অনুসরণকারী

শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ তৃতীয় পর্ব






ঐশীর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে একবার ঘুমন্ত ঐশীর দিকে তাকান সুজাতা। তারপর ঐশীর বিছানায় বসে একদৃষ্টে ঐশীর দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকেন। হুবহু মায়ের মুখ পেয়েছে ঐশী। সেই নাক, সেই চোখ, সেই হাসার সময় চোখ বুঁজে ফেলা। যেন এতগুলো বছর পর উর্মিই নতুন রূপে তার সামনে এসে উপস্থিত। ঐশীকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সুজাতা। আজ বিকেলে ওদের দেখামাত্র চলে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অভীকের জন্য থেকে যেতে বাধ্য হন তিনি। তাও চেষ্টা করেছিলেন আড়ালে থাকার। কিন্তু অভীক জোর করে যখন ওনাকে ওদের সামনে নিয়ে এল তখন অভিনয় না করে পারলেন না তিনি। ভেবেছিলেন ওনাকে দেখে রজতাভ হয়তো চমকে যাবেন। হয়তো রিঅ্যাক্ট করে বসবেন। রিঅ্যাক্ট করারই কথা! কারন বহুবছর আগে তারা পরস্পরকে কথা দিয়েছিলেন জীবনে কোনোদিন তারা আর মুখোমুখি হবেন না। কিন্তু নিয়তি তাদের এইভাবে কাছে নিয়ে আসবে কে জানতো? কিন্তু রজতাভ কত সহজে সামলে নিলেন সবটা! আর্মির লোক যে! সব পরিস্থিতি সামাল দিতে ওস্তাদ!কিন্তু একটু‌ আগেও ওস্তাদের মুখোশ খুলে পড়তে যাচ্ছিল একটু হলেই। যে কারনে তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসন বেছে নিয়েছেন, যে কারনে তিনি মনে মনে নিজেকে কে ক্ষমা করতে পারেন নি। সে কারনের জন্য দায়ী রজতাভকে তিনি কি করে এত সহজে ক্ষমা করে দেবেন! ক্ষমার করার মতো অধিকার কি তার আছে?অশ্রুসজল চোখে ঐশীর দিকে তাকান সুজাতা। মেয়েটার মুখটা তার কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। যেন কেউ পুরোনো ক্ষত খুচিয়ে রক্ত বের করেছে। চোখ মুছে শুয়ে পড়েন তিনি। নাহ! আর অতীত নিয়ে ভাবলে চলবে না। একটু আগেই তো তিনি রজতাভকে বললেন, “অতীত নিয়ে ভাবার চেয়ে বর্তমান নিয়ে ভাবা উচিত। তাই ভাববেন তিনি। আর পুরোনো দিনের কথা ভেবে ক্ষতবিক্ষত হবেন না তিনি। বরং ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঐশীকে বাড়ির বউ করে এনে উর্মির কাছে মনে মনে অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করবেন তিনি। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। 

বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান রজতাভ। বড্ড গরম পড়েছে আজ।  রজতাভ চুপচাপ ব্যালকনির একপাশে রাখা চেয়ারে বসে পড়েন। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আকাশের দিকে মেঘ জমলেও বৃষ্টির নাম নেই বরং একটা গুমোটভাব চারদিকে। বোধহয় ঝড় হবে। রজতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসেন। বড্ড ক্লান্ত, নিজেকে নিংড়ে নেওয়ার মতো ব্যথাতুর এক হাসি। এই ঝড়ের চেয়েও বড় ঝড় যে তাঁর মনের ভেতর উঠেছে। বার বার তাকে আছড়ে ফেলছে বাস্তবের মাটিতে। বার বার একটাই প্রশ্ন তাঁর মনে ঘাই মারছে। কেন? কেন এতবছর পর নিয়তি তাকে সুজাতার সামনে এনে দাঁড় করালো?তবে কি আরো ভোগান্তি, আরো শাস্তি বাকি আছে তাঁর?আর কত পুড়তে হবে তাকে?

এতগুলো বছর হয়ে গেল সুজাতা আজও তাকে একইরকম ঘৃণা করেন। অন্তত সুজাতার কথায় তাই মনে হয়েছে রজতাভর। সুজাতা চাইলেও মন থেকে তাকে ক্ষমা করতে পারবেন না। ক্ষমা করা উচিতও নয়! যে কাজ তিনি করেছিলেন তা ক্ষমার অযোগ্য। একসাথে তিনজন মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলেছিলেন তিনি। ঠকিয়েছিলেন কাছের মানুষকে। তখন অল্পবয়স ছিল, ভেবেছিলেন মনের বশে করছেন এসব। প্রেম, ভালোবাসার আবেগে করছেন এসব। মন কারো কথা মানে না, কোনো যুক্তি তার কাছে টেকে না। এখন জীবনের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে রজতাভ বোঝেন তিনি কতটা ভুল ছিলেন! যেটাকে তিনি ভালোবাসা ভেবেছিলেন তা আসলে ভালোবাসা ছিল না। উর্মির সাথে সংসার করতে করতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে বাইরে বেরিয়ে তিনি মোহগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ক্রমশ সর্বনেশে খাঁদে নেমে পড়েছিলেন। সাথে নামিয়েছিলেন আরেকজনকে। দুজনের মধ্যে তফাৎ ছিল একজায়গায়। সে সংসারের প্রতি কোনোদিনও বীতশ্রদ্ধ ছিল না। বরং সে ছিল উদাসীন। তাকে পথভ্রষ্ট করে মারনখেলায় মেতে উঠেছিলেন রজতাভ। যার প্রায়শ্চিত্ত এখনও করে যাচ্ছেন তিনি। সেদিন যদি তিনি নিজের মনকে বশে আনতে পারতেন তাহলে হয়তো আজ এতটা আত্মশ্লাঘায় ভুগতে হত না তাকে। একটু আগে সুজাতা যে কথাটা বললেন, ঠিক সেই কথাটাই মৃত্যুশয্যায় উর্মি বলেছিল। আজও মনে পড়ে তার সেই অভিশপ্ত দিনটার কথা। উর্মি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময় বলেছিলেন, “ তুমি মানুষটা ভীষণ ভয়ংকর রজতাভ! সাপের চেয়েও ভয়ংকর! তোমাকে ভালোবাসা যায়, জড়িয়ে ধরা যায়, কান্না পেলে কাঁধে মাথা রেখে কাঁদা‌ যায় কিন্তু বিশ্বাস? না! আর তোমায় বিশ্বাস করা যায় না! আর বাকি রইল ক্ষমা! তার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারন বাঘ যখন রক্তের স্বাদ একবার পায় তাকে শিকার করা থেকে আটকানো অসম্ভব! আজ যদি তোমায় ক্ষমা করি তাহলে তুমি আবার একই ভুল করবে! ও নয় তো অন্য কেউ হবে তোমার শিকার। আর তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবো না কেন জানো? তুমি জেনেশুনে একটা নিস্পাপ মেয়েকে পাপে জড়িয়েছ! তাকে পাঁকে‌ নামিয়ে পাপ করতে বাধ্য করেছ! ওকে কথার জালে বিবশ করে ভোগ করেছ! তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনে গেছি রজতাভ! আমার দুঃখ কোথায় জানো? সে বেচারি নিজেকে দোষী ভেবে দুরে সরে গেছে। যদি আমার শক্তি থাকতো তাহলে ওকে খুঁজে বের করে জড়িয়ে ধরে বলতাম, “তোর কোনো দোষ নেই!তুই নিজেকে শাস্তি দিস না!শাস্তি তো ওর প্রাপ্য!” বলে তোমার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতাম। কিন্তু আমার কপাল দেখো! তোমার সন্তানকে গর্ভে ধারন করার জন্য মরতে বসেছি। তোমার বিষাক্ত স্পর্শে আমার আয়ু কমে গেছে! এই মুহূর্তে তোমাকে দেখে আমার গা গুলোচ্ছে রজতাভ মজুমদার! বমি পাচ্ছে! নেহাত আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানকে দেখার কেউ নেই বলে তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। কিন্তু খবরদার রজতাভ! তোমার এই সুন্দর সুপুরুষ মুখের পেছনে যে কুৎসিত, নোংরা, ঘৃণ্য পরজীবী মুখটা আছে সেটার আভাস যাতে আমার মেয়ে না পায়!আর জেনে রাখো তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করবো না!আমার মৃত্যুর পর তুমি আমার মৃতদেহকে স্পর্শ করবে না!”

পাপ! পাপই বটে! সেদিন তিনি আবেগের বশে যেটা করেছিলেন, যেটাকে তিনি মুক্তির বাতাস খোঁজার প্রচেষ্টা ভেবেছিলেন, যেটাকে তিনি নিজেকে বাঁচতে দেওয়ার সুযোগ ভেবেছিলেন আজ এতবছর পর সেই কাজটা তার কাছে পাপই বটে! যে পাপের সাজা ভোগ করছেন তিনি।  ভাবতে ভাবতে সিগারেটে টান দিয়ে চোখ বোজেন রজতাভ। একমুহূর্তের জন্য সেইদিনগুলো সিনেমার রিলের মতো হাজির হয় তার মনে। চোখ বুঁজে সেদিনের কথা মনে করতে থাকেন তিনি।

*****

কাল দুপুরে সৈকত থেকে ফেরার পর কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল জানে না সুজাতা। হঠাৎ ভীষণ শীত লাগায় ঘুমটা ভাঙল তার। ঘুম ভাঙার পর‌ চারদিকে তাকিয়ে সে অবাক হলেও কিছুক্ষণ লাগল তার ধাতস্থ হতে। কিছুক্ষণ পর বিছানায় উঠে বসল সে। পাশে তাকিয়ে দেখল তথাগত উবু হয়ে শুয়ে আছে। পরনে একটা সুতো পর্যন্ত নেই। একই অবস্থা সুজাতারও। সম্পুর্ণ বিবস্ত্র হয়ে সে বিছানার উপর বসে আছে। গায়ের উপর চাপা দেওয়া কম্বলটা উঠে বসায় কোলের উপর পড়ে গেছে। খোলা জানলা দিয়ে সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস হুহু করে ঢুকে পড়ছে ঘরে যার ফলে তার ঠান্ডা লাগছে।‌ প্রাথমিক‌ বিহ্বলতা কাটিয়ে কোনোমতে কোলের উপর রাখা কম্বলটা দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিজের লজ্জা নিবারণ করে সুজাতা নামে খাট থেকে। তারপর বাথরুমে গিয়ে কম্বলটা ছুঁড়ে ফেলে খাটে। 

কিছুক্ষণ পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে ব্যাগ থেকে একটা নাইটি বের করে পরে নেয় সে। তারপর একটা‌ চাদর‌ বের করে কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে টেবিলে রাখা হাতঘড়িতে তাকিয়ে দেখে ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজে। তারমানে একটু পরেই তো সুর্যোদয় হবে! তাড়াতাড়ি  রুমের ব্যালকনিতে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসে সুজাতা। তাকিয়ে‌‌ দেখে পুর্বদিকের আকাশ ইতিমধ্যেই লালচে‌ হয়ে‌ গেছে।

কিছুক্ষণ পর দিগন্তের পার থেকে প্রায় সমুদ্রের মাঝখান থেকে উঠলেন সুর্যদেব। সমুদ্রের জলে লাল হয়ে প্রতিফলিত হয়ে দেখা দিতে লাগল সুর্যের প্রতিবিম্ব। সুজাতার ‌মনে হল যেন সদ্য সমুদ্রে‌ স্নান করে উঠলেন সুর্য। তার সারাদিনের তেজরাশিপুঞ্জ‌ ক্রমশ সমুদ্রের জলে ধুয়ে মিশে গেল। এরকম একটা নৈসর্গিক দৃশ্যের সাথে সমুদ্রের মৃদু হাওয়ায় চোখের সাথে সাথে শরীরেও বেশ আরাম বোধ হল সুজাতার। মনে হতে লাগল তার জ্বর, শরীর খারাপ এই হাওয়া আর সুর্যের আলোয় ক্রমশ দুর হয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতর থেকে তথাগতর গলা পেল সে, “ ভেতরে চলে এসো! ঠান্ডা লাগবে।”

সুজাতা কথাটা শুনেও চুপ করে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতর থেকে বারামুডা পরে বেরিয়ে আসে তথাগত। সুজাতার পাশে দাড়িয়ে চুপ করে দেখে প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্যটাকে। তারপর সুজাতার কাঁধে হাত দিয়ে তথাগত বলে, “সানরাইজ দেখা শেষ? চলো ভেতরে চলো। বেশিক্ষণ এখানে থাকলে আবার জ্বর আসতে পারে। ভেতরে গিয়ে আরেকটু ঘুমিয়ে নাও। তারপর আজ দুপুরের দিকে আমরা ফিরে যাব।”

সুজাতা চট করে তাকায় তথাগতর দিকে, “অ্যা! সেকি! এই তো এলাম আমরা! এই এরকম করো না প্লিজ! আর কটা দিন থাকি না!”

-“আর একটা দিনও নয়! প্রথমদিনেই যে খেল তুমি দেখালে তারপর আর তোমাকে এখানে রাখতে ইচ্ছে করছে না আমার। আমরা আজই ফিরে যাব!”

-“প্লিজ তথাগত! এরকম করো না! আচ্ছা এখন তো জ্বর নেই আমার! এখন ঠিক আছি আমি।”

-“ঐ কারনেই তো নিশ্চিন্ত হয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত‌‌ নিয়েছি আমি। কাল সারারাত কতটা চিন্তায় কেটেছে তুমি ভাবতে পারবে না। সারারাত জেগে একটু পর পর জল পট্টি দিয়েছি। জ্বরের ঘোরে তুমি বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছো তখন আমি বার বার চেক করছি তোমার জ্বর। শেষে বাধ্য হয়ে নিজের দেহ দিয়ে তোমার দেহের তাপকে শুষে নেওয়ার জন্য ওভাবে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লাম। আমার জন্যই এই দশা তোমার। আমি কালকে জোর করে যদি তোমাকে স্নান না করাতাম তাহলে হয়তো... না! না! আর আমি কোনো রিস্ক নিতে পারবো না! আমরা আজই ফিরে যাবো!” বলে করুণ মুখে সুজাতার দিকে তাকায় তথাগত। সুজাতা দেখে তথাগত চোখের কোণে জল জমেছে।

-“প্লিজ তথাগত!” বলে কাতর চোখে তাকায় সুজাতা। 

-“তোমার কথায় আর ভুলছি না আমি। এখানে তোমার কিছু হয়ে গেলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না আমি।” বলে সুজাতার থেকে চোখ ফিরিয়ে উদীত সুর্যের দিকে তাকায় তথাগত। সুজাতা তথাগতর দিকে তাকিয়ে ওর একটা আঙুল নিজের হাতে নেয়। তথাগত পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে সুজাতা ছলছলে চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

-“কিছু হবে না আমার। তুমি যখন সাথে আছো তখন কিছুই হবে না আমার।” 

-“কিন্তু সু!”

-“কোনো কিন্তু নয়! কালকে যেটা হল সেটাতে তোমার কোনো দোষ ছিল না। হ্যাঁ জোর করেছিলে তুমি। কিন্তু আমি চাইলে তোমাকে বাধা দিতে পারতাম। ইচ্ছে করেই দিই নি। কারন আমি জানতাম, আমার কোনো বারণ তুমি শুনবে না। তাই ইচ্ছে করেই তোমার সাথে সমুদ্রে নেমেছিলাম আমি। ভেবেছিলাম আমি অসুস্থ হলে তুমি বিরক্ত হবে। অন্তত কাল আমার জ্বর শোনার পর তোমার ব্যবহারে আমার তাই মনে হয়েছিল।”

-“আর এখন কী মনে হচ্ছে?”

-“ মানুষটা তুমি জেদী হলেও মন্দ নও। আমার কিছু হলে প্রাণপণে আমাকে রক্ষা করতে পিছু হটো না। প্রচণ্ড ভালোবাসো আমায় আর...!”

-“আর?” 

দুষ্টুমিভরা চোখে তথাগতর দিকে তাকায় সুজাতা,“ আর মানুষটা জংলী হলেও বেশ খাটি তুমি। বর্বর নও।”

তথাগত নতজানু হয়ে সুজাতার হাতটা ঠোঁটের কাছে চেপে ধরে তারপর ধরা গলায় বলে, “বিশ্বাস করো! কাল তোমার অবস্থা দেখে যতটা ভয় আমি পেয়েছি ততটা ভয় কোনোদিনও পাই নি। বারবার মনে হচ্ছিল এই বুঝি তোমাকে হারিয়ে ফেলব। আমি কথা দিচ্ছি, আর কোনোদিন তোমাকে জোর করবো না। তুমি প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না।” বলতে বলতে সুজাতার কোলে মাথা রাখে তথাগত।

সুজাতা তথাগতর মাথায় হাত রাখে। ঘন কোঁকড়ানো একঢাল চুলে আঙুল বুলিয়ে বলে, “কালরাতে কিছু খেয়েছ?”

তথাগত মাথা নাড়ে। সুজাতা তথাগতর চুলে আঙুল বোলাতে বোলাতে ফিসফিস করে বলে, “চলো ব্রাশ করে কিছু খেয়ে নেবে। আমিও খাবো। কাল সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি দুজনের।”

তথাগত মাথা তুলে তাকায় সুজাতার দিকে। তারপর বলে, “তাই তো! কাল সারাদিন কিছুই খাওনি। এরপর কিছু না খেলে তো দুর্বলবোধ করবে। খিদে পেয়েছে না খুব?”

সুজাতা ফিক করে হেসে বলে “প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে আমার। শুধু পেটে নয় তলপেটেও।” 

আচমকা একথা শুনে চমকে যায় তথাগত। তারপর হেসে সুজাতাকে কোলে তুলে নেয় সে। সুজাতা হেসে বলে, “আরে লেগে যাবে তো! ছাড়ো আমাকে! জংলী একটা!”

তথাগত হেসে বলে, “চুপ! খাবার সময় কথা বলতে নেই।”

সুজাতা কিছু বলার আগেই ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট গুজে চুমু খেতে খেতে ঘরে প্রবেশ করে তথাগত। ততক্ষণে সুর্যদেব সমুদ্রস্নান সেরে তার যাত্রায় বেরিয়ে পড়েছেন।

*****
অবশেষে তথাগত রাজি হয়েছে থেকে যাবার জন্য। তারপর দুদিন কেটে গেছে। এই দুদিনে সুজাতাও অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু তথাগত এখনও ক্রমাগত একজন গার্জেনের মতো খেয়াল রেখে চলেছে। ঠান্ডা জল, আইসক্রিম খেতে দিচ্ছে না সুজাতাকে। সুজাতা হাজার ছলছলে চোখে তাকালেও পাত্তা দিচ্ছে না সে। রাতের দিকে ব্যালকনিতে বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখার সময় চাদর দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে সুজাতাকে। ভুল করেও আর সমুদ্রে স্নান করতে দিচ্ছে না ওকে। 

এই দুদিনে একটু একটু করে চারপাশ ঘুরে নিচ্ছে তারা। দেখে নিচ্ছে দর্শনীয় জায়গাগুলো। তেমনই আজ এসেছিল মোহনা দেখতে। জায়গাটা বেশ ভালো। একপাশে সমুদ্রের শান্ত ঢেউ অপরদিকে উত্তাল করা নদীর উচ্ছাস। মাঝে পাথরের চাই ফেলে দুটো জায়গাকে ভাগ করা হয়েছে। সমুদ্র দেখে সুজাতার আনন্দ দেখে কে? বাচ্চা মেয়েদের মতো দৌড়ে দৌড়ে সমুদ্রের পাড়ে ছুটে যাচ্ছে। তথাগতর হাজার তর্জন-গর্জনকেও পাত্তা দিচ্ছে না সে। তথাগত বকা দিতে দিতে অবশেষে‌ ক্লান্ত‌ হয়ে হাল ছেড়ে বসে পড়েছে সমুদ্রের পাড়ে বালির উপর। সুজাতার ছেলে মানুষী দেখে আনমনে হাসছে সে। 

“আপনারা কি এখানে আগেও এসেছেন নাকি?”

কন্ঠস্বর শুনে পেছন ফিরে তাকাল তথাগত। একজন ভদ্রমহিলা তার পিছনে বসে আছেন। মহিলাকে চেনে সে। আজ সকালেই আলাপ হয়েছে। এরাও হানিমুন কাপল। ভদ্রলোক আর্মিতে চাকরি করেন। এরই মধ্যে ভদ্রমহিলার সাথে সুজাতার বেশ ভাব হয়ে গেছে। তথাগত হেসে বলল , “না এই প্রথমবার! আপনারা?"

-“এই নিয়ে দুবার । আমার পছন্দ ছিল পাহাড়, কিন্তু আমার কত্তাটির আবার সমুদ্র পছন্দ। তাই বাধ্য হয়ে আবার আসতে হল!"

-“আমার গিন্নিরও তাই। কত করে বললাম, 'সমুদ্রে দেখার কী আছে? সেই একনাগাড়ে ঢেউ আসছে আর আসছে। আর হাওয়া বইছে। তার চেয়ে পাহাড়ে চলো। বেশ নিরিবিলি জায়গা। ঠান্ডা, মনোরম পরিবেশ। প্রকৃতির মাঝে, প্রকৃতির কোলে কয়েকদিন কাটিয়ে আসি। তা না ম্যাডাম গাল ফুলিয়ে আবদার করলেন আর আসতে হলো। আর এসেও তো শান্তি নেই। ম্যাডাম দুদিন জ্বরে কাবু হয়ে রইলেন।"

-“ওমা সেকি! সুজাতার জ্বর হয়েছে আমাকে বলেনি তো?” বলে একটু উদ্বিগ্ন হলেন ভদ্রমহিলা। 

হাসতে হাসতে সুজাতা ওদের পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

-“হয়েছিল! পাস্ট টেন্স! এখন নেই। কিন্তু তুই এখানে এসে আমাকে চমকে দিবি জানলে আগে থেকে ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে নিতাম।”

-“না না এটা ভালো কথা নয়! সেই কলেজ থেকে দেখে আসছি তোর ভীষণ ঠান্ডার ধাঁচ অথচ কোনো পিকনিক বা এক্সপিডিশনে গেলে একেবারে জানলার ধারে বসবি। এরকম ছেলেমানুষি কবে যাবে তোর?” বলে মহিলা  জড়িয়ে ধরলেন সুজাতাকে।

-“কোনোদিনও না!” বলে খিলখিল করে হেসে ফেলল সুজাতা।

(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...