ভাবছ। ওরকম কিছু হয়নি। আমি বরং যাই। দুপুরের রান্না সেরে ফেলি। তুমি ঘুমোও।
বলে সুজাতা বিছানা থেকে উঠতে গেলে রজতাভ সুজাতার হাত ধরে আটকাবার চেষ্টা করে। কিন্তু সুজাতার হাত ধরামাত্র সুজাতা কঁকিয়ে ওঠায় চমকে ওঠে রজতাভ। সুজাতা প্রবল যন্ত্রণায় বিছানায় বসে পড়ে।
- একি! কী হল? ওভাবে
কঁকিয়ে উঠলে কেন? দেখি হাতে কী হয়েছে?
- ও কিছু না। একটু মচকে
গেছে।
- মচকে গেছে? কি করে?
- ও মেয়েমানুষদের একটু
আধটু চোট লেগে থাকে।
- দেখি!
বলে সুজাতার হাজার বাধা
দেওয়ার পরেও ব্যথার জায়গাটা ধরে রজতাভ। আর জায়গাটা দেখামাত্র চমকে ওঠে। সুজাতার
হাতে কালশিটের দাগ। হাতের পাঁচটা আঙুলের ছাপ পড়ে গেছে হাতে। রজতাভ বিস্ফারিত চোখে
তাকায় সুজাতার দিকে। আর তাকানো মাত্র দেখতে পায় সুজাতার কলারবোনের দিকে একটা
কামড়ের দাগ। মানুষের কামড়ের দাগ! তবে কি তথাগত…? সন্দিহান চোখে রজতাভ তাকায় সুজাতার
দিকে। সুজাতা নিজের হাত ছাড়িয়ে বলে, “কী দেখছ ওরকম করে?”
- এসব কী সুজাতা?
- ও কিছু নয়। জানোই তো
এখানে পোকার উপদ্রব ভীষণ। তারই একটা কামড়েছে হয়তো।
- আমাকে কামড় চেনাতে এসো
না সুজাতা। ওটা কোনো পোকার নয়, মানুষের কামড়ের দাগ। মাই গড সুজাতা! তারমানে তথাগত…
- একদমই না! ও আমাকে ভীষণ
ভালোবাসে রজতদা। বলতে পারেন নিজের থেকেও বেশি। তবে বিছানাতেই একটু বন্য এই যা! তবে
ওর ভালোবাসার কাছে এইটুকু যন্ত্রণা তুচ্ছ। তাছাড়া পুরুষ মানুষ একটু কঠোর নাহলে চলে
না। আর ভালোবাসা কবে দেহাতীত থেকেছে বলো তো? সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর আমার
কাছে মানুষটা একটু আশ্রয়ের খোঁজে আসে। সারাদিনের জমা রাগ উগড়ে দেয় আদর করার সময়।
আবার সকালে ক্ষমাও চায়। ও যে ভীষণ একা রজতদা। এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর ওর কে আছে?
- সেটা আলাদা কথা সুজাতা!
মানছি ভালোবাসা কোনোদিনই দেহাতীত হয় না। কিন্তু ভালোবাসার নামে নিজের প্রেমকে তিলে
তিলে শেষ করাটা ভালোবাসা নয়। তোমার সাথে তথাগত প্রতিরাতে যা করে চলেছে তা ভালোবাসা
নয়! এ যে বিকৃত যৌনাচার! তথাগত যে বিকৃত মনের মানুষ!
(চলবে...)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন