রজতাভকে কাঁদতে দেখে সুজাতা বেঞ্চ থেকে উঠে রজতাভর পাশে গিয়ে দাঁড়ান। তারপর রজতাভর কাঁধে হাত রাখেন। অভীকও রজতাভর পাশে গিয়ে বসে। রজতাভ সামনের দিকে তাকিয়ে দেখেন সুজাতার চোখও শুকনো নেই। সুজাতা অশ্রুসজল চোখে রজতাভর দিকে তাকিয়ে বলেন, “নিজেকে সামলাও রজতদা। ঐশী তোমাকে এভাবে দেখলে কষ্ট পাবে। আর কাঁদবে না! তোমার প্রায়শ্চিত্তের আগুনে পোড়ার দিন শেষ রজতদা। আজকে কান্নার দিন নয় হাসির দিন। কষ্টের নয়, আনন্দের দিন। দুঃখের নয়, উৎসবের দিন। অভিনন্দন নতুন দাদুকে! এসো নবজাতককে স্বাগত জানাব আমরা।” বলে হাসেন সুজাতা। রজতাভ সুজাতার হাত নিজের হাতে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকার পর নিজেকে সামলে চোখের জল মুছে হেসে বলেন, “তাই তো! তাই তো! আজ তো উৎসবের দিন! আনন্দের দিন! আমি দাদু হয়ে গেছি! হে হে! আমি দাদু হয়ে গেছি! তোমাকেও ঠাকুমা হবার অনেক অনেক অভিনন্দন সুজাতা!” বলে অভীকের দিকে তাকিয়ে বলেন, “কি হে ছোঁড়া! এখনও বসে আছো? যাও মিষ্টি নিয়ে এসো! বাবা হয়ে সব বুদ্ধিশুদ্ধি গোল্লায় গেছে নাকি? মিষ্টিমুখ করাতে হবে তো সবাইকে! আমার নাতি হয়েছে! দাদু হয়ে নাতিকে খালিহাতে দেখব নাকি? কি হল যাও নিয়ে এসো মিষ্টি! উফ! ঐশী ঠিকই বলে! একেবারে ক্যালাস!”
কিছুক্ষণ পর যখন ঐশীকে কেবিনে দেওয়া হল তখনও তার জ্ঞান ফেরেনি। অগত্যা রজতাভরা এগিয়ে গেলেন চাইল্ড কেয়ার ইউনিটের দিকে। ঐশীর সন্তানকে দেখতে। নার্স নির্দিষ্ট ক্রেটের দিকে এগোতেই রজতাভর মনে হতে লাগল তাঁর পা ক্রমশ পাথরের হয়ে আসছে। তিনি চাইলেও এগোতে পারছেন না। সুজাতারা ততক্ষণে পৌঁছে গেছেন ক্রেটের সামনে। ঐশীর সন্তানকে দেখছেন প্রাণভরে। রজতাভ ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন ক্রেটের সামনে। তারপর তাকালেন ক্রেটের মধ্যে শুয়ে থাকা শিশুটার দিকে।
মুখটা হুবহু না হলেও চোখটা অবিকল তাঁর মতো পেয়েছে শিশুটা। কপালটা ঐশীর মতো ছোটো। কানদুটো সরু ঠিক অভীকের মতো। নাকটা কিছুটা সুজাতার মতো কি? ঐশীর সন্তানের দিকে তাকিয়ে আরেকবার চোখে জল এল রজতাভর। নার্স ততক্ষণে ক্রেট থেকে শিশুটাকে তুলে নিয়েছে। সুজাতা নার্সকে ইশারা করতেই নার্স শিশুটাকে তুলে দিল রজতাভর কোলে। রজতাভ অপটু হাতে সাবধানে শিশুটাকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর অশ্রুসজল চোখে তাকালেন নাতির দিকে। শিশুটা ততক্ষণে পুর্ণচোখে তাকিয়েছে রজতাভর দিকে। রজতাভর মনে হল যেন শিশুটা তাকে দেখে হাসছে। একটা নির্মল, অপাপবিদ্ধ, ক্ষমাসুন্দর হাসি। কিছুক্ষণ প্রাণভরে দেখার পর সুজাতার কোলে শিশুটাকে তুলে দিলেন রজতাভ। সুজাতা শিশুটাকে কোলে নিয়েই আদর করতে লাগলেন। রজতাভ দেখলেন সুজাতার কোলে যাওয়া মাত্র শিশুটা আবার ফিক করে হাসল। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন ঐশীর কেবিনের দিকে।
কেবিনে ঢুকে দেখলেন ঐশীর জ্ঞান ফিরেছে। বাপিকে দেখে সে উঠে বসতে গেলে রজতাভ ইশারায় বারণ করলেন উঠতে। তারপর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে ঐশীর মাথায় হাত রেখে বললেন, “চিন্তার কিছু নেই। সব ঠিক আছে। কংগ্রাচুলেশন! ছেলে হয়েছে!” ঐশী বেডে শুয়ে অশ্রুসজল চোখে তাকায় বাপির দিকে। রজতাভ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।
******
- কি ব্যাপার রে? এখনও তৈরী হোসনি কেন? পুরোহিতমশাই এসে গেছেন। গেস্টরাও এসে পড়ল বলে!
- আরে আমার পাঞ্জাবীর বোতামগুলো খুঁজে পাচ্ছি না। আলমারীতেই তো রেখেছিলাম।
- সেকি রে! ওখানেই তো রাখা ছিল! সর আমি দেখছি। আর এটা ধুতি পরা হয়েছে?
- আরে কুচি হচ্ছে না কিছুতেই। তাই...!
- তাই সাউথ ইন্ডিয়ান স্টাইলে পরেছি! উফ সত্যি তোকে নিয়ে পারা যায় না! এভাবে কেউ পরে?তার উপর গরদের ধুতি বলে ভেতরের সব কিছু দেখা যাচ্ছে! তখন পই পই করে বললাম ধুতি পরার এত যখন ইচ্ছে তখন রেডি টু ওয়্যার ধুতি কিনে নিচ্ছি। কিন্তু না! বাবুর একেবারে ট্রাডিশনাল ধাঁচে ধুতি পরবেন! তা এই বুঝি তোর ট্র্যাডিশনাল স্টাইল?
- আরে তখন বুঝবো কি করে যে কুচিটা এরকম বিচ্ছিরিভাবে ফাঁসাবে!একটু হেল্প কর না প্লিজ!
- হুম! হেল্প করেই তো কেটে যাচ্ছে সারাদিন! দিনে বেবিকে সামলাতে বাপি-মাকে হেল্প করো, রাতে বেবির বাপের জাগে হুয়ে অরমান নেভাতে হেল্প করো। গোটা জীবন বোধহয় হেল্প করেই কেটে যাবে।
- শসসস! চুপ! তোর মুখে কি কিছুই আটকায় না! বাড়ি ভর্তি লোকের সামনে এসব প্রাইভেট কথা কে বলে?
- বেশ করেছি বলেছি! পাবলিকও জানুক তাদের আদরের নিরীহ অভীক কতটা মিটমিটে শয়তান! দিনে যতই সুবোধ বালক সাজুক না কেন রাতে পুরো ভোল পাল্টে অন্য মানুষ হয়ে যায়।
বলতে বলতে আলমারী থেকে একটা কৌটো বের করে অভীকের হাতে ধরিয়ে দেয় ঐশী। অভীক বাইরের দিকে একবার তাকিয়ে চকিতে ঐশীর হাত টেনে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে। ঐশী নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে,“কি হচ্ছেটা কী? দরজা খোলা আছে। কেউ দেখে ফেলবে তো!”
- দেখুক! আমার বউকে আমি আদর করবো তাতে কার কি এসে গেল আই ডোন্ট কেয়ার। বাই দা ওয়ে শাড়িটায় তোকে দারুণ লাগছে।
- অভি ছাড় আমাকে! অনেক কাজ আছে!যেকোনো মুহূর্তে মা ডাকতে পারে।
- উহু! এত সহজে তো ছাড়ব না। আগে একটা মিষ্টি করে চুমু খাব তারপর ছাড়বো।
- পাগল হয়ে গেছিস নাকি?বাড়ি ভর্তি লোক, কে কখন চলে আসবে ঠিক নেই !
- বললাম তো! আই ডোন্ট কেয়ার! চুমু না খেয়ে ছাড়ছি না।
- অভি প্লিজ!
- উহু!
বলে ঐশীর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় অভীক। ঐশীকে প্রগাড় চুমু খেতে খেতে আবেশে শিথিল হয় অভীকের বাহুডোর। পরক্ষণেই সুজাতার ডাকে চমকে ওঠে অভীক! সেই সুযোগে অভীকের ঠোঁটে কামড় বসিয়ে একটা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয় ঐশী। তারপর হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
ভাতের থালা সাজিয়ে বৈঠকখানায় পাতা জলচৌকিতে রাখেন সুজাতা। তারপর বসার আসন পেতে ডাকেন রজতাভকে। নাতিকে কোলে নিয়ে হই হই করে বৈঠকখানায় আসেন রজতাভ। তারপর পুরোহিতের কথামতো আসনে বসে পড়েন। এই ছমাসে নাতিটা বড্ড দুরন্ত হয়েছে। সারাক্ষণ এই ভাঙছে, ঐ ফেলছে। বাড়ির সবাই অতিষ্ঠ পুঁচকের দৌরাত্ম্যে । না সবাই নয়, রজতাভ বাদে সবাই পুঁচকের দুরন্তপনায় অতিষ্ঠ। রজতাভর কাছে নাতির এসব কাজ মোটেই শয়তানি নয়। তার মতে, “এই বয়সে খেলবে না তো কি তোদের মতো ধেড়ে বুড়ো বয়সে খেলবে?”
মাঝে মাঝে নাতিকে নিয়ে মেয়ের সাথে ঝগড়াও হয় রজতাভ। নাতি অন্তপ্রাণ রজতাভর সামনে নাতিকে কিছুতেই বকা যাবে না। বকলেই নাতি ফিচফিচ করে কাঁদতে কাঁদতে দাদুর কোলে উঠে বসবে। সেও যে দাদুর ভীষণ ন্যাওটা। তার আবদার, ঘুমনো,খেলা করা,আধো আধো গলায় যাবতীয় গল্প করা সব দাদুর সাথেই।
রজতাভ নাতিকে নিয়ে বসতেই পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণ করে আশীর্বাদী ফুল ছোঁয়ালেন নাতির মাথায়। তারপর নিয়মাচার পালন করে নামকরণ শুরু হল। পুরোহিতমশাই জানালেন পাঁজি ঘেটে তিনি যা বুঝছেন তাতে পুঁচকের নাম ‘অ’ দিয়ে হলেই মঙ্গল। রজতাভ মুচকি হেসে তাকালেন ঐশীদের দিকে। সেদিন নাতিকে প্রথমবার দেখার পরেই একটা নাম মাথায় এসেছিল তার। ঐশীকে জানাতে সেও সায় দিয়েছিল সে নামে। এবারও ঐশী হাসতে হাসতে চোখ নামিয়ে সায় দিল। রজতাভ নাতিকে দুহাতে জড়িয়ে পুরোহিতকে বললেন, “ওর নাম হবে অজাতশত্রু।”
******
খাবার পালা শেষ করে নাতিকে কোলে নিয়ে রজতাভ যখন ব্যালকনিতে বসলেন ততক্ষণে সুর্য পশ্চিমের দিকে হেলে পড়েছে। অতিথিদের খাইয়ে ঐশীরা এতক্ষণে খেতে বসেছে। নাতিকে নিয়ে খেলতে খেলতে রজতাভ অস্তামিত সুর্যের দিকে তাকিয়েছিলেন। তার চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো এক এক করে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভেসে উঠছিল। আজ থেকে কয়েকবছর আগে এরকমই এক বিকেলে কফিশপে ঐশীর সাথে তিনি অপেক্ষা করছিলেন অভীকের। আর আজ নাতিকে নিয়ে বসে আছেন ব্যালকনিতে। এই কটা বছর যেন ঝড়ের বেগে কেটে গেল। নাতির সাথে খেলতে খেলতে সুর্যের দিকে তাকিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন রজতাভ। ঘোর কাটল সুজাতার ডাকে। তাকিয়ে দেখলেন সুজাতা পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সুজাতা হেসে পাশের চেয়ারে বসে বললেন, “কি ভাবছেন রজতদা?”
- ভাবছি সময়গুলো কত তাড়াতাড়ি কেটে যায়। এই সেই ঐশী যার ডায়পার বদলাতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হত আমাকে। পিরিয়ডের সময় মনে করে ব্যাগে প্যাড ঢুকিয়ে না দিলে যে মেয়ে বিপদে পড়ে যেত। দিনের শেষে যে মেয়ের বাপির আদর ছাড়া চলত না সেই মেয়ে কত তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে গেল। সে দিনের সেই পুঁচকে মেয়েটা আজ মা হয়ে গেছে।
- সময়ের কাজই তো বয়ে চলা রজতদা। তাকে কি কেউ আটকাতে পারে? আমার অভিকেই দেখুন। এই সেদিন পর্যন্ত যে ছেলে আমার কোলে কোলে ঘুরতো। সেই ছেলে আজ আমাদের দুটো পরিবারকে এক করে নিয়ে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। যে ছেলের বিয়ে নিয়ে আমার মনে সন্দেহ ছিল সেই ছেলে আজ বাবা হয়ে নিজের সন্তানের অন্নপ্রাশন করাচ্ছে।
- সত্যিই ছেলেমেয়ে দুটো দেখতে দেখতে কত বড়ো হয়ে গেল। ঠিকই বলেছ সুজাতা। সময়ের কাজ তো বয়ে চলা। সে বয়ে চলে আপন খেয়ালে নদীর মতো। কখনো সম্পর্ক নামক পারে চিড় ধরায়। কখনো পুরোনো ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়ে সারিয়ে তোলে। কাউকে ভীষণ কাছের করে তোলে, আবার কাউকে দুরে সরিয়ে দেয়।
- সেদিন মিথ্যেটা না বললেও পারতেন।
রজতাভর ঘোর কাটে। তিনি তাকান সুজাতার দিকে, “কোন মিথ্যে?” সুজাতা নাতির দিকে চোখ রেখে বলেন, “কাজিরাঙার সেই দুপুরের কথাটা তো অর্ধ সত্য ছিল রজতদা।”
রজতাভ নাতির মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেন,“তোমার কি মনে হয় সত্যিটা জানালে ওরা মেনে নিত? মানত না সুজাতা! কেউ মানতে পারবে না। ঊর্মি মেনে নিতে পারেনি। ওরাও পারত না। এদের প্রজন্ম, সমাজ যতই আধুনিক হোক না কেন একজন পরপুরুষ আর পর স্ত্রীর সম্পর্ককে মেনে নেওয়া এদের পক্ষে অসম্ভব। পরকীয়া যতই আইনি ভাবে বৈধ হোক না কেন ততদিন এটা স্বাভাবিক হবে না যতদিন সমাজ না মেনে নিচ্ছে এটাকে। এই যে তুমি প্রতি সন্ধ্যায় সিরিয়াল দেখো, খেয়াল করে দেখেছ প্রতিটা সিরিয়ালে যাদের খলনায়িকা হিসেবে দেখানো হয় তারা প্রত্যেকে নায়কের সাথে বা নায়িকার বরের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত। অর্থাৎ সিরিয়ালেই বলে দেওয়া হচ্ছে পরকীয়া সংসারের প্রতি ক্ষতিকারক। এতে সংসার ভাঙে। একবার ভেবে দেখো যেখানে সিরিয়ালেই এই মেসেজ দেওয়া হয় সেই সমাজে আমাদের সম্পর্ককে মেনে নেওয়া হবে কি করে?আর যদি সেদিন আমি সবটা বলে দিতাম ওদের তার ফলশ্রুতি কি হত বলো তো?অভীক আর ঐশীর সম্পর্কটা ভেঙে যেত। সারাজীবনের মতো আমরা ওদের চোখে নিচে নেমে যেতাম। একজন বাবা হয়ে নিজের মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট হোক তা আমি চাইনি। তাই মিথ্যেটা বলতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমাদের নিজের জীবন তো আমাদের ভুলে কোনযুগেই শেষ হয়ে গেছে সুজাতা। সেই ভুলের মাশুল আমাদের সন্তানেরা গুনবে তা আমি চাই না সুজাতা। তাছাড়া আমি মনে করি বাবা-মা আর সন্তানের মধ্যে একটা লাইন ড্র করে রাখা ভীষণ জরুরী সুজাতা! নাহলে সর্বনাশ অবসম্ভাবী। ওরা ততটাই জানবে যতটা আমি জানাব। ওরা ততটাই দেখবে যতটা আমি দেখাবো।
- কিন্তু তাই বলে এভাবে! এতো মিথ্যে রজতদা! ওরা তো কোনোদিন না কোনোদিন সত্যিটা জানতে পারবে!
- হোক মিথ্যে! যে সত্যিটা বললে একটা সংসার বা দুজন মানুষের জীবন নষ্ট হয় সেটা বলার চেয়ে মিথ্যে বলাই ভালো। সত্যিটা তো সাহস করে বলেছিলাম আমি ঊর্মিকে। কি পেলাম? সেই দুপুরে করা একটা ভুলে শাস্তি হিসেবে ঊর্মি আমাকে একা ছেড়ে চলে গেল। তুমি অপবাদের ভয়ে সব সম্পর্ক চুকিয়ে স্বেচ্ছায় অজ্ঞাতবাস গ্রহণ করলে। এতগুলো বছর পর যদি আবার সত্যিটা বলতাম তাহলে যে সর্বনাশ হয়ে যেত সুজাতা। ওদের জীবনটা নরক হয়ে যেত ঠিক যেমন আমাদের হয়েছিল। ওদের চোখে আমরা খারাপ হয়ে যেতাম।
- কিন্তু সত্যিটা তো একদিন প্রকাশ্যে আসবেই রজতদা!ওরা সবটা জানতে পারবে! তখন কি হবে?
সুজাতার কথা কিছুক্ষণের জন্য থমকে যান রজতাভ। তার মনে পড়ে যায় সেই অভিশপ্ত দুপুরের কথা। না পুরোটা মিথ্যে বলেননি তিনি। তবে গোপন করে গেছেন অনেক কথা ওদের কাছ থেকে। সেদিন তথাগতকে নিয়ে সুজাতার সাথে কথা বলা, সুজাতার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন সবটাই সত্যি। শুধু ঘটনাগুলো ঘটেছিল দুপুরে নয়, সকালবেলায়। সেদিন সকালে সুজাতার ওষুধে জ্বর কমলেও দুপুরে তা আবার বেড়ে যায়। দুপুরে সুজাতা যখন খাবার দিতে এলেন জ্বরের ঘোরে তিনি তখন উন্মাদপ্রায়। সুজাতা তাকে ডাকতে গিয়ে আবিস্কার করলেন জ্বরটা আবার বেড়েছে। আর তিনি সুজাতার স্পর্শকে জ্বরের ঘোরে তিনি ঊর্মির স্পর্শ বলে কল্পনা করে বসলেন। জ্বরের ঘোরে তিনি সুজাতাকে টেনে নিলেন নিজের বুকে। সুজাতা সবটা বুঝতে পেরে অনেক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও রজতাভর সাথে পেরে উঠলেন না। রজতাভ সুজাতার সমগ্র দৈহিক, বাক্য প্রতিরোধ উপেক্ষা করে, দুহাতে সুজাতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। তারপর সারা দুপুর তিনি সুজাতাকে ঊর্মি ভেবে ভোগ করলেন।
অনেকপরে যখন রজতাভর হুশ ফিরে এল ততক্ষণে যা সর্বনাশ হবার হয়ে গেছে। সেদিনের পর থেকে তিনি সুজাতার চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস আর না পেলেও প্রতি মুহূর্তে ক্ষমা চেয়েছেন নিজের পাপের জন্য। কাজিরাঙ্গা থেকে ফেরার পর তিনি বার বার চিঠি লিখেছেন সুজাতাকে। একটা চিঠিরও উত্তর পাননি। শেষ চিঠিটা নিয়ে যখন ঊর্মির কাছে ধরা পড়ে গেলেন তখন সবটা শিকার করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না রজতাভর কাছে। ভেবেছিলেন ঊর্মি রাগ করবেন, কথা বলবেন না। তেমন হলে ডিভোর্স দিয়ে আলাদা হয়ে যাবেন। নিজের চরমতম শাস্তির জন্য প্রস্তুত ছিলেন রজতাভ। কিন্তু ঊর্মি যে তাকে এত বড়ো শাস্তি দেবেন তা তিনি বুঝতে পারেন নি। আজও ঊর্মির বলা শেষ কথাগুলো অভিশাপের মতো রজতাভর কানে বাজে। রোজ রাতে ঘুমের অতলে তাড়িয়ে বেড়ায়। রোজ তিনি শুনতে পান ঊর্মির ঘৃণায় ভরা সেই কথাগুলো, “তুমি মানুষটা ভীষণ ভয়ংকর রজতাভ! সাপের চেয়েও ভয়ংকর! তোমাকে ভালোবাসা যায়, জড়িয়ে ধরা যায়, কান্না পেলে কাঁধে মাথা রেখে কাঁদা যায় কিন্তু বিশ্বাস? না! আর তোমায় বিশ্বাস করা যায় না! আর বাকি রইল ক্ষমা! তার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ বাঘ যখন রক্তের স্বাদ একবার পায় তাকে শিকার করা থেকে আটকানো অসম্ভব! আজ যদি তোমায় ক্ষমা করি তাহলে তুমি আবার একই ভুল করবে! ও নয় তো অন্য কেউ হবে তোমার শিকার। আর তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবো না কেন জানো? তুমি জেনেশুনে একটা নিস্পাপ মেয়েকে পাপে জড়িয়েছ! তাকে পাঁকে নামিয়ে পাপ করতে বাধ্য করেছ! ওকে কথার জালে বিবশ করে ভোগ করেছ! তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনে গেছি রজতাভ! আমার দুঃখ কোথায় জানো? সে বেচারি নিজেকে দোষী ভেবে দুরে সরে গেছে। যদি আমার শক্তি থাকতো তাহলে ওকে খুঁজে বের করে জড়িয়ে ধরে বলতাম,‘তোর কোনো দোষ নেই!তুই নিজেকে শাস্তি দিস না!শাস্তি তো ওর প্রাপ্য!’ বলে তোমার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতাম। কিন্তু আমার কপাল দেখো! তোমার সন্তানকে গর্ভে ধারন করার জন্য মরতে বসেছি। তোমার বিষাক্ত স্পর্শে আমার আয়ু কমে গেছে! এই মুহূর্তে তোমাকে দেখে আমার গা গুলোচ্ছে রজতাভ মজুমদার! বমি পাচ্ছে! নেহাত আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানকে দেখার কেউ নেই বলে তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। কিন্তু খবরদার রজতাভ! তোমার এই সুন্দর সুপুরুষ মুখের পেছনে যে কুৎসিত, নোংরা, ঘৃণ্য পরজীবী মুখটা আছে সেটার আভাস যাতে আমার মেয়ে না পায়!আর জেনে রাখো তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করবো না!আমার মৃত্যুর পর তুমি আমার মৃতদেহকে স্পর্শ করবে না!”
সেই অভিশপ্ত দুপুরের পাপের প্রায়শ্চিত্তের আগুনে এতগুলো বছর পুড়েছেন রজতাভ। রোজ রাতে ঈশ্বরের কাছে, ঊর্মির কাছে নতজানু হয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। প্রতিটা মুহূর্তে কেঁদেছেন নিজের ভুলের জন্য। অভীকের আসল পরিচয় জানার পর ভেবেছিলেন এতদিনে ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন। ঠিক করেছিলেন সুজাতার সাথে তিনি যে অন্যায় করেছিলেন তার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ ঐশী আর রজতের চার হাত এক করে দেবেন। শুধু একটাই ভয় ছিল তার মনে। সুজাতা কি তাকে ক্ষমা করতে পেরেছেন? সেদিন রাতে সুজাতার থেকে ওরকম ঠাণ্ডা ব্যবহার পেয়ে ভয়টা আরো বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সুজাতা যখন ঐশী আর অভীকের বিয়ে দিতে রাজি হলেন সেদিন তিনি বুঝেছিলেন অবশেষে সুজাতা তাকে ক্ষমা করেছেন। ঐশী আর অভীকের চারহাত এককরে শান্তি পেয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন এতদিনে তার পাপ থেকে মুক্তি হল তার। কিন্তু ফেলে আসা অতীত যে এভাবে তার সামনে আবার চলে আসবে তা তিনি ভাবতে পারেননি। সেদিন যদি তিনি মিথ্যে না বলতেন তাহলে তার সেই অতীতের আগুন ঐশী-অভীকের জীবনটাও ছাড়খাড় করে দিত।
ভাবতে ভাবতে সুজাতার কথার জবাব দেন রজতাভ, “ কেউ জানতে পারবে না সুজাতা! তাছাড়া আমি চাই না সেদিন দুপুরে যা ঘটেছিল সেটা আমার মনের মণিকোঠায় গোপন ক্ষতের মতো বন্দী হয়ে থাকবে। সে পাপ, সে অপরাধের দায়, সে অভিশাপ সম্পুর্ণ আমার। আর সেই অভিশাপ, সেই ক্ষতটা আমার সাথেই এই পৃথিবী থেকে লুপ্ত হবে। আর কেউ জানতে পারবে না সেদিন ঠিক কী হয়েছিল।”
“কোন দিন কি হয়েছিল বাপি?” ঐশীর ডাকে চমকে গিয়েও পর মুহূর্তে নিজেকে সামলে হেসে রজতাভ বলেন,“ ঐ পুরোনো দিনের ঘটনা। তোর শ্বশুর মানে তথাগত একবার এরকমই এক অনুষ্ঠানে যা কাণ্ড করেছিল বলার মতো নয়। সেটারই কথা মনে পড়ছিল।”
“কি ঘটনা?” ব্যালকনিতে আরেকটা চেয়ার নিয়ে বসে ঐশী। রজতাভ হেসে বলেন,“ আর বলিস না! দার্জিলিং-এ আমাদের বাড়ির কথা তো বলেছি তোদের। তা সেখানে...।” বলে পুরোনো এক ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করেন রজতাভ। পুরোটা শুনে হাসতে হাসতে চেয়ারে গড়িয়ে পড়ে ঐশী। সুজাতার মুখেও পুরোনো দিনের কথা মনে করে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। বিকেলের অস্তরাগের আলোয় তিনজন মানুষ মেতে ওঠেন পুরোনো স্মৃতিকথায়।
(সমাপ্ত)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এখানে মন্তব্য করুন