অনুসরণকারী

বুধবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ ষোড়শতম পর্ব


অভীককে চুপ করে বসে থাকতে দেখে রজতাভ এবার ডাইরিটা টেবিলে আছড়ে ফেলে গর্জে ওঠেন, “কী হল? বলো তুমি এ ডাইরি কোথায় পেলে?”

রজতাভর চিৎকারে চমকে উঠলেন সুজাতা। অভীক আর ঐশী নিরুত্তাপ ভাবে দেখতে লাগল দুজনের মুখের অভিব্যক্তি। রাগে, ক্ষোভে থরথর করে কাঁপছেন রজতাভ। সুজাতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার?আপনি ওভাবে কথা বলছেন কেন? কী করেছে ও? কী লেখা আছে ডাইরিতে?" বলে ডাইরিটা হাতে নিয়েই নিস্তব্ধ হয়ে যান। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায় তাঁর। অভীক একবার সুজাতার দিকে তাকায় তারপর বলে, “ ব্যাপারটা কী? তোমরা দুজনেই এরকম রিঅ্যাক্ট করছ! এমন কী লেখা আছে ওটায়?”

- ন্যাকা সাজবে না! তুমি জানো না কী লেখা আছে ওটায়?

গর্জে ওঠেন রজতাভ। এবার আসরে নামে ঐশী।

- বাপি! তুমি এভাবে ওকে অ্যাকিউজ করতে পারো না। কি হয়েছেটা কী?কী লেখা আছে ডাইরিতে যে তোমরা এরকম বিহেভ করছ?

- ওতে...ওতে... আমি বলতে পারব না!

- বেশ তাহলে আমি নিজেই পড়ে দেখব।

বলে ঐশী সুজাতার হাত থেকে ডাইরিটা নিতে গেলে রজতাভ বাধা দিয়ে বলেন,

- না তুমি ঐ ডাইরি পড়বে না!

- কেন?

- আমি বলছি তাই!

- আমিও তো তাই জানতে চাইছি! কেন?

- সবসময় মুখে মুখে তর্ক করবে না ঐশ্বর্য!

- কেন বাপি? আমার মায়ের শেষ ডাইরি, শেষ স্মৃতি কেন পড়তে পারবো না?

- আমি বলেছি বলে পড়বে না! তুমি আমার কথা শুনতে বাধ্য।

- সরি বাপি! আমি ডাইরিটা পড়বোই!

- ঐশ্বর্য! আমি তোমার বাবা! আমি বলছি যখন তুমি ঐ ডাইরি পড়বে না, তখন তুমি ঐ ডাইরি পড়বে না! আর এটা আমার অর্ডার!

- সরি বাপি, বিয়ের আগে আমি শুধু তোমার মেয়ে ছিলাম। এখন বিয়ের পর এ বাড়ির বউ হয়ে গেছি। এখন আমার স্বামী আর আমার শাশুড়ির অর্ডারই আমার কাছে শেষ কথা। তোমার অর্ডার মানতে আমি বাধ্য নই।

- ঐশী!

রজতাভর কথাকে পাত্তা না দিয়ে ঐশী ডাইরিটা নিয়ে পড়তে শুরু করে।

"১৬ই মার্চ ২০০১

আজ আমি ভীষণ খুশি! এতবছর পর আমার নারী জন্মের সার্থকতা খুঁজে পেলাম। এতবছর ধরে রজত আমার কাছে যা চেয়েও পায়নি সেটাই দিতে চলেছি ওকে। হ্যা, ঈশ্বরের কৃপায় একটা ছোটো প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে আমার ভেতরে। আমি মা হতে চলেছি! রজত এখনও জানে না। ওকে এখন খবরটা দেবো না। আপাতত সারপ্রাইজ রাখবো..."

ডাইরির পাতা উল্টে পড়তে থাকে ঐশী। প্রতিটা পাতায় ধীরে ধীরে ঊর্মির মাতৃত্বের বিকাশ, এবং সেটার অনুভূতি লেখা। এই লেখা সে আগে পড়লেও নির্বিকার ভাবে পড়তে থাকে। ক্রমশ পড়তে পড়তে শেষ পাতায় এসে থামে সে। জন্মদিনের ঠিক দুদিন আগের পাতাটা পড়তে শুরু করে সে।

"৯ ডিসেম্বর ২০০১

আজ আমার ভালোবাসার উপর থেকে, বন্ধুত্বের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেল। রজতকে দুরে সরিয়ে রেখেছিলাম ওর ভালোর জন্যেই, কিন্তু সেই দুরে রাখার শাস্তি হিসেবে ও আমাকে এতবড়ো আঘাতটা দেবে ভাবতেও পারিনি। এতবছর হয়ে গেল আমাদের বিয়ের কিন্তু ওকে আমি চিনতেই পারিনি। মানুষ চিনতে গিয়ে ঠকে গেলাম আমি। রজত যখন আমাকে সবটা জানাল তখন মনে হচ্ছিল ও বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলে আমাকে রাগিয়ে মজা নিচ্ছে। কিন্তু যখন বুঝলাম যে ও যা বলছে তার একবর্ণও মিথ্যে নয়, তখন মনে হচ্ছিল এর চেয়ে ও মরে গেলেই ভালো হত। সুজাতাকে আমি কোনো দোষ দেব না কারন আমি ওকে ভালো করে চিনি। ওকে বাধ্য না করা হলে এই পাপে লিপ্ত..." হোয়াট?

বলে সুজাতার দিকে তাকিয়ে ঐশী অবাক হবার ভান করে। সুজাতা মাথা নামিয়ে ফেলেন। ঐশী আবার পড়তে শুরু করে।

“ওকে বাধ্য না করলে এই পাপে ও লিপ্ত হত না। ওর প্রতি আমার কোনো রাগ, বা ঘৃণা নেই। আক্ষেপ শুধু একজায়গায়, একজন চরিত্রহীন, লম্পট, নোংরা মানসিকতার মানুষের সন্তানকে আমি গর্ভে ধারন করেছি। ইচ্ছে করছে নিজেকে শেষ করে দিতে। কিন্তু না! আমাকে বাঁচতে হবে। আমার গর্বের সন্তানের জন্য আমাকে বাঁচতে হবে। তার কোনো দোষ নেই, সে তো আর জানে না তার পিতা কতটা নোংরা! তাকে জানতেও দেব না আমি!ঐ মানুষটার ছায়াও আমার সন্তানের উপর পড়তে দেব না আমি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দুরে চলে যাবো আমি। ঐ মানুষটার থেকে অনেক দুরে।"

- স্টপ ইট! স্টপ দিস ননসেন্স! অনেক হয়েছে আর না!

বলে চিৎকার করে ওঠেন রজতাভ। ঐশী ডাইরি পড়া থামিয়ে রজতাভর দিকে তাকায়। রজতাভর ফরসা মুখটা টকটকে লাল হয়ে গেছে দেখে জিজ্ঞেস করে, “কী হল বাপি? ওরকম করছো কেন? শরীর খারাপ হল নাকি?”

রজতাভ রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে ঐশীর হাত থেকে ডাইরিটা কেড়ে নিয়ে হিসহিসে গলায় বলেন, “অনেক হয়েছে! আর পড়তে হবে না!” 

আচমকা ডাইরিটা কেড়ে নেওয়ায় ঐশী চমকে উঠলেও পরক্ষণেই প্রতিবাদ করে ওঠে, “আরে ডাইরিটা নিয়ে নিলে কেন?এখনও তো শেষ লাইনটা পড়া হয়নি!”

- আর পড়তে হবে না!

- কী ব্যাপার বাপি? তুমি এরকম বিহেভ করছো কেন?একটা ডাইরি নিয়ে এতটা রিঅ্যাক্ট করার কি আছে বুঝতে পারছি না।

- বুঝতে হবে না তোমাকে! তুমি আর ঐ ডাইরি পড়বে না! আর ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও। কাল সকালে আমরা ফিরবো।

- ফিরবো মানে? কোথায় ফিরবো?

- বাড়ি ফিরবো আমরা। কাল সকালেই ফিরবো।

- সেকি! এত তাড়াতাড়ি! এই তো সেদিন এলাম!

- আমি কিছু জানি না! কাল সকালেই আমরা ফিরছি!

- সোজা সোজা বলুন না! সত্যিটা জানাজানি হবার পর আর‌ মুখ দেখানোর জায়গা রইল না বলে পালাতে চাইছেন।

ঘোলাটে চোখে রজতাভর দিকে তাকিয়ে অভীক মৃদু হেসে ওঠে। অভীকের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকান রজতাভ। সুজাতাও তাকান ছেলের দিকে। অভীক তখনও পাগলের মতো হেসে চলেছে। রজতাভ দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,“শাট আপ! কি যাতা বলছ তুমি?
- যেটা দেখতে পাচ্ছি সেটাই বলছি। কবে কোন ডাইরিতে ঐশীর মা কী লিখে গেছেন তা নিয়ে আপনাদের দুজনের ব্যবহারটা সন্দেহের সৃষ্টি করে বৈকি। তাছাড়া আপনার আচমকা এই উগ্র ব্যবহারে তো সেই সন্দেহটা আরো দৃঢ় হচ্ছে যে ডাইরির লেখাগুলো সত্যি।

- তোমার সন্দেহ ভুল! এরকম কোনো ঘটনা কোনোদিনও ঘটেনি। ঊর্মি এসব উল্টোপাল্টা কেন লিখে গেছে জানি না আমি!

- তাহলে তুমি এরকম ব্যবহার কেন করছ বাপি? কেন তুমি আমাকে নিয়ে কাল ফিরে যেতে চাইছ? কেন তুমি অভির সাথে এরকম ব্যবহার করছ?

ঐশীর প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে রজতাভ বলে ওঠেন,

- ঐশী! তোমার বিয়ে হয়ে গেছে মানে এই নয় যে তুমি তোমার বাপির মুখে মুখে তর্ক করবে! এত সাহস তোমার হয় কী করে?

অভীক বলে ওঠে, “সত্যি কথা জানাজানি হলে এইভাবেই বকে,ধমকে সেটাকে চাপা দেওয়া হয় ঐশী। বাদ দে, তোর বাপি যখন বলছেন তখন কটাদিন তুই বরং তোদের বাড়ি ঘুরেই আয়।”

অভীকের কলার ধরে একঝটকায় সোফা থেকে দাঁড় করিয়ে দেন রজতাভ। হিসহিসে কন্ঠে বলে ওঠেন, “হাউ ডেয়ার ইউ! আমারই বিরুদ্ধে আমার মেয়েকে দাঁড় করাবার সাহস কী করে হয় তোমার? যে মেয়ে কোনোদিন আমার কথার পিঠে কথা বলত না, সেই মেয়ে আজ মুখে মুখে তর্ক করছে!”

নিজের কলার ছাড়িয়ে অভীক ফুঁসে ওঠে, “কারন ও আজকে সত্যিটা জানতে পেরেছে! ইনফ্যাক্ট অনেক আগেই জানতে পেরেছে! আমাদের বিয়ের দিনই আমরা জানতে পেরেছিলাম আপনাদের সত্যিটা। আমরা বিশ্বাস করিনি লেখাটাকে। কিন্তু আজ আপনার ব্যবহার আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে যে ডাইরিতে লেখা প্রতিটা বর্ণ সত্যি। কি তাইতো? লেখাটা যদি সত্যি না হত তাহলে এতটা বিচলিত আপনি হতেন না। লেখাটা সত্যি বলেই আপনি এতটা উগ্র বিহেভ করছেন!”

ঐশী বলে, “ অভীকের সাথে আমি সহমত বাপি। তাও একটা দোলাচল মনের ভিতর ছিল যে আমার বাপি এরকম হতে পারে না। কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে মাম্মাম যা লিখে গেছে তা সত্যি। যদি তাই না হয় তাহলে এত অ্যাগ্রেসিভ বিহেভ করতে না। সত্যি করে বলো তো বাপি, মাম্মাম যা লিখে গেছে তা কি সত্যি?”

অভীক আর ঐশীর প্রশ্নবাণে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েন রজতাভ। অসহায় দেখায় সুজাতাকেও। ঐশীর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অসহায় চোখে সুজাতার দিকে তাকান রজতাভ। দেখেন সুজাতা লজ্জায়, দুঃখে প্রায় মাটিতে মিশে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলেছেন। ক্রমশ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পর রজতাভ নিরুপায় হয়ে বলে ওঠেন, “বেশ সত্যিটা যখন তোমরা জানতে পেরেছ তাহলে আমার দিক থেকেও সম্পুর্ণ ঘটনাটাও তোমাদের জানা দরকার। হ্যা, ডাইরিতে যা লেখা আছে সব সত্যি। তবে ডাইরিতে তোমরা যতটুকু পড়েছ তা ঊর্মির দৃষ্টিভঙিতে। আসল ঘটনা অন্য ছিল। সেটাও তোমাদের জানতে হবে। একজন ফাঁসীর আসামীও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়। তোমাদের কাছে সেই সুযোগটুকু চাইব। সবটা জানার পর তোমাদের বিচারে যদি আমি দোষী হই তাহলে যা শাস্তি দেবে মাথা পেতে নেব। শুধু একটা কথা, ঐ মানুষটাকে তোমরা কিছু বলবে না! ওই মানুষটা নির্দোষ, সব দোষ আমার!”

(চলবে...)

শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ পঞ্চদশতম পর্ব




অভীক ধরা গলায় বলে, “ডাইরিটা কার?”

- আমার মাম্মামের। বাপির কাছে শুনেছি মাম্মান নিয়মিত ডাইরি মেন্টেন করত। রোজকার ছোটোখাটো ঘটনা, মুহূর্ত,ভাবনা-চিন্তা লিখে রাখত ডাইরিতে।

- ডাইরিতে আমার বাবা-মায়ের কথা কেন লেখা? তোর বাপি-মাম্মাম কি আমার বাবা-মাকে চিনত?

- তুই পড়েছিস?

- কেন তুই পড়িসনি?

- পড়েছি। কিন্তু তোর মা-বাবাকে আমার বাপি-মাম্মাম কীভাবে চিনত এটা আমিও জানি না। বাপি কোনোদিনও আমাকে জানায়নি।

- কিন্তু চিনত সেটা তো এই ডাইরিতে পরিস্কার। শুধু তাই নয় আমার মায়ের সাথে তোর বাপির...

কথাটা বলতে গিয়ে থমকে যায় অভীক। ঐশী চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। অভীকের অবস্থাটা সে বুঝতে পারে। আসলে ব্যাপারটা এতটাই স্পর্শকাতর যে ডাইরিটা পড়ার পর ওর নিজেরই বিশ্বাস হয়নি। এতদিন ধরে দেখে আসা পৃথিবীটা সম্পুর্ণভাবে পাল্টে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল কেউ যেন সপাটে চড় কষিয়ে দিয়েছে।  অভীককে সামলানোর সময় দেয় সে। অভীক কিছুক্ষণ পর বলে, “আচ্ছা এটা তোর মাম্মামের ডাইরি তুই শিওর তো?”

-মানে?

- না মানে হতেই তো পারে, কেউ...

- কেউ আমাদের বাবা-মায়েদের নিয়ে কেচ্ছা লিখে রেখে গেছে! 

অভীকের কথার সূত্র ধরে ঐশী বলে ওঠে, “কিন্তু তাতে কার কী লাভ বলতে পারিস? আর কেচ্ছা যদি রটাতে বা জানাতেই হত তাহলে খামোখা ডাইরিতে কেন লিখে যেত? ডাইরিটা আমি আমার বাপির স্টাডিতে এমন জায়গায় পেয়েছি যেখানে মানুষের হাত পৌঁছনো অসম্ভব। ডাইরিটার অবস্থা দেখ একবার। দেখেই বোঝা  যাচ্ছে ডাইরিটা যেই লিখুক সে চায়নি ডাইরিটা অন্য কারো হাতে পড়ুক। তাই ডাইরিটা লুকানো ছিল। তাছাড়া ডাইরির শেষ লেখাটায় যা, সেখানে যে ডেটটা আছে সেটা আমার জন্মের দুদিন আগের ডেট। ডাইরিটা যদি মাম্মাম না লিখে থাকে তো কে লিখেছে?বাপি? কেন? খামোখা তোর মাকে জড়িয়ে এরকম একটা বিষয় নিয়ে কেন লিখতে যাবে? তাও মাম্মামের পয়েন্ট অফ ভিউ দিয়ে? কী লাভ? এতে তো বাপিরই বদনাম হবে! আর বাপিকে যতদুর চিনি বাপি কোনো সাহিত্যিক বা রাইটার নয় যে এভাবে রসিয়ে মিথ্যে লিখবে। তাছাড়া আমি মাম্মামের হাতের লেখা চিনি।  আমার এতটাও ভুল হবার কথা নয়। মাম্মামের ডাইরিতে মাম্মামের নাম মলাটে লেখা থাকতো। মাম্মামের সব ডাইরি আমার পড়া। প্রতিবছর জন্মদিনে বাপি একটা করে ডাইরি দিতো আমাকে।”

“তাও আমি বিশ্বাস করি না! আমার মা...” বলে থমকে যায় অভীক। মাথা নামিয়ে ফোপাতে থাকে।

ঐশী ডাইরিটা টেবিলে রেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অভীকের মাথা চেপে ধরে নিজের বুকে। অভীকের চুলে হাত বুলিয়ে বলে, “প্রথমবার পড়ার পর আমারও বিশ্বাস হয়নি। যে বাপিকে এতবছর ধরে চিনি, সেই মানুষটার এই রূপ জানার পর আমারও পৃথিবীটা পাল্টে গিয়েছিল অভীক। কিন্তু কথাগুলো যে লিখেছে সে মানুষটাও যে অনেকবছর হল মৃত। নিজের মৃত্যুশয্যায় শুয়ে এই কথাগুলো লিখে গেছে। সেই কথাগুলো অবিশ্বাস করি কী করে বলতো?”

- আমি জানি না। কিন্তু ঐ ডাইরিতে লেখা সুজাতা আমার মা নয়! আমার মা হতে পারে না!

ঐশীর বুকে মুখ লুকিয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে অভীক। ঐশী অভীককে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিতে থাকে।

*****
বিকেলবেলায় চা খাবার জন্য ঐশী ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে পা বাড়াতেই বৈঠকখানায় বাপির কন্ঠস্বর শুনে থমকে যায়। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে বৈঠকখানায় উঁকি দিতেই দেখে রজতাভ সোফায় বসে সুজাতার সাথে কথা বলছেন। বাপিকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য মনটা নেচে উঠলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলায় ঐশী। ইচ্ছে করলেও বৈঠকখানায় এখনই ঢোকা সমীচিন মনে করে না সে। দরজার পাশ থেকে আড়ি পেতে শুনতে থাকে রজতাভদের কথা।

টেবিল থেকে চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিয়ে রজতাভ বলেন,“বোধহয় একটু অসুবিধেতে ফেলে দিলাম আপনাদের। তাই না?”

সুজাতা পাশের সোফায় বসে বলেন, “ওরকম করে বলবেন না। আপনি আমাদের কুটুম। ঐশীর বাবা। আপনি যখন খুশি আসতে পারেন। ঐশী যতই আমার পুত্রবধু হোক না কেন,আপনার মেয়ে তো! মেয়ের কাছে বাবা এলে কোনো অসুবিধে কেন হবে?”

- কেমন আছে ঐশী? আপনার কোনো অসুবিধে করছে না তো?

- নাহ! বরং আজ দুপুরে আমাকে বাড়ির কাজে, রান্নায় সাহায্য করেছে। অভী তো এখানে আসার পর থেকেই বন্ধুদের কাছে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। মায়ের সাথে কথা বলার সময় কোথায়?

- কোথায় ওরা?

- ঘুমোচ্ছে। এই ঘন্টাদুয়েক হল দুপুরের ভাত খেয়ে শুয়েছে। আমি আর ডাকিনি।

- এহে! তাহলে তো ভুল সময় এসে পড়লাম। আপনিও তো বোধহয় বিশ্রাম নিতেন।

একটু বিব্রত দেখায় রজতাভকে। ম্লান হেসে সুজাতা বলেন,

- আমার আবার বিশ্রাম! দুপুরে আমি ঘুমোই না রজতদা। সে অভ্যেস আমার কোনো কালেই ছিল না। বরাবর খেয়েদেয়ে বই পড়েই দুপুরটা কাটিয়ে দিই।

- সে আবার জানি না? সেবারই তো...

বলেই থমকে যান রজতাভ। সুজাতা হেসে বলেন, “ সেবারই তো বইমেলায় একগাদা বই কেনায় আপনি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। শেষে ঊর্মি যখন জানালো যে আমারও বই পড়ার শখ আছে তখন আপনি বলেছিলেন...

- এখানেও জুড়িদার আছে! 

সুজাতার কথার খেই ধরে স্মৃতি রোমন্থন করেন রজতাভ। তারপর মৃদু হেসে বলেন, “কতবছর আগের ঘটনা! অথচ‌‌ মনে হচ্ছে যেন এই সেদিন ঘটেছে।‌ জানেন? আজও চোখ বুঁজলে আমি দেখতে পাই পাহাড়ে সেই পিকনিকে অন্যদলের সাথে গানে মেতে‌ ওঠা আমরা, কাজিরাঙার সেই নাচের আসর। সব জীবন্ত, সব ঝকঝকে! কিন্তু চোখ খোলার পর সব হারিয়ে যায়। মনে হয় মানুষগুলো না থাকলেও স্মৃতি থেকে গেছে একরাশ। মাঝখান থেকে তেইশটা বছর কীভাবে যেন কেটে গেছে।”

মৃদু হাসেন সুজাতা, “তা আর বলতে! আমার তো এখনও বিশ্বাস হয় না আমার অভিটার বিয়ে হয়ে গেছে।” বলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন,“পাঁচটা বাজতে চলল, দাঁড়ান ওদের ডেকে দিচ্ছি। দেখবেন আপনাকে দেখে ঐশী ভীষণ খুশি হবে।” বাধা দেন রজতাভ।

- না থাক! ডাকার দরকার নেই। নিজেই উঠুক ওরা। খামোখা ওদের বিব্রত‌ করে লাভ নেই।‌ বুঝতেই পারছেন ইয়ং ছেলে-মেয়ে,তার উপর সদ্য বিবাহিত। সারাদিন পর একটু কাছে আসার সময় পেয়েছে। এসময় ওদের ডিস্টার্ব না করাই ভালো। 

সুজাতা হেসে ফেলেন রজতাভর কথা শুনে। তারপর সোফায় হেলান দিয়ে বলেন, “চা-টা কেমন হয়েছে?"

- ফাইন!তবে অনেকদিন পর অন্যের হাতে খেলাম বলেই হয়তো অন্যরকম ‌লাগছে। আসলে আগের মতো আর রান্না পারি না। কোনোমতে মুখে দেওয়ার যোগ্য দুটো খাবার বানিয়ে খেয়ে নিই।

- আপনি বলছিলেন এখানে শুধু ঐশীর সাথে দেখা করতেই নয়, আরো একটা কারনে এসেছেন। খুব ব্যক্তিগত না হলে কারনটা জানতে পারি?

- বিলক্ষণ জানতে পারেন! কারন যে কাজে এসেছি সেটায় আপনার সাহায্য লাগবে।

- কী কাজ?

- আসলে আগামীকাল ঐশীর জন্মদিন। প্রতিবার ওর জন্মদিন আমার বাড়িতেই পালিত হয়। তেমন ধুমধাম করে না হলেও ছোটোখাটো আয়োজন করি। তা এবার তো ঐশী আমার বাড়িতে নেই। তাই...

- ওমা তাই নাকি? ঐশী বা অভি তো আমাকে কিছুই জানায়নি। বেশ আমি আছি আপনার সাথে। এবার ঐশীর জন্মদিন ওর এই মায়ের ঘরে করা হবে।

- কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব?

- দরকার নেই! ঐশী তো আমারও মেয়ে!

ঐশী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে ঢোকে। তারপর রজতাভকে দেখে অবাক হবার ভান করে রজতাভর কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে।

- মাই গড! বাপি! তুমি কখন এলে?

- এই তো কিছুক্ষণ হল। কেমন আছিস মা?

- ফার্স্ট ক্লাস! জানো আজই তোমাকে মিস করছিলাম!

- হুম সেজন্যই তো চলে এলাম! আমার মাম্মাম যখন আমাকে মিস করছে আমি কী বাড়িতে থাকতে পারি? তাই চলে এলাম।

- ভালো করেছ! বাপি আজ কিন্তু তোমাকে খেয়ে যেতে হবে। মায়ের সাথে আজ আমিও রান্না করেছি।

- তাই নাকি? তাহলে তো থেকে যেতে হচ্ছে! তা কি মেনু করেছিস শুনি?
সুজাতা চুপচাপ সোফায় বসে বাবা-মেয়ের খুনসুটি দেখতে থাকেন। একটা অনাবিল আনন্দে তার মনটা ভরে ওঠে। বাবা-মেয়ের খুনসুটি দেখতে দেখতে তিন ঠিক করে নেন কালকের দিনটা কীভাবে সেলিব্রেট করবেন।

***** 
পরদিন ঐশীরা বাইরে বেড়াতে যাওয়ায় সুবিধেই হল সুজাতাদের। ওরা বেরিয়ে পড়ার পর রজতাভ আর সুজাতা দুজনে মিলে গোটা ঘরটাকে সাজালেন নিজের মতো করে। তারপর রান্নাঘরে এক এক করে বানিয়ে ফেললেন ঐশীর পছন্দের পদগুলো। রজতাভ নিজের হাতে বানালেন জন্মদিনের কেক। সুজাতা বানালেন পায়েস। সব তৈরী করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে রাখতে বিকেল হয়ে গেল। সন্ধ্যেবেলা ঐশীরা ফেরার পর এই আয়োজন দেখে অবাক। ঐশী সবটা বুঝতে পেরে ওর বাপিকে জড়িয়ে ধরল। তারপর হইহই করে চারজনে মিলে কেক কেটে পালন করলেন ঐশীর জন্মদিন।

রাতেরবেলা খাবার পালা শেষ করে চারজনে বসলেন বৈঠকখানায়। রজতাভ ঐশীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ তা সারপ্রাইজ কেমন লাগল আমার মাম্মামের?”

ঐশী রজতাভর হাত জড়িয়ে ধরে বলল,“ দারুণ! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি ভুলেই গেছ আজকের দিনটা।”

- আমার মাম্মামের জন্মদিন আমি কি ভুলে যেতে পারি?

- সেজন্যেই তো তোমাকে এত্তটা ভালোবাসি। লাভ ইউ বাপি।

- লাভ ইউ টু মাম্মাম।

কিছুক্ষণ পর ঐশী বলে, “আচ্ছা বাপি প্রতিবার তো আমার জন্মদিনে মাম্মামের একটা ডাইরি পেতাম। কই এবার তো পেলাম না।”

- পাবি কি করে? তোর মাম্মামের যা ছিল সব তো গতবছরই দিয়ে দিলাম! তোর মাম্মামের আর ডাইরি নেই।

- কিন্তু তুমি তো বলেছিলে আমার জন্মের আগে পর্যন্ত মাম্মাম ডাইরি মেন্টেন করত।

- হ্যা। তা করত কিন্তু সেই শেষ ডাইরিটা তো হারিয়ে গেছে অনেকদিন হল। আমি অনেক খুঁজেও পাইনি।

- ঐ ডাইরিটা থাকলে বেশ হত। মনে হত আজকের দিনটাতেও মাম্মাম আমার সাথে আছে।

সুজাতারা দুজনের কথা শুনছেন দেখে ঐশী ব্যাপারটা খোলসা করে বলে। সবটা শুনে অভীক উঠে দাঁড়ায়। তারপর ঘরের এককোণে রাখা ব্যাগপ্যাক থেকে বের করে আনে একটা পুরোনো ডাইরি। ডাইরিটা দেখে অবাক হন রজতাভ।

- তুমি কোথা থেকে পেলে এটা?

- আপনার স্টাডিতে কয়েকটা বই বেশ ভালো লেগেছিল। ঐশীকে বলতে ঐশীই বইগুলো নিয়ে এসেছিল আপনার স্টাডি থেকে। সেই বইগুলোর সাথে ছিল ডাইরিটা। ঐশীকে তখনই জানাইনি এটার ব্যাপারে। ভেবেছিলাম পরে আপনাকে দিয়ে দেব। একদিকে ভালোই হল বলুন।

- হুম তাই তো দেখছি। তা মাম্মাম? এবার খুশি তো!

- ভীষণরকম! তবে আমার একটা আবদার আছে বাপি।

- কী আবদার শুনি?

- আজকে ডাইরিটা তুমি পড়বে।

- সেকি! মাম্মাম এটা তো তোর জন্য তোর মায়ের লেখা। সেখানে আমি পড়লে হবে কি করে? তাছাড়া অন্যের ডাইরি পড়া অসভ্যতার মধ্যে পড়ে।

- ওসব কিছু জানি না। আমি চাই তুমি ডাইরিটা পড়ো।

- মাম্মাম!

- পড়ো।

ঐশীকে কিছুক্ষণ বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করার পর অবশেষে হাল ছেড়ে দেন রজতাভ। ঐশীর সাফ কথা, ডাইরিটা রজতাভকে পড়তেই হবে। অগত্যা ডাইরিটা নিয়ে বসেন রজতাভ। কিন্তু দুপাতা ওল্টানোর পর চমকে ওঠেন তিনি। তারপর অভীকের দিকে তাকিয়ে থমথমে গলায় বলে ওঠেন, “এই ডাইরি তুমি কোথায় পেলে?”

(চলবে...)

Merry Christmas To all of you!

শনিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ চতুর্দশতম পর্ব

 



ঊর্মির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল সুজাতাও। বেশ কিছুক্ষণ ওর মুখ থেকে কথা সরছিল না। কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে পেতেই ড্রইং রূমে উপস্থিত সকলকে চমকে ঠোঁটের মাঝে আঙুল রেখে শিস দিয়ে উঠল সে। তারপর এগিয়ে গিয়ে ঊর্মিকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে চকাম করে একটা চুমু খেয়ে বলল, “ কী সুন্দর লাগছে আমার ঊর্মিরানীকে! রজতদা তো দুরস্থ আমিই চোখ ফেরাতে পারছি না। আমি ছেলে হলে আর বিবাহিত না হলে তোকে নিয়ে আজ রাতেই পালিয়ে যেতাম!” বলে নিজের চোখের কোল থেকে অল্প কাজল নিয়ে ঊর্মির কানের পেছনে চুলের গোড়ায় ছুঁইয়ে দিয়ে বলল, “আমার ঊর্মিরানীর উপর যাতে কারো নজর না লাগে, তাই টিপ দিয়ে দিলাম। 

 

বিকেল বেলার পর থেকে ঊর্মি এমনিতেই সুজাতার আয়োজন দেখার পর লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল এবার সুজাতার প্রগলভ ব্যবহারে আরো লজ্জা পেয়ে গেল সুজাতা একহাতে ঊর্মিকে জড়িয়ে রজতাভর সামনে এনে দাঁড় করিয়ে বলল, “এই নিন রজতদা! আপনার কাছে আমার প্রিয় সখীকে রেখে গেলাম এবার আপনারা একটু নিভৃতে বসে একটু প্রেম করুন ততক্ষণ আমি দেখে আসছি ওদিকে নটবরদার রান্না কতদুর এগোলো?” বলে ঊর্মিকে রজতাভর পাশে বসিয়ে সুজাতা ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে

 

রজতাভর পাশে বসে আপন মনে হেসে উঠল ঊর্মি তারপর চারদিকের সাজসজ্জার দিকে তাকিয়ে বলল, “সত্যি সুজাতাটা পারেও বটে! একবেলার মধ্যে না জানিয়ে কতকিছু আযোজন করে বসল বলো তো? এইসব বাড়াবাড়ি এখন পোষায়? আমরা কী আর সেই নবদম্পতি আছি?”

 

- করুক না! ক্ষতি কী? বান্ধবীর বিবাহবার্ষিকী পালনে আমি তো কোনো অন্যায় দেখছি না

- তা দেখবে কেন? তুমিই তো আসল নাটের গুরু! কী ভেবেছ আমি কিছু বুঝতে পারব না? আমাদের বিবাহবার্ষিকীর কথা সুজাতার তো মনে থাকার কথা নয় ওকে নির্ঘাত তুমিই বলেছ! সত্যি রজত! এখনও ছেলেমানুষি গেল না তোমার সুজাতাটা তো পাগল, তুমিও ওর সাথে মিশে পাগলামি শুরু করে দিয়েছ!

কে বলছে দেখো? বিকেলবেলা আয়োজন দেখে তো গদগদ হয়ে পড়েছিলে! এখন সেজেগুজে পটের বিবি হয়ে বসে আছো আর আমাকে পাগল বলছ? বাইরে যতই বিরক্তি দেখাও না কেন ভেতর ভেতর তুমিও যে একইরকম খুশি এটা তুমি মানতে বাধ্য! আর রইল ছেলেমানুষি শুনে রাখো ঊর্মি, দেহের বয়স যতই বাড়ুক না কেন, মনের বয়স বাড়তে দিতে নেই! মনের বয়স বাড়তে দিলে দেখবে পৃথিবীটাই পানসে হয়ে গেছে কাজেই মেজাজটাকে সবসময় শরিফ রাখার চেষ্টা করো কারন মেজাজটাই আসল রাজা!

 

রজতাভর কথা শুনে ঊর্মি প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে যাবে এমন সময় বাংলোর সব আলো ঝুপ করে নিভে যায় রজতাভ মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ বের করে বলেলোডশেডিং চুপ করে বসে থাকো অন্ধকারে উঠতে যেও না দাঁড়াও সুজাতাকে ডাকি ও আলো দিয়ে যাকবলে উঠতে গিয়ে থমকে যায় রজতাভ কারন রান্নাঘর থেকে একটা সুদৃশ্য কেক হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছে সুজাতা কেকের উপরে জ্বালানো মোমবাতির আলোয় সুজাতাকে অদ্ভুত লাগছে মোমবাতির আলোয় পায়ে পায়ে ড্রইংরুমে এসে টেবিলে কেকটা রাখে সুজাতা আর কেকটা টেবিলে রাখামাত্র ঘরের আলো জ্বলে ওঠে ওরা দেখে ড্রইংরুমে তথাগত ছাড়াও আরো অনেকে এসে দাঁড়িয়েছে ড্রাইভার রবি, সকালে পার্কে দেখা বন দপ্তরের কর্মী, অফিসার ছাড়াও আরো অনেকে আলো জ্বলে ওঠা মাত্র ওরা হই হই করে ওঠে, “সারপ্রাইজ!”  রজতাভ এবার একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়ে তথাগত এগিয়ে এসে রজতাভকে জড়িয়ে ধরে বলে, “কী ভেবেছিলে ভায়া? এই তথাগত চৌধুরী থাকতে তোমার বিবাহবার্ষিকীটা পানসে ভাবে কাটবে? কাভি নেহি! শুনে রাখো মেজর! ঊর্মি যেমন সু-এর বন্ধু, তুমিও তেমনই আমার বন্ধু! শুধু বন্ধুই নয় একদিক থেকে আমার ভাইও বটে! আর আমার ভাই হয়ে আমার এলাকায় আনন্দ করতে এসে হতোদ্যম হয়ে ফিরে যাবে এটা আমি হতে দিতে পারি না! হ্যা একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে ঠিকই, তাতে আমাদের অনুষ্ঠান বিঘ্নিত হয়েছে সেটাও ঠিক, কিন্তু পণ্ড হয়ে যায়নি! জাস্ট অনুষ্ঠানে কিছু বিলম্ব ঘটেছে মাত্র কাজেই আজকের অনুষ্ঠানটা হবেই! বাকিটা পরে বলব আপাতত দুজনে মিলে কেকটা কাটো দেখিবলে একটা ছুড়ি এগিয়ে দেয় রজতাভর দিকে রজতাভ কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর হেসে ছুড়িটা হাতে নেয় তারপর ঊর্মির সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কেকটা কাটে ড্রইংরুমে উপস্থিত সকলে একসাথে উইশ করে, “হ্যাপি অ্যানিভার্সারি টু ইউ!” 

কেক কাটার পর তথাগত সকলের সাথে রজতাভদের পরিচয় করিয়ে দেয় ফরেস্ট কনজারভেটর সাহেবের সাথে পরিচয় করা মাত্র তিনি আগে ক্ষমা চাইলেন সকালের ঘটনার জন্য

 

 - উই আর এক্সট্রিমলি সরি ফর দ্য ইনকনভিনিয়েন্স মেজর মজুমদার আসলে আজ শুধু আপনারাই নন আরো অনেক দূর থেকে আসা ট্যুরিস্টরাই ফিরে গেছে পার্ক থেকে বুঝতেই পারছেন এরকম একটা ঘটনা, তার উপর গণ্ডারের ডেডবডি দেখতে ভীড় বাড়লে ইনভেস্টিগেট করতে অসুবিধে হত তাই পার্কটাকে আজকের জন্য বন্ধ করা হয়েছে অবশ্য পাব্লিকের আর দোষ কোথায়? ডেভিড ছিলই যাকে বলে স্টার অফ দ্য নর্থান পার্ট অফ কাজিরাঙ্গা এত ফ্রেন্ডলি, এত ডিসেন্ট ছিল যে মানুষের কাছে চলে আসতো আদর পেতে সেই আদরটাই ওর কাল হয়ে দাঁড়াল দোজ বাস্টার্ডস

- ক্ষমা করবেন, ডেভিড মানে

 

- সকালে যার মৃতদেহ দেখলে সেই ডেভিড এখানে প্রত্যেকটা গণ্ডারের একটা করে কোডনেম আছে ডেভিড শুধু আমাদের পার্কের প্রিয় গণ্ডারই ছিল না আমাদের সকলের প্রিয় গণ্ডারও ছিল এখানে উপস্থিত পুরোনো যারা আছেন তাদের কাছে ডেভিড সন্তানতুল্য ছিল গোটা বন দফতর ক্ষেপে আছে যারা ডেভিডের পরিণামের জন্য দায়ী তাদের সকলকে খুঁজে বের করব আমরা

বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে তথাগত

 

ঘরের পরিবেশ ভারী হচ্ছে দেখে মৃদু হেসে কনজারভেটর সাহেব প্রসঙ্গ বদলে বলেন, “যাক গে বাদ দিন ও কথা! আমাদের প্রফেশনাল হ্যাজার্ড, বোঝেনই তো! তা এদিকে প্রথম না আগেও এসেছেন?” রজতাভরা এই প্রথম এসেছে শোনার পর কনজারভেটর সাহেব বলেন, “বেশ তা কদিন যখন আছেন এখানকার স্পেশালিটিগুলো চেক করতে ভুলবেন না চৌধুরী ওনাদের চেরাও নাচ দেখাওনি?”

 

তথাগত মাথা নেড়ে বলে, “না স্যার ইচ্ছে ছিল সকালে পার্কে প্রোগ্রামটা সেড়ে বিকেলে নিয়ে যাবো তা আর হল কই? দেখি কাল একবার ট্রাই করবরজতাভ হা করে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে তথাগত হেসে বলে, “আমাদের কাজিরাঙ্গা ন্যাশনাল পার্কের আরেকটা আকর্ষণ প্রতি সন্ধ্যেবেলা অর্কিড এন্ড বায়োডাইভার্সিটি পার্কে নাচের আসর বসে বাকিটা বলে স্পয়েলার দেব না কাল গেলে দেখতে পারবেরজতাভ হেসে বলে, “বেশ তাহলে কাল বিকেলের অপেক্ষায় রইলাম

 

রাতে অতিথিরা একে একে বিদায় নেওয়ার পর নটবর আর রবিকে খাইয়ে, ওদের বাড়ির লোকের জন্য খাবার গুছিয়ে পাঠিয়ে দিয়ে, ঘরের বাকি কাজ সেরে সুজাতা যখন নিজের ঘরে ঢুকল তখন রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। ঘরে  ঢুকে সুজাতা দেখল অন্যদিন বেশ রাত করে জেগে থাকলেও আজ তথাগত বেশ আগেই শুয়ে পড়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। সারাদিন ভীষণ খাটনি গেছে বেচারার। তার উপর সন্ধ্যের অনুষ্ঠানে না জানি কতটা ড্রিঙ্ক করেছে। ক্লান্ত, নেশাচ্ছন্ন ছিল বলেই হয়তো বেশিক্ষন জেগে থাকতে পারেনি। সুজাতা তথাগতকে জাগালো না। চুপচাপ ঘরের দরজা লাগিয়ে, বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে, সন্ধ্যের পোশাক ছেড়ে একটা নাইটি পরে নিয়ে বিছানায় বসল।

 

সারাদুপুর ঘুমোয়নি বলে মাথাটা টনটন করছে। বিছানার পাশের ড্রয়ার থেকে মাথাব্যথার ওষুধ বের করে একটা ট্যাবলেট জিভের তলায় রেখে অল্প জল খেয়ে তথাগতর দিকে পিঠ করে শুয়ে পড়ল সুজাতা। কিছুক্ষণ পর তথাগতর একটা হাত এসে পড়ল সুজাতার গায়ের উপর। সুজাতা বুঝলো তথাগত ঘুমোয়নি, ভান করে শুয়েছিল। সুজাতা পাত্তা দিল না। অন্যদিন হলে আলাদা কথা ছিল, কিন্তু আজ সে ভীষণ ক্লান্ত। এখন তার শারীরিক সুখের চেয়েও বেশি প্রয়োজন ঘুমের। সে মুখ দিয়ে নেতিবাচক শব্দ করে, তথাগতর হাত নিজের শরীরের উপর থেকে সরিয়ে বোঝাতে চাইল আজ তার আর ইচ্ছে নেই মিলিত হবার। কিন্তু তথাগত সে নিষেধ মানলে তো? 

 

সুজাতার বারন করা সত্ত্বেও তথাগতর হাতটা ক্রমশ সচল হয়ে সুজাতার সর্বাঙ্গে বেড়াতে লাগল। প্রথমে সুজাতার ঘাড়ে, গলায়, কানের লতির পেছনে আলতো করে বিলি কাটতে লাগল তথাগতর আঙুল। তাতেও যখন কোনো লাভ হল না, তখন সে হাত সুজাতাকে কামোত্তেজ্জিত করার জন্য প্রবেশ করল সুজাতার নাইটির গলার ভেতর দিয়ে। সুজাতা বুকে সেই কঠোর হাতের নিষ্পেষণ, স্তনবৃন্তে চিমটি কাটা কিছুই বাদ গেল না। কিন্তু এর পরেও সুজাতার সাড়া না পেয়ে সেই হাত ক্রমশ নামতে সুজাতার নিতম্বে আসতেই সুজাতা আর থাকতে পারল না

 

- কি হচ্ছেটা কী? বললাম না আজকে মুড নেই!

 

সুজাতার ধমকে তথাগত কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর আবার সুজাতাকে উত্যক্ত করতে শুরু করল। সুজাতা আবার মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ করতেই তথাগত উঠে পড়ল। তারপর সুজাতাকে গায়ের জোরে সুজাতাকে ঘুরিয়ে বিছানার মাঝখানে নিয়ে এনে সুজাতার দুটো হাত চেপে সুজাতার কানে কানে ফিসফিস করে বলল, “ একদম চুপ! মুড নেই মানে কী? কীসের এত ঘ্যাম তোমার?”

 

– আজ থাক তথা। আজকে শরীরটা ভালো নেই। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।

 

- আর আমার কী হবে? আমিও তো সারাদিন পরিশ্রম করেছি! জানো না সারাদিনের পরিশ্রমের পর কী চাই আমার? এতক্ষন ধরে তোমাকে জাগিয়ে যাচ্ছি কেন বুঝতে পারছ না? আমার তোমাকে চাই।

 

- আজকে না তথা। আজ আমি ক্লান্ত।

 

- বেশ তো! তাহলে তোমাকে পরিশ্রম করতে হবে না। তুমি চুপ করে শুয়ে থাকো। আমিই আদর করছি তোমাকে।

 

- তথা প্লিজ!

 

– একদম চুপ! চুপ করে শুয়ে থাকো!

 

বলে সুজাতার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় তথাগত। প্রাণপণে শুষে নিতে থাকে সুজাতা নরম ঠোঁটের আদ্রতাকে। মদের গন্ধে গা গুলিয়ে এলেও সুজাতা নিরুপায়। তার হাতদুটো তথাগতর একটা হাতে আবদ্ধ। অপর হাত সুজাতার ঊরুসন্ধিতে নিবদ্ধ। সুজাতা যে চিৎকার করে নিষেধ করবে তারও উপায় রাখেনি তথাগত। পাগলের মতো সে চুমু খেয়ে চলেছে সুজাতাকে। সুজাতা বোঝে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তার কাছে। এই মুহূর্তে তথাগত একজন কামুক পুরুষ ছাড়া আর কেউ নয়। বার বার নিষেধ করেও তথাগত শুনবে না। বরং বাধা পেলে সে জোর করবে তাকে। তার চেয়ে তথাগতর কামতৃষ্ণা যত তাড়াতাড়ি মেটে সে চেষ্টা করাই ভালো। যত তাড়াতাড়ি তথাগতর কামতৃষ্ণা মিটবে, তত তাড়াতাড়ি নিস্তার পাবে সে। অবশেষে হাল ছেড়ে সে সাড়া দেয় তথাগতর আদরে। তথাগত সাড়া পেয়ে খুশি হয়ে সুজাতার হাত ছেড়ে নিজের মাথা নামায় ঊরুসন্ধির দিকে।

 

পরদিন বিকেলে অর্কিড এন্ড বায়োডাইভার্সিটি পার্কে পৌঁছনো মাত্র ওরা দেখে পার্কে হাল্কা লোক জড়ো হতে শুরু করেছে। তথাগত আগে থেকে বলে রেখেছিল বলে ওরা একেবারে মঞ্চের সামনে গিয়ে বসে। কিছুক্ষণ পর মঞ্চে একে একে কুশীলবরা উঠে দাঁড়ায়। ঝলমলে পোশাক, আর পালকে ওদের অনবদ্য দেখতে লাগছে। ধীরে ধীরে সুর্যাস্তের আলো দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ামাত্র মঞ্চের আলো জ্বলে উঠল। আর তার সাথেই বেজে উঠল বাজনা। মঞ্চের কুশীলবদের সাথে চারজন মাদল গোছের একটা বাজনা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা প্রথমে ঢিমে তালে তারপর দ্রুতগতিতে বাজনা বাজাতে লাগল।   

 

বাজনার তালে তালে নেচে উঠলো উপজাতির পোশাকে একঝাক সজ্জিত তরুণ তরুণী। গোটা মঞ্চ জুড়ে ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগল তারা। ক্রমশ নাচের তালের হিল্লোল ছুঁয়ে গেল উপস্থিত সকলকে। চেয়ারে বসে বাজনার তালে তালে মাটিতে পা ঠুকতে লাগল রজতাভ। মাথা দোলাতে লাগল ঊর্মিও। আশেপাশে সকলেই তখন কম বেশি বাজনার তালে সম্মোহিত। কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠান শেষ হতেই গোটা পার্কে করতালির বন্যা বয়ে গেল।

 

*****

দুপুরবেলা খাবার পালা শেষ করে ঐশী ঘরে ঢুকতেই দেখল অভীক জানলার দিকে মুখ করে বিছানায় বসে মগ্ন হয়ে কি যেন একটা পড়ছে। এবং সেটা পড়তে পড়তে এতটাই বুঁদ হয়ে আছে যে ঐশী ঘরে ঢুকলেও টের পায়নি সে। ঐশী পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল অভীকের দিকে তারপর একঝটকায় ওর সামনে থেকে জিনিসটা কেড়ে নেওয়ামাত্র চমকে উঠল। অভীক ততক্ষণে লালচে চোখে ঐশীর দিকে তাকিয়েছে। ঐশী জিনিসটা হাতে নিয়ে অভীকের দিকে তাকাল। তারপর অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় পেলি এটা?”

(চলবে...)


শুক্রবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ ত্রয়োদশতম পর্ব


ট্রেন থেকে ব্যাগপত্র নামিয়ে তথাগতরা যখন স্টেশন চত্ত্বরে এসে দাঁড়ালো তখন সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে। স্টেশনে নেমে আড়মোড়া ভেঙে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সচল করে নিল তথাগত। সারাদিনের জার্নির ধকলে শরীরটা আড়ষ্ট হয়ে গেছে। একে সেই সকালবেলা বেরিয়েছে, তার উপর কাল রাতের হ্যাংওভার। গোটা রাস্তা মাথা যন্ত্রণায় কেটেছে তথাগতর। ভাগ্যিস সুজাতা সাথে করে ঊর্মির স্পেশাল চা নিয়ে এসেছিল। সেটা খেয়ে মাথা যন্ত্রণাটা অনেকটা কমেছে। কিছুক্ষণ স্ট্রেচিং করার পর ব্যাগ নিয়ে তথাগত রওনা দিল স্টেশনের বাইরের দরজার দিকে।

ব্যাগ হাতে তথাগতরা স্টেশনের বাইরে বেরোতেই ড্রাইভার এগিয়ে এলো ওদের দিকে। গাড়ির ডিক্কিতে ব্যাগপত্র রাখার পর সকলে গাড়িতে বসতেই তথাগত প্রস্তাবটা দিল, “বলছিলাম কী রাত তো তেমন হয়নি। একটু চা খেলে মন্দ হত না। কি বলো সবাই?”

“একদম না!” হিসহিস করে উঠল সুজাতা। “সারারাস্তা জ্বালিয়েছ! আর নয়। গাড়ি সোজা কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়াবে আর কোথাও নয়।”

– আহা! তুমি বুঝতে পারছ না। রজতাভরা এই প্রথম এসেছে আমাদের এখানে। এখানকার আবহাওয়ার সাথে পরিচয় করাতে হবে না? আর সেটা করতে গেলে তো প্রথমে এখানকার স্পেশাল চা খেতে হবে!

– রাখো তোমার স্পেশাল চা! কী ভাবছ? তোমার উদ্দেশ্য আমি বুঝিনি? দোকানে চা খাবার নামে গাড়ি থামিয়ে একফাকে ওসব ছাইপাঁশ কিনে আনবে, তারপর রাতে আকণ্ঠ গিলে আবার মাতলামো করবে। রোজ রোজ খাওয়াটা কমাও।

- মোটেও আমি রোজ খেয়ে মাতলামো করি না! মাঝে মাঝে খাই।

- আর যেদিন খাও সেদিনই উল্টে যাও। তোমার দৌড় আমার জানা আছে। গাড়ি কোথাও থামবে না। সোজা কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়াবে। এই যে রবিদা, খবরদার বলছি তোমার স্যারের কথায় রাস্তায় গাড়ি থামাবে না।

ড্রাইভার রবি লুকিং গ্লাসে একবার পেছনদিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে গাড়িতে স্টার্ট দেয়। তথাগত কিছু বলার আগে পেছনের সিটে বসা রজতাভ এগিয়ে এসে তথাগতর কাঁধে হাত রেখে বলল, “চেপে যাও ভায়া! ওয়েদার ফোরকাস্ট বলছে হোম ডিপার্টমেন্টের আকাশ আজ সকাল থেকেই তীব্রভাবে মেঘাচ্ছন্ন, এবং ক্রমশ সে মেঘ বজ্রগর্ভ মেঘে পরিণত হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি পৌঁছনোই ভালো নাহলে সবজ্র বৃষ্টিপাতের সাথে রণচণ্ডীকা নৃত্য দর্শনও ঘটতে পারে।”
রজতাভর কথা শোনার পর তথাগত পেছন ফিরে আড়চোখে সুজাতার দিকে তাকায়। দেখে সুজাতা গাড়ির জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে আছে, রজতাভ চোখ টিপে ইশারা করছে, আর ঊর্মি প্রাণপণে মুখ টিপে হাসি থামানোর চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর সামনে ফিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “ব্যস! আর কী? হোম ডিপার্টমেন্ট যখন প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে তখন আর কী করা যাবে? বুঝলে রবি? তোমার ম্যাডামের অর্ডারটাই আপাতত ফলো করা হোক। চলো বাড়ি!”

ড্রাইভার মুচকি হেসে রাস্তায় গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। রজতাভ আর তথাগত বাদে সারাদিনের ক্লান্তিতে ঊর্মি, সুজাতা হেলান দেয় গাড়ির ব্যাকরেস্টে। তথাগত ড্রাইভারের সাথে মৃদু স্বরে কথা বলতে থাকে। রজতাভ জানলার বাইরে থেকে দেখে বাইরের জগতটাকে। আর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুচকি হাসে। মানুষের কপালে কখন কি লেখা থাকে কেউ বলতে পারে না। সত্যি কথা বলতে গেলে তথাগতদের সাথে আসার, ওদের সঙ্গী হবার বিন্দুমাত্র পরিকল্পনা ছিল না ওদের। কাল রাতেও শোওয়ার সময় একবারের জন্যেও ওরা ভাবেনি যে এভাবে সকালবেলা চলে আসতে হবে। কিন্তু সকালবেলা তথাগতর অবস্থা দেখার পর সুজাতাকে একা ছাড়তে মন চাইল না ঊর্মির। প্রচণ্ড মাথাধরা, অবিরাম বমিতে তথাগতকে নাজেহাল হতে দেখে ওরা ঠিক করল তথাগতর সাথে এই অবস্থায় সুজাতা বেরোলে রাস্তায় সমস্যায় পড়ে যাবে। অগত্যা রজতাভর সাথে কথা বলে ঊর্মি তৈরি হয়ে নিল।  দার্জিলিং-এর বাড়িতে একসেট ব্যাগপত্র এমনিতেই গোছানোই থাকে। তাও সেই ব্যাগের সাথে দুএকটা প্রয়োজনীয় জিনিস আর কিছু জামাকাপড় গুছিয়ে ওরাও বেরিয়ে পড়ল সুজাতার সাথে। অবশ্য এতে সুজাতারই সুবিধে হল। গোটা রাস্তা তথাগত বমি করতে করতে এসেছে। সারা রাস্তা তিনজনে প্রায় পালা করে ওকে আগলে রেখেছিল।

আচমকা ঝাঁকুনিতে ঘোরটা কেটে গেল রজতাভর। বাইরের দিকে তাকাতে তাকাতে আচমকা ঘোর লেগে গিয়েছিল ওর চোখে। ঘোরটা কাটতেই সোজা হয়ে উঠে বসে সে দেখল গাড়িটা একটা কাঠের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওরা একে একে গাড়ি থেকে নামার পর তথাগত বলল, “অধমের গরীবখানায় স্বাগত ভায়া। তোমাদের দার্জিলিং-এর বাড়ির মতো বিলাসবহুল না হলেও মাথা গোঁজার ঠাই হিসেবে মন্দ নয়।”

তথাগত গরীবখানা বলে বাড়িটাকে দেখালেও বাস্তবে বাড়িটাকে ঠিক গরীবখানা মনে হল না রজতাভর। মাঝরাস্তায় ঘুমিয়ে পড়েছিল বলে টের পায়নি, কিন্তু এখন ওরা বনের একদম মাঝখানে অবস্থিত এক অফিসার কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়িয়ে। চারদিকে বনের মাঝে সুন্দর, ছিমছাম এক কাঠের বাড়ি। গাড়ি থেকে ব্যাগ নামিয়ে ধীরে ধীরে ওরা বাড়ির দিকে এগোতেই কেয়ারটেকার এগিয়ে এল। তথাগত বাড়িটার ভেতরের ঢুকে ব্যাগ রেখে জিজ্ঞেস করল,“ এদিকের খবরটবর কী? সব ঠিক আছে তো?”

কেয়ারটেকার মাথা নাড়ে। তথাগত হেসে রজতাভদের দেখিয়ে বলে, “শোনো নটবর। এরা আমার অতিথি। আমার বর্তমানে এনাদের যত্ন করার দায়িত্ব তোমার। কী বুঝলে? এনারা যা খেতে চান, তাই রান্না করবে। ”‌ বলে রজতাভদের দিকে তাকিয়ে বলে, “আর তোমরাও জেনে রাখো। এ হল নটবর। বেশি কিছু বলবো না তবে আমি ডিউটিতে ব্যস্ত থাকাকালীন সু-এর হাত,কান, চোখ বললেও ভুল বলা হবে না। কি সু, ঠিক বললাম তো?" সুজাতা মাথা নাড়ে। তারপর এগিয়ে এসে বলে, “কমলি বৌদি কেমন আছে? কী রান্না করেছে আজকে?”

নটবর মাথা নেড়ে হেসে অহমিয়া ও বাংলা মেশানো ভাষায় বলে ওঠে, “এয়া ঠিকেই ভনীয়েক। তুমি রাতিপুবা যা যা বলেছিলে সকলোবোর রান্ধি দিয়া হৈছে। এতিয়া কেবল তোমরা হাত ধুই বসে পড়লেই হল।"

তথাগত‌ হেসে বলল,“ বেশ বেশ! তা রজতাভ চল। চটপট যে যার ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে বসে পড়ি। সুজাতা আর ওর নটবর দাদা যখন চার্জ নিয়ে নিয়েছে আর চিন্তা নেই।"

*****
ভোরবেলা একটা অদ্ভুত মিষ্টি সুরে ঘুমটা ভাঙল ঊর্মির। প্রথম প্রথম আধবোঁজা চোখে ঠাহর করতে না পারলেও পরক্ষণে মনে পড়ে গেল ওরা কোথায় আছে।‌ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর চোখ বোঁজা অবস্থাতেই বিছানায় হাতড়ে রজতাভকে না পেয়ে চোখ মেলে তাকাল সে। পাশ ফিরে দেখল রজতাভ নেই। হয়তো বাথরুমে গেছে একথাটা একবার ভাবলেও পরক্ষণে ঊর্মির খেয়াল হল এত ভোরে তো রজতাভ বাথরুমে যায় না। এমনকী এত ভোরেও ওঠে না সে! তাহলে কোথায় গেল রজতাভ? বিছানায় উঠে বসল ঊর্মি। চারদিকে একবার চোখ বোলাতে গিয়ে দেখল বারান্দার দরজাটা খোলা। ঊর্মি গায়ের কম্বল সরিয়ে ধীরপায়ে খাট থেকে নামল। তারপর পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে। 

বারান্দায় রজতাভ কম্বল জড়িয়ে আরামকেদারায় চোখ বুঁজে বসেছিল। ঊর্মির পায়ের শব্দে চোখ মেলে তাকাল দরজা দিকে। ঊর্মি কিছু বলার আগে ইশারায় চুপ করতে বলে নিজের কাছে ডাকল। ঊর্মি কাছে এসে দাঁড়াতেই পাশে বসতে বলল। ঊর্মি  রজতাভর আরামকেদারার পাশে রাখা চেয়ারে না বসে আরামকেদারার হাতলে ভর দিয়ে দাঁড়াল। রজতাভ জানত ঊর্মি এটা করবে। তাই সে কথা না বাড়িয়ে কম্বলের একপ্রান্ত খুলে ঊর্মিকে কাছে টেনে নিয়ে কম্বলে মুড়ে নিল।‌ তারপর ঊর্মির কানের কাছে মুখ এনে বলল, “একদম চুপ! কোনো শব্দ করবে না। শুনতে পাচ্ছো শব্দটা?” 

এতক্ষণে ঊর্মির খেয়াল হল একটু আগে যে মিষ্টি সুরে ঘুমটা ভেঙেছিল সেই শব্দটা এখানে আরো পরিস্কার আর জোরে শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কাছেই কোথাও কোনো নাম না জানা সুরেলা পাখি অকাতরে ডেকেই চলেছে। ডাকটায় কেমন যেন একটা অদ্ভুত ঘোর লাগা মাদকতা আছে। শুনতে বেশ লাগছে ডাকটা। রজতাভ ফিসফিস করে বলল, “ সাধারণত এ পাখির ডাক  শহরতলী বা গ্রামে শুনতে পাবে। কিন্তু এতটা স্পষ্ট নয়। কী পাখি বলো তো?”

ঊর্মি মুচকি হাসে তারপর বলে “পিউকাহা। বুদ্ধদেব গুহর লেখায় এর নাম কত পড়েছি!উনি বোধহয় এ পাখির ডাক ভীষণ ভালোবাসেন। তা মেজরসাহেবের হঠাৎ প্রকৃতি প্রেম উথলে উঠেছে দেখছি। কী ব্যাপার?বাড়িতে তো ছয়টার আগে শয়ন থেকে উত্থান হয় না। আজ কী উপলক্ষ্যে এত আগে উত্থান শুনি?”

রজতাভ হেসে বলে, “কারন আছে বলেই তো উত্থান ঘটেছে দেবী। তোমার বুদ্ধদেব বাবু একটা দারুন কথা বলেন জানো? তিনি বলেন পৃথিবীর প্রতিটা জীবের মতো জঙ্গলেরও একটা ভাষা আছে। কেউ সেটা শুনতে পায়, কেউ পায় না। যারা পায় তারা সৌভাগ্যবান। কিন্তু যারা পায় না তাদের জন্যেও উপায় বলে গেছেন তিনি। যারা জঙ্গলের ভাষা, জঙ্গলের কথা শুনতে চায় তাদেরকে মুলত চারবেলা খেয়াল রাখতে হবে। কারন এই চারটে বেলাই জঙ্গল নীরবতার আবরণ ভেদ করে মুখর হয়ে ওঠে। প্রথম বেলা হল সকালবেলা,মানে এই ব্রাহ্মমুহূর্তটা।‌ পরেরটা হল সন্ধ্যেবেলা। তৃতীয়টা হল রাতের বেলা, মানে গরমকালের বা বর্ষাকালের রাতের বেলা। আর শেষেরটা হল যে কোনো ঝড় বা বৃষ্টির পরের সময়টা। কান পেতে শুনলে ঠিক শুনতে পাবে বনের শব্দ,যেমন এখন পাচ্ছ। পাখির ডাকের সাথে সাথে গাছের পাতা থেকে চুঁইয়ে পড়া কুয়াশার ফোঁটা, বনের একটা মিঠেকড়া অথচ সোঁদা গন্ধ, এটাই তো বনের ভাষা। প্রকৃতি আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে ঊর্মি।”

- তাই? তা সকাল সকাল এত কাব্যিক হয়ে উঠেছো যে! ব্যাপারখানা কী? আমার পড়া নভেলগুলো নাকি তোমার দুর্বোধ্য লাগে। বুদ্ধদেববাবুর লেখা নাকি একই থোড়বড়িখাড়া আর খাড়াবড়িথোড়। তা হঠাৎ সেই মানুষটা বুদ্ধদেব গুহ কোট করছে! এই কেসটা কী বলো তো? 

দুহাতে ঊর্মিকে জড়িয়ে ধরে রজতাভ। তারপর ঊর্মির কানে একটা গরম নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “বাহ রে! নিজের বউকে খুশি করার দিনটায় একটু রোম্যান্টিক হব না? বিবাহবার্ষিকী বলে কথা!”

কথাটা শোনামাত্র চমকে ওঠে ঊর্মি। ইস! আজকের দিনটার কথা একদম ভুলে গিয়েছিল সে! কিন্তু রজতাভ ঠিক মনে রেখেছে! সেই কারনে এত প্রকৃতি, রোম্যান্টিক ব্যবহার, বুদ্ধদেব গুহ কোট করে কথা! লজ্জা পেয়ে সে মুখ নামিয়ে নিল। রজতাভ একহাতে ঊর্মির থুতনি ধরে  একটু  উপরে তুললো। তারপর ঊর্মির ঠোঁটে একটা নিবিড় চুমু খেল। ঊর্মি আজ আর বাধা দিল না রজতাভকে। সেও সাড়া দিল রজতাভর এই চুম্বনকে। কিছুক্ষণ পর রজতাভর গালে চুম্বন চিহ্ন এঁকে কানে ফিসফিস করে বলল, “হ্যাপি অ্যানিভার্সারী মেজরসাহেব।” বাইরের সকালের নীরব সুন্দর প্রকৃতি সাক্ষী রইল দুজনের এই মিষ্টি মুহূর্তের।

*****
হুড খোলা জিপের সামনে আচমকা প্রাণীটা এসে পড়ায় ঊর্মিরা প্রথমে চমকে গেলেও রজতাভ চমকায়নি। সে টুক করে সাথে ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বের করে তাক করল প্রাণীটার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ নানা অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তোলার পর ক্যামেরা নামিয়ে অস্ফুটে বলে উঠল,“ফ্যানটাস্টিক!” প্রাণীটা অবশ্য ওদের উত্তেজনাকে গায়ে মাখল না। কিছুক্ষণ ওদের জিপের দিকে তাকিয়ে তারপর গদাইলস্করি চালে চলতে শুরু করল অপরদিকে। ড্রাইভার রবি গাড়ি স্টার্ট করে বলল,“ এদিকে এটাই স্পেশালিটি স্যার। গোটা ফরেস্ট জুড়ে এদের অবাধ বিচরণ। এর জন্য অবশ্য মাঝে মাঝে ঝামেলায়ও পড়তে হয় তবে এরা সচরাচর নিজে থেকে তেড়ে আসে না টুরিস্টদের দিকে। ” 

পেছন ফিরে জন্তুটার চলে যাওয়া দেখছিল রজতাভ। রবির কথার উত্তরে বলল,“সেটাই তো স্বাভাবিক নয় কি? ওদের মুক্তাঞ্চলে তো আমরাই অবাঞ্ছিত আগন্তুকের মতো ঢুকেছি।  ওদের শান্তিভঙ্গ করছি। নিরীহ, শান্ত প্রাণীগুলোর নাকের খড়গের লোভে উজার করে দিচ্ছি গোটা বনাঞ্চল। এরকম চললে একদিন এমন হবে হয় এরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে নাহলে মানুষের প্রতি হিংস্র হয়ে উঠবে।”

- একথাটা স্যারও বলেন। কিন্তু পাবলিককে বোঝাবে কে?স্মারক হিসেবে ছবি তুলতে হবে। চলো ওদের ডেরায়। আবার বিরক্ত হয়ে তাড়া করলে তখন বাঁচাতেও হবে। তার উপর পোচারদের ঝামেলা। এত নজর রাখা, এত টহল, এত পাহারার পরেও শয়তানগুলো ঢুকে পড়ে আর লুকিয়ে কাজ সেরে পালিয়ে যায়।

- ওদের আর দোষ কী? ওদের থেকেও বড়ো শয়তান সেই মানুষগুলো যারা এসবের চাহিদা নিয়ে বসে থাকে। ওদের চাহিদার জন্যেই এরা দু-টাকা লাভের আশায় নামে। একবার ভেবে দেখ কী আছে গন্ডারের খড়গে? একগাদা চুল জমাট বেঁধে তৈরী বস্তুটা। অনেকটা মানুষের নখের মতো ম্যাটেরিয়াল অথচ  বিদেশে এর থেকে নাকি নানারকম জিনিস তৈরী হয় অথচ সেগুলো কৃত্রিম, রাসায়নিকভাবেও তৈরী করা যায়। কিন্তু শয়তানগুলো সেগুলো না নিয়ে আসল উপাদানই নেবে। 

এইভাবে কথা বলতে বলতে গাড়ি এগোতে থাকে অভয়ারণ্য ধরে। সুজাতা আর ঊর্মি নীরব শ্রোতা হয়ে শুনতে থাকে ওদের কথা। একসময় পার্কের একস্থানে বনকর্মীদের ভীড় দেখে গাড়ির গতি কমায় রবি। ভীড়ের মধ্যে তথাগতকে দেখতে পায় ওরা। অন্ধকারাচ্ছন্ন মুখ করে মাটির দিকে তাকিয়ে কি একটা দেখছে সে।

- ঐ আবার! বোধহয় খড়গের লোভে আরেকটা নিরীহ জীবের জান নিয়ে নিয়েছে শুয়ারগুলো!

প্রবল আক্রোশে কথাগুলো বলার পর গাড়িতে রজতাভরা আছে টের পেয়ে পরক্ষণে নিজেকে সামলে নেয় রবি। রবিকে গাড়ি থামাতে বলে রজতাভ জিপ থেকে নেমে পড়ে। ঊর্মিও নামতে যাচ্ছে দেখে সুজাতা বাঁধা দেয়। ঊর্মি তাকাতেই মাথা নেড়ে বলে, “যাস না। সহ্য করতে পারবি না। পোচারগুলো ভীষণ নির্মম। খড়গ নেওয়ার জন্য অবলা প্রাণীগুলোকে নৃশংসভাবে মারে। দেখলে মায়া হয়। ওকে দেখি তো, যেদিন কোনো পশুর মরার খবর আসে সেদিন সরেজমিন থেকে ফেরার পর রাতে বাচ্চাদের মতো হাউ হাউ করে কাঁদে। বর্ণনা শোনার পর আমিই চোখের জল আটকাতে পারি না তো ওর অবস্থাটা একবার ভাব। জঙ্গল অন্ত প্রাণ মানুষ তো, এদের এতটুকু আঁচ লাগলেও সহ্য করতে পারে না। ”

জিপের জানলা দিয়ে ওরা দেখে রজতাভ সোজা ভীড়ের মধ্যে দিয়ে তথাগতর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তথাগত রজতাভর দিকে তাকায়। ভীষণ হতাশায় ভরা সেই দৃষ্টি। কিছুক্ষণ পর থমথমে মুখে ফিরে আসে রজতাভ। তারপর জিপে উঠে রবিকে নির্দেশ দেয়,“বাড়ি চলো। এখনই পার্ক বন্ধ হবে। কাল আবার আসবো।”

*****
বিকেলের দিকে ঊর্মিদের বিবাহবার্ষিকী নিয়ে একাধিক প্ল্যান করলেও আপাতত পরিস্থিতি বুঝে সাদামাটা আয়োজন করতে বাধ্য হল সুজাতা। যদিও ঊর্মির কাছে সেটাও অনেকটাই বেশী মনে হয়েছে। অবশ্য ঊর্মির দোষ নেই। ও তো আর জানতো না যে ওর অজান্তে কালরাতেই সুজাতা, তথাগত আর রজতাভরা গোপন পরিকল্পনা  করে ফেলেছিল। সারাদিনের জার্নির ধকলে ঊর্মি যখন গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছে তখন ফিসফিস করে তিনজনে  আগাম পরিকল্পনা করে নিয়েছে আজকের দিনের। সেই মতো সকালে রজতাভর কাছ থেকে বিবাহবার্ষিকীর আদর উপভোগ করার পর তথাগতর প্ল্যান মতো ওরা বেরিয়ে পড়েছিল অভয়ারণ্য ভ্রমনে। ইচ্ছে ছিল সেখানে একটা গ্র্যান্ড সারপ্রাইজ দেওয়া হবে ঊর্মিকে।

কিন্তু তাল কাটল অন্য জায়গায়। কাল রাতে কে বা কারা গন্ডারের খড়গের লোভে একটা গন্ডারকে মেরে গেছে। এবং ঠিক সেই জায়গায় দেহ রেখে গেছে যেখানে ওরা সারপ্রাইজের কথা ভেবেছিল। অগত্যা বাধ্য হয়ে কোয়ার্টারে ফিরে আসতে হলো ওদেরকে। কোয়ার্টারে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম করতে ঘরে শুয়েছিল ঊর্মি। সেই সময়টা কাজে লাগিয়ে সারাদুপুর রজত আর সুজাতারা গোটা ঘর সাজিয়েছে। বিকেলবেলা ড্রইংরুমের পরিবর্তন দেখে প্রথমে হতবাক হয়ে গিয়েছিল ঊর্মি। পরক্ষণে সুজাতার কথায় সবটা বুঝতে পেরে জড়িয়ে ধরেছিল সে।

সন্ধ্যেবেলা নটবরের সাহায্যে একের পর এক সুস্বাদু পদ খাবার টেবিলে সাজিয়ে রেখে নিজের ঘরে ঢুকলো সুজাতা। সারাদিন ধরে ঘরটাকে সাজানোর পর একটু নিজেকে সাজানো প্রয়োজন। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে পোশাক পাল্টে, অল্প প্রসাধনী  মেখে ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখল তথাগত ফিরে এসেছে।  তথাগত সুজাতার কাছে এসে বলল, “লাশটাকে ডেসপ্যাচ করে এলাম। ব্লাডি ক্রিচার্স! এরা কোনোদিনও শোধরাবে না। যাকগে বাদ দাও এদিকের কী খবর? নির্ঘাত পার্কে ঘুরতে পারেনি বলে একটু কষ্ট পেয়েছে ওরা। কী আর করা যাবে? বাইরের ঘরটা তো ভালোই সাজিয়েছ দেখছি। বেশ করেছ! খামোখা ওদের আনন্দ মাটি করার কোনো মানে হয় না। দাঁড়াও আমিও ফ্রেশ হয়ে আসছি।” বলে তথাগত ঢুকে যায় ওদের ঘরে।

সুজাতা ড্রইংরুমের দিকে এগোতেই দেখে রজতাভ তৈরী হয়ে সোফায় বসে আছে। সুজাতা এগিয়ে এসে বলে,

- বাহ! বর বাবাজি দেখছি একদম রেডি!

- আমার তৈরী হতে বেশিক্ষণ কোনোদিনও লাগে না। সময় লাগে তোমার প্রিয় সখীর। এখনও উনি গালে পাউডার ঘষে যাচ্ছেন।

- এই ওভাবে বলবে না! আমাদের তৈরী হতে সময় লাগে বলেই তো তোমরা হা করে চেয়ে থাকো।

- সকলে নয়। কিছু মানুষ চেয়ে থাকে। অতো সাজার কি দরকার বুঝি না আমি।

- বুঝতে হবে না তোমাকে।

কিছুক্ষণ পর বলে, “ঊর্মির মুডটা আজ দুপুরে ভীষণ অফ ছিল তাই না রজতদা?”

- না তেমন ছিল না। তবে ওরকম মৃত্যুর খবরে একটু মুষড়ে পড়েছিল। কিন্তু বিকেলে সব মেঘ কেটে আকাশ পরিস্কার হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে ডেকোরেশনটা ওর এত ভালো লাগবে বুঝতে পারিনি।

- ঊর্মি ভীষণ খুশি হয়েছে বলছো? তবে এর ক্রেডিট কিন্তু পুরোটাই তোমার। দুপুরে তুমি আমায় বুদ্ধি না দিলে এত কম সময় এত কিছু করতে পারতাম না। সত্যি কথা কী জানো?ঊর্মি ভীষণ লাকি যে ও তোমাকে পেয়েছে। তোমরা একে অপরকে কতটা ভালোবাসো সেটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। কজনের কপালে এরকম ভালোবাসা জোটে?

সুজাতার প্রশ্নের উত্তরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল রজতাভ। তারপর সামনের দিকে শব্দ শুনে তাকাল। ঊর্মি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। আকাশী রঙের শাড়িতে অপরূপ লাগছে ওকে। ওদের দিকে তাকিয়ে হাসছে সে। সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে রজতাভ বলল, “সবার কি আর সেই ভাগ্য হয়? কারো কাছে ভালোবাসা নেহাতই ভালোবেসে ভালো রাখার নিখাদ নিখুঁত অভিনয়। কেউ সেটা পারে, কেউ পারে না। যারা পারে তাদের সম্পর্কটা টিকে যায় এক ছাদের তলায়। আর যারা পারে না, দিনের শেষে দু পথে আলাদা হয়ে যায়।"

(চলবে...)

শনিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ দ্বাদশতম পর্ব





রাতের খাবার পালা শেষ করার পর নিজের ঘরে বসে ব্যাগপত্র গোছাতে শুরু করল সুজাতা। দেখতে দেখতে একটা গোটা সপ্তাহ যে কোথা দিয়ে কেটে গেল বোঝাই গেল না। মনে হচ্ছে এই তো কালই এলো ওরা। ইচ্ছে করছে আরো কটা দিন থেকে যেতে। ইচ্ছে করছে আরো কটা দিন পর ফিরে যেতে। কিন্তু সুজাতা জানে তা সম্ভব নয়। তথাগতর ছুটির মেয়াদ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, একগাদা কাজ আর বনাঞ্চল অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। কাল ফিরতে হবেই ওদের। তারপর আবার অপেক্ষা তথাগতর আবার ছুটি পাবার। ততদিন পর্যন্ত ওকে আবার থাকতে হবে অন্তঃপুরে। তথাগত তো ফিরেই ঝাঁপিয়ে পড়বে কাজে, আর ও থেকে যাবে সেই নিস্তব্ধ, নিরিবিলি ফাঁকা কোয়ার্টারে, এই কটা দিনের স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে একাকী বন্দিনী হয়ে।  

এখন তো এসবে তাও অভ্যেস হয়ে গেছে সুজাতার। আগে বদ্ধ কোয়ার্টারে দমবন্ধ হয়ে আসতো ওর। প্রতি মুহূর্তে মনে হতো কোয়ার্টারের প্রতিটা কোণ যেন ওকে গিলে খেতে আসছে। রাতে তথাগত ফিরে এলে হাফ ছেড়ে বাঁচত সে। তথাগতর বুকে মাথা রেখে প্রথম প্রথম কাঁদত। তথাগত সবটা না বুঝলেও আঁচ করতে পারতো। সুজাতার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিতো। এখন অভ্যেস হয়ে গেছে সুজাতার। আর সে কাঁদে না। তথাগতও আর মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দেয় না। 

এসব ভাবতে ভাবতেই ব্যাগ গোছাচ্ছিল সুজাতা। এমন সময় দরজার বাইরে থেকে ঊর্মির কন্ঠস্বর শুনতে পেল।

- ভেতরে আসবো?

সুজাতা সম্বিত ফিরে দেখল দরজার সামনে ঊর্মি দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জা পেয়ে ব্যাগ গোছানো বন্ধ রেখে বলল, “ আয়!” ঊর্মি একটা কৌটো হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকে বিছানার উপর বসল। তারপর কিছুক্ষণ সুজাতার দিকে তাকিয়ে বলল,“গোছানো কমপ্লিট?”

- হ্যা! প্রায়ই হয়ে এল। তা তোর হাতে কী ওটা?

- ঐ কালকের জন্য কিছু ড্রাইফ্রুট, আর তোদের রজতাভদা কাছের একটা বেকারি থেকে কিছু কুকিজ আনিয়েছিল তোদের জন্য, সেগুলোই আছে। 

- দেখেছ কাণ্ড! ওসবের আবার কি দরকার ছিল? শুধু শুধু ঝামেলা করলি!

- রেখে দে না! কালকে ফেরার সময় রাস্তায় খিদে পেলে কাজে লাগবে।  

- তাই বলে এতকিছু!

- থাক না! আবার কবে আসবি কে জানে?

বলে ছলছলে চোখে তাকায় ঊর্মি। ঊর্মির কথা শোনামাত্র সুজাতারও বুকটা হুহু করে ওঠে। ব্যাগ গোছানো থামিয়ে সে জড়িয়ে ধরে ঊর্মিকে। তারপর ধরা গলায় বলে, “কটা দিন তোদের ভীষণ জ্বালিয়ে মারলাম বল? খুব মিস করবো তোদের।”

- আমিও রে! এই কটা দিন যে কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না! ঝপ করে যেন কেটে গেল দিনগুলো। 

ঊর্মির মন ক্রমশ ভারাক্রান্ত হচ্ছে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুজাতা জিজ্ঞেস করে, “কি আর করবি বল? বেড়াতে গেলে দিনগুলো যেন ডানায় ভর দিয়ে কেটে যায়, অথচ বাড়িতে থাকলে এক-একটা সময় যেন কাটতেই চায় না। যাক গে ওসব কথা বাদ দে। আচ্ছা আমাদের বরদুটো কোথায় গেল বল তো? না মানে অন্যদিন তো দুজনের হাকডাকে বাড়িটা সরগরম থাকে আজ দুজনেই একবারে যাকে বলে স্পিকটি নট! কেসটা কী?”

ঊমি চোখ মুছে মুচকি হেসে বলে, “হবে না? দুজনে যে আবার পান পাত্র নিয়ে বসেছে! আজকে তোদের রজতদাকে ছাড় দিয়েছি ঠিকই তবে শুধু দু পেগ ওয়াইনের এবং নিঃশব্দ পানের শর্তে!”

- অ্যা! সেকি‌? কাল ট্রেন আছে জেনেও ও বসেছে?

- আহা! সবসময় অতো বকিস না তো! একটু‌ খেলে ক্ষতি নেই!

- ক্ষতি নেই মানে? আরে ও সহ্য...

পলকে সেদিনের রাতের কথা মনে পড়ে ষাওয়ায় লজ্জায় লাল হয়ে যায় সুজাতা। ঊর্মিও ফিক করে হেসে ফেলে। নিজেকে সামলে নিয়ে সুজাতা বলে ওঠে, “হাসিস না। একবার ওরকম কাণ্ড করেছি বলে বারবার করবো তার কোনো মানে নেই। তাছাড়া কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে আমাদের! এবার সকালে মাথা ধরা নিয়ে বসে থাকলেই হয়েছে।”

- চাপ নেই! সেদিনের মতো ডিটক্স চা খাইয়ে দেবো। তেমন হলে ফ্লাস্কে দিয়ে দেবো কিছুটা। আর রেসিপিটাও দিয়ে দেবো, মাঝে মাঝে বেসামাল হলে পরের দিন করে দিস, দেখবি ভালো লাগবে।

- না না! ওসব কিছু লাগবে না। ওকে তুই চিনিস না। এখানে সোনা মুখ করে খেলেও ওখানে জাস্ট ফেলে দেবে।

- কিছু হবে না। তথাগত যথেষ্ট ভালো ছেলে! তোদের রজতদার মতো না। খাবার নিয়ে ওর হাজার বায়নাক্কা ছিল একসময়। হার্ট অ্যাটাকের পর ডাক্তারের ডায়েট অনুযায়ী খাবার খাওয়াতে আমার রীতিমতো কালঘাম ছুটেছে। কিছুতেই স্যুপ খেতে চাইতো না। কত জোর, কান্নাকাটি করে খাওয়াতে হত। এখন তো তাও খায়, আগে তো পাগল হয়ে যেতাম আমি। যে মানুষটা আগে আকণ্ঠ মদ খেত সেই মানুষটাকে মদ ছাড়তে বাধ্য করার জন্য যে কত কান্নাকাটি করেছি তা জানিস না।

বলতে বলতে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঊর্মি। সুজাতা ঊর্মির কাঁধে হাত রাখে। ঐদিকে বারান্দা থেকে ভেসে আসে রজতাভদের কণ্ঠস্বর। সেদিকে তাকিয়ে সুজাতা বলে,“থাক বলতে হবে না। রজতদা যে আজ বেঁচে আছে, সুস্থ আছে, তার পেছনে তোর লড়াইটা আর কেউ জানুক বা না জানুক আমি জানি। রজতদাও জানে। আর জানে বলে তোকে এতটা ভালোবাসে।”

বারান্দায় বসে গ্লাসের তলানিতে থাকা তরল আগুনটাকে গলায় ঢেলে একটা সিগারেট ধরাল তথাগত। পাশে বসে থাকা রজতাভ গ্লাসের ওয়াইনে দুটো চুমুক মেরে আড়চোখে তথাগতর দিকে তাকিয়ে বলল,“এবার থামো হে ভায়া! আজকের ডোজ কিন্তু একটু বেশীই হয়ে গেছে।”

তথাগত সিগারেটে টান মেরে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে অ্যাশট্রে-তে ছাই ফেলে জড়ানো গলায় বলল, “কোথায় বেশী হলো? সবে তো দুইপেগ। দুইপেগে আবার নেশা হয়?” বলে গ্লাসে হুইস্কি ঢালতে লাগলো সে।

রজতাভ ওয়াইনের গ্লাসে অল্প চুমুক দিয়ে তথাগতকে দেখতে লাগল। কয়েকবছর আগে সেও এরকমই ছিল। বেসামাল, বেহিসাবি,বেপরোয়া। এখানকার এমন কোনো মদ নেই যা সে খায়নি। এমন কোনো মদের দোকান নেই যা সে চেনে না। এই সব জায়গা থেকে কিনতে কিনতে আজ ওর কালেকশন তৈরী হয়েছে। তথাগত যেটা খাচ্ছে সেটা স্পেশাল ধরনের হুইস্কি। প্রথম প্রথম নেশা হয় না ঠিকই, কিন্তু মিষ্টিজাতীয় কিছু খেলেই এমন নেশা ধরে যে পরদিন পর্যন্ত তার মৌতাত থাকে। রজতাভর মনে আছে এটার খোঁজ এক গোর্খা সুবেদার দিয়েছিল তাকে। সেও তার মতোই পানরসিক ছিল। সেখানে গিয়ে নিজে টেস্ট করে দুটো বোতল কোয়ার্টারে নিয়ে এসেছিল সে। এককালে মদের খোঁজে কোথায় যায়নি সে? কোন মদ আছে সে খায়নি? এমনকি গোর্খা বিয়ারের আদর্শ জায়গা কোথায় সেটাও সে জানে। এককালে তথাগতর মতোই সে বলত, ‘দুর! দুই পেগে আবার নেশা হয়?’ আর এখন? মদ খাওয়া তো দুর, সামান্য গুরুপাক খাবার খাওয়ার কথাও সে ভাবতে পারে না। ঊর্মি ওকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। আজ এতবছর পর ঊর্মি ওকে ওয়াইন খেতে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু ঐ দুই পেগের শর্তে। সে কারনেই সে ধীরে ধীরে ওয়াইনটা উপভোগ করছে। কারন এটা শেষ হয়ে গেলেই শেষ। আবার কবে ঊর্মি অনুমতি দেবে কে জানে?

ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে রজতাভ বলল,“কাল তোমরা রওনা হচ্ছো তাহলে?”

তথাগত হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল,“হুম! কাল সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বো। তাহলে ট্রেনটা ধরা যাবে।”

- কটার দিকে ট্রেন?

- সকাল দশটার দিকে। ডিব্রুগড় এক্সপ্রেস। সেটা ধরলে, আর লেট না হলে সন্ধ্যের মধ্যে ঢুকবো ডিব্রুগড়ে। সেখানে গাড়ি থাকবে। সব ঠিক থাকলে রাত আটটার মধ্যে ঢুকে যাবো আমরা। তা ভাই রজতাভ, এবার কিন্তু তোমাদের নিমন্ত্রণ রইল। দুজনে মিলে সমুদ্র দেখেছি, তোমার ডাকে পাহাড় দেখলাম, এবার তোমাকে জঙ্গল দেখানোর পালা রইল। তা কবে আসবে বলো?

- দেখি। আপাতত কটা দিন এখানে কাটিয়ে নিই। তারপর শিলিগুড়িতে কিছু কাজও আছে।

- ওসব শুনতে চাই না। বলো আসবে কিনা?

- দেখছি। আপাতত কথা দিতে পারছি না।

বলতে বলতে রজতাভ খেয়াল করে সুজাতা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তথাগত হুইস্কি খেতে খেতে বলে, “হু হু! একবার ঘুরে যাও আমাদের এদিকে। তোমাদের জঙ্গলের প্রেমী না করে তুলেছি তো আমার নাম বদলে দিও। টিভিতে, গল্পের বইতে জঙ্গলের যে বর্ননা জেনেছ, দেখবে জঙ্গল তার চেয়েও বেশী সুন্দর, তার চেয়েও বেশী রহস্যময়। আর আমাদের বাংলোর রাঁধুনির হাতে বনমোরগের ঝোল আর হাতে গড়া রুটি তোমাদের মলিদিদির তৈরী খাবারের চেয়ে কম নয়। তোমাদের সুজাতাও এ ব্যাপারে একমত হবে দেখো।”

সুজাতা রজতাভর দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই রজতাভ ইশারায় চারটে আঙুল দেখায়। সুজাতা কপাল চাপড়ে এগিয়ে যায়।

“এই যে ওঠো! অনেক গিলেছ আর না।” বলে তথাগতর হাত থেকে গ্লাস কেড়ে নিয়ে টেবিলে নামিয়ে রাখে। তথাগত সুজাতার দিকে ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে জড়ানো গলায় বলে,

- অ্যা! কে? অ তুমি! আহা গ্লাসটা আবার কেড়ে নিলে কেন? সবে মাত্র ঢেলেছিলাম।

- আর খেতে হবে না। অনেক খেয়ে নিয়েছ। চলো ঘরে গিয়ে ঘুমোবে। কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে।

- কোথায় আর খেলাম? সবে তো চার গ্লাস!

- ওটাই যথেষ্ট! চলো এবার!

- কোথায় যাবো?

- ঘরে চলো। ঘরে গিয়ে শোবে।

- শোবো?

বলে ফিক করে হেসে ফেলে তথাগত। তারপর জড়ানো কন্ঠে বলে, “এতদিন ধরে শুয়েছি তাতেও আশ মেটেনি? আরো চাই? এই তোমরা না হেবি ডিম্যান্ডিং! রোজ এটা চাই, ওটা চাই, না! তুমি না, তবে আমার সাথে কাজ করা সব কটা লোকের বউয়েরা একই পথের পথিক। কারো গয়না চাই, কারো শাড়ি, কারো মেকাপের সরঞ্জাম। চাহিদা আর শেষ হয় না। গতবারের পোস্টিং-এর দাসবাবুকে মনে আছে তোমার? সেই যে প্রতিরাতে কোয়ার্টারের বারান্দায় বিড়িমুখে মাদল বাজিয়ে গাইতেন। তিনি কী বলতেন জানো? ‘চৌধুরী! তোমার স্ত্রীভাগ্য বেশ ভালো! নো বায়না, নো দাবিদাওয়া, নো কান্নাকাটি। যা দাও তাতেই খুশি। সব জায়গায় সাথে সাথে চলে। এরকম বৌ পেলে তো আমি বর্তে যেতাম হে! এদিকে তোমার বৌদিকে দেখো, শহরের পাকা,চকমেলানো, আলো ঝলমলে বাড়িতে পটের বিবি সেজে সারাদিন বসে থাকেন। জঙ্গলের পরিবেশ তার নাপসন্দ, রোদে বেরোলে নাকি তার চামড়া কালো হয়ে যাবে! মাসের শেষে বেতনের সিংহভাগ হাতখরচের প্রণামী হিসেবে পৌঁছে গেলেই হল। আর বছরে বারোটা শাড়ি, গয়নার ফিরিস্তি আলাদা, আমি না থাকলেও ক্ষতি নেই। মানেটা কি দাঁড়াল? স্বামী না থাকলেও চলবে, হাতখরচের টাকা সময়মতো পৌঁছনো চাই। এদিকে ওদের আবদার, বায়নার দাম চোকানোর টাকা কোথা থেকে আসছে? কীভাবে আসছে? যে আনছে সে কোন ঝুঁকি নিয়ে আসছে সেটা নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই। সন্তান দুটোও তথৈবচ মর্কটশিরোমণি। বাপের টাকায় রাজপুত্তুরের মতো ঠাটবাট দেখালেও, বাপটা কেমন আছে জানার প্রয়োজন বোধ করে না। মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানো? সব ছেড়ে দিয়ে সিবিআইতে তলব দিয়ে গুম হয়ে যাই। ওরাও বুঝুক টাকার বোঝা কাকে বলে?' বুঝলে হে ভায়া রজতাভ? এই দাসবাবু আজব মানুষ ছিলেন। পরিবারের জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতেন। ন্যায়-অন্যায় দেখতেন না। অথচ মানুষটা পরিবারের কাছেই ব্রাত্য ছিলেন। তবে এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না তিনি। রোজ রাতে মহুয়া,হাড়িয়া, কোনোদিন মেজাজ শরিফ থাকলে রাম খেয়ে মাদল নিয়ে বসে পড়তেন বারান্দায় লাগোয়া আরামকেদারায়। মুখে একটা বিড়ি ধরিয়ে তাল ঠুকতেন ঢিমে তালে। তারপর তালের গতি বাড়তো। বিড়ি শেষ করে গাইতেন বনের গান, কখনো সাঁওতালদের গান। যার মাথামুন্ডু না বুঝলেও সুর আর তালে ঝিম ধরে যেত। বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞেস করে দেখো সুজাতাকে, এই সু! বলো না রজতাভকে। কত রাতে বিছানাতে সেই তালে তাল মিলিয়ে তোমাকে বুকের তলায়...” বলে আবার ফিকফিক করে হাসে তথাগত। 

তথাগতর কথায় রজতাভ গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়েও থমকে তাকায় তথাগতর দিকে। তারপর সুজাতার অগোচরে মুচকি হাসে। কথাটা শোনামাত্র সুজাতা মরমে মরে যায় । মদ খেয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে কার সামনে কী বলছে তার কোনো জ্ঞান তথাগতর না থাকলেও সুজাতার আছে। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে সুজাতা একপলক রজতাভর দিকে তাকায়। তারপর তথাগতর হাত ধরে বলে, “অনেক হয়েছে! এবার চলো!” কিন্তু ওর ঠেলাঠেলিতে তথাগতর কোনো বিকার ঘটে না। সে আপনমনে টেবিল থেকে গ্লাসটা তুলে নিয়ে সেটায় থাকা অবশিষ্ট তরল পানীয় গলায় ঢালে। সুজাতা তথাগতকে ঠেলা দিতে দিতে ক্রমশ বেহাল হচ্ছে দেখে অগত্যা বাধ্য হয়ে নিজের গ্লাসের পানীয়টা শেষ করে আসরে নামে রজতাভ। তারপর সুজাতার হাতে হাত লাগিয়ে তথাগতকে কোনোমতে আরামকেদারা থেকে তুলে সুজাতাদের ঘরে নিয়ে আসে। তারপর তথাগতকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরোবার আগে একবার পিছন ফিরে সুজাতার দিকে তাকায়। তারপর হাসতে হাসতে ধীরপায়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। বারান্দা থেকে গ্লাস আর বোতলদুটো নিয়ে যথাস্থানে রেখে বেডরুমে ঢুকে দেখে ঊর্মি বিছানায় বসে হাতে পায়ে শীতের মলম ঘষছে।

রজতাভর দিকে ঊর্মি তাকাতেই রজতাভ ফিক করে হেসে ফেলে। তারপর বিছানায় বসে ওষুধগুলো খেতে খেতে বলে, “যেমন দ্যাবা,তেমন দেবী। দুজনেই সমান! যাকে বলে একেবারে রাজজোটক! কেউ কারো থেকে কম যায় না। বউ যেমন বেশী খেলে উল্টে যায়, তেমনই বরও ভাট বকে। ভাগ্যিস সুজাতা এল! নাহলে বাবাজি আরো কিছুক্ষণ বকতেন।" ঊর্মি মলম মেখে বিছানায় বসে বলে, “যাই বলো, দুজনে বেশ আছে বলো?”

রজতাভ মাথা নাড়ে। তারপর বিছানায় আধশোয়া হয়ে বলে,“ওদের দেখলে আমাদের বিয়ের পরের দিন গুলোর কথা মনে পড়ে যায়। মনে আছে? সেই বিয়ের পর পর তুমি, আমি এরকমই পরস্পরকে চোখে হারাতাম। না এখনও হারাই। কিন্তু সদ্যবিবাহিতদের মধ্যে একটা কেমিস্ট্রি কাজ করে। একটু লজ্জা, একটু ভালোলাগা, ছোটখাটো বিষয়ে অল্প একটু যত্ন নেওয়া। যেটা বিয়ের এক-দুই বছর পরে ফিকে হয়ে গিয়ে শুধু অভ্যেসে পরিণত হয়। অথচ ওদের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। ওরা এখনও সেই কেমিস্ট্রিটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”

- ঠাকুর করুক ওদের এই কেমিস্ট্রিটা আজীবন বেঁচে থাকুক।  

- আমিও তাই চাই। সুজাতা বড়ো ভাল মেয়ে। তথাগতও ছেলে মন্দ নয়। ওর জন্য তথাগত একেবারে পারফেক্ট ম্যাচ। একে-অপরকে যেভাবে ওরা ভালোবেসে আগলে রাখে সেটা আজকালকার কাপলদের মধ্যে খুব কম দেখা যায়। আজকালকার দম্পত্তিরা প্রথম প্রথম ভালোবাসা,হাসিখুশি থাকলেও পরে নির্বিকার, নিরস ভাবে গোটা জীবন কাটায়। প্রথমে জীবনটা সুখের মনে হলেও পরে সেটা ক্রমশ খাঁচায় আবদ্ধ পাখির মতো মনে হয়। তখন ভালোবাসার জায়গায় চাহিদার প্রবেশ ঘটে। এটা দাও, ওটা দাও, সেটা দাও। মুখে প্রকাশ না করলেও হাবেভাবে বোঝানো হয় চাহিদাটাকে। তখন বিয়েটা বোঝাপড়ায় পরিণত হয়। ভালোবাসার জায়গা নেয় Give & Take policy। আর একারনেই দাম্পত্যজীবন বিষাক্ত হয়ে যায়। একটু আগেই তো তথাগত বলছিল ওর কোন কলিগের স্ত্রী নাকি সাংঘাতিক ডিমান্ডিং। স্বামী না হলেও চলবে, তবে চাহিদা পুরণ হওয়া চাই। সেক্ষেত্রে তথাগত অনেক লাকি।

- মোটেই না! আমরা মেয়েরা মোটেও ওরকম নই। বরং পুরুষদের চাহিদা বেশী!

- তাই! আমাকে এমন একটা পুরুষ দেখাও যে স্ত্রীর কাছে ‘এটা চাই',‘ওটা চাই' বলে বায়না করেছে। যত বায়না তোমরাই করো। বিবাহবার্ষিকীতে গয়না চাই, জন্মদিনে বাইরে খাওয়া চাই,বিয়ে-অনুষ্ঠানে শাড়ি চাই। এদিকে আলমারি উপচে পড়ছে অথচ তাও শাড়ির চাহিদা শেষ হয় না।

- বাহ রে! এটা তো আমাদের অধিকার। বৌভাতের দিনই তো তোমরা আমাদের খাওয়া-পরার দায়িত্ব নাও। তোমাদের কাছে চাইব না তো কার কাছে চাইব? আমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তো তোমাদের। আর অনুষ্ঠান-পার্বনে নতুন কাপড় পরবো না তাই কি হয়?

- পথে এসো! এই তো বলছিলে তোমরা নাকি এরকম নও,তোমাদের চাহিদা নেই তা এটা কি চাহিদা নয়? আর ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া এবং চাহিদাপুরণে তফাৎ অনেক। প্রথমটা কর্তব্য, পরেরটা আবদার মেটানো। আর আবদারের সংখ্যা যখন সাধ্যের বাইরে চলে যায় তখন জীবন কন্টকময় হয়ে যায়। আর ক্রমশ এই চাহিদাগুলো বোঝা হয়ে ওঠে। তোমাদের অবশ্য দোষ নেই। তোমরা ভাবো তোমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব যখন আমাদের তখন তোমাদের অফুরন্ত চাহিদাপুরণের দায়িত্বও আমাদের। অথচ আমরা ছোটোখাটো জিনিসেই খুশি থাকতে, খুশি রাখতে পছন্দ করি।

-‌ তাই বুঝি? তা তোমার বুঝি কোনো চাহিদা নেই আমার কাছ থেকে?
 
প্রশ্নটা শোনামাত্র স্তব্ধ হয়ে যায় রজতাভ। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ঊর্মির দিকে। তার একবার ইচ্ছে করে বলতে, “আমার চাহিদা যে ভীষণ সীমিত ঊর্মি। বেশীকিছু চাইও না আমার। কিন্তু আমার যা চাই তা তুমি দিতে অপারগ। বরং আমার চাহিদার কথা তোমাকে জানালে তুমি নিজেই আমাকে থামিয়ে দেবে। অথচ কী এমন চেয়েছি আমি? রক্তমাংসের একটা ছোটো প্রাণ, যা একান্ত আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন হয়ে এই পৃথিবীতে থাকবে। কিন্তু না, সামান্য একটা অহেতুক ভয়ের বশে তুমি নিজেই আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছ। আজ যদি আমি একই আবদার করি তুমি মেনে নেবে?” তারপর নিজেকে সামলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “না নেই। শুয়ে পড়ো, অনেক রাত হয়েছে। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।”
 
বলে বিছানার পাশের রিডিং ল্যাম্পটা বন্ধ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে রজতাভ। সুজাতা কিছুক্ষণ রজতাভর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মৃদু হেসে আলো নিভিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। আলো নিভে যাওয়ার পর রজতাভ চোখ খোলে। বিয়ের চার বছর হতে চলল। বাইরে থেকে ওদের একজন সুখী, পারফেক্ট কাপল মনে হলেও আসলে দুজনের মধ্যে যে একটা অদ্ভুত শীতল দুরত্বের সৃষ্টি হয়েছে তার খবর কেউ জানে না। সারাদিন হাসি, খুনসুটিতে, একে অপরকে সাহায্য করে দিন কেটে যায় ঠিকই। কিন্তু রাত হলেই বন্ধ ঘরের মধ্যে ভালো থাকার ছদ্মবেশ পাল্টে, হাসি মুখের মুখোশ খুলে যন্ত্রের মতো নীরস, নির্বিকারভাবে দুজনে পরস্পর পিঠ করে শুয়ে পড়ে। সারাদিন একে-অপরকে চোখে হারিয়ে, একে-অপরের যত্ন নিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করলেও দুজনেই জানে এটা অভিনয় ছাড়া আর কিছু নয়। এতগুলো দিন ধরে একে-অপরকে ভালোবেসে ভালো রাখার অভিনয় করে পরস্পরকে সুখী রাখা নামে ঠকিয়ে যাচ্ছে দুজনে। যুদ্ধভূমিতে মৃত্যুকে কাছে দেখার পর জীবনের প্রতি অনীহা জন্মানোয় তথাগত চেয়েছিল নিজের একটা চিহ্ন পৃথিবীতে রেখে যেতে। পিতৃত্বের সাধ জেগেছিল তার মনে। সে জানতো মৃত্যু একবার যখন তার নাগাল পেয়েছে মারণ ছোবল না দিয়ে সে ছাড়বে না। মৃত্যু নিশ্চিত জানার পর চলে যাবার আগে শেষবারের মতো বাবা ডাক শুনতে চেয়েছিল সে। কিন্তু মাঝখানে হার্ট অ্যাটাকের পর সেই আশা প্রায় নিভতে বসেছিল।

অপারেশনের পর আর কোনো ঝুঁকি নেই জানার পর পিতৃত্বের সাধ আরো তীব্র হয়ে উঠেছিল তার। রজতাভ চেয়েছিল ঊর্মি আর ওর সন্তানকে নিয়ে বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটাতে। কিন্তু এবার বাধ সাধল ঊর্মি। একটা অহেতুক ভয় জন্ম নিল ওর মনে। রজতাভর কাছে এলেই ওর মৃত্যু হবে এই ভয়ে দূরে সরিয়ে নিল নিজেকে। আর এই ভয়টাই হয়ে উঠল ওদের জীবনের সবথেকে বড়ো ক্ষত। সেদিনের পর থেকে যতবার রজতাভ ঊর্মির কাছে গেছে, ঊর্মি ওকে নানা কথায়, ছলে নিরস্ত করেছে। যতবার সন্তানের আবদার করে ঊর্মির কাছে গেছে রজতাভ, ততবার রিক্ত হাতে ব্যর্থ মনোরথে ফিরতে হয়েছে তাকে। সেদিনের পর থেকে ঊর্মি নিজেকে ওর থেকে এতটাই দূরে সরিয়ে নিয়েছে যে রজতাভ চাইলেও তার নাগাল আর পায়নি। ক্রমশ দূরে সরে যেতে যেতে, ক্রমাগত প্রত্যাখ্যাত হতে হতে একসময় অভিমান করে রজতাভও একটা দেওয়াল তৈরি করে নেয় নিজের চারপাশে। আজও সেই দেওয়ালে চিড় ধরেনি। একবার পেছন ফিরে ঊর্মির দিকে তাকায় রজতাভ। তারপর আবার সামনের দিকে ঘুরে শুয়ে পড়ে। নাইটল্যাম্পের আলোয় দুজন পিঠোপিঠি শুয়ে ক্রমশ তলিয়ে যায় ঘুমের অন্ধকারে।

পাশের ঘরে বিছানায় শুয়ে নাইটল্যাম্পের আলোয় অপলকে সদ্য রমণক্লান্ত তথাগতর দিকে তাকিয়েছিল সুজাতা। মাতাল হলেও তথাগত আজ রাতেও আদর করতে ভোলেনি। বরং আদরের মাত্রাটা আজ একটু বেশিই ছিল। যেন আজ ওকে বিছানায় মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল তথাগত। অন্যদিন এই বন্য আদর ভালো লাগলেও আজ যেন একটু বেশীই যন্ত্রণাময় লাগছিল তথাগতর আদরের মাত্রাটা। সে প্রতিরোধের চেষ্টা করতেই আরো রোখ চেপে গিয়েছিল তথাগতর। এক হাতে সুজাতার মুখ চেপে আরো প্রবলভাবে আদরের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল সে। কামড়ে ধরেছিল সুজাতার কাঁধ। দুরন্ত গতিতে তথাগত যখন ওর ভেতরে প্রবেশ করছিল সেসময় সুজাতার মনে হচ্ছিল যেন সে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। কতক্ষণ ওর উপর এই তীব্র আদর চালিয়েছিল তথাগত জানে না সুজাতা। তবে একটা সময় টের পেয়েছিল তথাগতর চরম মুহূর্তের সময় আসন্ন। আর পরক্ষণেই তথাগতর ক্লান্ত শরীরটা ওকে প্রায় ছিবড়ে করে ওর পাশে এলিয়ে পড়েছিল। 

গোটা শরীর যন্ত্রণায় ভেঙে পড়লেও সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না সুজাতার। ওর কানে বাজছিল তথাগতর বলা কথাগুলো। যে কথাগুলো রজতদার সামনে মত্ত অবস্থায় বলে চটুল হাসি হাসছিল তথাগত। রজতদার কাছে সেটা একটা মাতালের প্রলাপ হলেও সুজাতা ভালো করেই জানে তথাগতর ইঙ্গিতটা কতটা নোংরা, আর অশ্লীল ছিল। রজতদার কাছে ওকে কামুক প্রমাণিত করতে চাইলেও বাস্তবটা যে কতটা উল্টো সেটা সুজাতা ছাড়া আর কেউ জানে না। এই একটু আগেও আদর করার সময় ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলছিল তথাগত,“তুমি এত ভালো কেন সু? এতবছর হয়ে গেল,কোনো চাহিদা, কোনো চাওয়া নেই কেন তোমার? শাড়ি-গয়না কিছুই চাই না কেন তোমার? এত নিখুঁত কি করে হলে তুমি? বিছানাতেও কোনো প্রতিরোধ নেই,যেভাবে আদর করি মুখ বুঁজে সহ্য করো। কেন এত আপোষ করো তুমি? একবারও কি ইচ্ছে করে না ছকে বাঁধা নিয়ম ভাঙতে? ইচ্ছে করে না একবার প্রতিরোধ করে ডমিনেশনের ব্যাটন নিজের হাতে তুলে নিতে? যেমন বন্য আদর মুখ বুঁজে সহ্য করো ঠিক তেমন আদরে আমাকে ভরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে না?”

পরক্ষণে প্রতিরোধ করতেই ফুঁসে উঠেছিল তথাগতর পৌরুষ। আচমকা গালে সপাটে চড় মেরে হিসহিসে কন্ঠস্বরে বলে উঠেছিল, “তথাগত চৌধুরীকে বাধা দেওয়া? আমাকে কাবু করার চেষ্টা? এত সাহস? শালি আজ তোকে দেখিয়ে দেব আমি কী জিনিস!”

মাঝে মাঝে তথাগতকে অদ্ভুত মানুষ মনে হয় সুজাতার। নিজেই নিয়ম ভাঙতে প্রলুব্ধ করে আবার পরক্ষণেই নিয়মের বাইরে গেলে শাস্তি দিতে উদ্যত হয়। বাইরের জগতের কাছে নিজেকে‌ প্রেমিক, হাসিখুশি, কেয়ারিং বর প্রতিপন্ন করলেও চার দেওয়ালের ভেতরে তথাগত একজন আদ্যপান্ত ডমিনেটিং, পৌরুষত্ব জাহির করা এক দুর্দমনীয় জান্তব পুরুষ।‌ যার কাছে প্রতি রাতে তার স্ত্রী একজন যৌনখিদে মেটানোর বস্তুমাত্র। অথচ সকালে তথাগতর সম্পুর্ণ ভিন্ন মুর্তি দেখে সে। এই যে তথাগতকে দেখছে সে, কাল সকালেই এই তথাগতর ভোল যে আমূল পাল্টে যাবে সেটাও সুজাতা জানে। হয়তো সকালেই জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইবে ওর কাছে। বিয়ের এতগুলো বছর পর তথাগতর ভাবগতিক বুঝতে আর ভুল হয় না সুজাতার। তথাগতকে সে হাড়ে হাড়ে চেনে। তথাগতর এই দুমুখো ব্যবহারে এখন আর অবাক হয় না সে। কারন সে জানে তথাগতকে পাল্টানো অসম্ভব। সারাজীবন তথাগতর এই দুটো রূপ সহ্য করে যেতে হবে তাকে। এই ভাবতে ভাবতে চোখ বোঁজে সুজাতা। সকাল হতে এখনও দেরী। একটু বিশ্রাম দরকার। কাল সকালে আবার বেরোতে হবে। 

(চলবে...)

পাঠকের উদ্দেশ্যে 'প্রতিঘাত' সম্পুর্ণ বিনামূল্যে ইবুক আকারে প্রকাশিত হয়েছে। যারা এখনও সংগ্রহ করতে পারেন নি তাদের জন্য আরেকবার দেওয়া হল লিঙ্ক। নিচে হাইলাইট করা 'প্রতিঘাত' লেখাতে ক্লিক করুন আর ডাউনলোড করে নিন প্রতিঘাত।

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...