অনুসরণকারী

বুধবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ ষোড়শতম পর্ব


অভীককে চুপ করে বসে থাকতে দেখে রজতাভ এবার ডাইরিটা টেবিলে আছড়ে ফেলে গর্জে ওঠেন, “কী হল? বলো তুমি এ ডাইরি কোথায় পেলে?”

রজতাভর চিৎকারে চমকে উঠলেন সুজাতা। অভীক আর ঐশী নিরুত্তাপ ভাবে দেখতে লাগল দুজনের মুখের অভিব্যক্তি। রাগে, ক্ষোভে থরথর করে কাঁপছেন রজতাভ। সুজাতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার?আপনি ওভাবে কথা বলছেন কেন? কী করেছে ও? কী লেখা আছে ডাইরিতে?" বলে ডাইরিটা হাতে নিয়েই নিস্তব্ধ হয়ে যান। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায় তাঁর। অভীক একবার সুজাতার দিকে তাকায় তারপর বলে, “ ব্যাপারটা কী? তোমরা দুজনেই এরকম রিঅ্যাক্ট করছ! এমন কী লেখা আছে ওটায়?”

- ন্যাকা সাজবে না! তুমি জানো না কী লেখা আছে ওটায়?

গর্জে ওঠেন রজতাভ। এবার আসরে নামে ঐশী।

- বাপি! তুমি এভাবে ওকে অ্যাকিউজ করতে পারো না। কি হয়েছেটা কী?কী লেখা আছে ডাইরিতে যে তোমরা এরকম বিহেভ করছ?

- ওতে...ওতে... আমি বলতে পারব না!

- বেশ তাহলে আমি নিজেই পড়ে দেখব।

বলে ঐশী সুজাতার হাত থেকে ডাইরিটা নিতে গেলে রজতাভ বাধা দিয়ে বলেন,

- না তুমি ঐ ডাইরি পড়বে না!

- কেন?

- আমি বলছি তাই!

- আমিও তো তাই জানতে চাইছি! কেন?

- সবসময় মুখে মুখে তর্ক করবে না ঐশ্বর্য!

- কেন বাপি? আমার মায়ের শেষ ডাইরি, শেষ স্মৃতি কেন পড়তে পারবো না?

- আমি বলেছি বলে পড়বে না! তুমি আমার কথা শুনতে বাধ্য।

- সরি বাপি! আমি ডাইরিটা পড়বোই!

- ঐশ্বর্য! আমি তোমার বাবা! আমি বলছি যখন তুমি ঐ ডাইরি পড়বে না, তখন তুমি ঐ ডাইরি পড়বে না! আর এটা আমার অর্ডার!

- সরি বাপি, বিয়ের আগে আমি শুধু তোমার মেয়ে ছিলাম। এখন বিয়ের পর এ বাড়ির বউ হয়ে গেছি। এখন আমার স্বামী আর আমার শাশুড়ির অর্ডারই আমার কাছে শেষ কথা। তোমার অর্ডার মানতে আমি বাধ্য নই।

- ঐশী!

রজতাভর কথাকে পাত্তা না দিয়ে ঐশী ডাইরিটা নিয়ে পড়তে শুরু করে।

"১৬ই মার্চ ২০০১

আজ আমি ভীষণ খুশি! এতবছর পর আমার নারী জন্মের সার্থকতা খুঁজে পেলাম। এতবছর ধরে রজত আমার কাছে যা চেয়েও পায়নি সেটাই দিতে চলেছি ওকে। হ্যা, ঈশ্বরের কৃপায় একটা ছোটো প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে আমার ভেতরে। আমি মা হতে চলেছি! রজত এখনও জানে না। ওকে এখন খবরটা দেবো না। আপাতত সারপ্রাইজ রাখবো..."

ডাইরির পাতা উল্টে পড়তে থাকে ঐশী। প্রতিটা পাতায় ধীরে ধীরে ঊর্মির মাতৃত্বের বিকাশ, এবং সেটার অনুভূতি লেখা। এই লেখা সে আগে পড়লেও নির্বিকার ভাবে পড়তে থাকে। ক্রমশ পড়তে পড়তে শেষ পাতায় এসে থামে সে। জন্মদিনের ঠিক দুদিন আগের পাতাটা পড়তে শুরু করে সে।

"৯ ডিসেম্বর ২০০১

আজ আমার ভালোবাসার উপর থেকে, বন্ধুত্বের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেল। রজতকে দুরে সরিয়ে রেখেছিলাম ওর ভালোর জন্যেই, কিন্তু সেই দুরে রাখার শাস্তি হিসেবে ও আমাকে এতবড়ো আঘাতটা দেবে ভাবতেও পারিনি। এতবছর হয়ে গেল আমাদের বিয়ের কিন্তু ওকে আমি চিনতেই পারিনি। মানুষ চিনতে গিয়ে ঠকে গেলাম আমি। রজত যখন আমাকে সবটা জানাল তখন মনে হচ্ছিল ও বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলে আমাকে রাগিয়ে মজা নিচ্ছে। কিন্তু যখন বুঝলাম যে ও যা বলছে তার একবর্ণও মিথ্যে নয়, তখন মনে হচ্ছিল এর চেয়ে ও মরে গেলেই ভালো হত। সুজাতাকে আমি কোনো দোষ দেব না কারন আমি ওকে ভালো করে চিনি। ওকে বাধ্য না করা হলে এই পাপে লিপ্ত..." হোয়াট?

বলে সুজাতার দিকে তাকিয়ে ঐশী অবাক হবার ভান করে। সুজাতা মাথা নামিয়ে ফেলেন। ঐশী আবার পড়তে শুরু করে।

“ওকে বাধ্য না করলে এই পাপে ও লিপ্ত হত না। ওর প্রতি আমার কোনো রাগ, বা ঘৃণা নেই। আক্ষেপ শুধু একজায়গায়, একজন চরিত্রহীন, লম্পট, নোংরা মানসিকতার মানুষের সন্তানকে আমি গর্ভে ধারন করেছি। ইচ্ছে করছে নিজেকে শেষ করে দিতে। কিন্তু না! আমাকে বাঁচতে হবে। আমার গর্বের সন্তানের জন্য আমাকে বাঁচতে হবে। তার কোনো দোষ নেই, সে তো আর জানে না তার পিতা কতটা নোংরা! তাকে জানতেও দেব না আমি!ঐ মানুষটার ছায়াও আমার সন্তানের উপর পড়তে দেব না আমি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দুরে চলে যাবো আমি। ঐ মানুষটার থেকে অনেক দুরে।"

- স্টপ ইট! স্টপ দিস ননসেন্স! অনেক হয়েছে আর না!

বলে চিৎকার করে ওঠেন রজতাভ। ঐশী ডাইরি পড়া থামিয়ে রজতাভর দিকে তাকায়। রজতাভর ফরসা মুখটা টকটকে লাল হয়ে গেছে দেখে জিজ্ঞেস করে, “কী হল বাপি? ওরকম করছো কেন? শরীর খারাপ হল নাকি?”

রজতাভ রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে ঐশীর হাত থেকে ডাইরিটা কেড়ে নিয়ে হিসহিসে গলায় বলেন, “অনেক হয়েছে! আর পড়তে হবে না!” 

আচমকা ডাইরিটা কেড়ে নেওয়ায় ঐশী চমকে উঠলেও পরক্ষণেই প্রতিবাদ করে ওঠে, “আরে ডাইরিটা নিয়ে নিলে কেন?এখনও তো শেষ লাইনটা পড়া হয়নি!”

- আর পড়তে হবে না!

- কী ব্যাপার বাপি? তুমি এরকম বিহেভ করছো কেন?একটা ডাইরি নিয়ে এতটা রিঅ্যাক্ট করার কি আছে বুঝতে পারছি না।

- বুঝতে হবে না তোমাকে! তুমি আর ঐ ডাইরি পড়বে না! আর ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও। কাল সকালে আমরা ফিরবো।

- ফিরবো মানে? কোথায় ফিরবো?

- বাড়ি ফিরবো আমরা। কাল সকালেই ফিরবো।

- সেকি! এত তাড়াতাড়ি! এই তো সেদিন এলাম!

- আমি কিছু জানি না! কাল সকালেই আমরা ফিরছি!

- সোজা সোজা বলুন না! সত্যিটা জানাজানি হবার পর আর‌ মুখ দেখানোর জায়গা রইল না বলে পালাতে চাইছেন।

ঘোলাটে চোখে রজতাভর দিকে তাকিয়ে অভীক মৃদু হেসে ওঠে। অভীকের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকান রজতাভ। সুজাতাও তাকান ছেলের দিকে। অভীক তখনও পাগলের মতো হেসে চলেছে। রজতাভ দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,“শাট আপ! কি যাতা বলছ তুমি?
- যেটা দেখতে পাচ্ছি সেটাই বলছি। কবে কোন ডাইরিতে ঐশীর মা কী লিখে গেছেন তা নিয়ে আপনাদের দুজনের ব্যবহারটা সন্দেহের সৃষ্টি করে বৈকি। তাছাড়া আপনার আচমকা এই উগ্র ব্যবহারে তো সেই সন্দেহটা আরো দৃঢ় হচ্ছে যে ডাইরির লেখাগুলো সত্যি।

- তোমার সন্দেহ ভুল! এরকম কোনো ঘটনা কোনোদিনও ঘটেনি। ঊর্মি এসব উল্টোপাল্টা কেন লিখে গেছে জানি না আমি!

- তাহলে তুমি এরকম ব্যবহার কেন করছ বাপি? কেন তুমি আমাকে নিয়ে কাল ফিরে যেতে চাইছ? কেন তুমি অভির সাথে এরকম ব্যবহার করছ?

ঐশীর প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে রজতাভ বলে ওঠেন,

- ঐশী! তোমার বিয়ে হয়ে গেছে মানে এই নয় যে তুমি তোমার বাপির মুখে মুখে তর্ক করবে! এত সাহস তোমার হয় কী করে?

অভীক বলে ওঠে, “সত্যি কথা জানাজানি হলে এইভাবেই বকে,ধমকে সেটাকে চাপা দেওয়া হয় ঐশী। বাদ দে, তোর বাপি যখন বলছেন তখন কটাদিন তুই বরং তোদের বাড়ি ঘুরেই আয়।”

অভীকের কলার ধরে একঝটকায় সোফা থেকে দাঁড় করিয়ে দেন রজতাভ। হিসহিসে কন্ঠে বলে ওঠেন, “হাউ ডেয়ার ইউ! আমারই বিরুদ্ধে আমার মেয়েকে দাঁড় করাবার সাহস কী করে হয় তোমার? যে মেয়ে কোনোদিন আমার কথার পিঠে কথা বলত না, সেই মেয়ে আজ মুখে মুখে তর্ক করছে!”

নিজের কলার ছাড়িয়ে অভীক ফুঁসে ওঠে, “কারন ও আজকে সত্যিটা জানতে পেরেছে! ইনফ্যাক্ট অনেক আগেই জানতে পেরেছে! আমাদের বিয়ের দিনই আমরা জানতে পেরেছিলাম আপনাদের সত্যিটা। আমরা বিশ্বাস করিনি লেখাটাকে। কিন্তু আজ আপনার ব্যবহার আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে যে ডাইরিতে লেখা প্রতিটা বর্ণ সত্যি। কি তাইতো? লেখাটা যদি সত্যি না হত তাহলে এতটা বিচলিত আপনি হতেন না। লেখাটা সত্যি বলেই আপনি এতটা উগ্র বিহেভ করছেন!”

ঐশী বলে, “ অভীকের সাথে আমি সহমত বাপি। তাও একটা দোলাচল মনের ভিতর ছিল যে আমার বাপি এরকম হতে পারে না। কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে মাম্মাম যা লিখে গেছে তা সত্যি। যদি তাই না হয় তাহলে এত অ্যাগ্রেসিভ বিহেভ করতে না। সত্যি করে বলো তো বাপি, মাম্মাম যা লিখে গেছে তা কি সত্যি?”

অভীক আর ঐশীর প্রশ্নবাণে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েন রজতাভ। অসহায় দেখায় সুজাতাকেও। ঐশীর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অসহায় চোখে সুজাতার দিকে তাকান রজতাভ। দেখেন সুজাতা লজ্জায়, দুঃখে প্রায় মাটিতে মিশে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলেছেন। ক্রমশ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পর রজতাভ নিরুপায় হয়ে বলে ওঠেন, “বেশ সত্যিটা যখন তোমরা জানতে পেরেছ তাহলে আমার দিক থেকেও সম্পুর্ণ ঘটনাটাও তোমাদের জানা দরকার। হ্যা, ডাইরিতে যা লেখা আছে সব সত্যি। তবে ডাইরিতে তোমরা যতটুকু পড়েছ তা ঊর্মির দৃষ্টিভঙিতে। আসল ঘটনা অন্য ছিল। সেটাও তোমাদের জানতে হবে। একজন ফাঁসীর আসামীও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়। তোমাদের কাছে সেই সুযোগটুকু চাইব। সবটা জানার পর তোমাদের বিচারে যদি আমি দোষী হই তাহলে যা শাস্তি দেবে মাথা পেতে নেব। শুধু একটা কথা, ঐ মানুষটাকে তোমরা কিছু বলবে না! ওই মানুষটা নির্দোষ, সব দোষ আমার!”

(চলবে...)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...