অনুসরণকারী

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০

বলি দশম পর্ব




২০শে আগষ্ট ২০১৯, রাত দশটা, বাণপুর, বর্ধমান

 

হোটেলে ফিরে ঠান্ডা জলে স্নান করতেই সারাদিনের জ্বালাপোড়াটা একটু কম মনে হলো বাথরুম থেকে বেরিয়ে ফ্যানটা চালিয়ে দিয়ে খালি গায়েই বিছানায় শুয়ে পড়লাম গত পাঁচদিন ধরে যা ধকল যাচ্ছে তা বলার মতো নয় তার উপর এই গরমে পরচুলোনকল দাঁড়ি পরে ছদ্মবেশে থাকতে হচ্ছে সারাদিন

 

বিছানায় শুয়ে শুয়ে প্রথমে ব্যোমকেশ কে ফোন করলাম। সব শুনে ব্যোমকেশ সেটাই বললো যেটা বিগত চারদিন ধরে বলে আসছে, “একটু চোখ কান খোলা রেখো আর ভৈরবের প্রতিটা কার্যকলাপ লক্ষ্য করো।”

 

ফোনটা রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম। আজ আশ্রমেই রাতের খাবার সেরে নিয়ে হোটেলে ঢুকেছি। কাজেই আর কোনো চাপ নেই।হাত বাড়িয়ে বেডসুইচ টিপে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে বিগত চারদিনের কথা মনে করতে লাগলাম। এখানে এসেছি ষোলো তারিখ সন্ধ্যেবেলায়।

 

কথা ছিলো ভৈরবকে আমি হাসপাতাল থেকে ফলো করবো। সেই মতো ছদ্মবেশ নিয়ে দশটার দিকে হাসপাতালে গিয়ে শুনি ভৈরব সকাল নটার দিকে বেরিয়ে গেছে। অগত্যা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ব্যোমকেশকে ফোন করে আমিও বেরিয়ে পড়লাম ট্রেনের উদ্দেশ্যে। ভেবেছিলাম ভৈরব হয়তো ট্রেনে যাবে কিন্তু স্টেশনে গিয়ে বুঝলাম ভৈরব এদিকে আসেনি।বুঝলাম ভৈরব বাই লেন যাচ্ছে। মনে মনে নিশ্চিন্ত হলাম যাক অন্তত ও আসার আগে আমি বর্ধমান পৌছে যাবো। কিন্তু বিধিবাম।

 

যে ট্রেনে উঠেছিলাম সেটা রামপুরহাট পর্যন্ত বেশ ভালো গতিতে ছুটলেও রামপুরহাট ছাড়তেই বেশ ঢিমে তালে চলতে শুরু করলো তারপর আচমকা স্থির হয়ে গেল। কিছুক্ষন পর জানা গেল ইঞ্জিনে প্রবলেম হয়েছে। অগত্যা নামতে হলো। ট্রেনের সহযাত্রীরা একটু অসন্তোষ প্রকাশ করলেও আমি সেটা কে এড়িয়ে এগিয়ে গেলাম স্টেশনের দিকে।

 

স্টেশনে Enquiry কেবিনে জানা গেল পরের ট্রেন তিন ঘন্টা লেটে চলছে। মাথাটা গরম হয়ে গেলেও নিজেকে সামলে স্টেশন থেকে বেরোলাম। তখন আমার একমাত্র লক্ষ্য ভৈরবের আগে বর্ধমান পৌছনো। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম বারোটা বাজে। একটু নিশ্চিন্ত হলাম। কারন কাল শাম্ব বলেছিলো বারাসাত টু কৃষনগর হাইওয়ে তে আজ বিশাল জ্যাম হবে। কারন আজ নাকি ভোটের এর জন্য রুলিং পার্টির প্রার্থী হিসেবে কোন এক নায়িকার র‍্যালী আছে। শর্মি আজ গেছে সেটার কভারেজ করতে। ভৈরব এতক্ষনে নির্ঘাত সেই জ্যামে আটকে আছে। কাছেই একটা হোটেল ছিলো  সেখানে ভাত খেয়ে একটা সিগারেট ধরাতে মেজাজটা একটু ফুরফুরে হলো। সিগারেটে টান দিতে দিতে স্টেশনে ঢুকলাম।

 

তারপর ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসে রইলাম। আর এই জিনিসটাই কাল হলো আমার। তখন যদি ট্রেনের আশায় না বসে সোজাসুজি বাস ধরতাম।তাহলে হয়তো এতোটা দেরী হতো না। বসে থাকতে থাকতে একটু ঝিম লেগে গিয়েছিল। হঠাত্‌ ঘুমটা ভাঙল ফোনের শব্দে।ফোনটা কানে নিতেই শুনতে পেলাম ব্যোমকেশের গলা, “কতদুর? ” উঠে বসে বললাম, “রামপুরহাট।ট্রেন লেট করেছে।”

 

ব্যোমকেশ অসহিষ্ণু গলায় বলল, “আর তুমি পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছো? ওদিকে ভৈরব প্রায় পৌছে গেছে।” আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম দুটো বাজে । চটপট উঠে দাঁড়ালাম।এবাবা এযে অনেকক্ষন ঘুমিয়েছি। ব্যোমকেশকে বললাম, “চিন্তা নেই ভৈরব হয়তো এতক্ষনে ক” বাকি কথাটা বলার আগে ব্যোমকেশ যেটা বলল সেটা শোনার পর নিজেকে মনে মনে খিস্তি না দিয়ে পারলাম না। বারাসাতের সেই  র‍্যালীটা নাকি শেষ মুহুর্তে বাতিল হয়ে গেছে। নিউজ চ্যানেলে দেখাচ্ছে।ব্যোমকেশ ওপারে অসহিষ্ণু গলায় বলে চলেছে, “একটা কাজ যদি তোমাকে দিয়ে হয়। ট্রেন লেট করেছে তো পরের স্টেশনে নেমে গিয়ে বাসে করে যেতে তা না” আমি কোনোমতে ফোনটা কাটলাম।

 

বাপরে যা রেগে গেছে ব্যোমকেশ!  অবশ্য রাগার মতোই কাজ করেছি। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। আমাকে আরো এক ঘন্টা বসতে হবে। কাজেই প্ল্যাটফর্মে সিমেন্টের বেঞ্চে বসলাম। তবে বেশিক্ষন বসতে হলো না। একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন মিনিট দশেকের মধ্যে এলো। সেটায় চড়ে আমার পরবর্তী প্ল্যান কষে নিলাম। তারপর প্রায় সন্ধ্যেবেলায় পৌছলাম বর্ধমান স্টেশনে।

 

রেলের ওয়েটিংরুমে ছদ্মবেশ নিয়ে পোশাক পাল্টে বেরিয়ে পড়লাম। স্টেশনের সামনেই কতগুলো গাড়ি ছিলো তার মধ্যে একটায় বসে গন্তব্য বলতেই গাড়ি সোজা বেরিয়ে পড়লো সেদিকে। ড্রাইভারের কাছে শুনলাম আজ সকালে নাকি আরো অনেক রিপোর্টার এসেছে। বাবাজির নাকি আজই আসার কথা।এই কথাটা আমিও জানতাম। কারন কলকাতায় ভৈরবের হাসপাতালে থাকাকালীন কয়েকজন কে স্কুপের জন্য ঘুরঘুর করতে দেখেছি। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো আমিও রিপোর্টার নাকি। বোধহয় আমার পোশাক, আর ব্যাগপত্র দেখে ওর তাই মনে হয়েছে। মনে মনে খুশি হলাম যাক ছদ্মবেশটা বৃথা যায় নি। মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।

 

সেই থেকে বিগত চারদিন ধরে হোটেল-আশ্রম,  আশ্রম-হোটেল করছি। আমার কাজ সকাল সকাল ভৈরবের আশ্রমে যাওয়া, সারাদিন ভক্তদের ভীড়ে মিশে ওর কাজকর্ম লক্ষ্য রাখা। সকালে পুজো থেকে রাত্রের সন্ধ্যারতী পর্যন্ত ওকে ফলো করা। প্রথমদিন অবশ্য একটু অসুবিধে হয়েছিল। এতগুলো সাংবাদিক এর ভীড়ে ওকে ফলো করা। পরে অবশ্য সুবিধে হয়ে যায়। তবে বেশিদিন হয়তো আর এই হোটেলে থাকা যাবে না। হোটেলের লোকেদের সন্দেহ হতে পারে। তাই ঠিক করেছি সোজা ভৈরবের আশ্রমেই থাকবো। এতে আমার সুবিধেই হবে। দেখি কাল ব্যোমকেশ এর সাথে কথা বলতে হবে।

 

******

 

২৫শে আগষ্ট,২০১৯,  রাত দুটো শ্রী শ্রী  চন্দ্রকান্ত ভৈরবগিরি মহারাজ আশ্রম, বাণপুর, বর্ধমান

 

আজ পাঁচ দিন হলো আমি ভৈরবের ডেরায়। জীবনে অনেক অর্থলোভী ভন্ড পিশাচ দেখেছি। কিন্তু ভৈরবের মতো নরপশু দুটো দেখিনি। ভৈরব তাও সময় বিশেষে নিজের রূপ দেখায়। কিন্তু অর অন্যতম সহযোগী বজ্রধর। সাক্ষাত্‌ শয়তানের প্রতিভু। এমন কোনো পাপ কাজ নেই যা ও পারে না।

 

বাইরে থেকে এই আশ্রমটাকে দেখলে কোনো পুন্যাত্মার আশ্রম বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায় ছবিটা সম্পুর্ণ উল্টো। বেআইনি টাকার লেনদেন, গাঁজার ব্যবসা, এমন কি ব্যাভিচার পর্যন্ত চলে এখানে। প্রায় রোজ রাতেই ঐ বজ্রধরের একটা মেয়ে লাগে। বড়ো, ছোটো, কুমারী, বিবাহিতা, বিধবা, নাবালিকা, মধ্যবয়স্কা কোনো বাছবিচার নেই ঐ রাক্ষসটার।

প্রথমদিন আশ্রমের ভোগ খাবার পর হোটেল আমার সেই রাতে গভীর ঘুম হওয়ায় সন্দেহ হয়েছিলপরের দিন খাবার থেকে কিছু টুকরো লুকিয়ে রাস্তার নেড়িকে দিয়েছিলাম নেড়িটার একই অবস্থা দেখে নিশ্চিত হই আমি আশ্রমের ভক্তদের রোজ রাতের ভোগে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয় যাতে কেউ মেয়েটার চিত্কার শুনতে না পারে

 

তারপর পৈশাচিক খিদে মেটানো শেষ হলে সে অচৈতন্য হতভাগীগুলোকে পাঁজাকোলা করে ফেরত দিয়ে আসে তাদের ঘরে।যারা বাঁচে তারা টেরও পায় না কি সর্বনাশ ঘটে গেছে তাদের জীবনে। আর যারা বাঁচে না তাদের অর্ধজীবন্ত কবর দিয়ে সেখানে জবার চারা লাগিয়ে দেয় দানবটা!

 

মাঝে মাঝে মনে হয় রণিকে খবর দিয়ে হারামজাদাগুলোকে ধরিয়ে দিই। পরক্ষনেই মনে পড়ে আমাদের লক্ষ্য এই বজ্রধর নয়। আমাদের লক্ষ ভৈরব। তাই না চাইলেও আমাকে চুপ থাকতে হয়। ঈশ্বরে বিশ্বাস আমার কোনোকালেই ছিল না। কিন্তু আজ ঐ বছর পনেরোর নিষ্পাপ বাচ্চা মেয়েটার ওরকম পরিনতি দেখে এবার আমিও কায়মনে প্রার্থনা করছি যদি ঈশ্বর বলে সত্যি কেউ থাকেন তাহলে এই পাপের সাম্রাজ্যের যেন শীঘ্র ধ্বংশসাধন হয়।

 

******

 

৩০শে আগষ্ট,২০১৯, ভোর চারটা শ্রী শ্রী চন্দ্রকান্ত ভৈরবগিরি মহারাজ আশ্রম, বাণপুর, বর্ধমান

 

বিগত বারো-চোদ্দো দিন ধরে আমি ভৈরবের উপর নজর রেখে বসে আছি। রোজ রোজ ওর প্রবচন পুজো দেখে বোর হচ্ছিলাম।তবে আজকের সকালে যে জিনিসটা ঘটলো তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। । দাঁড়ান সকালবেলা ঘুম ভাঙল ভীষন হই হট্টগোলের শব্দে। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম চারটে বাজে। এত সকালে কি হলো আবার? চোখ কচলাতে কচলাতে ছদ্মবেশ নিয়ে বাইরে বেরোতেই অবাক হলাম। আশ্রমের সকলে ছুটোছুটি করছে। প্রায় সকলে মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে। ব্যাপারটা কি দেখার জন্য মন্দিরের দিকে এগোলাম। ভীড় কাটিয়ে মন্দিরের সামনে পৌছে দেখলাম ভৈরব মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে আছে। আশেপাশের সকলের মুখেও ত্রাসের ভাব স্পষ্ট। সকলে ফিসফিস করে বলাবলি করছে। এদিক ওদিক চাইতেই দেখলাম মন্দিরের পেছনে জবাবাগানেও লোকের ভীড়। তবে কি

 

ধীরে ধীরে সেদিকে এগোলাম। তারপর জবাবাগানের ভেতরে প্রবেশ করলাম। বেশী ভেতরে যেতে হলো না কিছু দুরেই জটলাটা দেখতে পেলাম। জটলার মাঝে যেতেই আমার চোখ স্থির হয়ে গেল।

 

জটলার মাঝে একটা রুপোর ত্রিশুল পোঁতা। ত্রিশুলটা আমি চিনি। ভৈরব সভায় বসার সময় এই ত্রিশুলটা হাতে নেয়। লম্বায় ছফুট ত্রিশুলটার কারুকার্য সত্যিই দেখার মতো। কিন্তু এখন সেই কারুকার্য বোঝার উপায় নেই। পুরোটাই ঢেকে গেছে রক্তে আর অন্ত্রে !  ত্রিশুলটার বামদিকের ফলায় আটকে হৃদপিন্ড। ডানদিকেরটায় আটকে লিভার আর ত্রিশুলটার মাঝের ফলাটায় আটকে আছে বজ্রধরের কাটা মাথাটা! চোখদুটো যেন কেউ খুবলে নিয়েছে। চোয়াল হা করা, মুখ দেখে মনে হচ্ছে যেন ভীষণ ভয় পেয়েছে!

 

বজ্রধরের মাথাটাকে ভালো করে দেখছিলাম হঠাৎ সম্বিত ফিরলো পুলিশের সাইরেনে। নির্ঘাত কোনো ভক্ত খবর দিয়েছে হয়তো। আর এখানে থাকা ঠিক হবে না। ভক্তমন্ডলীও দেখলাম একে একে সরে পড়ছে। আমিও আমার  ঘরের পথ ধরলাম।

 

*****

বিকেল হতে চললো এখনো গোটা আশ্রম পুলিশে আর মিডিয়ায় ছয়লাপ মন্দিরে, ভোজনঘরে, জবাবাগানে, এমনকি আমাদের থাকার ঘরে সব জায়গায় পুলিশ তল্লাশি জিজ্ঞাসাবাদ করছে এমন কি কলকাতা থেকেও পুলিশ এসেছে দেখলাম অবশ্য এর কারনও আছে জবাবাগানে যেখানে ত্রিশুলটা পোঁতা ছিলো সেই জায়গাটা খুঁড়ে বজ্রধরের কবন্ধ ছিন্নভিন্ন মৃতদেহটা পাওয়া গেছে তবে শুধু ওর দেহটাই পাওয়া যায় নি সাথে পাওয়া গেছে বেশ কিছু নরকঙ্কাল

 

এরকম পর পর বেশ কয়েকটা নরকঙ্কাল পাওয়ায় পুলিশের সন্দেহ হয়। তারা গোটা জবাবাগান তছনছ করে খুঁড়তেই পাওয়া যায় আরো নরকঙ্কাল, পচা দেহাংশ, ও পর পর পনেরোটা বাসি থেকে টাটকা লাশ। এখনও জবাবাগান খুঁড়ে চলেছে পুলিশ। আর যত খুঁড়ছে ততই নরকঙ্কাল বেরোচ্ছে। এমন কি মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আসনের তলায় ফুলের আড়ালে পাঁচটা নরকঙ্কালের মাথা পাওয়া গেছে। কাজেই সিআইডির আগমন অবসম্ভাবী। তারা এসেই ভৈরবকে জেরা শুরু করে দিয়েছেন। পাঁচ ঘন্টা হতে চললো এখনো ভৈরবের ঘর থেকে কেউ বেরোয় নি।

 

আজ গোটা আশ্রমের নিবাসীরা নিস্তব্ধ। গতকালও যারা ভৈরবের নামে জয়ধ্বণি দিচ্ছিলো আজ তারা অবিশ্বাসে, আতঙ্কে, বিশ্বাসভরসা হারানোর যন্ত্রণায় বাকরুদ্ধ। কেউ বাইরে বেরোতে চাইছে না। স্থানীয় লোকের ভীড়ে আশ্রমের প্রতিটা কোণ ভরে গেছে। অথচ প্রত্যেকে চুপ করে দাঁড়িয়ে। যেন তারা কোনো কিছুর অপেক্ষা করছে। আমি চুপচাপ এককোণে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর দেখছিলাম পুরো ঘটনাটা। সকালে পুলিশের সাইরেন শোনার পর ঘরে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছিলাম। তারপর সুযোগ বুঝে আশ্রম থেকে বেরিয়ে হোটেলে উঠেছি।

 

ব্যোমকেশকে ফোন করে জানাতে ও বললো, “ভালো করেছো সরে এসেছো। তবে বিপদ এখনও কাটেনি আজ অমাবস্যা। আজই ভৈরবের উপর চরম আঘাত হতে পারে। এই বজ্রধরের মৃত্যুটা একটা অজুহাত ওকে বের করে আনার। ক্ষিপ্ত জনতার ভীড়ে মিশে ওকে মেরে ফেললে কেউ ধরতে পারবে না আততায়ীকে। খুব সতর্ক হয়ে নজর রাখো। এই আমাদের শেষ চান্স।”

 

ঠিক সাতটার দিকে ভৈরবের ঘর থেকে বেরোলেন একজন। নীচে নেমে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে জানালেন অনেকগুলো প্রশ্নের সদুত্তর না পাওয়ায় আপাতত ভৈরবকে রিমান্ডে নিচ্ছেন তারা। ভৈরব ইচ্ছে জানিয়েছে যাবার আগে মায়ের চরনে মাথা ঠেকাতে চায় সে। তারা পাঁচমিনিট সময় দিয়েছেন।

আশ্চর্যের ব্যাপার এই কথাটা শুনে উপস্থিত জনতার যতটা প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা ছিলো ততটা হলো না বরং তারা যেন সায় দিলো এই সিদ্ধান্তে কিছুক্ষন পর বাকি অফিসারদের সাথে বেরোলো ভৈরব বিধ্বস্থ, ক্লান্ত, অন্তিম বিচারের জন্য প্রস্তুত সে ধীর পায়ে নেমে এলো নীচে আর ও নীচে নামার পর বুঝতে পারলাম জনতা কেন তখন অফিসারের কথায় সায় দিচ্ছিল তারা জানতো এসময় বিক্ষোভ করলে তারা হাতের কাছে পাবে না ভৈরবকে তাই এই সাময়িক বোঝাপড়া করেছিলো তারা ভৈরব নীচে নেমে মন্দিরের দিকে এগোতেই ওকে লক্ষ্য করে শয়ে শয়ে উড়ে এলো ডিম, টমেটো, ইট, পাথর

 

আকস্মিক এই আক্রমনের জন্য পুলিশ প্রস্তুত ছিলো না। তারা প্রথমে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হলেও পরক্ষনে ভৈরবকে গার্ড করে এগিয়ে চললো। কিন্তু সাথে থাকা সিআইডি অফিসাররা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। একজনই মাত্র রয়ে গেল ভৈরবের সাথে। আর তখনই আমি দেখলাম ওকে। সিভিল ড্রেসে সিআইডি অফিসারের ছদ্মবেশে সে ভৈরবকে টানতে টানতে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে গর্ভগৃহে প্রবেশ করে দরজা আটকে দিলো। কিন্তু এখানে কি করছে ও? এই বেশে কেন? তবে কি

 

উত্তেজিত জনতা আর বাধা মানলো নাতার পুলিশি বাধা ভেঙে এগিয়ে গেল মন্দিরের দিকেধাক্কা মেরে ভেঙে ফেলল দরজাটাকিন্তু দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর সকলে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলোতারপর গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে এসে আশ্রমে তান্ডবলীলা শুরু করে দিলোআমি সদর দরজার কাছে ছিলাম বিপদ বুঝে বেরিয়ে এলামএকজন ভক্তও আমার সাথে বেরিয়ে আসছিলেনতাকে জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল, মন্দিরের ভেতরে কেউ নেইনা সেই অফিসার না ভৈরববিপদ বুঝে অফিসার ভৈরব কে নিয়ে পালিয়েছে

 

ব্যাপারটা বুঝতে আমার কিছুক্ষন সময় লাগলো। তারপর সমগ্র বিষয়টা বুঝতে পারলাম। তার মানে ওই! সবটা বোঝার পর হোটেলে ফিরে কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যোমকেশকে ফোন করলাম। ব্যোমকেশ ফোন ধরে বললো, “বলো।” আমি বললাম, “কোথায় তুমি? ” ব্যোমকেশ সোজা জবাব দিলো, “ছাগলের সাথে। এই পাঠাটাকে বাঁচাতে হবে বলেছিলাম না? ”

 

তাই বলে

 

কোনো কথা নয়হোটেলের নিচে আমি বসে আছি গাড়িতে। তাড়াতাড়ি নেমে এসোযত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের বর্ধমান ছাড়তে হবে

 

নীচে নেমে এসে চেকআউট করে রাস্তায় দাঁড়াতেই একটা মারুতি ওমনি প্রায় গা ঘেষে দাঁড়ালো। ব্যোমকেশ দরজা খুলে দিতেই গাড়িতে বসলাম আমি। ব্যোমকেশ গাড়ি চালু করে দিলো। আমি ইশারায় ভৈরব কোথায় জিজ্ঞেস করতেই সেও পেছনে ইশারা করলো।পেছনে তাকিয়ে দেখলাম কালো কাপড় দিয়ে ভৈরবের চোখ মুখ বাঁধা। হাত পা নারকেল দড়ি দিয়ে পিছমোড়া করে বেঁধেছে ব্যোমকেশ।

 

হাইওয়ে পর্যন্ত ব্যোমকেশ চুপচাপ গাড়ি চালালো। আমি ওকে কোনো প্রশ্ন করলাম না। কারন আমি জানি ওকে প্রশ্ন করলে কোনো উত্তর পাবো না।হাইওয়েতে গাড়ি নামা মাত্র ফোনটা বেঁজে উঠলো। বের করে দেখলাম রণি। রিসিভ করা মাত্র রণি গর্জে উঠলো,“তোরা কোথায়?” আমি নির্বিকারভাবে বললাম,“আমরা মানে?” রণি একইভাবে বললো,“মানেটা তুই ভালো করেই জানিস।নিউজচ্যানেলের টেলিকাস্টে কেউ লক্ষ্য না করুক আমি তোকে ভৈরবের আশ্রমে দেখেছি নীল। গোটা পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ভৈরবের সাথে সাথে ব্যোমকেশকে খুঁজছে।  আজ সন্ধ্যের টেলিকাস্টে গোটা বাংলা দেখেছে কিভাবে তোর ধর্মের ধ্বজাধারী ব্যোমকেশ ঐ পাপী ভন্ডটাকে বাঁচিয়েছে। তুই আমার বন্ধু তাই বলছি তোর আর ব্যোমকেশের কোনো ক্ষতি হবে না। প্লিজ বল কোথায় এখন তুই?

 

আমি রণির কথা শুনে বললাম,“তুই ভুল ভাবছিস রণি। ব্যোমকেশ ভুল করতে পারেনা।ওর এই কাজে নির্ঘাত কোনো উদ্দেশ্য আছে” আমার কথার আগে ব্যোমকেশ আমার ফোনটা কেড়ে নিয়ে নিজের কানে কিছুক্ষন শুনলো তারপর একটা হাই তুলে দিয়ে বললো,“এই জুয়াটা না খেললে খুনিকে ধরা যেত না রণি। তাই ঝুকি নিতে বাধ্য হয়েছি। আজ রাতটা ভীষণ গুরুত্বপুর্ণ।  আশা করি আজ রাতের মধ্যে তোমার শিকারকে  তোমার হাতে তুলে দেবো। তাই বলছি একটু ধৈর্য ধরো। আর যদি পারো তো বীরভুমের মাল্লারপুরে এসো। ওখানে অসীতবাবু আছেন।উনিই তোমাকে আমার কাছে পৌছে দেবেন। তবে নীলের ফোন না পাওয়া পর্যন্ত একদম এগোবে না।বলে ফোনটা কেটে ব্যোমকেশ আমাকে ফেরত দিয়ে বললো,“মাল্লারপুর ঢুকলে রণিকে  আবার ফোন করবে। চার্জ আছে তো?”

 

আমি মাথা নাড়লাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম,“গাড়িটা কার?” ব্যোমকেশ মাথা নেড়ে বললো ,“জানি না। তবে ভদ্রলোক গাড়িতে চাবি ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। ভাগ্যিস ফুল ট্যাঙ্ক ছিল না হলেআমি পেছন দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভৈরব শুয়ে আছে। তারপর সামনে ফিরে বললাম,“ওকে অজ্ঞান করলে কি করে?” ব্যোমকেশ জবাব দিলো,“ক্লোরোফর্ম।” এবার প্রশ্ন করলাম,“কিন্তু কেন?”  ব্যোমকেশ কিছু বলল না। কিছুক্ষন পর বললাম,“আমাদের বাঘ কে?” ব্যোমকেশ লুকিংগ্লাসে পেছনে তাকিয়ে বলল,“আজ রাতে জানতে পারবে।” তারপর চুপচাপ গাড়ি চালাতে লাগলো।

 

এদিকে আমার ফোনে সমানে ফোন, ম্যাসেজ এসেই চলেছে। নেহাত সাইলেন্ট করা আছে নাহলে শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যেত। আমি চুপচাপ বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে রইলাম। আজ অমাবস্যা। আকাশে চাঁদ নেই ঠিকই তবু নক্ষত্রের টিমটিমে আলো রয়েছে আকাশ জুড়ে। সেই অন্ধকার নেমে এসেছে হাইওয়েতে।অন্ধকার রাস্তা চিরে চলেছে আমাদের গাড়ি মাল্লারপুরে যেখানে এসব কিছু শুরু হয়েছিল।

 

******

ফোনটা কেটে দেওয়ায় রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো রণির। প্রবল আক্রোশে টেবিলে ঘুষিটা মেরে উঠে দাঁড়ালো সে। ছিঃ ছিঃ লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে তার। আজ সকালে যখন খবরটা এলো রণি খুশি হয়েছিল। সেদিন ভৈরবের কনফেশনটা শোনার পর ওর ইচ্ছে করছিলো ভৈরবকে ওখানেই মেরে ফেলে। আজ দুপুরে যখন সম্পুর্ণ খবর এলো উত্তেজনায় নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। ও চেয়েছিল তখনই ফোর্স নিয়ে বেরোবে।কিন্তু তার আগেই উপর মহল থেকে জানা গেল কেসটা সিআইডি নিচ্ছে।

 

তখন যদি বেরিয়ে পড়তো তাহলে এই চুনকালিটা লাগতো না মুখে। তাও বিকেলে স্বস্তি ছিলো হারামজাদাটাকে কলকাতায় আনা হবে। সন্ধ্যেবেলা আচমকা তলব পেয়ে তড়িঘড়ি ছুটে গিয়েছিলো সে। ডিসি ডিডির থমথমে মুখ দেখে খটকা লেগেছিল। পরে তার কাছ থেকে সবটা শুনে বিশ্বাস করতে পারেনি সে।  ডিসিও হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। বার বার আক্ষেপ করছিলেন রণিকে না পাঠানোর জন্য। রণি ফুটেজটা চেয়ে নিয়ে নিজের রুমে এসে কম্পিউটারে চালিয়ে দেখছিল। প্রত্যেকটা জায়গা খুটিয়ে দেখার পর দাঁতে দাঁত চেপে ফোন করে নীলকে।

 

মাথাটা সাংঘাতিক তেতে আছে। বাথরুমে গিয়ে মাথায়,ঘাড়ে জল দিতে লাগলো রণি। কিছুক্ষন পর নিজের রুমে ঢুকে ফ্যানটা চালিয়ে চেয়ারে গা হেলান দিয়ে বসে চোখ বুঝতেই ব্যোমকেশের বাকি কথা গুলো এবার কানে বাজতে লাগলো তার। সোজা হয়ে বসলো রণি। মাল্লারপুরজায়গাটার নাম ভীষণ চেনা লাগছে।কোথায় যেন শুনেছে ও মনে পড়ছে না। একটু ভাবতেই মনে পড়লো কোথায় শুনেছে। আর মনে পড়া মাত্র শরীরটা টানটান হয়ে উঠলো তার। সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারকমে একজনের খোঁজ নিলো সে। ওপাশের কথা শুনে ভুরু কুঁচকে গেল রণির। নিজেকে সামলে একটা বিশেষ ফাইল চাইলো সে।

 

ঘন্টাদেড়েক পর রণির গাড়িটা হুটার বাজিয়ে কলকাতার রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো।তার ঠিক পেছনে সশস্ত্র সিভিল ড্রেস পরিহিত জনা পনেরোর পুলিশের দল নিয়ে  আরেকটা গাড়ি বেরোলো।যাদের গন্তব্য বর্তমানে মাল্লারপুরে।

 

******

মল্লারপুরে যতক্ষনে আমরা ঢুকলাম বেশ রাত হয়ে গেছে। রাস্তায় দুটো জায়গায় থেমেছিলাম আমরা। এক জায়গায় তেল ভরতে। আরেক জায়গায় সিট অদলবদল করার জন্য। রণির কথায় এটা স্পষ্ট যে প্রতিটা টোলে পুলিশ ব্যোমকেশকে খুঁজে বেরাচ্ছে। অগত্যা এছাড়া উপায় নেই। মাল্লারপুরে ঢোকার একটু আগে আমাকে ডেকে দেবে।কারন গ্রামের মাঝে এই গাড়ি নিয়ে যাবার কোনো মানে হয় না।  মন্দিরে যাবার একটা শর্টকার্ট হাইওয়ের পাশে আছে।” বলে পেছন সিটে বসে চোখ বুঁজে পেছনে হেলান দিলো ব্যোমকেশ।

 

হাইওয়ে ধরে সোজা গাড়ি চালাতে লাগলাম আমি। মোবাইলে গুগল ম্যাপ খুলবো তারও উপায় নেই রণি ট্র্যাক করতে পারে। অগত্যা রাস্তার সাইনবোর্ডই ভরসা। এটা জানতাম যে একটা রুটে মাল্লারপুরের আগে ময়ুরেশ্বর পড়ে আরেক রুটে পড়ে মহম্মদবাজার । ভেবেছিলাম ব্যোমকেশ সিউড়ির রুটটাই ধরবে কিন্তু আসানসোলে এসে ও যখন রুট বদল করলো আমি একটু অবাক হলাম। কারন সবচেয়ে শর্টকার্ট রাস্তা মানে সিউড়ির রুট না ধরে ও সাঁইথিয়ার রুট ধরে বললো,“শর্টকার্ট রুটে পুলিশ থাকতে পারে তাই একটু ঘুর পথে যাবো। চিন্তা নেই অমাবস্যা কেটে গেছে অনেকক্ষন। তবে সিদ্ধযোগ চলছে সেটাই যা চিন্তার।”

 

সাঁইথিয়ায় পেট্রোল পাম্পে গাড়িতে তেল ভরলাম। তারপর গাড়ি ময়ুরেশ্বর ক্রস করতেই ব্যোমকেশ কে ডাকলাম। ব্যোমকেশ গাড়ি দাঁড় করাতে বলল। তারপর তারপর সামনে এসে চালকের আসনে বসে হাই তুলে বলল,“অনেকক্ষন ঘুমিয়েছি না?” আমি মাথা নাড়লামব্যোমকেশ বলল,“অনেকক্ষন চালিয়েছ এবার পেছনে বসে একটু জিরিয়ে নাও। আজ রাতে অনেক ধকল আছে।আমি পেছনে গিয়ে বসলাম। ভৈরবের এখনও জ্ঞান ফেরেনি। সে মরার মতো গাড়ির ফুটবোর্ডে শুয়ে আছে। 

 

গাড়ির পেছনে হেলান দিয়ে বসে থাকতে থাকতে চোখ লেগে গিয়েছিল। আচমকা একটা ঝাকুনিতে ঘোরটা কেটে গেল। উঠে বসে দেখলাম গাড়িটা হাইওয়ে ছেড়ে একটা কাঁচা রাস্তায় নেমে গেছে।একটু চোখ রগড়ে দেখলাম গাড়িটা একটা মাঠের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিছু দুর গিয়ে গাড়িটা থামালো ব্যোমকেশ। তারপর গাড়ি থেকে নেমে পেছনের দরজা খুলে ভৈরবকে কাঁধে তুলে এগোতে লাগলো সামনের জঙ্গলের দিকে।পেছন পেছন আমিও গাড়ি থেকে নেমে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে এগোলাম। বেশীদুর যেতে হলো না ।জঙ্গলে প্রবেশ করে কিছুটা এগিয়ে থামলাম আমরা।

 

জঙ্গলের মাঝে একটা মন্দির। মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে বুঝলাম আমরা ঠিক জায়গায় পৌছেছি। এটা মন্দিরের পেছনদিক। মন্দিরের কালীমুর্তিটা এই আলোয় আরো ভীষণদর্শনা এবং রহস্যময়ী লাগছে। ব্যোমকেশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর মুখ নির্বিকার। ধীরে ধীরে ভৈরবকে মাটিতে নামিয়ে আমাকে ইশারায় ফ্ল্যাশটা নেভাতে বললো। আমি সামনে তাকিয়ে ফ্ল্যাশটা নিভিয়ে দিতেই চারদিকের জমাট অন্ধকার ঝুপ করে নেমে এলো আমাদের সামনেরাস্তায়, মাঠে তাও নক্ষত্রমন্ডলী আকাশে একটু ক্ষীণ আলো এনেছিল। এখানে তাও নেই। নিকষ,কালো অন্ধকারে আমরা দুজন জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি।ব্যোমকেশের উদ্দেশ্যে চাপা গলায় বললাম,অতঃ কিম?” বাতাসে ব্যোমকেশের ফিসফিসানি ভেসে এলো,“প্রতিক্ষা আহ!” সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে একটা ধপ করে ভারী শব্দ হলো! তারপর পাশে কে যেন মাটিতে পড়ে গেল। শব্দটা শুনে আমি চমকে উঠলাম।  কি হলো ব্যাপারটা? কিছুক্ষন চুপচাপ থেকে ফিসফিস করে ডাকলাম ,“ব্যোমকেশ!?” জবাবে কিছু শোনার আগেই মাথার পেছনে প্রচন্ড আঘাত আছড়ে পড়লো আমার। তারপর আর কিছু মনে নেই।

(আগামী পর্বে সমাপ্য)


 

বলি নবম পর্ব

 







১৪ই আগষ্ট ২০১৯, বিকেল পাঁচটা, কলকাতা

মাঝে মাঝে আমাদের জীবনে এমন সব ঘটনা ঘটে যেটার ভাগীদার আমরা মোটেও হতে চাই না কিন্তু ঘটনাক্রমে বাধ্য হয়ে সেটার ভাগীদার হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না যেমন গত দুদিন ধরে আমাকে ভুগতে হল শর্মিষ্ঠার জন্য গত পরশুদিন সকালে আচমকা ব্যোমকেশ প্রস্তাব দিল  যে আমরা  ভৈরবের আশ্রমে যাবো আর আমার আপত্তিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে শর্মিষ্ঠা সেই প্রস্তাব কে লুফেও নিলো তারপর আর কি? কথায় আছে 'পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে সাথে।' অগত্যা গেলাম আমরা ছদ্মবেশে ভৈরবের ডেরায়। তারপর কি হলো পাঠক জানেন। এই মুহুর্তে ব্যোমকেশ আর রণি বাদে আমাদের ভেঞ্চারের যোগ দেওয়া  সব কটা বর্তমানে হাসপাতালে শুয়ে আছি  ব্যোমকেশ বলছে টানা আটচল্লিশ ঘন্টা আমরা ঘুমিয়েছি। আজ সকালে ঘুম ভেঙেছে। বালুটা এখনও ভোঁসভোঁস করে ঘুমাচ্ছে প্রাচী বসে আছে আর আমি মনে মনে নাক কান মুলে বলছিএই শেষ আর কোনোদিন জীবনেও ব্যোমকেশের কথায় নাচবো নাব্যোমকেশ পাশে বসে বলল,“সত্যিই আমি দুঃখিত নীল মানে আরেকটু আগে হলে হয়তো তোমাদের এই দুর্যোগে পড়তে হত না কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম ভাই মানে এটুকু না করলে ভৈরব কে  হাতেনাতে ধরা যেত না। তাই এটাকে আনুষঙ্গিক ক্ষতি ভেবে নাওচোখ বুঁজে বিড়বিড় করে বললাম,“চুপ করো তুমি জীবনে আর কোনোদিন তোমার কথায় নাচবো না আরেকটু হলে শর্মিষ্ঠার কি হতে পারতো ভাবতেই আমারপাশের বেড থেকে শর্মিষ্ঠা আমাকে ধমকে বলল,“এই তুমি চুপ কর তো! ব্যোমকেশদা ওর কথা একদম পাত্তা দেবে না আই জাস্ট লাভ ইট! এত থ্রিলিং ছিল সব কিছু যে আমার দারুন লেগেছে উফ এরকম থ্রিলিং ভেঞ্চারে আবার আমি যেতে চাই

 

আমি চোখ বুঁজে মনে মনে বললাম, “তাহলেই হয়েছেমুখে বললাম, “যা খুশি করো আমি আজকের পর থেকে তোমাদের সাথে আর নেই” শর্মিষ্ঠা মুখ ভেটকে বললবেশ তো তুমি ঘরে বসে থেকো আমি আজকের পর থেকে ব্যোমকেশদার অ্যাসিস্ট্যান্ট হবো কি ব্যোমকেশদা রাজি তো?” বালু ঘড়ঘড়ে গলায় বলল,“ আমিও আছি কিন্তুপ্রাচী হেসে বলল,“ব্যস তাহলেই হয়েছে, একেবারে নরক গুলজার হয়ে যাবেবলে হাসতে লাগল বাকি গুলোও ওর সাথে যোগ দিলো

 

আমি চোখ বুঁজে হেসে বললাম,“ তোমার সাথে থেকে আরও কি কি যে দেখতে হবেপিশাচ দেখলাম, পিশাচিনীর খপ্পরে অনির্বাণদার জীবন যায় যায় অবস্থার কথা শুনলাম, জীবন ভালই যাচ্ছে আমার এর পরও বলবে যে আমি অবাস্তব গল্প লিখি?” “লেখোই তোব্যোমকেশ আড়মোড়া ভেঙে বলল,“উল্টো পাল্টা টাইমলাইন, গল্পে তন্ত্রের ভুল্ভাল ব্যাক্ষা, অনির্বাণবাবুর গল্পটা আমিও পড়েছি বুঝলে? সাধারন পিশাচিনী কে কর্ণপিশাচিনী  বলে চালাচ্ছিলে যেই একজন চেপে ধরলো ওমনি পালটে দিলে লেখক হওয়া এত সহজ নয় ভায়া অনেক খাটতে হয় অনেক পড়তে হয় অন্তত লেখার আগে আমাকে তো দেখিয়ে নেবেতা না উল্টোপাল্টা তথ্য দিয়ে পাঠককে বিভ্রান্ত করছো। শোনো ভায়া পাঠককে ভুল্ভাল তথ্য দিয়ে লাভ নেই। একজন লেখকের লেখা যেমন রোমহর্ষক হয় তেমনি হয় তথ্যবহুল। তোমার লেখা একদিকে যেমন হবে পাঠকের মনোগ্রাহী তেমনই তথ্যে সমৃদ্ধ হবে পাঠক। এই যে আমার সাথে সংস্কার বনাম কুসংস্কারের লড়াইতে নেমেছো।এতে পাঠককে যদি প্রথমেই ভ্রান্তিতে রাখো তাহলে এই লড়াইটা লড়বে কি করে।

 

আমি হেসে বললাম, বেশ তাই হবে গুরুজি। আচ্ছা ভৈরব সেদিন যজ্ঞে কি দিয়েছিল বলো তো? না মানে এমন ড্রাগ তো বাপের জন্মে শুনিনি যেটা এতগুলো লোককে প্রায় তিনদিন ঘুম পাড়িয়ে দেয়।” ব্যোমকেশের হাসি একটু ম্লান হলো।গম্ভীর গলায় বলল, কালকূট।” আমি হচকিয়ে বললাম, “ মানে?

 

ব্যোমকেশ হেসে বললো, আয়ুর্বেদে যতরকম মারণ বিষ আছে তার মিলিত নির্যাস এর বাস্তব রূপ হলো ‘কালকূট’। এছাড়া বিভিন্ন মাদক, ও ঘুমের ঔষধি মিলিয়েও বানানো যায়। আজকাল সাধু সেজে চুরি করতে হলে অনেকে মাদক ধুপ ব্যবহার করে। ভৈরব ছিলো এককাঠি উপরে। সব মাদক দ্রব্যর সাথে অ্যানেস্থেশিয়া, ক্লোরোফর্ম, মরফিয়া, লিকুইডেটেড ব্রাউন সুগার মিশিয়ে তৈরী করেছিল এটা। সাথে গাঁজার গুঁড়ো তো ছিলোই। এর প্রভাব এতটাই যে জ্ঞানত অবস্থায়  তোমার হাত কেটে ফেললেও তুমি টের পাবে না।

 

আমি শিউরে উঠলাম, “তাহলে ও কি আমাদের…” ব্যোমকেশ মাথা নাড়লো। “শর্মিষ্ঠাকে হয়তো মারতো না তবে তোমাদের হয়তোভয়ে চোখ বুঁজলাম আমি। উফ! কি সাঙ্ঘাতিক এই ভৈরব! আর একটু হলেই যে ঘটনাটা ঘটতে যাচ্ছিল ভাবতেও গা টা  শিঁউরে উঠছে। ভাগ্যিস সাথে ব্যোমকেশ ছিল। নাহলে কি যে হতো?   শর্মিষ্ঠা পরিবেশ হাল্কা করতে বললো, বাদ দাও।যা হয়েছে তা হয়েছে। আমরা এখন সেফ। কিছুই হয়নি আমাদের। আমাদের অবশেষে ব্যোমকেশদাই তো বাঁচিয়েছে।  তা ব্যোমকেশদা ভৈরব তো আমাদের হাতে। অবশেষে খুনি প্রায় ধরা পরলো বলো?”

 

ব্যোমকেশ আড়মোড়া ভাঙলো আবার তারপর বলল, “এখনই তা বলা যাচ্ছে না। কারন খুনির মোটিফ কি আমরা জানি না। আগে তা জানতে হবে। ও ভালো কথা তোমরা হাসপাতালে থাকাকালিন আমি একবার রামপুরহাট গিয়েছিলাম। গিয়ে কি জানলাম জানো? পরিবারের মৃত্যু রাজুকে টানা দশবছরের জন্য অপ্রকৃতিস্থ করে দিয়েছিল। ওর ঠাই হয়েছিল কলকাতার অ্যাসাইলামে। সেখানে ওর আচরন মোটেও সুখকর ছিলো না। এমনিতে শান্তশিষ্ট কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ এমন নৃশংস কান্ড করতো যে বলার মতো না। দশবছর ডাক্তারদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় সুস্থ হয় রাজু। কিন্তু ততদিনে নষ্ট হয়েছে ওর জীবনের অনেক মুল্যবান বছর।

 

সুস্থ হবার পর ওকে গ্রামে ফিরিয়ে আনেন আমাদের অসীতবাবু। ততদিনে অসীতের বাবা-মা গত হয়েছেন। অসীতবাবু নিজের ভাইয়ের মতো দেখতেন রাজুকে। তিনি রাজুকে নতুন নাম দেন এবং বাড়িতেই প্রাইভেটে মাধ্যমিক , উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে সাহায্য করে রাজুকে উচ্চ শিক্ষিত করেন। তবে এতকিছুর পরও সম্পুর্ণ সুস্থ হয়নি রাজু। এখনও নাকি মাঝে মাঝে রাজু একজন মনোবিদের কাছে নিজের আসল নামে চিকিৎসা করাচ্ছে।

 

সেই মনোবিদের কাছে গিয়েছিলাম তিনি রাজি হন নি রাজুর সম্বন্ধে কোনো কথা বলতে। এটা নাকি তার এথিক্সের বিরুদ্ধে পড়ে। তিনি পেশেন্টের কোনো রকম তথ্য দিতে অপারগ। অনেক বলার পরও রাজি হন নি। বড্ড কঠিন ঠাই ইনি। আমার পরিচয় পেয়েরণি সাথে থাকা সত্ত্বেও আমাদের কে কোনো তথ্য দেন নি। এমন কঠিন কাঠখোট্টা মেয়ে আমি কমই দেখেছি।

 

আমি হেসে বললাম, “বলো কি?  শেষ পর্যন্ত একজন মহিলা মনোবিদ তোমাকে কাঁচকলা দেখিয়ে দিলো। এনাকে তো চাক্ষুস দর্শন করতে হয়। কি নাম এনার? ” “বড্ড ইউনিক নাম। দীপান্বিতা। ড: দীপান্বিতা চক্রবর্তী।” ব্যাজার মুখে বললো ব্যোমকেশ। এমন সময় আমাদের সকলকে চমকে হো হো করে হেসে উঠলো শর্মিষ্ঠা। যেন কিছুতে মজা পেয়েছে। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লো সে বিছানায়।

 

বালু সহানুভুতির স্বরে বললো, এই সেরেছে! মনে হয় ভৈরবের ধোঁয়ায় মাথার সব তার কেটে গেছে। আহা রে নীল!  বেচারা।” প্রাচী হেসে মৃদু কিল মারলো বালুর হাতে। “ধ্যাৎ! কিসব বলছো

শর্মিষ্ঠা হাসতে হাসতে বললো, “দিপুদি আর কাঠখোট্টা।আমার জীবনে শোনা সবচেয়ে ফানিয়েস্ট কথা এটা! ”

 

আমরা হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছি দেখে শর্মিষ্ঠা কোনোরকমে নিজের হাসি সংবরণ করে বলল, “ যার কাছে ব্যোমকেশদা বারবার পদর্যুস্ত হচ্ছে সে আর কেউ নয় আমার মাসতুতো দিদি দীপান্বিতা চক্রবর্তী। এমনিতে আমাদের মতো হাসি খুশিহুল্লোড়বাজ। কিন্তু কাজের জায়গায় ভীষণ সিরিয়াস। একমিনিট তোমার প্রবলেম আমিই সলভ করছি দাঁড়াও। তার আগে বলো এখান থেকে আমাদের কবে ছাড়বে? ”

 

এমন সময় আমাদের কেবিনে রণি ঢোকে। ঢুকেই শর্মিষ্ঠার কথা শুনতে পেয়ে বলে, “ডাক্তার‌ বললেন আজই ছেড়ে দেবেন।” বালু ক্লান্ত গলায় বলল, “অ্যাঁ আজকেই? কিন্তু আমি তো এখনো অসুস্থ।প্রাচী ফুট কেটে বল, “ছাই অসুস্থ! ওসব তোমার বাহানা। দিব্বি বসে বসে গ্যাঁজাচ্ছো আবার অসুস্থ?আজই তোমায় বাড়ি নিয়ে গিয়ে দেখবো তুমি কত অসুস্থ। ”বালু হতাশ গলায় বলে, “দেখছিস নীল? বিবাহিত জীবন কত সুখের? দেখছিসভাই সাবধান! তোর পায়েও শেকল পড়তে চলেছে রে।

 

বটে! আজ তোমায় দেখাবো শেকল বাঁধা কাকে বলে। বাড়ি চলো একবার।” মিষ্টি হেসে গজগজ করে বলে প্রাচী। রণি গলা খাকড়ে বলে, “বলছিলাম যে শেকল লাগলে বলবি আমায়। সাপ্লাই দেবো। অবশ্যি এই বিশাল বপুর জন্য তো এক্সট্রা শেকল লাগবেই।”  বলে হাসে রণি। তারপর ব্যোমকেশ কে  বলে, “বলছি যে ছাগলের জ্ঞান ফিরেছে।তা ওকে বাঘের সম্বন্ধে জানাবে? ” ব্যোমকেশ বলে, “তা বলবো তার আগে জানতে হবে ছাগলটা বনে কোন কোন জায়গায় চড়েছে। সেই অনুযায়ী টোপ রেখে ফাঁদ বানাতে হবে।বেশ চলোশুনে আসি ছাগলের কীর্তি তবে এর বেশীরভাগই আমার জানা। তা নীল যাবে নাকি?ও তুমি তো বললে আমার সাথে আর যাবে না। তা শর্মিষ্ঠা আসুক তুমি ছুটি নিয়ে বাড়ি যাও। রেস্ট নাও।

 

আমি প্রমাদ গুনলাম। এই মরেছে!  এবার থেকে আমার জায়গায় শর্মিষ্ঠা?  কোনোমতে বললাম, ইয়ে মানে এমনি ঠিক আছে। তবে বিপদজনক কাজে  ঝুকি হয়ে যায় তাই বলছিলাম। তাছাড়া” আমায় থামিয়ে ব্যোমকেশ বললো, “থাক! আর বলতে হবে না।  এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। ওরা থাকুক। আমরা এগোচ্ছি। তুমি চাইলে আসতে পারো।” বলে রণির সাথে এগোলো ব্যোমকেশ।

 

******

জ্ঞান ফেরার পর চোখ মেলে চাইল ভৈরব চারদিকে তাকিয়ে দেখে আন্দাজ করতে চাইলো এখন সে কোথায় পাশে একজন নার্স আর একজন ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছে কিছুক্ষন পর ধাতস্থ হতেই উঠে বসল ভৈরব আর তখনি ওর পাশ থেকে কে যেন বলে উঠলো, “ এখন কেমন মনে হচ্ছে ভৈরব?” কন্ঠস্বর শুনে পাশ ফিরতেই হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে গেল ভৈরবের

 

চেয়ারে বসে হাই তুলতে তুলতে ব্যোমকেশ বলল,“কতদিন পর দেখা তাইনা। তাও প্রায় কুড়ি বছর হবে মনে হয়। তা বেশ আশ্রম টাশ্রম খুলে বসেছো দেখছি। পসার তো দারুন হয় মনে হয়। কেমন আছো?” ভৈরব বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে ব্যোমকেশ এর দিকে। ব্যোমকেশ হেসে বলে,“ ভয় নেই আমি এখানে তোমার ব্যবসা বন্ধ করতে আসিনি। আমি এসেছি একটা জিনিস জানতে।” বলে রণির দিকে তাকিয়ে ইশারা করে ব্যোমকেশ। রণি মাথা নেড়ে ডাক্তার আর নার্সকে বলে কিছুক্ষনের জন্য ঘরটা খালি করে দিতে। ডাক্তার প্রথমে মৃদু আপত্তি করলেও অবশেষে রাজি হন এবং দশ মিনিটের জন্য ঘর টা ছেড়ে দেন।

 

ঘরটা খালি হবার পর ব্যোমকেশ হাই তুলে বলে,“ দেখ ভৈরব। আমি জানি তুমি আগে কতটা নিকৃষ্ঠ পিশাচস্বভাবের ছিলে। আর এটাও জানি গুরুদেব তোমার শক্তি হরন করার আগে তুমি কতটা নিচে নেমেছিলে তন্ত্র সাধনায় সিদ্ধিলাভের জন্য। এমন কোনো গর্হিত কাজ নেই যা তুমি করো নি। তবে এটাও জানি এসব তুমি করেছিলে নিজস্বার্থের জন্য। কিন্তু তুমি বোধ হয় এটা ভুলে গিয়েছিলে যে তন্ত্র সাধনার  ফল যতটা ভাল হয় ততটাই ভয়ংকর হয় এর আনুসঙ্গিক প্রভাব গুলো।দুর্ভাগ্যের বিষয় খুব শীঘ্রই সেই ফলটা পেতে চলেছ তুমি। তোমার কৃত পাপের ফল তোমাকে নাশ করতে আসছে।”

 

এতক্ষনে হাসি খেলে যায় ভৈরবের ঠোটে।মৃদু হেসে ভৈরব বলে,“ভয় দেখাচ্ছো আমায়? কে ক্ষতি করবে আমার? তুমি?  বাইরে যতজন দেখছো তার চেয়ে আরো বেশি ভক্ত ছড়িয়ে আছে  পুরো পৃথিবী জুড়ে। আমার একচুলও ক্ষতি হলে বেঁচে ফিরতে পারবে? পুলিশও কিছু করতে পারবে না। হতে পারে আজ  আমার কাছে পূর্ব অর্জিত শক্তিসমূহ নেই কিন্তু অগণিত ভক্ত বৃন্দ আছে। যারা তোমার কথায় বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করবে না। আমার এক ইশারায় তোমাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলবে।” বলতে বলতে ভৈরবের মুখ লাল হয়ে উঠল।

 

ব্যোমকেশ টেবিলে রাখা জলের বোতল থেকে একটু জল খেয়ে বলল,“নীলু, কানাই, কপিল আর চাঁদুও তাই ভেবেছিল।”

 

“কে?” এবার ভৈরবের মুখের রঙ আবার ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

 

হাল্কা আড়মোড়া ভেঙ্গে হাই তুলে ব্যোমকেশ বলল,“ মনে পড়ছে না?  বেশ মনে করিয়ে দিচ্ছি। তোমার কৃত প্রথম পাপের সাক্ষী তথা সঙ্গীরা। টিভিতে সব সময় নিজের আস্থা চ্যানেল দেখলেই হবে? মাঝে মাঝে নিউজও দেখতে হয়কিছুই তো জানো না দেখছি। তোমার সমস্ত সাথীরা বৈতরনী পার করেছে। পুলিশ,জনগন, মায় তোমার ভক্তদের থেকেও বেশি ভীড় থেকেও ওদের তুলে নিয়ে খুন করেছে আততায়ী। একটু ভুল বললাম খুন করেনি বলি দিয়েছে স্বয়ং বুদ্ধকপালের এবং মা তারার চরনে। ওদের দেহাংশ দিয়ে আভূষণ বানিয়েছে তাদের। ঠিক যেভাবে তুমি বুদ্ধকপালকে হেরুক বানিয়ে একজন স্বয়ম্ভকুসুম নারী বলি দিয়ে মৃতদেহটাকে দেবী চিত্রসেনা কল্পে পুজো করেছিলে। আজ হোক কাল হোক সে আসবে । আর তোমার ভক্তদের সামনে দিয়ে তোমায় তুলে নিয়ে যাবে। আর নিয়মমতো এবার তোমায় বলি দেবে সাক্ষাত রঙ্কিনী দেবীর চরনে। আর রঙ্কিনীদেবী কতটা মাংসপ্রিয়া সেটা তোমার চেয়ে ভালো আর কেই বা জানে। পুজো শেষে পড়ে থাকবে তোমার হাড়গোড় সেই মন্দিরের আশেপাশে। শেয়ালের উচ্ছিষ্ট হবে। এই মুহুর্তে তোমায় যদি কেউ বাঁচাতে পারে সেটা আমি।কাজেই যেটা বলছি সেটা শোনো নাহলে কি বিশ্বাস হচ্ছে না বেশ সত্যতা নিজেই দেখে নাও।”

 

বলে ব্যোমকেশ নিজের কড়ে আঙুল রাখল ভৈরবের কপালে। ভৈরব প্রথমে বাধা দিচ্ছিল পরক্ষনেই স্থির হয়ে গেল তারপর বিকট চিৎকার করে উঠল। যেন কিছু দেখে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছে।ব্যোমকেশ বলল, “এবার বিশ্বাস হল? তোমার যম কতটা নিকটে তোমার। শেষবারের মতো বলছি যা যা জানতে চাইছি সব বলো। নাহলে তোমাকে বাঁচাতে পারবো না।”

 

ভৈরব কোনোমতে ঢোক গিলে বলল,“বলছি সব বলছি। আগে আমায় কথা দাও আমায় তুমি বাঁচাবে।”

 

ব্যোমকেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,“বেশ কথা দিলাম।

 

******

৯ এপ্রিল ১৯৯৬, বিকেল সাড়ে পাঁচটা মাল্লারপুর,  বীরভূম।

বিকেলবেলা মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালেন পুরোহিতসর্বেশ্বর চক্রবর্তী।রামপুরহাটে এক যজমানের অনুরোধে শিবপুজো করতে গিয়েছিলেন তিনি। সেই পুজো সাড়তে সাড়তে কখন সুর্য পাটে বসলো খেয়ালই করেন নি তিনি। খেয়াল হলো পুজো শেষে শিবস্তুতি শেষ করার পর। যজমানের স্ত্রী তাও বলছিলেন ভোগের খিচুড়ি প্রসাদ নিয়ে যেতে। তিনি নেন নি। আসলে সেসবের জন্য বসলে আরো দেরী হয়ে যেত।  আজ কেন জানেন না পুজো শেষ হবার পর বাড়ির জন্য, ছেলেমেয়েটার জন্য মন কেমন করছিল। এর আগেও পুজো করতে বাইরে গেছেন তিনি। কোনো বারই এত চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে নি। শিব তান্ডব স্তোত্র, কালিকাস্তোত্র তাঁর কন্ঠস্থ। অনায়সে একশ্বাসে পাঠ করতে পারেন, বিষ্ণু সহস্র নাম স্তোত্র, ’ ‘গজমোক্ষদা মন্ত্র’ ।কোনোবারই মন্ত্রপাঠে গলা কেঁপে ওঠে নি। আজ পুষ্পাঞ্জলীর সময় যখন শিবাষ্টকম মন্ত্র’ পাঠ করছিলেন নিজের অজান্তেই হঠাৎ গলাটা কেঁপে উঠলো।

পুজো শেষে যখন ধ্যানে বসলেন। আচমকা মেয়ের মুখটা ভেসে উঠলো। মুহুর্তের জন্য বিচলিত হলেও পরক্ষনে নিজেকে সামলে কোনোমতে পুজো সমাপ্ত করে ফিরে এলেন গাঁয়ে।

বাড়ির পথে যেতে পড়ে গ্রামের মাঠটা। যাবার সময় শুনেছিলেন আজ নাকি মাঠে ভীষণ ভীড় হবে। ফুটবল খেলা আছে। ওনাদের গাঁ বনাম রামপুরহাটের মধ্যে।  সেদিক দিয়ে আর গেলেন না তিনি। মাঠে বা দর্শকদের মধ্যে অসীত থাকলে বিপদ। ছেলেটা এমনি ভালো তবে ভীষণ খেলা পাগল। দেখা হলেই আবার রাজুকে খেলতে দেওয়ার জন্য বলবে। এই জিনিসটাই ভালো লাগে না তাঁর। ওসব খেলাধুলো বড়োলোকদের ব্যাপারস্যাপার। তাদের মতো মধ্যবিত্তদের কাছে ওটা হাতিপোষার সামিল।

 

তাছাড়া কলকাতায় এই ফুটবল খেলা নিয়ে যা ঝামেলা হয় দুদলের মধ্যে তা নিয়ে ভয়ে থাকেন তিনি। ওসব হুড়যুদ্ধ ভালো লাগে না তাঁর। শরীর সুস্থ রাখতে একটু আধটু ব্যায়াম, খেলাধুলো ঠিক আছে তবে এর বেশী কিছু চান না তিনি।তাছাড়া এবয়সটা পড়াশুনোর খেলাধুলোর নয়তাঁর বড়ো সাধ রাজু বড়ো হয়ে বড়োমানুষ হবে,  কলেজে পড়াবে নাহলে একটা ভদ্রস্থ চাকরী করবে। কিন্তু বাবু সে কথা শুনলে তো?  রাতদিন খালি ফুটবল আর ফুটবল।

 

বাবা-বাছা করে বুঝিয়ে, বকে,  মেরেধরেও ছেলের মাথা থেকে এই ভূত নামাতে পারেন নি তিনি। কবে যে ছেলের বোধবুদ্ধি হবে জানেন না তিনি।  দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন্দিরের দরজা খুললেন তিনি। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। ঠিক করলেন সন্ধ্যারতীটা করেই বাড়ি ফিরবেন তিনি।

 

মায়ের সামনে বসে প্রদীপ, ধূপকাঠি জ্বালিয়ে পুজো শুরু করলেন তিনি।

ওঁ বন্ধুক কুসুমাভাসাং পঞ্চমুন্ডাধিবাসিনীং।

স্ফুরচ্চন্দ্রকলারত্ন মুকুটাং মুন্ডমালিনীং॥

ত্রিনেত্রাং রক্ত বসনাং পীনোন্নত ঘটস্তনীং।

পুস্তকং চাক্ষমালাং চ বরং চাভয়কং ক্রমাত॥

দধতীং সংস্মরেন্নিত্যমুত্তরাম্নায়মানিতাং আহ! !

 

আচমকা পুরোহিতমশাই এর কন্ঠরোধ হলো একটা ভীষণ আঘাতে। পেছন থেকে একটা গামছা পেঁচিয়ে গেছে তাঁর গলায়! গামছাটার এককোণে একটাবড়ো পাথর গিঁট দিয়ে বাঁধা। পাথরটা সটান লেগেছে তাঁর মাথার পেছনে।আচমকা এই অতর্কিত আঘাত সহ্য করতে পারলেন না পুরোহিতমশাই ।লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।  জ্ঞান হারাবার আগে মায়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, “মা ওদের দেখো।”

 

পুরোহিত মশাই এর অজ্ঞান দেহটা কাঁধে নিয়ে সাতজনসামনের দিকে  খুব সাবধানে এগিয়ে চললো  যাতে কেউ টের না পায়। কিছু দুর গিয়ে দলটা দুভাগে ভাগ হয়ে গেল। চারজনের দলটা গেল পুরোহিতমশাইকে নিয়ে গ্রামের শুড়িপথ ধরে জঙ্গলের দিকে। অপর তিনজন গেল পুরোহিত মশাইয়ের বাড়ি।

 

******

 

জ্ঞান ফিরতেই গালে একটা ঠান্ডা স্পর্শ  টের পেলেন পুরোহিত মশাই। মাথাটা একটু ঘোরাতেই  পেছনদিকটা চিন চিন করে উঠলো। চোখটা অসম্ভব ভারী লাগছে। অনেক কষ্টে চোখ মেলে চারদিকে তাকিয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করলেন তিনি কিন্তু বুঝতে পারলেন না কোথায় আছেন।

 

চারদিক অন্ধকার। কেবল একটা মৃদু হুম হুম শব্দ ভেসে আসছে। কিছুক্ষন পর ধাতস্থ হবার পর উঠে বসার চেষ্টা  করতে করতে ভাবতে লাগলেন এখানে কি করে এলেন তিনি। এতক্ষনে অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে তাঁর। চারদিকে তাকিয়ে বুঁঝতে পারলেন বর্তমানে একটা কুঁড়েঘরে বসে আছেন তিনি। কিন্তু এখানে কি করে এলেন তিনি বুঝতে পারলেন না। তার স্পষ্ট মনে আছে তিনি গাঁয়ের মন্দিরের মায়ের পুজো করছিলেন। আচমকা গলায় একটা কি যেন পেঁচিয়ে গেল তারপর... মনে পড়তেই গলায় হাত বুলিয়ে দেখলেন কিছু নেই।

 

মৃদু হুম হুম শব্দটা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। মাথায় ঝিম ধরিয়ে দিচ্ছে। কোনোমতে উঠে দাঁড়াতেই হুট করে সামনের দরজাটা খুলে গেল। আর শব্দটার প্রাবল্য আরো বেড়ে গিয়ে হঠাত্‌ থেমে গেল। পুরোহিতমশাই বুঝতে পারলেন শব্দটা কোথা থেকে আসছিল। সামনে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে। অবয়বটা ক্রমশ এগিয়ে এসে দাঁড়ায় পুরোহিতমশায়ের সামনে। তারপর হেসে বলে,কেমন আছেন ঠাকুরমশাই?

 

কন্ঠস্বর শোনামাত্র ছায়ামুর্তিকে চিনতে পারলেন পুরোহিতমশাই চোঁয়াল শক্ত হল তাঁর মনে পড়ল একবছর আগের ঘটনা এই সেই লোক গতবছর অসীতেরর সাথে যাকে দেখেছিলেন তিনি লোকটা হেসে বলল,“দেখলেন? আমি ঠিক চিনে নিলাম মন্দিরটা আপনি বলেছিলেন এই মন্দির গুপ্ত মন্দিরে অধিষ্ঠানকারী কালভৈরব চান না তিনি প্রকাশ্যে আসুন আপনি কতটা ভুল ছিলেন আজ প্রমানিত কালভৈরব অনেকদিন পুজো পান নি তিনি ক্ষুধার্ত,তিনি তৃষ্ণার্ত তিনি পুজো চান,বলি চান আর সেটা আমার হাতেই চান

 

দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,“ আমি মোটেও ভুল ছিলাম না তুমিই কথাটা বুঝতে পারোনি হ্যাঁ এটা ঠিক যে মন্দিরে অধিষ্ঠানকারি ভৈরব অনেক দিন পুজো পাননি তারমানে এই নয় যে তিনি পুজো চান তার মনের ইচ্ছে জানার তুমি কে আমিই বা কে? একটা জিনিস বুঝতে পারোনি তুমি কিছু জিনিস গুপ্ত থাকলেই মঙ্গল মন্দির যদি জনসমক্ষে গোচর না হয় তাহলে বুঝতে হবে মন্দিরের দেবতা চাননা তিনি জনসমক্ষে আসুন

 

খলখল করে হেসে উঠল লোকটাতারপর বলল,“কিন্তু এই রুদ্রযামল তন্ত্রে যে অন্য কথা বলা আছে ঠাকুরমশাই এখানে বলা আছে ভৈরব যদি নিয়মিত পুজো না পান তার ফল হয় ভয়ংকর আর

 

লোকটা কে থামিয়ে বললেন পুরোহিতমশাই,“সেটা ঠিক কিন্তু এই ভৈরব যে কোনো সাধারন ভৈরব নন এমন কি ইনি কালভৈরব ও নন এনার পুজোর বিধি অন্য আর ভৈরবপুজোয় নুন্যতম ভুল হলে কি হয় আশা করি জানো? এনার পুজো বৈদিক ভাবে হয় নাএনার উপাচার অন্য,নৈবেদ্য অন্য,ভোগ অন্য আর এনার পুজোর একটা ভবিষ্যত বাণী আছে

 

জানিলোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললএক ব্রাহ্মণ এবং এক তন্ত্রে মহাবলিয়ান সিদ্ধপুরুষ এর হাতে একশো আট/একান্ন/অথবা অষ্টাদশ বলি গ্রহন করার পর মহাপুজো শেষে নিজ মুর্তি ধারণ ভৈরব আবির্ভুত হবেনতন্ত্রধারক এবং সেই ব্রাহ্মণকে ইপ্সিত বর প্রদান করবেন এবং পুজো শেষে চাইবেন একটি মহা অর্ঘ তন্ত্রধারকের কাছে সেটাই হবে এক মহাপরীক্ষা সেটায় উত্তীর্ণ হলে সে পাবে অপরিমিত ঐশ্বর্য,অমিত শক্তি, এবং জড়াহীন জীবন

 

সামান্য হাসলেন পুরোহিত সর্বেশ্বর চক্রবর্তী হেসে বললেন,“আর তোমার এসব সত্য মনে হয়েছে সত্যি অপরিশীম ক্ষমতান্ধতা, ঐশ্বর্য প্রীতি মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় শোনো বই তে ঐসব লেখা থাকে বাস্তবে ওসব কিছু হয় না কিছু অসাধু ব্যক্তি নিজস্বার্থ অন্বেষনে এই সব দেখে ক্রিয়া করতে গিয়ে প্রান হারান বাস্তবে ওসব কিছুই হয় না অপরিমিত ঐশ্বর্য মানে কি বোঝো? টাকা পয়সা, সোনাদানা ? এই ঐশ্বর্য ওর চেয়েও দামী এই ঐশ্বর্য হল মানসিক শান্তিআর তোমার কি মনে হয়? ভৈরব কি মহাঅর্ঘ চাইবেন তোমার কাছে?প্রানের চেয়ে দামী অর্ঘ আর কি আছে পৃথিবীতে? তুমি একা নও তোমার আগেও অনেকে এই নিয়ে আমার কাছে এসেছেন সকলেই হয় ব্যর্থ মনোরথে নয় মৃতাবস্থায় ফিরেছেন এরপরও তুমি বলবে যে তুমি এই সাধনা করতে চাও?”

 

একটু বিচলিত হয় এবার লোকটা বিড়বিড় করে বলে,“তাহলে সব মিথ্যে? এত পরিশ্রম, এত তপস্যা, এত খোঁজ সব সব বৃথা? আর এই জড়াহীন জীবন?”

 

ওটা একটা অভিশাপ ভেবে দেখ তোমার আত্মীয়স্বজন,পরিবার ,পরিজন, বন্ধুবান্ধব,সকলেই বৃদ্ধ হবে, মরবে তোমার চোখের সামনে আর তুমি চির জীবন অজর অমর হয়ে থাকবে এটা কোনো বর হল? তোমার আগে তোমার চেয়ে বড়ো সাধকেরা এই আশির্বাদ পান নি তুমি সেটা পাবে আশা করো? স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব এই অমরত্বের জ্বালায় জ্বলছেন প্রতি কল্পে তার প্রাণাধিক প্রিয়া স্ত্রী দেহত্যাগ করেন আর তাঁর দেহ কে

 

পুরোহিতমশাই কে থামতে হলো কারন আরেকজন এসে দাঁড়িয়েছে দরজার সামনে সে বলে উঠলো,“ভৈরবদা পুরোহিতের পুরো পরিবার কে এনেছি শুধু ছেলেটা মাঠে আছে বলে আনতে পারলাম না তবে ফিরলেই ধরে নিয়ে আসব

 

শিঁউড়ে উঠলেন পুরোহিতমশায় সেকি ওরা পরমেশ্বরী, শ্যামাকে ধরে এনেছে? কেন? তবে কি ওরা? সভয়ে দেখলেন লোকটা আবার স্বাভাবিক হচ্ছে আবার চোখ দুটোয় ক্রুরতা, ঠোটে কুটিল হাসিটা আবার ফিরে আসছেমৃদু হেসে  লোকটা বললো, “ আপনার জ্ঞান বিতরন ও পুরাণ কথা শেষ হয়েছে? সত্যি বড্ড বেশী বকেন আপনি। অনেক বকেছেন এবার চলুন দেখি মন্দিরের দ্বার উন্মোচনে সাহায্য করবেন।বলে পুরোহিতমশাইকে নিয়ে বাইরে এলো সে।

******

 

১৪ই আগষ্ট ২০১৯, রাত আটটা, কলকাতা

আমি এখন বাড়িতে । হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে বাকিরা বাড়ি ফিরে গেলেও আমি রণি আর ব্যোমকেশ  থেকে গিয়েছিলাম ভৈরবের কনফেশন শোনার জন্য। সবটা শুনে একটা কথাই মনে হয়েছে ভৈরবের প্রতি। আজ পর্যন্ত অনেক রকম মানুষ দেখেছি ওর মতো নরপশু দুটো দেখিনি।

 

এতটা স্বার্থান্বেষী মানুষও হয়? এতটা বর্বর,  এতটা নৃশংস? রাগে গোটা শরীর রি রি করে উঠছে। রণি তো পারলে মেরেই ফেলতো ঐ চিমড়ে বুড়োটাকে। নেহাত ব্যোমকেশ ছিলো নাহলে ভৈরব আজ বাঁচতো না।

 

ঐ ঘৃন্য পশুটার স্বীকারোক্তী লিখতেও ইচ্ছে করছে না আমার। কিন্তু এটা না লিখলে মানুষের কাছে একটা ঘৃন্য পাপীষ্ঠর পাপ অজানা থেকে যাবে। নরপশুটা পুজিত হবে  লক্ষ লক্ষ লোকের কাছে ভগবান রূপে। একজন মানুষ হিসেবে এটা হতে দিতে পারি না আমি। তাই ভৈরবের কথায় ওর জবানবন্দি তুলে দিলাম নীচে।

 

কুড়েঘর থেকে ঠাকুরমশাইকে নিয়ে বেরিয়ে মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে একটু অবাকই হলাম আমি। কানাই যে বলল ঠাকুরমশাই এর গোটা পরিবারকে ধরে এনেছে। এতো ঠাকুরমশাইয়ের স্ত্রী। ছেলেটা না হয় মাঠে। মেয়েটা কোথায়? তবে কি? ঠাকুরমশাইয়েরও হয়তো তাই মনে হয়েছিল।তিনি তাঁর স্ত্রী কে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী নীরব হয়ে বসে রইলেন। ওনার চোখে এমন কিছু ছিল যে একটা আতঙ্ক চেপে বসলো আমার বুকে।”

কানাইকে চেপে ধরলাম আমি। ওর চরিত্র নিয়ে আমার সন্দেহের শেষ নেই। পুরো ভাদ্রমাসের কুকুর। কামে আকন্ঠ নিমজ্জিত। অবশ্য হবে নাই বা কেন এই ছজন যে মানবের ষড়রিপুর প্রতিভু। কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ, মাৎসর্য। কানাই কামের বশ, নীলু ক্রোধী, উমাপতি লোভী, কপিল মাতাল, চাঁদুর টাকার মোহ বড্ড বেশী, আর জগা প্রচন্ড ঈর্ষাকাতর। কানাইকে চেপে ধরতেই ও যেটা বলল সেটা শুনে মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো আমার। ”

 

“মেয়েটাকে আর ওর মাকে আনতে উমাপতি, কানাই আর নীলু গিয়েছিল।পুরোহিত গিন্নি প্রথমে খবর শুনে ছুটে আসছিলেন হঠাৎ কি সন্দেহ হওয়ায় থেমে যান অবস্থা বেগতিক দেখে উমাপতিরা টেনে আনার চেষ্টা করতেই মেয়েটা কোথা থেকে দা জোগাড় করে আঘাত হানে উমাপতির হাতে। এক কোপে উমাপতির হাত কেটে পড়ে যায়। নীলু কানাই দুজন মিলেও পেরে উঠছিল না মেয়েটার সাথে। এমন সময় উমাপতি উঠে দাঁড়াতেই মেয়েটা পেছন ফেরে আর সেই সুযোগে নীলু তার হাসুয়াটা দিয়ে মেয়েটার গলায় কোপ দেয়। এক কোপে মাথাটা উড়ে যায়। মেয়েটা তারপরও কয়েকবার দা নিয়ে এদিক ওদিক ব্যর্থ কোপ মারার পর মাটিতে আছড়ে পড়ে।বলে মন্দিরের নৈবেদ্যের থালাটা দেখায়। সেখানে মেয়েটার মুখটা দেখে শিঁউড়ে উঠি আমি।

 

সাধারণ পাঁচটা গাঁয়ের মেয়ের মতোই মুখ। আগেও দেখেছি মেয়েটাকে। কিন্তু মেয়েটার কপালের জড়ুলটা আগে  চোখে পড়েনি আমার। এ যে দেবকন্যা! সাক্ষাত মহামায়ার অংশ! একি পাপ করলাম আমি? যে মোক্ষলাভের জন্য এতকিছু । যার কৃপার জন্য এত কান্ড । তারই অংশকে আমার অনুচর

 

নীলু আমার সামনেই এসে দাঁড়িয়েছিল। ওকে কিছু বলার আগেই ব্রাহ্মণদেব ছুটে এলেন আমার দিকে। পাশেই পড়ে ছিল বলির খাঁড়াটা । সেটা নিয়েই তিনি ছুটে এলেন আমার দিকে অমোঘ মৃত্যুর মতো। কিন্তু আমার কাছে পৌছনোর আগেই নীলুর হাঁসুয়া বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠলো আর পুরোহিতমশাইয়ের কবন্ধ দেহ থেকে ফিনকিতে রক্ত ছিটকে পড়লো আমার গায়ে। আর মাথাটা সোজা গড়িয়ে গিয়ে পড়লো পুরোহিত গিন্নির কোলে। মাথাটা হাতে নিয়ে  এবার তিনি নড়ে বসলেন। তারপর খিলখিল করে হাসতে লাগলেন।ভর সন্ধ্যেবেলায় সেই হাসিটা রীতিমতো বুক কাঁপিয়ে দিলো আমাদের। ”

 

“ধীরে ধীরে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর চোখ বুঁজে হাসতে হাসতে নিজের স্বামীর সদ্যকাটা মাথা থেকে রক্ত নিয়ে কপালে মেখে মাথাটা ছুড়ে দিলেন আমাদের দিকে। তারপর উন্মাদিনীর মতো হাসতে হাসতে ছুটে গেলেন নীলুর দিকে। নীলু প্রস্তুত ছিলো কিন্তু এইবার ওর আঘাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো নাকি হাসুয়াটা পুরোহিত গিন্নির শরীর ছুঁয়ে গেল সেটা জানে না কিন্তু পরক্ষনেই একটা প্রবল ধাক্কায় নীলু ছিটকে পড়লো দেয়ালে। ”

 

“পুরোহিত গিন্নির দিকে তাকিয়ে দেখলাম মাথার একঢাল চুল চারদিকে উড়ছে। পরনের কালো হলুদ শাড়ি বাঘছালের মতো লাগছে।  সিঁদুরে রক্তে মাখামাখি গোটা কপাল, আয়তচোখের দৃষ্টি অতি চঞ্চলময়,  মুখে মুচকি হাসি। এ মুখ যেন কোথায় যেন দেখেছি। মনে পড়ছে না কিছুতেই সহসা মনে পড়তেই শিঁউড়ে উঠলাম আমি। এ যে তাঁর পুরাণবর্ণিত রূপ! আদিশক্তি মহামায়া! স্বামী সন্তান হারিয়ে চরম উন্মত্ত হয়ে এখন উনি মহাকালির সম মৃত্যুরূপিনী।কানাইরাও টের পেয়েছিল এই রূপটাকে। ওরা ভয়ে পিছিয়ে আসছিল। শুধু উমাপতি ছাড়া।

 

উমাপতি সবসময় স্ত্রী জাতিকে নীচু চোখে দেখতো।এতটাই নারীবিদ্বেষী ছিলো সে যে মায়ের পুজোর প্রসাদও গ্রহণ করতো না। অবহেলা করতো মাকে। বুঝতেই পারছো একে পুরুষমানুষ  তার উপর একজন নারীর কাছে মারাত্মক আহত হওয়ায় পৌরুষে আঘাতপ্রাপ্ত। সেটার শোধ নিতে এগিয়ে গিয়েছিল। পুরোহিত গিন্নিকে আঘাত করার জন্য মাটিতে পড়ে থাকা খাঁড়া তুলতে যাবে এমন সময় যেটা হলো সেটা আজও মনে পড়লে বুক কেঁপে ওঠে।”

 

উমাপতি খাঁড়াটা তোলার আগেই কোথা থেকে আরেকজন ছুটে এসে হাতের দা সোজা নামিয়ে দিলো উমাপতির গলা লক্ষ্য করে। কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে করতে স্থির হয়ে গেল উমাপতি। আর ওর দেহ স্থির হতেই সকলকে চমকে খুলে গেল মন্দিরের দরজা। ভেতর থেকে বেড়িয়ে এলো এক প্রচন্ড আলো।সেই আলোয় আগন্তুক কে দেখে আমরা আর সেখানে থাকিনি। পুরোহিতের মেয়েটার কবন্ধ দেহ আর পুরোহিত গিন্নি ততক্ষনে পৈশাচিক নৃত্য শুরু করতে শুরু করায় ভয়ে আর থাকতে পারিনি। প্রচন্ড মৃত্যুভয়ে সকলে পালিয়ে এসেছিলাম। পালানোর সময় পেছন থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম পুরোহিত গিন্নির অট্টহাস্য। তিনি গর্জন করে বলছিলেন, ‘কোথায় পালাবি?  পালিয়ে যাবি কোথায়?  যেখানেই যাবি তোদের পাপ তোদেরকে ছাড়বে না। কুড়ে কুড়ে খাবে। ফিরে আসতেই হবে তোদের কে! বলি দিয়ে মহাকালকে জাগাতে চাস না? এই বলি দিয়েই তোদের পাপের মুক্তি হবে।আজ তোরা আমাকে জাগিয়েছিস। আমার রক্ততৃষ্ণা, মহাক্ষুধাকে জাগিয়েছিস।তোরাই তৃপ্ত করবি আমাকে ততক্ষন পর্যন্ত তোদের নিস্তার নেই।’

 

তারপর আমরা আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম। এরপর শতসাধনা করেছি পাপস্খলনের জন্যপারিনি।মায়ের কাছে মাথা কুটেছি। তাও পারিনি। তোমার গুরুদেব আমার সাধনশক্তি কেড়ে নেওয়ার পর পালিয়ে বেরিয়েছি। অবশেষে আমার গুরুদেব আমায় বাঁচালেন।দীক্ষা দিয়ে সাধনা করতে বললেন। কিন্তু আমি হলাম সাপের জাত। গুরু আজ্ঞা ভুলে সেই পাপেই লিপ্ত হলাম। বলতে বাধা নেই আজ পর্যন্ত পঁচিশটা মেয়েকে যোনীপুজোয় সমর্পিত করেছি। তাদের প্রতি অনাচারে আমি সিদ্ধি লাভ করতে চেয়েছি।ভেবেছিলাম পাপ থেকে মুক্তির পথে এগোচ্ছি। পুরোনো পাপ যে আমার এখন পিছু ছাড়েনি কে জানতো? আমি আমার কথা রেখেছি। সব বলেছি। এবার তুমি তোমার কথা রাখবে তো? আমায় বাঁচাবে তো? ”

 

চোখ বুঁজে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকতে থাকতে চোখটা লেগে এসেছিল।  আচমকা ফোনটা গোঁ গোঁ করে বেজে ওঠায় ঘোরটা কেটে গেল। বালিশের পাশ থেকে ফোনটা বের করেদেখলাম শর্মিষ্ঠা ফোন করেছে। রিসিভ করতেই উচ্ছসিত গলায়বলল, “কোথায় তুমি? মেসেজের রিপ্লাই করছো না কল রিসিভ করছো না। are you allright? ” এই রে! সেই ফোনটা ভৈরবের কেবিনে সাইলেন্ট করেছিলাম তারপর আর খুলিনি। নির্ঘাত অনেকগুলো কল মিস হয়েছে।

 

গলা খাকড়ে বললাম, “না আসলে একটুআমার কথাবাদ দাও তুমি ঠিকঠাকভাবে বাড়ি পৌঁছেছো তো? ” ও পার থেকে ও বলল, “একদম আর এসেই পুরো স্টানড হয়ে গেছি কেন বলোতো? ” হাই তুলে বললাম, “নির্ঘাত তোমার বাপি তোমার জন্য কোনো গিফ্ট এনেছেন।শর্মিষ্ঠা হেসে রহস্যে ভরা গলায় বলল, “মোটেই না।তার চেয়ে বড়ো সারপ্রাইজ। guess what?  এত বছর পর দিপুদি আমাদের বাড়ি এসেছে। কাল তোমাদের সাথে দেখা করতে চাইছে।”

 

মুখের সামনে একটা মশা অনেকক্ষন ধরে ভন ভন করছিল। অনেকক্ষন পর সেটাকে বাগে পেয়ে মারতে যাচ্ছিলাম শর্মিষ্ঠার কথা শুনে থমকে গেলাম। তারপর স্থান কাল পাত্র ভুলে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, “WHAT?চিৎকার টা একটু বেশীই জোরে হয়েছিল বুঝতে পেরেছিলাম। কারন রাস্তার দুটো কুকুর মারামারি করতে করতে আমার চিৎকার শুনে কাঁই কুঁই রব তুলে চৌঁচাঁ দৌড় দিলো।

 

ফোনের ওপারে তখনও শোনা যাচ্ছে শর্মিষ্ঠার উচ্ছাস, “তবে আর বলছি কি? আমি তো পুরো বোমকে গেছি। আসলে রণিদা বাড়িতে খবর দেওয়ার পর মা-ই দিপুদিকে ডেকেছিল।জানোই তো বাবা হাইপারটেনশনের রুগী। অল্পতেই এক্সাইটেড হয়ে যায়। এবার ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি হওয়ায় দিপুদিকে আসতেই হলো। দিপুদি সবটা শুনে তোমাদের কাল আসতে বলেছে।

 

বেশ কাল যাবো। তা আমি আর ব্যোমকেশ

আমাকে থামিয়ে বলে উঠলো শর্মিষ্ঠা, “না না সবাইকে আসতে বলেছে। তুমি, রণিদা, বালুদা, শাম্বদা সবাইকে।কাল সকাল সকাল চলে আসবে কিন্তু আমি অপেক্ষায় থাকবো।আচ্ছা এখন রাখছি খেতে ডাকছে বাই।”বলে কট করে ফোনটা কেটে দিলো শর্মিষ্ঠা।

 

একটা গলাখাকড়ানোর শব্দ পেয়ে পেছন ফিরে দেখি ব্যোমকেশ আমার ঘরের সামনে দুটো হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে। ওকে বলতেই হেসে বলল, “এ যে মেঘ না চাইতেই জল দেখছি। বেশচলো কাল যাওয়া যাক।

 

******

 

পরদিন সকালে যে চমকটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো সেটা আগে জানতে পারলে অন্তত এই ভাবে দীপাকে অপ্রস্তুত হতে হতো না। রণিকে পরে চেপে ধরতেই বলেছিল, “আরে সেই কোন মাধ্যমিকবেলায় স্কুল ছেড়ে গিয়েছিল ও। এতদিন পর আচমকা দেখলে চেনা যায়? তার উপর স্কুলের সেই মুটকি, পেঁচিটা যে এত ছিপছিপে সুন্দরী হয়ে যাবে কে জানতো? তবে হ্যাঁ নাকটা দেখে একটু চেনা লাগছিল কিন্তু যে মেজাজ দেখালি ভয়ে জিজ্ঞেস করতে সাহস পাইনি।”

 

সব শুনে দীপা বলেছিল, “এই একই কারনে আমিও তোকে চিনতে পারি নি। ক্লাসের সেই হোতকা হাতিটা যে গপ গপ করে টিফিনে ম্যাগি গিলতো।শামুর, নীলের পেছনে লাগার জন্য আমার কাছে প্রতিবার গাট্টা, রামচিমটি খেয়ে ভ্যাঁ করে কাঁদতো,   সে হঠাৎ এরকম সুঠাম সুন্দর দেখতে গম্ভীর পুলিশ অফিসার হয়ে আসবে জানলে আগে থেকে তৈরী থাকতামতা হ্যাঁরে তুই কি সত্যি এখনও আলুর পরোটা খেয়ে গ্যাস ছাড়িস?  না আসলে মৃদু গন্ধ পাচ্ছি কিনা। ”

 

দেখেছেন? এই পুরোনো বন্ধুদের সাথে হঠাৎ দেখা হলে এই এক সমস্যা।এই কথা সে কথায় আসল কথাটাই হারিয়ে যায়।যাক গে আপনারা তো জানেনই যে স্কুল কলেজে আমরা ছিলাম অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। যেটা জানেন না সেটা হলো আমাদের চারজনকে একসুঁতোয় যে বেঁধেছিলো সে আর কেউ নয় এই দীপান্বিতা।

 

বাবা-মা ডাক্তার হলে কি হবে? পড়াশুনোয় একদম মন ছিলো না মেয়ের। না একটু ভুল বললাম পড়ায় মন ছিলো ঠিকই। নাহলে প্রতিবছর ফার্স্ট হতো কি করে? গাছে চড়া,  টিফিনে ছেলেদের সাথে ক্রিকেট খেলাঘুড়ি ওড়ানো,  পাঁচিল টপকে স্কুল পালানো। এই সবে আমাদের টেক্কা দিতো এই মেয়ে। বয়কাট চুল, ছেলেদের পোষাক, আচরনও ছেলেদের মতো ছিলো।  মারপিট করে এসে আমাদের সাথে গল্প করতে করতে রোল খাচ্ছে। কপাল কেটে রক্তপাত হলেও ভ্রুক্ষেপ নেই।একটু ড্রেসিং করে দিলেই মেয়ে নিজের সিংহের (পুরুষদের পক্ষিরাজ হলে মা দুর্গার সিংহ হবে না কেন?উপর সওয়ার হয়ে ছুটতো এই মেয়ে।

 

সোজা কথায় আমাদের পঞ্চমপান্ডব ছিলো এই দীপা। ক্লাস নাইনে ওরা নর্থবেঙ্গল চলে যায়। তারপর আজ দেখা। আমরা পাঁচপান্ডব ছিলাম ঠিকই তবে কেন জানি না ওর দুর্বলতা শাম্বর উপরই বেশী ছিল। আজ বুঝতে পারি কেন ছিলো না হলে এতবছর পরও একে অপর কে দেখে লজ্জা পাবে কেন বলুন তো? অনেক গৌড়চন্দ্রিকা করলাম এবার গল্পে ফেরা যাক।

 

কথামতো সবাই মিলে যখন শর্মিষ্ঠার বাড়ি পৌছলাম তখন ঘড়িতে বাজে সকাল সাড়ে দশটা। আজ স্বাধীনতা দিবস বলে ছুটি আছে বলে ওদের বাড়ি পৌঁছতে বেশীক্ষন লাগলো না। কলিং বেল টিপতেই শর্মিষ্ঠা দরজা খুললো।  আমরা একে একে ড্রইংরুমে এলাম। শর্মিষ্ঠা আমাদের বসতে বলে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘর থেকে ঘিয়েভাজা পরোটার গন্ধ আসছে। আজ বোধহয় আমাদের অনারেই তৈরী হচ্ছে এসব।

কিছুক্ষন পর শর্মিষ্ঠার বাড়ির কাজের মেয়েটা ট্রে তে করে আমের জুস দিয়ে গেল। আমরা সকলে গ্লাস হাতে তুলে চুমুক দিয়েছি এমন সময় শর্মিষ্ঠার সাথে যিনি এলেন তাকে সুন্দরী বললে কম বলা হবে। উচ্চতায় আমার সমান, ছিপছিপে,  গায়ের রং হাল্কা চাপা, ফ্রেমহীন চশমার আড়ালে আয়ত চোখে শানিত দৃষ্টি। পড়নে সালোয়ার কামিজ।চেহারায় গাম্ভীর্য আর স্নিগ্ধটা ফুটে উঠছে। মোট কথা চট করে দেখলে সমীহ না করে পারা যায় না।

 

কফিমাগ হাতে সোফায় বসে তিনি বললেন, “একি এসিটা চালিয়ে দেয়নি কেনকাবেরী ও কাবেরী।”আমি গলা খাকড়ে বললাম, “তার প্রয়োজন নেই। এখন তো আর তেমন গরম নেই।” আমার কথা কে পাত্তা না দিয়ে এসির সুইচটা অন করে আবার বসলেন ভদ্রমহিলা। তারপর হেসে বললেন, “তা কি হয়? এত গরমে বাইরে থেকে এসেছেন আপনারা ।কোনো কষ্ট করার মানে আছে? নমস্কার আমি ড. দীপান্বিতা চক্রবর্তী। শর্মির দিপুদি। শর্মির কাছে আপনাদের ব্যাপারে অনেক শুনেছি। আমিই বললাম একদিন আপনাদের নেমন্তন্ন করতে।”

 

কিছুক্ষন পর এ কথা সে কথার পর কাজের মেয়েটা এসে বলল ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্ট দিয়ে দিয়েছে। আমরা সকলে খেতে বসলাম। প্লেটে গরম গরম আলুর পরোটা, আলু আর কাবলি ছোলার লাল লাল শুকনো তরকারি আর জিলিপি দিয়ে সকালের প্রাতরাশটা মন্দ হল না। খেতে খেতে বালু জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা আপনি তো মনোবিদ। তা আপনার কাছে রোজ রোজ এমন সব পেশেন্ট আসে যাদের চিকিত্‌সা করার সময় অনেক রকম অভিজ্ঞতা হয়।” মুচকি হেসে দীপান্বিতা বললেন, “প্রচুর হয়। তবে এটা প্রতিদিন হয় না। মাঝে সাঝেই ঘটে।

 

রণি জিলিপি খেতে খেতে বলল, “তা আপনি যদি মনে না করেন কয়েকটা বলবেন? না এটা যদি আপনার এথিক্সে না বাধে।” মহিলা একটু গম্ভীর হতে গিয়েও হেসে ফেললেন। “বেশ আপনি যখন আর স্ট্রেঞ্জার নন তখন দু একটা বলাই যায়। আগে খেয়ে নিন তারপর ছাদে বসে বলব।’’ ঠিক সেই মুহুর্তে  দুটো খটকা লাগল আমার মনে। প্রথম খটকা এই যে আমরা এখানে আসার পর থেকে আমাদের  সদা বকবক রিপোর্টার শাম্ব পুরো চুপ মেরে গেছে। আর দ্বিতীয় খটকা হল ভদ্রমহিলার এই হাসিটা আমার খুব চেনা লেগেছে। কিন্তু কথায় দেখেছি মনে করতে পারছি না। শর্মি আমার পাশেই বসে ছিল। ওকে বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করলাম, “ এই তোমার দিপুদির কথার টোনটা নর্থ বেঙ্গলে লোকের মতো কেন বলো তো?” শর্মি হেসে বলল, “ হবে না কেন। দিপু দি তো নর্থ বেঙ্গলেই বড়ো হয়েছে।”

 

আমার তাও খটকাটা গেল না গলার স্বর, চাউনি, হাসি খুব কারো সাথে চেনা মনে হচ্ছে কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিনা খাওয়া দাওয়া শেষ করার পর আমরা গেলাম ওদের অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে টিনের শেড দেওয়া বিশাল ছাদএককোণে খরগোশ দের খাঁচাবাইরে গরম হলে কি হবে? ছাদে দমকা ঠান্ডা হাওয়া আসছে একটু পর পর ছাদের মাঝে মাদুর পেতে রাখা শর্মির সকালে যোগ ব্যায়ামের অভ্যেস আছে নির্ঘাত আজ মাদুরটা তুলতে ভুলে গেছে শর্মি সকলকে নিয়ে মাদুরের উপর বসলো আমি এগিয়ে আলসের ধারে দাঁড়ালামজানি এই মুহুর্তে আমার কেসের লিঙ্ক পাওয়ার জন্য ওদের সাথে বসে থাকা উচিত্ কিন্তু একটা খটকা তখন থেকে মনের ভেতর খচ খচ করছে কিছুতেই তাড়াতে পারছি না অন্যমনস্ক হয়ে দুরের বিল্ডিং টার দিকে তাকিয়ে ছিলাম এমন সময় সম্বিত ফিরল একটা চেনা শব্দে

 

খরগোশদের খাঁচাটা খুলে দুটো খরগোশ বের করে এনেছেন দীপান্বিতা দেবী এক হাতে একটা বাটি তে একটু ভাতমাখা সেটা নিয়ে খাওয়াচ্ছেন দুটোকে সেদিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর আচমকা আমার নজর গেল তার বাহাতের দিকে আর তখনি বুঝে গেলাম খটকাটা কোথায় লাগছে আমার ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সেদিকে বসলাম ওনার পাশে তারপর মৃদু গলায় বললাম, “ সারেগামাপাধানিসঙ্গে সঙ্গে জোরে উত্তর এলো, “হোত্কা রণি জাপানি।এটা শোনার সাথে সাথে সবকটার কথা একসাথে থেমে গেল। তাকিয়ে দেখলাম বালু হা করে এদিকে তাকিয়ে। রণি ভ্রু কুঁচকে এদিকে তাকিয়ে গোঁফে তা দিচ্ছে। শাম্ব আর শর্মি মিটিমিটি হাসছে।আর আমি পুরো বোমকে গিয়ে তাকিয়ে আছি ওনার দিকে। ছেলেবেলায় মোটা সোটা হওয়ায় রণির চোখদুটো গালের ফোলা মাংসে ঢেকে থাকায় খানিকটা চিনাদের মতো লাগতো। সেই কারনে আমরা ওকে জাপানি বলে খেপাতাম।এই ডাকটা আমরা চারজন ছাড়া আর এক জন জানতো। আমি কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম।

 

শাম্ব হেসে বলল,“জানতাম। গোটা পৃথিবীতে একমাত্র একজনই আছে যে আলুমটরের তরকারী থেকে ওভাবে খুঁটে খুঁটে মটর খেয়ে জিলিপি চেবোয়।” আমি বললাম, “নাটকটা ভালোই করেছিলি। শেষে ধরা পড়লি কিসে বলতো?” বলে ওর বাহাতের দিকে ইশারা করে বললাম, “ এই কড়ে আঙুলটার জন্য মিস ষড়াঙ্গুলি। স্কুলবেলায় মনে আছে সেই যে জগাইকে পেটানোর সময় জগাইয়ের দাঁতের ব্রেসে তোর কড়ে আঙুলের পাশে থাকা আঙ্গুলটা চিরে গিয়েছিল? ইনফেকশন এর ভয়ে বাদ পড়ে যায় সেটা। সেই তোর কি কান্না? আর কাঁদতে কাঁদতে জগাইকে তোর শাঁসানো। মনে আছে?”

 

ফিক করে হেসে ফেলল দীপা। আমাদের দলের অন্যতম পুরোনো হারিয়ে যাওয়া সদস্য। হেসে বলল, “ মনে নেই আবার? আমার ভয়ে জগাই কদিন স্কুলেই আসেনি।শিলিগুড়িতে তোদের কথা খুব মনে পড়ত জানিস। খুব মিস করতাম তোদের।”

 

তারপর যা হয় হারিয়ে যাওয়া পুরোনো বন্ধুকে আবার ফিরে পেলে। একথা সে কথায় দুপুর গড়িয়ে গেল দুপুরের খাওয়া সেরে আমরা আবার ছাদে এলাম। একথা সেকথার পর ব্যোমকেশ একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, “ তাহলে বুঝতেই পারছেন দীপান্বিতা এই কেসে আপনার মতটা কতটা জরুরি আমি যাকে সাসপেক্ট ভেবেছি তার অতীতটা কতটা কষ্টের এবং নৃশংস ছিল সেটা আপনিও জানেন

 

দীপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ হুম তা জানি বেচারার জীবনটা ভীষন প্যাথেটিক একে ঐ বয়সে পুরো পরিবারের এরকম মৃত্যু দেখা তার উপর এরকম Damaged শৈশব আসলে  এধরনের পেশেন্টরা মূলত Post Traumatic Stress Disorder   এ ভোগে এই রোগটার অনেক রকম Phase হয় এই ট্রমাটা অতো সহজে কাটে নাবলাবাহুল্য এই ট্রমা থেকে অত সহজে ওরা বেরতে পারে না তখন আমাদের লক্ষ্য থাকে এদের কে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনাওর এই ট্রমাটাকে সাবলিমিট করা যে কাজে ওদের ন্যাক বেশি সেই কাজে ওকে বিজি রাখা আসলে এক্ষেত্রে আমরাও নিরুপায় আমরা সবসময় পেশেন্টকে কো-অপারেট করতে বলিকিন্তু সবটা খুলে বলতে বললেও সবাই কি আর বলে ? আমরাও যতটা শুনি সেটার উপর ভিত্তি করে অ্যানালাইজ করে থাকি এক্ষেত্রে তো আর আমরা কাউকে খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারি নাআমরা শুধুমাত্র বিহেভিয়ার পার্টে বেশি জোর দিয়ে থাকিতবে আপনার কথা শুনে যা বুঝলাম রাজু এই ট্রমাটা কাটিয়ে উঠলেও ক্রমশ গ্রিফ স্ট্রাইকেন হয়ে সেটা থেকে অ্যাগ্রেশন ফেজে  চলে গেছে ও এটা তো মেনে নিয়েছে যে এটা ওর সাথেই ঘটেছেকিন্তু এটার সাথে ওর মনে এটাও ঢুকে গেছে যে যাদের জন্য ওর জীবনে এটা ঘটেছে তারা আরাম করে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং ওর মতো আরো অনেক মানুষের জীবনে একই অন্ধকার ঘনিয়ে আনছে সুতরাং ওরা বাঁচার অধিকার হারিয়েছে আর এই জায়গাটাই ভীষন চাপের we should stop him right now. কারন ওর কাছে ন্যায়, অন্যায়, আইন কিছুই matter করে না কিন্তু তাই বলে এই নয় যে এটাও জেনে বুঝে করছেহয়তো  প্রচন্ড Stress এর জন্য এই ঘটনাগুলোওর মনে repress হয়ে যাচ্ছে মানে ও যা করছে সেটা ওর মনে থাকছে না

 

শাম্ব বলল, “ তার মানে স্প্লিট পারসোনালিটি?”

 

দীপা মাথা নেড়ে বলল, “খানিকটা বলতে পারিস

 

ব্যোমকেশ চিন্তিত গলায় বললো, “এর থেকে বেরোবার  উপায় কি? ”

 

“Mainly patient কে আগে ওর এই দ্বিতীয় রূপের সাথে পরিচয় করানোর কথা অনেকে বলে  তবে আমি বলব এটা না করতে কারন এতে ওর ক্ষতিই হবে বই কিছু নয় সবে একটা ট্রমা থেকে বেরিয়েছে এই ঘটনায় যে ধাক্কা তা লাগবে সেটায় recover করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে patient distress হয়ে এমন পথ বেছে নিতে পারে যেটায় ওর ক্ষতি হয়ে যেতে পারে কাজেই patient কে ওর এই প্রব্লেম তার সম্বন্ধে অবগত না করিয়ে বরং Engaged রাখতে হবে নানা কাজে ওকে যতটা পারবেন ব্যস্ত রাখুন  ও যতটা কাজে ভুলে থাকবে তত তাড়াতাড়ি রিকভার করবে সেই কারনেই রাজুকে এত টাস্ক দিই আমি জানি ওর বেলা সময় লাগবে কারন একে ঐ বয়সে এতটা violence দেখেছে তার উপর এতগুলো বছর অ্যাসাইলামে ছিল ফলে ওর শৈশব কৈশোর দুটোই নষ্ট হয়েছেতাও ভাগ্যিস অসীতবাবু ছিলেন। ওনার সুপারিশেই রাজুর স্পোর্টস কোটায় চাকরীটা হয়েছে”  ব্যোমকেশ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বলল, “ কি বললেন? ওর চাকরীটা স্পোর্টস কোটায় হয়েছে?” দীপা অবাক হয়ে বলল, “ হ্যাঁ আপনি জানেন না? রাজুর পুদীপা কে থামিয়ে ব্যোমকেশ বলল, “অনেক অনেক ধন্যবাদ দীপান্বিতা দেবী আপনি আমার মনের একটা জট ছাড়িয়ে দিয়েছেন এবার সব পরিস্কার আমার কাছে আপনার কাছে অনুরোধ এই যে আমার আপনার আজ কথা হল সেটা আর কেউ যাতে জানতে না পারে কথা দিন এটা কেউ জানবে নাহতভম্ব দীপা মাথা নাড়ল

 

এরপর ব্যোমকেশ আমার দিকে তাকালো। দেখলাম ওর মুখে সেই পুরোনো হাসিটা ফিরে এসেছে। হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে বিড়বিড় করে বললো, “চলো হে এবার ফাঁদ পাতা যাক।”

 

 

******

 

 

বিকেলবেলা শর্মিদের বাড়ি ফিরে আসার পর ব্যোমকেশ সেই যে নিজের ঘরে ঢুকলো তারপর গোটা সন্ধ্যে কেটে রাত হতে চললো এখনো বাইরে বেরোয় নি। রাতের খাওয়া সেরে আমি আমার লেখার টেবিলে বসলাম। ইদানিং একটা প্রেমের গল্প লিখছি। পাঠকদের নাকি দারুন পছন্দ হচ্ছে সেটা। বেশ একটা রোম্যান্টিক মুহুর্ত তৈরি করে সেটায় ডুব দিয়েছি। আমার গল্পের নায়ক অনিরুদ্ধ ওর প্রেমিকা ঊশা কে একটা বেশ অভিনব উপায়ে প্রপোজ করছে। এমন সময় দরজায় টরেটক্কা বেজে উঠলো। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখলাম ব্যোমকেশ দাঁড়িয়ে।

 

তুমি কি খুব ব্যস্ত এখন?”

 

এবার আর আগের মতো বোকামোটা করলাম না।ন্যাড়া একবারই বেলতলা যায়।  হেসে বললাম, “ একদমই নয়। ভেতরে এসো।”ব্যোমকেশ ভেতরে এলো। ওকে চেয়ারে বসতে দিয়ে আমি খাটে বসলাম। তারপর একটা সিগারেট ধরালাম। ইদানিং কাজের চাপে এই বদভ্যেসটা ধরতে বাধ্য হয়েছি। তবে সবসময় খাই না। মাঝে সাঝে খুব চাপ হলে খাই। ব্যোমকেশ এটা জানতো না বলে আমার দিকে একটু অবাক চোখে চাইল।আমি হেসে মাথা চুলকোলাম।ব্যোমকেশ একটু ভত্‌সর্নার দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুরু করলো।

 

“দেখো দীপান্বিতা দেবী যতই রাজুকে সুবোধ বালক বলুন না কেন। আইন সেটা মানবে না। রণির হাতে যদি ও ধরা পড়ে তাহলে ওর ফাঁসী নিশ্চিত। একটা নয় দুটো নয় পর পর সতেরোটা খুন করেছে সে। এত সহজে সে আইনের হাত থেকে পার পাবে না। তাই আমাদের লক্ষ্য হবে ফাঁদ পেতে বাঘ ধরে শিকারির নাগাল থেকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়া।বুঝতেই পারছো কাজ টা অতোটাও সহজ হবে না। কারন এতে যথেষ্ঠ প্রাণের ঝুকি আছে।  তাই আমি চাই এবারের অভিযানটা একান্তই গোপনীয় থাকুক।“ বলে নিজের সম্পুর্ণ পরিকল্পনাটা খুলে বলল।

 

আমি জানি আমি ওকে বারন করলেও ও শুনবে না। কাজেই চুপ করে শুনে গেলাম। সবটা বলার পর ব্যোমকেশ একটা গাঁজার সিগারেট ধরালো।আমি কিছুক্ষন চুপ থেকে বললাম, “তা এবার আমার কি করনীয়?” ব্যোমকেশ একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বলল,” আপাতত দুটো কাজ করতে হবে। এক, যতক্ষন পর্যন্ত পরিকল্পনাটা সম্পুর্ণ হচ্ছে ততক্ষন পর্যন্ত মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হবে। কাউকে এই পরিকল্পনার কথা বলা যাবে না। এমন কি শর্মিষ্ঠাকেও না। কাকপক্ষিতেও এই পরিকল্পনার কথা যাতে টের না পায়। দুই, ভৈরবকে আমাদের ফলো করতে হবে। এবারের বাঘবন্দী খেলায় ভৈরবই হল আমাদের ছাগল ওরফে টোপ। আমাদের খুব সাবধান থাকতে হবে। কোনোভাবেই যাতে আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বাঘ  ছাগল কে নিয়ে না পালায়। এই বাঘ শুধু নরখাদক নয়, অত্যন্ত ধুর্ত বটে। কাজেই সাধু সাবধান।“

 

আমি বললাম, “ তুমি এত তা নিশ্চিত কি করে হচ্ছো যে আমাদের বাঘ ভৈরবকে শিকার করবেই?”

 

ব্যোমকেশ মুচকি হেসে বলল, “ করতেই হবে। না করে যাবে কোথায়? হিসেব মতো তো ভৈরবই ওর শেষ শিকার। ওর জীবনের বিপর্যয়ের অন্যতম এবং শেষ জীবিত অপরাধী। ওকে না মারলে তো আমাদের রাজুর এই অভিযানটাই বৃথা।“ আমি ব্যোমকেশের দিকে তাকিয়ে বললাম, “ তারমানে তুমিও চাও ভৈরবের মৃত্যু হোক।“ ব্যোমকেশ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেন তুমি চাও না?”

 

 

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “দেখো আমার মতে ন্যায়ধর্ম অনুযায়ী  ভৈরবের চরম শাস্তি হওয়া উচিত। কারন ও যে ধরনের জ্ঞানপাপী আইন ওর নাগাল পাবে না। ওর এই ধরনের শাস্তিরই প্রয়োজন। তবে তাই বলে একেবারে মেরে ফেলাটা…”

 

আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ব্যোমকেশ বলল, “ ঐ কারনেই তো ভৈরবকে মরতে দেওয়া যাবে না কারন ঐ ন্যায়ধর্ম এই কারনেই তো এত পরিকল্পনা না হলে ঐ নরপশুটাকে বাঁচানোর বিন্দু মাত্র ইচ্ছে আমার নেই বরং ওকে রঙ্কিনী দেবী গ্রহন করলে আমি খুশি হবো কিন্তু তোমাদের এই আইন কানুনের মতো ন্যায়ধর্মও যে বড্ড নিরপেক্ষ, বড্ড একপেশেতার উপর আছেন বিবেক মহাশয় সব কাজেই টিক টিক করে ওঠেন কাজেই না চাইলেও ঐ নরকের কীটটাকে আমাদের বাঁচাতে হবেবলে সিগারেটের শেষ টানটা মেরে অবশিষ্ট অংশটা জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে একরাশ ধোঁয়া ছাড়লো ব্যোমকেশ

 

আমি বললাম, “ তাহলে ভৈরব রক্ষা অভিযান কবে?” ব্যোমকেশ যেন শুনতে পেল না কথাটা আনমনে বাইরে তাকিয়ে রইলো তারপর অন্যমনস্ক গলায় জিজ্ঞেস করল, “ আচ্ছা কৌশিকী অমাবস্যা কবে?”

 

এরকম প্রশ্নে আগে অবাক হতাম এখন হই না।নির্বিকার গলায় বললাম, “পঞ্জিকা দেখতে হবে।বলে টেবিল থেকে স্মার্টফোনটা নিয়ে গুগল করতেই বেড়িয়ে পড়লো পুরো পঞ্চাঙ্গম ক্যালেন্ডার।সেটায় তাকিয়ে বললাম, “এই মাসের তিরিশ তারিখ।”

হুম আর পনেরো দিন।বলে আনমনে বাইরে তাকিয়ে রইলো ব্যোমকেশ।

 

******

 

১৬ই আগষ্ট ২০১৯,দুপুর দুটো, শ্রী শ্রী  চন্দ্রকান্ত ভৈরবগিরি মহারাজ আশ্রম, বাণপুর, বর্ধমান

 

গাড়ি থেকে নেমে আশ্রমের সামনে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে দাঁড়ালো ভৈরব।শরীরটা এখনও তেমন জুতের নেই।তার উপর সেই সকালবেলায় বেরিয়েছে।ভক্তদের ভীড় এড়াতেই ট্রেন ধরেনি সে।প্রাইভেট গাড়ি ধরে এসেছে।আর তাতেই বিপত্তি।কলকাতায় যে এতো জ্যাম কে জানতো?  একটু এগিয়ে যেতেই বজু এগিয়ে এলো।ভৈরব বজুকে বলল ব্যাগপত্র বের করে ড্রাইভারকে প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দিতে।বজু মাথা নেড়ে ভৈরবকে প্রনাম করে  এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে।

 

ভৈরব ধীরে ধীরে সিড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে এলো।সারাদিনের জার্নিতে শরীরটা দুর্বল লাগছে। এখন ওর দরকার একটা লম্বা ঘুম।বাথরুমে স্নান করেপোশাক পাল্টে খাটে বসলো ভৈরব।কিছুক্ষন পর বজু খাবার নিয়ে এলো।খাবারটা বেড়ে একথা সে কথার পর আচমকা বললো, “প্রভু যে কদিন আপনি ছিলেন না এক ভদ্রলোক রোজ সকালে এসে খোঁজ নিয়ে যেতেন যে আপনি এলেন কিনাকবে আসবেন এই সব। আজকেও এসেছিলেন।”

 

কথাটা শুনে তেমন গা করলো না ভৈরব।আশ্রমে ভক্তদের আনাগোনা লেগেই থাকে ।হয়তো কোনো ভক্ত খবর পেয়ে এসেছিল।ও মুখে শুধু হুম।”বলে খেতে লাগলো।আশ্রমে কেউ জানে না ভৈরবের কি হয়েছিল।করিতকর্মা বজু সকল ভক্তদের মাঝে রটিয়েছে,  সাধনায় অতিরিক্ত কৃচ্ছসাধনের ফলে যজ্ঞ শেষে সে অজ্ঞান হয়ে যায়।এবং সে সময় উপস্থিত যজমানরা যদি তৎক্ষনাত ওকে হাসপাতালে না নিয়ে যেত তাহলে ভৈরবের স্বর্গারোহন নিশ্চিত ছিল।

 

কথাটা শুনে মনে মনে হাসলো ভৈরব।স্বর্গারোহন!  সারা জীবনে যতটা পাপ করেছে সে সবের ফিরিস্তি যদি স্বয়ং চিত্রগুপ্তও পড়েন তাহলে নির্ঘাত ভিরমি খাবেন।নরকে গেলে নরকও নিপাত যাবে।তবে মানতে হবে বজুর উদ্ভাবনী শক্তি দারুন।আজ বিকেলে দরবারে এটা নিয়ে একটা বেশ জম্পেশ প্রবচন দিতে হবে।

 

খাওয়া শেষ হলে বজু বাসনপত্র নিয়ে চলে যায়।ভৈরব হাত ধুয়ে খাটের পাশেরটেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা কৌটো বের করে।এটা মুখশুদ্ধির কৌটো।পানের নেশা ভৈরবের নেই।তবে গুরুপাক ভোজন হলে খায় সে।কৌটো খুলে এক চামচ জোয়ান নিয়ে মুখে ফেলে কৌটোটা বন্ধ করে ভৈরব।তারপর কৌটোটা ড্রয়ারে রেখে শুয়ে পড়ে ভৈরব।ধীরে ধীরে রাজ্যের ঘুম নেমে আসে তার চোখে।

 

গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে একসময় থামে ভৈরব।আচমকা গলাটা ভীষণ বাধোবাধো ঠেকে তার।মনে হয় কিসে যেন আটকে গেছে।অন্ধকারে বুঝতে পারেনা সে এমন সময় চারদিক আলোকিত হয়ে আকাশে বিদ্যুত ঝলসে ওঠে।ক্ষনিকের সেই আলোতে সে দেখতে পায় সে একটা মন্দিরের সামনে নতজানু হয়ে বসে আছে।

 

মন্দিরটা দেখেই চিনতে পারে ভৈরব।বুকের রক্ত হিম হয়ে যায় তার।মন্দিরে একজন পুজো করছে।মন্ত্র শুনতে না পেলেও সে বুঝতে পারে লোকটা ব্রাহ্মণ।এখানে কি করে এলোএভাবে এখানে কেন বসে আছে সে, গলাটা এরকম লাগছে কেন ভাবতে ভাবতে দেখে লোকটার পুজো শেষ হয়েছে।লোকটা হাতে লম্বা মতো কি একটা নিয়ে মন্দির থেকে বাইরে বেরোয়।

 

এমন সময় আবার দিকবিদিক আলোকিত করে আবার বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে।আর সেই আলোয় নিজেকে আর লোকটার হাতের জিনিশটা দেখে এক অজানা আতঙ্কে হাড়হিম হয়ে যায় তার।

 

লোকটা বলিষ্ঠ লম্বা-চওড়া।ব্রাহ্মণ কারন কাঁধে যজ্ঞোপবিত বিদ্যমান। তবে লোকটা অদ্ভুত একটা ত্রিভুজ আকারের শিরস্ত্রাণ পরে আছে।আর লোকটার হাতে একটা বিশাল বড়ো খাঁড়া।সিঁদুর আর তেলের প্রলেপে  চকচকে খাঁড়াটায় বলির আগেই রক্তচিহ্ন ফুটে উঠেছে।

 

বিদ্যুতের আলোয় নিজেকে দেখে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যার ভৈরব। মন্দিরের সামনের হাড়িকাঠের সামনে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে সে।লোকটা এগিয়ে এসে ইশারা করে হাড়িকাঠে মাথা রাখতে।প্রবল আতঙ্কে মাথা নাড়ায় ভৈরব।কথা বলতে গিয়েও বলতে পারে না।মনে হয় কে যেন টুটি টিঁপে ধরেছে।লোকটা এবার রুঢ়ভাবে বলে হাড়িকাঠে মাথা রাখতে। এবারও ভৈরব না বলায় লোকটা জোর করে বলিপ্রদত্ত পাঠার মতো ওকে ধরে শুইয়ে দেয় হাড়িকাঠে।তারপর দ্রুত গতিতে নামিয়ে দেয় খাঁড়াটা!

 

প্রবল আতঙ্কে চিৎকার করে খাটে উঠে বসে ভৈরব।ঘরে এসি চললেও দরদর করে ঘামছে সে।নিজের গলায় হাত বুলিয়ে আশস্থ হয় ভৈরব।তারমানে এটা স্বপ্ন ছিলো? ”বিড়বিড় করে নিজেকে প্রশ্ন করে সে। কিন্তু এই একই দৃশ্য তো সেই সন্ন্যাসীর চেলাটাও দেখিয়েছিলো।তবে কি ওটাই মনে চেপে বসছে?  অনেকক্ষন ভাবার পর ভৈরব এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে দুপুরের গুরুপাক ভোজনের জন্যে পেটগরম হয়ে এসব স্বপ্ন দেখছিলো সে।

 

ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে এখন চারটে বাজে।বেলা প্রায় পড়ে এসেছে।নাহ আর ঘুমোনো যাবে না।সন্ধ্যে ছটায় দরবার আছে।একটু স্বর্গারোহন নিয়ে পড়াশুনো করা যাক। আজ আবার মিডিয়া আসবে।অসুস্থ হবার পর এই প্রথম দরবারে বসবে সে।একটু পড়াশুনো করা চাই নাহলে ক্যামেরার সামনে উল্টোপাল্টা বকলে পাবলিক ট্রোল করতে পারে।একটু হোমওয়র্ক করে রাখা ভালো।এই ভেবে বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে বইয়ের আলমারীর দিকে এগোলো ভৈরব।

 

সন্ধ্যেবেলা স্বর্গারোহন নিয়ে রীতিমতো একটা থিসিস দিয়ে ফেলল ভৈরব।প্রবচনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যখন সে দরবার বন্ধ করলো তখন ভক্তদের ভীড়ে আশ্রম গিজগিজ করছে।সকলেই তাদের প্রানের গুরুকে প্রনাম করতে চায়স্পর্শ করতে চায়।সকল কে আশীর্বাদ করে ভৈরব মায়ের মন্দিরে প্রবেশ করে।সন্ধ্যারতী করে মায়ের কাছে মনে মনে প্রার্থনা করে দুপুরের স্বপ্নটা যাতে সত্যি না হয়।স্বপ্নটা কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছে না সে।বার বার খচখচ করছে মনটা।চোখ বুঁজলেই ঘাতকের খাঁড়া নেমে আসতে দেখছে সে।পুজোয় তার মন বসছে না।বার বার মনে হচ্ছে তার অন্তিম সময় আগত।মায়ের মুর্তির দিকে তাকিয়ে দেখে মায়ের মুখটা পুরোহিত গিন্নির মুখে পরিনত হয়েছে।মুখটা ওর দিকে বার বার চাইছে আর হেসে হেসে বলছে, “আমি ক্ষুধার্ত, মহাক্ষুধা আমার, আমার বলি চাই,  আমার রক্ত চাই মানুষের রক্ত।আমার মাংস চাইনরমাংস।আমায় রক্ত, মাংস দিবি না?  আমাকে খেতে দে।আমায় ভোগ দে।নিজেকে ভোগ হিসেবে দে।”বলে যেন অট্টহাস্য করছে মুর্তিটা।পাশে তাকিয়ে দেখে বজু নির্বিকার। ও কি দেখতে পাচ্ছে না পুরোহিত গিন্নিকে? ? ও কি শুনতে পারছে নাতার কথা?  তবে কি ভৈরব একাই শুনতে পাচ্ছে দেখতে পাচ্ছে? তবে কি সন্ন্যাসীর চেলাটার কথাই ঠিকতবে কি সত্যিই?

 

প্রচন্ড ভয়ে কোনোমতে সন্ধ্যারতীটা সেড়ে বজুর হাতে গাছপ্রদীপটা তুলে দিয়ে বেরিয়ে আসে ভৈরব।মন্দিরের পেছন দিক দিয়ে সকলের চোখ এড়িয়ে দোতলায় উঠে যায়।কিন্তু সে জানতেও পারে না যে সকলের থেকে লুকোলেও একজনের দৃষ্টিকে সে ফাঁকি দিতে পারে নি।সেই দৃষ্টি তাকে বিগত তিনদিন ধরে অনুসরন করছে।সেই দৃষ্টি তাকে ঘরে ঢুকতে দেখে। দৃষ্টিটাএকজোড়া হিমশীতল,নিস্পলক,  তীক্ষ্ণ , শিকারীবাঘের দৃষ্টি।

(চলবে...)


সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...