আজকেই আলাপ হওয়া মহিলার সাথে সুজাতাকে এভাবে তুইতোকারি করতে দেখে প্রথমে ভেবলে গিয়েছিল তথাগত। ঘোর কাটলো পাশের ব্যক্তির কন্ঠস্বরে। “ আপনি এখনও বুঝতে পারেন নি তাই না?" পাশ ফিরে তথাগত দেখল আগন্তুক মহিলার স্বামী তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার ঠোঁটে হাল্কা রহস্যের হাসি। তথাগত মাথা নাড়তেই ভদ্রলোক হেসে বলেন,
- আসলে ওরা দুই বান্ধবী! সেই স্কুলবেলা থেকে। বলতে পারেন দুই অভিন্ন হৃদয় সখী। এবার আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে তাহলে আজ সকালেই আলাপ হবার পর ওরা তেমন রিঅ্যাক্ট করল না কেন? বা আপনাকে আপনার স্ত্রী আমাদের ব্যাপারে আগে বলেনি কেন? কি তাইতো?
তথাগত মাথা নাড়তেই ভদ্রলোক হেসে বলেন,“ কারনটা ভীষণ বোকাবোকা আর চাইল্ডিশও বলতে পারেন। আসলে আমাদের বিয়েতে আপনার স্ত্রীর আসার কথা ছিল। কিন্তু ও আমাদের বিয়ে অ্যাটেন্ড না করে কাউকে না জানিয়ে সোজা কোন মাসির বাড়ি বেড়াতে চলে যায়। ব্যস! আমার গিন্নি তো রেগে ফায়ার! ভেবেছিল দুজনে মিলে বিয়েতে বেশ আনন্দ করবে। আপনার স্ত্রীও কথা দিয়েছিল ও আসবে। কিন্তু এভাবে কথা খেলাপ করায় রেগে প্রতিজ্ঞা করে বসল আর যাই হোক কোনোদিনও এই সখীর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবে না। রাগ এতটাই ছিল যে আপনার স্ত্রী আমাদের বিয়ের পরে দেখা করতে এলেও ও দেখা করেনি। কেন প্রতিজ্ঞা করা সত্ত্বেও ওকে মাসির বাড়ি যেতে হল সেটাও জানতে চায়নি। দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম ওর মাসির নাকি সে সময় যায় যায় অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। না গেলে খারাপ দেখাতো। কিন্তু সেটা আমার স্ত্রী বুঝলে তো? বাচ্চাদের মতো সে রাগ এখনও পুষে রেখেছে। এবং সময়ের সাথে সেটা এতটাই বেড়েছে যে বাড়িতে এসে নিমন্ত্রণ করা সত্ত্বেও আপনাদের বিয়েতে যায়নি ও। তবে আমি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম সুজাতার সাথে। বলতে পারেন আমার স্ত্রীর সব খবরই পাচার করে দিতাম ওর কাছে। আমরা অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম যাতে দুজনের এই অনির্দিষ্টকালের আড়িটা ভেঙে যায়। কিন্তু কিছুতেই কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আপনাদের বিয়ের সময় আমি বাইরে ছিলাম। জানতাম না বিয়ের খবরটা। জানলে হয়তো বিয়ের দিনই দেখা হত আমাদের। সে যাক গে! কথায় আছে বেটার লেট দ্যান নেভার। আমরা ঠিক করলাম যেটা বিয়েতে হয়নি সেটা হানিমুনে হবে। আপনাদের রওনা হবার পরদিন আমি ঊর্মিকে নিয়ে রওনা হব। বুদ্ধিটা সুজাতারই ছিল। কথামত আপনাদের আসার পরদিন চলে এলাম আমরা। ভেবেছিলাম এখানে পৌঁছে একদিন দুইসখীকে প্ল্যান করে মুখোমুখি বসিয়ে দেব। কিন্তু এখানে এসে খোঁজ নিয়ে দেখি সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। সুজাতা জ্বরে ভুগছে আর আপনি টেনশনে। অগত্যা দুটো দিন অপেক্ষা করতে হল। তবে একদিকে ভালোই হয়েছে। দুর থেকে আপনাদের দুজনকে দেখে ধীরে ধীরে ঊর্মির মনের রাগ একটু হলেও কমেছে। বাকি সুজাতার উপর ওর যতটুকু অভিমান ছিল জ্বরের খবর পেয়ে সেটুকুও দুর হয়ে গেছে। ঐ দেখুন এতবছর পর দুজনে কীরকম মিলে মিশে গেছে। মনে হচ্ছে যেন দুই বোন অনেক বছর পর আবার পরস্পরের সাথে মিলিত হয়েছে।”
তথাগত সামনের দিকে তাকায় দেখে সত্যিই সুজাতা আর ঐ মহিলা ততক্ষণে দুজনে একে অপরের হাত ধরে সৈকতের বালিতে বসে আছে। মহিলা কাঁদতে কাঁদতে কিছু একটা বলছে আর সুজাতাও অশ্রুসজল চোখে হাসতে হাসতে মহিলার চোখের জল মুছে দিচ্ছে। তথাগত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“সবই তো বুঝলাম! কিন্তু একটা জায়গায় আক্ষেপ থেকে গেল।”
ভদ্রলোক অবাক হয়ে বলেন, “কী আক্ষেপ?”
- আপনাদের এই ভেঞ্চারে আমাকে বাদ দেওয়া হল কেন? আরে মশাই আমি তো আর সিনেমা,সিরিয়ালের কুচুটে ভিলেন নই যে সব জেনে আপনার স্ত্রীকে জানিয়ে দিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দিতাম! বরং আপনাদের এই ভেঞ্চারে আমি থাকলে প্রথমদিনই হয়তো ওদের এই আড়ি, অভিমানের পালাটা ভেঙে যেত। না মশাই আমাকে না জানিয়ে আপনারা অন্যায় করেছেন। এতে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি!
- বিশ্বাস করুন! আমি নির্দোষ! আমি বারবার সুজাতাকে বলেছিলাম আপনাকে সবটা জানাতে। ও বলেছিল এখানে এলেই জানাবে। এমনকি এখানে এসে ও অসুস্থ জানার পর আপনার পাশে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছে করলেও পারিনি কারন সুজাতাকে কথা দিয়েছিলাম ও যতক্ষণ না বলছে ততক্ষণ কোনো রকম সাহায্য করবো না। তাছাড়া ওর জ্বরটা আমাদের প্ল্যানের মধ্যে ছিল না। আমরা ভেবেছিলাম এখানে আসার পর সব প্ল্যান অনুযায়ী হবে। কিন্তু...
-কোনো কিন্তু নয়!দোষ যখন করেছেন শাস্তি পেতেই হবে!
-বেশ! আপনার শাস্তি আমি মাথা পেতে নেব। বলুন কী শাস্তি দেবেন?
তথাগত গম্ভীর মুখ করে কিছুক্ষণ তাকায় ভদ্রলোকের দিকে তারপর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,“ প্রথমত, আজকের পর থেকে আপনাদের পার্টনার ইন ক্রাইম হিসেবে আমাকেও নিতে হবে। দ্বিতীয়ত,বাকি ট্যুরটা ইভেন এরপর কোথায় বেড়াতে গেলে একসাথে যেতে হবে। তৃতীয়ত, আপনি, আজ্ঞে করা যাবে না। আজ থেকে আমরাও দুজনে বন্ধু হব। সো মেজর রজতাভ মজুমদার! বলো রাজি?”
রজতাভ হেসে তথাগতর হাত নিজের হাতে নিয়ে বলে, “রাজি!"
******
রাতের বেলা খাবার পাট চুকিয়ে পায়ে পায়ে সমুদ্রের পাড়ে এসে দাঁড়াল তথাগত। পাঁচদিন হল এখানে এসেছে ওরা। কাল রাতের ট্রেনে ফিরে যাবে। দেখতে দেখতে কোথা থেকে এক সপ্তাহ কেটে গেল বোঝাই গেল না। এখানে আসার আগে সে নিজেই গজগজ করছিল সুজাতার আবদারের জন্য। এখানে এসে জ্বর বাধানোর জন্য বিরক্ত হয়ে ফিরে যেতে চেয়েছিল সে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আরও কটা দিন থেকে গেলে বেশ হত। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আসছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমুদ্রের দিকে তাকাল তথাগত। ক্রমাগত পাড়ে ভেঙে পড়া অশান্ত ঢেউগুলো দেখে তার মনে হল যেন তাদের ফেরার খবর পেয়ে সমুদ্রও অশান্ত হয়ে পড়ছে। একের পর এক প্রবল ঢেউয়ের শব্দে যেন আর্জি জানাচ্ছে থেকে যাওয়ার। কিন্তু তথাগত নিরুপায়। তার ছুটির সময়সীমা প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আর মাত্র দুটো দিন। তারপর তাকে আবার ফিরে যেতে হবে তার কর্মক্ষেত্রে। ফিরে যেতে হবে গভীর বনের কোলে। সমুদ্রের এই গর্জনমুখর সৈকত ছেড়ে নীরব,শান্ত বনের মাঝে। না জানি কেমন আছে বনের সেই গাছপালা,পশুপাখিরা।
সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বনের কথাই ভাবছিল তথাগত এমন সময় শুনতে পেল রজতাভর গলা, “কী ব্যাপার? রেঞ্জারমশাই হঠাৎ বনের গুণগান ছেড়ে সমুদ্রের মুখোমুখি? বলি মনের মাঝে কাব্যটাব্যের উদয় হয়েছে নাকি?”
তথাগত উদাসীনভাবে হেসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে, “নাহ! অতোটাও প্রতিভা নিয়ে এই ধরাধামে আসিনি আমি মেজরসাহেব। আমি ভাবছিলাম গত পাঁচদিনের কথা। দেখতে দেখতে পাঁচটা দিন কীভাবে কেটে গেল বোঝাই গেল না। ইচ্ছে করছে এখানে আরো কটা দিন থেকে যেতে। বার বার মনে হচ্ছে এই তো এলাম কালকে! এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হচ্ছে!”
রজতাভ এগিয়ে এসে তথাগতর পাশে দাঁড়ায়। জিন্সের পকেট থেকে হিপ ফ্লাস্ক বের করে ছিপি খুলে একচুমুক খেয়ে এগিয়ে দেয় তথাগতর দিকে। রজতাভ তেমন মাতাল না হলেও ওর মতোই যে পানীয়রসিক সেটা তথাগত জানতে পেরেছিল আলাপের প্রথম রাতেই। তথাগত হেসে ফ্লাস্কটা হাতে নিয়ে সেটায় থাকা পানীয়তে চুমুক দেয়। নিমেষের মধ্যে উগ্র ঝাঁঝালো তরল লাল পানীয় তথাগতর সমগ্র শরীরের শিরা-উপশিরায় আগুন ধরিয়ে স্নায়ুতে একটা বিদ্যুতের ঝিলিক খেলিয়ে কন্ঠ বেয়ে পাকস্থলীতে নেমে যায়। একচুমুক খেয়ে সে রজতাভকে ফেরত দেয় ফ্লাস্কটা। রজতাভ ফ্লাস্কটা ফেরত নিয়ে বলে, “সত্যিই তাই! দেখতে দেখতে কটা দিন যে কীভাবে কেটে গেল বোঝাই গেল না। খুব মিস করবো এই জায়গাটা আর তোমাদের। তা তোমাদের ট্রেন কটার দিকে?”
- দুপুর সাড়ে বারোটা। সকালেই বেরোতাম কিন্তু সারাদিনের ধকল নিয়ে আবার রাতে ট্রেন ধরো। অতো ধকল সুজাতার সইবে না। এই রাতের দিকে ঢুকে একটা দিন বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের দিকে বেরোনো যাবে। তা তোমাদের কটার দিকে?
- বিকেল চারটে! এখান থেকে সোজা শিয়ালদা। সেখান থেকে সোজা শিলিগুড়ি। ওখানে ঊর্মিদের বাড়িতে একদিন থেকে ঊর্মিকে রেখে বিকেলের ট্রেনে সোজা নিজের ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দেব।
- আমারও সেরকমই প্ল্যান। সুজাতাকে ওর মায়ের কাছে রেখে আপাতত রওনা দেব নিজের বেসে।
- সেকি! ওকে নিয়ে যাচ্ছ না?
- যাবো, তবে এখন নয়। ওদিকটা আগে গুছিয়ে নিয়ে, দুজনের বসবাসের যোগ্য করে,সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে সাজিয়ে তারপর নিয়ে যাব। আগে একা থাকতাম কাজেই বুঝতে পারছ ঘরদোরের অবস্থা কেমন হতে পারে। সেটা সামলে নিই তারপর। তাছাড়া একগাদা কাজ পড়ে আছে ওখানে। সেগুলো সামলে নিতে হবে। এখনই নিয়ে গেলে একে তো দিশেহারা হয়ে পড়বে, তার উপর সময় কাটাতে না পেরে আরো বোর হয়ে যাবে। জঙ্গলের জীবন বড্ড নিস্তব্ধ আর শান্ত। সারাদিন বসে বসে বিরক্ত হবার চেয়ে কটা দিন বাড়িতেই থাকুক। আমার কথা ছাড়ো তোমার তো কাশ্মীরে পোস্টিং না?
- হুম! অবশ্য ওখানকার অবস্থা যে খুবই শান্ত তা বলতে পারব না। জানি না ফেরার পর কী অপেক্ষা করছে। যাই বলো বনদপ্তরের চাকরি বেশ আরামের।
- কে বলেছে? রোজ হাজার গাছের হিসেব, কোথাও গাছ কাটতে হলে তার অনুমতিপত্র খতিয়ে দেখা। বনের জন্তু জানোয়ার তা সে যতই ভয়ংকরতম হিংস্র হোক না কেন তার খোঁজ রাখা। লোকালয়ে বনের পশু যাক বা বাড়ির উনুনে কেউটে সাপ পাওয়া যাক, দৌড়ে গিয়ে মানুষের হাত থেকে তাদের বাঁচানো, বনে ফিরিয়ে আনা। কম ঝক্কি নাকি? তার উপর পোচার, কাঠপাচারকারী, অনুমতি ছাড়া কোর এরিয়ায় প্রবেশ করা মানুষ তো আছেই। তাও কিছু হলে “বনদপ্তর অকর্মণ্য!" শুনতে হয়।
- বুঝলাম! ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস' কেস আমাদের। তবে একটা জিনিসে মিল আমাদের। জীবনের কোনো ভরসা নেই। যখন তখন পরপারে পোস্টিং হতে পারে।
- তা যা বলেছ। তবে তফাৎ একটাই। তোমরা শহিদ হলে মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর আমরা মরলে একটা শিরোনাম ব্যস!
বলে মলিন হাসি হাসে তথাগত। রজতাভও সোজা তাকায় সমুদ্রের দিকে তারপর বলে,“ অথচ আমরা মরতে চাই না। বরং বাঁচতে চাই আরো। যাতে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দেশের সেবা করে যেতে পারি। এই যে এত যুদ্ধ, এত ছাউনি দখল, এত হতাহত আমরা চাইনি। মানুষ মারতে আমাদেরও ভালো লাগে না। কিন্তু দেশের স্বার্থে, দেশকে রক্ষার স্বার্থে লড়ে যেতে হয় দুটো দেশকেই। ওদের আর আমাদের একটাই পরিচয়। আমরা সৈন্য। দেশের সেবা, দেশের রক্ষার স্বার্থে আমরা প্রাণের আহুতি নিতে অথবা আহুতি দিতেও বদ্ধ পরিকর।”
- এটাই তো অবাক করে আমাকেও! সীমান্তবর্তী দুটো দেশের পরিবেশ, ভাষা, পরিধান এক হলেও দুপক্ষ আলাদা শুধুমাত্র সমস্যাসঙ্কুল জায়গা থেকে দুরে কোনো প্রাসাদোপম বাড়িতে বসা কয়েকজন নেতার সিদ্ধান্তের ফলে। নাহলে প্রকৃতির কাছে তো সবাই সমান!
রজতাভ চুপ করে বসে থাকে। তথাগত একটাও ভুল কথা বলছে না। সত্যিই তো! প্রকৃতি তো মানুষের প্রতি পক্ষপাত করে নি। করেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের একেবারে চূড়ায় বসে থাকা মানুষেরা। কিন্তু তারা যে আবেগপ্রবণ নয়। আবেগ দিয়ে আর যাই হোক দেশ চালানো অসম্ভব। এখানে সে বা তথাগত একজন রাষ্ট্রের হাতে চালিত পুতুল মাত্র। তাদের কাজ দেশের হয়ে কাজ করা। দেশকে রক্ষা করা। এখানে রাষ্ট্র তাদের কাছে চায় প্রশ্নহীন আনুগত্য। কোনো প্রশ্ন করা চলবে না। করলেই তোমাকে সরে যেতে হবে তোমার জায়গা থেকে। মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রজতাভ। তারপর মনে মনে বলে, “সব যদি এতই সোজা হত তাহলে তো যুদ্ধের প্রয়োজন হত না তথাগত। সীমান্তের গোলকধাঁধার হিসেব তুমি বুঝবে না হে! এ হিসেব বনের মতো সহজ নয়।”
রজতাভর চিন্তার জাল ছিন্ন হল ঊর্মিদের চিৎকারে। সে পিছন ফিরে দেখল ঊর্মিরা ওদের কাছেই বসে আছে। রজতাভকে পেছন ফিরতে দেখে ঊর্মি বলে উঠল, “বলি সারারাত কি এখানেই কাটানোর প্ল্যান আছে নাকি? তা কাটাতে পারো। আমাদের অসুবিধে নেই। তবে ঘরের চাবিটা দিয়ে দিলে ভালো হয়। অন্তত আমরা ঘরে ফিরে ঘুমোতে পারি।” রজতাভ হেসে তথাগতকে বলে,“ দেখেছ? যেই একটু শান্তিতে দুজনে গল্প করতে বসেছি তখনই এদের হাকডাক শুরু হয়ে গেছে। বিয়ে করে একটুও শান্তি নেই। সবে বিয়ে করেছ তো! এখন টের পাবে না। দু তিনবছর যাক তারপর দেখবে বিবাহপরবর্তী দহন কাকে বলে? সাধে বলে ‘শাদি কা লাড্ডু বড়ি খতরনাক চিজ হোতি হ্যা। যো খাতা হ্যা বো পছতাতা হ্যা। যো নহি খাতা হ্যা বো অউর জ্যায়াদা পছতাতা হ্যা।’ নাহ যাই! নাহলে রাতটা সত্যি সত্যি এখানে বালির উপর নাহলে লাউঞ্জে শুয়ে কাটাতে হবে। তবে ঐ কথাই রইল ভায়া! এরপর থেকে পরের ট্রিপে কিন্তু সবকটা একসাথে বেড়োবো কেমন? এলাম!"
বলে রজতাভ হাসতে হাসতে উঠে চলে গেল ঊর্মির সাথে। সুজাতা এগিয়ে এসে তথাগতর পাশে বসল। তথাগত সুজাতার দিকে না তাকিয়েই বলল, “ওষুধ খেয়েছ?” জবাবে সুজাতা শুধু একটা “হুম!" বলে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর আকাশের মেঘ কেটে দেখা দিল চাঁদ। ক'দিন পরেই পূর্ণিমা। কাজেই অল্প জ্যোৎস্নায় ভেসে যেতে লাগল সমগ্র সৈকত। আকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে তথাগত বলে উঠলো, “তাহলে কাল আমরা ফিরছি!" সুজাতা চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিকথা বলতে পাঁচটা দিন যে এত তাড়াতাড়ি কেটে যাবে ও ভাবতে পারেনি। তথাগত মৃদুগলায় বলল,“সু?" সুজাতা জবাব দিল,“হুম!"
- তোমাকে তোমাদের বাড়িতে রেখে আমি ফিরে যাব।
- হুম।
- কটা দিন আমাকে ছাড়া থাকতে হবে। ওদিকটা গুছিয়ে নিই একটু। তারপর তোমাকে নিয়ে যাব ওখানে কেমন?
- হুম।
- তোমার মন খারাপ করবে না?
- হুম।
- ওখানে প্রতি সপ্তাহে একবার করে ফোন করবো তোমাকে কেমন?
- হুম।
- এখানে এসে ভালো লাগছে?
- হুম।
- আর কটাদিন থাকতে ইচ্ছে করছে ?
এবার তথাগতর কাঁধে মাথা রাখে সুজাতা। তথাগত জ্যোৎস্নার আলোয় দেখে সুজাতা কাঁদছে। তথাগত সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ আমারও যে আরো কটা দিন থাকার ইচ্ছে করছে না তা নয়। কিন্তু কি করা যাবে বলো? ছুটির দিনগুলো যে শেষ হতে চলল! ফিরতে তো হবেই!”
সুজাতা তথাগতর কাঁধে মাথা রেখে অশ্রুসজল চোখে দেখতে থাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্ছাস। তথাগত এবার সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে বলে, “তবে এই ফেরাটা কিন্তু ফেরা নয়। বরং এখানে আবার চলে আসার অজুহাত মাত্র। এখান থেকে ফিরছি ঠিকই কিন্তু আবার আসব আমরা। এবার কেউ থাকবে না সাথে। না রজতাভ, না ঊর্মি। শুধু তুমি আর আমি। এই ক'দিনে সমুদ্রকে আমিও ভালোবেসে ফেলেছি যে! দুজনে মিলে এভাবে সারাদিন পাড়ে বসে থাকবো কেমন? ”
সুজাতা অস্ফুটে বলে, “হুম।"
তথাগত হাতঘড়ির দিকে একবার দেখে বলে,“ রাত অনেক হল সুজাতা। চলো ফিরে যাই হোটেলে। রাতটুকু কাটিয়ে কাল পাড়ি দিতে হবে নিজের বাসায়।”
বলে বালি থেকে উঠে দাঁড়ায় তথাগত। প্যান্ট থেকে ভেজা বালি ঝেড়ে নিতে গিয়েও থমকে যায়। বালিগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবে বাইরে বেড়াতে এসে যদি কোনো স্মৃতিচিহ্ন থেকে যেতে চায় ইচ্ছে করে তো থাকুক না। অন্তত এই ভেজা বালিগুলো নাহয় স্মৃতি হয়ে চলুক ওর সাথে। ভেবে সুজাতার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় সে। তারপর দুজনে মিলে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় হোটেলের দিকে।
******
দীঘা থেকে ফেরার পর প্রায় একবছর কেটে গেছে। তথাগত প্রোমোশন নিয়ে মধ্যপ্রদেশে কানহা ফরেস্টে বদলি হয়ে গেছে। সাথে নিয়ে গেছে সুজাতাকে। দুজনে মিলে তিলে তিলে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে নিজেদের সংসার। সকালে তথাগত বেরিয়ে যায় নিজের কাজে। নেমে পড়ে সারাদিনের বনরক্ষার যুদ্ধে আর সুজাতা নেমে পড়ে সংসারের কাজে। কোয়ার্টারের কেয়ারটেকারের বউয়ের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে রান্না করে, গল্পগুজব করে কাটিয়ে দেয় সারাদিন। রাতে তথাগত ফিরলে দুজনে মিলে খেতে বসে সারাদিনের রোজনামচা জানায় একে অপরকে। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে তথাগত এদিক ওদিক ঘুরিয়ে আনে সুজাতাকে। আদিবাসীদের পরব হলে নিয়ে যায় সঙ্গে করে। স্বামী-স্ত্রীতে বেশ আছে ওরা।
প্রায় একবছর হতে চলল রজতাভর কোনো পাত্তা নেই। দীঘা থেকে ফেরার পরদিনই খবর এসেছিল রজতাভকে কাশ্মীর থেকে বদলী করে কার্গিলে পাঠানো হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জয়েন করতে হবে। রজতাভ আর দেরী করে নি। ঊর্মিকে ওর বাপের বাড়িতে রেখে প্রায় একঘন্টার মধ্যে বেড়িয়ে পড়েছিল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। তারপর থেকে আর কোনো খবর নেই। টিভিতে,রেডিওতে শোনা যাচ্ছে কার্গিলের অবস্থা ভালো নয়। যুদ্ধকালীন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। পাকসেনারা ক্রমশ এক এক করে দখল নিচ্ছে ভারতীয় সেনার বাঙ্কারগুলির। ভারতীয় সেনারাও ছাড়বার পাত্র নয়। নিজের প্রাণের তোয়াক্কা না করে ঝাপিয়ে পড়ছে যুদ্ধক্ষেত্রে। ছিনিয়ে নিচ্ছে নিজের বাঙ্কার। তারপর ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলে। রোজ রোজ একই খবর শুনে ঊর্মির অবস্থা ক্রমশ সঙ্গীন হয়ে পড়ছে। সকালে সে ক্রমাগত অস্থির হয়ে অপেক্ষা করে পোষ্টম্যানের। যদি কোনো চিঠি আসে এই আশায়। রোজ খবরের কাগজের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা খুটিয়ে পড়ে যদি কোনো খবর পাওয়া যায় এই আশায়। টেলিফোনের শব্দ পেলেই রজতাভ ফোন করেছে ভেবে ছুটে আসে সে। রোজ সন্ধ্যেতে শুকনো মুখ করে বৈঠকখানায় বসে খবর শোনে সে রেডিওতে। কিন্তু কোথাও কোনো খবর নেই! রজতাভ যেন নিখোঁজ হয়ে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। ঊর্মির মা-বাবার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে ওকে সামলানো। তারা বোঝেন সবই কিন্তু মেয়েকে বোঝাতে পারেন না। তাদের চোখের সামনে মেয়েটা ক্রমশ উন্মাদিনী হয়ে যেতে থাকে। সেটাই স্বাভাবিক। জামাই দেশের জন্য যুদ্ধে গেছে। যে যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরার চান্স প্রায় নেই বললেই চলে। রোজই তো শুনছেন রোজ এক একটা বাঙ্ক দখল করছে ভারতীয় সেনা। বাঙ্কারের মাথায় বিজয়কেতন রূপে জাতীয় পতাকা মেলে ধরছে। কিন্তু সেই বাঙ্কার দখল করতেই না জানি কত সৈনিক হাসি মুখে বলি হয়ে যাচ্ছে শত্রুদের হাতে। রোজ সন্ধ্যেবেলা খবর শোনার সময় একটা চোরা আতঙ্ক নিয়ে বসে থাকেন তারা। এই বুঝি সঞ্চালক তাদের জামাইয়ের নাম ঘোষণা করে বসলেন শহীদের তালিকায়। খবর শেষ হবার পর জামাইয়ের নাম না পেয়ে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলেন তারা। রোজ রোজ এই মানসিক যন্ত্রণা অসহনীয় হলেও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সহ্য করে যেতে হয় তাদের। মনে মনে তারা প্রাণপণে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন এই অপেক্ষার অবসানের। প্রার্থনা করেন যুদ্ধ শেষ হবার।
প্রতিদিনের মতো আজও অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বসার ঘরের রেডিওটা চালিয়েছিলেন ঊর্মির বাবা। সঞ্চালিকার খবর পাঠ শুনতে শুনতে সোফায় বসেছিলেন। ঊর্মি চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকছিল। সঞ্চালিকা প্রতিদিনের মতো একই খবর পড়ে চলেছিলেন এমন সময় দুজনকে চমকে ঘরের টেলিফোনটা বেজে উঠল। ঊর্মির বাবা ঊর্মির দিকে তাকালেন। ঊর্মি কোনোরকমে চায়ের ট্রে-টা টেবিলে রেখে ছুটে গেল টেলিফোনের দিকে। তারপর রিসিভারটা ক্রেডল থেকে তুলে কানে দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য প্রস্তরবৎ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হাউহাউ করে কেঁদে মেঝেতে বসে পড়ল। মেয়ের এহেন অবস্থা দেখে ছুটে এলেন ঊর্মির বাবা। মনে মনে একটা খারাপ খবর শোনার আশঙ্কায় নিজের মনকে শক্ত করে ঊর্মির থেকে রিসিভারটা নিয়ে নিজের কানে দিলেন তিনি। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “হ্যালো?”
প্রায় একবছর পর দুরভাষের ওপার থেকে ভেসে এল জামাইয়ের কন্ঠস্বর, “মেয়েকে বলুন হাউ হাউ করে না কেঁদে রান্না চাপাতে। আমি আসছি ঘন্টাখানেকের মধ্যে। ভীষণ খিদে পেয়েছে আমার। শিলিগুড়ি প্রায় এসে গেলাম বলে।”
(চলবে...)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন