অনুসরণকারী

বৃহস্পতিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ সপ্তম পর্ব



সকালে সুজাতার ঘুম ভাঙল ঐশীর চিৎকারে। চারদিকের অচেনা পরিবেশের দিকে একবার তাকিয়ে ধরমড়িয়ে উঠে বসলেন তিনি। কিছুক্ষণ সময় লাগল তার ধাতস্থ হতে। তারপর ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। ঐশী তখনও রজতাভর ঘরে বসে গজগজ করে চলেছে,“সামান্য সেন্স নেই! অপোগন্ড কুম্ভকর্ণ কোথাকার। এই হতভাগা ওঠ!”রজতাভর গলার স্বর কানে এল তার।

-আহা! খামোখা বকছিস ওকে! ওর দোষ নেই! সারাদিন অফিসে খাটনির পর ক্লান্ত ছিল বলে আর ডাকাডাকি করিনি। তাছাড়া আমি নিজেই স্টাডিরুমে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কোনো অসুবিধে হয়নি আমার!

- তুমি চুপ করো বাপি! তোমাকে আর ওর হয়ে সাফাই গাইতে হবে না! যে ছেলে নিজের হবু শ্বশুরের খাট পুরোপুরি দখল করে এভাবে ওপেন ইউনিভার্সিটির মতো পড়ে পড়ে ঘুমোতে‌ পারে সে বিয়ের পর আমাকেও বিছানা থেকে বেদখল করে দিতে পারে। এই ছেলে! উঠবি?

- আহ! ঐশী!পাশের ঘরে অভীকের মা রয়েছেন! তিনি শুনতে পাবেন!বলছি তো কোনো অসুবিধে হয় নি। তুমি চুপচাপ মুখ ধুয়ে এসো! আর দেখো তোমার সুজাতা আন্টি উঠলেন কিনা। আমি চা বসাচ্ছি।

বলে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সামনে সুজাতাকে দেখে থমকে যান রজতাভ। দেখেন কী হয়েছে বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সুজাতা। রজতাভ হেসে বলেন, “গুডমর্নিং! রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল?”সুজাতা মাথা নেড়ে বলেন,

- হ্যাঁ! কী ব্যাপার? ঐশী চিৎকার করছে কেন?

- ও কিছু না। বাদ দিন। চা খাবেন তো?আপনি মুখ ধুয়ে নিন ততক্ষণে চা হয়ে যাবে।

- আগে বলুন কী হয়েছে? নির্ঘাত অভি পুরো বিছানার দখল নিয়ে ঘুমিয়েছে! জানতাম! ইশ!ছিঃ!ছিঃ!দাঁড়ান আমি অভীককে ডাকছি।

- থাক! অতো রাতে ঘুমিয়েছে। আরেকটু ঘুমোক। সবে তো সকাল ছটা বাজে। ছেলেমানুষ এত সকালে উঠে কী করবে?আপনিও তো অনেক রাতে ঘুমিয়েছেন? আরেকটু ঘুমিয়ে নিলে পারতেন?

- আমার ভীষণ লজ্জা করছে জানেন? আমাদের জন্য আপনাদের এত কষ্ট করতে হচ্ছে। 

- সুজাতা, এ নিয়ে আমরা কালরাতেও কথা বলেছি। তাছাড়া অভীক আমার ছেলের মতো! ঐশীও একসময় এভাবেই শুতো। আমার কোনো প্রবলেম হয় নি। তাছাড়া নিজের বিছানায় আমি কমই ঘুমোই! বেশীরভাগ দিন আমার স্টাডিরুমেই কাটে। কাজেই ওখানকার সোফাকে কাঠের মিস্ত্রি লাগিয়ে সোফা কাম বেড করে নিয়েছি। রাতে ওখানেই প্রায় ঘুমোই। ওসব কথা বাদ দিন আপনি আগে মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন। ততক্ষণে আমি চায়ের জল বসাই গিয়ে। ঐশী! অভীককে ছেড়ে আগে মুখ ধুয়ে এসো!

বলে রান্নাঘরের দিকে চলে যান রজতাভ। 
মুখ ধুয়ে পরনের পোশাক ছেড়ে আবার শাড়ি পরে তৈরি হয়ে ঐশীর ঘর থেকে সুজাতা বেরিয়ে এসে দেখেন শুধু চা-ই নয় তার সাথে রীতিমতো সকালের জলখাবারও তৈরী করে নিয়েছেন রজতাভ। ডিমের পোঁচ,বাটার মাখানো সেঁকা পাউরুটি, কলা,আপেল, কেক সব নিয়ে একেবারে এলাহি ব্যাপার। ঐশী এক এক করে খাবার গুলো টেবিলে সাজাচ্ছে দেখে চোখ কপালে তুলে রজতাভর দিকে তাকিয়ে সুজাতা বললেন, “করেছেনটা কি! এত খাবার? আচ্ছা আপনি কি পাগল? এত সকালে এত খাবার কে খায়? শুধু চা হলেই তো হত!”

- এ আর এমন কী? ঐ সামান্য আয়োজন। ভেবেছিলাম লুচি আর ছোলার ডাল করবো।‌ পরে ভাবলাম থাক! অতো দুর যাবেন, অয়েলি ফুড খেলে আবার ঝামেলা হতে পারে তাই এই হাল্কা খাবার করলাম। পেটও ভরা থাকবে আবার বদহজমও হবে না।

- তাই বলে এত খাবার কে খাবে?

- কেন? সবাই মিলে খাবো! ঐ তো অভীক এসে গেছে!

সুজাতা‌ তাকিয়ে দেখলেন অভীকও রেডি হয়ে বেরিয়ে এসেছে। মাথা নিচু করে টেবিলের সামনে এসে অভীক বলল, “ সরি আঙ্কল! আসলে কাল এতটাই টায়ার্ড‌ ছিলাম যে আর... তাছাড়া আমি ঘুমোলে একেবারে কুম্ভকর্ণ মোডে চলে যাই। যাই হোক না কেন কিছুতেই ঘুম ভাঙে না।‌ আমার জন্য আপনি..."

অভীককে বাকি কথা বলতে না দিয়ে বলে উঠলেন রজতাভ,“ ব্যস অনেক সরি বলা হয়েছে! এবার কথা না বাড়িয়ে খেতে বোসো!”অভীক মাথা নেড়ে খেতে বসে। ঐশী প্লেটে খাবার সাজিয়ে এগিয়ে দেয় সবার দিকে।

বাসস্ট্যান্ডে ওরা যখন পৌঁছল ততক্ষণে বাস ছেড়ে দিয়েছে। পরের বাস তেমন নেই। তবে মালবাজারের‌‌ গাড়ি একটু পড়েই ছাড়বে। অগত্যা মালবাজার পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ধরতে হবে সুজাতাকে। আর কোনো উপায় নেই দেখে‌ অভীককে মালবাজারেরই টিকিট কাটতে বললেন সুজাতা। আজ স্কুলে ডুব দিতে হবে। কোনো উপায়‌ নেই! এমনিতেও সময় মতো পৌঁছতে পারবেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে রইলেন সুজাতা। আর তখনই হাল্কা করে বৃষ্টি নামল। ঐশীরা দৌড়ে এসে সুজাতার সামনে এসে দাঁড়াল। অভীক টিকিটটা হাতে দিয়ে বলল, “ গেটে‌র সামনে সিটের রো-তে জানলার ধারে সিট। এখনই বাস ছাড়বে।” ঐশীর হাতে একটা প্যাকেট ছিল সেটা সুজাতার হাতে দিতেই সুজাতা দেখলেন সেটায় জলের বোতল, কেক, বিস্কুট রাখা। বিরক্ত হয়ে সুজাতা বললেন,“ দেখো কাণ্ড মেয়ের! সকালে অতোগুলো খাবার খেয়ে তো এমনিতেই পেট ভরে আছে আবার এসব কেন?”

- থাক না আন্টি! পথে ঘাটে খিদে পেলে খাবে। বাপি বলে পথে ঘাটে বেরোলে খালি হাতে যেতে নেই। অন্তত জলের বোতল সাথে নিতে হয়। আমি ভাবলাম শুধু জলের বোতল দেব? তাই এগুলো নিলাম।

- তাই বলে এত! অভি তুই বারণ করতে পারলি না?

অভি বুঁজে আসা গলায় বলে,“ থাক না মা! ও দিয়েছে যখন। তাছাড়া তুমি তো এখন তেমন আর আসো না। তাই আর বাধা দিইনি।”

সুজাতা দেখেন অভীক সরাসরি তাকাচ্ছে না তার দিকে যদি মায়ের কাছে কাঁদতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। ঐশীর চোখও ছলছল করছে। মৃদু হেসে সুজাতা দুজনকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “পাগল সবকটা! এমন করছে যেন আর আসবো না। ধুস! এরপর তো আসা যাওয়া লেগে থাকবেই। এই ছেলে! এবার ছুটি পেলে ওকে নিয়ে আসবি জলঢাকায়। আর এই যে মেয়ে! পাহাড়ে আমার বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেলাম! আসতে হবে কিন্তু! তোমার বাপিকে নিয়ে আসবে। দুজনে ভালো থেকো। সাবধানে থেকো। একদম কাঁদবে না। এলাম কেমন?"

বাসে উঠে জানলার ধারের সিটে বসলেন সুজাতা। কিছুক্ষণ পর বাস ছেড়ে দিলো। অভীক আর ঐশী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল বাস স্ট্যান্ডে। বাসটা দৃষ্টিপথের আড়াল হবার পর ওরাও বেরিয়ে পড়ল যে যার পথের দিকে। 

বাসের সিটে হেলান দিয়ে বসলেন সুজাতা। বন্ধ জানলার বাইরে কাচে বৃষ্টির জলছাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। বাস ক্রমশ এগিয়ে যেতে লাগল গন্তব্যে।

*****
সময়ের চাকা বড়ো বিচিত্র! দুঃখের সময়, শোকের সময় ভীষণ ধীর গতিতে ঘোরে। তখন এক একটা দিন এক একটা বছরের মতো মনে হয়। কাটতেই চায় না। আবার সুখের সময় এত দ্রুতগামী হয়ে যায় যে একটা বছরও একলহমায় কেটে যায়। যেন কয়েকটা সেকেন্ড মাত্র। ঠিক এইভাবেই পরের কয়েকটা বছর কেটে গেছে। অভীকের সাংবাদিকতার চাকরিটা পাকা হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়। এখন সে খবরের কাগজের সাংবাদিক হবার সাথে সাথে ওদের সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্রের প্রুফরিডার। ঐশী কলেজ পাশ করে একটা ক্যারাটে স্কুলে টিচার হিসেবে যোগ দিয়েছে। সেখানেই সারাদিন কেটে যায় তার। রজতাভর পরিবারের সাথে সুজাতার সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। প্রতিরাতে অভীকের সাথে সাথে ঐশীও আজকাল সুজাতার সাথে কনফারেন্স কলে কথা বলে। গতমাসে দুর্গা পুজোতে ঐশীর আবদারে ওদের সাথে শিলিগুড়ির পুজো দেখে এসেছেন তিনি। এর আগে ঐশীও ওর বাপিকে নিয়ে অভীকের সাথে এসে ঘুরে গেছে জলঢাকা।‌ রজতাভর সাথে কথা বলে অভীকদের বিয়ের দিনক্ষণও পাকা করে ফেলেছেন সুজাতা। ঠিক হয়েছে সামনের মাঘ মাসে দুজনের চারহাত এক করে দেবেন ওরা। বিয়ের পরে ঐশীরা রজতাভর কাছেই থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত অভীক দুজনের মাথা গোঁজার ঠাই না খুঁজে‌ নিচ্ছে। অভীকও খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে কমদামে একটা ফ্ল্যাটের। রজতাভ অবশ্য ঠিক করেছেন অভীক ফ্ল্যাট‌ না পেলে নিজের ফ্ল্যাটের একটা‌ অংশ অভীকদের ছেড়ে দেবেন। সুজাতা ঠিক করেছেন নিজে হাতে গুছিয়ে দেবেন ছেলের সংসারটাকে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনটা ভালো হয়ে গেল সুজাতার। ক'দিন ধরে আকাশটা মেঘলা হয়ে ছিল। বৃষ্টি নামবে নামবে করেও নামছে না। অবশেষে কাল রাতের দিকে মুষলধারে নেমে সারারাত‌ একটানা বৃষ্টি হয়ে অবশেষে ভোররাতে থেমেছে। বৃষ্টি শেষে আকাশে ছেঁড়া মেঘ ছড়িয়ে।‌ মর্নিংওয়াকে বেরোনোর আগে শালটা গায়ে জড়িয়ে নিলেন সুজাতা। এখানে পুজোর পর পরই হাল্কা শীত নেমে আসে। তার উপর কাল রাতে বৃষ্টি হওয়ায় ঠান্ডাটা আরো বেড়েছে। ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে দরজায় তালা দিয়ে হাটতে শুরু করলেন সুজাতা।চারদিকের বৃষ্টিস্নাত পরিবেশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে হাটতে লাগলেন তিনি।

কিছুদুর গিয়ে নদীর শব্দ কানে এলো তার। পায়ে পায়ে ব্রিজের উপর উঠতেই নদীর‌ ঠাণ্ডা বাতাস এসে ঝাপটা মারল সুজাতার গায়ে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় শিউরে উঠলেন তিনি। তারপর কাঁপতে কাঁপতে ব্রিজ থেকে নেমে পাহাড়ের এক ছোটো ঢাল বেয়ে নেমে এলেন নদীর পারে। তারপর জুতো খুলে নদীর জলে পা ভিজিয়ে দিলেন। তিনি। এই অভ্যেসটা সুজাতার চিরকালের।‌ শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কোনোদিন এর অন্যথা হয় না। তথাগত বেঁচে থাকাকালীন সুজাতার সাথে আসতেন। নদীর জলে পা ডুবিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে‌ উপভোগ করতেন পাহাড়ের ভোরের পরিবেশকে। সুজাতা জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে থাকতে হারিয়ে যান এরকমই এক মুহূর্তে।

*****
- জানো সু? পাহাড়কে সবসময় সুন্দর লাগলেও তার আসল সৌন্দর্য ধরা পরে এই ভোরবেলায়। অর্ধেক অন্ধকার অর্ধেক আলোয় যতটা সুন্দর মনে হয় ততটাই রহস্যময় লাগে। এই সময়টা রাতচরা পাখিরা রাত জাগার ক্লান্তি নিয়ে ঘুমে তলিয়ে যাবার আগে শেষবারের মতো ডাক দিয়ে জানান দেয় তার অস্তিত্বের। ভোরের পাখিরা ডেকে সমগ্র ঘুমন্ত অরণ্যকে জাগিয়ে তোলে। এই একটা সময় জঙ্গলের সমস্ত পশুরা নিজেদের বিবাদ ভুলে একসাথে নদীর জল খেয়ে প্রকৃতিমায়ের, বনদেবীর আশীর্বাদ পায়। আর সবার শেষে ঠিক পুজোর দেবতার মতো নদীর পথ ধরে, জঙ্গলের প্রান্তিক অংশে প্রবেশ করেন সুর্যদেব। এই সৌন্দর্য হাজার মাথা কুটলেও কোথাও পাবে না তুমি। এই সৌন্দর্য দেখতে হলে ভোরের পাখির ডাক শুনে উঠতে পড়তে হয়। অন্ধকার থাকতে থাকতেই বেরিয়ে পড়তে হয়। শহরের মানুষেরা এটা না দেখে বনে আসে ফুর্তি করতে। পিকনিক করতে। আর বন্যপ্রাণীরা আক্রমণ করলে তাদের দোষারোপ করে। এটা বোঝে না যে এদের প্রমোদে ওদের শান্তি ভঙ্গ হয়। ওদের কাছে বন্যপ্রাণীরা আসেনি বরং ওরাই বন্যপ্রাণীর এলাকায় প্রবেশ করেছে। জানিনা কবে এদের এই বোধোদয় হবে। চিৎকার করে, গান বাজিয়ে নয়, নীরবে, নিভৃতে বনের শব্দ শুনতে আসবে। যতদিন পর্যন্ত এই বোধ ওদের না হবে ততদিন বন্যপ্রাণীদের আক্রমণ চলবে। আর এটার জন্য দায়ী থাকবে ওরাই!

(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...