সুজাতা মৃদু
প্রতিবাদের সুরে বলে, “কী সব
যা তা বলছ তুমি রজতদা! ভুলে যেও না তথাগত আমার স্বামী! মানছি আদরের সময় হুশ
হারিয়ে ও একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলে। কিন্তু তাই বলে ওর নামে তুমি যা নয় তা বলবে, এটা হতে পারে না। এটা আমাদের স্বামী-স্ত্রীর একান্ত
গোপনীয় আর নিজস্ব ব্যাপার! এখানে আমার স্বামীর ব্যাপারে বাইরের কারোর কোনো মন্তব্য
আমি সহ্য করব না! নেহাত তুমি অসুস্থ নাহলে...তুমি বরং ঘুমোও রজতদা। জ্বরের ঘোরে
তুমি ভুলভাল বকছ। আমি এলাম।”
বলে সুজাতা
ট্রে নিয়ে খাট থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই শুনতে পায় রজতাভর কন্ঠস্বর, “পালিয়ে যাচ্ছ? যেই সত্যিটা
ধরে ফেললাম ওমনি মুখ লুকিয়ে নিলে? কী ভেবেছ? পালিয়ে গেলেই সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে? হবে না!
সুজাতা যতই অস্বীকার করো, যতই মুখ লুকিয়ে পালাবার চেষ্টা
করো,সত্যিটা কোনোদিনও পাল্টে যাবে না। আর এটা তুমিও জানো!
তুমি যাই বলো না কেন? দিনের শেষে তথাগতর রূপে এই সত্যিটাই
তোমার সামনে এসে দাঁড়াবে। প্রবল আদরের আঘাতে তোমাকে ক্ষতবিক্ষত করবে, ছিন্নভিন্ন করে দেবে তোমার সমগ্র দেহ,ধ্বংস করে দেবে
তোমার এই সুখী দাম্পত্যের ভ্রমটাকে, টেনে ছিড়ে দেবে এই
সুখের মুখোশকে। সুখী দাম্পত্যের অভিনয় করাটা যে কি ভীষণ বিষাক্ত আর যন্ত্রণার
সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না সুজাতা। কারণ তুমি আমি একই পথের পথিক। ঊর্মি
নিঃসন্দেহে একজন ভালো মেয়ে। ওর সাথে এতবছরের সংসার আমার। ওকে ভালোবাসী আমি!
কিন্তু বিগত কয়েক বছরে আমার প্রতি ওর সমস্ত অনুভূতি মৃত। হ্যা আমরা একছাদের নিচে
থাকি, এক বিছানায় শয়ন করি, কিন্তু
একবারের জন্যেও এই কয়েক বছরে আমরা মিলিত হইনি। মিলিত হওয়া তো দুর! হাতে হাত রেখে
পাশাপাশি হাটা,কারণে অকারণে জড়িয়ে ধরা, ক্লান্ত হয়ে কাঁধে মাথা রাখা, একটু আদরের স্পর্শ
থেকেও বঞ্চিত আমি। এমনকি আমার ছায়ার স্পর্শেও যেন ঊর্মির তীব্র অনীহা। সামান্য
একটা অ্যাক্সিডেন্টের কারণে আমার গোটা জীবন তছনছ হয়ে গেছে সুজাতা! একটা তুচ্ছ
ভয়ে, একটা অকারণ, অবাস্তব, ভিত্তিহীন কুসংস্কারের জন্যে ঊর্মি সাথে আজ আমার যে দুরত্ব তৈরি হয়েছে তা
কোনোদিনই মেটার নয়। কেন জানো? আমার ঊর্মিও যে তোমার তথাগতর
মতো মানসিকভাবে অসুস্থ!”
কথাগুলো শোনামাত্র
সুজাতা ঘরের বাইরে বেরিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। রজতাভর বলা কথাগুলো যেন তার
নড়ার শক্তিটুকু কেড়ে নিয়েছে। পা দুটো যেন পাথরের হয়ে গেছে আচমকা। এ কি শুনছে
সে? ঊর্মিও মানসিকভাবে অসুস্থ মানে?
তবে কী রজতদার সংসারেও অশান্তির ছোঁয়া লেগেছে? ওরা কী এই দাম্পত্যজীবনে সুখী নয়? কিন্তু কেন?
কী কারণ এটার? কেন রজতদার মনে হচ্ছে ঊর্মিও
মানসিকভাবে অসুস্থ? কী করেছে ঊর্মি? সুজাতা
পিছন ফিরে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। রজতাভ ততক্ষণে বিছানায়
শুয়ে পড়ে বিড়বিড় করে আপন মনে নিজের সাথেই কথা বলে চলেছে। সুজাতা কান পেতে শোনে
রজতাভর স্বগতোক্তিগুলো। রজতাভ বলতে থাকে,
- ওর একটাই
ভয়! একটাই কথা! ওকে স্পর্শ করলেই আমি নাকি মারা যাব। তুমি জানো না সুজাতা এতগুলো
বছর ধরে ঊর্মিকে আমি পাগলের মতো বুঝিয়েছি। ওকে বলেছি এসব মিথ্যে, অমূলক ভাবনা। ওটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল! যে কারো সাথে হতে পারত! কিন্তু
ঊর্মি আমার কোনো কথা মানতে চায়নি। এই যে জ্বরে ভুগতে দেখছ! তুমি জানো এটা নর্মাল,
আমি জানি এটা নর্মাল! ঊর্মির কি মত জানো? কাল
রাতে যেহেতু আমরা একে-অপরের কাছাকাছি এসেছিলাম সে কারণেই আজ জ্বর এসেছে। এরপরেও
আমরা যদি আরো কাছাকাছি আসি তাহলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত! হ্যা
মৃত্যু তো হয়েছে ঠিকই, তবে সেটা আমার ভালোবাসার! আমার বিশ্বাসের! এতবছরের চেষ্টার! এতবছর ধরে একটু একটু করে বুঝিয়ে তিলে তিলে যে ধারনা থেকে ওকে টেনে বের
করেছিলাম আজ এই সামান্য একটা জ্বর সেই সমস্ত প্রচেষ্টা, সংগ্রামকে
তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিল সুজাতা! দুমড়ে মুচড়ে দিল আমার ভালোবাসাটাকে! তোমরা শুধু
জ্বরের ঘোরে পড়ে থাকা শরীরের উত্তাপটাকেই দেখলে! এদিকে আমার মন, আমার ইচ্ছে, ভালোবাসা পুড়ে ছাই হয়ে গেল সেটা কেউ
টেরও পেলে না! ভালোবাসার অভাবে যে আগুনে এতবছর জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিলাম সে আগুন আজ
গ্রাস করল আমার আশার শেষ বিশ্বাসটাকেও। আবার প্রমাণিত হল
এতগুলো বছর ধরে একটা মৃত সম্পর্ক বয়ে বেড়াচ্ছি আমি! এর চেয়ে তো যুদ্ধক্ষেত্রে গুলি লেগে, বা সেদিন হার্ট অ্যাটাকটায় মরে গেলে ভালো হত! তাহলে
এভাবে ক্ষতবিক্ষত হতে হত না সুজাতা! আমিও যে তোমার মতোই নিঃস্ব সুজাতা! দুজনেই
ভালোবেসে ভালো থাকার, সকলকে ভালো রাখার অভিনয় করে যাচ্ছি।
হাজার আঘাত পেলেও দাঁতে দাঁত চেপে হাসিমুখের মুখোশ পরে সুখী সংসারের অভিনয় করছি।
খুব বেশী তফাত নেই আমাদের মধ্যে। না একটাই তফাত আছে! তোমার
ক্ষতগুলো শারীরিক। অভিজ্ঞ চোখ দিয়ে দেখলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু আমার!
আমার ক্ষতগুলো যে মানসিক সুজাতা! আমি না জানালে কেউ জানতেও পারবে না কী নিদারুন
দগদগে ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি আমি! ভেবেছিলাম সময়ের প্রলেপে ক্ষতটা শুকিয়ে গেছে।
কিন্তু আজ বুঝলাম ক্ষতটা মোটেও শুকিয়ে যায়নি, বরং ভেতর
ভেতর পচে গলে একটা বিষাক্ত গ্যাংগ্রিনে পরিণত হয়ে গেছে! আর এই ক্ষত বয়ে বেড়ানোর
মতো মানসিক জোর আমার নেই! আমি ক্লান্ত! একটু বিশ্রাম চাই আমার! একটা আশ্রয় চাই। একটু
ঘুমোতে চাই! শান্তির ঘুম। একটু আগে বলছিলে না ঘুমোলে সব ঠিক হয়ে যাবে? আমিও যে সেই ঘুমটাই চাই সুজাতা!
সুজাতা
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যাপারটা সে আঁচ করেছিল সেদিন পিকনিক স্পটেই। কিন্তু
সেটা যে এতদুর গড়িয়েছে বুঝতে পারেনি। কিন্তু এখানে তার কী ভূমিকা থাকতে পারে? কেন রজতদা ওকে এই কথাগুলো ওকেই বলছে? আর ওই বা কেন এত কথা শুনছে?ভাবতে ভাবতে সুজাতা পায়ে
পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।
অন্যদিন গুনগুন
করে দুপুরের রান্না সাড়লেও আর চুপচাপ রান্না করতে থাকে সে। ভাতের গন্ধে অন্যদিন
খিদের পেলেও আজ আনমনা হয়ে পড়ে সুজাতা। তার মাথায় ঘুরতে থাকে রজতাভর কথাগুলো, “আমিও যে তোমার মতোই নিঃস্ব সুজাতা! দুজনেই ভালোবেসে ভালো থাকার, সকলকে ভালো রাখার অভিনয় করে যাচ্ছি। হাজার আঘাত পেলেও দাঁতে দাঁত চেপে
হাসিমুখের মুখোশ পরে সুখী সংসারের অভিনয় করছি। খুব বেশী তফাত নেই আমাদের মধ্যে।”
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রান্নায় মন বসে না তার। বার বার রান্নায় ভুল
করে বসে সে। ডালে ফোঁড়ন দিতে ভুল হয় তার। তরকারীতে দুবার নুন দিয়ে বসে সে।
আগুনের আঁচে তরকারী কড়াইতে পোড়ার উপক্রম হয়। অবশেষে বিরক্ত হয়ে কোনো মতে
রান্না শেষ করে গ্যাসের আগুন নিভিয়ে দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোয় সুজাতা।
বাথরুমে ঢুকে পরনের
পোশাক খুলে সুজাতা তাকায় বাথরুমের ঝাপসা হয়ে আসা আয়নার দিকে। জলের ফোঁটায়
ঝাপসা হয়ে আসা কাঁচে ফুটে ওঠা তার প্রতিবিম্বটা যেন আরো অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেন
এটা সুজাতার প্রতিবিম্ব নয়, অন্য কোনো অচেনা মানবীর। এক হাতে কাঁচটাকে পরিস্কার করতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে
প্রতিবিম্বটা। ফুটে ওঠে সুজাতার দেহের সমস্ত বিভাজিকা, চোখের
ধেবড়ে যাওয়া কাজল, এতগুলো বছর ধরে বয়ে আসা তথাগতর আদরের
স্মৃতিরূপী ক্ষতচিহ্নগুলো। সেই চিহ্নগুলোর দিকে
তাকিয়ে সুজাতা ক্রমশ অন্যমনস্ক হয়ে ওঠে। ওর মনে ভেসে ওঠে রজতাভর প্রশ্নটা, “তুমি কি অভিনয় করে লুকিয়ে যাচ্ছ সবটা?” অভিনয়! ঠিকই তো! এতদিন ধরে তো সে অভিনয় করেই এসেছে!
ভালো স্ত্রী হবার অভিনয়, ভালো শয্যাসঙ্গিনী হবার অভিনয়,
স্বামী সোহাগিনী হবার অভিনয়, সুখী দাম্পত্যের
অভিনয়। সারারাত তথাগতর পাশবিক আদরের পর সকালে যেন কিছুই হয়নি এমন ভান করে
প্রচণ্ড যন্ত্রণাকে চেপে হাসিমুখে থাকার অভিনয়। এত অভিনয় করে সেও যে ক্রমশ
ক্লান্ত হয়ে পড়েছে! তারও যে একটু বিশ্রামের প্রযোজন!
একটু শান্তি, একটু আদরের স্পর্শের প্রয়োজন।
ইদানীং তথাগতর সাথে ওর সম্পর্কটা কিছুটা যান্ত্রিক হয়ে গেছে। সব থাকলেও প্রাণ নেই!
ভালোবাসা নেই! শুধু আছে দিনের শেষে অবাধ,
বিকৃত যৌনতা! অথচ বিয়ের পর ছবিটা সম্পুর্ণ
উল্টো ছিল। বিয়ের পর তথাগতর প্রেমের বহর দেখে নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবতী মনে হত তার।
বিয়ের পর তথাগত মাসে একদিন হলেও ওকে নিয়ে শহরে বেড়াতে নিয়ে যেত, রেস্তরাঁয় একটা প্লেটে দুজনে মিলে খাবার ভাগাভাগি করে খেত, সিনেমা দেখত, বাজারে হাতে হাত ধরে হেঁটে হেঁটে
জিনিসপত্র কিনত। ফেরার সময় গাড়িতে তথাগতর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোবার ভাণ করত সে।
গাড়ির হাওয়ায় মাথার চুল এলোমেলো হয়ে মুখের সামনে এলে তথাগত নিজের হাতে চুল সরিয়ে
দিত। রাতে উদ্দাম সঙ্গমের পর অনেকক্ষণ সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকত।
নাইটল্যাম্পের আলোয় অপলকে চেয়ে দেখত সুজাতার ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত
মুখটাকে। কারণে-অকারণে চুমুতে ভরিয়ে দিত সুজাতার গোটা মুখ।
কোনোদিন দুপুরে ফিরে এলে সুজাতাকে চমকে দিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে নাক ঠেকিয়ে
প্রাণপণে আঘ্রাণ নিত সুজাতার চুলের সুবাসের। আর এখন? দিনের
শেষে যন্ত্রের মতো মেকি হাসি নিয়ে দাম্পত্যজীবন পালন করে ওরা। রাতে অমানুষিক
যৌনাচারে প্রায় বন্যজন্তুর মতো সুজাতার দেহটা ছিঁড়েখুঁড়ে ভোগ করে তথাগত। সুজাতার
ইচ্ছে-অনিচ্ছে, মতামত, শরীর খারাপ, যন্ত্রণা কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ নেই তার।
রোজ রাতে ছিন্নভিন্ন সুজাতার ক্ষতবিক্ষত দেহটাকে দীর্ঘক্ষণ ভোগ করে সুজাতার গর্ভে
নিজের সমস্ত পৌরুষ, সমস্ত তেজ উজার করে দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে
পড়ে সে। পাশে ক্ষতবিক্ষত, ছিন্নভিন্ন সুজাতার প্রায়
নিষ্প্রাণ দেহটা পড়ে থাকে একা।
শাওয়ারটা চালিয়ে
দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সুজাতা। শাওয়ারের ঠাণ্ডা জল ভিজিয়ে দেয় তার সর্বাঙ্গ।
ক্ষতচিহ্নগুলোয় জলের স্পর্শ লাগতেই শিঁউড়ে ওঠে তার সমগ্র শরীরটা। কৃত্রিম ঝর্ণার
বারিধারায় ক্রমশ জলস্নাত হতে হতে তার মাথায় তখনও ঘুরতে থাকে রজতাভর কথাগুলো, “তুমি আমি একই পথের পথিক...আমিও যে তোমার মতোই
নিঃস্ব সুজাতা! দুজনেই ভালোবেসে ভালো থাকার, সকলকে ভালো
রাখার অভিনয় করে যাচ্ছি। হাজার আঘাত পেলেও দাঁতে দাঁত চেপে হাসিমুখের মুখোশ পরে
সুখী সংসারের অভিনয় করছি। খুব বেশী তফাত নেই আমাদের মধ্যে...”
রজতাভর কথা
ভাবতে ভাবতে ক্রমশ উদাসীন হয়ে পড়ে সে। রজতাভও তার মতোই অভাগা। ভালোবাসার
স্পর্শের অপেক্ষা করতে করতে ক্রমশ ক্লান্ত দুজনে। বাইরে থেকে সুখী মানুষের অভিনয়
করলেও ভেতর ভেতর দুজনেই অনুভূতি শূন্য একটা মৃত মানুষ। কলের পুতুলের মতো নড়াচড়া
করলেও ভেতরে প্রাণ নেই। বাইরে থেকে দুজনে সুখী মনে হলেও ভেতর ভেতর দুজনেই একা।
দুজনেই ভালোবাসার কাঙাল। সত্যিই খুব বেশি তফাৎ নেই দুজনের মধ্যে। দুজনেরই চাই একটা
ভালোবাসার স্পর্শ। যে স্পর্শে যৌন ইঙ্গিত থাকবে না। অকারণ জোর থাকবে না। যে স্পর্শকে
ভরসা করা যাবে। সে স্পর্শকে বিশ্বাস করা যাবে। মন খারাপ হলে পরস্পরকে জড়িয়ে কাঁদা
যাবে। অকারণ যৌনতা নয়, প্রেমের
স্পর্শ।
ভাবতে ভাবতে
হঠাৎ সম্বিত ফিরতেই মাথা ঝাকায় সুজাতা। এসব কী ভাবছে সে? তবে কি মনের কোনো গহীন কোনে রজতদার প্রতি… না! না! এ যে অসম্ভব! এ যে পাপ! এ যে অনাচার! তথাগত থাকতে সে রজতাভর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে কেন?
সে তো নিজের ভবিতব্য মেনে নিয়েছে। তাহলে কেন বার বার ভাবছে সে
রজতাভর কথা? সে যে
বিবাহিত! একজন বিবাহিত মহিলা হয়ে পরপুরুষের প্রতি এইরকম
ভাবনা যে…ছিঃ! ছিঃ! কেন বার বার দুর্বল হয়ে পড়ছে সে? কেন বার বার একটা
কথাই তার কানে বেজে উঠছে? তবে কি রজতাভও তার মতো সুখী নয় বলে
ভেতর ভেতর সে রজতাভর সাথে নিজেকে গুলিয়ে ফেলছে? কিন্তু কেন?
রজতাভই বা ওকেই কেন এই কথাগুলো বলল? ও রজতাভর
কে হয়? ওর উপর রজতাভর এতটা বিশ্বাস কেন? কেন মনে হচ্ছে বার বার সে রজতাভর কথায় প্রভাবিত হচ্ছে? কেন বার বার মনটা অবাধ্য হতে চাইছে?
দুহাতে নিজের
মাথা চেপে ধরে সে। শাওয়ারের জলের শব্দ ছাপিয়ে তার কানে বেজে ওঠে রজতাভর কন্ঠস্বর। একটা
কথাই বার বার অনুরণন তোলে তার কানে,
“খুব বেশী তফাত নেই আমাদের মধ্যে!” দুহাতে
মাথা চেপে নতজানু হয়ে সে বসে পড়ে বাথরুমের মেঝেতে। হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“চুপ করো! চুপ করো! রজতদা
দোহাই তোমাকে চুপ করো! এ কোন মায়ায় বেঁধে ফেলতে চাইছ আমাকে
তুমি রজতদা? আমার জীবনটা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে! আর কোনো সর্বনাশকে ডেকে এনো না রজতদা! আমার জীবনে
ভালোবাসা অনেক আগেই মরে গেছে। সেটাকে আবার জাগিয়ে তুলতে এসো না রজতদা! আমি আমার ভবিতব্যকে মেনে নিয়েছি রজতদা! তুমিও মেনে
নাও! আমাকে আমার মতো করে বাঁচতে দাও! প্লিজ রজতদা!
আমাকে আমার মতো বাঁচতে দাও।” বলে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে সুজাতা। শাওয়ারের জলের
ওর চোখের জল সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
******
সুজাতা চলে যাবার পর জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল রজতাভ। সে ঘুম ভাঙল আবার সুজাতার ডাকে। ঘুম ভাঙার পর রজতাভ চারদিকে তাকিয়ে দেখল ঘর প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। তার মানে কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি নামল বলে। দূরে কোথাও মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। সুজাতা আবার ডাকল রজতাভকে, “রজতদা!” রজতাভ বুঝল সুজাতা দুপুরের খাবার এনেছে। কিন্তু ভেতরে ঢোকেনি, ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। রজতাভ বুঝল সুজাতা ওকে আর বিশ্বাস করতে পারছে না। রজতাভকে এড়িয়ে যেতে চাইছে মেয়েটা। আর কথাটা বোঝামাত্র একটা চাপা অভিমান জন্ম নেয় রজতাভর মনে। শেষমেশ সুজাতাও তাকে ভুল বুঝল! ও তো সুজাতার কাছে কিছুই চায়নি? আশ্রয়, ভালোবাসা কিছু না। সে তো চেয়েছিল সুজাতার সমব্যথী হতে। চেয়েছিল সুজাতার কষ্ট ভাগ করে নিতে। সুজাতাকে জানাতে চেয়েছিল এই পৃথিবীতে সে একা নয়! রজতাভও সুজাতার মতোই এই পৃথিবীতে নিঃস্ব, ভালোবাসার কাঙাল। সে বোঝাতে চেয়েছিল ভালোবাসা দেহাতীত নাহলেও বিকৃত যৌনাচারের নাম ভালোবাসা নয়। এভাবে চলতে থাকলে একদিন তথাগতর অত্যাচারে সুজাতা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সুজাতা কথাটা বুঝতে চাইল না। শুধু তাই নয় ওকে ভুল বুঝে চরিত্রহীন ভেবে বসল! কথাটা অনুধাবন করার পর রজতাভর ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। সুজাতার ডাকে সে ইচ্ছে করে সাড়া দেয় না।
সুজাতা আরো বার
দুয়েক ডাকার পর বাধ্য হয়ে রজতাভদের ঘরে ঢোকে। ঘরের আলো জ্বালাবার পর দেখে রজতাভ
বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। একটা হাত চোখের উপর রাখা। সুজাতা খাবারের ট্রে-টা বিছানার পাশের টেবিলে রেখে আবার ডাকে রজতাভকে,
“রজতদা, খাবারটা খেয়ে নাও।” রজতাভ এবারও সাড়া দেয় না। সুজাতা বোঝে রজতাভ ইচ্ছে করে ওর ডাকে সাড়া দিতে
চাইছে না। সুজাতা বোঝে কারণটা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রজতাভর গায়ে পড়ে থাকা চাদরটা
টেনে দেয় রজতাভর বুক পর্যন্ত। তারপর পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসে ঘরের বাইরে। দরজার কাছে
এসে দাঁড়িয়ে একবার পেছন ফিরে তাকায় সে। তারপর খানিকটা স্বগোতোক্তির ঢং-য়ে বলে, “যা কোনোদিনও হবার নয় তা নিয়ে এরকম
ছেলেমানুষের মতো জেদ তোমাকে মানায় না রজতদা। জিনিসটাকে প্র্যাক্টিক্যালই ভেবে দেখ।
আমি জানি তুমি সেভাবে মিন করতে চাওনি। তুমি আমাকে বোঝাতে চেয়েছিলে রোজ রাতে তথাগত আমার সাথে যে আচরণটা করে সেটা ভালোবাসা নয়, ভালোবাসা হতে পারে না। তথাগত আমার সাথে যা করে তা হল
বিকৃত যৌনাচার তাই তো? এ কথাটা আমি আগে থেকেই জানি রজতদা।
একদম আমাদের বিয়ের প্রথম রাত থেকে। ফুলশয্যার রাতে যখন তথাগত আমাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ভোগ
করল সেদিন থেকে জানি। কিন্তু আমার কোনোদিন তথাগতর এই আদরকে যৌনাচার বলে মনে হয়নি
রজতদা। অন্তত মাসছয়েক আগে পর্যন্ত তো নয়ই! আমার মোহভঙ্গ হল
ঠিক মাস ছয়েক আগে। কীভাবে? কেন? সেটা
বলবো না। তবে এতটুকু বলতে পারি সেদিনের পর থেকে তথাগতর মুখোশ আমার সামনে খুলে
গেছে। কিন্তু কী করব বলো? আমি ছাড়া যে এই পৃথিবীতে তথাগতর
আপনজন আর কেউ নেই! মানছি মানুষটা বিছানায় বর্বর-দুর্দমনীয়, কিন্তু এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে
মানুষটা আমাকে ভালোবাসে না। আমার কিছু হলে মানুষটা প্রায় উন্মাদ হয়ে যায়। আমি
বেসামাল হলে কেউ আসুক বা না আসুক এই লোকটাই এগিয়ে আসে। জামায় বমি করে দিলে বিরক্ত
হয় না। আদরের যন্ত্রণায় যখন ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ি, বা পিরিয়ড
হয় তখন এই মানুষটাই আমাকে আগলে রাখে। আমার সেবা করে। আমার খোঁজ নেয়। আর আমরা
নারীরা তো জানোই চোখের জল আর অনুতপ্ত মুখ দেখে গলে যাই। আর আমি তো চিরকালই বোকা।
বলতে পারো ভালোবাসার কাঙাল। তাই তো প্রতিরাতে তথাগতর অত্যাচারে মরতে মরতে বেঁচে
ফেরার পর তথাগতকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবলেও সকালে তথাগতর ক্ষমা চাওয়া, ওর সেবায় গলে যাই। যে ভালোবাসার পরশের জন্য আকুল হই সেই পরশের লোভ দেখিয়ে
আমাকে আটকে দেয় তথাগত। আর আমি বোকার মতো মুখ বুঁজে থেকে যাই ওর সাথে এই
চক্রব্যুহে। আমার কথা বাদ দাও রজতদা। আমি অভাগী মেয়ে, নিজের
জীবন, নিজের ভবিতব্যকে মেনে নিয়েছি। আমাকে নিয়ে তোমাকে না
ভাবলেও চলবে। তুমি বরং নিজেদের কথা ভাবো। তুমি যা চাইছ তা হবার নয়। কারন এর কোনো
ভবিষ্যতই নেই! জানি তুমি চাইছ আমার সমব্যথী হতে, আমার দুঃখ ভাগ করে নিতে। কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ বলতে পারো? কোনো লাভ নেই! বরং ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। তথাগত আর
ঊর্মি তো বটেই নিজেদের চোখেও আমরা ছোটো হয়ে যাবো। বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হব আমরা। আমরা এক হলে যে চারটে জীবন নষ্ট হয়ে যাবে।
সবচেয়ে বড়ো কথা তুমি নাহয় বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হবে কিন্তু এর কলঙ্কের ভাগীদার
আমাকেও হতে হবে। কলঙ্কিনীর দায় বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন। সে আমি পারব না। তার চেয়ে
বরং আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কটাই থাকুক। একটা নিখাদ মিষ্টি বন্ধুত্ব। যার
সাথে সব কথা শেয়ার করা যাবে। এমন কথা যা নিজের কাছের মানুষকেও বলা যায় না। যার
কাছে মিথ্যে অভিনয় করতে হয় না। যতদুরেই থাকি না কেন মনে হবে আমরা একা নই। আমাদের
মতো আরেকজনও আছে। আমরা বরং একে অপরের দোসর হয়ে উঠি। সেই ভালো হবে রজতদা। কোনো কথার
আড়াল থাকবে না। দিনের শেষে একা মনে হলে যার কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারব। এমন একটা
বন্ধুত্বের সম্পর্ক হলেই ভালো। এতে আমরা একে অপরকে যেমন স্পেস দিতে পারব তেমনই
পারব একে অপরের কষ্টের ভাগীদার হতে। আর অভিমান করে থেকো না রজতদা। আমাকে আমার মতো
বাঁচতে দাও। নিজেও নিজের মতো বাঁচো। ঊর্মি বড়ো ভালো মেয়ে। ওকে ঠকিও না। তেমন হলে
আমি ওর সাথে কথা বলব। ওকে বোঝাবো।”
(চলবে...)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন