অনুসরণকারী

বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

বসন্তোৎসব



দরজায় টোকার শব্দ পেয়ে অফিসের কলটা কেটে পেছন ফিরে তাকাল পলাশ আর তাকিয়েই একপ্রস্থ চমকে গেল অবশ্য চমকানোরই কথা কারণ যে অর্চি কস্মিনকালেও পাজামা-পাঞ্জাবী পরে না, বিয়েবাড়ী, অনুষ্ঠান মায় দুর্গাপুজোর অষ্টমীতেও হাজারবার বলা সত্ত্বেও পলাশ যাকে পাঞ্জাবী পরাতে পারেনি , সেই অর্চি কিনা পাঞ্জাবী পরে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে!

অর্চি বোধহয় ওর দাদার অবাক হবার কারণ বুঝতে পারল লাজুক হেসে বলল, “না মানে আসলে আমার বাইকটার একটু প্রবলেম দেখা দিচ্ছে কদিন ধরে তাই গ্যারাজে দিয়েছি একটু তোর বাইকের চাবিটা চাইছিলামপলাশ কোনো উত্তর দিল না দেখে অর্চি জিজ্ঞেস করল, “কী দেখছিস? নির্ঘাত খুব বাজে দেখাচ্ছে তাই না? এইজন্যে আমি বার বার করে বলেছিলাম দ্রুতিকে, এই সব পাঞ্জাবী-টাঞ্জাবী ইজ নট মাই টাইপ! এত ঘেরা, এত সাফোকেটিং, গরমও লাগে বেশ তার উপর এই পাজামার ফিতেটা, সো ডিজগাস্টিং! মনে হচ্ছে যেন বড়ো আন্ডারপ্যান্ট রে আছি হিসু পেলে খুলতে খুলতেই তো পড়ে যাবে কত করে বললাম, এর চেয়ে একটা টিশার্ট আর ডেনিম পরে নেব, ঝামেলা কম হবে কিন্তু তিনি শুনলে তো? সোজা ফরমান জারি করে দিল যে আজকের দিনে পাঞ্জাবী না পরলে আর কোনোদিন কথা বলবে না

পলাশ মাথা নেড়ে বলল, “নাহ! এতগুলো বছর যে কাজটা আমি এতগুলো বছর বলে বলে করাতে পারলাম না দ্রুতির এক কথায় সেই কাজ কত সহজে হয়ে গেল দেখছি! মানতে হবে দ্রুতির এলেম আছে

কপট রাগ দেখিয়ে অর্চি বলল, “ভাল হবেনা কিন্তু দা! ইটস সো সাফোকেটিং! তোরা এই সব পরে কাজ করিস কি করে? দেখ না এখনই ঘেমে চান হয়ে যাচ্ছিঅর্চির কথা শুনে কোনোমতে হাসি চেপে পলাশ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এগিয়ে এসে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে অর্চির পাঞ্জাবীর গলার দুটো বোতাম খুলে দিল তারপর হাতা দুটো ভাল করে গুটিয়ে দিল যাতে খুলে না যায় সানগ্লাসটা মাথা থেকে নামিয়ে পরিয়ে দিল চোখে, তারপর একটু পিছিয়ে গিয়ে আপাদমস্তক দেখে বলল, “এবার আয়নায় গিয়ে দেখ কেমন লাগছেপলাশের ঘরের এককোণে রাখা ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে চোখ স্থির হয়ে গেল অর্চির

গলার দিকের বোতামটা খুলে থাকায় যেমন আগের চেয়ে আরাম মনে হচ্ছে, তেমনি খোলা পাঞ্জাবীর আড়াল থেকে উকি মারছে অর্চির গলায় থাকা সোনার চেনটা হাতা দুটোর প্রায় বাহু পর্যন্ত গোটানোয় ফরসা পেশিবহুল বাহুর প্রতিটা খাঁজ, রগ দৃশ্যমান হাত দুটোতে শোভা পাচ্ছে সোনার ব্রেসলেট আর গত পরশু জন্মদিনে পলাশের গিফট করা ব্র্যান্ড নিউ মডেলের ঘড়িটা কাঁচা হলুদ রঙের পাঞ্জাবীতে ওকে দারুণ মানাচ্ছে আয়নার দিকে অর্চি ওরকম হা করে তাকিয়ে আছে দেখে পলাশ হেসে বলল, “কিরে ভালো লাগছে না? না লাগলে বলে দে, আমি অন্য ব্যবস্থা করে দিচ্ছিকথাটা শেষ করার আগেই পলাশ কে জড়িয়ে ধরল অর্চি

- দা! ইউ আর দ্য বেস্ট! আমার পুরো মেকওভার করে দিয়েছিস তুই! আয়নায় দেখে আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না যে এটা আমি নিজেকে দেখেই এই হাল তো

- তো দ্রুতির কি অবস্থা হবে? নে অনেক হয়েছে ঝটপট বেরো নাহলে এরপর দ্রুতির কাছে লেট হবার অজুহাত হিসেবে আমাকে ফাঁসাবি এই নে বাইকের চাবি সাবধানে চালাস আর হ্যা গতবারের মতো সিদ্ধি খেয়ে বমি করে বেহেড হয়ে যদি ফিরেছ পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলবো পরে, নিমের পাঁচন গেলাবো আগে অবশ্য আমাকে পেটাতে হবে না দ্রুতিই তোকে পিটিয়ে নেশা কাটিয়ে দেবে নে পালা শিগগিরি

বলে ড্রয়ার থেকে বাইকের চাবিটা বের করে ছুড়ে দেয় অর্চির দিকে অর্চি সেটা লুফে নিয়ে বলে, “দা তুইও তো আসতে পারিস আমার সাথে বেশ মজা হবে কতদিন হল তুই রবীন্দ্র ভারতীতে যাস নাঅর্চির কথা শুনে হাসিটা নিভে গেল পলাশের কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওর চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে বলল, “না রে, অফিসের অনেক কাজ বাকি সামনেই একটা বড় অ্যাসাইনমেন্ট আছে সেটা নিয়ে বোর্ড মিটিং আছে আজ তা ছাড়া তোর আর দ্রুতির মাঝখানে এসে কাবাব মে হাড্ডি হবার কোনো শখ আমার নেই সো, তুই যা এঞ্জয় ইয়োর ডে।”

অর্চি বলল,”কাম অন দা! দ্রুতি কিছু মনে করবে না, বরং খুশিই হবে তোকে দেখলে চল না দ্রুতি বার বার বলেছে আমরা দুই ভাই একসাথে যাতে আসি কতদিন হল আমরা দুই ভাই মিলে একসাথে আইটিং- যাই না বেশ একটা আউটিং হবে সারাবছর তো কাজেই ব্যস্ত থাকিস তুই, তোর নাগাল পাওয়া যায় না আজ নাকি দ্রুতির বাবা মাও আসবে এই সুযোগে তাদের সাথেও আলাপ করে নিবি

পলাশ মাথা নেড়ে সরাসরি অর্চির দিকে তাকিয়ে বলল, “বললাম না কাজ আছে, যেতে পারবো না আমার তরফ থেকে দ্রুতিকে আর ওর বাবা মাকে সরি বলে দিসবলে খাটে রাখা ল্যাপটপটা নিয়ে বসল পলাশ

অর্চি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রাগ করে “ওকে! অ্যাজ ইওর উইশ! বাই দাবলে বেরিয়ে গেল অর্চি জানে একবার ওর দা যে সিদ্ধান্ত নেয় সেটা থেকে ওকে টলানো অসম্ভব হাজার অনুরোধ, জোর করেও সেই সিদ্ধান্ত থেকে ওকে নড়ানো যাবে না তাই জোর করা বৃথা কিছুক্ষণ পর গেটের কাছে পলাশের বাইকের শব্দ শোনা গেল পলাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজ করতে লাগল৷

মিটিংটা শেষ করে ল্যাপটপে কিছুক্ষণ খুটখাট করার পর ল্যাপটপটা বন্ধ করে ব্যালকনিতে এসে  দাঁড়াল পলাশ৷ একটা সিগারেট ধরিয়ে একবুক ধোঁয়া ছেড়ে ইজিচেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসল৷ আজ দোল, পাড়া-বেপাড়ার সমস্ত রাস্তাঘাট, বাড়ির দেওয়াল, লোকজন সকলে আজ রঙে রঙিন৷ বাতাসে ভেসে আসছে মালপোঁয়ার গন্ধ৷ নির্ঘাত সন্ধ্যাদি ভাজছে৷ এবাড়িতে ছুটির দিন একটু হেভি ব্রেকফাস্ট হয়৷ ব্যালকনি থেকে সিগারেটে টান দিতে দিতে বাইরে তাকাল পলাশ৷  পাঁচিলে ওপারে আবিরের গুঁড়ো উড়ছে৷ আশেপাশের এলাকা থেকে সাউন্ড সিস্টেমে তারস্বরে ভেসে আসছে গান,“রং বরসে…ভিগে চুনরওয়ালী৷” কোথাও বা হাল আমলের গান৷ বাড়ির সামনে পাড়ার কয়েকটা বাচ্চা চিৎকার করছে,“হোলি হ্যা!” চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে বসে রইল পলাশ৷ দশটা বছর, পর পর দশটা বছর কেটে গেল তার জীবন রংবিহীন৷

এই দোলের দিন সে নিজেকে গুটিয়ে রাখে৷ একা থাকতে ভালোবাসে৷ সকলে ভাবে হয়তো রঙে অ্যালার্জি আছে, কেউ ভাবে হয়তো রং খেলতে পছন্দ করে না৷ সে শোনে সবই কিন্তু আসল কারণটা কাউকে বলতে চায় না৷ জানাতে চায় না এই দোলের দিনটায় লুকিয়ে থাকার কারণ৷ জানিয়ে কি লাভ? লোকে হয়তো পাগল বলবে, ন্যাকাপ্রেমী বলবে, হয়তো বলবে বদ্ধ উন্মাদ৷ আর মিডিয়ার কানে গেলে তো কথাই নেই৷ চার পাঁচদিন একই কথা ঘ্যানঘ্যান করে চলবে৷ ফেসবুক, টুইটারে ব্যতিব্যস্ত হবে সকলে, প্রখ্যাত শিল্পপতি পলাশরঞ্জন চক্রবর্তী ও এক অনামী রাজকন্যের কেচ্ছা শুনে কেউ বা মুখ টিপে হাসবে, কেউ বা সরাসরি বিরক্ত করবে ওকে৷ কি দরকার? তার চেয়ে এই একা বেশ আছে৷

দোল, হ্যা এই দোলের দিনটাতেই দেখা হয়েছিল ওর সাথে প্রথমবার৷ দোলের দিনেই নিবেদন করেছিল মনের কথা৷ আর এই দোলের দিনেই…! সকলের কাছে এই দিনটা উৎসবের দিন হলেও ওর কাছে একটা অভিশপ্ত দিন, শোকের দিন, একা হয়ে যাবার দিন৷ প্রথম প্রথম অসহ্য লাগত, মনে হতো সব শেষ হয়ে গেছে৷ সব ধ্বংস হয়ে গেছে৷ নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথাও মাথায় আসতো৷ এমনকি বেশ কয়েকবার চেষ্টা পর্যন্ত করেছে৷ প্রতিবার নিয়তীর অমোঘ নিয়মে মৃত্যুর হাত থেকে সে বেঁচে গেছে বার বার৷ এখনও মনে পড়ে সে দিনের কথাটা৷

******

- এই! একদম না! একদম রং দিবি না আমাকে উল্লুক! তুই জানিস না রং আমার ভালো লাগে না৷ অ্যাই! বললাম না? একদম কাছে আসবি না!

- ওভাবে তো হয় না পেত্নি! থুড়ি হবু পত্নী৷ পতিদেবকে উল্লুক বলিয়াছ শোধ আমি নেবই৷ তাছাড়া আজ তো দোল! শুনিস নি সে গানটা? খেলবো হোলী রং দেব না তাই কখনো হয়? এদিকে আয়! আয় বলছি!

- ভালো হবে না বলে দিচ্ছি পলু! এখনও বিয়ে হয়নি বউ কে নির্যাতন করছ? এর শাস্তি তিনমাসের ব্রেকাপ আর চারমাসের মৌনীব্রত কিন্তু!

বলতে বলতে পেছতে গিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় অহনার৷ ওর সামনে সটান দাঁড়িয়ে পথ আগলে দেয় পলাশ৷ মৃদু হাসতে হাসতে বলে, এইবার নাগাল পাইয়াছি! কোথায় যাবি এবার? পালাবার পথ নেই!বলে এগিয়ে অহনাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে পলাশ৷ অহনার ছটফটানিতেও বিন্দুমাত্র বাহুডোর ছিন্ন হয় না পলাশের৷ বরং অহনাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে৷

“ছাড় লাগছে! পলু লাগছে ছাড়! আহ! পলু!” বলে পলাশের দিকে তাকায় অহনা৷ পলাশ দেখে ব্যথাক্লিষ্ট চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে অহনা৷ চোখে যন্ত্রণার ছাপ, কষ্টের ছাপ স্পষ্ট৷ যে কোনো মুহুর্তে কেঁদে ফেলবে সে৷ ওর এই দৃষ্টিতেও বিন্দুমাত্র গলে না গিয়ে মুখটা এগিয়ে আনে পলাশ৷ ভয়ে, গ্লানিতে, ঘৃনায় চোখ বোঁজে অহনা৷ পরক্ষণেই পলাশের হাতের বন্ধন আলগা হয়ে যায়৷ অহনা টের পায় ওর গালে মৃদু আবিরের স্পর্শ৷ চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে ওর থেকে একটু দুরে দাঁড়িয়ে আছে পলাশ৷

মুখে দুষ্টু হাসি থাকলেও চোখে একটা ব্যথা আর অভয়ের দৃষ্টি৷ পলাশ হেসে বলে, “তোর কী মনে হল? এই নির্জন নিরিবিলিতে তোকে জোর করে আমি…? এই চিনলি তুই আমায়? আমার উপর সামান্য ভরসা নেই? এই তোর বিশ্বাস আমার উপর? শুনে রাখ, পলাশরঞ্জন চক্রবর্তী সব পারে কিন্তু কাউকে জোর করতে পারে না৷ এটাই আমার মাইনাস পয়েন্ট বলতে পারিস৷” বলে একটা  ব্যথাতুর হাসি হাসে পলাশ৷

- আমি মানে ওভাবে…!

- থাক! দোষটা আমারই৷ আমিই বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি৷ সরি!

বলে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে অহনার গালটা মুছতে চায় পলাশ৷ অহনা পলাশের হাত ধরে ফেলে বলে, “ঐ! কি করছিসটা কি?”

- ভুল সংশোধন৷

- থাক করতে হবে না৷ ঠিক আছে৷

- না ঠিক নেই৷ আমারই ভুল৷ এভাবে না বলে জোর করে রং মাখানো উচিত হয়নি৷ সরি, ইস! পুরো গালে মেখে গেছে আবিরটা!

- কিছু ভুল যে সংশোধন করা যায় না স্যার! সেটার শাস্তি ও ক্ষতিপুরণ দিতে হয়৷

- মানে?

- মানে এই যে আপনি এক স্বাধীন উড়ন্ত পক্ষিনীকে শুধু কবজা করিবার চেষ্টাই করেন নাই৷ উপরন্ত তাহাকে বলপুর্বক পোষ মানাইয়া হৃদয়ের রঙে রাঙানোর গভীর ষড়যন্ত্র করিয়াছেন৷ এই অপরাধের ক্ষমা নাই৷ আপনাকে শাস্তি ও ক্ষতিপুরণ দুটোই ভোগ করিতে হইবে৷ কারণ আপনার ষড়যন্ত্র অবশেষে সফল হইয়াছে মহাশয়৷

- মানে? বুঝলাম না পুরো গুগলি গেল৷

- উফ! এই জন্য বলি বঙ্কিমচন্দ্র পড়৷ তোর ঐ চেতন ভগত, জে.কে. রাউলিং সব সময় পড়া বাদ দে৷

- এই হ্যারি পটারকে নিয়ে কোনো কথা নয় হ্যা? নয় তো খুব খারাপ হয়ে যাবে!

- চুপ কর! বাঙালীর ছেলে অথচ শুদ্ধ বাংলা জানে না৷ তোর নাম পলাশরঞ্জন কে রেখেছিল রে? ডাবরলাল দন্তমঞ্জন রাখা উচিত ছিল৷ এই তোর মতো ছেলে-মেয়ের জন্য বাংলার করুণ দশা৷ এই দুহাজার নয়তেই এই দশা হলে তো আগামী দশ বছরে তোরা বাংলা বলাটাই ভুলে যাবি৷ এখনও সময় আছে সব রকমের সাহিত্য পড়তে আমি মানা করছি না কিন্তু বাংলাটাও তো পড়৷

- বাংলায় কী আছে শুনি? ঐ কাকাবাবু, ফেলুদা, ব্যোমকেশ৷ একই কনসেপ্ট৷ হ্যারি পটারে কী আছে জানিস? ম্যাজিক, অ্যাডভেঞ্চার, অ্যাকশন, বন্ধুত্ব সব৷ হ্যারি পটার শুধু বই না আমাদের কাছে ইমোশন৷

- ওরকম বই আমাদেরও আছে৷

- বটে? তা কী নাম শুনি?

- ঠাকুমার ঝুলি৷

- কী?

বলে হ্যা হ্যা করে হাসতে থাকে পলাশ৷ হাসতে হাসতে বলে, তোর ঐ ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর সাথে হগওয়ার্টস এর পেঁচার তুলনা? ক্ষ্যামা দে মা ! আমি…আজ…৷”

- সাধে বললাম ডাবরলাল দন্তমঞ্জন? হ্যা হ্যা করে হেসে মুল টপিকটাই চেঞ্জ করে দিল৷ নাহ! তোর মতো রসকসহীন, বাংলাজ্ঞানহীন প্রেমিককে বিয়ে করে লাভ নেই৷ যা ব্রেকাপ৷

বলে এগোতে যায় অহনা৷ প্রমাদ গুনে সামনে এগিয়ে দাঁড়ায় পলাশ৷

- আরে সাধুভাষায় শুরুটা কে করল? তুই তো জানিস আমি স্লো লার্নার, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছি৷ এমনকি কলেজে, ইউনিভার্সিটিতেও আর্টস ছিল না৷ বি.কম, এম.কম করে সি.এ করেছি৷ স্বপ্নেও যার বাংলা পড়ার চান্স ছিল না সেই ছেলে তোর পাল্লায় পড়ে বাংলা শিখছে, একটু টাইম তো লাগবেই৷ সম্পুর্ণ সাধুভাষা পারি না আমি৷ একটু একটু বলি৷ যাকগে মানেটা বল৷

- বলব না৷ আগে মানেটা নিজে শিখে আয় তারপর কথা হবে৷

 অভিমানে অন্যদিকে তাকিয়ে বলে অহনা৷

- কি রে বলবি না?

- বর্বর কোথাকার৷ সর তো!

- প্লিজ বাবু বলনা! বলে গোবেচারার মতো মুখ করে তাকায় পলাশ৷

পলাশের ঐ মুখ দেখে কোনো মতে হাসি চেপে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অহনা বলে, “According to the section 21 of love constitution যেহেতু তুই আমায় জোর করে রং লাগিয়েছিস সেই জন্য তোকে শাস্তি পেতে হবে৷ আর compensation দিতে হবে৷”

- এই অনা! Constitution of India শুনেছি, I.P.C শুনেছি৷ Love Constitution টা কী রে?

- ধুর! আবার?

- ওকে সরি সরি৷ তা শাস্তিটা কী?

- শাস্তিটা হল, এই যে!

বলে পলাশের পাঞ্জাবীর কলার ধরে ওকে নিজের কাছে টেনে আনল অহনা৷ তারপর পলাশের গালের সাথে নিজের রঙমাখা গাল ঘষে ওর গালটাও রাঙিয়ে দিল৷ ঘটনাটা এতটাই আকস্মিকভাবে ঘটল যে প্রথম কয়েকমিনিট বোমকে গেল পলাশ৷ তারপর বলল, “এটা কী হল?”

- উড়ন্ত পক্ষিনীকে কবজা করিবার শাস্তি৷

বলে চোখ মারল অহনা৷ পলাশ হেসে বলল,

- তো উড়তে মানা কে করেছিল? আর ফেরত আসতেই বা কে বলল?

ছদ্ম দীর্ঘশ্বাস ফেলে অহনা বলল,“কি আর করা যাবে? পক্ষিনীর হৃদয়তেও যে রং লাগিয়াছে৷ খাঁচায় বন্দিনী হবার সাধ জাগিয়াছে৷”

- নাহ এই পাখিকে আর খাঁচায় বন্দি করবো না!

বলে গেয়ে উঠল পলাশ,“যা পাখি উড়তে দিলাম তোকে…৷” অহনা হেসে উঠল গানটা শুনে৷

******

আচমকা আঙুলে ছ্যাঁকা লাগতেই ঘোরটা কাটে পলাশের৷ সিগারেটের আগুন তামাক পুড়িয়ে ফিল্টার জ্বালিয়ে কখন ত্বক ছুঁয়েছে টেরই পায়নি সে৷ অবশ্য এই সামান্য পোড়ায় কিছু যায় আসে না তার৷ ভেতরটাই যার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, এই সামান্য নিকোটিনের আগুন তার কী ক্ষতি করবে? গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচে নেমে আসে সে৷

ঘড়িতে সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে৷ ছুটির দিন বাড়িতে একটু দেরীতেই ব্রেকফাস্ট হয়৷ পলাশ চেয়ারে বসতেই সন্ধ্যাদি প্লেটে খাবার বেড়ে নিয়ে এলেন৷ হুম যা ভেবেছে ঠিক তাই৷ আজ মেনুতে মালপোয়া আছে৷ দুটো মালপোয়া আর একটু চিড়ের পোলাও৷ ধীরে সুস্থে খেতে লাগল পলাশ৷ আজ আর তার তাড়া নেই৷ অনলাইনে মিটিংটা শেষ হবার পরেই ম্যানেজারকে কল করে আজকের সব কাজ ক্যান্সেল করেছে সে৷ ধীরে সুস্থে খেয়ে কাটা চামচ ছুরি প্লেটে আড়াআড়ি রেখে বেসিনে হাত মুখ ধুয়ে আবার উপরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে যায় সে৷

ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে ঘুম চলে আসে তার৷ ঘুমোতে ঘুমোতে মনের মণিকোঠায় রাখা আরেকটা স্মৃতি উঠে আসে তার স্বপ্নে৷

 

******

- এই শোন বিয়েতে কিন্তু তোকে আমি ঔ গরদের ধুতি পাঞ্জাবী পরা অবস্থায় দেখতে পারব না৷

- সেকি রে! ওটা পরেই তো বিয়ে করাটা নিয়ম!

- দুত্তোর! নিকুচি করেছে নিয়মের! তুই পবি না মানে পবি না ব্যস!

- আরিব্বাস! বিয়ের চব্বিশঘন্টা আগে থেকেই বরকে ডমিনেট করছিস! তোর নাম অহনা না রেখে দুর্গেশ্বরী মা ঠাকুরুণ রাখতে হতো৷

- কারণ তোর মতো লাগাম ছাড়া জংলী বর্বর সিংহকে সামলাতে গেলে মা দুর্গাকেই নামতে হবে৷ বুঝলি হতভাগা?

- আচ্ছা বেশ! কিন্তু কারণটা তো বলবি?

- আমার ভালো লাগে না৷

- সেকি? এত কিউট ঘিয়ে কালার৷ বেশ ফুরফুরে আর তুই বলছিস তোর ভালো লাগে না? ওটাতেই তো বর বর ফিলিং আসে!

- রাইট! বর্বর ফিলিং আসে৷ আমার কেমন যেন লাগে৷ যেন সাদা পাঞ্জাবীতে কেউ এক বালতি ঘি ঢেলে লেপে দিয়েছে৷ তার উপর এতটাই ট্রান্সপারেন্ট যে ভেতরের সব দেখা যায় এমনকি ইনার্সও৷ তাছাড়া তুই ঠিক করে ধুতি ক্যারি করতে পারিস না৷ একবার ভাবতো বিয়ে করতে এসে বা বাসর রাতে ধুতি খুলে গেলে কি হবে? আমার, তোর প্রেস্টিজটা কোথায় থাকবে বল দেখি?

- যা শালা! বললাম সাথী, শুনছে হাতি! যাকগে বলছিলাম যে ধুতি আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেবো৷ আর তেমন হলে ভেতরে ইনার্স পরবো না৷ তাহলে তো আপত্তি নেই?

- ইস! ছিঃ! ছিঃ! নির্লজ্জ, বেহায়া, অসভ্য জানোয়ার কোথাকার! হতভাগা ভেতরে কিছু না পলে তো…! ছিঃ! ম্যাগো! তুই মহা অশ্লীল সালা!

- যাত্তারা! নিজের মত জানালাম বলে আমি মহা অশ্লীল? আমার কিন্তু বেশ লাগবে৷ পুরো ফুরফুরে৷

- হতভাগা! তোমার ঐ ফুরফুরে ভাব কুড়কুড়ে করে হাড় জিরজিরে করে দেবো আমি! বলে কিনা…ইস! ছিঃ! ছিঃ! ম্যাগো! তোকে ফোন করাটাই ভুল হয়েছে যা খুশি পরে আয়!

- সেটা মানলে তো ফুল…

- হারামজাদা ফোন রাখ তুই!

- আচ্ছা আচ্ছা মিস লজ্জাবতী হাতে আঁশবটি বেশ গরদ পরবো না৷ তাহলে কোনটা পরবো বল৷

- দাঁড়া ভাবতে দে৷ হ্যা তত্ত্বে যে ময়ুরকন্ঠী রঙের পাঞ্জাবীটা পাঠানো হয়েছে সেটা পরবি৷

- সেকি! ওটা তো বৌভাতের জন্য! ওটা বিয়েতে পরলে বৌভাতে কি পরবো? অবশ্য পরেই বা কি হবে? রাতে তো সব হে হে…! তার চেয়ে আগে থেকে খোলা...৷

- খালি সব সময় ঐ চিন্তা না? বউভাতে কি পরবি বৌভাতের দিন বলবো৷ আগে ঐ ময়ুরকন্ঠী রঙের পাঞ্জাবীটা পরে আসবি৷

- কিন্তু…

- কোনো কিন্তু নয়৷ ঐ পাঞ্জাবী পরে না আসলে বিয়েই করবো না তোকে! কথা দে ঐ পাঞ্জাবীটা পরে আসবি?

- আচ্ছা বেশ! কথা দিলাম৷

 

******

আচমকা ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল পলাশের৷ একটু বিরক্ত হল সে৷ উফ! আজকের দিনেও শান্তি দেবে না এরা৷ ম্যানেজারকে তো বললই আজকের সব কাজ ক্যান্সেল করতে৷ তারপরও… ধু! রিসিভই করবে না৷ মটকা মেরে পড়ে রইল পলাশ৷ কিন্তু ফোনটা ক্রমাগত বাজতে থাকায় বিরক্ত হয়ে ফোনটা না দেখেই ধরল সে, “হ্যালো!

- হ্যালো? দা? আমি অর্চি বলছি৷ সরি জানি তুই বিজি বাট একটা প্রবলেম হয়ে গেছে এখানে৷

ঘুমের ঘোর কেটে গেল পলাশের৷ সে ধড়মড় করে উঠে বলল, “কী হয়েছে? আবার কী করেছিস তুই? সব ঠিক আছে তো? দ্রুতি, ওর বাবা মা ঠিক আছেন তো? তুই ঠিক আছিস তো? তেমন হলে লোকেশন বল আমি আসছি!”

অর্চি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “ইয়ে মানে…মানে…আমার পার্সটা খুঁজে পাচ্ছি না৷” আশেপাশে জোরালো মাইকের শব্দ হওয়ায় কথাটা শুনতে পারে না পলাশ৷ সে বলে ওঠে, “কি?” ফোনের ওপারে এবার দ্রুতির কন্ঠ শুনতে পায় সে৷ দ্রুতি চেঁচিয়ে বলে,হ্যালো রঞ্জনদা? আমি দ্রুতি বলছি! আর বোলো না তোমার এই ঢ্যাড়স ভাইটা কোনো কাজের না৷ অকর্মার ঢেকি একটা! বাইক নিয়ে সেজেগুজে কেত মেরে এসেছেন৷ আসল জিনিসটাই ভুলে মেরে দিয়েছেন৷ পার্স, মোবাইল বাড়িতে ফেলে এখানে পকেটমার বলে চেচিয়ে যাচ্ছে৷ ওখানে আছে নাকি দেখ তো?পলাশ ততক্ষণে অর্চির ঘরে ঢুকে পড়েছে৷ অর্চির ঘরটা ভীষণ নোংরা অপরিচ্ছন্ন হয়ে আছে কিছুক্ষণ খোঁজার পর পলাশ দেখতে পায় ড্রেসিং টেবিলে স্মার্টফোন আর পার্সটা পড়ে আছে৷

তার মানে যখন পাঞ্জাবী নিয়ে অর্চি জেরবার হচ্ছিল তখনই ফেলে গেছে৷ পলাশ পার্স আর স্মার্টফোনটার দিকে তাকিয়ে বলে, “হুম ঠিক আন্দাজ করেছ৷ এখানেই পড়ে আছে৷ হতভাগাটার ড্রাইভিং লাইসেন্সও পার্সে৷ এখন যদি ট্রাফিক পুলিশের খপ্পরে পড়ে…৷”

­- পড়ে না রঞ্জনদা, পড়ে গেছে! বাবু স্টাইল দেখাতে উইথআউট হেলমেট বাইক চালাচ্ছিলেন৷ ব্যস ধরা পড়ে গেছে! এখন কিছুই না দেখাতে পারায় বুনো ষাঁড়ের মতো চেচাচ্ছে৷

কপালে হাত দিয়ে চাপড় মেরে হাসতে হাসতে পলাশ বলে,“তোমরা আছো কোথায়?”

লোকেশনটা জেনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পলাশ৷ কোথায় আজকের দিনটা বাড়িতেই শুয়ে কাটাবে ভাবছিল তা না এখন ছুটতে হবে৷ অর্চিটার উপর রাগ হল পলাশের৷ এত কেয়ারলেস একজন কি করে হতে পারে? নাহ ওকে দুটো কড়া কথা শোনাতেই হবে৷ দিন দিন আদরে আদরে বাঁদর হয়ে যাচ্ছে ভাইটা৷

নিজের ঘরে ঢুকে চেঞ্জ করতে গিয়ে কি মনে হতে কাবার্ড থেকে পাঞ্জাবী বের করতে গিয়ে  ময়ুরকন্ঠী পাঞ্জাবীটা বের করে পলাশ৷ কিছুক্ষণ সেটার দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে৷ পাঞ্জাবীটার রংটা বেশ পাকা৷ এতবছরে একবারও রং বেরোয় নি৷ খুবই সাদামাটা পাঞ্জাবী৷ তবে আসল কারুকাজ টা এর বুকের কাছে৷ সোনালী, সবুজ কলাপাতা, আর সাদা রঙের সুতো দিয়ে অসামান্য কারুকাজ করা বুকের উপর৷ চট করে দেখলে মনে হবে কেউ যেন একটা ময়ুরের পালক আঠা দিয়ে সেটে দিয়েছে বুকের উপর৷ এই পাঞ্জাবীটা পরেই অহনার কথা মতো সে বিয়ে করতে গিয়েছিল৷ এটাকেই অহনা কখনো ময়ুরপঙ্খী কখনো ময়ুরকন্ঠী বলত৷ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাঞ্জাবীটা আবার কাবার্ডে রেখে একটা হাল্কা নীল রঙের পাঞ্জাবী বের করে পলাশ৷ এটাও অহনারই দেওয়া৷ বিয়ের আগে দুর্গাপুজোর সময়৷ এত যে নীল রঙ কেন ভালো লাগত কে জানে? জিজ্ঞেস করলেই বলত,“নীল রঙের একটা আজব নেশা আছে৷ যেটার মাদকতা মুখে বলা যায় না৷ অনুভব করতে হয়৷ও ইয়ার্কি মেরে বলতো,“রূপম ইসলাম জানলে তোকে লুফে নেবে ওর কনসার্টে৷ তারপর গোটা কনসার্টে একটাই গান গাইবে,নীল রং ছিল ভীষন প্রিয়৷”

সাদা ট্রাউজার আর পাঞ্জাবীটা পরে সব জিনিস নিয়ে যখন নিজের ঘর থেকে বেরোল পলাশ তখন সন্ধ্যাদি দুপুরের খাবার তৈরী করছেন৷ পলাশের গলা পেয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে পলাশকে দেখে থমকে গেলেন৷ পলাশ একটু বাইরে বেরোচ্ছে বলতেই আরো অবাক হলেন তিনি৷ পলাশ বলল,“একটু কাজে বাইরে বেরোচ্ছি ফিরতে দেরী হলে আমার খাবার ঢেকে নিজের ভাগের খাবারটা নিয়ে চলে যেও৷ আর ওবেলা আসতে হবে না৷ তোমার ছোটোদাদাবাবুর কল্যানে রাতের খাবার খেয়ে ফিরতে হতে পারে৷ যদি না হয় আমি খাবার নিয়ে ফিরবো৷” জবাবে শুধু মাথা নাড়লেন সন্ধ্যাদি৷ তারপর পলাশ বেরোতেই দুহাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বললেন,“দুগ্গা দুগ্গা! মা তুমি সত্যিই আচো৷ নাহলে যে দাইদাবাবু এত বচ্ছরে কোনোদিনও দোলের দিন বাইরে যায় নি কো সে আজ বাইরে যাচ্চে! এতদিনে ওনাকে সুবুদ্ধি দিয়েচ মা৷ তোমার লীলা বোঝা দায় মা৷ বোঝা দায়৷” বলে আবার প্রনাম করে রান্নাঘরে ছুটে যান সন্ধ্যাদি৷

******

দ্রুতির বলা লোকেশনে পলাশের পৌছতে লাগল ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট৷ জ্যাম না থাকলে আধঘন্টায় ঢুকে যেত৷ পলাশের গাড়ি দাঁড়াতেই অর্চি ছুটে এল গাড়ির কাছে৷ পলাশ গাড়ি থেকে নেমে অফিসারকে লাইসেন্স দেখাতেই তিনি ছেড়ে দিলেন বাইকটা৷ কিন্তু পলাশের জেদে বিনা হেলমেট বাইক চালানোর অপরাধে ফাইন হল অর্চির৷ আর ফাইনটা পলাশই কাটল অর্চিকে হেলমেট কিনতে বাধ্য করে৷ সব হবার পর পলাশ যখন ফিরবে বলে গাড়িতে উঠছে তখনই দ্রুতি এগিয়ে এসে বলল,“ইয়ে মানে রঞ্জনদা, বলছিলাম কি যদি তোমার খুব অসুবিধা না হয়ে থাকে তো প্লিজ একটা কাজ করে দেবে?” দ্রুতি বরাবর পলাশকে রঞ্জনদা ডাকে কারণ ওর মতে পলাশ নামটা নাকি ব্যাকডেটেড ওর চেয়ে রঞ্জনটা নাকি বেশ কুল শোনায়৷

পলাশ গাড়িতে হেলান দিয়ে বলল,“কী কাজ?” দ্রুতি বলল,“একটু আমায় সামনের কফিশপে ড্রপ করে দেবে? না মানে আমার মা, বাবা আর আমার এক মাসি ওখানে অপেক্ষা করছে৷পলাশ ভ্রু কুঁচকে বলল,“আর বাইকটা?”

- ওটা অর্চিই চালিয়ে আনুক৷ আমি আর ওর বাইকে বসছি না৷ কে জানে হতভাগা আবার কোথায় কেস খেয়ে বসে৷ কি লজ্জার ব্যাপার হবে বল তো?

পলাশ হাসি চেপে বলে,“বেশ এস৷”

দ্রুতির কথামতো কফিশপে পৌছতেই দ্রুতি বলল,“আরেকটা রিকোয়েস্ট ছিল৷”

পলাশ হেসে বলল,“আরেকটা? বেশ বল এটাও শুনি৷”

দ্রুতি হেসে বলল,“এতদুর যখন এসেই পড়েছ তখন বাবা মায়ের সাথে দেখা করে নাও প্লিজ দাদা৷ অবশ্য তোমার যদি তেমন দরকারি কাজ না থাকে৷ অর্চিকে আমার ভরসা নেই৷ কে জানে কি ভাট বকে বসবে৷ তাই বলছিলাম প্লিজ ম্যানেজ হিম৷

পলাশ হো হো করে হাসতে হাসতে বলল,“নাহ এবার আমি নিশ্চিন্ত! আমার ভাইটা এতদিনে যোগ্য হাতে পড়েছে৷ সত্যি মানতে হবে শুধু মাত্র মুখের কথায় ভুলিয়ে মানুষকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া একটা আর্ট৷ সকলে সেটা পারে না৷ আর তুমি সেটাই অনায়সে পার৷ এরকম ভাইয়ের বউ পেয়ে আমি নিশ্চিন্ত৷ তুমিই ওকে মানুষ করবে৷ Welcome to the family দ্রুতি! বেশ চল এতদুর যখন এসেছি আলাপটা সেরেই যাবো৷ তার আগে দাঁড়াও অর্চি আসুক নাহলে আবার কনফিউসন হয়ে যাবে বলে গাড়িটা পার্কিং প্লেসে পার্ক করল পলাশ৷ কিছুক্ষণ পর অর্চি বাইক নিয়ে ওদের সামনে দাঁড়াল৷ তারপর বাইকটা পার্ক করে তিনজনে এগিয়ে গেল কফিশপের দিকে৷

কফিশপের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে পলাশ এগিয়ে গেল যেদিকে দ্রুতির বাবা মা আছে সেদিকে৷ দ্রুতি এগিয়ে গিয়ে ওদের বলতেই ওরা উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর পেছন ফিরে পলাশের দিকে তাকালেন৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তে পলাশের মনে হল যেন ওর পায়ের তলার মাটিটা নড়ে উঠল! এগিয়ে আসতেই দ্রুতি আলাপ করিয়ে দিল,“আলাপ করিয়ে দিই৷ উনি আমার মা শিখা ব্যানার্জী, উনি আমার বাবা বিবস্বান ব্যানার্জী আর উনি আমার মাসি অহনা চ্যাটার্জী৷ আর ইনি হলেন অর্চিষ্মান চক্রবর্তী আর ইনি ওর দাদা প্রখ্যাত শিল্পপতি, পলাশ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির মালিক পলাশরঞ্জন চক্রবর্তী৷

পলাশ বেশ বুঝতে পারছে ওর আগমনে দ্রুতির মা আর অহনা বেশ বিস্মিত৷ ওরা ওকে এক্সপেক্টই করেনি৷ ও কি ছাই এক্সপেক্ট করেছিল? সাধে বলে ইতিহাসের বার বার পুনরাবৃত্তি ঘটে। নাহলে এত বছর পর অহনার সাথে এভাবে দেখা হত না পলাশের৷ সেই অহনা যার সাথে সাতপাক ঘুরে জীবন কাটানোর সব স্বপ্ন এক‌লহমায় চুরমার হয়ে গিয়েছিল পলাশের। ঠিক দশবছর‌‌ পর নিয়তী আবার একই পরিস্থিতিতে আবার দাঁড় করিয়েছে দুজনকে৷

চেয়ারে বসে কাষ্ঠ হেসে নমস্কার করল পলাশ৷ তারপর হাল্কা চালে আলাপ চলতে লাগল৷ পলাশ খেয়াল করল তাকে দেখে অহনা প্রথমে অবাক হলেও পরে ব্যাপারটা সামলে নিয়েছে৷ টুকটাক কথা বললেও পলাশের দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে না সে৷ নাকি তাকানোর সাহস পাচ্ছে না? পলাশ মনে মনে ঠিক করল সেও অহনাকে এড়িয়ে চলবে৷

কিন্তু সেটা করতে পারছে কই? অহনাকে দেখার পর থেকে ওর মনে যে ঝড়ের সুত্রপাত হয়েছে সেটা থামার নামই নিচ্ছে না৷ বার বার গুলিয়ে যাচ্ছে সবটা৷ কথার খেই হারিয়ে যাচ্ছে তার৷ নিজেকে প্রাণপণে সংযত করার চেষ্টা করছে পলাশ কিন্তু পারছে কই? দশটা বছর, পর পর দশটা বছর কেটে গেছে কিন্তু যেন মনে হচ্ছে এই তো সেদিনের কথা৷ এই দশটা বছরে এতটুকু পাল্টায় নি অহনা৷ সেই কফির কাপে চামচ নাড়াতে নাড়াতে কথা বলা, দুহাতে কফিকাপটাকে ধরে কফিতে চুমুক দেওয়া, টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে হেসে কথা বলা সেই একই রকমই আছে৷

কিছু পাল্টেছে কি? হ্যা পাল্টেছে৷ আগের অহনার থেকে এই অহনা অনেক বেশী শান্ত৷ সেই ছটফটে, দামাল স্রোতের মতো পাগলপারা অহনা আজ দিঘির জলের মতো শান্ত৷ সেদিনের সেই ছটফটে ভাবটাই নেই৷ বরং আরো বেশী পরিত সে৷ বরাবরই অহনা সাজতো কম৷ হাল্কা লিপস্টিক আর কাজলেই কাজ চলে যেত তার৷ আজও তার ব্যাতিক্রম হয় নি৷ আজও একটু ন্যুড কালারের লিপস্টিক আর কাজলে অপরূপ লাগছে অহনাকে৷ পরনে একটা ময়ুরকন্ঠী রঙের শাড়ি৷ স্টেপকাট চুলটাকে খোপা করে নিয়েছে সে৷ চোখের রিমলেস চশমাটায় একটা ভারিক্কি ভাব ফুটে উঠেছে৷ বাহাতে একটা ঘড়ি আর গলায় একটা চেন ছাড়া আর কোনো অলংকার নেই অহনার শরীরে৷ অথচ এই সামান্য সাজেই তাকে অপরূপ সুন্দরী লাগছে৷

পলাশ না চাইলেও বার বার ওর নজর পড়ে যাচ্ছে অহনার দিকে৷ অহনার মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছে সে৷ দ্রুতির বাবার সাথে কথা বলতে বলতে হাসলেও ওর মন পড়ে রয়েছে অহনার দিকে৷ একথা সেকথার পর ঠিক হল পরশুদিন পলাশরা দ্রুতিদের বাড়ি যাবে৷ কারণ পরশুদিন দ্রুতির জন্মদিন৷ ঠিক হল সেদিনই পাকা দেখা হবে৷ নাম্বার আদানপ্রদানের পর দুপক্ষই বেরিয়ে পড়ল যার যার গন্তব্যের দিকে৷

দ্রুতিরা ট্যাক্সি নেবে জেনে পলাশ ওদের ড্রপ করতে চেয়েছিল৷ কিন্তু মি: ব্যানার্জী জানালেন তাদের কিছু কেনাকাটা আছে বাজারে ফলে একটু দেরী হবে৷ অগত্যা পলাশ হাল ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে এল৷

রাতের বেলা ফোনে টুং করে নোটিফিকেশন আসায় সেটায় চোখ বুলিয়ে অবাক হল পলাশ৷ একটা অজানা নাম্বার। সেটা থেকে মেসেজ এসেছে। এত রাতে কে হতে পারে? ঘুম চোখে হোয়াটসঅ্যাপ অন করে মেসেজটা পড়তেই ঘুম উড়ে গেল পলাশের। সে কিছুক্ষণ থেমে রিপ্লাই দিল,“এত রাতে কী ব্যাপার? এনিথিং সিরিয়াস?”

কিছুক্ষণ পর পাল্টা মেসেজ এল,“তেমন কিছু নয়। কিছু কথা ছিল কাল দেখা করা যাবে কি?”

আরাম করে বিছানার ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে বসল পলাশ। মৃদু হেসে কিছুক্ষণ থেমে রিপ্লাই দিল,“কাল তো সকালে সম্ভব নয়। কারণ অফিসের অনেক কাজ পরে তবে বিকেলে দেখা করা যেতে পারে।”

কিছুক্ষণ পর মেসেজ এল,“ঠিক আছে তাহলে কাল ছটা?” কিছুক্ষণ থেমে পলাশ লিখল,“ঠিক আছে। কিন্তু কোথায়?” জবাব এল,“যেখানে আগে দেখা করতাম।” জবাবে পলাশ একটা থাম্বস আপের ইমোজি পাঠাল ওপ্রান্ত সেটা দেখেই অফলাইন হয়ে গেল। পলাশ নাম্বারটা সেভ করে রাখল। তারপর সাইড টেবিলে ফোনটা রেখে শুয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আকাশপাতাল ভাবতে লাগল,“যেখানে আমরা দেখা করতাম। এমন তো অনেক গুলো জায়গা ছিল অনা যেখানে আমরা দেখা করতাম। এমন কোন জায়গা ছিল না বল তো যেখানে আমরা দেখা করিনি? গোটা কলকাতাই তো ছিল আমাদের দেখা করার জায়গা। প্রিন্সেপ ঘাটে গঙ্গার ধারে বসে থেকে আমরা গল্প করেছি, গড়ের মাঠে এক কোণে বসে তর্ক করেছি, ক্রিসমাসে পার্কস্ট্রিটে পাশাপাশি হাত ধরে হেটেছি, কফি হাউজে ঝগড়া করেছি, দোলে রবীন্দ্রভারতীতে তোকে রঙ মাখিয়েছি, সরস্বতী পুজোতে আমাদের পাড়ায় তোরা অঞ্জলি দিতে আসতি, তোদের পাড়ায় দুর্গাপুজো দেখতে আমি যেতাম। এ শহরের প্রতিটা গলি, প্রতিটা আনাচে কানাচে আমাদের স্মৃতি জড়িয়ে।” ভাবতে ভাবতে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে পলাশের।

******

- কোথায় তুই? সেই কখন থেকে তোকে ফোন করে যাচ্ছি?

- এই তো অলমোস্ট পৌছে গেছি

- আর কতক্ষণ? সেই কখন থেকে আমি দাঁড়িয়ে আছি

- আরে চলে এসেছি দাঁড়া ওই তো তোকে আমি দেখতে পাচ্ছি আরিব্বাস! লাল পেড়ে শাড়িতে তোকে কি দারুলাগছে রে!

- আমিও তোকে দেখতে পেয়েছি ইস! আজকের দিনেও এই জঘন্য কালারের পাঞ্জাবিটা পরেছিস! তোকে না বললাম হলুদ রঙের পাঞ্জাবিটা পরতে?

- আরে ওটাই পরতাম! কিন্তু কী করব বল? বেরোবার সময় কিছুতেই খুঁজে পেলাম না

- তা পাবে কেন? সব সময় কাবার্ডে ওরকম করে জামা কাপড়ের হিমবাহ পুঞ্জিভুত করিয়া রাখিলে ওরকমই হয়

- পুঞ্জি হোয়াট? কিছু শুনতে পারছি না দাঁড়া আসছি

বলে ফোনটা কেটে এগিয়ে যায় পলাশ। একে অপরের হাত ধরে বেশ কয়েকটা প্যান্ডেল ঘুরে একটা রেস্তোরায় বসে দুজনে। কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া ওঠা মোগলাই পরোটা আর কষা কষা ঘুগনি এসে যায় ওদের টেবিলে। সেটাই খেতে খেতে অহনা বলে,“মাকে আমাদের ব্যাপারটা বলেছি৷ মা রাজি হয়েছে৷” পলাশ এক চামচ ঘুগনি মুখে নিয়ে বলে,“তো মা কী বলল?”

- মা তোকে দেখতে চেয়েছে৷

- বেশ তো! কাল তো দশমী তো কালই যাবো তোর বাড়ি৷ কি বলিস? তোর মা ঠিকঠাক জামাই আদর করবে তো? না খুন্তি নিয়ে তাড়া করবে?

বলে হাসতে হাসতে স্যালাডের শশা মুখে নিয়ে চিবোতে থাকে পলাশ৷ অহনা খাওয়া থামিয়ে গম্ভীরভাবে দেখতে থাকে পলাশকে৷ সব কথায় এই ছেলেটা মজা খুঁজে পায়৷ কোনো সিরিয়াসনেস নেই জীবনে৷ থমথমে গলায় অহনা বলে,“পুজোটা শেষ হলেই তোর বাবা-মাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে  আসতে বলেছে৷”

এইটুকু শুনে খাওয়া থামিয়ে অবাক চোখে অহনার দিকে তাকায় পলাশ,“মানে ঠিক বুঝলাম না৷”

- দেখ আমরা ইউনিভার্সিটির গন্ডি পেরিয়েছি বছর তিনেক হল৷ তোর না হয় বাবার ব্যবসা আছে৷ কদিন হল সেটায় জয়েনও করেছিস৷ কিন্তু আমার তো তা হবে না৷ বাবা-মা আমার জন্য ছেলে দেখা শুরু করেছে৷ বেশ কয়েকটা পাত্র বাড়িতে এসে দেখে গেছে আমাকে৷ বাবা এখনো আমাদের রিলেশনের ব্যাপারে জানে না কিন্তু জানতে কতক্ষণ? তাই মা আর দেরী করতে চাইছে না৷

সবটা শুনে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল পলাশ৷ ব্যাপারটা বোঝার পর ওরও ভ্রু কুঁচকে গেছে৷ কোল্ডড্রিঙ্কসের বোতলে চুমুক দিয়ে সবটা শেষ করে একটা ন্যাপকিন দিয়ে ঠোট মুছে অহনার দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল পলাশ,“দেখ এই মুহুর্তে কোনোটাই আমার কাছে ম্যাটার করে না৷ তোর মায়ের চিন্তা, তোর বাবার ইচ্ছে কোনোটাই নয়৷ যেটা সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপুর্ণ আমার কাছে সেটা হল তোর ইচ্ছে৷ এবার বল আসলে তুই কি চাস?”

অহনা পলাশের দিকে তাকায়৷ দেখে পলাশ একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে আছে৷ অহনা ধরা গলায় বলে,“আমাদের এই রিলেশনের ভবিষ্যৎ কোথায় পলাশ? হয় একজায়গায় আমাদের থামতে হবে না হয় এটাকে পরিণতি দিতে হবে৷ এইভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে তোকে বন্ধু বানিয়ে প্রেম প্রেম খেলা খেলতে আর ভালো লাগছে না আমার৷ জাস্ট ভালো লাগছে না৷” পলাশ ন্যাপকিন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ধীর অথচ গম্ভীর গলায় বলল,“আমি কিন্তু এখনো আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না৷ সত্যি করে বল কি চাস তুই?” অহনা মাথা নত করে বলে,“আমি বাঁচতে চাই পলাশ! নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই৷ আর চাই তুই আমায় নিয়ে যাবি যোগ্য মর্যাদা দিয়ে৷ আর বন্ধু হিসেবে তোর সাথে আমার বাড়ি থেকে লুকিয়ে মাথা নত করে বেরোতে চাই না৷ চাই তোর সহধর্মিনী হয়ে তোর সাথে পায়ে পা মিলিয়ে মাথা উচু করে বেরোতে৷”

গম্ভীর গলায় একটা “হুম৷” বলে অহনাকে থামিয়ে দেয় পলাশ৷ চুপচাপ টেবিল থেকে উঠে বেসিনে হাত ধুয়ে নেয়৷ তারপর অর্ধেক বিলটা দিয়ে বাইরে বেরোতে বলে৷ অহনা বোঝে পলাশ ওর মন মতো উত্তর পায় নি৷ ও হয়তো অন্যকিছু শুনতে চেয়েছিল৷ তার মানেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না অহনার৷ পলাশ এই সম্পর্কে ইতি টানতে চাইছে৷ নিজের উপর একটা অদম্য রাগ আর ঘৃণা চেপে বসে অহনার মনে৷ রাগ এই জন্য সে মানুষ চিনতে গিয়ে ঠকে গেছে৷ ঘৃণা এই কারনে যে এত দিন একটা ভুল,জঘন্য মানুষকে ভালোবেসে এসেছে সে৷

চিরকাল পলাশের মতো বড়োলোকের ছেলেরা ওদের ভালোবাসাকে টাইমপাস ভেবে এসেছে৷ তবুও পলাশকে সে অন্যরকম ভাবতো৷ এখন দেখছে পলাশও এর ব্যতিক্রম নয়৷ রাগে ঘৃণায় চোখে জল এসে গেছে তার৷ বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে চোখে মুখে জল দেয় অহনা৷ নাহ আর কিছুতেই কাঁদবে না সে৷ কিসের জন্য কাঁদবে, কার জন্য কাঁদবে সে? ঐ হার্টলেস ছেলেটার জন্য? না কিছুতেই না৷ এত সহজে ভেঙে পড়ার মেয়ে ও নয়৷ পলাশ যদি ভেবে থাকে ওর মতো ছেলের জন্য সে ভেঙে পড়বে, ভিক্ষে চাইবে তাহলেও ভুল ভাবছে৷ ওকে দেখিয়ে দেবে অহনা যে ওকে ছাড়াও সে সুখে থাকতে পারে৷ আজই বাড়ি ফিরে মাকে বলতে হবে কদিন আগে ওকে দেখতে আসা ঐ ছেলেটার কথা৷ কি যেন নাম? হ্যা মনে পড়েছে প্রিয়াংশু৷ ওকেই বিয়ে করবে সে৷

এই সব ভাবতে ভাবতে নিজের টেবিলে এসে পার্স থেকে নিজের ভাগের টাকাটা বিলবুকে রাখতে গিয়ে টিস্যুটার দিকে চোখ পড়ে অহনার৷ নিজের ভাগের টাকার খুচরো পয়সা দিয়ে চাপা দিয়ে রেখে গেছে পলাশ৷ আর সেটা দেখতে পেয়েই সব হিসেব গোলমাল হয়ে যায় তার৷ টিস্যুর লেখাটা পড়ে লজ্জায়, অনুশোচনায় আনন্দে আবার চোখে জল চলে আসে তার৷ টিস্যুটা নিয়ে রেস্তোরার বাইরে বেরিয়ে দেখে কিছুদুরে একটা পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পান কিনছে পলাশ৷

সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াতেই পলাশ বলে ওঠে,“কোথায় যেন পড়েছিলাম নববিবাহিত স্ত্রী ফুলশয্যার রাতে বরকে মিষ্টিপান অফার করে যাতে আগামী জীবনটা সুখময় হয়৷ তুই তো ঝাঁসীর রানী, এসবের ধারেও যাবি না৷ সামান্য চুমু খেতে গিয়ে যে মেয়ে ঠোট কামড়ে, গোছা চুল ছিড়ে দিয়ে বাছা বাছা শব্দ প্রয়োগ করে, সেই মেয়ের থেকে পান পাব এটুকু ভাবাই অনেক৷ যাকগে এই নে বেনারসী পান৷ চুন, খয়ের কম, সুপুরি আর চমন বাহার বেশী৷ খেয়ে নে মুখের সব ঝাল, পেঁয়াজের গন্ধ চলে যাবে৷” বলে পানটা এগিয়ে দেয়৷ অহনা ছলছলে চোখে তাকিয়ে দেখে পলাশ ওর দিকে আর তাকাচ্ছে না৷ হাত বাড়িয়ে পানটা নেয় সে৷ পলাশ পানটা অহনার হাতে দিয়ে হাটতে থাকে৷ অহনা পানটা মুখে নিয়ে চিবোতে চিবোতে পলাশের পেছন পেছন এগোয়৷ কিছুদুর গিয়ে পলাশ পেছনে হাত বাড়াতেই অহনা এগিয়ে সেই হাতটা ধরে৷ তারপর দুজন পাশাপাশি হাটতে থাকে৷ দেবীপক্ষে মাকে দেখতে আসা দর্শনার্থীদের ভীড়ের ঢেউতেও ওদের আলাদা করা যায় না৷

প্রায় ভোরের আগে অহনাদের পাড়ায় থামে পলাশের গাড়িটা৷ অন্যদিনের মতো অহনা গাড়ি থেকে নামে না৷ দুজনে চুপচাপ বসে থাকে সামনের দিকে তাকিয়ে৷ কিছুক্ষণ পর অহনাই নীরবতাটা ভাঙে,“তুই জানতিস আমি আসব?”

পলাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“জানতাম৷”

- এতই যখন জানতিস তাহলে তখন মুখ ফুটে কেন বললি না?

- সত্যি কথাটা বললে অনেকটা ফিল্মি লাগবে৷

- তাও শুনি৷

- সেই সময় আমার কাছে তুই ছাড়া আর তোর ইচ্ছে ছাড়া কিছুই প্রায়োরিটি ছিল না৷ কারণ আমি জানতাম সে সময় তোকে কিছু বলতে গেলে তুই ভাবতিস আমি তোর কথা বুঝছি না, বা হয়তো নিজের ইচ্ছে তোর উপর চাপানোর চেষ্টা করছি৷ আর রাজি বললে ভাবতিস তোর চাপে পড়ে আমি এই বিয়েটা করতে রাজি হচ্ছি৷ তোকে বোঝাতে পারতাম না যে পরিণতি আর শেষ একই ঘটনার সমার্থক নামমাত্র৷ আর একটা সম্পর্ক শেষ না করলে শুরু করব কি করে?

- তাই বলে টিস্যুপেপারে? সো চিপ!

- জানতাম এটাই বলবি৷ বাট ভেবে দেখ ওটা না দেখলে হয়তো আমরা এভাবে বসে থাকতাম না৷

টিস্যুপেপারটা পার্স থেকে বের করে অহনা৷  ভাজ খুলে দেখে সেখানে পরিস্কার করে লেখা,

মাই ডিয়ার পেত্নি,

মাকে বলে দিস নাড়ু,আর মোয়া বানিয়ে রাখতে৷ চতুরঙ্গ বরযাত্রী নিয়ে লক্ষ্মীপুজোয় আসছি লক্ষ্মীকে নিয়ে যেতে৷ 

- ইতি

তোর নাড়ু

ওরফে নারায়নসম হবু বর

 

- কিন্তু যদি টিস্যুটা আমার চোখে না পড়ত? যদি আমি না দেখে চলে যেতাম?

- তাহলে জানতাম আমার ভালোবাসা মিথ্যে৷ জানতাম প্রেম বলে কিছু নেই৷ জানতাম তুই আমাকে বুঝিসই নি৷ যাকগে এমনিতে বলতো আমার বাংলা হাতের লেখা কেমন হয়েছে? হেবি না? রোজ প্র্যাক্টিস করে হেবি খাটতে হয়েছে৷

- ইস! এটা বাংলা? চারটে গ্রামাটিক্যাল ভুল আর অজস্র বানান ভুল, আর বলছিস এটা বাংলা? আমার স্টুডেন্ট হলে তোকে পরীক্ষায় নাড়ু দিতাম রে হতভাগা!

- আরে বাংলা পিএইচডি! বানানে যেতে কে বলেছে? ভাবটাকে বোঝ৷

- আমার বয়েই গেছে৷

- এই তোদের স্যাটিসফাই করা হেভি চাপের! কোথায় লাভ লেটার লিখেছি সেটার প্রশংসা করবি তা না উনি গ্রামাটিক্যাল এরর খুঁজছেন৷ দে এদিকে! তোকে আর পড়তে হবে না৷ দে বলছি!

- দেব না৷ এটা আমার কাছে থাকবে সযত্নে৷ বেগড়বাই দেখলে এটা কাজে লাগবে৷ বুঝলি বর্বর! সরি নাড়ুবর

- তবে রে!

বলে পলাশ কেড়ে নিতে যায় টিস্যুটা৷ অহনা টিস্যুটা লুকোতে যায়৷ দুজনের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়৷ হাতাহাতি করতে করতে ক্রমশ কাছাকাছি চলে আসে দুজনে৷ একসময় দুজনে থমকে যায় একে অপরকে দেখে৷ পলাশ দেখে এই শরৎকালের আবহাওয়াতেও অহনার ঠোটের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে৷ অহনা দেখে নিকোটিনের ছোঁয়াবিহীন পলাশের গোলাপ পাপড়ির মতো রক্তিম ঠোট৷ এই ঠোট আগেও দেখেছে অহনা কিন্তু আজকের মতো এমন মাদকতাময় আহ্বান দিয়ে ডাকে নি পলাশের ঠোটের কারুকাজগুলো৷ ক্রমশ ঠোটের দিকে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট হয় সে৷ ওদিকে পলাশ অহনার ঠোটের উপরে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে৷ আগে অহনাকে অনেক চুমু খেয়েছে সে কিন্তু কই কোনোদিন তো এরকম হয়নি৷ তবে আজ কেন? পলাশের মনে হচ্ছে এই তৃষ্ণার নিবারণ শুধু অহনাই করতে পারে সেও এগিয়ে যায় অহনার ঠোটের দিকে৷

অনেকক্ষণপরে দুজনে ঠোটের এই নিবিড় আকর্ষণের খেলা থামিয়ে সামনের দিকে তাকায়৷ অন্ধকার রাত ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে৷ শুরু হচ্ছে নতুন দিনের৷ সুর্যোদয়ের আলো যেন ওদের কে আশীর্বাদ করছে৷ যেন বলছে,“নতুন জীবনের শুভারম্ভের জন্য অনেক অভিনন্দন৷”

******

 

হ্যালো? কিরে কোথায় হারিয়ে গেলি? কফিটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে৷  আগে খেয়ে নে৷বলে অহনার সামনে তুড়ি মেরে অহনার সব চিন্তার জাল ছিন্ন করে দেয় পলাশ৷ সম্বিত ফিরে বাস্তব জীবনে ফিরে আসে অহনা৷ দেখতে দেখতে দশটা বছর কেটে গেছে৷ কিন্তু মনে হয় যেন এই সেদিনের গল্প৷ গতকাল সন্ধ্যেবেলায় পলাশকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল অহনা৷ পরক্ষণেই সবটা ঠিক করে রাতে মেসেজ করেছিল পলাশকে৷

পলাশের দিকে তাকিয়ে দেখে অহনা৷ এতগুলো বছরেও পলাশ এতটুকু বদলায় নি৷ সেই ঢেউ খেলানো চুল, সেই কথায় কথায় আঙুল মটকানো, পাতলা সরু গোঁফটাতে আঙুল বোলানো, চেয়ারে ধীরে ধীরে পা নাচানো৷ নাহ কিছুই পাল্টায় নি৷ বরং সে পাল্টে গেছে অনেকটা৷ একটা হাই তুলে পলাশ বলল, “কি দেখছিস? বুড়ো হয়ে গেলাম নাকি? তা বলতে পারিস বুড়ো একটু হয়েছি৷ তবে মানতে হবে তুই সে আগের মতোই আছিস৷ ফিগারটা মেনটেন করিস কি করে রে? জিম যাস না ডায়েট? ডায়েট তো হবে না কারণ কফিতে যে হারে চিনি দিয়েছে এরা এটা কফি না কফি ফ্লেবারড পায়েস বোঝা যাচ্ছে না৷ আমারই গা গুলোচ্ছে আর তুই অবলীলায় এটা গলাধঃকরন করছিস৷” বলে হাসে পলাশ৷

অহনা তাকিয়ে দেখে পলাশের হাসিটা৷ সত্যি কথা বলতে ওরও তাই মনে হয়েছিল৷ কফিতে এত চিনি ও জীবনে খায়নি৷ পলাশের রসিকতায় সে মৃদু হাসে৷ তারপর কফিটা চামচ দিয়ে নাড়াতে নাড়াতে বলে,“কেমন আছিস?”

দুদিকে দুটো হাত বাড়িয়ে বলে পলাশ,“যেমন দেখছিস?”

- বিয়ে করেছিস?

- হ্যা, তিনটে বিয়ে আর ছটা বাচ্চা৷

- ভালো৷ কতদিন পর দেখা তাই না?

- হুম তা অনেকদিন তো হবে৷ শেষ কথা হয়েছিল আমাদের বিয়ের আগেরদিন রাতে৷

- জানতে চাইবি না কেন সেদিন পালিয়েছিলাম?

- না৷

- কেন?

- কোনোদিন কি তোর থেকে কাজের কৈফিয়ত চেয়েছি যে আজ চাইব? আমার কাছে তোর চাওয়াটাই সব৷ সেদিনও ছিল, আজও আছে৷ সেই কারনেই তো বার বার জিজ্ঞেস করেছিলাম তুই কি চাস? তবে সেদিন যেটা ঘটেছিল তার ফলে আমার বাবা-মা যেটা ফেস করল সেটা তারা ডিজার্ভ করত না৷ যাকগে বাদ দে৷ পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে কি লাভ? কি বলার জন্য ডেকেছিলি বল৷

মাথা নত করে বলে অহনা,“জানি কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম৷ আমাদের বিয়ের দিন বিকেলে আমার কলেজে জয়েনিং-এর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা এসেছিল৷ একদিকে তোর সাথে সংসার অন্যদিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ডাক৷ আমি কোনদিকে যেতাম বলতো? একবার মনে হল যদি তোর পরিবার আমায় চাকরিটা করতে না দেয়? ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম৷

- বললাম তো কিছু শুনতে চাই না৷ তবে একটা কথা কি জানিস? হাতের উপর হাত রাখা যতটা সোজা, জীবন ভর সেটার সাথে চলা ততটা সোজা নয়৷ সেদিন তোর জন্য বসে থেকে ভালোবাসার থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল আমার৷ আজ সবটা শুনে বাকিটাও মুছে গেল৷ তোর কোনোদিনই আমার উপর বিশ্বাস ছিল না৷ সেই দোলের দিনই হোক, পুজোয় সেই রেস্তরাতেই হোক, বা আজকে এখানেই হোক৷ বিশ্বাস থাকলে পালানোর পরদিনই একটা ফোন করতে পারতিস৷ আর তোকে কে বলল যে বিয়ের পর তোকে আমার ফ্যামিলি চাকরী করতে দেবে না? একবার আমাকে বলে তো দেখতে পারতিস৷ এই কথাগুলো এখন বলা বেকার৷ আর যদি এই কথাগুলো বলার জন্যই ডেকে থাকিস তাহলে বৃথা সময় নষ্ট করছিস৷ তোরও, আমারও৷

বলে উঠতে যায় পলাশ৷ অহনা বলে,“দশটা বছর কেটে গেছে পলাশ৷ এখনও তুই আমাকে ঘেন্না করিস?”

- দশবছর, পনেরো দিন,একুশ ঘন্টা,কুড়ি মিনিট কেটে গেছে অহনা৷ না এতদিন যখন করিনি তখন ভবিষ্যতেও করবও না৷ এখন তোর প্রতি আমার কোনো হার্ড ফিলিংস নেই৷ ফিলিংসই নেই তো হার্ড ফিলিংস আসবে কোথা থেকে? তবে একটাই কথা এটা আমি ডিজার্ভ করতাম না৷ যাকগে যেটা বলছিলি বল!

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে অহনা তারপর থমথমে গলায় বলে,“এই বিয়েটা হতে দেওয়া যাবে না।”

ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লাগল পলাশের৷ তারপর জিজ্ঞেস করল,“কেন?”

- কারণ আমি চাই না দ্রুতি তোদের বাড়িতে বউ হয়ে আসুক৷ আমি চাই না ওরা আমাদের ব্যাপারে জানুক৷ আর আমি চাই না ওরা সত্যিটা জানুক৷

- কিন্তু সত্যিটা যদি জেনে থাকে দুজনে তখন? মানে অর্চি যদি বলে থাকে? ভুলে যাস না দশ বছর আগে অর্চি একটা টিনএজার ছিল৷ ও তোকে দেখেছে, তোর কথা শুনেছে৷ কাল তোকে দেখার পর যদি দ্রুতিকে সত্যিটা বলে থাকে? আজকালকার ছেলেমেয়েরা ভীষটেকস্যাভি৷ আমাদের মতো দিন নেই ওদের৷ এখন হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের সময় সামান্য কথাটা জানতে কতক্ষণ?

- তাহলে তো ব্যাপারটা আরো সোজা হয়ে যাবে৷ দ্রুতি আমার খুব ন্যাওটা৷ ওকে বললেই ও পিছিয়ে আসবে৷

তাই কি?” বলে নিচের দিকে ইশারা করে পলাশ৷ পাশ ফিরে নিচের দিকে তাকিয়ে অহনা দেখে দ্রুতি আর অর্চিও কফিশপে এসেছে৷ একতলায় একটা টেবিলে বসে ওরা৷ চেয়ারে হেলান দিয়ে পলাশ বলে,“শুভ কাজে দেরী কিসের? ওদের ডাকি? বলে ফেল কথাটা৷ তারপর তোরা তোদের রাস্তায় আমরা আমাদের রাস্তায়৷বলে কাটা চামচ দিয়ে কাটলেটটা একটু ভেঙে মুখে দেয় পলাশ তারপর মুখ ব্যাজার করে বলে,“এহে! কফিহাউসের রান্না এত বাজে হয়ে গেছে! অবশ্য ভালো ছিলই বা কবে? সময়ের সাথে সাথে সব নষ্ট হয়ে যায়৷ রেপুটেশন, গুড উইল, ভালোবাসা সব৷  একসময় যেটা দারুণ, অসামান্য লাগতো একটা সময়ের পর সেটা আর আগের মতো আকর্ষণীয় থাকে না৷অহনা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে পলাশের দিকে৷ বোঝার চেষ্টা করে ঠিক কী বলতে চাইছে পলাশ৷

খেতে খেতে পলাশ বলে,“কী হল ডাক ওদেরকে৷ ব্যাপারটা নিয়ে জলঘোলা হবার আগে ক্লিয়ার কর সবটা৷ তবে কারণটা কী বলবি? না মানে দ্রুতি তো জানতে চাইবে যে ওর মাসি কেন এ বিয়েটা হোক চাইছে না৷ কী বলবি? ‘তোমার ভাসুর আসলে শুধু তোমার ভাসুর নয় তোমার এককালের হবু মেসো সে হিসেবে আমি তোমার জা হই তাই এই বিয়েটা করো না৷’ শুনতে কেমন অড, কমপ্লিকেটেড আর ব্যাকডেটেড লাগবে না? আর কী কারণ বলবি? ‘তোমার ভাসুর আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড যাকে বিয়ের দিন আমি ডিচ করেছিলাম৷ হয়তো সে বিয়ের পর বা বিয়ের সময়তেই এর শোধ নিতে পারে অতএব আগেই তুমি এ বিয়ে নাকচ করে দাও৷’ সিরিয়াসলি? সত্যি কথা বলতে এসব কারণ ধোপেই টিকবে না কারণ এসব কোনো কারণই নয়৷ তুই এখানে আমায় ডেকেছিস নিজের গিল্টিটাকে জাস্টিফাই করতে৷ নিজের ভুলের কৈফিয়ত দিতে যাতে নিজের কাছে তুই ক্লিন থাকিস কি তাই তো? লিসেন মিস অহনা চ্যাটার্জী! সেদিন যেটা হয়েছিল সেটার জন্য তোকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারিনি ঠিকই, তবে যদি এটা ভেবে থাকো যে এর শোধ আমি তোমার বোনঝির থেকে নেব, তাহলে বুঝবো এতবছরেও তুমি মানুষ চিনে উঠতে পারনি৷ দ্রুতির পরিচয় আমার কাছে ম্যাটার করে না৷ ওকে আমি আমার ভাইয়ের বউ নয় নিজের বোনের মতো দেখেছি৷” বলে টিস্যু দিয়ে হাত মুছে টেবিলে রাখে পলাশ৷

অহনা মাথা নিচু করে আছে দেখে পলাশ বলে,“সব সময় তুই যা চাইবি তাই সবাইকে শুনতে হবে এমনটা নাও হতে পারে৷ তোর মনে কি চলছে এর সাথে অন্যরা কি চাইছে সেটাও শুনতে হয়৷ দেখ ওদেরকে, কতটা খুশি ওরা৷ কতটা আনন্দে মশগুল৷ ঠিক যেন দশবছর আগের আমরা৷ দ্রুতি আর অর্চির প্রেম চারবছর ধরে চলছে৷ এত বছর পর দুজনের সম্পর্কটা পরিতি পাচ্ছে৷ আর আমাদের শত্রুতার কারনে এই বিয়েটা ভেঙে যাবে এটা হতে পারে না৷ আমরা যেটা করতে পারিনি অন্তত ওদের সেটা করতে দিই৷ আর দাদা হয়ে ভাইকে আরেকটা পলাশরঞ্জন হতে দিতে পারব না৷ কাজেই এ বিয়েটা হবেই৷ আর ধুমধাম করেই হবে৷”

অহনা ভ্রু কুঁচকে তাকায়,“তুই কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছিস?” পলাশ স্থির দৃষ্টিতে অহনার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে৷ অহনা এবার নড়েচড়ে বসে৷ তারপর হেসে বলে,“ওকে চ্যালেঞ্জ অ্যাক্সেপ্টেড! যদি আমি জিতি তাহলে আমাদের জীবন থেকে তোরা দুভাই সরে যাবি৷”

- আর যদি আমি জিতি?

বলে কাটলেটটা শেষ করে টিস্যু দিয়ে মুখ মোছে পলাশ৷ অহনা থমকে তাকায় পলাশের দিকে৷ এতটা কনফিডেন্স ওর নিজের উপর? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অহনা বলে,“তাহলে তুই যা চাইবি তাই হবে৷

- ডান! তাই হবে! বলে অহনার দিকে তাকিয়ে পলাশ বলে,“আমার মনে হয় যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই মিটিং টা ছিল সেটা ক্লিয়ার হয়েছে৷” অহনা মাথা নাড়ে৷ পলাশ“গুড৷” বলে উঠে দাঁড়ায় তারপর নিজের বিলটা দিয়ে চলে যায়৷ অহনা বসে থাকে একা৷

 

******

বিয়ের সাজ কমপ্লিট হবার পর ফোনটা হাতে নিয়ে পলাশ দেখে অহনার মিসড কল৷ পলাশ হাসে৷ উফ আর যেন তর সইছে না মেয়ের! কতক্ষণ লাগবে তা জানতেই হয়তো কল করেছে৷ পলাশ হাসতে হাসতে অহনাকে একটা ফোন করে পলাশ৷ কিন্তু ওপাশ থেকে যন্ত্রমানবী জানান দেয়,“The number you've  dialed  is currently switch off. Please try again later.” একটু ভ্রু কুঁচকে যায় তার৷ আশ্চর্য! দুপুরবেলাতেই তো ফোনে কথা বলল তারা৷ তাহলে এখন আবার কী হল? আবার ফোন করে পলাশ৷ এবারও একই কথা৷ নির্ঘাত ফোনের ব্যাটারির চার্জ শেষ না হয় সাজতে বসেছে৷ এই সময় যাতে কেউ ডিস্টার্ব না করে তাই অফ করে রেখেছে৷ হেসে ফোনটা পাঞ্জাবীর পকেটে রেখে বেরিয়ে পড়ে সে৷

অহনাদের বাড়িতে বরযাত্রীদের বসার ঘরে কিছুক্ষণ বসার পর অহনার দিদি পলাশ কে নিয়ে বিয়ের মন্ডপে বসিয়ে দেয়৷ একে একে সমস্ত রীতিপালনের পর কনের ডাক পড়ে৷ পলাশ এবার একটু নড়ে চড়ে বসে৷ তারপর আড়চোখে তাকিয়ে থাকে যেদিক থেকে অহনা পিড়িতে চড়ে মুখে পানপাতা দিয়ে আসবে৷ কিন্তু কিছুক্ষণ কেটে গেলেও অহনার দেখা পায় না৷ একে একে কনেপক্ষের লোকেরা কনে ডাকতে গেলেও কেউ ফিরে আসে না৷ কোনো সমস্যা হল নাকি? ক্রমশ ঠাকুরমশাইও অধৈর্য্য হয়ে পড়েন৷ অহনার বাবাকে লগ্ন বয়ে যাবার তাড়া দেন৷  অহনার বাবা সেটা শুনে এগিয়ে যান অহনার ঘরের দিকে৷ ততক্ষনে গোটা বিয়েবাড়িতে লোকজনের মধ্যে নানা ধরনের ফিসফাস শুরু হয়েছে৷ পলাশ বুঝতে পারে না এতক্ষণ লাগছে কেন? কিছুক্ষণ পর পলাশের মামা ব্যাপারটা বুঝতে এগিয়ে যান অহনার ঘরের দিকে৷ আচমকা মামার উত্তেজিত কন্ঠস্বর শুনতে পায় পলাশ৷ এবার বাধ্য হয়ে সে উঠে দাঁড়ায়৷ তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় অহনার ঘরের দিকে৷

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটু অবাক হয় পলাশ৷ ঘর ভর্তি লোক অথচ এদের মধ্যে অহনা নেই৷ সকলের মুখ থমথমে৷ পলাশের মামা গজগজ করে চলেছেন,“দেখে নেব সব কটাকে! ইয়ারকি পেয়েছেন? এভাবে আমাদের ঠকানো হচ্ছে! এই ভাবে ডেকে অপমান করার মানেটা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেবো আপনাদের! আপনারা আমাকে চেনেন না! আমি…” পলাশের মামা পলাশকে দেখে থামেন৷ পলাশ বলে,“কি হয়েছেটা কী? এত চেচামেচি কেন? এত দেরী হচ্ছে কেন? অহনা কোথায়?” পলাশের প্রশ্নের কেউ উত্তর দেয় না৷ সকলে মাথা নত করে থাকে৷ প্রশ্নগুলো দেওয়ালে ধাক্কা খেতে থাকে৷ অহনার দিদি এগিয়ে এসে একটা চিঠি ধরিয়ে দেয় পলাশের হাতে৷  চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়ে দেখে পলাশ৷ মুক্তাক্ষরের মতো হাতের লেখা৷ লেখাটা সে চেনে৷ অহনারই হাতের লেখা এটা৷ চিঠিটা পড়ে দেখে পলাশ৷

জীবনের গুরুত্বপুর্ণ সময়ে দুটো দিক এসে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে৷ একদিক কর্তব্যের, অন্যদিক স্বপ্নপুরনের হাতছানির সুযোগের৷ একদিক যেমন ভালোবাসার মানুষের সাথে গোটা জীবন কাটানোর অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আরেকদিকে জীবনের চরমতম সুযোগের আগমন৷ জীবনের এই দোটানায় আমি দ্বিতীয় পথটা বেছে নিলাম৷ আমায় তোমরা ক্ষমা করো৷

- ইতি

অহনা

এসবের মানে কী?” চিঠিটা দুমড়ে মুচড়ে জিজ্ঞেস করে পলাশ৷ অহনার দিদি জানায় অহনার চাকরির কথাটা৷ পলাশ জিজ্ঞেস করে,“এটা আগে বলেননি কেন?” অহনার দিদি বলেন,“আমরাও জানতাম না৷ আজ বিকেলে চিঠিটা এসেছিল৷ অনা চিঠিটা নিয়ে অনেকক্ষণ বসেছিল৷ আমি জিজ্ঞেস করায়কিছু নাবলে চিঠিটা নিয়ে ও রুমে সাজতে বসেছিল৷ তারপর এখন দেখছি…” বলে মাথা নত করেন অহনার দিদি শিখা৷ ততক্ষনে পলাশের বাবাও চলে এসেছেন৷ সবটা শুনে গম্ভীর গলায় বললেন,“বোগাস! অল বোগাস! আপনারা ইচ্ছে করেই এটা করেছেন! আপনাদের মতো লোকদের আমার ভালো করে চেনা আছে৷ নেহাত আপনাদের মেয়েটাকে আমার ছেলের ভালো লেগে গেল৷ নাহলে এই ফ্যামিলিতে আমার ছেলের বিয়ে কিছুতেই দিতাম না৷ পলাশ চলে এসো৷

পলাশের মামা বলে উঠলেন,“এত সহজে আপনারা পার পাবেন না! আপনারা সাপের ল্যাজে পা দিয়েছেন৷ এর ফল আপনাদের ভোগ করতে হবে৷ আজ যে অপমানটা আপনারা আমাদের করেছেন তার চেয়ে দ্বিগুন অপমান আপনাদের সুদ সমেত ফেরত দেব! এমন হাল করব পাড়ায় বেরোতে পারবেন না!” পলাশ খাটে মাথা নত করে বসেছিল৷ ওর বার বার মনে হচ্ছিল অহনা এটা করতে পারল? এইভাবে ঠকাতে পারল? এটা সত্যি না স্বপ্ন? বরাবর এরকম প্র্যাক্টিক্যাল জোক করার অভ্যেস অহনার৷ পলাশ নিজে বেশ কয়েকবার এইরকম জোকসের ফাঁদে পড়েছে৷ এখনও মনে হচ্ছে এটা অহনার প্র্যাঙ্ক৷ সেদিনের সেই রেস্তরার শোধ নিচ্ছে৷ এখনই সকলকে চমকে দিয়ে আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলবে,“কি? কেমন দিলাম?” পলাশ মনে মনে প্রার্থনা করছে তাই যেন হয় যেকোনো মুহূর্তে বেরিয়ে আসুক অহনা৷ একবাড়ি লোক হাসুক তার উপর কিন্তু তাও অহনা বেরিয়ে আসুক৷ কিন্তু ওর হাতে রাখা দোমড়ানো কাগজটা যে অন্য কথা বলছে৷

কিছুক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল পলাশ৷ তারপর বলল,“কিছু করতে হবে না মামা৷ শুধু শুধু দুটো পরিবারের মানসম্মান পাবলিকের সামনে ধুলোয় মিশে যাবে৷ বাদ দাও চল এখান থেকে৷ বাচ্চারা খেয়েছে? অর্চি, নীল, টিয়া এরা খেয়ে নিয়েছে? তাহলে চল৷ বিয়েটাই যখন হল না থেকে কি লাভ? চল৷”

পলাশের মামা বললেন,“তুই চুপ কর ভাগ্নে৷ তোকে নরম মাটি পেয়ে এরা আচড়ে যাবে আর আমি মামা হয়ে সেটা দেখবো? কিছুতেই না৷ ঐ মেয়েটাকেও ছাড়বো না৷ যে চাকরির জন্য তোকে এভাবে সবার সামনে নগ্ন করেছে সেই চাকরিটা ও কি করে করতে পারে সেটাও আমি দেখবো৷”

পলাশ অনেকক্ষণ নিজেকে আটকে রেখেছিল আর পারে না৷ চিৎকার করে বলে ওঠে,“না তুমি কিছু করবে না মামা! তোমাকে আমার দিব্যি! বিয়ের আগেই ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ও কী চায়? তখন বলেনি, আজ বলেছে৷ আমার উচিত ওর মনের ইচ্ছে কে সম্মান করা৷ এখানে তুমি কিছু করবে না৷ যদি করো তাহলে আমি নিজেকে শেষ করে দেবো! মনে রেখো তোমরা! আমার কিছু হলে যায় আসবে না কিন্তু ওর একচুল ক্ষতি হলে সহ্য করতে পারব না৷ ওর ক্ষতি করতে চাইলে আমাকে চিতায় তুলে তারপর যা করার করবে তোমরা!” পলাশের এই কথাগুলো যেন হাহাকারের মতো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে৷ পলাশের মামা বিস্মিত হয়ে বলেন,“কিসব বলছিস তুই ভাগ্নে?”

- না মামা ও জঙ্গলের স্বাধীন পাখি৷ বনের মুক্ত ঘোড়া৷ জেনে বুঝে জোর করে আটকে রাখতে চেয়েছিলাম৷ ও থাকতে চাইনি তাই চলে গেছে৷ এতে ওর দোষ কোথায় বলো তো? আমিই মুর্খ, যে ওর সাথে সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিলাম৷ যাকগে বাদ দাও চলো এখান থেকে৷ এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না, লোবলে ঘর থেকে বেরিয়ে টোপরটা পা দিয়ে মাড়িয়ে বিয়েবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে পলাশ৷

বাড়ি ফিরে এসে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায় পলাশ৷ শাওয়ারটা চালিয়ে দেয় যাতে কেউ ওর কান্নার শব্দ শুনতে না পারে৷ শাওয়ারের জলে ভিজে যায় ওর বিয়ের পোশাক, ফুলের মালা সব৷ একটানে ছিঁড়ে ফেলে মালাটা৷ শাওয়ারের জলে মিশে যায় ওর চোখের জল৷ কাঁদতে কাঁদতে নতজানু হয়ে বসে পলাশ৷ দুহাতে মুখ টিপে কাঁদতে থাকে যাতে ওর কান্নার শব্দ বাইরে না বেরোয়৷

******

ঘড়ির অ্যালার্মে ঘুমটা ভেঙে যায় পলাশের৷ বিছানায় উঠে বসে সে৷ ঘুমচোখে তাকিয়ে দেখে ভোর চারটে বাজে৷ এখনও সুর্যোদয় হয় নি৷ আড়মোড়া ভেঙে খাট থেকে নেমে বাথরুমে ঢোকে পলাশ৷ আজ অনেক কাজ বাকি আজকে শুয়ে বসে কাটালে চলবে না৷ কারণ আজ যে অর্চির বিয়ে! নয় নয় করে প্রায় চার মাস কেটে গেছে সেদিনের পর৷ কথাবার্তা পাকা হয়ে গিয়ে সব ঠিক করতে করতে এই কটা দিন কোথা থেকে কেটে গেল টেরই পায় নি পলাশ৷

বাথরুম থেকে একেবারে স্নান সেরে বেরোল পলাশ৷ তারপর দরজা খুলতেই দেখল বাড়ির মহিলারা উঠে বসেছে৷ তারা অর্চিকে দধিমঙ্গলের দইচিড়ে খাওয়ানোর তোরজোর শুরু করে দিয়েছে৷ সন্ধ্যাদি দইচিড়ে মেখে দিয়েছে৷

বাইরে বেরোতেই পলাশ কে ছেকে ধরল সকলে৷ অর্চিকে নাকি ঘুম থেকে তোলা যাচ্ছে না৷ সে ছেলে নাকি এখনও ঘুমোচ্ছে৷ সব শুনে হাসতে হাসতে পলাশ এগিয়ে গেল অর্চির ঘরের দিকে৷ লোকে ঠিকই বলে,‘যার বিয়ে তার হুশ নেই পাড়াপড়শীর ঘুম নেই৷’ অর্চির ঘরের দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে হাকডাক করতেই চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলল অর্চি৷

- কি ব্যাপার? এত রাতে হাকডাক কীসের? ইজ এনিথিং রং?

হাসতে হাসতে পলাশ বলে,“নাথিং ইজ রং৷ পালন করতে হবে সাম ওয়েডিং রিচুয়াল মেড ইন বং৷”

- ও কাম অন দা! ভোর সাড়ে চারটে বাজে! এখনও সুর্য ওঠেনি৷ প্লিজ আমায় ঘুমোতে দে৷ কাল সকালে করবো৷

বলে দরজা লাগাতে যাচ্ছিল অর্চি৷ তার আগেই পলাশ ঘরে ঢুকে অর্চিকে বলে,“না না এখন ঘুমোলে চলবে না৷ সুর্য ওঠার আগে দইচিড়ে খেতে হবে৷ তারপর তুই যত খুশি ঘুমো কেউ দেখবে না৷ তেমন হলে আজ বিকেলে বিয়েতেও ঘুমোস৷ আমি প্রক্সি দেবো পাশে বসে৷ হতভাগা! আজ তোমার বিয়ে আর তুমি ঘুমোতে চাইছো? এই সবকটা ওকে নিয়ে যাও দেখি৷

মহিলামন্ডলী অর্চিকে নিয়ে যেতে এগোতেই অর্চি বলে উঠল,“ওয়েট বিয়ের দিন ঘুমোতে পারবো না এমন রিচুয়ালস ও আছে? আর কী বললি? সকাল সকাল দইচিড়ে খেতে হবে? দা, আর ইউ কিডিং মি?”

- নো কিডিং, ওনলি ফিডিং৷ আজকের দিনটা একটু অ্যাডজাস্ট করতে হবে অর্চি৷ আমিও এ ব্যাপারে নিরুপায়৷

- বাট দা দইচিড়ে? তাও আবার সকাল সকাল? অ্যাসিডিটি হবে তো!

পলাশ মাথা নেড়ে মুখে আঙুল দেয়৷ মানে এই ঘরোয়া বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে সে অপারগ৷ মহিলারা অর্চিকে টানতে টানতে নিয়ে যায় নিচে৷

অর্চির গায়ের হলুদ নিয়ে যখন দ্রুতিদের বাড়ির সামনে পলাশের গাড়ি দাঁড়াল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে৷ গাড়ি থেকে একে একে সকলে নেমে যাবার পর গাড়িটা কাছেই পার্ক করে নামল পলাশ৷ পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল দ্রুতিদের বাড়ির দিকে৷ ততক্ষনে বাড়ির মেয়েরা অর্চির গায়ে ছোঁয়ানো হলুদ দ্রুতির গায়ে মাখছে৷ পলাশ বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল৷ হঠাৎ পেছনে শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়াল৷

ট্রে তে করে কোল্ডড্রিঙ্কসের গ্লাস নিয়ে অহনা দাঁড়িয়ে আছে৷ ইশারা করতেই পলাশ একটা গ্লাস তুলে নিয়ে দেখতে থাকল অনুষ্ঠানটা৷ অহনা পাশে দাঁড়িয়ে সেদিকে তাকিয়ে বলল,“তাহলে বিয়েটা হচ্ছেই৷” পলাশ অহনার দিকে না তাকিয়ে বলল,“কোনো সন্দেহ আছে?” অহনা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল৷

এই চার মাসে অহনা কম চেষ্টা করেনি বিয়েটা ঠেকানোর৷ কিন্তু পলাশ নিজের বুদ্ধি দিয়ে বার বার অহনার সব পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে৷ এত কিছুর পরও পলাশ এটা বুঝতে পারেনি অহনা বিয়েটা কেন হতে দিতে চাইছিল না৷ কোল্ডড্রিংক্স শেষ করার পর খালি গ্লাসটা অহনাকে ফেরত দিয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছল পলাশ৷ তারপর পাশ ফিরে দেখল অহনা তখন রুমালটার দিকে তাকিয়ে৷ এই রুমালটা ওর ভীষ চেনা৷ ওদের বিয়ের আগের সরস্বতী পুজোর দিন এই রুমালটা কিনে দিয়েছিল পলাশকে৷ এই রুমালটা এখনও সযত্নে রেখেছে পলাশ? পলাশ হেসে বলে,“অনেক বেলা হয়েছে৷ এখন আমি গেলাম রে সন্ধ্যেবেলা আসবো বরকে নিয়ে৷” অহনা বলে,“দুপুরবেলা এসেছিস যখন কিছু মুখে দিয়ে যা৷” পলাশ হেসে বলে,“ওবেলা কবজি ডুবিয়ে খেয়ে যাবো৷” তারপর বেরিয়ে যায় পলাশ৷

বিকেলবেলা কনে সাজানোর লোক এলে দ্রুতিকে ঘুম থেকে তুলে দেয় অহনা৷ তারপর নিজের ঘরে ঢুকে আলমারি থেকে রানি কালারের শাড়িটা বের করে৷ সেটা পরে সাজতে বসে সে৷ সাজ শেষ করার পর ঘর থেকে বেরিয়ে দ্রুতিদের ঘরে রাখা খোঁপায় দেওয়ার জন্য ফুলের গোছা থেকে একটা গোলাপ বের করে চুলের খোঁপায় দেয়৷ তারপর দ্রুতির ঘরে বসে দ্রুতির সাজানো দেখতে থাকে সে৷ সাজ শেষ করে মেকাপ আর্টিস্টরা ওদের টাকা বুঝে নিয়ে চলে যায়৷ দ্রুতি অহনার পাশে এসে বসে ৷

কি রে? ফিলিং নার্ভাস?” অহনা হেসে বলে৷ দ্রুতি মাথা নাড়ে৷ অহনা হেসে বলে,“দুর পাগলী! এতে টেনশন করার কিছু নেই৷ প্রথম প্রথম এরকম মনে হয় পরে বিয়ের সময় বরকে দেখে সব টেনশন উধাও হয়ে যায়৷ অবশ্য অর্চির যে তোর চেয়েও অবস্থা দুর্বিষহ তা আমি চোখ বুঁজে বলতে পারি৷এটা শুনে দ্রুতি ফিক করে হেসে ফেলে৷ তারপর বলে,“আচ্ছা মাসি! তুমি তো কোনোদিন বিয়ে করোনি তাহলে এতসব জানলে কি করে? কি করে বুঝলে আমি নার্ভাস?”

জবাব দিতে গিয়েও থমকে যায় অহনা৷  কি বলবে সে? সত্যিটা বলবে? নাকি মিথ্যে৷ এমন সময় বাইরে শোরগোল শোনা যায় বর এসে গেছে৷ বাইরে থেকে ব্যান্ডপার্টির সুর ভেসে আসে৷ দ্রুতি উঁকি মেরে দেখে বরযাত্রীরা গানের তালে তালে নাচছে৷ এমন কি অর্চিও৷ অর্চিকে নাচতে দেখে খিলখিল করে হেসে ওঠে দ্রুতি৷ অহনাকে ডাকে দেখার জন্য৷ অহনা বাইরে বেরিয়ে অর্চির নাচ দেখে হাসে কিন্তু ওর চোখ খুঁজে চলে আরেকজনকে৷ কোথায় সে?

কনের ডাক আসার পর চারজন এসে পিড়ি সমেত দ্রুতিকে তোলে৷ অহনা পাশে পাশে নার্ভাস দ্রুতিকে সাহস দিতে দিতে ছাদনাতলায় আসে৷ সাতপাক ঘোরানোর পর শুভদৃষ্টির সময় পলাশকে দেখতে পায় অহনা৷ ঐ তো অর্চির পাশে দাঁড়িয়ে৷ ও কি এতক্ষণ এখানেই ছিল? তাহলে ওর নজরে পড়েনি কেন? শুভদৃষ্টির পর মালাবদলের সময় ছেলেরা দ্রুতির পিড়ি উপরে তোলে৷ শুরু হয় বর বড় না বউ বড় খেলা৷ ছেলেরা অর্চিকে উপরে তুলে ধরে৷ এতে দুজনের উচ্চতা সমান সমান হওয়ায় কোনো মীমাংসা হয় না দেখে বাধ্য হয়ে এগিয়ে আসে পলাশ৷ আর ওকে দেখে হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে যায় অহনার৷ ময়ুরকন্ঠী পাঞ্জাবীর হাতা কনুই পর্যন্ত গুটোনো৷ ডানহাতের স্মার্ট ফোনটা পাঞ্জাবীর পকেটে ঢুকিয়ে অর্চিকে কাঁধে তুলে নেয় পলাশ৷ প্রায় ছফুটের মতো লম্বা চেহারার পলাশের কাঁধে অর্চি বসায় ছেলেরা নাগাল পায় না তার৷ তারা দ্রুতিকে নামাতে গেলে ঝট করে বসে পড়ে পলাশ, অর্চি হঠাৎ নেমে আসে দ্রুতির কাছে আর সেই সুযোগে দ্রুতি ছুড়ে দেয় মালাটা৷ মালাবদল সম্পন্ন হয়৷ অর্চিকে নামিয়ে সরে আসে পলাশ৷

এককোণে দাঁড়িয়ে হাফাতে থাকে সে৷ অনেকদিন জিম যাওয়া হয় নি৷ এরকম হুট করে ওজন তোলার অভ্যেসও নেই তার৷ আচমকা অর্চিকে তোলার পর শরীরটা কেমন যেন করছে৷ এমনিতেও কাজের চাপে সারাদিন খাওয়া হয় নি৷ তাই হয়তো একটু দুর্বল লাগছে৷ মাথাটা যেন টলছে৷ পেছনে গিয়ে একটা চেয়ারে ধপ করে বসে সে৷ এমন সময় পাশ থেকে একজন জলের বোতল এগিয়ে দেয়৷ তাকিয়ে দেখে অহনা বোতল হাতে দাঁড়িয়ে৷ অহনা ইশারা করে বোতলটা নিতে৷ পলাশ জলের বোতলটা নিয়ে মুখে ঠেকাতেই বোঝে এতে গ্লুকোজ মেশানো৷ একঢোকে পুরোটা শেষ করে দেয় সে৷ অহনা পাশে বসে বলে,“অভ্যেস যখন নেই তখন এরকম হিরোগিরি মারতে যাস কেন? সব সময় বীরত্ব জাহির করা ভালো না৷ বয়স হয়েছে৷ এই বুড়ো বয়সে আর হুড়যুদ্ধ না করলেই নয়?” পলাশ জল খেয়ে উঠে দাঁড়ায়,“আমি ঠিক আছি৷ আমার জন্য ভাবতে হবে না৷” বলে এগিয়ে যায় মন্ডপের দিকে৷

অহনা বসে বসে ভাবে,“ঠিকই তো! এখন তো তোর জন্য ভাবার অনেক লোক আছে৷ আমিই কেন তোর পেছনে ছুটছি বলতো? তোর সাথে যা করেছি তার জন্য এ শাস্তি আমার প্রাপ্য তাহলে আজ আমার এত কষ্ট কেন হচ্ছে? কেন বার বার মনে হচ্ছে শোধটা তুই দ্রুতির থেকে না আমার থেকে নিচ্ছিস? সেদিন তোকে আমি ফোন করেছিলাম পলু৷ পাইনি তোকে৷ আমার হাতে সময় কম ছিল সেদিন৷ দেরী হলে তোর সাথে বিয়ে করে সুখী হতাম ঠিকই কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটাকে পায়ে মাড়িয়ে দিতে হতো৷ তুই তো জানিস আমার স্বপ্ন আর তোর মধ্যে বাছতে হলে আমি স্বপ্নকেই বাছবো৷ তুই তো জানতে চেয়েছিলি আমি কী চাই? তাহলে আজ এরকম ব্যবহার কেন পলু? নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটে আনন্দ পেয়েছি ঠিকই৷ কিন্তু শান্তি পাইনি রে! আমি জানি তুইও জ্বলেছিস আমার জন্য কিন্তু আমি যে নিরুপায় ছিলাম! খাঁচার ভেতর থাকার জন্য আমার জন্ম হয় নি৷ আমার জন্ম হয়েছে খোলা আকাশে ওড়ার জন্য৷ কেউ বুঝুক না বুঝুক আমি ভেবেছিলাম তুই বুঝবি৷ কিন্তু আমাকে ভুল প্রমান করে দিলি তুই৷ তুইও আমাকে ভুল বুঝছিস! ফাঁসীর আসামীকেও আত্মপক্ষসমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয় তুই তো আমার কোনো কথাই শুনতে চাইছিস না! ঠিক আছে৷ তুই যদি এই ভুল বোঝাবুঝি নিয়েই থাকতে চাস৷ তাহলে তাই হোক৷ আমি আর ভুল ভাঙাবো না!” বলে চোখ মুছে মন্ডপের সামনে এসে দাঁড়ায় অহনা৷

দ্রুতিদের কুসুমডিঙ্গে বা যজ্ঞাগ্নিতে খই অঞ্জলী হবার পর বরযাত্রীরা একে একে খেতে বসে৷ পলাশও বসে পরে তাদের সাথে৷ খাওয়া দাওয়া হবার পর দ্রুতিদের বাড়ির ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায় পলাশ৷ এমনিতে সিগারেট খুব কম খায় সে৷ যেদিন বেশী টেনশন থাকে সেদিন খায়৷ কয়েকটা টান দিতে না দিতেই পেছন থেকে অহনার কন্ঠ ভেসে আসে,“সিগারেটও ধরা হয়েছে? দিনে কটা?” পেছন না ফিরে পলাশ জবাব দেয়,“একটা৷”

অহনা রেলিং এর সামনে দাঁড়িয়ে বলে,“এই কারনেই হাপানি ধরেছে৷” বিরক্ত হয়ে পলাশ বলে ওঠে,“তাতে তোর কি? আমার যা খুশি হোক ! আমি মরে গেলেও তো তোর কিছু যায় আসে না৷ তাহলে এত কনসার্ন কেন? কোন অধিকারে আমার পিছু পিছু ঘুরছিস? তুই আমার কে হোস?  এতবছর পর আলগা পিরিত মারাতে এসেছে শালা স্বার্থপর!” শেষ কথাটা বিড়বিড় করে বলে সিগারেটটা শেষটান দিয়ে ফেলে ছাদের দরজার দিকে এগিয়ে যায় পলাশ৷

অহনা ছলছল চোখে তাকায় পলাশের চলে যাবার দিকে৷ ঠিকই তো পলাশ ওর কে হয়? কেন ওর জন্য কনসার্ন ও? কোন অধিকারে ওর এত খেয়াল রাখছে ও? ঠিকই বলেছে পলাশ৷ ও স্বার্থপরই! সারাজীবন জেতার নেশায় আর নিজের মনের কথা শোনাতেই সে ব্যস্ত থেকেছে৷ কোনোদিনও সে কারো পরোয়া করেনি৷ তবে আজ কেন পলাশের পরোয়া করতে তার মন চাইছে?  কেন মন চাইছে পলাশ বুঝতে পারুক ওকে? কেন সেই কফিহাউজে দেখা করার সময় থেকে সে চেয়েছে পলাশ ওকে বকুক, কথা শোনাক, অপমান করুক, কিন্তু ওকে ছেড়ে না যাক? কেন পলাশের এই শীতল উপেক্ষার ব্যবহার আর নিতে পারছে না সে? কেন? কেন এরকমটা হচ্ছে? মনে হচ্ছে যেন সব শেষ হয়ে যাচ্ছে৷ পলাশের কাছে হেরে গিয়ে কেন কোনো কষ্ট হচ্ছে না তার? হেরে যাওয়াতেও যে এত সুখ কে জানতো?

একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে সে বলে,“কনগ্রাচুলেশন!” পলাশ থমকে দাঁড়ায় দরজার সামনে৷ তারপর পেছন না ফিরেই বলে,

- কীসের জন্য?

- চ্যালেঞ্জটা জেতার জন্য৷ এই প্রথমবার কারো কাছে হারলাম আমি৷

- তা কেমন লাগছে হেরে?

সেটার জবাব না দিয়ে অহনা বলে,“চ্যালেঞ্জের শর্ত অনুযায়ী তুই যা চাইবি তা করতে, দিতে আমি বাধ্য৷ বল কি চাস?”

- যা চাইবো দিবি?

- হ্যা দেব?

- দিতে পারবি তো? পরে পিছিয়ে আসবি না তো?

- চেয়েই দেখ না৷

- বেশ!

বলে অহনার দিকে এগিয়ে এসে দশ কদম দুরে দাঁড়ায় পলাশ, তারপর গাঢ়স্বরে বলে,“সরি বল৷

অহনা চমকে তাকায় পলাশের দিকে৷ অবাক গলায় বলে ,“কেন?”

- যে কারনে তুই দ্রুতি আর অর্চির বিয়েটা ভাঙতে চেয়েছিলি সেই জন্য৷ আমাকে বিশ্বাস না করে সেদিন একা করে চলে যাবার জন্য৷ এতবছর নিজের সাথে আমাকে জ্বালানোর জন্য৷

বলে পলাশ সরাসরি তাকায় অহনার দিকে৷ অহনা আর পারে না হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে৷

পলাশ হেসে বলে,“আমি এতদিন বুঝতে পারিনি ঠিক কোন কারনে তুই বিয়েটা হতে দিতে চাসনি৷ আজ দুপুরে তোর সাথে কথা বলার সময় তোর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছি৷ তোর চোখটাই সব বলে দিয়েছে আমায়৷ আসলে তোর ভুলটা কোথায় জানিস? তুই সবসময় ভাবিস তোকে কেউ বোঝে না৷ তাই নিজের চারদিকে একটা দুর্ভেদ্য কবচ তৈরী করে নিজের মনের মতো চলতে থাকিস৷ আর এতে তোর আশেপাশের লোকের সাথে ক্ষতিটা তোরও হয়৷ কারণ তুই সব কিছু তাড়াতাড়ি পেতে চাস৷ সম্মান, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব সবটা৷ সব সময় তুই ঘোড়ায় জিন লাগিয়ে বসে থাকিস৷ এটা ভাবিস না যে যাকে তুই ভালোবাসছিস তার থেকে পালটা ভালোবাসা ফেরত পেতে হলে অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই৷ সত্যি বলতে গেলে তোর ডিক্সনারীতে অপেক্ষা শব্দটাই নেই!  সেদিন তোর মিসড কলটা দেখার সাথে সাথে কল করেছিলাম তোকে কিন্তু তুই ভুল বুঝে ফোনটাকে সুইচ অফ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলি৷ একবারও ভাবলি না আমাদের এই রিলেশনটার কথা৷ একবারও অপেক্ষা করলি না আমার কলের৷ সেই ভুলের মাসুল দুজনে আজও দিচ্ছি৷ দুজনের সারাদিন ব্যস্ততায় কর্মমুখর হয়ে দিন কাটলেও দিনের শেষে আজও একা আমরা৷ একই সরলরেখায় দাঁড়িয়ে৷ এতগুলো বছর এল গেল অথচ আমরা আমাদের বিকল্প মনের মানুষ খুঁজে পেলাম না৷ একে অপরের জন্য জ্বলে পুড়ে মরলাম৷

অহনা তখনও দাঁড়িয়ে ফোঁপাচ্ছে দেখে পলাশ বলে,“এখন আর কেঁদে কি হবে? আমাদের জীবনের দশটা বছর ফিরে আসবে? না আসবে না৷ যা গেছে একেবারে চলে গেছে৷ সেটা ফেরত আনার উপায় আর নেই৷ তবে একটা পথ আছে৷”

অহনা ধরা গলায় বলে,“কী?”

- সেই উপায় যেটা সেদিন কফিহাউজেই করলে হয়তো, হয়তো কি অবশ্যই সবটা আবার ঠিক করার কথা ভাবা যেত৷ সেদিন এত কৈফিয়ৎ দিলি৷ এত কথা বললি, একবারও মুখ ফুটেসরি পলুবেরোল না৷ সেদিন থেকে তোকে আমি ফলো করেছি৷ সেদিন থেকে প্রতিনিয়ত তোর চোখ ক্ষমা চাইছে আমার কাছে৷ চ্যালেঞ্জটায় জেতায় আমার চেয়ে বেশী খুশি তোর চোখে ধরা দিয়েছে৷ কিন্তু একবারও মুখ দিয়ে এই একটা কথা বেরোচ্ছে না৷ কারণ? তোর ফেমিনিস্ট ইগো৷ তোকে আমি মজ্জায় মজ্জায় চিনি৷ তোর বুক ফাটবে তবু মুখ ফুটবে না৷ আচ্ছা একবার সরি বলতে দোষ কোথায় বল তো? এতটাই কি কঠিন এই কথাটা বলা? এতে আমরা কেউ ছোটো-বড় হব না৷ ভুল করেছিস সেটা অ্যাডমিট করেছিস, ক্ষমা চাইতে দোষ কোথায় বলতে পারিস? একবার, শুধু একবার ক্ষমা চেয়ে দেখ, তোর উপর যত অভিযোগ আছে সব ভুলে যাবো৷ তোর মুখ থেকে এই একটা কথা শোনার জন্য, পলু ডাকটা শোনার জন্য আমি কতদিন ধরে অপেক্ষা করছি জানিস? একবার, একবার বল না অনা৷ একবার সরি বলে জড়িয়ে ধর আমায়, কথা দে আমাকে ছেড়ে যাবি না৷ বল!

বলতে বলতে গলা জড়িয়ে আসে পলাশের৷ মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে সে৷

অহনা পলাশের কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে৷ তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে পলাশ কে৷ তারপর ওর বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলে,“সরি! সরি! সরি! হয়েছে?”

পলাশ অহনাকে জড়িয়ে ধরে ধরাগলায় বলে,“একটা সরি বলতে তোর দশবছর লেগে গেল৷ ক্ষমা তো আমি তোকে সেদিন কফিহাউজেই করে দিয়েছিলাম৷ শুধু অপেক্ষা ছিল তোর মুখে অ্যাডমিট করার৷ আর চিন্তা নেই পক্ষিনী এবার ফাঁদে পড়িয়াছে! কথা দে আর আমায় ছেড়ে যাবি না!”

অহনা মাথা নাড়ে৷ পলাশ এবার মজার স্বরে বলে,“এই গেল রে! আমার পাঞ্জাবীটা ময়দা মেখে শেষ করে দিল রে! এবার তো ছাড়! কেউ দেখে ফেললে কেস খেয়ে যাবো৷ তার উপর তোর পাঁচহাজারি মেকাপ নষ্ট হলে পাবলিক আমায় কেলাবে! আবে ছাড় তো!”

বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেলে অহনা৷ দুম করে কিল মারে পলাশের বুকে৷ তারপর বলে,“না ছাড়বো না! একবার যখন প্রেতিনীর হাতে পড়িয়াছো তখন আজীবন ঘাড়ে বসে থাকবো৷ আর রইল মেকাপ৷ আজ শুধু মেকাপ কেন? নাকের শিকনিও মুছে দেবো তোর পাঞ্জাবীতে!”

ছিঃ বা*!” বলে অহনাকে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দেয় পলাশ৷ তারপর লজ্জায় জিভ কেটে দাঁড়ায়৷ অহনা এবার হেসে ফেলে৷ তারপর নাক টেনে বলে,“দেখেছিস? এই জন্য বলেছিলাম এই পাঞ্জাবীটা পরতে৷ কত সুন্দর লাগছে বল তো?”

- সে জন্যই তো পরেছি আজ৷ যাতে আমার অনার চোখে পড়ি৷ তবে তোকে এই কালারের শাড়িতে ঠিক মানাচ্ছে না৷ অন্য কালারের শাড়ি নেই? তুঁতে বা আকাশী?

- আছে তো তুঁতে রঙের৷ কিন্তু কেন বলতো?

- এটা পালটে ওটা পরে নে, নাহলে এক কাজ কর বৌভাতে ওটা পরে আসবি৷

- কেন বলবি তো?

- কারণ নীল রং এ তোকে মানায় বেশী৷ পরবি তো?

- বেশ, পরবো৷

- সিনটা ভাব! বৌভাতে নীলশাড়ি পরে এলি তখনই সাউন্ড সিস্টেমে বাজল,‘নীলরং ছিল ভীষণ প্রিয়আর উজালার অ্যাডের গানটার ডিজে মিক্স! উফ! পুরো জমে যাবে!

অহনা ব্যাপারটা চোখ বুঁজে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করে তারপর ,“তবে রে জানোয়ার! তোকে ঐ উজালায় চোবাবো!” বলে পলাশের উপর ঝাপিয়ে পড়ে৷ কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর চুমু তে ভরে দেয় পলাশের গোটা মুখ৷ তারপর পলাশের ঠোটে ঠোট ডুবিয়ে দেয় অহনা৷

বেশ কিছুক্ষণ পর দুজনে পরস্পরের হাত ধরে নিচে নামে৷ তারপর মন্ডপের সামনের চেয়ারে গিয়ে পাশাপাশি বসে৷ সামনের বিয়ের দিকে ওদের কোনো ভ্রক্ষেপ নেই৷ ওরা নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল৷ কখনো অহনার চুলের ফুল ঠিক করে দিচ্ছে পলাশ আবার পলাশের কথা শুনে হাসতে হাসতে ওর গায়ে চড় মারছে অহনা৷ ওদের দেখে মনে হচ্ছে  যেন কোনো নববিবাহিত দম্পতি প্রেম করছে৷ ওদের দেখে মুচকি হেসে অর্চি তাকায় দ্রুতির দিকে৷ চোখে চোখে ইশারা করে৷ দ্রুতিও সামনে তাকিয়ে লজ্জায় হেসে ফেলে৷ ওদের মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা৷ যেদিন কফিহাউজে ওরা ডেটে গিয়েছিল৷ হঠাৎ সেখানে পলাশ আর অহনাকে দেখে ওরা অবাক হয়৷ দ্রুতি প্রথমে কানেকশনটা বুঝতে না পারলেও অর্চি আগেরদিনই অহনাকে চিনতে পেরেছিল৷ সে দ্রুতিকে সবটা খুলে বলে৷ দ্রুতি সবটা জানার পর ঠিক করে ওদের ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে আবার এক করে দেবে৷ এবং এই বিয়ে উপলক্ষ্যেই সেটা করবে৷ দুজনে বার বার চেষ্টা করে পলাশ আর অহনার কথা হোক৷ কিন্তু দুজনে যেন চুম্বকের সম মেরু৷ একে অপরের থেকে সব সময় দুরে সরে যায়৷ অবশেষে আজ বোধ হয় দুজনের কথা হয়েছে৷ সবটা ক্লিয়ার হয়ে গেছে৷ পুরোহিতের কথায় সম্বিত ফেরে দুজনের৷ বিয়েতে মন দেয় তারা৷

ওদিকে চেয়ারে বসে পলাশ বলে,“একটা আইডিয়া মাথায় এসেছে৷”

অহনা সামনে তাকিয়ে বলে,“ডোন্ট! তোর আইডিয়া মানে যত কেলোর কেস!”

- ইস! কলেজ অধ্যাপিকার কি ভাষার ছিরি!

- তো আপনার জন্য কি শকার,মকার যুক্ত অপশব্দ দেবভাষায় প্রয়োগ করিবো?

- তাহা করিতেই পারেন মহাশয়া! অধম যে আপনার একান্ত অনুগত প্রিয়তম৷

অহনা চমকে তাকায়,“বাহ! সাধুভাষায় অত্যন্ত উন্নতি লাভ হইয়াছে দেখিতেছি৷”

- সবই আপনার বিরহযন্ত্রণার কৃপা দেবী৷

বলে মুচকি হেসে ফেলে পলাশ৷ কিছুক্ষণ পর সামনে তাকিয়ে অহনা বলে,“আইডিয়াটা কি?”

- ওদের বিয়ে দেখে আমারও বিয়ে বিয়ে পাচ্ছে৷ তাই ভাবছিলাম কি লগ্ন শেষ হতে তো অনেক দেরী তো এই ফাঁকে মানে মানে করে আমরাও বিয়েটা সেরে ফেলি?

- কিইইই? নাহ! সত্যি চেহারাতেই বুড়ো হয়েছিস তুই৷ বুদ্ধিটা এখনো একটা ধেড়ে খোকার৷  একটু আগে সকলের কথা ভাবতে বলে খুব ভাষণ দিলি৷ এখন নিজেই সিন ক্রিয়েট করবি? ভায়ের বিয়ে দেখে বিয়ে পাচ্ছে? এ কে রে? লোকে কি বলবে বুড়ো দাদার বিয়ের শখ জেগেছে?

- আচ্ছা মুশকিল তো! লোকে কি বলবে এটাও যদি ভাবতে বসি তাহলে লোকে কি বলবে? আর বিয়েটা হলে তো আমারই লাভ! আসছে জামাইষষ্টীতে তোর মায়ের হাতের নাড়ুর ভাগ আমিও পাবো৷

- কে বলবে প্রখ্যাত শিল্পপতির এত নোলা?

- সে যাই বলুক আই ডোন্ট কেয়ার৷ যখন করি তোকে পেয়ার৷ তখন কিসের ফিয়ার!

- করবো না চিয়ার৷ কমা এখন গিয়ার৷

- ওকে যেমন তুই বলবি৷ যাকগে আইডিয়াটা কেমন?

- থার্ডক্লাস!

- অ৷ তাহলে এককাজ করি, বিয়ের ঝামেলাটা মিটুক তারপর আমি নিজে যাবো কাকিমার কাছে আমাদের বিয়ে নিয়ে কথা বলতে৷ কেমন?

লজ্জায় লাল হয়ে অহনা বলে,“জানি না৷ ধ্যাত একটু চুপ করে বস না! বিয়েটা দেখতে দে৷ সেই তখন থেকে লেজ কাটা বাঁদরের মতো বিরক্ত করছিস!”

- কি? আমি লেজকাটা বাঁদর? এত সাহস? হবুবর কো অপমান করতা হ্যাই!

- কে হবুবর? তুই? তুই তো আমার হবুবর না৷

মুখটা চুপসে যায় পলাশের৷ “আমি হবুবর না? তবে আমি কে?”

কোনো মতে হাসিটা সামলে অহনা বলে,“নাড়ুবর! আমার বর্বর নাড়ুবর!” বলে ফিক করে হেসে ফেলে অহনা৷ ব্যাপারটা বুঝতে কিছুক্ষণ সময় লাগে পলাশের তারপর সেও হো হো করে হেসে ওঠে৷ ওদিকে মন্ডপে অর্চি দ্রুতির সিঁথিতে তখন সিঁদুরদান করছে৷ গাছকৌটো থেকে কিছুটা সিঁদুর এসে পড়েছে দ্রুতির নাকে৷ অঙ্গবস্ত্র দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পর অপরূপ লাগছে ওকে ৷ ওদের দিকে হাতে হাত ধরে তাকিয়ে থাকে পলাশ আর অহনা৷ আর চারদিকে গমগম করে পুরোহিতের কন্ঠে উচ্চারিত হয় সেই মন্ত্র যা উচ্চারন করে পুরাকাল থেকে দুজন মানুষ আজীবন পরিনয়সুত্রে আবদ্ধ হয়ে থাকে৷ “যদিদং হৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম/যদিদং হৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম৷৷”

 

 

 

 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...