অনুসরণকারী

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২০

বলি সপ্তম পর্ব


২২শে জুলাই, সোমবার, ২০১৯, সকাল সাড়ে এগারোটা, মাল্লারপুর, বীরভূম

বীরভূমের এই জায়গাটা বেশ ঘিঞ্চি।বেশ একটা ছোটোখাটো শহরের মতো। আমরা রামপুরহাটে গতকাল এসেছি।ব্যোমকেশ রামপুরহাট যাচ্ছে শুনে শাম্বই আমায় ম্যানেজে ছাড়লো। তবে এমনি এমনি ছাড়েনি। বেশ কয়েকটা লেখার সেকেন্ড ড্রাফ্ট ল্যাপটপে ডকুমেন্ট ফরম্যাটে আনতে হয়েছে। ব্যোমকেশ এসেই আমাকে হোটেলে রেখে একঘন্টার মধ্যে টইটই করে ঘুরে ফিরে এসে বললো, “কাল বিকেলে ফিরবো। তার আগে সকালে একজায়গায় যেতে হবে। তৈরী থেকো বেশ দুরে যেতে হবে। ভোরবেলা বাসে যাবো।” বলে নিজের ব্যাগ খুলে তোয়ালে আর জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমে চলে গেল।আমার স্নান কমপ্লিট ছিলো। ল্যাপটপে ড্রাফ্ট কারেকশনে মন দিলাম।
বিকেলবেলা অটো ধরে তারাপীঠ ঘুরে এলাম। মনটা পুরোনো দিনের স্মৃতিতে ভরে গেল। এই তারাপীঠেই তো ঘটেছিল তারাপদ আর ব্যোমকেশের সেই যুদ্ধ। ব্যোমকেশ দেখলাম এবার মহাশ্মশানের সামনে একটু থমকে দাঁড়ালেও ভেতরে ঢুকলো না। হয়তো ওরও পুরোনো কথা মনে পড়েছিল কিন্তু এসময় পুরোনো স্মৃতিচারনের সময় নয়। আমরা যখন নাটমন্দিরে বসলাম ততক্ষনে সন্ধ্যারতী শুরু হয়ে গেছে। ব্যোমকেশ গোটা সন্ধ্যারতীতে মায়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। যেন আসন্ন মহাযুদ্ধের জন্য অনুমতি চাইছে মায়ের কাছে।

সন্ধ্যারতীর পর মাকে প্রণাম করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। রাতে আর তেমন কিছু ঘটলো না। পরদিন ভোরে আমরা বাসে উঠলামগন্তব্যের উদ্দেশ্যে। বাস থেকে যখন আমরা নামলাম বেশ বেলা হয়ে গেছে। জায়গাটার নাম বেশ অদ্ভুত। মাল্লারপুর। বেশ ঘিঞ্চি এলাকাটা। ব্যোমকেশ এগিয়ে একটা টোটোচালককে বললো পঞ্চায়েত অফিস যাবে।

বাজার অঞ্চল ছাড়িয়ে গ্রামের সরু পিচের পথে চললো আমাদের টোটো।পঞ্চায়েত অফিসের সামনে আমাকে দাঁড়াতে বলে ভেতরে ঢুকলো ব্যোমকেশ। প্রায় মিনিট পনেরো পরে বেড়িয়ে বললো, “চলো এবার অসীত সমাদ্দারের বাড়ি যাওয়া যাক।”

অবাক হয়ে বললাম “সে আবার কে? ”

ব্যোমকেশ হেসে রহস্যমেশানো গলায় বললো, “এই কেসের মিসিং লিঙ্ক। দেখা যাক উনি কিছু বলেন কিনা।”

বলেই পঞ্চায়েত অফিসের পাশে একটা পানের দোকানে বাড়ির ঠিকানা জেনে নিয়ে এগিয়ে চললো। ওর পেছন পেছন আমিও চলতে লাগলাম। বেশীদুর যেতে হলো না মিনিটদশেক হাটার পর একটা পুরোনো মাটির দোতলা বাড়ির সামনে দাঁড়ালাম। রাস্তার ধারে পুকুরপাড়ে একটা বউ কাপড় কাঁচছিলো। তাকে জিজ্ঞেস করতেই আঙুল দিয়ে ইশারায় দেখিয়ে দিলো।

গ্রাম থেকে একটু ভেতরে এই বাড়িটা। একটু জরাজীর্ণ দেখতে হলেও এখনো বেশ মজবুত।দেওয়ালে ঘুঁটে আর মেঝেতে আলপনা ওর গোবর লেপার চিহ্ন দেখে বোঝা যায় বাড়িতে লোক থাকে। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। 

আশেপাশে অনেক নাম না জানা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। দরজায় কড়া লাগানো। ব্যোমকেশ দরজার কড়া নাড়তে গিয়ে থমকে গেল তারপর আমাকে ফিসফিস করে বললো, “শুনতে পাচ্ছো? ”
কিছুক্ষন ধরেই পাখির ডাকের মাঝে একটা ক্ষীণধাতব শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। যেন কোনো ভারী ধাতব কিছু পাথরের উপর ঘষা হচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম বোধহয় কোনো পাখির ডাক হবে। ব্যোমকেশের কথা শুনে বুঝলাম আমি একাই নই ওর কানেও গেছে শব্দটা। আমি মাথা নাড়তেইও বললো, “দরজায় কান পেতে দেখ। শব্দটা ভেতর থেকে আসছে না? ” আমি কান পেতে দেখলাম ঠিক তাই। ভেতর থেকে একটা ক্ষীণ অথচ অবিরাম শব্দ ভেসে আসছে। আমি মাথা নাড়লাম।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে দাঁড়ালো। তারপর কড়া নাড়লো।কড়ার নাড়ার সাথে সাথে শব্দটা থেমে গেল।কিছুক্ষন পর দরজা খুলে বেড়িয়ে এলেন এক প্রৌঢ়। গায়ের রং ময়লা। পরনে নিম্নাঙ্গে একটা লুঙ্গি মালকোচা করে পরা । উর্ধাঙ্গে পোশাক নেই। গড়ণ দেখে মনে হয় এককালে বেশ খেলাধুলো অথবা শরীরচর্চা করতেন ভদ্রলোক। বয়সের কারনে পাক ধরেছে জুলপিতে আর দাঁড়িতে। তবে ভদ্রলোকের চেহারার মুল আকর্ষণ হলো তার গোঁফ। বেশ একটা মোটা পাঁকানো জাঁদরেল মিলিটারি গোঁফ ভদ্রলোকের।
ভদ্রলোককে দেখে মনে হয় কোনো পরিশ্রমের কাজ করছিলেন কারণ এই সকালবেলাতেও বেশ ঘেমে গেছেন তিনি। ঠোটের এককোণে একটা জ্বলন্ত বিড়ির ধোঁয়া টানতে টানতে বাজখাই গলায় বললেন, “কি চাই? চাঁদা ফাঁদার মতলবে এলে কেটে পড়ো। এখানে কোনো লাভ হবে না।”
ব্যোমকেশ এগিয়ে বললো, “অসীতবাবু বাড়িতে আছেন? ”

ভদ্রলোক ব্যোমকেশকে আপাদমস্তক দেখে বললেন, “কে ইন্সিওরেন্স কম্পানি না রিপোর্টার? ”
ব্যোমকেশ হেসে বললো, “কোনোটাই নয় আমি থানা থেকে আসছি।”

লোকটা কিছুক্ষন আমাদের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলো তারপর হোহো করে হেসে ফেলল। আমরা অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। একি পাগলটাগল নাকিরে বাবা? এভাবে হাসছে? হাসতে হাসতে লোকটা বলল, “ঢপ মারার আর জায়গা পাওনি? পুলিশের লোক? মসকরার একটা লিমিট আছে। যাও যাও! কেটে পড়ো দুজনে। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে।কাজের সময় যত্তসব! ”

ব্যোমকেশ হাসি হাসি মুখে বললো, “বেশ চলে যাচ্ছি।তবে যাবার আগে একটা কথা ছিল। খাঁড়াটার ধারটা কিসের উপর পরীক্ষা করবেন জানতে পারলে ভালো হতো।”

মুহুর্তের মধ্যে লোকটার হাসি মিলিয়ে গেল। ব্যোমকেশের দিকে রক্তচোখ মেলে তাকালো লোকটা। বাপরে কি ভয়ংকর সেই দৃষ্টি ! যেন চোখের দৃষ্টি দিয়ে ভষ্ম করে দেবে ব্যোমকেশ কে। ব্যোমকেশ হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে রইলো। লোকটা দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “অহেতুক কৌতুহল যে আমি পছন্দ করি না। সেটা এই এলাকায় সকলে জানে। এবং অহেতুক কৌতুহলের ফল সব সময় যে ভালো হয় না আশা করি তোমরাও জানো। কাজেই বলছি যেখান থেকে এসেছো ফিরে যাও না হলে ফল ভালো হবে না।” বলে ব্যোমকেশের মুখের উপর দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো লোকটা।

ব্যোমকেশকিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে বিড়বিড় করে বললো, “বেশ তো চলেই যাবো আমরা। কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর পেলেই চলে যাবো। যতক্ষন সেটা না পাচ্ছি আমি হাল ছাড়বো না।” বলে সদর দরজা ছেড়ে রাস্তায় নেমে উল্টো দিকে হাটতে লাগলো ব্যোমকেশ। মাথা নিচু করে কিছুদুর হেটে আরেকটা পোড়ো বাড়ির সামনে দাঁড়ালো ব্যোমকেশ।

এই বাড়িটাও আগের বাড়িটার মতোই পুরোনো। তবে এটার অবস্থা ভীষণ সঙ্গীন। যেন কোনো মৃতদেহ হাড়গোড় বের করে পড়ে আছে।দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটায় বহুকাল কেউ থাকেনা। ব্যোমকেশ এগিয়ে গেল বাড়িটার দিকে। পিছন পিছন আমিও গেলাম। বাড়িটার সামনে গিয়ে দেখলাম যা ভেবেছিলাম তাই, বাড়িটা পরিত্যক্ত। বৃষ্টিতে ভিজে মাটির দেওয়াল প্রায় গলে গেছে। খড়ের চাল ভেঙে গেছে।

পুরোনো কাঠের দরজায় লাগানো তালায় মরচে ধরেছে। ব্যোমকেশ দেখলাম দাওয়ায় উঠে দরজায় লাগানো তালাটাকে অনেকক্ষন নেড়ে চেড়ে দেখে উঠোনে নেমে এলো ।তারপর নিচে বসে কিছুক্ষন মাটিতে কি একটা খুঁজে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা হাটতে লাগলো। তবে থেমে থেমে। যেন পা গুনছে। ব্যোমকেশের পেছন পেছন আমিও হাটতে লাগলাম। ব্যোমকেশ হাটতে হাটতে একটা উচু ঢিপির সামনে দাঁড়ালো। ঢিপিটা বেশী উচু নয় ঐ ফুট চারেক হবে। ব্যোমকেশ সেটায় উঠে সোজা তাকালো সামনের দিকে। তারপর চারদিকে তাকিয়ে এক জায়গায় থমকে তাকালো।

এরপর ঢিপি থেকে নেমে পা গুনে চলতে শুরু করলো সেই দিকে। এদিকটায় গাছপালা আর আগাছা ক্রমশ ঘন হতে শুরু করেছে সেটা সামনে গিয়ে একটা জঙ্গলে মিশেছে। ধীরে ধীরে সেই জঙ্গলে প্রবেশ করলাম আমরা। ক্রমশ জঙ্গল ঘন হতে লাগলো ডালপালা গুলো হাত দিয়ে সরিয়ে এগোতে লাগলাম। জঙ্গলটা বেশ নিস্তব্ধ। পাখির ডাকনেই এমন কি ঝিঁঝিঁর ডাকও নেই ।শুধু শুকনো পাতার উপর দিয়ে আমাদের সাবধানের পা ফেলার মর্মর শব্দটাই কানে আসছে। যেন এই জঙ্গলে চিরশান্তি বিরাজ করছে। কিছু দুর গিয়ে জঙ্গল ক্রমশ পাতলা হতে লাগলো।আমরা একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়লাম। বুঝতে পারছিলাম যে জঙ্গলের মাঝে আমরা দাঁড়িয়ে। চারদিকে ঘনজঙ্গল হলেও জঙ্গলের মাঝখানে জায়গাটা বেশ ফাঁকা। নিচে নরম ঘাসের চাদর ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। এত ঘন জঙ্গলের মাঝে এই ফাঁকা জায়গা কি করে এলো সেটার উত্তরও আমার সামনে দাঁড়িয়ে।

মন্দিরটা বেশ পুরোনো। তবে এর কারুকাজ গুলো অপরুপ। এরকম শিল্প দেখা যায় খাজুরাহে, কোনার্কে। নর্তকীগুলোর ফিনিশিং এতটাই নিখুঁত যেন জীবন্ত। যেন স্পর্শ করা মাত্রই চোখ মেলে তাকাবে। ব্যোমকেশ এগিয়ে গেল মন্দিরটার দিকে। চারপাশ দেখে মনে হয় না এখানেও কেউ আসে। মন্দিরটার জন্য আফসোস হলো। সৌন্দর্যে ভারতের তাবড় তাবড় মন্দিরকে টেক্কা দিতে পারে এ মন্দির। অথচ তা না হয়ে এইভাবে প্রকৃতির আড়ালে হেলায় পড়ে আছে।

ব্যোমকেশ এগিয়ে মন্দিরের সামনে দাঁড়ালো। এবার আমিও অবাক হলাম। মন্দিরের সামনে একটা হাঁড়িকাঠ।পুরোনো হলেও বেশ টেকসই।পুরু করে সিঁদুর মাখানো। হাঁড়িকাঠের সামনে ধূপকাঠি জবাফুল দেওয়া। তারমানে এই জঙ্গলেও মানুষের আনাগোনা আছে? ব্যোমকেশ কিছুক্ষন মাটিতে বসে হাঁড়িকাঠটাকে দেখলো। তারপর উঠে মন্দিরের সামনে জুতো খুলে মন্দিরে ঢুকলো।

মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজাতেও তালা দেওয়া। তবে এই তালাটা নতুন। ব্যোমকেশ তালাটা পরীক্ষা করে দরজাটা ফাঁক করে ভেতরে দেখার চেষ্টা করলো। কিছুক্ষন পর পিছন ফিরে এসে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো দরজার চারদিকটা। তারপর নেমে এসে জুতো পড়ে মন্দিরের পেছনে যেতে লাগলো। মন্দিরের পিছনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো সে। দেখলাম উত্তেজনায় মুখ চোখ লাল হয়ে গেছে তার।মন্দিরের পেছনে সেএকদৃষ্টে তাকিয়ে। আমি একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম। ব্যোমকেশের পাশে গিয়ে ওর দৃষ্টি অনুসরন করে যেটা দেখলাম সেটা দেখে একমুহুর্তের জন্য আমার বুক কেঁপে উঠলো।

কালীমুর্তি অনেক দেখেছিআমি তবে এরকম নৃশংষ ভয়ংকর অদ্ভুতদর্শন কালীমুর্তি জীবনে দেখিনি। প্রায় আটফুট লম্বা মুর্তি। আটহাতের মধ্যে দুটো হাতে হাতি তুলেছেন দেবী। বাকি ছয়হাতে নানাবিধ অস্ত্র। কোমরে একটা প্রকান্ড সাপ কুন্ডলী মেরে লজ্জা নিবারন করছে। দেবী ভীষণ ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে।যেন ভীষণ রুষ্ট হয়েছেন।দেবীর জিভটা ঠিক কালিঘাটের কালির মতো বিশাল আকারের।জিভের পাশদিয়েযেটুকু দাঁত দেখা যাচ্ছে পুরোটাই তীক্ষ্ণ ক্যানাইন ধর্মী। গজদাঁতের মতো কষ দিয়ে দুটো প্রকান্ড স্বদন্ত বেড়িয়েছে।মনে হচ্ছে যেন দেবী হাসছেন তবে সেই হাসিতে নির্মলতা নেই বরং আছে একটা ক্রুর ইঙ্গিত । এই ক্রোধপুর্ণ হাসির নিদর্শন সহজে দেখা যায় না। শিল্পী দুটোই মিশিয়ে দিয়েছেন মুর্তিতে। ধন্য শিল্পীর কারুকার্য! ধন্য তার কাজ।

ব্যোমকেশ কিছুক্ষন তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইলো মুর্তিটার দিকেতারপর বিড়বিড় করে বললো, “তারমানে আমি ঠিক পথেই এগোচ্ছি। হুম পুরোটা মিলে গেছে। এদিকেই জানতাম। তবে এতোটা…! ” বলে স্থির হয়ে গেল ব্যোমকেশ। বাতাসে কান পেতে কি একটা শোনার চেষ্টা করলো। তারপর হন হন করে হাটা দিলো জঙ্গলের উল্টো পথের দিকে। আমি কিছু না বুঝতে পেরে ওর পিছনে হাটতে লাগলাম।

জঙ্গল থেকে যখন আমরা বেরোলাম দুপুর হয়ে গেছে।ব্যোমকেশ সোজা হেটে সদর রাস্তায় এসে একটা টোটো ধরলো তারপর বাসস্টপে নেমে বললো, “আপাতত এখানকার কাজ শেষ। এখন এখানে না থাকাই আমাদের পক্ষে মঙ্গল। পেছনে ফেউ লেগেছে। বাঁচতে হলে আজ রাতের মধ্যে আমাদের রামপুরহাট ছাড়তে হবে।তবে চিন্তা নেই আবার আমাদের ফিরতে হবে এখানে। ” বলে মৃদু হাসলো ব্যোমকেশ। এই প্রথম ওর মুখে আতঙ্ক, ক্রোধ আর দৃঢ় সংকল্প মেশা একটা অভিব্যক্তি দেখলাম।

ব্যোমকেশ আরো কিছু বলতো তার আগে রামপুরহাটগামীএকটা বাস এসে গেল। সেই বাসে উঠলো ব্যোমকেশ। আমার কাছে গোটা ব্যাপারটা তখনো ধোঁয়াশার মতো। কি ছিল ঐ মন্দিরটাতে যে পেছনে ফেউ লাগবে? কে লাগাবে ফেউ? কেন? আমাকে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যোমকেশ বাস থেকেই তাড়া দিলো। সম্বিত ফিরে দেখলাম বাস ততক্ষনে চলতে শুরু করেছে। আমি কোনোরকমে দৌড়ে বাসে উঠলাম।

 ‌‌‌‌                          ******

রামপুরহাটে পৌছে আমরা থানায় গেলাম।থানার ওসি সুরেন বক্সির সাথে আগেরবারই আলাপ হয়েছিল। ভদ্রলোক বেশ খাতির করলেন ব্যোমকেশ কে। চা সিঙারা সহযোগে কথা হলো আমাদের। ব্যোমকেশ আজকের মন্দিরের ঘটনাটা বাদ দিয়ে যতটা সম্ভব রেখে ঢেকে সবটা বললো। ওসি সব শুনে যতটা পারেন সাহায্য করবেন আশ্বাস দিলেন।

থানা থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে জিজ্ঞেস করলাম, “এবার কোথায়? ” ব্যোমকেশ হাটতে হাটতে একটা গাঁজার সিগারেট ধরিয়ে বললো, “এবার হোটেলে গিয়ে স্নান করে ব্যাগপত্র নিয়ে সোজা বাড়ি। তার আগে… একমিনিট এদিকে এসো তো ।” বলে সোজা এগিয়ে গেল। আমি ওর পেছন পেছন হাটতে লাগলাম। কিছু দুর গিয়ে একটা চোরাগলিতে ঢুকে আমার হাত ধরে সেখানে টেনে নিয়ে ইশারায় চুপ করতে বলে যে দিক দিয়ে আসছিলাম সেদিকে তাকাতে বললো।

আচমকা ঘটনার আকস্মিকতায় আমি বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। ব্যোমকেশের কথামতো তাকাতেই আমি শিঁউরে উঠলাম। একটা লোক, রোগামতো সিড়িঙ্গে চেহারা। পরনে একটা কালো আলখাল্লা। হাতে একটা একমানুষ সমান লম্বা লাঠি। আমাদের পেছন পেছন আসছিল হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। রাস্তার দুটো ল্যাম্পপোষ্টের আলোর মাঝে দাঁড়িয়ে লোকটা। সামনের ল্যাম্পপোষ্টের আলোটা ক্ষীণ বলে চেহারাটা অস্পষ্ট দেখতে পারছি।অথচ পেছনের ল্যাম্পপোষ্টের জোড়ালো আলো লোকটার পেছনে পড়লেও লোকটার কোনো ছায়া মাটিতে পড়ছে না। লোকটার পায়ের দিকে তাকিয়ে আরো অবাক হলাম। লোকটা যেন মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই। যেন হাওয়ায় ভাসছে।

ব্যোমকেশকে সেটা দেখাতেই ও মাথা নেড়ে জানালো যে সেও এটা লক্ষ্য করেছে। তারপর আমাকে পিছিয়ে আসতে বলে একটা অদ্ভুত কান্ড করলো ব্যোমকেশ। একটু এগিয়ে কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে কি ভাবলো তারপর একটা লম্বা টান দিলো সিগারেটে।গাঁজার সিগারেট অর্ধেক হয়ে গেল ঐ একটানে। তারপর একবুক ধোঁয়া ছেড়ে আরেকবার টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লো। পরপর দুটো লম্বা টানে সিগারেটটা শেষ হয়ে গেল। কিন্তু একি? একি দেখছি আমি?

ধোঁয়া গুলো ক্রমশ মানুষের আদল নিচ্ছে। দুটো মানুষের আদল। ক্রমশ আদলগুলো চেনা লাগছে আমার, ভীষণ চেনা। আরে! এতো আমরা! মানে হুবহু আমি আর ব্যোমকেশ।যেন আমাদের যমজ এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের সামনে। ব্যোমকেশ ওদের সামনে দিয়ে যেতে বলে উল্টোপথ ধরলো। চাপাগলায় বললো, “আর দেরী নয়।চলো আমার সাথে।এদিক দিয়ে একটা শর্টকাট আছে। তাড়াতাড়ি হোটেলে পৌছে যাবো ।”

আমি তখনো গোটা ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম না। ব্যোমকেশের পেছন পেছন যেতে যেতে বললাম, “ওটা কি করলে? ” ব্যোমকেশ হাটতে হাটতে বললো, “ছায়াহীন মানুষের জন্য ধোঁয়ার মানুষ তৈরী করলাম। এর বেশী বলবো না কারন বললে বুঝবে না। এটুকু জেনে রাখো আমরা যে এই রামপুরহাটে এসেছি সেটা আমাদের সেই অজানা খুনি জানতে পেরেছে। আর আমরা যে তার সাধনক্ষেত্র তথা খুনের জায়গায় গিয়েছিলাম সেটাও জানতে পেরেছে। এবার প্রমাণ লোপাটের জন্য সে যা খুশি করতে পারে। তাই প্রাণ বাঁচাতে হলে আমাদের পালাতে হবে।”

ব্যাপারটা বুঝতে আমার বেশীক্ষন লাগলো না। আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অস্ফুটে বললাম, “তার মানে ঐ মন্দিরটা…” ব্যোমকেশ মাথা নাড়লো।

“কি সর্বনাশ! আমাদের উচিত ছিলো থানায় সবটা জানানো।”আমি চিৎকার করে বললাম
ম্লান হেসে ব্যোমকেশ বললো, “প্রমাণছাড়া এ যে অসম্ভব।তাছাড়া আমি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নই। হাতেনাতে প্রমাণ না পেলে নিশ্চিত হওয়া যায় না ভায়া। আর বেশী জানাজানি হলে খুনি সতর্ক হয়ে যাবে। হয়তো খুনের জায়গা পাল্টে নেবে। তাই এখন কিছু না করে অপেক্ষা করাটাই শ্রেয়। তবে হ্যা ওখানে গিয়ে খবরদার এখানকার কথা কাউকে বলবেনা।তোমাকে বিশ্বাস নেই। কখন কাকে বলে দেবে। একদম মুখে কুলুপ এঁটে থাকবে বুঝেছ? ” আমি মাথা নাড়তেই ব্যোমকেশ বললো, “অবশ্য বললেও ক্ষতি নেই।বরং আটঘাট বাঁধতে সুবিধেই হবে।তবে অধিকন্তু ন দোষায়। তাছাড়া…এখনও অমাবস্যা আসতে অনেকদিন বাকি।” বলে হাটতে লাগলো ব্যোমকেশ।

                            ******
২৯শে জুলাই ২০১৯, সোমবার, সকাল দশটা কলকাতা

আজ সাতদিন হয়ে গেল আমরা রামপুরহাট থেকে ফিরেছি। ব্যোমকেশ ফিরে এসেই ভীষণ রকমভাবে চুপ মেরে গেছে। যেন এই কেসটা নিয়ে ওর কোনো চিন্তাই নেই। চুপচাপ নিজের ঘরে বসে সিগারেট টানছে। আর অলসভাবে আগের কেসের জেরক্সফাইল গুলো পড়ছে। সেদিন হোটেল থেকে আমরা স্টেশনে পৌছবার পর কি একটা মনে হওয়ায় আমাকে স্টেশনে দাঁড়াতে বলে কোথায় বেরিয়ে গেল। যাবার সময় বললো ট্রেন আসার আগেই ফিরবে। যদি তার আগে ট্রেন চলে আসে তাহলেযাতে আমি ট্রেনে উঠে পড়ি। ও পরের ট্রেনে চলে আসবে।

সেদিন ট্রেন আধাঘন্টা লেট ছিলো বলে স্টেশনের বেঞ্চে বসেছিলাম। দশমিনিট, পনেরো মিনিট, পঁচিশমিনিট কেটে গেল অথচ ব্যোমকেশের কোনো পাত্তা নেই। ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠলাম আমি।কি এমন কাজ ব্যোমকেশের? এতক্ষন কেন লাগছে? কোথায় ও? ভাবতে ভাবতে দেখলাম ট্রেন এসে গেছে।

ট্রেনের বাঙ্কে ব্যাগপত্র রেখে সিটে বসলাম। ট্রেনটা যখন ছাড়বে ঠিক সেই মুহুর্তে ব্যোমকেশ কে দেখলাম স্টেশনে ঢুকতে। ওকে জানলা দিয়ে হাত বের করে চিৎকার করে ডাকলাম। ব্যোমকেশ আমায় দেখতে পেয়ে দৌড়ে এল। কম্পার্টমেন্টে উঠে আমার পাশে বসে হাপাতে লাগলো। জলের বোতল এগিয়ে দিতেই খানিকটা জল খেয়ে ধাতস্থ হয়ে বললো, “আসল কাজটাই ভুলে গিয়েছিলাম। ওটাই করে এলাম। এবার শুধু অপেক্ষা।”

সেই অপেক্ষা এখনো চলছে। রণি দু-একবার খোঁচালে একটাই কথা বলছে, “টোপ দিয়ে এসেছি এবার বাঘের ফাঁদে পড়ার অপেক্ষা।” রণি আমাকেও কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে। কিন্তু ব্যোমকেশের কথা মেনে আমি ওকে কিছুই বলিনি।
আজকে অফিস আছে তাই তাড়াতাড়ি স্নান করে রেডি হয়ে নিলাম। পুজো আসছে। সামনের মাস থেকেই পুজোবার্ষিকীগুলো পাবলিসড হবে তাই এখন কাজের চাপটা বেড়ে গেছে। রেডি হয়ে খেতে বসেছি এমন সময় কলিংবেল বেঁজে উঠলো। বাবা গিয়ে দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে চাই?”

একটা চেনা পুরুষ কন্ঠ কানে এলো আমার, “এটা কি ব্যোমকেশ মিত্রর বাড়ি? ব্যোমকেশবাবু কি বাড়িতে আছেন?” ব্যোমকেশ দেখলাম গলাটা শুনেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর সামনে এগিয়ে এসে হাত জোড় করে বলল, “আরে আসুন আসুন অসীতবাবু।কি সৌভাগ্য। নীল দেখো কে এসেছেন? ” স্বাভাবিকভাবে ভদ্রলোককে এই সাতসকালে দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।

ভদ্রলোক একটু লজ্জিত গলায় বললেন, “সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমায় ক্ষমা করবেন আসলে সেদিন একটু…” ব্যোমকেশ তাকেথামিয়ে বললো, “ওসব কথা থাক আপনি আমার সাথে আসুন। আমার ঘরে কথা হবে।” বলেই আমার মা কে ডেকে বললো, “মা বলছিলাম কি দু কাপ চা হলে…” ব্যোমকেশ আজকাল আমার মা-বাবা কে “মা-বাবা” ডাকে এবং এটায় আমার মায়ের প্রশয় আছে।মা মৃদু হেসে বলল, “থাক আর বলতে হবে না আমি নাড়ুকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি।” 

অসীতবাবুকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো ব্যোমকেশ।
আমি পড়লাম দোটানায়। একদিকে অফিসে কাজের চাপ অপরদিকে ব্যোমকেশের সঙ্গে থাকার লোভ।কোনদিকে যাবো ঠিক করতে পাচ্ছি না। অবশেষে অফিসেই যেতে হলো। অফিসে সারাদিন কাজের মধ্যে থাকলেও মনটা পড়ে রইলো বাড়িতেই। শর্মিষ্ঠা দু-একবার এসেব্যোমকেশের ব্যাপারে জিজ্ঞেস সাড়া না পেয়ে ফিরে গেল। বুঝলাম মেয়ের অভিমান হয়েছে কিন্তু আমি নিরুপায়। যেখানে আমি নিজেই এব্যাপারে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সেখানে ওকে কি বলবো?
সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে ব্যোমকেশের ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম ঘর অন্ধকার করে ব্যোমকেশ বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছে। একটা হাত কপালের উপর রাখা। আমি ঘরের আলোটা জ্বালাতেই ব্যোমকেশ উঠে বসলো। আমি এগিয়ে ঘরের এককোণে রাখা একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম।

“ব্যাপার কি? এই ভর সন্ধ্যেবেলা ঘর অন্ধকার করে বসে আছো? শরীর খারাপ নাকি?”
ব্যোমকেশ মাথা নেড়ে বললো, “না। আসলে কেসটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে চোখটা লেগে গেছিল।” বলে একটা হাই তুললো ব্যোমকেশ।একটু পরে নাড়ু দুকাপ চা আর একটা বড়ো বাটিতে তেল, চানাচুর দিয়ে মুড়ি মাখা আর চারটে সিঙারা দিয়ে গেল।

চা খেতে খেতে ব্যোমকেশ বললো, “বুঝলে নীল এসব কেসগুলো অনেকটা বীজগনিতের অঙ্কের মতো। ধাপে ধাপে জট ছাড়াতে হয়। এক ধাপে একটু ভুল হলেই সুতো পেঁচিয়ে গোটা অঙ্কটাই ভুল হয়ে যায় তখন অঙ্কের উত্তর আর মেলে না। তাই এসব ক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হয়। অথচ দেখো মানুষমাত্রেই ভুল হয়।বার বার একটাই ভুল করে চলেছিলাম আমি। এই কেসটা আগাগোড়া না ভেবে ভুল সিদ্ধান্তে এসেছিলাম। ভাগ্যিস আজ অসীতবাবু এলেন। নাহলে তো ওনাকেই আমি…ছিঃছিঃ। আবার সব কেঁচে গন্ডুষ করতে হবে।” বলে চায়ের কাপে চুমুক দিলো ব্যোমকেশ।

আমি অবাক হয়ে বললাম, “সেকি! উনি আসল অপরাধী নন? তাহলে সেদিন ওনার ঘরে যে…” আমাকে থামিয়ে ব্যোমকেশ বললো, “ওখানেই তো ধোঁকা খেয়েছি আমরা।অসীতবাবু একজন কামার। এককালে ফুটবল খেলতেন কিন্তু বছর কুড়ি আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে তাঁর পা মারাত্মকভাবে জখম হয়। খেয়াল করলে দেখতে পেতে ভদ্রলোক একটু খুঁড়িয়ে হাটেন। চাকরীর বাজারে এইখোঁড়া পা নিয়ে চাকরী পাওয়া অসম্ভব ভেবে ব্যবসা শুরু করেন। এ ব্যবসা সে ব্যবসার পর লোহার ব্যবসাটা কাজে লেগে যায়। লাভ তেমন হয় না। তবে একরকম চলে যায়। গ্রামের কালী মন্দির আছে। যেটায় আমরা গিয়েছিলাম সেটা নয় এটা গ্রামের অন্যপ্রান্তে। সেই কালীমন্দিরের বার্ষিক পুজো এই কৌষিকী অমাবস্যায়।এই পুজোয় বলির জন্য প্রতিবছর নতুন খাঁড়া লাগে। বলির পর খাঁড়াটা মায়ের চরনে অর্পণ করা হয়। পরের বছর পুরোনো মুর্তির সাথে পুরোনো খাঁড়াটাকেও পুজো করে ওরা পুকুরে বিসর্জিত করে। আমরা যেদিন গেছিলাম। সেদিন ভদ্রলোক খাঁড়ায় শাণ দিয়ে ধার করছিলেন। আর খাঁড়ায় ধার করার শব্দ শুনে আমরা… ছিঃ ছিঃ। তবে ভদ্রলোক একটা পুরোনো ঘটনার মধ্যে দিয়ে একটা জব্বর ক্লু দিয়েছেন।যার সাথে সম্ভবত এই খুনগুলো একটা সুত্র আছে। ”

“ও তা কি বললেন ভদ্রলোক? ”

ব্যোমকেশের চা শেষ হয়ে গিয়েছিল। একটা গাঁজার সিগারেট ধরিয়ে বলল, “সে বড়ো করুন কাহিনী।বলতে শুরু করলে গোটা সন্ধে চলে যাবে। তবে এতটুকু বলে রাখি মুল অপরাধী তিনি নন। এবার এই মুল অপরাধীটাকে ধরার জন্য আমাকে আবার শুরু থেকে ভাবতে হবে। তবে তার আগে… এই তোমার ফোনটা দাও তো! একটা কল করবো।আমারটা চার্জ থাকে না। ফোন এলে নম্বরও বুঝতে পারি না।”

ফোনটা আমার ঘরে আছে বলে আমি উঠে আমার ঘরে এলাম। তারপর ব্যাগ থেকে একটা বাক্স বের করে ব্যোমকেশের ঘরে ঢুকে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। ব্যোমকেশ বাক্সটা দেখে বললো, “এটা কি? ” আমি বললাম, “খুলেই দেখো।” ব্যোমকেশ বাক্সটা খুলেই অপ্রস্তুত গলায় বললো, “দেখো কান্ড! এসবের কি দরকার ছিলো? শুধু শুধু কতগুলো টাকা নষ্ট করলে।”

আমি হেসে বললাম, “চুপ! ঐ মান্ধাতা আমলের পাতি ফোন আর কতদিন চালাবে বলো তো? ও ফোন কোনযুগে অচল হয়ে গেছে।জানি তুমি প্রাচীনপন্থী, পুরোনো জিনিসকে আকড়ে বাঁচতে চাও কিন্তু এখন নতুনযুগের সাথে এটুকু তাল না মেলালে চলবে কি করে ভায়া? আর টাকার কথা বলছো? আমি না তোমার ছোটোভাইয়ের মতো? তা ছোটোভাই তার দাদাকে কিছু কিনে দেবে এতে টাকা খরচের কথা আসছে কোথা থেকে? ”

“কিন্তু এসবের দরকার ছিলো না নীল।” ব্যোমকেশের গলা ধরে এসেছিল। আমি বললাম, “ধুস সেন্টু দিও না তো! এমন কিছু করিনি। যাকগে দেখে নাও এই জায়গাটা টিপে ধরলে ফোন অন হবে।”

ঘন্টাদুয়েক লাগলো আমার ব্যোমকেশকে সম্পুর্ণভাবে ফোনটা চালানো শেখাতে। ব্যোমকেশ দারুণভাবে রপ্ত করে নিলো সবকিছু। ওর মুখে বিরক্তিভাব থাকলেও আমি জানি ভেতর ভেতর খুশি হয়েছে ও। সব শেখার পর ব্যোমকেশ ফোন করলো একটা নম্বরে।

ওপাশ থেকে রিসিভ হবার পর ব্যোমকেশের দিকের যা কথা হলো সেটা নিচে তুলে ধরলাম।
“হ্যালো…সুরেনবাবু? আমি ব্যোমকেশ মিত্র বলছি।”

“বলছিলাম যে আরেকজনের ব্যাপারে একটু খোঁজ করতে হতো। নামটা রাজেশ্বর চক্রবর্তী। ডাকনাম রাজু।”

“হুম মাল্লারপুরেরই ছেলে।আজ থেকে প্রায় পঁচিশবছর আগে বয়স ছিল বারো-তেরোর মতো।তা…”

“কি? তাই? আচ্ছা! কতবছর আগের ঘটনা বলুন তো?”

“তাই? আচ্ছা অনেক ধন্যবাদ সুরেন বাবু। এবার আমার ছেলেটার ডিটেল চাই মানে ঐ ঘটনার পর ছেলেটার কি হলো কোথায় গেল? ঠিক আছে। আচ্ছা কেসটা কার বিরুদ্ধে হয়েছিল? ”

“কি? কি নাম বললেন?”

“আচ্ছা বেশ!  ঠিক আছে। এই খবরটা শুধু জোগাড় হলে আর কিছু চাই না। বেশ অপেক্ষায় রইলাম।”

বলে ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করে ব্যোমকেশ বললো, “আবার ভৈরব? অবশ্য এই লোকটার জন্য কম হয়রানি হয় নি গুরুদেবের।”

আমি বুঁঝতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, “কে ভৈরব?” ব্যোমকেশের ঠোটে একটা হাসি খেলে গেল। যেন পুরোনো কোনো মজার স্মৃতি মনে পড়েছে। হেসে বললো, “আমাদের বহু পুরোনো বন্ধু। এককালে খুব জ্বালিয়েছিল আমাদের। সে অনেক কথা অন্যদিন বলবো। শুধু এইটুকু জেনে রাখো সে নিজেকে সিদ্ধাই বলে দাবি করতো। সিদ্ধি লাভের জন্য এমন কোনো ঘৃন্য কার্য নেই যা সে করে নি। শেষে গুরুদেব, আমি দুজনে ওকে শিক্ষা দিয়েছিলাম। আমাদের খুনির এই উন্মত্ততার জন্যে এই ভৈরবই দায়ী। এবার খুনি যদি একেও এরকম শাস্তি দেয় তাহলে আশ্চর্য হবো না। বরং মানবতার দিক দিয়ে আমি খুশিই হবো বলতে পারো।তবে বিবেক বড়ো শয়তান হে। এইভাবে একটা মানুষকে মরতে দেখতে পারবো না। বাঁচাতে হবে ওকে।”

“আর এই রাজুটা কে?  ”

ব্যোমকেশ বিছানায় হেলান দিয়ে বললো, “আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে এই মাল্লারপুরে একটা ভয়ঙ্কর অপরাধ ঘটে।একটা পুজোয় একজন ব্রাহ্মণের পরিবারকে নরবলি দেওয়া হয়। বলাবাহুল্য ভৈরবের নেতৃত্বেই। ভৈরব ঘটনার পর ক'দিনের জন্য গা ঢাকা দেয়। ঐ পরিবারটার একমাত্র সদস্য হিসেবে বেঁচে যায় ব্রাহ্মণের ছেলে। হিসেব মতো এখন তার বয়স সাঁইত্রিশ হবার কথা। যদি আমার অনুমান নির্ভুল হয় তাহলে এই ছেলেটাই আততায়ী।”

বলে উঠে বসলো ব্যোমকেশ। একটা সিগারেট ধরিয়ে বললো, “ভৈরবকে নিয়ে চিন্তিত নই আমি। আমার চিন্তা এই রাজুকে নিয়ে। কোথায় আছে ও? কেমন দেখতে ওকে? কি ভাবছে ও?”

(চলবে…)

বলি ষষ্ঠ পর্ব


১১ই জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার, দুপুর বারোটা, কলকাতা

পর পর দুদিন কেটে গেছে ব্যোমকেশ বাড়ি ফেরে নি। সেই ঘোষালবাড়িতে মিসেস কৃষ্ণা ঘোষাল কে জেরা করে আসার পরদিন যে ব্যাগপত্র নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোলো তারপর আর কোনো পাত্তাই নেই। এমন কি রণিও জানে না ও কোথায় গেছে। কাল রাতে বলছিল ও ফিরলে যাতে যোগাযোগ করে রণির সাথে। গলাটা একটু টেনসড শোনালো। অবশ্য ওকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ব্যোমকেশের অনেক পদক্ষেপ আমার কাছেও হেয়ালী বলে মনে হয়। এতদিন হয়ে গেল অথচ এখনও ওকে ভীষণ অচেনা লাগে।

আজকে অফিসে তেমন ওয়ার্ক লোড নেই ।ঐ দুটো প্রুফ ছিলো। সেটা শুধরে দিয়েছি। এই দেখুন আপনাদের তো বলাই হয় নি! আমার সেই ক্লার্কের চাকরীটা আমি কবেই ছেড়ে দিয়েছি। অবশ্য এক্ষেত্রে শাম্বর কথা বলতেই হয়। আমার আগে যেখানে চাকরী ছিলো। সেখানে ফিনান্সিয়াল প্রবলেম চলছিল বলে ভেতর ভেতর ছাঁটাই চলছিল। অবস্থা চরম বুঝে অনেক জায়গায় অ্যাপ্লাই করছিলাম। চাকরী পেলেই ছেড়ে দিতাম। কিন্তু চাকরী মুখের কথা নয়। আমার মতো অনেক বরং বলা যায় আমার চেয়ে বেশী মেধাবী বাংলায় এম এ পাশ করা অনেক ছাত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাজেই একটা চাকরী পেয়ে আরেকটা ছেড়ে দিলাম মুখের কথায় সহজ হলেও বাস্তবে ভীষণ কঠিন। একে একে সব কটায় ইন্টারভিউ দিয়ে রিজেক্ট হতে হতে যখন বেশ চাপে পড়ে গেছি। তখন উপায়টা শাম্বই বলে দিল।

ওদের অফিসে যিনি প্রুফরিডার ছিলেন তিনি মাস দুয়েক হলো রিটায়ার করেছেন। অতএব কম্পিউটার জানা, বাংলায় বিশেষ দক্ষ, নতুন একজন প্রুফরিডার চাই। খবরটা প্রেসে এখনও দেয়নি ওদের কাগজ। অতএব চেষ্টা করা যেতেই পারে। তা কপাল ঠুকে চেষ্টা করলাম আর চাকরীটা হয়ে গেল। আগের চেয়ে একটু বেশী মাইনে। তবে ব্যাপারটা শুধু এখানে আটকালো না। দুটো জিনিসও ঘটলো। প্রথমত কাজের চাপ এতো বাড়লো যে সাপ্তাহিক আড্ডায় যাওয়া কম হয়ে গেল। আর দ্বিতীয়ত, ঐ আসছে শুনতে পাচ্ছেন? হিল তোলা জুতো পড়ে খট খট করে? পাচ্ছেন না? দাঁড়ান ঐ এলো বলে। এই এক…দুই… তিন…!

“নীলার্কদা সদানন্দবাবুর গল্পটার প্রুফরিডিং হয়ে গেছে? ”

“হ…হ্যাঁ হয়ে গেছে। এই মাত্রই পাঠালাম।”

“ওকে। আচ্ছা কি ব্যাপার বলো তো? কদিন ধরে ডুব দিচ্ছো অফিসে? ব্যোমকেশদা নতুন কেস পেল নাকি? ”

কোনোরকমে তুতলে বললাম, “কই ন…ন…নাতো! ঐ একটু শরীরটা খারাপ ছিল।”

“ও তা ব্যোমকেশদার নতুন গল্প কোথায়? সেই ফেসবুকেতে “প্রতিঘাত”এর পর তো আর কোনো খবরই নেই।”

“সে আর কি করা যাবে? বেচারা নিজেও বসে আছে।”

“আচ্ছা বেশ তো কবে নিয়ে যাচ্ছো ব্যোমকেশদার সাথে দেখা করাতে?”

“ম…মানে? ”

“হ্যাঁ! তুমিই তো বলেছিলে ব্যোমকেশদা ফাঁকা থাকলে দেখা করাবে। তো নিয়ে যাচ্ছো কবে? আমার ব্যোমকেশদার সাথে দেখা করার সখ কতদিনের জানো না? ”

“সে জানি কিন্তু শর্মিষ্ঠা ব্যোমকেশ তো কলকাতায় নেই! ”

“কলকাতায় নেই? কোথায় গেছে? ”

“তা তো জানি না।”

“কোনো কেসের ব্যাপারে? ”

“হ্যাঁ…মানে…না…মানে…ইয়ে…মানে! ”

ব্যস ! আমার দম শেষ। এমনি তে আড্ডাতে, অফিসে আমার কথার এক্সপ্রেস থামে না। মুখে খই ফোঁটে। কিন্তু এই মেয়েটার সামনে আমার কথার খেই হারিয়ে যায় বার বার।আর এটারই সুযোগ নেয় শর্মিষ্ঠা। আজও নিলো। খিলখিল করে হেসে উঠলো সে। হাসতে হাসতে আমার কিউবিকলের উল্টোদিকে রাখা একটা ফাঁকা চেয়ারে বসলো।

“দেখলে? কিরকম করে ধরে ফেললাম! আরে শর্মিষ্ঠা বিশ্বাসের কাছে গপ্পো ফেঁদে লাভ নেই। ও ঠিক ধরে নেয়। আরে আমি তো জানি আমি কি? কি ভেবেছিলে ঢপ দেবে আর আমি টপ করে গিলে নেবো? উহু অতো সোজা নয় লেখক বাবু। আমাকে বোকা বানানো অতো সোজা নয়।”

ধরা পড়ে আমি আর না পেড়ে বোকার মতো হাসলাম। এবার শর্মিষ্ঠা অভিমানের সুরে বললো, “কিন্তু ব্যোমকেশদা নতুন কেস পেয়েছে এটা আমায় জানালে না কেন? জানো না তোমার লেখার, ব্যোমকেশদার কত বড়ো ফ্যান আমি? রোজ বসে থাকতাম তোমার লেখার জন্য।আর তুমি? বলো না কি কেস? ”

এবার বাধ্য হয়ে বলতেই হলো এই কেসটার ব্যাপারে তেমন কিছু জানি না। যতটুকু জেনেছি সেটাও কাউকে বলতে রণির নিষেধ আছে। আর আমি পেটপাতলা বলে ব্যোমকেশও কিছু বলছে না। কাজেই এ কেসে আমি অন্ধকারে বসে। ব্যোমকেশ যদি বলতেই না চায় আমি জানবো কি করে? আর জানাবো কি করে? শর্মিষ্ঠা সবটা শুনলো তারপর বললো, “বেশ।ব্যোমকেশদার কথা মেনে আর খোঁচাবো না তোমায়। তবে এই যে তুমি আমায় ঢপ দিলে তার শাস্তি পেতে হবে তোমায়।”

আমি ভেবলে গিয়ে ভালোমানুষের মতো মুখ করে বললাম, “কি শাস্তি?” শর্মিষ্ঠা মুখটা গম্ভীর করে বলে, “আজ বিকেলে ফ্রি আছো?” আমি চমকে গিয়ে বলি, “হ…হ্যাঁ আছি! কিন্তু কেন জানতে চাইছো? ” শর্মিষ্ঠা এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে বললো, “আজ বিকেলে বিরিয়ানি খাওয়াতে হবে। আমিনিয়ায়। খাওয়াবে? কোনো কথা শুনবো না খাওয়াতেই হবে। ”

হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।ও এই শাস্তি? হেসে বললাম, “বেশ খাওয়াবো।মিস মিতিন মার্পলের হুকুম বলে কথা।”

শর্মিষ্ঠা কপট রাগে বললো, “ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।” বলে হেসে চলে গেল।

আর আমি পেছন দিয়ে ওর যাওয়া দেখতে লাগলাম। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেছি আমি।শর্মিষ্ঠার সাথে আমার প্রথম দেখা এই অফিসে। ও আমার পরিচয় পেয়ে রীতিমতো উচ্ছসিত হয়ে আলাপ করতে এসেছিল। তখন অফিসে নতুন। অনেক কাজের চাপ। সেই কাজে বিরক্ত করতে আসতো। ওর একটাই প্রশ্ন। ব্যোমকেশ কেমন আছে। ব্যোমকেশময় জগৎ ওর। প্রথম প্রথম বিরক্ত হতাম। পরে অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। এখন যেদিন অফিসে ও আসেনা সেদিনটাই পানসে লাগে আমার। তবে একটা সন্দেহ ছিলো। এই যে ওর সম্বন্ধে এত কিছু ভাবি এটা কি একতরফাই? ওর মনে কি চলছে? ওর হাবভাবে তো মনে হয় উই আর জাস্ট ফ্রেন্ড। 

একদিন ভাবলাম বুক ঠুকে বলে দিই আমার ফিলিংস গুলো। ও যদি না বলে তাহলে শুধু ভালো বন্ধু হয়ে থাকবো আমরা। কিন্তু বলবো বলবো করে দুমাস কেটে গেল। তারপর একদিন এলো এক অপ্রত্যাশিত সুযোগ। না আমাকে বলতে হয়নি। একদিন ক্যান্টিনে নিজেই সরাসরি প্রস্তাব দিলো কন্যে। জন্মদিন উপলক্ষে ডাকলো নিজের বাড়িতে। তা গেলাম ওদের বাড়িতে। গল্ফ গ্রিনে একটা ফ্ল্যাটে থাকে ওরা।

শর্মিষ্ঠার বাবা একজন অবসর প্রাপ্ত পুলিশ অফিসার। মা ডাক্তার। উচ্চবিত্ত পরিবারের হলেও তার কোনো অহংকার নেই তাদের মধ্যে। সেই গুণটাই পেয়েছে শর্মিষ্ঠা। আমায় বেশ খাতির করলেন তারা। বাড়ি ফেরার সময় সদর পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলো শর্মিষ্ঠা। সুযোগ বুঝে দিলাম প্রস্তাবটা।

“ইয়ে মানে…বলছিলাম কি শর্মিষ্ঠা। একটা কথা ছিলো।”

“বলো।”

“ইয়ে…মানে কদিন ধরেই একটা কথা বলবো ভাবছি। বলা হয়ে উঠছে না।”

“বলো।”

“ইয়ে…মানে…বলছিলাম কি? মানে…ইয়ে মানে… আমি… তোমায়…মানে…”

“তুমি আমায় কি? ”

যাচ্চলে ! লোকে বলে কি করে? আমার তো রীতিমতো গলদঘর্ম অবস্থা! অবশেষে চোখ বুঁজে বলে ফেললাম।

“ইয়ে মানে আমি তোমায় ভালোবাসী।”

মেয়ে চুপচাপ শুনলো সব তবে কিছু বললো না। আমি ভয় পেলাম। কি জানি খারাপ ভাবলো নাকি? নিজেকে সামলে বললাম, “দেখো আসলে তোমার এই বিরক্ত করা এই ব্যোমকেশ কে নিয়ে এতো চিন্তা। এই নিয়ে আগে বিরক্ত হলেও এখন আর হই না। জানি না কবে থেকে এই ভালো লাগা শুরু হলো। জানি না এই রিলেশন কতদিন টিকবে। তাই আগে থেকে আমার মনের কথা জানিয়ে রাখলাম। তোমার যদি এটা ওকে না মনে হয়। তাহলে কোনো ব্যাপার না। আমরা ভালো বন্ধুও হতে পারি।” বলতে বলতে আমরা কমপ্লেক্সের বাইরে চলে এলাম।ওকে চুপ দেখে বুঝলাম নির্ঘাত ব্লান্ডার ঘটিয়েছি। ছিঃ এইভাবে জন্মদিনটা মাটি করে দিলাম।ভারাক্রান্ত মনে ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে উঠতে যাবো এমন সময় শর্মিষ্ঠা বলল, “ রাতে অনলাইন থেকো।” বলে মুচকি হেসে পিছন ফিরলো। ফিরে গেল ওর অ্যাপার্টমেন্টে।

এরপর ক্রমশ জানতে পারলাম আগুন ওদিকেও লেগেছিলো। বেচারীও আমার মতোই ভয় পাচ্ছিল।আর জন্মদিন উপলক্ষ্যে বাবা-মার সাথে দেখা করিয়ে মত চেয়েছিল তাদের। তারা গ্রিন সিগনাল দিলেও। আমরা ঠিক করেছি এই ব্যাপারে কাউকে জানাবো না। অফিসে জানলে যেমন ঝামেলা হবে তেমনই আমার বানরসেনাকে জানালে হই হই করে শর্মিষ্ঠাকেও নিজেদের মতো পাগল করে নেবে।যেমনটা ব্যোমকেশকে করেছে। কি দুঃখ বলুন তো চরম সিরিয়াস ব্যোমকেশও আজকাল আমায় নিয়ে খিল্লি করে। তাই বাড়িতেও পইপই করে বলেছি এব্যাপারে ব্যোমকেশ না জানতে পারে। যে কদিন ও আমাদের বাড়ি এসেছে ব্যোমকেশ বাড়ি তে থাকেনি।

তবে যাই হোক ধৈর্য আছে বটে এই পাঁচফুট দু ইঞ্চির শ্যামাঙ্গিনী মেয়েটার মধ্যে । নাহলে টানা দুমাস এই সম্পর্কেই রীতিমতো কর্তৃত্ব ফলায়? অসাধারন এই মেয়েটা বাইরো থেকে ভীষণ সাধারণ।সাজপোশাকেও তেমন চাকচিক্য নেই। কোনোদিন চুড়িদার, কোনোদিন জিন্স আর শার্ট পরে, একগোছা মেডুসার মতো কোঁকড়ানো চুলে খোঁপা করে, রিডিং গ্লাস পরে যখন একমনে কম্পিউটারে খবরের স্টোরি টাইপ করে কে বলবে? এই মেয়েটাই ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে প্রায় ছিঁড়ে খায় বড়ো বড়ো নেতাদের? পার্টিতে নেচে, হুল্লোর করে মাতিয়ে দেয় পরিবেশ? কে বলবে মাস দুই আগেও এই মেয়েটাকে আমার অসহ্য লাগতো? মনে মনে হাসলাম। সত্যি আমাদের মন অতীবও বিচিত্র বস্তু।

 ‌‌‌‌                           ******

ব্যোমকেশের যে দোষগুলোকে আমি সবচেয়ে বেশী অপছন্দ করি তারমধ্যে প্রথম হলো সাসপেন্স বজায় রাখা। দ্বিতীয়টা অকস্মাত চমকে দেওয়া। মানে কখন কীভাবে কোথায় ও বোমা ফাঁটিয়ে দেবে আপনি ধরতে পারবেন না। তবুও একটা গোটা বছর কাঁটিয়ে এসব গা সওয়া হয়ে গেছে। তবে ওর সঙ্গদোষে যে শাম্বটাও বদের ধারি হয়ে গেছে এটা জানা ছিলো না।অন্তত আজকে ও যেটা করলো সেটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না মোটেও।

বিকেলবেলা কথামতো শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে আমিনিয়ায় ঢুকেছি। গরম গরম চিকেন বিরিয়ানি আর চিকেন চাপে হাত দিয়েছি এমন সময় মনে হলো বালুর গলা পেলাম। খেতে গিয়েও থমকে গেলাম। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি ওদের কেউ নেই।শোনার ভুল ভেবে বিরিয়ানির চিকেন লেগপিসে কামড় বসাতে যাবো এমন সময় প্রায় মাটি ফুড়ে উদয় হলো শাম্ব। চেয়ারে বসে বললো, “কি ভাই একা একাই? ”

ওকে দেখে বিষম খেয়ে গেলাম আমি। কোনোমতে সামলে ওর দিকে তাকাতেই দেখি পেছন পেছন একে একে উদয় হলো বালু, প্রাচী , রণি, আর শ্রীমান ব্যোমকেশ মিত্তির। কোনোমতে নিজেকে সামলে বললাম, “না মানে শর্মিষ্ঠার সাথে প্ল্যান ছিলো। তাই…”

প্রাচী আমার মুখের কথা কেড়ে বললো, “তাই বিরিয়ানী খেতে চলে এলাম। তা আমাদের নিয়ে তো কোনোদিন এরকম প্ল্যান বানাস না? বলি পেটে পেটে এতো? ”

ব্যোমকেশ হেসে বললো, “কি ভেবেছিলে? তোমার ঘরে মেয়ের পারফিউম, আমি যতবার বাইরে বেরোই ততবার অতিথি আগমন। আমি কিছু বুঝবো না? ভাবলে কি করে কাকিমা আমার থেকে কিছু লুকিয়ে রাখতে পারবে? ”

রণিও ফোড়ন কাটলো, “তাই ভাবি ফোন করে কোনো পাত্তা নেই কেন ভায়ার। থাকবে কি করে? উনি তো ব্যস্ত! ” বাকিগুলোও যোগ দিলো ওদের সাথে। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “আঃ হচ্ছে কি? এটা পাবলিক প্লেস।সবাই দেখছে।” শাম্ব খ্যাকখ্যাক করে হেসে বললো, “রাখ তোর পাবলিক প্লেস। স্বার্থপর কোথাকার। বিরিয়ানীর জন্য আমরা অসভ্য হতেও রাজি। ভাগ্যিস আমার খটকা লাগলো। দুজনকেই যখন অফিসে দেখলাম না সন্দেহ হলো। এতদিন পর পাখিরা ফাঁদে পড়েছে।” বলেই আমার আর শর্মিষ্ঠার দিকে তাকালো।

শর্মিষ্ঠারও ধরা পড়ে আমার মতো অবস্থা।শাম্ব আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, “চিন্তা নেই ব্রাদার।অফিসে কাকপক্ষিতেও টের পাবে না। তবে পেনাল্টি দিতে হবে। ট্রিট চাই বস। আমরাও বিরিয়ানী খাবো। চিন্তা নেই তোর পকেট খসাবো না কিপ্টে কোথাকার। আজকে তোর অনারে আমি বিরিয়ানী পার্টি দিচ্ছি। কি চলবে তো সবার? ” সবকটা হই হই করে উঠলো।

সবার সাথে একে একে পরিচয় করালাম আমি। ব্যোমকেশের পরিচয় পেতেই মেয়ের গাল এত লাল হলো যে বলার মতো নয়। ক্রমে আড্ডায় মেতে উঠলাম আমরা।একসপ্তাহের মধ্যে আড্ডা আমিনিয়া থেকে সোজা বালুর বাড়িতে পৌছলো। মানে আমাদের সদস্য সংখ্যা বাড়লো। আর যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই হলো। শর্মিষ্ঠা ওদের দলের পুরো জলের মতো  মিশে গেল।আমাকে নিয়ে ইয়ার্কি ঠাট্টায় গোটা সন্ধ্যে কেটে যেতে লাগলো।

আজ রবিবার যথারীতি আড্ডা মারতে মারতে রাত হয়ে গেল। রাতের খাবার খেতে খেতেই শর্মিষ্ঠা বোমা ফাঁটালো। খেতে খেতে ব্যোমকেশকে বলল, “ তা নীল বললো নতুন কেস পেয়েছো তুমি। কতদুর এগোলো কেসটা? ” তাকিয়ে দেখলাম রণি আর ব্যোমকেশ কৌতুক আর ব্যাঙ্গের ভরা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে।আমি মাথা নামিয়ে খাওয়ায় মন দিলাম। ব্যোমকেশ হেসে বললো, “এখনো কোনো ক্লু পাইনি। পেলে তো এগোবো। দেখা যাক কি হয়।” শর্মিষ্ঠা বললো, “তা কেসটা সলভ হলে নীলের নতুন গল্প পাবো তো? ” মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। ব্যোমকেশ নির্বিকার ভাবে বললো, “ সে দেখা যাবে আগে কেসটা সলভ হোক।”

আমি শর্মিষ্ঠাকে থামাতে কি বলতে যাচ্ছিলাম এমন সময় রণির ফোন বেঁজে উঠলো। রণি ফোনটা রিসিভ করে কিছুক্ষন শুনলো। তারপর ব্যোমকেশকে ইশারা করলো। ব্যোমকেশের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ও উঠে দাঁড়ালো। তারপর হেসে বললো, “মনে হয় এবার বোধহয় ক্লু পেলাম।” রণি ফোনটা কাটতেই ব্যোমকেশ বললো, “এবার কোথায়?” রণি থমথমে মুখে বললো, “ডায়মন্ড হারবারে।”

 ‌‌‌‌                           ******

১৯শে জুলাই ২০১৯, শুক্রবার সকাল দশটা, আর.জি. কর. মেডিক্যাল কলেজ 

পরদিন সকালে হাসপাতালে যখন আমরা পৌছলাম। তখন রোদের তাপ বাড়তে শুরু করেছে । বডি দেখতে আমাদের ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত যেতে হয় নি।ওখানকার পুলিশ বডি সোজা হাসপাতালে পাঠিয়েছে ।সেই বডি দেখতে আমরা আজ সকালে এসেছি। আমরা বলতে রণি, ব্যোমকেশ, শর্মিষ্ঠা আর আমি। রণি, ব্যোমকেশ তদন্তের স্বার্থে, শর্মিষ্ঠা স্কুপের উদ্দেশ্যে। আর আমি অ্যাডভেঞ্চার আর আমার পরবর্তী লেখার আশায়(একটা কথা বলে রাখা ভালো। আমার এই মর্গে আসার পেছনে শর্মিষ্ঠার অবদান অনস্বীকার্য না হলে সাত সকালে অফিস ছেড়ে মর্গে কে আসে হ্যাঁ? )।এইবার আগের মতো ভুল আমি করিনি। কারন বিগত কয়েকদিনে আমি বুঝেছি ব্যোমকেশ আমার অবহেলা আর ওকে ইগনোর করার অভিমানে এই কেসের ব্যাপারে কিছু বলছে না। অতএব মানভঞ্জন করতে হবে জেষ্ঠ ভাতৃসম এই মিত্রটির।

তবে একটা কথা মানতে হবে দিনের বেলা হাসপাতাল চত্বর বেশ জমজমাট। অনেকে ওষুধের কাউন্টারে এখনো লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। অনেকে আবার ডাক্তার দেখানোর জন্য বেঞ্চে সারিবদ্ধ ভাবে বসে। কিছুদুর গিয়ে একপাশে একটা কম্পাউন্ডের সামনে দাঁড়ালাম আমরা। কম্পাউন্ডের উপরে গ্লোসাইন বোর্ডে বড়ো বড়ো করে লেখা “MORGUE”।এখানে বলে রাখি মর্গ নিয়ে লেখকরা ভুতের গল্পে যে হাড়হিম বর্ণনা দেন এই মর্গ মোটেও ওরকম নয়। বরং পরিস্কার পরিচ্ছন্ন চুনকাম করা একতলা বাড়ি। ফরম্যালডিহাইড আর ফিনাইলের চাপা গন্ধ আসছে। হাসপাতালের মতোই তকতকে তবে হাসপাতাল থেকে কিছুটা দুরে বলে বেশ নিরিবিলি পরিবেশ।

মর্গের সামনে একজন গার্ড দাঁড়িয়েছিল।তার কাছে জানা গেল। কাল রাতে একটা বডি এসেছে বটে তবে সেটার রিপোর্টের জন্য কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হবে? মর্গের ডাক্তার বডি পরিক্ষা করছেন।

রণি গার্ডের সাথে কথা বলছে এমন সময় ভেতর থেকে এক সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন। সাথে বেরিয়ে এলো রাজীব। রাজীব যেন আমাদের দেখে প্রথমে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। তারপর অবাক গলায় বললো, “আরে কি ব্যাপার? ব্যোমকেশবাবু দেখছি?” ব্যোমকেশ হেসে বললো, “ কি করা যাবে? খাস উপরমহলের আর রণবিজয়ের হুকুম! অগত্যা মাঠে নামতে হলো।তা কেস কতদুরএগোলো সেটাই দেখতে এলাম।”

রাজীব হেসে বললো, “সে তো বটেই।তা ভালোই হলো। অবশ্য কদিন আপনার কথাই ভাবছিলাম। এরকম কেস আমি বাপের জন্মে দেখিনি। ড: ধর্মাধিকারীর সাথে সেই নিয়েই কথা হচ্ছিল। ও ভালোকথা আলাপ করিয়ে দিই। ডাক্তারবাবু ইনি হলেন আমার সিনিয়ার অফিসার। এই কেসের তদন্ত করছেন। এসিপি রণবিজয় চ্যাটার্জী। ইনি বিখ্যাত সরকারী গোয়েন্দা ব্যোমকেশ মিত্র। ইনি বিশিষ্ট লেখক নীলার্ক চ্যাটার্জী। আর ইনি হলেন…”

 ডাক্তার ধর্মাধিকারী এগিয়ে এসে করমর্দন করে বললেন, “নমস্কার।আমার নাম যুধিষ্ঠির ধর্মাধিকারী। পেশায় একজন অটোপসি সার্জন।”

ব্যোমকেশ করমর্দন না করে নমস্কার করে বললো, “কেমন আছো যদু দা? ” বৃদ্ধ একটু থমকালেন। তারপর এগিয়ে ব্যোমকেশের মুখের দিকে ভালোভাবে তাকালেন। ব্যোমকেশ মুচকি হাসতে লাগলো। বৃদ্ধ বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর বললেন, “চেনা চেনা মনে হচ্ছে বাড়ি কোথায়? ” ব্যোমকেশ হেসে বললো, “হরিরামপুরের নিবারণ মিত্তির…।” বাকিটা আর বলতে হলো না কারন ততক্ষনে বৃদ্ধ ডাক্তার “বোমা! ” বলে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরেছেন ব্যোমকেশ কে। বেশ কিছুক্ষন পর ব্যোমকেশকে দুহাতে চেপে ধরে ধরা গলায় বললেন, “কতবছর পর বলতো? সেই তুই গ্রাম ছাড়লি তারপর বান এলো। নিবারনকাকাদের আমরা বারবার…। পরে শুনেছিলাম তুই নাকি সন্ন্যাস নিয়েছিস।”ব্যোমকেশও ধরা গলায় বললো, “জানি। বান ডাকার সাতদিন পর ফিরেছিলাম। সনাতন সবটা বলেছিল। তারপর সেই যে গ্রাম ছেড়ে চলে গেলাম আর ফিরিনি। কার জন্য ফিরতাম বলোতো? বাবা-মা- পুনু সবাই তো আমাকে একা রেখে চলে গেল। তারপর কি হয়েছিল সে অনেক বড়ো গল্প। পরে বলবো তোমাকে যাক গে বুঝতেই পারছো এই কেসে আমিও তদন্ত করছি। তোমার হেল্প চাই কিন্তু।”

“হেল্প কিরে? এতো আমার কর্তব্য? আজ এইযে আমি ডাক্তার এর পেছনে নিবারণকাকা না থাকলে…যাক সেসব কথা। আগে বল আমার কোয়ার্টারে কবে আসবি তুই? ”

“সে পরে হবে আগে কেসটায় এদের নৌকো পার করে দিই। তারপর একদিন তোমার হাতের চিংড়ি মাছের বড়া খাবো। এবার বলো তো আজকের বডিটার কি খবর? কজ অফ ডেথ কি? ”

“আর বডি! ” বলে মুচকি হাসেন যুধিষ্ঠিরবাবু। 

“এতবছর মড়া ঘাটছি। এরকম কেস জীবনে পাইনি। তাও আগের গুলো কিছুটা রিকভার করা যাচ্ছিল এটা তো একেবারে গন কেস।”

“মানে? বুঝলাম না। এটার বেলা কি হয়েছে? ”

“বলছি। ভেতরে আয়। তার আগে বলি তোদের মধ্যে কেউ সকালের খাবার খেয়ে আসিস নি তো? আসলে বমি টমি করলে এখানকার গ্রুপ ডি স্টাফ চম্পা হেবি খচে যায়।”

“না কি ব্যাপার বলো তো? ”

“ভেতরে চল। বুঝতে পারবি।”

বলে ভেতরে ঢুকে গেলেন ডাক্তার। আমরাও পেছন পেছন ঢুকলাম। একটা বড়ো হল ঘর। একদিকে সিলিং পর্যন্ত বিরাট লকারের প্যাসেজ। 

আরেকদিকে টেবিলের চারদিকে বড়ো বড়ো জারে ফরম্যালডিহাইডে ডোবানো মানবদেহের অংশ।ঘরের মাঝে একটা উচুমতো বেদি। বেদিটার উপরে এলইডি বালবের আলো জ্বলছে।বেদিটায় চাদর দিয়ে কি একটা ঢাকা। হয়তো নীলুর লাশ হবে।

ডাক্তার ধর্মাধিকারী বেদির সামনে দাঁড়িয়ে একটানে চাদরটা খুলে ফেললেন। চাদরের আড়ালে যেটা ছিলো সেটা দেখে আমার দুটো অনুভুতি হলো। প্রথম একটা অদ্ভুত আতঙ্ক গ্রাস করলো। দ্বিতীয় পেটটা গুলিয়ে উঠলো। শর্মিষ্ঠা দেখলাম ভয় পেয়ে আমার শার্টটা খিমচে ধরলো। রণি ভ্রু কুঁচকে একবার “মাই গড…”বলে তাকিয়ে রইলো। একমাত্র ব্যোমকেশ নির্বিকারভাবে তাকিয়ে রইলো। তবে ওর চোখ দেখে বুঝলাম যেন একটা কিছু খুঁজে পেয়েছে। মানুষ কতটা নৃশংস হতে পারে সামনের ওই দেহাংশটাই তার প্রমাণ। দেহাংশ মানে মৃতদেহটার আস্ত দেহটা নেই এখানে! শুধু শিরদাঁড়া সমেত মাথাটা বেদিতে শোয়ানো।মাথাটার কপালের কাছ থেকে আবার কাটা। সেখান থেকে মাছি ভনভন করছে।

চাদর দিয়ে মৃতদেহাংশটা ঢেকে ড: ধর্মাধিকারী বললেন, “কি বুঝলি? ” ব্যোমকেশ বললো, “বুঝলাম যে খুনি মারাত্মক রকমের মানসিকরোগগ্রস্থ।” 

ড. ধর্মাধিকারী বললেন, “সেতো বটেই তার সাথে তুখোড় অ্যানাটমি জ্ঞান। মানে শরীরের কোথায় অ্যানেস্থেশিয়া পুশ করলে ভিকটিম সজ্ঞানে থাকবে বাট কিছু করতে পারবে না। কিভাবে মারলে একেবারে কাজ হবে অথচ প্রাণ বেরোবে না। আর কাজগুলোও পুরো প্রফেশনালদের মতো করেছে। যেমন আগের কেস মানে চন্দ্রশেখর ব্যানার্জীর টা তো পুরো শিল্প পর্যায়ের। অতো নিখুঁতভাবে ডিসেকশন আমিও পারবো না। আর অদ্ভুতভাবে এই ডিসেকশন এর সময় ভিক্টিম কে বাঁচিয়ে রেখে করা ইটস কোয়াইট আনক্যানি বাট আমেজিং কাট। জানি এভাবে বলা উচিত হয় নয় বাট খুনির কাজের তারিফ না করে পারা যায় না।”

“চন্দ্রশেখরের কি কি বডিপার্ট উধাও ছিলো? কিডনি, লিভার না হার্ট।” ব্যোমকেশ নির্বিকারভাবে জিজ্ঞেস করে।

“অনলি ইন্টেস্টাইনস। মানে ক্ষুদ্রান্ত আর বৃহদন্ত।” ডাক্তারের কথা শুনে স্থির হয়ে যায় ব্যোমকেশ। তীক্ষ্ণ চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে, “কি? শুধুমাত্র অন্ত্র? ”

চিন্তিত গলায় ডাক্তার বলেন, “সেটাই তো অবাক করেছে রে। হার্ট, লিভার, বা কিডনি নিলেও কথা ছিল। নাড়িভুড়ি যে খুনির কোন কাজে লাগবে কে জানে?”

ব্যোমকেশ এবার এগিয়ে বেদির চাদর তুলে নীলুর মৃতদেহটা দেখে। বিশেষ করে ওর কপাল থেকে কাটা অংশটা। বিড়বিড় করে বলে, “তারমানে আমি যেটা ভাবছি সেটাই কি? তাহলে তো…” বলে চাদরটা দিয়ে দেহটা ঢেকে ডাক্তারকে এগিয়ে এসে বলে, “অনেক ধন্যবাদ যদুদা।তুমি জানো না কতবড়ো উপকার করলে আমার।”

ডাক্তার মুচকি হেসে বলেন, “আমি আগেই বলেছি এটা আমার জব।যাক গে আগে বল কবে আসছিস আমার কোয়ার্টারে।”

ব্যোমকেশ হেসে বলে, “আজ আর হবে না গো।তবে কথা দিচ্ছি একদিন আসবো। আর জমিয়ে আড্ডা দেবো। অনেক কথা জমে আছে আমাদের।”

ডাক্তার হেসে বললেন, “বেশ। তবে কথা রইলো কিন্তু।”

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ব্যোমকেশ রণিকে কানে কানে কি একটা বলায় সে হেসে বললো, “বেশ তো চলো।” বলে রণি রাজীবকে লালবাজারে ফিরে গিয়ে রিপোর্টটা ওর টেবিলে রাখতে বললো। ব্যোমকেশ আমাদের বাড়ি ফিরতে বলে রণির সাথে আবার কোথায় চলে গেল।

আমরা বাড়ি না গিয়ে অফিসের পথ ধরলাম।

(চলবে…)

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২০

বলি পঞ্চম পর্ব



৭ই জুলাই ২০১৯ রবিবার, সন্ধ্যে ছটা, কলকাতা

কখনো কখনো মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। ধরুন আপনি বাইরে কোথাও যাবেন বলে ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে তৈরী হয়ে আছেন। এবার দুগ্গা দুগ্গা বলে রওনা দিতে যাবেন এমন সময় ঝেঁপে বৃষ্টি এসে গেল। অথবা ধরুন আপনি বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়েছেন সময়মতো অফিসে পৌঁছে আগের দিনের কাজগুলো এগিয়ে রাখবেন।  কিন্তু মাঝরাস্তায় হঠাৎ ট্রাফিক জ্যাম হয়ে গেল।  ব্যস! পুরো পরিকল্পনাটাই বাতিল।

আমিও ভেবেছিলাম ব্যোমকেশ কেসটা পেলে বেশ একটা রোমাঞ্চকর গল্প লিখতে পারবো কিন্তু এযাত্রায় তা আর বোধহয় হবে না। কারণ এই কেসটা রণিরা প্রায় গুটিয়ে এনেছে। একমাস হয়ে গেছে। কানাইয়ের ঘটনাটা রণিরা সামলাতে পেরেছিল।  মৃতদেহটা কার এখনও তা জানা যায়নি। তবে ওর পর আর কোনো এরকম বডির খবরও আসেনি। তবে খুনটা  পর পর অমাবস্যায় হচ্ছে বলে রণিরা এখন সতর্ক হয়ে আছে।

পরশুই অমাবস্যা। কাজেই আজকে আর কালকে গোটা কলকাতা পুলিশ ফোর্স অ্যালার্ট হয়ে আছে। ব্যোমকেশের কথা অনুযায়ী রণি সব থানায় বলেছে, “আজ থেকে পরশু পর্যন্ত যদি কোনো মিসিং কেস আসে তা সঙ্গে সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। আর সেগুলোর সম্পুর্ণ ডিটেলস লালবাজারে দিতে হবে।”

আজকে আড্ডাটাও তেমন জমছে না বালুর বাড়িতে। রণি আজকের আড্ডায় নেই। তাই কেমন যেন সব কিছুর খেই হারিয়ে যাচ্ছে। সবাই যেন কিছু একটা হবার অপেক্ষায় বসেআছে। সকলেই এই অজানা খুনির খুনের পদ্ধতি নিয়ে নানারকম থিওরি বলছে। কিন্তু কারোটাই ধোপে টিকছে না। ব্যোমকেশ অবশ্য নির্বিকার। চুপচাপ সকলের থিওরি শুনছে আর সিগারেট টানছে। মুখে কিছু বলছে না বটে তবে আমি জানি ভেতর ভেতর ও অনেকটা এগিয়ে গেছে তদন্তে।

এর জন্য ধন্যবাদটা অবশ্য রাজীবের প্রাপ্য। এত ব্যস্ততার মধ্যেও একদিন ফাইলগুলো দিয়ে গিয়েছিল ছেলেটা। ফাইলগুলোর মধ্যে কয়েকটা ফাইল ব্যোমকেশ আলাদা করে রেখেছিল। সেগুলো জেরক্স করে পরদিনই সব ফাইল ফেরত দিয়েছিলাম আমি। ব্যোমকেশের অনুমান অভ্রান্ত ছিল।এরকম কেসের শুরু কুড়ি বছর আগে থেকে। রাজীব ভীষণ অবাক হয়েছিল, “ আশ্চর্য উনি জানলেন কি করে? ” আমি হেসে বলেছিলাম, “এটা ব্যোমকেশের ক্ষমতাটার মধ্যে একটা। ওর অনুমান সবসময় অভ্রান্ত হয়।”

ফাইলের কেসগুলো পড়তে ব্যোমকেশের লাগল পাক্কা দুদিন। ফাইলের সংখ্যাও কম নয়। সব মিলিয়ে তেত্রিশটা। সব পড়ার পর আরো গুম হয়ে গিয়েছিল ব্যোমকেশ। তবে এই চুপচাপভাব বেশীদিন ছিলো না কদিন পরই আবার স্বাভাবিক ভাবে গল্পগুজব আড্ডায় মেতে গিয়েছিল। আজকের আড্ডাতেও ব্যোমকেশ চুপচাপ বসেছিল দেখে বালু বললো, “ব্যাপার কি? আজ এত চুপচাপ কেন? ” ব্যোমকেশ হেসে বললো, “তোমাদের মতগুলো শুনছিলাম। অদ্ভুতভাবে একটা জিনিস খেয়াল করলাম। তোমাদের সকলের মত দারুন ভাবে বিবেচনা যোগ্য। প্রত্যেকের মতই কেসটাকে নানা অ্যাঙ্গেলে দেখতে সাহায্য করছে কিন্তু প্রত্যেকে একই জায়গায় থমকে যাচ্ছো। মোটিভ। ঠিক কি কারনে খুনি করছে এই খুন।”

বলে সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে প্রায় শেষ সিগারেটটা গুঁজে বললো, “এখন পর্যন্ত যতগুলো কেস সামনে এসেছে। তার মধ্যে যতগুলোর কাটামাথা পাওয়া গেছে। তাদের কয়েকটা সাদৃশ্য দেখতে পেয়েছি।” সকলে ব্যোমকেশের দিকে তাকালো। ব্যোমকেশ সোফায় হেলান দিয়ে বসলো, “ প্রথমত; মৃত সকলেই ব্রাহ্মণ। তবে কাজে নয় জাতে। কাজে এরা প্রত্যেকে ঘৃন্য অপরাধী ছিলো।”

“দ্বিতীয়ত;এদের মৃতদেহ বা মাথা দেখেই বোঝা যায় এরা কোনো পুজোয় উপাচার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এতে কোনো অতিলৌকিক কিছু নেই কেউ হয় প্রতিহিংসায় না হয় কোনো গভীর কুসংস্কারের বশবর্তি হয়ে তোমাদের ভাষায় সাইকো হয়ে খুনটা করছে।”

“তৃতীয়ত; মৃতগুলোর মাথায় কেউ ক্ষুরের মতো কোনো ধারালো কিছু দিয়ে লিখে রাখছে। যেমন প্রথমজনের মাথায় ‘পরশুরাম’,  দ্বিতীয়জনের মাথায়, ‘কালভৈরব’,  তৃতীয়জনের মাথায় ‘কালাপাহাড়’ আর এভাবেই করতে করতে শেষজন মানে কানাইয়ের মাথায় লেখা ছিলো ‘কপালী’।”

“আর শেষ দিকটা কেউ দেখেছো কিনা জানি না। মৃতদের সকলের নাম হয় শিবের নামে নয় নারায়ণের নামে। আর অদ্ভুতভাবে কানাই ঘোষাল বাদে সকলের স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী ওর দুর্গার নামে। বিশেষত দুর্গার নামের সকলের নাম একান্ন পীঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবীদের নামে। যেমন প্রথম খুন কপিলেশ্বর ভট্টাচার্য। এলাকায় পরিচিত রড কপিল হিসেবে। খুন করার সময় ক্রিকেটার কপিলদেবের মতো নটরাজ ভঙ্গি করে রড মারতো শত্রুর মাথায়। ওর স্ত্রীর নাম মঙ্গলা ভট্টাচার্য। আর মৃতরা যতটা পাষন্ড মৃতের স্ত্রীরা ততই পরোপকারি। যেন স্বামীর পাপ নিজের প্রায়শ্চিত্ত দ্বারা খন্ডন করছেন। দ্বিতীয় জন জগন্নাথ তালুকদার ওরফে পেটো জগা। স্ত্রী বিমলা তালুকদার। তৃতীয়জন চন্দ্রশেখর ব্যানার্জী। স্ত্রী ভবানী ব্যানার্জী। চতুর্থজন…”

ব্যোমকেশ থামলো কারন আমার ফোন বেঁজে উঠেছে। ফোনটা বের করে দেখলাম রণি ফোন করেছে। রিসিভ করতেই বললো ব্যোমকেশকে দিতে। ব্যোমকেশের ফোন থাকলেও সবসময় ফোনটা কাছে রাখে না। কাজেই আমার ফোনেই কথা হয়।ফোনটা নিয়ে ব্যোমকেশ কথা বললো। রণির কথা আর শুনতে পাইনি। তাই ব্যোমকেশের অংশটাই তুলে দিলাম।

“হ্যা বলো রণি।”

“হুম।”

“হু? ”

বিড়বিড় করে বললো “জানতাম।” তারপর বললো, “কিন্তু আমি যে আউটপার্সন। উপরমহলের অনুমতি না পেলে এগোবো কি করে?”

“কি? ডিসিডিডি কথা বলবেন? বেশ দাও।”

“বলুন স্যার।”

হেসে বলে, “না না ওরকম কিছুই নেই।আমি সাধারণ একজন মানুষ।”

“আচ্ছা বেশ আপনি যখন বলছেন। তা আমার কাজের নিয়ম জানেন তো? ”

“জানেন?  বেশ অনেক ধন্যবাদ। তা কে নিখোঁজ হলো? ”

“ও। ঠিক আছে। আমি আসছি।”

“অনেক ধন্যবাদ।”

বলে ফোনটা আমায় দিয়ে বললো, “উপরমহলের আদেশ। এবার মাঠে নামতে হবে। একটু পরেই রণি গাড়ি নিয়ে আসবে।”

শাম্ব জিজ্ঞেস করলো, “ তা কে নিখোঁজ গেল? ” 

ব্যোমকেশ উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে বললো, “নীলকন্ঠ চক্রবর্তী। এলাকায় গলাকাটা নীলু নামে পরিচিত। কানাই ঘোষালের রাইভাল।”

******

লালবাজার থেকে ব্যোমকেশ যখন বাড়ি ফিরল তখন রাত বারোটা বাজে। আমি জেগেছিলাম। ও আসতেই গেট খুলে দিলাম। সন্ধেবেলায় রণির ফোন আসার মিনিট পনেরো পরেই রণি এসেছিল ব্যোমকেশকে নিতে। ব্যোমকেশ অবশ্য তৈরীই ছিলো। যাবার আগে আমাকে খেয়েদেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলল। 
খেয়েদেয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন ঘড়িতে বাজে রাত দশটা। বাড়িতে জানালাম ব্যোমকেশের কাজ আছে ও পরে ফিরবে।

ব্যোমকেশ ভেতরে ঢুকে কোনো কথা না বলে সোজানিজের ঘরে চলে গেল। আমি গেটে তালা দিয়ে চাবিটা দেরাজে রেখে নিজের ঘরে ঢুকলাম। ব্যোমকেশের এই ভাবভঙ্গী আমার জানা। ও যতক্ষন না নিজে থেকে বলবে ততক্ষন ওর মুখ থেকে কথা বের করা অসম্ভব।

বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষন ঘুম এলো না। মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো।বিশেষ করে ব্যোমকেশের বলা কথা গুলো। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হলো দরজার ওপারে কে যেন দাঁড়িয়ে। উঠে দরজা খুলে দেখি ব্যোমকেশ।

আমাকে দেখে একটু যেন অপ্রস্তুত হলো সে। বললো, “ঘুমোওনি?”হেসে বললাম, “না ঘুম আসছে না। তা তুমিও তো ঘুমোওনি দেখছি। কিছু বলবে?” ব্যোমকেশ কি যেন বলতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর বললো, “আজ থাক অনেক রাত হয়েছে কাল বলবো। যাও ঘুমিয়ে পড়ো।” বলে ফিরে গেল ব্যোমকেশ। আমি কিছুক্ষন ওর ঘরের দিকে তাকিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলাম।

পরদিন সকালে উঠে দেখি ব্যোমকেশের ঘরে বাইরে থেকে ছিটকিনি দেওয়া। মানে ও বাইরে বেরিয়েছে। মাকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম ও অনেক ভোরে বেরিয়ে গেছে। কোথায় গেছে বলে যায় নি। আমি নিশ্চিন্ত হয়ে হাই তুললাম।

এই কদিন ব্যোমকেশের নাগাল আর পাওয়া যাবে না জানি। কাল ওর মনে অনেক কথা উঠেছিল। মুহুর্তের উত্তেজনায় সেগুলো বলতেই এসেছিল। আমাকে ক্লান্ত ভেবে নিজেকে সামলে নেয় সে। কথাগুলো ব্যোমকেশ না চাইলে আর জানা যাবে না। নিজের উপর একটু রাগ হলো। কাল ওকে বলতে দিলেই ভালো হত। পরেই মনে হল কি দরকার? আমি আদার ব্যাপারী জাহাজের খবর নিয়ে কি করবো? ওর বলার হলে ঠিক বলবে। ভাবতে ভাবতে বাথরুমের দিকে এগোলাম।

******

কতক্ষন এভাবে পড়েছিল জানে না নীলু। জ্ঞান ফিরতেই দেখে একটা অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছে সে। উঠে বসার চেষ্টা করতেই টের পায় হাত-পা বাঁধা। এমন কি ওর ও মুখে তুলো গুঁজে কাপড় দিয়েবেঁধে রেখেছে।উঁ উঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ বেরোচ্ছে নামুখ দিয়ে। জ্ঞান হারাবার আগে কোথায় ছিলো মনে করার চেষ্টা করে সে। গত দুমাসে এক এক করে ওর সব শত্রুরা গুম হয়ে যাচ্ছে। দুদিন পর ওদের লাশ বেরোচ্ছে দেখে ও ভেবেছিল হয়তো কানাই না হয় অন্য কেউ নিজের লাইন ক্লিয়ার করার জন্য এই কাজ করছে। তাই নিজে মনে মনে একটা যুদ্ধের জন্য তৈরী ছিল নীলু। ভেবেছিল কানাই যদি ওর দিকে হাত বাড়ায় তাহলেও ছেড়ে কথা বলবে না। এমনি এমনি এলাকায় ওর নাম গলাকাটা নীলু নয়। ওর গায়ে হাত দিলে ও নলি কেটে রেখে দেবে।

কিন্তু একমাস আগে কানাইয়ের মরার খবর পেয়ে ওর সব হিসেব গোলমাল হয়ে যায়। একটাই চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে ওর মাথায়। কে হতে পারে?  কানাইকে হাড়ে হাড়ে চিনতো নীলু। অত সহজ নয় ওকে মারা। সবসময় পকেটে মেশিন নিয়ে ঘুরতো কানাই। নিজের বউ বা পোষা মেয়েছেলেটাকেও অতো বিশ্বাস করতো না কানাই যতটা করতো নিজেকে আর নিজের রিভলভারকে। সাপের মতো ধুর্ত কানাইয়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে প্রথমে বিশ্বাস হয় নি তার।

তবে এতে একটা লাভ হয়েছে বৈকি। ওর দলের ও আশেপাশের দলের লোকেরা ওকে রীতিমতো সমীহ করতে শুরু করেছে। ওকে ভয় পেতে শুরু করেছে। কানাঘুষোয় ভাসছে কানাইকে আর কেউ নয় মেরেছে নীলুই। নীলু প্রথমে এটা অস্বীকার করলেও পরে ভেবে দেখেছে এতে ওরই লাভ। তাই আর কিছু বলেনি। বরং আরও বেপরোয়া হয়ে বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে।

কালরাতে একটা বারে গিয়েছিল নীলু। এমনিতেও প্রতিদিন নেশায় টংই থাকে তবে কাল মদটা একটু বেশীই খেয়ে ফেলেছিল। বারের জেন্টস টয়লেটে প্রস্রাব করছিল সে। নেশায় একটু মাথাটা টলছিল বলে প্রথমে টের পায় নি পেছনে কেউ দাঁড়িয়েছে। তবে মদ খেলেও নাড়ির জ্ঞান টনটনে থাকে তার। গোলমালটা টের পেয়েই পেছন ফিরে তাকিয়েছিল। কাউকে দেখতে না পেয়ে সামনের দিকে ফিরে নিজের কাজে মন দেয় সে। এমন সময় হঠাৎ ঘাড়ে একটা সুঁচ ফোঁটার অনুভুতি হয় নীলুর। তারপর আর কিছু মনে নেই। গলাটা শুকিয়ে আসছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে ওর। মনে মনে ভাবার চেষ্টা করলো কোথায় আছে ও?  এমন কোন মাইকা লাল জন্ম নিলো যে ওকে গুম করতে পারে?

একবার যদি এখান থেকে বেরোতে পারে তাহলে কুত্তাটাকে দেখে নেবে। ভাবতে ভাবতে আরেকটা অজানা ভয় ঘাই মারে নীলুর বুকে। কপিল, জগা, চাঁদু, আর কানাইয়ের মতো ওর দশা হবে নাতো? ওকেও কি…না না এসব ভাবলে চলবে না।কিসব ভাবছে ও? এই সময় এসব চিন্তা আসা ভালো না। নিজেকে নিজেই শাসন করে নীলু। এমন সময় বাইরে কার যেন পায়ের শব্দ শোনা যায়।

আড়ষ্ট হয়ে যায় নীলুর সারাশরীর। সে মটকা মেরে পড়ে থাকার ভান করে। দরজাটা মৃদু ক্যাঁচ শব্দে খুলে যায়। একটা ছেলে এক হাতে একটা পুটলি আরেক হাতে একটা হ্যারিকেন নিয়ে ঘরে  ঢোকে। তারপর এগিয়ে আসে নীলুর দিকে। নীলুর একবার মনে হয় চোখ মেলে তাকাবে ছেলেটার দিকে। বুঝে নেবে কে ওকে এনেছে। কিন্তু ওর মনের ভেতর থেকে কে যেন ওকে নিষেধ করে । যেন বলে এই সমুহ বিপদে বোকামো করা উচিত নয়।

ছেলেটা হ্যারিকেনটা পাশে রেখে টর্চটা জ্বালিয়ে নীলুর মুখের উপর ফেলে। যেন পরখ করে দেখে ও সত্যিই অজ্ঞান কিনা। তারপর পুটলি থেকে একটা সিরিঞ্জ আর একটা শিশি বের করে। শিশি থেকে খানিকটা তরল সিরিঞ্জে নিয়ে পুশ করে নীলুর শরীরে। তারপর উঠে চলে যায়।

ছেলেটা চলে যেতেই উঠে বসে নীলু। সুঁচ ফোঁটানো  জায়গাটা জ্বলছে। সাথে জ্বলছে নীলুর চোখ। মা আর গুরুদেব ছাড়া আজ পর্যন্ত কেউ ওর গায়ে হাত দিতে সাহস করে নি সেখানে এই ছেলেটার এত সাহস ওকে সুঁচ ফুঁটিয়ে মুরগীর মতো তুলে এনেছে। ইচ্ছে করছিল উঠে এক রদ্দা বসিয়ে দেয়। কিন্তু পারে নি কারন ছেলেটার বুক পকেটে ওর রামপুরিটা দেখতে পেয়েছে সে। তেমন বেচাল দেখলে যদি চালিয়ে দেয় তাহলে বিপদ।

ওস্তাদ বলতো, “জীবনে সব সময় মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করবি। ” তাই করেছে সে। কানাইয়ের মতো চালাক না হলেও নীলুর মাথা সব সময় ঠান্ডাই থাকে। চরম বিপদেও সে ঘাবড়ে যায় না। ভাবতে ভাবতে হাই পেল ওর। চোখটা লেগে আসছে, ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ছেলেটা কি তবে…আর ভাবতে পারে না নীলু। মেঝেতে শুয়ে পড়ে। গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় সে।

নীলু ঘুমিয়ে পড়ার পর ঘরে ঢোকে ছেলেটা। কাছে এসে ঘুমের গভীরতা বোঝার চেষ্টা করে। সন্তুষ্ট হয়ে একটু হাসি ফুটে ওঠে ছেলেটার ঠোটে। তারপর কাঁধে করে নীলকন্ঠকে বাইরে নিয়ে আসে।অত বড়ো শরীরটা মন্দিরে আনতে যথেষ্ট পরিশ্রম হয় তার।

মন্দিরের সামনে অজ্ঞান নীলুকে রেখে হাঁপিয়ে ওঠে সে। তারপর নীলুকে বিবস্ত্র করে সারা শরীরে তেল সিঁদুর মেখেকয়েকটা বিশেষ চিহ্ন এঁকে  হাড়িকাঠে  মাথাটা রেখে সারাশরীর বেঁধে  দেয় একটা বাঁশের সাথে। তারপর মন্দিরে এক কোণে গিয়ে পোশাক পাল্টে নেয়। পরনে তখন রক্তাম্বর আর উপবীত ছাড়া আর কিছুই নেই তার।

এরপর ছেলেটা মন্দিরের দরজা খোলে। তারপর গর্ভগৃহের প্রদীপ জ্বালায়। এই মন্দিরের বিগ্রহ সাক্ষাত কালভৈরব। অবশ্য এই মুর্তির সাথে তিব্বতের বুদ্ধকপালের অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। মুর্তির পাশে একটা কালীমুর্তি। দেখে বোঝা যায় দুজনেই নিয়মিত পুজো পান।

ছেলেটা বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে থাকে। আর পুজো করতে থাকে। প্রদীপের আলোতে কালভৈরবের বিকটরূপ আরো বিকটও ভয়ংকর লাগছে। ছেলেটা একমনে পুজো করে চলেছে। যেন পৃথিবীতে আর কিছুই তার কাছে অস্তিত্ব রাখে না।

একসময় পুজো শেষ হয়। এবার যজ্ঞ হবে। যজ্ঞের কাঠ সাজিয়ে যজ্ঞাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে যজ্ঞ করতে থাকে সে। যজ্ঞ শেষে একশো আটটা বেলপাতা আহুতির পর এক গভীর ধ্যানে বসে সে।

এক অক্ষন্ড নীরবতা নেমে আসে চারদিকে। নিশাচর পাখি, ঝিঁঝিঁর ডাক সব থেমে যায়।যেন সমগ্র প্রকৃতি স্তব্ধ হয়ে রুদ্ধশ্বাসে প্রতিক্ষা করছে কোনো ভয়ংকর কিছুর।একসময় একটা মৃদু গোঁ গোঁ শব্দ ভেসে আসে। নীলুর জ্ঞান ফিরছে।
চোখ খোলে ছেলেটা। যজ্ঞের আগুনে ঈষৎ লাল দেখায় চোখদুটো। চোখের তারাদুটো অস্বাভাবিক ভাবে বড়ো হয়ে গেছে। একটু মুচকি হেসে বিড়বিড় করে মন্ত্রপাঠ করতে করতে তুলে নেয় খাঁড়াটা। 

একটু সিঁদুরের টিপ লাগিয়ে জবাফুলে রক্ত চন্দন মাখিয়ে পুজো করে তারপর চন্দনটা খাঁড়ায় ঠেকায়।তারপর পাশে রাখা খালি সরা আর খাঁড়াটা নিয়ে গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর অমোঘ নিয়তীর মতো এগিয়ে যায় নীলুর দিকে।

******

৯ই জুলাই ২০১৯, মঙ্গলবার, দুপুর ২টো,‌ টিটাগড়, কলকাতা

আমরা এখন বসে আছি কানাই ঘোষালের বৈঠকখানায়। বৈঠকখানার গোছানো ভাব দেখে মনে হয় বাড়ির মালিক বেশ রুচিশীল ছিলেন। মানে আলমারী,  দেওয়াল সবেতেই রুচির ছাপ সুস্পষ্ট। দেওয়ালে একদিকে ঝুলছে কানাই ঘোষালের কিংসাইজ ছবি। তাতে মালা দেওয়াআছে। ছবি দেখে এটা ভাবতে কষ্ট হয় যে এই মানুষটাই ছিল কানাই ঘোষাল। কাজের লোক আমপান্নার সরবত দিয়ে গেছে। ভাঙা ভাঙা স্বরে বললেন কৃষ্ণা ঘোষাল, “কিছু মনে করবেন না আসলে আমাদের অশৌচ চলছে।আপনারা এই গরমে ভরদুপুরে এসেছেন। তাই এটুকু…।”

রণি বিব্রত হয়, “এমা ছিঃ ছিঃ।এসবের কি দরকার ছিল?  আপনি ভুল ভাবছেন। আসলে আপনাদের বিব্রত করতে আসি নি। আমি জানি আপনাদের এখন শোকের সময়। এসময় বিরক্ত করা অশোভন। কিন্তু কি করা যাবে বলুন? উপরমহলের চাপ। আসলে আপনার স্বামীর মৃত্যুটা এতটাই পিকিউলিয়ার যে আমাদের বাধ্য হয়ে আসতে হলো। আসলে এই কেসটার তদন্তভার আমার হাতে পড়লেও এটার পুর্ণ তদন্তের জন্য মি.মিত্রর উপর দায়ভার পড়েছে। তাই উনি বেশ কয়েকটা কথা জানতে চান।”

মিসেস ঘোষাল ম্লান হেসে বলেন, “আর তদন্ত করে কি হবে? যা গেছে আর ফিরে তো আসবে না।”

এবার ব্যোমকেশ কথা বলে, “ জানি। কানাইবাবু যেখানে গেছেন সেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব। কিন্তু তার মৃত্যুর কারনটা জানা আপনার অধিকারে পড়ে না?”

মৃদু গলায় বলেন মিসেস ঘোষাল, “জেনে কি লাভ? লোকটার তো আর কম শত্রু ছিল না।আগে কতবার বলেছিলাম 'ওগো ওসব ছেড়ে দাও। ওপথে বিপদ ওত পেতে আছে।' শুনে ও কি বলতো জানেন? বলতো, 'বিপদ নিয়ে খেলেই তো মজা। বিপদকে পায়ে পায়ে ল্যাজে না খেলালে কিসের পুরুষমানুষ?' নিজেকে অপ্রতিরোধ্য,  ভগবান ভাবতো। বলতো, 'মা এই জীবন দিয়েছেন মা-ই চাইলে জীবন নেবেন। এতে ভয়ের কি? আমি কালির ডাকাত ব্যাটা আমায় মারবে কার এত বুকের পাটা।” বলে ম্লান হাসেন তিনি।

বাবা!  এই মহিলা দেখছি স্বামী প্রেমে অন্ধ! স্বামী লম্পট হলে কি হবে?  যেন সে কথা মানতে চাননা তিনি। ব্যোমকেশ তাও দু তিনবার চেষ্টা করে। কিন্তু মহিলা যেন স্বামীর মৃত্যু সম্পর্কে উদাসীন। ভাবখানা এমন মানুষটার কপালে ওরকম মৃত্যু ছিলো তাই হয়েছে। এর কারন জেনে কি করবো? রণি আসার সময় বলেছিল বটে, “মহিলার নার্ভ যেন স্টিল দিয়ে বানানো। স্বীকারোক্তি দিলেও স্বামীর মৃত্যু সম্পর্কে একটু বেশীই উদাসীন। অথচ কয়েকটা প্রশ্নে ধোঁয়াশা রয়েছে। মহিলা সেই প্রশ্নগুলো দায়সাড়া জবাব দিয়েছেন। অথচ এই প্রশ্নগুলোর সদুত্তর পেলে কেসটা কিছুটা দাঁড়াবে।”

ব্যোমকেশ হাল ছেড়ে টেবিলে রাখা আমপান্নার সরবতটা নেয়। এক চুমুক খেয়ে বলে, “বাহ খাসা তো! আপনার বাড়িতে বানানো? ”

আচমকা এরকম প্রশ্নে থতমত খেয়ে যান মিসেস ঘোষাল। বলেন, “হ্যা। কেন বলুন তো?”

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ব্যোমকেশ বলে, “মালদার মেয়েরা আর কিছু পারুক বা না পারুক আমের জিনিস ভালো বানাতে পারে। বাড়িতে বানানো আমপোড়া আজকাল উঠেই গেছে।”

ব্যোমকেশ কি আবোলতাবোল বলছে কিছুই মাথায় ঢুকছে না আমাদের। আমি আর রণি চোখাচোখি করলাম। এতো মুল প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছে। কৃষ্ণাদেবী অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “এ আর এমনকি? আমার মা আমার চেয়েও ভালো আমপোড়ার সরবত বানাতেন। ও তো আগে প্রতি গরমকালে আমার হাতের বানানো আমপোড়ার সরবত খেত।”

শরবতটা খেতে খেতে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ব্যোমকেশ “তাই তো দেখছি। আপনার হাতের বানানো আমপোড়ার সরবত খেতে উনি বড়ো ভালোবাসতেন তাইতো আপনি কালিন্দীদেবীর বাড়িতেও একবোতল রেখে এসেছিলেন। যাতে কোনোদিন ওবাড়ি থেকে বেরোলে মানুষটা খালি মুখে না বেরোয়। এতটা ভালোবাসতেন তাকে।”

কথাটা এত অপ্রত্যাশিত ছিল যে ভদ্রমহিলা প্রথম দুমিনিট বুঝতে পারেন নি।পরে বোঝামাত্র চমকে তাকালেন ব্যোমকেশের দিকে। তারপর অস্ফুটে বললেন, “আপনি জানেন? ”

ব্যোমকেশ ফিরে তাকায়, “জানি। আর এটাও জানি মানুষটা পাষন্ড হওয়া সত্ত্বেও এতকিছুর পরও আপনি কেন এত ওর পক্ষ নিচ্ছেন। ভালোবাসা বড়ো বিষম বস্তু কৃষ্ণা দেবী। লোকটা শরীরসর্বস্ব নারীদেহলোভী কামুক হলেও আপনার স্বামী তো! ওর ভরসাতেই মাত্র ষোল বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন। এতগুলো বছর সংসার করার পর লোকটার প্রতি ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি আপনার। তাইতো লোকটার সমস্ত দোষ আপনি পরম ভালোবাসায় নিজের আঁচলে লুকিয়েছেন। এমন কি এখনও লোকটার দোষ লুকিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না। লোকটার জন্যই আপনি জীবনে আর মাতৃত্বের স্বাদ পাবেন না জেনেও আপনার ভালোবাসা এতটুকু টাল খায় নি। বরং কায়মনে ঈশ্বরের কাছে,  আপনাদের গৃহ অধিষ্ঠাত্রীর কাছে প্রার্থনা করেছেন যাতে আপনার আগে লোকটার মৃত্যু হয়।কারন আপনি ভাবতেন লোকটাকে ছাড়া আপনি বাঁচলেও আপনাকে ছাড়া লোকটা বাঁচবে না। সতীর পুণ্যে পতির পুণ্য ভেবে একের পর এক কাজ করেছেন যাতে মরেও লোকটা শান্তি পায়। কিন্তু আপনার এই বিশ্বাস টাল খেল যখন আপনি জানতে পারলেন কানাই ঘোষাল জোকায় একটা ফ্ল্যাটে একটা তরুনীর সাথে রাত্রীবাস করছে। প্রথমে বিশ্বাস না করলেও সন্দেহদানা বাধলো আপনার মনে। সেই সন্দেহ আর ভালোবাসার দোটানায় পড়লেন আপনি। যেদিন কানাই নিখোঁজ হলেন সেদিনই মনের দ্বন্দ ঘোচাতেই একা চলে গেলেন জোকায়।”

এতক্ষন চুপ করে শুনছিলেন মিসেস কৃষ্ণা ঘোষাল এবার ফোঁস করে উঠলেন, “হ্যা গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম আমি জোকায়। গিয়ে কি দেখলাম জানেন? আমার মতোই আরেকটা অসহায় মেয়েকে। যার অসহায়তার সুযোগ নিয়ে বার বার ব্যবহার করেছে ও। হতভাগিনীটার কপাল আমার চেয়েও মন্দ। আমি তো তাও ওর বউ এর পরিচয় নিয়ে বেঁচে আর ও? আপনাদের সমাজের চোখে ওর পরিচয় কি বলতে পারেন? মেয়েটাকে প্রতিরাতে ও ছিবড়ে করে ছুঁড়ে ফেলতো। ঠিক আমার মতো। ভেবেছিলাম গিয়ে দেখবো ওর কাছে গিয়ে কি সুখ পেয়েছে ও।গিয়ে কি দেখলাম জানেন? আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব কে। তখন মনে হয়েছিল এ জীবন বৃথা। সারাজীবন একটা ঠগকে ভালোবেসে গেছি। বদলে কি পেয়েছি? না যোগ্য সম্মান না ভালোবাসা। মেয়েটা যখন দিদি বলে ডুকরে কেঁদে আমায় জড়িয়ে ধরলো সে মুহুর্তে লোকটার প্রতি ভালোবাসা মরে গিয়ে একরাশ ঘৃণা জন্মে গেছে। লোকটার প্রতি আর কোনো ভালোবাসা রাখিনি। রাখতে পারিনি। আজ ও মারা গেছে বলে সমাজ আমায় ওর বিধবা বউ বলছে। কিন্তু ঐ মেয়েটা? মেয়েটার কি পরিচয় হবে? ওর গর্ভে যে বেড়ে উঠছে তার কি পরিচয় দেবে সমাজ বলতে পারেন? স্ত্রীর বিশ্বাস ভাঙা পাপ। কিন্তু একটা অসহায় মেয়ের সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন ঠকানো মহাপাপ। ভেবেছিলাম নিজে মরে এ পাপের জীবন থেকে রেহাই পাবো। কিন্তু মা বুঝলেন অন্য। রেহাই দিলেন অন্যপথে। কিন্তু সে রেহাই ঐ মেয়েটার জীবনের কাঁটা হয়ে গেল। আর কত?  আর কত প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে বলতে পারেন? এই জীবনে কি শান্তি পাবো না ওই লোকটার থেকে? ”

বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন মিসেস কৃষ্ণা ঘোষাল।

ঘরের আবহাওয়া ভারী হয়ে ওঠে। ব্যোমকেশ সরবতটা শেষ করে গ্লাসটা টেবিলে রেখে চুপ করে বসে। মহিলাকে ধাতস্থ হবার সময় দেয়।তারপর বলে, “ এবার আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর পেতে পারি?

(চলবে…)

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২০

বলি চতুর্থ পর্ব


৪ঠা জুন ২০১৯, মঙ্গলবার, সকাল সাতটা,কলকাতা

ফোনটা যখন এলো তখন সবে দু'চোখের পাতা এক করেছে রণি। ঘুম থেকে উঠে খবরটা পেয়ে একটু হতভম্ব হয়ে রইলো সে। তারপর নিস্ফল আক্রোশে ঘুষি মারলো দেওয়ালে। আবার,  আবার আরেকটা খুন। আর এবার থানার সামনেই বডি ফেলে পালিয়েছে। যেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে পুলিশকে। যেন বলছে দেখো এইভাবে তোমাদের সামনে একের পর এক খুন করে যাবো তোমরা শুধু দাঁড়িয়ে দেখবে । দাঁতে দাঁত চেপে আয়নার দিকে তাকায় রণি। ঠিক আছে সেও দেখবে খুনি কতদুর যায়।

চটপট তৈরী হয়ে নেয় সে। তারপর বেরিয়ে পড়ে কালিঘাট থানার উদ্দেশ্যে। গতবারের ঘটনার পর ডাক্তার ওকে বলেছেন বেশী দৌড়ঝাঁপ না করতে। কিন্তু যা শুরু হয়েছে শান্তিতে বসে থাকা অসম্ভব।
থানায় ঢুকে রণি দেখে রাজীবও এসে গেছে। রণিকে দেখে এগিয়ে আসে রাজীব। রণিকে নিয়ে স্পটে যায় রাজীব। রণি দেখে বডি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। চক দিয়ে মার্ক করা হয়েছে জায়গাটা। ব্যারিকেড করা হয়েছে রাস্তাটা তাও চারপাশে একটু একটু করে ভীড় জমতে শুরু করেছে। মিডিয়াও এসে পৌছল প্রায়। একে জায়গাটা ঘিঞ্চি তার উপর চৌমাথার উপর। রণি সবটা দেখে বলে, “কি বুঝলে রাজীব?

রাজীব একটু বিব্রতভাবে বলে, “ব্যাপারটা ভীষণ অড স্যার। বডিটাকে জয়েন্টের অংশ থেকে ভেঙে নারকেল ছোবড়ার দড়ি দিয়ে বেঁধেছে। যথারীতি এটাও beheaded. এবার ওই তেমন ছিন্নভিন্ন  করেনি। তবে ছালটা ছাড়িয়ে নিয়েছে। বডিতে এক ইঞ্চিও চামড়া নেই।”

রণি নিজের গালে হাত রাখে। দুসপ্তাহ হলো ও শেভ করেনি। তাতেই একগাল চাপদাঁড়ি গজিয়ে গেছে। গালে কিছুক্ষন হাত বুলিয়ে,  দাঁড়ি চুলকে নিয়ে রণি বললো, “বডিটা কার আইডেন্টিফাই করতে হবে। এক কাজ করো আগের কেসের পর যতগুলো মিসিং কেস এসেছে সবকটার ডিটেলটা দিও আমার টেবিলে।” বলে থানায় ঢুকলো। তারপর সেখানে যে অফিসার আর কনস্টেবল অন ডিউটি  ছিল । তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলো পুরো ঘটনাটা।

প্রথমে কনস্টেবল যে ছিল সে বলতে শুরু করলো। তার বক্তব্যে যেটা সংক্ষেপে দাঁড়ালো সেটা হলো।কাল সারারাত সে অনডিউটি হয়ে থানার গেটের সামনে বসেছিল। ভোর তিনটে কি চারটে হবে এমন সময় একটু ঝিমুনি লেগে গিয়েছিল তার। ঠিক সেই সময় এক ধপ্ শব্দে ঘোর কেটে যায় তার। বাইরে তাকিয়ে দেখে একটা ট্যাক্সি চলে যাচ্ছে ওদের থানার সামনে দিয়ে। আর থানার সামনে পড়ে আছে একটা বস্তা। আচমকা বস্তাটা ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে তার সন্দেহ হয় । এগিয়ে গিয়ে বস্তাটা নাড়তেই রক্তের ধারা দেখতে পেয়ে সে থানায় ডিউটিরত অফিসার কে ডেকে আনে। তারপর তার আর ওসির অর্ডারে বস্তাটার মুখ খুলতেই আবিস্কার করে লাশটা।

বাকিটা অফিসার বললেন, “বডি পাওয়ার পর আমিই ফোন করি হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টকে।” রণি একটা সিগারেট ধরিয়ে কনস্টেবলকে বলে, “আচ্ছা এই যে তুমি বললে একটা ট্যাক্সিকে যেতে দেখেছো সেটার যদি নম্বর দেখো চিনতে পারবে? ” কনস্টেবল মাথা নেড়ে বলে “নম্বর তো দেখিনি স্যার। আসলে জিনিসটা এতটাই তাড়াতাড়ি হলো খেয়াল করতে ভুলে গেছি।”

কাঁচাখিস্তিটা বেরিয়েই যাচ্ছিল মুখ দিয়ে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বললো, “আচ্ছা বেশ আজকাল তো নানা মডেলের গাড়ি ট্যাক্সি হিসেবে চলে রাস্তায়। মডেলটা চিনবে? ” কনস্টেবল একটু মাথা চুলকে বললো, “হলুদ অ্যাম্বাসেটর ছিল স্যার। তাই ছিল কি? নাকি ওলা গাড়ি গুলো মনে পড়ছে না। তবে রং হলুদই ছিল।” কনস্টেবলের কথায় রণি একটু অবাক হয়ে এগিয়ে আসতেই বুঝলো ব্যাপারটা।

“একি তুমি ড্রিংক করে অন ডিউটিতে আছো? ” রণি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। কনস্টেবল ধরা পড়ে বলে, “ঐ স্যার বডিটা দেখার পর আর সামলাতে পারিনি স্যার তাই নার্ভ চাঙ্গা রাখতে।” বলে কনস্টেবল দুটো আঙুল দেখায়। রণি মাথা নামিয়ে বলে, “হোপলেস!  এই নার্ভ নিয়ে ডিউটি করেন আপনারা? তাহলে পুলিশে কেন অন্য লাইনে যান না?  ” কনস্টেবলটা কাঁচুমাচু মুখে বলে, “সরি স্যার! ”

রণি কিছু বলতে গিয়েও বলে না। কি বলবে সে? কি বলারই বা আছে? লোকটার দিকে তাকায় সে। বয়স্ক লোকটার গড়ন মোটার দিকে হলেও চেহারা দেখে ভগ্নস্বাস্থ্য মনে হচ্ছে। হাত কাঁপছে। আহা কি বলবে সে? কাকে বলবে? রাতের পর রাত জেগে ডিউটি করে বেচারা নিজেই ভীষণ ক্লান্ত। শরীর ঘুম চাইছে কিন্তু তা বলে পার পাওয়া যায় না। উপর মহলের চাপ নিয়ে  সারারাত ঘুমোনোর যো আছে? সারা রাত ওরা পাহারা দেয় যাতে নাগরিকরা শান্তিতে ঘুমোতে পারে। আজ লোকটাকে দেখে মায়া হয় তার। আহা বেচারা। হয়তো প্রেসার রুগি। হয়তো  ডাক্তার বারণ করেছেন উত্তেজনা থেকে দুরে থাকতে। পুলিশের চাকরিতে সেটা থাকবে না তা কি হয়? সকাল সকাল ওরকম বডি দেখে সামলাতে পারেনি। তাই হয়তো…।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রণি। তারপর নরমগলায় বলে, “সরি আমি সেভাবে মিন করতে চাইনি। আসলে মাথাটা হুট করে গরম হয়ে গেল। আমি জানি আপনার অসহায়তা কোথায় কিন্তু আমাদের অবস্থাটাও বুঝুন। একটা খুনি রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে,  একের পর এক নৃশংসভাবে খুন করছে। আমরা তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না! আজ যদি একটু আপনি মনে করতে পারতেন তাহলে হয়তো তদন্তটা অনেক এগিয়ে যেত। এখন অন্ধকারে আমাদের খড়ের গাদায় সুঁচ খুঁজতে হবে। এই খুনিটা আমাদের প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করছে। আমরা পুলিশরা কি পারবো না একে হারিয়ে দিতে?  অবশ্যই পারবো বলুন। আমরা পুলিশ অত সহজে হার মানা আমাদের সাজে না। ওকে হারাবোই আমরা। ও ব্যাটা জানে না আমরা পুলিশরা সকলে যদি একসাথে ওর পেছনে পড়ি ও আর পালাবার পথ পাবে না। যাক গে সে সব কথা। আগে আপনি সুস্থ হন। কদিন ছুটি নিন। আর দেহের যত্ন নিন।” বলে এগিয়ে যায় রণি।

রণি থানার চৌকাঠ পেরবে এমন সময় কনস্টেবলটা বলে ওঠে, “স্যার দাঁড়ান!  আমার মনে পড়ে গেছে। ওটা হলুদ ট্যাক্সিই ছিল। এক ঝলক দেখায় যতদুর মনে হয় নম্বরটা ছিল…।” রণি মাথা নিচু করে হাসে। প্রত্যেকবার এই ভোকাল টনিকটা দারুন কাজে দেয় তার। সে চোর ডাকাত হোক বা পুলিশ । একটু সেন্টু দিলেই কার্যসিদ্ধি। সে পিছন ফিরে তাকায়।

******
বাড়ির ছাদে বানানো জিমে বসে আছে রণি।  মুঠো দুটো রক্তাক্ত।চোয়াল ক্রমশ শক্ত হয়ে আসছে তার। আজ সারা দিন ব্যর্থ। না জানা গেছে মৃতের পরিচয়। না পাওয়া গেছে ট্যাক্সির খোঁজ। আজ সকালে সেই কনস্টেবল এর তথ্য অনুযায়ী খোঁজ করে শুধু জানা গেছে এই নম্বরের ট্যাক্সির নাকি দুদিন ধরে খোঁজ নেই। সেই ট্যাক্সি ড্রাইভারের রিপোর্টও পড়েছে সে। তার মত অনুযায়ী গত পরশু রাত দশটার দিকে এক বৃদ্ধ শিয়ালদা স্টেশন থেকে ট্যাক্সিতে ওঠেন। গন্তব্য বলেন আলিপুর। অতো রাতে প্যাসেঞ্জার পেয়ে একটু বেশীই ভাড়া হেকেছিল সে। বৃদ্ধ প্রথমে আপত্তি করলেও পড়ে রাজি হন।

এসপ্ল্যানেড পার হবার পর ড্রাইভারের হঠাৎ ঘাড়ে মৃদু সুঁচ ফোটার অনুভুতি হয়।  ধীরে ধীরে তার চোখ জড়িয়ে আসে ঘুমে। তারপর আর তার কিছু মনে নেই। ঘুম ভাঙলে সে নিজেকে হাসপাতালে আবিস্কার করে। শুধু তাই নয়। সে দেখে কে যেন তার পরনের উর্দির জায়গায় ধুতি পাঞ্জাবী পরিয়ে দিয়েছে ডাক্তারের কাছে সে জানতে পারে তাকে অচৈতন্য অবস্থায় একজন মধ্য বয়স্ক ট্যাক্সিচালক হাসপাতালে ভর্তি করে গেছে।

এই সুত্র ধরে স্টেশন আর হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজও চেক করেছে রণি। কিন্তু কোথাও কোনো সুত্র পায় নি। লোকটা যেন এইসব সিসিটিভির ফাঁক গুলো জানতো। একটাতেও তার চেহারা দেখতে পায় নি সে। কখনো মাথা নামিয়ে কখনো একপাশের প্রোফাইল আংশিক দেখিয়েই চলে গেছে সে। সেই জায়গা গুলো পজ করে দেখেছে রণি। লোকটা মৃদু হাসছে। যেন বিদ্রুপ করে বলছে, “কিহে পুলিশ! ধরতে পারলে আমায়? পারবে না সে ক্ষমতাই নেই তোমার।”

রাগে সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে রণির। আজকে ডিসি হোমিসাইড ডেকে পাঠিয়েছিলেন। রুমে ঢুকে দেখে ডিসি ডিডিও বসে আছেন। তারপর যা হয় দুজনে মিলে যা নয় তা বললেন তাকে। মুখ বুঁজে সব সহ্য করে বেরিয়ে এসেছিল সে। নিজের রুমে বসে ভাবছিল এরপর কি করবে এমন সময় রাজীব ওর রুমে ঢুকে কিডন্যাপিং এর লিস্টটা দেয়। সাথে পিএম রিপোর্টটাও দেয়।দুটো পড়ে মাথা ভোঁভোঁ করে ওঠে তার। রিপোর্টে বলছে ভিক্টিমকে অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হয়েছিল। আর চামড়াটা মৃত্যুর পরেই ছাড়ানো হয়। মৃত্যুর কারন Execution। মানে মাথাটা কেটে ফেলার পরেই মৃত্যু। মিসিং লিস্ট মিলিয়ে দেখে সে।মিসিং পারসনদের মধ্যে টোটাল বাহাত্তর জন অ্যান্টিসোশ্যাল মিসিং। এ যেন খড়ের গাঁদায় সুঁচ খোজা।

রণি তাও এই মিসিং পার্সনদের ডিটেল বের করতে বলে। কে কিরকম? কোথায় থাকতো?  কি খেত?  কার সাথে শুতো এমনকি মিসিং হবার আগে কোথায় গিয়েছিল সব। রাজীব মাথা নেড়ে বেড়িয়ে যায়।

দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ায় রণি। আজ নিজের ব্যর্থতার উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার। এই রাগের আস্ফালন করছে সে জিমে। জিমঅন্তপ্রাণ রণি আগে কলেজে পড়াকালিন নিয়মিত জিম করতো। চাকরি পাওয়ার পর সময় হতো না বলে সে জিমের কিছু সরঞ্জাম এনে ছাদেই বানিয়েছিল জিম। ডিউটির পর সময় পেলেই জিম করতো সে। তারাপীঠের ঘটনাটার পর ছমাস জিম করেনি। ব্যাপারটা অনভ্যেসের পর্যায় চলে যাওয়ায় একমাস হলো আবার শরীরচর্চা শুরু করেছে।

পাঞ্চিং ব্যাগটার সামনে এসে দাঁড়ায় রণি। হাতের ব্যান্ডেজগুলো শক্ত করে বেঁধে নেয় আবার। সাদা পাঞ্চিং ব্যাগে জায়গায় জায়গায় লাল মুঠোর ছাপ। এই মুহুর্তে রণির ইচ্ছে করছে  পাঞ্চিংব্যাগের বালির পরিবর্তে খুনিটাকে  ভরে ঘুষি মারতে। একবার যদি লোকটাকে হাতের কাছে পেত ভাবতে ভাবতে পাঞ্চিংব্যাগে ঘুষি মারে সে। বাতাসে মৃদু ধপ করে শব্দ হয়। শব্দটা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তারপর একটা ছন্দবদ্ধ সৈনিকের দ্রত পদধ্বনির মতো শোনায়। দুটো হাতের ব্যান্ডেজ আবার রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। রণির তাতে কোনো বিকার নেই। যন্ত্রের মতো সে ঘুষি মেরেই চলেছে। রণির সমস্ত ক্ষোভ,  সমস্ত আক্রোশ যেন জমা হয়েছে ওর দুই মুঠোয়। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে তার। শরীরের গতিবেগের সাথে হাওয়ায় দুলে উঠছে ওর পৈতে। পেশিবহুল শরীরে ঘাম ঝড়ছে। যেত এক অশান্ত দানব ভর করেছে তার মধ্যে। দাঁতে দাঁত চেপে নির্মমভাবে পাঞ্চিংব্যাগে ঘুষি মেরেই চলেছে সে। ঘুষির অভিঘাতে পাঞ্চিংব্যাগের ভেতরে বালি চলকে উঠছে।

পাঞ্চিংব্যাগে ঘুষি মারতে মারতে আচমকা রণি শুনতে পেল ফোনের আওয়াজ। কেউ হয়তো কল করেছে। করুক গে আজ কারো কথা শুনবে না সে। ভেবে আরো জোরে ঘুষি মারতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আবার ফোনটা বেঁজে ওঠে। বিরক্ত হয়ে থামে রণি।

এগিয়ে এসে দেখে ব্যোমকেশ কল করেছে। আজ রবিবার। হয়তো আড্ডায় আসার জন্য। মনে মনে খিস্তি দেয় রণি। চুলোয় যাক সব কটা! ও মরছে নিজের জ্বালায় আর এরা মজা আনন্দে কাটাচ্ছে। কল কেটে দিতে গিয়েও রিসিভ করে রণি। ওপাশে মৃদুমন্দ্রস্বরে ব্যোমকেশ বলে ওঠে, “দুঃখিত তোমাকে বিরক্ত করার জন্য। কিন্তু একটা জিনিস না বললেই নয়। একটা অপরাধীর প্রতি যে রাগটা জমাচ্ছো সেটাকে এভাবে একটা পাঞ্চিংব্যাগে নষ্ট করে কি লাভ বলতে পারো? ”

রণি চমকে ওঠে! এই লোকটা কি থট রিডিংএর সাথে সাথে বাড়িতে বসে সব দেখতে পায় নাকি? ঢোক গিলে বলে, “তুমি কি করে জানলে আমি এই মুহুর্তে পাঞ্চিংব্যাগে পাঞ্চিং করছি? ” ব্যোমকেশ হেসে বলে, “সেটা বড়ো কথা নয়। তোমার কেসের কথা নিয়ে কদিন ভাবছিলাম। একটা আলো পেয়েছি। সেটা নিয়ে ভাবলাম তোমায় ফোন করে বলি কোথাও দেখা করতে। দেখলাম তুমি ফোনই তুলছো না। অগত্যা চলে এলাম সোজা। এসে দেখি বাতাসে ধুপধুপ শব্দ হচ্ছে তাই তোমার মনের কথা আঁচ করেই বললাম কথাটা।”

রণি ছাদের রেলিং এ এসে দেখে নিচে আমরা দাঁড়িয়ে। ফোনে বলে, “কি কান্ড!  একবার বলবে তো?  দাঁড়াও আসছি।” বলে চলে যায়। কিছুক্ষন পর সদর দরজা খোলে রণি। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “হারামজাদা এতদিনে এইবাড়ির কথা মনে পড়লো? ব্যোমকেশ এসো। গরিবের ঘরে স্বাগত।” আমি ফিসফিস করে বললাম, “চারতলা বাড়ি যদি গরিবের ঘর হয় তাহলে আমরা কি ঝুপড়িতে থাকি? ”

রণি শুনতে পেয়ে কি যেন বলতে যাচ্ছিল। ব্যোমকেশ কথা ঘুড়িয়ে বললো, “ওসব পরে হবেক্ষন আগে ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর এগুলোর সদগতি হবে।দেখে তো মনে হচ্ছে। অফিস থেকে বাড়ি ফিরেই নেমে পড়েছো শরীর চর্চায়।” বলে হাতে ধরা প্যাকড সিঙ্গারার ঠোঙাটা দেখায় ব্যোমকেশ। রণি হেসে বলে, “তা বলতে পারো। একমিনিট তোমরা বসো আমি একটু আসছি।”

******

আমরা এখন বসে আছি রণির বাড়ির ড্রইংরুমে। একাই থাকে ও এই বাড়িতে । প্রায় অনেক বছর পর এলাম এই বাড়িতে। শেষবার যখন এসেছিলাম তখনও কাকু কাকিমা বেঁচেছিলেন।

সেন্টার টেবিলে রাখা ঠোঙাটা খালি এখন। অ্যাশট্রে তে ছাই ফেলে গাঁজার সিগারেটে একটান দিলো ব্যোমকেশ। রণি পাশে বসে কফিমাগে চুমুক দিয়ে বললো, “বুঝতেই পারছো ব্যোমকেশ এই নিয়ে দু মাসে কলকাতার পর পর ষোল জন খুন হলো। মিডিয়া আর উপরমহল থেকে যে কি হারে চাপ আসছে আমিই জানি। উই নিড টু স্টপ দিস কিলার রাইট নাও। একের পর এক লোক নিঁখোজ হয়ে খুন হচ্ছে। আর মাথা কাটা অবস্থায় ডেডবডি পাওয়া যাচ্ছে। কারও আবার মাথা সমেত বডি পাওয়া গেলেও এমন অবস্থা করছে যে…!  জাস্ট হরিবল!  এই প্রথমবার কোনো কেসের  মাথামুন্ড বুঝতে পাচ্ছি না। মার্ডারার কে সেটা বড়োকথা নয়। খুনের মোটিভ কি? খুনই যদি করতে হয় এভাবে কেন? সারা শরীরে সিঁদুর, তেল আর কর্পুর মাখা। ? সব গুলিয়ে যাচ্ছে।”  রণিকে বেশ ক্লান্ত লাগলো।

ব্যোমকেশ সিগারেটে শেষটান দিয়ে সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে বললো, “সিপি তো দেখলাম অম্লানবদনে বললেন এ কোনো উগ্রপন্থি বা সেরকম গ্রুপেরই কাজ।” রণি হেসে বলে, “এছাড়া উপায় কি ছিল বলো? পাবলিকের মধ্যে প্যানিক ছড়িয়ে দিয়ে কি লাভ? তাছাড়া এভাবে কতদিন পাবলিককে সাসপেন্সে রাখা যায়? একজন খুনি রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে কিরকম দেখতে জানি না। সে কিরে করছে জানি না। এই অন্ধকারে হাতড়ানোর কথা পাবলিক জানলে কি হবে ভেবে দেখেছ? তাই একাজ করতে বাধ্য হলেন তিনি। অবশ্য এরকম কেস আগে কেউ দেখেনি।”

“তাই কি? ”ব্যোমকেশ সোজাসুজি তাকালো রণির দিকে। তারপর সোফায় হেলান দিয়ে বলতে লাগলো, “এই যে তুমি বলছো এরকম কেস আগে কেউ দেখেনি তা নয়। বেশীদিন না মাত্র প্রায় দেড়শো বছর আগের ঘটনা ইংল্যান্ডে এরকমই একটা ঘটনা ঘটেছিল। তোমরা নিজেদের যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সাথে তুলনা করো সেই স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকেও রীতিমতো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিল সে। সে ছিল ১৮৮৮ সালে লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল জেলার আশেপাশের এবং দারিদ্র্যের দারিদ্র্যপুর্ণ অঞ্চলে সক্রিয় একটি অজ্ঞাত সিরিয়াল কিলার । ফৌজদারী মামলার ফাইল এবং সমসাময়িক সাংবাদিকতার বিবরণী উভয় ক্ষেত্রেই এই হত্যাকারীকে হোয়াইট চ্যাপেল মার্ডারার বা লেদার অ্যাপ্রন বলা হত। বুঝতে পারছো কার কথা বলছি? ” রণি রীতিমতো টানটান হয়ে বসেছে। আমি মৃদু গলায় বললাম, “ জ্যাক দ্য রিপার কি? ”

ব্যোমকেশ মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। “এর শিকার  সাধারণত সেইসব মহিলারা ছিল। যারা পেশায়  পতিতাবৃত্তি অবলম্বন করেছিল। এর পদ্ধতিখানাও ছিল তোমার এই খুনির মতো। গলায় পেটে গভীর ক্ষত। অন্তত তিনটে মৃতদেহ পরীক্ষা করে ডাক্তাররা একটা কথায় সহমত হয়েছিলেন যে হত্যাকারী শারীরবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী।”

“১৮৮৮ থেকে ১৮৯৯ সালের মধ্যে হোয়াইটচ্যাপেল এবং স্পিটালফিল্ডে সংঘটিত এগারো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এই পুলিশি তদন্ত ১৮৮৮ সালের হত্যার সাথে সমস্ত হত্যাকাণ্ডকে একত্রে সংযুক্ত করতে পারত না। যদি না এই পাঁচটা খুন ওদের সামনে আসতো। এই পাঁচজন মৃতারা ছিলো মেরী অ্যান নিকোলস , অ্যানি চ্যাপম্যান , এলিজাবেথ স্ট্রাইড , ক্যাথরিন এডোয়েস এবং মেরি জেন ​​কেলি। এরা “ক্যানোনিকাল ফাইভ” হিসাবে পরিচিত এবং এদের খুনগুলি ৩১ ই আগস্ট থেকে ৯ই নভেম্বর ১৮৮৮ এর মধ্যে প্রায়শই সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বলে মনে করা হয়।”

বলে আবার একটা সিগারেট ধরালো ব্যোমকেশ। একটা লম্বাটান মেরে বললো, “১৮ এপ্রিল ১৮৮৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৯১ সাল পর্যন্ত এগারোটি পৃথক খুনকে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ সার্ভিসের তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং যৌথভাবে পুলিশ ডকেটে এটা “ হোয়াইটচাপেল হত্যাকাণ্ড ” নামে পরিচিত ছিল ।  এই হত্যাকাণ্ডগুলি একই অপরাধীর সাথে যুক্ত হওয়া উচিত কিনা সে সম্পর্কে মতামতগুলি ভিন্ন, তবে এগারো হোয়াইটচ্যাপেল হত্যার মধ্যে পাঁচটি, “ক্যানোনিকাল ফাইভ” নামে পরিচিত, আর এটা নিশ্চিতভাবে জ্যাক রিপারের কাজ বলেই ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়।  বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা মৃতদেহগুলিতে গভীর ক্ষত পেয়েছেন তলপেট কেটে অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির মানে অন্ত্র, লিভার, কিডনি কেটে নেওয়া হয়েছে। আর এটাই ছিল জ্যাকের স্টাইল।  হোয়াইটচ্যাপেল হত্যার ফাইলের প্রথম দুটি মামলা, এমা এলিজাবেথ স্মিথ এবং মার্থা তাব্রামের অবশ্য এই পাঁচটি খুনের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।”

“শুধু জ্যাক দ্য রিপারই কেন? এই পঞ্চাশবছর আগেও এরকম এক খুনির নাম জানা যায়। জোডিয়াক কিলার বলে সেইজন ১৯৬০ সালের পর থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় মানুষ খুন করেছে। এখন পর্যন্ত এই খুনির পরিচয় জানা যায়নি। জোডিয়াক  ১৯৬৮ এর ডিসেম্বর ও  ১৯৬৯ সালের অক্টোবরের মধ্যে বেনিসিয়া, ভ্যালিযু, লেক ব্যারিসা এবং সান ফ্রান্সিসকোতে সক্রিয় ছিল। সে ১৬ থেকে ২৯ বছর বয়সের মধ্যে চারজন পুরুষ ও তিনজন নারীকে হত্যার জন্য টার্গেট করেছিলো। এর স্টাইল আবার এককাঠি উপরে। প্রত্যেক হত্যার পর জোডিয়াক নিজের নামে স্থানীয় পুলিশ ও সংবাদসংস্থাকে জানিয়ে একটি চিঠি দিতো । এসব চিঠিতে চারটি সাংকেতিক ভাষার শব্দ ছিল যার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সমাধান করা হয়েছে। এছাড়া খাস কলকাতার স্টোনম্যান, ইংরেজ আমলে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের ত্রৈলক্য অনেক উদাহরন আছে।”

বলে সিগারেটের ছাই অ্যাশট্রে তে ফেলে ব্যোমকেশ বলল, “তবে এই সব কেসের সাথে তোমার কেসেও একটা প্যাটার্ন খুঁজে পেয়েছি জানো?  মনে আছে সেদিন তোমায় ফোন করে মৃতদের নিখোঁজ হবার তারিখ গুলো জানতে চেয়েছিলাম? সেই তারিখগুলো মিলিয়ে একটা অদ্ভুত মিল পেয়েছি। কাকতালীয়ভাবে সকল মৃতদেহের যেমন একইরকম ক্ষতবিক্ষত অবস্থা,  ঠিক তেমনি সবকটা নিখোঁজও হয়েছে ঠিক অমাবস্যার দিন। আর যাদের মৃতদেহ অক্ষত মানে ধরমুন্ডসমেত উদ্ধার হচ্ছে তারাও অমাবস্যাতে নিখোঁজ হলেও সেই অমাবস্যা ছিল বিশেষ তিথি সম্পন্ন। আর এই জায়গাটাই ভাবাচ্ছে আমায়।” বলে উঠে দাঁড়ায় ব্যোমকেশ।

পায়চারি করতে করতে বলে, “মৃতদেহগুলোর অবস্থা দেখে বোঝা যায় এদের মারার আগে বিশেষভাবে পুজো করা হয়েছে।  তোমার মুখে মৃতদেহের বর্ণনা শুনে যে পুজো পদ্ধতিটা আঁচ করেছি তা মোটেও তন্ত্র সম্মত নয়। তবে কেন এই পুজো? কারন কি এই পুজোর? কেনই বা আততায়ী অমাবস্যার দিনটাই বেছে নিচ্ছে? কেনই বা বেছে নিচ্ছে সেই সব মানুষকে যারা হোক বা দুষ্কৃতি কিন্তু প্রত্যেকেই ব্রাহ্মণ বংশজাত। না না একোনো সাধারণ মানুষ নয়। এ ভীষণ প্রখরবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। এ কোনো উগ্রপন্থি বা হিন্দুবিদ্বেষীর কাজ নয়। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো এই পুজো পদ্ধতিগুলো ভীষণ চেনা লাগছে । কিন্তু মনে করতে পারছি না।”

বলে মুখে বিরক্তিসুচক শব্দ করে বসলো ব্যোমকেশ। “আরো বড়ো সমস্যা হলো এটা তোমাদের লালবাজারের কেস। এতে ততক্ষন আমার এক্তিয়ার নেই যতক্ষন না উপরমহল থেকে অনুমতি পাচ্ছি। তবে আমার গাট ফিলিং কি বলে জানো? ” বলে চুপ করে ব্যোমকেশ।  থমথমে মুখে একটু গম্ভীর গলায় বলে, “এটাই শুরু নয় আর এই খুনের ধারাবাহিকতা এখনই শেষ হবার নয়। এই মারণখেলা আরো চলবে।”

ব্যোমকেশ আরো কিছু বলতো এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। “এখন আবার কে এলো? ” বলে রণি উঠে গেল দরজা খুলতে। ব্যোমকেশ তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইলো অ্যাশট্রের দিকে। অ্যাশট্রেতে রাখা ফুরিয়ে যাওয়া সিগারেট থেকে তখনো হাল্কা ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি ওর মনে এখন ভীষন একটা ঝড় চলছে। ধীরে ধীরে আত্মমগ্ন হয়ে একটা গভীর চিন্তায় ঢুকে পড়ছে সে।

এমন সময় রণি হাতে একটা ফাইল নিয়ে কার সাথে কথা বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো। দেখলাম রণির পেছন পেছন একজন অল্প বয়স্ক অফিসার ঢুকলো। বয়স ঐ পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। মানে আমাদেরই বয়সি । গায়ের রং একসময় ফরসা ছিল হয়তো এখন তামাটে। গড়ন রণির মতো নয় বরং ছিপছিপে তবে একেবারে রোগাও নয়। ছেলেটা আমাদের দেখে থমকে গেলো প্রথমে। তা দেখে রণি বললো, “আরে রাজীব দাঁড়িয়ে রইলে কেন?  ভেতরে এসো।” বলে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, “এই হলো রাজীব যার কথা বলেছিলাম। আর রাজীব,  ও হলো আমার বন্ধু নীলার্ক। আর ওকে হয়তো চেন না তবে নাম শুনে থাকবে। ও ব্যোমকেশ। ব্যোমকেশ মিত্র।”

ছেলেটার চোখ বড়ো হয়ে গেল উত্তেজনায়।  এগিয়ে এসে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললো, “আপনিই ব্যোমকেশ বাবু! আপনার গল্প ‘প্রতিঘাত’ আমি তো পড়েছি ফেসবুকে! ঐ তন্নিষ্ঠর কেসটা যেভাবে আপনি সলভ করলেন তা সত্যিই তারিফযোগ্য!” রণি ফ্যাচ করে হেসে চুপ করে গেল।আর  ব্যোমকেশ দেখলাম আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে নমস্কার করে বললো, “ধন্যবাদটা আমার নয় এনার প্রাপ্য। ইনিই লিখেছেন গল্পটা।” তারপর ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “ও তাই তো তাই তো!  আপনিই তো নীলার্ক মুখার্জী! আমি আপনার গুণমুগ্ধ পাঠকদের একজন। বেড়ে লিখেছেন মশাই। একমিনিট একটা সেলফি নিতে পারি কি?” বলে পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করলো রাজীব।
এই সেলফি ব্যাপারটায় ব্যোমকেশের কোনো ইচ্ছে নেই দেখে অগত্যা আমাকে এগিয়ে আসতে হলো। সেলফি পর্ব মেটার পর ছেলেটা বললো, “এখানে আসার পর রণবিজয় স্যার কে দেখে মনে হতো নামের সাথে সাথে এনার চরিত্র তো পুরো আপনার গল্পের রণির মতো। কে জানতো মানুষটাই সত্যি? তারপর এখানে হঠাৎ করে আপনাদের… মানে…আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না।”

রণি এবার বিরক্ত হয়ে বললো, “আহ রাজীব হচ্ছেটা কি? বি সিরিয়াস! এখনও তুমি অন ডিউটি আছো।” রাজীব এবার সম্বিত ফিরে পায়। কোনোমতে নিজেকে সামলে বলে, “সরি আসলে একটু এক্সাইটমেন্টের চোটে…।” আমি হেসে বলি, “আহা ঠিক আছে কোনো ব্যাপার না আমি বুঝতে পারছি। বসুন আপনি।” ছেলেটা আমাদের উল্টোদিকের সোফায় বসে।  রণি আমার পাশে বসে ফাইলটা খুলে চোখ বোলালো। তারপর একজায়গায় দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো, “স্ট্রেঞ্জ! ভিক্টিমকে অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হয়েছিল?” 



রাজীব মাথা নেড়ে বললো, “ফরেন্সিকের ডাক্তার তো তাই বললেন। যে দিয়েছে সে এই ওষুধটার ব্যবহার জানে। মানে ভিক্টিমের হুঁশ পুরোমাত্রায় থাকলেও সারা শরীর অবশ ছিল। মানে নিজেকে বাঁচানোর ক্ষমতাটুকু ছিল না।”
“মানে যখন খুনটা হয় ভিক্টিমের পুরোপুরি হুঁশ ছিল।”

রাজীব মাথা নাড়ে। রনি এবার রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে দেখে বলে “হুম ডেথটাইমদেখাচ্ছে রাত দেড়টা। ওকে থ্যাঙ্ক ইউ রাজীব। বসো,  চাখেয়েযাও। ” বলে রান্নাঘরের দিকে এগোয়।
রণি রান্নাঘরে যাবার পর রাজীব আমাদের দিকে ফিরে বললো, “তা ব্যোমকেশবাবু হাতে কোনো কেস আছে নাকি এখন?” ব্যোমকেশ মাথা নাড়ে। রাজীব হাত কচলে বলে, “বুঝতেই পারছেন ভীষণ পিকিউলিয়ার কেস।স্যার বলেছেন বোধহয়।তা তেমন হলে আপনার সাহায্য লাগতে পারে।”

ব্যোমকেশ হেসে বলে, “সে আর বলতে হবে না। রণবিজয় ইতিমধ্যেই আমাকেসবটা বলেছে। তেমন দরকার হলে পাশে থাকবো।”রাজীব আশ্বস্ত হয়। রণি আরেকপ্রস্থ চা নিয়ে আসে।  চা খেতে খেতে ব্যোমকেশ বলে, “তবে একটা কাজ করলে আমার একটা উপকার হতো রাজীববাবু।” চায়ে চুমুক দিয়ে রাজীব বলে, “বলুন কি কাজ।” ব্যোমকেশ চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বলে, “গত তিরিশ বছরে কলকাতা আর ওর আশেপাশের অঞ্চলে এরকম কোনো কেস যা অমীমাংসিত ছিল। মানে সেম এই পদ্ধতিতে খুনের কেস আছে কিনা। কাইন্ডলি একটু দেখবেন? আমি জানি এই তিরিশবছরে অনেক অপরাধ ঘটেছে। সেই সব ফাইল খুঁজে আনা অসম্ভব। তবে স্পেসিফিক কিছু মানে এই খুনগুলোর মতো কেস হলে সেটার ফাইল একটু আনতে পারবেন? ”

রাজীব চিন্তিত গলায় বলে, “এটা একটু প্রবলেম হবে কারন এরকম কেস খুঁজতে সময় লাগবে। কেন বলুন তো? আপনি কিছু হিন্ট পেয়েছেন নাকি?”

ব্যোমকেশ যেন নিজেকে গুটিয়ে নিলো।“না না তেমন কিছু না। আসলে তন্ত্র বনাম কুসংস্কার নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখছি। সেটার জন্যই একটু পড়াশোনা দরকার ছিলো। বুঝতেই পারছেন অফুরন্ত সময়। তাই…।” ব্যোমকেশ হঠাৎ এই মিথ্যেটা কেন বললো বুঝতে পারলাম না। কোন প্রবন্ধ? কবে লিখলো?

রাজীব মাথা নেড়ে বললো, “ঠিক আছে। আমি দেখছি আর…।” রাজীবকে থামতে হলো কারন ওর ফোন বেঁজে উঠেছে। চায়ের কাপটা রেখে ও ফোনটা রিসিভ করলো।

“হ্যালো।”

“হুম বলছি।”

কিছুক্ষন পর আচমকা চিৎকার করে উঠলো রাজীব, “কি?  ”

চিৎকারটা এতটাই জোরে ছিল যে চমকে উঠলাম আমি। আর আমার হাতে ধরা চায়ের কাপ থেকে চা চলকে পড়লো প্লেটে। বেশ কিছুক্ষন পর ফোনটা কেটে রণির দিকে তাকিয়ে বললো, “এই মাত্র হাজরা ফোন করেছিল স্যার।মিসিং লিস্ট অনুযায়ী টিটাগড়ের একজন মিসিং পার্সন ছিলো কানাই ঘোষাল। একটু আগে সন্ধ্যের দিকে একজন এসে কানাই ঘোষালের বাড়িতে গিয়ে কানাই ঘোষালের খোঁজ করে। বাড়িতে কানাই ঘোষালের স্ত্রী আর মা থাকেন। ডাক শুনে কানাই ঘোষালের স্ত্রী বেরিয়ে আসেন। লোকটা জিজ্ঞাসা করলে জানান যে কানাই ঘোষাল একটা কাজে দুদিনের জন্য দিল্লী গেছে। লোকটা সব শুনে বলে যে একটা পার্সেল কানাইয়ের জন্য এসেছে। যদি কানাই থাকতো তো ভালো হতো।সবটা শুনে কানাই ঘোষালের স্ত্রী পার্সেলটা রিসিভ করেন। তারপর বারান্দায় এসে পার্সেলটা খুলে দেখেন।পার্সেলের ভেতর একগাদা জবাফুলের সাথে কানাই ঘোষালের কাটা মাথা পাওয়া গেছে স্যার! তখন অন্ধকার হয়ে আসছিলো বলে মিসেস ঘোষাল বুঝতে পারেন নি লোকটা কে ছিল। টিটাগড়ে এই মুহুর্তে পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ স্যার। কানাই ঘোষালের দলের লোকেরা ভীষন ক্ষেপে আছে।যে কোনো মুহুর্তে খুনোখুনি হতে পারে।”

রণি স্তম্ভিত হয়ে যায় তারপর লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “মাই গড! হা করে বসে দেখছো কি ? লোকাল থানার সমস্ত ফোর্স পাঠাতে বলো। আমাদের ইমিডিয়েটলি বেরোতে হবে।” বলে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, “ব্যোমকেশ বুঝতেই পারছো। একটা ভীষণ এমার্জেন্সী পড়ে গেছে বলে যেতে হচ্ছে।তো সরি টু সে তোমাদের আজ একটু উঠতে হবে। ভাবলাম আজ এখান থেকে বালুর বাড়িতে গিয়ে বেশ একটা আড্ডা দেবো তার জায়গায়। তবে তোমাদের মোড়ে নামিয়ে দিচ্ছি ট্যাক্সি-বাস পেতে অসুবিধা হবে না।”

ব্যোমকেশ উঠে অবাক গলায়  বলে, “একমিনিট!  একমিনিট!  কানাই ঘোষালের দলের লোক মানে? কে এই কানাই ঘোষাল? যার মৃত্যুতে বিক্ষোভকারিদের সামলাতে এত পুলিশ লাগবে? কোনোস্থানীয় রাজনৈতিক লিডার গোছের কেউ নাকি কোনো সেলিব্রিটি?”

রণি গম্ভীর গলায় বলে “সেলিব্রিটিই বটে।টিটাগড়ে শুধু টিটাগড় কেন গোটা নর্থ কলকাতা ওকে একডাকে চেনে।একমিনিট তোমরা দাঁড়াওআমি রেডি হয়ে আসছি।” বলে নিজের বেডরুমে ঢোকে রণি।

আমরা হতভম্ব হয়ে রাজীবের দিকে তাকালে সে মাথা নেড়েঢোক গিলে বলে,“না ও কোনো সেলিব্রিটি নয়। একজন মাস্তান কামসামনের ইলেকশনে রুলিং পার্টির মনোনীত প্রার্থী। এলাকায় মারাত্মক ভয়ংকর দুষ্কৃতি হিসেবে পরিচিত।এলাকার লোকে ওকে ডাকে কষাই ঘোষাল বলে।ও হলো টিটাগড়ের কানাই ঘোষাল। প্রে করুন খুনিকেযাতে খুঁজে পাই নাহলে টিটাগড়ের সাথে সাথে পুরো নর্থ কলকাতা জ্বলে উঠবেওর দলের লোকের জন্য।”

(চলবে…)

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...