ট্রলীব্যাগটা টানতে টানতে ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসল বাসবদত্তা। এখন সন্ধ্যে সাতটা বাজে।সব ঠিক থাকলে হয়তো এতক্ষনে
ওর ট্রেনটা ছেড়ে দিত। কিন্তু স্টেশনে ঢোকার পর জানতে পেরেছে ওর
ট্রেন প্রায় আধঘন্টা লেট। অগত্যা অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই
ওর কাছে।গত পরশু শিলিগুড়ি এসেছে ও। একটা খুব নামী গয়নার ব্র্যান্ডের অ্যাম্বাসেটর ও। সম্প্রতি এখানে একটা শোরুম খুলছে সেই ব্র্যান্ড সেটার উদ্বোধনে এসেছে ও। হিসেব মতো কাল রাতেই চলে যাওয়ার কথা ছিলো বাসবদত্তার। কিন্তু সারাদিনের ঝামেলায় ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ায় আর কাল যায়নি সে। আজ সারাটা দিন প্রাণ খুলে শপিং করে তারপর
বিকেলের দিকে স্টেশনে এসে শুনছে যে ওর ট্রেনটা প্রায় আধঘন্টা লেট। বরাবরই এই দুরপাল্লার জার্নিগুলোতে ট্রেন সফর করতে পছন্দ করে সে। প্লেনে চড়ে ঘোড়া তার নাপসন্দ।
অবশ্য প্লেনে যে সে ট্রাভেল করে না তা নয়। দিল্লী, চেন্নাই, মুম্বাই, কিংবা
দেশের বাইরে পারফর্ম করতে যেতে হলে সে প্লেনেই যায়। কিন্তু এই উত্তরবঙ্গ সফরে এলে সে ট্রেন ছাড়া কিছু ভাবতেই পারেনা। মূলত নৃত্যশিল্পী হলেও ইদানিং কিছু সিনেমায় অভিনয় করেছে বলে বেশ জনগনের
কাছে পরিচিত মুখ সে। তাই সবসময় ছদ্মবেশ ধরতে হয়। তবে বেশি সাজতে হয়না এই যা। একটা জিন্স, শীতকাল হলে একটা হুডিজ্যাকেট,
গরমের সময় একটা কুর্তি আর একটা রিডিং চশমা ব্যাস। সাজ কমপ্লিট। তবে সব জায়গায় যে এই পদ্ধতি খাটে তা নয়। অনুরাগীদের মধ্যে কয়েকজন যদি চিনতে পারে তাহলে ছেঁকে ধরে। তখন বাধ্য হয়ে সেলফির আবদার মেটাতে হয়। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় হল যে ওর অনুরাগী খুব কমই আছে। একটু আগে যেমন এনকোয়াইরি সেলে ও যখন জিজ্ঞেস করছিল ট্রেনের কথা তখন ভেতরে
যিনি ছিলেন তিনি চিনতে পারেননি ওকে। তারপর ম্যাগাজিনের স্টলে কয়েকটা বই কিনতে
গিয়ে সেখানকার দোকানদারও চিনতে পারেননি। অথচ তার দোকানেই একটা ম্যাগাজিনের কভারে ওর ছবি রয়েছে।
ওয়েটিং রুমে আরাম করে গুছিয়ে বসল বাসবদত্তা। এখনও অনেক দেরী আছে ততক্ষন এই বইটা পড়া যেতেই পারে। আপাতত ওয়েটিং রুমে কেউ নেই শুধু একজন লোক ছাড়া। ভদ্রলোক মুখে রুমাল দিয়ে ঘুমিয়ে আছেন। পোশাক-আশাক,আর লাগেজ দেখে মনে হয় বিদেশী পর্যটক। আড়চোখে একবার তাকে দেখে বইটা পড়তে শুরু করল বাসবদত্তা। সবে দুপাতা এগিয়েছে এমন সময় শুনতে পেলো ভদ্রলোকের কন্ঠস্বর। “কটা বাজে এখন?” কন্ঠস্বরটা শোনামাত্র চমকে তাকাল সামনের দিকে বাসবদত্তা।
কন্ঠস্বরের মালিকও স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়েছে ওর দিকে। প্রায় মিনিটখানেক কেটে গেল দুজনে প্রায় চিত্রার্পিত হরিণের মতো একে অপরের
দিকে তাকিয়ে রইলো। বাসবদত্তার মনে পড়ে যেতে লাগলো পুরোনো দিনের
কথাগুলো। একের পর একদৃশ্যগুলো সিনেমার রিলের মতো ভেসে উঠতে লাগলো
চোখের সামনে। বেশ কিছুক্ষন পরে আগন্তুক হেসে বললো,“ কেমন আছো দত্তা?” দত্তা? গোটা পৃথিবীতে একজনই ওকে এই নামে ডাকতো। প্রায় ফিসফিস করে বলল বাসবদত্তা,
“বোধি?”
হাল্কা হেসে বোধি বলল, “
যাক! চিনতে পেরেছ তাহলে? আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে চিনবেই না তুমি।” বাসবদত্তা লজ্জিত গলায় বলল,“
এবাবা! চিনবো না কেন? নেহাত আগের সেই রোগাটে শরীর নেই, বেশ হাড়মাসে চেহারা
হয়েছে আর ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি রেখেছো তাই একটু সময় লাগলো। যাক গে কেমন আছো? কোথায় যাওয়া হচ্ছে? কতবছর পর দেখা বলোতো?”
“দশবছর! আপাতত গন্তব্য কলকাতা। তারপর সেখান থেকে প্লেনে চড়ে দিল্লী, সেখান থেকে লন্ডন।”
“বাবা! সে তো অনেকদূর! তা লন্ডন থেকে এখানে কেন? কবে এলে?”
মৃদু হেসে বোধি বলে,“এসেছি দিন পনেরো হলো। আসলে এসেছিলাম কলকাতায় একটা ডিলের
ব্যাপারে। ভাবলাম এই ফাকে ঘুরেই আসি পাহাড়টা। আবার কবে আসবো কে জানে? তা সেই ঘোরাঘুরির পালা কাল শেষ হলো। তাই আজ ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন। ভালো কথা এই আমার কার্ড।”
বলে পার্স থেকে একটা কার্ড বের করে বাসবদত্তার হাতে দেয় বোধি। কার্ডটা হাতে নিয়ে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলে বাসবদত্তা, “ হুম! নটব্যাড। সো মি. বোধিসত্ত্ব বোস, ফাইনালী আমার
কথা শুনে বিজনেসে মনোনিবেশ করেছো দেখছি! বলেছিলাম না?
তোমার যা গুণ সেটাকে কাজে লাগালে একটা সফল বিজনেসম্যান হতে পারবে?
ঐ ওকালতি তোমার কম্ম নয়। কি ? মিললো তো?”
লাজুক হাসে বোধি,“ আর আমি কিনা তোমার এই কথায় বোকার মতো রিঅ্যাক্ট করতাম। তবে সত্যি কথা বলতে তুমি চলে যাবার পর কিছু ভালোলাগতো না। বোকার মতো তোমাকে স্বার্থপর ভাবতাম। ভাবতাম তুমি টাকার নেশায় আমাকে এইভাবে ধ্বংসের মুখে ছেড়ে পালিয়েছো। মনে মনে তোমার এই নাচ করাটাকে কি খারাপ নজরেই না দেখেছি। মেল ইগো কিনা? পরে বুঝেছি, আসলে তুমি ঠিকই বলেছিলে। ওকালতি আমার দ্বারা কোনোদিনই হবার ছিলো না। কিন্তু আমি তোমার কথায় কান না দিয়ে কুয়োর ব্যাং-এর মতো ওটাকেই আকড়ে ধরেছিলাম। দিনের পর দিন পসার কমে গিয়ে প্রায় না খাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। মেজাজ হারাচ্ছিলাম ধীরে ধীরে। শেষে একদিন এক ক্লায়েন্ট আর এক সিনিয়ার
উকিলের সাথে মারপিট করে বসলাম। ব্যাস! রেজিস্ট্রেশন ক্যান্সেল হয়ে গেলো।”
“শুনেছিলাম এটা। মানে নিউজে দেখিয়েছিলো।” ঘোরের মধ্যে বলে উঠলো বাসবদত্তা। ম্লান হাসলো বোধিসত্ত্ব। “হ্যাঁ। নিউজে দেখিয়েছিল যে আমি মারপিট করেছি। কিন্তু এটা দেখায় নি যে সেদিনই রাতে আমি মরতে গিয়েছিলাম।” “কি?” শিঁউড়ে ওঠে বাসবদত্তা। বোধি হেসে বলে, “ভয় পেও না আমি ভুত নই।” জামার হাতাটা গুটিয়ে নেয় বোধি। বাসবদত্তা দেখে বোধির বা’হাতের কব্জিতে একটা সামুরাই ট্যাটু। তরবারি বাগিয়ে আক্রমনে উদ্যত সামুরাই। তরবারিতে আঙুল বুলিয়ে বোধিসত্ত্ব বলে,“ ভাগ্যিস সেদিন অমলদা ছিলো নাহলে
হয়তো সত্যি সত্যি আজ ভূতুড়ে সাক্ষাত হতো আমার সাথে তোমার।”
কপট রাগ দেখিয়ে বলে বাসবদত্তা,“
একদম উল্টোপাল্টা বলবে না! এরকম ছেলেমানুষি
কেউ করে?” বোধি হেসে বলে,“ছেলেমানুষই
তো ছিলাম আমি! যে পেশার জন্য তোমাকে আমি অপমান করেছি। সেই পেশাটা এইভাবে কেড়ে নেওয়ায় মনে হয়েছিল যেন কেউ আমার বাঁচার রসদ পর্যন্ত
কেড়ে নিয়েছে। এই জীবন রেখে লাভ কি? তাই…। কিন্তু সেই যাত্রা যখন বেঁচে গেলাম তখন
একটা অন্য অনুভুতি হলো জানো? মরতে গিয়ে টের পেলাম জীবনটার মুল্য। মনে হলো কি সর্বনাশটাই করতে যাচ্ছিলাম আমি? সামান্য একটা তুচ্ছ কারনে মরতে
যাচ্ছিলাম! পৃথিবীটাকে
আবার নতুনভাবে দেখতে পেয়ে নিজের ভুলটা বুঝতে পারলাম। বলতে পারো সেদিন আমার পুণর্জন্ম হলো। মরার আগে বাঁচার কোনো তাগিদ,
কোনো কারন ছিল না আমার কাছে। কিন্তু বেঁচে ফেরার পর একটা জেদ চেপে বসলো আমার মনে। বারবার মনে হতে লাগলো আমায় বাঁচতে হবে। গোটা পৃথিবী আমাকে হেরো প্রমাণিত করতে চেয়েছে, আমাকে ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিতে
চেয়েছে, তাদেরকে ভুল প্রমাণিত করতে হবে। দেখিয়ে দিতে হবে বোধিসত্ত্ব বোস এত সহজে হেরে যাবার পাব্লিক নয়। তারপর যেমন ভাবা তেমন কাজ!
নতুনভাবে শুরু করলাম সব কিছু। কলকাতা ছেড়ে চলে গেলাম লন্ডন। সেখানে শুরু করলাম নতুনভাবে অমলদার সাথে। এইকাজ সেই কাজের পর এই ব্যবসাটায় ক্লিক করে গেলো। তারপর আর কি? ব্যবসা বাড়তে লাগলো পাল্লা দিয়ে আমার ব্যস্ততাও। দেখতে দেখতে বছরচারেক হলো আমি লন্ডনে সেটল করেছি। যাকগে আমার কথা ছাড়ো। এখন তোমার খবর বলো। তুমি তো রীতিমতো স্টার হয়ে গেছো! লন্ডনে আমাদের বাঙালীদের যে কমিউনিটি
আছে সেখানে তো তোমাকে নিয়ে রীতিমতো আলোচনা হয়! তোমার নাচ,
তোমার অভিনয় সব নিয়ে। বলতে দোষ নেই আমিও তোমার কয়েকটা সিনেমা দেখেছি। অভিনয় তুমি মন্দ করো না। ”
লাজুক হেসে বলে বাসবদত্তা,“
তাই? তা কি কি দেখলে?”
“ঐতো ‘পরবাস’, ‘রক্তমঞ্জরী,
‘ফেরারী ‘,আর ‘বসন্তোৎসব’। শুনেছিলাম ‘বসন্তোৎসব’ এর জন্য নাকি তুমি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছো। কনগ্রাটস!” বলে বাসবদত্তার সাথে হাত মেলায় বোধি। তারপর বলে, “তা তোমার নাচের ট্রুপটার কি খবর? আছে না ভেঙে গেছে?
বৈশালী, অনুরাধা, কৌশিকী, অমিতাভ এরা কেমন আছে?”
“বহাল তবিয়তে আছে ওরা। দলটা ভেঙে গেছে ঠিকই কিন্তু আজও ওদের সাথে
আমার যোগাযোগ আছে। সেই পুরোনো দিনের মতো৷ মনে আছে?”
মুচকি হেসে বলে বোধি ,“তা আর মনে নেই? ওই দলটা নিয়ে কম কথা হয় নি আমাদের মধ্যে৷ বিশেষ করে
অমিতাভ কে নিয়ে৷”
“সেই অমিতাভ এতদিনে বিয়ে করেছে
জানো?”
“অ্যাঁ! কবে? ”
“বছর দুয়েক হলো বৈশালীকে বিয়ে করেছে৷”
“বলো কি? ওদের দেখে তো একবারও প্রেম করছে মনে হয়নি আমার৷ বরং সারাদিন
দুজনে দুজনের মুন্ডুপাত করতো দেখতাম ৷”
“সেটাই তো আশ্চর্য জানো? বজ্জাত দুটো একবারও টের পেতে দেয় নি৷ সব সময়
এমন ভাব করতো যেন দুজনে দুই প্রতিপক্ষ৷ যখন বিয়ের নিমন্ত্রণ নিয়ে এলো ওরা আমি তো
জাস্ট থ মেরে গেছি!”
“তাহলে গ্রেট বাসবদত্তা মিত্রকেও বোকা বানানো যায় অ্যাঁ?” বলে হো হো করে
হাসতে লাগলো বোধিসত্ত্ব৷ কিছুক্ষন মুখ গোমড়া করে থেকে বাসবদত্তাও সেই হাসিতে যোগ
দিল৷ সে সময় মাইকে ঘোষণা হলো,“ মে আই হ্যাভ ইয়োর অ্যাটেনশন প্লিজ? আপ ২০১…” দুজনে হাসতে হাসতে একে অপরের ব্যাগ
নিয়ে ট্রেনের সামনে এসে আবিস্কার করলো দুজনের সিটও একই কম্পার্টমেন্টে একই কুপে
পড়েছে৷ ব্যাগপত্র নিয়ে জায়গা মতো দুজনে গুছিয়ে বসা মাত্র ট্রেন ছেড়ে দিলো৷
যথারীতি যে ভয়টা করছিল বাসবদত্তার সেটাই হলো৷ ট্রেনে কয়েকজন অনুরাগীর
সাথে দেখা হয়ে গেল তার৷ অগত্যা তাদের সেলফির আবদার মিটিয়ে নিয়ে বসতে বসতে প্রায়
মিনিট কুড়ি লাগলো৷ বোধিসত্ত্ব একপাশে বসে সবটা লক্ষ্য করছিল৷ বাসবদত্তা বসতেই জলের
বোতলটা এগিয়ে দিলো৷ জলের বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল খেয়ে বোতলের ছিপি আটকে সাইডটেবিলে
রাখলো বাসবদত্তা ৷ তারপর জানলার বাইরে তাকালো৷ এসি কোচের কালো জানলা দিয়ে নিজের
প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে বাসবদত্তা ঘোরের
গলায় বলল,“মনে আছে
হানিমুনে আমরা দার্জিলিং এসেছিলাম? তখন এই এসি কোচ অ্যাফোর্ড করার সামর্থ ছিলো না
তোমার ৷ অনেক কষ্টে একটা ফার্স্ট ক্লাস স্লিপার কোচের টিকিট পেয়েছিলে৷ সারা রাত
গরমে জেগে বসে কাটিয়েছিলাম আমরা৷” বোধি মোবাইল ঘাটতে ঘাটতে বলল,“মনে নেই আবার? সেই
শিলিগুড়ি স্টেশনে নেমে কি চোটপাট তোমার! বাপরে সেদিন যে হারে শব্দবাণ গুলো
প্রক্ষেপণ করেছিলে কয়েকমিনিট ধন্ধে ছিলাম ভুল শুনছি না তো?” বলে হাসলো বোধি৷
বাসবদত্তার মনে পড়ে গেল সেই দিনটা৷ সেদিন স্টেশনে নেমেই বোধির সাথে
একপ্রস্থ ঝগড়া হয়ে গিয়েছিল তার৷ লাজুক গলায় বলল,“সত্যি কি বোকা ছিলাম আমি বলোতো? নাহলে ঐভাবে কেউ
সিন ক্রিয়েট করে?”
******
“একদম আমার সাথে কথা বলবে না তুমি! নিকুচি করেছে হানিমুনের! বা*র
হানিমুন! কোথায় ভাবলাম একটু রোম্যান্স হবে তা না সারা রাত বাথরুমের দুর্গন্ধ, আর
গরমে জেগে কাটাতে হলো! কে বলেছিল এই ভীড়ে ভরা ট্রেনে সিট বুক করতে? গেল তো পুরো
টাকাটা জলে? আর লোকগুলো বাঁ* কোন লেভেলের উদগা* হ্যাঁ? সরতে বলছি সরবে না! কোনো প্রপার টিকিট নেই, টিটিই কে ঘুষ দিয়ে সিট
দখল করে বসে আছে তো বসেই আছে! মানে চক্ষুলজ্জাও নেই৷ আবার নামার সময় ব্যাগটা পা দিয়ে
মাড়িয়ে বলে 'সরি বৌদি!’ সালা! কে তোর বউদি? বোকাচো*! অবশ্য ওকে দোষ দিয়ে কি লাভ?
আসল ফল্ট তো আমার ঘরেই! এমন মেনিমুখো ঢ্যা*নাচো* পুরুষমানুষ জীবনে দেখিনি! লোকে
দেখুক কাকে নিয়ে বেরিয়েছি আমি!” বলে গজগজ করতে করতে ট্রেন
থেকে ব্যাগ নামালো বাসবদত্তা৷
সামনে কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে বোধিসত্ত্ব৷ সত্যি এত প্ল্যান করে বাড়ি
থেকে বেরোনোটা এভাবে মাটি হয়ে যাবে কে জানতো? ট্রেনে রিজার্ভেসন করাই ছিলো৷ কিন্তু
কম্পার্টমেন্টে পৌছে একটা অল্পবয়স্ক ছেলেদের দলকে দেখে ভ্রুতে ভাঁজ পড়ে
বোধিসত্ত্বের৷ ছেলেগুলোকে দু-একবার বলার পরও উঠছে না দেখে হাবভাব সুবিধের ঠেকেনা
তার৷ টিটিই কে বলতে তিনিও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় সবটা পরিস্কার হয় তার কাছে৷ সে
বাসবদত্তাকে নিয়ে একটা ফাঁকা বার্থ দেখে বসে পড়ে ৷ অহেতুক ঝামেলা পছন্দ হয় না তার ৷
চিরকালই নির্ঝঞ্ঝাট থেকে এসেছে সে ৷ কারো সাতে পাঁচে থাকতে ভালো লাগে না তার ৷ যত
তর্জনগর্জন আদালতের জন্যই তুলে রাখে সে৷ এর বাইরে সে একজন নিপাট ভালোমানুষ ছাড়া আর
কিছু নয়। কাজেই ট্রেনেও যাতে কোনো ঝামেলা
যাতে না হয় তাই সরে এসেছিলো সে৷
কিন্তু বাধ সাধলো বাসবদত্তা৷ রীতিমতো এ নিয়ে টিটিইর সাথে ঝগড়া করলো
সে৷ তারপর কিছু করতে না পেরে সারারাত গজগজ করে বোধির সাথে ঝগড়া করে কাটিয়ে দিলো৷
সারারাত ধিকিধিকি আগুন তো জ্বলছিলোই সকালবেলায় সেটায় ঘি ঢেলে দিলো ওদের দলেরই একটা
ছেলে৷ ট্রেন থেকে নামার সময় ছেলেটা খেয়াল করে নি বোধহয় বাসবদত্তার মতে হয়তো ইচ্ছে
করে ওদের ব্যাগটাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে দেয়৷ সে সময় বাসবদত্তা বাথরুমে ছিলো বলে টের
পায়নি৷ কিন্তু পরক্ষনেই বাথরুম থেকে বেরোয় সে আর ছেলেটা তখনই বাসবদত্তার কাছে
ক্ষমা চেয়ে নেমে যায়৷
বাসবদত্তা ভেবেছিলো হয়তো কাল রাতের জন্য ক্ষমা চাইছে ছেলেটা৷ কিন্তু
পরক্ষনে সিটের সামনে পায়ের কাছে রাখা
ব্যাগটায় পায়ের ছাপ দেখে ভুল ভাঙে তার৷ ভাগ্যিস ততক্ষনে ছেলেটা নেমে গেছে নাহলে যে
কি হতো ভগবানই জানেন৷ আর এমনি কপাল বোধির সারারাত জেগে সেই মুহুর্তে একটু চোখ
লেগেছিলো তার৷ বোধি চারদিকে তাকিয়ে দেখে লোকজন তাদের দিকে তাকিয়ে৷ কয়েকজন মুচকি
মুচকি হাসছে৷ হয়তো ভাবছে ‘এ কেমন পুরুষ রে বাবা? বউয়ের কাছে খিস্তি খাচ্ছে!’ বিড়বিড় করে বলে বোধি,“প্লিজ দত্তা! ফর গড সেক
চুপ করো! সিন ক্রিয়েট করো না সবাই দেখছে! প্লিজ!”
বাসবদত্তা সেটা শুনে গর্জন করছে,“দেখুক! দেখুক সবাই কেমন মেনিমুখো বর
আমার! বাপি আগেই
বলেছিল ,‘ওর কাছে যাস না৷ তোকে খুশি রাখতে পারবে না৷”
বোধিসত্ত্ব এতক্ষন সব চুপচাপ শুনছিলো এটা আর পারলো না। হিসহিসে গলায়
বলে উথলো, “বেশ তো ! তাহলে আমার গলায়
সাপের মতো ঝুললে কেন? ওই রোহিত, না মোহিত কার সাথে তো বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলো তোমার
বাবা তাকে বিয়ে করতেই তো পারতে! খামোখা আমার মতো মেনিমুখো মেরুদন্ড হীন অ্যাসিস্ট্যান্ট
উকিলের সাথে পালাতে কে বলেছিলো? এসেই যখন পড়েছ তখন আমি যেমন রাখবো তেমনি থাকতে
হবে। মনে রেখো আমি তোমার বড়ো লোক বাপ নই যে তোমার কষ্টে কষ্ট পাবো বুঝলে। আমার
সাথে থাকতে হলে মধ্যবিত্ত জীবন যাপন করা, অ্যাডজাস্ট করা শিখতে হবে।”
আচমকা এই পালটা আঘাতের জন্য তৈরি ছিলোনা বাসবদত্তা। অস্ফুট কন্ঠে সে
বলল, “ কি? কি বললে তুমি?”
“আর যাই হও কানে কালা নও বলে জানতাম। ঠিকই শুনতে পেরেছো তুমি । একে নিজের কাজ ফেলে আসো তারপর বউ এর খিস্তিও শোনো এত মহান নই। চলে এস।
নাহলে আমি একাই চলে যাবো”
বলে নিজের ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে যায় বোধিসত্ত্ব। বাসবদত্তা ছুটে এসে বলে
, “তাহলে আসতে কে বলেছিলো?”
বোধিসত্ত্ব স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাসবদত্তার দিকে তারপর ঠান্ডা
গলায় বলে, “নিজে কে জিজ্ঞেস করো।” বলে এগিয়ে যায় বোধিসত্ত্ব। বাসবদত্তা কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। হয়তো বোধিসত্ত্বের কথাগুলো হজম করার চেষ্টা করে। তারপর চোখ মুছতে মুছতে নিজের ব্যাগ নিয়ে বোধির পিছু ধরে। বোধিকে ভরসা নেই। ও একবার যা বলে তাই করে দেখায়। হয়তো এতক্ষনে ট্যাক্সি ধরে নিয়েছে।”
******
আচমকা ফোনের শব্দে তন্দ্রাটা কেটে গেলো বাসবদত্তার। জিন্সের পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলো মি. রয় ফোন করেছেন। ফোনটা রিসিভ করে কথা সেরে দেখল বোধি কুপে নেই। কুপের বাইরে বেরিয়ে দেখলো বোধি বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝলো বোধি স্মোক করছে। বাসবদত্তা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল বোধির দিকে। বোধি বাসবদত্তা কে দেখে সিগারটা ঠোট থেকে নামিয়ে হাসলো। কলেজ জীবনে বোধি চেন স্মোকার ছিলো। সারা দিনে প্যাকেটের পর প্যাকেট শেষ হয়ে জেত। অন্তত যতবার বাসবদত্তা বোধিকে দেখেছে ততবারই বোধি ঠোটের কোণে সিগারেট ঝুলিয়ে
রাখতো। বিয়ের পর আর ঘন ঘন বেড়ে গিয়েছিলো বোধির সিগারেট খাওয়া। বাসবদত্তা প্রথমে রাগ করতো,
বোধিকে বকা দিতো। সিগারেটের গন্ধে গা গুলিয়ে আসতো তার। পরে ধিরে ধিরে গা সওয়া হতে হতে কখন যে বাসবদত্তাও সিগারেট খাওয়া শুরু করে
ফেলেছিলো বুঝতেই পারে নি। এক সময় এমন ছিল স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে একটা সিগারেটেই
টান দিতো।
ডিভোর্সের পর সিগারেট খাওয়া অনেক কমিয়ে দিয়েছিলো বাসবদত্তা। এখন দিনে একবারই খায় সে। বোধির সামনে গিয়ে হাত পাতলো বাসবদত্তা। বোধি একটু ইতস্তত হয়ে বলল,
“হ্যাভানার সিগার, দারুন কড়া ফ্লেভারটা। তোমার সহ্য হবে?” বাসবদত্তা বলল,” সেটা ট্রাই না করে বুঝবো কি করে?
দাও।” বোধি আর কথা
না বাড়িয়ে বুক পকেট থেকে সিগারের প্যাকেট বের করে একটা সিগার দিলো বাসবদত্তাকে।
সিগারটা ধরিয়ে প্রথমে কয়েকটা টান দিয়ে খুক খুক করে কাশলেও পরে ম্যানেজ
করে নিলো বাসবদত্তা। পরপর কয়েকটা টান মেরে জিজ্ঞেস করলো,” মি. রয়কে
কি করে চেনো তুমি?”
“কে মি.রয়?” সিগারটা ঠোঁটে
গুঁজে জিজ্ঞেস করলো বোধিসত্ত্ব।
“মি. এ.কে.রয়। রত্নাকর ডায়মন্ড অ্যান্ড জুয়েলারিস এর কর্ণধার। তাকে কি করে চেনো তুমি?
“
“কেন বলোতো?” বলার সাথে সাথে বোধির স্মার্টফোনটা
বেজে উঠলো। সেটা রিসিভ করে কিছুক্ষন পর বোধির ভ্রু
কুঁচকে গেলো। তারপর
“আচ্ছা।” বলে ফোনটা কেটে
অবাক গলায় বলল,” স্ট্রেঞ্জ!” তারপর
বাসবদত্তার দিকে তাকিয়ে বলল,” তুমি যে আমার সাথে ট্রাভেল করছো
সেটা অমলদা জানলো কি করে?”
“কে অমলদা? “ সিগারটা শেষ করে দরজার দিকের জানলাটা
খুলে ফেলে দিয়ে আবার জানলা লাগিয়ে জিজ্ঞেস করল বাসবদত্তা।
“
আরে আমাদের সেই কসবায় প্রতিবেশী ছিলেন না বিশাখা বৌদি, তৃষা বৌদি, অনামিকা বৌদিরা। মনে আছে? সেই যে অনামিকা বৌদির ভাই স্টেটসে থাকতো। ”
“
হ্যা হ্যা মনে আছে। দশ বছর পর পর আসতো। ওনাকে নিয়ে অনামিকা দির গর্বের শেষ ছিলো না। এই নিয়ে আড়ালে গোটা পাড়া হাসি ঠাট্টা করতো। ভাবতো উনি বুঝি গুল মারছেন। কিন্তু তার সাথে মি. রয় এর কি সম্পর্ক?”
“আরে মি. রয়ই তো অনামিকাদির ভাই! অমলদা! অমলকান্তি রায়। ওনার শুধু গয়না আর হীরের ব্যবসা নয়। আরও অনেক ব্যবসা আছে। কাপড়, ওষুধ, প্রায় সব জায়গায় ইনভেস্ট
করেছেন উনি। অবশ্য তোমাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের সংসার টিকেছিলই বা কতদিন?
যেদিন আমার লাইসেন্স ক্যান্সেল হলো তার দিন পাঁচেক আগে অমলদা এসেছিলো
দিদির বাড়ি বেড়াতে। তেমন সখ্য গড়ে না উঠলেও অমলদার জন্যই আমি
প্রাণে বেঁচে যাই। আজ আমি যা কিছু সব অমলদার ই অবদান। অমলদার নিজের বিজনেসের কাপড়ের অংশের পার্টনার কাম কনসালটেন্ট আমি। যদিও খাতায় কলমে আমার অফিসের নাম আর ট্রেড আলাদা। কিন্তু বাস্তবে সেটাও অমলদারই।”
বাসবদত্তার ভ্রু কুঁচকে যায়। কিছুক্ষন পর থেমে থেমে সে বলে,” মি. রয়ের
ডায়মন্ড ব্যবসার ইন্ডিয়াতে যে ব্রাঞ্চ আছে। আমি সেটার ফেস মডেল কাম ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেটর। বিগত চার বছর ধরে আমিই ওনার ব্রাঞ্চ হীরক এর মুখ হিসেবে ক্যাম্পেন করছি। ইভেন হীরকের শিলিগুড়িতে ব্রাঞ্চ এর ওপেনিং এ এসেছিলাম আমি।”
“
তাই নাকি?” অবাক হয় বোধি। মাথা নাড়ে বাসবদত্তা। “ কিন্তু মি.
রয় আমাকে তোমার সাথে টীম আপ করতে বললেন কেন? তোমার ব্রাঞ্চ আলাদা। তুমি গার্মেন্ট বিজনেসম্যান। টীম আপ তো ক্যামেরা ম্যান আর অ্যাড কোম্পানির সাথে হয়। ” ভ্রু কুঁচকে বাসবদত্তা জিজ্ঞেস করে।
“সেটাই তো আমিও ভাবছি। অমলদা আমাকে ডীল করতে লন্ডন থেকে পাঠালো। এখন বলছে তোমার সাথে ডীল করতে কিন্তু কি নিয়ে ডীল করবো সেটা বলল না। বলল তুমি নাকি জানো। তুমি কি নতুন কোনো ভেঞ্চারে নামবে নাকি?”
মাথা নাড়ে বাসবদত্তা। “ তাহলে?”
অবাক হয় বোধিসত্ত্ব। “ সেটা কলকাতা না গেলে বোঝা যাবে
না। কারন মি.
রয় কলকাতায় আসছেন কাল বিকেলে।” বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে বাসবদত্তা।
******
কথামতো গ্র্যান্ড ওবেরয় হোটেলে যখন পৌছোল বাসবদত্তা ততক্ষনে কাঁটায় কাঁটায়
সন্ধ্যে সাতটা বাজে। হোটেলের লবিতে পৌছে দেখলো বোধিসত্ত্ব রিসেপশনের
দিকে এগোচ্ছে। বাসবদত্তা একটু দাঁড়ালো তারপর এগিয়ে গেলো
বোধির দিকে।
রিসেপশনিস্ট এর কথা মতো ওরা লিফট ধরে বারোতলায় উঠে নির্দিষ্ট রুমের দরজায়
কড়া নাড়তেই দরজা খুললেন এক প্রৌঢ়। প্রৌঢ় বললেও ভদ্রলোককে প্রৌঢ় ভাবতে বেশ
বেগ পেতে হয়। কারন এই চেহারায় যেকোনো এই সময়ের যুবকদের গুনে গুনে
দশ গোল দিতে পারেন ইনি। একগাল ট্রিম করা কাঁচাপাকা দাঁড়ি, ব্যাকব্রাশ করা চুল। পড়নে জিন্স আর একটা সাদা শার্টের আড়ালে সুঠাম দেহটা লুকিয়ে থাকলেও যতটুকু
দেখা যাচ্ছে তাও কম ঈর্ষণীয় নয়। দুজনকে একসাথে দেখে প্রথমে অবাক তারপর খুশিই
হলেন তিনি।
“আরে! এতো দেখছি দুজনে একসাথে এসে পড়েছ!
যাক গে ভালোই হলো। কাম ইন।” বলে সরে দাঁড়ালেন অমলকান্তি রায়।
ওরা ভেতরে ঢোকার পর দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে বললেন, “ তোমরা বসো আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। আসলে মুম্বাইতে এসে ফ্লাইট ডিলে করলো নাহলে কখন পৌছে যেতাম। এই জাস্ট আধঘন্টা হলো এসে পৌছেছি। আই নিড এ স্ট্রং গ্রিন টি ভেরি ব্যাডলি। তোমরা কিছু নেবে? চা, কফি, সফটড্রিঙ্ক, হার্ডড্রিঙ্ক?”
বাসবদত্তা না বলতে যাচ্ছিলো এমন সময় বোধি বলল, “ এই সময় ব্ল্যাক কফি হলে ভালো হতো অমলদা। বুঝতেই পারছো প্রায় সারা রাত ট্রেন জার্নি করে এসেছি। এখানে যা গরম হোটেলে দুপুরে ঘুম হয়নি। নেহাত তুমি ডেকেছো নাহলে আজকের ফ্লাইটে
আমি ফিরে যাচ্ছিলাম।”
“কেন হে ? আবার হোটেলে থাকার কি প্রয়োজন হলো তোমার?
কসবার বাড়িটার কি হলো ? যতদুর শুনেছি ওটা
তুমি বিক্রি করো নি।” ভ্রু কুঁচকে
তাকালেন অমলকান্তি।
বাসবদত্তা চমকে আড়চোখে তাকালো বোধির দিকে। এত বছর কেটে গেল এখন বাড়িটা ছাড়ে নি বোধি? ও শুনতে পেলো বোধি ম্লান হেসে মৃদুগলায়
বলছে, “আর বলো না। অনেকদিন আসা হয় না এতবছর পর দেখলাম পাড়াটাই পালটে গেছে। পুরনোরা আর নেই, আমাদের ফ্ল্যাটটাও ভীষণ নোংরা হয়ে পড়ে আছে। চারদিকে আগাছা ভর্তি। আর ফিরবোই বা কার জন্য বলো? যার জন্য ফেরা যেত সেই তো নেই।” বাসবদত্তার মনে হলো কথা গুলো ওকে
শুনিয়ে বলল বোধি।
একটু চুপ থেকে বললেন অমলকান্তি,
“ তাহলে ছেড়ে দিচ্ছো না কেনো ফ্ল্যাটটা? তোমাকে তো আমি কতোবার বলেছি লন্ডনে যখন শিফট করেই গেছো তখন এই পিছুটান রাখার
কি মানে? আমি লোক ঠিক করে দিচ্ছি। শুধু একবার সই করতে এলেই হলো। বাকিটা অনলাইনে হয়ে যাবে।”
“কি করবো দাদা? ছাড়তে পারি না তো ! কত পুরোনো জিনিস, কত স্মৃতি ছড়িয়ে আছে এই বাড়ি
জুড়ে। বাড়িটার প্রতিটা আনাচেকানাচে লেগে আছে আমাদের স্পর্শ। সেসব ছেড়ে আসা যায়? নিজের লঞ্চিং প্যাড এতো তাড়াতাড়ি ভোলা যায়? একেবারে
ছন্নছাড়া ছিন্নমুল হবার থেকে এটুকু পিছুটান থাকা কি ভালো নয় দাদা? তার চেয়ে ভালো এতটুকু টান থাকুক। হাজার হোক এই টানেই ফিরে তো আসবো আমি।”
ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে যাচ্ছে দেখে হেসে পরিস্থিতিটাকে হাল্কা করার চেষ্টা
করলেন অমলকান্তি। “তোমাকে বোঝানো দায়। বাদ দাও। আমি কফি বলে দিচ্ছি। ” বলে বাসবদত্তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ ওর কথা কিছু মনে করবেন না। ও একটু ওরকমই। সব সময় পিছুটানের কথা বলে। যাক গে কি খাবেন বলুন?”
বাসবদত্তা নিজের জন্য এক কাপ গ্রিন টি চাইলো। অমলকান্তি রুম সার্ভিসকে ফোন করে অর্ডার দিয়ে ওয়াশরুমে গেলেন।
বাসবদত্তা আর বোধিসত্ত্ব রইলো ড্রয়িংরুমে বসে। কিছুক্ষন নীরবতার পর বাসবদত্তা বলল, “ তুমিতো আমাকে বলোনি।”
“কি?”
“বাড়িতা এখনও বিক্রি করো নি।”
মৃদু হাসে বোধি, “বিক্রি করিনি নয় করতে পারিনি। আমদের জীবনের আনন্দময় বছরগুলো কেটেছে ঐ বাড়িতে। বাড়িটার সামনে দাঁড়ালে আজ আমাদের সেই দিন গুলোর কথা মনে পড়ে। হতে পারে আমরা জীবনে সেই পথটাকে ছেড়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছি। কিন্তু আমাদের স্মৃতিটা নিয়ে বাড়িটা আজও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।”
বাসবদত্তা চুপচাপ বসে থাকে। হাল্কা হেসে বোধি বলতে থাকে, “মনে আছে? সেই গোলাপ গাছটা তুমি গেটের পাশে পুঁতেছিলে? সেটা
বেশ বড়ো হয়েছে জানো। এই বার এসে দেখলাম গাছে একটা গোলাপ ফুটেছে। তুমিই বলো এই সব ছেড়ে চলে গেলে বার বার কিসের টানে ফিরবো বলো তো? কার টানে ফিরবো? অমলদা বরাবর বাস্তববাদি হলেও আমি হতে পারি না। দিনের শেষে এইটুকুই যে আমার বাঁচার রসদ। নাহলে ওই বিদেশ বিভুঁইয়ে সারাদিন টাকা-পয়সা, ব্যবসা, ঐ দেশের ব্যবসায়ীদের সাথে ওঠা বসায় কবে পাগল হয়ে যেতাম। তাই তো মাঝে মাঝে হঠাৎ ব্যাগপত্র গুছিয়ে হারিয়ে যাই। চলে যাই নতুন কোনো শহরে,
কোনো গহীন জঙ্গলে, কিংবা কোনো দূর পাহাড়ে। যেখানে কেউ আমার খোঁজ পাবে না। কেউ আমার নাগাল পাবে না।” বলে সম্বিত ফিরে দেখে বাসবদত্তা ওর দিকে অপলকে
তাকিয়ে আছে। লজ্জা পেয়ে বোধি বলে, “কি দেখছ?”
বাসবদত্তা হেসে বলে, “ দেখছি এতো গুলো বছর কেটে গেলেও তুমি মোটেও বদলাও নি সেই একই থেকে গেছো। বিদেশে থেকেও সেই মিডীল ক্লাস মেন্টালিটি, ছোটো ছোটো বিষয় নিয়ে ভাবা থেকে
নিজেকে মুক্ত করতে পার নি।” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস
ফেলে বলে, “এদিকে আমাকে দেখো। এই সবকিছুকে অবাস্তব, অ্যাবসার্ড ভেবে সব ছেড়ে দিয়ে নতুন ভাবে নিজের জীবন বাঁচতে বেরিয়ে গেলাম। সেই থেকে ঘুরেই চলেছি। কোনো বিরাম নেই। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সেই ছোটো খাটো আনন্দের দিন গুলো ফিরে পেতে। কিন্তু এখন আর তা সম্ভব নয়। এখন আর আমি সেই পুরোনো দিনের ‘দত্তা’ নই। নিজের মতো বাঁচতে গিয়ে সেই সব
দিন গুলো হারিয়ে ফেলেছি। সেই দিনগুলো আর ফেরার নয়।” বলে ম্লান হাসে বাসবদত্তা মিত্র।
ইতিমধ্যে অমলকান্তি ফ্রেশ হয়ে জামা কাপড় পাল্টে ড্রয়িং রুমে ঢোকেন। আর সাথে সাথে রুমের কলিং বেল বেজে ওঠে। অমলকান্তি দরজা খুলতেই রুম সার্ভিস ঘরে এসে সেন্টার টেবিলে টি-পয় সাজিয়ে দেয়। তারপর টিপস নিয়ে চলে যায়। বাসবদত্তা নিজের গ্রিন টি আর বোধিদের কফি
তৈরী করে দেয়। চা নিয়ে সোফায় আরাম করে বসেন। তারপর একটা লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন,”আহ! দিনের শেষে এরকম চা হলে
আর কিছু চাই না আমার। হাজার হোক বাঙালী তো? চা প্রেমটা এতো সহজে ছাড়বো কি করে?
এই আজকাল কার জেনারেশন কফিতে কি যে স্বাদ পায় কে জানে? ঐ তো সেদিন শুনলাম কোথায় যেন আরে …
হ্যাঁ মনে পড়েছে! সাউথ এশিয়াতে তে নাকি একপ্রকার
গন্ধগোকুলের ইয়ে দিয়ে … আরে ছ্যা ছ্যা! শুনেই তো আমার গা গুলিয়ে উঠেছিলো। আমাদের বেলায় আমরা খেতাম সব তাজা, টাটকা জিনিস, যাকে বলে একেবারে
অরগ্যানিক। গাছ থেকে পেড়ে আর তোমরা কিনা শেষমেশ গন্ধগোকুলের
ইয়ে! ” বলে হো হো করে
হেসে ফেলেন অমলকান্তি।
এটুকু শুনে আরেকটু হলেই বিষম খাচ্ছিলো বোধি। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“ তোমার মুখে কিছু আটকায় না। দেখছো সামনে একজন মহিলা বসে আছেন তার সামনে এরকম নোংরা কথা না বললেই নয়?”
“আহা আমি তো শুধু ফ্যাক্টটা বললাম। আর এটা অনেকেই জানে না,তুমিও জানতে না। যাক গে বাদ দাও সেই কথা। তা কাল ডীল হলো?” বলে চায়ের কাপে আরেকটা চুমুক দিলেন অমলকান্তি।
এবার বাসবদত্তা কথা বলল,
“আসলে কিছু মনে করবেন না মি. রয়। কাল আপনার কথার মানেটা আমরা দুজনে বুঝতে পারিনি। না মানে আসলে আমাদের দুজনের সাবজেক্ট আলাদা কিনা। তাই কোন বিষয় ডীল, কি নিয়ে ডীল বুঝতে পারিনি। তাই সেরকম কোনো কথা হয় নি আমাদের মধ্যে। কাইন্ডলি একটু বলবেন ঠিক কি নিয়ে ডীলটা হবে?”
“সেকি কথা? আপনারা জানেন না? এই ডীলটার ব্যাপারে তো আপনাদের জানার কথা! বোধি
আপনাকে বলে নি? আমি তো বোধিকে ঐ কারনেই পাঠালাম! কি বোধি তুমি কিছু বলোনি ওনাকে? তুমি তো জানতে
ডীলটার ব্যাপারে। ” অমলকান্তি যেন
আকাশ থেকে পড়লেন। বাসবদত্তা দুদিকে মাথা নাড়ায়।
“ঠিক কি জানার কথা বলো তো অমলদা? আমার তো মনে পড়ছে
না ওনার সাথে কোনো ডীল হবার কথা ছিলো। তুমি তো বলেছিলে মি. তামাং আর মি. সুরজমল এর সাথে আগামি ভেঞ্চারের জন্য
ডীল করতে। আর সেটা তো করেছি। আর কোনো ডীলের কথা তো মনে পড়ছে না।” বোধি এবার ভ্রু কুঁচকে তাকায় অমলকান্তির
দিকে। অমলকান্তি এবার চায়ের কাপটা সেন্টার টেবিলে রেখে পকেট
থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছলেন। তারপর গোঁফটাকে পাঁকিয়ে নিয়ে বললেন, “ সেকি হে? এই তো সেদিন কোন চ্যানেল থেকে এসে বলে গেলো তোমার মনে নেই? সেই যে রিয়্যালিটি শো এর ব্যাপারে?”
আচমকা কিছু মনে পরে যাওয়ায় স্থির হয়ে বসলো বোধিসত্ত্ব। তারপর বলল,” মনে পড়েছে কিন্তু তার সাথে মিস. মিত্রর কি কানেকশন?”
“আরে এই মুহূর্তে কলকাতা এবং বেঙ্গল সেক্টর জুড়ে মোটামুটি একটা পরিচিত মুখ
মিস. মিত্র। কয়েকটা সিনেমায় পার্শ্ব চরিত্র করলেও দর্শকদের
একাংশের নজর কেড়েছেন ইনি। বিশেষত ‘বসন্তোৎসব’সিনেমাটার পর তো
এনার খ্যাতি লন্ডনেও পৌছে গেছে।”
“কিন্তু উনিই কেন? বেঙ্গল ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রি তে আর অনেক অভিনেত্রী আছেন যারা দারুন নাচেন,
আরও অনেক পাওয়ার কাপল আছেন যাদের জীবনের গল্প আরো ইন্সপাইরিং। এনার প্রতিই এতো ইন্টারেস্ট কেন?”
“একমিনিট! একমিনিট! আপনাদের
কথার বিন্দুমাত্র আমার মাথায় ঢুকছে না। কাইন্ডলি বলবেন ব্যাপারটা কি?” বলে চায়ের কাপটা টেবিলে রাখে বাসবদত্তা।
“আমি বলছি।” বলে বোধিসত্ত্ব
কফির কাপ্টা টেবিলে রেখে বলে, “ আসলে দিন পঁচিশেক আগে অমলদার ডাকে অফিসে গিয়েছিলাম সেখানেই
আলাপ হয় মি. সুরিন্দার পাটিয়ালার সাথে। তাকে নিশ্চয়ই চেনো?”
“হুম চিনি। এস.পি. মুভিজ এর হেড। এখানকার বড়ো প্রোডিউসার দের মধ্যে একজন। শুধু তাই নয় এই বেঙ্গল মার্কেটিং জোনে অন্যতম টিভি সিরিয়াল চ্যানেল প্রোডিউস
করে তার কোম্পানি। তার ব্যানারে বেশ কয়েকটা সিনেমা আমিও করেছি।”
“এই সুরিন্দার পাটিয়ালা একটা নতুন ভেঞ্চার আনতে চলেছেন তার চ্যানেলে। একটা রিয়্যালিটি ডেলিসোপ টাইপ শো। তবে এখন যেরকম বছর ধরে যে সব শো চলে
তেমন নয়। আসলে এটা একটা ইন্টারভিউ সিরিজের মতো। মানে তুমি তোমার গল্প বলবে আর
সেটা নিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে একজন অভিনয় করবে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে যেমন দেখায়
ঠিক সেরকম । একজনকে নিয়ে একসপ্তাহর মতো এপিসোড শুটিং হবে। তারপর নেক্সট পার্সন। বিশেষ
কিছু খুলে বলেন নি তবে শো তে একজন নৃত্যশিল্পীর জীবন নিয়ে ইন্সপিরেশন যেমন থাকবে
তেমনই থাকবে অনেক স্পেশাল কিছু৷ বাছাই করে মোট পনেরো জন শিল্পী ওরা পছন্দ করেছেন।”
“হুম বুঝলাম এতো ভালো কথা৷ তা এতে তোমাদের কোম্পানীর কি ভুমিকা?”
“আসলে এই প্রজেক্টের বাজেট বড্ড বেশী পড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া শুটিং
কলকাতায় হবে না। হায়দ্রাবাদ, দিল্লী, এমনকি অ্যাব্রডেও হতে পারে। তাই আমাদের কোম্পানীর
সাথে টাই আপ করে প্রোডিউস করতে চাইছেন মি. পাটিয়ালা। মানে যৌথ প্রযোজনায় তৈরী
হবে শো টা।”
“সো আমি কি করতে পারি এখানে?”
“শোয়ের হেডরা যে পনেরো জনকে বাছাই করেছেন তাদের মধ্যে তুমিও আছো। আর
ওরা চান। প্রথম এপিসোডে তোমার জীবনের গল্প শোনাতে।”
“হুম সাউন্ডস গুড! আমি রাজি! কবে শুটিং হবে?”
“পুরোটা শোনো আগে। এখানে একজন তোমার জীবনের সব ঘটনার খুটিনাটি শুনতে
চাইবে। ইভেন তোমার বিয়ের গল্পও। ”
বাসবদত্তা এবার উঠে দাঁড়ালো। বিরক্ত হলে ডানদিকের ভ্রুটা সামান্য
উপরে উঠে যায় তার। থমথমে মুখে সে বলল,“বাট এটা আমার পার্সনাল ব্যাপার! সেটা আমি
বলবো কেন? আমার পার্সনাল ব্যাপারে কেউ নাক গলার সেটা আমার পছন্দ নয়।”
বোধি মাথা উচু করে বলে,“কাম ডাউন!বাসবদত্তা কাম ডাউন। শান্ত হয়ে বসো। দেখো এই সোশাল মিডিয়ার যুগে
নাথিং ইজ পার্সনাল টু এভরিওয়ান। তাই ওরা সবটা জানতে চাইবে ফর টিআরপি। কি করে সব প্রতিকুলতা কাটিয়ে এই পজিশনে এলে সব।”
“বাট কারো ব্যক্তিগত পরিসর সম্পর্কে জানতে চাওয়াটা অশোভন।”
“জানি। তবে একটা কথা কি জানো? এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ, ওয়ার এর সাথে
বর্তমান যুগে টিআরপিও যুক্ত হয়েছে। যার যত টিআরপি তার তত ভ্যালু বেশী। এদেশের
নিউজ আমি নিয়মিত ফলো করি। এত বছরেও বিন্দু মাত্র বদল হয়নি এদের বরং আরো খারাপ
অবস্থা হয়ে গেছে। এখানে পাবলিকের ইন্টারেস্ট এর উপর ভিত্তি করে যেমন মেগা
সিরিয়াল তৈরি হয়, সিনেমা তৈরি হয়, তেমনই নিউজও
পরিবেশিত করা হয়। রাস্তায় পাবলিক না খেতে পেয়ে মরলো, গরীব অথচ মেধাবী ছাত্র
আত্মহত্যা করলো এটা ম্যাটার করে না। ম্যাটার করে কোন নেতা কি বললেন, কোন অভিনেতার
কি হলো, কোন অভিনেত্রী বিদেশে ঘুরতে গিয়ে বিকিনি পড়ে নেটিজেনের কাছে ট্রোল হলেন,
কার কয়টা বিয়ে এইসব। কেন? পাবলিক খুব খায় এসব। বেশ কয়েকবছর আগে একটা বাংলা
সিনেমায় যৌনদৃশ্য দেখিয়েছে বলে সবকটা নিউজ চ্যানেলে বাঙালি কি সাবালক হলো বলে
কদিন ডিবেট হলো। এই যে তোমার এত গুলো সিনেমা তার মধ্যে ‘বসন্তোৎসব’এর এত
জনপ্রিয়তার কারন কি জানো? তোমার অভিনয় তো ছিলোই। তার সাথে আরেকটা কারন ছিলো।
সিনেমার এক জায়গায় তোমার ব্যাকলেস সিন ছিলো। যেখানে শিববর্মার চরিত্র তোমার খোলা
পিঠে ময়ুর আঁকে। মানছি দৃশ্যটা আর্টিস্টিক ছিলো। কিন্তু সকল মানুষ কি তাই ভেবে
দেখেছে? ইন্ডিয়ান অডিয়েন্সের আশি শতাংশ এতটাও শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন নয়। তাই এখানকার পাবলিক তোমরা কি যেন বলো? হ্যা পাবলিক যেটা
খাবে সেটাই করতে হবে।”
“বুঝলাম। কিন্তু আমিই প্রথমে কেন?”
এবার মুখ খুললেন অমলকান্তি।“ আসলে গত চারমাশ ধরে এই বাছাই পর্বটা
চলছে। এবং সিলেকশন ফাইনাল হবার পর ওরা জানতে পারে যে আপনি আমাদের ‘রত্নাকর
ডায়মন্ডস’ এর ইন্ডিয়ান ব্রাঞ্চ ‘হীরক’ এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেটর কাম ফেস মডেল।
তাই ওরা আমাদের কাছে এসেছিল এটা জানতে যে আপনি কোনোভাবে আমাদের সাথে
চুক্তিবদ্ধকিনা। সেই কথা উপলক্ষেই ওরা প্রস্তাবটা দেয়। ওদের প্ল্যানিংটা সিম্পল।
মডেল কাম অভিনেত্রী থেকে শুরু করে, ডাক্তার, বিজনেস ওমেন, নৃত্যশিল্পী,
বাচিকশিল্পী, রেডিও জকি, জননেত্রী, প্রত্যেকের ইন্টারভিউ নেবে ওরা। যেহেতু আপনি
এখানে পরিচিত মুখ তাই শুরুটা আপনাকে দিয়ে করতে চাইছে। এবার এই নিয়ে আমার, আর বোধির
প্রশ্ন ছিল যে আপনিই প্রথমে কেন? যেখানে ওদের লিষ্টে বৈদেহীর মতো মডেল, বহ্নিশিখা
মৈত্রর মতো বড়ো সেলিব্রিটি আছে। মে বি ওরা
হয়তো ভাবছে যে কোন ভাবে যদি আপনার সাথে
শুট করার সময় কোনোভাবে যদি আমাদের থেকে অবজেকশন আসে। তাই হয়তো আগেই আপনাকে
নিয়ে শুট করতে চাইছে। দেখুন বাসবদত্তা আমাদের তরফ থেকে ওদেরকে এনওসি দিয়ে দেওয়া
হয়েছে। এবার বাকিটা আপনার ইচ্ছের উপর নির্ভর করছে। আপনি যদি না চান তাহলে আমরা
আপনাকে জোর করবো না কারন আপনার সাথে আমাদের সম্পর্ক শুধু মাত্র কাজের নয়। ওয়েস্ট
বেঙ্গলে ‘হীরক’ এর ফেস মানেই বাসবদত্তা মিত্র। আপনাকে রিপ্লেস করার কথা আমরা
ভাবতেই পারি না বাট আপনি হয়তো জানেন ধীরে ধীরে আমাদের ব্রাঞ্চের বিজনেস যেভাবে
গ্রো করছে সেক্ষেত্রে আমাদেরকেও আপগ্রেড হতে হবে। কে বলতে পারে হয়তো আপনার এই
ইন্টারভিউ আপনার ফ্যান ফলোইং আরও বাড়িয়ে দিলো। তাছাড়া এই ভেঞ্চারে ইনভেস্ট করলে
আমাদের কোম্পানীর লাভই দেখছি আমি। সো আপনি পার্টিসিপেট করবেন কিনা সেটা পুরোপুরি
আপনার ডিসিশন। তবে আপনি রাজি হলে ভালো হবে।”
বাসবদত্তা স্পষ্ট বুঝতে পারলো মি. রয়ের এই কথাগুলোর মধ্যে একটা
প্রচ্ছন্ন হুমকি লুকিয়ে আছে। ও যদি এই ভেঞ্চারে রাজি না হয় এতে ওরই সমূহ সর্বনাশ
হতে পারে। কোম্পানী থেকে তো ব্ল্যাকলিষ্ট হবেই সাথে ওর কেরিয়ারে হয়তো সাময়িক ভাবে
কমা পড়ে যেতে পারে। আর সেটা হলেই বিপদ। এই কয়েক বছর মডেলিং আর নাচ করে একটু একটু
করে নিজে কে তোইরি করতে করতে বুঝেছে এই ইন্ডাষ্ট্রি বড়ো কঠিন ঠাই। এখানে
প্রোডিউসার, ডিরেক্টর এর মন মতো না চললে জাস্ট ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। এই কটা বছরে
অনেক নামী অভিনেত্রী, মডেলকে ঝরে যেতে দেখেছে ও। সেখানে ও তো একজন উঠতি মডেল কাম
অভিনেত্রী মাত্র । কয়েকটা সিনেমায় পার্শ্বচরিত্র করে অবশেষে একটা সিনেমায় ডেবিউ
হয়েছে মাত্র। সেখানে এইভাবে মি. রয়কে চটালে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। ইদানিং
কানাঘুঁষোয় শুনেছে সুজাতা নামের একজন উঠতি মডেল ক্যাম্পেনের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
মেয়েটাকে দেখেছে বাসবদত্তা। এমনি ভালো হাসি খুশি, মিশুকে তবে চুড়ান্ত
রকমের ন্যাকা । বয়স হবে ঐ বাইশ তেইশ। কলেজে পড়ে। তবে এই বয়সেই ইন্ডাস্ট্রির সব
প্যাঁচপয়জার শিখে ফেলেছে। ভীষণ বোল্ড ফোটোশুট করে। গতবছর একটা ম্যাগাজিনের এডিশনে আর একটা কাপড়ের
অ্যাডের হোর্ডিং-এ কলকাতায় সাড়া ফেলে দিয়ে ছিলো মেয়েটা। ম্যাগাজিনের প্রথমবার
সুইমস্যুট এডিশনে কভার গার্ল হিসেবে আর কাপড়ের হোর্ডিং-এ ব্যাকলেস পোজে। শুনেছে
মি. পাটিয়ালার ওয়েবসিরিজ ডিপার্টমেন্টের হেড জর্জ সেন এই শুটের ছবি দেখেই ওকে নতুন
সিরিজে কাস্ট করার কথা ভাবছে। এই বছর পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে গয়না নিয়ে ফোটোশুট করতে
গিয়ে ভালো ভাব হয়ে ছিল দুজনের মধ্যে। মেয়েটা দিদি দিদি বলে পুরো মাথা খাচ্ছিলো। ওর
কাছেই শুনেছিলো কথাটা। প্রমাদ গুনলো বাসবদত্তা। ঐ মেয়ে কে ওর জায়গায় রিপ্লেস করার
কথা ভাবছেন নাকি মি. রয়? তাহলেই সর্বনাশ। এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রফেসনাল না হলে চলে
না। ও জানে সুজাতা যতোই ওকে দিদি বলে ডাকুক সুযোগ পেলে সেও ছেড়ে দেবে না। এই
প্রথমবার নিজেকে এত অসহায় লাগলো বাসবদত্তার।
মডেলিং-য়ে আসার আগে কয়েকটা
নিয়ম মনে মনে ভেবে নিয়েছিলো সে। প্রথমত নিজেকে সবার সামনে পণ্য করে তুলবে না। আর
কোনোদিন পরিস্থিতির সাথে আপোষ করবে না। এত বছরেও এই দুটো প্রতিজ্ঞায় অটল থেকেছে
সে।সিনেমায়, ফটোগ্রাফিতে দৃশ্য যদি নান্দনিক না হয় তাহলে প্রয়োজনেও শালীনতা অতিক্রম
করে পোশাক খোলেনি সে। এ নিয়ে অনেক তাবড় তাবড় ফটোগ্রাফারের সাথে ঝামেলা হয়েছে তার,
অনেক প্রোডিউসার তাকে ঘুরিয়ে কুপ্রস্তাব দিয়েছে পরক্ষনে তাদের সংশ্রব ত্যাগ করেছে
সে। এ নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে ওকে নিয়ে যেমন আড়ালে কথা হয় তেমন প্রশংসাও হয় সে জানে।
কিন্তু এই মুহূর্তে ওর মনে হচ্ছে দ্বিতীয় প্রতিজ্ঞাটা প্রায় ভাঙ্গার মুখে। মনে
একটা ভীষণ ঝড় উঠেছে। সেই ঝড়ের সাথে জন্মেছে তার ভেতরে দুটো স্বত্বা। একজন বলছে
এগিয়ে যেতে, এতেওরই সিনেমায় প্রবেশের পথ সুগম হবে। অপরজন বলছে পিছিয়ে আসতে। এই
ইদুরদৌড়ের কি মানে? যেখানে নিজের প্রতিজ্ঞা ভাঙতে হয়? এই দুই পক্ষের দ্বন্দে ক্রমশ
ক্লান্ত হয়ে গেলো বাসবদত্তা।
অনেকক্ষন পরে ধীর কন্ঠে জবাব দিলো, “ ওকে আমি রাজি। তবে আমার কিছু
শর্ত আছে।”
******
“লাইটস , সাউন্ড রেডি?”
“রেডি!”
“ক্যামেরা?”
“চেক!”
“গ্রেট! ম্যাডাম একটু হাল্কা বাঁদিক ঘেঁষে বসুন। একটু! আরেকটু!
ব্যাস! পারফেক্ট!। মধুজা রেডি? ওকে এভরিবডি সাইলেন্স! স্টার্ট সাউন্ড!
ক্যামেরা রোলিং! অ্যান্ড…
অ্যাকশান!”
“হীরক প্রেজেন্টস আমরা নারী আমরাই পারির প্রথম এপিসোডে আপনাদের স্বাগত। আপনাদের সাথে আমি মধুজা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বেড়াজালে আবদ্ধ আমাদের
চারপাশের নারীদের জগৎ। প্রতিনিয়ত সমাজের সাথে, নিজের পরিবারের সাথে আমরা আপোষ
করে চলেছি। শুধু বাড়িতেও নয়, কর্মক্ষেত্রেও একইভাবে আমাদের সংঘর্ষ
করে চলতে হয়। প্রতিনিয়ত শুনতে হয় ‘এই কাজ মেয়েরা পারবে না।’‘মেয়েদের দ্বারা হবে না।’ তবে আশার কথা আমাদের মধ্যেই কয়েকজন
অনন্যা পুরুষদের এই চিন্তাধারা কে ভুল প্রমানিত করেছেন। অসাধ্য সাধন করে বলেছেন
‘হ্যাঁ আমরা নারী, হ্যাঁ আমরাই পারি।’আজকে আমাদের প্রথম অতিথি এমনি একজন
অনন্যা। যার নাচ, অভিনয় যেমন আমাদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি তার মডেলিং-য়ের আভিজাত্য প্রমাণ করেছে মডেলিং
মানেই শুধু শরীর প্রদর্শন
নয়। আসুন কথা বলে নিই আমাদের অতিথি বাসবদত্তা মিত্রর সাথে। বাসবদত্তা দি…। ”
******
বিছানার উপর রাখা ফোনটা ক্রমাগত বেজে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে বাথরুম থেকে কোনোমতে
তোয়ালে জড়িয়ে বেরোলো বাসবদত্তা। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো মি. পাটিয়ালা ফোন করেছেন। ফোনটা রিসিভ করতেই শুনতে পেল মি.
পাটিয়ালার উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর।
“হ্যাঁ বলুন মি. পাটিয়ালা। ”
“আরে ম্যাডাম সে কোখোন থেকে অপনাকে ফোন লগাচ্ছি জানেন?”
“সরি আসলে একটু বাথরুমে ছিলাম আমি। তাই আপনার কল শুনতে পাইনি। ”
“ও ঠিক হ্যাঁ কোই বাত নেহি। যেটা বোলার জন্য ফোন কোরেছিলাম। আজ প্রিমিয়ারে আসছেন তো? না মানে আমি জানি যে আপনি ওসাব
পার্টি-ওয়ার্টি বিলকুল পসন্দ কোরেন না। কিন্তু বুঝতেই পারছেন আজ প্রেস মিডিয়া সাব থাকবে। আর এই ফিল্মের লিড অ্যাক্ট্রেস হিসেবে আপনাকে হমলোগ এক্সপেক্ট কোরছি। তাই বোলছিলাম আপনি আসবেন তো?”
“হ্যাঁ এ নিয়ে চিন্তা করবেন না মি. পাটিয়ালা, আমি আসবো। তবে বেশিক্ষন থাকবোনা। প্রেসমিটটা করে ইন্টারভালে বেরিয়ে আসবো। ”
“চিন্তা কোরবেন না ম্যাডাম। বেসি টাইম আপনাকে আটকে রাখবো না। জাস্ট প্রেসমিটে এলেই হোবে।”
“বেশ ঠিক আছে। তাহলে ঐ কথাই রইলো।”
“হা ম্যাডাম। তাহলে সিক্স পি এম গাড়িটা পাঠিয়ে দেবো।” বলে কলটা কেটে দেন মি. পাটিয়ালা। ফোনটা রেখে কিছুক্ষন বসে থাকে বাসবদত্তা
তারপর বাথরুমে ঢুকে যায়। শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে মাথায় শ্যাম্পু করতে
করতে ভাবে এই এক বছরে ছবিটা কত দ্রুত বদলে গেলো। এক বছর আগেও সে কলকাতার রাস্তায় হাল্কা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতে পারতো। এক বছর আগে ওর পরিচয় ছিল একজন নৃত্যশিল্পী কাম মডেল। কয়েকটা ছোটো রোলে অভিনয় করে অবশেষে ‘বসন্তোৎসব’ এ আত্মপ্রকাশ। তার পরও বেশ কমাস হাতে কোনো কাজ ছিলো না শুধুমাত্র ‘হীরক’ এ মডেলিং করা ছাড়া। ঐ একটা ইন্টারভিউ সব পাল্টে দিলো।
সেদিনের সেই ইন্টারভিউটা পরে ইউটিউবে দেখেছে সে। সত্যি কথা বলতে সেদিনের সেই ইন্টারভিউ এর পর যেমন অনেক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা এসেছিলো। তেমনি অনেক ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়াও পেয়েছিল সে। এই প্রতিক্রিয়াটাই আশা করেছিলো সে। কারন সমাজের কয়েকজন গোঁড়া মানসিকতার মানুষদের চিন্তাভাবনায় যে সে আঘাত
করেছে। মডেলিং মানেই খোলামেলা কাপড় পড়ে, শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে দেহপ্রদর্শন নয়। মডেল মানেই নোংরা চরিত্রের মানুষ নয়। কেউ স্বেচ্ছায় ক্যামেরার সামনে অর্ধনগ্ন হয় না। যারা ভাবেন সেজে গুঁজে বসলাম আর ফটোগ্রাফার ছবি তুলে নিলেই মডেলিং হয়ে গেলো
তারা ভুল ভাবেন। ফটোগ্রাফারের এর মনপূত না হয়া পর্যন্ত অসীম
ধৈর্যের সাথে অক্লান্তভাবে পোজ দিয়ে যেতে হয়। সাথে খেয়াল রাখতে হয় ফটোগ্রাফার,ড্রেস স্টাইলিশ, মেক আপ আর্টিস্ট, এরা শালীনতা অতিক্রম করছে না তো?
সিনেমার ক্ষেত্রেও তাই। যতক্ষন পর্যন্ত ডিরেক্টরের মনপূত শট না
উঠছে ততক্ষন পর্যন্ত অভিনয় করে যেতে হয়। নেচে যেতে হয়। তার সাথে লক্ষ্য রাখতে হয় সঠিক অভিব্যক্তি আর অভিনয়ের ছন্দ। যারা ভাবেন ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করা সোজা তারাও ভুল ভাবেন। ক্যামেরার সামনে অভিব্যক্তি ঠিক রেখে অভিনয় করে যেতে হয় যতক্ষন না পরিচালক
খুশি হচ্ছেন। তার সাথে সহ-অভিনেতার হাবভাবেও খেয়াল রাখতে হয়। সে শালীনতা অতিক্রম করছে না তো?
এরকম শটে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে তো। এসব মাথায় রেখে শুটিং করতে হয়। অভিনয় জগতে স্বজনপোষণ থাকলেও দিনের শেষে
প্রতিভাই কথা বলে। এই জগতে অতো সহজে প্রতিপত্তি, নাম হয় না। প্রত্যেকটা সিনেমার সাফল্যের পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের পরিশ্রম ও অভিনেতা-অভিনেত্রীর স্ট্রাগল।
অনেক মডেল সহকর্মীরা ইন্টারভিউটা দেখে ওকে সাধুবাদ জানিয়েছিলো সত্যি কথাটা
বলার জন্য। এদের মধ্যে সুজাতাও ছিলো। তবে ওকে যেটা অবাক করেছিলো সেটা হলো মি. পাটিয়ালার ফোনকল। তারপর তো এক বছর যেন চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে নিমেষের মধ্যে কেটে গেলো। আজ ওর ছবির প্রিমিয়ার। দেড় মাস আগে যখন ওর ছবির ট্রেলার লঞ্চ হলো তখনো ব্যাপারটা কিছুতেই বিশ্বাস
করতে পারছিলো না সে। সবটা স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিলো। সত্যি কথা বলতে এখনো ওর বিশ্বাস হচ্ছে না। দিন পনেরো আগে যখন রাস্তায় ওর ছবির পোস্টার, হোর্ডিং দেখলো তখনো মনে হচ্ছিল এসব সত্যি
নয়। যেন এই মূহুর্তে ঘুম ভেঙ্গে যাবে আর সবটা মিথ্যে হয়ে
যাবে। কিন্তু না!
এটা তো মিথ্যে নয়! এটা ভীষণরকম সত্যি। আর এই সত্যিটা সম্ভব হয়েছে দুজনের জন্য। বিশেষ করে বোধি। কাল্রাতে দুজনের মধ্যে কথা হয়েছে। বাসবদত্তার ছবির প্রিমিয়ারে আসছে বোধি।
স্নান সেরে ঘরে ঢুকে নাইটিটা গলিয়ে নিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষন নাড়াচাড়া
করার পর বোধিকে কতদুর পৌছেছে জানার জন্য ফোন করলো বাসবদত্তা। বেশ কিছুক্ষন রিং হবার পর কেটে গেলো ফোনটা। আরেকবার চেষ্টা করলো সে কিন্তু এইবারও যন্ত্রমানবী জানান দিল “The
number you have called is currently switch off. Please try again later. ” বেশ কিছুক্ষন চেষ্টা করার পর হাল
ছেড়ে দিল বাসবদত্তা। হয়তো ফ্লাইটে আছে। থাক আর বিরক্ত করবে না। বিকেলে পার্টিতে দেখা হচ্ছেই। ভেবে বিছানায় কিছুক্ষন গড়াগড়ি দিয়ে। ড্রয়িং রুমে গেলো বাসবদত্তা। ঠিক করলো কিছু মুখে দিয়ে একটু ঘুমিয়ে নেবে।
******
ইন্টারভালের আলো নেভার সাথে সাথে হল থেকে বেড়িয়ে এলো বাসবদত্তা। পার্স
থেকে ফোনটা বের করে আরেকবার ফোন করলো বোধির নম্বরে। এবারও একই উত্তর পেয়ে বিরক্ত
হলো সে।সেই দুপুর থেকে একই কথা শুনে আসছে সে। “The number you have dialed is
currently switch off.” ব্যাপারটা
কি? বোধি ফোনটা
সুইচ অফ রেখেছে কেন? আজ ওর ছবির প্রিমিয়ারে বোধির আসার কথা। অথচ এলো না কেন?
প্রেসমিটের সময় বারবার ওর দৃষ্টি বোধিকে খুঁজে চলেছে। আজকে ওর আনন্দের দিনে বোধি
ওর পাশে থাকুক এইটুকুই তো চেয়েছিল সে। কিন্তু কই বোধি তো এলো না।
দাঁতে দাঁত চেপে মি.রয় কে কল করে বাসবদত্তা। বেশ কিছুক্ষন রিং হবার
পর ওপাশে অমলকান্তির ব্যারিটোন কন্ঠস্বর শুনতে পায় বাসবদত্তা।
“বলুন মিস মিত্র। কেমন আছেন? আজ তো আপনার মুভির প্রিমিয়ার?
কনগ্রাচুলেশনস এন্ড বেস্ট উইশেস ফর ইউ।”
“বোধি…আই মিন মি. বোসের কোনো খবর জানেন? ওনার আজ
কলকাতায় আসার কথা ছিল। উনি বলেছিলেন।”
“ইয়েস! তা ছিলো বটে! কিন্তু বোধিসত্ত্ব তো কখন বেরিয়ে গেছে! এতক্ষনে
তো কলকাতায় পৌছে যাবার কথা।”
“সেটাই তো! ওনাকে…” কিছুক্ষন থামে বাসবদত্তা। মি. রয়কে ওর চিন্তাটা
বুঝতে দিলে চলবে না। নিজেকে সামলে বলে বাসবদত্তা,“ আসলে আজ বিকেলে ওনার মিসড কল দেখেছিলাম। তারপর
এদিকে প্রিমিয়ারের জন্য ব্যস্ত থাকায় আর কল করিনি। এখন কল করে দেখছি সুইচড অফ
বলছে। তাই জানতে চাইলাম ইজ এনিথিং রং?”
“মে বি হি ইজ আপসেট। হাজার হোক এতবছরের স্মৃতি, মূল উপড়ে ফেলা সহজ
নয়।”
“এক্সিউজ মি? আপনি কি বলতে চাইছেন বুঝতে পারলাম না।”
“কেন আপনি জানেন না বোধি এবার কেন ইন্ডিয়ায় গেছে?”
“না তো। কেন বলুন তো এনিথিং সিরিয়াস?”কৌতুহল চেপে জিজ্ঞেশ করে
বাসবদত্তা।
“সিরিয়াস তো বটেই। বোধি ওর কসবার বাড়িটা বিক্রি করে দিচ্ছে। অনেকদিন
ধরেই কাজকর্ম চলছিল আজ পাকাপাকি ভাবে সইসাবুদ করে বাড়িটা বিক্রি করে দেবে।”
মূহুর্তের জন্য আশেপাশের পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেলো বাসবদত্তার কাছে।
পায়ের তলার মাটিটা যেন দুলে উঠলো। ফোনের অপারে মি. রয় কি বলছেন তার একবর্ণও আর
কানে গেলো না তার। কোনোমতে দায়সারা ভাবে কথা বলে ফোনটা কেটে দৌড় লাগালো গেটের
দিকে। নেহাত সিনেমা চলছে বলে বেশিরভাগ প্রেসমিডিয়া হলের ভেতর বলে তেমন অসুবিধে হলো না তার। গাড়ির ড্রাইভারকে বলাই
ছিলো। সে বাসবদত্তাকে আসতে দেখে দরজা খুলে দিলো।
বাসবদত্তা গাড়িতে উঠে বাড়ি যেতে না বলে অন্য একটা জায়গায় যেতে বললে
ভ্রুটা একটু কুঁচকে গেলো ড্রাইভারের। তাও কোনোরকম কথাখরচ না করে গাড়ি স্টার্ট দিলো
সে।
******
বাড়িটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বোধিসত্ত্ব।
পনেরো বছর, পনেরোটা বছর এই বাড়িটার সাথে সম্পর্ক ছিলো তার। বিদেশে থেকেও দেশের একটা শেকড়,
একটা পিছুটান ছিলো এই বাড়িটা। ওর আর দত্তার কাটানো পাঁচবছরের সংসারের মিষ্টি মূহুর্তগুলোর ফসিল
ছিলো এই বাড়িটা। প্রতিবার যার টানে সে ছুটে আসতো এই দেশে। আজ সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিলো সে। সেই মূলটাকেই উপড়ে দিলো সে। আর কোনো পিছুটান রইলো না তার। রেখেই বা কি লাভ? পৃথিবীতে কেউ পুরোনো স্মৃতি নিয়ে বসে নেই সকলেই এগিয়ে গেছে নিজের নিজের
পথে। সেই বা কেন এসব আঁকড়ে বসে থাকবে? কার জন্যই বা বসে থাকবে?
ছমাস আগে যখন সে নিজে থেকে অমলদাকে প্রস্তাবটা দিয়েছিল প্রথমে তিনিও
অবাক হয়েছিলেন। তারপর, “গুড ডিসিশন!” বলে হেল্প করেছিলেন। এখানকার কাজের মাঝে সে মাঝে মধ্যে দত্তার সাথে দেখা করতে যেতো।
নাহ মেয়েটার এতদিনে একটা স্বপ্নপূরণ হয়েছে। প্রথম প্রথম এই নাচ নিয়ে আপত্তি করলেও সে পরে ওর কয়েকটা সিনেমা দেখে বুঝেছিলো
মেয়েটা অভিনয় মন্দ করে না। কিন্তু কিছুতেই লোকের নজর কাড়তে পারছে না। সেইদিন মি. পাটিয়ালার প্রস্তাবটা শোনার পর সে ভেবেই নিয়েছিলো যে করেই হোক দত্তাকে এই
শোতে আনতেই হবে। সে প্রেশারাইজড করেই হোক কিংবা বুঝিয়ে সুঝিয়েই
হোক। এইটুকু করেই সে নিজে যে অন্যায়টা করেছিলো সেটার প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু কলকাতায় দত্তা কোথায় থাকে সেটা জানতো
না বোধি। তবে ওর মনে এই বিশ্বাস ছিল যে দত্তার সাথে
দেখা হবেই। আর তাই হলো। ট্রেকিং থেকে ফেরার পথে এন.জি.পি রেল
স্টেশনে দেখা হয়ে গেলো দত্তার সাথে। কথা কথায় বুঝলো দত্তার ওর প্রতি কোনোরকম
ফিলিংস নেই। কলেজবেলায় যেমন ওরা বন্ধু ছিল তেমনি মনোভাবে কথা বলছে
ও। একপ্রকার নিশ্চিন্ত হলো সে। রাতের বেলা সবার চোখের আড়ালে কুপ থেকে বেরিয়ে অমলদাকে সবটা জানালো সে। তারপরের দিন কলকাতায় সে হোটেলে ডীলটা হলো।
ইদানিং সে দেখছে দত্তা আবার ওর সাথে ইমোশনালি অ্যাটাচ হয়ে পড়ছে। সেও একটু একটু করে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দত্তার প্রতি। এটা ভালো কথা নয়। একটা ক্ষত সামলে উঠতে এতোগুলো বছর লেগে
গেছে। আরেকটা ক্ষত সে সহ্য করতে পারবে না। কাজেই মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই। যত তাড়াতাড়ি সমস্ত পিছুটান ছাড়িয়ে নেওয়া
যায় তত ভালো। হঠাৎ উকিলের কথায় সম্বিৎ ফেরে বোধির।
“মি. বোস? কাইন্ডলি এই
পেপার্সগুলোতে একটু সাইন করে দিন। তাহলেই সব কাজ কমপ্লিট হয়ে যাবে।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোধি কাগজগুলোয় সই করতে যাবে এমন সময় ভেজানো দরজা
খুলে ঘরে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো প্রবেশ করে বাসবদত্তা।
******
ফোনটা হাতে নিয়ে বসে ছিলেন অমলকান্তি। ঠিক দুপুর আড়াইটের দিকে ফোন করেছিলো বাসবদত্তা। সব ঠিকঠাক থাকলে তো এতক্ষনে ফোন এসে যাবার কথা। কিন্তু কই ফোন তো এলো না?
তাহলে কি বাসবদত্তা যায় নি? তা কি করে হয়?
যে বোমাটা ফাটিয়েছিলেন বাসবদত্তার সামনে তাতে তো ওকে বিচলিত মনে হচ্ছিলো। ইস প্ল্যানটা যদি সাকসেসফুল না হয় তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে! এতদিনের এত পরিশ্রম সব জলে যাবে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরে চলেছে সাথে পাল্লা দিয়ে অমলকান্তির টেনশনও বেড়ে চলেছে। ঠিক সাড়ে তিনটের দিকে ফোনটা বাঁজতেই লাফিয়ে নেচে উঠলেন অমলকান্তি। কিছুক্ষন পর কলটা রিসিভ করতেই অপ্রান্তের কথা শুনে হাসি চওড়া হলো তার ঠোঁটের। মনের ভাব গোপন রেখে বললেন,
“কি আর করা যাবে বলুন? যখন মালিকই মানা করছেন
তখন আমিই বা কি করতে পারি? যাক গে বাদ দিন।”
ফোনটা রেখে এক গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে চেয়ারে হেলান দিলেন অমলকান্তি। অবশেষে তিনি পেরেছেন! এত দিন ধরে একটু একটু করে যে প্ল্যানটা কষেছিলেন সেটা অবশেষে সফল হয়েছে। আজ থেকে দশবছর আগে যখন বোধিসত্ত্বকে ওর ঘরে অচৈতন্য অবস্থায় পান তখন ওর
মুখের সাথে রোদ্দুরের মিল পেয়েছিলেন তিনি। তার রোদ্দুরটাও যে এইভাবে আঘাত পেয়ে নিজেকে
শেষ করে দিয়ে তাকে আর বিশাখাকে সারাজীবনের জন্য একা করে দিয়ে গিয়েছিলো। ছেলের সব কিছুতেই সারাজীবন প্রশ্রয় দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এমন কি বৌমা বিদেশী হলেই আপত্তি করেন নি। কিন্তু মার্গারেটের সাথে রোদ্দুরের সম্পর্ক যে দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে সেটা ঘুনাক্ষরেও টের পান নি তিনি। ছেলেটার মৃতদেহ যেদিন ওর ঘরে পেলেন ততক্ষনে দেরী হয়ে গেছে। ছেলের শোকে বিশাখাও দু বছর পর তাকে ছেড়ে চলে গেলো। সেই থেকে তিনি ভীষণ একা। একাকিত্ব ভুলতেই কাজে ডুবে গিয়েছিলেন আপাদমস্তক। কিন্তু দিনের শেষে ফাঁকা ঘরে বুকটা হু হু করতো।
কাজের জন্যই কদিনের জন্য ভারতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে বোনের বাড়িতে থাকাকালীন বোধিকে দেখেন। বোধির গল্পটা জানতে পেরে একটু কষ্ট হয়েছিলো তার। লন্ডনে ফেরার আগে নিছক দেখা করতে গিয়েছিলেন ছেলেটার সাথে। কিন্তু অন্ধকার ঘরে ছেলেটাকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে
সন্দেহ হয় তার।
বোধিকে সুস্থ করে নিজের কাছে এনে নিজের ছেলের মতোই দেখছিলেন তিনি। ছেলেটা যাতে ওর অতীত ভুলে নতুন করে শুরু করে তার
কম চেষ্টা করেন নি তিনি। কাজে ঢুকিয়েছেন , বিজনেসের একটা পার্ট ওর নামে করে দিয়েছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতায় একজন উকিল বলে নিজের কন্সালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ করেছেন। তবুও ছেলেটার মন থেকে ওর অতীত মুছে ফেলতে পারেন নি। ডীল করতে গিয়ে প্রায় নিখোঁজ হয়ে যেত ছেলেটা। সিনেমা দেখতে গেলে মিস. মিত্রকে দেখে মুগ্ধ চোখে দেখতো। অথচ জিজ্ঞেস করলে লাজুক হেসে মাথা নাড়তো। অবশেষে বোনের কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন মিস . মিত্রই সেই মেয়ে যার জন্য বোধি
সেদিন মরতে গিয়েছিল। কিন্তু এই মেয়েটার জন্য বোধি এখনও কেন ভাবে
বুঝতে পারছিলেন না তিনি।
সেদিন মি. পাটিয়ালার প্রস্তাব নিয়ে বোধি যখন এই অদ্ভুত শর্তটা রাখলো তখনি সন্দেহ করেছিলেন
তিনি। তারপর সেদিন রাতের দিকে ফোনটা পেয়ে বুঝেছিলেন যে আগুন এখনও জ্বলছে ছেলেটার
মনের মধ্যে। কিন্তু ব্যাপারটা কি এক তরফা না
দু দিকেই চলছে? এটাই দেখার জন্য পরদিন কলকাতায় গিয়েছিলেন তিনি। আর মেয়েটাকে দেখে, ওদের একা বসতে দিয়ে লুকিয়ে ওদের
কথা শুনে বুঝেছিলেন জ্বলছে দুজনেই কিন্তু এত গুলো বছরে দুজনের মধ্যে একটা দুরত্বের,
অভিমানের দেওয়াল তৈরী হয়ে গেছে যার ফলে দুজনেই নিজের মনের কথা বলতে
পারছে না। তখনি ঠিক করেছিলেন দুজন কে মিল
করিয়ে ছাড়বেন। দক্ষ ব্যবসায়ী তিনি। জহুরীর নজরে দুজনকে পরিক্ষা করে বুঝেছিলেন দুজনের আলাদা হওয়ায় দুজনেরই
কোনো দোষ ছিল না। একটা ভুল বোঝাবুঝির জন্য দুজনে আলাদা হয়েছিলো। তখনই একটা পরিকল্পনা ভেবেছিলেন তিনি। সেই মতো দুজনকে মিশতে দিয়েছিলেন। তার পরিকল্পনা কাজ করতে শুরু করেছিলো। দুজনের মধ্যের বরফ গলতে শুরু করেছিলো।
কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন বোধি
ধীরে ধীরে সরে যেতে চাইছে বাসবদত্তার থেকে। অবশেষে সেদিন বোধি যখন বাড়িটা বিক্রি করতে
রাজি হলো তখনি বুঝলেন আর দেরি করা ঠিক হবে না। এখনই চরম আঘাত করে অভিমানের দেওয়ালটা ভাঙতে হবে। কিন্তু সে সুযোগটা দুজনের কেউই দিচ্ছিলো না তাকে। পাকাল মাছের মতো পিছলে যাচ্ছিলো দুজনে। কিন্তু তিনিও কম যান না। ক্রমশ দাঁতে দাঁত চিপে সুযোগের প্রতিক্ষা
করে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু আজকেই যে অপ্রত্যাশিত ভাবে এই সুযোগ
পাবেন এতটাও সৌভাগ্য কল্পনা করেননি তিনি। আজ যে কার মুখ দেখে উঠেছিলেন তিনি?
হাসতে হাসতে ভাবলেন আজকের দিনটা উৎযাপন করলে কেমন হয়? কিন্তু কি করে? এখানে তো তেমন মিষ্টি ফিষ্টি পাওয়া
যায় না। তাহলে কি করা যায়? ভাবতে ভাবতে ঠিক করলেন চা খেয়েই
উৎযাপন করবেন তিনি। গ্রিন টি ফিন টি নয় একেবারে দুধ চা।
ইন্টারকমে কল করে এককাপ চায়ের অর্ডার দিলেন অমলকান্তি। তারপর বসে বসে গুনগুন করে গাইতে লাগলেন পুরনো দিনের গান। কিছুক্ষন পরে মেড টি-পয় এনে এক কাপে চা ঢেলে
দিয়ে গেলো। হাসি মুখে গানে বিভোর হয়ে চোখ বুঁজে চায়ে
চুমুক দিয়ে মুখটা কুঁচকে গেলো তার। তাকিয়ে দেখলেন দুধ চায়ের বদলে মেড গ্রিন
টি দিয়ে চলে গেছে।
******
“বোঝার চেষ্টা করো দত্তা এভাবে হয় না।”
“আমি কিছু বুঝতে চাই না। তুমি এই বাড়ি বিক্রি করবে না ব্যস।”
“কিন্তু কেন? আমার বাড়ি আমি বিক্রি করবো কি করবো না সেটা বলার তুমি কে?
তুমি তো আমার বউ নও। এমনকি তুমি আমার কেউ নও।”
“জানি। কিন্তু এ বাড়িটা আমারও। এখানে আমারও স্মৃতি জড়িয়ে। এভাবে
আমাদের বাড়িটা তুমি বিক্রি করতে পারো না।”
“কোন অধিকারে একথা বলছো?সেদিন যখন আমাকে ছেড়ে চলে গেলে সেদিন তো এইসব
মনে পড়েনি তোমার! তাহলে আজ কেন?”
“সেদিন তুমিও তো আমাকে আটকাও নি। কতদিন প্রতিক্ষায় ছিলাম কই তুমি তো
আমাকে নিতে আসো নি? সব সময় নিজের জেদ, নিজের ইগো নিয়ে বসে রইলে। তোমার কাছে নিজের ইগোটাই
সব। একবার ভাবলে না আমি কি চাই?
আমি তো চাইনি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। তোমার ইগো, তোমার সন্দেহ আমাকে বাধ্য করেছিলো
বাড়ি ছাড়তে। নাহলে বাড়িটা তো আমারও ছিলো বোধি।”
“উফফ আবার সেই লেকচার! আবার
সেই কথার পিঠে কথা বলে তর্ক করা। তুমি কি একবারও বদলাবে না?”
“তুমি বদলেছো? সেই একই রয়ে গেলে মেগালোম্যানিয়াক
কোথাকার! সব সময় আমার বাড়ি, আমার
বাড়ি। একবার তো বললে না আমাদের বাড়ি। অবশ্য বলবেই বা কেন? মেল ইগো তে আঘাত লাগবে না?”
“উফফ একটু শান্তি দিতে পারো তো? ”
“দিয়েছিলাম তো! টানা দশবছর শান্তি দিয়েছিলাম কি
হলো? আত্মহত্যার চেষ্টা, মিডিল ক্লাস
মনোভাব সেই ন্যাকা মার্কা কান্না, নস্টালজিয়া, আর একগাদা কথা বলে আমাকে ফিরিয়ে আনলে তো?”
“আসতে কে বলেছিল?”
“আলবাত আসবো! আমার স্বামীর ঘরে আমি যতবার চাইবো
ততবার আসবো। কেউ আটকাতে পারবে না তুমিও না!”
“এটাই তো চাইনা আমি! তুমি ফিরে এসে আমাকে আবার দুর্বল
করে তোলো। আমি চাইনা আমি তোমার জীবনের কাঁটা হয়ে উঠি। এত বছর পর তোমার স্বপ্নপূরণ হয়েছে। এখন তুমি বড়ো নায়িকা। আমি চাইনা আমার জন্য তোমার এতো বছরের পরিশ্রম
জলে যাক। আমি চাইনা আমার জন্য তোমার অভিনয় জীবন নষ্ট হোক। ” বলে হতাশ গলায় নিজের কান্না চাপে
বোধিসত্ত্ব। দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে বলে, “ চলে যাও তুমি। আর ফিরে এসো না। আমি চাই না আবার আমাদের জীবন পুরনো দিনের
মতো অশান্তির হয়ে উঠুক। চাইনা আবার সেই মান অভিমানের পালা আবার
শুরু হোক। আবার আমি অহেতুক সন্দেহ করবো তোমায়, আবার আমার মেল ইগো আমাকে প্রভোক
করবে। চলে যাও তুমি দত্তা। আর ফিরে এসো না। এই বাড়ির সাথে তোমাকেও আমি মুক্ত করে দিলাম।”
“কিন্তু আমি তো চাইনি মুক্ত হতে।” বলে বোধিসত্ত্বর পিঠে হাত রাখে
বাসবদত্তা। “ আমি তো সংসার
করতে চেয়েছিলাম। মানছি আমি উদ্ধত ছিলাম। বৈভবে ছোটোবেলা কাটিয়ে প্রেমের আবেশে তোমার হাত ধরে যখন বাস্তবের মুখোমুখি
হলাম। তখন মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়েছিলো। কিন্তু তুমি তো জানতে মানানোর চেষ্টা কম করিনি। একবার বোঝালে বুঝতাম। কিন্তু তুমি বোঝানোর চেষ্টাই করো নি। ভুল বললাম, তুমি আমাকে বোঝার চেষ্টাই করো নি। আমাকে আটকাও নি তুমি। যেতে দিয়েছিলে নীরব হয়ে। এত বছর পর কেন ফিরলাম জানো?
যে টানে এতো বছর পর তুমি ফিরে এলে। তুমি ঠিকই বলেছিলে নিজের লঞ্চিং প্যাড এতো তাড়াতাড়ি ভোলা যায় না। একেবারে ছন্নছাড়া ছিন্নমুল হবার থেকে এটুকু পিছুটান থাকা ভালো। এই বাড়িতে আমাদের স্মৃতি সত্যিই জড়িয়ে আছে। হতে পারে আমরা জীবনে সেই পথটাকে ছেড়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছি। কিন্তু আমাদের স্মৃতিটা নিয়ে বাড়িটা আজও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। যেমন প্রতি বার এর টানে তুমি ফিরে আসো আজ আমি এলাম। আর রইলো আমার অভিনয় জীবনের কথা। এটা আমার জীবন আমিই বুঝে নেবো। তোমাকে ভাবতে হবে না।”
“বেকার বেকার এই সম্পর্কে জড়াচ্ছো তুমি। আবার একগাদা কষ্ট সহ্য করতে হবে তোমায়।”
“সে দেখা যাবে। এই পোড়া জীবনে তোমাকে ছাড়া কম তো জ্বললাম
না? ভালোবাসতে গেলে
একটু দহনের আঁচ তো পেতেই হবে। শুনেছি সোনা না পুড়লে খাটি হয়না। নাহয় আবার জ্বলে পুড়ে দেখবো জীবনটাকে। যাক গে ও কথা বাদ দাও। আপাতত বলো তো কি খাবে? খুব খিদে পেয়েছে আমার।”
মাথা তুলে তাকায় বোধিসত্ত্ব। দেখে সেই প্রথম দিনের মতোই ঝলমলে হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে ওর দত্তা। সেই প্রথম দিনের মতো স্বতঃস্ফূর্ত, হাসিখুশি দত্তা। ওর নাক উঁচু দত্তা। মাথা নত করে বোধি বলে, “পাগলী একটা। নাহলে জেনে বুঝে কেও আবার সর্বনাশের পথে পা বাড়ায়? সব আবার জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে। ”
“হোক! পরোয়া করি না। ভালোবেসে পুড়িয়ে যেমন সুখ তার চেয়ে বেশী সুখ ভালোবেসে পুড়ে। এতোদিন তো তোমাকে ভালোবেসে জ্বালালাম। এবার আমিও একটু পুড়ে দেখি।”
“সব শেষ হয়ে যাবে।”
“হোক!”
“আবার আমার মেল ইগোর জ্বালায় জ্বলতে হবে।”
“রাজি। ”
“সারাজীবন…।”নতজানু হয়ে বসে বোধির ঠোঁটে আলতো
করে নিজের ঠোঁট বসিয়ে বোধিকে চুপ করিয়ে দেয় বাসবদত্তা। তারপর নরম মোমের মতো তর্জনী দিয়ে বোধিসত্ত্বর ঠোঁট চেপে ধরে আধো আধো গলায়
বলে,
“চুপ! কত বকো তুমি? মুখ
ব্যথা হয়না? ওকালতি ছাড়লেও বকবকম থামে নি দেখছি। এবার একটু থামো।”
তারপর হঠাৎ কি একটা যেন মনে পড়ে যাওয়ায় বলে,“এই সেদিন বলেছিলে আমার হাতে পোঁতা
গাছে গোলাপ ফুটেছে কই দেখাবে না?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসে বোধি। উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “ বেশ চলো। ”
(আজ্ঞে নিয়ম অনুযায়ী গপ্পো এখানেই শেষ। তবে পাথকের উদ্দেশ্যে কয়েকটা ইনফো দিয়ে দি নাহলে এই দুজন আবার আমাকে জ্বালাবে।
দত্তা এখন নামী অভিনেত্রী। বাংলার পর আরবসাগরপারেও ওর নাম পৌছে গেছে। ওখানেও দারুন কিছু সিনেমায় অভিনয় করছে সে। তবে বাসবদত্তা নামটা বদলে ওরা বসুধা রেখেছে। জানি নামটার মানে বদলে গেছে কিন্তু কি করা যাবে বলুন তো?
বোধির চাপ বেড়ে গেছে। এখন সে গ্লোবাল সিটিজেন। দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। বছরে পাঁচদিন মাত্র ছুটি পায় আর সেটা বাসবদত্তার
সাথে কাটায়। কারন অমলকান্তি নিজের ব্যাবসার ভার ওর কাঁধে দিয়ে নিশ্চিন্ত
হয়ে পায়ের উপর পা তুলে নিজের বাড়ির বারান্দায় আরামকেদারায় বসে দুবেলা চা পান করেন। অবশ্যই দুধ চা। গ্রিন টি, কফির প্রবেশ ওনার বাড়ির ত্রিসীমানায় নিষিদ্ধ।
ও হ্যাঁ ভালোকথা। সেদিনের দুমাস পর আমাদের দত্তা-বোধির আবার ব্রেকাপ হয়। আজ্ঞে ঠিকই শুনেছেন। ওরা বিয়ে করে নি। কারন দুজনের মতে বারবার বিয়ে করে এই ব্রেক আপ প্যাচ আপ করতে থাকলে রেজিস্ট্রার
আর ডিভোর্সের উকিল দুজনের রক্তচাপ বেড়ে যাবে। দুজনেই ক্ষেপচুরিয়াস হয়ে ভায়োলেন্ট হয়ে যেতে পারে। কাজেই এই দুজনকে শান্তি দেওয়াই ভালো। তবে ওদের ব্রেকাপ-প্যাচ আপ চলছে। এই নিয়ে কতবার হলো বলতে পারবো না। ওরাও গোনা ছেড়ে দিয়েছে।)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন