অনুসরণকারী

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২০

বলি দ্বিতীয় পর্ব


১৫ই এপ্রিল ২০১৯,সোমবার, সকাল সাড়ে দশটা, কলকাতা

চা-জলখাবার খাবার পর একটা গাঁজার সিগারেট ধরালো ব্যোমকেশ। মনের সুখে দুটো টান দিয়ে আরাম করে সোফায় হেলান দিয়ে আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়লো। আমাদের লুচি-আলুর দম খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। আজ পয়লা বৈশাখ। সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে। ছুটির দিন বলে যথারীতি সকাল থেকেই আজ আমরা জড়ো হয়েছি বালুর বাড়িতে। আজকের প্ল্যান সারাদিন আড্ডা দেবো, আর কবজি ডুবিয়ে খাবো। প্রাচী একটু পর পর আসছে কারো লুচি বা আলুর দম লাগবে কিনা।

বালু খেতে খেতে বলল, “যতই সারাবছর সকালে দুধ-কনফ্লেক্স, ফ্রেঞ্চ টোস্ট খাও না কেন। এই লুচি আলুর দমের কথাই আলাদা।” রণি একটা প্রকান্ড ঢেঁকুর ছেড়ে বললো, “ছাড় তো? কিসের সাথে কিসের তুলনা? কোথায় ফ্রেঞ্চ টোস্ট আর কোথায় লুচি আলুর দম। বলি ও বৌদি আরো দুটো লুচি দে।” আমি ফুট না কেটে থাকতে পারলাম না, “বলি হাসপাতাল থেকে ফেরার পর তো খাই খাই বাতিকটা বেড়েছে দেখছি। একটু চেপে খান স্যার। মধ্যপ্রদেশ যে হারে স্ফীত হচ্ছে কদিন পর তো ফেটে যাবেন! ”

রণি চোখ কটমট করে বললো, “আবার খাওয়ার খোঁটা দিচ্ছিস! নেহাত শরীরটা একটু দুর্বল হয়ে আছে তাই বলে এভাবে বলবি? ঠিকই বলে লোকে পাঁকে পড়লে হাতি ব্যাঙে মারে লাথি।” শাম্ব বললো, “তাহলে তুই স্বীকার করছিস তুই হাতি? ” 
রণি বাহাতে মুঠো পাঁকিয়ে বললো, “হ্যা আমি হাতি। আর এই হাতিটা চাইলে এক থাবড়ায় তোদের হাড়ে চিড় ধরিয়ে দেবে। দেখবি?” আমি বললাম, “ না কোনো শখ নেই। শেষে কুমড়োপটাশ গড়িয়ে গেলে আরেক কেলেঙ্কারী হবে।”

ভষ্মে ঘি পড়লো যেন। রণি গর্জে উঠে বললো, “বালু! ওকে সামলা বলে দিলাম নাহলে একটা খুনোখুনি হয়ে যাবে। তখন তুইও কিছু করতে পারবি না।” বালু নির্বিকারভাবে বললো, “বেশ তো কিছু করে দে। তারপর মামলা হলে আমি আছি। অনেকদিন হলো হাতে কোনো কেস নেই। এই সুযোগে তোদের থেকে টু পাইস উসুল করবো।” আমি বললাম, “শালা! এর মধ্যেও নিজের লাভ দেখছিস। সাধে বলে উকিল আর ঢেঁকি সমগোত্রীয়। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে উকিল নরকে গেলেও কৌঁসুলি করে।”

ব্যোমকেশ এতক্ষন চোখ বন্ধ করে গাঁজা টানছিল আচমকা উঠে বসে বললো, “এই প্রবাদটা আবার কোথায় পেলে হে?” আমি হেসে বললাম, “পাই নি তো! এই মাত্র বানালাম।” ব্যোমকেশ হেসে বললো, “তাই বলো। আমি ভাবছি ঢেঁকির স্বর্গভ্রমণের কথা জানি উকিলের নরকভ্রমণটা আবার কবে হলো? অবশ্যি সাহিত্যিক মানুষ বলে কথা। তোমরা বানিয়ে বানিয়ে সব লিখতে পারো।” কথার শেষে শ্লেষটা বড়ো কানে লাগলো।

আসলে গতবার তন্নিষ্ঠদের নিয়ে ঘটনাগুলো('প্রতিঘাত'যারা পড়েছেন তারা বুঝবেন) নিয়ে একটা বড়োগল্প লিখে ফেসবুকে একটা গ্রুপে দিয়েছিলাম। অবশ্য তন্নিষ্ঠ-দেবলীনাদের আসল নামটা দিইনি। ব্যোমকেশ এব্যাপারে কিছু জানতো না। অবশ্য জানবে কি করে ওর তো সেই পুরোনো আমলের নোকিয়া ফোন। শুধু ফোন হয় আর কিছু না। তবে এই ব্যাপারটা জানতে পেরে একপ্রস্থ চোটপাট করে। অনেক কষ্টে ওকে থামানোর পর গল্পটা পড়তে চেয়েছিল। ফলে ওকে পড়তে দিই।

গল্পটা পড়ে গজগজ করে বলেছিল, “এই তোমার গল্প? যতসব উল্টোপাল্টা গাঁজাখুরি আর গোঁজামিলে ভরা! এটা গল্প? আর তুমি এতটা নির্লজ্জ জানলে তোমাকে আমার সাথে কার্শিয়াং নিয়ে যেতাম না। ছিঃ! ছি! দেবলীনা বৌঠান আমাদের বিশ্বাস করে গল্পটা বলেছিল আর তুমি সেটাও বেমালুম লিখে দিলে! বৌঠানের সামনে কোন মুখে দাঁড়াবো বলোতো? আবার পাঞ্চালীর ঘটনাটাও বলে দিলে! বলি কতজন এটা বুঝবে যে তন্ত্রসাধনায় অন্ধ তন্নিষ্ঠর এটা ভুল কাজ ছিল? বেচারা একেই মরমে মরে ছিল এর পর কি হবে বুঝতে পারছো? আর আজকাল মেয়েদের বয়স আন্দাজ করাও শুরু করেছো দেখছি। বলি মাসিমা-মেসোমশাই জানে? নেহাত তুমি আমার ছোটোভাই নও নাহলে তোমার কান মুলে দিতাম। এহ আবার লেখক হয়েছেন! শোনো লিখতে হলে পুরোটাই লিখবে নাহলে লিখবে না। বানিয়ে লেখা আমার পছন্দ নয়। লোকের কাছে আমায় গাঁজাড়ু বানিয়ে দিলে। বলি দিনে ক'বার টান দিতে দেখেছ শুনি? আমার চেয়ে বেশী তো তোমাকে সিগারেট টানতে দেখি। খবরদার! ভবিষ্যতে যদি দেখি এরকম উল্টোপাল্টা লিখেছ। সত্যি সত্যি প্রাচী বৌঠানের সামনে কান মুলে দেবো।” রণি বলেছিল, “আহা তুমি খামোকা কষ্ট করবে কেন? আমি আছি কি করতে? আমি না হয়…।”

এরপর টানা একসপ্তাহ আমার সাথে কোনো কথা বলেনি ব্যোমকেশ। আড্ডাতেও এসেছে আলাদা ভাবে। অবশ্য দেখতে গেলে দোষ আমারই ছিল। আসলে ঘটনাগুলো এতটাই দুর্বোধ্য আর নৃশংস ছিল যে লিখতে গিয়ে মনে হতো পাঠক নেবেন তো? সহ্য করতে পারবেন তো? তাই নিজের সাহিত্যসাধনার বিদ্যে ফলিয়েছিলাম। তবে এখন আর এসব করা যাবে না মনে হয়। ব্যোমকেশকে বন্ধু কম দাদা বেশি মানি। ও কান মুললে আমার কোনো কিছুই যায় আসবে না। তবে…প্রাচীদের সামনে যদি কান মুলে ধরে আপনারাই বলুন আমার প্রেস্টিজটা কোথায় যাবে? কাজেই ঠিক করেছি পাঠকের যাই মনে হোক না কেন এবার আর বানিয়ে লিখবো না।

ব্যোমকেশ ধোঁয়া ছেড়ে গাঁজার সিগারেটটা অ্যাশট্রে তে গুঁজে সময় কাটাতে নিউজপেপারে মন দিল। আমরা খেয়েদেয়ে ড্রইংরুমে বসলাম। পেপার পড়তে পড়তে ভ্রু কুঁচকে একজায়গায় থামলো ব্যোমকেশ। টেবিলে রেখে সেই জায়গাটা আরেকবার পড়ে বললো “অদ্ভুত তো! ” আমরা ওর দিকে তাকাতেই ও খবরটার দিকে আঙুল দিয়ে দেখালো। রণি শুধু হেডলাইনটা পড়ে ব্যাজারমুখে বললো, “হুম স্ট্রেঞ্জ কেসই বটে। এ নিয়ে উপরমহলে যথেষ্ট চাপ আসছে আমাদের উপর।” আমরা এক এক করে খবরটা পড়লাম। শাম্বদের খবরের কাগজ এটা। মাঝের পাতায় এক কোণে বড়ো করে ছাপা।

খবরটা পড়ার পর আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে তাকালাম। ব্যোমকেশ আরেকটা গাঁজার সিগারেট ধরালো। তারপর হাল্কা একটা টান দিয়ে বললো, “ পিএম রিপোর্ট কি বলছে? ” রণির সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ডাক্তারের কড়া নিষেধ দিনে দুটোর বেশী খেতে পারবে না। তাই ব্যোমকেশের হাতে গাঁজার সিগারেট দেখে জিভ দিয়ে ঠোট চেটে বললো, “আর পিএম রিপোর্ট। এমন হাল করেছে বডিটার যে আলাদা করে আর পিএম করতে হয় নি।”

ব্যোমকেশ ভ্রু কুঁচকে বললো, “ সে কি রকম? ” রণি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “ এতবছর হয়ে গেল এই ডিপার্টমেন্টে কোনোদিনও এমন কেস দেখিনি। মানে মানুষ কতটা ব্রুটাল হতে পারে বডিগুলো না দেখলে বিশ্বাস করবেন না।” 

ব্যোমকেশ বললো, “একমিনিট বডিগুলো মানে? এরকম খুন আরো হয়েছে নাকি? ” রণি মাথা নেড়ে বললো, “এ নিয়ে পনেরোটা।” ব্যোমকেশ এবার সোজা হয়ে বসলো, “তাই নাকি? তা বডির দশা কিরকম ? ” বলে একটা গাঁজার সিগারেট অফার করলো রণিকে। আমরা হায় হায় করে উঠতে রণি হাত বাড়িয়ে নিতে গিয়েও একটু দমে গেল।

ব্যোমকেশ হেসে বললো, ”আরে দুর তুমি নাও তো! ওদের কথায় কান দেবে না। এটা তোমাদের ওই নিকোটিনে ভরা সিগারেটের চেয়ে ঢের ভালো। কিছু হবে না।” রণি সিগারেটটা নিয়ে ধরিয়ে নিলো। তারপর বললো, ”হ্যা কি যেন বলছিলাম? হ্যা বডির অবস্থা ভীষণ প্যাথেটিক। মানে ডাক্তারের মতে জীবন্ত অবস্থাতেই পোষ্টমর্টেম করে নাড়িভুড়ি, হৃদপিন্ড বের করে নিয়ে মালা বানিয়ে দিয়েছে। তারপর মাথাটা কেটে নিয়েছে। প্রথমবার তো মর্গের ডাক্তারও চমকে গিয়েছিল।” ব্যোমকেশ জিজ্ঞেস করে, ”দেহাংশগুলো যে মৃতদেহেরই তার প্রমাণ কি করে হলো? ” রণি একটান মেরে সিগারেটটা শেষ করে বলে, “ডিএনএ টেস্টে প্রমানিত হয়েছে।”

ব্যোমকেশ মাথা নিচু করে বলে, “হুম। আচ্ছা মৃতদেহ গুলোর আর কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছো? ” রণি মাথা চুলকে বলে, “আর তো তেমন কিছু…ও হ্যা! মনে পড়েছে। প্রত্যেক বডিতেই সিঁদুর মাখানো।” ব্যোমকেশ সোজা তাকায় রণির দিকে। “সিঁদুর মাখানো? ”

“হ্যা ভীষণ পিকিউলার ফর্মে সারা শরীরে সিঁদুর দিয়ে বিশেষ কিছু চিহ্ন আঁকা। সামনে থেকে বোঝা যায় না। তবে মৃতদেহ উল্টো করে শোয়ালে পিঠে বাহুতে তেল সিঁদুর মিশিয়ে আঁকা।”

ব্যোমকেশ অ্যাশট্রের দিকে তাকায়। অ্যাশট্রে দিয়ে তখনও সিগারেটের ধোঁয়া উঠছে। সেই ধোঁয়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে নিজের মনেই বলে, “দারুন ব্যাপার তো! ” কিছুক্ষন পর সম্বিত ফিরে এলে সে বলে, “ভালো কথা এই কেসের আইও মানে তদন্তকারী অফিসার কে? ”

রণির মুখে এবার একটা খুশির আলো ছড়িয়ে পড়ে। সে একটু হেসে বলে, “নতুন ছেলে, আগে ছিল বেঙ্গল পুলিশে। রিসেন্টলি আমাদের ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছে। নাম রাজীবলোচন চক্রবর্তী। আমরা রাজীব বলে ডাকি। ভীষণ এফিসিয়েন্ট ছেলে। ভীষণ চটপটে। আসার পরেই বেশ কয়েকটা কেস মারাত্মক বুদ্ধির সাথে সলভ করেছে। আমারই আন্ডারে কেসটা পড়েছে। উপরমহল থেকে বলেছে দিস ইজ আওয়ার লাস্ট চান্স। এরপর সিআইডি টেক ওভার করবে। ছেলেটা ভীষণ খাটছে। ”

ব্যোমকেশ একটু নিজের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে হাত বুলোলো। তারপর আর কিছু বললো না। মেতে উঠলো অন্য আড্ডায়। পুরোনো গল্পে। কিন্তু আমি বেশ টের পাচ্ছিলাম ওর মনে একটা ঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে। হাজার চেষ্টা করেও ও সেটাকে ঝেড়ে ফেলতে পারছেনা। দুপুরে খেতে বসেও দেখলাম। খাবারে ওর তেমন মন নেই।

বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে দেখলাম ও ক্রমশ অচঞ্চল হয়ে উঠেছে। ওকে জিজ্ঞেস করতেই হাসলো। বললো, “খালি উল্টোপাল্টা চিন্তা মাথায় আসছে। জপে মন বসাতে পারছি না। সকালে রণিবাবুর বলা কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। কি যেন একটা হন্ট করছে আমায় ঐ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে । কি যেন একটা মনে পড়বে পড়বে করেও মনে পড়ছে না। পদ্ধতিটা ভীষণ চেনা ঠেকছে। তবে মনে করতে পারছি না।”

পরেরদিন সকালে খাবার টেবিলে ওর থমথমে মুখটা দেখে বুঝলাম সারারাত রণির কথাগুলো ওকে ঘুমোতে দেয় নি। ওর হাতের কাছে পেপারটা ছিল সেটা নিয়ে পড়তে লাগলাম। ব্যোমকেশ কি একটা ভাবতে ভাবতে ওর ফোনটা বের করে কাকে যেন ফোন করলো। কিছুক্ষন পর বুঝলাম রণিকে ফোন লাগিয়েছে।

“হ্যালো! হ্যা রণি…হ্যা ব্যোমকেশ বলছি… দুঃখিত তোমাকে বিরক্ত করার জন্য… বলছিলাম কি এই যে মার্ডার গুলো হচ্ছে এটার সময়টা একবার আমায় বলতে পারবে? …না বলছিলাম যে ডেটটা শুধু…ঠিক আছে আমি ওয়েট করছি …না না এমনিই কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করলাম। জানি এটা তোমাদেরই কেস…না না সবার লাগবে না এই ধরো শুরুর বা শেষের পাঁচজন…আচ্ছা রাখলাম।”
ফোনটা রাখার কিছুক্ষন পর আবার ফোন এলো। ব্যোমকেশ ফোনটা কানে নিতে পেপারটা এগিয়ে নিলো। তারপর আমার পকেট থেকে পেনটা নিয়ে খসখস করে লিখতে লাগলো। লেখার পর ফোনটা কেটে একদৃষ্টে তারিখগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। আমার অফিসের তাড়া ছিল বলে খেয়ে দেয়ে উঠে পড়লাম। ব্যোমকেশ তখনো তারিখগুলোর দিকে তাকিয়ে বসে আছে।

(চলবে…)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...