হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকাপড়গুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল সে। আরেকটা ব্যাগে পুরে নিল এখান থেকে কেনা শাল, মাফলার, সুভ্যেনির গুলো। লাগেজ গুছিয়ে রুমের এককোণে রাখার পর স্মার্টফোনটা নিয়ে বিছানার উপর বাবু হয়ে বসে ফেসবুক অন করল সে। গতকাল পিস প্যাগোডার সামনে তোলা ছবিগুলোতে ভালো রিচ এসেছে। কমেন্টে অনেকে অতীনের স্বাস্থ্য নিয়ে আপডেট জানতে চেয়েছেন। আবার অনেকে আরো কিছু দর্শনীয় স্থানের সাজেশন দিয়েছেন। সেই কমেন্টগুলোর উত্তর দিতে দিতে আড়চোখে অতীনের দিকে তাকিয়ে মধুজা দেখল অন্যদিনের মতো আজও অতীন জানলার ধারের চেয়ারটায় বসেছে। তবে আজ যেন সেই স্বতঃস্ফূর্তভাব, সেই শান্ত অথচ চনমনে মুডটা যেন অতীনের নেই। কোনো কারণে আজ যেন ওর সেই চিরপরিচিত আমুদে ইমেজটা ম্লান হয়ে আছে। বরং কিছু একটা যেন ওকে ভেতর থেকে একসাথে অশান্ত ও শোকগ্রস্ত করে তুলেছে। এতদিনের চেনা অতীনের হাবভাব আজ কেন জানে না ভীষণ অচেনা লাগল মধুজার। কিছুক্ষণ অতীনের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে থাকার পর আবার ফেসবুকে মনোনিবেশ করলো সে। একসময় ফেসবুকের কমেন্ট, উত্তর-প্রত্যুত্তর, লাইক-শেয়ারের পালা সাঙ্গ হলে ফোনটা চার্জে বসিয়ে মধুজা জিজ্ঞেস করল, “রাত কত হল খেয়াল আছে? ঘুমোবি না?”
জানলার ধারে বসে বাইরের শহরটা দেখতে দেখতে অতীন যেন কোনো গভীর চিন্তায় হারিয়ে গিয়েছিল। আচমকা মধুজার ডাকে সম্বিত ফিরল তার। মৃদু চমকে সে মধুজার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল তারপর পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “তুই শুয়ে পড়। আমি একটু পরে শোবো।”
অতীনের কাছ থেকে এরকম উত্তর পেয়ে একটু অবাক হল মধুজা। চিরকাল সময়ানুবর্তিতা নিয়ে ভীষণরকম সচেতন অতীন। বিগত কয়েক বছরে সেই সচেতনতা আরো বেড়েছে। সময় মতো ওষুধ খাওয়া, সময় মতো লাঞ্চ-ডিনার সেরে ঘুমোতে যাওয়া। এতদিনে হাজার অসুস্থতা, অসুবিধের মধ্যে একবারের জন্যেও অতীনের এই রুটিনের তারতম্য ঘটেনি। তবে আজ এর ব্যতিক্রম ঘটল কেন?
মধুজা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে দেখে একটু হেসে অতীন বলে, “না মানে কাল তো আমরা চলেই যাচ্ছি। তাই ভাবছিলাম আজকের রাতটা একটু জেগেই থাকি। ঐ যে তুই বলিস না! কিছু মুহূর্তকে স্মৃতির মণিকোঠায় জমিয়ে রাখতে হয়। সেটাই করবো ভাবছি। বাইরে কীরকম সিনারিও তৈরী হয়েছে দেখ। সেটাই দেখতে দেখতে ভাবছিলাম মোমেন্টটা এখানে থমকে গেলে ভালো হত। কাল থেকে তো আবার সেই একই রুটিন। আবার কবে আসবো কে জানে?”
অতীনের কথা শুনে জানলার বাইরে তাকাল মধুজা। সত্যিই বৃষ্টির ফোঁটা আর রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের আলোয় একটা চমৎকার ল্যান্ডস্কেপের মতো দৃশ্য তৈরী হয়েছে বাইরে। বৃষ্টিতে ভেজা রাস্তায় ল্যাম্পপোষ্টের আলোয় পিছলে সৃষ্টি করেছে এক আলোআঁধারি মায়ার। শব্দের মাধ্যমে যার বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিছুটা আনমনা হয়ে পড়লেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে মধুজা বলে ওঠে, “ঠিক আছে আর পনেরো মিনিট। তার বেশি নয়। কাল সকালে বেরোতে হবে আমাদের। বেশি রাত করিস না।”
পরদিন ওরা যখন দার্জিলিং থেকে রওনা দিল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। যাওয়ার আগে অবশ্য অতীনের ক্ষতর সেলাই কাটার উদ্দেশ্যে ড. প্রধানের চেম্বারে ঘুরে এসেছে ওরা। অতীনের গালে আর কপালে স্টিকিং ব্যান্ডেজ আটকানো বলে কথা বলা বারণ তাই এই মুহূর্তে দুজনেই চুপচাপ গাড়িতে বসে বৃষ্টিস্নাতা পাহাড়ের শোভা দেখছে। কাল সারা রাত বৃস্টির পর আকাশ আপাতত পরিস্কার। মেঘের কোলে মিঠে অথচ তীব্র রোদ্দুর লুকোচুরি খেলে বেড়াচ্ছে পাহাড়ের সাথে। প্রতিটা বাঁকের সাথে সেই আলো আর প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য ধরা পড়ছে ওদের কাছে।
সেদিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে উঠেছিল মধুজা। আচমকা ওর ঘোর কাটল অতীনের ডাকে। ঘাড় ঘুরিয়ে অতীনের দিকে তাকাল সে।
— আমার তোকে কিছু বলার আছে মধু।
— কী?
— আমি মানে… ঠিক কোথা থেকে শুরু করবো? … মানে আমি তোকে আই মিন তোদের সকলকে মিথ্যে কথা বলেছি।
— কী মিথ্যে কথা?
— তার আগে তুই বল আমাকে ভুল বুঝবি না।
— কী হয়েছে আগে বলবি তো! কি মিথ্যে কথা বলেছিস?
— তুই মানে… তোরা এতদিন যেটা জানতিস সেটা সম্পূর্ণ ভুল।
— মানে? হেঁয়ালি না করে সবটা খুলে বল।
— আমি মানে… ওয়াচ আউট!!!
অতীনের কথা শেষ হওয়ার আগে সামনে একটা ভীষণ ভারী কিছু পড়ার শব্দ শুনতে পায় মধুজা। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির একটা মৃদু ঝাঁকুনিতে ওর শরীরটা সিট থেকে অতীনের উপর আছড়ে পড়ে। পরক্ষণেই নিজের শরীরটা ভীষণ হাল্কা মনে হয় তার। আর তারপরেই একটা প্রবল ঝাঁকুনিতে সামনের সিটের দিকে ওর মাথাটা আছড়ে পড়ে। চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে মধুজার। কপাল ও নাক দিয়ে রক্তের একটা ধারা নেমে আসে তার মুখমণ্ডলে। সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে একটা তীব্র বিষাক্ত যন্ত্রণা। প্রবল যন্ত্রণায় জ্ঞান হারাবার আগের মুহূর্তে মধুজা দেখতে পায় অচৈতন্য অবস্থাতেও অতীন ওকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। ওর নাক দিয়েও নেমে আসছে ক্ষীণ রক্তের ধারা।
******
(বর্তমান সময়)
অতীনের পাশে বসে সেদিনের ঘটনাগুলো ভাবতে ভাবতে একটা ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল মধুজা। আচমকা একটা কণ্ঠে ওর ঘোরটা কেটে যেতেই সম্বিত ফিরে এল তার। চেয়ারের উপর সোজা হয়ে উঠে বসল সে। অতীন ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। মাইকে একটি নারীকণ্ঠ বলে চলেছে, “ Now we acknowledge the Sarvottam Jeevan Raksha Padak presented to Retired Captain Atin Roychoudhuri for his outstanding contribution to saving lives during natural disasters in Landslide at Lebong Cart Road in Darjeeling. Despite being a disabled person and being injured in a car accident caused by a landslide, Captain Roychoudhuri's commitment to save people including his wife is commendable…”
মধুজার আবার মনে পড়ে যায় সেইদিনটার কথা। সেদিন রাস্তায় আচমকা ধ্বস নামায় ওদের গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে নেমে যায়। অদৃষ্টের নির্মম লিখনের ফলে হয়তো খাদের অতলে তলিয়ে যেতে পারতো কিন্তু দৈবক্রমে গাড়িটা একটা গাছে আটকে যাওয়ায় কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যায় ওরা। তারপর আর কিছু মনে নেই ওর। পরে হাসপাতালে নার্সের কাছে শুনেছে অ্যাক্সিডেন্টটা হওয়ার কিছুক্ষণ পরে নাকি অতীনের জ্ঞান ফেরে। তারপর সে অনেক কষ্টে মধুজা আর ড্রাইভারকে গাড়ি থেকে বের করে আনে। রেসকিউ টিম নাকি পরে ওদের উদ্ধার করতে এসে দেখে অতীন একটা গাছের ডাল আর একটা দড়ি হাতে রাস্তার ধারে বসে আছে। ওর পাশে পড়ে আছে ড্রাইভার আর মধুজার অচৈতন্য দেহ। তড়িঘড়ি ওদের নিয়ে আসা হয় হাসপাতালে। প্রতিবন্ধী হওয়ার পরেও অত নিচু থেকে অতীন কীভাবে ড্রাইভার আর মধুজাকে গাড়ি থেকে বের করে আনল, কীভাবে ওদের খাদ থেকে তুলল, কেউ জানে না।
যদিও পরে বাড়ি ফেরার পর মধুজার কাছে এই রহস্যের সমাধান করেছিল অতীন নিজেই। স্বীকার করেছিল ওর স্পেশাল ফোর্সের জয়েনিং এর কথা। তার সাথে জানিয়েছিল একটা ভীষণ গোপনতম তথ্য যা জানার পর চমকে গিয়েছিল মধুজা। আজও মধুজার কানে বেজে ওঠে অতীনের সেই কাতর স্বীকারোক্তি যা আজীবন গোপন রাখার অঙ্গীকার করেছে সে।
সেদিন পহলগামের কটেজের প্রতিটা ঘরে লুকিয়ে থাকা জঙ্গীদের একের পর এক নিকেশ করার পর অতীনের দলটা পৌঁছেছিল কটেজের দোতলার শেষ ঘরটায়। যে মুহূর্তে ওরা আক্রমণ করতে যাবে সেই সময় ঘরটার ভেতর থেকে ভেসে এসেছিল একটা তীব্র আর্তনাদ। আর্তনাদটা শুনে ওরা প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গেলেও পরক্ষণে নিজেদের সামলে প্রবেশ করেছিল ঘরটায়। আর প্রবেশ করার পরেই ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে ভয়ংকর বিবমিষায় আক্রান্ত হয়েছিল ওরা। ঘরের ভেতরে একজন জঙ্গী ছিল ঠিকই কিন্তু সে একা ছিল না। তার সাথে ছিল একটা বাচ্চা ছেলে। বয়স বারো-তেরো হবে। বিছানায় একটা কম্বল সর্বাঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছিল সে। আর ওদের সামনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল জঙ্গিটা। এই প্রবল শীতের মধ্যেও তার নিম্নাঙ্গ ছিল সম্পূর্ণ অনাবৃত।
ব্যাপারটা কী বুঝতে বাকি ছিল না ওদের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রচণ্ড ক্রোধের সঞ্চার হয়েছিল সকলের মনে। সব থেকে বেশি ক্রুদ্ধ হয়েছিল তেজেন্দ্রপ্রতাপ। মুহূর্তের মধ্যে রাইফেল তাক করে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল জঙ্গীর শরীরটাকে। তারপর কোমর থেকে কুকরি ছোরা বের করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জঙ্গীর নিথর দেহটার উপর। পাগলের মতো এলোপাথাড়ি ভাবে দেহটাকে কোপাতে শুরু করেছিল সে।
ঘটনাটা এত আকস্মিকভাবে ঘটে যে অতীনরা কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে বুঝতে পারছিল না। পরক্ষণে সম্বিত ফিরতেই ওরা সকলে মিলে তেজেন্দ্রপ্রতাপকে জাপ্টে ধরে জঙ্গিপ্রধানের দেহ থেকে সরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তেজেন্দ্রপ্রতাপের যেন রোখ চেপে গিয়েছিল। ওকে কিছুতেই ধরে রাখা যাচ্ছিল না। অনেক কষ্টে ওরা তেজেন্দ্রপ্রতাপকে শান্ত করে। তারপর বাচ্চাটাকে রেসকিউ করতে এগোয়। যেটা ওদের সবথেকে বড় ভুল ছিল।
যাকে ওরা বাচ্চা ভেবে রেসকিউ করতে যাচ্ছিল সে আদপেও বাচ্চা ছিল না। বরং সে ছিল বাচ্চার ছদ্মবেশে একজন বামন। অতীনরা যে কটেজের ভেতর ঢুকে পড়েছে সেটা বুঝতে পেরে একটা ফাঁদ পেতেছিল সে। অতীনরা সেই ফাঁদে পা দিয়ে প্রবেশ করেছিল ঘরে। তেজেন্দ্রপ্রতাপকে সরিয়ে ওরা যখন বাচ্চারূপী বামনটার সম্মুখে পৌঁছে সুরক্ষার আশ্বাস দিতে যাবে এমন সময় বামনটা অতর্কিতে বিছানার পাশে থাকা AK-56 তুলে নিয়ে ওদের দিকে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করতেই ওরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
বামনটার সামনে থাকা দুজন কমান্ডোর দেহ মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ওদের থেকে কিছুটা তফাতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় তিনটে গুলি অতীনের পিঠে লাগে। যার মধ্যে একটা গুলি ওর মেরুদণ্ডে ঢুকে নার্ভ ড্যামেজ করে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে সে। সেই সময় তেজেন্দ্রপ্রতাপ আর ওর সঙ্গী কমান্ডো বাইরে ছিল বলেই প্রাণে বাঁচে ওরা। পরক্ষণে পজিশন নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বামনটাকে গুলি করে মারে ওরা। তারপর অতীনকে রেসকিউ করে নিয়ে আসে।
পরে স্পেশাল ফোর্স থেকে ব্যাপারটা নিয়ে তদন্তের উদ্দেশ্যে অতীনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সমস্ত অভিযানটার বর্ণনা দিলেও কটেজের শেষ ঘরের ব্যাপারটা এড়িয়ে যায় সে। তদন্তকারী আর্মি অফিসারকে সে জানায় ঘরটার ভেতর অ্যাটাকের সময় একটু টাইমিং এর ভুলের কারণে এই ক্যাজুয়ালিটি ঘটেছে। শুধু তাই নয়, পুরো ঘটনার দায়ভার সে নিজের উপরে নিয়ে নেয় সে। যার ফলশ্রুতিতে কোর্টমার্শাল হতে পারতো তার। কিন্তু তেজেন্দ্রপ্রতাপের হস্তক্ষেপে ব্যাপারটা সেখানেই স্থগিত হয়। তদন্তকারী অফিসারকে তেজেন্দ্রপ্রতাপ সবিস্তারে জানায় সেদিনের ঘটনাটা। যার ফলে সামরিক শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যায় অতীন। অতীনের শারিরীক অবস্থা বিচার করে ওকে স্বেচ্ছাবসর দেওয়া হয়।
সবটা শোনার পর মধুজা বলেছিল, “এসব কথা তুই এতদিন বলিসনি কেন?” অতীন মধুজার হাত ধরে বলেছিল, “কারণ আমি চাইনি আমার জন্য তুই কষ্ট পাস। ভেবেছিলাম তোকে একান্তে সারপ্রাইজ দিয়ে জানাবো আমার স্পেশাল ফোর্সে জয়েনিং এর কথা। ভাবিনি সেই সারপ্রাইজটা পঙ্গু হিসেবে দিতে হবে।”
— তাহলে আজ জানালি কেন?
একপলক ওর দিকে তাকিয়েছিল অতীন তারপর মুচকি হেসে বলেছিল, “তোর সাথে সারাজীবন কাটাবার অঙ্গীকার করেছি যে পাগলী! তাই ভাবলাম আমার ভালো-মন্দ, দোষ-গুণের সাথে সাথে নাহয় গৌরব-কলঙ্কের একান্ত গোপন হিসেবটাও তোর জানা দরকার। তবে কথা দে, এই কথাটা তুই কাউকে জানতে দিবি না।”
অতীনের হাতে অপর হাত রেখে মধুজা বলেছিল, “বেশ! কথা দিলাম।”
প্রবল করতালিতে ঘোর কাটে মধুজার। অশ্রুসজল চোখে সে তাকিয়ে দেখে এক হাতে ক্রাচে ভর দিয়ে ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেই মানুষটা যে কয়েকবছর আগে অন্যের কলঙ্কের দায়ভার কাঁধে নিয়ে পঙ্গু অবস্থায় অজ্ঞাতবাসে জীবন কাটাতে চেয়েছিল, যে সরস্বতীপুজোয় নির্বাক থেকেও স্বীকার করেছিল ভালোবাসার কথা, যে পাহাড়ের ঐ বিভীষিকাময় অ্যাক্সিডেন্টে নিজে আহত হলেও আগলে রেখেছিল ওকে। আজ সেই মানুষটা নিজের প্রাপ্য সম্মান গ্রহণ করতে যাচ্ছে দেশের সবথেকে সম্মানীয় ব্যক্তির কাছ থেকে।
সেই মানুষটা আর কেউ নয়, ওর ভালোবাসা, ওর জীবনসঙ্গী, ওর পাগলপ্রেমিক, এবং ওর ভাবি সন্তানের পিতা, অতীন। দিল্লী আসার আগে মধুজা জানতে পেরেছে ও সন্তানসম্ভবা। তবে অতীনকে এখনও এই অতিথির আগমন বার্তা দেয়নি সে। মধুজা ঠিক করেছে আগে এই পুরস্কারের ঝামেলা মিটুক, তারপর সে জানাবে অতীনকে। এই মুহূর্তে নিজেকে ভীষণ সুখী ও গর্বিত মনে হয় মধুজার। চোখের কোলে জমে থাকা আনন্দের অশ্রু মুছে করতালিতে যোগদান করে সে।


