(পাঠকের সুবিধার্থে খেই ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আগের পর্বের কিছু অংশ তুলে দেওয়া হল।)
রজতাভ বিরক্তিতে ভরা গলায় বলে, “দরকার নেই! আমার আর খিদে নেই!”
- সে তোমার নাই থাকতে পারে। কিন্তু আমার আছে। সকালে এক জোড়া পাউরুটি ছাড়া আর কিছু জোটেনি। আর দুপুরের কথা তো ছেড়েই দিলাম। অগত্যা ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য কিছু তো খেতে হবে! তাই আমি যাচ্ছি আমার জন্য ডিমটোস্ট বানাতে। তুমি বরং তোমার জামাটা পাল্টে নাও। ভাতে-ডালে মাখামাখি হয়ে গেছে। আমি চললাম।
বলে ট্রে হাতে সুজাতা চলে যায় রান্নাঘরে। কিছুক্ষণ পর সুজাতা যখন আবার ট্রে সাজিয়ে ফিরল ততক্ষণে রজতাভ পোশাক পাল্টে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। ট্রে-টা খাটের পাশে রেখে চেয়ারে বসে সুজাতা খেতে শুরু করল। শব্দ শুনে রজতাভ পিছন ফিরে সুজাতাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কি ব্যাপার? এ ঘরে বসে খাচ্ছ যে?”
- উপায় কী বলো রজতদা? ঊর্মি যে একটা বাচ্চা ছেলের দায়িত্ব দিয়ে গেছে। চোখের আড়াল করলে যদি আবার কিছু করে বসে!তাই চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে।
- উফ সুজাতা তুমি থামবে!
- যতক্ষণ তোমার এই ছেলেমানুষি না থামছে ততক্ষণ পর্যন্ত তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না!
- সুজাতা!
- ভদ্রমহিলার এককথা! মিছিমিছি জেদ করে লাভ নেই! এতে তোমারই ক্ষতি। ঊর্মি বড় ভালো মেয়ে রজতদা।
- ওকে বুঝিয়ে লাভ নেই সুজাতা! ও বুঝবে না। বরং তোমাকেও ভুল বুঝে বসবে।
রজতাভ চোখ থেকে হাত নামিয়ে তাকায় দরজার দিকে। সুজাতা এগিয়ে এসে বিছানায় বসে।
- কিছু ভুল বুঝবে না। আমি আছি তো! আমি ঠিক বুঝিয়ে বলব। তবে তার আগে জানতে চাই এই বন্ধুত্বের সম্পর্কে তুমি রাজি কিনা?
- রাজি যদি না হতাম তাহলে এতক্ষণে অনেক কিছুই করতে পারতাম সুজাতা। তুমি কিছু করতে পারতে না। এই গোটা বাড়িতে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। আর এই দুর্যোগে চিৎকার করলেও কেউ আসবে না। চাইলে আমি জোর করে অনেক কিছুই করতে পারতাম। তুমি যা ভেবেছ তা করতেও আমাকে কেউ আটকাতে পারতো না। কিন্তু তা আমি করিনি কেন জানো? আমার ভালোবাসার স্পর্শ, মনের দোসরের প্রয়োজন হলেও এতটাও চরিত্রহীন হয়ে উঠিনি যে আমার স্ত্রীর সহোদরা না হলেও বোনের চেয়ে কম নয় এমন স্ত্রীকে নিজের অঙ্কশায়িনী করবো। এতে যেমন বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে, তেমনই একাধিক সম্পর্ক নষ্ট হবে। নিজের চোখে আমি ছোটো হয়ে যাব। তুমি কি ভেবেছিলে? মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাওয়ার নামে…ছিঃ! তুমি আমাকে এতদিনে এই চিনলে সুজাতা? তুমি আমাকে দাদা ডাকো। এতটুকু বিশ্বাস নেই দাদার উপর? মেজর রজতাভ মজুমদারের চরিত্র অতোটাও নীচু নয় যে ঊর্মিকে ভালোবাসা সত্ত্বেও অন্য নারীর কাছে আশ্রয় চাইবে। তার সাথে শারীরিকভাবে… ছিঃ! তুমি আমাকে এত নীচ ভাবতে পারলে?
- না মানে আমি ওভাবে মিন করতে চাইনি। কিন্তু পুরুষজাতটাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি তো!
- বটে? তা এখন পর্যন্ত কটা পুরুষের সাথে সাক্ষাত হয়েছে শুনি? আমি তো জানতাম তুমি দুজনকেই চেন। নাকি ভেতর ভেতর আরো অনুরাগী আছে?
- ইস! তোমার মুখে কি কিছু আটকায় না?
- এই রাগ করলে নাকি? আমি কিন্তু মজা করছিলাম।
- তা রাগ করবো না? তখন থেকে আমার স্বামীর নামে যা নয় তা বলে চলেছ। এমনকি আমাকে আরেকটু হলে বিশ্বাসঘাতিনীতে পরিণত করতে। রাগ করার কারণ হিসেবে কম কী?
- সে তো এমনি এমনি বলছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি কোনো নোংরা ইঙ্গিত করিনি। আমি শুধু তোমার কষ্টটা ভাগ করে নিতে চেয়েছি। এক বন্ধুর মতো।
- সে কারণেই তো প্রস্তাবটা দিলাম। নাহলে সোজা কমপ্লেন করতাম ঊর্মির কাছে। ইস! আবার বাচ্চাদের মতো গোঁসা করেছে!
- ইচ্ছে করে করেছি নাকি? করেছি তো অভিমানে।
- ইস! আবার অভিমান করা হয়েছে! স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ওরকম একটু-আধটু ঝামেলা হয়। সেটাকে নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নিতে হয়। আমাকেই দেখো। তথাগতর সাথে রোজ অ্যাডজাস্ট করি আমি। সংসার মানে এক বিছানায় শোয়া, একছাদের নিচে একসাথে থাকা বা একে অপরের দায়িত্ব নেওয়া নয়! সংসার মানে হল অ্যাডজাস্টমেন্ট। কথাটা নাটকীয় শোনালেও হাড়ে হাড়ে সত্যি। আর এটা একপাক্ষিক নয়। দুই দিক থেকেই চাই। মানছি একটা মানুষ যতই কঠোর হোক না কেন দিনের শেষে তারও একটা আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় সে ঘরের মানুষটাকে ছেড়ে বাইরে আশ্রয় খুঁজে বেড়াবে। সেটা উচিতও নয়। প্রয়োজনে সেই মানুষটাকে বোঝাতে হবে! তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে ভুলটা কোথায়?
- তোমার কি মনে হয়? ঊর্মি বুঝবে?
- বুঝতে হবে! এবং সেটা তুমিই বোঝাবে।
রজতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “বুঝলাম!”
“কি বুঝলে?” সুজাতা তাকায় রজতাভর দিকে। রজতাভ হেসে বলে, “বড়ো সড়ো ঝামেলা বাঁধতে চলেছে। যাকগে একটা কথা ছিল।”
- কী?
- ঝামেলা লাগার আগে একটু শক্তির প্রয়োজন। কারন ঊর্মিকে সামলানো ভীষণ চাপের। তাই বলছিলাম যে একটু খাবার হলে মন্দ হত না।
- থাক! ঢের অভিনয় হয়েছে। আমি জানতাম তুমি কথাটা তুলবে। তাই তোমার ভাগের খাবারটাও বানিয়েছিলাম। নিয়ে আসছি সেটা। চুপচাপ খেয়ে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করো।
বলে রান্নাঘর থেকে খাবারের প্লেটটা নিয়ে এনে রজতাভর হাতে ধরিয়ে দেয় সুজাতা। তারপর দুজনে খেতে বসে। সুজাতা দেখে রজতাভ গোগ্রাসে খাচ্ছে। দেখে বোঝাই যাচ্ছে ভীষণ ক্ষুধার্ত ও। প্লেটে থাকা পাউরুটি চিবোতে চিবোতে রজতাভর খাওয়া দেখতে থাকে সুজাতা।
খাওয়া শেষ হলে প্লেট দুটো নিয়ে সুজাতা ঘরের বাইরে বেরোতে যাবে এমন সময় ঝপ করে ঘরের আলো নিভে যায় আর তার সাথে সাথে গোটা বাংলো কেঁপে ওঠে বাজের শব্দে, তারপর মুষলধারে বৃষ্টি নামে। আলো নিভে যাওয়ার সময় সুজাতা থমকে গেলেও বাজের শব্দে চমকে ওঠে। রজতাভ সঙ্গে সঙ্গে বিছানার পাশে থাকা পকেট টর্চ বের করে জ্বালিয়ে চিৎকার করে ডাকে, “সুজাতা?”
সুজাতা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “আমি ঠিক আছি রজতদা। তুমি শান্ত হয়ে বসো। বিছানা থেকে নামবে না। এদিকে এরকমই হয়। একটু বাজ পড়লে, বা বৃষ্টি হলেই কারেন্ট চলে যায়। এক কাজ করো, টর্চটা আমায় দাও। আমি প্লেটগুলো রেখে জেনারেটরের সুইচটা অন করে আসছি।”
রজতাভ টর্চ হাতে বিছানা থেকে নেমে বলে, “তুমি একা পারবে না। চলো আমি তোমাকে আলো দেখিয়ে দিচ্ছি।” সুজাতা মাথা নাড়ে, “একদম না! তুমি বিশ্রাম করো। আমি যাচ্ছি।”
- বললাম তো একহাতে প্লেট নিয়ে তুমি পারবে না। চলো আমিও যাচ্ছি তোমার সাথে। এখন আর অতো দুর্বল লাগছে না আমার।
- কোনো দরকার নেই! আমি পারবো। তুমি টর্চটা দাও।
রজতাভ সুজাতার কথায় পাত্তা না দিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায়। সুজাতা রজতাভর পেছন পেছন বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে খাবার প্লেটগুলো সিঙ্কে রেখে হাত ধুয়ে বেরিয়ে আসে সুজাতা। তারপর এগিয়ে যায় ড্রয়িংরুমের এককোণের দিকে। রজতাভ টর্চের আলো দিয়ে পথ দেখায় তাকে। ড্রয়িংরুমের এককোণে সুইচবোর্ডের সামনে এসে দাঁড়ায় সুজাতা। তারপর সুইচবোর্ডের পাশে থাকা একটা লিভারে হ্যাচকা টান দেয়। কিন্তু লিভার নামাতে পারে না। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পরেও ব্যর্থ হয়ে সুজাতা সরে দাঁড়ালে হাল ধরে রজতাভ। সুজাতা টর্চের আলো দেখায়। বেশ কয়েকটা হ্যাচকা টান দিতে গিয়ে সে বোঝে সুইচটা কোথাও জ্যাম হয়ে গেছে। রজতাভ তাও হাল ছাড়ে না। কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পর লিভারটা নামিয়ে দিতেই ড্রয়িংরুমের আলোটা জ্বলে ওঠে।
আলোটা জ্বলে ওঠামাত্র কলিংবেল সশব্দে বেজে ওঠে। সুজাতা এক ছুটে দরজাটা খোলামাত্র তথাগতরা প্রবেশ করে ঘরের ভেতর। দুজনেই প্রায় কাকভেজা হয়ে ঘরে ঢুকেছে। রজতাভ ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে ওঠে, “ইস! দুজনে একেবারে ভিজে চিপ্পুস হয়ে গেছো দেখছি! কি দরকার ছিল এই ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে ফেরার? কোথাও একটু থেমে যেতে পারতে!”
সুজাতা দরজা আটকে দৌড়ে দুজনকে তোয়ালে এগিয়ে দেয়। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে দুজনে যে যার ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। তথাগত পোশাক পাল্টে ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে সিগারেট ধরিয়ে বলে,
- আর বোলো না! স্পটে পৌঁছে কিছুক্ষণ ঘোরার সাথে সাথে দেখি আকাশের কোণে মেঘ জমেছে। মেঘের ধরণ দেখেই বুঝেছি এ ভোগাবে! সঙ্গে সঙ্গে ঊর্মিকে তাড়া দিলাম। এখানে মাঝে মাঝে এরকম অকাল বর্ষণ ঘটে বুঝলে? এমনিতে তেমন ভোগায় না তবে যখন হয় নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। ওসব এখন বাদ দাও। আগে বলো শরীর কেমন আছে এখন?
সুজাতার দিকে একবার তাকিয়ে রজতাভ বলে,“একটু ভালো। সকালের সেই কাঁপুনিটা নেই। আর তোমার সু যা সেবা করেছে সেটাতেই একবেলায় উঠে বসেছি। আর বারান্দার দরজা খুলে বৃষ্টিতে জুলজুল চোখে ওয়াইল্ডলাইফ দেখেছি।
- ধুস! ওটা আবার দেখা হলো নাকি! আসল দেখা তো আমরা দেখলাম। তুমি জানো না কি মিস করলে তুমি।
- ও বাদ দাও! পরে আবার শরীর ঠিক থাকলে দেখব। তা ঊর্মির কি খবর?ও আনন্দ পেয়েছে?
- ওর থেকেই শুনে নাও! প্রথম প্রথম মনমরা ছিল ঠিকই তবে এখন দারুণ উপভোগ করছে চারদিক। ফেরার পথেই তো কত পশু দর্শন হল আমাদের! যাদের টাওয়ারে বসে দুরবীনে দেখার কথা তারা আজ ফেরার পথে গাড়ির আশেপাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। বলতে গেলে একদম কাছ থেকে দেখা।
তথাগতর কথা চলাকালীন ঊর্মি পোশাক পাল্টে একটা হাউজকোট পরে ড্রয়িংরুমে ঢোকে। রজতাভর পাশের সোফায় বসে গায়ে হাত দিয়ে জ্বর বোঝার চেষ্টা করে তারপর সুজাতাকে জিজ্ঞেস করে, “ক্যালপল কটার দিকে দিয়েছিলি?”
সুজাতা হেসে বলে,“বাহ! এসেই গিন্নিপনা চালু! ওরে তোর বর অক্ষত আছে! ক্যালপল দিয়েছিলাম বারোটার দিকে। তারপর ঘুমিয়ে কাটিয়েছে সারাদিন।”
ঊর্মি সুজাতার কথায় পাত্তা না দিয়ে রজতাভকে জিজ্ঞেস করে, “কিছু খেয়েছ?”
রজতাভ সুজাতার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মনে মনে ফিক করে হেসে বলে, “এই মাত্র খেয়ে উঠলাম। ”
- কী খেলে?
- আমার কথা রাখো। তোমরা কিছু খেয়েছ? দেখে তো মনে হচ্ছে ব্রেকফাস্ট ছাড়া আর কিছু জোটেনি।
- আগে বলো কি খেলে?
রজতাভ ফিক করে হেসে বলে, “জ্বর মুখে ভাত-ডালে রুচি হচ্ছিল না বলে রাজকীয় ডিমটোষ্ট আর নুনছাড়া চিকেন স্টু গলাধঃকরণ করেছি। এবার তোমাদেরও যদি ভাত-ডালে রুচি না হয় তাহলে তোমরাও খেতে পারো। কি তথাগত? আপত্তি নেই তো?”
তথাগত চুপ করে রজতাভদের কার্যকলাপ দেখছিল। রজতাভর প্রশ্নে হেসে বলে, “না! তেমন আপত্তি নেই। এই অবেলায় খিদে মেটার মতো খাবার পেটে পড়লেই হল।”
তথাগতর কথা শুনে সুজাতা উঠে দাঁড়ায়। তারপর পায়ে পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে তথাগতদের জন্য ডিমটোষ্ট,আর চিকেন স্টু নিয়ে ডাইনিং টেবিলে রেখে ডাক দেয়। তথাগতরা ড্রয়িংরুম থেকে ডাইনিং টেবিলে এসে বসে। সুজাতা পরিবেশন করে দেয় দুজনকে। তারপর টেবিলে বসে।
টেবিলের এপাশ থেকে সুজাতা দেখে রজতাভ হাসিমুখে ঊর্মির সাথে গল্প করে চলেছে। সুজাতা অপলকে দেখতে থাকে রজতাভকে। কি অদ্ভুত মানুষ এই রজতাভ! এই একটু আগে এই মানুষটাকেই ঊর্মির থেকে মানসিকভাবে দুরে সরে যাওয়ার জন্য হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখেছে সে। দাম্পত্যজীবনে সুখের খোঁজ হারিয়ে ফেলে উদভ্রান্তের মতো প্রলাপ বকতে দেখেছে সে। অথচ সেই মানুষটাই এখন স্ত্রীর সাথে খুনশুটি করে চলেছে। নিজে হাতে খাই সত্যি! রজতাভ দারুণ অভিনেতা। অবশ্য সেও বা অভিনয়ে কম কীসে? রোজ সেও যে একজন সুখী মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে। রজতাভদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুজাতা।
******
এই পর্যন্ত বলে সিগারে শেষ টান দিয়ে চায়ের কাপে গুঁজে সোনার ব্যাকরেস্টে হেলান দেন রজতাভ। সুজাতা মুখে হাত দিয়ে বসে থাকেন। পাশে ঐশী সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকেন। কাপে থাকা সিগারটা থেকে তখনও সদ্য ধোঁয়া উঠছে। সেই ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বুঁজে আসা গলায় অভীক বলে ওঠে, “তারপর?”
অভীকের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসেন রজতাভ, “তারপর আর কি?বিকেলের মধ্যে আমার জ্বর সেরে গেল! আরো চারদিন সেখানে থেকে ফিরে এলাম আমরা। তবে ফেরার সময় জানলাম আমরা একা নই। এই পৃথিবীতে আমার মতো আরেকজন আছে। যে সুখী না হয়েও সুখী থাকার অভিনয় করে চলেছে। অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা করছে। বিশ্বাস করো সেদিন সুজাতার আশ্বাসে আমার মনোবল অনেক বেড়ে গেল। আমি আবার সাহস পেলাম ঊর্মিকে ফিরিয়ে আনার। কাজিরাঙ্গা থেকে ফেরার পর প্রতি রবিবার সুজাতাদের ফোন করতাম আমরা। ঊর্মির সাথে অনবরত কথা বলত সুজাতা। সেখানে আমি কয়েকটা কথা বলেই দায় সাড়তাম। সুজাতার সাথে আমার কথা হত অন্যপথে। তখনকার দিনে এই হোয়াটসঅ্যাপ,মেসেঞ্জার ছিল না। ছিল চিঠি, পোষ্টকার্ড। সুজাতার সাথে প্রতি মাসে আমি চিঠিতে কথা বলতাম। রোজকার প্রগ্রেস, মনের ভাব লিখে রাখতাম কাগজে তারপর সেটা পাঠাতাম ওকে। সুজাতাও তাই করত। অবশেষে আমার তপস্যা সফল হল। ঊর্মিকে ফেরাতে পারলাম আমি। আমাদের জীবন আগের মতোই চলতে লাগল। তারপর একদিন ঊর্মি জানাল ঐশীর খবর। সেদিন আমার কি আনন্দ হয়েছিল বলে বোঝানো অসম্ভব। সেদিন রাতেই চিঠি লিখেছিলাম আমি। সুজাতাকে জানিয়েছিলাম খবরটা। তারপর সেটাকে পরদিন ডাকে ফেলে দিয়েছিলাম। সেই আমার পাঠানো শেষ চিঠি।”
“শেষ চিঠি কেন?” ঐশী বলে ওঠে। রজতাভ হেসে বলেন, “কথায় আছে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার যতই চেষ্টা করো না কেন? একদিন না একদিন ধরা পড়বেই! সেদিন তাই হল। আমাদের এই চিঠি চালাচালি ধরা পড়ল। আর পড়বি তো পর একেবারে ঊর্মির হাতে।”
(চলবে...)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন