অনুসরণকারী

রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ নবম পর্ব




সেই মতো বিধান মার্কেটের দিকে রওনা হলেন সকলে। সেখানে একটা রেস্তরাঁয় চারপ্লেট বিরিয়ানী আর চিকেন চাপের অর্ডার দিয়ে গুছিয়ে বসলেন সকলে। ঐশীর পাশে বসে সুজাতা বলে উঠলেন,

- তাহলে আপনার মেয়েকে কিন্তু আমি নিজের করে নিলাম রজতাভ। আপনি কিন্তু আর ওকে শাসন বা বকাঝকা করতে পারবেন না।

- একই কথা অভীকের ক্ষেত্রেও খাটে সুজাতা। তবে চিন্তা করবেন না ওকে আমরা ঠিক গড়ে পিঠে ঘোড়া বানিয়ে দেব!

বলে অভীকের কাঁধে একটা চাপড় মারলেন রজতাভ। সুজাতা হেসে বললেন, “সেই! ছেলেটা আমার বরাবর দুগ্ধপোষ্য‌ শিশু কিনা!"

অপ্রস্তুত হয়ে অভীক বলে ওঠে, “ মা প্লিজ! শ্বশুরমশাইয়ের সামনে অন্তত...”

- তুই থামতো! যা সত্যি তাই বলছি! এতবছর হয়ে গেল তাও কোনো অকেশনের কাপড় সাজিয়ে দিতে লাগে, দরকারি কাগজপত্র হাতের সামনে এগিয়ে দিতে হয়। যতই তোর বিয়ে হোক, চাকরি কর! তুই বাচ্চাই। জানেন রজতাভ? হায়ার স্টাডিজ-এর জন্য শিলিগুড়ি আসার আগের দিন কি কান্নাই না কেঁদেছিল আপনার জামাই! যেন ছেলে নয় মেয়ে বিয়ে দিয়ে কন্যাবিদায় হচ্ছে। একমাস পর পুজোর ছুুটিতে এসে বলে আর যাবেনা! ভাবুন তো কি জ্বালা! আরে ছেলেমানুষের এটাই তো বয়স মায়ের আঁচল ছেড়ে বাইরের জগতটাকে দেখা, নিজের মতো করে বাঁচতে শেখার। তা না ছেলে আমাকে জড়িয়ে কাঁদছে! প্রায় মেরে ধরে পাঠিয়েছিলাম। আর এখন? এই শহর ছেড়ে যেতেই চায় না।

- মা! প্লিজ! পাশে ঐশী বসে আছে! এরপর সারাটা দিন আমাকে ছিচকাঁদুনে বলে ভ্যাংচাবে।

- বেশ করবে! তোর মতো ধেড়ে শিশুকে এই ভাবেই মানুষ করতে হবে। কি রে ঐশী‌ মা পারবি না?

ঐশী চুপচাপ চোখ বুঁজে বসেছিল। সুজাতার ডাকে চোখ খুলে মুচকি হেসে বলল, “পারবো!"

খাবার পালা শেষ করে সুজাতাকে নিয়ে ওরা পৌঁছলেন বাসস্ট্যান্ডে। রজতাভ আর অভীক বাসের টিকিট কাটতে এগিয়ে যেতেই ঐশীর হাতদুটো জড়িয়ে ধরে সুজাতা বললেন,“ এই যে মেয়ে! অনেক তো ছোটালে এই বুড়িটাকে এবার কিন্তু তোমাদের ছুটতে হবে। কাল তোমাদের অপেক্ষায় থাকব বলে রাখলাম। আর এবার থেকে আর আন্টি নয়, মা বলে ডাকবে।”

- বেশ তাই হবে। আজ রাতটা কাটিয়ে কালকেই তোমার কাছে চলে আসব আমি। তবে একটা শর্ত আছে।

- কি শর্ত?

- তোমার হাতের স্পেশাল আলুর ভর্তার দম আর গরম গরম ছাতুর পুর দেওয়া পরোটা চাই কিন্তু। ঐ যে ছাতুর সাথে মিহি করে চিনি মিশিয়ে নাড়ুর মতো রান্না করে সেটার পুর পরোটার লেচিতে দিয়ে ভেজে উপরে অল্প বাটার মাখিয়ে দিতে যেভাবে সেরকমই চাই!

চমকে ওঠেন সুজাতা! এই পদ তো তিনি বিয়ের পর তথাগতর জন্য তৈরী করতেন। তথাগত চলে যাবার পর বহুকাল এই পদ রান্না করেন নি!অভীকেরও জানার কথা নয়! এই মেয়ে জানল কি করে? 

সুজাতা কিছু বলার আগেই রজতাভরা ফিরে আসায় চুপ করে যান। কিছুক্ষণ পর বাস আসতেই উঠে পড়েন সেটায়। জানলা দিয়ে দেখেন ঐশী তার দিকেই তাকিয়ে হাসছে। হাসিটা প্রতিদিনের মতো প্রাণখোলা নয়। বরং ব্যথাতুর, কষ্টে ভরা অথচ রহস্যময় এক হাসি।

সুজাতার বাস চলে যাবার পর ওরা বেরিয়ে পড়ল। রজতাভ বললেন, “এখন সবে সাড়ে তিনটে বাজে। এখন তোদের বাড়ি ফিরে কোনো কাজ নেই। শুনলাম আইনক্সে নাকি নতুন একটা রোম্যান্টিক অ্যাকশন মুভি এসেছে। ফেসবুকে ভালো রিভিউ দেখেছি সিনেমাটার। তোরা এক কাজ কর। দুজনে মিলে সিনেমাটা দেখে আয়। আর আমি ততক্ষণ রাতের খাবারের বাজারটা করে ফেলছি। সিনেমা দেখা শেষ হলে সোজা বাড়িতে চলে আসবে দুজনে। আমি আর যাবো না। বাজার সেরে সোজা ফিরে যাবো নিজের ঘরে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড় তোরা। এখন বেরোলে চারটের শো-টা ধরতে পারবি।‌ যা পালা!”

- কিন্তু বাপি...

- কোনো কিন্তু নয়! দুজন সদ্য বিবাহিত দম্পতির সেলিব্রেশনে কাবাব মে হাড্ডি হবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। তোরা যা! এঞ্জয় ইয়োরসেল্ফ! 

হেসে‌ দুজনের কাঁধে হাত রাখে রজতাভ। লজ্জায় লাল হয়ে ঐশী বলে ওঠে। 

- বাপি প্লিজ! রাস্তায় সবার সামনে...এভাবে! 

- থাক! আর লজ্জা পেতে হবে না। তার চেয়ে বরং বেরিয়ে পড়। সাবধানে যাস। আমি এলাম।

বলে দুজনকে বাসস্ট্যান্ডে রেখে বাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন রজতাভ। ছেলেমেয়ে দুটোর একান্ত মুহূর্তে আর কোনো বিঘ্ন ঘটুক তা তিনি চান না। ওরা দুজনে চুপ করে রজতাভর চলে যাওয়া দেখে। তারপর বেরিয়ে পড়ে কিছু একান্ত মুহূর্ত কাটানোর উদ্দেশ্যে।

*****
রাতে খাবার পালা শেষ করে শোয়ার জন্য অভীক ঐশীর ঘরে ঢুকতেই দেখতে পেল ঐশী বিছানায় বসে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছে। অভীক মৃদু হেসে ঘরের দরজা লাগিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ঐশীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর ঘাড়ে নাক ডোবাল। একটা বেশ মৃদু অথচ ভীষণ মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে ঐশীর শরীর থেকে। সেই গন্ধে ডুব দিতে দিতে ঘাড়ে আলতো করে একটা চুমু খেল অভীক। ঐশী বাধা দিল না। অভীক গলা বাড়িয়ে দেখল আজকের তোলা ছবি গুলো ঐশী ফেসবুকে পোষ্ট করেছে। টুকটাক রিঅ্যাকশন পড়ছে ছবিগুলোতে। ক্যাপশনে লেখা ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি। ঐশীর কাঁধে মাথা রেখে অভীক বলল,“ তাহলে শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়েই গেল বল?” ঐশী আলতো স্বরে বলল, “হুম!”

-‌ আমার তো এখনও বিশ্বাসই হচ্ছে না! মনে হচ্ছে যেন স্বপ্ন দেখছি। এতদিনের এত ঝগড়া, এত অপেক্ষা, এত মান-অভিমানে ভরা আমাদের সম্পর্ক অবশেষে পুর্ণতা পেল!

- হুম!

- ঐশী?

- হুম?

- তুই খুশি তো এই বিয়েটা নিয়ে? না মানে আমরা তাড়াতাড়ি বিয়েটা করে কোনো ভুল করলাম না তো?

- উহু! 

- তাহলে কথা বলছিস না কেন? থিয়েটারেরও তুই আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিলি। তুই যাই বলিস না কেন আমি ঠিক বুঝতে পেরেছিলাম। কি হয়েছে বলবি?

- কিছু না। আমি ভীষণ টায়ার্ড অভীক! কাল সারারাত একেই প্রায় জেগে কাটিয়েছি। তার উপর আজ সারাদিন ধকল গেছে। আমার ঘুম পাচ্ছে। তোর পাচ্ছে না?

- আজকের রাতেও তোর ঘুম পাচ্ছে?

- হুম! কেন আজ কি আছে?

- কিছু না! তুই শুয়ে পড়। 

বলে ঐশীকে ছেড়ে উঠতে যায় অভীক। ঐশী অভীকের হাত চেপে ধরে। তারপর ফিক করে হেসে বলে, “ ব্যাস? হয়ে গেল? এই তোর পুরুষত্বের জোর? কোথায় আমাকে প্রোভোক করবি, আমাকে বাধ্য করবি তা না হাল ছেড়ে দিচ্ছিস?”অভীক হেসে বলে,

- হাল ছাড়িনি। শুধু তোর ইচ্ছেটাকে সম্মান দিচ্ছি। শোন ফিজিকাল রিলেশনশিপে দুজনের সম্মতি, ইচ্ছে-অনিচ্ছেটা ম্যাটার করে। বিয়ের প্রথম রাতে জোর করে বেড়াল মারাটা‌ আমি সমর্থন করি না। ইভেন বিয়ের প্রথমরাতেই সেক্স করতেই হবে এই কনসেপ্টটাই জঘন্য লাগে আমার। গোটা জীবন পড়ে থাকে ভালোবাসার জন্য, আদরের জন্য কিন্তু না ঐ দিনই নিজের পৌরুষ প্রমাণ করতে হবে কেন? ফুলশয্যা, মধুনিশিযাপন এর মানে যদি সেক্স হয় তাহলে আমি বলব আমি ক্যাবলাই ঠিক আছি। আমার মতে বিয়ের প্রথম রাতে দুজন প্রেমের মানুষের মধ্যে ভালোবাসার, আদরের একান্ত গোপনীয় আর মধুর মুহূর্তটাকেই মধুনিশিযাপন বলা উচিত। এদিন সেক্স বাদেও অনেক কিছু করা যায়। যেমন রাতের নিস্তব্ধতায় এক অপরের হৃদস্পন্দন শুনে প্রেমের মানুষ হওয়া যায়। গল্প করা যায়।  রইল ফিজিকাল রিলেশনশিপ, ওটা কোনো পটি বা খিদে নয় যে চট করে পাবে। ওটারও নির্দিষ্ট সময় আছে। 

- একে অপরের সাথে মিলিত হবারও সময় লাগে? সেক্সুয়াল আর্জ, শরীরের খিদে ম্যাটার করে না?

- না করে না। তোর কাছে ফিজিকাল রিলেশনশিপ মানে সেক্স হতেই পারে। তবে আমার কাছে ওটার মানে হল লাভমেকিং। যেখানে নিজের তৃপ্তির বা পার্টনারকে পরিতৃপ্ত করার তারা থাকবে না। দুজন মানুষ ইমোশনালই, প্যাশনেটলি পরস্পরকে ভালোবাসবে, আদরে আদরে ভরে তুলবে,পরস্পরকে নতুন ভাবে আবিস্কার করবে। পরিতৃপ্তির চরমে পৌঁছেও ভালোবাসায় পুর্ণ করে তুলবে পরস্পরকে। এতদিন লোকলজ্জা, পরিবারের জন্য আলাদা থাকায় যা আদর বাকি ছিল তা মনে প্রাণে উসুল করে নেবে, একে অপরকে চিনেও যতটুকু অজানা ছিল তা জেনে নেবে। যা আদর, যা খুনসুটি এতদিন করতে পারেনি, বিরহে জ্বলেছে তা মিটিয়ে নেবে সুদে আসলে। ভালোবাসার লেনদেন হবে একে অপরের সম্মতিতে। এটাকে লাভমেকিং বলে। এসব না থাকলে ওটা পাতি সেক্স হয়ে যায়।

ঐশী হা করে তাকায় অভীকের দিকে। অভীক ঐশীর গালে আলতো করে আঙুল বুলিয়ে বলে, “আমি চাই না আমাদের মধ্যে ফিজিকাল রিলেশনশিপে মানে পাতি সেক্স হোক। তোকে যখন পেতে চাই পুরোটা পেতে চাই। শরীর দিয়েই নয় মন দিয়েও। তার জন্য যদি অপেক্ষা করতে হয় করবো। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখ যেদিন এই লাভমেকিংয়ের ইচ্ছেটা তোর মনেও জাগবে সেদিন আমাকে তোর কাছে আসতে হবে না। তুই সেদিন আসবি আমার কাছে। সেদিন কিন্তু আমি একমুহূর্তও অপেক্ষা করবো না, কোনো বাধা মানবো না।‌ সেদিন হবে আমাদের প্রকৃত ফুলশয্যা।” 

বলে ঐশীর কপালে একটা চুমু খেয়ে শুয়ে পড়ে অভীক। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে ঐশী অভীকের দিকে তাকায়। তারপর ল্যাপটপ বন্ধ করে, আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ খোলে অভীক। পাশ ফিরে নাইটল্যাম্পের আলোয় দেখে ঐশী ঘুমোচ্ছে। সিলিং ফ্যানের আলতো হাওয়ায় গালের পাশের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে সামনের দিকে চলে এসেছে। অভীক কিছুক্ষণ ঐশীর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর উঠে টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। 

হলঘরের আলো নেভানো। কোনোমতে পায়ে পায়ে বারান্দায় এসে বসে সিগারেটের প্যাকেট একটা সিগারেট বের করে ধরায়। তারপর একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। কিছুক্ষণ পর সিগারেটে শেষটান দিয়ে সিগারেটটা বারান্দা দিয়ে বাইরে ফেলে ঐশীর ঘরে ঢুকে ঐশীর ব্যাগ থেকে বের করে আনে ডাইরিটা। বাড়িতে ফিরে ফ্রেশ হয়ে যখন ঐশী ওর জামাকাপড় গুছোচ্ছিল তখনই ডাইরিটা আলমারি থেকে পড়ে যায়। অভীক তুলতে যাবার আগেই ঐশী ছোঁ মেরে ডাইরিটা নিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়। আচমকা ঐশীর এই আচরণে অবাক হয়ে অভীক ওর দিকে তাকালে ঐশী পরিস্থিতি সামাল দিতে অভীককে তাড়া দেয় ওর লাগেজ গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। অভীক বেশী কথা বাড়ায় নি। সরাসরি বলেছিল ওর লাগেজ গুছোনোই আছে। মেস থেকে বেরোবার আগে মা গুছিয়ে দিয়ে মেসের ম্যানেজারের কাছে জমা রেখে এসেছে। কাল সকালে বেরিয়ে ওখান থেকে লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে পড়বে ওরা।

ডাইরিটা হাতে নিয়ে স্টাডিরুমে চলে আসে অভীক। তারপর স্টাডিরুমের দরজা আটকে আলো জ্বালিয়ে ডাইরিটা পড়তে বসে।

বহুদিন ধরে অযত্নে থাকার জন্য পাতাগুলো হলদে হয়ে এসেছে ঠিকই। তাও লেখাগুলো পড়া যায়। স্টাডিরুমের চৌকিতে বসে ডাইরিটা পড়তে শুরু করে অভীক।

******
প্রচণ্ড গরমে ঘুম ভেঙে গেল সুজাতার। চোখ মেলে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বুঝল কারেন্ট নেই কারন সারারাত প্রচণ্ড জোরে চলা সিলিংফ্যানটা এখন স্তব্ধ হয়ে নিশ্চল অবস্থায় ছাদের সাথে ঝুলে আছে। সুজাতা ঘুম ঘুম চোখে ডানপাশে তাকাতেই দেখতে পেল তথাগতকে। ওর দিকে পিঠ করে আদুর গায়ে শুয়ে আছে তথাগত। গরমের ফলে পেশীবহুল পিঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। সেই ঘামে ভিজে যাচ্ছে বেডশিট, গায়ে দেওয়ার চাদর।  ওর অবস্থাও তথৈবচ। পরনে একটা সুতো পর্যন্ত নেই। সমগ্র শরীর ঘামে সিক্ত। সেই ঘামে গায়ে চাপা দেওয়ার চাদর, এমনকি বেডশিট পর্যন্ত ভিজে চপচপে হয়ে আছে। চেষ্টা করেও বিছানায় উঠে বসতে না পেরে কিছুক্ষণ চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে রইল সুজাতা। মাথাটা ভীষণ বাজে রকম ভাবে ধরে আছে ওর। কাল রাতে বেশী ওয়াইন খাওয়াটা ঠিক হয় নি। ঊর্মি মানা করেছিল বটে কিন্তু ওরা শুনলে তো! কিছুক্ষণ চোখ বুঁজে শুয়ে থাকার পর কারেন্ট এলে ধীরে ধীরে উঠে বসার সময় তলপেটে একটা হাল্কা যন্ত্রণা টের পেলেও সেটাকে পাত্তা না দিয়ে বিছানা ছেড়ে কোনোমতে বাথরুমে ঢোকে সুজাতা। দীর্ঘ দুবছর তথাগতর সাথে সংসার করায় এই যন্ত্রণা ওর গা সওয়া হয়ে গেছে। মিলিত হবার সময় তথাগত আর তথাগত থাকে না। চুড়ান্ত প্যাশনেট অথচ ভীষণ জান্তব পশুতে পরিণত হয়। তখন ওর কাছে আদর করাটা নয় সুজাতাকে জয় করাটা মুল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
 
প্রথম প্রথম তথাগতর এই বন্য আদর ভালো লাগত সুজাতার। মিলনের সময় ও তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতো তথাগতর এই প্রবল পৌরুষোচিত ডমিনেটিং যৌনতা। বিনিময় ভরে দিত তথাগতকে প্রবল আদর আর সুখের আতিশয্যে। কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যাপারটা ক্রমশ একঘেয়ে হতে লাগল। রোজ রাতে শরীরের খিদে তথাগতর এই বন্য আদর ক্রমশ যৌন অত্যাচার মনে হতে লাগল সুজাতার। প্রবল গতিতে প্রবেশ করে যোনী প্রায় ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া, চুমু খেতে খেতে ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করে দেওয়া, সমগ্র শরীরে বিশেষ করে বুকে লাভবাইটের জায়গায় দাঁতের দাগ বসিয়ে দেওয়া, এভাবে বন্য আদরে ক্রমশ ক্ষতবিক্ষত হতে লাগল সুজাতা। মিলনের সময় তথাগত যেন রক্তপাতে আনন্দ পায়। মিলনে জান্তব সুখটাই যেন ওর কাছে প্রধান। যেন সুজাতাকে জয় করে দাবিয়ে রেখে ওর গর্ভে নিজের বীজ বপন করাটাই ওর লক্ষ্য। সেখানে সুজাতার আদরের, ভালোবাসার কোনো জায়গা নেই। কেবল মুখ বুঁজে তথাগতর এই বন্য আদর উপভোগ‌ করা ছাড়া আর কোনো ভুমিকাই নেই।

অথচ পরদিন সকালে তথাগতর ব্যবহার সবচেয়ে বেশী অবাক করতো ওকে। ভীষণ অমায়িকভাবে হাত ধরে আগের দিনের পাশবিকতার জন্য যখন ক্ষমা চাইত তখন সুজাতার মনে হতো যেন সে অন্য মানুষের সাথে কথা বলছে। কালরাতের মানুষটার সাথে সকালে মানুষটার যেন আকাশপাতাল তফাৎ। আগের রাতের‌ সেই মানুষটার সাথে এই মানুষটার কোনো মিলই নেই!

প্রথম প্রথম ভাবতো এসব হয়তো ওর মনের ভুল কিন্তু যতদিন যেতে লাগল ততই এই ভুল ক্রমশ ভাঙতে লাগল তার। তারপর একদিন মিলনের সময় হিতাহিত জ্ঞান শুন্য হয়ে যখন তথাগত ওর গলাটা টিপে ধরল তখন ওর ভুল পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে রাতের কথা ওর আজও মনে আছে। প্রতিরোধ করতে করতে একসময় ভোরের দিকে ক্রমশ অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল ও। তথাগত সেটা খেয়াল না করেই প্রায় সারারাত ধরে উন্মত্ত পশুর মতো অবিরাম রমণ করে যাচ্ছিল। শেষে খেয়াল হওয়ায় সুজাতাকে ছেড়ে দিয়ে ওর জ্ঞান ফেরাতে উদ্যত হয়।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে তোয়ালে জড়িয়ে ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে সুজাতা। কালরাতের তথাগতর আদরের মাত্রাটা বেশীই হয়ে গেছে। বুকে, পেটে, হাতে অজস্র কামড়ের দাগ সেটারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। কেউ টের পাবার আগে সেগুলোকে মেকাপ দিয়ে লুকিয়ে নিতে হবে। বুক-পেটের ক্ষত না হয় পোশাক দিয়ে ঢেকে নেবে। হাতের ক্ষতটা ঢাকতে মেকাপ লাগবেই। ভাবতে ভাবতে মেকাপের সেটটা ব্যাগ থেকে বের করে সুজাতা। তারপর আলতো করে রং বুলোতে থাকে আগের রাতে হওয়া ক্ষতগুলোর উপরে।

(চলবে...)

বুধবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ অষ্টম পর্ব



সুজাতা চুপ করে বসে বসে বনের পাখিদের ডাক শুনতে থাকে। তথাগত বলে চলে,

- বন কেটে লোকালয় বাড়ানো, বারন থাকা সত্ত্বেও নিরীহ পশুগুলোকে শিকার করা। ইচ্ছে করে বনের জমি দখল করে চাষবাস করা। এরপরেও খবরে বলবে বনের পশু লোকালয় আসছে। মুর্খগুলো বোঝে না যে বনের পশুরা মোটেও লোকালয়ে আসছে না। ওরাই বনের পশুদের খাবারের ভান্ডার নষ্ট করে ওদের এলাকায় থাকছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন বনের পশুরা তিলে তিলে শেষ হয়ে যাবে। মিউজিয়ামের একটা স্টাফড পুতুল হিসেবে থেকে যাবে ওদের দেহগুলো। লোকে জানবে ওরা বিলুপ্ত। 

বলার পর থামে তথাগত। তারপর বলে, “সেই তখন থেকে তো আমিই বলে যাচ্ছি। তুমি কিছু বলছো না কেন?” সুজাতা জলে পা ডুবিয়ে চোখ বুঁজে বসে ছিল। তথাগতর কথায় চোখ খোলে সে। তারপর বলে, “ কারন তুমিই তো বলেছ বনের শব্দ শোনার সময় কথা বলতে নেই। চুপ করে শুনে যেতে‌ হয়। তাই করছি। চোখ বুঁজে জলের কলকল শব্দের সাথে সামনের পাহাড়ের কথা শুনছি।”

- বটে? তা কি বলছে পাহাড়টা?

- বলছে, আমার বরটি বেশ! আমার চেয়ে বেশী ওকে ভালোবাসে। তবে বড্ড বকে যাতে আমাদের দুই সতীনের মধ্যে কথা না হয়।

হেসে ফেলে তথাগত, “সতীন! ভালো বলেছো তো! পাহাড়, জঙ্গল তোমার সতীন!"

- সতীনই তো! সারাদিন তো আমার কোনো খবরই নাও না। রাতটুকু আর এই ভোরের সময় বাদ দিলে তো সারাদিন ওর কাছেই থাকো। আমার কাছে থাকলেও সবসময় জঙ্গলের কথা, বন্যপ্রাণীর কথা, ওকে সতীন বলবো না তো কাকে বলব? তবে ভারী মিষ্টি সতীন। সারাদিন ভালোবাসার পর রাতটুকু আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়। যাতে ভালোবাসার ভাগ পেতে পারি। তবে ঐটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট জানো? কারন আমি জানি বন জঙ্গল তোমার কত কাছের। এখানকার জীবজন্তু, এমনকি গাছের পাতাটুকুও তোমার কত আপন। এর জন্য বিন্দুমাত্র রাগ বা হিংসে আমার হয় না, বরং গর্ব হয়। তাই তো রাত শেষে তোমাকে ফিরিয়ে দিই ওর কাছে।

তথাগত হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে সুজাতাকে। তারপর বলে, “এই জন্যই তো এতটা ভালোবাসি তোমাকে। কারন তুমি আমাকে যতটা বোঝো কেউ বোঝে না। জানো সু যখন দেখি বনের কোনো গাছ বিনা অনুমতিতে কেউ কেটে ফেলেছে, বা সামান্য দাঁত, চামড়ার লোভে নিরীহ পশুগুলোকে ওরকম নৃশংসভাবে মেরে ফেলতে দেখি ভীষণ কষ্ট হয়। একটা বুনো রাগ চেপে বসে মাথায়। কি দোষ ওদের বলো তো? বড়ো দাঁত, সুন্দর চামড়ার অধিকারী হওয়াটাই কি অপরাধ?আমার ইচ্ছে করে যারা এসব করছে তাদের উচিত শাস্তি দিই! কিন্তু পারি না। ধরা পড়বার আগেই ওরা বেড়িয়ে যায় পাকাল মাছের মতো। দিন শেষে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই তখন নিজেকে পরাজিত সৈনিক‌ মনে হয়। ইচ্ছে করে নিজেকে শেষ করে দিই। কিন্তু পারিনা কারন আমি চলে গেলে তোমার কি হবে ভেবে। তুমি বোঝো সেটা। তাই নিজে এগিয়ে এসে বাঁচাও আমায়। আশ্রয় দাও এই ভেঙে পড়া আমিকে।”

সুজাতা‌ চুপ করে বসে আছে দেখে তথাগত বোঝে এই সময় এই কথোপকথন সুজাতা পছন্দ করছে না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর তথাগত প্রসঙ্গ বদলে বলে,

- সু?

- হুম!

- আচ্ছা এতদিন তো আমার সাথে না জানি কত বনে ঘুরেছ। তা তোমার মতে বছরের কোন সময়টা বনের জন্য সেরা? মানে দৃষ্টিনন্দন? মানে সেই সময়টা বনে থাকলে মনে হয় থেকেই যাই এখানে সারা জীবন। বছরের কোন সময় এরকম মনে হয়?

উত্তরটা নিতে একটু সময় নেয় সুজাতা। বিগত পাঁচ বছরে তথাগতর সাথে ঘুরতে ঘুরতে অভ্যেস হয়ে গেছে তার। বা বলা ভালো বনের নেশা ধরিয়ে দিয়েছে তথাগত। নিজের অজান্তে কখন যে সে নিজেও বনকে ভালোবাসতে শুরু করেছে সে নিজেও জানতে পারে নি।

চোখ বুঁজে বনের শব্দ শুনতে শুনতে তথাগতর কাঁধে মাথা রেখে সুজাতা বলে, “ বছরের একটা সময় বললে বলা মুশকিল। সারা বছরে যদি বল তাহলে বলবো চারটে সময়ের কথা যখন বনের কাছে এলে মনে হয় এখানেই থেকে যাই। আর সভ্য জগতে ফিরে কাজ নেই।”

- তাই নাকি? তা সময়গুলো কখন কখন শুনি?

- গ্রীষ্মের দুপুর শেষে বা ভোরের দিকে নদীর পাড়ে। পাতা ঝড়ার মরশুমের বা সকালবেলা, শিশির পড়ার সময়ের ভোর আর ...

- আর?

- এই বসন্তকালে নতুন পাতা গজানোর সময়টা। এই সময় বন বা প্রকৃতি নিজেকে যেমন সাজায় তেমনই একটা মিঠে জংলা গন্ধে ভরে ওঠে চারদিক। এই গন্ধটা খুব বিকট উগ্রও নয়। আবার হাল্কাও নয়। বরং একটা ঝিম ধরানো নেশাতুর গন্ধ। তবে এতে মহুয়ার মৌতাত নেই। বরং একটা বুকভরা শান্তির আশ্বাস আছে।


তথাগত অবাক হয়ে যায়। এভাবে তো সে কোনোদিনও ভেবে দেখেনি! রোজ বনের মধ্যে প্রতিটা মুহূর্ত কাটালেও, বনের শোভা সে উপভোগ করলেও এভাবে ঋতুকালীন সৌন্দর্য সে উপভোগ করেনি। সে অবাক হয়ে তাকায় সুজাতার দিকে। সুজাতা একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,“গন্ধটা টের পাচ্ছ?” 

একটা মিষ্টি অথচ জংলি গন্ধ তথাগতর নাকে ভেসে আসছিল, সে মাথা নাড়তেই সুজাতা বলে,“এই সেই বনের গন্ধ। আমরা যারা বনকে ভালোবাসি তারাই এই গন্ধটা পাই। বাইরের লোকেরা, যাদের উপর তোমার এত রাগ, যারা বনকে ভালোবাসে না, তারা কোনোদিনও এ গন্ধটা পাবে না।”

তথাগত চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পর সুজাতা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “চলো ফেরা যাক! ছটা বাজে।” তথাগত উঠে দাঁড়িয়ে একটা আড়মোড়া ভেঙে বলে, “চলো।" 
দুজনে মিলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ব্রিজে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাটতে থাকে তথাগতর কোয়ার্টারের দিকে।

*****

সূর্যের নরম আলো চোখের উপর পড়তেই সম্বিত ফেরে সুজাতার। চোখ মেলে তাকান তিনি। দেখেন সমগ্র নদী, নদীর দুই পার ভেসে যাচ্ছে সুর্যের আলোয়। প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা দেখে মৃদু হাসেন সুজাতা। তারপর ঝুকে দুহাতের আঁজলায় জল নিয়ে মুখের কাছে নিয়ে এনে বলেন,“ আমরা ভালো আছি তথা। সামনেই তোমার ছেলের বিয়ে। এতদিন আমি একজনের মা ছিলাম। এরপর থেকে দুজনের দায়িত্ব নিতে হবে। সব ঠিকঠাক চলছে। তোমাকে খুব মিস করছি। ইচ্ছে করছে তোমার কাছে ছুটে চলে যেতে। কিন্তু এদিকটা না সামলালে ছুটি নেই। এদিকটা গুছিয়ে নিই তারপর তোমার কাছে আসব। ততক্ষণ একটু অপেক্ষা করো লক্ষ্মীটি! ভালো থেকো।” বলে উঠে দাঁড়িয়ে সুর্যের দিকে তাকিয়ে তর্পণ করেন তিনি। তারপর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে যান উপরের দিকে।


*****

স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ফোনটা বেজে উঠতেই সেটা হাতে নিয়ে কলারের নাম দেখে মুচকি হাসল ঐশী। তারপর হেডফোন কানে লাগিয়ে কলটা রিসিভ করে চুপ করে বসল ড্রেসিং টেবিলের সামনে। ফোনের ওপাশে থাকা অভীক অধৈর্য গলায় বলল, “সেই কখন থেকে ফোন করে যাচ্ছি! তুলছিস না কেন? কোথায় আছিস তুই? কোন রাজকার্য করছিলি?” ঐশী জবাব দিল না। সে একমনে আয়নার সামনে বসে চিরুনি ‌দিয়ে চুল আঁচড়াতে ‌লাগল। আর শুনতে লাগল অভীকের বকবকম। সাধারণত বাস্তবে এর উল্টোটাই হামেশা দেখা যায় যেখানে প্রেমিকা কলকল করে কথা বলতে থাকে আর প্রেমিক একমনে কথা শোনে। ফোনালাপ রাতে হলে ঘুমিয়েও পড়ে। কিন্তু ঐশীদের ক্ষেত্রে অভীকই বেশী বকে ঐশী চুপ করে শোনে। আর মাঝে মাঝে অ্যাটেনডেন্সের জন্য ছোটোখাটো ‘ হুম!’ বলে কাজ চালিয়ে নেয়। তবে মাঝে মাঝে দুপক্ষের মধ্যে যে তর্কযুদ্ধ হয় না তা নয়। তবে তা সীমিত সময়ের জন্য। একটা সময়ের পরে দুজনেই কথা হারিয়ে চুপ করে বসে থাকে।  তবে আজ ঐশী আর রিস্ক নিল না। চুপ করে বসে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে শুনতে লাগল অভীকের বকবকম। আগে শুধু রাতে হোয়াটসঅ্যাপেই কথা চালাচালি, সারাদিনের রোজনামচা শোনানোতেই সীমাবদ্ধ ছিল দুজনের বার্তালাপ। ইদানীং সেটা বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে অভীকের সাহসও। আগে কালেভদ্রে একটা আধটা ফোন করতো। আজকাল ফোনই ছাড়তে চায় না। বিয়ের যতদিন এগিয়ে আসছে ততই ক্রমশ ফাজিল আর নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে। ঐশীর কোনো বাধা, কোনো বারন শুনছে না। এতে অবশ্য‌ ওর একার দোষ নেই, ঐশী নিজেও ওকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে। তাই ঐশী আজ অভীকের আর কোনো কথার জবাব দিচ্ছে না। কারন কথা বললেই হতভাগাটা বকবক শুরু করে দেবে। তারচেয়ে চুপ করে থাকাই ভালো। অন্যদিন ‌হলে সারারাত কথার চাষ হতো দুজনের মধ্যে। কিন্তু আজকে ঐশী আর চাইছে না কথা বাড়ুক। আজকের রাতটা ওর কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আজকের রাতটা সে একা নিজের সাথে কাটাতে চায়। নিজের মতো করে কাটাতে চায়। সে চায় না আজকের রাতটা কোনোভাবে নষ্ট হোক। কেউ তাকে বিরক্ত করুক। এমনিতেও ওর কাছে আজকের রাতটুকুই আছে। এমনিতেও কালকের পর থেকে ওর জীবন পুরোপুরি বদলে যাবে। তাই সে চুপ করে অভীকের কথা শুনছে আর মাঝে মাঝে‌ “হুম! হ্যা” বলে দায়সারা ভাবে উত্তর দিচ্ছে। সে জানে কোনো জবাব না পেলে অভীক একসময় ক্লান্ত হয়ে থেমে ফোন কেটে দেবে। 


হলোও তাই! টানা দশমিনিট বকবক করার পর একসময় ক্লান্ত হয়ে অভীক বলল,“ আচ্ছা এখন রাখছি। কাল তাহলে দেখা হচ্ছে কেমন?” ঐশী ফোনটা কেটে সুইচড অফ করে টেবিলে রেখে আয়নার দিকে তাকালো। তারপর উঠে গিয়ে ঘরের দরজাটা আটকে দিল। তারপর সন্তর্পণে আলমারির লকার খুলে বের করে আনল একটা ডাইরি। এই ডাইরিটা সে ক’দিন আগে বাপির স্টাডিরুমে একটা বই খুঁজতে গিয়ে পেয়েছিল। বেশ মোটা একটা ডাইরি। চামড়া দিয়ে বাঁধানো, সোনার জল করা একটা ডাইরি। পাতাগুলো বেশ মোটা আর দামী কাগজের হলেও যত্নের অভাবে হলদে হয়ে গেছে। তবে ভেতরের লেখা পড়া যায়। ডাইরিটা পাবার পর প্রথমে ঐশী বুঝতে পারে নি এত ভালো মানের ডাইরিটা এত অযত্নে এখানে পড়ে আছে কেন। পরে বুঝেছিল ডাইরিটা আসলে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল সকলের চোখের আড়াল থেকে। ডাইরিটা ছিল বইয়ের তাকের একদম পেছনে। ডাইরিটা হাতে পেয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকার পর খুলে প্রথমপাতায় চোখ বোলাতেই যে অনুভূতিটা ঐশীর হয়েছিল সেটাকে মুখে বলে প্রকাশ করা অসম্ভব। কোনো হারানিধি পাওয়া অথবা কোনো প্রাণাধিক প্রিয় আত্মীয়ের সাথে হঠাৎ অনেকবছর পর যোগাযোগ হলে যে অনুভূতিটা হয় ঠিক‌ সেই রকম মনে হয়েছিল ঐশীর। ডাইরিটা লুকিয়ে নিজের ঘরে আলমারিতে রেখে দিয়েছিল সে। তারপর কাজের চাপে আর পড়ে উঠতে পারেনি। আজ সুযোগ পেয়েছে অবশেষে। ডাইরিটা নিয়ে পড়ার‌ টেবিলে রেখে ঘরের আলো নিভিয়ে শুধু রিডিং ল্যাম্পটা জ্বালালো সে। তারপর চেয়ারে বসে ডাইরির পাতা উল্টোতেই প্রথমপাতায় চোখ পড়ল তার। সেটায় হাত বুলোতে বুলোতে চোখটা একটু আদ্র হল ঐশীর। ডাইরির প্রথমপাতায় মুক্তোর মতো ঝড়ঝড়ে বাংলা অক্ষরে লেখা ‘ ঊর্মিমালা মজুমদার’। প্রথমপাতা উল্টে ডাইরিটা পড়তে শুরু করল সে।

ডাইরিটা যখন পড়া শেষ হল তখন রাত গড়িয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ডাইরিটা বন্ধ করে টেবিলে রেখে বাথরুমে চোখে মুখে জল দিতে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল ঐশী। একরাতের মধ্যে আমুল পরিবর্তন ঘটে গেছে মেয়েটার মধ্যে। চোখের কোল দুটো  কেঁদেকেটে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। গালের উপর অশ্রুর ধারা কাজল ধেবড়ে দিয়ে দাগ বসিয়ে দিয়েছে। রীতিমতো বিধঃস্থ লাগছে তাকে। বেসিনের কল খুলে চোখে মুখে জলের ঝাপটা মেরে নিজেকে প্রকৃতিস্থ করল ঐশী। তারপর তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে আয়নার দিকে তাকাল। এবার সব ঠিক থাকলেও একটা জিনিস বদলালো না। ওর চোখ দুটো একইরকম থেকে গেছে। রক্তের মতো লাল,হিংস্র জীঘাংসায় ভরা, ক্রুর স্বাপদের মতো চোখ। না ধরা পড়ে গেলে চলবে না। চোখের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে। তারজন্য ঘুম চাই। লম্বা শান্তির ঘুম। যদিও ডাইরির লেখাটা পড়ার পর আর কোনোদিনও শান্তির ঘুম আসবে কিনা জানে না সে। তাও চেষ্টা করে দেখা যাক। ভেবে বাথরুম থেকে বেরিয়ে বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর ঘুম নেমে এল তার চোখে।

ঐশীর ঘুম যখন ভাঙল তখন সকাল আটটা বাজে। বিছানায় উঠে বসে চারদিকে একবার তাকাল সে। সব আগের মতোই আছে, যেন মনে হচ্ছে কাল রাতের ঐ ডাইরিটা, ঐ ডাইরি ভেতরে লেখা কথাগুলো নিছকই এক দুঃস্বপ্ন ছিল। যেন ঐ ডাইরিটা নিছকই একটা কল্পনা। কিন্তু পড়ার টেবিলে ডাইরিটা দেখে ভুল ভাঙল তার। তারমানে ওটা দুঃস্বপ্ন ছিল না! দুহাতে মাথা চেপে বসে রইল ঐশী তারপর উঠে টেবিল থেকে ডাইরিটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে যাবে এমন সময় দরজায় নক করার শব্দ শুনে থমকে গেল। তারপর বালিশের তলায় কোনোমতে ডাইরিটা আড়াল করে দরজা খুলল।

দরজার ওপার থেকে রজতাভ বললেন, “ অভীক ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করছে কটার দিকে যাবি? বোধহয় তোর ফোনটা সুইচড অফ পেয়ে আমাকে কল করেছিল। ছেলের তো দেখি আর তর সইছে না! কটার দিকে বেরোবি?”

- এগারোটার দিকে বেরোবো। দশটার দিকে বলে দাও। 

- সেকি রে! এত দেরী করে অপেক্ষা করাবি ছেলেটাকে? 

- দেরীতেই তো মজা বাপি! যত দেরী করবে তত বেশী বিরহে জ্বলবে। তাছাড়া প্রায় পাঁচটা বছর অপেক্ষা করেছে। তিনঘন্টা পারবে না? তাছাড়া তোমার জামাই যা লেট লতিফ? দশটা বললে এগারোটার দিকেই ঢুকবে। 

- তাহলে দশটাই বলছি।

ঐশী মাথা নেড়ে দরজা লাগিয়ে দেয়।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করল ঐশী। এমনিতেও সারাবছর ওর আলমারিতে শার্ট আর জিন্সে ভর্তি থাকলেও গত কয়েকমাসে তাদের জায়গা দখল করেছে রকমারি শাড়িরা। রজতাভ, সুজাতা দুজনে মিলে এই কয়েকমাসে প্রায় বাজার ঘুরে পাহাড় প্রমাণ শাড়ি কিনেছেন। জামদানী,টাঙাইল, কটন, সিল্ক কী নেই! তবে ঐশী একটাও শাড়ির ভাজ ভাঙেনি। এসব সে কোনোদিন পরেনি, আজও পড়বে না। বরং কাল দুপুরে বাপি মায়ের যে শাড়িটা দিয়েছিল সেটাই পরবে সে। তার জন্য রীতিমতো ইউটিউবে ভিডিও দেখেছে। শাড়িটা বের করে বিছানায় রেখে ফোনটা সুইচ অন করল সে। অন করতেই টুং টুং করে নোটিফিকেশন আসতেই ফোনটাকে সাইলেন্ট করে শাড়িটা পরতে শুরু করল সে। শাড়িটা তেমন আহামরি না হলেও একটা আলাদা মাধুর্য আছে। একটা আরাম আছে। ঐশীর মনে হল যেন কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। একটা মিষ্টি গন্ধ সমগ্র শাড়িজুড়ে। এই গন্ধটা গতকাল ডাইরিতেও পেয়েছে সে। শাড়িটা পরে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলে বসতেই অভীকের কল এল।

 ঐশী কালকের মতোই হেডফোন লাগিয়ে কলটা রিসিভ করে শুনতে লাগল অভীকের বকবকম। কেন ফোনটা সুইচড অফ রেখেছে? কেন কথা বলছে না? কটার দিকে রেজিস্ট্রি অফিসে আসবে? কোন শাড়িটা পরছে? কটার দিকে পৌঁছতে হবে? অভীকের এরকম হাজার ঘ্যানঘ্যানানি অন্যদিনের মতো অসহ্য লাগলেও আজ ঐশী উত্তর দিল না। সে চুপচাপ সাজাতে লাগল নিজেকে। সেদিন অভীকের মা ওকে যে কসমেটিক্সগুলো কিনে দিয়েছিলেন সেগুলোর একটাও ব্যবহার করেনি সে। এমনকি পুজোর দিনেও না। কসমেটিক্সগুলো তুলে রেখেছিল ওর জীবনের বিশেষ দিনের জন্য, আজকের জন্য। আজ ঐশী আর অভীকের বিয়ে। রজতাভরা ঠিক করেছিলেন অভীক কাজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হলেই ধুমধাম করে বিয়ে দেবেন। পরে ঠিক করেছেন আপাতত রেজিষ্ট্রি ম্যারেজটা করিয়ে পরে নাহয় একটা ছোটোখাটো গেটটুগেদারের আয়োজন করা হবে। সুজাতাকে বলতেই তিনিও রাজি হয়েছেন। ড্রয়ার থেকে লিপস্টিক,মাস্কারা, আইলাইনার, ফাউন্ডেশন, প্রাইমার, একে একে সব প্রসাধনী বের করে নিজেকে সাজাতে সাজাতে ঐশী বলল,“ দশটার মধ্যে পৌঁছে যাস‌ আন্টিকে নিয়ে। বাকি কথা ওখানেই বলব।” বলে ফোনটা কেটে চোখে কাজল পরতে লাগল ঐশী।


সাড়ে নটার দিকে তৈরী হয়ে ড্রইংরুমে বসে ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছিলেন রজতাভ। ব্যাপার কি? অন্যদিন তো এত দেরী হয় না ঐশীর। তাহলে আজ কেন? দু একবার দরজায় নক করেও সাড়া পাননি তিনি। এদিকে ঘড়ির কাঁটা ক্রমশ দশটার দিকে এগিয়ে চলেছে। সোফা থেকে উঠে চঞ্চল হয়ে রীতিমতো পায়চারি করতে লাগলেন রজতাভ। এইভাবে প্রায় পনেরোবার পায়চারি করা মাত্র ঐশীর ঘরের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন রজতাভ। আর ঘুরে দাঁড়ানো মাত্র থমকে গেলেন। এ তিনি কাকে দেখছেন? কোথায় তার সেই দামাল দস্যি মেয়ে ঐশী? যে কথায় কথায় বাপিকে জড়িয়ে ধরত! যে চাপে পড়ে গেলে কাঁদো কাঁদো স্বরে ‘ বাপি!’ বলে ডাকত! এ তো সেই ঐশী নয়! এক মুহূর্তের জন্য রজতাভর মনে হল তার সামনে আর কেউ নয়, ঊর্মিই দাঁড়িয়ে। সেই কাজলপরা হরিণের মতো চোখ, সেই ভঙ্গিমায় শাড়ির কুচি, আচল সামলানো, সেই এক চাহনি। ঐশীর ছেলেবেলায় অনেকে রজতাভকে বলেছিল ঐশীকে নাকি হুবহু ঊর্মির মতো দেখতে। রজতাভ বিশ্বাস করতেন না। হেসে কথাগুলো উড়িয়ে দিয়ে বলতেন 'ধ্যাত! ওসব কিছু হয় না। হ্যা নাকটা আর চোখটা ঊর্মির পেলেও বাকি আর কোনো মিল নেই!' কিন্তু আজ মনে হচ্ছে তিনি এত বছরেও নিজের মেয়েকে ঠিক চিনে উঠতেই পারেন নি। এতগুলো বছর মেয়েকে দেখে এসেছেন কিন্তু এতটা মিল কোনোদিনও লক্ষ্য করেন নি। 

ঐশীর ডাকে সম্বিত ফিরল রজতাভর। চমক ভেঙে দেখলেন ঊর্মি নয় তার মেয়ে ঐশীই দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। তাকে শাড়ির কুচিটা ধরে দিতে বলছে। রজতাভ অশ্রুসজল চোখে এগিয়ে গেলেন কুচিটা ধরতে। 

রেজিস্ট্রি অফিসে যখন ওরা পৌঁছল তখন পৌনে এগারোটা বাজে। যথারীতি ঐশীর আশঙ্কাকে সঠিক প্রমাণিত করে অভীক তখনও পৌঁছয়নি। রজতাভ ভ্রু কুঁচকে ঐশীর দিকে তাকাতেই ঐশী ফিক করে হেসে ফেলল। তারপর এগিয়ে গিয়ে বসল কাছের একটা বেঞ্চে। রজতাভ পায়ে পায়ে এগিয়ে মেয়ের পাশে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ পর একটা বাইক নিয়ে অভীকের সাথে সুজাতা এসে পৌঁছলেন অফিসের সামনে। ওদের দেখে ঐশীরা উঠে দাঁড়াল। সুজাতা এগিয়ে এসে প্রথমেই ক্ষমা চাইলেন দেরী করার জন্য। জানালেন তারা ঠিক সময় বেরোলেও মাঝপথে অভীকের কিছু জিনিস ছাড়া পড়ে যাওয়ায় আবার ফিরে আসতে হয়। কাজেই দেরী করেই বেরোতে বাধ্য হন তারা। তারপর সকলে মিলে ঢুকলেন অফিসে। সইসাবুদ, মাল্যদান,সিঁদুরদান, আংটি বিনিময়ের পালা সেরে যখন ওরা অফিস থেকে বেরোচ্ছেন তখন বেলা দুটো বাজে। ঠিক হল কাছেরই একটা হোটেলে দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়ে সুজাতা ফিরে যাবেন তাঁর বাড়ি। আর অভীকদের নিয়ে রজতাভ ফিরবেন নিজের ফ্ল্যাটে। আজ রাতটা সেখানে কাটিয়ে কাল ওরা রওনা দেবে জলঢাকায়। আপাতত রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হলেও পরে ধুমধাম করে ওদের রিসেপশনের আয়োজন করা হবে। 

(চলবে)

বৃহস্পতিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ সপ্তম পর্ব



সকালে সুজাতার ঘুম ভাঙল ঐশীর চিৎকারে। চারদিকের অচেনা পরিবেশের দিকে একবার তাকিয়ে ধরমড়িয়ে উঠে বসলেন তিনি। কিছুক্ষণ সময় লাগল তার ধাতস্থ হতে। তারপর ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। ঐশী তখনও রজতাভর ঘরে বসে গজগজ করে চলেছে,“সামান্য সেন্স নেই! অপোগন্ড কুম্ভকর্ণ কোথাকার। এই হতভাগা ওঠ!”রজতাভর গলার স্বর কানে এল তার।

-আহা! খামোখা বকছিস ওকে! ওর দোষ নেই! সারাদিন অফিসে খাটনির পর ক্লান্ত ছিল বলে আর ডাকাডাকি করিনি। তাছাড়া আমি নিজেই স্টাডিরুমে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কোনো অসুবিধে হয়নি আমার!

- তুমি চুপ করো বাপি! তোমাকে আর ওর হয়ে সাফাই গাইতে হবে না! যে ছেলে নিজের হবু শ্বশুরের খাট পুরোপুরি দখল করে এভাবে ওপেন ইউনিভার্সিটির মতো পড়ে পড়ে ঘুমোতে‌ পারে সে বিয়ের পর আমাকেও বিছানা থেকে বেদখল করে দিতে পারে। এই ছেলে! উঠবি?

- আহ! ঐশী!পাশের ঘরে অভীকের মা রয়েছেন! তিনি শুনতে পাবেন!বলছি তো কোনো অসুবিধে হয় নি। তুমি চুপচাপ মুখ ধুয়ে এসো! আর দেখো তোমার সুজাতা আন্টি উঠলেন কিনা। আমি চা বসাচ্ছি।

বলে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সামনে সুজাতাকে দেখে থমকে যান রজতাভ। দেখেন কী হয়েছে বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সুজাতা। রজতাভ হেসে বলেন, “গুডমর্নিং! রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল?”সুজাতা মাথা নেড়ে বলেন,

- হ্যাঁ! কী ব্যাপার? ঐশী চিৎকার করছে কেন?

- ও কিছু না। বাদ দিন। চা খাবেন তো?আপনি মুখ ধুয়ে নিন ততক্ষণে চা হয়ে যাবে।

- আগে বলুন কী হয়েছে? নির্ঘাত অভি পুরো বিছানার দখল নিয়ে ঘুমিয়েছে! জানতাম! ইশ!ছিঃ!ছিঃ!দাঁড়ান আমি অভীককে ডাকছি।

- থাক! অতো রাতে ঘুমিয়েছে। আরেকটু ঘুমোক। সবে তো সকাল ছটা বাজে। ছেলেমানুষ এত সকালে উঠে কী করবে?আপনিও তো অনেক রাতে ঘুমিয়েছেন? আরেকটু ঘুমিয়ে নিলে পারতেন?

- আমার ভীষণ লজ্জা করছে জানেন? আমাদের জন্য আপনাদের এত কষ্ট করতে হচ্ছে। 

- সুজাতা, এ নিয়ে আমরা কালরাতেও কথা বলেছি। তাছাড়া অভীক আমার ছেলের মতো! ঐশীও একসময় এভাবেই শুতো। আমার কোনো প্রবলেম হয় নি। তাছাড়া নিজের বিছানায় আমি কমই ঘুমোই! বেশীরভাগ দিন আমার স্টাডিরুমেই কাটে। কাজেই ওখানকার সোফাকে কাঠের মিস্ত্রি লাগিয়ে সোফা কাম বেড করে নিয়েছি। রাতে ওখানেই প্রায় ঘুমোই। ওসব কথা বাদ দিন আপনি আগে মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন। ততক্ষণে আমি চায়ের জল বসাই গিয়ে। ঐশী! অভীককে ছেড়ে আগে মুখ ধুয়ে এসো!

বলে রান্নাঘরের দিকে চলে যান রজতাভ। 
মুখ ধুয়ে পরনের পোশাক ছেড়ে আবার শাড়ি পরে তৈরি হয়ে ঐশীর ঘর থেকে সুজাতা বেরিয়ে এসে দেখেন শুধু চা-ই নয় তার সাথে রীতিমতো সকালের জলখাবারও তৈরী করে নিয়েছেন রজতাভ। ডিমের পোঁচ,বাটার মাখানো সেঁকা পাউরুটি, কলা,আপেল, কেক সব নিয়ে একেবারে এলাহি ব্যাপার। ঐশী এক এক করে খাবার গুলো টেবিলে সাজাচ্ছে দেখে চোখ কপালে তুলে রজতাভর দিকে তাকিয়ে সুজাতা বললেন, “করেছেনটা কি! এত খাবার? আচ্ছা আপনি কি পাগল? এত সকালে এত খাবার কে খায়? শুধু চা হলেই তো হত!”

- এ আর এমন কী? ঐ সামান্য আয়োজন। ভেবেছিলাম লুচি আর ছোলার ডাল করবো।‌ পরে ভাবলাম থাক! অতো দুর যাবেন, অয়েলি ফুড খেলে আবার ঝামেলা হতে পারে তাই এই হাল্কা খাবার করলাম। পেটও ভরা থাকবে আবার বদহজমও হবে না।

- তাই বলে এত খাবার কে খাবে?

- কেন? সবাই মিলে খাবো! ঐ তো অভীক এসে গেছে!

সুজাতা‌ তাকিয়ে দেখলেন অভীকও রেডি হয়ে বেরিয়ে এসেছে। মাথা নিচু করে টেবিলের সামনে এসে অভীক বলল, “ সরি আঙ্কল! আসলে কাল এতটাই টায়ার্ড‌ ছিলাম যে আর... তাছাড়া আমি ঘুমোলে একেবারে কুম্ভকর্ণ মোডে চলে যাই। যাই হোক না কেন কিছুতেই ঘুম ভাঙে না।‌ আমার জন্য আপনি..."

অভীককে বাকি কথা বলতে না দিয়ে বলে উঠলেন রজতাভ,“ ব্যস অনেক সরি বলা হয়েছে! এবার কথা না বাড়িয়ে খেতে বোসো!”অভীক মাথা নেড়ে খেতে বসে। ঐশী প্লেটে খাবার সাজিয়ে এগিয়ে দেয় সবার দিকে।

বাসস্ট্যান্ডে ওরা যখন পৌঁছল ততক্ষণে বাস ছেড়ে দিয়েছে। পরের বাস তেমন নেই। তবে মালবাজারের‌‌ গাড়ি একটু পড়েই ছাড়বে। অগত্যা মালবাজার পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ধরতে হবে সুজাতাকে। আর কোনো উপায় নেই দেখে‌ অভীককে মালবাজারেরই টিকিট কাটতে বললেন সুজাতা। আজ স্কুলে ডুব দিতে হবে। কোনো উপায়‌ নেই! এমনিতেও সময় মতো পৌঁছতে পারবেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে রইলেন সুজাতা। আর তখনই হাল্কা করে বৃষ্টি নামল। ঐশীরা দৌড়ে এসে সুজাতার সামনে এসে দাঁড়াল। অভীক টিকিটটা হাতে দিয়ে বলল, “ গেটে‌র সামনে সিটের রো-তে জানলার ধারে সিট। এখনই বাস ছাড়বে।” ঐশীর হাতে একটা প্যাকেট ছিল সেটা সুজাতার হাতে দিতেই সুজাতা দেখলেন সেটায় জলের বোতল, কেক, বিস্কুট রাখা। বিরক্ত হয়ে সুজাতা বললেন,“ দেখো কাণ্ড মেয়ের! সকালে অতোগুলো খাবার খেয়ে তো এমনিতেই পেট ভরে আছে আবার এসব কেন?”

- থাক না আন্টি! পথে ঘাটে খিদে পেলে খাবে। বাপি বলে পথে ঘাটে বেরোলে খালি হাতে যেতে নেই। অন্তত জলের বোতল সাথে নিতে হয়। আমি ভাবলাম শুধু জলের বোতল দেব? তাই এগুলো নিলাম।

- তাই বলে এত! অভি তুই বারণ করতে পারলি না?

অভি বুঁজে আসা গলায় বলে,“ থাক না মা! ও দিয়েছে যখন। তাছাড়া তুমি তো এখন তেমন আর আসো না। তাই আর বাধা দিইনি।”

সুজাতা দেখেন অভীক সরাসরি তাকাচ্ছে না তার দিকে যদি মায়ের কাছে কাঁদতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। ঐশীর চোখও ছলছল করছে। মৃদু হেসে সুজাতা দুজনকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “পাগল সবকটা! এমন করছে যেন আর আসবো না। ধুস! এরপর তো আসা যাওয়া লেগে থাকবেই। এই ছেলে! এবার ছুটি পেলে ওকে নিয়ে আসবি জলঢাকায়। আর এই যে মেয়ে! পাহাড়ে আমার বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেলাম! আসতে হবে কিন্তু! তোমার বাপিকে নিয়ে আসবে। দুজনে ভালো থেকো। সাবধানে থেকো। একদম কাঁদবে না। এলাম কেমন?"

বাসে উঠে জানলার ধারের সিটে বসলেন সুজাতা। কিছুক্ষণ পর বাস ছেড়ে দিলো। অভীক আর ঐশী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল বাস স্ট্যান্ডে। বাসটা দৃষ্টিপথের আড়াল হবার পর ওরাও বেরিয়ে পড়ল যে যার পথের দিকে। 

বাসের সিটে হেলান দিয়ে বসলেন সুজাতা। বন্ধ জানলার বাইরে কাচে বৃষ্টির জলছাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। বাস ক্রমশ এগিয়ে যেতে লাগল গন্তব্যে।

*****
সময়ের চাকা বড়ো বিচিত্র! দুঃখের সময়, শোকের সময় ভীষণ ধীর গতিতে ঘোরে। তখন এক একটা দিন এক একটা বছরের মতো মনে হয়। কাটতেই চায় না। আবার সুখের সময় এত দ্রুতগামী হয়ে যায় যে একটা বছরও একলহমায় কেটে যায়। যেন কয়েকটা সেকেন্ড মাত্র। ঠিক এইভাবেই পরের কয়েকটা বছর কেটে গেছে। অভীকের সাংবাদিকতার চাকরিটা পাকা হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়। এখন সে খবরের কাগজের সাংবাদিক হবার সাথে সাথে ওদের সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্রের প্রুফরিডার। ঐশী কলেজ পাশ করে একটা ক্যারাটে স্কুলে টিচার হিসেবে যোগ দিয়েছে। সেখানেই সারাদিন কেটে যায় তার। রজতাভর পরিবারের সাথে সুজাতার সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। প্রতিরাতে অভীকের সাথে সাথে ঐশীও আজকাল সুজাতার সাথে কনফারেন্স কলে কথা বলে। গতমাসে দুর্গা পুজোতে ঐশীর আবদারে ওদের সাথে শিলিগুড়ির পুজো দেখে এসেছেন তিনি। এর আগে ঐশীও ওর বাপিকে নিয়ে অভীকের সাথে এসে ঘুরে গেছে জলঢাকা।‌ রজতাভর সাথে কথা বলে অভীকদের বিয়ের দিনক্ষণও পাকা করে ফেলেছেন সুজাতা। ঠিক হয়েছে সামনের মাঘ মাসে দুজনের চারহাত এক করে দেবেন ওরা। বিয়ের পরে ঐশীরা রজতাভর কাছেই থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত অভীক দুজনের মাথা গোঁজার ঠাই না খুঁজে‌ নিচ্ছে। অভীকও খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে কমদামে একটা ফ্ল্যাটের। রজতাভ অবশ্য ঠিক করেছেন অভীক ফ্ল্যাট‌ না পেলে নিজের ফ্ল্যাটের একটা‌ অংশ অভীকদের ছেড়ে দেবেন। সুজাতা ঠিক করেছেন নিজে হাতে গুছিয়ে দেবেন ছেলের সংসারটাকে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনটা ভালো হয়ে গেল সুজাতার। ক'দিন ধরে আকাশটা মেঘলা হয়ে ছিল। বৃষ্টি নামবে নামবে করেও নামছে না। অবশেষে কাল রাতের দিকে মুষলধারে নেমে সারারাত‌ একটানা বৃষ্টি হয়ে অবশেষে ভোররাতে থেমেছে। বৃষ্টি শেষে আকাশে ছেঁড়া মেঘ ছড়িয়ে।‌ মর্নিংওয়াকে বেরোনোর আগে শালটা গায়ে জড়িয়ে নিলেন সুজাতা। এখানে পুজোর পর পরই হাল্কা শীত নেমে আসে। তার উপর কাল রাতে বৃষ্টি হওয়ায় ঠান্ডাটা আরো বেড়েছে। ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে দরজায় তালা দিয়ে হাটতে শুরু করলেন সুজাতা।চারদিকের বৃষ্টিস্নাত পরিবেশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে হাটতে লাগলেন তিনি।

কিছুদুর গিয়ে নদীর শব্দ কানে এলো তার। পায়ে পায়ে ব্রিজের উপর উঠতেই নদীর‌ ঠাণ্ডা বাতাস এসে ঝাপটা মারল সুজাতার গায়ে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় শিউরে উঠলেন তিনি। তারপর কাঁপতে কাঁপতে ব্রিজ থেকে নেমে পাহাড়ের এক ছোটো ঢাল বেয়ে নেমে এলেন নদীর পারে। তারপর জুতো খুলে নদীর জলে পা ভিজিয়ে দিলেন। তিনি। এই অভ্যেসটা সুজাতার চিরকালের।‌ শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কোনোদিন এর অন্যথা হয় না। তথাগত বেঁচে থাকাকালীন সুজাতার সাথে আসতেন। নদীর জলে পা ডুবিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে‌ উপভোগ করতেন পাহাড়ের ভোরের পরিবেশকে। সুজাতা জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে থাকতে হারিয়ে যান এরকমই এক মুহূর্তে।

*****
- জানো সু? পাহাড়কে সবসময় সুন্দর লাগলেও তার আসল সৌন্দর্য ধরা পরে এই ভোরবেলায়। অর্ধেক অন্ধকার অর্ধেক আলোয় যতটা সুন্দর মনে হয় ততটাই রহস্যময় লাগে। এই সময়টা রাতচরা পাখিরা রাত জাগার ক্লান্তি নিয়ে ঘুমে তলিয়ে যাবার আগে শেষবারের মতো ডাক দিয়ে জানান দেয় তার অস্তিত্বের। ভোরের পাখিরা ডেকে সমগ্র ঘুমন্ত অরণ্যকে জাগিয়ে তোলে। এই একটা সময় জঙ্গলের সমস্ত পশুরা নিজেদের বিবাদ ভুলে একসাথে নদীর জল খেয়ে প্রকৃতিমায়ের, বনদেবীর আশীর্বাদ পায়। আর সবার শেষে ঠিক পুজোর দেবতার মতো নদীর পথ ধরে, জঙ্গলের প্রান্তিক অংশে প্রবেশ করেন সুর্যদেব। এই সৌন্দর্য হাজার মাথা কুটলেও কোথাও পাবে না তুমি। এই সৌন্দর্য দেখতে হলে ভোরের পাখির ডাক শুনে উঠতে পড়তে হয়। অন্ধকার থাকতে থাকতেই বেরিয়ে পড়তে হয়। শহরের মানুষেরা এটা না দেখে বনে আসে ফুর্তি করতে। পিকনিক করতে। আর বন্যপ্রাণীরা আক্রমণ করলে তাদের দোষারোপ করে। এটা বোঝে না যে এদের প্রমোদে ওদের শান্তি ভঙ্গ হয়। ওদের কাছে বন্যপ্রাণীরা আসেনি বরং ওরাই বন্যপ্রাণীর এলাকায় প্রবেশ করেছে। জানিনা কবে এদের এই বোধোদয় হবে। চিৎকার করে, গান বাজিয়ে নয়, নীরবে, নিভৃতে বনের শব্দ শুনতে আসবে। যতদিন পর্যন্ত এই বোধ ওদের না হবে ততদিন বন্যপ্রাণীদের আক্রমণ চলবে। আর এটার জন্য দায়ী থাকবে ওরাই!

(চলবে)

রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ ষষ্ট পর্ব



খাবার পালা শেষ হতেই ঊর্মিকে নিয়ে রজতাভ বেরিয়ে পড়ল। এবার গন্তব্য রক গার্ডেন। স্ট্যান্ডে পৌঁছনো মাত্র জিপ পেয়ে গেল ওরা।‌ ড্রাইভারের সাথে কথা বলে রজতাভ জানতে পারল রক গার্ডেন বেশী দুর নয়, ঐ দশ কিলোমিটারের মতো হবে। ঘুম স্টেশন হয়ে যেতে হবে। আবহাওয়া ঠিক থাকলে আধঘন্টা চল্লিশ মিনিটের মতো লাগতে পারে। তবে ফেরার সময় গাড়ি পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। রজতাভ ঠিক করল এই গাড়িতেই ফিরবে। সেই মতো দরদাম করে গাড়ি ভাড়া করল সে। ঠিক হল ওদের পৌঁছে দিয়ে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে যাবে নিজের মতো ভাড়া খাটাতে। তবে মাত্র দুঘন্টার জন্য। ঠিক দুঘন্টা পর ওরা যেখানে গাড়ি থেকে নেমেছিল ঠিক সেই স্পটে দাঁড়াবে। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে সেই স্পটে এলে ওরা গাড়ি করে ফিরে আসবে। এতে ওদের ঘুরে বেড়ানোও হবে, আবার ড্রাইভারকে বসে থাকতে হবে না।

সব ঠিক করে গাড়িতে চাপল ওরা। ড্রাইভার কিছুক্ষণ ঘুরে আরো কয়েকজন প্যাসেঞ্জার জোগাড় করে পাঁচমিনিটের মাথায় গাড়ি স্টার্ট দিতেই সিটে হেলান দিয়ে বসল রজতাভ। দার্জিলিং শহর থেকে বেরোতেই উদাসীন ভাবে তাকিয়ে রইল জানলার বাইরে। দেখতে লাগল পাহাড়ের খাঁদের ধার দিয়ে নেমে যাওয়া অপূর্ব ভয়ংকর সবুজাভ সৌন্দর্যকে। ড্রাইভারের অসীম দক্ষতায় পাহাড়ের পাকদন্ডি বেয়ে চলতে লাগল ছোটো জিপটা। এক এক মুহূর্তে ঊর্মির মনে হতে লাগল এই বুঝি জিপ উল্টে গেল খাঁদে। সে ভয় পেয়ে খামচে ধরল রজতাভর হাত। রজতাভ মুচকি হেসে একবার ঊর্মির দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল,“ভয় নেই! আমি তো আছি!” ঊর্মির তাও ভয় কমল না। গোটা রাস্তা সে রজতাভর জ্যাকেটের হাতা খামচে ধরে রইল।

আধঘন্টা পর যখন ওরা গাড়ি থেকে নামল রজতাভর হাসি দেখে কে? সে হাসিমুখে বলল, “খুব তো তখন বলছিলে। নর্মাল কাপলের মতো থাকবে। কোনোরকম টাচিং না। গাড়িতে বসে সব বুলি বেরিয়ে গেল তো!”

চড়া রোদ আর বদ্ধ গাড়িতে বসে থাকার দরুন গরম লাগায় পরনের শালটা খুলে ঊর্মি ঝাঁঝিয়ে উঠল,“বাজে বকো না তো! আমি তোমার মতো অতো ডাকাবুকো নই! যেভাবে গাড়ি চালাচ্ছিল ড্রাইভারটা মনে হচ্ছিল এই বুঝি গাড়ি নেমে গেল। বাপরে!খুব জোর বেঁচে গেছি!এই কান মলছি। জীবনেও আর পাহাড়ে আসবো না বাবা!”

- সেকি! বিয়ের পর থেকে তো তুমিই আসতে চাইতে পাহাড়ে! হানিমুনে পাহাড়ে যাবে বসে কানের পোকা নড়িয়ে দিয়েছিলে। আজ যখন সত্যিই পাহাড়ে এলাম তখন বিরক্ত হচ্ছো!

- তখন কি আর ছাই জানতাম‌ যে এভাবে প্রাণ হাতে করে ঘুরে বেড়াতে হবে? ভেবেছিলাম ম্যাল,কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে কার্শিয়াং, কালিম্পঙ, গ্যাংটক‌ থেকে ঘুরে বেড়িয়ে কেটে যাবে দিনগুলো।

- উহু! ওটা তুমিই না অনেকেই ভাবে। তবে‌ পাহাড়ের মজা এই জায়গাগুলোতে থেকে নেই। আর কার্শিয়াং আলাদা জায়গা। ওটা বিখ্যাত নেতাজির বাড়ি, আর ট্রয়ট্রেন হল্ট হিসেবে। শোনো, পাহাড়কে চিনতে হলে, পাহাড়কে জানতে হলে, এর মজা উপভোগ করতে হলে পায়ে হেটে ঘুরে বেড়াতে হবে। শুনতে হবে প্রকৃতির শব্দ, অচেনা পাখির সুরেলা ডাক আর পাহাড়ের নিস্তব্ধ কোণে সবুজের আড়ালে বসে থাকা ঝিঁঝিঁর ডাক। চোখের সুখ করতে হবে সবুজে ঘেরা এই চারপাশ দেখে। তাহলেই পাহাড়ের মজা টের পাবে। তুমি গাড়িতে করে আসার সময় পাহাড়ের যে খাঁদ দেখে ভয় পাচ্ছিলে। সেই খাঁদের নিচের সৌন্দর্যকে দেখে মজা পাচ্ছিলাম আমি। কার্গিলে এই মজাটাই সেরা ছিল আমার কাছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে পাহাড়ের চারদিকের শোভা দেখে নিতাম প্রাণভরে। কে জানে পরদিন দেখতে পাব কিনা?এই আনন্দটা ভীষণ মিস করি জানো?

বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রজতাভ। ঊর্মি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকায় রজতাভর দিকে তারপর কথার প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“ দার্জিলিং-এ তো ছবি তোলার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলে? তা এখানে এসে সব ফোটোগ্রাফির শখ মিটে গেল নাকি?কখন থেকে সিনেমার নায়িকার মতো‌ শাল খুলে দাঁড়িয়ে আছি বলতো? এরপর তো ঠান্ডায় জমে যাবো! এবার অন্তত‌ একটা ছবি তোলো! তারপর ওই ওখানে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে বাকি ছবি তুলে আবার দুঘন্টার মধ্যে এখানে ফিরতে হবে যে!উফ! আর্মির লোক হয়েও কেউ যে এতটা অলস আর প্রচুর বাজেবকা মানুষ হতে পারে সেটা তোমাকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না।”

ঊর্মির অবস্থা দেখে রজতাভ ফিক করে হেসে ফেলল। সত্যিই ঊর্মি ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছে। হাসতে হাসতে ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে ঊর্মির দিকে তাক করে রজতাভ বলে ওঠে। “ রেডি? স্মাইল!”

পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা একটা ছোটোখাটো পার্ক হল ‘রক গার্ডেন’। সবুজ‌ পাকদন্ডি বেয়ে উদ্যানটা বেশ অনেকটা জায়গা জুড়েই ছড়িয়ে আছে।‌ পার্কটার সাথে কার্গিলের পিকের অনেকটা মিল পেল রজতাভ। চারদিকে ছোটো ছোটো পাহাড়ের মতো অসংখ্য স্পট। পাকদন্ডি বেয়ে সেই পাহাড়ে উঠতেই আশেপাশের জায়গা দেখতে পাওয়া যাবে। বসার জায়গাও আছে। আজকে ছুটির দিন বলে টুরিস্টের ভীড়ও দেখার মতো। হাতে সময় কম বলে ওরা কাছের একটা জায়গায় উঠে একটা বেঞ্চে বসল। ঊর্মি খাবারের ব্যাগ থেকে শালপাতার প্লেট আর খাবার আরেকটা বাক্স বের করল। খুলে দেখল ভেতরে অনেকটা পরিমাণে এগ চাউমিন আছে। দুটো কাঁটাচামচও দেওয়া। বাক্স থেকে প্লেটে চাউমিন বেড়ে নিয়ে সে রজতাভকে খেতে দিয়ে নিজে বাক্সটা নিয়ে বসল। 

রজতাভ একটু টমেটো কেচাপ চাউমিনে দিয়ে খেতে খেতে বলল, “যাই বলো না কেন মলিদিদির রান্নার হাত কিন্তু বেশ ভালো! কাল রাতে ডিমের কারি আর রুটিটা যা করেছিল না! উফ! অনেকদিন এরকম কারি খাই নি!”

- এই রান্নার জন্যই তো মেজোমামা মলিদিদিকে রেখেছেন। তবে মলিদিদির থেকে ওর মা মানে সুষমা মৌসি আরো ভালো রাঁধতে পারতেন। ওনার হাতে বানানো চিকেন মসালা থুপ্পা আর চিকেন কারি এত ভালো হত যে কী বলবো! যখন ছোটো ছিলাম তখন যতবার আসতাম আমার জন্য একটা স্পেশাল ডিশ বানাতেন মৌসি। চিকেন মোমো কারি! মানে চিকেন মোমোটাকে ভেজে অনেকটা ক্যাপসিকাম, গাজর, স্কোয়াশ দিয়ে কষা কষা ঝোল। অনেকটা তোমার ঐ ধোকার ডালনার মতো দেখতে লাগতো। আর খেতেও অপূর্ব হত। 

- আচ্ছা মলিদিদির মাকে তুমি মৌসি বলছো কেন? মাসি বলতে পারো।

মৃদু হাসে ঊর্মি তারপর বলে, “কারন মৌসি নিজে বলতেন তাকে মৌসি বলে ডাকতে। আমি এখানে এলে ভীষণ খুশি হতেন। নিজে হাতে নানারকম পদ রান্না করে খাওয়াতেন।”

রজতাভ দেখে ঊর্মির চোখটা ছলছল করছে। সেটাই স্বাভাবিক। আত্মীয়-বিয়োগের যন্ত্রণা সত্যিই কষ্টের। রজতাভ ঊর্মিকে চাঙ্গা করার জন্য বলল, “তাহলে তো আমাকেও চেখে দেখতে হয়! এক কাজ করো আজ বিকেলে আমরা তোমার মলিদিদির ঘরে‌ যাবো। সেখানে গল্পচ্ছলে জেনে নেবে উনি এই ‘চিকেন মোমো কারি’ আর ‘মসালা থুপ্পা’-র রেসিপি জানেন কিনা। যদি জেনে থাকেন তাহলে কালকের প্ল্যান ক্যানসেল। কাল সারাদিন কাছে পিঠে ঘুরবো। আর দুপুরে জমিয়ে খাবো দুটো পদ। আমিও দেখি যে পদের এত সুখ্যাতি করছো সেটা কেমন খেতে!”

ঊর্মি হেসে বলে,“যাহ! আবার ওসব কেন? শুধু শুধু মলিদিদিকে খাটানো! তারচেয়ে কালকে বলব যা ইচ্ছে বানাতে। তেমন হলে আমিও হাত লাগাব। এখানে এসে তেমন ভাবে গল্প করা হয়নি মলিদিদির সাথে। কাল সেটাও হয়ে যাবে।”

- বেশ তবে তাই হোক! সাথে এটাও বলে দেবে কাল সারাদিন মলিদিদি আর ওনার পরিবারের নিমন্ত্রণ রইল আমাদের ওখানে। একেবারে রাতে খেয়ে দেয়ে বাড়ি যাবেন ওনারা।

- ভালো বলেছ তো! বেশ পিকনিকের মতো হবে।‌ আমি আজকেই বলে আসব।
বলে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে প্লেটটা ডাস্টবিনে ফেলে ন্যাপকিনে হাত মুছে উঠে দাঁড়ায় রজতাভ। তারপর ক্যামেরা নিয়ে নেমে পড়ে ছবি তোলার কাজে।

*****
আচমকা শরীরে অস্বস্তিভাব বোধ করায় থমকে দাঁড়ালো তথাগত। কাল সারাদিন গুরুপাক খাবার খেয়ে একটু অম্বলের মতো বোধ হয়েছিল। দেরী না করে সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টাসিড খেয়ে নিয়েছিল সে। ঊর্মিকে ইচ্ছে করে জানায় নি। জানলে চিৎকার,চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিয়ে সবার টেনশন বাড়িয়ে দিত সে। কিন্তু অ্যান্টাসিড‌ খাবার পরেও শরীরের ভারীভাবটা যায় নি। অনেকদিন পর ঊর্মির সাথে মিলিত হতে গিয়েও গলদঘর্ম হয়ে পড়ছিল সে। মনে হচ্ছিল বুকের বাঁদিকে কে যেন হাতুড়ি পিটছে। ঊর্মি যাতে বুঝতে না পারে‌ সেই কারনে বেশিক্ষণ ওর উপরে থাকেনি সে। কিছুক্ষণ পরেই ঊর্মিকে তুলে নিয়েছিল নিজের বুকের উপর। বিছানায় শুয়ে সারারাত বুকের বাঁদিকের চিনচিনে ব্যথা সহ্য করে আদরে আদরে ভরে দিচ্ছিল ঊর্মিকে। ভেবেছিল হয়তো খাবার হজম হয় নি বলেই এই ঝামেলা হচ্ছে। ঠিক করেছিল সকালে উঠে মর্নিং ওয়াক সেরে একটু হাল্কা ফ্রি হ্যান্ড করবে খাবারটাকে হজম করার জন্য। 

সেই মতো সকালে বেরিয়ে পড়েছিল ওয়াকের জন্য। সকালে আর সেই অস্বস্তিভাবটা ছিল না ঠিকই। কিন্তু খাবারটার কারনে যা ক্যালরি জমেছে তা কমানোর জন্য কিছু দুর গিয়ে ওয়ার্মআপের জন্য দৌড় শুরু করেছিল সে। তারপর একজায়গায় থেমে হাল্কা ফ্রি হ্যান্ড করে ফিরে আসার সময় অস্বস্তিটা আবার ফিরে আসায় ভ্রু কুঁচকে গেল রজতাভর। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। হা করে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। বুকের চিনচিনে ব্যথা ক্রমশ পরিণত হয়েছে প্রচন্ড যন্ত্রণায়। মনে হচ্ছে যেন হৃৎপিন্ডটা ফেটে যাবে। দাঁতে দাঁত চেপে পাহাড়ের দিকটায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল রজতাভ। ড.মিত্র বলেছিলেন এই সিম্পটমটার ব্যাপারে। গুলির চাপ তো ছিলই তার উপর কালকের গুরপাক ভোজন আর পরিশ্রমের আঘাতে হৃদযন্ত্র জবাব দিতে শুরু করেছে। রজতাভ বুঝতে পারল ওর সাথে কি হয়েছে। কিন্তু এত সহজে হার মানার পাত্র সে নয়। আর আপাতত এই জনমানবহীন জায়গায় সে মরতে পারে না। শেষ চেষ্টা তাকে নিজেকেই করতে হবে। যে করে হোক কটেজে পৌঁছতে হবে। একবার পৌঁছতে পারলেই আর চিন্তা নেই। মুহূর্তের মধ্যে কর্তব্য স্থির করে নিল সে। তারপর ধীরে ধীরে হাটতে লাগল কটেজের দিকে।

এক একটা মুহূর্ত রজতাভর কাছে অনন্তকালের মতো মনে হচ্ছে। চোখের সামনে ক্রমশ অন্ধকার নেমে আসছে। রীতিমতো হাপাচ্ছে সে। বা বলা উচিত খাবি খাচ্ছে সে। বুকের যন্ত্রণা বিদ্যুতের মতো সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। রজতাভর মনে হচ্ছে‌ যেন ওর হৃৎপিন্ডটা যেন ভেতর থেকে কেউ দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। কে জানে কটেজটা আর কতদুর? কোনো মতে টলতে টলতে এগোতে লাগল সে। কিছুদুর এগিয়ে একটা বাঁক পেরোতেই সে দেখতে পেল কটেজটা‌। ঐতো ঊর্মি বাইরের লনে বসে আছে। হাতে চায়ের কাপ। ঐ তো মলিদিদির বর! বীরেন্দর দাজু! হাতে বাজারের থলে নিয়ে বেরোচ্ছে। আর চিন্তা নেই! আর কয়েক পা! ঐ তো ওরা তাকিয়েছে!আরেকটু! আর কটা পা! আর পারল না রজতাভ। বুক খিমচে ধরে মাটিতে বসে পড়ল সে। তারপর খাবি খেতে খেতে মাটিতে শুয়ে পড়ার আগে শুনতে পেল ঊর্মির আকাশকাঁপানো চিৎকার! চোখে অন্ধকার নেমে আসার আগে সে দেখতে পেল ওরা পাগলের মতো ছুটে আসছে ওর দিকে। ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্রমশ রজতাভর চোখে নেমে এল কালো পর্দার মতো একরাশ অন্ধকার।

কতক্ষণ অচৈতন্য ছিল জানে না রজতাভ। জ্ঞান ফেরার পর চোখ মেলতেই একটা চোখ ধাঁধানো আলোয় চোখটা জ্বলে উঠল তার। বাধ্য হয়ে চোখ বন্ধ করলো সে। কিছুক্ষণ নিজেকে ধাতস্থ হবার সময় দিল সে। তারপর চোখ মেলে তাকাতেই নিজেকে আবিস্কার করল নার্সিংহোমের বেডে। একটু ধাতস্থ হয়ে কোথায় আছে, কেমন আছে মনে করার আগে সে টের পেল তার সমগ্র শরীরে তার, পাইপ জড়ানো। হাতে স্যালাইন আর রক্তের চ্যানেল করা। বুকে কতগুলো পাম্পের মতো, ক্লিপের মতো যন্ত্র আটকানো। সেখান থেকে তার বেরিয়ে জুড়ে আছে পাশের যন্ত্রে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক আটকানো রয়েছে। কানের কাছে একটা বিপ বিপ শব্দ ভেসে আসছে। সারা শরীরে কোনো সাড় নেই। কয়েকবার চেষ্টা করল সে নড়ে ওঠার। পারল না। তবে কি...? আতঙ্কে সমগ্র শরীর হিম হয়ে এল রজতাভর। শেষমেশ বুকে আটকে থাকা গুলিটার কারনেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে তার শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে গেল অবশেষে! অসহায় চোখে চারদিকে তাকাল সে। পাশে একজন নার্স‌ বসেছিল। সে চোখ মেলে তার দিকে চাইতেই সে উঠে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। রজতাভ চারদিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে খুঁজতে লাগল ঊর্মিকে। চিৎকার করে সাহায্যের জন্য ডাকতে চাইল। কিন্তু কন্ঠ দিয়ে কেবলমাত্র গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ বেরোল না তার। 

কিছুক্ষণ পরেই নার্সটা আবার তার ঘরে এল। আর তার সাথে একজন ডাক্তার ঢুকলেন ঘরে। ডাক্তার এসে কিছুক্ষণ মেশিনের পর্দার দিকে চেয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “এখন কেমন বোধ করছেন?”

রজতাভ ডাক্তারের দিকে‌ তাকিয়ে রইল। ডাক্তার হেসে বললেন, “যা খেল দেখালেন আপনি! আমরা তো প্রায় ধরেই নিয়েছিলাম আপনাকে বাঁচানো যাবে না ভেবে। বুলেটটা ভীষণ কমপ্লিকেটেড জায়গায় আটকে ছিল। শুনতে একটু ক্লিশে লাগবে বাট আই মাস্ট সে,আপনার স্ত্রীর সিদুরের জোরে আপনি বেঁচে ফিরেছেন আবার। আপনার কেস হিস্ট্রি, আপনার আর্মিতে ইঞ্জুরি সবটা বলে হেল্প করেছেন তিনি। বাকি হেল্প করেছেন আপনাদের ডক্টর মিত্র! ফোনে কথা‌ বলে আপনার কন্ডিশনটা ব্রিফলি শুনেছি। আপনার লাক মারাত্মক! স্ট্রেসটা সামান্য স্ট্রোকের উপর দিয়ে চলে গেছে। নাহলে হার্ট ফেলিওর, বুলেটের কারনে হার্টে সংক্রমণ অনেক কিছুই হতে পারত। তবে আর চিন্তা নেই। বুলেটটা আমরা বের করেছি। কিন্তু এবার থেকে আপনাকে আরো সাবধানে থাকতে হবে। হার্ট সার্জারি করে বুলেট বের করা মানে বুঝতেই পারছেন।‌ এরপর থেকে আপনাকে রেস্ট্রিকশনে চলতে হবে। স্পাইসি, অয়েলি ফুড, এক্সেসিভ ট্রেনিং, বেশিক্ষণ পরিশ্রম বাদ। রেস্টে থাকতে হবে আপনাকে। আপাতত রেস্ট নিন আপনি। বিকেলে আসব আবার চেকাপ করতে।” বলে বেরিয়ে গেলেন ডাক্তার। তারপর কেবিনে ঢুকল ঊর্মি। ধীর পায়ে এসে রজতাভর বেডের পাশে বসল সে। রজতাভর একটা হাত ধরে কিছুক্ষণ অশ্রুসজল অথচ অভিমানী চোখে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। রজতাভ চোখের ইশারায় বলল ,“ভয় নেই!” ঊর্মি তাও চুপ করে বসে রইল। তারপর যেমনভাবে এসেছিল ঠিক তেমন ভাবে ধীর পায়ে চলে গেল। রজতাভ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ক্লান্তিতে চোখ বুঁজল।

*****

আচমকা মুখের উপর জলের স্পর্শ পেতেই চোখ মেলে তাকালেন রজতাভ। কিছুক্ষণ লাগল তার ধাতস্থ‌ হতে। বুঝতে পারলেন এতক্ষণ ধরে‌ পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। চোখ‌ মুছে ‌তাকিয়ে দেখলেন আকাশ ক্রমশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। চারদিকে গুম গুম শব্দে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি নামল বলে। আজকাল বৃষ্টিতে ভিজলেই ভীষণ শরীর খারাপ করে রজতাভর। অথচ একসময় এই বৃষ্টিতেই কত ভিজেছেন। ঊর্মিকে আদর করেছেন।‌ এরকমই এক বৃষ্টিমুখর রাতেই ঘটেছিল সর্বনাশটা। চট করে ঘরে ঢুকে এলেন তিনি। আর ঘরে ঢোকামাত্র ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল। রজতাভ ব্যালকনির দরজা লাগিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দেখলেন তার বিছানার প্রায় পুরোটাই দখল করে শুয়ে আছে অভীক। অভীককে ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে হাসি পেল তার। ঐশ্বর্যও একসময় এইভাবে ঘুমোতো। হাসতে হাসতে বিছানা থেকে একটা বালিশ আর চাদর নিয়ে নিজের স্টাডিরুমে চলে এলেন তিনি। স্টাডিরুমের সোফাতে বালিশ রেখে আলমারি থেকে একটা বই বের করে সোফায় আধশোয়া হয়ে কিছুক্ষণ পাতা উল্টে শুয়ে পড়লেন তিনি।

(চলবে...)


সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...