অনুসরণকারী
শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১
জাল
রবিবার, ২৭ জুন, ২০২১
রামধনু এফ.এম
“ ৯১.১৯ রামধনু এফ.এম-এ আপনারা শুনছেন ‘জলতরঙ্গ’ এবং আপনাদের সাথে রয়েছি আমি মধুজা।
আচ্ছা কেউ কি খেয়াল করেছেন আজকের সন্ধ্যেটা, আজকের এই
রাতটা বেশ অন্যরকম না? মানে সারাদিনের অসহ্য গরমের পর
একপশলা বৃষ্টি এসে যেন চারদিকের পরিবেশ কে একলহমায় পাল্টে দিয়েছে। ভীষণ গরমে
সারাদিন মুখ বুঁজে কাজ করে করে যাবার ক্লান্তি যেন একলহমায় অনেকটা কম হয়ে গেছে।
গরমের তেঁতে যাওয়া মাটি থেকে বেরোচ্ছে একটা মিষ্টি সোঁদা গন্ধ যা ক্রমশ নেশা ধরিয়ে
দিচ্ছে মগজে। তার সাথে যোগ্য সঙ্গত করছে মাঠেঘাটে ব্যাঙের দল এবং ঝিঁঝিঁপোকারা।
কলকাতা এবং শহরতলির শ্রোতারা এ রসে বঞ্চিত হলেও কলকাতার বাইরে যারা এই অনুষ্ঠান
শুনছেন তারা নিশ্চয়ই অনুভব করছেন আজকের এই রাতটাকে। অফিস থেকে ফিরে চায়ের কাপ হাতে
নিয়ে বারান্দায় আধো অন্ধকারে উপভোগ করছেন প্রকৃতির বৃষ্টিস্নাতরূপ। দেখতে পারছেন
পুর্ণিমার জ্যোৎস্নার আলো গাছের পাতায় থাকা জলের কুঁচির সাথে মিশে তৈরি করেছে একটা
মায়াময় পরিবেশ। মানে সব মিলিয়ে একটা বেশ মাদকীয় রোমান্টিক আবহাওয়া। আর এই আবহাওয়ায়
কয়েকটা মিষ্টি দেখে গান হলে কেমন হয়? ব্যাপারটা বেশ জমে
যাবে কি বলেন? ঠিক ধরেছেন! আজকের অনুষ্ঠানে এরকমই কিছু
বাছাই করা গান নিয়ে হাজির হয়েছি আমি। আজ অনেকক্ষণ আপনাদের সাথে আড্ডা দেবো সাথে
শুনে নেব আপনাদের কথা! তবে তার আগে অনুষ্ঠানটা শুরু করছি অরিজিত সিংহের কন্ঠে একটা
মিষ্টি প্রেমের গান দিয়ে। তারপর ফিরবো আজকের আড্ডার বিষয় নিয়ে। ততক্ষণ শুনতে থাকুন
‘জলতরঙ্গ’ ৯১.১৯ এফ.এম-এ।”
একটানা কথাগুলো বলে মাইক অফ করে
অভ্যস্থ হাতে কনসোলের মাধ্যমে ডেস্কটপে লিস্ট করা গানগুলোর মধ্যে প্রথম গানটা
চালিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো মধুজা। গোটা ঘর ছাপিয়ে বাইরে থাকা মাইক এবং সেই
মুহূর্তের প্রত্যেকটা রেডিওতে ৯১.১৯ এফ.এম-এ বেজে উঠলো অরিজিতের ভরাট সুরেলা কন্ঠস্বর, “ফির লে আয়া দিল,
মজবুর কেয়া কিজে…”। টেবিলে থাকা কফিমাগ
হাতে নিয়ে মৃদু চুমুক দিতে দিতে পরের গানগুলো সাজিয়ে নিতে লাগলো সে। গানগুলো তার
নিজের বাছাই করা। এই এক ক্ষেত্রে ওদের বস ছাড় দিয়েছে সবাইকে। শুধু শোয়ের আগে
জানিয়ে দিতে হয় আজকের টপিকটা কী নিয়ে, তারপর সেই টপিক
সম্পর্কিত সব গানবাছাইয়ের দায়িত্ব তাদের। এছাড়া সব জায়গাতেই খবরদারি তার। শো
টাইমের শিডিউলের সামান্যতম দেরী সহ্য করে না তাদের বস অংশুমান দেবনাথ। এমনকি অফিসে
দেরী করে পৌঁছলেও হাজারটা কৈফিয়ত হয় তাদের।
অবশ্য এতে অংশুমানকে দোষ দেওয়া যায় না।
অফিসটা সবে দু-বছর হলো খুলেছে। আর দুবছরের মাথাতেই প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের
প্রিয় হয়ে উঠেছে চ্যানেলটা। বিশেষ করে প্রৌঢ় আর বৃদ্ধ মানুষের কাছে সকালের
অনুষ্ঠানের ক্রেজ দেখার মতো। বাড়িতে দেখেছে সে বাবাকে রেডিও নিয়ে বসে থাকতে। ধীরে
ধীরে শহরে চ্যানেলটা গ্রোথ করছে ভীষণ স্লথগতিতে কিন্তু করছে। বড়ো বড়ো কোম্পানিদের
কাছে পাত্তা না পেলেও ক্রমশ চর্চায় আসছে ওদের চ্যানেল। এখন একটা ভুল হলে বা
শ্রোতাদের খুশি না করতে পারলে দায়টা অংশুমানের ঘাড়েই পড়বে। সে কারনে অংশুমানের
মেজাজ সবসময় চড়ে না থাকলেও যেদিন থেকে এখানে এসেছে সেদিন থেকে অংশুমানকে সব সময়
গম্ভীরমুখেই দেখে আসছে তারা। অংশুমানকে কোনোদিনও হাসতে দেখেনি কেউ। সবসময় ভ্রু
কুঁচকে কী যেন ভেবেই চলেছে সে। আর যখন পারছে তখন অফিসের কাউকে না কাউকে কাজে
ঢিলেমি দেওয়ার জন্য কথা শুনিয়ে চলেছে। অগত্যা অফিসের সবাই সবসময় অংশুমানকে বুঝে
শুনে চলে। কারো যদি ডাক পড়ে তাহলে অফিসে একটা কথাই ওঠে, “আজ হিটলারের হাতে
জবাই হলো বলে!”
গানগুলো ক্রমানুযায়ী সাজিয়ে নেওয়ার পর
কফিমাগ হাতে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মধুজা। একচুমুক দিয়ে বোঝে আজকেও কফিতে চিনি
দিতে ভুলে গেছে পল্টুদা। এ নিয়ে অংশুমানের সাথে আগেও ঝামেলা হয়েছে ওর। অংশুমানের
নর্মাল কফি পছন্দ, মানে চিনি, দুধ, আর
কফি সবকটাই সমান মাপের হবে। আর পল্টুদা বার বার এই নিয়ম ভাঙবে। কোনোদিন চিনি বেশি,
কোনোদিন দুধ,আবার কোনো দিন দুটোর একটা
কম। ব্যস! অংশুমানের মেজাজ চড়ে যাবে সপ্তমে। মাঝে মাঝে অংশুমানের মেজাজ গরম থাকলে
ওরা ধরে নেয় আজ কফিতে কেলেঙ্কারি করেছে পল্টুদা। আজকেও হয়তো এতক্ষণে হয়তো আবার
ঠাই ঠাই লেগে গেছে অংশুমানের সাথে। মুচকি হেসে কফিতে চুমুক দেয় মধুজা। নাহ সকাল
থেকে গলাটা খুসখুস করছে। চিনি ছাড়া হোক বা দুধ ছাড়া, গরম
পানীয়টা খেলে গলাটা খুলবে। অতীন বলতো “শোন! তোর যা
প্রোফেশন তাতে সুললিত কন্ঠের অধিকারীনি না হলেও খোলা গলার অধিকারীনি হতে হবে তোকে।
তার জন্য গলার যত্নটা কম্পালসারি। তাই রোজ গার্গল তো করছিস ঠিকই কিন্তু শোতে কফি,চা বা গরম পানীয় কিছু একটা খাবি! এতে গলা খোলে ভালো। আর সাথে যদি আদা
বা লবঙ্গ ফোটানো জল থাকে তাহলে তো কথাই নেই। দারুন কাজ করবে।”
অতীনের কথা মনে পড়তেই একটু আগে ফুটে
ওঠা হাসিটা মিলিয়ে যায় মধুজার। একবছর হয়ে গেল কোনো পাত্তা নেই হতভাগাটার। না
কোনো ফোন, না হোয়াটসঅ্যাপে রিপ্লাই। কোথায় আছে কেমন আছে কে জানে? স্টুডিওর জানলার দিকে তাকায় মধুজা। বৃষ্টি থামলেও আকাশে মেঘ এখনও থম
মেরে রয়েছে। রাতে আবার হয়তো একপ্রস্থ বৃষ্টি হবে। গতবছর ঠিক এরকমই এক বৃষ্টিমুখর
দুপুরে শেষ দেখা হয়েছিল ওদের। অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে বসেছিল ওরা পরস্পরকে। সেদিন
শ্রাবণের মেঘ ঘনিয়েছিল মধুজার দুচোখেও। অতীনের বুকে মাথা গুঁজে অনেকক্ষণ ফুপিয়ে
কেঁদেছিল সে। অতীন মধুজার মাথায় হাত বুলিয়ে বার বার প্রবোধ দিচ্ছিল, “আরে ধুর পাগলি! আমি কি সারা জীবনের মতো চলে যাচ্ছি নাকি?কয়েকটা মাসের তো ব্যাপার! দেখবি ঝপ করে কেটে গেছে। আর আমি ফিরে এসেছি।
তবে হ্যা তোর শো খুব মিস করবো আমি।” কিন্তু মধুজার কান্না
কিছুতেই থামছিল না। বার বার মনে হচ্ছিল এটাই যেন অতীনের সাথে ওর শেষবারের মতো
দেখা। অবশ্য প্রতিবার অতীনের ফেরার সময় হলে এই ভয়টাই জাকিয়ে বসতো মধুজার মনে।
অতীন না থাকলে সেই ভয়টাকেই আশ্রয় সরে আশঙ্কায় দিন কাটতো তার। অবশ্য সে ভয় কেটে
যেত অতীনের বাড়ি ফেরার পর। বাড়ি ফিরেই অতীন ওকে ফোন করে দরাজ গলায় গাইতো “তুম নে বুলায়া অউর হাম চলে আয়! দিল পুকারে চায়! চায়!গরম চায়!” বলে ফিক করে হেসে ফেলত নিজের রসিকতায়। কিন্তু সেদিন কেন জানে না
মধুজার কান্না থামছিল না। অতীন অনেক কষ্টে বুঝিয়ে শান্ত করেছিল মধুজাকে। তারপর
সেদিন সন্ধ্যায় নিজের কর্মক্ষেত্রে ফিরে গিয়েছিল ক্যাপ্টেন অতীন রায়চৌধুরী।
সম্বিত ফিরতেই কফি মাগটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসে মধুজা। দ্বিতীয় গানটা প্রায়
শেষের দিকে। গানটা শেষ হওয়ামাত্র মাইক অন করে অনুষ্ঠান শুরু করে সে।
অনুষ্ঠান শেষ করে মধুজা যখন স্টুডিও
থেকে বেরোলো তখন ঘড়ির কাটা প্রায় রাত সাড়ে নটার ঘরে পৌঁছে গেছে। নিজের টেবিলে গিয়ে
জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে অফিসের বাইরে বেরোনো মাত্র থমকে গেল মধুজা। গোটা রাস্তা
জলকাদায় অসম্ভব রকমের প্যাচপ্যাচে হয়ে আছে। এই জলকাদা পেরিয়ে বড় রাস্তায় ট্যাক্সি
ধরা অসম্ভব। রোজকার মতো সালোয়ার কামিজ বা জিন্স কুর্তি পরা থাকলে অসুবিধে ছিলো না।
কিন্তু আজ রবীন্দ্রজয়ন্তী। অংশুমানের কড়া নির্দেশ অফিসের সবাইকে আজ ট্র্যাডিশনাল
পোশাক পরে আসতে হবে। মেয়েরা শাড়ি পরবে আর ছেলেরা ধুতি পাঞ্জাবী। সেই মতো আজ অনেক
খুঁজে একটা লিনেন শাড়ি বেছে পরে এসেছিল সে। সারাদিনের গরমের পর বিকেলে এরকমভাবে
বৃষ্টি হবে কে জানতো? এই জলকাদায় এগোলে শাড়ি তো নোংরা হবেই, কাদায়
পা পিছলে পড়লে আরেক ঝামেলা। সাইডব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে উবের অ্যাপটা ওপেন করে
সে। কিন্তু সেখানেও কোনো ক্যাব এভেলেবল নেই দেখে প্রমাদ গোনে সে। আকাশের গতিক ভালো
ঠেকছে না, যখন তখন আবার বৃষ্টি আসতে পারে। কিন্তু এভাবে
তো আর সারারাত এখানে থাকতে পারে না সে! কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর বৃষ্টি আসছে দেখে
বড় রাস্তার দিকে পা বাড়ালো সে।
ট্যাক্সিটা যখন মধুজাদের পাড়ার সামনে
দাঁড়ালো তখন বৃষ্টির জোরটা বেশ বেড়ে গেছে। ভাড়া মিটিয়ে ছাতা মাথায় ট্যাক্সি থেকে
নামলেও বৃষ্টির ছাঁটে পুরোপুরি ভিজে গেল মধুজা। কোনো মতে বাড়ির সামনে পৌঁছে
কলিংবেল বাজালো সে। দরজা খুলে মধুজার মা বললেন, “আজ এত দেরী?” ঘরে
ঢুকে ছাতা বন্ধ করে দরজার পাশে রেখে মধুজা বলল, “ যা
বৃষ্টি শুরু হয়েছে! গোটা শহরে একহাঁটু জল জমে। তাও তো ট্যাক্সিওয়ালা শর্টকার্ট
দিয়ে নিয়ে এলো নাহলে আরও দেরী হতো।”
“একটা ফোন করতে পারতিস ! তেমন হলে তোর বাবা গিয়ে নিয়ে আসতো।”
“পাগল! কদিন ধরে বাবার সর্দির ধাতটা বেড়েছে
জানো? এই সর্দি নিয়ে যদি এই জলঝড়ের রাতে বেরোলে আর দেখতে
হবে না!”
“তাও দিনকাল ভালো নয়! না জানে কোথা থেকে কী…”
বলতে গিয়েও থমকে যান মধুজার মা। মধুজা বোঝে মা কী বলতে চাইছেন।
সে হেসে মায়ের কাঁধে হাত রেখে বলে, “উফ! মা! আমি এখন আর
কচি খুকি, বা কলেজে পড়া তন্বী নই। তাছাড়া যেখানে আমি কাজ
করি সেখানে এরকম কোনো ভয় নেই। কাজেই ভয় পেও না।”
“তাও এত রাত করে বাড়ি ফেরাটা…” বলে আমতা আমতা করেন মধুজার মা। মধুজা হেসে বলে “কাজটা না করলে যে বাড়িতে বসে বসে পাগল হয়ে যাবো মা! নাহলে প্রতিটা
মুহূর্তে অতীনের চিন্তা আমাকে পাগল করে দেবে। এর চেয়ে কাজে, গানে ডুবে থাকলেই আমি ভালো থাকি। আর লোকের কাজ হল কথা বলা, তাই বলে। আজ যারা আমার কাজ নিয়ে বলছে, তাদের
কথা শুনে আমি কাজ ছেড়ে বসে থেকে পাগল হয়ে গেলেও কথা বলবে। বলবে অতীন কবে ফিরবে তার
ঠিক নেই। তার চেয়ে অন্য কোনো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দাও। সবার কথা ভেবে, সবার কথা শুনে যদি চলি, তাহলে ভগবান আমাদের
বোধবুদ্ধি দিলেন কেন? ওসব কথা বাদ দাও আজকে রাতের মেনু কী
গো? খুব খিদে পেয়েছে!”
মধুজার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, “তোর সাথে কথায়
পারা যাবে না। যা ভেজা কাপড় পাল্টে হাত মুখ ধুয়ে আয়। আজকে তেমন বেশি কিছু রান্না
করিনি। ওবেলার চিংড়িমাছের ঝোল ছিল এবেলা শরীর ভালো লাগছিল না বলে ভাত করেছি। তুই
ফ্রেশ হয়ে নে আমি খাবার গরম করছি।”
“উফ! কী করেছটা কি মা? আজকের রাতের খাবার জাস্ট জমে যাবে মা!” বলে
মাকে জড়িয়ে ধরে মধুজা। “আরে আরে ছাড় ছাড়! বাইরের পোশাকে
ছুঁয়ে নিচ্ছে দেখো! আগে হাত মুখ ধুয়ে মাথাটা মুছে নে! ইস! শাড়িটার কি দশা করেছিস
মধু! পুরো কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে! শীগগিরই বাথরুমে বালতিতে ভিজিয়ে দিয়ে আয়! নাহলে
দাগ উঠবে না।” বলে চেচিয়ে ওঠেন মধুজার মা।
মধুজা মাকে ছেড়ে নিজের ঘরে ঢুকে
সাইডব্যাগটা টেবিলে রেখে আলনা থেকে একটা তোয়ালে আর একটা নাইটি নিয়ে ঢুকে যায়
বাথরুমে। পরনের পোশাক খুলে বাথরুমে বালতিতে ভিজিয়ে দিয়ে শাওয়ারের কলটা খুলে দেয়
সে। এটা ওর বরাবরের অভ্যেস। বাড়িরে ফেরার পর রোজ রাতে স্নান করে সে। বৃষ্টিতে
ভেজার পর তো আরও ভালো করে স্নান করে নেয় সে। এতে বৃষ্টির জলও ধুয়ে যায়, ঠান্ডাও লাগে না।
শাওয়ারের জল ক্রমশ ভিজিয়ে দেয় মধুজার সমগ্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে। সে অনুভব করতে থাকে
একেকটা জলকণাকে। যেন প্রতিটা জলকণা ক্রমশ তাকে স্নিগ্ধ করে তুলছে, ক্রমশ শুষে নিচ্ছে তার সারাদিনের যাবতীয় ক্লান্তিকে। সে অনুভব করে ধীরে
ধীরে তার শরীরটা পালকের মতো হাল্কা হয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমনটা হতো অতীনের সাথে দিনের
শেষে কথা বলার সময়।
সারাদিনের রোজনামচা, মনের কথা সবটা সে
রাতের বেলা ফোনে বলতো অতীনকে। আর অতীন নির্বাক শ্রোতার মতো ফোনে শুনে যেত ওর
একনাগাড়ে বকবক করে যাওয়া কথাগুলো। একবছর হতে চলল অতীনের সাথে তার কোনো কথা হয়নি।
অনেক কথা জমে আছে তাদের মধ্যে। কে জানে কোথায় আছে হতভাগাটা। ভাবতে ভাবতে শাওয়ার
বন্ধ করে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে নাইটিটা গায়ে গলিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে মধুজা।
সারাদিনের পর স্নান করে ফ্রেশ লাগছে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে সে দেখে মা টেবিলে
খাবার রাখছেন। মাছের ঝোলের একটা মিষ্টি ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে গোটা ঘরে।
নিজের ঘরে ঢুকে তোয়ালেটা মেলে দিয়ে এসে টেবিলে বসে মধুজা। মা তাকে ভাত বেড়ে দিয়ে
পাশে বসেন। বাটি থেকে অল্প ঝোল ভাতে নিয়ে মাখতে মাখতে মধুজা জিজ্ঞেস করে, “তোমরা খেয়েছ?”
মধুজার মা মাথা নাড়েন।
মধুজা ভাত মেখে খেতে থাকে চুপ করে।
কিছুক্ষণ পর মা জিজ্ঞেস করেন, “কালকেও কি তোর শো আছে?” মধুজা
চিংড়ি মাছে খোঁসা ছাড়িয়ে খেতে খেতে বলে, “হুম। কেন কাল কী
আছে?”
“না, একবার ভাবছিলাম
ওদের বাড়ি যাবো। অনেকদিন যাওয়া হয় না। কেমন আছেন ওনারা কে জানে? শুনেছিলাম অতীনের বাবার নাকি গতসপ্তাহে স্ট্রোকের মতো হয়েছিল।”
“হুম। পরে জানা গেছে গ্যাসের ব্যাথা উঠেছিল।
তার উপর নাকি নিউজ দেখছিলেন উনি। ব্যাস নির্ঘাত উত্তেজক কিছু খবর দেখে প্রেসার
বেড়ে গেছে। আমি খোঁজ নিয়েছিলাম এখন ঠিক আছেন।”
“তাও কাল আমি একবার দেখা করে আসবো। কাল ডুব
দিতে পারবি না?”
“না গো! কাল আমাদের অফিসে এক অনুষ্ঠান আছে।
আমাদের স্টেশন এবার শ্রুতিনাটক লঞ্চ করতে চলেছে। জয়ন্ত মিশ্র আসছেন কাল আমাদের
প্রথম শ্রুতি নাটকে।”
“কি যে এমন চাকরি করিস বুঝি না। জয়ন্ত মিশ্র
আসছেন তো তাতে তোর কি? এতদিন ধরে কাজ করছিস। একদিন ছুটি
পাবি না?”
মুচকি হাসে মধুজা, “রেডিও জকিদের কাজ
ওরকমই মা। সহজে ছাড় নেই। শো থাকলে করতেই হবে। আর আমি যদি ডুব দিই তাহলে আমার
যায়গায় আরেকজনের কাজের চাপ বেড়ে যাবে। কাজেই দা শো মাস্ট গো অন! তাছাড়া আমি না
গেলে শো হবে না। তবে চিন্তা করো না। কাল অফিসে যাবার সময় আমি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে
আসবো। আর ফেরার সময় নাহয় বাবা তোমাকে নিয়ে আসবে। তা কখন যাবে?”
“ভেবেছিলাম বিকেলে যাবো। কিন্তু তুই তো
ঝামেলায় ফেলে দিলি! সকালে যাবো, কী ভাববেন ওনারা?”
“কিছু ভাববেন না। বরং খুশিই হবেন। কাকিমা তো
সই বলতে অজ্ঞান। দেখবে দুই সইতে গল্প করতে করতে দিনটা দারুণভাবে কেটে গেছে।”
এবার মধুজার মাও হেসে ফেলেন। “তা ঠিক! কতদিন কথা
হয় না আমাদের মধ্যে। আমাদেরর তো আর তোদের মতো হোয়াটস্যাপের বালাই নেই। আর ওই ফোনে
প্রাণভরে কথাও হয় না। মুখোমুখি কথা বলেই আনন্দ পাই। তা হ্যাঁরে তুই বলছিস জয়ন্ত
মিশ্র আসছেন। কিন্তু তুই না থাকলে শো হবে না মানে?”
খাওয়া থামিয়ে রহস্যের হাসি হাসে মধুজা।
কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে মা বলেন, “কার গল্প বলতো?”
“কোন মাস চলছে?” বলে
হাসে মধুজা। মা চমকে তাকান মেয়ের দিকে। মধুজা হেসে বলে “মুক্তির
উপায়!”
“কোন চরিত্রে?”
“জয়ন্ত স্যার ষষ্ঠীচরণের চরিত্রে। আমি
মাখনলালের ছোটো স্ত্রীর রোলে।” বলে টেবিল থেকে থালাটা
নিয়ে রান্নাঘরে সিঙ্কে রেখে হাত ধুয়ে নিলো মধুজা।
“আগে বলিস নি কেন?” বলে
চিৎকার করে উঠেও নিজেকে থামালেন মা। মধুজা হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “সারপ্রাইজ মাদার ইন্ডিয়া! আমি জানি জয়ন্ত স্যার তোমার পছন্দের ভয়েস
আর্টিস্ট। তাই চুপ করেছিলাম চমকে দেবো বলে। কেমন লাগলো সারপ্রাইজটা?”
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মা জিজ্ঞেস করলেন, “কটার দিকে
টেলিকাস্ট হবে?”
“ দুপুর দুটোর দিকে। লাইভ গল্প পাঠ করবো আমরা।
তখন কিন্তু ফোন করতে পারবে না বলে রাখলাম!”
“আচ্ছা ঠিক আছে! তুই বেরোবি কটার দিকে?”
“সকাল দশটার দিকে।”
*****
“কিরে আর কতক্ষণ? ওদিকে
তো অঞ্জলী শুরু হলো বলে!” মধুজার ঘরের বাইরে চিৎকার করে অতীন।
“আসছি আসছি! উফ এত তাড়া কেন দিচ্ছিস? শাড়িটাও পরতে দিবি না নাকি?” বন্ধ ঘরের ভেতর
থেকে পালটা চিৎকার করে মধুজা।
“তোদের নিয়ে আর পারা যায় না! সাজতে বসলে সারা
দিন পার! আরে এত সাজার কি আছে? তোদের ওই শাড়ির অ্যাডের
মতো ছোটো টিপ, হাল্কা লিপস্টিক আর শাড়ি পরলেই তো হলো! তা
না গাদাগুচ্ছের মেকাপ নিয়ে বসবি তোরা।” বলে দরজায় ধাক্কা
মেরে বলে “কিরে হল?”
“অসভ্যের মতো দরজায় ধাক্কা দিবি না তো! তেমন
তাড়া লাগলে তুই চলে যা। আমি ট্যাক্সি করে চলে আসবো। আর যেটা জানিস না সেটা নিয়ে
বকবক করিস না তো! আমাদের একটু সাজতে সময় লাগে।” গর্জে উঠল
মধুজা।
“ফাজলামো করার জায়গা পাও নি? বাড়ি থেকে পাঠালো তোকে নিয়ে আসতে আর তুই বলছিস একা চলে যাবি? বাড়িতে শুনলে আমার কপালে দুঃখ আছে।”
“বাবা! ক্যাপ্টেন অতীন রায়চৌধুরী মাকে ভয় পায়?”
বলে হেসে ফেলল মধুজা।
অতীন বিরক্ত হয়ে বসল ড্রইংরুমে। এখন
ঝগড়া করলে চলবে না। উল্টে দেরী হয়ে যাবে। মেয়েদের তৈরী হতে এত সময় কেন লাগে বোঝে
না অতীন। এত সাজার কি আছে?
মা-বাবা কি ওকে প্রথমবার দেখছে নাকি? একদিকে
ওরা ছেলেরা বেশ। পোশাক যাই হোক না কেন চটপট করে পরে নিলেই হল। এখন এর কতক্ষণ লাগবে
কে জানে? ভাবতে ভাবতে আচমকা অতীন দেখল মধুজা দরজা খুলে
বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। আজকে পরেছে হাল্কা গোলাপি পাড়ের সাদা শাড়ি। সাথে ম্যাচিং
কানের দুল আর প্রসাদনী। অপুর্ব লাগছে মধুজাকে।
"কী দেখছিস ওরকম ড্যাবড্যাব করে?”
মধুজার ডাকে সম্বিত ফেরে অতীনের। আর
সম্বিত ফেরা মাত্র লজ্জায় মাথা নামিয়ে ফেলে সে। এর আগেও সে মধুজাকে শাড়িতে দেখেছে।
কিন্তু কোনোবারই এতটা স্নিগ্ধ, এতটা মিষ্টি লাগে নি তার। হয়তো আগে এভাবে খেয়াল করেনি
সে। সে আবার তাকায় মধুজার দিকে। সাধারণ সাজ সেজেছে মধুজা আজকে। বেশি উগ্র বা বেশ
ম্লান সাজ নয় বরং বেশ পরিপাটি সাজ। সদ্যস্নাতা মুখে একটা স্নিগ্ধতা ফুটে উঠেছে। চোখে
হাল্কা করে কাজল আর ঠোঁটে হাল্কা গোলাপী লিপস্টিকে অনন্যা লাগছে মধুজাকে।
মধুজা শাড়ির কুঁচিটা সামলাতে সামলাতে
ড্রইংরুমে এসে জিজ্ঞেস করলো, “কী হলটা কি? ওরকম হা করে কী
দেখছিস?” মুচকি হেসে অতীন বলে “কিছু
না!রেডি তো?”
মধুজা মাথা নেড়ে জুতোর তাক থেকে থেকে
চটিটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অতীনের সাথে।”
বাড়ির সামনেই পার্ক করা ছিলো অতীনের
বাইক। অতীন বাইকে বসে। মধুজা ওর মাকে বলে বেড়িয়ে আসে। মধুজা বাইকে বসামাত্র অতীন
বাইকে স্টার্ট দেয়। দুজনে বেরিয়ে পড়ে কলেজের উদ্দেশ্যে। তবে তার আগে একবার ঢু
মারতে হবে অতীনদের বাড়িতে। ওদের বাড়িতেও বেশ বড়ো করে সরস্বতী পুজো হয়। বাইকে বসার
পর মধুজার খটকা লাগে। যে ছেলে একটু আগেও ঝগড়া করছিল হঠাৎ করে কেমন যেন চুপ মেরে
গেছে। ব্যাপারটা কী? একটু আগেও দেরী হচ্ছিল বলে তাড়া দিচ্ছিল, যে
ছেলে অন্যদিন সামান্য দেরী হয় বলে গজগজ করে হঠাৎ এরকম চুপ হয়ে গেল কী করে? ব্যাপারটা আন্দাজ করতে অতীনকে তাতানোর জন্য মধুজা বলে ওঠে, “তোদের বাড়ি অঞ্জলী দিয়ে কিন্তু আগেই কলেজে যাবো না। আগে যাবো বইপাড়ায়,
তারপর যাবো মিতাদের মেসে, তারপর কলেজে
যাবো। আগে কলেজে গেলে আর দেখতে হবে না। অভয় আর স্নেহাদের পাল্লায় পুরো দিনটা মাটি
হয়ে যাবে। তুই বরং মিতাদের ওখানে আমাকে নামিয়ে কলেজে চলে যাস। হাওয়া কেমন দেখে
আসিস তারপর নাহয় কলেজে যাওয়া যাবে। তেমন হলে কলেজে আজ পা রাখবো না।” অতীন জবাবে শুধু একটা “হুম!” বলে।
মধুজা অবাক হয়ে যায়, ব্যাপারটা কী?
অন্যদিন হলে এতক্ষণে মুখে খই ফুটতো বাবুর। প্রতিবাদ করে বাইক থেকে
নামিয়ে দিয়ে বলতো, “ ট্যাক্সি ধরে চলে যা! আমি তোর
ড্রাইভার নই! ভাগ!” সেই ছেলে রাজি হয়ে গেল! অদ্ভুত তো!
মধুজা ব্যাপারটা বোঝার জন্য নিজের বকবক চালিয়ে গেল কিন্তু অতীনের তরফ থেকে দু-একটা
“হুম!” ছাড়া আর কোনো জবাব পেল
না। অতীন গোটা রাস্তা উপচাপ বাইক চালিয়ে গেল। মধুজা বুঝতে পারলো না ব্যাপারটা কী।
বুঝতে পারলে হয়তো লজ্জায় ওর মুখও ওর শাড়ির মতো গোলাপী আভায় ভরে যেত।
আর অতীন? সে বেচারা কীভাবে রাস্তায় বাইক
চালিয়েছে সেই জানে। গোটা পথে তার মনোসংযোগ ব্যাহত হচ্ছিল দুটো কারনে। এক যতবার
সামনের দিকে তাকাচ্ছিল প্রতিবার ওর চোখের সামনে ভেসে আসছিল সদ্যস্নাত, সেজে ওঠা এক তরুণীর মুখ। যাকে সে স্কুলবেলা থেকে দেখে আসছে। যাকে আগেও
অনেকবার দেখেছে সেই তরুণীর শাড়িতে নতুন করে আবিস্কার করা রূপ বার বার ধরা দিচ্ছিল
তার চোখের সামনে। আর একটা মিঠে ফুলেল গন্ধ তার নাকে প্রবেশ করে পাগলপারা করে তুলছিল
বারংবার। ভাগ্যিস মধুজা বকবক করে ওর মনোসংযোগ ফিরিয়ে আনছিল। নাহলে রাস্তায়
অ্যাক্সিডেন্ট করে বসতো সে।
বাড়ির সামনে বাইকটা থামালো অতীন। মধুজা
বাইক থেকে নেমে ঢুকে গেল বাড়ির ভেতরে। অতীন পেছন থেকে দেখতে লাগল ওকে, তারপর নিজেকে
ধমকালো। কী হচ্ছেটা কি? এর আগেও তো কতবার মধুজাকে সে
শাড়িতে দেখেছে কই এরকম তো আগে হয় নি! সব হিসেব কেন গুলিয়ে যাচ্ছে তার? কেন মনে হচ্ছে সময়টা এখানেই থমকে গেলে ভালো হয়? কেন এরকম হচ্ছে? কেন? তবে কি সে প্রেমে পড়ে গেল? ধুস! তা কীকরে হয়?
ওরা তো ভালো বন্ধু! মধুজা জানতে পারলে বিচ্ছিরিভাবে হাসবে! ভীষণ বোকা
বোকা লাগছে নিজেকে। কিন্তু কেন জানে না মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবটা সে দেখছে, শুনছে, অনুভব করছে সব মিথ্যে। শুধু তার আর
মধুজার এতটা পথ আসাটা সত্যি। আশ্চর্য এরকম মনে হচ্ছে কেন? চেষ্টা করলেও কিছুতেই এই মুগ্ধতাকে তাড়াতে পারছে না কেন সে? ভাবতে ভাবতে বাইকটা লক করে নিজের বাড়িতে ঢুকল সে।
গোটা রাস্তা অতীন চুপ করে বাইক
চালাচ্ছে দেখে মধুজা আর থাকতে পারলো না। সে বলল, “গাড়ি থামা!” অতীন কথামতো বাইকটা রাস্তার ধারে দাঁড় করালো। মধুজা বাইক থেকে নেমে বলল,
“তোর কী হয়েছে বলতো? সেই সকাল থেকে
দেখছি কেসটা কী বস? সকালে আমাকে দেখে সেই যে চুপ মেরে
গেলি তারপর সারাদিন সাইলেন্ট মোডেই আছিস ব্যাপারটা কী? এই!
আমাকে এই শাড়িতে ভালো লাগছে না নাকি? এবার বুঝতে পারছি!
মিথ্যে বলবি না! আমি সবটা লক্ষ্য করেছি। তোদের বাড়িতে অঞ্জলী দেওয়ার সময় তুই আমার
দিকে হা করে তাকিয়েছিলি। মিতাদের মেসেও যখন ঢুকছি একই ভাবে তাকিয়েছিলি, কলেজেও সেম! সত্যি করে বল! বাজে লাগছে না? আমি
জানতাম! আমি জানতাম! মাকে বলেছিলাম এই শাড়িটা পরবো না! এই শাড়িটা পরলে আমাকে বুড়ি
বুড়ি লাগবে। কিন্তু মা শুনলো না। আজকে মায়ের হবে! তোরও বলিহারি যাই! তখনই বলতে
পারলি না? এভাবে শোধ নিলি? ইস
কলেজে ওরা আমাকে…ইস! অতীন!”
অতীন চুপ করে শুনছিল মধুজার বকবক।
সত্যি কথা বলতে গেলে ওর বেশ ভালোই লাগছিল মধুজার এই বকবক, এই টেনশন। মনে
হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে মধুজা এইভাবে বকবক করতে থাকুক। আর ও নির্বাক শ্রোতার মতো
শুনতে থাকুক। কিন্তু মধুজার চোখ ছলছল দেখে আর থাকতে পারলো না সে। ফিক করে হেসে
মধুজার ঠোঁটে একটা আঙুল চাপা দিয়ে থামিয়ে দিল সে। তারপর হেসে বলল, “বাপ রে বাপ! কত বকিস তুই! একবার শুরু করলে থামতে চাস না। কাকু ঠিকই
বলে! তোর জন্য রেডিও জকির কাজই পারফেক্ট! সারাদিন বকবকম আর বকবকম! এবার থাম মা!
ভীষণ খিদে পেয়েছে আমার। তোর বকবক শুনে আমার পেট ভরবে না। সেই সকালে দুটো ফল খেয়ে
বেরিয়েছি আর দুপুরের ঐ চাইমিন পেটের এক কোনো পড়ে আছে। আর তোরও সেম কেস! এখন
রিচার্জ না করালে বকবকম কিছুক্ষণ পর ঘ্যানঘ্যানানিতে পরিণত হয়ে যাবে। অগত্যা
রাস্তায় কান্নাকাটি করে সিন ক্রিয়েট না করে চল সামনে একটা পার্ক আছে সেখানে বসবো।
সেখানে ভালো এগরোল পাওয়া যায়। সেখানে এগরোল খেতে খেতে তোর সব কথার জবাব দিচ্ছি।”
অতীনের এহেন জবাবের আশা করে নি মধুজা।
সে অবাক হয়ে দেখলো ওর বকবকানিতে অতীন বিরক্ত হয়নি একবারও! বরং মজা পেয়ে হাসছে!
মধুজা চুপ করে উঠে বসে অতীনের বাইকে। অতীন বাইক স্টার্ট দিয়ে কিছুদুর এগোনো মাত্র
ব্যাপারটা বুঝতে পারে মধুজা। সারাদিন চুপ করে থাকা, ওভাবে তাকানো, হাজার বকবকানিতেও বিরক্ত না হওয়া তারমানে কী? সঙ্গে
সঙ্গে একটা লজ্জা আর প্রচন্ড হাসির একটা অনুভূতি চেপে বসে মধুজার মনে। সে অতীনের
দিকে তাকায়। অতীন নির্বিকারভাবে বাইক চালিয়ে পার্কের জায়গায় একটা রেস্তোরাঁর সামনে
বাইক দাঁড় করায়। শহরতলীতে এই রেস্তোরাঁটা নতুন খুলেছে।
বেশ খোলামেলা জায়গার মাঝে রেস্তোরাঁটা।
আশেপাশে কয়েকটা চেয়ার টেবিল পাতা। মধুজা বাইক থেকে নেমে একটা টেবিলে গিয়ে বসে।
মধুজা তাকিয়ে দেখে আশেপাশের টেবিলে ওদের মতোই বেশ কয়েকটা জোড়া বসে আছে। অতীন বাইক
লক করে রেস্তোরাঁতে অর্ডার দিতে এগিয়ে যায়। মধুজা বসে বসে অতীনকে দেখতে থাকে আর
মনে মনে হাসতে থাকে। দেখা যাক অতীন কী বলে! ইস শেষমেশ অতীনও! কদিন আগেও যখন অজানা
লাভলেটারটা দেখিয়েছিল ওকে তখন ওকে ব্যঙ্গ করে বলেছিল অতীন, “কোনো রামপাঠা বা
কানাচন্দনই তোর মতো একটা রসকসহীন কাঠখোট্টা মেয়ের প্রেমে পড়তে পারে।” সেই অতীন কিনা...উফ! এইবার বাগে পেয়েছে। অতীন কনফেস করলেই জানতে হবে
ও কোন দলে পড়ে। বলে ফিক করে হেসে নিজেকে সামলে নিয়ে অতীনকে দেখতে লাগলো সে।
অতীন দুটো এগরোল হাতে নিয়ে টেবিলের
দিকে এগিয়ে এলো। মধুজা হাত বাড়িয়ে একটা এগরোল নিতেই ওর মুখোমুখি চেয়ারে বসলো
অতীন। তারপর ধীরেসুস্থে এগরোলটা খেতে লাগলো। মধুজা এগরোলে একটা কামড় দিয়ে খেতে
খেতে বলল, “কই তুই কি বলবি বলছিলি বল!” অতীন এগরোল খেতে
খেতে বলল, “বলছি দাঁড়া আগে খেয়ে নিই। ভীষণ খিদে
পেয়েছে।” বলে খেতে লাগল। মধুজা অবাক হয়ে দেখল অতীনের
খাওয়া।
অতীন চোখ বুঁজে তাড়িয়ে তাড়িয়ে
এগরোলটা খাচ্ছে। সামনে যে কেউ বসে আছে এ নিয়ে ওর কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। আপনমনে
এগরোল খেয়ে যাচ্ছে সে। মধুজা অপেক্ষা করতে লাগলো অতীনের স্বীকারোক্তির। কিন্তু
অতীন মধুজার আশায় জল ঢেলে এগরোলটা শেষ করে বলল, “কীরে খা! এখনও শেষ হয় নি?এগরোলটা বেশ ভালোই করেছে তো। নে নে তাড়াতাড়ি শেষ কর আরে এরপর চিকেন
মাঞ্চুরিয়ান কাবাবটা আসছে! ওটাও তো খেতে হবে নাকি?”
মধুজার ভ্রু কুঁচকে গেল। মানেটা কি? কোথায় সে ভেবেছিল
অতীন কনফেস করবে আর ও খিল্লি করবে। কিন্তু অতীনের ব্যবহার সব হিসেব গুলিয়ে
দিচ্ছে। তবে কি সে ভুল ভাবছে? কিন্তু তা কি করে হয়?
সারাদিন অতীন যা আচরন করেছে তার তো একটাই মানে। ভাবতে ভাবতে
এগরোলে কামড় দেয় সে।
এগরোল শেষ হবার পর টেবিলে ধোঁয়া ওঠা
কাবাবের প্লেট চলে আসতেই অতীন মন দিল কাবাবে। মধুজা আড়চোখে দেখতে লাগলো অতীনের
দিকে। নাহ! কোথাও যেন হিসেব মিলছে না। কোথায় যেন একটা তাল কেটে গেছে। যত সময়
এগোচ্ছে মজার জায়গায় একটা অধৈর্যভাব আর একটা অভিমান ক্রমশ গ্রাস করছে মধুজার
মনে। বারবার মনে হচ্ছে এইভাবে ঠকে গেল ও। এতটা ভুল ভেবে বসলো অতীনকে। সত্যিই তো!
সে আর অতীন! মানে কি করে সম্ভব! ওরা তো ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছু না। হয়তো কোনো
কারনে আজ মুড অফ ছিল বলে ওরকম আচরণ করেছে। রোজ রোজ ঝগড়া করতে করতে হয়তো আজ
ভেবেছে একটা দিন ঝগড়া করবে না। হয়তো কাকিমাই ওকে বলেছে আজকের দিন ঝগড়া না করতে।
হয়তো ভেতর ভেতর বিরক্ত হলেও কাকিমার জন্যে হেসে নিজের বিরক্তিকে ঢেকেছে সে। আর
তাকানোটা হয়তো বুঝিয়ে দেওয়া আজ যত মাথা খাওয়ার খেয়ে নে। কাল থেকে আবার শুরু
হবে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সে টের পেল একটা কান্নার ডেলা ক্রমশ গলায় চেপে বসছে।
কাবাবটা বিস্বাদ ঠেকছে। ওদিকে অতীন আয়েশ করে কাবাবের টুকরো মুখে পুরে চোখ বুঁজে
চিবোচ্ছে।
মধুজা কোনো রকমে দুটো টুকরো খেয়ে বলল, “আমার পেট ভরে
গেছে। আর খেতে ইচ্ছে করছে না।” অতীন কাঁধ নাচিয়ে মধুজার
প্লেট থেকে কাবাবগুলো নিজের প্লেটে নিয়ে বলল,“তাহলে আমি
নিয়ে নিচ্ছি। এত সুস্বাদু কাবাব নষ্ট করে লাভ নেই।” বলে
মধুজার প্লেটের কাবাবগুলোও খেতে লাগলো। মধুজা অতীনের দিকে তাকিয়ে রইল।
খেয়েদেয়ে ওরা যখন বেরোল ততক্ষণে
সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে। অতীন বাইকটা বের করে রাস্তার দিকে দাঁড় করালো।
মধুজা ধীরপায়ে এগিয়ে বাইকের পেছনের সিটে বসল। অতীন বাইকের লুকিং গ্লাসে মধুজার
অন্ধকার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তারপর বাইক স্টার্ট দিয়ে বাড়ির দিকে
রওনা দিল। এবার গোটা রাস্তা মধুজাও চুপ করে রইল। অতীন বাইক চালাতে চালাতে আড়চোখে
লুকিং গ্লাসে দেখতে লাগলো মধুজার দিকে। তারপর বলল, “কাবাবটা দারুন করেছিল। এরপর একদিন
অভয়-স্নেহাদের সাথে আসতে হবে। সেদিন জম্পেশ পার্টি হবে বুঝেছিস? সেদিন কিন্তু আজকের মতো অরুচি রোগ নিয়ে আসবি না। তোর চক্করে অতোগুলো
কাবাব গিলেছি, কাল যদি পেট ছাড়ে দায় কিন্তু তোর!”
মধুজা কোনো সাড়া দিল না। বাইক চালাতে চালাতে অতীন বলল, “কি হলো মিস বকবকম পায়রা? হঠাৎ সাইলেন্ট মেরে
গেলি! শরীরটরির খারাপ হলো নাকি?”
মধুজা বলল, “হুম!মাথাটা ধরেছে।
তুই কথা না বলে তাড়াতাড়ি বাইকটা চালা।”
অতীন মুচকি হেসে বাইকের গতি বাড়ালো।
এইবার জব্দ হয়েছে! তখন রেস্তোরাঁয় আসার সময় আয়নায় হাসিটা দেখেই অতীন বুঝতে
পেরেছিল কনফেস করলে কপালে দুঃখ আছে। এগরোল খাবার সময় মধুজার অভিব্যক্তি দেখেই
বোঝা যাচ্ছিল কনফেস করলেই ও ঝাঁপাবে। তাই চেপে গিয়েছিল ও। অবশ্য চেপে লাভই
হয়েছিল। ধীরে ধীরে মজারু থেকে বিরহিণী মোডে চলে যেতে দেখছিল সে মধুজাকে।
রেস্তোরাঁ থেকে বেরোবার পর টোটাল অভিমানী মহিলায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। আরেকটু
হলেই কেঁদে ফেলবে। মধুজার দিকে তাকিয়ে হেসে বাইকের গতি বাড়ালো সে।
বাড়ির সামনে বাইক দাঁড় করাতেই মধুজা
নিঃশব্দে নেমে গেল। পা দুটো ভীষণ ভারী মনে হচ্ছে এখন। কোনো রকমে “বাই।” বলে এগিয়ে গেল সে। অতীন পেছন থেকে কিছু ওকে যেতে দেখার পর মুচকি হেসে
বাইক স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে পড়লো নিজের বাড়ির দিকে।
মধুজা নিজের ঘরে ঢুকে শাড়ি খুলে পরনের
পোশাক পরে বিছানায় শুয়ে পড়লো। আর ওর অজান্তে চোখের কোল বেয়ে বেরিয়ে এল দু
ফোটা অশ্রু। আর তখনই টুংটুং করে দুটো SMS ঢুকলো ওর ফোনে।
*****
ঝুমঝুম শব্দে ঘুম ভাঙলো মধুজার। সে
সোজা হয়ে বসল। শো শেষ করে ক্যাব ডেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে অতীনদের বাড়ির দিকে।
কাল প্রায় সারারাত জেগেই কাটিয়েছে স্ক্রিপ্টটা মুখস্ত করার জন্য। কাজেই শোয়ের
পর রাস্তায় ক্যাবে বসার পর একটু গা এলিয়ে দিয়েছিল সে। চোখটা লেগে যাবে ভাবতে
পারে নি। ঘুম ভাঙার পর ফোনের দিকে তাকাতেই দেখলো মেসেজ ঢুকছে অজস্র। আজকের শোটার
জন্য সকলে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটু পর পর মেসেজ করেই যাচ্ছে তাকে। কেউ কেউ অভিনন্দন
বার্তা জানিয়ে ফোন করছে।বলে সে ফোনটা সাইলেন্ট রেখেছিল। কিন্তু ফোনের ঝুমঝুমধ্বনি
বন্ধ হয়নি। একঝলক সেদিকে তাকিয়ে তারপর মধুজা সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল ক্যাবটা
অতীনদের পাড়ায় ঢুকছে।
ক্যাবটা অতীনদের বাড়ির সামনে দাঁড়
করিয়ে অতীনদের বাড়িতে প্রবেশ করতেই আপাদমস্তক শিরশির করে উঠলো মধুজার। প্রায় একবছর
পর এ বাড়িতে এসেছে ও। আগে অতীন থাকাকালীন না জানি কতবার এসেছে এখানে। এবাড়ির
প্রতিটা কোণ তার মুখস্থ। কিন্তু এখন কেন জানে না এ বাড়িতে আসতে মন চায়না। কারন
এখানে এলেই কাকিমার কান্না,
অতীনের জন্য কাকুর খোঁজ তাকে কুড়ে কুড়ে খায়। নেহাত মা আসতে
চেয়েছে বলে মাকে নিয়ে এসেছিল। মা বলেছিল শো শেষ হলে এখানে চলে আসতে তাই এসেছে
সে। মধুজা ধীর পায়ে দরজার সামনে দাঁড়ালো।
কলিংবেলটা টিপতে যাবে এমন সময় অতীনদের
ছাদ থেকে ভেসে আসা একটা কন্ঠস্বর ওকে স্তব্ধ করে দিলো। মধুজার মনে হলো যেন ওর পা
দুটো কেউ মাটিতে সিমেন্টের সাথে গেঁথে দিয়েছে। সে একটু পিছিয়ে গিয়ে উপরের দিকে
তাকালো।
সদর দরজার ঠিক উপরদিকেই অতীনের ঘর।
শব্দটা সেখান দিয়েই ভেসে এল মনে হল। মধুজা কান পেতে শুনলো মা আর কাকিমার কন্ঠস্বর
শোনা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই মজার কোনো ঘটনা ঘটেছে তা নিয়ে দুজনে হাসাহাসি করছে। কিন্তু
মধুজার মনে হলো যেন...মধুজা উৎকর্ণ হয়ে কিছুক্ষণ অতীনের ঘরের জানলার দিকে তাকিয়ে
রইল। তারপর থমথমে মুখে কলিংবেলটা বাজালো।
উপরের কথা বন্ধ হলো অতীনের জানলায়
দেখা দিলেন কাকিমা। একপলকের জন্য মধুজার মনে হলো তাকে দেখে কাকিমার মুখ ফ্যাকাশে
হয়ে গেল, পরক্ষণে নিজেকে সামলে হেসে বললেন, “আসছি।”
দরজা খোলার পর মধুজা ভেতরে ঢুকতেই মা
দোতলার সিড়ি থেকে বলে উঠলেন, “তোর কাজ হয়ে গেল এত তাড়াতাড়ি?” মধুজা চটি ছাড়তে ছাড়তে বলল, “হ্যাঁ, স্যার আজকে একদম কাঁটায় কাঁটায় ১টায় চলে এসেছিলেন। একমুহূর্ত সময়
নষ্ট করতে চাননি। ফলে ঝটপট বসে পড়েছিলাম।”
কাকিমা বললেন,“তোমার অনুষ্ঠানটাই
শুনছিলাম মধু। দারুণ হয়েছে। তা এটা কি পঁচিশে বৈশাখ স্পেশাল ছিল না কন্টিনিউ
চলবে।”
“থ্যাঙ্ক ইউ কাকিমা। শ্রোতারা ভালো সাড়া
দিয়েছে শোতে। এবার থেকে প্রতি শুক্রবার আর রবিবার দুপুরে এই শো হবে। ঐ দুদিন
কিন্তু দুপুরে ঘুমোলে চলবে না। যাক গে কাকু এখন কেমন আছেন?”
“আগের থেকে একটু ভালো। তবে ডাক্তার বেডরেস্ট
নিতে বলেছেন বলে নীচে নামে না। ঘরেই বসে বসে হয় বই পড়ে নাহলে রেডিও শোনে। তোমার
অনুষ্ঠানটা ওর ভীষণ ভালো লাগে।” বলে দরজা লাগান কাকিমা।
মধুজা ড্রইংরুমে ঢুকে সোজা সোফায়
ব্যাগটা রেখে বসল । মা দোতলা থেকে নেমে মধুজার পাশে বসে বললেন, “ তোর বাবাকে সকালে
বলেছিলাম সন্ধ্যের দিকে অফিস থেকে ফেরার পথে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য বিকেলের দিকে
জানালো আজকে নাকি অফিসে খুব চাপ, ফিরতে দেরী হবে তাই তোকে
বলেছিলাম। এত তাড়াতাড়ি চলে আসবি জানলে...”
মাকে থামিয়ে কাকিমা বলেন, “তাও তো এই সুযোগে
এসেছে। নাহলে তো কাকু-কাকিমার কথা মনেই থাকে না।”
মধুজা হেসে বলে, “ না গো! আসলে কাজে
এত ব্যস্ত থাকি যে সময় করে উঠতে পারি না। বিশ্বাস না হলে মা কে জিজ্ঞেস করে দেখো
সেই সকালে নটার দিকে বাড়ি থেকে বেরোই, ফিরতে ফিরতে রাত
আটটা বেজে যায়। তুমিই বলো সারাদিনের ক্লান্তি আর স্টুডিওতে টানা অতক্ষণ বকবক করার
পর আর কি শরীর সঙ্গ দেয়? তখন মনে হয় বাড়ি ফিরে দুমুঠো
ভাত খেয়ে বিছানায় গড়াতে পারলেই শান্তি।”
কাকিমা হাসেন, “ভীষণ ধকল যায় না?
তোমার কাকুও রিটায়ারমেন্টের আগে এই কথা বলতেন। বেশ বসো। ঠিক
সময় এসেছো এখনই চা করতে নামছিলাম নীচে। ভালোই হলো তুমি এসে পড়ায়। শোনোমেয়ে আজ
কিন্তু তোমাকে আমি ছাড়ছি না। এতদিন পর বাগে পেয়েছি! আজ একেবারে রাতের খাবার
খেয়ে বাড়ি যাবে। আজকে এত সহজে যেতে দেব না। রাত পর্যন্ত গল্প করে খেয়েদেয়ে
তারপর তোমাদের ছুটি। তোমার বাবাকেও বলো অফিস শেষে যাতে এখানে চলে আসে়।”
মধুজার মা হাউমাউ করে ওঠেন, “কী যে বলিস তুই।
বাড়িঘর ফাকা রেখে এভাবে এতক্ষণ থাকা যায় নাকি?”
কাকিমা হেসে বলেন, “হ্যা যায়। রাখ তো
তোর বাড়িঘর! এতদিন পর এসেছিস তোরা এত সহজে ছাড়ছি না। এতদিন পর বাড়িটা গমগম করছে,
হাসিখুশিতে ভরে গেছে । তোরা চলে গেলে তো আবার সেই নিষ্প্রাণ,
নিশ্চুপ হয়ে যাবে গোটা বাড়িটা। তার চেয়ে কিছুক্ষণ থেকে যা না
তোরা। আবার কবে আসবি কিনা ঠিক নেই।” বলতে বলতে থেমে ছলছল
চোখে তাকালেন কাকিমা। মা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। গোটা ঘরে নেমে এলো একটা একটা
অস্বস্তিকর নীরবতা।একদিক থেকে কাকিমা ঠিকই বলেছেন। অতীন না থাকলে বাড়িটা সত্যিই
প্রাণহীন লাগে। অতীন থাকলে বাড়িটা বেশ গমগম করে। এই গিটার বাজাচ্ছে, এই মিউজিক প্লেয়ারের গজল বাজাচ্ছে, নাহলে
ড্রইংরুমে টিভি চালিয়ে খেলা দেখতে দেখতে তারস্বরে চিৎকার করছে। এই কারনে সে আসতে
চায় না এ বাড়িতে। অতীনকে ছাড়া এই বাড়িটার নিস্তব্ধতা যেন ওকে গিলে খেতে আসে।
কাকিমার কষ্টটা সে বুঝতে পারে। ও তো তাও বাইরের লোক। ওরই যদি এরকম বোধহয় তাহলে
কাকিমার কি দশা হয় এই বাড়িতে সহজেই অনুমেয় । কাকিমার জায়গায় ও হলে তো এতদিনে
পাগল হয়ে যেত।
মধুজা উঠে কাকিমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আচ্ছা বেশ! কাকিমা
যখন বলেছে তখন আজ আমরা এখানেই খাবো। তবে দুটো শর্তে।”
মধুজার কথা শুনে কাকিমার মুখ উজ্জ্বল
হয়ে ওঠে। ধরা গলায় বলেন,
“কী শর্ত?”
মধুজা হেসে বলে, “প্রথম শর্তটা হলো
রাতের রান্নাটা একা করলে চলবে না। আমরা মা-মেয়েও হাত লাগাবো তোমার সাথে। আর
দ্বিতীয় শর্ত হল এখনই আমাকে এককাপ কড়া করে তোমার স্পেশাল আদা চা খাওয়াতে হবে।
কি রাজি তো?”
চোখ মুছে হেসে ফেলেন কাকিমা। তারপর
মুচকি হেসে মধুজার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, “রাজি।”
*****
বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে
মধুজা দেখে দুই সইতে মিলে রান্নাঘরে শুধু চাই নয় তার সাথে টা তৈরিতেও নেমে
পড়েছে। মা ঝপাঝপ পেঁয়াজ লঙ্কা কেটে মুড়ি মাখছে আর কাকিমা চা তৈরী করছে।মধুজা
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে দুই সইয়ের কীর্তি। তারপর মুচকি হেসে চুপচাপ পা বাড়ায়
দোতলার দিকে।
দোতলায় সিড়ির মুখেই অতীনের ঘর। অতীন
না থাকলে ঘরটা বন্ধ থাকে। সপ্তাহে একদিন কাকিমা এসে ঘরটা পরিস্কার করেন। মধুজা পা
টিপেটিপে দরজাটার সামনে দাঁড়ায়। কান পাতে দরজায়। তারপর আচমকা দরজাটা খুলে ঘরে
ঢুকে আলো জ্বেলে দেয়। অন্ধকার ঘরটা আচমকা আলো পেয়ে চমকে ওঠে। ঘরটা ঝলমলিয়ে ওঠে।
আর সেই আলোয় মধুজা দেখে বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোন হাতে নিয়ে তার দিকে বিস্ফারিত
চোখে তাকিয়ে আছে অতীন!
কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে অপলকে তাকিয়ে
থাকার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতীন। মধুজা কিছুক্ষণ অতীনের দিকে তাকিয়ে নিরুত্তাপ গলায়
জিজ্ঞেস করে, “কবে আসা হয়েছে?” অতীন জবাব না দিয়ে একদৃষ্টে
তাকিয়ে থাকে মধুজার দিকে। আহ! ঠিক একবছর! একবছর পর সে প্রাণভরে দেখছে মধুজাকে। এই
একটা বছর কীভাবে কেটেছে একমাত্র অতীনই জানে। সে প্রাণভরে দেখে মধুজাকে। একবছর পরেও
ঠিক আগের মতোই আছে মধুজা। শুধু সামান্য মেদ জমে রূপটা আরো খোলতাই হয়েছে। পানপাতার
মতো মুখমন্ডলে লাবণ্য ঠিকরে পড়ছে। ফরসা গালদুটো উত্তেজনায় ঈষৎ লালচে হয়ে গেছে।
কাজলকালো চোখের কোণে ঈষৎ জল জমেছে। পাতলা ঠোঁটদুটো তিরতির করে কাঁপছে। এই
লক্ষ্যণগুলো অতীনের বিলক্ষণ চেনা। যখন তখন বর্ষণ শুরু হতে পারে। অতীন মধুজার
প্রশ্নের জবাবে ম্লান হাসে। মধুজা ছলছলে চোখে তাকায় অতীনের দিকে। একবছরে কত
পাল্টে গেছে অতীন। কী ভীষণভাবে শুকিয়ে গেছে চেহারাটা। গালের মাংস বসে গিয়ে হাড়
বেরিয়ে এসেছে, কন্ঠার হাড়ও দৃশ্যমান। টিশার্ট পরে
থাকলেও টিশার্টের উপর দিয়ে পাঁজরার হাড় গোনা যাবে। বিছানায় আধশোয়া হয়ে খয়াটে
চেহারার মধ্যে যদি কিছু অমলিন থাকে তাহলে সেটা হল অতীনের হাসি। এত কিছু হয়ে যাবার
পরেও একই রকম হেসে চলেছে। মধুজা কিছুক্ষণ একভাবে তাকিয়ে থাকার পর এগিয়ে এসে
অতীনকে দুমদুম করে দু তিন ঘা মারার পর জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা
রেখে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে “ছোটোলোক কোথাকার!”।
*****
“নাটকটা ভালোই শুরু করেছিলে তোমরা। কিন্তু
নিজেদের ভুলে সব গুবলেট করে ফেললে।” বলে মুড়ির বাটি থেকে
একমুঠো মুড়ি মুখে ফেলে চায়ের কাপে চুমুক দেয় মধুজা। এই মুহূর্তে বাড়ির সকলে
অতীনের ঘরে বসে। মা-কাকিমা দুজনে অপরাধীর মতো মুখ করে বসে আছে। মধুজা বলে,
“খটকাটা লাগে এবাড়িতে আসার সময়। বাড়িতে ঢুকতেই আমি শুনতে পাই
রেডিওর শব্দ। শুধু তাই নয় আমারই রেডিও স্টেশনের শোয়ের শব্দ। তাও আবার এঘর থেকে।
এবাড়িতে রেডিও একমাত্র কাকুই শোনেন। কিন্তু এত জায়গা থাকতে এ ঘরেই কেন শুনবেন?
দ্বিতীয় খটকাটা লাগে যখন আমি তোমাদের আড্ডার সাথে সাথে তীনুর
গলা শুনতে পাই। কিন্তু সেটাকে মনের ভুল ভেবে কলিংবেল বাজাই। আর আমাকে অবাক করে
কাকিমা দেখা দেন এঘরের জানলা দিয়ে। তখনই আমার সন্দেহ হয় এঘরে বসে কাকু রেডিও
শুনছেন, মায়েরা আড্ডা দিচ্ছে মানে এঘর খোলা হয়েছে। তার
উপর কাকিমা আমাকে দেখে প্রথমে চমকালেও পরে সামলে নেন। এবং এমন আচরণ করেন যেন আমি
আসায় ভীষণ খুশি হয়েছেন। এমনকি আমাকে রাতে খেয়ে যেতে বলেন। কিন্তু আমার মা
তোদের সব প্রয়াসে জল ঢেলে দিয়েছে। প্রথমত আমি যে এত তাড়াতাড়ি আসবো ভাবতে
পারেনি। কাজেই ফেরার জন্য তাড়া দিতে থাকে। যেটা আমার সন্দেহটা আরো বাড়িয়ে দেয়।”
অতীন এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল মধুজার
কথাগুলো। মধুজার কথা শেষ হতেই হেসে বলে, “খামোখা ওদের বকে লাভ নেই। ওদের কোনো দোষ
নেই। আমিই বলেছিলাম ওদের তোকে ম্যানেজ করতে।”
“তুই চুপ কর ছোটোলোক কোথাকার! এতদিন হলো
ফিরেছিস, এতকিছু হয়ে গেল অথচ আমাকে একটা খবর পর্যন্ত দিস
নি! নাকি দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করিস নি!” মধুজা ঝাঁঝিয়ে
ওঠে।
মুচকি হেসে অতীন বলে, “কী খবর দিতাম তোকে?
জঙ্গীদের টাইট দিতে গিয়ে গ্রেনেডের বিস্ফোরণে জখম হয়ে জন্মের
মতো পঙ্গু হয়ে ফিরে এসেছি এটা বলতাম? নাকি বলতাম আর্মি
থেকে ভলিন্টারি রিটায়ার নিয়ে সারাজীবনের মতো হুইলচেয়ারে আবদ্ধ হয়ে চলে এসেছি?
সহ্য করতে পারতিস তুই? সব ছেড়ে দিয়ে
ছুটে চলে আসতিস আমার কাছে। যেটা আমি চাই নি। আমি চাইনি তুই তোর কেরিয়ার ছেড়ে
আমার পিছনে পড়ে থাকিস।”
“ আরেকবার কথাগুলো বলে দেখ, পঙ্গু হবার সাথে সাথে ফ্রিতে এককানে কালা হয়েও যাবি। এক চড় মারবো!
আমার জীবন, আমার কেরিয়ার আমি বুঝবো। তোর মাথা গলানোর
দরকার নেই। এখন থেকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তোর নিস্তার নেই। একমিনিট! তার মানে এতসব কীর্তির মাস্টারমাইন্ড
তুই! কাকু মোটেও নিউজ দেখে নয় বরং তোকে দেখে...”
মধুজাকে থামিয়ে অতীন বলে,“ ওদের বলছিলাম আমি ফিরছি,
কীভাবে কোন অবস্থায় ফিরছি সেটা বলিনি। কারন বললে দুজনে একসাথে
অসুস্থ হয়ে যাবে। ভয়টা বেশি ছিল মাকে নিয়ে। আমাকে এই অবস্থায় দেখে কীভাবে
রিঅ্যাক্ট করবে জানতাম না। কিন্তু আমাকে দেখে বাবা ওভাবে দুম করে হার্টফেল করে
পড়ে যাবে কে জানতো? ভাগ্যিস আমার কলিগরা আমাকে বাড়ি পৌঁছে
দিতে এসেছিল। ওরাই বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। নাহলে এ অবস্থায় কিছু করতে পারতাম
না। মাকে বলেছিলাম আমি যে ফিরেছি সে খবর তোদের না দিতে। যদি বাবার ব্যাপারে জানতে
চায় একটা অজুহাত দিয়ে দিতে বলেছিলাম। কিন্তু মা বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারে নি।
তোর মায়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল। কাজেই কাকিমাকেও আমার দলে
টানতে হয়।”
“ও! তারমানে মা জানতো তোর ব্যাপারে! অথচ আমাকে
...”
“বলেনি কারন আমি বারণ করেছিলাম। কিন্তু তুই যে
এভাবে হুট করে চলে আসবি কে জানতো? নেহাত আমি বেডরিডন
নাহলে বাথরুমে লুকিয়ে পড়তাম।”
“তাও তোকে ধরে ফেলতাম। আমাকে চিনিস না তুই।
আমার থেকে পার পাওয়া সহজ নয়। বুঝেছিস ছোটলোক? অংশুমানদার সাথে কথা হয়ে গেছে।
কাল আমরা ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।” বলে অতীনের কান মুলে দেয়
মধুজা।
কথা হচ্ছিল অতীনের ঘরে বসে। মধুজা যে
এভাবে হুট করে উপরে চলে আসবে ওরা ভাবতে পারেনি । অতীন ঘরে বসে চুপচাপ মধুজার
কন্ঠস্বর শুনছিল। আর যতটা পারে নিঃশব্দে নড়াচড়া করছিল। কারন ও চাইছিল না মধুজা
ওকে এই অবস্থায় দেখুক। অতীন চায় নি মধুজা জানুক ওর কথা। কিন্তু বিধিবাম! মধুজা নির্ঘাত কিছু আঁচ করে
সোজা উপরে চলে আসে।
অতীন হেসে কানে হাত বুলিয়ে বলে, “সত্যি কথা বলতে
গেলে সেদিন ব্লাস্টের পর আমি ভেবেছিলাম আমি মারা গেছি। হুশ যখন ফিরলো দেখি
হাসপাতালে শুয়ে, গোটা শরীরের গাঁটে গাঁটে ভীষণ যন্ত্রণা।
ব্যথা সয়ে যাবার পর খেয়াল হল কোমরের নীচের দিকে কোনো সাড় নেই আমার। আর এই
অনুভূতিটা আসতেই একটা কথাই মনে এলো , এর চেয়ে মরে গেলেই
বেশ হতো। তোর কথা, বাড়ির কথা মনে পড়তে লাগলো। ভয় হতে
লাগলো তোরা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবি। ডাক্তারের কাছে সবটা শোনার পর বুঝলাম সব শেষ
হয়ে গেছে। একবার ভাবলাম আর ফিরবো না এখানে। আমাদের ওখানে আর্মিদের একটা
কোয়ার্টারের মতো আছে অনেকটা আশ্রমের মতো। যুদ্ধে আহত, চিরজীবনের
মতো অক্ষম সৈনিকেরা থাকেন সেখানে। সেখানেই কাটিয়ে দেব। কিন্তু পারলাম না। জাস্ট
পারলাম না। প্রথমত মায়ের জন্য, আর দ্বিতীয়ত…” বলে থেমে যায় অতীন। তারপর অস্ফুটে বলে “একজন
কে কথা দিয়েছিলাম ফিরে আসবো বলে। সে যে আমার জন্য অপেক্ষায় ছিল। তাকে ফেলে
স্বার্থপরের মতো থেকে যেতে পারলাম না। ফিরতে হল। তাও ভেবেছিলাম আমার ফেরার খবর দেব
না। কিন্তু বিধিবাম!” বলে মধুজার দিকে তাকায় অতীন। মধুজা
ছলছলে চোখে অতীনের হাত নিজের মুঠোয় চেপে ধরে। ব্যাপারটা নজর এড়ায় না ঘরে উপস্থিত
বাকি তিনজনের। তারা বোঝেন এই মুহূর্তে এই দুজনের একা থাকাটা প্রয়োজন। অনেক বোঝাপড়া
বাকি আছে দুজনের মধ্যে। রান্না করার অজুহাতে দুই সই বেরিয়ে আসেন। আর অতীনের বাবা
খবর শুনতে চলে যান নিজের ঘরে।
মধুজা ব্যাপারটা টের পেয়ে লজ্জা পেয়ে
বলে, “ইস
কী ভাবলো ওরা বলতো?”
“কী আবার ভাববে? আমরা
দুজনেই অ্যাডাল্ট, আমাদেরও কিছু প্রাইভেসি প্রয়োজন।
আমাদের বাবা-মা এ বিষয়ে দাদুদের মতো সেকেলে নন তাই আমাদের প্রাইভেসি দিয়েছেন।”
“রাখ তোর প্রাইভেসি! ইস কি এমব্যারাসিং লাগছে!”
“আমার তো বেশ লাগছে!” বলে মুচকি হেসে খাটের ব্যাকরেস্টে হেলান দেয় অতীন।
“হুম! তোর তো লাগবেই! অসভ্য ছোটোলোক কোথাকার!”
বলে অতীনের হাতে মৃদু চাপড় মেরে হেসে ফেলে অতীনকে জড়িয়ে ধরে
মধুজা।
মধুজাকে জড়িয়ে ধরে অতীন জিজ্ঞেস করে, “মধু!”
অতীনের বুকে মুখ গুঁজে মধুজা জবাব দেয়, “উম?”
“তুই শিওর! তুই অপেক্ষা করতে পারবি?”
বুকে মাথা রেখে মধুজা জবাব দেয়, “টানা একবছর তোমার
জন্য অপেক্ষা করেছি মশাই! একবছর যখন থাকতে পেরেছি। আর কটাদিনও থাকতে পারবো। তবে
তোকে কথা দিতে হবে তুই উঠে দাঁড়াবি, আবার সেদিনের মতো
আমাকে বাইকে করে নিয়ে যাবি রেস্টুরেন্টটায়। এবার কিন্তু আমার কাবাব আমি ছাড়বো না।
কথা দে তুই উঠে দাঁড়াবি!”
অতীন জবাব না দিয়ে আরও শক্ত করে জড়িয়ে
ধরে মধুজাকে। তারপর ওর কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে, “কথা দিলাম।”
শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১
দ্বারকাপুরাণ
রাত্রি তখন দ্বিতীয় প্রহর। অন্তত
আকাশে চন্দ্রদেবের অবস্থান এবং দুরে ভুখণ্ডে শৃগালদের ক্রন্দন ধ্বনি তাই ইঙ্গিত
দিচ্ছে। কয়েকজন বাদে সমগ্র দ্বারকা বর্তমানে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। যারা জেগে
আছে তারা আর কেউ নয় দ্বারকার অতন্দ্র প্রহরী।
লোকমতে দ্বারকা নাকি সদাজাগ্রত নগরী।
এখানে সারারাতে কেউ না কেউ জেগে থাকে। তবে চুরির বা লুন্ঠনের ভয়ে নয়। জেগে থাকে
নিজ ইচ্ছায়। কেউ রাত জেগে রচনা করে কাব্য। কেউ বা রাত জেগে অধ্যয়ন করে
বহুযুগশ্রুত, পরম্পরাগত শাস্ত্র, মহাকাব্য। কেউ বা
প্রেয়সীর সাথে অভিসারে মত্ত। দ্বারকায় চুরির বা লুন্ঠনের ভয় নেই। কারন লোকমতে
দ্বারকার রক্ষায়, এবং ন্যায়ধর্ম পালনে সদাব্রতী থাকে স্বয়ং
নারায়ণের কৌমুদী ।
দ্বারকার বাইরে লোককথায় প্রচলিত আছে
দ্বারকা এক মায়াবী নগরী । যা স্বয়ং নারায়ণের আয়ুধ এবং তাঁর প্রিয়পাত্র স্বয়ং
বিষ্ণুবাহন গরুড়দেব দ্বারা সুরক্ষিত। দ্বারকার কীর্তি তথা দ্বারকাধীশের যশ প্রচার
করেন স্বয়ং পাঞ্চজন্য। সমুদ্রের মাঝে স্বয়ং নারায়ণের প্রস্ফুটিত কমলের উপর
বিরাজমান দ্বারকা। রাত্রে সমগ্র দ্বারকা তথা দ্বারকাধীশের প্রাসাদ রক্ষা করেন
দেবায়ুধ শিরোমণি, নারায়ণে অমোঘ শস্ত্র সুদর্শণ চক্র। দিনে সে ভার গ্রহণ করেন
বিষ্ণুবাহন। কারন দ্বারকার প্রতিটা কোণে নিবাস করেন স্বয়ং নারায়ণ। কিন্তু সমগ্র
দ্বারকাবাসীরা জানে এসব বানিয়ে বলা হয়েছে তথা দ্বারকার বাইরের অধিবাসীদের
বিশ্বাস করানো হয়েছে যাতে কেউ দ্বারকা আক্রমণ করে না বসে। এমনিতেই যাদবদের শত্রুর
অভাব নেই। নিত্যদিন এর সাথে ওর সাথে যুদ্ধ লেগেই রয়েছে। তার উপর যাদবদের অনেকে
দ্বারকাধীশের কীর্তিতে ঈর্ষান্বিত । আগে একাধিকবার দ্বারকাধীশের অনুপস্থিতিতে
শত্রুরা আক্রমণ করেছে দ্বারকা। তবে তাদের প্রতিহত করতেও সময় লাগেনি নারায়ণী সেনা
এবং দ্বারকাধীশের। কিন্তু বর্তমানে তিনি ভীষণ ব্যস্ত। হস্তিনাপুর সাম্রাজ্যের
আসন্ন মহাযুদ্ধের জন্য তিনি একাধারে উত্তেজিত এবং উৎকন্ঠিতও বটে। সেই কারনে বহুকাল
আগেই তিনি চরদ্বারা সমগ্র আর্যাবর্তে রটিয়েছেন এই গুজব।
দ্বারকার নামে নারায়ণের আয়ুধ নিয়ে যে
গুজব আছে তা বাস্তবে নারায়ণী সেনার বিভিন্ন পদের কীর্তি তথা কর্তব্যের নামান্তর।
দ্বারকাধীশের গুজব ছড়ানো চরেরাই দ্বারকায় ‘পাঞ্চজন্য’ নামে
খ্যাত। দ্বারকার ন্যায়ধর্ম তথা অনুশাসন দেখে ‘কৌমুদী’
পদাধিকারীরা। এরাই অপরাধীকে দণ্ড এবং আর্তদের রক্ষা করে। আর
দ্বারকার প্রহরীরা সুদর্শন চক্র পদাধিকারী। এরা দ্বারকার সীমান্ত তথা সমগ্র
দ্বারকার রক্ষার্থে বদ্ধ পরিকর। আর দ্বারকাধীশ তথা বলভদ্র এবং তাদের পারিষদের এবং
তাদের পরিবারের একান্ত ব্যক্তিগত অঙ্গরক্ষকরা ‘গরুড়’
নামে খ্যাত। অত্যন্ত স্থিতধী, মহাপরাক্রমী,
ব্যাঘ্রের মতো বলশালী এবং শ্যেনপক্ষির ন্যায় তীব্র দৃষ্টিসম্পন্ন
এই গরুড়েরা নিজের প্রাণের আহুতি দিয়েও দ্বারকাধীশের প্রাণ রক্ষার্থে বদ্ধ পরিকর।
সমুদ্র থেকে দ্বাদশ ধনু দুরত্বে
অবস্থিত চক্রাকার দ্বীপ দ্বারকা। অনেক উচু স্থান থেকে দেখলে মনে হবে যেন সমুদ্রের
উপর একটা সুবিশাল প্রস্তর নির্মিত চক্র ভাসমান। প্রায় শতযোজন উচু গগনচুম্বী
প্রাচীরে আবৃত দ্বারকা চক্রাকারে তিন ভাগে বিভক্ত। বহির্দ্বারকা, মধ্য দ্বারকা এবং
মূল দ্বারকা তথা অন্তর্দ্বারকা। বহির্দ্বারকায় থাকে নারায়ণী সেনার পদাতিক বাহিনী,
নগরীর কর্মকার, বাস্তুকার, সারথী, কুম্ভকার তথা শ্রমিকেরা। এখানে
অশ্বশালা বিদ্যমান। মধ্যদ্বারকায় থাকে কবি, শিল্পী,
গোয়ালাগন, এবং বনিকেরা। এখানে গোশালা
বিদ্যমান। আর অন্তর্দ্বারকার একেবারে মধ্যভাগে দ্বারকাধীশের সুবিশাল স্বর্ণময়
প্রাসাদ, এবং দ্বারকাধীশের সাধের বাগান রাধাকুঞ্জ।
প্রাসাদের আশেপাশে বড়ো বড়ো অট্টালিকায় থাকেন যাদবেরা, সেনাপতি,
মন্ত্রীমন্ডল তথা দ্বারকাধীশ এবং বলভদ্রর পার্ষদেরা।
দ্বারকাধীশ ধেনুদের ন্যায় অশ্বদেরও ভীষণ
ভালোবাসেন। সেই হেতু প্রতি প্রত্যুষে স্বয়ং নিজে বহির্দ্বারকায় এসে অশ্বশালার
অশ্বদের পরিদর্শন করেন। দাঁড়িয়ে থেকে তাদের জলপান, খাদ্য গ্রহণ করান। তারপর সারথীদের
সাথে সময় কাটান। বর্তমানে সারথীদের সাথে তার সখ্য ভীষণভাবে বেড়েছে। প্রতি
প্রত্যুষে অশ্বশালা পরিদর্শনের পর দ্বারকাধীশ সারথীদের নিবাসস্থলে যান। কিছু কাল
সেখানে ব্যায় করে নিজ প্রাসাদে ফিরে আসেন। তারপর প্রতিদিনের মতো সভায় বসেন। সভা
শেষে দ্বারকাধীশের সারথী দারুক আসে। তাকে নিয়ে দ্বারকাধীশ চলে যান নিজ
মন্ত্রণাকক্ষে। দিনরাত তিনি তার সাথে কি পরামর্শ করেন বোঝা দায়। মহারাণী রুক্মিনী
এবং মহারাণী সত্যভামাও নানাবিধ প্রচেষ্টা করেও দ্বারকাধীশের মুখ থেকে এই রহস্য
উন্মোচন করতে অপারগ পরিগনিত হয়েছেন। এমনকি দ্বারকাধীশের অগ্রজ বলভদ্র একবার এ
নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত করায় প্রত্যুত্তরে দ্বারকাধীশ কিছু বলেন নি বরং মৃদু
হেসেছেন শুধু।
দ্বারকায় প্রবেশ পথ আটটি হলেও
স্থলপথের দ্বারকেই প্রধান দ্বার হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বাকি সাতটা পথ ধরে
বনিকেরা জলপথে যাতায়াত করেন দুরদেশে বানিজ্য করা জন্য। জলপথে আক্রমণের কোনো ভয়
না থাকলেও প্রহরীরা নিরন্তর প্রহরা দেয় এই আটদ্বারে, প্রহরা দেয়
তিনদ্বারকার সীমাস্থলে। রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর উপস্থিত হওয়ায় আট দ্বারে তথা
সমগ্র দ্বারকায় প্রহরারত প্রহরীদের অবস্থান বদল হয়। এবারও তার অন্যথা হয় নি।
পুর্ববর্তী প্রহরী চলে যাবার আগে পরবর্তী প্রহরী তার কর্তব্য পালন করতে উপস্থিত
হয়েছিল। এমন সময় পরবর্তী প্রহরীর হঠাৎ মুত্রত্যাগের বাসনা উপনীত হলো। তার মনে
হতে লাগলো মুত্রত্যাগের এই ভীষণ বেগ উপশম না করতে পারলে তার ভাগ্যে অনেক দুর্গতি
লেখা আছে। সে পুর্ববর্তী প্রহরীকে অপেক্ষা করতে বলে ছুটল রাধাকুঞ্জে। একে রাত্রি
দ্বিতীয় প্রহর, তার উপর অন্ধকার। কেউ বুঝতে পারবে না
ভেবে সে বাগানের একেবারে গভীর অন্ধকার কোনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর নিম্নাঙ্গের
বস্ত্র একটু স্খলিত করে নিভৃতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে লাগলো। মুত্রত্যাগের পর
বস্ত্র সংযত করে সে পেছন ফিরতে যাবে এমন সময় কাছেই খুট করে একটা শব্দ হলো এবং তার
মনে হলো যেন গলার কাছে ভীষণ তীক্ষ্ণ কী একটা যেন প্রবেশ করল। অন্ধকারে বস্তুটি ঠিক
কী বুঝতে না পারলেও প্রহরী বুঝতে পারল বস্তুটা তার কন্ঠনালীকে আড়াআড়ি ভাবে ভেদ
করে তার কন্ঠ রোধ করেছে। মুহূর্তের ভগ্নাংশেরও কম সময় সে টের পেল তার মুখ দিয়ে
রক্ত বেরিয়ে আসছে এবং পারিপার্শ্বিক অন্ধকারের চেয়েও আরো গভীর অন্ধকারে তলিয়ে
যাচ্ছে সে।
পরবর্তী প্রহরীর ফিরে আসতে বিলম্ব
হওয়ায় একটু হতবাক হলো পুর্ববর্তী প্রহরী। মুত্রত্যাগে তো এত বিলম্ব হবার কথা
নয়। তাহলে পরবর্তী প্রহরী গেল কোথায়? আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর পুর্ববর্তী
প্রহরী নিকটে থাকা আরেক প্রহরীকে সতর্ক থাকতে বলে খোঁজ করতে এগিয়ে এল বাগানের
দিকে।
কিছু দুর এগিয়ে সে ডাকতে লাগলো
পুর্ববর্তী প্রহরীর নাম ধরে। কিন্তু কোনো সাড়া না পাওয়ায় ক্রমশ এগিয়ে গেল
অন্ধকারের দিকে৷ বেশ কিছুদুর যাবার পর হঠাৎ তার মনে হলো পশ্চাতে কে যেন দাঁড়িয়ে
আছে। সে কোমর থেকে তরবারি কোষমুক্ত করার আগেই পেছন থেকে কে যেন একটা ধারালো
ছুড়িকা চেপে ধরলো তার কন্ঠের ওপর। তারপর আড়াআড়ি একটান দিতেই লুটিয়ে পড়লো
পুর্ববর্তী প্রহরী। দুটো দেহকে বাগানের এক বৃক্ষের তলায় শায়িত করে ক্রমশ
সন্তর্পণে প্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেল এক ছায়ামুর্তি।
*****
রাত্রী তখন তৃতীয় প্রহর, দ্বারকাধীশের
কক্ষের আগে একটা বাঁকের আড়ালে নতজানু হয়ে বসলো ছায়ামুর্তি। তারপর পশ্চাতে একবার
দৃষ্টিপাত করলো। রাধাকুঞ্জ থেকে দ্বারকাধীশের কক্ষের পথ বেশীক্ষণ নয়। কিন্তু
এইটুকু পথ সন্তর্পণে অতিক্রম করতে তার একপ্রহর অতিবাহিত হয়ে গেছে। পশ্চাতে ফিরে সে
দেখলো পথের মাঝে অবস্থিত সকল প্রহরী তার কৃপায় গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। কেউ মাটিতে
নতজানু হয়ে বসে, কেউ বা ধরনীতে শয্যা গ্রহণ করেছে।
পার্থক্য শুধু একটাই এই নিদ্রা সাধারণ নিদ্রার মতো আর ভঙ্গ হবে না। পথের মাঝে সকল
প্রহরীকে সে নিঃশব্দে চিরনিদ্রায় শায়িত করে দিয়েছে। চন্দ্রালোক এখনো এদিকে উপনীত
হয় নি। হলে দেখা যেত প্রত্যেক প্রহরীর হয় মস্তকে শরবিদ্ধ নয় কন্ঠ দ্বিখণ্ডিত। কে
বলবে এই সকল প্রহরীরা নারায়ণী সেনার সুদর্শন চক্র পদাধিকারী মহাপরাক্রমী সৈন্য?
যুদ্ধক্ষেত্রে একমাত্র দ্বারকাধীশ ছাড়া আর কেউ এদের পরাস্ত করতে
অপারগ! মনে মনে হাসে ছায়ামুর্তি!
এদের পরাজিত করা কঠিন কিছু নয়। এদের
মারতে হলে ব্যাঘ্রের মৃগয়া রণনীতি প্রয়োগ করতে হয়৷ পেছন থেকে অতর্কিতে আক্রমণ করে
এক আঘাতে হত্যা করতে হয়। এই নীতি প্রয়োগ করে সমগ্র প্রাসাদের প্রায় অর্ধ নারায়ণী সেনা
বধ করে সে উপস্থিত হয়েছে দ্বারকাধীশের কক্ষে। দ্বারকার বাইরে এই সেনার যতই কীর্তি
প্রচারিত হোক না কেন বাস্তবে এরা যে কতটা মদ্যপ্রিয় এবং অলস তা সে জানে। কারন সেও
যে একজন প্রাক্তন সুদর্শণ চক্র পদাধীকারী সৈনিক! এবং বর্তমানে দ্বারকাধীশের একান্ত
প্রিয় অঙ্গরক্ষক গরুড় কেতুধ্বজ!
নিজ প্রশিক্ষণের বলে নাকি সুদর্শণদের
অকর্মন্যতার সুযোগে এতদুর পর্যন্ত কার্যসিদ্ধি করতে পেরেছে জানে না কেতুধ্বজ, কিন্তু আজ যদি সে
কার্যসিদ্ধি না করতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে দ্বারকার উপর যে ভয়াবহ ঝড় আসতে চলেছে তার
থেকে দ্বারকাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। এমনকি স্বয়ং দ্বারকাধীশও নন। ভাবতে ভাবতে
ডানহাতের রক্তস্নাত তরবারিটা সন্তর্পণে ভূমিতে রেখে বাঁকের আড়াল থেকে দ্বারকাধীশের
কক্ষের দিকে দৃষ্টিপাত করে কেতুধ্বজ। দেখে দ্বারকাধীশের কক্ষের বাইরে দুজন প্রহরী
প্রস্তরমুর্তির ন্যায় নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের দেখামাত্র চট করে কাঁধ
থেকে নিজের ধনুকটা নামিয়ে নেয় কেতুধ্বজ।
এই ধনুকের আকৃতি অন্যান্য ধনুকের চেয়ে
একটু ছোট। এই ধনুক তার নিজের আবিস্কার। অন্যান্য ধনুকের আকৃতি চারহস্ত সম হয়।
সেখানে তার ধনুক মাত্র দুইহস্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ধনুক আকারে ছোটো হলেও আক্রমণে
তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের গাণ্ডীব এবং অঙ্গরাজ কর্ণের বিজয়কে প্রতিযোগিতায় ফেলে দিতে
পারে। এই ধনু দিয়ে সে পলকে ছয়টা শর নিক্ষেপ করতে পারে। সমগ্র আর্যাবর্তে শরচালনায়
পরাক্রম কেবলমাত্র আটজনের আছে। মহামতী ভীষ্ম, মহাগুরু দ্রোণাচার্য, মহাগুরু কৃপাচার্য, দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা,
অঙ্গরাজ কর্ণ, তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন,
অর্জুনপুত্র অভিমন্যু, এবং দ্বারকাধীশ
নিজে শরক্ষেপণে মহারথী। এদের মধ্যে দ্বারকাধীশ, অভিমন্যু,
তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন আর অঙ্গরাজ কর্ণের পরাক্রম সে দেখেছে।
তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের মধ্যে একজন
আদর্শ গরুড়ের সমগ্র চিহ্ন বিদ্যমান। অর্জুন শরক্ষেপণে সর্বশ্রেষ্ঠ কারন তিনি
শরযোজনা করেন অসম্ভব ক্ষিপ্রতায়। তার মতোই অর্জুনও পলকে ছয়টা শরক্ষেপণ করে থাকেন।
অন্ধকারেও শরক্ষেপণে ব্যর্থ হন না। একজন সাধারণ ধনুর্ধারী সর্বাধিক দুশো গজ
পর্যন্ত শরক্ষেপণ করতে পারে কিন্তু অর্জুন পারেন তিনশো গজ পর্যন্ত। একই কৌশল আয়ত্ত
করেছেন অঙ্গরাজ কর্ণ। তবে তার রণকৌশলের আরেক উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার কবচ ও
কুণ্ডল। একবার কথায় কথায় দ্বারকাধীশ অর্জুনকে বলেছিলেন কর্ণের কবচ শুধু অভেদ্যই নয়, তার সাথে ভীষণ মসৃন
এবং ঝকঝকে, প্রায় আরশির মতো। আর যাই হোক না কেন, যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে কর্ণ সর্বদা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড়ান। বাকিটা
অনুমান করতে দেরী হয় নি কেতুধ্বজের। সুর্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে
কর্ণ পরিণত হন চলমান আরশিতে। ফলে শত্রুরা তার সম্মুখে এলেও কবচের প্রতিফলিত আলোর
ফলে তার দিকে তাকাতে পারে না। কার্যত অন্ধ হয়ে যায় তারা, আর
কর্ণ সে সুযোগে বধ করেন শত্রুদের। কর্ণকে পরাজিত করতে হলে শব্দভেদী হওয়া ছাড়া উপায়
নেই। আর বধ করতে হলে কবচহীন করতে হবে তাকে।
দ্বারকাধীশের কথা স্মরণ করতে করতে
তুনীর থেকে শব্দরোধী দুটো বিষাক্ত শর বের করে সে। ধনুকে শরযোজনা করে পলকের মধ্যে
প্রহরীদের দিকে নিক্ষেপ করে। শরবিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে দুজন প্রহরী বিষক্রিয়ায় ঢলে
পড়লে পুনরায় ধনুক কাঁধে নিয়ে ভূমি থেকে তরবারী তুলে দ্বারকাধীশের কক্ষের সম্মুখে
উপস্থিত হয় কেতুধ্বজ। অপুর্ব স্বর্ণের কারুকার্য করা কক্ষের রুদ্ধদ্বারের সম্মুখে
দাঁড়িয়ে চারদিকে একবার দৃষ্টিপাত করে দ্বারে একটা হাত রাখে। একহাত দিয়ে দ্বারে চাপ
দেওয়ামাত্র দ্বার উন্মোচিত হয়ে যায়। এত সহজে দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে দেখে একমুহূর্ত
থমকে দাঁড়ায় কেতুধ্বজ। কী হলো ব্যাপারটা? তাহলে কী দ্বারকাধীশ দ্বার অবরুদ্ধ করে
শয্যায় যান নি? তবে কী তিনি জানেন সে আসছে? মুহূর্তের জন্য বিচলিত হলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে মনকে স্থির করে কক্ষে
প্রবেশ করে কেতুধ্বজ।
*****
কক্ষের ভেতরটা ঈষৎ তমসাচ্ছন্ন, সারারাত
স্বল্পালোকে কক্ষকে আলোকিত করার পর অবশেষে সমগ্র কক্ষের দীপসমূহ নির্বাপিত। কিন্তু
এতে দৃষ্টিপথে কোনো ব্যাঘাত ঘটল না কেতুধ্বজের। তাছাড়া দ্বারকাধীশের কক্ষের
প্রতিটা কোন তার নখদর্পনে অবস্থিত।
গরুড় পদাধিকারীদের পদে উন্নীত হবার পরে
সৈনিকদের এক বর্ষের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণে প্রেরিত করা হয়। সেই প্রশিক্ষণ চলে কঠোর
থেকে কঠোরতম আবহাওয়ায়, কঠোর থেকে কঠোরতম পরিস্থিতিতে। কেউ প্রশিক্ষিত হয় দুর্গম পর্বত পাদদেশে,
কেউ বা মরুভূমিতে, কেউ প্রশিক্ষিত হয়
শ্বাপদসঙ্কুল বনে। দিনের পর দিন অভুক্ত থেকে সুর্যোদয় থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত চলে
অমানুষিক প্রশিক্ষণ। তারপর হয় এক ভয়ঙ্কর পরীক্ষা! সেই বিপদসঙ্কুল পরিবেশে বেঁচে
থাকার পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় ত্রুটির কোনো ক্ষমা নেই। কারন বিপদসঙ্কুল পরিবেশে
ত্রুটির ফল একটাই, ভয়াবহ মৃত্যু। একারনে একবর্ষের কঠোর
প্রশিক্ষণে সকলে ফিরে আসতে পারে না। যারা আসে তারা পরিণত হয় আবেগহীন, মায়া-মমতাহীন এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধায়। যাদের মনে কোনো রকম করুণা থাকে না,
থাকে কেবল দ্বারকাধীশের প্রতি প্রবল আনুগত্য এবং দ্বারকার রক্ষার
প্রবল কর্তব্যবোধ। দ্বারকাকে রক্ষার স্বার্থে এরা নিজপ্রাণ আহুতি দিতে কিংবা কারো
প্রাণ হরণ করতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ করেনা। তা সে যে কেউ এমন কি দ্বারকাধীশ
বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণই হোন না কেন! ঠিক এই কারনেই আজকে দ্বারকাধীশের কক্ষে কেতুধ্বজের
অভিযান পরিকল্পিত হয়েছে। বিগত একমাস নিজের সাথে অমানুসিক যুদ্ধ করে অবশেষে সে
সিদ্ধান্ত নিয়েছে দ্বারকাকে যদি রক্ষা করতে হয় তাহলে দ্বারকাধীশকে মরতে হবে!
পাণ্ডব ও কৌরবদের মধ্যে সংগঠিত
মহাযুদ্ধ আসন্ন প্রায়। যেকোনো মুহূর্তে রণভেড়ী বাজতে পারে। এই মহাযুদ্ধকে কেন্দ্র
করে সমগ্র আর্যাবর্তের রাজন্যবর্গ যোগ দিচ্ছেন দুই শিবিড়ে। নিজ শত্রুর প্রতি
পুঞ্জিভূত আক্রোশকে প্রশমিত করার জন্য, এতদিন যে শত্রুকে মাত দিতে পারেন নি তাদের
বধ করার জন্য রাজন্যবর্গরা একে একে ভীড় করছেন দুই শিবিড়ে। সে শুনেছে প্রায় সমগ্র
আর্যাবর্তের যোগ দেওয়া সম্পুর্ণ। কেবল দ্বারকার এবং মদ্রদেশের যোগদান অবশিষ্ট।
মদ্রদেশ পাণ্ডবদের মাতুলদের দেশ। মদ্ররাজ শল্য নকুল এবং সহদেবের আপন মাতুল। তিনি
পাণ্ডব পক্ষেই যোগ দেবেন কিন্তু দ্বারকা? দ্বারকাধীশ এবং
বলভদ্রের আত্মীয় এই দুপক্ষই। দ্বারকাধীশ সম্পর্কে
পাণ্ডবদের ভ্রাতা হন। আবার যুবরাজ দুর্যোধন বলভদ্রের স্নেহধন্য। বলভদ্র নিজে হাতে
তাকে গদাযুদ্ধে অপরাজেয় করে তুলেছেন। সেই হেতু দ্বারকা এখন ভীষণ ধর্মসঙ্কটের
সম্মুখীন হয়েছে। এক শিবিড়ে যোগ দিলে অপর শিবিড়ের বিরাগভাজন হতে হবে দ্বারকাকে। আর
মহাযুদ্ধে বিপক্ষ শিবিড় জিতলে তার প্রকোপ সহ্য করতে হবে দ্বারকাকে। বলভদ্রকে জানে
কেতুধ্বজ, তিনি কোনো পক্ষেই যাবেন না। কিন্তু দ্বারকাধীশ?
তিনি তো আর তাঁর অগ্রজের মতো নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন না। সে জানে,
তিনি যোগ দেবেন পাণ্ডবপক্ষেই। আর এখানেই সে ভয় পাচ্ছে।
গরুড় অধিনায়ক সাত্যকির কাছে সে শুনেছে
কৌরবেরা সংখ্যায়, বলে, কৌশলে পাণ্ডবদের চেয়ে চার অক্ষৌহিণী
সেনায় এগিয়ে। কৌরবদের পক্ষে মহামহিম ভীষ্ম, মহাগুরু
কৃপাচার্য, মহাগুরু দ্রোণাচার্য, দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা, অঙ্গরাজ কর্ণ রয়েছেন।
এদিকে পাণ্ডবেরা কেবল অর্জুন, অভিমন্যু, এবং মধ্যম পাণ্ডব ভীমের গদার ভরসায় যুদ্ধে অবতীর্ণ। এ যুদ্ধ এক
অসমযুদ্ধ! এতে কৌরবদের জয় একপ্রকার নিশ্চিত! এবার যদি বাসুদেব পাণ্ডবদের পক্ষে…
না আর ভাবতে পারছে না কেতুধ্বজ। যুদ্ধে পাণ্ডবেরা হারলে দুর্যোধন
বলভদ্রের জন্য দ্বারকা আক্রমণ করবেন না ঠিকই কিন্তু এমন কিছু করবেন যাতে দ্বারকার
মান সম্মান আর্যাবর্তের সম্মুখে ধুলোয় মিশে যায়। যুবরাজ দুর্যোধন ভীষণরকমের
প্রতিহিংসাপরায়ণ।
মনকে শক্ত করে কোমর থেকে একটা বিষাক্ত
ছুরিকা বের করে কেতুধ্বজ। বাসুদেবের মৃত্যু হলে হয়তো দ্বারকা অভিভাবকহীন হবে, কিন্তু আসন্ন
সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা পাবে চিরতরে। ভাবতে ভাবতে সন্তর্পনে পা ফেলে বাসুদেবের
পালঙ্কের কাছে এগিয়ে যায় কেতুধ্বজ। প্রায় কাছে পৌঁছে গেছে এমন সময় একটা পরিচিত
কন্ঠস্বরে সে স্তব্ধ হয়ে যায়। ভীষণ মৃদুস্বরে কে যেন বলে ওঠে, “অবশেষে এলে তুমি! এত বিলম্ব কেন হলো কেতুধ্বজ?”
অবাক হয়ে কেতুধ্বজ। কে বলল কথাটা? কেউ কী ঘরে জাগ্রত?
কিন্তু তা কী করে সম্ভব? রাত্রে
দ্বারকাধীশের কক্ষে কারো প্রবেশের অনুমতি নেই! তাছাড়া রাধাকুঞ্জ থেকে এই কক্ষ
পর্যন্ত পথে প্রহরারত সকল প্রহরীকে সে চিরশয্যায় শায়িত করে এসেছে! তবে কী বাসুদেব?
শক্ত মুঠোয় ছুরিকাটাকে ধরে কেতুধ্বজ। বাসুদেবের কথায় বিচলিত হলে
চলবে না। সে নিজেকে প্রবোধ দেয়, “বাসুদেব কোনো সাধারণ
মানুষ নন! তিনি একাধারে অসামান্য ঐন্দ্রজালিক, মহান
কূটনীতিজ্ঞ এবং একজন অসাধারণ বাগ্মী। কথার কৌশলে তিনি অসাধ্যসাধন করে থাকেন। তার
কথায় বিচলিত হলে চলবে না। নিজ লক্ষ্যে স্থির থাকো!” ভেবে
সে এগিয়ে যায় পালঙ্কের দিকে।
এমন সময় গৃহে শেষবারের মতো প্রবেশ করে
চন্দ্রদেবের ম্লান আলো। আর সেই আলোয় সাম্নের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায়
কেতুধ্বজ। বাসুদেব উঠে বসেছেন নিজশয্যায়। তার দৃষ্টি সটান কেতুধ্বজের দিকে। তার
দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন তিনি। কী নিস্পাপ, স্নিগ্ধতায় ভরা দৃষ্টি বাসুদেবের!
সেই দৃষ্টিতে মৃত্যুর আতঙ্কের করাল ছায়া কিংবা একান্ত প্রিয়জনের বিশ্বাসঘাতকতার
তীব্র ঘৃণার লেশমাত্র নেই বরং তার জায়গায় সমগ্র মুখ জুড়ে রয়েছে একটা প্রশান্তি,
একটা আনন্দের ছাপ। যেন অনেক অপেক্ষার পর অবশেষে কাঙ্খিত বস্তু
পেতে চলেছেন তিনি!
এ কোন বাসুদেবকে দেখছে সে? এতদিন ধরে যাকে
দেখে এসেছে আর আজ যাকে দেখছে দুজনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য! সমগ্র দ্বারকা যাকে
চেনে সেই বাসুদেব সরল, সদাহাস্যময়, প্রগলভ, নায়কোচিত স্বভাবের মানব।
সর্বজনপ্রিয়, প্রাণবন্ত বাসুদেব যেখানে যান সেইস্থান
আলোকিত করে অধিষ্ঠান করেন। যাদবদের অভিজাতবর্গ হোক বা কৌমুদীসেনার একজন সেনানী,
গোয়ালা হোক বা দ্বারকার সারথীগন, সকলের
সাথে এমন আন্তরিকভাবে মিলিত হন যেন তিনি তাদেরই লোক। সেই মানুষটার এতটা
মৃত্যুতৃষ্ণা? দিনের সুর্যালোকে যে মানুষটা প্রাণোচ্ছল
হাসিতে পরিপূর্ণ হয়ে সমগ্র দ্বারকা পরিচালনা করেন সেই মানুষটার রাত্রে কী নিদারুন
পরিবর্তন!
কেতুধ্বজ বুঝতে পারছে বাসুদেব জানতেন
তার পরিকল্পনার কথা। জানতেন আজ হোক বা কাল সে আসবেই। সেকারনেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা
করছিলেন তার। কোন মন্ত্রবলে জানতে পারলেন তা বুঝতে না পারলেও সে বেশ বুঝতে পেরেছে
বাসুদেবকে হত্যা করার জন্য সে যতটা বদ্ধপরিকর তার চেয়েও বেশী আকুল বাসুদেব মৃত্যুকে
বরণ করার জন্য। কিন্তু কেন?
বাসুদেবের কন্ঠস্বরে ঘোর কাটে কেতুধ্বজের। বাসুদেব হেসে বললেন,“কী হলো কেতুধ্বজ? দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?এসো উদ্ধার করো আমায়! যে কার্যে এসেছো সেই কার্যসমাধা করো! আমার
হৃদয়ে ওই ছুরিকা বিদ্ধ করে মুক্ত করো আমাকে!একে একে সব প্রিয়জনকে নিজের শত্রুতে
রূপান্তরিত হতে দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত! আর পারছি না আমি এই দ্বারকার দায়ভার বহন
করতে! এসো পঞ্চভূতে বিলীন হতে সাহায্য করো আমায়!" বলে দুদিকে নিজের দুহাত
মেলে ধরে নিজের দুচোখ বন্ধ করেন বাসুদেব।
আগেও অনেক মানবহত্যা করেছে কেতুধ্বজ।
পলক ফেলার আগে অস্ত্রের কোপে মানবদেহ থেকে প্রাণবায়ুকে পঞ্চভূতে বিলীন করেছে সে।
হত্যা করার পূর্বে তাদের চোখে সে মৃত্যুর করাল গ্রাসের আতঙ্ক প্রত্যক্ষ করেছে।
কারো কারো চোখে বিষাদের ছায়া দেখেছে। কিন্তু মৃত্যুর প্রতিক্ষায় কেউ অধৈর্য হতে
পারে, মৃত্যুর
জন্য কেউ এত আকুল হতে পারে, এ তার কল্পনাতীত ছিল। হঠাৎ
তার মনে হতে লাগলো একটা অবসাদ যেন তাকে চারপাশ দিয়ে ক্রমশ ঘিরে ধরছে। সে এখানে
এসেছিল বাসুদেবকে বধ করতে। সমগ্র প্রাসাদের অর্ধেক সৈন্যকে বধ করে অনেক কষ্টে
প্রবেশ করেছিল কক্ষে। এখন তার সম্মুখেই সম্পুর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় উপবিষ্ট বাসুদেব
অথচ একপাও সে এগোতে পারছে না। তার পদযুগল যেন কক্ষের ভূমির সাথে প্রস্তরিভূত হয়ে
প্রোথীত হয়ে গেছে। প্রতি মুহূর্তে একটা গ্লানি, একটা
অপরাধবোধ ক্রমশ গ্রাস করছে তাকে। তার মনে পড়ে যাচ্ছে গরুড় পদে উন্নীত হবার পর
অগ্নিশপথ গ্রহণের দিনটা। মনে পড়ছে প্রতিমুহূর্তে বাসুদেবের সান্নিধ্য। নাহ আর যাই
হোক না কেন, বাসুদেবকে সে চাইলেও আর হত্যা করতে পারবে না।
ছুরিকাটা ফেলে দিয়ে নতজানু হয়ে বসে
পড়ে কেতুধ্বজ। বাসুদেবের চরনে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে সে। বাসুদেব
কেতুধ্বজের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এবারেও হলো না! শিওরে শমন এসেও তাকে
স্পর্শ করলো না। তারমানে এখনও তার দায়িত্ব শেষ হয় নি। এখনও তাকে অনেক সহ্য করতে
হবে। অনেক প্রিয়জনের মৃত্যুর সাক্ষী হতে হবে, অনেক দুঃসংবাদ শ্রবণ করতে হবে। অথচ এর থেকে
মুক্তি পেতে না জানি কতবার তিনি মরণের দ্বারে গেছেন। কিন্তু বিধিবাম! তার মরণ হয়
নি। অমর হওয়ার চেয়ে বড়ো জ্বালা ঈশ্বর হওয়ায়। না জানি সেই ভার আর কতদিন বইতে
হবে তাকে! কেতুধ্বজের দিকে তাকিয়ে ব্যথাতুর হাসি হাসেন বাসুদেব। তারপর বলেন,
“তোমার আশঙ্কা মিথ্যে কেতুধ্বজ! তুমি ভাবলে কি করে যুদ্ধে আমি
যোগ দেব? আমি শিবিড়ে যোগদান করলেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হবো
না। কারন দুর্যোধন আর যুধিষ্ঠির দুজনেই আমার প্রিয়জন। যাকেই আঘাত করি না কেন কষ্ট
আমারই হবে। আর একজনের পক্ষ নিলে দ্বারকার সমূল ক্ষতি আসন্ন তা আমি জানি। কিন্তু
পক্ষ না নিলে নব আর্যাবর্ত নির্মাণে দ্বারকার ভূমিকা যে নগন্য থেকে যাবে কেতুধ্বজ।
তুমি যেমন দ্বারকার রক্ষার্থে বদ্ধপরিকর। তেমনই আমিও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যাদবদের
প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার্থে। সে কারনে যুদ্ধে যোগ দেওয়া অবসম্ভাবী। তবে যে কোনো এ
শিবিড়ে যোগ দিলেও অপরপক্ষকে ফেরাবো না আমি। যুদ্ধে দুপক্ষেই যোগ দেবে
দ্বারকা।"
কেতুধ্বজ বাসুদেবের দিকে তাকিয়ে বলে, “তা কী করে সম্ভব
প্রভু?" বাসুদেব হেসে বলেন, “দেখতেই পাবে। তবে তার আগে এক কোণে লুকিয়ে পড়ো। রাত্রি ঘনিয়ে
সুর্যোদয় হতে চলেছে। ঐ ওরা এলো বলে!" বলার সাথে সাথে কক্ষের বাইরে কোলাহল
শুনতে পান ওরা। কেতুধ্বজ তড়িঘড়ি লুকিয়ে পড়ে অলিন্দের এক কোণে। আর বাসুদেব
পুনরায় শয্যাগ্রহণ করেন। আর ঠিক সেই সময় কক্ষের দ্বার উন্মোচন করে কক্ষে প্রবেশ
করেন হস্তিনাপুর যুবরাজ, ধৃতরাষ্ট পুত্র, গান্ধারীনন্দন, জ্যেষ্ঠ কৌরব, দুর্যোধন।
সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব
হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...
-
রেস্তরাঁর ছাদ থেকে অস্তপ্রায় সুর্যর দিকে তাকিয়ে মুখে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন রজতাভ। “কিরে? আর কতক্ষণ?” বলে ঐশ্বর্...
-
“Ladies and gentlemen, may I have your attention please? Thank you! আজ আমরা সকলে এখানে উপস্থিত হয়েছি আমার প্রিয় বন্ধু প্রখ্যাত চিত্রশিল্প...
-
স্টুডিও থেকে গাড়িটা বেরোনো মাত্র ব্যাকসিটে হ্যালান দিয়ে বসল মঞ্জুষা। সারাদিন আজ বড্ড ধকল গেছে। এই সোমবার ওদের সেটে একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে না...

