অনুসরণকারী

বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

টেক্কা




ফোনটা রিসিভ করে সবটা শোনার পর চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল বাদশা। চারদিক কেমন যেন ঝাঁপসা হয়ে উঠল।মাথার দুপাশের রগে আঙুল দিয়ে চেপে চোখ বুঁজে বসে রইল সেকিছুক্ষন। ফোনে যেটা শুনল সে এরপর বড়োবাবুর সামনে দাঁড়ানোর সাহস আর ওর নেই।বড়ো মুখ করে ও ভরসা দিয়েছিল ম্যাডামকে। সব সব বৃথা হয়ে গেল। এই নিয়ে পর পর চারবার, পর পর চারবার চুরি হয়েছে এই সবুজগঞ্জে। আর চুরিটাও অদ্ভুত। সোনাদানা, টাকাপয়সা, ঘটিবাটি কিচ্ছু চুরি যাচ্ছে না। বরং চুরি যাচ্ছে অন্য কিছু।

 

স্যার শুনতে পাচ্ছেন?”  কন্ঠস্বর শুনে চোখ খুলে সামনে তাকালো বাদশা হেড কন্সটেবল রুইতন সামনে দাঁড়িয়ে  ছিপছিপে গড়ন, পরনে হাল্কা হয়ে আসা খাকি রঙের ইউনিফর্ম কাচুমাচু মুখে আবার বলল রুইতন, “ স্যার শুনতে পারছেন?” “হুম কিছু বলবে?” বলে সোজা হয়ে বসলো বাদশা সামন্তইয়ে মানে বড়োবাবু মানে ম্যাডাম আপনাকে ডেকেছেন খুব রেগে আছেন মনে হলোমনে মনে প্রমাদ গুনল বাদশা এই রে! তারমানে ম্যাডামের কানেও খবর গেছে! আজ বোধহয় আর রক্ষে নেই মনে মনে একটু আশঙ্কিত হলেও রুইতনের সামনে সেটা প্রকাশ না করে গম্ভীর গলায় সে বলল, “হুম তুমি যাও আমি আসছিবলে উঠে দাঁড়ালো বাদশা

 

রুইতন মাথা নেড়ে বাদশার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর থানার বাইরে বেঞ্চে গিয়ে বসলো। পাশেই বসে ছিল হরতন। সে এক হাতে খৈনি ডলতে ডলতে বলল, কিরে আজ মুখটা ওরকম হনুমানের মতো কালো করে বসে আছিস কেন?কি ব্যাপার? বউদি আজ সকাল সকাল করলা সেদ্ধ খাইয়েছে নাকি?বলে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগলো সে। হরতনের এই কথা গায়ে মাখল না রুইতন। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ম্যাডাম আবার স্যার কে ডেকেছেন।খৈনিতে তালি মারতে মারতে হরতন বলল, টেক্কা?রুইতন মাথা নাড়লো। খৈনিতে তালি মেরে পরিস্কার করে হরতন  এগিয়ে দিল রুইতনের দিকে। নিজের ভাগের খৈনি নিয়ে মুখে পুরে রুইতন বলল, ব্যাপারটা ক্রমশ গুরুতর হয়ে যাচ্ছে। হতভাগাটা বেশ বার বেড়ে গেছে।

 

অবশিষ্ট খৈনি মুখে পুরে হাত ঝেরে হরতন বলল, তা তো বটেই। কিন্তু চুরিটাও যে বড়ো অদ্ভুত। লোকের ঘটি,বাটি, টাকাপয়সা চুরি যায় শুনেছি।কিন্তু পুজোর ভোগ, ঠাকুরের সাজ, ভিয়েন, উনুন চুরি যায় জীবনে শুনি নি। মন্দিরের সিন্নি ভোগ চুরি।জীবনে এরকম শুনিনি।হতাশ গলায় রুইতন বলল, মেজবাবুর জন্য খারাপ লাগছে। সত্যি লোকটা বড্ড খাটছে। কিন্তু কোনো কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।বার বার এত বজ্রআটুনির পরও কিভাবে যেন পাঁকাল মাছের মতো পিছলে যাচ্ছে টেক্কাটা। আর মেজবাবুকে হাত কামড়াতে হচ্ছে।

 

তা এবার কে?” হরতন বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে জিজ্ঞেস করল রুইতন রাইফেলটা কোলে রেখে বলল,“ এবার পাঁকা খবর ছিল যোগেন গোঁসাই এর বাড়িতে টেক্কা হানা দেবে সেই মতো ফোর্স নিয়ে মেজোবাবু কড়া পাহারার ব্যবস্থা করে এসেছিলেন একটা মাছিরও গলে যাবার উপায় ছিল না কিন্তু আজ ম্যাডাম আর স্যারের মুখ দেখে মনে হচ্ছে টেক্কা আবার টেক্কা মেরে দিয়েছেহরতন আড়মোড়া ভেঙ্গে বলল,“ তা বেশ করেছে যোগেন গোঁসাই যে আদপে একটা কশাই এটা এই সবুজ গঞ্জের প্রত্যেকে জানেওর এই পুজো, এই সাধারন মানুষকে ভোগ খাওয়ানো যে লোক দেখানো আর ওর গুদামের বাসি পঁচা চাল, ডাল পার করে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়

 

শশব্যস্ত হয়ে ঠোটে আঙুল দিয়ে রুইতন বলল,চুপ! এই কথাটা এখানে বলেছিস বলেছিস। খবরদার এই কথাটা ম্যাডাম বা যোগেন গোঁসাইয়ের কানে না যায়। সর্বনাশ হয়ে যাবে।” “হোক গে। আমি কি ওকে ভয় পাই নাকি?ক্ষোভে  হিসহিস করে উঠলো হরতন। গোটা গ্রাম যোগেন গোঁসাই আর আঢ্যিবাবুর উপর খাপ্পা হয়ে আছে। সেই সোজারথে তিরির ছেলেটাকে ওভাবে মেরে ফেলার জন্য। কত বয়স ছিল বাচ্চাটার বলতো? কি দোষ করেছিল বেচারা? রথযাত্রায় শুধু রথের দড়িটা ছুঁয়েছিল ও। আর গোটা গ্রাম দেখেছে কিভাবে আঢ্যিবাবু ধাক্কা মেরে বাচ্চাটাকে রথের চাকার তলায় ফেলে দিল! তারপর কি হল? সব ধামাচাপা পড়ে গেল।আজও বাচ্চাটার চিৎকার আর ঐ হাড় ভাঙ্গার মটমট শব্দ এখনও কানে বাজে। এই সব লোকের জন্য টেক্কাই ভালো ওষুধ।

 

 রুইতন এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল কেউ ওদের কথা শুনছে কিনা তারপর ফিসফিস করে বলল,“ জানি কিন্তু এইভাবে চুরি করে কি ওকে সাজা দেওয়া যাবে?” হরতন রুইতনের দিকে তাকিয়ে বলল,“ মানে?” রুইতন হেসে বলল,“ মানেটা সহজ এইভাবে চুরি করে কি যোগেন গোঁসাইয়ের কোনো ক্ষতি করতে পারছে টেক্কা? এত পুকুরের থেকে একটা ঝিনুক দিয়ে জল তুলে নেওয়ার মতো গোঁসাইকে মারতে হলে যে অন্য পথ লাগবেহরতন রহস্যের গন্ধ পেয়ে বলল,“কোন পথ?” রুইতন চারদিক তাকিয়ে বলল,“এখানে নয় আজ রাতে বাড়িতে বলবো

 

()

 

ওসি রাধারাণী ভট্টাচার্যের কেবিনে ঢোকার আগে টুপিটা ঠিক করে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ইষ্টনাম করতে করতে বাদশা বলল,আসবো ম্যাডাম?ভেতর থেকে কাঁচের চুড়ির মতো রিনরিনে মোলায়েম কন্ঠস্বর ভেসে এল।কাম ইন!ভেতরে ঢুকে একটা মিহি মিষ্টি গন্ধ টের পেল বাদশা। একটা পেল্লাই টেবিলের ওপারে একটা রিভলভিং চেয়ারে বসে একটা ফাইল দেখতে দেখতে রাধারাণী হাই তুলে বললেন,খবর পেয়েছেন?বিড়বিড় করে বাদশা বলল,হ্যা ম্যাডাম। এইমাত্র খবর পেলাম।

 

ফাইলটা টেবিলে রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে এবার সরাসরি বাদশার দিকে তাকালেন রাধারাণী। সো এই ব্যাপারে  আপনার কিছু বলার আছে? কাল তো ভীষন আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন এবার নাকি টেক্কা আর পার পাবে না। এবার আপনি ওকে ধরবেনই তা কি হলো? কালকের সেই আত্মবিশ্বাস কোথায় গেলো? খুব তো বলেছিলেন টেক্কাকে হাজতে পুরবেন তা কোথায় টেক্কা? ইউ নো হোয়াট? আই থিঙ্ক ইউ কান্ট ডু দিস৷ সবার দ্বারা সব কাজ হয় না মি: সামন্ত৷ আপনারা কোনো কাজেরই নন৷ শুধু মুখে মুখেই যত বাতেলা৷ কাজের বেলা অষ্টরম্ভা৷ এতগুলো ফোর্স, এত সতর্কতা সত্ত্বেও টেক্কা আপনার নাকের তলা দিয়ে বেরিয়ে গেল আর আপনি বসে রয়ে গেলেন ৷ জাস্ট ওয়ার্থলেস! আপনাকে দিয়ে বোধহয় হবে না বুঝলেন? এককাজ করুন কেসটা আপনি মি: চক্রবর্তীকে হ্যান্ডওভার করে দিন৷ আর কদিন ধরে দেখছি আপনাকে একটু রেস্টলেস লাগছে৷ এককাজ করুন কদিনের সিএল নিয়ে নিন৷ আপনার মানসিক শান্তিও হবে আর বেশ কদিন ছুটি কাটাতে পারবেন৷

 

কানের মধ্যে যেন কেউ গলন্ত লোহা ঢেলে দিলো বাদশার৷ দশবছর, পর পর দশবছর হলো পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছে সে৷ আজ পর্যন্ত কেউ এই অপবাদ দিতে পারবে না যে সে থানায় বসে বসে মাছি তাড়ায়৷ বরং এত বছরের সার্ভিসে সে যে যে থানায় গেছে অপরাধীদের হাড়মাস ভেজে দিয়ে এসেছে৷ লাস্ট পোস্টিং ছিলো লালগড় সেখান থেকে ওর বদলী হবার দিন ওখান কার নাম করা গুন্ডা পান সিং পাঁড়ে মা কালির মন্দিরে মানত করা দুজোড়া পাঠা বলি দিয়েছে৷ কারন মাত্র ছমাসেই লালগড়ের দোর্দন্ডপ্রতাপ গুন্ডাকে নাকে দড়ি দেওয়া বলদের মতো ঘুরিয়েছে সে৷ বাচ্চার মতো কাঁদিয়েছে৷ খোচড় মুখে শুনেছে আজও নাকি রাতে মাঝে মাঝে ওর নামে ভয়ে কেঁপে ওঠে পান সিং৷ এই গ্রামে এসেই শুনেছিল টেক্কার কথা৷ এমনকি লোক লাগিয়ে দেখাও করে এসেছে সে৷ এটাই ওর অভ্যেস৷ শত্রুর সাথে মোকাবিলার আগে তাকে মেপে নিতে হয়৷ মেপে নেওয়ার পর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিলো সে মনে মনে৷ কিন্তু ক্রমশ সে হাসি ফুরিয়েছে৷  টেক্কা সত্যি সত্যি টেক্কা দিচ্ছে তাকে৷

 

পাঁচফুট দু ইঞ্চির ঐ গোবেচারা দেখতে লোকটার বিরুদ্ধে কোনো প্রমান পাচ্ছে না সে৷ অথচ সে জানে চুরিটা টেক্কা আর তার দুই শাগরেদ দুরি আর তিরি মিলে করছে৷ বামাল সমেত কিছুতেই ধরতে পারছে না সে৷ চুরির সাথে সাথে বাড়ি সার্চ করেও কিছু নেই৷ এমনকি হরতন,রুইতনকে ওদের বাড়িতে পাহারায় বসিয়েও লাভ হচ্ছে না৷ ক্রমশ মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে তার৷  এতবছরের ট্র্যাক রেকর্ডে পানের পিকের মতো দাগ ফেলে দিয়েছে টেক্কা৷ যার ফলে রোজ ম্যাডাম ওকে এইভাবে আক্রমন করতে সুযোগ পাচ্ছেন৷ 

দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজেকে সামলে বলে,আমিও তাই ভাবছি ম্যাডাম৷ কদিন একটু ছুটি নেবো৷ কিন্তু ঐযে মুদ্রাদোষ ৷ যতক্ষন পর্যন্ত এই সবুজগঞ্জে ক্রাইম না আটকাতে পারছি ততক্ষন পর্যন্ত শান্তিতে ঘুমোতে পারবো না৷ তবে শরীর আর সাথ দিচ্ছে না তাই আজকের দিনটা শেষবারের মতো চাইছি আমি৷ আপাতত এই অ্যাপ্লিকেশনে সই করে দিন৷ আজ রাতের পর ছুটি নেবো৷ তবে তার আগে টেক্কাকে ধরবোই৷ একটা ট্রেস পেয়েছি৷ প্লিজ ম্যাডাম আজকের দিনটা আমাকে সময় দিন৷বাদশার কথায় এমন কিছু ছিলো না করতে পারলেন না রাধারাণী৷ অ্যাপ্লিকেশনটা হাতে নিয়ে পড়তেই চকিতে তাকালেন তার দিকে৷ আর ইউ শিওর?বাদশা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গলায় বলল,একশো শতাংশ!রাধারাণী কিছুক্ষন বাদশার দিকে তাকিয়ে সই করে অ্যাপ্লিকেশনটা ফেরত দিয়ে বললেন,ওয়েল আজ রাত বারোটা পর্যন্ত সময় দিচ্ছি৷ তারপর আর সময় পাবেন না৷ বি কেয়ারফুল মি: সামন্ত৷ বাদশা অ্যাপ্লিকেশনটা ফেরত নিয়ে পকেটে পুরে বলে,চিন্তা নেই ম্যাডাম আজ রাতের মধ্যে টেক্কা আমার সাথে থাকবে৷

 

()

 

যোগেন গোঁসাইয়ের বাড়ি যখন পৌছলো বাদশা তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে৷  গেটের সামনে বাইকটা রেখে ভেতরে ঢুকলো সে৷ পাথরের সুড়িপথ ধরে এগিয়ে গেল যোগেন গোসাইয়ের দালানের দিকে৷  এই সবুজগঞ্জে মাত্র দুটো বড়ো পাকা দালানের বাড়ি আছে, এক এ গ্রামের জমিদার ইন্দ্রজিৎ আঢ্যর আর এই যোগেন গোঁসাইয়ের৷ যোগেন গোঁসাই নামে আর লোক দেখানোতে গোঁসাই মনে হলেও বাদশা জানে এটা ওর ভেক ছাড়া আর কিছু নয়৷ কানাঘুষোয় শুনেছে সুদের কারবার ছাড়াও আরো অনেক বেআইনি ব্যাবসা আছে৷  মাঝে মাঝে তার মনে হয় টেক্কাকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই৷  কারন ও যা করছে এতে যোগেন গোঁসাইয়ের বিন্দু মাত্র ক্ষতি হচ্ছে না৷ এ যেন সমুদ্র থেকে এক ঝিনুক জল তুলে নেওয়া৷

ইন্দ্রজিৎ আঢ্য দালানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, বাদশাকে দেখে এগিয়ে এসে বললেন,আসুন আসুন বাদশাবাবু৷ কি ঝামেলা বলুন দেখি? হতভাগা চোরের দল জগন্নাথের ভোগ, নৈবেদ্য সমেত বাসনগুলোও নিয়ে গেছে৷ এদিকে যোগেন হত্যে দিয়ে ঠাকুরঘরে পড়ে আছে৷ কথা বলতে বলতে বাদশা দালানের বাদিকে তাকিয়ে রথটা দেখতে পেল৷ প্রায় ছমানুষ লম্বা লোহার রথ৷ কাপড়, রাংতা, ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে৷

 

  আজ উল্টোরথ, জগন্নাথের বাড়ি ফেরার দিন৷ সে শুনেছে সবুজগঞ্জে রথের দিন আঢ্যদের বাড়ি থেকে ওদের কুলদেবতা চক্রপাণী জগন্নাথবেশে যোগেন গোঁসাইয়ের বাড়িতে আসেন৷ এবং আটদিন গোঁসাইয়ের বাড়িতে পুজো পান৷ এই আটদিন গ্রামে অরন্ধন চলে৷ গ্রামের সকলে দুবেলা পাত পেড়ে ভোগ গ্রহন করে যোগেন গোঁসাইয়ের বাড়ি৷ তাকেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল৷ কিন্তু সে যায় নি৷ নিমন্ত্রণ বাড়ির খাবার তার ভালো লাগে না৷ এত খাবার নষ্ট হতে দেখে তার কষ্ট লাগে৷  সে স্বল্পাহারী৷ তার মতে খাবার খাওয়া উচিত খিদে মেটানোর জন্য৷ পেট ভরানোর জন্য নয়৷  নিজে রান্না করে সামান্য চাল ডাল ফুটিয়ে খেয়ে নেয় সে৷ রথের দিকে তাকিয়ে সে বলল,“ চলুন যাওয়া যাক৷ দেখি কি অবস্থা?”

 

ঠাকুরঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় টোকা দিতেই বেরিয়ে এলো যোগেন গোঁসাই৷ বাদশাকে দেখে হাহা করে কেঁদে বলল,অ দারোগাবাবু! আমার একি সব্বোনাশ হলো গো ? দারোগাবাবু চোরে আমার চক্রপাণীর ভোগের পেরসাদ বাসন সমেত নিয়ে গেল ! এমন কি সাজের গয়নাটুকু নিয়ে গেছে গো! আপনিই তো বলিসিলেন যে আমার গুদামের চোররে ধইরে দেবেন কিন্তু এতো এবার ঘরে ডাকাতি করলো গো! এরপর কাছারির চাবি, আলমারির টাকাও চুরি যাবে গ! ওমাগো!যোগেনের এই ছিঁচকাদুনি দেখে মাথা গরম হলেও সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শান্ত করলো বাদশা৷ যোগেন যে এইকথা গুলো শুধু বাড়িয়ে বলছে না বরং তার অক্ষমতাকেও টিটকিরি দিচ্ছে সেটা বুঝতে কষ্ট হলো না তার৷

 

এটা সবুজগঞ্জ না হয়ে লালগড় হলে এতক্ষনে যোগেনের গালে আধডজন চড় পড়ে যেত৷ মাথা ঠান্ডা করে সে বলল,আপনাকে দেওয়া কথা রাখতে না পারায় দুঃখিত যোগেনবাবু৷  চোরটা যে এভাবে ধোকা দেবে জানলে কিছুতেই আপনাকে ঠাকুরঘর ছাড়তে বলতাম না৷ তবে কথা দিচ্ছি হারানো সব জিনিস ফেরত পাবেন আপনি৷ এককাজ করুন এক এক করে সেগুলোর নাম বলুন আমি টুকে নিচ্ছি৷ বলে পকেটডাইরি বের করে বাদশা৷ আঢ্যবাবু বলেন , শুধু জিনিস ফেরত দিলেই হবেনা চোরটাকেও ধরা চাই বাদশাবাবু৷ একবার ওকে বাগে পেলে না বাঁশডলা!বাকি কথাটা বলতে পারলেন না তিনি কারন বাদশা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছে তারদিকে৷

 

 “সে দিন আর নেই আঢ্যবাবু যখন আপনারাই প্রজাদের দন্ডমুন্ডের কর্তা ছিলেন৷ এখন সব গণতান্ত্রিক হয়ে গেছে৷ তাই আইন  হাতে তুলে নেওয়ার  কোনো অধিকার নেই আপনার৷ ওটা আমাদের দায়িত্ব৷ আর এমনিতেই সদ্য একটা ঝামেলা থেকে উঠেছেন আরেকটা ঝামেলায় পড়তে ভালো লাগবে?” জোকের মুখে যেন নুনের ছিটে পড়লো৷ পরক্ষনেই গুটিয়ে গেলেন ইন্দ্রজিৎ আঢ্য,“আমি ওভাবে বলতে চাই নি৷” “বেশ তাহলে আমাকে আমার কাজ করতে দিন৷ আর দয়া করে ফোড়ন কাটবেন না৷হাতে হাত কচলে ইন্দ্রজিৎ আঢ্য বললেন,“তা তো বটেই! তা তো বটেই!” মনে মনে বললেন,“সাপের ল্যাজে পা দিচ্ছো অফিসার৷ কদিন এই সবুজগঞ্জে টিকতে পারো আমিও দেখবো!” আচমকা বাদশার মুখে এরকম শীতল দাবড়ানি শুনে অবাক হয়ে গেছিল যোগেন গোঁসাই৷  তার সম্বিত ফিরলো বাদশার ডাকে,“কি হলো বলুন? কি কি খোয়া গেছে?”

 

()

 

বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে এসে জামাকাপড় ছেড়ে টিউবওয়েলে একবালতি জল নিয়ে গায়ে ঢালতেই শরীর মন চাঙ্গা হয়ে উঠলো বাদশার৷ থানায় কোয়ার্টার থাকলেও থানা থেকে দশ মিনিটের হাটা পথ দুরত্বে এই ঘরটা নিয়েছে ও৷ বেশ নিরিবিলি আর নিঝুম জায়গাটা৷ একফালি উঠোনের এক কোণে ছোটো ছোটো ফুলের চারা লাগিয়েছে সে৷ স্নান করে এক বালতি জল নিয়ে সেই চারাগুলোয় দিয়ে সে দাওয়ায় বালতিটা রাখলো৷ তারপর ভেজা গামছা পাল্টে জামাকাপড় পড়ে স্টোভে চা তৈরী করে বারান্দায় চেয়ার পেতে বসলো সে৷

আজ রথযাত্রার সাথে সাথে পুর্নিমাও বটে৷  ধীরে ধীরে আকাশে চাঁদ উঠলো৷  জ্যোৎস্নার আলো এসে পড়লো একফালি উঠোনে৷ ঝিঁঝিঁর ডাকে কানপাতা দায়৷ কিন্তু উৎকর্ণ বাদশার কানে দুটো শব্দ ভেসে এলো৷ এক দুরে নাম সংকীর্তনের শব্দ৷ তারমানে যোগেন গোঁসাইয়ের বাড়ি থেকে চক্রপাণী বেরিয়ে পড়েছেন৷ দুই কে যেন পা টিপে টিপে এগিয়ে আসছে তার বাড়ির দিকে৷ প্যান্টের কোমরে গোঁজা রিভলবারটা একবার হাত দিয়ে দেখে নিয়ে স্থির হয়ে বসলো সে৷

 

ধীরে ধীরে একটা ছায়ামুর্তি চাদর মুড়ি দিয়ে  ক্রমশ এগিয়ে এসে দাঁড়ালো তার সামনে৷ অলস গলায় বাদশা বলল,চা খাবে দুরি?ছায়া মুর্তি মাথা নাড়লো৷  বাদশা বললো,ওদিকে কি খবর?ছায়ামুর্তি এবার চাদর সরিয়ে বলল,সব পরিস্কার স্যার ! যোগেন গোঁসাই দলবল নিয়ে বেরিয়ে গেছে বাড়ি ফাঁকা!

 

হুম ফিরতে কতক্ষন লাগবে?”

 

ফিরতে ফিরতে ভোর রাত স্যার!”

 

হুম, চলো!”

 

বলে ঘরে চেয়ার রেখে দরজায় তালা মেরে বেরিয়ে এলো বাদশা৷

 

******

খবর পেয়ে যতক্ষনে যোগেনরা ফিরে এসেছে ততক্ষনে বাদশারা ঠাকুরঘরে শাবল, কোদাল নিয়ে নেমে পড়েছে৷ যোগেন এসেই চিৎকার করতে লাগলো,“ এটা অন্যায় ! ঠাকুরঘরে এইভাবে আপনি ঢুকতে পারেন না গো দারোগাবাবু! চক্রপাণীর থান ভাঙলে পাপ হবে যে ! তার অভিশাপ থেকে আপনি বেরোতে পারবেন নি! এটা করবেন নি দারোগাবাবু!” বাদশা ওর কথায় কান না দিয়ে কনস্টেবলদের বলে,“থামবি না খুড়তে থাক! ন্যায় অন্যায় আমি বুঝবো! তোরা খোড়!”

 

 আঢ্য বিপদবুঝে নরম সুরে বলে,“আহা কি করছেন কি বাদশাবাবু? উঠে আসুন! ওমন করবেন না! আপনার সাথে একটা কথা আছে!”

 

বাদশা বলে,কিন্তু আমার আপনার সাথে কোনো কথা নেই আঢ্যবাবু! আপনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকুন! আমার কাজ করতে দিন!

 

উপায় না দেখে এবার ভয় দেখায় আঢ্য৷ ভদ্রতার মুখোশ খুলে পড়ে তার,হোয়াট এ অডিসিটি? এর ফল আপনাকে ভোগ করতে হবে! আমি হায়ার অথারিটির সাথে কথা বলবো! আপনি জানেন না আমার দৌড় কতদুর? আপনার চাকরি খেয়ে নেবো আমি! আপনি আমায় চেনেন না!

 

জানি! উপর মহলের কয়েকজনের টিকি বাঁধা আপনার কাছে তাও বলছি আপনি আমার কিছু ছিঁড়তে পারবেন না! রুইতন! , হরতন ! আরেকবার কেউ বেগড়বাই করলে সোজা কপালে গুলি চালিয়ে দেবে৷  যদি না পারো অন্তত সারা জীবনের জন্য খোঁড়া করে দিও! ” বলে কোমর থেকে রিভলবারটা বের করে সামনে তাকায় বাদশা৷ রুইতন চোখ টিপে বলে হরতনকে,“কি বুঝলি?” হরতন রাইফেল বাগিয়ে হেসে বলে,“শঠে শাঠ্যম গুরু!”

 

হাত পাঁচেক খোড়ার পর একটা ধাতবশব্দ পেয়ে সবাই আরো উৎসাহে খুড়তে থাকে৷ কিছুক্ষন পর সকলে মিলে একটা সিন্দুক উপরে তুলে আনে৷ ডালাটা ভাঙতে বেশী কসরত করতে হয় না বাদশাকে৷ পুরোনো ডালা সহজেই ভেঙে যায়৷ ভেতরের জিনিসটা দেখে সে অবাক হয় না৷ একটা কঙ্কাল দুমড়ে মুচড়ে রাখা ভেতরে৷

 

()

 

ভোরবেলা যখন আসামীদের নিয়ে বাদশা থানায় এলো তখন রাধারাণী থানাতেই ছিলেন৷ পেছনে গাড়িতে করে আনা অন্তত বারোটা ট্রাঙ্ক দেখে তিনি অবাক হলেন না৷ কারন বাদশার সেই অ্যাপ্লিকেশনে ততটাই আশঙ্কা করা হয়েছিলো৷  ট্রাঙ্ক খুলে সোনার বিস্কুট, বিদেশী অস্ত্র, আফিম গুঁড়োর প্যাকেট আর অনেকগুলো নকল টাকা বাজেয়াপ্ত হলো৷ রাধারাণী বাদশার কাছে সবটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন৷ তাঁর অফিসে বসে বাকি কথা হলো৷

 

চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে শুরু করলো বাদশা৷ সন্দেহের সুত্রপাত ঘটেছিল লালগড়ে ম্যাডাম৷ লালগড়ে কি পরিমান অস্ত্র, আফিং গুঁড়োর ব্যবসা হয় আপনি জানেন৷ আমার সোর্স মারফত খবর পেয়েছিলাম এই সবুজগঞ্জ থেকেই নাকি লালগড়ে আফিং আসতো৷ কিন্তু এখানে এসে একটাও পোস্তগাছ না দেখে আমার খটকা লাগে৷ এখানকার সোর্স লাগিয়ে জানতে পারি যে এখানে নাকি কস্মিনকালেও পোস্তচাষ হয় নি৷ কিন্তু আমার লালগড়ের সোর্স জোর দিয়ে বলছে যে ওরা এখান থেকেই আফিং কেনে৷ কিন্তু আমি ভেবে পারছিলাম না যে  এটা কি করে সম্ভব? যেখানে পোস্তচাষই হয় না সেখান থেকে আফিং কি করে রপ্তানি হবে? কাজেই নিজেই খোঁজে বেরোলাম৷ এবং দেখলাম এখানে পোস্তচাষ হয় এবং পুরোদমে হয় কিন্তু জনসাধারনকে লুকিয়ে৷

 

খোঁজ করে জানলাম এই গ্রামে দুজনের ক্ষেতে এই পোস্ত চাষ হয় কিন্তু সেটা এমনভাবে যে চটকরে ধরা অসম্ভব৷ প্রায় কুড়ি বিঘা জমির ভুট্টার মাঝে চাষ করা হয়৷ আর চাষ করে এই দুজনের খপ্পরে পড়া কয়েকজন ভাগচাষী৷ যোগেনের কাছে টাকা ধার নিয়ে শোধ করতে না পারলে এভাবে টাকা পুষিয়ে দিতে হতো তাদের৷ চাষ শেষে প্রাণের মায়া ত্যাগ করতে হতো তাদের৷ আমি নিশ্চিত যোগেন আর আঢ্যর ক্ষেত খুড়লে আরো মৃতদেহ পাবো আমরা৷ শুধু তাই নয় আমি  আরো খোঁজ করে জানলাম শুধু আফিংই নয় দেশজ উপায় তৈরী আগ্নেয়াস্ত্রও এখান থেকে যায় লালগড়ে৷ কিন্তু শুধুমাত্র সারকামস্টানশিয়াল এভিডেন্সের উপর ভিত্তি করে চার্জ করা ইমপসিবল ছিলো৷ তার উপর ওরা যদি সতর্ক হয়ে যেত তাহলে আজকের রেইডটা সম্ভব হতো না৷ তাই অপেক্ষায় থাকতে হলো৷ তবে বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হয় নি অপরাধীরা নিজেরাই ভুল করে বসলো৷ সোজা রথের দিন একটা বাচ্চাকে ভুলবশত খুন করে বসলো ওরা৷ ফলে একদিকে সুবিধে হলো আমার৷ অপরাধীরা সমস্ত জিনিসের লেনদেন পিছিয়ে দিলো৷ সোর্স লাগালাম ওদের পেছনে৷ ঘটনাচক্রে সেই খুন হওয়া শিশু আমারই এক সোর্সেরই সন্তান ছিলো  ফলে সেই সোর্স প্রতিশোধে স্বপ্রণদিত হয়ে অপরাধীদের  প্রতিমুহুর্তের খবর দিতে লাগলো আমায়৷  আরেকজন সোর্স রইলো ওদের বাড়ির ভেতরে এমনভাবে যে কেউ সন্দেহ করলো না তাকে৷ এমন কি হয়তো বিশ্বাসও করবে না তারা যে সে সেখানে ছিলো৷ সেই সোর্স আমায় বাড়ির আনাচে কানাচের খবর দিলো৷ তারপর আর কি আমার খেলা শুরু করলাম৷

 

আমার মুল লক্ষ্য যে যোগেন গোঁসাইরা এটা কাউকে জানতে না দিয়ে টেক্কার পেছনে পড়লাম আমি৷ সবাই জানলো টেক্কা আমায় নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছে৷ শেষ মুহুর্তে চুরিটা হওয়ার ফলে  আমি প্রবেশ করলাম যোগেনের প্রাসাদে৷ সকলের আড়ালে সেই সোর্স আমায় জানালো কাল বিকেলে লেনদেন হয়ে গেছে৷ ব্যস সুযোগ বুঝে বামালসমেত ধরলাম ওদের৷

 

রাধারাণী সবটা শুনে বললেন,সবটা বুঝলাম কিন্তু কঙ্কালটা কার?বাদশা এবার মলিন হেসে বলল,এক হতভাগ্যের৷ হয়তো এই পোস্তচাষের ব্যাপারে সব জেনে গেছিল যার মাশুল হিসেবে প্রাণ দিতে হলো তাকে৷ যাকগে ম্যাডাম এবার আমার কাজ শেষ৷ কদিন ছুটিতে যাচ্ছি৷ কেসটা আপনার হাতে তুলে দিলাম৷ যা প্রমান আছে ওয়াটার টাইট চার্জশিট বানাতে অসুবিধে হবে না৷বলে উঠতে যাচ্ছিল বাদশা , রাধারাণী বলে উঠলেন,এত সহজে তো আপনি ছুটি পাবেন না মি: সামন্ত! এখনও অনেক কাজ বাকি আর আপনি ছুটি নিচ্ছেন? চার্জশিট তৈরী করেঅপরাধীদের জেলে পাঠিয়ে তবে আপনার ছুটি তার আগে নয়৷ কাল সারারাত খাটনি গেছে এখন যান রেস্ট নিন বাড়ি গিয়ে৷ ওবেলা ডিউটি জয়েন করবেন৷” 

বাদশা হেসে মাথা নেড়ে বলল,ওকে ম্যাডাম৷তারপর স্যালুট ঠুকে বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে৷

 

******

 

দুপরবেলা খিচুড়ির হাড়িটা স্টোভ থেকে নামাতেই বাচ্চাদের গলার স্বর শুনে খুশি হলো বাদশা৷  ওই ওরা এসে গেছে৷ ঝটপট তরকারীর গামলা আর খিচুড়ির হাড়িতে ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে এসে দেখলো একঝাক উজ্জ্বল পায়রার মতো কয়েকটা ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে৷ তাদের সাথে এসেছে তিনজন আগন্তুক৷ গতকাল ওরা খেতে পারে নি তাই হরতনকে দিয়ে নিমন্ত্রণ করেছিল ওদের৷ হরতন, রুইতনও এসেছে৷  বাদশা হেসে ওদের সবাইকে স্বাগত জানালো৷  তারপর ঝটপট মাদুর পেতে সব বাচ্চাদের বসিয়ে আগন্তুকদের সাহায্যে খেতে দিলো সে ৷ তারপর সে আর আগন্তুকরা একসাথে খেতে বসলো৷ গরম গরম খিচুড়ি তরকারী দিয়ে খেতে খেতে বাদশা বলল,তুমি বহুরূপী জানতাম৷ কিন্তু এতটা ভাবতেও পারিনি৷ কিন্তু কি করে? আগন্তুক তরকারীর আলু মুখে দিয়ে বলল,ভেক ধরার বিদ্যেটা বাপে শিখিয়েছিল স্যার৷ ঐ করেই তো সংসার চলতো৷ বাপে শেখানো বিদ্যে কোনো রকমে ধরে রেখেছি স্যার৷

 

কিন্তু অতক্ষন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব?”

 

কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকলে সবই সম্ভব স্যার৷

 

সত্যিই তাই আমি যোগেনের বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজছি তোমায়৷ এদিকে তুমি চোখের সামনে দাঁড়িয়ে৷ শেষমেশ চক্রপাণীর মুর্তির ভেক ধরে থাকলে কে ধরবে? তার উপর ওরম মেকাপ৷

 

মেকাপটাই তো বাঁচালো স্যার৷ ভাগ্যিস গোঁসাই আর কোথাও রাখুক না রাখুক ঠাকুরঘরে এসি চালিয়ে রাখতো তাই ঘাম হয় নি না হলে!”

 

ধন্যি মানতে হবে তোমাকে৷ কিন্তু মুর্তির সাথে অদলবদল করলে কি করে? আর ভোগ নিয়ে পালাতে কোথা দিয়ে?”

 

ওটাই তো কেরামতি স্যার! সবাই কে বলা যাবে না৷ যে কি বলে ? হ্যা ট্রেড সিগ্রেড!এটা আমার ট্রেড সিগ্রেড৷বলে হাসে আগন্তুক৷

 

হো হো করে হেসে ওঠে বাদশা৷ তারপর বলে,বাহ ভালোই তো ইংরেজি জানো?আগন্তুক লজ্জা পেয়ে বলে,কোথায় স্যার? আমি তো ক্লাস থিরি পাস৷ আপনাদের মতো অতো ইনজিরি পারি না৷ তবে পড়া লেখার ইচ্ছে ছিলো না এটা না৷ বাপ চাইতো আমি পড়াশুনো করি, মস্ত মানুষ হয়ে আপনার মতো চাকরি করি৷ তা আর হলো কই? ও সব আমার কপালে নেই৷ লালগড়ে দুর্গাপুজোয় চৈতন্য সেজে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একদিন অজ্ঞান হয়ে গেল বাপ৷ ডাক্তার বললেন হার্টের ব্যামো হয়েছে৷ সেই ব্যবসা গেল৷ যোগেন গোঁসাইয়ের কাছে আমার পড়ালেখার জন্য ধার নিয়েছিল সেটা শোধ দিতে গিয়ে!বলে বাহাতে চোখের জল মোছে আগন্তুক৷ বাদশা আগন্তুকের কাঁধে হাত রেখে বলে,জানি৷ সেই সময় ঝোকের বশে খুনটা করে আঢ্যই৷ তারপর দুজনে মিলে পুরোনো সিন্দুকে লাশ পুরে পুঁতে দেয় ঠাকুরঘরে৷ সেই কারনে লাশ চিনলেও প্রকাশ করিনি৷ এই ফরেনসিকের ঝামেলা মিটলেই কঙ্কাল ফেরত পাবে তুমি৷ তারপর পিতৃকর্ম করো৷ এত বছর তাঁর দেহ সৎকার হয়নি৷ এবার হবে৷

 

বাহাতে চোখের জল মুছতে মুছতে বলে আগন্তুক,কেউ নিজের ইচ্ছে তে চোর হতে চায় না স্যার! পরিস্থিতি বাধ্য করে চুরি করতে৷ বাপ নিখোঁজ হবার সাতদিনের মধ্যে মা টাও বাসের তলায় চাপা পড়ে গেল স্যার৷ মায়ের মরার পর পাড়া প্রতিবেশীদের দেওয়া খাবারে একবছর চললো৷ কিন্তু তারপর একে একে সব কটা মুখ ফিরিয়ে নিলো স্যার৷ এ বড়ো স্বার্থপর দুনিয়া স্যার এখানে মানুষ প্রয়োজনে নয় আয়োজনে থাকে৷ কাজেই চুরি করতে নামতে হলো৷ প্রথম প্রথম হাটুড়ে মার খেলেও পরে জহুরীর হাতে পড়লাম৷ তিনি আমায় ঘষে মেজে তুললেন৷ তন্ময় বাগদী হয়ে উঠলো টেক্কা৷ সামান্য রুটি চুরি করতে গিয়ে যে হাটুড়ে মার খেত তার হাতসাফাইতে চোখের সামনে চুরি হতে লাগলো অথচ যার মাল সে ধরতে পারলো না৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন এমন টা হতে চাইনি স্যার৷ আমি একটা নিরীহ ভদ্রস্থ জীবন পালন করতে চেয়েছিলাম৷ গাঁয়ে ফিরে দেখলাম আমার মতো আরো টেক্কা জন্ম নিচ্ছে৷ ওদেরও বাবা মা নেই, কাছের লোক কাঁচের গুড়োর মতো সরে গেছে৷ ওরা ক্রমশ নিরুপায় হয়ে যেকোনো সময় আমার পথে পা বাড়াবে এমন অবস্থায় স্থির থাকতে পারিনি৷ আমি যে পথে গেছি সে পথে যেতে দিই নিই ওদের৷ সবকটাকে একসাথে জড়ো করে আশ্রমের মতো খুলেছি৷ সেখানে পড়ালেখা, গানবাজনা সব হয়৷ হ্যা আমরা তিনজন চুরি করি, কিন্তু বিশ্বাস করুন ওদের এ বিদ্যে আমরা কোনোদিন  শেখাই নি৷ বরং কেউ হাতসাফাই করলেও তাকে শাসন করেছি৷

 

এটাও জানি পর পর চারদিন ভোগ চুরি করে তোমরা ওদের খাওয়াতে৷ কারন যোগেনের পুজোয় সকলের প্রবেশাধিকার হলেও অনাথ শিশুদের অধিকার ছিলো না৷ তার উপর ওরা তোমার আশ্রিত৷ সে ভাবতো তোমাদের মতোই ওরা চোর৷ আর সেই আক্রোশেথামে বাদশা৷ বাচ্চাটার মায়াভরা মুখ মনে পড়ে যায় তার৷ রথের লোহার চাকা আড়াআড়িভাবে পিষে দিয়েছিল বেচারাকে৷ সেই মুহুর্তে মনে হয়েছিল কুকুরদুটোকে ওখানেই গুলি করে দেয়৷ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলেছিলো সে৷

 

টেক্কা হেসে বলে,আপনাকে পেত্থম দেখেই বুঝেছিলাম আপনি মানুষ ভালো৷ তার উপর সেদিন কানাইকে ওভাবে দেখে আপনার মুখটা যেভাবে লাল হয়ে উঠেছিল সেটাতেই বুঝেছিলাম আপনার লক্ষ্য আমি নই৷ লক্ষ্য ওরা৷ সত্যি কথা বলতে কানাইয়ের মৃত্যুর সময় আমিও স্থির থাকতে পারিনি৷ আমার ভারেই বাচ্চাটা! বড্ড ন্যাওটা ছিলো আমার৷ যাকে কোলে পিঠে মানুষ করলাম আমার রথেরই সামনে! এর শাস্তি তো ওদের পেতে হতোই স্যার৷ পাপের ঘড়া পুর্ণ হয়েছিল ৷ তাই তো! স্যার একটা কথা বলবো?

 

জানি! কানাইয়ের হত্যার কেসটা ধামাচাপা হয় নি মোটেও৷ ওটা ব্রহ্মাস্ত্রের মতো লুকিয়ে রেখেছিলাম৷ আর এই কেসের প্রত্যক্ষদর্শী তো তুমি টেক্কা৷ তোমায় কোর্টে বয়ান দিতে আসতে হবে৷ আসবে তো?”

 

চোখ মুছে টেক্কা বলল,আসবো! আমায় আসতে হবেই স্যার নাহলে কানাইটা বিচার পাবে না৷ আমি আসবো!


 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...