অনুসরণকারী
রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১
অস্তরাগ নবম পর্ব
বুধবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১
অস্তরাগ অষ্টম পর্ব
সুজাতা চুপ করে বসে বসে বনের পাখিদের ডাক শুনতে থাকে। তথাগত বলে চলে,
- বন কেটে লোকালয় বাড়ানো, বারন থাকা সত্ত্বেও নিরীহ পশুগুলোকে শিকার করা। ইচ্ছে করে বনের জমি দখল করে চাষবাস করা। এরপরেও খবরে বলবে বনের পশু লোকালয় আসছে। মুর্খগুলো বোঝে না যে বনের পশুরা মোটেও লোকালয়ে আসছে না। ওরাই বনের পশুদের খাবারের ভান্ডার নষ্ট করে ওদের এলাকায় থাকছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন বনের পশুরা তিলে তিলে শেষ হয়ে যাবে। মিউজিয়ামের একটা স্টাফড পুতুল হিসেবে থেকে যাবে ওদের দেহগুলো। লোকে জানবে ওরা বিলুপ্ত।
বলার পর থামে তথাগত। তারপর বলে, “সেই তখন থেকে তো আমিই বলে যাচ্ছি। তুমি কিছু বলছো না কেন?” সুজাতা জলে পা ডুবিয়ে চোখ বুঁজে বসে ছিল। তথাগতর কথায় চোখ খোলে সে। তারপর বলে, “ কারন তুমিই তো বলেছ বনের শব্দ শোনার সময় কথা বলতে নেই। চুপ করে শুনে যেতে হয়। তাই করছি। চোখ বুঁজে জলের কলকল শব্দের সাথে সামনের পাহাড়ের কথা শুনছি।”
- বটে? তা কি বলছে পাহাড়টা?
- বলছে, আমার বরটি বেশ! আমার চেয়ে বেশী ওকে ভালোবাসে। তবে বড্ড বকে যাতে আমাদের দুই সতীনের মধ্যে কথা না হয়।
হেসে ফেলে তথাগত, “সতীন! ভালো বলেছো তো! পাহাড়, জঙ্গল তোমার সতীন!"
- সতীনই তো! সারাদিন তো আমার কোনো খবরই নাও না। রাতটুকু আর এই ভোরের সময় বাদ দিলে তো সারাদিন ওর কাছেই থাকো। আমার কাছে থাকলেও সবসময় জঙ্গলের কথা, বন্যপ্রাণীর কথা, ওকে সতীন বলবো না তো কাকে বলব? তবে ভারী মিষ্টি সতীন। সারাদিন ভালোবাসার পর রাতটুকু আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়। যাতে ভালোবাসার ভাগ পেতে পারি। তবে ঐটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট জানো? কারন আমি জানি বন জঙ্গল তোমার কত কাছের। এখানকার জীবজন্তু, এমনকি গাছের পাতাটুকুও তোমার কত আপন। এর জন্য বিন্দুমাত্র রাগ বা হিংসে আমার হয় না, বরং গর্ব হয়। তাই তো রাত শেষে তোমাকে ফিরিয়ে দিই ওর কাছে।
তথাগত হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে সুজাতাকে। তারপর বলে, “এই জন্যই তো এতটা ভালোবাসি তোমাকে। কারন তুমি আমাকে যতটা বোঝো কেউ বোঝে না। জানো সু যখন দেখি বনের কোনো গাছ বিনা অনুমতিতে কেউ কেটে ফেলেছে, বা সামান্য দাঁত, চামড়ার লোভে নিরীহ পশুগুলোকে ওরকম নৃশংসভাবে মেরে ফেলতে দেখি ভীষণ কষ্ট হয়। একটা বুনো রাগ চেপে বসে মাথায়। কি দোষ ওদের বলো তো? বড়ো দাঁত, সুন্দর চামড়ার অধিকারী হওয়াটাই কি অপরাধ?আমার ইচ্ছে করে যারা এসব করছে তাদের উচিত শাস্তি দিই! কিন্তু পারি না। ধরা পড়বার আগেই ওরা বেড়িয়ে যায় পাকাল মাছের মতো। দিন শেষে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই তখন নিজেকে পরাজিত সৈনিক মনে হয়। ইচ্ছে করে নিজেকে শেষ করে দিই। কিন্তু পারিনা কারন আমি চলে গেলে তোমার কি হবে ভেবে। তুমি বোঝো সেটা। তাই নিজে এগিয়ে এসে বাঁচাও আমায়। আশ্রয় দাও এই ভেঙে পড়া আমিকে।”
সুজাতা চুপ করে বসে আছে দেখে তথাগত বোঝে এই সময় এই কথোপকথন সুজাতা পছন্দ করছে না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর তথাগত প্রসঙ্গ বদলে বলে,
- সু?
- হুম!
- আচ্ছা এতদিন তো আমার সাথে না জানি কত বনে ঘুরেছ। তা তোমার মতে বছরের কোন সময়টা বনের জন্য সেরা? মানে দৃষ্টিনন্দন? মানে সেই সময়টা বনে থাকলে মনে হয় থেকেই যাই এখানে সারা জীবন। বছরের কোন সময় এরকম মনে হয়?
উত্তরটা নিতে একটু সময় নেয় সুজাতা। বিগত পাঁচ বছরে তথাগতর সাথে ঘুরতে ঘুরতে অভ্যেস হয়ে গেছে তার। বা বলা ভালো বনের নেশা ধরিয়ে দিয়েছে তথাগত। নিজের অজান্তে কখন যে সে নিজেও বনকে ভালোবাসতে শুরু করেছে সে নিজেও জানতে পারে নি।
চোখ বুঁজে বনের শব্দ শুনতে শুনতে তথাগতর কাঁধে মাথা রেখে সুজাতা বলে, “ বছরের একটা সময় বললে বলা মুশকিল। সারা বছরে যদি বল তাহলে বলবো চারটে সময়ের কথা যখন বনের কাছে এলে মনে হয় এখানেই থেকে যাই। আর সভ্য জগতে ফিরে কাজ নেই।”
- তাই নাকি? তা সময়গুলো কখন কখন শুনি?
- গ্রীষ্মের দুপুর শেষে বা ভোরের দিকে নদীর পাড়ে। পাতা ঝড়ার মরশুমের বা সকালবেলা, শিশির পড়ার সময়ের ভোর আর ...
- আর?
- এই বসন্তকালে নতুন পাতা গজানোর সময়টা। এই সময় বন বা প্রকৃতি নিজেকে যেমন সাজায় তেমনই একটা মিঠে জংলা গন্ধে ভরে ওঠে চারদিক। এই গন্ধটা খুব বিকট উগ্রও নয়। আবার হাল্কাও নয়। বরং একটা ঝিম ধরানো নেশাতুর গন্ধ। তবে এতে মহুয়ার মৌতাত নেই। বরং একটা বুকভরা শান্তির আশ্বাস আছে।
তথাগত অবাক হয়ে যায়। এভাবে তো সে কোনোদিনও ভেবে দেখেনি! রোজ বনের মধ্যে প্রতিটা মুহূর্ত কাটালেও, বনের শোভা সে উপভোগ করলেও এভাবে ঋতুকালীন সৌন্দর্য সে উপভোগ করেনি। সে অবাক হয়ে তাকায় সুজাতার দিকে। সুজাতা একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,“গন্ধটা টের পাচ্ছ?”
একটা মিষ্টি অথচ জংলি গন্ধ তথাগতর নাকে ভেসে আসছিল, সে মাথা নাড়তেই সুজাতা বলে,“এই সেই বনের গন্ধ। আমরা যারা বনকে ভালোবাসি তারাই এই গন্ধটা পাই। বাইরের লোকেরা, যাদের উপর তোমার এত রাগ, যারা বনকে ভালোবাসে না, তারা কোনোদিনও এ গন্ধটা পাবে না।”
তথাগত চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পর সুজাতা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “চলো ফেরা যাক! ছটা বাজে।” তথাগত উঠে দাঁড়িয়ে একটা আড়মোড়া ভেঙে বলে, “চলো।"
দুজনে মিলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ব্রিজে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাটতে থাকে তথাগতর কোয়ার্টারের দিকে।
হলোও তাই! টানা দশমিনিট বকবক করার পর একসময় ক্লান্ত হয়ে অভীক বলল,“ আচ্ছা এখন রাখছি। কাল তাহলে দেখা হচ্ছে কেমন?” ঐশী ফোনটা কেটে সুইচড অফ করে টেবিলে রেখে আয়নার দিকে তাকালো। তারপর উঠে গিয়ে ঘরের দরজাটা আটকে দিল। তারপর সন্তর্পণে আলমারির লকার খুলে বের করে আনল একটা ডাইরি। এই ডাইরিটা সে ক’দিন আগে বাপির স্টাডিরুমে একটা বই খুঁজতে গিয়ে পেয়েছিল। বেশ মোটা একটা ডাইরি। চামড়া দিয়ে বাঁধানো, সোনার জল করা একটা ডাইরি। পাতাগুলো বেশ মোটা আর দামী কাগজের হলেও যত্নের অভাবে হলদে হয়ে গেছে। তবে ভেতরের লেখা পড়া যায়। ডাইরিটা পাবার পর প্রথমে ঐশী বুঝতে পারে নি এত ভালো মানের ডাইরিটা এত অযত্নে এখানে পড়ে আছে কেন। পরে বুঝেছিল ডাইরিটা আসলে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল সকলের চোখের আড়াল থেকে। ডাইরিটা ছিল বইয়ের তাকের একদম পেছনে। ডাইরিটা হাতে পেয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকার পর খুলে প্রথমপাতায় চোখ বোলাতেই যে অনুভূতিটা ঐশীর হয়েছিল সেটাকে মুখে বলে প্রকাশ করা অসম্ভব। কোনো হারানিধি পাওয়া অথবা কোনো প্রাণাধিক প্রিয় আত্মীয়ের সাথে হঠাৎ অনেকবছর পর যোগাযোগ হলে যে অনুভূতিটা হয় ঠিক সেই রকম মনে হয়েছিল ঐশীর। ডাইরিটা লুকিয়ে নিজের ঘরে আলমারিতে রেখে দিয়েছিল সে। তারপর কাজের চাপে আর পড়ে উঠতে পারেনি। আজ সুযোগ পেয়েছে অবশেষে। ডাইরিটা নিয়ে পড়ার টেবিলে রেখে ঘরের আলো নিভিয়ে শুধু রিডিং ল্যাম্পটা জ্বালালো সে। তারপর চেয়ারে বসে ডাইরির পাতা উল্টোতেই প্রথমপাতায় চোখ পড়ল তার। সেটায় হাত বুলোতে বুলোতে চোখটা একটু আদ্র হল ঐশীর। ডাইরির প্রথমপাতায় মুক্তোর মতো ঝড়ঝড়ে বাংলা অক্ষরে লেখা ‘ ঊর্মিমালা মজুমদার’। প্রথমপাতা উল্টে ডাইরিটা পড়তে শুরু করল সে।
ডাইরিটা যখন পড়া শেষ হল তখন রাত গড়িয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ডাইরিটা বন্ধ করে টেবিলে রেখে বাথরুমে চোখে মুখে জল দিতে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল ঐশী। একরাতের মধ্যে আমুল পরিবর্তন ঘটে গেছে মেয়েটার মধ্যে। চোখের কোল দুটো কেঁদেকেটে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। গালের উপর অশ্রুর ধারা কাজল ধেবড়ে দিয়ে দাগ বসিয়ে দিয়েছে। রীতিমতো বিধঃস্থ লাগছে তাকে। বেসিনের কল খুলে চোখে মুখে জলের ঝাপটা মেরে নিজেকে প্রকৃতিস্থ করল ঐশী। তারপর তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে আয়নার দিকে তাকাল। এবার সব ঠিক থাকলেও একটা জিনিস বদলালো না। ওর চোখ দুটো একইরকম থেকে গেছে। রক্তের মতো লাল,হিংস্র জীঘাংসায় ভরা, ক্রুর স্বাপদের মতো চোখ। না ধরা পড়ে গেলে চলবে না। চোখের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে। তারজন্য ঘুম চাই। লম্বা শান্তির ঘুম। যদিও ডাইরির লেখাটা পড়ার পর আর কোনোদিনও শান্তির ঘুম আসবে কিনা জানে না সে। তাও চেষ্টা করে দেখা যাক। ভেবে বাথরুম থেকে বেরিয়ে বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর ঘুম নেমে এল তার চোখে।
ঐশীর ঘুম যখন ভাঙল তখন সকাল আটটা বাজে। বিছানায় উঠে বসে চারদিকে একবার তাকাল সে। সব আগের মতোই আছে, যেন মনে হচ্ছে কাল রাতের ঐ ডাইরিটা, ঐ ডাইরি ভেতরে লেখা কথাগুলো নিছকই এক দুঃস্বপ্ন ছিল। যেন ঐ ডাইরিটা নিছকই একটা কল্পনা। কিন্তু পড়ার টেবিলে ডাইরিটা দেখে ভুল ভাঙল তার। তারমানে ওটা দুঃস্বপ্ন ছিল না! দুহাতে মাথা চেপে বসে রইল ঐশী তারপর উঠে টেবিল থেকে ডাইরিটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে যাবে এমন সময় দরজায় নক করার শব্দ শুনে থমকে গেল। তারপর বালিশের তলায় কোনোমতে ডাইরিটা আড়াল করে দরজা খুলল।
দরজার ওপার থেকে রজতাভ বললেন, “ অভীক ফোন করেছিল। জিজ্ঞেস করছে কটার দিকে যাবি? বোধহয় তোর ফোনটা সুইচড অফ পেয়ে আমাকে কল করেছিল। ছেলের তো দেখি আর তর সইছে না! কটার দিকে বেরোবি?”
- এগারোটার দিকে বেরোবো। দশটার দিকে বলে দাও।
- সেকি রে! এত দেরী করে অপেক্ষা করাবি ছেলেটাকে?
- দেরীতেই তো মজা বাপি! যত দেরী করবে তত বেশী বিরহে জ্বলবে। তাছাড়া প্রায় পাঁচটা বছর অপেক্ষা করেছে। তিনঘন্টা পারবে না? তাছাড়া তোমার জামাই যা লেট লতিফ? দশটা বললে এগারোটার দিকেই ঢুকবে।
- তাহলে দশটাই বলছি।
ঐশী মাথা নেড়ে দরজা লাগিয়ে দেয়।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করল ঐশী। এমনিতেও সারাবছর ওর আলমারিতে শার্ট আর জিন্সে ভর্তি থাকলেও গত কয়েকমাসে তাদের জায়গা দখল করেছে রকমারি শাড়িরা। রজতাভ, সুজাতা দুজনে মিলে এই কয়েকমাসে প্রায় বাজার ঘুরে পাহাড় প্রমাণ শাড়ি কিনেছেন। জামদানী,টাঙাইল, কটন, সিল্ক কী নেই! তবে ঐশী একটাও শাড়ির ভাজ ভাঙেনি। এসব সে কোনোদিন পরেনি, আজও পড়বে না। বরং কাল দুপুরে বাপি মায়ের যে শাড়িটা দিয়েছিল সেটাই পরবে সে। তার জন্য রীতিমতো ইউটিউবে ভিডিও দেখেছে। শাড়িটা বের করে বিছানায় রেখে ফোনটা সুইচ অন করল সে। অন করতেই টুং টুং করে নোটিফিকেশন আসতেই ফোনটাকে সাইলেন্ট করে শাড়িটা পরতে শুরু করল সে। শাড়িটা তেমন আহামরি না হলেও একটা আলাদা মাধুর্য আছে। একটা আরাম আছে। ঐশীর মনে হল যেন কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। একটা মিষ্টি গন্ধ সমগ্র শাড়িজুড়ে। এই গন্ধটা গতকাল ডাইরিতেও পেয়েছে সে। শাড়িটা পরে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলে বসতেই অভীকের কল এল।
ঐশী কালকের মতোই হেডফোন লাগিয়ে কলটা রিসিভ করে শুনতে লাগল অভীকের বকবকম। কেন ফোনটা সুইচড অফ রেখেছে? কেন কথা বলছে না? কটার দিকে রেজিস্ট্রি অফিসে আসবে? কোন শাড়িটা পরছে? কটার দিকে পৌঁছতে হবে? অভীকের এরকম হাজার ঘ্যানঘ্যানানি অন্যদিনের মতো অসহ্য লাগলেও আজ ঐশী উত্তর দিল না। সে চুপচাপ সাজাতে লাগল নিজেকে। সেদিন অভীকের মা ওকে যে কসমেটিক্সগুলো কিনে দিয়েছিলেন সেগুলোর একটাও ব্যবহার করেনি সে। এমনকি পুজোর দিনেও না। কসমেটিক্সগুলো তুলে রেখেছিল ওর জীবনের বিশেষ দিনের জন্য, আজকের জন্য। আজ ঐশী আর অভীকের বিয়ে। রজতাভরা ঠিক করেছিলেন অভীক কাজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হলেই ধুমধাম করে বিয়ে দেবেন। পরে ঠিক করেছেন আপাতত রেজিষ্ট্রি ম্যারেজটা করিয়ে পরে নাহয় একটা ছোটোখাটো গেটটুগেদারের আয়োজন করা হবে। সুজাতাকে বলতেই তিনিও রাজি হয়েছেন। ড্রয়ার থেকে লিপস্টিক,মাস্কারা, আইলাইনার, ফাউন্ডেশন, প্রাইমার, একে একে সব প্রসাধনী বের করে নিজেকে সাজাতে সাজাতে ঐশী বলল,“ দশটার মধ্যে পৌঁছে যাস আন্টিকে নিয়ে। বাকি কথা ওখানেই বলব।” বলে ফোনটা কেটে চোখে কাজল পরতে লাগল ঐশী।
সাড়ে নটার দিকে তৈরী হয়ে ড্রইংরুমে বসে ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছিলেন রজতাভ। ব্যাপার কি? অন্যদিন তো এত দেরী হয় না ঐশীর। তাহলে আজ কেন? দু একবার দরজায় নক করেও সাড়া পাননি তিনি। এদিকে ঘড়ির কাঁটা ক্রমশ দশটার দিকে এগিয়ে চলেছে। সোফা থেকে উঠে চঞ্চল হয়ে রীতিমতো পায়চারি করতে লাগলেন রজতাভ। এইভাবে প্রায় পনেরোবার পায়চারি করা মাত্র ঐশীর ঘরের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন রজতাভ। আর ঘুরে দাঁড়ানো মাত্র থমকে গেলেন। এ তিনি কাকে দেখছেন? কোথায় তার সেই দামাল দস্যি মেয়ে ঐশী? যে কথায় কথায় বাপিকে জড়িয়ে ধরত! যে চাপে পড়ে গেলে কাঁদো কাঁদো স্বরে ‘ বাপি!’ বলে ডাকত! এ তো সেই ঐশী নয়! এক মুহূর্তের জন্য রজতাভর মনে হল তার সামনে আর কেউ নয়, ঊর্মিই দাঁড়িয়ে। সেই কাজলপরা হরিণের মতো চোখ, সেই ভঙ্গিমায় শাড়ির কুচি, আচল সামলানো, সেই এক চাহনি। ঐশীর ছেলেবেলায় অনেকে রজতাভকে বলেছিল ঐশীকে নাকি হুবহু ঊর্মির মতো দেখতে। রজতাভ বিশ্বাস করতেন না। হেসে কথাগুলো উড়িয়ে দিয়ে বলতেন 'ধ্যাত! ওসব কিছু হয় না। হ্যা নাকটা আর চোখটা ঊর্মির পেলেও বাকি আর কোনো মিল নেই!' কিন্তু আজ মনে হচ্ছে তিনি এত বছরেও নিজের মেয়েকে ঠিক চিনে উঠতেই পারেন নি। এতগুলো বছর মেয়েকে দেখে এসেছেন কিন্তু এতটা মিল কোনোদিনও লক্ষ্য করেন নি।
ঐশীর ডাকে সম্বিত ফিরল রজতাভর। চমক ভেঙে দেখলেন ঊর্মি নয় তার মেয়ে ঐশীই দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। তাকে শাড়ির কুচিটা ধরে দিতে বলছে। রজতাভ অশ্রুসজল চোখে এগিয়ে গেলেন কুচিটা ধরতে।
রেজিস্ট্রি অফিসে যখন ওরা পৌঁছল তখন পৌনে এগারোটা বাজে। যথারীতি ঐশীর আশঙ্কাকে সঠিক প্রমাণিত করে অভীক তখনও পৌঁছয়নি। রজতাভ ভ্রু কুঁচকে ঐশীর দিকে তাকাতেই ঐশী ফিক করে হেসে ফেলল। তারপর এগিয়ে গিয়ে বসল কাছের একটা বেঞ্চে। রজতাভ পায়ে পায়ে এগিয়ে মেয়ের পাশে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ পর একটা বাইক নিয়ে অভীকের সাথে সুজাতা এসে পৌঁছলেন অফিসের সামনে। ওদের দেখে ঐশীরা উঠে দাঁড়াল। সুজাতা এগিয়ে এসে প্রথমেই ক্ষমা চাইলেন দেরী করার জন্য। জানালেন তারা ঠিক সময় বেরোলেও মাঝপথে অভীকের কিছু জিনিস ছাড়া পড়ে যাওয়ায় আবার ফিরে আসতে হয়। কাজেই দেরী করেই বেরোতে বাধ্য হন তারা। তারপর সকলে মিলে ঢুকলেন অফিসে। সইসাবুদ, মাল্যদান,সিঁদুরদান, আংটি বিনিময়ের পালা সেরে যখন ওরা অফিস থেকে বেরোচ্ছেন তখন বেলা দুটো বাজে। ঠিক হল কাছেরই একটা হোটেলে দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়ে সুজাতা ফিরে যাবেন তাঁর বাড়ি। আর অভীকদের নিয়ে রজতাভ ফিরবেন নিজের ফ্ল্যাটে। আজ রাতটা সেখানে কাটিয়ে কাল ওরা রওনা দেবে জলঢাকায়। আপাতত রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হলেও পরে ধুমধাম করে ওদের রিসেপশনের আয়োজন করা হবে।
(চলবে)
বৃহস্পতিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১
অস্তরাগ সপ্তম পর্ব
রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১
অস্তরাগ ষষ্ট পর্ব
সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব
হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...
-
রেস্তরাঁর ছাদ থেকে অস্তপ্রায় সুর্যর দিকে তাকিয়ে মুখে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন রজতাভ। “কিরে? আর কতক্ষণ?” বলে ঐশ্বর্...
-
“Ladies and gentlemen, may I have your attention please? Thank you! আজ আমরা সকলে এখানে উপস্থিত হয়েছি আমার প্রিয় বন্ধু প্রখ্যাত চিত্রশিল্প...
-
স্টুডিও থেকে গাড়িটা বেরোনো মাত্র ব্যাকসিটে হ্যালান দিয়ে বসল মঞ্জুষা। সারাদিন আজ বড্ড ধকল গেছে। এই সোমবার ওদের সেটে একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে না...