অনুসরণকারী

বুধবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ অষ্টম পর্ব



সুজাতা চুপ করে বসে বসে বনের পাখিদের ডাক শুনতে থাকে। তথাগত বলে চলে,

- বন কেটে লোকালয় বাড়ানো, বারন থাকা সত্ত্বেও নিরীহ পশুগুলোকে শিকার করা। ইচ্ছে করে বনের জমি দখল করে চাষবাস করা। এরপরেও খবরে বলবে বনের পশু লোকালয় আসছে। মুর্খগুলো বোঝে না যে বনের পশুরা মোটেও লোকালয়ে আসছে না। ওরাই বনের পশুদের খাবারের ভান্ডার নষ্ট করে ওদের এলাকায় থাকছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন বনের পশুরা তিলে তিলে শেষ হয়ে যাবে। মিউজিয়ামের একটা স্টাফড পুতুল হিসেবে থেকে যাবে ওদের দেহগুলো। লোকে জানবে ওরা বিলুপ্ত। 

বলার পর থামে তথাগত। তারপর বলে, “সেই তখন থেকে তো আমিই বলে যাচ্ছি। তুমি কিছু বলছো না কেন?” সুজাতা জলে পা ডুবিয়ে চোখ বুঁজে বসে ছিল। তথাগতর কথায় চোখ খোলে সে। তারপর বলে, “ কারন তুমিই তো বলেছ বনের শব্দ শোনার সময় কথা বলতে নেই। চুপ করে শুনে যেতে‌ হয়। তাই করছি। চোখ বুঁজে জলের কলকল শব্দের সাথে সামনের পাহাড়ের কথা শুনছি।”

- বটে? তা কি বলছে পাহাড়টা?

- বলছে, আমার বরটি বেশ! আমার চেয়ে বেশী ওকে ভালোবাসে। তবে বড্ড বকে যাতে আমাদের দুই সতীনের মধ্যে কথা না হয়।

হেসে ফেলে তথাগত, “সতীন! ভালো বলেছো তো! পাহাড়, জঙ্গল তোমার সতীন!"

- সতীনই তো! সারাদিন তো আমার কোনো খবরই নাও না। রাতটুকু আর এই ভোরের সময় বাদ দিলে তো সারাদিন ওর কাছেই থাকো। আমার কাছে থাকলেও সবসময় জঙ্গলের কথা, বন্যপ্রাণীর কথা, ওকে সতীন বলবো না তো কাকে বলব? তবে ভারী মিষ্টি সতীন। সারাদিন ভালোবাসার পর রাতটুকু আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়। যাতে ভালোবাসার ভাগ পেতে পারি। তবে ঐটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট জানো? কারন আমি জানি বন জঙ্গল তোমার কত কাছের। এখানকার জীবজন্তু, এমনকি গাছের পাতাটুকুও তোমার কত আপন। এর জন্য বিন্দুমাত্র রাগ বা হিংসে আমার হয় না, বরং গর্ব হয়। তাই তো রাত শেষে তোমাকে ফিরিয়ে দিই ওর কাছে।

তথাগত হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে সুজাতাকে। তারপর বলে, “এই জন্যই তো এতটা ভালোবাসি তোমাকে। কারন তুমি আমাকে যতটা বোঝো কেউ বোঝে না। জানো সু যখন দেখি বনের কোনো গাছ বিনা অনুমতিতে কেউ কেটে ফেলেছে, বা সামান্য দাঁত, চামড়ার লোভে নিরীহ পশুগুলোকে ওরকম নৃশংসভাবে মেরে ফেলতে দেখি ভীষণ কষ্ট হয়। একটা বুনো রাগ চেপে বসে মাথায়। কি দোষ ওদের বলো তো? বড়ো দাঁত, সুন্দর চামড়ার অধিকারী হওয়াটাই কি অপরাধ?আমার ইচ্ছে করে যারা এসব করছে তাদের উচিত শাস্তি দিই! কিন্তু পারি না। ধরা পড়বার আগেই ওরা বেড়িয়ে যায় পাকাল মাছের মতো। দিন শেষে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই তখন নিজেকে পরাজিত সৈনিক‌ মনে হয়। ইচ্ছে করে নিজেকে শেষ করে দিই। কিন্তু পারিনা কারন আমি চলে গেলে তোমার কি হবে ভেবে। তুমি বোঝো সেটা। তাই নিজে এগিয়ে এসে বাঁচাও আমায়। আশ্রয় দাও এই ভেঙে পড়া আমিকে।”

সুজাতা‌ চুপ করে বসে আছে দেখে তথাগত বোঝে এই সময় এই কথোপকথন সুজাতা পছন্দ করছে না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর তথাগত প্রসঙ্গ বদলে বলে,

- সু?

- হুম!

- আচ্ছা এতদিন তো আমার সাথে না জানি কত বনে ঘুরেছ। তা তোমার মতে বছরের কোন সময়টা বনের জন্য সেরা? মানে দৃষ্টিনন্দন? মানে সেই সময়টা বনে থাকলে মনে হয় থেকেই যাই এখানে সারা জীবন। বছরের কোন সময় এরকম মনে হয়?

উত্তরটা নিতে একটু সময় নেয় সুজাতা। বিগত পাঁচ বছরে তথাগতর সাথে ঘুরতে ঘুরতে অভ্যেস হয়ে গেছে তার। বা বলা ভালো বনের নেশা ধরিয়ে দিয়েছে তথাগত। নিজের অজান্তে কখন যে সে নিজেও বনকে ভালোবাসতে শুরু করেছে সে নিজেও জানতে পারে নি।

চোখ বুঁজে বনের শব্দ শুনতে শুনতে তথাগতর কাঁধে মাথা রেখে সুজাতা বলে, “ বছরের একটা সময় বললে বলা মুশকিল। সারা বছরে যদি বল তাহলে বলবো চারটে সময়ের কথা যখন বনের কাছে এলে মনে হয় এখানেই থেকে যাই। আর সভ্য জগতে ফিরে কাজ নেই।”

- তাই নাকি? তা সময়গুলো কখন কখন শুনি?

- গ্রীষ্মের দুপুর শেষে বা ভোরের দিকে নদীর পাড়ে। পাতা ঝড়ার মরশুমের বা সকালবেলা, শিশির পড়ার সময়ের ভোর আর ...

- আর?

- এই বসন্তকালে নতুন পাতা গজানোর সময়টা। এই সময় বন বা প্রকৃতি নিজেকে যেমন সাজায় তেমনই একটা মিঠে জংলা গন্ধে ভরে ওঠে চারদিক। এই গন্ধটা খুব বিকট উগ্রও নয়। আবার হাল্কাও নয়। বরং একটা ঝিম ধরানো নেশাতুর গন্ধ। তবে এতে মহুয়ার মৌতাত নেই। বরং একটা বুকভরা শান্তির আশ্বাস আছে।


তথাগত অবাক হয়ে যায়। এভাবে তো সে কোনোদিনও ভেবে দেখেনি! রোজ বনের মধ্যে প্রতিটা মুহূর্ত কাটালেও, বনের শোভা সে উপভোগ করলেও এভাবে ঋতুকালীন সৌন্দর্য সে উপভোগ করেনি। সে অবাক হয়ে তাকায় সুজাতার দিকে। সুজাতা একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,“গন্ধটা টের পাচ্ছ?” 

একটা মিষ্টি অথচ জংলি গন্ধ তথাগতর নাকে ভেসে আসছিল, সে মাথা নাড়তেই সুজাতা বলে,“এই সেই বনের গন্ধ। আমরা যারা বনকে ভালোবাসি তারাই এই গন্ধটা পাই। বাইরের লোকেরা, যাদের উপর তোমার এত রাগ, যারা বনকে ভালোবাসে না, তারা কোনোদিনও এ গন্ধটা পাবে না।”

তথাগত চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পর সুজাতা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “চলো ফেরা যাক! ছটা বাজে।” তথাগত উঠে দাঁড়িয়ে একটা আড়মোড়া ভেঙে বলে, “চলো।" 
দুজনে মিলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ব্রিজে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাটতে থাকে তথাগতর কোয়ার্টারের দিকে।

*****

সূর্যের নরম আলো চোখের উপর পড়তেই সম্বিত ফেরে সুজাতার। চোখ মেলে তাকান তিনি। দেখেন সমগ্র নদী, নদীর দুই পার ভেসে যাচ্ছে সুর্যের আলোয়। প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা দেখে মৃদু হাসেন সুজাতা। তারপর ঝুকে দুহাতের আঁজলায় জল নিয়ে মুখের কাছে নিয়ে এনে বলেন,“ আমরা ভালো আছি তথা। সামনেই তোমার ছেলের বিয়ে। এতদিন আমি একজনের মা ছিলাম। এরপর থেকে দুজনের দায়িত্ব নিতে হবে। সব ঠিকঠাক চলছে। তোমাকে খুব মিস করছি। ইচ্ছে করছে তোমার কাছে ছুটে চলে যেতে। কিন্তু এদিকটা না সামলালে ছুটি নেই। এদিকটা গুছিয়ে নিই তারপর তোমার কাছে আসব। ততক্ষণ একটু অপেক্ষা করো লক্ষ্মীটি! ভালো থেকো।” বলে উঠে দাঁড়িয়ে সুর্যের দিকে তাকিয়ে তর্পণ করেন তিনি। তারপর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে যান উপরের দিকে।


*****

স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ফোনটা বেজে উঠতেই সেটা হাতে নিয়ে কলারের নাম দেখে মুচকি হাসল ঐশী। তারপর হেডফোন কানে লাগিয়ে কলটা রিসিভ করে চুপ করে বসল ড্রেসিং টেবিলের সামনে। ফোনের ওপাশে থাকা অভীক অধৈর্য গলায় বলল, “সেই কখন থেকে ফোন করে যাচ্ছি! তুলছিস না কেন? কোথায় আছিস তুই? কোন রাজকার্য করছিলি?” ঐশী জবাব দিল না। সে একমনে আয়নার সামনে বসে চিরুনি ‌দিয়ে চুল আঁচড়াতে ‌লাগল। আর শুনতে লাগল অভীকের বকবকম। সাধারণত বাস্তবে এর উল্টোটাই হামেশা দেখা যায় যেখানে প্রেমিকা কলকল করে কথা বলতে থাকে আর প্রেমিক একমনে কথা শোনে। ফোনালাপ রাতে হলে ঘুমিয়েও পড়ে। কিন্তু ঐশীদের ক্ষেত্রে অভীকই বেশী বকে ঐশী চুপ করে শোনে। আর মাঝে মাঝে অ্যাটেনডেন্সের জন্য ছোটোখাটো ‘ হুম!’ বলে কাজ চালিয়ে নেয়। তবে মাঝে মাঝে দুপক্ষের মধ্যে যে তর্কযুদ্ধ হয় না তা নয়। তবে তা সীমিত সময়ের জন্য। একটা সময়ের পরে দুজনেই কথা হারিয়ে চুপ করে বসে থাকে।  তবে আজ ঐশী আর রিস্ক নিল না। চুপ করে বসে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে শুনতে লাগল অভীকের বকবকম। আগে শুধু রাতে হোয়াটসঅ্যাপেই কথা চালাচালি, সারাদিনের রোজনামচা শোনানোতেই সীমাবদ্ধ ছিল দুজনের বার্তালাপ। ইদানীং সেটা বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে অভীকের সাহসও। আগে কালেভদ্রে একটা আধটা ফোন করতো। আজকাল ফোনই ছাড়তে চায় না। বিয়ের যতদিন এগিয়ে আসছে ততই ক্রমশ ফাজিল আর নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে। ঐশীর কোনো বাধা, কোনো বারন শুনছে না। এতে অবশ্য‌ ওর একার দোষ নেই, ঐশী নিজেও ওকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে। তাই ঐশী আজ অভীকের আর কোনো কথার জবাব দিচ্ছে না। কারন কথা বললেই হতভাগাটা বকবক শুরু করে দেবে। তারচেয়ে চুপ করে থাকাই ভালো। অন্যদিন ‌হলে সারারাত কথার চাষ হতো দুজনের মধ্যে। কিন্তু আজকে ঐশী আর চাইছে না কথা বাড়ুক। আজকের রাতটা ওর কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আজকের রাতটা সে একা নিজের সাথে কাটাতে চায়। নিজের মতো করে কাটাতে চায়। সে চায় না আজকের রাতটা কোনোভাবে নষ্ট হোক। কেউ তাকে বিরক্ত করুক। এমনিতেও ওর কাছে আজকের রাতটুকুই আছে। এমনিতেও কালকের পর থেকে ওর জীবন পুরোপুরি বদলে যাবে। তাই সে চুপ করে অভীকের কথা শুনছে আর মাঝে মাঝে‌ “হুম! হ্যা” বলে দায়সারা ভাবে উত্তর দিচ্ছে। সে জানে কোনো জবাব না পেলে অভীক একসময় ক্লান্ত হয়ে থেমে ফোন কেটে দেবে। 


হলোও তাই! টানা দশমিনিট বকবক করার পর একসময় ক্লান্ত হয়ে অভীক বলল,“ আচ্ছা এখন রাখছি। কাল তাহলে দেখা হচ্ছে কেমন?” ঐশী ফোনটা কেটে সুইচড অফ করে টেবিলে রেখে আয়নার দিকে তাকালো। তারপর উঠে গিয়ে ঘরের দরজাটা আটকে দিল। তারপর সন্তর্পণে আলমারির লকার খুলে বের করে আনল একটা ডাইরি। এই ডাইরিটা সে ক’দিন আগে বাপির স্টাডিরুমে একটা বই খুঁজতে গিয়ে পেয়েছিল। বেশ মোটা একটা ডাইরি। চামড়া দিয়ে বাঁধানো, সোনার জল করা একটা ডাইরি। পাতাগুলো বেশ মোটা আর দামী কাগজের হলেও যত্নের অভাবে হলদে হয়ে গেছে। তবে ভেতরের লেখা পড়া যায়। ডাইরিটা পাবার পর প্রথমে ঐশী বুঝতে পারে নি এত ভালো মানের ডাইরিটা এত অযত্নে এখানে পড়ে আছে কেন। পরে বুঝেছিল ডাইরিটা আসলে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল সকলের চোখের আড়াল থেকে। ডাইরিটা ছিল বইয়ের তাকের একদম পেছনে। ডাইরিটা হাতে পেয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকার পর খুলে প্রথমপাতায় চোখ বোলাতেই যে অনুভূতিটা ঐশীর হয়েছিল সেটাকে মুখে বলে প্রকাশ করা অসম্ভব। কোনো হারানিধি পাওয়া অথবা কোনো প্রাণাধিক প্রিয় আত্মীয়ের সাথে হঠাৎ অনেকবছর পর যোগাযোগ হলে যে অনুভূতিটা হয় ঠিক‌ সেই রকম মনে হয়েছিল ঐশীর। ডাইরিটা লুকিয়ে নিজের ঘরে আলমারিতে রেখে দিয়েছিল সে। তারপর কাজের চাপে আর পড়ে উঠতে পারেনি। আজ সুযোগ পেয়েছে অবশেষে। ডাইরিটা নিয়ে পড়ার‌ টেবিলে রেখে ঘরের আলো নিভিয়ে শুধু রিডিং ল্যাম্পটা জ্বালালো সে। তারপর চেয়ারে বসে ডাইরির পাতা উল্টোতেই প্রথমপাতায় চোখ পড়ল তার। সেটায় হাত বুলোতে বুলোতে চোখটা একটু আদ্র হল ঐশীর। ডাইরির প্রথমপাতায় মুক্তোর মতো ঝড়ঝড়ে বাংলা অক্ষরে লেখা ‘ ঊর্মিমালা মজুমদার’। প্রথমপাতা উল্টে ডাইরিটা পড়তে শুরু করল সে।

ডাইরিটা যখন পড়া শেষ হল তখন রাত গড়িয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ডাইরিটা বন্ধ করে টেবিলে রেখে বাথরুমে চোখে মুখে জল দিতে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল ঐশী। একরাতের মধ্যে আমুল পরিবর্তন ঘটে গেছে মেয়েটার মধ্যে। চোখের কোল দুটো  কেঁদেকেটে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। গালের উপর অশ্রুর ধারা কাজল ধেবড়ে দিয়ে দাগ বসিয়ে দিয়েছে। রীতিমতো বিধঃস্থ লাগছে তাকে। বেসিনের কল খুলে চোখে মুখে জলের ঝাপটা মেরে নিজেকে প্রকৃতিস্থ করল ঐশী। তারপর তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে আয়নার দিকে তাকাল। এবার সব ঠিক থাকলেও একটা জিনিস বদলালো না। ওর চোখ দুটো একইরকম থেকে গেছে। রক্তের মতো লাল,হিংস্র জীঘাংসায় ভরা, ক্রুর স্বাপদের মতো চোখ। না ধরা পড়ে গেলে চলবে না। চোখের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে। তারজন্য ঘুম চাই। লম্বা শান্তির ঘুম। যদিও ডাইরির লেখাটা পড়ার পর আর কোনোদিনও শান্তির ঘুম আসবে কিনা জানে না সে। তাও চেষ্টা করে দেখা যাক। ভেবে বাথরুম থেকে বেরিয়ে বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর ঘুম নেমে এল তার চোখে।

ঐশীর ঘুম যখন ভাঙল তখন সকাল আটটা বাজে। বিছানায় উঠে বসে চারদিকে একবার তাকাল সে। সব আগের মতোই আছে, যেন মনে হচ্ছে কাল রাতের ঐ ডাইরিটা, ঐ ডাইরি ভেতরে লেখা কথাগুলো নিছকই এক দুঃস্বপ্ন ছিল। যেন ঐ ডাইরিটা নিছকই একটা কল্পনা। কিন্তু পড়ার টেবিলে ডাইরিটা দেখে ভুল ভাঙল তার। তারমানে ওটা দুঃস্বপ্ন ছিল না! দুহাতে মাথা চেপে বসে রইল ঐশী তারপর উঠে টেবিল থেকে ডাইরিটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে যাবে এমন সময় দরজায় নক করার শব্দ শুনে থমকে গেল। তারপর বালিশের তলায় কোনোমতে ডাইরিটা আড়াল করে দরজা খুলল।

দরজার ওপার থেকে রজতাভ বললেন, “ অভীক ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করছে কটার দিকে যাবি? বোধহয় তোর ফোনটা সুইচড অফ পেয়ে আমাকে কল করেছিল। ছেলের তো দেখি আর তর সইছে না! কটার দিকে বেরোবি?”

- এগারোটার দিকে বেরোবো। দশটার দিকে বলে দাও। 

- সেকি রে! এত দেরী করে অপেক্ষা করাবি ছেলেটাকে? 

- দেরীতেই তো মজা বাপি! যত দেরী করবে তত বেশী বিরহে জ্বলবে। তাছাড়া প্রায় পাঁচটা বছর অপেক্ষা করেছে। তিনঘন্টা পারবে না? তাছাড়া তোমার জামাই যা লেট লতিফ? দশটা বললে এগারোটার দিকেই ঢুকবে। 

- তাহলে দশটাই বলছি।

ঐশী মাথা নেড়ে দরজা লাগিয়ে দেয়।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করল ঐশী। এমনিতেও সারাবছর ওর আলমারিতে শার্ট আর জিন্সে ভর্তি থাকলেও গত কয়েকমাসে তাদের জায়গা দখল করেছে রকমারি শাড়িরা। রজতাভ, সুজাতা দুজনে মিলে এই কয়েকমাসে প্রায় বাজার ঘুরে পাহাড় প্রমাণ শাড়ি কিনেছেন। জামদানী,টাঙাইল, কটন, সিল্ক কী নেই! তবে ঐশী একটাও শাড়ির ভাজ ভাঙেনি। এসব সে কোনোদিন পরেনি, আজও পড়বে না। বরং কাল দুপুরে বাপি মায়ের যে শাড়িটা দিয়েছিল সেটাই পরবে সে। তার জন্য রীতিমতো ইউটিউবে ভিডিও দেখেছে। শাড়িটা বের করে বিছানায় রেখে ফোনটা সুইচ অন করল সে। অন করতেই টুং টুং করে নোটিফিকেশন আসতেই ফোনটাকে সাইলেন্ট করে শাড়িটা পরতে শুরু করল সে। শাড়িটা তেমন আহামরি না হলেও একটা আলাদা মাধুর্য আছে। একটা আরাম আছে। ঐশীর মনে হল যেন কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। একটা মিষ্টি গন্ধ সমগ্র শাড়িজুড়ে। এই গন্ধটা গতকাল ডাইরিতেও পেয়েছে সে। শাড়িটা পরে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলে বসতেই অভীকের কল এল।

 ঐশী কালকের মতোই হেডফোন লাগিয়ে কলটা রিসিভ করে শুনতে লাগল অভীকের বকবকম। কেন ফোনটা সুইচড অফ রেখেছে? কেন কথা বলছে না? কটার দিকে রেজিস্ট্রি অফিসে আসবে? কোন শাড়িটা পরছে? কটার দিকে পৌঁছতে হবে? অভীকের এরকম হাজার ঘ্যানঘ্যানানি অন্যদিনের মতো অসহ্য লাগলেও আজ ঐশী উত্তর দিল না। সে চুপচাপ সাজাতে লাগল নিজেকে। সেদিন অভীকের মা ওকে যে কসমেটিক্সগুলো কিনে দিয়েছিলেন সেগুলোর একটাও ব্যবহার করেনি সে। এমনকি পুজোর দিনেও না। কসমেটিক্সগুলো তুলে রেখেছিল ওর জীবনের বিশেষ দিনের জন্য, আজকের জন্য। আজ ঐশী আর অভীকের বিয়ে। রজতাভরা ঠিক করেছিলেন অভীক কাজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হলেই ধুমধাম করে বিয়ে দেবেন। পরে ঠিক করেছেন আপাতত রেজিষ্ট্রি ম্যারেজটা করিয়ে পরে নাহয় একটা ছোটোখাটো গেটটুগেদারের আয়োজন করা হবে। সুজাতাকে বলতেই তিনিও রাজি হয়েছেন। ড্রয়ার থেকে লিপস্টিক,মাস্কারা, আইলাইনার, ফাউন্ডেশন, প্রাইমার, একে একে সব প্রসাধনী বের করে নিজেকে সাজাতে সাজাতে ঐশী বলল,“ দশটার মধ্যে পৌঁছে যাস‌ আন্টিকে নিয়ে। বাকি কথা ওখানেই বলব।” বলে ফোনটা কেটে চোখে কাজল পরতে লাগল ঐশী।


সাড়ে নটার দিকে তৈরী হয়ে ড্রইংরুমে বসে ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছিলেন রজতাভ। ব্যাপার কি? অন্যদিন তো এত দেরী হয় না ঐশীর। তাহলে আজ কেন? দু একবার দরজায় নক করেও সাড়া পাননি তিনি। এদিকে ঘড়ির কাঁটা ক্রমশ দশটার দিকে এগিয়ে চলেছে। সোফা থেকে উঠে চঞ্চল হয়ে রীতিমতো পায়চারি করতে লাগলেন রজতাভ। এইভাবে প্রায় পনেরোবার পায়চারি করা মাত্র ঐশীর ঘরের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন রজতাভ। আর ঘুরে দাঁড়ানো মাত্র থমকে গেলেন। এ তিনি কাকে দেখছেন? কোথায় তার সেই দামাল দস্যি মেয়ে ঐশী? যে কথায় কথায় বাপিকে জড়িয়ে ধরত! যে চাপে পড়ে গেলে কাঁদো কাঁদো স্বরে ‘ বাপি!’ বলে ডাকত! এ তো সেই ঐশী নয়! এক মুহূর্তের জন্য রজতাভর মনে হল তার সামনে আর কেউ নয়, ঊর্মিই দাঁড়িয়ে। সেই কাজলপরা হরিণের মতো চোখ, সেই ভঙ্গিমায় শাড়ির কুচি, আচল সামলানো, সেই এক চাহনি। ঐশীর ছেলেবেলায় অনেকে রজতাভকে বলেছিল ঐশীকে নাকি হুবহু ঊর্মির মতো দেখতে। রজতাভ বিশ্বাস করতেন না। হেসে কথাগুলো উড়িয়ে দিয়ে বলতেন 'ধ্যাত! ওসব কিছু হয় না। হ্যা নাকটা আর চোখটা ঊর্মির পেলেও বাকি আর কোনো মিল নেই!' কিন্তু আজ মনে হচ্ছে তিনি এত বছরেও নিজের মেয়েকে ঠিক চিনে উঠতেই পারেন নি। এতগুলো বছর মেয়েকে দেখে এসেছেন কিন্তু এতটা মিল কোনোদিনও লক্ষ্য করেন নি। 

ঐশীর ডাকে সম্বিত ফিরল রজতাভর। চমক ভেঙে দেখলেন ঊর্মি নয় তার মেয়ে ঐশীই দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। তাকে শাড়ির কুচিটা ধরে দিতে বলছে। রজতাভ অশ্রুসজল চোখে এগিয়ে গেলেন কুচিটা ধরতে। 

রেজিস্ট্রি অফিসে যখন ওরা পৌঁছল তখন পৌনে এগারোটা বাজে। যথারীতি ঐশীর আশঙ্কাকে সঠিক প্রমাণিত করে অভীক তখনও পৌঁছয়নি। রজতাভ ভ্রু কুঁচকে ঐশীর দিকে তাকাতেই ঐশী ফিক করে হেসে ফেলল। তারপর এগিয়ে গিয়ে বসল কাছের একটা বেঞ্চে। রজতাভ পায়ে পায়ে এগিয়ে মেয়ের পাশে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ পর একটা বাইক নিয়ে অভীকের সাথে সুজাতা এসে পৌঁছলেন অফিসের সামনে। ওদের দেখে ঐশীরা উঠে দাঁড়াল। সুজাতা এগিয়ে এসে প্রথমেই ক্ষমা চাইলেন দেরী করার জন্য। জানালেন তারা ঠিক সময় বেরোলেও মাঝপথে অভীকের কিছু জিনিস ছাড়া পড়ে যাওয়ায় আবার ফিরে আসতে হয়। কাজেই দেরী করেই বেরোতে বাধ্য হন তারা। তারপর সকলে মিলে ঢুকলেন অফিসে। সইসাবুদ, মাল্যদান,সিঁদুরদান, আংটি বিনিময়ের পালা সেরে যখন ওরা অফিস থেকে বেরোচ্ছেন তখন বেলা দুটো বাজে। ঠিক হল কাছেরই একটা হোটেলে দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়ে সুজাতা ফিরে যাবেন তাঁর বাড়ি। আর অভীকদের নিয়ে রজতাভ ফিরবেন নিজের ফ্ল্যাটে। আজ রাতটা সেখানে কাটিয়ে কাল ওরা রওনা দেবে জলঢাকায়। আপাতত রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হলেও পরে ধুমধাম করে ওদের রিসেপশনের আয়োজন করা হবে। 

(চলবে)

বৃহস্পতিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ সপ্তম পর্ব



সকালে সুজাতার ঘুম ভাঙল ঐশীর চিৎকারে। চারদিকের অচেনা পরিবেশের দিকে একবার তাকিয়ে ধরমড়িয়ে উঠে বসলেন তিনি। কিছুক্ষণ সময় লাগল তার ধাতস্থ হতে। তারপর ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। ঐশী তখনও রজতাভর ঘরে বসে গজগজ করে চলেছে,“সামান্য সেন্স নেই! অপোগন্ড কুম্ভকর্ণ কোথাকার। এই হতভাগা ওঠ!”রজতাভর গলার স্বর কানে এল তার।

-আহা! খামোখা বকছিস ওকে! ওর দোষ নেই! সারাদিন অফিসে খাটনির পর ক্লান্ত ছিল বলে আর ডাকাডাকি করিনি। তাছাড়া আমি নিজেই স্টাডিরুমে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কোনো অসুবিধে হয়নি আমার!

- তুমি চুপ করো বাপি! তোমাকে আর ওর হয়ে সাফাই গাইতে হবে না! যে ছেলে নিজের হবু শ্বশুরের খাট পুরোপুরি দখল করে এভাবে ওপেন ইউনিভার্সিটির মতো পড়ে পড়ে ঘুমোতে‌ পারে সে বিয়ের পর আমাকেও বিছানা থেকে বেদখল করে দিতে পারে। এই ছেলে! উঠবি?

- আহ! ঐশী!পাশের ঘরে অভীকের মা রয়েছেন! তিনি শুনতে পাবেন!বলছি তো কোনো অসুবিধে হয় নি। তুমি চুপচাপ মুখ ধুয়ে এসো! আর দেখো তোমার সুজাতা আন্টি উঠলেন কিনা। আমি চা বসাচ্ছি।

বলে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সামনে সুজাতাকে দেখে থমকে যান রজতাভ। দেখেন কী হয়েছে বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সুজাতা। রজতাভ হেসে বলেন, “গুডমর্নিং! রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল?”সুজাতা মাথা নেড়ে বলেন,

- হ্যাঁ! কী ব্যাপার? ঐশী চিৎকার করছে কেন?

- ও কিছু না। বাদ দিন। চা খাবেন তো?আপনি মুখ ধুয়ে নিন ততক্ষণে চা হয়ে যাবে।

- আগে বলুন কী হয়েছে? নির্ঘাত অভি পুরো বিছানার দখল নিয়ে ঘুমিয়েছে! জানতাম! ইশ!ছিঃ!ছিঃ!দাঁড়ান আমি অভীককে ডাকছি।

- থাক! অতো রাতে ঘুমিয়েছে। আরেকটু ঘুমোক। সবে তো সকাল ছটা বাজে। ছেলেমানুষ এত সকালে উঠে কী করবে?আপনিও তো অনেক রাতে ঘুমিয়েছেন? আরেকটু ঘুমিয়ে নিলে পারতেন?

- আমার ভীষণ লজ্জা করছে জানেন? আমাদের জন্য আপনাদের এত কষ্ট করতে হচ্ছে। 

- সুজাতা, এ নিয়ে আমরা কালরাতেও কথা বলেছি। তাছাড়া অভীক আমার ছেলের মতো! ঐশীও একসময় এভাবেই শুতো। আমার কোনো প্রবলেম হয় নি। তাছাড়া নিজের বিছানায় আমি কমই ঘুমোই! বেশীরভাগ দিন আমার স্টাডিরুমেই কাটে। কাজেই ওখানকার সোফাকে কাঠের মিস্ত্রি লাগিয়ে সোফা কাম বেড করে নিয়েছি। রাতে ওখানেই প্রায় ঘুমোই। ওসব কথা বাদ দিন আপনি আগে মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন। ততক্ষণে আমি চায়ের জল বসাই গিয়ে। ঐশী! অভীককে ছেড়ে আগে মুখ ধুয়ে এসো!

বলে রান্নাঘরের দিকে চলে যান রজতাভ। 
মুখ ধুয়ে পরনের পোশাক ছেড়ে আবার শাড়ি পরে তৈরি হয়ে ঐশীর ঘর থেকে সুজাতা বেরিয়ে এসে দেখেন শুধু চা-ই নয় তার সাথে রীতিমতো সকালের জলখাবারও তৈরী করে নিয়েছেন রজতাভ। ডিমের পোঁচ,বাটার মাখানো সেঁকা পাউরুটি, কলা,আপেল, কেক সব নিয়ে একেবারে এলাহি ব্যাপার। ঐশী এক এক করে খাবার গুলো টেবিলে সাজাচ্ছে দেখে চোখ কপালে তুলে রজতাভর দিকে তাকিয়ে সুজাতা বললেন, “করেছেনটা কি! এত খাবার? আচ্ছা আপনি কি পাগল? এত সকালে এত খাবার কে খায়? শুধু চা হলেই তো হত!”

- এ আর এমন কী? ঐ সামান্য আয়োজন। ভেবেছিলাম লুচি আর ছোলার ডাল করবো।‌ পরে ভাবলাম থাক! অতো দুর যাবেন, অয়েলি ফুড খেলে আবার ঝামেলা হতে পারে তাই এই হাল্কা খাবার করলাম। পেটও ভরা থাকবে আবার বদহজমও হবে না।

- তাই বলে এত খাবার কে খাবে?

- কেন? সবাই মিলে খাবো! ঐ তো অভীক এসে গেছে!

সুজাতা‌ তাকিয়ে দেখলেন অভীকও রেডি হয়ে বেরিয়ে এসেছে। মাথা নিচু করে টেবিলের সামনে এসে অভীক বলল, “ সরি আঙ্কল! আসলে কাল এতটাই টায়ার্ড‌ ছিলাম যে আর... তাছাড়া আমি ঘুমোলে একেবারে কুম্ভকর্ণ মোডে চলে যাই। যাই হোক না কেন কিছুতেই ঘুম ভাঙে না।‌ আমার জন্য আপনি..."

অভীককে বাকি কথা বলতে না দিয়ে বলে উঠলেন রজতাভ,“ ব্যস অনেক সরি বলা হয়েছে! এবার কথা না বাড়িয়ে খেতে বোসো!”অভীক মাথা নেড়ে খেতে বসে। ঐশী প্লেটে খাবার সাজিয়ে এগিয়ে দেয় সবার দিকে।

বাসস্ট্যান্ডে ওরা যখন পৌঁছল ততক্ষণে বাস ছেড়ে দিয়েছে। পরের বাস তেমন নেই। তবে মালবাজারের‌‌ গাড়ি একটু পড়েই ছাড়বে। অগত্যা মালবাজার পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ধরতে হবে সুজাতাকে। আর কোনো উপায় নেই দেখে‌ অভীককে মালবাজারেরই টিকিট কাটতে বললেন সুজাতা। আজ স্কুলে ডুব দিতে হবে। কোনো উপায়‌ নেই! এমনিতেও সময় মতো পৌঁছতে পারবেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে রইলেন সুজাতা। আর তখনই হাল্কা করে বৃষ্টি নামল। ঐশীরা দৌড়ে এসে সুজাতার সামনে এসে দাঁড়াল। অভীক টিকিটটা হাতে দিয়ে বলল, “ গেটে‌র সামনে সিটের রো-তে জানলার ধারে সিট। এখনই বাস ছাড়বে।” ঐশীর হাতে একটা প্যাকেট ছিল সেটা সুজাতার হাতে দিতেই সুজাতা দেখলেন সেটায় জলের বোতল, কেক, বিস্কুট রাখা। বিরক্ত হয়ে সুজাতা বললেন,“ দেখো কাণ্ড মেয়ের! সকালে অতোগুলো খাবার খেয়ে তো এমনিতেই পেট ভরে আছে আবার এসব কেন?”

- থাক না আন্টি! পথে ঘাটে খিদে পেলে খাবে। বাপি বলে পথে ঘাটে বেরোলে খালি হাতে যেতে নেই। অন্তত জলের বোতল সাথে নিতে হয়। আমি ভাবলাম শুধু জলের বোতল দেব? তাই এগুলো নিলাম।

- তাই বলে এত! অভি তুই বারণ করতে পারলি না?

অভি বুঁজে আসা গলায় বলে,“ থাক না মা! ও দিয়েছে যখন। তাছাড়া তুমি তো এখন তেমন আর আসো না। তাই আর বাধা দিইনি।”

সুজাতা দেখেন অভীক সরাসরি তাকাচ্ছে না তার দিকে যদি মায়ের কাছে কাঁদতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। ঐশীর চোখও ছলছল করছে। মৃদু হেসে সুজাতা দুজনকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “পাগল সবকটা! এমন করছে যেন আর আসবো না। ধুস! এরপর তো আসা যাওয়া লেগে থাকবেই। এই ছেলে! এবার ছুটি পেলে ওকে নিয়ে আসবি জলঢাকায়। আর এই যে মেয়ে! পাহাড়ে আমার বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেলাম! আসতে হবে কিন্তু! তোমার বাপিকে নিয়ে আসবে। দুজনে ভালো থেকো। সাবধানে থেকো। একদম কাঁদবে না। এলাম কেমন?"

বাসে উঠে জানলার ধারের সিটে বসলেন সুজাতা। কিছুক্ষণ পর বাস ছেড়ে দিলো। অভীক আর ঐশী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল বাস স্ট্যান্ডে। বাসটা দৃষ্টিপথের আড়াল হবার পর ওরাও বেরিয়ে পড়ল যে যার পথের দিকে। 

বাসের সিটে হেলান দিয়ে বসলেন সুজাতা। বন্ধ জানলার বাইরে কাচে বৃষ্টির জলছাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। বাস ক্রমশ এগিয়ে যেতে লাগল গন্তব্যে।

*****
সময়ের চাকা বড়ো বিচিত্র! দুঃখের সময়, শোকের সময় ভীষণ ধীর গতিতে ঘোরে। তখন এক একটা দিন এক একটা বছরের মতো মনে হয়। কাটতেই চায় না। আবার সুখের সময় এত দ্রুতগামী হয়ে যায় যে একটা বছরও একলহমায় কেটে যায়। যেন কয়েকটা সেকেন্ড মাত্র। ঠিক এইভাবেই পরের কয়েকটা বছর কেটে গেছে। অভীকের সাংবাদিকতার চাকরিটা পাকা হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়। এখন সে খবরের কাগজের সাংবাদিক হবার সাথে সাথে ওদের সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্রের প্রুফরিডার। ঐশী কলেজ পাশ করে একটা ক্যারাটে স্কুলে টিচার হিসেবে যোগ দিয়েছে। সেখানেই সারাদিন কেটে যায় তার। রজতাভর পরিবারের সাথে সুজাতার সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। প্রতিরাতে অভীকের সাথে সাথে ঐশীও আজকাল সুজাতার সাথে কনফারেন্স কলে কথা বলে। গতমাসে দুর্গা পুজোতে ঐশীর আবদারে ওদের সাথে শিলিগুড়ির পুজো দেখে এসেছেন তিনি। এর আগে ঐশীও ওর বাপিকে নিয়ে অভীকের সাথে এসে ঘুরে গেছে জলঢাকা।‌ রজতাভর সাথে কথা বলে অভীকদের বিয়ের দিনক্ষণও পাকা করে ফেলেছেন সুজাতা। ঠিক হয়েছে সামনের মাঘ মাসে দুজনের চারহাত এক করে দেবেন ওরা। বিয়ের পরে ঐশীরা রজতাভর কাছেই থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত অভীক দুজনের মাথা গোঁজার ঠাই না খুঁজে‌ নিচ্ছে। অভীকও খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে কমদামে একটা ফ্ল্যাটের। রজতাভ অবশ্য ঠিক করেছেন অভীক ফ্ল্যাট‌ না পেলে নিজের ফ্ল্যাটের একটা‌ অংশ অভীকদের ছেড়ে দেবেন। সুজাতা ঠিক করেছেন নিজে হাতে গুছিয়ে দেবেন ছেলের সংসারটাকে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনটা ভালো হয়ে গেল সুজাতার। ক'দিন ধরে আকাশটা মেঘলা হয়ে ছিল। বৃষ্টি নামবে নামবে করেও নামছে না। অবশেষে কাল রাতের দিকে মুষলধারে নেমে সারারাত‌ একটানা বৃষ্টি হয়ে অবশেষে ভোররাতে থেমেছে। বৃষ্টি শেষে আকাশে ছেঁড়া মেঘ ছড়িয়ে।‌ মর্নিংওয়াকে বেরোনোর আগে শালটা গায়ে জড়িয়ে নিলেন সুজাতা। এখানে পুজোর পর পরই হাল্কা শীত নেমে আসে। তার উপর কাল রাতে বৃষ্টি হওয়ায় ঠান্ডাটা আরো বেড়েছে। ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে দরজায় তালা দিয়ে হাটতে শুরু করলেন সুজাতা।চারদিকের বৃষ্টিস্নাত পরিবেশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে হাটতে লাগলেন তিনি।

কিছুদুর গিয়ে নদীর শব্দ কানে এলো তার। পায়ে পায়ে ব্রিজের উপর উঠতেই নদীর‌ ঠাণ্ডা বাতাস এসে ঝাপটা মারল সুজাতার গায়ে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় শিউরে উঠলেন তিনি। তারপর কাঁপতে কাঁপতে ব্রিজ থেকে নেমে পাহাড়ের এক ছোটো ঢাল বেয়ে নেমে এলেন নদীর পারে। তারপর জুতো খুলে নদীর জলে পা ভিজিয়ে দিলেন। তিনি। এই অভ্যেসটা সুজাতার চিরকালের।‌ শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কোনোদিন এর অন্যথা হয় না। তথাগত বেঁচে থাকাকালীন সুজাতার সাথে আসতেন। নদীর জলে পা ডুবিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে‌ উপভোগ করতেন পাহাড়ের ভোরের পরিবেশকে। সুজাতা জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে থাকতে হারিয়ে যান এরকমই এক মুহূর্তে।

*****
- জানো সু? পাহাড়কে সবসময় সুন্দর লাগলেও তার আসল সৌন্দর্য ধরা পরে এই ভোরবেলায়। অর্ধেক অন্ধকার অর্ধেক আলোয় যতটা সুন্দর মনে হয় ততটাই রহস্যময় লাগে। এই সময়টা রাতচরা পাখিরা রাত জাগার ক্লান্তি নিয়ে ঘুমে তলিয়ে যাবার আগে শেষবারের মতো ডাক দিয়ে জানান দেয় তার অস্তিত্বের। ভোরের পাখিরা ডেকে সমগ্র ঘুমন্ত অরণ্যকে জাগিয়ে তোলে। এই একটা সময় জঙ্গলের সমস্ত পশুরা নিজেদের বিবাদ ভুলে একসাথে নদীর জল খেয়ে প্রকৃতিমায়ের, বনদেবীর আশীর্বাদ পায়। আর সবার শেষে ঠিক পুজোর দেবতার মতো নদীর পথ ধরে, জঙ্গলের প্রান্তিক অংশে প্রবেশ করেন সুর্যদেব। এই সৌন্দর্য হাজার মাথা কুটলেও কোথাও পাবে না তুমি। এই সৌন্দর্য দেখতে হলে ভোরের পাখির ডাক শুনে উঠতে পড়তে হয়। অন্ধকার থাকতে থাকতেই বেরিয়ে পড়তে হয়। শহরের মানুষেরা এটা না দেখে বনে আসে ফুর্তি করতে। পিকনিক করতে। আর বন্যপ্রাণীরা আক্রমণ করলে তাদের দোষারোপ করে। এটা বোঝে না যে এদের প্রমোদে ওদের শান্তি ভঙ্গ হয়। ওদের কাছে বন্যপ্রাণীরা আসেনি বরং ওরাই বন্যপ্রাণীর এলাকায় প্রবেশ করেছে। জানিনা কবে এদের এই বোধোদয় হবে। চিৎকার করে, গান বাজিয়ে নয়, নীরবে, নিভৃতে বনের শব্দ শুনতে আসবে। যতদিন পর্যন্ত এই বোধ ওদের না হবে ততদিন বন্যপ্রাণীদের আক্রমণ চলবে। আর এটার জন্য দায়ী থাকবে ওরাই!

(চলবে)

রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ ষষ্ট পর্ব



খাবার পালা শেষ হতেই ঊর্মিকে নিয়ে রজতাভ বেরিয়ে পড়ল। এবার গন্তব্য রক গার্ডেন। স্ট্যান্ডে পৌঁছনো মাত্র জিপ পেয়ে গেল ওরা।‌ ড্রাইভারের সাথে কথা বলে রজতাভ জানতে পারল রক গার্ডেন বেশী দুর নয়, ঐ দশ কিলোমিটারের মতো হবে। ঘুম স্টেশন হয়ে যেতে হবে। আবহাওয়া ঠিক থাকলে আধঘন্টা চল্লিশ মিনিটের মতো লাগতে পারে। তবে ফেরার সময় গাড়ি পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। রজতাভ ঠিক করল এই গাড়িতেই ফিরবে। সেই মতো দরদাম করে গাড়ি ভাড়া করল সে। ঠিক হল ওদের পৌঁছে দিয়ে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে যাবে নিজের মতো ভাড়া খাটাতে। তবে মাত্র দুঘন্টার জন্য। ঠিক দুঘন্টা পর ওরা যেখানে গাড়ি থেকে নেমেছিল ঠিক সেই স্পটে দাঁড়াবে। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে সেই স্পটে এলে ওরা গাড়ি করে ফিরে আসবে। এতে ওদের ঘুরে বেড়ানোও হবে, আবার ড্রাইভারকে বসে থাকতে হবে না।

সব ঠিক করে গাড়িতে চাপল ওরা। ড্রাইভার কিছুক্ষণ ঘুরে আরো কয়েকজন প্যাসেঞ্জার জোগাড় করে পাঁচমিনিটের মাথায় গাড়ি স্টার্ট দিতেই সিটে হেলান দিয়ে বসল রজতাভ। দার্জিলিং শহর থেকে বেরোতেই উদাসীন ভাবে তাকিয়ে রইল জানলার বাইরে। দেখতে লাগল পাহাড়ের খাঁদের ধার দিয়ে নেমে যাওয়া অপূর্ব ভয়ংকর সবুজাভ সৌন্দর্যকে। ড্রাইভারের অসীম দক্ষতায় পাহাড়ের পাকদন্ডি বেয়ে চলতে লাগল ছোটো জিপটা। এক এক মুহূর্তে ঊর্মির মনে হতে লাগল এই বুঝি জিপ উল্টে গেল খাঁদে। সে ভয় পেয়ে খামচে ধরল রজতাভর হাত। রজতাভ মুচকি হেসে একবার ঊর্মির দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল,“ভয় নেই! আমি তো আছি!” ঊর্মির তাও ভয় কমল না। গোটা রাস্তা সে রজতাভর জ্যাকেটের হাতা খামচে ধরে রইল।

আধঘন্টা পর যখন ওরা গাড়ি থেকে নামল রজতাভর হাসি দেখে কে? সে হাসিমুখে বলল, “খুব তো তখন বলছিলে। নর্মাল কাপলের মতো থাকবে। কোনোরকম টাচিং না। গাড়িতে বসে সব বুলি বেরিয়ে গেল তো!”

চড়া রোদ আর বদ্ধ গাড়িতে বসে থাকার দরুন গরম লাগায় পরনের শালটা খুলে ঊর্মি ঝাঁঝিয়ে উঠল,“বাজে বকো না তো! আমি তোমার মতো অতো ডাকাবুকো নই! যেভাবে গাড়ি চালাচ্ছিল ড্রাইভারটা মনে হচ্ছিল এই বুঝি গাড়ি নেমে গেল। বাপরে!খুব জোর বেঁচে গেছি!এই কান মলছি। জীবনেও আর পাহাড়ে আসবো না বাবা!”

- সেকি! বিয়ের পর থেকে তো তুমিই আসতে চাইতে পাহাড়ে! হানিমুনে পাহাড়ে যাবে বসে কানের পোকা নড়িয়ে দিয়েছিলে। আজ যখন সত্যিই পাহাড়ে এলাম তখন বিরক্ত হচ্ছো!

- তখন কি আর ছাই জানতাম‌ যে এভাবে প্রাণ হাতে করে ঘুরে বেড়াতে হবে? ভেবেছিলাম ম্যাল,কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে কার্শিয়াং, কালিম্পঙ, গ্যাংটক‌ থেকে ঘুরে বেড়িয়ে কেটে যাবে দিনগুলো।

- উহু! ওটা তুমিই না অনেকেই ভাবে। তবে‌ পাহাড়ের মজা এই জায়গাগুলোতে থেকে নেই। আর কার্শিয়াং আলাদা জায়গা। ওটা বিখ্যাত নেতাজির বাড়ি, আর ট্রয়ট্রেন হল্ট হিসেবে। শোনো, পাহাড়কে চিনতে হলে, পাহাড়কে জানতে হলে, এর মজা উপভোগ করতে হলে পায়ে হেটে ঘুরে বেড়াতে হবে। শুনতে হবে প্রকৃতির শব্দ, অচেনা পাখির সুরেলা ডাক আর পাহাড়ের নিস্তব্ধ কোণে সবুজের আড়ালে বসে থাকা ঝিঁঝিঁর ডাক। চোখের সুখ করতে হবে সবুজে ঘেরা এই চারপাশ দেখে। তাহলেই পাহাড়ের মজা টের পাবে। তুমি গাড়িতে করে আসার সময় পাহাড়ের যে খাঁদ দেখে ভয় পাচ্ছিলে। সেই খাঁদের নিচের সৌন্দর্যকে দেখে মজা পাচ্ছিলাম আমি। কার্গিলে এই মজাটাই সেরা ছিল আমার কাছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে পাহাড়ের চারদিকের শোভা দেখে নিতাম প্রাণভরে। কে জানে পরদিন দেখতে পাব কিনা?এই আনন্দটা ভীষণ মিস করি জানো?

বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রজতাভ। ঊর্মি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকায় রজতাভর দিকে তারপর কথার প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“ দার্জিলিং-এ তো ছবি তোলার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলে? তা এখানে এসে সব ফোটোগ্রাফির শখ মিটে গেল নাকি?কখন থেকে সিনেমার নায়িকার মতো‌ শাল খুলে দাঁড়িয়ে আছি বলতো? এরপর তো ঠান্ডায় জমে যাবো! এবার অন্তত‌ একটা ছবি তোলো! তারপর ওই ওখানে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে বাকি ছবি তুলে আবার দুঘন্টার মধ্যে এখানে ফিরতে হবে যে!উফ! আর্মির লোক হয়েও কেউ যে এতটা অলস আর প্রচুর বাজেবকা মানুষ হতে পারে সেটা তোমাকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না।”

ঊর্মির অবস্থা দেখে রজতাভ ফিক করে হেসে ফেলল। সত্যিই ঊর্মি ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছে। হাসতে হাসতে ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে ঊর্মির দিকে তাক করে রজতাভ বলে ওঠে। “ রেডি? স্মাইল!”

পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা একটা ছোটোখাটো পার্ক হল ‘রক গার্ডেন’। সবুজ‌ পাকদন্ডি বেয়ে উদ্যানটা বেশ অনেকটা জায়গা জুড়েই ছড়িয়ে আছে।‌ পার্কটার সাথে কার্গিলের পিকের অনেকটা মিল পেল রজতাভ। চারদিকে ছোটো ছোটো পাহাড়ের মতো অসংখ্য স্পট। পাকদন্ডি বেয়ে সেই পাহাড়ে উঠতেই আশেপাশের জায়গা দেখতে পাওয়া যাবে। বসার জায়গাও আছে। আজকে ছুটির দিন বলে টুরিস্টের ভীড়ও দেখার মতো। হাতে সময় কম বলে ওরা কাছের একটা জায়গায় উঠে একটা বেঞ্চে বসল। ঊর্মি খাবারের ব্যাগ থেকে শালপাতার প্লেট আর খাবার আরেকটা বাক্স বের করল। খুলে দেখল ভেতরে অনেকটা পরিমাণে এগ চাউমিন আছে। দুটো কাঁটাচামচও দেওয়া। বাক্স থেকে প্লেটে চাউমিন বেড়ে নিয়ে সে রজতাভকে খেতে দিয়ে নিজে বাক্সটা নিয়ে বসল। 

রজতাভ একটু টমেটো কেচাপ চাউমিনে দিয়ে খেতে খেতে বলল, “যাই বলো না কেন মলিদিদির রান্নার হাত কিন্তু বেশ ভালো! কাল রাতে ডিমের কারি আর রুটিটা যা করেছিল না! উফ! অনেকদিন এরকম কারি খাই নি!”

- এই রান্নার জন্যই তো মেজোমামা মলিদিদিকে রেখেছেন। তবে মলিদিদির থেকে ওর মা মানে সুষমা মৌসি আরো ভালো রাঁধতে পারতেন। ওনার হাতে বানানো চিকেন মসালা থুপ্পা আর চিকেন কারি এত ভালো হত যে কী বলবো! যখন ছোটো ছিলাম তখন যতবার আসতাম আমার জন্য একটা স্পেশাল ডিশ বানাতেন মৌসি। চিকেন মোমো কারি! মানে চিকেন মোমোটাকে ভেজে অনেকটা ক্যাপসিকাম, গাজর, স্কোয়াশ দিয়ে কষা কষা ঝোল। অনেকটা তোমার ঐ ধোকার ডালনার মতো দেখতে লাগতো। আর খেতেও অপূর্ব হত। 

- আচ্ছা মলিদিদির মাকে তুমি মৌসি বলছো কেন? মাসি বলতে পারো।

মৃদু হাসে ঊর্মি তারপর বলে, “কারন মৌসি নিজে বলতেন তাকে মৌসি বলে ডাকতে। আমি এখানে এলে ভীষণ খুশি হতেন। নিজে হাতে নানারকম পদ রান্না করে খাওয়াতেন।”

রজতাভ দেখে ঊর্মির চোখটা ছলছল করছে। সেটাই স্বাভাবিক। আত্মীয়-বিয়োগের যন্ত্রণা সত্যিই কষ্টের। রজতাভ ঊর্মিকে চাঙ্গা করার জন্য বলল, “তাহলে তো আমাকেও চেখে দেখতে হয়! এক কাজ করো আজ বিকেলে আমরা তোমার মলিদিদির ঘরে‌ যাবো। সেখানে গল্পচ্ছলে জেনে নেবে উনি এই ‘চিকেন মোমো কারি’ আর ‘মসালা থুপ্পা’-র রেসিপি জানেন কিনা। যদি জেনে থাকেন তাহলে কালকের প্ল্যান ক্যানসেল। কাল সারাদিন কাছে পিঠে ঘুরবো। আর দুপুরে জমিয়ে খাবো দুটো পদ। আমিও দেখি যে পদের এত সুখ্যাতি করছো সেটা কেমন খেতে!”

ঊর্মি হেসে বলে,“যাহ! আবার ওসব কেন? শুধু শুধু মলিদিদিকে খাটানো! তারচেয়ে কালকে বলব যা ইচ্ছে বানাতে। তেমন হলে আমিও হাত লাগাব। এখানে এসে তেমন ভাবে গল্প করা হয়নি মলিদিদির সাথে। কাল সেটাও হয়ে যাবে।”

- বেশ তবে তাই হোক! সাথে এটাও বলে দেবে কাল সারাদিন মলিদিদি আর ওনার পরিবারের নিমন্ত্রণ রইল আমাদের ওখানে। একেবারে রাতে খেয়ে দেয়ে বাড়ি যাবেন ওনারা।

- ভালো বলেছ তো! বেশ পিকনিকের মতো হবে।‌ আমি আজকেই বলে আসব।
বলে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে প্লেটটা ডাস্টবিনে ফেলে ন্যাপকিনে হাত মুছে উঠে দাঁড়ায় রজতাভ। তারপর ক্যামেরা নিয়ে নেমে পড়ে ছবি তোলার কাজে।

*****
আচমকা শরীরে অস্বস্তিভাব বোধ করায় থমকে দাঁড়ালো তথাগত। কাল সারাদিন গুরুপাক খাবার খেয়ে একটু অম্বলের মতো বোধ হয়েছিল। দেরী না করে সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টাসিড খেয়ে নিয়েছিল সে। ঊর্মিকে ইচ্ছে করে জানায় নি। জানলে চিৎকার,চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিয়ে সবার টেনশন বাড়িয়ে দিত সে। কিন্তু অ্যান্টাসিড‌ খাবার পরেও শরীরের ভারীভাবটা যায় নি। অনেকদিন পর ঊর্মির সাথে মিলিত হতে গিয়েও গলদঘর্ম হয়ে পড়ছিল সে। মনে হচ্ছিল বুকের বাঁদিকে কে যেন হাতুড়ি পিটছে। ঊর্মি যাতে বুঝতে না পারে‌ সেই কারনে বেশিক্ষণ ওর উপরে থাকেনি সে। কিছুক্ষণ পরেই ঊর্মিকে তুলে নিয়েছিল নিজের বুকের উপর। বিছানায় শুয়ে সারারাত বুকের বাঁদিকের চিনচিনে ব্যথা সহ্য করে আদরে আদরে ভরে দিচ্ছিল ঊর্মিকে। ভেবেছিল হয়তো খাবার হজম হয় নি বলেই এই ঝামেলা হচ্ছে। ঠিক করেছিল সকালে উঠে মর্নিং ওয়াক সেরে একটু হাল্কা ফ্রি হ্যান্ড করবে খাবারটাকে হজম করার জন্য। 

সেই মতো সকালে বেরিয়ে পড়েছিল ওয়াকের জন্য। সকালে আর সেই অস্বস্তিভাবটা ছিল না ঠিকই। কিন্তু খাবারটার কারনে যা ক্যালরি জমেছে তা কমানোর জন্য কিছু দুর গিয়ে ওয়ার্মআপের জন্য দৌড় শুরু করেছিল সে। তারপর একজায়গায় থেমে হাল্কা ফ্রি হ্যান্ড করে ফিরে আসার সময় অস্বস্তিটা আবার ফিরে আসায় ভ্রু কুঁচকে গেল রজতাভর। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। হা করে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। বুকের চিনচিনে ব্যথা ক্রমশ পরিণত হয়েছে প্রচন্ড যন্ত্রণায়। মনে হচ্ছে যেন হৃৎপিন্ডটা ফেটে যাবে। দাঁতে দাঁত চেপে পাহাড়ের দিকটায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল রজতাভ। ড.মিত্র বলেছিলেন এই সিম্পটমটার ব্যাপারে। গুলির চাপ তো ছিলই তার উপর কালকের গুরপাক ভোজন আর পরিশ্রমের আঘাতে হৃদযন্ত্র জবাব দিতে শুরু করেছে। রজতাভ বুঝতে পারল ওর সাথে কি হয়েছে। কিন্তু এত সহজে হার মানার পাত্র সে নয়। আর আপাতত এই জনমানবহীন জায়গায় সে মরতে পারে না। শেষ চেষ্টা তাকে নিজেকেই করতে হবে। যে করে হোক কটেজে পৌঁছতে হবে। একবার পৌঁছতে পারলেই আর চিন্তা নেই। মুহূর্তের মধ্যে কর্তব্য স্থির করে নিল সে। তারপর ধীরে ধীরে হাটতে লাগল কটেজের দিকে।

এক একটা মুহূর্ত রজতাভর কাছে অনন্তকালের মতো মনে হচ্ছে। চোখের সামনে ক্রমশ অন্ধকার নেমে আসছে। রীতিমতো হাপাচ্ছে সে। বা বলা উচিত খাবি খাচ্ছে সে। বুকের যন্ত্রণা বিদ্যুতের মতো সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। রজতাভর মনে হচ্ছে‌ যেন ওর হৃৎপিন্ডটা যেন ভেতর থেকে কেউ দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। কে জানে কটেজটা আর কতদুর? কোনো মতে টলতে টলতে এগোতে লাগল সে। কিছুদুর এগিয়ে একটা বাঁক পেরোতেই সে দেখতে পেল কটেজটা‌। ঐতো ঊর্মি বাইরের লনে বসে আছে। হাতে চায়ের কাপ। ঐ তো মলিদিদির বর! বীরেন্দর দাজু! হাতে বাজারের থলে নিয়ে বেরোচ্ছে। আর চিন্তা নেই! আর কয়েক পা! ঐ তো ওরা তাকিয়েছে!আরেকটু! আর কটা পা! আর পারল না রজতাভ। বুক খিমচে ধরে মাটিতে বসে পড়ল সে। তারপর খাবি খেতে খেতে মাটিতে শুয়ে পড়ার আগে শুনতে পেল ঊর্মির আকাশকাঁপানো চিৎকার! চোখে অন্ধকার নেমে আসার আগে সে দেখতে পেল ওরা পাগলের মতো ছুটে আসছে ওর দিকে। ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্রমশ রজতাভর চোখে নেমে এল কালো পর্দার মতো একরাশ অন্ধকার।

কতক্ষণ অচৈতন্য ছিল জানে না রজতাভ। জ্ঞান ফেরার পর চোখ মেলতেই একটা চোখ ধাঁধানো আলোয় চোখটা জ্বলে উঠল তার। বাধ্য হয়ে চোখ বন্ধ করলো সে। কিছুক্ষণ নিজেকে ধাতস্থ হবার সময় দিল সে। তারপর চোখ মেলে তাকাতেই নিজেকে আবিস্কার করল নার্সিংহোমের বেডে। একটু ধাতস্থ হয়ে কোথায় আছে, কেমন আছে মনে করার আগে সে টের পেল তার সমগ্র শরীরে তার, পাইপ জড়ানো। হাতে স্যালাইন আর রক্তের চ্যানেল করা। বুকে কতগুলো পাম্পের মতো, ক্লিপের মতো যন্ত্র আটকানো। সেখান থেকে তার বেরিয়ে জুড়ে আছে পাশের যন্ত্রে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক আটকানো রয়েছে। কানের কাছে একটা বিপ বিপ শব্দ ভেসে আসছে। সারা শরীরে কোনো সাড় নেই। কয়েকবার চেষ্টা করল সে নড়ে ওঠার। পারল না। তবে কি...? আতঙ্কে সমগ্র শরীর হিম হয়ে এল রজতাভর। শেষমেশ বুকে আটকে থাকা গুলিটার কারনেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে তার শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে গেল অবশেষে! অসহায় চোখে চারদিকে তাকাল সে। পাশে একজন নার্স‌ বসেছিল। সে চোখ মেলে তার দিকে চাইতেই সে উঠে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। রজতাভ চারদিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে খুঁজতে লাগল ঊর্মিকে। চিৎকার করে সাহায্যের জন্য ডাকতে চাইল। কিন্তু কন্ঠ দিয়ে কেবলমাত্র গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ বেরোল না তার। 

কিছুক্ষণ পরেই নার্সটা আবার তার ঘরে এল। আর তার সাথে একজন ডাক্তার ঢুকলেন ঘরে। ডাক্তার এসে কিছুক্ষণ মেশিনের পর্দার দিকে চেয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “এখন কেমন বোধ করছেন?”

রজতাভ ডাক্তারের দিকে‌ তাকিয়ে রইল। ডাক্তার হেসে বললেন, “যা খেল দেখালেন আপনি! আমরা তো প্রায় ধরেই নিয়েছিলাম আপনাকে বাঁচানো যাবে না ভেবে। বুলেটটা ভীষণ কমপ্লিকেটেড জায়গায় আটকে ছিল। শুনতে একটু ক্লিশে লাগবে বাট আই মাস্ট সে,আপনার স্ত্রীর সিদুরের জোরে আপনি বেঁচে ফিরেছেন আবার। আপনার কেস হিস্ট্রি, আপনার আর্মিতে ইঞ্জুরি সবটা বলে হেল্প করেছেন তিনি। বাকি হেল্প করেছেন আপনাদের ডক্টর মিত্র! ফোনে কথা‌ বলে আপনার কন্ডিশনটা ব্রিফলি শুনেছি। আপনার লাক মারাত্মক! স্ট্রেসটা সামান্য স্ট্রোকের উপর দিয়ে চলে গেছে। নাহলে হার্ট ফেলিওর, বুলেটের কারনে হার্টে সংক্রমণ অনেক কিছুই হতে পারত। তবে আর চিন্তা নেই। বুলেটটা আমরা বের করেছি। কিন্তু এবার থেকে আপনাকে আরো সাবধানে থাকতে হবে। হার্ট সার্জারি করে বুলেট বের করা মানে বুঝতেই পারছেন।‌ এরপর থেকে আপনাকে রেস্ট্রিকশনে চলতে হবে। স্পাইসি, অয়েলি ফুড, এক্সেসিভ ট্রেনিং, বেশিক্ষণ পরিশ্রম বাদ। রেস্টে থাকতে হবে আপনাকে। আপাতত রেস্ট নিন আপনি। বিকেলে আসব আবার চেকাপ করতে।” বলে বেরিয়ে গেলেন ডাক্তার। তারপর কেবিনে ঢুকল ঊর্মি। ধীর পায়ে এসে রজতাভর বেডের পাশে বসল সে। রজতাভর একটা হাত ধরে কিছুক্ষণ অশ্রুসজল অথচ অভিমানী চোখে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। রজতাভ চোখের ইশারায় বলল ,“ভয় নেই!” ঊর্মি তাও চুপ করে বসে রইল। তারপর যেমনভাবে এসেছিল ঠিক তেমন ভাবে ধীর পায়ে চলে গেল। রজতাভ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ক্লান্তিতে চোখ বুঁজল।

*****

আচমকা মুখের উপর জলের স্পর্শ পেতেই চোখ মেলে তাকালেন রজতাভ। কিছুক্ষণ লাগল তার ধাতস্থ‌ হতে। বুঝতে পারলেন এতক্ষণ ধরে‌ পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। চোখ‌ মুছে ‌তাকিয়ে দেখলেন আকাশ ক্রমশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। চারদিকে গুম গুম শব্দে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি নামল বলে। আজকাল বৃষ্টিতে ভিজলেই ভীষণ শরীর খারাপ করে রজতাভর। অথচ একসময় এই বৃষ্টিতেই কত ভিজেছেন। ঊর্মিকে আদর করেছেন।‌ এরকমই এক বৃষ্টিমুখর রাতেই ঘটেছিল সর্বনাশটা। চট করে ঘরে ঢুকে এলেন তিনি। আর ঘরে ঢোকামাত্র ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল। রজতাভ ব্যালকনির দরজা লাগিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দেখলেন তার বিছানার প্রায় পুরোটাই দখল করে শুয়ে আছে অভীক। অভীককে ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে হাসি পেল তার। ঐশ্বর্যও একসময় এইভাবে ঘুমোতো। হাসতে হাসতে বিছানা থেকে একটা বালিশ আর চাদর নিয়ে নিজের স্টাডিরুমে চলে এলেন তিনি। স্টাডিরুমের সোফাতে বালিশ রেখে আলমারি থেকে একটা বই বের করে সোফায় আধশোয়া হয়ে কিছুক্ষণ পাতা উল্টে শুয়ে পড়লেন তিনি।

(চলবে...)


মঙ্গলবার, ৩১ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ পঞ্চম পর্ব




- সোজা হয়ে দাঁড়াও। মুখটা তোলো। একটু হাসো। হোল্ড! দ্যাটস ইট!

ক্যামেরার সাটার টেপার পর রজতাভ ক্যামেরা নামিয়ে মাথা নাড়তেই নড়েচড়ে বসল ঊর্মি। তারপর খাবার ব্যাগ থেকে বের করল দুটো শালপাতার প্লেট আর কাগজের প্যাকেটটা। কাগজের বাক্স খুলে দেখল ঠিক যা যা বলেছিল মলিদিদি ঠিক তাই তাই দিয়েছে। কেক, সেঁকা পাউরুটি আর একটা ডিমসেদ্ধ। কাগজের বাক্স থেকে খাবার বের করে শালপাতার প্লেটে সাজিয়ে সে ডাকল রজতাভকে। গতকাল রাতে দার্জিলিংয়ে বেড়াতে এসেছে ওরা। সেদিন রজতাভ আসার পর হাউহাউ করে ওকে জড়িয়ে কেঁদেছিল ঊর্মি। রাতে খাবার পালা সারার পর রজতাভ বলেছিল সবটা। রেডিওতে যতটা শোনা যাচ্ছে, খবরের কাগজে যতটা লেখা হচ্ছে অবস্থা তারচেয়েও গুরুতর। কার্গিলে প্রতি মুহূর্তে প্রাণহাতে করে কাটাতে হচ্ছে সবাইকে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রাতে আবার বাঙ্কারে ফিরতে পারবে কিনা তার ঠিক থাকছে না। এক এক করে সঙ্গী, বন্ধুরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে রোজ। তারমধ্যেও অটল হয়ে লড়ে যাচ্ছিল রজতাভ। গত সপ্তাহে তাদের ট্রুপকে একটা বাঙ্কার সিজ করতে পাঠানো হয়। ওরা ধৈর্যের সাথে দুদিন ধরে যুদ্ধ করে বাঙ্কার কবজা করে ফেলেছিল। সন্ধ্যের দিকে বাঙ্কার থেকে মৃতদেহ গুলো বের করার সময় আচমকা এক আহত পাক সৈনিক পাল্টা আক্রমণ করে বসে। রজতাভ সামনে থাকায় ওর বুকে গুলি লাগে। সঙ্গে সঙ্গে বাকিরা মিলে সেই সৈনিককে কবজা করে ফেলায় বেশী ক্ষতি হয়নি। রজতাভ চেয়ারে হেলান দিয়ে বলছিল,“বিশ্বাস করো বুলেটগুলো যখন বুকে ঢুকল মনে হল যেন একগাদা পেরেক বুকের ভেতর ঠুকে দেওয়া হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে মনে হল পৃথিবীটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। চারদিকের শব্দ, চিৎকার কিছুই কানে আসছিল না। একটা আচ্ছন্নভাব ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলছিল আমায়। মনে হচ্ছিল আর বোধহয় তোমাদের সাথে দেখা হবে না। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছিল দু’চোখের উপর। তারপর কমপ্লিট ব্ল্যাকআউট। যেন একটা ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলাম। ঘুম যখন ভাঙল দেখি হাসপাতালে শুয়ে আছি। পরে শুনেছিলাম আটটা গুলি বের করা হয়েছিল আমার বুক থেকে। সত্যি কথা বলতে আমি কি করে বেঁচে গেলাম আমিও জানি না। ডাক্তারদের কাছেও এটা মিরাকেলের মতো ছিল। আমি ফিরতে চাইছিলাম যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের স্যার আমাকে কদিন ছুটি কাটাতে বলে পাঠিয়ে দিলেন এখানে। এভাবে কি চলে বলো তো? আপনিই বলুন বাবা। ওদিকে আমার জুনিয়ার, কলিগরা প্রাণ হাতে লড়বে আর আমি ছুটি কাটাতে চলে আসবো? এত একপ্রকার যুদ্ধ থেকে পালানো!”


কথাগুলো শোনার পর ফুপিয়ে কেঁদেছিল ঊর্মি, “হোক পালানো! যতক্ষণ না সব নর্মাল হচ্ছে, তুমি সুস্থ হচ্ছো ততক্ষণ তোমার যাওয়া হবে না!” বলে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। রজতাভ কিছু বলার সুযোগই পায়নি। ঊর্মির বাবা বুঝেছিলেন মেয়ে জামাইয়ের উপর রাগ করেছে। রাগ করাটাই স্বাভাবিক। এতগুলো দিন কোনো খবর নেই, কোনো কথা নেই। হঠাৎ এরকম বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরে এসে আবার মৃত্যুপুরীতে ফেরার কথা বলছে বলেই ঊর্মি অভিমান করেছে ওর উপর। উনি হেসে জামাইকে বুঝিয়েছিলেন সবটা তারপর ঊর্মির অভিমান ভাঙাতেই দুজনকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন দার্জিলিংয়ে। 

 রজতাভ ক্যামেরার রিলটাকে পরের ছবির জন্য সেট করতে করতে বেঞ্চে বসতেই ওর হাতে প্লেট ধরিয়ে দিয়ে বলল,“ রাখো তো এখন ক্যামেরাটা! সেই তখন থেকে দেখছি। একটু পর পর ছবি তুলেই চলেছ। এত ছবি তোলা কীসের শুনি? আগে তো বেড়াতে গেলে এত ছবি তুলতে না।” রজতাভ ক্যামেরাটা কভারে ঢুকিয়ে প্লেট থেকে একটা পাউরুটি তুলে কামড় দিয়ে বলল,“ও তুমি বুঝবে না। পাহাড়ে এসে যদি ছবিই না তুললাম তাহলে ঘুরতে আসা কীসের জন্য?চারদিকে দেখো একবার। সকলেই ছবি তুলছে। হ্যা আগেও আমরা বেড়াতে এসে ছবি তুলিনি বটে। কিন্তু সেটা তো আর নিছক বেড়ানো ছিল না। ছিল হানিমুন। আর এটা হানিমুন নয়। বলতে পারো নর্মাল ট্রিপ। তাই ছবি তুলছি। তাছাড়া আগে বেড়াতে গেলে তো অর্ধেকদিন তো ঘরেই কাটাতাম। সেখানে কি ছবি তুলবো? নিজের বউয়ের সাথে...!” 

কথাটা শেষ হবার আগেই রজতাভর হাতে মৃদু চাপড় মেরে চারদিকে একবার সন্তর্পণে তাকায় ঊর্মি। তারপর বলে,“উফ! তোমার মুখে কি কিছুই আটকায় না?”

- আজ্ঞে না ম্যাডাম! আমরা আর্মিম্যানরা এরকমই। লজ্জা,ঘৃণা,ভয় এই তিনটেই আমাদের থাকে না। আমরা যা করি সদর্পে করি। তাছাড়া নিজের বউয়ের সাথে আদিরসাত্মক তত্ত্ব নিয়ে কথা বলবো না তো কি পদাবলী নিয়ে কথা বলব?

- আমি সেটা বলছি না। কিন্তু সব কথার একটা নির্দিষ্ট জায়গা, নির্দিষ্ট সময় থাকে। লোকলজ্জা বলেও তো কিছু আছে।

- উফ! তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না। একইরকম দিদিমাদের আমলে থেকে গেলে তুমি। আরে এটা আগের যুগ নেই যে ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেম করবো। চেনা কাউকে দেখলে মুখ ঢাকবো। এটা ১৯৯৯!এবছরটা গেলেই নতুন শতাব্দীতে পা রাখবো আমরা। এখনও লোকলজ্জা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে? লোকের কী অতো সময় আছে যে কে কী করছে দেখে বেড়াবে? তাছাড়া আমরা যদি সারাদিন ধরে এটাই ভাবতে থাকি যে লোকে কী বলবে? তাহলে লোকে কী বলবে? তাছাড়া আমি তো আর পরের বউকে নিয়ে কিছু করছি না। করছি নিজের বউকে নিয়ে। আর বিদেশে তো এসব নর্মাল! মনে আছে সেবার মানালীতে দুজন বিদেশীকে দেখেছিলাম আমরা।

- তাও আমার মতে এসব জিনিস চার দেওয়ালের মধ্যেই হওয়া ভালো। বাইরে নয়। আমরা বিদেশী নই যে যেখানে সেখানে শুরু হয়ে যাব।‌ তাহলে পশুর মধ্যে আর আমাদের মধ্যে তফাৎ কি রইল? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যতটা মনের তার চেয়ে বেশী আত্মার। শারীরিক প্রেম থাকবে তবে সেটা সাময়িক। বুঝলে মেজর মশাই?

- বুঝলাম! মানে আমি আর নিজের বউকে চুমু খেতে পারব না। জড়িয়ে ধরতে পারব না। জীবন থেকে সব অ্যাডভেঞ্চার বাদ নিয়ে নিরামিষ সাত্ত্বিক দাম্পত্য যাপন করব। তা এটা আসার আগেই বলতে পারতে। দার্জিলিং না এসে গয়া,কাশী,বৃন্দাবনের টিকিট কাটতাম। তীর্থযাত্রা হয়ে যেত।

- ধুর! আরে আমি ওসব করতে বারণ করেছি নাকি? করবে! অবশ্যই করবে! তবে সেটা হোটেলরুমের ভেতরে। সেটা আমাদের একান্ত আপন মুহূর্ত। যা আমাদেরই থাকবে। তবে পাবলিকের মাঝে নয়। কিছু জিনিসের আড়াল-আবডাল থাকলেই ভালো। সবকিছু খোলামেলায় হলে আর রহস্য কোথায় রইল?সংযমই দাম্পত্যের নিয়ম।

- তার মানে চাইলেও আর বাঁধনছাড়া হতে পারব না?

- কেন পারবে না? সংযম রাখতে বলেছি। ব্রহ্মচর্য নয়। তাছাড়া রাতে তো আমি তোমারই থাকছি! যত খুশি আদর করো বাধা দেব না। কিন্তু যতক্ষণ আমরা বাইরে আছি ততক্ষণ আমাদের এটুকু সংযম মেনে চলতে হবে। ঐ দেখো বাবুর মুখ হাড়ি হয়ে গেল। আরে বাবা আমি আমাদের ভালোর জন্যই বলছি তো নাকি?

রজতাভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তাহলে আজ থেকে আমি বর্বর প্রেমিক থেকে প্রাণনাথ স্বামী হয়ে গেলাম। বাইরে নো টাচিং নিয়ম মেনে চলতে হবে। কাকু-কাকিমাদের মতো বিহেভ করে ‘হ্যাগো’,‘ওগো করতে হবে।”

“আজ্ঞে হ্যা মশাই!একবছর আমাকে জ্বালানোর এটাই শাস্তি।" বলে হাসে ঊর্মি। রজতাভ মাথা নিচু করে বসে থাকে তারপর হেসে বলে, “হেসে নাও! হেসে নাও! যত পার হেসে নাও। একবার রুমে ফিরি তারপর আমি হাসব। একবছরের যত আদর আছে তোমার নিয়মেই উসুল করে নেব। বাইরে তোমার কথা শুনলেও ঘরে আমার কথা শুনতে হবে।”

- সে নাহয় দেখা যাবে। আপাতত খাবারটা খেয়ে নাও। তারপর আরো ঘুরতে হবে আমাদের।

বলে খেতে থাকে ঊর্মি। রজতাভ খাওয়া শুরু করার কিছুক্ষণ পরেই থেমে যায় তারপর বলে,“এক মিনিট! দাঁড়াও আরেকটা দারুন কনসেপ্ট পেয়েছি! ঊর্মি পাউরুটিটা ধরে থাকো।” বলে ক্যামেরাটা বের করে রজতাভ। ঊর্মি এবার বিরক্ত হয়।

- আবার? 

- এটাই লাস্ট! তারপর পরের ডেস্টিনেশনে তুলবো দাঁড়াও। এই মুহূর্তগুলো ধরে রাখা ভীষণ দরকার। দাঁড়াও!পাউরুটিটা তোলো। আরেকটু হাসো,পারফেক্ট!”

বলে ছবিটা তুলে খেতে বসে রজতাভ। মনে মনে বলে,“এই মুহূর্তগুলো যে আজ ধরে রাখছি। এর মূল্য পরে টের পাবে তুমি। যখন আমি থাকবো না তখন এই ছবিগুলো তোমাকে আমার কথা মনে করিয়ে দেবে।” 

খেতে খেতে রজতাভ অতীতে চলে যায়। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর সে সামনে পেয়েছিল ড.মিত্রকে। আর্মিদের কাছে তিনি সাক্ষাত ভগবানের মতো। ডাক্তারির জোরে না জানি কত সৈন্যকে তিনি বাঁচিয়েছেন। এ যাত্রায় তার জন্যই বেঁচেছে বুঝতে পেরেছিল। তারপরেই পেয়েছিল সেই ভয়ংকর সংবাদটা। সেদিন সেই পাক সৈনিক নয়টা গুলি করেছিল তাকে। আটটা গুলি বের করতে পারলেও একটা গুলি বের করা সম্ভব হয় নি। ড.মিত্র বলেছিলেন,“দেখুন মেজর। বুলেটটা যে জায়গায় আটকে আছে সেখান থেকে বের করতে হলে একটা রিস্কি অপারেশন করতে হতো আমাদের। আর সেটা করতে গেলে হয়তো আপনার লাইফ রিস্ক হতে পারতো।"

- যেদিন ভারতমায়ের জন্য আর্মি জয়েন করেছিলাম সেদিন থেকেই লাইফ রিস্ককে সঙ্গী‌ করেছি আমরা ডক্টর।

- হ্যা। কিন্তু তাই বলে জেনে শুনে একজন পেশেন্টকে আমি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না।

-আমি অতো জানতে চাইনা ডক্টর! জাস্ট জানতে চাই আমি আবার ব্যাটলফিল্ডে যেতে পারব কিনা?

কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রজতাভর দিকে তাকিয়ে থাকেন ডাক্তার মিত্র। তারপর ধীর অথচ দৃঢ়কন্ঠে বলেন, "বুলেটটা যেখানে আটকে আছে সেখানে চাপ পড়লে ভয়ঙ্করতম কষ্ট পেয়ে মরতে হতে পারে আপনাকে। আর আপনার যা কাজ তাতে ওখানে চাপ পড়বেই।"

- তো বুলেটটা বের করে দিন!

- সেখানেই তো যত সমস্যা!

- বুঝলাম না।

- বুলেটটা বের করতে হলে আমাদের একটা অপারেশন করতেই হবে। কিন্তু সেখানেও একটা রিস্ক থাকছে। বুলেটটা বের করা মাত্র ভীষণরকমের ব্লাডলস হতে পারে। মেবি অপারেশন টেবিলে আপনার মৃত্যু হতে পারে। সেই ভয়ে আমরা রিস্ক নিই নি।

- আমি বলছি তো! কোনো ভয় নেই। আপনি কোনোরকম হেজিটেশন না করে বুলেটটা বের করুন। আমার আপনার প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। একবার যখন বেঁচে ফিরেছি। আবার বেঁচে ফিরব। আপনি প্লিজ অপারেশনটা করুন। আমি ব্যাটলফিল্ডে ফিরতে চাই। আমার কলিগরা, আমার দেশ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। 

কিন্তু রজতাভর অনুরোধ রাখতে পারেন নি ডাক্তার মিত্র। হাজার অনুরোধ,ঝগড়ার পড়েও মানুষটা কোনোরকম রিস্ক নিতে চাননি। রজতাভকে বাধ্য হয়ে ভলিন্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। এসব কথা রজতাভ জানায়নি বাড়িতে। নিজের ক্ষতর কথা কাকে জানাবে ও। যে পরিমাণ কষ্ট নিয়ে আর্মি থেকে ফিরেছে সেই কষ্টের কথা কে বুঝবে?কিছু কিছু জিনিস আছে যা কাউকে বলা যায় না। কিছু কিছু ক্ষত আছে যা কাউকে দেখানো যায় না। নিজের বুকের মধ্যে চেপে রেখে দিতে হয় সেই সব রক্তাক্ত ক্ষতকে। যাতে কেউ সেটার নাগাল না পায়। 


(চলবে...)

শনিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ চতুর্থ পর্ব





আজকেই আলাপ হওয়া মহিলার সাথে সুজাতাকে এভাবে তুইতোকারি করতে দেখে প্রথমে ভেবলে গিয়েছিল তথাগত। ঘোর কাটলো পাশের ব্যক্তির কন্ঠস্বরে। “ আপনি এখনও বুঝতে পারেন নি তাই না?" পাশ ফিরে তথাগত দেখল আগন্তুক মহিলার স্বামী তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার ঠোঁটে হাল্কা রহস্যের হাসি। তথাগত মাথা নাড়তেই ভদ্রলোক হেসে বলেন,

- আসলে ওরা দুই বান্ধবী! সেই স্কুলবেলা থেকে। বলতে পারেন দুই অভিন্ন হৃদয় সখী। এবার আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে তাহলে আজ সকালেই আলাপ হবার পর ওরা তেমন রিঅ্যাক্ট করল না কেন? বা আপনাকে আপনার স্ত্রী আমাদের ব্যাপারে আগে বলেনি কেন? কি তাইতো?

তথাগত মাথা নাড়তেই ভদ্রলোক হেসে বলেন,“ কারনটা ভীষণ বোকাবোকা আর চাইল্ডিশও বলতে পারেন। আসলে আমাদের বিয়েতে আপনার স্ত্রীর আসার কথা ছিল। কিন্তু ও আমাদের বিয়ে অ্যাটেন্ড না করে কাউকে না জানিয়ে সোজা কোন মাসির বাড়ি বেড়াতে চলে যায়। ব্যস! আমার গিন্নি তো রেগে ফায়ার! ভেবেছিল দুজনে মিলে বিয়েতে বেশ আনন্দ করবে। আপনার স্ত্রীও কথা দিয়েছিল ও আসবে। কিন্তু এভাবে কথা খেলাপ করায় রেগে প্রতিজ্ঞা করে বসল আর যাই হোক কোনোদিনও এই সখীর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবে না। রাগ এতটাই ছিল যে আপনার স্ত্রী আমাদের বিয়ের পরে দেখা করতে এলেও ও দেখা করেনি। কেন প্রতিজ্ঞা করা সত্ত্বেও ওকে মাসির বাড়ি যেতে হল সেটাও জানতে চায়নি। দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম ওর মাসির নাকি সে সময় যায় যায় অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। না গেলে খারাপ দেখাতো। কিন্তু সেটা আমার স্ত্রী বুঝলে তো? বাচ্চাদের মতো সে রাগ এখনও পুষে রেখেছে। এবং সময়ের সাথে সেটা এতটাই বেড়েছে যে বাড়িতে এসে নিমন্ত্রণ করা সত্ত্বেও আপনাদের বিয়েতে যায়নি ও। তবে আমি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম সুজাতার সাথে। বলতে পারেন আমার স্ত্রীর সব খবরই পাচার করে দিতাম ওর কাছে। আমরা অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম যাতে দুজনের এই অনির্দিষ্টকালের আড়িটা ভেঙে যায়। কিন্তু কিছুতেই কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আপনাদের বিয়ের সময় আমি বাইরে ছিলাম। জানতাম না বিয়ের খবরটা। জানলে হয়তো বিয়ের দিনই দেখা হত আমাদের। সে যাক‌ গে! কথায় আছে বেটার লেট দ্যান নেভার। আমরা ঠিক করলাম যেটা বিয়েতে হয়নি সেটা হানিমুনে হবে। আপনাদের রওনা হবার পরদিন আমি ঊর্মিকে নিয়ে রওনা হব। বুদ্ধিটা সুজাতারই ছিল। কথামত আপনাদের আসার পরদিন চলে এলাম আমরা। ভেবেছিলাম এখানে পৌঁছে একদিন দুইসখীকে প্ল্যান করে মুখোমুখি বসিয়ে দেব। কিন্তু এখানে এসে খোঁজ নিয়ে দেখি সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। সুজাতা জ্বরে ভুগছে আর আপনি টেনশনে। অগত্যা দুটো দিন অপেক্ষা করতে হল। তবে একদিকে ভালোই হয়েছে। দুর থেকে আপনাদের দুজনকে দেখে ধীরে ধীরে ঊর্মির মনের রাগ একটু হলেও কমেছে। বাকি সুজাতার উপর ওর যতটুকু অভিমান ছিল জ্বরের খবর পেয়ে সেটুকুও দুর হয়ে গেছে। ঐ দেখুন এতবছর পর দুজনে কীরকম মিলে মিশে গেছে। মনে হচ্ছে যেন দুই বোন অনেক বছর পর আবার পরস্পরের সাথে মিলিত হয়েছে।”

তথাগত সামনের দিকে তাকায় দেখে সত্যিই সুজাতা আর ঐ মহিলা ততক্ষণে দুজনে একে অপরের হাত ধরে সৈকতের বালিতে বসে আছে। মহিলা কাঁদতে কাঁদতে কিছু একটা বলছে আর সুজাতাও অশ্রুসজল চোখে হাসতে হাসতে মহিলার চোখের জল মুছে দিচ্ছে। তথাগত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“সবই তো বুঝলাম! কিন্তু একটা জায়গায় আক্ষেপ থেকে গেল।”

ভদ্রলোক অবাক হয়ে বলেন, “কী আক্ষেপ?”

- আপনাদের এই ভেঞ্চারে আমাকে বাদ দেওয়া হল কেন? আরে মশাই আমি তো আর সিনেমা,সিরিয়ালের কুচুটে ভিলেন নই যে সব জেনে আপনার স্ত্রীকে জানিয়ে দিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দিতাম! বরং আপনাদের এই ভেঞ্চারে আমি থাকলে প্রথমদিনই হয়তো ওদের এই আড়ি, অভিমানের পালাটা ভেঙে যেত। না মশাই আমাকে না জানিয়ে আপনারা অন্যায় করেছেন। এতে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি!

- বিশ্বাস করুন! আমি‌ নির্দোষ! আমি বারবার সুজাতাকে বলেছিলাম আপনাকে সবটা জানাতে। ও বলেছিল এখানে এলেই জানাবে। এমনকি এখানে এসে ও অসুস্থ জানার পর আপনার পাশে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছে করলেও পারিনি কারন সুজাতাকে কথা দিয়েছিলাম ও যতক্ষণ না বলছে ততক্ষণ কোনো রকম সাহায্য করবো না। তাছাড়া ওর জ্বরটা আমাদের প্ল্যানের মধ্যে ছিল না। আমরা ভেবেছিলাম এখানে আসার পর সব প্ল্যান অনুযায়ী হবে। কিন্তু...

-কোনো কিন্তু নয়!দোষ যখন করেছেন শাস্তি পেতেই হবে!

-বেশ! আপনার শাস্তি আমি মাথা পেতে নেব। বলুন কী শাস্তি দেবেন?

তথাগত গম্ভীর মুখ করে কিছুক্ষণ তাকায় ভদ্রলোকের দিকে তারপর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,“ প্রথমত, আজকের পর থেকে আপনাদের পার্টনার ইন ক্রাইম হিসেবে আমাকেও নিতে হবে। দ্বিতীয়ত,বাকি ট্যুরটা ইভেন এরপর কোথায় বেড়াতে গেলে একসাথে যেতে হবে। তৃতীয়ত, আপনি, আজ্ঞে করা যাবে না। আজ থেকে আমরাও দুজনে বন্ধু হব। সো মেজর রজতাভ মজুমদার! বলো রাজি?”

রজতাভ হেসে তথাগতর হাত নিজের হাতে নিয়ে বলে, “রাজি!"

******

রাতের বেলা খাবার পাট চুকিয়ে পায়ে পায়ে সমুদ্রের পাড়ে এসে দাঁড়াল তথাগত। পাঁচদিন হল এখানে এসেছে ওরা। কাল রাতের ট্রেনে ফিরে যাবে। দেখতে দেখতে কোথা থেকে এক সপ্তাহ কেটে গেল বোঝাই গেল না। এখানে আসার আগে সে নিজেই গজগজ করছিল সুজাতার আবদারের জন্য। এখানে এসে জ্বর বাধানোর জন্য বিরক্ত হয়ে ফিরে যেতে চেয়েছিল সে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আরও কটা দিন থেকে গেলে বেশ হত। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আসছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমুদ্রের দিকে তাকাল তথাগত। ক্রমাগত পাড়ে ভেঙে পড়া অশান্ত ঢেউগুলো দেখে তার মনে হল যেন তাদের ফেরার খবর পেয়ে সমুদ্রও অশান্ত হয়ে পড়ছে। একের পর এক প্রবল ঢেউয়ের শব্দে যেন আর্জি জানাচ্ছে থেকে যাওয়ার। কিন্তু তথাগত নিরুপায়। তার ছুটির সময়সীমা প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আর মাত্র দুটো দিন। তারপর তাকে আবার ফিরে যেতে হবে তার কর্মক্ষেত্রে। ফিরে যেতে হবে গভীর বনের কোলে। সমুদ্রের এই গর্জনমুখর সৈকত ছেড়ে নীরব,শান্ত বনের মাঝে। না জানি কেমন আছে বনের সেই গাছপালা,পশুপাখিরা। 

সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বনের কথাই ভাবছিল তথাগত এমন সময় শুনতে পেল রজতাভর গলা, “কী ব্যাপার? রেঞ্জারমশাই হঠাৎ বনের গুণগান ছেড়ে সমুদ্রের মুখোমুখি? বলি মনের মাঝে কাব্যটাব্যের উদয় হয়েছে নাকি?”

তথাগত উদাসীনভাবে হেসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে, “নাহ! অতোটাও প্রতিভা নিয়ে এই ধরাধামে আসিনি আমি মেজরসাহেব। আমি ভাবছিলাম গত পাঁচদিনের কথা। দেখতে দেখতে পাঁচটা দিন কীভাবে কেটে গেল বোঝাই গেল না। ইচ্ছে করছে এখানে আরো কটা দিন থেকে যেতে। বার বার মনে হচ্ছে এই তো এলাম কালকে! এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হচ্ছে!” 

রজতাভ এগিয়ে এসে তথাগতর পাশে দাঁড়ায়। জিন্সের পকেট থেকে হিপ ফ্লাস্ক বের করে ছিপি খুলে একচুমুক খেয়ে এগিয়ে দেয় তথাগতর দিকে। রজতাভ তেমন মাতাল না হলেও ওর মতোই যে পানীয়রসিক সেটা তথাগত জানতে পেরেছিল আলাপের প্রথম রাতেই। তথাগত হেসে ফ্লাস্কটা হাতে নিয়ে সেটায় থাকা পানীয়তে চুমুক দেয়। নিমেষের মধ্যে উগ্র ঝাঁঝালো তরল লাল পানীয় তথাগতর সমগ্র শরীরের শিরা-উপশিরায় আগুন ধরিয়ে স্নায়ুতে একটা বিদ্যুতের ঝিলিক খেলিয়ে কন্ঠ বেয়ে পাকস্থলীতে নেমে যায়। একচুমুক খেয়ে সে রজতাভকে ফেরত দেয় ফ্লাস্কটা। রজতাভ ফ্লাস্কটা ফেরত নিয়ে বলে, “সত্যিই তাই! দেখতে দেখতে কটা দিন যে কীভাবে কেটে গেল বোঝাই গেল না। খুব মিস করবো এই জায়গাটা আর তোমাদের। তা তোমাদের ট্রেন কটার দিকে?”

- দুপুর সাড়ে বারোটা। সকালেই বেরোতাম কিন্তু সারাদিনের ধকল নিয়ে আবার রাতে ট্রেন ধরো। অতো ধকল সুজাতার সইবে না। এই রাতের দিকে ঢুকে একটা দিন বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের দিকে বেরোনো যাবে। তা তোমাদের কটার দিকে?

- বিকেল চারটে! এখান থেকে সোজা শিয়ালদা। সেখান থেকে সোজা শিলিগুড়ি। ওখানে ঊর্মিদের বাড়িতে একদিন থেকে ঊর্মিকে রেখে বিকেলের ট্রেনে সোজা নিজের ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দেব।

- আমারও সেরকমই প্ল্যান। সুজাতাকে ওর মায়ের কাছে রেখে আপাতত রওনা দেব নিজের বেসে।

- সেকি! ওকে নিয়ে‌ যাচ্ছ না?

- যাবো, তবে এখন নয়। ওদিকটা আগে গুছিয়ে নিয়ে, দুজনের বসবাসের যোগ্য করে,সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে সাজিয়ে তারপর নিয়ে যাব। আগে একা থাকতাম কাজেই বুঝতে পারছ ঘরদোরের অবস্থা কেমন হতে পারে। সেটা সামলে নিই তারপর। তাছাড়া একগাদা কাজ পড়ে আছে ওখানে। সেগুলো সামলে নিতে হবে। এখনই নিয়ে গেলে একে তো দিশেহারা হয়ে পড়বে, তার উপর সময় কাটাতে না পেরে আরো বোর হয়ে যাবে। জঙ্গলের জীবন বড্ড নিস্তব্ধ আর শান্ত। সারাদিন বসে বসে বিরক্ত হবার চেয়ে কটা দিন বাড়িতেই থাকুক। আমার কথা ছাড়ো তোমার তো কাশ্মীরে পোস্টিং না?

- হুম! অবশ্য ওখানকার অবস্থা যে খুবই শান্ত তা বলতে পারব না। জানি না ফেরার পর কী অপেক্ষা করছে। যাই বলো বনদপ্তরের চাকরি বেশ আরামের।

- কে বলেছে? রোজ হাজার গাছের হিসেব, কোথাও গাছ কাটতে হলে তার অনুমতিপত্র খতিয়ে দেখা। বনের জন্তু জানোয়ার তা সে যতই ভয়ংকরতম হিংস্র হোক না কেন তার‌ খোঁজ রাখা। লোকালয়ে বনের পশু যাক বা বাড়ির উনুনে কেউটে সাপ পাওয়া যাক, দৌড়ে গিয়ে মানুষের হাত থেকে তাদের বাঁচানো, বনে ফিরিয়ে আনা। কম ঝক্কি নাকি? তার উপর পোচার, কাঠপাচারকারী, অনুমতি ছাড়া কোর এরিয়ায় প্রবেশ করা মানুষ তো আছেই। তাও কিছু হলে “বনদপ্তর অকর্মণ্য!" শুনতে হয়।

- বুঝলাম! ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস' কেস আমাদের। তবে একটা জিনিসে মিল আমাদের। জীবনের কোনো ভরসা নেই।‌ যখন তখন পরপারে পোস্টিং হতে পারে।

- তা যা বলেছ। তবে তফাৎ একটাই। তোমরা শহিদ হলে মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর আমরা মরলে একটা শিরোনাম ব্যস!‌

বলে মলিন হাসি হাসে তথাগত। রজতাভও সোজা তাকায় সমুদ্রের দিকে তারপর বলে,“ অথচ আমরা মরতে চাই না। বরং বাঁচতে চাই আরো। যাতে‌ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দেশের সেবা করে যেতে পারি।  এই যে এত যুদ্ধ, এত ছাউনি দখল, এত হতাহত আমরা চাইনি। মানুষ মারতে আমাদেরও ভালো লাগে না।‌ কিন্তু দেশের স্বার্থে, দেশকে রক্ষার স্বার্থে লড়ে যেতে‌ হয় দুটো দেশকেই। ওদের আর আমাদের একটাই পরিচয়। আমরা সৈন্য। দেশের সেবা, দেশের রক্ষার স্বার্থে আমরা প্রাণের আহুতি নিতে অথবা আহুতি দিতেও বদ্ধ পরিকর।”

- এটাই তো অবাক করে আমাকেও! সীমান্তবর্তী‌ দুটো দেশের পরিবেশ, ভাষা, পরিধান এক হলেও দুপক্ষ আলাদা শুধুমাত্র সমস্যাসঙ্কুল জায়গা থেকে দুরে কোনো প্রাসাদোপম বাড়িতে বসা কয়েকজন নেতার সিদ্ধান্তের ফলে। নাহলে প্রকৃতির কাছে তো সবাই সমান!

রজতাভ চুপ করে বসে থাকে। তথাগত একটাও ভুল কথা বলছে না। সত্যিই তো! প্রকৃতি তো মানুষের প্রতি পক্ষপাত করে নি।‌ করেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের একেবারে চূড়ায় বসে থাকা মানুষেরা। কিন্তু তারা যে আবেগপ্রবণ নয়। আবেগ দিয়ে আর যাই হোক দেশ চালানো অসম্ভব। এখানে সে বা তথাগত একজন রাষ্ট্রের হাতে চালিত পুতুল মাত্র। তাদের কাজ দেশের হয়ে কাজ করা। দেশকে রক্ষা করা। এখানে রাষ্ট্র তাদের কাছে চায় প্রশ্নহীন আনুগত্য। কোনো প্রশ্ন করা চলবে না। ‌করলেই তোমাকে সরে যেতে হবে তোমার জায়গা থেকে। মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রজতাভ। তারপর মনে মনে বলে, “সব যদি এতই সোজা‌ হত তাহলে তো যুদ্ধের প্রয়োজন হত‌ না তথাগত। সীমান্তের গোলকধাঁধার হিসেব তুমি বুঝবে না হে! এ হিসেব বনের মতো সহজ‌ নয়।”

রজতাভর চিন্তার জাল ছিন্ন হল ঊর্মিদের চিৎকারে। সে পিছন ফিরে দেখল ঊর্মিরা ওদের কাছেই বসে আছে। রজতাভকে পেছন ফিরতে দেখে ঊর্মি বলে উঠল, “বলি সারারাত কি এখানেই কাটানোর প্ল্যান আছে নাকি? তা কাটাতে পারো। আমাদের অসুবিধে নেই। তবে ঘরের চাবিটা দিয়ে দিলে ভালো হয়। অন্তত আমরা ঘরে ফিরে ঘুমোতে পারি।” রজতাভ হেসে তথাগতকে বলে,“ দেখেছ? যেই একটু শান্তিতে দুজনে গল্প করতে বসেছি তখনই এদের হাকডাক শুরু হয়ে গেছে। বিয়ে করে একটুও শান্তি নেই। সবে বিয়ে করেছ তো! এখন টের পাবে না। দু তিনবছর যাক তারপর দেখবে বিবাহপরবর্তী দহন কাকে বলে? সাধে বলে ‘শাদি কা লাড্ডু বড়ি খতরনাক চিজ হোতি হ্যা। যো খাতা হ্যা বো পছতাতা হ্যা। যো নহি খাতা হ্যা বো অউর জ্যায়াদা পছতাতা হ্যা।’ নাহ যাই! নাহলে রাতটা সত্যি‌ সত্যি এখানে বালির উপর নাহলে লাউঞ্জে শুয়ে কাটাতে হবে। তবে ঐ কথাই রইল ভায়া! এরপর থেকে পরের ট্রিপে কিন্তু সবকটা একসাথে বেড়োবো কেমন? এলাম!"

বলে রজতাভ হাসতে হাসতে উঠে চলে গেল ঊর্মির সাথে। সুজাতা এগিয়ে এসে তথাগতর পাশে বসল। তথাগত সুজাতার দিকে না তাকিয়েই বলল, “ওষুধ খেয়েছ?” জবাবে সুজাতা শুধু একটা “হুম!" বলে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর আকাশের মেঘ কেটে দেখা দিল চাঁদ। ক'দিন পরেই পূর্ণিমা। কাজেই অল্প জ্যোৎস্নায় ভেসে যেতে লাগল সমগ্র সৈকত। আকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে তথাগত বলে উঠলো, “তাহলে কাল আমরা ফিরছি!" সুজাতা চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিকথা বলতে পাঁচটা দিন যে এত তাড়াতাড়ি কেটে যাবে ও ভাবতে পারেনি। তথাগত মৃদুগলায় বলল,“সু?" সুজাতা জবাব দিল,“হুম!"

- তোমাকে তোমাদের বাড়িতে রেখে আমি ফিরে যাব।

- হুম।

- কটা দিন আমাকে ছাড়া থাকতে হবে। ওদিকটা গুছিয়ে নিই একটু। তারপর তোমাকে নিয়ে যাব ওখানে কেমন?

- হুম।

- তোমার মন খারাপ করবে না?

- হুম।

- ওখানে প্রতি সপ্তাহে একবার করে ফোন করবো তোমাকে কেমন?

- হুম।

- এখানে এসে ভালো লাগছে?

- হুম।

- আর কটাদিন থাকতে ইচ্ছে করছে ?

এবার তথাগতর কাঁধে মাথা রাখে সুজাতা। তথাগত জ্যোৎস্নার আলোয় দেখে সুজাতা কাঁদছে। তথাগত সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ আমারও যে আরো কটা দিন থাকার ইচ্ছে করছে না তা নয়।‌ কিন্তু কি করা যাবে বলো? ছুটির দিনগুলো যে শেষ হতে চলল! ফিরতে তো হবেই!”

সুজাতা তথাগতর কাঁধে মাথা রেখে অশ্রুসজল চোখে দেখতে থাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্ছাস। তথাগত এবার সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে বলে, “তবে এই ফেরাটা কিন্তু ফেরা নয়। বরং এখানে আবার চলে আসার অজুহাত মাত্র। এখান থেকে ফিরছি ঠিকই কিন্তু আবার আসব আমরা। এবার কেউ থাকবে না সাথে। না রজতাভ, না ঊর্মি। শুধু তুমি আর‌ আমি।‌ এই ক'দিনে সমুদ্রকে আমিও ভালোবেসে ফেলেছি যে! দুজনে মিলে এভাবে সারাদিন পাড়ে বসে থাকবো কেমন? ”

সুজাতা অস্ফুটে বলে, “হুম।" 

তথাগত হাতঘড়ির দিকে একবার দেখে বলে,“ রাত অনেক হল সুজাতা। চলো ফিরে যাই হোটেলে। রাতটুকু কাটিয়ে কাল পাড়ি দিতে হবে নিজের বাসায়।”

বলে বালি থেকে উঠে দাঁড়ায় তথাগত। প্যান্ট থেকে ভেজা বালি ঝেড়ে নিতে গিয়েও থমকে যায়। বালিগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবে বাইরে বেড়াতে এসে যদি কোনো স্মৃতিচিহ্ন থেকে যেতে চায় ইচ্ছে করে তো থাকুক না। অন্তত এই ভেজা বালিগুলো নাহয় স্মৃতি হয়ে চলুক ওর সাথে। ভেবে সুজাতার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় সে। তারপর দুজনে মিলে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় হোটেলের দিকে।

******

দীঘা থেকে ফেরার পর প্রায় একবছর কেটে গেছে। তথাগত প্রোমোশন নিয়ে মধ্যপ্রদেশে কানহা ফরেস্টে বদলি হয়ে গেছে। সাথে নিয়ে গেছে সুজাতাকে। দুজনে মিলে তিলে তিলে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে নিজেদের সংসার। সকালে তথাগত বেরিয়ে যায় নিজের কাজে। নেমে পড়ে সারাদিনের বনরক্ষার যুদ্ধে আর সুজাতা নেমে পড়ে সংসারের কাজে। কোয়ার্টারের কেয়ারটেকারের বউয়ের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে রান্না করে, গল্পগুজব করে কাটিয়ে দেয় সারাদিন। রাতে তথাগত ফিরলে দুজনে মিলে খেতে বসে সারাদিনের রোজনামচা জানায় একে অপরকে। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে তথাগত এদিক ওদিক ঘুরিয়ে আনে সুজাতাকে। আদিবাসীদের পরব হলে নিয়ে যায় সঙ্গে করে। স্বামী-স্ত্রীতে বেশ‌ আছে ওরা। 

প্রায় একবছর হতে চলল রজতাভর কোনো পাত্তা নেই। দীঘা থেকে ফেরার পরদিনই খবর এসেছিল রজতাভকে কাশ্মীর থেকে বদলী করে কার্গিলে পাঠানো হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জয়েন করতে হবে। রজতাভ আর দেরী করে নি। ঊর্মিকে ওর বাপের বাড়িতে রেখে প্রায় একঘন্টার মধ্যে বেড়িয়ে পড়েছিল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। তারপর থেকে আর কোনো খবর নেই। টিভিতে,রেডিওতে শোনা যাচ্ছে কার্গিলের অবস্থা ভালো নয়। যুদ্ধকালীন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। পাকসেনারা ক্রমশ এক এক করে দখল নিচ্ছে ভারতীয় সেনার বাঙ্কারগুলির। ভারতীয় সেনারাও ছাড়বার পাত্র নয়। নিজের প্রাণের তোয়াক্কা না করে ঝাপিয়ে পড়ছে যুদ্ধক্ষেত্রে। ছিনিয়ে নিচ্ছে নিজের বাঙ্কার। তারপর‌ ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলে। রোজ রোজ একই খবর শুনে ঊর্মির অবস্থা ক্রমশ সঙ্গীন হয়ে পড়ছে। সকালে সে ক্রমাগত অস্থির হয়ে অপেক্ষা করে পোষ্টম্যানের। যদি কোনো চিঠি আসে এই আশায়। রোজ খবরের কাগজের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা খুটিয়ে পড়ে যদি কোনো খবর পাওয়া যায় এই আশায়। টেলিফোনের শব্দ পেলেই রজতাভ ফোন করেছে ভেবে ছুটে আসে সে। রোজ সন্ধ্যেতে শুকনো মুখ করে বৈঠকখানায় বসে খবর শোনে সে রেডিওতে। কিন্তু কোথাও কোনো খবর নেই! রজতাভ যেন নিখোঁজ হয়ে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। ঊর্মির মা-বাবার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে ওকে সামলানো। তারা বোঝেন সবই কিন্তু মেয়েকে বোঝাতে‌ পারেন না। তাদের চোখের সামনে মেয়েটা ক্রমশ‌ উন্মাদিনী হয়ে যেতে থাকে। সেটাই স্বাভাবিক। জামাই দেশের জন্য যুদ্ধে গেছে। যে যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরার চান্স প্রায় নেই বললেই চলে। রোজই তো শুনছেন রোজ এক একটা বাঙ্ক দখল করছে ভারতীয় সেনা। বাঙ্কারের মাথায় বিজয়কেতন রূপে জাতীয় পতাকা মেলে ধরছে। কিন্তু সেই বাঙ্কার দখল করতেই না জানি কত সৈনিক হাসি মুখে বলি হয়ে যাচ্ছে শত্রুদের হাতে। রোজ সন্ধ্যেবেলা খবর শোনার সময় একটা চোরা আতঙ্ক নিয়ে বসে থাকেন তারা।‌ এই বুঝি সঞ্চালক তাদের জামাইয়ের নাম ঘোষণা করে বসলেন শহীদের তালিকায়। খবর শেষ হবার পর জামাইয়ের নাম না পেয়ে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলেন তারা। রোজ রোজ এই মানসিক যন্ত্রণা অসহনীয় হলেও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সহ্য করে যেতে হয় তাদের। মনে মনে তারা প্রাণপণে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন এই অপেক্ষার অবসানের। প্রার্থনা করেন যুদ্ধ শেষ হবার।

প্রতিদিনের মতো আজও অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বসার ঘরের রেডিওটা চালিয়েছিলেন ঊর্মির বাবা। সঞ্চালিকার খবর পাঠ শুনতে শুনতে সোফায় বসেছিলেন। ঊর্মি চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকছিল। সঞ্চালিকা প্রতিদিনের মতো একই খবর পড়ে চলেছিলেন এমন সময় দুজনকে চমকে ঘরের টেলিফোনটা বেজে উঠল। ঊর্মির বাবা ঊর্মির দিকে তাকালেন। ঊর্মি কোনোরকমে চায়ের ট্রে-টা টেবিলে রেখে ছুটে গেল টেলিফোনের দিকে। তারপর রিসিভারটা ক্রেডল থেকে তুলে কানে দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য প্রস্তরবৎ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হাউহাউ করে কেঁদে মেঝেতে বসে পড়ল। মেয়ের এহেন অবস্থা দেখে ছুটে এলেন ঊর্মির বাবা। মনে মনে একটা খারাপ খবর শোনার আশঙ্কায় নিজের মনকে শক্ত করে ঊর্মির থেকে রিসিভারটা নিয়ে নিজের কানে দিলেন তিনি। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “হ্যালো?”

প্রায় একবছর পর দুরভাষের ওপার থেকে ভেসে এল জামাইয়ের কন্ঠস্বর, “মেয়েকে বলুন হাউ হাউ করে না কেঁদে রান্না চাপাতে। আমি আসছি ঘন্টাখানেকের মধ্যে। ভীষণ খিদে পেয়েছে আমার। শিলিগুড়ি প্রায় এসে গেলাম বলে।”

(চলবে...)

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...