অনুসরণকারী

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২০

বলি তৃতীয় পর্ব


২রা জুন ২০১৯, রবিবার, সকাল ছটা,জোকা,কলকাতা

ফোনের আওয়াজে ভোরবেলা আচমকা ঘুম ভেঙে গেল কানাই ঘোষালের। ঘুমের ঘোরে ফোনটা কানে ঠেকিয়ে ওপারে রজতের গলা শুনতে পেল সে, “দাদা সরি ভোরবেলা ফোন করার জন্য। আসলে এখানে একটা প্রবলেম হয়ে গেছে।” ফোন কানে ঘুম জড়ানো গলায় কানাই বলে, “উফ! সামান্য একটা কাজও করতে পারিস না? একটা বাড়ি খালি করতে বলেছিলাম। তোদের দ্বারা সেটাও হয় না? কি হয়েছেটা কি?”

ওপার থেকে রজত একটু আমতা আমতা করে বলে, “না মানে বুড়িটা।” কানাই চোখ মেলে তাকায়, “বুড়িটা আবার কিচাইন করছে নাকি? উফ! একটা বুড়িকে সামলাতে পারছিস না? চুড়ি পরে বসে থাক শালা। মদ মাংস দিয়ে হিজরে পুষছি সব! ” রজত এবার বলে, “ না দাদা রাতারাতি আমরা বাড়ি খালি করতে এসেছিলাম। বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরের জিনিস বেরও করছিলাম। বুড়ি সিনেই ছিল না। আমরা ভাবলাম বোধহয় পালিয়েছে। কিন্তু ঠাকুরঘরের দরজা ভাঙতেই কেস খেয়ে গেছি। ঠাকুরঘরে ঢুকে দেখি বুড়িটা ঠাকুরঘরে মরে পড়ে আছে।”

বিছানায় উঠে বসে কানাই ঘোষাল। কালরাতে মদ একটু বেশী টেনে ফেলায় এখন মাথাটা টনটন করছে। সে গজগজ করে বলে, “বাল ! একটা কাজও যদি তোদের দিয়ে হয়। বুড়িটা মরে গেছে তো ভালোই হয়েছে! আপদ গেছে। লাশ সরাতে কতক্ষন? আহা লোক জড়ো হয়েছে তো হোক না? একটা দুটো দানা খরচ করলেই তো ভীড় পাতলা হয়ে যেত।”

ওপাশে রজত বলে, “আমরা সেটাও করেছি দাদা। ভীড় পাতলাও হয়ে গিয়েছিল দাদা কিন্তু বাধ সাধলো একটা মেয়ে।” কানাই এবার নড়েচড়ে বসে। “একটা মেয়ে? ” রজত বলে, “হ্যা দাদা একটা মেয়ে। কিভাবে ভিডিও তুলে সোজা ফেসবুকে দিয়ে দিয়েছে। আবার পুলিশও ডেকেছে।” কানাই এবার শান্ত গলায় বলে, “তোরা কোথায় এখন? ” রজতের কাছে থানার নাম জেনে ফোনটা রাখে কানাই। পাশে তাকিয়ে দেখে নগ্ন কালিন্দী পাশ ফিরে শুয়ে। রাতে লোডশেডিং হয়েছিল বলে গরমে জানলা খুলে পর্দা নামিয়েছিল। সেই জানলা দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়ছে কালিন্দীর ছিপছিপে নিটোল শরীরে। সেই আলোয় ঘামে ভেজা শরীরটা লাগছে আরো মোহময়ী। অন্যদিন হলে আরেকপ্রস্থ আদর করতো ওকে কানাই কিন্তু আজ যতরাজ্যের বিরক্তি আর ঝামেলা এসে ভর করেছে ওর মাথায়।

সকাল সকাল এই সব হুজ্জতি ওর ভালো লাগে না। সকালবেলা গঙ্গাস্নান সেরে বাড়িতে ফিরে পুজোয় বসে সে। বাড়িতে মা কালি প্রতিষ্ঠিত আছেন বহুবছর ধরে। ঘন্টাদুয়েক দরজা বন্ধ করে পুজো করার পর ঘর থেকে যে বেড়িয়ে আসে তার সাথে ঘন্টাদেড়েক আগে পুজো করতে ঢোকা কানাই ঘোষালের মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

পুজো সেরে কোনোমতে ডাল রুটি খেয়ে কানাই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ওর অফিসের উদ্দেশ্যে। অফিসটা অবশ্য নামেই অফিস আসলে অ্যান্টিসোশালদের আখড়া বললে ভুল হবে না। অফিসে ঢুকে নিজের চেম্বারে ঢুকে সোজাসুজি দেওয়ালে তাকায় সে। সেখানে কালীঘাটের মা কালির বিরাট একটা ছবি। ছবিটাকে প্রতিদিন নতুন জবাফুলের মালা পড়িয়ে প্রনাম করে চেয়ারে বসে সে।

আপাতদৃষ্টিতে কানাইকে আর ওর এই অফিসকে দেখলে কোনো জ্যোতিষীর চেম্বার বলে যে কারো ভুল হতেই পারে। কিন্তু কলকাতা আর তার আশেপাশের অঞ্চলের একটা ছিঁচকে চোরেও জানে ওটা সম্পুর্ণ কানাইয়ের ছদ্মবেশ। অবশ্য কানাই এর সমস্ত মক্কেলরা বেশ শাঁসালোও বটে। কানাই যে কাজটা করে সেটার ইংরেজীতে একটা বেশ সুন্দর নাম আছে সেটা হলো, “Settlement and Consulting. ” আরো ভালো করে নিন্দুকদের ভাষায় (এটা কানাই এর মত। অবশ্য এই নিন্দুকরা কোনোদিনই ওর সামনে আসে না বলে আক্ষেপের শেষ নেই ওর।) বললে মাফিয়া সিন্ডিকেট চালায় সে।

কানাইয়ের ব্যবহার, কথাবার্তা এতটাই নম্র যে ও একজন নৃশংস মানুষ এটা ভাবতেও কষ্ট হয়। অথচ যারা জানে তারাই জানে যে সময় আর সুযোগ পেলে কানাইয়ের রূপ কতটা নির্মম হতে পারে। এমনি এমনি এতবছরে এই জায়গায় এসে পৌছয় নি ও। রীতিমতো লাশ ফেলে, মানুষকে ভয় দেখিয়ে এই জায়গায় এসেছে সে। এলাকায় ওর আতঙ্ক এতটাই যে আড়ালে ওর শত্রুরা ওকে কষাই ঘোষাল বলে ডাকে।

ইদানিং পার্টি অফিসেও ওর আনাগোনা বেড়েছে। কানাইয়ের ইচ্ছে এখন রাজনীতিতে প্রবেশ করার। এতবছর ওর পেশীশক্তি আর লোকবলে অনেকজনকেই ও এমএলএ, এমপি বানিয়েছে।এবার নিজে সেই ক্ষমতার স্বাদ নিতে চায়। এরজন্য সব করতে রাজি সে।

কানাইয়ের স্ত্রী কৃষ্ণা কানাইয়ের ঠিক বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। পাড়ায় কারো বিপদ হলে পাশে এসে দাঁড়ান, কেউ কিছু চাইলে ফেরান না। এমনকি পাড়ার মন্দিরে প্রতিসপ্তাহে গরীব মানুষের পাত পেড়ে খাওয়ার আয়োজনও করেন। কানাইয়ের টাকায় হাসপাতালও খুলেছেন তিনি।
কানাই প্রথমে এটা নিয়ে ভীষণ চোটপাট করতো। এমনকি কৃষ্ণাকে মারধোরও করেছে। একবার তো গর্ভস্থ অবস্থাতেই এমন মেরেছিল যে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় কৃষ্ণাকে। তবে এখন কিছু বলে না কারন এমএলএ ঘোষ তাকে বুঝিয়েছে যে এসব করলে আখেড়ে ওরই লাভ। বউকে সামনে রেখে সে ইলেকশন জিততে পারে চোখ বন্ধ করে। কৃষ্ণা বোঝেন সবই কিন্তু কিছু বলেন না। তবে স্বামীর হয়ে প্রচারও করেন না। কোনো প্রচার ছাড়াই নিভৃতে কাজ করে যান। লোকে সব দেখে আর আড়ালে ওনার জন্য দুঃখ করে বলে, “ ঘোর কলিযুগ নাহলে এযুগে মা সীতাকে রাবণের গৃহিণী হয়ে আসতে হয়? ”

কানাইয়ের জীবনে এই উত্থানের কারন যেমন একজন স্ত্রী।তেমনই ওর দুর্বলতাও একজন স্ত্রী। এক্ষেত্রে কানাই নিজের পিতৃদত্ত নামের পুর্ণ মর্যাদা রেখেছে।

জলপাইগুড়ি থেকে মডেল থেকে অভিনেত্রী হবার স্বপ্ন দুচোখে নিয়ে বছর পাঁচেক আগে কলকাতায় এসেছিল কালিন্দী। কিন্তু বেচারী জানতো না এই স্বপ্নপুরনের জন্য চাই কঠিন পরিশ্রম, অসীম ধৈর্য আর সঠিক পথপ্রদর্শক। প্রথম দুটো অফুরন্ত থাকলেও শেষেরটা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। জহুরীর মতো খুঁজে নিতে হয় তাকে। কারন এই শহরটা যতটা রূপকথার ততটাই রূঢ় বাস্তবেরও। যতটা ভালোমানুষের ততটাই শঠ প্রবঞ্চকদেরও। এদের থেকে বাঁচতে হলে হতে হবে চালাক আর হতে হবে সতর্ক নাহলে পদে পদে ঠকতে হবে। আর এখানেই ঠকে গেল কালিন্দী।

জলপাইগুড়ির সহজসরল মেয়েটা পড়ে গেল স্টুডিওপাড়ায় ঘোরা এমনি এক প্রবঞ্চকের খপ্পরে। সে বেচারীকে ঠকিয়ে বেচে দিলো নোংরা পল্লিতে। অবশ্য বেচার আগে টেস্টড্রাইভ করে নিয়েছিল সে। গ্ল্যামার জগতে আসার স্বপ্ন ভাঙতে বেশিক্ষন লাগেনি কালিন্দীর। ক্রমশ সে শেষ হতে লাগলো প্রতিরাতে। এভাবেই একদিন এক শেঠের কাছে গিয়েছিল সে। সেখান থেকে ওকে উদ্ধার করে কানাই।

উদ্ধার হবার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল কালিন্দী। কিন্তু এই মুক্তির আনন্দ বেশীক্ষন স্থায়ী হয়নি। কানাই ততদিনে কৃষ্ণার থেকে অনেক দুরে সরে গেছে। এক ছাদে থেকেও এক খাটে শোয় না তারা। তাছাড়া কালিন্দীর রূপ যৌবন, ছিপছিপে ফিগার কানাইকে মারাত্মকভাবে টেনেছিল। আর কানাইয়ের বিশ্বাস ওর নাম যখন ভগবানের নামে কাজেও তাই হবেনা কেন। তাছাড়া পুরুষমানুষের একটা মেয়েমানুষে চলে নাকি? কানাই আর অপেক্ষা করেনি। সেই নোংরা পল্লিতে চড়া দামে কালিন্দীকে কিনে নিয়ে এনেছিল জোকায় সদ্য কেনা ফ্ল্যাটে।

প্রথম দুদিনে নতুন আসবাব কিনে সমস্ত ঘর সাজিয়েছিল দুজনে। কালিন্দী ততদিনে বুঝে নিয়েছে কানাইয়ের এই উপকারের আসল কারন কিন্তু সে ছিল নিরুপায়। বলতে গেলে খাঁচার হাতবদল হয়েছে মাত্র তার অবস্থান বদলায় নি। তবুও ঐ নোংরা স্যাঁতস্যাতে পরিবেশ থেকে এই ফ্ল্যাটের সাচ্ছন্দ ঢের ভালো। কানাইও ভালোমানুষের ভান করে দেখাচ্ছিল যে সে নিজের তাগিদে উপকার করছে তার। তারপর একরাতে সুযোগ বুঝে কড়ায়গন্ডায় বুঝে নিয়েছিল সমস্ত উপকারের হিসেব। প্রথম প্রথম সপ্তাহে একদিন আসতো তারপর প্রতিদিনই আনাগোনা হতে লাগলো। হাউজিং সোসাইটি একটু আপত্তি তুলেছিল বটে । তবে তাদেরকেও টাকা খাইয়ে চুপ করিয়েছে কানাই।

মাঝে মাঝে নিজের উপর ঘেন্না হয় কালিন্দীর। নিজের বোকামোর জন্য রাগও হয়। এসেছিল কি হতে আর কি হয়ে গেল। সমাজে আজ তার পরিচয় সে কানাই ঘোষালের রক্ষিতা। অথচ এমনটা তো হবার কথা ছিল না। একবার লুকিয়ে কানাইয়ের বাড়িতে গিয়ে কৃষ্ণাকেও দেখেছে সে। তাকে দেখার পর আত্মগ্লানিতে মরতে ইচ্ছে হয়েছে তার। আত্মহত্যার চেষ্টা যে করেনি তা নয়। তবে প্রতিবার কানাই এসে বাঁচিয়েছে। মাঝে মাঝে জলপাইগুড়িতে থাকা বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে। ইচ্ছে করে তাদের কাছে ফিরে যেতে। কিন্তু সে কোন মুখে যাবে? কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াবে? একবার ফোন করেছিল সে তবে লজ্জায় কথা বলতে পারেনি।

রোজরাতে যখন কানাই ওর মধ্যে প্রবেশ করে তখন যন্ত্রণায়, ঘেন্নায়, রাগে, নিজের উপর বিতৃষ্ণায় মনটা ভরে যায়। মনে মনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করে নিজের মুক্তির। ঠাকুর ওর প্রার্থনা শোনেন কিনা সে জানে না। সে জানে না আর কতদিন এইভাবে যৌনদাসী হয়ে কাটাতে হবে তাকে। জানে না আর কতদিন এইভাবে যন্ত্রণায় সারারাত কাটাতে হবে। সারারাত রমণের পর ক্লান্ত কানাই শুয়ে পড়লে। যন্ত্রণাকাতর শরীরে সে ভগবানের কাছে নিজের মৃত্যুকামনা করে।

আজকে কানাইকে ওভাবে উঠতে দেখে সে পাশ ফিরে শুলো। কদিন আগেই কানাই একটা পুরোনো বাড়ির ডিলের কথা বলছিল। বাড়ির মালিক বাড়িটা বেচতে চাইলেও বাধ সাধছে সেই বাড়িতে থাকা বৃদ্ধা। কানাই গজগজ করে উঠলো, “বাল ! একটা কাজও যদি তোদের দিয়ে হয়। বুড়িটা মরে গেছে তো ভালোই হয়েছে! আপদ গেছে। লাশ সরাতে কতক্ষন?” বেচারী বৃদ্ধার জন্য কষ্ট হয় কালিন্দীর। মৃদু হিংসেও হয়। আহা কি সৌভাগ্য বৃদ্ধার। নিজের বাড়িটাও তো নিজের সম্মানের, নিজের স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্নকে আকড়ে মরেছেন উনি। আর সে, প্রতিরাতে নিজের জীবন দিয়ে তাকে চোকাতে হচ্ছে কানাই ঘোষালের সব ঋন। নিজেরই দুর্ভাগ্যের জন্য দুফোঁটা জল চোখ থেকে ঝড়ে পড়ে তার।

কানাই বিছানা ছেড়ে জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে কালিন্দীকে ডাক দেয় দরজাটা লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। কালিন্দী বিছানার কোণে ফেলে রাখা নাইটিটা পরে নিয়ে সদর দরজাটা খোলে। কানাই বেরিয়ে যাবার পর বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার চালিয়ে দেয়। শাওয়ারের জলে ভিজতে ভিজতে মাটিতে বসে পড়ে সে।

******

২রা জুন ২০১৯, রবিবার, সকাল দশটা, টিটাগড় পুলিশ স্টেশন

উকিলকে নিয়ে থানায় ঢুকে কানাই দেখে রজতরা হাজতে দাঁড়িয়ে। সেদিকে একঝলক তাকিয়ে কানাই ঢোকে ওসির ঘরে। এখানকার ওসিকেও হাড়ে হাড়ে চেনে সে। টাকার খাই খুব ওসির। রুমেই ছিল ওসি অনুব্রত খাসনবিস। কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছিল। কানাইকে দেখে ফোনটা রাখে।

কানাই সোজা ভেতরে ঢুকে চেয়ারে বসে। অনুব্রত বিব্রত হয়ে বলে, “আরে দাদা খামোখা কষ্ট করে তুমি এলে কেন? আমাকে বললে আমিই যেতাম। কি খাবে বলো চা আনাই? ” কানাই হাত তুলে বলে, ”সকালবেলা চা খেতে বা তোমার আপ্যায়ন নিতে আসিনি খাসনবিস। ওদের ছাড়াতে এসেছি।” বলে উকিলের কাছ থেকে বেল অর্ডার নিয়ে ওসির টেবিলে ফেলে দেয় কানাই। সাথে একটা পাঁচশো টাকার বান্ডিল রাখে পেপারওয়েট হিসেবে।

অনুব্রত দেখে নোটটা তারপর ঢোক গিলে বলে, ”ইয়ে মানে কানাইদা। বুঝতেই পারছো এটায় আমার হাত আর নেই। উপরমহল থেকে অর্ডার এসেছে।”

”আরে রাখো তোমার উপরমহল। সব জানা আছে আমার। যেটা বলছি সেটা করো। একটা পেটি কেস মেরে ছেড়ে দাও। বাকিটা আমি দেখে নেবো।” বলে আরেকটা বান্ডিল রাখে কানাই
বান্ডিলটার দিকে লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে খাসনবিস বলে“সেতো দিতেই পারতাম তবে…হে হে ইয়ে মানে ঐ ভিডিওটা ফেসবুকে খুব ছড়াচ্ছে কিনা। ওটাতেই আরো চাপ হয়ে গেছে। চাইলেও আমি ছাড়তে পারবো না।”

কানাই এবার বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে, “কাজটা তুমি ভালো করলে না খাসনবিশ।” খাসনবিশও ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়ায়, “আমার দোষ নেই দাদা। মেয়েটার উপরমহলে বহুত চ্যানেল আছে। সোজা লালবাজার থেকে ফোন এসেছিল। এবার মেয়েটা যদি নিজে থেকে কেসটা না তোলে আমার পক্ষে কিছু করা অসম্ভব।”

কানাইয়ের মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি খেলে যায়। সে বলে, “কোর্টে কবে তুলছো ওদের? ” খাসনবিশ বুঝতে না পেরে মাথা চুলকে বলে, “ইয়ে মানে কালকে সকালে। কেন দাদা? ” কানাই কিছু বলে না মুচকি হেসে বেরিয়ে যায়।

বাইকে বসে ফোনে ফেসবুক অ্যাপটা খোলে কানাই। এমনিতে এসবের নেশা নেই তবে মাঝে মাঝে খোলে সে। বেশীক্ষন লাগে না। ফেসবুকে কিছুক্ষন নাড়াঘাটার পর খুঁজে পায় সে ভিডিওটা। পুরোটা দেখে সে। বেশ পাকা হাতের কাজ। একফোঁটাও কাঁপে নি কোথাও। আরেকটু খুঁজতেই পেয়ে যায় মেয়েটার আইডি। নামটা আরেকবার পড়ে, “পাখি চ্যাটার্জী।” প্রোফাইল পিক দেখে চমকে ওঠে সে।

কানাইয়ের মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসে, “আরিব্বাস! এতো ডানাকাটা পরি দেখছি! তা মামনির আবার ডানা গজিয়েছে মনে হচ্ছে? কোনো ব্যাপার না। আবার ছেটে দেবো।” বলে ছবিটা ফোনে সেভ করে হোয়াটসঅ্যাপে নিজের দলের ছেলেদের ফরোয়ার্ড করে একটা ভয়েস মেসেজ দেয়, “এই মেয়েটা কোথায় থাকে, কোথায় যায় তা ফলো রাখ আর সময়ে সময়ে আমাকে জানা। দরকার আছে।” বলে ফোনটা রেখে মৃদুগলায় শ্যামাসঙ্গীত গাইতে গাইতে বাড়ির উদ্দেশ্যে বাইক চালিয়ে দেয়।

******

৩রা জুন ২০১৯, সোমবার, রাত নটা, ব্যারাকপুর

আজ অফিস থেকে ফিরতে বেশ রাত হলো পাখির। আসলে রাস্তায় জ্যাম মারাত্মক ছিল ফলে ক্যাবে ফিরতে ফিরতে দেরী হয়ে গেল। ঘড়িতে দেখে রাত নটা বাজে। বেশী রাত হয়নি অবশ্য তবে মা হয়তো ভীষণ চিন্তা করছে তাই তাড়াতাড়ি পা চালায় পাখি। আসলে ওদের পাড়াটা এতটা ঘিঞ্চি যে সহজে ক্যাব ঢোকে না। দতাই মেনরোডে নামতে হয়। তারপর একটা পাড়া আর একটা কালীমন্দির পেরিয়ে ওদের পাড়ায় পৌছয়। মেনরোড থেকে ওদের পাড়া পায়ে হেটে মিনিট পাঁচেকের পথ।

প্রথম পাড়া পেরিয়ে পাখি ওদের পাড়ায় ঢুকতে যাবে এমন সময় লোডশেডিং হয়ে গেল। আচমকা অন্ধকার নেমে আসায় পাখি প্রথমে থমকে দাঁড়ালো। আজ অমাবশ্যা ওর খেয়ালই ছিল না। পকেট থেকে ফোনটা বের করে আলো জ্বালিয়ে এগিয়ে গেল। কিছুদুর যেতেই পাখির মনে হলো কে যেন তাকে ফলো করছে। পেছনে আলো ফেলে সে দেখলো কেউ নেই। আবার কিছুদুর এগোতেই আবার মনে হলো কে যেন ওকে সত্যিই ফলো করছে। আবার পেছনে আলো ফেললো। এবারও কেউ নেই। পাখির মনে হলো এটা হয়তো ওর মনের ভুল।

নিজেকে আশস্ত করে সামনে ফিরতেই আচমকা একজনকে সামনে দাঁড়াতে দেখে চমকে উঠলো পাখি। মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলোয় দেখল ওর সামনে দাঁড়িয়ে কানাই ঘোষাল। সকালে মর্নিংওয়াক করতে গিয়ে পাশের পাড়ায় বসু দিদার বাড়ির সামনে ভীড় দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল পাখি। ব্যাপারটা বুঝতে বেশীক্ষন লাগে নি। চট করে ফোনটা বের করে ভিডিও তুলে আপলোড করেছিল ফেসবুকে। তারপর ফোন করেছিল ওর কলেজের এক বন্ধুকে। বন্ধুটা লালবাজারে গুন্ডাদমন শাখায় আছে। ওরই জোরে লোকগুলো অ্যারেস্ট হয়। মা পরে জানতে পেরে একপ্রস্থ চোটপাট করেছিল। বলেছিল ওরা নাকি কানাই ঘোষালের ছেলে। কানাই ঘোষাল সাংঘাতিক লোক। ওর সাথে লাগতে না যাওয়াই ভালো। পাখি তখন মায়ের কথায় পাত্তা দেয় নি।

ভয় পেয়ে যাওয়া পাখিকে দেখে মুচকি হেসে কানাই বললো, “এত রাতে কোথা থেকে আসা হচ্ছে? ” পাখি নিজেকে সামলে বলে, “সেটা জেনে আপনার কি লাভ? ” কানাই হেসে বলে, “ওবাবা এতো তেজ? ভালো ভালো। আজকের যুগে এটুকু তেজ থাকা ভালো। তোমাদের মতো তেজি মেয়েদের আমার ভালো লাগে। তা কাল সকালে মর্নিংওয়াকে যখন গেলে তখন সেটা সেরেই তো ফিরে আসতে পারতে? বাড়িতে শেখায় নি রাস্তায় জটলা হলে সেখানে যেতে নেই? যার তার অনুমতি ছাড়া ছবি তুলতে নেই? ” বলতে বলতে দু এক পা এগিয়ে আসে কানাই। ভয়ে পাখি দুপা পিছিয়ে আসে।

কানাই বলে, “তুমি মেয়ে ভালো, পড়াশোনা জানো, চাকরি করো, পরোপকারি, কিন্তু এই উপকারটা যে আমার সর্বনাশ ডেকে এনেছে। আর কানাই ঘোষালের কাছে নিজের স্বার্থ আগে মানবতা পরে। কাজেই তোমায় সরে যেতে হবে। তবে চিন্তা কোরো না। ফেসবুকে তো খুব আক্ষেপ করো যে একদিন তুমি ভার্জিনই মরবে। পাড়ার দাদা হয়ে আমি কি তা হতে দিতে পারি? আগে তোমার সমস্ত আক্ষেপ অভিযোগ দুর করবো তারপর তোমার মুক্তি।” বলতে বলতে পকেট থেকে চাকু বের করে সোজা চালিয়ে দেয়।

অন্ধকারেও নিখুঁতভাবে চাকুটা শার্টের মাঝ বরাবর চিরে দেয়। শার্টের আড়াল থেকে উকি দেয় পাখির উন্মুক্ত শরীর। কোনোরকমে ব্যাগ থেকে পেপারস্প্রেটা বের করে কানাইয়ের চোখ লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয় পাখি। তারপর জামার দুপ্রান্ত ধরে নিজের লজ্জা নিবারন করে উল্টোদিকে দৌড়য়।আচমকা এই আঘাতের জন্য তৈরী থাকলেও একটু স্প্রের ছিঁটে কানাইয়ের মুখে লাগে। কানাই নিজের মুখ চেপে ধরে তারপর পাখির পেছনে ধাওয়া করে। একবার যদি মেয়েটা পাশের পাড়ায় চলে যায় তাহলে বিপদ।

পাখি পেছনে না তাকিয়ে সোজা দৌড়াতে থাকে। কিন্তু বেশীদুর দৌড়তে পারে না। অন্ধকারে কিসের উপর যেন হোচট খেয়ে পড়ে যায়। মাথাটা ঠুকে যায় রাস্তায় থাকা ল্যাম্পপোষ্টে। আর পড়া মাত্র পাড়ায় আলো জ্বলে ওঠে। কোনোমতে মাথা উঠিয়ে তাকিয়ে দেখে কালীমন্দিরের স্ল্যাবে হোচট খেয়ে পড়েছে। পেছন ফিরে দেখে কেউ নেই। পাশের পাড়াতেই ক্লাবের ছেলেরা বসেছিল। আচমকা পাখিকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে ছুটে আসে তারা।

******

কতক্ষন অজ্ঞান হয়েছিল জানে না কানাই। জ্ঞান ফিরতেই মাথাটা টনটন করে ওঠে তার। প্রচন্ড ব্যথার মধ্যে ওর মনে পড়ে অজ্ঞান হবার আগে অন্ধকারের সুযোগে পাড়ায় ঐ মেয়েটাকে গুম করতে গিয়েছিল ও। মেয়েটা ভয় পেয়ে পালাতে যায়। কানাইও ওকে তাড়া করে ধরতে যাচ্ছিল এমন সময় পাশ থেকে আরেকটা জমাট অন্ধকার টের পায় সে। কিছু করার আগেই পেছন থেকে রুমাল দিয়ে মুখ চেপে ধরে সেই ছায়ামুর্তি। একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে লাগে ওর তারপর আর কিছু মনে নেই কানাইয়ের।

হুঁশ ফিরতেই কোথায় আছে সেটা বোঝার চেষ্টা করে কানাই। গলাটা ভীষণ চাপা লাগছে। কানে ভেসে আসছে ঘন্টার শব্দ আর গম্ভীর গলায় মন্ত্রপাঠের শব্দ। চোখ মেলে আশেপাশে তাকাতেই বুক হিম হয়ে যায় কানাইয়ের। একটা মন্দিরের সামনে উল্টো হয়ে শুয়ে আছে ও। হাত পা অবশ হয়ে গেছে। ইচ্ছে করেও নাড়াতে পারছে না। আর ওর মাথাটা হাড়িকাঠে আটকানো। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে কানাই। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোয় না।

কানাইয়ের গোঙানী শুনে পুজারী একটু থামে তারপর আবার পুজো শুরু করে। পুজো শেষ করে হোম আরম্ভ করে সে। হোম করার পর উঠে দাঁড়ায় সে পুরোহিত। হোমের আগুনের আলোয় তার বলিষ্ঠ চেহারাটা অস্পষ্ট লাগে কানাইয়ের।পুরোহিত এক হাতে একটা সরা আরেক হাতে একটা খাঁড়া নিয়ে আসে। তারপর কানাইয়ের মাথার নিচে সরাটা রেখে বলে, “ ব্রাহ্মণ নিজের ধর্ম ভুললে কি হয় জানিস? নীচ, কুলভ্রষ্ট, আর মহাপাপী। তাও তো তোর ভাগ্য ভালো আজকের দিনে মা তোকে নিজের ভোগ হিসেবে চেয়েছে। তোর ভক্তি সার্থক। আজ ফলহারিনী কালিপুজো। বড়ো পবিত্র দিন আজ। নিজের সব পাপের জন্য মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে মাকে স্মরণ কর।”
বলে উঠে দাঁড়ায় পুরোহিত। খাঁড়াটা হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করে মন্ত্রপাঠ করতে করতে উপরে তোলে খাঁড়াটা। ভয়ে আতঙ্কে কাঁপতে থাকে কানাই। পুরোহিত খাঁড়াটা নামিয়ে পৈতেটায় ঠেকায়। খাঁড়াটা ঠেকানো মাত্র কেটে পড়ে যায় পৈতেটা। তারপর খাঁড়াটা আবার উপরে তুলে স্থির হয়ে যায় পুরোহিত। পরক্ষনেই “জয় মা! ” বলে নামিয়ে দেয় খাঁড়াটা। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে পড়ে সরাটায়। কাটা পাঁঠার মতো থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে যায় কানাইয়ের দেহ।

খাঁড়াটা মাটিতে রেখে একহাতে মাথাটা নিয়ে আরেক হাতে সরাটা নিয়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে যায় পুরোহিত। পেছনে পড়ে থাকে কানাই ঘোষালের কবন্ধ মৃতদেহ। 

(চলবে…)

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২০

বলি দ্বিতীয় পর্ব


১৫ই এপ্রিল ২০১৯,সোমবার, সকাল সাড়ে দশটা, কলকাতা

চা-জলখাবার খাবার পর একটা গাঁজার সিগারেট ধরালো ব্যোমকেশ। মনের সুখে দুটো টান দিয়ে আরাম করে সোফায় হেলান দিয়ে আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়লো। আমাদের লুচি-আলুর দম খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। আজ পয়লা বৈশাখ। সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে। ছুটির দিন বলে যথারীতি সকাল থেকেই আজ আমরা জড়ো হয়েছি বালুর বাড়িতে। আজকের প্ল্যান সারাদিন আড্ডা দেবো, আর কবজি ডুবিয়ে খাবো। প্রাচী একটু পর পর আসছে কারো লুচি বা আলুর দম লাগবে কিনা।

বালু খেতে খেতে বলল, “যতই সারাবছর সকালে দুধ-কনফ্লেক্স, ফ্রেঞ্চ টোস্ট খাও না কেন। এই লুচি আলুর দমের কথাই আলাদা।” রণি একটা প্রকান্ড ঢেঁকুর ছেড়ে বললো, “ছাড় তো? কিসের সাথে কিসের তুলনা? কোথায় ফ্রেঞ্চ টোস্ট আর কোথায় লুচি আলুর দম। বলি ও বৌদি আরো দুটো লুচি দে।” আমি ফুট না কেটে থাকতে পারলাম না, “বলি হাসপাতাল থেকে ফেরার পর তো খাই খাই বাতিকটা বেড়েছে দেখছি। একটু চেপে খান স্যার। মধ্যপ্রদেশ যে হারে স্ফীত হচ্ছে কদিন পর তো ফেটে যাবেন! ”

রণি চোখ কটমট করে বললো, “আবার খাওয়ার খোঁটা দিচ্ছিস! নেহাত শরীরটা একটু দুর্বল হয়ে আছে তাই বলে এভাবে বলবি? ঠিকই বলে লোকে পাঁকে পড়লে হাতি ব্যাঙে মারে লাথি।” শাম্ব বললো, “তাহলে তুই স্বীকার করছিস তুই হাতি? ” 
রণি বাহাতে মুঠো পাঁকিয়ে বললো, “হ্যা আমি হাতি। আর এই হাতিটা চাইলে এক থাবড়ায় তোদের হাড়ে চিড় ধরিয়ে দেবে। দেখবি?” আমি বললাম, “ না কোনো শখ নেই। শেষে কুমড়োপটাশ গড়িয়ে গেলে আরেক কেলেঙ্কারী হবে।”

ভষ্মে ঘি পড়লো যেন। রণি গর্জে উঠে বললো, “বালু! ওকে সামলা বলে দিলাম নাহলে একটা খুনোখুনি হয়ে যাবে। তখন তুইও কিছু করতে পারবি না।” বালু নির্বিকারভাবে বললো, “বেশ তো কিছু করে দে। তারপর মামলা হলে আমি আছি। অনেকদিন হলো হাতে কোনো কেস নেই। এই সুযোগে তোদের থেকে টু পাইস উসুল করবো।” আমি বললাম, “শালা! এর মধ্যেও নিজের লাভ দেখছিস। সাধে বলে উকিল আর ঢেঁকি সমগোত্রীয়। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে উকিল নরকে গেলেও কৌঁসুলি করে।”

ব্যোমকেশ এতক্ষন চোখ বন্ধ করে গাঁজা টানছিল আচমকা উঠে বসে বললো, “এই প্রবাদটা আবার কোথায় পেলে হে?” আমি হেসে বললাম, “পাই নি তো! এই মাত্র বানালাম।” ব্যোমকেশ হেসে বললো, “তাই বলো। আমি ভাবছি ঢেঁকির স্বর্গভ্রমণের কথা জানি উকিলের নরকভ্রমণটা আবার কবে হলো? অবশ্যি সাহিত্যিক মানুষ বলে কথা। তোমরা বানিয়ে বানিয়ে সব লিখতে পারো।” কথার শেষে শ্লেষটা বড়ো কানে লাগলো।

আসলে গতবার তন্নিষ্ঠদের নিয়ে ঘটনাগুলো('প্রতিঘাত'যারা পড়েছেন তারা বুঝবেন) নিয়ে একটা বড়োগল্প লিখে ফেসবুকে একটা গ্রুপে দিয়েছিলাম। অবশ্য তন্নিষ্ঠ-দেবলীনাদের আসল নামটা দিইনি। ব্যোমকেশ এব্যাপারে কিছু জানতো না। অবশ্য জানবে কি করে ওর তো সেই পুরোনো আমলের নোকিয়া ফোন। শুধু ফোন হয় আর কিছু না। তবে এই ব্যাপারটা জানতে পেরে একপ্রস্থ চোটপাট করে। অনেক কষ্টে ওকে থামানোর পর গল্পটা পড়তে চেয়েছিল। ফলে ওকে পড়তে দিই।

গল্পটা পড়ে গজগজ করে বলেছিল, “এই তোমার গল্প? যতসব উল্টোপাল্টা গাঁজাখুরি আর গোঁজামিলে ভরা! এটা গল্প? আর তুমি এতটা নির্লজ্জ জানলে তোমাকে আমার সাথে কার্শিয়াং নিয়ে যেতাম না। ছিঃ! ছি! দেবলীনা বৌঠান আমাদের বিশ্বাস করে গল্পটা বলেছিল আর তুমি সেটাও বেমালুম লিখে দিলে! বৌঠানের সামনে কোন মুখে দাঁড়াবো বলোতো? আবার পাঞ্চালীর ঘটনাটাও বলে দিলে! বলি কতজন এটা বুঝবে যে তন্ত্রসাধনায় অন্ধ তন্নিষ্ঠর এটা ভুল কাজ ছিল? বেচারা একেই মরমে মরে ছিল এর পর কি হবে বুঝতে পারছো? আর আজকাল মেয়েদের বয়স আন্দাজ করাও শুরু করেছো দেখছি। বলি মাসিমা-মেসোমশাই জানে? নেহাত তুমি আমার ছোটোভাই নও নাহলে তোমার কান মুলে দিতাম। এহ আবার লেখক হয়েছেন! শোনো লিখতে হলে পুরোটাই লিখবে নাহলে লিখবে না। বানিয়ে লেখা আমার পছন্দ নয়। লোকের কাছে আমায় গাঁজাড়ু বানিয়ে দিলে। বলি দিনে ক'বার টান দিতে দেখেছ শুনি? আমার চেয়ে বেশী তো তোমাকে সিগারেট টানতে দেখি। খবরদার! ভবিষ্যতে যদি দেখি এরকম উল্টোপাল্টা লিখেছ। সত্যি সত্যি প্রাচী বৌঠানের সামনে কান মুলে দেবো।” রণি বলেছিল, “আহা তুমি খামোকা কষ্ট করবে কেন? আমি আছি কি করতে? আমি না হয়…।”

এরপর টানা একসপ্তাহ আমার সাথে কোনো কথা বলেনি ব্যোমকেশ। আড্ডাতেও এসেছে আলাদা ভাবে। অবশ্য দেখতে গেলে দোষ আমারই ছিল। আসলে ঘটনাগুলো এতটাই দুর্বোধ্য আর নৃশংস ছিল যে লিখতে গিয়ে মনে হতো পাঠক নেবেন তো? সহ্য করতে পারবেন তো? তাই নিজের সাহিত্যসাধনার বিদ্যে ফলিয়েছিলাম। তবে এখন আর এসব করা যাবে না মনে হয়। ব্যোমকেশকে বন্ধু কম দাদা বেশি মানি। ও কান মুললে আমার কোনো কিছুই যায় আসবে না। তবে…প্রাচীদের সামনে যদি কান মুলে ধরে আপনারাই বলুন আমার প্রেস্টিজটা কোথায় যাবে? কাজেই ঠিক করেছি পাঠকের যাই মনে হোক না কেন এবার আর বানিয়ে লিখবো না।

ব্যোমকেশ ধোঁয়া ছেড়ে গাঁজার সিগারেটটা অ্যাশট্রে তে গুঁজে সময় কাটাতে নিউজপেপারে মন দিল। আমরা খেয়েদেয়ে ড্রইংরুমে বসলাম। পেপার পড়তে পড়তে ভ্রু কুঁচকে একজায়গায় থামলো ব্যোমকেশ। টেবিলে রেখে সেই জায়গাটা আরেকবার পড়ে বললো “অদ্ভুত তো! ” আমরা ওর দিকে তাকাতেই ও খবরটার দিকে আঙুল দিয়ে দেখালো। রণি শুধু হেডলাইনটা পড়ে ব্যাজারমুখে বললো, “হুম স্ট্রেঞ্জ কেসই বটে। এ নিয়ে উপরমহলে যথেষ্ট চাপ আসছে আমাদের উপর।” আমরা এক এক করে খবরটা পড়লাম। শাম্বদের খবরের কাগজ এটা। মাঝের পাতায় এক কোণে বড়ো করে ছাপা।

খবরটা পড়ার পর আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে তাকালাম। ব্যোমকেশ আরেকটা গাঁজার সিগারেট ধরালো। তারপর হাল্কা একটা টান দিয়ে বললো, “ পিএম রিপোর্ট কি বলছে? ” রণির সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ডাক্তারের কড়া নিষেধ দিনে দুটোর বেশী খেতে পারবে না। তাই ব্যোমকেশের হাতে গাঁজার সিগারেট দেখে জিভ দিয়ে ঠোট চেটে বললো, “আর পিএম রিপোর্ট। এমন হাল করেছে বডিটার যে আলাদা করে আর পিএম করতে হয় নি।”

ব্যোমকেশ ভ্রু কুঁচকে বললো, “ সে কি রকম? ” রণি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “ এতবছর হয়ে গেল এই ডিপার্টমেন্টে কোনোদিনও এমন কেস দেখিনি। মানে মানুষ কতটা ব্রুটাল হতে পারে বডিগুলো না দেখলে বিশ্বাস করবেন না।” 

ব্যোমকেশ বললো, “একমিনিট বডিগুলো মানে? এরকম খুন আরো হয়েছে নাকি? ” রণি মাথা নেড়ে বললো, “এ নিয়ে পনেরোটা।” ব্যোমকেশ এবার সোজা হয়ে বসলো, “তাই নাকি? তা বডির দশা কিরকম ? ” বলে একটা গাঁজার সিগারেট অফার করলো রণিকে। আমরা হায় হায় করে উঠতে রণি হাত বাড়িয়ে নিতে গিয়েও একটু দমে গেল।

ব্যোমকেশ হেসে বললো, ”আরে দুর তুমি নাও তো! ওদের কথায় কান দেবে না। এটা তোমাদের ওই নিকোটিনে ভরা সিগারেটের চেয়ে ঢের ভালো। কিছু হবে না।” রণি সিগারেটটা নিয়ে ধরিয়ে নিলো। তারপর বললো, ”হ্যা কি যেন বলছিলাম? হ্যা বডির অবস্থা ভীষণ প্যাথেটিক। মানে ডাক্তারের মতে জীবন্ত অবস্থাতেই পোষ্টমর্টেম করে নাড়িভুড়ি, হৃদপিন্ড বের করে নিয়ে মালা বানিয়ে দিয়েছে। তারপর মাথাটা কেটে নিয়েছে। প্রথমবার তো মর্গের ডাক্তারও চমকে গিয়েছিল।” ব্যোমকেশ জিজ্ঞেস করে, ”দেহাংশগুলো যে মৃতদেহেরই তার প্রমাণ কি করে হলো? ” রণি একটান মেরে সিগারেটটা শেষ করে বলে, “ডিএনএ টেস্টে প্রমানিত হয়েছে।”

ব্যোমকেশ মাথা নিচু করে বলে, “হুম। আচ্ছা মৃতদেহ গুলোর আর কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছো? ” রণি মাথা চুলকে বলে, “আর তো তেমন কিছু…ও হ্যা! মনে পড়েছে। প্রত্যেক বডিতেই সিঁদুর মাখানো।” ব্যোমকেশ সোজা তাকায় রণির দিকে। “সিঁদুর মাখানো? ”

“হ্যা ভীষণ পিকিউলার ফর্মে সারা শরীরে সিঁদুর দিয়ে বিশেষ কিছু চিহ্ন আঁকা। সামনে থেকে বোঝা যায় না। তবে মৃতদেহ উল্টো করে শোয়ালে পিঠে বাহুতে তেল সিঁদুর মিশিয়ে আঁকা।”

ব্যোমকেশ অ্যাশট্রের দিকে তাকায়। অ্যাশট্রে দিয়ে তখনও সিগারেটের ধোঁয়া উঠছে। সেই ধোঁয়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে নিজের মনেই বলে, “দারুন ব্যাপার তো! ” কিছুক্ষন পর সম্বিত ফিরে এলে সে বলে, “ভালো কথা এই কেসের আইও মানে তদন্তকারী অফিসার কে? ”

রণির মুখে এবার একটা খুশির আলো ছড়িয়ে পড়ে। সে একটু হেসে বলে, “নতুন ছেলে, আগে ছিল বেঙ্গল পুলিশে। রিসেন্টলি আমাদের ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছে। নাম রাজীবলোচন চক্রবর্তী। আমরা রাজীব বলে ডাকি। ভীষণ এফিসিয়েন্ট ছেলে। ভীষণ চটপটে। আসার পরেই বেশ কয়েকটা কেস মারাত্মক বুদ্ধির সাথে সলভ করেছে। আমারই আন্ডারে কেসটা পড়েছে। উপরমহল থেকে বলেছে দিস ইজ আওয়ার লাস্ট চান্স। এরপর সিআইডি টেক ওভার করবে। ছেলেটা ভীষণ খাটছে। ”

ব্যোমকেশ একটু নিজের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে হাত বুলোলো। তারপর আর কিছু বললো না। মেতে উঠলো অন্য আড্ডায়। পুরোনো গল্পে। কিন্তু আমি বেশ টের পাচ্ছিলাম ওর মনে একটা ঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে। হাজার চেষ্টা করেও ও সেটাকে ঝেড়ে ফেলতে পারছেনা। দুপুরে খেতে বসেও দেখলাম। খাবারে ওর তেমন মন নেই।

বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে দেখলাম ও ক্রমশ অচঞ্চল হয়ে উঠেছে। ওকে জিজ্ঞেস করতেই হাসলো। বললো, “খালি উল্টোপাল্টা চিন্তা মাথায় আসছে। জপে মন বসাতে পারছি না। সকালে রণিবাবুর বলা কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। কি যেন একটা হন্ট করছে আমায় ঐ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে । কি যেন একটা মনে পড়বে পড়বে করেও মনে পড়ছে না। পদ্ধতিটা ভীষণ চেনা ঠেকছে। তবে মনে করতে পারছি না।”

পরেরদিন সকালে খাবার টেবিলে ওর থমথমে মুখটা দেখে বুঝলাম সারারাত রণির কথাগুলো ওকে ঘুমোতে দেয় নি। ওর হাতের কাছে পেপারটা ছিল সেটা নিয়ে পড়তে লাগলাম। ব্যোমকেশ কি একটা ভাবতে ভাবতে ওর ফোনটা বের করে কাকে যেন ফোন করলো। কিছুক্ষন পর বুঝলাম রণিকে ফোন লাগিয়েছে।

“হ্যালো! হ্যা রণি…হ্যা ব্যোমকেশ বলছি… দুঃখিত তোমাকে বিরক্ত করার জন্য… বলছিলাম কি এই যে মার্ডার গুলো হচ্ছে এটার সময়টা একবার আমায় বলতে পারবে? …না বলছিলাম যে ডেটটা শুধু…ঠিক আছে আমি ওয়েট করছি …না না এমনিই কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করলাম। জানি এটা তোমাদেরই কেস…না না সবার লাগবে না এই ধরো শুরুর বা শেষের পাঁচজন…আচ্ছা রাখলাম।”
ফোনটা রাখার কিছুক্ষন পর আবার ফোন এলো। ব্যোমকেশ ফোনটা কানে নিতে পেপারটা এগিয়ে নিলো। তারপর আমার পকেট থেকে পেনটা নিয়ে খসখস করে লিখতে লাগলো। লেখার পর ফোনটা কেটে একদৃষ্টে তারিখগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। আমার অফিসের তাড়া ছিল বলে খেয়ে দেয়ে উঠে পড়লাম। ব্যোমকেশ তখনো তারিখগুলোর দিকে তাকিয়ে বসে আছে।

(চলবে…)

বলি প্রথম পর্ব


পূর্বাভাস:১

৯ এপ্রিল ১৯৯৬, মঙ্গলবার‚ মাল্লারপুর, বীরভূম

স্কুল থেকে ফিরে হাতমুখ ধুয়েই কিছু একটা নাকেমুখে গুঁজেই কিটব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে গেল রাজু । আজকে বীরভূম ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল বলে কথা। ওদের গ্রামের পঞ্চানন ব্যায়ামাগার বনাম রামপুরহাট স্পোর্টিং ক্লাবের খেলা আজকে। খেলা হবে ওদেরই গ্রামের মাঠটায়। আজকের ম্যাচে না জিতলে ওদের গ্রামের আর মান থাকবে না। পর পর পাঁচ বছর রামপুরহাট স্পোর্টিং ক্লাব জিতে আসছে এই ট্রফি। আর ওরা প্রতিবার কোয়ার্টার ফাইনালে ফিরে আসে। এবছর মা তারার কাছে প্রার্থনা করেছিল রাজু অন্তত এইবার যাতে হেরোভুত না হতে হয়।
মা তারা শুনেছেন। এতগুলো দিনের হাড়ভাঙা অনুশীলন বৃথা যায় নি। ওদের গ্রাম অবশেষে ফাইনালে উঠেছে। বিপক্ষে আবার সেই রামপুরহাট। টিমের ক্যাপ্টেন অসীতদা বলেই দিয়েছে ইয়া তো ইসপার নাহয় ওসপার। মিডফিল্ডার বলে রাজুকে বলেছে, “ বল পায়ে এলে হরিনের মতো দৌড়বি। কোথাও তাকাবি না। যতক্ষন না পর্যন্ত আটকে পড়ছিস থামবি না। অন্তত দুটো গোল চাই।”

তা অবশ্য বলতে হবে না অসীতদাকে। একবার বল তার পায়ের নাগালে এলে চুম্বকের মতো টেনে নেয় সে। তারপর ওর নাগাল আর পায় কে? যতই কঠিন ডিফেন্স বা কড়া প্রতিপক্ষ হোক না কেন গোল না দিয়ে থামে না সে। অসীতদার কথায় গত একমাস পায়ের জোর বাড়াতে নদীপাড়ের নরম পাঁকে, ভেজাবালিতে পিঠে ইট বেঁধে দৌড়েছে। দম বাড়াতে নদী এপার ওপার সাঁতরেছে। যোগব্যায়াম করেছে।

যেতে যেতে রাজু হঠাৎ মনে পড়ে, এই রে কিটব্যাগে সব নিলেও জুতোটাই নিতে ভুলে গেছে। ওদের দলের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী হওয়ায় পায়ের মাপটাও ওরই একটু ছোটো। এখনও খেলা শুরু হতে দেরী আছে এই ভেবে বাড়ির দিকে ফিরলো সে। বাবার ফেরার সময় এখনও হয় নি। বাবা কি একটা কাজে যেন রামপুরহাটে গেছেন। এই যে সে ফুটবল খেলে বেড়ায় এটা ওর বাবার পছন্দ নয়। গ্রামের কালীমন্দিরের পুজারি এবং প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক ওর বাবা সর্বেশ্বর চক্রবর্তী বিশ্বাসী সাধারন জীবনযাপনে। কোনো অলৌকিক চমৎকারে তিনি বিশ্বাস করেন না। দুবেলা দুমুঠো অন্ন আর দিনান্তে মায়ের পুজো এই দুটোতেই শান্তি তাঁর। আর কিছুই চান না তিনি।

তাঁর যাবতীয় স্বপ্ন রাজু আর তার দিদি শ্যামাকে নিয়ে। শ্যামার একটা পাল্টি ঘরে বিয়ে হোক আর রাজু পড়াশুনো শেষ করে মানুষ হোক এইটুকুই চান তিনি। বাবার জন্যই আজ স্কুলে যেতে হলো তাকে। নাহলে আজকের দিনে কে যায়? রাজু বাড়ি ফিরে আসে ওর মা ওকে দেখে অবাক হন। দিদি তরকারী কাটতে কাটতে বলে, “কিরে ফিরে এলি যে? ” রাজু ঘরে ঢুকে জুতোটা দেখায় তারপর ব্যাগে ঢুকিয়ে বেরিয়ে যায়।

ছেলের এই খেলাপাগল মনোভাবে সর্বেশ্বর বাবুর মত না থাকলেও পুরোহিত গিন্নি এটা নীরবে সমর্থন করেন। বিশেষ করে যখন পাড়ার ঝি-বউদের কাছে শোনেন যে তাদের বাড়ির পুরুষেরা তার রাজুর খেলার সুখ্যাতি করছে গর্বে বুকটা ভরে যায়। তিনি চান তাঁর ছেলেটা বড়ো হোক মানুষ হোক। সেদিন কালীপুজোর নিমন্ত্রণের সময় গ্রামের মোড়লের ছেলে অসীত বলেছিল, “রাজুটার খেলার স্কিল দারুন বেড়েছে জেঠিমা। দেখবেন ও একদিন আমাদের গাঁয়ের নাম ঠিক উজ্জ্বল করবে। ”

মনে মনে মা তারার কাছে প্রার্থনা করেন পুরোহিত গিন্নী, তাই যেন হয় । তবে এখন একটাই চিন্তা। মেয়েটার একটা গতি হয়ে গেলেই হলো। সামনের বৈশাখে কুড়িতে পা দেবে। একদম বাপের মতো গায়ের রং পেয়েছে মেয়েটা। দুধে আলতা গায়ের রং। ডাগর চোখ, পানপাতা মুখ। ঠিক যেন মা লক্ষ্মী। তবে কপালে একটা মুসুরির ডালের মতো জড়ুল আছে। ঠিক যেন সিঁদুরের টিপের মতো। সহজে বোঝা যায় না। মেয়ের জন্মের পর ওনার বাবা বলেছিলেন, “ এ মেয়ে অতীব সুলক্ষনা। পরমা, মারে! সাক্ষাত মা এসেছেন তোদের ঘরে। এর অবহেলা করিস না।”

অবহেলা অবশ্য করেন নি তিনি। তবে হাজার হোক মেয়ের মা তো? একটা অজানা ভয় মাঝে মাঝে গ্রাস করে। তাছাড়া ইদানিং সময়টা ভালো যাচ্ছে না তাদের। এসব ভাবতে ভাবতে দেখলেন মেয়েটা হঠাৎ সোজা হয়ে বসলো। পুরোহিত গিন্নি তাগাদা দিলেন, “ও শ্যামা! তাড়াতাড়ি হাত চালা। রান্না শেষ করে নাইতে যেতে হবে। আজ নীলষষ্ঠী সেটা খেয়াল আছে? নীলপুজো করতে হবে তো আমাকে? তরকারীটা কুঁটে খোসা গুলো ফেলে দিয়ে আয় মা।” শ্যামা সাড়া না দেওয়ায় আরেকবার তাগাদা দিতেই শ্যামা পেছন ফিরে তাকালো। মেয়েকে দেখেই চমকে উঠলেন পুরোহিত গিন্নি পরমেশ্বরী। কপালের জড়ুলটা লাল টকটকে হয়ে উঠেছে। চোখ ঈষত লালচে। ঘনঘন শ্বাস ফেলছে সে। মেয়েটা মাঝে মাঝে এরকম করে ওঠে। যখন কারো কোনো চরম বিপদ আসে মেয়েটা কি করে যেন আগাম টের পায়। এমনকি ভালো খবরও টের পায়। কি করে পায় জানেন না তিনি তবে পায়। তবে কি আবার কারো উপর চরম বিপদ আসতে চলেছে? কার উপর? ভেবে মনে মনে মা তারাকে ডাকতে থাকেন পরমেশ্বরী।

******

রাজু ক্লাবঘর থেকে যখন বেরোলো ততক্ষনে সুর্য পশ্চিমদিকে হেলে পড়েছেন। আজকের রাজুর মন ভীষণ তৃপ্ত। অবশেষে ওরা জিতেছে। রামপুরহাটের জয়যাত্রা একবারের জন্য হলেও আটকে দিয়েছে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্স মারাত্মক হলেও সুযোগ বুঝে দুটো গোল দিয়েছে ওরা। প্রতিপক্ষও সমান গোল করায় চাপে পড়ে গিয়েছিল ঠিকই, পরে এক্সট্রা টাইমে রাইট উইং শান্তনুদার হেড করায় খেলাটা ওদের মুঠোয় চলে আসে। আজকের খেলা দেখতে কলকাতা থেকেও লোক এসেছিল। অসীতদা বললো পরে এক ভদ্রলোক নাকি মোহনবাগানের তরফ থেকে এসেছিলেন। ওর, শান্তনুদার আর রামপুরহাটের গোলকিপার গনেশের খেলা নাকি তাঁর ভালো লেগেছে। গনেশ, রাজুর মনে পড়লো ছিপছিপে গড়নের চাপা রঙের ছেলেটাকেহুম ছেলেটা দারুন খেলে। ওর দুটো শটকে কি অবিশ্বাস্য ভাবে আটকে দিয়েছিল যেন কোনো বাচ্চার ছোড়া খেলনা বল লুফে নিচ্ছে। ও ছেলে তেমন যত্ন পেলে অনেক দুরে যাবে।

ভাবতে ভাবতে তাড়াতাড়ি পা চালায় রাজু। সন্ধ্যে তো হয়ে এলো। বাবা আসার আগে ঘরে না ঢুকলে কপালে দুঃখ আছে তার। ঐ তো পৌছে গেছে প্রায় কিন্তু একি? সন্ধ্যে হতে চলল এখনো বাড়িতে আলো জ্বলেনি কেন? বাড়িতে ঢুকে একটু অবাক হয় রাজু। ব্যাপারখানা কি? দরজা সব হাট করে খোলা। উনুনে ভাতের হাড়ি রাখা। ঘরদোর সব স্বাভাবিক কিন্তু ঘরে কেউ নেই কেন?

ব্যাগটা দাওয়ায় রেখে হাক দেয় রাজু, “মা! ও মা! কোথায় তুমি? দিদি! অ্যাই দিদি? কোথায় গেলি? ” কোনো সাড়া না পেয়ে আরো অবাক হয় সে। কি হলো? সকলে সাড়া দিচ্ছে না কেন? আরেকবার ডাকে রাজু, “মা! দিদি! কোথায় তোমরা?” ব্যাপারখানা সুবিধের ঠেকছে না রাজুর। সে ঘরে গিয়ে সব আলো জ্বালায়। মা না হয় পাশের বাড়িতে গেছে হয়তো কোনো কারনে কিন্তু দিদি তো কোথাও যায় না। তাহলে গেল কোথায় ওরা?

ভাবতে ভাবতে কলপাড়ে হাত পা ধুতে যায় রাজু। এ গাঁয়ে একটা পুকুর আছে বটে তবে তা পুজোআচ্চার কাজে লাগে। তবে মাঝে মধ্যে মেয়েরাও স্নান করে ওখানে। বাবা আসার আগে হাতমুখ ধুঁয়ে পড়তে বসলে বাবা আর টের পাবে না যে ও খেলতে গিয়েছিল।

কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আচমকা কলপাড়ের আগে পা পিছলে আছাড় খেয়ে পড়ে যায় রাজু। বৃষ্টি পড়লে বা জল পড়লে এই জায়গাটা কাদা হয়ে পিছল হয়ে যায়। কত বার ও আর দিদি যে পড়েছে এখানে। নাহ কালকে আবার কয়েকটা টালি ফেলে রাখতে হবে। নাহলে আবার কেউ আছাড় খাবে। এই ভেবে উঠতে গিয়ে একটা অদ্ভুত অনুভুতি হয় রাজুর। কেমন যেন একটা বোঁটকা গন্ধ আসছে না? নাক টেনে গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করে সে।

হ্যাঁ! খুব কাছ থেকেই গন্ধটা আসছে। কিসের যেন গন্ধ এটা। মনে করতে পারে না রাজু। এহ ! সাদা জার্সিটার পুরো পিছনটা কাদায় মাখামাখি হয়ে গেছে। জার্সিটা খুলতে গিয়ে গন্ধটা আরো প্রকটভাবে পায় সে। গন্ধে গা গুলিয়ে আসে তার। তারমানে জার্সিটার থেকে গন্ধ আসছে? কিন্তু কেন? এমনটা তো হবার কথা নয়। মা প্রায় রোজই তার জামাকাপড় ধুয়ে দেয়। কলপাড়ে গিয়ে টিউবওয়েল চালিয়ে ধুতে থাকে।

কিন্তু অবাক হয়ে দেখে জার্সিটার পেছনে কেমন যেন ছোপ ছোপ হয়ে লেগে আছে কাদাটা।কিছুতেই যাচ্ছে না। “আবার কি লাগলো রে বাবা? ” বলে বারান্দায় জ্বালানো আলোয় ছোপটা দেখে চমকে ওঠে সে। এতো রক্ত! বারান্দার আলোয় রাজু দেখে ওর সারা গায়ে রক্তমাখা কাদা লেগে আছে। কিন্তু এত রক্ত এলো কোথা থেকে? তবে কি?

চট করে ঘরে ঢুকে টর্চটা বের করে রাজু। এটা গতবছর বাবা কিনেছিল রামপুরহাটে গিয়ে। চার সেলের টর্চ। পুরো দিনের মতো আলো হয়। টর্চটা জ্বেলে এগোয় কলপাড়ের দিকে। তারপর বিস্ময়ে ভয়ে হতবাক হয়ে যায়। গোটা কলপাড়ের পথ জুড়ে থইথই রক্ত। ঠিক যেমন বলির পর মন্দির চত্বর রক্তে ভেসে যায়। সেই রক্তেরই কিছু ধারা এগিয়ে গেছে কলপাড় পার করে।

চরম বিস্ময়ে আর আতঙ্কে স্থবির হয়ে যায় রাজু। সে ভেবে পায় না এগোবে কিনা। এমন সময় পেছন থেকে অসীতদার ডাক শুনে বুকে বল পায় সে। অসীত তার দলবল নিয়ে এসেছিল মিষ্টি নিয়ে। রাজু যে খেলতে চায় এটা পুরোহিত জেঠুর পছন্দ নয় এটা বিলক্ষন জানে সে। এটাও জানে যে জেঠু চান না যে রাজু ওদের সাথে মিশুক। তাও আজ এসেছে সে কারন প্রথমত এবছর ওদের গ্রাম জিতেছে। দ্বিতীয়ত ছেলেটাকে নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসে সে।

নিজে স্পোর্টস পারসন হওয়াতে বোঝে কি ভীষণ সম্ভাবনা লুকিয়ে ওর মধ্যে। নাহলে মাত্র বারোবছর বয়স ওর। এই বয়সেই ওর স্কিল, বলপায়ে ছোটা, প্রতিপক্ষকে ডজ করা যে কোনো পেশাদার ফুটবলারকে অবাক করে দিতে বাধ্য। না আজ জেঠুর সাথে কথা বলতেই হবে। এভাবে একটা প্রতিভাকে নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। আরেকটা কারন অবশ্য… মুচকি হাসে অসীত।কিন্তু আজ বাড়িটা ফাঁকা লাগছে কেন? সবাই কোথায় গেল? সে আবার ডাকে, “রাজু! জেঠিমা! বাড়িতে কেউ নেই? ”

কলপাড় থেকে রাজুর সাড়া পায় অসীত । কিন্তু গলাটা কেমন যেন লাগলো না? অসীতের মন বলে কোথাও তো গন্ডগোল আছে। সে মিষ্টির হাড়িটা দাওয়ায় রাজুর ব্যাগের পাশে রেখে , বাকিদের দাঁড়াতে বলে এগিয়ে যায় কলপাড়ের দিকে। দেখে রাজু টর্চ হাতে সেখানে দাঁড়িয়ে। কিছুদুর গিয়ে থমকে দাঁড়ায় অসীত। তারপর ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝে চমকে ওঠে। কালরাতে অবশ্য বাবা বলেছিলেন । তবে কি? না না এসব কি ভাবছে সে। এযে একেবারে অসম্ভব! তাছাড়া গোটা গ্রাম তো আর খেলা দেখতে যায় নি। কয়েকজন নির্ঘাত ছিল বাড়িতে। তাদের থাকতে…।

এগিয়ে গিয়ে রাজুর হাত থেকে টর্চটা নেয় অসীত। তারপর রাজুর গায়ে আলো ফেলে দেখে রাজুর গোটা শরীরে রক্তমাখা। রাজুকে নিয়ে এনে ঘরের দাওয়ায় বসায় সে। সকলে রাজুকে ঐ অবস্থায় দেখে চমকে উঠে ফিসফাস শুরু করে দেয়। অসীত সকলকে থামিয়ে বলে, “কি ব্যাপার রে? এসব কি? জেঠুরা কোথায়? তোর এই অবস্থা কেন? ” রাজু অবাক গলায় হয়ে সবটা বলে। অসীত ওইটুকু কথার মধ্যে যা বোঝার বুঝে নেয়। তারমানে সর্বনাশটা হয়ে গেছে। চোয়াল শক্ত হয় তার। না মাথা গরম করলে চলবে না। মাথা ঠান্ডা করে এগোতে হবে। ওদের যদি একবার হাতের নাগালে পাওয়া যায়…! নিজেকে সামলে বলে অসীত, “তোর ঘরে কাটারি বা কাস্তের মতো আছে কিছু? ” রাজু বিহ্বল গলায় বলে তা নেই তবে কাঠ কাটার জন্য কুড়াল আছে। অসীত সেটাই আনতে বলে রাজুকে। রাজু কোনোমতে ওর বাবার ঘরে ঢুকে বের করে আনে কুড়ালটা। অসীত কুড়ালটা হাতে নিয়ে ধার পরীক্ষা করে। ধার ঠিক আছে দেখে খুশি হয়।

“অসীতদা! ” অসীত তাকায় রাজুর দিকে। রাজু ধরা গলায় বলে, “বাবা-মা, দিদি কি মরে গেছে? ” অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায় অসীত। এই নির্মম সত্যিটা এখনই বলা ঠিক হবে না। হাল্কা গম্ভীর গলায় বলে, “সেটাই দেখতে যাচ্ছি। এককাজ কর তুই এখানে বসে থাক ।” বলে বাকি ছেলেগুলোর দিকে তাকায় অসীত কয়েকজনকে রাজুর সাথে থাকতে বলে ডাকাবুকো কয়েকজনকে নিয়ে সেই রক্তের ধারা অনুসরন করে এগিয়ে যায়।

******

রক্তের ধারাটা শেষ হয়েছে পুরোহিতমশাই এর বাড়ি থেকে কিছুটা দুরে একটা বনে। এই বনেরই মাঝে একটা মন্দির আছে। সেই মন্দিরে অধিষ্ঠিত কালভৈরব। এই অঁজপাড়া গাঁয়ে কি করে এনার মন্দির তৈরী হলো তা কেউ জানে না তবে পারতপক্ষে সাধারনত দিনের বেলাতেও এই স্থান এড়িয়ে চলে গ্রামবাসীরা । এমনকি অসীতরাও।
কিন্তু আজ এসপার ইয়া ওসপার না করলেই নয়। মাথায় খুন চেপে গেছে অসীতের। যে আশঙ্কা করছে সে সেটা যদি সত্যি হয় আর ওদের একজনও যদি সেখানে থাকে। তাহলে আজ কালভৈরবের কাছেই তাকে বলি দেবে সে। মন্দিরের দিকে এগিয়ে যেতেই সে থমকে দাঁড়ায়। হুম মন্দির চত্ত্বর পরিচ্ছন্ন তারমানে ওরা এখানেই আছে। মন্দিরের দরজা বন্ধ।

একটু এগোতেই হাঁড়িকাঠে নজর পড়ে তার। মাটিটা রাজুদের মতোই রক্তে ভেজা। তারমানে…! চরম আক্রোশে অসীত এক দৌড়ে মন্দিরের চাঁতালে উঠে দাঁড়ায়। তারপর একটা ধাক্কা দেয় দরজায়। দরজাটা ভেজানো ছিলো। দরজাটা খুলতেই চরম আতঙ্কে, ক্রোধে, বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায় অসীত।

মন্দিরের ভেতরে প্রদীপ, ধূপ জ্বলছে যেন একটু আগে এখানে পুজো হচ্ছিল। মন্দিরে গর্ভগৃহে কালভৈরবের দিগম্বর মুর্তি। উচ্চতা দশফুট। প্রচন্ড ক্রোধ আর জিঘাংসায় ভরা সেই মুর্তির মুখ। অসীত কলেজে ইতিহাস নিয়ে পড়ে। সে জানে এই কালভৈরবের মুর্তি আদপেও শিবাবতারের নয়। এই কালভৈরব মুর্তি আসলে তিব্বতী দেবতা বুদ্ধকপালের। বৈশিষ্ট্য গুলো দেখে অসীতের তাই মনে হয়। তবে এখন অসীতের চোখ মুর্তির অপরূপ শোভায় নেই।

তার চোখ আটকে মুর্তিটার গায়ের দিকে। ও লাইব্রেরীতে পড়েছে বুদ্ধকপালের সাথে দেবী চিত্রসেনা থাকেন। তবে এই মুর্তিতে এতদিন কোনো নারীমুর্তি ছিলনা। আজ আছে। রক্তমাংসে গড়া নগ্ন নারীমুর্তি। মুর্তিটাকে মৈথুন মুদ্রায় জড়িয়ে। তবে তাতে প্রাণ নেই। কবন্ধ দেহটা থেকে রক্ত বেড়িয়ে সম্পুর্ণ হাল্কা শরীর রক্তাভ। মুর্তিটাকে দেখে অসীতের মনে হয় যেন সে ভীষণ তৃপ্ত। অসীত মুর্তিটাকে ছেড়ে পুজোর নৈবদ্যে আলো ফেলে।

সেখানে একটা কাঁসার বড়ো থালায় পদ্ম আর জবাফুলের মধ্যে ত্রিভুজাকারে রাখা তিনটে জিনিস। তিনটে সদ্যকর্তিত মাথা। পুরোহিত জেঠু, জেঠীমা আর শ্যামার মাথা। শ্যামার চোখ তখনও খোলা। যেন ভীষণ ক্রুদ্ধ সে।

পূর্বাভাস:২

৩০শে অক্টোবর, ২০১৬, রবিবার, রাত আড়াইটে, রামপুরহাট, বীরভূম

রাত তখন দেড়টা। থানায় জিডি অফিসার হিসেবে বসেছিলেন রমেশ স্যান্যাল। আজ দীপান্বিতা কালিপুজো। থানার মন্দিরে পুজো হচ্ছে। বাতাসে ধুপ-ধুনো আর আতশবাজীর গন্ধ। যাদের ডিউটি আছে তারা বাদে গোটা থানা পুজোয় অংশগ্রহণ করেছে। তিনিও করতে পারতেন কিন্তু কাজ ফেলে রাখা একদম পছন্দ নয় তাঁর। এজন্য পুলিশ জীবনে কম ঝক্কি পোহাতে হয় নি বরং প্রশংসাই পেয়েছেন উপরমহল থেকে। তবে ইদানিং একটা ক্লান্তি এসে গেছে এই কাজে। সেই উত্তেজনা, সেই থ্রিল আর নেই। ক্রিমিনালগুলোও সব চুনোপুঁটি। ধরতে বেশীক্ষন লাগে না। অনেকদিন হলো তেমন জম্পেশ কেস পাননা। কলেজবেলায়, পরে চাকরি করা সময়তেও ব্যোমকেশ, ফেলুদা, শার্লক গুলে খেয়েছেন। তদন্ত করেছেন গা ছমছমে সব কেস আর এখন?

মাঝেমাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন পুরোনো কেসগুলোর কথা ভেবে। আহা কি সব দিন ছিল সেই সময়। এক একটা কেস জাস্ট রোমহর্ষক। পেপারে কেসগুলো পড়তেন আর বসে বসে ভাবতেন সেই কেসগুলো নিয়ে। স্টোনম্যান নিয়ে তো একটা থিওরি পর্যন্ত খাড়া করেছিলেন। কিন্তু তা উর্ধ্বতন মহলে বলার আগেই থেমে গেল সব। আহা কতদিন এরকম কেস পাননি, দেখেন নি যা তার মগজকে খোরাক দেবে। রাতের ঘুম কেড়ে নেবে। এখন ওসব অলীক মনে হয়। মনে মনে মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন রমেশবাবু রিটায়ার হবার আগে যাতে একটা অন্তত এমন কেস পান। যেটা হবে সবথেকে ইউনিক। মা শোনেন আর হাসেন। তবে সম্মতিপ্রদান করেন কিনা জানা যায় না।

একমনে বসে কাজ করছিলেন এমন সময় টেবিলে রাখা টেলিফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা রিসিভ করলেন রমেশবাবু।

“হ্যালো রামপুরহাট পুলিশ স্টেশন থেকে বলছি।”

“স্যার আমি হেড কনস্টেবল তাপস কর্মকার বলছি।”

“বলো।”

“স্যার তারাপীঠ যাবার পথের ধারে আমরা একটা গাড়ি পেয়েছি। মনে হয় তীর্থযাত্রীর গাড়ি ছিল। গাড়িটা উল্টে পড়ে আছে। গাড়িতে কেউ নেই। ”

“স্ট্রেঞ্জ! কেউ নেই? মানে বডি ফডি কিছু না? ”

“না স্যার বডি আছে তবে…।”

একটু ইতস্তত লাগে তাপসের গলাটা। একটু অবাক হন রমেশবাবু। বলেন, “তবে কি তাপস? ”

তাপস একটু ইতস্তত করে বলে, “আপনি বীরেন স্যারের সাথে কথা বলুন।”

ফোনের ওপারে একটা ভরাট গলা শুনতে পান রমেশ বাবু। বীরেন খাসনবিস বলেন, “হ্যালো কে রমেশবাবু? শুনুন এখানে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। ভীষন পিকিউলার ভাবে প্রত্যেকে স্পট ডেড বাট…। আপনি এক কাজ করুন। হাসপাতাল থেকে একটা অ্যাম্বুলেন্স আর চারজন মর্গের ডোম পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। লোকেশনটা নোট করুন”

লোকেশনটা একটা কাগজে টুকে কেজো গলায় রমেশবাবু বলেন, “ওকে ওয়েট করুন অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে।” বলে ফোনটা রাখতে যাচ্ছিলেন এমন সময় বীরেনবাবু বললেন, “ও হ্যা রমেশবাবু শুনুন। আসার সময় সাথে দুটো বড়ো বস্তা আনতে বলবেন।”

প্রথমে কথাটা বুঝতে পারেন নি রমেশবাবু। আরেকবার শুনে বললেন, “বস্তা? কেন মশাই বস্তা কেন লাগবে? ” উত্তরে যেটা শুনলেন শরীরটা নিজে থেকে টানটান হয়ে গেল তার। অবশেষে মা শুনেছেন! এমন একটা কেস পাঠিয়েছেন যার মাথামুন্ড বোঝা যাচ্ছে না। চরম উত্তেজনায় রমেশবাবু বলে উঠলেন, “হোয়াট? ”

ওপারে বীরেনবাবুও উত্তেজিত গলায় বললেন, “তবে আর বলছি কি মশাই? ডেডবডিগুলোর একটাও আস্ত নয় । ভীষন হরিবল কন্ডিশন। একটা বাদে সবকটার মাথা আছে বাট বডি উধাও। আর যেটা আস্ত সেটারও অবস্থা আরো ভয়ংকর যেন জীবন্ত অবস্থায় পোষ্টমর্টেম করেছে। বডিটা একটা মাটির বেদীতে বসানো। একহাতে হৃদপিন্ড ধরা। নাড়িভুড়ি আর মাথাগুলো দিয়ে মুন্ডমালা বানিয়ে পড়ানো। আর কপালে কি একটা যেন খোদাই করে লেখা। রক্তে ভেজা বলে বোঝা যাচ্ছে না।

(চলবে…)

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...