অনুসরণকারী

রবিবার, ২৭ জুন, ২০২১

রামধনু এফ.এম




৯১.১৯ রামধনু এফ.এম-এ আপনারা শুনছেন জলতরঙ্গএবং আপনাদের সাথে রয়েছি আমি মধুজা। আচ্ছা কেউ কি খেয়াল করেছেন আজকের সন্ধ্যেটা, আজকের এই রাতটা বেশ অন্যরকম না? মানে সারাদিনের অসহ্য গরমের পর একপশলা বৃষ্টি এসে যেন চারদিকের পরিবেশ কে একলহমায় পাল্টে দিয়েছে। ভীষণ গরমে সারাদিন মুখ বুঁজে কাজ করে করে যাবার ক্লান্তি যেন একলহমায় অনেকটা কম হয়ে গেছে। গরমের তেঁতে যাওয়া মাটি থেকে বেরোচ্ছে একটা মিষ্টি সোঁদা গন্ধ যা ক্রমশ নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে মগজে। তার সাথে যোগ্য সঙ্গত করছে মাঠেঘাটে ব্যাঙের দল এবং ঝিঁঝিঁপোকারা। কলকাতা এবং শহরতলির শ্রোতারা এ রসে বঞ্চিত হলেও কলকাতার বাইরে যারা এই অনুষ্ঠান শুনছেন তারা নিশ্চয়ই অনুভব করছেন আজকের এই রাতটাকে। অফিস থেকে ফিরে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় আধো অন্ধকারে উপভোগ করছেন প্রকৃতির বৃষ্টিস্নাতরূপ। দেখতে পারছেন পুর্ণিমার জ্যোৎস্নার আলো গাছের পাতায় থাকা জলের কুঁচির সাথে মিশে তৈরি করেছে একটা মায়াময় পরিবেশ। মানে সব মিলিয়ে একটা বেশ মাদকীয় রোমান্টিক আবহাওয়া। আর এই আবহাওয়ায় কয়েকটা মিষ্টি দেখে গান হলে কেমন হয়? ব্যাপারটা বেশ জমে যাবে কি বলেন? ঠিক ধরেছেন! আজকের অনুষ্ঠানে এরকমই কিছু বাছাই করা গান নিয়ে হাজির হয়েছি আমি। আজ অনেকক্ষণ আপনাদের সাথে আড্ডা দেবো সাথে শুনে নেব আপনাদের কথা! তবে তার আগে অনুষ্ঠানটা শুরু করছি অরিজিত সিংহের কন্ঠে একটা মিষ্টি প্রেমের গান দিয়ে। তারপর ফিরবো আজকের আড্ডার বিষয় নিয়ে। ততক্ষণ শুনতে থাকুন জলতরঙ্গ৯১.১৯ এফ.এম-এ।

একটানা কথাগুলো বলে মাইক অফ করে অভ্যস্থ হাতে কনসোলের মাধ্যমে ডেস্কটপে লিস্ট করা গানগুলোর মধ্যে প্রথম গানটা চালিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো মধুজা। গোটা ঘর ছাপিয়ে বাইরে থাকা মাইক এবং সেই মুহূর্তের প্রত্যেকটা রেডিওতে ৯১.১৯ এফ.এম-এ বেজে উঠলো অরিজিতের ভরাট সুরেলা কন্ঠস্বর, “ফির লে আয়া দিল, মজবুর কেয়া কিজে…”। টেবিলে থাকা কফিমাগ হাতে নিয়ে মৃদু চুমুক দিতে দিতে পরের গানগুলো সাজিয়ে নিতে লাগলো সে। গানগুলো তার নিজের বাছাই করা। এই এক ক্ষেত্রে ওদের বস ছাড় দিয়েছে সবাইকে। শুধু শোয়ের আগে জানিয়ে দিতে হয় আজকের টপিকটা কী নিয়ে, তারপর সেই টপিক সম্পর্কিত সব গানবাছাইয়ের দায়িত্ব তাদের। এছাড়া সব জায়গাতেই খবরদারি তার। শো টাইমের শিডিউলের সামান্যতম দেরী সহ্য করে না তাদের বস অংশুমান দেবনাথ। এমনকি অফিসে দেরী করে পৌঁছলেও হাজারটা কৈফিয়ত হয় তাদের।

অবশ্য এতে অংশুমানকে দোষ দেওয়া যায় না। অফিসটা সবে দু-বছর হলো খুলেছে। আর দুবছরের মাথাতেই প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের প্রিয় হয়ে উঠেছে চ্যানেলটা। বিশেষ করে প্রৌঢ় আর বৃদ্ধ মানুষের কাছে সকালের অনুষ্ঠানের ক্রেজ দেখার মতো। বাড়িতে দেখেছে সে বাবাকে রেডিও নিয়ে বসে থাকতে। ধীরে ধীরে শহরে চ্যানেলটা গ্রোথ করছে ভীষণ স্লথগতিতে কিন্তু করছে। বড়ো বড়ো কোম্পানিদের কাছে পাত্তা না পেলেও ক্রমশ চর্চায় আসছে ওদের চ্যানেল। এখন একটা ভুল হলে বা শ্রোতাদের খুশি না করতে পারলে দায়টা অংশুমানের ঘাড়েই পড়বে। সে কারনে অংশুমানের মেজাজ সবসময় চড়ে না থাকলেও যেদিন থেকে এখানে এসেছে সেদিন থেকে অংশুমানকে সব সময় গম্ভীরমুখেই দেখে আসছে তারা। অংশুমানকে কোনোদিনও হাসতে দেখেনি কেউ। সবসময় ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভেবেই চলেছে সে। আর যখন পারছে তখন অফিসের কাউকে না কাউকে কাজে ঢিলেমি দেওয়ার জন্য কথা শুনিয়ে চলেছে। অগত্যা অফিসের সবাই সবসময় অংশুমানকে বুঝে শুনে চলে। কারো যদি ডাক পড়ে তাহলে অফিসে একটা কথাই ওঠে, “আজ হিটলারের হাতে জবাই হলো বলে!

গানগুলো ক্রমানুযায়ী সাজিয়ে নেওয়ার পর কফিমাগ হাতে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মধুজা। একচুমুক দিয়ে বোঝে আজকেও কফিতে চিনি দিতে ভুলে গেছে পল্টুদা। এ নিয়ে অংশুমানের সাথে আগেও ঝামেলা হয়েছে ওর। অংশুমানের নর্মাল কফি পছন্দ, মানে চিনি, দুধ, আর কফি সবকটাই সমান মাপের হবে। আর পল্টুদা বার বার এই নিয়ম ভাঙবে। কোনোদিন চিনি বেশি, কোনোদিন দুধ,আবার কোনো দিন দুটোর একটা কম। ব্যস! অংশুমানের মেজাজ চড়ে যাবে সপ্তমে। মাঝে মাঝে অংশুমানের মেজাজ গরম থাকলে ওরা ধরে নেয় আজ কফিতে কেলেঙ্কারি করেছে পল্টুদা। আজকেও হয়তো এতক্ষণে হয়তো আবার ঠাই ঠাই লেগে গেছে অংশুমানের সাথে। মুচকি হেসে কফিতে চুমুক দেয় মধুজা। নাহ সকাল থেকে গলাটা খুসখুস করছে। চিনি ছাড়া হোক বা দুধ ছাড়া, গরম পানীয়টা খেলে গলাটা খুলবে। অতীন বলতো শোন! তোর যা প্রোফেশন তাতে সুললিত কন্ঠের অধিকারীনি না হলেও খোলা গলার অধিকারীনি হতে হবে তোকে। তার জন্য গলার যত্নটা কম্পালসারি। তাই রোজ গার্গল তো করছিস ঠিকই কিন্তু শোতে কফি,চা বা গরম পানীয় কিছু একটা খাবি! এতে গলা খোলে ভালো। আর সাথে যদি আদা বা লবঙ্গ ফোটানো জল থাকে তাহলে তো কথাই নেই। দারুন কাজ করবে।

অতীনের কথা মনে পড়তেই একটু আগে ফুটে ওঠা হাসিটা মিলিয়ে যায় মধুজার। একবছর হয়ে গেল কোনো পাত্তা নেই হতভাগাটার। না কোনো ফোন, না হোয়াটসঅ্যাপে রিপ্লাই। কোথায় আছে কেমন আছে কে জানে? স্টুডিওর জানলার দিকে তাকায় মধুজা। বৃষ্টি থামলেও আকাশে মেঘ এখনও থম মেরে রয়েছে। রাতে আবার হয়তো একপ্রস্থ বৃষ্টি হবে। গতবছর ঠিক এরকমই এক বৃষ্টিমুখর দুপুরে শেষ দেখা হয়েছিল ওদের। অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে বসেছিল ওরা পরস্পরকে। সেদিন শ্রাবণের মেঘ ঘনিয়েছিল মধুজার দুচোখেও। অতীনের বুকে মাথা গুঁজে অনেকক্ষণ ফুপিয়ে কেঁদেছিল সে। অতীন মধুজার মাথায় হাত বুলিয়ে বার বার প্রবোধ দিচ্ছিল, “আরে ধুর পাগলি! আমি কি সারা জীবনের মতো চলে যাচ্ছি নাকি?কয়েকটা মাসের তো ব্যাপার! দেখবি ঝপ করে কেটে গেছে। আর আমি ফিরে এসেছি। তবে হ্যা তোর শো খুব মিস করবো আমি। কিন্তু মধুজার কান্না কিছুতেই থামছিল না। বার বার মনে হচ্ছিল এটাই যেন অতীনের সাথে ওর শেষবারের মতো দেখা। অবশ্য প্রতিবার অতীনের ফেরার সময় হলে এই ভয়টাই জাকিয়ে বসতো মধুজার মনে। অতীন না থাকলে সেই ভয়টাকেই আশ্রয় সরে আশঙ্কায় দিন কাটতো তার। অবশ্য সে ভয় কেটে যেত অতীনের বাড়ি ফেরার পর। বাড়ি ফিরেই অতীন ওকে ফোন করে দরাজ গলায় গাইতো তুম নে বুলায়া অউর হাম চলে আয়! দিল পুকারে চায়! চায়!গরম চায়! বলে ফিক করে হেসে ফেলত নিজের রসিকতায়। কিন্তু সেদিন কেন জানে না মধুজার কান্না থামছিল না। অতীন অনেক কষ্টে বুঝিয়ে শান্ত করেছিল মধুজাকে। তারপর সেদিন সন্ধ্যায় নিজের কর্মক্ষেত্রে ফিরে গিয়েছিল ক্যাপ্টেন অতীন রায়চৌধুরী। সম্বিত ফিরতেই কফি মাগটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসে মধুজা। দ্বিতীয় গানটা প্রায় শেষের দিকে। গানটা শেষ হওয়ামাত্র মাইক অন করে অনুষ্ঠান শুরু করে সে।

 

অনুষ্ঠান শেষ করে মধুজা যখন স্টুডিও থেকে বেরোলো তখন ঘড়ির কাটা প্রায় রাত সাড়ে নটার ঘরে পৌঁছে গেছে। নিজের টেবিলে গিয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে অফিসের বাইরে বেরোনো মাত্র থমকে গেল মধুজা। গোটা রাস্তা জলকাদায় অসম্ভব রকমের প্যাচপ্যাচে হয়ে আছে। এই জলকাদা পেরিয়ে বড় রাস্তায় ট্যাক্সি ধরা অসম্ভব। রোজকার মতো সালোয়ার কামিজ বা জিন্স কুর্তি পরা থাকলে অসুবিধে ছিলো না। কিন্তু আজ রবীন্দ্রজয়ন্তী। অংশুমানের কড়া নির্দেশ অফিসের সবাইকে আজ ট্র্যাডিশনাল পোশাক পরে আসতে হবে। মেয়েরা শাড়ি পরবে আর ছেলেরা ধুতি পাঞ্জাবী। সেই মতো আজ অনেক খুঁজে একটা লিনেন শাড়ি বেছে পরে এসেছিল সে। সারাদিনের গরমের পর বিকেলে এরকমভাবে বৃষ্টি হবে কে জানতো? এই জলকাদায় এগোলে শাড়ি তো নোংরা হবেই, কাদায় পা পিছলে পড়লে আরেক ঝামেলা। সাইডব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে উবের অ্যাপটা ওপেন করে সে। কিন্তু সেখানেও কোনো ক্যাব এভেলেবল নেই দেখে প্রমাদ গোনে সে। আকাশের গতিক ভালো ঠেকছে না, যখন তখন আবার বৃষ্টি আসতে পারে। কিন্তু এভাবে তো আর সারারাত এখানে থাকতে পারে না সে! কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর বৃষ্টি আসছে দেখে বড় রাস্তার দিকে পা বাড়ালো সে।

ট্যাক্সিটা যখন মধুজাদের পাড়ার সামনে দাঁড়ালো তখন বৃষ্টির জোরটা বেশ বেড়ে গেছে। ভাড়া মিটিয়ে ছাতা মাথায় ট্যাক্সি থেকে নামলেও বৃষ্টির ছাঁটে পুরোপুরি ভিজে গেল মধুজা। কোনো মতে বাড়ির সামনে পৌঁছে কলিংবেল বাজালো সে। দরজা খুলে মধুজার মা বললেন, “আজ এত দেরী?” ঘরে ঢুকে ছাতা বন্ধ করে দরজার পাশে রেখে মধুজা বলল, “ যা বৃষ্টি শুরু হয়েছে! গোটা শহরে একহাঁটু জল জমে। তাও তো ট্যাক্সিওয়ালা শর্টকার্ট দিয়ে নিয়ে এলো নাহলে আরও দেরী হতো।

একটা ফোন করতে পারতিস ! তেমন হলে তোর বাবা গিয়ে নিয়ে আসতো।

পাগল! কদিন ধরে বাবার সর্দির ধাতটা বেড়েছে জানো? এই সর্দি নিয়ে যদি এই জলঝড়ের রাতে বেরোলে আর দেখতে হবে না!

তাও দিনকাল ভালো নয়! না জানে কোথা থেকে কী…” বলতে গিয়েও থমকে যান মধুজার মা। মধুজা বোঝে মা কী বলতে চাইছেন। সে হেসে মায়ের কাঁধে হাত রেখে বলে, “উফ! মা! আমি এখন আর কচি খুকি, বা কলেজে পড়া তন্বী নই। তাছাড়া যেখানে আমি কাজ করি সেখানে এরকম কোনো ভয় নেই। কাজেই ভয় পেও না।

তাও এত রাত করে বাড়ি ফেরাটা…” বলে আমতা আমতা করেন মধুজার মা। মধুজা হেসে বলে কাজটা না করলে যে বাড়িতে বসে বসে পাগল হয়ে যাবো মা! নাহলে প্রতিটা মুহূর্তে অতীনের চিন্তা আমাকে পাগল করে দেবে। এর চেয়ে কাজে, গানে ডুবে থাকলেই আমি ভালো থাকি। আর লোকের কাজ হল কথা বলা, তাই বলে। আজ যারা আমার কাজ নিয়ে বলছে, তাদের কথা শুনে আমি কাজ ছেড়ে বসে থেকে পাগল হয়ে গেলেও কথা বলবে। বলবে অতীন কবে ফিরবে তার ঠিক নেই। তার চেয়ে অন্য কোনো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দাও। সবার কথা ভেবে, সবার কথা শুনে যদি চলি, তাহলে ভগবান আমাদের বোধবুদ্ধি দিলেন কেন? ওসব কথা বাদ দাও আজকে রাতের মেনু কী গো? খুব খিদে পেয়েছে!

মধুজার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, “তোর সাথে কথায় পারা যাবে না। যা ভেজা কাপড় পাল্টে হাত মুখ ধুয়ে আয়। আজকে তেমন বেশি কিছু রান্না করিনি। ওবেলার চিংড়িমাছের ঝোল ছিল এবেলা শরীর ভালো লাগছিল না বলে ভাত করেছি। তুই ফ্রেশ হয়ে নে আমি খাবার গরম করছি।

উফ! কী করেছটা কি মা? আজকের রাতের খাবার জাস্ট জমে যাবে মা!বলে মাকে জড়িয়ে ধরে মধুজা। আরে আরে ছাড় ছাড়! বাইরের পোশাকে ছুঁয়ে নিচ্ছে দেখো! আগে হাত মুখ ধুয়ে মাথাটা মুছে নে! ইস! শাড়িটার কি দশা করেছিস মধু! পুরো কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে! শীগগিরই বাথরুমে বালতিতে ভিজিয়ে দিয়ে আয়! নাহলে দাগ উঠবে না।বলে চেচিয়ে ওঠেন মধুজার মা।

মধুজা মাকে ছেড়ে নিজের ঘরে ঢুকে সাইডব্যাগটা টেবিলে রেখে আলনা থেকে একটা তোয়ালে আর একটা নাইটি নিয়ে ঢুকে যায় বাথরুমে। পরনের পোশাক খুলে বাথরুমে বালতিতে ভিজিয়ে দিয়ে শাওয়ারের কলটা খুলে দেয় সে। এটা ওর বরাবরের অভ্যেস। বাড়িরে ফেরার পর রোজ রাতে স্নান করে সে। বৃষ্টিতে ভেজার পর তো আরও ভালো করে স্নান করে নেয় সে। এতে বৃষ্টির জলও ধুয়ে যায়, ঠান্ডাও লাগে না। শাওয়ারের জল ক্রমশ ভিজিয়ে দেয় মধুজার সমগ্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে। সে অনুভব করতে থাকে একেকটা জলকণাকে। যেন প্রতিটা জলকণা ক্রমশ তাকে স্নিগ্ধ করে তুলছে, ক্রমশ শুষে নিচ্ছে তার সারাদিনের যাবতীয় ক্লান্তিকে। সে অনুভব করে ধীরে ধীরে তার শরীরটা পালকের মতো হাল্কা হয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমনটা হতো অতীনের সাথে দিনের শেষে কথা বলার সময়।

সারাদিনের রোজনামচা, মনের কথা সবটা সে রাতের বেলা ফোনে বলতো অতীনকে। আর অতীন নির্বাক শ্রোতার মতো ফোনে শুনে যেত ওর একনাগাড়ে বকবক করে যাওয়া কথাগুলো। একবছর হতে চলল অতীনের সাথে তার কোনো কথা হয়নি। অনেক কথা জমে আছে তাদের মধ্যে। কে জানে কোথায় আছে হতভাগাটা। ভাবতে ভাবতে শাওয়ার বন্ধ করে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে নাইটিটা গায়ে গলিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে মধুজা। সারাদিনের পর স্নান করে ফ্রেশ লাগছে।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে সে দেখে মা টেবিলে খাবার রাখছেন। মাছের ঝোলের একটা মিষ্টি ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে গোটা ঘরে। নিজের ঘরে ঢুকে তোয়ালেটা মেলে দিয়ে এসে টেবিলে বসে মধুজা। মা তাকে ভাত বেড়ে দিয়ে পাশে বসেন। বাটি থেকে অল্প ঝোল ভাতে নিয়ে মাখতে মাখতে মধুজা জিজ্ঞেস করে, “তোমরা খেয়েছ?” মধুজার মা মাথা নাড়েন।

মধুজা ভাত মেখে খেতে থাকে চুপ করে। কিছুক্ষণ পর মা জিজ্ঞেস করেন, “কালকেও কি তোর শো আছে?” মধুজা চিংড়ি মাছে খোঁসা ছাড়িয়ে খেতে খেতে বলে, “হুম। কেন কাল কী আছে?”

না, একবার ভাবছিলাম ওদের বাড়ি যাবো। অনেকদিন যাওয়া হয় না। কেমন আছেন ওনারা কে জানে? শুনেছিলাম অতীনের বাবার নাকি গতসপ্তাহে স্ট্রোকের মতো হয়েছিল।

হুম। পরে জানা গেছে গ্যাসের ব্যাথা উঠেছিল। তার উপর নাকি নিউজ দেখছিলেন উনি। ব্যাস নির্ঘাত উত্তেজক কিছু খবর দেখে প্রেসার বেড়ে গেছে। আমি খোঁজ নিয়েছিলাম এখন ঠিক আছেন।

তাও কাল আমি একবার দেখা করে আসবো। কাল ডুব দিতে পারবি না?”

না গো! কাল আমাদের অফিসে এক অনুষ্ঠান আছে। আমাদের স্টেশন এবার শ্রুতিনাটক লঞ্চ করতে চলেছে। জয়ন্ত মিশ্র আসছেন কাল আমাদের প্রথম শ্রুতি নাটকে।

কি যে এমন চাকরি করিস বুঝি না। জয়ন্ত মিশ্র আসছেন তো তাতে তোর কি? এতদিন ধরে কাজ করছিস। একদিন ছুটি পাবি না?”

মুচকি হাসে মধুজা, “রেডিও জকিদের কাজ ওরকমই মা। সহজে ছাড় নেই। শো থাকলে করতেই হবে। আর আমি যদি ডুব দিই তাহলে আমার যায়গায় আরেকজনের কাজের চাপ বেড়ে যাবে। কাজেই দা শো মাস্ট গো অন! তাছাড়া আমি না গেলে শো হবে না। তবে চিন্তা করো না। কাল অফিসে যাবার সময় আমি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবো। আর ফেরার সময় নাহয় বাবা তোমাকে নিয়ে আসবে। তা কখন যাবে?”

ভেবেছিলাম বিকেলে যাবো। কিন্তু তুই তো ঝামেলায় ফেলে দিলি! সকালে যাবো, কী ভাববেন ওনারা?”

কিছু ভাববেন না। বরং খুশিই হবেন। কাকিমা তো সই বলতে অজ্ঞান। দেখবে দুই সইতে গল্প করতে করতে দিনটা দারুণভাবে কেটে গেছে।

এবার মধুজার মাও হেসে ফেলেন। তা ঠিক! কতদিন কথা হয় না আমাদের মধ্যে। আমাদেরর তো আর তোদের মতো হোয়াটস্যাপের বালাই নেই। আর ওই ফোনে প্রাণভরে কথাও হয় না। মুখোমুখি কথা বলেই আনন্দ পাই। তা হ্যাঁরে তুই বলছিস জয়ন্ত মিশ্র আসছেন। কিন্তু তুই না থাকলে শো হবে না মানে?”

খাওয়া থামিয়ে রহস্যের হাসি হাসে মধুজা। কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে মা বলেন, “কার গল্প বলতো?”

কোন মাস চলছে?” বলে হাসে মধুজা। মা চমকে তাকান মেয়ের দিকে। মধুজা হেসে বলে মুক্তির উপায়!

কোন চরিত্রে?”

জয়ন্ত স্যার ষষ্ঠীচরণের চরিত্রে। আমি মাখনলালের ছোটো স্ত্রীর রোলে।বলে টেবিল থেকে থালাটা নিয়ে রান্নাঘরে সিঙ্কে রেখে হাত ধুয়ে নিলো মধুজা।

আগে বলিস নি কেন?” বলে চিৎকার করে উঠেও নিজেকে থামালেন মা। মধুজা হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “সারপ্রাইজ মাদার ইন্ডিয়া! আমি জানি জয়ন্ত স্যার তোমার পছন্দের ভয়েস আর্টিস্ট। তাই চুপ করেছিলাম চমকে দেবো বলে। কেমন লাগলো সারপ্রাইজটা?”

মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মা জিজ্ঞেস করলেন, “কটার দিকে টেলিকাস্ট হবে?”

দুপুর দুটোর দিকে। লাইভ গল্প পাঠ করবো আমরা। তখন কিন্তু ফোন করতে পারবে না বলে রাখলাম!

আচ্ছা ঠিক আছে! তুই বেরোবি কটার দিকে?”

সকাল দশটার দিকে।

*****

কিরে আর কতক্ষণ? ওদিকে তো অঞ্জলী শুরু হলো বলে!মধুজার ঘরের বাইরে চিৎকার করে অতীন।

আসছি আসছি! উফ এত তাড়া কেন দিচ্ছিস? শাড়িটাও পরতে দিবি না নাকি?” বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে পালটা চিৎকার করে মধুজা।

তোদের নিয়ে আর পারা যায় না! সাজতে বসলে সারা দিন পার! আরে এত সাজার কি আছে? তোদের ওই শাড়ির অ্যাডের মতো ছোটো টিপ, হাল্কা লিপস্টিক আর শাড়ি পরলেই তো হলো! তা না গাদাগুচ্ছের মেকাপ নিয়ে বসবি তোরা।বলে দরজায় ধাক্কা মেরে বলে কিরে হল?”

অসভ্যের মতো দরজায় ধাক্কা দিবি না তো! তেমন তাড়া লাগলে তুই চলে যা। আমি ট্যাক্সি করে চলে আসবো। আর যেটা জানিস না সেটা নিয়ে বকবক করিস না তো! আমাদের একটু সাজতে সময় লাগে।গর্জে উঠল মধুজা।

ফাজলামো করার জায়গা পাও নি? বাড়ি থেকে পাঠালো তোকে নিয়ে আসতে আর তুই বলছিস একা চলে যাবি? বাড়িতে শুনলে আমার কপালে দুঃখ আছে।

বাবা! ক্যাপ্টেন অতীন রায়চৌধুরী মাকে ভয় পায়?” বলে হেসে ফেলল মধুজা।

অতীন বিরক্ত হয়ে বসল ড্রইংরুমে। এখন ঝগড়া করলে চলবে না। উল্টে দেরী হয়ে যাবে। মেয়েদের তৈরী হতে এত সময় কেন লাগে বোঝে না অতীন। এত সাজার কি আছে? মা-বাবা কি ওকে প্রথমবার দেখছে নাকি? একদিকে ওরা ছেলেরা বেশ। পোশাক যাই হোক না কেন চটপট করে পরে নিলেই হল। এখন এর কতক্ষণ লাগবে কে জানে? ভাবতে ভাবতে আচমকা অতীন দেখল মধুজা দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। আজকে পরেছে হাল্কা গোলাপি পাড়ের সাদা শাড়ি। সাথে ম্যাচিং কানের দুল আর প্রসাদনী। অপুর্ব লাগছে মধুজাকে।

"কী দেখছিস ওরকম ড্যাবড্যাব করে?”

মধুজার ডাকে সম্বিত ফেরে অতীনের। আর সম্বিত ফেরা মাত্র লজ্জায় মাথা নামিয়ে ফেলে সে। এর আগেও সে মধুজাকে শাড়িতে দেখেছে। কিন্তু কোনোবারই এতটা স্নিগ্ধ, এতটা মিষ্টি লাগে নি তার। হয়তো আগে এভাবে খেয়াল করেনি সে। সে আবার তাকায় মধুজার দিকে। সাধারণ সাজ সেজেছে মধুজা আজকে। বেশি উগ্র বা বেশ ম্লান সাজ নয় বরং বেশ পরিপাটি সাজ। সদ্যস্নাতা মুখে একটা স্নিগ্ধতা ফুটে উঠেছে। চোখে হাল্কা করে কাজল আর ঠোঁটে হাল্কা গোলাপী লিপস্টিকে অনন্যা লাগছে মধুজাকে।

মধুজা শাড়ির কুঁচিটা সামলাতে সামলাতে ড্রইংরুমে এসে জিজ্ঞেস করলো, “কী হলটা কি? ওরকম হা করে কী দেখছিস?” মুচকি হেসে অতীন বলে কিছু না!রেডি তো?”

মধুজা মাথা নেড়ে জুতোর তাক থেকে থেকে চটিটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অতীনের সাথে।

বাড়ির সামনেই পার্ক করা ছিলো অতীনের বাইক। অতীন বাইকে বসে। মধুজা ওর মাকে বলে বেড়িয়ে আসে। মধুজা বাইকে বসামাত্র অতীন বাইকে স্টার্ট দেয়। দুজনে বেরিয়ে পড়ে কলেজের উদ্দেশ্যে। তবে তার আগে একবার ঢু মারতে হবে অতীনদের বাড়িতে। ওদের বাড়িতেও বেশ বড়ো করে সরস্বতী পুজো হয়। বাইকে বসার পর মধুজার খটকা লাগে। যে ছেলে একটু আগেও ঝগড়া করছিল হঠাৎ করে কেমন যেন চুপ মেরে গেছে। ব্যাপারটা কী? একটু আগেও দেরী হচ্ছিল বলে তাড়া দিচ্ছিল, যে ছেলে অন্যদিন সামান্য দেরী হয় বলে গজগজ করে হঠাৎ এরকম চুপ হয়ে গেল কী করে? ব্যাপারটা আন্দাজ করতে অতীনকে তাতানোর জন্য মধুজা বলে ওঠে, “তোদের বাড়ি অঞ্জলী দিয়ে কিন্তু আগেই কলেজে যাবো না। আগে যাবো বইপাড়ায়, তারপর যাবো মিতাদের মেসে, তারপর কলেজে যাবো। আগে কলেজে গেলে আর দেখতে হবে না। অভয় আর স্নেহাদের পাল্লায় পুরো দিনটা মাটি হয়ে যাবে। তুই বরং মিতাদের ওখানে আমাকে নামিয়ে কলেজে চলে যাস। হাওয়া কেমন দেখে আসিস তারপর নাহয় কলেজে যাওয়া যাবে। তেমন হলে কলেজে আজ পা রাখবো না।অতীন জবাবে শুধু একটা হুম!বলে।

মধুজা অবাক হয়ে যায়, ব্যাপারটা কী? অন্যদিন হলে এতক্ষণে মুখে খই ফুটতো বাবুর। প্রতিবাদ করে বাইক থেকে নামিয়ে দিয়ে বলতো, “ ট্যাক্সি ধরে চলে যা! আমি তোর ড্রাইভার নই! ভাগ!সেই ছেলে রাজি হয়ে গেল! অদ্ভুত তো! মধুজা ব্যাপারটা বোঝার জন্য নিজের বকবক চালিয়ে গেল কিন্তু অতীনের তরফ থেকে দু-একটা হুম!ছাড়া আর কোনো জবাব পেল না। অতীন গোটা রাস্তা উপচাপ বাইক চালিয়ে গেল। মধুজা বুঝতে পারলো না ব্যাপারটা কী। বুঝতে পারলে হয়তো লজ্জায় ওর মুখও ওর শাড়ির মতো গোলাপী আভায় ভরে যেত।

আর অতীন? সে বেচারা কীভাবে রাস্তায় বাইক চালিয়েছে সেই জানে। গোটা পথে তার মনোসংযোগ ব্যাহত হচ্ছিল দুটো কারনে। এক যতবার সামনের দিকে তাকাচ্ছিল প্রতিবার ওর চোখের সামনে ভেসে আসছিল সদ্যস্নাত, সেজে ওঠা এক তরুণীর মুখ। যাকে সে স্কুলবেলা থেকে দেখে আসছে। যাকে আগেও অনেকবার দেখেছে সেই তরুণীর শাড়িতে নতুন করে আবিস্কার করা রূপ বার বার ধরা দিচ্ছিল তার চোখের সামনে। আর একটা মিঠে ফুলেল গন্ধ তার নাকে প্রবেশ করে পাগলপারা করে তুলছিল বারংবার। ভাগ্যিস মধুজা বকবক করে ওর মনোসংযোগ ফিরিয়ে আনছিল। নাহলে রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট করে বসতো সে।

বাড়ির সামনে বাইকটা থামালো অতীন। মধুজা বাইক থেকে নেমে ঢুকে গেল বাড়ির ভেতরে। অতীন পেছন থেকে দেখতে লাগল ওকে, তারপর নিজেকে ধমকালো। কী হচ্ছেটা কি? এর আগেও তো কতবার মধুজাকে সে শাড়িতে দেখেছে কই এরকম তো আগে হয় নি! সব হিসেব কেন গুলিয়ে যাচ্ছে তার? কেন মনে হচ্ছে সময়টা এখানেই থমকে গেলে ভালো হয়? কেন এরকম হচ্ছে? কেন? তবে কি সে প্রেমে পড়ে গেল? ধুস! তা কীকরে হয়? ওরা তো ভালো বন্ধু! মধুজা জানতে পারলে বিচ্ছিরিভাবে হাসবে! ভীষণ বোকা বোকা লাগছে নিজেকে। কিন্তু কেন জানে না মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবটা সে দেখছে, শুনছে, অনুভব করছে সব মিথ্যে। শুধু তার আর মধুজার এতটা পথ আসাটা সত্যি। আশ্চর্য এরকম মনে হচ্ছে কেন? চেষ্টা করলেও কিছুতেই এই মুগ্ধতাকে তাড়াতে পারছে না কেন সে? ভাবতে ভাবতে বাইকটা লক করে নিজের বাড়িতে ঢুকল সে।

গোটা রাস্তা অতীন চুপ করে বাইক চালাচ্ছে দেখে মধুজা আর থাকতে পারলো না। সে বলল, “গাড়ি থামা!অতীন কথামতো বাইকটা রাস্তার ধারে দাঁড় করালো। মধুজা বাইক থেকে নেমে বলল, “তোর কী হয়েছে বলতো? সেই সকাল থেকে দেখছি কেসটা কী বস? সকালে আমাকে দেখে সেই যে চুপ মেরে গেলি তারপর সারাদিন সাইলেন্ট মোডেই আছিস ব্যাপারটা কী? এই! আমাকে এই শাড়িতে ভালো লাগছে না নাকি? এবার বুঝতে পারছি! মিথ্যে বলবি না! আমি সবটা লক্ষ্য করেছি। তোদের বাড়িতে অঞ্জলী দেওয়ার সময় তুই আমার দিকে হা করে তাকিয়েছিলি। মিতাদের মেসেও যখন ঢুকছি একই ভাবে তাকিয়েছিলি, কলেজেও সেম! সত্যি করে বল! বাজে লাগছে না? আমি জানতাম! আমি জানতাম! মাকে বলেছিলাম এই শাড়িটা পরবো না! এই শাড়িটা পরলে আমাকে বুড়ি বুড়ি লাগবে। কিন্তু মা শুনলো না। আজকে মায়ের হবে! তোরও বলিহারি যাই! তখনই বলতে পারলি না? এভাবে শোধ নিলি? ইস কলেজে ওরা আমাকেইস! অতীন!

অতীন চুপ করে শুনছিল মধুজার বকবক। সত্যি কথা বলতে গেলে ওর বেশ ভালোই লাগছিল মধুজার এই বকবক, এই টেনশন। মনে হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে মধুজা এইভাবে বকবক করতে থাকুক। আর ও নির্বাক শ্রোতার মতো শুনতে থাকুক। কিন্তু মধুজার চোখ ছলছল দেখে আর থাকতে পারলো না সে। ফিক করে হেসে মধুজার ঠোঁটে একটা আঙুল চাপা দিয়ে থামিয়ে দিল সে। তারপর হেসে বলল, “বাপ রে বাপ! কত বকিস তুই! একবার শুরু করলে থামতে চাস না। কাকু ঠিকই বলে! তোর জন্য রেডিও জকির কাজই পারফেক্ট! সারাদিন বকবকম আর বকবকম! এবার থাম মা! ভীষণ খিদে পেয়েছে আমার। তোর বকবক শুনে আমার পেট ভরবে না। সেই সকালে দুটো ফল খেয়ে বেরিয়েছি আর দুপুরের ঐ চাইমিন পেটের এক কোনো পড়ে আছে। আর তোরও সেম কেস! এখন রিচার্জ না করালে বকবকম কিছুক্ষণ পর ঘ্যানঘ্যানানিতে পরিণত হয়ে যাবে। অগত্যা রাস্তায় কান্নাকাটি করে সিন ক্রিয়েট না করে চল সামনে একটা পার্ক আছে সেখানে বসবো। সেখানে ভালো এগরোল পাওয়া যায়। সেখানে এগরোল খেতে খেতে তোর সব কথার জবাব দিচ্ছি।

অতীনের এহেন জবাবের আশা করে নি মধুজা। সে অবাক হয়ে দেখলো ওর বকবকানিতে অতীন বিরক্ত হয়নি একবারও! বরং মজা পেয়ে হাসছে! মধুজা চুপ করে উঠে বসে অতীনের বাইকে। অতীন বাইক স্টার্ট দিয়ে কিছুদুর এগোনো মাত্র ব্যাপারটা বুঝতে পারে মধুজা। সারাদিন চুপ করে থাকা, ওভাবে তাকানো, হাজার বকবকানিতেও বিরক্ত না হওয়া তারমানে কী? সঙ্গে সঙ্গে একটা লজ্জা আর প্রচন্ড হাসির একটা অনুভূতি চেপে বসে মধুজার মনে। সে অতীনের দিকে তাকায়। অতীন নির্বিকারভাবে বাইক চালিয়ে পার্কের জায়গায় একটা রেস্তোরাঁর সামনে বাইক দাঁড় করায়। শহরতলীতে এই রেস্তোরাঁটা নতুন খুলেছে।

বেশ খোলামেলা জায়গার মাঝে রেস্তোরাঁটা। আশেপাশে কয়েকটা চেয়ার টেবিল পাতা। মধুজা বাইক থেকে নেমে একটা টেবিলে গিয়ে বসে। মধুজা তাকিয়ে দেখে আশেপাশের টেবিলে ওদের মতোই বেশ কয়েকটা জোড়া বসে আছে। অতীন বাইক লক করে রেস্তোরাঁতে অর্ডার দিতে এগিয়ে যায়। মধুজা বসে বসে অতীনকে দেখতে থাকে আর মনে মনে হাসতে থাকে। দেখা যাক অতীন কী বলে! ইস শেষমেশ অতীনও! কদিন আগেও যখন অজানা লাভলেটারটা দেখিয়েছিল ওকে তখন ওকে ব্যঙ্গ করে বলেছিল অতীন, “কোনো রামপাঠা বা কানাচন্দনই তোর মতো একটা রসকসহীন কাঠখোট্টা মেয়ের প্রেমে পড়তে পারে। সেই অতীন কিনা...উফ! এইবার বাগে পেয়েছে। অতীন কনফেস করলেই জানতে হবে ও কোন দলে পড়ে। বলে ফিক করে হেসে নিজেকে সামলে নিয়ে অতীনকে দেখতে লাগলো সে।

অতীন দুটো এগরোল হাতে নিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো। মধুজা হাত বাড়িয়ে একটা এগরোল নিতেই ওর মুখোমুখি চেয়ারে বসলো অতীন। তারপর ধীরেসুস্থে এগরোলটা খেতে লাগলো। মধুজা এগরোলে একটা কামড় দিয়ে খেতে খেতে বলল, “কই তুই কি বলবি বলছিলি বল! অতীন এগরোল খেতে খেতে বলল, “বলছি দাঁড়া আগে খেয়ে নিই। ভীষণ খিদে পেয়েছে। বলে খেতে লাগল। মধুজা অবাক হয়ে দেখল অতীনের খাওয়া।

অতীন চোখ বুঁজে তাড়িয়ে তাড়িয়ে এগরোলটা খাচ্ছে। সামনে যে কেউ বসে আছে এ নিয়ে ওর কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। আপনমনে এগরোল খেয়ে যাচ্ছে সে। মধুজা অপেক্ষা করতে লাগলো অতীনের স্বীকারোক্তির। কিন্তু অতীন মধুজার আশায় জল ঢেলে এগরোলটা শেষ করে বলল, “কীরে খা! এখনও শেষ হয় নি?এগরোলটা বেশ ভালোই করেছে তো। নে নে তাড়াতাড়ি শেষ কর আরে এরপর চিকেন মাঞ্চুরিয়ান কাবাবটা আসছে! ওটাও তো খেতে হবে নাকি?”

মধুজার ভ্রু কুঁচকে গেল। মানেটা কি? কোথায় সে ভেবেছিল অতীন কনফেস করবে আর ও খিল্লি করবে। কিন্তু অতীনের ব্যবহার সব হিসেব গুলিয়ে দিচ্ছে।‌ তবে কি সে‌ ভুল ভাবছে? কিন্তু তা কি করে হয়? সারাদিন অতীন যা আচরন করেছে তার তো একটাই মানে। ভাবতে ভাবতে এগরোলে কামড় দেয় সে।

এগরোল শেষ হবার পর টেবিলে ধোঁয়া ওঠা কাবাবের প্লেট চলে আসতেই অতীন মন দিল কাবাবে। মধুজা আড়চোখে দেখতে লাগলো অতীনের দিকে। নাহ! কোথাও যেন হিসেব মিলছে না।‌ কোথায় যেন একটা তাল কেটে গেছে। যত সময় এগোচ্ছে মজার জায়গায় একটা অধৈর্যভাব আর একটা অভিমান ক্রমশ গ্রাস করছে মধুজার মনে। বারবার মনে হচ্ছে এইভাবে ঠকে গেল ও। এতটা ভুল ভেবে বসলো অতীনকে। সত্যিই তো! সে আর অতীন! মানে কি করে সম্ভব! ওরা তো ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছু না। হয়তো কোনো কারনে আজ মুড অফ ছিল বলে ওরকম আচরণ করেছে। রোজ রোজ ঝগড়া করতে করতে হয়তো আজ ভেবেছে একটা দিন ঝগড়া করবে না। হয়তো কাকিমাই ওকে বলেছে আজকের দিন ঝগড়া না করতে। হয়তো ভেতর ভেতর বিরক্ত হলেও কাকিমার জন্যে হেসে নিজের বিরক্তিকে ঢেকেছে সে। আর তাকানোটা হয়তো বুঝিয়ে দেওয়া আজ যত মাথা খাওয়ার খেয়ে নে। কাল থেকে আবার শুরু হবে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সে টের পেল একটা কান্নার ডেলা ক্রমশ গলায় চেপে বসছে। কাবাবটা বিস্বাদ ঠেকছে। ওদিকে অতীন আয়েশ করে কাবাবের টুকরো মুখে পুরে চোখ বুঁজে চিবোচ্ছে।

মধুজা কোনো রকমে দুটো টুকরো খেয়ে বলল, “আমার পেট ভরে গেছে। আর খেতে ইচ্ছে করছে না। অতীন কাঁধ নাচিয়ে মধুজার প্লেট থেকে কাবাবগুলো নিজের প্লেটে নিয়ে বলল,“তাহলে আমি নিয়ে নিচ্ছি‌। এত সুস্বাদু কাবাব নষ্ট করে লাভ নেই। বলে মধুজার প্লেটের কাবাবগুলোও খেতে লাগলো। মধুজা অতীনের দিকে তাকিয়ে রইল।

খেয়েদেয়ে ওরা যখন বেরোল ততক্ষণে সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে। অতীন বাইকটা বের করে রাস্তার দিকে দাঁড় করালো। মধুজা ধীরপায়ে এগিয়ে বাইকের পেছনের সিটে বসল। অতীন বাইকের লুকিং গ্লাসে মধুজার অন্ধকার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তারপর বাইক স্টার্ট দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল। এবার গোটা রাস্তা মধুজাও চুপ করে রইল। অতীন বাইক চালাতে চালাতে আড়চোখে লুকিং গ্লাসে দেখতে লাগলো মধুজার দিকে। তারপর বলল, “কাবাবটা দারুন করেছিল। এরপর একদিন অভয়-স্নেহাদের সাথে আসতে হবে। সেদিন জম্পেশ পার্টি হবে বুঝেছিস? সেদিন কিন্তু আজকের মতো অরুচি রোগ নিয়ে আসবি না। তোর চক্করে অতোগুলো কাবাব গিলেছি, কাল যদি পেট ছাড়ে দায় কিন্তু তোর!মধুজা কোনো সাড়া দিল না। বাইক চালাতে চালাতে অতীন বলল, “কি হলো মিস বকবকম পায়রা? হঠাৎ সাইলেন্ট মেরে গেলি! শরীরটরির খারাপ হলো নাকি?”

মধুজা বলল, “হুম!মাথাটা ধরেছে। তুই কথা না বলে তাড়াতাড়ি বাইকটা চালা।

অতীন মুচকি হেসে বাইকের গতি বাড়ালো। এইবার জব্দ হয়েছে! তখন রেস্তোরাঁয় আসার সময় আয়নায় হাসিটা দেখেই অতীন বুঝতে পেরেছিল কনফেস করলে কপালে দুঃখ আছে। এগরোল খাবার সময় মধুজার অভিব্যক্তি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল কনফেস করলেই ও ঝাঁপাবে। তাই চেপে গিয়েছিল ও। অবশ্য চেপে লাভই হয়েছিল। ধীরে ধীরে মজারু থেকে বিরহিণী মোডে চলে যেতে দেখছিল সে মধুজাকে। রেস্তোরাঁ থেকে বেরোবার পর টোটাল অভিমানী মহিলায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আরেকটু হলেই কেঁদে ফেলবে। মধুজার দিকে তাকিয়ে হেসে বাইকের গতি বাড়ালো সে।

বাড়ির সামনে বাইক দাঁড় করাতেই মধুজা নিঃশব্দে নেমে গেল। পা দুটো ভীষণ ভারী মনে হচ্ছে এখন। কোনো রকমে বাই। বলে এগিয়ে গেল সে। অতীন পেছন থেকে কিছু ওকে যেতে দেখার পর মুচকি হেসে বাইক স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে পড়লো নিজের বাড়ির দিকে।

মধুজা নিজের ঘরে ঢুকে শাড়ি খুলে পরনের পোশাক পরে বিছানায় শুয়ে পড়লো। আর ওর অজান্তে চোখের কোল বেয়ে বেরিয়ে এল দু ফোটা অশ্রু। আর তখনই টুংটুং করে দুটো SMS ঢুকলো ওর ফোনে।

*****

ঝুমঝুম শব্দে ঘুম ভাঙলো মধুজার। সে সোজা হয়ে বসল। শো শেষ করে ক্যাব ডেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে অতীনদের বাড়ির দিকে। কাল প্রায় সারারাত জেগেই কাটিয়েছে স্ক্রিপ্টটা মুখস্ত করার জন্য। কাজেই শোয়ের পর রাস্তায় ক্যাবে বসার পর একটু গা এলিয়ে দিয়েছিল সে। চোখটা লেগে যাবে ভাবতে পারে নি। ঘুম ভাঙার পর ফোনের দিকে তাকাতেই দেখলো মেসেজ ঢুকছে অজস্র। আজকের শোটার জন্য সকলে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটু পর পর মেসেজ করেই যাচ্ছে তাকে। কেউ কেউ অভিনন্দন বার্তা জানিয়ে ফোন করছে।বলে সে ফোনটা সাইলেন্ট রেখেছিল। কিন্তু ফোনের ঝুমঝুমধ্বনি বন্ধ হয়নি। একঝলক সেদিকে তাকিয়ে তারপর মধুজা সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল ক্যাবটা অতীনদের পাড়ায় ঢুকছে।

ক্যাবটা অতীনদের বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে অতীনদের বাড়িতে প্রবেশ করতেই আপাদমস্তক শিরশির করে উঠলো মধুজার। প্রায় একবছর পর এ বাড়িতে এসেছে ও। আগে অতীন থাকাকালীন না জানি কতবার এসেছে এখানে। এবাড়ির প্রতিটা কোণ তার মুখস্থ। কিন্তু এখন কেন জানে না এ বাড়িতে আসতে মন চায়‌না। কারন এখানে এলেই কাকিমার কান্না, অতীনের জন্য কাকুর খোঁজ তাকে কুড়ে কুড়ে খায়। নেহাত মা আসতে চেয়েছে বলে মাকে নিয়ে এসেছিল। মা বলেছিল শো শেষ হলে এখানে চলে আসতে তাই এসেছে সে। মধুজা ধীর পায়ে দরজার সামনে দাঁড়ালো।

কলিংবেলটা টিপতে যাবে এমন সময় অতীনদের ছাদ থেকে ভেসে আসা একটা কন্ঠস্বর ওকে স্তব্ধ করে দিলো। মধুজার মনে হলো যেন ওর পা দুটো কেউ মাটিতে সিমেন্টের সাথে গেঁথে দিয়েছে। সে একটু পিছিয়ে গিয়ে উপরের দিকে তাকালো।

সদর দরজার ঠিক উপরদিকেই অতীনের ঘর। শব্দটা সেখান দিয়েই ভেসে এল মনে হল। মধুজা কান পেতে শুনলো মা আর কাকিমার কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই মজার কোনো ঘটনা ঘটেছে তা নিয়ে দুজনে হাসাহাসি করছে। কিন্তু মধুজার মনে হলো যেন...মধুজা উৎকর্ণ হয়ে কিছুক্ষণ অতীনের ঘরের জানলার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর থমথমে মুখে কলিংবেলটা বাজালো।

উপরের কথা বন্ধ হলো অতীনের জানলায় দেখা দিলেন কাকিমা। একপলকের জন্য মধুজার মনে হলো তাকে দেখে কাকিমার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, পরক্ষণে নিজেকে সামলে হেসে বললেন, “আসছি।

দরজা খোলার পর মধুজা ভেতরে ঢুকতেই মা দোতলার সিড়ি থেকে বলে উঠলেন, “তোর কাজ হয়ে গেল এত তাড়াতাড়ি?” মধুজা চটি ছাড়তে ছাড়তে বলল, “হ্যাঁ, স্যার আজকে একদম কাঁটায় কাঁটায় ১টায় চলে এসেছিলেন। একমুহূর্ত সময় নষ্ট করতে চাননি। ফলে ঝটপট বসে পড়েছিলাম।

কাকিমা বললেন,“তোমার অনুষ্ঠানটাই শুনছিলাম মধু। দারুণ হয়েছে। তা এটা কি পঁচিশে বৈশাখ স্পেশাল ছিল না কন্টিনিউ চলবে।

থ্যাঙ্ক ইউ কাকিমা। শ্রোতারা ভালো সাড়া দিয়েছে শোতে। এবার থেকে প্রতি শুক্রবার আর রবিবার দুপুরে এই শো হবে। ঐ দুদিন কিন্তু দুপুরে ঘুমোলে চলবে না। যাক গে কাকু এখন কেমন আছেন?”

আগের থেকে একটু ভালো। তবে ডাক্তার বেডরেস্ট নিতে বলেছেন বলে নীচে নামে না। ঘরেই বসে বসে হয় বই পড়ে নাহলে রেডিও শোনে। তোমার অনুষ্ঠানটা ওর ভীষণ ভালো লাগে।বলে দরজা লাগান কাকিমা।

মধুজা ড্রইংরুমে ঢুকে সোজা সোফায় ব্যাগটা রেখে বসল । মা দোতলা থেকে নেমে মধুজার পাশে বসে বললেন, “ তোর বাবাকে সকালে বলেছিলাম সন্ধ্যের দিকে অফিস থেকে ফেরার পথে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য বিকেলের দিকে জানালো আজকে নাকি অফিসে খুব চাপ, ফিরতে দেরী হবে তাই তোকে বলেছিলাম। এত তাড়াতাড়ি চলে আসবি জানলে...

মাকে থামিয়ে কাকিমা বলেন, “তাও তো এই সুযোগে এসেছে। নাহলে তো কাকু-কাকিমার কথা মনেই থাকে না।

মধুজা হেসে বলে, “ না গো! আসলে কাজে এত ব্যস্ত থাকি যে সময় করে উঠতে পারি না। বিশ্বাস না হলে মা কে জিজ্ঞেস করে দেখো সেই সকালে নটার দিকে বাড়ি থেকে বেরোই, ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে যায়। তুমিই বলো সারাদিনের ক্লান্তি আর স্টুডিওতে টানা অতক্ষণ বকবক করার পর আর কি শরীর সঙ্গ দেয়? তখন মনে হয় বাড়ি ফিরে দুমুঠো ভাত খেয়ে বিছানায় গড়াতে পারলেই শান্তি।

কাকিমা হাসেন, “ভীষণ ধকল যায় না? তোমার কাকুও রিটায়ারমেন্টের আগে এই কথা বলতেন। বেশ বসো। ঠিক সময় এসেছো এখনই চা করতে নামছিলাম নীচে। ভালোই হলো তুমি এসে পড়ায়। শোনোমেয়ে আজ কিন্তু তোমাকে আমি ছাড়ছি না। এতদিন পর বাগে পেয়েছি! আজ একেবারে রাতের খাবার খেয়ে বাড়ি যাবে। আজকে এত সহজে যেতে দেব না। রাত পর্যন্ত গল্প করে খেয়েদেয়ে তারপর তোমাদের ছুটি। তোমার বাবাকেও বলো অফিস শেষে যাতে এখানে চলে আসে়।

মধুজার মা হাউমাউ করে ওঠেন, “কী যে বলিস তুই। বাড়িঘর ফাকা রেখে এভাবে এতক্ষণ থাকা যায় নাকি?”

কাকিমা হেসে বলেন, “হ্যা যায়। রাখ তো তোর বাড়িঘর! এতদিন পর এসেছিস তোরা এত সহজে ছাড়ছি না। এতদিন পর বাড়িটা গমগম করছে, হাসিখুশিতে ভরে গেছে । তোরা চলে গেলে তো আবার সেই নিষ্প্রাণ, নিশ্চুপ হয়ে যাবে গোটা বাড়িটা। তার চেয়ে কিছুক্ষণ থেকে যা না তোরা। আবার কবে আসবি কিনা ঠিক নেই।বলতে বলতে থেমে ছলছল চোখে তাকালেন কাকিমা। মা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। গোটা ঘরে নেমে এলো একটা একটা অস্বস্তিকর নীরবতা।একদিক থেকে কাকিমা ঠিকই বলেছেন। অতীন না থাকলে বাড়িটা সত্যিই প্রাণহীন লাগে। অতীন থাকলে বাড়িটা বেশ গমগম করে। এই গিটার বাজাচ্ছে, এই মিউজিক প্লেয়ারের গজল বাজাচ্ছে, নাহলে ড্রইংরুমে টিভি চালিয়ে খেলা দেখতে দেখতে তারস্বরে চিৎকার করছে। এই কারনে সে আসতে চায় না এ বাড়িতে। অতীনকে ছাড়া এই বাড়িটার নিস্তব্ধতা যেন ওকে গিলে খেতে আসে। কাকিমার কষ্টটা সে বুঝতে পারে। ও তো তাও বাইরের লোক। ওরই যদি এরকম বোধহয় তাহলে কাকিমার কি দশা হয় এই বাড়িতে সহজেই অনুমেয় । কাকিমার জায়গায় ও হলে তো এতদিনে পাগল হয়ে যেত।

মধুজা উঠে কাকিমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আচ্ছা বেশ! কাকিমা যখন বলেছে তখন আজ আমরা এখানেই খাবো। তবে দুটো শর্তে।

মধুজার কথা শুনে কাকিমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ধরা গলায় বলেন, “কী শর্ত?”

মধুজা হেসে বলে, “প্রথম শর্তটা হলো রাতের রান্নাটা একা করলে চলবে না। আমরা মা-মেয়েও হাত লাগাবো তোমার সাথে। আর দ্বিতীয় শর্ত হল এখনই আমাকে এককাপ কড়া করে তোমার স্পেশাল আদা চা খাওয়াতে হবে। কি রাজি তো?”

চোখ মুছে হেসে ফেলেন কাকিমা। তারপর মুচকি হেসে মধুজার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, “রাজি।

*****

বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে মধুজা দেখে দুই সইতে মিলে রান্নাঘরে শুধু চাই নয় তার সাথে টা তৈরিতেও নেমে পড়েছে। মা ঝপাঝপ পেঁয়াজ লঙ্কা কেটে মুড়ি মাখছে আর কাকিমা চা তৈরী করছে।মধুজা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে দুই সইয়ের কীর্তি। তারপর মুচকি হেসে চুপচাপ পা বাড়ায় দোতলার দিকে।

দোতলায় সিড়ির মুখেই অতীনের ঘর। অতীন না থাকলে ঘরটা বন্ধ থাকে। সপ্তাহে একদিন কাকিমা এসে ঘরটা পরিস্কার করেন। মধুজা পা টিপেটিপে দরজাটার সামনে দাঁড়ায়। কান পাতে দরজায়। তারপর আচমকা দরজাটা খুলে ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলে দেয়। অন্ধকার ঘরটা আচমকা আলো পেয়ে চমকে ওঠে। ঘরটা ঝলমলিয়ে ওঠে। আর সেই আলোয় মধুজা দেখে বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোন হাতে নিয়ে তার দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে অতীন!

কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতীন। মধুজা কিছুক্ষণ অতীনের দিকে তাকিয়ে নিরুত্তাপ গলায় জিজ্ঞেস করে, “কবে আসা হয়েছে?” অতীন জবাব না দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মধুজার দিকে। আহ! ঠিক একবছর! একবছর পর সে প্রাণভরে দেখছে মধুজাকে। এই একটা বছর কীভাবে কেটেছে একমাত্র অতীনই জানে। সে প্রাণভরে দেখে মধুজাকে। একবছর পরেও ঠিক আগের মতোই আছে মধুজা। শুধু সামান্য মেদ জমে রূপটা আরো খোলতাই হয়েছে। পানপাতার মতো মুখমন্ডলে লাবণ্য ঠিকরে পড়ছে। ফরসা গালদুটো উত্তেজনায় ঈষৎ লালচে হয়ে গেছে। কাজলকালো চোখের কোণে ঈষৎ জল জমেছে। পাতলা ঠোঁটদুটো তিরতির করে কাঁপছে। এই লক্ষ্যণগুলো অতীনের বিলক্ষণ চেনা। যখন তখন বর্ষণ শুরু হতে পারে। অতীন মধুজার প্রশ্নের জবাবে ম্লান হাসে। মধুজা ছলছলে চোখে তাকায় অতীনের দিকে। একবছরে কত পাল্টে গেছে অতীন।‌ কী ভীষণভাবে শুকিয়ে গেছে চেহারাটা। গালের মাংস বসে গিয়ে হাড় বেরিয়ে এসেছে, কন্ঠার হাড়ও দৃশ্যমান। টিশার্ট পরে থাকলেও টিশার্টের উপর দিয়ে পাঁজরার হাড় গোনা যাবে। বিছানায় আধশোয়া হয়ে খয়াটে চেহারার মধ্যে যদি কিছু অমলিন থাকে তাহলে সেটা হল অতীনের হাসি। এত কিছু হয়ে যাবার পরেও একই রকম হেসে চলেছে। মধুজা কিছুক্ষণ একভাবে তাকিয়ে থাকার পর এগিয়ে এসে‌ অতীনকে দুমদুম করে দু তিন ঘা মারার পর জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে “ছোটোলোক কোথাকার!”

*****

নাটকটা ভালোই শুরু করেছিলে তোমরা।‌ কিন্তু নিজেদের ভুলে সব গুবলেট করে ফেললে।বলে মুড়ির বাটি থেকে একমুঠো মুড়ি মুখে ফেলে চায়ের কাপে চুমুক দেয় মধুজা। এই মুহূর্তে বাড়ির সকলে অতীনের ঘরে বসে। মা-কাকিমা দুজনে অপরাধীর মতো মুখ করে বসে আছে। মধুজা বলে, “খটকাটা লাগে এবাড়িতে আসার সময়। বাড়িতে ঢুকতেই আমি শুনতে পাই রেডিওর শব্দ। শুধু তাই নয় আমারই রেডিও স্টেশনের শোয়ের শব্দ। তাও আবার এঘর থেকে। এবাড়িতে রেডিও একমাত্র কাকুই শোনেন। কিন্তু এত জায়গা থাকতে এ ঘরেই কেন শুনবেন? দ্বিতীয় খটকাটা লাগে যখন আমি তোমাদের আড্ডার সাথে সাথে তীনুর গলা শুনতে পাই। কিন্তু সেটাকে মনের ভুল ভেবে কলিংবেল বাজাই। আর আমাকে অবাক করে কাকিমা দেখা দেন এঘরের জানলা দিয়ে। তখনই আমার সন্দেহ হয় এঘরে বসে কাকু রেডিও শুনছেন, মায়েরা আড্ডা দিচ্ছে মানে এঘর খোলা হয়েছে। তার উপর কাকিমা আমাকে দেখে প্রথমে চমকালেও পরে সামলে নেন। এবং এমন আচরণ করেন যেন আমি আসায় ভীষণ খুশি হয়েছেন। এমনকি আমাকে রাতে খেয়ে যেতে‌ বলেন। কিন্তু আমার মা তোদের সব প্রয়াসে জল ঢেলে দিয়েছে। প্রথমত আমি যে‌ এত তাড়াতাড়ি আসবো ভাবতে পারেনি। কাজেই ফেরার জন্য তাড়া দিতে থাকে। যেটা আমার সন্দেহটা আরো বাড়িয়ে দেয়।

অতীন এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল মধুজার কথাগুলো। মধুজার কথা শেষ হতেই হেসে বলে, “খামোখা ওদের বকে লাভ নেই। ওদের কোনো দোষ নেই। আমিই বলেছিলাম ওদের তোকে ম্যানেজ করতে।

তুই চুপ কর ছোটোলোক কোথাকার! এতদিন হলো ফিরেছিস, এতকিছু হয়ে গেল অথচ আমাকে একটা খবর পর্যন্ত দিস নি! নাকি দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করিস নি!মধুজা ঝাঁঝিয়ে ওঠে।

মুচকি হেসে অতীন বলে, “কী খবর দিতাম তোকে? জঙ্গীদের টাইট দিতে গিয়ে গ্রেনেডের বিস্ফোরণে জখম হয়ে জন্মের মতো পঙ্গু হয়ে ফিরে এসেছি এটা বলতাম? নাকি বলতাম আর্মি থেকে ভলিন্টারি রিটায়ার নিয়ে সারাজীবনের মতো হুইলচেয়ারে আবদ্ধ হয়ে চলে এসেছি? সহ্য করতে পারতিস তুই? সব ছেড়ে দিয়ে ছুটে চলে আসতিস আমার কাছে। যেটা আমি চাই নি। আমি চাইনি তুই তোর কেরিয়ার ছেড়ে আমার পিছনে পড়ে থাকিস।

আরেকবার কথাগুলো বলে দেখ, পঙ্গু হবার সাথে সাথে ফ্রিতে এককানে কালা হয়েও যাবি। এক চড় মারবো! আমার জীবন, আমার কেরিয়ার আমি বুঝবো। তোর মাথা গলানোর দরকার নেই। এখন থেকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তোর নিস্তার নেই। একমিনিট! তার মানে এতসব কীর্তির মাস্টারমাইন্ড তুই! কাকু মোটেও নিউজ দেখে নয় বরং তোকে দেখে...

মধুজাকে থামিয়ে অতীন বলে,“ ওদের বলছিলাম আমি ফিরছি, কীভাবে কোন অবস্থায় ফিরছি সেটা বলিনি। কারন বললে দুজনে একসাথে অসুস্থ‌ হয়ে যাবে। ভয়টা বেশি ছিল মাকে নিয়ে। আমাকে এই অবস্থায় দেখে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে জানতাম না। কিন্তু আমাকে দেখে বাবা ওভাবে দুম করে হার্টফেল করে পড়ে যাবে কে জানতো? ভাগ্যিস আমার কলিগরা আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে এসেছিল। ওরাই বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। নাহলে এ অবস্থায় কিছু করতে পারতাম না। মাকে বলেছিলাম আমি যে ফিরেছি সে খবর তোদের না দিতে। যদি বাবার ব্যাপারে জানতে চায় একটা অজুহাত দিয়ে দিতে বলেছিলাম। কিন্তু মা বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারে নি। তোর মায়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল। কাজেই কাকিমাকেও আমার দলে টানতে হয়।

ও! তারমানে মা জানতো তোর ব্যাপারে! অথচ আমাকে ...

বলেনি কারন আমি বারণ করেছিলাম। কিন্তু তুই যে এভাবে হুট করে চলে আসবি কে জানতো? নেহাত আমি বেডরিডন নাহলে বাথরুমে লুকিয়ে পড়তাম।

তাও তোকে ধরে ফেলতাম। আমাকে চিনিস না তুই। আমার থেকে পার পাওয়া সহজ নয়। বুঝেছিস ছোটলোক? অংশুমানদার সাথে কথা হয়ে গেছে। কাল আমরা ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।” বলে অতীনের কান মুলে দেয় মধুজা।

কথা হচ্ছিল অতীনের ঘরে বসে। মধুজা যে এভাবে হুট করে উপরে চলে আসবে ওরা ভাবতে পারেনি । অতীন ঘরে বসে চুপচাপ মধুজার কন্ঠস্বর শুনছিল। আর যতটা পারে নিঃশব্দে নড়াচড়া করছিল। কারন ও চাইছিল না মধুজা ওকে এই অবস্থায় দেখুক। অতীন চায় নি মধুজা জানুক ওর কথা। কিন্তু বিধিবাম! মধুজা নির্ঘাত কিছু আঁচ করে সোজা উপরে চলে আসে।

অতীন হেসে কানে হাত বুলিয়ে বলে, “সত্যি কথা বলতে গেলে সেদিন ব্লাস্টের পর আমি ভেবেছিলাম আমি মারা গেছি। হুশ যখন ফিরলো দেখি হাসপাতালে শুয়ে, গোটা শরীরের গাঁটে গাঁটে ভীষণ যন্ত্রণা। ব্যথা সয়ে যাবার পর খেয়াল হল কোমরের নীচের দিকে কোনো সাড় নেই আমার। আর এই অনুভূতিটা আসতেই একটা কথাই মনে এলো , এর চেয়ে মরে গেলেই বেশ হতো। তোর কথা, বাড়ির কথা মনে পড়তে লাগলো। ভয় হতে লাগলো তোরা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবি। ডাক্তারের কাছে সবটা শোনার পর বুঝলাম সব শেষ হয়ে গেছে। একবার ভাবলাম আর ফিরবো না এখানে। আমাদের ওখানে আর্মিদের একটা কোয়ার্টারের মতো আছে অনেকটা আশ্রমের মতো। যুদ্ধে আহত, চিরজীবনের মতো অক্ষম সৈনিকেরা থাকেন সেখানে। সেখানেই কাটিয়ে দেব। কিন্তু পারলাম না। জাস্ট পারলাম না। প্রথমত মায়ের জন্য, আর দ্বিতীয়ত…” বলে থেমে যায় অতীন। তারপর অস্ফুটে বলে একজন কে কথা দিয়েছিলাম ফিরে আসবো বলে। সে যে আমার জন্য অপেক্ষায় ছিল। তাকে ফেলে স্বার্থপরের মতো থেকে যেতে পারলাম না। ফিরতে হল। তাও ভেবেছিলাম আমার ফেরার খবর দেব না। কিন্তু বিধিবাম!বলে মধুজার দিকে তাকায় অতীন। মধুজা ছলছলে চোখে অতীনের হাত নিজের মুঠোয় চেপে ধরে। ব্যাপারটা নজর এড়ায় না ঘরে উপস্থিত বাকি তিনজনের। তারা বোঝেন এই মুহূর্তে এই দুজনের একা থাকাটা প্রয়োজন। অনেক বোঝাপড়া বাকি আছে দুজনের মধ্যে। রান্না করার অজুহাতে দুই সই বেরিয়ে আসেন। আর অতীনের বাবা খবর শুনতে চলে যান নিজের ঘরে।

মধুজা ব্যাপারটা টের পেয়ে লজ্জা পেয়ে বলে, “ইস কী ভাবলো ওরা বলতো?”

কী আবার ভাববে? আমরা দুজনেই অ্যাডাল্ট, আমাদেরও কিছু প্রাইভেসি প্রয়োজন। আমাদের বাবা-মা এ বিষয়ে দাদুদের মতো সেকেলে নন তাই আমাদের প্রাইভেসি দিয়েছেন।

রাখ তোর প্রাইভেসি! ইস কি এমব্যারাসিং লাগছে!

আমার তো বেশ লাগছে!বলে মুচকি হেসে খাটের ব্যাকরেস্টে হেলান দেয় অতীন।

হুম! তোর তো লাগবেই! অসভ্য ছোটোলোক কোথাকার!বলে অতীনের হাতে মৃদু চাপড় মেরে হেসে ফেলে অতীনকে জড়িয়ে ধরে মধুজা।

মধুজাকে জড়িয়ে ধরে অতীন জিজ্ঞেস করে, “মধু!

অতীনের বুকে মুখ গুঁজে মধুজা জবাব দেয়, “উম?”

তুই শিওর! তুই অপেক্ষা করতে পারবি?”

বুকে মাথা রেখে মধুজা জবাব দেয়, “টানা একবছর তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি মশাই! একবছর যখন থাকতে পেরেছি। আর কটাদিনও থাকতে পারবো। তবে তোকে কথা দিতে হবে তুই উঠে দাঁড়াবি, আবার সেদিনের মতো আমাকে বাইকে করে নিয়ে যাবি রেস্টুরেন্টটায়। এবার কিন্তু আমার কাবাব আমি ছাড়বো না। কথা দে তুই উঠে দাঁড়াবি!

অতীন জবাব না দিয়ে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মধুজাকে। তারপর ওর কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে, “কথা দিলাম।

 


 

শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১

দ্বারকাপুরাণ



রাত্রি তখন দ্বিতীয় প্রহর।‌ অন্তত‌ আকাশে চন্দ্রদেবের অবস্থান এবং দুরে ভুখণ্ডে শৃগালদের ক্রন্দন ধ্বনি তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কয়েকজন বাদে সমগ্র দ্বারকা বর্তমানে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। যারা জেগে আছে তারা আর কেউ নয় দ্বারকার অতন্দ্র প্রহরী।

লোকমতে দ্বারকা নাকি সদাজাগ্রত নগরী। এখানে সারারাতে কেউ না কেউ জেগে থাকে। তবে চুরির বা লুন্ঠনের ভয়ে নয়। জেগে থাকে নিজ ইচ্ছায়। কেউ রাত জেগে রচনা করে কাব্য। কেউ বা রাত জেগে অধ্যয়ন করে বহুযুগশ্রুত, পরম্পরাগত শাস্ত্র, মহাকাব্য। কেউ বা প্রেয়সীর সাথে অভিসারে মত্ত। দ্বারকায় চুরির বা লুন্ঠনের ভয় নেই। কারন লোকমতে দ্বারকার রক্ষায়, এবং ন্যায়ধর্ম পালনে সদাব্রতী থাকে স্বয়ং নারায়ণের কৌমুদী ।

দ্বারকার বাইরে লোককথায় প্রচলিত আছে দ্বারকা এক মায়াবী নগরী । যা স্বয়ং নারায়ণের আয়ুধ এবং তাঁর প্রিয়পাত্র স্বয়ং বিষ্ণুবাহন গরুড়দেব দ্বারা সুরক্ষিত। দ্বারকার কীর্তি তথা দ্বারকাধীশের যশ প্রচার করেন স্বয়ং পাঞ্চজন্য। সমুদ্রের মাঝে স্বয়ং নারায়ণের প্রস্ফুটিত কমলের উপর বিরাজমান দ্বারকা। রাত্রে সমগ্র দ্বারকা তথা দ্বারকাধীশের প্রাসাদ রক্ষা করেন দেবায়ুধ শিরোমণি, নারায়ণে অমোঘ শস্ত্র সুদর্শণ চক্র। দিনে সে ভার গ্রহণ করেন বিষ্ণুবাহন। কারন দ্বারকার প্রতিটা কোণে নিবাস করেন স্বয়ং নারায়ণ। কিন্তু সমগ্র দ্বারকাবাসীরা জানে এসব বানিয়ে বলা হয়েছে তথা দ্বারকার বাইরের অধিবাসীদের বিশ্বাস করানো হয়েছে যাতে কেউ দ্বারকা আক্রমণ করে না বসে। এমনিতেই যাদবদের শত্রুর অভাব নেই। নিত্যদিন এর সাথে ওর সাথে যুদ্ধ লেগেই রয়েছে। তার উপর যাদবদের অনেকে দ্বারকাধীশের কীর্তিতে ঈর্ষান্বিত । আগে একাধিকবার দ্বারকাধীশের অনুপস্থিতিতে শত্রুরা আক্রমণ করেছে দ্বারকা। তবে তাদের প্রতিহত করতেও সময় লাগেনি নারায়ণী সেনা এবং দ্বারকাধীশের। কিন্তু বর্তমানে তিনি ভীষণ ব্যস্ত। হস্তিনাপুর সাম্রাজ্যের আসন্ন মহাযুদ্ধের জন্য তিনি একাধারে উত্তেজিত এবং উৎকন্ঠিতও বটে। সেই কারনে বহুকাল আগেই তিনি চরদ্বারা সমগ্র আর্যাবর্তে রটিয়েছেন এই গুজব।

দ্বারকার নামে নারায়ণের আয়ুধ নিয়ে যে গুজব আছে তা বাস্তবে নারায়ণী সেনার বিভিন্ন পদের কীর্তি তথা কর্তব্যের নামান্তর। দ্বারকাধীশের গুজব ছড়ানো চরেরাই দ্বারকায় পাঞ্চজন্যনামে খ্যাত। দ্বারকার ন্যায়ধর্ম তথা অনুশাসন দেখে কৌমুদীপদাধিকারীরা। এরাই অপরাধীকে দণ্ড এবং আর্তদের রক্ষা করে। আর দ্বারকার প্রহরীরা সুদর্শন চক্র পদাধিকারী। এরা দ্বারকার সীমান্ত তথা সমগ্র দ্বারকার রক্ষার্থে বদ্ধ পরিকর। আর দ্বারকাধীশ তথা বলভদ্র এবং তাদের পারিষদের এবং তাদের পরিবারের একান্ত ব্যক্তিগত অঙ্গরক্ষকরা গরুড়নামে খ্যাত। অত্যন্ত স্থিতধী, মহাপরাক্রমী, ব্যাঘ্রের মতো বলশালী এবং শ্যেনপক্ষির ন্যায় তীব্র দৃষ্টিসম্পন্ন এই গরুড়েরা নিজের প্রাণের আহুতি দিয়েও দ্বারকাধীশের প্রাণ রক্ষার্থে বদ্ধ পরিকর।

সমুদ্র থেকে দ্বাদশ ধনু দুরত্বে অবস্থিত চক্রাকার দ্বীপ দ্বারকা। অনেক উচু স্থান থেকে দেখলে মনে হবে যেন সমুদ্রের উপর একটা সুবিশাল প্রস্তর নির্মিত চক্র ভাসমান। প্রায় শতযোজন উচু গগনচুম্বী প্রাচীরে আবৃত দ্বারকা চক্রাকারে তিন ভাগে বিভক্ত। বহির্দ্বারকা, মধ্য দ্বারকা এবং মূল দ্বারকা তথা অন্তর্দ্বারকা। বহির্দ্বারকায় থাকে নারায়ণী সেনার পদাতিক বাহিনী, নগরীর কর্মকার, বাস্তুকার, সারথী, কুম্ভকার তথা শ্রমিকেরা। এখানে অশ্বশালা বিদ্যমান। মধ্যদ্বারকায় থাকে কবি, শিল্পী, গোয়ালাগন, এবং বনিকেরা। এখানে গোশালা বিদ্যমান। আর অন্তর্দ্বারকার একেবারে মধ্যভাগে দ্বারকাধীশের সুবিশাল স্বর্ণময় প্রাসাদ, এবং দ্বারকাধীশের সাধের বাগান রাধাকুঞ্জ। প্রাসাদের আশেপাশে বড়ো বড়ো অট্টালিকায় থাকেন যাদবেরা, সেনাপতি, মন্ত্রীমন্ডল তথা দ্বারকাধীশ এবং বলভদ্রর পার্ষদেরা।

দ্বারকাধীশ ধেনুদের ন্যায় অশ্বদেরও ভীষণ ভালোবাসেন। সেই হেতু প্রতি প্রত্যুষে স্বয়ং নিজে বহির্দ্বারকায় এসে অশ্বশালার অশ্বদের পরিদর্শন করেন। দাঁড়িয়ে থেকে তাদের জলপান, খাদ্য গ্রহণ করান। তারপর সারথীদের সাথে সময় কাটান। বর্তমানে সারথীদের সাথে তার সখ্য ভীষণভাবে বেড়েছে। প্রতি প্রত্যুষে অশ্বশালা পরিদর্শনের পর দ্বারকাধীশ সারথীদের নিবাসস্থলে যান। কিছু কাল সেখানে ব্যায় করে নিজ প্রাসাদে ফিরে আসেন। তারপর প্রতিদিনের মতো সভায় বসেন। সভা শেষে দ্বারকাধীশের সারথী দারুক আসে। তাকে নিয়ে দ্বারকাধীশ চলে যান নিজ মন্ত্রণাকক্ষে। দিনরাত তিনি তার সাথে কি পরামর্শ করেন বোঝা দায়। মহারাণী রুক্মিনী এবং মহারাণী সত্যভামাও নানাবিধ প্রচেষ্টা করেও দ্বারকাধীশের মুখ থেকে এই রহস্য উন্মোচন করতে অপারগ পরিগনিত হয়েছেন। এমনকি দ্বারকাধীশের অগ্রজ বলভদ্র একবার এ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত করায় প্রত্যুত্তরে দ্বারকাধীশ কিছু বলেন নি বরং মৃদু হেসেছেন শুধু।

দ্বারকায় প্রবেশ পথ আটটি হলেও স্থলপথের দ্বারকেই প্রধান দ্বার হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বাকি সাতটা পথ ধরে বনিকেরা জলপথে যাতায়াত করেন দুরদেশে বানিজ্য করা জন্য। জলপথে আক্রমণের কোনো ভয় না থাকলেও প্রহরীরা নিরন্তর প্রহরা দেয় এই আটদ্বারে, প্রহরা দেয় তিনদ্বারকার সীমাস্থলে। রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর উপস্থিত হওয়ায় আট দ্বারে তথা সমগ্র দ্বারকায় প্রহরারত প্রহরীদের অবস্থান বদল হয়। এবারও তার অন্যথা হয় নি। পুর্ববর্তী প্রহরী চলে যাবার আগে পরবর্তী প্রহরী তার কর্তব্য পালন করতে উপস্থিত হয়েছিল। এমন সময় পরবর্তী প্রহরীর হঠাৎ মুত্রত্যাগের বাসনা উপনীত হলো। তার মনে হতে লাগলো মুত্রত্যাগের এই ভীষণ বেগ উপশম না করতে পারলে তার ভাগ্যে অনেক দুর্গতি লেখা আছে। সে পুর্ববর্তী প্রহরীকে অপেক্ষা করতে বলে ছুটল রাধাকুঞ্জে। একে রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর, তার উপর অন্ধকার। কেউ বুঝতে পারবে না ভেবে সে বাগানের একেবারে গভীর অন্ধকার কোনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর নিম্নাঙ্গের বস্ত্র একটু স্খলিত করে নিভৃতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে লাগলো। মুত্রত্যাগের পর বস্ত্র সংযত করে সে পেছন ফিরতে যাবে এমন সময় কাছেই খুট করে একটা শব্দ হলো এবং তার মনে হলো যেন গলার কাছে ভীষণ তীক্ষ্ণ কী একটা যেন প্রবেশ করল। অন্ধকারে বস্তুটি ঠিক কী বুঝতে না পারলেও প্রহরী বুঝতে পারল বস্তুটা তার কন্ঠনালীকে আড়াআড়ি ভাবে ভেদ করে তার কন্ঠ রোধ করেছে। মুহূর্তের ভগ্নাংশেরও কম সময় সে টের পেল তার মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে এবং পারিপার্শ্বিক অন্ধকারের চেয়েও আরো গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে সে।

পরবর্তী প্রহরীর ফিরে আসতে বিলম্ব হওয়ায় একটু হতবাক হলো পুর্ববর্তী প্রহরী। মুত্রত্যাগে তো এত বিলম্ব হবার কথা নয়। তাহলে পরবর্তী প্রহরী গেল কোথায়? আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর পুর্ববর্তী প্রহরী নিকটে থাকা আরেক প্রহরীকে সতর্ক থাকতে বলে খোঁজ করতে এগিয়ে এল বাগানের দিকে।

কিছু দুর এগিয়ে সে ডাকতে লাগলো পুর্ববর্তী প্রহরীর নাম ধরে। কিন্তু কোনো সাড়া না পাওয়ায় ক্রমশ এগিয়ে গেল অন্ধকারের দিকে৷ বেশ কিছুদুর যাবার পর হঠাৎ তার মনে হলো পশ্চাতে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। সে কোমর থেকে তরবারি কোষমুক্ত করার আগেই পেছন থেকে কে যেন একটা ধারালো ছুড়িকা চেপে ধরলো তার কন্ঠের ওপর। তারপর আড়াআড়ি একটান দিতেই লুটিয়ে পড়লো পুর্ববর্তী প্রহরী। দুটো দেহকে বাগানের এক বৃক্ষের তলায় শায়িত করে ক্রমশ সন্তর্পণে প্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেল এক ছায়ামুর্তি।

*****

রাত্রী তখন তৃতীয় প্রহর, দ্বারকাধীশের কক্ষের আগে একটা বাঁকের আড়ালে নতজানু হয়ে বসলো ছায়ামুর্তি। তারপর পশ্চাতে একবার দৃষ্টিপাত করলো। রাধাকুঞ্জ থেকে দ্বারকাধীশের কক্ষের পথ বেশীক্ষণ নয়। কিন্তু এইটুকু পথ সন্তর্পণে অতিক্রম করতে তার একপ্রহর অতিবাহিত হয়ে গেছে। পশ্চাতে ফিরে সে দেখলো পথের মাঝে অবস্থিত সকল প্রহরী তার কৃপায় গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। কেউ মাটিতে নতজানু হয়ে বসে, কেউ বা ধরনীতে শয্যা গ্রহণ করেছে। পার্থক্য শুধু একটাই এই নিদ্রা সাধারণ নিদ্রার মতো আর ভঙ্গ হবে না। পথের মাঝে সকল প্রহরীকে সে নিঃশব্দে চিরনিদ্রায় শায়িত করে দিয়েছে। চন্দ্রালোক এখনো এদিকে উপনীত হয় নি। হলে দেখা যেত প্রত্যেক প্রহরীর হয় মস্তকে শরবিদ্ধ নয় কন্ঠ দ্বিখণ্ডিত। কে বলবে এই সকল প্রহরীরা নারায়ণী সেনার সুদর্শন চক্র পদাধিকারী মহাপরাক্রমী সৈন্য? যুদ্ধক্ষেত্রে একমাত্র দ্বারকাধীশ ছাড়া আর কেউ এদের পরাস্ত করতে অপারগ! মনে মনে হাসে ছায়ামুর্তি!

এদের পরাজিত করা কঠিন কিছু নয়। এদের মারতে হলে ব্যাঘ্রের মৃগয়া রণনীতি প্রয়োগ করতে হয়৷ পেছন থেকে অতর্কিতে আক্রমণ করে এক আঘাতে হত্যা করতে হয়। এই নীতি প্রয়োগ করে সমগ্র প্রাসাদের প্রায় অর্ধ নারায়ণী সেনা বধ করে সে উপস্থিত হয়েছে দ্বারকাধীশের কক্ষে। দ্বারকার বাইরে এই সেনার যতই কীর্তি প্রচারিত হোক না কেন বাস্তবে এরা যে কতটা মদ্যপ্রিয় এবং অলস তা সে জানে। কারন সেও যে একজন প্রাক্তন সুদর্শণ চক্র পদাধীকারী সৈনিক! এবং বর্তমানে দ্বারকাধীশের একান্ত প্রিয় অঙ্গরক্ষক গরুড় কেতুধ্বজ!

নিজ প্রশিক্ষণের বলে নাকি সুদর্শণদের অকর্মন্যতার সুযোগে এতদুর পর্যন্ত কার্যসিদ্ধি করতে পেরেছে জানে না কেতুধ্বজ, কিন্তু আজ যদি সে কার্যসিদ্ধি না করতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে দ্বারকার উপর যে ভয়াবহ ঝড় আসতে চলেছে তার থেকে দ্বারকাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। এমনকি স্বয়ং দ্বারকাধীশও নন। ভাবতে ভাবতে ডানহাতের রক্তস্নাত তরবারিটা সন্তর্পণে ভূমিতে রেখে বাঁকের আড়াল থেকে দ্বারকাধীশের কক্ষের দিকে দৃষ্টিপাত করে কেতুধ্বজ। দেখে দ্বারকাধীশের কক্ষের বাইরে দুজন প্রহরী প্রস্তরমুর্তির ন্যায় নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের দেখামাত্র চট করে কাঁধ থেকে নিজের ধনুকটা নামিয়ে নেয় কেতুধ্বজ।

এই ধনুকের আকৃতি অন্যান্য ধনুকের চেয়ে একটু ছোট। এই ধনুক তার নিজের আবিস্কার। অন্যান্য ধনুকের আকৃতি চারহস্ত সম হয়। সেখানে তার ধনুক মাত্র দুইহস্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ধনুক আকারে ছোটো হলেও আক্রমণে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের গাণ্ডীব এবং অঙ্গরাজ কর্ণের বিজয়কে প্রতিযোগিতায় ফেলে দিতে পারে। এই ধনু দিয়ে সে পলকে ছয়টা শর নিক্ষেপ করতে পারে। সমগ্র আর্যাবর্তে শরচালনায় পরাক্রম কেবলমাত্র আটজনের আছে। মহামতী ভীষ্ম, মহাগুরু দ্রোণাচার্য, মহাগুরু কৃপাচার্য, দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা, অঙ্গরাজ কর্ণ, তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন, অর্জুনপুত্র অভিমন্যু, এবং দ্বারকাধীশ নিজে শরক্ষেপণে মহারথী। এদের মধ্যে দ্বারকাধীশ, অভিমন্যু, তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন আর অঙ্গরাজ কর্ণের পরাক্রম সে দেখেছে।

তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের মধ্যে একজন আদর্শ গরুড়ের সমগ্র চিহ্ন বিদ্যমান। অর্জুন শরক্ষেপণে সর্বশ্রেষ্ঠ কারন তিনি শরযোজনা করেন অসম্ভব ক্ষিপ্রতায়। তার মতোই অর্জুনও পলকে ছয়টা শরক্ষেপণ করে থাকেন। অন্ধকারেও শরক্ষেপণে ব্যর্থ হন না। একজন সাধারণ ধনুর্ধারী সর্বাধিক দুশো গজ পর্যন্ত শরক্ষেপণ করতে পারে কিন্তু অর্জুন পারেন তিনশো গজ পর্যন্ত। একই কৌশল আয়ত্ত করেছেন অঙ্গরাজ কর্ণ। তবে তার রণকৌশলের আরেক উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার কবচ ও কুণ্ডল। একবার কথায় কথায় দ্বারকাধীশ অর্জুনকে বলেছিলেন কর্ণের কবচ শুধু অভেদ্যই নয়, তার সাথে ভীষণ মসৃন এবং ঝকঝকে, প্রায় আরশির মতো। আর যাই হোক না কেন, যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে কর্ণ সর্বদা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড়ান। বাকিটা অনুমান করতে দেরী হয় নি কেতুধ্বজের। সুর্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে কর্ণ পরিণত হন চলমান আরশিতে। ফলে শত্রুরা তার সম্মুখে এলেও কবচের প্রতিফলিত আলোর ফলে তার দিকে তাকাতে পারে না। কার্যত অন্ধ হয়ে যায় তারা, আর কর্ণ সে সুযোগে বধ করেন শত্রুদের। কর্ণকে পরাজিত করতে হলে শব্দভেদী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর বধ করতে হলে কবচহীন করতে হবে তাকে।

দ্বারকাধীশের কথা স্মরণ করতে করতে তুনীর থেকে শব্দরোধী দুটো বিষাক্ত শর বের করে সে। ধনুকে শরযোজনা করে পলকের মধ্যে প্রহরীদের দিকে নিক্ষেপ করে। শরবিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে দুজন প্রহরী বিষক্রিয়ায় ঢলে পড়লে পুনরায় ধনুক কাঁধে নিয়ে ভূমি থেকে তরবারী তুলে দ্বারকাধীশের কক্ষের সম্মুখে উপস্থিত হয় কেতুধ্বজ। অপুর্ব স্বর্ণের কারুকার্য করা কক্ষের রুদ্ধদ্বারের সম্মুখে দাঁড়িয়ে চারদিকে একবার দৃষ্টিপাত করে দ্বারে একটা হাত রাখে। একহাত দিয়ে দ্বারে চাপ দেওয়ামাত্র দ্বার উন্মোচিত হয়ে যায়। এত সহজে দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে দেখে একমুহূর্ত থমকে দাঁড়ায় কেতুধ্বজ। কী হলো ব্যাপারটা? তাহলে কী দ্বারকাধীশ দ্বার অবরুদ্ধ করে শয্যায় যান নি? তবে কী তিনি জানেন সে আসছে? মুহূর্তের জন্য বিচলিত হলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে মনকে স্থির করে কক্ষে প্রবেশ করে কেতুধ্বজ।

*****

কক্ষের ভেতরটা ঈষৎ তমসাচ্ছন্ন, সারারাত স্বল্পালোকে কক্ষকে আলোকিত করার পর অবশেষে সমগ্র কক্ষের দীপসমূহ নির্বাপিত। কিন্তু এতে দৃষ্টিপথে কোনো ব্যাঘাত ঘটল না কেতুধ্বজের। তাছাড়া দ্বারকাধীশের কক্ষের প্রতিটা কোন তার নখদর্পনে অবস্থিত।

গরুড় পদাধিকারীদের পদে উন্নীত হবার পরে সৈনিকদের এক বর্ষের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণে প্রেরিত করা হয়। সেই প্রশিক্ষণ চলে কঠোর থেকে কঠোরতম আবহাওয়ায়, কঠোর থেকে কঠোরতম পরিস্থিতিতে। কেউ প্রশিক্ষিত হয় দুর্গম পর্বত পাদদেশে, কেউ বা মরুভূমিতে, কেউ প্রশিক্ষিত হয় শ্বাপদসঙ্কুল বনে। দিনের পর দিন অভুক্ত থেকে সুর্যোদয় থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত চলে অমানুষিক প্রশিক্ষণ। তারপর হয় এক ভয়ঙ্কর পরীক্ষা! সেই বিপদসঙ্কুল পরিবেশে বেঁচে থাকার পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় ত্রুটির কোনো ক্ষমা নেই। কারন বিপদসঙ্কুল পরিবেশে ত্রুটির ফল একটাই, ভয়াবহ মৃত্যু। একারনে একবর্ষের কঠোর প্রশিক্ষণে সকলে ফিরে আসতে পারে না। যারা আসে তারা পরিণত হয় আবেগহীন, মায়া-মমতাহীন এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধায়। যাদের মনে কোনো রকম করুণা থাকে না, থাকে কেবল দ্বারকাধীশের প্রতি প্রবল আনুগত্য এবং দ্বারকার রক্ষার প্রবল কর্তব্যবোধ। দ্বারকাকে রক্ষার স্বার্থে এরা নিজপ্রাণ আহুতি দিতে কিংবা কারো প্রাণ হরণ করতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ করেনা। তা সে যে কেউ এমন কি দ্বারকাধীশ বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণই হোন না কেন! ঠিক এই কারনেই আজকে দ্বারকাধীশের কক্ষে কেতুধ্বজের অভিযান পরিকল্পিত হয়েছে। বিগত একমাস নিজের সাথে অমানুসিক যুদ্ধ করে অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দ্বারকাকে যদি রক্ষা করতে হয় তাহলে দ্বারকাধীশকে মরতে হবে!

পাণ্ডব ও কৌরবদের মধ্যে সংগঠিত মহাযুদ্ধ আসন্ন প্রায়। যেকোনো মুহূর্তে রণভেড়ী বাজতে পারে। এই মহাযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সমগ্র আর্যাবর্তের রাজন্যবর্গ যোগ দিচ্ছেন দুই শিবিড়ে। নিজ শত্রুর প্রতি পুঞ্জিভূত আক্রোশকে প্রশমিত করার জন্য, এতদিন যে শত্রুকে মাত দিতে পারেন নি তাদের বধ করার জন্য রাজন্যবর্গরা একে একে ভীড় করছেন দুই শিবিড়ে। সে শুনেছে প্রায় সমগ্র আর্যাবর্তের যোগ দেওয়া সম্পুর্ণ। কেবল দ্বারকার এবং মদ্রদেশের যোগদান অবশিষ্ট। মদ্রদেশ পাণ্ডবদের মাতুলদের দেশ। মদ্ররাজ শল্য নকুল এবং সহদেবের আপন মাতুল। তিনি পাণ্ডব পক্ষেই যোগ দেবেন কিন্তু দ্বারকা? দ্বারকাধীশ এবং বলভদ্রের আত্মীয় এই দুপক্ষই। দ্বারকাধীশ সম্পর্কে পাণ্ডবদের ভ্রাতা হন। আবার যুবরাজ দুর্যোধন বলভদ্রের স্নেহধন্য। বলভদ্র নিজে হাতে তাকে গদাযুদ্ধে অপরাজেয় করে তুলেছেন। সেই হেতু দ্বারকা এখন ভীষণ ধর্মসঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে। এক শিবিড়ে যোগ দিলে অপর শিবিড়ের বিরাগভাজন হতে হবে দ্বারকাকে। আর মহাযুদ্ধে বিপক্ষ শিবিড় জিতলে তার প্রকোপ সহ্য করতে হবে দ্বারকাকে। বলভদ্রকে জানে কেতুধ্বজ, তিনি কোনো পক্ষেই যাবেন না। কিন্তু দ্বারকাধীশ? তিনি তো আর তাঁর অগ্রজের মতো নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন না। সে জানে, তিনি যোগ দেবেন পাণ্ডবপক্ষেই। আর এখানেই সে ভয় পাচ্ছে।

গরুড় অধিনায়ক সাত্যকির কাছে সে শুনেছে কৌরবেরা সংখ্যায়, বলে, কৌশলে পাণ্ডবদের চেয়ে চার অক্ষৌহিণী সেনায় এগিয়ে। কৌরবদের পক্ষে মহামহিম ভীষ্ম, মহাগুরু কৃপাচার্য, মহাগুরু দ্রোণাচার্য, দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা, অঙ্গরাজ কর্ণ রয়েছেন। এদিকে পাণ্ডবেরা কেবল অর্জুন, অভিমন্যু, এবং মধ্যম পাণ্ডব ভীমের গদার ভরসায় যুদ্ধে অবতীর্ণ। এ যুদ্ধ এক অসমযুদ্ধ! এতে কৌরবদের জয় একপ্রকার নিশ্চিত! এবার যদি বাসুদেব পাণ্ডবদের পক্ষেনা আর ভাবতে পারছে না কেতুধ্বজ। যুদ্ধে পাণ্ডবেরা হারলে দুর্যোধন বলভদ্রের জন্য দ্বারকা আক্রমণ করবেন না ঠিকই কিন্তু এমন কিছু করবেন যাতে দ্বারকার মান সম্মান আর্যাবর্তের সম্মুখে ধুলোয় মিশে যায়। যুবরাজ দুর্যোধন ভীষণরকমের প্রতিহিংসাপরায়ণ।

মনকে শক্ত করে কোমর থেকে একটা বিষাক্ত ছুরিকা বের করে কেতুধ্বজ। বাসুদেবের মৃত্যু হলে হয়তো দ্বারকা অভিভাবকহীন হবে, কিন্তু আসন্ন সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা পাবে চিরতরে। ভাবতে ভাবতে সন্তর্পনে পা ফেলে বাসুদেবের পালঙ্কের কাছে এগিয়ে যায় কেতুধ্বজ। প্রায় কাছে পৌঁছে গেছে এমন সময় একটা পরিচিত কন্ঠস্বরে সে স্তব্ধ হয়ে যায়। ভীষণ মৃদুস্বরে কে যেন বলে ওঠে, “অবশেষে এলে তুমি! এত বিলম্ব কেন হলো কেতুধ্বজ?”

অবাক হয়ে কেতুধ্বজ। কে বলল কথাটা? কেউ কী ঘরে জাগ্রত? কিন্তু তা কী করে সম্ভব? রাত্রে দ্বারকাধীশের কক্ষে কারো প্রবেশের অনুমতি নেই! তাছাড়া রাধাকুঞ্জ থেকে এই কক্ষ পর্যন্ত পথে প্রহরারত সকল প্রহরীকে সে চিরশয্যায় শায়িত করে এসেছে! তবে কী বাসুদেব? শক্ত মুঠোয় ছুরিকাটাকে ধরে কেতুধ্বজ। বাসুদেবের কথায় বিচলিত হলে চলবে না। সে নিজেকে প্রবোধ দেয়, “বাসুদেব কোনো সাধারণ মানুষ নন! তিনি একাধারে অসামান্য ঐন্দ্রজালিক, মহান কূটনীতিজ্ঞ এবং একজন অসাধারণ বাগ্মী। কথার কৌশলে তিনি অসাধ্যসাধন করে থাকেন। তার কথায় বিচলিত হলে চলবে না। নিজ লক্ষ্যে স্থির থাকো!ভেবে সে এগিয়ে যায় পালঙ্কের দিকে।

এমন সময় গৃহে শেষবারের মতো প্রবেশ করে চন্দ্রদেবের ম্লান আলো। আর সেই আলোয় সাম্নের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় কেতুধ্বজ। বাসুদেব উঠে বসেছেন নিজশয্যায়। তার দৃষ্টি সটান কেতুধ্বজের দিকে। তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন তিনি। কী নিস্পাপ, স্নিগ্ধতায় ভরা দৃষ্টি বাসুদেবের! সেই দৃষ্টিতে মৃত্যুর আতঙ্কের করাল ছায়া কিংবা একান্ত প্রিয়জনের বিশ্বাসঘাতকতার তীব্র ঘৃণার লেশমাত্র নেই বরং তার জায়গায় সমগ্র মুখ জুড়ে রয়েছে একটা প্রশান্তি, একটা আনন্দের ছাপ। যেন অনেক অপেক্ষার পর অবশেষে কাঙ্খিত বস্তু পেতে চলেছেন তিনি!

এ কোন বাসুদেবকে দেখছে সে? এতদিন ধরে যাকে দেখে এসেছে আর আজ যাকে দেখছে দুজনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য! সমগ্র দ্বারকা যাকে চেনে সেই বাসুদেব সরল, সদাহাস্যময়, প্রগলভ, নায়কোচিত স্বভাবের মানব। সর্বজনপ্রিয়, প্রাণবন্ত বাসুদেব যেখানে যান সেইস্থান আলোকিত করে অধিষ্ঠান করেন। যাদবদের অভিজাতবর্গ হোক বা কৌমুদীসেনার একজন সেনানী, গোয়ালা হোক বা দ্বারকার সারথীগন, সকলের সাথে এমন আন্তরিকভাবে মিলিত হন যেন তিনি তাদেরই লোক। সেই মানুষটার এতটা মৃত্যুতৃষ্ণা? দিনের সুর্যালোকে যে মানুষটা প্রাণোচ্ছল হাসিতে পরিপূর্ণ হয়ে সমগ্র দ্বারকা পরিচালনা করেন সেই মানুষটার রাত্রে কী নিদারুন পরিবর্তন!

কেতুধ্বজ বুঝতে পারছে বাসুদেব জানতেন তার পরিকল্পনার কথা। জানতেন আজ হোক বা কাল সে আসবেই। সেকারনেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন তার। কোন মন্ত্রবলে জানতে পারলেন তা বুঝতে না পারলেও সে বেশ বুঝতে পেরেছে বাসুদেবকে হত্যা করার জন্য সে যতটা বদ্ধপরিকর তার চেয়েও বেশী আকুল বাসুদেব মৃত্যুকে বরণ করার জন্য। কিন্তু কেন? বাসুদেবের কন্ঠস্বরে ঘোর কাটে কেতুধ্বজের। বাসুদেব হেসে বললেন,“কী হলো কেতুধ্বজ? দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?এসো উদ্ধার করো আমায়! যে কার্যে এসেছো সেই কার্যসমাধা করো! আমার হৃদয়ে ওই ছুরিকা বিদ্ধ করে মুক্ত করো আমাকে!একে একে সব প্রিয়জনকে নিজের শত্রুতে রূপান্তরিত হতে দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত! আর পারছি না আমি এই দ্বারকার দায়ভার বহন করতে! এসো পঞ্চভূতে বিলীন হতে সাহায্য করো আমায়!" বলে দুদিকে নিজের দুহাত মেলে ধরে নিজের দুচোখ বন্ধ করেন বাসুদেব।

আগেও অনেক মানবহত্যা করেছে কেতুধ্বজ। পলক ফেলার আগে অস্ত্রের কোপে মানবদেহ থেকে প্রাণবায়ুকে পঞ্চভূতে বিলীন করেছে সে। হত্যা করার পূর্বে তাদের চোখে সে মৃত্যুর করাল গ্রাসের আতঙ্ক প্রত্যক্ষ করেছে। কারো কারো চোখে বিষাদের ছায়া দেখেছে। কিন্তু মৃত্যুর প্রতিক্ষায় কেউ অধৈর্য হতে পারে, মৃত্যুর জন্য কেউ এত আকুল হতে পারে, এ তার কল্পনাতীত ছিল। হঠাৎ তার মনে হতে লাগলো একটা অবসাদ যেন তাকে চারপাশ দিয়ে ক্রমশ ঘিরে ধরছে। সে এখানে এসেছিল বাসুদেবকে বধ করতে। সমগ্র প্রাসাদের অর্ধেক সৈন্যকে বধ করে অনেক কষ্টে প্রবেশ করেছিল কক্ষে। এখন তার সম্মুখেই সম্পুর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় উপবিষ্ট বাসুদেব অথচ একপাও সে এগোতে পারছে না। তার পদযুগল যেন কক্ষের ভূমির সাথে প্রস্তরিভূত হয়ে প্রোথীত হয়ে গেছে। প্রতি মুহূর্তে একটা গ্লানি, একটা অপরাধবোধ ক্রমশ গ্রাস করছে তাকে। তার মনে পড়ে যাচ্ছে গরুড় পদে উন্নীত হবার পর অগ্নিশপথ গ্রহণের দিনটা। মনে পড়ছে প্রতিমুহূর্তে বাসুদেবের সান্নিধ্য। নাহ আর যাই হোক না কেন, বাসুদেবকে সে চাইলেও আর হত্যা করতে পারবে না।

ছুরিকাটা ফেলে দিয়ে নতজানু হয়ে বসে পড়ে কেতুধ্বজ। বাসুদেবের চরনে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে সে। বাসুদেব কেতুধ্বজের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এবারেও হলো না! শিওরে শমন এসেও তাকে স্পর্শ করলো না। তারমানে এখনও তার দায়িত্ব শেষ হয় নি। এখনও তাকে অনেক সহ্য করতে হবে। অনেক প্রিয়জনের মৃত্যুর সাক্ষী হতে হবে, অনেক দুঃসংবাদ শ্রবণ করতে হবে। অথচ এর থেকে মুক্তি পেতে না জানি কতবার তিনি মরণের দ্বারে গেছেন। কিন্তু বিধিবাম! তার মরণ হয় নি। অমর হওয়ার চেয়ে বড়ো জ্বালা ঈশ্বর হওয়ায়। না জানি সেই ভার আর কতদিন বইতে হবে তাকে! কেতুধ্বজের দিকে তাকিয়ে ব্যথাতুর হাসি হাসেন বাসুদেব। তারপর বলেন, “তোমার আশঙ্কা মিথ্যে কেতুধ্বজ! তুমি ভাবলে কি করে যুদ্ধে আমি যোগ দেব? আমি শিবিড়ে যোগদান করলেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হবো না। কারন দুর্যোধন আর যুধিষ্ঠির দুজনেই আমার প্রিয়জন। যাকেই আঘাত করি না কেন কষ্ট আমারই হবে। আর একজনের পক্ষ নিলে দ্বারকার সমূল ক্ষতি আসন্ন তা আমি জানি। কিন্তু পক্ষ না নিলে নব আর্যাবর্ত নির্মাণে দ্বারকার ভূমিকা যে নগন্য থেকে যাবে কেতুধ্বজ। তুমি যেমন দ্বারকার রক্ষার্থে বদ্ধপরিকর। তেমনই আমিও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যাদবদের প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার্থে। সে কারনে যুদ্ধে যোগ দেওয়া অবসম্ভাবী। তবে যে কোনো এ শিবিড়ে যোগ দিলেও অপরপক্ষকে ফেরাবো না আমি। যুদ্ধে দুপক্ষেই যোগ দেবে দ্বারকা।"

কেতুধ্বজ বাসুদেবের দিকে তাকিয়ে বলে, “তা কী করে সম্ভব প্রভু?" বাসুদেব হেসে বলেন, “দেখতেই পাবে। তবে তার আগে এক কোণে লুকিয়ে পড়ো। রাত্রি ঘনিয়ে সুর্যোদয় হতে চলেছে। ঐ ওরা এলো বলে!" বলার সাথে সাথে কক্ষের বাইরে কোলাহল শুনতে পান ওরা। কেতুধ্বজ তড়িঘড়ি লুকিয়ে পড়ে অলিন্দের এক কোণে। আর বাসুদেব পুনরায় শয্যাগ্রহণ করেন। আর ঠিক সেই সময় কক্ষের দ্বার উন্মোচন করে কক্ষে প্রবেশ করেন হস্তিনাপুর যুবরাজ, ধৃতরাষ্ট পুত্র, গান্ধারীনন্দন, জ্যেষ্ঠ কৌরব, দুর্যোধন।

      

সোমবার, ২৯ মার্চ, ২০২১

কৃষ্ণচূড়ার ছায়া



পার্কের সামনে বাইকটা দাঁড় করাল অনিরুদ্ধ। চারদিকে একঝলক তাকিয়ে তারপর বাইকটা লক করে শিষ দিতে দিতে পার্কের ভেতরে ঢুকলো সে। এ জায়গাটা এমনিতে ভীষণ নিরিবিলি। এদিক দিয়ে প্রায় যাতায়াত করলেও কোনোদিন এই পার্কে আসেনি সে। আজ হঠাৎ ঊষার ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি চলে এলো। একদিক দিয়ে মন্দের ভালো যে এই জায়গায় দেখা করলে ওদের বাড়ির কেউ জানতে পারবে না। নাহলে দুজনের বাড়িতেই দুজনকে ইতিমধ্যে সন্দেহ করা শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে ঊষার বাড়িতে তো রীতিমতো কড়াকড়ি পড়ে গেছে। ওর বাড়ির লোকেরা এখনই ওর জন্য ছেলে দেখা শুরু করে দিয়েছে। ওদের সাফ কথা,‘অনেক পড়াশুনো হলো। এবার মানে মানে বিয়ের পিড়িতে বসে পড়ো। বিয়ের পর যদি শ্বশুরবাড়ি চায় তাহলে পড়াশোনা চালাতে পারবে।’

একই কেস অনিরুদ্ধর বাড়িতেও। তবে তার বাবা বিয়ের পিড়িতে বসাতে চাইছেন না। বরং তিনি চাইছেন ছেলে পড়ালেখার পাঠ তুলে দিয়ে এবার পৈত্রিক ব্যবসায় বসুক। তার বক্তব্য, ‘আমার ঠাকুর্দা পাঠশালা পর্যন্ত গিয়েছিলেন। আমার বাবা ম্যাট্রিক ফেল। আমি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনবছর ধ্যারিয়ে ক্ষ্যামা দিয়েছি। আর তোর দাদা বি.এ পরীক্ষায় সাপ্লি পেয়ে কলেজের পথ ছেড়েছে। সে তুলনায় তো তুই অনেকদুর পড়েছিস। একেবারে বি.কম ফার্স্টক্লাস করে চার্টাড অ্যাকাউন্ট্যান্ট পড়ছিস। কিন্তু আর না বাপ আমার। এবার থামো! একা তুমি যদি সব পড়া করে নাও তাহলে আমার বংশধররা কি পড়বে? কাজেই কলেজের গলি ছেড়ে বাপের গদি আলো করে বসো চাঁদ। পড়াশোনায় তোমার পেছনে যত খরচ হয়েছে তার দ্বিগুণ উসুল করে দাও দেখি। পড়াশোনার বাকি পথটা না হয় বংশধরদের জন্যই তোলা থাক। ’

সংসারে বাবার কথাই শেষ কথা। কেউ তার উপর উচ্চবাচ্য করতে পারে না। শুধু ঠাকুমা ছাড়া। অনিরুদ্ধকে ওর ঠাকুমা ভীষণ ভালোবাসেন। বলা যায় অনিরুদ্ধ যে কলেজে পড়াশোনা করছে তার মূল কারন ওর ঠাকুমা। ঠাকুমার আশকারাতেই সে প্রতিবার বাবার কাছ থেকে রক্ষা পায়। যতবার অনিরুদ্ধকে ওর বাবা ব্যবসায় বসতে বলেছেন ততবার মা বিপত্তারিনীরূপে ওর ঠাকুমা এসে ওকে বাঁচিয়ে বলেছেন, ‘আহা একটু থাম দিকিনি খোকা! দাদুভাই আমার ছেলেমানুষ।ও ব্যবসার কি বোঝে? তাছাড়া তুই এতও অথর্ব কিছু হোস নি যে ব্যবসা ছেড়ে আসতে হবে। তোর বাবা, পড়াশোনা ছাড়ার পর আজীবন ব্যবসা সামলেছেন। তোদের বিন্দুমাত্র সাহায্য নেননি। তিনি যাবার পর সেনগুপ্ত কোম্পানীর দায়িত্ব তোদের কাঁধে পড়েছে। তেমনই দাদুভাই বড়ো হোক সব বুঝতে শিখুক তারপর না হয় তোদের সাথে ব্যবসার হাল ধরবে। তাছাড়া আমার বড়োদাদুভাই তো আছেই তোর সাহায্য করার জন্য। ও নাহয় ক’দিন পরেই ঢুকবে। তাছাড়া এই বয়সটা কি দোকানে বসে হিসেবের খাতা দেখার বয়স? অতো খিটখিট করিস না তো বাপু!’

অবশ্য অনিরুদ্ধর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই পৈত্রিক ব্যবসায় বসার। সে পড়াশুনো শেষ করে চাকরী করতে চায়। কিন্তু এই কথাটা আজ পর্যন্ত মুখ ফুটে বলতে পারেনি সে। তলে তলে সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বটে। কিন্তু মন্দার এই বাজারে চাকরীর আকাল যে কতটা তা পাঠকমাত্রেই জানেন। তাই আপাতত সে কাঠবেকার হয়ে বাইকারোহণ করে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছে। আর প্রাণপণে চেষ্টা করছে একটা চাকরী পেতে। যাকগে আপাতত এই গুরুগম্ভীর বিষয়ে আলোচনা না করে আমরা আপাতত দেখে নিই যে মে মাসের এই পচা গরমে আমাদের গল্পের নায়ক অনিরুদ্ধকে ঠিক কোন কারনে আমাদের গল্পের নায়িকা ঊষা ডেকে পাঠালো।

তবে তার আগে ঊষার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কেও পাঠককে একবার অবগত করানো দরকার। অনিরুদ্ধ যতটা বড়োলোক বাড়ির ছেলে ঊষা ঠিক ততটাই মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে। বাবা পোস্টঅফিসে পোস্টমাস্টার ছিলেন। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। মা গৃহবধূ। একমাত্র ছোটো বোন নিশা সদ্য কলেজে উঠেছে। বাড়িতে লোক বলতে সাকুল্যে চারজন। বাবার পেনশনে আর ঊষা আর নিশার টিউশনির টাকায় কোনোমতে সংসার চলে। তবে একটা জিনিস ওদের পরিবারে ভীষণভাবে বিরাজমান, সেটা হলো শান্তি। এদের পরিবারে যতই ঝড়ঝাপটা আসুক না কেন কেউ কোনোদিন এদের মুখের হাসি মিলিয়ে যেতে দেখেনি। সবসময় হাসিমুখে জীবনের সব কষ্ট মেনে নিয়ে চলছে এরা।

এবার আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে এই অতি সাধারণ মেয়ের সাথে আমাদের হিরোর প্রেম হলো কিভাবে? আলাপই বা হলো কি করে? উত্তরটা হলো কলেজ। অনিরুদ্ধ ঊষার থেকে একবছর সিনিয়ার। অনিরুদ্ধ যে কলেজে পড়ত সেই কলেজে আমাদের ঊষাও স্কলারশিপে চান্স পেয়েছিলো। প্রথমদিন ক্লাসে যেতে গিয়ে অনিরুদ্ধদের ব্যাচের খপ্পরে পড়ে ঊষারা। কিন্তু বুদ্ধির জোরে শেষে ওদেরকেই ঘোল খাইয়ে দিয়েছিলো ঊষা। তারপর যা হয়, রোজ ক্লাসে যাবার সময় করিডোরে দেখা, ক্যান্টিনে খাওয়া, ক্লাস না থাকলে আড্ডা দেওয়া, লাইব্রেরীর বই এক্সচেঞ্জ করে পড়া। ঊষা ধীরে ধীরে ওদের দলে মিশে গেল, এবং একবছর কেটে যাবার পর অনিরুদ্ধ আবিস্কার করল সে এই সাধারণ মেয়েটার প্রেমে পড়েছে। শুধু তাই নয় ঊষাও অনিরুদ্ধর প্রতি হাল্কা হলেও অনুরক্ত। কিন্তু বলতে পারছে না। সেও বা বলবে কি করে? সময় বা সুযোগই তো পাচ্ছে না সে। কারন সামনেই সেমিস্টারের পরীক্ষা। সকলেই ব্যস্ত। ঊষাও ক’দিন কলেজে ডুব মেরে পড়ছে বাড়িতে। অনিরুদ্ধ ঠিক করল শেষ পরীক্ষার দিন সে ঊষাকে প্রপোজ করবে।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। শেষ পরীক্ষার দিন পরীক্ষা শেষ হবার পর সকলে ক্যান্টিনে বসে আছে। ক’দিন পর পুজো তাই সকলের মনে একটা আনন্দের রেশ লেগে রয়েছে। সকলে প্ল্যান করছে পুজোর কটাদিন কে কিভাবে কাটাবে। ব্যাতিক্রম ঊষা, সে ক্যান্টিনের এককোণে চুপচাপ বসে আছে। আসলে অনিরুদ্ধদের ব্যাচের সাথে সে মিশে গেলেও কোথাও যেন একটা তাল মেলাতে পারে না। এদের পোশাক, জীবনযাপনের সাথে ওর জীবনের আকাশপাতাল ফারাক। এরা ক্যান্টিনে একদিনে যা খরচ করে সেই টাকাটা ঊষা চারবাড়ি টিউশনি করেও উপার্জন করতে পারে না। এরা যে খাবার খায়। সেই খাবার খাওয়া তো দুরস্থ কেনার কথাও ভাবতে পারে না সে। ঊষার কপালে তখন একগাদা চিন্তা ঘোরাফেরা করছে। পরীক্ষার জন্যে দুটো টিউশনি ছেড়েছে সে। দুটো থেকে যে উপার্জন হতো সেই টাকায় কলেজের রাহাখরচটা উঠে যেত তার। কিন্তু এখন তার সেই সম্বলটাও গেছে। এখন কি করবে সে? বছরের এইসময় টিউশনি পাবে কোথা থেকে? কে দেবে তাকে? এই সবই ভাবছিলো সে এমন সময় পাশ থেকে একটা মৃদু পুরুষকন্ঠে ঘোর কাটলো তার।

“কিরে কি ভাবছিস? পেপার ভালো যায়নি বুঝি?”

চমক কেটে গিয়ে ঊষা দেখলো পাশে অনিরুদ্ধ বসে আছে। সে হেসে বলল, “ নাগো পরীক্ষা ভালোই হয়েছে। ডি.জি স্যারের নোট ভীষণভাবে হেল্প করেছে। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। আমার কথা বাদ দাও তোমার পেপার কেমন গেল?”

“আর কেমন যাবে? প্রতিটা সেমে যেমন যায় তেমনই গেল। এবারও সাপ্লি পাবো নির্ঘাত। জানিসই তো সারা সেমেস্টারে যা টোটো করে ঘুরে বেড়াই পড়াশোনা হবে কি করে?”

“ইহ! কি মিথ্যুক রে বাবা! তুমি আর সাপ্লি? হতেই পারে না। মানছি গোটা সেমেস্টারে তুমি তোমার পক্ষিরাজে সওয়ার হয়ে সেঁজুতিদিদের সাথে ঘুরে বেড়াও কিন্তু পরীক্ষার সময় তুমি একদম সিরিয়াস। কাজেই ওসব ঢপ অন্য কাউকে দিও। ”

“নারে সত্যি বলছি এবারের সেমে অতোটা মন বসাতে পারিনি। ”

“বললেই হলো? তা কিসে মন আটকে ছিলো শুনি? কাজলদি? সেঁজুতিদি না নয়নাদি?”

“এই মেয়ে! তুই কিন্তু ভুলে যাচ্ছিস আমি তোর সিনিয়ার। সে হিসেবে তোর আমাকে সম্মান দেওয়া উচিত! ”

“কাঁচকলা! তোমার মতো সিনিয়ারকে সম্মান দিতে আমার বয়েই গেছে!” বলে ফিক করে হাসে ঊষা।

“বটে! আচ্ছা দেখাচ্ছি মজা! এই স্নেহা, কাজল ,সেঁজুতি, দেবাশিস এসে শুনে যা তোদের আদরের জুনিয়ার জিনিয়াস কি বলছে!” বলে চিৎকার করে নিজের দলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে ডাকে অনিরুদ্ধ।

“এই এই কি হচ্ছেটা কি? এরকম হল্লা করছো কেন?” ছদ্মরাগে ভ্রু কুঁচকে বলে ঊষা।

“যা বাব্বা! ক্যান্টিনে চ্যাঁচাবো না তো কোথায় চ্যাঁচাবো?” 

“উফ! এত বকো কেন তুমি বলো তো?”

“তুইই বা এত কি ভাবিস বলতো?”

“সে তুমি বুঝবেনা। নিম্ন মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেমেয়েদের হাজারটা চিন্তা থাকে। তোমাদের মতো আরামের জীবন নাকি যে উঠলো বাই তো মন্দারমণি যাই। ”

“আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। সরি টু ডিস্টার্ব ইউ। তা সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েছে? নাকি উপোষ করেই পরীক্ষা দিতে আসা হয়েছে?”

“আমার খিদে পায়নি অনিরুদ্ধদা। তোমার খিদে পেলে খেয়ে নাও।” 

“সে খেতেই পারি। কিন্তু আমার সাথে বসে থাকা মানুষটা হা করে তাকিয়ে থাকবে আর আমি গোঁৎ গোঁৎ করে গিলবো তা হবে না। শেষে আমার পেটখারাপ হলে কে দায় নেবে?”

“উফ! কি বলতে এসেছো বলো না!”

“বলছি বলছি আগে কিছু মুখে তুলে নিই। সেই সকালবেলা বেরিয়েছি। দাঁড়া, হরিদা দুটো ডিমটোস্ট। আর দুটো চা। আমার খাতায় লিখে নাও।”

“বললাম তো খিদে নেই আমার।”

“আমার আছে। চুপ করে বসে থাক।”

টোস্ট আর চা আসার পরে কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলো ঊষা, তারপর খেতে শুরু করেছে। ওর খাওয়া দেখে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা সকাল থেকে কিছু খায়নি। অনিরুদ্ধ খাওয়া থামিয়ে দেখতে লাগলো ঊষাকে। তারপর খেতে খেতে বলল, “তারপর? পরীক্ষা তো শেষ আর পুজো তো এসেই গেলো। পুজোতে কি প্ল্যান?” 

ঊষার ডিমটোস্ট খাওয়া শেষ করে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, “আমার আবার প্ল্যান? ঐ পুজোর চারদিন পাড়ার পুজোমন্ডপে মায়ের সাথে থাকবো। ”

“ব্যাস? আর কোনো প্ল্যান নেই? কলকাতার পুজো দেখবি না ? ”

“নাগো! এবার আর হবে না। আসলে বাবার প্রেশারটা বেড়েছে। তার উপর মহালয়ার দিন ঠান্ডা জলে স্নান করে সর্দিও বাঁধিয়েছে। তাই এবার আর বেরোবো না।”

এদিকে অনিরুদ্ধর মনে একটা দোলাচলের সৃষ্টি হয়েছে। সে বলবে কি বলবে না? বললে যদি মেয়েটা রাজি না হয় তাহলে কি হবে? মেয়েটা যদি তাকে লম্পট ভেবে বসে? একটু আগেই কাজলদের নিয়ে যেভাবে খোঁটা দিলো। এতদিনের একটা মিষ্টি সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে। কাজে বলবে কি বলবে না ভাবতে ভাবতে শেষমেশ বলেই ফেলবে ভেবে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অনিরুদ্ধ বলে উঠল, “ঊষা!”

“বলো অনিরুদ্ধদা।” বলে চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে কাগজের গ্লাসটা টেবিলে রেখে অনিরুদ্ধর দিকে তাকায় ঊষা।”

“তোর সাথে একটা কথা ছিলো।”

“জানি কি বলবে আমাকে। কিন্তু তা সম্ভব নয়।”

মুহূর্তের মধ্যে সবটা গুলিয়ে গেল অনিরুদ্ধর। আচমকা ঊষার মুখে এই কথা শুনে বিষম খেয়ে গেলো অনিরুদ্ধ। ঊষা জলের জগটা এগিয়ে দিতেই সেটা থেকে অল্প জল খেয়ে কোনোমতে নিজেকে সামলে বলল, “জানিস মানে? ক্কি কি জানিস তুই?”

“যেটা বলতে এসেছো। কিন্তু তা সম্ভব নয় অনিরুদ্ধদা।” বলে নিজের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ঊষা। পেছন পেছন বেরিয়ে আসে অনিরুদ্ধ। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে বলে, “ঊষা দাঁড়া। যাবি না বলছি। দাঁড়া।” বলে এগিয়ে গিয়ে করিডোরে ঊষার হাতটা ধরে অনিরুদ্ধ। ঊষা পেছন না ফিরেই বলে, “হাতটা ছাড়ো অনিরুদ্ধদা। সবাই দেখছে। একটা বিচ্ছিরি কান্ড ঘটে যাবে। প্লিজ হাতটা ছাড়ো। ” অনিরুদ্ধ সোজা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, “ না ছাড়বো না। আগে বল কি সম্ভব নয়? আর আমি যা বলতে এসেছি তা তুই জানলি কি করে? একবার আমার দিকে ফিরে তাকা। তাকা দেখি? মাই গড ঊষা! তার মানে তুইও!”

কথায় কাজ হয়। ঊষা ফিরে তাকায় অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ দেখে ঊষার চোখের কোল বেয়ে জল প্রায় বেরোবো বেরোবো করছে। কোনো ক্রমে কান্না চেপে রয়েছে মেয়েটা। অনিরুদ্ধ হাতটা ছেড়ে দেয়। তারপর অস্ফুটে বলে, “বাধাটা কোথায় বলতে পারিস। আমার জীবনযাত্রায়, চরিত্রে, চাকচিক্যে, বংশগরিমায় না আর্থিক দিক থেকে?”

ঊষা নীরবভাবে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। অনিরুদ্ধ হেসে বলে , “বল না! আমাদের সম্পর্ক সম্ভব নয় কেন?” 

ঊষা মাথা নত করেই বলতে থাকে, “আমার পরিবার ভীষণ সাধারণ পরিবার অনিরুদ্ধদা। তোমাদের মতো অতো জাকজমক, চাকচিক্যে ভরা জীবন নয় আমার। তোমাদের সমাজে আমি বড়ো বেমানান। তোমার বাবা একজন সফল ব্যবসায়ী। আর আমার বাবা একজন রিটায়ার্ড পোস্টমাস্টার। তোমাদের একদিনে যা হাতখরচ আমার কাছে তা গোটা বছরের মাইনে। এককথায় আমাদের সম্পর্ক যদিও হয় তাহলেও বেশিদিন টিকবে না। মাঝখান থেকে আমার জীবন কেরিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে। তোমরা ডোনেশন দিয়ে এই কলেজে ভর্তি হয়েছো। কিন্তু আমাকে রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমান করে স্কলারশিপ নিতে হয়েছে। আমি এখানে তোমাদের মতো সময় কাটাতে আসিনি অনিরুদ্ধদা! তুমি ক’দিন পর তোমার বাবার ব্যবসায় বসবে। তাই তোমার কোনোচিন্তা নেই কিন্তু আমার আছে। আমি এখানে ক্যান্টিনে হইহই করতে, কলেজে বেড়াতে আসিনি। আমি এখানে পড়তে এসেছি। আমার স্বপ্ন ভালো করে পড়াশোনা করে একটা ভালো চাকরি করে আমার পরিবারকে দেখা। এখন যদি আমি তোমার সাথে জড়িয়ে যাই। লোকে নানারকম কথা বলবে। বলবে বামুন হয়ে চাঁদে হাত বাড়িয়েছি, বড়োলোক ছেলের মাথা চিবিয়েছি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য, আরো অনেক কথা যা একটা মেয়ে হয়ে আমাকে শুনতে হবে যা মুখে বলতেও আমার রুচিতে বাঁধছে। কিন্তু তুমি ছেলে বলে পার পেয়ে যাবে। তুমি বড়োলোকের স্মার্ট, হ্যান্ডসাম, ড্যাশিং ছেলে। আজ আমায় ভালো লেগেছে। কাল অন্য কাউকে ভালোবাসবে। কারন এটা তোমার কাছে নর্মাল কিন্তু আমার কাছে নয়। আমি রয়ে যাবো কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে। আর রইলো আমাদের সম্পর্ক সেটা কারোপক্ষেই ভালো হবে না। আমাদের মানসিকতার বিস্তর তফাৎ। আজ নয় কাল আমাদের মধ্যে মানসিকতা নিয়ে মতান্তর লাগতে বাধ্য। কাজেই এমন একটা সম্পর্ক যার কোনো ভবিষ্যত নেই সেই সম্পর্কটা তেঁতো হবার আগে আমাদের এখানেই থেমে যাওয়া ভালো। কারন আমি চাই না এ বিষয়ে কোনোরকম স্ক্যান্ডাল হোক। তার চেয়ে আমরা বন্ধু আছি এটাই বেশ ভালো অনিরুদ্ধদা। ”

অনিরুদ্ধ একদৃষ্টে ঊষার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঊষা চোখ মুছে বলে , “আজকের পর কোনোদিনও এভাবে আমাকে আটকানোর চেষ্টা কোরো না। না হলে আমি বাধ্য হবো ভিসিকে জানাতে।” বলে এগিয়ে যায় সামনের গেটের দিকে। অনিরুদ্ধ পেছন থেকে দেখতে থাকে ঊষার চলে যাওয়াটা।

তারপর কেটে গেছে তিনমাস। অনিরুদ্ধ আর ঊষার কাছে এগিয়ে যায়নি। ঊষাও দুরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে অনিরুদ্ধদের সাথে। এছাড়া বাকি সব একই ছন্দে চলছে। প্রতিবারের মতো কলেজ এবারও সেজে উঠেছে শুক্লাপঞ্চমী তিথির আনন্দে। ক্যাম্পাসের এককোণে বড়ো সুদৃশ্য প্যান্ডেল তৈরী করা হয়েছে। সকাল সকাল হোস্টেলের আর কলেজের স্টাফেরা সকলে বাগদেবীর আরাধনায় মগ্ন। সে বছরটাই অনিরুদ্ধদের বি.কম ব্যাচের শেষ বছর। কাজেই আর্টস, আর সায়েন্স স্ট্রীমের ফাইনাল ইয়ার ব্যাচের সাথে ওরা তাল মিলিয়ে কাজ করে চলেছে। তবে সবাই যে কাজ করছে তা নয়। বেশ কয়েকজন একটু থেকেই ফাঁকতালে নিজের নিজের প্রেমিকাকে নিয়ে কেটে পড়েছে। সরস্বতী পুজোর দিনে কোন প্রেমিকজোড়া প্রেম না করে পুজোর কাজে হাত লাগায় বলুন তো? 

আমাদের অনিরুদ্ধও কিছুক্ষণ থেকে বেরিয়ে পড়েছে। তবে তার সাথে সওয়ারী কেউ নেই। সে একাই বাইকে সওয়ার হয়ে চলেছে। কোনো গন্তব্য নেই, কোথাও থামা নেই যেদিকে দুচোখ যায় আর বাইকে যতক্ষণ পেট্রোল আছে ততক্ষণ সোজা চলতে থাকো। বাইক হাতে পাওয়ার পর থেকে এই একটা বরাবরের নেশা অনিরুদ্ধর। ছুটি থাকলে, মুড খারাপ হলে সে বেরিয়ে পরে বাইকের চাবি আর হেলমেট নিয়ে। কখনো কখনো কলকাতা ছাড়িয়ে শহরতলিতে কিছুক্ষনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যায় সে। কখনো প্রকৃতির মাঝে নিরালায় বসে কাটিয়ে দেয় ঘন্টার পর ঘন্টা। কখনো শহরতলীর ভীড়ের আড়ালে চায়ের দোকানে, পার্কে বসে দেখে মানুষের নানারকম জীবনযাপনের অভিনয়। বেশ কয়েকঘন্টা কেটে যাবার পর সে যখন বাড়ি ফেরে ততক্ষনে তার মন, বোধ, মুড সম্পুর্ণ পাল্টে গেছে। এরকমই সেদিন সে বেরিয়েছে বাইক নিয়ে। গন্তব্য যথারীতি ঠিক করা নেই। যতদুর গাড়ি চলে, চলতে থাকো।

চলতে চলতে শহরতলিতে ঢোকার মুখে হঠাৎ তার খেয়াল হলো এইদিকেই কাছেই ঊষার বাড়ি। বাইকের গতি স্লথ করতে গিয়েও করল না অনিরুদ্ধ। কোনো দরকার নেই। সে যখন নিজেই চাইছে না সম্পর্কটা হোক তাহলে নির্লজ্জের মতো এগিয়ে কোনো লাভ নেই। এই ভেবে বাইকের গতি বাড়াল সে। কিন্তু রাস্তার সামনে একটা বাঁক পেরোতেই থমকে বাইকটা থামাতে বাধ্য হল সে।

বাঁকটা পেরোতেই গলি থেকে একটা মেয়ে আচমকা বেরিয়ে এসে থমকে দাঁড়াতেই চমকে গিয়ে বাইকের ব্রেক কষল অনিরুদ্ধ। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে, মেয়েটা বাইকের অনেকটা কাছে চলে এসেছে। অনিরুদ্ধ আর উপায় না দেখে বাইকের হ্যান্ডেল ঘুড়িয়ে দিল। বাইকটা মেয়েটাকে প্রায় ছুঁয়ে পেরিয়ে গিয়ে অনিরুদ্ধ সমেত কাত হয়ে পড়ে গিয়ে কিছুদুর ঘষটে চলে গেল। শব্দ শুনে রাস্তায় যারা ছিল সকলে ছুটে এল। মাথায় হেলমেট ছিল বলে অনিরুদ্ধর মাথাটা বেঁচে গেলেও ডানহাতটা বেশ ছড়ে গেছে। ডান পাটাও বেশ যন্ত্রণা করছে। 

কোনোমতে বাইক সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো অনিরুদ্ধ। তারপর বাইকটা স্থানীয়দের সাহায্যে তুলে একসাইডে দাঁড় করাতে গিয়ে বুঝলো ডানদিকের ইন্ডিকেটরটা গেছে। রংটাও ঘষে গেছে অনেকটা। মুহূর্তে মাথাটা গরম হয়ে গেল অনিরুদ্ধর। বাইকটা তার বড়ো সাধের বাইক। বাইকটার ভীষণ যত্ন নেয় সে। অ্যাক্সিডেন্টটার জন্য দায়ী মেয়েটা। ওরকম হুট করে রাস্তার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে গেল নাহলে তো সে সোজা বেরিয়ে যেত। মেয়েটাকে কষে ধমক লাগানোর জন্য পেছন ফিরে তাকাল সে।

যাত্তারা! দেখেছেন! আসল লোকের কথাই বলিনি আমি! সেই তখন থেকে গৌরচন্দ্রিকা করে চলেছি। ওই যে মেয়েটা, যাকে দেখে থমকে গিয়ে এতকান্ড সে আর কেউ নয় আমাদের ঊষার বোন নিশা। দিদির সাথে পাড়ার পুজোয় অঞ্জলি দিতে বেরিয়েছিল, পেছনেই ছিল ঊষা। ঊষা দেখলো হাটতে হাটতে নিশা আচমকা গলির সামনের রাস্তায় থমকে দাঁড়িয়েছে। আর ওর খুব কাছ থেকে বাইকের হর্নের সাথে সাথে ব্রেক কষার শব্দ। মুহূর্তের মধ্যে একটা হলুদ বিদ্যুৎশিখা নিশাকে ছুঁয়ে চলে গেল আর পরক্ষণে ভারী কিছু একটা রাস্তায় পড়ে গিয়ে ঘষটে যাবার শব্দ শুনতে পেল ঊষা। সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে এল সে বোনের কাছে। সদ্য মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আতঙ্কে তখন নিশার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ঊষা এগিয়ে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরল। তারপর তাকাল অ্যাক্সিডেন্টের জায়গাটার দিকে। আরোহী বাইক ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। আসেপাশের লোক জড়ো হয়েছে একটু। সকলে মিলে বাইকটাকে তুলে দাঁড় করাল। কেউ বাইক আরোহীর দোষ দেখছে, কেউ নিশার। বাইক আরোহী ওদের দিকে ধীরে ধীরে লেংচে লেংচে এগিয়ে এল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে লোকটা বেশ জখম হয়েছে। লোকটা কাছে এসে হেলমেট খুলতেই পায়ের তলার মাটি টলে উঠলো ঊষার। এ কি! এ যে অনিরুদ্ধদা! এ কি হাল হয়েছে ওর? 

একই অবস্থা অনিরুদ্ধরও। মেয়েটাকে ধমক দেবে ভেবে এগিয়ে আসতেই ঊষাকে দেখে অবাক হয়ে গেছে সে। তারপর সে মেয়েটাকে চিনতে পেরেছে। কাছে এসে সে বলল, “ তুমি ঠিক আছো তো? লাগেনি তো?” নিশা মাথা নেড়ে জানায় তার লাগেনি। মুচকি হেসে অনিরুদ্ধ বলে, “রাস্তাঘাটে দেখে চলাফেরা করবে তো!? এখনই আমি গাড়ি না ঘোরালে কি হত বলো তো? অন্য কেউ হলে তো আর দেখতে হতো না। এরপর থেকে সাবধানে চলাফেরা করবে। ” ঊষা অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলে, “ ওর কথা ছেড়ে দিয়ে নিজের তাকাও অনিরুদ্ধদা। তোমার তো ভালোরকম ব্লিডিং হচ্ছে! পায়ের দিকে আর পাঞ্জাবীর হাতা রক্তে মেখে গেছে। ” নিজের দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। তারপর স্বভাবসিদ্ধভঙ্গিতে হেসে বলে, “ও কিছু হয়নি আমার। একটু ছড়ে গেছে। তবে বাইকটা একটু জখম হয়েছে বৈকি, ও ম্যানেজ দিয়ে নেব।” 

“ওসব ডাইলগবাজি কলেজে দেবে। দেখি, ইস কি ভীষনভাবে ছড়ে গেছে! এখনই ফার্স্টএইড করা দরকার।” বলে অনিরুদ্ধর পাঞ্জাবীর হাতা তুলে ক্ষতটা দেখে জড়ো হওয়া মানুষদের মধ্যে একজনকে দেখে বলে ঊষা, “মঙ্গলকাকা একটু তোমার দোকানটা খুলবে। এনাকে মনে হচ্ছে ফার্স্টএইড দিতে হবে। ” মঙ্গলকাকা মাথা নেড়ে এগিয়ে যান। কজন অনিরুদ্ধকে সাপোর্ট দিয়ে নিয়ে আসে তার দোকানে। পেছন পেছন নিশাকে নিয়ে আসে ঊষা। ছোটোখাটো একটা ডিস্পেন্সারী মঙ্গলকাকার। মঙ্গলকাকা দোকানের শাটার তুলে কিছুক্ষণের মধ্যে ওষুধপত্র নিয়ে এসে প্রাথমিক চিকিৎসা করে টেট-ভ্যাক দিয়ে দেন। অনিরুদ্ধ তাকিয়ে দেখে ঊষা ততক্ষণে নিশাকে নিয়ে চলে গেছে।

মঙ্গলকাকা চিকিৎসা করে বলেন, “এমনি ভয়ের কিছু নেই। তাও একবার আপনার এলাকার ডাক্তারকে দেখিয়ে নেবেন। বাড়ি কোথায় আপনার?” এদিকওদিক তাকিয়ে হতাশ গলায় নিজের ঠিকানা বলে অনিরুদ্ধ। চমকে ওঠেন মঙ্গলকাকা, “ ওবাবা ! সে তো অনেকদূর। তা এতদুর কি মনে করে এলেন? কোথায় যাবেন?” অনিরুদ্ধ চুপ করে থাকে। মঙ্গলকাকা জিজ্ঞেস করেন ঊষাকে সে কি করে চেনে? অনিরুদ্ধ বোঝে মানুষটা নির্ঘাত কিছু আন্দাজ করেছেন। এসব জায়গায় সন্দেহের কথা বাতাসের গতিতে রটে। তাই বাধ্য হয়ে সে জানায় সে আর ঊষা একই কলেজে পড়ে। সে যাচ্ছিল এই এলাকা পার করে পাশের অঞ্চলে বন্ধুর বাড়ি। এমন সময় ওদের সাথে আকস্মিক ভাবে দেখা হয়ে গেছে। বলে সে ইঞ্জেকশনের টাকাটা দিতে চায়। ভদ্রলোক জিভ কাটেন, বলেন , “ঊষা-নিশা আমার মেয়ের মতো। তুমি ওদের পরিচিত। তোমার থেকে টাকা নিতে পারি? ও টাকা লাগবে না। ” অনিরুদ্ধ তাও জোর করে টাকাটা দিয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর বাইকে উঠে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

বাড়ি ফেরার পর কাঁপুনি দিয়ে ভীষণ জ্বর আসে অনিরুদ্ধর। সারাদিন শুয়ে কাটিয়ে দেয় সে। সন্ধ্যেবেলা অনিরুদ্ধর ঘরে ধুনোর ধোঁয়া দিতে গিয়ে ঠাকুমা খেয়াল করেন ব্যান্ডেজটা। তারপর চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তোলেন। পাড়ার ডাক্তারকাকা এসে ব্যান্ডেজ খুলে ক্ষতপরীক্ষা করে সবটা জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়ে ওষুধ লিখে দিলে তারপর শান্ত হন। কিন্তু টানা একসপ্তাহ অনিরুদ্ধকে বাড়ির বাইরে যেতে বারন করেন। বাধ্য হয়ে ঠাকুমার নির্দেশ মানতে বাধ্য হয় অনিরুদ্ধ।

একসপ্তাহ পর কলেজে দেখা দুজনের। ততদিনে অনিরুদ্ধ অনেকটাই সুস্থ হয়েছে ঠিকই কিন্তু ব্যান্ডেজ খোলা হয় নি। বন্ধুদের সাথে দেখা করে গোটা দিন হইহই করে কাটানোর পর বাড়ি ফেরার জন্য গেটের বাইরে এসে কিছুদুর এগোতেই সে দেখতে পেলো ঊষাকে। নীলচে রঙের একটা সাধারণ চেক চুড়িদার পড়ে তার উপর একটা লালচে হুডি চাপিয়ে নিয়েছে সে। অনিরুদ্ধ একবার তাকালো ঊষার দিকে তারপর উল্টোদিকে হাটা দিলো। ঊষা যখন চায় না তখন সে নিজে থেকে আর এগোবে না ওর দিকে। কিছুদুর গিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে বেরিয়ে যায় অনিরুদ্ধ। কিছুদুর গিয়ে নেমে পড়ে ট্যাক্সি থেকে। টাকা মিটিয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে নীরবে হাটতে থাকে সোজা সামনে দিকে।

কিছুদূর এগোতেই একটা বাস পেয়ে সেটায় উঠে পড়ে সে। পরের স্টপেজে নেমে আবার হাটতে থাকে। ঊষাকে ইগনোর করে চলে এলেও মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না সে। বারবার মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কিছুদুর এগিয়ে রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকানে বসে চায়ের অর্ডার করে সে। চায়ের দোকানে এখন তেমন ভীড় নেই। দু-একজন যারা আছে তারাও নিজেদের মধ্যে আলাপ আড্ডায় মগ্ন। মাটির ভাড়ে চা নিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে খেতে গিয়ে ঠোট, জিভ পুড়িয়ে ফেলে অনিরুদ্ধ। দোকানে বসা অন্য লোকেদের চোখ এড়ায় না সেটা। তারা আড়চোখে অনিরুদ্ধর দিকে তাকায় তারপর আবার নিজেদের গল্পে বুঁদ হয়ে যায়। অনিরুদ্ধ কোনোমতে চা’টা শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। দোকানীকে চায়ের দাম দিয়ে আবার হাটতে থাকে। এভাবে সারাদিন হেঁটে সন্ধ্যের দিকে বাড়ি ফেরে সে। বাড়ির লোকে জিজ্ঞাসা করলে জানায় কলেজে এক্সট্রা ক্লাস ছিল।

এইভাবে একমাস কেটে যাবার পর একদিন কলেজ ক্যান্টিনে বসে বসে সে ডিমের পোঁচ নাড়াচাড়া করছিল এমনসময় পেছন থেকে শুনতে পেল একটা কন্ঠস্বর, “তোমার ব্যাপারস্যাপার কি বলো তো? আজকাল খুব ‘হিমু’ পড়ছো নাকি? না মানে এরকম দেবদাসমার্কা চেহারা নিয়ে গোটা কলকাতা ঘুরে বেড়াচ্ছো তাই বলছি। তা এই বেবাগী হবার রোগটা কতদিন চলবে শুনি? না মানে বাড়িতে জানে? ” অনিরুদ্ধ পেছন ফিরলো না। একমনে নিজের খাবারটা খেতে লাগলো। 

পেছনে দাঁড়ানো কন্ঠস্বরের অধিকারিনী থামলো না। সামনের চেয়ারে এসে বসে বলল, “কি হলোটা কি? কথা কানে যাচ্ছে না? নাকি মৌনব্রত নিয়েছ? না মানে তুমি কি চাও বলো তো? গোটা কলেজ দেখুক আমি তোমাকে দেবদাস বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। এই যে তুমি কলেজ থেকে বেরিয়ে খোলা ষাঁড়ের মতো গোটা কলেজ চষে বেড়াও, না সে তুমি বেড়াতেই পারো তোমার যা ইচ্ছে এতে আমার কি দোষ বলো তো? বেকার বেকার আমাকে দায়ী প্রমাণ করছ কেন?”

এইবার অনিরুদ্ধ চুপ করে থাকতে পারলো না। অস্ফুটে বলল, “তুই দায়ী নোস?”

“কেন হতে যাবো বলো তো? আমি তোমাকে প্রথমদিনই বলেছি আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কোনো সম্পর্ক হয় না, হতে পারে না। এর চেয়ে লজিক্যালভাবে কোন মেয়ে তোমাকে বলবে শুনি? আমি কি তোমাকে চিট করেছি? তোমাকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়েছি? না তোমাকে কোনো আকারে ইঙ্গিতে বলেছি কিছু করতে? জবাব দাও বলেছি কি?”

অনিরুদ্ধ মাথা নাড়ে। এই একটা ব্যাপারে সে ঊষাকে ক্লিনচিট দিতে পারে। প্রপোজ করার সময় থেকেই ঊষা ওর কোনোরকম সুযোগ নেয়নি। বরং বারবার ওকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। ঊষা এবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলে ওঠে, “ তাহলে কলেজে তুমি আমাকে বারবার অপমান করছো কেন? কেন তুমি এইভাবে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছ? জানো কলেজে আমাদের নিয়ে রীতিমতো হাসাহাসি হয়। সকলে আমাকে কেমন যেন একটা নজরে দেখে। আর জিমিদা…’’ ঊষা মাথা নামিয়ে নেয়।

খাওয়া থামিয়ে একপলক ঊষার দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। তারপর বলে, “জিমি কি?” ঊষা মাথা উচু করে তাকায় এবার অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ দেখে ঊষার চোখে একরাশ ঘৃণা উপচে পড়েছে ওর প্রতি। অনিরুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলে, “ কি করেছে জিমি বল?”

“যেন তুমি জানো না! তোমার মদতেই তো সব হচ্ছে।” ব্যঙ্গ ভরা গলায় বলে ওঠে ঊষা।

“কি হচ্ছে?” অবাক গলায় বলে ওঠে অনিরুদ্ধ! ঊষার কথার কিছু বুঝতে পারে না সে।

“থাক আর সাধু সাজতে হবে না। আমার অনেক বড়ো ক্ষতি করে দিয়েছ তুমি! যে ভয়টা পেয়েছিলাম সেটাই সত্যি করে দিয়েছ। অনেক শিক্ষে হলো আমার। তোমাকে বিশ্বাস করে ঠকে গেলাম আমি! আজকের পর থেকে আর কাউকে বিশ্বাস করবো না! সামান্য নোটস নিতাম বলে, তোমাদের সাথে হেসে হেসে কথা বলতাম বলে তোমরা আমাকে টেকেন ফর গ্রান্টেড ভেবে নিয়েছ! আমাকে তোমরা রাস্তায় এনে নামিয়েছ! তোমার থেকে এটা আশা করিনি আমি। তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করব না। জেনে রাখো অনিরুদ্ধদা তোমার প্রতি আমার মনে যতটুকু সম্মান ছিলো সব শেষ হয়ে গেছে। শুধু একটা অনুরোধ যতদিন এই কলেজে আছি ততদিনের জন্য এইসব বন্ধ রাখো প্লিজ! আর আমার সাথে ভবিষ্যতে কোনোরকম যোগাযোগের চেষ্টা করো না।” বলে উঠে চলে যায় ঊষা। অনিরুদ্ধ হতবাক হয়ে বসে থাকে। গোটা ব্যাপারটা সাজাতে গিয়ে গোলমেলে লাগে অনিরুদ্ধর কাছে। হঠাৎ কি হলো ? ঊষা এত বড়ো অভিযোগ করে গেল কেন? কি হয়েছে? জিমি কি বলেছে ওকে? ভাবতে ভাবতে হঠাত তার খেয়াল হয় ক্যান্টিনের সবাই যেন তাকেই আড়চোখে দেখছে। যেন ওর আর ঊষার কথা সকলে মনযোগ দিয়ে শুনছিল। কিন্তু কেন? ভাবতে ভাবতে খাওয়া শেষ করে সে উঠতে যাবে এমনসময় দেখে কাজল হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে ওর দিকে।

অনিরুদ্ধর সামনে এসে কাজল থমথমে গলায় বলে, “ঊষাকে কাঁদতে কাঁদতে বেরোতে দেখে আন্দাজ করেছিলাম তুই এখানে আছিস। সত্যি করে বলতো কি শুরু করেছিস তোরা? মেয়েটাকে শান্তিতে থাকতে দিবি না নাকি?” 

“আগে কি হয়েছে সেটা বলবি তো? কথা নেই বার্তা নেই আচমকা অতগুলো কথা বলে চলে গেলো মেয়েটা। কিছু বলতে পর্যন্ত দিল না। এদিকে কলেজে সবাই আমাদের দিকে এমন দিকে তাকিয়ে আছে যেন আমি কোনো শোপিস! হয়েছেটা কি বলবি? ” রাগত গলায় বলে অনিরুদ্ধ।

“কি হয়েছে? সর্বনাশ হয়ে গেছে! মেয়েটার কি দোষ বলতো? ও তোকে রিজেক্ট করেছে। কেন করেছে সেটার বাস্তবসম্মত কারনও বলেছে তাই বলে তোরা এইভাবে মেয়েটাকে মেন্টালি টর্চার করবি? তোর থেকে এটা এক্সপেক্টেড ছিলো না অনি।”

“এক সেকেন্ড! মেন্টালি টর্চার মানে? কি হয়েছে আমাকে খুলে বলবি?”

“কেন তুই জানিস না?”

“কি জানবো?”

“মানে? তুই সত্যিই জানিস না? জিমি যে বলছে…”

“সেটাই তো জানতে চাইছি তখন থেকে! জিমি কি বলেছে?” অধৈর্য গলায় বলে ওঠে অনিরুদ্ধ। 

কাজল একমুহূর্ত থামে তারপর বলে, “জিমি যে বলছে, তুই ওকে বলেছিস তুই ঊষাকে ভালবাসলেও ও কিন্তু তোকে লেজে গোবরে খেলিয়ে ধোপার কুকুরের দশা করে দিয়েছে। তোর থেকে সব আদায় করে নিয়ে এখন তোকে লেঙ্গি মেরে সতী সাজছে। ও নাকি? মানে…ওর স্বভাবচরিত্রটাই নাকি ওরকম! এখন নাকি ও জিমির দিকে ঝুঁকতে চাইছে কিন্তু জিমি ওকে পাত্তা দিচ্ছে না। এমনকি আরো অনেক নোংরা কথা রটিয়েছে। তোরা নাকি মাঝে মাঝে … মানে লংড্রাইভে যেতিস। মানে কলেজের ভেতরে ও যতই সতী সাজুক বাইরে ও একটা টাকার লোভী গোল্ডডিগার। এসব নাকি তুই ওকে বলেছিস।তাছাড়া… ”

বাকি কথাগুলো আর অনিরুদ্ধর কানে ঢুকছিল না। কানমাথা সব ঝালাপালা হয়ে আসছিল। তার মানে ঊষা এইসব বিশ্বাস করে ওকে… ছিঃ! ছিঃ! অসহায়ের মতো দুহাতে মাথা চেপে বসে থাকে অনিরুদ্ধ। তারপর আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে কাজলের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডাগলায় জিজ্ঞেস করে, “জিমি কোথায়?”

ধুস! আবার একই ভুল হলো! আরেক পাব্লিকের সাথেও আপনাদের আলাপ করাতে ভুলে গেছি। এতক্ষণ ধরে আমাদের নায়ক নায়িকার প্রেমালাপের গল্প বলে যাচ্ছি তো বলেই যাচ্ছি। গল্পে নায়ক নায়িকার প্রেম হলেই জমে নাকি? এট্টু ভিলেনের দুষ্টুমি, এট্টু ঢিসুম ঢিসুম না হলে যেকোনো সিনেমাটাই জমবে না কাকা! তা আমাদের গল্পে ভিলেন কিন্তু একজন নয়। একাধিক আছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে আপনাদের হয়তো আলাপ হয়েছে। মেন দুই ভিলেনের সাথে হয়নি। যাক গে! প্রাইমারি ভিলেনের সাথে আলাপ সেরে নিন আগে পরে সেকেন্ডারি ভিলেনের সাথে আলাপ করিয়ে দেব।

আমাদের গল্পে প্রাইমারি ভিলেন হলো, আজ্ঞে হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন! জিমি। পুরোনাম জগমোহন মোহন্ত। অনিরুদ্ধর মতোই ব্যবসায়ী বাপের সন্তান। নাম শুনে এমন কোনো নেশা নেই যা করে না। বদমাস ছেলেদের পান্ডা, স্পয়েল্ড চাইল্ড এরকমই ঠাওরে থাকলে ভুল করবেন। হ্যাঁ জিমি অনিরুদ্ধর মতো বড়োলোক বাড়ির ছেলে কিন্তু কোনরকম নেশা নেই ওর। সরি ভূল বললাম একটা নেশা আছে, বইয়ের নেশা। সামান্যশার্ট, ট্রাউজার পরিহিত, চশমা পড়া বইপোকা ছাত্র। গত দুবছর ধরে ক্লাসে টপার। ওকে যতবার দেখা যায় ততবারই কোনো না কোনো বই হাতে থাকবে। বইমেলায় প্রতিবছর প্রচুর বই কেনে, পড়ে জমায়। যেকোনো বিষয়ে অগাধ জ্ঞান। চলমান লাইব্রেরি বলতে পারেন। এমন কোনো বই নেই যা ওর কালেকশনে নেই। ওর কাছে সবরকম বই পাবেন। স্বভাবখানাও ভারী মিশুকে, হাসি খুশি। নতুন কাউকে দেখলে ভাব করে চট করে বন্ধু বানিয়ে আপন করে নেয়।

কি? সব গুলিয়ে যাচ্ছে তো? ভাবছেন এমন একটা গোপালমার্কা ছেলেকে ভিলেন বলছি কেন? কারন আপাদমস্তক এই নান্তুমার্কা সুবোধ বালকটির একটা মারাত্মক অন্ধকার দিক আছে। বন্ধুরা যে ওকে জিমি ডাকে সেটা আদৌও ওর নামের আদ্যক্ষর হিসেবে নয়। ওদের জিমির মানে হলো Ge.Me, Genius Menace মানে বুদ্ধিমান দস্যি। কেন? তাই বলছি একটু সবুর করুন না! উফফ! তো হ্যাঁ কি বলছিলাম? হ্যাঁ বুদ্ধিমান দস্যি। আমাদের জিমির সব ভালো কয়েকটা জিনিস বাদে। প্রথমত, বইয়ের যত্ন নিতে সে বড্ড ভালবাসে। বইয়ের সামান্যতম অবহেলা সহ্য করতে পারেনা। দ্বিতীয়ত, জীবনে কোনোদিন সে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি কাজেই সহজে হার স্বীকার করে না। তৃতীয়ত, একবার যেটা ঠিক মনে হয় সেটাই করে ছাড়ে। কেউ ওকে টলাতে পারে না। চতুর্থত, না শুনতে পারে না। পঞ্চমত, এটা গোপনীয় থাক! যথাসময় জানা যাবে। তবে এই পঞ্চম দোষের কথা কলেজে কেউ জানে না।

এইবার অনেকে বলবেন শেষেরগুলো বাদ দিয়ে বাকিগুলো গুণই তো! কি তাই তো? কচুপোড়া! দোষগুলো আরেকবার ভালো করে পড়ুন। বইয়ের সামান্য অযত্ন হলে যার দ্বারা হয়েছে তাকে দিয়েই নতুন বই কিনিয়ে ছাড়ে। সে যেই হোক না কেন? এবার বলবেন এতে কি আছে সামান্য কটা টাকাই তো। আজ্ঞে কোনোদিন কলেজস্ট্রীটে গিয়ে কোনো ব্র্যান্ড নিউ বইয়ের দাম খোঁজ করে দেখবেন কত করে পড়ে। এবার কল্পনা করুন একজন মধ্যবিত্ত স্টুডেন্টের কাছে থাকে প্রায় সর্বাধিক একশো টাকার মতো। এবার বইটার দাম ধরুন দুশো কি তিনশোর মতো। সেই স্টুডেন্টের জায়গায় আপনি হলে কি বলবেন? “ভাই আপাতত এই কটা টাকা আছে। আমার কাছে এটা রাখ পরে দিয়ে দেব।” অন্য কেউ হলে মেনে নিতো কিন্তু জিমি মানবে না। ও যেনতেন প্রকারেণ ভাবে সেদিনই নতুন বই আপনাকে দিয়ে কেনাবে। এবার আপনি উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত হলে টাকাটা তেমন ম্যাটার করবে না। বরং পকেটমানির ভার কিছুটা লাঘব হবে। কিন্তু একজন গরীব ছাত্র যার পরিবারের গোটা মাসের মাইনে ওই বইয়ের দামের সমান তার কি হবে একবার ভেবে দেখেছেন? আজ্ঞে হ্যাঁ গরীবদেরও ছাড়ে না জিমি। পারলে ওদের জিনিস বেঁচে বই কেনার দাম উশুল করে নেয়।

জিমি কোনোদিনও হারতে শেখেনি। হার ওর সহ্য হয় না। এবার ধরুন প্রতিপক্ষ যদি ওর চেয়ে বেশি প্রতিভাবান হয় তাহলে তো জয় অসম্ভব। সেক্ষেত্রে কি করবে? আজ্ঞে হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, হয় প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলে দেবে যাতে প্রতিযোগিতায় না আসতে পারে নাহলে এমন কিছু করবে যাতে জয়টা ওরই হয়। সে পথ যেরকমই হোক না কেন। এবার বুঝেছেন আপাদমস্তক নিরীহ এই ছেলেটাকে চটালে কতটা বিপদজনক হতে পারে? 

এবার আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই ছেলের কোন পাকা ধানে ঊষা মই দিয়েছে যে এইভাবে ছেলেটা মেয়েটার সম্মানের দফারফা করে দিচ্ছে। সেটা জানতে হলে আমাদের ফিরতে হবে আবার সিনে। তো কাজলের মুখে জিমির কীর্তি শোনার পর অনিরুদ্ধ ঠাণ্ডাগলায় জিজ্ঞেস করলো “জিমি কোথায়?” কাজল অবাক চোখে তাকিয়েছিলো অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ আরেকবার জিজ্ঞেস করলো , “জিমি কোথায়?”

জবাব দিতে হলো না কাজলকে কারন তখনই জিমি ব্যাকপ্যাক কাঁধে ক্যান্টিনে ঢুকে বলল, “ হরিদা একটা চা দিও।” বলে টেবিলে বসে ব্যাকপ্যাক থেকে বই বের করে পড়তে লাগলো। 

জিমির দিকে একবার তাকিয়ে কাজলের দিকে তাকাল অনিরুদ্ধ। তারপর এগিয়ে গিয়ে চুপ করে জিমির সামনে বসলো। ক্যান্টিনের ছেলেটা চা দিয়ে যেতেই চায়ের গ্লাসটা সরিয়ে রাখলো সে। জিমি অনিরুদ্ধকে খেয়াল করেনি। অনিরুদ্ধ চুপচাপ একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আনমনে দেখতে লাগলো জিমিকে। জিমি বই পড়তে পড়তে টেবিলে চায়ের গ্লাসটা খুঁজতে লাগলো। খুঁজে না পেয়ে বই নামাতেই অনিরুদ্ধকে দেখে একটু চমকে উঠলো সে। অনিরুদ্ধ নির্বিকারভাবে ওর দিকে তাকিয়ে চায়ের গ্লাসটা এগিয়ে দিলো। জিমি চায়ের গ্লাসটা হাতে নিয়ে চুমুক দিয়ে খেতে গিয়ে জিভ পুড়িয়ে হ্যা হ্যা করতে লাগলো। অনিরুদ্ধ একটা ধোঁয়ার রিং উড়িয়ে বলল, “ আস্তে! আস্তে! সাবধানে খা! গরম চায়ে জিভটা পুড়িয়ে ফেললি তো!” জিমি চায়ের গ্লাসটা টেবিলে রেখে হাসি হাসি মুখ করে তাকালো। 

নির্বিকার ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে অনিরুদ্ধ বলল, “ তোর সাথে কিছু কথা ছিলো।” কোনোমতে তুতলে বলে জিমি, “হ… হ্যাঁ, বলনা!” 

“কয়েকটা জিনিস জানার ছিলো। তাই বলছি কটা বই আমাকে ধার দিবি? সামনেই পরীক্ষা। কিছু নোটসের জন্য নিতাম আর কি।”

“হ… হ্যাঁ! শিওর! বল না কি কি বই চাই?”

“আপাতত এই বইটা হলেই চলবে।” বলে টেবিলে রাখা বইটার দিকে আঙুল দেখায় অনিরুদ্ধ। প্রথমে চমকে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে জিমি এগিয়ে দেয় বইটা। বইটা হাতে নিয়ে পাতাগুলো ওল্টাতে থাকে অনিরুদ্ধ। অনিরুদ্ধকে নির্বিকার দেখে একটু হলেও ভয়টা কমে আসে জিমির। অনিরুদ্ধ পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলে “বাবা পেজগুলো দেখছি বেশ মোটা। বইটা নিশ্চয়ই খুব দামি হবে। আচ্ছা কলেজস্ট্রীটে পাওয়া যাবে? না মানে একটা আমি নিয়ে নিলে তুই কি পড়বি তাই বলছি। তেমন হলে কিনে নিতাম।” জিমি হেসে বলে, “ কেন পাওয়া যাবে না? আমার একটা চেনা দোকান আছে ওখানে। যে কোন বইয়ের নতুন এডিশনের দুটো কপি কিনে আনি আমি বাইচান্স একটা কপি কেউ নিয়ে গেলে যাতে আমার অসুবিধে না হয়।”

সিগারেট টানতে টানতে বইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আচমকা অনিরুদ্ধ বলে ওঠে, “আচ্ছা, একটা প্রশ্ন ছিলো। এটা যদিও সিলেবাস সম্পর্কিত নয়। তোর যদি কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে জিজ্ঞেস করতে পারি? মানে একটু সাজেশনের দরকার ছিল।”

জিমির ভয় ততক্ষণে কেটে গেছে। হাসিমুখে সে বলে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ! বল না।”

সিগারেটটা শেষ করে ফিল্টারটা খালি কাপে গুঁজে আরাম করে বসে অনিরুদ্ধ। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলে, “ ধর কেউ একজন, যার সাথে তোর কোনোরকম শত্রুতা নেই, তোর সাতেপাঁচেও থাকে না এমন একজন একদিন হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই আচমকা তোর নামে যা নয় তা রটাতে লাগলো। তোর অজান্তে তোর নামে এমন কিছু বলল যে তুই জানতেও পারলি না অথচ তোর ইমেজের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। তখন তুই কি করবি?”

জিমি ভয় মিশ্রিত চোখে তাকিয়ে রইল অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ চুপচাপ বইটা পড়তে লাগলো। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলো, “কি হলো বল? তখন তুই কি করবি?” জিমির কপালে আবার ঘাম ঝরতে শুরু করেছে। সে চারদিকে একঝলক চোখ বুলিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “বুঝলাম না! কি বলতে চাইছিস তুই?”

বই পড়তে পড়তে একটা অলস হাই তুলে অনিরুদ্ধ বলল, “বাদ দে। বইতে উত্তর পেয়ে গেছি। আমি হলে কি করতাম বলতো?”

স্খলিত গলায় জিমি বলে , “কি?”

অনিরুদ্ধ বইটা পড়তে পড়তে আচমকা একটা পাতা ছিঁড়ে নেয়। জিমি হাহা করে বইটা কেড়ে নিতে যাবে ঠিক তখনই টেবিলে রাখা জলের জগটা তুলে জিমির মুখে জগে রাখা সমস্ত জল ছুড়ে মারে অনিরুদ্ধ। তারপর বইটা কেড়ে নিয়ে লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় সেটায়। আচমকা জলের ঝাপটায় জিমির চশমা খুলে মেঝেতে পড়ে যায়। মেঝেতে বসে সেটা খুঁজে নিয়ে পরে সামনে তাকাতেই একটা আর্তচিৎকার করে অনিরুদ্ধকে বাধা দিতে যায় সে কিন্তু ততক্ষণে অনিরুদ্ধ জিমির ব্যাগপ্যাকটা হাতে তুলে নিয়েছে।

একহাতে জ্বলন্ত বই আরেকহাতে ব্যাকপ্যাক নিয়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে আসে অনিরুদ্ধ। তারপর পোড়া বইটা ছুঁড়ে ফেলে দূরে। পেছন পেছন উদভ্রান্তের মতো বেরিয়ে আসে জিমি। দূরে বইটা দেখে ছুটে যায় সেদিকে। কিন্তু বেশিদুর যেতে পারেনা, মাঝরাস্তায় অনিরুদ্ধ ব্যাকপ্যাকটা জিমির মুখ লক্ষ্য করে মেরে ফেলে দেয় তাকে। আচমকা ব্যাগের বাড়ি খেয়ে পাথুরে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে জিমি। চোখ থেকে চশমা খুলে পড়ে যায় একদিকে। জিমি মাটিতে হাতড়ে হাতড়ে চশমা খুঁজতে থাকে। চশমাটা হাতে খুঁজে পেয়েছে ঠিক সেইসময় অনিরুদ্ধ পা দিয়ে জিমির ডানহাতের পাতা মাড়িয়ে দেয়। চশমাটা হাতের চেটোতে ভেঙে কাঁচের টুকরোগুলো গেঁথে যায় জিমির হাতে চেটোয়। অসহ্য যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে জিমি। এমনসময় একটা লাথি আছড়ে পড়ে জিমির মুখে। তারপর জামার কলার ধরে জিমিকে তুলে দাঁড় করায় অনিরুদ্ধ। কানের কাছে হিসহিসে কন্ঠে বলে, “ভালো ছেলে, ভালোবন্ধু হওয়ার জন্য কিছু বলি না বলে যা খুশি করবি? একটা মেয়ে যে তোর কোনো ক্ষতি করেনি তার নামে এরকম নোংরা কথা বলার সাহস হয় কি করে তোর? আমি তোকে বলেছি যে ঊষা আমাকে কুকুরের মতো ঘোরায়? ঊষা আমার থেকে ফেবার নেয়? আমি কবে বলেছি বল? কবে বলেছি?” 

বলে একটা ঘুষি কষিয়ে দেয় জিমির চোয়ালে। তারপর আরেকটা ঘুষি মারে নাকে। জিমির নাক বেয়ে গলগল করে রক্ত বেরোতে থাকে। অনিরুদ্ধ ওকে ক্যান্টিনের বাইরের দেয়ালে ঠেসে ধরে আরেকটা ঘুষি মেরে বলে, “কেন করলি তুই এটা? কেন? একটা মেয়ের কাছে, গোটা কলেজের কাছে তোর জন্য আমি কতটা ছোটো হয়ে গেলাম! কি ক্ষতি করেছে মেয়েটা বল? মেয়েটার এত বড়ো সর্বনাশ কেন করলি তুই? বল! নাহলে আজকে তোকে তোর ওই বইগুলোর সাথে জ্যান্ত পুড়িয়ে দেব। বল! বল!” বলে জিমিকে অনবরত ঘুষি মারতে থাকে অনিরুদ্ধ। 

ক্যান্টিনের বাইরে অবস্থিত সকলে অনিরুদ্ধর এই রূপ দেখে থমকে গিয়েছিল। সম্বিত ফিরে পেতেই সকলে মিলে ওদেরকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু অনিরুদ্ধর মাথায় ততক্ষণে আগুন চেপে গেছে সে আরো জোরে ঘুষি মারতে‌ থাকে।

অনেক কষ্টে যখন ওদেরকে আলাদা করা গেল ততক্ষণে জিমির অবস্থা বেশ সঙ্গিন। সকলে মিলে জিমিকে বারান্দায় শুইয়ে দেয় জিমিকে। মুখ চোখ ফুলে ঢোল, নাক দিয়ে, ঠোঁট দিয়ে অনবরত রক্ত বেরিয়ে বুক ভেসে গেছে। কিন্তু তাতেও কোনো হেলদোল নেই জিমির। কিছুক্ষণ খাবি খাওয়ার পর সে উঠে বসে একদলা রক্তমাখা থুতু ফেলল মাটিতে তারপর জিঘাংসা ভরা গলায় বলল, “ ক্ষতি করে নি আবার! আমার মস্ত বড়ো ক্ষতি করেছে তোর ওই বুলবুলি! এত বছর ধরে তিলতিল করে গড়ে তোলা আমার গর্ব, পরিশ্রম করে অর্জন করা আমার স্থান, সব কেড়ে নিয়েছে একটু একটু করে! আজ পর্যন্ত কোনোদিন আমি হারিনি, সেই আমাকে ওই মিডিলক্লাস ছোটোলোক মেয়েটা সবজায়গায় গোহারান হারিয়ে দিয়েছে! ইন্টার কলেজ ডিবেটে প্রতিবছর আমি কলেজের হয়ে পার্টিসিপেট করি সেখানে আমাকে টপকে ও পার্টিসিপেট করেছে। যে প্রফেসর আমাকে কলেজের হয়ে কুইজ টিম রিপ্রেজেন্ট করতে বলতো, সে আমাকে বলছে এবছর তোমার দরকার নেই! আজ পর্যন্ত জিমিকে কেউ হারাতে পারেনি সেখানে একটা মেয়ে এসে সব হিসেব উল্টে দিয়েছে। আমি হারতে পারি না! আমার হার সহ্য হয় না! আর একটা মেয়ের কাছে তো কখনোই না! একটা মেয়ে হয়ে আমাকে টপকে যাবে এ আমি হতে দেব না!” 

দাঁতে দাঁত চেপে জিমির দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। তারপর বলে, “ তুই আর তোর ব্লাডি মেল ইগো! আর সেই ইগোর চক্করে তুই মেয়েটার নামে এতবড়ো অপবাদ দিয়ে সর্বনাশ করে দিলি!”

“বেশ করেছি!” বলে আরেকদলা থুতু ফেলে রাগত গলায় বলে ঘোলাটে চোখে আন্দাজ করে তাকায় জিমি। “শালা তুই পাগলাচোদার মতো ওর পেছনে কবে থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, অথচ মহারানির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। শালা ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে এতক্ষণে বিছানায় উঠে যেত। আর শালী তোকেও ঘোরাচ্ছে। আমাকেও ঘোরাচ্ছে।”

দাঁতে দাঁত চেপে জ্বলন্ত চোখে জিমির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে অনিরুদ্ধ,“কি বলতে চাইছিস তুই? তোকেও ঘোরাচ্ছে মানেটা কি?”

ব্যঙ্গভরা গলায় বলে ওঠে জিমি, “আহা চাঁদ বোঝো না যেন! নোটস নিচ্ছে, হেসে হেসে গড়াচ্ছে গায়ের উপর, অথচ প্রেমের কথা বললে বলছে ওসব করতে আসে নি। ঢং! একটা মেয়েমানুষ হয়ে ছেলেদের সাথে ঢলে সতীপণা চোদাচ্ছে! ওরকম সতী আমার অনেক দেখা আছে! শুধু বলেছিলাম অনি পাত্তা দেয় নি তো কি হয়েছে আমি দেব। অনি যে নোটস দিতো সব আমি দেবো, যে সাজেশন দিতো তার চেয়ে বেটার সাজেশন দেব শুধু ও যেটা অনির সাথে করে সেটা আমার সাথে করুক। শুনে শালির কি দেমাক! গোটা লাইব্রেরীর সামনে আমাকে থাপ্পর মেরে দিলো? আমি শালা জগমোহন মোহন্ত! আমার গায়ে হাত? কেন? আমিই বা অনির চেয়ে কম কিসে? ওর চেয়ে অনেক বেশী পারফর্মেন্স পাওয়ার আমার! অনি যে সুখ দিয়েছে ওকে তার চেয়ে দেড় গুন বেশি সুখ দিতাম ওকে! চাইলে টাকাও দিতাম! কিন্তু মাগীর গুমোর খুব! ওর গুমোর যদি ভেঙেছি তাহলে আমি পুরুষই নই! হয় ওকে বাধ্য করবো আমার রুমে আসতে নয় ওই মেয়েকে কলেজছাড়া করবো। যদি না করতে পেরেছি তাহলে আমার নামে তোরা কুকুর পুষিস!” বলে উঠে দাঁড়িয়ে জামার হাতা দিয়ে নাকের রক্ত মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ায় জিমি।

কাজল ওর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “ছিঃ! জিমি ছিঃ! এত নীচু মানসিকতা তোর? একটা মেয়ে কারো সাথে হেসে খেলে বেড়ালেই সহজলভ্য হয়ে যায়? একটা মেয়ের প্রতি তোর এই মনোভাব? তারমানে তো আমরাও তোর কাছে সহজলভ্য! এতদিন তোকে তাহলে ভুল চিনেছি আমরা! এতদিন ধরে তুই আমাদের সামনে ভালো সাজার অভিনয় করে এসেছিস!” 

খিকখিক করে হেসে বলে জিমি, “হ্যাঁ তোরাও তো তাই! এই যে এত অনির পেছনে কুত্তির মতো ঘুরঘুর করিস কিসের জন্যে? এই ছোটো জামা পরে পা, হাত, বুক দেখাস কিসের জন্যে? সেই তো লাগানোর জন্যেই নয় কি? আরে হাজার আধুনিক হোস না কেন? এটা তো মানবি যে তোদের জন্মই হয়েছে ঘর সামলানো আর আমাদের সেবা করে খুশি করার জন্য। যতই অফিসের কাজ করিস বলিস না কেন, বসের ঠাপন ছাড়া প্রোমোশন পাস না। শালা আধুনিকতা চোদাচ্ছে! এটা মর্ডান যুগ নাহলে দেখিয়ে দিতাম পুরুষ কাকে বলে।” 

আচমকা এই কুৎসিত আক্রমণে নির্বাক হয়ে যায় কাজল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নয়না বলে, “হোপলেস! তুই শুধু নীচ মানসিকতারই নোস, ঘৃণ্য দৃষ্টিভঙ্গির মানুষও বটে! আমার ঘেন্না করছে এই ভেবে যে তোকে একসময় আমার বন্ধু ভাবতাম।”

মুচকি হেসে জিমি বলে, “সেটাই তো দুর্ভাগ্য আমার! তুই শুধু আমাকে বন্ধু ভাবলি বলে কিছু করতে পারিনি! প্রেমিক ভাবলে এতদিনে তোকেও পরখ করা হয়ে যেত আমার!” 

অনিরুদ্ধ একমনে জিমির কথা শুনছিল আর ব্যাপারটা মেলাচ্ছিল। তারমানে এতদুর ব্যাপারটা গড়িয়ে গেছে অথচ ঊষা ওকে কিছু বলে নি? এই জন্য ঊষা ওকে যা নয় তাই বলে গেল? তারমানে জিমি ওকে একা পেয়ে…! জিমির সব কথা ওর কানে ঢুকছিল না। সে শুধু ভাবছিল ঊষা যে ভয়টা পাচ্ছিল সেটাই হল। একটা বিচ্ছিরি স্ক্যান্ডাল ঘটলো ওদের নিয়ে যেখানে ওদের কোনো ভূমিকাই নেই! অনিরুদ্ধ বুঝতে পারছিল ঠিক কতটা ভুল বুঝে আর অভিমানে ঊষা এভাবে চলে গেল। ওকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পর্যন্ত দিল না। এই নরকের কীটটার জন্য ঊষা ওকে ভুল বুঝলো। দাঁতে দাঁত চেপে জিমির দিকে তাকাল অনিরুদ্ধ। বড়ো ভুল হয়ে গেছে ওকে ছেড়ে। যে করেই হোক ঊষার ভুল ভাঙাতে হবে। ওকে ফেরত আনতে হবে। নাহলে ও শান্তি পাবে না। কিন্তু তার আগে এই পশুটাকে সাজা দিতে হবে।মনে মনে স্থির করে নিল আর যাই হয়ে যাক একে ছাড়া যাবে না কিন্তু কি ভাবে? ভাবতে ভাবতে ওর নজর পড়ে জ্বলন্ত বইটার দিকে। চট করে বুদ্ধি খেলে যায় তার মাথায়। জিমির ব্যাগ থেকে বইগুলো বের করে মাটিতে ফেলে দেয় সে। পাশেই দাঁড় করানো বাইকের সিট খুলে বের করে আনে এক্সট্রা পেট্রলের বোতল।পুরো বোতলটা উপর করে দেয় বইগুলোর উপর। তারপর জ্বলন্ত বইটা তুলে এনে ফেলে দেয় বইয়ের স্তুপের উপর। ছাইচাপা আগুন ইন্ধন পেয়ে দপ করে জ্বলে ওঠে। 

আচমকা পেট্রলের গন্ধ পেয়ে চমকে ওঠে জিমি! ঘোলাটে চোখে সামনের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে। আর একটা হলুদাভ আলো দেখে ভয়ে আতঙ্কে বুকটা ফাকা হয়ে যায় তার। সাধের বইগুলোর ওরকম অবস্থা দেখে আর্তচিৎকার করে ওঠে জিমি। আলো অনুসরন করে সে দৌড়ে আসে অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ জিমির বুকে লাথি মেরে ফেলে দেয় মাটিতে। বইয়ের পাতা পোড়ার শব্দ পেয়ে জিমি বুঝতে পারে ওর সাধের বইগুলো পুড়ে যাচ্ছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে তাপ অনুভব করে এগোতে যাবে এমন সময় অনিরুদ্ধ আবার ওকে ল্যাং মেরে ফেলে দেয় তারপর কোমরে কষিয়ে লাথি মেরে বলে, “ঠিক এমনটাই মনে হয় যখন কাছের মানুষ দুরে সরে যায় আর তাকে ফেরানো সম্ভব হয় না। এরকম কষ্ট হয় যখন তোমার স্বপ্ন, তোমার কষ্টে তিলে তিলে গড়ে তোলা ইচ্ছেকে কেউ পা দিয়ে মারিয়ে গুঁড়ো করে দেয়। ঠিক এরকমই মনে হয়েছে ঊষার, আমার। তুই শুধু আমাদের সম্পর্ক নষ্ট বা মেয়েটার স্বপ্ন ভাঙিস নি। মেয়েটার এতদিনের পরিশ্রমকে ধুলো করে দিয়েছিস। এই যে ছাই দেখছিস ওর জীবনটা ঠিক এরকম ছাই করে দিয়েছিস তুই। তোর অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। কোনো ক্ষমা নেই!” বলে জিমির শিরদাঁড়ায় কষিয়ে লাথি মারে অনিরুদ্ধ । 

কট করে একটা শব্দ হয়। চিৎকার করে ওঠে জিমি। অনিরুদ্ধ হিসহিসে কন্ঠে বলে ওঠে, “ কি হলো? লাগলো নাকি?? যাহ! তা কি করে সম্ভব? তুই তো মেরুদন্ডহীন পুরুষ! মেরুদন্ড ভাঙলে তোর আবার কিসের ব্যথা লাগবে?” বলে জিমির পিঠে আরেকবার চাপ দেয় অনিরুদ্ধ । প্রবল ব্যথায় গোঙাতে থাকে জিমি। এবার আর কেউ অনিরুদ্ধকে থামাতে আসে না। মাটিতে পড়ে গোঙাতে থাকে জিমি , খাবি খেতে থাকে বইয়ের ধোঁয়ায়, বইয়ের ছাই, ধোঁয়া জিমির চোখে ঢোকে। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলতে থাকে তার। সেই ধোঁয়া ক্রমশ কুন্ডলি পাঁকিয়ে উঠে যায় আকাশে।

*****
“ভাগ্যিস সেদিন আমি চলে যাইনি! সেঁজুতিদির কথা শুনে ঠিক সময় পৌছেছিলাম! নাহলে তো জিমিদাকে তুমি মেরেই ফেলতে! তোমার ভাগ্য ভালো জিমিদার পরিবার তোমাকে পুলিশে দেয় নি। জিমিদা তো পরে ক্ষমাও তো চেয়েছিল মনে আছে? সে কি কান্না আমার হাত ধরে হাসপাতালে।” ঊষার কথায় হুঁশ ফেরে অনিরুদ্ধর।

 আসলে ঊষার সাথে কথা বলতে বলতে পুরোনো দিনগুলোয় ফিরে গিয়েছিল সে। সেই কলেজের দিনগুলো, ঊষার সাথে তার দেখা, প্রেম, ঊষার পিছিয়ে আসা, জিমি। সব একে একে মনে পড়ছিল তার। সেদিন জিমির শিরদাঁড়া ভেঙে ওকেও পারলে আগুনে ছুঁড়ে ফেলত। ঠিক সে সময় ঊষা এসে ওকে না থামালে কি যে হতো অনিরুদ্ধ জানতো না। সেদিন যখন অনিরুদ্ধ জিমির ঘাড়ে পা তুলে দিয়ে ধীরে ধীরে ওকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে ঠিক এমন সময় ঊষা এসে অনিরুদ্ধকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। তারপর সকলের সামনে সপাটে চড় মারে। সকলে এতক্ষণ ধরে অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে ছিল, এমন সময় ঊষার এই কাণ্ডে ক্যান্টিনে উপস্থিত সকলে চমকে যায়। তারপর সম্বিত ফেরায় সকলে মিলে ধরাধরি করে জিমিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেই দিনের পরে জিমি ঊষার হাত ধরে ক্ষমা চেয়েছিল। 

আনমনে গালে হাত বুলিয়ে অনিরুদ্ধ বলে, “আমার মাথা কাজ করছিল না সেদিন। শুধু মনে হচ্ছিল যে মানুষটা তোমার এত বড়ো সর্বনাশ করেছে তার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।”

“তাই বলে মানুষটাকে মেরে ফেলবে? ইস ও মরে গেলে এই যে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করা ঘুচে যেত। আর অতোগুলো বই পুড়িয়ে দিলে যে! জিনিসপত্রের দাম নেই নাকি? কত দরকারি বই ছিল ওর কাছে জানো? ”

“বেশ করেছি পুড়িয়ে দিয়েছি! কত সাহস ওর! তোমার নামে উল্টোপাল্টা বলবে কেন ও?” বলে বিরক্তিসূচক শব্দ করে মাটিতে থুতু ফেলে অনিরুদ্ধ।

“তাই বলে একেবারে মানুষ খুন করবে?” অবাক হয়ে তাকায় ঊষা।

“আলবাত করবো! যে তোমার নামে বাল বকবে, তোমাকে কষ্ট দেবে তার ছাল ছাড়িয়ে দেব আমি!” বলে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরায় অনিরুদ্ধ। ঊষা নাক কুঁচকে অনিরুদ্ধর ঠোঁট থেকে সিগারেট বের করে ফেলে দিয়ে বলে,“ কতবার বলেছি! আমার সামনে সিগারেট ধরাবে না! আর এখনও এত রাগ! সত্যি এত বছর হয়ে গেল এতটুকু বদলালে না তুমি! কবে ম্যাচিওর হবে বলো তো? আর কে কি বলল তাতে কি আসে যায়? ভগবান লোককে মুখ দিয়েছেন বলার জন্য। লোকের কাজ বলা। তাই বলে লোককে ধরে পেটাবে?”

“দরকার পড়লে পেটাবো! এই অনিরুদ্ধ সেনগুপ্ত নিজের বাপকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না!” বলে গোঁফে তা দেয় অনিরুদ্ধ।

“সেই জন্যই বিগত দুবছর ধরে নিজের বাপকে বলতে পারছো না তুমি চাকরি করতে চাও।” বলে ফোঁড়ন কাটে ঊষা।

“এই যে! ডোন্ট আন্ডারেস্টিমেট মি! আমি চাইলে এখনই বলে দিতে পারি।” বলে ঊষার দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। ঊষা এবার অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে সিরিয়াস মুখ করে বলে, “বেশ! তাহলে এখনই তোমার বাবাকে কল করে বলো। দাও ফোনটা।” বলে হাত পাতে ঊষা। তারপর মুচকি হেসে বলে, “ কি হলো? ফুস! দম বেরিয়ে গেল? ওরকম সকলেই আমাদের সামনে একটু আধটু মুখে হম্বিতম্বি করে। কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা।”

“বাজে কথা না বলে কি জন্য ডেকেছো বলো।” বলে বেঞ্চে হেলান দেয় অনিরুদ্ধ।

“এমন ভাবে বলছে যেন কত কাজ ফেলে এসেছে!” বলেই মুখটা মলিন হয়ে যায় ঊষার, তারপর থমথমে গলায় বলে, “বাড়িতে ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে বিয়ে করার জন্য। এদিকে একের পর এক পাত্র দেখতে আসছে আমাকে দেখতে। গতপরশুও একজন এলো। ভাগ্য ভালো ওরা যে পণ চাইছে সেটা আমার বাবা দিতে অপারগ বলে সম্বন্ধ ভেস্তে যাচ্ছে। এদিকে বাড়িতে আমি বলতে পারছি না। কিন্তু এভাবে চললে বেশি দিন আর লুকোনো যাবে না।”

“জানি কিন্তু কি করবো বলো? চেষ্টা তো চালিয়ে যাচ্ছি, কিছুই তো হচ্ছে না। এই মন্দার বাজারে চাকরি পাওয়ার চেয়ে সিনেমা হলে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটা সহজ। কালকেই এক জায়গায় ইন্টারভিউ দিলাম। ওদের মুখ দেখে মনে হলো না যে চাকরিটা পাচ্ছি। আর সরকারি চাকরি তো একেবারে হীরের আংটির মতো। হয় পরীক্ষায় র‍্যাঙ্ক করে নেতাদের পা ধরো, নাহয় টাকা দিয়ে পোষ্ট কিনে ফেলো। এই দুটো পথের প্রথমটা আমার দ্বারা হবে না। আর পরেরটা তোমার পছন্দ হবে না। তাহলে কি করা যায়?” অসহায়ের মতো ঊষার দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। 

ঊষা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, “কিছু একটা উপায় তো বের করতেই হবে! বাড়িতে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে জানাজানি হলে অশান্তির শেষ থাকবে না। এভাবে রোজ রোজ তো আর পাত্র আমায় রিজেক্ট করবে না। আর একবার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলে…”

“বিয়ের মন্ডপ থেকে তুলে আনবো তোমাকে! দেখি শালা কে আমাকে আটকায়? আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করবে তুমি? সাহস হয় কি করে?” বলে চিৎকার করে ওঠে অনিরুদ্ধ।

“আস্তে!” ত্রস্ত চোখে চারদিকে তাকায় ঊষা। তারপর ধীর গলায় বলে, “তুমি কি পাগল? এইভাবে চিৎকার করছো কেন?”

“আলবাত করবো! আরো বেশি করে করবো! আমাকে ছেড়ে তুমি অন্য কারো সাথে বিয়ের মন্ডপে বসবে কেন? এই কথা বলার সাহস হয় কি করে তোমার!” বলে বেঞ্চ চেড়ে উঠে দাঁড়ায় অনিরুদ্ধ।

ঊষা একপলক তাকায় অনিরুদ্ধর দিকে তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “জানতাম!”

“কি জানতে?” বলে ভ্রু কুঁচকে ঊষার দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। ঊষা বেঞ্চে হেলান দিয়ে বলে, “আমাদের এই সম্পর্ক, আর তোমার চাকরি পাওয়া দুটোই এখন বিশ বাঁও জলে। এই কারনে আমি আগেই বলেছিলাম এই সম্পর্ক হবার নয়, কিন্তু তুমি বোঝার পাত্র নও।”

দাঁতে দাঁত চেপে অনিরুদ্ধ বলে, “ এইটা এতবছর আমার সাথে প্রেম করার সময় মনে ছিল না? নাকি অন্যকোনো পয়সাওয়ালা চাকরিরত নাগর পেয়ে মোহ কেটে গেছে?”

ঊষা হেসে বলে, “যদি বলি হ্যাঁ তাহলে কি করবে? মেরে ফেলবে? তাছাড়া আর কি পারবে? এই অ্যাটিটিউডের জন্য আজও তুমি বেকার। রগচটা, মেজাজি, অহংকারী, নবাবী অ্যাটিটিউড নিয়ে আর যাই হোক চাকরি হয় না। কিন্তু এই স্বভাবগুলো তোমার মজ্জাগত। দুনিয়াটা তোমার কলেজ ক্যাম্পাস নয় যে নিজের জোর খাটিয়ে সব আদায় করবে। মতের মিল হবে না বলে জিমিদার মতো সকলকে পেটাবে, বা রুমে ডেপুটেশনের নামে হল্লা করবে। এটা বাস্তব! এই পৃথিবীটা তোমার ওই বাইকে চলা সুগম রাজপথ নয়। পাথুড়ে, খানাখন্দে ভরা ভাঙাচোরা কাঁচারাস্তা। এখানে পায়ে হেঁটে চলতে হয়,পদে পদে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়, আবার উঠে দাঁড়িয়ে চলতে হয়। তোমার দ্বারা ওসব সম্ভব নয়। প্রথম ইন্টারভিউতে জিন্স-টিশার্ট পরে গিয়ে ওদের সামনে মুখে সিগারেট নিয়ে দেশলাই চেয়ে বসলে। দ্বিতীয় ইন্টারভিউতে ফ্যাকাল্টির প্রশ্নের জবাব দিতে না পেরে ওকে মেরে বেরিয়ে এলে। তৃতীয় ইন্টারভিউতে সব ঠিক চলা সত্ত্বেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা বন্ধুদের সাথে পার্টি করতে গিয়ে পুড়িয়ে দিলে। এত ক্যালাস তুমি যে চাকরির পরীক্ষার দিন মদ খেয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলে। তারপরও বলছো তুমি চাকরি পাবে? এত দম আসে কোথা থেকে তোমার?”

অনিরুদ্ধর মনে হয় কেউ যেন তার গালে সপাটে চড় কষিয়ে দিয়েছে। কান-মাথা জ্বালা করছে তার। একটা মিডিলক্লাস মেয়ে তাকে এইভাবে যা নয় তা বলছে! ইচ্ছে করছে কষিয়ে একটা চড় মেরে দিতে। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সহ্য করে সে। ঊষা সরাসরি অনিরুদ্ধর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “জানি তুমি পারবে না। তোমার দ্বারা ওসব হবে না। যাও, ফিরে যাও তুমি। নিজের বাবার ব্যবসায় গদি আলো করে বসো।” তারপর ধরা গলায় বলে, “ আমাকে আমার হালে ছেড়ে দাও। এভাবে আমাদের সম্পর্ক জিইয়ে রাখা অসম্ভব। আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো। এতে দুজনেই খুশি থাকবো। আর আমাকে ভুলে যেও। মনে করবে আমাদের এই সম্পর্কটা একটা স্বপ্ন ছিল।”

বলে উঠে দাঁড়ায় ঊষা। অনিরুদ্ধ আর সহ্য করতে পারে না। পেছন থেকে শক্ত করে ধরে ঊষার হাত, পেছনদিকে মুচড়ে ধরে হাতটা। ককিয়ে ওঠে ঊষা। কানের কাছে মুখ এনে হিসহিসে কন্ঠস্বরে বলে ওঠে অনিরুদ্ধ, “কোথায় যাওয়া হচ্ছে? আমাকে ছেড়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? শালী! এতদিন আমার সাথে প্রেমের ভান করে, নাটক করে, এখন নতুন নাগর পেয়ে আমাকে কলা দেখানো হচ্ছে! বলা হচ্ছে আমাদের সম্পর্কটা স্বপ্ন মনে করে ভুলে যেতে! শালী তোকে মেরেই ফেলব আমি! জিমি ঠিকই বলতো! তোদের মতো মেয়েরা টাকা বোঝে আর সম্পত্তি বোঝে। সরকারি চাকরি টাকরি সব ভান! আসলে নতুন নাগর জুটেছে তাই আমাকে কাটানোর প্ল্যান! অনেকদিন ধরে দেখে যাচ্ছি তোর নাটক দেখছি। আর নয়! আজকেই তোকে আমি…!”

ব্যথার মধ্যেও গর্জে ওঠে ঊষা, “ কি করবে? রেপ করবে? মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেবে নাকি আমাকে মেরে ফেলবে? অবশ্য তা তুমি করতেই পারো! বড়োলোক বাপের ছেলে কিনা! যে ছেলে মতের মিল না হওয়ায় লোকজনকে মেরে ফেলতে পারে সেই ছেলে আমার মতো একটা মিডিলক্লাসের মেয়েকে অনায়সে পৃথিবী থেকে লুপ্ত করে দিতে পারে। আসল কথা কি জানো? বাইরে থেকে তোমরা যতটা সুদর্শন ভেতর থেকে ততটাই কুৎসিত! বাইরে যতই ভালো সাজো না কেন? ভেতর ভেতর প্রত্যেকে নোংরা মনের মানুষ! তোমার আর জিমিদার মধ্যে কোনো তফাৎ নেই! দুজনেই একই মানসিকতার মানুষ! আমারই ভুল তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসা। তোমার সাথে মেশা। তারই মাসুল দিতে হবে! রেপ করবে তো? চলো ওইদিকের ঝোপে চলো! তারপর মনের সুখে আমাকে রেপ করে পাথর দিয়ে আমার মাথাটা থেতলে দেবে। ভয় নেই! যতই যন্ত্রণা দাও না কেন আমি চ্যাচাবো না।”  

কথাটা শোনা মাত্র ঊষাকে কষে থাপ্পর মারে অনিরুদ্ধ! থাপ্পরের চোটে মাটিতে আছড়ে পড়ে ঊষা। দাঁতে দাঁত চেপে পাশে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছের গুড়িতে ঘুষি মেরে নিজের রাগটা ঝেড়ে ফেলে অনিরুদ্ধ। তারপর ঝুঁকে ঊষাকে তুলে বেঞ্চে বসিয়ে দেয়। মাটিতে পড়ে গিয়ে ঊষার কপালের একপাশে আঘাত লেগে রক্ত জমাট বেধে গেছে, জায়গাটা হাল্কা নীলচে দেখাচ্ছে। গালেও হাতের পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে গেছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে পার্কের ট্যাপকলের জলে ভিজিয়ে এনে ঊষার মুখের লেগে থাকা ধুলোবালি পরিস্কার করে ব্যথার জায়গাটায় চেপে ধরে রক্তটা সচল করার জন্য একটু ঘষে দেয় অনিরুদ্ধ। এত কিছুর পরেও ঊষা নীরব হয়ে বসে থাকে, যেন কিছুই হয় নি। অনিরুদ্ধ ঊষার মুখটা মুছে নতজানু হয়ে ঊষার সামনে বসে পড়ে। তারপর হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ঊষার কোলে মুখ গোঁজে। ঊষা নির্বিকার হয়ে বসে থাকে।

অনিরুদ্ধ গোঙাতে গোঙাতে বলে, “একটা সুযোগ!... একটা সুযোগের অপেক্ষায় বসে আছি।… সুযোগটা পেলে আর আমাদের চিন্তা করতে হবে না।… কত চেষ্টা করছি আমি! কিন্তু সেই সুযোগ আসছেই না।… দিনের পর দিন এভাবে চাপে পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি!... একমাত্র তোর মুখ দেখে, তোর সাথে গোটা জীবনটা কাটাবো এই আশায় রোজ একেকটা ইন্টারভিউতে যাচ্ছি।এখন তুইও যদি এভাবে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিস তাহলে আমি কোথায় যাবো বল? আমার যত সংঘর্ষ আমাদের কথা ভেবেই। এখন যদি তুইও আমাকে এভাবে ছেড়ে চলে যাস তাহলে আমার এতদিনের সব যুদ্ধ মাটি হয়ে যাবে।”

ঊষা আনমনে অনিরুদ্ধর মাথায় বিলি কাটতে থাকে। ছেলেটা যে চাকরির জন্য কতটা খাটছে তা সে বিলক্ষণ জানে। এবং কেন একটা চাকরির জন্য এতটা আকুল সেটাও অজানা নয় ঊষার। বড়োলোক ব্যবসায়ী বাবার আদুরে ছেলে, চাইলে আরামে বাবার সাথে ব্যবসায় নেমে জীবন কাটাতে পারতো। কিন্তু ওর একটা শর্তে সব কিছু ছাড়তেও প্রস্তুত হয়ে গেছে ছেলেটা। এমন ছেলেকে কি না ভালোবেসে পারা যায়? 

******
“দাঁড়া! তখন থেকে শুধু পালিয়ে বেড়াচ্ছে! আমি কি বাঘ , ভাল্লুক, না পুলিশ ? যে এভাবে আমাকে দেখলেই ভয়ে পালাচ্ছিস?” বলে দৌড়ে ঊষার পথ আগলে দাঁড়ায় অনিরুদ্ধ। 

“তোমাকে ভয় পেতে আমার বয়েই গেছে! পথ ছাড়ো ক্লাসে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। ” বলে অনিরুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে ক্লাসের দিকে এগিয়ে যায় ঊষা। ঊষার পেছন পেছন পেছন অনিরুদ্ধ হাটতে হাটতে বলে, “উফ! একটু দাঁড়া না! এত কিসের তাড়া তোর? পিকে স্যারের ক্লাস তো? ও আমি নোট এনে দেব। চাপ নেই।”

“না চাপ আছে!” বলে হাটার গতি বাড়ায় ঊষা। পেছন পেছন প্রায় দৌড়তে দৌড়তে অনিরুদ্ধ বলে, “কীসের চাপ?” ঊষা প্রায় ক্লাসে পৌঁছে গেছে। ক্লাসে ঢোকার আগে সে বলে, “পরে বলবো।”

প্রায় দুঘন্টা পরে কলেজের মাঠে দুজনে দুদিকে বসে আছে। একজন বইয়ের পাতায় মগ্ন, অপরজন সিগারেটের ধোঁয়ার রিং ওড়ানোয়। তবে একজনের গোমড়ামুখ দেখে মনে হয় সে অপরজনের কোনো কাজে আহত হয়ে অভিমান করে বসে আছে। অপ্রজনের অবসশ্য তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বইয়ের পাতাতে মগ্ন। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সিগারেটটা শেষ করে মাঠের উপর শুয়ে পড়ল অনিরুদ্ধ। ভেবেছিল ঊষা হাই হাই করে উঠবে এই নোংরা মাটিতে শুতে দেখলে। কিন্তু ঊষা তখনও একমনে বই পড়ে চলেছে দেখে বাধ্য হয়ে সব অভিমান জলাঞ্জলী দিয়ে অনিরুদ্ধ বলে উঠলো, “ধুস! এত কি পড়িস তুই বলতো? সারাদিন দেখছি কোনো না কোনো একটা বই সবসময় মুখের সামনে ধরা। শেষমেশ জিমির ভুত তোর উপরও চাপলো নাকি?”

বই পড়তে পড়তে ঊষা বলল, “এর উত্তর আমার চেয়ে বেশি তুমি জানবে। সামনেই ফাইনাল সেমেস্টারের পরীক্ষা। এখন যদি না পড়ি তাহলে কখন পড়বো?”

“রাখ তো? এত পড়ে কি হবে? আচ্ছা পরীক্ষা নিয়ে এত চিন্তা তো? ও আমি কোশ্চেন পেপা…” অনিরুদ্ধর কথা মুখেই থেকে গেল। ঊষা ঝট করে তাকিয়েছে অনিরুদ্ধর দিকে। ঊষার চোখের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় পড়ে গেল অনিরুদ্ধ। ঊষা ভ্রু কুঁচকে ভৎসর্নার চোখে তাকিয়ে বলল, “লজ্জা করে না এই কথাটা বলতে? এই তুমি কলেজের এফিশিয়েন্ট ছাত্র? ছিঃ! ছিঃ! অনি, শেষমেশ তুমি কিনা কোশ্চেন পেপার চুরি করতে চাইছো!”

“এই দেখো! চুরি করতে চাইছি কবে বললাম? আরে আমি বলছি যে তেমন হলে চুরি করা যাবে।” আমতা আমতা করে বলে অনিরুদ্ধ।

“না করবে না!” গর্জে ওঠে ঊষা! “আমি করতে দেবো না। পরীক্ষায় ফেল করলে ফেল করবো কিন্তু কোনোরকম চিটিং করবো না।”

“আরে আমি কথার কথা বলছি। সত্যি সত্যি করবো নাকি? তুইও যেমন!” বলে হাসার চেষ্টা করে অনিরুদ্ধ। ঊষা গম্ভীর মুখে বই পড়তে পড়তে বলে, “কথাটাও বলবে না। আমি চাই না আমার কেরিয়ারে আর কোনো দাগ লাগুক। মনে রেখো অনিরুদ্ধ সেনগুপ্ত, তোমার জন্য যদি আমার কেরিয়ারে কখনো দাগ লাগে তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করবো না।”

বলে আবার বইতে মুখ গোঁজে ঊষা। অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আলতো করে বলে , “ঊষা, তুই আমার উপর শুধু শুধু রাগ করছিস। আমি তো জাস্ট কথার কথা বলেছিলাম। আমি জানি যদি আমি কোনোদিন পেপার চুরি করেও আনি তুই কোনোদিনই সেই পেপার ফলো করবি না। বরং এমন ব্যবস্থা করবি যাতে সেই পেপারে কেউ পরীক্ষা না দিতে পারে।”

“তা জানোই যখন তাহলে এরকম কথা বলে আমাকে রাগিয়ে দাও কেন?”

“সত্যি বলবো? না কারনটা অনেকটা সেই নাইন্টিজের বাংলা সিনেমার ডাইলগের মতো শোনাবে।”

“বাঃ বাঃ তুমি আবার বাংলা সিনেমাও দেখো নাকি?” ঠোঁট ওল্টায় ঊষা।

“একসময়ে দেখতাম। এখন মনে পড়লে মনে হয় কেন দেখতাম?” বলে হতাশ গলায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনিরুদ্ধ।

“তা এই সত্যিটা কি শুনি?”

“রাগলে তোকে ভীষণ কিউট লাগে।”

কথাটা শোনার পর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকে ঊষা তারপর হো হো করে হেসে ফেলে। অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ঊষার দিকে। কিছুক্ষণ হাসার পর ঊষা নিজেকে সামলে বলে, “ইস! এর চেয়ে না বললেই পারতে! কি বাজে লাগলো শুনতে! আমি তোমার সানলাইট মার্কা অ্যাডের লাইন এটা।”

হতাশ গলায় অনিরুদ্ধ বলে , “জানতাম! আমি জানতাম এই নিয়ে খিল্লি হবে। আরে ওসব ফ্লার্টিং টার্টিং আমার দ্বারা হয় না।”

হাসতে হাসতে ঊষা বলে, “তাই বলে এই বস্তাপঁচা ডাইলগ ঝাড়বে? ও মাগো! পেট ব্যথা করছে আমার হাসতে হাসতে!”

কাঁদো কাঁদো মুখ করে অনিরুদ্ধ বলে, “সবই আমার কপাল! নাহলে এরম প্রেমিকা জোটে? কতদিন পর প্রেমিকাকে প্রেম নিবেদন করলাম। কোথায় লজ্জা পাবি তা না উল্টে হেসে গড়িয়ে পড়ছিস।”

ঊষা হাসি থামিয়ে বলে, “ তা হাসবো না তো কি করবো? তুমি যেমন ফ্লার্টিং পারো না তেমনই নেকুপুষু প্রেম আমারও পোষায় না। কাজেই ওসব ডাইলগ দিয়ে আমাকে পটাতে পারবে না।” 

“তাহলে কি করিলে আপনার হৃদয় পাবো দেবী?”

“অতো বার খাওয়াতে হবে না।” বলে আবার বইতে মুখ গোঁজে ঊষা। 

“ইস! কি ভাষা হয়েছে রে তোর!” নাক কুঁচকে বলে অনিরুদ্ধ।

“কি করবো? মোর প্রেমিকের সঙ্গদোষের জোর।” বই পড়তে পড়তে আলগোছে বলে ঊষা।

অনিরুদ্ধ প্রথমে চমকে গিয়ে তারপর হেসে বলে “আমি নিরপরাধ ধর্মাবতার! আমার দোষ নাই।”

ঊষা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “ওই ক্লাসের টাইম হলো আমি পালাই।”

******

বাইকটা গ্যারাজে পার্ক করে বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে বাবার গলা শুনতে পেল অনিরুদ্ধ। ঘরে ঢুকে দেখলো বাবা আজকে সকাল সকালই দোকান থেকে ফিরে এসেছেন। ড্রইং রুমে সোফায় বসে তার দিকে অপলকে তাকিয়ে আছেন। পাশে দাদা বিব্রত মুখ করে বসে। ঠাকুমার সোফার আরেকপাশে থমথমে মুখ করে বসে আছেন। অনিরুদ্ধ ওর বাবাকে পাত্তা না দিয়ে চুপচাপ দেওয়ালের হুকে বাইকের চাবি ঝুলিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগোতেই শুনতে পেল বাবার গম্ভীর কন্ঠস্বর। 

“দাঁড়াও অনি! তোমার সাথে কয়েকটা কথা ছিল।”

অনিরুদ্ধ থমকে দাঁড়ালো। ধীর পায়ে ব্যাপারখানা আঁচ করতে করতে এগিয়ে এলো ড্রইং রুমে। বাবা তখনও তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। সে কাছে এগোতেই তিনি বললেন, “বসো!”

অনিরুদ্ধ সোফায় বসার পর কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “কাল থেকে তুমি আমার সাথে দোকানে বসবে। অনেক ঘোরাঘুরি, পড়াশুনোর নামে রংবাজি হয়েছে আর নয়! এবার থেকে সব বন্ধ।”

অনিরুদ্ধর মনে হল কেউ যেন তাকে অনেক উচু থেকে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিয়েছে। ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করতে বেশ কিছুক্ষণ লাগলো তার। কোনোমতে সে জিজ্ঞেস করলো , “কেন?”

“আমি বলেছি বলে! আমি চাই না তোমার স্বেচ্ছাচারিতার জন্য আমাকে আর কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হতে। বাপের হোটেলে থেকে বাপের পয়সায় খেয়ে আর ঘোরাঘুরি করতে হবে না।”

“কিন্তু আমার চার্টাড অ্যাকাউন্টেন্সি…”

“থামো! আর গুলগপ্পো দিতে হবে না! তোমার মিথ্যে ধরা পড়ে গেছে!”

পরিস্থিতি সামলাতে ঠাকুমা বলে উঠলেন, “আহা ও বাইরে থেকে এসেছে! স্নান করে ফ্রেশ হয়ে আসুক। তারপর নাহয় খেতে বসে ধীরে সুস্থে…”

“তুমি চুপ করো মা!” গর্জে উঠলেন অনিরুদ্ধর বাবা।

“বাপ-ছেলের মাঝে একটাও কথা বলবে না তুমি! তোমার আশকারাতেই ও এতবড়ো স্পর্ধা দেখিয়েছে! কিছু বলতে গেলেই সবসময় তুমি আড়াল করে গেছো ওকে! তোমার আশকারা না হলে এত সাহস পায় কোথা থেকে?”

অনিরুদ্ধ নিজেকে সামলে বলে ওঠে, “এক সেকেন্ড! ঠাম্মির সাথে ওভাবে কথা বলছো কেন? কি হয়েছেটা কি? আমি এমন কি করেছি যেটায় তোমার মুখ দেখানো দায় হয়ে গেছে! কি করেছি আমি?”

“কি করেছো? আবার বড়ো মুখ করে জিজ্ঞেস করছো আমাকে? আমার মান সম্মান একেবারে ডুবিয়ে দিয়েছ তুমি!”

“আহা কি করেছি সেটা তো বলবে? ফাঁসির আসামীকেও সাজা দেওয়ার আগে তার অপরাধ সম্পর্কে জানানো হয়। সেখানে আমার জীবন নিয়ে এতবড়ো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি জানবো না যে কি কারনে এই সিদ্ধান্ত নিতে হলো তোমাকে?”

“বেয়াদপ ছেলে! বাপের নাম ডুবিয়ে চাকরি করতে যাবে তুমি? লোকের ফাইফরমাস খাটবে? বড্ড লায়েক হয়ে উঠেছ না তুমি?”

এতক্ষণে সবটা পরিস্কার হয় অনিরুদ্ধর কাছে। সে চট করে খামটা খুলে ফেলে। ভেতর থেকে বের করে আনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা। পড়তে পড়তে মনের ভেতর একটা আনন্দের ঢেউ খেলে যায় তার। অবশেষে সে পেরেছে! একটা চাকরি! যে কোনো একটা হোক তাও একটা সরকারি চাকরি! মুহূর্তের মধ্যে ড্রইংরুম, ঠাকুমা, দাদা, বাবা চোখের সামনে থেকে উবে গেল। সে নিজেকে আবিস্কার করলো কফিহাউজে। তার সামনে চেয়ারে বসে আছে ঊষা। একদৃষ্টে চেয়ে আছে কফির কাপের দিকে।

******
“কিরে হা করে বসে আছিস কেন? খা! বুঝেছি, কফিটা ভালো হয়নি না? সত্যি কফিহাউজের কফির মানটা দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে।”

সম্বিত ফিরে পেয়ে হাল্কা বিব্রত হয় ঊষা। হাল্কা হেসে বলে, “এমা! না না! কফি ঠিকই আছে।”

“তাহলে খাচ্ছিস না কেন?”

“খাচ্ছি তো।” বলে কফির কাপে চুমুক দেয় ঊষা। 

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে ঊষার দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলে, “ব্যাপার কী বল তো? কয়েকদিন ধরে দেখছি তুই একটু ডিস্টার্বড। কী এত চিন্তা করছিস তুই? ”

ঊষা চমকে বলে, “কই কিছু না তো! সব ঠিক আছে। ”

অনিরুদ্ধ মাথা নেড়ে বলে ,“না কিছু ঠিক নেই। থাকলে তোর মুখটা এরকম দেখাতো না। কী হয়েছে আমাকে বল?”

ঊষা বিরক্ত হয়ে বলে,“বললাম তো কিছু হয় নি! তোমার কফি খাওয়া হয়েছে? তাহলে চলো আমাকে বাসস্টপে পৌঁছে দেবে”

“সেকি? এত তাড়াতাড়ি? কিছুই তো খেলি না!”

“আমার ভালো লাগছে না। তোমার হলে চলো। নাহলে আমিই চললাম।” বলে উঠে দাঁড়ায় ঊষা। 
শশব্যস্ত হয়ে অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়ায়। কফির দাম মিটিয়ে কফিহাউজের বাইরে এসে দাঁড়ায় ওরা।

অনিরুদ্ধ বাইক বের করার সাথে সাথে পেছনে ঊষা বসতেই অনিরুদ্ধ বাইক স্টার্ট করে দেয়। কিছুদুর যাবার পর বাসস্টপে না গিয়ে উল্টোদিকের পথ ধরে সে। ঊষা অবাক হয়ে বলে, “আরে করছো টা কী? বাসস্টপ তো পার হয়ে গেল!” 

অনিরুদ্ধ বলে, “জানি, চুপ করে বসে থাক। আমি তোকে ঠিক সময় পৌঁছে দেব। এখন বিরক্ত করিস না।” 

ঊষা বুঝতে পারে অনিরুদ্ধ আজ ওকে সহজে ছাড়বে না। পেটের কথা বলিয়ে ছুটি দেবে। ঊষা শান্ত গলায় বলে, “বাইক থামাও। আমি নেমে যাচ্ছি অনিরুদ্ধ ।” অনিরুদ্ধ বাইকের গতি বাড়িয়ে দেয়। ঊষা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অনিরুদ্ধকে। 

“অনিরুদ্ধ আমার ভয় করছে। বাইক থামাও বলছি।” ঊষা কাঁপা অথচ শান্ত গলায় বলে। অনিরুদ্ধ জবাবে বাইকের গতি আরো বাড়িয়ে দেয়। ঊষা আরো ভয়ে চেপে ধরে অনিরুদ্ধর জামাটাকে। কিন্তু অনিরুদ্ধর কোনো বিকার নেই। সে প্রবল গতিতে বাইক চালিয়ে যাচ্ছে। বেগতিক দেখে অবশেষে ঊষা বলে, “আচ্ছা বেশ বলছি কী হয়েছে। আগে বাইকটা থামাও।” অনিরুদ্ধ বাইকের গতি কমিয়ে এগোতে থাকে।

বেশ কিছুদুর যাবার পর একটা পার্কের সামনে বাইকটা দাঁড় করায় অনিরুদ্ধ । ঊষা চট করে নেমে দাঁড়ায়। অনিরুদ্ধ বাইকটাকে পার্কিংয়ে রেখে ঊষার দিকে তাকিয়ে বলে, “ভেতরে কথা বলার অনেক জায়গা আছে। সেখানে আমাদের ডিস্টার্ব করবে না।” বলে ঊষার সাথে সাথে পার্কের ভেতরে ঢোকে। 

পার্কের ভেতরটা বেশ ছিমছাম, নিরিবিলি। চারদিকে সবুজ জানা-অজানা গাছে ঘেরা পার্কটা। একপাশে বাচ্চাদের খেলার জন্য নানারকম দোলনা, স্লিপার রয়েছে। তেমনই জগারদের জন্য মোরামের রাস্তা আছে। রাস্তার ধারে কয়েকটা স্টিলের বেঞ্চ পাতা। তার মধ্যে একটায় বসে অনিরুদ্ধরা। 

এখন দুপুরবেলা বলে পার্কে তেমন ভীড় নেই। দু-একজন যারা আছে তারাও নিজেদের মধ্যে প্রেমালাপে ব্যস্ত। অনিরুদ্ধ সেদিকে আলগোছে একবার তাকিয়ে সিগারেট ধরায়, তারপর একটা টান মেরে বলে, “এবার বল কী হয়েছে।”

ঊষা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। অনিরুদ্ধ বোঝে কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারছে না মেয়েটা। ঊষাকে সবটা গুছিয়ে বলার সময় দেয় সে। কিছুক্ষণ পর ঊষা সোজা তাকায় অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ দেখে ঊষার চোখের কোণটা চিকচিক করছে জলে। যেন প্রাণপণে কান্না চেপে রেখেছে মেয়েটা। যেকোনো মুহূর্তে কেঁদে ফেলবে। হতবাক অনিরুদ্ধ ঊষার হাত নিজের মুঠোতে এনে বলে, “কী হয়েছে? এনিথিং সিরিয়াস? বাড়ির সবাই ভালো আছে? কাকু মানে তোর বাবার শরীর ভালো তো?”

মাথা নেড়ে ইতিবাচক উত্তর দেয় ঊষা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অনিরুদ্ধ ।

“ যাক বাবা! আমি তো টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম! তাহলে কী হয়েছে?”

“আমার বোধহয় আর বেশিদিন পড়া সম্ভব হবে না।” 

“মানে?” কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকে যায় অনিরুদ্ধর। 

ঊষা ধরাগলায় বলে, “বাবার শরীর রীতিমতো ভাঙছে। এককালে আমাদের জন্য অনেক খেটেছে। আর কত খাটবে? তার উপর বয়স হয়েছে। সংসারটা বাবার পেনসন আর আমার এবং নিশার টিউশনির টাকায় চলে। গত সেমেস্টারে দুটো টিউশনি ছেড়েছিলাম পরীক্ষার চাপে। তারপর আর পাইনি। কেউ আর নতুন টিউশন টিচার চাইছে না। বাকি টিউশনগুলোও প্রায় না হবারই সমান। বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে তাদের অভিজ্ঞ গৃহশিক্ষক প্রয়োজন। অতএব মানে মানে কেটে পড়ো। কিন্তু যেহেতু অনেকদিন ধরে পড়াচ্ছি তাই মুখ ফুটে বলতে পারছেন না। এবার ওটা ছেড়ে দিলে কার্যত হাত ফাঁকা হয়ে যাবে আমার । বাড়িতে আমি ছাড়াও নিশা রয়েছে। ওরও পড়াশুনো আছে। সামনের বছর জয়েন্ট দেবে। এরমাঝে যদি আমি…”

“বুঝেছি। কিন্তু তাই বলে এভাবে হুট করে মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিবি?”

“না। লাস্ট সেমেস্টারটা দিলেই আমার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হবে। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেই ইতি দেব।”

ঊষা মাথা নাড়ে। অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করে, “আর তোর চাকরির স্বপ্ন, চাকরি করে বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছেটা? সেটার কি হবে?”

ম্লান হাসে ঊষা, “কতরকম স্বপ্নই তো দেখে মানুষ । সব স্বপ্ন কি সত্যি হয়? মধ্যবিত্তের স্বপ্ন দেখাটাই সার। বাস্তবে পূর্ণ করা অসম্ভব । এটাও তেমনই থেকে যাবে।”

“তারপর কি করবি?”

“যা যুগে যুগে মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়েরা করে আসছে। কন্যাদায়গ্রস্ত বাপ-মাকে মুক্তি দেব।”

“মানে? তুই বিয়ে করবি? কাকে?”

“যার সাথে বাবা মা ঠিক করবে!”

“হোয়াট দ্য ফ…! আর আমাদের সম্পর্কটা?”

“ভালো স্বপ্ন মনে করে ভুলে যেতে হবে দুজনকেই। এই কারনেই আমি কোনোরকম সম্পর্ক চাইনি তোমার সাথে। তুমিই কাছে এসেছিলে।”

অনিরুদ্ধর মনে হয় তার মাথায় যেন বাজ পড়লো। তার মনে হয় কেউ তাকে মাটিতে আছড়ে ফেলেছে। এতদিন সে মুর্খের স্বর্গে বাস করেছে। এখন বাস্তবের মুখোমুখি হতে সব যেন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে। ভালোবাসা জিনিসটা ততদিনই সুন্দর থাকে যতদিন পর্যন্ত মানুষ বাস্তবের সম্মুখীন না হচ্ছে।

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। তারপর হঠাৎ বলে, “বাড়িতে জানে আমাদের সম্পর্কে? ”

“নিশা বাদে কেউ জানে না। সেদিন নিশা আমাদের দেখে কিছু আন্দাজ করেছিল বোধহয়। তারপর সবটা জানতে পারে। কিন্তু বাড়িতে জানায় নি।” 

“হুম। বেশ আজ বাড়ি ফিরে কাকিমাকে জানিয়ে দিবি।”

ঊষা ত্রস্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, “মানে? কী বলতে চাইছো তুমি?”

“মানে কাল আমি ঠাম্মিকে নিয়ে তোদের বাড়ি আসছি। তোকে বউ করে নিয়ে যেতে।”

“পাগল হয়ে গেছ তুমি? কী বলছো কোনো খেয়াল আছে তোমার?”

“কেন? ভুল কী আছে এতে?”

“বাড়িতে জানাজানি হলে কী হবে ভেবেছ? আমার কলেজে পড়া আগেই বন্ধ হয়ে যাবে! পড়াশোনা করতে গিয়ে কলেজে প্রেম করছি জানলে… পাড়া-প্রতিবেশীরা এমনিতেই বাঁকা কথা শোনায়। তারপর জানাজানি হলে… না না! তা হয় না। তার উপর বাবা আমাদের সম্পর্ক মানবে না।”

“সেকি? কেন?”

“যারা ব্যবসা করে, কিংবা দোকান বা কারখানা আছে তাদের বাবা সহ্য করতে পারে না।”

“তোর বাবা সিপিএম নাকি? শ্রেণীশত্রু, বুর্জোয়া মানে?”

“অনিরুদ্ধ!” ঊষা বিরক্ত হয়।

“যাহ বাঁ…! তুই তো বলছিস তোর বাবা ব্যবসায়ীদের সহ্য করতে পারে না। তা সিপিএমের পাবলিকরাই তো এসব মানে।”

“বাবার মত হলো, ব্যবসায় স্থায়ী আয় নেই। পুরোটাই লাভের উপর নির্ভরশীল । এমনকি ব্যবসা করে সকলে লাভের মুখ যেমন দেখে রাজা হয় তেমনই ক্ষতি হলে পথের ভিখিরি হয়ে যায়। তাই বেশীরভাগ ব্যবসায়ী কালোটাকা রাখে। ট্যাক্সে ফাঁকি দেয়। তাই বাবার চোখে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ক্রিমিনাল। বাবার সখ সরকারি চাকরী করা ছেলের সাথে আমাদের দুই বোনের বিয়ে দেবে। ”

“বুঝলাম।” বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অনিরুদ্ধ ।

“কী বুঝলে?” ঊষা জিজ্ঞেস করে।

“প্রথমত, তোর বাবা ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে গেলে ভালো নাম করতেন, ডাকঘরের পোষ্টমাষ্টার হয়ে জীবন ব্যর্থ করেছেন। দ্বিতীয়ত, তোর বাবা পাক্কা সিপিএম এবং তোকেও মিনি সিপিএম করে তুলেছেন। এবং শেষ পয়েন্ট তোর বাবা ছিটগ্রস্ত। সরি ছিটগ্রস্ত বলছি। কথাটা হবে টিপিক্যাল ছিটগ্রস্ত।”

ঊষা উঠে দাঁড়ায়। রাগে ওর গোটা মুখ থমথমে হয়ে গেছে। সে হাটা শুরু করলে পেছন থেকে অনিরুদ্ধ ঊষার হাত ধরে বলে, “আরে রাগ করলি নাকি? আরে আমি মজা করছিলাম! আচ্ছা বাবা শ্বশুরমশাইকে আর সিপিএম বলবো না হয়েছে? এবার বোস, একটা আইডিয়া এসেছে।”

“কী?”

“তোর বাবার চাকরিওয়ালা ছেলে পছন্দ তো? বেশ আমারও বাবার ব্যবসায় জয়েন করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। কিন্তু বাবা নাছোড়বান্দার মতো আমাকে ব্যবসায় নামাবেই। একটা রিজন খুঁজছিলাম বাবাকে থামানোর। মনে হয় এতে দুজনের বাপই থামবে। আচ্ছা আমি যদি চাকরী পেয়ে তোর বাবার সামনে হাজির হই তাহলে তো ওনার কোনো আপত্তি নেই।”

“মানে? কী বলতে চাইছো তুমি? তুমি চাকরি করবে?”

“ইয়েস মাই লাভ। চাকরি করবো।”

ঊষা এতক্ষণে ফিক করে হাসে, “তুমি আর চাকরি? ব্যাপারটা কেমন শোনাচ্ছে না? মানে শচিনকে সিজন বল দিয়ে ফুটবল মাঠে বাস্কেট বল খেলতে বলা হচ্ছে এমন ব্যাপার হয়ে গেল না?‌ এ প্ল্যান চলবে না।”

“আলবাৎ চলবে! বাজি লাগাতে পারিস।”

“চাকরি মুখের কথা নয়। আর জীবনটা কলেজ‌ নয় যে গায়ের জোরে সব পেয়ে গেলে। ”

“বেশ দেখা যাবে! আমি চাকরি পেয়ে দেখাবো। কি বাজি রাখবি বল।”

“অনিরুদ্ধ…!”

“আমি বাজি লাগাচ্ছি। যদি পাঁচবছরের মধ্যে আমি চাকরি না পাই তাহলে বাবার ব্যবসায় যোগ দেব। আর তোর বিয়েতে সবচেয়ে বড়ো বোকে টা আমিই পাঠাবো। কিন্তু চাকরি পেলে তুই কি‌ করবি?”

ঊষা থমকে তাকায় অনিরুদ্ধর দিকে। ছেলেটা অন্যদিন এতটা কনফিডেন্স নিয়ে কথা বলে না। আজ এতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কেন? অবশ্য একটা চমৎকার হোক সেও চায়। কিন্তু … দেখাই যাক‌ না কি হয় কিছুক্ষণ ভেবে বলে, “তুমি যা চাইবে তাই পাবে।”

“কথা দিচ্ছিস?”

“দিলাম!”

“পরে পিছিয়ে যাবি না তো?”

“প্রশ্নই ওঠে না!"

“পাঁচবছর পর না পারলে আমাদের সম্পর্কটার কী হবে?”

“যা হয়, ব্রেকাপ। চিরকালের মতো। আমরা একে অপরের অচেনা হয়ে যাবো চিরকালের মতো। এই বাজিটা শুধু আমাকে পাবার বাজিই নয় আমাদের সম্পর্কটাকে পণ করে বাজি। জিতলে ঠিক আছে। হারলে আমি তোমাকে চিনবো না।”

“বেশ! মনে থাকবে তো?”

“থাকবে! তোমার মনে থাকবে?”

প্রশ্নটা ক্রমাগত তাকে ধাক্কা দিতে দিতে বর্তমানে ফিরিয়ে আনে। অনিরুদ্ধ দেখে সে ড্রইংরুমে বসে আছে। তার বাবা ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করছেন, “মনে আছে ওদের মাকে কী কথা দিয়েছিলে? ছেলেদের মানুষ করবে। এই তোমার মানুষ করার নমুনা?”

চিঠিটা আরেকবার পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল অনিরুদ্ধর। তাহলে দিনটা এসেই গেল অবশেষে! সোজাসুজি সে তাকালো তার ঠাকুমার দিকে। অপমানে,আত্মগ্লানিতে, কষ্টে মানুষটা এতটুকু হয়ে গেছে। হঠাৎ মাথায় আগুন চেপে গেল তার। ঊষাকে সে কথা দিয়েছিল আর সে কোনোদিন ঝগড়া করবে না। কিন্তু কতক্ষণ ঠাকুমাকে এভাবে অপদস্ত হতে দেখা যায়? সে ঠিক করল আর নয়। আজই এসপার নয় ওসপার করে ছাড়বে। ভাবতে ভাবতে সে উঠে দাঁড়ালো সোফা ছেঁড়ে।

“একমিনিট! ব্যাপারটা কী? ঠাকুমাকে খামোখা কথা শোনাচ্ছ কেন?"

অনিরুদ্ধর বাবা অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বললেন,“একটাও কথা বলবে না তুমি! চুপচাপ ঘরে যাও!"

“না যাব না! ঘরের সদস্য হিসেবে আমারও কিছু মতামত আছে। তাছাড়া আমি তোমার কচি খোকা নই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক হবার দরুণ আমার জীবন নিয়ে আমার নিজস্ব মত আছে। তুমি এভাবে নিজের মত আমার উপর আমার ইচ্ছে ছাড়া চাপিয়ে দিতে পারো না। আমি দাদা নই যাকে ম্যানুপুলেট করে, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে ব্যবসায় নামাতে পারবে। ”

“এত বড়ো বড়ো কথা? চাকরি পেয়ে লায়েক হয়ে গেছ না? আমি তোমাকে...” বলে অনিরুদ্ধকে সপাটে চড় মারেন তার বাবা।

চড়টা খেয়ে স্বাভাবিক গলায় বলে অনিরুদ্ধ, “আমাকে যতখুশি মারতে পারো, কিন্তু মেরে তো সত্যিটা মিথ্যে হবে না। দাদা স্কুলে টপার ছিল। আমাদের স্কুলে সবচেয়ে হায়েস্ট মার্কস দাদার। এমনকি কলেজে পর পর তিনবছর টপারের সিট দাদার দখলে ছিল। সেই মেধাবী ছেলেটা হঠাৎ ফাইনাল পরীক্ষায় সাপ্লি পেল এটা বিশ্বাসযোগ্য?তুমিই বলো এটা সম্ভব?"

অনিরুদ্ধর দাদা উঠে দাঁড়ায়, “চুপ কর অনি। বাবার মুখে মুখে কথা বলিস না।”

“তুই চুপ কর! এতদিন একটা মিথ্যে ভয় নিয়ে বেঁচে আছিস। তোর কি মনে হয় মানুষটা সত্যিই বিষ খাবে?" বলে অনিরুদ্ধ ওর বাবার দিকে ফিরে বলে, “বলো সেদিন তুমি দাদার ঘরে ঢোকোনি? দাদাকে ভয় দেখাও নি? ভুল বুঝিয়ে ম্যানুপুলেট করো নি? সেদিন তুমি ভেবেছিলে আমি ঘুমিয়ে আছি। কিন্তু সেদিন আমি সবটা শুনেছিলাম বাবা! সেদিনই বাবা হিসেবে তোমার প্রতি সব শ্রদ্ধা শেষ হয়ে গেছে আমার! বাবা‌-মায়েরা সন্তানের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করে থাকেন, তারা যা করেন সন্তানের মঙ্গলের জন্য এটা আমি মানি। কিন্তু কোনো বাবা নিজের দায়িত্বের বোঝা জোর করে নিজের সন্তানের কাছে চাপিয়ে দেন না। নিজেকে শেষ করে দেবেন এমন ভয় সন্তানকে দেখান না। কিন্তু তুমি? তুমি নিজের ব্যবসার জন্য এসব করেছ।”

“তাতে ভুল কোথায়? তোর দাদা পাশ করলে বিদেশে যেত। সেখানকার পড়াশোনা আমাদের ব্যবসার কোন কাজে লাগতো শুনি? আমি ইনভেস্ট বুঝি। বেকার কটা সস্তার রদ্দির কাগজের জন্য টাকা খরচ করা আমার ধাঁতে নেই! তোর দাদাকে বলেছিলাম বলে আজ ব্যবসাটা বেড়েছে। তুইও আয় তাহলে তিন বাপ ব্যাটায় ছহাতে রোজগার করবো ।"

“আর দাদার মতো স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে দেব তাই তো?"

“ধুস! তোরা একদম তোদের মায়ের মতো হয়েছিস! ইমোশনাল ফুল! ব্যবসায় ইমোশন চলে না, রক্তের সম্পর্ক, মনের ইচ্ছে-অনিচ্ছে চলে না। চলে শুধু প্রফিট আর কাস্টোমারকে ম্যানুপুলেট করে রাইভালদের টেক্কা দেওয়ার স্কিল। এই যে এতদিন কলেজে নষ্ট করলি এ সময়টা ব্যবসায়‌ লাগালে কত টাকা আসতো জানিস?”

“সারাদিন শুধু প্রফিট, টাকা আর প্রফিট! তোমার জীবনের আর কোনো লক্ষ্য‌ নেই না? বেশ একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তাহলেই আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে তোমার সাথে দোকানে বসবো।‌ এই অফিস, ব্যবসা, আমাদের পরিচিতি বাদ দিলে তুমি কী ? তোমার অস্তিত্ব কী?তোমার পরিচয় কী?সেনগুপ্ত ইন্ডাস্ট্রি বাদ দিলে আমরা কারা? আমাদের পরিচয় কী? লোকে আমাদের চিনবে কি করে?আমাদের ড্রাইভারের পরিচয় আছে সে একজন ড্রাইভার। সিকিউরিটি গার্ডেরও পরিচয় আছে একটা। তোমার কী পরিচয়? কে তুমি? তোমাকে মিডিয়ায় বলা হয় সেনগুপ্ত ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান কর্ণধার। ব্যস ঐটুকুই তোমার পরিচয়? আর কিছু না? এই যে দাদা ওর কি পরিচয়? ঠাকুমা আর মায়ের পরিচয় তারা সেনগুপ্ত পরিবারের পুত্রবধু, এছাড়া তাদেরকে লোকে আর কী নামে চেনে? পার্টিতে গেলে লোকে এতদিন বলতো ,‘The Sengupta's are coming' এছাড়া কি আর কোনো পরিচয় নেই?ধরে নাও না সেই পরিচিতি কেই খোঁজার জন্য এই চাকরিটা করছি। যাতে লোকে সেনগুপ্তরা না বলে একটা স্পেসিফিক নামে ডাকে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে এই পদক্ষেপ।”

“কোনো সিনেমা দেখে এসেছ নাকি কলেজে কোনো নাটক-ফাটক চলছে?এত বড়ো বড়ো ডাইলগ বেরোচ্ছে! নাহ পরিচালককে আর অভিনেতাকে একসাথে পুরস্কার দিতাম।"

“আমি তো কোনো সিনেমার কথা বলছি না। অবশ্য তোমার মনে হলে আলাদা ব্যাপার । আমি শুধু আমাদের বংশের ঐতিহ্য ফলো করছি।”

“মানে?”

“মনে আছে তুমিই তো গল্প বলেছিলে তোমার ঠাকুর্দার বাবা জমিদার বংশের সন্তান। সেন রাজাদের রক্তের একটা ধারা নাকি আজও আমাদের ধমনিতে বহমান। তোমার ঠাকুর্দার বাবা জমিদারি ছেড়ে ব্যবসা করতে চাওয়ায় জমিদার বংশে অশান্তি লেগেছিল। শেষমেষ তিনি সফল হন।”

“হ্যাঁ কিন্তু কোন মুল্যে মনে আছে তো?তা সেটা চোকাতে পারবে?এত বড়ো বড়ো বাতেলা বাড়ির বাইরে গিয়ে টিকবে তো?”

স্থির হয়ে যায় অনিরুদ্ধ । মানেটা পরিস্কার তার কাছে। বাবা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবেন। ত্যাজ্যপুত্র করবেন তাকে। চোখ বুঁজে কিছুক্ষণ নিজেকে সময় দেয়। তারপর ধীরপায়ে চলে যায় নিজের ঘরে। অনিরুদ্ধর বাবা বিজয়ের হাসি হেসে বলেন, “জানতাম পারবে না! আরে মুখে ন্যায়ের কথা, বড়ো বড়ো দার্শনিক ভাষন ঝাড়া সহজ। কাজের বেলা সকলের ফেটে চার হয়ে যায়। বাপের টাকায় অবলম্বন করে, বাইকে টোটো করে ঘোরে যে ছেলে তার মুখে মধ্যবিত্তের বস্তাপঁচা ডাইলগ মানায় না! ওসব সিনেমাতে হয়। যে নিজেই আত্মনির্ভর নয় সে নাকি আমাকে জ্ঞান দিচ্ছে! আমাকে কনভিন্স করতে যা করেছ এই এফর্টটা ব্যবসায় লাগিয়ে দেখাও। আমিও দেখবো কত টাকা প্রফিট হয়। আমাকে জ্ঞান দিতে‌ এসেছে। দুদিনের ছেলে...”

অনিরুদ্ধর বাবার মুখের কথা মুখেই থেকে গেল কারন অনিরুদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। কাঁধে ট্রাভেলিং এর রুকস্যাক। পরনে একটা মলিন শার্ট আর ফেডেড জিন্স। পায়ে একটা সাদামাটা পুরোনো স্পোর্টস শু। ড্রইংরুমে এসে পকেট থেকে বাইকের চাবিটা বের করে টেবিলে রাখে অনিরুদ্ধ। 
“বাইকটা রাখলে রেখে দিয়ো নাহলে বিক্রি করে দিও। রুমটা চাইলে পিজি রাখতে পারো আমার আপত্তি নেই। ল্যাপটপটা আর ফোনটা নিচ্ছি কারন ওদুুটো লাগবেই। বাকি ম্যাকবুকটা ফরম্যাট করে দিয়েছি। রুমটা পিজি ইউজ করতে পারে। এমনকি আসবাবগুলোও। জামাকাপড় নিয়েছি কয়েকটা। বাকি জিনিস হোস্টেলে আছে, ওখান থেকে নিয়ে নেবো।”বলে ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে অনিরুদ্ধ । 

“চললাম ঠাম্মি।”

“কোথায় যাচ্ছো দাদুভাই এই বুড়িটাকে ফেলে?”

“নিজেকে খুঁজতে। আর বংশের নিয়ম অনুযায়ী বাঁধাছক ভেঙে নতুন ভাবে নতুনধারা তৈরি করতে। আমার শরীরেও তো সেনগুপ্তদের রক্ত বইছে! সেটা প্রমাণ করতে হবে। এবং তার জন্য সব রকম কষ্ট সহ্য করতে আমি প্রস্তুত। আমাকে আটকে রেখো না ঠাম্মি। এতে আমরা দুজনেই কষ্ট পাবো। তার চেয়ে এটাই ভালো হবে। তবে কথা দিচ্ছি তোমার কাছে ফিরবো আমি। হয় নিজেকে প্রমাণিত করে বিজয়বিক্রমে নাহয় পথভোলা ঘরের ছেলে হিসেবে। ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে তো?" শেষ কথাটুকু বলতে গিয়ে গলা কেঁপে ওঠে অনিরুদ্ধর। এই পরিবারে দাদা ছাড়া একমাত্র ঠাকুমাই ওকে ভালোবাসতো। ঠাকুমার কোলেই মানুষ সে। ঠাকুমার শরীরটা ইদানিং ভালো যাচ্ছে না। ঠাকুমার কিছু হলে দাদা আর ও একা হয়ে যাবে।

“পারবো!” ধরা অথচ দৃঢ় গলায় বলে উঠলেন বৃদ্ধা । 

“যাও। নিজের মতো বাঁচো জীবনটাকে। প্রমাণ করে দাও তুমি সেনগুপ্তবাড়ির ছেলে। আমি আশীর্বাদ করছি সফল হবে তুমি। তারপর এই বুড়িটার কথা মনে পড়লে ফিরে এসো!" বলে অনিরুদ্ধর কপালে একটা চুমু খেলেন তিনি।
অনিরুদ্ধ তাঁকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াল। দাদাকে জড়িয়ে বলল, “চললাম রে।"

ধরা গলায় অনিরুদ্ধর দাদা বলল, “আয়! যেটা আমি পারিনি তুই করে দেখা ভাই। জানবো তোর হয়ে আমিই সেসব করছি। ঠাম্মি আর বাবাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। ওদের জন্য আমি রইলাম। জীবনে কখনো দরকার পড়লে ফোন করিস আমি চলে আসবো। বাবা যতই বলুক, এবাড়ির দরজা তোর জন্য সবসময় খোলা আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে।”

অনিরুদ্ধ ওর দাদাকে আরেকবার জড়িয়ে ধরে সদর দরজার দিকে এগোয়। পেছন থেকে শুনতে পায় ও বাবার কন্ঠস্বর, “যাচ্ছো যাও। আমিও দেখবো এই অ্যাডভেঞ্চার কতদিন টেকে। তিন মাসের মধ্যে তুমি ফিরে আসবে এই আমি বলে রাখলাম।”

অনিরুদ্ধ হেসে পেছন ফিরে বলে, “তা ঠিক! তিন মাস পরেই ফিরবো আমি। তবে এভাবে নয়,পুলিশের পোশাকে।”

“মানে?” ভ্রু কুঁচকে যায় অনিরুদ্ধর বাবার।

হেসে অনিরুদ্ধ বলে, “অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দেখলে অথচ খামে ছাপটা দেখনি তুমি। তোমার রগচটা ছেলে রগচটা চাকরিই পেয়েছে। বাকিটা তিন মাস পর ফিরে এলে জানতে পারবে।” বলে হাসতে হাসতে মেন গেট থেকে কানে ফোন দিয়ে বেরিয়ে যায় অনিরুদ্ধ ।

******

বাইকটা নিয়ে ঊষাদের বাড়ির প্রায় পৌঁছে গেছে এমন সময় বাইকটা গোঁ গোঁ শব্দ করে থেমে গেল। অনিরুদ্ধ অনেক চেষ্টা করলো কিন্তু নাহ! বার বার কিক মেরেও স্টার্ট হচ্ছে না বাইকটা। নিজের বাইক হলে চাপ হতো না কিন্তু সেটা ছেড়ে এসেছে সে। এটা এক বন্ধুর বাইক। মনে হচ্ছে পেট্রোল শেষ। কিন্তু এখনও যে ঊষার বাড়ি অনেকটা দূর! “দুচ্ছাই!” বলে বাইকটা রাস্তার ধারে দাঁড় করাল অনিরুদ্ধ। যে করেই হোক পাত্রপক্ষের আগে পৌঁছতে হবে। অবশেষে সে জিতে গেছে খবরটা দিয়ে বিবাহ প্রস্তাবটা দিতে হবে। ফোনে অনেকবার ট্রাই করেছে কিন্তু জবাব পায় নি। হয়তো ছেলে দেখতে আসবে তাই ব্যস্ত। মেসেজ করে বলতে পারতো কিন্তু খবরটা শোনার পর ওর ঊষার রিঅ্যাকশন মিস করতে চায় না অনিরুদ্ধ। উফ! প্রায় একমাস পর দেখা হবে দুজনের! কতদিন ঊষাকে দেখেনি সে! না আর দেরী করা যাবে না। বলে বাইকটা লক করে অনিরুদ্ধ দৌড়তে লাগল ঊষাদের বাড়ি লক্ষ্য করে। 

ঊষা সেজে বসে ছিল নিজের ঘরে। আর কিছুক্ষণ পর পাত্রপক্ষ এসে পৌঁছবে। সে ঠিক করল আর সে এদের ফেরাবে না। অনেক হয়েছে আর নয়। অনিরুদ্ধকে একমাসের সময় দিয়েছিল সে। সেই একমাস শেষ হতে আর মাত্র মিনিট পাঁচেক। এখনও অনিরুদ্ধ একটা চাকরি জোগাড় করতে পারে নি। বাড়িতে সবার সাথে যুদ্ধ করতে করতে সে ক্লান্ত। দুঘন্টা আগে মেসেজটা করার পর অনিরুদ্ধ অনেকবার ফোন করেছে। সে পাত্তা দেয় নি। এবার বোধ হয় ওদের আলাদা হওয়াই উচিত। এতেই দুজনের ভালো হবে। এই ভেবে চোখের জল মুছে ফোনটা হাতে নেয় ঊষা। ঘষা স্ক্রিনে দেখাচ্ছে অনিরুদ্ধর নাম, পাশে পঁচিশটা মিসড কলের চিহ্ন। নাম্বারটায় মেসেজ করে সে, “আর একসাথে আমাদের পথ চলা হলো না। এ জন্মের বাকি পথ না হয় পরের জন্মে হেঁটে নেব। বাই। ভালো থেকো।” 

মেসেজটা পাঠিয়ে নাম্বারটা শেষবারের মতো দেখে স্ক্রিনে চুমু দিয়ে ডিলিট করতে যাবে এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢোকে নিশা। ঊষা নিশার দিকে অবাক চোখে তাকায়। দেখে নিশার মুখ আনন্দে ভরে উঠেছে। মুহূর্তে ব্যাপারটা আন্দাজ করে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে ঊষা। তারপর নিশার সাথে ঘরের বাইরে বেরিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ায়।

আর এখানেই আমাদের গল্পের ইতি ঘটে। জানি পাঠক ভাবছেন ইস! এরকম একটা চরম জায়গায় গল্পটা শেষ হয়ে গেল! কিন্তু কি করব বলুন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখা- শোনা এরকম হাজারো গল্প থাকে যাদের শুরুটা জানা থাকলেও শেষটা জানতে পারি না। এই যে আপনি- আমি যারা নিত্য বাসযাত্রী। রোজ কতজনের সাথে না আমাদের সাক্ষাৎ হয়। এদের মধ্যে কেউ কলেজ পড়ুয়া, কেউ অফিস যাত্রী, কেউ বা ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছে। সকলের জীবনের গল্প কি আমরা পুরোটা জানতে পারি? মাঝে মাঝে কিছু জিনিস অজানা থাকাই ভালো। বরং চলুন না একসাথে কল্পনা করা যাক ঊষার সাথে অনিরুদ্ধর শেষ পর্যন্ত মিল কিভাবে হলো। এতক্ষণ তো আপনারা আমার মুখে থুড়ি লেখায় শুনলেন ওদের গল্প। শেষটা আপনারাই কল্পনা করুন দেখি।  

 

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...