অনুসরণকারী

শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১

দ্বারকাপুরাণ



রাত্রি তখন দ্বিতীয় প্রহর।‌ অন্তত‌ আকাশে চন্দ্রদেবের অবস্থান এবং দুরে ভুখণ্ডে শৃগালদের ক্রন্দন ধ্বনি তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কয়েকজন বাদে সমগ্র দ্বারকা বর্তমানে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। যারা জেগে আছে তারা আর কেউ নয় দ্বারকার অতন্দ্র প্রহরী।

লোকমতে দ্বারকা নাকি সদাজাগ্রত নগরী। এখানে সারারাতে কেউ না কেউ জেগে থাকে। তবে চুরির বা লুন্ঠনের ভয়ে নয়। জেগে থাকে নিজ ইচ্ছায়। কেউ রাত জেগে রচনা করে কাব্য। কেউ বা রাত জেগে অধ্যয়ন করে বহুযুগশ্রুত, পরম্পরাগত শাস্ত্র, মহাকাব্য। কেউ বা প্রেয়সীর সাথে অভিসারে মত্ত। দ্বারকায় চুরির বা লুন্ঠনের ভয় নেই। কারন লোকমতে দ্বারকার রক্ষায়, এবং ন্যায়ধর্ম পালনে সদাব্রতী থাকে স্বয়ং নারায়ণের কৌমুদী ।

দ্বারকার বাইরে লোককথায় প্রচলিত আছে দ্বারকা এক মায়াবী নগরী । যা স্বয়ং নারায়ণের আয়ুধ এবং তাঁর প্রিয়পাত্র স্বয়ং বিষ্ণুবাহন গরুড়দেব দ্বারা সুরক্ষিত। দ্বারকার কীর্তি তথা দ্বারকাধীশের যশ প্রচার করেন স্বয়ং পাঞ্চজন্য। সমুদ্রের মাঝে স্বয়ং নারায়ণের প্রস্ফুটিত কমলের উপর বিরাজমান দ্বারকা। রাত্রে সমগ্র দ্বারকা তথা দ্বারকাধীশের প্রাসাদ রক্ষা করেন দেবায়ুধ শিরোমণি, নারায়ণে অমোঘ শস্ত্র সুদর্শণ চক্র। দিনে সে ভার গ্রহণ করেন বিষ্ণুবাহন। কারন দ্বারকার প্রতিটা কোণে নিবাস করেন স্বয়ং নারায়ণ। কিন্তু সমগ্র দ্বারকাবাসীরা জানে এসব বানিয়ে বলা হয়েছে তথা দ্বারকার বাইরের অধিবাসীদের বিশ্বাস করানো হয়েছে যাতে কেউ দ্বারকা আক্রমণ করে না বসে। এমনিতেই যাদবদের শত্রুর অভাব নেই। নিত্যদিন এর সাথে ওর সাথে যুদ্ধ লেগেই রয়েছে। তার উপর যাদবদের অনেকে দ্বারকাধীশের কীর্তিতে ঈর্ষান্বিত । আগে একাধিকবার দ্বারকাধীশের অনুপস্থিতিতে শত্রুরা আক্রমণ করেছে দ্বারকা। তবে তাদের প্রতিহত করতেও সময় লাগেনি নারায়ণী সেনা এবং দ্বারকাধীশের। কিন্তু বর্তমানে তিনি ভীষণ ব্যস্ত। হস্তিনাপুর সাম্রাজ্যের আসন্ন মহাযুদ্ধের জন্য তিনি একাধারে উত্তেজিত এবং উৎকন্ঠিতও বটে। সেই কারনে বহুকাল আগেই তিনি চরদ্বারা সমগ্র আর্যাবর্তে রটিয়েছেন এই গুজব।

দ্বারকার নামে নারায়ণের আয়ুধ নিয়ে যে গুজব আছে তা বাস্তবে নারায়ণী সেনার বিভিন্ন পদের কীর্তি তথা কর্তব্যের নামান্তর। দ্বারকাধীশের গুজব ছড়ানো চরেরাই দ্বারকায় পাঞ্চজন্যনামে খ্যাত। দ্বারকার ন্যায়ধর্ম তথা অনুশাসন দেখে কৌমুদীপদাধিকারীরা। এরাই অপরাধীকে দণ্ড এবং আর্তদের রক্ষা করে। আর দ্বারকার প্রহরীরা সুদর্শন চক্র পদাধিকারী। এরা দ্বারকার সীমান্ত তথা সমগ্র দ্বারকার রক্ষার্থে বদ্ধ পরিকর। আর দ্বারকাধীশ তথা বলভদ্র এবং তাদের পারিষদের এবং তাদের পরিবারের একান্ত ব্যক্তিগত অঙ্গরক্ষকরা গরুড়নামে খ্যাত। অত্যন্ত স্থিতধী, মহাপরাক্রমী, ব্যাঘ্রের মতো বলশালী এবং শ্যেনপক্ষির ন্যায় তীব্র দৃষ্টিসম্পন্ন এই গরুড়েরা নিজের প্রাণের আহুতি দিয়েও দ্বারকাধীশের প্রাণ রক্ষার্থে বদ্ধ পরিকর।

সমুদ্র থেকে দ্বাদশ ধনু দুরত্বে অবস্থিত চক্রাকার দ্বীপ দ্বারকা। অনেক উচু স্থান থেকে দেখলে মনে হবে যেন সমুদ্রের উপর একটা সুবিশাল প্রস্তর নির্মিত চক্র ভাসমান। প্রায় শতযোজন উচু গগনচুম্বী প্রাচীরে আবৃত দ্বারকা চক্রাকারে তিন ভাগে বিভক্ত। বহির্দ্বারকা, মধ্য দ্বারকা এবং মূল দ্বারকা তথা অন্তর্দ্বারকা। বহির্দ্বারকায় থাকে নারায়ণী সেনার পদাতিক বাহিনী, নগরীর কর্মকার, বাস্তুকার, সারথী, কুম্ভকার তথা শ্রমিকেরা। এখানে অশ্বশালা বিদ্যমান। মধ্যদ্বারকায় থাকে কবি, শিল্পী, গোয়ালাগন, এবং বনিকেরা। এখানে গোশালা বিদ্যমান। আর অন্তর্দ্বারকার একেবারে মধ্যভাগে দ্বারকাধীশের সুবিশাল স্বর্ণময় প্রাসাদ, এবং দ্বারকাধীশের সাধের বাগান রাধাকুঞ্জ। প্রাসাদের আশেপাশে বড়ো বড়ো অট্টালিকায় থাকেন যাদবেরা, সেনাপতি, মন্ত্রীমন্ডল তথা দ্বারকাধীশ এবং বলভদ্রর পার্ষদেরা।

দ্বারকাধীশ ধেনুদের ন্যায় অশ্বদেরও ভীষণ ভালোবাসেন। সেই হেতু প্রতি প্রত্যুষে স্বয়ং নিজে বহির্দ্বারকায় এসে অশ্বশালার অশ্বদের পরিদর্শন করেন। দাঁড়িয়ে থেকে তাদের জলপান, খাদ্য গ্রহণ করান। তারপর সারথীদের সাথে সময় কাটান। বর্তমানে সারথীদের সাথে তার সখ্য ভীষণভাবে বেড়েছে। প্রতি প্রত্যুষে অশ্বশালা পরিদর্শনের পর দ্বারকাধীশ সারথীদের নিবাসস্থলে যান। কিছু কাল সেখানে ব্যায় করে নিজ প্রাসাদে ফিরে আসেন। তারপর প্রতিদিনের মতো সভায় বসেন। সভা শেষে দ্বারকাধীশের সারথী দারুক আসে। তাকে নিয়ে দ্বারকাধীশ চলে যান নিজ মন্ত্রণাকক্ষে। দিনরাত তিনি তার সাথে কি পরামর্শ করেন বোঝা দায়। মহারাণী রুক্মিনী এবং মহারাণী সত্যভামাও নানাবিধ প্রচেষ্টা করেও দ্বারকাধীশের মুখ থেকে এই রহস্য উন্মোচন করতে অপারগ পরিগনিত হয়েছেন। এমনকি দ্বারকাধীশের অগ্রজ বলভদ্র একবার এ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত করায় প্রত্যুত্তরে দ্বারকাধীশ কিছু বলেন নি বরং মৃদু হেসেছেন শুধু।

দ্বারকায় প্রবেশ পথ আটটি হলেও স্থলপথের দ্বারকেই প্রধান দ্বার হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বাকি সাতটা পথ ধরে বনিকেরা জলপথে যাতায়াত করেন দুরদেশে বানিজ্য করা জন্য। জলপথে আক্রমণের কোনো ভয় না থাকলেও প্রহরীরা নিরন্তর প্রহরা দেয় এই আটদ্বারে, প্রহরা দেয় তিনদ্বারকার সীমাস্থলে। রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর উপস্থিত হওয়ায় আট দ্বারে তথা সমগ্র দ্বারকায় প্রহরারত প্রহরীদের অবস্থান বদল হয়। এবারও তার অন্যথা হয় নি। পুর্ববর্তী প্রহরী চলে যাবার আগে পরবর্তী প্রহরী তার কর্তব্য পালন করতে উপস্থিত হয়েছিল। এমন সময় পরবর্তী প্রহরীর হঠাৎ মুত্রত্যাগের বাসনা উপনীত হলো। তার মনে হতে লাগলো মুত্রত্যাগের এই ভীষণ বেগ উপশম না করতে পারলে তার ভাগ্যে অনেক দুর্গতি লেখা আছে। সে পুর্ববর্তী প্রহরীকে অপেক্ষা করতে বলে ছুটল রাধাকুঞ্জে। একে রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর, তার উপর অন্ধকার। কেউ বুঝতে পারবে না ভেবে সে বাগানের একেবারে গভীর অন্ধকার কোনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর নিম্নাঙ্গের বস্ত্র একটু স্খলিত করে নিভৃতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে লাগলো। মুত্রত্যাগের পর বস্ত্র সংযত করে সে পেছন ফিরতে যাবে এমন সময় কাছেই খুট করে একটা শব্দ হলো এবং তার মনে হলো যেন গলার কাছে ভীষণ তীক্ষ্ণ কী একটা যেন প্রবেশ করল। অন্ধকারে বস্তুটি ঠিক কী বুঝতে না পারলেও প্রহরী বুঝতে পারল বস্তুটা তার কন্ঠনালীকে আড়াআড়ি ভাবে ভেদ করে তার কন্ঠ রোধ করেছে। মুহূর্তের ভগ্নাংশেরও কম সময় সে টের পেল তার মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে এবং পারিপার্শ্বিক অন্ধকারের চেয়েও আরো গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে সে।

পরবর্তী প্রহরীর ফিরে আসতে বিলম্ব হওয়ায় একটু হতবাক হলো পুর্ববর্তী প্রহরী। মুত্রত্যাগে তো এত বিলম্ব হবার কথা নয়। তাহলে পরবর্তী প্রহরী গেল কোথায়? আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর পুর্ববর্তী প্রহরী নিকটে থাকা আরেক প্রহরীকে সতর্ক থাকতে বলে খোঁজ করতে এগিয়ে এল বাগানের দিকে।

কিছু দুর এগিয়ে সে ডাকতে লাগলো পুর্ববর্তী প্রহরীর নাম ধরে। কিন্তু কোনো সাড়া না পাওয়ায় ক্রমশ এগিয়ে গেল অন্ধকারের দিকে৷ বেশ কিছুদুর যাবার পর হঠাৎ তার মনে হলো পশ্চাতে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। সে কোমর থেকে তরবারি কোষমুক্ত করার আগেই পেছন থেকে কে যেন একটা ধারালো ছুড়িকা চেপে ধরলো তার কন্ঠের ওপর। তারপর আড়াআড়ি একটান দিতেই লুটিয়ে পড়লো পুর্ববর্তী প্রহরী। দুটো দেহকে বাগানের এক বৃক্ষের তলায় শায়িত করে ক্রমশ সন্তর্পণে প্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেল এক ছায়ামুর্তি।

*****

রাত্রী তখন তৃতীয় প্রহর, দ্বারকাধীশের কক্ষের আগে একটা বাঁকের আড়ালে নতজানু হয়ে বসলো ছায়ামুর্তি। তারপর পশ্চাতে একবার দৃষ্টিপাত করলো। রাধাকুঞ্জ থেকে দ্বারকাধীশের কক্ষের পথ বেশীক্ষণ নয়। কিন্তু এইটুকু পথ সন্তর্পণে অতিক্রম করতে তার একপ্রহর অতিবাহিত হয়ে গেছে। পশ্চাতে ফিরে সে দেখলো পথের মাঝে অবস্থিত সকল প্রহরী তার কৃপায় গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। কেউ মাটিতে নতজানু হয়ে বসে, কেউ বা ধরনীতে শয্যা গ্রহণ করেছে। পার্থক্য শুধু একটাই এই নিদ্রা সাধারণ নিদ্রার মতো আর ভঙ্গ হবে না। পথের মাঝে সকল প্রহরীকে সে নিঃশব্দে চিরনিদ্রায় শায়িত করে দিয়েছে। চন্দ্রালোক এখনো এদিকে উপনীত হয় নি। হলে দেখা যেত প্রত্যেক প্রহরীর হয় মস্তকে শরবিদ্ধ নয় কন্ঠ দ্বিখণ্ডিত। কে বলবে এই সকল প্রহরীরা নারায়ণী সেনার সুদর্শন চক্র পদাধিকারী মহাপরাক্রমী সৈন্য? যুদ্ধক্ষেত্রে একমাত্র দ্বারকাধীশ ছাড়া আর কেউ এদের পরাস্ত করতে অপারগ! মনে মনে হাসে ছায়ামুর্তি!

এদের পরাজিত করা কঠিন কিছু নয়। এদের মারতে হলে ব্যাঘ্রের মৃগয়া রণনীতি প্রয়োগ করতে হয়৷ পেছন থেকে অতর্কিতে আক্রমণ করে এক আঘাতে হত্যা করতে হয়। এই নীতি প্রয়োগ করে সমগ্র প্রাসাদের প্রায় অর্ধ নারায়ণী সেনা বধ করে সে উপস্থিত হয়েছে দ্বারকাধীশের কক্ষে। দ্বারকার বাইরে এই সেনার যতই কীর্তি প্রচারিত হোক না কেন বাস্তবে এরা যে কতটা মদ্যপ্রিয় এবং অলস তা সে জানে। কারন সেও যে একজন প্রাক্তন সুদর্শণ চক্র পদাধীকারী সৈনিক! এবং বর্তমানে দ্বারকাধীশের একান্ত প্রিয় অঙ্গরক্ষক গরুড় কেতুধ্বজ!

নিজ প্রশিক্ষণের বলে নাকি সুদর্শণদের অকর্মন্যতার সুযোগে এতদুর পর্যন্ত কার্যসিদ্ধি করতে পেরেছে জানে না কেতুধ্বজ, কিন্তু আজ যদি সে কার্যসিদ্ধি না করতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে দ্বারকার উপর যে ভয়াবহ ঝড় আসতে চলেছে তার থেকে দ্বারকাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। এমনকি স্বয়ং দ্বারকাধীশও নন। ভাবতে ভাবতে ডানহাতের রক্তস্নাত তরবারিটা সন্তর্পণে ভূমিতে রেখে বাঁকের আড়াল থেকে দ্বারকাধীশের কক্ষের দিকে দৃষ্টিপাত করে কেতুধ্বজ। দেখে দ্বারকাধীশের কক্ষের বাইরে দুজন প্রহরী প্রস্তরমুর্তির ন্যায় নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের দেখামাত্র চট করে কাঁধ থেকে নিজের ধনুকটা নামিয়ে নেয় কেতুধ্বজ।

এই ধনুকের আকৃতি অন্যান্য ধনুকের চেয়ে একটু ছোট। এই ধনুক তার নিজের আবিস্কার। অন্যান্য ধনুকের আকৃতি চারহস্ত সম হয়। সেখানে তার ধনুক মাত্র দুইহস্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ধনুক আকারে ছোটো হলেও আক্রমণে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের গাণ্ডীব এবং অঙ্গরাজ কর্ণের বিজয়কে প্রতিযোগিতায় ফেলে দিতে পারে। এই ধনু দিয়ে সে পলকে ছয়টা শর নিক্ষেপ করতে পারে। সমগ্র আর্যাবর্তে শরচালনায় পরাক্রম কেবলমাত্র আটজনের আছে। মহামতী ভীষ্ম, মহাগুরু দ্রোণাচার্য, মহাগুরু কৃপাচার্য, দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা, অঙ্গরাজ কর্ণ, তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন, অর্জুনপুত্র অভিমন্যু, এবং দ্বারকাধীশ নিজে শরক্ষেপণে মহারথী। এদের মধ্যে দ্বারকাধীশ, অভিমন্যু, তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন আর অঙ্গরাজ কর্ণের পরাক্রম সে দেখেছে।

তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের মধ্যে একজন আদর্শ গরুড়ের সমগ্র চিহ্ন বিদ্যমান। অর্জুন শরক্ষেপণে সর্বশ্রেষ্ঠ কারন তিনি শরযোজনা করেন অসম্ভব ক্ষিপ্রতায়। তার মতোই অর্জুনও পলকে ছয়টা শরক্ষেপণ করে থাকেন। অন্ধকারেও শরক্ষেপণে ব্যর্থ হন না। একজন সাধারণ ধনুর্ধারী সর্বাধিক দুশো গজ পর্যন্ত শরক্ষেপণ করতে পারে কিন্তু অর্জুন পারেন তিনশো গজ পর্যন্ত। একই কৌশল আয়ত্ত করেছেন অঙ্গরাজ কর্ণ। তবে তার রণকৌশলের আরেক উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার কবচ ও কুণ্ডল। একবার কথায় কথায় দ্বারকাধীশ অর্জুনকে বলেছিলেন কর্ণের কবচ শুধু অভেদ্যই নয়, তার সাথে ভীষণ মসৃন এবং ঝকঝকে, প্রায় আরশির মতো। আর যাই হোক না কেন, যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে কর্ণ সর্বদা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড়ান। বাকিটা অনুমান করতে দেরী হয় নি কেতুধ্বজের। সুর্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে কর্ণ পরিণত হন চলমান আরশিতে। ফলে শত্রুরা তার সম্মুখে এলেও কবচের প্রতিফলিত আলোর ফলে তার দিকে তাকাতে পারে না। কার্যত অন্ধ হয়ে যায় তারা, আর কর্ণ সে সুযোগে বধ করেন শত্রুদের। কর্ণকে পরাজিত করতে হলে শব্দভেদী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর বধ করতে হলে কবচহীন করতে হবে তাকে।

দ্বারকাধীশের কথা স্মরণ করতে করতে তুনীর থেকে শব্দরোধী দুটো বিষাক্ত শর বের করে সে। ধনুকে শরযোজনা করে পলকের মধ্যে প্রহরীদের দিকে নিক্ষেপ করে। শরবিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে দুজন প্রহরী বিষক্রিয়ায় ঢলে পড়লে পুনরায় ধনুক কাঁধে নিয়ে ভূমি থেকে তরবারী তুলে দ্বারকাধীশের কক্ষের সম্মুখে উপস্থিত হয় কেতুধ্বজ। অপুর্ব স্বর্ণের কারুকার্য করা কক্ষের রুদ্ধদ্বারের সম্মুখে দাঁড়িয়ে চারদিকে একবার দৃষ্টিপাত করে দ্বারে একটা হাত রাখে। একহাত দিয়ে দ্বারে চাপ দেওয়ামাত্র দ্বার উন্মোচিত হয়ে যায়। এত সহজে দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে দেখে একমুহূর্ত থমকে দাঁড়ায় কেতুধ্বজ। কী হলো ব্যাপারটা? তাহলে কী দ্বারকাধীশ দ্বার অবরুদ্ধ করে শয্যায় যান নি? তবে কী তিনি জানেন সে আসছে? মুহূর্তের জন্য বিচলিত হলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে মনকে স্থির করে কক্ষে প্রবেশ করে কেতুধ্বজ।

*****

কক্ষের ভেতরটা ঈষৎ তমসাচ্ছন্ন, সারারাত স্বল্পালোকে কক্ষকে আলোকিত করার পর অবশেষে সমগ্র কক্ষের দীপসমূহ নির্বাপিত। কিন্তু এতে দৃষ্টিপথে কোনো ব্যাঘাত ঘটল না কেতুধ্বজের। তাছাড়া দ্বারকাধীশের কক্ষের প্রতিটা কোন তার নখদর্পনে অবস্থিত।

গরুড় পদাধিকারীদের পদে উন্নীত হবার পরে সৈনিকদের এক বর্ষের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণে প্রেরিত করা হয়। সেই প্রশিক্ষণ চলে কঠোর থেকে কঠোরতম আবহাওয়ায়, কঠোর থেকে কঠোরতম পরিস্থিতিতে। কেউ প্রশিক্ষিত হয় দুর্গম পর্বত পাদদেশে, কেউ বা মরুভূমিতে, কেউ প্রশিক্ষিত হয় শ্বাপদসঙ্কুল বনে। দিনের পর দিন অভুক্ত থেকে সুর্যোদয় থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত চলে অমানুষিক প্রশিক্ষণ। তারপর হয় এক ভয়ঙ্কর পরীক্ষা! সেই বিপদসঙ্কুল পরিবেশে বেঁচে থাকার পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় ত্রুটির কোনো ক্ষমা নেই। কারন বিপদসঙ্কুল পরিবেশে ত্রুটির ফল একটাই, ভয়াবহ মৃত্যু। একারনে একবর্ষের কঠোর প্রশিক্ষণে সকলে ফিরে আসতে পারে না। যারা আসে তারা পরিণত হয় আবেগহীন, মায়া-মমতাহীন এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধায়। যাদের মনে কোনো রকম করুণা থাকে না, থাকে কেবল দ্বারকাধীশের প্রতি প্রবল আনুগত্য এবং দ্বারকার রক্ষার প্রবল কর্তব্যবোধ। দ্বারকাকে রক্ষার স্বার্থে এরা নিজপ্রাণ আহুতি দিতে কিংবা কারো প্রাণ হরণ করতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ করেনা। তা সে যে কেউ এমন কি দ্বারকাধীশ বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণই হোন না কেন! ঠিক এই কারনেই আজকে দ্বারকাধীশের কক্ষে কেতুধ্বজের অভিযান পরিকল্পিত হয়েছে। বিগত একমাস নিজের সাথে অমানুসিক যুদ্ধ করে অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দ্বারকাকে যদি রক্ষা করতে হয় তাহলে দ্বারকাধীশকে মরতে হবে!

পাণ্ডব ও কৌরবদের মধ্যে সংগঠিত মহাযুদ্ধ আসন্ন প্রায়। যেকোনো মুহূর্তে রণভেড়ী বাজতে পারে। এই মহাযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সমগ্র আর্যাবর্তের রাজন্যবর্গ যোগ দিচ্ছেন দুই শিবিড়ে। নিজ শত্রুর প্রতি পুঞ্জিভূত আক্রোশকে প্রশমিত করার জন্য, এতদিন যে শত্রুকে মাত দিতে পারেন নি তাদের বধ করার জন্য রাজন্যবর্গরা একে একে ভীড় করছেন দুই শিবিড়ে। সে শুনেছে প্রায় সমগ্র আর্যাবর্তের যোগ দেওয়া সম্পুর্ণ। কেবল দ্বারকার এবং মদ্রদেশের যোগদান অবশিষ্ট। মদ্রদেশ পাণ্ডবদের মাতুলদের দেশ। মদ্ররাজ শল্য নকুল এবং সহদেবের আপন মাতুল। তিনি পাণ্ডব পক্ষেই যোগ দেবেন কিন্তু দ্বারকা? দ্বারকাধীশ এবং বলভদ্রের আত্মীয় এই দুপক্ষই। দ্বারকাধীশ সম্পর্কে পাণ্ডবদের ভ্রাতা হন। আবার যুবরাজ দুর্যোধন বলভদ্রের স্নেহধন্য। বলভদ্র নিজে হাতে তাকে গদাযুদ্ধে অপরাজেয় করে তুলেছেন। সেই হেতু দ্বারকা এখন ভীষণ ধর্মসঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে। এক শিবিড়ে যোগ দিলে অপর শিবিড়ের বিরাগভাজন হতে হবে দ্বারকাকে। আর মহাযুদ্ধে বিপক্ষ শিবিড় জিতলে তার প্রকোপ সহ্য করতে হবে দ্বারকাকে। বলভদ্রকে জানে কেতুধ্বজ, তিনি কোনো পক্ষেই যাবেন না। কিন্তু দ্বারকাধীশ? তিনি তো আর তাঁর অগ্রজের মতো নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন না। সে জানে, তিনি যোগ দেবেন পাণ্ডবপক্ষেই। আর এখানেই সে ভয় পাচ্ছে।

গরুড় অধিনায়ক সাত্যকির কাছে সে শুনেছে কৌরবেরা সংখ্যায়, বলে, কৌশলে পাণ্ডবদের চেয়ে চার অক্ষৌহিণী সেনায় এগিয়ে। কৌরবদের পক্ষে মহামহিম ভীষ্ম, মহাগুরু কৃপাচার্য, মহাগুরু দ্রোণাচার্য, দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা, অঙ্গরাজ কর্ণ রয়েছেন। এদিকে পাণ্ডবেরা কেবল অর্জুন, অভিমন্যু, এবং মধ্যম পাণ্ডব ভীমের গদার ভরসায় যুদ্ধে অবতীর্ণ। এ যুদ্ধ এক অসমযুদ্ধ! এতে কৌরবদের জয় একপ্রকার নিশ্চিত! এবার যদি বাসুদেব পাণ্ডবদের পক্ষেনা আর ভাবতে পারছে না কেতুধ্বজ। যুদ্ধে পাণ্ডবেরা হারলে দুর্যোধন বলভদ্রের জন্য দ্বারকা আক্রমণ করবেন না ঠিকই কিন্তু এমন কিছু করবেন যাতে দ্বারকার মান সম্মান আর্যাবর্তের সম্মুখে ধুলোয় মিশে যায়। যুবরাজ দুর্যোধন ভীষণরকমের প্রতিহিংসাপরায়ণ।

মনকে শক্ত করে কোমর থেকে একটা বিষাক্ত ছুরিকা বের করে কেতুধ্বজ। বাসুদেবের মৃত্যু হলে হয়তো দ্বারকা অভিভাবকহীন হবে, কিন্তু আসন্ন সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা পাবে চিরতরে। ভাবতে ভাবতে সন্তর্পনে পা ফেলে বাসুদেবের পালঙ্কের কাছে এগিয়ে যায় কেতুধ্বজ। প্রায় কাছে পৌঁছে গেছে এমন সময় একটা পরিচিত কন্ঠস্বরে সে স্তব্ধ হয়ে যায়। ভীষণ মৃদুস্বরে কে যেন বলে ওঠে, “অবশেষে এলে তুমি! এত বিলম্ব কেন হলো কেতুধ্বজ?”

অবাক হয়ে কেতুধ্বজ। কে বলল কথাটা? কেউ কী ঘরে জাগ্রত? কিন্তু তা কী করে সম্ভব? রাত্রে দ্বারকাধীশের কক্ষে কারো প্রবেশের অনুমতি নেই! তাছাড়া রাধাকুঞ্জ থেকে এই কক্ষ পর্যন্ত পথে প্রহরারত সকল প্রহরীকে সে চিরশয্যায় শায়িত করে এসেছে! তবে কী বাসুদেব? শক্ত মুঠোয় ছুরিকাটাকে ধরে কেতুধ্বজ। বাসুদেবের কথায় বিচলিত হলে চলবে না। সে নিজেকে প্রবোধ দেয়, “বাসুদেব কোনো সাধারণ মানুষ নন! তিনি একাধারে অসামান্য ঐন্দ্রজালিক, মহান কূটনীতিজ্ঞ এবং একজন অসাধারণ বাগ্মী। কথার কৌশলে তিনি অসাধ্যসাধন করে থাকেন। তার কথায় বিচলিত হলে চলবে না। নিজ লক্ষ্যে স্থির থাকো!ভেবে সে এগিয়ে যায় পালঙ্কের দিকে।

এমন সময় গৃহে শেষবারের মতো প্রবেশ করে চন্দ্রদেবের ম্লান আলো। আর সেই আলোয় সাম্নের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় কেতুধ্বজ। বাসুদেব উঠে বসেছেন নিজশয্যায়। তার দৃষ্টি সটান কেতুধ্বজের দিকে। তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন তিনি। কী নিস্পাপ, স্নিগ্ধতায় ভরা দৃষ্টি বাসুদেবের! সেই দৃষ্টিতে মৃত্যুর আতঙ্কের করাল ছায়া কিংবা একান্ত প্রিয়জনের বিশ্বাসঘাতকতার তীব্র ঘৃণার লেশমাত্র নেই বরং তার জায়গায় সমগ্র মুখ জুড়ে রয়েছে একটা প্রশান্তি, একটা আনন্দের ছাপ। যেন অনেক অপেক্ষার পর অবশেষে কাঙ্খিত বস্তু পেতে চলেছেন তিনি!

এ কোন বাসুদেবকে দেখছে সে? এতদিন ধরে যাকে দেখে এসেছে আর আজ যাকে দেখছে দুজনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য! সমগ্র দ্বারকা যাকে চেনে সেই বাসুদেব সরল, সদাহাস্যময়, প্রগলভ, নায়কোচিত স্বভাবের মানব। সর্বজনপ্রিয়, প্রাণবন্ত বাসুদেব যেখানে যান সেইস্থান আলোকিত করে অধিষ্ঠান করেন। যাদবদের অভিজাতবর্গ হোক বা কৌমুদীসেনার একজন সেনানী, গোয়ালা হোক বা দ্বারকার সারথীগন, সকলের সাথে এমন আন্তরিকভাবে মিলিত হন যেন তিনি তাদেরই লোক। সেই মানুষটার এতটা মৃত্যুতৃষ্ণা? দিনের সুর্যালোকে যে মানুষটা প্রাণোচ্ছল হাসিতে পরিপূর্ণ হয়ে সমগ্র দ্বারকা পরিচালনা করেন সেই মানুষটার রাত্রে কী নিদারুন পরিবর্তন!

কেতুধ্বজ বুঝতে পারছে বাসুদেব জানতেন তার পরিকল্পনার কথা। জানতেন আজ হোক বা কাল সে আসবেই। সেকারনেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন তার। কোন মন্ত্রবলে জানতে পারলেন তা বুঝতে না পারলেও সে বেশ বুঝতে পেরেছে বাসুদেবকে হত্যা করার জন্য সে যতটা বদ্ধপরিকর তার চেয়েও বেশী আকুল বাসুদেব মৃত্যুকে বরণ করার জন্য। কিন্তু কেন? বাসুদেবের কন্ঠস্বরে ঘোর কাটে কেতুধ্বজের। বাসুদেব হেসে বললেন,“কী হলো কেতুধ্বজ? দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?এসো উদ্ধার করো আমায়! যে কার্যে এসেছো সেই কার্যসমাধা করো! আমার হৃদয়ে ওই ছুরিকা বিদ্ধ করে মুক্ত করো আমাকে!একে একে সব প্রিয়জনকে নিজের শত্রুতে রূপান্তরিত হতে দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত! আর পারছি না আমি এই দ্বারকার দায়ভার বহন করতে! এসো পঞ্চভূতে বিলীন হতে সাহায্য করো আমায়!" বলে দুদিকে নিজের দুহাত মেলে ধরে নিজের দুচোখ বন্ধ করেন বাসুদেব।

আগেও অনেক মানবহত্যা করেছে কেতুধ্বজ। পলক ফেলার আগে অস্ত্রের কোপে মানবদেহ থেকে প্রাণবায়ুকে পঞ্চভূতে বিলীন করেছে সে। হত্যা করার পূর্বে তাদের চোখে সে মৃত্যুর করাল গ্রাসের আতঙ্ক প্রত্যক্ষ করেছে। কারো কারো চোখে বিষাদের ছায়া দেখেছে। কিন্তু মৃত্যুর প্রতিক্ষায় কেউ অধৈর্য হতে পারে, মৃত্যুর জন্য কেউ এত আকুল হতে পারে, এ তার কল্পনাতীত ছিল। হঠাৎ তার মনে হতে লাগলো একটা অবসাদ যেন তাকে চারপাশ দিয়ে ক্রমশ ঘিরে ধরছে। সে এখানে এসেছিল বাসুদেবকে বধ করতে। সমগ্র প্রাসাদের অর্ধেক সৈন্যকে বধ করে অনেক কষ্টে প্রবেশ করেছিল কক্ষে। এখন তার সম্মুখেই সম্পুর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় উপবিষ্ট বাসুদেব অথচ একপাও সে এগোতে পারছে না। তার পদযুগল যেন কক্ষের ভূমির সাথে প্রস্তরিভূত হয়ে প্রোথীত হয়ে গেছে। প্রতি মুহূর্তে একটা গ্লানি, একটা অপরাধবোধ ক্রমশ গ্রাস করছে তাকে। তার মনে পড়ে যাচ্ছে গরুড় পদে উন্নীত হবার পর অগ্নিশপথ গ্রহণের দিনটা। মনে পড়ছে প্রতিমুহূর্তে বাসুদেবের সান্নিধ্য। নাহ আর যাই হোক না কেন, বাসুদেবকে সে চাইলেও আর হত্যা করতে পারবে না।

ছুরিকাটা ফেলে দিয়ে নতজানু হয়ে বসে পড়ে কেতুধ্বজ। বাসুদেবের চরনে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে সে। বাসুদেব কেতুধ্বজের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এবারেও হলো না! শিওরে শমন এসেও তাকে স্পর্শ করলো না। তারমানে এখনও তার দায়িত্ব শেষ হয় নি। এখনও তাকে অনেক সহ্য করতে হবে। অনেক প্রিয়জনের মৃত্যুর সাক্ষী হতে হবে, অনেক দুঃসংবাদ শ্রবণ করতে হবে। অথচ এর থেকে মুক্তি পেতে না জানি কতবার তিনি মরণের দ্বারে গেছেন। কিন্তু বিধিবাম! তার মরণ হয় নি। অমর হওয়ার চেয়ে বড়ো জ্বালা ঈশ্বর হওয়ায়। না জানি সেই ভার আর কতদিন বইতে হবে তাকে! কেতুধ্বজের দিকে তাকিয়ে ব্যথাতুর হাসি হাসেন বাসুদেব। তারপর বলেন, “তোমার আশঙ্কা মিথ্যে কেতুধ্বজ! তুমি ভাবলে কি করে যুদ্ধে আমি যোগ দেব? আমি শিবিড়ে যোগদান করলেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হবো না। কারন দুর্যোধন আর যুধিষ্ঠির দুজনেই আমার প্রিয়জন। যাকেই আঘাত করি না কেন কষ্ট আমারই হবে। আর একজনের পক্ষ নিলে দ্বারকার সমূল ক্ষতি আসন্ন তা আমি জানি। কিন্তু পক্ষ না নিলে নব আর্যাবর্ত নির্মাণে দ্বারকার ভূমিকা যে নগন্য থেকে যাবে কেতুধ্বজ। তুমি যেমন দ্বারকার রক্ষার্থে বদ্ধপরিকর। তেমনই আমিও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যাদবদের প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার্থে। সে কারনে যুদ্ধে যোগ দেওয়া অবসম্ভাবী। তবে যে কোনো এ শিবিড়ে যোগ দিলেও অপরপক্ষকে ফেরাবো না আমি। যুদ্ধে দুপক্ষেই যোগ দেবে দ্বারকা।"

কেতুধ্বজ বাসুদেবের দিকে তাকিয়ে বলে, “তা কী করে সম্ভব প্রভু?" বাসুদেব হেসে বলেন, “দেখতেই পাবে। তবে তার আগে এক কোণে লুকিয়ে পড়ো। রাত্রি ঘনিয়ে সুর্যোদয় হতে চলেছে। ঐ ওরা এলো বলে!" বলার সাথে সাথে কক্ষের বাইরে কোলাহল শুনতে পান ওরা। কেতুধ্বজ তড়িঘড়ি লুকিয়ে পড়ে অলিন্দের এক কোণে। আর বাসুদেব পুনরায় শয্যাগ্রহণ করেন। আর ঠিক সেই সময় কক্ষের দ্বার উন্মোচন করে কক্ষে প্রবেশ করেন হস্তিনাপুর যুবরাজ, ধৃতরাষ্ট পুত্র, গান্ধারীনন্দন, জ্যেষ্ঠ কৌরব, দুর্যোধন।

      

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...