- সোজা হয়ে দাঁড়াও। মুখটা তোলো। একটু হাসো। হোল্ড! দ্যাটস ইট!
ক্যামেরার সাটার টেপার পর রজতাভ ক্যামেরা নামিয়ে মাথা নাড়তেই নড়েচড়ে বসল ঊর্মি। তারপর খাবার ব্যাগ থেকে বের করল দুটো শালপাতার প্লেট আর কাগজের প্যাকেটটা। কাগজের বাক্স খুলে দেখল ঠিক যা যা বলেছিল মলিদিদি ঠিক তাই তাই দিয়েছে। কেক, সেঁকা পাউরুটি আর একটা ডিমসেদ্ধ। কাগজের বাক্স থেকে খাবার বের করে শালপাতার প্লেটে সাজিয়ে সে ডাকল রজতাভকে। গতকাল রাতে দার্জিলিংয়ে বেড়াতে এসেছে ওরা। সেদিন রজতাভ আসার পর হাউহাউ করে ওকে জড়িয়ে কেঁদেছিল ঊর্মি। রাতে খাবার পালা সারার পর রজতাভ বলেছিল সবটা। রেডিওতে যতটা শোনা যাচ্ছে, খবরের কাগজে যতটা লেখা হচ্ছে অবস্থা তারচেয়েও গুরুতর। কার্গিলে প্রতি মুহূর্তে প্রাণহাতে করে কাটাতে হচ্ছে সবাইকে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রাতে আবার বাঙ্কারে ফিরতে পারবে কিনা তার ঠিক থাকছে না। এক এক করে সঙ্গী, বন্ধুরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে রোজ। তারমধ্যেও অটল হয়ে লড়ে যাচ্ছিল রজতাভ। গত সপ্তাহে তাদের ট্রুপকে একটা বাঙ্কার সিজ করতে পাঠানো হয়। ওরা ধৈর্যের সাথে দুদিন ধরে যুদ্ধ করে বাঙ্কার কবজা করে ফেলেছিল। সন্ধ্যের দিকে বাঙ্কার থেকে মৃতদেহ গুলো বের করার সময় আচমকা এক আহত পাক সৈনিক পাল্টা আক্রমণ করে বসে। রজতাভ সামনে থাকায় ওর বুকে গুলি লাগে। সঙ্গে সঙ্গে বাকিরা মিলে সেই সৈনিককে কবজা করে ফেলায় বেশী ক্ষতি হয়নি। রজতাভ চেয়ারে হেলান দিয়ে বলছিল,“বিশ্বাস করো বুলেটগুলো যখন বুকে ঢুকল মনে হল যেন একগাদা পেরেক বুকের ভেতর ঠুকে দেওয়া হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে মনে হল পৃথিবীটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। চারদিকের শব্দ, চিৎকার কিছুই কানে আসছিল না। একটা আচ্ছন্নভাব ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলছিল আমায়। মনে হচ্ছিল আর বোধহয় তোমাদের সাথে দেখা হবে না। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছিল দু’চোখের উপর। তারপর কমপ্লিট ব্ল্যাকআউট। যেন একটা ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলাম। ঘুম যখন ভাঙল দেখি হাসপাতালে শুয়ে আছি। পরে শুনেছিলাম আটটা গুলি বের করা হয়েছিল আমার বুক থেকে। সত্যি কথা বলতে আমি কি করে বেঁচে গেলাম আমিও জানি না। ডাক্তারদের কাছেও এটা মিরাকেলের মতো ছিল। আমি ফিরতে চাইছিলাম যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের স্যার আমাকে কদিন ছুটি কাটাতে বলে পাঠিয়ে দিলেন এখানে। এভাবে কি চলে বলো তো? আপনিই বলুন বাবা। ওদিকে আমার জুনিয়ার, কলিগরা প্রাণ হাতে লড়বে আর আমি ছুটি কাটাতে চলে আসবো? এত একপ্রকার যুদ্ধ থেকে পালানো!”
কথাগুলো শোনার পর ফুপিয়ে কেঁদেছিল ঊর্মি, “হোক পালানো! যতক্ষণ না সব নর্মাল হচ্ছে, তুমি সুস্থ হচ্ছো ততক্ষণ তোমার যাওয়া হবে না!” বলে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। রজতাভ কিছু বলার সুযোগই পায়নি। ঊর্মির বাবা বুঝেছিলেন মেয়ে জামাইয়ের উপর রাগ করেছে। রাগ করাটাই স্বাভাবিক। এতগুলো দিন কোনো খবর নেই, কোনো কথা নেই। হঠাৎ এরকম বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরে এসে আবার মৃত্যুপুরীতে ফেরার কথা বলছে বলেই ঊর্মি অভিমান করেছে ওর উপর। উনি হেসে জামাইকে বুঝিয়েছিলেন সবটা তারপর ঊর্মির অভিমান ভাঙাতেই দুজনকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন দার্জিলিংয়ে।
রজতাভ ক্যামেরার রিলটাকে পরের ছবির জন্য সেট করতে করতে বেঞ্চে বসতেই ওর হাতে প্লেট ধরিয়ে দিয়ে বলল,“ রাখো তো এখন ক্যামেরাটা! সেই তখন থেকে দেখছি। একটু পর পর ছবি তুলেই চলেছ। এত ছবি তোলা কীসের শুনি? আগে তো বেড়াতে গেলে এত ছবি তুলতে না।” রজতাভ ক্যামেরাটা কভারে ঢুকিয়ে প্লেট থেকে একটা পাউরুটি তুলে কামড় দিয়ে বলল,“ও তুমি বুঝবে না। পাহাড়ে এসে যদি ছবিই না তুললাম তাহলে ঘুরতে আসা কীসের জন্য?চারদিকে দেখো একবার। সকলেই ছবি তুলছে। হ্যা আগেও আমরা বেড়াতে এসে ছবি তুলিনি বটে। কিন্তু সেটা তো আর নিছক বেড়ানো ছিল না। ছিল হানিমুন। আর এটা হানিমুন নয়। বলতে পারো নর্মাল ট্রিপ। তাই ছবি তুলছি। তাছাড়া আগে বেড়াতে গেলে তো অর্ধেকদিন তো ঘরেই কাটাতাম। সেখানে কি ছবি তুলবো? নিজের বউয়ের সাথে...!”
কথাটা শেষ হবার আগেই রজতাভর হাতে মৃদু চাপড় মেরে চারদিকে একবার সন্তর্পণে তাকায় ঊর্মি। তারপর বলে,“উফ! তোমার মুখে কি কিছুই আটকায় না?”
- আজ্ঞে না ম্যাডাম! আমরা আর্মিম্যানরা এরকমই। লজ্জা,ঘৃণা,ভয় এই তিনটেই আমাদের থাকে না। আমরা যা করি সদর্পে করি। তাছাড়া নিজের বউয়ের সাথে আদিরসাত্মক তত্ত্ব নিয়ে কথা বলবো না তো কি পদাবলী নিয়ে কথা বলব?
- আমি সেটা বলছি না। কিন্তু সব কথার একটা নির্দিষ্ট জায়গা, নির্দিষ্ট সময় থাকে। লোকলজ্জা বলেও তো কিছু আছে।
- উফ! তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না। একইরকম দিদিমাদের আমলে থেকে গেলে তুমি। আরে এটা আগের যুগ নেই যে ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেম করবো। চেনা কাউকে দেখলে মুখ ঢাকবো। এটা ১৯৯৯!এবছরটা গেলেই নতুন শতাব্দীতে পা রাখবো আমরা। এখনও লোকলজ্জা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে? লোকের কী অতো সময় আছে যে কে কী করছে দেখে বেড়াবে? তাছাড়া আমরা যদি সারাদিন ধরে এটাই ভাবতে থাকি যে লোকে কী বলবে? তাহলে লোকে কী বলবে? তাছাড়া আমি তো আর পরের বউকে নিয়ে কিছু করছি না। করছি নিজের বউকে নিয়ে। আর বিদেশে তো এসব নর্মাল! মনে আছে সেবার মানালীতে দুজন বিদেশীকে দেখেছিলাম আমরা।
- তাও আমার মতে এসব জিনিস চার দেওয়ালের মধ্যেই হওয়া ভালো। বাইরে নয়। আমরা বিদেশী নই যে যেখানে সেখানে শুরু হয়ে যাব। তাহলে পশুর মধ্যে আর আমাদের মধ্যে তফাৎ কি রইল? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যতটা মনের তার চেয়ে বেশী আত্মার। শারীরিক প্রেম থাকবে তবে সেটা সাময়িক। বুঝলে মেজর মশাই?
- বুঝলাম! মানে আমি আর নিজের বউকে চুমু খেতে পারব না। জড়িয়ে ধরতে পারব না। জীবন থেকে সব অ্যাডভেঞ্চার বাদ নিয়ে নিরামিষ সাত্ত্বিক দাম্পত্য যাপন করব। তা এটা আসার আগেই বলতে পারতে। দার্জিলিং না এসে গয়া,কাশী,বৃন্দাবনের টিকিট কাটতাম। তীর্থযাত্রা হয়ে যেত।
- ধুর! আরে আমি ওসব করতে বারণ করেছি নাকি? করবে! অবশ্যই করবে! তবে সেটা হোটেলরুমের ভেতরে। সেটা আমাদের একান্ত আপন মুহূর্ত। যা আমাদেরই থাকবে। তবে পাবলিকের মাঝে নয়। কিছু জিনিসের আড়াল-আবডাল থাকলেই ভালো। সবকিছু খোলামেলায় হলে আর রহস্য কোথায় রইল?সংযমই দাম্পত্যের নিয়ম।
- তার মানে চাইলেও আর বাঁধনছাড়া হতে পারব না?
- কেন পারবে না? সংযম রাখতে বলেছি। ব্রহ্মচর্য নয়। তাছাড়া রাতে তো আমি তোমারই থাকছি! যত খুশি আদর করো বাধা দেব না। কিন্তু যতক্ষণ আমরা বাইরে আছি ততক্ষণ আমাদের এটুকু সংযম মেনে চলতে হবে। ঐ দেখো বাবুর মুখ হাড়ি হয়ে গেল। আরে বাবা আমি আমাদের ভালোর জন্যই বলছি তো নাকি?
রজতাভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তাহলে আজ থেকে আমি বর্বর প্রেমিক থেকে প্রাণনাথ স্বামী হয়ে গেলাম। বাইরে নো টাচিং নিয়ম মেনে চলতে হবে। কাকু-কাকিমাদের মতো বিহেভ করে ‘হ্যাগো’,‘ওগো করতে হবে।”
“আজ্ঞে হ্যা মশাই!একবছর আমাকে জ্বালানোর এটাই শাস্তি।" বলে হাসে ঊর্মি। রজতাভ মাথা নিচু করে বসে থাকে তারপর হেসে বলে, “হেসে নাও! হেসে নাও! যত পার হেসে নাও। একবার রুমে ফিরি তারপর আমি হাসব। একবছরের যত আদর আছে তোমার নিয়মেই উসুল করে নেব। বাইরে তোমার কথা শুনলেও ঘরে আমার কথা শুনতে হবে।”
- সে নাহয় দেখা যাবে। আপাতত খাবারটা খেয়ে নাও। তারপর আরো ঘুরতে হবে আমাদের।
বলে খেতে থাকে ঊর্মি। রজতাভ খাওয়া শুরু করার কিছুক্ষণ পরেই থেমে যায় তারপর বলে,“এক মিনিট! দাঁড়াও আরেকটা দারুন কনসেপ্ট পেয়েছি! ঊর্মি পাউরুটিটা ধরে থাকো।” বলে ক্যামেরাটা বের করে রজতাভ। ঊর্মি এবার বিরক্ত হয়।
- আবার?
- এটাই লাস্ট! তারপর পরের ডেস্টিনেশনে তুলবো দাঁড়াও। এই মুহূর্তগুলো ধরে রাখা ভীষণ দরকার। দাঁড়াও!পাউরুটিটা তোলো। আরেকটু হাসো,পারফেক্ট!”
বলে ছবিটা তুলে খেতে বসে রজতাভ। মনে মনে বলে,“এই মুহূর্তগুলো যে আজ ধরে রাখছি। এর মূল্য পরে টের পাবে তুমি। যখন আমি থাকবো না তখন এই ছবিগুলো তোমাকে আমার কথা মনে করিয়ে দেবে।”
খেতে খেতে রজতাভ অতীতে চলে যায়। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর সে সামনে পেয়েছিল ড.মিত্রকে। আর্মিদের কাছে তিনি সাক্ষাত ভগবানের মতো। ডাক্তারির জোরে না জানি কত সৈন্যকে তিনি বাঁচিয়েছেন। এ যাত্রায় তার জন্যই বেঁচেছে বুঝতে পেরেছিল। তারপরেই পেয়েছিল সেই ভয়ংকর সংবাদটা। সেদিন সেই পাক সৈনিক নয়টা গুলি করেছিল তাকে। আটটা গুলি বের করতে পারলেও একটা গুলি বের করা সম্ভব হয় নি। ড.মিত্র বলেছিলেন,“দেখুন মেজর। বুলেটটা যে জায়গায় আটকে আছে সেখান থেকে বের করতে হলে একটা রিস্কি অপারেশন করতে হতো আমাদের। আর সেটা করতে গেলে হয়তো আপনার লাইফ রিস্ক হতে পারতো।"
- যেদিন ভারতমায়ের জন্য আর্মি জয়েন করেছিলাম সেদিন থেকেই লাইফ রিস্ককে সঙ্গী করেছি আমরা ডক্টর।
- হ্যা। কিন্তু তাই বলে জেনে শুনে একজন পেশেন্টকে আমি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না।
-আমি অতো জানতে চাইনা ডক্টর! জাস্ট জানতে চাই আমি আবার ব্যাটলফিল্ডে যেতে পারব কিনা?
কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রজতাভর দিকে তাকিয়ে থাকেন ডাক্তার মিত্র। তারপর ধীর অথচ দৃঢ়কন্ঠে বলেন, "বুলেটটা যেখানে আটকে আছে সেখানে চাপ পড়লে ভয়ঙ্করতম কষ্ট পেয়ে মরতে হতে পারে আপনাকে। আর আপনার যা কাজ তাতে ওখানে চাপ পড়বেই।"
- তো বুলেটটা বের করে দিন!
- সেখানেই তো যত সমস্যা!
- বুঝলাম না।
- বুলেটটা বের করতে হলে আমাদের একটা অপারেশন করতেই হবে। কিন্তু সেখানেও একটা রিস্ক থাকছে। বুলেটটা বের করা মাত্র ভীষণরকমের ব্লাডলস হতে পারে। মেবি অপারেশন টেবিলে আপনার মৃত্যু হতে পারে। সেই ভয়ে আমরা রিস্ক নিই নি।
- আমি বলছি তো! কোনো ভয় নেই। আপনি কোনোরকম হেজিটেশন না করে বুলেটটা বের করুন। আমার আপনার প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। একবার যখন বেঁচে ফিরেছি। আবার বেঁচে ফিরব। আপনি প্লিজ অপারেশনটা করুন। আমি ব্যাটলফিল্ডে ফিরতে চাই। আমার কলিগরা, আমার দেশ আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
কিন্তু রজতাভর অনুরোধ রাখতে পারেন নি ডাক্তার মিত্র। হাজার অনুরোধ,ঝগড়ার পড়েও মানুষটা কোনোরকম রিস্ক নিতে চাননি। রজতাভকে বাধ্য হয়ে ভলিন্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। এসব কথা রজতাভ জানায়নি বাড়িতে। নিজের ক্ষতর কথা কাকে জানাবে ও। যে পরিমাণ কষ্ট নিয়ে আর্মি থেকে ফিরেছে সেই কষ্টের কথা কে বুঝবে?কিছু কিছু জিনিস আছে যা কাউকে বলা যায় না। কিছু কিছু ক্ষত আছে যা কাউকে দেখানো যায় না। নিজের বুকের মধ্যে চেপে রেখে দিতে হয় সেই সব রক্তাক্ত ক্ষতকে। যাতে কেউ সেটার নাগাল না পায়।
(চলবে...)


