অনুসরণকারী

বুধবার, ১১ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ দ্বিতীয় পর্ব


অভীক হোস্টেলের রুমমেটকে জানিয়ে দিল সে আজ রাতে হোস্টেলে ফিরছে না। রুমমেট যেন তার খাবার না বানায়। চারজনে মিলে রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে গেলেন বিধান মার্কেটের দিকে। দিনের শেষে দেখা গেল ঐশীর সাথে সুজাতার ভাব বেশ গাঢ় হয়েছে। রজতাভ অবাক হয়ে দেখলেন একবেলার মধ্যে মেয়েটার পুরো ভোল বদলে গেছে। যে মেয়ে কোনোদিনও নিজের জন্য গয়না কেনে নি। জন্মদিন বা পুজোর সময় তাঁর আবদার রাখতে চেন, কখনো নেকলেস গলায় দিত,সেই মেয়ে ফুটপাথের এক দোকান থেকে একটা ঝুমকো পছন্দ করে কিনল! তাও আবার সুজাতাকে দেখিয়ে! যে মেয়ে বছরে একআধবার চোখে কাজল দেয়, সেই মেয়ে কসমেটিক্সের দোকানে গিয়ে সুজাতাদেবীর পরামর্শে একগাদা কসমেটিক্স কিনল! বিল পেমেন্ট করার সময় তিনি সুজাতাদেবীর কথা শুনতে পাচ্ছিলেন, “মেয়েদের ওরকম শ্রীহীন মুখ করে থাকতে নেই! মাঝে মাঝে অল্পসল্প সাজতে হয়। কাউকে দেখানোর বা কোনো অকেশনের জন্য নয়! নিজের জন্য, মনের খুশির জন্য! বুঝেছ মেয়ে? এমনিতে তোমাকে হাল্কা মেকাপে মানালেও মাঝে মাঝে নিজের জন্য সাজতে ক্ষতি কী? কেউ তো দেখছে না! নিজেকে একবার সাজিয়েই দেখ না, দেখবে নিজেকে নতুনভাবে আবিস্কার করেছ। নিজেকে আবিস্কার করার, সাজানোর আলাদা মজা আছে। মন খারাপ?সকাল থেকে মেজাজ খিঁচড়ে আছে?আয়নার সামনে বসে হাল্কা করে সেজে নাও। দেখবে মনখারাপ উবে গেছে। নিজেকে সাজতে দেখে মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। তোমার বাপি, অভি এমন কী পৃথিবীর কোনো পুরুষ এই আনন্দটা উপলব্ধি করতে পারেনা বলেই বোঝে না আমরা সেজে কী আনন্দ পাই? তাছাড়া এগুলো তোমার দরকার। রোদে, ধুলোয় ঘুরে ঘুরে চেহারার বারোটা বাজিয়েছ। গালে ব্রণ দেখা দিয়েছে,চোখের কোণে কালো দাগ। ঠোট ফেটে গেছে। সত্যি করে বলবে! নিজের স্কিনের যত্ন নাও না তাই না?অভি এগুলো দেখতে পায় না? ওর তো উচিত এসব কিনে দেওয়া।”


অভীক গলা নামিয়ে বলেছিল, “হুম কিনে দিই আর ও ক্যাৎ করে একটা লাথি মেরে দিক।” সুজাতা হেসে বলেছিলেন, “বেশ করে!তোর দম আমার জানা আছে! জানো ঐশী আমার বাড়ি থেকে বাজার বেশী নয় এই মিনিট দুয়েকের পথ। তো একবার বাবুকে পাঠিয়েছি সয়াবিনের বড়ি আনতে। ও কী এনেছিল জানো? এত বড়ো একটা সয়াসসের বোতল!” বলে মুচকি হেসেছিলেন সুজাতাদেবী। ঐশী‌ মুখ ভেটকে বলেছিল, “সাধে বলি? ক্যালাস! পুরো ক্যালাস!”

মার্কেট থেকে কেনাকাটা করে, ফুটপাথের স্টলে স্টিম মোমো খেয়ে রজতাভর বাড়িতে যখন ওরা পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যে গড়িয়ে প্রায় রাত হয়ে গেছে। রাতের খাবার নিয়ে বেশী ঝক্কি পোয়াতে হল না রজতাভকে। ফ্রিজে ম্যারিনেট করা চিকেন ছিল সেটাকেই রান্না করা হল। ঐশী চটপট করে আটা মেখে রুটি তৈরী করে নিল। সুজাতাদেবী সাহায্য করার জন্য রান্নাঘরে যেতে চাইতেই বাবা-মেয়ে রে রে করে উঠল। রজতাভ সুজাতার পথ আগলে বললেন,“আপনি না আমাদের অতিথি? অতিথিকে দিয়ে কেউ কাজ করায়?অতিথি নারায়ণ বলে কথা! পাপ লাগবে তো!”

-“কিন্তু তাই বলে এভাবে বসে থাকাটাও তো দৃষ্টিকটু! খামোখা একজন অচেনা আগন্তুকের মতো হুট করে এসে আপনাদের ঝামেলা বাড়িয়ে দিলাম। আমার জন্য‌ আপনাদের শুধু শুধু হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হচ্ছে এটা দেখার পরেও শুধু বসে থাকবো নাকি?”

-“ হ্যাঁ বসে থাকবেন! আর আপনার কথার উত্তরে বলতে পারি আপনি অচেনা আগন্তুক নন। চেনা লোক!আর ঝামেলার কিছু নেই! আপনি না এলেও আমাদের হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হত। ও নিয়ে ভাববেন না। আমাদের বাপ-বেটির অভ্যেস আছে। ”

-“কিন্তু রজতাভ! এতগুলো লোকের রান্না!”

-“কোথায় এত লোক? মাত্র তো চারজন আমরা!নিজেকে একদিন ছাড় দিন না সুজাতা! রোজই তো সারাদিন স্কুলে কাটিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে‌ বাজার করে বাড়ি ফিরে হাত পুড়িয়ে রান্না করেন। একদিন নাহয় নিজেকে ছুটি দিলেন এই হেঁসেল থেকে! কাল নাহয় ফিরে আবার দাঁড়াবেন আগুনের সামনে। আর সাহায্য করেও লাভ কী? সেই তো কাল আবার আমাদেরকেই হাত পোড়াতে হবে। তার চেয়ে বরং আপনি ঐশীর ঘরে গিয়ে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিন। সারাদিন জার্নির ধকল গেছে একটু জিরিয়ে নিলে ভালো লাগবে। ঐ যে বাদিকের ঘরটা, দরজায় ময়ূরের ছবি আছে। ওটা ঐশীর ঘর। যান ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি ততক্ষণ এদিকটা সামলাচ্ছি। ভয় নেই! আমার রান্না আপনার মতো অতো ভালো না হলেও চালিয়ে নেওয়ার মতো।  তাছাড়া হবু কুটুমের বাড়িতে বেড়াতে‌ এসেছেন একটু সেবাটেবার সুযোগ দিন! কোথায় পায়ের উপর পা তুলে হুকুম করবেন, আরাম করবেন,তা না উনি এলেন সাহায্য করতে! কী শাশুড়ি হবেন আপনি?”

-“কিন্তু বিনা পরিশ্রমে অর্জিত খাবার আমার মুখে রোচে না রজতাভ! নিজে বাছাই করে সবজি, মাছ কিনে নিজের মতো রান্না করে খাবার সুখ কী...!”সুজাতার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রজতাভ বললেন,“সেটা ভালো করেই জানি বলেই হাত পুড়িয়ে রান্না করি! অন্যের হাতের রান্না পছন্দ হয় না বলে কাউকে হেঁসেলে ঢুকতে দিই না। ঐশীকেও এখানে ঢোকার জন্য আমাকে কনভিন্সড করার জন্য পরীক্ষা দিতে হয়েছে!ওসব অনেক বড়ো গল্প। আপাতত যান স্নানটা সেড়ে ফেলুন। আজ ভীষণ গরম পড়েছে। রান্না হলেই ডাকা হবে। ওদিকে বোধহয় চিকেনটা কড়াইয়ের তলায় লেগে গেল!”

-“উফ! আপনার সাথে কথায় পাল্লা দেওয়া অসম্ভব!”

-“ তো জানেনই যখন বাকযুদ্ধে নেমেছেন কেন?শুনুন! যত দেরী করবেন, রান্নায় তত দেরী হবে আর রান্নায় দেরী হলে খেতে দেরী হবে! অগত্যা দেরী না করাই ভালো!যান যান স্নান করে নিন! ওদিকে মাংসটা কড়াইতে‌ লেগে গেল মনে হয়! ঐশীরে! মাংসটা দেখ!” 

বলে রান্নাঘরে ছুটে গেলেন রজতাভ। সুজাতা কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে পরক্ষণে মুচকি হেসে চলে গেলেন ঐশীর ঘরে।

বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের তলায় দাঁড়াতেই একটা তৃপ্তির ঢেউ খেলে গেল সুজাতার আপাদমস্তক জুড়ে। সত্যিই আজ ভীষণ গরম পড়েছে!পাহাড়ে‌ থাকাকালীন এই গরমটা‌ তেমন টের পান না তিনি। সেখানে তিনটে কালই বিরাজ করে শীতকাল, বর্ষাকাল, আর শরৎকালের মতো নাতিশীতোষ্ণ কাল। দিনে হাল্কা সুতির পোশাক পরে কাজ চালালেও রাতে কম্বল লাগে। শাওয়ারের তলায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। শীতল বারিধারা ক্রমশ তাঁর সারাদিনের ধকল, ক্লান্তি ধুয়ে‌ দিতে লাগল।

স্নান সেরে একটা নাইটির উপর সুতির হাউজকোট চাপিয়ে নিলেন সুজাতা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলেন এরমধ্যে ঐশী গোটাঘর গুছিয়ে রেখে বিছানার চাদর পাতছে। বিছানার চাদর পাতার পর মাথার বালিশ গুছিয়ে দিয়ে ঐশী বলল,“আন্টি! বিছানা তৈরী হয়ে গেছে!আপনি রেস্ট নিন। খাবার সময় হলে আমি ডাকবো।”

বিছানায় বসে সুজাতা‌ ঐশীর হাত‌ ধরে বলেন,“আমার ভীষণ লজ্জা করছে জানো? হুট করে তোমার বাবার কথা শুনে রাজি হয়ে বিপদে ফেলে দিলাম তোমাদের! আমার জন্য অসুবিধে হয়ে গেল তোমাদের। তোমরা হেল্পও করতে দিচ্ছ না। আমার ভীষণ গিল্টি ফিল হচ্ছে।” ঐশী বিছানায় বসে বলল,


-“আমাদের কিচ্ছু মনে হচ্ছে না আন্টি! বরং মজা‌ লাগছে এই ভেবে যে অনেকদিন পর বাড়িটা আবার গমগম করছে। কতদিন হল আত্মীয়-স্বজনরা আসে না। বন্ধুবান্ধবরাও এখন যে যার কাজে ব্যস্ত। বাড়িটা ভীষণ ফাঁকা লাগে। মনে হয় এই চারটে দেওয়াল যেন গিলতে আসছে আমাকে। তাই তো সারাদিন বাড়িতে থাকি না আমি। সকালে বেরোই কলেজে। ফেরার পথে ক্যারাটে ক্লাসে ঢুকি। স্টুডেন্টদের ক্যারাটে শেখাই। বিকেলটা কটা টিউশনি পড়িয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে কোনোমতে দুটো রুটি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।‌ সে যাকগে! আজকে কিন্তু আমরা অনেক গল্প করব! অভীকের অনেক কথা তোমাকে জানানোর আছে। আচ্ছা আমি এখন গেলাম। বাপি ওদিকে একা আছে। আপনি রেস্ট নিন। এসিটা চালানো আছে। আলোটা নিভিয়ে দেব?”

সুজাতা মাথা নাড়তেই ঘরের নাইটল্যাম্প জ্বালিয়ে ঝড়ের মতো বেরিয়ে যায় ঐশী। সুজাতা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন অন্ধকারে। তারপর নরম বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে চোখ লেগে আসে তাঁর। সারাদিনের ক্লান্তিতে ক্রমশ ঘুমের দেশে তলিয়ে যেতে যেতে আচমকা তাঁর মনে হতে লাগল কে যেন তাকে খুব কাছ থেকে ডাকছে। গলার স্বরটা তাঁর খুব চেনা। খুব চেনা স্বরে কে যেন ডাকছে তাকে। “সুজাতা! সুজাতা! সুজাতা!”

******** 

-“কাম অন সুজাতা! হানিমুনে বেড়াতে এসে ওভাবে পাড়ে বসে থাকলে চলবে? লোকে কী ভাববে? আমি কি একা স্নান করবো নাকি? এসো না! ইট উইল বি ফান!”

-“না না! আমি এখানেই ঠিক আছি।”

-“ও কাম অন সুজাতা! তোমার কথাতেই হানিমুনে দীঘা বেড়াতে এলাম আর তুমিই কিনা শেষে সমুদ্রে ভয় পাচ্ছ?

-“ভয় পাচ্ছি না আমি।”

-“তাহলে? সমুদ্রে নামছো না কেন?”

-“এমনি ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া কাল সারারাত জেগে জার্নি করে আমি ভীষণ টায়ার্ড তথাগত। আমি বরং কাল নামবো।‌ এই দেখো মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে পড়ল! স্নান করো না তুমি!কে মানা করেছে? তুমি স্নান করলে আমাকেও করতে হবে কোথায় লেখা আছে? তাছাড়া আমরা পাঁচ দিন আছি দীঘাতে! সবে তো এলাম। একটু জিরোতে দাও! আরে কাল আমিও নামবো তো নাকি?”

-“বেশ তবে আমিও কাল নামবো!"

বলে সুজাতার পাশে ভিজে বালিতে বসে পড়ে তথাগত।”

-“দেখো কান্ড ছেলের! আরে আমি কি মানা করেছি নাকি? যাও না স্নান করে এসো। কাল আমিও নামবো তোমার সাথে।”

-“কাল হলে আজ নয় কেন?” বলে সুজাতার দিকে তাকায় তথাগত।

-“বললাম তো কারনটা।‌ মাথাটা ভীষণ ধরেছে। কাল রাতে বাসের জানলার হাওয়াটা সরাসরি মাথায় লাগায় একটু সর্দি সর্দি ভাব‌‌ এসেছে তাই।”

-“সেকি!” বলে সঙ্গে সঙ্গে সুজাতার কপালে গলায় হাত ঠেকায় তথাগত। দেখে সুজাতার গায়ে বেশ জ্বর। উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, “আগে বলো নি কেন? উফ! সু! তুমি না! আগে বললে বেরোতাম না। তেমন হলে প্যারাসিটামল দিতে পারতাম। না না আর এখানে থাকা ঠিক হবে না। সমুদ্রের হাওয়ায় সর্দি বাড়তে পারে। চলো আমরা হোটেলে ফিরে যাই।”

উদ্বিগ্ন তথাগতকে দেখে হেসে ফেলে সুজাতা। তারপর বলে,

-“চিন্তা করার কোনো কারন নেই মশাই! প্যারাসিটামল খেয়েই বেরিয়েছি। তাছাড়া জানোই তো আমার ঠান্ডার ধাত আছে। সর্দিগর্মি সহ্য হয় না।  ও কিছু হবে না।”

-“তুমি চুপ‌‌ করো! তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি! ‘ও কিছু হবে না' বলে পরে ভোগান্তি শুরু হয়। এখন সর্দি হচ্ছে পরে সেটা জমে মাইগ্রেনের ব্যথাটাও ধরবে। চলো আর বসতে হবে না। হোটেলে ফিরে যাই! রাস্তায় মেডিক্যাল শপ পেলে অ্যান্টিবায়োটিকও নিতে হবে। প্রোটেকশনটাও নিতে ভুলে গেছি তাড়াহুড়োয় সেটাও নিতে হবে।”

চারদিকে একবার সন্ত্রস্তভাবে তাকিয়ে তথাগতর হাতে একটা চাপড় মেরে বলে,“অ্যাই! ওভাবে অসভ্যের মতো চিৎকার করছো কেন! আশেপাশের লোক আছে তো নাকি?”

চারদিকে একবার অবজ্ঞার সাথে তাকিয়ে তথাগত বলে, “তাতে কী হয়েছে? বউকে নিয়ে হানিমুনে এসেছি তীর্থ করার জন্য নাকি? নাকি সাইট‌সিন করতে এসেছি?প্রোটেকশন তো লাগবেই!”

-“ইশ! অসভ্য কোথাকার! কেমন চিৎকার করছে দেখ! এই কারনে তোমার সাথে বেড়াতে যাই না।”

-“কী করি বলো তো? জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে জং‌লী হয়ে গেছি! আর জংলীদের খিদে কেমন হয় জানো না? আমাদের পেটে যেমন খিদে, তলপেটেও তেমনই...." বাকিটা বলার আগে দুহাত দিয়ে তথাগতর মুখ চেপে ধরে সুজাতা। কিন্তু বলিষ্ঠ চেহারার তথাগতর সাথে পারে না সে। তথাগত উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় কোলে তুলে নেয় সুজাতাকে। সুজাতা লজ্জায় বলে ওঠে, “ কি করছোটা‌ কী? সবাই দেখছে তো! নামাও!”

তথাগত সুজাতার কোনো কথা না শুনে বলে, “জ্বরের‌ একটা টোটকা কী জানো? হয় জলপট্টি, নাহয় ঠান্ডা জলে স্নান। ” বলে সুজাতার কোনো আপত্তি না শুনে সমুদ্রের জলে নেমে যায়। সুজাতা প্রথমে তথাগতর উপর রাগ করলেও পরে মেতে ওঠে জলক্রীড়ায়।

অনেকক্ষণ পর দুজনে যখন পাড়ে ফিরে এল।‌ সুজাতা সত্যিই থর থর করে কাঁপছে আর হাসছে।‌ তথাগত ওকে কোনোমতে হোটেলে নিয়ে গেল। নিজেদের রুমে ঢুকে চট করে ভেজা পোশাক খুলে তোয়ালে দিয়ে ভালো করে মুছে দিল সুজাতার মাথা, ওর সর্বাঙ্গ। আর মোছার পরেই সুজাতা এলিয়ে পড়লো বিছানায়। তথাগত সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় রাখা কম্বল দিয়ে ঢেকে দিল সুজাতার আপাদমস্তক। তথাগত বুঝতে পারল সুজাতার বারণ সত্ত্বেও ওকে জোর করে সমুদ্রে স্নান করানোটা উচিত হয় নি। কাজটা ভুল হয়েছে বুঝতে পেরে মনে মনে ভীষণ অনুতপ্ত‌ হল সে।

ওষুধের কৌটোটা ড্রেসিং টেবিলের সামনেই রাখা ছিল। সেখান থেকে প্যারাসিটামলের পাতা বের করে ট্যাবলেট নিয়ে বিছানার কাছে এসে সুজাতাকে কোনো মতে তুলে খাইয়ে দিল। ওষুধটা খাওয়াবার সময় তথাগত টের পেল সুজাতার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। তথাগত সঙ্গে সঙ্গে সুজাতার পায়ের পাতা‌, হাতের চেটো ঘষতে লাগলো। সুজাতার জ্বর তাতেও কমছে না দেখে কী করবে ভাবছে এমন সময় তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে চটজলদি নিজের ভিজে পোশাক ছেড়ে বাথরুমে ঢুকে গেল সে। ঠান্ডা জলে স্নান সেরে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে ঢুকে গেল সুজাতার কম্বলের ভেতরে। জড়িয়ে ধরল সুজাতার‌ জ্বরে তপ্ত‌ অচৈতন্য নগ্ন দেহটাকে আষ্টেপৃষ্টে!বরফের মতো ঠান্ডা শরীরে শুষে নিতে লাগল সুজাতার প্রচণ্ডজ্বরের ফলে সৃষ্ট তীব্র লীনতাপ। আর অশ্রুসজল চোখে বলতে লাগল, “আই অ্যাম সরি সু! আর এরকম ভুল হবে না! আর‌ আমি তোমার অবাধ্য হবো না।‌ তুমি শুনতে পারছ? সু? সুজাতা! সুজাতা?”

******

-“সুজাতা?” 

ডাকটা শুনে ঘুম ভাঙলো সুজাতার। চোখ মেলে দেখলেন রজতাভ মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘুমের ঘোরে কোথায় আছেন প্রথমে বুঝতে না পারলেও কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হতেই উঠে বসলেন তিনি। 

-“ সরি! আসলে একটু চোখ লেগে গিয়েছিল।”

-“সেকারনেই আপনাকে ডিস্টার্ব করি নি। খাবার তৈরী হবার পর ঐশীকে পাঠিয়েছিলাম আপনাকে ডেকে পাঠাতে। ঐশী বলল আপনি ঘুমোচ্ছেন তাই ভাবলাম আপনাকে বিরক্ত করা আর ঠিক হবে না। ওদের খাইয়ে দিয়ে আপনাকে ডাকতে এলাম।”

-“সেকি! কটা বাজে? এবাবা! এগারোটা বেজে গেছে! ইশ এতক্ষণ ধরে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছি একবার ডাকবেন তো! ইশ! ছিঃ! ছিঃ! লোকের বাড়িতে এসে এভাবে হ্যারাস করলাম!আপনাদের খাওয়ার দেরি হয়ে গেল!”

-“আবার আপনি ভুল করছেন সুজাতা! এটা লোকের নয় আপনার কুটুমবাড়ি। দ্বিতীয়ত হ্যারাসমেন্টের কিছু হয় নি। কারন ঐশীর ফিরতে ফিরতে প্রায়ই রাত হয় আর এসময়ই আমরা খেতে বসি। কাজেই বেশী দেরী হয় নি। আর আপনার পরের প্রশ্নটার উত্তর আগেই দিয়েছি! ওরা খেয়ে নিয়ে ড্রইংরুমে আড্ডা মারছে। বাকি রইলাম আমি আর আপনি। চোখে মুখে জল দিয়ে চটপট চলে আসুন। আমি খাবার বেড়ে রাখছি।” বলে বেড়িয়ে গেলেন রজতাভ। 

কিছুক্ষণ পরে দুজনে মিলে রজতাভর বানানো রুটি আর চিকেনের কারি খেয়ে নিয়ে জমিয়ে বসলেন বৈঠকখানায়। ধীরে ধীরে আড্ডা জমে উঠল চারজনের মধ্যে। নানা বিষয় নিয়ে চলতে লাগল আড্ডা। রাজনীতি থেকে বিনোদন, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে আবহাওয়া। ক্রমশ রাত বাড়তেই ঐশী আর অভীক যে যার ঘরে শুতে চলে গেল। বৈঠকখানায় বসে রইলেন রজতাভ আর সুজাতা। কথায় কথায় প্রসঙ্গ উঠল তথাগত, ঊর্মির। সেই কথা প্রসঙ্গেই রজতাভ বললেন, “জানেন? ঊর্মি সব সময় বলতো আমার মতো মানুষ নাকি দুটো নেই। আমি যেমন মানুষকে ম্যানুপুলেট করতে পারি তেমন নাকি তাকে দিয়ে কাজও করাতে পারি। আমি মানতে চাইতাম না।”

-“ভুল তো কিছু বলতেন না! আপনি সত্যিই তা করতে পারেন। এইতো আমার এখানে আসার পরিকল্পনা ছিল না। আপনি নিয়ে এলেন বাধ্য করে। শুধু কি তাই? এই যে আপনাকে হেল্প করতে চাইলাম আপনি কি করলেন? আমাকে কথার প্যাঁচে ফেলে বিশ্রাম নিতে পাঠিয়ে দিলেন। তবে আপনার দোষ নেই! তথাগতও তাই বলত আমায়! ‘সুজাতা! তোমাকে বোকা বানানো সহজ নয়। তবে ম্যানুপুলেট করা সম্ভব!যে কেউ করতে পারে! তাই সাবধান থেকো।’ অবশ্য‌ ওর তো আর জানা ছিল না যে ন্যাড়া একবারই গাছ তলায় যায়। আমিও একবারই ঠকেছিলাম! তারপর আর কেউ পারেনি। ”

-“যাহ আপনাকে কে ঠকাতে পারে? আপনার মতো একজন বিচক্ষণ মহিলাকে ঠকিয়ে কার কী লাভ?”

-“ অথচ‌ ঠকেছিলাম জানেন? তার উপর বিশ্বাস করে ভীষণ ঠকে গিয়েছিলাম। সে আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল বাঁচার,জীবনকে নতুন করে খুঁজে পাবার দিশা দেখিয়েছিল। কিন্তু যখন বুঝেছিলাম এই সব স্বপ্ন মিথ্যে। সে শুধু আশ্রয়ের খোঁজে আমার কাছে এসেছে। নিজের ক্ষত নিরাময় করতে এসেছে বিশ্বাস করুন ভালোবাসার উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। যাবার সময় সে কি বলে গিয়েছিল জানেন? ‘ভালোবাসা কখনও সত্যি হয় না। সকলকে ভালো রেখে চলার মিথ্যে মূকাভিনয় ছাড়া ভালোবাসা আর কিছুই নয়।’ তখন বয়স কম ছিল এসবের মানে বুঝিনি আজ বুঝি। তবে একটাই আক্ষেপ থেকে গেল জানেন? যে মানুষটা আমার কাছে সুখের খোঁজে এসেছিল। সে মানুষটা নিজে সুখ পেল কিনা জানা যায় নি। অথচ আমি সুখ পেয়েছি প্রচুর!” বলে মুচকি হাসেন সুজাতা ।

-“আচ্ছা যদি কোনোদিন এমন হয় যে মানুষটা একদিন আপনার কাছে এল।  নিজের ভুলের ক্ষমা চাইতে। তাকে ক্ষমা করতে পারবেন?”

-“ এতবছর পর সে যদি সত্যিই অনুতপ্ত হয় তাহলে ক্ষমা করতে পারি। কারন সে আমাকে ছেড়ে গেলেও ফেরত দিয়ে গিয়েছিল আমার সংসারটাকে। যে মানুষ নিজের বিনিময় সংসার ফিরিয়ে দেয়,ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয় তাকে ক্ষমা করাই যায়। কিন্তু সে ক্ষমাটা যে অন্তর থেকে হবে না রজতাভ! কারন সে নিজের সাথে আমাকেও পাঁকে নামিয়েছিল।”

-সুজাতা...! মানে আমি... বলতে চাইছিলাম যে...!”

সুজাতার মুখ পলকে গম্ভীর হয়ে যায়। সোফায় সোজা হয়ে বসে‌ন তিনি। 

-“ প্লিজ রজতাভ। দয়া করে আর পুরোনো অতীতটাকে মনে করাবেন না। অনেক কষ্টে অতীত থেকে বেড়িয়ে এসেছি আমি। সেই মুহূর্তগুলো প্রথমে সুখের হলেও পরে তার বিষ আমাকে সারাজীবন অন্তর্দহনে জ্বালিয়েছে। প্রতি রাতে সেই আগুনে পুড়ে কষ্ট পেয়েছি। প্লিজ সেই আগুনে উসকে দেবেন না। অতীতটাকে মনে করে কষ্ট পেয়ে আর লাভ নেই। আর আমি পেতেও চাই না। কিছু জিনিস একান্ত ব্যক্তিগত থাকাই ভালো। তারচেয়ে বরং বর্তমানে আমরা কেমন আছি সেটা নিয়ে ভাবাটাই বড়ো কথা। আমি তো বেশ সুখে আছি। ছেলের বিয়ে বলে কথা! ”

-“কিন্তু...!”

-“অনেক রাত‌ হল রজতাভ। আমার ঘুম পাচ্ছে। কাল সকাল সকাল ফিরতে হবে আমায়। আপনিও নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।” বলে উঠে পড়েন সুজাতা। পায়ে পায়ে এগিয়ে ঐশীর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। রজতাভ কিছুক্ষণ সুজাতার যাওয়ার পথে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিয়ে বসেন।

(চলবে...)

রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০২১

অস্তরাগ প্রথম পর্ব


রেস্তরাঁর ছাদ থেকে অস্তপ্রায় সুর্যর দিকে তাকিয়ে মুখে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন রজতাভ।  “কিরে? আর কতক্ষণ?” বলে ঐশ্বর্যর দিকে তাকালেন রজতাভ। “এই তো বাপি আর পাঁচ মিনিট। অভি প্রায় এসে পড়লো বলে। আসলে আগেই আসতো। গলিটা একটুর জন্য মিস করে গেছে।” বলে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ঐশ্বর্য। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিমাগে চুমুক দিলেন রজতাভ।

এই নিয়ে পাঁচ দফায় কফি এসেছে। ঐশ্বর্যর কাপ খালি না হলেও রজতাভ আয়েশ করে কফি খেয়ে বসে আছেন। আজকের দিনটা ঐশ্বর্য ওরফে ঐশীর কাছে খুব স্পেশাল। আজ অভীকের সাথে ঐশী ওর বাপির আলাপ করিয়ে দেবে। অভীক ঐশীরই কলেজের সিনিয়ার। বর্তমানে কলেজ পাশ করে একটা স্থানীয় খবরের কাগজে চাকরি করছে তবে নেশায় একজন ফ্রিল্যান্স ফোটোগ্রাফার। ঐশীর সাথে নাকি ওর আলাপও নাকি এই ফোটো তুলতে গিয়ে। ঐশী ওর বাপিকে কালরাতে সবটা বলেছে। সবটা শুনে রজতাভ প্রথমে গম্ভীর হয়ে রাগ করার অভিনয় করেছিলেন পরে মেয়ের কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে ফিক করে হেসে আজ বিকেলে অভীককে ডাকতে বলেছেন।  আসলে রজতাভ ঐশীর কান্না সহ্য করতে পারেন না ঠিকই তবে নিজের ডাকাবুকো মেয়েকে মাঝে মাঝে বিপর্যস্ত হতে দেখে মজা লাগে তাঁর। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারেন না। ঐশী কাঁদো কাঁদো গলায়, “বাপি!” বলে ডাকলেই তাঁর সব স্থৈর্য্য শেষ হয়ে যায়।  তখন তিনি বুদ্ধি দিয়ে মেয়েকে উদ্ধার হবার পথ বাতলে দেন। 

আসলে উর্মি মারা যাবার পর থেকে ঐশীকে প্রায় নিজের মতো করে কোলে পিঠে মানুষ করেছেন রজতাভ। ফলে তার মেয়ে হয়েছে তাঁর মতোই ডাকাবুকো, হুল্লোড়ে আর খিল্লিবাজ। বয়কাট চুলে, পোশাকে কেউ সহজে ধরতে পারে না যে ঐশী আসলে মেয়ে। ক্রেডিটটা অবশ্য রজতাভর। তিনি নিজের গরজে মেয়েকে সাবলম্বী করে তুলেছেন। ক্যারাটে ক্লাসে, সাঁতারে, নাচে নিয়ে গেছেন। রীতিমতো ট্রেনার রেখে মেয়েকে তলোয়ার, পিস্তল চালানো শিখিয়েছেন। নিজে থেকে মেয়েকে বাইক থেকে কার চালানো দুটোই চালানো শিখিয়েছেন। আগেকারদিনে মেয়েদের চৌষট্টি কলা শিখতে হতো। সেই নিয়মে নিজের মেয়েকে একটা ছেলের মতোই ট্রিট করেছেন। একবার মনে আছে রজতাভর, সেবার ঐশীর ক্লাস নাইন। একদিন বিকেলে স্কুল থেকে বুকের দিকে ব্যাগ দিয়ে চাপা দিয়ে থমথমে মুখে বাড়ি ফিরেছিলো মেয়ে। বাড়িতে ফিরে ব্যাগটা নামাতে রজতাভ দেখতে পান মেয়ের জামার বুকের দিকটা কেমনভাবে যেন ছিঁড়ে গেছে। মুখে একাধিক আঘাতের চিহ্ন। যেন কারো সাথে মারপিট করে ফিরেছে। ফার্স্ট এইড করে মেয়েকে ধাতস্থ হবার সময় দিয়েছিলেন রজতাভ। পরে রাতে খাবার পর টিভি দেখতে দেখতে ঐশী নিজেই ধরা গলায় বলেছিলো সবটা। কয়েকদিন ধরেই ওদের স্কুলের কয়েকটা ছেলে স্কুল ছুটি হবার পর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওদের টন্ট করতো। ঐশীও বাদ ছিল না। কিন্তু সে কিছু না বলে চুপচাপ ইগনোর করে চলে যেত।‌ আজকে ছেলেগুলোর বাঁদড়ামি সহ্য না করতে পেরে অবশেষে সে রুখে দাঁড়ায়। প্রচণ্ড রাগে ছেলেগুলোর দিকে তেড়ে যেতেই একপ্রস্থ ঝামেলা বাঁধে। ওরা ভেবেছিল বাচ্চা মেয়ে, হাত চেপে ধরলে বা একটু ভয় দেখালে শান্ত হয়ে যাবে। কিন্তু ওদের দলের দুজন ধরাশায়ী হবার পর ওদের ভুল ভাঙে। তারপর ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়ের উপর। দাঁতে দাঁত চেপে ঐশী ওদের দলের বাকিদের জখম করে হারিয়ে দিলেও হাজার চেষ্টা করেও কিছুতেই ওদের দলের একটা ছেলের সাথে লড়ে উঠতে পারে নি। আর এই ছেলেটার ইন্ধনেই বাকি ছেলেরা মেয়েদের টন্ট করত। এই ছেলেটাই ছিল আসল দোষী। ছেলেটাকে সে প্রায় বাগে এনে ফেলেছিল কিন্তু মোক্ষম সময় ছেলেটার তার শার্টের বুকের দিকের কাপড় কীভাবে যেন ধরে ছিঁড়ে ফেলে। ফলে নিজের পোশাকের দিকে মনোযোগ চলে যায় তার। আর সেই সুযোগে ছেলেটা ওকে কষে একটা ঘুষি মেরে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিয়ে বলে মেয়ে হয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করতে। এরপর যদি সে বেশি কিছু করতে যায় আজ তো শুধু কাপড় ছিঁড়েছে, এরপর ওকে ওরা ন্যাংটো করে পাড়ায় ছেড়ে দেবে। 


সবটা শুনে চোয়াল শক্ত হয়েছিলো রজতাভর। অন্য কেউ সাহসী হলে পুলিশ ডাকতেন। নাহলে ঐশীকেই লড়তে যাবার জন্য দোষারোপ করতেন। এমন কি ওনার মতো কেউ এক্স মিলিটারিম্যান হলে নিজে গিয়ে ছেলেগুলোকে দু ঘা দিয়ে আসতেন। কিন্তু রজতাভ অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি চুপচাপ মেয়েকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে অ্যানিমাল প্ল্যানেট চালিয়ে দেখছিলেন। কথাগুলো বলতে বলতে ঐশীর গাল বেয়ে অশ্রুধারা বেরিয়ে আসলেও রজতাভ টের পাচ্ছিলেন মেয়ের কান্নাটা ছেলেগুলোর কথার জন্য নয়। নিজের হেরে যাবার জন্য। ঐশীর নিজেকে সামলাবার কিছু সময় দিয়ে টিভির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ধীর অথচ দৃঢ় গলায় বলেছিলেন, “সবটা বুঝলাম। কিন্তু আমি বলব এখানে তোরও ভুল কম ছিল না। ”

মেয়ে বজ্রাহতের মতো তাকিয়েছিল রজতাভর দিকে। টিভিটা মিউট করে সোফায় হেলান দিয়ে রজতাভ বলেছিলেন, “লড়াইয়ের প্রধান নিয়মটাই তুই ফলো করিস নি। লড়াই করার সময় শত্রুর উপর মনোযোগ রাখাটাই আসল নিয়ম। শত্রুর প্রতিটা মুভমেন্ট লক্ষ্য করে ওর আক্রমণ করার পদ্ধতি অনুধাবন করে নিজেকে বাঁচিয়ে লড়ে যেতে হয়। লড়াই করার সময় শত্রু বাদে আর কোনো বাহ্যিক বস্তুর উপর মনোযোগ দিতে নেই! ওটা লড়াইতে হেরে যাবার প্রথম পদক্ষেপ। আর তুই সেটাই করেছিস। তোর হারটা কখন হল জানিস? যখন ছেলেটা তোর শার্ট ছিঁড়ে দিলো আর তুই নিজের আব্রু ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়লি তখন। তার আগে তোর মনোযোগ সম্পুর্ণ ওদের উপর ছিলো। যে কারনে ওরা তোর বিরুদ্ধে বেশীক্ষণ দাঁড়াতে পারে নি। এমন কি যে ছেলেটা তোর শার্ট ছিঁড়ে দিল সেও প্রায় হেরেই যাচ্ছিল। তবে মানতে হবে ছোকরার এলেম আছে। এ তেমন লাথখোর এলেবেলে ছোকরা নয়। একজন মেল ইগোতে ভরা একটা ছেলে। যার কাছে মেয়েরা অবলা,শক্তিহীনা, ভোগ্যা। এতদিন সেই চিন্তাধারার বশেই চলছিল সে। বাকি ছেলেদের মধ্যে সেই চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিয়ে তোদের টন্ট করছিল। ভেবেছিল তোরা মুখ বুঁজে সহ্য করে যাবি। তোদের মধ্যেও যে একজন রুখে দাঁড়াতে পারে সেটা ওরা ভাবতে পারে নি। কিন্তু তুই যখন রুখে দাঁড়ালি, একে একে ওদের ধরাশায়ী করলি তখন তুই কিন্তু একদিক থেকে ওদের চিন্তাধারায় আঘাতটা করলি। আর এটাই ওদের কাছে বড়ো ধাক্কা হয়ে গেল। বিশেষ করে ওই ছেলেটার কাছে। একজন পুরুষ হয়ে একজন নারী তাও আবার একটা বাচ্চা মেয়ের হাতে হেরে যাচ্ছে, তাকে পরাজিত করতে পারছে না, বশে আনতে পারছে না, বরং বেদম মার খেতে হচ্ছে এটা হজম হচ্ছিল না ছেলেটার। কিন্তু এই জিনিসটাই বাস্তবে পরিনত হচ্ছে দেখে ছেলেটার মেল ইগো ক্রমশ হার্ট হচ্ছিল। সেই কারনে ও মরিয়া হয়ে এমন একটা স্পর্শকাতর আঘাত করে বসল যেটা একটা নারীর কাছে যেমন অবমাননাকর ঠিক তেমনই একজন লড়াকু নারীকে পরাজিত করার, মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করার ফাঁদও বটে। সহজাত সংস্কারের বশে শতকরা ৯৮% লড়াকু মেয়ে এই ফাঁদে পা দেয়। আর তুইও ঠিক সেটাই করলি। ওর ফাঁদে পা দিয়ে ওকে সুযোগ দিয়ে বসলি। যেই মুহূর্তে ছেলেটা তোর সম্মানে হাত দিলো সেই মুহূর্তে তোর মনোযোগ ছেলেটার থেকে সরে গিয়ে তোর শার্টের উপর গিয়ে পড়লো আর তুই সহজে হেরে গেলি।  যদি সেই মুহূর্তে তুই নিজের দিকে নজর না দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতিস তাহলে ছেলেটা সহজে হেরে যেত। আর হেরে যেত ওর পৌরুষের মিথ্যে অহংকারটা। তখন তোকে নগ্ন করার হুমকি দেওয়া তো দুরস্থ, ওর সাহস হতো না তোর চোখে চোখ রেখে কথা বলার। আর এটা আমার থেকে বেশি করে তুই জানিস। কি ঠিক তো?”

মেয়ে তন্ময় হয়ে তাঁর কথা শুনতে শুনতে মাথা নেড়ে কোলে মাথা রাখতেই রজতাভ হেসে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “ একটা কথা সবসময় মনে রাখিস মা। এই যে বাইরের জগতটা দেখছিস এটার সাথে এই অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটের জঙ্গলের জগতটার বেশী পার্থক্য নেই। এখানে দুটো দল আছে একদল ‘Preachers’ আর অপরদল হলো ‘Survivers’, মানে শিকারী এবং শিকার থেকে বেঁচে ফেরা প্রাণী। এই পৃথিবীতে বাঁচতে হলে তোকে এই দুটো দলের মধ্যে একটা হতেই হবে। হয় তোকে ‘Surviver’ হয়ে আজীবন এই শিকারীদের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে হবে, survive করতে হবে। নাহলে নিজেই শিকারী হয়ে এই শিকারীদের পাল্টা শিকার করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজে মেয়েরা দ্বিতীয় পথটা বেছে নিয়ে Surviver হতে গিয়ে এই শিকারীদের সহজ শিকারে পরিণত হয়। আর এটা বার বার হয় বলে ওরা ভেবে নেয় স্বভাবে তোরা নরমসরম বলেই তোরা ভীষণ দুর্বল। কিন্তু বাস্তবটা ভীষণ উল্টো। নারীদেহে কোমলতা, করুণা একটা গুণ, একটা Instinct, যেটা তোদের সহজাত। এই গুনগুলো তোরা সাথে নিয়ে জন্মাস। নারী মানে কোমল মনের হতে পারে কিন্তু সে অবলা নয়। সে যেমন আর্তের পাশে দাঁড়াতে পারে ঠিক তেমনই চাইলে সে শত্রুর টুটি টিপে ধরতে পারে। আর এইসব শিকারীরা যখন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয় তখন স্বাভাবিকভাবে ওদের সব নিয়ম, হিসেবনিকেশ পালটে যায়। এতদিন ধরে বিশ্বাস করে আসা মতবাদ এলোমেলো হয়ে যায়। তখন নিজের, সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে যেনতেন প্রকারেণ ভাবে এই হিসেবের বাইরে থাকা মেয়েদের দমানোর চেষ্টা করে। কখনো বাহুবলে, কখনো এই নারীদের সম্মানে আঘাত করে তাকে পরাজিত করার চেষ্টা করে। হ্যা সমাজ এই মেয়েদের একেবারেই  প্রাধান্য দেয় না তা নয়। সমাজ এদের প্রাধান্য তখনই দেয় যখন এই মেয়েরা বহির্বিশ্বে সম্মান পায়, স্বীকৃতি পায়। ততক্ষণ পর্যন্ত প্রাণপণে লড়ে যেতে হয়। তোকেও এরকম প্রাণপণে লড়ে যেতে হবে। আর রইলো পোশাক, তাহলে শোন যুদ্ধে পোশাক, আভূষণ, বা হাতের অস্ত্র Matter করে না। Matter করে যুদ্ধে অক্ষন্ড মনোযোগ, অন্তিমশ্বাস পর্যন্ত হার না মানা মনোভাব, আর শত্রুকে পরাজিত করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ঠান্ডা মস্তিক। যুদ্ধে এটা বড়ো কথা নয় কে প্রথম আঘাত করল, বরং যুদ্ধশেষে কে ধরাশায়ী হচ্ছে এটাই শেষ কথা। আর নারীদেহ হল নিজেই একটা চলন্ত অস্ত্র। ঠিক মতো এই অস্ত্রকে ব্যবহার করতে পারলে ভীষণ কড়া প্রতিপক্ষকেও পরাস্ত করা সম্ভব। তুই এখন ছোটো এসব বুঝবি না তাই শর্টে বলছি। জঙ্গলে যখন সুর্যোদয় হয় তখন একটা হরিণ ভাবে আজ যদি আমি প্রাণপণে না দৌড়োই তাহলে বিকেলের সুর্যাস্ত দেখার জন্য বেঁচে থাকবো না। আর একটা বাঘ ভাবে আজ যদি আমি হরিণের চেয়ে জোরে না দৌড়োই তাহলে না খেতে পেয়ে মারা পড়বো। মানে তুই শিকারী হোস বা শিকার দৌড়তে তোকে হবে। এবার তুই শিকারী হবি না শিকার সেটা তোর উপর নির্ভর করছে। কিন্তু মনে রাখবি শিকারের বেঁচে থাকাটা তার ভাগ্যের উপর নির্ভর করে। অনেক সময় অনেক চালাক শিকারও শিকারীর তীব্র অধ্যাবসায়ের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। কারন শিকারী বাঘ যখন শিকার করে তখন তার মনোযোগ সম্পুর্ণ ভাবে তার শিকারের উপর থাকে আর কোনোকিছুর উপর নয়। এমন কি তার নিজের উপরও নয়। এরপরও যখন শিকার ফস্কে যায় তখন সে আক্ষেপে গর্জন করে না। বরং সুযোগের প্রতিক্ষা করে। তেমনই আজকের ব্যর্থতায় যে নিজের উপর রাগটা জমেছে সেই রাগটাকে পুষে রাখতে শেখ। তারপর যখন শিকারকে হাতে পাবি তখন নিজের সমস্ত মনোযোগ তার উপরই দে। একমাত্র লক্ষ্য রাখ ওকে পরাজিত করার দিকে। দেখবি পরেরবার জয় তোরই হবে।”  

মেয়ে বাবার কোলে মাথা রেখে পুরো কথাটাই শুনেছিল। তারপর একসময় উঠে চলে গিয়েছিলো নিজের ঘরে। এক সপ্তাহ পরে আবার মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় বাড়িতে ফিরতে দেখলেও ফার্স্টএইড করার সময় মেয়ের ঠোঁটে বিজয়ের হাসিটা দেখে সবটা অনুমান করে নিতে কষ্ট হয় নি রজতাভর। তিনি বুঝেছিলেন এবার তাঁর মেয়ে নিজের আত্মরক্ষা করতে সক্ষম। আর তাঁর মেয়েকে আগলে রাখার প্রয়োজন হবে না। কিছুক্ষণ পরে ছেলেগুলোর মা, বাবা এসে ঝামেলা করতে এলে তিনি নিজে তাদের সাথে কথা বলতে বসেছিলেন। জানিয়েছিলেন পুরো ঘটনাটা। সবটা শোনার পর সবাই না হলেও দুজন ছেলের মা, বাবা ক্ষমা চেয়েছিলেন তাঁর কাছে। বাকিরা সমানে তর্ক করে চলেছিলেন ওনার সাথে। মেয়েকে মানুষ করতে তিনি ব্যর্থ এই কথাটাও ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিতে কসুর করছিলেন না তারা। অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি বলেছিলেন, “দেখুন! মেয়ে আমার, মেয়েকে মানুষ করার দায়িত্বও আমার। আমি কীভাবে আমার মেয়েকে মানুষ করব সেটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। কাজেই এই বিষয়টা আমার উপরই ছেড়ে দিন। আপাতত একটা কথাই বলব আমি।‌ আপনারা বরং আপনাদের ছেলেদের প্রকৃত পুরুষমানুষ হতে শেখান। এই বয়সটা পড়াশুনো করার সময়। প্রেম করার বা রাস্তাঘাটে মেয়েদের টিটকিরি মারার নয়। প্রেম করার জন্য ওদের গোটা জীবন পড়ে আছে। আর আপনাদের ছেলেরা ক্রিকেট খেলতে গিয়ে‌ মার খায় নি। ইভটিজিং করতে গিয়ে মার খেয়েছে।‌ আজ আমার মেয়ে মেরেছে। কালও যদি এরকম করে তাহলে পাবলিকের কাছেও হাটুরে মার খেতে পারে ওরা। তখন কী সবার বাড়িতেও এরকম সদলবলে চড়াও হবেন? আশা করি নিশ্চয়ই তা করবেন না।‌ আপনাদের ছেলেরা বয়সে ছোটো বলে আমি পুলিশ ডাকিনি। নাহলে ওরা যেটা করেছে তারজন্য অন্তত একটা দিন হাজতবাস ওদের দরকার। কিন্তু আমি চাই না ওদের জীবনে, কেরিয়ারে কোনো দাগ পড়ুক। ওরা ক্রিমিনালে পরিণত হোক। আমাকে সন্তান শিক্ষার পাঠ না দিয়ে বরং আপনাদের ছেলেদের কীভাবে একটা মেয়েকে সম্মান প্রদর্শন করতে হয় সেটা শেখান। প্রকৃত পুরুষের পরিচয় পুরুষাকারে নয় শিরদাঁড়ায় এটা শেখান, তাহলে দেখবেন ভবিষ্যতে পুরুষ হয়ে একজন নারীর কাছে মার খেতে হচ্ছে না তাদের। আর আপনাদেরও এই সামান্য বিষয় নিয়ে কারো বাড়িতে উঠে পড়ে ঝগড়া করতে যেতে হচ্ছে না। একবার ভেবে দেখুন তো এই ব্লকে, আপনাদের পাড়ায়, স্কুলে সকলে যদি জেনে যায় আপনাদের ছেলেরা ওদের চেয়ে বয়সে ছোটো বাচ্চা মেয়েদের টিটকিরি মারতে গিয়ে, ইভটিজিং করতে গিয়ে একটা মেয়ের কাছে বেধড়ক মার খেয়ে গেছে। ব্যাপারটা কিন্তু তেমন শ্রুতিমধুর হবে না বরং এতে আপনাদেরই অসম্মানটা বাড়বে। কাজেই এই বিষয়ে বেশি জলঘোলা না করাই ভালো। আশা করি বুঝতে পেরেছেন। ও ভালো কথা আপনারা প্রথমবার আমার বাড়িতে এসেছেন চা না খাইয়ে কিন্তু আপনাদের ছাড়ছি না। বসুন! সন্ধ্যাদি পাঁচ কাপ চা হবে?”  

ঘটনাটা ঘটার পরে ক'দিন তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে ফলো করেছিলেন মেয়েকে যাতে কোনো অঘটন না ঘটে।কিন্তু অঘটন ঘটার মতো কিছুই ঘটে নি। মেয়ে স্কুল থেকে ফেরার‌ পথে নিজে এগিয়ে গেছিল ছেলেগুলোর কাছে।‌ আগেরদিন মার খাবার পর স্বাভাবিকভাবেই ছেলেগুলো মেয়েকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। ওদের মধ্যে একজন বড়ো করে ছেলে মাথা নত করে ক্ষমা চেয়েছিল। মেয়ে অবশ্য আগের দিনের কোনো ঘটনা মনে রাখে নি। বরং সে নিজে এগিয়ে গিয়ে ছেলেগুলোর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো।ছেলেগুলো প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও পরে বন্ধুত্বের প্রস্তাবটা গ্রহণ করতে দেরী করেনি। সেই বন্ধুত্ব আজও টিকে আছে। 

মাঝে মাঝে তাঁর অবাক লাগে এই কি সেই ঐশী? যে ছোটোবেলায় তাঁর বুকের উপর কার্টুন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তো। সেই ঐশী , যার পরীক্ষার আগের দিন অহেতুক টেনশন করতেন তিনি। সেই ঐশী যে রাগ হলে নিজের ছোটো ছোটো হাত দিয়ে তার বাপিকে মারতো। সত্যি সময় বড়ো তাড়াতাড়ি বয়ে যায়। সেদিনের সেই ছোটো ঐশী আজ কলেজে পড়াশুনো শেষ করার দোরগোড়ায়। এরপর সে নিজেই ঠিক করবে তার ভবিষ্যতের প্ল্যান। তারপর একদিন বিয়ে করে চলে যাবে পরের ঘরে। তবে সেসব সুদূর ভবিষ্যতের কথা, আপাতত তিনি এখানে এসেছেন অভীক ছেলেটিকে একবার বাজিয়ে দেখতে। তিনি দেখতে চান কোন মন্ত্রবলে সে তাঁর ডাকাবুকো কন্যেকে জয় করলো। 

প্রায় আধঘন্টা হয়ে গেলো রজতাভরা এসেছেন। অথচ অভীকের পাত্তা নেই। ঐশীর মুখও প্রায় কাঁচুমাচু হয়ে গেছে। সে ক্রমাগত ফোন করে যাচ্ছে অভীককে। ভেতর ভেতরে ক্রমশ বিরক্ত হলেও নিজেকে সামলে তিনি বললেন, “কিরে আর কতক্ষণ? সেই বিকেল পাঁচটা থেকে বসে আছি তা তোর ঐ অভীকবাবাজি কোথায়? এই বললি গলি মিস করেছে। তা ঠিকঠাক ঠিকানা দিয়েছিলি তো?”

রজতাভর কথায় ঐশী কিছু বলতে যাবে এমন সময় রজতাভর পেছনে যেন কাকে দেখে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাত নেড়ে ইশারায় ওদের টেবিলের দিকে আসতে বলে। রজতাভ খেয়াল করেন একটু আগেও যে মেয়ের মুখ প্রায় কালো হয়ে এসেছিল হঠাৎ তার পিছনে কাকে দেখে আবার উজ্জ্বল হয়ে গেছে। রজতাভর একবার ইচ্ছে করল যে ছেলেটা ওদের দুজনকে এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছে সেই ছেলের মুখ একবার দর্শন করতে। কিন্তু পরক্ষণে নিজের কৌতুহল দমন করে কফির ষষ্ঠতম কাপে চুমুক দেন তিনি। কিছুক্ষণ পরেই একটা রোগামতো ভীষণ মিষ্টি দেখতে ছেলে ওদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতেই শুরু হয় ঐশীর মৃদুস্বরে বকাবকি। “তোর কি কোনোদিনও আক্কেল জ্ঞান হবে না? এতক্ষণ লাগে অফিস থেকে এখানে আসতে?” ছেলেটা কাঁচুমাচু মুখে কিছু বলার আগেই ঐশী ধমকায়, “একদম কোনো এক্সকিউজ দিবি না! গতবারের ডেটেও তুই এরকমই অজুহাত দিয়েছিলি!কী ভেবেছিস? চাকরি করিস বলে সাপের পাঁচ পা দেখে ফেলেছিস?” 

ব্যাপারটা ক্রমশ বিপজ্জনক দিকে এগোচ্ছে দেখে রজতাভ চটপট কফির কাপে চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলে রেখে একটু গলা খাকড়ে বলেন, “হয়েছে! হয়েছে! এবার থাম দুজনে! এটা পাবলিক প্লেস! ঝগড়া করার জন্য আরো অনেক জায়গা আছে। ছেলেটা এতক্ষণ পর এসেছে কোথায় ওকে বসতে বলবি তা না ঝগড়া করছে। বোস দুজনে!"

কথায় কাজ হয়। দুজনে চেয়ারে বসে। রজতাভ কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলেন, “ওয়েল! তুমিই তাহলে অভীক?" ছেলেটা মাথা নাড়ে। রজতাভ এবার গম্ভীর গলায় বলেন, “দেখো ছেলে যেহেতু আমি আর্মিতে ছিলাম সেকারনে টাইম মেন্টেন করতে পছন্দ করি। সময়ের অপচয় করা, পাংচুয়াল না হওয়া আমার পছন্দ হয় না। ঐশ্বর্যও আমার মতোই পাংচুয়ালিটি মেন্টেন করতে পছন্দ করে। কালরাত থেকে এখানে আসা পর্যন্ত ওর মুখে তোমার ব্যাপারে যতটুকু শুনেছি তাতে বুঝেছি তুমি এমনিতে পাংচুয়াল হলেও মাঝে মাঝে দেরী করো। এটা কিন্তু ভালো কথা নয়। ইউ শুড বি মোর কনসার্নড অ্যাবাউট দিস! তবে যেহেতু এটা আমাদের প্রথম দেখা তাই তোমাকে আমি অ্যালাউ করছি। তাছাড়া আমার মনে হয়েছে দেরী করার যথেষ্ট কারন তোমার কাছে আছে। আর আমার মনে হয় তোমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা সুযোগ দেওয়া যেতে‌ পারে। সো টেল আস অভীক! কী এমন কারন ছিল যে তোমার প্রায় আধঘন্টা লেগে গেল?”

ঐশী ফুঁসে উঠল, “একদম ওর কথা বিশ্বাস করবে না বাপি! প্রতিবার একই এক্সকিউজ দেয়। জানো গতবার কী বলেছিল?” হাতের ইশারায় মেয়েকে থামিয়ে রজতাভ বলেন, “আহ একটু চুপ কর! ওকে বলতে দে! হ্যা অভীক বলো।”

অভীক এতক্ষণ মাথা নীচু করে ছিল। রজতাভর কথায় মাথা তুলে বলে, “আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি স্যার!”

-“আঙ্কল! ইউ ক্যান কল মি আঙ্কল।”

-“‌ ওকে। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি ফর‌ বিইং লেট অন আওয়ার মিটিং। আসলে আমি ঠিক সময়ই বেরোব বলে অফিস থেকে হাফটাইমের পর লিভ নিয়েছিলাম। যেই আমি অফিস থেকে বেরোব অমনি মায়ের কল। হঠাৎ কাউকে না বলে কয়ে মা চলে এসেছে এখানে। আমি পড়লাম মহাবিপদে! একদিকে আপনারা আমার অপেক্ষায়। অন্যদিকে মা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। কী করব ভাবছি এমন সময় মা-ই উপায় বলে দিল। মা জানতো আমাদের আজকের মিটিংয়ের ব্যাপারে। মা বলল, “এককাজ কর তুই আমাকে এখান থেকে পিকআপ করে নিয়ে চল রেস্তরাঁতে। আমিও ঐশীকেই দেখতে এসেছি। এক যাত্রায় পৃথকফল হবে কেন? তারচেয়ে বরং ঐশীদের সাথে আলাপটাও সেরে নেব।”

কথার মাঝপথে অভীককে থামিয়ে দেন রজতাভ, “সেকি! তোমার মাও তোমার সাথে এসেছেন নাকি?”

অভীক মাথা নাড়তেই রজতাভ বলে ওঠেন, “সেকি! উনি কোথায়?বাইরে দাঁড়িয়ে নাকি? কি আশ্চর্য! তাকে সাথে করে নিয়ে আসবে তো!”

ঐশী পাশ থেকে ফুট কাটে ,“সাধে বলি? ক্যালাস!”

অভীক হেসে বলে, “অতোটাও নই! মাকে নিয়েই এখানে ঢুকেছি। ঐ তো! আপনাদের পিছনের টেবিলে মা বসে আছে।”বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যায় রজতাভদের পিছনের টেবিলে। টেবিলে বসা মহিলাকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটে ঐশী। ইশ! ভদ্রমহিলা একেবারে ওদের পাশাপাশিই বসেছিলেন, আর সে কিনা ওনার সামনেই ওনার ছেলেকে যা নয় তা বলে যাচ্ছিল! ভদ্রমহিলা হাসতে হাসতে টেবিলের সামনে এসে বললেন, “আহা! আবার আমাকে টানছিস কেন? বেশ তো চলছিল। আরেকটু চললে জমে যেত। খামোখা মজাটা নষ্ট করলি!” 

অভীক বলে ওঠে,“ আঙ্কল আলাপ করিয়ে দিই। ইনি আমার মা সুজাতা চৌধুরী। মা ইনি ঐশীর বাপি কর্নেল রজতাভ মজুমদার।” দুজনে দুজনকে নমস্কার জানান।

ঐশী‌ কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ সরি আন্টি! মানে আমি বুঝতে পারি নি আপনি এইভাবে...! আর অভীকও তো কিছু বলেনি!”

সুজাতা হেসে বললেন, “ওর কোনো দোষ নেই। আসলে তোমাদের সারপ্রাইজ দিতে আমিই কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে এসেছি! তবে এসে ভালোই হল দেখছি! এখানেও ওকে শাসন করার‌ লোক আছে দেখছি! যাক নিশ্চিন্ত হলাম! এই মেয়ে! একদম লজ্জা পাবে না! অভীক আমার ছেলে হলে কী হবে? ঠিক ওর বাবার মতোই জাত কুঁড়ে হয়েছে ও। জানো আমাদের বেলা তো আর এখনকার মতো ডেট, মিটিং হত না। আমাদের সময় ডেটের মানে সিনেমা দেখা, পার্কে যাওয়া। সেইসময়ও ওর বাবা এইরকমই দেরী করতো। আর আসার পর নানারকম অজুহাত দিতো। আমি নাহয় সহ্য করেছি তুমি কিন্তু একদম ‌সহ্য করবে না! এই আমি পারমিশন দিলাম গরুর গাড়িতে গরু বেচাল হলে যেরকম গারোয়ান গরুর ল্যাজ মুচড়ে দেয় তুমিও বেগোড়বাই দেখলে কানটা মুলে দেবে! বুঝেছ?” 

ঐশী ফিক করে হেসে মাথা নেড়ে বলে, “বেশ! ও নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না আন্টি! আমার হাতে যখন পড়েছে চটপটে করেই ছাড়ব।”

অভীক চারদিকে তাকিয়ে বলে, “মা প্লিজ! তুমি এখানে ঐশীকে দেখতে এসেছ নাকি আমার শাসনভার তুলে দিতে এসেছ?”

সুজাতা হেসে চেয়ারে বসে বলেন, “চুপ কর তো! যা করেছি বেশ করেছি!এতদিনে নিশ্চিন্ত আমি। যোগ্য লোকের হাতেই পড়েছিস‌ তুই! তোর জন্য ঐশীই ঠিক আছে। ওই পারবে তোকে শুধরোতে। কিন্তু একটা জিনিস বুঝছি না এত মিষ্টি একটা লক্ষ্মীমন্ত‌ মেয়ে তোর মতো অলসের পাল্লায় পড়ল কী করে?” বলে ঐশীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন তিনি।

এবার রজতাভ বলে ওঠেন ,“ওভাবে বলবেন না! আমাদের অভীকও বেশ ভালো ছেলে! অন্তত ওকে যতটা দেখছি। ওর ব্যাপারে যতটা শুনেছি তাতে বলব আজকালকার যুগে এরকম রত্ন খুবই কম পাওয়া যায়। হ্যা দোষের মধ্যে ও একটু অলস। তাতে কী?ওর লেখা, ওর ছবিতোলার হাতও বেশ ভালো। তাছাড়া ভুল করে সেটা স্বীকার করার সৎসাহসও আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে বেশি দেখি না। সেখানে সামান্য দেরী করার জন্য এতটা হনেস্ট কনফেশন দিয়েছে বেচারা। ওর আর লেগপুলিং করবেন না প্লিজ!”

ঐশী বলে ওঠে, “বাপি! তুমি কিনা শেষে দলবদল করছ? এই একটু আগে ওকে টাইম মেন্টেনিং নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছিলে এখন ওরই সাইড নিচ্ছ?”

রজতাভ হেসে বলেন, “মোটেই না। আমি শুধু ভালোটা বলছি। তুই তো কালরাত থেকে ওর ব্যাপারে বার বার বলে যাচ্ছিস! ‘বাপি জানো অভীক ছেলেটা মন্দ নয়...', ‘বাপি!অভীকের তোলা ছবি! কী সুন্দর লাগছে না আমাকে?’,‘বাপি এই যে অভীকের পেজ! দেখো কী ভালো লেখা! রিসেন্ট লেখাটা পড়ছি শোনো!’ আমার তো কান পঁচে যাবার জোগাড়। কিন্তু এখানে এসে দেখছি ছেলেটাকে সমানে লেগপুলিং করে যাচ্ছিস তুই! এতটা খিল্লি ও ডিজার্ভ করে না তাই বললাম। একি তুমি দাঁড়িয়ে কেন? বসো!” বলতেই অভীক চেয়ার টেনে রজতাভর পাশে বসে। 

ঐশী লজ্জা পেয়ে বলে, “বাপি!স্টপ! এটা পাবলিক প্লেস!”

এবার ফুট কাটে অভীক, “কেন এটা এতক্ষণ মনে ছিল না?” অভীকের কথা শুনে রজতাভ আর সুজাতা এবার হোহো করে হেসে ফেলেন। 

কিছুক্ষণ হাসিঠাট্টার পর ছেলে-মেয়ে দুজনকে একা ছেড়ে দিয়ে আলাদা টেবিলে বসেন দুজনে। চেয়ারে বসে সুজাতা বলেন, “সত্যিই এখানে না এলে আমি অনেক কিছু মিস করে যেতাম! তবে এখন আমি নিশ্চিন্ত জানেন? আমার ছেলেটা বাড়ি থেকে এতদুরে থেকেও অযত্নে নেই। ওকে দেখার লোকও আছে এই শহরে। আসলে ছেলেবেলা থেকে আমিই ওকে আগলে রেখেছি তো! বুঝতেই পারছেন।‌ ভীষণ আদরে মানুষ!”

রজতাভ হেসে বলেন, “জানি! বাবা-মা হল সন্তানের কাছে ছাদের দুটো স্তম্ভের মতো। একটা স্তম্ভ সরে গেলে পুরো নড়বড়ে ছাদের ভার অপর স্তম্ভের উপর পড়ে যায়। আপনার ছেলের মতো আমার মেয়েটারও ভাগ্য এক!অভীক তো তাও বাবার স্নেহ পেয়েছে পাঁচটা বছর। আমার মেয়েটা তো মায়ের আদর কাকে বলে জানেই না। জন্মের পর থেকে ওর কাছে আমিই বাবা, আমিই মা। তবে আপনার ছেলের মেধা, বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। তারচেয়েও বেশী প্রশংসনীয় আপনার গাইডেন্স! আজকালকার দিনে বাবা-মায়েরা কম্পিটিশনের দৌড়ে সন্তানকে মানুষ করাই ভুলে গেছে। একটা টিয়াপাখি পোষা আর সন্তানকে মানুষ করা সমার্থক হয়ে গেছে। সন্তানকে আর কিছু হোক না হোক প্রথম হতেই হবে। কত সন্তান যে এভাবে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে তার হিসেব নেই। কিন্তু আপনি তা হতে দেন নি! নিজের আদর্শে মানুষ করেছেন ছেলেকে। আজকালকার যুগে সিঙ্গল প্যারেন্টিং ভীষণ কষ্টকর। আর বহুল চর্চিতও বটে। আমি নিজে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মেয়েকে মানুষ করা সহজ নয়। কিছু কিছু সময় মেয়ের মাকেও প্রয়োজন হয়।‌ বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির সময়।‌ কিন্তু আমার মেয়েটার কপাল এত খারাপ কাউকে পাশে পায়নি ও। এমনকি ওর প্রথম পিরিয়ডের খবরও আমি টের পাই দুদিন পর। যন্ত্রণা, রক্তপাত লুকিয়ে দিব্যি হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল মেয়েটা। শেষে একদিন থাকতে না পেরে বাথরুমে অজ্ঞান হয়ে যায়। সে এক কান্ড! বলতে গেলে সারা দিন চলে যাবে। আমার মেয়েটা বরাবরই এরকমই! হাজার যন্ত্রণা পেলেও মুখ ফুটে বলবে না। আমি এমন একজন ছেলে চেয়েছিলাম যে আমার মেয়েকে বুঝবে, আমার মতোই আগলে রাখবে। আর অভীকই ‌সেই ছেলে আমি হলফ করে বলতে পারি। আমি মানুষ চিনতে পারি সুজাতাদেবী! আর আপনার ছেলেকে দেখে বুঝেছি এ ছেলে লাখে এক। হাজার আঘাত পেলেও আমার মেয়ের হাত ছাড়বে না। কাল যখন আমরা থাকবো না ওরা একে অপরকে ঠিক সামলে নেবে।”

সুজাতা রজতাভর দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমারও তাই মনে হয় জানেন? সেই কারনেই আমি এখানে এসেছি।”

রজতাভ এতক্ষণ ছলছলে চোখে তাকিয়েছিলেন মেয়ের দিকে। সুজাতার কথা শুনে সরাসরি তাকান।

সুজাতা ধীর কন্ঠে বলেন, “আমি চাই আমরা থাকতে থাকতেই ওদের পায়ে শেকল বেঁধে চারহাত এক করে দিতে। না মানে এখনই নয়। আগে ওরা নিজের পায়ে দাঁড়াক, প্রতিষ্ঠিত হোক। তারপর না হয় ওদের বিয়েটা হবে! তবে বেশী দেরী না করাই মঙ্গল। কারন ওরা যতই আমাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হোক না কেন আসলে তো আধুনিক যুগের ছেলেমেয়ে! এই প্রেম, তো এই ব্রেকআপ। কাজেই আমি চাই ওদের এক করে দিতে। ”

রজতাভ হেসে বলেন, “আইডিয়াখানা মন্দ নয়! আমিও এরকমই কিছু ভেবেই এসেছিলাম এখানে।‌ তেমন হলে আপনার সাথে যোগাযোগ করতাম। একদিকে ভালোই হল আপনি এলেন।”

-“তাহলে আপনার মেয়েকে আমার কোলে তুলে দিচ্ছেন তো?”

-“হুম। বেশ দিলাম! তবে দুটো শর্তে!”

-“কী শর্ত?

-“প্রথমত, আপনার ছেলেকে আমার কোলে দিতে হবে। মানে বিয়ে করে আপনার ছেলে যেমন আপনার কাছে মেয়ে নিয়ে যাবে। তেমনই আপনার ছেলে বিয়ের পর আমার ছেলের মতো আদর পাবে। 

-“বেশ! আর দ্বিতীয় শর্ত?”

-“আপাতত আজ রাতটা আপনাদের মা ছেলেকে আমার বাড়িতে কাটাতে হবে।”

এবার সুজাতা নড়ে বসেন, “সে কি কথা! না না কোনো দরকার নেই! আমি এসেছি একদিনের জন্য,আজ রাতটুকু থাকবো কাল সকালের বাসে ফিরে যাবো। শুধু শুধু আপনাদের কষ্ট হবে। আমি অভীকের কলেজেই গার্জেন কোয়ার্টারে থেকে যাব। একটা রাতের তো ব্যাপার!”

রজতাভ হেসে বলেন, “কোনো কষ্ট হবে না। আমাদের বাড়িটা এমনি ফাকাই পড়ে থাকে। বলতে গেলে আমরা বাপ-বেটিতে হানাবাড়িতে থাকি। চলুন না! আজ না হয় গল্প করে কাটাবো সবাই মিলে। লোকজন থাকলে বাড়িটাও সরগরম থাকবে। তাছাড়া আপনি আমাদের অতিথি কাম আমার হবু বেয়ান। এটুকু যদি না করতে পারি তাহলে কী করলাম?তাছাড়া ঐশীও ভীষণ খুশি হবে। ঐশীর জন্য চলুন প্লিজ!”

বলে ঐশীদের ডেকে প্রস্তাবটা দিতেই অভীক একটু কিন্তু কিন্তু করতে থাকে।‌ ঐশী এককথায় রাজি হয়ে খুশিতে ওর বাপিকে জড়িয়ে ধরে। তারপর বলে, “ সাউন্ডস গুড! এই কারনে বাপিকে আমি এত্তটা ভালোবাসি! প্লিজ আন্টি চলুন না! আমাদের বাড়িতে নাহয় আজ রাতটা থাকবেন! আমার রুমে কোনো অসুবিধে হবে না আপনার। তেমন হলে কাল সকালে আমি নিজে আপনাকে বাইকে করে বাসে তুলে দেবো! প্লিজ আন্টি না বলবেন না!”

ঐশীর আবদারে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন সুজাতা। তারপর অবশেষে মৃদু হেসে বলেন , “বেশ! চলো।"

(চলবে...)


শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১

জাল


টেবিলে বসে গুনগুন করতে করতে একমনে কাজ করছিল হেড কনস্টেবল শাশ্বত দাস। মনটা আজ ভালো আছে তার। কদিন ধরে বউ বাপের বাড়ি যাবে বলে বায়না ধরেছে। শাশ্বত বউকে বুঝিয়েও বোঝাতে পারেনি যে এখন ভোটের সময় এভাবে ছুটি পাওয়া যায় না। বউ বুঝতেই চাইছে না। এই সময়ে দুজনের মধ্যে অনেক মন কষাকষি হলেও শাশ্বত ঠিক করে রেখেছিল ভোটটা গেলেই সে আই.সি সাহেবের কাছে দরখাস্ত করবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ! কাল ভোটের রেজাল্ট বেরোতেই আজ সকালে থানায় এসেই আই.সি সাহেবের রুমে গিয়েছিল সে। আই.সি সাহেব দরখাস্তটা পড়ে একটু হেসে ছুটি মঞ্জুর করে দিয়েছেন। তবে একটা শর্তের বিনিময় ছুটিটা মঞ্জুর হয়েছে। ছুটি সে পাবে তবে কিছু কাজ বাকি থেকে গেছে তার, সেগুলো করে যেতে হবে আর এবেলার ডিউটিটা করে যেতে হবে। শাশ্বত তাতেই রাজি হয়ে থানায় ওর টেবিলে বসে কাজ করছিল। কাজ করতে করতে ভাবছিল ছুটি পেয়েছে জানলে বউ কী করবে? বউয়ের মুখটা কল্পনা করে ওর আনন্দ আর থামছিল না। ইচ্ছে করেই ফোন করে খবরটা জানায় নি সে। ফিরে গিয়ে একেবারে চমকে দেবে।

একমনে কাজ করছিল শাশ্বত। হঠাৎ তার মনে হলো সামনে কেউ দাঁড়িয়েছে। সে চোখ তুলে দেখলো একটা মেয়ে। বয়স বাইশ থেকে পঁচিশের মধ্যে হবে। বেশ সম্ভ্রান্ত চেহারা । ম্যাগাজিনে, রাস্তার হোর্ডিংয়ে দেখা মডেলদের মতো ছিপছিপে গড়ন। সাজপোষাকও মডেলদের মতো। একঝলক দেখে বড়োলোক বাড়ির মেয়ে মনে হচ্ছে। গায়ের রং ফরসার দিকে। এদিক ওদিক সন্তর্পণে তাকাচ্ছে মেয়েটা। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন চেনা মনে হলো শাশ্বতর। মনে হলো আগে কোথায় যেন দেখেছে। কিন্তু কোথায় মনে করতে পারছে না। মেয়েটার গলা খাকড়ানিতে হুশ ফিরলো শাশ্বতর। সে চমক ভেঙে নিজেকে সামলে বললো , “কাউকে খুঁজছেন?”মেয়েটা চমকে তাকালো শাশ্বতর দিকে। শাশ্বত আবার প্রশ্ন করলো, “কাউকে খুঁজছেন?” মেয়েটা মাথা নেড়ে বলল, “এই থানার ইনচার্জের সাথে কিছু কথা ছিল। উনি কোথায় বলতে পারবেন?”‌

শাশ্বত কাজ ফেলে মেয়েটার দিকে তাকালো। ব্যাপার কী? মেয়েটা সাহেবকে খুঁজছে কেন? ভ্রু কুঁচকে বললো ,“স্যার‌ তো রাউন্ডে বেরোলেন এই মাত্র। ফিরতে দেরী অনেক দেরী আছে । আপনার কোনো অভিযোগ থাকলে সেকেন্ড ইনচার্জের সাথে কথা বলতে পারেন। উনিই আমাদের মহিলা সেকশনের ওসি। ম্যাডাম ঐ রুমে আছেন এখনও। ” বলে অপালা ম্যাডামের ঘরটা দেখিয়ে দিলো শাশ্বত। মেয়েটা মাথা নেড়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। শাশ্বত কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো মেয়েটার চলে যাওয়াটা। তারপর আবার কাজে মন দিলো। কিন্তু ওর মনে বারবার একটা খটকা খোঁচা দিতে লাগলো। মেয়েটাকে সে আগেও দেখেছে। কিন্তু কোথায়‌ মন করতে পারছে না। একসময় মনে হলো যাকগে! বড়োলোকদের কেস, অফিসারদের ব্যাপার। তার এখানে মাথা ঘামিয়ে কাজ নেই। এই ভেবে ভাবনাটাকে ঝেড়ে সে কাজে লেগে পড়লো আবার।

নিজের টেবিলে বসে পুরোনো একটা পেন্ডিং কেসের প্রোগ্রেসে নজর বোলাচ্ছিল অপালা। কাল এস.পি. স্যারের কাছ থেকে তলব এসেছিল কয়েকজন অফিসারের। তাদের মধ্যে সেও ছিল। কয়েকটা পেন্ডিং কেসের জন্য কথা শুনতে হলো তাকে। যদিও কেস বলতে তেমন কিছু আহামরি নয়। ঐ ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, পণ নিয়ে বিয়ে, নাবালিকাকে বিয়ে, এরকমই সাদামাটা নারীজনিত কেস। কেন এতদিন ধরে পেন্ডিং জবাব দাও। তোমার আন্ডারেই তো কেসের ইনভেস্টিগেশন অফিসার। তার প্রোগ্রেস কেন এত ধীরে? আগে এরকম প্রশ্নবাণে রাগ হত, কষ্ট হত তার। দশবছরের সার্ভিস লাইফে এখন এসব গা সওয়া হয়ে গেছে। তাও কেস ফেলে রাখাটা মুর্খামি অগত্যা আজ সকালে এসেই বসে পড়েছে সব পেন্ডিং কেস নিয়ে। সকল ইনভেস্টিগেশন অফিসারদেরও রিপোর্ট করতে বলেছে।
রিপোর্টটা মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল অপালা, এমনসময় দরজায় টোকা পড়ল আর সাথে একটা প্রায় এক অষ্টাদশী কিশোরীর মতো মিহি স্বর ভেসে এল, “মে আই কাম ইন ম্যাডাম?" 

ফাইল থেকে চোখ না তুলেই অপালা জবাব দিলো, “কাম ইন।" তারপর ফাইল থেকে চোখ তুলে তাকালো সামনের দিকে। একটা মেয়ে তার টেবিলের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স বাইশ থেকে পঁচিশের মধ্যে হবে। অথচ‌ ভয়েসটা শুনে মনে হলো... অপালা দেখলো মেয়েটা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। অপালার একটু ভ্রু কুঁচকে গেল। সে মেয়েটার দিকে একবার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিলো। সাজপোশাক দেখে মনে হচ্ছে বড়োলোক বাড়ির বখে যাওয়া মেয়ে। চুলের সামনে দিক হাইলাইট করা। এই সকালেও চোখে একগাদা কাজল ধেবড়ে মেকাপ করে এসেছে। কব্জিতে উল্কি আঁকা। পরনে জিন্স আর একটা ঢলঢলে টিশার্ট। হয় বয়ফ্রেন্ডজনিত কেস, নাহলে কাল রাতে নির্ঘাত মদ গিলে পার্টি করে ফেরার সময় পুলিশের হাতে গাড়ি জমা করেছে। এসব মেয়েদেরকেও হ্যান্ডল করেছে এক সময় অপালা। বাপ রে! সে সব মেয়েদের কি তেজ, কি ঔদ্ধত্য! যেন সাক্ষাত সি.এম. বা পি.এমের কাছের কেউ । মাঝে মধ্যে এদেরকে চড়িয়ে লাল করে দিতে ইচ্ছে করলেও পেশার খাতিরে চুপ করে থেকেছে।

এই মুহূর্তে মেয়েটাকে দেখে রাগ হলেও পর মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে অপালা বলল, “বসুন।"
মেয়েটা টেবিলের সামনের একটা চেয়ার টেনে বসলো। অপালা জিজ্ঞেস করল, “বলুন কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?"

“আমি একটা রিপোর্ট লেখাতে এসেছি।"

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপালা বলল, “বেশ। তা কী বিষয়ে রিপোর্ট লেখাতে এসেছেন জানতে পারি কি?"

প্রশ্নটা শুনে মেয়েটা থমকে যায়। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে তারপর পার্স থেকে একটা ফোন বের করে বলে, “কদিন আগে আমার বয়ফ্রেন্ডের ফোন চুরি যায়। পুলিশের সাহায্যে সেটা রিকভারিও হয়। কিন্তু তারপর থেকে একটা অজানা নাম্বার থেকে আমার ফোনে হোয়াটসঅ্যাপে নোংরা সব মেসেজ, পিক আসতে শুরু করে। প্রথম প্রথম আমি পাত্তা দিই নি। কারণ এরকম মেসেজ আমার কাছে প্রায়ই আসে। সেক্ষেত্রে আমি ব্লক করে দিই নাম্বারটাকে। ফেসবুকে হলে রিপোর্ট। এটাকেও করেছিলাম। কিন্তু তারপরেই আরেকটা নাম্বার থেকে সেম মেসেজ আসতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, যখন তখন ভয়েস কল, ভিডিও কল আসতে থাকে। এরকম দু তিনটে আননোন নাম্বার ব্লক করার পরেও থামছে না দেখে আমি বয়ফ্রেন্ডকে জানাই। তারপর কল আসতেই বয়ফ্রেন্ড সেটা রিসিভ করে ভালো রকম দাবড়ানি দেয় কলারকে। তারপর কাল সকালে সেই নাম্বার থেকে একটা ক্লিপিং আর কিছু ফোটো আসে আমার ফোনে।" বলে ফোনটা এগিয়ে দেয় মেয়েটা। 

অপালা হাত বাড়িয়ে ফোনটা নেয়। বেশ দামি ফোনটা সন্তর্পণে দুহাতে ধরে ফোনটার পর্দায় চোখ রাখে। গোটা ইনবক্স জুড়ে অশ্রাব্য, অকথ্য ভাষার মেসেজ। সরাসরি যৌন প্রস্তাব দিয়েছে মেসেজ কর্তা। শুধু তাই নয়, নানারকম যৌন ফ্যান্টাসি,উত্থিত পুরুষাঙ্গের ছবিতে ভর্তি ইনবক্স। ঘেন্নায় গোটা শরীর রি রি করে ওঠে অপালার। তাও সে চোখ রাখে শেষ মেসেজের দিকে। আর সেদিকে চোখ রাখতেই অবাক হয়ে যায় সে। শেষের কয়েকটা ছবি আর কারো নয়, তার সামনে বসা মেয়েটার ছবি। দেখে বোঝা যাচ্ছে কোনো সমুদ্রসৈকতের পাশে তোলা। একের পর এক ছবিতে ক্রমশ নিরাভরণ হচ্ছে মেয়েটা। প্রথম ছবিতে শর্ট আর টিশার্ট থাকলেও শেষ ছবিতে মেয়েটার শরীরে একটা সুতো পর্যন্ত নেই। সম্পুর্ণ নিরাভরণ হয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা হাসছে।

ছবিটা দেখে একঝলক মেয়েটার দিকে তাকায় অপালা। তারপর ক্লিপিংটা চালু করে। তিরিশ সেকেন্ডের ক্লিপিংটায় দেখা যায় একটা ঘরে সঙ্গমরত যুগলের মুহূর্ত। দুজনে একে অপরের প্রতি প্রায় ভালুকের মতো ঝাপিয়ে পড়ছে, আর দ্রুতগতিতে রমণ করছে তারা। কলেজবেলায় অনেক পর্ণোগ্রাফিক ছবি , ভিডিও দেখেছে অপালা। এই ভিডিওটাও একরকমের পর্ণোগ্রাফিক ভিডিওই বটে। ভিডিওটা বেশ কাঁচাহাতে তোলা মানে অ্যামেচার ক্যাটাগরির। অপালা ভ্রু কুঁচকে ভিডিওটা দেখে। ভিডিওটার একদম শেষ মুহূর্তে সঙ্গমরতা তরুণীর মুখটা দেখে অবাক হয়ে যায় সে। ফোনটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বলে, “এই ভিডিও, ছবিগুলো..."

“লাস্ট‌ ইয়ারের নভেম্বরে Maldives-এ তোলা। আমিই ইনসিস্ট করেছিলাম মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখার জন্য। ভাবিনি এভাবে..." 

“আপনার বয়ফ্রেন্ড কী করেন?"

“হি ইজ ইন কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড। সারাদিন ইন্টারন্যাশনাল মিটিংএ ব্যস্ত। ওর নামটা কি বলতে হবে?"

“ ইনভেস্টিগেশনের স্বার্থে তো অবশ্যই বলতে হবে ম্যাডাম। তবে চিন্তা নেই এই তথ্য বাইরে যাবে না।"

“তাহলে শুরু থেকেই বলছি।"

“অবভিয়াসলি‌ ম্যাডাম।‌ একটা তথ্যও বাদ‌ দেবেন না।"

বলে অপালা চেয়ার থেকে উঠে গেটের বাইরে থাকা শাশ্বতকে বলে, “কেউ আমার খোঁজে এলে বলবে আমি ব্যস্ত। কাউকে এলাউ করবে না। আর আই.সি স্যার এলে তাকে আমার রুমে আসতে বলবে।" 

কথাগুলো বলে নিজের চেয়ারে এসে বসে অপালা। তারপর বলে, “নিন ম্যাডাম শুরু করুন।"
মেয়েটা সোজা হয়ে বসে। তারপর ধীর কন্ঠে বলে,“আমার নাম লিজা স্মিথ। আমার ড্যাডিকে আপনারা হয়তো চেনেন, তিনি একসময় বেঙ্গল ক্রিকেট টিমে খেলতেন। পরে সেখান থেকেই পুলিশে চাকরি পান। ইন্সপেক্টর ডেভিড স্মিথ। ড্যাডি শুনেছি রঞ্জি ট্রফির জন্যেও খেলেছেন। আমার ছেলেবেলা কেটেছে দার্জিলিং-য়ে বোর্ডিং স্কুলে। এখানে কেন জানি না পড়াতে চাননি ড্যাডি। দার্জিলিং-য়ে স্কুল ফাইনাল দিয়ে হায়ার সেকেন্ডারির জন্য আমি চলে আসি এখানে । ভর্তি হই এখানকারই এক কলেজে। আর কলেজেই আমার সাথে দেখা হয় ভিকির। মানে আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে। ভিক্টর ডি'সিলভা বা ভিকির সাথে আমার রিলেশন দশ বছরের। ইউ কান্ট বিলিভ মি বাট হি ইজ দ্যা মোস্ট কিউট এন্ড অ্যাডোরেবল গাই আই হ্যাভ এভার মেট। হি ওয়াজ সো পজেসিভ এন্ড প্যাশনেট অ্যাবাউট আওয়ার রিলেশনশিপ। আমরা একসাথে কলেজ কমপ্লিট করে যে যার মতো কেরিয়ার মেকিংয়ে নেমে পড়ি। হি জয়েনড হিজ ফাদার্স কোম্পানি । আর আমি জয়েন করি একটা প্রাইভেট ফার্মে। পার্ট টাইমে টুকটাক মডেলিংও করতে থাকি। এতদিন পরেও একবারের জন্যেও আমরা আমাদের রিলেশনে কোনোরকম গ্লিচ আসতে দিই নি। ফাইনালি দুজনেই সেটল হবার পর ঠিক করি আমরা বিয়ে করবো। আমাদের পেরেন্টসরাও সায় দেন আমাদের সিদ্ধান্তে। অল থিংস আর সর্টেড। উই আর রিয়ালি হ্যাপি অ্যাবাউট আওয়ার ম্যারেজ বাট...।"

ধরা গলায় কথাগুলো বলে থামে মেয়েটা। তারপর মাথা নিচু করে বসে থাকে। মেয়েটাকে ধাতস্থ হবার সময় দেয় অপালা। জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলে, “তারপর আপনারা ভ্যাকেশন কাটাতে Maldives- এ গিয়েছিলে?" মেয়েটা ধাতস্থ হয়ে একচুমুক জল খেয়ে মাথা নাড়ে। তারপর বলে,“লাস্ট ইয়ার লকডাউন ওঠার পর যখন সব নিউ নর্মালে ফিরলো আমরা ঠিক করলাম মাইন্ড ফ্রেশ করতে বাইরে কোথাও ঘুরে আসবো। ভিকি হয় গোয়া নাহলে কাশ্মীর ভেবেছিল। আমিই বলেছিলাম ওর চেয়ে বাইরে কোথাও যাওয়া হোক। Maldives-এর সাজেশনটাও আমিই দিই। ইট ওয়াজ লাইক আওয়ার প্রি-হানিমুন। সাতদিন ছিলাম আমরা। দোজ ডেজ আর বেস্ট মেমোরেবল ডেজ অফ আওয়ার লাইফ। আমরা ঐ সাতদিন নিজের মতো এঞ্জয় করেছি। কেউ বাধা দেওয়ার ছিল না । আমরা নিজেদের মতো ছিলাম। তারপর কি যে হয় গেল!"

“আচ্ছা আপনার বয়ফ্রেন্ড মানে ভিকি। সে কেমন মানুষ? মানে বিশ্বাসযোগ্য কি?"

“ডেফিনেটলি! ওর সাথে আমার সম্পর্ক সেই কলেজের সময় থেকে। আমরা যাকে বলে মেড ফর ইচ আদার, সোলমেটস। এতবছরের রিলেশনশিপে একবারের জন্যেও একে অপরকে আমরা চিট করিনি। আমাদের বন্ডিংটা বেশ শক্ত ইভেন একে অপরকে দেখলেই আমরা বুঝে যাই যে অপরজন কি বলতে চাইছে।" মেয়েটা এবার নিজেকে সামলে স্থিরভাবে উত্তর দেয়। অপালা বুঝতে পারে বয়ফ্রেন্ডও যে এসবে জড়িয়ে থাকতে পারে এটা মেয়েটা বুঝছে না। বা বলা বাহুল্য বুঝতে চাইছে না। নিজের চাকরি জীবনে এরকম অনেক কাপল দেখেছে অপালা। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েটা বা ছেলেটা যাকে ভরসা করে এসেছে এত বছর, ইনভেস্টিগেশনের শেষে সেই মানুষটাই মুল কালপ্রিট বেরিয়েছে। অপালার বার বার মনে হচ্ছে হোক না হোক এই ব্ল্যাকমেলের পেছনে ভিকির হাত আছে। সেটা‌ যাচাই করতেই অপালা একটু আগে করা প্রশ্নটাকে ঘুরিয়ে দেয়।

“আচ্ছা এই যে বললেন যে এই ছবিগুলো, ভিডিওটা আপনার কনসেন্টে তোলা। এ ব্যাপারে ভিকির কি সায় ছিল?"

“ প্রথমে ভিকি রাজি হয় নি। জায়গা, আর সময় দেখে ও পিছিয়ে গিয়েছিল। লোকভর্তি জায়গা, কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি হবে। তার উপর এই সব ক্লিপিংস যদি বাইরে লিকড হয় তাহলে একটা বিচ্ছিরি স্ক্যান্ডাল হবে। ওর যে একেবারে ইচ্ছে যে ছিল না তা বলবো না। ইভেন আমার ন্যুড ছবিটা ওর সাজেশন ছিল। আমি বিকিনি পরে কয়েকটা ছবি তুলে ওকে থামতে বলেছিলাম। ওই বলেছিল আরো বোল্ড পোজ দিতে। ভিকি চিরকালই ওয়াইল্ড আর বোল্ড স্বভাবের। এরকম অ্যাডভেঞ্চার ওর প্রিয়। তবে ওর কেসটা হল ঐ যে আপনাদের একটা প্রবাদ আছে না? পেটে খিদে মুখে লাজ। এটার লিভিং এক্সামপল হলো ভিকি। প্রথমে না না করলেও পরে নিমরাজি হবে,শেষে দেখা যাবে পুরো জিনিসটা ও উপভোগ করছে। " 

বলে কিছুক্ষণ থামে মেয়েটা তারপর মৃদু গলায় বলে,“আমি জানি আপনি কী মিন করতে চাইছেন। সেই আশঙ্কাটা আমার মনেও এসেছিল। পরে অবশ্য চিন্তা করে দেখেছি এসব করে ওর কী লাভ? মোটিভটাই বা কি?নিজের উড বি-র ন্যুড পিক, সেক্সটেপ লিক করে ওর কী লাভ? যেখানে ভিডিওতে ওকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হ্যা লাভ হতো কখন যখন এই ছবিগুলো নিয়ে ওকে আমি ব্ল্যাকমেল করতাম। কিন্তু ছবি আর ক্লিপিংসের কপি তো একমাত্র আমাদের কাছেই আছে। বাইরের কেউ পাবার চান্সই নেই। তাছাড়া এখানে তো ব্ল্যাকমেল আমাকে করা হচ্ছে।"

“ভিডিওটা কবে তোলা?"

“Maldives থেকে ফেরার দুদিন আগে। Maldives-এ আমরা হানিমুন কাপলের‌ মতোই ছিলাম। শুধু সেদিনই নয়। যতদিন ছিলাম উই মেড লাভ এভরিডে। ইভেন ছবিগুলো তোলার দিনও জঙ্গলে... ভিকি ওয়াজ সো ডেসপারেট। আমিই পুরো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আইল্যান্ডে। পুরো দ্বীপে টুরিস্ট ভর্তি এই সময় আমরা সেখানেই একটা গাছে...আমিই বলেছিলাম এই মুহূর্তগুলো ভীষণ গোপনীয়, ভীষণ কাছের, ভীষণ রোমান্টিক। মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখলে ভালো হতো। এমনি ফ্রাঙ্কলি বলেছিলাম। ও বলেছিল, “তুমি কি চাও? আমাদের ইন্টিমেট মোমেন্টগুলোও রেকর্ডেড থাকুক?পাগল নাকি?" এখন মনে হচ্ছে সেদিন কথাগুলো শুনলে আজ এই দিনটা দেখতে হতো না। এখন কেমন একটা আতঙ্ক লাগে জানেন? ভিকিকে আমি বিশ্বাস করলেও ওকে দেখলে মনে হয় ও আমাকে বিশ্বাস করছে না। ও আমার পাশে আছে এটা যতই ফিল করি না কেন কোথাও যেন একটা সুর কেটে গেছে। বার বার মনে হচ্ছে আমিই দায়ী। অথচ হি ওয়াজ অলসো দেয়ার! হি ওয়াজ অলসো এঞ্জয়েড দোজ ডেজ ।"

“এই স্ক্যান্ডালটার ব্যাপারে আর কেউ জানে?"

“না। জানতে পারলে‌ সব শেষ হয়ে যাবে। ড্যাডির রেপুটেশন, ভিকির বাবাদের রেপুটেশন সব নষ্ট হয়ে যাবে। আর একটা স্ক্যান্ডালকে কে ঘরে আনবে। ভিকির বাড়িতে জানলে ওরা জাস্ট এটাকে ডিনাই করে বেরিয়ে যাবে। ভিকির আচরণে এটা মনে হচ্ছে বার বার।"

“কেন মনে হচ্ছে এরকম? একটু আগেই তো বললেন আপনারা নাকি সোলমেটস। তো হঠাৎ কী হলো যে ভিকি এভাবে পাল্টে গেলেন?"

“সেটাই তো আমিও ভাবছি। ওকে মেসেজগুলো দেখানোর পর ফ্র্যাঙ্কলি হেসেছিল। কিন্তু সেদিন কলটা রিসিভ করে কথা বলার পর ওর বিহেভিয়ারটা পাল্টে গেছে। লোকটার সাথে কী কথা হয়েছে জানি না। বাট এমন একটা কিছু হয়েছে যার কারণে ও আমাকে আগের মতো পুরোপুরি বিশ্বাস করছে না। বার বার হাবেভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে ভুলটা আমারই। বা হয়তো ভাবছে আমিই ওকে ব্ল্যাকমেল করার জন্য এসব ড্রামা করছি। কিন্তু আমি এটা কেন করবো? ওর সাথে যদি আমার এমনি অ্যাফেয়ার থাকতো তাহলে একটা লজিক হতো যে ওকে ব্ল্যাকমেল করে বিয়ে করতে চাইছি। কিন্তু আমাদের তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! আমরা যে Maldives-এ গিয়েছিলাম সবাই জানে। এখানে কোনো লুকোছাপা নেই! আমি ওকে ব্ল্যাকমেল করে নিজের সর্বনাশ কেন ডেকে আনবো? এই ক্লিপিং আর ছবির কথা এই কারণে ওকে বলিনি। কারণ ও বিশ্বাস তো করবে না তার উপর ওর সন্দেহ বদ্ধমুল হবে।"

“তারমানে ভিকির প্রতি আপনার সম্পুর্ণ বিশ্বাস থাকলেও ভিকির আপনার প্রতি যে বিশ্বাস ছিল সেটা টাল খেয়েছে।"

মেয়েটা অশ্রুসজল চোখে অপালার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে।

অপালা আরো কিছু বলতে যাবে এমন সময় দরজায় টোকা পড়ে। অপালা বসে কাম ইন বলতেই আই.সি অগস্ত্য সেন ভেতরে ঢোকে। (অগস্ত্যর সাথে পাঠকের আগেও পরিচয় হয়েছে বারোভাজায়। “বারুদের বাড়ি" গল্পে তাই বিস্তারিত পরিচয় দিলাম না) অপালা উঠে দাঁড়ায়। অগস্ত্য অপালাকে হাতের ইশারায় বসতে বলে। তারপর মেয়েটার দিকে তাকায়। 

“রাউন্ড থেকে ফিরে শাশ্বতর কাছে শুনলাম একটা মেয়ে নাকি আমার খোঁজ করছিল। তাকে তোমার কাছে পাঠানো হয়েছে। মেয়েটার সাথে কথা বলে নাকি তুমিও আমারই খোঁজ করছো। সকাল বেলা দুই নারীর তলব উপেক্ষা করার সাহস হলো না আমার তাই চলে এলাম।"

অপালা লজ্জা পেয়ে বলে, “কি বলছেন স্যার! ওসব কিছু নয় আসলে এনার কেসটা...!"

অপালাকে‌ থামিয়ে দেয় অগস্ত্য। তারপর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলে, “বলতে হবে না। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে পুরোটা না শুনলেও যতটুকু শুনেছি তাতেই আন্দাজ করে নিয়েছি বাকিটা। তবে আউট অফ ইনভেস্টিগেশন দুটো কথাই বলব আপনাকে‌ মিস স্মিথ। সেটাকে জ্ঞান মনে করতে পারেন, মরাল পুলিশের ভাষণ বলতে পারেন। কথাদুটো হলো, প্রথমত, এই যে একান্ত আপন গোপনীয় মুহূর্তগুলোকে বন্দি রাখার এই প্ল্যান, এটা করার সময় আপনাদের কেয়ারফুল থাকা উচিত ছিল। এগুলো তোলা ক্রাইমই বটে কিন্তু যেখানে দুজনেই ইচ্ছে করে তুলেছেন সেখানে আউটপার্সন হয়ে আমার বলা উচিত নয়। তবে এগুলো এভাবে ফেলে রাখা উচিত হয় নি। ইউ শুড বি মোর কেয়ারফুল এন্ড সিকিওরড অ্যাবাউট প্রিসারভিং দ্যাট ডেটা। বিশেষত আজকের দিনে এই ডেটা হ্যাকারদের হাতে পড়লে সর্বনাশ হতে বেশী সময় লাগে না। আর দ্বিতীয়ত এইরকম মেসেজ যখন এসেছিল তখন একে হাল্কা ভাবে না নিয়ে তখনই পুলিশ স্টেশনে আসতে হতো। বিশেষত আপনার বয়ফ্রেন্ডের ফোন চুরি হবার পর আপনাকে আরো কনসার্ন হবার কথা। যেখানে আপনি জানেন এই বিষয়ে একটা সামান্য‌ ভুলের জন্য আপনার গোটা জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”

মেয়েটা মাথা নীচু করে বসে থাকে। বুঝতে পারে আই.সি কথাগুলো ভুল বলছেন না। সত্যিই তাই একটু কেয়ারফুল হলে, তখনই স্টেপ নিলে এত কিছু হতো না। কিন্তু তখন কি আর ও জানতো ব্যাপারটা এতদুর গড়াবে? আর এসব ব্যাপারে থানা পুলিশ হলে ড্যাডির রেপুটেশনটাও যেত। তাই ও ইচ্ছে করেই স্টেপ নেয় নি। ওখন মনে হচ্ছে ভিকির কাছে না গিয়ে এখানে এলেই ভালো হত।
মেয়েটাকে মনমরা হতে দেখে অপালা বলে, “আপনি...তুমি চিন্তা করো না। তোমাকে তুমি করেই বলছি। উই উইল ফাইন্ড দ্যাট বাস্টার্ড। তোমার নাম, ডিটেল সব পাবলিকের কাছ থেকে লুকোনো থাকবে। ওকে আমরা এক্সপোজ করে দেবো শুধু।কিছু শেষ হয়নি লিজা। চিয়ার আপ। থ্যাঙ্ক গড ব্লান্ডার হবার আগে তুমি এখানে এসেছ! আমরা বাকিটা সামলে নেব। ইউ আর এ ব্রেভ গার্ল! এরকম সাহস হলেই তো এইসব লোকদের ধরতে সুবিধে হয় আমাদের।"

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অগস্ত্য তাকায় লিজার দিকে। তারপর ধীরকন্ঠে বলে, “ব্লান্ডার হতে আর কিছু বাকি নেই! লোকটা অলরেডি সব শেষ করে ফেলেছে।"

“মানে?" চমকে অগস্ত্যর দিকে তাকায় অপালা। লিজাও রক্তশুন্য ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে তাকায় অগস্ত্যর দিকে। 

অগস্ত্য কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলে,“লোকটা ভিডিওটা লিজাকে কাল সকালে পাঠিয়ে দেখতে চেয়েছিল লিজার কি রিঅ্যাকশন হয়। লিজার থেকে নেগেটিভ রিঅ্যাকশন এবং পুলিশের থ্রেট পেয়ে রাগে কাল রাতেই পর্ণোগ্রাফিক সাইটে ভিডিওটা আপলোড করেছে,শুধু তাই নয় হি মেড দ্যাট ভিডিও সো মাচ ভাইরাল যে রাতারাতি অলমোস্ট গোটা পৃথিবীতে ভিডিওটা স্প্রেড করে গেছে। কোথাও অ্যাজ এ মিম, কোথাও জিআইএফ হিসেবে। হোয়াটসঅ্যাপে, মেসেঞ্জারে, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে সব জায়গায় ইতিমধ্যে ছড়িয়েছে ভিডিওটা। ইভেন আমাদের শাশ্বতও লিজাকে সেই ভিডিওর থ্রুতেই রিকগনাইজ করেছে।" 

অগস্ত্যর কথা শেষ হবার আগে লিজা দুহাতে মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করে। অপালা উঠে লিজার পাশে বসে ওকে শান্তনা দিতে শুরু করে। “কেঁদো না লিজা। বি স্ট্রং!আমরা ভিডিওটা আর ছড়াতে দেবো না। আমরা এর জন্য প্রপার স্টেপ নেব। দেন উই উইল ফাইন্ড দ্যাট বাস্টার্ড। কথা দিচ্ছি ওকে কঠিন শাস্তি না দিয়ে ছাড়বো না। বি স্ট্রং লিজা।"

লিজা কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আর খুঁজে কী হবে ম্যাডাম? যা সর্বনাশ করার করে ফেলেছে ওই লোকটা। এভরিথিং ইজ ফিনিশড ম্যাডাম। এভরিথিং ইজ ফিনিশড!"

বলতে বলতে কেঁপে ওঠে টেবিলে রাখা লিজার ফোনটা। লিজা কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা নেয়। আর ফোনটা হাতে নেওয়া মাত্র লিজার মুখটা আবার আতঙ্কে রক্তশুন্য হয়ে যায়। ফোনের দিকে ইশারা করে ও বলে, “ইটস হিম!মাই গড! কী চায় ও?এত কিছুর পরেও শান্তি হয় নি?"

“কাম ডাউন লিজা! কাম ডাউন! দেখাই যাক না ও কি চায়? লেট হিম টক টু ইউ! রিসিভ করো কলটা।"

অগস্ত্য ভাবলেশহীন কন্ঠে কথাগুলো বলে তাকায় লিজার দিকে।

“বাট?"

“কোনো কিন্তু নয়! ওকে ধরতে গেলে আগে জানতে হবে ও কী চায়? রিসিভ দ্য কল। আর স্পিকারে নেবে।"

লিজা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা রিসিভ করে।

“হ্যালো!"

ফোনের স্পিকারে একটা ভারী কন্ঠস্বর শুনতে পায় অগস্ত্য । স্পিকারে সেই কন্ঠস্বর হাল্কা হেসে বলে ওঠে, “কি বেবী ডল? বিশ্বাস হল যে আমি কী করতে পারি?"

“ হোয়াই? কেন আমার এত বড়ো সর্বনাশটা করলে তুমি!আমি তোমার কী ক্ষতি করেছি?" হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে লিজা। ওপারের লোকটা ঠান্ডা হেসে বলে, “এখনও তো কিছুই করিনি! ভিডিওটা জাস্ট লোকালে ছড়িয়েছি। যদি তুমি আমার কথা না শোনো তাহলে এর চেয়েও বড়ো স্টেপ আমি নেবো। তোমাকে এলাকায় ফেমাস করেছি। এরপর গ্লোবালই ফেমাস করে দেব। আর রইল ক্ষতির কথা। না তুমি আমার ক্ষতি করো নি বটে বাট ভবিষ্যতে করবে না তার কী গ্যারান্টি আছে? এই যে পুলিশ স্টেশনে তুমি আমার এগেনস্টে‌ রিপোর্ট লেখাতে গেছ।তুমি কি ভাবছো জানি না আমি?"

কথাটা শোনামাত্র লিজার হাত কেঁপে ওঠে । অগস্ত্য ভ্রু কুঁচকে অপালার দিকে তাকায়। অপালাও হা হয়ে অগস্ত্যর দিকে তাকায়। ফোনের ব্যক্তি বলে ওঠে,“তোমার প্রথম ভুল ছিল আমার কথা ইগনোর করা, দ্বিতীয় ভুল ঐ দুদুভাতু মডেলগোছের বয়ফ্রেন্ডকে দিয়ে আমাকে ভয় দেখানো, আর তৃতীয় ভুল হল পুলিশের কাছে যাওয়া। ইউ হার্ট মি ডার্লিং! আর এর জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে!শুধু এটাই নয়। আজকের পর যতবার একটা ভুল করবে ততবার তোমাকে শাস্তি পেতে হবে।‌ এবারে এই ক্লিপিংসের এক কপি যাবে তোমার বয়ফ্রেন্ডের কাছে, আরেক কপি তোমার বসের কাছে।"

“না, না! প্লিজ‌ এরকম করো না! আমার জীবন, কেরিয়ার সব শেষ হয়ে যাবে!"

“হয়ে যাক! অবাধ্য মেয়েরা যখন কথা শোনে না তখন তাদের শাস্তি দিয়ে পথে আনতে হয়। আর তোমার বসও তো শুনেছি তোমাকে কয়েকবার অ্যাপ্রোচ করেছিলেন, কিন্তু তুমি তাকে ঘোল খাইয়ে দিয়েছ! এবার তোমার অফিসের লোক, বাড়ির লোক, পাড়ার লোকেও জানুক যে তুমি কোন লেভেলের সতীলক্ষী!"

“প্লিজ না! আমার এতবড়ো সর্বনাশ করো না! আমার পরিবার কোথাও নিজের মুখ দেখাতে পারবে না।‌ তোমার কী চাই বলো সব দেব আমি! যতটাকা চাও সব দেব আমি। প্লিজ তুমি ভিডিওটা ডিলিট করে দাও!" লিজা অস্ফুটে বলে কেঁদে ওঠে।

“আমিও তো তাই চাই বেবী! তোমার ভিডিও, পিকস গুলো পাবলিক করে লাভ আছে কিন্তু আমি চাই না সেগুলো আরো ছড়াক। তবে তা তো আর ফ্রিতে করতে পারি না! এভরিথিং হ্যাজ এ প্রাইজ! তাই এই ভিডিও ডিলিট করার জন্য তোমাকেও মুল্য চোকাতে হবে। তবে টাকাপয়সা, সোনাদানা দিয়ে নয়।"

“কী চাই তোমার?" ফ্যাকাশে মুখে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে লিজা।

“ আমি কী চাই সেটা আগেও তোমাকে বলেছি বেবী!‌আই ওয়ান্ট ইউ। আই ওয়ান্ট টু স্পেন্ড সাম মোমেন্টস উইথ ইউ! বেশীক্ষণ নয়, জাস্ট একটা ঘন্টা। একটা ঘন্টা আমার সাথে কাটাতে হবে। আপাতত আগে থানা থেকে বেরোও! তারপর একটা লোকেশন সেন্ড করছি সেখানে চলে এসো। ট্রাস্ট মি! আই উইল গিভ ইউ মোর প্লেজার দ্যান ইউর বয়ফ্রেন্ড। তোমার ভিক্টরের চেয়ে আমিও বিছানায় কম যাই না। একবার ট্রাই করে দেখো, তোমার ভিক্টরকে ভুলে যাবে।" বলে হোহো করে হেসে ওঠে ফোনের ওপারের লোকটা।

টেবিলে থাকা পেপারওয়েটটা দৃঢ় মুঠোয় চেপে ধরে রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করে অগস্ত্য । অপালা প্রচন্ড রাগে ফুঁসে ফোনটা কেড়ে নিতে গেলে হাতের ইশারায় শান্ত হতে বলে অপালাকে। লিজা চিৎকার করে ওঠে, “শাট আপ! কী বলতে চাইছো তুমি?"

“ঠিকই বলছি বেবী ডল। আমার তোমাকে চাই। ভেবে দেখো এবার তোমার কেরিয়ার, জীবন সব নির্ভর করছে তোমার সম্মতির উপর। যদি রাজি হও তাহলে কথা দিচ্ছি সব ভিডিও ডিলিট করে দেবো। আর না হলে..." 

“কোনো প্রশ্নই ওঠে না!" আহত বাহিনীর মতো গর্জে ওঠে লিজা।

“বেশ! আমার কাছে আর কোনো পথ রইলো না তবে। তোমার সর্বনাশের জন্য তুমিই দায়ী রইলে বেবীডল!আমার কোনো দোষ থাকলো না। রাজি থাকলে তোমার ফিউচার, কেরিয়ার যেমন সিকিওরড থাকতো সাথে ফিজিকালি স্যাটিসফ্যাকশন বোনাস পেতে। বাট তোমার রিফিউজালটা...সো স্যাড! আমি শুধু ভাবছি তোমার ড্যাডি, তোমার বস আর ভিক্টর যখন এই ভিডিওটা দেখবে তখন ওদের কী রিঅ্যাকশন হবে?ওরা তো এই সময় বাইরে আছে। তোমার ড্যাডি পেনশন নিতে অফিসে। আর ভিক্টর ওর ড্যাডের সাথে একটা মিটিংয়ে। তাই তো?”

কথাটা শোনামাত্র লিজার শরীরটা কেঁপে ওঠে। ওপারের কন্ঠস্বর বিদ্রুপ করে ওঠে, “কি? এখন চুপ কেন?একটু আগে তো বেশ গর্জন করছিলে। লিজা‌ হতভম্ব হয়ে ফোনটার দিকে তাকায়। লিজা চুপ করে আছে দেখে অগস্ত্য চট করে পকেট থেকে কলম বার করে একটা কাগজে খসখস করে কিছু একটা লিখে এগিয়ে দেয় লিজার দিকে। লিজা লেখাটা পড়ে তাকায় অগস্ত্যর দিকে। অগস্ত্য মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। লিজা বলে, “ওয়েট! আমার ভাবার সময় চাই। আই নিড টাইম।"

“ওয়াইজ চয়েস বেবীডল। টেক ইয়োর টাইম তবে বেশী সময় নিলে তোমারই লস। কাল সকাল পর্যন্ত সময় দিলাম। রিমেমবার, তোমার কাছে মাত্র চব্বিশ ঘন্টা আছে ভেবে উত্তর দেওয়ার জন্য!তোমার কেরিয়ার, জীবন সবটা নির্ভর করছে তোমার সিদ্ধান্তের উপর। আশা করি নিজের সর্বনাশ ডেকে আনার মতো বোকা তুমি নও! কালকে তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো। বাই। মুয়াহ!"

কলটা কেটে যাবার পর লিজা দুহাতে মুখ ঢেকে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। ভ্রু কুঁচকে লিজার দিকে তাকায় অগস্ত্য। লোকটাকে যতটা এলেবেলে ভেবেছিল ততটা এলেবেলে নয়। লিজার উপর, ওর গোটা ফ্যামিলির উপর পুরোদস্তুর হোমওয়ার্ক করেছে সে। এ কোনো সাধারণ ছিঁচকে ঠগ হতে পারে না। এ পুরোদস্তুর ঠান্ডামাথার ক্রিমিনাল,শুধু তাই নয় ইন্টারনেটের জমিতেও অবাধ বিচরণ এর। কিন্তু এতটা গোপন তথ্য এ পাচ্ছে কোথা থেকে? কোথাও একটা খটকা থেকে যাচ্ছে। ভাবতে ভাবতে সে প্রশ্ন করে,

“তুমি শিওর? এর পেছনে তোমার কোনো পরিচিত লোক বা কোনো শত্রু নেই। কারণ কটাদিনের মাথায় এতটা হোমওয়ার্ক করা অসম্ভব । যদিও বা খোঁজখবর করে এই তথ্য পাওয়া যায় কিন্তু এই মুহূর্তে তোমরা কে কোথায় আছো তার অ্যাকুরেট তথ্য জানা ইমপসিবল। যেখানে তুমি কাউকে নিজের লোকেশন জানাও নি। আই থিঙ্ক হি ইজ ট্র্যাকিং ইউ। তোমরা কোথায় কখন যাচ্ছ, কার সাথে কথা বলছ ,কার সাথে মিশছ, কী খাচ্ছো সব তথ্যের খবর ও এমনভাবে রাখছে যেন ও তোমাদের সাথেই তোমাদের সামনেই আছে। খুব কাছের জন না হলে এটা অসম্ভব।"

নিজেকে সামলে চোখ মুছে লিজা বলে,“কিন্তু আমাদের তো তেমন কেউ ক্লোজ ফ্রেন্ড নেই। যারা আছে সবাই কলেজের পর আর কানেকশনে নেই।"

“মনে করে দেখো এমন কেউ যার সাথে রিসেন্ট তোমাদের কোনোভাবে ক্ল্যাশ হয়েছে।"

লিজা‌ মাথা নাড়ে। অগস্ত্য মাথা নামিয়ে ভাবতে থাকে। তারপর লিজাকে বলে, “এক কাজ করো, তুমি বাড়ি চলে যাও। আর যাবার আগে তোমার নাম্বার আর এই নাম্বারটা দিয়ে যাও। দেখি ট্র্যাক করে পাই কিনা।"

“কোনো লাভ নেই। সারাদিনে কিছুক্ষণের জন্যই অন থাকে নাম্বারটা তারপর সারাদিন একটাই কথা বাজে, ‘দিস নাম্বার ডাজনট এক্সিস্ট।' কালকে ভিডিওটা পাবার পর অনেকবার ট্রাই করেছি। পাই নি।"

“তাও দিয়ে যাও। আমরা দেখছি কী করা যায়।"

“ওকে তো সময় চাই বলে কাটিয়ে দিলাম। কাল ফোন করলে কী বলবো?"

“সেটা ভেবে নেওয়া যাবে। আপাতত ওকে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।"

বলে চেয়ারে হেলান দেয় অগস্ত্য । লিজা মাথা নেড়ে বেরিয়ে যায়। অগস্ত্য চেয়ারে বসে ভাবতে থাকে, “সেয়ানা পাবলিক বটে! ঠিক হ্যাই। আমিও দেখবো কত বড়ো সেয়ানা তুমি।" বলে বিড়বিড় করে অগস্ত্য।

*****
রাতের বেলা খাওয়াদাওয়ার পর ছাদে পায়চারি করছিল অগস্ত্য। এটা ওর বরাবরের অভ্যেস হয়ে গেছে। জঙ্গলমহলে থাকাকালিন(‘বারুদের বাড়ি' পড়ুন) এই অভ্যেসটা রপ্ত করেছিল সে। আদিবাসীদের পরবে নিমন্ত্রণ হলে সে সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করতো। ওদের পরব মানে দেদার খাওয়া আর নাচগান। মাঝে মাঝে গুরুপাক হলে সাইকেল চালিয়ে ফিরতো। জঙ্গলের এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় অতো দুর সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সব হজম হয়ে যেত। এছাড়া মাঝে মাঝে সাইকেলেই গ্রামে গ্রামে টহল দিতো সে। 

এখানে কাজের চাপে সারাদিন জিপেই ঘুরতে হয়। ফলে অভ্যেসটাকে রাতে ছাদে পায়চারি করে আর সকালে জিমের ট্রেডমিলের দৌড়ে আবদ্ধ করতে হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে সাইক্লিং করে না এমন নয়। কার্ডিও ওয়ার্কআউটের দিন মনে সুখে সাইক্লিং করে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটায় সে।
এমনিতে পায়চারি করার সময় সিগারেট খায় না অগস্ত্য কিন্তু আজকের দিনটা ব্যতিক্রম। আজকে কিছুতেই মনটাকে বাগে আনতে পারছে না সে। সকালে লিজার থেকে পাওয়া নাম্বারটা নিয়ে লালবাজারে গিয়েছিল সে। কিন্তু কিছুতেই কোনো ট্রেস পাওয়া যায় নি। এমন কি নাম্বারটাই নাকি এক্সিস্ট করে না। অগস্ত্য দ্রুত পায়চারি করতে লাগলো। কিছু একটা করতে হবে নাহলে কাল সকালে সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিন্তু কী করা যাবে? কোনো পথই তো খোলা নেই একটা বাদে! আর সেটা করা না করা সমান। ভাবতে ভাবতে মাথাটা গরম হয়ে উঠলো অগস্ত্যর। সিগারেট ধরিয়ে বুক ভরে একটা টান দিলো সে। তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ছাদের এককোণে বসে পকেট থেকে ফোনটা বের করে গ্যালারীটা খুললো। ওর হোয়াটসঅ্যাপেও ভিডিওটা এক অজানা নাম্বার থেকে এসেছে। ভিডিওটা চালু করে দেখতে লাগলো সে। 

ভিডিওটা দেখতে দেখতে হঠাৎ কি একটা জিনিস মনে হতে হোয়াটসঅ্যাপে গেল অগস্ত্য। একটা অজানা নাম্বার থেকে ভিডিওটা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু নাম্বারটার পাশে...ওটা কী? চট করে আরেকবার ভিডিওটা প্লে করলো অগস্ত্য। এবার একটু জুম করে দেখল। তারপর চ্যাটবক্সে‌ ফিরে চোখ বোলাতেই... মুচকি হেসে অগস্ত্য বেরিয়ে এলো ইনবক্স থেকে। তারপর কী মনে হতে ঢুকল লিজার ইনবক্সে।‌ আজ সকালে নাম্বার দিয়ে যাবার পর। নাম্বার দুটো নোট করেছিল অগস্ত্য। তখন খেয়াল করেনি, করলে এত খাটনি হত না। অগস্ত্য দেখল এত রাতেও লিজা অনলাইন বসে আছে।‌ চটপট টাইপ করে বার্তা পাঠালো অগস্ত্য। তারপর বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা চালিয়ে অফলাইন হয়ে নেমে এল নিজের ঘরে। 

*****
ফোনটা এল ঠিক সাড়ে এগারোটা নাগাদ। লিজা তখন অফিসে ছিল। ফোনটা আসতেই সে ফোনটা নিয়ে চেয়ার থেকে উঠে লেডিস ওয়াশরুমে ঢুকে রিসিভ করল।

“হ্যালো!"

“তা কী ঠিক করলে বেবিডল?"

উত্তরটা দিতে কয়েকমুহূর্ত ভাবল লিজা। তারপর থেমে থেমে বলল, “আমি রাজি! তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। ম্যাক্সিমাম আধঘন্টা! তবে আমার সামনে ভিডিওটা আর ওর সব সোর্স‌ ডিলিট করতে হবে। এই দুটো শর্তে রাজি থাকলে আমি আসবো।"

“ ওকে ডিল! আধঘন্টা এনাফ!"

“কোথায় আসতে হবে?"

“ ক্যাব পাঠানো হবে। ক্যাবে বেরোনোর সময় টেক্সট করো এই নাম্বারে। ক্যাব পৌঁছে দেবে। তোমাকে শুধু সেখানে এসে খোঁজ করতে হবে মি.গ্রেসনের।"

“কটার দিকে আসতে হবে?"

“রাত আটটার দিকে"

“হোয়াট! অতরাতে?"

“কলকাতার মতো শহরে রাত আটটা সন্ধ্যে বেবীডল!এতটা নখরা করার কিছু নেই। আটটার দিকে তোমার বাড়ির কাছে ক্যাব পৌঁছে যাবে।"
বলে ওপারের লোকটা কল কেটে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে লিজা আরেকটা নাম্বারে কল করে।‌ কথা বলার পর কলটা কেটে দাঁতে দাঁত চেপে কোনো মতে কান্না আটকে‌‌ লিজা আয়নার দিকে তাকায়।‌ খুটিয়ে দেখে নেয় মনের বিধ্বস্থ‌ ‌ভাবটা চেহারায় ফুটে উঠেছে‌ কিনা। না মনে হচ্ছে‌‌ না।‌ দু তিনবার আয়নার সামনে মেকি হাসির অভিনয় করে নেয় সে। মনের ভেতর যাই চলুক‌ বাইরের লোককে‌ বুঝতে দিলে চলবে না। বেসিনের কল চালিয়ে চোখে মুখে জল ছেটায় লিজা। তারপর যতটা সম্ভব সাজটাকে ঠিক করে একটা মেকি হাসি নিয়ে বেরিয়ে এসে নিজের কিউবিকলে বসে।

*****
ক্যাবটা যখন লিজাকে নিয়ে হোটেলটায় এসে পৌঁছল। তখন ঘড়িতে সাড়ে আটটা বেজে গেছে। লিজা ক্যাব থেকে নেমে হোটেলের সামনে দাঁড়াল। তাকিয়ে দেখল বেশ বড়ো আর অভিজাত হোটেল। তারমানে ইচ্ছে করেই লোকটা ওকে এখানে ডেকেছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে রিসেপশনের দিকে এগিয়ে গেল সে। কিন্তু রিসেপশন পর্যন্ত পৌঁছতে হল না তাকে। তার আগেই পেছন থেকে ওকে কে যেন নাম ধরে ডাকল। লিজা পেছন ফিরে দেখল হোটেলের একজন প্রৌঢ় স্টাফ তার দিকে এগিয়ে আসছে। লোকটা কাছে এসে বলল, “আর ইউ মিস.স্মিথ?"

লিজা মাথা নাড়তেই সে বলে, “কাম উইথ‌‌ মি। মি.গ্রেসন ইজ ওয়েটিং ফর ইউ।" বলে লোকটা হাটা দেয় লিফ্টের দিকে। চারদিকে একবার তাকিয়ে ধীরপায়ে লোকটাকে অনুসরন করে লিজা ঢোকে লিফ্টে। 

নির্দিষ্ট‌ তলায় পৌঁছনোর পর লিফ্ট থেকে বেরিয়ে লোকটা দেখিয়ে দেয় ঘরটা। তারপর “এঞ্জয় ইয়োরসেল্ফ!" বলে চলে যায়। লিজা কিছুক্ষণ লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর সামনের দিকে এগোয় । নির্দিষ্ট দরজাটার‌‌ সামনে দাঁড়িয়ে একমুহূর্ত দাঁড়ায় লিজা। তারপর কলিংবেলের বোতামটা টেপে। কিছুক্ষণ পর দরজাটা খুলে যায়। দরজার ওপারের মানুষটাকে দেখে অবাক হয়ে যায় লিজা। লোকটা হেসে সরে দাঁড়ায়। লিজা একদৃষ্টে লোকটার দিকে তাকিয়ে মন্থরপায়ে ঘরে ঢুকতেই দরজাটা বন্ধ করে দেয় লোকটা।

*****
দরজাটা খুলে একসাথে এত গুলো পুলিশ দেখে ঘাবড়ে যান মহিলাটি। অগস্ত্য গম্ভীর অথচ মৃদু কন্ঠে বলে ওঠে, “শ্যামবাজার থানা থেকে আসছি। মোহিত কী বাড়িতে আছে?"

মহিলা কোনোরকমে ঢোক গিলে বলেন,“হ্যাঁ কিন্তু কেন? কী করেছে ও?"

অগস্ত্য প্রশ্নটাকে পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করে,“ওর ঘরটা কোনদিকে বলবেন?"

কন্ঠস্বর শুনে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন একজন পুরুষ, “কি হয়েছেটা কী? আরে অগস্ত্য! কী ব্যাপার? "

লোকটাকে দেখে চিনতে পারে অগস্ত্য। মদনমোহনবাবু! সে এগিয়ে এসে বলে, “মোহিত কোথায় স্যার?"

“বাবু তো ওর নিজের ঘরে!"

“ওর ঘরটা কোনদিকে বলবেন স্যার?"

মদনমোহন দেখিয়ে দেন ঘরটা। “ইজ এনিথিং রং অগস্ত্য?"

“আপনাকে পরে বলছি।" বলে ঘরের দিকে এগোয় সে।

******
অগস্ত্যর গাড়ি যখন হোটেলে থামলো তখন রাত প্রায় পৌনে নটা। অগস্ত্যকে আসতে দেখে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এগিয়ে এলো অপালা। অপালাকে দেখে অগস্ত্য বলল, “কতক্ষণ এসেছ?"

“এই মিনিট পনেরো। লিজা ভেতরে গেছে স্যার। আপনার কথা মতো ওর ক্যাবটাকে আমরা ফলো করেছিলাম । কেউ টের পায়নি।" অপালা বলে ওঠে। 

“ওকে! লেটস গো!" বলে হোটেলের দিকে এগোয় অগস্ত্য । বাকিরা ফলো করে ওকে। হোটেলে ওকে ঢুকতে দেখে হাতে শ্যাম্পেনের বাকেট নিয়ে‌ এগিয়ে আসে সেই প্রৌঢ় কর্মচারীটি। অগস্ত্যর কাছে এসে লোকটা বলে, “সেভেন্থ ফ্লোর, রুম নাম্বার ৭০৪। দুজন আছে স্যার।" অগস্ত্য মাথা নেড়ে এগিয়ে যায় লিফ্টের দিকে। 

সেভেন্থ ফ্লোরে উঠে সবাইকে অ্যালার্ট হতে বলে দরজার সামনে দাঁড়ায় অগস্ত্য। তারপর কলিংবেল টেপে। ভেতর থেকে একটা জলদগম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে, “হুজ দেয়ার?" অগস্ত্য ইশারা করতেই প্রৌঢ় বলে ওঠে, “রুম সার্ভিস স্যার।" অগস্ত্যরা দরজা থেকে সরে আড়াল করে দাঁড়ায়। দরজাটা খুলে যায়। দরজার ভেতর থেকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ভদ্রলোক বাথরোব পরে বেরিয়ে‌ এসে বলে, “হোয়াট হ্যাপেনড?" প্রৌঢ় জানায় এই ঘর থেকে ওদের কাছে শ্যাম্পেনের অর্ডার এসেছে। ভেতরের ব্যক্তি বলে ওঠে, “আই থিঙ্ক ইউ হ্যাভ মিসটেকেন উইথ অ্যানাদার রুম। উই ডিড নট অর্ডারড এনি ড্রিঙ্ক। " বলে দরজাটা বন্ধ করতে যাবে এমন সময় দরজার সামনে প্রায় মাটি ফুড়ে উদয় হওয়ার মতো এসে দাঁড়ায় অগস্ত্য । স্পষ্ট অথচ গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে, “নো স্যার, উই হ্যাভ প্রপার ইনফরমেশন অ্যাবাউট দিস রুম।‌ ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড‌ ক্যান উই সার্চ ইয়োর রুম!"

লোকটা অগস্ত্যকে দেখে যতটা না ভড়কে গিয়েছিল তার চেয়ে বেশি ভড়কে যায় অগস্ত্যর কথা শুনে। কোনো মতে নিজেকে সামলে বলে, “সরি?"

অগস্ত্য এবার কেটে কেটে কথাগুলো বলে, “ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, ক্যান উই সার্চ‌ ইয়োর রুম?"

“হু দ্যা হেল আর ইউ? হোয়াই শুড আই লেট ইউ টু সার্চ‌ মাই রুম?" গর্জে ওঠে কৃষ্ণাঙ্গ।

“সরি টু বদার ইউ, বাট উই আর ইনফর্মড দ্যাট ইউ গাইজ‌ আর‌ ডেলিবারেটলি মেকিং পর্ণ ফিল্ম ইন দিস রুম।‌ দ্যাটস হোয়াই উই ওয়ান্ট টু সার্চ ইয়োর রুম। উই হ্যাভ এ সার্চ‌ ওয়ারেন্ট উইথ‌ আস।‌ নাউ ইফ ইউ প্লিজ লেট আস‌ এন্টার ইয়োর রুম ইট উইল বি বেটার ফর ইউ।"

জোকের মুখে যেন নুন পড়ে গেল এমন ভাব করে কাষ্ঠ‌হাসি হেসে কৃষ্ণাঙ্গ বলে ওঠে,

“আই থিঙ্ক ইউ হ্যাভ রং ইনফরমেশন অ্যাবাউট‌ মি। লিসেন অফিসার, আই এম এ রেসিডেন্ট অফ টরন্টো । আই কেম ইন্ডিয়া জাস্ট ফর ট্যুর পারপাস। ইফ ইউ ওয়ান্ট ইউ ক্যান চেক মাই পাসপোর্ট । আই রোমড মেনি কান্ট্রি ফর ট্যুরিজম । আই অ্যাম এ গ্লোবাল সিটিজেন। ইউ হ্যাভ নো রাইট টু ইন্টারফেয়ার মাই প্রিভেসি উইথ আউট দ্য পারমিশন অফ এমব্যাসি ! দিস ইজ আনএথিক্যাল!" 

“ হোয়াট ইজ এথিক্যাল এন্ড হোয়াট ইজ আনএথিক্যাল ইট ডিপেন্ডস অন ইয়োর বিহেভিয়ার মিস্টার গ্রেসন একেএ ম্যাডবুল! ইফ ইউ ডিডনট কো অপারেট উইথ আস দেন উই হ্যাভ টু অ্যারেস্ট ইউ ফর স্টপিং আস। নাও ইফ ইউ প্লিজ?"

এতগুলো লোককে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে লোকটা সরে দাঁড়ায়। অগস্ত্যরা এক এক করে ভেতরে ঢোকে। আর ভেতরে ঢোকা মাত্র বেডরুমের দৃশ্য দেখে রাগে ঘৃণায় সকলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ঘরের মাঝে একটা পেল্লাই কারুকার্য‌ করা খাট। তার চারদিকে রিফ্লেক্টর,ক্যামেরা, আলো দিয়ে সাজানো। যেন কোনো স্টুডিওতে ঢুকে পড়েছে তারা। রিফ্লেক্টরে আলো ঠিকরে এসে পড়ছে বিছানার শ্বেতশুভ্র চাদরে। কিন্তু এখানে কোনো সিনেমার শুটিং বা সিরিয়ালের শুটিং হচ্ছে না। অন্তত‌ বিছানায় যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে তাকে দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। বিছানার ঠিক মাঝখানে চিত হয়ে শুয়ে আছে চৈতন্যহীন লিজার দেহটা। খাটের চার বাজুতে শক্ত দড়ি দিয়ে লিজার হাত-পা বাঁধা। শরীরে সুতোর কোনো লেস মাত্র নেই।‌ বরং গোটা শরীর জুড়ে চপচপে করে লেপা হয়েছে এক ধরনের সুগন্ধী তেল। চারদিকের আলো সেই তেলে পড়ে লিজার দেহসৌষ্ঠবকে আরো চকচকে করে তুলেছে। লিজার মুখটা একটা বেল্ট দিয়ে বাঁধা। অগস্ত্য এক ঝলক সেদিকে তাকিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুড়িয়ে নেয়। অপালা চট করে মাটিতে পড়ে থাকা তোয়ালে দিয়ে লিজার দেহটা ঢেকে হাত-পায়ের বাঁধন খুলে গলার কাছে হাত রেখে মাথা নেড়ে জানায় লিজা অজ্ঞান হয়ে আছে।

অগস্ত্য পেছন ফিরে তাকায় কৃষ্ণাঙ্গ লোকটার দিকে। তারপর লোকটার কলার ধরে বলে, “সো দিস ইজ ইয়োর ট্যুর পারপাস? দিস ইজ ইয়োর প্রিভেসি মোমেন্ট হা? ইউ রোমড‌ মেনি কান্ট্রি ফর দিস? জাস্ট ফর ফাকিং ইনোসেন্ট গার্লস এন্ড আপলোড দেয়ার ভিডিওস উইথআউট দেয়ার কনসেন্ট?"

“বিলিভ মি অফিসার! আই ডিডনট ওয়ান্ট টু ডু দ্যাট। ইট ওয়াজ হার ফিয়ান্সেস প্ল্যান। দ্যাট ফাকিং কাকোল্ড‌ টোল্ড মি দ্যাট হি উইল ম্যানেজ হিজ গার্ল টু স্লেপ্ট উইথ মি! ইট ওয়াজ হিজ ফল্ট।"

“ডিড ইউ.....আই মিন..."

মাথা নাড়ে‌ কৃষ্ণাঙ্গ, “নো! আই হ্যাভন্ট‌ স্টার্টেড ইয়েট।‌ আই ওয়াজ জাস্ট গিভিং হার এ ইরোটিক ম্যাসাজ।" 

চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অগস্ত্য । তারপর জিজ্ঞেস করে, “হোয়্যার ইজ হি? দ্যাট ফাকিং বাস্টার্ড!" কৃষ্ণাঙ্গ বাথরুমের দিকে আঙুল দেখায়।‌ অগস্ত্য দরজাটায় ধাক্কা দিতেই খুলে যায় দরজাটা। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সেই ব্যক্তি যে এই সবকিছুর মূলে ছিল। লিজার বাগদত্ত হবু স্বামী, ওর এতবছরের বন্ধু, প্রিয়তম প্রেমিক ভিক্টর ডি'সিলভা।

******

“ভিকির উপর আমার সন্দেহ শুরু থেকে ছিল না। তবে ওকে বাইরেও রাখিনি।" বলে সিগারেটে শেষটান মেরে ফিল্টারটা মাটিতে ফেলে‌ পা দিয়ে‌ পিষে দেয় অগস্ত্য । কথা হচ্ছিল হোটেলে বসে। সারাদিন খাটাখাটনির পর‌ লিজাকে‌ উদ্ধার করে ওর বাড়িতে পৌঁছে, ভিক্টর আর ওর সাথী গ্রেসনকে জেলে পাঠিয়ে অবশেষে বাড়ি ফিরছে ওরা। গোটা রাস্তা লিজা হাউ হাউ করে কেঁদেছে। সেটাই স্বাভাবিক । ভিকির প্রতি লিজার বিশ্বাস অটুট ছিল। সেই বিশ্বাসটা ভেঙে যাওয়ায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে বেচারি। বাড়ি পৌঁছে অপালাকে জড়িয়ে হাউহাউ করে কাঁদছিল সে। ঘরে ঢোকার পর ভিকি একটা ড্রিঙ্ক অফার করে ওর সব কথা বলেছিল ওকে। রাগে ঘেন্নায় গা গুলোলেও ড্রিঙ্কের জন্য নেশাতে উঠে আসতে পারে নি সে। একসময় ঘুমে ঢলে পড়েছিল তারপর আর কিছু মনে নেই তার। লিজাকে বাড়িতে পৌঁছে রাস্তার ধারে‌ একটা হোটেলে খাওয়াদাওয়া সেরে সিগারেট ধরিয়েছে ওরা। ভিক্টর পুলিশের হাতে ধরা দিলেও পরে বেশ চিৎকার করে বলেছে সে দেখে নেবে পুলিশ ওকে কতদিন আটকে রাখবে। কোনো প্রমাণ নেই। 

“তবে যাই বলো মোহিত না থাকলে এটার কিনারা করা অসম্ভব ছিল। ও যদি সেই সময় ঐ ম্যাডবুলের খবর না দিতো কী হতো‌‌ বলো তো?" বলে সিগারেটে টান দেয় অপালা। 

“কী আর হত?আরেকটা রেপ কেস বাড়তো!কিন্তু তা হয়নি ওর একটা ছোট ভুলে। ভিডিওটা শেয়ার যখন করা‌ হয়েছিল তখন একটা জিনিস দেখে খটকা লেগেছিল। যে নাম্বারে ভিডিওটা এসেছিল‌ তার প্রোফাইল পিকটা ছিল একটা ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের। ছবিটা ভীষণ চেনা মনে হয়েছিল।‌ এদিকে ভিকিদের ছবিতে কোথাও না কোথাও এই গ্রেসনকে পেয়েছিলাম আমি। শুধু তাই নয় ভিকির মুখটাও চেনা লাগছিলো আমার।‌ লিজার ইন্সটাগ্রামেও ওদের কাপল পিকে ছবির কৃতজ্ঞতা গ্রেসনকে। ওর প্রোফাইলে যেতেই আমি অবাক! গোটা প্রোফাইল জুড়ে নগ্ন মডেলের ছবির ছড়াছড়ি! কিন্তু সবকটাই ক্যান্ডিড। তখনই আমি গুগলে সার্চ‌ মেরেছিলাম এই গ্রেসন বাবাজীকে নিয়ে।‌‌ ও বাবা দেখি ভদ্রলোক শুধু ছবিতুলিয়েই নন সাথে সাথে‌‌ একজন পর্ণতারকাও বটে!তখনই আমি চার্জ করি লিজাকে। এই গ্রেসন কে? জানতে পারি Maldives-এই আলাপ। ভদ্রলোক দারুন ছবি তোলেন, ভিকির কীরকম বন্ধু হন। আরো জানলাম ভদ্রলোক নাকি লিজাকে অ্যাপ্রোচ করেছিলেন । পাত্তা পান নি। তখনই আমার সন্দেহ হয়। একজন ব্যবসায়ীর বড়োলোক ছেলের সাথে পর্ণতারকার বন্ধুত্ব খারাপ না হলেও কেমন যেন দৃষ্টিকটুও বটে। লিজাকে গ্রেসনের ব্যাপারে সবটা জানিয়ে ওকে‌ বুঝিয়ে‌ বলি রাজি হতে। কিন্তু ওরা ক্যাব পাঠাবে এটা জানতাম না।‌ ফলে তোমাদের ফলো করতে বলে‌ বেরিয়ে আমি যাই মোহিতের কাছে। ছবিদুটো স্ক্রিনশট‌ তুলেছিলাম। সে দুটো‌ দেখাতেই মোহিত চিনে ফেলে জানায়। ভিকি ওর বাবার ব্যবসা সামলালেও আসলে এই গ্রেসনকে মেয়ে সাপ্লাই দিত পর্ণছবি শুট করার জন্য। কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারতো না ওরা ট্রিপের নামে কী করে বেড়াচ্ছে।”

“সত্যি! ভিকিকে দেখে বোঝা যায় না ও এত বড়ো একটা নোংরা কাজে যুক্ত!"

“ ওটাই তো! এতদিন সাথে থাকা লিজাও টের পায় নি এসবের। হয়তো আরো কটা দিন চলত এসব কিন্তু বাধ সাধল‌ লিজা।‌ Maldives-এ ওকে দেখে পাগল হয়ে গেল গ্রেসন। হবারই কথা। ভারতীয় হয়েও লিজার সৌন্দর্য্য পাশ্চাত্যের মেয়েদের দশ গোল দেবে। হয়তো অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বলেই এই সৌন্দর্য্য পেয়েছে সে। লিজাকে আধুনিকমনস্কা দেখে গ্রেসন একদিন কামনা করে বসল ওকে। কিন্তু লিজা ওকে জানাল ‌সে‌‌ ভিকির বাগদত্তা। প্রতিরোধ পেয়ে আহত পৌরুষ জেগে উঠল গ্রেসনের‌ সে দাবী করে বসল লিজাকে। ভিকি ব্যবসা বোঝে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ‌ আর একজন ভারতীয়র পর্ণগ্রাফিক ভিডিও‌র দর বিদেশে‌ মারাত্মক। সে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু লিজাকে‌‌ রাজি করা শক্ত।‌ অগত্যা এক ঘৃন্য ষড়যন্ত্রের জাল বুনলো‌ সে। ফোন চুরি থেকে লিজাকে‌ সেক্সটিং সবটা ওরই প্ল্যান ছিল মোটিভটা খাড়া করার জন্য। সেই জালে পা দিল লিজা। ভেবেছিল লিজাকে গ্রেসনের‌ হাতে তোলার পর ওকেও নিজের দলে টেনে নেবে। ইমেজের ভয়ে লিজাও রাজি হবে। কিন্তু মাঝখান থেকে ঘটে গেল আরেক ঘটনা। লিজা এলো‌ থানাতে আর‌ সবটা আমাদের জানাল। তারপর নামলাম আমরা। মোহিতের নামে সাইবার কেস‌ ছিল বটে তবে সেটা এথিক্যাল হ্যাকিংয়ের। সেই কারনে মোহিতের চাকরি হয় নি। তবে ও পুলিশ না হলেও পুলিশের সাহায্যে একপায়ে‌ খাড়া থাকে সবসময়। তোমাদের লোকেশন জানার পর ভিকির প্ল্যানটা শিওর হতে মোহিতকে জিজ্ঞেস‌ করলাম গ্রেসন এখন কোথায়? ও জানাল গ্রেসন ভারতেই আছে। এমন কি লোকেশন বের করে দিলো। সেটা নিয়ে রওনা হলাম আমরা।"

“যাক যার শেষ ভালো তার সব ভালো। ভাগ্যিস লিজা সাহস করে এসেছিল বলে‌ ওকে বাঁচাতে পারলাম!" বলে সিগারেটে শেষটান দিয়ে ফিল্টারটা ফেলে গাড়িতে উঠে বসে অপালা।‌" অগস্ত্য দাঁড়িয়ে থাকে‌ বাইরে কিছুক্ষণ তারপর স্বগোতোক্তির স্বরে বলে ওঠে,

“কষ্টের কথা কী জানো? লিজা সাহসটা করেছিল ব‌‌লে ওকে‌ বাঁচাতে‌ পেরেছি। কিন্তু লিজার মতো না জানি কত মেয়ে নিজের প্রেমিককে ভরসা করে নিজের জীবনের একান্ত গোপনীয় মুহূর্ত ফোনে বন্দি হতে দিচ্ছে। কিন্তু সেই ভরসার মূল্য‌ চোকাতে হচ্ছে সেই মুহূর্তকে সার্বজনীন হতে দেখে। আজকাল মোহিতের মতো বাচ্চাদের হাতে স্মার্টফোন, হাতের মুঠোয় দ্রুতগতির ইন্টারনেট, অথচ ওদের গাইড করা, ভালো খারাপ বোঝানোর কেউ নেই।‌ কেউ নেই খারাপ-ভালো স্পর্শ বোঝানোর। যৌনশিক্ষাও শেখানোর কেউ নেই। ফ‌‌‌লে‌ ওরা ঝুঁকছে আন্তর্জালের দিকে।‌ ক্লিক করলেই পেয়ে যাচ্ছে সেই নিষিদ্ধ বস্তু। যা খারাপ প্রভাব ফেলছে ওদের মনে। বয়ঃসন্ধিকালে যা করে ফেলছে পর্ণাশক্ত। ধীরে ধীরে গোটা একটা প্রজন্ম ভুলপথে চালিত হয়ে পরিণত হচ্ছে ক্রিমিনালে। অথচ‌ আমরা দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু করতে পারছি না। ‌লিজাদের মতো মেয়েরা ভালোবেসে‌‌ এদের কাছে সব উজার‌ করে দিচ্ছে আর এরা সেটার সুযোগ নিয়ে সর্বনাশের জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। লিজা তো বেঁচে গেছে। কিন্তু ওর মতো না জানি কত অভাগী না বলতে পেরে তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দিয়েছে। শেষ‌ করছে। আর আমরা নীরব দর্শকের মতো তা দেখছি। প্রেমের জালে জড়িয়ে একালের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করে তা আন্তর্জালে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এদের রক্ষার জন্য বাসুদেবও নেই।‌‌ আর আমরা পরাজিত পাণ্ডবের মতো নীরব হয়ে নির্লজ্জের মতো বসে আছি।‌ বসে বসে দেখছি।" বলে গাড়িতে বসে‌‌ মাথা নত করে অগস্ত্য । ওর অজান্তে চোখের কোণ বেয়ে বেড়িয়ে পড়ে দু ফোঁটা অশ্রু। 


সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...