অনুসরণকারী

রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ ষষ্ট পর্ব



খাবার পালা শেষ হতেই ঊর্মিকে নিয়ে রজতাভ বেরিয়ে পড়ল। এবার গন্তব্য রক গার্ডেন। স্ট্যান্ডে পৌঁছনো মাত্র জিপ পেয়ে গেল ওরা।‌ ড্রাইভারের সাথে কথা বলে রজতাভ জানতে পারল রক গার্ডেন বেশী দুর নয়, ঐ দশ কিলোমিটারের মতো হবে। ঘুম স্টেশন হয়ে যেতে হবে। আবহাওয়া ঠিক থাকলে আধঘন্টা চল্লিশ মিনিটের মতো লাগতে পারে। তবে ফেরার সময় গাড়ি পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। রজতাভ ঠিক করল এই গাড়িতেই ফিরবে। সেই মতো দরদাম করে গাড়ি ভাড়া করল সে। ঠিক হল ওদের পৌঁছে দিয়ে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে যাবে নিজের মতো ভাড়া খাটাতে। তবে মাত্র দুঘন্টার জন্য। ঠিক দুঘন্টা পর ওরা যেখানে গাড়ি থেকে নেমেছিল ঠিক সেই স্পটে দাঁড়াবে। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে সেই স্পটে এলে ওরা গাড়ি করে ফিরে আসবে। এতে ওদের ঘুরে বেড়ানোও হবে, আবার ড্রাইভারকে বসে থাকতে হবে না।

সব ঠিক করে গাড়িতে চাপল ওরা। ড্রাইভার কিছুক্ষণ ঘুরে আরো কয়েকজন প্যাসেঞ্জার জোগাড় করে পাঁচমিনিটের মাথায় গাড়ি স্টার্ট দিতেই সিটে হেলান দিয়ে বসল রজতাভ। দার্জিলিং শহর থেকে বেরোতেই উদাসীন ভাবে তাকিয়ে রইল জানলার বাইরে। দেখতে লাগল পাহাড়ের খাঁদের ধার দিয়ে নেমে যাওয়া অপূর্ব ভয়ংকর সবুজাভ সৌন্দর্যকে। ড্রাইভারের অসীম দক্ষতায় পাহাড়ের পাকদন্ডি বেয়ে চলতে লাগল ছোটো জিপটা। এক এক মুহূর্তে ঊর্মির মনে হতে লাগল এই বুঝি জিপ উল্টে গেল খাঁদে। সে ভয় পেয়ে খামচে ধরল রজতাভর হাত। রজতাভ মুচকি হেসে একবার ঊর্মির দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল,“ভয় নেই! আমি তো আছি!” ঊর্মির তাও ভয় কমল না। গোটা রাস্তা সে রজতাভর জ্যাকেটের হাতা খামচে ধরে রইল।

আধঘন্টা পর যখন ওরা গাড়ি থেকে নামল রজতাভর হাসি দেখে কে? সে হাসিমুখে বলল, “খুব তো তখন বলছিলে। নর্মাল কাপলের মতো থাকবে। কোনোরকম টাচিং না। গাড়িতে বসে সব বুলি বেরিয়ে গেল তো!”

চড়া রোদ আর বদ্ধ গাড়িতে বসে থাকার দরুন গরম লাগায় পরনের শালটা খুলে ঊর্মি ঝাঁঝিয়ে উঠল,“বাজে বকো না তো! আমি তোমার মতো অতো ডাকাবুকো নই! যেভাবে গাড়ি চালাচ্ছিল ড্রাইভারটা মনে হচ্ছিল এই বুঝি গাড়ি নেমে গেল। বাপরে!খুব জোর বেঁচে গেছি!এই কান মলছি। জীবনেও আর পাহাড়ে আসবো না বাবা!”

- সেকি! বিয়ের পর থেকে তো তুমিই আসতে চাইতে পাহাড়ে! হানিমুনে পাহাড়ে যাবে বসে কানের পোকা নড়িয়ে দিয়েছিলে। আজ যখন সত্যিই পাহাড়ে এলাম তখন বিরক্ত হচ্ছো!

- তখন কি আর ছাই জানতাম‌ যে এভাবে প্রাণ হাতে করে ঘুরে বেড়াতে হবে? ভেবেছিলাম ম্যাল,কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে কার্শিয়াং, কালিম্পঙ, গ্যাংটক‌ থেকে ঘুরে বেড়িয়ে কেটে যাবে দিনগুলো।

- উহু! ওটা তুমিই না অনেকেই ভাবে। তবে‌ পাহাড়ের মজা এই জায়গাগুলোতে থেকে নেই। আর কার্শিয়াং আলাদা জায়গা। ওটা বিখ্যাত নেতাজির বাড়ি, আর ট্রয়ট্রেন হল্ট হিসেবে। শোনো, পাহাড়কে চিনতে হলে, পাহাড়কে জানতে হলে, এর মজা উপভোগ করতে হলে পায়ে হেটে ঘুরে বেড়াতে হবে। শুনতে হবে প্রকৃতির শব্দ, অচেনা পাখির সুরেলা ডাক আর পাহাড়ের নিস্তব্ধ কোণে সবুজের আড়ালে বসে থাকা ঝিঁঝিঁর ডাক। চোখের সুখ করতে হবে সবুজে ঘেরা এই চারপাশ দেখে। তাহলেই পাহাড়ের মজা টের পাবে। তুমি গাড়িতে করে আসার সময় পাহাড়ের যে খাঁদ দেখে ভয় পাচ্ছিলে। সেই খাঁদের নিচের সৌন্দর্যকে দেখে মজা পাচ্ছিলাম আমি। কার্গিলে এই মজাটাই সেরা ছিল আমার কাছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে পাহাড়ের চারদিকের শোভা দেখে নিতাম প্রাণভরে। কে জানে পরদিন দেখতে পাব কিনা?এই আনন্দটা ভীষণ মিস করি জানো?

বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রজতাভ। ঊর্মি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকায় রজতাভর দিকে তারপর কথার প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“ দার্জিলিং-এ তো ছবি তোলার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলে? তা এখানে এসে সব ফোটোগ্রাফির শখ মিটে গেল নাকি?কখন থেকে সিনেমার নায়িকার মতো‌ শাল খুলে দাঁড়িয়ে আছি বলতো? এরপর তো ঠান্ডায় জমে যাবো! এবার অন্তত‌ একটা ছবি তোলো! তারপর ওই ওখানে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে বাকি ছবি তুলে আবার দুঘন্টার মধ্যে এখানে ফিরতে হবে যে!উফ! আর্মির লোক হয়েও কেউ যে এতটা অলস আর প্রচুর বাজেবকা মানুষ হতে পারে সেটা তোমাকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না।”

ঊর্মির অবস্থা দেখে রজতাভ ফিক করে হেসে ফেলল। সত্যিই ঊর্মি ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছে। হাসতে হাসতে ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে ঊর্মির দিকে তাক করে রজতাভ বলে ওঠে। “ রেডি? স্মাইল!”

পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা একটা ছোটোখাটো পার্ক হল ‘রক গার্ডেন’। সবুজ‌ পাকদন্ডি বেয়ে উদ্যানটা বেশ অনেকটা জায়গা জুড়েই ছড়িয়ে আছে।‌ পার্কটার সাথে কার্গিলের পিকের অনেকটা মিল পেল রজতাভ। চারদিকে ছোটো ছোটো পাহাড়ের মতো অসংখ্য স্পট। পাকদন্ডি বেয়ে সেই পাহাড়ে উঠতেই আশেপাশের জায়গা দেখতে পাওয়া যাবে। বসার জায়গাও আছে। আজকে ছুটির দিন বলে টুরিস্টের ভীড়ও দেখার মতো। হাতে সময় কম বলে ওরা কাছের একটা জায়গায় উঠে একটা বেঞ্চে বসল। ঊর্মি খাবারের ব্যাগ থেকে শালপাতার প্লেট আর খাবার আরেকটা বাক্স বের করল। খুলে দেখল ভেতরে অনেকটা পরিমাণে এগ চাউমিন আছে। দুটো কাঁটাচামচও দেওয়া। বাক্স থেকে প্লেটে চাউমিন বেড়ে নিয়ে সে রজতাভকে খেতে দিয়ে নিজে বাক্সটা নিয়ে বসল। 

রজতাভ একটু টমেটো কেচাপ চাউমিনে দিয়ে খেতে খেতে বলল, “যাই বলো না কেন মলিদিদির রান্নার হাত কিন্তু বেশ ভালো! কাল রাতে ডিমের কারি আর রুটিটা যা করেছিল না! উফ! অনেকদিন এরকম কারি খাই নি!”

- এই রান্নার জন্যই তো মেজোমামা মলিদিদিকে রেখেছেন। তবে মলিদিদির থেকে ওর মা মানে সুষমা মৌসি আরো ভালো রাঁধতে পারতেন। ওনার হাতে বানানো চিকেন মসালা থুপ্পা আর চিকেন কারি এত ভালো হত যে কী বলবো! যখন ছোটো ছিলাম তখন যতবার আসতাম আমার জন্য একটা স্পেশাল ডিশ বানাতেন মৌসি। চিকেন মোমো কারি! মানে চিকেন মোমোটাকে ভেজে অনেকটা ক্যাপসিকাম, গাজর, স্কোয়াশ দিয়ে কষা কষা ঝোল। অনেকটা তোমার ঐ ধোকার ডালনার মতো দেখতে লাগতো। আর খেতেও অপূর্ব হত। 

- আচ্ছা মলিদিদির মাকে তুমি মৌসি বলছো কেন? মাসি বলতে পারো।

মৃদু হাসে ঊর্মি তারপর বলে, “কারন মৌসি নিজে বলতেন তাকে মৌসি বলে ডাকতে। আমি এখানে এলে ভীষণ খুশি হতেন। নিজে হাতে নানারকম পদ রান্না করে খাওয়াতেন।”

রজতাভ দেখে ঊর্মির চোখটা ছলছল করছে। সেটাই স্বাভাবিক। আত্মীয়-বিয়োগের যন্ত্রণা সত্যিই কষ্টের। রজতাভ ঊর্মিকে চাঙ্গা করার জন্য বলল, “তাহলে তো আমাকেও চেখে দেখতে হয়! এক কাজ করো আজ বিকেলে আমরা তোমার মলিদিদির ঘরে‌ যাবো। সেখানে গল্পচ্ছলে জেনে নেবে উনি এই ‘চিকেন মোমো কারি’ আর ‘মসালা থুপ্পা’-র রেসিপি জানেন কিনা। যদি জেনে থাকেন তাহলে কালকের প্ল্যান ক্যানসেল। কাল সারাদিন কাছে পিঠে ঘুরবো। আর দুপুরে জমিয়ে খাবো দুটো পদ। আমিও দেখি যে পদের এত সুখ্যাতি করছো সেটা কেমন খেতে!”

ঊর্মি হেসে বলে,“যাহ! আবার ওসব কেন? শুধু শুধু মলিদিদিকে খাটানো! তারচেয়ে কালকে বলব যা ইচ্ছে বানাতে। তেমন হলে আমিও হাত লাগাব। এখানে এসে তেমন ভাবে গল্প করা হয়নি মলিদিদির সাথে। কাল সেটাও হয়ে যাবে।”

- বেশ তবে তাই হোক! সাথে এটাও বলে দেবে কাল সারাদিন মলিদিদি আর ওনার পরিবারের নিমন্ত্রণ রইল আমাদের ওখানে। একেবারে রাতে খেয়ে দেয়ে বাড়ি যাবেন ওনারা।

- ভালো বলেছ তো! বেশ পিকনিকের মতো হবে।‌ আমি আজকেই বলে আসব।
বলে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে প্লেটটা ডাস্টবিনে ফেলে ন্যাপকিনে হাত মুছে উঠে দাঁড়ায় রজতাভ। তারপর ক্যামেরা নিয়ে নেমে পড়ে ছবি তোলার কাজে।

*****
আচমকা শরীরে অস্বস্তিভাব বোধ করায় থমকে দাঁড়ালো তথাগত। কাল সারাদিন গুরুপাক খাবার খেয়ে একটু অম্বলের মতো বোধ হয়েছিল। দেরী না করে সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টাসিড খেয়ে নিয়েছিল সে। ঊর্মিকে ইচ্ছে করে জানায় নি। জানলে চিৎকার,চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিয়ে সবার টেনশন বাড়িয়ে দিত সে। কিন্তু অ্যান্টাসিড‌ খাবার পরেও শরীরের ভারীভাবটা যায় নি। অনেকদিন পর ঊর্মির সাথে মিলিত হতে গিয়েও গলদঘর্ম হয়ে পড়ছিল সে। মনে হচ্ছিল বুকের বাঁদিকে কে যেন হাতুড়ি পিটছে। ঊর্মি যাতে বুঝতে না পারে‌ সেই কারনে বেশিক্ষণ ওর উপরে থাকেনি সে। কিছুক্ষণ পরেই ঊর্মিকে তুলে নিয়েছিল নিজের বুকের উপর। বিছানায় শুয়ে সারারাত বুকের বাঁদিকের চিনচিনে ব্যথা সহ্য করে আদরে আদরে ভরে দিচ্ছিল ঊর্মিকে। ভেবেছিল হয়তো খাবার হজম হয় নি বলেই এই ঝামেলা হচ্ছে। ঠিক করেছিল সকালে উঠে মর্নিং ওয়াক সেরে একটু হাল্কা ফ্রি হ্যান্ড করবে খাবারটাকে হজম করার জন্য। 

সেই মতো সকালে বেরিয়ে পড়েছিল ওয়াকের জন্য। সকালে আর সেই অস্বস্তিভাবটা ছিল না ঠিকই। কিন্তু খাবারটার কারনে যা ক্যালরি জমেছে তা কমানোর জন্য কিছু দুর গিয়ে ওয়ার্মআপের জন্য দৌড় শুরু করেছিল সে। তারপর একজায়গায় থেমে হাল্কা ফ্রি হ্যান্ড করে ফিরে আসার সময় অস্বস্তিটা আবার ফিরে আসায় ভ্রু কুঁচকে গেল রজতাভর। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। হা করে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। বুকের চিনচিনে ব্যথা ক্রমশ পরিণত হয়েছে প্রচন্ড যন্ত্রণায়। মনে হচ্ছে যেন হৃৎপিন্ডটা ফেটে যাবে। দাঁতে দাঁত চেপে পাহাড়ের দিকটায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল রজতাভ। ড.মিত্র বলেছিলেন এই সিম্পটমটার ব্যাপারে। গুলির চাপ তো ছিলই তার উপর কালকের গুরপাক ভোজন আর পরিশ্রমের আঘাতে হৃদযন্ত্র জবাব দিতে শুরু করেছে। রজতাভ বুঝতে পারল ওর সাথে কি হয়েছে। কিন্তু এত সহজে হার মানার পাত্র সে নয়। আর আপাতত এই জনমানবহীন জায়গায় সে মরতে পারে না। শেষ চেষ্টা তাকে নিজেকেই করতে হবে। যে করে হোক কটেজে পৌঁছতে হবে। একবার পৌঁছতে পারলেই আর চিন্তা নেই। মুহূর্তের মধ্যে কর্তব্য স্থির করে নিল সে। তারপর ধীরে ধীরে হাটতে লাগল কটেজের দিকে।

এক একটা মুহূর্ত রজতাভর কাছে অনন্তকালের মতো মনে হচ্ছে। চোখের সামনে ক্রমশ অন্ধকার নেমে আসছে। রীতিমতো হাপাচ্ছে সে। বা বলা উচিত খাবি খাচ্ছে সে। বুকের যন্ত্রণা বিদ্যুতের মতো সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। রজতাভর মনে হচ্ছে‌ যেন ওর হৃৎপিন্ডটা যেন ভেতর থেকে কেউ দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। কে জানে কটেজটা আর কতদুর? কোনো মতে টলতে টলতে এগোতে লাগল সে। কিছুদুর এগিয়ে একটা বাঁক পেরোতেই সে দেখতে পেল কটেজটা‌। ঐতো ঊর্মি বাইরের লনে বসে আছে। হাতে চায়ের কাপ। ঐ তো মলিদিদির বর! বীরেন্দর দাজু! হাতে বাজারের থলে নিয়ে বেরোচ্ছে। আর চিন্তা নেই! আর কয়েক পা! ঐ তো ওরা তাকিয়েছে!আরেকটু! আর কটা পা! আর পারল না রজতাভ। বুক খিমচে ধরে মাটিতে বসে পড়ল সে। তারপর খাবি খেতে খেতে মাটিতে শুয়ে পড়ার আগে শুনতে পেল ঊর্মির আকাশকাঁপানো চিৎকার! চোখে অন্ধকার নেমে আসার আগে সে দেখতে পেল ওরা পাগলের মতো ছুটে আসছে ওর দিকে। ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্রমশ রজতাভর চোখে নেমে এল কালো পর্দার মতো একরাশ অন্ধকার।

কতক্ষণ অচৈতন্য ছিল জানে না রজতাভ। জ্ঞান ফেরার পর চোখ মেলতেই একটা চোখ ধাঁধানো আলোয় চোখটা জ্বলে উঠল তার। বাধ্য হয়ে চোখ বন্ধ করলো সে। কিছুক্ষণ নিজেকে ধাতস্থ হবার সময় দিল সে। তারপর চোখ মেলে তাকাতেই নিজেকে আবিস্কার করল নার্সিংহোমের বেডে। একটু ধাতস্থ হয়ে কোথায় আছে, কেমন আছে মনে করার আগে সে টের পেল তার সমগ্র শরীরে তার, পাইপ জড়ানো। হাতে স্যালাইন আর রক্তের চ্যানেল করা। বুকে কতগুলো পাম্পের মতো, ক্লিপের মতো যন্ত্র আটকানো। সেখান থেকে তার বেরিয়ে জুড়ে আছে পাশের যন্ত্রে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক আটকানো রয়েছে। কানের কাছে একটা বিপ বিপ শব্দ ভেসে আসছে। সারা শরীরে কোনো সাড় নেই। কয়েকবার চেষ্টা করল সে নড়ে ওঠার। পারল না। তবে কি...? আতঙ্কে সমগ্র শরীর হিম হয়ে এল রজতাভর। শেষমেশ বুকে আটকে থাকা গুলিটার কারনেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে তার শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে গেল অবশেষে! অসহায় চোখে চারদিকে তাকাল সে। পাশে একজন নার্স‌ বসেছিল। সে চোখ মেলে তার দিকে চাইতেই সে উঠে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। রজতাভ চারদিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে খুঁজতে লাগল ঊর্মিকে। চিৎকার করে সাহায্যের জন্য ডাকতে চাইল। কিন্তু কন্ঠ দিয়ে কেবলমাত্র গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ বেরোল না তার। 

কিছুক্ষণ পরেই নার্সটা আবার তার ঘরে এল। আর তার সাথে একজন ডাক্তার ঢুকলেন ঘরে। ডাক্তার এসে কিছুক্ষণ মেশিনের পর্দার দিকে চেয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “এখন কেমন বোধ করছেন?”

রজতাভ ডাক্তারের দিকে‌ তাকিয়ে রইল। ডাক্তার হেসে বললেন, “যা খেল দেখালেন আপনি! আমরা তো প্রায় ধরেই নিয়েছিলাম আপনাকে বাঁচানো যাবে না ভেবে। বুলেটটা ভীষণ কমপ্লিকেটেড জায়গায় আটকে ছিল। শুনতে একটু ক্লিশে লাগবে বাট আই মাস্ট সে,আপনার স্ত্রীর সিদুরের জোরে আপনি বেঁচে ফিরেছেন আবার। আপনার কেস হিস্ট্রি, আপনার আর্মিতে ইঞ্জুরি সবটা বলে হেল্প করেছেন তিনি। বাকি হেল্প করেছেন আপনাদের ডক্টর মিত্র! ফোনে কথা‌ বলে আপনার কন্ডিশনটা ব্রিফলি শুনেছি। আপনার লাক মারাত্মক! স্ট্রেসটা সামান্য স্ট্রোকের উপর দিয়ে চলে গেছে। নাহলে হার্ট ফেলিওর, বুলেটের কারনে হার্টে সংক্রমণ অনেক কিছুই হতে পারত। তবে আর চিন্তা নেই। বুলেটটা আমরা বের করেছি। কিন্তু এবার থেকে আপনাকে আরো সাবধানে থাকতে হবে। হার্ট সার্জারি করে বুলেট বের করা মানে বুঝতেই পারছেন।‌ এরপর থেকে আপনাকে রেস্ট্রিকশনে চলতে হবে। স্পাইসি, অয়েলি ফুড, এক্সেসিভ ট্রেনিং, বেশিক্ষণ পরিশ্রম বাদ। রেস্টে থাকতে হবে আপনাকে। আপাতত রেস্ট নিন আপনি। বিকেলে আসব আবার চেকাপ করতে।” বলে বেরিয়ে গেলেন ডাক্তার। তারপর কেবিনে ঢুকল ঊর্মি। ধীর পায়ে এসে রজতাভর বেডের পাশে বসল সে। রজতাভর একটা হাত ধরে কিছুক্ষণ অশ্রুসজল অথচ অভিমানী চোখে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। রজতাভ চোখের ইশারায় বলল ,“ভয় নেই!” ঊর্মি তাও চুপ করে বসে রইল। তারপর যেমনভাবে এসেছিল ঠিক তেমন ভাবে ধীর পায়ে চলে গেল। রজতাভ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ক্লান্তিতে চোখ বুঁজল।

*****

আচমকা মুখের উপর জলের স্পর্শ পেতেই চোখ মেলে তাকালেন রজতাভ। কিছুক্ষণ লাগল তার ধাতস্থ‌ হতে। বুঝতে পারলেন এতক্ষণ ধরে‌ পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। চোখ‌ মুছে ‌তাকিয়ে দেখলেন আকাশ ক্রমশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। চারদিকে গুম গুম শব্দে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি নামল বলে। আজকাল বৃষ্টিতে ভিজলেই ভীষণ শরীর খারাপ করে রজতাভর। অথচ একসময় এই বৃষ্টিতেই কত ভিজেছেন। ঊর্মিকে আদর করেছেন।‌ এরকমই এক বৃষ্টিমুখর রাতেই ঘটেছিল সর্বনাশটা। চট করে ঘরে ঢুকে এলেন তিনি। আর ঘরে ঢোকামাত্র ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল। রজতাভ ব্যালকনির দরজা লাগিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দেখলেন তার বিছানার প্রায় পুরোটাই দখল করে শুয়ে আছে অভীক। অভীককে ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে হাসি পেল তার। ঐশ্বর্যও একসময় এইভাবে ঘুমোতো। হাসতে হাসতে বিছানা থেকে একটা বালিশ আর চাদর নিয়ে নিজের স্টাডিরুমে চলে এলেন তিনি। স্টাডিরুমের সোফাতে বালিশ রেখে আলমারি থেকে একটা বই বের করে সোফায় আধশোয়া হয়ে কিছুক্ষণ পাতা উল্টে শুয়ে পড়লেন তিনি।

(চলবে...)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...