ট্রেন থেকে যখন নামলো মেহুলরা তখন বেশ রাত হয়ে গেছে।
আসলে ফরাক্কা পার হবার পর ধুলিয়ান নামে একটা স্টেশনে গাড়িটা বেশ অনেকক্ষণ আটকেছিল। যখন ছাড়ল তখন প্রায় সুর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে।
সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে অনির্বাণ আর মেহুল প্ল্যাটফর্মে নামতেই ট্রেনটা ছেড়ে দিল। ট্রেনটা
চলে যাবার পর গোটা স্টেশনটা নিঝুম হয়ে গেল। মেহুল গজগজ করে উঠলো, “বলেছিলাম! বলেছিলাম আমি। আজকে যেতে হবে না। এমনিতেই সারাদিন জুড়ে একের
পর এক অঘটন ঘটে চলেছে। তার উপর বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মরা কাক গেটের সামনে পড়ে
থাকা। বার বার বাধা পড়ছে। আজকের দিনটা যাত্রার জন্য ভালো নয়। মিলল তো?”
অনির্বাণ বিরক্ত হয়ে বলল, “আচ্ছা ট্রেন মাঝপথে বিগড়োলে কি সেটা আমার দোষ? আর মরা
কাক, অঘটন এসব কবে থেকে মানতে শুরু করেছি আমরা? সকালে
ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল আর কাকটা কদিন ধরেই অসুস্থ ছিল। কদিন ধরেই দেখছিলাম সকালে
বিস্কুট দিলে খাচ্ছিল না। হয়তো ঝড়ের দাপটে মরেছে। অকারণে টেনশন করছো তুমি। শোনো অভীকদার মেয়ের বিয়ে কালকে। কাল যদি বেরিয়ে আজকের মতোই
অসুবিধা হত তাহলে কি বলতে তুমি?”
“রাখো তোমার অভীকদা!” ঝাঁঝিয়ে
উঠল মেহুল। “মেয়ের বিয়ের দুদিন আগে নেমতন্ন দিয়ে
আদিখ্যেতা দেখানো হচ্ছে। এতই যদি ভালোবাসেন তাহলে এতদিন কোনো খোঁজ নেন নি কেন?”
অনির্বাণ গম্ভীর গলায় বলল, “আহ মেহুল!
হচ্ছেটা কি? একটা ভালো মানুষের সম্পর্কে একি কথা তোমার?
মনে রেখো এই অভীকদা ছিলো বলেই আজ আমাকে স্বামী হিসেবে পেয়েছ। আজ আমি যে এখানে তার
পেছনে অভীকদার কতটা অবদান জানা আছে তোমার?” মেহুল গজগজ
করে বলল, “জানি জানি। পুরোনো কাসুন্দি আর ঘাটতে হবে না।
এতই যদি ভালোবাসেন একটা গাড়ি পাঠাতে পারতেন। এক কাজ করো এত রাতে তো আর গাড়ি
পাবে না। তাও খোঁজ করে দেখো নাহলে রাতটা এখানেই কাটাতে হবে।” বলে স্টেশনের বেঞ্চে বসল মেহুল। আর শরীর টানছে না। পেটে চারমাসের
বাচ্চা নিয়ে আর কত ছোটাছুটি করা যায়? অনির্বাণ একটু দাঁড়াল তারপর স্টেশনের
গেটের দিকে এগোল কোনো গাড়ি আছে কিনা দেখতে। সারাদিনের
ক্লান্তিতে চোখটা লেগে এল মেহুলের। আজকে আসার কোনো প্ল্যান ছিল না ওদের। কিন্তু
অনির্বাণের মাসতুতো দাদার চিঠিটাই সব পাল্টে দিল।
অনির্বাণ অনাথ। মাসির বাড়িতে মানুষ। ওর মাসতুতো দাদা
অভীক ওকে প্রায় কোলে পিঠে মানুষ করেছে। মাসতুতো হলেও নিজের দাদার মতোই দেখে তাকে
অনির্বাণ। কলেজে পড়াকালীন ওদের প্রেম আর বাড়ির অমতে বিয়ে করায় বেশ কয়েক বছর
মনোমালিন্য চলেছিল। সেই বরফ গলাতেই এই আমন্ত্রণ। অনির্বাণও লুফে নিয়েছে এ আমন্ত্রণ। তবে মেহুলের আপত্তি ছিল। আসলে জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোয়
অনির্বাণের এই দাদা কোনো সাহায্য করেননি। এমনদিনও গেছে অনির্বাণ নিজে না খেয়ে
কাটিয়েছে সারারাত। অনেক কষ্টে একটা চাকরী
জুটিয়ে অবশেষে এতদিনে সুখের মুখ দেখেছে। এই সময় হঠাৎ এই চিঠির কারণ সে বোঝে না। তাছাড়া আজকে আসার সময় একের পর এক অঘটন ঘটায় মনটা এমনিতেই অশান্ত
হয়েছিল। আজ বার বার বারণ করছিল সে অনির্বাণকে বেরোতে। কিন্তু অনির্বাণ
নাছোড়বান্দা। সে কোনো বারণ শুনল না। কতক্ষণ এভাবে বসেছিল
জানে না সে কিন্তু হঠাৎ যেন ওর
মনে হল কে যেন ওর শিঁওরে দাঁড়িয়ে আছে আর ওকে দেখছে। চোখ মেলে একটা মহিলাকে
সত্যি সত্যিই ওর শিঁওরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠল মেহুল। ছোটো প্ল্যাটফর্মের দুপাশে দুটো পুরোনো সোডিয়াম ভেপার
থাকায় আলো আঁধারীর মতো এখানে। তার উপর নিঃস্তব্ধ স্টেশন থাকায় একটা গা ছমছমে ভাব
রয়েছে। এই অবস্থায় আচমকা এহেন মহিলার উপস্থিতিতে বুকটা কেঁপে উঠল মেহুলের।
ধরমড় করে উঠে বসতেই মহিলা রিনরিনে কন্ঠস্বরে বললেন, “আহা করছোটা কি বাছা? বসে থাকো! পোঁয়াতি
মেয়ে মানুষকে এভাবে উঠতে আছে? তা হ্যা গা মেয়ে এখানকার তো মনে হচ্ছে না তোমাকে। কে
তুমি? কোথা থেকে আসা হচ্ছে?” কন্ঠস্বর শুনে একটু আশস্ত হল
মেহুল। যাক মহিলা স্থানীয় কেউ। এই রাতে হয়তো উনিও ওদের মতোই ট্রেন থেকে নেমেছেন। মেহুল
হেসে বলল, “আমি থাকি কলকাতায়। যাবো নিশীথপুর। ট্রেনটা লেট
করল বলে এতক্ষণে পৌঁছেছি। আমার
স্বামী গেছেন বাইরে গাড়ি আনতে। আপনি কি এখানেই থাকেন?” মহিলা
মৃদু হেসে জবাব দিলেন, “তা বলতে
পারো। গাঁয়ের পুব দিকে যে কালী মন্দিরটা আচে তার পাশ দিয়ে
মিনিট পাঁচেক হাটলেই আমার বাড়ি। তা হ্যা গা মেয়ে এত রাতে ট্রেন থেকে নেমেচো। এত
রাতে গাড়ি পাবে তো তোমার বর?” মেহুল কিছু বলতে যাচ্ছিল
এমন সময় থমথমে মুখে অনির্বাণ এসে
বলল, “পেলাম না। অনেক রাত হয়েছে। একটাও গাড়ি তো দুর
রাস্তায় কুকুর অবধি নেই। স্টেশনমাষ্টারের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম এত রাতে গাড়ি
পাওয়া অসম্ভব।”
“তাহলে? রাতটা এই স্টেশনেই
কাটাতে হবে?” মেহুলের গলায় উদ্বেগের চিহ্ন। অনির্বাণ বলল,
“সেটা আরো রিস্কের হয়ে যাবে। স্টেশনমাষ্টার
বলেছেন রাতে এই স্টেশনে নাকি শেঁয়াল, কুকুর ঘুরে বেড়ায়।
ওনাকে অনেক বলাতে ওনার ঘরে আমাদের থাকতে দিতে রাজি হয়েছেন। আজ রাতটা যদি একটু কষ্ট
করে…” অনির্বাণের কথা শেষ হবার আগেই মেহুল দাঁতে দাঁত ঘষে
বলল, “ইমপসিবল! ওই ঘরে আমি থাকব না।” অনির্বাণ বলল, “রাগ করে না সোনা, প্লিজ একটু বোঝো আমি নিরুপায়।” মেহুল কড়া গলায়
বলল, “না মানে না। আমি জানি না তুমি কি করবে বাট ওই নোংরা ঘরে আমি কিছুতেই থাকব না। কেন তোমার দাদা
আছেন কি করতে? তাকে ফোন করো!” এবার অনির্বাণও গম্ভীর গলায় বলল, “মেহুল! এ নিয়ে আমরা
আগেও কথা বলেছি।” এই ভাবে যখন ঝগড়া লাগবার উপক্রম হয়েছে। এমন
সময় ঐ মহিলা খিঁকখিঁক করে হেসে উঠলেন। সেই হাসিটা শোনামাত্র মেহুলের বুকটা কেঁপে উঠল। অনির্বাণও ঝগড়া থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল
মহিলার দিকে।
মহিলা হাসতে হাসতে বললেন, “বাপরে বাপ! ঝগড়া করতে পারোও
বটে তোমরা। একদম আমি আর আমার উনির মতো। আচ্চা বেশ। আমিই
একটা পথ বলে দিচ্চি। তোমরা দুজনেই আমার বাড়িতে থাকলে আপত্তি নেই তো?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল, “আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না? কে আপনি?” মহিলা
আবার খিঁকখিঁক করে হাসলেন। এবারের হাসিটা আরো বিকট। হাসিটায় এমন একটা কিছু ছিল যে অনির্বাণের
ভ্রু আরো কুঁচকে গেল। এই জনমানবহীন স্টেশনে কারো থাকার তো কথা নয়। এমনকি ট্রেন থেকে
নামার পর ওদের সাথে আর কাউকে প্ল্যাটফর্মে নামতে দেখেনি সে। ইনি কোথা থেকে এলেন? ভ্রু
কুঁচকে মেহুলের দিকে তাকিয়ে ইশারায় মহিলার পরিচয় জিজ্ঞেস করল সে। মেহুল মাথা নাড়িয়ে
জানাল সে জানে না।
মহিলা হাসি থামিয়ে বললেন, “এই তো মুশকিলে ফেলে দিলে বাছা! আমার নাম বললে তুমি
চিনবে নাকো। আবার সোয়ামীর নামও মুকে আনতি পারবো না। তবে চিন্তার কিছু নেই গা। আমি তোমাদের
গাঁয়েই থাকি। গাঁয়ের পুব দিকে যে শ্মশানকালী
মন্দিরটা আচে তার পাশ দিয়ে মিনিট পাঁচেক হাটলেই আমার বাড়ি।”
ভ্রুটা আরো কুঁচকে যায় অনির্বাণের। গাঁয়ের পুর্ব দিক মানে তো…! অনির্বাণের চিন্তার
জাল সঙ্গে সঙ্গে ছিন্ন করে দিয়ে মহিলা আবার বলে ওঠেন, “সে তুমি দেকলেই চিনতে পারবে
বাছা। হাজার হোক আমাদের গাঁয়ের ছেলে বলে কতা!”
“আপনি আমাকে চেনেন?” চমকে ওঠে অনির্বাণ। মহিলা আবার হেসে বলেন, “ওমা, চিনবো
না কেন? সেই কত্ত ছোটো থেকে দেকচি তোমাকে। এই এইটুকু বয়সে শ্মশানের মাঠটায় খেলতে, কালীমন্দিরের
আমগাছে আম নিতে গিয়ে কত্তবার তোমার দাদা মানে ঐ অভীক মিত্তিরের হাতে মারও খেয়েচ! সেই
অভীক মিত্তিরেরই মেয়ের বিয়ে কাল! দেকতে দেকতে একরত্তি মেয়েটা কত্ত বড় হয়ে গেল! তুমিও
তো দেকচি বিয়ে করে নতুন পোঁয়াতি বউ নিয়ে পেত্থমবার আমাদের গাঁয়ে এয়েচ।” অনির্বাণ অবাক
হয়ে যায়। এতো সেই বহুযুগ আগের ঘটনা! এই মহিলা তাকে সেই সময়ে দেখেছেন? কই তার তো মনে
পড়ছে না এনার সাথে সাক্ষাতের কথা। অথচ এই গ্রামের সবাইকে সে ভালো করে চেনে। অনির্বাণ
মহিলাকে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় মহিলা বলে উঠলেন, “ঐ দেখো কতা কইতে কইতে কত রাত হয়ে গেল। আমার কত্তাও গাড়ি নিয়ে এসে পড়েচেন।” এবার ওরাও যেন গরুর
গাড়ির শব্দ শুনতে পেল। মহিলা এবার মেহুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাহলে ঐ কতাই রইল। আজ রাতে তোমরা দুজন আমাদের বাড়িতে থাকবে। এসো দিকি
আমার সাথে। তা হ্যা গা ভালোমানুষের বাছারা? এই গরীব গাঁয়ের লোকের বাড়িতে একরাত
থাকতে আপত্তি নেই তো?”
অনির্বাণ মৃদু আপত্তি করে বলতে যাচ্ছিল, “না না সেকি কথা? আপনার
অসুবিধে হতে পারে। আমরা রাতটুকু এখানে কোথাও ঠিক কাটিয়ে নিতে পারব।” কিন্তু ওকে থামিয়ে মেহুল বলল, “না না আপত্তি
নেই। তবে আপনার অসুবিধে হবে না তো?” মহিলা হেসে বললেন, “না গো মেয়ে আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না। ঘরে
মানুষ বলতে আমরা দুজন কত্তা-গিন্নি। দুজনের জন্য কোনোক্রমে দিন চলে যায়। একজন তো
থেকেও থাকেন না। আরেকজনের থাকা না থাকা সমান। ঘর তো ফাঁকাই পড়ে থাকে। কোনো
অসুবিধে হবে না।” বলে তিনি এগিয়ে গেলেন গেটের দিকে। কথাগুলোর
শেষে যেন একটা হেঁয়ালিতে মেশানো বিষাদ মাখা ছিল।
অনির্বাণের মনে একটা খটকা থেকে গেল। সে মেহুলকে বলল, “Oh
what's going on Mehul? why did you stop me? i think there is something
fishy. একটা মহিলা যাকে চিনি না জানি
না। গায়ে পড়ে আলাপ করলেন। আবার হুট করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। হতে পারে তিনি
আমাকে চেনেন। কিন্তু আমার ওনাকে কিছুতেই মনে পড়ছে না। আমার মনে হচ্ছে কোথাও কোনো একটা গন্ডগোল আছে।” মেহুল ঝাঁঝিয়ে
বলল, “তুমি থামো তো! কোথায় একজন আমাদের
বিপদে সাহায্য করছেন। কোথায় কৃতজ্ঞ থাকবে তা না সব সময়
এটা কেন ওটা কেন করে যাচ্ছ। শোনো থাকতে হলে তুমি থাকো এখানে। আমি চললাম।” বলে
কোনো মতে উঠে দাঁড়িয়ে একটা ট্রলি ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে গেল মেহুল। কিছুক্ষণ মেহুলের দিকে
তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাকি লাগেজ নিয়ে এগোল অনির্বাণ।
অনির্বাণরা ব্যাগপত্র নিয়ে এগিয়ে দেখলো সত্যিই একটা গরুর
গাড়ি দাঁড়িয়ে। ওরা গাড়ির কাছে এসে থমকে গেল। গাড়োয়ান হিসেবে যিনি বসে আছেন তাঁর পরনে প্রায় কিছু নেই। কেবল একটা ধুতি কোনোমতে পরা। ধবধবে সাদা
শরীরের সর্বাঙ্গে রুদ্রাক্ষের মালা জড়ানো। কাঁচা-পাকা দাঁড়ি-গোঁফ আর জটায় গোটা মুখটা
ঢাকা। কোটরে থাকা অঙ্গারের মতো চোখে ওদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন ভদ্রলোক।
কী ভয়ঙ্কর আর মর্মভেদী সেই দৃষ্টি! যেন অস্থিমজ্জার ভেতর পর্যন্ত পড়ে নিচ্ছেন তিনি।
ভদ্রলোকের দৃষ্টি একবার অনির্বাণকে ছুঁয়ে চলে গেছে মেহুলের দিকে। বিশেষ করে মেহুলের
গর্ভের দিকে তাঁর চোখ নিবদ্ধ। মেহুল একটু ভয় পেয়ে অনির্বাণের জামার হাতা খামচে ধরল।
অনির্বাণের কেন জানে না মনে হল এই দৃষ্টি তার ভীষণ চেনা। এই ভয়ঙ্কর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি
সে আগেও দেখেছে। কিন্তু কোথায় দেখেছে সেটা কিছুতেই মনে পড়ছে না।ওরা গাড়ির চালকের দিকে
স্তম্ভিতভাবে তাকিয়ে আছে দেখে মহিলা বলে উঠলেন, “ইনিই আমার সোয়ামী।” অনির্বাণ একবার অস্ফুটে বলে উঠল, “কিন্তু ইনি তো...!”
“হ্যা উনি সন্নেসী। আজ থেকে অনেকবছর আগে উনি সন্নেস নেন।
তবে উনি একা নন। ওনার সাথে আমিও
দীক্ষে নিয়ে ওনার সাধনসঙ্গিনী হয়েচি। আমরা একসাথে সন্নেসধম্মো পালন করি। ঈশ্বরের
আরাধনা করি। কেন গো ভালোমানুষের ছা? কোনো
অসুবিধে আছে?” শেষ কথায় একটু বিরক্তি প্রকাশ পেল মহিলার
গলায়। অনির্বাণ কি একটা বলতে যাচ্ছিল মেহুল ওকে থামিয়ে বলল, “না না কোনো অসুবিধে নেই। কিছু মনে করবেন না। আসলে
ও একটু বেশীই কিন্তু কিন্তু করে।” অনির্বাণ ফিসফিস করে মেহুলকে
ইংরেজীতে বলল যাতে ওরা না বুঝতে পারে, “মেহুল বোঝার চেষ্টা
করো আমার কেমন যেন একটা খটকা লাগছে। ভদ্রমহিলার স্বামীকে দেখে
আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে সাধারণ কোনো সাধক তিনি নন। তাকে দেখে আমার সুবিধের
মনে হচ্ছে না। ওনাদের উপর ভরসা করে আমরা বিপদে পড়ে যাবো না
তো? প্লিজ আমার অন্তত একটা রিকোয়েস্ট রাখো মেহুল। প্লিজ
আজকের রাতটা কষ্ট করে এখানেই থেকে যাই
চলো। একটা রাতের তো ব্যাপার! কাল সকালে নাহয় ফিরে যাবো।”
বিপদে আমরা তো এমনিতেই পড়ে আছি অনি! এই রাতদুপুরে জনমানবহীন স্টেশনে থাকার
চেয়ে আর বড়ো বিপদ কি আসতে পারে? এখানে বসে থেকে বিপদের অপেক্ষা করার থেকে কোথাও আশ্রয়
নেওয়াটা ভালো নয় কি? তাছাড়া এই বিপদে আমি আসতে চাইনি। তুমি আমাকে নিয়ে এসেছ।
- তুমি বুঝতে পারছ না মেহুল…!
- আহ তুমি থামবে? ওনারা শুনতে
পেলে কী ভাববেন বলো তো? হাজার হোক এই বিপদের সময় ওনারা
অন্তত আমাদের আশ্রয় দিতে চাইছেন। এইটুকুই বা কে করে? নাহলে তো ঐ স্টেশনমাস্টারের ঘরে
রাত কাটাতে হত। মানছি ভদ্রলোককে দেখতে একটু ভয়ঙ্কর। কিন্তু হয়তো তার বাহ্যিক রূপটাই
এরকম। ভেতর ভেতর উনিও ওনার স্ত্রীর মতোই অমায়িক। নাহলে এতদিন ধরে একসাথে আছেন কি করে?
একটা মানুষকে বাইরে থেকে বিচার করা ঠিক না। তবে হ্যা ভদ্রলোক যদি একা থাকতেন তাহলে
এখানেই থেকে যেতাম আমি। কিন্তু উনি তো একা থাকছেন না। ওনার সাথে ওনার স্ত্রীও থাকবেন।
অতো ভয় না পেলেও চলবে।
ওরা ফিসফিস করে কথা বলছে দেখে মহিলা বলে উঠলেন, “কই হে তোমাদের গুজুরগুজুর
ফুসুরফুসুর শেষ হল? শেষ হলে বলো আমরা রওনা দেব।” মেহুল এগিয়ে গিয়ে বলল, “গরুর গাড়িতে কিছু অসুবিধে হবে না তো? মানে
বুঝতেই পারছেন এই অবস্থায়…!” মহিলা একটু থমকে গিয়ে হাসলেন। তারপর বললেন, “হবে না। এমন ভাবে খড়-বিচালী পেতে দিয়েচি যে তুলোর তোষকও হার মেনে যাবে। আর আমার সোয়ামী গরুর
গাড়ি ভালোই চালান। একটুও ঝাকুনি টের পাবে নাকো।” বলে
মেহুল কে গাড়িতে তুলে ওর পাশে বসলেন। অনির্বাণ সমস্ত ব্যাগ পত্র গাড়ির পেছনে রেখে
দিল। মহিলার স্বামীও গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির পেছনে এসে হাত লাগালেন। দুজনে মিলে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিলেন ব্যাগপত্র। তারপর সামনে
গিয়ে বসলেন।
গাড়ি চলতে শুরু করলে অনির্বাণ বুঝল মহিলা মিথ্যে বলেননি।
সন্ন্যাসী ভদ্রলোক সত্যিই দারুণ গাড়ি চালান। গরুর গলার ঘন্টি আর চাকার
ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ না থাকলে মনে হতো যেন কোনো মোটর গাড়িতে বসে। গাড়িটা যেন উড়ে
চলছে। বাতাসে শণশণ শব্দ ভেসে আসছে। মেহুল ততক্ষণে মহিলার
সাথে মন খুলে গল্প জুড়ে দিয়েছে। ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও অনির্বাণের
মন অন্যদিকে পড়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ওর মনে বেশ কয়েকটা
খটকার জন্ম হয়েছে। হাজার চেষ্টা করেও কিছুতেই সেই খটকাগুলো তাড়াতে পারছে না সে। জনমানবহীন
স্টেশনে হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই আচমকা এক অল্পচেনা মহিলা প্রায় মাটি ফুঁড়ে উদয় হয়ে মেহুলের
সাথে খেজুরে আলাপ জুড়লেন। তারপর গায়ে পড়ে আচমকা নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিতে রাজি হয়ে গেলেন।
আবার ওনার স্বামী নাকি সন্ন্যাসী। সব যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
গাড়িতে বসে বসে অনির্বাণ মেহুলের দিকে তাকিয়েছিল আর কথাগুলো ভাবছিল এমন সময় ওর খেয়াল হল ওর গায়ে কিসের যেন একটা মিহি অথচ গরম
কিছু একটা উড়ে এসে বসছে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফ্ল্যাশলাইট
জ্বালিয়ে অনির্বাণ দেখল ওর অনুমান সঠিক। সত্যিই বাতাসে অনেকটা
পাউডারের মতো সাদা গুঁড়ো ভেসে
আসছে। আরো আশ্চর্য হয়ে অনির্বাণ দেখল গুঁড়োগুলো উড়ে আসছে লোকটার গা থেকে। কি মনে হতে গুঁড়োগুলো আঙুল দিয়ে ঘষে নাকে ঠেকাতেই শরীরের সব স্নায়ুগুলো
টানটান হয়ে গেল তার। জিনিসটা আসলে গুঁড়ো বা পাউডার নয়।
ওগুলো ছাই! মড়া মানুষের ছাই! ভ্রু
কুঁচকে সামনের দিকে তাকাল অনির্বাণ। খটকাটা আরো বেড়ে গেল তার।
******
বিছানায় শুঁয়ে শুঁয়ে একটা ঢেকুর ছাড়ল অনির্বাণ। আজকের
ভোজনটা বেশ গুরুতরই হয়েছে। রাতের খাবারের আয়োজনটা সত্যি দারুণ ছিল। অতোরাতেও কি
করে যেন মহিলার স্বামী যোগাড় করে আনলেন পাঁঠার মাংস। রান্নার স্বাদও হয়েছিল দারুণ। মানতে হবে ভদ্রমহিলা সত্যি দারুণ রাঁধেন।
এর আগেও মাংস খেয়েছে ওরা তবে এত ভালো স্বাদ পায় নি। এমনকি যে
মেহুল রান্না নিয়ে এত খুঁতখুঁতে সেও পর্যন্ত তৃপ্তি করে দুবার
ভাত চেয়ে খেল। ভদ্রমহিলা নিজে দাঁড়িয়ে ওদের খাবার তদারক করেছেন।
কষা মাংস আর গরম গরম ভাত খেয়ে ওরা যখন শুঁয়ে পড়েছে তখন প্রায়
মাঝরাত। মেহুল এমনিতেই সারাদিনের জার্নিতে ক্লান্ত তার উপর খাওয়াটা বেশি হওয়ায় বিছানায়
শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে। খড় বিচালী দিয়ে বেশ নরম বিছানায় শুলে
ঘুম আসবারই কথা কিন্তু অনির্বাণের চোখে ঘুম নেই। ওর মনে কে যেন আজ একটা কুডাক
দিচ্ছে। কোথাও একটা বড়ো গন্ডগোল হচ্ছে। কোথায় বুঝতে পারছে না। একের পর এক
ঘটনাগুলো কে সাজাচ্ছে ও মাথার মধ্যে কিন্তু কিছুতেই সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না।
কোথায় যেন আটকে যাচ্ছে। খটকাগুলোকে কিছুতেই তাড়াতে পারছে না সে। এক সময় উঠে বসল অনির্বাণ। নাহ মাথাটা গরম হয়ে আসছে একটা সিগারেট না
ধরালেই নয়।
জামার পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল অনির্বাণ। এই
ঘরের বা’পাশে একটা জানলা
রয়েছে। জানলার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিতে দিতে
ভাবতে লাগল মহিলার হাবভাবটা যেন ওর ভীষণ চেনা। আজ রান্না করতে করতে ঘোমটাটা খুলে
গিয়েছিল তার। মেহুলের সাথে বসে গল্প করতে করতে সে দেখেছে মহিলা অপুর্ব সুন্দরী।
গায়ের রং দুধে আলতায়, টিকালো নাক, টানা চোখ। হলদে সবুজ
কটা চোখের মণি দেখে মনে হয় যেন কোনো আর্যনারী। হাসলে পরে গালে টোল পড়ে। বয়স যেন
এক সময় থমকে গেছে। তবে আকর্ষণীয় জিনিস ওনার দাঁতগুলো।
ক্যানাইন মানে মাংসছেঁড়ার দাঁতের উপরে দুপাশেই একজোড়া গজদাঁত। মহিলা মনে হয়
অতিরিক্ত পান খান তাই দাঁতে লালচে ছোপ রয়েছে। ঐ চেহারা নিয়েই যত ধন্ধ তার মনে।
কোথায় যেন দেখেছে তাঁকে। মনে করতে পারছে না। মহিলার বরও ভারী অদ্ভুত। তাকেও ভীষণ
চেনা লাগছে তার, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না। ওদের
নামিয়ে, রাতের খাবার জোগাড় করে গাড়িটা
থেকে গরুগুলোকে খুলে কোথায় চলে গেলেন কে জানে?
সিগারেটটা শেষ করে জানলার বাইরে ফেলে দিয়ে শুতে যাবে এমন সময় একটা জিনিস খেয়াল হলে তার। আজকে চারিদিক
যেন একটু বেশীই নিস্তব্ধ। অনির্বাণ যতই শহরে থাকুক না কেন সে গাঁয়ের ছেলে। সে
জানে রাতেরবেলা গ্রামের একটা নির্দিষ্ট শব্দ, একটা ছন্দ থাকে। এই ছন্দ সে ছেলেবেলা
থেকে উপলব্ধি করে আসছে। এই ব্যাপারটা মুখে বলে বোঝানো অসম্ভব। যারা গ্রামের ছেলে একমাত্র
তারাই এই ছন্দ উপলব্ধি করতে পারে। গ্রামে আসার পর থেকে সেই ছন্দের কোনো নামগন্ধ পাচ্ছে
না সে। তাছাড়া এতক্ষণ হয়ে গেল গ্রামে এসেছে অথচ কোনো রাতের পাখির ডাক সে শুনতে পায়নি।
রাতের পাখি তো দুরস্থ, এমনকি একটা
ঝিঁঝিঁ পর্যন্ত ডাকছে না। ব্যাপারটা কিরকম যেন অস্বাভাবিক
ঠেকছে না?
কথাগুলো একমনে ভাবতে ভাবতে অনির্বাণ বিছানায় শুয়ে খড়ের
চালের দিকে তাকিয়েছিল হঠাৎ তার মনে হল জানলা
দিয়ে কে যেন উঁকি দিল ওদের ঘরে। সঙ্গে সঙ্গে আড়চোখে জানলার
দিকে তাকাল সে। ঘরের জানলা দিয়ে হাল্কা চাঁদের আলো আসায় অন্ধকারে চোখ প্রায় সয়ে এসেছে অনির্বাণের। সেই আলোয় সে দেখতে পেল জানলা দিয়ে একটা ছায়ামুর্তি ঘরে
ঢুকছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। শরীরটা শক্ত করে চোখ আধবোঁজা করে মটকা
মেরে শুয়ে রইল অনির্বাণ। ছায়ামুর্তিটা ক্রমশ এগিয়ে এল। তারপর
একবার ওর মুখের দিকে তাকাল। একটা বোঁটকা গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল অনির্বাণের। তবুও সে
মড়ার মতো পরে রইল। ছায়ামুর্তি এবার মেহুলের দিকে এগিয়ে
গেল। অনির্বাণ আড়চোখে দেখল ছায়ামুর্তির মাথাটা ধীরে ধীরে
মেহুলের গলার দিকে এগোচ্ছে। আর থাকতে পারল না অনির্বাণ। ওর যা হয় হোক মেহুল আর ওর
সন্তানের কোনো ক্ষতি হতে দিতে পারে না সে। ফোনের ফ্ল্যাশটা জ্বালিয়ে চিৎকার
করে বলে উঠল, “কে?”
ক্ষণিকের জন্য অনির্বাণের মনে হল
যেন আশ্রয়দাত্রী ভদ্রমহিলাকে দেখল সে। তবে রাতে দেখা সেই
সুন্দরী মধ্যবয়স্কা মহিলা নন। ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের আলোয়
যেন এক নরকের বিভীষিকা মনে হল তাঁকে। ফ্যাকাশে রক্তশুন্য মুখ। শ্বাপদের মতো চোখ।
গজদাঁতগুলো যেন শ্বদন্তের মতো বেরিয়ে এসেছে। আলো পড়ার সাথে সাথে চমকে উঠলেন
তিনি। তারপর জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে একলাফে বেরিয়ে গেলেন
ঘর থেকে। ততক্ষণে অনির্বাণের চিৎকারে মেহুলের ঘুমও
ভেঙেছে। চোখ মেলে নরকের ঐ জীবকে দেখামাত্র সে আর্তচিৎকার করে উঠল। অনির্বাণ হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল মেহুলকে। অনির্বাণের জামা খামচে ধরে ওর বুকে মুখ গুঁজে
মেহুল কাঁপতে কাঁপতে জানলার দিকে আঙুল দেখিয়ে
বলল, “ওটা কী? কী ছিলো ওটা? কি ভয়ঙ্কর মুখটা!”
অনির্বাণ মেহুলকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে বলল, “কিছু না। ও কিছু না। কিছু হয়নি। ভয় পেও না মেহুল। আমি আছি তো। কিছু হবে না।” বলে উঠে দাঁড়াল অনির্বাণ। মেহুলকে জড়িয়ে ধরে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল
জানলার দিকে। সেই আলোয় বাইরে দেখে বুঝতে পেরেছে ওরা কোথায়। এতক্ষণ
ধরে যে একটা খটকাটা ওর মাথাখারাপ
করে দিয়েছিল সেটা মিটে গেছে। এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। এতক্ষণে মহিলাটিকে সে চিনতে পেরেছে। তার
সেই সন্ন্যাসী স্বামীটাকেও চিনেছে সে। কেন তার দেহ দিয়ে ছাঁই উড়ে আসছিল তাও
পরিস্কার এখন তার কাছে। যে জিনিসটা এতক্ষণ ধরে কিছুতেই মনে আসছিল না সেই জিনিসটা
ঐ নরকের জীবন্ত বিভীষিকাকে দেখা মাত্র মনে পড়ে গেছে তার। ওর মনে
পড়ে গেছে ছেলেবেলায় ঘটে যাওয়া এক ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা, যার মুলে ছিল এই সন্ন্যাসী আর তার স্ত্রী।
সবটা জানা সত্ত্বেও এতবছর পর আবার ওরা নিজেরই অজান্তে ওই
মহিলার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে। এই ফাঁদ থেকে বেরোনো
প্রায় অসম্ভব! পালাবার পথ প্রায় নেই বললেই চলে। ছেলেবেলায়
এই জায়গাগুলোয় টইটই করে ঘুরে বেড়াতো বলে এই জায়গাটা ওর হাতের তালুর মতো চেনা।
অনভ্যাসের ফলে আর অন্ধকার থাকায় একটু ভুলেই গিয়েছিল পথঘাটগুলো। বড্ড ভুল হয়ে
গেছে। কালীমন্দিরটা দেখেই আন্দাজ করা উচিত ছিলো তার। মেহুলের সাথে কথা বলতে বলতে
খেয়ালই করে নি। আর কিছু করার নেই।
তাই কি? কোনো পথই কি নেই? মেহুলকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আচমকা থমকে গেল অনির্বাণ। তারপর নিজেকে প্রচণ্ডভাবে ভৎসর্না করল
সে। ছিঃ! ছিঃ! এই বিপদের সময় কিসব আবোলতাবোল ভাবছে সে? কোথায় মাথা ঠাণ্ডা করে বেরোবার
পথ খুঁজবে তা না কোথাকার এক পিশাচিণীর ভয়ে সে জুজু হয়ে যাচ্ছে? এই তার সাহস? এই তার
পৌরুষ? এভাবে একটা সামান্য পিশাচিণীর কাছে সে হেরে যাবে? কিছুতেই
না! কোথা থেকে একটা তীব্র জেদ চেপে বসল অনির্বাণের মাথায়। ওর মনে হল যেন ভেতরে সেই
ছেলেবেলার ডানপিটে, জেদি, ডাকাবুকো অনির্বাণ আবার ফিরে আসছে। যে করেই হোক এখান থেকে
ওদেরকে বেরোতেই হবে। হার মানলে চলবে না। এভাবে মেহুলদের চরম
ক্ষতি সে হতে দেবে না, মরে গেলেও
না।
চোয়াল শক্ত করে অনির্বাণ। কিছু একটা তো করতেই হবে। মেহুলদের এত বড়ো বিপদে ফেলে দিতে পারে না সে। চোয়াল শক্ত করে অনির্বাণ ফোন করে একটা বিশেষ
নম্বরে। ভেবেছিল এখানে এসে দাদাকে সারপ্রাইজ দেবে,
নিজে গিয়ে ভাঙবে এতবছর ধরে পাহাড়ের মতো অটুট থাকা দাদার অভিমানকে। সে কারনেই এখানে পৌঁছনো
মাত্র দাদাকে ফোন করেনি সে। কিন্তু পরিস্থিতিটাই বিপরীত হয়ে গেল। স্টেশনে নেমেই ফোনটা করলে
এতকিছু হত না। দাদা নিশ্চয়ই গাড়ি পাঠাতেন। হয়তো নিজেই আসতেন। ভাবতে ভাবতে ফোনটা
কানে ঠেকায় সে।
কিছুক্ষণ ফোনের ঘন্টি অকাতরে বেজে যাবার পর ওপার থেকে
সাড়া পেতেই এক নিঃশ্বাসে সে বলে, “দাদা আমি অনি। শোন
একটা বড়ো বিপদে পড়েছি। আমরা এখন করালী কাপালিকের ডেরায়।
কঙ্কাল ভৈরবের শ্মশাণে।” বলে সমস্ত ঘটনা জানায়। সবটা শোনার পর ওপাশ থেকে একটা উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শোনা গেলে একটু থেমে অনির্বাণ
বলে, “সে আমি জানি। কিন্তু আমি পরোয়া করি না। মেহুলকে আমাকে বাঁচাতে হবেই দাদা। যে
করেই হোক না কেন মেহুলকে নিয়ে আমি এখান থেকে বেরোবোই ঠিক করেছি। যদি আমি বেরোতে না
পারি তাহলে মেহুলকে বের করে দেব। তোর কাছে শুধু একটাই অনুরোধ,
আমার কিছু হলে মেহুলদের একটু দেখিস।” কথাটা বলতে বলতে গলাটা একটু কেঁপে যায় অনির্বাণের। মেহুল অনির্বাণকে শক্ত করে জড়িয়ে
ধরে কাঁদতে থাকে। ওপারের ব্যক্তিকে আর কিছু বলার সুযোগ না
দিয়ে ফোনটা কেটে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে মেহুলকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ভয় নেই মেহুল।
আমি আছি তো!”
******
মোবাইলের কথা সেড়ে গুম হয়ে বসে রইলেন অভীকবাবু। একটু
আগে ফোনে অনির কাছে যা শুনলেন তা নিজের কানে বিশ্বাস করতে পারছেন না। আবার করালী
কাপালিক ফিরে এসেছে। কিন্তু এ যে একেবারেই অসম্ভব! ক’দিন ধরে অবশ্য কানাঘুষোয় শুনেছিলেন করালী কাপালিকের
ডেরায় এক অপরূপ সুন্দরী মহিলাকে দেখা গেছে। এটাও শুনেছেন যে যারা ওকে দেখেছে তারা
কেউ বেঁচে ফেরেনি। সবকটার রক্তশুন্য প্রায় খুবলে খাওয়া শরীর পাওয়া গেছে শ্মশানের সামনে। তিনি বিশ্বাস করেননি। ভেবেছিলেন
হয়তো কোনো হিংস্র জন্তুর কাজ। গাঁয়ের কয়েকটা ছেলেপুলে নিয়ে গাঁয়ের সীমানায় পাহারা বসানোর
পর জন্তুটার উপদ্রব কিছুটা হলেও কমেছিল। ভেবেছিলেন বিপদ হয়তো কেটে গেছে। কিন্তু এতদিন
পর বিপদ যে আচমকা তাঁরই দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াবে তা তিনি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি। তাঁরই আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে আজ অনি,
বৌমা দুজনেই বিপদে পড়েছে। মেয়েটার গর্ভে অনির সন্তান। হতে
পারে অনেক মনোমালিন্য, অনেক অভিমান জমে ছিল দুই ভাইয়ের মধ্যে, কিন্তু এত বছর পর অনির মুখে দাদা ডাকটা শুনে তাঁর সব অভিমান মুছে
গেছে। তার মনে পড়ছে ছেলেবেলায় সব বিপদে কি ভাবে আগলে রাখতেন অনিকে। আজ এত বছর পর
ভাইটা বিপদে পড়ে তাকে ডেকেছে। তিনি কি না গিয়ে থাকতে পারেন? না তিনি বসে থাকতে
পারেন না। প্রাণ থাকতে ছোটোভাইটাকে এভাবে মরতে দিতে পারেন না তিনি। যা করার
তাড়াতাড়ি করতে হবে। খাট থেকে নেমে দাঁড়ালেন অভীকবাবু। কি করে করবেন, কিভাবে বাঁচাবেন অনিকে জানেন না। শুধু এটুকু জানেন তাঁর অনি চরম বিপদে।
যে করেই হোক বাঁচাতে হবে ওকে। দরকার পড়লে করালী কাপালিককে আবার মেরে বাঁচাবেন
ওকে। ঘর থেকে বেরিয়ে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। কি মনে হতে আবার ঘরে
ঢুকলেন। তারপর একটা রামদা হাতে বেরিয়ে এলেন তিনি। সদর দরজা ডিঙোতে যাবেন এমন সময়
পেছন থেকে একটা মন্দ্রস্বর ভেসে এল, “এতরাতে কোথায়
যাচ্ছেন অভীকদা?”
পেছন ফিরে দেখলেন শাম্বর সেই তান্ত্রিক বন্ধুটা দাঁড়িয়ে।
ছেলেটা ভারী ভালো। দুদিন হল এসেছে। কিন্তু এই দু’দিনে গোটা বাড়ি মাত করে রেখেছে। খেয়াল করেছেন ছেলেটাকে দেখলে মন যেন
অনেকটা আশস্ত হয়ে যায় ওনার। মনে হয় যেন যতক্ষণ ছেলেটা আছে ততক্ষণ কোনো অমঙ্গল ঘটবে
না। ছেলেটাই ঘটতে দেবে না। তিনি অবাক হয়ে বললেন, “এখনো
ঘুমোওনি?” ছেলেটা জবাবে বলে, “আজকের
রাতটা ভীষণ গুরুত্বপুর্ণ। আজকের রাতটা যে জাগতে হবেই আমাকে। তাছাড়া এক আধ রাত না
ঘুমোলে কিছু হয় না আমার।” ছেলেটার কথা মাঝে মাঝে বুঝতে
পারেন না তিনি। তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকাতেই ছেলেটা বলে ওঠে, “আমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না। কোথায় যাচ্ছেন?” অভীকবাবু সম্বিত ফিরে বললেন, “আমি একটু কাজে
যাচ্ছি। ভোরের আগেই ফিরে আসবো। তুমি চিন্তা করো না। যাও গিয়ে শুঁয়ে পড়ো।” ছেলেটা এগিয়ে এসে বলে, “এতরাতে তো আপনাকে
ছেড়ে দিতে পারি না। বিশেষত আজকের রাতে।” একটু বিরক্ত হন
অভীকবাবু। একেই দেরী হয়ে গেছে তার উপর এভাবে গল্প করে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। তিনি
বলেন, “কেন আজ কি আছে?” ছেলেটা
অনুচ্চ কন্ঠে বলে, “আজ যে কালরাত্রী। আজ সকল অশুভ শক্তিরা
জাগ্রত হয় শুভ শক্তিকে পরাজিত করতে। এই সময়টাতে কালের নিয়ম রক্ষা করতে সাক্ষাত মহাকালও নীরব
থাকেন। এই সময় বাড়ির বাইরে বেরোনো মানে ভয়ংকর মৃত্যুকে গ্রহণ করে নেওয়া।”
- কিন্তু আজ যে আমায় বেরোতেই হবে। আমার খুব কাছের একজন
চরম বিপদে পড়েছে। আমার যা হয় হোক তাঁর কিছু হলে আমি সইতে পারব না।
- কে সে? কি হয়েছে তার?
ছেলেটা শান্ত হয়ে জানতে চায়। “অতো সময় নেই আমার কাছে। ফিরে এসে বলব। আমার দেরী হয়ে
যাচ্ছে।” বলে এগোন অভীকবাবু। পেছন পেছন ছেলেটাও বেরিয়ে আসে।
“চলুন পথে যেতে যেতে শুনে নেব। তবে আজ আপনাকে একা ছাড়তে
রাজি নই আমি।” বলে অভীকবাবুর সাথে পা মেলায়। অভীকবাবুর মন
সায় দেয় তাতে। তার মন বলে একে বিশ্বাস করা যেতে পারে। এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলেন,
“তবে শোনো…”
******
মেহুলকে জড়িয়ে ধরে আশস্ত করে অনির্বাণ। মেহুলের কান্না থামলেও
তখনও সে ভয়ে কাঁপছে। অনির্বাণ একটু আগে ফোনে অভীকদাকে যা
বলল এই একবিংশ শতাব্দীতে তা বাস্তবসম্মতভাবে অসম্ভব। কিন্তু একটু আগেই যে
বিভীষিকাকে ও দেখল সেটাই বা অস্বীকার করে কি করে? এই মুহুর্তে নিজের প্রতি খুব রাগ
হচ্ছে মেহুলের। অনির্বাণের কথা শুনে রাতটা স্টেশনে কাটালেই ভালো হত। এই মুহূর্তে নিজের আর নিজের সন্তানের জন্য বড়ো ভয় করছে তার। অনির্বাণ তখনও
ওকে জড়িয়ে বসে আছে।
অনির্বাণ মৃদু গলায় বলে, “মেহুল?” মেহুল কোনোমতে সাড়া দেয়, “হুম?” অনির্বাণ বলে, “ভয়
পাচ্ছো মেহুল?” মেহুল এবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে
অনির্বাণকে। অনির্বাণ হাল্কা হেসে বলে, “ভয় কিসের? আমি তো
আছি? যতক্ষণ আমি আছি তোমার আর আমাদের সন্তানের কিছু হবে না। আমি হতে দেব না।
আমাদের বাঁচতে হবে মেহুল, তোমাদেরকে বাঁচতে হবে মেহুল। নিজেদের আর আমাদের সন্তানকে
যদি বাঁচাতে হয় তাহলে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালাতে হবে।
দাদাকে আমি ফোন করেছি। দাদা আসছে। আমাদের যে করেই হোক গ্রামের সীমানার মধ্যে
পৌঁছতে হবে। একবার গ্রামের সীমানায় পৌঁছে গেলে আর চিন্তা নেই। তুমি তৈরী তো?” মেহুল মাথা নাড়ায়। অনির্বাণ বলে, “তাহলে চলো আর দেরী করা যাবে না। যত তাড়াতাড়ি
সম্ভব এখান থেকে বেরোতে হবে।” বলে অনির্বাণ উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে।
ঘর থেকে বেরিয়ে একটু থমকে দাঁড়ায় অনির্বাণ। পেছন পেছন
মেহুলও এগিয়ে আসে। বাইরের উঠোন জুড়ে কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই। এমনকি রাতের বেলা ওরা যে ঝকঝকে কুঁড়েঘর
দেখেছিল সে সবের কিছুই নেই। পেছন ফিরে চাঁদের আলোয় ওরা দেখতে পায়, একটু আগেও যে ঘরটায়
শুয়েছিল, বেরিয়ে আসা মাত্র সম্পুর্ণ ভোল পাল্টে গেছে সেই ঘরের। একটা ভাঙা, জীর্ণ কুঁড়েঘরের
উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। অনির্বাণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারপর
মোবাইলের ফ্ল্যাশটা জ্বালিয়ে মেহুলের হাত ধরে সে একটু
একটু করে পা টিপে টিপে সামনের দিকে এগোয়।
কিছুদুর এগিয়ে গিয়ে একটা বাঁক পেরোতেই অনির্বাণ শ্মশানের মাঠের সামনে এসে দাঁড়ায়। অনির্বাণ তাকিয়ে দেখে চাঁদের ক্ষীণ আলোয় গোটা মাঠ ধুঁধুঁ করছে। অনির্বাণের মনে পড়ে ছেলেবেলায় এই মাঠে কত বল
পিটিয়েছে ও। শ্মশানের পাশে বলে লোকজন বেশী আসতো না শুধু
অনির্বাণ আর তার কয়েকজন ডাকাবুকো বন্ধুরা ছাড়া। একদিন এই
খেলার সময়ই তো…! ভাবতে ভাবতে আচমকা বাস্তবের মাটিতে ফিরে
আসে সে। তারপর মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলোয় পথ দেখে যত
তাড়াতাড়ি সম্ভব হাটতে থাকে। চারপাশে এক অসম্ভব নীরবতা ছড়িয়ে। যেন প্রকৃতি
রুদ্ধশ্বাসে কোনো কিছুর অপেক্ষা করে চলেছে।
পথে দু-তিনবার
মেহুল হোচট খেলে অনির্বাণ মোবাইলের আলো পেছনে দেখায় তারপর ধীরে ধীরে অথচ দ্রুত পদক্ষেপে এগোয় ওরা। একবার সামনের
কালীমন্দির পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে আর চিন্তা নেই। কারণ ওটাই শ্মশানের সীমানা। ওটা পেরোলে আর এই পিশাচিণী কিছু করতে
পারবে না। আলো দিয়ে দিক ঠিক করে এবার ওরা দ্রুত পায়ে হাটতে শুরু করে। মন্দিরের
প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যাবে এমন সময় মোবাইলের আলো নিভে যায়। অনির্বাণ ফোনটা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে বোঝে ব্যাটারির চার্জ শেষ। বিরক্ত
হয় সে। এখনই চার্জ ফুরোতে হল? আরেকটু এগিয়ে গেলেই কালী মন্দির।
সেটা পেরোলে আর চিন্তা ছিল না। অনির্বাণের চিন্তা নেই সে চাঁদের আলোয় এটুকু চলে
যেতে পারবে। কিন্তু মেহুল পারবে না। কারণ একে অন্ধকারে চলার অভ্যেস নেই ওর তার উপর
গর্ভবতী। কতক্ষণ হাটছে ওরা? মেরে
কেটে পাঁচ মিনিট হবে। তাতেই মেহুল সাংঘাতিক হাঁপাচ্ছে। দাদা
যে কতক্ষণে আসবে কে জানে? দাদা এলে মেহুলকে দুজনে মিলে ধরে
নিয়ে যাওয়া যেত। মেহুলের দিকে তাকিয়ে এসব কথাই ভাবছিল অনির্বাণ।
আচমকা মেহুলের গলার স্বরে সম্বিত ফেরে তার।
সামনের দিকে তাকিয়ে কি একটা দেখে ভয়ে মেহুল খামচে ধরেছে অনির্বাণের
জামাটা। অনির্বাণ মেহুলের দিকে তাকাতেই সামনের দিকে ইশারা করে মেহুল। মেহুলের কথায় সামনে তাকাতেই হৃদপিন্ড স্তব্ধ হয়ে যায় অনির্বাণের। মন্দিরের আগে একটা আমগাছ।
সেখানে একটা ডাল গাঁয়ের পথের দিকে নীচু হয়ে গেছে। ছেলেবেলায় সেই ডাল ধরেই মন্দিরের আমগাছে উঠে আম খেতো সে। চাঁদের ক্ষীণ আলোয় পিশাচিণীটাকে সেই ডালের উপর দেখতে পায় ওরা। পিশাচিণীটা অনেকটা বাদুড়ের
মতো গাছের ডালটায় হেটমুন্ড হয়ে
ঝুলে আছে। এই অন্ধকারেও শয়তানীটার হলদেটে সবুজ চোখদুটো জ্বলছে। প্রাণীটা একটা পাখিকে কাঁচা চিবিয়ে
খাচ্ছে। দাঁত দিয়ে খুবলে খুবলে খাচ্ছে পাখিটার ডানা, মাথা। মুখের কষ দিয়ে তাজা রক্ত,
পাখির পালক গড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে জমা হচ্ছে মাটিতে। একটু তাকিয়েই অনির্বাণ বুঝলো ওটা কি পাখি। অবশ্য
এটাই তো ওদের প্রধান খাদ্য। পিশাচিণী মানুষের রক্তের চেয়েও বেশী ভালোবাসে কাকের
মাংস। এছাড়া গর্ভবতী স্ত্রীর গর্ভস্থ ভ্রূণও তার অতীব
প্রিয়খাদ্য। এই জন্যই তো ডেকে এনেছে ওদেরকে। আজ যদি কোনোভাবে
অনির্বাণরা ঘুমিয়ে পড়ত তাহলে ওদের এই ঘুম আর কোনোদিন ভাঙত কিনা সন্দেহ।
পাখিটাকে খাবার পর অবশিষ্টাংশগুলো দূরে
ছুঁড়ে ফেলে একটা ঢেকুর তোলে পিশাচিণী। তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে
খলখল করে হেসে উঠে সে। তারপর ব্ল্যাকবোর্ডে চক বা নখ ঘষলে যে শব্দ হয় অবিকল সেই
শব্দে বলে, “ধুর! রোজ রোজ কাক
খেয়ে খেয়ে মুখে অরুচি ধরে গেল গা! আহা! কতদিন ধরে মানুষের রক্ত খাই না। কতদিন হয়ে গেল ভ্রুণের কচি কচি মাংস
চিবোইনি, ঘিলু খাইনি। আজ একটু চেইখে
দেকব ক্যামন লাগে। অ মেয়ে!
ভয় পাসনি কো! একটুও লাগবেনি। ঐ তোদের
ইনজিরি তে বলে না ঐ সূচ ফুঁটুনি যন্ত্র ওরমই লাগবে। তারপর আরামই আরাম! দেরী করিস
নি তাড়াতাড়ি আয়!” বলে হাতছানি দিয়ে খলখল করে হাসতে থাকে সেই পিশাচিণী।
অনির্বাণ বুঝতে পারে দুজনে একসাথে ঐ পথ দিয়ে যাওয়া
অসম্ভব। একজন পেরোলেও আরেকজনকে ধরবেই ওই রাক্ষসীটা। আর কোনো পথ নেই। একটা গভীর
দীর্ঘশ্বাস ফেলল অনির্বাণ। তাহলে একটাই উপায়। পেছন ফিরে মেহুলকে বলে, “আর দেরী করা যাবে না। শোনো মেহুল।
যে করেই হোক আমাদের এক দমে ছুটে এই
মন্দিরটা পেরোতেই হবে। মন্দিরটা পেরোলে সোজা আঠাশ পা হেটে
বাঁদিকে গিয়ে দশ পা হেটে যাবে। তারপর ডানদিকে গুনে গুনে একুশ পা হাটলেই মন্দিরের
পুরোহিতের বাড়ি। পুরোহিতের বাড়ি আসার আগে যদি দাদাকে পেয়ে যাও তাহলে তো কথাই
নেই। কিন্তু না পেলে যেভাবেই হোক না কেন সোজা পুরোহিতের বাড়িতে আশ্রয় নেবে। একদম ভয় পাবে
না। আমি তো আছিই। চিন্তা নেই।”
“আর তুমি?” মেহুল কাঁদো কাঁদো
গলায় বলে। অনির্বাণ একটু থমকে মেহুলের দিকে তাকায়, তারপর বলে, “আমি ঠিক তোমার পেছনে থাকবো। তবে একটা কথা! যাই হয়ে যাক না কেন পুরোহিতের
বাড়ি না পৌঁছনো পর্যন্ত কিছুতেই পেছনে
তাকাবে না তুমি। কথা দাও মেহুল।” বলে মেহুলের দিকে
নিজের হাত বাড়ায় অনির্বাণ। অনির্বাণের হাত ধরে মেহুল কেঁদে ফেলে। “সব আমার দোষ! সব কিছু
আমার জন্য হয়েছে!” বলে অনির্বাণের হাত নিজের কপালে
ঠেকায় সে। অনির্বাণ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “এই বোকা মেয়ে! একদম কাঁদবে না! আমি তো আছি। এতে তোমার কোনো দোষ নেই। সব ভগবানের
ইচ্ছে। ওসব কথা বাদ দাও, এখন একটাই জিনিস matter করে আমার কাছে আর সেটা হল তোমাদের
বাঁচানো। তোমাকে বাঁচতে হবে মেহুল। আমার
জন্য, আমাদের সন্তানের জন্য। আমি বাবা হয়ে, একজন স্বামী
হয়ে তোমাদের ক্ষতি হতে দিতে পারি না। আমার যা হয় হোক। তুমি কথা দাও, তুমি পেছন ফিরে তাকাবে না। Be strong Mehul! Promise
me তুমি তাকাবে না। কি হলো? Promise me!” মেহুল কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ায়। অনির্বাণ হেসে বলে, “That's my girl! চলো যাওয়া যাক।” বলে মেহুলের কপালে একটা চুমু খেয়ে দুজনে মিলে ছুটতে শুরু করে।
অনির্বাণ ছুটতে ছুটতে স্প্রিন্ট টানতে শুরু করে। ছেলেবেলায়
ত্রৈলোক্যমাষ্টার ওকে আদর করে মৃগশিখা বলতো। বদমাইসি করলে সেটা শাখামৃগ হয়ে যেত।
কারণ ওর পায়ে যেমন হরিণের গতি, তেমনই হনুমানের মতো যখন তখন লাফিয়ে গাছে উঠে যাওয়া।
স্কুলে হাই জাম্প, লংজাম্প আর দৌড়ে কতবার যে ও প্রথম হয়ে
গাঁয়ের মান বাঁচিয়েছে তার ঠিক নেই। বিয়ের পর একটু মোটা
হয়ে গেলেও ইদানিং জিম করার ফলে শরীরটাকে
সে কিশোর বয়সের আকারে ফিরিয়ে এনেছে। পায়ের সেই গতিকে সে আবার আয়ত্ত করেছে নিজের
মধ্যে। এবার এই জন্মগত প্রতিভা কাজে লাগাতে হবে। যে করেই হোক ঐ
পিশাচিণীকে ধরাশায়ী করে আটকাতে হবে। অন্তত যতক্ষণ পর্যন্ত
মেহুল মন্দির পার না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত। একবার মেহুল চলে
গেলে আর চিন্তা নেই। অনির্বাণ গতি বাড়ায় ক্রমশ জোরে আরও জোরে।
পিশাচিণীর প্রায় দশ মিটার কাছে পৌঁছে অনির্বাণ শূন্যে লাফিয়ে
একটা লাথি ছুঁড়ে দিল পিশাচিণীর বুক লক্ষ্য করে। বাতাসে
একটা মৃদু ধপ শব্দ হল। পিশাচিণীকে নিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল অনির্বাণ। পাশ দিয়ে মেহুল দৌড়ে গেল সোজা গাঁয়ের দিকে। পা-টা পিশাচিণীর বুকে লাগলেও অনির্বাণের মনে হল যেন কোনো পাথরে পা-টা সটান আছড়ে পড়েছে। মাটিতে শুঁয়ে অনির্বাণ
দেখল মেহুলের ছায়াটা ক্রমশ দুরে চলে যাচ্ছে। পিশাচিণী মাটি থেকে উঠে মেহুলকে লক্ষ্য করে এগোতে যাচ্ছিল এমন সময় অনির্বাণ একটু গড়িয়ে গিয়ে অপর পা দিয়ে পিশাচিণীর পায়ে একটা মারাত্মক
ল্যাং মারতেই সে মুখ থুবড়ে আবার মাটিতে
পড়ে গেল। আর মাটিতে পড়ামাত্র অনির্বাণ নিজের সর্বশক্তি দিয়ে জাপটে ধরল পিশাচিণীর দুটো পা।
শিকার ফস্কে যাচ্ছে দেখে গর্জে উঠল পিশাচিণী। তারপর
নিজেকে অনির্বাণের হাত থেকে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করতে
লাগল। কিন্তু অনির্বাণ নাছোড়বান্দা, কিছুতেই সে পিশাচিণীকে ছাড়বে না। পিশাচিণী
যখন আচড়ে, কিল-ঘুষি, লাথি মেরেও নিজেকে ছাড়াতে পারল না তখন ওকে নিয়েই দু’হাতে
ভর দিয়ে নিজেকে মাটিতে ঘষটে ঘষটে এগোতে লাগল। অনির্বাণ প্রাণপণ
চেষ্টা করেও পিশাচিণীকে আটকাতে পারল না। একটা পরজীবী
পশুর মতো ওকে টেনে হিচড়ে এগোতে লাগল পিশাচিণীটা। কিন্তু বেশীক্ষণ এগোতে পারল না। মন্দিরটার
কাছে আসামাত্র কিসে একটা ধাক্কা খেয়ে অনির্বাণকে নিয়ে পেছন দিকে ছিটকে গেল সে। সেই
ধাক্কার চোটে বাতাসে কিছুক্ষণ ভেসে থাকার পর মাঠের উপর মুখ থুবড়ে আছড়ে পড়ল অনির্বাণ।
তারপর মাথা তুলে দেখল মেহুল কালী মন্দির পার হয়ে গেছে। ধীরে
ধীরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে ওর ছায়াটা। সে দিকে তাকিয়ে একটা তৃপ্তির
নিঃশ্বাস ফেলল সে। পেরেছে! অবশেষে সে পেরেছে। নিজের সন্তান আর স্ত্রীকে বাঁচাতে পেরেছে সে। আর চিন্তা নেই।
দাদা ঠিক বাঁচিয়ে নেবে মেহুলকে। এখন মরেও শান্তি।
নিজের শিকার হাতছাড়া হওয়ার আক্রোশে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে একটা রক্তজল করা গর্জন করে ওঠে
পিশাচিণী। অনির্বাণের মনে হয় যেন সেই গর্জনে ওর কানের পর্দা
ফেটে যাবে। কিছুক্ষণ
দাপাদাপি করার পর পেছন ফিরে অনির্বাণের শরীরটাকে এক হাতে তুলে আমগাছটা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে ফেলে পিশাচিণী। আবার কিছুক্ষণ হাওয়া ভেসে উঠে সোজা গাছের
গুড়িতে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অনির্বাণ। চোখের পলকে গাছের সামনে পৌঁছে
পিশাচিণী অনির্বাণের চুলের মুঠি ধরে গর্জে ওঠে, “সোয়ামী-ইস্তিরির খুব পেরেম না? খুব রক্ষেকত্তা হয়ে বাঁচানো হচ্চে! তোর পোয়াতি বউটা তো
বেঁচে গেল! তোকে কে বাঁচাবে শুনি?” বলে অনির্বাণকে দু’হাতে তুলে নিয়ে গাছের
গুঁড়ি লক্ষ্য করে আবার ছুঁড়ে মারে পিশাচিণী। গাছের গুঁড়িতে
ধাক্কা খাওয়ামাত্র কঁকিয়ে ওঠে অনির্বাণ। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মাটিতে শুয়ে পড়ে সে। মুখ দিয়ে ভলকে ভলকে
রক্ত বেরিয়ে আসে তার। সেটা দেখে পিশাচিণী খলখল করে একটা রক্তজল
করা অট্টহাসি হেসে ঝাঁপিয়ে পড়ে
অনির্বাণের উপর। আচড়ে, কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে তোলে ওর গোটা
শরীর। অনির্বাণ হাজার প্রতিরোধ করলেও কিছুতেই ঠেকাতে পারে না পিশাচিণীকে। পিশাচিণী
অনির্বাণের হাত দুটো একহাতে শক্ত করে চেপে ধরে, তারপর অনির্বাণের
গলা লক্ষ্য করে কামড় দেওয়ার জন্য মুখটা
এগিয়ে আনে। অনির্বাণ বোঝে তার অন্তিম সময় আসন্ন। সে
মৃদু হেসে মেহুলের কথা ভাবতে ভাবতে চোখ
বুঁজে ফেলে অন্তিম পরিনতিকে গ্রহণ করার জন্য।
হঠাৎ একটা নীলাভ আলোয় চারপাশ ভরে ওঠে। অনির্বাণের মনে হয়
ওর উপর থেকে যেন কীসের ধাক্কায় ছিটকে সরে গেছে পিশাচিণীটা। চোখ মেলে দেখে সেই
পিশাচিণী পাশে পড়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাটা পাঁঠার মতো
ছটফট করছে। ওর গোটা শরীরে নীলাভ পাউডারের মতো একটা পদার্থ
ছড়ানো। সেই পদার্থে ক্রমশ পুড়ে যাচ্ছে তার শরীরটা। প্রচণ্ড যন্ত্রণার ফলে
চারদিক কাঁপিয়ে আর্তচিৎকার করছে সে। ক্রমশ চিৎকার মিলিয়ে আসে
বাতাসে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একসময় স্থির হয়ে যায় পিশাচিণীর
দেহটা, তারপর ক্রমশ ছাই এর মতো বাতাসে মিলিয়ে যায়। ক্লান্তিতে
চোখ বুঁজে আসে অনির্বাণের। জ্ঞান হারানোর আগে মেহুলের গলা শুনতে পায় সে। কারা যেন ছুটে
আসছে ওর দিকে। আর চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতে পারে না
অনির্বাণ। জ্ঞান হারাবার আগে অনির্বাণের মনে হয় কে যেন ওর মাথাটা কোলে তুলে
নিয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিটা কে সেটা বোঝার আগে জ্ঞান হারায় সে।
******
জ্ঞান ফেরার পর চোখ মেলে তাকিয়ে নিজেকে
একটা ঘরে আবিষ্কার করে অনির্বাণ। সুর্যের নির্মল আলোয় ঘরটা
আলোকিত। একটু যে উঠে বসবে তার
জোরটুকু নেই অনির্বাণের। গোটা শরীর যন্ত্রণায় টাঁটিয়ে উঠেছে। বা’পায়ে সাড় নেই একদম। চোখ মেলে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর একটু ধাতস্থ
হয়ে চারদিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে অনেক লোকের উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে পায়
সে। কান্নার শব্দে পাশ ফিরে দেখে বিছানার
পাশে ওর হাত ধরে মেহুল বসে আছে। দেখেই
বোঝা যায় সারারাত কেঁদে ভাসিয়েছে মেয়েটা। মেহুলকে দেখে বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করতেই অপর পাশ থেকে আরেকটা শক্ত হাত ওর বুক ছুঁয়ে ওকে শুইয়ে দিল। অনির্বাণ শুনতে পেল ওর
দাদার কণ্ঠস্বর, “একদম উঠবি না! চুপচাপ শুয়ে থাক। হাড়গোড় যেমন ভেঙেছিস, তেমনই গোটা বিয়েবাড়িটা এবার শুয়ে শুয়ে কাটাবি! এহ ভারী আমার বীরপুরুষ এসেছেন! ‘আমার
কিছু হয়ে গেলে মেহুলদের দেখিস!’ এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে
দেব তোর! বড্ড লায়েক হয়ে গেছ না
তুমি? তোমার খবর আছে হতভাগা! এখন থেকে সুস্থ না হওয়া অবধি
ঘরের বাইরে বেরোনো বন্ধ!”
প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্যেও কন্ঠস্বরটা শুনে চোখ বুঁজে
আনমনে হেসে ফেলে অনির্বাণ। কতদিন
পর দাদার বকুনি শুনতে পাচ্ছে সে! ঠিক সেই ছেলেবেলার মতো! একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে
দাদার দিকে তাকায় সে। অভীকবাবু তখনও বলে
চলেছেন, “আর বৌমা তোমারও বলিহারী! স্টেশনে পৌঁছে একটা ফোন করলেই তো চলে আসতাম আমি। কোথায় স্টেশনে পৌঁছে আমাকে ফোন করবে তা নয়, তোমরা কিনা সোজা চলে গেলে একজন অজানা অচেনা মানুষের ঘরে? কেন আমরা কি মরে গেছি নাকি? অনিটা নাহয়
বোকার হদ্দ। কিন্তু তুমি এই ভুলটা করলে কি করে? যাক গে বিপদ থেকে তোমরা মানে মানে ফিরে এসেছ এই ঢের। তবে একটা কথা জেনে রাখো, যতদিন পর্যন্ত ও সুস্থ না হচ্ছে ততদিন তুমি এই বাড়িতে আমার মেয়ের মতো
থাকবে। এটা শুধু তোমার অনিরই নয়, তোমারও বাড়ি। এই বাড়িতে যতটা অধিকার, যতটা
আদর এবাড়ির মেয়েরা পেয়ে এসেছে। আজ থেকে তুমিও সেই আদর, সেই অধিকার পাবে। এটা আমি, অভীক
মিত্তির কথা দিচ্ছে তোমাকে।”
অভীকবাবুর কথা শুনে মেহুলের কান্না আরো বেড়ে যায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে হেসে অনির্বাণ
বলে, “বলেছিলাম না মেহুল? দাদা আমার যতই বাইরে থেকে রাগ করুক না কেন? ভেতর ভেতর একদম
মাটির মানুষ! দেখলে তো? কিভাবে আমাকে বাদ দিয়ে তোমাকে আপন করে নিল? তোমারই বাজার এখন!
লুটেপুটে নাও!” মেহুল অনির্বাণের হাত ধরে কাঁদতে থাকে। অভীকবাবু অনির্বাণের হাতে চাপড়
মেরে বলেন, “এক থাপ্পড় মারব হতভাগা! আবার উল্টোপাল্টা কথা বলে মেয়েটাকে কাঁদাচ্ছিস!”
তারপর মেহুলের মাথায় হাত বুলিয়ে ধরা গলায় বলেন, “ব্যস! ব্যস! আর কাঁদতে হবে না! বোকা
মেয়ে কোথাকার! ওর কথা ধরতে আছে? পাজি ছেলে একটা! ওর কথায় একদম কাঁদবে না! যদি আবার
কাঁদায় আমাকে বলবে, আমি ওকে দেখে নেব। এখন তুমি যাও। অনির কাছে আমরা আছি। আর কোনো চিন্তা
নেই। সারারাত অনেক ধকল গেছে, ভালো করে ঘুম
হয়নি, এখন একটু বিশ্রাম নেবে
যাও। বিকেলে সবটা শুনবো তোমার কাছে। এই কে আছো? বৌমাকে মেয়েদের ঘরে নিয়ে যাও। আর এই যে তুমি।
তোমায় কি বলে যে ধন্যবাদ দেব জানি না ভাই। কাল তুমি ছিলে বলেই ওদের বাঁচাতে
পেরেছি। না হলে যে কি হত? ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠছে।”
একটা মৃদুমন্দ্র অথচ নম্র স্বর শুনতে পায় অনির্বাণ, “আরে আমাকে
ধন্যবাদ দিচ্ছেন কেন অভীকদা। ধন্যবাদ পাওয়ার মতো কিছু করিনি আমি। আমি শুধু আপনার সাহায্য করেছি। এখন আমাদের দেখা উচিত অনির্বাণবাবুকে।
উনি আগে সুস্থ হয়ে উঠুন। যেভাবে পিশাচিণীটা ক্ষেপে উঠে আক্রমণ
করেছিল, আমাদের একটু দেরি হয়ে গেলে একটা
ভালোমন্দ হতেই পারত। মা মহাকালী আর কালভৈরবের অসীম কৃপা যে কিছুই হয়নি।”
বিকেলবেলা বাড়ির বারান্দায় সকলে চা নিয়ে বসেছে। বিয়েবাড়ির আয়োজন প্রায় শেষ। একটু পরেই বর এলে ব্যস্ততা শুরু
হবে। তাই সব আয়োজন শেষ করে বাড়ির মেয়েরা সাজতে বসেছে। থেকে থেকে অন্দরমহল
থেকে ওদের হাসির কলতান ভেসে আসছে। বাইরে প্রায় বাড়ির সকল
পুরুষেরা সাজগোজ সেরে বারান্দায় বসে
চায়ের কাপ হাতে গল্প করছে। অনির্বাণও সেজেগুজে অভীকবাবুর কাঁধে ভর দিয়ে ঘরের বাইরে এসে বারান্দার আরামকেদারায়
বসেছে। দেখেই বোঝা যায় দুজনের মধ্যের দুরত্ব প্রায় ঘুঁচে গেছে।
দুজনে পাশাপাশি বসে খোশমেজাজে গল্প করছেন। বেশিরভাগই পুরোনোদিনের কথা, আর গাঁয়ের
লোকদের হালচালের খবর। বাতাসে সুস্বাদু সব খাবারের গন্ধ ভেসে আসছে। সব মিলিয়ে একটা আনন্দের আবহাওয়া। তবু একটা চাপা কানাঘুষো চলছে সকলের
মধ্যে কালরাতের ঘটনা নিয়ে।
কথা বলতে বলতে অভীকবাবু বললেন, “শোন
অনি, আজ যে তুই বেঁচে আছিস তার একমাত্র কারণ এই যে ছেলেটা
বসে আছে, এর জন্য।” অনির্বাণ
হেসে বলে, “তা আর জানি না?
আপনাকে আমি চিনি না তবুও বলছি আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আপনি না থাকলে হয়তো আমি
কার রাতেই মারা পড়তাম।” ছেলেটা হেসে বলে, “এভাবে বলবেন না। ঈশ্বর তাকেই সাহায্য করেন যিনি নিজেকে নিজে সাহায্য
করেন। আপনি যদি সাহস করে ফোনটা না করতেন তাহলে আমরা হয়তো জানতেও পারতাম না আপনাদের
কথা। বলতে পারেন আপনার ফোন করাটাই আপনাদের বাঁচিয়েছে।” অভীকবাবু বলেন, “সে তুমি যতই বলো! তুমি যে কতটা শক্তিধর তা আমি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। শক্তিধর
না হলে ঐ ভয়ঙ্কর পিশাচিণীকে হত্যা করা
অসম্ভব ছিল। আসলে এই গ্রামে আসার সময়ই ঐ আমগাছটা দেখে আর শ্মশানের নিস্তব্ধটা দেখেই খটকা লেগেছিল। পরে অভীকদাই সব প্রশ্নের উত্তর
দিলেন। বাকিটা আমি আন্দাজ করেছি আজ সকালে।”
এমন সময় পাশ থেকে অনির্বাণের পিসতুতো ভাই শাম্ব বলে
ওঠে, “ওভাবে নয়! একেবারে শুরু থেকে বলো।” ছেলেটা হেসে বলে, “সবটা
বলতে শুরু করলে রাত কাবাড় হয়ে যাবে। আচ্ছা বেশ সংক্ষেপে বলছি। ঘটনার সুত্রপাত আজ থেকে চোদ্দবছর আগে। চোদ্দবছর
আগে এ গ্রামের শ্মশানে সস্ত্রীক আশ্রয়
নেন এক তান্ত্রিক। গ্রামের লোক প্রথমে কিন্তু কিন্তু করলেও পরে মেনে নেয় ওদেরকে। কারন ওদের ব্যবহার। স্বামী-স্ত্রী দুজনে গ্রামের সকলের সাথে সদ্ভাব
বজায় রেখে চলতেন। বিশেষ করে তার স্ত্রীর অমায়িক ব্যবহার গ্রামের সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।
তান্ত্রিক কারো সাতেপাঁচে থাকতেন না। স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামের এককোণে নিভৃতে মায়ের আরাধনা করতেন। গ্রামের লোকের দেওয়া
চালডাল ফুটিয়ে খেতেন দুজনে। এমনিতে সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু একদিন
একটা অঘটন ঘটে গেল। একদিন সকালে মাধুকরী করতে গিয়ে সাপের কামড়ে প্রাণ হারালেন
তান্ত্রিকের স্ত্রী।”
“স্ত্রীর এই আকস্মিক মৃত্যুতে কার্যত দিশেহারা হয়ে যান তান্ত্রিক। নিজের স্ত্রীকে তিনি বড়ো ভালোবাসতেন।
এতটাই যে কালের নিয়ম উপেক্ষা করে একের পর এক তন্ত্র প্রয়োগ করে বসেন নিজের স্ত্রীকে ফিরে পাবার জন্য। কিন্তু একে একে সব তন্ত্র ব্যর্থ হয়ে
যায়। হায় তখন যদি তিনি বুঝতেন যে জীবন-মৃত্যু মহাকালের হাতে। তার ইচ্ছে ছাড়া একটা গাছের পাতাও নড়ে না। সে যাই হোক একে একে সব রকম তন্ত্রে ব্যর্থ
হবার পর অবশেষে একটাই পথ বাকি রইল তার কাছে। নরবলির পথ। মা কালীর কাছে নরবালক বলি দিয়ে
সেই বলির প্রসাদস্বরূপ রক্ত মৃতদেহকে খাইয়ে তার উপর শব
সাধনা। এইভাবে সাধনা করে কোনোদিনও সিদ্ধিলাভ হয় না। বরং
বলিপ্রদত্ত মানুষের আত্মা রুষ্ট হয়। আর তান্ত্রিকের সাধনক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
তাছাড়া এসব অসৎ উপায়ের সাধনা বেশীদিন চলেও না। তান্ত্রিকেরও এই
সাধনা দীর্ঘদিন চলল না। গ্রামের বাচ্চারা একের পর এক উধাও হতে থাকলে গ্রামের লোকদের সন্দেহ হতে লাগল। তারপর একদিন ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা।”
“গ্রামের কয়েকজন ছেলে শ্মশান
সংলগ্ন মাঠে একদিন ফুটবল খেলছিল। খেলতে খেলতে বলটা তান্ত্রিকের কুটিরের সামনে চলে
যায়। একজন সেই বল আনতে গিয়ে অনেকক্ষণ না ফিরে আসায় বাকি ছেলেগুলোর সন্দেহ হয়।
ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে ডাকাবুকো সে সকলকে অপেক্ষা করতে বলে এগিয়ে যায়। যাবার আগে সঙ্গীদের
বলে যায় তারও যদি ফিরতে দেরী হয় তাহলে
সকলে যেন গ্রামের লোকজন ডেকে আনে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার
পরও ডাকাবুকো ছেলেটারও কোনো সাড়া না
পেলে সকলে মিলে গ্রামে ফিরে যায়। এই ডাকাবুকো ছেলেটা আর কেউ নয়, আমাদের অনির্বাণবাবু।”
“কিছুক্ষণ পর গ্রামের লোকেরা তান্ত্রিকের কুটিরে হানা দিয়ে তান্ত্রিককে হাতেনাতে ধরে ফেলে। তান্ত্রিক সেই দুই ছেলেকেও ধরে বেঁধে বলি দিচ্ছিল। হয়তো সময় মতো
গ্রামবাসীরা না পৌঁছলে বলি দিয়েও ফেলতো। তান্ত্রিককে ধরার
পর গ্রামবাসীরা বুঝতে পারে কোন কারণে গ্রামের ছেলেরা উধাও হয়ে
যাচ্ছে। ক্রোধোন্মত জনতা তান্ত্রিক আর তান্ত্রিকের স্ত্রীর মৃতদেহটাকে পুড়িয়ে
দেয়। তারপর গ্রামের পুরোহিতের নির্দেশে
সেই মড়ামানুষের ছাঁইটাকে শ্মশানের পাশের নদীতে ফেলে
দেওয়া হয়।”
“এরপর দীর্ঘ চোদ্দবছর কোনো উপদ্রব ছিল না। কিন্তু
মাসদুয়েক আগে আবার এক নতুন উপদ্রব শুরু হয়। অবশ্য এর
পেছনে কোনো মানুষের হাত ছিল না। বলতে
পারো ঘটনাটা সম্পুর্ণ কাকতালীয় বা প্রকৃতির আজব খেয়ালমাত্র। চোদ্দবছর আগে গ্রামবাসীরা
তান্ত্রিক আর তার স্ত্রীর পোড়া ছাঁই নদীতে ফেললেও সেদিন সম্পুর্ণ
ছাঁই নদীতে মেশেনি। বরং যে ভাঙা কুলোয় ছাঁইটা ফেলা হয়েছিল, কিছুটা অবশিষ্ট চিতাভষ্ম নিয়ে সেটা
নদীর ধারেতেই পড়েছিল।”
“একদিন প্রকৃতির আপন খেয়ালে শ্মশানের পাশের নদীতে একটা
নারীর মৃতদেহ ভেসে গ্রামের শ্মশানের পাড়ে এসে পৌঁছয় আর
সেই মৃতদেহের সাথে সেই কুলোয় থাকা অবশিষ্ট চিতাভষ্মের স্পর্শ ঘটে। যার ফলে এই অঘটনটা ঘটে যায়।
চিতাভষ্ম স্পর্শমাত্র সেই তান্ত্রিকের স্ত্রীর অতৃপ্ত আত্মা বাসা
বাধে সেই নারীর মৃতদেহে। মৃতমানুষের দেহে অন্য আত্মার
প্রাণসঞ্চার বড়ো ভয়ংকর বিষয়। সাধারণ আত্মা প্রবেশ করলেই গুণিনদের গলদঘর্ম
হতে হয়, আর এখানে তো এমন এক অতৃপ্ত আত্মা যে কিনা একসময় নিয়মিত বলির রক্তপান করছিল,
সেই আত্মা প্রবেশ করেছে। বুঝতেই পারছেন এরফলে কতটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটে গিয়েছিল। তান্ত্রিকের
স্ত্রীর সেই ভয়ঙ্কর রক্তপিপাসু প্রেত মানবদেহরূপী আধার পেয়ে যাওয়ায় এক ভয়ঙ্কর পিশাচিণীতে পরিণত হয়।”
“ওভাবে মৃতদেহ সৎকার হওয়ায় বিদেহী অবস্থায় গ্রামের মানুষের উপর রাগ তো ছিলই।
পিশাচিণীরূপ গ্রহণের পর সেটা প্রতিহিংসায় পরিণত হয়। আর তারই খেসারত দিতে হয় গ্রামবাসীদের।
এই পিশাচিণীরা অপূর্ব রূপসী হবার
সাথে সাথে অসম্ভব কুহক শক্তিসম্পন্না হয়। এদের মায়া বা কুহক
থেকে বেরোনো প্রায় অসম্ভব। এই মেয়েটি রোজ নিজের রূপ বা কুহকের
জালে জড়িয়ে শিকার ধরত। কথার জালে বা রূপের মোহে হরণ করত বাস্তব বুদ্ধিটুকু। তারপর সুযোগ বুঝে
সেই সব মানুষদের রক্ত পান করে হত্যা করত। অনির্বাণবাবুদের
আশ্রয়ের টোপ দেখিয়ে নিয়ে গেছিল অবশ্য। তবে ওদের কুহকের বেশিরভাগই চিতাভষ্মকেন্দ্রীক
তাই আসার দিন গারোয়ানের মানে সেই
পিশাচিণীর স্বামীর দেহ থেকে ছাঁই উড়তে
দেখেছিলেন অনির্বাণবাবু।”
“আমার খটকা লেগেছিল গ্রামের সীমানায় আমগাছ আর শ্মশানটা দেখে। শ্মশান জায়গাটা এমনিতে নিরিবিলি হয়
অথচ এই শ্মশানটা যেন একটু বেশীই নীরব। এমনকি পাখির ডাকও
শোনা যাচ্ছে না। তাছাড়া এখানে আসার দিন ওই কালীমন্দিরে কিছুক্ষণের জন্য বসেছিলাম
আমি। সেই সময়ই মন্দিরের পাশের আমগাছটার নীচে পাখির হাড়গোড়
ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখি। শুধু তাই নয় মন্দিরের চারপাশে
অনেকগুলো অমঙ্গলের চিহ্ন দেখতে পাই। সব দেখে দুইয়ে দুইয়ে চার
করতে সময় লাগেনি আমার। কালরাতে অভীকবাবুকে বেরোতে দেখে খটকা লাগে। ওনার পিছু নিয়ে
চেপে ধরতেই উনি সবটা খুলে বলেন। সবটা
জানার পর বুঝতে পারি অনির্বাণবাবু্দের ভয়ঙ্কর বিপদ আসন্ন। হয়তো পিশাচিণী কাল রাতেই
আবার আক্রমণ করতে পারে। ঠিক করি যে করেই হোক ওনাদের বাঁচাতে হবেই। সেই মতো জিনিসপত্র
নিয়ে আমরা শ্মশানের কাছে পৌঁছতেই মেহুলদেবীকে ছুটে আসতে দেখি। বাকিটা আপনারা
জানেন।"
একটানা কথাগুলো বলে একটু থামে ছেলেটা। গোটা ঘর চুপ করে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর কথা শুনছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। শাম্ব জিজ্ঞেস
করে, “সবই তো বুঝলাম। কিন্তু একটা জিনিস বুঝলাম না। ঐ নীলাভ
তরলটা আসলে কী ছিল? যেটার ছোঁয়া লাগতেই অতো ভয়ঙ্কর
একটা পিশাচিণী মুহূর্তের মধ্যে ছাঁই হয়ে গেল।” ছেলেটা মৃদু হেসে
বলে, “বেশি কিছু নয়, ঐ সামান্য
কিছু রাসায়নিক যৌগ যা খোলা হাওয়ায় দাহ্য হয়ে ওঠে, অল্প কেরোসিন,
কালকেউটের বিষ, গঙ্গাজল, আর চিতাভস্মের
মিশ্রণ। পিশাচিণীর আধাররূপী মানবদেহ নষ্ট করার জন্য
কিছুটা হলেও অব্যর্থ অস্ত্র। গায়ত্রী মন্ত্র অথবা নিদেন পক্ষে ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ বলে কিংবা কিছু না বলে প্রয়োগ করলেও চলে। তবে সত্যি কথা বলতে গেলে আমার
দ্বারাও এইসব করা অসম্ভব হত যদি না অনির্বাণবাবু সেই
কুহকের মায়া কাটিয়ে ফোনটা না করতেন, আর ভাতৃস্নেহের টানে
অভীকবাবু ছুটে না যেতেন। অনির্বাণবাবু, আপনার দাদা আপনাকে সত্যিই ভালোবাসেন। নাহলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও এভাবে নিজের
প্রাণের পরোয়া না করে ভাইকে রক্ষা করতে কে ছুটে যায়? এরকম ভাতৃস্নেহ আজকালকার স্বার্থপরযুগে বড্ড বিরল। ভাগ্য করে এযুগে এরকম একটা দাদা পেয়েছেন আপনি।
এরকম মানুষ আজকাল পাওয়া যায় না।”
অনির্বাণ মাথা নামিয়ে বসে থাকে। অভীকবাবু শক্ত করে নিজের ভায়ের একটা কাঁধ জড়িয়ে
ধরেন। এমন সময় বাইরে শোরগোল পড়ে যায় বর
এসেছে। অভীকবাবু উঠে এসে ছেলেটার হাত ধরে ধরা গলায় বলেন, “তোমার এই ঋণ আমি কোনোদিন ভুলব না। আজকে আমার
পরিবারকে জুড়ে দিয়েছো বোম ভাই।”
ছেলেটা প্রথমে থমকে যায়
তারপর হো হো করে হাসতে হাসতে বলে, “নাহ! আপনার উচ্চারণ আর পালটাতে পারলাম না। ওটা বোম নয় দাদা ব্যোম। আমার
নাম ব্যোমকেশ মিত্র। কোনো বোম টোম নয়।”