অনুসরণকারী

বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

টেক্কা




ফোনটা রিসিভ করে সবটা শোনার পর চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল বাদশা। চারদিক কেমন যেন ঝাঁপসা হয়ে উঠল।মাথার দুপাশের রগে আঙুল দিয়ে চেপে চোখ বুঁজে বসে রইল সেকিছুক্ষন। ফোনে যেটা শুনল সে এরপর বড়োবাবুর সামনে দাঁড়ানোর সাহস আর ওর নেই।বড়ো মুখ করে ও ভরসা দিয়েছিল ম্যাডামকে। সব সব বৃথা হয়ে গেল। এই নিয়ে পর পর চারবার, পর পর চারবার চুরি হয়েছে এই সবুজগঞ্জে। আর চুরিটাও অদ্ভুত। সোনাদানা, টাকাপয়সা, ঘটিবাটি কিচ্ছু চুরি যাচ্ছে না। বরং চুরি যাচ্ছে অন্য কিছু।

 

স্যার শুনতে পাচ্ছেন?”  কন্ঠস্বর শুনে চোখ খুলে সামনে তাকালো বাদশা হেড কন্সটেবল রুইতন সামনে দাঁড়িয়ে  ছিপছিপে গড়ন, পরনে হাল্কা হয়ে আসা খাকি রঙের ইউনিফর্ম কাচুমাচু মুখে আবার বলল রুইতন, “ স্যার শুনতে পারছেন?” “হুম কিছু বলবে?” বলে সোজা হয়ে বসলো বাদশা সামন্তইয়ে মানে বড়োবাবু মানে ম্যাডাম আপনাকে ডেকেছেন খুব রেগে আছেন মনে হলোমনে মনে প্রমাদ গুনল বাদশা এই রে! তারমানে ম্যাডামের কানেও খবর গেছে! আজ বোধহয় আর রক্ষে নেই মনে মনে একটু আশঙ্কিত হলেও রুইতনের সামনে সেটা প্রকাশ না করে গম্ভীর গলায় সে বলল, “হুম তুমি যাও আমি আসছিবলে উঠে দাঁড়ালো বাদশা

 

রুইতন মাথা নেড়ে বাদশার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর থানার বাইরে বেঞ্চে গিয়ে বসলো। পাশেই বসে ছিল হরতন। সে এক হাতে খৈনি ডলতে ডলতে বলল, কিরে আজ মুখটা ওরকম হনুমানের মতো কালো করে বসে আছিস কেন?কি ব্যাপার? বউদি আজ সকাল সকাল করলা সেদ্ধ খাইয়েছে নাকি?বলে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগলো সে। হরতনের এই কথা গায়ে মাখল না রুইতন। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ম্যাডাম আবার স্যার কে ডেকেছেন।খৈনিতে তালি মারতে মারতে হরতন বলল, টেক্কা?রুইতন মাথা নাড়লো। খৈনিতে তালি মেরে পরিস্কার করে হরতন  এগিয়ে দিল রুইতনের দিকে। নিজের ভাগের খৈনি নিয়ে মুখে পুরে রুইতন বলল, ব্যাপারটা ক্রমশ গুরুতর হয়ে যাচ্ছে। হতভাগাটা বেশ বার বেড়ে গেছে।

 

অবশিষ্ট খৈনি মুখে পুরে হাত ঝেরে হরতন বলল, তা তো বটেই। কিন্তু চুরিটাও যে বড়ো অদ্ভুত। লোকের ঘটি,বাটি, টাকাপয়সা চুরি যায় শুনেছি।কিন্তু পুজোর ভোগ, ঠাকুরের সাজ, ভিয়েন, উনুন চুরি যায় জীবনে শুনি নি। মন্দিরের সিন্নি ভোগ চুরি।জীবনে এরকম শুনিনি।হতাশ গলায় রুইতন বলল, মেজবাবুর জন্য খারাপ লাগছে। সত্যি লোকটা বড্ড খাটছে। কিন্তু কোনো কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।বার বার এত বজ্রআটুনির পরও কিভাবে যেন পাঁকাল মাছের মতো পিছলে যাচ্ছে টেক্কাটা। আর মেজবাবুকে হাত কামড়াতে হচ্ছে।

 

তা এবার কে?” হরতন বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে জিজ্ঞেস করল রুইতন রাইফেলটা কোলে রেখে বলল,“ এবার পাঁকা খবর ছিল যোগেন গোঁসাই এর বাড়িতে টেক্কা হানা দেবে সেই মতো ফোর্স নিয়ে মেজোবাবু কড়া পাহারার ব্যবস্থা করে এসেছিলেন একটা মাছিরও গলে যাবার উপায় ছিল না কিন্তু আজ ম্যাডাম আর স্যারের মুখ দেখে মনে হচ্ছে টেক্কা আবার টেক্কা মেরে দিয়েছেহরতন আড়মোড়া ভেঙ্গে বলল,“ তা বেশ করেছে যোগেন গোঁসাই যে আদপে একটা কশাই এটা এই সবুজ গঞ্জের প্রত্যেকে জানেওর এই পুজো, এই সাধারন মানুষকে ভোগ খাওয়ানো যে লোক দেখানো আর ওর গুদামের বাসি পঁচা চাল, ডাল পার করে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়

 

শশব্যস্ত হয়ে ঠোটে আঙুল দিয়ে রুইতন বলল,চুপ! এই কথাটা এখানে বলেছিস বলেছিস। খবরদার এই কথাটা ম্যাডাম বা যোগেন গোঁসাইয়ের কানে না যায়। সর্বনাশ হয়ে যাবে।” “হোক গে। আমি কি ওকে ভয় পাই নাকি?ক্ষোভে  হিসহিস করে উঠলো হরতন। গোটা গ্রাম যোগেন গোঁসাই আর আঢ্যিবাবুর উপর খাপ্পা হয়ে আছে। সেই সোজারথে তিরির ছেলেটাকে ওভাবে মেরে ফেলার জন্য। কত বয়স ছিল বাচ্চাটার বলতো? কি দোষ করেছিল বেচারা? রথযাত্রায় শুধু রথের দড়িটা ছুঁয়েছিল ও। আর গোটা গ্রাম দেখেছে কিভাবে আঢ্যিবাবু ধাক্কা মেরে বাচ্চাটাকে রথের চাকার তলায় ফেলে দিল! তারপর কি হল? সব ধামাচাপা পড়ে গেল।আজও বাচ্চাটার চিৎকার আর ঐ হাড় ভাঙ্গার মটমট শব্দ এখনও কানে বাজে। এই সব লোকের জন্য টেক্কাই ভালো ওষুধ।

 

 রুইতন এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল কেউ ওদের কথা শুনছে কিনা তারপর ফিসফিস করে বলল,“ জানি কিন্তু এইভাবে চুরি করে কি ওকে সাজা দেওয়া যাবে?” হরতন রুইতনের দিকে তাকিয়ে বলল,“ মানে?” রুইতন হেসে বলল,“ মানেটা সহজ এইভাবে চুরি করে কি যোগেন গোঁসাইয়ের কোনো ক্ষতি করতে পারছে টেক্কা? এত পুকুরের থেকে একটা ঝিনুক দিয়ে জল তুলে নেওয়ার মতো গোঁসাইকে মারতে হলে যে অন্য পথ লাগবেহরতন রহস্যের গন্ধ পেয়ে বলল,“কোন পথ?” রুইতন চারদিক তাকিয়ে বলল,“এখানে নয় আজ রাতে বাড়িতে বলবো

 

()

 

ওসি রাধারাণী ভট্টাচার্যের কেবিনে ঢোকার আগে টুপিটা ঠিক করে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ইষ্টনাম করতে করতে বাদশা বলল,আসবো ম্যাডাম?ভেতর থেকে কাঁচের চুড়ির মতো রিনরিনে মোলায়েম কন্ঠস্বর ভেসে এল।কাম ইন!ভেতরে ঢুকে একটা মিহি মিষ্টি গন্ধ টের পেল বাদশা। একটা পেল্লাই টেবিলের ওপারে একটা রিভলভিং চেয়ারে বসে একটা ফাইল দেখতে দেখতে রাধারাণী হাই তুলে বললেন,খবর পেয়েছেন?বিড়বিড় করে বাদশা বলল,হ্যা ম্যাডাম। এইমাত্র খবর পেলাম।

 

ফাইলটা টেবিলে রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে এবার সরাসরি বাদশার দিকে তাকালেন রাধারাণী। সো এই ব্যাপারে  আপনার কিছু বলার আছে? কাল তো ভীষন আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন এবার নাকি টেক্কা আর পার পাবে না। এবার আপনি ওকে ধরবেনই তা কি হলো? কালকের সেই আত্মবিশ্বাস কোথায় গেলো? খুব তো বলেছিলেন টেক্কাকে হাজতে পুরবেন তা কোথায় টেক্কা? ইউ নো হোয়াট? আই থিঙ্ক ইউ কান্ট ডু দিস৷ সবার দ্বারা সব কাজ হয় না মি: সামন্ত৷ আপনারা কোনো কাজেরই নন৷ শুধু মুখে মুখেই যত বাতেলা৷ কাজের বেলা অষ্টরম্ভা৷ এতগুলো ফোর্স, এত সতর্কতা সত্ত্বেও টেক্কা আপনার নাকের তলা দিয়ে বেরিয়ে গেল আর আপনি বসে রয়ে গেলেন ৷ জাস্ট ওয়ার্থলেস! আপনাকে দিয়ে বোধহয় হবে না বুঝলেন? এককাজ করুন কেসটা আপনি মি: চক্রবর্তীকে হ্যান্ডওভার করে দিন৷ আর কদিন ধরে দেখছি আপনাকে একটু রেস্টলেস লাগছে৷ এককাজ করুন কদিনের সিএল নিয়ে নিন৷ আপনার মানসিক শান্তিও হবে আর বেশ কদিন ছুটি কাটাতে পারবেন৷

 

কানের মধ্যে যেন কেউ গলন্ত লোহা ঢেলে দিলো বাদশার৷ দশবছর, পর পর দশবছর হলো পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছে সে৷ আজ পর্যন্ত কেউ এই অপবাদ দিতে পারবে না যে সে থানায় বসে বসে মাছি তাড়ায়৷ বরং এত বছরের সার্ভিসে সে যে যে থানায় গেছে অপরাধীদের হাড়মাস ভেজে দিয়ে এসেছে৷ লাস্ট পোস্টিং ছিলো লালগড় সেখান থেকে ওর বদলী হবার দিন ওখান কার নাম করা গুন্ডা পান সিং পাঁড়ে মা কালির মন্দিরে মানত করা দুজোড়া পাঠা বলি দিয়েছে৷ কারন মাত্র ছমাসেই লালগড়ের দোর্দন্ডপ্রতাপ গুন্ডাকে নাকে দড়ি দেওয়া বলদের মতো ঘুরিয়েছে সে৷ বাচ্চার মতো কাঁদিয়েছে৷ খোচড় মুখে শুনেছে আজও নাকি রাতে মাঝে মাঝে ওর নামে ভয়ে কেঁপে ওঠে পান সিং৷ এই গ্রামে এসেই শুনেছিল টেক্কার কথা৷ এমনকি লোক লাগিয়ে দেখাও করে এসেছে সে৷ এটাই ওর অভ্যেস৷ শত্রুর সাথে মোকাবিলার আগে তাকে মেপে নিতে হয়৷ মেপে নেওয়ার পর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিলো সে মনে মনে৷ কিন্তু ক্রমশ সে হাসি ফুরিয়েছে৷  টেক্কা সত্যি সত্যি টেক্কা দিচ্ছে তাকে৷

 

পাঁচফুট দু ইঞ্চির ঐ গোবেচারা দেখতে লোকটার বিরুদ্ধে কোনো প্রমান পাচ্ছে না সে৷ অথচ সে জানে চুরিটা টেক্কা আর তার দুই শাগরেদ দুরি আর তিরি মিলে করছে৷ বামাল সমেত কিছুতেই ধরতে পারছে না সে৷ চুরির সাথে সাথে বাড়ি সার্চ করেও কিছু নেই৷ এমনকি হরতন,রুইতনকে ওদের বাড়িতে পাহারায় বসিয়েও লাভ হচ্ছে না৷ ক্রমশ মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে তার৷  এতবছরের ট্র্যাক রেকর্ডে পানের পিকের মতো দাগ ফেলে দিয়েছে টেক্কা৷ যার ফলে রোজ ম্যাডাম ওকে এইভাবে আক্রমন করতে সুযোগ পাচ্ছেন৷ 

দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজেকে সামলে বলে,আমিও তাই ভাবছি ম্যাডাম৷ কদিন একটু ছুটি নেবো৷ কিন্তু ঐযে মুদ্রাদোষ ৷ যতক্ষন পর্যন্ত এই সবুজগঞ্জে ক্রাইম না আটকাতে পারছি ততক্ষন পর্যন্ত শান্তিতে ঘুমোতে পারবো না৷ তবে শরীর আর সাথ দিচ্ছে না তাই আজকের দিনটা শেষবারের মতো চাইছি আমি৷ আপাতত এই অ্যাপ্লিকেশনে সই করে দিন৷ আজ রাতের পর ছুটি নেবো৷ তবে তার আগে টেক্কাকে ধরবোই৷ একটা ট্রেস পেয়েছি৷ প্লিজ ম্যাডাম আজকের দিনটা আমাকে সময় দিন৷বাদশার কথায় এমন কিছু ছিলো না করতে পারলেন না রাধারাণী৷ অ্যাপ্লিকেশনটা হাতে নিয়ে পড়তেই চকিতে তাকালেন তার দিকে৷ আর ইউ শিওর?বাদশা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গলায় বলল,একশো শতাংশ!রাধারাণী কিছুক্ষন বাদশার দিকে তাকিয়ে সই করে অ্যাপ্লিকেশনটা ফেরত দিয়ে বললেন,ওয়েল আজ রাত বারোটা পর্যন্ত সময় দিচ্ছি৷ তারপর আর সময় পাবেন না৷ বি কেয়ারফুল মি: সামন্ত৷ বাদশা অ্যাপ্লিকেশনটা ফেরত নিয়ে পকেটে পুরে বলে,চিন্তা নেই ম্যাডাম আজ রাতের মধ্যে টেক্কা আমার সাথে থাকবে৷

 

()

 

যোগেন গোঁসাইয়ের বাড়ি যখন পৌছলো বাদশা তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে৷  গেটের সামনে বাইকটা রেখে ভেতরে ঢুকলো সে৷ পাথরের সুড়িপথ ধরে এগিয়ে গেল যোগেন গোসাইয়ের দালানের দিকে৷  এই সবুজগঞ্জে মাত্র দুটো বড়ো পাকা দালানের বাড়ি আছে, এক এ গ্রামের জমিদার ইন্দ্রজিৎ আঢ্যর আর এই যোগেন গোঁসাইয়ের৷ যোগেন গোঁসাই নামে আর লোক দেখানোতে গোঁসাই মনে হলেও বাদশা জানে এটা ওর ভেক ছাড়া আর কিছু নয়৷ কানাঘুষোয় শুনেছে সুদের কারবার ছাড়াও আরো অনেক বেআইনি ব্যাবসা আছে৷  মাঝে মাঝে তার মনে হয় টেক্কাকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই৷  কারন ও যা করছে এতে যোগেন গোঁসাইয়ের বিন্দু মাত্র ক্ষতি হচ্ছে না৷ এ যেন সমুদ্র থেকে এক ঝিনুক জল তুলে নেওয়া৷

ইন্দ্রজিৎ আঢ্য দালানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, বাদশাকে দেখে এগিয়ে এসে বললেন,আসুন আসুন বাদশাবাবু৷ কি ঝামেলা বলুন দেখি? হতভাগা চোরের দল জগন্নাথের ভোগ, নৈবেদ্য সমেত বাসনগুলোও নিয়ে গেছে৷ এদিকে যোগেন হত্যে দিয়ে ঠাকুরঘরে পড়ে আছে৷ কথা বলতে বলতে বাদশা দালানের বাদিকে তাকিয়ে রথটা দেখতে পেল৷ প্রায় ছমানুষ লম্বা লোহার রথ৷ কাপড়, রাংতা, ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে৷

 

  আজ উল্টোরথ, জগন্নাথের বাড়ি ফেরার দিন৷ সে শুনেছে সবুজগঞ্জে রথের দিন আঢ্যদের বাড়ি থেকে ওদের কুলদেবতা চক্রপাণী জগন্নাথবেশে যোগেন গোঁসাইয়ের বাড়িতে আসেন৷ এবং আটদিন গোঁসাইয়ের বাড়িতে পুজো পান৷ এই আটদিন গ্রামে অরন্ধন চলে৷ গ্রামের সকলে দুবেলা পাত পেড়ে ভোগ গ্রহন করে যোগেন গোঁসাইয়ের বাড়ি৷ তাকেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল৷ কিন্তু সে যায় নি৷ নিমন্ত্রণ বাড়ির খাবার তার ভালো লাগে না৷ এত খাবার নষ্ট হতে দেখে তার কষ্ট লাগে৷  সে স্বল্পাহারী৷ তার মতে খাবার খাওয়া উচিত খিদে মেটানোর জন্য৷ পেট ভরানোর জন্য নয়৷  নিজে রান্না করে সামান্য চাল ডাল ফুটিয়ে খেয়ে নেয় সে৷ রথের দিকে তাকিয়ে সে বলল,“ চলুন যাওয়া যাক৷ দেখি কি অবস্থা?”

 

ঠাকুরঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় টোকা দিতেই বেরিয়ে এলো যোগেন গোঁসাই৷ বাদশাকে দেখে হাহা করে কেঁদে বলল,অ দারোগাবাবু! আমার একি সব্বোনাশ হলো গো ? দারোগাবাবু চোরে আমার চক্রপাণীর ভোগের পেরসাদ বাসন সমেত নিয়ে গেল ! এমন কি সাজের গয়নাটুকু নিয়ে গেছে গো! আপনিই তো বলিসিলেন যে আমার গুদামের চোররে ধইরে দেবেন কিন্তু এতো এবার ঘরে ডাকাতি করলো গো! এরপর কাছারির চাবি, আলমারির টাকাও চুরি যাবে গ! ওমাগো!যোগেনের এই ছিঁচকাদুনি দেখে মাথা গরম হলেও সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শান্ত করলো বাদশা৷ যোগেন যে এইকথা গুলো শুধু বাড়িয়ে বলছে না বরং তার অক্ষমতাকেও টিটকিরি দিচ্ছে সেটা বুঝতে কষ্ট হলো না তার৷

 

এটা সবুজগঞ্জ না হয়ে লালগড় হলে এতক্ষনে যোগেনের গালে আধডজন চড় পড়ে যেত৷ মাথা ঠান্ডা করে সে বলল,আপনাকে দেওয়া কথা রাখতে না পারায় দুঃখিত যোগেনবাবু৷  চোরটা যে এভাবে ধোকা দেবে জানলে কিছুতেই আপনাকে ঠাকুরঘর ছাড়তে বলতাম না৷ তবে কথা দিচ্ছি হারানো সব জিনিস ফেরত পাবেন আপনি৷ এককাজ করুন এক এক করে সেগুলোর নাম বলুন আমি টুকে নিচ্ছি৷ বলে পকেটডাইরি বের করে বাদশা৷ আঢ্যবাবু বলেন , শুধু জিনিস ফেরত দিলেই হবেনা চোরটাকেও ধরা চাই বাদশাবাবু৷ একবার ওকে বাগে পেলে না বাঁশডলা!বাকি কথাটা বলতে পারলেন না তিনি কারন বাদশা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছে তারদিকে৷

 

 “সে দিন আর নেই আঢ্যবাবু যখন আপনারাই প্রজাদের দন্ডমুন্ডের কর্তা ছিলেন৷ এখন সব গণতান্ত্রিক হয়ে গেছে৷ তাই আইন  হাতে তুলে নেওয়ার  কোনো অধিকার নেই আপনার৷ ওটা আমাদের দায়িত্ব৷ আর এমনিতেই সদ্য একটা ঝামেলা থেকে উঠেছেন আরেকটা ঝামেলায় পড়তে ভালো লাগবে?” জোকের মুখে যেন নুনের ছিটে পড়লো৷ পরক্ষনেই গুটিয়ে গেলেন ইন্দ্রজিৎ আঢ্য,“আমি ওভাবে বলতে চাই নি৷” “বেশ তাহলে আমাকে আমার কাজ করতে দিন৷ আর দয়া করে ফোড়ন কাটবেন না৷হাতে হাত কচলে ইন্দ্রজিৎ আঢ্য বললেন,“তা তো বটেই! তা তো বটেই!” মনে মনে বললেন,“সাপের ল্যাজে পা দিচ্ছো অফিসার৷ কদিন এই সবুজগঞ্জে টিকতে পারো আমিও দেখবো!” আচমকা বাদশার মুখে এরকম শীতল দাবড়ানি শুনে অবাক হয়ে গেছিল যোগেন গোঁসাই৷  তার সম্বিত ফিরলো বাদশার ডাকে,“কি হলো বলুন? কি কি খোয়া গেছে?”

 

()

 

বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে এসে জামাকাপড় ছেড়ে টিউবওয়েলে একবালতি জল নিয়ে গায়ে ঢালতেই শরীর মন চাঙ্গা হয়ে উঠলো বাদশার৷ থানায় কোয়ার্টার থাকলেও থানা থেকে দশ মিনিটের হাটা পথ দুরত্বে এই ঘরটা নিয়েছে ও৷ বেশ নিরিবিলি আর নিঝুম জায়গাটা৷ একফালি উঠোনের এক কোণে ছোটো ছোটো ফুলের চারা লাগিয়েছে সে৷ স্নান করে এক বালতি জল নিয়ে সেই চারাগুলোয় দিয়ে সে দাওয়ায় বালতিটা রাখলো৷ তারপর ভেজা গামছা পাল্টে জামাকাপড় পড়ে স্টোভে চা তৈরী করে বারান্দায় চেয়ার পেতে বসলো সে৷

আজ রথযাত্রার সাথে সাথে পুর্নিমাও বটে৷  ধীরে ধীরে আকাশে চাঁদ উঠলো৷  জ্যোৎস্নার আলো এসে পড়লো একফালি উঠোনে৷ ঝিঁঝিঁর ডাকে কানপাতা দায়৷ কিন্তু উৎকর্ণ বাদশার কানে দুটো শব্দ ভেসে এলো৷ এক দুরে নাম সংকীর্তনের শব্দ৷ তারমানে যোগেন গোঁসাইয়ের বাড়ি থেকে চক্রপাণী বেরিয়ে পড়েছেন৷ দুই কে যেন পা টিপে টিপে এগিয়ে আসছে তার বাড়ির দিকে৷ প্যান্টের কোমরে গোঁজা রিভলবারটা একবার হাত দিয়ে দেখে নিয়ে স্থির হয়ে বসলো সে৷

 

ধীরে ধীরে একটা ছায়ামুর্তি চাদর মুড়ি দিয়ে  ক্রমশ এগিয়ে এসে দাঁড়ালো তার সামনে৷ অলস গলায় বাদশা বলল,চা খাবে দুরি?ছায়া মুর্তি মাথা নাড়লো৷  বাদশা বললো,ওদিকে কি খবর?ছায়ামুর্তি এবার চাদর সরিয়ে বলল,সব পরিস্কার স্যার ! যোগেন গোঁসাই দলবল নিয়ে বেরিয়ে গেছে বাড়ি ফাঁকা!

 

হুম ফিরতে কতক্ষন লাগবে?”

 

ফিরতে ফিরতে ভোর রাত স্যার!”

 

হুম, চলো!”

 

বলে ঘরে চেয়ার রেখে দরজায় তালা মেরে বেরিয়ে এলো বাদশা৷

 

******

খবর পেয়ে যতক্ষনে যোগেনরা ফিরে এসেছে ততক্ষনে বাদশারা ঠাকুরঘরে শাবল, কোদাল নিয়ে নেমে পড়েছে৷ যোগেন এসেই চিৎকার করতে লাগলো,“ এটা অন্যায় ! ঠাকুরঘরে এইভাবে আপনি ঢুকতে পারেন না গো দারোগাবাবু! চক্রপাণীর থান ভাঙলে পাপ হবে যে ! তার অভিশাপ থেকে আপনি বেরোতে পারবেন নি! এটা করবেন নি দারোগাবাবু!” বাদশা ওর কথায় কান না দিয়ে কনস্টেবলদের বলে,“থামবি না খুড়তে থাক! ন্যায় অন্যায় আমি বুঝবো! তোরা খোড়!”

 

 আঢ্য বিপদবুঝে নরম সুরে বলে,“আহা কি করছেন কি বাদশাবাবু? উঠে আসুন! ওমন করবেন না! আপনার সাথে একটা কথা আছে!”

 

বাদশা বলে,কিন্তু আমার আপনার সাথে কোনো কথা নেই আঢ্যবাবু! আপনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকুন! আমার কাজ করতে দিন!

 

উপায় না দেখে এবার ভয় দেখায় আঢ্য৷ ভদ্রতার মুখোশ খুলে পড়ে তার,হোয়াট এ অডিসিটি? এর ফল আপনাকে ভোগ করতে হবে! আমি হায়ার অথারিটির সাথে কথা বলবো! আপনি জানেন না আমার দৌড় কতদুর? আপনার চাকরি খেয়ে নেবো আমি! আপনি আমায় চেনেন না!

 

জানি! উপর মহলের কয়েকজনের টিকি বাঁধা আপনার কাছে তাও বলছি আপনি আমার কিছু ছিঁড়তে পারবেন না! রুইতন! , হরতন ! আরেকবার কেউ বেগড়বাই করলে সোজা কপালে গুলি চালিয়ে দেবে৷  যদি না পারো অন্তত সারা জীবনের জন্য খোঁড়া করে দিও! ” বলে কোমর থেকে রিভলবারটা বের করে সামনে তাকায় বাদশা৷ রুইতন চোখ টিপে বলে হরতনকে,“কি বুঝলি?” হরতন রাইফেল বাগিয়ে হেসে বলে,“শঠে শাঠ্যম গুরু!”

 

হাত পাঁচেক খোড়ার পর একটা ধাতবশব্দ পেয়ে সবাই আরো উৎসাহে খুড়তে থাকে৷ কিছুক্ষন পর সকলে মিলে একটা সিন্দুক উপরে তুলে আনে৷ ডালাটা ভাঙতে বেশী কসরত করতে হয় না বাদশাকে৷ পুরোনো ডালা সহজেই ভেঙে যায়৷ ভেতরের জিনিসটা দেখে সে অবাক হয় না৷ একটা কঙ্কাল দুমড়ে মুচড়ে রাখা ভেতরে৷

 

()

 

ভোরবেলা যখন আসামীদের নিয়ে বাদশা থানায় এলো তখন রাধারাণী থানাতেই ছিলেন৷ পেছনে গাড়িতে করে আনা অন্তত বারোটা ট্রাঙ্ক দেখে তিনি অবাক হলেন না৷ কারন বাদশার সেই অ্যাপ্লিকেশনে ততটাই আশঙ্কা করা হয়েছিলো৷  ট্রাঙ্ক খুলে সোনার বিস্কুট, বিদেশী অস্ত্র, আফিম গুঁড়োর প্যাকেট আর অনেকগুলো নকল টাকা বাজেয়াপ্ত হলো৷ রাধারাণী বাদশার কাছে সবটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন৷ তাঁর অফিসে বসে বাকি কথা হলো৷

 

চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে শুরু করলো বাদশা৷ সন্দেহের সুত্রপাত ঘটেছিল লালগড়ে ম্যাডাম৷ লালগড়ে কি পরিমান অস্ত্র, আফিং গুঁড়োর ব্যবসা হয় আপনি জানেন৷ আমার সোর্স মারফত খবর পেয়েছিলাম এই সবুজগঞ্জ থেকেই নাকি লালগড়ে আফিং আসতো৷ কিন্তু এখানে এসে একটাও পোস্তগাছ না দেখে আমার খটকা লাগে৷ এখানকার সোর্স লাগিয়ে জানতে পারি যে এখানে নাকি কস্মিনকালেও পোস্তচাষ হয় নি৷ কিন্তু আমার লালগড়ের সোর্স জোর দিয়ে বলছে যে ওরা এখান থেকেই আফিং কেনে৷ কিন্তু আমি ভেবে পারছিলাম না যে  এটা কি করে সম্ভব? যেখানে পোস্তচাষই হয় না সেখান থেকে আফিং কি করে রপ্তানি হবে? কাজেই নিজেই খোঁজে বেরোলাম৷ এবং দেখলাম এখানে পোস্তচাষ হয় এবং পুরোদমে হয় কিন্তু জনসাধারনকে লুকিয়ে৷

 

খোঁজ করে জানলাম এই গ্রামে দুজনের ক্ষেতে এই পোস্ত চাষ হয় কিন্তু সেটা এমনভাবে যে চটকরে ধরা অসম্ভব৷ প্রায় কুড়ি বিঘা জমির ভুট্টার মাঝে চাষ করা হয়৷ আর চাষ করে এই দুজনের খপ্পরে পড়া কয়েকজন ভাগচাষী৷ যোগেনের কাছে টাকা ধার নিয়ে শোধ করতে না পারলে এভাবে টাকা পুষিয়ে দিতে হতো তাদের৷ চাষ শেষে প্রাণের মায়া ত্যাগ করতে হতো তাদের৷ আমি নিশ্চিত যোগেন আর আঢ্যর ক্ষেত খুড়লে আরো মৃতদেহ পাবো আমরা৷ শুধু তাই নয় আমি  আরো খোঁজ করে জানলাম শুধু আফিংই নয় দেশজ উপায় তৈরী আগ্নেয়াস্ত্রও এখান থেকে যায় লালগড়ে৷ কিন্তু শুধুমাত্র সারকামস্টানশিয়াল এভিডেন্সের উপর ভিত্তি করে চার্জ করা ইমপসিবল ছিলো৷ তার উপর ওরা যদি সতর্ক হয়ে যেত তাহলে আজকের রেইডটা সম্ভব হতো না৷ তাই অপেক্ষায় থাকতে হলো৷ তবে বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হয় নি অপরাধীরা নিজেরাই ভুল করে বসলো৷ সোজা রথের দিন একটা বাচ্চাকে ভুলবশত খুন করে বসলো ওরা৷ ফলে একদিকে সুবিধে হলো আমার৷ অপরাধীরা সমস্ত জিনিসের লেনদেন পিছিয়ে দিলো৷ সোর্স লাগালাম ওদের পেছনে৷ ঘটনাচক্রে সেই খুন হওয়া শিশু আমারই এক সোর্সেরই সন্তান ছিলো  ফলে সেই সোর্স প্রতিশোধে স্বপ্রণদিত হয়ে অপরাধীদের  প্রতিমুহুর্তের খবর দিতে লাগলো আমায়৷  আরেকজন সোর্স রইলো ওদের বাড়ির ভেতরে এমনভাবে যে কেউ সন্দেহ করলো না তাকে৷ এমন কি হয়তো বিশ্বাসও করবে না তারা যে সে সেখানে ছিলো৷ সেই সোর্স আমায় বাড়ির আনাচে কানাচের খবর দিলো৷ তারপর আর কি আমার খেলা শুরু করলাম৷

 

আমার মুল লক্ষ্য যে যোগেন গোঁসাইরা এটা কাউকে জানতে না দিয়ে টেক্কার পেছনে পড়লাম আমি৷ সবাই জানলো টেক্কা আমায় নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছে৷ শেষ মুহুর্তে চুরিটা হওয়ার ফলে  আমি প্রবেশ করলাম যোগেনের প্রাসাদে৷ সকলের আড়ালে সেই সোর্স আমায় জানালো কাল বিকেলে লেনদেন হয়ে গেছে৷ ব্যস সুযোগ বুঝে বামালসমেত ধরলাম ওদের৷

 

রাধারাণী সবটা শুনে বললেন,সবটা বুঝলাম কিন্তু কঙ্কালটা কার?বাদশা এবার মলিন হেসে বলল,এক হতভাগ্যের৷ হয়তো এই পোস্তচাষের ব্যাপারে সব জেনে গেছিল যার মাশুল হিসেবে প্রাণ দিতে হলো তাকে৷ যাকগে ম্যাডাম এবার আমার কাজ শেষ৷ কদিন ছুটিতে যাচ্ছি৷ কেসটা আপনার হাতে তুলে দিলাম৷ যা প্রমান আছে ওয়াটার টাইট চার্জশিট বানাতে অসুবিধে হবে না৷বলে উঠতে যাচ্ছিল বাদশা , রাধারাণী বলে উঠলেন,এত সহজে তো আপনি ছুটি পাবেন না মি: সামন্ত! এখনও অনেক কাজ বাকি আর আপনি ছুটি নিচ্ছেন? চার্জশিট তৈরী করেঅপরাধীদের জেলে পাঠিয়ে তবে আপনার ছুটি তার আগে নয়৷ কাল সারারাত খাটনি গেছে এখন যান রেস্ট নিন বাড়ি গিয়ে৷ ওবেলা ডিউটি জয়েন করবেন৷” 

বাদশা হেসে মাথা নেড়ে বলল,ওকে ম্যাডাম৷তারপর স্যালুট ঠুকে বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে৷

 

******

 

দুপরবেলা খিচুড়ির হাড়িটা স্টোভ থেকে নামাতেই বাচ্চাদের গলার স্বর শুনে খুশি হলো বাদশা৷  ওই ওরা এসে গেছে৷ ঝটপট তরকারীর গামলা আর খিচুড়ির হাড়িতে ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে এসে দেখলো একঝাক উজ্জ্বল পায়রার মতো কয়েকটা ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে৷ তাদের সাথে এসেছে তিনজন আগন্তুক৷ গতকাল ওরা খেতে পারে নি তাই হরতনকে দিয়ে নিমন্ত্রণ করেছিল ওদের৷ হরতন, রুইতনও এসেছে৷  বাদশা হেসে ওদের সবাইকে স্বাগত জানালো৷  তারপর ঝটপট মাদুর পেতে সব বাচ্চাদের বসিয়ে আগন্তুকদের সাহায্যে খেতে দিলো সে ৷ তারপর সে আর আগন্তুকরা একসাথে খেতে বসলো৷ গরম গরম খিচুড়ি তরকারী দিয়ে খেতে খেতে বাদশা বলল,তুমি বহুরূপী জানতাম৷ কিন্তু এতটা ভাবতেও পারিনি৷ কিন্তু কি করে? আগন্তুক তরকারীর আলু মুখে দিয়ে বলল,ভেক ধরার বিদ্যেটা বাপে শিখিয়েছিল স্যার৷ ঐ করেই তো সংসার চলতো৷ বাপে শেখানো বিদ্যে কোনো রকমে ধরে রেখেছি স্যার৷

 

কিন্তু অতক্ষন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব?”

 

কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকলে সবই সম্ভব স্যার৷

 

সত্যিই তাই আমি যোগেনের বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজছি তোমায়৷ এদিকে তুমি চোখের সামনে দাঁড়িয়ে৷ শেষমেশ চক্রপাণীর মুর্তির ভেক ধরে থাকলে কে ধরবে? তার উপর ওরম মেকাপ৷

 

মেকাপটাই তো বাঁচালো স্যার৷ ভাগ্যিস গোঁসাই আর কোথাও রাখুক না রাখুক ঠাকুরঘরে এসি চালিয়ে রাখতো তাই ঘাম হয় নি না হলে!”

 

ধন্যি মানতে হবে তোমাকে৷ কিন্তু মুর্তির সাথে অদলবদল করলে কি করে? আর ভোগ নিয়ে পালাতে কোথা দিয়ে?”

 

ওটাই তো কেরামতি স্যার! সবাই কে বলা যাবে না৷ যে কি বলে ? হ্যা ট্রেড সিগ্রেড!এটা আমার ট্রেড সিগ্রেড৷বলে হাসে আগন্তুক৷

 

হো হো করে হেসে ওঠে বাদশা৷ তারপর বলে,বাহ ভালোই তো ইংরেজি জানো?আগন্তুক লজ্জা পেয়ে বলে,কোথায় স্যার? আমি তো ক্লাস থিরি পাস৷ আপনাদের মতো অতো ইনজিরি পারি না৷ তবে পড়া লেখার ইচ্ছে ছিলো না এটা না৷ বাপ চাইতো আমি পড়াশুনো করি, মস্ত মানুষ হয়ে আপনার মতো চাকরি করি৷ তা আর হলো কই? ও সব আমার কপালে নেই৷ লালগড়ে দুর্গাপুজোয় চৈতন্য সেজে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একদিন অজ্ঞান হয়ে গেল বাপ৷ ডাক্তার বললেন হার্টের ব্যামো হয়েছে৷ সেই ব্যবসা গেল৷ যোগেন গোঁসাইয়ের কাছে আমার পড়ালেখার জন্য ধার নিয়েছিল সেটা শোধ দিতে গিয়ে!বলে বাহাতে চোখের জল মোছে আগন্তুক৷ বাদশা আগন্তুকের কাঁধে হাত রেখে বলে,জানি৷ সেই সময় ঝোকের বশে খুনটা করে আঢ্যই৷ তারপর দুজনে মিলে পুরোনো সিন্দুকে লাশ পুরে পুঁতে দেয় ঠাকুরঘরে৷ সেই কারনে লাশ চিনলেও প্রকাশ করিনি৷ এই ফরেনসিকের ঝামেলা মিটলেই কঙ্কাল ফেরত পাবে তুমি৷ তারপর পিতৃকর্ম করো৷ এত বছর তাঁর দেহ সৎকার হয়নি৷ এবার হবে৷

 

বাহাতে চোখের জল মুছতে মুছতে বলে আগন্তুক,কেউ নিজের ইচ্ছে তে চোর হতে চায় না স্যার! পরিস্থিতি বাধ্য করে চুরি করতে৷ বাপ নিখোঁজ হবার সাতদিনের মধ্যে মা টাও বাসের তলায় চাপা পড়ে গেল স্যার৷ মায়ের মরার পর পাড়া প্রতিবেশীদের দেওয়া খাবারে একবছর চললো৷ কিন্তু তারপর একে একে সব কটা মুখ ফিরিয়ে নিলো স্যার৷ এ বড়ো স্বার্থপর দুনিয়া স্যার এখানে মানুষ প্রয়োজনে নয় আয়োজনে থাকে৷ কাজেই চুরি করতে নামতে হলো৷ প্রথম প্রথম হাটুড়ে মার খেলেও পরে জহুরীর হাতে পড়লাম৷ তিনি আমায় ঘষে মেজে তুললেন৷ তন্ময় বাগদী হয়ে উঠলো টেক্কা৷ সামান্য রুটি চুরি করতে গিয়ে যে হাটুড়ে মার খেত তার হাতসাফাইতে চোখের সামনে চুরি হতে লাগলো অথচ যার মাল সে ধরতে পারলো না৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন এমন টা হতে চাইনি স্যার৷ আমি একটা নিরীহ ভদ্রস্থ জীবন পালন করতে চেয়েছিলাম৷ গাঁয়ে ফিরে দেখলাম আমার মতো আরো টেক্কা জন্ম নিচ্ছে৷ ওদেরও বাবা মা নেই, কাছের লোক কাঁচের গুড়োর মতো সরে গেছে৷ ওরা ক্রমশ নিরুপায় হয়ে যেকোনো সময় আমার পথে পা বাড়াবে এমন অবস্থায় স্থির থাকতে পারিনি৷ আমি যে পথে গেছি সে পথে যেতে দিই নিই ওদের৷ সবকটাকে একসাথে জড়ো করে আশ্রমের মতো খুলেছি৷ সেখানে পড়ালেখা, গানবাজনা সব হয়৷ হ্যা আমরা তিনজন চুরি করি, কিন্তু বিশ্বাস করুন ওদের এ বিদ্যে আমরা কোনোদিন  শেখাই নি৷ বরং কেউ হাতসাফাই করলেও তাকে শাসন করেছি৷

 

এটাও জানি পর পর চারদিন ভোগ চুরি করে তোমরা ওদের খাওয়াতে৷ কারন যোগেনের পুজোয় সকলের প্রবেশাধিকার হলেও অনাথ শিশুদের অধিকার ছিলো না৷ তার উপর ওরা তোমার আশ্রিত৷ সে ভাবতো তোমাদের মতোই ওরা চোর৷ আর সেই আক্রোশেথামে বাদশা৷ বাচ্চাটার মায়াভরা মুখ মনে পড়ে যায় তার৷ রথের লোহার চাকা আড়াআড়িভাবে পিষে দিয়েছিল বেচারাকে৷ সেই মুহুর্তে মনে হয়েছিল কুকুরদুটোকে ওখানেই গুলি করে দেয়৷ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলেছিলো সে৷

 

টেক্কা হেসে বলে,আপনাকে পেত্থম দেখেই বুঝেছিলাম আপনি মানুষ ভালো৷ তার উপর সেদিন কানাইকে ওভাবে দেখে আপনার মুখটা যেভাবে লাল হয়ে উঠেছিল সেটাতেই বুঝেছিলাম আপনার লক্ষ্য আমি নই৷ লক্ষ্য ওরা৷ সত্যি কথা বলতে কানাইয়ের মৃত্যুর সময় আমিও স্থির থাকতে পারিনি৷ আমার ভারেই বাচ্চাটা! বড্ড ন্যাওটা ছিলো আমার৷ যাকে কোলে পিঠে মানুষ করলাম আমার রথেরই সামনে! এর শাস্তি তো ওদের পেতে হতোই স্যার৷ পাপের ঘড়া পুর্ণ হয়েছিল ৷ তাই তো! স্যার একটা কথা বলবো?

 

জানি! কানাইয়ের হত্যার কেসটা ধামাচাপা হয় নি মোটেও৷ ওটা ব্রহ্মাস্ত্রের মতো লুকিয়ে রেখেছিলাম৷ আর এই কেসের প্রত্যক্ষদর্শী তো তুমি টেক্কা৷ তোমায় কোর্টে বয়ান দিতে আসতে হবে৷ আসবে তো?”

 

চোখ মুছে টেক্কা বলল,আসবো! আমায় আসতে হবেই স্যার নাহলে কানাইটা বিচার পাবে না৷ আমি আসবো!


 

শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২০

ডাক


“ধুস! ওরকম আবার হয় নাকি? নির্ঘাত কৃষ্ণেন্দুদা ভুল দেখেছে। ”

“নারে, কৃষ্ণেন্দুদা মিথ্যে কথা বলার লোক নয়। এখনকার লোক বা ছোকরা ছেলেপুলে হলে তাও বলতাম নেহাত নেশাভাঙ্গ করে হ্যালুসিনেট করেছে। কিন্তু কৃষ্ণেন্দুদাকে তুই তো দেখেছিস! পঁয়ত্রিশ বছর বয়স, রীতিমতো জিম করা চেহারা, কোনো নেশা নেই, নিয়মিত মেডিটেশনও করে নেহাত করোনার জন্য স্বাস্থ্যটা ভেঙেছে তাই বলে সেই মানুষটা এতটা ভুল দেখবে?”

“ তাই বলে ভর দুপুরবেলা, মার্কেটে অতোগুলো লোকের মাঝে ওভাবে? ইম্পসিবল! তাছাড়া মাধবী মারা গেছে সেই এপ্রিলে। এতদিন পর সে ফিরে আসবে কি করে? যদি ফিরেও আসে, ওভাবে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো আর কেউ দেখতেও পেল না?”

“সেটাই তো আমি বলছি প্রাচীকে। ঐ ভীড়ে অতোগুলো মানুষের মাঝে কি দেখতে কি দেখেছে আর ভয় পেয়ে গেছে। আর বলছে মাধবীকে দেখেছে। ”

“আমি কিন্তু তোমার এই কথা মানতে পারলাম না বলরাম। অন্তত যতটুকু তোমাদের কাছে শুনে বুঝেছি কৃষ্ণেন্দুবাবু বেশ স্থির মনের মানুষ। যাকে তোমরা বলো স্টিল নার্ভের মানুষ। প্রাণায়াম করলে আর কিছু হোক বা না হোক চঞ্চল মন স্থির হয়। আর স্থির মনের মানুষের ইন্দ্রিয় ভীষণ প্রখর হয়। অন্তত আজ পর্যন্ত যতজন স্থিতধী পুরুষকে দেখেছি তাঁদের ইন্দ্রিয়ের প্রখরতা চমকে দেওয়ার মতো। এরা সহজে ইন্দ্রিয়দ্বারা প্রতারিত হন না। আর ওরা আমাদের থেকে বেশি দেখেন, বেশি জানেন। আমার মনে হয় নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে ওনার কথা পেছনে। এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস উনি পরপারের ডাক পেয়ে গেছেন। ”

কথা হচ্ছিল বলরামের বাড়িতে বসে। প্রায় নমাস পর ওদের বাড়িতে এসেছি আমরা। সত্যি কথা বলতে এইবছরটা যেরকম পরিকল্পনা করেছিলাম সেটা তো হয়নি বরং এইবছরটা প্রায় বাড়িতে বসেই কাটাতে হয়েছে আমাদের সবাইকে।ব্যাতিক্রম শুধু রণি, শাম্ব আর শর্মি। এই মহামারিতে যখন আমরা বাড়িতে বসে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করে মাসের শেষে মাইনে গুনেছি। ওরা তিনজনে নির্বিকার ভাবে বাইরে বেরিয়ে নিজেদের ডিউটি পালন করেছে। আম্ফানের আস্ফালনে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যখন আমরা বিদ্যুৎহীন, জলহীন হয়ে বাড়িতে বসে পৌরসভার বাপবাপান্ত করছি, একের পর একমানুষের মৃত্যুতে, সংক্রমণে আক্রান্তদের ভীড়ে মাঝে নিজেদের দেখে শিহরিত হয়ে বছরটাকে অভিশপ্ত বলে চিহ্নিত করছি। তখন ওরা স্যানিটাইজার, আর মাস্ককে অবলম্বন করে গোটা শহর, আশেপাশের এলাকা চষে বেড়াচ্ছে মানুষকে বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য। আশেপাশের এলাকার খবর আমাদের কাছে পৌছে দেওয়ার জন্য। এখন সব যখন আবার নতুন উদ্যোমে নতুন উদ্যোগে শুরু হয়েছে। তখনও ওদের ডিঊটির শেষ হয়নি। ওরা অক্লান্তে ছুটে চলেছে নিজের নিজের কাজে।

সব ঠিক থাকলে এবছর দীপা আর শাম্বটার বিয়ে হয়ে যেত। লকডাউনের চাপে সেটা স্থগিত করতে হয়েছে। এবছর আমার আর শর্মির ব্যাপারটারও একটা হিল্লে হয়ে যেত সেটাও পেন্ডিং থেকে গেছে। এখন শুধু অপেক্ষা কবে এই মারন ভাইরাসটার বিলুপ্তি ঘটবে আর আমরা আবার আগের মতো মেতে উঠবো আনন্দে, উৎসবে। এই নিউ নর্মালের মুখোশ আর প্রতিমুহূর্তে স্যানিটাইজার স্নান আর ভালো লাগছে না। এইবছর মনটা এতটাই খারাপ হয়ে আছে যে পুজোতেও তেমন বেরোইনি। যে আমি দুবছর আগেও প্রাচীর সাথে ঠাকুর দেখা নিয়ে ঝগড়া করেছি। গতবছরেও শর্মির হাতে হাত দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ঠাকুর দেখেছি। সেই আমি বাড়িতে থেকে এবারের পুজো কাটালাম।

কালীপুজোতেও ভেবেছিলাম আমি বাড়িতে থেকে লেখালেখি করে কাটিয়ে দেবো। কিন্তু বাধ সাধলো ব্যোমকেশ। সে নিজে থেকে এসে বললো, “তোমার ব্যাপারখানা কি বলো তো? দিন দিন ঘরকুনো রোগটা তোমাকে বেশ চেপে ধরছে দেখছি। এত আলসের ডিপো তো আগে তুমি ছিলে না। বরং বেশ চনমনে ভাব ছিলো তোমার। দিন দিন দেখছি তুমি ক্রমশ খাঁচার পাখির মতো ব্যবহার করছো। দিব্যি খাচ্ছো দাচ্ছো আবার ঘরে ঢুকে কখনো ল্যাপটপে খুটুর খুটুর করছো, কখনো মোবাইলে মুখ গুঁজে বসে আছো। নানা এ তো ভালো কথা নয়। চলো বেরোবে চলো।” আমি বললাম, “নাগো, শরীরটা ভালো লাগছে না।তুমি বরং ঘুরে এসো। আমি থাকি। ” ব্যোমকেশ শুনলো না , “শরীরের আর কি দোষ বলো? সে হল সুখের পায়রা। যত আরাম দেবে তত আরাম সে নেবে। চলো একটু বেড়িয়ে এলে শরীরটা ভালো লাগবে। চলো আরাম অনেক হলো। দূর্গাপুজোয় বেরোওনি কিছু বলিনি। কিন্তু এই কালীপুজোয় না বেরোলে চলবে কেন? তার উপর আজ শনিবার। কতদিন হল বলোতো বলরামদের বাড়িতে জমিয়ে আড্ডা দিয়ে প্রাচী বৌদির হাতের গরম গরম চা আর মুড়িমাখা খাইনি। চলো কোনো কথা নয়।ওঠো!” অগত্যা বাধ্য হয়ে উঠতে হল ।অবশ্য এসে লাভই হয়েছে আমার।

আজ দীপান্বিতা কালীপুজো। এবছর মহামারীর কারনে শাম্বদের বাড়িতে পুজো হচ্ছে না। অগত্যা আমরা বালুদের বাড়িতে এসেছি। বালুদের বাড়িতে গোটা উঠোন জুড়ে প্রাচী আলপনা এঁকেছে। গোটাবাড়ি প্রদীপ, আর টুনিবাল্বে ঝলমল করছে। আমাদের দেখে বালু হইহই করে উঠলো। আমরা ওর বৈঠকখানায় জাঁকিয়ে বসলাম। প্রাচীও ভীষণ খুশি আমাদের দেখে। সব কাজ সেরে নিয়ে সে সবার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে এসে বসলো। এই প্রথম আমাদের আড্ডায় রণি আর শাম্ব মিসিং। দীপা আর শর্মিও খুব ব্যস্ত। কাজেই আমাদের চারজনই আজকের আড্ডায় উপস্থিত আছি। এই ক’দিনে বালুটা বেশ রোগা হয়ে গেছে। কথায় কথায় পুরোনো দিনের ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গ এসে পড়েছে। তন্নিষ্ঠ, দেবলীনা, পাঞ্চালী, মেহুল বৌদী, অনির্বাণদা, রাজীব, ভৈরবদের প্রসঙ্গ উঠে আসছে বারবার।

এমনই কথা প্রসঙ্গে বালু কথাটা পাড়লো। গতকাল ও আর প্রাচী গিয়েছিল ধনতেরস উপলক্ষ্যে কিছু কেনাকাটা করতে। কিছু কেনাকাটা করার পর আচমকা একজায়গায় সে কৃষ্ণেন্দুদাকে দেখতে পায়। কৃষ্ণেন্দুদা আমাদের কলেজের সিনিয়ার ছিল। দারুন স্পোর্টস পার্সন। বর্তমানে ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে আছে। শাম্বদের প্রতিবেশী বললেই চলে। প্রতিবছর শাম্বদের বাড়ির পুজোতে দেখা হয় আমাদের।

কৃষ্ণেন্দুদা বলতে গেলে ভীষণ আমুদে একটা লোক।‌ যে কোনো কাজে, যে কোনো ভেঞ্চারে কৃষ্ণেন্দুদাকে একবার বললেই হল। মানুষটা সাহায্য করতে একপায়ে খাড়া হয়ে যাবে। ওর যোগ্য সহধর্মিণী মাধবীও বেশ মিষ্টি মনের মানুষ। মাধবী আমাদের চেয়ে এক ব্যাচ জুনিয়ার ছিল । কীভাবে কৃষ্ণেন্দুদার সাথে ওর প্রেম হল সেটা নিয়ে আজও আমরা সন্দিহান। তবে কলেজে ফাইনাল ইয়ারে পড়াকালিনই ওরা পালিয়ে বিয়ে করে। তারপর দশবছর কোনো পাত্তা ছিল না ওদের। পাঁচবছর আগে শাম্বদের পাড়ায় ওরা নতুন বাড়ি কেনে। তারপর থেকে ওদের সাথে পুরোনো সম্পর্কটা আবার তৈরী হয়।  

এবছর শুনেছিলাম ওরা নাকি করোনা আক্রান্ত হয়েছিলো। কৃষ্ণেন্দুদা বেঁচে ফিরলেও মাধবীকে বাঁচানো যায় নি। তারপর থেকে নাকি কৃষ্ণেন্দুদা কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। কারো সাথে মিশতো না, কথা বলোতো না। ক্রমশ দেখতে দেখতে সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। কৃষ্ণেন্দুদা ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিল।  কিন্তু সেদিন মার্কেটে যা ঘটেছে শুনছি প্রাচীর মুখে তাতে তো মনে হচ্ছে শোকে‌ দুঃখে কৃষ্ণেন্দুদার মাথাটাই গেছে। 

সেদিন মার্কেটে কেনাকাটা করার সময় প্রাচীরা মার্কেটের ভেতরে একটু ঢুকেছিল এমন সময় কাছে একটা ‘গেল! গেল!’ রব শুনে থমকে দাঁড়ায় ওরা। তাকিয়ে দেখে দোকানের সামনে জটলা হয়েছে। সাধারনত এই ধরনের জটলা দেখলে ওরা এড়িয়ে যায়। কিন্তু এই জটলাটা এড়িয়ে যাবার সময় কি মনে হতে বালু উঁকি মেরে দেখতে চায় ব্যাপারটা। আর দেখেই অবাক হয়ে যায় সে। কারন ভিড়ের মাঝে প্রায় চোখ উল্টে মাটিতে ভিড়মি খেয়ে পড়ে আছে কৃষ্ণেন্দুদা! 

এই কদিনে চেহারার কি অবস্থা হয়ে গেছে মানুষটার! পেটানো স্বাস্থ্যবান শরীরটা পুরো ভেঙে গেছে। একমাথা কোঁকড়ানো চুল পেঁকে গিয়ে অর্ধেক উঠে গেছে। ভরাট গালগুলো বসে গিয়ে চোয়ালের হাড় উচু হয়ে গেছে। গোটা মুখে কদিনের না কামানো দাঁড়িতে ভরে গেছে। সবসময় সেজেগুজে থাকা মানুষটা ময়লা রঙের জামা কাপড় পড়ে আছে। বলতে গেলে কমাসে মানুষটার চেহারা পুরো বদলে গেছে। 

বালু একঝলক দেখেই চিনেছিল কৃষ্ণেন্দুদাকে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারে কৃষ্ণেন্দুদা নাকি মোমবাতি কিনছিল। মোমবাতি কিনে টাকাটা দিতে গিয়ে নাকি আচমকা থমকে যায় তারপর গোঁ গোঁ শব্দ করে অজ্ঞান হয়ে যায়। সে সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধি করে প্রাচীকে বাড়ি পাঠিয়ে কৃষ্ণেন্দুদাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। তারপর শাম্বদের খবর দেয়। মাধবীকে বিয়ে করার পর নিজের বাড়ির সাথে‌ সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিলো কৃষ্ণেন্দুদা। শাম্ব অনেক খুঁজে পেতে ওর বাড়ির লোকের সাথে যোগাযোগ করে খবর দেয়। ডাক্তাররা জানান করোনা সেরে যাবার পর কৃষ্ণেন্দুদার শরীর ভীষণ দুর্বল । তাই অজ্ঞান হয়ে গেছে । কিন্তু জ্ঞান ফিরতেই কৃষ্ণেন্দুদা যে কথাটা বলছে তাতে রহস্য থেকেই যাচ্ছে। কৃষ্ণেন্দুদার মতে ও ঠিক আছে। শরীর একদম ফিট ওর। কিন্তু ওর হাতে সময় বড্ড কম। কারন মাধবী ওকে বাঁচতে দেবে না। সে নাকি ওকে ছাড়া একা থাকতে পারছে না। সবসময় ওকে কাছে ডাকছে। অজ্ঞান হবার আগে ভূত চতুর্দশীর উপলক্ষ্যে মার্কেটে মোমবাতি কিনছিল কৃষ্ণেন্দুদা। টাকাটা দিতে যাবে এমন সময় মাধবী এসে ওকে নাকি বলছে মোমবাতি কিনে লাভ নেই কারন ক’দিন পরেই নাকি ওরা এক হয়ে যাবে। তারপর আর কিছু মনে নেই ওর। কিন্তু মাধবী কেন ওকে বাঁচতে দেবেনা জিজ্ঞেস করতেই চেপে যাচ্ছে ব্যাপারটা।

 সবটা শুনে আমি বলেছিলাম,“ধুস! ওরকম আবার হয় নাকি? নির্ঘাত কৃষ্ণেন্দুদা ভুল দেখেছে।” তারপর কথায় কথায় ব্যোমকেশ কথাটা বললো। বালু হেসে বললো,“তারমানে কৃষ্ণেন্দুদার এই ভূত দেখার কথাটা তুমি বিশ্বাস করো?” 

“করি! কারন আমি নিজে দেখেছি এদের প্রকোপ। মানুষের দেহান্তরের পর আত্মার দুটো ভাগ হয়। একপক্ষের কার্যকাল সমাপ্ত হলে সোজা বৈতরণী পেরিয়ে যমালয়ে উপস্থিত হয়। এদের মৃত্য হয় সাধারণভাবে। কাজেই জীবন শক্তি ফুরোবার পর কিছু করার থাকে না। যেমনটা একটা ব্যাটারীর জীবনীশক্তি ফুরোবার পর জিনিসটার কোনো কার্যক্ষমতা থাকেনা। অপরপক্ষের জনের মৃত্যু হয় অপঘাতে। সেও বৈতরণী পার হয় ঠিকই কিন্তু জীবন শক্তি আর কার্যক্ষমতা অবশিষ্ট থাকায় এরা যমালয়ে প্রবেশ করতে পারে না। এদের ফিরে আসতে হয় নিজের দেহে। এবার এই যে মৃত মানুষ টুক করে বেঁচে উঠছে এটা কিন্তু হয় ঠিক এই কারনে। অনেক সময় দেখবে হাসপাতালে মৃত রোগী ব্রেন ডেথ হওয়া সত্ত্বেও আচমকা জেগে উঠে ধীরে ধীরে বেঁচে উঠছে। এটা কোটিতে একবারই হয়। তবে হয়। কারন আত্মা তার পুরোনো আধারটা ফিরে পায়। কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এটা সম্ভব হয় না। আত্মা যমালয় থেকে ফিরে এসে দেখে তার আধার কে বিনষ্ট করে ফেলা হয়েছে। আধারটাকে হয় দাহ করা হয়েছে কিংবা পুঁতে দেওয়া হয়েছে। নিজের আধারে ফিরতে না পেরে আত্মা অশান্ত হয়ে ওঠে। সে জানতে চায় ঠিক কোন কারনে তার মৃত্যু হল। যদি স্বাভাবিক অপঘাত হয় তখন প্রেতাকৃতি ধারন করে মৃত্যুর স্থানেই সে বাস করতে থাকে যাতে সে আরেকটা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ মেরে সেই মানুষের দেহ ধারন করতে পারে। যাতে তার জীবনীশক্তি ও কার্যকাল সেই আধারের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। কিন্তু তা হয় না বরং সদ্যমৃত মানুষের আত্মার সাথে তার সংঘর্ষ বাধে এবং সেই সুযোগে সেই সদ্যমৃত মানুষটার আধারটাও বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে দুটো অতৃপ্ত আত্মা অপেক্ষা করে নতুন আধারের। এই চক্র ততক্ষণ পর্যন্ত চলে যতক্ষণ না ওদের কার্যকাল সমাপ্ত হচ্ছে । আর যদি অপঘাতটা মানবসৃষ্ট হয় তাহলেই সর্বনাশ। আত্মা ভয়ংকর প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। সে যেনতেন প্রকারেণ ভাবে প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে। যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার প্রতিশোধ না নিচ্ছে ততক্ষন পর্যন্ত তার মুক্তি নেই।”

এই প্রসঙ্গে আমার একটা কথা মনে পড়ল। জিজ্ঞেস না করে পারলাম না। “আচ্ছা ব্যোমকেশ, এই যে অঘোরীরা শবসাধনা করেন। এই শব যদি অপঘাতে মৃত হয় তখন কি এই আত্মা অঘোরীর ক্ষতিসাধন করে থাকে?”

ব্যোমকেশ হেসে বলোলো,“না তা হয় না কারন অঘোরীরা মহাশক্তির অধিকারী হন। আত্মার সাধ্য নেই তাঁদের অনিষ্ট করার। তবে তন্ত্রসাধকদের মধ্যে কেউ কেউ শবসাধনায় ব্যর্থ হলে তখন মৃত ব্যক্তির আত্মা তন্ত্রসাধকের ক্ষতিসাধন করে থাকে। অবশ্য তা স্বাভাবিক। মৃত্যুর পর যদি কোনো আত্মা নিজের আধারের এহেন দশা দেখে তখন সে ক্ষুদ্ধ হবেই। যদি সাধক সিদ্ধি লাভ করেন তখন আত্মার ক্ষমতা থাকে না তাকে স্পর্শ করার। কিন্তু যদি একবার অকৃতকার্য হন তাহলে তাকে মহাকালও বাঁচাতে অক্ষম। কিন্তু একবার এক সাধকের গল্প শুনেছিলাম গুরুদেবের কাছে যিনি নিজের ইচ্ছাশক্তির বলে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও বেঁচে ফিরেছিলেন। ”

বালু অবিশ্বাসের গলায় বললো,“তাই নাকি? তা কীভাবে তিনি প্রাণে বাঁচলেন শুনি?”

ব্যোমকেশ আড়চোখে তাকিয়ে বললো ,“সে অনেক কথা। বলতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে।”

“লাগুক। এখন সবে সাড়ে সাতটা বাজে। খেতে খেতে সেই রাত দশটা। তাছাড়া কালীপুজোর রাতে ভূতের গল্প মন্দ লাগবে না। তা গাঁজাখুড়িই হোক না কেন, কি বলিস নীল?”

আমি মাথা নাড়লাম। চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে ব্যোমকেশ হেসে বলোলো,“বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদুর। যে ভূত দেখেনি সে কোনো দিনও বিশ্বাস করবে না। কাজেই এ নিয়ে তোমার সাথে তর্ক করবো না। যাকগে ঘটনাটা যখন শুনেছিলাম তারও প্রায় বছর তিরিশেক আগের ঘটনা। হিসেব করলে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের ঘটনা। তখনও গুরুদেব তারাপীঠে আসেন নি। সবে আশ্রয় নিয়েছেন কামাখ্যায়। এখন যেমন কামাখ্যা দেখেছো তোমরা। আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে জায়গাটা আরো ঘনবনে ঢাকা ছিলো। নিরিবিলি হবার জন্য গুরুদেব বনের আরো গভীরে অস্থায়ী আশ্রম নির্মাণ করেছিলেন। যাতে যে কটা দিন আছেন ততদিন সাধনার সময় যাতে কেউ বিঘ্ন না ঘটায়। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। এক’দিন দুপুরে মায়ের প্রসাদ গ্রহন করে আশ্রমে ফিরে বিশ্রাম করার পর সন্ধ্যায় আহ্নিক করার জন্য ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে নেমেছেন তিনি এমন সময় দেখতে পেলেন একটা দেহ নদীতে ভেসে আসছে। ভাসতে ভাসতে ক্রমশ দেহটা গুরুদেবের নাগালে চলে এল। গুরুদেব আর দেরি করলেন না। সোজা ঝাপ দিলেন নদীর জলে। কিছুদুর সাঁতরে দেহটাকে নদী থেকে টেনে এনে রাখলেন ডাঙ্গায়।” 

“ডাঙ্গায় তোলার পর গুরুদেবের খেয়াল হল দেহটা মৃত মানুষের নয়। প্রাণের স্পন্দন আছে দেহতে। তিনি সেখান থেকে লোকটাকে আশ্রমে নিয়ে এলেন। আশ্রমে নিয়ে এসে দেখলেন সন্ধ্যার অন্ধকারে যাকে লোক মনে করছিলেন সে মোটেও লোক নয়। বরং একটা অল্প বয়স্ক ছেলে। বয়স আঠাশ থেকে তিরিশের মধ্যে। জলে দীর্ঘকাল ভেসে থাকার জন্য গায়ের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেছে । ছেলেটাকে কুশের শয্যায় শুইয়ে শুশ্রষা করতে লাগলেন তিনি । রাতের দিকে ছেলেটার জ্ঞান ফিরে এলেও ধুম জ্বরে সে শয্যা থেকে উঠতে পারল না। দুদিন পর যখন লোকটা সুস্থ হল তখন দেখা গেল তার আগের স্মৃতি কিছুই মনে নেই।”

“গুরুদেব তাও চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন ছেলেটার স্মৃতি ফেরাবার জন্য। সাথে ছেলেটার পরিজনের সম্পর্কে খোঁজ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না ছেলেটার পরিজনের। এইভাবে কেটে গেল পুরো একবছর। অনেক চেষ্টা করার পরও কোনো ফল না পাওয়ায় অবশেষে গুরুদেব হাল ছেড়ে দিলেন। ছেলেটা বলতে গেলে গুরুদেবের সাথে থেকে গেল। গুরুদেব লক্ষ্য করলেন ছেলেটা সংসার সম্পর্কে ভীষণ উদাসীন। বরং সাধনমার্গে তার ঝোঁক অনেক বেশি। অগত্যা গুরুদেব অনেক ভাবনা চিন্তা করে অবশেষে ছেলেটার পরীক্ষা নিয়ে তাকে দীক্ষা দিলেন। দীক্ষা শেষে তার নাম দিলেন সদাশিব।”

“সদাশিব বেশ চালাক চতুর ছেলে। দীক্ষার পরে অল্পকালে তন্ত্রসাধনার অনেকটাই আয়ত্ত করে নিলো সে। ক্রমশ তন্ত্রসাধনায় সে সিদ্ধিলাভের পথে এগিয়ে যেতে লাগল। অবশেষে এল সেই কাঙ্খিত দিন। গুরুদেবের সাথে সে বসল শবসাধনায়।”

“এর আগে যতগুলো শবসাধনা হয়েছে সবকটায় সে গুরুদেবের নৈবেদ্য জোগাড় করে দিয়ে আশ্রমে ফিরে এসেছে। কোনোদিনও সাধনার সময়ে সে গুরুদেবের সম্মুখে থাকেনি। গুরুদেবই নিষেধ করেছিলেন তাকে থাকতে। কাজেই সে কোনোদিনও শবসাধনা প্রত্যক্ষ দর্শন করেনি। সাধনার দিন দুই আগে থেকে গুরুদেব ওকে শবসাধনার সমগ্র গুঢ় প্রক্রিয়া, নিয়মাবলী শিখিয়ে দিলেন। বিকেলের দিকে শ্মশানে গিয়ে বেওয়ারিশ লাশ খুঁজে পাওয়া বেশি কষ্টের হল না। সব জোগাড়যন্তর করতে করতে রাত হয়ে গেল। স্নান করে শুদ্ধ হয়ে গুরুদেবের সাথে পুজোয় বসল সদাশিব।”

“পুজো শেষে গুরুদেব পদ্মবীজের মালা পড়িয়ে দিলেন সদাশিবের গলায়। তারপর অনুমতি দিলেন সাধনায় বসার। সদাশিব মৃতদেহের পিঠের উপর বজ্রাসনে বসল। ধীরে ধীরে ধ্যানে ডুবে গেল সে। যথাসময় গুরুদেব তার কানে বীজমন্ত্র প্রদান করে সাবধান করে দিলেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি না বলছেন ততক্ষণ পর্যন্ত যেন সে মন্ত্র পাঠ না থামায়। মন্ত্রপাঠ চলাকালীন সে অনেক কিছু দেখবে, অনেক কিছু শুনতে পাবে। কিছু দৃশ্য হবে রমণীয়, কিছু হবে ভীষণ ভয়াবহ, কিন্তু কিছুতেই যাতে সে বিচলিত হয়ে মন্ত্রপাঠ না থামায় বা শবাসন থেকে না নামে। হয়তো আসনের শবও তাকে বিচলিত করতে পারে তখন কি করতে হবে তার নিদান যেন সে স্মরণ করে। হতে পারে গুরুদেব নিজে এসে তাকে মন্ত্র থামাতে বলছেন এমনও সে দেখতে পারে। কিন্তু তাও যেন সে মন্ত্র না থামায়। সাধনা সমাপ্ত হলে গুরুদেব স্বয়ং তাকে শান্তিজল প্রদান করে স্তব্ধ হতে বলবেন। ”

“সবটা শুনে বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নেড়ে মন্ত্রপাঠে বসল সদাশিব। গুরুদেব কিছুক্ষণ থেকে তারপর চলে গেলেন। শবসাধনার সময় সাধক বাদে আর কাউকে থাকতে নেই। কারন শবের আত্মা সে সময় সাধনাভঙ্গ করার জন্য আধার খোঁজে। সেইসময় সাধক শবারূঢ় হয়ে মন্ত্রপাঠ করার জন্য তার কোনো অনিষ্ট সাধন করতে পারে না ফলে নানারকম বিভূতি দেখিয়ে সাধককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। সাধক যদি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন তাহলে কোনো বিভূতিই কার্যকর হয় না। কিন্তু আশেপাশে কোনো আধার থাকলে তাকে অবলম্বন করে সাধনাভঙ্গ করার চেষ্টার একটা সুযোগ থেকে যায়। ”

“সদাশিবকে সাধনায় বসিয়ে গুরুদেব নিজের আশ্রমে ধ্যানে বসলেন। কিন্তু একাগ্র হয়ে ধ্যান করতে পারলেন না। একটা চিন্তা থেকেই গেল মনে তাঁর। সদাশিব পারবে তো? হাজার তন্ত্রে সাফল্য লাভ করুক। কিন্তু আদপে সে তো ছেলেমানুষ। কে জানে পারবে কি না? চিন্তায় চিন্তায় গোটা রাত কেটে গেল। ব্রাহ্মমুহূর্তে তিনি উঠে পড়লেন আসন ছেড়ে। নদীতে স্নান সেরে কমন্ডলুতে জল ভরে যখন তিনি শ্মশানে প্রবেশ করলেন তখন ভোরের পাখিদের কূজন শুরু হয়ে গেছে। শ্মশানে ঢুকে যেখানে সদাশিব সাধনা করছিল সেখানে পৌঁছে তার চক্ষুস্থির হয়ে গেল। ”

“সাধনার সমস্ত নৈবেদ্য চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যজ্ঞাগ্নির অবশিষ্টাংশ শবের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। এমনকি কাঁদা, রক্ত, মড়া মানুষের ছাই,হাড়-গোড়, বিষ্ঠায় চারদিক ভরে গেছে। ব্যতিক্রম সদাশিব। সে স্থিরভাবে মন্ত্রপাঠ করে চলেছে। তার সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও সে একমুহূর্ত মন্ত্রপাঠ থামায় নি। মড়ামানুষের ছাইতে তার সর্বাঙ্গ মেখে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন সাক্ষাৎ মহাদেব ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন। সদাশিবকে ওভাবে দেখে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেলেন গুরুদেব। তারপর ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে ওর শরীরে মন্ত্রপূত শান্তিজল ছিটিয়ে দিলেন। শান্তিজল দেওয়ার সাথে সাথে সদাশিব গুরুদেবের কোলে এলিয়ে পড়ল। গুরুদেব তাকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। তারপর দেহটাকে যথাযথ সৎকার করে সদাশিবকে নিয়ে ফিরে এলেন আশ্রমে। ”

“এভাবে আরও দুবার সদাশিব বসেছিল শবসাধনায়। দুবারই কৃতকার্য হয় সে। এভাবে কেটে গেল আরো কয়েকবছর। ততদিনে সদাশিব তন্ত্রপথে অনেকটাই অগ্রসর হয়েছে। গুরুদেবের সাথে সে ঘুরে এসেছে নানা তীর্থ। সেখানকার স্থানমাহাত্ম্য বুঝে সাধনাও করেছে সে বিস্তর। ধীরে ধীরে সে মোক্ষের পথে ক্রমশ এগোচ্ছে এমন সময় ঘটল একটা ঘটনা।” 

“ততদিনে গুরুদেব কামাখ্যার পাট চুকিয়ে তারাপীঠে কুটির বেঁধেছেন। সেখানে সাধনা শুরু করেছেন দুজনে মিলে। এক’দিন শবসাধনান্তে সদাশিব জানাল তার পুর্বাশ্রমের সব ঘটনা মনে পড়ে গেছে। তার বাড়ি নবদ্বীপে। পুর্বাশ্রমে তার নাম ছিল অচিন্ত্য উপাধ্যায়। গৃহে তার আত্মীয় বলতে আছেন তার মা, তার স্ত্রী এবং চারবছরের ছোটো কন্যা বিনি। কামাখ্যায় সে গিয়েছিল তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে। উমানন্দ ভৈরবের মন্দির দর্শন করার পর সে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে কামাখ্যা পর্বতের অবস্থান দেখছিল এমন সময় তার পা হড়কে যায় আর সে তলিয়ে পড়ে নিচের দিকে। ব্রহ্মপুত্রের বুকে আছড়ে পড়ার আগে তার মাথাটা ঠুকে যায় একটা গাছের কান্ডে, তারপর আর কিছু মনে নেই তার। পরের ঘটনা গুরুদেব সবই জানেন। ”

“গুরুদেব সবটা জেনে খুশি হন। সাথে একটা আশঙ্কাও দেখা দেয় তার মনে। গুরুদেব বলেন সন্ন্যাস নেওয়ার আগে মায়ের কাছে সন্তানকে অনুমতি গ্রহণ করতে হয়। নাহলে মাতৃঋণ ও মোহের জন্য মোক্ষপ্রাপ্তি হয় না। সদাশিবের অতীতের ব্যাপারে তিনি কিছু জানতেন না বলেই তাকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। এখন সব জানার পরও যদি সদাশিব তার মায়ের অনুমতি নিতে না যায় তাহলে তার মোক্ষলাভ হবেনা। হয়তো এই কারনেই মা মহামায়া তাকে সব মনে করিয়ে দিয়েছেন। যাতে সে সব মোহপাশ থেকে মুক্ত হতে পারে।”

“কিন্তু আমি চলে গেলে যে আর ফিরে আসতে পারবো না গুরুদেব। ’ সদাশিব জানায়। ‘কারন আমি আমার পরিবার ছেড়ে এতবছর দূরে ছিলাম। এতবছর পর যদি আমি ফিরে যাই। ওরা আমাকে আসতে দেবে না। আমাকে পুনরায় গৃহির ধর্মপালন করতে বাধ্য করবে।’ গুরুদেবও এই কথা জানতেন। সংসার পাশ থেকে একবার যে মুক্ত হয়ে গেছে সে সহজে সংসারের পাঁকে আটকে পড়ে না। কিন্তু যদি একবার সংসারের নাগপাশে জড়ায় তাহলে তার ফেরার পথ প্রায় থাকে না। কিন্তু গুরুদেব নিরুপায়। অগত্যা বাধ্য হয়ে তিনি শর্ত দিলেন সদাশিবকে। একবছর পর সদাশিবকে এখানে ফিরে আসতে হবে। হয় সাধক হয়ে নচেৎ সংসারী ভক্ত হয়ে। যদি সে সাধক হয়ে ফেরে তাহলে সে তার সাধনক্রিয়া পুনরায় চালাতে পারবে। আর যদি সংসারী হয়ে ফেরে তাহলে তাকে তিনি কিছু গুঢ়ক্রিয়া শিখিয়ে দেবেন যাতে সে সংসারের গন্ডিতে আবদ্ধ থেকেও সাধনার পথ থেকে বিপথগামি না হয়। সদাশিব গুরুদেবের এই শর্ত মেনে নিল, তারপরের দিন সকালে নিজের বাড়ির দিকে যাত্রা করল সে। গুরুদেব তাকে তন্ত্রসাধনা সম্পর্কে কিছু বিধিনিষেধ বলে দিলেন। বারবার তাকে বলে দিলেন গৃহস্থ বাড়িতে সবরকমের সাধনা করলেও সে ভুলেও যেন শবসাধনা, ডামরিপুজো এবং বেতাল আবাহন অভ্যেস না করে। কারন এই তিনসাধনার পদ্ধতি এত ভয়াবহ যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সহ্য করা অসম্ভব। আর এই তিনপুজোয় বিঘ্ন ঘটলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। সদাশিব সব বাক্য অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিয়ে যাত্রা করল নিজের ভিটের দিকে। ”

“একবছর পর সদাশিব ফিরে এল গুরুদেবের কাছে তবে সাধক রূপে নয় সংসারী রূপে। পরনের রক্তাম্বর ছেড়ে সে পড়েছে সাধারণ ফতুয়া আর ধুতি। জটাশশ্রূগুম্ফ ত্যাগ করে সে সংসারীর বেশ ধারন করেছে। এবং সে একা আসে নি, সাথে স্ত্রী-মাতা-কন্যাকে নিয়ে এসেছে সে। সদাশিবের মানত জানু হয়ে গুরুদেবের চরণ স্পর্শ করতে যাচ্ছিলেন, গুরুদেব তৎক্ষণাৎ পা সরিয়ে নেন। ভদ্রমহিলার দুচোখ বেয়ে তখন আনন্দাশ্রু বইছে। সন্তানের প্রাণ বাঁচানোর জন্য তিনি গুরুদেবের কাছে কৃতজ্ঞ। পারলে তিনি গুরুদেবকে মাথায় তুলে রাখেন। গুরুদেব এতে যথেষ্ট বিব্রত বোধ করলেও কিছু বলতেও পারছেন না। মায়ের আবেগকে কি বাধা দেওয়া যায়? বেশ কিছুক্ষণ পর সদাশিব গুরুদেবকে প্রণাম করে ওদের নিয়ে চলে গেলে গুরুদেব স্বস্তির শ্বাস ফেললেন। ”

“গভীর রাতে সদাশিব আবার গুরদেবের কাছে এল। সকালে মায়ের ব্যবহারের জন্য মাফ চেয়ে জানাল সে মাকে আনতে চায়নি, এমনকি সে পরিবারকেই আনতে চায়নি। কিন্তু সে আসার সময় সকলে এমন জোর করল যে সে না নিয়ে আসতে পারল না। সে যা আশঙ্কা করেছিল তাই হয়েছে। সংসারে ফেরামাত্র সে মায়ের ডাক উপেক্ষা করে এখানে ফিরে আসতে পারেনি। মায়ের একমাত্র সন্তান সে। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে বৃদ্ধা শোকে-দুঃখে পাথর হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। এতবছর পর তাকে ফিরে পেয়ে যেন আবার বাঁচার রসদ ফিরে পেলেন তিনি। এবার সন্তানকে এমনভাবে সংসারের পাঁকে বেঁধে দিলেন যে সে আর সুযোগ পেল না ফিরে আসার। এবারেও আসতে দিচ্ছিলেন না তিনি, অবশেষে সে অনেক মান-অভিমান, কান্নাকাটির পর অবশেষে সঙ্গে আসার শর্ত দিয়ে আসতে দিয়েছেন। গুরুদেব সবটা শুনে মৃদু হাসলেন। নিজের শিষ্যকে সংসারের করুণ নাগপাশে জড়িয়ে যেতে দেখে তার করুণাও হল হাসিও পেল। তারপর তিনি সদাশিবকে তন্ত্রের গুঢ়ক্রিয়া শিখিয়ে দিয়ে একবছর আগের সেই বিধিনিষেধ মনে করিয়ে দিলেন। সদাশিব কথা দিল যে সে প্রতিবছর এইদিন এখানে আসবে এবং গুরুদেবের সান্নিধ্যে তন্ত্রসাধনা করবে। গুরুদেব সম্মত হলেন। ”

“সদাশিব কথা রেখেছিল। সারাবছর সে গৃহস্থের জীবনযাপন করলেও বছরে একটা দিন সে গুরুদেবের সান্নিধ্যে তন্ত্রসাধনা করতো। দেখতে দেখতে কেটে গেল বেশ কয়েকটা বছর। সদাশিবের মা-ও গত হয়েছেন। সংসারের হাল এখন তার স্ত্রীর হাতে। তার মেয়েও বেশ বড়ো হয়েছে। আর কয়েকবছর গেলে তাকে পরের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হবে। সদাশিবই গুরুদেবকে সব খবর দিতো। একবার সদাশিবকে দেখে গুরুদেব অবাক হয়ে গেলেন। সে এসেছে ঠিকই কিন্তু গুরুদেবের কোনো কথাতেই তার যেন মনোযোগ নেই, মুখটা ভীষণ শুকনো দেখাচ্ছে তার। গুরুদেব সবই লক্ষ্য করছিলেন কিন্তু কিছু বলছিলেন না। অবশেষে আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি ব্যাপার বল তো সদাশিব? তোমার মুখটা এরকম শুকনো দেখাচ্ছে কেন? সব কুশল তো? বাড়ির সবাই ভালো আছে তো? ’ সদাশিব মাথা নেড়ে জানাল কিছু হয়নি সব ঠিক আছে কিন্তু গুরুদেবের বিশ্বাস হল না। তিনি জোড়াজুড়ি করতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ চেপে ধরার পর অবশেষে ভেঙ্গে পড়ল সদাশিব। গুরুদেবের কাছে ক্ষমা চেয়ে স্বীকার করল 
তার ভুল। জানাল সে নিতান্ত নিরুপায় হয়ে গুরুদেবের সাবধানবাণী লঙ্ঘন করতে বাধ্য হয়েছে।” 

“সবটা শোনার পর গুরুদেব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর হেসে বলেছিলেন , ‘না, তোমার স্ত্রীর সিঁথির সিঁদুর সত্যিই অক্ষয় বলতে হবে। পরপর তিনবার সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছো। না মা আমার সতীলক্ষ্মীই বটে। কথায় আছে বারবার তিনবার। আর তুমি তিনবার যমের দুয়ারে পৌঁছতে পৌঁছতে শেষমুহূর্তে পরপারের ডাক উপেক্ষা করতে পেরেছ। এমন সৌভাগ্য কতজনের হয়?”

“ এবার সদাশিব কি কান্ড করেছিল সেটা বলি। সদাশিবের গ্রাম এমনিতে শান্ত গ্রাম। লোকজন নির্বিবাদে বসবাস করে। দুবেলা দুমুঠো অন্ন আর শীত-গ্রীষ্মে দুটো মোটাকাপড়েই তারা সুখী। সেই গ্রামে এক’দিন ঘটে গেল একটা ঘটনা। গ্রামের একজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে গেল। জোয়ান ছেলে, বয়স কুড়ি-একুশ হবে, ভোরবেলা মাঠে গিয়েছিল প্রাতকৃত্য করতে। আর ফেরা হয়নি তার। বেলা বাড়লে মাঠের মাঝে তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়। মুখ দেখে মনে হয় যেন কিছু দেখে সে ভীষণ ভয় পেয়েছে। আর সেই ভয়েই যেন তার প্রাণ বায়ু বেরিয়ে গেছে। ছেলেটার মৃত্যু নিয়ে ক’দিন গ্রামে শোরগোল হল, তারপর স্বাভাবিক নিয়মে তা থিতিয়েও গেল। ছেলেটার পরিবার ক’দিন কাঁদল তারপর তারাও ক্রমে শোক সামলে নিল। সব আবার আগের নিয়মে চলতে লাগল। কিন্তু ক’দিন যেতে না যেতে আবার একইভাবে গ্রামের আরেকজনের মৃত্যু ঘটলে সকলের ভ্রু কুঁচকে গেল। এবারের মৃতদেহটা ছিল একটা মহিলার। এও রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বেরিয়েছিল। গ্রামের দু-তিনজন ডাকাবুকো ছেলে ছোকরা ঠিক করলো ব্যাপারটা তারা খতিয়ে দেখবে। রাতে সকলে ঘুমোলেও ওরা জেগে পাহারা দেবে। কিন্তু পরের সপ্তাহ যেতে না যেতে ছোকরাদের মধ্যে দুজন মারা পড়লে গ্রামে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেল। কারন দুজনের মৃত্যু ছিল আরো মর্মান্তিক। একজনের মাথাটা মুচড়ে সম্পুর্ণ উল্টে দেওয়া হয়েছিল। অপরজনের শরীরের শুধুমাত্র কাটা ডান পা-টা পাওয়া গিয়েছিলো। গোটা শরীরটাই আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। এরপর কেউ আর প্রাণ হাতে করে বেরোতে চাইল না। সকলে দরজা জানলা খিল আটকে ঘরে বসে রইল। সূর্যাস্তের পর প্রয়োজন হলেও কেউ বাড়ির বাইরে বেরোয় না। দৈবাৎ যদি কেউ বেরিয়েও পড়ে পরদিন তার লাশ পাওয়া যায় বাড়ির উঠোনে। তবে এতে সদাশিব বিচলিত হয়নি। কারন সে জানতো কোন কারনে এসব ঘটছে। ”

“বুঝেছি!” বলে সোফার হাতলে চাপড় মারল বালু। “নির্ঘাত সদাশিব গুরুদেবের কথা অমান্য করে বেতাল আবাহন করেছিল! পরে সামলাতে না পারায় কেস খেয়ে গেছে। সেই কারনেই গুরুদেবের কাছে ওরকম চোরের মতো আচরণ করছিল।”

ব্যোমকেশ একদৃষ্টে বালুর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল এমনসময় কলিংবেল বেজে উঠল। প্রাচী উঠে গেল দরজা খুলতে, তারপর বাইরে থেকে ওর গলা শুনতে পেলাম আমরা। যেন কাউকে দেখে ভীষণ সারপ্রাইজড হয়ে গেছে ও। কিছুক্ষণ পর প্রাচী ঘরে ফিরে এল এবং ওর পেছন পেছন যে এল তাকে দেখে আমরা অবাক হয়ে গেলাম। “কৃষ্ণেন্দুদা!” আপনা থেকেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল আমার।
কৃষ্ণেন্দুদা ম্লান হেসে বললো, “চলে এলাম। বিকেলের দিকে ছাড়া পেয়েছি হাসপাতাল থেকে। বাড়ি ফিরতে গিয়ে মনে হল ফিরে কি লাভ? কেউ তো আর আমার অপেক্ষায় থাকবে না। কাজেই বাড়ি না ফিরে ভাবলাম কোথায় যাওয়া যায়? তারপর মনে পড়ল সেদিন তোরা আমাকে মার্কেট থেকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে অ্যাডমিট করলি অথচ তোদের ধন্যবাদ পর্যন্ত জানাই নি। সেদিন তোরা না থাকলে যে কি হতো?” বলে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল কৃষ্ণেন্দুদা।

ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে আসছে দেখে বালু উঠে কৃষ্ণেন্দুদার হাত ধরে বললো, “ছাড়ো ওসব কথা। সেদিন আমার যা করার ছিল তাই করেছি। আজ এই প্রথম আমার বাড়ি এসেছো না খেয়ে যেতে পারবে না। তবে তার আগে এসো। আমাদের সাথে বসে আগে এক কাপ চা খাবে এসো। ”

আমি যোগ করলাম, “ সাথে একটা সিগারেট।” সকলে হো হো করে হেসে উঠল। প্রাচী চা করে আনতে আনতে আমাদের আড্ডা আবার জমে উঠল। কথায় কথায় ব্যোমকেশ সদাশিবের প্রসঙ্গটা কৃষ্ণেন্দুদাকে জানাল। কৃষ্ণেন্দুদা সবটা শুনে বাকিটা শুনতে চাইল। ব্যোমকেশ আবার শুরু করল, “ বলরাম, তুমি যে কথাটা বললে তার উত্তরে বলি তোমার অনুমান এবারও হনুমানের এঁটো কলায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। তুমি প্রায় কাছাকাছি গিয়েছিলে তবে শেষ মুহূর্তে সবটা গুলিয়ে গেল।”

“মানে? সদাশিব বেতাল ডাকেনি? তাহলে?” বালুর গলায় অনিশ্চয়তার সুর।

“না। তোমাদের বিজ্ঞানে সমান্তরাল জগত বা প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে তা তো জানো?”

“হ্যা। ” কৃষ্ণেন্দুদা সায় দিল।

“জানেন? বেশ তা কি জানেন শুনি?” ব্যোমকেশ ভ্রু কুঁচকে তাকাল কৃষ্ণেন্দুদার দিকে।

কৃষ্ণেন্দুদা স্থির গলায় বললো, “আমাদের এই পৃথিবী তথা বিশ্বচরাচরের বাইরেও আরো অনেকজগত আছে যারা আমাদের জগতের সাথে সমান্তরাল ভাবে চললেও আমাদের জগতের সাথে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। এই জগতসমূহের কিছু জগত এমন আছে যা আমাদের জগতের চেয়ে ভীষণ দুর্বল শক্তির অধিকারী, কিছু জগত আবার আমাদের জগত থেকে অনেকগুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন। এই জগতের বাসিন্দারা কেউ কেউ মনুষ্যসদৃশ কেউ বা মনুষ্যেতর ভীষণদর্শন, কেউ বা আমাদের দৃষ্টিতে অদৃশ্য। সাধারণত এদের সাথে আমাদের জগতের তেমন ক্ল্যাশ হয় না কিন্তু কখনো কখনো প্রকৃতির আপন খেয়ালে এই জগতের মধ্যে সংযোগ স্থাপন হয়ে যায় আর এর ফলে কখনো আমাদের জগতের মানুষ ওই জগতে প্রবেশ করে, কখনো বা সেই জগতের বাসিন্দারা আমাদের জগতে প্রবেশ করে। এতে দুপক্ষেরই জগতে একটু ভারসাম্যের স্থিতি নষ্ট হয়। এই জগতগুলোকে অনেকে প্যারারাল ইউনিভার্স, কিংবা মাল্টিভার্স বলে। ”

আমরা চমকে কৃষ্ণেন্দুদার দিকে তাকালাম। এ কোন কৃষ্ণেন্দুদাকে দেখছি আমরা? কলেজজীবন থেকে যে কট্টর বিজ্ঞানমনস্ক, শাম্বদের বাড়িতে পুজোয় যে এসেছে শুধু প্রসাদ খেতে, ঠাকুর দেখতে নয়, সেই মানুষটা এই অদ্ভুত বিষয়ে বিশ্বাস করছে?

ব্যোমকেশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম উত্তেজনায় ওর চোখ জ্বলছে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কৃষ্ণেন্দুদার দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আচমকা হেসে বললো, “ঠিক তাই! সদাশিবের গ্রামের ক্ষেত্রেও এই জিনিসটাই হয়েছিল। পরাবাস্তব জগত থেকে একটা মনুষ্যেতর হিংস্র প্রাণী প্রকৃতির আপন খেয়ালে সদাশিবদের জগতে ওদের গ্রামে এসে পড়েছিল। সদাশিব জানতো একে সাধারণ কোনো তন্ত্র ছাড়া প্রতিহত করা অসম্ভব। তাছাড়া সে গুরুদেবের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সে চাইলেও প্রাণীটাকে কোনোরকম ভাবে ঠেকাতে পারবে না। তাছাড়া প্রকৃতির কাছে আমরা ক্রীড়ানক তুল্য। আমাদের কি স্পর্ধা তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াই। প্রকৃতির খেয়ালে যেমন জীবটা এসেছে তেমনই প্রকৃতির আপন খেয়ালে সে ফিরেও যাবে। ”

“দেখতে দেখতে সদাশিবের গুরুদেবের কাছে আসার দিন এসে গেল। সে যথাসময় গুরুদেবের কাছে গিয়ে তন্ত্রসাধনা অভ্যাস করল। পরদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার বিকেল হয়ে গেল। গ্রামের আলপথ ধরে ফিরছিল সদাশিব। কিন্তু তার মন পড়েছিল তারাপীঠে গুরুদেবের কাছে। এদিকে সূর্য যে পশ্চিমে অস্ত চলতে বসেছে সেদিকে তার খেয়াল নেই। খেয়াল হল গ্রামের আগে নদীর পাড়ে এসে। নিজের সময়জ্ঞানহীনতার জন্য নিজের প্রতি প্রচণ্ড বিরক্ত হল সদাশিব। একটু আগে বেরোলে হয়তো এতক্ষণে বাড়ি পৌঁছে যেত। যাকগে, একটু তাড়াতাড়ি পা চালাতে হবে তাহলেই অন্ধকার হবার আগে সে পৌঁছে যাবে বাড়িতে। এই ভেবে মনে মনে কালীস্তব করতে করতে সে এগোতে লাগল গ্রামের দিকে। এমনসময় সামনের একটা দৃশ্য দেখে থমকে গেল সে!”

“গ্রামের সীমানায় একটা তালগাছ। অনেক দূর থেকেও দেখা যায় সেটা। গ্রামে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেলে এই তালগাছটাকে নিশানা করে তারা বাড়ি ফেরে। এই আধো অন্ধকারে সদাশিবের মনে হল সেই তালগাছের মাথায় কি যেন একটা ঝুলছে। অন্ধকারে ঠাওর করা যাচ্ছে না কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে বিরাটাকার একটা বাদর হেটমুণ্ড হয়ে ঝুলে আছে। সদাশিবকে দেখে জীবটা যেন একটু নড়েচড়ে উঠল। তারপর গাছ থেকে লাফিয়ে নেমে ধীর পদক্ষেপে এগোতে লাগল সদাশিবের দিকে। সদাশিব বুঝতে পারল এই সেই মনুষ্যেতর জীব যে এতদিন ধরে গ্রামে ত্রাসের সৃষ্টি করেছে, হত্যা করেছে একের পর এক গ্রামবাসীকে, আজ বোধহয় তার পালা। জীবটাকে দেখে ভয় না পেলেও একপলকের জন্য মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল সদাশিবের। নতজানু হয়ে বসে পড়ল সে কাদামাটিতে। খুকির মুখটা ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। বেচারি তারাপীঠ থেকে ফেরার সময় কাঠের পুতুল কিনে আনার আবদার করেছিল আজ। মৃত্যু এভাবে আসবে জানলে সে আসার সময় গিন্নিকে নিজের পদ্মবীজের মালাটা দিয়ে আসতো শেষস্মৃতি হিসেবে। সহসা তার শরীরের সব রোম দাঁড়িয়ে গেল। তাইতো! এটা তো ভেবে দেখে নি সে। কিন্তু এইমুহূর্তে কি সে পারবে? না জানি কতদিনের অনভ্যেস রয়ে গেছে। তাছাড়া এই মন্ত্র সবসময় কাজে দেয় না। এবং এর জন্য সে গুরুদেবের কাছে দেওয়া প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করার পাপে লিপ্ত হতে পারে। কিন্তু এছাড়া যে আর কোনো উপায় নেই তার কাছে। কি আর করা যাবে? একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। ভাবার সঙ্গে সঙ্গে বজ্রাসনে বসে পড়ল সে। মনের সমগ্র গতি একাগ্র করল একবিন্দুতে।”

“ওদিকে প্রেতাকৃতি জীবটা ক্রমশ কাছে চলে এসেছে সদাশিবের। আর চারশো গজ। সহসা দিকবিদিক আলোকিত করে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো আকাশে। আর প্রায় সাথে সাথে জ্বলে উঠল সদাশিবের কন্ঠের পদ্মবীজের মালাটা। তারপর যেন দম দেওয়া পুতুলের মতো লাফিয়ে উঠল সদাশিব। কোনোদিকে না তাকিয়ে কামানের গোলার মতো ছুটল জীবটাকে লক্ষ্য করে। জীবটা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছিল মৃত্যুর অমোঘগতির মতো। সদাশিবকেও ভাবে ছুটে আসতে দেখে আচমকা থমকে গেল সে। অবশ্য থমকানোর কারন যথেষ্ট ছিল কারন সে দেখতে পারছিল সদাশিবের দেহটা প্রায়বন্দুকের গুলির গতিতে তার দিকে ছুটে আসছে। তার কন্ঠের পদ্মবীজের মালা থেকে একটা আগুনের শিখা সদাশিবের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে সে পরিনত হচ্ছে একটা আগুন মানুষে। যেন একটা প্রকাণ্ড অগ্নিগোলক মানবদেহ ধারন করে ভীষণ দ্রুতগতিতে তার দিকে ছুটে আসছে।”

“কিছুক্ষনের মধ্যে অগ্নিগোলকটা জীবটাকে কাঁধে তুলে নিল। জীবটা হাজার চেষ্টাতেও তাকে এড়াতে পারল না। পরক্ষণে অগ্নিগোলকটা তাকে নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ল জলঙ্গি নদীর মধ্যে। আর জলে পড়ামাত্র আকাশ চিড়ে বিদ্যুৎ নেমে এল ঠিক সেই জায়গায় যেখানে সদাশিব ডুব দিয়েছিল। বিদ্যুতস্পৃষ্ট হওয়ার সাথে সাথে জীবটার দেহ জলে ভাসমান হবার আগেই পলকে ছাই হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর নদীর পাড়ে জল থেকে ঊঠে দাঁড়াল সদাশিব। দুহাতের আঁজলায় বেশ খানিকটা জল নিয়ে পশ্চিমদিকে তর্পন করতে করতে স্বস্তিবাক্য পাঠ করল সে।”

এইটুকু বলে থামল ব্যোমকেশ। তারপর একটা গাঁজার সিগারেট বের করে ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে তাকাল আমাদের দিকে। তারপর কিছুক্ষণ আরাম করে সিগারেটে টান দেওয়ার পর কৃষ্ণেন্দুদার দিকে তাকিয়ে বললো, “এরপর যতদিন বেঁচেছিল সদাশিব ততদিন সে গুরুদেবের কাছে এসে তন্ত্রসাধনা করেছে। এমনকি আমি থাকাকালীনও সে এসেছে প্রতিবার গুরুদেবের কাছে। তারপর এক’দিন যথাসময় সে ভবলীলা সমাপ্ত করে পাড়ি দিয়েছে অমৃতলোকে। আর তার মৃত্যুও হয়েছে সম্পুর্ণ স্বাভাবিক ভাবে প্রায়োপবেসনে। কোনো অপঘাতে নয়। তাহলে কৃষ্ণেন্দুবাবু এর থেকে কি প্রমাণিত হয় না যে মনের জোরই আসল শক্তি? এই মনের শক্তির কাছে সাক্ষাৎ যমও বারে বারে পরাভূত হন? ”

কৃষ্ণেন্দুদা মাথা নাড়লো। বালু বললো, “কিন্তু কিছু জিনিস যে ক্লিয়ার হল না ব্যোমকেশ! এই যে তুমি বললে যে জীবটাকে নাকি তন্ত্রদ্বারা প্রতিহত করা অসম্ভব ছিল তা সম্ভব হল কি করে? কি এমন শক্তি ব্যবহার করেছিল সদাশিব যার জন্য সে মর্মাহত হয়েছিল? জীবটা ধরে নিচ্ছি মানুষের থেকে বেশী ক্ষমতা সম্পন্ন। তাকে হারানো সাধারন মানুষের কর্ম নয় তাহলে কোন বলে সদাশিব তাকে বধ করতে সমর্থ হল? শুধু মাত্র মনোবল দ্বারা তো একটা ভয়ঙ্কর জীবকে হত্যা করা অসম্ভব!”

“একটু তলিয়ে ভাবলেই তোমার প্রশ্নেই তোমার উত্তর পেয়ে যাবে বলরাম। হ্যা তুমি ঠিক বলেছ শুধুমাত্র মনোবল দ্বারা ঐ নরকের জীবকে পরাজিত করা অসম্ভব। সদাশিব শুধু মনোবল দ্বারা এই অসাধ্য সাধন করে নি। সে প্রয়োগ করেছিল মহাডামরী আহ্বান মন্ত্র আর প্রয়োগ করেছিল মানুষের সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র, বিশ্বাস। কথায় আছে ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর।’ মৃত্যুর মুহূর্তে তার মনে পড়েছিল জীবনের সমস্ত অসমাপ্ত কার্যসমূহ। একই সাথে সে আনন্দিত হচ্ছিল ভবসাগর থেকে মুক্তি পাবে বলে আবার নিজের কন্যাকে এভাবে ছেড়ে যাবার জন্য তার মন খারাপ করছিল। ঠিক এই সময় তার খেয়াল হয় সে পদ্মবীজের মালা পরে আছে। তন্ত্রমতে পদ্মবীজের মালা হলো তান্ত্রিকের পক্ষে অত্যন্ত শুভ এবং রক্ষাকবচ সদৃশ। একবার সাধক সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলে তার পদ্মবীজের মালাতেও সেই সাধনার শক্তি সঞ্চারিত হয়। কোন অশুভশক্তি এই পদ্মবীজের মালার কারনে সাধককে সহজে স্পর্শ করতে পারে না। সেই মুহূর্তে সে ঠিক করল নিজে মুক্তি পাবার সাথে সাথে এই জীবটাকেও সে হয় তার জগতে নিজের সাধনায় রপ্ত সিদ্ধির বলে প্রেরন করবে নাহয় চিরতরে অকেজো করে দেবে। যাতে তার পর এই গ্রামে আর কোনো মানুষের মৃত্যু না ঘটাতে পারে জীবটা। কিন্তু এই প্রেতাকৃতী জীবকে অকেজো করার শক্তি কে হবে? পরক্ষণেই সে ঠিক করে নিল কাকে আবাহন করবে সে। সেই মতো সে বজ্রাসনে বসে নিজের সকল সিদ্ধিকে একত্র করে নিজের প্রাণ বায়ুকে অবরুদ্ধ করল সদাশিব। তারপর আবাহন করলো মহাডামরীদেবী কে তার আধারে ভর করার জন্য। সেই সময় সে বিশ্বাস করেছিল যে একমাত্র মহাডামরীদেবীই পারেন এই জীবকে প্রতিহত করতে। বাকিটা সবটাই তোমরা জানো কিন্তু একটা জিনিস কেউ গোচর করো নি যা ঘটে গিয়েছিল সদাশিবের প্রবল বিশ্বাসের জোরে। ”

আমি বললাম, “কি জিনিস?”

কৃষ্ণেন্দুদা বললো, “ জীবটার কোনো ক্ষতি হয় নি।”

আমরা সকলে চমকে গেলাম। বলে কি কৃষ্ণেন্দুদা! বালু অবাক গলায় বললো, “সেকি! ব্যোমকেশ যে বললো ঐ প্রবল বজ্রাঘাতে যে জীবটার দেহ ছাই হয়ে গিয়েছিলো!” 

কৃষ্ণেন্দুদা একই ভাবে নিরুত্তাপ গলায় বললো, “ সদাশিব যখন ধ্যানস্থ হয় ঠিক সেই মুহূর্তে বাজ পড়েছিল। আকাশে তো কোনো মেঘ ছিল না অথচ বাজ পড়ল কি করে? এমনকি জীবটাকে নিয়ে সে যখন নদীতে ঝাপ মারল তখন আবার বিনা মেঘে বজ্রপাত হল আর হলও ঠিক যেখানে সদাশিব ঝাপ মেরেছিল সেখানে। ভেবে দেখ তোরা , জীবটার সাথে সাথে সদাশিবেরও তো বজ্রাঘাতে পুড়ে যাবার কথা। তার ক্ষতি হল না কেন? আমার যা মনে হচ্ছে। জীবটা যে জগত থেকে এসেছিল সেই জগতের পোর্টাল প্রকৃতির আশ্চর্য খেয়ালে আবার খুলে যায়। আর ঐ বিদ্যুৎটাই ছিল সেই পোর্টালের গেট। যার মাধ্যমে জীবটা নিজের জগতে ফিরে যায়। আর ঐ ভষ্ম হওয়াটা সদাশিবের হ্যালুসিনেশন।”

ব্যোমকেশ উজ্জ্বল চোখে তাকিয়েছিল কৃষ্ণেন্দুদার দিকে। সে শুধু অস্ফুটে বললো , “চমৎকার! ঠিক আন্দাজ করেছেন আপনি! আমারও তাই বিশ্বাস। ” কথার মাঝে প্রাচী এসে জানাল খাবার টেবিলে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সকলে তাকিয়ে দেখলাম ঘড়িতে রাত দশটা বাজতে চলেছে। 

খেয়ে দেয়ে আমরা কিছুক্ষণ বসার পর কৃষ্ণেন্দুদা বললো , “নাহ! অনেক দেরি হয়ে গেছে! এরপর আর ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না। আমি এলাম রে, তোরা ভালো থাকিস। অনেকদিন পর বিকেলটা দারুন কাটলো।পুজো খুব ভালো কাটুক তোদের। আর ব্যোমকেশবাবু আপনার সাথে আলাপ করে ভালো লাগলো। ভালো থাকবেন, আবার দেখা হবে আমাদের। ”

ব্যোমকেশ কৃষ্ণেন্দুদার হাত ধরে বললো, “আপনিও ভালো থাকবেন। সাবধানে যাবেন। ” কৃষ্ণেন্দুদা ব্যোমকেশের দিকে তাকিয়ে রইলো।ব্যোমকেশ কৃষ্ণেন্দুদার সাথে কথা বলছে এমন সময় বালুর ফোন বেঁজে উঠলো। বালু ফোনটা কানে দিয়ে , “হ্যালো” বলে থেমে গেল তারপর চমকে বললো, “তা কি করে হয়? কৃষ্ণেন্দুদা তো…” বলে সামনের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলো। আমি বালুর কথা শুনে ওর দিকে তাকিয়েছিলাম তারপর ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাতে চমকে গেলাম। এক সেকেন্ড আগেও আমাদের সামনে কৃষ্ণেদুদা দাঁড়িয়ে ছিলো। এখন ব্যোমকেশ একা দাঁড়িয়ে আছে। কৃষ্ণেন্দুদা কোথাও নেই! যেন হাওয়ায় উবে গেছে লোকটা। ব্যোমকেশ আনমনে হেসে বললো, “খবর পেয়েছো?” 

বালু মাথা নেড়ে বললো, “কিন্তু এটা কি করে সম্ভব? লোকটা কিছুক্ষণ আগেও তো এখানে ছিলো। আমাদের সাথে গল্প করলো,খেলো।অথচ লোকটা নাকি দুপুর তিনটের দিকে মারা গেছে! এ যে অসম্ভব! আমরা সবাই কি তাহলে ভুল দেখলাম?”

“না ভুল দেখোনি। তিনি সত্যিই এসেছিলেন। আবার আসেনও নি। হয়তো তোমার বিশ্বাসটাকে ভাঙতে এসেছিলেন। আমি আগেই আঁচ করেছিলাম ওনার কন্ঠস্বর শুনে। কেমন যেন অস্পষ্ট ঘষাকাঁচের মতো কন্ঠস্বর। তারপর আলোতে ওনার ছায়া না পড়া, গাঁজার ধোঁয়ায় অস্বস্তিবোধ করা, অবশেষে ঠান্ডা বরফের মতো হাত দেখে নিশ্চিত হই।”

এদের কথার বিষয়বস্তু কিছুই আমার মাথায় ঢুকছিল না।একবার এর মুখে আরেকবার ওর মুখে তাকাচ্ছিলাম। আমার মুখ দেখে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বালু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “কৃষ্ণেন্দুদা আজ দুপুরের দিকে সুইসাইড করেছে। দুপুরের দিকে কেবিনে পেশেন্টকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়। সে সময়টায় কেবিনে একজন আয়া থাকে ঠিকই পেশেন্টকে বাথরুমে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু আজ কৃষ্ণেন্দুদার রুমে কেউ ছিলো না। কাল ডিসচার্জ হবার কথা ছিলো কৃষ্ণেন্দুদার। স্বাভাবিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠায় ওর রুমে আয়া দেওয়া হয় নি। সেই সুযোগে ও আটতলার জানলা দিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। বডিটা নাকি আট তলা থেকে সোজা দোতলার কার্নিশে বাউন্স করে সোজা মাটিতে আছড়ে পড়ে। কিন্তু এ যে অসম্ভব ব্যাপার! তুই , আমি, প্রাচী এতটা ভুল দেখলাম! তাহলে যে মানুষটা এলো, আমাদের সাথে আড্ডা মারলো সে কে?”

আমি চমকে তাকালাম ওর দিকে। ব্যোমকেশ হেসে বলল, “বিশ্বে এরকম অনেককিছুই ঘটে থাকে যার ব্যাক্ষা পাওয়া যায় না বলরাম। কৃষ্ণেন্দুবাবু পরপারের ডাক শুনতে পেয়েছিলেন সদাশিবের মতো। কিন্তু তার মতো উপেক্ষা করতে পারেন নি। অমৃতলোক বলে যদি কিছু থাকে তাহলে এতক্ষণে তিনি তাঁর স্ত্রীর কাছে পৌঁছে গেছেন।”

“কিন্তু…”

“কোনো কিন্তু নেই এখানে বলরাম। মানুষের বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে এই জগত চলে না। তোমার বৈজ্ঞানিক মনোভাব হয়তো বলবে এটা তোমাদের দৃষ্টিভ্রম ছিলো। কিন্তু সেই বিজ্ঞানও হোঁচট খাবে একটু আগে কৃষ্ণেন্দুবাবুর ফেলে যাওয়া এঁটো পাত দেখলে। তুমি চাইলে এটাকে অবিশ্বাস করতেই পারো, কিন্তু একটা কথা জেনে রাখো এরা যে নেই এটা যেমন সত্য, এরা আছে এটাও তেমনি সত্য। জানি মন মানছে না তোমার কিন্তু কি করবে বলো? আগেই বলেছিলাম আমি, বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদুর।”

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...