অনুসরণকারী

মঙ্গলবার, ৩ মে, ২০২২

ফেরা

 





পুজো এবং অঞ্জলীর জন্য ফুল-বেলপাতা বেছে আলাদা আলাদা পুষ্পপত্রে সাজিয়ে ঠাকুরমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে ঠাকুরদালানের এককোণে এসে বসল মৈত্রেয়ী। দালানের এই কোণ থেকে প্রতিমার মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়। প্রতিমার মুখের দিকে একঝলক তাকিয়ে বাইরের উঠোনটার দিকে তাকাল সে। সারাবছর শ্যাওলা পড়ে পড়ে পিছল হয়ে যাওয়া ভাঙা উঠোনটাকে একরাতের মধ্যে পরিস্কার করে আলপনা দিয়ে ছবির মতো সাজিয়েছে কানাইদারা। ঠিক যেমন আগে করত। আপাতত সেই উঠোনে টুবাই তার মামাতুতো ভাই-বোনেদের সাথে খেলতে ব্যস্ত। বয়সে বড়ো বলে সব বাড়ির সব বাচ্চারা ওকে সর্দার বলে মেনে নিয়েছে। সারাদিন ওদের সাথে হুটোপাটি করে কেটে যাচ্ছে টুবাইয়ের। আজ ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, তো কাল ডাংগুলি খেলছে। আজকের বিষয় লাট্টু। জিনিসটা প্রথমে দেখে বলেছিল, “আরে! এতো বেব্লেডের মতো!” তারপর তা নিয়েই চলছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে গোটা পুজোটাই এইভাবেই হেসে খেলে কাটিয়ে দেবে ঠিক যেমন মেয়েবেলায় দাদাদের সাথে হুটোপাটি করে ওর পুজো কাটতো। প্রথমে মৈত্রেয়ী বাধা দিতে গিয়েছিল কিন্তু পরে ভেবে দেখেছে সারাবছর তো স্মার্টফোন আর ডেস্কটপের সামনে বসেই কাটিয়ে দেয় ছেলেটা। এখানে এসে না হয় কদিন ঐ জিনিসগুলোর থেকে একটু দুরত্ব বজায় রাখুক। একঝলকে সেই দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মৈত্রেয়ী। নাহ সব একই আছে। কিছুই বদলায়নি। শুধু মাঝখান থেকে অনেকগুলো বছর কেটে গেছে।


মৈত্রেয়ীর মনে আছে বিয়ের আগের বছর কলেজের পুজোর ছুটিতে শেষবারের মতো এসেছিল সে। বাবা-মা, ঠাকুর্দা-ঠাম্মাম, জেঠু-জেঠিমা, মেজকা, ছোটকা, আর দাদাদের সাথে হই হই করে কাটিয়েছিল পুজোর পাঁচটা দিন। সেই শেষবার, তারপর প্রায় পনেরো বছর পর এই বাড়িতে পা দিল সে। পনেরো বছর! কথাটা বলতেই কম সময় লাগে। কাটানোর সময় মনে হয় এক একটা মুহূর্ত যেন এক একটা যুগের মতো করে কাটছে। অন্তত মৈত্রেয়ীর কাছে তো তাই মনে হয়েছে। এই পনেরোটা বছর সে যেন সবার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল একটা নিভৃতবাসে। এই পনেরোটা বছরে মৈত্রেয়ী নিজের পরিবারের সাথে কোনোরকম সম্পর্ক রাখেনি। মৈত্রেয়ীর বাড়ির লোকেরা এই পনেরো বছরে একদিনও কেউ ওর সাথে কোনোরকম সম্পর্ক, বা ওর কোনো খোঁজ রাখেনি বা বলা ভালো রাখতে চায়নি। সেটাই তো স্বাভাবিক! বাড়ির সকলের অমতে সাত্যকিকে বিয়ে করার পর ঠাকুর্দার আদেশেই বাড়ির সকলে ওর সাথে সমস্ত রকম সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল। বাবা তো বলেই দিয়েছিলেন ও নাকি ওনার কাছে মৃত। মৈত্রেয়ীও মেনে নিয়েছিল ঠাকুর্দার আদেশ। আর কোনোদিন যোগাযোগ করেনি বাপের বাড়ির কারো সাথে। শুধু টুবাইয়ের জন্মের সময় সাত্যকিকে দিয়ে একটা কল করিয়ে খবরটুকু দিয়েছিল। কিন্তু ওপার থেকে শীতল নীরবতা পাওয়ার পর দীর্ঘকাল আর কোনো যোগাযোগ রাখেনি। ফলে সম্পর্কের সুতোটাও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

ব্যাঙ্গালোরে তিন কামরার ফ্ল্যাটে স্বামী-ছেলেকে নিয়ে দিব্যি একটা সুখের সংসার গড়ে তুলেছিল সে। সংসারের কাজ, অ্যাপার্টমেন্টের অনুষ্ঠান, আর নিজের বয়সী গৃহিণীদের নিয়ে একটা ছোট গ্রুপ নিয়ে বেশ ছিল সে। তাহলে কীসের টানে এত বছর পর ফিরে আসতে হল তাকে? সে তো সব সম্পর্ক চুকিয়ে দূরে সরে গিয়েছিল। তাহলে ফিরে এল কেন? কারণটা বোধহয় মৈত্রেয়ীর জানা। কিন্তু কিছুতেই মানতে পারছে না সে। বেশ কাটছিল দিনগুলো। কিন্তু একটা ফোন সব পাল্টে দিল। ছোড়দা সেদিন কেন যে ফোনটা করতে গেল কে জানে? সেদিন ফোনটা না করলে হয়তো ওরা অন্য কোথাও বেড়াতে যেত। অন্তত ফোনটা আসার আগে তো সাত্যকি তাই ঠিক করেছিল।

দিনটা এখনও মনে আছে মৈত্রেয়ীর। সেদিন ছিল রবিবার। প্রতিবারের মতো সেদিনও বাড়িতে বসে সারাদিন ল্যাপটপে কাজ করে বিকেলে একটু ফ্রি হয়ে চায়ের কাপ নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল সাত্যকি। সামনেই দুর্গাপুজো। প্রতিবার পুজোর সময় ওরা কোথাও না কোথাও বেড়াতে যায়। এবার কোথায় যাবে সেই নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল এমন সময় সাত্যকির ফোনটা এল। মৈত্রেয়ী প্রথমে ভেবেছিল বোধহয় অফিসের ফোন এসেছে। কিন্তু সেই ভুলটা ভাঙতে বেশিক্ষণ লাগেনি। কলটা কাটার পর গম্ভীর মুখ করে সাত্যকি বলেছিল, “এবারের ট্রিপটা ক্যান্সেল করতে হবে বুঝলে? তোমার বাপের বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল। তোমার বাবা মৃত্যুশয্যায়। যে কোনো দিন মারা যেতে পারেন।”

“তো আমি কি করব?” বিরক্তির সাথে বলে উঠেছিল মৈত্রেয়ী। সাত্যকি চায়ের কাপে মৃদু চুমুক দিয়ে বলেছিল, “মরার আগে তোমাকে দেখতে চেয়েছেন। এবারের পুজোতে যাতে তুমি থাকো সেটাই ইচ্ছে তাঁর। বলতে পারো লাস্ট উইশ।”

- রাখো তোমার শেষ ইচ্ছে! যতসব ঢং! এতবছর পর আদিখ্যেতা দেখানো হচ্ছে! কই এতগুলো বছর গেল একবারও তো এই মেয়ের কথা মনে পড়েনি! আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি জানার প্রয়োজন বোধ করেনি। আর এখন দরদ উথলে উঠছে! কেন? আমি নাকি ওদের কাছে মৃত! তা হঠাৎ এই মরা মেয়েকে স্মরণ হল কেন? মরার আগে প্রায়শ্চিত্তের জন্য?

- আহ মিতু! হচ্ছেটা কি? হাজার হোক সম্পর্কে তিনি তোমার বাবা। নিজের বাবার সম্পর্কে এসব বলতে নেই।

- বেশ করব বলব। যেদিন থেকে ওদের কাছে আমি মৃত হয়ে গেছি। সেদিন থেকে ওরাও আমার কাছে মরে গেছে! কেউ নেই আমার! কেন? মনে নেই? টুবাইয়ের জন্মের খবর যখন দিতে গেলে মানুষটা কি ব্যবহার করেছিল? সটান রং নাম্বার বলে ফোন কেটে দিয়েছিল। তুমি ভুলে যেতে পারলেও আমি ভুলিনি। ওই বাড়ির কাউকে আমি জীবনে ক্ষমা করতে পারব না। তুমি ওদের ফোন করে বলে দাও আমরা আসতে পারব না। কোনো একটা অজুহাত দিয়ে কাটিয়ে দাও।

বলতে বলতে ছলছলে চোখে মেঝের দিকে তাকিয়েছি মৈত্রেয়ী। সাত্যকি বুঝেছিল মৈত্রেয়ী যে এই কথাগুলো বলছে একটাও মন থেকে নয় বরং অভিমানে কষ্ট পেয়ে। অন্তত ওর চোখ থেকে সেটা স্পষ্ট। এতগুলো বছর ভালোবেসে সংসার করতে করতে মৈত্রেয়ীকে সে হাড়ে হাড়ে চেনে। সাত্যকি মুচকি হেসে বলেছিল, “আচ্ছা বেশ তাই করব। তবে একটা কথাই বলার ছিল। মানুষটা তোমার বাবা। তিনি যতই অন্যায় করে থাকুন, আমাদের যতই আঘাত দিয়ে থাকুন বর্তমানে মানুষটা অসুস্থ আর মৃত্যুশয্যায় শয্যাশায়ী। তিনি যতই তোমাকে নিজের থেকে দূর করুন মন থেকে কোনোদিনই দূর করেননি। নাহলে শেষজীবনে এভাবে তোমাকে ডাকতেন না। আমার মতে এই সময় একজন সন্তান হিসেবে তোমার ওনার সামনে দাঁড়ানো উচিৎ।” মৈত্রেয়ী কিছু না বলে চুপ করে মাথা নামিয়ে বসেছিল। সাত্যকি হেসে একহাতে মৈত্রেয়ীর চিবুক ছুঁয়ে বলেছিল, “আঠেরো বছরের প্রেম আর পনেরো বছরের সংসার করেছি তোমার সাথে পাগলী! তোমার মনের কথা আমি জানবো না তো কে জানবে? মুখে যতই বলো না কেন ভেতরে ভেতরে তুমিও তোমার বাবার সাথে দেখা করার জন্য, বাড়ি ফেরার জন্য মরে যাচ্ছ। হাজার হোক রক্তের টানকে কি উপেক্ষা করা যায়?”

“অতশত জানি না। আমরা যাচ্ছি না মানে যাচ্ছি না!” বলে চায়ের কাপ নিয়ে মৈত্রেয়ী সোজা চলে গিয়েছিল রান্নাঘরে। সাত্যকি দু-একবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও মৈত্রেয়ীকে টলাতে পারেনি। শেষে একরকম হাল ছেড়ে দিয়েছিল সে। কিন্তু শেষপর্যন্ত পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে ওদের একপ্রকার বাধ্য হয়ে দেশের বাড়ি ফিরে আসতে হল।

এ বাড়িতে আসার পর গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে একবার আলগোছে তাকিয়ে দেখেছিল মৈত্রেয়ী। পনেরো বছরে বাড়িঘর, বাগান, পুকুর, ঠাকুরদালান কিছুই বদলায়নি। সব একইরকম আছে শুধু মানুষগুলো ছাড়া। পনেরো বছর আগের বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ কর্তা-গিন্নিরা অনেকেই আর ইহজগতে নেই। ঠাকুর্দা-ঠাম্মাম, জেঠু-জেঠিমা গত হয়েছেন অনেক বছর হল। মেজকা, ছোটকা দুজনেরই বয়সের কারনে স্বাস্থ্য ভেঙেছে। মেজদা, ছোড়দার চুলেও পাক ধরেছে। সেও কি আর সেদিনের কলেজ পাশ করা মেয়ে আছে নাকি? সেদিনের সেই তারুণ্য ঢাকা পড়ে গেছে মধ্যবয়সের গাম্ভীর্যে।

গাড়ি থেকে নেমে সোজা গটগট করে হেঁটে বাবার ঘরে ঢুকে দোর দিয়েছিল সে। তারপর ঘরের ভেতর বাবা-মেয়ের মধ্যে কি কথা হল কেউ জানে না। ঘন্টাদেড়েক পর ঘর থেকে মৈত্রেয়ী যখন বেরোল তখন তার চোখদুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাবা-মেয়ের মানভঞ্জনের সাথে সাথে অশ্রুপাতও অনেক পরিমাণে ঘটেছে। বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে সে দেখেছিল ইতিমধ্যে দালানের সামনে সাত্যকি আর টুবাইকে নিয়ে বাড়ির লোকেরা মেতে উঠেছে। বিশেষ করে টুবাইকে নিয়ে। দুজনকে একেবারে জামাইআদরে আপ্যায়ন করা হচ্ছে। ওদের দিকে একঝলক তাকিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল মৈত্রেয়ী।

“এখনই অঞ্জলী শুরু হবে! যারা যারা অঞ্জলী দেবে চলে এসো!” ঠাকুরমশাইয়ের কন্ঠস্বরে ঘোর কেটে গেল মৈত্রেয়ীর। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ঠাকুর দালানের দিকে তাকিয়ে নিয়ে তারপর টুবাইকে ডাকল সে। মায়ের ডাক শুনে ভাইবোনেরদের নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দালানে হাজির হল টুবাই। এ কদিনে ছেলেটা বাড়ির সকলের আদরের হয়ে উঠেছে। মা-বাবা তো টুবাই বলতে অজ্ঞান। বিশেষ করে মা। রোজ গাদাগুচ্ছের পদ করে খাওয়াচ্ছে। মৈত্রেয়ী বাধা দিতে গেলে বলছে, “থাম দিকিনি! সারাবছরই তো সেই তেল নুন ছাড়া সাঁতলানো খাবার খাস। কটা দিন একটু ভালোমন্দ খেলে কিছু হবে না। জামাইয়ের না হয় শরীর খারাপ বলে বাধ্য হয়ে ওসব অখাদ্য গিলতে বাধ্য হয়। কিন্তু আমার দাদুভাই? দাদুভাইয়ের কি দোষ? বেচারা তো কিছু খেতেই শিখল না? না সুক্তো, না বড়ি দিয়ে পাঁচমেশালি ঘন্ট। এমনকি বেচারাকে মাছ পর্যন্ত খাওয়া শেখাতে পারলি না। সত্যি করে বল তো মিতু! তুই ওখানে সংসার করিস তো নাকি সারাদিন টিভি দেখে কাটাস?”

টুবাইরা আসার পর ঠাকুরমশাই আরেকবার হাক দিলেন, “এখনই অঞ্জলী শুরু হবে! যারা যারা অঞ্জলী দেবে চলে এসো!” এবার সেই ডাক শুনে দালানের আশেপাশে যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল একে একে দালানের সামনে জড়ো হতে শুরু করল। পুষ্পপত্র থেকে ফুল-বেলপাতা নিয়ে টুবাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে মৈত্রেয়ী একবার চারদিকে তাকিয়ে দেখল সাত্যকি‌ নেই। আশ্চর্য! একটু আগেই তো ঐখানে বসে মেজদাদের সাথে আড্ডা মারছিল। কোথায় গেল? মৈত্রেয়ী উঠে দাঁড়াল। তারপর টুবাইকে জিজ্ঞেস করল, “তোর বাবা কোথায় গেল রে? এই তো ওখানে বসেছিল।”

- বাবা তো এইমাত্র দোতলায় গেল।

- দোতলায় গেল? কেন?

- কে জানে? গল্প করতে করতে আচমকা ফোন এল। সেটা রিসিভ করতে করতে দোতলার সিড়ির দিকে চলে গেল।

- ঠিক আছে তুমি এখানে দিদানের কাছে দাঁড়াও। এখনই অঞ্জলী শুরু হবে। ঠাকুরমশাই যে মন্ত্র বলবেন সেটাকে রিপিট করবে।তারপর সবাই যখন ঠাকুরের দিকে ফুল ছুঁড়বে তুমিও ফুল ছুঁড়বে। তারপর দিদানের থেকে ফুল নিয়ে আবার একই কাজ রিপিট করবে। আমি বাবাকে নিয়ে আসছি।

বলে টুবাইকে অঞ্জলী দেওয়ার জন্য দাঁড়াতে বলে মৈত্রেয়ী এগিয়ে গেল দোতলার সিড়ির দিকে।

ঘরে ঢুকে মৈত্রেয়ী দেখল সাত্যকি বিছানার উপর শুয়ে আছে। একহাত দিয়ে চোখ ঢাকা। কাছে গিয়ে দেখল ঘেমে স্নান হয়ে গেছে সাত্যকি। সকালে পরা নীল পাঞ্জাবীটা ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। মৈত্রেয়ী অবাক হয়ে খাটে বসে জিজ্ঞেস করল, “কি ব্যাপার? অবেলায় শুয়ে আছো যে!” চোখ থেকে হাত না সরিয়ে সাত্যকি জবাব দিল, “ও কিছু না। শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল তাই শুয়েছি। অঞ্জলী শুরু হলে ডেকো।”

- শরীর খারাপ লাগছে মানে? সুগার ফল করেনি তো? এই সকালে ওষুধ খেয়েছ?

- আগে অঞ্জলী দিয়ে নিই। তারপর নাহয়...

- রাখো তোমার অঞ্জলী! আগে বাঁচলে তারপর অঞ্জলী দেবে।

বলে গজগজ করতে করতে ব্যাগ থেকে ওষুধ বের করতে গিয়ে মৈত্রেয়ী দেখল সাত্যকির সুগারের ওষুধটা নিলেও প্রেসারের ওষুধটা তাড়াহুড়োয় নিতে ভুলে গেছে। মৈত্রেয়ী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল খাটে। সর্বনাশ! কি হবে এখন? এখানে তো সেই ওষুধটা পাওয়াও যাবে না! মেজকাকে বললে ও ম্যানেজ করে অন্য ব্র্যান্ডের ওষুধ দিতে পারে কিন্তু একটু আগেই তো মেজকাকে দালানে অঞ্জলী দিতে দেখল তারমানে তো ওষুধের দোকান বন্ধ! এখন কী করবে? কী করা যায়? ছোড়দাকে একবার ডাকবে? ওতো ডাক্তার...চকিতে সাত্যকির দিকে একবার তাকিয়ে মৈত্রেয়ী বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

সাত্যকির শরীর তখন ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাসের গতি কমছে। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে সে। ক্রমশ চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। সাত্যকি বুঝতে পারছে প্রেসার ফল করার জন্য ধীরে ধীরে জ্ঞান হারাচ্ছে ও। মৈত্রেয়ীকে বেরিয়ে যেতে দেখে সে একবার চেষ্টা করল ওকে থামানোর, কিন্তু পারল না। ধীরে ধীরে সাত্যকি তলিয়ে যেতে লাগল অচৈতন্যভাবের অন্ধকারে। একসময়ে মৈত্রেয়ীর কন্ঠস্বর শুনতে পেল সে। তারপর আর কিছু মনে নেই।

হাতে একটা চিনচিনে ব্যথা টের পেতেই জ্ঞান ফিরল সাত্যকির। আর জ্ঞান ফিরতেই পাশ ফিরে সে দেখল ছোট শ্যালক ওর পাশে বসে আছে। শেষ দুপুরের আলোয় ঘরটা ঝলমলে হয়ে উঠেছে। সেই আলোয় সাত্যকি একঝলক চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল ওদের ঘরে একাধিক লোক ওর দিকে তাকিয়ে আছে। শাশুড়ি, শ্বশুর, শ্যালক-শ্যালিকারা বিছানার চারদিকে দাঁড়িয়ে। লজ্জায় উঠে বসতে যাবে এমন সময়‌ পাশ থেকে একটা নরম হাত ওকে বাধা দিল। সাত্যকি তাকিয়ে দেখল ওর মাথার কাছে মৈত্রেয়ী বসে আছে। আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল সাত্যকি। চোখ বুঁজে জিজ্ঞেস‌ করল, “কতক্ষণ?”

“তা এই ঘন্টাচারেক তো হবে।” ছোটো শ্যালকের গলা পেল সে। ছোটো শ্যালক বলে চলল, “যা টেনশনে ফেলে দিয়েছিলেন আপনি! ব্লাড প্রেসার এত ফ্ল্যাকচুয়েট করে জেনেও উপোস থাকতে গেলেন কেন? ভাগ্যিস মিতু বুদ্ধি করে আমাকে ডাকল। নাহলে তো সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেত। অবশ্য শরীরের আর দোষ কি? কদিন ধরে যা চোব্য চোষ্য চলছে এতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে। এবার বুঝলে মা? কেন আমি আর মিতু তোমাকে বারণ করতাম অতো অয়েলি ফুড না দিতে? আগেকার দিন আর নেই! এখন সকলের বয়স হয়েছে। এত রিচ খাবার হজম করার মতো শক্তি আমাদের কারোরই নেই। হতে পারে ওটা তোমাদের কাছে ভালোমন্দ খাবার কিন্তু সুগার-প্রেসার রুগীর কাছে সেটা বিষ!


শ্যালকের কথায় শাশুড়ি মুখে আঁচলচাপা দিয়ে কাঁদছেন দেখে সাত্যকি শ্যালককে থামিয়ে বলল, “আহা খামোখা ওনাকে বকছো! ওনার কোনো দোষ নেই। সত্যি কথা বলতে গেলে দোষ আমারই। মিতু ওষুধ এনেছিল ঠিকই। কাল রাতে ফুরিয়ে যাওয়ায় স্ট্রিপটা ফেলে দিয়েছিলাম। আজ বিকেলেই কিনে আনতাম। ভেবেছিলাম একবেলায় তেমন কিছু হবে না। এতটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি। ইস! আমার জন্য তোমাদের পুজোটাই মাটি হয়ে গেল। শুধু শুধু তোমাদের অহেতুক টেনশনে ফেলে দিলাম, সরি। মা আপনি কিছু মনে করবেন না। চিন্তা নেই আমি এখন ঠিক আছি।”

ছোটো শ্যালক ডাক্তারি সরঞ্জামগুলো ব্যাগে গুছিয়ে বলল, “সে আপনি যাই বলুন সাত্যকিদা। ঐ খাবারগুলো আপনার পক্ষে বিষই। আর আজকের পর আর কেউ দিক বা না দিক অন্তত আমি খেতে দেবো না। মিতুকে বলা আছে। আজ রাত থেকে শুধু চিকেন স্টু আর রুটি আপনার খাদ্য। দুবেলা ওটাই গলাধঃকরণ করতে হবে। আর বাড়ি ফিরে আরেকবার চেকআপ করিয়ে নেবেন। সুগারটাও একটু বেড়েছে মনে হচ্ছে। আপাতত আজকের দিনটা রেস্ট নিন।” বলে সকলকে ঘর থেকে বেরোবার নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে গেল ছোটো শ্যালক। কিছুক্ষণ সেখানে থাকার পর একে একে সকলে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর মৈত্রেয়ীর হাত ধরে সাত্যকি বলল, “টুবাই…?”

সাত্যকির মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে মৈত্রেয়ী বলল, “এসেছিল। এখন নিচে বাকি বাচ্চাদের সাথে খেলছে।” চোখ বুঁজে মৃদু হেসে সাত্যকি বলল, “থ্যাঙ্কস!” মৈত্রেয়ী সেটার জবাব না দিয়ে বলল, “থাক! অনেক হয়েছে! সারাদিন অনেক জ্বালিয়েছ এখন আপাতত একটু ঘুমোও। ভালো লাগবে।”

মৈত্রেয়ীর দিকে তাকিয়ে আরেকবার হাসল সাত্যকি। তারপর ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, “এখানে আসার পর থেকে দেখছি শাশুড়িমা আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমাকে আর টুবাইকে নিয়ে ওনার আদরের আর শেষ নেই। ‘মেজো জামাই এই...’, ‘মেজো জামাই ঐ...’,‘মেজো জামাই না থাকলে কী যে হত?’ তা আজ তো তাকে তাঁর মেজো মেয়ের প্রশংসা করতে দেখলাম না। তাঁর মেয়েও যে যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে।”

- বাজে কথা না বলে ঘুমোও।

- আমি বাজে কথা বলছি না। সত্যিই তুমি না থাকলে হয়তো এতক্ষণে বৈতরণী পাড়ে চোখ খুলতো আমার।

শশব্যস্তে সাত্যকির মুখে হাত চাপা দেয় মৈত্রেয়ী। তারপর কড়াগলায় বলে, “চুপ! একদম চুপ! আরেকটা কথা বললে ভালো হবে না বলে দিলাম! তোমার মুখে কি কিছু আটকায় না? একে শরীরের এই অবস্থা করে আমাকে পাগল করে দিয়েছ। তারপর মরার কথা বলে জ্বালাচ্ছ! লজ্জা করে না! জানো সারাটা দিন কীভাবে কেটেছে আমার? আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল পুরো! এরপর যদি আরেকবার তোমাকে অনিয়ম করতে দেখি তাহলে তোমার একদিন কি আমার একদিন!” বলেই পরক্ষণেই সম্বিত ফিরে পেয়ে সাত্যকির মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয় মৈত্রেয়ী। সাত্যকি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মৈত্রেয়ীর দিকে। মৈত্রেয়ী নীচু গলায় বলে, “সরি!” সাত্যকি চোখ বুঁজে আলতো গলায় বলে,

- এতে সরি বলার দরকার নেই। দোষ আমারই। আমিই ওষুধের কথা জানাইনি তোমাকে। ভেবেছিলাম তেমন ঝামেলা হবে না, কিন্তু কপাল মন্দ আমার।

- আমি সেভাবে বলতে চাইনি।

- জানি। তুমি আমার স্ত্রী মৈত্রেয়ী। আমাকে ভালোবাসার অধিকার যেমন তোমার আছে তেমনই শাসন করারও আছে। আর শাসন করা তাকেই সাজে সোহাগ করে যে। তবে একটাই আক্ষেপ আছে জানো?

- কী?

একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৈত্রেয়ীর দিকে তাকায় সাত্যকি তারপর বলে, “তুমি না দিন দিন বড্ড বড্ড ঝগড়ুটে বুড়ি হয়ে যাচ্ছ। খালি শাসন করো!” মৈত্রেয়ীও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “কি করব বলো? বর যদি বাচ্চাদের মতো আবদার করে তখন শাসন না করে লাভ আছে? মা বলেছিল ব্যাঙ্গালোরে আমি সংসার করি না। সারাদিন টিভি দেখে বেড়াই। মা কি করে জানবে দুটো ধেড়ে বাচ্চাকে নিয়ে সারাদিন এমন কাটে যে টিভি দেখার প্রয়োজন পড়ে না। নিজের সংসারটাই সিরিয়াল বলে মনে হয়।”

- কি? আমি ধেড়ে খোকা?

- না তো কি? সারাদিন তোমার পেছনে যা ঘুরতে হয় টুবাইয়ের ছেলেবেলাতেও অতো ঘুরতে হয়নি। লকডাউনের আগে তাও ছুটির দিনে আমাকে হেল্প করতে। এখন তো তাও করো না। সারাদিন হয় খাবার নিয়ে নাহয় ওষুধ নিয়ে তোমার পেছনে দৌড়তে হয়। বাচ্চাদের মতো চোখে চোখে রাখতে হয়।

- রাখতে হবে না আমার খেয়াল! কে বলেছে আমার পেছন পেছন দৌড়তে? আমারটা আমিই দেখে নিতে পারি।

- থাক! তোমার দৌড় আমার জানা আছে। নিজে থেকে তো কিছুই করতে পারো না। সব সময় এই আমাকে লাগে তোমার। সারাদিন ‘মিতু আমার চশমা কই?’, ‘মিতু আমার ফোনটা কোথায়?’, ‘মিতু গাড়ির চাবি পাচ্ছি না।’ সবসময় মিতু মিতু আর মিতু। আমি না থাকলে বা একদিনের জন্য বাইরে গেলে বাপ-ব্যাটায় চোখে সর্ষেফুল দেখো। মনে নেই? সেবার সোসাইটির সব মহিলাদের সাথে একটু সিনেমা দেখতে গেছি ওমনি বাবু অফিস থেকে ফিরে গোঁসা করে বসে আছে। অন্যদিন তো রাত আটটার আগে ফেরা হয় না। সেদিন ছটা বাজতে না বাজতে ফিরে আসা হয়েছে।

- বেশ করেছি! অন্যদিন মুভিডেটের কথা বললে বলো, ‘আজ থাক! শরীর ভালো নেই’, ‘টুবাইয়ের পরীক্ষা চলছে।’ আমিও মানুষ! আমারও ইচ্ছে করে নিজের বউকে নিয়ে ডেটে যেতে!

- ইস! শখ কত? বলি বয়সটা দিন দিন বাড়ছে না কমছে?

- বয়সের আর কি দোষ? এরকম সুন্দরী বউ থাকলে সকলের মাথা ঘুড়ে যেতে বাধ্য।

বলে সাত্যকি জড়িয়ে ধরে মৈত্রেয়ীকে। দরজার দিকে একবার তাকিয়ে মৈত্রেয়ী শশব্যস্ত হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে ওঠে, “কি হচ্ছেটা কি? ছাড়ো! বাড়িভর্তি লোকজন! কেউ দেখে ফেললে কি হবে?” মৈত্রেয়ীকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সাত্যকি বলে, “কিছু হবে না। আমার বউকে আমি আদর করছি এতে কে কি ভাবল আই ডোন্ট কেয়ার। তাছাড়া সবাই জানে এ বাড়ির জামাই এখন অসুস্থ। তার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। আর সেই কারনে অন্তত এবেলা কেউ এদিকে আসবে না। কাজেই এবেলা ম্যারাথন খেললে ধরা পড়ার চান্স নেই।”

“সে গুড়ে বালি মশাই! আরেকটু পরে সন্ধিপুজো শুরু হবে। আর বাড়ির মেয়ে হিসেবে আমাকে থাকতে হবে সেখানে।” বলে সাত্যকির গালে একটা চুমু খেয়ে হাতে চিমটি কাটে মৈত্রেয়ী। মৃদু যন্ত্রণায় সাত্যকির বাহুডোরের জোর একটু আলগা হয়। সেই সুযোগে নিজেকে ছাড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় মৈত্রেয়ী। ওর দিকে তাকিয়ে হতভম্ব সাত্যকি বলে, “আর আমার কি হবে? শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী সেবা পাবো না?” দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মৈত্রেয়ী চটুল হেসে “সে পরে দেখা যাবে!” বলে বেরিয়ে যায়। সেদিকে তাকিয়ে আপন মনে হেসে বিছানায় শুয়ে চোখ বোজে সাত্যকি। অনেকদিন পর মৈত্রেয়ীকে এতটা প্রগলভ দেখল সে। ঠিক বিয়ের আগের মতো। নাহ এখানে আসার সিদ্ধান্তটা নিয়ে ভুল করেনি সে। বরং না এলে আফসোস থেকে যেত চিরকালের মতো। না এলে মৈত্রেয়ীকে এত হাসিখুশি দেখতে পারত সে?

সত্যি কথা বলতে গেলে অনেকদিন ধরে একটা অভিমান জমেছিল দুপক্ষের মধ্যে। যার কারনে কষ্ট পাচ্ছিল দুপক্ষই। কেন পুজোর সময়টাতেই মৈত্রেয়ী বাইরে যাবার প্ল্যান করতে বলতো সে কি আর জানে না? যাতে নিজের মনকে ভুলিয়ে রাখা যায়। যাতে পুজোর সময় নিজের লোকেদের কাছ থেকে দূরে থাকার কষ্টটা ভোলা যায়। কিন্তু পারত কি? সাত্যকি দেখেছে বাইরে বেরোতে গেলেও কীরকম যেন আনমনা হয়ে যেত মৈত্রেয়ী। বাইরে থেকে দেখাত বটে যে এই ট্যুরটা সে এঞ্জয় করছে কিন্তু ভেতর ভেতর গুমড়ে মরত সে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম বাইরে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ রাতে ঘুম ভেঙে সে মৈত্রেয়ীকে কাঁদতে দেখেছে। মৈত্রেয়ীকে সে ভালোবাসে। তাই আজীবন এই অভিমানের খেলায় মৈত্রেয়ী ওর পরিবারের থেকে দূরে থাকুক চায়নি সে। তাই এবছর নিজে থেকেই ছোটো শ্যালকের সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ করেছিল সে। তারপর ছোটো শ্যালকের সাথে মিলেই এই পরিকল্পনাটা করে সে। কিন্তু দুজনের কাছে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল মৈত্রেয়ী আর শ্বশুরমশাইকে কনভিন্স করা। মৈত্রেয়ীকে নাহয় ম্যানেজ করা গেল কিন্তু শ্বশুরমশাই? তাকে কিভাবে ম্যানেজ করবে সেটা নিয়েই চিন্তিত ছিল সে। কিন্তু এখানে আসার পর সেই মুশকিলটাও আসান করে দিল টুবাই। নাতিকে সামনে দেখে শ্বশুরমশাই এমন গলে গেলেন যে বাকি কাজটাও সহজ হয়ে গেল। ভাবতে ভাবতে আলতো হাই তোলে সাত্যকি।

ওদিকে মায়ের সন্ধি-পুজো প্রায় শুরুর মুখে। বাড়ির সমস্ত মেয়ে-বউরা একে একে জড়ো হয়েছে ঠাকুর দালানে। মৈত্রেয়ী দোতলা থেকে নেমে পায়ে পায়ে এগিয়ে মিশে যায় সেই মেয়ে-বউদের দলে। সকলে মিলে লজ্জাবস্ত্র তুলে ধরে মায়ের সামনে। ঠাকুরমশাইয়ের মন্ত্রোচ্চারণে, ঢাকিদের ঢাকের শব্দে, ঠাকুরদালানের পরিবেশ তখন বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে। ক্রমাগত জ্বলে ওঠা ধূপের ধোঁয়ায় দেবীপ্রতিমার মুখটা প্রায় আবছা হয়ে এলেও সে মুখে আজ যেন বেশ অন্যরকম দীপ্তি দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন প্রতিমার ঠোঁটের হাসিটা একটু চওড়া হয়েছে। এ হাসি ভারী আমোদের হাসি। যেমনটা অনেকবছর পর নিজের প্রিয়জনের সাথে দেখা করার সময় দেখা যায়। যে হাসিটা বহুদিন পর বাড়ির মেয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এলে আত্মীয় পরিজনদের মধ্যে দেখা যায়। যখন মা তার সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে আসেন চারদিনের জন্য তখন যে হাসিটা আমাদের মধ্যে সঞ্চালিত হয়, এ হাসি সেই হাসি। ধীরে ধীরে সেই হাসিটা ছড়িয়ে পড়ে দালানে উপস্থিত সকলের মধ্যে।


রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০২২

মায়া




নিজের রুমে ঢুকেই সিলিংফ্যানের সুইচ অন করে ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে চেয়ারে বসলেন অতীনবাবু। দিন দিন যা অসম্ভব গরম পড়ছে তাতে তাঁর মতো মোটা মানুষের টেকা দায়। কতদুর হবে বাড়ি থেকে স্কুলের দুরত্ব? বড়োজোর কুড়িমিনিটের হাটা পথ। সাইকেল চালালে মিনিট দশেক লাগে। অথচ সেটুকু পথ সাইকেলে পেরোতেই আজ প্রায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল তাঁর। জামাকাপড় ঘামে ভিজে চপচপে হয়ে গেছে। চেয়ারে বসে ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে ফ্যানের তলায় চোখ বুঁজে কিছুক্ষণ বসে রইলেন তিনি।


সত্যি কথা বলতে গেলে গরমকাল তাঁর কোনো কালেই পছন্দ নয়। ছেলেবেলা থেকেই গরম সহ্য করতে পারেন না তিনি। পারদের মাত্রা তিরিশের উপরের গেলেই তাঁর নানারকম অস্বস্তি শুরু হয়। তার উপর ঘামাচি, র‍্যাশ হওয়া তো লেগেই আছে। এই গরমকালের চেয়ে শীতকাল ঢের ভালো। কত সুন্দর মিঠে রোদের ওমে পিঠ রেখে কাজ করা যায়। অতীনবাবুর মনে আছে ছেলেবেলায় ছুটির দিনে শীতের সকালে ছাদে শতরঞ্চি পেতে বসে পড়তেন পড়ার বই নিয়ে। তারপর সারাটা দিন যে কোথা দিয়ে কেটে যেত টেরই পেতেন না। খেয়াল হত যখন দুপুরে মা স্নানের তাগাদা দিয়ে ডাকতেন। এখনও যে সেই অভ্যেসটা নেই তা নয়। এখনও ছুটির দিনে ছাদে শতরঞ্চি পেতে গল্পের বই নিয়ে বসে যান তিনি। যতক্ষণ পর্যন্ত একতলা থেকে সৌমির ডাক না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত ধ্যান ভাঙে না তাঁর।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটু ঘোরের মতো এসে গিয়েছিল অতীনবাবুর। প্রেয়ারের বেলের শব্দ শুনে সেটা কেটে গেল। সোজা হয়ে চেয়ারে বসলেন তিনি। খেয়াল করলেন শরীরের ক্লান্তিটা এখন অনেকটাই কেটে গেছে। আগের চেয়ে এখন বেশ সুস্থ বোধ করছেন তিনি। একটু আগের সেই দমবন্ধ বন্ধ করা ভাবটাও অনেকটাই কমে গেছে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলেন প্রেয়ারে যোগ দিতে।

অতীনবাবু পেশায় একজন বাংলা শিক্ষক। এই পার্বতীচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ে আজ তিরিশ বছর হল তিনি শিক্ষকতা করে আসছেন। প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদান করেছেন এই বছর পাঁচেক হল। সাধারণত প্রধান শিক্ষক বলতে আমাদের চোখের সামনে যে চেহারাটা ভাসে অতীনবাবুর ব্যক্তিত্ব তার ঠিক উল্টো। কোনো উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলতে আমরা বুঝি রাশভারী, গম্ভীর, ব্যক্তিত্বময় একজন মানুষ। যার মুখটা সব সময় পেঁচার মতো গম্ভীর হয়ে আছে। কিন্তু অতীনবাবুকে দেখলে মনে হবে হয় আমরা এতদিন যা জেনে এসেছি তা ভুল, নাহলে প্রধান শিক্ষক বলে যে মানুষটার সাথে আমাদের ছেলেবেলায়, বা বলা ভালো স্কুলবেলায় পরিচয় ঘটেছে তিনি অন্য কোনো গ্রহের লোক ছিলেন। পদমর্যাদায় একজন প্রধান শিক্ষক হলেও অতীনবাবু লোকটা ভীষণ অমায়িক, আমুদে, আর ছাত্রদের মধ্যে জনপ্রিয়। প্রধানশিক্ষক হলেও নিজের চাকরীজীবনের শিকড়কে তিনি ভোলেননি। নিজের রুমে থেকে যাবতীয় কাজ করলেও নিয়মিত ছাত্রদের ক্লাস নেওয়া, টিফিন পিরিয়ডে স্টাফরুমে বসে অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে আড্ডা দেওয়া, মালির সাথে নতুন ফুল গাছের বিষয় গল্প করা সবই তিনি হাসি মুখে করে থাকেন। এতবছরের চাকরীজীবনে অতীনবাবুকে কেউ কোনোদিন রাগতে বা গম্ভীর মুখে দেখেনি। বরং সারাক্ষণ ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি লেগেই রয়েছে তাঁর। স্কুলে কেউ কোনো অপরাধ করলে, কেউ শয়তানি করলেও তিনি রাগ করেন না। এমনকি ছাত্রদের শাস্তিও দেন না। না ভুল বলা হল, শাস্তি তিনি দেন ঠিকই। কিন্তু সে শাস্তিগুলোও বড়ো আজব।

ধরা যাক কোনো ছাত্র আরেক ছাত্রের জামায় কলমের আঁচড় কেটে দিল, বা জামাটা নোংরা করে দিল। তার শাস্তি হবে নিজের জামায় কলম দিয়ে ‘আমি অমুকের জামায় কলমের দাগ কেটে ভীষণ দুঃখিত। আমি প্রতিজ্ঞা করছি জীবনে কারো জামায় দাগ দেব না।’ লিখে কান ধরে সেই জামায় দাগ খাওয়া ছেলেটার সামনে দশবার উঠবোস করা। কেউ যদি টিফিন টাইমের আগে খাবার খেতে গিয়ে ধরা পড়ে, পরদিন গোটা ক্লাসকে সে দুটো করে সিঙ্গারা খাওয়াবে। কারন সে টিফিন টাইমের আগে খেয়ে যেমন নিয়ম ভেঙেছে, তেমনই ক্লাসের সহপাঠীদেরকেও খাবারের লোভ দেখিয়ে পড়ার মনঃসংযোগ নষ্ট করে নিয়ম ভাঙতে প্রলুব্ধ করেছে। কেউ যদি স্কুল থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে, তাহলে তাকে গোটা সপ্তাহ স্কুল খোলার আগে স্কুল আসতে হবে। প্রেয়ারে সবার সামনে জাতীয় সংগীত গাইতে হবে এবং গান শেষে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জাতীয় পতাকাকে স্পর্শ করে শপথ করতে হবে যে আর কোনোদিন সে এই কাজ করবে না। পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়লে পরীক্ষার পর গোটা স্কুলের সমস্ত ক্লাসের মেঝেতে পড়ে থাকা নকলের টুকরো কুড়িয়ে ক্লাসরুমগুলো পরিস্কার করতে হবে। আর ধরা যাক ব্যাপারটা মারপিটে গড়াল। তাহলে যে মারপিট আগে শুরু করেছে সেই মূল অপরাধীকে সে দিনের মতো মেয়েদের ক্লাসের সামনে নিলডাউন হয়ে বসে থাকতে হবে। এবং পরের একসপ্তাহ যার সাথে মারপিট হয়েছিল তাকে বুকে জড়িয়ে সরি বলতে হবে।

অতীনবাবুর এই বিধানে কেউ কেউ অবাক হন, কেউ হাসেন, কেউ কেউ রাগ করেন। একবার তো অঙ্কের স্যার তুষারবাবু বলেই বসলেন, “দূর! ওটা কোনো শাস্তি হল নাকি? এরা সব বেতের ভুত। বাবা-বাছা করে ভুলিয়ে উদ্ভট শাস্তি দিলে শোধরাবে না। বেতই হল এদের মোক্ষম ওষুধ। দু-চার ঘা বেতের বাড়ি দিলে সব শুধরে যাবে।” অতীনবাবু সবটা শুনে মুচকি হেসে বললেন, “বেশ তো! তা আপনার বাড়ির সন্তানদেরও এইভাবে মানুষ করেন বুঝি?” তুষারবাবু গর্বিতভাবে হেসে বলেন, “কি যে বলেন স্যার? আমার বাড়ির বাচ্চারা অন্তত এদের মতো ত্যাঁদড়, লেজকাটা হনুমান নয়। ওরা অনেক ভদ্র সভ্য।” উত্তরটা শুনে আরো মুচকি হেসে অতীনবাবু বলেন, “আমি সেই কথা বলছি না। আমি বলতে চাইছি, ধরুন আপনার বাড়ির বাচ্চা একদিন ঘরের জিনিস ভুল করে ভেঙে ফেলল। ধরা যাক আপনার সাধের ফোনটাই আছড়ে ফেলল। সেক্ষেত্রেও কি আপনি বাচ্চাটাকে বেতপেটা করবেন?” পলকে তুষারবাবু চমকে নিজের বুক পকেট খামচে ধরে দামী ফোনটা বের করে বলেন, “কি যে বলেন? নিজের সন্তানকে কি আর ওভাবে মারা যায়? তাছাড়া আমার বাড়ির সন্তান তো অবুঝ, দুগ্ধপোষ্য!”

কথাটা শুনে হেসে অতীনবাবু জবাব দেন, “আমার স্কুলের বাচ্চারাও যে সে নিয়মে আমারই সন্তান। হ্যা ওরা ঠিক দুগ্ধপোষ্য নয়, তবে অবুঝ বটে। ভালো-মন্দের বিচার করার মত বোধ ওদের নেই। কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়, শত্রুতা-বন্ধুত্বের সঠিক হিসেব ওরা জানে না। বলতে পারেন ওরা মাটির তাল মাত্র। যাকে গড়ে সুন্দর মাটির সব বস্তু বানানোর দায়িত্ব আমাদের। ওরা আমাদের যেমন দেখবে তেমনই শিখবে। আর কাউকে বেত মেরে শেখানোর ব্যবস্থার আমি ঘোরতর বিরোধী। এতে কোনো লাভ তো হয় নাই, তার উপর শাস্তি সম্পর্কে ওদের ভুল জ্ঞান তৈরি হয়। হ্যা শাস্তি দেবেন না কেন? দিন যতখুশি পারেন দিন। কিন্তু সেটা যাতে শারীরিক বা মানসিক আঘাতের কারন না হয়। বরং এমন শাস্তি দিন যেটায় ওদের বিবেক, মননের বিকাশ হয়, চরিত্রের উন্নতি ঘটে। যে শাস্তির প্রভাবে সত্যিই ওদের মনের সংশোধন হয়। যার সাথে অন্যায় করা হয়েছে, তার যন্ত্রণাটা যতক্ষণ দোষী অনুভব না করছে, অন্যায়ের জন্য যতক্ষণ দোষীর অনুতাপ না হচ্ছে ততক্ষণ শাস্তির কোনো মানেই হয় না। ওরা যদি দেখে অন্যায় করলে একটা বেতের বাড়ি খেলে, বা লাঠির আঘাত পেলেই সাতখুন মাফ হয়ে যাচ্ছে। তাহলে শাস্তির প্রতি ওদের ভয়টাই থাকবে না। আর যাদের শাস্তির প্রতি ভয় থাকে না তাদের কি বলে জানেন? বেপরোয়া। আর একজন শিক্ষক হয়ে আমার কোনো শিক্ষার্থীকে বেপরোয়া হতে দিতে আমি পারি না। তাছাড়া এদের বাবা-মায়েরা এদের স্কুলে পাঠান আমাদের ভরসায়। একজন শিক্ষক হিসেবে সেই ভরসার মান রাখা আমাদের কর্তব্য। এটা ভুললে চলবে না স্কুলে প্রেয়ারের বেল পড়ার পর থেকে ছুটির বেল পড়া পর্যন্ত এদের দায়িত্ব আমাদের উপর। এই সময়টুকু আমরাই এদের বাবা-মা। এরা ভালো কিছু করলে যেমন আমাদের উৎসাহ দেওয়া উচিৎ, তেমনই ভুল করলে বকাঝকা বা মারধোর না করে ওদের ভুলটা ধরিয়ে দেওয়াটাও আমাদের কর্তব্য। আপনারা এটাকে পাগলামো বা ছাত্রদের প্রশ্রয় দেওয়া বলতেই পারেন কিন্তু যতক্ষণ আমি এই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে আছি বা এই শিক্ষকতার পেশায় আছি ততদিন এইভাবেই ছাত্রদের প্রশ্রয় দিয়ে যাব।”

শোনা যায় তুষারবাবু সেই সময় কিছু না বললেও পরে জনান্তিকে ইংরেজির ম্যাডাম ঐন্দ্রিলাদেবীকে বলেছিলেন, “অতীনবাবুর অবিলম্বে ডাক্তার দেখানো উচিৎ। আগে তো মিনি ক্র্যাকড ছিলেনই, হেডু হবার পর ফুল ক্র্যাকড হয়ে গেছেন। আরে রুটি দু-পিঠে সেঁকতে হয়। নাহলে ভালো রুটি তৈরি হয় না। এতবছর হয়ে গেল আমরা স্কুলে কম বাচ্চা মানুষ করিনি। উনি যাদের অবুঝ বাচ্চা বলছেন তারা চৌবাচ্চা ছাড়া আর কিছু নয়। ক্লাস সেভেনের অপুর্বকে কাল দেখলাম, এই বয়সেই সিগারেট ধরেছে। নেহাত আমাকে দেখে পালিয়ে গেল। নাহলে ধরে ওখানেই পিঠের ছাল তুলে নিতাম।”

প্রত্যুত্তরে ঐন্দ্রিলাদেবী বলেছিলেন, “সে আপনি যাই বলুন তুষারদা। লোকটার প্রতি ছাত্রদের একটা আলাদাই ক্রেজ আছে। অন্য স্কুলের প্রিন্সিপালদের দেখলে স্টুডেন্টরা ভয়ে তটস্থ থাকে। এদিকে আমাদের অতীনবাবুকে দেখলে ছেলেরা আনন্দে নাচে। কিছু তো একটা আছে লোকটার মধ্যে।”

“হুম আছে তো! অন্ধস্নেহ!” বলে গজগজ করে ক্লাস নিতে চলে গিয়েছিলেন তুষারবাবু।

*****

- আজ তবে এইটুকু থাক। কাল কিন্তু সবাই পড়া করে আসবি। আমি পড়া ধরব। পড়া না পারলে কি হবে মনে আছে তো?

বলে ক্লাসের দরজার বাইরের দিকে তাকান অতীনবাবু। বাইরে নীলডাউন হয়ে কান ধরে বসে আছে ক্লাস সিক্সের সুনীল। ক্লাসের সবচেয়ে বেশি অমনোযোগী ছাত্র। স্কুলে ডানপিটে ছাত্রদের মধ্যে এর নামও শুনেছেন তিনি। ছাত্ররা অতীনবাবুর সঙ্গে ক্লাসের বাইরে তাকাল। তারপর সমস্বরে বলল, “বাইরে নীলডাউন!”

- কথাটা মনে থাকে যেন!

বলে চক-ডাস্টার নিয়ে ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে আসেন অতীনবাবু। তারপর সুনীলের কাছে গিয়ে বলেন, “থাক! অনেক শাস্তি পাওয়া হয়েছে! এবার ক্লাসে গিয়ে আমাকে উদ্ধার করা হোক।” সুনীল কান ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। অতীনবাবু হেসে বলেন, “আর কতদিন এই ক্লাসে পড়ে থাকবি? তিনবছর তো হতে চলল! তোর বয়সের সব ছেলেরা, তোর সহপাঠীরা সব সামনের বছর মাধ্যমিক দেবে। আর তুই এত বড়ো হয়ে…পড়াশোনাটা একটু ভালো করে কর বাবা! জানি তোর বাবা অসুস্থ হবার পর তোকেই দোকানে বসতে হয়। অনেক চাপ তোর মাথায়! তাই বলে এইভাবে বছর বছর ফেল করবি?”

সুনীল মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে। অতীনবাবু হেসে সুনীলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, “শোন ছেলে! তোর মাথা ভালো কিন্তু তা পড়াশোনায় না লাগিয়ে অপুর্বদের সাথে মিশে বদকাজে লাগাস বলেই তোকে শাস্তিটা দিই। হ্যা বদমাইসি করবি না কেন? অবশ্যই করবি! হাজারবার করবি। কিন্তু তার সাথে পড়াশোনাটাও করতে হবে তো! যা ক্লাসে যা। ভালো করে পড়। কাল কিন্তু আমি পড়া ধরবো। মনে থাকবে তো?”

সুনীল মাথা নেড়ে ক্লাসে চলে যায়। অতীনবাবু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন, তারপর আপন মনে হাসতে হাসতে মাথা নেড়ে এগিয়ে যান স্টাফরুমের দিকে।

*****

স্কুলের সব কাজ সেরে অতীনবাবু যখন স্কুল থেকে বেরোলেন ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা বিকেল পাঁচটার ঘর ছুঁয়েছে। স্কুলের দারোয়ান কাম পিয়ন নিবারণ হেডমাস্টারের ঘরের বাইরে বসেছিল। তিনি বেরিয়ে যেতেই দরজা আটকে তালা মেরে দিল। অতীনবাবু সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাজারের উদ্দেশ্যে। কদিন ধরে সৌমির শরীরটা খুব খারাপ। জ্বরের মুখ থাকায় কদিন ধরে কোনো খাবারের স্বাদ পাচ্ছে না সৌমি। এদিকে অসুস্থ সৌমি বিছানায় শয্যাশায়ী হওয়ায় তাকেই রান্নাঘরের ভার নিতে হয়েছে। এসব কাজে তিনি যে কতটা অপটু তা তিনি এই কদিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেছেন। কোনোদিন তরকারী নুনে পুড়িয়েছেন, কোনোদিন আবার ডালে নুনই দেননি। জ্বরে ভোগা সৌমী সেই সব অখাদ্য খাবার মুখ বুঁজে খেয়ে নিলেও নিজে খেতে গিয়ে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেছে তাঁর। আজকে সকাল মাপতে গিয়ে দেখলেন আগের তুলনায় সৌমির জ্বরটা একটু কমেছে। মুখের স্বাদও ফিরে এসেছে কিছুটা। তাই সকালবেলা ভাত ডাল আর আলুভাজা করলেও বিকেলের দিকে বাজার থেকে বেশ অনেকটা মাংস কিনে নিয়ে যাবেন ঠিক করেছেন তিনি। সৌমি মাংস খেতে খুব ভালোবাসে। সদ্য জ্বর থেকে ওঠা অরুচির মুখে ঝাল ঝাল মাংসের চেয়ে ভালো খাবার আর হয় না। ভাবতে ভাবতে বাজারে ঢুকলেন তিনি।

বাজার থেকে মাংস, আলু ইত্যাদি সবজি কিনে অতীনবাবু যখন বাড়ি পৌঁছলেন ততক্ষণে চারদিকে সন্ধ্যের গাঢ় অন্ধকার ক্রমশ তাঁর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে। গোটা পাড়া মহিলাদের উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে গমগম করছে। সাইকেল থেকে নেমে মেনগেট খুলতেই পিছন থেকে, ‘মাস্টারমশাই!’ ডাক শুনে থমকে গেলেন অতীনবাবু। পিছন ফিরে দেখলেন সামনের বাড়ির তারিণীবাবু গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। মুচকি হেসে অতীনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু বলবেন?” একটু হেসে ইতস্তত হয়ে তারিণীবাবু বললেন, “স্কুল থেকে ফিরলেন বুঝি?”

- হ্যা। আসলে ফেরার পথে একটু বাজার হয়ে এলাম বলে একটু দেরি হয়ে গেল।

- বৌঠান কেমন আছেন? জ্বরটা কমেছে?

- তা কমেছে। আজ সকালেই তো দেখলাম উঠে বসল। কেন বলুন তো?

- না এমনিই জিজ্ঞেস করছিলাম। আসলে বুঝতেই পারছেন আমার গিন্নি আর বৌঠান দুজনেই ভীষণ বন্ধু। ওড় কাছেই শুনেছিলাম বৌঠানের শরীর খারাপের খবরটা।

- তা বটে! সৌমি আর বৌঠান তো যাকে বলে একেবারে হরিহর আত্মা!

- আসলে আজ দুপুরে আমার গিন্নি বৌঠানের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। অনেক ডেকেও সাড়া পায়নি। তাই চিন্তা করছিল।

অতীনবাবু একটু থমকে তাকান তারিণীবাবুর দিকে তারপর হেসে বলেন, “ও এই ব্যাপার? আসলে কি হয়েছে জানেন? কদিন ধরেই সৌমিকে কড়া ডোজের ওষুধ খেতে হচ্ছে।তার উপর কদিনের জ্বরে কাহিল হয়ে গেছে বেচারি। সেই কারনেই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাই বৌঠান ডেকেও সাড়া পাননি। সৌমির ব্যবহারে আমি অত্যন্ত দুঃখিত! ক্ষমা করবেন।”

- এবাবা! ছিঃ! ছিঃ! আপনি ক্ষমা চাইছেন কেন? ভুল তো আমাদের। আমার গিন্নিরই বোঝা উচিৎ ছিল ব্যাপারটা। আসলে বুঝতেই পারছেন, সই অন্ত প্রাণ মহিলা। কদিন ধরে সইকে দেখতে পারছে না। আজ দেখা করতে গিয়ে ডেকেও সাড়া পায়নি। অহেতুক ভুলভাল ভেবে ফেলেছে। জানেনই তো মহিলাদের মন…

- সন্দেহবাতিক সারাক্ষণ! হে হে বুঝেছি! চিন্তা নেই! সৌমি একদম ঠিক আছে। আচ্ছা চলি! আমাকে আবার রাতের রান্না চাপাতে হবে। বুঝতেই পারছেন হোম মিনিস্টার যখন সিক লাইভ তখন এই শর্মাকেই হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হচ্ছে।

- তা আর জানি না? আমার বাড়িতেও একই নিয়ম চালু আছে। গিন্নি অসুস্থ হলে আমাকেই মাঠে নামতে হয়।

- আচ্ছা আসি তাহলে।

- এই দেখেছেন! যে কারনে আপনাকে ডাকলাম সেটাই বলতে ভুলে গেছি। আচ্ছা অতীনবাবু আপনি কোনো গন্ধ পাচ্ছেন?

- গন্ধ মানে? ঠিক বুঝলাম না।

- না মানে বেশ কয়েকদিন ধরেই পাড়ার সকলে একটা গন্ধ পাচ্ছে। ভীষণ বিচ্ছিরি আর পঁচা গন্ধ। অনেকটা ইঁদুর মরলে যে গন্ধ বেরোয় সেরকম।

- কই আমি তো সেরকম কিছু গন্ধ পাচ্ছি না। হ্যাঁ একটা গন্ধ ভেসে আসছে বটে। বোধহয় কোনো ইঁদুর মরেছে কোথাও।

- তাই হবে হয়তো। আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি আসুন। আর কোনো রকম প্রয়োজন হলে আমাদের ডাকবেন। বিপদে প্রতিবেশী হিসেবে যদি এগিয়ে না আসি তাহলে প্রতিবেশী হবার কি মানে?

- সে তো বটেই। আচ্ছা এলাম।

বলে মেনগেটের একটা পাল্লা খুলে বাড়ির ভেতর ঢুকে যান অতীনবাবু। তারিণীবাবুও কিছুক্ষণ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পর ঢুকে যান নিজের বাড়িতে।

ঘরের ঢোকার পর সুইচ টিপে এক এক করে ঘরের সব আলো জ্বেলে দিলেন অতীনবাবু। মুহূর্তের মধ্যে গোটা ঘর আলোতে ঝলমল করে উঠল। বাজারের থলেটা রান্নাঘরে রেখে শোয়ার ঘরে ঢুকে আলোটা জ্বেলে বিছানার দিকে ঘুমন্ত সৌমির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন তিনি। কদিনের রোগভোগে সৌমির চেহারা শুকিয়ে একেবারে কঙ্কালসার হয়ে গেছে। সৌমির দিকে কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে কাঁধে গামছা নিয়ে সোজা কলঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন অতীনবাবু।

স্নান সেরে ঘরের পোশাক পরে রাতের রান্নার তোড়জোড়ে লেগে পড়লেন অতীনবাবু। চটপট গরম গরম কষা মাংস আর ভাত রান্না করে খাবারগুলো ঢেকে দিয়ে নিজের স্টাডিরুমে ঢুকলেন তিনি। রাতের খাবার খেতে এখনও অনেক দেরী আছে। ততক্ষণ একটু বই নিয়ে বসলে মন্দ হয় না। ভাবতে ভাবতে স্টাডিরুমের দিকে এগোতে যাবেন এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে থমকে দাঁড়ালেন অতীনবাবু। এতরাতে আবার কে এল? কোনো ছাত্র নাকি? কই কাউকে তিনি বাড়িতে আসতে বলেছিলেন মনে পড়ছে না তো। কিছুক্ষণ পর আবার দরজায় কড়ার নাড়ার শব্দ ভেসে এল। অবাক হয়ে অতীনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কে?” কোনো উত্তর এল না। ভ্রু কুঁচকে গেল অতীনবাবু। কাউকে তো তিনি বাড়িতে আসতে বলেননি। তাহলে এত রাতে কে দরজায় কড়া নাড়ছে? ভাবতে ভাবতে আবার কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। এবার অতীনবাবু একপলক নিজের বেডরুমের দিকে তাকান। তারপর বেডরুমের দরজা বাইরে থেকে আটকে সদর দরজার সামনে এগিয়ে এসে আরেকবার উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কে?” এবার জবাব এল, “আমরা!” কন্ঠস্বর শুনে অতীনবাবু অবাক হলেন। এতো কোনো বাচ্চা বা কিশোরের গলা নয়। তাহলে কে? ভাবতে ভাবতে অতীনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা কে?” এবার ওপার থেকে জবাব এল, “আমরা লক্ষ্মীপুর থানা থেকে আসছি। দরজাটা খুলুন মাস্টারমশাই।”

অতীনবাবু একটু অবাক হয়ে দরজাটা একটু ফাঁক করে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলেন একজন অফিসার এবং কয়েকজন কনস্টেবল বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন অতীনবাবু।

- কি ব্যাপার অফিসার? এতরাতে আপনারা?

- এতরাতে আপনাকে বিব্রত করার জন্য একান্তভাবে দুঃখিত। আসলে আপনার থেকে কয়েকটা কথা জানার ছিল।

- বেশ! বলুন।

- আচ্ছা এই মুহূর্তে আপনার বাড়িতে আর কে কে আছেন?

অতীনবাবু মুচকি হেসে বলেন, “এত রাতে আপনারা নিশ্চয়ই ঠাট্টা করতে আসেননি? কে আবার থাকবে? আমি আর আমার স্ত্রী আছেন।” অফিসার একটু হেসে বললেন, “ আচ্ছা তাকে একবার ডেকে দিতে পারবেন?” অতীনবাবু হেসে বললেন, “ দুঃখিত অফিসার! আপনার এই অনুরোধটি রাখতে পারব না। আসলে বিগত কয়েকদিন ধরে আমার স্ত্রী অসুস্থ। তীব্র জ্বরের ফলে আজ ছয়দিন হল শয্যাশায়ী হয়ে আছেন। এখন ঘুমোচ্ছেন।” অফিসার কিছুক্ষণ অতীনবাবুর দিকে অপলকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “কিছু মনে করবেন না মাস্টারমশাই, আমরা আপনার ঘরটা একটু তল্লাশি করতে চাই। আমাদের কাছে ওয়ারেন্ট আছে।” বলে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে অতীনবাবুর দিকে এগিয়ে দেন। অতীনবাবু হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়ান। তারপর বলেন, “বেশ! ভেতরে আসুন। তবে এই সার্চের কোনো মানে নেই। আমার কাছে এমন কিছু নেই যা আপনাদের কাছে বেআইনি বলে মনে হতে পারে।”

একে একে সকলে ঘরের ভেতর ঢোকেন। অতীনবাবু ঘরে ঢুকে বৈঠকখানার সোফায় বসতে বসতে বললেন, “সমস্ত ঘর সার্চ করার আগে একটা অনুরোধ ছিল। কনস্টেবলদের বলবেন ওরা যাতে স্টাডিরুম আর আমার বেডরুমে বেশি শব্দ বা জিনিসপত্র ওলটপালট না করে। আসলে স্টাডিরুমটা একটু অপরিচ্ছন্ন হয়ে আছে। সেখানে বই বা কাগজপত্র এদিক-ওদিক হলে আমিই বিপদে পড়ব। আর আমার স্ত্রী এখন ঘুমিয়ে আছেন। তাই বেডরুমে অহেতুক শব্দ হলে যেমন তার ঘুমের ব্যাঘাত হবে তেমনই এত রাতে ঘরের ভেতর পুলিশ দেখে বিব্রতও হতে পারেন।” অফিসার মাথা নেড়ে কনস্টেবলদের তল্লাশির আদেশ দেন। সকলে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। একজন কনস্টেবল অতীনবাবুর বেডরুমের দরজাটা খোলামাত্র ছিটকে আসে। অফিসার সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকে দেন। সেই কনস্টেবলটাও দুহাতে নিজের নাক ঢেকে ফেলে। কারন দরজাটা খোলার সাথে সাথে যে গন্ধটা এতক্ষণ প্রছন্নভাবে তার নাকে আসছিল সেটা একলহমায় বেড়ে গেছে। মাংস রান্নার গন্ধ ছাপিয়ে গোটা ঘর ম ম করছে এই ঘরটায়। এ গন্ধ তার চেনা। পুলিশের চাকরিতে এই গন্ধের সাথে তার পরিচয় বহুকাল আগেই হলেও যতবার এই গন্ধটা তার নাকে আসে প্রতিবার মনে হয় যেন পেটের ভাত বেরিয়ে আসবে। এ গন্ধ হল মৃতদেহের গন্ধ। তিন-চারদিন ধরে মৃতদেহ পচে গেলে যে গন্ধ বেরোয় সেই গন্ধ।

নাকে রুমাল চাপা দিয়ে বিছানার সামনে এসে দাঁড়ান অফিসার। একপলক বিছানায় শুয়ে থাকা সৌমির মুখের দিকে তাকিয়ে একটানে খুলে ফেলেন বুকের উপর চাপা দেওয়া চাদরটাকে। আর চাদরটা টানার সাথে সাথে সৌমির দেহটার দিকে তাকিয়ে গা গুলিয়ে ওঠে ঘরে উপস্থিত সকলের। সৌমির গলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিকে ঢাকা। সেই প্লাস্টিকের পর্দার বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে সৌমির দেহে পচন ধরতে শুরু করেছে। এই দৃশ্য দেখে সকলে যখন ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে তখন একমাত্র অতীনবাবু নির্বিকার থেকে বলে উঠলেন, “আহা! করছেনটা কী? ও জেগে যাবে তো!”

*****

সেদিনের ঘটনার পর দুমাস কেটে গেছে। পুলিশ সৌমির বিকৃত মৃতদেহ উদ্ধার করে সেদিনই মর্গে চালান করেছিল। অতীনবাবুকে গ্রেফতার না করা হলেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে থানায় ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তাকে মানসিক চিকিৎসালয়ে পাঠানো হয়েছে। ঠিক কি ঘটেছিল সেটা না জানা গেলেও কানাঘুষোয় শোনা গেছে প্রবল জ্বরে সৌমি তিনদিনের মাথায় মারা যান। স্ত্রী বিয়োগের শোকে পাগল হয়ে অতীনবাবু এতদিন ধরে স্ত্রীর মৃতদেহ আগলে বসেছিলেন। এ বিষয়ে প্রথম প্রথম পাড়ায়, স্কুলে অনেক আলোচনা হলেও সময়ের সাথে সাথে এখন তা স্তিমিতপ্রায়। তাও মাঝে মাঝে অতীনবাবুর প্রসঙ্গ উঠলে ছাইচাপা আগুনের মতো তাকে নিয়ে আলোচনাগুলোও বেরিয়ে আসে। পার্বতীচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ে নতুন হেডমাস্টার এসেছেন। ইনি কিন্তু অতীনবাবুর মতো অমায়িক নন। বরং রাশভারী এবং বেজায় বদরাগী একজন। কথায় কথায় বেত বের করেন। ছাত্রদের মন খারাপ। কবে তাদের অতীনস্যার আসবেন সেই অপেক্ষায় আছে তারা। আর বাকি রইলেন তারিণীবাবু। তিনি প্রতি সপ্তাহে একবার করে মানসিক হাসপাতালে অতীনবাবুর কাছে দেখা করতে যান। হাজার হোক পুরোনো প্রতিবেশী বলে কথা। তাছাড়া সেদিনের ঘটনার দায় কিছুটা তারও বটে। বিকেলবেলা অফিস থেকে ফিরে গিন্নির কাছে সবটা শুনে তার সন্দেহ হয়েছিল। সেই সন্দেহের বসে তিনি ফোন করেছিলেন লোকাল থানায়। আর তার ফলেই ব্যাপারটা প্রকাশ্যে চলে আসে। মানসিক হাসপাতালে গেলে আজও দেখা পাওয়া যাবে বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী এক প্রাক্তনশিক্ষককে। যিনি কথায় কথায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতা আউড়ে বেড়ান। সাহিত্যের কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করলে অমায়িক এক হাসি হেসে উত্তর দেন। কিন্তু স্ত্রীর কথা জিজ্ঞেস করলেই বিছানায় শোয়ানো বালিশের দিকে দেখিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলেন, “শশস! চুপ! ও এখন ঘুমোচ্ছে! বিরক্ত করবেন না। অনেকে বলছে বটে ও মরে গেছে। লোকের কথায় বিশ্বাস করবেন না। ও কিন্তু মরেনি। ও ঘুমোচ্ছে!”

(স্ত্রীর মৃতদেহ আগলে রাখার ঘটনা বাদে গল্পের স্থান-কাল-পাত্র লেখকের মস্তিস্কপ্রসূত এবং একেবারে কাল্পনিক। কোথাও মিল খুঁজে পেলে সেটা একেবারে কাকতালীয়)

সোমবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

অস্তরাগ অন্তিম পর্ব




রজতাভকে কাঁদতে দেখে সুজাতা বেঞ্চ থেকে উঠে রজতাভর পাশে গিয়ে দাঁড়ান। তারপর রজতাভর কাঁধে হাত রাখেন। অভীকও রজতাভর পাশে গিয়ে বসে। রজতাভ সামনের দিকে তাকিয়ে দেখেন সুজাতার চোখও শুকনো নেই। সুজাতা অশ্রুসজল চোখে রজতাভর দিকে তাকিয়ে বলেন, “নিজেকে সামলাও রজতদা। ঐশী তোমাকে এভাবে দেখলে কষ্ট পাবে। আর কাঁদবে না! তোমার প্রায়শ্চিত্তের আগুনে পোড়ার দিন শেষ রজতদা। আজকে কান্নার দিন নয় হাসির দিন। কষ্টের নয়, আনন্দের দিন। দুঃখের নয়, উৎসবের দিন। অভিনন্দন নতুন দাদুকে! এসো নবজাতককে স্বাগত জানাব আমরা।” বলে হাসেন সুজাতা। রজতাভ সুজাতার হাত নিজের হাতে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকার পর নিজেকে সামলে চোখের জল মুছে হেসে বলেন, “তাই তো! তাই তো! আজ তো উৎসবের দিন! আনন্দের দিন! আমি দাদু হয়ে গেছি! হে হে! আমি দাদু হয়ে গেছি! তোমাকেও ঠাকুমা হবার অনেক অনেক অভিনন্দন সুজাতা!” বলে অভীকের দিকে তাকিয়ে বলেন, “কি হে ছোঁড়া! এখনও বসে আছো? যাও মিষ্টি নিয়ে এসো! বাবা হয়ে সব বুদ্ধিশুদ্ধি গোল্লায় গেছে নাকি? মিষ্টিমুখ করাতে হবে তো সবাইকে! আমার নাতি হয়েছে! দাদু হয়ে নাতিকে খালিহাতে দেখব নাকি? কি হল যাও নিয়ে এসো মিষ্টি! উফ! ঐশী ঠিকই বলে! একেবারে ক্যালাস!”

কিছুক্ষণ পর যখন ঐশীকে কেবিনে দেওয়া হল তখনও তার জ্ঞান ফেরেনি। অগত্যা রজতাভরা এগিয়ে গেলেন চাইল্ড কেয়ার ইউনিটের দিকে। ঐশীর সন্তানকে দেখতে। নার্স নির্দিষ্ট ক্রেটের দিকে এগোতেই রজতাভর মনে হতে লাগল তাঁর পা ক্রমশ পাথরের হয়ে আসছে। তিনি চাইলেও এগোতে পারছেন না। সুজাতারা ততক্ষণে পৌঁছে গেছেন ক্রেটের সামনে। ঐশীর সন্তানকে দেখছেন প্রাণভরে। রজতাভ ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন ক্রেটের সামনে। তারপর তাকালেন ক্রেটের মধ্যে শুয়ে থাকা শিশুটার দিকে।

মুখটা হুবহু না হলেও চোখটা অবিকল তাঁর মতো পেয়েছে শিশুটা। কপালটা ঐশীর মতো ছোটো। কানদুটো সরু ঠিক অভীকের মতো। নাকটা কিছুটা সুজাতার মতো কি? ঐশীর সন্তানের দিকে তাকিয়ে আরেকবার চোখে জল এল রজতাভর। নার্স ততক্ষণে ক্রেট থেকে শিশুটাকে তুলে নিয়েছে। সুজাতা নার্সকে ইশারা করতেই নার্স শিশুটাকে তুলে দিল রজতাভর কোলে। রজতাভ অপটু হাতে সাবধানে শিশুটাকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর অশ্রুসজল চোখে তাকালেন নাতির দিকে। শিশুটা ততক্ষণে পুর্ণচোখে তাকিয়েছে রজতাভর দিকে। রজতাভর মনে হল যেন শিশুটা তাকে দেখে হাসছে। একটা নির্মল, অপাপবিদ্ধ, ক্ষমাসুন্দর হাসি। কিছুক্ষণ প্রাণভরে দেখার পর সুজাতার কোলে শিশুটাকে তুলে দিলেন রজতাভ। সুজাতা শিশুটাকে কোলে নিয়েই আদর করতে লাগলেন। রজতাভ দেখলেন সুজাতার কোলে যাওয়া মাত্র শিশুটা আবার ফিক করে হাসল। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন ঐশীর কেবিনের দিকে।

কেবিনে ঢুকে দেখলেন ঐশীর জ্ঞান ফিরেছে। বাপিকে দেখে সে উঠে বসতে গেলে রজতাভ ইশারায় বারণ করলেন উঠতে। তারপর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে ঐশীর মাথায় হাত রেখে বললেন, “চিন্তার কিছু নেই। সব ঠিক আছে। কংগ্রাচুলেশন! ছেলে হয়েছে!” ঐশী বেডে শুয়ে অশ্রুসজল চোখে তাকায় বাপির দিকে। রজতাভ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। 

******

- কি ব্যাপার রে? এখনও তৈরী হোসনি কেন? পুরোহিতমশাই এসে গেছেন। গেস্টরাও এসে পড়ল বলে! 

- আরে আমার পাঞ্জাবীর বোতামগুলো খুঁজে পাচ্ছি না। আলমারীতেই তো রেখেছিলাম। 

- সেকি রে! ওখানেই তো রাখা ছিল! সর আমি দেখছি। আর এটা ধুতি পরা হয়েছে?

- আরে কুচি হচ্ছে না কিছুতেই। তাই...!

- তাই সাউথ ইন্ডিয়ান স্টাইলে পরেছি! উফ সত্যি তোকে নিয়ে পারা যায় না! এভাবে কেউ পরে?তার উপর গরদের ধুতি বলে ভেতরের সব কিছু দেখা যাচ্ছে! তখন পই পই করে বললাম ধুতি পরার এত যখন ইচ্ছে তখন রেডি টু ওয়্যার ধুতি কিনে নিচ্ছি। কিন্তু না! বাবুর একেবারে ট্রাডিশনাল ধাঁচে ধুতি পরবেন! তা এই বুঝি তোর ট্র্যাডিশনাল স্টাইল?

- আরে তখন বুঝবো কি করে যে কুচিটা এরকম বিচ্ছিরিভাবে ফাঁসাবে!একটু হেল্প কর না প্লিজ!

- হুম! হেল্প করেই তো কেটে যাচ্ছে সারাদিন! দিনে বেবিকে সামলাতে বাপি-মাকে হেল্প করো, রাতে বেবির বাপের জাগে হুয়ে অরমান নেভাতে হেল্প করো। গোটা জীবন বোধহয় হেল্প করেই কেটে যাবে।

- শসসস! চুপ! তোর মুখে কি কিছুই আটকায় না! বাড়ি ভর্তি লোকের সামনে এসব প্রাইভেট কথা কে বলে?

- বেশ করেছি বলেছি! পাবলিকও জানুক তাদের আদরের নিরীহ অভীক কতটা মিটমিটে শয়তান! দিনে যতই সুবোধ বালক সাজুক না কেন রাতে পুরো ভোল পাল্টে অন্য মানুষ হয়ে যায়।

বলতে বলতে আলমারী থেকে একটা কৌটো বের করে অভীকের হাতে ধরিয়ে দেয় ঐশী। অভীক বাইরের দিকে একবার তাকিয়ে চকিতে ঐশীর হাত টেনে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে। ঐশী নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে,“কি হচ্ছেটা কী? দরজা খোলা আছে। কেউ দেখে ফেলবে তো!”

- দেখুক! আমার বউকে আমি আদর করবো তাতে কার কি এসে গেল আই ডোন্ট কেয়ার। বাই দা ওয়ে শাড়িটায় তোকে দারুণ লাগছে।

- অভি ছাড় আমাকে! অনেক কাজ আছে!যেকোনো মুহূর্তে মা ডাকতে পারে।

- উহু! এত সহজে তো ছাড়ব না। আগে একটা মিষ্টি করে চুমু খাব তারপর ছাড়বো।

- পাগল হয়ে গেছিস নাকি?বাড়ি ভর্তি লোক, কে কখন চলে আসবে ঠিক নেই !

- বললাম তো! আই ডোন্ট কেয়ার! চুমু না খেয়ে ছাড়ছি না।

- অভি প্লিজ!

- উহু!

বলে ঐশীর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় অভীক। ঐশীকে প্রগাড় চুমু খেতে খেতে আবেশে শিথিল হয় অভীকের বাহুডোর। পরক্ষণেই সুজাতার ডাকে চমকে ওঠে অভীক! সেই সুযোগে অভীকের ঠোঁটে কামড় বসিয়ে একটা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয় ঐশী। তারপর হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

ভাতের থালা সাজিয়ে বৈঠকখানায়‌ পাতা জলচৌকিতে রাখেন সুজাতা। তারপর বসার আসন পেতে ডাকেন রজতাভকে। নাতিকে কোলে নিয়ে হই হই করে বৈঠকখানায় আসেন রজতাভ। তারপর পুরোহিতের কথামতো আসনে বসে পড়েন। এই ছমাসে নাতিটা বড্ড দুরন্ত হয়েছে। সারাক্ষণ এই ভাঙছে, ঐ ফেলছে। বাড়ির সবাই অতিষ্ঠ পুঁচকের দৌরাত্ম্যে । না সবাই নয়, রজতাভ বাদে সবাই পুঁচকের দুরন্তপনায় অতিষ্ঠ। রজতাভর কাছে নাতির এসব কাজ মোটেই শয়তানি নয়। তার মতে, “এই বয়সে খেলবে না তো কি তোদের মতো ধেড়ে বুড়ো বয়সে খেলবে?” 

মাঝে মাঝে নাতিকে নিয়ে মেয়ের সাথে ঝগড়াও হয় রজতাভ। নাতি অন্তপ্রাণ রজতাভর সামনে নাতিকে কিছুতেই বকা যাবে না। বকলেই নাতি ফিচফিচ করে কাঁদতে‌ কাঁদতে‌ দাদুর কোলে উঠে বসবে। সেও যে দাদুর ভীষণ ন্যাওটা। তার আবদার, ঘুমনো,খেলা করা,আধো আধো গলায় যাবতীয় গল্প করা সব দাদুর সাথেই। 

রজতাভ নাতিকে নিয়ে বসতেই পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণ করে আশীর্বাদী ফুল ছোঁয়ালেন নাতির মাথায়। তারপর নিয়মাচার পালন করে নামকরণ শুরু হল। পুরোহিতমশাই জানালেন পাঁজি ঘেটে তিনি যা বুঝছেন তাতে পুঁচকের নাম ‘অ’ দিয়ে হলেই মঙ্গল। রজতাভ মুচকি হেসে‌ তাকালেন ঐশীদের দিকে। সেদিন নাতিকে প্রথমবার দেখার পরেই একটা নাম মাথায় এসেছিল তার। ঐশীকে জানাতে সেও সায় দিয়েছিল সে নামে। এবারও ঐশী হাসতে হাসতে চোখ নামিয়ে সায় দিল। রজতাভ নাতিকে দুহাতে জড়িয়ে পুরোহিতকে বললেন, “ওর নাম হবে অজাতশত্রু।”

******

খাবার পালা শেষ করে নাতিকে কোলে নিয়ে রজতাভ যখন ব্যালকনিতে বসলেন ততক্ষণে সুর্য পশ্চিমের দিকে হেলে পড়েছে। অতিথিদের খাইয়ে ঐশীরা এতক্ষণে খেতে বসেছে। নাতিকে নিয়ে খেলতে খেলতে রজতাভ অস্তামিত সুর্যের দিকে তাকিয়েছিলেন। তার চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো এক এক করে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভেসে উঠছিল। আজ থেকে কয়েকবছর আগে এরকমই এক বিকেলে কফিশপে ঐশীর সাথে তিনি অপেক্ষা করছিলেন অভীকের। আর আজ নাতিকে নিয়ে বসে আছেন ব্যালকনিতে। এই কটা বছর যেন ঝড়ের বেগে কেটে গেল। নাতির সাথে খেলতে খেলতে সুর্যের দিকে তাকিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন রজতাভ। ঘোর কাটল সুজাতার ডাকে। তাকিয়ে দেখলেন সুজাতা পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সুজাতা হেসে পাশের চেয়ারে বসে বললেন, “কি ভাবছেন রজতদা?”

- ভাবছি সময়গুলো কত তাড়াতাড়ি কেটে যায়। এই সেই ঐশী যার ডায়পার বদলাতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হত আমাকে। পিরিয়ডের সময় মনে করে ব্যাগে প্যাড ঢুকিয়ে না দিলে যে মেয়ে বিপদে পড়ে যেত। দিনের শেষে যে মেয়ের বাপির আদর ছাড়া চলত না সেই মেয়ে কত তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে গেল। সে দিনের সেই পুঁচকে মেয়েটা আজ মা হয়ে গেছে।

- সময়ের কাজই তো বয়ে চলা রজতদা। তাকে কি কেউ আটকাতে পারে? আমার অভিকেই দেখুন। এই সেদিন পর্যন্ত যে ছেলে আমার কোলে কোলে ঘুরতো। সেই ছেলে আজ আমাদের দুটো পরিবারকে এক করে নিয়ে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। যে ছেলের বিয়ে নিয়ে আমার মনে সন্দেহ ছি‌ল সেই ছেলে আজ বাবা হয়ে নিজের সন্তানের অন্নপ্রাশন করাচ্ছে।

- সত্যিই ছেলেমেয়ে দুটো দেখতে দেখতে কত‌ বড়ো হয়ে গেল। ঠিকই বলেছ সুজাতা। সময়ের কাজ তো বয়ে চলা। সে বয়ে চলে আপন খেয়ালে নদীর মতো। কখনো সম্পর্ক নামক পারে চিড় ধরায়। কখনো পুরোনো ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়ে সারিয়ে তোলে। কাউকে ভীষণ কাছের করে তোলে, আবার কাউকে দুরে সরিয়ে দেয়।

- সেদিন মিথ্যেটা না ব‌‌ললেও পারতেন।

রজতাভর ঘোর কাটে। তিনি তাকান সুজাতার দিকে, “কোন মিথ্যে?” সুজাতা নাতির দিকে চোখ রেখে বলেন, “কাজিরাঙার সেই দুপুরের কথাটা তো অর্ধ সত্য ছিল রজতদা।” 

রজতাভ নাতির মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেন,“তোমার কি মনে হয় সত্যিটা জানালে ওরা মেনে নিত? মানত না সুজাতা! কেউ মানতে পারবে না। ঊর্মি মেনে নিতে পারেনি। ওরাও পারত না। এদের প্রজন্ম, সমাজ যতই আধুনিক হোক না কেন একজন পরপুরুষ আর পর স্ত্রীর সম্পর্ককে মেনে নেওয়া এদের পক্ষে অসম্ভব। পরকীয়া যতই আইনি ভাবে বৈধ হোক না কেন ততদিন এটা স্বাভাবিক হবে না যতদিন সমাজ না মেনে নিচ্ছে এটাকে। এই যে তুমি প্রতি সন্ধ্যায় সিরিয়াল দেখো, খেয়াল করে দেখেছ প্রতিটা সিরিয়ালে যাদের খলনায়িকা হিসেবে দেখানো হয় তারা প্রত্যেকে নায়কের সাথে বা নায়িকার বরের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত। অর্থাৎ সিরিয়ালেই বলে দেওয়া হচ্ছে পরকীয়া সংসারের প্রতি ক্ষতিকারক। এতে সংসার ভাঙে। একবার ভেবে দেখো যেখানে সিরিয়ালেই এই মেসেজ দেওয়া হয় সেই সমাজে আমাদের সম্পর্ককে মেনে নেওয়া হবে কি করে?আর যদি সেদিন আমি সবটা বলে দিতাম ওদের তার ফলশ্রুতি কি হত বলো তো?অভীক আর ঐশীর সম্পর্কটা ভেঙে যেত। সারাজীবনের মতো আমরা ওদের চোখে নিচে নেমে যেতাম। একজন বাবা হয়ে নিজের মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট হোক তা আমি চাইনি। তাই মিথ্যেটা বলতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমাদের নিজের জীবন তো আমাদের ভুলে কোনযুগেই শেষ হয়ে গেছে সুজাতা। সেই ভুলের মাশুল আমাদের সন্তানেরা গুনবে তা আমি চাই না সুজাতা। তাছাড়া আমি মনে করি বাবা-মা আর সন্তানের মধ্যে একটা লাইন ড্র করে রাখা ভীষণ জরুরী সুজাতা! নাহলে সর্বনাশ অবসম্ভাবী। ওরা ততটাই জানবে যতটা আমি জানাব। ওরা ততটাই দেখবে যতটা আমি দেখাবো।

- কিন্তু তাই বলে এভাবে! এতো মিথ্যে রজতদা! ওরা তো কোনোদিন না কোনোদিন সত্যিটা জানতে পারবে!

- হোক মিথ্যে! যে সত্যিটা বললে একটা সংসার বা দুজন মানুষের জীবন নষ্ট হয় সেটা বলার চেয়ে মিথ্যে বলাই ভালো। সত্যিটা তো সাহস করে বলেছিলাম আমি ঊর্মিকে। কি পেলাম? সেই দুপুরে করা একটা ভুলে শাস্তি হিসেবে ঊর্মি আমাকে একা ছেড়ে চলে গেল। তুমি অপবাদের ভয়ে সব সম্পর্ক চুকিয়ে স্বেচ্ছায় অজ্ঞাতবাস গ্রহণ করলে। এতগুলো বছর পর যদি আবার সত্যিটা বলতাম তাহলে যে সর্বনাশ হয়ে যেত সুজাতা। ওদের জীবনটা নরক হয়ে যেত ঠিক যেমন আমাদের হয়েছিল। ওদের চোখে‌ আমরা খারাপ হয়ে যেতাম। 

- কিন্তু সত্যিটা তো একদিন প্রকাশ্যে আসবেই রজতদা!ওরা সবটা জানতে পারবে! তখন কি হবে? 

সুজাতার কথা কিছুক্ষণের জন্য থমকে যান রজতাভ। তার মনে পড়ে যায় সেই অভিশপ্ত দুপুরের কথা। না পুরোটা মিথ্যে বলেননি তিনি। তবে গোপন করে গেছেন অনেক কথা ওদের কাছ থেকে। সেদিন তথাগতকে নিয়ে সুজাতার সাথে কথা বলা, সুজাতার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন সবটাই সত্যি। শুধু ঘটনাগুলো ঘটেছিল দুপুরে নয়, সকালবেলায়। সেদিন সকালে সুজাতার ওষুধে জ্বর কমলেও দুপুরে তা আবার বেড়ে যায়। দুপুরে সুজাতা যখন খাবার দিতে এলেন জ্বরের ঘোরে তিনি তখন উন্মাদপ্রায়। সুজাতা তাকে ডাকতে গিয়ে আবিস্কার করলেন জ্বরটা আবার বেড়েছে। আর তিনি সুজাতার স্পর্শকে জ্বরের ঘোরে তিনি ঊর্মির স্পর্শ বলে কল্পনা করে বসলেন। জ্বরের ঘোরে তিনি সুজাতাকে টেনে নিলেন নিজের বুকে। সুজাতা সবটা বুঝতে পেরে অনেক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও রজতাভর সাথে পেরে উঠলেন না। রজতাভ সুজাতার সমগ্র দৈহিক, বাক্য প্রতিরোধ উপেক্ষা করে, দুহাতে সুজাতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। তারপর সারা দুপুর তিনি সুজাতাকে ঊর্মি ভেবে ভোগ করলেন।

অনেকপরে যখন রজতাভর হুশ ফিরে এল ততক্ষণে যা সর্বনাশ হবার হয়ে গেছে। সেদিনের পর থেকে তিনি সুজাতার চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস আর না পেলেও প্রতি মুহূর্তে ক্ষমা চেয়েছেন নিজের পাপের জন্য। কাজিরাঙ্গা থেকে ফেরার পর তিনি বার বার চিঠি লিখেছেন সুজাতাকে। একটা চিঠিরও উত্তর পাননি। শেষ চিঠিটা নিয়ে যখন ঊর্মির কাছে ধরা পড়ে গেলেন তখন সবটা শিকার করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না রজতাভর কাছে। ভেবেছিলেন ঊর্মি রাগ করবেন, কথা বলবেন না। তেমন হলে ডিভোর্স দিয়ে আলাদা হয়ে যাবেন। নিজের চরমতম শাস্তির জন্য প্রস্তুত ছিলেন রজতাভ। কিন্তু ঊর্মি যে তাকে এত বড়ো শাস্তি দেবেন তা তিনি বুঝতে পারেন নি। আজও ঊর্মির বলা শেষ কথাগুলো অভিশাপের মতো রজতাভর কানে বাজে। রোজ রাতে ঘুমের অতলে তাড়িয়ে বেড়ায়। রোজ তিনি শুনতে পান ঊর্মির ঘৃণায় ভরা সেই কথাগুলো, “তুমি মানুষটা ভীষণ ভয়ংকর রজতাভ! সাপের চেয়েও ভয়ংকর! তোমাকে ভালোবাসা যায়, জড়িয়ে ধরা যায়, কান্না পেলে কাঁধে মাথা রেখে কাঁদা‌ যায় কিন্তু বিশ্বাস? না! আর তোমায় বিশ্বাস করা যায় না! আর বাকি রইল ক্ষমা! তার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ বাঘ যখন রক্তের স্বাদ একবার পায় তাকে শিকার করা থেকে আটকানো অসম্ভব! আজ যদি তোমায় ক্ষমা করি তাহলে তুমি আবার একই ভুল করবে! ও নয় তো অন্য কেউ হবে তোমার শিকার। আর তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবো না কেন জানো? তুমি জেনেশুনে একটা নিস্পাপ মেয়েকে পাপে জড়িয়েছ! তাকে পাঁকে‌ নামিয়ে পাপ করতে বাধ্য করেছ! ওকে কথার জালে বিবশ করে ভোগ করেছ! তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনে গেছি রজতাভ! আমার দুঃখ কোথায় জানো? সে বেচারি নিজেকে দোষী ভেবে দুরে সরে গেছে। যদি আমার শক্তি থাকতো তাহলে ওকে খুঁজে বের করে জড়িয়ে ধরে বলতাম,‘তোর কোনো দোষ নেই!তুই নিজেকে শাস্তি দিস না!শাস্তি তো ওর প্রাপ্য!’ বলে তোমার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতাম। কিন্তু আমার কপাল দেখো! তোমার সন্তানকে গর্ভে ধারন করার জন্য মরতে বসেছি। তোমার বিষাক্ত স্পর্শে আমার আয়ু কমে গেছে! এই মুহূর্তে তোমাকে দেখে আমার গা গুলোচ্ছে রজতাভ মজুমদার! বমি পাচ্ছে! নেহাত আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানকে দেখার কেউ নেই বলে তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। কিন্তু খবরদার রজতাভ! তোমার এই সুন্দর সুপুরুষ মুখের পেছনে যে কুৎসিত, নোংরা, ঘৃণ্য পরজীবী মুখটা আছে সেটার আভাস যাতে আমার মেয়ে না পায়!আর জেনে রাখো তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করবো না!আমার মৃত্যুর পর তুমি আমার মৃতদেহকে স্পর্শ করবে না!”

সেই অভিশপ্ত দুপুরের পাপের প্রায়শ্চিত্তের আগুনে এতগুলো বছর পুড়েছেন রজতাভ। রোজ রাতে ঈশ্বরের কাছে, ঊর্মির কাছে নতজানু হয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। প্রতিটা মুহূর্তে কেঁদেছেন নিজের ভুলের জন্য। অভীকের আসল পরিচয় জানার পর ভেবেছিলেন এতদিনে ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন। ঠিক করেছিলেন সুজাতার সাথে তিনি যে অন্যায় করেছিলেন তার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ ঐশী আর রজতের চার হাত এক করে দেবেন। শুধু একটাই ভয় ছিল তার মনে। সুজাতা কি তাকে ক্ষমা করতে পেরেছেন? সেদিন রাতে সুজাতার থেকে ওরকম ঠাণ্ডা ব্যবহার পেয়ে ভয়টা আরো বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সুজাতা যখন ঐশী আর অভীকের বিয়ে দিতে রাজি হলেন সেদিন তিনি বুঝেছিলেন অবশেষে সুজাতা তাকে ক্ষমা করেছেন।  ঐশী আর অভীকের চারহাত এককরে শান্তি পেয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন এতদিনে তার পাপ থেকে মুক্তি হল তার। কিন্তু ফেলে আসা অতীত যে এভাবে তার সামনে আবার চলে আসবে তা তিনি ভাবতে পারেননি। সেদিন যদি তিনি মিথ্যে না বলতেন তাহলে তার সেই অতীতের আগুন ঐশী-অভীকের জীবনটাও ছাড়খাড় করে দিত। 

ভাবতে ভাবতে সুজাতার কথার জবাব দেন রজতাভ, “ কেউ জানতে পারবে না সুজাতা! তাছাড়া আমি চাই না সেদিন দুপুরে যা ঘটেছিল সেটা আমার মনের মণিকোঠায় গোপন ক্ষতের মতো বন্দী হয়ে থাকবে। সে পাপ, সে অপরাধের দায়, সে অভিশাপ সম্পুর্ণ আমার। আর সেই অভিশাপ, সেই ক্ষতটা আমার সাথেই এই পৃথিবী থেকে লুপ্ত হবে। আর কেউ জানতে পারবে না সেদিন ঠিক কী হয়েছিল।”

“কোন দিন কি হয়েছিল বাপি?” ঐশীর ডাকে চমকে গিয়েও পর মুহূর্তে নিজেকে সামলে হেসে‌ রজতাভ বলেন,“ ঐ পুরোনো দিনের ঘটনা। তোর শ্বশুর মানে তথাগত একবার এরকমই এক অনুষ্ঠানে যা কাণ্ড করেছিল বলার মতো নয়। সেটারই কথা মনে পড়ছিল।”

“কি ঘটনা?” ব্যালকনিতে আরেকটা চেয়ার নিয়ে বসে ঐশী। রজতাভ হেসে বলেন,“ আর বলিস না! দার্জিলিং-এ আমাদের বাড়ির কথা তো বলেছি তোদের। তা সেখানে...।” বলে পুরোনো এক ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করেন রজতাভ। পুরোটা শুনে হাসতে হাসতে চেয়ারে গড়িয়ে পড়ে ঐশী। সুজাতার মুখেও পুরোনো দিনের কথা মনে করে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। বিকেলের অস্তরাগের আলোয় তিনজন মানুষ মেতে ওঠেন পুরোনো স্মৃতিকথায়।

(সমাপ্ত)

বৃহস্পতিবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

অস্তরাগ ত্রয়োবিংশ পর্ব



রজতাভ অভীকের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “তারপর আর কি? বাপ-মেয়েতে নতুন করে জীবনযাপন শুরু করলাম। ঊর্মির মারা যাবার তেরোদিন পর পারলৌকিক কাজ সেরে ঠিক করলাম যে কারনে ঊর্মি আমার উপর অভিমান করে চলে গেছে সেই স্মৃতিস্বরূপ চিঠিগুলোর কোনো চিহ্ন আমি রাখবো না। সুজাতা যখন নিজেই সব সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে গেছে তখন আমিও আর কোনো সম্পর্ক রাখবো না। ঠিক করলাম সুজাতাদের সাথে থাকা আমাদের সব স্মৃতি মুছে দেব। সেই মতো একদিন আমাদের সব ছবি, চিঠি খুঁজে বের করে পুড়িয়ে দিলাম আমি। শুধু পোড়ালাম না ঊর্মির ডাইরিগুলো। কারন ওগুলো ছিল আমার ঊর্মির শেষ স্মৃতি। ঠিক করলাম যে ডাইরির পাতায় সুজাতার উল্লেখ থাকবে সেই পাতাগুলো বাদ দিয়ে ডাইরিগুলো তুলে দেবো ঐশীর হাতে। আমাদের জীবনে যে সুজাতাদের কোনো অস্তিত্ব ছিল তা কিছুতেই জানতে দেব না ঐশীকে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক‌ আর হয় আরেক। নিয়তি আবার আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। যেকারনে আমি আর সুজাতা পরস্পরের থেকে দুরে সরে গিয়েছিলাম ঠিক সেই কারনে আমরা পরস্পরের সামনে চলে এলাম। আমরা দুজনেই চেয়েছিলাম আমাদের অতীতের ছায়া তোমাদের উপর না পড়ুক। অথচ দেখো ঠিক তাই হল। তোমাদের চারহাত এক হয়ে গেল। ঊর্মির এই ডাইরিটা তোমরা কোথা থেকে পেলে জানি না। কিন্তু ডাইরি পড়ে তোমরা যতটুকু জেনেছ তা অর্ধেক সত্যি। বাকিটুকু শোনার পরেও যদি তোমাদের মনে হয় আমরা অপরাধী তাহলে তোমরা যা শাস্তি দেবে মাথা পেতে নেব। শুধু দুটো কথাই বলার আছে। প্রথমত ঐ মানুষটার সাথে আমার কোনো অবৈধ্য সম্পর্ক নেই। কোনো কালেই ছিল না। যা ছিল তা সম্পূর্ণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আর এই সম্পর্ককে যদি তোমরা নোংরা মনে করো তাহলে আমার কিছু করার নেই। কিন্তু ঐ মানুষটাকে তোমরা কিছু বলো না। ঐ মানুষটার কোনো দোষ নেই। ও সম্পূর্ণ নির্দোষ।”

কিছুক্ষণ থেমে  রজতাভ আবার বলতে শুরু করেন,“সেদিনের পর প্রায় তেইশটা বছর কেটে গেছে। তোমার মায়ের সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। আমিও কোনো চেষ্টা করিনি কারন সেটা করলে তোমার মায়ের সাথে যে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা তৈরি হয়েছিল সেটাকে অশ্রদ্ধা করা হত। যেখানে সুজাতা নিজেই সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছিল সেখানে যদি আমি এগোতাম তাহলে তোমার মা সমস্ত সমাজের কাছে ছোটো হয়ে যেত। এমনিতেও সে সময়টায় একজন পুরুষ ও আরেকজন স্ত্রীর নিখাদ বন্ধুত্বকে সমাজ ভালো চোখে দেখত না। এখনও দেখে না। তার উপর একজন বিবাহিত অপরজন সদ্য বিপত্নীক। তাই সব দিক ভেবে তোমার মায়ের সিদ্ধান্ত কে সম্মান দিয়ে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আর দেখা হবে না আমাদের। কিন্তু আমাদের ভাগ্য আবার পরস্পরকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। তোমার সাথে ঐশীর আলাপ,পরে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ধীরে ধীরে সে সম্পর্ক প্রেমে গড়াল এবং সেদিন কফিশপে সুজাতার সাথে আবার দেখা হয়ে যাবার পর আবিস্কার করলাম তুমি আমাদের সুজাতার ছেলে। তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানি না তবে এতগুলো বছর পর সেদিনই আবার দেখা হল আমাদের। আর আমি দেখলাম এতবছর পরেও সুজাতা ঠিক আগের মতোই আছে। সেই হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল, তবে সেই প্রগলভতা আর নেই। বরং একটা শান্তভাব এসেছে। ঐদিন ঐশীকে যেভাবে সুজাতা প্রথম দেখাতেই আপন করে নিল বিশ্বাস করো সেদিন মনে একটা প্রশান্তি অনুভব করেছিলাম। কারণ আমি বুঝেছিলাম আমার মেয়ে শাশুড়ি নয় আবার ওর মাকে পেতে চলেছে। কাল যদি আমি মরেও যাই আমার মেয়েটাকে সামলানোর মতো দুজন মানুষ থাকবে। যাদের একজনের সাথে একসময় আমার আত্মার সম্পর্ক ছিল। সেদিনই ঠিক করলাম যে করেই হোক তোমাদের চার হাত এক করতে হবেই। সেই মতো আমি প্রস্তাব রাখলাম সুজাতার কাছে। ভেবেছিলাম সুজাতা হয়তো রাজি হবে না এ প্রস্তাবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সুজাতা রাজি হল। তারপরের ঘটনা তো তোমাদের জানা।”


কথাগুলো বলে একটু থামলেন রজতাভ। গোটা ঘরে তখন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। শুধু আর সুজাতার ফোপানোর শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ কানে আসছে না। অভীক গম্ভীর মুখ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে বসে আছে। ঐশীর অবস্থাও তথৈবচ। কিছুক্ষণ পর অভীকের দিকে তাকিয়ে রজতাভ বলেন, “সবটা জানার পরেও যদি তোমাদের বিচারে আমরা দোষী হই তাহলে আমার কিছু বলার নেই। শুধু কটা প্রশ্ন আছে। তোমাদের জেনারেশন বেশ ম্যাচিওর আর স্মার্ট। আমাদের থেকে তোমরা অনেকটা ক্যাজুয়াল। তোমরা এখন বড় হয়েছ, বিয়ে করে সদ্য দাম্পত্য জীবনে পা দিয়েছ। আশা করি প্রশ্নগুলোর উত্তর তোমাদের কাছে আছে। তোমাদের কী মনে হয়,দুজন মানুষের মধ্যে কী নিখাদ বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরী হতে পারে না? দুজন মানুষের সংসার থেকে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পরস্পরের কাছে আশ্রয় কামনা করে থাকাটা কি ভুল? দুজন মানুষ যদি আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পরস্পরকে দোসর হিসেবে খুঁজে পায় তাহলে আপত্তি কোথায়? তাদের সেই নিখাদ বন্ধুত্বের সম্পর্ককে তোমরা কি নাম দেবে? আর সব থেকে বড়ো প্রশ্ন যেটা আমি ঊর্মিকে করতে পারিনি সেটাই তোমাদের করছি। দুজন একা মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা নিখাদ বন্ধুত্ব কি গুরুতর অপরাধ? নাকি পাপ? যদি তা না হয়ে থাকে তাহলে এতগুলো বছর আমাদের জ্বলতে হল কেন? কেন তোমার মাকে অপবাদের ভয়ে সারাজীবন এই পাণ্ডববরিজিত জায়গায় কাটাতে হল? কেন আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ঐশীর মা ছেড়ে চলে গেল? কেন এত বছর পর আমাকে তোমাদের কাছে জবাবদিহি করতে হচ্ছে? আমার জায়গায় তোমরা থাকলে কি করতে? বলতে পারবে? জানা আছে জবাবগুলো?জানি পারবে না! যদি পারতে তাহলে ঐ যে সোফায় বসে তখন থেকে কেঁদে চলা মানুষটাকে এতবছর পর একটা ডাইরির লেখাকে ভিত্তি করে সন্দেহ করতে না। এভাবে নাটকীয়ভাবে আমাদের কে কাঠগড়ায় তুলতে না। বরং সোজাসুজি জিজ্ঞেস করতে ডাইরিটার ব্যাপারে। কিন্তু তোমরা তা করোনি। করেছ কি? বরং উল্টে নিজের বাবা-মায়ের চরিত্রকে সন্দেহ করেছ! মানছি আশ্রয়ের খোঁজে মানুষটাকে আমি মুহূর্তের জন্য দুর্বল করে তুলেছিলাম ঠিকই। কিন্তু মানুষটাকে একবারের জন্যেও কালিমালিপ্ত করিনি আমি। যেটা তোমরা আজ প্রকারান্তরে করলে! ঊর্মির কাছে সবটা জানাজানি হবার পরেও সব দোষ আমি নিজে মাথা পেতে নিলেও যার দিকে অভিযোগের একটা আঙুলও তুলতে দিইনি। সেই মানুষটার চরিত্র নিয়ে আজ তারই সন্তান সন্দেহপ্রকাশ করছে। এত সংঘর্ষের পর যে মানুষটা তোমাকে নিজের আদর্শ, শিক্ষায় মানুষ করে তুলল, এতটা আঘাত বোধহয় তার প্রাপ্য ছিল না। আজ যেটা তোমরা করলে সেটা ও ডিজার্ভ করতো না।"


কথাগুলো বলতে বলতে রজতাভর গলাটা হাল্কা ধরে এলেও তাতে একটা প্রচ্ছন্ন অভিমানের সুর ধরা পড়ে। সুজাতার দেহটা কান্নার দমকে কেঁপে ওঠে আবার। ঐশী সুজাতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলেও ওর দু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। অভীক স্থির হয়ে মেঝেতে দৃষ্টি রেখে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর উঠে ধীরপায়ে হাটতে হাটতে নিজের ঘরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর সুজাতাকে নিয়ে ঐশীও চলে যায় সুজাতার ঘরে। রজতাভ বৈঠকখানায় বসে থাকেন একা।


******


- আর মাত্র আধ ঘন্টা!


- সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে?


- উহু! এগারোটা পঁচিশ।


- ডাক্তার তো বলল সাড়ে বারোটায় অপারেশন করবে!


- হুম! তবে তোকে ওটিতে নিয়ে যাবে বারোটার দিকে।


- এত আগে কেন?


- কি জানি? কি সব প্রসিডিওর আছে বলল।


- বাপি কোথায়?


- বাইরে বসে আছেন। যা হাবভাব বুঝলাম তোর চেয়ে বেশী টেনশনে তো উনি পড়ে গেছেন।


- মানে?


- মানেটা হল আমার শ্বশুরমশাই এমন প্যানিকড হয়ে আছেন যেন ওনার মেয়ের নয় ওনারই সিজার হবে।


- ধ্যাত! কিসব আলফাল বকছিস?লাথি মারবো হারামী!


- বিশ্বাস না হলে ভেতরে ডাকছি ওনাকে। নিজেই দেখে নে। 


- ইস! বাপি সবসময় এরকম টেনসড ফিল করে।


- ওনার আর কি দোষ বল? মেয়ে যদি প্রেগনেন্ট হবার পরেও এরম ধিঙ্গিপনা চালিয়ে যায়। তাহলে বাবার চিন্তা বেড়েই যায়।


- বটে? একবার এখান থেকে বেরোই,তারপর তোকে দেখাব ধিঙ্গিপনা কাকে বলে?


- ঐ দেখো আবার রেগে যাচ্ছে! 


- রাগব না? সালা একে টেনশন হচ্ছে কি হবে না হবে তার উপর তুই আমাকে ইরিটেট করছিস!


- আচ্ছা ঠিক আছে আর করব না।


বলে কান ধরে অভীক। অভীকের কাণ্ড দেখে ফিক করে হেসে ফেলে ঐশী। অভীক ঐশীর একটা হাত ধরে বলে,“ একটা কথা বলবি?”


ঐশী অভীকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,“কী?”


- তুই রেডি তো? মানে ভয় করছে না তো?


- একটু যে ভয় করছে না তা নয়। তবে ওটুকু চলে। তা অভীকবাবুর কি মনে হয়? কে আসতে চলেছে? জুনিয়র অভীক না জুনিয়র ঐশ্বর্য?


- যেই আসুক। দুজনকেই স্বাগত জানানো হবে। ঐশী...


- কী?


- কিছু না। থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভরিথিং! দাঁড়া তোর বাপিকে ভেতরে পাঠাচ্ছি। নাহলে উনি টেনশনে টেনশনে পাগল হয়ে যাবেন।


বলে ঐশীর কপালে একটা চুমু খেয়ে কেবিন থেকে বেড়িয়ে আসে অভীক। ততক্ষণে কেবিনের বাইরেও আরেক নাটকের সৃষ্টি হয়েছে। কেবিনের বাইরে বেঞ্চে বসে আছেন সুজাতা। আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে হাসি লুকিয়ে রজতাভকে দেখছেন। আর রজতাভ কেবিনের বাইরে ক্রমাগত পায়চারী করে যাচ্ছেন। সুজাতা একসময় থাকতে না পেরে বলে ফেললেন, “একটু শান্ত হয়ে বসুন তো রজতদা। এত চিন্তা করলে হয়? এসব অভিকে মানায়। আপনাকে নয়। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন অভি নয় আপনি বাবা হতে চলেছেন।”


রজতাভ পায়চারী করতে করতে বলে ওঠেন, “তুমি বুঝবে না সুজাতা! বাবা হবার কি জ্বালা! এত বড়ো অপারেশন হতে চলেছে মেয়েটার। না জানি কি হতে চলেছে! নির্ঘাত ভয় পাচ্ছে মেয়েটা। বাবা হয়ে চিন্তা হবে না?”


সুজাতা হেসে বলেন, “সব ঠিক হয়ে যাবে রজতদা। আমিও তো সন্তানের জন্ম দিয়েছি নাকি? আপনি শান্ত হয়ে বসুন। আপনাকে এভাবে দেখলে তো ঐশী চিন্তায় পড়ে যাবে। ওকে অপারেশনের আগে হাসিখুশি আর টেনশন ফ্রি রাখতে হবে আমাদের।”


প্রত্যুত্তরে রজতাভ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন অভীককে কেবিন থেকে বেরোতে দেখে থেমে এগিয়ে যান।


- ঐশীর কি খবর? কি করছে? নেহাত ভয় পাচ্ছে তাই না?


- ভেতরে গিয়েই দেখে নিন। 


বলে নির্বিকার মুখে সরে দাঁড়ায় অভীক। রজতাভ ঢুকে যান কেবিনে আর তার সাথে সাথে অভীক ফিক করে হেসে ফেলে। সুজাতাও আঁচল নামিয়ে হাসেন। অভীক হাসতে হাসতে মায়ের পাশে বসতেই সুজাতা জিজ্ঞেস করেন, “কি বুঝলি?”


- বুঝলাম মেয়ের থেকে মেয়ের বাবার চিন্তা অনেক বেশী। 


- রজতদা চিরকাল এরকমই। সিরিয়াস বিষয় নিয়ে চিন্তা করবে না অথচ সামান্য বিষয় নিয়ে টেনশনে পড়ে যাবে। আরে এখন কি আর আগের মতো চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে? এখন কত উন্নত হয়ে গেছে সব কিছু। এত চিন্তা করলে চলে?


বলতে বলতে হাসেন সুজাতা। অভীক মায়ের কাঁধে‌ মাথা রাখে। সুজাতা হাত বাড়িয়ে দেন অভীকের মাথায়। সেদিনের ঘটনার পর পাঁচ বছর কেটে গেছে। সেদিন রজতাভর স্বীকারোক্তি পর অভীক সারারাত ঘুমোতে পারেনি। নিজের মাকে সন্দেহ করার অপরাধবোধ তাকে কুড়ে খাচ্ছিল। পরদিন সকালে সুজাতাদেবী ছেলেকে প্রাতরাশের জন্য ডাকতেই মাকে জড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদেছিল অভীক। মা-ছেলের সেই মানভঞ্জনের দৃশ্য দেখে রজতাভ বুঝেছিলেন এতদিনে তার শাপমোচন ঘটেছে। তারপর বিগত পাঁচবছরে অভীক নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের সাথে সাথে সুজাতা আর রজতাভর দায়িত্বও সে নিয়েছে। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর এখন ওরা চারজন একসাথেই থাকেন। সুজাতার মনে আছে তিনি যখন রজতাভকে ঐশীর মা হওয়ার খবর দিয়েছিলেন রজতাভ বাচ্চাদের মতো হাউহাউ করে কাঁদছিলেন। তারপর থেকে ঐশীর যাবতীয় যত্ন দুজনে মিলে করে এসেছেন। আজ ঐশীর ডেলিভারি ডেট পড়েছে। ডাক্তারবাবু নর্মাল এবং সিজারিয়ান দুটো অপশনই দিয়েছিলেন। ঐশীর যাতে কষ্ট না হয় তাই রজতাভরা সিজারিয়ান ডেলিভারি বেছে নিয়েছেন। আর শেষ মুহূর্তে এসে রজতাভর চিন্তা আরো বেড়ে গেছে এই ভেবে যে অপারেশন ঠিকঠাক হবে কিনা? সুজাতা যতই বোঝাবার চেষ্টা করছেন রজতাভ ততটাই অবুঝ হয়ে উঠছেন। 


ঠিক বারোটার একটু আগে নার্সিংহোমের স্টাফরা ঐশীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেল। রজতাভ ঐশীর পিছু পিছু কিছুদুর যাবার পর থেমে গেলেন। তারপর শুরু হল সকলের এক অনন্ত প্রতিক্ষা। ঘড়ির কাঁটা যেন কিছুতেই ঘুড়তে চায় না। রজতাভ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন অপারেশন থিয়েটারের সামনে। বেশ কয়েকঘন্টা কেটে যাবার পর নার্স বেরিয়ে এসে জানালেন অপারেশন সাকসেসফুল। ঐশীর ছেলে হয়েছে। মা আর সন্তান দুজনেই সুস্থ। কিছুক্ষণ পর ঐশীকে কেবিনে নিয়ে যাওয়া হবে। 


খবরটা শোনার পর অভীক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসে। সুজাতা দুটো হাত জড়ো করে কপালে ঠেকিয়ে ঈশ্বরের কাছে ধন্যবাদ জানান। আর রজতাভ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বেঞ্চে বসে পড়েন তারপর দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করেন।


(আগামী পর্বে সমাপ্য)

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...