অনুসরণকারী

শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ তৃতীয় পর্ব






ঐশীর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে একবার ঘুমন্ত ঐশীর দিকে তাকান সুজাতা। তারপর ঐশীর বিছানায় বসে একদৃষ্টে ঐশীর দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকেন। হুবহু মায়ের মুখ পেয়েছে ঐশী। সেই নাক, সেই চোখ, সেই হাসার সময় চোখ বুঁজে ফেলা। যেন এতগুলো বছর পর উর্মিই নতুন রূপে তার সামনে এসে উপস্থিত। ঐশীকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সুজাতা। আজ বিকেলে ওদের দেখামাত্র চলে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অভীকের জন্য থেকে যেতে বাধ্য হন তিনি। তাও চেষ্টা করেছিলেন আড়ালে থাকার। কিন্তু অভীক জোর করে যখন ওনাকে ওদের সামনে নিয়ে এল তখন অভিনয় না করে পারলেন না তিনি। ভেবেছিলেন ওনাকে দেখে রজতাভ হয়তো চমকে যাবেন। হয়তো রিঅ্যাক্ট করে বসবেন। রিঅ্যাক্ট করারই কথা! কারন বহুবছর আগে তারা পরস্পরকে কথা দিয়েছিলেন জীবনে কোনোদিন তারা আর মুখোমুখি হবেন না। কিন্তু নিয়তি তাদের এইভাবে কাছে নিয়ে আসবে কে জানতো? কিন্তু রজতাভ কত সহজে সামলে নিলেন সবটা! আর্মির লোক যে! সব পরিস্থিতি সামাল দিতে ওস্তাদ!কিন্তু একটু‌ আগেও ওস্তাদের মুখোশ খুলে পড়তে যাচ্ছিল একটু হলেই। যে কারনে তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসন বেছে নিয়েছেন, যে কারনে তিনি মনে মনে নিজেকে কে ক্ষমা করতে পারেন নি। সে কারনের জন্য দায়ী রজতাভকে তিনি কি করে এত সহজে ক্ষমা করে দেবেন! ক্ষমার করার মতো অধিকার কি তার আছে?অশ্রুসজল চোখে ঐশীর দিকে তাকান সুজাতা। মেয়েটার মুখটা তার কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। যেন কেউ পুরোনো ক্ষত খুচিয়ে রক্ত বের করেছে। চোখ মুছে শুয়ে পড়েন তিনি। নাহ! আর অতীত নিয়ে ভাবলে চলবে না। একটু আগেই তো তিনি রজতাভকে বললেন, “অতীত নিয়ে ভাবার চেয়ে বর্তমান নিয়ে ভাবা উচিত। তাই ভাববেন তিনি। আর পুরোনো দিনের কথা ভেবে ক্ষতবিক্ষত হবেন না তিনি। বরং ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঐশীকে বাড়ির বউ করে এনে উর্মির কাছে মনে মনে অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করবেন তিনি। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। 

বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান রজতাভ। বড্ড গরম পড়েছে আজ।  রজতাভ চুপচাপ ব্যালকনির একপাশে রাখা চেয়ারে বসে পড়েন। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আকাশের দিকে মেঘ জমলেও বৃষ্টির নাম নেই বরং একটা গুমোটভাব চারদিকে। বোধহয় ঝড় হবে। রজতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসেন। বড্ড ক্লান্ত, নিজেকে নিংড়ে নেওয়ার মতো ব্যথাতুর এক হাসি। এই ঝড়ের চেয়েও বড় ঝড় যে তাঁর মনের ভেতর উঠেছে। বার বার তাকে আছড়ে ফেলছে বাস্তবের মাটিতে। বার বার একটাই প্রশ্ন তাঁর মনে ঘাই মারছে। কেন? কেন এতবছর পর নিয়তি তাকে সুজাতার সামনে এনে দাঁড় করালো?তবে কি আরো ভোগান্তি, আরো শাস্তি বাকি আছে তাঁর?আর কত পুড়তে হবে তাকে?

এতগুলো বছর হয়ে গেল সুজাতা আজও তাকে একইরকম ঘৃণা করেন। অন্তত সুজাতার কথায় তাই মনে হয়েছে রজতাভর। সুজাতা চাইলেও মন থেকে তাকে ক্ষমা করতে পারবেন না। ক্ষমা করা উচিতও নয়! যে কাজ তিনি করেছিলেন তা ক্ষমার অযোগ্য। একসাথে তিনজন মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলেছিলেন তিনি। ঠকিয়েছিলেন কাছের মানুষকে। তখন অল্পবয়স ছিল, ভেবেছিলেন মনের বশে করছেন এসব। প্রেম, ভালোবাসার আবেগে করছেন এসব। মন কারো কথা মানে না, কোনো যুক্তি তার কাছে টেকে না। এখন জীবনের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে রজতাভ বোঝেন তিনি কতটা ভুল ছিলেন! যেটাকে তিনি ভালোবাসা ভেবেছিলেন তা আসলে ভালোবাসা ছিল না। উর্মির সাথে সংসার করতে করতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে বাইরে বেরিয়ে তিনি মোহগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ক্রমশ সর্বনেশে খাঁদে নেমে পড়েছিলেন। সাথে নামিয়েছিলেন আরেকজনকে। দুজনের মধ্যে তফাৎ ছিল একজায়গায়। সে সংসারের প্রতি কোনোদিনও বীতশ্রদ্ধ ছিল না। বরং সে ছিল উদাসীন। তাকে পথভ্রষ্ট করে মারনখেলায় মেতে উঠেছিলেন রজতাভ। যার প্রায়শ্চিত্ত এখনও করে যাচ্ছেন তিনি। সেদিন যদি তিনি নিজের মনকে বশে আনতে পারতেন তাহলে হয়তো আজ এতটা আত্মশ্লাঘায় ভুগতে হত না তাকে। একটু আগে সুজাতা যে কথাটা বললেন, ঠিক সেই কথাটাই মৃত্যুশয্যায় উর্মি বলেছিল। আজও মনে পড়ে তার সেই অভিশপ্ত দিনটার কথা। উর্মি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময় বলেছিলেন, “ তুমি মানুষটা ভীষণ ভয়ংকর রজতাভ! সাপের চেয়েও ভয়ংকর! তোমাকে ভালোবাসা যায়, জড়িয়ে ধরা যায়, কান্না পেলে কাঁধে মাথা রেখে কাঁদা‌ যায় কিন্তু বিশ্বাস? না! আর তোমায় বিশ্বাস করা যায় না! আর বাকি রইল ক্ষমা! তার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারন বাঘ যখন রক্তের স্বাদ একবার পায় তাকে শিকার করা থেকে আটকানো অসম্ভব! আজ যদি তোমায় ক্ষমা করি তাহলে তুমি আবার একই ভুল করবে! ও নয় তো অন্য কেউ হবে তোমার শিকার। আর তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবো না কেন জানো? তুমি জেনেশুনে একটা নিস্পাপ মেয়েকে পাপে জড়িয়েছ! তাকে পাঁকে‌ নামিয়ে পাপ করতে বাধ্য করেছ! ওকে কথার জালে বিবশ করে ভোগ করেছ! তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনে গেছি রজতাভ! আমার দুঃখ কোথায় জানো? সে বেচারি নিজেকে দোষী ভেবে দুরে সরে গেছে। যদি আমার শক্তি থাকতো তাহলে ওকে খুঁজে বের করে জড়িয়ে ধরে বলতাম, “তোর কোনো দোষ নেই!তুই নিজেকে শাস্তি দিস না!শাস্তি তো ওর প্রাপ্য!” বলে তোমার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতাম। কিন্তু আমার কপাল দেখো! তোমার সন্তানকে গর্ভে ধারন করার জন্য মরতে বসেছি। তোমার বিষাক্ত স্পর্শে আমার আয়ু কমে গেছে! এই মুহূর্তে তোমাকে দেখে আমার গা গুলোচ্ছে রজতাভ মজুমদার! বমি পাচ্ছে! নেহাত আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানকে দেখার কেউ নেই বলে তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। কিন্তু খবরদার রজতাভ! তোমার এই সুন্দর সুপুরুষ মুখের পেছনে যে কুৎসিত, নোংরা, ঘৃণ্য পরজীবী মুখটা আছে সেটার আভাস যাতে আমার মেয়ে না পায়!আর জেনে রাখো তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করবো না!আমার মৃত্যুর পর তুমি আমার মৃতদেহকে স্পর্শ করবে না!”

পাপ! পাপই বটে! সেদিন তিনি আবেগের বশে যেটা করেছিলেন, যেটাকে তিনি মুক্তির বাতাস খোঁজার প্রচেষ্টা ভেবেছিলেন, যেটাকে তিনি নিজেকে বাঁচতে দেওয়ার সুযোগ ভেবেছিলেন আজ এতবছর পর সেই কাজটা তার কাছে পাপই বটে! যে পাপের সাজা ভোগ করছেন তিনি।  ভাবতে ভাবতে সিগারেটে টান দিয়ে চোখ বোজেন রজতাভ। একমুহূর্তের জন্য সেইদিনগুলো সিনেমার রিলের মতো হাজির হয় তার মনে। চোখ বুঁজে সেদিনের কথা মনে করতে থাকেন তিনি।

*****

কাল দুপুরে সৈকত থেকে ফেরার পর কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল জানে না সুজাতা। হঠাৎ ভীষণ শীত লাগায় ঘুমটা ভাঙল তার। ঘুম ভাঙার পর‌ চারদিকে তাকিয়ে সে অবাক হলেও কিছুক্ষণ লাগল তার ধাতস্থ হতে। কিছুক্ষণ পর বিছানায় উঠে বসল সে। পাশে তাকিয়ে দেখল তথাগত উবু হয়ে শুয়ে আছে। পরনে একটা সুতো পর্যন্ত নেই। একই অবস্থা সুজাতারও। সম্পুর্ণ বিবস্ত্র হয়ে সে বিছানার উপর বসে আছে। গায়ের উপর চাপা দেওয়া কম্বলটা উঠে বসায় কোলের উপর পড়ে গেছে। খোলা জানলা দিয়ে সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস হুহু করে ঢুকে পড়ছে ঘরে যার ফলে তার ঠান্ডা লাগছে।‌ প্রাথমিক‌ বিহ্বলতা কাটিয়ে কোনোমতে কোলের উপর রাখা কম্বলটা দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিজের লজ্জা নিবারণ করে সুজাতা নামে খাট থেকে। তারপর বাথরুমে গিয়ে কম্বলটা ছুঁড়ে ফেলে খাটে। 

কিছুক্ষণ পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে ব্যাগ থেকে একটা নাইটি বের করে পরে নেয় সে। তারপর একটা‌ চাদর‌ বের করে কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে টেবিলে রাখা হাতঘড়িতে তাকিয়ে দেখে ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজে। তারমানে একটু পরেই তো সুর্যোদয় হবে! তাড়াতাড়ি  রুমের ব্যালকনিতে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসে সুজাতা। তাকিয়ে‌‌ দেখে পুর্বদিকের আকাশ ইতিমধ্যেই লালচে‌ হয়ে‌ গেছে।

কিছুক্ষণ পর দিগন্তের পার থেকে প্রায় সমুদ্রের মাঝখান থেকে উঠলেন সুর্যদেব। সমুদ্রের জলে লাল হয়ে প্রতিফলিত হয়ে দেখা দিতে লাগল সুর্যের প্রতিবিম্ব। সুজাতার ‌মনে হল যেন সদ্য সমুদ্রে‌ স্নান করে উঠলেন সুর্য। তার সারাদিনের তেজরাশিপুঞ্জ‌ ক্রমশ সমুদ্রের জলে ধুয়ে মিশে গেল। এরকম একটা নৈসর্গিক দৃশ্যের সাথে সমুদ্রের মৃদু হাওয়ায় চোখের সাথে সাথে শরীরেও বেশ আরাম বোধ হল সুজাতার। মনে হতে লাগল তার জ্বর, শরীর খারাপ এই হাওয়া আর সুর্যের আলোয় ক্রমশ দুর হয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতর থেকে তথাগতর গলা পেল সে, “ ভেতরে চলে এসো! ঠান্ডা লাগবে।”

সুজাতা কথাটা শুনেও চুপ করে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতর থেকে বারামুডা পরে বেরিয়ে আসে তথাগত। সুজাতার পাশে দাড়িয়ে চুপ করে দেখে প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্যটাকে। তারপর সুজাতার কাঁধে হাত দিয়ে তথাগত বলে, “সানরাইজ দেখা শেষ? চলো ভেতরে চলো। বেশিক্ষণ এখানে থাকলে আবার জ্বর আসতে পারে। ভেতরে গিয়ে আরেকটু ঘুমিয়ে নাও। তারপর আজ দুপুরের দিকে আমরা ফিরে যাব।”

সুজাতা চট করে তাকায় তথাগতর দিকে, “অ্যা! সেকি! এই তো এলাম আমরা! এই এরকম করো না প্লিজ! আর কটা দিন থাকি না!”

-“আর একটা দিনও নয়! প্রথমদিনেই যে খেল তুমি দেখালে তারপর আর তোমাকে এখানে রাখতে ইচ্ছে করছে না আমার। আমরা আজই ফিরে যাব!”

-“প্লিজ তথাগত! এরকম করো না! আচ্ছা এখন তো জ্বর নেই আমার! এখন ঠিক আছি আমি।”

-“ঐ কারনেই তো নিশ্চিন্ত হয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত‌‌ নিয়েছি আমি। কাল সারারাত কতটা চিন্তায় কেটেছে তুমি ভাবতে পারবে না। সারারাত জেগে একটু পর পর জল পট্টি দিয়েছি। জ্বরের ঘোরে তুমি বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছো তখন আমি বার বার চেক করছি তোমার জ্বর। শেষে বাধ্য হয়ে নিজের দেহ দিয়ে তোমার দেহের তাপকে শুষে নেওয়ার জন্য ওভাবে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লাম। আমার জন্যই এই দশা তোমার। আমি কালকে জোর করে যদি তোমাকে স্নান না করাতাম তাহলে হয়তো... না! না! আর আমি কোনো রিস্ক নিতে পারবো না! আমরা আজই ফিরে যাবো!” বলে করুণ মুখে সুজাতার দিকে তাকায় তথাগত। সুজাতা দেখে তথাগত চোখের কোণে জল জমেছে।

-“প্লিজ তথাগত!” বলে কাতর চোখে তাকায় সুজাতা। 

-“তোমার কথায় আর ভুলছি না আমি। এখানে তোমার কিছু হয়ে গেলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না আমি।” বলে সুজাতার থেকে চোখ ফিরিয়ে উদীত সুর্যের দিকে তাকায় তথাগত। সুজাতা তথাগতর দিকে তাকিয়ে ওর একটা আঙুল নিজের হাতে নেয়। তথাগত পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে সুজাতা ছলছলে চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

-“কিছু হবে না আমার। তুমি যখন সাথে আছো তখন কিছুই হবে না আমার।” 

-“কিন্তু সু!”

-“কোনো কিন্তু নয়! কালকে যেটা হল সেটাতে তোমার কোনো দোষ ছিল না। হ্যাঁ জোর করেছিলে তুমি। কিন্তু আমি চাইলে তোমাকে বাধা দিতে পারতাম। ইচ্ছে করেই দিই নি। কারন আমি জানতাম, আমার কোনো বারণ তুমি শুনবে না। তাই ইচ্ছে করেই তোমার সাথে সমুদ্রে নেমেছিলাম আমি। ভেবেছিলাম আমি অসুস্থ হলে তুমি বিরক্ত হবে। অন্তত কাল আমার জ্বর শোনার পর তোমার ব্যবহারে আমার তাই মনে হয়েছিল।”

-“আর এখন কী মনে হচ্ছে?”

-“ মানুষটা তুমি জেদী হলেও মন্দ নও। আমার কিছু হলে প্রাণপণে আমাকে রক্ষা করতে পিছু হটো না। প্রচণ্ড ভালোবাসো আমায় আর...!”

-“আর?” 

দুষ্টুমিভরা চোখে তথাগতর দিকে তাকায় সুজাতা,“ আর মানুষটা জংলী হলেও বেশ খাটি তুমি। বর্বর নও।”

তথাগত নতজানু হয়ে সুজাতার হাতটা ঠোঁটের কাছে চেপে ধরে তারপর ধরা গলায় বলে, “বিশ্বাস করো! কাল তোমার অবস্থা দেখে যতটা ভয় আমি পেয়েছি ততটা ভয় কোনোদিনও পাই নি। বারবার মনে হচ্ছিল এই বুঝি তোমাকে হারিয়ে ফেলব। আমি কথা দিচ্ছি, আর কোনোদিন তোমাকে জোর করবো না। তুমি প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না।” বলতে বলতে সুজাতার কোলে মাথা রাখে তথাগত।

সুজাতা তথাগতর মাথায় হাত রাখে। ঘন কোঁকড়ানো একঢাল চুলে আঙুল বুলিয়ে বলে, “কালরাতে কিছু খেয়েছ?”

তথাগত মাথা নাড়ে। সুজাতা তথাগতর চুলে আঙুল বোলাতে বোলাতে ফিসফিস করে বলে, “চলো ব্রাশ করে কিছু খেয়ে নেবে। আমিও খাবো। কাল সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি দুজনের।”

তথাগত মাথা তুলে তাকায় সুজাতার দিকে। তারপর বলে, “তাই তো! কাল সারাদিন কিছুই খাওনি। এরপর কিছু না খেলে তো দুর্বলবোধ করবে। খিদে পেয়েছে না খুব?”

সুজাতা ফিক করে হেসে বলে “প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে আমার। শুধু পেটে নয় তলপেটেও।” 

আচমকা একথা শুনে চমকে যায় তথাগত। তারপর হেসে সুজাতাকে কোলে তুলে নেয় সে। সুজাতা হেসে বলে, “আরে লেগে যাবে তো! ছাড়ো আমাকে! জংলী একটা!”

তথাগত হেসে বলে, “চুপ! খাবার সময় কথা বলতে নেই।”

সুজাতা কিছু বলার আগেই ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট গুজে চুমু খেতে খেতে ঘরে প্রবেশ করে তথাগত। ততক্ষণে সুর্যদেব সমুদ্রস্নান সেরে তার যাত্রায় বেরিয়ে পড়েছেন।

*****
অবশেষে তথাগত রাজি হয়েছে থেকে যাবার জন্য। তারপর দুদিন কেটে গেছে। এই দুদিনে সুজাতাও অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু তথাগত এখনও ক্রমাগত একজন গার্জেনের মতো খেয়াল রেখে চলেছে। ঠান্ডা জল, আইসক্রিম খেতে দিচ্ছে না সুজাতাকে। সুজাতা হাজার ছলছলে চোখে তাকালেও পাত্তা দিচ্ছে না সে। রাতের দিকে ব্যালকনিতে বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখার সময় চাদর দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে সুজাতাকে। ভুল করেও আর সমুদ্রে স্নান করতে দিচ্ছে না ওকে। 

এই দুদিনে একটু একটু করে চারপাশ ঘুরে নিচ্ছে তারা। দেখে নিচ্ছে দর্শনীয় জায়গাগুলো। তেমনই আজ এসেছিল মোহনা দেখতে। জায়গাটা বেশ ভালো। একপাশে সমুদ্রের শান্ত ঢেউ অপরদিকে উত্তাল করা নদীর উচ্ছাস। মাঝে পাথরের চাই ফেলে দুটো জায়গাকে ভাগ করা হয়েছে। সমুদ্র দেখে সুজাতার আনন্দ দেখে কে? বাচ্চা মেয়েদের মতো দৌড়ে দৌড়ে সমুদ্রের পাড়ে ছুটে যাচ্ছে। তথাগতর হাজার তর্জন-গর্জনকেও পাত্তা দিচ্ছে না সে। তথাগত বকা দিতে দিতে অবশেষে‌ ক্লান্ত‌ হয়ে হাল ছেড়ে বসে পড়েছে সমুদ্রের পাড়ে বালির উপর। সুজাতার ছেলে মানুষী দেখে আনমনে হাসছে সে। 

“আপনারা কি এখানে আগেও এসেছেন নাকি?”

কন্ঠস্বর শুনে পেছন ফিরে তাকাল তথাগত। একজন ভদ্রমহিলা তার পিছনে বসে আছেন। মহিলাকে চেনে সে। আজ সকালেই আলাপ হয়েছে। এরাও হানিমুন কাপল। ভদ্রলোক আর্মিতে চাকরি করেন। এরই মধ্যে ভদ্রমহিলার সাথে সুজাতার বেশ ভাব হয়ে গেছে। তথাগত হেসে বলল , “না এই প্রথমবার! আপনারা?"

-“এই নিয়ে দুবার । আমার পছন্দ ছিল পাহাড়, কিন্তু আমার কত্তাটির আবার সমুদ্র পছন্দ। তাই বাধ্য হয়ে আবার আসতে হল!"

-“আমার গিন্নিরও তাই। কত করে বললাম, 'সমুদ্রে দেখার কী আছে? সেই একনাগাড়ে ঢেউ আসছে আর আসছে। আর হাওয়া বইছে। তার চেয়ে পাহাড়ে চলো। বেশ নিরিবিলি জায়গা। ঠান্ডা, মনোরম পরিবেশ। প্রকৃতির মাঝে, প্রকৃতির কোলে কয়েকদিন কাটিয়ে আসি। তা না ম্যাডাম গাল ফুলিয়ে আবদার করলেন আর আসতে হলো। আর এসেও তো শান্তি নেই। ম্যাডাম দুদিন জ্বরে কাবু হয়ে রইলেন।"

-“ওমা সেকি! সুজাতার জ্বর হয়েছে আমাকে বলেনি তো?” বলে একটু উদ্বিগ্ন হলেন ভদ্রমহিলা। 

হাসতে হাসতে সুজাতা ওদের পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

-“হয়েছিল! পাস্ট টেন্স! এখন নেই। কিন্তু তুই এখানে এসে আমাকে চমকে দিবি জানলে আগে থেকে ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে নিতাম।”

-“না না এটা ভালো কথা নয়! সেই কলেজ থেকে দেখে আসছি তোর ভীষণ ঠান্ডার ধাঁচ অথচ কোনো পিকনিক বা এক্সপিডিশনে গেলে একেবারে জানলার ধারে বসবি। এরকম ছেলেমানুষি কবে যাবে তোর?” বলে মহিলা  জড়িয়ে ধরলেন সুজাতাকে।

-“কোনোদিনও না!” বলে খিলখিল করে হেসে ফেলল সুজাতা।

(চলবে)

বৃহস্পতিবার, ১২ আগস্ট, ২০২১

রূপে তোমায় ভোলাব না



“I'm in love with the shape of you/

We push and pull like a magnet do/

Although my heart is falling too/

I'm in love with your body” 

ফোনের শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি তোয়ালে জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল উত্তরা। বিছানা থেকে ফোনটা তুলে দেখল স্ক্রিন জুড়ে জ্বলজ্বল করছে “Calling Parag” ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে একটা মোলায়েম অথচ গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এল, “ওকে আমি রাজি। কবে দেখা করবে?”

 
কথাটা শোনামাত্র উত্তরার মুখে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে হেসে বলল, “কাল বিকেল ছটায়। অ্যাক্রোপলিস মলের স্টারবাকস এর আউটলেটে।”

- “ অ্যা! না না আমি অতো বড়োলোক ছেলে নই। এক কাজ করো নন্দনে চলে এসো। সেখান থেকে কাছে পিঠে যাওয়া যাবে।”

- “বেশ কিন্তু বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারবো না কিন্তু বলে দিলাম!”

- “ওকে! ডান।”

- “তোমাকে চিনবো কি করে? ওয়েট এক কাজ করো। কাল তুমি নীল রংয়ের টিশার্ট পরে আসবে।”

- “বেশ। যো হুকুম রাণীসাহেবার। আর তুমি?”

- “আমি? কোরাল ব্লু রংয়ের কুর্তি পরবো।”

- “কোনটা? যেটা পরে একটু আগে রিল ছেড়েছ সেটা?”

- “ও! বাবুর সেটা দেখাও হয়ে গেছে? তা কেমন লাগলো?”

- “মন্দ নয়! তবে অ্যাবসের উপর একটু ফোকাস করতে হবে। ফ্লন্ট করতে গিয়ে হাল্কা Chubby লেগেছে।”

- “সেম পিঞ্চ! আর বলো না। কদিন ধরে ভাবছি ডায়েট করবো। ওয়েট পুট অন হচ্ছে।‌ মাকে বলেছি দুপুরে রাইস খাবো না কিন্তু মা শুনলে তো!রোজ নানারকমের টেস্টি খাবার করবে। আর আমিও হ্যাংলার মতো গিলে ফেলি।”

- “মায়েরা ওরকমই হয়। মায়ের হাতের খাবার খেলে ডায়েট মনে থাকে না। যাকগে কাল ছটাতেই তো?”

- “হ্যা।”

- “ওকে বেবি! সি ইউ দেয়ার!”

- “ওকে।”

বলে কলটা কেটে ফোনটা বিছানায় রেখে বাথরুমে ঢোকে উত্তরা। সম্পুর্ণ নগ্ন হয়ে শাওয়ারের সামনে দাঁড়ায়। প্রাণভরে উপভোগ করে সর্বাঙ্গে আছড়ে পড়া প্রতিটা জলবিন্দুকে। চুলে শ্যাম্পু দিতে দিতে মনে করতে থাকে বিগত কয়েকবছর আগের ঘটনাগুলো। তখন সবে কলেজ পাশ করেছে সে। কলেজ ফেস্টে ফ্যাশন শোতে ওকে দেখে পছন্দ করেছেন বেশ কয়েকজন অ্যাডের ডিরেক্টর। কলেজের আগেই কয়েকটা ম্যাগাজিনে, ফ্লেক্সে মুখ দেখানো হয়ে গেছে তার। মেয়ের সাফল্যে বাবা খুশি হলেও মা শুরু থেকেই মেয়ের এই কাজে নারাজ। অবশেষে নিমরাজি হয়ে বলেছেন “যা খুশি করো কিন্তু অশালীন পোশাক পরে ছবি তোলা যাবে না। আর বিয়ে হলে ওসব বন্ধ করবে।” অগত্যা নিরুপায় হয়ে বোল্ড, সুইমওয়্যার শুট করা যাবে না এরকম টার্ম নিয়ে মডেলিং জগতে ঢুকতে হয়েছে। এ নিয়ে ফোটোগ্রাফারদের সাথে একটু বাদানুবাদ হলেও সে রাজি হয় নি। তবে অশালীন পোশাকের দরকার পড়ে নি। শুধুমাত্র দৃষ্টির মাদকতা আর একগাল মিষ্টি হাসিতেই মেয়ে বাজিমাত করে দিয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকে অনুরাগীদের ভীড় টেনে এনেছে ওই হাসি আর অভিব্যক্তিতে ভরা মুখ। সারাদিন মেসেঞ্জার, ডি.এমে উপচে পড়ছে নানারকমের প্রশস্তিবাক্য। 

এরকমই একদিন দুপুরবেলা টিকটকের একটা ভিডিও ইনস্টাগ্রামে পোষ্ট করে শুয়ে শুয়ে ফেসবুক ঘাটছিল উত্তরা। আচমকা একটা পোষ্টে চোখ আটকে গেল তার। একটা লেকের ধারে একটা পাটাতনে একটা প্রেমিকযুগল পিঠ করে বসে আছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে অস্তগামী সুর্য ধীরে ধীরে লেকের জল স্পর্শ করেছে। সুর্যের আলোয় দুজনের দীর্ঘছায়া পড়েছে পাটাতনের উপর। একটা নৈস্বর্গিক দৃশ্য। অন্যদিন হলে লাইক করে উত্তরা স্ক্রল করতো পরের পোষ্টে। কিন্তু ওর চোখ আটকে গেল ক্যাপশনে। ক্যাপশনে একটা বেশ মিষ্টি প্রেমের গল্প লেখা। স্কুলবেলায় গল্পের বইয়ের পোকা ছিল সে। একটু আধটু লেখালেখিও করেছে স্কুল ম্যাগাজিনে। কয়েকটা লাইন পরেই সে বুঝতে পারল লেখার বাঁধুনি বেশ পোক্ত। সে বুঁদ হয়ে লেখাটা পড়তে লাগল। কিন্তু লেখাতে ডোবার আগেই লেখাটা শেষ হয়ে গেল। গল্পের শেষে বায়োতে ক্লিক করে বাকি লেখা পড়তে বলেছেন গল্পকার। তড়িঘড়ি পোষ্টদাতার প্রোফাইলে গেল সে। আর গিয়েই আরেকপ্রস্থ অবাক হল সে। পোষ্টদাতা লেখকও তার অনুগামীদের মধ্যে পড়েন। বন্ধুত্বের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন ইনিও। 

রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট না করে বায়ো পড়তে লাগল সে। কয়েকটা তথ্যের মাঝে পেয়ে গেল ব্লগের লিঙ্কটা। সেখানে ক্লিক করে ঢুকে পড়লো পোষ্টদাতার ওয়েবসাইটে। তারপর খুঁজে খুঁজে গল্পটা পেয়ে পড়তে লাগল। লেখকের সব লেখা পড়ে উত্তরা যখন ব্লগ থেকে বেরোল ততক্ষণে দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে। ফেসবুকের প্রোফাইলের দিকে আরেকবার তাকালো সে। মুঠোফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে বাংলা হরফে লেখা নামটা, ‘পরাগরেণু দত্তগুপ্ত’। প্রোফাইল পিকে একটা চিনার পাতার ছবি। কভারে শান্তিনিকেতনের একটা নৈসর্গিক দৃশ্য। সাতপাঁচ না ভেবে রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করে উত্তরা। মেসেঞ্জারে গিয়ে মেসেজ করে, “ আপনার গল্পগুলো পড়লাম। দারুন লাগল।” বেশ কিছুক্ষণ পর ওপার থেকে একটা উত্তর আসে, “ধন্যবাদ!” তারপর অফলাইন হয়ে যায় পরাগ।

এই ব্যবহারে একটু হলেও অবাক হয় উত্তরা। অন্য কেউ হলে আহ্লাদে ডগমগ হয়ে মেসেজের বন্যা বইয়ে দিত। অথচ এই ছেলেটা শুধু একটা শুকনো ধন্যবাদ দিয়ে চুপ হয়ে গেল! অ্যাটিটিউড দেখাচ্ছে! এত সাহস! উত্তরা সিংহরায়কে অ্যাটিটিউড! বেশ থাকুক লেখকমশাই ওর ঔদ্ধত্য নিয়ে। ঐ তো ফলোয়ারের ছিরি। ওর থেকে বেশি ফলোয়ার ওর একটা পোষ্টে ঝাঁপায়। অভিমানে পরাগকে ব্লক করে ফোন বন্ধ করে উত্তরা। 

কিন্তু বইপোকাদের একটা বড়ো দুর্বলতা হল ভালো গল্প। পৃথিবীতে একজন বইপ্রেমী যতই লেখকের প্রতি খাপ্পা হন না কেন, লেখকের লেখা যদি মনোগ্রাহী হয় তাহলে সেই লেখার টানে তিনি লেখকের লেখা পড়তে বাধ্য। উত্তরার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হল না। পড়বে না পড়বে না করেও সে ঠিক আবার চলে গেল পরাগের ব্লগে। আবারও একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে কমেন্টবক্সে গেল সে। তবে এবার পরাগের তরফ থেকে কাষ্ঠ জবাব পেল না সে। বরং পেল একটা মিষ্টি করে ক্ষমাপ্রার্থনার মেসেজ। সেই শুরু, তারপর কেটে গেছে প্রায় পাঁচবছর। এর মধ্যে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। মডেলিং এর সাথে সাথে দু-একটা ওয়েব সিরিজ, সিরিয়ালে মুখ দেখানো হয়ে গেছে উত্তরার। অনুগামীদের সংখ্যা বেড়ে হাজার থেকে লাখে দাঁড়িয়েছে। টিকটক ব্যান হবার পর ইনস্টাগ্রামে ভীড় বেড়েছে ভীষণ। ওদিকে পরাগের অনুগামীরাও বেড়েছে অল্প অল্প করে। যদিও এর পেছনে উত্তরার অবদান অপরিসীম। সে ক্রমশ প্রমোট করেছে পরাগের ব্লগটাকে। পেজ বানাতে, পেজ চালাতে সাহায্য করেছে। ক্রমাগত তাগাদা দিয়ে গেছে নতুন নতুন গল্পের জন্য। 

এতকিছু করতে করতে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে অনেক। মেসেঞ্জার থেকে হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে ফোনে কথা বলেছে দুজনে। কিন্তু একটা জিনিস একই থেকে গেছে। পরাগের আড়ালে থাকা। এই ক’বছরে কাছে এলেও পরাগকে ঠিক কেমন দেখতে তা জানে না উত্তরা। মানে কন্ঠস্বর জানলেও পরাগকে স্বচক্ষে দেখে নি উত্তরা। হোয়াটসঅ্যাপে কতবার ছবি দিতে বলেছে সে। চেষ্টা করেছে ভিডিও কল করার কিন্তু কিছুতেই পরাগের চেহারা দেখতে পারে নি সে। পরাগের একটাই কথা, “চেহারা দেখে কী হবে? মানুষের পরিচয় তার কর্মে, তার রচনায়।” 

এক আধবার উত্তরার মনে হয়েছে এই পরাগ বলে ছেলেটা সত্যিই আছে তো? নাকি কোনো ফেক আইডি? ক্রমশ ঝগড়া বাদানুবাদের পর উত্তরা ঠিক করেছে পরাগ যদি ওর সামনে না আসে তাহলে সে আর কোনো দিন কোনোরকম সম্পর্ক রাখবে না সে। পরাগকে সে কথা জানিয়ে সব জায়গায় ব্লক করেছে সে। তার পরিপ্রেক্ষিতে আজকে পরাগের ফোন।

মাথায় শ্যাম্পু দিতে দিতে ভাবতে থাকে উত্তরা। পরাগকে কেমন দেখতে? নিশ্চয়ই ভীষণ হ্যান্ডসাম, বা ভীষণ কিউট দেখতে! হতেই পারে! ফোনে ওরকম সেক্সি ভয়েসের অধিকারী মানুষ হ্যান্ডসাম হাঙ্ক না হয়ে যেতে পারেই না! কল্পনায় পরাগের সাথে কালকে দেখা করার দৃশ্য কল্পনা করে শাওয়ারের জলে ভিজতে থাকে উত্তরা।

*****

নন্দন চত্ত্বরে উত্তরা যখন পৌঁছল তখন বিকেল পৌনে ছটা বাজে। চারদিকে তাকিয়ে দেখল সে। নন্দনে এই বিকেলেই বেশ ভীড়। চারদিকে প্রেমিকযুগল বসে আড্ডা দিচ্ছে, কোথাও কোথাও কয়েকদল ছেলে মেয়ে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু এত জনের মধ্যে পরাগ কে? কোথায় ও? ভাবতে ভাবতে ফোন বের করে পরাগকে কল করল সে। আর ওকে চমকে প্রায় ওর কানের কাছে বেঁজে উঠলো অরিজিত সিংহের সুললিত কন্ঠের গান, “জো তুম না হো…” চমকে গিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই এক প্রকার ধাক্কা খেল সে। 


ধাক্কাই বটে! কারণ ওর সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে। ছেলে বললেও আকারে বেশ একটা পাহাড়ের মতো ছেলেটা। বেশ নাদুসনুদুস গোলগাল দেখতে ছেলেটা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। উত্তরা ছেলেটা পাত্তা না দিয়ে ফোনে মনোযোগ দিতে যাচ্ছিল কিন্তু এমন সময় ছেলেটার কথায় সে সোজা তাকালো। ছেলেটা এক গাল হেসে বলল, “বাসবদত্তা আমি এসে গেছি!” কন্ঠস্বরটা, নামটা উত্তরার ভীষণ চেনা। পরাগের নতুন গল্পের নায়িকার নাম বাসবদত্তা। ইদানিং ওকে সেই নামেই সম্বোধন করে পরাগ। তারমানে এই হোঁতকা মোটা ছেলেটা পরাগ? উত্তরা ভালো করে তাকাল ছেলেটার দিকে। ছেলেটার পরনে নীল রঙের টি শার্ট আর ওভার সাইজড জিন্স। এই পোশাকই তো পরে আসতে বলেছিল সে! ছেলেটা এক পা এগিয়ে এসে বলল, “চিনতে পারো নি? আমি পরাগ!” কন্ঠস্বরটা শোনা মাত্র সম্বিত ফিরল উত্তরার। এ যে কেঁচো খুড়তে কেউটে বেরোল! সে স্বপ্ন দেখেছিল একটা হ্যান্ডসাম ছেলের সাথে ডেটের। কিন্তু এ যে একটা মোটকা নাড়ুগোপাল। ছেলেটাকে দেখে কেন যানে না ভীষণ হাসি পেয়ে গেল উত্তরার। সে হেসে ফেলল। নিজের ভাগ্যের জন্য, নিজের বোকামোর জন্য। ইস নির্ঘাত পরাগের কীর্তি এটা! নির্ঘাত প্র্যাঙ্ক করছে। নাহলে কোনো দুঃস্বপ্ন এটা। ভাবতে ভাবতে সে হেসে বলল, “বুঝতে পেরেছি! এটা নির্ঘাত পরাগের প্ল্যান তাই না? তা ও কোথায়? ধরতে পারলে মজা দেখা দেখাব ওকে।” কিন্তু ছেলেটা ওকে চমকে দিয়ে হেসে ফেলল। 

ছেলেটাকে পাল্টা হো হো করে হাসতে দেখে হাসি বন্ধ হয়ে গেল উত্তরার। হাসি থামিয়ে হা করে সে তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে। আশেপাশের লোকজন ওদের দিকে তাকাচ্ছে। হাসির চোটে ছেলেটার থলথলে শরীরটা বারবার কেঁপে উঠছে। কিছুক্ষণ হাসার পর ছেলেটা নিজেকে থামিয়ে বলল, “মাপ করো। আসলে আমার এই একটা মুদ্রাদোষ। কাউকে হাসতে দেখলে নিজেকে আর সামলে থাকতে পারিনা। ফিক করে হেসে ফেলি। তাছাড়া হাসার সময় তোমার মুখটা এতোটাই মজার হয়ে উঠেছিল যে নিজেকে সামলাতে পারিনি। সরি।”

ভ্রুটা কুঁচকে গেল উত্তরার। এ কি পাগল টাগল নাকি? কাউকে হাসতে দেখলে হাসি পেয়ে যায়? তাও আবার সামান্য হাসি নয় একেবারে অট্টহাস্য! কোনোরকমে নিজেকে সামলে যতটা পারে সিরিয়াস মুখ করে উত্তরা বলে , “তাহলে কাজের কথায় আসা যাক!”
ছেলেটা সোজা হয়ে বসল তারপর বলল, “ আগে কোথাও বসি চলো। তার পর শুনবো তোমার কী জানার আছে? এসো।”


ইচ্ছে না থাকলেও একপ্রকার বাধ্য হয়েই ছেলেটার পেছন পেছন হাটতে লাগল উত্তরা। কাছেই ছেলেটার বাইক পার্ক করা ছিল। ছেলেটা সেটা বের করে এনে স্টার্ট করল। উত্তরা বাইকের পেছনের সিটে বসতেই ছেলেটা বাইক চালিয়ে দিল। কিছুদুর গিয়ে একটা রেস্তরাঁর সামনে ছেলেটা বাইক দাঁড় করাতেই নেমে পড়ল উত্তরা। দুজনে মিলে ঢুকলো রেস্তরাঁতে।


বেশ ছিমছাম, পরিপাটি রেস্তরাঁর ভেতরটা। আশেপাশের টেবিলে বেশ কয়েকজন বসে আছে। ভীড় হলেও তেমন শব্দ নেই। রেস্তরাঁতে বোধহয় ছেলেটার আগে থেকেই বুকিং করা ছিল। ওরা ঢোকামাত্র ওয়েটার এগিয়ে এল ওদের দিকে। তারপর নির্দিষ্ট টেবিলে বসিয়ে অর্ডারের অপেক্ষা করতে লাগল। ছেলেটা বোধহয় আগেও এসেছে এখানে। ওয়েটার জিজ্ঞেস করা মাত্র নিজের জন্য একপ্লেট ফ্রাই মোমো অর্ডার করল। উত্তরা শুধুমাত্র এককাপ কফি নিল। ওয়েটার চলে যেতেই ছেলেটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল,““তুমি শুধু কফিই খাবে? এখানকার হাক্কা নুডলসটাও দারুণ খেতে।”


উত্তরা মাথা নেড়ে বলে, “বাড়ি থেকে স্ন্যাকস খেয়েই বেড়িয়েছি। তাছাড়া কদিন ডায়েট চলছে। আমি কফিই খাবো।”

-“বেশ! তা এবার বলো। তোমার কী কী জানার আছে।”

-“তোমার নাম তো পরাগ। অন্তত আমি তাই জানি। ভালোনামটা...”

-“ অসীমাভ দত্তগুপ্ত।”

-“অসী...হোয়াট?”

-“অসীমাভ। নামটা শুনে মনে হয় না যে কোনো বুড়ো, বা জেঠু টাইপের লোকের নাম অথবা বাবা-কাকা টাইপের লোক? বিশ্বাস করো নামটা এতটাই ব্যাকডেটেড যে অফিশিয়াল কাজে বার বার বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে আমায়। তাই ফেসবুকে আমার ডাকনামটার সাথে মায়ের নামটা যোগ করে রেখেছি। আচ্ছা সত্যি করে বলো তো, তুমি সিরিয়াসলি ভেবেছিলে না যে আমি ফেক আইডি নিয়ে তোমার সাথে মজা করেছি বা তোমার সাথে কোনো নোংরা প্র্যাঙ্ক করা হয়েছে? কি তাই তো? জানতাম! অবশ্য এক্ষেত্রে তোমার কোনো দোষ নেই। কারন এর আগে অন্তত জনা পাঁচেক মহিলাও আমার আইডি দেখে ডেটে এসে বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে তাই ভেবেছিলেন। তারপর আমার বিরাট বপু এবং রাক্ষুসে চেহারা দেখে, বাস্তবের সম্মুখীন হয়ে কেউ মানে মানে কেটে পড়েছেন, কেউ বা ভিরমি খেয়েছেন, কেউ আবার মিটিং সেরে পরে না বলেছেন, কেউ আবার ঠকিয়েছি বলে আমাকে দেখে নেবেন বলে শাঁসিয়েছেন। ঠিক এই কারণেই আমি দেখা করতে চাই নি। কারণ বাস্তবের আমি আর ফেসবুকের আমির মধ্যে বিস্তর ফারাক। আমি চাই নি আমাদের বন্ধুত্বটা এইভাবে শেষ হোক তাই...। তবে এই নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই জানো? কারণ বাস্তবটাকে আমি মেনে নিয়েছি। এটাই আমি। বাস্তবের পরাগ দত্তগুপ্ত।‌‌” বলে ছেলেটা মলিন হাসি হাসে।

একটু বিব্রত হয়ে পড়ে উত্তরা। সত্যিকথা বলতে গেলে খানিকক্ষণ আগেও সে তাই ভাবছিল ঠিকই। কিন্তু এতটাও রুড ভাবে ভেবে দেখেনি। সে হাল্কা হেসে বলে, “না মানে আমি সেটা মিন করে বলতে চাই নি। আমি যেটা বলতে চাইছি তোমার ডাকনামের চেয়ে আসল নামটা বেশী ইউনিক। বেশ খটোমটোও বটে।”

-“ধন্যবাদ! তবে এর পেছনে আমার স্বর্গত ঠাকুমার অবদান অনস্বীকার্য। আসলে আমার দুই দাদার নামের সাথে মিল রাখতে গিয়ে বোধহয় তিনিও জানতেন না যে ভবিষ্যতে তার ছোটো নাতিকে নামবিম্ভ্রাটে পড়তে হবে। স্কুল-কলেজেও অসীমাভ নামটা অ্যাসিমভ থেকে অ্যাসি হয়ে গিয়েছিল। বলতে পারো কলেজে এই নামেই আমি ডিপার্টমেন্টে প্রসিদ্ধ ছিলাম। ভাগ্যিস আমার মা আমার ডাকনামটা রেখেছিলেন। নাহলে কী যে হতো?”

-“এ নামের মানে কী?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেটা বলে, “মানেটা একটু উদ্ভট। যে আলো বা আভা মাত্রাহীন। এবার তুমি বলবে আলো তো সীমাহীনই হয়। আমিও তাই জানি। কিন্তু ঠাকুমা কেন যে এই নামটা রেখেছিলেন সেটা উনিই বলতে পারতেন। কিন্তু দশবছর হলো তিনি স্বর্গে সেটল করে গেছেন অগত্যা এই রহস্যটাও তার সাথে চলে গেছে।”

উত্তরা আরো কিছু বলার আগে ওয়েটার অর্ডার নিয়ে টেবিলের সামনে হাজির হয়। ধোঁয়া ওঠা ফ্রাই মোমোর প্লেট, আর কফির কাপ নামিয়ে চলে যায়। অসীমাভ ওরফে পরাগ বলে, “তুমি শিওর আর কিছু খাবে না?”

উত্তরা মাথা নেড়ে কফির কাপে চুমুক দেয়। পরাগ শ্রাগ করে মোমো খেতে থাকে। উত্তরা কফি খেতে খেতে দেখতে থাকে পরাগের খাওয়া। কফিতে চুমুক দিয়ে বলে, “এই রেস্তরাঁর স্টাফেরা তোমার চেনা মনে হয়। যেভাবে খাতির যত্ন হচ্ছে।”

-“চেনা তো বটেই। আফটার অল আমাদেরই তো রেস্তরাঁটা ।”

এবার কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খায় উত্তরা। এতটা চমক সে আশা করে নি। সত্যিকথা বলতে গেলে এতদিন পরাগের লেখা নিয়েই কথা হয়েছে ওদের মধ্যে। এর বাইরে পরাগ নিজের ব্যাপারে না কিছু বলেছে, না ও জানতে চেয়েছে। জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে পরাগ মোমো খেতে খেতে বলে, “আমাদের তিন ভাইয়ের মিলিত ব্যবসা এই রেণুকণা’স কিচেন। বড়দা, আর মেজদাই মেন ব্যবসা সামলায়। আমার শেয়ার থাকলেও আমি লেখালেখিতেই ব্যস্ত। যদিও বাবা চান আমিও ব্যবসায় নামি। দাদাদের হেল্প করি। কিন্তু আমার এই হিসেবনিকেশের ঝামেলা ভালো লাগে না।”

উত্তরা জল খেয়ে চুপচাপ বসে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, “আন্টি মানে তোমার মা...”

-“মা এসব ব্যাপারে কুল। সত্যি কথা বলতে গেলে মা-ই আমাকে রক্ষা করে আসছে এসব থেকে। বাড়িতে সর্বময়কর্ত্রী আমার মা। বাড়িতে মায়ের কথাই শেষ কথা।”

বলে খাওয়া শেষ করে ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পরাগ। তারপর বলে, “তাই বলে আমি যে একেবারে অকম্মার ঢেকি, বা ওয়ার্থলেস স্পয়েল্ড মামাস বয় এমনটা নয়। রেস্তরাঁটার ইন্টিরিওর আমারই ডিজাইন করা। তারপর ওয়েটারদের পোশাক, রাঁধুনিদের হাইজিন সবটাই আমার মাথা থেকে বেরিয়েছে।”

এবার অবাক হয় উত্তরা। ছেলেটা কি থটরিডিং জানে নাকি? একটু আগেই মনে মনে ওকে মাকালফল ভাবতে যাচ্ছিল। খাবার শেষ করার পর ওয়েটার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “আর কিছু লাগবে স্যার?” পরাগ‌ মাথা নেড়ে বলে, “না ম্যাডামকে জিজ্ঞেস কর। উনি তো কফি ছাড়া আর কিছুই খেলেন না।”

উত্তরা মাথা নাড়ে। পরাগ হেসে বলে ,“তাহলে বিলটা নিয়ে এস নিতাইদা।” নিতাই মাথা নেড়ে চলে যেতেই পরাগ বলে, “এটাও আমারই বানানো নিয়ম। নাথিং ইজ ফ্রি। তুমি যতই রেস্তরাঁর মালিক হও না কেন এটা তোমার বাবার হোটেল নয় যে ফ্রিতে খেয়ে যাবে। বিজনেস বিজনেসের জায়গায়, ফ্যামিলি ফ্যামিলির জায়গায়।‌ আর এটা আমার রেস্তরাঁ হলেও এখন আমি এই রেস্তরাঁয় মালিক হয়ে নই বরং একজন কাস্টোমার হিসেবে এসেছি। কাজেই বিলটা কম্পালসারি।” বলতে বলতে নিতাই বিলবুকটা নিয়ে হাজির হয়। দুজনের বিল মিটিয়ে পরাগ বলে, “তাহলে এবার ওঠা যাক?” উত্তরা মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ছেলেটাকে যত বোকা মনে হয়েছিল তত নয়। বেশ চালাক চতুর। ব্যবসায়িক বুদ্ধিও আছে। মনে মনে উত্তরা বলে, “ইন্টারেস্টিং!”

রেস্তরাঁ থেকে‌‌ বেরিয়ে পরাগ বাইকটা স্টার্ট করে। উত্তরা পেছনে বসতেই পরাগ বলে, “এবার কোথায় যাবে?”

উত্তরা জবাব দিচ্ছে না দেখে পরাগ বোঝে পরপর দুটো ধাক্কা সামলাতে পারে নি মেয়েটা। সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া বিল মিটিয়ে আসার সময় কয়েকজন কাস্টোমার উত্তরাকে চিনে ফেলায় সেলফির আবদার মেটাতে হয় যার জন্য পরাগ নিজেও বিব্রত। এখানে এরকম হবে সে মাথাতেও আনে নি। সঙ্গী যদি পাবলিক সেলিব্রেটি হয় তাহলে বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। যাক গে! এখন এমন জায়গায় যেতে হবে যেখানে উত্তরার মন ঠিক হয়ে যায়। ভাবতে ভাবতে সে নিজেই ঠিক করে নেয় কোথায় যাবে। এমন একটা জায়গা যেখানে গেলে উত্তরার মন ফ্রি হবেই। সেই ভাবনা মতো বাইক চালায় সে।


নন্দন চত্ত্বরে ওরা যখন পৌঁছল ততক্ষণে অন্ধকার না হলেও দিনের আলো প্রায় মরে এসেছে। বাইরের দোকানগুলোতে পর্যটকদের ভীড় বাড়ছে। দেখে শুনে এক‌জায়গায় বসে ওরা দুজনে। উত্তরা চুপ করে বসে থাকে। সত্যি কথা বলতে ওর সব কিছু গুলিয়ে গেছে। সকালে যে কার মুখ দেখে উঠেছিল কে জানে? ছেলেটাকে দেখে যতটা কবিগোছের মনে হয়েছিল ততটাও নয়। বেশ বাস্তববোধ সম্পন্ন মনে হচ্ছে। কিন্তু এই ছেলেটাই যে পরাগ এটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না সে। ছেলেটাকে আরেকটু পরখ করে দেখা দরকার। আরেকটু বাজিয়ে দেখা দরকার। কাজেই চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয় তার। 

যেখানে ওরা বসেছিল সেখান থেকে কিছুটা দুরে একটা প্রেমিকজুটি খুনশুটিতে ব্যস্ত। আরেকদিকে কতগুলো ছেলেমেয়ে আড্ডা দিচ্ছে। উত্তরা সেদিকে তাকায়। উত্তরার দৃষ্টি অনুসরণ করে ওদের দিকে তাকিয়ে হাল্কা হাসে পরাগ। তারপর বলে, “মনে আছে? একবার তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে এই যে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে এত প্রেম, বন্ধুত্বর গল্পের অনুপ্রেরণা আমি কোথা থেকে পাই? এই যে সামনে ভীড়টা দেখছ এদের থেকে। ঐ যে দুরে দুজন প্রেম করছে ওদের পোশাক দেখে বোঝা যায় ওরা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে-মেয়ে। সদ্য কলেজে উঠেছে হয়তো। প্রথম প্রেমের স্বাদ পেয়েছে। বাস্তবে পাঁচ বছর পর যখন ছেলেটা চাকরির পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হবে, মেয়েটার সম্বন্ধ দেখতে একের পর এক পাত্র আসবে তখন এই প্রেমটা থাকবে না। কি তাইতো? সাধারণ যে কেউ তাই ভাববে। কিন্তু আমি মানুষটা এত নেগেটিভ নই। তাই এতটা ভাবতে পারি না। তাছাড়া আগামীকাল, পরের মুহূর্ত কে ই বা দেখেছে? আমার চোখে ধরা পড়ছে এখনকার মুহূর্তটা। সেটাকেই বন্দি করি শব্দে আর সেটা থেকেই পজেটিভ উপসংহার খুঁজি। যেমনটা করছে ঐ ছেলেমেয়ের দল। এদের কারো বাড়ি মফঃস্বলে, কারো হয়তো অনেক দুরে। এতদিন পর এতটা পথ পার করে এসেছে পরস্পরের সাথে দেখা করতে। কে জানে? হয়তো ভবিষ্যতে আর কোনোদিন দেখা নাও হতে পারে। তাই বিদায়বেলায় শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে পরস্পরকে। জড়িয়ে ধরছে শক্ত করে। মুঠোফোনে বন্দি করছে মুহূর্তটাকে। জীবনের কোনো ভরসা নেই। কখন কোন খাতে প্রবাহিত হবে কেউ জানে না। জীবনটা আমাদের হলেও এর পরিবর্তন আমাদের হাতেও নেই। যা আছে এই মুহূর্তটুকু। সেটাকেই বন্দি করে রেখে সারাজীবন বয়ে চলতে পারি আমরা।”

-“কিন্তু কিছু মুহূর্ত আছে যা প্রথমে মধুর মনে হলেও পরে কাঁটায় পরিণত হয়।” উত্তরা তাকায় পরাগের দিকে। সুযোগ বুঝে মোক্ষম কথাটা তোলে সে। এই কথার উত্তরেই প্রমাণিত হবে ছেলেটা সত্যিই পরাগ কিনা। কারণ পরাগ মুহূর্তগুলো ধরতে ভালোবাসলেও এই কন্টক মুহূর্তের কনসেপ্টটা পুরোপুরি মানে না।

উত্তরার কথায় হেসে‌ পরাগ বলে, “সেটা ঠিক। তবে এর জন্য দায়ী থাকি আমরাই। আমরা মানুষ চিনতে ভুল করি। মানুষের মনের পরিচয় না নিয়েই তার সাথে থাকতে শুরু করি। মুহূর্তগুলো বন্দি করতে শুরু করি। পরে যখন ভুল বুঝতে পারি ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে যায়। তখন এই মুহূর্ত গুলো বিষে পরিণত হয়। তবে একদিকে এটা ভালো জানো যে আমরা মানুষের মনের তল বুঝতে পারিনা। পৃথিবীতে সকলের যদি মন বোঝার ক্ষমতা থাকত তাহলে মানুষের চেয়ে হিংস্র, নোংরা, নির্লজ্জ আর নিম্নমানের জীব আর দুটো থাকতো না। বিশেষ করে মানুষের মানুষের প্রতি বিশ্বাস, নারী-পুরুষের মুখোশ খুলে যেত। নারীরা পুরুষকে বিশ্বাস করে আর ঠকতো না। প্রকৃত পুরুষের নারীর সন্ধান হতো না। প্রেমে ব্যর্থতা থাকতো না। মানুষ ঠকতো না। শঠ, জোচ্চরদের টেকা দায় হত। সেটা যাতে না হয় তাই ঈশ্বর মানুষকে এ ক্ষমতা দেন নি। থাকলে দেখতে পেতে কেউই সুখী নয়।”

-“এরকম মুখোশধারী মানুষের সাথে দেখা হয়েছে তোমার?” অস্ফুটে আরেকটা মোক্ষম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে উত্তরা। আগের উত্তরটা একেবারে বুলসআইতে মেরেছে ছেলেটা। পরাগও তাই ভাবে। তারমানে এই কি?

-“বহুবার! এতবার ঠকেছি যে বিশ্বাস করতেও ভয় লাগে। এই কারণেই নিজেকে লোকসমাজের থেকে লুকিয়ে নিয়েছি। যাতে কেউ আর ঠকাতে না পারে। ঠাকুমাকে বেশি ভালোবাসতাম একদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখলাম ঠকিয়ে চলে গেল। প্রিয় মানুষটাকে না জানিয়েই ভালোবেসে গেলাম। ঠকিয়ে চলে গেল অন্যজনের সাথে। এত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছি যে মানুষকে আর বিশ্বাস করতে পারি না। ভয় হয় আবার যদি ঠকে যাই। এই ভয় তাড়াতেই লেখা নিয়ে মেতেছিলাম কিন্তু বোধহয় আর হবে না।”

-“কেন?” বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস‌ করে উত্তরা। আর কোনো সন্দেহ নেই।‌ এই ছেলেটাই পরাগ! এবার সে রিলেট করতে পারছে কেন পরাগের গল্পে প্রেম থাকলেও এত যন্ত্রণার প্রচ্ছন্ন ছাপ থাকে। 
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরাগ বলে, “আমরা যারা স্রষ্টা তাদের মাঝে মাঝে একটা রোগ হয় জানো? সৃজনশীলতা হারাবার রোগ, ফুরিয়ে যাবার রোগ। ধরো একটা প্লট মাথায় এল সেটা নিয়ে বসলে তুমি খাতা পেন নিয়ে। কিন্তু কিছুতেই আর লেখা আসছে না। মানে লেখা আসলেও গল্পটা দাঁড়াচ্ছে না। নাহলে মাথা খালি হয়ে যাচ্ছে।”

-“জানি। ওটাকে রাইটার্স ব্লক বলে।” নিভে যাওয়া গলায় বলে উত্তরা।

-“ঠিক তাই! আমি এখন রাইটার্স ব্লকে আক্রান্ত। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমার লেখা ফুরিয়ে গেছে, লেখা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আই অ্যাম ফিনিশড। এই যে প্রত্যেকটা পর্বে রিডার্সরা জিজ্ঞেস করে ‘তারপর?’ , ‘নেক্সট’ সত্যি কথা বলতে জবাব দিতে পারি না আমি কারণ আমি নিজেই জানি না পরে কী হতে চলেছে। জানি একটু অড লাগছে শুনতে কিন্তু এটাই সত্যি! যে আমি রাতের পর রাত জেগে লিখেছি, ‘অভিসার’, ‘দোস্তি ডট কম’ এর মতো গল্প। সেই আমিই রাতের পর রাত জেগে থাকি লেখা ভাবার জন্য। কতগুলো রাত ঘুমোই নি জানো? মাঝে মাঝে মনে হয় পাগল হয়ে যাব। মনে হয় সব যখন ফুরিয়েছে তখন নিজেকে রেখে লাভ কী? কিন্তু পারি না কেন জানো? মায়ের জন্য। আমার মৃতদেহ দেখার পর মায়ের মুখটা ঠিক কেমন দেখতে লাগবে সেটা কল্পনা করেই পিছিয়ে আসি।”


উত্তরা চুপ করে দেখে পরাগকে। ঠিক একের পর এক অডিশনে বাতিল হয়ে, আপোষহীন শর্তে একাধিক মডেলিংয়ের প্রোজেক্ট হাতছাড়া হবার পর কর্মহীনতায় সেও যে একই রকম অবসাদে ভুগছে। তেমনভাবে দেখতে গেলে ও আর পরাগ ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। তফাৎ শুধু এক জায়গায় পরাগ আত্মহত্যা করতে গিয়েও ফিরে এসেছে। আর সে দুবার মরতে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে। আর এই ফিরে আসাটা পরাগের লেখার কারণেই! এই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, কর্মহীন হওয়ার যন্ত্রণা সে বোঝে। নাহ আর কোনো সন্দেহ নেই। ওর মনের সব সন্দেহ দুর হয়ে গেছে। এই ছেলেটাই পরাগ। ওর প্রিয় লেখক! যার লেখা পড়ে ও বাঁচার মানে খুঁজে পেয়েছে। প্রথম দেখাতে মনে হচ্ছিল তার সে বোধহয় মানুষ চিনতে ঠকে গেছে। পরাগ ওকে ঠকিয়েছে। কিন্তু এখন ওর এই হতাশায় ভরা কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে যেন ওরই কথা নিজের জবানিতে বলছে পরাগ।‌ বাইরে থেকে দেখলে দুজনকেই ভীষণ সুখী মনে হবে। একজন নামী মডেল, রোজ যার প্রোফাইলে উপচে পড়ে অনুরাগীদের ভীড়। বিবাহ প্রস্তাব আসে সব সময় ইনবক্স জুড়ে। ইন্ডাস্ট্রিতে ওর এই আপোষহীন শর্তের জন্য অনেকে গর্বিত, অনেকে খুশি কারণ মডেল মানেই যা খুশি পরে ছবি তুললাম যাতে সেটা ফ্যাশন হয়ে যায় এই মিথটা ভেঙেছে ও। আরেক দিকে পরাগ, বড়লোক বাড়ির আদুরে ছোটোছেলে। মায়ের প্রিয়। অঢেল টাকা, প্রতিশ্রুতিমান লেখক। পরিবারের এত সাপোর্ট, কি নেই ওদের কাছে? অথচ দুজনে ভেতর ভেতর কতটা একা। কতটা দুঃখী। ছেলেটাকে সে ঠকবাজ ভেবেছিল প্রথম দেখাতে । এখন মনে হচ্ছে এই ছেলেটা যেন তারই প্রতিবিম্ব। তারই দোসর। এমন ছেলেকেই তো তার চাই! যে তাকে বুঝবে, জানবে। বন্ধুর মতো পাশে থাকবে। নাহ সে ঠকে যায় নি। আর দেরী করা চলবে না। যা বলার জন্য এতদিন প্ল্যান করে এসেছিল ভাবতে ভাবতে সেই কথাটাই উত্তরা বলে ফেলে, “জীবন যদি আবার সুযোগ দেয় কাউকে বিশ্বাস করতে তাহলে‌ কী তুমি আরেকবার বিশ্বাস করবে? শেষবারের মতো?”

পরাগ উত্তরার দিকে তাকায়। উত্তরা বলে, “যদি এবার সত্যিই প্রকৃত প্রেম তোমার জীবনে আসে পারবে তাকে ধরে রাখতে?”

পরাগ হেসে বলে,“নাহ! অতো সাহস আমার নেই। আর আমি নিজেকে ঠকাতে চাইনা।”

-“এই শেষবারের মতো বিশ্বাস করেই দেখ না! কে জানে এইবার আর ঠকলে না।”

-“আর যদি ঠকে যাই?”

-“তাহলে জানবে পৃথিবীতে প্রেম মিথ্যে, ভালোবাসা মিথ্যে, যে ভালোবাসার গল্প লেখ তুমি সেটা একটা অলীক কল্পনা।”

-“এই যাত্রা ঠকবো না বলছ?”

-“বলছি তো ঠকবে না।”

-“কিন্তু...!”

-“আমরা দুজনেই বাইরে থেকে আলাদা হলেও ভেতর থেকে এক পরাগ। একা, নিঃস্ব। যেমন তুমি লেখার জন্য সারারাত জেগেছ। আমিও জেগে হাউহাউ করে কেঁদে খোঁজ করেছি একটা হাতের জন্য। নিজের আপোষহীন শর্তের জন্য কাজ হারিয়ে একটু একটু করে ভেঙে গিয়ে তলিয়ে গেছি অবসাদে। লোকে দেখেছে ম্যাগাজিনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার হাসিটাকে। কিন্তু কেউ আমার চোখের উদাসীনতাকে, কষ্টকে খেয়াল করে নি। বাইরে লোক তো দুর আমার নিজের বাবা-মাই আমার‌ মনের খোঁজ রাখে নি।‌ সত্যি কথা বলতে আমার কাঁদার জন্য কাঁধ চাই না পরাগ। শুধু একটা হাত চাই। ভরসার, ভালোবাসার।‌ আমি যখন ক্লান্ত হব তখন সে হাত আমাকে শক্তি জোগাবে। যখন ভেঙে পড়ব তখন ভরসা দেবে।‌‌ এই ভীড়ের মাঝে আমরা মিশে থাকলেও সম্পুর্ণ একা আমরা। তবে আমি বিশ্বাস করি দুজন একা মানুষ যখন একসাথে পথ চলতে শুরু করে তখন তারা একা থাকে না। এবার বলো আমার সেই ভরসার হাত হবে? একসাথে পাশাপাশি পথে হাটবে? কথা দিচ্ছি এবার ঠকবে না।”

-“এতদিন যারা এসেছিল তারাও একই কথা বলেছিল বাসবদত্তা। কিন্তু তারপর? সকলই গরল ভৈল। বাস্তবটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলেছে ওদের জন্য আমি পারফেক্ট নই।” বলে মাথা নত করে কান্না সামলে অভিমানের সুরে বলে‌ পরাগ।

পরাগের একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে উত্তরা বলে, “আমরা কেউই পারফেক্ট নই পরাগ। আমাদের সকলের মধ্যেই কিছু না কিছু ইমপারফেকশন আছে। তবে ভগবান সেটাকে পুষিয়ে দিয়েছেন আমাদের আরেক গুনকে সুন্দর করে সাঁজিয়ে। ঈশ্বর তোমাকে এই বিরাট দেহর সাথে দিয়েছেন একটা আবেগপ্রবণ, কল্পনাশ্রয়ী, সৃষ্টিশীল মন। তোমার রাগ, দুঃখ, কষ্ট তোমাকে প্রেরণা জোগায়, তোমাকে তাগিদ দেয় লেখার। তাই তুমি লেখ। তোমার সুন্দর মন বলে তোমার সৃষ্টিও সুন্দর হয়। এই যে ময়ুর যার জগৎজোড়া খ্যাতি পেখম মেলা নাচের জন্য, ঝলমলে রঙের জন্য কিন্তু বাস্তবে ময়ুরের পেখম বাদ দিলে কি থাকবে বলো তো? না গাইতে পারে, না ভালো উড়তে পারে। এই যে আমি, তোমার মতে আমি নাকি অসামান্যা সুন্দরী। তোমার প্রতিটা গল্পের নায়িকা চরিত্র নাকি আমাকে ভেবে লেখা। বাস্তবে যদি এতটাই সুন্দর হতাম তাহলে এত স্ট্রাগল করতে হত না। কাজেই তুমি সুন্দর নও এই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে তুমি যেমন তাতেই খুশি থাকো। স্বার্থপর পৃথিবীতে নিজেকে নিয়ে খুশি থাকাটা ম্যাটার করে পরাগ। আর এটাই আমরা করি না। আর রইল বাকিদের কথা সত্যি কথা বলতে মানুষের দৈহিক সৌন্দর্য আমার কাছে তেমন ম্যাটার করে না। তবে তোমার কন্ঠস্বর শুনে তোমাকে সুপুরুষ ভেবেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে তোমাকে যখন দেখলাম মনে হল একটু হলেও তুমি আমাকে ঠকিয়েছ। আমি তোমার দৈহিক গঠনের জন্য রাগ করিনি পরাগ। রাগ করেছি এই প্রবঞ্চনার জন্য। আর এখন...!”

“আর এখন?” বলে পরাগ তাকায় উত্তরার দিকে। উত্তরা পরাগের চোখে চোখ রেখে বলে, “এখন দেখলাম ঠিক ঠকে যাইনি। তোমার এই বিশাল দেহের ভেতরে যে বিশাল মনটা আছে সেটা কাউকে ইচ্ছে করে ঠকায় নি। সে আড়ালে থাকতে চেয়েছে। কিন্তু যখনই তাকে দেখার জন্য আমরা উঠে পড়ে লেগেছি, ততবার ঠকে গেছি। এই জগতে একটু খুঁজলেই ভালো মানুষ পাওয়া যায় পরাগ। কিন্তু ভালো মনের বন্ধু পাওয়া অসম্ভব। তোমার মধ্যে আমি সেই ভালো মনের বন্ধুকে পেয়েছি কাজেই হারাতে চাইছি না। এবার বলো বন্ধু হবে তো?”

পরাগ অশ্রুসজল চোখে শক্ত করে ধরে রাখে উত্তরার হাতটাকে। অনুভব করে উত্তরার মনের উত্তাপটাকে। উত্তরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর নাক শিটকে বলে, “তবে খুশি থাকা মানে এই নয় যে এতটা ফ্যাট নিয়ে খুশি থাকবে। এতটা ফ্যাট থাকাটা মোটেই ভালো নয়। ভবিষ্যতে নানান কম্প্লিকেশন আসতে পারে। কাজেই কালকেই তুমি আমার সাথে জিমে যাবে। আর এই সব তেলাক্ত আনহাইজেনিক ফুড ছাড়বে।”

কথাটা সোনা মাত্র আঁতকে ওঠে পরাগ,“ইরিক! মানেটা কী?”

-“মানেটা খুবই সহজ! কাল থেকে তোমার জাঙ্কফুড খাওয়া বন্ধ!”

-“এহ! বললেই হল! আমি খাবোই! দেখি কে আটকায়!”

-“বটে! আমিও দেখব তুমি কি করে খাও।”


বলে দুজনে ঝগড়া করতে করতে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাটতে হাটতে এগিয়ে যায় সামনের দিকে।


*******

বাড়িতে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে অনলাইন হতেই টুং করে মেসেজ ঢোকে উত্তরার ফোনে। সে দেখে পরাগের মেসেজ, “বাড়ি পৌঁছে গেছ?”


উত্তরা চটজলদি টাইপ করে “হুম। একদম বাড়ির সামনে ক্যাবটা দাঁড়িয়েছিল।”


-“আজকের দিনটা সত্যিই দারুণ কাটলো বলো?”

-“সে আর বলতে! এক কাজ করবে? আজকে যে ছবিগুলো তুললাম সেগুলো একটু সেন্ড করবে?”
কিছুক্ষণ পর কয়েকটা ছবি এসে ঢোকে উত্তরার ফোনে। সেগুলো দেখে মেসেজ করে উত্তরা, “তাহলে কাল জিমে দেখা হচ্ছে?”

ওপাশ থেকে পরাগের মেসেজ আসে “রক্ষে করো মা!” সাথে একটা হাতজোড় করা ইমোজি। মেসেজটা দেখে ফিক করে হেসে উত্তরা টাইপ করে, “ওভাবে আমি ভুলছি না। কাল তোমাকে আমি জিমে ভর্তি করাবোই। দুমাসের মধ্যে ফিট না করিয়েছি তো আমার নামও উত্তরা সিংহরায় নয়।”

মেসেজটা পড়ে হাল্কা হাসে পরাগ। তারপর ফোনের নেট অফ করে চুপ করে গ্যালারী থেকে একটা ছবি বের করে বসে থাকে। উত্তরা সব ছবি পাঠাতে বললেও এই একটা ছবি সে পাঠায় নি। একান্ত গোপন করে রেখেছে। ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর একটা হাসি ফুটে ওঠে ওর মুখে। এসেছে! এসেছে! অবশেষে‌ এসেছে! ভাবতে ভাবতে ল্যাপটপটা খুলে বসে। এতদিনে একটা নতুন প্লট এসেছে মাথায়। ওয়ার্ড ফাইল খুলে ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করে সে। ক্রমশ‌ লেখায় বুঁদ হয়ে যায় পরাগ।

উত্তরা দেখে মেসেজটা সিন করে অফলাইন হয়ে গেছে পরাগ। বোঝে অবশেষে নির্ঘাত নতুন কোনো লেখার প্লট পেয়ে গেছে ছেলেটা। লিখুক গে! আর ওকে বিরক্ত করবে না সে। ভাবতে ভাবতে ফোনের সেটিংসে গিয়ে ফোনের রিংটোনটা বদলে একটা চিরনতুন রবীন্দ্র সংগীত রাখে উত্তরা।‌ শুধুমাত্র একজনের জন্য। রিংটোনটা বদলে নিয়ে ফোনে হেডফোন লাগিয়ে গানটা শুনতে থাকে সে। হেডফোনের মাধ্যমে তার মগজের প্রতিটা কোষে ছড়িয়ে পড়তে থাকে একটাই কথা, “আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না।”





 

বুধবার, ১১ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ দ্বিতীয় পর্ব


অভীক হোস্টেলের রুমমেটকে জানিয়ে দিল সে আজ রাতে হোস্টেলে ফিরছে না। রুমমেট যেন তার খাবার না বানায়। চারজনে মিলে রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে গেলেন বিধান মার্কেটের দিকে। দিনের শেষে দেখা গেল ঐশীর সাথে সুজাতার ভাব বেশ গাঢ় হয়েছে। রজতাভ অবাক হয়ে দেখলেন একবেলার মধ্যে মেয়েটার পুরো ভোল বদলে গেছে। যে মেয়ে কোনোদিনও নিজের জন্য গয়না কেনে নি। জন্মদিন বা পুজোর সময় তাঁর আবদার রাখতে চেন, কখনো নেকলেস গলায় দিত,সেই মেয়ে ফুটপাথের এক দোকান থেকে একটা ঝুমকো পছন্দ করে কিনল! তাও আবার সুজাতাকে দেখিয়ে! যে মেয়ে বছরে একআধবার চোখে কাজল দেয়, সেই মেয়ে কসমেটিক্সের দোকানে গিয়ে সুজাতাদেবীর পরামর্শে একগাদা কসমেটিক্স কিনল! বিল পেমেন্ট করার সময় তিনি সুজাতাদেবীর কথা শুনতে পাচ্ছিলেন, “মেয়েদের ওরকম শ্রীহীন মুখ করে থাকতে নেই! মাঝে মাঝে অল্পসল্প সাজতে হয়। কাউকে দেখানোর বা কোনো অকেশনের জন্য নয়! নিজের জন্য, মনের খুশির জন্য! বুঝেছ মেয়ে? এমনিতে তোমাকে হাল্কা মেকাপে মানালেও মাঝে মাঝে নিজের জন্য সাজতে ক্ষতি কী? কেউ তো দেখছে না! নিজেকে একবার সাজিয়েই দেখ না, দেখবে নিজেকে নতুনভাবে আবিস্কার করেছ। নিজেকে আবিস্কার করার, সাজানোর আলাদা মজা আছে। মন খারাপ?সকাল থেকে মেজাজ খিঁচড়ে আছে?আয়নার সামনে বসে হাল্কা করে সেজে নাও। দেখবে মনখারাপ উবে গেছে। নিজেকে সাজতে দেখে মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। তোমার বাপি, অভি এমন কী পৃথিবীর কোনো পুরুষ এই আনন্দটা উপলব্ধি করতে পারেনা বলেই বোঝে না আমরা সেজে কী আনন্দ পাই? তাছাড়া এগুলো তোমার দরকার। রোদে, ধুলোয় ঘুরে ঘুরে চেহারার বারোটা বাজিয়েছ। গালে ব্রণ দেখা দিয়েছে,চোখের কোণে কালো দাগ। ঠোট ফেটে গেছে। সত্যি করে বলবে! নিজের স্কিনের যত্ন নাও না তাই না?অভি এগুলো দেখতে পায় না? ওর তো উচিত এসব কিনে দেওয়া।”


অভীক গলা নামিয়ে বলেছিল, “হুম কিনে দিই আর ও ক্যাৎ করে একটা লাথি মেরে দিক।” সুজাতা হেসে বলেছিলেন, “বেশ করে!তোর দম আমার জানা আছে! জানো ঐশী আমার বাড়ি থেকে বাজার বেশী নয় এই মিনিট দুয়েকের পথ। তো একবার বাবুকে পাঠিয়েছি সয়াবিনের বড়ি আনতে। ও কী এনেছিল জানো? এত বড়ো একটা সয়াসসের বোতল!” বলে মুচকি হেসেছিলেন সুজাতাদেবী। ঐশী‌ মুখ ভেটকে বলেছিল, “সাধে বলি? ক্যালাস! পুরো ক্যালাস!”

মার্কেট থেকে কেনাকাটা করে, ফুটপাথের স্টলে স্টিম মোমো খেয়ে রজতাভর বাড়িতে যখন ওরা পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যে গড়িয়ে প্রায় রাত হয়ে গেছে। রাতের খাবার নিয়ে বেশী ঝক্কি পোয়াতে হল না রজতাভকে। ফ্রিজে ম্যারিনেট করা চিকেন ছিল সেটাকেই রান্না করা হল। ঐশী চটপট করে আটা মেখে রুটি তৈরী করে নিল। সুজাতাদেবী সাহায্য করার জন্য রান্নাঘরে যেতে চাইতেই বাবা-মেয়ে রে রে করে উঠল। রজতাভ সুজাতার পথ আগলে বললেন,“আপনি না আমাদের অতিথি? অতিথিকে দিয়ে কেউ কাজ করায়?অতিথি নারায়ণ বলে কথা! পাপ লাগবে তো!”

-“কিন্তু তাই বলে এভাবে বসে থাকাটাও তো দৃষ্টিকটু! খামোখা একজন অচেনা আগন্তুকের মতো হুট করে এসে আপনাদের ঝামেলা বাড়িয়ে দিলাম। আমার জন্য‌ আপনাদের শুধু শুধু হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হচ্ছে এটা দেখার পরেও শুধু বসে থাকবো নাকি?”

-“ হ্যাঁ বসে থাকবেন! আর আপনার কথার উত্তরে বলতে পারি আপনি অচেনা আগন্তুক নন। চেনা লোক!আর ঝামেলার কিছু নেই! আপনি না এলেও আমাদের হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হত। ও নিয়ে ভাববেন না। আমাদের বাপ-বেটির অভ্যেস আছে। ”

-“কিন্তু রজতাভ! এতগুলো লোকের রান্না!”

-“কোথায় এত লোক? মাত্র তো চারজন আমরা!নিজেকে একদিন ছাড় দিন না সুজাতা! রোজই তো সারাদিন স্কুলে কাটিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে‌ বাজার করে বাড়ি ফিরে হাত পুড়িয়ে রান্না করেন। একদিন নাহয় নিজেকে ছুটি দিলেন এই হেঁসেল থেকে! কাল নাহয় ফিরে আবার দাঁড়াবেন আগুনের সামনে। আর সাহায্য করেও লাভ কী? সেই তো কাল আবার আমাদেরকেই হাত পোড়াতে হবে। তার চেয়ে বরং আপনি ঐশীর ঘরে গিয়ে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিন। সারাদিন জার্নির ধকল গেছে একটু জিরিয়ে নিলে ভালো লাগবে। ঐ যে বাদিকের ঘরটা, দরজায় ময়ূরের ছবি আছে। ওটা ঐশীর ঘর। যান ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি ততক্ষণ এদিকটা সামলাচ্ছি। ভয় নেই! আমার রান্না আপনার মতো অতো ভালো না হলেও চালিয়ে নেওয়ার মতো।  তাছাড়া হবু কুটুমের বাড়িতে বেড়াতে‌ এসেছেন একটু সেবাটেবার সুযোগ দিন! কোথায় পায়ের উপর পা তুলে হুকুম করবেন, আরাম করবেন,তা না উনি এলেন সাহায্য করতে! কী শাশুড়ি হবেন আপনি?”

-“কিন্তু বিনা পরিশ্রমে অর্জিত খাবার আমার মুখে রোচে না রজতাভ! নিজে বাছাই করে সবজি, মাছ কিনে নিজের মতো রান্না করে খাবার সুখ কী...!”সুজাতার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রজতাভ বললেন,“সেটা ভালো করেই জানি বলেই হাত পুড়িয়ে রান্না করি! অন্যের হাতের রান্না পছন্দ হয় না বলে কাউকে হেঁসেলে ঢুকতে দিই না। ঐশীকেও এখানে ঢোকার জন্য আমাকে কনভিন্সড করার জন্য পরীক্ষা দিতে হয়েছে!ওসব অনেক বড়ো গল্প। আপাতত যান স্নানটা সেড়ে ফেলুন। আজ ভীষণ গরম পড়েছে। রান্না হলেই ডাকা হবে। ওদিকে বোধহয় চিকেনটা কড়াইয়ের তলায় লেগে গেল!”

-“উফ! আপনার সাথে কথায় পাল্লা দেওয়া অসম্ভব!”

-“ তো জানেনই যখন বাকযুদ্ধে নেমেছেন কেন?শুনুন! যত দেরী করবেন, রান্নায় তত দেরী হবে আর রান্নায় দেরী হলে খেতে দেরী হবে! অগত্যা দেরী না করাই ভালো!যান যান স্নান করে নিন! ওদিকে মাংসটা কড়াইতে‌ লেগে গেল মনে হয়! ঐশীরে! মাংসটা দেখ!” 

বলে রান্নাঘরে ছুটে গেলেন রজতাভ। সুজাতা কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে পরক্ষণে মুচকি হেসে চলে গেলেন ঐশীর ঘরে।

বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের তলায় দাঁড়াতেই একটা তৃপ্তির ঢেউ খেলে গেল সুজাতার আপাদমস্তক জুড়ে। সত্যিই আজ ভীষণ গরম পড়েছে!পাহাড়ে‌ থাকাকালীন এই গরমটা‌ তেমন টের পান না তিনি। সেখানে তিনটে কালই বিরাজ করে শীতকাল, বর্ষাকাল, আর শরৎকালের মতো নাতিশীতোষ্ণ কাল। দিনে হাল্কা সুতির পোশাক পরে কাজ চালালেও রাতে কম্বল লাগে। শাওয়ারের তলায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। শীতল বারিধারা ক্রমশ তাঁর সারাদিনের ধকল, ক্লান্তি ধুয়ে‌ দিতে লাগল।

স্নান সেরে একটা নাইটির উপর সুতির হাউজকোট চাপিয়ে নিলেন সুজাতা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলেন এরমধ্যে ঐশী গোটাঘর গুছিয়ে রেখে বিছানার চাদর পাতছে। বিছানার চাদর পাতার পর মাথার বালিশ গুছিয়ে দিয়ে ঐশী বলল,“আন্টি! বিছানা তৈরী হয়ে গেছে!আপনি রেস্ট নিন। খাবার সময় হলে আমি ডাকবো।”

বিছানায় বসে সুজাতা‌ ঐশীর হাত‌ ধরে বলেন,“আমার ভীষণ লজ্জা করছে জানো? হুট করে তোমার বাবার কথা শুনে রাজি হয়ে বিপদে ফেলে দিলাম তোমাদের! আমার জন্য অসুবিধে হয়ে গেল তোমাদের। তোমরা হেল্পও করতে দিচ্ছ না। আমার ভীষণ গিল্টি ফিল হচ্ছে।” ঐশী বিছানায় বসে বলল,


-“আমাদের কিচ্ছু মনে হচ্ছে না আন্টি! বরং মজা‌ লাগছে এই ভেবে যে অনেকদিন পর বাড়িটা আবার গমগম করছে। কতদিন হল আত্মীয়-স্বজনরা আসে না। বন্ধুবান্ধবরাও এখন যে যার কাজে ব্যস্ত। বাড়িটা ভীষণ ফাঁকা লাগে। মনে হয় এই চারটে দেওয়াল যেন গিলতে আসছে আমাকে। তাই তো সারাদিন বাড়িতে থাকি না আমি। সকালে বেরোই কলেজে। ফেরার পথে ক্যারাটে ক্লাসে ঢুকি। স্টুডেন্টদের ক্যারাটে শেখাই। বিকেলটা কটা টিউশনি পড়িয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে কোনোমতে দুটো রুটি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।‌ সে যাকগে! আজকে কিন্তু আমরা অনেক গল্প করব! অভীকের অনেক কথা তোমাকে জানানোর আছে। আচ্ছা আমি এখন গেলাম। বাপি ওদিকে একা আছে। আপনি রেস্ট নিন। এসিটা চালানো আছে। আলোটা নিভিয়ে দেব?”

সুজাতা মাথা নাড়তেই ঘরের নাইটল্যাম্প জ্বালিয়ে ঝড়ের মতো বেরিয়ে যায় ঐশী। সুজাতা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন অন্ধকারে। তারপর নরম বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে চোখ লেগে আসে তাঁর। সারাদিনের ক্লান্তিতে ক্রমশ ঘুমের দেশে তলিয়ে যেতে যেতে আচমকা তাঁর মনে হতে লাগল কে যেন তাকে খুব কাছ থেকে ডাকছে। গলার স্বরটা তাঁর খুব চেনা। খুব চেনা স্বরে কে যেন ডাকছে তাকে। “সুজাতা! সুজাতা! সুজাতা!”

******** 

-“কাম অন সুজাতা! হানিমুনে বেড়াতে এসে ওভাবে পাড়ে বসে থাকলে চলবে? লোকে কী ভাববে? আমি কি একা স্নান করবো নাকি? এসো না! ইট উইল বি ফান!”

-“না না! আমি এখানেই ঠিক আছি।”

-“ও কাম অন সুজাতা! তোমার কথাতেই হানিমুনে দীঘা বেড়াতে এলাম আর তুমিই কিনা শেষে সমুদ্রে ভয় পাচ্ছ?

-“ভয় পাচ্ছি না আমি।”

-“তাহলে? সমুদ্রে নামছো না কেন?”

-“এমনি ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া কাল সারারাত জেগে জার্নি করে আমি ভীষণ টায়ার্ড তথাগত। আমি বরং কাল নামবো।‌ এই দেখো মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে পড়ল! স্নান করো না তুমি!কে মানা করেছে? তুমি স্নান করলে আমাকেও করতে হবে কোথায় লেখা আছে? তাছাড়া আমরা পাঁচ দিন আছি দীঘাতে! সবে তো এলাম। একটু জিরোতে দাও! আরে কাল আমিও নামবো তো নাকি?”

-“বেশ তবে আমিও কাল নামবো!"

বলে সুজাতার পাশে ভিজে বালিতে বসে পড়ে তথাগত।”

-“দেখো কান্ড ছেলের! আরে আমি কি মানা করেছি নাকি? যাও না স্নান করে এসো। কাল আমিও নামবো তোমার সাথে।”

-“কাল হলে আজ নয় কেন?” বলে সুজাতার দিকে তাকায় তথাগত।

-“বললাম তো কারনটা।‌ মাথাটা ভীষণ ধরেছে। কাল রাতে বাসের জানলার হাওয়াটা সরাসরি মাথায় লাগায় একটু সর্দি সর্দি ভাব‌‌ এসেছে তাই।”

-“সেকি!” বলে সঙ্গে সঙ্গে সুজাতার কপালে গলায় হাত ঠেকায় তথাগত। দেখে সুজাতার গায়ে বেশ জ্বর। উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, “আগে বলো নি কেন? উফ! সু! তুমি না! আগে বললে বেরোতাম না। তেমন হলে প্যারাসিটামল দিতে পারতাম। না না আর এখানে থাকা ঠিক হবে না। সমুদ্রের হাওয়ায় সর্দি বাড়তে পারে। চলো আমরা হোটেলে ফিরে যাই।”

উদ্বিগ্ন তথাগতকে দেখে হেসে ফেলে সুজাতা। তারপর বলে,

-“চিন্তা করার কোনো কারন নেই মশাই! প্যারাসিটামল খেয়েই বেরিয়েছি। তাছাড়া জানোই তো আমার ঠান্ডার ধাত আছে। সর্দিগর্মি সহ্য হয় না।  ও কিছু হবে না।”

-“তুমি চুপ‌‌ করো! তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি! ‘ও কিছু হবে না' বলে পরে ভোগান্তি শুরু হয়। এখন সর্দি হচ্ছে পরে সেটা জমে মাইগ্রেনের ব্যথাটাও ধরবে। চলো আর বসতে হবে না। হোটেলে ফিরে যাই! রাস্তায় মেডিক্যাল শপ পেলে অ্যান্টিবায়োটিকও নিতে হবে। প্রোটেকশনটাও নিতে ভুলে গেছি তাড়াহুড়োয় সেটাও নিতে হবে।”

চারদিকে একবার সন্ত্রস্তভাবে তাকিয়ে তথাগতর হাতে একটা চাপড় মেরে বলে,“অ্যাই! ওভাবে অসভ্যের মতো চিৎকার করছো কেন! আশেপাশের লোক আছে তো নাকি?”

চারদিকে একবার অবজ্ঞার সাথে তাকিয়ে তথাগত বলে, “তাতে কী হয়েছে? বউকে নিয়ে হানিমুনে এসেছি তীর্থ করার জন্য নাকি? নাকি সাইট‌সিন করতে এসেছি?প্রোটেকশন তো লাগবেই!”

-“ইশ! অসভ্য কোথাকার! কেমন চিৎকার করছে দেখ! এই কারনে তোমার সাথে বেড়াতে যাই না।”

-“কী করি বলো তো? জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে জং‌লী হয়ে গেছি! আর জংলীদের খিদে কেমন হয় জানো না? আমাদের পেটে যেমন খিদে, তলপেটেও তেমনই...." বাকিটা বলার আগে দুহাত দিয়ে তথাগতর মুখ চেপে ধরে সুজাতা। কিন্তু বলিষ্ঠ চেহারার তথাগতর সাথে পারে না সে। তথাগত উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় কোলে তুলে নেয় সুজাতাকে। সুজাতা লজ্জায় বলে ওঠে, “ কি করছোটা‌ কী? সবাই দেখছে তো! নামাও!”

তথাগত সুজাতার কোনো কথা না শুনে বলে, “জ্বরের‌ একটা টোটকা কী জানো? হয় জলপট্টি, নাহয় ঠান্ডা জলে স্নান। ” বলে সুজাতার কোনো আপত্তি না শুনে সমুদ্রের জলে নেমে যায়। সুজাতা প্রথমে তথাগতর উপর রাগ করলেও পরে মেতে ওঠে জলক্রীড়ায়।

অনেকক্ষণ পর দুজনে যখন পাড়ে ফিরে এল।‌ সুজাতা সত্যিই থর থর করে কাঁপছে আর হাসছে।‌ তথাগত ওকে কোনোমতে হোটেলে নিয়ে গেল। নিজেদের রুমে ঢুকে চট করে ভেজা পোশাক খুলে তোয়ালে দিয়ে ভালো করে মুছে দিল সুজাতার মাথা, ওর সর্বাঙ্গ। আর মোছার পরেই সুজাতা এলিয়ে পড়লো বিছানায়। তথাগত সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় রাখা কম্বল দিয়ে ঢেকে দিল সুজাতার আপাদমস্তক। তথাগত বুঝতে পারল সুজাতার বারণ সত্ত্বেও ওকে জোর করে সমুদ্রে স্নান করানোটা উচিত হয় নি। কাজটা ভুল হয়েছে বুঝতে পেরে মনে মনে ভীষণ অনুতপ্ত‌ হল সে।

ওষুধের কৌটোটা ড্রেসিং টেবিলের সামনেই রাখা ছিল। সেখান থেকে প্যারাসিটামলের পাতা বের করে ট্যাবলেট নিয়ে বিছানার কাছে এসে সুজাতাকে কোনো মতে তুলে খাইয়ে দিল। ওষুধটা খাওয়াবার সময় তথাগত টের পেল সুজাতার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। তথাগত সঙ্গে সঙ্গে সুজাতার পায়ের পাতা‌, হাতের চেটো ঘষতে লাগলো। সুজাতার জ্বর তাতেও কমছে না দেখে কী করবে ভাবছে এমন সময় তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে চটজলদি নিজের ভিজে পোশাক ছেড়ে বাথরুমে ঢুকে গেল সে। ঠান্ডা জলে স্নান সেরে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে ঢুকে গেল সুজাতার কম্বলের ভেতরে। জড়িয়ে ধরল সুজাতার‌ জ্বরে তপ্ত‌ অচৈতন্য নগ্ন দেহটাকে আষ্টেপৃষ্টে!বরফের মতো ঠান্ডা শরীরে শুষে নিতে লাগল সুজাতার প্রচণ্ডজ্বরের ফলে সৃষ্ট তীব্র লীনতাপ। আর অশ্রুসজল চোখে বলতে লাগল, “আই অ্যাম সরি সু! আর এরকম ভুল হবে না! আর‌ আমি তোমার অবাধ্য হবো না।‌ তুমি শুনতে পারছ? সু? সুজাতা! সুজাতা?”

******

-“সুজাতা?” 

ডাকটা শুনে ঘুম ভাঙলো সুজাতার। চোখ মেলে দেখলেন রজতাভ মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘুমের ঘোরে কোথায় আছেন প্রথমে বুঝতে না পারলেও কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হতেই উঠে বসলেন তিনি। 

-“ সরি! আসলে একটু চোখ লেগে গিয়েছিল।”

-“সেকারনেই আপনাকে ডিস্টার্ব করি নি। খাবার তৈরী হবার পর ঐশীকে পাঠিয়েছিলাম আপনাকে ডেকে পাঠাতে। ঐশী বলল আপনি ঘুমোচ্ছেন তাই ভাবলাম আপনাকে বিরক্ত করা আর ঠিক হবে না। ওদের খাইয়ে দিয়ে আপনাকে ডাকতে এলাম।”

-“সেকি! কটা বাজে? এবাবা! এগারোটা বেজে গেছে! ইশ এতক্ষণ ধরে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছি একবার ডাকবেন তো! ইশ! ছিঃ! ছিঃ! লোকের বাড়িতে এসে এভাবে হ্যারাস করলাম!আপনাদের খাওয়ার দেরি হয়ে গেল!”

-“আবার আপনি ভুল করছেন সুজাতা! এটা লোকের নয় আপনার কুটুমবাড়ি। দ্বিতীয়ত হ্যারাসমেন্টের কিছু হয় নি। কারন ঐশীর ফিরতে ফিরতে প্রায়ই রাত হয় আর এসময়ই আমরা খেতে বসি। কাজেই বেশী দেরী হয় নি। আর আপনার পরের প্রশ্নটার উত্তর আগেই দিয়েছি! ওরা খেয়ে নিয়ে ড্রইংরুমে আড্ডা মারছে। বাকি রইলাম আমি আর আপনি। চোখে মুখে জল দিয়ে চটপট চলে আসুন। আমি খাবার বেড়ে রাখছি।” বলে বেড়িয়ে গেলেন রজতাভ। 

কিছুক্ষণ পরে দুজনে মিলে রজতাভর বানানো রুটি আর চিকেনের কারি খেয়ে নিয়ে জমিয়ে বসলেন বৈঠকখানায়। ধীরে ধীরে আড্ডা জমে উঠল চারজনের মধ্যে। নানা বিষয় নিয়ে চলতে লাগল আড্ডা। রাজনীতি থেকে বিনোদন, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে আবহাওয়া। ক্রমশ রাত বাড়তেই ঐশী আর অভীক যে যার ঘরে শুতে চলে গেল। বৈঠকখানায় বসে রইলেন রজতাভ আর সুজাতা। কথায় কথায় প্রসঙ্গ উঠল তথাগত, ঊর্মির। সেই কথা প্রসঙ্গেই রজতাভ বললেন, “জানেন? ঊর্মি সব সময় বলতো আমার মতো মানুষ নাকি দুটো নেই। আমি যেমন মানুষকে ম্যানুপুলেট করতে পারি তেমন নাকি তাকে দিয়ে কাজও করাতে পারি। আমি মানতে চাইতাম না।”

-“ভুল তো কিছু বলতেন না! আপনি সত্যিই তা করতে পারেন। এইতো আমার এখানে আসার পরিকল্পনা ছিল না। আপনি নিয়ে এলেন বাধ্য করে। শুধু কি তাই? এই যে আপনাকে হেল্প করতে চাইলাম আপনি কি করলেন? আমাকে কথার প্যাঁচে ফেলে বিশ্রাম নিতে পাঠিয়ে দিলেন। তবে আপনার দোষ নেই! তথাগতও তাই বলত আমায়! ‘সুজাতা! তোমাকে বোকা বানানো সহজ নয়। তবে ম্যানুপুলেট করা সম্ভব!যে কেউ করতে পারে! তাই সাবধান থেকো।’ অবশ্য‌ ওর তো আর জানা ছিল না যে ন্যাড়া একবারই গাছ তলায় যায়। আমিও একবারই ঠকেছিলাম! তারপর আর কেউ পারেনি। ”

-“যাহ আপনাকে কে ঠকাতে পারে? আপনার মতো একজন বিচক্ষণ মহিলাকে ঠকিয়ে কার কী লাভ?”

-“ অথচ‌ ঠকেছিলাম জানেন? তার উপর বিশ্বাস করে ভীষণ ঠকে গিয়েছিলাম। সে আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল বাঁচার,জীবনকে নতুন করে খুঁজে পাবার দিশা দেখিয়েছিল। কিন্তু যখন বুঝেছিলাম এই সব স্বপ্ন মিথ্যে। সে শুধু আশ্রয়ের খোঁজে আমার কাছে এসেছে। নিজের ক্ষত নিরাময় করতে এসেছে বিশ্বাস করুন ভালোবাসার উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। যাবার সময় সে কি বলে গিয়েছিল জানেন? ‘ভালোবাসা কখনও সত্যি হয় না। সকলকে ভালো রেখে চলার মিথ্যে মূকাভিনয় ছাড়া ভালোবাসা আর কিছুই নয়।’ তখন বয়স কম ছিল এসবের মানে বুঝিনি আজ বুঝি। তবে একটাই আক্ষেপ থেকে গেল জানেন? যে মানুষটা আমার কাছে সুখের খোঁজে এসেছিল। সে মানুষটা নিজে সুখ পেল কিনা জানা যায় নি। অথচ আমি সুখ পেয়েছি প্রচুর!” বলে মুচকি হাসেন সুজাতা ।

-“আচ্ছা যদি কোনোদিন এমন হয় যে মানুষটা একদিন আপনার কাছে এল।  নিজের ভুলের ক্ষমা চাইতে। তাকে ক্ষমা করতে পারবেন?”

-“ এতবছর পর সে যদি সত্যিই অনুতপ্ত হয় তাহলে ক্ষমা করতে পারি। কারন সে আমাকে ছেড়ে গেলেও ফেরত দিয়ে গিয়েছিল আমার সংসারটাকে। যে মানুষ নিজের বিনিময় সংসার ফিরিয়ে দেয়,ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয় তাকে ক্ষমা করাই যায়। কিন্তু সে ক্ষমাটা যে অন্তর থেকে হবে না রজতাভ! কারন সে নিজের সাথে আমাকেও পাঁকে নামিয়েছিল।”

-সুজাতা...! মানে আমি... বলতে চাইছিলাম যে...!”

সুজাতার মুখ পলকে গম্ভীর হয়ে যায়। সোফায় সোজা হয়ে বসে‌ন তিনি। 

-“ প্লিজ রজতাভ। দয়া করে আর পুরোনো অতীতটাকে মনে করাবেন না। অনেক কষ্টে অতীত থেকে বেড়িয়ে এসেছি আমি। সেই মুহূর্তগুলো প্রথমে সুখের হলেও পরে তার বিষ আমাকে সারাজীবন অন্তর্দহনে জ্বালিয়েছে। প্রতি রাতে সেই আগুনে পুড়ে কষ্ট পেয়েছি। প্লিজ সেই আগুনে উসকে দেবেন না। অতীতটাকে মনে করে কষ্ট পেয়ে আর লাভ নেই। আর আমি পেতেও চাই না। কিছু জিনিস একান্ত ব্যক্তিগত থাকাই ভালো। তারচেয়ে বরং বর্তমানে আমরা কেমন আছি সেটা নিয়ে ভাবাটাই বড়ো কথা। আমি তো বেশ সুখে আছি। ছেলের বিয়ে বলে কথা! ”

-“কিন্তু...!”

-“অনেক রাত‌ হল রজতাভ। আমার ঘুম পাচ্ছে। কাল সকাল সকাল ফিরতে হবে আমায়। আপনিও নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।” বলে উঠে পড়েন সুজাতা। পায়ে পায়ে এগিয়ে ঐশীর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। রজতাভ কিছুক্ষণ সুজাতার যাওয়ার পথে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিয়ে বসেন।

(চলবে...)

রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ প্রথম পর্ব


রেস্তরাঁর ছাদ থেকে অস্তপ্রায় সুর্যর দিকে তাকিয়ে মুখে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন রজতাভ।  “কিরে? আর কতক্ষণ?” বলে ঐশ্বর্যর দিকে তাকালেন রজতাভ। “এই তো বাপি আর পাঁচ মিনিট। অভি প্রায় এসে পড়লো বলে। আসলে আগেই আসতো। গলিটা একটুর জন্য মিস করে গেছে।” বলে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ঐশ্বর্য। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিমাগে চুমুক দিলেন রজতাভ।

এই নিয়ে পাঁচ দফায় কফি এসেছে। ঐশ্বর্যর কাপ খালি না হলেও রজতাভ আয়েশ করে কফি খেয়ে বসে আছেন। আজকের দিনটা ঐশ্বর্য ওরফে ঐশীর কাছে খুব স্পেশাল। আজ অভীকের সাথে ঐশী ওর বাপির আলাপ করিয়ে দেবে। অভীক ঐশীরই কলেজের সিনিয়ার। বর্তমানে কলেজ পাশ করে একটা স্থানীয় খবরের কাগজে চাকরি করছে তবে নেশায় একজন ফ্রিল্যান্স ফোটোগ্রাফার। ঐশীর সাথে নাকি ওর আলাপও নাকি এই ফোটো তুলতে গিয়ে। ঐশী ওর বাপিকে কালরাতে সবটা বলেছে। সবটা শুনে রজতাভ প্রথমে গম্ভীর হয়ে রাগ করার অভিনয় করেছিলেন পরে মেয়ের কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে ফিক করে হেসে আজ বিকেলে অভীককে ডাকতে বলেছেন।  আসলে রজতাভ ঐশীর কান্না সহ্য করতে পারেন না ঠিকই তবে নিজের ডাকাবুকো মেয়েকে মাঝে মাঝে বিপর্যস্ত হতে দেখে মজা লাগে তাঁর। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারেন না। ঐশী কাঁদো কাঁদো গলায়, “বাপি!” বলে ডাকলেই তাঁর সব স্থৈর্য্য শেষ হয়ে যায়।  তখন তিনি বুদ্ধি দিয়ে মেয়েকে উদ্ধার হবার পথ বাতলে দেন। 

আসলে উর্মি মারা যাবার পর থেকে ঐশীকে প্রায় নিজের মতো করে কোলে পিঠে মানুষ করেছেন রজতাভ। ফলে তার মেয়ে হয়েছে তাঁর মতোই ডাকাবুকো, হুল্লোড়ে আর খিল্লিবাজ। বয়কাট চুলে, পোশাকে কেউ সহজে ধরতে পারে না যে ঐশী আসলে মেয়ে। ক্রেডিটটা অবশ্য রজতাভর। তিনি নিজের গরজে মেয়েকে সাবলম্বী করে তুলেছেন। ক্যারাটে ক্লাসে, সাঁতারে, নাচে নিয়ে গেছেন। রীতিমতো ট্রেনার রেখে মেয়েকে তলোয়ার, পিস্তল চালানো শিখিয়েছেন। নিজে থেকে মেয়েকে বাইক থেকে কার চালানো দুটোই চালানো শিখিয়েছেন। আগেকারদিনে মেয়েদের চৌষট্টি কলা শিখতে হতো। সেই নিয়মে নিজের মেয়েকে একটা ছেলের মতোই ট্রিট করেছেন। একবার মনে আছে রজতাভর, সেবার ঐশীর ক্লাস নাইন। একদিন বিকেলে স্কুল থেকে বুকের দিকে ব্যাগ দিয়ে চাপা দিয়ে থমথমে মুখে বাড়ি ফিরেছিলো মেয়ে। বাড়িতে ফিরে ব্যাগটা নামাতে রজতাভ দেখতে পান মেয়ের জামার বুকের দিকটা কেমনভাবে যেন ছিঁড়ে গেছে। মুখে একাধিক আঘাতের চিহ্ন। যেন কারো সাথে মারপিট করে ফিরেছে। ফার্স্ট এইড করে মেয়েকে ধাতস্থ হবার সময় দিয়েছিলেন রজতাভ। পরে রাতে খাবার পর টিভি দেখতে দেখতে ঐশী নিজেই ধরা গলায় বলেছিলো সবটা। কয়েকদিন ধরেই ওদের স্কুলের কয়েকটা ছেলে স্কুল ছুটি হবার পর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওদের টন্ট করতো। ঐশীও বাদ ছিল না। কিন্তু সে কিছু না বলে চুপচাপ ইগনোর করে চলে যেত।‌ আজকে ছেলেগুলোর বাঁদড়ামি সহ্য না করতে পেরে অবশেষে সে রুখে দাঁড়ায়। প্রচণ্ড রাগে ছেলেগুলোর দিকে তেড়ে যেতেই একপ্রস্থ ঝামেলা বাঁধে। ওরা ভেবেছিল বাচ্চা মেয়ে, হাত চেপে ধরলে বা একটু ভয় দেখালে শান্ত হয়ে যাবে। কিন্তু ওদের দলের দুজন ধরাশায়ী হবার পর ওদের ভুল ভাঙে। তারপর ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়ের উপর। দাঁতে দাঁত চেপে ঐশী ওদের দলের বাকিদের জখম করে হারিয়ে দিলেও হাজার চেষ্টা করেও কিছুতেই ওদের দলের একটা ছেলের সাথে লড়ে উঠতে পারে নি। আর এই ছেলেটার ইন্ধনেই বাকি ছেলেরা মেয়েদের টন্ট করত। এই ছেলেটাই ছিল আসল দোষী। ছেলেটাকে সে প্রায় বাগে এনে ফেলেছিল কিন্তু মোক্ষম সময় ছেলেটার তার শার্টের বুকের দিকের কাপড় কীভাবে যেন ধরে ছিঁড়ে ফেলে। ফলে নিজের পোশাকের দিকে মনোযোগ চলে যায় তার। আর সেই সুযোগে ছেলেটা ওকে কষে একটা ঘুষি মেরে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিয়ে বলে মেয়ে হয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করতে। এরপর যদি সে বেশি কিছু করতে যায় আজ তো শুধু কাপড় ছিঁড়েছে, এরপর ওকে ওরা ন্যাংটো করে পাড়ায় ছেড়ে দেবে। 


সবটা শুনে চোয়াল শক্ত হয়েছিলো রজতাভর। অন্য কেউ সাহসী হলে পুলিশ ডাকতেন। নাহলে ঐশীকেই লড়তে যাবার জন্য দোষারোপ করতেন। এমন কি ওনার মতো কেউ এক্স মিলিটারিম্যান হলে নিজে গিয়ে ছেলেগুলোকে দু ঘা দিয়ে আসতেন। কিন্তু রজতাভ অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি চুপচাপ মেয়েকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে অ্যানিমাল প্ল্যানেট চালিয়ে দেখছিলেন। কথাগুলো বলতে বলতে ঐশীর গাল বেয়ে অশ্রুধারা বেরিয়ে আসলেও রজতাভ টের পাচ্ছিলেন মেয়ের কান্নাটা ছেলেগুলোর কথার জন্য নয়। নিজের হেরে যাবার জন্য। ঐশীর নিজেকে সামলাবার কিছু সময় দিয়ে টিভির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ধীর অথচ দৃঢ় গলায় বলেছিলেন, “সবটা বুঝলাম। কিন্তু আমি বলব এখানে তোরও ভুল কম ছিল না। ”

মেয়ে বজ্রাহতের মতো তাকিয়েছিল রজতাভর দিকে। টিভিটা মিউট করে সোফায় হেলান দিয়ে রজতাভ বলেছিলেন, “লড়াইয়ের প্রধান নিয়মটাই তুই ফলো করিস নি। লড়াই করার সময় শত্রুর উপর মনোযোগ রাখাটাই আসল নিয়ম। শত্রুর প্রতিটা মুভমেন্ট লক্ষ্য করে ওর আক্রমণ করার পদ্ধতি অনুধাবন করে নিজেকে বাঁচিয়ে লড়ে যেতে হয়। লড়াই করার সময় শত্রু বাদে আর কোনো বাহ্যিক বস্তুর উপর মনোযোগ দিতে নেই! ওটা লড়াইতে হেরে যাবার প্রথম পদক্ষেপ। আর তুই সেটাই করেছিস। তোর হারটা কখন হল জানিস? যখন ছেলেটা তোর শার্ট ছিঁড়ে দিলো আর তুই নিজের আব্রু ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়লি তখন। তার আগে তোর মনোযোগ সম্পুর্ণ ওদের উপর ছিলো। যে কারনে ওরা তোর বিরুদ্ধে বেশীক্ষণ দাঁড়াতে পারে নি। এমন কি যে ছেলেটা তোর শার্ট ছিঁড়ে দিল সেও প্রায় হেরেই যাচ্ছিল। তবে মানতে হবে ছোকরার এলেম আছে। এ তেমন লাথখোর এলেবেলে ছোকরা নয়। একজন মেল ইগোতে ভরা একটা ছেলে। যার কাছে মেয়েরা অবলা,শক্তিহীনা, ভোগ্যা। এতদিন সেই চিন্তাধারার বশেই চলছিল সে। বাকি ছেলেদের মধ্যে সেই চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিয়ে তোদের টন্ট করছিল। ভেবেছিল তোরা মুখ বুঁজে সহ্য করে যাবি। তোদের মধ্যেও যে একজন রুখে দাঁড়াতে পারে সেটা ওরা ভাবতে পারে নি। কিন্তু তুই যখন রুখে দাঁড়ালি, একে একে ওদের ধরাশায়ী করলি তখন তুই কিন্তু একদিক থেকে ওদের চিন্তাধারায় আঘাতটা করলি। আর এটাই ওদের কাছে বড়ো ধাক্কা হয়ে গেল। বিশেষ করে ওই ছেলেটার কাছে। একজন পুরুষ হয়ে একজন নারী তাও আবার একটা বাচ্চা মেয়ের হাতে হেরে যাচ্ছে, তাকে পরাজিত করতে পারছে না, বশে আনতে পারছে না, বরং বেদম মার খেতে হচ্ছে এটা হজম হচ্ছিল না ছেলেটার। কিন্তু এই জিনিসটাই বাস্তবে পরিনত হচ্ছে দেখে ছেলেটার মেল ইগো ক্রমশ হার্ট হচ্ছিল। সেই কারনে ও মরিয়া হয়ে এমন একটা স্পর্শকাতর আঘাত করে বসল যেটা একটা নারীর কাছে যেমন অবমাননাকর ঠিক তেমনই একজন লড়াকু নারীকে পরাজিত করার, মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করার ফাঁদও বটে। সহজাত সংস্কারের বশে শতকরা ৯৮% লড়াকু মেয়ে এই ফাঁদে পা দেয়। আর তুইও ঠিক সেটাই করলি। ওর ফাঁদে পা দিয়ে ওকে সুযোগ দিয়ে বসলি। যেই মুহূর্তে ছেলেটা তোর সম্মানে হাত দিলো সেই মুহূর্তে তোর মনোযোগ ছেলেটার থেকে সরে গিয়ে তোর শার্টের উপর গিয়ে পড়লো আর তুই সহজে হেরে গেলি।  যদি সেই মুহূর্তে তুই নিজের দিকে নজর না দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতিস তাহলে ছেলেটা সহজে হেরে যেত। আর হেরে যেত ওর পৌরুষের মিথ্যে অহংকারটা। তখন তোকে নগ্ন করার হুমকি দেওয়া তো দুরস্থ, ওর সাহস হতো না তোর চোখে চোখ রেখে কথা বলার। আর এটা আমার থেকে বেশি করে তুই জানিস। কি ঠিক তো?”

মেয়ে তন্ময় হয়ে তাঁর কথা শুনতে শুনতে মাথা নেড়ে কোলে মাথা রাখতেই রজতাভ হেসে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “ একটা কথা সবসময় মনে রাখিস মা। এই যে বাইরের জগতটা দেখছিস এটার সাথে এই অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটের জঙ্গলের জগতটার বেশী পার্থক্য নেই। এখানে দুটো দল আছে একদল ‘Preachers’ আর অপরদল হলো ‘Survivers’, মানে শিকারী এবং শিকার থেকে বেঁচে ফেরা প্রাণী। এই পৃথিবীতে বাঁচতে হলে তোকে এই দুটো দলের মধ্যে একটা হতেই হবে। হয় তোকে ‘Surviver’ হয়ে আজীবন এই শিকারীদের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে হবে, survive করতে হবে। নাহলে নিজেই শিকারী হয়ে এই শিকারীদের পাল্টা শিকার করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজে মেয়েরা দ্বিতীয় পথটা বেছে নিয়ে Surviver হতে গিয়ে এই শিকারীদের সহজ শিকারে পরিণত হয়। আর এটা বার বার হয় বলে ওরা ভেবে নেয় স্বভাবে তোরা নরমসরম বলেই তোরা ভীষণ দুর্বল। কিন্তু বাস্তবটা ভীষণ উল্টো। নারীদেহে কোমলতা, করুণা একটা গুণ, একটা Instinct, যেটা তোদের সহজাত। এই গুনগুলো তোরা সাথে নিয়ে জন্মাস। নারী মানে কোমল মনের হতে পারে কিন্তু সে অবলা নয়। সে যেমন আর্তের পাশে দাঁড়াতে পারে ঠিক তেমনই চাইলে সে শত্রুর টুটি টিপে ধরতে পারে। আর এইসব শিকারীরা যখন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয় তখন স্বাভাবিকভাবে ওদের সব নিয়ম, হিসেবনিকেশ পালটে যায়। এতদিন ধরে বিশ্বাস করে আসা মতবাদ এলোমেলো হয়ে যায়। তখন নিজের, সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে যেনতেন প্রকারেণ ভাবে এই হিসেবের বাইরে থাকা মেয়েদের দমানোর চেষ্টা করে। কখনো বাহুবলে, কখনো এই নারীদের সম্মানে আঘাত করে তাকে পরাজিত করার চেষ্টা করে। হ্যা সমাজ এই মেয়েদের একেবারেই  প্রাধান্য দেয় না তা নয়। সমাজ এদের প্রাধান্য তখনই দেয় যখন এই মেয়েরা বহির্বিশ্বে সম্মান পায়, স্বীকৃতি পায়। ততক্ষণ পর্যন্ত প্রাণপণে লড়ে যেতে হয়। তোকেও এরকম প্রাণপণে লড়ে যেতে হবে। আর রইলো পোশাক, তাহলে শোন যুদ্ধে পোশাক, আভূষণ, বা হাতের অস্ত্র Matter করে না। Matter করে যুদ্ধে অক্ষন্ড মনোযোগ, অন্তিমশ্বাস পর্যন্ত হার না মানা মনোভাব, আর শত্রুকে পরাজিত করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ঠান্ডা মস্তিক। যুদ্ধে এটা বড়ো কথা নয় কে প্রথম আঘাত করল, বরং যুদ্ধশেষে কে ধরাশায়ী হচ্ছে এটাই শেষ কথা। আর নারীদেহ হল নিজেই একটা চলন্ত অস্ত্র। ঠিক মতো এই অস্ত্রকে ব্যবহার করতে পারলে ভীষণ কড়া প্রতিপক্ষকেও পরাস্ত করা সম্ভব। তুই এখন ছোটো এসব বুঝবি না তাই শর্টে বলছি। জঙ্গলে যখন সুর্যোদয় হয় তখন একটা হরিণ ভাবে আজ যদি আমি প্রাণপণে না দৌড়োই তাহলে বিকেলের সুর্যাস্ত দেখার জন্য বেঁচে থাকবো না। আর একটা বাঘ ভাবে আজ যদি আমি হরিণের চেয়ে জোরে না দৌড়োই তাহলে না খেতে পেয়ে মারা পড়বো। মানে তুই শিকারী হোস বা শিকার দৌড়তে তোকে হবে। এবার তুই শিকারী হবি না শিকার সেটা তোর উপর নির্ভর করছে। কিন্তু মনে রাখবি শিকারের বেঁচে থাকাটা তার ভাগ্যের উপর নির্ভর করে। অনেক সময় অনেক চালাক শিকারও শিকারীর তীব্র অধ্যাবসায়ের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। কারন শিকারী বাঘ যখন শিকার করে তখন তার মনোযোগ সম্পুর্ণ ভাবে তার শিকারের উপর থাকে আর কোনোকিছুর উপর নয়। এমন কি তার নিজের উপরও নয়। এরপরও যখন শিকার ফস্কে যায় তখন সে আক্ষেপে গর্জন করে না। বরং সুযোগের প্রতিক্ষা করে। তেমনই আজকের ব্যর্থতায় যে নিজের উপর রাগটা জমেছে সেই রাগটাকে পুষে রাখতে শেখ। তারপর যখন শিকারকে হাতে পাবি তখন নিজের সমস্ত মনোযোগ তার উপরই দে। একমাত্র লক্ষ্য রাখ ওকে পরাজিত করার দিকে। দেখবি পরেরবার জয় তোরই হবে।”  

মেয়ে বাবার কোলে মাথা রেখে পুরো কথাটাই শুনেছিল। তারপর একসময় উঠে চলে গিয়েছিলো নিজের ঘরে। এক সপ্তাহ পরে আবার মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় বাড়িতে ফিরতে দেখলেও ফার্স্টএইড করার সময় মেয়ের ঠোঁটে বিজয়ের হাসিটা দেখে সবটা অনুমান করে নিতে কষ্ট হয় নি রজতাভর। তিনি বুঝেছিলেন এবার তাঁর মেয়ে নিজের আত্মরক্ষা করতে সক্ষম। আর তাঁর মেয়েকে আগলে রাখার প্রয়োজন হবে না। কিছুক্ষণ পরে ছেলেগুলোর মা, বাবা এসে ঝামেলা করতে এলে তিনি নিজে তাদের সাথে কথা বলতে বসেছিলেন। জানিয়েছিলেন পুরো ঘটনাটা। সবটা শোনার পর সবাই না হলেও দুজন ছেলের মা, বাবা ক্ষমা চেয়েছিলেন তাঁর কাছে। বাকিরা সমানে তর্ক করে চলেছিলেন ওনার সাথে। মেয়েকে মানুষ করতে তিনি ব্যর্থ এই কথাটাও ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিতে কসুর করছিলেন না তারা। অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি বলেছিলেন, “দেখুন! মেয়ে আমার, মেয়েকে মানুষ করার দায়িত্বও আমার। আমি কীভাবে আমার মেয়েকে মানুষ করব সেটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। কাজেই এই বিষয়টা আমার উপরই ছেড়ে দিন। আপাতত একটা কথাই বলব আমি।‌ আপনারা বরং আপনাদের ছেলেদের প্রকৃত পুরুষমানুষ হতে শেখান। এই বয়সটা পড়াশুনো করার সময়। প্রেম করার বা রাস্তাঘাটে মেয়েদের টিটকিরি মারার নয়। প্রেম করার জন্য ওদের গোটা জীবন পড়ে আছে। আর আপনাদের ছেলেরা ক্রিকেট খেলতে গিয়ে‌ মার খায় নি। ইভটিজিং করতে গিয়ে মার খেয়েছে।‌ আজ আমার মেয়ে মেরেছে। কালও যদি এরকম করে তাহলে পাবলিকের কাছেও হাটুরে মার খেতে পারে ওরা। তখন কী সবার বাড়িতেও এরকম সদলবলে চড়াও হবেন? আশা করি নিশ্চয়ই তা করবেন না।‌ আপনাদের ছেলেরা বয়সে ছোটো বলে আমি পুলিশ ডাকিনি। নাহলে ওরা যেটা করেছে তারজন্য অন্তত একটা দিন হাজতবাস ওদের দরকার। কিন্তু আমি চাই না ওদের জীবনে, কেরিয়ারে কোনো দাগ পড়ুক। ওরা ক্রিমিনালে পরিণত হোক। আমাকে সন্তান শিক্ষার পাঠ না দিয়ে বরং আপনাদের ছেলেদের কীভাবে একটা মেয়েকে সম্মান প্রদর্শন করতে হয় সেটা শেখান। প্রকৃত পুরুষের পরিচয় পুরুষাকারে নয় শিরদাঁড়ায় এটা শেখান, তাহলে দেখবেন ভবিষ্যতে পুরুষ হয়ে একজন নারীর কাছে মার খেতে হচ্ছে না তাদের। আর আপনাদেরও এই সামান্য বিষয় নিয়ে কারো বাড়িতে উঠে পড়ে ঝগড়া করতে যেতে হচ্ছে না। একবার ভেবে দেখুন তো এই ব্লকে, আপনাদের পাড়ায়, স্কুলে সকলে যদি জেনে যায় আপনাদের ছেলেরা ওদের চেয়ে বয়সে ছোটো বাচ্চা মেয়েদের টিটকিরি মারতে গিয়ে, ইভটিজিং করতে গিয়ে একটা মেয়ের কাছে বেধড়ক মার খেয়ে গেছে। ব্যাপারটা কিন্তু তেমন শ্রুতিমধুর হবে না বরং এতে আপনাদেরই অসম্মানটা বাড়বে। কাজেই এই বিষয়ে বেশি জলঘোলা না করাই ভালো। আশা করি বুঝতে পেরেছেন। ও ভালো কথা আপনারা প্রথমবার আমার বাড়িতে এসেছেন চা না খাইয়ে কিন্তু আপনাদের ছাড়ছি না। বসুন! সন্ধ্যাদি পাঁচ কাপ চা হবে?”  

ঘটনাটা ঘটার পরে ক'দিন তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে ফলো করেছিলেন মেয়েকে যাতে কোনো অঘটন না ঘটে।কিন্তু অঘটন ঘটার মতো কিছুই ঘটে নি। মেয়ে স্কুল থেকে ফেরার‌ পথে নিজে এগিয়ে গেছিল ছেলেগুলোর কাছে।‌ আগেরদিন মার খাবার পর স্বাভাবিকভাবেই ছেলেগুলো মেয়েকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। ওদের মধ্যে একজন বড়ো করে ছেলে মাথা নত করে ক্ষমা চেয়েছিল। মেয়ে অবশ্য আগের দিনের কোনো ঘটনা মনে রাখে নি। বরং সে নিজে এগিয়ে গিয়ে ছেলেগুলোর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো।ছেলেগুলো প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও পরে বন্ধুত্বের প্রস্তাবটা গ্রহণ করতে দেরী করেনি। সেই বন্ধুত্ব আজও টিকে আছে। 

মাঝে মাঝে তাঁর অবাক লাগে এই কি সেই ঐশী? যে ছোটোবেলায় তাঁর বুকের উপর কার্টুন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তো। সেই ঐশী , যার পরীক্ষার আগের দিন অহেতুক টেনশন করতেন তিনি। সেই ঐশী যে রাগ হলে নিজের ছোটো ছোটো হাত দিয়ে তার বাপিকে মারতো। সত্যি সময় বড়ো তাড়াতাড়ি বয়ে যায়। সেদিনের সেই ছোটো ঐশী আজ কলেজে পড়াশুনো শেষ করার দোরগোড়ায়। এরপর সে নিজেই ঠিক করবে তার ভবিষ্যতের প্ল্যান। তারপর একদিন বিয়ে করে চলে যাবে পরের ঘরে। তবে সেসব সুদূর ভবিষ্যতের কথা, আপাতত তিনি এখানে এসেছেন অভীক ছেলেটিকে একবার বাজিয়ে দেখতে। তিনি দেখতে চান কোন মন্ত্রবলে সে তাঁর ডাকাবুকো কন্যেকে জয় করলো। 

প্রায় আধঘন্টা হয়ে গেলো রজতাভরা এসেছেন। অথচ অভীকের পাত্তা নেই। ঐশীর মুখও প্রায় কাঁচুমাচু হয়ে গেছে। সে ক্রমাগত ফোন করে যাচ্ছে অভীককে। ভেতর ভেতরে ক্রমশ বিরক্ত হলেও নিজেকে সামলে তিনি বললেন, “কিরে আর কতক্ষণ? সেই বিকেল পাঁচটা থেকে বসে আছি তা তোর ঐ অভীকবাবাজি কোথায়? এই বললি গলি মিস করেছে। তা ঠিকঠাক ঠিকানা দিয়েছিলি তো?”

রজতাভর কথায় ঐশী কিছু বলতে যাবে এমন সময় রজতাভর পেছনে যেন কাকে দেখে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাত নেড়ে ইশারায় ওদের টেবিলের দিকে আসতে বলে। রজতাভ খেয়াল করেন একটু আগেও যে মেয়ের মুখ প্রায় কালো হয়ে এসেছিল হঠাৎ তার পিছনে কাকে দেখে আবার উজ্জ্বল হয়ে গেছে। রজতাভর একবার ইচ্ছে করল যে ছেলেটা ওদের দুজনকে এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছে সেই ছেলের মুখ একবার দর্শন করতে। কিন্তু পরক্ষণে নিজের কৌতুহল দমন করে কফির ষষ্ঠতম কাপে চুমুক দেন তিনি। কিছুক্ষণ পরেই একটা রোগামতো ভীষণ মিষ্টি দেখতে ছেলে ওদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতেই শুরু হয় ঐশীর মৃদুস্বরে বকাবকি। “তোর কি কোনোদিনও আক্কেল জ্ঞান হবে না? এতক্ষণ লাগে অফিস থেকে এখানে আসতে?” ছেলেটা কাঁচুমাচু মুখে কিছু বলার আগেই ঐশী ধমকায়, “একদম কোনো এক্সকিউজ দিবি না! গতবারের ডেটেও তুই এরকমই অজুহাত দিয়েছিলি!কী ভেবেছিস? চাকরি করিস বলে সাপের পাঁচ পা দেখে ফেলেছিস?” 

ব্যাপারটা ক্রমশ বিপজ্জনক দিকে এগোচ্ছে দেখে রজতাভ চটপট কফির কাপে চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলে রেখে একটু গলা খাকড়ে বলেন, “হয়েছে! হয়েছে! এবার থাম দুজনে! এটা পাবলিক প্লেস! ঝগড়া করার জন্য আরো অনেক জায়গা আছে। ছেলেটা এতক্ষণ পর এসেছে কোথায় ওকে বসতে বলবি তা না ঝগড়া করছে। বোস দুজনে!"

কথায় কাজ হয়। দুজনে চেয়ারে বসে। রজতাভ কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলেন, “ওয়েল! তুমিই তাহলে অভীক?" ছেলেটা মাথা নাড়ে। রজতাভ এবার গম্ভীর গলায় বলেন, “দেখো ছেলে যেহেতু আমি আর্মিতে ছিলাম সেকারনে টাইম মেন্টেন করতে পছন্দ করি। সময়ের অপচয় করা, পাংচুয়াল না হওয়া আমার পছন্দ হয় না। ঐশ্বর্যও আমার মতোই পাংচুয়ালিটি মেন্টেন করতে পছন্দ করে। কালরাত থেকে এখানে আসা পর্যন্ত ওর মুখে তোমার ব্যাপারে যতটুকু শুনেছি তাতে বুঝেছি তুমি এমনিতে পাংচুয়াল হলেও মাঝে মাঝে দেরী করো। এটা কিন্তু ভালো কথা নয়। ইউ শুড বি মোর কনসার্নড অ্যাবাউট দিস! তবে যেহেতু এটা আমাদের প্রথম দেখা তাই তোমাকে আমি অ্যালাউ করছি। তাছাড়া আমার মনে হয়েছে দেরী করার যথেষ্ট কারন তোমার কাছে আছে। আর আমার মনে হয় তোমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা সুযোগ দেওয়া যেতে‌ পারে। সো টেল আস অভীক! কী এমন কারন ছিল যে তোমার প্রায় আধঘন্টা লেগে গেল?”

ঐশী ফুঁসে উঠল, “একদম ওর কথা বিশ্বাস করবে না বাপি! প্রতিবার একই এক্সকিউজ দেয়। জানো গতবার কী বলেছিল?” হাতের ইশারায় মেয়েকে থামিয়ে রজতাভ বলেন, “আহ একটু চুপ কর! ওকে বলতে দে! হ্যা অভীক বলো।”

অভীক এতক্ষণ মাথা নীচু করে ছিল। রজতাভর কথায় মাথা তুলে বলে, “আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি স্যার!”

-“আঙ্কল! ইউ ক্যান কল মি আঙ্কল।”

-“‌ ওকে। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি ফর‌ বিইং লেট অন আওয়ার মিটিং। আসলে আমি ঠিক সময়ই বেরোব বলে অফিস থেকে হাফটাইমের পর লিভ নিয়েছিলাম। যেই আমি অফিস থেকে বেরোব অমনি মায়ের কল। হঠাৎ কাউকে না বলে কয়ে মা চলে এসেছে এখানে। আমি পড়লাম মহাবিপদে! একদিকে আপনারা আমার অপেক্ষায়। অন্যদিকে মা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। কী করব ভাবছি এমন সময় মা-ই উপায় বলে দিল। মা জানতো আমাদের আজকের মিটিংয়ের ব্যাপারে। মা বলল, “এককাজ কর তুই আমাকে এখান থেকে পিকআপ করে নিয়ে চল রেস্তরাঁতে। আমিও ঐশীকেই দেখতে এসেছি। এক যাত্রায় পৃথকফল হবে কেন? তারচেয়ে বরং ঐশীদের সাথে আলাপটাও সেরে নেব।”

কথার মাঝপথে অভীককে থামিয়ে দেন রজতাভ, “সেকি! তোমার মাও তোমার সাথে এসেছেন নাকি?”

অভীক মাথা নাড়তেই রজতাভ বলে ওঠেন, “সেকি! উনি কোথায়?বাইরে দাঁড়িয়ে নাকি? কি আশ্চর্য! তাকে সাথে করে নিয়ে আসবে তো!”

ঐশী পাশ থেকে ফুট কাটে ,“সাধে বলি? ক্যালাস!”

অভীক হেসে বলে, “অতোটাও নই! মাকে নিয়েই এখানে ঢুকেছি। ঐ তো! আপনাদের পিছনের টেবিলে মা বসে আছে।”বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যায় রজতাভদের পিছনের টেবিলে। টেবিলে বসা মহিলাকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটে ঐশী। ইশ! ভদ্রমহিলা একেবারে ওদের পাশাপাশিই বসেছিলেন, আর সে কিনা ওনার সামনেই ওনার ছেলেকে যা নয় তা বলে যাচ্ছিল! ভদ্রমহিলা হাসতে হাসতে টেবিলের সামনে এসে বললেন, “আহা! আবার আমাকে টানছিস কেন? বেশ তো চলছিল। আরেকটু চললে জমে যেত। খামোখা মজাটা নষ্ট করলি!” 

অভীক বলে ওঠে,“ আঙ্কল আলাপ করিয়ে দিই। ইনি আমার মা সুজাতা চৌধুরী। মা ইনি ঐশীর বাপি কর্নেল রজতাভ মজুমদার।” দুজনে দুজনকে নমস্কার জানান।

ঐশী‌ কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ সরি আন্টি! মানে আমি বুঝতে পারি নি আপনি এইভাবে...! আর অভীকও তো কিছু বলেনি!”

সুজাতা হেসে বললেন, “ওর কোনো দোষ নেই। আসলে তোমাদের সারপ্রাইজ দিতে আমিই কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে এসেছি! তবে এসে ভালোই হল দেখছি! এখানেও ওকে শাসন করার‌ লোক আছে দেখছি! যাক নিশ্চিন্ত হলাম! এই মেয়ে! একদম লজ্জা পাবে না! অভীক আমার ছেলে হলে কী হবে? ঠিক ওর বাবার মতোই জাত কুঁড়ে হয়েছে ও। জানো আমাদের বেলা তো আর এখনকার মতো ডেট, মিটিং হত না। আমাদের সময় ডেটের মানে সিনেমা দেখা, পার্কে যাওয়া। সেইসময়ও ওর বাবা এইরকমই দেরী করতো। আর আসার পর নানারকম অজুহাত দিতো। আমি নাহয় সহ্য করেছি তুমি কিন্তু একদম ‌সহ্য করবে না! এই আমি পারমিশন দিলাম গরুর গাড়িতে গরু বেচাল হলে যেরকম গারোয়ান গরুর ল্যাজ মুচড়ে দেয় তুমিও বেগোড়বাই দেখলে কানটা মুলে দেবে! বুঝেছ?” 

ঐশী ফিক করে হেসে মাথা নেড়ে বলে, “বেশ! ও নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না আন্টি! আমার হাতে যখন পড়েছে চটপটে করেই ছাড়ব।”

অভীক চারদিকে তাকিয়ে বলে, “মা প্লিজ! তুমি এখানে ঐশীকে দেখতে এসেছ নাকি আমার শাসনভার তুলে দিতে এসেছ?”

সুজাতা হেসে চেয়ারে বসে বলেন, “চুপ কর তো! যা করেছি বেশ করেছি!এতদিনে নিশ্চিন্ত আমি। যোগ্য লোকের হাতেই পড়েছিস‌ তুই! তোর জন্য ঐশীই ঠিক আছে। ওই পারবে তোকে শুধরোতে। কিন্তু একটা জিনিস বুঝছি না এত মিষ্টি একটা লক্ষ্মীমন্ত‌ মেয়ে তোর মতো অলসের পাল্লায় পড়ল কী করে?” বলে ঐশীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন তিনি।

এবার রজতাভ বলে ওঠেন ,“ওভাবে বলবেন না! আমাদের অভীকও বেশ ভালো ছেলে! অন্তত ওকে যতটা দেখছি। ওর ব্যাপারে যতটা শুনেছি তাতে বলব আজকালকার যুগে এরকম রত্ন খুবই কম পাওয়া যায়। হ্যা দোষের মধ্যে ও একটু অলস। তাতে কী?ওর লেখা, ওর ছবিতোলার হাতও বেশ ভালো। তাছাড়া ভুল করে সেটা স্বীকার করার সৎসাহসও আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে বেশি দেখি না। সেখানে সামান্য দেরী করার জন্য এতটা হনেস্ট কনফেশন দিয়েছে বেচারা। ওর আর লেগপুলিং করবেন না প্লিজ!”

ঐশী বলে ওঠে, “বাপি! তুমি কিনা শেষে দলবদল করছ? এই একটু আগে ওকে টাইম মেন্টেনিং নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছিলে এখন ওরই সাইড নিচ্ছ?”

রজতাভ হেসে বলেন, “মোটেই না। আমি শুধু ভালোটা বলছি। তুই তো কালরাত থেকে ওর ব্যাপারে বার বার বলে যাচ্ছিস! ‘বাপি জানো অভীক ছেলেটা মন্দ নয়...', ‘বাপি!অভীকের তোলা ছবি! কী সুন্দর লাগছে না আমাকে?’,‘বাপি এই যে অভীকের পেজ! দেখো কী ভালো লেখা! রিসেন্ট লেখাটা পড়ছি শোনো!’ আমার তো কান পঁচে যাবার জোগাড়। কিন্তু এখানে এসে দেখছি ছেলেটাকে সমানে লেগপুলিং করে যাচ্ছিস তুই! এতটা খিল্লি ও ডিজার্ভ করে না তাই বললাম। একি তুমি দাঁড়িয়ে কেন? বসো!” বলতেই অভীক চেয়ার টেনে রজতাভর পাশে বসে। 

ঐশী লজ্জা পেয়ে বলে, “বাপি!স্টপ! এটা পাবলিক প্লেস!”

এবার ফুট কাটে অভীক, “কেন এটা এতক্ষণ মনে ছিল না?” অভীকের কথা শুনে রজতাভ আর সুজাতা এবার হোহো করে হেসে ফেলেন। 

কিছুক্ষণ হাসিঠাট্টার পর ছেলে-মেয়ে দুজনকে একা ছেড়ে দিয়ে আলাদা টেবিলে বসেন দুজনে। চেয়ারে বসে সুজাতা বলেন, “সত্যিই এখানে না এলে আমি অনেক কিছু মিস করে যেতাম! তবে এখন আমি নিশ্চিন্ত জানেন? আমার ছেলেটা বাড়ি থেকে এতদুরে থেকেও অযত্নে নেই। ওকে দেখার লোকও আছে এই শহরে। আসলে ছেলেবেলা থেকে আমিই ওকে আগলে রেখেছি তো! বুঝতেই পারছেন।‌ ভীষণ আদরে মানুষ!”

রজতাভ হেসে বলেন, “জানি! বাবা-মা হল সন্তানের কাছে ছাদের দুটো স্তম্ভের মতো। একটা স্তম্ভ সরে গেলে পুরো নড়বড়ে ছাদের ভার অপর স্তম্ভের উপর পড়ে যায়। আপনার ছেলের মতো আমার মেয়েটারও ভাগ্য এক!অভীক তো তাও বাবার স্নেহ পেয়েছে পাঁচটা বছর। আমার মেয়েটা তো মায়ের আদর কাকে বলে জানেই না। জন্মের পর থেকে ওর কাছে আমিই বাবা, আমিই মা। তবে আপনার ছেলের মেধা, বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। তারচেয়েও বেশী প্রশংসনীয় আপনার গাইডেন্স! আজকালকার দিনে বাবা-মায়েরা কম্পিটিশনের দৌড়ে সন্তানকে মানুষ করাই ভুলে গেছে। একটা টিয়াপাখি পোষা আর সন্তানকে মানুষ করা সমার্থক হয়ে গেছে। সন্তানকে আর কিছু হোক না হোক প্রথম হতেই হবে। কত সন্তান যে এভাবে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে তার হিসেব নেই। কিন্তু আপনি তা হতে দেন নি! নিজের আদর্শে মানুষ করেছেন ছেলেকে। আজকালকার যুগে সিঙ্গল প্যারেন্টিং ভীষণ কষ্টকর। আর বহুল চর্চিতও বটে। আমি নিজে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মেয়েকে মানুষ করা সহজ নয়। কিছু কিছু সময় মেয়ের মাকেও প্রয়োজন হয়।‌ বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির সময়।‌ কিন্তু আমার মেয়েটার কপাল এত খারাপ কাউকে পাশে পায়নি ও। এমনকি ওর প্রথম পিরিয়ডের খবরও আমি টের পাই দুদিন পর। যন্ত্রণা, রক্তপাত লুকিয়ে দিব্যি হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল মেয়েটা। শেষে একদিন থাকতে না পেরে বাথরুমে অজ্ঞান হয়ে যায়। সে এক কান্ড! বলতে গেলে সারা দিন চলে যাবে। আমার মেয়েটা বরাবরই এরকমই! হাজার যন্ত্রণা পেলেও মুখ ফুটে বলবে না। আমি এমন একজন ছেলে চেয়েছিলাম যে আমার মেয়েকে বুঝবে, আমার মতোই আগলে রাখবে। আর অভীকই ‌সেই ছেলে আমি হলফ করে বলতে পারি। আমি মানুষ চিনতে পারি সুজাতাদেবী! আর আপনার ছেলেকে দেখে বুঝেছি এ ছেলে লাখে এক। হাজার আঘাত পেলেও আমার মেয়ের হাত ছাড়বে না। কাল যখন আমরা থাকবো না ওরা একে অপরকে ঠিক সামলে নেবে।”

সুজাতা রজতাভর দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমারও তাই মনে হয় জানেন? সেই কারনেই আমি এখানে এসেছি।”

রজতাভ এতক্ষণ ছলছলে চোখে তাকিয়েছিলেন মেয়ের দিকে। সুজাতার কথা শুনে সরাসরি তাকান।

সুজাতা ধীর কন্ঠে বলেন, “আমি চাই আমরা থাকতে থাকতেই ওদের পায়ে শেকল বেঁধে চারহাত এক করে দিতে। না মানে এখনই নয়। আগে ওরা নিজের পায়ে দাঁড়াক, প্রতিষ্ঠিত হোক। তারপর না হয় ওদের বিয়েটা হবে! তবে বেশী দেরী না করাই মঙ্গল। কারন ওরা যতই আমাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হোক না কেন আসলে তো আধুনিক যুগের ছেলেমেয়ে! এই প্রেম, তো এই ব্রেকআপ। কাজেই আমি চাই ওদের এক করে দিতে। ”

রজতাভ হেসে বলেন, “আইডিয়াখানা মন্দ নয়! আমিও এরকমই কিছু ভেবেই এসেছিলাম এখানে।‌ তেমন হলে আপনার সাথে যোগাযোগ করতাম। একদিকে ভালোই হল আপনি এলেন।”

-“তাহলে আপনার মেয়েকে আমার কোলে তুলে দিচ্ছেন তো?”

-“হুম। বেশ দিলাম! তবে দুটো শর্তে!”

-“কী শর্ত?

-“প্রথমত, আপনার ছেলেকে আমার কোলে দিতে হবে। মানে বিয়ে করে আপনার ছেলে যেমন আপনার কাছে মেয়ে নিয়ে যাবে। তেমনই আপনার ছেলে বিয়ের পর আমার ছেলের মতো আদর পাবে। 

-“বেশ! আর দ্বিতীয় শর্ত?”

-“আপাতত আজ রাতটা আপনাদের মা ছেলেকে আমার বাড়িতে কাটাতে হবে।”

এবার সুজাতা নড়ে বসেন, “সে কি কথা! না না কোনো দরকার নেই! আমি এসেছি একদিনের জন্য,আজ রাতটুকু থাকবো কাল সকালের বাসে ফিরে যাবো। শুধু শুধু আপনাদের কষ্ট হবে। আমি অভীকের কলেজেই গার্জেন কোয়ার্টারে থেকে যাব। একটা রাতের তো ব্যাপার!”

রজতাভ হেসে বলেন, “কোনো কষ্ট হবে না। আমাদের বাড়িটা এমনি ফাকাই পড়ে থাকে। বলতে গেলে আমরা বাপ-বেটিতে হানাবাড়িতে থাকি। চলুন না! আজ না হয় গল্প করে কাটাবো সবাই মিলে। লোকজন থাকলে বাড়িটাও সরগরম থাকবে। তাছাড়া আপনি আমাদের অতিথি কাম আমার হবু বেয়ান। এটুকু যদি না করতে পারি তাহলে কী করলাম?তাছাড়া ঐশীও ভীষণ খুশি হবে। ঐশীর জন্য চলুন প্লিজ!”

বলে ঐশীদের ডেকে প্রস্তাবটা দিতেই অভীক একটু কিন্তু কিন্তু করতে থাকে।‌ ঐশী এককথায় রাজি হয়ে খুশিতে ওর বাপিকে জড়িয়ে ধরে। তারপর বলে, “ সাউন্ডস গুড! এই কারনে বাপিকে আমি এত্তটা ভালোবাসি! প্লিজ আন্টি চলুন না! আমাদের বাড়িতে নাহয় আজ রাতটা থাকবেন! আমার রুমে কোনো অসুবিধে হবে না আপনার। তেমন হলে কাল সকালে আমি নিজে আপনাকে বাইকে করে বাসে তুলে দেবো! প্লিজ আন্টি না বলবেন না!”

ঐশীর আবদারে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন সুজাতা। তারপর অবশেষে মৃদু হেসে বলেন , “বেশ! চলো।"

(চলবে...)


সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...