রজতাভ কোনো সাড়া দিচ্ছে না দেখে সুজাতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে যায় ডাইনিং রুমের দিকে। একটা প্লেটে নিজের খাবার বেড়ে নিয়ে খেতে শুরু করে। বাইরে মেঘের অন্ধকার আরো গাঢ় হয়েছে। ভাতের উপর ডাল ঢেলে ভালো করে মেখে প্রথম গ্রাস মুখে তোলে সুজাতা। আর প্রথম গ্রাস মুখে তোলামাত্র গা গুলিয়ে ওঠে তার। ইস! কী বাজে রান্না হয়েছে আজ! একেবারে মুখে তোলার অযোগ্য! অন্যদিন তো এরকম হয় না! মন দিয়েই সে রান্না করে। তবে আজ কেন এরকম হল? সব রজতদার জন্য! লোকটা ওকে এমন দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল যে রান্নাটাও ঠিকঠাক করতে পারেনি সে। অন্যদিন রান্না অল্পবিস্তর খারাপ হলেও মুখে তোলা যায়। আজ তো একেবারেই মুখে দেওয়া যাচ্ছে না! ইস! মিছিমিছি এতগুলো খাবার নষ্ট! পরক্ষণেই চমকে ওঠে সুজাতা। এই রে! এই একই খাবার তো সে রজতাভকেও দিয়ে এসেছে! রজতাভ এই খাবার মুখে তুললে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে! ভাবামাত্র উঠে দাঁড়ায় সুজাতা। তড়িঘড়ি হাত ধুয়ে ছুট লাগায় রজতাভদের ঘরের দিকে। ঘরের কাছাকাছি পৌঁছতেই শুনতে পায় কাঁচ ভাঙার শব্দ এবং তার সাথে ভেসে আসে রজতাভর কাশির শব্দ। ঠিক যেমন কেউ বিষম খেলে কাশে। সুজাতা একছুটে দৌড়ে এসে রজতাভদের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখে দৃশ্যটা। রজতাভর গোটা জামা আর বিছানার সামনের মেঝে ভাত-ডাল তরকারীতে মাখামাখি হয়ে আছে। বিছানার পাশের টেবিলে একটা কাঁচের গ্লাসে জল রাখা ছিল। সেটা ভেঙে গিয়ে ছত্রাখান হয়ে গেছে। তার মাঝে রজতাভ বিছানায় বসে বিষম খেয়ে কেশেই চলেছে।
সুজাতা সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে ডাইনিং রুমে। তৎক্ষণাৎ একটা গ্লাস আর জলের জগ নিয়ে ছুট লাগায় সে। ঘরে ঢুকে সাবধানে মেঝেতে ছড়ানো কাঁচের টুকরো পেরিয়ে গ্লাসে জল ভরে এগিয়ে দেয় রজতাভর দিকে রজতাভ হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিয়ে জল খেতে থাকে। সুজাতা বিষমটা কমানোর জন্য ফু দিতে থাকে রজতাভর মাথায়। কিছুটা জল খাবার পর রজতাভ শান্ত হয়। তারপর বলে, “ইস এত বাজে রান্না আমি বাপের জন্মে খাইনি! তরকারীতে এত নুন কে দেয়?”
- সরি! সরি! রজতদা বিশ্বাস করো। রান্নাটা এত বাজে হবে আমি ভাবতে পারিনি। আগে কোনোদিন এরকম হয়নি।
- নাকি ইচ্ছে করেই এরকম রান্না করেছ যাতে আমাকে শাস্তি দিতে পারো?
- একদমই না! রান্নার ব্যাপারে আমি যথেষ্ট সিরিয়াস থাকি রজতদা। খাবার নষ্ট করা তথাগত একদম পছন্দ করে না। সে কারনে রান্নার সময় আমাকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয় যাতে সব কিছু পরিমাণগত হয়।
- তাহলে আজ এর ব্যতিক্রম হল কেন?
রজতাভর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সুজাতা প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, “গ্লাসটা ভাঙল কী করে?” রজতাভ সুজাতার দিকে কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে থাকে তারপর বলে, “জ্বরের মুখে ডাল দিয়ে ভাতটা বিস্বাদ লাগছিল বলে তরকারী দিয়ে মেখেছিলাম। কিন্তু সে গ্রাস মুখে তোলামাত্র মনে হল যেন পেটের ভাত বেরিয়ে আসবে। কাশতে কাশতে হাত বাড়িয়ে জলের গ্লাসটা নিতে যেতেই হাত ফস্কে পড়ে গেল।”
- কোনো মানে হয়? আমাকে ডাকলেই তো হত!
- কী লাভ হত? আর তুমি এলেই বা কী করতে? তাছাড়া তোমাকে আমি বিব্রত করতে চাইনি।
- তুমি আমার অতিথি রজতদা। তার উপর অসুস্থ। ঊর্মি তোমার দায়িত্ব আমার উপর দিয়ে গেছে।
- কোনো দরকার নেই আমার দায়িত্ব নেওয়ার। তাছাড়া ঊর্মিই বা কে তোমাকে দায়িত্ব দেওয়ার? আমি কি কোনো অমুল্য ধন বা দুগ্ধপোষ্য শিশু নাকি?
- তা তোমার হাবভাবে তো তাই মনে হচ্ছে। যেরকম শিশুর মতো অভিমান করছ সেটা তো একটা বাচ্চাকেই মানায়। আর নামতে হবে না। গোটা ঘরের মেঝেতে কাঁচের গুড়ো ছড়িয়ে আছে। নামলেন পায়ে ফুঁটে যাবে। চুপচাপ খাটে পা তুলে বসো।
বলে ঘরের এক কোণ থেকে ঝাড়ু বের করে আনে সুজাতা। কাঁচের গুড়োগুলোকে ঝাড় দিয়ে ঘরের এককোণে জড়ো করে ঝাড়ুটা রেখে দেয় যথাস্থানে। তারপর বিছানা থেকে খাবারের প্লেটের ট্রে-টা তুলে বলে, “এটা আর খেয়ে কাজ নেই। দাঁড়াও ফ্রিজে বোধহয় ডিম পাউরুটি আছে। চটপট ডিমটোস্ট বানিয়ে আনছি।”
রজতাভ বিরক্তিতে ভরা গলায় বলে, “দরকার নেই! আমার আর খিদে নেই!”
- সে তোমার নাই থাকতে পারে। কিন্তু আমার আছে। সকালে এক জোড়া পাউরুটি ছাড়া আর কিছু জোটেনি। আর দুপুরের কথা তো ছেড়েই দিলাম। অগত্যা ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য কিছু তো খেতে হবে! তাই আমি যাচ্ছি আমার জন্য ডিমটোস্ট বানাতে। তুমি বরং তোমার জামাটা পাল্টে নাও। ভাতে-ডালে মাখামাখি হয়ে গেছে। আমি চললাম।
বলে ট্রে হাতে সুজাতা চলে যায় রান্নাঘরে। কিছুক্ষণ পর সুজাতা যখন আবার ট্রে সাজিয়ে ফিরল ততক্ষণে রজতাভ পোশাক পাল্টে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। ট্রে-টা খাটের পাশে রেখে চেয়ারে বসে সুজাতা খেতে শুরু করল। শব্দ শুনে রজতাভ পিছন ফিরে সুজাতাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কি ব্যাপার? এ ঘরে বসে খাচ্ছ যে?”
- উপায় কী বলো রজতদা? ঊর্মি যে একটা বাচ্চা ছেলের দায়িত্ব দিয়ে গেছে। চোখের আড়াল করলে যদি আবার কিছু করে বসে!তাই চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে।
- উফ সুজাতা তুমি থামবে!
- যতক্ষণ তোমার এই ছেলেমানুষি না থামছে ততক্ষণ পর্যন্ত তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না!
- সুজাতা!
- ভদ্রমহিলার এককথা! মিছিমিছি জেদ করে লাভ নেই! এতে তোমারই ক্ষতি। ঊর্মি বড় ভালো মেয়ে রজতদা।
- ওকে বুঝিয়ে লাভ নেই সুজাতা! ও বুঝবে না। বরং তোমাকেও ভুল বুঝে বসবে।
রজতাভ চোখ থেকে হাত নামিয়ে তাকায় দরজার দিকে। সুজাতা এগিয়ে এসে বিছানায় বসে।
- কিছু ভুল বুঝবে না। আমি আছি তো! আমি ঠিক বুঝিয়ে বলব। তবে তার আগে জানতে চাই এই বন্ধুত্বের সম্পর্কে তুমি রাজি কিনা?
- রাজি যদি না হতাম তাহলে এতক্ষণে অনেক কিছুই করতে পারতাম সুজাতা। তুমি কিছু করতে পারতে না। এই গোটা বাড়িতে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। আর এই দুর্যোগে চিৎকার করলেও কেউ আসবে না। চাইলে আমি জোর করে অনেক কিছুই করতে পারতাম। তুমি যা ভেবেছ তা করতেও আমাকে কেউ আটকাতে পারতো না। কিন্তু তা আমি করিনি কেন জানো? আমার ভালোবাসার স্পর্শ, মনের দোসরের প্রয়োজন হলেও এতটাও চরিত্রহীন হয়ে উঠিনি যে আমার স্ত্রীর সহোদরা না হলেও বোনের চেয়ে কম নয় এমন স্ত্রীকে নিজের অঙ্কশায়িনী করবো। এতে যেমন বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে, তেমনই একাধিক সম্পর্ক নষ্ট হবে। নিজের চোখে আমি ছোটো হয়ে যাব। তুমি কি ভেবেছিলে? মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাওয়ার নামে…ছিঃ! তুমি আমাকে এতদিনে এই চিনলে সুজাতা? তুমি আমাকে দাদা ডাকো। এতটুকু বিশ্বাস নেই দাদার উপর? মেজর রজতাভ মজুমদারের চরিত্র অতোটাও নীচু নয় যে ঊর্মিকে ভালোবাসা সত্ত্বেও অন্য নারীর কাছে আশ্রয় চাইবে। তার সাথে শারীরিকভাবে… ছিঃ! তুমি আমাকে এত নীচ ভাবতে পারলে?
- না মানে আমি ওভাবে মিন করতে চাইনি। কিন্তু পুরুষজাতটাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি তো!
- বটে? তা এখন পর্যন্ত কটা পুরুষের সাথে সাক্ষাত হয়েছে শুনি? আমি তো জানতাম তুমি দুজনকেই চেন। নাকি ভেতর ভেতর আরো অনুরাগী আছে?
- ইস! তোমার মুখে কি কিছু আটকায় না?
- এই রাগ করলে নাকি? আমি কিন্তু মজা করছিলাম।
- তা রাগ করবো না? তখন থেকে আমার স্বামীর নামে যা নয় তা বলে চলেছ। এমনকি আমাকে আরেকটু হলে বিশ্বাসঘাতিনীতে পরিণত করতে। রাগ করার কারণ হিসেবে কম কী?
- সে তো এমনি এমনি বলছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি কোনো নোংরা ইঙ্গিত করিনি। আমি শুধু তোমার কষ্টটা ভাগ করে নিতে চেয়েছি। এক বন্ধুর মতো।
- সে কারণেই তো প্রস্তাবটা দিলাম। নাহলে সোজা কমপ্লেন করতাম ঊর্মির কাছে। ইস! আবার বাচ্চাদের মতো গোঁসা করেছে!
- ইচ্ছে করে করেছি নাকি? করেছি তো অভিমানে।
- ইস! আবার অভিমান করা হয়েছে! স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ওরকম একটু-আধটু ঝামেলা হয়। সেটাকে নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নিতে হয়। আমাকেই দেখো। তথাগতর সাথে রোজ অ্যাডজাস্ট করি আমি। সংসার মানে এক বিছানায় শোয়া, একছাদের নিচে একসাথে থাকা বা একে অপরের দায়িত্ব নেওয়া নয়! সংসার মানে হল অ্যাডজাস্টমেন্ট। কথাটা নাটকীয় শোনালেও হাড়ে হাড়ে সত্যি। আর এটা একপাক্ষিক নয়। দুই দিক থেকেই চাই। মানছি একটা মানুষ যতই কঠোর হোক না কেন দিনের শেষে তারও একটা আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় সে ঘরের মানুষটাকে ছেড়ে বাইরে আশ্রয় খুঁজে বেড়াবে। সেটা উচিতও নয়। প্রয়োজনে সেই মানুষটাকে বোঝাতে হবে! তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে ভুলটা কোথায়?
- তোমার কি মনে হয়? ঊর্মি বুঝবে?
- বুঝতে হবে! এবং সেটা তুমিই বোঝাবে।
রজতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “বুঝলাম!”
“কি বুঝলে?” সুজাতা তাকায় রজতাভর দিকে। রজতাভ হেসে বলে, “বড়ো সড়ো ঝামেলা বাঁধতে চলেছে। যাকগে একটা কথা ছিল।”
- কী?
- ঝামেলা লাগার আগে একটু শক্তির প্রয়োজন। কারন ঊর্মিকে সামলানো ভীষণ চাপের। তাই বলছিলাম যে একটু খাবার হলে মন্দ হত না।
- থাক! ঢের অভিনয় হয়েছে। আমি জানতাম তুমি কথাটা তুলবে। তাই তোমার ভাগের খাবারটাও বানিয়েছিলাম। নিয়ে আসছি সেটা। চুপচাপ খেয়ে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করো।
বলে রান্নাঘর থেকে খাবারের প্লেটটা নিয়ে এনে রজতাভর হাতে ধরিয়ে দেয় সুজাতা। তারপর দুজনে খেতে বসে। সুজাতা দেখে রজতাভ গোগ্রাসে খাচ্ছে। দেখে বোঝাই যাচ্ছে ভীষণ ক্ষুধার্ত ও। প্লেটে থাকা পাউরুটি চিবোতে চিবোতে রজতাভর খাওয়া দেখতে থাকে সুজাতা।
(চলবে...)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন