অনুসরণকারী

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২০

বলি চতুর্থ পর্ব


৪ঠা জুন ২০১৯, মঙ্গলবার, সকাল সাতটা,কলকাতা

ফোনটা যখন এলো তখন সবে দু'চোখের পাতা এক করেছে রণি। ঘুম থেকে উঠে খবরটা পেয়ে একটু হতভম্ব হয়ে রইলো সে। তারপর নিস্ফল আক্রোশে ঘুষি মারলো দেওয়ালে। আবার,  আবার আরেকটা খুন। আর এবার থানার সামনেই বডি ফেলে পালিয়েছে। যেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে পুলিশকে। যেন বলছে দেখো এইভাবে তোমাদের সামনে একের পর এক খুন করে যাবো তোমরা শুধু দাঁড়িয়ে দেখবে । দাঁতে দাঁত চেপে আয়নার দিকে তাকায় রণি। ঠিক আছে সেও দেখবে খুনি কতদুর যায়।

চটপট তৈরী হয়ে নেয় সে। তারপর বেরিয়ে পড়ে কালিঘাট থানার উদ্দেশ্যে। গতবারের ঘটনার পর ডাক্তার ওকে বলেছেন বেশী দৌড়ঝাঁপ না করতে। কিন্তু যা শুরু হয়েছে শান্তিতে বসে থাকা অসম্ভব।
থানায় ঢুকে রণি দেখে রাজীবও এসে গেছে। রণিকে দেখে এগিয়ে আসে রাজীব। রণিকে নিয়ে স্পটে যায় রাজীব। রণি দেখে বডি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। চক দিয়ে মার্ক করা হয়েছে জায়গাটা। ব্যারিকেড করা হয়েছে রাস্তাটা তাও চারপাশে একটু একটু করে ভীড় জমতে শুরু করেছে। মিডিয়াও এসে পৌছল প্রায়। একে জায়গাটা ঘিঞ্চি তার উপর চৌমাথার উপর। রণি সবটা দেখে বলে, “কি বুঝলে রাজীব?

রাজীব একটু বিব্রতভাবে বলে, “ব্যাপারটা ভীষণ অড স্যার। বডিটাকে জয়েন্টের অংশ থেকে ভেঙে নারকেল ছোবড়ার দড়ি দিয়ে বেঁধেছে। যথারীতি এটাও beheaded. এবার ওই তেমন ছিন্নভিন্ন  করেনি। তবে ছালটা ছাড়িয়ে নিয়েছে। বডিতে এক ইঞ্চিও চামড়া নেই।”

রণি নিজের গালে হাত রাখে। দুসপ্তাহ হলো ও শেভ করেনি। তাতেই একগাল চাপদাঁড়ি গজিয়ে গেছে। গালে কিছুক্ষন হাত বুলিয়ে,  দাঁড়ি চুলকে নিয়ে রণি বললো, “বডিটা কার আইডেন্টিফাই করতে হবে। এক কাজ করো আগের কেসের পর যতগুলো মিসিং কেস এসেছে সবকটার ডিটেলটা দিও আমার টেবিলে।” বলে থানায় ঢুকলো। তারপর সেখানে যে অফিসার আর কনস্টেবল অন ডিউটি  ছিল । তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলো পুরো ঘটনাটা।

প্রথমে কনস্টেবল যে ছিল সে বলতে শুরু করলো। তার বক্তব্যে যেটা সংক্ষেপে দাঁড়ালো সেটা হলো।কাল সারারাত সে অনডিউটি হয়ে থানার গেটের সামনে বসেছিল। ভোর তিনটে কি চারটে হবে এমন সময় একটু ঝিমুনি লেগে গিয়েছিল তার। ঠিক সেই সময় এক ধপ্ শব্দে ঘোর কেটে যায় তার। বাইরে তাকিয়ে দেখে একটা ট্যাক্সি চলে যাচ্ছে ওদের থানার সামনে দিয়ে। আর থানার সামনে পড়ে আছে একটা বস্তা। আচমকা বস্তাটা ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে তার সন্দেহ হয় । এগিয়ে গিয়ে বস্তাটা নাড়তেই রক্তের ধারা দেখতে পেয়ে সে থানায় ডিউটিরত অফিসার কে ডেকে আনে। তারপর তার আর ওসির অর্ডারে বস্তাটার মুখ খুলতেই আবিস্কার করে লাশটা।

বাকিটা অফিসার বললেন, “বডি পাওয়ার পর আমিই ফোন করি হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টকে।” রণি একটা সিগারেট ধরিয়ে কনস্টেবলকে বলে, “আচ্ছা এই যে তুমি বললে একটা ট্যাক্সিকে যেতে দেখেছো সেটার যদি নম্বর দেখো চিনতে পারবে? ” কনস্টেবল মাথা নেড়ে বলে “নম্বর তো দেখিনি স্যার। আসলে জিনিসটা এতটাই তাড়াতাড়ি হলো খেয়াল করতে ভুলে গেছি।”

কাঁচাখিস্তিটা বেরিয়েই যাচ্ছিল মুখ দিয়ে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বললো, “আচ্ছা বেশ আজকাল তো নানা মডেলের গাড়ি ট্যাক্সি হিসেবে চলে রাস্তায়। মডেলটা চিনবে? ” কনস্টেবল একটু মাথা চুলকে বললো, “হলুদ অ্যাম্বাসেটর ছিল স্যার। তাই ছিল কি? নাকি ওলা গাড়ি গুলো মনে পড়ছে না। তবে রং হলুদই ছিল।” কনস্টেবলের কথায় রণি একটু অবাক হয়ে এগিয়ে আসতেই বুঝলো ব্যাপারটা।

“একি তুমি ড্রিংক করে অন ডিউটিতে আছো? ” রণি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। কনস্টেবল ধরা পড়ে বলে, “ঐ স্যার বডিটা দেখার পর আর সামলাতে পারিনি স্যার তাই নার্ভ চাঙ্গা রাখতে।” বলে কনস্টেবল দুটো আঙুল দেখায়। রণি মাথা নামিয়ে বলে, “হোপলেস!  এই নার্ভ নিয়ে ডিউটি করেন আপনারা? তাহলে পুলিশে কেন অন্য লাইনে যান না?  ” কনস্টেবলটা কাঁচুমাচু মুখে বলে, “সরি স্যার! ”

রণি কিছু বলতে গিয়েও বলে না। কি বলবে সে? কি বলারই বা আছে? লোকটার দিকে তাকায় সে। বয়স্ক লোকটার গড়ন মোটার দিকে হলেও চেহারা দেখে ভগ্নস্বাস্থ্য মনে হচ্ছে। হাত কাঁপছে। আহা কি বলবে সে? কাকে বলবে? রাতের পর রাত জেগে ডিউটি করে বেচারা নিজেই ভীষণ ক্লান্ত। শরীর ঘুম চাইছে কিন্তু তা বলে পার পাওয়া যায় না। উপর মহলের চাপ নিয়ে  সারারাত ঘুমোনোর যো আছে? সারা রাত ওরা পাহারা দেয় যাতে নাগরিকরা শান্তিতে ঘুমোতে পারে। আজ লোকটাকে দেখে মায়া হয় তার। আহা বেচারা। হয়তো প্রেসার রুগি। হয়তো  ডাক্তার বারণ করেছেন উত্তেজনা থেকে দুরে থাকতে। পুলিশের চাকরিতে সেটা থাকবে না তা কি হয়? সকাল সকাল ওরকম বডি দেখে সামলাতে পারেনি। তাই হয়তো…।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রণি। তারপর নরমগলায় বলে, “সরি আমি সেভাবে মিন করতে চাইনি। আসলে মাথাটা হুট করে গরম হয়ে গেল। আমি জানি আপনার অসহায়তা কোথায় কিন্তু আমাদের অবস্থাটাও বুঝুন। একটা খুনি রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে,  একের পর এক নৃশংসভাবে খুন করছে। আমরা তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না! আজ যদি একটু আপনি মনে করতে পারতেন তাহলে হয়তো তদন্তটা অনেক এগিয়ে যেত। এখন অন্ধকারে আমাদের খড়ের গাদায় সুঁচ খুঁজতে হবে। এই খুনিটা আমাদের প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করছে। আমরা পুলিশরা কি পারবো না একে হারিয়ে দিতে?  অবশ্যই পারবো বলুন। আমরা পুলিশ অত সহজে হার মানা আমাদের সাজে না। ওকে হারাবোই আমরা। ও ব্যাটা জানে না আমরা পুলিশরা সকলে যদি একসাথে ওর পেছনে পড়ি ও আর পালাবার পথ পাবে না। যাক গে সে সব কথা। আগে আপনি সুস্থ হন। কদিন ছুটি নিন। আর দেহের যত্ন নিন।” বলে এগিয়ে যায় রণি।

রণি থানার চৌকাঠ পেরবে এমন সময় কনস্টেবলটা বলে ওঠে, “স্যার দাঁড়ান!  আমার মনে পড়ে গেছে। ওটা হলুদ ট্যাক্সিই ছিল। এক ঝলক দেখায় যতদুর মনে হয় নম্বরটা ছিল…।” রণি মাথা নিচু করে হাসে। প্রত্যেকবার এই ভোকাল টনিকটা দারুন কাজে দেয় তার। সে চোর ডাকাত হোক বা পুলিশ । একটু সেন্টু দিলেই কার্যসিদ্ধি। সে পিছন ফিরে তাকায়।

******
বাড়ির ছাদে বানানো জিমে বসে আছে রণি।  মুঠো দুটো রক্তাক্ত।চোয়াল ক্রমশ শক্ত হয়ে আসছে তার। আজ সারা দিন ব্যর্থ। না জানা গেছে মৃতের পরিচয়। না পাওয়া গেছে ট্যাক্সির খোঁজ। আজ সকালে সেই কনস্টেবল এর তথ্য অনুযায়ী খোঁজ করে শুধু জানা গেছে এই নম্বরের ট্যাক্সির নাকি দুদিন ধরে খোঁজ নেই। সেই ট্যাক্সি ড্রাইভারের রিপোর্টও পড়েছে সে। তার মত অনুযায়ী গত পরশু রাত দশটার দিকে এক বৃদ্ধ শিয়ালদা স্টেশন থেকে ট্যাক্সিতে ওঠেন। গন্তব্য বলেন আলিপুর। অতো রাতে প্যাসেঞ্জার পেয়ে একটু বেশীই ভাড়া হেকেছিল সে। বৃদ্ধ প্রথমে আপত্তি করলেও পড়ে রাজি হন।

এসপ্ল্যানেড পার হবার পর ড্রাইভারের হঠাৎ ঘাড়ে মৃদু সুঁচ ফোটার অনুভুতি হয়।  ধীরে ধীরে তার চোখ জড়িয়ে আসে ঘুমে। তারপর আর তার কিছু মনে নেই। ঘুম ভাঙলে সে নিজেকে হাসপাতালে আবিস্কার করে। শুধু তাই নয়। সে দেখে কে যেন তার পরনের উর্দির জায়গায় ধুতি পাঞ্জাবী পরিয়ে দিয়েছে ডাক্তারের কাছে সে জানতে পারে তাকে অচৈতন্য অবস্থায় একজন মধ্য বয়স্ক ট্যাক্সিচালক হাসপাতালে ভর্তি করে গেছে।

এই সুত্র ধরে স্টেশন আর হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজও চেক করেছে রণি। কিন্তু কোথাও কোনো সুত্র পায় নি। লোকটা যেন এইসব সিসিটিভির ফাঁক গুলো জানতো। একটাতেও তার চেহারা দেখতে পায় নি সে। কখনো মাথা নামিয়ে কখনো একপাশের প্রোফাইল আংশিক দেখিয়েই চলে গেছে সে। সেই জায়গা গুলো পজ করে দেখেছে রণি। লোকটা মৃদু হাসছে। যেন বিদ্রুপ করে বলছে, “কিহে পুলিশ! ধরতে পারলে আমায়? পারবে না সে ক্ষমতাই নেই তোমার।”

রাগে সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে রণির। আজকে ডিসি হোমিসাইড ডেকে পাঠিয়েছিলেন। রুমে ঢুকে দেখে ডিসি ডিডিও বসে আছেন। তারপর যা হয় দুজনে মিলে যা নয় তা বললেন তাকে। মুখ বুঁজে সব সহ্য করে বেরিয়ে এসেছিল সে। নিজের রুমে বসে ভাবছিল এরপর কি করবে এমন সময় রাজীব ওর রুমে ঢুকে কিডন্যাপিং এর লিস্টটা দেয়। সাথে পিএম রিপোর্টটাও দেয়।দুটো পড়ে মাথা ভোঁভোঁ করে ওঠে তার। রিপোর্টে বলছে ভিক্টিমকে অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হয়েছিল। আর চামড়াটা মৃত্যুর পরেই ছাড়ানো হয়। মৃত্যুর কারন Execution। মানে মাথাটা কেটে ফেলার পরেই মৃত্যু। মিসিং লিস্ট মিলিয়ে দেখে সে।মিসিং পারসনদের মধ্যে টোটাল বাহাত্তর জন অ্যান্টিসোশ্যাল মিসিং। এ যেন খড়ের গাঁদায় সুঁচ খোজা।

রণি তাও এই মিসিং পার্সনদের ডিটেল বের করতে বলে। কে কিরকম? কোথায় থাকতো?  কি খেত?  কার সাথে শুতো এমনকি মিসিং হবার আগে কোথায় গিয়েছিল সব। রাজীব মাথা নেড়ে বেড়িয়ে যায়।

দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ায় রণি। আজ নিজের ব্যর্থতার উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার। এই রাগের আস্ফালন করছে সে জিমে। জিমঅন্তপ্রাণ রণি আগে কলেজে পড়াকালিন নিয়মিত জিম করতো। চাকরি পাওয়ার পর সময় হতো না বলে সে জিমের কিছু সরঞ্জাম এনে ছাদেই বানিয়েছিল জিম। ডিউটির পর সময় পেলেই জিম করতো সে। তারাপীঠের ঘটনাটার পর ছমাস জিম করেনি। ব্যাপারটা অনভ্যেসের পর্যায় চলে যাওয়ায় একমাস হলো আবার শরীরচর্চা শুরু করেছে।

পাঞ্চিং ব্যাগটার সামনে এসে দাঁড়ায় রণি। হাতের ব্যান্ডেজগুলো শক্ত করে বেঁধে নেয় আবার। সাদা পাঞ্চিং ব্যাগে জায়গায় জায়গায় লাল মুঠোর ছাপ। এই মুহুর্তে রণির ইচ্ছে করছে  পাঞ্চিংব্যাগের বালির পরিবর্তে খুনিটাকে  ভরে ঘুষি মারতে। একবার যদি লোকটাকে হাতের কাছে পেত ভাবতে ভাবতে পাঞ্চিংব্যাগে ঘুষি মারে সে। বাতাসে মৃদু ধপ করে শব্দ হয়। শব্দটা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তারপর একটা ছন্দবদ্ধ সৈনিকের দ্রত পদধ্বনির মতো শোনায়। দুটো হাতের ব্যান্ডেজ আবার রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। রণির তাতে কোনো বিকার নেই। যন্ত্রের মতো সে ঘুষি মেরেই চলেছে। রণির সমস্ত ক্ষোভ,  সমস্ত আক্রোশ যেন জমা হয়েছে ওর দুই মুঠোয়। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে তার। শরীরের গতিবেগের সাথে হাওয়ায় দুলে উঠছে ওর পৈতে। পেশিবহুল শরীরে ঘাম ঝড়ছে। যেত এক অশান্ত দানব ভর করেছে তার মধ্যে। দাঁতে দাঁত চেপে নির্মমভাবে পাঞ্চিংব্যাগে ঘুষি মেরেই চলেছে সে। ঘুষির অভিঘাতে পাঞ্চিংব্যাগের ভেতরে বালি চলকে উঠছে।

পাঞ্চিংব্যাগে ঘুষি মারতে মারতে আচমকা রণি শুনতে পেল ফোনের আওয়াজ। কেউ হয়তো কল করেছে। করুক গে আজ কারো কথা শুনবে না সে। ভেবে আরো জোরে ঘুষি মারতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আবার ফোনটা বেঁজে ওঠে। বিরক্ত হয়ে থামে রণি।

এগিয়ে এসে দেখে ব্যোমকেশ কল করেছে। আজ রবিবার। হয়তো আড্ডায় আসার জন্য। মনে মনে খিস্তি দেয় রণি। চুলোয় যাক সব কটা! ও মরছে নিজের জ্বালায় আর এরা মজা আনন্দে কাটাচ্ছে। কল কেটে দিতে গিয়েও রিসিভ করে রণি। ওপাশে মৃদুমন্দ্রস্বরে ব্যোমকেশ বলে ওঠে, “দুঃখিত তোমাকে বিরক্ত করার জন্য। কিন্তু একটা জিনিস না বললেই নয়। একটা অপরাধীর প্রতি যে রাগটা জমাচ্ছো সেটাকে এভাবে একটা পাঞ্চিংব্যাগে নষ্ট করে কি লাভ বলতে পারো? ”

রণি চমকে ওঠে! এই লোকটা কি থট রিডিংএর সাথে সাথে বাড়িতে বসে সব দেখতে পায় নাকি? ঢোক গিলে বলে, “তুমি কি করে জানলে আমি এই মুহুর্তে পাঞ্চিংব্যাগে পাঞ্চিং করছি? ” ব্যোমকেশ হেসে বলে, “সেটা বড়ো কথা নয়। তোমার কেসের কথা নিয়ে কদিন ভাবছিলাম। একটা আলো পেয়েছি। সেটা নিয়ে ভাবলাম তোমায় ফোন করে বলি কোথাও দেখা করতে। দেখলাম তুমি ফোনই তুলছো না। অগত্যা চলে এলাম সোজা। এসে দেখি বাতাসে ধুপধুপ শব্দ হচ্ছে তাই তোমার মনের কথা আঁচ করেই বললাম কথাটা।”

রণি ছাদের রেলিং এ এসে দেখে নিচে আমরা দাঁড়িয়ে। ফোনে বলে, “কি কান্ড!  একবার বলবে তো?  দাঁড়াও আসছি।” বলে চলে যায়। কিছুক্ষন পর সদর দরজা খোলে রণি। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “হারামজাদা এতদিনে এইবাড়ির কথা মনে পড়লো? ব্যোমকেশ এসো। গরিবের ঘরে স্বাগত।” আমি ফিসফিস করে বললাম, “চারতলা বাড়ি যদি গরিবের ঘর হয় তাহলে আমরা কি ঝুপড়িতে থাকি? ”

রণি শুনতে পেয়ে কি যেন বলতে যাচ্ছিল। ব্যোমকেশ কথা ঘুড়িয়ে বললো, “ওসব পরে হবেক্ষন আগে ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর এগুলোর সদগতি হবে।দেখে তো মনে হচ্ছে। অফিস থেকে বাড়ি ফিরেই নেমে পড়েছো শরীর চর্চায়।” বলে হাতে ধরা প্যাকড সিঙ্গারার ঠোঙাটা দেখায় ব্যোমকেশ। রণি হেসে বলে, “তা বলতে পারো। একমিনিট তোমরা বসো আমি একটু আসছি।”

******

আমরা এখন বসে আছি রণির বাড়ির ড্রইংরুমে। একাই থাকে ও এই বাড়িতে । প্রায় অনেক বছর পর এলাম এই বাড়িতে। শেষবার যখন এসেছিলাম তখনও কাকু কাকিমা বেঁচেছিলেন।

সেন্টার টেবিলে রাখা ঠোঙাটা খালি এখন। অ্যাশট্রে তে ছাই ফেলে গাঁজার সিগারেটে একটান দিলো ব্যোমকেশ। রণি পাশে বসে কফিমাগে চুমুক দিয়ে বললো, “বুঝতেই পারছো ব্যোমকেশ এই নিয়ে দু মাসে কলকাতার পর পর ষোল জন খুন হলো। মিডিয়া আর উপরমহল থেকে যে কি হারে চাপ আসছে আমিই জানি। উই নিড টু স্টপ দিস কিলার রাইট নাও। একের পর এক লোক নিঁখোজ হয়ে খুন হচ্ছে। আর মাথা কাটা অবস্থায় ডেডবডি পাওয়া যাচ্ছে। কারও আবার মাথা সমেত বডি পাওয়া গেলেও এমন অবস্থা করছে যে…!  জাস্ট হরিবল!  এই প্রথমবার কোনো কেসের  মাথামুন্ড বুঝতে পাচ্ছি না। মার্ডারার কে সেটা বড়োকথা নয়। খুনের মোটিভ কি? খুনই যদি করতে হয় এভাবে কেন? সারা শরীরে সিঁদুর, তেল আর কর্পুর মাখা। ? সব গুলিয়ে যাচ্ছে।”  রণিকে বেশ ক্লান্ত লাগলো।

ব্যোমকেশ সিগারেটে শেষটান দিয়ে সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে বললো, “সিপি তো দেখলাম অম্লানবদনে বললেন এ কোনো উগ্রপন্থি বা সেরকম গ্রুপেরই কাজ।” রণি হেসে বলে, “এছাড়া উপায় কি ছিল বলো? পাবলিকের মধ্যে প্যানিক ছড়িয়ে দিয়ে কি লাভ? তাছাড়া এভাবে কতদিন পাবলিককে সাসপেন্সে রাখা যায়? একজন খুনি রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে কিরকম দেখতে জানি না। সে কিরে করছে জানি না। এই অন্ধকারে হাতড়ানোর কথা পাবলিক জানলে কি হবে ভেবে দেখেছ? তাই একাজ করতে বাধ্য হলেন তিনি। অবশ্য এরকম কেস আগে কেউ দেখেনি।”

“তাই কি? ”ব্যোমকেশ সোজাসুজি তাকালো রণির দিকে। তারপর সোফায় হেলান দিয়ে বলতে লাগলো, “এই যে তুমি বলছো এরকম কেস আগে কেউ দেখেনি তা নয়। বেশীদিন না মাত্র প্রায় দেড়শো বছর আগের ঘটনা ইংল্যান্ডে এরকমই একটা ঘটনা ঘটেছিল। তোমরা নিজেদের যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সাথে তুলনা করো সেই স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকেও রীতিমতো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিল সে। সে ছিল ১৮৮৮ সালে লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল জেলার আশেপাশের এবং দারিদ্র্যের দারিদ্র্যপুর্ণ অঞ্চলে সক্রিয় একটি অজ্ঞাত সিরিয়াল কিলার । ফৌজদারী মামলার ফাইল এবং সমসাময়িক সাংবাদিকতার বিবরণী উভয় ক্ষেত্রেই এই হত্যাকারীকে হোয়াইট চ্যাপেল মার্ডারার বা লেদার অ্যাপ্রন বলা হত। বুঝতে পারছো কার কথা বলছি? ” রণি রীতিমতো টানটান হয়ে বসেছে। আমি মৃদু গলায় বললাম, “ জ্যাক দ্য রিপার কি? ”

ব্যোমকেশ মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। “এর শিকার  সাধারণত সেইসব মহিলারা ছিল। যারা পেশায়  পতিতাবৃত্তি অবলম্বন করেছিল। এর পদ্ধতিখানাও ছিল তোমার এই খুনির মতো। গলায় পেটে গভীর ক্ষত। অন্তত তিনটে মৃতদেহ পরীক্ষা করে ডাক্তাররা একটা কথায় সহমত হয়েছিলেন যে হত্যাকারী শারীরবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী।”

“১৮৮৮ থেকে ১৮৯৯ সালের মধ্যে হোয়াইটচ্যাপেল এবং স্পিটালফিল্ডে সংঘটিত এগারো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এই পুলিশি তদন্ত ১৮৮৮ সালের হত্যার সাথে সমস্ত হত্যাকাণ্ডকে একত্রে সংযুক্ত করতে পারত না। যদি না এই পাঁচটা খুন ওদের সামনে আসতো। এই পাঁচজন মৃতারা ছিলো মেরী অ্যান নিকোলস , অ্যানি চ্যাপম্যান , এলিজাবেথ স্ট্রাইড , ক্যাথরিন এডোয়েস এবং মেরি জেন ​​কেলি। এরা “ক্যানোনিকাল ফাইভ” হিসাবে পরিচিত এবং এদের খুনগুলি ৩১ ই আগস্ট থেকে ৯ই নভেম্বর ১৮৮৮ এর মধ্যে প্রায়শই সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বলে মনে করা হয়।”

বলে আবার একটা সিগারেট ধরালো ব্যোমকেশ। একটা লম্বাটান মেরে বললো, “১৮ এপ্রিল ১৮৮৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৯১ সাল পর্যন্ত এগারোটি পৃথক খুনকে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ সার্ভিসের তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং যৌথভাবে পুলিশ ডকেটে এটা “ হোয়াইটচাপেল হত্যাকাণ্ড ” নামে পরিচিত ছিল ।  এই হত্যাকাণ্ডগুলি একই অপরাধীর সাথে যুক্ত হওয়া উচিত কিনা সে সম্পর্কে মতামতগুলি ভিন্ন, তবে এগারো হোয়াইটচ্যাপেল হত্যার মধ্যে পাঁচটি, “ক্যানোনিকাল ফাইভ” নামে পরিচিত, আর এটা নিশ্চিতভাবে জ্যাক রিপারের কাজ বলেই ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়।  বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা মৃতদেহগুলিতে গভীর ক্ষত পেয়েছেন তলপেট কেটে অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির মানে অন্ত্র, লিভার, কিডনি কেটে নেওয়া হয়েছে। আর এটাই ছিল জ্যাকের স্টাইল।  হোয়াইটচ্যাপেল হত্যার ফাইলের প্রথম দুটি মামলা, এমা এলিজাবেথ স্মিথ এবং মার্থা তাব্রামের অবশ্য এই পাঁচটি খুনের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।”

“শুধু জ্যাক দ্য রিপারই কেন? এই পঞ্চাশবছর আগেও এরকম এক খুনির নাম জানা যায়। জোডিয়াক কিলার বলে সেইজন ১৯৬০ সালের পর থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় মানুষ খুন করেছে। এখন পর্যন্ত এই খুনির পরিচয় জানা যায়নি। জোডিয়াক  ১৯৬৮ এর ডিসেম্বর ও  ১৯৬৯ সালের অক্টোবরের মধ্যে বেনিসিয়া, ভ্যালিযু, লেক ব্যারিসা এবং সান ফ্রান্সিসকোতে সক্রিয় ছিল। সে ১৬ থেকে ২৯ বছর বয়সের মধ্যে চারজন পুরুষ ও তিনজন নারীকে হত্যার জন্য টার্গেট করেছিলো। এর স্টাইল আবার এককাঠি উপরে। প্রত্যেক হত্যার পর জোডিয়াক নিজের নামে স্থানীয় পুলিশ ও সংবাদসংস্থাকে জানিয়ে একটি চিঠি দিতো । এসব চিঠিতে চারটি সাংকেতিক ভাষার শব্দ ছিল যার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সমাধান করা হয়েছে। এছাড়া খাস কলকাতার স্টোনম্যান, ইংরেজ আমলে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের ত্রৈলক্য অনেক উদাহরন আছে।”

বলে সিগারেটের ছাই অ্যাশট্রে তে ফেলে ব্যোমকেশ বলল, “তবে এই সব কেসের সাথে তোমার কেসেও একটা প্যাটার্ন খুঁজে পেয়েছি জানো?  মনে আছে সেদিন তোমায় ফোন করে মৃতদের নিখোঁজ হবার তারিখ গুলো জানতে চেয়েছিলাম? সেই তারিখগুলো মিলিয়ে একটা অদ্ভুত মিল পেয়েছি। কাকতালীয়ভাবে সকল মৃতদেহের যেমন একইরকম ক্ষতবিক্ষত অবস্থা,  ঠিক তেমনি সবকটা নিখোঁজও হয়েছে ঠিক অমাবস্যার দিন। আর যাদের মৃতদেহ অক্ষত মানে ধরমুন্ডসমেত উদ্ধার হচ্ছে তারাও অমাবস্যাতে নিখোঁজ হলেও সেই অমাবস্যা ছিল বিশেষ তিথি সম্পন্ন। আর এই জায়গাটাই ভাবাচ্ছে আমায়।” বলে উঠে দাঁড়ায় ব্যোমকেশ।

পায়চারি করতে করতে বলে, “মৃতদেহগুলোর অবস্থা দেখে বোঝা যায় এদের মারার আগে বিশেষভাবে পুজো করা হয়েছে।  তোমার মুখে মৃতদেহের বর্ণনা শুনে যে পুজো পদ্ধতিটা আঁচ করেছি তা মোটেও তন্ত্র সম্মত নয়। তবে কেন এই পুজো? কারন কি এই পুজোর? কেনই বা আততায়ী অমাবস্যার দিনটাই বেছে নিচ্ছে? কেনই বা বেছে নিচ্ছে সেই সব মানুষকে যারা হোক বা দুষ্কৃতি কিন্তু প্রত্যেকেই ব্রাহ্মণ বংশজাত। না না একোনো সাধারণ মানুষ নয়। এ ভীষণ প্রখরবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। এ কোনো উগ্রপন্থি বা হিন্দুবিদ্বেষীর কাজ নয়। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো এই পুজো পদ্ধতিগুলো ভীষণ চেনা লাগছে । কিন্তু মনে করতে পারছি না।”

বলে মুখে বিরক্তিসুচক শব্দ করে বসলো ব্যোমকেশ। “আরো বড়ো সমস্যা হলো এটা তোমাদের লালবাজারের কেস। এতে ততক্ষন আমার এক্তিয়ার নেই যতক্ষন না উপরমহল থেকে অনুমতি পাচ্ছি। তবে আমার গাট ফিলিং কি বলে জানো? ” বলে চুপ করে ব্যোমকেশ।  থমথমে মুখে একটু গম্ভীর গলায় বলে, “এটাই শুরু নয় আর এই খুনের ধারাবাহিকতা এখনই শেষ হবার নয়। এই মারণখেলা আরো চলবে।”

ব্যোমকেশ আরো কিছু বলতো এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। “এখন আবার কে এলো? ” বলে রণি উঠে গেল দরজা খুলতে। ব্যোমকেশ তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইলো অ্যাশট্রের দিকে। অ্যাশট্রেতে রাখা ফুরিয়ে যাওয়া সিগারেট থেকে তখনো হাল্কা ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি ওর মনে এখন ভীষন একটা ঝড় চলছে। ধীরে ধীরে আত্মমগ্ন হয়ে একটা গভীর চিন্তায় ঢুকে পড়ছে সে।

এমন সময় রণি হাতে একটা ফাইল নিয়ে কার সাথে কথা বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো। দেখলাম রণির পেছন পেছন একজন অল্প বয়স্ক অফিসার ঢুকলো। বয়স ঐ পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। মানে আমাদেরই বয়সি । গায়ের রং একসময় ফরসা ছিল হয়তো এখন তামাটে। গড়ন রণির মতো নয় বরং ছিপছিপে তবে একেবারে রোগাও নয়। ছেলেটা আমাদের দেখে থমকে গেলো প্রথমে। তা দেখে রণি বললো, “আরে রাজীব দাঁড়িয়ে রইলে কেন?  ভেতরে এসো।” বলে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, “এই হলো রাজীব যার কথা বলেছিলাম। আর রাজীব,  ও হলো আমার বন্ধু নীলার্ক। আর ওকে হয়তো চেন না তবে নাম শুনে থাকবে। ও ব্যোমকেশ। ব্যোমকেশ মিত্র।”

ছেলেটার চোখ বড়ো হয়ে গেল উত্তেজনায়।  এগিয়ে এসে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললো, “আপনিই ব্যোমকেশ বাবু! আপনার গল্প ‘প্রতিঘাত’ আমি তো পড়েছি ফেসবুকে! ঐ তন্নিষ্ঠর কেসটা যেভাবে আপনি সলভ করলেন তা সত্যিই তারিফযোগ্য!” রণি ফ্যাচ করে হেসে চুপ করে গেল।আর  ব্যোমকেশ দেখলাম আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে নমস্কার করে বললো, “ধন্যবাদটা আমার নয় এনার প্রাপ্য। ইনিই লিখেছেন গল্পটা।” তারপর ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “ও তাই তো তাই তো!  আপনিই তো নীলার্ক মুখার্জী! আমি আপনার গুণমুগ্ধ পাঠকদের একজন। বেড়ে লিখেছেন মশাই। একমিনিট একটা সেলফি নিতে পারি কি?” বলে পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করলো রাজীব।
এই সেলফি ব্যাপারটায় ব্যোমকেশের কোনো ইচ্ছে নেই দেখে অগত্যা আমাকে এগিয়ে আসতে হলো। সেলফি পর্ব মেটার পর ছেলেটা বললো, “এখানে আসার পর রণবিজয় স্যার কে দেখে মনে হতো নামের সাথে সাথে এনার চরিত্র তো পুরো আপনার গল্পের রণির মতো। কে জানতো মানুষটাই সত্যি? তারপর এখানে হঠাৎ করে আপনাদের… মানে…আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না।”

রণি এবার বিরক্ত হয়ে বললো, “আহ রাজীব হচ্ছেটা কি? বি সিরিয়াস! এখনও তুমি অন ডিউটি আছো।” রাজীব এবার সম্বিত ফিরে পায়। কোনোমতে নিজেকে সামলে বলে, “সরি আসলে একটু এক্সাইটমেন্টের চোটে…।” আমি হেসে বলি, “আহা ঠিক আছে কোনো ব্যাপার না আমি বুঝতে পারছি। বসুন আপনি।” ছেলেটা আমাদের উল্টোদিকের সোফায় বসে।  রণি আমার পাশে বসে ফাইলটা খুলে চোখ বোলালো। তারপর একজায়গায় দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো, “স্ট্রেঞ্জ! ভিক্টিমকে অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হয়েছিল?” 



রাজীব মাথা নেড়ে বললো, “ফরেন্সিকের ডাক্তার তো তাই বললেন। যে দিয়েছে সে এই ওষুধটার ব্যবহার জানে। মানে ভিক্টিমের হুঁশ পুরোমাত্রায় থাকলেও সারা শরীর অবশ ছিল। মানে নিজেকে বাঁচানোর ক্ষমতাটুকু ছিল না।”
“মানে যখন খুনটা হয় ভিক্টিমের পুরোপুরি হুঁশ ছিল।”

রাজীব মাথা নাড়ে। রনি এবার রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে দেখে বলে “হুম ডেথটাইমদেখাচ্ছে রাত দেড়টা। ওকে থ্যাঙ্ক ইউ রাজীব। বসো,  চাখেয়েযাও। ” বলে রান্নাঘরের দিকে এগোয়।
রণি রান্নাঘরে যাবার পর রাজীব আমাদের দিকে ফিরে বললো, “তা ব্যোমকেশবাবু হাতে কোনো কেস আছে নাকি এখন?” ব্যোমকেশ মাথা নাড়ে। রাজীব হাত কচলে বলে, “বুঝতেই পারছেন ভীষণ পিকিউলিয়ার কেস।স্যার বলেছেন বোধহয়।তা তেমন হলে আপনার সাহায্য লাগতে পারে।”

ব্যোমকেশ হেসে বলে, “সে আর বলতে হবে না। রণবিজয় ইতিমধ্যেই আমাকেসবটা বলেছে। তেমন দরকার হলে পাশে থাকবো।”রাজীব আশ্বস্ত হয়। রণি আরেকপ্রস্থ চা নিয়ে আসে।  চা খেতে খেতে ব্যোমকেশ বলে, “তবে একটা কাজ করলে আমার একটা উপকার হতো রাজীববাবু।” চায়ে চুমুক দিয়ে রাজীব বলে, “বলুন কি কাজ।” ব্যোমকেশ চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বলে, “গত তিরিশ বছরে কলকাতা আর ওর আশেপাশের অঞ্চলে এরকম কোনো কেস যা অমীমাংসিত ছিল। মানে সেম এই পদ্ধতিতে খুনের কেস আছে কিনা। কাইন্ডলি একটু দেখবেন? আমি জানি এই তিরিশবছরে অনেক অপরাধ ঘটেছে। সেই সব ফাইল খুঁজে আনা অসম্ভব। তবে স্পেসিফিক কিছু মানে এই খুনগুলোর মতো কেস হলে সেটার ফাইল একটু আনতে পারবেন? ”

রাজীব চিন্তিত গলায় বলে, “এটা একটু প্রবলেম হবে কারন এরকম কেস খুঁজতে সময় লাগবে। কেন বলুন তো? আপনি কিছু হিন্ট পেয়েছেন নাকি?”

ব্যোমকেশ যেন নিজেকে গুটিয়ে নিলো।“না না তেমন কিছু না। আসলে তন্ত্র বনাম কুসংস্কার নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখছি। সেটার জন্যই একটু পড়াশোনা দরকার ছিলো। বুঝতেই পারছেন অফুরন্ত সময়। তাই…।” ব্যোমকেশ হঠাৎ এই মিথ্যেটা কেন বললো বুঝতে পারলাম না। কোন প্রবন্ধ? কবে লিখলো?

রাজীব মাথা নেড়ে বললো, “ঠিক আছে। আমি দেখছি আর…।” রাজীবকে থামতে হলো কারন ওর ফোন বেঁজে উঠেছে। চায়ের কাপটা রেখে ও ফোনটা রিসিভ করলো।

“হ্যালো।”

“হুম বলছি।”

কিছুক্ষন পর আচমকা চিৎকার করে উঠলো রাজীব, “কি?  ”

চিৎকারটা এতটাই জোরে ছিল যে চমকে উঠলাম আমি। আর আমার হাতে ধরা চায়ের কাপ থেকে চা চলকে পড়লো প্লেটে। বেশ কিছুক্ষন পর ফোনটা কেটে রণির দিকে তাকিয়ে বললো, “এই মাত্র হাজরা ফোন করেছিল স্যার।মিসিং লিস্ট অনুযায়ী টিটাগড়ের একজন মিসিং পার্সন ছিলো কানাই ঘোষাল। একটু আগে সন্ধ্যের দিকে একজন এসে কানাই ঘোষালের বাড়িতে গিয়ে কানাই ঘোষালের খোঁজ করে। বাড়িতে কানাই ঘোষালের স্ত্রী আর মা থাকেন। ডাক শুনে কানাই ঘোষালের স্ত্রী বেরিয়ে আসেন। লোকটা জিজ্ঞাসা করলে জানান যে কানাই ঘোষাল একটা কাজে দুদিনের জন্য দিল্লী গেছে। লোকটা সব শুনে বলে যে একটা পার্সেল কানাইয়ের জন্য এসেছে। যদি কানাই থাকতো তো ভালো হতো।সবটা শুনে কানাই ঘোষালের স্ত্রী পার্সেলটা রিসিভ করেন। তারপর বারান্দায় এসে পার্সেলটা খুলে দেখেন।পার্সেলের ভেতর একগাদা জবাফুলের সাথে কানাই ঘোষালের কাটা মাথা পাওয়া গেছে স্যার! তখন অন্ধকার হয়ে আসছিলো বলে মিসেস ঘোষাল বুঝতে পারেন নি লোকটা কে ছিল। টিটাগড়ে এই মুহুর্তে পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ স্যার। কানাই ঘোষালের দলের লোকেরা ভীষন ক্ষেপে আছে।যে কোনো মুহুর্তে খুনোখুনি হতে পারে।”

রণি স্তম্ভিত হয়ে যায় তারপর লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “মাই গড! হা করে বসে দেখছো কি ? লোকাল থানার সমস্ত ফোর্স পাঠাতে বলো। আমাদের ইমিডিয়েটলি বেরোতে হবে।” বলে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, “ব্যোমকেশ বুঝতেই পারছো। একটা ভীষণ এমার্জেন্সী পড়ে গেছে বলে যেতে হচ্ছে।তো সরি টু সে তোমাদের আজ একটু উঠতে হবে। ভাবলাম আজ এখান থেকে বালুর বাড়িতে গিয়ে বেশ একটা আড্ডা দেবো তার জায়গায়। তবে তোমাদের মোড়ে নামিয়ে দিচ্ছি ট্যাক্সি-বাস পেতে অসুবিধা হবে না।”

ব্যোমকেশ উঠে অবাক গলায়  বলে, “একমিনিট!  একমিনিট!  কানাই ঘোষালের দলের লোক মানে? কে এই কানাই ঘোষাল? যার মৃত্যুতে বিক্ষোভকারিদের সামলাতে এত পুলিশ লাগবে? কোনোস্থানীয় রাজনৈতিক লিডার গোছের কেউ নাকি কোনো সেলিব্রিটি?”

রণি গম্ভীর গলায় বলে “সেলিব্রিটিই বটে।টিটাগড়ে শুধু টিটাগড় কেন গোটা নর্থ কলকাতা ওকে একডাকে চেনে।একমিনিট তোমরা দাঁড়াওআমি রেডি হয়ে আসছি।” বলে নিজের বেডরুমে ঢোকে রণি।

আমরা হতভম্ব হয়ে রাজীবের দিকে তাকালে সে মাথা নেড়েঢোক গিলে বলে,“না ও কোনো সেলিব্রিটি নয়। একজন মাস্তান কামসামনের ইলেকশনে রুলিং পার্টির মনোনীত প্রার্থী। এলাকায় মারাত্মক ভয়ংকর দুষ্কৃতি হিসেবে পরিচিত।এলাকার লোকে ওকে ডাকে কষাই ঘোষাল বলে।ও হলো টিটাগড়ের কানাই ঘোষাল। প্রে করুন খুনিকেযাতে খুঁজে পাই নাহলে টিটাগড়ের সাথে সাথে পুরো নর্থ কলকাতা জ্বলে উঠবেওর দলের লোকের জন্য।”

(চলবে…)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...