অনুসরণকারী

সোমবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২২

অস্তরাগ সপ্তদশতম পর্ব




পার্ক থেকে তথাগতদের ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। কোয়ার্টারে ফেরার পর নটবরকে রাতের খাবার তৈরীর কথা বলে তথাগতরা গুছিয়ে বসল বৈঠকখানায়। সুজাতা আর ঊর্মি চলে গেল ঊর্মির ঘরে।‌‌ একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশে একটা সুখটান দিয়ে তথাগত বলল,“বলো রজতাভ, কেমন লাগল আজকের অনুষ্ঠানটা?”

- অনবদ্য!‌ আমার তো এখনও চোখের সামনে ওদের নাচ ভেসে উঠছে। সত্যিই আমাদের দেশে প্রাচীন ট্র্যাডিশন, লোকনৃত্যগুলো এদের জন্যেই বেঁচে আছে।

- আরে এতো কিছুই নয়! এই যে‌ ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখলে এরা সবাই কিন্তু ট্রাইবের নয়। কয়েকজনের বাড়ি যথেষ্ট শহরে। অথচ এই নাচে ওরা এত ভালো ট্রেইনড যে এরা ট্রাইবের নয় এটা বিশ্বাস করা শক্ত। আসল ট্রাইবাল ড্যান্স দেখতে হলে ঝাড়খন্ডে যেতে হবে। এছাড়া তোমাদের ঐ যে লেখক, কী যেন নাম, আরে জঙ্গল নিয়ে বেশ গল্প লেখেন।‌ সুজাতার বেশ লাগে ওনার লেখা। হ্যা, মনে পড়েছে! বুদ্ধদেব গুহ! ওনার লেখায় এই ট্রাইবালদের ড্যান্স  নিয়ে অনেক লেখা পাবে। স্পেশালই অবুঝমারের  বাইসন হর্ন মারিয়াদের কথা। মধ্যপ্রদেশের বস্তারে ছিলাম যখন, একবার অবুঝমারে‌ গিয়েছিলাম এদের নাচ দেখতে। বুঝলে রজতাভ,তোমাদের ঐ বুদ্ধদেব গুহ যতটা লিখে গেছেন, বাস্তবে তার চেয়েও জমকালো, রঙিন আর ঝলমলে  ওদের নাচ। সমাজ এগিয়ে গেলেও ওরা এখনও সেই পুরোনো দিনে পড়ে আছে। কিন্তু ওদের থাকা, ওদের চালচলন, আচারবিচার যে কোনো পাশ্চাত্যের সভ্যতাকে গুনে গুনে দশগোল দেবে।  অবশ্য এর ফলে কিছুটা অসুবিধেতেও পড়ে ওরা।

- জানি। আমাদের সভ্যজগতে আমরা জীবন সঙ্গী বাছতে বিয়েতে ভরসা রাখি। আমাদের বাবা-মায়েরা নাহলে আমরা নিজেরাই নিজেদের জীবনসাথী বেছে নিয়ে বিয়েতে আবদ্ধ হই। ওরা সেই বিয়ের ধার ধারে না।  জুটি না মেলা পর্যন্ত একের পর এক সঙ্গীর সাথে মিলিত হতে থাকে। এই অবাধ যৌনাচারের ফলে নানান যৌনরোগে ভোগে।

- কারেক্ট! এই অবাধ যৌনাচারের অনেকের নাকও শিটকোয়, কেউ কেউ ওদের সহজলভ্য ভেবে অভব্যতাও করে বসে। তবে আমার মতে ওদের এই ব্যবস্থাটাই সেরা! যতক্ষণ তোমার মনের মতো নারী না পাচ্ছ ততক্ষণ ট্রায়াল দিতে থাকো। গোটা উপজাতির তরুণী তোমার হাতের কাছে। বুঝলে রজতাভ? গোটা উপজাতির! ইস! জীবন হোক তো এরকম! কোনো বন্ডেজ নেই, কোনো সীমা নেই! কোথায়‌ এরকম বনের পাখির মতো জীবন কাটাবো তার জায়গায় একজন নারীর সাথে বিয়ে নামক একটা  বন্ধন নিয়ে গোটা জীবন কাটাতে হচ্ছে।

বলে তথাগত চটুল হাসি হাসে। তথাগতর নোংরা ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধে হয় না রজতাভর। সে  ঊর্মির ঘরের দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে, “ একটু সামলে ভায়া! তোমার এই অদম্য ইচ্ছের কথা হোমমিনিস্ট্রি জানতে পারলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাইরে শুতে হবে তোমাকে। আর কী করা যাবে? বাঙালি হয়ে জন্মেছ যখন তখন এক স্ত্রীতেই সুখী থাকতে হবে। তবে এর একটা প্লাস পয়েন্ট কী জানো? তোমার মনের মানুষ, তোমার স্ত্রী শুধু তোমারই থাকবে। আর কারো অধিকার থাকবে না ওর উপর। কারও সাহস থাকবে না তাকে স্পর্শ করার। একবার ভেবে দেখ শুধু পুরুষরাই নয়,নারীরাও পুরুষদের  মতো সঙ্গী খোঁজার সুযোগ পায় তথাগত। যতক্ষণ সে উপজাতি থেকে তার মন মতো পুরুষ পাচ্ছে,যে তাকে শারীরিক, মানসিক দিক দিয়ে সুখী করতে সক্ষম ততক্ষণ এই খোঁজ চলে হে! এবার ভেবে দেখো তোমরা দুজনে যদি এই উপজাতিতে জন্মাতে তাহলে কী হতো? তুমি এদিকে জীবন সঙ্গী খুঁজতে উপজাতির সব মেয়েদের সাথে মিশতে শুরু করলে ওদিকে তোমার সুজাতাকে অন্য কেউ অরগ্যাজম দিয়ে তুলে নিল। ব্যাপারটা কীরকম হবে বলো তো?”

উদাহরণটা শুনে নড়ে চড়ে বসে তথাগত। রজতাভ বুঝতে পারে ঘটনাটা কল্পনা করে তথাগতর অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে গেছে। অন্তত ওর  নিভে যাওয়া মুখ দেখে তাই মনে হচ্ছে। তথাগত নিজেকে সামলে কোনো মতে সিগারেটে একটা টান দিয়ে হেসে‌ বলে, “না আমি সেটা বলতে চাইনি। আমি বলতে চেয়েছি  মাঝে মাঝে মনে হয় ওদের একজন হয়ে জন্মালেই বেশ হত! একটা অ্যাডভেঞ্চারময় জীবন কাটাতাম! বনে শিকার করে ফলমূল, মাংস খেয়ে দিন কাটতো। তা না বাঙালি হয়ে সেই থোড়বড়িখাড়া আর খাড়াবড়িথোড়! ধুস! কোনো অ্যাডভেঞ্চারই নেই! তাও ভাগ্যিস বনদপ্তরের চাকরিটা জুটেছিল বলে বাঁচোয়া! নাহলে কোনো সরকারি দপ্তরের কেরানীগিরি করে জীবনটা শেষ হয়ে যেত। বনের এই আদিম মাদকতার স্বাদই পেতাম না।

- রাখো তোমার জঙ্গলের জীবন!আর্মিতে থাকাকালীন ওদের মতোই টিকে থাকার ট্রেনিং নিতে হয়েছিল। সেই ট্রেনিং কতটা যন্ত্রণার বলে বোঝানো অসম্ভব। গোটা জঙ্গলে তুমি আর তোমার সঙ্গীরা, সঙ্গে বেঁচে থাকার আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র,যার ওজন তোমার দেহের ওজনের অর্ধেক হলেও সেটাকে কাঁধে করে বয়ে পথ চলতে হবে। বিপদের মোকাবিলা করতে একটা একহাত লম্বা চপার, নাহলে একটা বড়ো ছোরা, আর একটা কালাশনিকভ ভরসা। খাদ্য, পানীয়, গোলাবারুদ সীমিত। এই অবস্থায় বনের পথে হেটে চলো। পথে সাপ, জোক, বন্যজন্তুর অবাধ বিচরণ। এর মধ্যে বাঁচার জন্যে  রসদ না থাকলে শিকার করো, সেটাকে নিয়ে চলো।‌ কথাতে, লেখাতেই এই জীবন অ্যাডভেঞ্চারময় লাগে। বাস্তবে যখন এই অবস্থায় পড়লে বোঝা যায় স্নায়ুর উপর কতটা চাপ পড়ে। এই যে তুমি বললে বনদপ্তরের চাকরি পেলে বলে বেঁচে গেছ। তুমি তো জানবেই একটা বাঘ ধরতে গেলে যতটা প্রসিডিওরের দরকার তার থেকেও বেশি দরকার ইস্পাতের স্নায়ু হওয়ার। প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকতে হয়। এবার সিচুয়েশনটা কল্পনা করো, বনে একটা বাঘ ঘুরছে, আর তার বিরুদ্ধে তোমার হাতের চপার আর ট্রেনিং পিরিয়ডে শেখা আত্মরক্ষার কৌশল ভরসা। কেমন লাগবে?বনকে ভালোবেসে তার সৌন্দর্যতা উপভোগ করলেই চলবে না হে। বনের স্বরূপ বুঝতে হলে তার মাঝে থেকে তার রকমসকম বুঝে‌ তার মধ্যে বাঁচার রসদ খুঁজে নিতে হবে। যেমনটা ওর সন্তানেরা নেয়। বনকে প্রেমিকা করে নয়, মা ভেবে চলতে হবে। এক শহরকে জানতে হলে যেমন তার জন্য পড়াশোনা করতে হয়, তেমনই একটা বনকে জানতে হলে তাকে ঘুরে দেখতে হবে। সাফারি বা জিপে নয়, পায়ে হেটে। বনের শব্দের সাথে নিজের পদশব্দ মিলিয়ে, বনের গন্ধের সাথে নিজের দেহের গন্ধ মিলিয়ে মিশে যেতে হবে বনের মধ্যে। পোচারগুলো এই নিয়ম মেনে চলে বলেই এত পাহারার পরেও হামলা করতে পারে। ওরা জঙ্গলের হাওয়া বুঝে মিশে যায় বলেই পশুরা বুঝতে পারে না ওদের মৃত্যুফাঁদকে। আর সেই সুযোগে ওরা শিকার করে, যেমন আজ করবে।

তথাগত এতক্ষণ হা হয়ে রজতাভর কথা শুনছিল। রজতাভর শেষ কথায় চমকে ওঠে।

- কী বললে? আজ শিকার করবে ওরা?

ভুল না হলে আজকে হবার চান্স বেশি!

- কিন্তু কেন?

- কারণটা বললে বিশ্বাস করবে না।

- তবুও শুনি?

- কাল তোমরা যখন  মৃত গণ্ডারটা মানে ডেভিডের কথা বলছিলে তখন একটা ব্যাপার মাথায় ঘুরছিল। কিন্তু পরে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম। ব্যাপারটা হল ডেভিড একটা পুর্ণবয়স্ক গণ্ডার ছিল। শুধু তাই নয়, ডেভিড ছিল এখানকার গণ্ডারদের প্রমুখ। আর সেই নিয়ম অনুযায়ী ডেভিডের সঙ্গিনী থাকা...

- লায়লা! হ্যা! ডেভিডের সঙ্গিনী ছিল!

- শুধু তাই নয়, নটবরের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি লায়লার আকার ছোটো হলেও ওর নাকের খড়গ ডেভিডের মতোই প্রকাণ্ড।  শুধু তাই নয় লায়লা নাকি গর্ভবতীও বটে! তোমাকে বলা হয়নি ,ডেভিডের মৃতদেহ দেখার আগে আমরা দেখা পেয়েছিলাম লায়লার। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে  হলেও ওর মতো একটা পুর্ণবয়স্ক মাদি গণ্ডারকে একা ঘুরতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল। সকালে নটবরের সাথে কথা বলে বুঝলাম, ডেভিড ওদের টার্গেট ছিলই না।

- ডেভিড ওদের টার্গেট ছিল না?

- না! খামোখা একটা গণ্ডার যে কিনা এখানকার স্টার অফ অ্যাট্রাকশন তাকে মেরে গোটা বনদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ কে করতে যাবে? কাজটা বোকামো হয়ে যাবে না?

- তাহলে ওদের টার্গেট ছিল কে?

- ওদের টার্গেট ছিল লায়লা। কিন্তু অন্ধকারে ভুলবশত ওরা মেরে ফেলে ডেভিডকে। লায়লা আর ডেভিড একই প্রজাতির,একই আকারের খড়গ হওয়ায় ওরা ভুল করে বসে। ভুলটা করার পর ওদের খেয়াল হলেও তখন কিছু করার ছিল না। অগত্যা কাজ সেরে পালিয়ে গিয়েছিল।

- কিন্তু আজকেই যে হামলা করবে কি করে শিওর হচ্ছ?

- লায়লা যে পুর্ণগর্ভা! যেকোনো সময় প্রসব করতে পারে ও। আর সেই সুযোগটাই নেবে ওরা। লায়লা প্রসব করতে এক জায়গায় দাঁড়াবেই। আর আমি যতদুর জানি ও প্রসব করবে ডেভিডের মৃতদেহ যেখানে পেয়েছিলাম সেই জায়গাতেই। জায়গাটা নরম ঘাসে ভর্তি।

- তাহলে তো আমাদের হাতে সময় নেই! এখনই বেরোতে হয়!এখনই ফোর্সকে অ্যালার্ট করে দিচ্ছি।

- দাঁড়াও! লায়লাকে বাঁচাতে গেলে অতো হুড়যুদ্ধ করে নয়। বুদ্ধি করে এগোতে হবে। জায়গাটাকে কর্ডন করবে তোমরা, তবে নিশব্দে। যেভাবে ওরা করে। একটা পরিকল্পনা এসেছে মাথায়, দাঁড়াও বলছি!

বলে দুজনে বসে গভীর আলোচনায়। কিছুক্ষণ পর তথাগত ওর কোয়ার্টারের টেলিফোনে ফরেস্ট কনজার্ভেটর সাহেবের সাথে কিছু শলাপরামর্শ করে নেয়। ফোন রাখার সাথে সাথে নটবর জানায় খাবার তৈরী। খেতে বসলেই হল। নটবরের কথা শুনে তথাগত সুজাতাদের ডাকে। সুজাতারা এলে সকলে মিলে খেতে বসে। খাওয়ার টেবিলে তথাগত সুজাতাকে জানায় আজ রাতে সে একটু বেরোবে, ফিরতে দেরী হলে রাতটা একেবারে কাটিয়ে কাল সকালে  ফিরবে। সুজাতা অবাক হলেও তথাগতর গম্ভীর মুখ দেখে কিছু বলে না। ঊর্মি রজতাভকে ইশারা করে ব্যাপারটা জানতে চাইলে রজতাভ মাথা নাড়ে।

খাবার পালা শেষ হলে রজতাভ পোশাক পরে বেরিয়ে‌ পড়ে। ঊর্মি  ঠিক করে আজ রাতটা সে  সুজাতার সাথে শোবে। তথাগত বাধা দেয় না। সেই মতো রাতে যে যার ঘরে শুয়ে পড়ে।

কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করার পরেও ঘুম আসছে না দেখে উঠে পড়ে রজতাভ। বিছানার‌ পাশের টেবিলে রাখা হাত ঘড়িতে দেখে রাত সাড়ে বারোটা বাজে। ভীষণ গুমোট ঘরে। হয়তো একারণেই ঘুম আসছে না তার। তাছাড়া গণ্ডারটাকে নিয়ে একটা উত্তেজনা তো আছেই। বিছানা থেকে নামে রজতাভ। এই সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়টা ভীষণ গোলমেলে। এই গরম, আবার এই শীত। বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে জল দিয়ে বেরিয়ে  এসে ড্রেসিং টেবিলে রাখা সিগারকেস, অ্যাশট্রে আর লাইটার নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় রজতাভ। একটা সিগার ধরিয়ে আরামকেদারায় বসে সে। আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে।  আকাশে চাঁদের আলোয় কিছুটা হলেও অন্ধকারটা কমেছে। সেই আলোয় সে তাকিয়ে থাকে সামনের বনের দিকে। কান পেতে শোনার চেষ্টা করে একটা কাঙ্ক্ষিত শব্দকে। কিছুক্ষণ পর শোনা যায় সেই শব্দটা। বনের ঝিঁঝিঁপোকা, আর রাতচড়া পাখির ডাককে ছাপিয়ে, বনের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে ,চারদিক কাঁপিয়ে শব্দটা আসে।  একবার! দুবার! কয়েকবার! এ শব্দ তার ভীষণ চেনা! কতকাল পর শুনে মনে আনন্দের‌ সঞ্চার হয় তার। এ শব্দ‌ বন্দুকের গুলির! বনের এককোণে একাধিক রাইফেল গর্জে উঠেছে।  আরামকেদারায় হেলান দিয়ে আরাম করে সিগারটা শেষ করে রজতাভ। তারপর অবশিষ্ট অংশটা অ্যাশট্রে তে গুঁজে ঘরে ঢোকে। অ্যাশট্রেটা ড্রেসিং টেবিলে রেখে বিছানায় শোওয়ার তোড়জোড় করতেই দরজায় কড়াঘাতে শব্দ শোনে সে।  বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলতেই দেখতে পায় সুজাতারা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। চিন্তিত মুখে ঊর্মি জিজ্ঞেস করে,

- শুনেছ?

- হুম! শুনেছি! ওটা গুলির শব্দ। চিন্তা করার কিছু নেই। তোমরা শুয়ে পড়ো।

- কিন্তু রাতবিরেতে জঙ্গলে কে গুলি চালাতে যাবে?

- যারা সাধারণত চালায় তারা। নির্ঘাত পোচাররা চোরাশিকার করতে বেরিয়েছিল, গার্ডদের  নজরে পড়ে গেছে। তাই গোলাগুলি চলছে।

- সে জন্যেই তো চিন্তা হচ্ছে! তথাগত নেই। হুট করে রাতে বেরিয়ে গেল, তার উপর এত রাতে গুলির শব্দ।

- বললাম তো! ভয়ের কিছু নেই! পোচাররা অ্যামুনেশন খুব কম নেয়, বেশিরভাগ ট্র্যাংকুলাইজারই রাখে। তেমন রোগ জন্তর পাল্লায় পড়লে তখন গুলির দরকার পড়ে। তথাগত তো বলেই গেছে, ফিরতে রাত হবে। তেমন হলে কাল সকালে ফিরবে। যাও শুয়ে পড়ো।

- সুজাতা বলছিল, এখানে নাকি কোনোদিন গুলিগোলা চলেনি...

ঊর্মিকে একটু দ্বিধাগ্রস্থ দেখায়।‌‌ রজতাভ এবার বিরক্ত হয়ে বলে, “আশ্চর্য! গোলাগুলি চলেনি মানে কি কোনোদিনও চলবে না? আত্মরক্ষার জন্যে যে কেউ গুলি চালাতেই পারে! একজন এক্স আর্মি অফিসারের স্ত্রী হয়ে কী সব উল্টোপাল্টা বলছ?এত ভয় কীসের?”

তারপর সুজাতার দিকে তাকিয়ে বলে, “ভয়ের কিছু নেই! বন্দুকের শব্দ শুনে যা বুঝলাম তথাগত একা নয়, আরো অনেকে ওর সাথে আছে। তেমন হলে কাল তথাগত ফিরলে ওর থেকে সবটা জেনে নিও! আপাতত দুজনে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো,ভয় নেই!

সুজাতা মাথা নেড়ে ঊর্মিকে নিয়ে ওদের ঘরে চলে যায়। রজতাভ দরজা লাগিয়ে দেয়।

 পরদিন সকালে তথাগত ফিরলে সকলে মিলে ঘিরে ধরে তাকে। সারারাত জাগার ক্লান্তি কাটানোর জন্যে সুজাতা চটপট এককাপ কফি বানিয়ে দেয় তথাগতর জন্যে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসে তথাগত‌, তারপর সবটা বলার পর রজতাভর দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব ভায়া? তোমার অনুমান, এমনকি জায়গাটা পর্যন্ত একদম মিলে গিয়েছে! যেখানে ডেভিডের বডি আমরা পেয়েছিলাম, লায়লা ঠিক সেখানেই বাচ্চা প্রসব করতে এসেছিল! ভাগ্যিস আমরা স্পটে ছিলাম! নাহলে শুয়ারগুলো লায়লাকে তো মারতোই, ওর বাচ্চাটাকেও নিয়ে যেত! ফরেস্ট কনজার্ভেটর সাহেব তোমার ভীষণ প্রশংসা করেছেন! উনি চাইছেন তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে! কাজিরাঙার প্রাইড রক্ষা করার জন্য তোমাকে উনি সম্বর্ধনা দিতে চান!"

রজতাভ হেসে বলে, “এসবের কোনো দরকার নেই! একটা বন্যপ্রাণ রক্ষা পেল এটাই অনেক বড়ো পাওনা। ওনাকে বারন করো এসব করতে। আর যদি সম্বর্ধনা দিতেই হয় তাহলে তা তোমাদের মানে কাল যারা স্পটে ছিলে তাদের প্রাপ্য। আমি তো শুধু বুদ্ধি দিয়ে খালাস! সেটা ব্যর্থও হতে পারত। হয়নি তোমাদের জন্য। কারণ আমার  অবাস্তব বুদ্ধিটাকে বাস্তবায়িত করে, নিজের জীবন বাজি রেখে  তোমরা লড়েছ। আমি তো বুদ্ধি দিয়ে খেয়ে দেয়ে বিছানায় টানটান হয়ে ঘুম দিয়েছি। তা কজন পোচার ধরা পড়ল?"

- ছজন পোচার। প্রত্যেকে আর্মড ছিল। রাইফেল পেয়েছি ছটা। আট রাউন্ড ট্র্যাঙ্কুলাইজার ডার্ট,তিন রাউন্ড গুলি,দুটো কুকরি,চারটে চপার,একটা চিতাবাঘের ছাল,এক পলিপ্যাকে প্যাঙ্গোলিনের আঁশ, আর কী পেলাম জানো?

- ডেভিডের খড়গটা তো?

- একদম অক্ষত অবস্থায়!তোমার আন্দাজই সঠিক! ওরা ডেভিডের খড়গটা পাঁচার করতে পারেনি।

- তাই তো কাল রাতে আবার এসেছিল। লায়লা আর তার সন্তান কেমন আছে?

- দুজনেই সুস্থ। আপাতত জায়গাটা আমরা সিলড রেখেছি কয়েকদিন পর বাচ্চাটা একটু সবল হলে পাবলিকের সামনে আনবো। তা ভায়া একটা অনুরোধ তোমাকে রাখতে হবে।

- আবার কী?

- বাচ্চাটার একটা নামকরণ করে দিতে হবে তোমায়! না বলতে পারবে না।

- এতো আচ্ছা মুশকিলে ফেললে দেখছি! এসব আমি পারি নাকি? এটা আমাদের অর্ধাঙ্গিনী ডিপার্টমেন্টের কাজ।

- তাও একটা নাম তোমাকে দিতে হবেই।

- আচ্ছা বেশ! ডেভিডের সন্তান, যে মরণ থেকে বেঁচে ফিরেছে, বাপ-মায়ের যোগ্য উত্তরসূরী হুম! মাইকেল রাখতে পারো।

- মাইকেল?

- হুম, মাইকেল। বাইবেল অনুসারে ঈশ্বরের প্রথম পুত্র, প্রথম সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্ট স্বর্গের রক্ষকদের সর্বোচ্চ নায়ক, আর্চএঞ্জেলদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে কুশল ও ভয়ঙ্করতম যোদ্ধা, শয়তানকে ঈশ্বরের আদেশে যিনি নরকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। আমাদের ডেভিডের সন্তানও তাঁর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সে প্রায় মৃত্যুকে সাক্ষী করে, একাধিক উন্নত মস্তিস্কের শত্রুদের লোলুপদৃষ্টি এড়িয়ে পৃথিবীতে পা রেখেছে।

- বেশ! আজ থেকে ওর নাম হবে মাইকেল!

 সেদিনের ঘটনার দুই দিন পর, কাজিরাঙ্গা ফরেস্টের কনজার্ভেটর জনপ্রকাশ্যে নিয়ে এলেন ডেভিডের সন্তান মাইকেলকে। পর্যটকদের প্রায় ভীড় লেগে গেল গণ্ডারশাবকটিকে দেখার জন্য। সকলে দেখল মা লায়লার সাথে গুটিগুটি পায়ে হেটে চলেছে একটা খুদে গণ্ডারশাবক।

 সেদিন রাতে তথাগতরা আমন্ত্রণ পেল কনজার্ভেটর সাহেবের কাছে। পার্টিতে পৌঁছোবার পর কনজার্ভেটর সাহেব এগিয়ে এলেন ওদের অভ্যর্থনা করার জন্য।

- আরে আসুন! আসুন! মোস্ট ওয়েলকাম মেজর মজুমদার! মিসেস মজুমদার, মিসেস চৌধুরী, তথাগত ওয়েলকাম!

- সরি, আসলে একটু দেরী হয়ে গেল!

-  নো ইস্যুজ! আজকের পার্টিটা তো আপনাদের অনারেই আয়োজন করা! ভেতরে চলুন, আমার মিসেস আপনাদের সাথে দেখা করলে ভীষণ খুশি হবেন।

বলে ওরা সকলে মিলে বাংলোর ভেতরে প্রবেশ করেন।

পার্টি থেকে ফিরে পোশাক পাল্টে, ফ্রেশ হয়ে রজতাভরা যখন বিছানায় শয্যা নিল তখন বেশ রাত হয়েছে। বিছানায় শোয়ার পর ঊর্মি রজতাভর বুকে মাথা দিয়ে বলল, “আজকের দিনটা বেশ কাটল বল?”

রজতাভ ঊর্মির চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, “হুম!”

- আজকে পার্টিতে সুজাতাকে কি হাসিখুশি লাগছিল না?

- ওকে তো সব সময়ই হাসিখুশি লাগে।

- হুম। তা ঠিক! কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়, মেয়েটা সুখী নেই।

- কেন?

- সেটাই তো বুঝতে পারছি না কেন? এত ভালো একটা বর, এত ভালো একটা জীবন, অথচ মেয়েটাকে দেখে মনে হয় কী যেন একটা নেই ওর জীবনে। কী কারনে যেন ও সুখী নেই। ও যেন সুখী থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে। কীসের যে এত অভাব বুঝি না আমি। কালরাতে ঘুমের ঘোরে কীসব বিড়বিড় করছিল। সকালে জিজ্ঞেস করতেই চেপে গেল। কী যে চলছে কে জানে? কাল তেমন হলে তথাগতর সাথে কথা বলে দেখো তো?

- ঠিক আছে বলব।

বলতে বলতে হাই তোলে ঊর্মি। তারপর পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। রজতাভ ভ্রু কুঁচকে জেগে থাকে একা। ওর কানে বাজতে থাকে ঊর্মির কথাগুলো,‘এত ভালো একটা বর, এত ভালো একটা জীবন, অথচ মেয়েটাকে দেখে মনে হয় কী যেন একটা নেই ওর জীবনে। কী কারনে যেন ও সুখী নেই। ও যেন সুখী থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে।'

(চলবে...)

বুধবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ ষোড়শতম পর্ব


অভীককে চুপ করে বসে থাকতে দেখে রজতাভ এবার ডাইরিটা টেবিলে আছড়ে ফেলে গর্জে ওঠেন, “কী হল? বলো তুমি এ ডাইরি কোথায় পেলে?”

রজতাভর চিৎকারে চমকে উঠলেন সুজাতা। অভীক আর ঐশী নিরুত্তাপ ভাবে দেখতে লাগল দুজনের মুখের অভিব্যক্তি। রাগে, ক্ষোভে থরথর করে কাঁপছেন রজতাভ। সুজাতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার?আপনি ওভাবে কথা বলছেন কেন? কী করেছে ও? কী লেখা আছে ডাইরিতে?" বলে ডাইরিটা হাতে নিয়েই নিস্তব্ধ হয়ে যান। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায় তাঁর। অভীক একবার সুজাতার দিকে তাকায় তারপর বলে, “ ব্যাপারটা কী? তোমরা দুজনেই এরকম রিঅ্যাক্ট করছ! এমন কী লেখা আছে ওটায়?”

- ন্যাকা সাজবে না! তুমি জানো না কী লেখা আছে ওটায়?

গর্জে ওঠেন রজতাভ। এবার আসরে নামে ঐশী।

- বাপি! তুমি এভাবে ওকে অ্যাকিউজ করতে পারো না। কি হয়েছেটা কী?কী লেখা আছে ডাইরিতে যে তোমরা এরকম বিহেভ করছ?

- ওতে...ওতে... আমি বলতে পারব না!

- বেশ তাহলে আমি নিজেই পড়ে দেখব।

বলে ঐশী সুজাতার হাত থেকে ডাইরিটা নিতে গেলে রজতাভ বাধা দিয়ে বলেন,

- না তুমি ঐ ডাইরি পড়বে না!

- কেন?

- আমি বলছি তাই!

- আমিও তো তাই জানতে চাইছি! কেন?

- সবসময় মুখে মুখে তর্ক করবে না ঐশ্বর্য!

- কেন বাপি? আমার মায়ের শেষ ডাইরি, শেষ স্মৃতি কেন পড়তে পারবো না?

- আমি বলেছি বলে পড়বে না! তুমি আমার কথা শুনতে বাধ্য।

- সরি বাপি! আমি ডাইরিটা পড়বোই!

- ঐশ্বর্য! আমি তোমার বাবা! আমি বলছি যখন তুমি ঐ ডাইরি পড়বে না, তখন তুমি ঐ ডাইরি পড়বে না! আর এটা আমার অর্ডার!

- সরি বাপি, বিয়ের আগে আমি শুধু তোমার মেয়ে ছিলাম। এখন বিয়ের পর এ বাড়ির বউ হয়ে গেছি। এখন আমার স্বামী আর আমার শাশুড়ির অর্ডারই আমার কাছে শেষ কথা। তোমার অর্ডার মানতে আমি বাধ্য নই।

- ঐশী!

রজতাভর কথাকে পাত্তা না দিয়ে ঐশী ডাইরিটা নিয়ে পড়তে শুরু করে।

"১৬ই মার্চ ২০০১

আজ আমি ভীষণ খুশি! এতবছর পর আমার নারী জন্মের সার্থকতা খুঁজে পেলাম। এতবছর ধরে রজত আমার কাছে যা চেয়েও পায়নি সেটাই দিতে চলেছি ওকে। হ্যা, ঈশ্বরের কৃপায় একটা ছোটো প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে আমার ভেতরে। আমি মা হতে চলেছি! রজত এখনও জানে না। ওকে এখন খবরটা দেবো না। আপাতত সারপ্রাইজ রাখবো..."

ডাইরির পাতা উল্টে পড়তে থাকে ঐশী। প্রতিটা পাতায় ধীরে ধীরে ঊর্মির মাতৃত্বের বিকাশ, এবং সেটার অনুভূতি লেখা। এই লেখা সে আগে পড়লেও নির্বিকার ভাবে পড়তে থাকে। ক্রমশ পড়তে পড়তে শেষ পাতায় এসে থামে সে। জন্মদিনের ঠিক দুদিন আগের পাতাটা পড়তে শুরু করে সে।

"৯ ডিসেম্বর ২০০১

আজ আমার ভালোবাসার উপর থেকে, বন্ধুত্বের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেল। রজতকে দুরে সরিয়ে রেখেছিলাম ওর ভালোর জন্যেই, কিন্তু সেই দুরে রাখার শাস্তি হিসেবে ও আমাকে এতবড়ো আঘাতটা দেবে ভাবতেও পারিনি। এতবছর হয়ে গেল আমাদের বিয়ের কিন্তু ওকে আমি চিনতেই পারিনি। মানুষ চিনতে গিয়ে ঠকে গেলাম আমি। রজত যখন আমাকে সবটা জানাল তখন মনে হচ্ছিল ও বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলে আমাকে রাগিয়ে মজা নিচ্ছে। কিন্তু যখন বুঝলাম যে ও যা বলছে তার একবর্ণও মিথ্যে নয়, তখন মনে হচ্ছিল এর চেয়ে ও মরে গেলেই ভালো হত। সুজাতাকে আমি কোনো দোষ দেব না কারন আমি ওকে ভালো করে চিনি। ওকে বাধ্য না করা হলে এই পাপে লিপ্ত..." হোয়াট?

বলে সুজাতার দিকে তাকিয়ে ঐশী অবাক হবার ভান করে। সুজাতা মাথা নামিয়ে ফেলেন। ঐশী আবার পড়তে শুরু করে।

“ওকে বাধ্য না করলে এই পাপে ও লিপ্ত হত না। ওর প্রতি আমার কোনো রাগ, বা ঘৃণা নেই। আক্ষেপ শুধু একজায়গায়, একজন চরিত্রহীন, লম্পট, নোংরা মানসিকতার মানুষের সন্তানকে আমি গর্ভে ধারন করেছি। ইচ্ছে করছে নিজেকে শেষ করে দিতে। কিন্তু না! আমাকে বাঁচতে হবে। আমার গর্বের সন্তানের জন্য আমাকে বাঁচতে হবে। তার কোনো দোষ নেই, সে তো আর জানে না তার পিতা কতটা নোংরা! তাকে জানতেও দেব না আমি!ঐ মানুষটার ছায়াও আমার সন্তানের উপর পড়তে দেব না আমি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দুরে চলে যাবো আমি। ঐ মানুষটার থেকে অনেক দুরে।"

- স্টপ ইট! স্টপ দিস ননসেন্স! অনেক হয়েছে আর না!

বলে চিৎকার করে ওঠেন রজতাভ। ঐশী ডাইরি পড়া থামিয়ে রজতাভর দিকে তাকায়। রজতাভর ফরসা মুখটা টকটকে লাল হয়ে গেছে দেখে জিজ্ঞেস করে, “কী হল বাপি? ওরকম করছো কেন? শরীর খারাপ হল নাকি?”

রজতাভ রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে ঐশীর হাত থেকে ডাইরিটা কেড়ে নিয়ে হিসহিসে গলায় বলেন, “অনেক হয়েছে! আর পড়তে হবে না!” 

আচমকা ডাইরিটা কেড়ে নেওয়ায় ঐশী চমকে উঠলেও পরক্ষণেই প্রতিবাদ করে ওঠে, “আরে ডাইরিটা নিয়ে নিলে কেন?এখনও তো শেষ লাইনটা পড়া হয়নি!”

- আর পড়তে হবে না!

- কী ব্যাপার বাপি? তুমি এরকম বিহেভ করছো কেন?একটা ডাইরি নিয়ে এতটা রিঅ্যাক্ট করার কি আছে বুঝতে পারছি না।

- বুঝতে হবে না তোমাকে! তুমি আর ঐ ডাইরি পড়বে না! আর ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও। কাল সকালে আমরা ফিরবো।

- ফিরবো মানে? কোথায় ফিরবো?

- বাড়ি ফিরবো আমরা। কাল সকালেই ফিরবো।

- সেকি! এত তাড়াতাড়ি! এই তো সেদিন এলাম!

- আমি কিছু জানি না! কাল সকালেই আমরা ফিরছি!

- সোজা সোজা বলুন না! সত্যিটা জানাজানি হবার পর আর‌ মুখ দেখানোর জায়গা রইল না বলে পালাতে চাইছেন।

ঘোলাটে চোখে রজতাভর দিকে তাকিয়ে অভীক মৃদু হেসে ওঠে। অভীকের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকান রজতাভ। সুজাতাও তাকান ছেলের দিকে। অভীক তখনও পাগলের মতো হেসে চলেছে। রজতাভ দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,“শাট আপ! কি যাতা বলছ তুমি?
- যেটা দেখতে পাচ্ছি সেটাই বলছি। কবে কোন ডাইরিতে ঐশীর মা কী লিখে গেছেন তা নিয়ে আপনাদের দুজনের ব্যবহারটা সন্দেহের সৃষ্টি করে বৈকি। তাছাড়া আপনার আচমকা এই উগ্র ব্যবহারে তো সেই সন্দেহটা আরো দৃঢ় হচ্ছে যে ডাইরির লেখাগুলো সত্যি।

- তোমার সন্দেহ ভুল! এরকম কোনো ঘটনা কোনোদিনও ঘটেনি। ঊর্মি এসব উল্টোপাল্টা কেন লিখে গেছে জানি না আমি!

- তাহলে তুমি এরকম ব্যবহার কেন করছ বাপি? কেন তুমি আমাকে নিয়ে কাল ফিরে যেতে চাইছ? কেন তুমি অভির সাথে এরকম ব্যবহার করছ?

ঐশীর প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে রজতাভ বলে ওঠেন,

- ঐশী! তোমার বিয়ে হয়ে গেছে মানে এই নয় যে তুমি তোমার বাপির মুখে মুখে তর্ক করবে! এত সাহস তোমার হয় কী করে?

অভীক বলে ওঠে, “সত্যি কথা জানাজানি হলে এইভাবেই বকে,ধমকে সেটাকে চাপা দেওয়া হয় ঐশী। বাদ দে, তোর বাপি যখন বলছেন তখন কটাদিন তুই বরং তোদের বাড়ি ঘুরেই আয়।”

অভীকের কলার ধরে একঝটকায় সোফা থেকে দাঁড় করিয়ে দেন রজতাভ। হিসহিসে কন্ঠে বলে ওঠেন, “হাউ ডেয়ার ইউ! আমারই বিরুদ্ধে আমার মেয়েকে দাঁড় করাবার সাহস কী করে হয় তোমার? যে মেয়ে কোনোদিন আমার কথার পিঠে কথা বলত না, সেই মেয়ে আজ মুখে মুখে তর্ক করছে!”

নিজের কলার ছাড়িয়ে অভীক ফুঁসে ওঠে, “কারন ও আজকে সত্যিটা জানতে পেরেছে! ইনফ্যাক্ট অনেক আগেই জানতে পেরেছে! আমাদের বিয়ের দিনই আমরা জানতে পেরেছিলাম আপনাদের সত্যিটা। আমরা বিশ্বাস করিনি লেখাটাকে। কিন্তু আজ আপনার ব্যবহার আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে যে ডাইরিতে লেখা প্রতিটা বর্ণ সত্যি। কি তাইতো? লেখাটা যদি সত্যি না হত তাহলে এতটা বিচলিত আপনি হতেন না। লেখাটা সত্যি বলেই আপনি এতটা উগ্র বিহেভ করছেন!”

ঐশী বলে, “ অভীকের সাথে আমি সহমত বাপি। তাও একটা দোলাচল মনের ভিতর ছিল যে আমার বাপি এরকম হতে পারে না। কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে মাম্মাম যা লিখে গেছে তা সত্যি। যদি তাই না হয় তাহলে এত অ্যাগ্রেসিভ বিহেভ করতে না। সত্যি করে বলো তো বাপি, মাম্মাম যা লিখে গেছে তা কি সত্যি?”

অভীক আর ঐশীর প্রশ্নবাণে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েন রজতাভ। অসহায় দেখায় সুজাতাকেও। ঐশীর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অসহায় চোখে সুজাতার দিকে তাকান রজতাভ। দেখেন সুজাতা লজ্জায়, দুঃখে প্রায় মাটিতে মিশে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলেছেন। ক্রমশ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পর রজতাভ নিরুপায় হয়ে বলে ওঠেন, “বেশ সত্যিটা যখন তোমরা জানতে পেরেছ তাহলে আমার দিক থেকেও সম্পুর্ণ ঘটনাটাও তোমাদের জানা দরকার। হ্যা, ডাইরিতে যা লেখা আছে সব সত্যি। তবে ডাইরিতে তোমরা যতটুকু পড়েছ তা ঊর্মির দৃষ্টিভঙিতে। আসল ঘটনা অন্য ছিল। সেটাও তোমাদের জানতে হবে। একজন ফাঁসীর আসামীও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়। তোমাদের কাছে সেই সুযোগটুকু চাইব। সবটা জানার পর তোমাদের বিচারে যদি আমি দোষী হই তাহলে যা শাস্তি দেবে মাথা পেতে নেব। শুধু একটা কথা, ঐ মানুষটাকে তোমরা কিছু বলবে না! ওই মানুষটা নির্দোষ, সব দোষ আমার!”

(চলবে...)

শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ পঞ্চদশতম পর্ব




অভীক ধরা গলায় বলে, “ডাইরিটা কার?”

- আমার মাম্মামের। বাপির কাছে শুনেছি মাম্মান নিয়মিত ডাইরি মেন্টেন করত। রোজকার ছোটোখাটো ঘটনা, মুহূর্ত,ভাবনা-চিন্তা লিখে রাখত ডাইরিতে।

- ডাইরিতে আমার বাবা-মায়ের কথা কেন লেখা? তোর বাপি-মাম্মাম কি আমার বাবা-মাকে চিনত?

- তুই পড়েছিস?

- কেন তুই পড়িসনি?

- পড়েছি। কিন্তু তোর মা-বাবাকে আমার বাপি-মাম্মাম কীভাবে চিনত এটা আমিও জানি না। বাপি কোনোদিনও আমাকে জানায়নি।

- কিন্তু চিনত সেটা তো এই ডাইরিতে পরিস্কার। শুধু তাই নয় আমার মায়ের সাথে তোর বাপির...

কথাটা বলতে গিয়ে থমকে যায় অভীক। ঐশী চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। অভীকের অবস্থাটা সে বুঝতে পারে। আসলে ব্যাপারটা এতটাই স্পর্শকাতর যে ডাইরিটা পড়ার পর ওর নিজেরই বিশ্বাস হয়নি। এতদিন ধরে দেখে আসা পৃথিবীটা সম্পুর্ণভাবে পাল্টে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল কেউ যেন সপাটে চড় কষিয়ে দিয়েছে।  অভীককে সামলানোর সময় দেয় সে। অভীক কিছুক্ষণ পর বলে, “আচ্ছা এটা তোর মাম্মামের ডাইরি তুই শিওর তো?”

-মানে?

- না মানে হতেই তো পারে, কেউ...

- কেউ আমাদের বাবা-মায়েদের নিয়ে কেচ্ছা লিখে রেখে গেছে! 

অভীকের কথার সূত্র ধরে ঐশী বলে ওঠে, “কিন্তু তাতে কার কী লাভ বলতে পারিস? আর কেচ্ছা যদি রটাতে বা জানাতেই হত তাহলে খামোখা ডাইরিতে কেন লিখে যেত? ডাইরিটা আমি আমার বাপির স্টাডিতে এমন জায়গায় পেয়েছি যেখানে মানুষের হাত পৌঁছনো অসম্ভব। ডাইরিটার অবস্থা দেখ একবার। দেখেই বোঝা  যাচ্ছে ডাইরিটা যেই লিখুক সে চায়নি ডাইরিটা অন্য কারো হাতে পড়ুক। তাই ডাইরিটা লুকানো ছিল। তাছাড়া ডাইরির শেষ লেখাটায় যা, সেখানে যে ডেটটা আছে সেটা আমার জন্মের দুদিন আগের ডেট। ডাইরিটা যদি মাম্মাম না লিখে থাকে তো কে লিখেছে?বাপি? কেন? খামোখা তোর মাকে জড়িয়ে এরকম একটা বিষয় নিয়ে কেন লিখতে যাবে? তাও মাম্মামের পয়েন্ট অফ ভিউ দিয়ে? কী লাভ? এতে তো বাপিরই বদনাম হবে! আর বাপিকে যতদুর চিনি বাপি কোনো সাহিত্যিক বা রাইটার নয় যে এভাবে রসিয়ে মিথ্যে লিখবে। তাছাড়া আমি মাম্মামের হাতের লেখা চিনি।  আমার এতটাও ভুল হবার কথা নয়। মাম্মামের ডাইরিতে মাম্মামের নাম মলাটে লেখা থাকতো। মাম্মামের সব ডাইরি আমার পড়া। প্রতিবছর জন্মদিনে বাপি একটা করে ডাইরি দিতো আমাকে।”

“তাও আমি বিশ্বাস করি না! আমার মা...” বলে থমকে যায় অভীক। মাথা নামিয়ে ফোপাতে থাকে।

ঐশী ডাইরিটা টেবিলে রেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অভীকের মাথা চেপে ধরে নিজের বুকে। অভীকের চুলে হাত বুলিয়ে বলে, “প্রথমবার পড়ার পর আমারও বিশ্বাস হয়নি। যে বাপিকে এতবছর ধরে চিনি, সেই মানুষটার এই রূপ জানার পর আমারও পৃথিবীটা পাল্টে গিয়েছিল অভীক। কিন্তু কথাগুলো যে লিখেছে সে মানুষটাও যে অনেকবছর হল মৃত। নিজের মৃত্যুশয্যায় শুয়ে এই কথাগুলো লিখে গেছে। সেই কথাগুলো অবিশ্বাস করি কী করে বলতো?”

- আমি জানি না। কিন্তু ঐ ডাইরিতে লেখা সুজাতা আমার মা নয়! আমার মা হতে পারে না!

ঐশীর বুকে মুখ লুকিয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে অভীক। ঐশী অভীককে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিতে থাকে।

*****
বিকেলবেলায় চা খাবার জন্য ঐশী ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে পা বাড়াতেই বৈঠকখানায় বাপির কন্ঠস্বর শুনে থমকে যায়। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে বৈঠকখানায় উঁকি দিতেই দেখে রজতাভ সোফায় বসে সুজাতার সাথে কথা বলছেন। বাপিকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য মনটা নেচে উঠলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলায় ঐশী। ইচ্ছে করলেও বৈঠকখানায় এখনই ঢোকা সমীচিন মনে করে না সে। দরজার পাশ থেকে আড়ি পেতে শুনতে থাকে রজতাভদের কথা।

টেবিল থেকে চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিয়ে রজতাভ বলেন,“বোধহয় একটু অসুবিধেতে ফেলে দিলাম আপনাদের। তাই না?”

সুজাতা পাশের সোফায় বসে বলেন, “ওরকম করে বলবেন না। আপনি আমাদের কুটুম। ঐশীর বাবা। আপনি যখন খুশি আসতে পারেন। ঐশী যতই আমার পুত্রবধু হোক না কেন,আপনার মেয়ে তো! মেয়ের কাছে বাবা এলে কোনো অসুবিধে কেন হবে?”

- কেমন আছে ঐশী? আপনার কোনো অসুবিধে করছে না তো?

- নাহ! বরং আজ দুপুরে আমাকে বাড়ির কাজে, রান্নায় সাহায্য করেছে। অভী তো এখানে আসার পর থেকেই বন্ধুদের কাছে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। মায়ের সাথে কথা বলার সময় কোথায়?

- কোথায় ওরা?

- ঘুমোচ্ছে। এই ঘন্টাদুয়েক হল দুপুরের ভাত খেয়ে শুয়েছে। আমি আর ডাকিনি।

- এহে! তাহলে তো ভুল সময় এসে পড়লাম। আপনিও তো বোধহয় বিশ্রাম নিতেন।

একটু বিব্রত দেখায় রজতাভকে। ম্লান হেসে সুজাতা বলেন,

- আমার আবার বিশ্রাম! দুপুরে আমি ঘুমোই না রজতদা। সে অভ্যেস আমার কোনো কালেই ছিল না। বরাবর খেয়েদেয়ে বই পড়েই দুপুরটা কাটিয়ে দিই।

- সে আবার জানি না? সেবারই তো...

বলেই থমকে যান রজতাভ। সুজাতা হেসে বলেন, “ সেবারই তো বইমেলায় একগাদা বই কেনায় আপনি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। শেষে ঊর্মি যখন জানালো যে আমারও বই পড়ার শখ আছে তখন আপনি বলেছিলেন...

- এখানেও জুড়িদার আছে! 

সুজাতার কথার খেই ধরে স্মৃতি রোমন্থন করেন রজতাভ। তারপর মৃদু হেসে বলেন, “কতবছর আগের ঘটনা! অথচ‌‌ মনে হচ্ছে যেন এই সেদিন ঘটেছে।‌ জানেন? আজও চোখ বুঁজলে আমি দেখতে পাই পাহাড়ে সেই পিকনিকে অন্যদলের সাথে গানে মেতে‌ ওঠা আমরা, কাজিরাঙার সেই নাচের আসর। সব জীবন্ত, সব ঝকঝকে! কিন্তু চোখ খোলার পর সব হারিয়ে যায়। মনে হয় মানুষগুলো না থাকলেও স্মৃতি থেকে গেছে একরাশ। মাঝখান থেকে তেইশটা বছর কীভাবে যেন কেটে গেছে।”

মৃদু হাসেন সুজাতা, “তা আর বলতে! আমার তো এখনও বিশ্বাস হয় না আমার অভিটার বিয়ে হয়ে গেছে।” বলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন,“পাঁচটা বাজতে চলল, দাঁড়ান ওদের ডেকে দিচ্ছি। দেখবেন আপনাকে দেখে ঐশী ভীষণ খুশি হবে।” বাধা দেন রজতাভ।

- না থাক! ডাকার দরকার নেই। নিজেই উঠুক ওরা। খামোখা ওদের বিব্রত‌ করে লাভ নেই।‌ বুঝতেই পারছেন ইয়ং ছেলে-মেয়ে,তার উপর সদ্য বিবাহিত। সারাদিন পর একটু কাছে আসার সময় পেয়েছে। এসময় ওদের ডিস্টার্ব না করাই ভালো। 

সুজাতা হেসে ফেলেন রজতাভর কথা শুনে। তারপর সোফায় হেলান দিয়ে বলেন, “চা-টা কেমন হয়েছে?"

- ফাইন!তবে অনেকদিন পর অন্যের হাতে খেলাম বলেই হয়তো অন্যরকম ‌লাগছে। আসলে আগের মতো আর রান্না পারি না। কোনোমতে মুখে দেওয়ার যোগ্য দুটো খাবার বানিয়ে খেয়ে নিই।

- আপনি বলছিলেন এখানে শুধু ঐশীর সাথে দেখা করতেই নয়, আরো একটা কারনে এসেছেন। খুব ব্যক্তিগত না হলে কারনটা জানতে পারি?

- বিলক্ষণ জানতে পারেন! কারন যে কাজে এসেছি সেটায় আপনার সাহায্য লাগবে।

- কী কাজ?

- আসলে আগামীকাল ঐশীর জন্মদিন। প্রতিবার ওর জন্মদিন আমার বাড়িতেই পালিত হয়। তেমন ধুমধাম করে না হলেও ছোটোখাটো আয়োজন করি। তা এবার তো ঐশী আমার বাড়িতে নেই। তাই...

- ওমা তাই নাকি? ঐশী বা অভি তো আমাকে কিছুই জানায়নি। বেশ আমি আছি আপনার সাথে। এবার ঐশীর জন্মদিন ওর এই মায়ের ঘরে করা হবে।

- কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব?

- দরকার নেই! ঐশী তো আমারও মেয়ে!

ঐশী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে ঢোকে। তারপর রজতাভকে দেখে অবাক হবার ভান করে রজতাভর কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে।

- মাই গড! বাপি! তুমি কখন এলে?

- এই তো কিছুক্ষণ হল। কেমন আছিস মা?

- ফার্স্ট ক্লাস! জানো আজই তোমাকে মিস করছিলাম!

- হুম সেজন্যই তো চলে এলাম! আমার মাম্মাম যখন আমাকে মিস করছে আমি কী বাড়িতে থাকতে পারি? তাই চলে এলাম।

- ভালো করেছ! বাপি আজ কিন্তু তোমাকে খেয়ে যেতে হবে। মায়ের সাথে আজ আমিও রান্না করেছি।

- তাই নাকি? তাহলে তো থেকে যেতে হচ্ছে! তা কি মেনু করেছিস শুনি?
সুজাতা চুপচাপ সোফায় বসে বাবা-মেয়ের খুনসুটি দেখতে থাকেন। একটা অনাবিল আনন্দে তার মনটা ভরে ওঠে। বাবা-মেয়ের খুনসুটি দেখতে দেখতে তিন ঠিক করে নেন কালকের দিনটা কীভাবে সেলিব্রেট করবেন।

***** 
পরদিন ঐশীরা বাইরে বেড়াতে যাওয়ায় সুবিধেই হল সুজাতাদের। ওরা বেরিয়ে পড়ার পর রজতাভ আর সুজাতা দুজনে মিলে গোটা ঘরটাকে সাজালেন নিজের মতো করে। তারপর রান্নাঘরে এক এক করে বানিয়ে ফেললেন ঐশীর পছন্দের পদগুলো। রজতাভ নিজের হাতে বানালেন জন্মদিনের কেক। সুজাতা বানালেন পায়েস। সব তৈরী করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে রাখতে বিকেল হয়ে গেল। সন্ধ্যেবেলা ঐশীরা ফেরার পর এই আয়োজন দেখে অবাক। ঐশী সবটা বুঝতে পেরে ওর বাপিকে জড়িয়ে ধরল। তারপর হইহই করে চারজনে মিলে কেক কেটে পালন করলেন ঐশীর জন্মদিন।

রাতেরবেলা খাবার পালা শেষ করে চারজনে বসলেন বৈঠকখানায়। রজতাভ ঐশীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ তা সারপ্রাইজ কেমন লাগল আমার মাম্মামের?”

ঐশী রজতাভর হাত জড়িয়ে ধরে বলল,“ দারুণ! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি ভুলেই গেছ আজকের দিনটা।”

- আমার মাম্মামের জন্মদিন আমি কি ভুলে যেতে পারি?

- সেজন্যেই তো তোমাকে এত্তটা ভালোবাসি। লাভ ইউ বাপি।

- লাভ ইউ টু মাম্মাম।

কিছুক্ষণ পর ঐশী বলে, “আচ্ছা বাপি প্রতিবার তো আমার জন্মদিনে মাম্মামের একটা ডাইরি পেতাম। কই এবার তো পেলাম না।”

- পাবি কি করে? তোর মাম্মামের যা ছিল সব তো গতবছরই দিয়ে দিলাম! তোর মাম্মামের আর ডাইরি নেই।

- কিন্তু তুমি তো বলেছিলে আমার জন্মের আগে পর্যন্ত মাম্মাম ডাইরি মেন্টেন করত।

- হ্যা। তা করত কিন্তু সেই শেষ ডাইরিটা তো হারিয়ে গেছে অনেকদিন হল। আমি অনেক খুঁজেও পাইনি।

- ঐ ডাইরিটা থাকলে বেশ হত। মনে হত আজকের দিনটাতেও মাম্মাম আমার সাথে আছে।

সুজাতারা দুজনের কথা শুনছেন দেখে ঐশী ব্যাপারটা খোলসা করে বলে। সবটা শুনে অভীক উঠে দাঁড়ায়। তারপর ঘরের এককোণে রাখা ব্যাগপ্যাক থেকে বের করে আনে একটা পুরোনো ডাইরি। ডাইরিটা দেখে অবাক হন রজতাভ।

- তুমি কোথা থেকে পেলে এটা?

- আপনার স্টাডিতে কয়েকটা বই বেশ ভালো লেগেছিল। ঐশীকে বলতে ঐশীই বইগুলো নিয়ে এসেছিল আপনার স্টাডি থেকে। সেই বইগুলোর সাথে ছিল ডাইরিটা। ঐশীকে তখনই জানাইনি এটার ব্যাপারে। ভেবেছিলাম পরে আপনাকে দিয়ে দেব। একদিকে ভালোই হল বলুন।

- হুম তাই তো দেখছি। তা মাম্মাম? এবার খুশি তো!

- ভীষণরকম! তবে আমার একটা আবদার আছে বাপি।

- কী আবদার শুনি?

- আজকে ডাইরিটা তুমি পড়বে।

- সেকি! মাম্মাম এটা তো তোর জন্য তোর মায়ের লেখা। সেখানে আমি পড়লে হবে কি করে? তাছাড়া অন্যের ডাইরি পড়া অসভ্যতার মধ্যে পড়ে।

- ওসব কিছু জানি না। আমি চাই তুমি ডাইরিটা পড়ো।

- মাম্মাম!

- পড়ো।

ঐশীকে কিছুক্ষণ বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করার পর অবশেষে হাল ছেড়ে দেন রজতাভ। ঐশীর সাফ কথা, ডাইরিটা রজতাভকে পড়তেই হবে। অগত্যা ডাইরিটা নিয়ে বসেন রজতাভ। কিন্তু দুপাতা ওল্টানোর পর চমকে ওঠেন তিনি। তারপর অভীকের দিকে তাকিয়ে থমথমে গলায় বলে ওঠেন, “এই ডাইরি তুমি কোথায় পেলে?”

(চলবে...)

Merry Christmas To all of you!

শনিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ চতুর্দশতম পর্ব

 



ঊর্মির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল সুজাতাও। বেশ কিছুক্ষণ ওর মুখ থেকে কথা সরছিল না। কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে পেতেই ড্রইং রূমে উপস্থিত সকলকে চমকে ঠোঁটের মাঝে আঙুল রেখে শিস দিয়ে উঠল সে। তারপর এগিয়ে গিয়ে ঊর্মিকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে চকাম করে একটা চুমু খেয়ে বলল, “ কী সুন্দর লাগছে আমার ঊর্মিরানীকে! রজতদা তো দুরস্থ আমিই চোখ ফেরাতে পারছি না। আমি ছেলে হলে আর বিবাহিত না হলে তোকে নিয়ে আজ রাতেই পালিয়ে যেতাম!” বলে নিজের চোখের কোল থেকে অল্প কাজল নিয়ে ঊর্মির কানের পেছনে চুলের গোড়ায় ছুঁইয়ে দিয়ে বলল, “আমার ঊর্মিরানীর উপর যাতে কারো নজর না লাগে, তাই টিপ দিয়ে দিলাম। 

 

বিকেল বেলার পর থেকে ঊর্মি এমনিতেই সুজাতার আয়োজন দেখার পর লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল এবার সুজাতার প্রগলভ ব্যবহারে আরো লজ্জা পেয়ে গেল সুজাতা একহাতে ঊর্মিকে জড়িয়ে রজতাভর সামনে এনে দাঁড় করিয়ে বলল, “এই নিন রজতদা! আপনার কাছে আমার প্রিয় সখীকে রেখে গেলাম এবার আপনারা একটু নিভৃতে বসে একটু প্রেম করুন ততক্ষণ আমি দেখে আসছি ওদিকে নটবরদার রান্না কতদুর এগোলো?” বলে ঊর্মিকে রজতাভর পাশে বসিয়ে সুজাতা ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে

 

রজতাভর পাশে বসে আপন মনে হেসে উঠল ঊর্মি তারপর চারদিকের সাজসজ্জার দিকে তাকিয়ে বলল, “সত্যি সুজাতাটা পারেও বটে! একবেলার মধ্যে না জানিয়ে কতকিছু আযোজন করে বসল বলো তো? এইসব বাড়াবাড়ি এখন পোষায়? আমরা কী আর সেই নবদম্পতি আছি?”

 

- করুক না! ক্ষতি কী? বান্ধবীর বিবাহবার্ষিকী পালনে আমি তো কোনো অন্যায় দেখছি না

- তা দেখবে কেন? তুমিই তো আসল নাটের গুরু! কী ভেবেছ আমি কিছু বুঝতে পারব না? আমাদের বিবাহবার্ষিকীর কথা সুজাতার তো মনে থাকার কথা নয় ওকে নির্ঘাত তুমিই বলেছ! সত্যি রজত! এখনও ছেলেমানুষি গেল না তোমার সুজাতাটা তো পাগল, তুমিও ওর সাথে মিশে পাগলামি শুরু করে দিয়েছ!

কে বলছে দেখো? বিকেলবেলা আয়োজন দেখে তো গদগদ হয়ে পড়েছিলে! এখন সেজেগুজে পটের বিবি হয়ে বসে আছো আর আমাকে পাগল বলছ? বাইরে যতই বিরক্তি দেখাও না কেন ভেতর ভেতর তুমিও যে একইরকম খুশি এটা তুমি মানতে বাধ্য! আর রইল ছেলেমানুষি শুনে রাখো ঊর্মি, দেহের বয়স যতই বাড়ুক না কেন, মনের বয়স বাড়তে দিতে নেই! মনের বয়স বাড়তে দিলে দেখবে পৃথিবীটাই পানসে হয়ে গেছে কাজেই মেজাজটাকে সবসময় শরিফ রাখার চেষ্টা করো কারন মেজাজটাই আসল রাজা!

 

রজতাভর কথা শুনে ঊর্মি প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে যাবে এমন সময় বাংলোর সব আলো ঝুপ করে নিভে যায় রজতাভ মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ বের করে বলেলোডশেডিং চুপ করে বসে থাকো অন্ধকারে উঠতে যেও না দাঁড়াও সুজাতাকে ডাকি ও আলো দিয়ে যাকবলে উঠতে গিয়ে থমকে যায় রজতাভ কারন রান্নাঘর থেকে একটা সুদৃশ্য কেক হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছে সুজাতা কেকের উপরে জ্বালানো মোমবাতির আলোয় সুজাতাকে অদ্ভুত লাগছে মোমবাতির আলোয় পায়ে পায়ে ড্রইংরুমে এসে টেবিলে কেকটা রাখে সুজাতা আর কেকটা টেবিলে রাখামাত্র ঘরের আলো জ্বলে ওঠে ওরা দেখে ড্রইংরুমে তথাগত ছাড়াও আরো অনেকে এসে দাঁড়িয়েছে ড্রাইভার রবি, সকালে পার্কে দেখা বন দপ্তরের কর্মী, অফিসার ছাড়াও আরো অনেকে আলো জ্বলে ওঠা মাত্র ওরা হই হই করে ওঠে, “সারপ্রাইজ!”  রজতাভ এবার একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়ে তথাগত এগিয়ে এসে রজতাভকে জড়িয়ে ধরে বলে, “কী ভেবেছিলে ভায়া? এই তথাগত চৌধুরী থাকতে তোমার বিবাহবার্ষিকীটা পানসে ভাবে কাটবে? কাভি নেহি! শুনে রাখো মেজর! ঊর্মি যেমন সু-এর বন্ধু, তুমিও তেমনই আমার বন্ধু! শুধু বন্ধুই নয় একদিক থেকে আমার ভাইও বটে! আর আমার ভাই হয়ে আমার এলাকায় আনন্দ করতে এসে হতোদ্যম হয়ে ফিরে যাবে এটা আমি হতে দিতে পারি না! হ্যা একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে ঠিকই, তাতে আমাদের অনুষ্ঠান বিঘ্নিত হয়েছে সেটাও ঠিক, কিন্তু পণ্ড হয়ে যায়নি! জাস্ট অনুষ্ঠানে কিছু বিলম্ব ঘটেছে মাত্র কাজেই আজকের অনুষ্ঠানটা হবেই! বাকিটা পরে বলব আপাতত দুজনে মিলে কেকটা কাটো দেখিবলে একটা ছুড়ি এগিয়ে দেয় রজতাভর দিকে রজতাভ কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর হেসে ছুড়িটা হাতে নেয় তারপর ঊর্মির সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কেকটা কাটে ড্রইংরুমে উপস্থিত সকলে একসাথে উইশ করে, “হ্যাপি অ্যানিভার্সারি টু ইউ!” 

কেক কাটার পর তথাগত সকলের সাথে রজতাভদের পরিচয় করিয়ে দেয় ফরেস্ট কনজারভেটর সাহেবের সাথে পরিচয় করা মাত্র তিনি আগে ক্ষমা চাইলেন সকালের ঘটনার জন্য

 

 - উই আর এক্সট্রিমলি সরি ফর দ্য ইনকনভিনিয়েন্স মেজর মজুমদার আসলে আজ শুধু আপনারাই নন আরো অনেক দূর থেকে আসা ট্যুরিস্টরাই ফিরে গেছে পার্ক থেকে বুঝতেই পারছেন এরকম একটা ঘটনা, তার উপর গণ্ডারের ডেডবডি দেখতে ভীড় বাড়লে ইনভেস্টিগেট করতে অসুবিধে হত তাই পার্কটাকে আজকের জন্য বন্ধ করা হয়েছে অবশ্য পাব্লিকের আর দোষ কোথায়? ডেভিড ছিলই যাকে বলে স্টার অফ দ্য নর্থান পার্ট অফ কাজিরাঙ্গা এত ফ্রেন্ডলি, এত ডিসেন্ট ছিল যে মানুষের কাছে চলে আসতো আদর পেতে সেই আদরটাই ওর কাল হয়ে দাঁড়াল দোজ বাস্টার্ডস

- ক্ষমা করবেন, ডেভিড মানে

 

- সকালে যার মৃতদেহ দেখলে সেই ডেভিড এখানে প্রত্যেকটা গণ্ডারের একটা করে কোডনেম আছে ডেভিড শুধু আমাদের পার্কের প্রিয় গণ্ডারই ছিল না আমাদের সকলের প্রিয় গণ্ডারও ছিল এখানে উপস্থিত পুরোনো যারা আছেন তাদের কাছে ডেভিড সন্তানতুল্য ছিল গোটা বন দফতর ক্ষেপে আছে যারা ডেভিডের পরিণামের জন্য দায়ী তাদের সকলকে খুঁজে বের করব আমরা

বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে তথাগত

 

ঘরের পরিবেশ ভারী হচ্ছে দেখে মৃদু হেসে কনজারভেটর সাহেব প্রসঙ্গ বদলে বলেন, “যাক গে বাদ দিন ও কথা! আমাদের প্রফেশনাল হ্যাজার্ড, বোঝেনই তো! তা এদিকে প্রথম না আগেও এসেছেন?” রজতাভরা এই প্রথম এসেছে শোনার পর কনজারভেটর সাহেব বলেন, “বেশ তা কদিন যখন আছেন এখানকার স্পেশালিটিগুলো চেক করতে ভুলবেন না চৌধুরী ওনাদের চেরাও নাচ দেখাওনি?”

 

তথাগত মাথা নেড়ে বলে, “না স্যার ইচ্ছে ছিল সকালে পার্কে প্রোগ্রামটা সেড়ে বিকেলে নিয়ে যাবো তা আর হল কই? দেখি কাল একবার ট্রাই করবরজতাভ হা করে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে তথাগত হেসে বলে, “আমাদের কাজিরাঙ্গা ন্যাশনাল পার্কের আরেকটা আকর্ষণ প্রতি সন্ধ্যেবেলা অর্কিড এন্ড বায়োডাইভার্সিটি পার্কে নাচের আসর বসে বাকিটা বলে স্পয়েলার দেব না কাল গেলে দেখতে পারবেরজতাভ হেসে বলে, “বেশ তাহলে কাল বিকেলের অপেক্ষায় রইলাম

 

রাতে অতিথিরা একে একে বিদায় নেওয়ার পর নটবর আর রবিকে খাইয়ে, ওদের বাড়ির লোকের জন্য খাবার গুছিয়ে পাঠিয়ে দিয়ে, ঘরের বাকি কাজ সেরে সুজাতা যখন নিজের ঘরে ঢুকল তখন রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। ঘরে  ঢুকে সুজাতা দেখল অন্যদিন বেশ রাত করে জেগে থাকলেও আজ তথাগত বেশ আগেই শুয়ে পড়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। সারাদিন ভীষণ খাটনি গেছে বেচারার। তার উপর সন্ধ্যের অনুষ্ঠানে না জানি কতটা ড্রিঙ্ক করেছে। ক্লান্ত, নেশাচ্ছন্ন ছিল বলেই হয়তো বেশিক্ষন জেগে থাকতে পারেনি। সুজাতা তথাগতকে জাগালো না। চুপচাপ ঘরের দরজা লাগিয়ে, বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে, সন্ধ্যের পোশাক ছেড়ে একটা নাইটি পরে নিয়ে বিছানায় বসল।

 

সারাদুপুর ঘুমোয়নি বলে মাথাটা টনটন করছে। বিছানার পাশের ড্রয়ার থেকে মাথাব্যথার ওষুধ বের করে একটা ট্যাবলেট জিভের তলায় রেখে অল্প জল খেয়ে তথাগতর দিকে পিঠ করে শুয়ে পড়ল সুজাতা। কিছুক্ষণ পর তথাগতর একটা হাত এসে পড়ল সুজাতার গায়ের উপর। সুজাতা বুঝলো তথাগত ঘুমোয়নি, ভান করে শুয়েছিল। সুজাতা পাত্তা দিল না। অন্যদিন হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু আজ সে ভীষণ ক্লান্ত। এখন তার শারীরিক সুখের চেয়েও বেশি প্রয়োজন ঘুমের। সে মুখ দিয়ে নেতিবাচক শব্দ করে, তথাগতর হাত নিজের শরীরের উপর থেকে সরিয়ে বোঝাতে চাইল আজ তার আর ইচ্ছে নেই মিলিত হবার। কিন্তু তথাগত সে নিষেধ মানলে তো? 

 

সুজাতার বারন করা সত্ত্বেও তথাগতর হাতটা ক্রমশ সচল হয়ে সুজাতার সর্বাঙ্গে বেড়াতে লাগল। প্রথমে সুজাতার ঘাড়ে, গলায়, কানের লতির পেছনে আলতো করে বিলি কাটতে লাগল তথাগতর আঙুল। তাতেও যখন কোনো লাভ হল না, তখন সে হাত সুজাতাকে কামোত্তেজ্জিত করার জন্য প্রবেশ করল সুজাতার নাইটির গলার ভেতর দিয়ে। সুজাতা বুকে সেই কঠোর হাতের নিষ্পেষণ, স্তনবৃন্তে চিমটি কাটা কিছুই বাদ গেল না। কিন্তু এর পরেও সুজাতার সাড়া না পেয়ে সেই হাত ক্রমশ নামতে সুজাতার নিতম্বে আসতেই সুজাতা আর থাকতে পারল না

 

- কি হচ্ছেটা কী? বললাম না আজকে মুড নেই!

 

সুজাতার ধমকে তথাগত কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর আবার সুজাতাকে উত্যক্ত করতে শুরু করল। সুজাতা আবার মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ করতেই তথাগত উঠে পড়ল। তারপর সুজাতাকে গায়ের জোরে সুজাতাকে ঘুরিয়ে বিছানার মাঝখানে নিয়ে এনে সুজাতার দুটো হাত চেপে সুজাতার কানে কানে ফিসফিস করে বলল, “ একদম চুপ! মুড নেই মানে কী? কীসের এত ঘ্যাম তোমার?”

 

– আজ থাক তথা। আজকে শরীরটা ভালো নেই। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।

 

- আর আমার কী হবে? আমিও তো সারাদিন পরিশ্রম করেছি! জানো না সারাদিনের পরিশ্রমের পর কী চাই আমার? এতক্ষন ধরে তোমাকে জাগিয়ে যাচ্ছি কেন বুঝতে পারছ না? আমার তোমাকে চাই।

 

- আজকে না তথা। আজ আমি ক্লান্ত।

 

- বেশ তো! তাহলে তোমাকে পরিশ্রম করতে হবে না। তুমি চুপ করে শুয়ে থাকো। আমিই আদর করছি তোমাকে।

 

- তথা প্লিজ!

 

– একদম চুপ! চুপ করে শুয়ে থাকো!

 

বলে সুজাতার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় তথাগত। প্রাণপণে শুষে নিতে থাকে সুজাতা নরম ঠোঁটের আদ্রতাকে। মদের গন্ধে গা গুলিয়ে এলেও সুজাতা নিরুপায়। তার হাতদুটো তথাগতর একটা হাতে আবদ্ধ। অপর হাত সুজাতার ঊরুসন্ধিতে নিবদ্ধ। সুজাতা যে চিৎকার করে নিষেধ করবে তারও উপায় রাখেনি তথাগত। পাগলের মতো সে চুমু খেয়ে চলেছে সুজাতাকে। সুজাতা বোঝে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তার কাছে। এই মুহূর্তে তথাগত একজন কামুক পুরুষ ছাড়া আর কেউ নয়। বার বার নিষেধ করেও তথাগত শুনবে না। বরং বাধা পেলে সে জোর করবে তাকে। তার চেয়ে তথাগতর কামতৃষ্ণা যত তাড়াতাড়ি মেটে সে চেষ্টা করাই ভালো। যত তাড়াতাড়ি তথাগতর কামতৃষ্ণা মিটবে, তত তাড়াতাড়ি নিস্তার পাবে সে। অবশেষে হাল ছেড়ে সে সাড়া দেয় তথাগতর আদরে। তথাগত সাড়া পেয়ে খুশি হয়ে সুজাতার হাত ছেড়ে নিজের মাথা নামায় ঊরুসন্ধির দিকে।

 

পরদিন বিকেলে অর্কিড এন্ড বায়োডাইভার্সিটি পার্কে পৌঁছনো মাত্র ওরা দেখে পার্কে হাল্কা লোক জড়ো হতে শুরু করেছে। তথাগত আগে থেকে বলে রেখেছিল বলে ওরা একেবারে মঞ্চের সামনে গিয়ে বসে। কিছুক্ষণ পর মঞ্চে একে একে কুশীলবরা উঠে দাঁড়ায়। ঝলমলে পোশাক, আর পালকে ওদের অনবদ্য দেখতে লাগছে। ধীরে ধীরে সুর্যাস্তের আলো দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ামাত্র মঞ্চের আলো জ্বলে উঠল। আর তার সাথেই বেজে উঠল বাজনা। মঞ্চের কুশীলবদের সাথে চারজন মাদল গোছের একটা বাজনা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা প্রথমে ঢিমে তালে তারপর দ্রুতগতিতে বাজনা বাজাতে লাগল।   

 

বাজনার তালে তালে নেচে উঠলো উপজাতির পোশাকে একঝাক সজ্জিত তরুণ তরুণী। গোটা মঞ্চ জুড়ে ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগল তারা। ক্রমশ নাচের তালের হিল্লোল ছুঁয়ে গেল উপস্থিত সকলকে। চেয়ারে বসে বাজনার তালে তালে মাটিতে পা ঠুকতে লাগল রজতাভ। মাথা দোলাতে লাগল ঊর্মিও। আশেপাশে সকলেই তখন কম বেশি বাজনার তালে সম্মোহিত। কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠান শেষ হতেই গোটা পার্কে করতালির বন্যা বয়ে গেল।

 

*****

দুপুরবেলা খাবার পালা শেষ করে ঐশী ঘরে ঢুকতেই দেখল অভীক জানলার দিকে মুখ করে বিছানায় বসে মগ্ন হয়ে কি যেন একটা পড়ছে। এবং সেটা পড়তে পড়তে এতটাই বুঁদ হয়ে আছে যে ঐশী ঘরে ঢুকলেও টের পায়নি সে। ঐশী পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল অভীকের দিকে তারপর একঝটকায় ওর সামনে থেকে জিনিসটা কেড়ে নেওয়ামাত্র চমকে উঠল। অভীক ততক্ষণে লালচে চোখে ঐশীর দিকে তাকিয়েছে। ঐশী জিনিসটা হাতে নিয়ে অভীকের দিকে তাকাল। তারপর অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় পেলি এটা?”

(চলবে...)


সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...