(বর্তমান সময়)
— অতীন! অতীন! কী ঘুম ঘুমোচ্ছে রে বাবা! এই অতীন!
হাল্কা একটা তন্দ্রার মধ্যে তলিয়ে যেতে যেতে আচমকা মধুজার মৃদুস্বরের ডাকে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল অতীনের। আর ঘুমটা ভেঙ্গে যেতেই কোমরের কাছে একটা মৃদু চিমটির অনুভূতি টের পেল সে। চোখ মেলে মধুজার দিকে তাকাল অতীন। বুঝতে পারল ওর ঘুম ভাঙানোর জন্যেই মধুজা চিমটিটা কেটেছে। মধুজা চোখের মাধম্যে সামনের দিকে ইশারা করতেই অতীন সামনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল ওদের গাড়িটা রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত আলস্য কেটে গেল তার। গাড়ি থেকে নেমে একবার রাষ্ট্রপতি ভবনের মাথায় থাকা তেরঙ্গার দিকে তাকাল অতীন, তারপর বুকভরে একটা লম্বা প্রশ্বাস নিয়ে ধীর অথচ দৃপ্তপদে এগিয়ে গেল ভবনের দিকে।
*****
(মাসছয়েক আগে)
— আস্তে আস্তে পা ফেলে হাট। রাস্তাটা বড্ড স্লিপারি হয়ে আছে। খুব সাবধান।
— আমার কথা ভাবতে হবে না। তুই আগে নিজেকে সামলা। আরেকটু হলে পা পিছলে পড়ে যেতিস।
— হুম। আগে যদি জানতাম এখানে এত বৃষ্টি হবে তাহলে শাড়ি পরে আসতাম না।
— বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে সেটাই স্বাভাবিক নয় কি?
আর কথা বাড়াল না মধুজা। অতীনের হাত ধরে পাথুরে রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে একবার আকাশের দিকে তাকাল সে। নাহ! রোদের আর দেখা নেই। বরং গোটা আকাশ আবার ঢেকে গেছে ঘন কালো মেঘে। গতিক সুবিধের ঠেকছে না। বোধহয় সকালের মতো রাতের দিকেও নেমে আসবে ভীষণ বারিধারা। কথাটা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মধুজা ধীরপায়ে এগিয়ে গেল সামনের কটেজটার দিকে।
কলিংবেল টেপার খানিকক্ষণ পরেই দরজা খুললেন এক প্রৌঢ়। তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে একটা দরাজ হাসি হেসে হিন্দিতে বললেন, “ওয়েলকাম! রাস্তায় কোনো অসুবিধে হয়নি তো? আসলে আজ সকাল থেকে যে হারে রেইনফল হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে ল্যান্ডস্লাইডের খবর এলো বলে। সে কারণেই আমার ড্রাইভার মানে জনিকে পাঠালাম। ভীষণ কাজের ছেলে। ওর ড্রাইভিং স্কিল সাংঘাতিক।”
মধুজা মৃদু হেসে বলল, “না, তেমন অসুবিধে হয়নি। আপনার ড্রাইভার ঠিকভাবেই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে এসেছে।” ভদ্রলোক হেসে বললেন, “তা তো চালাবেই! কতবার যে ওর কারণে এর চেয়েও খারাপ ওয়েদারে দুর্গম পথ পার করে এসেছি তার ঠিক নেই। একবার জানো সেই ১৯৮৯-এ…” হয়তো আরো কিছু বলতেন ভদ্রলোক। কিন্তু তার আগেই ঘরের ভেতর থেকে একটা মহিলা কন্ঠ তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিল। পরক্ষণেই হাউজকোট পরিহিতা একজন ভীষণ মিষ্টি দেখতে প্রৌঢ় মহিলা বেরিয়ে এসে সেই ভদ্রলোককে তিরস্কার করে বলে উঠলেন,
— আহ! হচ্ছেটা কী গিরিশ! ছেলেমেয়ে দুটো সেই তখন থেকে বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কোথায় ওদের ভেতরে নিয়ে আসবে তা না দরজার সামনেই খেঁজুরে আলাপ জুড়ে বসেছ?
তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বললেন, “কিছু মনে করো না তোমরা। আসলে উনি ওরকমই। কারো সাথে একবার গল্প জুড়ে বসলে সময় আর কাণ্ড দুটোরই জ্ঞান থাকে না ওনার। তোমরা ভেতরে এসো। আকাশের অবস্থা ভালো নয়। আবার বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।” কথাটা বলে মধুজাদের ঘরের ভেতরে নিয়ে গেলেন মহিলা।
বাইরে থেকে কটেজটা পুরোনো মনে হলেও ভেতর থেকে বেশ ছিমছাম আর সুন্দর। সুসজ্জিত ড্রইংরুমের দেওয়ালে যেমন শোভা পাচ্ছে লৌকিক চিত্রপট, গৌতম বুদ্ধের ছবি, তেমনই শোভা পাচ্ছে সামরিক শিল্ড, নেপালি কুকরি আর সামরিক পোশাকে এ বাড়ির কর্তার একাধিক ছবি। সেদিকে তাকাতেই সেদিনের হোটেলে কাটানো অপয়া সন্ধ্যেটার কথা মনে পড়ে গেল। সেদিন হোটেলের বাথরুমে অস্বাভাবিক শব্দগুলো শোনামাত্র বাথরুমের দরজায় টোকা মারলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে মারাত্মক ভয় পেয়ে গিয়েছিল মধুজা। বেশ কয়েকবার টোকা মারার পরেও যখন অতীন বাথরুমের দরজা খুলল না তখন রুম সার্ভিসকে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না ওর কাছে। হোটেলের কর্মচারীরা কোনোমতে বাথরুমের দরজা ভেঙে উদ্ধার করেছিল অতীনের অচৈতন্য দেহটাকে। কপালের মাঝখানে আর গালে আয়নার কাঁচের টুকরো গেঁথে যাওয়ায় অতীনের সারা মুখ, জামা ভেসে যাচ্ছিল রক্তে। কোনোমতে পাঁজাকোলা করে অতীনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পাশেরই এক ওষুধের কাম ডাক্তারের চেম্বারে। কর্মচারীদের ডাকে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে রক্তাক্ত অতীনকে দেখে প্রথমে থমকে গেলেও পরক্ষণে দ্রুত হাতে ফার্স্ট এইড করতে শুরু করেছিলেন ডাক্তার।
ঘন্টাখানেক পর অতীনের জ্ঞান ফিরে আসতেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, “How are you feeling Captain?” যা শুনে প্রথমে চমকে গেলেও পরক্ষণে ডাক্তারের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখার পর অতীন বলেছিল, “Way better than I deserve!”
— চোটটা বাধালে কী করে ইয়াংম্যান?
প্রশ্নটা শুনে বেঞ্চে উঠে বসে একটু নিভে যাওয়া অথচ স্বভাবসিদ্ধ কৌতুক ভরা কন্ঠে অতীন বলেছিল, “Do you want the short or the long version?”
— ছোটো করেই বলো।
— তেমন কিছু নয়, ঐ বাথরুমে একটু পা পিছলে যাওয়ায় গুঁতো খেয়েছি আর কি!”
— গুঁতো! কীসের গুঁতো?
— ষাঁড়ের গুঁতো।
— অ্যাঁ!? ষাঁড়ের গুঁতো! তা হোটেলের রুমে ষাঁড় এলো কোথা থেকে?
— সেটা তো জানা নেই তবে ষাঁড়টা এখন কোথায় সেটা বলতে পারি।
— বটে! তা কোথায় সেই ষাঁড়টা?
মুচকি হেসে আলতো করে অতীন বলেছিল, “এই তো কর্ণেল? আপনার সামনেই তো পড়ে আছি!”
কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর হো হো করে হেসে ফেলেছিলেন অতীনদের সামনে বসে অবসর প্রাপ্ত মিলিটারি ডাক্তার কর্ণেল গিরিশ প্রধান। তারপর বলেছিলেন, “আই মাস্ট সে! এতদিন পরেও চরম সিরিয়াস মুহূর্তে সার্কাজম করার বদঅভ্যেসটা তোমার যায়নি ইয়াংম্যান! আপাতত ফার্স্ট এইড করে দিয়েছি। আর একটা টেট-ভ্যাক দিচ্ছি। এখন হোটেলের রুমে গিয়ে রেস্ট নেবে। রাতে লিকুইড ডায়েট হলে বেটার কারণ কপালে আর গালে স্টিচ পড়েছে। কোনোরকম খাবার চিবোনোর বা কথা বলার চাপ দেওয়া যাবে না। কাল সকালে নাহলে বিকেলের দিকে একবার চেম্বারে এসে দেখিয়ে যাবে। বলে চটপট অতীনকে টিটেনাস ইঞ্জেকশন দিয়েছিলেন ডাক্তার।
হোটেলে ফেরার পর সেই রুমটা পাল্টে অন্য রুম নিয়েছিল ওরা। অতীনকে বিছানায় শোয়ানোর পর হোটেলের কর্মচারীরা ওদের লাগেজ রুমে রেখে বিদায় নিতেই ভেতর থেকে রুমের দরজা আটকে দিয়ে অতীনের বুকের উপর আছড়ে পড়েছিল মধুজা। দুহাতে অতীনকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল সে। অতীন একহাত মধুজার মাথার উপর রেখে বলেছিল, “ধুর পাগলী! কিছু হয়নি আমার। শুধু ঐ রুমের বাথরুমটা স্লিপারি বলে পা-টা একটু পিছলে গিয়েছিল। ক্ষতির মধ্যে শুধু হোটেল মালিকের বাথরুমের আয়নাটা গেল এই যা। কাল সকালে সেটার দাম না হয় চুকিয়ে দেব।”
মধুজা প্রত্যুত্তরে কাঁদতে কাঁদতে অতীনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল। অতীন হেসে বলেছিল, “পাগলী একটা! ওটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল। যে কারোর সাথে হতে পারতো। আমার জায়গায় তুইও থাকতে পারতিস। যদিও আমি জানতাম আমার কিছু হবে না। এই অতীন রায়চৌধুরী যমের অরুচি! এত সহজে মরণ...” কথাটা শেষ করার আগেই মধুজা শশব্যস্ত হয়ে এক হাতে অতীনের মুখ চেপে ধরে ধরা গলায় বলেছিল, “বাড়িতে তো আমাকে মিসেস বকবকম বলে খুব খোঁটা দেওয়া হয়, তা এখানে উল্টোপাল্টা কে বকছে শুনি? আরেকবার যদি এই কথাটা তোর মুখে শুনেছি। তাহলে...”
মুখ থেকে মধুজার হাত সরিয়ে অতীন জিজ্ঞেস করেছিল,
— তাহলে কী? কী করবি তুই?
— তাহলে জেনে রাখো ক্যাপটেন অতীন রায়চৌধুরী! তোমার এই বিয়ে করা বকমবাজ বউ সেদিন তোমার হাঁড়ে দুব্বোঘাস গজিয়ে দেবে।
— বটে! তাহলে মৃত্যু ক্যান্সেল!
বলে মুচকি হেসে মধুজার ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিল অতীন। বাইরের আকাশে বর্ষার ঘন কালো মেঘ জমলেও ঘরের ভেতরে থাকা সদ্য বিবাহিত দম্পতির মধ্যে থাকা মান-অভিমানের মেঘ কেটে গিয়েছিল সে রাতেই। সে রাতে অতীনের ক্ষতর কথা মাথায় রেখে সন্তর্পণে ও সাবধানে ওরা পরস্পরকে নতুনভাবে আবিস্কার করেছিল।
সে রাতের কথা ভেবে লজ্জায় অধোবদনা হয়ে আপনমনে হাসল মধুজা। তারপর তাকাল ঘরে এককোণে সোফায় বসা অতীনের দিকে। পরে অতীনের কাছে মধুজা শুনেছে, কাশ্মীরে থাকাকালীন ড. প্রধান ওদের আর্মি হাসপাতালের ইনচার্জ ছিলেন। শুধু তাই নয়, ব্লাস্টে জখম হওয়ার পর অতীন ড.প্রধানের তত্ত্বাবধানেই চিকিৎসারত ছিল। বলা যায় তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই অতীন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিল। এই তথ্যটা জানার পর থেকেই মানুষটার প্রতি মধুজার শ্রদ্ধা অনেকটা বেড়ে গেছে। সেদিনের পর থেকে যতদিন ওরা এখানে আছে, প্রায় প্রতিদিনই হয় সকালে নাহলে সন্ধ্যের দিকে নিয়ম করে ড.প্রধান ওদের রুমে এসে অতীনকে চেকাপ করে গেছেন। আগামীকাল ওরা ফিরে যাবে শোনার পর আজ সকালে উনি ওদেরকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। সেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতেই ওদের এখানে আসা।
ড. প্রধান অতীনের ক্ষতটা পরীক্ষা করে বললেন, “এই তো দিব্যি হিলড হয়ে গেছে উন্ডটা। তেমন হলে আজই স্টিচগুলো কেটে ফেলা যায়। তবে আমি রেকোমেন্ড করবো আজকের দিনটা থাক। কাল নাহয় সকালে চেম্বারে এসো তখন চট করে কেটে ফেলা যাবে।”
— তুমি থামো তো! ছেলেমেয়েদুটো প্রথমবার বাড়িতে এসেছে কোথায় ওদের গোটা বাড়ি ঘুরে দেখাবে তা না এখানেও ডাক্তারখানা খুলে বসেছ!
কথাটা বলতে বলতে একটা ট্রে-তে চায়ের কাপ আর একটা বড়ো প্লেটে অনেকগুলো চিকেন পকোড়া নিয়ে ড্রইংরুমে ঢুকলেন মিসেস প্রধান। তারপর সকলের হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “কিছু মনে করো না তোমরা। তোমাদের স্যার ওরকমই। কোনো কান্ডজ্ঞান নেই। যেখানে সেখানে ডাক্তারি ফলাতে বসে যান। ঐ যে তোমাদের বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না? কী যেন ঐ ইন্সট্রুমেন্টটা? ঐ যে ধান ভেঙ্গে চালের গুঁড়ো বের করে। সেটা নাকি স্বর্গে গেলেও নিজের কাজ ভোলে না? সেটা হলেন তোমাদের স্যার!”
— আহ লিলি! ছেলে-মেয়েদুটোর সামনে অন্তত আমার প্রেস্টিজ ডাউন করে দিও না! অবশ্য তোমাকে বলে কী লাভ? ছেলেটার woundটা তো দেখোনি! দেখলে বুঝতে কেন আমি এতটা concerned?
কথাটা বলে একটু বিরসবদনে Medical Kit-এর বাক্সটা বন্ধ করে জায়গামতো রেখে দেওয়ার পর বেসিনে হাত ধুতে গেলেন ড.প্রধান। ট্রে থেকে পকোড়ার প্লেটটা সেন্টার টেবিলে রাখতে রাখতে মিসেস প্রধান বললেন,
— অতো শত আমি বুঝি না বাপু। আমি শুধু বুঝি কাজ কাজের জায়গায় আর ফ্যামিলি টাইম ফ্যামিলি টাইমের জায়গায়। দুটো জিনিস কোনোদিনও একসাথে হয় না, হতে পারে না। মানুষকে ওয়ার্কলাইফ আর পার্সোনাল লাইফ ব্যালেন্স করতে হয়। যখন বাড়িতে থাকবো তখন কাজের কথা বা কোনো পেন্ডিং কাজ নিয়ে ভাববো না। আবার যখন কাজ করবো তখন ফ্যামিলি, বাড়িঘর নিয়েও bothered হবো না। অবশ্য কাকে বলছি? যে লোকটা সারা জীবন কাজ, ডিউটি করে কাটিয়ে দিল তার কাছে এসব বলা বৃথা! যাকগে তোমরা চা আর স্ন্যাকসগুলো খাও, আমি রান্নাঘরে আছি। কোনো কিছুর দরকার লাগলে বা স্ন্যাকস লাগলে বলবে। রান্নাটাও প্রায় হয়ে এসেছে। ”
কথাটা বলে খালি ট্রে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোলেন মিসেস লিলি প্রধান। হাত ধুয়ে এসে সেন্টার টেবিল থেকে নিজের চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে চা খেতে খেতে ড.প্রধান বললেন, “ তবে একটা কথা মানতে হবে অতীন, তোমাকে লাস্ট যেভাবে দেখেছিলাম আর এখন যেভাবে দেখছি এই improvement-টা truly remarkable! তুমি যে এত তাড়াতাড়ি wheel chair ছেড়ে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াবে এটা আমি এক্সপেক্টই করিনি। এই miracle-টা ঘটালে কীভাবে?”
অতীন লাজুক হেসে বলে, “এর পুরো কৃতিত্বটাই মধুজা মানে আমার wife-এর স্যার। ও যদি আমার পাশে না দাঁড়াতো, আমাকে morally and mentally support না করতো, তাহলে হয়তো আমি কোনোদিনই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারতাম না। ও প্রতিটা মুহূর্তে আমার সাথে ছায়ার মতো ছিল। আমাকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। হয়তো ওর ভালোবাসায় miracle-টা ছিল তাই আজ আমি এখানে।”
— অথচ সেই ভালোবাসার মানুষের কাছে তুমি ফিরতে চাইছিলে না। একটা দূরত্ব করে সারাজীবন আলাদাভাবে কাটাতে চাইছিলে।
ড. প্রধানের কথাটা শুনে লজ্জায়, অপরাধবোধে মাথা নামিয়ে নেয় অতীন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “ভাগ্যিস শেষ পর্যন্ত তা করিনি!”
— সেটাই তো বলছি! করলে হয়তো তোমার জীবনটা অন্যরকম হত আজ। আসলে destiny and karma বুঝলে? এই দুটো জিনিস বড্ড আজব। আমরা ভাবি এক আর আমার অদৃষ্টে লেখা থাকে আরেক। আবার কর্মফল থেকেও নিস্তার মেলে না। তেজেন্দ্রপ্রতাপ সিং যেমন! তোমার সাথে মিশনে গেল অথচ ওর গায়ে একটাও দাগ লাগল না। কিন্তু তুমি? Blast-এর আঘাতে পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে রইলে। সে Yudh Seva Medal আর promotion পেয়ে সুবেদার থেকে lieutenant গেল আর তুমি? Wound Medal আর Uttam Yudh Seva Medal পেয়েও voluntary retirement নিতে বাধ্য হলে।
— সে আমার দোষ ছিল বলেই শাস্তি পেয়েছি স্যার। আমাদের মেজরের নির্দেশ মেনে এগোনোটাই ঠিক ছিল। কিন্তু যেভাবে ওরা একটা নিরীহ বাচ্চাকে মারছিল সেটা সহ্য করতে পারিনি। ভুলটা আমারই। যাকগে তেজেন্দ্রপ্রতাপের কী খবর স্যার? এতদিনে নিশ্চয়ই ক্যাপটেন হয়ে গেছে। ছেলেটার মধ্যে কিন্তু potential ছিল। অফিসারদের অর্ডার বেদবাক্যের মতো মেনে চলতো। তবে একটু রাগী আর বদমেজাজি ছিল এই যা।
— হুম! সেই রাগের কারণেই তো এত বড়ো mishap-টা হল। বেচারা নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারেনি। এমনকি ওর শেষের দিনগুলোতেও নয়।
— মানে? বুঝলাম না। তেজেন্দ্রপ্রতাপের কী হয়েছে?
— মেডেল আর promotion letter পাওয়ার পর ক’দিনের জন্য ছুটি নিয়ে দেশের বাড়ি গিয়েছিল তেজেন্দ্রপ্রতাপ। সেখানেই সুইসাইড করে সে।
— কী বলছেন স্যার!
— তবে আর বলছি কি! সেদিনের ঘটনাটার ট্রমা থেকে বেরোতে পারেনি বেচারা। ওর সবসময় মনে হত ঘটনাটার জন্য ওই দায়ী। ওর জন্যই…
— তেজেন্দ্রপ্রতাপ সিং কে?
ড. প্রধানের কথা শোনার পর আচমকা একটা বিস্ময় ও শোকের ধাক্কায় অতীন এতটাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল যে একমুহূর্তের জন্য ঘরের ভেতর মধুজার উপস্থিতিটাই ভুলে যেতে বসেছিল। ড. প্রধানের কথার মাঝে আচমকা মধুজার প্রশ্নটা শোনামাত্র চমকের ঘোর কাটে তার। বলা ভালো মধুজার প্রশ্নে সামান্য চমকে ওঠে সে। ব্যাপারটা মধুজার নজর এড়ায় না। পরক্ষণে নিজেকে সামলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতীন মুচকি হেসে বলে ওঠে , “তেমন কেউ নয়। আমার একজন জুনিয়র। ভীষণ বাধ্য ছেলে ছিল। তবে বড্ড রাগী আর বদমেজাজি। আমাদের ইউনিটে ওকে সবাই মজা করে তেজপাতা বলে ডাকতাম।”
— তা কোন মিশনের কথা বলছিলেন স্যার?
— তেমন কিছু না। ঐ একটা…
অতীন কথা বলার আগেই রান্নাঘর থেকে লিলি আরেক প্রস্থ স্ন্যাকস নিয়ে বেরিয়ে এসে বলেন, “নির্ঘাত বুড়োটা তোমাদের বকিয়ে মারছে। এই আরেক বদভ্যেস ওনার। আর্মি থেকে রিটায়ারমেন্ট নিলেও আর্মির কথা, যুদ্ধের গল্প, রুগীর কাহিনী থেকে কোনো বিরাম নেই ওনার। সারাদিন শুধু পেশেন্ট আর যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে বকবক করতে থাকেন। এদিকে সেই কখন চা-স্ন্যাকস দিয়েছি সেই খেয়াল আছে? পকোড়াগুলো তো ঠান্ডা হয়ে গেল! আমার আরেক প্রস্থ স্ন্যাকস ভাজা হয়ে গেল অথচ ওনার খাওয়া হল না।”
— আহ লিলি! দেখছো একটা ক্রুশিয়াল বিষয় নিয়ে কথা বলছি ওমনি তোমার ফোড়ন কাটতে হবে?
— রাখো তোমার ক্রুশিয়াল বিষয়! তোমার সব ক্রুশিয়াল বিষয় জানা আছে আমার। ঐ অমুক মিশনে তমুক সৈনিক আহত হয়েছিল, ওমুক সৈনিক অসুস্থ ছিল। অমুক পেশেন্টের সুগার, প্রেশার। রাতদিন একই ভাঙা ক্যাসেট বেজেই চলেছে!
প্রধান দম্পতির খুনশুটিতে ভরা ঝগড়ায় মিশন আর তেজেন্দ্রপ্রতাপের ব্যাপারটা তখনই ধামাচাপা পড়ে গেলেও মধুজা বোঝে অতীন ওর থেকে কিছু একটা লুকোবার চেষ্টা করছে। কিন্তু কী সেই জিনিস বুঝতে পারে না সে। (চলবে...)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন