পূর্বাভাস:১
৯ এপ্রিল ১৯৯৬, মঙ্গলবার‚ মাল্লারপুর, বীরভূম
স্কুল থেকে ফিরে হাতমুখ ধুয়েই কিছু একটা নাকেমুখে গুঁজেই কিটব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে গেল রাজু । আজকে বীরভূম ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল বলে কথা। ওদের গ্রামের পঞ্চানন ব্যায়ামাগার বনাম রামপুরহাট স্পোর্টিং ক্লাবের খেলা আজকে। খেলা হবে ওদেরই গ্রামের মাঠটায়। আজকের ম্যাচে না জিতলে ওদের গ্রামের আর মান থাকবে না। পর পর পাঁচ বছর রামপুরহাট স্পোর্টিং ক্লাব জিতে আসছে এই ট্রফি। আর ওরা প্রতিবার কোয়ার্টার ফাইনালে ফিরে আসে। এবছর মা তারার কাছে প্রার্থনা করেছিল রাজু অন্তত এইবার যাতে হেরোভুত না হতে হয়।
মা তারা শুনেছেন। এতগুলো দিনের হাড়ভাঙা অনুশীলন বৃথা যায় নি। ওদের গ্রাম অবশেষে ফাইনালে উঠেছে। বিপক্ষে আবার সেই রামপুরহাট। টিমের ক্যাপ্টেন অসীতদা বলেই দিয়েছে ইয়া তো ইসপার নাহয় ওসপার। মিডফিল্ডার বলে রাজুকে বলেছে, “ বল পায়ে এলে হরিনের মতো দৌড়বি। কোথাও তাকাবি না। যতক্ষন না পর্যন্ত আটকে পড়ছিস থামবি না। অন্তত দুটো গোল চাই।”
তা অবশ্য বলতে হবে না অসীতদাকে। একবার বল তার পায়ের নাগালে এলে চুম্বকের মতো টেনে নেয় সে। তারপর ওর নাগাল আর পায় কে? যতই কঠিন ডিফেন্স বা কড়া প্রতিপক্ষ হোক না কেন গোল না দিয়ে থামে না সে। অসীতদার কথায় গত একমাস পায়ের জোর বাড়াতে নদীপাড়ের নরম পাঁকে, ভেজাবালিতে পিঠে ইট বেঁধে দৌড়েছে। দম বাড়াতে নদী এপার ওপার সাঁতরেছে। যোগব্যায়াম করেছে।
যেতে যেতে রাজু হঠাৎ মনে পড়ে, এই রে কিটব্যাগে সব নিলেও জুতোটাই নিতে ভুলে গেছে। ওদের দলের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী হওয়ায় পায়ের মাপটাও ওরই একটু ছোটো। এখনও খেলা শুরু হতে দেরী আছে এই ভেবে বাড়ির দিকে ফিরলো সে। বাবার ফেরার সময় এখনও হয় নি। বাবা কি একটা কাজে যেন রামপুরহাটে গেছেন। এই যে সে ফুটবল খেলে বেড়ায় এটা ওর বাবার পছন্দ নয়। গ্রামের কালীমন্দিরের পুজারি এবং প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক ওর বাবা সর্বেশ্বর চক্রবর্তী বিশ্বাসী সাধারন জীবনযাপনে। কোনো অলৌকিক চমৎকারে তিনি বিশ্বাস করেন না। দুবেলা দুমুঠো অন্ন আর দিনান্তে মায়ের পুজো এই দুটোতেই শান্তি তাঁর। আর কিছুই চান না তিনি।
তাঁর যাবতীয় স্বপ্ন রাজু আর তার দিদি শ্যামাকে নিয়ে। শ্যামার একটা পাল্টি ঘরে বিয়ে হোক আর রাজু পড়াশুনো শেষ করে মানুষ হোক এইটুকুই চান তিনি। বাবার জন্যই আজ স্কুলে যেতে হলো তাকে। নাহলে আজকের দিনে কে যায়? রাজু বাড়ি ফিরে আসে ওর মা ওকে দেখে অবাক হন। দিদি তরকারী কাটতে কাটতে বলে, “কিরে ফিরে এলি যে? ” রাজু ঘরে ঢুকে জুতোটা দেখায় তারপর ব্যাগে ঢুকিয়ে বেরিয়ে যায়।
ছেলের এই খেলাপাগল মনোভাবে সর্বেশ্বর বাবুর মত না থাকলেও পুরোহিত গিন্নি এটা নীরবে সমর্থন করেন। বিশেষ করে যখন পাড়ার ঝি-বউদের কাছে শোনেন যে তাদের বাড়ির পুরুষেরা তার রাজুর খেলার সুখ্যাতি করছে গর্বে বুকটা ভরে যায়। তিনি চান তাঁর ছেলেটা বড়ো হোক মানুষ হোক। সেদিন কালীপুজোর নিমন্ত্রণের সময় গ্রামের মোড়লের ছেলে অসীত বলেছিল, “রাজুটার খেলার স্কিল দারুন বেড়েছে জেঠিমা। দেখবেন ও একদিন আমাদের গাঁয়ের নাম ঠিক উজ্জ্বল করবে। ”
মনে মনে মা তারার কাছে প্রার্থনা করেন পুরোহিত গিন্নী, তাই যেন হয় । তবে এখন একটাই চিন্তা। মেয়েটার একটা গতি হয়ে গেলেই হলো। সামনের বৈশাখে কুড়িতে পা দেবে। একদম বাপের মতো গায়ের রং পেয়েছে মেয়েটা। দুধে আলতা গায়ের রং। ডাগর চোখ, পানপাতা মুখ। ঠিক যেন মা লক্ষ্মী। তবে কপালে একটা মুসুরির ডালের মতো জড়ুল আছে। ঠিক যেন সিঁদুরের টিপের মতো। সহজে বোঝা যায় না। মেয়ের জন্মের পর ওনার বাবা বলেছিলেন, “ এ মেয়ে অতীব সুলক্ষনা। পরমা, মারে! সাক্ষাত মা এসেছেন তোদের ঘরে। এর অবহেলা করিস না।”
অবহেলা অবশ্য করেন নি তিনি। তবে হাজার হোক মেয়ের মা তো? একটা অজানা ভয় মাঝে মাঝে গ্রাস করে। তাছাড়া ইদানিং সময়টা ভালো যাচ্ছে না তাদের। এসব ভাবতে ভাবতে দেখলেন মেয়েটা হঠাৎ সোজা হয়ে বসলো। পুরোহিত গিন্নি তাগাদা দিলেন, “ও শ্যামা! তাড়াতাড়ি হাত চালা। রান্না শেষ করে নাইতে যেতে হবে। আজ নীলষষ্ঠী সেটা খেয়াল আছে? নীলপুজো করতে হবে তো আমাকে? তরকারীটা কুঁটে খোসা গুলো ফেলে দিয়ে আয় মা।” শ্যামা সাড়া না দেওয়ায় আরেকবার তাগাদা দিতেই শ্যামা পেছন ফিরে তাকালো। মেয়েকে দেখেই চমকে উঠলেন পুরোহিত গিন্নি পরমেশ্বরী। কপালের জড়ুলটা লাল টকটকে হয়ে উঠেছে। চোখ ঈষত লালচে। ঘনঘন শ্বাস ফেলছে সে। মেয়েটা মাঝে মাঝে এরকম করে ওঠে। যখন কারো কোনো চরম বিপদ আসে মেয়েটা কি করে যেন আগাম টের পায়। এমনকি ভালো খবরও টের পায়। কি করে পায় জানেন না তিনি তবে পায়। তবে কি আবার কারো উপর চরম বিপদ আসতে চলেছে? কার উপর? ভেবে মনে মনে মা তারাকে ডাকতে থাকেন পরমেশ্বরী।
******
রাজু ক্লাবঘর থেকে যখন বেরোলো ততক্ষনে সুর্য পশ্চিমদিকে হেলে পড়েছেন। আজকের রাজুর মন ভীষণ তৃপ্ত। অবশেষে ওরা জিতেছে। রামপুরহাটের জয়যাত্রা একবারের জন্য হলেও আটকে দিয়েছে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্স মারাত্মক হলেও সুযোগ বুঝে দুটো গোল দিয়েছে ওরা। প্রতিপক্ষও সমান গোল করায় চাপে পড়ে গিয়েছিল ঠিকই, পরে এক্সট্রা টাইমে রাইট উইং শান্তনুদার হেড করায় খেলাটা ওদের মুঠোয় চলে আসে। আজকের খেলা দেখতে কলকাতা থেকেও লোক এসেছিল। অসীতদা বললো পরে এক ভদ্রলোক নাকি মোহনবাগানের তরফ থেকে এসেছিলেন। ওর, শান্তনুদার আর রামপুরহাটের গোলকিপার গনেশের খেলা নাকি তাঁর ভালো লেগেছে। গনেশ, রাজুর মনে পড়লো ছিপছিপে গড়নের চাপা রঙের ছেলেটাকেহুম ছেলেটা দারুন খেলে। ওর দুটো শটকে কি অবিশ্বাস্য ভাবে আটকে দিয়েছিল যেন কোনো বাচ্চার ছোড়া খেলনা বল লুফে নিচ্ছে। ও ছেলে তেমন যত্ন পেলে অনেক দুরে যাবে।
ভাবতে ভাবতে তাড়াতাড়ি পা চালায় রাজু। সন্ধ্যে তো হয়ে এলো। বাবা আসার আগে ঘরে না ঢুকলে কপালে দুঃখ আছে তার। ঐ তো পৌছে গেছে প্রায় কিন্তু একি? সন্ধ্যে হতে চলল এখনো বাড়িতে আলো জ্বলেনি কেন? বাড়িতে ঢুকে একটু অবাক হয় রাজু। ব্যাপারখানা কি? দরজা সব হাট করে খোলা। উনুনে ভাতের হাড়ি রাখা। ঘরদোর সব স্বাভাবিক কিন্তু ঘরে কেউ নেই কেন?
ব্যাগটা দাওয়ায় রেখে হাক দেয় রাজু, “মা! ও মা! কোথায় তুমি? দিদি! অ্যাই দিদি? কোথায় গেলি? ” কোনো সাড়া না পেয়ে আরো অবাক হয় সে। কি হলো? সকলে সাড়া দিচ্ছে না কেন? আরেকবার ডাকে রাজু, “মা! দিদি! কোথায় তোমরা?” ব্যাপারখানা সুবিধের ঠেকছে না রাজুর। সে ঘরে গিয়ে সব আলো জ্বালায়। মা না হয় পাশের বাড়িতে গেছে হয়তো কোনো কারনে কিন্তু দিদি তো কোথাও যায় না। তাহলে গেল কোথায় ওরা?
ভাবতে ভাবতে কলপাড়ে হাত পা ধুতে যায় রাজু। এ গাঁয়ে একটা পুকুর আছে বটে তবে তা পুজোআচ্চার কাজে লাগে। তবে মাঝে মধ্যে মেয়েরাও স্নান করে ওখানে। বাবা আসার আগে হাতমুখ ধুঁয়ে পড়তে বসলে বাবা আর টের পাবে না যে ও খেলতে গিয়েছিল।
কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আচমকা কলপাড়ের আগে পা পিছলে আছাড় খেয়ে পড়ে যায় রাজু। বৃষ্টি পড়লে বা জল পড়লে এই জায়গাটা কাদা হয়ে পিছল হয়ে যায়। কত বার ও আর দিদি যে পড়েছে এখানে। নাহ কালকে আবার কয়েকটা টালি ফেলে রাখতে হবে। নাহলে আবার কেউ আছাড় খাবে। এই ভেবে উঠতে গিয়ে একটা অদ্ভুত অনুভুতি হয় রাজুর। কেমন যেন একটা বোঁটকা গন্ধ আসছে না? নাক টেনে গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করে সে।
হ্যাঁ! খুব কাছ থেকেই গন্ধটা আসছে। কিসের যেন গন্ধ এটা। মনে করতে পারে না রাজু। এহ ! সাদা জার্সিটার পুরো পিছনটা কাদায় মাখামাখি হয়ে গেছে। জার্সিটা খুলতে গিয়ে গন্ধটা আরো প্রকটভাবে পায় সে। গন্ধে গা গুলিয়ে আসে তার। তারমানে জার্সিটার থেকে গন্ধ আসছে? কিন্তু কেন? এমনটা তো হবার কথা নয়। মা প্রায় রোজই তার জামাকাপড় ধুয়ে দেয়। কলপাড়ে গিয়ে টিউবওয়েল চালিয়ে ধুতে থাকে।
কিন্তু অবাক হয়ে দেখে জার্সিটার পেছনে কেমন যেন ছোপ ছোপ হয়ে লেগে আছে কাদাটা।কিছুতেই যাচ্ছে না। “আবার কি লাগলো রে বাবা? ” বলে বারান্দায় জ্বালানো আলোয় ছোপটা দেখে চমকে ওঠে সে। এতো রক্ত! বারান্দার আলোয় রাজু দেখে ওর সারা গায়ে রক্তমাখা কাদা লেগে আছে। কিন্তু এত রক্ত এলো কোথা থেকে? তবে কি?
চট করে ঘরে ঢুকে টর্চটা বের করে রাজু। এটা গতবছর বাবা কিনেছিল রামপুরহাটে গিয়ে। চার সেলের টর্চ। পুরো দিনের মতো আলো হয়। টর্চটা জ্বেলে এগোয় কলপাড়ের দিকে। তারপর বিস্ময়ে ভয়ে হতবাক হয়ে যায়। গোটা কলপাড়ের পথ জুড়ে থইথই রক্ত। ঠিক যেমন বলির পর মন্দির চত্বর রক্তে ভেসে যায়। সেই রক্তেরই কিছু ধারা এগিয়ে গেছে কলপাড় পার করে।
চরম বিস্ময়ে আর আতঙ্কে স্থবির হয়ে যায় রাজু। সে ভেবে পায় না এগোবে কিনা। এমন সময় পেছন থেকে অসীতদার ডাক শুনে বুকে বল পায় সে। অসীত তার দলবল নিয়ে এসেছিল মিষ্টি নিয়ে। রাজু যে খেলতে চায় এটা পুরোহিত জেঠুর পছন্দ নয় এটা বিলক্ষন জানে সে। এটাও জানে যে জেঠু চান না যে রাজু ওদের সাথে মিশুক। তাও আজ এসেছে সে কারন প্রথমত এবছর ওদের গ্রাম জিতেছে। দ্বিতীয়ত ছেলেটাকে নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসে সে।
নিজে স্পোর্টস পারসন হওয়াতে বোঝে কি ভীষণ সম্ভাবনা লুকিয়ে ওর মধ্যে। নাহলে মাত্র বারোবছর বয়স ওর। এই বয়সেই ওর স্কিল, বলপায়ে ছোটা, প্রতিপক্ষকে ডজ করা যে কোনো পেশাদার ফুটবলারকে অবাক করে দিতে বাধ্য। না আজ জেঠুর সাথে কথা বলতেই হবে। এভাবে একটা প্রতিভাকে নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। আরেকটা কারন অবশ্য… মুচকি হাসে অসীত।কিন্তু আজ বাড়িটা ফাঁকা লাগছে কেন? সবাই কোথায় গেল? সে আবার ডাকে, “রাজু! জেঠিমা! বাড়িতে কেউ নেই? ”
কলপাড় থেকে রাজুর সাড়া পায় অসীত । কিন্তু গলাটা কেমন যেন লাগলো না? অসীতের মন বলে কোথাও তো গন্ডগোল আছে। সে মিষ্টির হাড়িটা দাওয়ায় রাজুর ব্যাগের পাশে রেখে , বাকিদের দাঁড়াতে বলে এগিয়ে যায় কলপাড়ের দিকে। দেখে রাজু টর্চ হাতে সেখানে দাঁড়িয়ে। কিছুদুর গিয়ে থমকে দাঁড়ায় অসীত। তারপর ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝে চমকে ওঠে। কালরাতে অবশ্য বাবা বলেছিলেন । তবে কি? না না এসব কি ভাবছে সে। এযে একেবারে অসম্ভব! তাছাড়া গোটা গ্রাম তো আর খেলা দেখতে যায় নি। কয়েকজন নির্ঘাত ছিল বাড়িতে। তাদের থাকতে…।
এগিয়ে গিয়ে রাজুর হাত থেকে টর্চটা নেয় অসীত। তারপর রাজুর গায়ে আলো ফেলে দেখে রাজুর গোটা শরীরে রক্তমাখা। রাজুকে নিয়ে এনে ঘরের দাওয়ায় বসায় সে। সকলে রাজুকে ঐ অবস্থায় দেখে চমকে উঠে ফিসফাস শুরু করে দেয়। অসীত সকলকে থামিয়ে বলে, “কি ব্যাপার রে? এসব কি? জেঠুরা কোথায়? তোর এই অবস্থা কেন? ” রাজু অবাক গলায় হয়ে সবটা বলে। অসীত ওইটুকু কথার মধ্যে যা বোঝার বুঝে নেয়। তারমানে সর্বনাশটা হয়ে গেছে। চোয়াল শক্ত হয় তার। না মাথা গরম করলে চলবে না। মাথা ঠান্ডা করে এগোতে হবে। ওদের যদি একবার হাতের নাগালে পাওয়া যায়…! নিজেকে সামলে বলে অসীত, “তোর ঘরে কাটারি বা কাস্তের মতো আছে কিছু? ” রাজু বিহ্বল গলায় বলে তা নেই তবে কাঠ কাটার জন্য কুড়াল আছে। অসীত সেটাই আনতে বলে রাজুকে। রাজু কোনোমতে ওর বাবার ঘরে ঢুকে বের করে আনে কুড়ালটা। অসীত কুড়ালটা হাতে নিয়ে ধার পরীক্ষা করে। ধার ঠিক আছে দেখে খুশি হয়।
“অসীতদা! ” অসীত তাকায় রাজুর দিকে। রাজু ধরা গলায় বলে, “বাবা-মা, দিদি কি মরে গেছে? ” অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায় অসীত। এই নির্মম সত্যিটা এখনই বলা ঠিক হবে না। হাল্কা গম্ভীর গলায় বলে, “সেটাই দেখতে যাচ্ছি। এককাজ কর তুই এখানে বসে থাক ।” বলে বাকি ছেলেগুলোর দিকে তাকায় অসীত কয়েকজনকে রাজুর সাথে থাকতে বলে ডাকাবুকো কয়েকজনকে নিয়ে সেই রক্তের ধারা অনুসরন করে এগিয়ে যায়।
******
রক্তের ধারাটা শেষ হয়েছে পুরোহিতমশাই এর বাড়ি থেকে কিছুটা দুরে একটা বনে। এই বনেরই মাঝে একটা মন্দির আছে। সেই মন্দিরে অধিষ্ঠিত কালভৈরব। এই অঁজপাড়া গাঁয়ে কি করে এনার মন্দির তৈরী হলো তা কেউ জানে না তবে পারতপক্ষে সাধারনত দিনের বেলাতেও এই স্থান এড়িয়ে চলে গ্রামবাসীরা । এমনকি অসীতরাও।
কিন্তু আজ এসপার ইয়া ওসপার না করলেই নয়। মাথায় খুন চেপে গেছে অসীতের। যে আশঙ্কা করছে সে সেটা যদি সত্যি হয় আর ওদের একজনও যদি সেখানে থাকে। তাহলে আজ কালভৈরবের কাছেই তাকে বলি দেবে সে। মন্দিরের দিকে এগিয়ে যেতেই সে থমকে দাঁড়ায়। হুম মন্দির চত্ত্বর পরিচ্ছন্ন তারমানে ওরা এখানেই আছে। মন্দিরের দরজা বন্ধ।
একটু এগোতেই হাঁড়িকাঠে নজর পড়ে তার। মাটিটা রাজুদের মতোই রক্তে ভেজা। তারমানে…! চরম আক্রোশে অসীত এক দৌড়ে মন্দিরের চাঁতালে উঠে দাঁড়ায়। তারপর একটা ধাক্কা দেয় দরজায়। দরজাটা ভেজানো ছিলো। দরজাটা খুলতেই চরম আতঙ্কে, ক্রোধে, বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায় অসীত।
মন্দিরের ভেতরে প্রদীপ, ধূপ জ্বলছে যেন একটু আগে এখানে পুজো হচ্ছিল। মন্দিরে গর্ভগৃহে কালভৈরবের দিগম্বর মুর্তি। উচ্চতা দশফুট। প্রচন্ড ক্রোধ আর জিঘাংসায় ভরা সেই মুর্তির মুখ। অসীত কলেজে ইতিহাস নিয়ে পড়ে। সে জানে এই কালভৈরবের মুর্তি আদপেও শিবাবতারের নয়। এই কালভৈরব মুর্তি আসলে তিব্বতী দেবতা বুদ্ধকপালের। বৈশিষ্ট্য গুলো দেখে অসীতের তাই মনে হয়। তবে এখন অসীতের চোখ মুর্তির অপরূপ শোভায় নেই।
তার চোখ আটকে মুর্তিটার গায়ের দিকে। ও লাইব্রেরীতে পড়েছে বুদ্ধকপালের সাথে দেবী চিত্রসেনা থাকেন। তবে এই মুর্তিতে এতদিন কোনো নারীমুর্তি ছিলনা। আজ আছে। রক্তমাংসে গড়া নগ্ন নারীমুর্তি। মুর্তিটাকে মৈথুন মুদ্রায় জড়িয়ে। তবে তাতে প্রাণ নেই। কবন্ধ দেহটা থেকে রক্ত বেড়িয়ে সম্পুর্ণ হাল্কা শরীর রক্তাভ। মুর্তিটাকে দেখে অসীতের মনে হয় যেন সে ভীষণ তৃপ্ত। অসীত মুর্তিটাকে ছেড়ে পুজোর নৈবদ্যে আলো ফেলে।
সেখানে একটা কাঁসার বড়ো থালায় পদ্ম আর জবাফুলের মধ্যে ত্রিভুজাকারে রাখা তিনটে জিনিস। তিনটে সদ্যকর্তিত মাথা। পুরোহিত জেঠু, জেঠীমা আর শ্যামার মাথা। শ্যামার চোখ তখনও খোলা। যেন ভীষণ ক্রুদ্ধ সে।
পূর্বাভাস:২
৩০শে অক্টোবর, ২০১৬, রবিবার, রাত আড়াইটে, রামপুরহাট, বীরভূম
রাত তখন দেড়টা। থানায় জিডি অফিসার হিসেবে বসেছিলেন রমেশ স্যান্যাল। আজ দীপান্বিতা কালিপুজো। থানার মন্দিরে পুজো হচ্ছে। বাতাসে ধুপ-ধুনো আর আতশবাজীর গন্ধ। যাদের ডিউটি আছে তারা বাদে গোটা থানা পুজোয় অংশগ্রহণ করেছে। তিনিও করতে পারতেন কিন্তু কাজ ফেলে রাখা একদম পছন্দ নয় তাঁর। এজন্য পুলিশ জীবনে কম ঝক্কি পোহাতে হয় নি বরং প্রশংসাই পেয়েছেন উপরমহল থেকে। তবে ইদানিং একটা ক্লান্তি এসে গেছে এই কাজে। সেই উত্তেজনা, সেই থ্রিল আর নেই। ক্রিমিনালগুলোও সব চুনোপুঁটি। ধরতে বেশীক্ষন লাগে না। অনেকদিন হলো তেমন জম্পেশ কেস পাননা। কলেজবেলায়, পরে চাকরি করা সময়তেও ব্যোমকেশ, ফেলুদা, শার্লক গুলে খেয়েছেন। তদন্ত করেছেন গা ছমছমে সব কেস আর এখন?
মাঝেমাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন পুরোনো কেসগুলোর কথা ভেবে। আহা কি সব দিন ছিল সেই সময়। এক একটা কেস জাস্ট রোমহর্ষক। পেপারে কেসগুলো পড়তেন আর বসে বসে ভাবতেন সেই কেসগুলো নিয়ে। স্টোনম্যান নিয়ে তো একটা থিওরি পর্যন্ত খাড়া করেছিলেন। কিন্তু তা উর্ধ্বতন মহলে বলার আগেই থেমে গেল সব। আহা কতদিন এরকম কেস পাননি, দেখেন নি যা তার মগজকে খোরাক দেবে। রাতের ঘুম কেড়ে নেবে। এখন ওসব অলীক মনে হয়। মনে মনে মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন রমেশবাবু রিটায়ার হবার আগে যাতে একটা অন্তত এমন কেস পান। যেটা হবে সবথেকে ইউনিক। মা শোনেন আর হাসেন। তবে সম্মতিপ্রদান করেন কিনা জানা যায় না।
একমনে বসে কাজ করছিলেন এমন সময় টেবিলে রাখা টেলিফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা রিসিভ করলেন রমেশবাবু।
“হ্যালো রামপুরহাট পুলিশ স্টেশন থেকে বলছি।”
“স্যার আমি হেড কনস্টেবল তাপস কর্মকার বলছি।”
“বলো।”
“স্যার তারাপীঠ যাবার পথের ধারে আমরা একটা গাড়ি পেয়েছি। মনে হয় তীর্থযাত্রীর গাড়ি ছিল। গাড়িটা উল্টে পড়ে আছে। গাড়িতে কেউ নেই। ”
“স্ট্রেঞ্জ! কেউ নেই? মানে বডি ফডি কিছু না? ”
“না স্যার বডি আছে তবে…।”
একটু ইতস্তত লাগে তাপসের গলাটা। একটু অবাক হন রমেশবাবু। বলেন, “তবে কি তাপস? ”
তাপস একটু ইতস্তত করে বলে, “আপনি বীরেন স্যারের সাথে কথা বলুন।”
ফোনের ওপারে একটা ভরাট গলা শুনতে পান রমেশ বাবু। বীরেন খাসনবিস বলেন, “হ্যালো কে রমেশবাবু? শুনুন এখানে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। ভীষন পিকিউলার ভাবে প্রত্যেকে স্পট ডেড বাট…। আপনি এক কাজ করুন। হাসপাতাল থেকে একটা অ্যাম্বুলেন্স আর চারজন মর্গের ডোম পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। লোকেশনটা নোট করুন”
লোকেশনটা একটা কাগজে টুকে কেজো গলায় রমেশবাবু বলেন, “ওকে ওয়েট করুন অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে।” বলে ফোনটা রাখতে যাচ্ছিলেন এমন সময় বীরেনবাবু বললেন, “ও হ্যা রমেশবাবু শুনুন। আসার সময় সাথে দুটো বড়ো বস্তা আনতে বলবেন।”
প্রথমে কথাটা বুঝতে পারেন নি রমেশবাবু। আরেকবার শুনে বললেন, “বস্তা? কেন মশাই বস্তা কেন লাগবে? ” উত্তরে যেটা শুনলেন শরীরটা নিজে থেকে টানটান হয়ে গেল তার। অবশেষে মা শুনেছেন! এমন একটা কেস পাঠিয়েছেন যার মাথামুন্ড বোঝা যাচ্ছে না। চরম উত্তেজনায় রমেশবাবু বলে উঠলেন, “হোয়াট? ”
ওপারে বীরেনবাবুও উত্তেজিত গলায় বললেন, “তবে আর বলছি কি মশাই? ডেডবডিগুলোর একটাও আস্ত নয় । ভীষন হরিবল কন্ডিশন। একটা বাদে সবকটার মাথা আছে বাট বডি উধাও। আর যেটা আস্ত সেটারও অবস্থা আরো ভয়ংকর যেন জীবন্ত অবস্থায় পোষ্টমর্টেম করেছে। বডিটা একটা মাটির বেদীতে বসানো। একহাতে হৃদপিন্ড ধরা। নাড়িভুড়ি আর মাথাগুলো দিয়ে মুন্ডমালা বানিয়ে পড়ানো। আর কপালে কি একটা যেন খোদাই করে লেখা। রক্তে ভেজা বলে বোঝা যাচ্ছে না।
(চলবে…)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন