
রাতের খাবার পালা শেষ করার পর নিজের ঘরে বসে ব্যাগপত্র গোছাতে শুরু করল সুজাতা। দেখতে দেখতে একটা গোটা সপ্তাহ যে কোথা দিয়ে কেটে গেল বোঝাই গেল না। মনে হচ্ছে এই তো কালই এলো ওরা। ইচ্ছে করছে আরো কটা দিন থেকে যেতে। ইচ্ছে করছে আরো কটা দিন পর ফিরে যেতে। কিন্তু সুজাতা জানে তা সম্ভব নয়। তথাগতর ছুটির মেয়াদ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, একগাদা কাজ আর বনাঞ্চল অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। কাল ফিরতে হবেই ওদের। তারপর আবার অপেক্ষা তথাগতর আবার ছুটি পাবার। ততদিন পর্যন্ত ওকে আবার থাকতে হবে অন্তঃপুরে। তথাগত তো ফিরেই ঝাঁপিয়ে পড়বে কাজে, আর ও থেকে যাবে সেই নিস্তব্ধ, নিরিবিলি ফাঁকা কোয়ার্টারে, এই কটা দিনের স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে একাকী বন্দিনী হয়ে।
এখন তো এসবে তাও অভ্যেস হয়ে গেছে সুজাতার। আগে বদ্ধ কোয়ার্টারে দমবন্ধ হয়ে আসতো ওর। প্রতি মুহূর্তে মনে হতো কোয়ার্টারের প্রতিটা কোণ যেন ওকে গিলে খেতে আসছে। রাতে তথাগত ফিরে এলে হাফ ছেড়ে বাঁচত সে। তথাগতর বুকে মাথা রেখে প্রথম প্রথম কাঁদত। তথাগত সবটা না বুঝলেও আঁচ করতে পারতো। সুজাতার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিতো। এখন অভ্যেস হয়ে গেছে সুজাতার। আর সে কাঁদে না। তথাগতও আর মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দেয় না।
এসব ভাবতে ভাবতেই ব্যাগ গোছাচ্ছিল সুজাতা। এমন সময় দরজার বাইরে থেকে ঊর্মির কন্ঠস্বর শুনতে পেল।
- ভেতরে আসবো?
সুজাতা সম্বিত ফিরে দেখল দরজার সামনে ঊর্মি দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জা পেয়ে ব্যাগ গোছানো বন্ধ রেখে বলল, “ আয়!” ঊর্মি একটা কৌটো হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকে বিছানার উপর বসল। তারপর কিছুক্ষণ সুজাতার দিকে তাকিয়ে বলল,“গোছানো কমপ্লিট?”
- হ্যা! প্রায়ই হয়ে এল। তা তোর হাতে কী ওটা?
- ঐ কালকের জন্য কিছু ড্রাইফ্রুট, আর তোদের রজতাভদা কাছের একটা বেকারি থেকে কিছু কুকিজ আনিয়েছিল তোদের জন্য, সেগুলোই আছে।
- দেখেছ কাণ্ড! ওসবের আবার কি দরকার ছিল? শুধু শুধু ঝামেলা করলি!
- রেখে দে না! কালকে ফেরার সময় রাস্তায় খিদে পেলে কাজে লাগবে।
- তাই বলে এতকিছু!
- থাক না! আবার কবে আসবি কে জানে?
বলে ছলছলে চোখে তাকায় ঊর্মি। ঊর্মির কথা শোনামাত্র সুজাতারও বুকটা হুহু করে ওঠে। ব্যাগ গোছানো থামিয়ে সে জড়িয়ে ধরে ঊর্মিকে। তারপর ধরা গলায় বলে, “কটা দিন তোদের ভীষণ জ্বালিয়ে মারলাম বল? খুব মিস করবো তোদের।”
- আমিও রে! এই কটা দিন যে কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না! ঝপ করে যেন কেটে গেল দিনগুলো।
ঊর্মির মন ক্রমশ ভারাক্রান্ত হচ্ছে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুজাতা জিজ্ঞেস করে, “কি আর করবি বল? বেড়াতে গেলে দিনগুলো যেন ডানায় ভর দিয়ে কেটে যায়, অথচ বাড়িতে থাকলে এক-একটা সময় যেন কাটতেই চায় না। যাক গে ওসব কথা বাদ দে। আচ্ছা আমাদের বরদুটো কোথায় গেল বল তো? না মানে অন্যদিন তো দুজনের হাকডাকে বাড়িটা সরগরম থাকে আজ দুজনেই একবারে যাকে বলে স্পিকটি নট! কেসটা কী?”
ঊমি চোখ মুছে মুচকি হেসে বলে, “হবে না? দুজনে যে আবার পান পাত্র নিয়ে বসেছে! আজকে তোদের রজতদাকে ছাড় দিয়েছি ঠিকই তবে শুধু দু পেগ ওয়াইনের এবং নিঃশব্দ পানের শর্তে!”
- অ্যা! সেকি? কাল ট্রেন আছে জেনেও ও বসেছে?
- আহা! সবসময় অতো বকিস না তো! একটু খেলে ক্ষতি নেই!
- ক্ষতি নেই মানে? আরে ও সহ্য...
পলকে সেদিনের রাতের কথা মনে পড়ে ষাওয়ায় লজ্জায় লাল হয়ে যায় সুজাতা। ঊর্মিও ফিক করে হেসে ফেলে। নিজেকে সামলে নিয়ে সুজাতা বলে ওঠে, “হাসিস না। একবার ওরকম কাণ্ড করেছি বলে বারবার করবো তার কোনো মানে নেই। তাছাড়া কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে আমাদের! এবার সকালে মাথা ধরা নিয়ে বসে থাকলেই হয়েছে।”
- চাপ নেই! সেদিনের মতো ডিটক্স চা খাইয়ে দেবো। তেমন হলে ফ্লাস্কে দিয়ে দেবো কিছুটা। আর রেসিপিটাও দিয়ে দেবো, মাঝে মাঝে বেসামাল হলে পরের দিন করে দিস, দেখবি ভালো লাগবে।
- না না! ওসব কিছু লাগবে না। ওকে তুই চিনিস না। এখানে সোনা মুখ করে খেলেও ওখানে জাস্ট ফেলে দেবে।
- কিছু হবে না। তথাগত যথেষ্ট ভালো ছেলে! তোদের রজতদার মতো না। খাবার নিয়ে ওর হাজার বায়নাক্কা ছিল একসময়। হার্ট অ্যাটাকের পর ডাক্তারের ডায়েট অনুযায়ী খাবার খাওয়াতে আমার রীতিমতো কালঘাম ছুটেছে। কিছুতেই স্যুপ খেতে চাইতো না। কত জোর, কান্নাকাটি করে খাওয়াতে হত। এখন তো তাও খায়, আগে তো পাগল হয়ে যেতাম আমি। যে মানুষটা আগে আকণ্ঠ মদ খেত সেই মানুষটাকে মদ ছাড়তে বাধ্য করার জন্য যে কত কান্নাকাটি করেছি তা জানিস না।
বলতে বলতে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঊর্মি। সুজাতা ঊর্মির কাঁধে হাত রাখে। ঐদিকে বারান্দা থেকে ভেসে আসে রজতাভদের কণ্ঠস্বর। সেদিকে তাকিয়ে সুজাতা বলে,“থাক বলতে হবে না। রজতদা যে আজ বেঁচে আছে, সুস্থ আছে, তার পেছনে তোর লড়াইটা আর কেউ জানুক বা না জানুক আমি জানি। রজতদাও জানে। আর জানে বলে তোকে এতটা ভালোবাসে।”
বারান্দায় বসে গ্লাসের তলানিতে থাকা তরল আগুনটাকে গলায় ঢেলে একটা সিগারেট ধরাল তথাগত। পাশে বসে থাকা রজতাভ গ্লাসের ওয়াইনে দুটো চুমুক মেরে আড়চোখে তথাগতর দিকে তাকিয়ে বলল,“এবার থামো হে ভায়া! আজকের ডোজ কিন্তু একটু বেশীই হয়ে গেছে।”
তথাগত সিগারেটে টান মেরে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে অ্যাশট্রে-তে ছাই ফেলে জড়ানো গলায় বলল, “কোথায় বেশী হলো? সবে তো দুইপেগ। দুইপেগে আবার নেশা হয়?” বলে গ্লাসে হুইস্কি ঢালতে লাগলো সে।
রজতাভ ওয়াইনের গ্লাসে অল্প চুমুক দিয়ে তথাগতকে দেখতে লাগল। কয়েকবছর আগে সেও এরকমই ছিল। বেসামাল, বেহিসাবি,বেপরোয়া। এখানকার এমন কোনো মদ নেই যা সে খায়নি। এমন কোনো মদের দোকান নেই যা সে চেনে না। এই সব জায়গা থেকে কিনতে কিনতে আজ ওর কালেকশন তৈরী হয়েছে। তথাগত যেটা খাচ্ছে সেটা স্পেশাল ধরনের হুইস্কি। প্রথম প্রথম নেশা হয় না ঠিকই, কিন্তু মিষ্টিজাতীয় কিছু খেলেই এমন নেশা ধরে যে পরদিন পর্যন্ত তার মৌতাত থাকে। রজতাভর মনে আছে এটার খোঁজ এক গোর্খা সুবেদার দিয়েছিল তাকে। সেও তার মতোই পানরসিক ছিল। সেখানে গিয়ে নিজে টেস্ট করে দুটো বোতল কোয়ার্টারে নিয়ে এসেছিল সে। এককালে মদের খোঁজে কোথায় যায়নি সে? কোন মদ আছে সে খায়নি? এমনকি গোর্খা বিয়ারের আদর্শ জায়গা কোথায় সেটাও সে জানে। এককালে তথাগতর মতোই সে বলত, ‘দুর! দুই পেগে আবার নেশা হয়?’ আর এখন? মদ খাওয়া তো দুর, সামান্য গুরুপাক খাবার খাওয়ার কথাও সে ভাবতে পারে না। ঊর্মি ওকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। আজ এতবছর পর ঊর্মি ওকে ওয়াইন খেতে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু ঐ দুই পেগের শর্তে। সে কারনেই সে ধীরে ধীরে ওয়াইনটা উপভোগ করছে। কারন এটা শেষ হয়ে গেলেই শেষ। আবার কবে ঊর্মি অনুমতি দেবে কে জানে?
ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে রজতাভ বলল,“কাল তোমরা রওনা হচ্ছো তাহলে?”
তথাগত হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল,“হুম! কাল সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বো। তাহলে ট্রেনটা ধরা যাবে।”
- কটার দিকে ট্রেন?
- সকাল দশটার দিকে। ডিব্রুগড় এক্সপ্রেস। সেটা ধরলে, আর লেট না হলে সন্ধ্যের মধ্যে ঢুকবো ডিব্রুগড়ে। সেখানে গাড়ি থাকবে। সব ঠিক থাকলে রাত আটটার মধ্যে ঢুকে যাবো আমরা। তা ভাই রজতাভ, এবার কিন্তু তোমাদের নিমন্ত্রণ রইল। দুজনে মিলে সমুদ্র দেখেছি, তোমার ডাকে পাহাড় দেখলাম, এবার তোমাকে জঙ্গল দেখানোর পালা রইল। তা কবে আসবে বলো?
- দেখি। আপাতত কটা দিন এখানে কাটিয়ে নিই। তারপর শিলিগুড়িতে কিছু কাজও আছে।
- ওসব শুনতে চাই না। বলো আসবে কিনা?
- দেখছি। আপাতত কথা দিতে পারছি না।
বলতে বলতে রজতাভ খেয়াল করে সুজাতা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তথাগত হুইস্কি খেতে খেতে বলে, “হু হু! একবার ঘুরে যাও আমাদের এদিকে। তোমাদের জঙ্গলের প্রেমী না করে তুলেছি তো আমার নাম বদলে দিও। টিভিতে, গল্পের বইতে জঙ্গলের যে বর্ননা জেনেছ, দেখবে জঙ্গল তার চেয়েও বেশী সুন্দর, তার চেয়েও বেশী রহস্যময়। আর আমাদের বাংলোর রাঁধুনির হাতে বনমোরগের ঝোল আর হাতে গড়া রুটি তোমাদের মলিদিদির তৈরী খাবারের চেয়ে কম নয়। তোমাদের সুজাতাও এ ব্যাপারে একমত হবে দেখো।”
সুজাতা রজতাভর দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই রজতাভ ইশারায় চারটে আঙুল দেখায়। সুজাতা কপাল চাপড়ে এগিয়ে যায়।
“এই যে ওঠো! অনেক গিলেছ আর না।” বলে তথাগতর হাত থেকে গ্লাস কেড়ে নিয়ে টেবিলে নামিয়ে রাখে। তথাগত সুজাতার দিকে ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে জড়ানো গলায় বলে,
- অ্যা! কে? অ তুমি! আহা গ্লাসটা আবার কেড়ে নিলে কেন? সবে মাত্র ঢেলেছিলাম।
- আর খেতে হবে না। অনেক খেয়ে নিয়েছ। চলো ঘরে গিয়ে ঘুমোবে। কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে।
- কোথায় আর খেলাম? সবে তো চার গ্লাস!
- ওটাই যথেষ্ট! চলো এবার!
- কোথায় যাবো?
- ঘরে চলো। ঘরে গিয়ে শোবে।
- শোবো?
বলে ফিক করে হেসে ফেলে তথাগত। তারপর জড়ানো কন্ঠে বলে, “এতদিন ধরে শুয়েছি তাতেও আশ মেটেনি? আরো চাই? এই তোমরা না হেবি ডিম্যান্ডিং! রোজ এটা চাই, ওটা চাই, না! তুমি না, তবে আমার সাথে কাজ করা সব কটা লোকের বউয়েরা একই পথের পথিক। কারো গয়না চাই, কারো শাড়ি, কারো মেকাপের সরঞ্জাম। চাহিদা আর শেষ হয় না। গতবারের পোস্টিং-এর দাসবাবুকে মনে আছে তোমার? সেই যে প্রতিরাতে কোয়ার্টারের বারান্দায় বিড়িমুখে মাদল বাজিয়ে গাইতেন। তিনি কী বলতেন জানো? ‘চৌধুরী! তোমার স্ত্রীভাগ্য বেশ ভালো! নো বায়না, নো দাবিদাওয়া, নো কান্নাকাটি। যা দাও তাতেই খুশি। সব জায়গায় সাথে সাথে চলে। এরকম বৌ পেলে তো আমি বর্তে যেতাম হে! এদিকে তোমার বৌদিকে দেখো, শহরের পাকা,চকমেলানো, আলো ঝলমলে বাড়িতে পটের বিবি সেজে সারাদিন বসে থাকেন। জঙ্গলের পরিবেশ তার নাপসন্দ, রোদে বেরোলে নাকি তার চামড়া কালো হয়ে যাবে! মাসের শেষে বেতনের সিংহভাগ হাতখরচের প্রণামী হিসেবে পৌঁছে গেলেই হল। আর বছরে বারোটা শাড়ি, গয়নার ফিরিস্তি আলাদা, আমি না থাকলেও ক্ষতি নেই। মানেটা কি দাঁড়াল? স্বামী না থাকলেও চলবে, হাতখরচের টাকা সময়মতো পৌঁছনো চাই। এদিকে ওদের আবদার, বায়নার দাম চোকানোর টাকা কোথা থেকে আসছে? কীভাবে আসছে? যে আনছে সে কোন ঝুঁকি নিয়ে আসছে সেটা নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই। সন্তান দুটোও তথৈবচ মর্কটশিরোমণি। বাপের টাকায় রাজপুত্তুরের মতো ঠাটবাট দেখালেও, বাপটা কেমন আছে জানার প্রয়োজন বোধ করে না। মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানো? সব ছেড়ে দিয়ে সিবিআইতে তলব দিয়ে গুম হয়ে যাই। ওরাও বুঝুক টাকার বোঝা কাকে বলে?' বুঝলে হে ভায়া রজতাভ? এই দাসবাবু আজব মানুষ ছিলেন। পরিবারের জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতেন। ন্যায়-অন্যায় দেখতেন না। অথচ মানুষটা পরিবারের কাছেই ব্রাত্য ছিলেন। তবে এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না তিনি। রোজ রাতে মহুয়া,হাড়িয়া, কোনোদিন মেজাজ শরিফ থাকলে রাম খেয়ে মাদল নিয়ে বসে পড়তেন বারান্দায় লাগোয়া আরামকেদারায়। মুখে একটা বিড়ি ধরিয়ে তাল ঠুকতেন ঢিমে তালে। তারপর তালের গতি বাড়তো। বিড়ি শেষ করে গাইতেন বনের গান, কখনো সাঁওতালদের গান। যার মাথামুন্ডু না বুঝলেও সুর আর তালে ঝিম ধরে যেত। বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞেস করে দেখো সুজাতাকে, এই সু! বলো না রজতাভকে। কত রাতে বিছানাতে সেই তালে তাল মিলিয়ে তোমাকে বুকের তলায়...” বলে আবার ফিকফিক করে হাসে তথাগত।
তথাগতর কথায় রজতাভ গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়েও থমকে তাকায় তথাগতর দিকে। তারপর সুজাতার অগোচরে মুচকি হাসে। কথাটা শোনামাত্র সুজাতা মরমে মরে যায় । মদ খেয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে কার সামনে কী বলছে তার কোনো জ্ঞান তথাগতর না থাকলেও সুজাতার আছে। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে সুজাতা একপলক রজতাভর দিকে তাকায়। তারপর তথাগতর হাত ধরে বলে, “অনেক হয়েছে! এবার চলো!” কিন্তু ওর ঠেলাঠেলিতে তথাগতর কোনো বিকার ঘটে না। সে আপনমনে টেবিল থেকে গ্লাসটা তুলে নিয়ে সেটায় থাকা অবশিষ্ট তরল পানীয় গলায় ঢালে। সুজাতা তথাগতকে ঠেলা দিতে দিতে ক্রমশ বেহাল হচ্ছে দেখে অগত্যা বাধ্য হয়ে নিজের গ্লাসের পানীয়টা শেষ করে আসরে নামে রজতাভ। তারপর সুজাতার হাতে হাত লাগিয়ে তথাগতকে কোনোমতে আরামকেদারা থেকে তুলে সুজাতাদের ঘরে নিয়ে আসে। তারপর তথাগতকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরোবার আগে একবার পিছন ফিরে সুজাতার দিকে তাকায়। তারপর হাসতে হাসতে ধীরপায়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। বারান্দা থেকে গ্লাস আর বোতলদুটো নিয়ে যথাস্থানে রেখে বেডরুমে ঢুকে দেখে ঊর্মি বিছানায় বসে হাতে পায়ে শীতের মলম ঘষছে।
রজতাভর দিকে ঊর্মি তাকাতেই রজতাভ ফিক করে হেসে ফেলে। তারপর বিছানায় বসে ওষুধগুলো খেতে খেতে বলে, “যেমন দ্যাবা,তেমন দেবী। দুজনেই সমান! যাকে বলে একেবারে রাজজোটক! কেউ কারো থেকে কম যায় না। বউ যেমন বেশী খেলে উল্টে যায়, তেমনই বরও ভাট বকে। ভাগ্যিস সুজাতা এল! নাহলে বাবাজি আরো কিছুক্ষণ বকতেন।" ঊর্মি মলম মেখে বিছানায় বসে বলে, “যাই বলো, দুজনে বেশ আছে বলো?”
রজতাভ মাথা নাড়ে। তারপর বিছানায় আধশোয়া হয়ে বলে,“ওদের দেখলে আমাদের বিয়ের পরের দিন গুলোর কথা মনে পড়ে যায়। মনে আছে? সেই বিয়ের পর পর তুমি, আমি এরকমই পরস্পরকে চোখে হারাতাম। না এখনও হারাই। কিন্তু সদ্যবিবাহিতদের মধ্যে একটা কেমিস্ট্রি কাজ করে। একটু লজ্জা, একটু ভালোলাগা, ছোটখাটো বিষয়ে অল্প একটু যত্ন নেওয়া। যেটা বিয়ের এক-দুই বছর পরে ফিকে হয়ে গিয়ে শুধু অভ্যেসে পরিণত হয়। অথচ ওদের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। ওরা এখনও সেই কেমিস্ট্রিটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”
- ঠাকুর করুক ওদের এই কেমিস্ট্রিটা আজীবন বেঁচে থাকুক।
- আমিও তাই চাই। সুজাতা বড়ো ভাল মেয়ে। তথাগতও ছেলে মন্দ নয়। ওর জন্য তথাগত একেবারে পারফেক্ট ম্যাচ। একে-অপরকে যেভাবে ওরা ভালোবেসে আগলে রাখে সেটা আজকালকার কাপলদের মধ্যে খুব কম দেখা যায়। আজকালকার দম্পত্তিরা প্রথম প্রথম ভালোবাসা,হাসিখুশি থাকলেও পরে নির্বিকার, নিরস ভাবে গোটা জীবন কাটায়। প্রথমে জীবনটা সুখের মনে হলেও পরে সেটা ক্রমশ খাঁচায় আবদ্ধ পাখির মতো মনে হয়। তখন ভালোবাসার জায়গায় চাহিদার প্রবেশ ঘটে। এটা দাও, ওটা দাও, সেটা দাও। মুখে প্রকাশ না করলেও হাবেভাবে বোঝানো হয় চাহিদাটাকে। তখন বিয়েটা বোঝাপড়ায় পরিণত হয়। ভালোবাসার জায়গা নেয় Give & Take policy। আর একারনেই দাম্পত্যজীবন বিষাক্ত হয়ে যায়। একটু আগেই তো তথাগত বলছিল ওর কোন কলিগের স্ত্রী নাকি সাংঘাতিক ডিমান্ডিং। স্বামী না হলেও চলবে, তবে চাহিদা পুরণ হওয়া চাই। সেক্ষেত্রে তথাগত অনেক লাকি।
- মোটেই না! আমরা মেয়েরা মোটেও ওরকম নই। বরং পুরুষদের চাহিদা বেশী!
- তাই! আমাকে এমন একটা পুরুষ দেখাও যে স্ত্রীর কাছে ‘এটা চাই',‘ওটা চাই' বলে বায়না করেছে। যত বায়না তোমরাই করো। বিবাহবার্ষিকীতে গয়না চাই, জন্মদিনে বাইরে খাওয়া চাই,বিয়ে-অনুষ্ঠানে শাড়ি চাই। এদিকে আলমারি উপচে পড়ছে অথচ তাও শাড়ির চাহিদা শেষ হয় না।
- বাহ রে! এটা তো আমাদের অধিকার। বৌভাতের দিনই তো তোমরা আমাদের খাওয়া-পরার দায়িত্ব নাও। তোমাদের কাছে চাইব না তো কার কাছে চাইব? আমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তো তোমাদের। আর অনুষ্ঠান-পার্বনে নতুন কাপড় পরবো না তাই কি হয়?
- পথে এসো! এই তো বলছিলে তোমরা নাকি এরকম নও,তোমাদের চাহিদা নেই তা এটা কি চাহিদা নয়? আর ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া এবং চাহিদাপুরণে তফাৎ অনেক। প্রথমটা কর্তব্য, পরেরটা আবদার মেটানো। আর আবদারের সংখ্যা যখন সাধ্যের বাইরে চলে যায় তখন জীবন কন্টকময় হয়ে যায়। আর ক্রমশ এই চাহিদাগুলো বোঝা হয়ে ওঠে। তোমাদের অবশ্য দোষ নেই। তোমরা ভাবো তোমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব যখন আমাদের তখন তোমাদের অফুরন্ত চাহিদাপুরণের দায়িত্বও আমাদের। অথচ আমরা ছোটোখাটো জিনিসেই খুশি থাকতে, খুশি রাখতে পছন্দ করি।
- তাই বুঝি? তা তোমার বুঝি কোনো চাহিদা নেই আমার কাছ থেকে?
প্রশ্নটা শোনামাত্র স্তব্ধ হয়ে যায় রজতাভ। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ঊর্মির দিকে। তার একবার ইচ্ছে করে বলতে, “আমার চাহিদা যে ভীষণ সীমিত ঊর্মি। বেশীকিছু চাইও না আমার। কিন্তু আমার যা চাই তা তুমি দিতে অপারগ। বরং আমার চাহিদার কথা তোমাকে জানালে তুমি নিজেই আমাকে থামিয়ে দেবে। অথচ কী এমন চেয়েছি আমি? রক্তমাংসের একটা ছোটো প্রাণ, যা একান্ত আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন হয়ে এই পৃথিবীতে থাকবে। কিন্তু না, সামান্য একটা অহেতুক ভয়ের বশে তুমি নিজেই আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছ। আজ যদি আমি একই আবদার করি তুমি মেনে নেবে?” তারপর নিজেকে সামলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “না নেই। শুয়ে পড়ো, অনেক রাত হয়েছে। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।”
বলে বিছানার পাশের রিডিং ল্যাম্পটা বন্ধ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে রজতাভ। সুজাতা কিছুক্ষণ রজতাভর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মৃদু হেসে আলো নিভিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। আলো নিভে যাওয়ার পর রজতাভ চোখ খোলে। বিয়ের চার বছর হতে চলল। বাইরে থেকে ওদের একজন সুখী, পারফেক্ট কাপল মনে হলেও আসলে দুজনের মধ্যে যে একটা অদ্ভুত শীতল দুরত্বের সৃষ্টি হয়েছে তার খবর কেউ জানে না। সারাদিন হাসি, খুনসুটিতে, একে অপরকে সাহায্য করে দিন কেটে যায় ঠিকই। কিন্তু রাত হলেই বন্ধ ঘরের মধ্যে ভালো থাকার ছদ্মবেশ পাল্টে, হাসি মুখের মুখোশ খুলে যন্ত্রের মতো নীরস, নির্বিকারভাবে দুজনে পরস্পর পিঠ করে শুয়ে পড়ে। সারাদিন একে-অপরকে চোখে হারিয়ে, একে-অপরের যত্ন নিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করলেও দুজনেই জানে এটা অভিনয় ছাড়া আর কিছু নয়। এতগুলো দিন ধরে একে-অপরকে ভালোবেসে ভালো রাখার অভিনয় করে পরস্পরকে সুখী রাখা নামে ঠকিয়ে যাচ্ছে দুজনে। যুদ্ধভূমিতে মৃত্যুকে কাছে দেখার পর জীবনের প্রতি অনীহা জন্মানোয় তথাগত চেয়েছিল নিজের একটা চিহ্ন পৃথিবীতে রেখে যেতে। পিতৃত্বের সাধ জেগেছিল তার মনে। সে জানতো মৃত্যু একবার যখন তার নাগাল পেয়েছে মারণ ছোবল না দিয়ে সে ছাড়বে না। মৃত্যু নিশ্চিত জানার পর চলে যাবার আগে শেষবারের মতো বাবা ডাক শুনতে চেয়েছিল সে। কিন্তু মাঝখানে হার্ট অ্যাটাকের পর সেই আশা প্রায় নিভতে বসেছিল।
অপারেশনের পর আর কোনো ঝুঁকি নেই জানার পর পিতৃত্বের সাধ আরো তীব্র হয়ে উঠেছিল তার। রজতাভ চেয়েছিল ঊর্মি আর ওর সন্তানকে নিয়ে বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটাতে। কিন্তু এবার বাধ সাধল ঊর্মি। একটা অহেতুক ভয় জন্ম নিল ওর মনে। রজতাভর কাছে এলেই ওর মৃত্যু হবে এই ভয়ে দূরে সরিয়ে নিল নিজেকে। আর এই ভয়টাই হয়ে উঠল ওদের জীবনের সবথেকে বড়ো ক্ষত। সেদিনের পর থেকে যতবার রজতাভ ঊর্মির কাছে গেছে, ঊর্মি ওকে নানা কথায়, ছলে নিরস্ত করেছে। যতবার সন্তানের আবদার করে ঊর্মির কাছে গেছে রজতাভ, ততবার রিক্ত হাতে ব্যর্থ মনোরথে ফিরতে হয়েছে তাকে। সেদিনের পর থেকে ঊর্মি নিজেকে ওর থেকে এতটাই দূরে সরিয়ে নিয়েছে যে রজতাভ চাইলেও তার নাগাল আর পায়নি। ক্রমশ দূরে সরে যেতে যেতে, ক্রমাগত প্রত্যাখ্যাত হতে হতে একসময় অভিমান করে রজতাভও একটা দেওয়াল তৈরি করে নেয় নিজের চারপাশে। আজও সেই দেওয়ালে চিড় ধরেনি। একবার পেছন ফিরে ঊর্মির দিকে তাকায় রজতাভ। তারপর আবার সামনের দিকে ঘুরে শুয়ে পড়ে। নাইটল্যাম্পের আলোয় দুজন পিঠোপিঠি শুয়ে ক্রমশ তলিয়ে যায় ঘুমের অন্ধকারে।
পাশের ঘরে বিছানায় শুয়ে নাইটল্যাম্পের আলোয় অপলকে সদ্য রমণক্লান্ত তথাগতর দিকে তাকিয়েছিল সুজাতা। মাতাল হলেও তথাগত আজ রাতেও আদর করতে ভোলেনি। বরং আদরের মাত্রাটা আজ একটু বেশিই ছিল। যেন আজ ওকে বিছানায় মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল তথাগত। অন্যদিন এই বন্য আদর ভালো লাগলেও আজ যেন একটু বেশীই যন্ত্রণাময় লাগছিল তথাগতর আদরের মাত্রাটা। সে প্রতিরোধের চেষ্টা করতেই আরো রোখ চেপে গিয়েছিল তথাগতর। এক হাতে সুজাতার মুখ চেপে আরো প্রবলভাবে আদরের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল সে। কামড়ে ধরেছিল সুজাতার কাঁধ। দুরন্ত গতিতে তথাগত যখন ওর ভেতরে প্রবেশ করছিল সেসময় সুজাতার মনে হচ্ছিল যেন সে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। কতক্ষণ ওর উপর এই তীব্র আদর চালিয়েছিল তথাগত জানে না সুজাতা। তবে একটা সময় টের পেয়েছিল তথাগতর চরম মুহূর্তের সময় আসন্ন। আর পরক্ষণেই তথাগতর ক্লান্ত শরীরটা ওকে প্রায় ছিবড়ে করে ওর পাশে এলিয়ে পড়েছিল।
গোটা শরীর যন্ত্রণায় ভেঙে পড়লেও সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না সুজাতার। ওর কানে বাজছিল তথাগতর বলা কথাগুলো। যে কথাগুলো রজতদার সামনে মত্ত অবস্থায় বলে চটুল হাসি হাসছিল তথাগত। রজতদার কাছে সেটা একটা মাতালের প্রলাপ হলেও সুজাতা ভালো করেই জানে তথাগতর ইঙ্গিতটা কতটা নোংরা, আর অশ্লীল ছিল। রজতদার কাছে ওকে কামুক প্রমাণিত করতে চাইলেও বাস্তবটা যে কতটা উল্টো সেটা সুজাতা ছাড়া আর কেউ জানে না। এই একটু আগেও আদর করার সময় ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলছিল তথাগত,“তুমি এত ভালো কেন সু? এতবছর হয়ে গেল,কোনো চাহিদা, কোনো চাওয়া নেই কেন তোমার? শাড়ি-গয়না কিছুই চাই না কেন তোমার? এত নিখুঁত কি করে হলে তুমি? বিছানাতেও কোনো প্রতিরোধ নেই,যেভাবে আদর করি মুখ বুঁজে সহ্য করো। কেন এত আপোষ করো তুমি? একবারও কি ইচ্ছে করে না ছকে বাঁধা নিয়ম ভাঙতে? ইচ্ছে করে না একবার প্রতিরোধ করে ডমিনেশনের ব্যাটন নিজের হাতে তুলে নিতে? যেমন বন্য আদর মুখ বুঁজে সহ্য করো ঠিক তেমন আদরে আমাকে ভরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে না?”
পরক্ষণে প্রতিরোধ করতেই ফুঁসে উঠেছিল তথাগতর পৌরুষ। আচমকা গালে সপাটে চড় মেরে হিসহিসে কন্ঠস্বরে বলে উঠেছিল, “তথাগত চৌধুরীকে বাধা দেওয়া? আমাকে কাবু করার চেষ্টা? এত সাহস? শালি আজ তোকে দেখিয়ে দেব আমি কী জিনিস!”
মাঝে মাঝে তথাগতকে অদ্ভুত মানুষ মনে হয় সুজাতার। নিজেই নিয়ম ভাঙতে প্রলুব্ধ করে আবার পরক্ষণেই নিয়মের বাইরে গেলে শাস্তি দিতে উদ্যত হয়। বাইরের জগতের কাছে নিজেকে প্রেমিক, হাসিখুশি, কেয়ারিং বর প্রতিপন্ন করলেও চার দেওয়ালের ভেতরে তথাগত একজন আদ্যপান্ত ডমিনেটিং, পৌরুষত্ব জাহির করা এক দুর্দমনীয় জান্তব পুরুষ। যার কাছে প্রতি রাতে তার স্ত্রী একজন যৌনখিদে মেটানোর বস্তুমাত্র। অথচ সকালে তথাগতর সম্পুর্ণ ভিন্ন মুর্তি দেখে সে। এই যে তথাগতকে দেখছে সে, কাল সকালেই এই তথাগতর ভোল যে আমূল পাল্টে যাবে সেটাও সুজাতা জানে। হয়তো সকালেই জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইবে ওর কাছে। বিয়ের এতগুলো বছর পর তথাগতর ভাবগতিক বুঝতে আর ভুল হয় না সুজাতার। তথাগতকে সে হাড়ে হাড়ে চেনে। তথাগতর এই দুমুখো ব্যবহারে এখন আর অবাক হয় না সে। কারন সে জানে তথাগতকে পাল্টানো অসম্ভব। সারাজীবন তথাগতর এই দুটো রূপ সহ্য করে যেতে হবে তাকে। এই ভাবতে ভাবতে চোখ বোঁজে সুজাতা। সকাল হতে এখনও দেরী। একটু বিশ্রাম দরকার। কাল সকালে আবার বেরোতে হবে।
(চলবে...)
পাঠকের উদ্দেশ্যে 'প্রতিঘাত' সম্পুর্ণ বিনামূল্যে ইবুক আকারে প্রকাশিত হয়েছে। যারা এখনও সংগ্রহ করতে পারেন নি তাদের জন্য আরেকবার দেওয়া হল লিঙ্ক। নিচে হাইলাইট করা 'প্রতিঘাত' লেখাতে ক্লিক করুন আর ডাউনলোড করে নিন প্রতিঘাত।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন