অনুসরণকারী

শুক্রবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ ত্রয়োদশতম পর্ব


ট্রেন থেকে ব্যাগপত্র নামিয়ে তথাগতরা যখন স্টেশন চত্ত্বরে এসে দাঁড়ালো তখন সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে। স্টেশনে নেমে আড়মোড়া ভেঙে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সচল করে নিল তথাগত। সারাদিনের জার্নির ধকলে শরীরটা আড়ষ্ট হয়ে গেছে। একে সেই সকালবেলা বেরিয়েছে, তার উপর কাল রাতের হ্যাংওভার। গোটা রাস্তা মাথা যন্ত্রণায় কেটেছে তথাগতর। ভাগ্যিস সুজাতা সাথে করে ঊর্মির স্পেশাল চা নিয়ে এসেছিল। সেটা খেয়ে মাথা যন্ত্রণাটা অনেকটা কমেছে। কিছুক্ষণ স্ট্রেচিং করার পর ব্যাগ নিয়ে তথাগত রওনা দিল স্টেশনের বাইরের দরজার দিকে।

ব্যাগ হাতে তথাগতরা স্টেশনের বাইরে বেরোতেই ড্রাইভার এগিয়ে এলো ওদের দিকে। গাড়ির ডিক্কিতে ব্যাগপত্র রাখার পর সকলে গাড়িতে বসতেই তথাগত প্রস্তাবটা দিল, “বলছিলাম কী রাত তো তেমন হয়নি। একটু চা খেলে মন্দ হত না। কি বলো সবাই?”

“একদম না!” হিসহিস করে উঠল সুজাতা। “সারারাস্তা জ্বালিয়েছ! আর নয়। গাড়ি সোজা কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়াবে আর কোথাও নয়।”

– আহা! তুমি বুঝতে পারছ না। রজতাভরা এই প্রথম এসেছে আমাদের এখানে। এখানকার আবহাওয়ার সাথে পরিচয় করাতে হবে না? আর সেটা করতে গেলে তো প্রথমে এখানকার স্পেশাল চা খেতে হবে!

– রাখো তোমার স্পেশাল চা! কী ভাবছ? তোমার উদ্দেশ্য আমি বুঝিনি? দোকানে চা খাবার নামে গাড়ি থামিয়ে একফাকে ওসব ছাইপাঁশ কিনে আনবে, তারপর রাতে আকণ্ঠ গিলে আবার মাতলামো করবে। রোজ রোজ খাওয়াটা কমাও।

- মোটেও আমি রোজ খেয়ে মাতলামো করি না! মাঝে মাঝে খাই।

- আর যেদিন খাও সেদিনই উল্টে যাও। তোমার দৌড় আমার জানা আছে। গাড়ি কোথাও থামবে না। সোজা কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়াবে। এই যে রবিদা, খবরদার বলছি তোমার স্যারের কথায় রাস্তায় গাড়ি থামাবে না।

ড্রাইভার রবি লুকিং গ্লাসে একবার পেছনদিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে গাড়িতে স্টার্ট দেয়। তথাগত কিছু বলার আগে পেছনের সিটে বসা রজতাভ এগিয়ে এসে তথাগতর কাঁধে হাত রেখে বলল, “চেপে যাও ভায়া! ওয়েদার ফোরকাস্ট বলছে হোম ডিপার্টমেন্টের আকাশ আজ সকাল থেকেই তীব্রভাবে মেঘাচ্ছন্ন, এবং ক্রমশ সে মেঘ বজ্রগর্ভ মেঘে পরিণত হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি পৌঁছনোই ভালো নাহলে সবজ্র বৃষ্টিপাতের সাথে রণচণ্ডীকা নৃত্য দর্শনও ঘটতে পারে।”
রজতাভর কথা শোনার পর তথাগত পেছন ফিরে আড়চোখে সুজাতার দিকে তাকায়। দেখে সুজাতা গাড়ির জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে আছে, রজতাভ চোখ টিপে ইশারা করছে, আর ঊর্মি প্রাণপণে মুখ টিপে হাসি থামানোর চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর সামনে ফিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “ব্যস! আর কী? হোম ডিপার্টমেন্ট যখন প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে তখন আর কী করা যাবে? বুঝলে রবি? তোমার ম্যাডামের অর্ডারটাই আপাতত ফলো করা হোক। চলো বাড়ি!”

ড্রাইভার মুচকি হেসে রাস্তায় গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। রজতাভ আর তথাগত বাদে সারাদিনের ক্লান্তিতে ঊর্মি, সুজাতা হেলান দেয় গাড়ির ব্যাকরেস্টে। তথাগত ড্রাইভারের সাথে মৃদু স্বরে কথা বলতে থাকে। রজতাভ জানলার বাইরে থেকে দেখে বাইরের জগতটাকে। আর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুচকি হাসে। মানুষের কপালে কখন কি লেখা থাকে কেউ বলতে পারে না। সত্যি কথা বলতে গেলে তথাগতদের সাথে আসার, ওদের সঙ্গী হবার বিন্দুমাত্র পরিকল্পনা ছিল না ওদের। কাল রাতেও শোওয়ার সময় একবারের জন্যেও ওরা ভাবেনি যে এভাবে সকালবেলা চলে আসতে হবে। কিন্তু সকালবেলা তথাগতর অবস্থা দেখার পর সুজাতাকে একা ছাড়তে মন চাইল না ঊর্মির। প্রচণ্ড মাথাধরা, অবিরাম বমিতে তথাগতকে নাজেহাল হতে দেখে ওরা ঠিক করল তথাগতর সাথে এই অবস্থায় সুজাতা বেরোলে রাস্তায় সমস্যায় পড়ে যাবে। অগত্যা রজতাভর সাথে কথা বলে ঊর্মি তৈরি হয়ে নিল।  দার্জিলিং-এর বাড়িতে একসেট ব্যাগপত্র এমনিতেই গোছানোই থাকে। তাও সেই ব্যাগের সাথে দুএকটা প্রয়োজনীয় জিনিস আর কিছু জামাকাপড় গুছিয়ে ওরাও বেরিয়ে পড়ল সুজাতার সাথে। অবশ্য এতে সুজাতারই সুবিধে হল। গোটা রাস্তা তথাগত বমি করতে করতে এসেছে। সারা রাস্তা তিনজনে প্রায় পালা করে ওকে আগলে রেখেছিল।

আচমকা ঝাঁকুনিতে ঘোরটা কেটে গেল রজতাভর। বাইরের দিকে তাকাতে তাকাতে আচমকা ঘোর লেগে গিয়েছিল ওর চোখে। ঘোরটা কাটতেই সোজা হয়ে উঠে বসে সে দেখল গাড়িটা একটা কাঠের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওরা একে একে গাড়ি থেকে নামার পর তথাগত বলল, “অধমের গরীবখানায় স্বাগত ভায়া। তোমাদের দার্জিলিং-এর বাড়ির মতো বিলাসবহুল না হলেও মাথা গোঁজার ঠাই হিসেবে মন্দ নয়।”

তথাগত গরীবখানা বলে বাড়িটাকে দেখালেও বাস্তবে বাড়িটাকে ঠিক গরীবখানা মনে হল না রজতাভর। মাঝরাস্তায় ঘুমিয়ে পড়েছিল বলে টের পায়নি, কিন্তু এখন ওরা বনের একদম মাঝখানে অবস্থিত এক অফিসার কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়িয়ে। চারদিকে বনের মাঝে সুন্দর, ছিমছাম এক কাঠের বাড়ি। গাড়ি থেকে ব্যাগ নামিয়ে ধীরে ধীরে ওরা বাড়ির দিকে এগোতেই কেয়ারটেকার এগিয়ে এল। তথাগত বাড়িটার ভেতরের ঢুকে ব্যাগ রেখে জিজ্ঞেস করল,“ এদিকের খবরটবর কী? সব ঠিক আছে তো?”

কেয়ারটেকার মাথা নাড়ে। তথাগত হেসে রজতাভদের দেখিয়ে বলে, “শোনো নটবর। এরা আমার অতিথি। আমার বর্তমানে এনাদের যত্ন করার দায়িত্ব তোমার। কী বুঝলে? এনারা যা খেতে চান, তাই রান্না করবে। ”‌ বলে রজতাভদের দিকে তাকিয়ে বলে, “আর তোমরাও জেনে রাখো। এ হল নটবর। বেশি কিছু বলবো না তবে আমি ডিউটিতে ব্যস্ত থাকাকালীন সু-এর হাত,কান, চোখ বললেও ভুল বলা হবে না। কি সু, ঠিক বললাম তো?" সুজাতা মাথা নাড়ে। তারপর এগিয়ে এসে বলে, “কমলি বৌদি কেমন আছে? কী রান্না করেছে আজকে?”

নটবর মাথা নেড়ে হেসে অহমিয়া ও বাংলা মেশানো ভাষায় বলে ওঠে, “এয়া ঠিকেই ভনীয়েক। তুমি রাতিপুবা যা যা বলেছিলে সকলোবোর রান্ধি দিয়া হৈছে। এতিয়া কেবল তোমরা হাত ধুই বসে পড়লেই হল।"

তথাগত‌ হেসে বলল,“ বেশ বেশ! তা রজতাভ চল। চটপট যে যার ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে বসে পড়ি। সুজাতা আর ওর নটবর দাদা যখন চার্জ নিয়ে নিয়েছে আর চিন্তা নেই।"

*****
ভোরবেলা একটা অদ্ভুত মিষ্টি সুরে ঘুমটা ভাঙল ঊর্মির। প্রথম প্রথম আধবোঁজা চোখে ঠাহর করতে না পারলেও পরক্ষণে মনে পড়ে গেল ওরা কোথায় আছে।‌ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর চোখ বোঁজা অবস্থাতেই বিছানায় হাতড়ে রজতাভকে না পেয়ে চোখ মেলে তাকাল সে। পাশ ফিরে দেখল রজতাভ নেই। হয়তো বাথরুমে গেছে একথাটা একবার ভাবলেও পরক্ষণে ঊর্মির খেয়াল হল এত ভোরে তো রজতাভ বাথরুমে যায় না। এমনকী এত ভোরেও ওঠে না সে! তাহলে কোথায় গেল রজতাভ? বিছানায় উঠে বসল ঊর্মি। চারদিকে একবার চোখ বোলাতে গিয়ে দেখল বারান্দার দরজাটা খোলা। ঊর্মি গায়ের কম্বল সরিয়ে ধীরপায়ে খাট থেকে নামল। তারপর পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে। 

বারান্দায় রজতাভ কম্বল জড়িয়ে আরামকেদারায় চোখ বুঁজে বসেছিল। ঊর্মির পায়ের শব্দে চোখ মেলে তাকাল দরজা দিকে। ঊর্মি কিছু বলার আগে ইশারায় চুপ করতে বলে নিজের কাছে ডাকল। ঊর্মি কাছে এসে দাঁড়াতেই পাশে বসতে বলল। ঊর্মি  রজতাভর আরামকেদারার পাশে রাখা চেয়ারে না বসে আরামকেদারার হাতলে ভর দিয়ে দাঁড়াল। রজতাভ জানত ঊর্মি এটা করবে। তাই সে কথা না বাড়িয়ে কম্বলের একপ্রান্ত খুলে ঊর্মিকে কাছে টেনে নিয়ে কম্বলে মুড়ে নিল।‌ তারপর ঊর্মির কানের কাছে মুখ এনে বলল, “একদম চুপ! কোনো শব্দ করবে না। শুনতে পাচ্ছো শব্দটা?” 

এতক্ষণে ঊর্মির খেয়াল হল একটু আগে যে মিষ্টি সুরে ঘুমটা ভেঙেছিল সেই শব্দটা এখানে আরো পরিস্কার আর জোরে শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কাছেই কোথাও কোনো নাম না জানা সুরেলা পাখি অকাতরে ডেকেই চলেছে। ডাকটায় কেমন যেন একটা অদ্ভুত ঘোর লাগা মাদকতা আছে। শুনতে বেশ লাগছে ডাকটা। রজতাভ ফিসফিস করে বলল, “ সাধারণত এ পাখির ডাক  শহরতলী বা গ্রামে শুনতে পাবে। কিন্তু এতটা স্পষ্ট নয়। কী পাখি বলো তো?”

ঊর্মি মুচকি হাসে তারপর বলে “পিউকাহা। বুদ্ধদেব গুহর লেখায় এর নাম কত পড়েছি!উনি বোধহয় এ পাখির ডাক ভীষণ ভালোবাসেন। তা মেজরসাহেবের হঠাৎ প্রকৃতি প্রেম উথলে উঠেছে দেখছি। কী ব্যাপার?বাড়িতে তো ছয়টার আগে শয়ন থেকে উত্থান হয় না। আজ কী উপলক্ষ্যে এত আগে উত্থান শুনি?”

রজতাভ হেসে বলে, “কারন আছে বলেই তো উত্থান ঘটেছে দেবী। তোমার বুদ্ধদেব বাবু একটা দারুন কথা বলেন জানো? তিনি বলেন পৃথিবীর প্রতিটা জীবের মতো জঙ্গলেরও একটা ভাষা আছে। কেউ সেটা শুনতে পায়, কেউ পায় না। যারা পায় তারা সৌভাগ্যবান। কিন্তু যারা পায় না তাদের জন্যেও উপায় বলে গেছেন তিনি। যারা জঙ্গলের ভাষা, জঙ্গলের কথা শুনতে চায় তাদেরকে মুলত চারবেলা খেয়াল রাখতে হবে। কারন এই চারটে বেলাই জঙ্গল নীরবতার আবরণ ভেদ করে মুখর হয়ে ওঠে। প্রথম বেলা হল সকালবেলা,মানে এই ব্রাহ্মমুহূর্তটা।‌ পরেরটা হল সন্ধ্যেবেলা। তৃতীয়টা হল রাতের বেলা, মানে গরমকালের বা বর্ষাকালের রাতের বেলা। আর শেষেরটা হল যে কোনো ঝড় বা বৃষ্টির পরের সময়টা। কান পেতে শুনলে ঠিক শুনতে পাবে বনের শব্দ,যেমন এখন পাচ্ছ। পাখির ডাকের সাথে সাথে গাছের পাতা থেকে চুঁইয়ে পড়া কুয়াশার ফোঁটা, বনের একটা মিঠেকড়া অথচ সোঁদা গন্ধ, এটাই তো বনের ভাষা। প্রকৃতি আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে ঊর্মি।”

- তাই? তা সকাল সকাল এত কাব্যিক হয়ে উঠেছো যে! ব্যাপারখানা কী? আমার পড়া নভেলগুলো নাকি তোমার দুর্বোধ্য লাগে। বুদ্ধদেববাবুর লেখা নাকি একই থোড়বড়িখাড়া আর খাড়াবড়িথোড়। তা হঠাৎ সেই মানুষটা বুদ্ধদেব গুহ কোট করছে! এই কেসটা কী বলো তো? 

দুহাতে ঊর্মিকে জড়িয়ে ধরে রজতাভ। তারপর ঊর্মির কানে একটা গরম নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “বাহ রে! নিজের বউকে খুশি করার দিনটায় একটু রোম্যান্টিক হব না? বিবাহবার্ষিকী বলে কথা!”

কথাটা শোনামাত্র চমকে ওঠে ঊর্মি। ইস! আজকের দিনটার কথা একদম ভুলে গিয়েছিল সে! কিন্তু রজতাভ ঠিক মনে রেখেছে! সেই কারনে এত প্রকৃতি, রোম্যান্টিক ব্যবহার, বুদ্ধদেব গুহ কোট করে কথা! লজ্জা পেয়ে সে মুখ নামিয়ে নিল। রজতাভ একহাতে ঊর্মির থুতনি ধরে  একটু  উপরে তুললো। তারপর ঊর্মির ঠোঁটে একটা নিবিড় চুমু খেল। ঊর্মি আজ আর বাধা দিল না রজতাভকে। সেও সাড়া দিল রজতাভর এই চুম্বনকে। কিছুক্ষণ পর রজতাভর গালে চুম্বন চিহ্ন এঁকে কানে ফিসফিস করে বলল, “হ্যাপি অ্যানিভার্সারী মেজরসাহেব।” বাইরের সকালের নীরব সুন্দর প্রকৃতি সাক্ষী রইল দুজনের এই মিষ্টি মুহূর্তের।

*****
হুড খোলা জিপের সামনে আচমকা প্রাণীটা এসে পড়ায় ঊর্মিরা প্রথমে চমকে গেলেও রজতাভ চমকায়নি। সে টুক করে সাথে ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বের করে তাক করল প্রাণীটার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ নানা অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তোলার পর ক্যামেরা নামিয়ে অস্ফুটে বলে উঠল,“ফ্যানটাস্টিক!” প্রাণীটা অবশ্য ওদের উত্তেজনাকে গায়ে মাখল না। কিছুক্ষণ ওদের জিপের দিকে তাকিয়ে তারপর গদাইলস্করি চালে চলতে শুরু করল অপরদিকে। ড্রাইভার রবি গাড়ি স্টার্ট করে বলল,“ এদিকে এটাই স্পেশালিটি স্যার। গোটা ফরেস্ট জুড়ে এদের অবাধ বিচরণ। এর জন্য অবশ্য মাঝে মাঝে ঝামেলায়ও পড়তে হয় তবে এরা সচরাচর নিজে থেকে তেড়ে আসে না টুরিস্টদের দিকে। ” 

পেছন ফিরে জন্তুটার চলে যাওয়া দেখছিল রজতাভ। রবির কথার উত্তরে বলল,“সেটাই তো স্বাভাবিক নয় কি? ওদের মুক্তাঞ্চলে তো আমরাই অবাঞ্ছিত আগন্তুকের মতো ঢুকেছি।  ওদের শান্তিভঙ্গ করছি। নিরীহ, শান্ত প্রাণীগুলোর নাকের খড়গের লোভে উজার করে দিচ্ছি গোটা বনাঞ্চল। এরকম চললে একদিন এমন হবে হয় এরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে নাহলে মানুষের প্রতি হিংস্র হয়ে উঠবে।”

- একথাটা স্যারও বলেন। কিন্তু পাবলিককে বোঝাবে কে?স্মারক হিসেবে ছবি তুলতে হবে। চলো ওদের ডেরায়। আবার বিরক্ত হয়ে তাড়া করলে তখন বাঁচাতেও হবে। তার উপর পোচারদের ঝামেলা। এত নজর রাখা, এত টহল, এত পাহারার পরেও শয়তানগুলো ঢুকে পড়ে আর লুকিয়ে কাজ সেরে পালিয়ে যায়।

- ওদের আর দোষ কী? ওদের থেকেও বড়ো শয়তান সেই মানুষগুলো যারা এসবের চাহিদা নিয়ে বসে থাকে। ওদের চাহিদার জন্যেই এরা দু-টাকা লাভের আশায় নামে। একবার ভেবে দেখ কী আছে গন্ডারের খড়গে? একগাদা চুল জমাট বেঁধে তৈরী বস্তুটা। অনেকটা মানুষের নখের মতো ম্যাটেরিয়াল অথচ  বিদেশে এর থেকে নাকি নানারকম জিনিস তৈরী হয় অথচ সেগুলো কৃত্রিম, রাসায়নিকভাবেও তৈরী করা যায়। কিন্তু শয়তানগুলো সেগুলো না নিয়ে আসল উপাদানই নেবে। 

এইভাবে কথা বলতে বলতে গাড়ি এগোতে থাকে অভয়ারণ্য ধরে। সুজাতা আর ঊর্মি নীরব শ্রোতা হয়ে শুনতে থাকে ওদের কথা। একসময় পার্কের একস্থানে বনকর্মীদের ভীড় দেখে গাড়ির গতি কমায় রবি। ভীড়ের মধ্যে তথাগতকে দেখতে পায় ওরা। অন্ধকারাচ্ছন্ন মুখ করে মাটির দিকে তাকিয়ে কি একটা দেখছে সে।

- ঐ আবার! বোধহয় খড়গের লোভে আরেকটা নিরীহ জীবের জান নিয়ে নিয়েছে শুয়ারগুলো!

প্রবল আক্রোশে কথাগুলো বলার পর গাড়িতে রজতাভরা আছে টের পেয়ে পরক্ষণে নিজেকে সামলে নেয় রবি। রবিকে গাড়ি থামাতে বলে রজতাভ জিপ থেকে নেমে পড়ে। ঊর্মিও নামতে যাচ্ছে দেখে সুজাতা বাঁধা দেয়। ঊর্মি তাকাতেই মাথা নেড়ে বলে, “যাস না। সহ্য করতে পারবি না। পোচারগুলো ভীষণ নির্মম। খড়গ নেওয়ার জন্য অবলা প্রাণীগুলোকে নৃশংসভাবে মারে। দেখলে মায়া হয়। ওকে দেখি তো, যেদিন কোনো পশুর মরার খবর আসে সেদিন সরেজমিন থেকে ফেরার পর রাতে বাচ্চাদের মতো হাউ হাউ করে কাঁদে। বর্ণনা শোনার পর আমিই চোখের জল আটকাতে পারি না তো ওর অবস্থাটা একবার ভাব। জঙ্গল অন্ত প্রাণ মানুষ তো, এদের এতটুকু আঁচ লাগলেও সহ্য করতে পারে না। ”

জিপের জানলা দিয়ে ওরা দেখে রজতাভ সোজা ভীড়ের মধ্যে দিয়ে তথাগতর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তথাগত রজতাভর দিকে তাকায়। ভীষণ হতাশায় ভরা সেই দৃষ্টি। কিছুক্ষণ পর থমথমে মুখে ফিরে আসে রজতাভ। তারপর জিপে উঠে রবিকে নির্দেশ দেয়,“বাড়ি চলো। এখনই পার্ক বন্ধ হবে। কাল আবার আসবো।”

*****
বিকেলের দিকে ঊর্মিদের বিবাহবার্ষিকী নিয়ে একাধিক প্ল্যান করলেও আপাতত পরিস্থিতি বুঝে সাদামাটা আয়োজন করতে বাধ্য হল সুজাতা। যদিও ঊর্মির কাছে সেটাও অনেকটাই বেশী মনে হয়েছে। অবশ্য ঊর্মির দোষ নেই। ও তো আর জানতো না যে ওর অজান্তে কালরাতেই সুজাতা, তথাগত আর রজতাভরা গোপন পরিকল্পনা  করে ফেলেছিল। সারাদিনের জার্নির ধকলে ঊর্মি যখন গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছে তখন ফিসফিস করে তিনজনে  আগাম পরিকল্পনা করে নিয়েছে আজকের দিনের। সেই মতো সকালে রজতাভর কাছ থেকে বিবাহবার্ষিকীর আদর উপভোগ করার পর তথাগতর প্ল্যান মতো ওরা বেরিয়ে পড়েছিল অভয়ারণ্য ভ্রমনে। ইচ্ছে ছিল সেখানে একটা গ্র্যান্ড সারপ্রাইজ দেওয়া হবে ঊর্মিকে।

কিন্তু তাল কাটল অন্য জায়গায়। কাল রাতে কে বা কারা গন্ডারের খড়গের লোভে একটা গন্ডারকে মেরে গেছে। এবং ঠিক সেই জায়গায় দেহ রেখে গেছে যেখানে ওরা সারপ্রাইজের কথা ভেবেছিল। অগত্যা বাধ্য হয়ে কোয়ার্টারে ফিরে আসতে হলো ওদেরকে। কোয়ার্টারে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম করতে ঘরে শুয়েছিল ঊর্মি। সেই সময়টা কাজে লাগিয়ে সারাদুপুর রজত আর সুজাতারা গোটা ঘর সাজিয়েছে। বিকেলবেলা ড্রইংরুমের পরিবর্তন দেখে প্রথমে হতবাক হয়ে গিয়েছিল ঊর্মি। পরক্ষণে সুজাতার কথায় সবটা বুঝতে পেরে জড়িয়ে ধরেছিল সে।

সন্ধ্যেবেলা নটবরের সাহায্যে একের পর এক সুস্বাদু পদ খাবার টেবিলে সাজিয়ে রেখে নিজের ঘরে ঢুকলো সুজাতা। সারাদিন ধরে ঘরটাকে সাজানোর পর একটু নিজেকে সাজানো প্রয়োজন। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে পোশাক পাল্টে, অল্প প্রসাধনী  মেখে ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখল তথাগত ফিরে এসেছে।  তথাগত সুজাতার কাছে এসে বলল, “লাশটাকে ডেসপ্যাচ করে এলাম। ব্লাডি ক্রিচার্স! এরা কোনোদিনও শোধরাবে না। যাকগে বাদ দাও এদিকের কী খবর? নির্ঘাত পার্কে ঘুরতে পারেনি বলে একটু কষ্ট পেয়েছে ওরা। কী আর করা যাবে? বাইরের ঘরটা তো ভালোই সাজিয়েছ দেখছি। বেশ করেছ! খামোখা ওদের আনন্দ মাটি করার কোনো মানে হয় না। দাঁড়াও আমিও ফ্রেশ হয়ে আসছি।” বলে তথাগত ঢুকে যায় ওদের ঘরে।

সুজাতা ড্রইংরুমের দিকে এগোতেই দেখে রজতাভ তৈরী হয়ে সোফায় বসে আছে। সুজাতা এগিয়ে এসে বলে,

- বাহ! বর বাবাজি দেখছি একদম রেডি!

- আমার তৈরী হতে বেশিক্ষণ কোনোদিনও লাগে না। সময় লাগে তোমার প্রিয় সখীর। এখনও উনি গালে পাউডার ঘষে যাচ্ছেন।

- এই ওভাবে বলবে না! আমাদের তৈরী হতে সময় লাগে বলেই তো তোমরা হা করে চেয়ে থাকো।

- সকলে নয়। কিছু মানুষ চেয়ে থাকে। অতো সাজার কি দরকার বুঝি না আমি।

- বুঝতে হবে না তোমাকে।

কিছুক্ষণ পর বলে, “ঊর্মির মুডটা আজ দুপুরে ভীষণ অফ ছিল তাই না রজতদা?”

- না তেমন ছিল না। তবে ওরকম মৃত্যুর খবরে একটু মুষড়ে পড়েছিল। কিন্তু বিকেলে সব মেঘ কেটে আকাশ পরিস্কার হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে ডেকোরেশনটা ওর এত ভালো লাগবে বুঝতে পারিনি।

- ঊর্মি ভীষণ খুশি হয়েছে বলছো? তবে এর ক্রেডিট কিন্তু পুরোটাই তোমার। দুপুরে তুমি আমায় বুদ্ধি না দিলে এত কম সময় এত কিছু করতে পারতাম না। সত্যি কথা কী জানো?ঊর্মি ভীষণ লাকি যে ও তোমাকে পেয়েছে। তোমরা একে অপরকে কতটা ভালোবাসো সেটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। কজনের কপালে এরকম ভালোবাসা জোটে?

সুজাতার প্রশ্নের উত্তরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল রজতাভ। তারপর সামনের দিকে শব্দ শুনে তাকাল। ঊর্মি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। আকাশী রঙের শাড়িতে অপরূপ লাগছে ওকে। ওদের দিকে তাকিয়ে হাসছে সে। সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে রজতাভ বলল, “সবার কি আর সেই ভাগ্য হয়? কারো কাছে ভালোবাসা নেহাতই ভালোবেসে ভালো রাখার নিখাদ নিখুঁত অভিনয়। কেউ সেটা পারে, কেউ পারে না। যারা পারে তাদের সম্পর্কটা টিকে যায় এক ছাদের তলায়। আর যারা পারে না, দিনের শেষে দু পথে আলাদা হয়ে যায়।"

(চলবে...)

শনিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২১

অস্তরাগ দ্বাদশতম পর্ব





রাতের খাবার পালা শেষ করার পর নিজের ঘরে বসে ব্যাগপত্র গোছাতে শুরু করল সুজাতা। দেখতে দেখতে একটা গোটা সপ্তাহ যে কোথা দিয়ে কেটে গেল বোঝাই গেল না। মনে হচ্ছে এই তো কালই এলো ওরা। ইচ্ছে করছে আরো কটা দিন থেকে যেতে। ইচ্ছে করছে আরো কটা দিন পর ফিরে যেতে। কিন্তু সুজাতা জানে তা সম্ভব নয়। তথাগতর ছুটির মেয়াদ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে, একগাদা কাজ আর বনাঞ্চল অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। কাল ফিরতে হবেই ওদের। তারপর আবার অপেক্ষা তথাগতর আবার ছুটি পাবার। ততদিন পর্যন্ত ওকে আবার থাকতে হবে অন্তঃপুরে। তথাগত তো ফিরেই ঝাঁপিয়ে পড়বে কাজে, আর ও থেকে যাবে সেই নিস্তব্ধ, নিরিবিলি ফাঁকা কোয়ার্টারে, এই কটা দিনের স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে একাকী বন্দিনী হয়ে।  

এখন তো এসবে তাও অভ্যেস হয়ে গেছে সুজাতার। আগে বদ্ধ কোয়ার্টারে দমবন্ধ হয়ে আসতো ওর। প্রতি মুহূর্তে মনে হতো কোয়ার্টারের প্রতিটা কোণ যেন ওকে গিলে খেতে আসছে। রাতে তথাগত ফিরে এলে হাফ ছেড়ে বাঁচত সে। তথাগতর বুকে মাথা রেখে প্রথম প্রথম কাঁদত। তথাগত সবটা না বুঝলেও আঁচ করতে পারতো। সুজাতার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিতো। এখন অভ্যেস হয়ে গেছে সুজাতার। আর সে কাঁদে না। তথাগতও আর মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দেয় না। 

এসব ভাবতে ভাবতেই ব্যাগ গোছাচ্ছিল সুজাতা। এমন সময় দরজার বাইরে থেকে ঊর্মির কন্ঠস্বর শুনতে পেল।

- ভেতরে আসবো?

সুজাতা সম্বিত ফিরে দেখল দরজার সামনে ঊর্মি দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জা পেয়ে ব্যাগ গোছানো বন্ধ রেখে বলল, “ আয়!” ঊর্মি একটা কৌটো হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকে বিছানার উপর বসল। তারপর কিছুক্ষণ সুজাতার দিকে তাকিয়ে বলল,“গোছানো কমপ্লিট?”

- হ্যা! প্রায়ই হয়ে এল। তা তোর হাতে কী ওটা?

- ঐ কালকের জন্য কিছু ড্রাইফ্রুট, আর তোদের রজতাভদা কাছের একটা বেকারি থেকে কিছু কুকিজ আনিয়েছিল তোদের জন্য, সেগুলোই আছে। 

- দেখেছ কাণ্ড! ওসবের আবার কি দরকার ছিল? শুধু শুধু ঝামেলা করলি!

- রেখে দে না! কালকে ফেরার সময় রাস্তায় খিদে পেলে কাজে লাগবে।  

- তাই বলে এতকিছু!

- থাক না! আবার কবে আসবি কে জানে?

বলে ছলছলে চোখে তাকায় ঊর্মি। ঊর্মির কথা শোনামাত্র সুজাতারও বুকটা হুহু করে ওঠে। ব্যাগ গোছানো থামিয়ে সে জড়িয়ে ধরে ঊর্মিকে। তারপর ধরা গলায় বলে, “কটা দিন তোদের ভীষণ জ্বালিয়ে মারলাম বল? খুব মিস করবো তোদের।”

- আমিও রে! এই কটা দিন যে কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না! ঝপ করে যেন কেটে গেল দিনগুলো। 

ঊর্মির মন ক্রমশ ভারাক্রান্ত হচ্ছে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুজাতা জিজ্ঞেস করে, “কি আর করবি বল? বেড়াতে গেলে দিনগুলো যেন ডানায় ভর দিয়ে কেটে যায়, অথচ বাড়িতে থাকলে এক-একটা সময় যেন কাটতেই চায় না। যাক গে ওসব কথা বাদ দে। আচ্ছা আমাদের বরদুটো কোথায় গেল বল তো? না মানে অন্যদিন তো দুজনের হাকডাকে বাড়িটা সরগরম থাকে আজ দুজনেই একবারে যাকে বলে স্পিকটি নট! কেসটা কী?”

ঊমি চোখ মুছে মুচকি হেসে বলে, “হবে না? দুজনে যে আবার পান পাত্র নিয়ে বসেছে! আজকে তোদের রজতদাকে ছাড় দিয়েছি ঠিকই তবে শুধু দু পেগ ওয়াইনের এবং নিঃশব্দ পানের শর্তে!”

- অ্যা! সেকি‌? কাল ট্রেন আছে জেনেও ও বসেছে?

- আহা! সবসময় অতো বকিস না তো! একটু‌ খেলে ক্ষতি নেই!

- ক্ষতি নেই মানে? আরে ও সহ্য...

পলকে সেদিনের রাতের কথা মনে পড়ে ষাওয়ায় লজ্জায় লাল হয়ে যায় সুজাতা। ঊর্মিও ফিক করে হেসে ফেলে। নিজেকে সামলে নিয়ে সুজাতা বলে ওঠে, “হাসিস না। একবার ওরকম কাণ্ড করেছি বলে বারবার করবো তার কোনো মানে নেই। তাছাড়া কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে আমাদের! এবার সকালে মাথা ধরা নিয়ে বসে থাকলেই হয়েছে।”

- চাপ নেই! সেদিনের মতো ডিটক্স চা খাইয়ে দেবো। তেমন হলে ফ্লাস্কে দিয়ে দেবো কিছুটা। আর রেসিপিটাও দিয়ে দেবো, মাঝে মাঝে বেসামাল হলে পরের দিন করে দিস, দেখবি ভালো লাগবে।

- না না! ওসব কিছু লাগবে না। ওকে তুই চিনিস না। এখানে সোনা মুখ করে খেলেও ওখানে জাস্ট ফেলে দেবে।

- কিছু হবে না। তথাগত যথেষ্ট ভালো ছেলে! তোদের রজতদার মতো না। খাবার নিয়ে ওর হাজার বায়নাক্কা ছিল একসময়। হার্ট অ্যাটাকের পর ডাক্তারের ডায়েট অনুযায়ী খাবার খাওয়াতে আমার রীতিমতো কালঘাম ছুটেছে। কিছুতেই স্যুপ খেতে চাইতো না। কত জোর, কান্নাকাটি করে খাওয়াতে হত। এখন তো তাও খায়, আগে তো পাগল হয়ে যেতাম আমি। যে মানুষটা আগে আকণ্ঠ মদ খেত সেই মানুষটাকে মদ ছাড়তে বাধ্য করার জন্য যে কত কান্নাকাটি করেছি তা জানিস না।

বলতে বলতে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঊর্মি। সুজাতা ঊর্মির কাঁধে হাত রাখে। ঐদিকে বারান্দা থেকে ভেসে আসে রজতাভদের কণ্ঠস্বর। সেদিকে তাকিয়ে সুজাতা বলে,“থাক বলতে হবে না। রজতদা যে আজ বেঁচে আছে, সুস্থ আছে, তার পেছনে তোর লড়াইটা আর কেউ জানুক বা না জানুক আমি জানি। রজতদাও জানে। আর জানে বলে তোকে এতটা ভালোবাসে।”

বারান্দায় বসে গ্লাসের তলানিতে থাকা তরল আগুনটাকে গলায় ঢেলে একটা সিগারেট ধরাল তথাগত। পাশে বসে থাকা রজতাভ গ্লাসের ওয়াইনে দুটো চুমুক মেরে আড়চোখে তথাগতর দিকে তাকিয়ে বলল,“এবার থামো হে ভায়া! আজকের ডোজ কিন্তু একটু বেশীই হয়ে গেছে।”

তথাগত সিগারেটে টান মেরে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে অ্যাশট্রে-তে ছাই ফেলে জড়ানো গলায় বলল, “কোথায় বেশী হলো? সবে তো দুইপেগ। দুইপেগে আবার নেশা হয়?” বলে গ্লাসে হুইস্কি ঢালতে লাগলো সে।

রজতাভ ওয়াইনের গ্লাসে অল্প চুমুক দিয়ে তথাগতকে দেখতে লাগল। কয়েকবছর আগে সেও এরকমই ছিল। বেসামাল, বেহিসাবি,বেপরোয়া। এখানকার এমন কোনো মদ নেই যা সে খায়নি। এমন কোনো মদের দোকান নেই যা সে চেনে না। এই সব জায়গা থেকে কিনতে কিনতে আজ ওর কালেকশন তৈরী হয়েছে। তথাগত যেটা খাচ্ছে সেটা স্পেশাল ধরনের হুইস্কি। প্রথম প্রথম নেশা হয় না ঠিকই, কিন্তু মিষ্টিজাতীয় কিছু খেলেই এমন নেশা ধরে যে পরদিন পর্যন্ত তার মৌতাত থাকে। রজতাভর মনে আছে এটার খোঁজ এক গোর্খা সুবেদার দিয়েছিল তাকে। সেও তার মতোই পানরসিক ছিল। সেখানে গিয়ে নিজে টেস্ট করে দুটো বোতল কোয়ার্টারে নিয়ে এসেছিল সে। এককালে মদের খোঁজে কোথায় যায়নি সে? কোন মদ আছে সে খায়নি? এমনকি গোর্খা বিয়ারের আদর্শ জায়গা কোথায় সেটাও সে জানে। এককালে তথাগতর মতোই সে বলত, ‘দুর! দুই পেগে আবার নেশা হয়?’ আর এখন? মদ খাওয়া তো দুর, সামান্য গুরুপাক খাবার খাওয়ার কথাও সে ভাবতে পারে না। ঊর্মি ওকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। আজ এতবছর পর ঊর্মি ওকে ওয়াইন খেতে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু ঐ দুই পেগের শর্তে। সে কারনেই সে ধীরে ধীরে ওয়াইনটা উপভোগ করছে। কারন এটা শেষ হয়ে গেলেই শেষ। আবার কবে ঊর্মি অনুমতি দেবে কে জানে?

ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে রজতাভ বলল,“কাল তোমরা রওনা হচ্ছো তাহলে?”

তথাগত হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল,“হুম! কাল সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বো। তাহলে ট্রেনটা ধরা যাবে।”

- কটার দিকে ট্রেন?

- সকাল দশটার দিকে। ডিব্রুগড় এক্সপ্রেস। সেটা ধরলে, আর লেট না হলে সন্ধ্যের মধ্যে ঢুকবো ডিব্রুগড়ে। সেখানে গাড়ি থাকবে। সব ঠিক থাকলে রাত আটটার মধ্যে ঢুকে যাবো আমরা। তা ভাই রজতাভ, এবার কিন্তু তোমাদের নিমন্ত্রণ রইল। দুজনে মিলে সমুদ্র দেখেছি, তোমার ডাকে পাহাড় দেখলাম, এবার তোমাকে জঙ্গল দেখানোর পালা রইল। তা কবে আসবে বলো?

- দেখি। আপাতত কটা দিন এখানে কাটিয়ে নিই। তারপর শিলিগুড়িতে কিছু কাজও আছে।

- ওসব শুনতে চাই না। বলো আসবে কিনা?

- দেখছি। আপাতত কথা দিতে পারছি না।

বলতে বলতে রজতাভ খেয়াল করে সুজাতা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তথাগত হুইস্কি খেতে খেতে বলে, “হু হু! একবার ঘুরে যাও আমাদের এদিকে। তোমাদের জঙ্গলের প্রেমী না করে তুলেছি তো আমার নাম বদলে দিও। টিভিতে, গল্পের বইতে জঙ্গলের যে বর্ননা জেনেছ, দেখবে জঙ্গল তার চেয়েও বেশী সুন্দর, তার চেয়েও বেশী রহস্যময়। আর আমাদের বাংলোর রাঁধুনির হাতে বনমোরগের ঝোল আর হাতে গড়া রুটি তোমাদের মলিদিদির তৈরী খাবারের চেয়ে কম নয়। তোমাদের সুজাতাও এ ব্যাপারে একমত হবে দেখো।”

সুজাতা রজতাভর দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই রজতাভ ইশারায় চারটে আঙুল দেখায়। সুজাতা কপাল চাপড়ে এগিয়ে যায়।

“এই যে ওঠো! অনেক গিলেছ আর না।” বলে তথাগতর হাত থেকে গ্লাস কেড়ে নিয়ে টেবিলে নামিয়ে রাখে। তথাগত সুজাতার দিকে ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে জড়ানো গলায় বলে,

- অ্যা! কে? অ তুমি! আহা গ্লাসটা আবার কেড়ে নিলে কেন? সবে মাত্র ঢেলেছিলাম।

- আর খেতে হবে না। অনেক খেয়ে নিয়েছ। চলো ঘরে গিয়ে ঘুমোবে। কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে।

- কোথায় আর খেলাম? সবে তো চার গ্লাস!

- ওটাই যথেষ্ট! চলো এবার!

- কোথায় যাবো?

- ঘরে চলো। ঘরে গিয়ে শোবে।

- শোবো?

বলে ফিক করে হেসে ফেলে তথাগত। তারপর জড়ানো কন্ঠে বলে, “এতদিন ধরে শুয়েছি তাতেও আশ মেটেনি? আরো চাই? এই তোমরা না হেবি ডিম্যান্ডিং! রোজ এটা চাই, ওটা চাই, না! তুমি না, তবে আমার সাথে কাজ করা সব কটা লোকের বউয়েরা একই পথের পথিক। কারো গয়না চাই, কারো শাড়ি, কারো মেকাপের সরঞ্জাম। চাহিদা আর শেষ হয় না। গতবারের পোস্টিং-এর দাসবাবুকে মনে আছে তোমার? সেই যে প্রতিরাতে কোয়ার্টারের বারান্দায় বিড়িমুখে মাদল বাজিয়ে গাইতেন। তিনি কী বলতেন জানো? ‘চৌধুরী! তোমার স্ত্রীভাগ্য বেশ ভালো! নো বায়না, নো দাবিদাওয়া, নো কান্নাকাটি। যা দাও তাতেই খুশি। সব জায়গায় সাথে সাথে চলে। এরকম বৌ পেলে তো আমি বর্তে যেতাম হে! এদিকে তোমার বৌদিকে দেখো, শহরের পাকা,চকমেলানো, আলো ঝলমলে বাড়িতে পটের বিবি সেজে সারাদিন বসে থাকেন। জঙ্গলের পরিবেশ তার নাপসন্দ, রোদে বেরোলে নাকি তার চামড়া কালো হয়ে যাবে! মাসের শেষে বেতনের সিংহভাগ হাতখরচের প্রণামী হিসেবে পৌঁছে গেলেই হল। আর বছরে বারোটা শাড়ি, গয়নার ফিরিস্তি আলাদা, আমি না থাকলেও ক্ষতি নেই। মানেটা কি দাঁড়াল? স্বামী না থাকলেও চলবে, হাতখরচের টাকা সময়মতো পৌঁছনো চাই। এদিকে ওদের আবদার, বায়নার দাম চোকানোর টাকা কোথা থেকে আসছে? কীভাবে আসছে? যে আনছে সে কোন ঝুঁকি নিয়ে আসছে সেটা নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই। সন্তান দুটোও তথৈবচ মর্কটশিরোমণি। বাপের টাকায় রাজপুত্তুরের মতো ঠাটবাট দেখালেও, বাপটা কেমন আছে জানার প্রয়োজন বোধ করে না। মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানো? সব ছেড়ে দিয়ে সিবিআইতে তলব দিয়ে গুম হয়ে যাই। ওরাও বুঝুক টাকার বোঝা কাকে বলে?' বুঝলে হে ভায়া রজতাভ? এই দাসবাবু আজব মানুষ ছিলেন। পরিবারের জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতেন। ন্যায়-অন্যায় দেখতেন না। অথচ মানুষটা পরিবারের কাছেই ব্রাত্য ছিলেন। তবে এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না তিনি। রোজ রাতে মহুয়া,হাড়িয়া, কোনোদিন মেজাজ শরিফ থাকলে রাম খেয়ে মাদল নিয়ে বসে পড়তেন বারান্দায় লাগোয়া আরামকেদারায়। মুখে একটা বিড়ি ধরিয়ে তাল ঠুকতেন ঢিমে তালে। তারপর তালের গতি বাড়তো। বিড়ি শেষ করে গাইতেন বনের গান, কখনো সাঁওতালদের গান। যার মাথামুন্ডু না বুঝলেও সুর আর তালে ঝিম ধরে যেত। বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞেস করে দেখো সুজাতাকে, এই সু! বলো না রজতাভকে। কত রাতে বিছানাতে সেই তালে তাল মিলিয়ে তোমাকে বুকের তলায়...” বলে আবার ফিকফিক করে হাসে তথাগত। 

তথাগতর কথায় রজতাভ গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়েও থমকে তাকায় তথাগতর দিকে। তারপর সুজাতার অগোচরে মুচকি হাসে। কথাটা শোনামাত্র সুজাতা মরমে মরে যায় । মদ খেয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে কার সামনে কী বলছে তার কোনো জ্ঞান তথাগতর না থাকলেও সুজাতার আছে। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে সুজাতা একপলক রজতাভর দিকে তাকায়। তারপর তথাগতর হাত ধরে বলে, “অনেক হয়েছে! এবার চলো!” কিন্তু ওর ঠেলাঠেলিতে তথাগতর কোনো বিকার ঘটে না। সে আপনমনে টেবিল থেকে গ্লাসটা তুলে নিয়ে সেটায় থাকা অবশিষ্ট তরল পানীয় গলায় ঢালে। সুজাতা তথাগতকে ঠেলা দিতে দিতে ক্রমশ বেহাল হচ্ছে দেখে অগত্যা বাধ্য হয়ে নিজের গ্লাসের পানীয়টা শেষ করে আসরে নামে রজতাভ। তারপর সুজাতার হাতে হাত লাগিয়ে তথাগতকে কোনোমতে আরামকেদারা থেকে তুলে সুজাতাদের ঘরে নিয়ে আসে। তারপর তথাগতকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরোবার আগে একবার পিছন ফিরে সুজাতার দিকে তাকায়। তারপর হাসতে হাসতে ধীরপায়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। বারান্দা থেকে গ্লাস আর বোতলদুটো নিয়ে যথাস্থানে রেখে বেডরুমে ঢুকে দেখে ঊর্মি বিছানায় বসে হাতে পায়ে শীতের মলম ঘষছে।

রজতাভর দিকে ঊর্মি তাকাতেই রজতাভ ফিক করে হেসে ফেলে। তারপর বিছানায় বসে ওষুধগুলো খেতে খেতে বলে, “যেমন দ্যাবা,তেমন দেবী। দুজনেই সমান! যাকে বলে একেবারে রাজজোটক! কেউ কারো থেকে কম যায় না। বউ যেমন বেশী খেলে উল্টে যায়, তেমনই বরও ভাট বকে। ভাগ্যিস সুজাতা এল! নাহলে বাবাজি আরো কিছুক্ষণ বকতেন।" ঊর্মি মলম মেখে বিছানায় বসে বলে, “যাই বলো, দুজনে বেশ আছে বলো?”

রজতাভ মাথা নাড়ে। তারপর বিছানায় আধশোয়া হয়ে বলে,“ওদের দেখলে আমাদের বিয়ের পরের দিন গুলোর কথা মনে পড়ে যায়। মনে আছে? সেই বিয়ের পর পর তুমি, আমি এরকমই পরস্পরকে চোখে হারাতাম। না এখনও হারাই। কিন্তু সদ্যবিবাহিতদের মধ্যে একটা কেমিস্ট্রি কাজ করে। একটু লজ্জা, একটু ভালোলাগা, ছোটখাটো বিষয়ে অল্প একটু যত্ন নেওয়া। যেটা বিয়ের এক-দুই বছর পরে ফিকে হয়ে গিয়ে শুধু অভ্যেসে পরিণত হয়। অথচ ওদের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। ওরা এখনও সেই কেমিস্ট্রিটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”

- ঠাকুর করুক ওদের এই কেমিস্ট্রিটা আজীবন বেঁচে থাকুক।  

- আমিও তাই চাই। সুজাতা বড়ো ভাল মেয়ে। তথাগতও ছেলে মন্দ নয়। ওর জন্য তথাগত একেবারে পারফেক্ট ম্যাচ। একে-অপরকে যেভাবে ওরা ভালোবেসে আগলে রাখে সেটা আজকালকার কাপলদের মধ্যে খুব কম দেখা যায়। আজকালকার দম্পত্তিরা প্রথম প্রথম ভালোবাসা,হাসিখুশি থাকলেও পরে নির্বিকার, নিরস ভাবে গোটা জীবন কাটায়। প্রথমে জীবনটা সুখের মনে হলেও পরে সেটা ক্রমশ খাঁচায় আবদ্ধ পাখির মতো মনে হয়। তখন ভালোবাসার জায়গায় চাহিদার প্রবেশ ঘটে। এটা দাও, ওটা দাও, সেটা দাও। মুখে প্রকাশ না করলেও হাবেভাবে বোঝানো হয় চাহিদাটাকে। তখন বিয়েটা বোঝাপড়ায় পরিণত হয়। ভালোবাসার জায়গা নেয় Give & Take policy। আর একারনেই দাম্পত্যজীবন বিষাক্ত হয়ে যায়। একটু আগেই তো তথাগত বলছিল ওর কোন কলিগের স্ত্রী নাকি সাংঘাতিক ডিমান্ডিং। স্বামী না হলেও চলবে, তবে চাহিদা পুরণ হওয়া চাই। সেক্ষেত্রে তথাগত অনেক লাকি।

- মোটেই না! আমরা মেয়েরা মোটেও ওরকম নই। বরং পুরুষদের চাহিদা বেশী!

- তাই! আমাকে এমন একটা পুরুষ দেখাও যে স্ত্রীর কাছে ‘এটা চাই',‘ওটা চাই' বলে বায়না করেছে। যত বায়না তোমরাই করো। বিবাহবার্ষিকীতে গয়না চাই, জন্মদিনে বাইরে খাওয়া চাই,বিয়ে-অনুষ্ঠানে শাড়ি চাই। এদিকে আলমারি উপচে পড়ছে অথচ তাও শাড়ির চাহিদা শেষ হয় না।

- বাহ রে! এটা তো আমাদের অধিকার। বৌভাতের দিনই তো তোমরা আমাদের খাওয়া-পরার দায়িত্ব নাও। তোমাদের কাছে চাইব না তো কার কাছে চাইব? আমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তো তোমাদের। আর অনুষ্ঠান-পার্বনে নতুন কাপড় পরবো না তাই কি হয়?

- পথে এসো! এই তো বলছিলে তোমরা নাকি এরকম নও,তোমাদের চাহিদা নেই তা এটা কি চাহিদা নয়? আর ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া এবং চাহিদাপুরণে তফাৎ অনেক। প্রথমটা কর্তব্য, পরেরটা আবদার মেটানো। আর আবদারের সংখ্যা যখন সাধ্যের বাইরে চলে যায় তখন জীবন কন্টকময় হয়ে যায়। আর ক্রমশ এই চাহিদাগুলো বোঝা হয়ে ওঠে। তোমাদের অবশ্য দোষ নেই। তোমরা ভাবো তোমাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব যখন আমাদের তখন তোমাদের অফুরন্ত চাহিদাপুরণের দায়িত্বও আমাদের। অথচ আমরা ছোটোখাটো জিনিসেই খুশি থাকতে, খুশি রাখতে পছন্দ করি।

-‌ তাই বুঝি? তা তোমার বুঝি কোনো চাহিদা নেই আমার কাছ থেকে?
 
প্রশ্নটা শোনামাত্র স্তব্ধ হয়ে যায় রজতাভ। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ঊর্মির দিকে। তার একবার ইচ্ছে করে বলতে, “আমার চাহিদা যে ভীষণ সীমিত ঊর্মি। বেশীকিছু চাইও না আমার। কিন্তু আমার যা চাই তা তুমি দিতে অপারগ। বরং আমার চাহিদার কথা তোমাকে জানালে তুমি নিজেই আমাকে থামিয়ে দেবে। অথচ কী এমন চেয়েছি আমি? রক্তমাংসের একটা ছোটো প্রাণ, যা একান্ত আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন হয়ে এই পৃথিবীতে থাকবে। কিন্তু না, সামান্য একটা অহেতুক ভয়ের বশে তুমি নিজেই আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছ। আজ যদি আমি একই আবদার করি তুমি মেনে নেবে?” তারপর নিজেকে সামলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “না নেই। শুয়ে পড়ো, অনেক রাত হয়েছে। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।”
 
বলে বিছানার পাশের রিডিং ল্যাম্পটা বন্ধ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে রজতাভ। সুজাতা কিছুক্ষণ রজতাভর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মৃদু হেসে আলো নিভিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। আলো নিভে যাওয়ার পর রজতাভ চোখ খোলে। বিয়ের চার বছর হতে চলল। বাইরে থেকে ওদের একজন সুখী, পারফেক্ট কাপল মনে হলেও আসলে দুজনের মধ্যে যে একটা অদ্ভুত শীতল দুরত্বের সৃষ্টি হয়েছে তার খবর কেউ জানে না। সারাদিন হাসি, খুনসুটিতে, একে অপরকে সাহায্য করে দিন কেটে যায় ঠিকই। কিন্তু রাত হলেই বন্ধ ঘরের মধ্যে ভালো থাকার ছদ্মবেশ পাল্টে, হাসি মুখের মুখোশ খুলে যন্ত্রের মতো নীরস, নির্বিকারভাবে দুজনে পরস্পর পিঠ করে শুয়ে পড়ে। সারাদিন একে-অপরকে চোখে হারিয়ে, একে-অপরের যত্ন নিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করলেও দুজনেই জানে এটা অভিনয় ছাড়া আর কিছু নয়। এতগুলো দিন ধরে একে-অপরকে ভালোবেসে ভালো রাখার অভিনয় করে পরস্পরকে সুখী রাখা নামে ঠকিয়ে যাচ্ছে দুজনে। যুদ্ধভূমিতে মৃত্যুকে কাছে দেখার পর জীবনের প্রতি অনীহা জন্মানোয় তথাগত চেয়েছিল নিজের একটা চিহ্ন পৃথিবীতে রেখে যেতে। পিতৃত্বের সাধ জেগেছিল তার মনে। সে জানতো মৃত্যু একবার যখন তার নাগাল পেয়েছে মারণ ছোবল না দিয়ে সে ছাড়বে না। মৃত্যু নিশ্চিত জানার পর চলে যাবার আগে শেষবারের মতো বাবা ডাক শুনতে চেয়েছিল সে। কিন্তু মাঝখানে হার্ট অ্যাটাকের পর সেই আশা প্রায় নিভতে বসেছিল।

অপারেশনের পর আর কোনো ঝুঁকি নেই জানার পর পিতৃত্বের সাধ আরো তীব্র হয়ে উঠেছিল তার। রজতাভ চেয়েছিল ঊর্মি আর ওর সন্তানকে নিয়ে বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটাতে। কিন্তু এবার বাধ সাধল ঊর্মি। একটা অহেতুক ভয় জন্ম নিল ওর মনে। রজতাভর কাছে এলেই ওর মৃত্যু হবে এই ভয়ে দূরে সরিয়ে নিল নিজেকে। আর এই ভয়টাই হয়ে উঠল ওদের জীবনের সবথেকে বড়ো ক্ষত। সেদিনের পর থেকে যতবার রজতাভ ঊর্মির কাছে গেছে, ঊর্মি ওকে নানা কথায়, ছলে নিরস্ত করেছে। যতবার সন্তানের আবদার করে ঊর্মির কাছে গেছে রজতাভ, ততবার রিক্ত হাতে ব্যর্থ মনোরথে ফিরতে হয়েছে তাকে। সেদিনের পর থেকে ঊর্মি নিজেকে ওর থেকে এতটাই দূরে সরিয়ে নিয়েছে যে রজতাভ চাইলেও তার নাগাল আর পায়নি। ক্রমশ দূরে সরে যেতে যেতে, ক্রমাগত প্রত্যাখ্যাত হতে হতে একসময় অভিমান করে রজতাভও একটা দেওয়াল তৈরি করে নেয় নিজের চারপাশে। আজও সেই দেওয়ালে চিড় ধরেনি। একবার পেছন ফিরে ঊর্মির দিকে তাকায় রজতাভ। তারপর আবার সামনের দিকে ঘুরে শুয়ে পড়ে। নাইটল্যাম্পের আলোয় দুজন পিঠোপিঠি শুয়ে ক্রমশ তলিয়ে যায় ঘুমের অন্ধকারে।

পাশের ঘরে বিছানায় শুয়ে নাইটল্যাম্পের আলোয় অপলকে সদ্য রমণক্লান্ত তথাগতর দিকে তাকিয়েছিল সুজাতা। মাতাল হলেও তথাগত আজ রাতেও আদর করতে ভোলেনি। বরং আদরের মাত্রাটা আজ একটু বেশিই ছিল। যেন আজ ওকে বিছানায় মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল তথাগত। অন্যদিন এই বন্য আদর ভালো লাগলেও আজ যেন একটু বেশীই যন্ত্রণাময় লাগছিল তথাগতর আদরের মাত্রাটা। সে প্রতিরোধের চেষ্টা করতেই আরো রোখ চেপে গিয়েছিল তথাগতর। এক হাতে সুজাতার মুখ চেপে আরো প্রবলভাবে আদরের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল সে। কামড়ে ধরেছিল সুজাতার কাঁধ। দুরন্ত গতিতে তথাগত যখন ওর ভেতরে প্রবেশ করছিল সেসময় সুজাতার মনে হচ্ছিল যেন সে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। কতক্ষণ ওর উপর এই তীব্র আদর চালিয়েছিল তথাগত জানে না সুজাতা। তবে একটা সময় টের পেয়েছিল তথাগতর চরম মুহূর্তের সময় আসন্ন। আর পরক্ষণেই তথাগতর ক্লান্ত শরীরটা ওকে প্রায় ছিবড়ে করে ওর পাশে এলিয়ে পড়েছিল। 

গোটা শরীর যন্ত্রণায় ভেঙে পড়লেও সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না সুজাতার। ওর কানে বাজছিল তথাগতর বলা কথাগুলো। যে কথাগুলো রজতদার সামনে মত্ত অবস্থায় বলে চটুল হাসি হাসছিল তথাগত। রজতদার কাছে সেটা একটা মাতালের প্রলাপ হলেও সুজাতা ভালো করেই জানে তথাগতর ইঙ্গিতটা কতটা নোংরা, আর অশ্লীল ছিল। রজতদার কাছে ওকে কামুক প্রমাণিত করতে চাইলেও বাস্তবটা যে কতটা উল্টো সেটা সুজাতা ছাড়া আর কেউ জানে না। এই একটু আগেও আদর করার সময় ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলছিল তথাগত,“তুমি এত ভালো কেন সু? এতবছর হয়ে গেল,কোনো চাহিদা, কোনো চাওয়া নেই কেন তোমার? শাড়ি-গয়না কিছুই চাই না কেন তোমার? এত নিখুঁত কি করে হলে তুমি? বিছানাতেও কোনো প্রতিরোধ নেই,যেভাবে আদর করি মুখ বুঁজে সহ্য করো। কেন এত আপোষ করো তুমি? একবারও কি ইচ্ছে করে না ছকে বাঁধা নিয়ম ভাঙতে? ইচ্ছে করে না একবার প্রতিরোধ করে ডমিনেশনের ব্যাটন নিজের হাতে তুলে নিতে? যেমন বন্য আদর মুখ বুঁজে সহ্য করো ঠিক তেমন আদরে আমাকে ভরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে না?”

পরক্ষণে প্রতিরোধ করতেই ফুঁসে উঠেছিল তথাগতর পৌরুষ। আচমকা গালে সপাটে চড় মেরে হিসহিসে কন্ঠস্বরে বলে উঠেছিল, “তথাগত চৌধুরীকে বাধা দেওয়া? আমাকে কাবু করার চেষ্টা? এত সাহস? শালি আজ তোকে দেখিয়ে দেব আমি কী জিনিস!”

মাঝে মাঝে তথাগতকে অদ্ভুত মানুষ মনে হয় সুজাতার। নিজেই নিয়ম ভাঙতে প্রলুব্ধ করে আবার পরক্ষণেই নিয়মের বাইরে গেলে শাস্তি দিতে উদ্যত হয়। বাইরের জগতের কাছে নিজেকে‌ প্রেমিক, হাসিখুশি, কেয়ারিং বর প্রতিপন্ন করলেও চার দেওয়ালের ভেতরে তথাগত একজন আদ্যপান্ত ডমিনেটিং, পৌরুষত্ব জাহির করা এক দুর্দমনীয় জান্তব পুরুষ।‌ যার কাছে প্রতি রাতে তার স্ত্রী একজন যৌনখিদে মেটানোর বস্তুমাত্র। অথচ সকালে তথাগতর সম্পুর্ণ ভিন্ন মুর্তি দেখে সে। এই যে তথাগতকে দেখছে সে, কাল সকালেই এই তথাগতর ভোল যে আমূল পাল্টে যাবে সেটাও সুজাতা জানে। হয়তো সকালেই জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইবে ওর কাছে। বিয়ের এতগুলো বছর পর তথাগতর ভাবগতিক বুঝতে আর ভুল হয় না সুজাতার। তথাগতকে সে হাড়ে হাড়ে চেনে। তথাগতর এই দুমুখো ব্যবহারে এখন আর অবাক হয় না সে। কারন সে জানে তথাগতকে পাল্টানো অসম্ভব। সারাজীবন তথাগতর এই দুটো রূপ সহ্য করে যেতে হবে তাকে। এই ভাবতে ভাবতে চোখ বোঁজে সুজাতা। সকাল হতে এখনও দেরী। একটু বিশ্রাম দরকার। কাল সকালে আবার বেরোতে হবে। 

(চলবে...)

পাঠকের উদ্দেশ্যে 'প্রতিঘাত' সম্পুর্ণ বিনামূল্যে ইবুক আকারে প্রকাশিত হয়েছে। যারা এখনও সংগ্রহ করতে পারেন নি তাদের জন্য আরেকবার দেওয়া হল লিঙ্ক। নিচে হাইলাইট করা 'প্রতিঘাত' লেখাতে ক্লিক করুন আর ডাউনলোড করে নিন প্রতিঘাত।

শুক্রবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২১

প্রতিঘাত

 


বস্তুত ভূতের গল্প আমরা সবাই পড়ে থাকি মিষ্টি ভূত, দুঃখী ভূত, সরল ভূত, ভয়ঙ্কর ভূত আমরা জানি যেখানে ভয়ঙ্কর ভূত থাকে সেখানে তাকে তাড়ানোর জন্য ওঝা, তান্ত্রিক, সাধুর আগমন হয় অনেকে আবার রহস্য গোয়েন্দা গল্পও পড়ে থাকি আচ্ছা কেমন হয় যদি এই ভূত তাড়ানো তান্ত্রিকই গোয়েন্দা হন? এই বিষয়ে অনেক চিন্তা করে বাঙালির দুই প্রিয় গোয়েন্দাকে মিলিয়ে মিশিয়ে সৃষ্ট চরিত্র হল ব্যোমকেশ মিত্র।

অনেকটা তারানাথ তান্ত্রিকের গুণে মিশিয়ে সৃষ্ট ব্যোমকেশকে ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করতে গিয়ে আপনাদের ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেওয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছিএবার পরিপাকটা কেমন হয়েছে এবার সেটা আপনারাই বলবেন আর আটকাবো না আপনাদের। নিচে হাইলাইট করা লেখাতে ক্লিক করুন আর ঝটপট পড়ে নিয়ে জানান কেমন লাগলো 'প্রতিঘাত'। 








বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর, ২০২১

অস্তরাগ একাদশতম পর্ব



রজতাভদের গাড়িটা যখন ওদের বাড়ির সামনে দাঁড়াল তখন সন্ধ্যে সাতটা বাজে। যাবার সময় জোরথাং রোড হয়ে ঘুরপথে গেলেও ফেরার সময় পেশক রোড হয়েই ফিরেছে ওরা। ঊর্মিরা নেমে যেতেই গাড়ি গ্যারাজে পার্ক করে গ্যারাজের দরজা লাগিয়ে দিল রজতাভ। তারপর গাড়ি এবং গ্যারাজের চাবিটা পকেটে ঢুকিয়ে শিষ দিতে দিতে নিজের রুমে ঢুকে বাথরুম থেকে ফ্লাশের শব্দ শুনে বুঝল ঊর্মি বাথরুমে গেছে।  ঘরের দরজা আটকে গাড়ি এবং গ্যারাজের চাবি দুটো ড্রয়ারে রেখে পোশাক পাল্টে সিগারের কেসটা নিয়ে চেয়ারে বসে রজতাভ। ইদানীং স্মোক করা একেবারে কমিয়ে দিলেও একেবারে ছাড়তে পারেনি সে। অবশেষে অনেক বাদানুবাদ, মান-অভিমানের পর ঊর্মির আদেশে দিনে একটা সিগার খায় সে। সিগারটা জ্বালিয়ে আরামে ধুমপান করতে থাকে‌ সে। 


বাথরুমে শাওয়ারের শব্দ শুনে বুঝতে পারে ঊর্মির স্নানপর্ব শুরু হয়েছে। এটা ঊর্মির বরাবরের মুদ্রাদোষ। বাইরে কোথাও গেলে বাড়ি ফেরার পর একবার গরম জলে স্নান করবেই। সে যতরাতই হোক না কেন! গতবছর পুজোর সময়ও একই জিনিস ঘটেছে। যতদিন যাচ্ছে ঊর্মি তত শুচিবাইগ্রস্থ হয়ে যাচ্ছে। সবসময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ভালো। কিন্তু ঊর্মির মারাত্মক রকমের বাড়াবাড়ি করে। বাজার থেকে আনা শাক-সবজিও সাবান জলে ডেটল মিশিয়ে ধুয়ে নেয়। ছাদ থেকে জামাকাপড় নামিয়ে খুটিয়ে দেখে‌ কোথাও ধুলো লেগেছে কিনা। এমনকি রান্নার সময় খাবার সময় বাসনও গরমজলে ফুটিয়ে নেয়। ঊর্মির এই পাগলামো দেখে আগে রজতাভ হেসে‌ ওকে ডেটল ওম্যান বলতো। এখন রীতিমতো বিরক্ত হয়। সিগারটা শেষ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রজতাভ। সারাদিন এক মুহূর্তের জন্যেও বিশ্রাম নেয় নি সে। মাথার সব শিরা-উপশিরাগুলো অবসন্ন হয়ে আসছে। এখন ওর ঘুমের দরকার। কোনো মতে নাকে-মুখে গুঁজে একটা লম্বা ঘুম। চেয়ারের হেলান দিয়ে চোখ বোঁজে রজতাভ।

সবে মাত্র চোখটা লেগেছে এমন সময় বাথরুমের দরজা খোলার শব্দে ঘোর কাটে রজতাভর আর ওকে অবাক করে বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে সুজাতা। সুজাতা বাথরুম থেকে বেরিয়ে রজতাভকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।

- সরি রজতদা! আসলে ও আমাদের ঘরের বাথরুমে ঢুকেছে। আর আমার ভীষণ এমার্জেন্সী ছিল বলে ঊর্মিই আমাকে তোমাদের বাথরুমটা ইউজ করতে বলল। আমি বুঝতে পারিনি তুমি রুমে আছো সরি।

- আরে না না ঠিক আছে। কোনো ব্যাপার না। আমি কিছু মনে করিনি। 


সুজাতা আড়ষ্টভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রজতাভ হাই তুলে বাথরুমে ঢোকে। আর বাথরুমে ঢুকেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। কারন তোয়ালে রাখার জায়গায় সুজাতার অন্তর্বাস ঝুলছে। হাসতে হাসতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে রজতাভ। আর বেরোনোর সাথে সাথে মুখোমুখি হয় ঊর্মির।

- কি ব্যাপারটা কী? এভাবে হাসতে হাসতে হুড়মুড় করে বেরোচ্ছ যে! কি হলো? ভেতরে স্বপ্ন সুন্দরী পেলে নাকি?

 ঊর্মির প্রশ্নের উত্তরে কিছু বলতে গিয়েও থমকে যায় রজতাভ তারপর হেসে বলে, “ আমার সেই সৌভাগ্য কোঠায়? যে এই বয়সে স্বপ্ন সুন্দরী আসবে আর আমি তাকে মনে করে স্নানঘরের বাস্পে ভাসবো।”


- বটে? তা তোথায়? হুড়মুড় করে বেরোনোর কারনটা কি শুনি?

- তোমার সখীর কবচ,কুণ্ডল স্নানাগারে ছাড়া পড়িয়াছে প্রিয়ে! দয়া করে ওটা ওকে দিয়ে এসো।

- কবচ ও কুণ্ডল মানে? 

- ভেতরে যাও বুঝতে পারবে।

বলে দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ায় রজতাভ। ঊর্মি ভেতরে ঢুকে হো হো করে হেসে ফেলে। তারপর বলে, “অসভ্য একটা!”রজতাভ প্রত্যুত্তরে কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় ওদের দরজায় টোকা পড়ে। ওরা ঘুরে দেখে ঘরের বাইরে সুজাতা দাঁড়িয়ে। রজতাভর সাথে চোখাচোখি হয় ঊর্মির, তারপর বাথরুম থেকে সুজাতার অন্তর্বাস বের করে সুজাতার হাতে ধরিয়ে ঊর্মি মুচকি হেসে বলে, “ এই নে ধর! তোর কবচ-কুণ্ডল!”

সুজাতা বুঝতে না পেরে হা করে তাকিয়ে থাকে ঊর্মির দিকে। তারপর মানে বুঝতে পেরে আরক্ত মুখে জিনিসটা নিয়ে চলে যায় নিজের ঘরে। এদিকে ঊর্মিও বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। রজতাভ প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলেও পরে হাসতে হাসতে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলে,

-এটা কি হল? আমি লাইনে ছিলাম তো!

ভেতর থেকে উত্তর আসে, " তাতে কি? তুমি আমাকে জায়গা ছেড়ে দিয়েছ।"

-সে তো সুজাতার ইয়ে মানে আন্ডারগার্মেন্টস বের করার জন্য!

-সে কারনেই তো স্নান করছি! কত জার্ম ছিল ওতে জানো? 

- তাই বলে এভাবে? এতো চিটিং!

- হ্যাঁ! এখন যাও তো বিরক্ত করো না!

রজতাভ তাও কয়েকবার চেষ্টা করে অবশেষে হাল ছেড়ে চেয়ারে গিয়ে বসে।

*****

জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে সকালের হাল্কা রোদের আলো মুখের উপর পড়ায় ঘুম ভেঙে যায় ঐশীর। চোখ খুলেই কোথায় আছে প্রথমে বুঝতে না পারলেও বেশ কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হতেই একে একে সব মনে পড়ে যায় তার। কাল বিকেলের দিকে ওরা জলঢাকায় এসেছে। সারাদিনের জার্নিতে ক্লান্ত ছিল বলে বেশি রাত করে নি। কোনো মতে নাকেমুখে গুঁজে ঘুমিয়ে পড়েছিল দুজনে। এক ঘুমে রাত কাবাড় হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকানোর পর ঐশী পাশ ফিরে তাকায়। দেখে অভিক মুখ হা করে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। কষ বেয়ে বেরিয়ে আসছে লালা। অভিকের এরকম রূপ দেখে মনে মনে ফিক করে হেসে ফেলে ঐশী। তারপর হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিল থেকে স্মার্টফোনটা নিয়ে টুক করে ঘুমন্ত অভিকের ছবিটা তুলে নিয়ে বিছানায় উঠে বসে একটা হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙে ঐশী। 


ফ্রেশ হয়ে বেডরুম থেকে বেরিয়ে ঐশী দেখল রান্নাঘর থেকে সুজাতা চায়ের কাপ নিয়ে বেরোচ্ছেন। ঐশীকে দেখে চায়ের কাপটা সেন্টার টেবিলে রেখে সুজাতা বললেন, “গুড মর্নিং! এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়লে যে! যাক গে ভালোই করেছ! দাঁড়াও তোমার চা-টাও নিয়ে আসি।”

ঐশী চুপচাপ সোফায় গিয়ে বসে। সুজাতাকে বলে, আটকে লাভ নেই। উনি কারো কোনো কথা শুনবেন না। গত দুইবার এই বাড়িতে এসে সুজাতাকে রান্না করা থেকে বিরত করা যায় নি। সুজাতার সাফ কথা, ‘আজ নাহয় তোমরা আমাকে ছুটি দিলে। কাল যখন থাকবে না তখন কে ছুটি দেবে?’

রান্নাঘর থেকে ঐশীর চায়ের কাপটা নিয়ে সুজাতা ড্রইংরুমের সেন্টার টেবিলে রেখে সোফায় বসলেন। ঐশী চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিল। 

চা-পর্ব শেষ করে শাশুড়ি-বৌমা লেগে পড়লেন ঘরের কাজে। তবে বৌমাকে বেশি কাজ করতে হল না। শাশুড়িই বৌমাকে হাল্কা কাজ দিয়ে বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন করলেন। দুপুর সাড়ে বারোটার মধ্যে রান্নাবান্নাসমেত সব কাজ সেরে শাশুড়ি-বৌমা বসলেন নির্ভেজাল আড্ডায়। 

*****

প্লেট থেকে এক পিস চিকেন পকোড়া মুখে ফেলে তথাগত বলল, “ যাই বলো রজতাভ, তোমার কথাটা কিন্তু মানতে পারলাম না!”


রজতাভ কফিমাগে চুমুক দিয়ে বলল, “ সে তুমি না মানতেই পারো কিন্তু অস্বীকার করতে পারবে না। কারন সাক্ষাত করবেট এটা অ্যাপ্রুভ করেছেন। বিপদে পড়লে,বা আঘাত পেলে নিরীহ প্রাণীও ভয়ংকর প্রাণী হতে বাধ্য। আর এটা মানুষের মধ্যেও দেখা যায়। সাহিত্যের ভাষায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়ে ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেলে মানুষ অসম্ভব ও সম্ভব করতে পারে।”

- কিন্তু তাই বলে একটা বাচ্চা ছেলে নিজের মা-বাবা, দাদাকে খুন করবে?

- সৎমা, সৎ দাদা। মানছি খুন করাটা অন্যায়। কিন্তু ছেলেটার মত অনুযায়ী এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ওদের না মারলে হয়তো নিজে মরতো।

- কিন্তু বন্ধুদের টানলো কেন?

- কারন খুন জিনিসটা ওদের কাছে অ্যাডভেঞ্চারের মতো মনে হয়েছিল। খুনের বিবরণটা পড়ো নি? মাইকেল ডগলাসের ‘ফলিং ডাউন’ সিনেমার অনুকরণে খুন করে টেবিলে অস্ত্র,টাকাপয়সা রেখে গিয়েছিল বন্ধুরা। শোনো তথাগত,বয়ঃসন্ধির সময় বাচ্চাদের জগতটা বেশ আজব হয়। ১৩-১৯ এই সাতটা বছর ওদের জগতটা রঙিন, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় হয়। ‘চাঁদের পাহাড়’ পড়ে নিজেকে শঙ্কর ভাবতে ইচ্ছে করে। বাবা মায়ের নিষেধ শুনতে ইচ্ছে করে না। বরং সেটা শেকল মনে হয়। ইচ্ছে করে সেটা থেকে বেরোতে। পরে যখন বয়স বাড়ে, ম্যাচিওরিটি আসে তখন জীবনটা হাল্কা বেরঙিন হয়ে যায়। তখন বাস্তবটা চোখের‌ সামনে ওদের চোখে ওটা খুন ছিল না। ছিল পোয়েটিক জাস্টিস। বন্ধুর প্রতি সুবিচার। নোয়াপাড়ার ব্যাপারেও তাই ঘটেছিল। মেয়েটাকে ওর মা অতিরিক্ত কেয়ার দিতো যেটাকে আপাতদৃষ্টিতে দেখলে শাসনই মনে হয়। আর সেটারই সুযোগ নিয়েছিল মাষ্টার।

- তাই বলে খুন করবে?

- বললাম তো ওটা ওদের চোখে খুন ছিলই না। ওদের কাছে ওটা ছিল মুক্তির পথ। 
কথা হচ্ছিল আজ সকালে খবরের কাগজের একটা খবর নিয়ে। নয় বছর আগে নিজের পরিবারের সকলকে খুন করার দায় জেল খাটা এক কিশোর জেল থেকে পালিয়ে গেছে। সন্ধ্যেবেলা ছেলেটার খুনের ব্যাপারে আলোচনাটাই আজকের আড্ডার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল। রজতাভর মতে ছেলেগুলো অ্যাডভেঞ্চারের তাড়নায়, পরিস্থিতির চাপে পড়ে খুনগুলো করেছিল। তথাগতর মতে মানুষ যতই চাপে পড়ুক না কেন খুন করতে পারে না। ছেলেগুলোর মধ্যে ক্রিমিনালস্বত্তা ছিল। সেই নিয়ে তর্ক চলছে। আর তার সাথে সমানে চিকেন পকোড়ার ব্যবহারও চলছে। রজতাভ থামবে না। তথাগতও হার মানবে না। ঊর্মি আর সুজাতা দুর থেকে দুজনকে দেখছিল আর হাসছিল। ঊর্মি কফিমাগে চুমুক দিয়ে বলল, “দুজনকে দেখ কিরকম ঝগড়া করছে! আরে একটা খুনি পালিয়েছে তাকে নিয়ে এত আলোচনার কি আছে? পুলিশ নেই? আইন নেই?” সুজাতা পকোড়ায়‌ কামড় দিয়ে বলল, “করতে দে! ওদের এখন বললে শুনবে না। দেখবি একসময় দুজনেই থামবে। তারপর একটা মতে মিল হবে।” 

কিছুক্ষণ পর সুজাতার কথা সঠিক প্রমাণিত করে দুজনে থামল এই সিদ্ধান্তে‌, ‘বয়ঃসন্ধির সময়টা সন্তানের পক্ষে বিপজ্জনক সময়। এ সময় সন্তানকে যেমন চোখে চোখে রাখতে হয়, তেমনই বন্ধুর মতো মিশতে হয়।’ সুজাতা ঊর্মির দিকে তাকিয়ে বলে, “কি বলেছিলাম? মিলল তো? এদের দৌড় আমার জানা আছে।” ঊর্মি হাসতে হাসতে সুজাতাকে কিছু বলতে যাবে এমন সময় রজতাভ এসে বলে, “বলছিলাম কি আরেক কাপ কফি আর এক প্লেট পকোড়া হবে?” ঊর্মি চোখ পাকিয়ে বলে, “পকোড়া চলতে পারে কিন্তু কফি আর নয়! চারকাপ ইতিমধ্যে চালান করেছ! এরপর আরো খেলে সারারাত পেঁচার মতো জেগে থাকতে হবে।” 

- তাতে অসুবিধে নেই! রাত জাগার অভ্যেস আমার আছে। 

- একদম না! রাত জেগে জেগেই তো শরীরের সর্বনাশ করেছ! 

- ঊর্মি!

- কোনো কথা নয়।

- উফ! আচ্ছা ঠিক আছে। পকোড়াটাই চলুক।

- হুম! তবে এটাই লাস্ট। এরপর আর পাবে না। একদম রাতে খাবার খাবে।

- সেকি!

- আজ্ঞে হ্যা মশাই!আর হবে না। এটাই শেষ প্লেট।

- সুজাতা দেখো তোমার বান্ধবীর...


- আমাকে টেনে লাভ নেই! আমিও ওর দলে। বরং আমার ওনাকেও একই পরামর্শ দেব আমি। 

 এবার তথাগত বলে ওঠে, “ সেকি সু! তুমিও?”

- আজ্ঞে হ্যা! আমিও!

- বেশ আর কি করা যাবে? হোম ডিপার্টমেন্টের অর্ডার। তা এসো ভাই রজতাভ আর লড়ে লাভ নেই। নাহলে মঞ্জুর হওয়া এক প্লেট চিকেন পকোড়াও জুটবে না। 

(চলবে...
এই স্বল্পাকারের পর্বের জন্য একান্ত দুঃখিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। আসলে “প্রতিঘাত”-এর প্রুফ রিডিংয়ে সময় দেওয়ার কারনে অস্তরাগে সময় দিতে পারছি না। এই দীপান্বিতা কালিপুজোয় আসছে “প্রতিঘাত”।)

মঙ্গলবার, ১২ অক্টোবর, ২০২১

অস্তরাগ দশম পর্ব




মেকাপ সেরে ব্যাগ থেকে সালওয়ার কামিজ আর একটা হাউজকোট বের করে বিছানায় রাখল সুজাতা। হাউজকোটটা পরে নিয়ে তারপর গোটা ঘরময় ছড়িয়ে থাকা কাল রাতের পোশাক কুড়িয়ে আরেকটা ব্যাগে ভরে রাখল। কাল রাতের বেসামাল হবার চিহ্ন কাপড়ের এদিকে ওদিকে লেগে আছে। এগুলো বাড়ি ফিরে কাচতে হবে। যদিও ঊর্মি বলেছে এখানে ধোপা আছে। এখানকার রাঁধুনি মানে যাকে‌ ঊর্মি মলিদিদি বলে ডাকে তার বর নাকি কাপড় ধুতে দিয়ে আসেন প্রতি সপ্তাহে। তাও ঊর্মি এসব পোশাক দিতে পারবে না। নিজের কাজ নিজে করার বদঅভ্যেসের ফলে কাউকে দিয়ে কাজ করাতে গেলে তার বাধে। তার চেয়ে বরং ব্যাগে রেখে দেবে জামাকাপড়গুলো। বাড়ি ফিরে কেচে নেবে। তবে বাকি গুলো ধুতে সমস্যা না হলেও তথাগতর জামাটা নিয়ে একটু সমস্যা হবে। 


তথাগত মদ খুব কমই খায়। বলতে গেলে অকেশন ছাড়া গ্লাস হাতে নেয় না। নিলেও হজম করতে পারে না। চার পেগের বেশী খেলেই বমি করে ভাসিয়ে দেয় সে। কাল রাতে খাবার পালা শেষ করে তিনজনে বসেছিল অল্প ওয়াইন নিয়ে। রজতাভ হার্ট অ্যাটাকের পর ঊর্মির ঠেলায় মদ খাওয়া কমিয়েছে। এখন ভীষণ রকমের সাবধানী ও। খাবার সময়ও ওরা চিকেন কারি দিয়ে রুটি খেলেও রজতাভ শুধু চিকেন স্যুপ খেয়েছে।


খাবার পর ওরা যখন গ্লাস হাতে বৈঠকখানায় বসল। রজতাভর হাত খালি দেখে তথাগত বলে উঠেছিল, “ আরে একটা দিন তো! কিছু হবে না ভায়া। তাছাড়া ওয়াইন খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো!”

রজতাভ হেসে বলেছিল, “ না হে! অনেকদিন হল ওসব খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। বুঝতেই পারছ আমার হৃদযন্ত্রের ক্ষতটি এতটাই প্রবল যে কটা বছর ড্রাই থাকতে বলেছে ডাক্তার। একদম কড়া নিয়মে তেল মশলা বাদ গেছে। বলেছে এক পেগ খেলেই ক'দিন পরেই দেওয়ালে ছবি হয়ে ঝুলতে হবে। প্রাণের দায় বড়ো দায় হে! তোমরা খাও। তাছাড়া তোমরা বেহেড হলে ঘরে পৌঁছে দিতে একজন সুস্থ পাবলিকেরও দরকার! চিন্তা নেই সেই রোলটাও আমিই করবো।”

ঊর্মি বলেছিল,“ আমিও বাবা দু পেগের বেশী নেব না।‌ কাল অনেক কাজ আছে। তোরাও বেশী নিস না। নাহলে কাল সারাদিন হ্যাংওভারের ভারে বসে থাকতে হবে। তার উপর তথাগত শুনেছি বেশী খেতে পারে না।”

- সে আর বলতে? চার পেগেই বাবু উল্টে যান আর ঝক্কি আমাকে সামলাতে‌ হয়।

- আজ আমি অ্যালকোহল ইনটলারেট বলে এভাবে বললে সু?

- বেশ করেছি! শোনো অলরেডি দুই পেগ হয়ে গেছে। এটার পর আর খাবে না। সোজা নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়বে।

- আর তুমি?

বলে ভ্রু কুঁচকে‌ তাকায় তথাগত। ততক্ষণে লাল পানীয়ের নেশা অল্প অল্প করে মৌতাত তৈরী করছে সুজাতার মধ্যে। সে মুচকি হেসে জড়ানো অথচ দুষ্টুমিতে ভরা আদুরে গলায় বলে, “ আমি? উম... আমি বরং আজ সারারাত ঊর্মির সাথে গল্প করে কাটিয়ে দেব।‌ কি রে? মনে আছে? সেই এক্সকারশনের সময় রাতে রেস্টরুমে বসে তুই, আমি, কুসুমিতারা সারা রাত আড্ডা দিতাম? তা আজ হবে নাকি?”

- হুম! তার পরের দিন সব কটাকে হাই তুলে ম্যাডামের বকুনি খেতে হত। তবে আজ আর সেই আশা নেই কারন এখন তোর সাথে বসলে সারারাত তুই ভাট বকবি! তুই কি রে? তথাগতকে তিন পেগের জন্য বকছিস এদিকে নিজে চারপেগ গিলে বসে আছিস!

- আরে দুর! ওয়াইনে নেশা হয় নাকি? নেশা তো করেছি আমরা কলেজে! তোর মনে আছে? সেই শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসবে গিয়ে ঘুরে ফেরার পথে তাড়ি খেয়েছিলাম?  উফ! ওটার কাছে এটার নেশা তুচ্ছ। এসবে আর কি নেশা হয়?

- হয়! আর তোকে দেখে বোঝা যাচ্ছে কতটা নেশা হয়ে গেছে। আমারই ভুল এসব নিয়ে বসা উচিত হয় নি। অ্যাই ওঠ! আর খেতে হবে না। তথাগত, ওকে ধরো। আর খেতে হবে না। চলো ওকে ঘরে শুইয়ে দিয়ে‌ আসি। আর এই যে তুমি! ওদিকে বসে কি তামাশা দেখছ? এসো হাত লাগাও! নাহলে সুজাতাদেবী আজ এখানেই শয্যা নেবেন। 

রজতাভ দুরে বসে ওদের কাণ্ড দেখছিল আর মুচকি মুচকি হাসছিল। ঊর্মির কথায় হাসতে হাসতে বলল, “ বেশ হবে! কে বলেছিল? খাবার পর ওয়াইন পার্টি করতে? যেখানে একজন অ্যালকোহল ইনটলারেট আর অপরজন ননস্টপ ড্রিঙ্কার! নাও বোঝো ঠেলা !”

- বাজে জ্ঞান না দিয়ে এদিকে এসে হেল্প করো! এই সুজাতা! আরে এতো শুয়ে পড়ছে! তথাগত শক্ত করে ধরো!

- কাউকে লাগবে না। দাঁড়াও আমি ধরছি। অনেক রাত হয়ে গেছে। তোমরাও শুয়ে পড়ো। কাল সকালে কথা হবে। গুডনাইট!

বলে তথাগত হাতের গ্লাসের পানীয়টা শেষ করে গ্লাসটা টেবিলে রেখে সুজাতাকে কোলে তুলে নিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে আবার সোফায় বসে পড়ে। বেগতিক দেখে রজতাভ উঠে আসে নিজের চেয়ার ছেড়ে। তারপর তিনজনে মিলে সুজাতাকে ধরে ঘরে নিয়ে যায়।

ঘরে ঢুকে সুজাতা ইশারায় বাথরুমে যেতে‌ চাইলে তথাগত ওকে ধরে বাথরুমে নিয়ে যায়। বাথরুমে ঢুকে বেসিনের কল খুলে ওর চোখে মুখে জল ছেটায় তথাগত।

চোখে মুখে ঈষদুষ্ণ জলের স্পর্শ পেয়ে কিছু আরাম লাগে সুজাতার। তারপর হঠাৎ রজতাভদের চমকে একটা প্রচণ্ড ‘ওয়াক’ শব্দ তুলে বমি করে বসে সে। সুজাতার মুখ থেকে ঝলকে ঝলকে বেরিয়ে আসে সদ্য উদরস্থ হওয়া লাল ওয়াইন। বাথরুমের বেসিন ভেসে যায় সেই বমিতে। বমির ছিটে এসে পড়ে তথাগতর জামাতেও। বমি না থামা পর্যন্ত তথাগত কিছুক্ষণ নির্বিকারভাবে ধরে থাকে সুজাতাকে। পিঠে হাত বুলিয়ে, কখনো মৃদু চাপড় মেরে দেয় যাতে বমিটা থামে। বেশ কিছুক্ষণ বমি করার পর একটু হাল্কা লাগলে চোখে মুখে আবার জল ছিটিয়ে তথাগতর কাঁধে ভর দিয়ে বেরিয়ে আসে সুজাতা। 

সুজাতাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তথাগত একটু ইতস্তত করলে রজতাভ বুঝতে পারে সে কি চাইছে। সে ইশারায় ঘরের একটা কোণ দেখিয়ে বলে, “ওদিকে আপাতত রেখে দিতে পারো। কাল বীরেন্দর দাজু এলে বাসি কাপড়ের বাস্কেটে দিয়ে দেবে। আমরা এলাম। রাতে কোনো প্রবলেম হলে ডাকবে। ঊর্মি এসো। গুড নাইট!”

বলে ঊর্মিকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার নবটা টেনে দেয় রজতাভ। তথাগত এগিয়ে ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে সুজাতার আর ওর পরনের জামাটা খুলে ঘরের এককোণে ফেলে দেয় রজতাভ। তারপর বাথরুমে হাত-মুখ ধুতে গিয়ে আপনমনে হেসে ফেলে। 

বাথরুম থেকে বেরিয়ে হাত-পা মুছে বিছানায় শুয়ে তথাগত সুজাতার দিকে তাকায়। ঘরের নাইটল্যাম্পের আলোয় দেখে সুজাতা ইতিমধ্যেই প্রায় ঘুমে ঢলে পড়েছে। ওয়াইনের প্রভাবে সুজাতার ফর্সা মুখে হাল্কা লালচে আভা এসেছে। কপালে অল্প ভেজা চুল লেপ্টে আছে। বাকি চুলগুলো গোটা মুখে ছড়িয়ে। যার ফলে লাইটল্যাম্পের আলোয় আরো মোহময়ী লাগছে সুজাতাকে। সুজাতার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তথাগত। বিয়ের প্রায় তিন বছর হতে চলল। সুজাতার শরীরের সমস্ত বাঁক, সমস্ত অলিগলি, খাঁজ তার চেনা। কিন্তু তবুও যতবার সে সুজাতাকে নিরাবরণ অবস্থায় দেখে ততবার তার মনে হয় তার কিছুই দেখা হয় নি। প্রতিবার সুজাতাকে একইরকম স্নিগ্ধ অথচ রহস্যময়ী লাগে তার। কিছুক্ষণ সুজাতার নিরাবরণ দেহের অপার্থিব সৌন্দর্যের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে তথাগত। তারপর মুচকি হেসে সুজাতাকে টেনে নেয় নিজের দিকে।

কাল রাতের কথা মনে পড়তেই লজ্জায় লাল হয়ে যায় সুজাতা। ইস! কাল রাতে নেশার ঝোঁকে কি কাণ্ডটাই না ঘটিয়েছে ওরা! ছিঃ! ছিঃ! রজতাভরা কি ভাবছে কে জানে? বিয়ের পর এরকম বেসামাল কোনোদিনই হয় নি সে। বরং তথাগত বেসামাল হলে সামলেছে। কাল রাতে কি যে হল ওর কে জানে? ভাবতে ভাবতে তথাগতকে ডাক দেয় সুজাতা। ঘুমের ঘোরে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করার পর তথাগত‌ চোখ মেলে তাকায়। তারপর সুজাতার একটা হাত ধরে হ্যাচকা টান মেরে জড়িয়ে ধরে। সুজাতা লজ্জায় তথাগতর বুকে আদুরে চড় মেরে বলে,“আহ! কী হচ্ছেটা কি? ছাড়ো!কত বেলা হয়েছে খেয়াল আছে?”

সদ্যস্নাতা সুজাতাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ওর ভেজা চুলের আঘ্রান নিতে নিতে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে তথাগত বলে ওঠে, “উহু! এখনও অনেক দেরী। আরেকটু ঘুমোবো।”

- ওরকম করে না লক্ষ্মীটি! বাইরে রজতদা, ঊর্মি আছে। ওরা কি ভাববে বলো তো?

- কিছু ভাববে না। ওরা জানে কাল রাতে ঠিক কি হয়েছে?

“ অ্যাঁ!” বলে ছিটকে ওঠে সুজাতা। তথাগতর দিকে তাকিয়ে থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করে “ওরাও জানে?”

একটা প্রকাণ্ড হাই তুলে আদুরে গলায় তথাগত বলে, “ বাহ! জানবে না? কাল রাতে তুমি যে হারে চেঁচিয়েছ‌ , ও চিৎকার বোধহয় মলিদিদির বাড়িতেও পৌঁছে গেছে।”

লজ্জায় লাল‌ হয়ে তথাগতর হাতে একটা চড় মেরে সুজাতা বলে, “ধ্যাত! বাজে বোকো না।”

- আমি বাজে‌ বকছি? বেশ ঊর্মিদের জিজ্ঞেস করে দেখো ওরা কি বলে?

- ইস! ছিঃ! ছিঃ! লোকের বাড়িতে এসে আমরা কিসব করেছি! তোমারও বলিহারি! কাল রাতে একটু কন্ট্রোল করতে পারলে না? ইস! ওদের সামনে কি করে মুখ দেখাবো? রজতদা কি ভাববে?

- কিছুই ভাববে না। আর কাল রাতে যা হওয়ার হয়ে গেছে! আর ভেবে লাভ নেই! ঐ যে তুমি বলো না? কি যেন? হ্যা! গতস্য শোচনা নাস্তি। কালকের চিন্তা বাদ দাও ! যদি ভাবতেই হয় তাহলে ভাবো আমাকে খোরপোশ দেবে কি করে? 

- খোরপোশ মানে?

 - বাহ রে! কাল রাতে যা হলো তার খোরপোশ দেবে না? তবে সত্যি কথা বলতে গেলে না দিলেও চলবে। কাল রাতে যা হল তাতে আই এম ইমপ্রেসড! এতদিন ধরে প্যাশনেট প্রেমিকাকে আদর করে এসেছি। সে আদরে সমর্পন ছিল, আদর ছিল।  কিন্তু কাল রাতে যা হল! কাল এক প্রেমিকার নয় বরং এক বাঘিনীর দর্শন করেছি। এতদিন ধরে বনদপ্তরে প্রচুর বাঘ সামলেছি। কোনোবারই কিছু হয় নি আমার। কিন্তু এই বাঘিনী কাল রাতে পুরো আচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত‌ করে দিয়েছে‌‌ আমাকে। বিশ্বাস না হলে ঘরের আলোটা জ্বেলে দিচ্ছি দেখতে পারো। কাল রাতের সংঘর্ষের চিহ্ন আমার সর্বাঙ্গে পাবে। সর্বাঙ্গে মানে সর্বাঙ্গে। দেখবে?

- অসভ্য!

- বটে? আমি অসভ্য? তা তো বলবেনই! এখন নেশা কেটে গেছে কিনা? এখন তো আমি অসভ্য, জংলী, বর্বর! আর আপনি তো কবির সুরঞ্জনা!

- অ্যাই! সুনীলবাবুকে নিয়ে কোনো কথা বলবে না! 

- আচ্ছা বেশ! তাহলে বাবলি বলি?

- ধুস! আমি কি বুদ্ধদেব গুহর নায়িকা নাকি?

- তাহলে কি বলি? হ্যা! তন্বীশ্যামা, শিখরদশনা, অবলতাঙ্গী, পক্কো বিম্বোষ্ঠা, পীনোন্নত পয়োধরা,রম্ভোরু... রম্ভোরু...

- ব্যাস! হয়ে গেল? মিস্টার রম্ভোরু? এবার যাও ফ্রেশ হয়ে ড্রইংরূমে এসো। আমি যাচ্ছি।

- আরে ওসব পরে হবেক্ষণ! এখন আর ওসব করতে ইচ্ছে করছে না।

- তাহলে কি করতে ইচ্ছে করছে?

- ওটাই যা হানিমুনে কাপলদের ইচ্ছে করে।

বলে সুজাতাকে কাছে টেনে নিবিড় ভাবে পরম আশ্লেষে চুমু খায় তথাগত। যেভাবে প্রজাপতি ফুলের মধু শুষে নেয় ঠিক সেইভাবে সুজাতার নরম ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁটের যাবতীয় আদ্রতা শুষে নিয়ে তিলে তিলে চেটে পুটে খেতে থাকে তথাগত। সুজাতা চোখ বুঁজে পরম আশ্লেষে তথাগতর এই আদরে সাড়া দেয়। ওর শঙ্খধবল হাতের সরু সরু আঙুলগুলো তথাগতর চুলে বিলি কাটতে থাকে। তথাগত দুহাতে সুজাতার মুখটা স্থির করে ধরে রাখে যাতে সুজাতা পালাতে না পারে। একসময় সুজাতা তথাগতকে মৃদু ধাক্কা মেরে সরিয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁটটা মুছে বলে, “ আর নয় মশাই! ঢের হয়েছে! সকালের পক্ষে ডোজটা বেশীই হয়ে গেছে। এবার উঠে পড়ো।” তথাগত বাধ্য হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “একটা কথা বলবো?” সুজাতা তথাগতর দিকে তাকিয়ে বলে,

- কি?

- মাঝে মাঝে এরকম মাতাল হলে মন্দ হয় না! বাড়ি ফিরে আরেকবার ট্রাই করতে হবে।

বলে চোখ মেরে বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয় তথাগত। সুজাতা দরজার সামনে তেড়ে এসে থমকে দাঁড়ায় তারপর ফিক করে হেসে বলে, “ বর্বর!”

দরজা খুলে ঘর থেকে বেরোয় সুজাতা। পায়ে পায়ে ড্রইংরুমে পৌঁছতেই দেখে ঊর্মি সোফায় বসে চা খাচ্ছে। সুজাতা মাথা নিচু করে ঊর্মির পাশের সোফায় বসা মাত্র ঊর্মি একটা কাপ সুজাতার দিকে এগিয়ে দেয়। 

কাপের মধ্যে হাল্কা সবুজাভ একটা তরল দেখে প্রথমে একটু ইতস্তত করে সুজাতা। তারপর এক চুমুক দিতেই প্রচণ্ড টক এবং প্রচণ্ড তেঁতোর একটা মিশ্রণের স্বাদে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার উপক্রম হয়। কোনো মতে বমি সামলে সুজাতা জিজ্ঞেস করে

- ওয়াক! এটা কি? 

- চিনিছাড়া কড়া লিকার চায়ের সাথে  লেবুর রস এবং একটু নিমপাতা্র নির্যাস। ডিটক্স করতে কাজে লাগে। কাল রাতে যা খেল দেখিয়েছিস , সেটার হ্যাঙ্গওভার থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র পথ।

- কি? লেবু চায়ে নিমপাতা কে দেয়?

- বায়না না করে পুরোটা খেয়ে নে। দেখবি মাথা ধরাটা ঠিক হয়ে গেছে। তোর বর বুঝি এখনও ঘুমোচ্ছে? স্বাভাবিক! ওর জন্যেও এককাপ তৈরী করা আছে। দুজনে মিলে লক্ষ্মী ছেলে মেয়ের মতো এটা খেয়ে নিয়ে চুপচাপ রেস্ট নেবে। কাল রাতে অনেক ধকল গেছে দুজনের। জাতে মাতাল হলে কি হবে? দুজনে কাল রাতে তাল ঠিকই দিয়েছ! না নিজে ঘুমিয়েছ না আমাদের ঘুমোতে দিয়েছ!

কাপের পানীয়তে সবে চুমুক দিয়েছিল সুজাতা। ঊর্মির কথা শুনে বিষম খেয়ে বসে। ঊর্মি দুষ্টু হেসে বলে,

- থাক আর লজ্জা পেয়ে বিষম খেতে হবে না! তোদের ভাগ্য ভালো রাতে এখানে আমরা ছাড়া আর কেউ থাকি না। বাপরে! কাল রাতে যেভাবে চিৎকার জুড়েছিলি তুই! মনে হচ্ছিল শুধু আমরা না আশেপাশের প্রত্যেকে শুনে ফেলবে। তা হ্যা রে? তথাগতকে কি খাওয়াস বলতো? নেশায় টাল হয়েও এত স্ট্যামিনা?চার পাঁচ রাউণ্ড‌ তো হবেই! না মানে তোর রজতদাকেও খাওয়াতাম। হার্টের অপারেশনের পর স্ট্যামিনা কমে গেছে কিনা!

- বেশী কিছু না! একটা ডিম, একটা কলা আর দুপিস মাখন লাগানো সেঁকা পাউরুটি আর সকাল সকাল একটা লম্বা মিষ্টি চুমু। ব্যস! তাহলেই দেখবে রজতাভর সারাদিনের এনার্জি ফিরে এসেছে।

দুজনে চমকে পেছন ফিরে তাকায়। দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে তথাগত। তথাগতর কথায় সুজাতা লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। ইস কার সামনে কি বলতে হয় সেটুকু সেন্স নেই লোকটার! ঊর্মি যে ওর বন্ধু হয় এইটুকু খেয়ালও নেই ওর! কে জানে ঊর্মি কি ভাবছে?  পায়ে পায়ে ড্রইংরুমে এসে সুজাতার পাশে বসে তথাগত। ঊর্মি চায়ের মিশ্রনের কাপটা এগিয়ে দিতে অবলীলায় সেটা একঢোকে শেষ করে বলে, “ হুম! নট ব্যাড! কাল রাতের মিষ্টির পর এত ভালো ডিটক্স! সত্যি কথা বলতে তোমার জবাব নেই ঊর্মি! সত্যি কাল রাতে আমরা বড্ড জ্বালিয়েছি তোমাদের। একে ওর বমি করে ভাসানো, তারপর সারারাত ধরে লতা মঙ্গেশকরের মতো রেওয়াজ করা, আমরা সত্যিই লজ্জিত! আরেকটা কাজ করবে প্লিজ? এটার রেসিপিটা আমাকে বা সুজাতাকে লিখে দেবে? না মানে আবার কোনো দিন যদি আবার এরকম মুহূর্ত তৈরী হয় তখন ব্যাকআপ হিসেবে এটা বানানো থাকবে। বেসামাল হতে দেখলেই পেগ পাল্টে দিয়ে ডিটক্সটা ধরিয়ে দেব। ” মৃদু হেসে‌ ঊর্মি বলে,

- ডিটক্সের দরকার নেই! তোমার মতো কেয়ারিং বর থাকলেই হবে। যেভাবে কাল সামলালে ওকে সত্যি বলছি আমার এই সখীটির পতিভাগ্য অতীব ভালো।

- অথচ ও মানতে‌‌ চায় না জানো?

লজ্জায় মাথা কাটা যাবার উপক্রম হয় সুজাতার।‌ একে কাল রাতে নেশার ঝোকে কী করছে তার কোনো খেয়াল ছিল না তার উপর সুযোগ বুঝে তথাগত ইচ্ছে করে ওকে টিজ‌ করছে... ইস! কেন যে মরতে কাল খেতে গেল ও! ঊর্মি কি ভাবছে ওর ব্যাপারে? ছিঃ! ছিঃ! তথাগতকে একা পাক একবার! ওর কপালে দুঃখ আছে। কথার প্রসঙ্গ ঘোরাতে সুজাতা জিজ্ঞেস করে, "ওর কথা বাদ দে তো! সব জায়গাতেই বাড়াবাড়ি! রজতদা কোথায়? বাইরেও দেখতে পাচ্ছি না। সেও ঘুমোচ্ছে নাকি?"

তথাগত ফুট কাটে, “ঘুমোতেই পারে! কাল রাতে যা হল! বেচারা হয়তো একফোঁটা ঘুমোতেই পারেনি!”

- আমার‌ ঘুম এমনিতেও কম হে ভায়া! রাতে মোট চারঘন্টা কি পাঁচঘন্টা ঘুমোই। বরং ঊর্মি অনেকক্ষণ ঘুমোয়!

বলতে বলতে ঘরে ঢুকে জুতোর ফিতে খুলে সোফায় এসে বসে রজতাভ। তথাগত হেসে বলে, “ ইস! আগে বলবে তো মর্নিংওয়াকে বেরোচ্ছ! আমিও যেতাম!”

- ইচ্ছে তো ছিল! কিন্তু কাল রাতের খ্যাটনের পর ক্লান্ত হয়ে ঘুমোনোর পর সকাল সকাল রূপসী বউয়ের সঙ্গ ছেড়ে এই হার্টের রুগীর সাথে বেরোবে কিনা সেই আশঙ্কায় আর ডাকিনি।

লজ্জায় সুজাতার‌ মাটিতে‌ মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। শেষমেশ রজতদাও এ নিয়ে ইয়ার্কি মারছে!  মনে মনে কান ধরে সুজাতা। আর জীবনেও ওয়াইন তো দুরস্থ অ্যালকোহলও ছোঁবে না সে! সুজাতার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে ঊর্মি বলে ওঠে ,“ আচ্ছা হয়েছে! এবার থামো তোমরা! একে মেয়েটা কাল রাতের কাণ্ডের পর লজ্জায় মিশে যাচ্ছে তার উপর তোমরা ওকে আরো লজ্জায় ফেলে দিচ্ছো! বাদ দাও ও কথা। তা সকলেই যখন আছি তখন আজকের ট্যুরের প্ল্যানটা করে নেওয়া যাক!”


*****

নদীর ধারের পাথরের চাইয়ের উপর বসে হাতের মোজাটা খুলে জলে আঙুল ডোবালো সুজাতা। বরফের মতো শীতল কনকনে ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে প্রথম সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠলেও পরক্ষণে কনকনে ভাবটা সয়ে এলো আর সুজাতা অনুভব করতে লাগল জলের আলগা স্রোতটাকে। গতবছর জুন মাসে‌ ওরা কাশ্মীরে গিয়েছিল। সেবারই নৌকোবিহারের প্রেমে পড়ে সে। ডাল লেকে নৌকোতে ঘোরার সময় ইচ্ছে থাকলেও হাত ডোবাতে পারেনি সে। সেই সাধ মেটাতে একবছর পর আজ তিরতির করে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর স্রোতে হাত ডুবিয়ে চোখ বুঁজে একটা আরাম অনুভব করল সে। অবশ্য বেশীক্ষণ এই সুখ সহ্য‌ হল না সুজাতার। ঊর্মির তারস্বরে ডাকাডাকিতে বাধ্য হয়ে ফিরে এসে ঊর্মির পাশে বসল সে।

জায়গাটার নাম আগেও শুনেছে সে। ভীষণ অদ্ভুত আর মিষ্টি একটা নাম, কালীঝোড়া। এই জায়গাটা মানে নদীর এই তীরটা পিকনিক স্পট বলেই পরিচিত। শুধু ওরাই নয় আরো অনেক পর্যটক এসে ভীড় করেছে এখানে। বেলা দশটা বাজলেও জায়গাটা লোকের ভীড়ে সরগরম। আশেপাশে ‌পাথরের উপর বসে অনেকে সেরে নিচ্ছে প্রাতরাশ। কেউ কেউ গাড়ি থেকে বাসনপত্র বের করে রান্নার তোড়জোর শুরু করে দিয়েছে। কিছু লোক দুরে গিয়ে ছিপ হাতে বসে পড়েছে। কাছেই একটা দল বসেছে। ছজনের একটা গ্রুপ, চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সকলেই কলেজপড়ুয়া। খাবার পালা শেষ করে গিটার, ড্রাম নিয়ে চারজন গানের আসর বসিয়েছে। মাঝে মাঝে গানের দু-একটা কলি ভেসে আসছে। গানগুলো বেশিরভাগ  বাংলা ব্যান্ডের গান। বেশীরভাগই ‘ফসিল’, ‘ক্যাকটাস’, ‘মহিনের ঘোড়াগুলি’র গানগুলো ঘুরেফিরে গাইছে ছেলে-মেয়েগুলো। ঊর্মির সাথে বসে ছেলেগুলোর গান শুনতে লাগলো সুজাতা। ডিম সেদ্ধ আর স্যান্ডউইচ প্লেটে করে এগিয়ে দিল তথাগতদের দিকে। তথাগতদের মনও তখন ছেলেমেয়েগুলোর দিকে চলে গেছে। খাবার পালা শেষ করে ক্যামেরাহাতে ওরাও জুড়ে গেছে ওদের সাথে। হাতছানি দিয়ে ডাকছে সুজাতাদেরও। 


সুজাতা যেতে চাইলেও বাধ সেধেছে ঊর্মি, বিড়বিড় করে বলছে, “ কোনো দরকার নেই! একে নতুন জায়গা, তার উপর অজানা অচেনা ছেলে-মেয়েগুলো। চুপচাপ বসে থাক! পিকনিক সেরে দুপুরের মধ্যে বেরোলে সন্ধ্যে সন্ধ্যে ফিরতে পারবো। রজতকে বলে লাভ নেই। ওখানে থেকে ওকে নড়ানো অসাধ্য। তারচেয়ে বরং তুই তোর বরকে ডাক। ” ফিক করে হেসে সুজাতা বলে,


- হুম, তারপর তিনজনে বসে ঐ মনাস্ট্রির সাধুদের মতো ধ্যানে বসি। ওম মণিপদ্মে হুং।‌ 

- ঠাট্টা‌ করছিস?

- করবো না? পিকনিকে লোকে মজা করতে আনন্দ করতে আসে। চুপচাপ বসে কী করবে? লুডো খেলবে? তুইও যেমন! নতুন জায়গায় নতুন মানুষের সাথে না মিশলে, তাদের সাথে দেখা না করলে মজা কোথায়? আর ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখ! কি সুন্দর গাইছে! মনে আছে? সেবার বসন্তোৎসবে শান্তিনিকেতনে পিকনিকে আমরা গিয়েছিলাম? তুই, আমি, চৈতি, সাথী। সাথীটা কি সুন্দর নাচতো। সেবার পিকনিকে আমরা ‘ আয় তবে সহচরী’ গাইলাম, চৈতি আর সাথী নাচলো মনে নেই। 

- ওসব দিন আর নেই! চলে গেছে। বিয়ের পর ওসব আর আমাদের মানায় না।

- তো কি মানায় শুনি? সারাদিন রান্নাঘরে রান্নাবান্না, কাজের লোকের সাথে কূটকচালি, আর রাতে খাবার পর বরের সাথে ইয়ে? তা তো বছরে ৩৬৫ দিনই করি আমরা। মাঝেমধ্যে স্বাদবদলের জন্য একটু বাধনছাড়া, একটু বেলাগাম হতে ক্ষতি কি? আগে তো এত গোঁড়া ছিলি না তুই!

- ক্ষতি নেই? বেলাগাম হলেই তো যত ক্ষতি! বেলাগাম হলেই ঘোড়া হোক বা মন অবাধ্য হয়ে ওঠে।

- তা উঠুক না! মনকে তো সারাজীবন চাবুক মেরে চুপ করিয়ে রাখি আমরা। কষ্ট পেলেও মুখ ফুটে বলি না। কটা দিন যদি অবাধ্য হয় হোক! মন এটা কোনো বুনো ঘোড়া নয় যে পালিয়ে যাবে। একসময় দাপাদাপি করে ক্ষতবিক্ষত হয়ে নিজে ফিরে আসবে তোর কাছে।

- আর মনের মানুষটাই যদি অবাধ্য হয়ে ওঠে?

- মানে?

- ধুস কি ভাবে বোঝাই? ঐ ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখ। ওদের বেশভুষা কেমন যেন হিপিদের মতো। কোথা থেকে এসেছে কে জানে? সাথে কোনো গার্জেনও নেই।‌ তার উপর ঐ যে ফরসা করে মেয়েটা, ঐ যে সিগারেট খাচ্ছে। কী বাজে দেখতে লাগছে বল।

- তো? কী বলতে চাইছিস বুঝতে পারছি না।‌ সিগারেট খাওয়াটা খারাপ জানি। তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য। এতে‌ বাজে দেখার কী আছে?

- আরে অন্ধ! দেখতে পারছিস না মেয়েটা তথাগতদের সাথে ঢলাঢলি করছে! বাজে মেয়েছেলে একটা! দেখেই মনে হচ্ছে ছেলে ঢলানি মেয়ে। এসব মেয়েদের পাল্লায় পড়লে সংসার ভেসে যায়! তুই তাড়াতাড়ি তথাগতকে ডাক। তোর রজতদার ব্যবস্থা আমি করছি। এতদিন তো বিয়ে হলো এটাও বলে দিতে হবে? স্বামীকে ধরে রাখতে শেখ! অন্য জায়গায় যেতে দিবি না!


- বুঝলাম! তোর মাথাটা‌‌ পুরো গেছে! তোকে মাথার ডাক্তার দেখাতে হবে। মেয়েটাকে দেখ! হ্যা ডেঁপো মেয়ে বলা যেতে পারে কিন্তু আসলে তো বাচ্চা মেয়ে! আঠেরো- উনিশ হবে বয়স! ও ভোলাবে বুড়ো দুটোকে?

- সুজাতা তুই বুঝতে পারছিস না।

- ধুস! সবসময় পাড়ার কাকিমাদের মতো খিটখিট করিস‌ না তো! বেড়াতে এসে এটুকু আনন্দও করবো না? তাহলে এলাম কেন? বাড়িতেই থাকতে পারতাম! আচ্ছা বেশ! এতই যখন হারানোর ভয় তখন চল একসাথে গিয়ে নিয়ে আসি ওদের।

- না আমি যাবো না!

- কেন? 

- ওখানে কতগুলো ছেলে বসে আছে না? অতোগুলো ছেলের সামনে আমি যাবো? আশেপাশে এত লোক আছে। ওরা কি বলবে?

ঊর্মির কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায় সুজাতা তারপর হো হো করে হেসে বলে, “ব্যস? দম ফুড়ুত? এই সাহসে স্বামীকে ধরে রাখবি? স্বামীকে বাঁচাতে সাবিত্রী যমরাজের দরবারে ঢুকে গিয়েছিল। আর তুই সামান্য কটা বাচ্চা ছেলেকে ভয় পাচ্ছিস? না রজতদা ঠিকই বলে! তুই দিন দিন টিপিক্যাল কাকিমা হয়ে যাচ্ছিস!তবে তুই থাক আমি যাচ্ছি!”

বলে ঊর্মিকে রেখে‌ তথাগতদের দিকে এগিয়ে যায় সুজাতা। তথাগত সুজাতার সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর রজতাভ ফিরে এসে একরকম জোর করে টেনে নিয়ে আসে ঊর্মিকে। প্রথম প্রথম আড়ষ্ট থাকলেও পরে ঊর্মিও সহজ হতে শুরু করে।‌ গানের আসর শুরু হয় আবার। তবে এবার রজতাভ গান ধরে,

- ভালোবাসি জ্যোৎস্নায় কাশ বনে ছুটতে/ছায়া ঘেরা মেঠো পথে ভালোবাসি হাঁটতে।
দূর পাহাড়ের গায়ে গোধূলীর আলো মেখে/ কাছে ডাকে ধান খেত সবুজ দিগন্তে।
তবুও কিছুই যেন ভালো যে লাগে না কেন/উদাসী পথের মাঝে মন পড়ে থাকে যেন
কোথায় রয়েছে ভাবি লুকিয়ে বিষাদ তবুও।

ছেলে-মেয়েগুলো গানের তালে তালে গিটার, ড্রাম বাজাতে থাকে। সুজাতা‌ রজতাভর সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে ওঠে,

- ভালো লাগে ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে ভাসতে/প্রজাপতি বুনো হাঁস ভালো লাগে দেখতে।
জানলার কোণে বসে উদাসী বিকেল দেখে/ভালোবাসি এক মনে কবিতা পড়তে।
তবুও কিছুই যেন ভালো যে লাগে না কেন/উদাসী পথের মাঝে মন পড়ে থাকে যেন,
কোথায় রয়েছে ভাবি লুকিয়ে বিষাদ তবুও।

এরপর সকলে একসাথে কোরাসে গেয়ে ওঠে, 

- যখন… দেখি ওরা কাজ করে গ্রামে বন্দরে/ শুধুই.. ফসল ফলায় ঘাম ঝরায় মাঠে প্রান্তরে।
তখন.. ভালোলাগে না, লাগে না কোন কিছুই
সুদিন.. কাছে এসো,
ভালোবাসি একসাথে এই সব কিছুই।

ওদের গানের তালে আশেপাশে উপস্থিত সকলে একে একে যোগ দেয়। একসময় আশেপাশের চার-পাঁচটা দল একটা দলে পরিণত হয়। মেয়েরা একসাথে সকলের দুপুরের খাবারের আয়োজন করে। ছেলেরা নাচে-গানে, খেলায় জমিয়ে দেয় পিকনিক স্পটটাকে। খাবার তৈরী হলে পাত পেড়ে বসে পড়ে সকলে। 

ফেরার পথে গাড়িতে লুকিং মিররে তাকায় রজতাভ। দেখে তথাগতর কাঁধে মাথা রেখে ক্লান্ত সুজাতা ঘুমিয়ে পড়েছে। তথাগতর অবস্থাও তাই। পাশ ফিরে দেখে ঊর্মি জানলার দিকে মুখ করে বসে। একদৃষ্টে সে চেয়ে আছে খাঁদের দিকে। রজতাভ সামনের রাস্তায় মনোযোগ দেয়। আর কিছুক্ষণ ঊর্মির দিকে তাকালে সে দেখতে পেত ঊর্মির চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে অশ্রুধারা। সে অশ্রু অনুতাপের। যে মেয়েটাকে নিয়ে সুজাতার কাছে নিন্দে করছিল সে, পরে রজতাভর কাছে জানতে পেরেছে মেয়েটা সদ্য মাকে হারিয়ে ক্রমশ অবসাদে ভুগে নিজেকে শেষ করে ফেলছিল। মেয়েটা শোক দূর করতে, আর মন ভালো করতেই ওর বন্ধুবান্ধবরা ওকে নিয়ে এসেছে। সত্যি মেয়েটার ব্যাপারে না জেনে কত কথাই না বলেছে সে। দুপুরে মাংসের এক্সট্রা পিস দেওয়ায় কি খুশি হয়েছিল মেয়েটা! মিষ্টি করে হেসে থ্যাঙ্ক ইউ বলেছিল। এরকম একটা মিষ্টি মেয়ে পাওয়ার ইচ্ছে ঊর্মির চিরকালের। কিন্তু বিয়ের চার বছর পরেও আজও ওরা সন্তানহীন। অথচ ওদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই!

আছে কি? তা আছে! রজতাভ যতবার এগিয়ে এসেছে, ততবার ওকে সরিয়ে দিয়েছে। যতবার‌ আদর করতে চেয়েছে ততবার ওকে শরীর খারাপের কথা বলে থামিয়েছে। অবশেষে হাজার মান-অভিমানের পর একবারই মিলিত হয়েছিল ওরা। তারপর তো... হার্ট অ্যাটাকের পর রজতাভ আর মিলিত হয় নি। বলাবাহুল্য ওই মিলিত হতে দেয়নি। কেন জানে না ওর মনে একটা ধারনা বদ্ধমূল হয়েছে যে ওর সাথে মিলিত‌ হলে রজতাভ আর বাঁচবে না। এই ভয়ে সে আর‌‌‌ মিলিত হয় নি। সেদিনের পর থেকে আজকাল রজতাভকে হারানোর একটা ভয় প্রায়ই ওকে কুড়ে কুড়ে খায়। অথচ ওরও ইচ্ছে করে রজতাভ ওকে ভালবাসুক, বেলাগাম আদর করুক। শরীরে, মনে কানায় কানায় সুখের আদরে ভরে তৃপ্ত করুক। কিন্তু ওকে হারানোর ভয়ে কাছে আসতে দেয় না। 

সুজাতা বলেছিল মাঝে মাঝে বেলাগাম হলে দোষ নেই। কিন্তু বেলাগাম হতে গিয়ে মানুষটা কে চিরতরে হারিয়ে ফেললে যে ও শেষ হয়ে যাবে! কাজেই চাইলেও মনকে প্রশ্রয় দেয় না ও। শরীরে দাবানল জ্বলে উঠলেও পাত্তা দেয় না ও। 

(চলবে...)

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...