অনুসরণকারী

মঙ্গলবার, ৩১ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ পঞ্চম পর্ব




- সোজা হয়ে দাঁড়াও। মুখটা তোলো। একটু হাসো। হোল্ড! দ্যাটস ইট!

ক্যামেরার সাটার টেপার পর রজতাভ ক্যামেরা নামিয়ে মাথা নাড়তেই নড়েচড়ে বসল ঊর্মি। তারপর খাবার ব্যাগ থেকে বের করল দুটো শালপাতার প্লেট আর কাগজের প্যাকেটটা। কাগজের বাক্স খুলে দেখল ঠিক যা যা বলেছিল মলিদিদি ঠিক তাই তাই দিয়েছে। কেক, সেঁকা পাউরুটি আর একটা ডিমসেদ্ধ। কাগজের বাক্স থেকে খাবার বের করে শালপাতার প্লেটে সাজিয়ে সে ডাকল রজতাভকে। গতকাল রাতে দার্জিলিংয়ে বেড়াতে এসেছে ওরা। সেদিন রজতাভ আসার পর হাউহাউ করে ওকে জড়িয়ে কেঁদেছিল ঊর্মি। রাতে খাবার পালা সারার পর রজতাভ বলেছিল সবটা। রেডিওতে যতটা শোনা যাচ্ছে, খবরের কাগজে যতটা লেখা হচ্ছে অবস্থা তারচেয়েও গুরুতর। কার্গিলে প্রতি মুহূর্তে প্রাণহাতে করে কাটাতে হচ্ছে সবাইকে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রাতে আবার বাঙ্কারে ফিরতে পারবে কিনা তার ঠিক থাকছে না। এক এক করে সঙ্গী, বন্ধুরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে রোজ। তারমধ্যেও অটল হয়ে লড়ে যাচ্ছিল রজতাভ। গত সপ্তাহে তাদের ট্রুপকে একটা বাঙ্কার সিজ করতে পাঠানো হয়। ওরা ধৈর্যের সাথে দুদিন ধরে যুদ্ধ করে বাঙ্কার কবজা করে ফেলেছিল। সন্ধ্যের দিকে বাঙ্কার থেকে মৃতদেহ গুলো বের করার সময় আচমকা এক আহত পাক সৈনিক পাল্টা আক্রমণ করে বসে। রজতাভ সামনে থাকায় ওর বুকে গুলি লাগে। সঙ্গে সঙ্গে বাকিরা মিলে সেই সৈনিককে কবজা করে ফেলায় বেশী ক্ষতি হয়নি। রজতাভ চেয়ারে হেলান দিয়ে বলছিল,“বিশ্বাস করো বুলেটগুলো যখন বুকে ঢুকল মনে হল যেন একগাদা পেরেক বুকের ভেতর ঠুকে দেওয়া হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে মনে হল পৃথিবীটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। চারদিকের শব্দ, চিৎকার কিছুই কানে আসছিল না। একটা আচ্ছন্নভাব ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলছিল আমায়। মনে হচ্ছিল আর বোধহয় তোমাদের সাথে দেখা হবে না। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছিল দু’চোখের উপর। তারপর কমপ্লিট ব্ল্যাকআউট। যেন একটা ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলাম। ঘুম যখন ভাঙল দেখি হাসপাতালে শুয়ে আছি। পরে শুনেছিলাম আটটা গুলি বের করা হয়েছিল আমার বুক থেকে। সত্যি কথা বলতে আমি কি করে বেঁচে গেলাম আমিও জানি না। ডাক্তারদের কাছেও এটা মিরাকেলের মতো ছিল। আমি ফিরতে চাইছিলাম যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের স্যার আমাকে কদিন ছুটি কাটাতে বলে পাঠিয়ে দিলেন এখানে। এভাবে কি চলে বলো তো? আপনিই বলুন বাবা। ওদিকে আমার জুনিয়ার, কলিগরা প্রাণ হাতে লড়বে আর আমি ছুটি কাটাতে চলে আসবো? এত একপ্রকার যুদ্ধ থেকে পালানো!”


কথাগুলো শোনার পর ফুপিয়ে কেঁদেছিল ঊর্মি, “হোক পালানো! যতক্ষণ না সব নর্মাল হচ্ছে, তুমি সুস্থ হচ্ছো ততক্ষণ তোমার যাওয়া হবে না!” বলে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। রজতাভ কিছু বলার সুযোগই পায়নি। ঊর্মির বাবা বুঝেছিলেন মেয়ে জামাইয়ের উপর রাগ করেছে। রাগ করাটাই স্বাভাবিক। এতগুলো দিন কোনো খবর নেই, কোনো কথা নেই। হঠাৎ এরকম বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরে এসে আবার মৃত্যুপুরীতে ফেরার কথা বলছে বলেই ঊর্মি অভিমান করেছে ওর উপর। উনি হেসে জামাইকে বুঝিয়েছিলেন সবটা তারপর ঊর্মির অভিমান ভাঙাতেই দুজনকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন দার্জিলিংয়ে। 

 রজতাভ ক্যামেরার রিলটাকে পরের ছবির জন্য সেট করতে করতে বেঞ্চে বসতেই ওর হাতে প্লেট ধরিয়ে দিয়ে বলল,“ রাখো তো এখন ক্যামেরাটা! সেই তখন থেকে দেখছি। একটু পর পর ছবি তুলেই চলেছ। এত ছবি তোলা কীসের শুনি? আগে তো বেড়াতে গেলে এত ছবি তুলতে না।” রজতাভ ক্যামেরাটা কভারে ঢুকিয়ে প্লেট থেকে একটা পাউরুটি তুলে কামড় দিয়ে বলল,“ও তুমি বুঝবে না। পাহাড়ে এসে যদি ছবিই না তুললাম তাহলে ঘুরতে আসা কীসের জন্য?চারদিকে দেখো একবার। সকলেই ছবি তুলছে। হ্যা আগেও আমরা বেড়াতে এসে ছবি তুলিনি বটে। কিন্তু সেটা তো আর নিছক বেড়ানো ছিল না। ছিল হানিমুন। আর এটা হানিমুন নয়। বলতে পারো নর্মাল ট্রিপ। তাই ছবি তুলছি। তাছাড়া আগে বেড়াতে গেলে তো অর্ধেকদিন তো ঘরেই কাটাতাম। সেখানে কি ছবি তুলবো? নিজের বউয়ের সাথে...!” 

কথাটা শেষ হবার আগেই রজতাভর হাতে মৃদু চাপড় মেরে চারদিকে একবার সন্তর্পণে তাকায় ঊর্মি। তারপর বলে,“উফ! তোমার মুখে কি কিছুই আটকায় না?”

- আজ্ঞে না ম্যাডাম! আমরা আর্মিম্যানরা এরকমই। লজ্জা,ঘৃণা,ভয় এই তিনটেই আমাদের থাকে না। আমরা যা করি সদর্পে করি। তাছাড়া নিজের বউয়ের সাথে আদিরসাত্মক তত্ত্ব নিয়ে কথা বলবো না তো কি পদাবলী নিয়ে কথা বলব?

- আমি সেটা বলছি না। কিন্তু সব কথার একটা নির্দিষ্ট জায়গা, নির্দিষ্ট সময় থাকে। লোকলজ্জা বলেও তো কিছু আছে।

- উফ! তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না। একইরকম দিদিমাদের আমলে থেকে গেলে তুমি। আরে এটা আগের যুগ নেই যে ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেম করবো। চেনা কাউকে দেখলে মুখ ঢাকবো। এটা ১৯৯৯!এবছরটা গেলেই নতুন শতাব্দীতে পা রাখবো আমরা। এখনও লোকলজ্জা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে? লোকের কী অতো সময় আছে যে কে কী করছে দেখে বেড়াবে? তাছাড়া আমরা যদি সারাদিন ধরে এটাই ভাবতে থাকি যে লোকে কী বলবে? তাহলে লোকে কী বলবে? তাছাড়া আমি তো আর পরের বউকে নিয়ে কিছু করছি না। করছি নিজের বউকে নিয়ে। আর বিদেশে তো এসব নর্মাল! মনে আছে সেবার মানালীতে দুজন বিদেশীকে দেখেছিলাম আমরা।

- তাও আমার মতে এসব জিনিস চার দেওয়ালের মধ্যেই হওয়া ভালো। বাইরে নয়। আমরা বিদেশী নই যে যেখানে সেখানে শুরু হয়ে যাব।‌ তাহলে পশুর মধ্যে আর আমাদের মধ্যে তফাৎ কি রইল? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যতটা মনের তার চেয়ে বেশী আত্মার। শারীরিক প্রেম থাকবে তবে সেটা সাময়িক। বুঝলে মেজর মশাই?

- বুঝলাম! মানে আমি আর নিজের বউকে চুমু খেতে পারব না। জড়িয়ে ধরতে পারব না। জীবন থেকে সব অ্যাডভেঞ্চার বাদ নিয়ে নিরামিষ সাত্ত্বিক দাম্পত্য যাপন করব। তা এটা আসার আগেই বলতে পারতে। দার্জিলিং না এসে গয়া,কাশী,বৃন্দাবনের টিকিট কাটতাম। তীর্থযাত্রা হয়ে যেত।

- ধুর! আরে আমি ওসব করতে বারণ করেছি নাকি? করবে! অবশ্যই করবে! তবে সেটা হোটেলরুমের ভেতরে। সেটা আমাদের একান্ত আপন মুহূর্ত। যা আমাদেরই থাকবে। তবে পাবলিকের মাঝে নয়। কিছু জিনিসের আড়াল-আবডাল থাকলেই ভালো। সবকিছু খোলামেলায় হলে আর রহস্য কোথায় রইল?সংযমই দাম্পত্যের নিয়ম।

- তার মানে চাইলেও আর বাঁধনছাড়া হতে পারব না?

- কেন পারবে না? সংযম রাখতে বলেছি। ব্রহ্মচর্য নয়। তাছাড়া রাতে তো আমি তোমারই থাকছি! যত খুশি আদর করো বাধা দেব না। কিন্তু যতক্ষণ আমরা বাইরে আছি ততক্ষণ আমাদের এটুকু সংযম মেনে চলতে হবে। ঐ দেখো বাবুর মুখ হাড়ি হয়ে গেল। আরে বাবা আমি আমাদের ভালোর জন্যই বলছি তো নাকি?

রজতাভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তাহলে আজ থেকে আমি বর্বর প্রেমিক থেকে প্রাণনাথ স্বামী হয়ে গেলাম। বাইরে নো টাচিং নিয়ম মেনে চলতে হবে। কাকু-কাকিমাদের মতো বিহেভ করে ‘হ্যাগো’,‘ওগো করতে হবে।”

“আজ্ঞে হ্যা মশাই!একবছর আমাকে জ্বালানোর এটাই শাস্তি।" বলে হাসে ঊর্মি। রজতাভ মাথা নিচু করে বসে থাকে তারপর হেসে বলে, “হেসে নাও! হেসে নাও! যত পার হেসে নাও। একবার রুমে ফিরি তারপর আমি হাসব। একবছরের যত আদর আছে তোমার নিয়মেই উসুল করে নেব। বাইরে তোমার কথা শুনলেও ঘরে আমার কথা শুনতে হবে।”

- সে নাহয় দেখা যাবে। আপাতত খাবারটা খেয়ে নাও। তারপর আরো ঘুরতে হবে আমাদের।

বলে খেতে থাকে ঊর্মি। রজতাভ খাওয়া শুরু করার কিছুক্ষণ পরেই থেমে যায় তারপর বলে,“এক মিনিট! দাঁড়াও আরেকটা দারুন কনসেপ্ট পেয়েছি! ঊর্মি পাউরুটিটা ধরে থাকো।” বলে ক্যামেরাটা বের করে রজতাভ। ঊর্মি এবার বিরক্ত হয়।

- আবার? 

- এটাই লাস্ট! তারপর পরের ডেস্টিনেশনে তুলবো দাঁড়াও। এই মুহূর্তগুলো ধরে রাখা ভীষণ দরকার। দাঁড়াও!পাউরুটিটা তোলো। আরেকটু হাসো,পারফেক্ট!”

বলে ছবিটা তুলে খেতে বসে রজতাভ। মনে মনে বলে,“এই মুহূর্তগুলো যে আজ ধরে রাখছি। এর মূল্য পরে টের পাবে তুমি। যখন আমি থাকবো না তখন এই ছবিগুলো তোমাকে আমার কথা মনে করিয়ে দেবে।” 

খেতে খেতে রজতাভ অতীতে চলে যায়। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর সে সামনে পেয়েছিল ড.মিত্রকে। আর্মিদের কাছে তিনি সাক্ষাত ভগবানের মতো। ডাক্তারির জোরে না জানি কত সৈন্যকে তিনি বাঁচিয়েছেন। এ যাত্রায় তার জন্যই বেঁচেছে বুঝতে পেরেছিল। তারপরেই পেয়েছিল সেই ভয়ংকর সংবাদটা। সেদিন সেই পাক সৈনিক নয়টা গুলি করেছিল তাকে। আটটা গুলি বের করতে পারলেও একটা গুলি বের করা সম্ভব হয় নি। ড.মিত্র বলেছিলেন,“দেখুন মেজর। বুলেটটা যে জায়গায় আটকে আছে সেখান থেকে বের করতে হলে একটা রিস্কি অপারেশন করতে হতো আমাদের। আর সেটা করতে গেলে হয়তো আপনার লাইফ রিস্ক হতে পারতো।"

- যেদিন ভারতমায়ের জন্য আর্মি জয়েন করেছিলাম সেদিন থেকেই লাইফ রিস্ককে সঙ্গী‌ করেছি আমরা ডক্টর।

- হ্যা। কিন্তু তাই বলে জেনে শুনে একজন পেশেন্টকে আমি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না।

-আমি অতো জানতে চাইনা ডক্টর! জাস্ট জানতে চাই আমি আবার ব্যাটলফিল্ডে যেতে পারব কিনা?

কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রজতাভর দিকে তাকিয়ে থাকেন ডাক্তার মিত্র। তারপর ধীর অথচ দৃঢ়কন্ঠে বলেন, "বুলেটটা যেখানে আটকে আছে সেখানে চাপ পড়লে ভয়ঙ্করতম কষ্ট পেয়ে মরতে হতে পারে আপনাকে। আর আপনার যা কাজ তাতে ওখানে চাপ পড়বেই।"

- তো বুলেটটা বের করে দিন!

- সেখানেই তো যত সমস্যা!

- বুঝলাম না।

- বুলেটটা বের করতে হলে আমাদের একটা অপারেশন করতেই হবে। কিন্তু সেখানেও একটা রিস্ক থাকছে। বুলেটটা বের করা মাত্র ভীষণরকমের ব্লাডলস হতে পারে। মেবি অপারেশন টেবিলে আপনার মৃত্যু হতে পারে। সেই ভয়ে আমরা রিস্ক নিই নি।

- আমি বলছি তো! কোনো ভয় নেই। আপনি কোনোরকম হেজিটেশন না করে বুলেটটা বের করুন। আমার আপনার প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। একবার যখন বেঁচে ফিরেছি। আবার বেঁচে ফিরব। আপনি প্লিজ অপারেশনটা করুন। আমি ব্যাটলফিল্ডে ফিরতে চাই। আমার কলিগরা, আমার দেশ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। 

কিন্তু রজতাভর অনুরোধ রাখতে পারেন নি ডাক্তার মিত্র। হাজার অনুরোধ,ঝগড়ার পড়েও মানুষটা কোনোরকম রিস্ক নিতে চাননি। রজতাভকে বাধ্য হয়ে ভলিন্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। এসব কথা রজতাভ জানায়নি বাড়িতে। নিজের ক্ষতর কথা কাকে জানাবে ও। যে পরিমাণ কষ্ট নিয়ে আর্মি থেকে ফিরেছে সেই কষ্টের কথা কে বুঝবে?কিছু কিছু জিনিস আছে যা কাউকে বলা যায় না। কিছু কিছু ক্ষত আছে যা কাউকে দেখানো যায় না। নিজের বুকের মধ্যে চেপে রেখে দিতে হয় সেই সব রক্তাক্ত ক্ষতকে। যাতে কেউ সেটার নাগাল না পায়। 


(চলবে...)

শনিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ চতুর্থ পর্ব





আজকেই আলাপ হওয়া মহিলার সাথে সুজাতাকে এভাবে তুইতোকারি করতে দেখে প্রথমে ভেবলে গিয়েছিল তথাগত। ঘোর কাটলো পাশের ব্যক্তির কন্ঠস্বরে। “ আপনি এখনও বুঝতে পারেন নি তাই না?" পাশ ফিরে তথাগত দেখল আগন্তুক মহিলার স্বামী তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার ঠোঁটে হাল্কা রহস্যের হাসি। তথাগত মাথা নাড়তেই ভদ্রলোক হেসে বলেন,

- আসলে ওরা দুই বান্ধবী! সেই স্কুলবেলা থেকে। বলতে পারেন দুই অভিন্ন হৃদয় সখী। এবার আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে তাহলে আজ সকালেই আলাপ হবার পর ওরা তেমন রিঅ্যাক্ট করল না কেন? বা আপনাকে আপনার স্ত্রী আমাদের ব্যাপারে আগে বলেনি কেন? কি তাইতো?

তথাগত মাথা নাড়তেই ভদ্রলোক হেসে বলেন,“ কারনটা ভীষণ বোকাবোকা আর চাইল্ডিশও বলতে পারেন। আসলে আমাদের বিয়েতে আপনার স্ত্রীর আসার কথা ছিল। কিন্তু ও আমাদের বিয়ে অ্যাটেন্ড না করে কাউকে না জানিয়ে সোজা কোন মাসির বাড়ি বেড়াতে চলে যায়। ব্যস! আমার গিন্নি তো রেগে ফায়ার! ভেবেছিল দুজনে মিলে বিয়েতে বেশ আনন্দ করবে। আপনার স্ত্রীও কথা দিয়েছিল ও আসবে। কিন্তু এভাবে কথা খেলাপ করায় রেগে প্রতিজ্ঞা করে বসল আর যাই হোক কোনোদিনও এই সখীর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবে না। রাগ এতটাই ছিল যে আপনার স্ত্রী আমাদের বিয়ের পরে দেখা করতে এলেও ও দেখা করেনি। কেন প্রতিজ্ঞা করা সত্ত্বেও ওকে মাসির বাড়ি যেতে হল সেটাও জানতে চায়নি। দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম ওর মাসির নাকি সে সময় যায় যায় অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। না গেলে খারাপ দেখাতো। কিন্তু সেটা আমার স্ত্রী বুঝলে তো? বাচ্চাদের মতো সে রাগ এখনও পুষে রেখেছে। এবং সময়ের সাথে সেটা এতটাই বেড়েছে যে বাড়িতে এসে নিমন্ত্রণ করা সত্ত্বেও আপনাদের বিয়েতে যায়নি ও। তবে আমি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম সুজাতার সাথে। বলতে পারেন আমার স্ত্রীর সব খবরই পাচার করে দিতাম ওর কাছে। আমরা অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম যাতে দুজনের এই অনির্দিষ্টকালের আড়িটা ভেঙে যায়। কিন্তু কিছুতেই কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আপনাদের বিয়ের সময় আমি বাইরে ছিলাম। জানতাম না বিয়ের খবরটা। জানলে হয়তো বিয়ের দিনই দেখা হত আমাদের। সে যাক‌ গে! কথায় আছে বেটার লেট দ্যান নেভার। আমরা ঠিক করলাম যেটা বিয়েতে হয়নি সেটা হানিমুনে হবে। আপনাদের রওনা হবার পরদিন আমি ঊর্মিকে নিয়ে রওনা হব। বুদ্ধিটা সুজাতারই ছিল। কথামত আপনাদের আসার পরদিন চলে এলাম আমরা। ভেবেছিলাম এখানে পৌঁছে একদিন দুইসখীকে প্ল্যান করে মুখোমুখি বসিয়ে দেব। কিন্তু এখানে এসে খোঁজ নিয়ে দেখি সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। সুজাতা জ্বরে ভুগছে আর আপনি টেনশনে। অগত্যা দুটো দিন অপেক্ষা করতে হল। তবে একদিকে ভালোই হয়েছে। দুর থেকে আপনাদের দুজনকে দেখে ধীরে ধীরে ঊর্মির মনের রাগ একটু হলেও কমেছে। বাকি সুজাতার উপর ওর যতটুকু অভিমান ছিল জ্বরের খবর পেয়ে সেটুকুও দুর হয়ে গেছে। ঐ দেখুন এতবছর পর দুজনে কীরকম মিলে মিশে গেছে। মনে হচ্ছে যেন দুই বোন অনেক বছর পর আবার পরস্পরের সাথে মিলিত হয়েছে।”

তথাগত সামনের দিকে তাকায় দেখে সত্যিই সুজাতা আর ঐ মহিলা ততক্ষণে দুজনে একে অপরের হাত ধরে সৈকতের বালিতে বসে আছে। মহিলা কাঁদতে কাঁদতে কিছু একটা বলছে আর সুজাতাও অশ্রুসজল চোখে হাসতে হাসতে মহিলার চোখের জল মুছে দিচ্ছে। তথাগত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“সবই তো বুঝলাম! কিন্তু একটা জায়গায় আক্ষেপ থেকে গেল।”

ভদ্রলোক অবাক হয়ে বলেন, “কী আক্ষেপ?”

- আপনাদের এই ভেঞ্চারে আমাকে বাদ দেওয়া হল কেন? আরে মশাই আমি তো আর সিনেমা,সিরিয়ালের কুচুটে ভিলেন নই যে সব জেনে আপনার স্ত্রীকে জানিয়ে দিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দিতাম! বরং আপনাদের এই ভেঞ্চারে আমি থাকলে প্রথমদিনই হয়তো ওদের এই আড়ি, অভিমানের পালাটা ভেঙে যেত। না মশাই আমাকে না জানিয়ে আপনারা অন্যায় করেছেন। এতে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি!

- বিশ্বাস করুন! আমি‌ নির্দোষ! আমি বারবার সুজাতাকে বলেছিলাম আপনাকে সবটা জানাতে। ও বলেছিল এখানে এলেই জানাবে। এমনকি এখানে এসে ও অসুস্থ জানার পর আপনার পাশে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছে করলেও পারিনি কারন সুজাতাকে কথা দিয়েছিলাম ও যতক্ষণ না বলছে ততক্ষণ কোনো রকম সাহায্য করবো না। তাছাড়া ওর জ্বরটা আমাদের প্ল্যানের মধ্যে ছিল না। আমরা ভেবেছিলাম এখানে আসার পর সব প্ল্যান অনুযায়ী হবে। কিন্তু...

-কোনো কিন্তু নয়!দোষ যখন করেছেন শাস্তি পেতেই হবে!

-বেশ! আপনার শাস্তি আমি মাথা পেতে নেব। বলুন কী শাস্তি দেবেন?

তথাগত গম্ভীর মুখ করে কিছুক্ষণ তাকায় ভদ্রলোকের দিকে তারপর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,“ প্রথমত, আজকের পর থেকে আপনাদের পার্টনার ইন ক্রাইম হিসেবে আমাকেও নিতে হবে। দ্বিতীয়ত,বাকি ট্যুরটা ইভেন এরপর কোথায় বেড়াতে গেলে একসাথে যেতে হবে। তৃতীয়ত, আপনি, আজ্ঞে করা যাবে না। আজ থেকে আমরাও দুজনে বন্ধু হব। সো মেজর রজতাভ মজুমদার! বলো রাজি?”

রজতাভ হেসে তথাগতর হাত নিজের হাতে নিয়ে বলে, “রাজি!"

******

রাতের বেলা খাবার পাট চুকিয়ে পায়ে পায়ে সমুদ্রের পাড়ে এসে দাঁড়াল তথাগত। পাঁচদিন হল এখানে এসেছে ওরা। কাল রাতের ট্রেনে ফিরে যাবে। দেখতে দেখতে কোথা থেকে এক সপ্তাহ কেটে গেল বোঝাই গেল না। এখানে আসার আগে সে নিজেই গজগজ করছিল সুজাতার আবদারের জন্য। এখানে এসে জ্বর বাধানোর জন্য বিরক্ত হয়ে ফিরে যেতে চেয়েছিল সে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আরও কটা দিন থেকে গেলে বেশ হত। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আসছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমুদ্রের দিকে তাকাল তথাগত। ক্রমাগত পাড়ে ভেঙে পড়া অশান্ত ঢেউগুলো দেখে তার মনে হল যেন তাদের ফেরার খবর পেয়ে সমুদ্রও অশান্ত হয়ে পড়ছে। একের পর এক প্রবল ঢেউয়ের শব্দে যেন আর্জি জানাচ্ছে থেকে যাওয়ার। কিন্তু তথাগত নিরুপায়। তার ছুটির সময়সীমা প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আর মাত্র দুটো দিন। তারপর তাকে আবার ফিরে যেতে হবে তার কর্মক্ষেত্রে। ফিরে যেতে হবে গভীর বনের কোলে। সমুদ্রের এই গর্জনমুখর সৈকত ছেড়ে নীরব,শান্ত বনের মাঝে। না জানি কেমন আছে বনের সেই গাছপালা,পশুপাখিরা। 

সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বনের কথাই ভাবছিল তথাগত এমন সময় শুনতে পেল রজতাভর গলা, “কী ব্যাপার? রেঞ্জারমশাই হঠাৎ বনের গুণগান ছেড়ে সমুদ্রের মুখোমুখি? বলি মনের মাঝে কাব্যটাব্যের উদয় হয়েছে নাকি?”

তথাগত উদাসীনভাবে হেসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে, “নাহ! অতোটাও প্রতিভা নিয়ে এই ধরাধামে আসিনি আমি মেজরসাহেব। আমি ভাবছিলাম গত পাঁচদিনের কথা। দেখতে দেখতে পাঁচটা দিন কীভাবে কেটে গেল বোঝাই গেল না। ইচ্ছে করছে এখানে আরো কটা দিন থেকে যেতে। বার বার মনে হচ্ছে এই তো এলাম কালকে! এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হচ্ছে!” 

রজতাভ এগিয়ে এসে তথাগতর পাশে দাঁড়ায়। জিন্সের পকেট থেকে হিপ ফ্লাস্ক বের করে ছিপি খুলে একচুমুক খেয়ে এগিয়ে দেয় তথাগতর দিকে। রজতাভ তেমন মাতাল না হলেও ওর মতোই যে পানীয়রসিক সেটা তথাগত জানতে পেরেছিল আলাপের প্রথম রাতেই। তথাগত হেসে ফ্লাস্কটা হাতে নিয়ে সেটায় থাকা পানীয়তে চুমুক দেয়। নিমেষের মধ্যে উগ্র ঝাঁঝালো তরল লাল পানীয় তথাগতর সমগ্র শরীরের শিরা-উপশিরায় আগুন ধরিয়ে স্নায়ুতে একটা বিদ্যুতের ঝিলিক খেলিয়ে কন্ঠ বেয়ে পাকস্থলীতে নেমে যায়। একচুমুক খেয়ে সে রজতাভকে ফেরত দেয় ফ্লাস্কটা। রজতাভ ফ্লাস্কটা ফেরত নিয়ে বলে, “সত্যিই তাই! দেখতে দেখতে কটা দিন যে কীভাবে কেটে গেল বোঝাই গেল না। খুব মিস করবো এই জায়গাটা আর তোমাদের। তা তোমাদের ট্রেন কটার দিকে?”

- দুপুর সাড়ে বারোটা। সকালেই বেরোতাম কিন্তু সারাদিনের ধকল নিয়ে আবার রাতে ট্রেন ধরো। অতো ধকল সুজাতার সইবে না। এই রাতের দিকে ঢুকে একটা দিন বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের দিকে বেরোনো যাবে। তা তোমাদের কটার দিকে?

- বিকেল চারটে! এখান থেকে সোজা শিয়ালদা। সেখান থেকে সোজা শিলিগুড়ি। ওখানে ঊর্মিদের বাড়িতে একদিন থেকে ঊর্মিকে রেখে বিকেলের ট্রেনে সোজা নিজের ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দেব।

- আমারও সেরকমই প্ল্যান। সুজাতাকে ওর মায়ের কাছে রেখে আপাতত রওনা দেব নিজের বেসে।

- সেকি! ওকে নিয়ে‌ যাচ্ছ না?

- যাবো, তবে এখন নয়। ওদিকটা আগে গুছিয়ে নিয়ে, দুজনের বসবাসের যোগ্য করে,সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে সাজিয়ে তারপর নিয়ে যাব। আগে একা থাকতাম কাজেই বুঝতে পারছ ঘরদোরের অবস্থা কেমন হতে পারে। সেটা সামলে নিই তারপর। তাছাড়া একগাদা কাজ পড়ে আছে ওখানে। সেগুলো সামলে নিতে হবে। এখনই নিয়ে গেলে একে তো দিশেহারা হয়ে পড়বে, তার উপর সময় কাটাতে না পেরে আরো বোর হয়ে যাবে। জঙ্গলের জীবন বড্ড নিস্তব্ধ আর শান্ত। সারাদিন বসে বসে বিরক্ত হবার চেয়ে কটা দিন বাড়িতেই থাকুক। আমার কথা ছাড়ো তোমার তো কাশ্মীরে পোস্টিং না?

- হুম! অবশ্য ওখানকার অবস্থা যে খুবই শান্ত তা বলতে পারব না। জানি না ফেরার পর কী অপেক্ষা করছে। যাই বলো বনদপ্তরের চাকরি বেশ আরামের।

- কে বলেছে? রোজ হাজার গাছের হিসেব, কোথাও গাছ কাটতে হলে তার অনুমতিপত্র খতিয়ে দেখা। বনের জন্তু জানোয়ার তা সে যতই ভয়ংকরতম হিংস্র হোক না কেন তার‌ খোঁজ রাখা। লোকালয়ে বনের পশু যাক বা বাড়ির উনুনে কেউটে সাপ পাওয়া যাক, দৌড়ে গিয়ে মানুষের হাত থেকে তাদের বাঁচানো, বনে ফিরিয়ে আনা। কম ঝক্কি নাকি? তার উপর পোচার, কাঠপাচারকারী, অনুমতি ছাড়া কোর এরিয়ায় প্রবেশ করা মানুষ তো আছেই। তাও কিছু হলে “বনদপ্তর অকর্মণ্য!" শুনতে হয়।

- বুঝলাম! ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস' কেস আমাদের। তবে একটা জিনিসে মিল আমাদের। জীবনের কোনো ভরসা নেই।‌ যখন তখন পরপারে পোস্টিং হতে পারে।

- তা যা বলেছ। তবে তফাৎ একটাই। তোমরা শহিদ হলে মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর আমরা মরলে একটা শিরোনাম ব্যস!‌

বলে মলিন হাসি হাসে তথাগত। রজতাভও সোজা তাকায় সমুদ্রের দিকে তারপর বলে,“ অথচ আমরা মরতে চাই না। বরং বাঁচতে চাই আরো। যাতে‌ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দেশের সেবা করে যেতে পারি।  এই যে এত যুদ্ধ, এত ছাউনি দখল, এত হতাহত আমরা চাইনি। মানুষ মারতে আমাদেরও ভালো লাগে না।‌ কিন্তু দেশের স্বার্থে, দেশকে রক্ষার স্বার্থে লড়ে যেতে‌ হয় দুটো দেশকেই। ওদের আর আমাদের একটাই পরিচয়। আমরা সৈন্য। দেশের সেবা, দেশের রক্ষার স্বার্থে আমরা প্রাণের আহুতি নিতে অথবা আহুতি দিতেও বদ্ধ পরিকর।”

- এটাই তো অবাক করে আমাকেও! সীমান্তবর্তী‌ দুটো দেশের পরিবেশ, ভাষা, পরিধান এক হলেও দুপক্ষ আলাদা শুধুমাত্র সমস্যাসঙ্কুল জায়গা থেকে দুরে কোনো প্রাসাদোপম বাড়িতে বসা কয়েকজন নেতার সিদ্ধান্তের ফলে। নাহলে প্রকৃতির কাছে তো সবাই সমান!

রজতাভ চুপ করে বসে থাকে। তথাগত একটাও ভুল কথা বলছে না। সত্যিই তো! প্রকৃতি তো মানুষের প্রতি পক্ষপাত করে নি।‌ করেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের একেবারে চূড়ায় বসে থাকা মানুষেরা। কিন্তু তারা যে আবেগপ্রবণ নয়। আবেগ দিয়ে আর যাই হোক দেশ চালানো অসম্ভব। এখানে সে বা তথাগত একজন রাষ্ট্রের হাতে চালিত পুতুল মাত্র। তাদের কাজ দেশের হয়ে কাজ করা। দেশকে রক্ষা করা। এখানে রাষ্ট্র তাদের কাছে চায় প্রশ্নহীন আনুগত্য। কোনো প্রশ্ন করা চলবে না। ‌করলেই তোমাকে সরে যেতে হবে তোমার জায়গা থেকে। মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রজতাভ। তারপর মনে মনে বলে, “সব যদি এতই সোজা‌ হত তাহলে তো যুদ্ধের প্রয়োজন হত‌ না তথাগত। সীমান্তের গোলকধাঁধার হিসেব তুমি বুঝবে না হে! এ হিসেব বনের মতো সহজ‌ নয়।”

রজতাভর চিন্তার জাল ছিন্ন হল ঊর্মিদের চিৎকারে। সে পিছন ফিরে দেখল ঊর্মিরা ওদের কাছেই বসে আছে। রজতাভকে পেছন ফিরতে দেখে ঊর্মি বলে উঠল, “বলি সারারাত কি এখানেই কাটানোর প্ল্যান আছে নাকি? তা কাটাতে পারো। আমাদের অসুবিধে নেই। তবে ঘরের চাবিটা দিয়ে দিলে ভালো হয়। অন্তত আমরা ঘরে ফিরে ঘুমোতে পারি।” রজতাভ হেসে তথাগতকে বলে,“ দেখেছ? যেই একটু শান্তিতে দুজনে গল্প করতে বসেছি তখনই এদের হাকডাক শুরু হয়ে গেছে। বিয়ে করে একটুও শান্তি নেই। সবে বিয়ে করেছ তো! এখন টের পাবে না। দু তিনবছর যাক তারপর দেখবে বিবাহপরবর্তী দহন কাকে বলে? সাধে বলে ‘শাদি কা লাড্ডু বড়ি খতরনাক চিজ হোতি হ্যা। যো খাতা হ্যা বো পছতাতা হ্যা। যো নহি খাতা হ্যা বো অউর জ্যায়াদা পছতাতা হ্যা।’ নাহ যাই! নাহলে রাতটা সত্যি‌ সত্যি এখানে বালির উপর নাহলে লাউঞ্জে শুয়ে কাটাতে হবে। তবে ঐ কথাই রইল ভায়া! এরপর থেকে পরের ট্রিপে কিন্তু সবকটা একসাথে বেড়োবো কেমন? এলাম!"

বলে রজতাভ হাসতে হাসতে উঠে চলে গেল ঊর্মির সাথে। সুজাতা এগিয়ে এসে তথাগতর পাশে বসল। তথাগত সুজাতার দিকে না তাকিয়েই বলল, “ওষুধ খেয়েছ?” জবাবে সুজাতা শুধু একটা “হুম!" বলে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর আকাশের মেঘ কেটে দেখা দিল চাঁদ। ক'দিন পরেই পূর্ণিমা। কাজেই অল্প জ্যোৎস্নায় ভেসে যেতে লাগল সমগ্র সৈকত। আকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে তথাগত বলে উঠলো, “তাহলে কাল আমরা ফিরছি!" সুজাতা চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিকথা বলতে পাঁচটা দিন যে এত তাড়াতাড়ি কেটে যাবে ও ভাবতে পারেনি। তথাগত মৃদুগলায় বলল,“সু?" সুজাতা জবাব দিল,“হুম!"

- তোমাকে তোমাদের বাড়িতে রেখে আমি ফিরে যাব।

- হুম।

- কটা দিন আমাকে ছাড়া থাকতে হবে। ওদিকটা গুছিয়ে নিই একটু। তারপর তোমাকে নিয়ে যাব ওখানে কেমন?

- হুম।

- তোমার মন খারাপ করবে না?

- হুম।

- ওখানে প্রতি সপ্তাহে একবার করে ফোন করবো তোমাকে কেমন?

- হুম।

- এখানে এসে ভালো লাগছে?

- হুম।

- আর কটাদিন থাকতে ইচ্ছে করছে ?

এবার তথাগতর কাঁধে মাথা রাখে সুজাতা। তথাগত জ্যোৎস্নার আলোয় দেখে সুজাতা কাঁদছে। তথাগত সুজাতাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ আমারও যে আরো কটা দিন থাকার ইচ্ছে করছে না তা নয়।‌ কিন্তু কি করা যাবে বলো? ছুটির দিনগুলো যে শেষ হতে চলল! ফিরতে তো হবেই!”

সুজাতা তথাগতর কাঁধে মাথা রেখে অশ্রুসজল চোখে দেখতে থাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্ছাস। তথাগত এবার সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে বলে, “তবে এই ফেরাটা কিন্তু ফেরা নয়। বরং এখানে আবার চলে আসার অজুহাত মাত্র। এখান থেকে ফিরছি ঠিকই কিন্তু আবার আসব আমরা। এবার কেউ থাকবে না সাথে। না রজতাভ, না ঊর্মি। শুধু তুমি আর‌ আমি।‌ এই ক'দিনে সমুদ্রকে আমিও ভালোবেসে ফেলেছি যে! দুজনে মিলে এভাবে সারাদিন পাড়ে বসে থাকবো কেমন? ”

সুজাতা অস্ফুটে বলে, “হুম।" 

তথাগত হাতঘড়ির দিকে একবার দেখে বলে,“ রাত অনেক হল সুজাতা। চলো ফিরে যাই হোটেলে। রাতটুকু কাটিয়ে কাল পাড়ি দিতে হবে নিজের বাসায়।”

বলে বালি থেকে উঠে দাঁড়ায় তথাগত। প্যান্ট থেকে ভেজা বালি ঝেড়ে নিতে গিয়েও থমকে যায়। বালিগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবে বাইরে বেড়াতে এসে যদি কোনো স্মৃতিচিহ্ন থেকে যেতে চায় ইচ্ছে করে তো থাকুক না। অন্তত এই ভেজা বালিগুলো নাহয় স্মৃতি হয়ে চলুক ওর সাথে। ভেবে সুজাতার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় সে। তারপর দুজনে মিলে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় হোটেলের দিকে।

******

দীঘা থেকে ফেরার পর প্রায় একবছর কেটে গেছে। তথাগত প্রোমোশন নিয়ে মধ্যপ্রদেশে কানহা ফরেস্টে বদলি হয়ে গেছে। সাথে নিয়ে গেছে সুজাতাকে। দুজনে মিলে তিলে তিলে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে নিজেদের সংসার। সকালে তথাগত বেরিয়ে যায় নিজের কাজে। নেমে পড়ে সারাদিনের বনরক্ষার যুদ্ধে আর সুজাতা নেমে পড়ে সংসারের কাজে। কোয়ার্টারের কেয়ারটেকারের বউয়ের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে রান্না করে, গল্পগুজব করে কাটিয়ে দেয় সারাদিন। রাতে তথাগত ফিরলে দুজনে মিলে খেতে বসে সারাদিনের রোজনামচা জানায় একে অপরকে। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে তথাগত এদিক ওদিক ঘুরিয়ে আনে সুজাতাকে। আদিবাসীদের পরব হলে নিয়ে যায় সঙ্গে করে। স্বামী-স্ত্রীতে বেশ‌ আছে ওরা। 

প্রায় একবছর হতে চলল রজতাভর কোনো পাত্তা নেই। দীঘা থেকে ফেরার পরদিনই খবর এসেছিল রজতাভকে কাশ্মীর থেকে বদলী করে কার্গিলে পাঠানো হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জয়েন করতে হবে। রজতাভ আর দেরী করে নি। ঊর্মিকে ওর বাপের বাড়িতে রেখে প্রায় একঘন্টার মধ্যে বেড়িয়ে পড়েছিল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। তারপর থেকে আর কোনো খবর নেই। টিভিতে,রেডিওতে শোনা যাচ্ছে কার্গিলের অবস্থা ভালো নয়। যুদ্ধকালীন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। পাকসেনারা ক্রমশ এক এক করে দখল নিচ্ছে ভারতীয় সেনার বাঙ্কারগুলির। ভারতীয় সেনারাও ছাড়বার পাত্র নয়। নিজের প্রাণের তোয়াক্কা না করে ঝাপিয়ে পড়ছে যুদ্ধক্ষেত্রে। ছিনিয়ে নিচ্ছে নিজের বাঙ্কার। তারপর‌ ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলে। রোজ রোজ একই খবর শুনে ঊর্মির অবস্থা ক্রমশ সঙ্গীন হয়ে পড়ছে। সকালে সে ক্রমাগত অস্থির হয়ে অপেক্ষা করে পোষ্টম্যানের। যদি কোনো চিঠি আসে এই আশায়। রোজ খবরের কাগজের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা খুটিয়ে পড়ে যদি কোনো খবর পাওয়া যায় এই আশায়। টেলিফোনের শব্দ পেলেই রজতাভ ফোন করেছে ভেবে ছুটে আসে সে। রোজ সন্ধ্যেতে শুকনো মুখ করে বৈঠকখানায় বসে খবর শোনে সে রেডিওতে। কিন্তু কোথাও কোনো খবর নেই! রজতাভ যেন নিখোঁজ হয়ে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। ঊর্মির মা-বাবার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে ওকে সামলানো। তারা বোঝেন সবই কিন্তু মেয়েকে বোঝাতে‌ পারেন না। তাদের চোখের সামনে মেয়েটা ক্রমশ‌ উন্মাদিনী হয়ে যেতে থাকে। সেটাই স্বাভাবিক। জামাই দেশের জন্য যুদ্ধে গেছে। যে যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরার চান্স প্রায় নেই বললেই চলে। রোজই তো শুনছেন রোজ এক একটা বাঙ্ক দখল করছে ভারতীয় সেনা। বাঙ্কারের মাথায় বিজয়কেতন রূপে জাতীয় পতাকা মেলে ধরছে। কিন্তু সেই বাঙ্কার দখল করতেই না জানি কত সৈনিক হাসি মুখে বলি হয়ে যাচ্ছে শত্রুদের হাতে। রোজ সন্ধ্যেবেলা খবর শোনার সময় একটা চোরা আতঙ্ক নিয়ে বসে থাকেন তারা।‌ এই বুঝি সঞ্চালক তাদের জামাইয়ের নাম ঘোষণা করে বসলেন শহীদের তালিকায়। খবর শেষ হবার পর জামাইয়ের নাম না পেয়ে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলেন তারা। রোজ রোজ এই মানসিক যন্ত্রণা অসহনীয় হলেও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সহ্য করে যেতে হয় তাদের। মনে মনে তারা প্রাণপণে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন এই অপেক্ষার অবসানের। প্রার্থনা করেন যুদ্ধ শেষ হবার।

প্রতিদিনের মতো আজও অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বসার ঘরের রেডিওটা চালিয়েছিলেন ঊর্মির বাবা। সঞ্চালিকার খবর পাঠ শুনতে শুনতে সোফায় বসেছিলেন। ঊর্মি চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকছিল। সঞ্চালিকা প্রতিদিনের মতো একই খবর পড়ে চলেছিলেন এমন সময় দুজনকে চমকে ঘরের টেলিফোনটা বেজে উঠল। ঊর্মির বাবা ঊর্মির দিকে তাকালেন। ঊর্মি কোনোরকমে চায়ের ট্রে-টা টেবিলে রেখে ছুটে গেল টেলিফোনের দিকে। তারপর রিসিভারটা ক্রেডল থেকে তুলে কানে দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য প্রস্তরবৎ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হাউহাউ করে কেঁদে মেঝেতে বসে পড়ল। মেয়ের এহেন অবস্থা দেখে ছুটে এলেন ঊর্মির বাবা। মনে মনে একটা খারাপ খবর শোনার আশঙ্কায় নিজের মনকে শক্ত করে ঊর্মির থেকে রিসিভারটা নিয়ে নিজের কানে দিলেন তিনি। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “হ্যালো?”

প্রায় একবছর পর দুরভাষের ওপার থেকে ভেসে এল জামাইয়ের কন্ঠস্বর, “মেয়েকে বলুন হাউ হাউ করে না কেঁদে রান্না চাপাতে। আমি আসছি ঘন্টাখানেকের মধ্যে। ভীষণ খিদে পেয়েছে আমার। শিলিগুড়ি প্রায় এসে গেলাম বলে।”

(চলবে...)

শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ তৃতীয় পর্ব






ঐশীর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে একবার ঘুমন্ত ঐশীর দিকে তাকান সুজাতা। তারপর ঐশীর বিছানায় বসে একদৃষ্টে ঐশীর দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকেন। হুবহু মায়ের মুখ পেয়েছে ঐশী। সেই নাক, সেই চোখ, সেই হাসার সময় চোখ বুঁজে ফেলা। যেন এতগুলো বছর পর উর্মিই নতুন রূপে তার সামনে এসে উপস্থিত। ঐশীকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সুজাতা। আজ বিকেলে ওদের দেখামাত্র চলে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অভীকের জন্য থেকে যেতে বাধ্য হন তিনি। তাও চেষ্টা করেছিলেন আড়ালে থাকার। কিন্তু অভীক জোর করে যখন ওনাকে ওদের সামনে নিয়ে এল তখন অভিনয় না করে পারলেন না তিনি। ভেবেছিলেন ওনাকে দেখে রজতাভ হয়তো চমকে যাবেন। হয়তো রিঅ্যাক্ট করে বসবেন। রিঅ্যাক্ট করারই কথা! কারন বহুবছর আগে তারা পরস্পরকে কথা দিয়েছিলেন জীবনে কোনোদিন তারা আর মুখোমুখি হবেন না। কিন্তু নিয়তি তাদের এইভাবে কাছে নিয়ে আসবে কে জানতো? কিন্তু রজতাভ কত সহজে সামলে নিলেন সবটা! আর্মির লোক যে! সব পরিস্থিতি সামাল দিতে ওস্তাদ!কিন্তু একটু‌ আগেও ওস্তাদের মুখোশ খুলে পড়তে যাচ্ছিল একটু হলেই। যে কারনে তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসন বেছে নিয়েছেন, যে কারনে তিনি মনে মনে নিজেকে কে ক্ষমা করতে পারেন নি। সে কারনের জন্য দায়ী রজতাভকে তিনি কি করে এত সহজে ক্ষমা করে দেবেন! ক্ষমার করার মতো অধিকার কি তার আছে?অশ্রুসজল চোখে ঐশীর দিকে তাকান সুজাতা। মেয়েটার মুখটা তার কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। যেন কেউ পুরোনো ক্ষত খুচিয়ে রক্ত বের করেছে। চোখ মুছে শুয়ে পড়েন তিনি। নাহ! আর অতীত নিয়ে ভাবলে চলবে না। একটু আগেই তো তিনি রজতাভকে বললেন, “অতীত নিয়ে ভাবার চেয়ে বর্তমান নিয়ে ভাবা উচিত। তাই ভাববেন তিনি। আর পুরোনো দিনের কথা ভেবে ক্ষতবিক্ষত হবেন না তিনি। বরং ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঐশীকে বাড়ির বউ করে এনে উর্মির কাছে মনে মনে অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করবেন তিনি। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। 

বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান রজতাভ। বড্ড গরম পড়েছে আজ।  রজতাভ চুপচাপ ব্যালকনির একপাশে রাখা চেয়ারে বসে পড়েন। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আকাশের দিকে মেঘ জমলেও বৃষ্টির নাম নেই বরং একটা গুমোটভাব চারদিকে। বোধহয় ঝড় হবে। রজতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসেন। বড্ড ক্লান্ত, নিজেকে নিংড়ে নেওয়ার মতো ব্যথাতুর এক হাসি। এই ঝড়ের চেয়েও বড় ঝড় যে তাঁর মনের ভেতর উঠেছে। বার বার তাকে আছড়ে ফেলছে বাস্তবের মাটিতে। বার বার একটাই প্রশ্ন তাঁর মনে ঘাই মারছে। কেন? কেন এতবছর পর নিয়তি তাকে সুজাতার সামনে এনে দাঁড় করালো?তবে কি আরো ভোগান্তি, আরো শাস্তি বাকি আছে তাঁর?আর কত পুড়তে হবে তাকে?

এতগুলো বছর হয়ে গেল সুজাতা আজও তাকে একইরকম ঘৃণা করেন। অন্তত সুজাতার কথায় তাই মনে হয়েছে রজতাভর। সুজাতা চাইলেও মন থেকে তাকে ক্ষমা করতে পারবেন না। ক্ষমা করা উচিতও নয়! যে কাজ তিনি করেছিলেন তা ক্ষমার অযোগ্য। একসাথে তিনজন মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলেছিলেন তিনি। ঠকিয়েছিলেন কাছের মানুষকে। তখন অল্পবয়স ছিল, ভেবেছিলেন মনের বশে করছেন এসব। প্রেম, ভালোবাসার আবেগে করছেন এসব। মন কারো কথা মানে না, কোনো যুক্তি তার কাছে টেকে না। এখন জীবনের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে রজতাভ বোঝেন তিনি কতটা ভুল ছিলেন! যেটাকে তিনি ভালোবাসা ভেবেছিলেন তা আসলে ভালোবাসা ছিল না। উর্মির সাথে সংসার করতে করতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে বাইরে বেরিয়ে তিনি মোহগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ক্রমশ সর্বনেশে খাঁদে নেমে পড়েছিলেন। সাথে নামিয়েছিলেন আরেকজনকে। দুজনের মধ্যে তফাৎ ছিল একজায়গায়। সে সংসারের প্রতি কোনোদিনও বীতশ্রদ্ধ ছিল না। বরং সে ছিল উদাসীন। তাকে পথভ্রষ্ট করে মারনখেলায় মেতে উঠেছিলেন রজতাভ। যার প্রায়শ্চিত্ত এখনও করে যাচ্ছেন তিনি। সেদিন যদি তিনি নিজের মনকে বশে আনতে পারতেন তাহলে হয়তো আজ এতটা আত্মশ্লাঘায় ভুগতে হত না তাকে। একটু আগে সুজাতা যে কথাটা বললেন, ঠিক সেই কথাটাই মৃত্যুশয্যায় উর্মি বলেছিল। আজও মনে পড়ে তার সেই অভিশপ্ত দিনটার কথা। উর্মি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময় বলেছিলেন, “ তুমি মানুষটা ভীষণ ভয়ংকর রজতাভ! সাপের চেয়েও ভয়ংকর! তোমাকে ভালোবাসা যায়, জড়িয়ে ধরা যায়, কান্না পেলে কাঁধে মাথা রেখে কাঁদা‌ যায় কিন্তু বিশ্বাস? না! আর তোমায় বিশ্বাস করা যায় না! আর বাকি রইল ক্ষমা! তার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারন বাঘ যখন রক্তের স্বাদ একবার পায় তাকে শিকার করা থেকে আটকানো অসম্ভব! আজ যদি তোমায় ক্ষমা করি তাহলে তুমি আবার একই ভুল করবে! ও নয় তো অন্য কেউ হবে তোমার শিকার। আর তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবো না কেন জানো? তুমি জেনেশুনে একটা নিস্পাপ মেয়েকে পাপে জড়িয়েছ! তাকে পাঁকে‌ নামিয়ে পাপ করতে বাধ্য করেছ! ওকে কথার জালে বিবশ করে ভোগ করেছ! তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনে গেছি রজতাভ! আমার দুঃখ কোথায় জানো? সে বেচারি নিজেকে দোষী ভেবে দুরে সরে গেছে। যদি আমার শক্তি থাকতো তাহলে ওকে খুঁজে বের করে জড়িয়ে ধরে বলতাম, “তোর কোনো দোষ নেই!তুই নিজেকে শাস্তি দিস না!শাস্তি তো ওর প্রাপ্য!” বলে তোমার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতাম। কিন্তু আমার কপাল দেখো! তোমার সন্তানকে গর্ভে ধারন করার জন্য মরতে বসেছি। তোমার বিষাক্ত স্পর্শে আমার আয়ু কমে গেছে! এই মুহূর্তে তোমাকে দেখে আমার গা গুলোচ্ছে রজতাভ মজুমদার! বমি পাচ্ছে! নেহাত আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানকে দেখার কেউ নেই বলে তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। কিন্তু খবরদার রজতাভ! তোমার এই সুন্দর সুপুরুষ মুখের পেছনে যে কুৎসিত, নোংরা, ঘৃণ্য পরজীবী মুখটা আছে সেটার আভাস যাতে আমার মেয়ে না পায়!আর জেনে রাখো তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করবো না!আমার মৃত্যুর পর তুমি আমার মৃতদেহকে স্পর্শ করবে না!”

পাপ! পাপই বটে! সেদিন তিনি আবেগের বশে যেটা করেছিলেন, যেটাকে তিনি মুক্তির বাতাস খোঁজার প্রচেষ্টা ভেবেছিলেন, যেটাকে তিনি নিজেকে বাঁচতে দেওয়ার সুযোগ ভেবেছিলেন আজ এতবছর পর সেই কাজটা তার কাছে পাপই বটে! যে পাপের সাজা ভোগ করছেন তিনি।  ভাবতে ভাবতে সিগারেটে টান দিয়ে চোখ বোজেন রজতাভ। একমুহূর্তের জন্য সেইদিনগুলো সিনেমার রিলের মতো হাজির হয় তার মনে। চোখ বুঁজে সেদিনের কথা মনে করতে থাকেন তিনি।

*****

কাল দুপুরে সৈকত থেকে ফেরার পর কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল জানে না সুজাতা। হঠাৎ ভীষণ শীত লাগায় ঘুমটা ভাঙল তার। ঘুম ভাঙার পর‌ চারদিকে তাকিয়ে সে অবাক হলেও কিছুক্ষণ লাগল তার ধাতস্থ হতে। কিছুক্ষণ পর বিছানায় উঠে বসল সে। পাশে তাকিয়ে দেখল তথাগত উবু হয়ে শুয়ে আছে। পরনে একটা সুতো পর্যন্ত নেই। একই অবস্থা সুজাতারও। সম্পুর্ণ বিবস্ত্র হয়ে সে বিছানার উপর বসে আছে। গায়ের উপর চাপা দেওয়া কম্বলটা উঠে বসায় কোলের উপর পড়ে গেছে। খোলা জানলা দিয়ে সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস হুহু করে ঢুকে পড়ছে ঘরে যার ফলে তার ঠান্ডা লাগছে।‌ প্রাথমিক‌ বিহ্বলতা কাটিয়ে কোনোমতে কোলের উপর রাখা কম্বলটা দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিজের লজ্জা নিবারণ করে সুজাতা নামে খাট থেকে। তারপর বাথরুমে গিয়ে কম্বলটা ছুঁড়ে ফেলে খাটে। 

কিছুক্ষণ পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে ব্যাগ থেকে একটা নাইটি বের করে পরে নেয় সে। তারপর একটা‌ চাদর‌ বের করে কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে টেবিলে রাখা হাতঘড়িতে তাকিয়ে দেখে ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজে। তারমানে একটু পরেই তো সুর্যোদয় হবে! তাড়াতাড়ি  রুমের ব্যালকনিতে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসে সুজাতা। তাকিয়ে‌‌ দেখে পুর্বদিকের আকাশ ইতিমধ্যেই লালচে‌ হয়ে‌ গেছে।

কিছুক্ষণ পর দিগন্তের পার থেকে প্রায় সমুদ্রের মাঝখান থেকে উঠলেন সুর্যদেব। সমুদ্রের জলে লাল হয়ে প্রতিফলিত হয়ে দেখা দিতে লাগল সুর্যের প্রতিবিম্ব। সুজাতার ‌মনে হল যেন সদ্য সমুদ্রে‌ স্নান করে উঠলেন সুর্য। তার সারাদিনের তেজরাশিপুঞ্জ‌ ক্রমশ সমুদ্রের জলে ধুয়ে মিশে গেল। এরকম একটা নৈসর্গিক দৃশ্যের সাথে সমুদ্রের মৃদু হাওয়ায় চোখের সাথে সাথে শরীরেও বেশ আরাম বোধ হল সুজাতার। মনে হতে লাগল তার জ্বর, শরীর খারাপ এই হাওয়া আর সুর্যের আলোয় ক্রমশ দুর হয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতর থেকে তথাগতর গলা পেল সে, “ ভেতরে চলে এসো! ঠান্ডা লাগবে।”

সুজাতা কথাটা শুনেও চুপ করে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর ঘরের ভেতর থেকে বারামুডা পরে বেরিয়ে আসে তথাগত। সুজাতার পাশে দাড়িয়ে চুপ করে দেখে প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্যটাকে। তারপর সুজাতার কাঁধে হাত দিয়ে তথাগত বলে, “সানরাইজ দেখা শেষ? চলো ভেতরে চলো। বেশিক্ষণ এখানে থাকলে আবার জ্বর আসতে পারে। ভেতরে গিয়ে আরেকটু ঘুমিয়ে নাও। তারপর আজ দুপুরের দিকে আমরা ফিরে যাব।”

সুজাতা চট করে তাকায় তথাগতর দিকে, “অ্যা! সেকি! এই তো এলাম আমরা! এই এরকম করো না প্লিজ! আর কটা দিন থাকি না!”

-“আর একটা দিনও নয়! প্রথমদিনেই যে খেল তুমি দেখালে তারপর আর তোমাকে এখানে রাখতে ইচ্ছে করছে না আমার। আমরা আজই ফিরে যাব!”

-“প্লিজ তথাগত! এরকম করো না! আচ্ছা এখন তো জ্বর নেই আমার! এখন ঠিক আছি আমি।”

-“ঐ কারনেই তো নিশ্চিন্ত হয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত‌‌ নিয়েছি আমি। কাল সারারাত কতটা চিন্তায় কেটেছে তুমি ভাবতে পারবে না। সারারাত জেগে একটু পর পর জল পট্টি দিয়েছি। জ্বরের ঘোরে তুমি বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছো তখন আমি বার বার চেক করছি তোমার জ্বর। শেষে বাধ্য হয়ে নিজের দেহ দিয়ে তোমার দেহের তাপকে শুষে নেওয়ার জন্য ওভাবে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লাম। আমার জন্যই এই দশা তোমার। আমি কালকে জোর করে যদি তোমাকে স্নান না করাতাম তাহলে হয়তো... না! না! আর আমি কোনো রিস্ক নিতে পারবো না! আমরা আজই ফিরে যাবো!” বলে করুণ মুখে সুজাতার দিকে তাকায় তথাগত। সুজাতা দেখে তথাগত চোখের কোণে জল জমেছে।

-“প্লিজ তথাগত!” বলে কাতর চোখে তাকায় সুজাতা। 

-“তোমার কথায় আর ভুলছি না আমি। এখানে তোমার কিছু হয়ে গেলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না আমি।” বলে সুজাতার থেকে চোখ ফিরিয়ে উদীত সুর্যের দিকে তাকায় তথাগত। সুজাতা তথাগতর দিকে তাকিয়ে ওর একটা আঙুল নিজের হাতে নেয়। তথাগত পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে সুজাতা ছলছলে চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

-“কিছু হবে না আমার। তুমি যখন সাথে আছো তখন কিছুই হবে না আমার।” 

-“কিন্তু সু!”

-“কোনো কিন্তু নয়! কালকে যেটা হল সেটাতে তোমার কোনো দোষ ছিল না। হ্যাঁ জোর করেছিলে তুমি। কিন্তু আমি চাইলে তোমাকে বাধা দিতে পারতাম। ইচ্ছে করেই দিই নি। কারন আমি জানতাম, আমার কোনো বারণ তুমি শুনবে না। তাই ইচ্ছে করেই তোমার সাথে সমুদ্রে নেমেছিলাম আমি। ভেবেছিলাম আমি অসুস্থ হলে তুমি বিরক্ত হবে। অন্তত কাল আমার জ্বর শোনার পর তোমার ব্যবহারে আমার তাই মনে হয়েছিল।”

-“আর এখন কী মনে হচ্ছে?”

-“ মানুষটা তুমি জেদী হলেও মন্দ নও। আমার কিছু হলে প্রাণপণে আমাকে রক্ষা করতে পিছু হটো না। প্রচণ্ড ভালোবাসো আমায় আর...!”

-“আর?” 

দুষ্টুমিভরা চোখে তথাগতর দিকে তাকায় সুজাতা,“ আর মানুষটা জংলী হলেও বেশ খাটি তুমি। বর্বর নও।”

তথাগত নতজানু হয়ে সুজাতার হাতটা ঠোঁটের কাছে চেপে ধরে তারপর ধরা গলায় বলে, “বিশ্বাস করো! কাল তোমার অবস্থা দেখে যতটা ভয় আমি পেয়েছি ততটা ভয় কোনোদিনও পাই নি। বারবার মনে হচ্ছিল এই বুঝি তোমাকে হারিয়ে ফেলব। আমি কথা দিচ্ছি, আর কোনোদিন তোমাকে জোর করবো না। তুমি প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না।” বলতে বলতে সুজাতার কোলে মাথা রাখে তথাগত।

সুজাতা তথাগতর মাথায় হাত রাখে। ঘন কোঁকড়ানো একঢাল চুলে আঙুল বুলিয়ে বলে, “কালরাতে কিছু খেয়েছ?”

তথাগত মাথা নাড়ে। সুজাতা তথাগতর চুলে আঙুল বোলাতে বোলাতে ফিসফিস করে বলে, “চলো ব্রাশ করে কিছু খেয়ে নেবে। আমিও খাবো। কাল সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি দুজনের।”

তথাগত মাথা তুলে তাকায় সুজাতার দিকে। তারপর বলে, “তাই তো! কাল সারাদিন কিছুই খাওনি। এরপর কিছু না খেলে তো দুর্বলবোধ করবে। খিদে পেয়েছে না খুব?”

সুজাতা ফিক করে হেসে বলে “প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে আমার। শুধু পেটে নয় তলপেটেও।” 

আচমকা একথা শুনে চমকে যায় তথাগত। তারপর হেসে সুজাতাকে কোলে তুলে নেয় সে। সুজাতা হেসে বলে, “আরে লেগে যাবে তো! ছাড়ো আমাকে! জংলী একটা!”

তথাগত হেসে বলে, “চুপ! খাবার সময় কথা বলতে নেই।”

সুজাতা কিছু বলার আগেই ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট গুজে চুমু খেতে খেতে ঘরে প্রবেশ করে তথাগত। ততক্ষণে সুর্যদেব সমুদ্রস্নান সেরে তার যাত্রায় বেরিয়ে পড়েছেন।

*****
অবশেষে তথাগত রাজি হয়েছে থেকে যাবার জন্য। তারপর দুদিন কেটে গেছে। এই দুদিনে সুজাতাও অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু তথাগত এখনও ক্রমাগত একজন গার্জেনের মতো খেয়াল রেখে চলেছে। ঠান্ডা জল, আইসক্রিম খেতে দিচ্ছে না সুজাতাকে। সুজাতা হাজার ছলছলে চোখে তাকালেও পাত্তা দিচ্ছে না সে। রাতের দিকে ব্যালকনিতে বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখার সময় চাদর দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে সুজাতাকে। ভুল করেও আর সমুদ্রে স্নান করতে দিচ্ছে না ওকে। 

এই দুদিনে একটু একটু করে চারপাশ ঘুরে নিচ্ছে তারা। দেখে নিচ্ছে দর্শনীয় জায়গাগুলো। তেমনই আজ এসেছিল মোহনা দেখতে। জায়গাটা বেশ ভালো। একপাশে সমুদ্রের শান্ত ঢেউ অপরদিকে উত্তাল করা নদীর উচ্ছাস। মাঝে পাথরের চাই ফেলে দুটো জায়গাকে ভাগ করা হয়েছে। সমুদ্র দেখে সুজাতার আনন্দ দেখে কে? বাচ্চা মেয়েদের মতো দৌড়ে দৌড়ে সমুদ্রের পাড়ে ছুটে যাচ্ছে। তথাগতর হাজার তর্জন-গর্জনকেও পাত্তা দিচ্ছে না সে। তথাগত বকা দিতে দিতে অবশেষে‌ ক্লান্ত‌ হয়ে হাল ছেড়ে বসে পড়েছে সমুদ্রের পাড়ে বালির উপর। সুজাতার ছেলে মানুষী দেখে আনমনে হাসছে সে। 

“আপনারা কি এখানে আগেও এসেছেন নাকি?”

কন্ঠস্বর শুনে পেছন ফিরে তাকাল তথাগত। একজন ভদ্রমহিলা তার পিছনে বসে আছেন। মহিলাকে চেনে সে। আজ সকালেই আলাপ হয়েছে। এরাও হানিমুন কাপল। ভদ্রলোক আর্মিতে চাকরি করেন। এরই মধ্যে ভদ্রমহিলার সাথে সুজাতার বেশ ভাব হয়ে গেছে। তথাগত হেসে বলল , “না এই প্রথমবার! আপনারা?"

-“এই নিয়ে দুবার । আমার পছন্দ ছিল পাহাড়, কিন্তু আমার কত্তাটির আবার সমুদ্র পছন্দ। তাই বাধ্য হয়ে আবার আসতে হল!"

-“আমার গিন্নিরও তাই। কত করে বললাম, 'সমুদ্রে দেখার কী আছে? সেই একনাগাড়ে ঢেউ আসছে আর আসছে। আর হাওয়া বইছে। তার চেয়ে পাহাড়ে চলো। বেশ নিরিবিলি জায়গা। ঠান্ডা, মনোরম পরিবেশ। প্রকৃতির মাঝে, প্রকৃতির কোলে কয়েকদিন কাটিয়ে আসি। তা না ম্যাডাম গাল ফুলিয়ে আবদার করলেন আর আসতে হলো। আর এসেও তো শান্তি নেই। ম্যাডাম দুদিন জ্বরে কাবু হয়ে রইলেন।"

-“ওমা সেকি! সুজাতার জ্বর হয়েছে আমাকে বলেনি তো?” বলে একটু উদ্বিগ্ন হলেন ভদ্রমহিলা। 

হাসতে হাসতে সুজাতা ওদের পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর ভদ্রমহিলাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

-“হয়েছিল! পাস্ট টেন্স! এখন নেই। কিন্তু তুই এখানে এসে আমাকে চমকে দিবি জানলে আগে থেকে ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে নিতাম।”

-“না না এটা ভালো কথা নয়! সেই কলেজ থেকে দেখে আসছি তোর ভীষণ ঠান্ডার ধাঁচ অথচ কোনো পিকনিক বা এক্সপিডিশনে গেলে একেবারে জানলার ধারে বসবি। এরকম ছেলেমানুষি কবে যাবে তোর?” বলে মহিলা  জড়িয়ে ধরলেন সুজাতাকে।

-“কোনোদিনও না!” বলে খিলখিল করে হেসে ফেলল সুজাতা।

(চলবে)

বৃহস্পতিবার, ১২ আগস্ট, ২০২১

রূপে তোমায় ভোলাব না



“I'm in love with the shape of you/

We push and pull like a magnet do/

Although my heart is falling too/

I'm in love with your body” 

ফোনের শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি তোয়ালে জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল উত্তরা। বিছানা থেকে ফোনটা তুলে দেখল স্ক্রিন জুড়ে জ্বলজ্বল করছে “Calling Parag” ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে একটা মোলায়েম অথচ গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এল, “ওকে আমি রাজি। কবে দেখা করবে?”

 
কথাটা শোনামাত্র উত্তরার মুখে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে হেসে বলল, “কাল বিকেল ছটায়। অ্যাক্রোপলিস মলের স্টারবাকস এর আউটলেটে।”

- “ অ্যা! না না আমি অতো বড়োলোক ছেলে নই। এক কাজ করো নন্দনে চলে এসো। সেখান থেকে কাছে পিঠে যাওয়া যাবে।”

- “বেশ কিন্তু বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারবো না কিন্তু বলে দিলাম!”

- “ওকে! ডান।”

- “তোমাকে চিনবো কি করে? ওয়েট এক কাজ করো। কাল তুমি নীল রংয়ের টিশার্ট পরে আসবে।”

- “বেশ। যো হুকুম রাণীসাহেবার। আর তুমি?”

- “আমি? কোরাল ব্লু রংয়ের কুর্তি পরবো।”

- “কোনটা? যেটা পরে একটু আগে রিল ছেড়েছ সেটা?”

- “ও! বাবুর সেটা দেখাও হয়ে গেছে? তা কেমন লাগলো?”

- “মন্দ নয়! তবে অ্যাবসের উপর একটু ফোকাস করতে হবে। ফ্লন্ট করতে গিয়ে হাল্কা Chubby লেগেছে।”

- “সেম পিঞ্চ! আর বলো না। কদিন ধরে ভাবছি ডায়েট করবো। ওয়েট পুট অন হচ্ছে।‌ মাকে বলেছি দুপুরে রাইস খাবো না কিন্তু মা শুনলে তো!রোজ নানারকমের টেস্টি খাবার করবে। আর আমিও হ্যাংলার মতো গিলে ফেলি।”

- “মায়েরা ওরকমই হয়। মায়ের হাতের খাবার খেলে ডায়েট মনে থাকে না। যাকগে কাল ছটাতেই তো?”

- “হ্যা।”

- “ওকে বেবি! সি ইউ দেয়ার!”

- “ওকে।”

বলে কলটা কেটে ফোনটা বিছানায় রেখে বাথরুমে ঢোকে উত্তরা। সম্পুর্ণ নগ্ন হয়ে শাওয়ারের সামনে দাঁড়ায়। প্রাণভরে উপভোগ করে সর্বাঙ্গে আছড়ে পড়া প্রতিটা জলবিন্দুকে। চুলে শ্যাম্পু দিতে দিতে মনে করতে থাকে বিগত কয়েকবছর আগের ঘটনাগুলো। তখন সবে কলেজ পাশ করেছে সে। কলেজ ফেস্টে ফ্যাশন শোতে ওকে দেখে পছন্দ করেছেন বেশ কয়েকজন অ্যাডের ডিরেক্টর। কলেজের আগেই কয়েকটা ম্যাগাজিনে, ফ্লেক্সে মুখ দেখানো হয়ে গেছে তার। মেয়ের সাফল্যে বাবা খুশি হলেও মা শুরু থেকেই মেয়ের এই কাজে নারাজ। অবশেষে নিমরাজি হয়ে বলেছেন “যা খুশি করো কিন্তু অশালীন পোশাক পরে ছবি তোলা যাবে না। আর বিয়ে হলে ওসব বন্ধ করবে।” অগত্যা নিরুপায় হয়ে বোল্ড, সুইমওয়্যার শুট করা যাবে না এরকম টার্ম নিয়ে মডেলিং জগতে ঢুকতে হয়েছে। এ নিয়ে ফোটোগ্রাফারদের সাথে একটু বাদানুবাদ হলেও সে রাজি হয় নি। তবে অশালীন পোশাকের দরকার পড়ে নি। শুধুমাত্র দৃষ্টির মাদকতা আর একগাল মিষ্টি হাসিতেই মেয়ে বাজিমাত করে দিয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকে অনুরাগীদের ভীড় টেনে এনেছে ওই হাসি আর অভিব্যক্তিতে ভরা মুখ। সারাদিন মেসেঞ্জার, ডি.এমে উপচে পড়ছে নানারকমের প্রশস্তিবাক্য। 

এরকমই একদিন দুপুরবেলা টিকটকের একটা ভিডিও ইনস্টাগ্রামে পোষ্ট করে শুয়ে শুয়ে ফেসবুক ঘাটছিল উত্তরা। আচমকা একটা পোষ্টে চোখ আটকে গেল তার। একটা লেকের ধারে একটা পাটাতনে একটা প্রেমিকযুগল পিঠ করে বসে আছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে অস্তগামী সুর্য ধীরে ধীরে লেকের জল স্পর্শ করেছে। সুর্যের আলোয় দুজনের দীর্ঘছায়া পড়েছে পাটাতনের উপর। একটা নৈস্বর্গিক দৃশ্য। অন্যদিন হলে লাইক করে উত্তরা স্ক্রল করতো পরের পোষ্টে। কিন্তু ওর চোখ আটকে গেল ক্যাপশনে। ক্যাপশনে একটা বেশ মিষ্টি প্রেমের গল্প লেখা। স্কুলবেলায় গল্পের বইয়ের পোকা ছিল সে। একটু আধটু লেখালেখিও করেছে স্কুল ম্যাগাজিনে। কয়েকটা লাইন পরেই সে বুঝতে পারল লেখার বাঁধুনি বেশ পোক্ত। সে বুঁদ হয়ে লেখাটা পড়তে লাগল। কিন্তু লেখাতে ডোবার আগেই লেখাটা শেষ হয়ে গেল। গল্পের শেষে বায়োতে ক্লিক করে বাকি লেখা পড়তে বলেছেন গল্পকার। তড়িঘড়ি পোষ্টদাতার প্রোফাইলে গেল সে। আর গিয়েই আরেকপ্রস্থ অবাক হল সে। পোষ্টদাতা লেখকও তার অনুগামীদের মধ্যে পড়েন। বন্ধুত্বের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন ইনিও। 

রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট না করে বায়ো পড়তে লাগল সে। কয়েকটা তথ্যের মাঝে পেয়ে গেল ব্লগের লিঙ্কটা। সেখানে ক্লিক করে ঢুকে পড়লো পোষ্টদাতার ওয়েবসাইটে। তারপর খুঁজে খুঁজে গল্পটা পেয়ে পড়তে লাগল। লেখকের সব লেখা পড়ে উত্তরা যখন ব্লগ থেকে বেরোল ততক্ষণে দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে। ফেসবুকের প্রোফাইলের দিকে আরেকবার তাকালো সে। মুঠোফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে বাংলা হরফে লেখা নামটা, ‘পরাগরেণু দত্তগুপ্ত’। প্রোফাইল পিকে একটা চিনার পাতার ছবি। কভারে শান্তিনিকেতনের একটা নৈসর্গিক দৃশ্য। সাতপাঁচ না ভেবে রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করে উত্তরা। মেসেঞ্জারে গিয়ে মেসেজ করে, “ আপনার গল্পগুলো পড়লাম। দারুন লাগল।” বেশ কিছুক্ষণ পর ওপার থেকে একটা উত্তর আসে, “ধন্যবাদ!” তারপর অফলাইন হয়ে যায় পরাগ।

এই ব্যবহারে একটু হলেও অবাক হয় উত্তরা। অন্য কেউ হলে আহ্লাদে ডগমগ হয়ে মেসেজের বন্যা বইয়ে দিত। অথচ এই ছেলেটা শুধু একটা শুকনো ধন্যবাদ দিয়ে চুপ হয়ে গেল! অ্যাটিটিউড দেখাচ্ছে! এত সাহস! উত্তরা সিংহরায়কে অ্যাটিটিউড! বেশ থাকুক লেখকমশাই ওর ঔদ্ধত্য নিয়ে। ঐ তো ফলোয়ারের ছিরি। ওর থেকে বেশি ফলোয়ার ওর একটা পোষ্টে ঝাঁপায়। অভিমানে পরাগকে ব্লক করে ফোন বন্ধ করে উত্তরা। 

কিন্তু বইপোকাদের একটা বড়ো দুর্বলতা হল ভালো গল্প। পৃথিবীতে একজন বইপ্রেমী যতই লেখকের প্রতি খাপ্পা হন না কেন, লেখকের লেখা যদি মনোগ্রাহী হয় তাহলে সেই লেখার টানে তিনি লেখকের লেখা পড়তে বাধ্য। উত্তরার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হল না। পড়বে না পড়বে না করেও সে ঠিক আবার চলে গেল পরাগের ব্লগে। আবারও একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে কমেন্টবক্সে গেল সে। তবে এবার পরাগের তরফ থেকে কাষ্ঠ জবাব পেল না সে। বরং পেল একটা মিষ্টি করে ক্ষমাপ্রার্থনার মেসেজ। সেই শুরু, তারপর কেটে গেছে প্রায় পাঁচবছর। এর মধ্যে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। মডেলিং এর সাথে সাথে দু-একটা ওয়েব সিরিজ, সিরিয়ালে মুখ দেখানো হয়ে গেছে উত্তরার। অনুগামীদের সংখ্যা বেড়ে হাজার থেকে লাখে দাঁড়িয়েছে। টিকটক ব্যান হবার পর ইনস্টাগ্রামে ভীড় বেড়েছে ভীষণ। ওদিকে পরাগের অনুগামীরাও বেড়েছে অল্প অল্প করে। যদিও এর পেছনে উত্তরার অবদান অপরিসীম। সে ক্রমশ প্রমোট করেছে পরাগের ব্লগটাকে। পেজ বানাতে, পেজ চালাতে সাহায্য করেছে। ক্রমাগত তাগাদা দিয়ে গেছে নতুন নতুন গল্পের জন্য। 

এতকিছু করতে করতে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে অনেক। মেসেঞ্জার থেকে হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে ফোনে কথা বলেছে দুজনে। কিন্তু একটা জিনিস একই থেকে গেছে। পরাগের আড়ালে থাকা। এই ক’বছরে কাছে এলেও পরাগকে ঠিক কেমন দেখতে তা জানে না উত্তরা। মানে কন্ঠস্বর জানলেও পরাগকে স্বচক্ষে দেখে নি উত্তরা। হোয়াটসঅ্যাপে কতবার ছবি দিতে বলেছে সে। চেষ্টা করেছে ভিডিও কল করার কিন্তু কিছুতেই পরাগের চেহারা দেখতে পারে নি সে। পরাগের একটাই কথা, “চেহারা দেখে কী হবে? মানুষের পরিচয় তার কর্মে, তার রচনায়।” 

এক আধবার উত্তরার মনে হয়েছে এই পরাগ বলে ছেলেটা সত্যিই আছে তো? নাকি কোনো ফেক আইডি? ক্রমশ ঝগড়া বাদানুবাদের পর উত্তরা ঠিক করেছে পরাগ যদি ওর সামনে না আসে তাহলে সে আর কোনো দিন কোনোরকম সম্পর্ক রাখবে না সে। পরাগকে সে কথা জানিয়ে সব জায়গায় ব্লক করেছে সে। তার পরিপ্রেক্ষিতে আজকে পরাগের ফোন।

মাথায় শ্যাম্পু দিতে দিতে ভাবতে থাকে উত্তরা। পরাগকে কেমন দেখতে? নিশ্চয়ই ভীষণ হ্যান্ডসাম, বা ভীষণ কিউট দেখতে! হতেই পারে! ফোনে ওরকম সেক্সি ভয়েসের অধিকারী মানুষ হ্যান্ডসাম হাঙ্ক না হয়ে যেতে পারেই না! কল্পনায় পরাগের সাথে কালকে দেখা করার দৃশ্য কল্পনা করে শাওয়ারের জলে ভিজতে থাকে উত্তরা।

*****

নন্দন চত্ত্বরে উত্তরা যখন পৌঁছল তখন বিকেল পৌনে ছটা বাজে। চারদিকে তাকিয়ে দেখল সে। নন্দনে এই বিকেলেই বেশ ভীড়। চারদিকে প্রেমিকযুগল বসে আড্ডা দিচ্ছে, কোথাও কোথাও কয়েকদল ছেলে মেয়ে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু এত জনের মধ্যে পরাগ কে? কোথায় ও? ভাবতে ভাবতে ফোন বের করে পরাগকে কল করল সে। আর ওকে চমকে প্রায় ওর কানের কাছে বেঁজে উঠলো অরিজিত সিংহের সুললিত কন্ঠের গান, “জো তুম না হো…” চমকে গিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই এক প্রকার ধাক্কা খেল সে। 


ধাক্কাই বটে! কারণ ওর সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে। ছেলে বললেও আকারে বেশ একটা পাহাড়ের মতো ছেলেটা। বেশ নাদুসনুদুস গোলগাল দেখতে ছেলেটা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। উত্তরা ছেলেটা পাত্তা না দিয়ে ফোনে মনোযোগ দিতে যাচ্ছিল কিন্তু এমন সময় ছেলেটার কথায় সে সোজা তাকালো। ছেলেটা এক গাল হেসে বলল, “বাসবদত্তা আমি এসে গেছি!” কন্ঠস্বরটা, নামটা উত্তরার ভীষণ চেনা। পরাগের নতুন গল্পের নায়িকার নাম বাসবদত্তা। ইদানিং ওকে সেই নামেই সম্বোধন করে পরাগ। তারমানে এই হোঁতকা মোটা ছেলেটা পরাগ? উত্তরা ভালো করে তাকাল ছেলেটার দিকে। ছেলেটার পরনে নীল রঙের টি শার্ট আর ওভার সাইজড জিন্স। এই পোশাকই তো পরে আসতে বলেছিল সে! ছেলেটা এক পা এগিয়ে এসে বলল, “চিনতে পারো নি? আমি পরাগ!” কন্ঠস্বরটা শোনা মাত্র সম্বিত ফিরল উত্তরার। এ যে কেঁচো খুড়তে কেউটে বেরোল! সে স্বপ্ন দেখেছিল একটা হ্যান্ডসাম ছেলের সাথে ডেটের। কিন্তু এ যে একটা মোটকা নাড়ুগোপাল। ছেলেটাকে দেখে কেন যানে না ভীষণ হাসি পেয়ে গেল উত্তরার। সে হেসে ফেলল। নিজের ভাগ্যের জন্য, নিজের বোকামোর জন্য। ইস নির্ঘাত পরাগের কীর্তি এটা! নির্ঘাত প্র্যাঙ্ক করছে। নাহলে কোনো দুঃস্বপ্ন এটা। ভাবতে ভাবতে সে হেসে বলল, “বুঝতে পেরেছি! এটা নির্ঘাত পরাগের প্ল্যান তাই না? তা ও কোথায়? ধরতে পারলে মজা দেখা দেখাব ওকে।” কিন্তু ছেলেটা ওকে চমকে দিয়ে হেসে ফেলল। 

ছেলেটাকে পাল্টা হো হো করে হাসতে দেখে হাসি বন্ধ হয়ে গেল উত্তরার। হাসি থামিয়ে হা করে সে তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে। আশেপাশের লোকজন ওদের দিকে তাকাচ্ছে। হাসির চোটে ছেলেটার থলথলে শরীরটা বারবার কেঁপে উঠছে। কিছুক্ষণ হাসার পর ছেলেটা নিজেকে থামিয়ে বলল, “মাপ করো। আসলে আমার এই একটা মুদ্রাদোষ। কাউকে হাসতে দেখলে নিজেকে আর সামলে থাকতে পারিনা। ফিক করে হেসে ফেলি। তাছাড়া হাসার সময় তোমার মুখটা এতোটাই মজার হয়ে উঠেছিল যে নিজেকে সামলাতে পারিনি। সরি।”

ভ্রুটা কুঁচকে গেল উত্তরার। এ কি পাগল টাগল নাকি? কাউকে হাসতে দেখলে হাসি পেয়ে যায়? তাও আবার সামান্য হাসি নয় একেবারে অট্টহাস্য! কোনোরকমে নিজেকে সামলে যতটা পারে সিরিয়াস মুখ করে উত্তরা বলে , “তাহলে কাজের কথায় আসা যাক!”
ছেলেটা সোজা হয়ে বসল তারপর বলল, “ আগে কোথাও বসি চলো। তার পর শুনবো তোমার কী জানার আছে? এসো।”


ইচ্ছে না থাকলেও একপ্রকার বাধ্য হয়েই ছেলেটার পেছন পেছন হাটতে লাগল উত্তরা। কাছেই ছেলেটার বাইক পার্ক করা ছিল। ছেলেটা সেটা বের করে এনে স্টার্ট করল। উত্তরা বাইকের পেছনের সিটে বসতেই ছেলেটা বাইক চালিয়ে দিল। কিছুদুর গিয়ে একটা রেস্তরাঁর সামনে ছেলেটা বাইক দাঁড় করাতেই নেমে পড়ল উত্তরা। দুজনে মিলে ঢুকলো রেস্তরাঁতে।


বেশ ছিমছাম, পরিপাটি রেস্তরাঁর ভেতরটা। আশেপাশের টেবিলে বেশ কয়েকজন বসে আছে। ভীড় হলেও তেমন শব্দ নেই। রেস্তরাঁতে বোধহয় ছেলেটার আগে থেকেই বুকিং করা ছিল। ওরা ঢোকামাত্র ওয়েটার এগিয়ে এল ওদের দিকে। তারপর নির্দিষ্ট টেবিলে বসিয়ে অর্ডারের অপেক্ষা করতে লাগল। ছেলেটা বোধহয় আগেও এসেছে এখানে। ওয়েটার জিজ্ঞেস করা মাত্র নিজের জন্য একপ্লেট ফ্রাই মোমো অর্ডার করল। উত্তরা শুধুমাত্র এককাপ কফি নিল। ওয়েটার চলে যেতেই ছেলেটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল,““তুমি শুধু কফিই খাবে? এখানকার হাক্কা নুডলসটাও দারুণ খেতে।”


উত্তরা মাথা নেড়ে বলে, “বাড়ি থেকে স্ন্যাকস খেয়েই বেড়িয়েছি। তাছাড়া কদিন ডায়েট চলছে। আমি কফিই খাবো।”

-“বেশ! তা এবার বলো। তোমার কী কী জানার আছে।”

-“তোমার নাম তো পরাগ। অন্তত আমি তাই জানি। ভালোনামটা...”

-“ অসীমাভ দত্তগুপ্ত।”

-“অসী...হোয়াট?”

-“অসীমাভ। নামটা শুনে মনে হয় না যে কোনো বুড়ো, বা জেঠু টাইপের লোকের নাম অথবা বাবা-কাকা টাইপের লোক? বিশ্বাস করো নামটা এতটাই ব্যাকডেটেড যে অফিশিয়াল কাজে বার বার বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে আমায়। তাই ফেসবুকে আমার ডাকনামটার সাথে মায়ের নামটা যোগ করে রেখেছি। আচ্ছা সত্যি করে বলো তো, তুমি সিরিয়াসলি ভেবেছিলে না যে আমি ফেক আইডি নিয়ে তোমার সাথে মজা করেছি বা তোমার সাথে কোনো নোংরা প্র্যাঙ্ক করা হয়েছে? কি তাই তো? জানতাম! অবশ্য এক্ষেত্রে তোমার কোনো দোষ নেই। কারন এর আগে অন্তত জনা পাঁচেক মহিলাও আমার আইডি দেখে ডেটে এসে বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে তাই ভেবেছিলেন। তারপর আমার বিরাট বপু এবং রাক্ষুসে চেহারা দেখে, বাস্তবের সম্মুখীন হয়ে কেউ মানে মানে কেটে পড়েছেন, কেউ বা ভিরমি খেয়েছেন, কেউ আবার মিটিং সেরে পরে না বলেছেন, কেউ আবার ঠকিয়েছি বলে আমাকে দেখে নেবেন বলে শাঁসিয়েছেন। ঠিক এই কারণেই আমি দেখা করতে চাই নি। কারণ বাস্তবের আমি আর ফেসবুকের আমির মধ্যে বিস্তর ফারাক। আমি চাই নি আমাদের বন্ধুত্বটা এইভাবে শেষ হোক তাই...। তবে এই নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই জানো? কারণ বাস্তবটাকে আমি মেনে নিয়েছি। এটাই আমি। বাস্তবের পরাগ দত্তগুপ্ত।‌‌” বলে ছেলেটা মলিন হাসি হাসে।

একটু বিব্রত হয়ে পড়ে উত্তরা। সত্যিকথা বলতে গেলে খানিকক্ষণ আগেও সে তাই ভাবছিল ঠিকই। কিন্তু এতটাও রুড ভাবে ভেবে দেখেনি। সে হাল্কা হেসে বলে, “না মানে আমি সেটা মিন করে বলতে চাই নি। আমি যেটা বলতে চাইছি তোমার ডাকনামের চেয়ে আসল নামটা বেশী ইউনিক। বেশ খটোমটোও বটে।”

-“ধন্যবাদ! তবে এর পেছনে আমার স্বর্গত ঠাকুমার অবদান অনস্বীকার্য। আসলে আমার দুই দাদার নামের সাথে মিল রাখতে গিয়ে বোধহয় তিনিও জানতেন না যে ভবিষ্যতে তার ছোটো নাতিকে নামবিম্ভ্রাটে পড়তে হবে। স্কুল-কলেজেও অসীমাভ নামটা অ্যাসিমভ থেকে অ্যাসি হয়ে গিয়েছিল। বলতে পারো কলেজে এই নামেই আমি ডিপার্টমেন্টে প্রসিদ্ধ ছিলাম। ভাগ্যিস আমার মা আমার ডাকনামটা রেখেছিলেন। নাহলে কী যে হতো?”

-“এ নামের মানে কী?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেটা বলে, “মানেটা একটু উদ্ভট। যে আলো বা আভা মাত্রাহীন। এবার তুমি বলবে আলো তো সীমাহীনই হয়। আমিও তাই জানি। কিন্তু ঠাকুমা কেন যে এই নামটা রেখেছিলেন সেটা উনিই বলতে পারতেন। কিন্তু দশবছর হলো তিনি স্বর্গে সেটল করে গেছেন অগত্যা এই রহস্যটাও তার সাথে চলে গেছে।”

উত্তরা আরো কিছু বলার আগে ওয়েটার অর্ডার নিয়ে টেবিলের সামনে হাজির হয়। ধোঁয়া ওঠা ফ্রাই মোমোর প্লেট, আর কফির কাপ নামিয়ে চলে যায়। অসীমাভ ওরফে পরাগ বলে, “তুমি শিওর আর কিছু খাবে না?”

উত্তরা মাথা নেড়ে কফির কাপে চুমুক দেয়। পরাগ শ্রাগ করে মোমো খেতে থাকে। উত্তরা কফি খেতে খেতে দেখতে থাকে পরাগের খাওয়া। কফিতে চুমুক দিয়ে বলে, “এই রেস্তরাঁর স্টাফেরা তোমার চেনা মনে হয়। যেভাবে খাতির যত্ন হচ্ছে।”

-“চেনা তো বটেই। আফটার অল আমাদেরই তো রেস্তরাঁটা ।”

এবার কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খায় উত্তরা। এতটা চমক সে আশা করে নি। সত্যিকথা বলতে গেলে এতদিন পরাগের লেখা নিয়েই কথা হয়েছে ওদের মধ্যে। এর বাইরে পরাগ নিজের ব্যাপারে না কিছু বলেছে, না ও জানতে চেয়েছে। জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে পরাগ মোমো খেতে খেতে বলে, “আমাদের তিন ভাইয়ের মিলিত ব্যবসা এই রেণুকণা’স কিচেন। বড়দা, আর মেজদাই মেন ব্যবসা সামলায়। আমার শেয়ার থাকলেও আমি লেখালেখিতেই ব্যস্ত। যদিও বাবা চান আমিও ব্যবসায় নামি। দাদাদের হেল্প করি। কিন্তু আমার এই হিসেবনিকেশের ঝামেলা ভালো লাগে না।”

উত্তরা জল খেয়ে চুপচাপ বসে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, “আন্টি মানে তোমার মা...”

-“মা এসব ব্যাপারে কুল। সত্যি কথা বলতে গেলে মা-ই আমাকে রক্ষা করে আসছে এসব থেকে। বাড়িতে সর্বময়কর্ত্রী আমার মা। বাড়িতে মায়ের কথাই শেষ কথা।”

বলে খাওয়া শেষ করে ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পরাগ। তারপর বলে, “তাই বলে আমি যে একেবারে অকম্মার ঢেকি, বা ওয়ার্থলেস স্পয়েল্ড মামাস বয় এমনটা নয়। রেস্তরাঁটার ইন্টিরিওর আমারই ডিজাইন করা। তারপর ওয়েটারদের পোশাক, রাঁধুনিদের হাইজিন সবটাই আমার মাথা থেকে বেরিয়েছে।”

এবার অবাক হয় উত্তরা। ছেলেটা কি থটরিডিং জানে নাকি? একটু আগেই মনে মনে ওকে মাকালফল ভাবতে যাচ্ছিল। খাবার শেষ করার পর ওয়েটার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “আর কিছু লাগবে স্যার?” পরাগ‌ মাথা নেড়ে বলে, “না ম্যাডামকে জিজ্ঞেস কর। উনি তো কফি ছাড়া আর কিছুই খেলেন না।”

উত্তরা মাথা নাড়ে। পরাগ হেসে বলে ,“তাহলে বিলটা নিয়ে এস নিতাইদা।” নিতাই মাথা নেড়ে চলে যেতেই পরাগ বলে, “এটাও আমারই বানানো নিয়ম। নাথিং ইজ ফ্রি। তুমি যতই রেস্তরাঁর মালিক হও না কেন এটা তোমার বাবার হোটেল নয় যে ফ্রিতে খেয়ে যাবে। বিজনেস বিজনেসের জায়গায়, ফ্যামিলি ফ্যামিলির জায়গায়।‌ আর এটা আমার রেস্তরাঁ হলেও এখন আমি এই রেস্তরাঁয় মালিক হয়ে নই বরং একজন কাস্টোমার হিসেবে এসেছি। কাজেই বিলটা কম্পালসারি।” বলতে বলতে নিতাই বিলবুকটা নিয়ে হাজির হয়। দুজনের বিল মিটিয়ে পরাগ বলে, “তাহলে এবার ওঠা যাক?” উত্তরা মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ছেলেটাকে যত বোকা মনে হয়েছিল তত নয়। বেশ চালাক চতুর। ব্যবসায়িক বুদ্ধিও আছে। মনে মনে উত্তরা বলে, “ইন্টারেস্টিং!”

রেস্তরাঁ থেকে‌‌ বেরিয়ে পরাগ বাইকটা স্টার্ট করে। উত্তরা পেছনে বসতেই পরাগ বলে, “এবার কোথায় যাবে?”

উত্তরা জবাব দিচ্ছে না দেখে পরাগ বোঝে পরপর দুটো ধাক্কা সামলাতে পারে নি মেয়েটা। সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া বিল মিটিয়ে আসার সময় কয়েকজন কাস্টোমার উত্তরাকে চিনে ফেলায় সেলফির আবদার মেটাতে হয় যার জন্য পরাগ নিজেও বিব্রত। এখানে এরকম হবে সে মাথাতেও আনে নি। সঙ্গী যদি পাবলিক সেলিব্রেটি হয় তাহলে বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। যাক গে! এখন এমন জায়গায় যেতে হবে যেখানে উত্তরার মন ঠিক হয়ে যায়। ভাবতে ভাবতে সে নিজেই ঠিক করে নেয় কোথায় যাবে। এমন একটা জায়গা যেখানে গেলে উত্তরার মন ফ্রি হবেই। সেই ভাবনা মতো বাইক চালায় সে।


নন্দন চত্ত্বরে ওরা যখন পৌঁছল ততক্ষণে অন্ধকার না হলেও দিনের আলো প্রায় মরে এসেছে। বাইরের দোকানগুলোতে পর্যটকদের ভীড় বাড়ছে। দেখে শুনে এক‌জায়গায় বসে ওরা দুজনে। উত্তরা চুপ করে বসে থাকে। সত্যি কথা বলতে ওর সব কিছু গুলিয়ে গেছে। সকালে যে কার মুখ দেখে উঠেছিল কে জানে? ছেলেটাকে দেখে যতটা কবিগোছের মনে হয়েছিল ততটাও নয়। বেশ বাস্তববোধ সম্পন্ন মনে হচ্ছে। কিন্তু এই ছেলেটাই যে পরাগ এটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না সে। ছেলেটাকে আরেকটু পরখ করে দেখা দরকার। আরেকটু বাজিয়ে দেখা দরকার। কাজেই চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয় তার। 

যেখানে ওরা বসেছিল সেখান থেকে কিছুটা দুরে একটা প্রেমিকজুটি খুনশুটিতে ব্যস্ত। আরেকদিকে কতগুলো ছেলেমেয়ে আড্ডা দিচ্ছে। উত্তরা সেদিকে তাকায়। উত্তরার দৃষ্টি অনুসরণ করে ওদের দিকে তাকিয়ে হাল্কা হাসে পরাগ। তারপর বলে, “মনে আছে? একবার তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে এই যে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে এত প্রেম, বন্ধুত্বর গল্পের অনুপ্রেরণা আমি কোথা থেকে পাই? এই যে সামনে ভীড়টা দেখছ এদের থেকে। ঐ যে দুরে দুজন প্রেম করছে ওদের পোশাক দেখে বোঝা যায় ওরা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে-মেয়ে। সদ্য কলেজে উঠেছে হয়তো। প্রথম প্রেমের স্বাদ পেয়েছে। বাস্তবে পাঁচ বছর পর যখন ছেলেটা চাকরির পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হবে, মেয়েটার সম্বন্ধ দেখতে একের পর এক পাত্র আসবে তখন এই প্রেমটা থাকবে না। কি তাইতো? সাধারণ যে কেউ তাই ভাববে। কিন্তু আমি মানুষটা এত নেগেটিভ নই। তাই এতটা ভাবতে পারি না। তাছাড়া আগামীকাল, পরের মুহূর্ত কে ই বা দেখেছে? আমার চোখে ধরা পড়ছে এখনকার মুহূর্তটা। সেটাকেই বন্দি করি শব্দে আর সেটা থেকেই পজেটিভ উপসংহার খুঁজি। যেমনটা করছে ঐ ছেলেমেয়ের দল। এদের কারো বাড়ি মফঃস্বলে, কারো হয়তো অনেক দুরে। এতদিন পর এতটা পথ পার করে এসেছে পরস্পরের সাথে দেখা করতে। কে জানে? হয়তো ভবিষ্যতে আর কোনোদিন দেখা নাও হতে পারে। তাই বিদায়বেলায় শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে পরস্পরকে। জড়িয়ে ধরছে শক্ত করে। মুঠোফোনে বন্দি করছে মুহূর্তটাকে। জীবনের কোনো ভরসা নেই। কখন কোন খাতে প্রবাহিত হবে কেউ জানে না। জীবনটা আমাদের হলেও এর পরিবর্তন আমাদের হাতেও নেই। যা আছে এই মুহূর্তটুকু। সেটাকেই বন্দি করে রেখে সারাজীবন বয়ে চলতে পারি আমরা।”

-“কিন্তু কিছু মুহূর্ত আছে যা প্রথমে মধুর মনে হলেও পরে কাঁটায় পরিণত হয়।” উত্তরা তাকায় পরাগের দিকে। সুযোগ বুঝে মোক্ষম কথাটা তোলে সে। এই কথার উত্তরেই প্রমাণিত হবে ছেলেটা সত্যিই পরাগ কিনা। কারণ পরাগ মুহূর্তগুলো ধরতে ভালোবাসলেও এই কন্টক মুহূর্তের কনসেপ্টটা পুরোপুরি মানে না।

উত্তরার কথায় হেসে‌ পরাগ বলে, “সেটা ঠিক। তবে এর জন্য দায়ী থাকি আমরাই। আমরা মানুষ চিনতে ভুল করি। মানুষের মনের পরিচয় না নিয়েই তার সাথে থাকতে শুরু করি। মুহূর্তগুলো বন্দি করতে শুরু করি। পরে যখন ভুল বুঝতে পারি ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে যায়। তখন এই মুহূর্ত গুলো বিষে পরিণত হয়। তবে একদিকে এটা ভালো জানো যে আমরা মানুষের মনের তল বুঝতে পারিনা। পৃথিবীতে সকলের যদি মন বোঝার ক্ষমতা থাকত তাহলে মানুষের চেয়ে হিংস্র, নোংরা, নির্লজ্জ আর নিম্নমানের জীব আর দুটো থাকতো না। বিশেষ করে মানুষের মানুষের প্রতি বিশ্বাস, নারী-পুরুষের মুখোশ খুলে যেত। নারীরা পুরুষকে বিশ্বাস করে আর ঠকতো না। প্রকৃত পুরুষের নারীর সন্ধান হতো না। প্রেমে ব্যর্থতা থাকতো না। মানুষ ঠকতো না। শঠ, জোচ্চরদের টেকা দায় হত। সেটা যাতে না হয় তাই ঈশ্বর মানুষকে এ ক্ষমতা দেন নি। থাকলে দেখতে পেতে কেউই সুখী নয়।”

-“এরকম মুখোশধারী মানুষের সাথে দেখা হয়েছে তোমার?” অস্ফুটে আরেকটা মোক্ষম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে উত্তরা। আগের উত্তরটা একেবারে বুলসআইতে মেরেছে ছেলেটা। পরাগও তাই ভাবে। তারমানে এই কি?

-“বহুবার! এতবার ঠকেছি যে বিশ্বাস করতেও ভয় লাগে। এই কারণেই নিজেকে লোকসমাজের থেকে লুকিয়ে নিয়েছি। যাতে কেউ আর ঠকাতে না পারে। ঠাকুমাকে বেশি ভালোবাসতাম একদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখলাম ঠকিয়ে চলে গেল। প্রিয় মানুষটাকে না জানিয়েই ভালোবেসে গেলাম। ঠকিয়ে চলে গেল অন্যজনের সাথে। এত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছি যে মানুষকে আর বিশ্বাস করতে পারি না। ভয় হয় আবার যদি ঠকে যাই। এই ভয় তাড়াতেই লেখা নিয়ে মেতেছিলাম কিন্তু বোধহয় আর হবে না।”

-“কেন?” বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস‌ করে উত্তরা। আর কোনো সন্দেহ নেই।‌ এই ছেলেটাই পরাগ! এবার সে রিলেট করতে পারছে কেন পরাগের গল্পে প্রেম থাকলেও এত যন্ত্রণার প্রচ্ছন্ন ছাপ থাকে। 
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরাগ বলে, “আমরা যারা স্রষ্টা তাদের মাঝে মাঝে একটা রোগ হয় জানো? সৃজনশীলতা হারাবার রোগ, ফুরিয়ে যাবার রোগ। ধরো একটা প্লট মাথায় এল সেটা নিয়ে বসলে তুমি খাতা পেন নিয়ে। কিন্তু কিছুতেই আর লেখা আসছে না। মানে লেখা আসলেও গল্পটা দাঁড়াচ্ছে না। নাহলে মাথা খালি হয়ে যাচ্ছে।”

-“জানি। ওটাকে রাইটার্স ব্লক বলে।” নিভে যাওয়া গলায় বলে উত্তরা।

-“ঠিক তাই! আমি এখন রাইটার্স ব্লকে আক্রান্ত। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমার লেখা ফুরিয়ে গেছে, লেখা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আই অ্যাম ফিনিশড। এই যে প্রত্যেকটা পর্বে রিডার্সরা জিজ্ঞেস করে ‘তারপর?’ , ‘নেক্সট’ সত্যি কথা বলতে জবাব দিতে পারি না আমি কারণ আমি নিজেই জানি না পরে কী হতে চলেছে। জানি একটু অড লাগছে শুনতে কিন্তু এটাই সত্যি! যে আমি রাতের পর রাত জেগে লিখেছি, ‘অভিসার’, ‘দোস্তি ডট কম’ এর মতো গল্প। সেই আমিই রাতের পর রাত জেগে থাকি লেখা ভাবার জন্য। কতগুলো রাত ঘুমোই নি জানো? মাঝে মাঝে মনে হয় পাগল হয়ে যাব। মনে হয় সব যখন ফুরিয়েছে তখন নিজেকে রেখে লাভ কী? কিন্তু পারি না কেন জানো? মায়ের জন্য। আমার মৃতদেহ দেখার পর মায়ের মুখটা ঠিক কেমন দেখতে লাগবে সেটা কল্পনা করেই পিছিয়ে আসি।”


উত্তরা চুপ করে দেখে পরাগকে। ঠিক একের পর এক অডিশনে বাতিল হয়ে, আপোষহীন শর্তে একাধিক মডেলিংয়ের প্রোজেক্ট হাতছাড়া হবার পর কর্মহীনতায় সেও যে একই রকম অবসাদে ভুগছে। তেমনভাবে দেখতে গেলে ও আর পরাগ ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। তফাৎ শুধু এক জায়গায় পরাগ আত্মহত্যা করতে গিয়েও ফিরে এসেছে। আর সে দুবার মরতে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে। আর এই ফিরে আসাটা পরাগের লেখার কারণেই! এই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, কর্মহীন হওয়ার যন্ত্রণা সে বোঝে। নাহ আর কোনো সন্দেহ নেই। ওর মনের সব সন্দেহ দুর হয়ে গেছে। এই ছেলেটাই পরাগ। ওর প্রিয় লেখক! যার লেখা পড়ে ও বাঁচার মানে খুঁজে পেয়েছে। প্রথম দেখাতে মনে হচ্ছিল তার সে বোধহয় মানুষ চিনতে ঠকে গেছে। পরাগ ওকে ঠকিয়েছে। কিন্তু এখন ওর এই হতাশায় ভরা কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে যেন ওরই কথা নিজের জবানিতে বলছে পরাগ।‌ বাইরে থেকে দেখলে দুজনকেই ভীষণ সুখী মনে হবে। একজন নামী মডেল, রোজ যার প্রোফাইলে উপচে পড়ে অনুরাগীদের ভীড়। বিবাহ প্রস্তাব আসে সব সময় ইনবক্স জুড়ে। ইন্ডাস্ট্রিতে ওর এই আপোষহীন শর্তের জন্য অনেকে গর্বিত, অনেকে খুশি কারণ মডেল মানেই যা খুশি পরে ছবি তুললাম যাতে সেটা ফ্যাশন হয়ে যায় এই মিথটা ভেঙেছে ও। আরেক দিকে পরাগ, বড়লোক বাড়ির আদুরে ছোটোছেলে। মায়ের প্রিয়। অঢেল টাকা, প্রতিশ্রুতিমান লেখক। পরিবারের এত সাপোর্ট, কি নেই ওদের কাছে? অথচ দুজনে ভেতর ভেতর কতটা একা। কতটা দুঃখী। ছেলেটাকে সে ঠকবাজ ভেবেছিল প্রথম দেখাতে । এখন মনে হচ্ছে এই ছেলেটা যেন তারই প্রতিবিম্ব। তারই দোসর। এমন ছেলেকেই তো তার চাই! যে তাকে বুঝবে, জানবে। বন্ধুর মতো পাশে থাকবে। নাহ সে ঠকে যায় নি। আর দেরী করা চলবে না। যা বলার জন্য এতদিন প্ল্যান করে এসেছিল ভাবতে ভাবতে সেই কথাটাই উত্তরা বলে ফেলে, “জীবন যদি আবার সুযোগ দেয় কাউকে বিশ্বাস করতে তাহলে‌ কী তুমি আরেকবার বিশ্বাস করবে? শেষবারের মতো?”

পরাগ উত্তরার দিকে তাকায়। উত্তরা বলে, “যদি এবার সত্যিই প্রকৃত প্রেম তোমার জীবনে আসে পারবে তাকে ধরে রাখতে?”

পরাগ হেসে বলে,“নাহ! অতো সাহস আমার নেই। আর আমি নিজেকে ঠকাতে চাইনা।”

-“এই শেষবারের মতো বিশ্বাস করেই দেখ না! কে জানে এইবার আর ঠকলে না।”

-“আর যদি ঠকে যাই?”

-“তাহলে জানবে পৃথিবীতে প্রেম মিথ্যে, ভালোবাসা মিথ্যে, যে ভালোবাসার গল্প লেখ তুমি সেটা একটা অলীক কল্পনা।”

-“এই যাত্রা ঠকবো না বলছ?”

-“বলছি তো ঠকবে না।”

-“কিন্তু...!”

-“আমরা দুজনেই বাইরে থেকে আলাদা হলেও ভেতর থেকে এক পরাগ। একা, নিঃস্ব। যেমন তুমি লেখার জন্য সারারাত জেগেছ। আমিও জেগে হাউহাউ করে কেঁদে খোঁজ করেছি একটা হাতের জন্য। নিজের আপোষহীন শর্তের জন্য কাজ হারিয়ে একটু একটু করে ভেঙে গিয়ে তলিয়ে গেছি অবসাদে। লোকে দেখেছে ম্যাগাজিনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার হাসিটাকে। কিন্তু কেউ আমার চোখের উদাসীনতাকে, কষ্টকে খেয়াল করে নি। বাইরে লোক তো দুর আমার নিজের বাবা-মাই আমার‌ মনের খোঁজ রাখে নি।‌ সত্যি কথা বলতে আমার কাঁদার জন্য কাঁধ চাই না পরাগ। শুধু একটা হাত চাই। ভরসার, ভালোবাসার।‌ আমি যখন ক্লান্ত হব তখন সে হাত আমাকে শক্তি জোগাবে। যখন ভেঙে পড়ব তখন ভরসা দেবে।‌‌ এই ভীড়ের মাঝে আমরা মিশে থাকলেও সম্পুর্ণ একা আমরা। তবে আমি বিশ্বাস করি দুজন একা মানুষ যখন একসাথে পথ চলতে শুরু করে তখন তারা একা থাকে না। এবার বলো আমার সেই ভরসার হাত হবে? একসাথে পাশাপাশি পথে হাটবে? কথা দিচ্ছি এবার ঠকবে না।”

-“এতদিন যারা এসেছিল তারাও একই কথা বলেছিল বাসবদত্তা। কিন্তু তারপর? সকলই গরল ভৈল। বাস্তবটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলেছে ওদের জন্য আমি পারফেক্ট নই।” বলে মাথা নত করে কান্না সামলে অভিমানের সুরে বলে‌ পরাগ।

পরাগের একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে উত্তরা বলে, “আমরা কেউই পারফেক্ট নই পরাগ। আমাদের সকলের মধ্যেই কিছু না কিছু ইমপারফেকশন আছে। তবে ভগবান সেটাকে পুষিয়ে দিয়েছেন আমাদের আরেক গুনকে সুন্দর করে সাঁজিয়ে। ঈশ্বর তোমাকে এই বিরাট দেহর সাথে দিয়েছেন একটা আবেগপ্রবণ, কল্পনাশ্রয়ী, সৃষ্টিশীল মন। তোমার রাগ, দুঃখ, কষ্ট তোমাকে প্রেরণা জোগায়, তোমাকে তাগিদ দেয় লেখার। তাই তুমি লেখ। তোমার সুন্দর মন বলে তোমার সৃষ্টিও সুন্দর হয়। এই যে ময়ুর যার জগৎজোড়া খ্যাতি পেখম মেলা নাচের জন্য, ঝলমলে রঙের জন্য কিন্তু বাস্তবে ময়ুরের পেখম বাদ দিলে কি থাকবে বলো তো? না গাইতে পারে, না ভালো উড়তে পারে। এই যে আমি, তোমার মতে আমি নাকি অসামান্যা সুন্দরী। তোমার প্রতিটা গল্পের নায়িকা চরিত্র নাকি আমাকে ভেবে লেখা। বাস্তবে যদি এতটাই সুন্দর হতাম তাহলে এত স্ট্রাগল করতে হত না। কাজেই তুমি সুন্দর নও এই চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে তুমি যেমন তাতেই খুশি থাকো। স্বার্থপর পৃথিবীতে নিজেকে নিয়ে খুশি থাকাটা ম্যাটার করে পরাগ। আর এটাই আমরা করি না। আর রইল বাকিদের কথা সত্যি কথা বলতে মানুষের দৈহিক সৌন্দর্য আমার কাছে তেমন ম্যাটার করে না। তবে তোমার কন্ঠস্বর শুনে তোমাকে সুপুরুষ ভেবেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে তোমাকে যখন দেখলাম মনে হল একটু হলেও তুমি আমাকে ঠকিয়েছ। আমি তোমার দৈহিক গঠনের জন্য রাগ করিনি পরাগ। রাগ করেছি এই প্রবঞ্চনার জন্য। আর এখন...!”

“আর এখন?” বলে পরাগ তাকায় উত্তরার দিকে। উত্তরা পরাগের চোখে চোখ রেখে বলে, “এখন দেখলাম ঠিক ঠকে যাইনি। তোমার এই বিশাল দেহের ভেতরে যে বিশাল মনটা আছে সেটা কাউকে ইচ্ছে করে ঠকায় নি। সে আড়ালে থাকতে চেয়েছে। কিন্তু যখনই তাকে দেখার জন্য আমরা উঠে পড়ে লেগেছি, ততবার ঠকে গেছি। এই জগতে একটু খুঁজলেই ভালো মানুষ পাওয়া যায় পরাগ। কিন্তু ভালো মনের বন্ধু পাওয়া অসম্ভব। তোমার মধ্যে আমি সেই ভালো মনের বন্ধুকে পেয়েছি কাজেই হারাতে চাইছি না। এবার বলো বন্ধু হবে তো?”

পরাগ অশ্রুসজল চোখে শক্ত করে ধরে রাখে উত্তরার হাতটাকে। অনুভব করে উত্তরার মনের উত্তাপটাকে। উত্তরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর নাক শিটকে বলে, “তবে খুশি থাকা মানে এই নয় যে এতটা ফ্যাট নিয়ে খুশি থাকবে। এতটা ফ্যাট থাকাটা মোটেই ভালো নয়। ভবিষ্যতে নানান কম্প্লিকেশন আসতে পারে। কাজেই কালকেই তুমি আমার সাথে জিমে যাবে। আর এই সব তেলাক্ত আনহাইজেনিক ফুড ছাড়বে।”

কথাটা সোনা মাত্র আঁতকে ওঠে পরাগ,“ইরিক! মানেটা কী?”

-“মানেটা খুবই সহজ! কাল থেকে তোমার জাঙ্কফুড খাওয়া বন্ধ!”

-“এহ! বললেই হল! আমি খাবোই! দেখি কে আটকায়!”

-“বটে! আমিও দেখব তুমি কি করে খাও।”


বলে দুজনে ঝগড়া করতে করতে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাটতে হাটতে এগিয়ে যায় সামনের দিকে।


*******

বাড়িতে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে অনলাইন হতেই টুং করে মেসেজ ঢোকে উত্তরার ফোনে। সে দেখে পরাগের মেসেজ, “বাড়ি পৌঁছে গেছ?”


উত্তরা চটজলদি টাইপ করে “হুম। একদম বাড়ির সামনে ক্যাবটা দাঁড়িয়েছিল।”


-“আজকের দিনটা সত্যিই দারুণ কাটলো বলো?”

-“সে আর বলতে! এক কাজ করবে? আজকে যে ছবিগুলো তুললাম সেগুলো একটু সেন্ড করবে?”
কিছুক্ষণ পর কয়েকটা ছবি এসে ঢোকে উত্তরার ফোনে। সেগুলো দেখে মেসেজ করে উত্তরা, “তাহলে কাল জিমে দেখা হচ্ছে?”

ওপাশ থেকে পরাগের মেসেজ আসে “রক্ষে করো মা!” সাথে একটা হাতজোড় করা ইমোজি। মেসেজটা দেখে ফিক করে হেসে উত্তরা টাইপ করে, “ওভাবে আমি ভুলছি না। কাল তোমাকে আমি জিমে ভর্তি করাবোই। দুমাসের মধ্যে ফিট না করিয়েছি তো আমার নামও উত্তরা সিংহরায় নয়।”

মেসেজটা পড়ে হাল্কা হাসে পরাগ। তারপর ফোনের নেট অফ করে চুপ করে গ্যালারী থেকে একটা ছবি বের করে বসে থাকে। উত্তরা সব ছবি পাঠাতে বললেও এই একটা ছবি সে পাঠায় নি। একান্ত গোপন করে রেখেছে। ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর একটা হাসি ফুটে ওঠে ওর মুখে। এসেছে! এসেছে! অবশেষে‌ এসেছে! ভাবতে ভাবতে ল্যাপটপটা খুলে বসে। এতদিনে একটা নতুন প্লট এসেছে মাথায়। ওয়ার্ড ফাইল খুলে ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করে সে। ক্রমশ‌ লেখায় বুঁদ হয়ে যায় পরাগ।

উত্তরা দেখে মেসেজটা সিন করে অফলাইন হয়ে গেছে পরাগ। বোঝে অবশেষে নির্ঘাত নতুন কোনো লেখার প্লট পেয়ে গেছে ছেলেটা। লিখুক গে! আর ওকে বিরক্ত করবে না সে। ভাবতে ভাবতে ফোনের সেটিংসে গিয়ে ফোনের রিংটোনটা বদলে একটা চিরনতুন রবীন্দ্র সংগীত রাখে উত্তরা।‌ শুধুমাত্র একজনের জন্য। রিংটোনটা বদলে নিয়ে ফোনে হেডফোন লাগিয়ে গানটা শুনতে থাকে সে। হেডফোনের মাধ্যমে তার মগজের প্রতিটা কোষে ছড়িয়ে পড়তে থাকে একটাই কথা, “আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না।”





 

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...