২২শে জুলাই, সোমবার, ২০১৯, সকাল সাড়ে এগারোটা, মাল্লারপুর, বীরভূম
বীরভূমের এই জায়গাটা বেশ ঘিঞ্চি।বেশ একটা ছোটোখাটো শহরের মতো। আমরা রামপুরহাটে গতকাল এসেছি।ব্যোমকেশ রামপুরহাট যাচ্ছে শুনে শাম্বই আমায় ম্যানেজে ছাড়লো। তবে এমনি এমনি ছাড়েনি। বেশ কয়েকটা লেখার সেকেন্ড ড্রাফ্ট ল্যাপটপে ডকুমেন্ট ফরম্যাটে আনতে হয়েছে। ব্যোমকেশ এসেই আমাকে হোটেলে রেখে একঘন্টার মধ্যে টইটই করে ঘুরে ফিরে এসে বললো, “কাল বিকেলে ফিরবো। তার আগে সকালে একজায়গায় যেতে হবে। তৈরী থেকো বেশ দুরে যেতে হবে। ভোরবেলা বাসে যাবো।” বলে নিজের ব্যাগ খুলে তোয়ালে আর জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমে চলে গেল।আমার স্নান কমপ্লিট ছিলো। ল্যাপটপে ড্রাফ্ট কারেকশনে মন দিলাম।
বিকেলবেলা অটো ধরে তারাপীঠ ঘুরে এলাম। মনটা পুরোনো দিনের স্মৃতিতে ভরে গেল। এই তারাপীঠেই তো ঘটেছিল তারাপদ আর ব্যোমকেশের সেই যুদ্ধ। ব্যোমকেশ দেখলাম এবার মহাশ্মশানের সামনে একটু থমকে দাঁড়ালেও ভেতরে ঢুকলো না। হয়তো ওরও পুরোনো কথা মনে পড়েছিল কিন্তু এসময় পুরোনো স্মৃতিচারনের সময় নয়। আমরা যখন নাটমন্দিরে বসলাম ততক্ষনে সন্ধ্যারতী শুরু হয়ে গেছে। ব্যোমকেশ গোটা সন্ধ্যারতীতে মায়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। যেন আসন্ন মহাযুদ্ধের জন্য অনুমতি চাইছে মায়ের কাছে।
সন্ধ্যারতীর পর মাকে প্রণাম করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। রাতে আর তেমন কিছু ঘটলো না। পরদিন ভোরে আমরা বাসে উঠলামগন্তব্যের উদ্দেশ্যে। বাস থেকে যখন আমরা নামলাম বেশ বেলা হয়ে গেছে। জায়গাটার নাম বেশ অদ্ভুত। মাল্লারপুর। বেশ ঘিঞ্চি এলাকাটা। ব্যোমকেশ এগিয়ে একটা টোটোচালককে বললো পঞ্চায়েত অফিস যাবে।
বাজার অঞ্চল ছাড়িয়ে গ্রামের সরু পিচের পথে চললো আমাদের টোটো।পঞ্চায়েত অফিসের সামনে আমাকে দাঁড়াতে বলে ভেতরে ঢুকলো ব্যোমকেশ। প্রায় মিনিট পনেরো পরে বেড়িয়ে বললো, “চলো এবার অসীত সমাদ্দারের বাড়ি যাওয়া যাক।”
অবাক হয়ে বললাম “সে আবার কে? ”
ব্যোমকেশ হেসে রহস্যমেশানো গলায় বললো, “এই কেসের মিসিং লিঙ্ক। দেখা যাক উনি কিছু বলেন কিনা।”
বলেই পঞ্চায়েত অফিসের পাশে একটা পানের দোকানে বাড়ির ঠিকানা জেনে নিয়ে এগিয়ে চললো। ওর পেছন পেছন আমিও চলতে লাগলাম। বেশীদুর যেতে হলো না মিনিটদশেক হাটার পর একটা পুরোনো মাটির দোতলা বাড়ির সামনে দাঁড়ালাম। রাস্তার ধারে পুকুরপাড়ে একটা বউ কাপড় কাঁচছিলো। তাকে জিজ্ঞেস করতেই আঙুল দিয়ে ইশারায় দেখিয়ে দিলো।
গ্রাম থেকে একটু ভেতরে এই বাড়িটা। একটু জরাজীর্ণ দেখতে হলেও এখনো বেশ মজবুত।দেওয়ালে ঘুঁটে আর মেঝেতে আলপনা ওর গোবর লেপার চিহ্ন দেখে বোঝা যায় বাড়িতে লোক থাকে। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি।
আশেপাশে অনেক নাম না জানা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। দরজায় কড়া লাগানো। ব্যোমকেশ দরজার কড়া নাড়তে গিয়ে থমকে গেল তারপর আমাকে ফিসফিস করে বললো, “শুনতে পাচ্ছো? ”
কিছুক্ষন ধরেই পাখির ডাকের মাঝে একটা ক্ষীণধাতব শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। যেন কোনো ভারী ধাতব কিছু পাথরের উপর ঘষা হচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম বোধহয় কোনো পাখির ডাক হবে। ব্যোমকেশের কথা শুনে বুঝলাম আমি একাই নই ওর কানেও গেছে শব্দটা। আমি মাথা নাড়তেইও বললো, “দরজায় কান পেতে দেখ। শব্দটা ভেতর থেকে আসছে না? ” আমি কান পেতে দেখলাম ঠিক তাই। ভেতর থেকে একটা ক্ষীণ অথচ অবিরাম শব্দ ভেসে আসছে। আমি মাথা নাড়লাম।
ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে দাঁড়ালো। তারপর কড়া নাড়লো।কড়ার নাড়ার সাথে সাথে শব্দটা থেমে গেল।কিছুক্ষন পর দরজা খুলে বেড়িয়ে এলেন এক প্রৌঢ়। গায়ের রং ময়লা। পরনে নিম্নাঙ্গে একটা লুঙ্গি মালকোচা করে পরা । উর্ধাঙ্গে পোশাক নেই। গড়ণ দেখে মনে হয় এককালে বেশ খেলাধুলো অথবা শরীরচর্চা করতেন ভদ্রলোক। বয়সের কারনে পাক ধরেছে জুলপিতে আর দাঁড়িতে। তবে ভদ্রলোকের চেহারার মুল আকর্ষণ হলো তার গোঁফ। বেশ একটা মোটা পাঁকানো জাঁদরেল মিলিটারি গোঁফ ভদ্রলোকের।
ভদ্রলোককে দেখে মনে হয় কোনো পরিশ্রমের কাজ করছিলেন কারণ এই সকালবেলাতেও বেশ ঘেমে গেছেন তিনি। ঠোটের এককোণে একটা জ্বলন্ত বিড়ির ধোঁয়া টানতে টানতে বাজখাই গলায় বললেন, “কি চাই? চাঁদা ফাঁদার মতলবে এলে কেটে পড়ো। এখানে কোনো লাভ হবে না।”
ব্যোমকেশ এগিয়ে বললো, “অসীতবাবু বাড়িতে আছেন? ”
ভদ্রলোক ব্যোমকেশকে আপাদমস্তক দেখে বললেন, “কে ইন্সিওরেন্স কম্পানি না রিপোর্টার? ”
ব্যোমকেশ হেসে বললো, “কোনোটাই নয় আমি থানা থেকে আসছি।”
লোকটা কিছুক্ষন আমাদের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলো তারপর হোহো করে হেসে ফেলল। আমরা অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। একি পাগলটাগল নাকিরে বাবা? এভাবে হাসছে? হাসতে হাসতে লোকটা বলল, “ঢপ মারার আর জায়গা পাওনি? পুলিশের লোক? মসকরার একটা লিমিট আছে। যাও যাও! কেটে পড়ো দুজনে। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে।কাজের সময় যত্তসব! ”
ব্যোমকেশ হাসি হাসি মুখে বললো, “বেশ চলে যাচ্ছি।তবে যাবার আগে একটা কথা ছিল। খাঁড়াটার ধারটা কিসের উপর পরীক্ষা করবেন জানতে পারলে ভালো হতো।”
মুহুর্তের মধ্যে লোকটার হাসি মিলিয়ে গেল। ব্যোমকেশের দিকে রক্তচোখ মেলে তাকালো লোকটা। বাপরে কি ভয়ংকর সেই দৃষ্টি ! যেন চোখের দৃষ্টি দিয়ে ভষ্ম করে দেবে ব্যোমকেশ কে। ব্যোমকেশ হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে রইলো। লোকটা দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “অহেতুক কৌতুহল যে আমি পছন্দ করি না। সেটা এই এলাকায় সকলে জানে। এবং অহেতুক কৌতুহলের ফল সব সময় যে ভালো হয় না আশা করি তোমরাও জানো। কাজেই বলছি যেখান থেকে এসেছো ফিরে যাও না হলে ফল ভালো হবে না।” বলে ব্যোমকেশের মুখের উপর দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো লোকটা।
ব্যোমকেশকিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে বিড়বিড় করে বললো, “বেশ তো চলেই যাবো আমরা। কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর পেলেই চলে যাবো। যতক্ষন সেটা না পাচ্ছি আমি হাল ছাড়বো না।” বলে সদর দরজা ছেড়ে রাস্তায় নেমে উল্টো দিকে হাটতে লাগলো ব্যোমকেশ। মাথা নিচু করে কিছুদুর হেটে আরেকটা পোড়ো বাড়ির সামনে দাঁড়ালো ব্যোমকেশ।
এই বাড়িটাও আগের বাড়িটার মতোই পুরোনো। তবে এটার অবস্থা ভীষণ সঙ্গীন। যেন কোনো মৃতদেহ হাড়গোড় বের করে পড়ে আছে।দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটায় বহুকাল কেউ থাকেনা। ব্যোমকেশ এগিয়ে গেল বাড়িটার দিকে। পিছন পিছন আমিও গেলাম। বাড়িটার সামনে গিয়ে দেখলাম যা ভেবেছিলাম তাই, বাড়িটা পরিত্যক্ত। বৃষ্টিতে ভিজে মাটির দেওয়াল প্রায় গলে গেছে। খড়ের চাল ভেঙে গেছে।
পুরোনো কাঠের দরজায় লাগানো তালায় মরচে ধরেছে। ব্যোমকেশ দেখলাম দাওয়ায় উঠে দরজায় লাগানো তালাটাকে অনেকক্ষন নেড়ে চেড়ে দেখে উঠোনে নেমে এলো ।তারপর নিচে বসে কিছুক্ষন মাটিতে কি একটা খুঁজে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা হাটতে লাগলো। তবে থেমে থেমে। যেন পা গুনছে। ব্যোমকেশের পেছন পেছন আমিও হাটতে লাগলাম। ব্যোমকেশ হাটতে হাটতে একটা উচু ঢিপির সামনে দাঁড়ালো। ঢিপিটা বেশী উচু নয় ঐ ফুট চারেক হবে। ব্যোমকেশ সেটায় উঠে সোজা তাকালো সামনের দিকে। তারপর চারদিকে তাকিয়ে এক জায়গায় থমকে তাকালো।
এরপর ঢিপি থেকে নেমে পা গুনে চলতে শুরু করলো সেই দিকে। এদিকটায় গাছপালা আর আগাছা ক্রমশ ঘন হতে শুরু করেছে সেটা সামনে গিয়ে একটা জঙ্গলে মিশেছে। ধীরে ধীরে সেই জঙ্গলে প্রবেশ করলাম আমরা। ক্রমশ জঙ্গল ঘন হতে লাগলো ডালপালা গুলো হাত দিয়ে সরিয়ে এগোতে লাগলাম। জঙ্গলটা বেশ নিস্তব্ধ। পাখির ডাকনেই এমন কি ঝিঁঝিঁর ডাকও নেই ।শুধু শুকনো পাতার উপর দিয়ে আমাদের সাবধানের পা ফেলার মর্মর শব্দটাই কানে আসছে। যেন এই জঙ্গলে চিরশান্তি বিরাজ করছে। কিছু দুর গিয়ে জঙ্গল ক্রমশ পাতলা হতে লাগলো।আমরা একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়লাম। বুঝতে পারছিলাম যে জঙ্গলের মাঝে আমরা দাঁড়িয়ে। চারদিকে ঘনজঙ্গল হলেও জঙ্গলের মাঝখানে জায়গাটা বেশ ফাঁকা। নিচে নরম ঘাসের চাদর ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। এত ঘন জঙ্গলের মাঝে এই ফাঁকা জায়গা কি করে এলো সেটার উত্তরও আমার সামনে দাঁড়িয়ে।
মন্দিরটা বেশ পুরোনো। তবে এর কারুকাজ গুলো অপরুপ। এরকম শিল্প দেখা যায় খাজুরাহে, কোনার্কে। নর্তকীগুলোর ফিনিশিং এতটাই নিখুঁত যেন জীবন্ত। যেন স্পর্শ করা মাত্রই চোখ মেলে তাকাবে। ব্যোমকেশ এগিয়ে গেল মন্দিরটার দিকে। চারপাশ দেখে মনে হয় না এখানেও কেউ আসে। মন্দিরটার জন্য আফসোস হলো। সৌন্দর্যে ভারতের তাবড় তাবড় মন্দিরকে টেক্কা দিতে পারে এ মন্দির। অথচ তা না হয়ে এইভাবে প্রকৃতির আড়ালে হেলায় পড়ে আছে।
ব্যোমকেশ এগিয়ে মন্দিরের সামনে দাঁড়ালো। এবার আমিও অবাক হলাম। মন্দিরের সামনে একটা হাঁড়িকাঠ।পুরোনো হলেও বেশ টেকসই।পুরু করে সিঁদুর মাখানো। হাঁড়িকাঠের সামনে ধূপকাঠি জবাফুল দেওয়া। তারমানে এই জঙ্গলেও মানুষের আনাগোনা আছে? ব্যোমকেশ কিছুক্ষন মাটিতে বসে হাঁড়িকাঠটাকে দেখলো। তারপর উঠে মন্দিরের সামনে জুতো খুলে মন্দিরে ঢুকলো।
মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজাতেও তালা দেওয়া। তবে এই তালাটা নতুন। ব্যোমকেশ তালাটা পরীক্ষা করে দরজাটা ফাঁক করে ভেতরে দেখার চেষ্টা করলো। কিছুক্ষন পর পিছন ফিরে এসে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো দরজার চারদিকটা। তারপর নেমে এসে জুতো পড়ে মন্দিরের পেছনে যেতে লাগলো। মন্দিরের পিছনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো সে। দেখলাম উত্তেজনায় মুখ চোখ লাল হয়ে গেছে তার।মন্দিরের পেছনে সেএকদৃষ্টে তাকিয়ে। আমি একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম। ব্যোমকেশের পাশে গিয়ে ওর দৃষ্টি অনুসরন করে যেটা দেখলাম সেটা দেখে একমুহুর্তের জন্য আমার বুক কেঁপে উঠলো।
কালীমুর্তি অনেক দেখেছিআমি তবে এরকম নৃশংষ ভয়ংকর অদ্ভুতদর্শন কালীমুর্তি জীবনে দেখিনি। প্রায় আটফুট লম্বা মুর্তি। আটহাতের মধ্যে দুটো হাতে হাতি তুলেছেন দেবী। বাকি ছয়হাতে নানাবিধ অস্ত্র। কোমরে একটা প্রকান্ড সাপ কুন্ডলী মেরে লজ্জা নিবারন করছে। দেবী ভীষণ ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে।যেন ভীষণ রুষ্ট হয়েছেন।দেবীর জিভটা ঠিক কালিঘাটের কালির মতো বিশাল আকারের।জিভের পাশদিয়েযেটুকু দাঁত দেখা যাচ্ছে পুরোটাই তীক্ষ্ণ ক্যানাইন ধর্মী। গজদাঁতের মতো কষ দিয়ে দুটো প্রকান্ড স্বদন্ত বেড়িয়েছে।মনে হচ্ছে যেন দেবী হাসছেন তবে সেই হাসিতে নির্মলতা নেই বরং আছে একটা ক্রুর ইঙ্গিত । এই ক্রোধপুর্ণ হাসির নিদর্শন সহজে দেখা যায় না। শিল্পী দুটোই মিশিয়ে দিয়েছেন মুর্তিতে। ধন্য শিল্পীর কারুকার্য! ধন্য তার কাজ।
ব্যোমকেশ কিছুক্ষন তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইলো মুর্তিটার দিকেতারপর বিড়বিড় করে বললো, “তারমানে আমি ঠিক পথেই এগোচ্ছি। হুম পুরোটা মিলে গেছে। এদিকেই জানতাম। তবে এতোটা…! ” বলে স্থির হয়ে গেল ব্যোমকেশ। বাতাসে কান পেতে কি একটা শোনার চেষ্টা করলো। তারপর হন হন করে হাটা দিলো জঙ্গলের উল্টো পথের দিকে। আমি কিছু না বুঝতে পেরে ওর পিছনে হাটতে লাগলাম।
জঙ্গল থেকে যখন আমরা বেরোলাম দুপুর হয়ে গেছে।ব্যোমকেশ সোজা হেটে সদর রাস্তায় এসে একটা টোটো ধরলো তারপর বাসস্টপে নেমে বললো, “আপাতত এখানকার কাজ শেষ। এখন এখানে না থাকাই আমাদের পক্ষে মঙ্গল। পেছনে ফেউ লেগেছে। বাঁচতে হলে আজ রাতের মধ্যে আমাদের রামপুরহাট ছাড়তে হবে।তবে চিন্তা নেই আবার আমাদের ফিরতে হবে এখানে। ” বলে মৃদু হাসলো ব্যোমকেশ। এই প্রথম ওর মুখে আতঙ্ক, ক্রোধ আর দৃঢ় সংকল্প মেশা একটা অভিব্যক্তি দেখলাম।
ব্যোমকেশ আরো কিছু বলতো তার আগে রামপুরহাটগামীএকটা বাস এসে গেল। সেই বাসে উঠলো ব্যোমকেশ। আমার কাছে গোটা ব্যাপারটা তখনো ধোঁয়াশার মতো। কি ছিল ঐ মন্দিরটাতে যে পেছনে ফেউ লাগবে? কে লাগাবে ফেউ? কেন? আমাকে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যোমকেশ বাস থেকেই তাড়া দিলো। সম্বিত ফিরে দেখলাম বাস ততক্ষনে চলতে শুরু করেছে। আমি কোনোরকমে দৌড়ে বাসে উঠলাম।
******
রামপুরহাটে পৌছে আমরা থানায় গেলাম।থানার ওসি সুরেন বক্সির সাথে আগেরবারই আলাপ হয়েছিল। ভদ্রলোক বেশ খাতির করলেন ব্যোমকেশ কে। চা সিঙারা সহযোগে কথা হলো আমাদের। ব্যোমকেশ আজকের মন্দিরের ঘটনাটা বাদ দিয়ে যতটা সম্ভব রেখে ঢেকে সবটা বললো। ওসি সব শুনে যতটা পারেন সাহায্য করবেন আশ্বাস দিলেন।
থানা থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে জিজ্ঞেস করলাম, “এবার কোথায়? ” ব্যোমকেশ হাটতে হাটতে একটা গাঁজার সিগারেট ধরিয়ে বললো, “এবার হোটেলে গিয়ে স্নান করে ব্যাগপত্র নিয়ে সোজা বাড়ি। তার আগে… একমিনিট এদিকে এসো তো ।” বলে সোজা এগিয়ে গেল। আমি ওর পেছন পেছন হাটতে লাগলাম। কিছু দুর গিয়ে একটা চোরাগলিতে ঢুকে আমার হাত ধরে সেখানে টেনে নিয়ে ইশারায় চুপ করতে বলে যে দিক দিয়ে আসছিলাম সেদিকে তাকাতে বললো।
আচমকা ঘটনার আকস্মিকতায় আমি বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। ব্যোমকেশের কথামতো তাকাতেই আমি শিঁউরে উঠলাম। একটা লোক, রোগামতো সিড়িঙ্গে চেহারা। পরনে একটা কালো আলখাল্লা। হাতে একটা একমানুষ সমান লম্বা লাঠি। আমাদের পেছন পেছন আসছিল হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। রাস্তার দুটো ল্যাম্পপোষ্টের আলোর মাঝে দাঁড়িয়ে লোকটা। সামনের ল্যাম্পপোষ্টের আলোটা ক্ষীণ বলে চেহারাটা অস্পষ্ট দেখতে পারছি।অথচ পেছনের ল্যাম্পপোষ্টের জোড়ালো আলো লোকটার পেছনে পড়লেও লোকটার কোনো ছায়া মাটিতে পড়ছে না। লোকটার পায়ের দিকে তাকিয়ে আরো অবাক হলাম। লোকটা যেন মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই। যেন হাওয়ায় ভাসছে।
ব্যোমকেশকে সেটা দেখাতেই ও মাথা নেড়ে জানালো যে সেও এটা লক্ষ্য করেছে। তারপর আমাকে পিছিয়ে আসতে বলে একটা অদ্ভুত কান্ড করলো ব্যোমকেশ। একটু এগিয়ে কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে কি ভাবলো তারপর একটা লম্বা টান দিলো সিগারেটে।গাঁজার সিগারেট অর্ধেক হয়ে গেল ঐ একটানে। তারপর একবুক ধোঁয়া ছেড়ে আরেকবার টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লো। পরপর দুটো লম্বা টানে সিগারেটটা শেষ হয়ে গেল। কিন্তু একি? একি দেখছি আমি?
ধোঁয়া গুলো ক্রমশ মানুষের আদল নিচ্ছে। দুটো মানুষের আদল। ক্রমশ আদলগুলো চেনা লাগছে আমার, ভীষণ চেনা। আরে! এতো আমরা! মানে হুবহু আমি আর ব্যোমকেশ।যেন আমাদের যমজ এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের সামনে। ব্যোমকেশ ওদের সামনে দিয়ে যেতে বলে উল্টোপথ ধরলো। চাপাগলায় বললো, “আর দেরী নয়।চলো আমার সাথে।এদিক দিয়ে একটা শর্টকাট আছে। তাড়াতাড়ি হোটেলে পৌছে যাবো ।”
আমি তখনো গোটা ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম না। ব্যোমকেশের পেছন পেছন যেতে যেতে বললাম, “ওটা কি করলে? ” ব্যোমকেশ হাটতে হাটতে বললো, “ছায়াহীন মানুষের জন্য ধোঁয়ার মানুষ তৈরী করলাম। এর বেশী বলবো না কারন বললে বুঝবে না। এটুকু জেনে রাখো আমরা যে এই রামপুরহাটে এসেছি সেটা আমাদের সেই অজানা খুনি জানতে পেরেছে। আর আমরা যে তার সাধনক্ষেত্র তথা খুনের জায়গায় গিয়েছিলাম সেটাও জানতে পেরেছে। এবার প্রমাণ লোপাটের জন্য সে যা খুশি করতে পারে। তাই প্রাণ বাঁচাতে হলে আমাদের পালাতে হবে।”
ব্যাপারটা বুঝতে আমার বেশীক্ষন লাগলো না। আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অস্ফুটে বললাম, “তার মানে ঐ মন্দিরটা…” ব্যোমকেশ মাথা নাড়লো।
“কি সর্বনাশ! আমাদের উচিত ছিলো থানায় সবটা জানানো।”আমি চিৎকার করে বললাম
ম্লান হেসে ব্যোমকেশ বললো, “প্রমাণছাড়া এ যে অসম্ভব।তাছাড়া আমি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নই। হাতেনাতে প্রমাণ না পেলে নিশ্চিত হওয়া যায় না ভায়া। আর বেশী জানাজানি হলে খুনি সতর্ক হয়ে যাবে। হয়তো খুনের জায়গা পাল্টে নেবে। তাই এখন কিছু না করে অপেক্ষা করাটাই শ্রেয়। তবে হ্যা ওখানে গিয়ে খবরদার এখানকার কথা কাউকে বলবেনা।তোমাকে বিশ্বাস নেই। কখন কাকে বলে দেবে। একদম মুখে কুলুপ এঁটে থাকবে বুঝেছ? ” আমি মাথা নাড়তেই ব্যোমকেশ বললো, “অবশ্য বললেও ক্ষতি নেই।বরং আটঘাট বাঁধতে সুবিধেই হবে।তবে অধিকন্তু ন দোষায়। তাছাড়া…এখনও অমাবস্যা আসতে অনেকদিন বাকি।” বলে হাটতে লাগলো ব্যোমকেশ।
******
২৯শে জুলাই ২০১৯, সোমবার, সকাল দশটা কলকাতা
আজ সাতদিন হয়ে গেল আমরা রামপুরহাট থেকে ফিরেছি। ব্যোমকেশ ফিরে এসেই ভীষণ রকমভাবে চুপ মেরে গেছে। যেন এই কেসটা নিয়ে ওর কোনো চিন্তাই নেই। চুপচাপ নিজের ঘরে বসে সিগারেট টানছে। আর অলসভাবে আগের কেসের জেরক্সফাইল গুলো পড়ছে। সেদিন হোটেল থেকে আমরা স্টেশনে পৌছবার পর কি একটা মনে হওয়ায় আমাকে স্টেশনে দাঁড়াতে বলে কোথায় বেরিয়ে গেল। যাবার সময় বললো ট্রেন আসার আগেই ফিরবে। যদি তার আগে ট্রেন চলে আসে তাহলেযাতে আমি ট্রেনে উঠে পড়ি। ও পরের ট্রেনে চলে আসবে।
সেদিন ট্রেন আধাঘন্টা লেট ছিলো বলে স্টেশনের বেঞ্চে বসেছিলাম। দশমিনিট, পনেরো মিনিট, পঁচিশমিনিট কেটে গেল অথচ ব্যোমকেশের কোনো পাত্তা নেই। ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠলাম আমি।কি এমন কাজ ব্যোমকেশের? এতক্ষন কেন লাগছে? কোথায় ও? ভাবতে ভাবতে দেখলাম ট্রেন এসে গেছে।
ট্রেনের বাঙ্কে ব্যাগপত্র রেখে সিটে বসলাম। ট্রেনটা যখন ছাড়বে ঠিক সেই মুহুর্তে ব্যোমকেশ কে দেখলাম স্টেশনে ঢুকতে। ওকে জানলা দিয়ে হাত বের করে চিৎকার করে ডাকলাম। ব্যোমকেশ আমায় দেখতে পেয়ে দৌড়ে এল। কম্পার্টমেন্টে উঠে আমার পাশে বসে হাপাতে লাগলো। জলের বোতল এগিয়ে দিতেই খানিকটা জল খেয়ে ধাতস্থ হয়ে বললো, “আসল কাজটাই ভুলে গিয়েছিলাম। ওটাই করে এলাম। এবার শুধু অপেক্ষা।”
সেই অপেক্ষা এখনো চলছে। রণি দু-একবার খোঁচালে একটাই কথা বলছে, “টোপ দিয়ে এসেছি এবার বাঘের ফাঁদে পড়ার অপেক্ষা।” রণি আমাকেও কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে। কিন্তু ব্যোমকেশের কথা মেনে আমি ওকে কিছুই বলিনি।
আজকে অফিস আছে তাই তাড়াতাড়ি স্নান করে রেডি হয়ে নিলাম। পুজো আসছে। সামনের মাস থেকেই পুজোবার্ষিকীগুলো পাবলিসড হবে তাই এখন কাজের চাপটা বেড়ে গেছে। রেডি হয়ে খেতে বসেছি এমন সময় কলিংবেল বেঁজে উঠলো। বাবা গিয়ে দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে চাই?”
একটা চেনা পুরুষ কন্ঠ কানে এলো আমার, “এটা কি ব্যোমকেশ মিত্রর বাড়ি? ব্যোমকেশবাবু কি বাড়িতে আছেন?” ব্যোমকেশ দেখলাম গলাটা শুনেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর সামনে এগিয়ে এসে হাত জোড় করে বলল, “আরে আসুন আসুন অসীতবাবু।কি সৌভাগ্য। নীল দেখো কে এসেছেন? ” স্বাভাবিকভাবে ভদ্রলোককে এই সাতসকালে দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
ভদ্রলোক একটু লজ্জিত গলায় বললেন, “সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমায় ক্ষমা করবেন আসলে সেদিন একটু…” ব্যোমকেশ তাকেথামিয়ে বললো, “ওসব কথা থাক আপনি আমার সাথে আসুন। আমার ঘরে কথা হবে।” বলেই আমার মা কে ডেকে বললো, “মা বলছিলাম কি দু কাপ চা হলে…” ব্যোমকেশ আজকাল আমার মা-বাবা কে “মা-বাবা” ডাকে এবং এটায় আমার মায়ের প্রশয় আছে।মা মৃদু হেসে বলল, “থাক আর বলতে হবে না আমি নাড়ুকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
অসীতবাবুকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো ব্যোমকেশ।
আমি পড়লাম দোটানায়। একদিকে অফিসে কাজের চাপ অপরদিকে ব্যোমকেশের সঙ্গে থাকার লোভ।কোনদিকে যাবো ঠিক করতে পাচ্ছি না। অবশেষে অফিসেই যেতে হলো। অফিসে সারাদিন কাজের মধ্যে থাকলেও মনটা পড়ে রইলো বাড়িতেই। শর্মিষ্ঠা দু-একবার এসেব্যোমকেশের ব্যাপারে জিজ্ঞেস সাড়া না পেয়ে ফিরে গেল। বুঝলাম মেয়ের অভিমান হয়েছে কিন্তু আমি নিরুপায়। যেখানে আমি নিজেই এব্যাপারে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সেখানে ওকে কি বলবো?
সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে ব্যোমকেশের ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম ঘর অন্ধকার করে ব্যোমকেশ বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছে। একটা হাত কপালের উপর রাখা। আমি ঘরের আলোটা জ্বালাতেই ব্যোমকেশ উঠে বসলো। আমি এগিয়ে ঘরের এককোণে রাখা একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম।
“ব্যাপার কি? এই ভর সন্ধ্যেবেলা ঘর অন্ধকার করে বসে আছো? শরীর খারাপ নাকি?”
ব্যোমকেশ মাথা নেড়ে বললো, “না। আসলে কেসটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে চোখটা লেগে গেছিল।” বলে একটা হাই তুললো ব্যোমকেশ।একটু পরে নাড়ু দুকাপ চা আর একটা বড়ো বাটিতে তেল, চানাচুর দিয়ে মুড়ি মাখা আর চারটে সিঙারা দিয়ে গেল।
চা খেতে খেতে ব্যোমকেশ বললো, “বুঝলে নীল এসব কেসগুলো অনেকটা বীজগনিতের অঙ্কের মতো। ধাপে ধাপে জট ছাড়াতে হয়। এক ধাপে একটু ভুল হলেই সুতো পেঁচিয়ে গোটা অঙ্কটাই ভুল হয়ে যায় তখন অঙ্কের উত্তর আর মেলে না। তাই এসব ক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হয়। অথচ দেখো মানুষমাত্রেই ভুল হয়।বার বার একটাই ভুল করে চলেছিলাম আমি। এই কেসটা আগাগোড়া না ভেবে ভুল সিদ্ধান্তে এসেছিলাম। ভাগ্যিস আজ অসীতবাবু এলেন। নাহলে তো ওনাকেই আমি…ছিঃছিঃ। আবার সব কেঁচে গন্ডুষ করতে হবে।” বলে চায়ের কাপে চুমুক দিলো ব্যোমকেশ।
আমি অবাক হয়ে বললাম, “সেকি! উনি আসল অপরাধী নন? তাহলে সেদিন ওনার ঘরে যে…” আমাকে থামিয়ে ব্যোমকেশ বললো, “ওখানেই তো ধোঁকা খেয়েছি আমরা।অসীতবাবু একজন কামার। এককালে ফুটবল খেলতেন কিন্তু বছর কুড়ি আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে তাঁর পা মারাত্মকভাবে জখম হয়। খেয়াল করলে দেখতে পেতে ভদ্রলোক একটু খুঁড়িয়ে হাটেন। চাকরীর বাজারে এইখোঁড়া পা নিয়ে চাকরী পাওয়া অসম্ভব ভেবে ব্যবসা শুরু করেন। এ ব্যবসা সে ব্যবসার পর লোহার ব্যবসাটা কাজে লেগে যায়। লাভ তেমন হয় না। তবে একরকম চলে যায়। গ্রামের কালী মন্দির আছে। যেটায় আমরা গিয়েছিলাম সেটা নয় এটা গ্রামের অন্যপ্রান্তে। সেই কালীমন্দিরের বার্ষিক পুজো এই কৌষিকী অমাবস্যায়।এই পুজোয় বলির জন্য প্রতিবছর নতুন খাঁড়া লাগে। বলির পর খাঁড়াটা মায়ের চরনে অর্পণ করা হয়। পরের বছর পুরোনো মুর্তির সাথে পুরোনো খাঁড়াটাকেও পুজো করে ওরা পুকুরে বিসর্জিত করে। আমরা যেদিন গেছিলাম। সেদিন ভদ্রলোক খাঁড়ায় শাণ দিয়ে ধার করছিলেন। আর খাঁড়ায় ধার করার শব্দ শুনে আমরা… ছিঃ ছিঃ। তবে ভদ্রলোক একটা পুরোনো ঘটনার মধ্যে দিয়ে একটা জব্বর ক্লু দিয়েছেন।যার সাথে সম্ভবত এই খুনগুলো একটা সুত্র আছে। ”
“ও তা কি বললেন ভদ্রলোক? ”
ব্যোমকেশের চা শেষ হয়ে গিয়েছিল। একটা গাঁজার সিগারেট ধরিয়ে বলল, “সে বড়ো করুন কাহিনী।বলতে শুরু করলে গোটা সন্ধে চলে যাবে। তবে এতটুকু বলে রাখি মুল অপরাধী তিনি নন। এবার এই মুল অপরাধীটাকে ধরার জন্য আমাকে আবার শুরু থেকে ভাবতে হবে। তবে তার আগে… এই তোমার ফোনটা দাও তো! একটা কল করবো।আমারটা চার্জ থাকে না। ফোন এলে নম্বরও বুঝতে পারি না।”
ফোনটা আমার ঘরে আছে বলে আমি উঠে আমার ঘরে এলাম। তারপর ব্যাগ থেকে একটা বাক্স বের করে ব্যোমকেশের ঘরে ঢুকে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। ব্যোমকেশ বাক্সটা দেখে বললো, “এটা কি? ” আমি বললাম, “খুলেই দেখো।” ব্যোমকেশ বাক্সটা খুলেই অপ্রস্তুত গলায় বললো, “দেখো কান্ড! এসবের কি দরকার ছিলো? শুধু শুধু কতগুলো টাকা নষ্ট করলে।”
আমি হেসে বললাম, “চুপ! ঐ মান্ধাতা আমলের পাতি ফোন আর কতদিন চালাবে বলো তো? ও ফোন কোনযুগে অচল হয়ে গেছে।জানি তুমি প্রাচীনপন্থী, পুরোনো জিনিসকে আকড়ে বাঁচতে চাও কিন্তু এখন নতুনযুগের সাথে এটুকু তাল না মেলালে চলবে কি করে ভায়া? আর টাকার কথা বলছো? আমি না তোমার ছোটোভাইয়ের মতো? তা ছোটোভাই তার দাদাকে কিছু কিনে দেবে এতে টাকা খরচের কথা আসছে কোথা থেকে? ”
“কিন্তু এসবের দরকার ছিলো না নীল।” ব্যোমকেশের গলা ধরে এসেছিল। আমি বললাম, “ধুস সেন্টু দিও না তো! এমন কিছু করিনি। যাকগে দেখে নাও এই জায়গাটা টিপে ধরলে ফোন অন হবে।”
ঘন্টাদুয়েক লাগলো আমার ব্যোমকেশকে সম্পুর্ণভাবে ফোনটা চালানো শেখাতে। ব্যোমকেশ দারুণভাবে রপ্ত করে নিলো সবকিছু। ওর মুখে বিরক্তিভাব থাকলেও আমি জানি ভেতর ভেতর খুশি হয়েছে ও। সব শেখার পর ব্যোমকেশ ফোন করলো একটা নম্বরে।
ওপাশ থেকে রিসিভ হবার পর ব্যোমকেশের দিকের যা কথা হলো সেটা নিচে তুলে ধরলাম।
“হ্যালো…সুরেনবাবু? আমি ব্যোমকেশ মিত্র বলছি।”
“বলছিলাম যে আরেকজনের ব্যাপারে একটু খোঁজ করতে হতো। নামটা রাজেশ্বর চক্রবর্তী। ডাকনাম রাজু।”
“হুম মাল্লারপুরেরই ছেলে।আজ থেকে প্রায় পঁচিশবছর আগে বয়স ছিল বারো-তেরোর মতো।তা…”
“কি? তাই? আচ্ছা! কতবছর আগের ঘটনা বলুন তো?”
“তাই? আচ্ছা অনেক ধন্যবাদ সুরেন বাবু। এবার আমার ছেলেটার ডিটেল চাই মানে ঐ ঘটনার পর ছেলেটার কি হলো কোথায় গেল? ঠিক আছে। আচ্ছা কেসটা কার বিরুদ্ধে হয়েছিল? ”
“কি? কি নাম বললেন?”
“আচ্ছা বেশ! ঠিক আছে। এই খবরটা শুধু জোগাড় হলে আর কিছু চাই না। বেশ অপেক্ষায় রইলাম।”
বলে ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করে ব্যোমকেশ বললো, “আবার ভৈরব? অবশ্য এই লোকটার জন্য কম হয়রানি হয় নি গুরুদেবের।”
আমি বুঁঝতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, “কে ভৈরব?” ব্যোমকেশের ঠোটে একটা হাসি খেলে গেল। যেন পুরোনো কোনো মজার স্মৃতি মনে পড়েছে। হেসে বললো, “আমাদের বহু পুরোনো বন্ধু। এককালে খুব জ্বালিয়েছিল আমাদের। সে অনেক কথা অন্যদিন বলবো। শুধু এইটুকু জেনে রাখো সে নিজেকে সিদ্ধাই বলে দাবি করতো। সিদ্ধি লাভের জন্য এমন কোনো ঘৃন্য কার্য নেই যা সে করে নি। শেষে গুরুদেব, আমি দুজনে ওকে শিক্ষা দিয়েছিলাম। আমাদের খুনির এই উন্মত্ততার জন্যে এই ভৈরবই দায়ী। এবার খুনি যদি একেও এরকম শাস্তি দেয় তাহলে আশ্চর্য হবো না। বরং মানবতার দিক দিয়ে আমি খুশিই হবো বলতে পারো।তবে বিবেক বড়ো শয়তান হে। এইভাবে একটা মানুষকে মরতে দেখতে পারবো না। বাঁচাতে হবে ওকে।”
“আর এই রাজুটা কে? ”
ব্যোমকেশ বিছানায় হেলান দিয়ে বললো, “আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে এই মাল্লারপুরে একটা ভয়ঙ্কর অপরাধ ঘটে।একটা পুজোয় একজন ব্রাহ্মণের পরিবারকে নরবলি দেওয়া হয়। বলাবাহুল্য ভৈরবের নেতৃত্বেই। ভৈরব ঘটনার পর ক'দিনের জন্য গা ঢাকা দেয়। ঐ পরিবারটার একমাত্র সদস্য হিসেবে বেঁচে যায় ব্রাহ্মণের ছেলে। হিসেব মতো এখন তার বয়স সাঁইত্রিশ হবার কথা। যদি আমার অনুমান নির্ভুল হয় তাহলে এই ছেলেটাই আততায়ী।”
বলে উঠে বসলো ব্যোমকেশ। একটা সিগারেট ধরিয়ে বললো, “ভৈরবকে নিয়ে চিন্তিত নই আমি। আমার চিন্তা এই রাজুকে নিয়ে। কোথায় আছে ও? কেমন দেখতে ওকে? কি ভাবছে ও?”
(চলবে…)