অনুসরণকারী

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২০

বলি তৃতীয় পর্ব


২রা জুন ২০১৯, রবিবার, সকাল ছটা,জোকা,কলকাতা

ফোনের আওয়াজে ভোরবেলা আচমকা ঘুম ভেঙে গেল কানাই ঘোষালের। ঘুমের ঘোরে ফোনটা কানে ঠেকিয়ে ওপারে রজতের গলা শুনতে পেল সে, “দাদা সরি ভোরবেলা ফোন করার জন্য। আসলে এখানে একটা প্রবলেম হয়ে গেছে।” ফোন কানে ঘুম জড়ানো গলায় কানাই বলে, “উফ! সামান্য একটা কাজও করতে পারিস না? একটা বাড়ি খালি করতে বলেছিলাম। তোদের দ্বারা সেটাও হয় না? কি হয়েছেটা কি?”

ওপার থেকে রজত একটু আমতা আমতা করে বলে, “না মানে বুড়িটা।” কানাই চোখ মেলে তাকায়, “বুড়িটা আবার কিচাইন করছে নাকি? উফ! একটা বুড়িকে সামলাতে পারছিস না? চুড়ি পরে বসে থাক শালা। মদ মাংস দিয়ে হিজরে পুষছি সব! ” রজত এবার বলে, “ না দাদা রাতারাতি আমরা বাড়ি খালি করতে এসেছিলাম। বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরের জিনিস বেরও করছিলাম। বুড়ি সিনেই ছিল না। আমরা ভাবলাম বোধহয় পালিয়েছে। কিন্তু ঠাকুরঘরের দরজা ভাঙতেই কেস খেয়ে গেছি। ঠাকুরঘরে ঢুকে দেখি বুড়িটা ঠাকুরঘরে মরে পড়ে আছে।”

বিছানায় উঠে বসে কানাই ঘোষাল। কালরাতে মদ একটু বেশী টেনে ফেলায় এখন মাথাটা টনটন করছে। সে গজগজ করে বলে, “বাল ! একটা কাজও যদি তোদের দিয়ে হয়। বুড়িটা মরে গেছে তো ভালোই হয়েছে! আপদ গেছে। লাশ সরাতে কতক্ষন? আহা লোক জড়ো হয়েছে তো হোক না? একটা দুটো দানা খরচ করলেই তো ভীড় পাতলা হয়ে যেত।”

ওপাশে রজত বলে, “আমরা সেটাও করেছি দাদা। ভীড় পাতলাও হয়ে গিয়েছিল দাদা কিন্তু বাধ সাধলো একটা মেয়ে।” কানাই এবার নড়েচড়ে বসে। “একটা মেয়ে? ” রজত বলে, “হ্যা দাদা একটা মেয়ে। কিভাবে ভিডিও তুলে সোজা ফেসবুকে দিয়ে দিয়েছে। আবার পুলিশও ডেকেছে।” কানাই এবার শান্ত গলায় বলে, “তোরা কোথায় এখন? ” রজতের কাছে থানার নাম জেনে ফোনটা রাখে কানাই। পাশে তাকিয়ে দেখে নগ্ন কালিন্দী পাশ ফিরে শুয়ে। রাতে লোডশেডিং হয়েছিল বলে গরমে জানলা খুলে পর্দা নামিয়েছিল। সেই জানলা দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়ছে কালিন্দীর ছিপছিপে নিটোল শরীরে। সেই আলোয় ঘামে ভেজা শরীরটা লাগছে আরো মোহময়ী। অন্যদিন হলে আরেকপ্রস্থ আদর করতো ওকে কানাই কিন্তু আজ যতরাজ্যের বিরক্তি আর ঝামেলা এসে ভর করেছে ওর মাথায়।

সকাল সকাল এই সব হুজ্জতি ওর ভালো লাগে না। সকালবেলা গঙ্গাস্নান সেরে বাড়িতে ফিরে পুজোয় বসে সে। বাড়িতে মা কালি প্রতিষ্ঠিত আছেন বহুবছর ধরে। ঘন্টাদুয়েক দরজা বন্ধ করে পুজো করার পর ঘর থেকে যে বেড়িয়ে আসে তার সাথে ঘন্টাদেড়েক আগে পুজো করতে ঢোকা কানাই ঘোষালের মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

পুজো সেরে কোনোমতে ডাল রুটি খেয়ে কানাই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ওর অফিসের উদ্দেশ্যে। অফিসটা অবশ্য নামেই অফিস আসলে অ্যান্টিসোশালদের আখড়া বললে ভুল হবে না। অফিসে ঢুকে নিজের চেম্বারে ঢুকে সোজাসুজি দেওয়ালে তাকায় সে। সেখানে কালীঘাটের মা কালির বিরাট একটা ছবি। ছবিটাকে প্রতিদিন নতুন জবাফুলের মালা পড়িয়ে প্রনাম করে চেয়ারে বসে সে।

আপাতদৃষ্টিতে কানাইকে আর ওর এই অফিসকে দেখলে কোনো জ্যোতিষীর চেম্বার বলে যে কারো ভুল হতেই পারে। কিন্তু কলকাতা আর তার আশেপাশের অঞ্চলের একটা ছিঁচকে চোরেও জানে ওটা সম্পুর্ণ কানাইয়ের ছদ্মবেশ। অবশ্য কানাই এর সমস্ত মক্কেলরা বেশ শাঁসালোও বটে। কানাই যে কাজটা করে সেটার ইংরেজীতে একটা বেশ সুন্দর নাম আছে সেটা হলো, “Settlement and Consulting. ” আরো ভালো করে নিন্দুকদের ভাষায় (এটা কানাই এর মত। অবশ্য এই নিন্দুকরা কোনোদিনই ওর সামনে আসে না বলে আক্ষেপের শেষ নেই ওর।) বললে মাফিয়া সিন্ডিকেট চালায় সে।

কানাইয়ের ব্যবহার, কথাবার্তা এতটাই নম্র যে ও একজন নৃশংস মানুষ এটা ভাবতেও কষ্ট হয়। অথচ যারা জানে তারাই জানে যে সময় আর সুযোগ পেলে কানাইয়ের রূপ কতটা নির্মম হতে পারে। এমনি এমনি এতবছরে এই জায়গায় এসে পৌছয় নি ও। রীতিমতো লাশ ফেলে, মানুষকে ভয় দেখিয়ে এই জায়গায় এসেছে সে। এলাকায় ওর আতঙ্ক এতটাই যে আড়ালে ওর শত্রুরা ওকে কষাই ঘোষাল বলে ডাকে।

ইদানিং পার্টি অফিসেও ওর আনাগোনা বেড়েছে। কানাইয়ের ইচ্ছে এখন রাজনীতিতে প্রবেশ করার। এতবছর ওর পেশীশক্তি আর লোকবলে অনেকজনকেই ও এমএলএ, এমপি বানিয়েছে।এবার নিজে সেই ক্ষমতার স্বাদ নিতে চায়। এরজন্য সব করতে রাজি সে।

কানাইয়ের স্ত্রী কৃষ্ণা কানাইয়ের ঠিক বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। পাড়ায় কারো বিপদ হলে পাশে এসে দাঁড়ান, কেউ কিছু চাইলে ফেরান না। এমনকি পাড়ার মন্দিরে প্রতিসপ্তাহে গরীব মানুষের পাত পেড়ে খাওয়ার আয়োজনও করেন। কানাইয়ের টাকায় হাসপাতালও খুলেছেন তিনি।
কানাই প্রথমে এটা নিয়ে ভীষণ চোটপাট করতো। এমনকি কৃষ্ণাকে মারধোরও করেছে। একবার তো গর্ভস্থ অবস্থাতেই এমন মেরেছিল যে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় কৃষ্ণাকে। তবে এখন কিছু বলে না কারন এমএলএ ঘোষ তাকে বুঝিয়েছে যে এসব করলে আখেড়ে ওরই লাভ। বউকে সামনে রেখে সে ইলেকশন জিততে পারে চোখ বন্ধ করে। কৃষ্ণা বোঝেন সবই কিন্তু কিছু বলেন না। তবে স্বামীর হয়ে প্রচারও করেন না। কোনো প্রচার ছাড়াই নিভৃতে কাজ করে যান। লোকে সব দেখে আর আড়ালে ওনার জন্য দুঃখ করে বলে, “ ঘোর কলিযুগ নাহলে এযুগে মা সীতাকে রাবণের গৃহিণী হয়ে আসতে হয়? ”

কানাইয়ের জীবনে এই উত্থানের কারন যেমন একজন স্ত্রী।তেমনই ওর দুর্বলতাও একজন স্ত্রী। এক্ষেত্রে কানাই নিজের পিতৃদত্ত নামের পুর্ণ মর্যাদা রেখেছে।

জলপাইগুড়ি থেকে মডেল থেকে অভিনেত্রী হবার স্বপ্ন দুচোখে নিয়ে বছর পাঁচেক আগে কলকাতায় এসেছিল কালিন্দী। কিন্তু বেচারী জানতো না এই স্বপ্নপুরনের জন্য চাই কঠিন পরিশ্রম, অসীম ধৈর্য আর সঠিক পথপ্রদর্শক। প্রথম দুটো অফুরন্ত থাকলেও শেষেরটা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। জহুরীর মতো খুঁজে নিতে হয় তাকে। কারন এই শহরটা যতটা রূপকথার ততটাই রূঢ় বাস্তবেরও। যতটা ভালোমানুষের ততটাই শঠ প্রবঞ্চকদেরও। এদের থেকে বাঁচতে হলে হতে হবে চালাক আর হতে হবে সতর্ক নাহলে পদে পদে ঠকতে হবে। আর এখানেই ঠকে গেল কালিন্দী।

জলপাইগুড়ির সহজসরল মেয়েটা পড়ে গেল স্টুডিওপাড়ায় ঘোরা এমনি এক প্রবঞ্চকের খপ্পরে। সে বেচারীকে ঠকিয়ে বেচে দিলো নোংরা পল্লিতে। অবশ্য বেচার আগে টেস্টড্রাইভ করে নিয়েছিল সে। গ্ল্যামার জগতে আসার স্বপ্ন ভাঙতে বেশিক্ষন লাগেনি কালিন্দীর। ক্রমশ সে শেষ হতে লাগলো প্রতিরাতে। এভাবেই একদিন এক শেঠের কাছে গিয়েছিল সে। সেখান থেকে ওকে উদ্ধার করে কানাই।

উদ্ধার হবার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল কালিন্দী। কিন্তু এই মুক্তির আনন্দ বেশীক্ষন স্থায়ী হয়নি। কানাই ততদিনে কৃষ্ণার থেকে অনেক দুরে সরে গেছে। এক ছাদে থেকেও এক খাটে শোয় না তারা। তাছাড়া কালিন্দীর রূপ যৌবন, ছিপছিপে ফিগার কানাইকে মারাত্মকভাবে টেনেছিল। আর কানাইয়ের বিশ্বাস ওর নাম যখন ভগবানের নামে কাজেও তাই হবেনা কেন। তাছাড়া পুরুষমানুষের একটা মেয়েমানুষে চলে নাকি? কানাই আর অপেক্ষা করেনি। সেই নোংরা পল্লিতে চড়া দামে কালিন্দীকে কিনে নিয়ে এনেছিল জোকায় সদ্য কেনা ফ্ল্যাটে।

প্রথম দুদিনে নতুন আসবাব কিনে সমস্ত ঘর সাজিয়েছিল দুজনে। কালিন্দী ততদিনে বুঝে নিয়েছে কানাইয়ের এই উপকারের আসল কারন কিন্তু সে ছিল নিরুপায়। বলতে গেলে খাঁচার হাতবদল হয়েছে মাত্র তার অবস্থান বদলায় নি। তবুও ঐ নোংরা স্যাঁতস্যাতে পরিবেশ থেকে এই ফ্ল্যাটের সাচ্ছন্দ ঢের ভালো। কানাইও ভালোমানুষের ভান করে দেখাচ্ছিল যে সে নিজের তাগিদে উপকার করছে তার। তারপর একরাতে সুযোগ বুঝে কড়ায়গন্ডায় বুঝে নিয়েছিল সমস্ত উপকারের হিসেব। প্রথম প্রথম সপ্তাহে একদিন আসতো তারপর প্রতিদিনই আনাগোনা হতে লাগলো। হাউজিং সোসাইটি একটু আপত্তি তুলেছিল বটে । তবে তাদেরকেও টাকা খাইয়ে চুপ করিয়েছে কানাই।

মাঝে মাঝে নিজের উপর ঘেন্না হয় কালিন্দীর। নিজের বোকামোর জন্য রাগও হয়। এসেছিল কি হতে আর কি হয়ে গেল। সমাজে আজ তার পরিচয় সে কানাই ঘোষালের রক্ষিতা। অথচ এমনটা তো হবার কথা ছিল না। একবার লুকিয়ে কানাইয়ের বাড়িতে গিয়ে কৃষ্ণাকেও দেখেছে সে। তাকে দেখার পর আত্মগ্লানিতে মরতে ইচ্ছে হয়েছে তার। আত্মহত্যার চেষ্টা যে করেনি তা নয়। তবে প্রতিবার কানাই এসে বাঁচিয়েছে। মাঝে মাঝে জলপাইগুড়িতে থাকা বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে। ইচ্ছে করে তাদের কাছে ফিরে যেতে। কিন্তু সে কোন মুখে যাবে? কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াবে? একবার ফোন করেছিল সে তবে লজ্জায় কথা বলতে পারেনি।

রোজরাতে যখন কানাই ওর মধ্যে প্রবেশ করে তখন যন্ত্রণায়, ঘেন্নায়, রাগে, নিজের উপর বিতৃষ্ণায় মনটা ভরে যায়। মনে মনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করে নিজের মুক্তির। ঠাকুর ওর প্রার্থনা শোনেন কিনা সে জানে না। সে জানে না আর কতদিন এইভাবে যৌনদাসী হয়ে কাটাতে হবে তাকে। জানে না আর কতদিন এইভাবে যন্ত্রণায় সারারাত কাটাতে হবে। সারারাত রমণের পর ক্লান্ত কানাই শুয়ে পড়লে। যন্ত্রণাকাতর শরীরে সে ভগবানের কাছে নিজের মৃত্যুকামনা করে।

আজকে কানাইকে ওভাবে উঠতে দেখে সে পাশ ফিরে শুলো। কদিন আগেই কানাই একটা পুরোনো বাড়ির ডিলের কথা বলছিল। বাড়ির মালিক বাড়িটা বেচতে চাইলেও বাধ সাধছে সেই বাড়িতে থাকা বৃদ্ধা। কানাই গজগজ করে উঠলো, “বাল ! একটা কাজও যদি তোদের দিয়ে হয়। বুড়িটা মরে গেছে তো ভালোই হয়েছে! আপদ গেছে। লাশ সরাতে কতক্ষন?” বেচারী বৃদ্ধার জন্য কষ্ট হয় কালিন্দীর। মৃদু হিংসেও হয়। আহা কি সৌভাগ্য বৃদ্ধার। নিজের বাড়িটাও তো নিজের সম্মানের, নিজের স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্নকে আকড়ে মরেছেন উনি। আর সে, প্রতিরাতে নিজের জীবন দিয়ে তাকে চোকাতে হচ্ছে কানাই ঘোষালের সব ঋন। নিজেরই দুর্ভাগ্যের জন্য দুফোঁটা জল চোখ থেকে ঝড়ে পড়ে তার।

কানাই বিছানা ছেড়ে জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে কালিন্দীকে ডাক দেয় দরজাটা লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। কালিন্দী বিছানার কোণে ফেলে রাখা নাইটিটা পরে নিয়ে সদর দরজাটা খোলে। কানাই বেরিয়ে যাবার পর বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার চালিয়ে দেয়। শাওয়ারের জলে ভিজতে ভিজতে মাটিতে বসে পড়ে সে।

******

২রা জুন ২০১৯, রবিবার, সকাল দশটা, টিটাগড় পুলিশ স্টেশন

উকিলকে নিয়ে থানায় ঢুকে কানাই দেখে রজতরা হাজতে দাঁড়িয়ে। সেদিকে একঝলক তাকিয়ে কানাই ঢোকে ওসির ঘরে। এখানকার ওসিকেও হাড়ে হাড়ে চেনে সে। টাকার খাই খুব ওসির। রুমেই ছিল ওসি অনুব্রত খাসনবিস। কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছিল। কানাইকে দেখে ফোনটা রাখে।

কানাই সোজা ভেতরে ঢুকে চেয়ারে বসে। অনুব্রত বিব্রত হয়ে বলে, “আরে দাদা খামোখা কষ্ট করে তুমি এলে কেন? আমাকে বললে আমিই যেতাম। কি খাবে বলো চা আনাই? ” কানাই হাত তুলে বলে, ”সকালবেলা চা খেতে বা তোমার আপ্যায়ন নিতে আসিনি খাসনবিস। ওদের ছাড়াতে এসেছি।” বলে উকিলের কাছ থেকে বেল অর্ডার নিয়ে ওসির টেবিলে ফেলে দেয় কানাই। সাথে একটা পাঁচশো টাকার বান্ডিল রাখে পেপারওয়েট হিসেবে।

অনুব্রত দেখে নোটটা তারপর ঢোক গিলে বলে, ”ইয়ে মানে কানাইদা। বুঝতেই পারছো এটায় আমার হাত আর নেই। উপরমহল থেকে অর্ডার এসেছে।”

”আরে রাখো তোমার উপরমহল। সব জানা আছে আমার। যেটা বলছি সেটা করো। একটা পেটি কেস মেরে ছেড়ে দাও। বাকিটা আমি দেখে নেবো।” বলে আরেকটা বান্ডিল রাখে কানাই
বান্ডিলটার দিকে লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে খাসনবিস বলে“সেতো দিতেই পারতাম তবে…হে হে ইয়ে মানে ঐ ভিডিওটা ফেসবুকে খুব ছড়াচ্ছে কিনা। ওটাতেই আরো চাপ হয়ে গেছে। চাইলেও আমি ছাড়তে পারবো না।”

কানাই এবার বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে, “কাজটা তুমি ভালো করলে না খাসনবিশ।” খাসনবিশও ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়ায়, “আমার দোষ নেই দাদা। মেয়েটার উপরমহলে বহুত চ্যানেল আছে। সোজা লালবাজার থেকে ফোন এসেছিল। এবার মেয়েটা যদি নিজে থেকে কেসটা না তোলে আমার পক্ষে কিছু করা অসম্ভব।”

কানাইয়ের মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি খেলে যায়। সে বলে, “কোর্টে কবে তুলছো ওদের? ” খাসনবিশ বুঝতে না পেরে মাথা চুলকে বলে, “ইয়ে মানে কালকে সকালে। কেন দাদা? ” কানাই কিছু বলে না মুচকি হেসে বেরিয়ে যায়।

বাইকে বসে ফোনে ফেসবুক অ্যাপটা খোলে কানাই। এমনিতে এসবের নেশা নেই তবে মাঝে মাঝে খোলে সে। বেশীক্ষন লাগে না। ফেসবুকে কিছুক্ষন নাড়াঘাটার পর খুঁজে পায় সে ভিডিওটা। পুরোটা দেখে সে। বেশ পাকা হাতের কাজ। একফোঁটাও কাঁপে নি কোথাও। আরেকটু খুঁজতেই পেয়ে যায় মেয়েটার আইডি। নামটা আরেকবার পড়ে, “পাখি চ্যাটার্জী।” প্রোফাইল পিক দেখে চমকে ওঠে সে।

কানাইয়ের মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসে, “আরিব্বাস! এতো ডানাকাটা পরি দেখছি! তা মামনির আবার ডানা গজিয়েছে মনে হচ্ছে? কোনো ব্যাপার না। আবার ছেটে দেবো।” বলে ছবিটা ফোনে সেভ করে হোয়াটসঅ্যাপে নিজের দলের ছেলেদের ফরোয়ার্ড করে একটা ভয়েস মেসেজ দেয়, “এই মেয়েটা কোথায় থাকে, কোথায় যায় তা ফলো রাখ আর সময়ে সময়ে আমাকে জানা। দরকার আছে।” বলে ফোনটা রেখে মৃদুগলায় শ্যামাসঙ্গীত গাইতে গাইতে বাড়ির উদ্দেশ্যে বাইক চালিয়ে দেয়।

******

৩রা জুন ২০১৯, সোমবার, রাত নটা, ব্যারাকপুর

আজ অফিস থেকে ফিরতে বেশ রাত হলো পাখির। আসলে রাস্তায় জ্যাম মারাত্মক ছিল ফলে ক্যাবে ফিরতে ফিরতে দেরী হয়ে গেল। ঘড়িতে দেখে রাত নটা বাজে। বেশী রাত হয়নি অবশ্য তবে মা হয়তো ভীষণ চিন্তা করছে তাই তাড়াতাড়ি পা চালায় পাখি। আসলে ওদের পাড়াটা এতটা ঘিঞ্চি যে সহজে ক্যাব ঢোকে না। দতাই মেনরোডে নামতে হয়। তারপর একটা পাড়া আর একটা কালীমন্দির পেরিয়ে ওদের পাড়ায় পৌছয়। মেনরোড থেকে ওদের পাড়া পায়ে হেটে মিনিট পাঁচেকের পথ।

প্রথম পাড়া পেরিয়ে পাখি ওদের পাড়ায় ঢুকতে যাবে এমন সময় লোডশেডিং হয়ে গেল। আচমকা অন্ধকার নেমে আসায় পাখি প্রথমে থমকে দাঁড়ালো। আজ অমাবশ্যা ওর খেয়ালই ছিল না। পকেট থেকে ফোনটা বের করে আলো জ্বালিয়ে এগিয়ে গেল। কিছুদুর যেতেই পাখির মনে হলো কে যেন তাকে ফলো করছে। পেছনে আলো ফেলে সে দেখলো কেউ নেই। আবার কিছুদুর এগোতেই আবার মনে হলো কে যেন ওকে সত্যিই ফলো করছে। আবার পেছনে আলো ফেললো। এবারও কেউ নেই। পাখির মনে হলো এটা হয়তো ওর মনের ভুল।

নিজেকে আশস্ত করে সামনে ফিরতেই আচমকা একজনকে সামনে দাঁড়াতে দেখে চমকে উঠলো পাখি। মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলোয় দেখল ওর সামনে দাঁড়িয়ে কানাই ঘোষাল। সকালে মর্নিংওয়াক করতে গিয়ে পাশের পাড়ায় বসু দিদার বাড়ির সামনে ভীড় দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল পাখি। ব্যাপারটা বুঝতে বেশীক্ষন লাগে নি। চট করে ফোনটা বের করে ভিডিও তুলে আপলোড করেছিল ফেসবুকে। তারপর ফোন করেছিল ওর কলেজের এক বন্ধুকে। বন্ধুটা লালবাজারে গুন্ডাদমন শাখায় আছে। ওরই জোরে লোকগুলো অ্যারেস্ট হয়। মা পরে জানতে পেরে একপ্রস্থ চোটপাট করেছিল। বলেছিল ওরা নাকি কানাই ঘোষালের ছেলে। কানাই ঘোষাল সাংঘাতিক লোক। ওর সাথে লাগতে না যাওয়াই ভালো। পাখি তখন মায়ের কথায় পাত্তা দেয় নি।

ভয় পেয়ে যাওয়া পাখিকে দেখে মুচকি হেসে কানাই বললো, “এত রাতে কোথা থেকে আসা হচ্ছে? ” পাখি নিজেকে সামলে বলে, “সেটা জেনে আপনার কি লাভ? ” কানাই হেসে বলে, “ওবাবা এতো তেজ? ভালো ভালো। আজকের যুগে এটুকু তেজ থাকা ভালো। তোমাদের মতো তেজি মেয়েদের আমার ভালো লাগে। তা কাল সকালে মর্নিংওয়াকে যখন গেলে তখন সেটা সেরেই তো ফিরে আসতে পারতে? বাড়িতে শেখায় নি রাস্তায় জটলা হলে সেখানে যেতে নেই? যার তার অনুমতি ছাড়া ছবি তুলতে নেই? ” বলতে বলতে দু এক পা এগিয়ে আসে কানাই। ভয়ে পাখি দুপা পিছিয়ে আসে।

কানাই বলে, “তুমি মেয়ে ভালো, পড়াশোনা জানো, চাকরি করো, পরোপকারি, কিন্তু এই উপকারটা যে আমার সর্বনাশ ডেকে এনেছে। আর কানাই ঘোষালের কাছে নিজের স্বার্থ আগে মানবতা পরে। কাজেই তোমায় সরে যেতে হবে। তবে চিন্তা কোরো না। ফেসবুকে তো খুব আক্ষেপ করো যে একদিন তুমি ভার্জিনই মরবে। পাড়ার দাদা হয়ে আমি কি তা হতে দিতে পারি? আগে তোমার সমস্ত আক্ষেপ অভিযোগ দুর করবো তারপর তোমার মুক্তি।” বলতে বলতে পকেট থেকে চাকু বের করে সোজা চালিয়ে দেয়।

অন্ধকারেও নিখুঁতভাবে চাকুটা শার্টের মাঝ বরাবর চিরে দেয়। শার্টের আড়াল থেকে উকি দেয় পাখির উন্মুক্ত শরীর। কোনোরকমে ব্যাগ থেকে পেপারস্প্রেটা বের করে কানাইয়ের চোখ লক্ষ্য করে চালিয়ে দেয় পাখি। তারপর জামার দুপ্রান্ত ধরে নিজের লজ্জা নিবারন করে উল্টোদিকে দৌড়য়।আচমকা এই আঘাতের জন্য তৈরী থাকলেও একটু স্প্রের ছিঁটে কানাইয়ের মুখে লাগে। কানাই নিজের মুখ চেপে ধরে তারপর পাখির পেছনে ধাওয়া করে। একবার যদি মেয়েটা পাশের পাড়ায় চলে যায় তাহলে বিপদ।

পাখি পেছনে না তাকিয়ে সোজা দৌড়াতে থাকে। কিন্তু বেশীদুর দৌড়তে পারে না। অন্ধকারে কিসের উপর যেন হোচট খেয়ে পড়ে যায়। মাথাটা ঠুকে যায় রাস্তায় থাকা ল্যাম্পপোষ্টে। আর পড়া মাত্র পাড়ায় আলো জ্বলে ওঠে। কোনোমতে মাথা উঠিয়ে তাকিয়ে দেখে কালীমন্দিরের স্ল্যাবে হোচট খেয়ে পড়েছে। পেছন ফিরে দেখে কেউ নেই। পাশের পাড়াতেই ক্লাবের ছেলেরা বসেছিল। আচমকা পাখিকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে ছুটে আসে তারা।

******

কতক্ষন অজ্ঞান হয়েছিল জানে না কানাই। জ্ঞান ফিরতেই মাথাটা টনটন করে ওঠে তার। প্রচন্ড ব্যথার মধ্যে ওর মনে পড়ে অজ্ঞান হবার আগে অন্ধকারের সুযোগে পাড়ায় ঐ মেয়েটাকে গুম করতে গিয়েছিল ও। মেয়েটা ভয় পেয়ে পালাতে যায়। কানাইও ওকে তাড়া করে ধরতে যাচ্ছিল এমন সময় পাশ থেকে আরেকটা জমাট অন্ধকার টের পায় সে। কিছু করার আগেই পেছন থেকে রুমাল দিয়ে মুখ চেপে ধরে সেই ছায়ামুর্তি। একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে লাগে ওর তারপর আর কিছু মনে নেই কানাইয়ের।

হুঁশ ফিরতেই কোথায় আছে সেটা বোঝার চেষ্টা করে কানাই। গলাটা ভীষণ চাপা লাগছে। কানে ভেসে আসছে ঘন্টার শব্দ আর গম্ভীর গলায় মন্ত্রপাঠের শব্দ। চোখ মেলে আশেপাশে তাকাতেই বুক হিম হয়ে যায় কানাইয়ের। একটা মন্দিরের সামনে উল্টো হয়ে শুয়ে আছে ও। হাত পা অবশ হয়ে গেছে। ইচ্ছে করেও নাড়াতে পারছে না। আর ওর মাথাটা হাড়িকাঠে আটকানো। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে কানাই। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোয় না।

কানাইয়ের গোঙানী শুনে পুজারী একটু থামে তারপর আবার পুজো শুরু করে। পুজো শেষ করে হোম আরম্ভ করে সে। হোম করার পর উঠে দাঁড়ায় সে পুরোহিত। হোমের আগুনের আলোয় তার বলিষ্ঠ চেহারাটা অস্পষ্ট লাগে কানাইয়ের।পুরোহিত এক হাতে একটা সরা আরেক হাতে একটা খাঁড়া নিয়ে আসে। তারপর কানাইয়ের মাথার নিচে সরাটা রেখে বলে, “ ব্রাহ্মণ নিজের ধর্ম ভুললে কি হয় জানিস? নীচ, কুলভ্রষ্ট, আর মহাপাপী। তাও তো তোর ভাগ্য ভালো আজকের দিনে মা তোকে নিজের ভোগ হিসেবে চেয়েছে। তোর ভক্তি সার্থক। আজ ফলহারিনী কালিপুজো। বড়ো পবিত্র দিন আজ। নিজের সব পাপের জন্য মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে মাকে স্মরণ কর।”
বলে উঠে দাঁড়ায় পুরোহিত। খাঁড়াটা হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করে মন্ত্রপাঠ করতে করতে উপরে তোলে খাঁড়াটা। ভয়ে আতঙ্কে কাঁপতে থাকে কানাই। পুরোহিত খাঁড়াটা নামিয়ে পৈতেটায় ঠেকায়। খাঁড়াটা ঠেকানো মাত্র কেটে পড়ে যায় পৈতেটা। তারপর খাঁড়াটা আবার উপরে তুলে স্থির হয়ে যায় পুরোহিত। পরক্ষনেই “জয় মা! ” বলে নামিয়ে দেয় খাঁড়াটা। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে পড়ে সরাটায়। কাটা পাঁঠার মতো থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে যায় কানাইয়ের দেহ।

খাঁড়াটা মাটিতে রেখে একহাতে মাথাটা নিয়ে আরেক হাতে সরাটা নিয়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে যায় পুরোহিত। পেছনে পড়ে থাকে কানাই ঘোষালের কবন্ধ মৃতদেহ। 

(চলবে…)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...