১১ই জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার, দুপুর বারোটা, কলকাতা
পর পর দুদিন কেটে গেছে ব্যোমকেশ বাড়ি ফেরে নি। সেই ঘোষালবাড়িতে মিসেস কৃষ্ণা ঘোষাল কে জেরা করে আসার পরদিন যে ব্যাগপত্র নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোলো তারপর আর কোনো পাত্তাই নেই। এমন কি রণিও জানে না ও কোথায় গেছে। কাল রাতে বলছিল ও ফিরলে যাতে যোগাযোগ করে রণির সাথে। গলাটা একটু টেনসড শোনালো। অবশ্য ওকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ব্যোমকেশের অনেক পদক্ষেপ আমার কাছেও হেয়ালী বলে মনে হয়। এতদিন হয়ে গেল অথচ এখনও ওকে ভীষণ অচেনা লাগে।
আজকে অফিসে তেমন ওয়ার্ক লোড নেই ।ঐ দুটো প্রুফ ছিলো। সেটা শুধরে দিয়েছি। এই দেখুন আপনাদের তো বলাই হয় নি! আমার সেই ক্লার্কের চাকরীটা আমি কবেই ছেড়ে দিয়েছি। অবশ্য এক্ষেত্রে শাম্বর কথা বলতেই হয়। আমার আগে যেখানে চাকরী ছিলো। সেখানে ফিনান্সিয়াল প্রবলেম চলছিল বলে ভেতর ভেতর ছাঁটাই চলছিল। অবস্থা চরম বুঝে অনেক জায়গায় অ্যাপ্লাই করছিলাম। চাকরী পেলেই ছেড়ে দিতাম। কিন্তু চাকরী মুখের কথা নয়। আমার মতো অনেক বরং বলা যায় আমার চেয়ে বেশী মেধাবী বাংলায় এম এ পাশ করা অনেক ছাত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাজেই একটা চাকরী পেয়ে আরেকটা ছেড়ে দিলাম মুখের কথায় সহজ হলেও বাস্তবে ভীষণ কঠিন। একে একে সব কটায় ইন্টারভিউ দিয়ে রিজেক্ট হতে হতে যখন বেশ চাপে পড়ে গেছি। তখন উপায়টা শাম্বই বলে দিল।
ওদের অফিসে যিনি প্রুফরিডার ছিলেন তিনি মাস দুয়েক হলো রিটায়ার করেছেন। অতএব কম্পিউটার জানা, বাংলায় বিশেষ দক্ষ, নতুন একজন প্রুফরিডার চাই। খবরটা প্রেসে এখনও দেয়নি ওদের কাগজ। অতএব চেষ্টা করা যেতেই পারে। তা কপাল ঠুকে চেষ্টা করলাম আর চাকরীটা হয়ে গেল। আগের চেয়ে একটু বেশী মাইনে। তবে ব্যাপারটা শুধু এখানে আটকালো না। দুটো জিনিসও ঘটলো। প্রথমত কাজের চাপ এতো বাড়লো যে সাপ্তাহিক আড্ডায় যাওয়া কম হয়ে গেল। আর দ্বিতীয়ত, ঐ আসছে শুনতে পাচ্ছেন? হিল তোলা জুতো পড়ে খট খট করে? পাচ্ছেন না? দাঁড়ান ঐ এলো বলে। এই এক…দুই… তিন…!
“নীলার্কদা সদানন্দবাবুর গল্পটার প্রুফরিডিং হয়ে গেছে? ”
“হ…হ্যাঁ হয়ে গেছে। এই মাত্রই পাঠালাম।”
“ওকে। আচ্ছা কি ব্যাপার বলো তো? কদিন ধরে ডুব দিচ্ছো অফিসে? ব্যোমকেশদা নতুন কেস পেল নাকি? ”
কোনোরকমে তুতলে বললাম, “কই ন…ন…নাতো! ঐ একটু শরীরটা খারাপ ছিল।”
“ও তা ব্যোমকেশদার নতুন গল্প কোথায়? সেই ফেসবুকেতে “প্রতিঘাত”এর পর তো আর কোনো খবরই নেই।”
“সে আর কি করা যাবে? বেচারা নিজেও বসে আছে।”
“আচ্ছা বেশ তো কবে নিয়ে যাচ্ছো ব্যোমকেশদার সাথে দেখা করাতে?”
“ম…মানে? ”
“হ্যাঁ! তুমিই তো বলেছিলে ব্যোমকেশদা ফাঁকা থাকলে দেখা করাবে। তো নিয়ে যাচ্ছো কবে? আমার ব্যোমকেশদার সাথে দেখা করার সখ কতদিনের জানো না? ”
“সে জানি কিন্তু শর্মিষ্ঠা ব্যোমকেশ তো কলকাতায় নেই! ”
“কলকাতায় নেই? কোথায় গেছে? ”
“তা তো জানি না।”
“কোনো কেসের ব্যাপারে? ”
“হ্যাঁ…মানে…না…মানে…ইয়ে…মানে! ”
ব্যস ! আমার দম শেষ। এমনি তে আড্ডাতে, অফিসে আমার কথার এক্সপ্রেস থামে না। মুখে খই ফোঁটে। কিন্তু এই মেয়েটার সামনে আমার কথার খেই হারিয়ে যায় বার বার।আর এটারই সুযোগ নেয় শর্মিষ্ঠা। আজও নিলো। খিলখিল করে হেসে উঠলো সে। হাসতে হাসতে আমার কিউবিকলের উল্টোদিকে রাখা একটা ফাঁকা চেয়ারে বসলো।
“দেখলে? কিরকম করে ধরে ফেললাম! আরে শর্মিষ্ঠা বিশ্বাসের কাছে গপ্পো ফেঁদে লাভ নেই। ও ঠিক ধরে নেয়। আরে আমি তো জানি আমি কি? কি ভেবেছিলে ঢপ দেবে আর আমি টপ করে গিলে নেবো? উহু অতো সোজা নয় লেখক বাবু। আমাকে বোকা বানানো অতো সোজা নয়।”
ধরা পড়ে আমি আর না পেড়ে বোকার মতো হাসলাম। এবার শর্মিষ্ঠা অভিমানের সুরে বললো, “কিন্তু ব্যোমকেশদা নতুন কেস পেয়েছে এটা আমায় জানালে না কেন? জানো না তোমার লেখার, ব্যোমকেশদার কত বড়ো ফ্যান আমি? রোজ বসে থাকতাম তোমার লেখার জন্য।আর তুমি? বলো না কি কেস? ”
এবার বাধ্য হয়ে বলতেই হলো এই কেসটার ব্যাপারে তেমন কিছু জানি না। যতটুকু জেনেছি সেটাও কাউকে বলতে রণির নিষেধ আছে। আর আমি পেটপাতলা বলে ব্যোমকেশও কিছু বলছে না। কাজেই এ কেসে আমি অন্ধকারে বসে। ব্যোমকেশ যদি বলতেই না চায় আমি জানবো কি করে? আর জানাবো কি করে? শর্মিষ্ঠা সবটা শুনলো তারপর বললো, “বেশ।ব্যোমকেশদার কথা মেনে আর খোঁচাবো না তোমায়। তবে এই যে তুমি আমায় ঢপ দিলে তার শাস্তি পেতে হবে তোমায়।”
আমি ভেবলে গিয়ে ভালোমানুষের মতো মুখ করে বললাম, “কি শাস্তি?” শর্মিষ্ঠা মুখটা গম্ভীর করে বলে, “আজ বিকেলে ফ্রি আছো?” আমি চমকে গিয়ে বলি, “হ…হ্যাঁ আছি! কিন্তু কেন জানতে চাইছো? ” শর্মিষ্ঠা এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে বললো, “আজ বিকেলে বিরিয়ানি খাওয়াতে হবে। আমিনিয়ায়। খাওয়াবে? কোনো কথা শুনবো না খাওয়াতেই হবে। ”
হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।ও এই শাস্তি? হেসে বললাম, “বেশ খাওয়াবো।মিস মিতিন মার্পলের হুকুম বলে কথা।”
শর্মিষ্ঠা কপট রাগে বললো, “ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।” বলে হেসে চলে গেল।
আর আমি পেছন দিয়ে ওর যাওয়া দেখতে লাগলাম। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেছি আমি।শর্মিষ্ঠার সাথে আমার প্রথম দেখা এই অফিসে। ও আমার পরিচয় পেয়ে রীতিমতো উচ্ছসিত হয়ে আলাপ করতে এসেছিল। তখন অফিসে নতুন। অনেক কাজের চাপ। সেই কাজে বিরক্ত করতে আসতো। ওর একটাই প্রশ্ন। ব্যোমকেশ কেমন আছে। ব্যোমকেশময় জগৎ ওর। প্রথম প্রথম বিরক্ত হতাম। পরে অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। এখন যেদিন অফিসে ও আসেনা সেদিনটাই পানসে লাগে আমার। তবে একটা সন্দেহ ছিলো। এই যে ওর সম্বন্ধে এত কিছু ভাবি এটা কি একতরফাই? ওর মনে কি চলছে? ওর হাবভাবে তো মনে হয় উই আর জাস্ট ফ্রেন্ড।
একদিন ভাবলাম বুক ঠুকে বলে দিই আমার ফিলিংস গুলো। ও যদি না বলে তাহলে শুধু ভালো বন্ধু হয়ে থাকবো আমরা। কিন্তু বলবো বলবো করে দুমাস কেটে গেল। তারপর একদিন এলো এক অপ্রত্যাশিত সুযোগ। না আমাকে বলতে হয়নি। একদিন ক্যান্টিনে নিজেই সরাসরি প্রস্তাব দিলো কন্যে। জন্মদিন উপলক্ষে ডাকলো নিজের বাড়িতে। তা গেলাম ওদের বাড়িতে। গল্ফ গ্রিনে একটা ফ্ল্যাটে থাকে ওরা।
শর্মিষ্ঠার বাবা একজন অবসর প্রাপ্ত পুলিশ অফিসার। মা ডাক্তার। উচ্চবিত্ত পরিবারের হলেও তার কোনো অহংকার নেই তাদের মধ্যে। সেই গুণটাই পেয়েছে শর্মিষ্ঠা। আমায় বেশ খাতির করলেন তারা। বাড়ি ফেরার সময় সদর পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলো শর্মিষ্ঠা। সুযোগ বুঝে দিলাম প্রস্তাবটা।
“ইয়ে মানে…বলছিলাম কি শর্মিষ্ঠা। একটা কথা ছিলো।”
“বলো।”
“ইয়ে…মানে কদিন ধরেই একটা কথা বলবো ভাবছি। বলা হয়ে উঠছে না।”
“বলো।”
“ইয়ে…মানে…বলছিলাম কি? মানে…ইয়ে মানে… আমি… তোমায়…মানে…”
“তুমি আমায় কি? ”
যাচ্চলে ! লোকে বলে কি করে? আমার তো রীতিমতো গলদঘর্ম অবস্থা! অবশেষে চোখ বুঁজে বলে ফেললাম।
“ইয়ে মানে আমি তোমায় ভালোবাসী।”
মেয়ে চুপচাপ শুনলো সব তবে কিছু বললো না। আমি ভয় পেলাম। কি জানি খারাপ ভাবলো নাকি? নিজেকে সামলে বললাম, “দেখো আসলে তোমার এই বিরক্ত করা এই ব্যোমকেশ কে নিয়ে এতো চিন্তা। এই নিয়ে আগে বিরক্ত হলেও এখন আর হই না। জানি না কবে থেকে এই ভালো লাগা শুরু হলো। জানি না এই রিলেশন কতদিন টিকবে। তাই আগে থেকে আমার মনের কথা জানিয়ে রাখলাম। তোমার যদি এটা ওকে না মনে হয়। তাহলে কোনো ব্যাপার না। আমরা ভালো বন্ধুও হতে পারি।” বলতে বলতে আমরা কমপ্লেক্সের বাইরে চলে এলাম।ওকে চুপ দেখে বুঝলাম নির্ঘাত ব্লান্ডার ঘটিয়েছি। ছিঃ এইভাবে জন্মদিনটা মাটি করে দিলাম।ভারাক্রান্ত মনে ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে উঠতে যাবো এমন সময় শর্মিষ্ঠা বলল, “ রাতে অনলাইন থেকো।” বলে মুচকি হেসে পিছন ফিরলো। ফিরে গেল ওর অ্যাপার্টমেন্টে।
এরপর ক্রমশ জানতে পারলাম আগুন ওদিকেও লেগেছিলো। বেচারীও আমার মতোই ভয় পাচ্ছিল।আর জন্মদিন উপলক্ষ্যে বাবা-মার সাথে দেখা করিয়ে মত চেয়েছিল তাদের। তারা গ্রিন সিগনাল দিলেও। আমরা ঠিক করেছি এই ব্যাপারে কাউকে জানাবো না। অফিসে জানলে যেমন ঝামেলা হবে তেমনই আমার বানরসেনাকে জানালে হই হই করে শর্মিষ্ঠাকেও নিজেদের মতো পাগল করে নেবে।যেমনটা ব্যোমকেশকে করেছে। কি দুঃখ বলুন তো চরম সিরিয়াস ব্যোমকেশও আজকাল আমায় নিয়ে খিল্লি করে। তাই বাড়িতেও পইপই করে বলেছি এব্যাপারে ব্যোমকেশ না জানতে পারে। যে কদিন ও আমাদের বাড়ি এসেছে ব্যোমকেশ বাড়ি তে থাকেনি।
তবে যাই হোক ধৈর্য আছে বটে এই পাঁচফুট দু ইঞ্চির শ্যামাঙ্গিনী মেয়েটার মধ্যে । নাহলে টানা দুমাস এই সম্পর্কেই রীতিমতো কর্তৃত্ব ফলায়? অসাধারন এই মেয়েটা বাইরো থেকে ভীষণ সাধারণ।সাজপোশাকেও তেমন চাকচিক্য নেই। কোনোদিন চুড়িদার, কোনোদিন জিন্স আর শার্ট পরে, একগোছা মেডুসার মতো কোঁকড়ানো চুলে খোঁপা করে, রিডিং গ্লাস পরে যখন একমনে কম্পিউটারে খবরের স্টোরি টাইপ করে কে বলবে? এই মেয়েটাই ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে প্রায় ছিঁড়ে খায় বড়ো বড়ো নেতাদের? পার্টিতে নেচে, হুল্লোর করে মাতিয়ে দেয় পরিবেশ? কে বলবে মাস দুই আগেও এই মেয়েটাকে আমার অসহ্য লাগতো? মনে মনে হাসলাম। সত্যি আমাদের মন অতীবও বিচিত্র বস্তু।
******
ব্যোমকেশের যে দোষগুলোকে আমি সবচেয়ে বেশী অপছন্দ করি তারমধ্যে প্রথম হলো সাসপেন্স বজায় রাখা। দ্বিতীয়টা অকস্মাত চমকে দেওয়া। মানে কখন কীভাবে কোথায় ও বোমা ফাঁটিয়ে দেবে আপনি ধরতে পারবেন না। তবুও একটা গোটা বছর কাঁটিয়ে এসব গা সওয়া হয়ে গেছে। তবে ওর সঙ্গদোষে যে শাম্বটাও বদের ধারি হয়ে গেছে এটা জানা ছিলো না।অন্তত আজকে ও যেটা করলো সেটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না মোটেও।
বিকেলবেলা কথামতো শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে আমিনিয়ায় ঢুকেছি। গরম গরম চিকেন বিরিয়ানি আর চিকেন চাপে হাত দিয়েছি এমন সময় মনে হলো বালুর গলা পেলাম। খেতে গিয়েও থমকে গেলাম। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি ওদের কেউ নেই।শোনার ভুল ভেবে বিরিয়ানির চিকেন লেগপিসে কামড় বসাতে যাবো এমন সময় প্রায় মাটি ফুড়ে উদয় হলো শাম্ব। চেয়ারে বসে বললো, “কি ভাই একা একাই? ”
ওকে দেখে বিষম খেয়ে গেলাম আমি। কোনোমতে সামলে ওর দিকে তাকাতেই দেখি পেছন পেছন একে একে উদয় হলো বালু, প্রাচী , রণি, আর শ্রীমান ব্যোমকেশ মিত্তির। কোনোমতে নিজেকে সামলে বললাম, “না মানে শর্মিষ্ঠার সাথে প্ল্যান ছিলো। তাই…”
প্রাচী আমার মুখের কথা কেড়ে বললো, “তাই বিরিয়ানী খেতে চলে এলাম। তা আমাদের নিয়ে তো কোনোদিন এরকম প্ল্যান বানাস না? বলি পেটে পেটে এতো? ”
ব্যোমকেশ হেসে বললো, “কি ভেবেছিলে? তোমার ঘরে মেয়ের পারফিউম, আমি যতবার বাইরে বেরোই ততবার অতিথি আগমন। আমি কিছু বুঝবো না? ভাবলে কি করে কাকিমা আমার থেকে কিছু লুকিয়ে রাখতে পারবে? ”
রণিও ফোড়ন কাটলো, “তাই ভাবি ফোন করে কোনো পাত্তা নেই কেন ভায়ার। থাকবে কি করে? উনি তো ব্যস্ত! ” বাকিগুলোও যোগ দিলো ওদের সাথে। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “আঃ হচ্ছে কি? এটা পাবলিক প্লেস।সবাই দেখছে।” শাম্ব খ্যাকখ্যাক করে হেসে বললো, “রাখ তোর পাবলিক প্লেস। স্বার্থপর কোথাকার। বিরিয়ানীর জন্য আমরা অসভ্য হতেও রাজি। ভাগ্যিস আমার খটকা লাগলো। দুজনকেই যখন অফিসে দেখলাম না সন্দেহ হলো। এতদিন পর পাখিরা ফাঁদে পড়েছে।” বলেই আমার আর শর্মিষ্ঠার দিকে তাকালো।
শর্মিষ্ঠারও ধরা পড়ে আমার মতো অবস্থা।শাম্ব আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, “চিন্তা নেই ব্রাদার।অফিসে কাকপক্ষিতেও টের পাবে না। তবে পেনাল্টি দিতে হবে। ট্রিট চাই বস। আমরাও বিরিয়ানী খাবো। চিন্তা নেই তোর পকেট খসাবো না কিপ্টে কোথাকার। আজকে তোর অনারে আমি বিরিয়ানী পার্টি দিচ্ছি। কি চলবে তো সবার? ” সবকটা হই হই করে উঠলো।
সবার সাথে একে একে পরিচয় করালাম আমি। ব্যোমকেশের পরিচয় পেতেই মেয়ের গাল এত লাল হলো যে বলার মতো নয়। ক্রমে আড্ডায় মেতে উঠলাম আমরা।একসপ্তাহের মধ্যে আড্ডা আমিনিয়া থেকে সোজা বালুর বাড়িতে পৌছলো। মানে আমাদের সদস্য সংখ্যা বাড়লো। আর যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই হলো। শর্মিষ্ঠা ওদের দলের পুরো জলের মতো মিশে গেল।আমাকে নিয়ে ইয়ার্কি ঠাট্টায় গোটা সন্ধ্যে কেটে যেতে লাগলো।
আজ রবিবার যথারীতি আড্ডা মারতে মারতে রাত হয়ে গেল। রাতের খাবার খেতে খেতেই শর্মিষ্ঠা বোমা ফাঁটালো। খেতে খেতে ব্যোমকেশকে বলল, “ তা নীল বললো নতুন কেস পেয়েছো তুমি। কতদুর এগোলো কেসটা? ” তাকিয়ে দেখলাম রণি আর ব্যোমকেশ কৌতুক আর ব্যাঙ্গের ভরা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে।আমি মাথা নামিয়ে খাওয়ায় মন দিলাম। ব্যোমকেশ হেসে বললো, “এখনো কোনো ক্লু পাইনি। পেলে তো এগোবো। দেখা যাক কি হয়।” শর্মিষ্ঠা বললো, “তা কেসটা সলভ হলে নীলের নতুন গল্প পাবো তো? ” মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। ব্যোমকেশ নির্বিকার ভাবে বললো, “ সে দেখা যাবে আগে কেসটা সলভ হোক।”
আমি শর্মিষ্ঠাকে থামাতে কি বলতে যাচ্ছিলাম এমন সময় রণির ফোন বেঁজে উঠলো। রণি ফোনটা রিসিভ করে কিছুক্ষন শুনলো। তারপর ব্যোমকেশকে ইশারা করলো। ব্যোমকেশের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ও উঠে দাঁড়ালো। তারপর হেসে বললো, “মনে হয় এবার বোধহয় ক্লু পেলাম।” রণি ফোনটা কাটতেই ব্যোমকেশ বললো, “এবার কোথায়?” রণি থমথমে মুখে বললো, “ডায়মন্ড হারবারে।”
******
১৯শে জুলাই ২০১৯, শুক্রবার সকাল দশটা, আর.জি. কর. মেডিক্যাল কলেজ
পরদিন সকালে হাসপাতালে যখন আমরা পৌছলাম। তখন রোদের তাপ বাড়তে শুরু করেছে । বডি দেখতে আমাদের ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত যেতে হয় নি।ওখানকার পুলিশ বডি সোজা হাসপাতালে পাঠিয়েছে ।সেই বডি দেখতে আমরা আজ সকালে এসেছি। আমরা বলতে রণি, ব্যোমকেশ, শর্মিষ্ঠা আর আমি। রণি, ব্যোমকেশ তদন্তের স্বার্থে, শর্মিষ্ঠা স্কুপের উদ্দেশ্যে। আর আমি অ্যাডভেঞ্চার আর আমার পরবর্তী লেখার আশায়(একটা কথা বলে রাখা ভালো। আমার এই মর্গে আসার পেছনে শর্মিষ্ঠার অবদান অনস্বীকার্য না হলে সাত সকালে অফিস ছেড়ে মর্গে কে আসে হ্যাঁ? )।এইবার আগের মতো ভুল আমি করিনি। কারন বিগত কয়েকদিনে আমি বুঝেছি ব্যোমকেশ আমার অবহেলা আর ওকে ইগনোর করার অভিমানে এই কেসের ব্যাপারে কিছু বলছে না। অতএব মানভঞ্জন করতে হবে জেষ্ঠ ভাতৃসম এই মিত্রটির।
তবে একটা কথা মানতে হবে দিনের বেলা হাসপাতাল চত্বর বেশ জমজমাট। অনেকে ওষুধের কাউন্টারে এখনো লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। অনেকে আবার ডাক্তার দেখানোর জন্য বেঞ্চে সারিবদ্ধ ভাবে বসে। কিছুদুর গিয়ে একপাশে একটা কম্পাউন্ডের সামনে দাঁড়ালাম আমরা। কম্পাউন্ডের উপরে গ্লোসাইন বোর্ডে বড়ো বড়ো করে লেখা “MORGUE”।এখানে বলে রাখি মর্গ নিয়ে লেখকরা ভুতের গল্পে যে হাড়হিম বর্ণনা দেন এই মর্গ মোটেও ওরকম নয়। বরং পরিস্কার পরিচ্ছন্ন চুনকাম করা একতলা বাড়ি। ফরম্যালডিহাইড আর ফিনাইলের চাপা গন্ধ আসছে। হাসপাতালের মতোই তকতকে তবে হাসপাতাল থেকে কিছুটা দুরে বলে বেশ নিরিবিলি পরিবেশ।
মর্গের সামনে একজন গার্ড দাঁড়িয়েছিল।তার কাছে জানা গেল। কাল রাতে একটা বডি এসেছে বটে তবে সেটার রিপোর্টের জন্য কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হবে? মর্গের ডাক্তার বডি পরিক্ষা করছেন।
রণি গার্ডের সাথে কথা বলছে এমন সময় ভেতর থেকে এক সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন। সাথে বেরিয়ে এলো রাজীব। রাজীব যেন আমাদের দেখে প্রথমে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। তারপর অবাক গলায় বললো, “আরে কি ব্যাপার? ব্যোমকেশবাবু দেখছি?” ব্যোমকেশ হেসে বললো, “ কি করা যাবে? খাস উপরমহলের আর রণবিজয়ের হুকুম! অগত্যা মাঠে নামতে হলো।তা কেস কতদুরএগোলো সেটাই দেখতে এলাম।”
রাজীব হেসে বললো, “সে তো বটেই।তা ভালোই হলো। অবশ্য কদিন আপনার কথাই ভাবছিলাম। এরকম কেস আমি বাপের জন্মে দেখিনি। ড: ধর্মাধিকারীর সাথে সেই নিয়েই কথা হচ্ছিল। ও ভালোকথা আলাপ করিয়ে দিই। ডাক্তারবাবু ইনি হলেন আমার সিনিয়ার অফিসার। এই কেসের তদন্ত করছেন। এসিপি রণবিজয় চ্যাটার্জী। ইনি বিখ্যাত সরকারী গোয়েন্দা ব্যোমকেশ মিত্র। ইনি বিশিষ্ট লেখক নীলার্ক চ্যাটার্জী। আর ইনি হলেন…”
ডাক্তার ধর্মাধিকারী এগিয়ে এসে করমর্দন করে বললেন, “নমস্কার।আমার নাম যুধিষ্ঠির ধর্মাধিকারী। পেশায় একজন অটোপসি সার্জন।”
ব্যোমকেশ করমর্দন না করে নমস্কার করে বললো, “কেমন আছো যদু দা? ” বৃদ্ধ একটু থমকালেন। তারপর এগিয়ে ব্যোমকেশের মুখের দিকে ভালোভাবে তাকালেন। ব্যোমকেশ মুচকি হাসতে লাগলো। বৃদ্ধ বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর বললেন, “চেনা চেনা মনে হচ্ছে বাড়ি কোথায়? ” ব্যোমকেশ হেসে বললো, “হরিরামপুরের নিবারণ মিত্তির…।” বাকিটা আর বলতে হলো না কারন ততক্ষনে বৃদ্ধ ডাক্তার “বোমা! ” বলে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরেছেন ব্যোমকেশ কে। বেশ কিছুক্ষন পর ব্যোমকেশকে দুহাতে চেপে ধরে ধরা গলায় বললেন, “কতবছর পর বলতো? সেই তুই গ্রাম ছাড়লি তারপর বান এলো। নিবারনকাকাদের আমরা বারবার…। পরে শুনেছিলাম তুই নাকি সন্ন্যাস নিয়েছিস।”ব্যোমকেশও ধরা গলায় বললো, “জানি। বান ডাকার সাতদিন পর ফিরেছিলাম। সনাতন সবটা বলেছিল। তারপর সেই যে গ্রাম ছেড়ে চলে গেলাম আর ফিরিনি। কার জন্য ফিরতাম বলোতো? বাবা-মা- পুনু সবাই তো আমাকে একা রেখে চলে গেল। তারপর কি হয়েছিল সে অনেক বড়ো গল্প। পরে বলবো তোমাকে যাক গে বুঝতেই পারছো এই কেসে আমিও তদন্ত করছি। তোমার হেল্প চাই কিন্তু।”
“হেল্প কিরে? এতো আমার কর্তব্য? আজ এইযে আমি ডাক্তার এর পেছনে নিবারণকাকা না থাকলে…যাক সেসব কথা। আগে বল আমার কোয়ার্টারে কবে আসবি তুই? ”
“সে পরে হবে আগে কেসটায় এদের নৌকো পার করে দিই। তারপর একদিন তোমার হাতের চিংড়ি মাছের বড়া খাবো। এবার বলো তো আজকের বডিটার কি খবর? কজ অফ ডেথ কি? ”
“আর বডি! ” বলে মুচকি হাসেন যুধিষ্ঠিরবাবু।
“এতবছর মড়া ঘাটছি। এরকম কেস জীবনে পাইনি। তাও আগের গুলো কিছুটা রিকভার করা যাচ্ছিল এটা তো একেবারে গন কেস।”
“মানে? বুঝলাম না। এটার বেলা কি হয়েছে? ”
“বলছি। ভেতরে আয়। তার আগে বলি তোদের মধ্যে কেউ সকালের খাবার খেয়ে আসিস নি তো? আসলে বমি টমি করলে এখানকার গ্রুপ ডি স্টাফ চম্পা হেবি খচে যায়।”
“না কি ব্যাপার বলো তো? ”
“ভেতরে চল। বুঝতে পারবি।”
বলে ভেতরে ঢুকে গেলেন ডাক্তার। আমরাও পেছন পেছন ঢুকলাম। একটা বড়ো হল ঘর। একদিকে সিলিং পর্যন্ত বিরাট লকারের প্যাসেজ।
আরেকদিকে টেবিলের চারদিকে বড়ো বড়ো জারে ফরম্যালডিহাইডে ডোবানো মানবদেহের অংশ।ঘরের মাঝে একটা উচুমতো বেদি। বেদিটার উপরে এলইডি বালবের আলো জ্বলছে।বেদিটায় চাদর দিয়ে কি একটা ঢাকা। হয়তো নীলুর লাশ হবে।
ডাক্তার ধর্মাধিকারী বেদির সামনে দাঁড়িয়ে একটানে চাদরটা খুলে ফেললেন। চাদরের আড়ালে যেটা ছিলো সেটা দেখে আমার দুটো অনুভুতি হলো। প্রথম একটা অদ্ভুত আতঙ্ক গ্রাস করলো। দ্বিতীয় পেটটা গুলিয়ে উঠলো। শর্মিষ্ঠা দেখলাম ভয় পেয়ে আমার শার্টটা খিমচে ধরলো। রণি ভ্রু কুঁচকে একবার “মাই গড…”বলে তাকিয়ে রইলো। একমাত্র ব্যোমকেশ নির্বিকারভাবে তাকিয়ে রইলো। তবে ওর চোখ দেখে বুঝলাম যেন একটা কিছু খুঁজে পেয়েছে। মানুষ কতটা নৃশংস হতে পারে সামনের ওই দেহাংশটাই তার প্রমাণ। দেহাংশ মানে মৃতদেহটার আস্ত দেহটা নেই এখানে! শুধু শিরদাঁড়া সমেত মাথাটা বেদিতে শোয়ানো।মাথাটার কপালের কাছ থেকে আবার কাটা। সেখান থেকে মাছি ভনভন করছে।
চাদর দিয়ে মৃতদেহাংশটা ঢেকে ড: ধর্মাধিকারী বললেন, “কি বুঝলি? ” ব্যোমকেশ বললো, “বুঝলাম যে খুনি মারাত্মক রকমের মানসিকরোগগ্রস্থ।”
ড. ধর্মাধিকারী বললেন, “সেতো বটেই তার সাথে তুখোড় অ্যানাটমি জ্ঞান। মানে শরীরের কোথায় অ্যানেস্থেশিয়া পুশ করলে ভিকটিম সজ্ঞানে থাকবে বাট কিছু করতে পারবে না। কিভাবে মারলে একেবারে কাজ হবে অথচ প্রাণ বেরোবে না। আর কাজগুলোও পুরো প্রফেশনালদের মতো করেছে। যেমন আগের কেস মানে চন্দ্রশেখর ব্যানার্জীর টা তো পুরো শিল্প পর্যায়ের। অতো নিখুঁতভাবে ডিসেকশন আমিও পারবো না। আর অদ্ভুতভাবে এই ডিসেকশন এর সময় ভিক্টিম কে বাঁচিয়ে রেখে করা ইটস কোয়াইট আনক্যানি বাট আমেজিং কাট। জানি এভাবে বলা উচিত হয় নয় বাট খুনির কাজের তারিফ না করে পারা যায় না।”
“চন্দ্রশেখরের কি কি বডিপার্ট উধাও ছিলো? কিডনি, লিভার না হার্ট।” ব্যোমকেশ নির্বিকারভাবে জিজ্ঞেস করে।
“অনলি ইন্টেস্টাইনস। মানে ক্ষুদ্রান্ত আর বৃহদন্ত।” ডাক্তারের কথা শুনে স্থির হয়ে যায় ব্যোমকেশ। তীক্ষ্ণ চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে, “কি? শুধুমাত্র অন্ত্র? ”
চিন্তিত গলায় ডাক্তার বলেন, “সেটাই তো অবাক করেছে রে। হার্ট, লিভার, বা কিডনি নিলেও কথা ছিল। নাড়িভুড়ি যে খুনির কোন কাজে লাগবে কে জানে?”
ব্যোমকেশ এবার এগিয়ে বেদির চাদর তুলে নীলুর মৃতদেহটা দেখে। বিশেষ করে ওর কপাল থেকে কাটা অংশটা। বিড়বিড় করে বলে, “তারমানে আমি যেটা ভাবছি সেটাই কি? তাহলে তো…” বলে চাদরটা দিয়ে দেহটা ঢেকে ডাক্তারকে এগিয়ে এসে বলে, “অনেক ধন্যবাদ যদুদা।তুমি জানো না কতবড়ো উপকার করলে আমার।”
ডাক্তার মুচকি হেসে বলেন, “আমি আগেই বলেছি এটা আমার জব।যাক গে আগে বল কবে আসছিস আমার কোয়ার্টারে।”
ব্যোমকেশ হেসে বলে, “আজ আর হবে না গো।তবে কথা দিচ্ছি একদিন আসবো। আর জমিয়ে আড্ডা দেবো। অনেক কথা জমে আছে আমাদের।”
ডাক্তার হেসে বললেন, “বেশ। তবে কথা রইলো কিন্তু।”
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ব্যোমকেশ রণিকে কানে কানে কি একটা বলায় সে হেসে বললো, “বেশ তো চলো।” বলে রণি রাজীবকে লালবাজারে ফিরে গিয়ে রিপোর্টটা ওর টেবিলে রাখতে বললো। ব্যোমকেশ আমাদের বাড়ি ফিরতে বলে রণির সাথে আবার কোথায় চলে গেল।
আমরা বাড়ি না গিয়ে অফিসের পথ ধরলাম।
(চলবে…)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন