এই পর্যন্ত বলে সিগারে শেষ টান দিয়ে চায়ের কাপে গুঁজে সোনার ব্যাকরেস্টে হেলান দেন রজতাভ। সুজাতা মুখে হাত দিয়ে বসে থাকেন। পাশে ঐশী সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকেন। কাপে থাকা সিগারটা থেকে তখনও সদ্য ধোঁয়া উঠছে। সেই ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বুঁজে আসা গলায় অভীক বলে ওঠে, “তারপর?”
অভীকের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসেন রজতাভ, “তারপর আর কি?বিকেলের মধ্যে আমার জ্বর সেরে গেল! আরো চারদিন সেখানে থেকে ফিরে এলাম আমরা। তবে ফেরার সময় জানলাম আমরা একা নই। এই পৃথিবীতে আমার মতো আরেকজন আছে। যে সুখী না হয়েও সুখী থাকার অভিনয় করে চলেছে। অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা করছে। বিশ্বাস করো সেদিন সুজাতার আশ্বাসে আমার মনোবল অনেক বেড়ে গেল। আমি আবার সাহস পেলাম ঊর্মিকে ফিরিয়ে আনার। কাজিরাঙ্গা থেকে ফেরার পর প্রতি রবিবার সুজাতাদের ফোন করতাম আমরা। ঊর্মির সাথে অনবরত কথা বলত সুজাতা। সেখানে আমি কয়েকটা কথা বলেই দায় সাড়তাম। সুজাতার সাথে আমার কথা হত অন্যপথে। তখনকার দিনে এই হোয়াটসঅ্যাপ,মেসেঞ্জার ছিল না। ছিল চিঠি, পোষ্টকার্ড। সুজাতার সাথে প্রতি মাসে আমি চিঠিতে কথা বলতাম। রোজকার প্রগ্রেস, মনের ভাব লিখে রাখতাম কাগজে তারপর সেটা পাঠাতাম ওকে। সুজাতাও তাই করত। অবশেষে আমার তপস্যা সফল হল। ঊর্মিকে ফেরাতে পারলাম আমি। আমাদের জীবন আগের মতোই চলতে লাগল। তারপর একদিন ঊর্মি জানাল ঐশীর খবর। সেদিন আমার কি আনন্দ হয়েছিল বলে বোঝানো অসম্ভব। সেদিন রাতেই চিঠি লিখেছিলাম আমি। সুজাতাকে জানিয়েছিলাম খবরটা। তারপর সেটাকে পরদিন ডাকে ফেলে দিয়েছিলাম। সেই আমার পাঠানো শেষ চিঠি।”
"তখন ঊর্মি পূর্ণগর্ভা। ডাক্তারবাবু ডেট দিয়েছেন ১১ই ডিসেম্বর। আমরা ঐশীর আগমনের প্রহর গুনছি। ঊর্মির ইচ্ছে একটা মেয়ে হোক। আমি চাইছি একটা ছেলে। ঠিক করেছি মেয়ে হলে নাম দেব ঐশ্বর্য। ছেলে হলে নাম হবে অজয়। দুজনে বাজি রেখেছি এ নিয়ে। মোট কথা যে দাম্পত্য সুখ থেকে মাঝের কটা বছর বঞ্চিত ছিলাম ঊর্মি সেই সুখে ভরিয়ে দিয়েছে আমাকে। সুখের সাগরে ভাসছি দুজনে। এমন সময় চিঠিটা এসে পৌঁছল ঊর্মির হাতে। সেদিন ছিল ৯ ডিসেম্বর। দুদিন পর বিকেলে ঊর্মিকে হাসপাতালে অ্যাডমিট করার কথা। সেদিন সকালেই ঘটল ঘটনাটা।
কলিং বেলটা বাজাতেই ঊর্মি দরজা খুলে দিয়ে চলে গেল ড্রয়িংরুমে। রান্নাঘরে ঢুকে বাজারের ব্যাগ থেকে মাছের প্লাস্টিকটা বের করে সিঙ্কে রাখল রজতাভ। তারপর জামার হাতা গুটিয়ে শুরু করল মাছ ধোয়া। মাছটাকে ধুয়ে নুন হলুদ দিয়ে ম্যারিনেট করতে করতে রজতাভ শুনতে পেল কলিংবেলের শব্দ। মাছটাকে ম্যারিনেট করে হাত ধুয়ে রজতাভ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখল ঊর্মি ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাতে ধরা একাধিক কাগজ আর একটা চিঠির খাম। খামটা খুলে ঊর্মি ততক্ষণে চিঠিটা পড়া শুরু করেছে।
চিঠির খামটা দেখা মাত্র রজতাভ থমকে গেল। রজতাভ বুঝতে পারল ও ধরা পড়ে গেছে। আর কোনো উপায় নেই। সে চোখ বুঁজে বসে পড়ল সোফায়। ঊর্মি চিঠিটা শেষ করে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল রজতাভর দিকে। তারপর থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করল, “এটা কী?”
বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রজতাভ। তারপর সিগারে আরেকটা টান দিয়ে বললেন, “রাগের মাথায় সেদিন আমাকে যা নয় তা বলে যেতে লাগল ঊর্মি। সুজাতাকে নিয়ে অজস্র নোংরা কথায় বিঁধতে লাগল আমাকে। আমি ওকে পাগলের মতো বোঝাতে চাইলাম। কিন্তু ও বুঝল না। যা নয় তা বলতে লাগল সুজাতার নামে। ক্রমে আমারও ধৈর্য্য কমে আসছিল। শেষে আমিও জড়িয়ে পড়লাম তর্কে। কথাকাটি ক্রমশ বাড়তে লাগল। শেষে বাধ্য হয়ে থাকতে না পেরে এত বছর যা করিনি তাই করে বসলাম আমি! হিতাহিত ভুলে ঊর্মির গায়ে হাত তুললাম আমি!”
বলতে বলতে রজতাভর গলা ধরে আসে। কথা বলা থামিয়ে মাখা নত করে তিনি বসে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে বলতে শুরু করেন, “তখন বুঝতে পারিনি চড়টা এত জোরে লেগে যাবে। চড়টা মারার সাথে সাথেই সম্বিত ফিরে আসতেই বুঝতে পারলাম কি ভুলটাই না করেছি আমি। চড় খেয়ে ঊর্মি গালে হাত দিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। আমি নতজানু হয়ে বসে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। ঊর্মি প্রাণপণে আমাকে বাধা দিতে চাইলেও পারল না। কিল, ঘুষি, চড়, আচড় কিছুই বাদ গেল না। কিন্তু আমি ওকে কিছুতেই ছাড়লাম না। অনেক সংঘর্ষের পর এক সময় ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিল ঊর্মি। তারপর আমাকে আকড়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। আমি চুপ করে ওকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলাম অনেকক্ষণ।”
বলে সিগারে শেষ টান দিয়ে কাপে অবশিষ্টাংশটা গুঁজে রজতাভ বললেন, “ সেদিনের পর দুদিন আমরা পরস্পরের সাথে প্রয়োজন ছাড়া আর কোনো কথা বলিনি। বা বলা ভালো ঊর্মিই আমার সাথে কোনো কথা বলতে চায়নি। ঐ দুটো দিন পাগলের মতো ওর কাছে মাথা কুটেছি। ওর সাথে কথা বলার, আমার মতটা জানানোর অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঊর্মি আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা সুযোগও দেয়নি। বরং একটা মিথ্যে অভিমানে আমাকে আবার দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। ওকে আমি আর বোঝাতে পারিনি যে সুজাতা আর আমার মধ্যে কোনো অবৈধ্য সম্পর্ক নেই। আমাদের মধ্যে যেটা আছে সেটা নিখাদ বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছু নয়। সেই মিথ্যে অভিমানেই ঐশীকে জন্ম দিয়ে সেপ্টিসেমিয়ায় সাতদিনের মাথায় আমাকে একা রেখে চলে গেল ঊর্মি। আর সেই খবরটা জানার পর সুজাতাও সব সম্পর্ক ছিন্ন করে অজ্ঞাতবাসে চলে গেল। এই পৃথিবীতে আমি একেবারে একা হয়ে গেলাম। একবার মনে হয়েছিল নিজেকে শেষ করে দিই। চিরতরে এই পৃথিবী থেকে মুছে দিই রজতাভ মজুমদারকে কিন্তু পারলাম না। ঐ যে সুজাতার পাশে বসে আছে মেয়েটা, ওই আমাকে শেষ হয়ে যেতে দিল না। আমাকে বাঁচার নতুন পথ দেখাল। মেয়েটাকে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করলাম আমি।”
ঐশীর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে মৃদু হাসলেন রজতাভ। ঐশী ততক্ষণে সুজাতাকে জড়িয়ে পাথরের মতো বসে আছে। দু গাল বেয়ে বেড়িয়ে আসছে অশ্রুধারা। অভীকের চোখও জলশূন্য নেই। কিছুক্ষণ পর ধরা গলায় অভীক জিজ্ঞেস করল, “তারপর?”
রজতাভ অভীকের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “তারপর আর কি? বাপ-মেয়েতে নতুন করে জীবনযাপন শুরু করলাম। ঊর্মির মারা যাবার তেরোদিন পর পারলৌকিক কাজ সেরে ঠিক করলাম যে কারনে ঊর্মি আমার উপর অভিমান করে চলে গেছে সেই স্মৃতিস্বরূপ চিঠিগুলোর কোনো চিহ্ন আমি রাখবো না। সুজাতা যখন নিজেই সব সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে গেছে তখন আমিও আর কোনো সম্পর্ক রাখবো না। ঠিক করলাম সুজাতাদের সাথে থাকা আমাদের সব স্মৃতি মুছে দেব। সেই মতো একদিন আমাদের সব ছবি, চিঠি খুঁজে বের করে পুড়িয়ে দিলাম আমি। শুধু পোড়ালাম না ঊর্মির ডাইরিগুলো। কারন ওগুলো ছিল আমার ঊর্মির শেষ স্মৃতি। ঠিক করলাম যে ডাইরির পাতায় সুজাতার উল্লেখ থাকবে সেই পাতাগুলো বাদ দিয়ে ডাইরিগুলো তুলে দেবো ঐশীর হাতে। আমাদের জীবনে যে সুজাতাদের কোনো অস্তিত্ব ছিল তা কিছুতেই জানতে দেব না ঐশীকে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। নিয়তি আবার আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। যেকারনে আমি আর সুজাতা পরস্পরের থেকে দুরে সরে গিয়েছিলাম ঠিক সেই কারনে আমরা পরস্পরের সামনে চলে এলাম। আমরা দুজনেই চেয়েছিলাম আমাদের অতীতের ছায়া তোমাদের উপর না পড়ুক। অথচ দেখো ঠিক তাই হল। তোমাদের চারহাত এক হয়ে গেল। ঊর্মির এই ডাইরিটা তোমরা কোথা থেকে পেলে জানি না। কিন্তু ডাইরি পড়ে তোমরা যতটুকু জেনেছ তা অর্ধেক সত্যি। বাকিটুকু শোনার পরেও যদি তোমাদের মনে হয় আমরা অপরাধী তাহলে তোমরা যা শাস্তি দেবে মাথা পেতে নেব। শুধু দুটো কথাই বলার আছে। প্রথমত ঐ মানুষটার সাথে আমার কোনো অবৈধ্য সম্পর্ক নেই। কোনো কালেই ছিল না। যা ছিল তা সম্পূর্ণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আর এই সম্পর্ককে যদি তোমরা নোংরা মনে করো তাহলে আমার কিছু করার নেই। কিন্তু ঐ মানুষটাকে তোমরা কিছু বলো না। ঐ মানুষটার কোনো দোষ নেই। ও সম্পূর্ণ নির্দোষ।”
(চলবে...)
