৫ আগস্ট ২০০৬, শনিবার, সন্ধ্যে সাতটা
ব্যারাকের তাবুর বারান্দায় একটা ক্যাম্বিসের ফোল্ডিং চেয়ারে বসে নিজের অ্যাসল্ট রাইফেলটা পরিস্কার করছিলো শিবরাজ। ইদানিং সবসময় এটা নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে তাকে। কাজেই সবসময় সচল রাখার জন্য এটাকেও নিয়মিত পরিস্কার করে রাখতে হয়। এখানে পদে পদে বিপদ। কে জানে কখন কি হয়ে যায়। মোক্ষমসময় এটা জ্যাম হয়ে গেলে আর দেখতে হবে না। শহিদের লিস্টে নাম লেখাতে হবে। কদিন আগেও এতটা ডিউটির চাপ তৈরি হয়নি এখানে কিন্তু ইদানিং এই জায়গাটা ক্রমশ হিংস্র হয়ে পড়ছে। কেরোসিন তেল দিয়ে রাইফেলের নলের ভেতরটা পরিস্কার করতে করতে তার মনে পরে গেলো কদিন আগের কথা…।
ওর আগের পোস্টিং ছিলো কর্ণাটকের টুমকুরে। পরিবার থাকে ম্যাঙ্গালোরে। সেখানে বেশ ছিলো সে। মাঝে মাঝে ছুটি পেলে চলে যেত বাড়িতে হুট করে। কাউকে না জানিয়ে। বাবা-মা ভীষণ খুশি হতো ওকে দেখে। আর পদ্মা ওকে দেখলে চুপ করে কাঁদতো। পদ্মা! মুহূর্তে হাসি ফুটে ওঠে শিবরাজের মুখে। কলেজে পড়াকালীন আলাপ সেখান থেকে লুকিয়ে প্রেম তারপর বিয়ে। এই চাকরী নিয়ে বাবা-মায়ের থেকে বেশী আপত্তি ছিলো পদ্মার। কারনটা জানে সে। পদ্মা বলেছে পদ্মার বাবা নাকি আর্মিতে ছিলেন। পদ্মা তখন অনেক ছোটো। বাবা অন্তপ্রাণ ছিলো সে। তার বাবা ডিউটিতে যাবার আগে প্রায় বলতেন সে যদি ভালোমেয়ের মতো থাকে তাহলে তিনি তাড়াতাড়ি ফিরবেন আর ওকে নিয়ে বেড়াতে যাবেন মাইসোরে। প্রত্যেকবার একই কথা বলতেন তিনি। শুধু জায়গার নাম পাল্টে যেত। পদ্মাও ওর বাবার কথা শুনতো। একবার স্কুল থেকে ফেরার সময় বাড়িতে অনেক লোক দেখতে পায় সে। তাদের ভিড় কাটিয়ে অনেক কষ্টে ভেতরে ঢুকতেই সে দেখতে পেয়েছিলো তেরঙ্গায় জড়ানো কফিনে শোয়া তার বাবার মৃতদেহ।
তারপর থেকে এই বি.এস.এফ, আর্মির চাকরীকে ভীষণ ভয় করে সে। পদ্মার স্থির বিশ্বাস এই চাকরীতে যারা যায় তারা সবসময় জীবিত বা অক্ষত ফেরে না। শিবরাজ হেসে বলেছিলো সি.আর.পি.এফ-এ সে ভয় নেই। তেমন বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতি না হলে ওদের তলব হয় না। আর ওরাও পুলিশের মতোই ডিউটি করে। ওদের শিফটিং হয়, পোস্টিং হয়। পদ্মা কিছু বলেনি শুধু ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলো। যেমন প্রতিবার ডিউটি থেকে ফেরার পর কাঁদে। কিন্তু সে কান্না হয় আনন্দের, শান্তির, বিশ্বাসের। শিবরাজ এটা বোঝে। তার মনে আছে বিয়ের পর একবছর কাটতে না কাটতে ওর পোস্টিং হয়েছিলো এখানে। রওনা হবার আগের দিন সারারাত ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলো পদ্মা। তারপর ভোরে সুখবরটা দিয়েছিলো তাকে। বিস্ময়ে, আনন্দে আত্মহারা হয়ে শিবরাজ কথা দিয়েছিলো সে তাড়াতাড়ি ফিরবে। নিজের অনাগত সন্তান আর পদ্মার জন্য ফিরতে হবে তাকে।
এই জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। জঙ্গলের চেনা শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ প্রায় নেই বললেই চলে। রাইফেলটা পরিস্কার করা পর কাপড় দিয়ে মুছে লোড করতে করতে একটু আনমনা হয় শিবরাজ। সত্যিকথা বলতে এদের উপর তার কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই। কলেজে পড়াকালীন সেও ছাত্ররাজনীতি করতো। এদের মতো সেও বিশ্বাস করে যে সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র অত্যন্ত আবশ্যক। তার উপর এখানকার লোকজন ভীষণ গরীব, বঞ্চিত, সরকারী জমি অধিগ্রহণের আশঙ্কায় শঙ্কিত। একমাত্র রোজগার বলতে জঙ্গলে কাঠকাটা, আর শিকার। এছাড়া দুবেলা দুমুঠোর জোগানের জন্য কৃষিকাজ। তাও সেটা মুখে তোলার আগে ছিনিয়ে নেয় মহাজন, ফড়ে, দালালরা। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আর কিবা করতে পারে মানুষ? এছাড়া অন্য কোনো পথও যে খোলা নেই।
তবে বন্দুকের নলই যে ক্ষমতার উৎস সেটা সে মানতে নারাজ। ইতিহাস সাক্ষী আছে ক্ষমতায় যে দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার সাথে তার বিরোধীদলেরও সৃষ্টি হয়েছে। কোনোদলই সুস্থ, পরিচ্ছন্ন ভাবে রাষ্ট্রপরিচালনা করতে পারেনি। সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী দেশেও দুর্নীতির ছোঁয়া লেগেছে। বুর্জোয়ারাই সর্বহারাদের নেতৃবৃন্দের ছদ্মবেশ নিয়ে সিংহাসনে বসে সর্বহারাদের আবার বঞ্চিত করেছে। সর্বহারারা প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি কারন সিংহাসনে আসীন ব্যক্তির হাতে তারাই তুলে দিয়েছে বিদ্রোহ দমনের রাজদণ্ড। কিন্তু সেকথা এদের বোঝাবে কে? এদের এমনভাবে ব্রেনওয়াশ করা হয়েছে যে পুলিশ তো দূরস্থ এদের মধ্যে কারো যদি বোধোদয়ও ঘটে তার কথাও এরা আমল দেবে না। একটা আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস বেরোয় শিবরাজের বুক দিয়ে।
রাইফেলটা পরিস্কার করার পর লোড করতে করতে বাইরে একটা মৃদু পায়ের শব্দ টের পেলো শিবরাজ। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিলো কেউ বা কারা যেন খুব সন্তর্পণে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। নির্ঘাত ওরা হবে। বিগত দুমাসে ওদের কার্যকলাপ বেশ বেড়েছে। গতমাসে পুলিশের কনভয়তে ল্যান্ডমাইন ব্লাস্ট, পাঁচদিন আগে চুরিমারা ক্যাম্পে আক্রমণ। এবার বোধহয় এই ক্যাম্পটার পালা। সৌভাগ্যের কথা ক্যাম্পে এখন কেউ নেই। সবাই ডিউটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অন্যদিকে। কেউ মনে হয় খেয়ালও করেনি। রাইফেলটা লোড করার পর বোল্টটা টেনে অটোমেটিক মোড চালু করে পেট্রোম্যাক্স বাতিটার আলো কমাতে যেতেই বাতাসে মৃদু খুট শব্দ শুনতে পেল সে।
আর শুনতে পারার সাথে সাথে রিফ্লেক্সে পেছন দিকে ডিগবাজি খেয়ে চিতার মতো একলাফে সরে পাশের বড়োগাছের গুড়ির আড়ালে চলে গেলো শিবরাজ। আর পর মুহূর্তে একরাশ গুলি ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ওর পেট্রোম্যাক্স বাতিটাকে উল্টে দিয়ে, চেয়ারটাকে প্রায় ছিন্নভিন্ন করে দিলো। পরক্ষণেই পেট্রোম্যাক্সের সিলিন্ডারটা প্রচণ্ড শব্দে ফেটে গেলো। আর সেই বিস্ফোরণের আগুন মাটিতে পরে থাকা কেরোসিনের জারটার সংস্পর্শে আসতেই আরেকটা মৃদু বিস্ফোরণ ঘটলো যেটার ফলে লেলিহান শিখায় দাউদাউ করে জ্বলতে লাগলো ওদের ব্যারাকের তাবুটা।
শিবরাজ তৎক্ষণাৎ মনে মনে হিসেব করে নিলো। বিস্ফোরণের শব্দ এতক্ষণে আশেপাশে সবার কানে গেছে। সবাই এবার ঠিক ছুটে আসবে। তাও যদি হিসেব করা যায় সবার আসতে ম্যাক্সিমাম পনেরো মিনিট লাগবে। এই পনেরো মিনিট যদি এদের আটকে রাখা যায় তাহলেই যথেষ্ট। কিন্তু এরা সংখ্যায় কতজন সেটা না জানা পর্যন্ত কিছু করা যাবে না। ওর কাছে ফুললি লোডেড রাইফেল, সাথে পিস্তল আর হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাটের জন্য ভোজালি আছে ঠিকই কিন্তু ওদের সংখ্যা যদি বেশি হয় তাহলে পনেরো মিনিট ওদের আটকে রাখাটা এক অসম যুদ্ধের সামিল হয়ে যাবে। দেখা যাক কতজন আছে। ভেবে চট করে গাছে উঠে গাছের ডালের আড়ালে লুকিয়ে যেখান থেকে গুলির ঝাঁক এসেছিলো সেদিকে তাকিয়ে প্রতিক্ষা করতে লাগলো শিবরাজ।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। কিছুক্ষণ পর ওদের একজন এগিয়ে এসে দেখতে লাগলো শিবরাজ সত্যিই মরেছে কিনা। তারপর পেছনে ইশারা করতেই একে একে সবাই ক্যাম্পের সামনে এসে দাঁড়ালো। শিবরাজ লুকিয়ে গুণে দেখলো সবশুদ্ধ জনাকুড়ি সশস্ত্র লোক ওর উঠোনে দাঁড়িয়ে। আগুনে ওদের চোখ জ্বলছে। মুখে ওদের কুটিল হাসি। কিন্তু ওদের চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেলো শিবরাজ। এরা তো তারা নয়! এমনকি এরা তো এখানকার অধিবাসীই নয়! এরা কারা? কি করছে এখানে? পরনের পোশাক ওদের মতোই। হাবভাবও ওদের মতোই। কিন্তু ওদের সম্পর্কে সে যা শুনেছে আর এখন যা দেখছে তার মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য। এদের প্রত্যেকের কাছে কালাশনিকভ রাইফেল রয়েছে। পড়নের পোশাক একদম মিলিটারি ধাঁচের। এমনকি মাথার চুলও ওদের ধাঁচেই কাটা। ভ্রু কুঁচকে ওদের কার্যকলাপ দেখতে লাগলো শিবরাজ।
ওরা প্রথমে চারদিক ভালো করে টহল মেরে দেখে নিলো কেউ আছে কিনা। তারপর চারদিকে চারজন গার্ড দিতে লাগলো। একদল তাবুর ভেতরে উঁকি মেরে দেখতে লাগলো। আরেকজন যেদিক থেকে এসেছিলো সেদিকে ইশারা করলো। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে একজন খর্বকায় ব্যক্তি বেরিয়ে এলো। মুখ গামছায় ঢাকা কিন্তু পরনে সামরিক পোশাক। আরে এ যে বেণীমাধব মজুমদার! ওয়েস্ট বেঙ্গলের মাওইস্ট রেভোলিউশনের অবিসংবিদিত প্রণেতা এবং প্রধান কম্যান্ডার কে সিংয়ের ডানহাত! যাকে হন্যে হয়ে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ প্রশাসন খুঁজছে! যার মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছে প্রায় দু লক্ষ পুরস্কারের বিনিময়। এ এখানে কি করছে?
এ যে মেঘ না চাইতেই জল! এই লোকটাকে জ্যান্ত বা মৃত ধরা গেলে বেঙ্গলের মাওইস্টদের মেরুদন্ড প্রায় ভেঙে যাবে। মনে মনে ঠিক করে নিলো শিবরাজ, যে করেই হোক এই লোকটাকে আজ পালাতে দেওয়া চলবে না। কিন্তু এই গাছে থেকে তা সম্ভব নয়। ওরা টার্গেট করে ফেলবে। এদেরকে গেরিলা পদ্ধতিতে জব্দ করতে হবে। ভালো করে চারপাশের আড়ালের জায়গাটা দেখে নিলো শিবরাজ। তারপর নামতে গিয়ে থমকে গেল।
রক্ষীদের একজন তার ঠিক নিচে বসে। বোধহয় পেচ্ছাব করছে। টুক করে হোলস্টার থেকে ভোজালিটা বের করে রক্ষীর মাথায় লক্ষ্য করে মারলো সে। বাতাসের তারতম্যের ফলে সেটা সটান গিয়ে বিঁধলো তার ঘাড়ে। রক্ষী কেবলমাত্র একটা ‘ওক!’ শব্দ করে ঢলে পড়লো। টুক করে নেমে পড়ে ভোজালিটা বের করে নিলো শিবরাজ। মৃত মাওইস্টটার জামায় রক্তটা মুছে হোলস্টারে ভরে নিয়ে চট করে পজিশন নিলো সে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর শিবরাজ দেখলো ওরা সবাই ওর রেঞ্জের নাগালে দাঁড়িয়ে। এই শেষ সুযোগ ওদের শেষ করার। একমুহূর্ত চোখ বুঁজে নিজেকে প্রস্তুত করলো শিবরাজ। তারপর একটা গভীর শ্বাস নিয়ে রাইফেলের লকটা খুলে ওদের দিকে তাক করে চালিয়ে দিলো।
এইভাবে আচমকা অতর্কিতে আঘাত আসবে ওরা ভাবতেই পারেনি। কাজেই পলক ফেলতে না ফেলতেই বেশ কয়েকজন ধরাশায়ী হলো। বাকিরা যেদিক থেকে গুলি এসেছিলো সেদিকে গুলি চালালো। কিন্তু পরক্ষণে ওদের ঠিক উল্টোদিক থেকে একরাশ গুলি ছুটে এলো। আক্রমণকারিরা ফোর্সের তৎপরতায় প্রায় চমকে উঠলো। এত তাড়াতাড়ি যে ফোর্স এসে যাবে ওরা ভাবতেই পারেনি। কিন্তু আসল জিনিসটা ওরা ধরতেই পারেনি। ওরা ভেবেছিলো বোধহয় ফোর্স ওদের ঘিরে ধরেছে। কিন্তু আসলে তা ছিলো না। শিবরাজ চিতাবাঘের মতো অসম্ভব ক্ষিপ্রগতিতে নিজের জায়গা বদল করে গুলি চালিয়ে যাচ্ছিলো। ওরা ধরতেই পারছিলো না যে আক্রমণ ঠিক কোথা দিয়ে আসবে।
দেখতে দেখতে কুড়িজনের দলটা মাত্র চারজনের হয়ে দাঁড়ানোর সাথে সাথে শিবরাজের রাইফেলের গুলি ফুরিয়ে গেলো। আর ঠিক তখনই ওর পেছন থেকে একজন ওকে জাপ্টে ধরলো। শিবরাজও সেয়ানা চট করে পেছন দিকে শরীরের ভর দিয়ে গাছের গুড়িতে ধাক্কা মারতেই পেছনের ব্যক্তির বজ্রবাঁধুনি সামান্য আলগা হলো আর সে সুযোগে পেছন ফিরে চকিতে ভোজালি দিয়ে আততায়ীর গলার নলী দুফাক করে দিলো সে। আর সেই সাথে একটা শব্দ শুনতে পেলো সে অনেকগুলো ভারী বুটের শব্দ। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো শিবরাজ। যাক! ফোর্স আসছে। এবার বি.এম.মজুমদারকে কব্জা করতে পারলেই হলো। এই ভেবে আড়াল থেকে বেরোলো সে।
বেশ কিছুক্ষণ লড়াইয়ের পর শিবরাজ বুঝলো প্রতিপক্ষ ও মার্শাল আর্টে বেশ পটু। এবং দুজনেই সমান দক্ষ। তাও দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে গেলো শিবরাজ। দুপক্ষই সমান আহত, ক্ষত বিক্ষত কিন্তু মারের বিরাম নেই। একই সাথে রক্ষণ ও মার চলছে। কখনো শিবরাজের ঘুষি আছড়ে পড়ছে মজুমদারের চোয়ালে, কখনো মজুমদারের লাথি এসে লাগছে শিবরাজের পেটে। মজুমদারও বুঝতে পেরেছে এভাবে হবে না। ফোর্স চলে এলে সর্বনাশ ঘটে যাবে। কিন্তু এই সি.আর.পি.এফ জওয়ানটা মারাত্মক নাছোড়বান্দা। কিছুতেই পালাতে দিচ্ছে না।প্রতি মুহুর্তে আটকে দিচ্ছে তার পথ।
আশেপাশে বুটের শব্দ আর হাকডাক শুনতে পাচ্ছে সে। এদের হাতে ধরা পড়লে সমুহ বিপদ। এমন সময় পেছনে এক কমরেডকে নড়তে দেখলো সে। তৎক্ষনাৎ মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল মজুমদারের। সে পেছনদিকে উদ্দেশ্য করে একটা শব্দ করে পড়ে গেলো। শব্দটা এমনভাবে করলো যেন জওয়ানটার মনে হয় আঘাত পেয়ে আর্তনাদ করছে।
মজুমদার পড়ে যেতেই তার উপর চড়ে বসতে যাবার আগে শিবরাজের পেছন থেকে গর্জে উঠলো কালাশনিকভ। শিবরাজ অবাক হয়ে দেখলো ওর বুকটা ঝাঁঝড়া হয়ে গেছে। একরাশ গুলি ওকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে চলে গেছে। পেছন ফিরে দেখলো একজন উবু হয়ে শুয়ে রাইফেল বাগিয়ে রয়েছে তার দিকে। পরক্ষণে চোখের পলক ফেলামাত্র সেই ব্যক্তির গলা ভেদ করে বসে গেল শিবরাজের ভোজালি। নতজানু হয়ে বসে পড়লো শিবরাজ। ভলকে ভলকে রক্ত বেরিয়ে এলো ওর মুখ দিয়ে । তাহলে আর পদ্মার কাছে ফিরে যাওয়া হলো না তার!
মজুমদার ততক্ষণে উঠে বসেছে। হিন্দিতে বলে উঠলো সে,“জীবনে অনেক পুলিশ,জওয়ান দেখেছি। তোমার মতো দেখিনি। তুমি যদি আমাদের দলে থাকতে তাহলে তোমায় মাথায় করে রাখতাম। ক্ষমা করো এভাবে মারার জন্য । কিন্তু আমি নিরুপায় । পালাতে আমায় হবেই। কিন্তু তোমায় আমি ভুলবো না। কি নাম তোমার?”
কোনোমতে শিবরাজ খাবি খেতে খেতে বললো,“শিব…শিব… ইন্সপেক্টর…শিবরাজাপ্পা… পেরিয়ার।” বলেই কাঁকড়ার মরণকামড়ের মতো দুহাতে জাপটে ধরলো মজুমদারকে। মজুমদার নিজেকে ছাড়ানোর মরণপণ চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু শিবরাজের হাত যেন লোহার তৈরী। কিছুতেই ছাড়ানো যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর যখন ফোর্সরা ওকে উদ্ধার করলো ততক্ষণে শিবরাজের দেহ নিথর হয়ে গেছে ।
১২ মার্চ ২০১৮, সোমবার, বিকেল পাঁচটা
ফাঁড়ির সামনে যখন জীপটা দাঁড়ালো তখন সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। জীপ থেকে নেমে আড়মোড়া ভাঙলো অগস্ত্য । গোটা রাস্তা নাচতে নাচতে গাড়িটা এসেছে। কোমরের বল্টু প্রায় ঢিলে হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ স্ট্রেচিং করে নিয়ে জীপের পেছন থেকে বেডিংটা নামিয়ে কাঁধে নিলো সে। ড্রাইভার কিষুণ সাহায্য করতে চাইছিলো। ইশারায় তাকে মানা করে ব্যারাকের দিকটা জেনে নিয়ে সেদিকে এগোলো সাব-ইন্সপেক্টর অগস্ত্য সেন।
কিছুদুর গিয়ে থমকে দাঁড়ালো অগস্ত্য। সামনে পাটকাঠির আর দরমার মিশ্রনে তৈরী ঝুপড়িটা দেখেপেছন ফিরে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো কিষুণের দিকে। কিষুণ মাথা নেড়ে বললো ,“এটাই আপনাদের ব্যারাক কাম কোয়ার্টার।ঐ ডানদিকে চৌবাচ্চাটা আছে দেখছেন? তার পাশে কলঘর আছে। আপনি হাতমুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিন। আমি রাতের খাবারের আয়োজন করছি কেমন ?আজকের মেনু খিচুড়ি আর পাপড়ভাজা । কি চলবে তো স্যার?” অগস্ত্য মাথা নেড়ে বললো,“খুব চলবে তার আগে একটু গরম চা হবে? লাল চা লেবু দিয়ে।”
“হবে। আপনি বিশ্রাম নিন। আমি বানিয়ে আনছি ।” বলে ডানদিকের ছোটো বেঁড়ার ঘরটার দিকে চলে গেল ড্রাইভার কাম হোমগার্ড কাম রাঁধুনি কিষুন মুন্ডা।
অগস্ত্য ঝুপরির ভেতরে ঢুকলো। বাইরে থেকে ঝুপড়ি মনে হলেও ভেতরে অনেকটা জায়গা রয়েছে। ছটা ক্যাম্পখাট মুখোমুখি করে পাতা। মাঝে একটা মস্ত নাইলনের দড়ি এ মাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত টাঙানো। ছটার মধ্যে পাঁচটায় বিছানা গুটোনো। একটা সম্পুর্ণ খালি। পাশে বেডিং ফোল্ড করে রাখা। নিজের বেডিংটা সেখানে রেখে বেরিয়ে এসে চৌবাচ্চায় হাত মুখ ধুয়ে একটা চেয়ার বের করে বারান্দায় বসলো অগস্ত্য।
কিছুক্ষণ পর কিষুণ একটা থালায় বেশ কয়েকটা কাগজের কাপে করে চা নিয়ে এলো। অগস্ত্য একটা কাপ নিতেই সে চলে গেল ফাঁড়িয়। এদিকে মনে হয় তেমন ইলেক্ট্রিসিটি নেই। তবে ফাঁড়িয় আছে হয়তো। অগস্ত্যর অসুবিধে হলো না। সে গ্রামের ছেলে।গ্রামে মানুষহয়েছে। অন্ধকারে তার অভ্যেস আছে। তবে এখানে সাপখোপ আর জোক আছে কিনা জানে না। কিষুণের থেকে জেনে নিতে হবে।
ফাঁড়িতে চা দিয়ে কিষুণ ফিরে এলো। তার সাথে এলো আরেকজন। কাছে আসতেই অগস্ত্য বুঝতে পারলো একজন কনস্টেবল । কনস্টেবলটা কাছে এসে তাকে দেখে পুরো দস্তুর স্যালুট করলো। অগস্ত্য হেসে বললো,“আরে ঠিক আছে ঠিক আছেঅতো ফরম্যালিটি করতে হবে না। তাছাড়া এখনও আমি ফাঁড়িয় চার্জ নিইনি। ফাঁড়িয় চার্জ নিলে পরে এসব হবে। বসুন, শিফ্ট শেষ বুঝি? চা খেয়েছেন?” কনস্টেবলটা একজন উর্ধ্বতন কর্তার কাছে এরকম আন্তরিক সম্বোধন আশা করেনি। সে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে রইলো। তারপর আমতা আমতা করে বললো,“হ…হ্যা…স্যার!”
অন্ধকারে লোকটার গলা শুনে হাসলো অগস্ত্য । আসলে ও এরকমই। এর আগে যেখানে যেখানে পোস্টিং হয়েছেকোনোদিনও সেখানে কাউকে নিজের অধীন ভাবে নি। সিভিক ভলিন্টিয়ার, কনস্টেবল, হোমগার্ডদের সাথে বন্ধুর মতো, দাদা-ভাইয়ের মতো মিশেছে। কাঠখোট্টা ব্যবহার , অধস্তন কর্মচারীদের দমিয়ে রাখা তার না পসন্দ। তার মত হলো পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কাজ করছি মানেই আমরা কলিগ। হতে পারে সে আমার চেয়ে পদমর্যাদায় ছোটো। কিন্তু তাতে কি? সেও পুলিশ আমিও পুলিশ। আমরা উর্দিগত ভাই। জীবনের পঁয়ত্রিশটা বছর একসাথে কাটাবো তাতে আমি বড়ো তুমি ছোটো কি? হ্যা ডিউটির সময় আমি তোমাকে পরিচালন করার জন্য কর্তৃত্ব দেখাতে পারি। ডিউটি শেষে তুমিও সাধারণ মানুষ আমিও তাই। এই মতবাদের জন্য অনেক ফাঁড়িয় সহকর্মী অফিসারদের কাছে যেমন সে ঠাট্টার পাত্র হয়েছে। তেমনই লোকাল এরিয়ায় আর অধস্তন কর্মচারীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
মুচকি হেসে কনস্টেবলকে বললো অগস্ত্য,“ অবাক হবার কিছু নেই আমি ওরকমই। অন্য অফিসারদের মতো গাম্ভীর্য আমার আসে না। যাকগে আপনার বাড়ি কোথায়? এই দেখুন নাম না জিজ্ঞেস করে ধাম জানতে চাইছি। বাঙালী পুলিশ কিনা? মুদ্রাদোষ হয়ে গেছে।”
অগস্ত্যর কথা শুনে হেসে উঠলো কনস্টেবলটা। তারপর থেমে থেমে বললো,“আমার বাড়ি পাশের গাঁয়ে। গাঁয়ের নাম বললে চিনবেন না।আর আমার নাম আপনি জানেন স্যার। এককালে পেপারে বেরিয়েছিলো। আমার বিশ্বাস আমাকে আলোয় দেখলে চিনতেও পারতেন। আমার নামবি.এম মজুমদার স্যার । কনস্টেবল বেণীমাধব মজুমদার!”
অগস্ত্যর মনে হলো কেউ যেন ওর পায়ের তলা থেকে মাটি কেড়ে নিলো। কোনোমতে থমথমে গলায় সে বললো,“বি.এম মজুমদার! মানে মাওবা…!” কথাটা শেষ হতে না দিয়ে ধরা গলায় বললো বেণীমাধব, “হ্যা স্যার। আমিই সেই বেণীমাধব মজুমদার। যাকে নিজের প্রাণের বিনিময়ে ধরেছিলেন শিবরাজ স্যার। সত্যি মানুষ ছিলেন বটে শিবরাজ স্যার। একেবারে বাঘের বাচ্চা! নাহলে একা কুড়িজনকে মেরে। আমাকে ধরা কোনো পুলিশ-সেনার কম্ম ছিলো না স্যার! বলতে লজ্জা করে কিন্তু এককালে আমি, এই আমি পঞ্চাশের মতো পুলিশ মেরেছি। সেই মানুষকে ইঁদুরছানার মতো নিজের থাবায় আটকে রেখেছিলেন তিনি। কে বলবে মানুষটার শরীর গুলি দিয়ে ঝাঁঝড়া করে দিয়েছিল আমারই এক কমরেড! পরে জেনেছিলাম ২০টা গুলি ঢুকেছিলো স্যারের শরীরে। সেই অবস্থাতেও সেই কমরেডকে মেরে আমাকে ধরে রেখেছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত ফোর্স না আসে।”
বলতে বলতে উত্তেজনায় কেঁপে উঠলো বেণীমাধবের গলা। অগস্ত্য চুপ করে রইলো। তার মনে আছেকলেজের পড়াকালিন পেপারে একবার পড়েছিল মাওবাদীদের একজন চাঁইয়ের ধরা পড়বার খবর। কিছুক্ষণ থেমে বললো,“এখনো সেই পথে বিশ্বাস করো। মানে এত দিন আমরাই তো তোমাদের শত্রু ছিলাম। পুলিশে যোগদান করার পর কি মনে হয়?”
মৃদু হাসে বেণীমাধব,“যে জিনিসটা একেবারে মজ্জায় ঢুকে গেছে সেটাকে কি করে অস্বীকার করি বলুন তো? তবে হ্যা এটুকু বুঝেছি পুলিশ আসলে শ্রেণীশত্রু নয়। তারাও সরকারের আদেশপ্রাপ্ত একটা যন্ত্র। যার মন আছে, বিচারবুদ্ধি আছে, বোধ আছে, মানবিক হৃদয় আছে। কিন্তু তারা নিরুপায়। তাদের হাতে-পায়ে আইনের শেকল পড়ানো, ন্যায়ব্যবস্থার দায়ভারের দেওয়ালে সরকারের আদেশের খাঁচায় বন্দি তারা। সরকারের আদেশে তাদের দম দেওয়া পুতুলের মতো কাজ করে যেতে হয় বাধ্য হয়ে। যে অবাধ্য হবার কথা ভাবে তার উপর নেমে আসে উপরমহলের চাবুকের আঘাত। ছুড়ে ফেলা হয় দুরে ট্রান্সফারের নামে। নাহলে গুরুত্বহীন পদে ভূষিত করে বেঁধে দেওয়া হয় আরো আইনের শেকল। আমার আর পুলিশের প্রতি কোনো বিদ্বেষ নেই। চাকরিতে ঢুকেছি পাঁচ বছর হলো। পাঁচবছরে সিস্টেম বুঝে গিয়েছি স্যার। জঙ্গলের নিয়মের থেকেও ভয়ংকর এই সিস্টেম । একটা পারফেক্ট তেল দেওয়া সচল যন্ত্র । যা বারবার অপব্যবহৃত হয়ে চলেছে।”
কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে থাকে অগস্ত্য । বড়ো গোপনীয় আর নির্মমতম সত্যি কথা বলে ফেলেছে বেণীমাধব । এতবছরে যে জিনিসটা সে হাড়ে হাড়ে বুঝছে সে। সেই জিনিসটা কি অবলীলায় সহজে বুঝে গেছে বেণীমাধব! সত্যিই তো! আজকাল কোনো ক্রাইম হলে পুলিশের বাপান্ত করে পাবলিক। একবারও এটা ভেবে দেখে না যে তাদেরই প্রতিনিধির প্রণীত আইনে তারাই বঞ্চিত হয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধির আত্মীয় অপরাধ করলে পাবলিক‘নিস্কর্মা পুলিশ, ঘুষখোর পুলিশ’ বলে খালাশ হয়ে যায়। একবারও তাদের দিকটা ভেবে দেখে না।
দুবছর আগে নিউজে একটা থানায় বিক্ষোভে ওসির লুকোনো দেখে রাগে ফেটে পড়েছিলো সে। সিনিয়ারকে ক্ষোভের সাথে বলেছিল,“এত ভয়ের কি ছিলো কে জানে? প্রত্যেকে মিলে আকাশে ফায়ার করলেই তো হতো! নিদেন পক্ষে ঐ নেতাটার পায়ে গুলি করলেই জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত!” শুনে মৃদু হেসেছিলেন সেই অফিসার। বলেছিলেন,“তারপর কি হতো? মিডিয়ায় যত বেশী হাসাহাসি হচ্ছে তার চেয়ে বেশী তুলোধোনা করা হতো পুলিশকে। অপোজিশন পার্টি তো আমাদের রুলিং পার্টির পোষা গুন্ডা অপবাদ তো দিয়েই রেখেছে।সেটাকেসত্যিকারের ইস্যু বানিয়ে দেওয়া হতো। তার উপর এনকোয়াইরি কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ছিঁড়ে খেত সেই অফিসার কে বিনা অনুমতিতে গুলি চালানোর জন্য। এদিকে সেই গুলি খাওয়া নেতা কি চুপ করে থাকতো ভেবে রেখেছ? সে আরো লোক নিয়ে ফাঁড়িয় আসতো। হয়তো বিক্ষোভের নামে ফাঁড়িটাকেই জ্বালিয়ে দিতো। তার উপর পার্সোনাল অ্যাটাক তো আছেই। এত বছর চাকরী করছি কম তো দেখলাম না। এটা সিস্টেম অগস্ত্য । এখানে আবেগের বশবর্তী হলে চলে না। ইচ্ছে হলো আর গুলি চালিয়ে দিলাম ওসব সিনেমায়, গল্পে হয়। বাস্তবটা ভীষণরকমের আলাদা। এখানে হিরোগিরি দেখিয়ে গুলি চালাতে গিয়ে কখন ভিলেন হয়ে যাবে ধরতে পারবে না। কাজেই আবেগ কে আর রাগকে কন্ট্রোল করা শেখো। রিভলবার কোমরে গোঁজা থাকলে কেউ চুলবুল পান্ডে বা সিঙ্ঘম হয়ে যায় না। ওসব সিনেমায় মানায় বাস্তবে নয়। অনেক অফিসারকে দেখেছি নিজেকে নায়ক প্রমাণিত করতে গিয়ে অবশেষে ঘাতক প্রমাণিত হয়ে প্যাভেলিয়নে ফিরেছেন। কোমরে রিভলবার থাকলেও তাতে অনেক আইনের লক লাগানো। আমাদের সিচুয়েশন সামলাতে হয় অন্য অস্ত্র দিয়ে। তোমরা যাকে বলো মগজাস্ত্র। একজন পাবলিক ওয়ান ট্র্যাক মাইন্ড হলেও একজন পুলিশকে রাবণের মতো দশরকম পথের কথা ভেবে চলতে হয়। তুমি সদ্য জয়েন করেছো, রক্ত গরম হওয়া স্বাভাবিক । আমিও যখন জয়েন করেছিলাম তোমার মতোই ছিলাম। নিজেকে পাওয়ার ফুল অ্যাংরি ইয়াং ম্যান ভাবতাম। পরে বুঝেছি এখানে আবেগের বশে নয় বুদ্ধিবলে চলতে হয়। উপর থেকে অর্ডার আসবে চলবে। তবে পথ বাচিয়ে। আবেগের বশে ভুল পা ফেলেছ কি ঘ্যাচাং করে নেমে আসবে খাঁড়া। কাজেই শান্ত হও আর ডিউটি করে যাও।”
“স্যার?” বেণীমাধবের ডাকে সম্বিত ফিরে আসে অগস্ত্যর। সে হেসে বলে,“নাহ কথাটা ভুল বলো নি হে। চরম বাস্তব এটা। যাক গে আমার জয়েনিং তো কালকে। আজকে একেবারে ঝাড়া হাত পা । কাল থেকে কেস, ফাইল নিয়ে মেতে থাকবো। তুমিও থাকবে তোমার ডিউটি নিয়ে। তাই ভাবছিলাম আজ আড্ডা মারলে কেমন হয়? সিনিয়ার-জুনিয়ার হিসেবে নয় বন্ধু হিসেবে। আজ বরং তোমার গল্প শুনি।”
অন্ধকারে বেণীমাধবের গলাটা লাজুক শোনায়,“আমার আর কি গল্প স্যার। ওসব গল্প আপনার ভালো লাগবে না।”
“সেটা আমি ঠিক করবো। তবে তার আগে বলো তো এই কিষুণ এতো ভালো বাংলা বলে কি করে? না মানে সেই স্টেশন থেকে গল্প করতে করতে আসছি আমরা। ওর গলার টোনে এমন কি কথায় কোনো সাঁওতালী ডায়লেক্ট পর্যন্ত পেলাম না।কি করে? ”
মুচকি হেসে বলে বেণীমাধব,“এর উত্তর আরো ভালো দিতে পারবে কিষুণ। তবে যতটুকু জানি ওদের গায়ে একজন মাষ্টার আসেন স্কুলে পড়াতে সদর থেকে। তার কাছেই পড়েছে সে। মাষ্টারমশাই নাকি নিজের খরচে ওকে কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন। তবে হ্যা ওর বাংলায় কোনো সাঁওতালী টান পাবেন না। আবার যখন ও সাঁওতালীতে কথা বলবে তখন বুঝতেও পারবেন না কি বলছে। তবে হ্যা রান্নার হাত চমৎকার ব্যাটার!আমাদের ফাঁড়ির পুরোনো ওসি অভয়বাবু। মানে যার জায়গায় আপনি এসেছেন। তিনি তো কিষুণের রান্নার মারাত্মক ভক্ত। কিষুণের সেরা রান্না কি জানেন? গরম গরম কষা গ্রেভিওয়ালা মুরগীর মাংস আর ভাত। সেও হাঁড়িতে নয় রীতিমতো ট্র্যাডিশনাল ব্যাম্বু রাইস। মানে বাঁশের ভেতর সেদ্ধ হওয়া ভাত আর মাংস। মাংসটাও পুরো নরম করেরান্না করা । মুখে দিলে গলে যায়।”
“তাই নাকি? তাহলে তো একদিন ট্রাই করতে হচ্ছে!যাকগে তোমার গল্প শুরু করো।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেণীমাধব । তারপর বলে,“বেশ! আপনি যখন জানতে চাইছেন তাহলে শুনুন। পাশের গাঁয়ে আমার বাড়ি হলেও আদেও আমি এখানকার বাসিন্দা নই স্যার। আমার বাড়ি জলপাইগুড়িতে। দুহাজার তিন সালে আমি কলকাতায় বঙ্গবাসী কলেজেরাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হই। একবছর পর এখানেবন্ধুবান্ধবদের সাথে এসেছিলাম জাস্ট একটা সার্ভে করতে। উদ্দেশ্য ছিল সার্ভে করা আর বন্ধুবান্ধবদের সাথে হইহল্লা করে একটা পিকনিক ট্যুর করা। তখন কি আর জানতাম যে নিয়তী এভাবে আমাদের সাথে খেলা খেলবে?”
“একদিন সার্ভে চলাকালীন খবর পেলাম পাশের গাঁয়ে নাকি পূর্ণিমাউপলক্ষ্যে একটা পরব হবে। খবর পেয়ে গেলাম। গাঁয়ের লোক বেশ খাতির করে বসালো। তারপর তাড়ি খেতে দিলো। আপনি কখনো তাড়ি খেয়েছেন?”
অগস্ত্য মাথা নেড়ে বললো,“না তবে শুনেছি তেমন নাকি নেশা হয় না।”
“কে বলেছে? যারা প্রথম খায় তাদের অবস্থা সঙ্গিন হয়ে যায় স্যার। অন্তত আমাদের হয়েছিল। একটু মিষ্টি, একটু গন্ধ তবে মন্দ খেতে নয় স্যার। তো সেই তাড়ি খেয়ে আমাদের যেন পায়ের তলার মাটি দুলতে লাগলো। আমরা নাচতে শুরু করলাম ওদের সাথে। একসময় পরব শেষ হলো তবু আমাদের ঘোর কাটলো না।ফেরার পথেও টলতে লাগলাম আমরা। আর সেটাই কাল হলো আমার। নেশায় চুর হয়ে দলছুট হয়ে ঢুকে পড়লাম গহীন জঙ্গলে। কতদুর এগোলাম জানি না। কিছু দুর গিয়ে হোচট খেতেই চোখে অন্ধকার নেমে এলো।”
“পরদিন যখন ঘুম ভাঙলো তখন আমি মাওবাদীদের ডেরায়। ধাতস্থ হয়ে দেখলাম আমাকে হেটমুন্ডু করে গাছে বাঁধা হয়েছে। আর চারদিকে অনেকগুলো লোক আমাকে ঘিরে বসে আছে। একজন বোধ হয় এদের নেতাগোছের হবে আমার দিকে এগিয়ে এসে আমার নাম,ধাম আর কি করতে এসেছি জানতে চাইলো। ভেবে দেখলাম এদের মিথ্যে বলে লাভ নেই। কারন এদের নেটওয়ার্ক ভীষণ পাওয়ার ফুল আর অনেকদুর ছড়ানো। কাজেই সব সত্যি কথা বললাম। ওরা আমার জবাবে কতটা সন্তুষ্ট হলো জানি না। কিন্তু ওদের একজনে ইশারাতে আমাকে মাটিতে নামানো হলো। কিন্তু এক মিনিটের জন্যও ওরা আমার দিক থেকে বন্দুক নামালো না। যে আমার নাম জানতে চেয়েছিল সে একজনকে ইশারা করতেই সে কোথায় চলে গেল। তারপর নেতা গোছের লোকটা আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো,‘এখানে কি করে এলে তুমি? পুলিশ পর্যন্ত এখানকার খোঁজ রাখে নি। তুমি এলে কি করে?’’
“সত্যি কথা বলতে তাড়ির নেশায় দিকবিদিক কোনো জ্ঞান ছিলো না।কাজেই কোথায় যাচ্ছি, কিভাবে যাচ্ছি মনে ছিলো না। কথা বলতে কিছুটা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো লোকে। তারপর জিজ্ঞেস করলো,‘আমরা কারা জানো?’ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি আমি কাদের খপ্পরে পড়েছি। এরা চোর ডাকাত নয় সেটা এদের ব্যবহারেই বোঝা যাচ্ছে । চোর ডাকাত হলে এত জেরা করতো না। তাছাড়া এরা ফিশফিশ করে কথা বলছে ঠিকই কিন্তু একটা জিনিস বার বার কানে আসছে। এরা একে অপরকে কমরেড বলে সম্বোধন করছে। মাথা নামিয়ে বললাম, ‘জানি।’পাল্টা প্রশ্ন করলো লোকটা , ‘তোমার ভয় করছে না? আমরা চাইলে তোমায় মেরে ফেলতে পারি।’ আমি মৃদু কন্ঠে বললাম,‘সেটা করার হলে আগেই করতে পারতেন। তখন আমি অজ্ঞান ছিলাম। সুযোগ ছিলো আপনাদের কাছে।’ লোকটা একটু অবাক হলো।তারপর জিজ্ঞেস করলো,‘ আমরা কি কাজ করি জানো?’’
“কলেজে থাকা কালীন ছাত্র রাজনীতিতে প্রচ্ছন্নভাবে জড়িত থাকতাম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার পেপার ছিলো মার্ক্সের উপর। সত্যি বলতে এদের কে আমি সমর্থন করতাম একটু একটু। কোনোদিনও ভাবিনি এদের সম্মুখে পড়ে যাবো একদিন। মাথা নাড়িয়ে জানালাম জানি।তারপর বললাম, ‘সর্বহারাদের আশ্রয়দান আর শ্রেণীশত্রুর বিনাশসাধন।’ শুনে লোকগুলোর ভ্রু একটু কুঁচকে গেলো। একজন বয়স্ক মতো লোক জিজ্ঞেস করলো, ‘আর শ্রেণীশত্রু কারা?’ এবার আমি মাথা তুললাম। সটান সেই বয়স্ক লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘শহরে দিকে গেলে পুঁজিবাদী বুর্জোয়া দলের ব্যবসায়ীরা, কারখানার রক্তপিপাসু মালিকেরা আর সুবিধে বাদি উচ্চমধ্যবিত্তরা। তার সাথে এদের রক্ষক পুলিশরা!’ কথা গুলো শুনে মনে হলো লোকটা খুশি হয়েছে। এমন সময় সেই লোকটা যাকে পাঠানো হয়েছিলো সে এলো এবং নেতার কানে ফিসফিস করে কি একটা বললো। লোকটা সেটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো তারপর গম্ভীর গলায় বললো, ‘এই মাত্র খবর পেলাম তোমার বন্ধুদের। তারা সকালের দিকে তোমার খোঁজাখুঁজি করছিলো। অনেকক্ষণ পর্যন্ত খোঁজার পরও তোমার কোনো খবর না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে চলে গেছে। হয়তো পাশের ফাঁড়িয় খবর দেবে। তুমি ছেলে ভালো কিন্তু এই পথ তোমার জন্য নয়। আমরা এখনই তোমায় বনের কিনারে ছেড়ে আসবো তবে একটা শর্তে। তুমি কাউকে আমাদের এই সাক্ষাতের কথা বলতে পারবে না। কি রাজি?”
“তখন আমার মনে ঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে মুক্তির আনন্দ, অন্য দিকে মাওবাদীদের সাথে দেখা করে বেঁচে ফেরার উত্তেজনা। আমি মাথা নাড়লাম। ওরা আমার চোখে মোটা কাপড় বেঁধে দিলো। তারপর আমাকে হাটিয়ে নিয়ে চললো। কতক্ষণ যে হাটলাম জানি না। বেশ কয়েকঘন্টা হাটার পর নেতার কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম। ‘এখান থেকে সোজা দশ পা হাটার পর চোখের পট্টিটা খুলবে। আশা করি আমাদের আর কোনো দিন দেখা হবে না।”
“নেতার কথা মতো পথে গিয়ে পট্টিটা খুলতেই দেখলাম বাস রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি। দুর থেকে একটা গাড়ি আসতে দেখে হাত নেড়ে থামানোর চেষ্টা করলাম। কাছে আসতেই বুঝতে পারলাম সেটা পুলিশের জিপ। তাতে আমার বন্ধুরা ছিলো। আমাকে দেখতে পেয়ে ওরা হই হই করে উঠলো। ওদের সাথে থাকা অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করতেই বললাম তাড়ির নেশায় পথ হারিয়ে বনে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। সকালে জ্ঞান ফিরতেই পথ চিনে চিনে ফিরেছি। অফিসার মাথা নেড়ে কি একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। দেখলাম ওনার চোখ আমার হাতে ধরে রাখা পট্টিটার উপর। সেদিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে তিনি চলে গেলেন। আমার ব্যাপারটা ভালো লাগলো না। বন্ধুদের সাথে হুল্লোড় করতে করতে ফিরলেও মনে একটা কাঁটা খচখচ করতে লাগলো। কে জানতো এই আশঙ্কাটাই সত্যি হবে।”
গল্পে বুঁদ হয়ে গিয়েছিল অগস্ত্য । এমন সময় কিষুণ এসে খবর দিলো খাবার তৈরী তারা খাবে কিনা? বেণীমাধবও সম্বিত ফিরে পেয়ে বললো,“আজ এইটুকুই থাক স্যার। পরে না হয় বাকিটা শুনবেন। রাত অনেক হলো। এখানকার লোকে সাড়ে আটটার মধ্যে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আজ আপনি ব্যারাকে শুয়ে থাকুন। অভয়বাবুর আজ জিডি আছে। কিছুক্ষণ পরে তিনি এসে খেয়ে ব্যাগপত্র নিয়ে ফাঁড়িতে চলে যাবেন। সেখান থেকে কাল সকালেই চলে যাবেন। চলুন খেয়ে নেবেন।”
অভয়বাবুর সাথে সেদিনই আলাপ হয় অগস্ত্যর। ভীষণ হাসিখুশি আর আমুদে লোক। শহরে বাড়ি হলেও এখানকার লোকের সাথে দারুন মিশে গেছেন। ট্রান্সফার হচ্ছেন বলে একটু মনমরা। পরদিন সকালে অগস্ত্যকে সবটা বুঝিয়ে ডিপার্চার নিয়ে চলে গেলেন ভদ্রলোক।
চেয়ারে বসে ফাইলগুলো ঘাটতে ঘাটতে একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলো সে। দুপুরে সেটাই বললো বেণীমাধবকে।
“আচ্ছা বেণীমাধব। আজ একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। কেস ফাইল গুলোয় ডেটগুলো খাপছাড়া। তার উপর তেমন কেসও নেই। অথচ আমি শুনেছি জায়গাটা নাকি নটোরিয়াস। তাহলে ফাঁড়িতে এত কম কেস পেন্ডিং কেন?”
বেণীমাধব খেতে খেতে বলে, “কারন এখানকার মানুষ কোনোদিন ফাঁড়িতে আসেনা। চরম অপরাধ হলেও তারা পঞ্চায়েতকে ভরসা করে।”
“তার মানে?”
“সে অনেক কথা স্যার। একদিনে সবটা বলা সম্ভব নয়। আপনি তো আছেনই দেখতে পাবেন। তবে এটুকু বলে রাখি এখানকার লোক আর পুলিশের উপর বিশ্বাস রাখে না।”
“কিন্তু কেন?” ভ্রু কুঁচকে যায় অগস্ত্যর। তার মুখ দেখে ম্লান হাসে কনস্টেবল বেণীমাধব মজুমদার।
“ওদের ভরসার স্থলটাই টলে গেছে স্যার। সরকারই টলিয়ে দিয়েছে। অশোক চৌধুরীর কার্যকলাপের পর ওরা আর পুলিশ তো দুর শহরের কাউকে বিশ্বাস করেনা। আমি মাওবাদের সাথে থাকার সময় আমাকেও চট করে ওরা বিশ্বাস করেনি। বলতে পারেন প্রায় অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে ওদের কাছে পৌছেছিলাম। পুলিশের যোগ দেওয়ার পর সেটাও গেছে। আমাকে ওরা কি বলে ডাকে জানেন? ‘বিভীষণ মজুন্দার’।’
‘অশোক চৌধুরী কে?’
একদৃষ্টে দুরে জঙ্গলের দিকে তাকায় বেণীমাধব। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “একটা অভিশাপ যা এরা বহুবছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছিল।”
******
২০শে নভেম্বর ২০০৪, শনিবার, বেলা দুটো
জমির একপাশে গাছতলায় কুড়ালটা রেখে বসলো সনাতন মুর্মু। বেলা অনেক হয়েছে সে আকাশ দেখে বুঝতে পারে। তার বাবা তাকে ছেলেবেলাতে এই জিনিসটা শিখিয়ে গিয়েছিল। তার বাবা লক্ষ্মণ মুর্মু তাকে বলতো, “ দ্যাখ সনা, ইকটো কুথা সব সময় মনে রাখবি বটে। সুয্যিটো যেখানেই থাকুক না ক্যানে তুই সব সময় পুবদিকটো ডাইন হাইত্যে আর পচ্ছিমদিকটো বা হাইত্যে রাখবিক বটে। তারপর একটো গোল কাইট্টে উয়ার মাইঝখ্যানে একটো ডান্ডা বা যেটা দিয়া গোল কাটছিস কেনে সিটো রাখবিক। সুয্যির ছায়াটো যিখানে পড়বেক সিটাই সময় হইবে কেনে। মনে রাখবিক মাথার উপর সোজা সুয্যি থাইকলে ছায়া পড়বেক লাই। তখুন মাঝ দুপুর হবেক কেনে।” পরে স্কুলের মাষ্টারমশাই বলেছিলেন এটা নাকি সূর্য ঘড়ি দেখার নিয়ম। এমন কি কাঠির এই নিয়মটা নাকি ত্রিকোণমিতির সূক্ষ্ম নিয়মে তৈরী। এইভাবেই নাকি ত্রিকোণমিতির অঙ্কগুলো কষা হতো। আচ্ছা বাবা তো কোনো দিন স্কুল যায় নি। তাহলে এত কিছু নিয়ম বাবা জানতো কি করে?
স্কুল! খানিকটা আনমনা হয়ে ওঠে সনাতন। বেশ তো ছিলো সব। এ গাঁ থেকে প্রায় পাঁচ মাইল দুরে ছিলো একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়। তারা ঝড়, জল, আর ঠান্ডার দিন বাদ দিলে রোজ পায়ে হেটে স্কুল যেত সনাতন। মাষ্টারমশাইরাও সাইকেলে করে আসতেন অনেক দুর থেকে। সারাদিন পড়ালেখা করে দুপুরে বাড়ি থেকে আনা পোটলা করা মুড়ি চিবিয়ে টিউবওয়েল থেকে জল খেয়ে পেট ভরাতো সনাতন। কখনো মাষ্টারমশাইরা উৎসব বা পরবের আগে স্কুলে রান্না করে সবাইকে খাওয়াতেন। তখন সনাতনদের খাওয়া বিয়েবাড়ির ভোজের মতো হয়ে যেত।
সনাতনের মনে আছে সরস্বতী পুজোর দিন ওরা স্কুলের বারান্দায় পাত পেড়ে খিচুড়ি খেত। শালপাতার থালায় গরম গরম খিচুড়ি আর লাবড়া দারুন লাগতো। আর স্বাধীনতা দিবসের দিন চকলেট কখনো বা জিলিপি । সনাতন অবশ্য একা খেত না। বাড়ির জন্য আলাদা নিয়ে নিতো তারপর খেত।
পড়ালেখা সেরে বিকেলে দিকে গাঁয়ে ফিরত সনাতন। গাঁয়ে ফিরেই বন্ধুদের সাথে খেলতে দৌড়ত। সব সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে যেত। হাত মুখ ধুয়ে দাওয়ায় মাদুর পেতে বসে টিমটিমে কুপির আলোয় সে দুলে দুলে পড়া মুখস্ত করতো। যদিও বেশিক্ষণ পড়তে লাগতো না তার। অল্প পড়লেই সব পড়া বুঝে নিতো সে।
কিন্তু মাঝে মাঝে পড়তে পড়তে ঘুম এসে যেত। সারাদিনের ক্লান্তি যেন চেপে বসতো সারা শরীরে । বারান্দায় তখন ছড়িয়ে পড়তো ফুটন্ত ভাতের গন্ধ। সেই গন্ধের ঘ্রাণ নিতে নিতে কখন যে ঘুমে তলিয়ে যেত সনাতন তা সে টেরও পেত না। মাঝরাতে কাঁচাঘুম ভাঙিয়ে ছোটো ছোটো দলায় আলুসেদ্ধ ভাত মেখে খাইয়ে দিতো মা। পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে দেখতো সে মা আর বাবার মাঝে শুয়ে। সবই তো ঠিক ছিলো। হঠাৎ কেন যে বাবা বনে কাঠ কাটতে গিয়ে ফরেস্ট অফিসারের তাড়া খেয়ে পালাতে গিয়ে সাপের ছোবল খেল কে জানে?
বাবাকে যখন নিয়ে আসা হয় তখন সে দেখেছিল বাবার কালচে ঠোটদুটো আরো কালো হয়ে গেছে। মা খুব কাঁদছিল। বলাইমামা সনাতনকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল। তারপর তো সেই স্কুল ছেড়েছিল অনেকদিন হলো আর যায়নি সে। মাঝে কেটে গেছে আটটা বছর। সেদিনের সেই দশবছরের কিশোর আজ অষ্টাদশী কর্মঠ তরুন। বাবার মতো সে বছরের বাকি সময় চাষ করে আর চাষের পর বনের কাঠ কেটে বিক্রি করে। মাঝে মাঝে বনদফতরের সামনে গজানো আগাছা সাফ করার বরাত আসে আজ যেমন এসেছে। তবে সনাতন একা কাটে না । সঙ্গী সাথীও জুটেছে কজন। সবাই মিলে গাছের ডাল কাটে তবে গভীর বনে আর যায় না।
পোটলা থেকে বাটিটা বের করে সনাতন। খুলে দেখে ভাতের সাথে পেঁয়াজ লঙ্কা রাখা। গতবছর পুজোর সময় বরাত এসেছিল। সেবার আগাছা পরিস্কার করতে করতে বেশ কয়েকটা কাঁচের বোতল পেয়েছিল সে। বনদফতরের বাবুকে দেখাতেই ফেলে দিতে বলেছিলেন। সনাতন ফেলে নি। বাড়ি নিয়ে এসে ছাই দিয়ে ভালো করে মেজে ব্যবহার করছে। বেশ মোটা কাঁচের বোতল। নীলচে কালো রংয়ের। মাথাটা সরু পেটটা মোটা। নীচে চকমকে কাগজে লেখা Blenders Pride মানেটা কি? জানে না সনাতন। তবে বোতলে জল খেয়ে বেশ আরাম পায় সে। ঠান্ডা জল ঠান্ডাই থাকে। বোতলটার ছিপি ছিলো না। কাঠের টুকরো দিয়ে ছিপি বানিয়েছে সে।
বোতল থেকে সামান্য জল ভাতে ঢেলে খেতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে টুক করে জগাই ডেকে উঠলো,“কি বনাইঞ্ছে রে তুর মা আইজ? ”ব্যস! হয়ে গেল! এবার বক বক করে মাথাটা খাবে। বলাইমামার ছেলে জগাই। ওদের দলের সদস্য এমনিতে ভালো তবে ভীষণ বাঁচাল আর মজারু। কাজের সময় কাজ করবে। কিন্তু কাজ ফুরোলে অকাজটা বেশী করে করবে। আপনভোলা জগাইকে নিয়ে ওর বাবা মা ভীষণ চিন্তা করলেও হাসিখুশি জগাইয়ের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে নিজের জগতে মগ্ন। অথচ আজ এর বাড়ির বেঁড়া বাধতে হবে, কাল ওর জমি কোপাতে হবে, পরশু পরবে মাদল বাজাতে হলে জগাইকে বলে দেখো? সে চোখের পলকে অকুস্থলে পৌছে যাবে। অথচ পারিশ্রমিক দিতে গেলে একটা দেঁতো হাসি হেসে জিভ কেটে পালিয়ে যাবে। যাকে বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো লোক সেটাই জগাই।
পাত্তা না দিয়ে সনাতন ভাত খেতে থাকে। জগাই আবার জিজ্ঞেস করে,“আরে বুল না! কি পাঠাইঞ্ছে কাকি? পান্তা?” সনাতন খেতে খেতে বলে,“চুখে কি ঠুলিটো পড়ে আঞ্ছিস নাকি? দেখতে পারছিস না কেনে ? এখন খাবার সুময় বিরক্ত করিস লাই কেনে। যা ।” বলে খেতে থাকে সনাতন।
জগাই বলে,“জানিস মুর মাটোও আমার লগ্গে রুটি পঠাইঞ্ছিল। রাস্তা দিয়া আসার সুময় দেখলুম আমাদের গাঁয়ের হরিকাকার ব্যাটাটো। ঐ কিষুণ, কাঁইদতে কাঁইদতে ইসকুল যাইঞ্ছে কেনে। কাছে আইতেই জিগাইঞ্ছি মু। 'এ তুই কাঁদছিস কেনে?'জবাবে কি বইল্যো জানিস? উয়া নাকি আইজ সকালে কিছু খাইতে পারেক লাই। হরিকাকার দু নম্বর বউটো ডাইন আছেক বটে। বেচারী কিষুণ উয়ার কাছে ভাইত চাইতেই দুঘা কষায় দিঞ্ছে কেনে!”
“আর সেই দুখে তু তোর খাবার টো উয়াকে দিয়া দিছিস লাই? সত্যি মু তোকে লিয়া আর পারিবক লাই। এত সরল কেন হইঞ্ছিস তুই বটে? কিষুণ ভাইত পায় লাই তো তাতে তুর কি করা আঞ্ছে বটে? এত দরদ তু পাস কোথা থেইক্যে ? এখন খিদা পাইঞ্ছে বলে কেউ কেউ করছিস কেনে? দোষ তো তুর! কবে মানুষ হবিক তুই বটে?” বলে ঝাঁঝিয়ে ওঠে সনাতন। জগাই কাঁচুমাচু মুখে চুপ করে বসে থাকে।
সনাতন চুপচাপ খাবার পর নিজের বাটিটা এগিয়ে দেয় জগাইয়ের দিকে। জগাই দেখে বাটিতে অনেকগুলো ভাত আছে। সনাতন বলে,“মা আইজ অনেক ভাইত রাইন্ধেছে বটেক। মোর পেট ভইরে গেইঞ্ছে । তু খাই লে কেনে।” জগাইয়ের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে গপগপ করে গোগ্রাসে খেতে থাকে ভাতগুলো। বোঝা যায় যে সে ভীষণ ক্ষুধার্ত । সনাতন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জলের বোতল থেকে জল খেয়ে বোতলটা রাখতেই একটা প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে পাশে রাখা বোতলটা ফেটে চৌচির হয়ে যায়। কয়েকটা টুকরো ছিটকে এসে বিঁধে যায় তার হাতে। আর তখনই একটা মেয়েলী কন্ঠ বলে ওঠে ,“Nice Shot অশোক!”
শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে সনাতন। খাকি পোশাক পরা একটা লোক। বয়স ঐ আন্দাজ তিরিশ- পঁয়ত্রিশ হবে। প্রকান্ড বলিষ্ঠ চেহারা। গায়ের রং এককালে ফরসা ছিলো এখন রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে । লোকটার তেমন বিশেষত্ব নেই কেবল দুটো জিনিসছাড়া। প্রথমত লোকটার গোঁফ। বেশ একটা জাঁদরেল পাকানো গোঁফ রয়েছে লোকটার। আর লোকটার চোখ। ভীষণ নিষ্ঠুর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি সম্পন্ন উজ্জ্বল সবুজ হলদে শিকারীর চোখ! যেন কোনো বাঘ বা শিকারী ঈগলের চোখ কে তুলে বসানো হয়েছে। ডানহাতে একটা রাইফেল ধরা । মহিলা কন্ঠের প্রশংসায় হাসলেও লোকটার নজর এদিকেই।
সনাতনের বুঝতে অসুবিধে হয় না বোতলটা আসলে লোকটার টার্গেট প্র্যাকটিস ছিলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে শরীরে বিঁধে থাকা কাঁচের টুকরো গুলো বের করতে থাকে। ক্ষত গুলো থেকে বিন্দু বিন্দু রক্ত চুঁইয়ে পড়ে কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে লোকটার দিকে।
লোকটার নাম অশোক চৌধুরী। বনদফতরের একজন আধিকারিক। আগে এই অঞ্চলের অফিসার ছিলো সে। মাঝে বদলি হয়ে গিয়েছিল। আবার ফিরে এসেছে। লোকটাকে এই বনদফতরের প্রত্যেকে সমঝে চলে। ওর পূর্বপুরুষরা নাকি এককালে এই এলাকার জমিদার ছিলেন। জমিদারি গেলেও তেজ যায় নি। প্রচণ্ড দোর্দন্ডপ্রতাপ আর নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক।
বনদফতরে থাকলেও বনের পশুপাখি শিকার করে তাদের মাংস খায়। দামী কাঠ চোরাচালান করে। কিন্তু কেউ লোকটার বিরুদ্ধে টু শব্দটুকুও করে না। প্রাণের ভয় সবারই আছে। কিন্তু সনাতনের ভয় করে না। কারন সে জানে অসৎ লোকেদের ভয় পেলে তাদের ক্ষমতা বাড়ে। তাছাড়া বলাইমামার কাছে সে শুনেছে এই অশোক চৌধুরীর তাড়া খেয়ে তার বাবা মারা গেছে। এই খবর জানার পর সে লোকটাকে আরো ঘৃণা করে।
অশোক চৌধুরীর সাথে থাকা লোকেরা তাদের দেখে নি। তাদের দেখা মাত্র একটা লোক ছুটে এলো। চোখে মুখে অনুতাপের ছাপ। লোকটা কাছে এসে বললো,“I am extremely sorry. আমি অত্যন্ত দুঃখিত । আমি আপনাদের একেবারে দেখিনি। আমারই দোষ! আমি বলেছিলাম এই বনে টার্গেট প্র্যাকটিস করা অসম্ভব। তখনই অশোকদা ঝটকরে ফায়ার করে বসে। আপনাদের লাগে নি তো? একি! ইস ! এতো কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেছে। এখনই First Aid করতে হবে। এই মালা! আমার Room থেকে First Aid Box টা নিয়ে এসো।”
“আহ! তুমি সব কিছুতে একটু বেশীই ভেবে ডাক্তারী ফলিয়ে বসো জয়ন্ত! কিছু হয়নি ওদের। হবার কথা নয়।আমি সাবধানে মেরেছি যাতে বোতল ভাঙলেও কেউ আহত না হয়।” বলে এগিয়ে এলো অশোক চৌধুরী।
“নাগো অশোকদা। এসে দেখো ভালোই কেটেছে। বোতলের Splinter গুলো পুরো গেঁথে গেছে। I think, Tet-Vac লাগবে।” ক্ষতগুলো পরীক্ষা করতে করতে চিন্তিত গলায় জয়ন্ত বলে ওঠে।
“Don’t Do this জয়ন্ত! এদের কি তোমার কলকাতার পেশেন্টের মতো চুপচাপ সূঁচ ফোটানো, বড়ি গেলা পাবলিক ভেবেছো? এদের Immunity অন্য ছাঁচে গড়া। তাছাড়া তোমার Homeopath এদের হজম হবেনা। এদের জন্য ঐ ওঝাই better option” বলে ওদের দিকে অবজ্ঞার চোখে তাকায় অশোক চৌধুরী।
জগাই এতক্ষণ হতভম্ব হয়ে সবটা দেখছিল। এবার রাগে ফেটে পড়ে বলে,“বটেই তো! বটেই তো! আমাদের লিগ্যে ওঝাই আঞ্ছে। আর কাউকে লাগবেক লাই।ওসব ওষুধ তো তুদের মতো কমজোরদের লিগ্যে!”
“See? কেমন অশিক্ষিতের মতো পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে আসছে দেখো? এরপরও এদের জন্য তুমি কিছু করবে? যদি করে থাকো মনে রেখো সেটা কারাটা বেকার। কারন এরা তোমার উপকারটা মনে তো রাখবেই না বরং ভালো বুজে এদের রিচুয়াল নিয়ে কিছু বলতে যাবে তো এরা রে রে করে তেড়ে আসবে।” বলে কুটিল হাসি হাসে অশোক চৌধুরী।
“একদম উল্টোপাল্টা কুথা বলবিক লাই! মু ডাগটরবাবুর সাথে কথাটো বুলছিলা। মু কথা বুলছি তুর সাথে। তুর কি মনে হয় আমাদের জীবন এত্ত সস্তা বটে? আমাগো পরবের নিয়ম তো দুর তুরা তো সভ্য হতেও শিখিস লাই। এই ডাগটরবাবুটো তাও দেখতে আইঞ্ছে। মাফ চায়ে সনাতনটোর ঘা টো দেখছে। তু কি করছিস? এই ইলাকায় তুদের জমিন্দারি ছিলো বলে যা খুশি করবিক লাকি বটে?”
অশোক এবার দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“এবার কিন্তু তোরা limit cross করছিস! বেশ করেছি মেরেছি। আমার টার্গেটের পাশে থাকতে কে বলেছিল ওকে? আমরা শিকারী। শিকার করাই আমাদের কাজ। শিকারের কাছে এলে এই ভাবে মরা স্বাভাবিক। কাজ করতে এসেছিস কাজ করে টাকা নিয়ে চলে যা। বেশী বকলে এরপরের গুলিটা ফসকাবে না।”
সনাতন আর জয়ন্ত দুজনকে থামানোর চেষ্টা করছিল। এমন সময় একটা অঘটন ঘটে গেল। অশোকের কথা শুনে ফিক করে হেসে বললো জগাই,“উহ! বড়ো আমার শিকারী আইঞ্ছে রে? ঐ তো দুর থেইক্যে হাতি উপর বইস্যে বাঘ শিকার করে নিজেকে সবাই শিকারী ভাইবে বসে বটেক। ইদিকে কানের পাশে বাঘের ডাক দিলে দেইখবো প্যান্টুলুনেই বাবাজির কাম সাইরবো বটেক। নিজেকে মরদ বুলিস ইদিকে বনে গেলে ভয় পাস ক্যামন পুরুষ বটে তু? ছিঃ!”
বলা বাহুল্য আগে বলা অশোকের 'see'কে জগাই 'ছিঃ!'শুনেছিল। সেটাই ফিরিয়ে দিয়েছিল সে কথার জবাবে। কিন্তু বেচারা জানতো না একটাই শব্দ সবক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। তার উপর জগাই কথাটা এমন ভাবে বলেছিল সনাতনের সাথে সাথে জয়ন্ত, বাকি লোকেরা এমন কি মালাও এসে শুনে হেসে ফেলে।
কথাটা ঠাট্টার ছলে বললেও অশোক আর সহ্য করতে পারলো না এই ঠাট্টাটা। এই চাষার ছেলেটা যে ওর জুতোর যোগ্য নয় সে কিনা ওর মুখে মুখে তর্ক করছে! ওর পৌরুষ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে? আজ ওকে দেখিয়ে দেবে জমিদারের শাসন কাকে বলে। দেখিয়ে দেবে অশোক চৌধুরীকে রাগানোর পরিনাম কি হতে পারে। মুঠো পাকিয়ে সাপের ফনার মতো অতর্কিতে ঘুষি মারতে যায় অশোক জগাইয়ের মুখ লক্ষ্য করে কিন্তু জগাই যেন আগে থেকে টের পেয়ে যায় ব্যাপারটা । সে অদ্ভুত কায়দায় বেকে গিয়ে দেহটা সরিয়ে নে। কিন্তু মুখের জায়গায় হাত চলে আসায় সর্বনাশটা ঘটে যায়। অশোকের ঘুশি আছড়ে পড়ে ধারালো কুড়ালের উপর। আর মুঠোটার মাঝে গেঁথে যায় কুড়ুলটা।
একটা ভীষণ আর্তনাদ করে ওঠে অশোক ।
জগাই এক টানে কুড়ালটা বের করে বলে,“একটু আইগ্যে আমাকে ভাষণ দিঞ্ছি লি লা? ইবার দেখ হরবরিতে কি হুইন গেল! ও ডাগটরবাবু কিসব ফাস্টো করবি বুলছিলি আগে উয়ার উসব কর কেনে।”
প্রবল আক্রোশে জগাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে অশোক চৌধুরী,“you fucking illiterate filthy bustard! I will see you! You will be pay for this!”
জগাই না বুঝে বলে,“সে সব পরে বুলবি কেনে। ইখন যা ঘরের ভেতর যা। কত রক্ত বেরোইঞ্চে বটেক।”
জয়ন্ত কোনোমতে ফার্স্ট এইড করে অশোককে নিয়ে যায়। সনাতন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“কাজটো ভালো হলোক লাই ।”
******
১৩ই মার্চ ২০১৮, মঙ্গলবার, সন্ধ্যে ছটা
স্তব্ধ হয়ে বেণিমাধবের কথা শুনছিলো অগস্ত্য । কিছুক্ষণ পর বললো, “তারপর?” বেণিমাধব ম্লান হেসে বললো, “সনাতনের আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণিত হতে বেশি দিন লাগেনি । জগাই কে ওর কাজের রীতিমতো মুল্য দিতে হয়েছিলো । একজন গরীব আদিবাসী প্রজা হয়ে বড়োলোক মনিবকে আহত করার শাস্তি যে পেতেই হতো তাকে । কিন্তু শাস্তিটা যে এতটা নির্মম হবে কেউ ভাবতে পারে নি । এই সংসারে জগাইয়ের আপন বলতে ছিল বৃদ্ধা মা- পক্ষাঘাতগ্রস্থ বাবা আর ওর ষোলো বছর বয়সী বউ চাঁপা । বাবা-মা বৃদ্ধ, অথর্ব বলে তেমন কাজ করতে পারতেন না বলে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব একা টানতো জগাই। আর চাঁপা বাড়ির কাজের সাথে শ্বশুর- শাশুড়ির সেবা করতো । চাঁপা কে দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারতো না যে ও জগাইদের জাতের মেয়ে । চাঁপাফুলের মতো গায়ের রং, পানের রসে লাল হওয়া ঠোঁট। কাজল কালো চোখ । যেন কেউ শহরের কোনো রাজকন্যেকে গাঁয়ের বধূ রূপে সাজিয়ে দিয়েছে । গাঁয়ের সকলের সাথে মিল ছিলো মেয়েটার। সকলে ভীষণ ভালোবাসতো ওকে ।”
“সেদিনও এরকমই সন্ধ্যে নেমে ছিলো সনাতনদের গ্রামে । আর অন্ধকার নেমে এসেছিলো জগাইয়ের জীবনে । সেদিন কি একটা কাজে সদরে গিয়েছিলো জগাই । ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে গেলো । সোজা বাড়িতেই আসতো সে কিন্তু হঠাৎ মাঝপথে তার সাথে দেখা হয়ে গেল গাঁয়ের প্রধান রতন কিস্কুর সাথে । শীতের ফসল ফলানোর পর রতন ওর জমির মাটিকে কুপিয়ে আবার চাষের উপযোগী করে তোলার জন্য তৈরী করছিলো । রতন জগাইয়ের বাবার সমবয়সীতার উপর ওর বাবার ন্যাংটো বয়সের বন্ধুও বটে। কাজেই জগাইকে সে ভালো করেই চিনতো । জগাইও ভালোবাসতো তার রতন কাকাকে । সেদিন রতনকে কাজ করতে করতে হাপাতে দেখে সেও নেমে পড়লো মাঠে । রতনের হাজার নিষেধ সত্ত্বেও ওর হাত থেকে কোদাল নিয়ে কোপাতে শুরু করলো মাটি । যতক্ষণে মাটি কোপানো শেষ হলো জগাইয়ের ততক্ষণে সূর্য পাটে যেতে বসেছে । উত্তরদিকের আকাশে দেখা দিচ্ছে একরাশ কালো মেঘ । রতনের সাথে সেই মেঘ দেখে খুশি হয়েছিলো জগাই। তখন কি আর জানতো ওর জীবনে কত বড়ো বজ্রপাত হতে চলেছে ।”
“রতনের সাথে গল্প করে ক্ষেত থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেলো জগাইয়ের। ততক্ষণে উত্তরাকাশের মেঘ এগিয়ে এসে বিস্তার লাভ করেছে সমগ্র আকাশে । গম গম করে মেঘের শব্দ চারদিক কাঁপিয়ে দিচ্ছে। বাতাসের গতি হয়েছে বেশ তীব্র । তার মধ্যে দুজনে যতটা পারে পা চালিয়ে হেটে চলেছে গাঁয়ের দিকে । জগাই হাসতে হাসতে বকবক করলেও রতনের মনে শান্তি নেই । কদিন ধরেই তার মনটা ভীষণ কু গাইছে। আকাশের ভাবগতিকওসুবিধের ঠেকছে না অভিজ্ঞ রতনের চোখে । নির্ঘাত তুমুল বৃষ্টি নামবে আজ । বৃষ্টি শুরু হবার আগে যে করেই হোক ওদের বাড়ি ফিরতেই হবে । আল ধরে বাড়ি ফিরছিলো জগাইরা আচমকা একটা দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ালো রতন । রতনের দেখাদেখি জগাইও দাঁড়িয়ে পড়লো । রতনের দৃষ্টিপথ অনুসরন করতেই দৃশ্যটা দেখে ওরও চক্ষু স্থির হয়ে গেলো। জগাইয়ের মনে হল ওর পায়ের তলার মাটিটা দুলছে । যেন কোনো সাড় নেই দুপায়ে । যেকোনো মুহুর্তে টলে পড়ে যাবে সে । কোনো মতে কাঁধে রাখা কোদালটা ফেলে সে সোজা দৌড়ে গেলো সেদিকে।”
“গাঁয়ের একদম ঢোকার মুখেই জগাইদের জমি । কদিন আগেই ফসল কেটে রাখার পর বিচালীগুলো ফেলে রেখেছিলো জগাই পরে এসে তুলে নিয়ে যাবে বলে । কিন্তু এখন সেই বিচালীর একটা টুকরো পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই । সবটা আগুনের লেলিহান শিখার গ্রাসে ছাই হয়ে গেছে । শুধু তাই নয় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে পাশের জমিতেও । কাছে এগিয়ে যেতেই আরেকটা দৃশ্য দেখে চিৎকার করে উঠলো জগাই। আর্তনাদ করে দুহাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লো সে । রতন এগিয়ে এসে দৃশ্যটা দেখে চমকে গেল ।”
“ক্ষেতে জ্বলে ওঠা আগুনের মাঝখানে একটা রক্তাক্ত, নগ্ন নারীদেহ উল্টো হয়ে পড়ে আছে । হাত-পা নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা । পিঠে অজস্র ক্ষত আর সিগারেটের পোড়া দাগ । যোনীপথ থেকে রক্ত বেরিয়ে মাটিতে শুকিয়ে কালো রং ধারন করেছে। আগুন এখনো স্পর্শ করেনি দেহটাকে । রতন স্তম্ভিত হয়ে দেখছিলো দেহটাকে । দেহটা সে চিনতে পেরেছে । এ আর কেউ নয় জগাইয়ের বিয়ে করা বউ চাঁপা । দুবছর আগে জগাই আর চাঁপার বিয়েতে সে টাকা জমিয়ে একজোড়া রুপোর মল কিনে উপহার দিয়েছিল চাঁপাকে । মল দুটো এখনো চাঁপার পায়ে পড়ানো । ধূলায় ধূসরিত চাঁপার সমগ্র দেহ । বিহ্বলভাবটা কাটতেই রতনের খেয়াল হলো চাঁপার দেহটা যেন নড়ছে ! অন্ধকারে ঠাহর করতে না পেরে সে চোখ মুছে আবার তাকালো । একঝলক তাকাতেই আগুনের আলোয় সে দেখতে পেলো সত্যিই চাঁপার দেহটা নড়ছে । ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত পিঠটা হাল্কা ওঠা নামা করছে । রতন কি করবে ভাবছিলো এমন সময় তুমুল জোরে বৃষ্টি নামলো । এতে রতনের সুবিধেই হলো । দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনের তেজ কমতে লাগলো । রতন চট করে মনস্থির করে নিলো তারপর চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো । সন্ধের অন্ধকারে সে দেখলো বাদিকের জমির সীমানার দিকে আগুন প্রায় নিভে এসেছে । রতন আর দেরী না করে সেই দিকে ছুটলো । ”
“একটা জিনিস মাথায় আসছিলো না রতনের যে গাঁয়ের কাছেই একটা মেয়ের এরকম সর্বনাশ করা হলো অথচ কেউ টের পেল না কেন? চাঁপা তো চুপ করে থাকার মেয়ে নয়। জগাইয়ের সাথে ঝগড়া করলে গোটা গাঁ শুনতে পায় ওর কন্ঠস্বর। চাঁপা চেচালো না কেন? চাঁপার কাছে পৌঁছে সবটা পরিস্কার হয়ে যায় রতনের কাছে।চাঁপার মুখটা গামছা দিয়ে আস্টেপৃষ্টে বাঁধা। এই জন্য কেউ টের পায়নি। সে একমুহূর্ত ইতস্তত করে অবশেষে চাঁপার মুখে বাঁধা গামছাটা খুলে চাঁপার অচৈতন্য শরীরটাকে ঢেকে সে জগাইকে বললো, 'এ জগাই! তু কাদিস লাই রে । তু চাঁপাটো ইখুনও বেইচ্চে আঞ্ছে বটে! তু উয়াকে কোলে করে ডাগটরখানায় লিয়ে যা কেনে! মু উয়াকে লিতে পারিবক লাই । গাঁইয়ের লক দেইখলে উল্টাসিধা বলবেক!'রতনের এই কথা শুনে জগাইয়ের বুকে প্রাণ এলো । এতক্ষণ জগাইয়ের চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গিয়েছিলো । জীবনে সে কোনোদিন জ্ঞানত কারো ক্ষতি করেনি । সে বুঝতে পারছিলো না যে তার কোন অপরাধের শাস্তি চাঁপাকে পেতে হলো । চাঁপাকে সে ভীষণ ভালোবাসতো । উৎসবে, পরবে একটু একটু করে টাকা বাঁচিয়ে সে চাঁপাকে টুকটাক জিনিস কিনে দিতো । আজও সদর থেকে ফেরার পথে ওর জন্য পেঁয়ারা কিনে এনেছিলো সে । চাঁপা মরে গেলে কার সাথে থাকবে ও? কে ওর সাথে ঝগড়া করবে? বিকেলবেলা কাজ থেকে ফিরলে কে ঘটিতে করে জল এনে দেবে? কে সদরে যাবার আগে বায়না করবে আমলকী, পেঁয়ারা, গোলাপফুল নিয়ে আনার জন্য? রাতেরবেলা কে গল্প করবে ওর সাথে? সারাদিন যে ও এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায় তার জন্য বকা কে দেবে? চাঁপা না থাকলে যে জগাইও প্রায় নেই হয়ে যাবে! রতন কাকার কথা শুনে সে দৌড়ে চাঁপার কাছে এলো । তারপর চাঁপাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গেলো কাছেই হাসপাতালে।”
বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো বেণীমাধব । অগস্ত্য একটা সিগারেট বের করে বেণীমাধবকে অফার করতেই সে হেসে বললো, “না স্যার আপনি খান। এখনও আমার ডিউটি শেষ হয় নি। তাছাড়া আপনি আমার সিনিয়ার। আপনার সামনে সিগারেট খাবো কি করে?” অগস্ত্য সিগারেট ধরিয়ে আনমনে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললো,“She was brutally raped! Culprit মুহুর্তের সদব্যবহার করে বডিটাকে decompose করতে চেয়েছিল। but জগাইরা যথাসময় এসে পড়ায় বেঁচে যায় চাঁপা। কিন্তু গাঁয়ের লোক আগুন দেখে আসে নি কেন?”
“বেঁচে থাকলে তো আসবে স্যার! ”নির্বিকার গলা বেণীমাধবের। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় অগস্ত্য ।
“What? মানেকিবলছো তুমি? গোটা গ্রামের লোক সেই মুহুর্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল? How is this possible? এতগুলো লোক… কি করে?”
গম্ভীর মুখে বেণীমাধব বলে,“কারন সেসময় গাঁয়ে বেশী লোক ছিলো না। গাঁয়ের পুরুষ এবং স্ত্রীরা মাঠেঘাটের কাজ সেরে বাড়িতে বসে। একেই শীতকাল তার উপর বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব। ভেবে দেখুন স্যার এই সময় হাড়িয়া খেয়ে আগুন পোয়াতে গিয়ে অসাবধানে শুকনো পাতার , পাটকাঠির ছাউনি দেওয়া কুটিরে আগুন লাগা কি খুব অসম্ভব? তাছাড়া রিপোর্ট অনুযায়ী জগাইয়ের জমিতে রাখা বিচালীতে আগুন লেগেছিল দুপুরে।”
“কিন্তু তুমি যে বললে তুমুল বৃষ্টি হয়েছিল!”
“পুলিশ রিপোর্টে কিন্তু তা লেখা নেই। লেখা আছে আকাশ মেঘলা ছিলো।”
স্তম্ভিত হয়ে চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে অগস্ত্য ।পুলিশের এই স্বরূপটা তার সামনে উন্মোচিত হওয়ায় সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। চাকরিজীবনে কিছু দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর কলিগ দেখেছে সে। কিন্তু এতটা কোনো দিন দেখেনি সে। স্খলিত গলায় বলে ওঠে,“My Goodness! এ তো Mass Murder! অথচ পুলিশের কোনো step নেই!”
“এবার বুঝলেন স্যার? এরা কেন পুলিশকে বিশ্বাস করে না?”
কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকার পর জিজ্ঞেস করে অগস্ত্য । “কিন্তু অশোক চৌধুরীর লোকেরা রেপ করে পার পেয়ে গেল কি করে? চাঁপা হাসপাতালে কনফেসন করে নি?”
“করেছিল। মারা যাবার আগে জগাই, রতন আর হাসপাতালের ডাক্তারের সামনে জবানবন্দি দেয় চাঁপা। কিন্তু সেই জবানবন্দি রেকর্ড হয়নি। এমনকি চাঁপা যে রেপড হয়েছিল তার ডাক্তারী পরীক্ষার প্রমাণও হারিয়ে ফেলা হয়েছিল সে সময়ের ফাঁড়ির বড়োবাবুর তত্ত্বাবধানে ।এর পেছনে অবশ্য অশোক চৌধুরীর প্রভাব ছিলো।”
“Unbeliveable! এইভাবে একটা কেস ধামাচাপা পড়ে গেল অথচ কেউ জানলো না”
“এতে আশ্চর্যের কি আছে স্যার? এমনটা তো হয়ে থাকে। এভাবে কত কেস ধামাচাপা পড়ে যায়। অপরাধ হবার পর কয়েকদিন মোমবাতি মিছিল হয়। শোকসভা হয় । ইলেকশন থাকলে সেই অপরাধ নিয়ে ইস্যু বানিয়ে বিরোধীদলের নেতারা জিতে যায়। তারপর সব থিতিয়ে যায়। কেউ খোঁজ রাখে না সঠিক বিচার পেল কিনা। আর যদি মিডিয়ার কথা বলেন তাহলে বলবো এখানে ওনারা আসবেন কেন? কোনো মুখরোচক গল্প নেই, কোনো থ্রিল নেই, কোনো বড়ো নামী মানুষ জড়িয়ে নেই তাহলে কি লাভ? ওনাদের ভাষায় পাবলিক এসব খাবে না। তাছাড়া রেপই তো হয়েছে? এতে আশ্চর্যের কি আছে? এরকম কত রেপ কেস ঘটে যায় ভারতে সবকটা কি সুবিচার পেয়েছে? ”
বেণীমাধব কথাগুলো বলে একটু চুপ করে। তারপর বলে,“সরি স্যার ! না বুঝে এতগুলো কথা বলে ফেললাম ।কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় এর চেয়ে মাওবাদী অবস্থায় বেশ ছিলাম স্যার।পুলিশ হয়ে খাঁচায় বন্দি হয়ে গেছি।”
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অগস্ত্য বলে,“তারপর জগাইদের কি হলো?”
“কি আবার হবে? কেসের অনেক প্রমাণের মতো ওরাও হারিয়ে গেল।”
নির্বাক হয়ে অগস্ত্য তাকায় বেণীমাধবের দিকে। বাইরের প্রকৃতিকে তখন রাতের অন্ধকার ক্রমশ গ্রাস করছে।
******
অগস্ত্যর ফাঁড়িতে জয়েন করার পর আড়াই মাস কেটে গেছে। প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হতো অন্ধকারে। এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। ফাঁড়ির বাকি সেপাইদের সাথেও তার বেশ ভাব হয়ে গেছে। সেপাইরা বুঝেছে অন্য সব বড়োবাবুদের মতো নয় অগস্ত্য।বরং বেশ হাসিখুশি, মিশুকে আর বন্ধুস্বভাবের মানুষ সে। আগের অফিসাররা বেশ গাম্ভীর্য বজায় রেখে চলতো। সেপাইদের সাথে একটা দুরত্ব বজায় রেখে চলতো। সেখানে অগস্ত্য সবার সাথে হেসে কথা বলে, সকলের বাড়ির খোঁজখবর রাখে। তেমন এমারজেন্সি হলে ছুটিও ছেড়ে দেয়। দুপুরে একসাথে পাত পেড়ে বসে খাবার খায়। কোনো জাত মানে না। সেপাইরা ইতস্তত করলে সে হেসে বলে , “ আমাদের একটাই জাত। পুলিশ জাত।”
সারাদিন এমনিতে অবসরেই কাটে অগস্ত্যর। দু-একটা যাও বা পেটি কেস আসে ফাঁড়িতে বসেই সলভ হয়ে যায়। বাকি সময়টা বসে বসেই কেটে যায় তার। সদরে গিয়ে বেশ কয়েকটা গল্পের বই কিনে এনেছে সে। সেগুলো নিয়েই দিন কেটে যায়। বাকি সময় সে বেণীমাধবের সাথে বসে গল্প করে। তার মাওবাদী জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প শোনে। মাঝে মাঝে পরবের দিন এলে দুপুরে কিষুণের রান্না করা ব্যাম্বুরাইস আর গ্রেভি চিকেন খেয়ে তারিফ করে। আর রাতে মাঝে মাঝে আশেপাশের গাঁয়ে যায়। গাঁয়ের মোড়লদের সাথে মেলামেশা বাড়ায়। তারপর গাঁয়ের লোকের সাথে মিশে পরবে মেতে ওঠে। প্রথম প্রথম গাঁয়ের লোকেরা তাকে সন্দেহের চোখে দেখতো। সহজে মিশতে চাইতো না। অগস্ত্য জানতো এটা স্বাভাবিক। এতদিনের অবিশ্বাস, সন্দেহ এত সহজে কাটে?
কিন্তু সে হার মানে নি। অসীম ধৈর্যের সাথে চেষ্টা চালিয়ে গেছে সে। কিষুণের সাহায্যে এদের ভাষা অনেক কষ্টে আয়ত্ত করেছে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছে তারপর ধীরে ধীরে এদের মন জয় করতে পেরেছে। এখন সে এখানকারই একজন বাসিন্দা হয়ে উঠেছে। এদের সাথে মিশতে মিশতে সে ক্রমশ বুঝতে পেরেছে এরা সাধারণ, নিরীহ এবং নির্বিবাদ জীবনযাপন করে। ছোটোখাটো চুরি, বাল্যবিবাহ আর মদের নেশায় চুর হয়ে ছুটকো গার্হস্থ্য হিংসা ছাড়া তেমন গুরুতর কোনো অপরাধ এখানে হয়না। আর এগুলোও হয় খুবই কম পরিমানে। ফলে এখানে তেমন কিছুই করার নেই তার। তাই সেও নির্বিবাদে আরামে কাটাচ্ছে জঙ্গলের নিস্তব্ধ, নিরিবিলি জীবন। সে জানে যতদিন পর্যন্ত তার বদলির ডাক না আসছে ততদিন পর্যন্ত তাকে এই বনবাসে থেকে যেতে হবে। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না তার। এই বনের পরিবেশে সে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। শহরের চাকচিক্য পুর্ণ জীবনের চেয়ে এই সরল মানুষগুলোর মাঝে সে আরামে থাকে।
এরকমই একদিন সকালবেলা সে ফাঁড়িতে বসে একজনের কেস রিপোর্ট দেখছিলো আর ডাইরীতে ইনফর্মেশন নোট করছিলো। এটা অগস্ত্যর চাকরি জীবনের বরাবরের অভ্যেস। কোনো ইন্টারেস্টিং কেস বা পেপারে কোনো কিছু দেখলে সেটা ডাইরীতে লিখে রাখে সে। এমন সময় ফাঁড়ির সামনে একটা বড়ো সাদা রঙের মার্সিডিজ গাড়ি এসে দাঁড়ালো। নিরিবিলি পরিবেশে আচমকা গাড়িটার শব্দে আশেপাশের শান্ত পরিবেশ যেন একটু বিচলিত হয়ে উঠলো। শব্দ শুনে ফাঁড়ির সকলে গাড়িটার দিকে তাকালো। এই বন জঙ্গুলে জায়গায় এরকম আধুনিক চকচকে গাড়ি দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল অগস্ত্যর। গাড়িটা তো বেশ দামী গাড়ি বলে মনে হচ্ছে। এত সকালে আবার কে এলো? এই প্রত্যন্ত জায়গায় কে আসতে পারে? ভাবতে ভাবতে সে কাজ করতে করতে আড়চোখে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
গাড়ির ভেতর থেকে দুজন সশস্ত্র ষণ্ডাগোছের লোক নেমে দাঁড়ালো। দুজনের কাঁধেই আধুনিক রাইফেল ঝোলানো। তাদের একজন গাড়ি থেকে নেমেই পেছনের দরজা খুলে দিতেই সেখান থেকে নেমে দাঁড়ালো একজন মধ্যবয়স্ক সুপুরুষ ব্যক্তি। সুঠাম পেশীবহুল চেহারা দেখে বোঝা যায় লোকটা এককালে দারুন পরিশ্রমের কাজ করতো। পরনে সাদা গলাবন্ধ স্যুট। গায়ের রং এককালে টকটকে ফরসা ছিলো তবে এখন রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। হিরের সাথে আরো গ্রহরত্ন সম্মিলিত অনেকগুলো আংটিতে অলংকৃত বাহাতে ধরা একটা রুপো বাঁধানো সাদা আইভরি রঙের লাঠি। ডানহাতে ধরা আইভরি রঙেরই একটা চুরুট। লোকটা লাইটার দিয়ে চুরুটটা ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে একটু লেংচে লাঠির উপর ভর করে ফাঁড়ির ভেতরে ঢুকে এলো। সাথে আসা দুজন ষণ্ডার মধ্যে একজন ষণ্ডা দাঁড়িয়ে রইলো গাড়ির সামনে। অপরজন লোকটার সাথে এগিয়ে এলো ফাঁড়িতে।
অগস্ত্য আড় চোখে দেখলো লোকটাকে দেখামাত্র ফাঁড়ির সবাই একটু যেন তটস্থ হয়ে গেল। বিশেষ করে বেণীমাধব যেন থরথর করে ভীষণ রাগে কেঁপে উঠলেও পরমুহূর্তে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সংযত করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
লোকটা কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা তার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো। ষণ্ডাগোছের লোকটা টেবিলের উল্টোদিকের একটা চেয়ার টেনে দিতেই বেশ কসরৎ করে সেখানে বসলো। তারপর একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে চুরুটটা দাঁতে কামড়ে বললো, “আপনিই বুঝি এখানকার নতুন In charge? নমস্কার! অধমের নাম অশোক চৌধুরী।” বলে লাঠিটা দুহাতে তুলে নমস্কারের ভঙ্গি করলো লোকটা।
অগস্ত্য সাড়া না দিয়ে মাথা নামিয়ে কিছুক্ষণ কাজ করতে লাগলো। সে ক্রমশ বুঝতে পারলো লোকটার নমস্কারের জবাব না দেওয়ায় সে একটু অবাক হয়েছে। হোক! লোকটা এমন কোনো দেবপুরুষ বা গন্যমান্য কেউ নয় যে এলেই তাকে সম্মান দিতে হবে। অগস্ত্য বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ডাইরীতে কেসটা নোট করলো। তারপর ডাইরীটায় পেজমার্ক দিয়ে বন্ধ করে পেনের খাপ পরাতে পরাতে সোজা তাকালো লোকটার দিকে। তারপর গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললো, “বলুন কি সাহায্য করতে পারি আপনার?”
লোকটা চুরুট মুখে দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। যেন তাকে দুই চোখে মেপে নিচ্ছে। অগস্ত্যও লোকটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। লোকটার বয়স আন্দাজ মেরেকেটে পঞ্চাশের ঘরে হবে। কাঁচা-পাকা মিলিটারি গোঁফে একটা আত্মপ্রত্যয় রয়েছে। চেহারা দেখে বেশ বনেদী অভিজাত বংশের মনে হচ্ছে। দেহের উপর দিয়ে যে অনেক অত্যাচার গেছে তা একঝলক দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু এটা শারীরিক রোগভোগের অত্যাচার নয়। বরং অস্ত্রের আঘাতের দাগ লোকটার অনাবৃত দেহের প্রতিটা কোণে বিদ্যমান। যেন লোকটা সারাজীবন যুদ্ধ করে এসেছে। লোকটার স্থির কটা চোখ দেখে মনে হচ্ছে লোকটা বাইরে যতই ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকুক না কেন কারো চরম সর্বনাশ করার জন্য নির্মম হতে একমুহূর্তও লাগবেনা তার। ভাবসাবও এমন যেন একটা কেদো নরখাদক বাঘ নিস্পাপ ছাগশিশুর মুখোশ পরে বসে আছে। কিন্তু লোকটার চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে লোকটা কত বড়ো নরপশু।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর অগস্ত্য বললো , “ মাফ করবেন। দেখতেই পারছেন আমি একটু ব্যস্ত আছি। আপনার যদি কিছু বলার থাকে তাহলে বলুন না হলে পাশের টেবিলে বর্মনবাবু আছেন। তার কাছে রিপোর্ট লেখাতে পারেন। ”
কথায় কাজ হলো। লোকটা যেন একটু ঘোর কেটে নড়েচড়ে বসলো। তারপর চুরুটটা দাঁতে চেপে একটা অমায়িক হাসি হেসে বললো, “ফাইন! এখানে আসার পর থেকে আপনার কথা বেশ কয়েকদিন ধরে শুনছিলাম আমার লোকেদের কাছে। কথা শুনে মনে মনে আপনাকে চাক্ষুস দেখার সাধ জন্মেছিলো । তাই দেখতে এলাম। এসে দেখলাম আমার লোকেরা ভুল বলেনি।”
“তা কি বলেছিলো আপনার লোকেরা? আশা করি ভালো কথা নয়। কারন সুনাম হলে এতদুরে আপনি আসতেন না মি. চৌধুরী। ”
“বলেছিল এখানে নাকি নতুন দারোগা এসেছে। খুব efficient অফিসার। এসে সবার সাথে মিলে মিশে গেছে। তা ভালো ভালো কাজের জায়গায় না মিশলে কোথায় মিশবে বলুন তো? Look Inspector,আমি আমার জীবনের বেশীরভাগ সময় জঙ্গলে কাটিয়েছি। জঙ্গলের প্রতিটা শব্দের মানে আমার নখদর্পনে। সে কথা থাক যে কারনে এসেছিলাম সেটা বলে ফেলি? কাল আমার পঞ্চান্নতম জন্মবার্ষিকী। সারাবছর কলকাতায় কাটালেও প্রতিবছর এই জন্মমাসটা এখানেই কাটিয়ে যাই। এতদিনে আশেপাশের গাঁয়ের লোকেদের কাছ থেকে হয়তো জানতে পেরেছেন আমার পূর্বপুরুষেরা এখানকার রাজা ছিলেন। বর্তমানে যদিও রাজপাট নেই তবুও পুরোনো নস্টালজিয়া তো আছে নাকি? তাছাড়া আমার শৈশব থেকে কর্মজীবনের সিংহভাগ এখানে কেটেছে সে সব দিনের স্মৃতিচারণ করতেই আসি। প্রতিবছর জন্মদিনের আগের দিন আমি নিজে এসে ফাঁড়ির সকলকে নিমন্ত্রণ করি। আপনার আগে যারা ছিলেন তারা সকলেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছেন। আশা করি আপনিও আসবেন।” বলে মিটিমিটি হাসলো অশোক চৌধুরী ।
অগস্ত্য স্পষ্ট বুঝতে পারলো এটা নিছক নিমন্ত্রণ করা নয় ।নিজের ক্ষমতার আস্ফালন করা। লোকটা তাকে এলেবেলে ঘুষখোর অফিসার ভেবে এসেছে। ভেবেছে ক্ষমতার ভয়ে না হলে টাকা দিয়ে তাকে দাবিয়ে রাখবে। একটা অদম্য রাগ চেপে উঠলো অগস্ত্যর মাথায় ।এরকম স্থানীয় কেউকেটা পাবলিক চাকরিজীবনে অনেক দেখেছে অগস্ত্য । মনে মনে কচুকাটাও করেছে বিস্তর। চাইলেই লোকটাকে লাথি মেরে ফেলে দিতে পারে সে। ষণ্ডাদুটো তার কিছু করতে পারবে না। কিন্তু এখন সেটার সময় আসে নি।আর সবজায়গায় মাথাগরম করলে চলে না এটা চাকরিজীবনে ঠেকে শিখেছে সে।তাই গনগনে রাগটাকে গিলে ফেলে আড়চোখে বেণীমাধবদের দিকে তাকায় সে।
বেণীমাধবরা একদৃষ্টে চেয়ে আছে ওর দিকে। মাথা নেড়ে ইশারায় না বলছে। একমুহূর্ত ভেবে নেয় অগস্ত্য । তারপর যতটা সম্ভব মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে,“দেখুন বুঝতেই পারছেন ইদানিং কাজের বড্ড চাপ যাচ্ছে। তার উপর প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে একদিন সদরে রিপোর্টিং করতে যেতে হয় আমাকে। আর বাকিরাও প্রতিদিন ডিউটিতে ব্যস্ত থাকে। আমার আগে কি ছিলো জানি না তবে নিশ্চয়ই শুনেছেন নিয়মের ব্যাপারে আমি ভীষণ Discipline Maintain করি। কাজেই আমি এখনই আপনাকে কথা দিতে পারছি না। তবে আমি চেষ্টা করবো। তাছাড়া বুঝতেই পারছেন আমি কাজের মানুষ। বৃথা সময় নষ্ট করা আমার পছন্দও নয় আর বেকার বসে কারো অন্ন ধ্বংস করা আমি পছন্দ করি না। সেটা সরকারের হোক কিংবা নিজের বাপ-ঠাকুরদার হোক ।আশা করি আপনি কিছু মনে করবেন না।”
কথাটা শোনামাত্র লোকটার চোখ রাগে জ্বলে উঠলো। অগস্ত্য বুঝতে পারলো সে অব্যর্থ লক্ষ্যে ঠিক জায়গায় ঢিল ছুড়েছে। বেণীমাধব ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। লোকটার সারাশরীর মৃদুভাবে থরথর করে কাঁপছে। যেন সে এখনই তাকে ছিড়ে খাবে।কিন্তু পরক্ষণেই মৃদু হেসে লোকটা বললো,“বটেই তো! বটেই তো! আপনি ব্যস্ত মানুষ বটে। এমনি এমনি তো আপনাকে এখানে আনা হয় নি। তবে আমার কথাটা ভুলে যাবেন না যেন। আমি কাল আপনার অপেক্ষায় থাকবো। আচ্ছা আজ আসি? নমস্কার।” বলে একটু বাহাতটা বাড়াতেই ষণ্ডাগোছের লোকটা অশোককে টেনে তুললো। তারপর দুজনে ফাঁড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ি করে চলে গেল।
“কাজটা কি ঠিক হলো স্যার?” বলে বেণীমাধব এবার অগস্ত্যর পাশে এসে দাঁড়ালো। “লোকটা সাধারণ কোনো লোক নয় স্যার।একেবারে নরখাদক। ওর সাথে লড়তে যাওয়া মানে মৃত্যুকে ডেকে আনা।” অগস্ত্য হাসে। শুধু অশোক চৌধুরীই নয় বেণীমাধবও কথার মাঝে বিদ্রুপটা ধরে ফেলেছে।সে হেসে ডাইরীটা খুলে এগিয়ে দেয়। বেণীমাধব ডাইরীতে চোখ বুলিয়ে অবাক হয়ে বলে, “একি স্যার! এতো…!” অগস্ত্য হেসে ডাইরীটা ফেরত নিয়ে বলে, “তাই তো কাল আমি ওর কাছে যাচ্ছি। শত্রুর সাথে মোকাবিলা করার আগে তাকে মেপে নেবো না? এখানে আমার আসার কারণটা আশা করি বুঝতে পেরেছো? তোমাকে ভরসা করে কথাটা বলেছি। আশা করি পাঁচকান করবে না।”
“কিন্তু স্যার!”
“কর্মক্ষেত্রে প্রতিবার এদের মতো অসংখ্য শত্রুর মোকাবিলা করতে হয়েছে বলেই তো আমাকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে এখানে। অগস্ত্য সেন সব পারে শুধু পারে না অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াতে। আমার শিরদাঁড়া অতোটাও নমনীয় নয় যে ওর মতো লোকের কাছে নত হবো। চাকরী জীবনে আপোষ করিনি বরং শত্রুর জীবন পাপোষের অধম করেছি বলে এত ট্রান্সফার আমার। ভেবেছিলাম এখানে কদিন আরামে কাটাবো কিন্তু ঐ যে কপাল আমার মন্দ। সাধে বলে ঢেকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভানে। ও আসবে আমি জানতাম। যাকগে তুমি আমাকে আগে বলো নি তো আগের অফিসাররা ওর কাছে যেত।”
বেণীমাধব ম্লান হেসে বলে,“কোন মুখেবলতাম স্যার। উপরে থুতু ফেললে নিজের গায়েই পড়ে কিনা।”
“হুম! আচ্ছা এই অশোক চৌধুরী সম্পর্কে আরো কিছু ইনফর্মেশন দিতে পারবে আমাকে? মানে ঐ দুটো হুডলাম কারা, অশোক চৌধুরীর কি কি কাজ আছে। যদিও সবটা জানি তবে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য সোর্স নেই কোনো ডিটেলের। আমাকে পুরো ডিটেল দিতে পারবে?”
বেণীমাধব হেসে বলে “একটু সময় লাগবে তবে পেয়ে যাবেন।”
অগস্ত্য মাথা নেড়ে গম্ভীরমুখেবলে,“শুধু একটা সুযোগের দরকার বেণীমাধব। টার্গেট একদম সামনে দাঁড়িয়ে। শুধু একটা মোক্ষম সুযোগের দরকার। যে সু্যোগে অমোঘ অস্ত্র প্রয়োগ করবো আমি। এরা বারবার আইনের হাতে পার পেয়ে ভেবেছে আইন কিছু করতে পারবে না। এদের বোঝাতে হবে তেমন পুলিশের খপ্পরে পড়লে কি হতে পারে। কিন্তু দুঃখটা কোথায় বলো তো? গাঁয়ের লোক কেউ আসবে না এদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে। ওদের সাথে মিশে যতটা বুঝেছি ওরা সম্পুর্ণ ভাবে আমাদের উপর ভরসা করতে পারছে না। এর জন্য দায়ী আমরাই। এদের মনের ভয়টা কাটাতে হলে নিজে থেকে কিছু করতে হবে আমায়। একজনও আসবে না বলে আমাকে কাল শত্রুপুরীতে ছিদ্র খুঁজতে যেতে হবে। যেখান দিয়ে ওকে মারা যায়। এদের মধ্যে একজনও যদি আসতো তাহলে আমাকে আর যেতে হতো না। এখানে বসেই ঐ অশোক চৌধুরী কত বড়ো বাঘ আমি দেখে নিতাম। কিন্তু…সকলি গরল ভেল! কপাল মন্দ আমার।” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডাইরী খুলে আবার লিখতে বসে অগস্ত্য।
এমন সময় দরজার সামনে থেকে একটা বৃদ্ধগলা ডেকে ওঠে ,“দারোগাবাবু আঞ্ছিস নাকি বটে?”
******
অশোক চৌধুরীর বাড়ির সামনে যখন দাঁড়ালো অগস্ত্য তখন সন্ধে হয়ে গেছে। অগস্ত্য আজ একা আসে নি তার সাথে এসেছে বেণীমাধবও। প্রথমে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না সে। অগস্ত্য অনেক বুঝিয়ে নিয়ে এসেছে। দুজনে আজ সিভিল ড্রেসে সেজে এলেও নিরস্ত্র হয়ে আসে নি। অগস্ত্য নিজের সার্ভিস রিভলবার শার্টের তলায় গুঁজে এনেছে। বেণীমাধবের পকেটে ছুরিআছে আছে। তেমন বিপদ হলে আত্মরক্ষার একটা অবলম্বন রেখেছে দুজনে।
বেণীমাধব আজ সকালেই সমস্ত তথ্য দিয়েছে অগস্ত্যকে। অগস্ত্য সবটা শুনে শুধু মাথা নাড়িয়েছে। তারপর সারাদুপুর বসে বসে নিজের সার্ভিস রিভলবারটা পরিস্কার করেছে। তারপর বিকেলের দিকে সদরে গিয়ে একটা গিফ্ট কিনে এনেছে।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ফিসফাস করার পর দরজার কড়া নাড়ে অগস্ত্য।দুবার কড়া নাড়ার পর ভেতর থেকে একজন দরজা খুলে দেয়। অগস্ত্য দেখে কাল সকালে যে ষণ্ডাটা অশোক চৌধুরীর সাথে এসেছিলো সে লোকটাই দরজা খুলেছে। কালকের মতো আজকেও লোকটার কাঁধে একটা আধুনিক রাইফেল ঝুলছে। লোকটা ওদের একঝলক দেখে সরে দাঁড়ায়। অগস্ত্যরা ভেতরে ঢোকে। ওরা ভেতরে ঢোকামাত্র লোকটা দরজা আটকে দেয়। তারপর পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে।
সামনে একটা বিরাট কাঠের বাংলো দাঁড়িয়ে। অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না তবে বাংলোটা বেশ প্রাচীন বুঝতে পারে অগস্ত্য। গেট থেকে নুড়ি ফেলা পথ এগিয়ে গেছে বাংলোর দিকে। পথের চারপাশে অনেকগুলো ঝোপঝাড় আর বড়ো বড়ো গাছপালায় অন্ধকারটা আরো গাঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই অন্ধকার পথে লোকটা একটা ছোটো টর্চের আলো ফেলে পথ দেখিয়ে এগিয়ে চলেছে। বাংলোর সামনে এসে দাঁড়ায় ওরা। অগস্ত্য দেখে দরজার পাশে আরো দুজন ষণ্ডা দাঁড়িয়ে রয়েছে। অগস্ত্যদের দেখে তারা পথ আগলে দাঁড়ায়। দুজনের হাতে বন্দুক থাকলেও অগস্ত্যর মনে হয় কাজের সময় এটার প্রয়োজন হবেনা। দুজনের হাতের পাঞ্জার আকার যা দেখতে পারছে সে তাতে মনে হচ্ছে খালি হাতেই এরা দশজনের মহরা নিতে পারে। লোকদুটো এগিয়ে এসে তাকে আর বেণীমাধবকে আপাদমস্তক সার্চ করে বের করে আনে দুজনের আত্মরক্ষার শেষ অবলম্বন। ছুরি আর রিভলবারটা বাজেয়াপ্ত করে ষণ্ডা লোক দুটো তাদের পথ ছেড়ে দেয়। বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে কি একটা ভাবে অগস্ত্য। তারপর সামনের লোকটার পিছু পিছু বাংলোতে প্রবেশ করে।
বাংলোতে প্রবেশ করে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নেয় অগস্ত্য । বেণীমাধব ভুল কিছু বলেনি। বাড়িটা বাইরে থেকে যতই হতদরিদ্র দেখাক না কেন, ভেতরের সাজসজ্জা দেখে তাক লেগে যেতে হয়। ভেতরে সানমাইকা লাগানো দেওয়ালে বেশ কয়েকটা দামি পোট্রেট, ল্যান্ডস্কেপ, আর আর্টপিস সাজানো। মেঝেতে পুরু গালিচা পাতা। সিলিঙে ছোটোখাটো হলেও বেশ দামি একটা ঝাড়বাতি শোভা পাচ্ছে। গোটা বাড়ি আলোয় ঝলমল করছে। ওরা এখন একটা হলঘরের ভেতর দিয়ে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছে। হলঘরটায় যা জিনিসপত্র আছে তা দেখে বোঝা যায় গৃহকর্তা যেমন সৌখিন তেমনই বেশ শিল্পের সমঝদারও বটে।
হলঘরের মাঝবরাবর একটা সিড়ি উঠে গেছে দোতলায়। সেখান দিয়ে দোতলায় উঠে কিছুদুর গিয়ে অগস্ত্যদের ইশারায় সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বলে ষণ্ডা লোকটা। লোকটার দেখানো পথে কিছুদুর এগোতেই অগস্ত্যরা দেখতে পায় সামনে একটা দরজা ভেজানো। দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে একটা গলা ভেসে আসে, “Come in!” দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে অগস্ত্যরা।
এই ঘরটাও বাইরের হলঘরের মতো বড়োসড়ো বটে, তবে এর বৈচিত্র অন্য জায়গায়। বাইরের নিচে হলঘরটা যেমন বিভিন্ন রকমের শৈল্পিক কারুকার্যে সজ্জিত। এই ঘরটা তেমনই সজ্জিত নানারকমের বনজন্তুর চামড়া আর তাদের দেহাবশেষে। সিলিঙে শোভা পাচ্ছে বাঘ, হরিন, ভালুকের স্টাফ করা মাথা, বাঘের চামড়া, হাতির দাঁত, আর ছোটো বড়ো বন্দুক। পালিশ করা মেঝেতেও বাঘের চামড়ায় তৈরী গালিচা পাতা রয়েছে। এইঘরটাও বৈদ্যুতিন আলোয় ঝলমলে। বেণীমাধব ফিসফিস করে বলে, “ট্রোফিঘর!” অগস্ত্য আন্দাজ করে আশেপাশে কোথাও নির্ঘাত জেনারেটর চলছে। নাহলে এইরকম জায়গায় এত আলো জ্বলার কথা নয়। কারন এদিকে বিকেল থেকে কারেন্ট প্রায় থাকে না বললেই চলে। ঘরের মাঝখানে একটা বড়ো সোফায় বসে আছে দুজন। তাদের সামনে সেন্টার টেবিলে দুটো মদের বোতল রাখা। বোতলে পানীয়র পরিমান দেখে বোঝা যাচ্ছে দুজনেই ইতিমধ্যে জিনিসটার সদব্যবহার করতে শুরু করে দিয়েছে। দ্বিতীয়জনকে দেখে অগস্ত্য অবাক না হলেও বিস্মিত হয় বেণীমাধব। অবাক হবারই কথা তাদের, কারন অশোক চৌধুরীর পাশে বসে আছে সদর থানার ইনচার্জ মদনমোহন চোংদার!
অশোক চৌধুরী অগস্ত্যকে দেখে হেসে বলে, “ আরে আসুন আসুন! আপনার কথাই বলছিলাম মদনকে। কি হে মদন? ” বলে মদনবাবুর দিকে তাকায় অশোক চৌধুরী। মদনবাবূ জবাবে মাথা নাড়ে। অগস্ত্য এগিয়ে এসে গিফ্টটা অশোকের হাতে দিয়ে বলে , “চলে এলাম। হাজার হোক অশোক চৌধুরীর নিমন্ত্রণ বলে কথা। সামান্য একটা ফাঁড়ির ইনচার্জ হয়ে ফেলতে পারি? আমার ঘাড়ে কটা মাথা বলুন তো? ”
“ওভাবে বলবেন না। আমি সামান্য একজন লোক। আপনি আমার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছেন এটাই অনেক। আপনি ব্যস্ত মানুষ। কত কাজ থাকে আপনার। যাক গে বসুন। কি খাবেন বলুন? রাতের খাবার খেতে অনেক দেরী ততক্ষণ হবে না কি?” বলে বোতলের দিকে ইশারা করে অশোক। অগস্ত্য হেসে বলে , “শীতের রাতে দু-এক পেগ হলে মন্দ হবে না। তবে আমি বেশি খাবো না। আসলে বাড়ি ফিরতে হবে কি না?”
“হুম বুঝলাম! আর উনি?” বলে বেণীমাধবের দিকে ইশারা করে অশোক। অগস্ত্য হেসে বলে , “বেণীমাধব এ রসে বঞ্চিত। ও এসব খায়না।” মাথা নেড়ে অশোক বাইরে লক্ষ্য করে একটা ডাক দেয়। বাইরে থেকে একটা রোগামতো লোক ঘরে ঢোকে। লোকটাকে একটা গ্লাস আর কিছু চাট আনতে বলে অশোক চৌধুরী। বেণীমাধবের ব্যাপারটা ভালো লাগে না। সে ভেবেছিলো তারা এসে অশোক চৌধুরীকে গিফ্ট দিয়ে চলে যাবে। তেমন সুযোগ পেলে অতিথির সামনে অশোক চৌধুরীকে অপদস্ত করবে অগস্ত্য স্যার। কিন্তু কোথায় কি? এতো দিব্যি গল্প জুড়ে বসেছে। যেন অনেকদিন পর কোনো পুরোনো বন্ধুর দেখা হয়েছে। তাহলে স্যার যে কাল এখানে আসার আসল কারন ওকে বললো, সারাদিন ধরে এখানকার সমস্ত পরিকল্পনা করলো সব মিথ্যে? আর মদন স্যার! মদন স্যারও অবশেষে অশোক চৌধুরীর দলে ভিড়ে গেলেন? এবার বুঝতে পারছে কেন সদরে এমনকি ফাঁড়িতেও অশোক চৌধুরীর নামে কোনো কেস বেশিদিন চলে না। কেন সব অকাট্য প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও কাজের সময় সব বেমালুম উধাও হয়ে যায়। তার মানে থানায় স্যারের দোর্দন্ডপ্রতাপ রূপটা আসলে মুখোশ ছাড়া কিছু নয়! থানায় যা কিছু এতদিন সে দেখে এসেছে সবটাই অভিনয়! এরা দুজনেই কি তাহলেই অশোক চৌধুরীর পোষা লোক? তাহলে তো অশোকের অপরাধী চক্রের জাল বেশ অনেকদুর পর্যন্ত ছড়ানো বলতে হবে। একটা অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে ওঠে বেণীমাধবের। না ভেবেচিন্তে সে অনেকগুলো প্রমাণ দিয়ে ফেলেছে অগস্ত্য স্যারের হাতে।যা সে বাঁচিয়ে রেখেছিলো অশোক চৌধুরীর কাছ থেকে। সেগুলোর কি হবে? তাছাড়া এইসব প্রমাণ ছাড়া অশোক চৌধুরীর পাপের একমাত্র সাক্ষী সে। তাহলে স্যার কি ইচ্ছে করে তাকে এখানে নিয়ে এলো? ফাঁদে ফেলে তাকেও…! ইস বড্ড ভুল হয়ে গেছে! এইভাবে চলে আসাটা ঠিক হয়নি তার। কিন্তু এখন কিছু করার নেই। ছুরিটা নিচে দারোয়ানদের জিম্মায়। আগে টের পেলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারতো। যা হবে দেখা যাবে ভেবে একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের মনের ভাব চেপে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সে।
কথায় কথায় রাত বাড়ে রোগা লোকটা এসে জানায় রান্না তৈরী। ওরা একতলায় নেমে ডাইনিংরুমে আসে। বড়ো ডাইনিং রুমের মাঝে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত বিরাট একটা টেবিল।টেবিলে নানারকম সুস্বাদু পদ সাজানো। মাছ, মাংস, মিষ্টির এলাহি পদের আয়োজন করেছে অশোক চৌধুরী ।
ওরা খেতে বসে। বেণীমাধব প্রথমে বসতে না চাইলেও অগস্ত্যর কথায় বসতে বাধ্য হয়। যদিও চিন্তিত থাকায় বেশীরভাগ খাবারই তার কাছে বিস্বাদ ঠেকে। অগস্ত্যর কোনো বিকার নেই সেই দিব্যি মনের আনন্দে চোব্য চোষ্য গিলে চলেছে। অবশ্য আনন্দ হবারই কথা। মনিবের ফেলা হাড্ডি খেতে প্রত্যেক কুকুরই ভালোবাসে।
খাওয়া দাওয়ার পর সকলে এবার হলঘরে এসে বসে। অশোক চৌধুরী নিজের চুরুটটা ধরায়।অগস্ত্যরা সিগারেট ধরায়। ধুমপান করতে করতে অশোক চৌধুরী বলে,“well এবার কাজের কথায় আসা যাক। শুনেছি তুমি, তোমাকে তুমি করেই বলছি। কারন বয়সে তুমি আমার চেয়ে অনেকটাই ছোটো। চলবে তো? তা তুমি নাকি আমার Against-এ যত কেস ছিলো সব Re-open করেছো?প্রমাণও নাকি খুঁজে পেয়েছ শুনেছি?”
বেণীমাধবের বুকটা আবার ধড়ফড় করে ওঠে। সে আড়চোখে অগস্ত্যর দিকে তাকায়। কিন্তু অগস্ত্য তাকে অবাক করে দিয়ে বলে,“কে বলেছে আমি প্রমাণ খুঁজে পেয়েছি? এখনও কোনো প্রমাণ পাইনি। তবে আমার অন্য উদ্দেশ্যটা সফল হয়েছে।”
“উদ্দেশ্য? বটে! তা কি উদ্দেশ্য শুনি?”
অগস্ত্য সিগারেটে শেষ টান দিয়ে অ্যাশট্রেতে সিগারেটটা গুঁজে দেয়। তারপর একটা হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে বলে,“রাত অনেক হলো তাইনা? যাক গে কাল দেরী করে ডিউটি জয়েন করবো। বেশ শুনুন। আজ পর্যন্ত যত গ্রাম্য জায়গায় পোষ্টেড হয়েছি সব থানায় কেসের একগাদা ফাইলের চাপে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে গেছে। গত পোষ্টিংয়েও আমার আগের অফিসারের পেন্টিং কেস সলভ করতে করতে সময় কেটে গেছে অথচ কেস ফুরোয় নি। কিন্তু এখানে এসে ফাঁড়িতে কেসের সংখ্যা দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। যেখানে নর্মাল থানায় বছরে প্রায় দেড় হাজারের মতো কেস আসে সেক্ষেত্রে এই এলাকায় ক্রাইম প্রায় ঘটেই না! অথচ মাত্র দশ-বারো বছর আগেও এই জায়গাটা মাওবাদী অধ্যুষিত অঞ্চল বলে পরিচিত ছিল।কানাঘুষো আছে তারা নাকি এখনও গোপনে ছদ্মবেশে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা নিয়ে আমার ঘোর সন্দেহ হয়। থানায় গিয়ে এই এলাকার কয়েকটা অমীমাংসিত কেস ফাইল নিয়ে আসি আমি। সেগুলো চেক করতে গিয়ে একটা নাম খুব কমন পাই আমি। তারপর চেক করে দেখি বেছে বেছে যে কেসে সেই ব্যক্তিটার নাম আছে সেই কেসগুলোই অমীমাংসিত।নামটা আর কারো নয় আপনার মি: চৌধুরী । ”
ঘরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা।পিন পড়লেও তার শব্দ শুনতে পাওয়া যাবে। সকলে নির্বাক হয়ে অগস্ত্যর দিকে তাকিয়ে। অগস্ত্য চেয়ার থেকে উঠে জানলার দিকে এগোয়। তারপর বলে,“ জানেন মি:চৌধুরী ? পুলিশে জয়েন করার পর থেকে দুটো জিনিস আমার অভ্যেসে পরিনত হয়ে গেছে। সেটা হলো কোনো অমীমাংসিত কেস দেখলে সেটাকে নিজে থেকে বুদ্ধি দিয়ে সলভ করা।আর প্রত্যেকটা কেসের সাসপেক্টদের স্টাডি করা।আপনাকেও আমি স্টাডি করেছি মি: চৌধুরী। আর স্টাডি করে বুঝেছি আপনি সাধারণ মানুষ নন। আপনার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ, প্রত্যেকটা কাজ সবটাই ভীষণ ইমপ্রেসিভ।বাইরে থেকে আপনাকে যতই রাশভারী, রাগী দেখাক না কেন ভেতর ভেতর আপনি চিতাবাঘের মত ধুর্ত। আর সাপের মতো তীব্র গতি সম্পন্ন। আপনাকে কেউ যদি না ঘাটায় তাহলে তার দিকে আপনি তাকান না কিন্তু আপনার পথে কেউ এসে দাঁড়ালে তার সর্বনাশ হতে বাধ্য। দুঃখ কোথায় জানেন? আপনি যদি আপনার এই গুন গুলো সৎপথে কাজে লাগাতেন তাহলে হয়তো সরকার আরো বেশী লাভবান হতো। যাকগে এবার অমীমাংসিত কেসগুলোয় আসি। বেশীরভাগ কেসগুলোই আপনার যুবাবয়সের চাকরিজীবনের কীর্তি । কাজেই সেগুলো প্রভাব খাটিয়ে ধামাচাপা দেওয়া কোনো বড়ো ব্যাপার নয়। কিন্তু আপনি যা করেছেন তা আইনের দিক দিয়ে তো বটেই মানবিকতার দিক দিয়েও ভীষণ অপরাধ।”
“আপনাকে স্টাডি করতে গিয়ে আপনার অতীতটাকেও স্টাডি করতে হয়েছে আমায়। আর তা থেকে যতটা জেনেছি, আমার মনে একই সাথে আপনার জন্য শ্রদ্ধা আর ঘৃণা দুটোই বেড়েছে। শ্রদ্ধা আপনার বুদ্ধিমত্তার জন্য আর ঘৃণা আপনার মানসিকতার জন্য।আপনারা বংশানুক্রমিক ভাবে এখানকার জমিদার। আপনার বাবা এখানকার ডাকসাইটে জমিদার হলেও এখানকার মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি জাতি,ধর্ম, বড়োলোক-গরীব মানতেন না। আশেপাশের গাঁয়ে সকল প্রজার বাড়িতে তা অবাধ যাতায়াত ছিলো। এটা আপনার মা পছন্দ করতেন না। কিন্তু আপনার বাবার প্রতাপের কারনে বলতেও পারতেন না।কিন্তু এ নিয়ে আপনার মায়ের মনে চাপা অসন্তোষ ছিলো। সেটা আপনার আর আপনার বোন মালাদেবীর মনে কিছুটা হলেও বিস্তার করতে পেরেছিলেন তিনি। যার ফলে আপনাদের মনে এখানকার লোকের প্রতি একটা অবজ্ঞা মিশ্রিত ঘৃণার সৃষ্টি হয়। ”
“আপনার বাবার ইচ্ছেতেই বনদফতরের চাকরিটা আপনি নিতে বাধ্য হলেও পরে বোঝেন এতে আখেড়ে আপনারই লাভ হয়েছে। কারন এখানে অসংখ্য দামী কাঠের সম্ভার আছে। ব্যস! আর কি? চোরাচালানকারির সাথে আপস করে আপনি নেমে পড়লেন ব্যবসায়। নিয়ম হলো গাছ পাচার করে যে টাকা উঠবে তার সত্তর পারসেন্ট আপনার। বদলে ফরেস্ট গার্ডদের হুজ্জোত থেকে বাঁচাবেন আপনি। ব্যবসা দারুণ চলছিল একদিন ঘটে গেল একটা ঘটনা। একজন কাঠুরিয়া আপনাকে দেখে ফেলল। সে আপনাকে ভয় দেখিয়ে বললো এখানকার অধিবাসী হিসেবে তারও ভাগ চাই। তা ভাগ আপনি দিলেন। লোভের ভাগ। লোকটাকে আপনার পোষা সাপের ছোবল খাইয়ে। সকলে জানলো লোকটা কাঠ কাটতে গিয়ে ফরেস্ট গার্ডের তাড়া খেয়ে পালাতে গিয়ে সাপের ছোবল খেয়েছে।পথের কাঁটা দুর হলো আপনি নিশ্চিন্ত মনে ব্যবসা করতে লাগলেন। তার কয়েকবছর পর আরেকটা ঘটনা ঘটলো যার ফলে আপনার দেহে এই ক্ষতের সৃষ্টি হলো এমনকি আপনি সারা জীবনের মতো খোঁড়া হয়ে গেলেন।যে কারনে এককালের দুর্জয় সাহসী অশোক চৌধুরীর প্রহরায় লোক লাগে সর্বক্ষণ। এখানকার সকলে জগাই মুর্মুর ঘটনাটা জানে। যেটা জানে না সেটা আমি বলছি। হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর পুলিশ যথাসময় এসে চাঁপার জবানবন্দি নেয়। কিন্তু সেটা কোনো কারনে মিসিং হয়ে গেলেও আরেকটা প্রমাণ সকলের অগোচরে থেকে যায়। আচ্ছা আপনার প্রহরায় কতজন আছে?”
এতক্ষণ ঘোরলাগা অবস্থায় অগস্ত্যর কথা শুনছিলো অশোক। সম্বিত ফিরে বলে ,“আট জন। দুজন মেন গেটে ছজন গোটা চৌহদ্দিতে।”
“এরা কতদিন ধরে কাজ করছে?”
“বছর পাঁচেক তো হবেই। আগে যারা ছিলোজগাইয়ের ঘটনার পর ওদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। তারপর কেস খারিজ হলেও ওদের রাখিনি দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছি।”
“ওরাও কি সংখ্যায় আটজন ছিলো?”
“হ্যা কিন্তু এর সাথে অত পুরোনো ঘটনার কি সম্পর্ক জানতে পারি?”
“অবশ্যই পারেন। ডাক্তারি রিপোর্টে লেখা ছিলো চাঁপাকে শক্ত কোনো দড়ি দিয়ে হাত পা মুখ বেঁধে নির্মমভাবে ধর্ষণ করা হয়। ব্রুটালিটি এতটাই প্রবল ছিলো যে চাঁপার হিপবোন, কক্সিক্স, আর মেরুদন্ড ভেঙে যায়। ওর শরীরে সিমেন স্যাম্পেল পাওয়া যায় নজনের।এই আঘাত নিতে পারেনি চাঁপার শরীর ।পরদিন ভোরে সে মারা যায়। মারা যাবার আগে জগাইকে বলে যায় অপরাধীর নাম। কেস হিস্ট্রি দেখে যা অনুমান করেছি সেটা হলো। আপনার উপর আঘাত আসতেই আপনি জগাইয়ের উপর শোধ নেবেন স্থির করেন। একে আপনার পৌরুষ নিয়ে ঠাট্টা তার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে আপনার ডানহাত জখম করা অপরাধ কম নয় জগাইয়ের। অতএব তাকে শাস্তি পেতে হবে।সুযোগ বুঝে জগাইয়ের ঠিকুজি বের করলেন আপনি। তারপর ভাবলেন লোকদিয়ে জগাইয়ের পরিবারকে শেষ করে দেবেন।”
“সেই মতো লোক নিয়ে দুপুরে সন্তর্পণে চড়াও হলেন জগাইয়ের বাড়ি। হত্যা করলেন তার মা-বাবা কে কিন্তু তার বউকে দেখে আপনি অবাক হয়ে গেলেন। সেটা স্বাভাবিক কারন আদিবাসী ঘরে জন্ম নিলেও চাঁপা দেখতে সুন্দরী ছিলো। আপনি ওর রূপে মুগ্ধ হয়ে পড়লেন। ঠিক করলেন তেমন হলে ওকে নিয়ে যাবেন। তারপর নিজের মেয়েছেলে করে রাখবেন। কারন আদিবাসী প্রজাকে বিয়ে করার কথা আপনি স্বপ্নেও ভাবেন না। ভেবেছিলেন টাকা দিয়ে ওর মন জিতে নেবেন।কিন্তু সে আপনার কাছে ধরা দিলো না। বশ করতে গিয়ে ভীষণ ভাবে আহত হলেন আপনি। আবার আহত হলো আপনার পৌরুষ।ক্ষোভে রাগে সেখানেই চাঁপাকে নিজের লোকেদের সাহায্যে ধর্ষণ করলেন আপনি। তারপর নিজের লোকেদের কাছে বিলিয়ে দিলেন উচ্ছিষ্ট চাঁপাকে। তারা পাগল কুকুরের মতো ছিন্নভিন্ন করে খেল চাঁপাকে। তারপর চাঁপার অচৈতন্য দেহটাকে জগাইদের ক্ষেতে ফেলে ক্ষেতটাকে জ্বালিয়ে দিলেন। কিন্তু তার আগেই জগাইদের কন্ঠস্বর শুনে আপনাদের পালিয়ে আসতে হলো। বাড়ি ফিরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন চাঁপা পুলিশকে জবানবন্দী দিয়েছে। সে সময় থানার ওসি ছিলেন আপনার বশংবদ। আপনার প্রভাবে লোপাট করে দিলেন সমস্ত প্রমাণ।আর আপনার লোকেরা নিশ্চিহ্ন করে দিলো একটা গোটা গ্রাম।”
“কিন্তু এতকিছুর পরেও আপনারা ভুলে গেলেন একটা কথা। সেটা হলো প্রত্যেকটা ক্রাইমের মেডিক্যাল রিপোর্টের দুটো কপি থাকে। একটা হাসপাতালে জমা থাকে অপরটা থাকে পুলিশের কাছে।সেটা থেকে গোটা কেসটা গোছাতে পেরেছি। পুলিশ জবানবন্দি নেওয়ার পর মুর্খ জগাই ভাবলো চাঁপার বিচার করবে পুলিশ। বেচারা জানতো না এসব প্রহসন ছাড়া কিছু নয়। পুলিশ প্রমাণাভাবে কেস খারিজ করে দেওয়ায় সমস্ত হিসেব গুলিয়ে গেল জগাইয়ের। রাগে ক্ষোভে দিকবিদিকশুন্য হয়ে হতবুদ্ধি জগাই ভাবলো পুলিশ যখন পারলো না তখন সেই বিচার করবে। চাঁপার প্রতিশোধ সে নেবে। তারপর সেদিন রাতেই সে আক্রমণ করলো এই বাংলোতে। একে একে আপনার প্রত্যেকটা সাগরেদকে যমের দুয়ারে পাঠিয়ে আপনার সম্মুখীন হলো সে। আপনি জানতেন এরা সহজে রাগে না ঠিকই। কিন্তু একবার রেগে গেলে এদের বুনো রাগ সর্বনাশ ঘটিয়ে ছাড়ে। তাই আপনিও প্রস্তুত ছিলেন। যেই জগাই আপনাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলো আপনি ওকে গুলি করলেন।"
"জগাইয়ের মাথার খুলি ফুটো করে দিলো আপনার বন্দুকের গুলি। জগাইও কুড়ুলটা আপনার দিকে ছুঁড়ে দিলো বটে তবে তার লক্ষ্যভেদ হলো না। কুড়ুলটা আপনার মাথার বদলে নেমে এলো আপনার উরুলক্ষ্য করে। আপনি নড়ার সময় টুকু পেলেননা। বিষাক্ত কুড়ুল আমুল বিঁধে গেল আপনার উরুতে। আপনি মাটিতে পড়ে গেলেন। মৃত্যুতে ঢলে পড়ার আগে ফোন করলেন পুলিশকে। তারা এসে নিয়ে গেল আপনাকে।”
“এরপর আপনি আর এমুখো হননি ঠিকই তবে প্রচ্ছন্ন ভাবে এখানকার কাজ করে গেছেন। তারপর সময় বদলেছে মানুষের বোধ হয়েছে তারা মাওবাদী আন্দোলনের সমর্থন করেছে। কিন্তু কেউ বুঝতেও পারে নি যে সরষের মধ্যে ভূত ছিলো। এখানকার মাওবাদী দল আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও পরোক্ষে আপনার কাজই করছিল। এবং জনগনকেও সেই কাজেই উৎসাহিত করছিল। আপনারই বেআইনি জিনিস লুট করে আপনাকেই আইনের হাত থেকে রক্ষা করছিল। কেউ ভেবেও দেখেনি নয়মাসে-ছয়মাসে লুট করা দল পুলিশের সাথে অসম যুদ্ধ করা সত্ত্বেও কি করে এতটা বন্দুকের কার্তুজ, খাবার, প্রয়োজনীয় জিনিস পেত। কারন বিপ্লব কথাটা ভীষণ আবেগের। সেই আবেগের সাথে চললে বাস্তববোধ থাকে না। ফলে বারবার ব্যর্থ হতে হয়। তাছাড়া এই অঞ্চলে মাওবাদী দলের যতই নাম থাকুক। ওরা আদপেও মাওবাদী ছিলো না। ওরা আপনার লোক ছিলো।তাই ওরা ওদের এরিয়ার মুল কমান্ডারকে কোনোদিন দেখেনি। যেখানে অন্য দল কমান্ডারের সাথে অ্যাকশন করেছে। তাছাড়া কেউ প্রশ্ন করারও ছিলো না যে প্রশ্ন করতো তাকে পুলিশের হাতে অতর্কিতে অ্যাকশনের প্রহসন করে ধরিয়ে দেওয়া হতো।পুলিশ নিজের সহকর্মীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তাদের অত্যাচার করে মেরে ফেলত। যেমনটা হয়েছিল লাল সিং, সুরজ মুন্ডা, বি.এম মজুমদারের ক্ষেত্রে। কিন্তু এখানেও আপনার পাপে সাক্ষী থেকে গেছে। যে তিনজনের কথা বললাম তাদের মধ্যে একজনকে পুলিশ মারে নি কারন সে ছিল এখানকার দলের একজন চাই। যার কাছে ছিলো প্রচুর তথ্য। পুলিশের কাছে ইনফর্মেশন ছিল এই লোকটা মিসগাইডেড হয়ে দলে ঢুকেছে। এবং পরে দলের একজন নেতৃ স্থানীয় হয়ে দলটাকে ইনফ্লুয়েন্স করছে। ফলে দলের লোক তাদের কমান্ডারের কথা কম এর কথা বেশী শুনছে। পুলিশ লোকটাকে যথারীতি কাউন্সেলিং করে তার ভুল ধারনাটা ভাঙায়। এবং তার লিড ধরেই দলটাকে পাকড়াও করে। আপনাকে জানিয়ে রাখি লোকটা বর্তমানে এখানেই আছে আর আমাদের কথা শুনছে। তা বেণীমাধব এবার চৌধুরী বাবুর গলাটা চেনা লাগছে কি?”
শেষ কথাটা বলে অগস্ত্য বেণীমাধবের দিকে তাকায়। বেণীমাধব একটা বুনো রাগে ফুঁসছিল। তার এবং আরো অনেকের জীবন নষ্টের কারিগরের গলা সে চিনতে পেরেছে এতক্ষনে। সে রাগের বশে দুটো হাত মুঠো করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“ হুম! এবার চিনতে পেরেছি। এটা কমান্ডারের গলা।”
“শুধু তাই নয় এনার আরো অনেক কীর্তি আছে। সেদিন অতো গুলি খাবার পরও তোমার শিবরাজ স্যার বেঁচে গিয়েছিলেন। হাসপাতালে যমের সাথে লড়ছিলেন যাতে বেঁচে উঠে দেশে ফিরে গিয়ে নিজের পুর্ণগর্ভা স্ত্রীর কাছে যেতে পারেন।এই খবরটা পেয়ে বিচলিত হয়ে ওঠেন চৌধুরীবাবু। কারন শিবরাজ যদি বেঁচে যান তাহলে তিনি নিজে তোমাকে বাঁচাতে সাক্ষী দেবেন।যদিও তিনি না দেন তাহলেও দলের বাকিদের কাজ তিনি দেখে ফেলেছেন। যা জনসমক্ষে এলেই বিপদ হতো। অতএব তাকে চলে যেতে হবে।সেদিন নার্সকে ভালোরকমই টাকা দিয়েছিলেন চৌধুরীবাবু স্যালাইনে বিষ মেশানোর জন্য।”
“শয়তান!” বলে আক্রমণ করতে যাচ্ছিল বেণীমাধব।অগস্ত্য তাকে থামিয়ে বললো,“খামোখা উত্তেজিত হচ্ছো তুমি বেণীমাধব। ইনি একা শুধু তোমার অপরাধী নন। তাই তুমি একা এনাকে শাস্তি দিতে পারো না।”
বেণীমাধব ফুঁসে উঠে,“তাই বলে স্যার এইভাবে একে ছেড়ে দেবেন?”
“কে বলেছে? শাস্তি এনাকে পেতে হবে।কিন্তু আমরা নিজে হাতে এনাকে শাস্তি দেবো না।” বলে জলন্ত চোখে অশোক চৌধুরীর দিকে তাকায় অগস্ত্য ।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আচমকা হাসতে শুরু করে অশোক চৌধুরী। হো হো করে হাসতে হাসতে সে হেলান দিয়ে বসে তার আরামকেদারায়। পাশে বসে থাকা বড়োথানার দারোগা মদনবাবুও অগস্ত্যর কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসতে থাকেন।
বেণীমাধব শিউড়ে ওঠে। তার ষষ্ঠ
ইন্দ্রিয় বলছে ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে চলেছে।এমন কিছুর আশঙ্কা করেই সে অগস্ত্য কে বারবার ইশারায় আসতে বারন করেছিল।
বেশ কিছুক্ষণ হাসার পর আচমকা সোজা হয়ে উঠে বসে ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে অশোক চৌধুরী বললো,“মানতে হবে তোমার যেমন সাহস আছে তেমনই বুদ্ধিও আছে বটে। মারা পড়বে জেনেও বাঘের গুহায় এসে বাঘকে প্ররোচিত করছো অ্যাঁ? মদন তোমার আন্ডারে এমন করিতকর্মা বীরপুরুষ আছে কই আগে বলো নি তো?”
দারোগাবাবু হাসতে হাসতে বললেন,“আরে জানলে তো বলবো? কে জানতো অভয়ের বদলে কলকাতা থেকে জঞ্জিরের অমিতাভ বচ্চন আর ফেলুদার মিক্সচার এসেছে। বাপরে! কি লেভেলের করিতকর্মা ছেলে এসে বসেছিল বলুন দেখি? খুঁজে খুঁজে ঠিক প্রমাণ, সাক্ষী জোগাড় করেছে দেখছি!”
মাথা নাড়িয়ে অগস্ত্যর দিকে হিংস্র দৃষ্টি ফেলে অশোক চৌধুরী । মুখে হাসি লেগে আছে তখনো। হাসতে হাসতে বলে,“বেশ আমি স্বীকার করছি এতক্ষণ যে যে অভিযোগ এনেছো সবটাই সত্যি আর আমিই এর পেছনে। কিন্তু ভাই আমার কথাতে কি তোমার সরকার, জজ মেনে নেবে? প্রমাণ লাগবে তো? তা প্রমাণ আছে? বা সাক্ষী?তা ঐ মেডিক্যাল রিপোর্টের জোরে প্রমাণ করতে পারবে? ও তো এখানে বসেই লোপাট হয়ে যাবে। আর এখানে কার বুকে এত দম আছে বলোতো যে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে? এই বেণীমাধব? Seriously? আর সাক্ষ্য দিলেও কি মনে হয় তোমার? কতদিন আটকে রাখতে পারবে আমাকে গরাদের ওপারে?মনেরেখোএসবএরিয়ায়আইনকানুনআমাদেরমতোঅর্থবানদেরঅর্থেবন্দিথাকে। তোমার কাছে যদি আমাকে আটকানোর জন্য আইন থাকে সেটাকে ভাঙার জন্য আমার কাছে অনেক পথস্রষ্ঠা উকিলবসে আছে। তারাই বের করে আনবে আমায়। আর আমি বেরোলে কি ওকে বা তোমাকে ছেড়ে দেবো? তোমার আইনের ক্ষমতা বা সাধ্য নেই আমার কেশ স্পর্শ করার শাস্তি তো দুরস্ত । আজ পর্যন্ত কেউ আমায় ছুতে পারে নি ভবিষ্যতেও পারবে না। কাজেই এতদিন যা খুঁড়েছো তা বন্ধ করে মানে মানে সমস্ত প্রমাণ আমার হাতে তুলে দিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে চুপচাপ গুডি গুডি পুলিশের মতো ডিউটি করো। নাহলে জগাইদের মতো একদিন তুমি ও তোমার এই সাক্ষীও লোপাট হয়ে যাবে। কেউ জানতেও পারবে না বুঝেছ? যদি প্রাণে বাঁচতে চাও তাহলে মানে মানে সব প্রমাণ আমার হাতে দিয়ে ফেলো দেখি। ভুল করেও কোনো চালাকি করার চেষ্টা করবে না। নাহলে… রামু! শেরু! বালী! বলওয়ান্ত! সবকটা ভেতরে এসো।”
একে একে সবকটা ষণ্ডা ভেতরে এসে দাঁড়ালো। একজন এগিয়ে এসে টেবিলে অগস্ত্যর রিভলবার আর বেণীমাধবের ছুরিটা রাখলো। অশোক চৌধুরী সেদিকে তাকিয়ে হেসে বললো,“বাহ! পুরো তৈরী হয়ে এসেছিলে দেখছি! কিন্তু কিছু লাভ হলো না। সকলি গরল ভৈল অ্যাঁ! সবাইকে বলছিএই দুই বাবু যদি বেশী বেগড়বাই করে তাহলে সোজা মগজে গুলি করবে!” বলে রিভলবারটা নিয়ে কোনোমতে চেয়ার থেকে উঠে অগস্ত্যর সামনে এসে দাঁড়ালো অশোক। তারপর অগস্ত্যর দিকে তাক করে বললো,“ Now Inspector! Your Game is over! বেশিক্ষণ আমার দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যেস নেই তুমি জানো। তাই বেশী চালাকি না করে আমার হাতে প্রমাণগুলো দিয়ে দাও দেখি?”
বেণীমাধবঅস্থিরহয়েউঠলো।ভাবগতিক সুবিধের ঠেকছে না।প্রচণ্ড রাগে তার আপাদমস্তক জ্বলে যাচ্ছে।ইচ্ছে করছে লোকটার টুঁটি চিপে ধরতে। কিন্তু ষণ্ডাগুলো তাদের দিকে বন্দুক উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।একটু নড়লেই সোজা গুলি করবে। কিন্তু এইভাবে লোকটা পার পেয়ে যাবে? লোকগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে এদের মনে মায়াদয়া বলে কোনো বস্তু নেই। এরা প্রমাণ নিয়ে ক্ষান্ত হবে বলে মনে হয় না। সে আড়চোখে অগস্ত্যর দিকে তাকায়।দেখে অগস্ত্য নির্বিকারভাবে স্থিরদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে অশোক চৌধুরীর দিকে।
অশোক চৌধুরী এবার তাড়া দেয়,“Come on Inspector! আমাদের কাছে নষ্ট করার মতো সময় নেই! Give it to me!”
অগস্ত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ,“ওটা যথাস্থানে সুরক্ষিত আছে মি: চৌধুরী। আপনার কি মনে হয় আপনার মৃত্যুবাণ আমি সাথে নিয়ে ঘুরবো?যদিও প্ল্যান সেটাই ছিলো তবে… আমি ছাড়া আর কেউ জানে না প্রমাণটা কোথায় আছে। আপনার যদি মনে হয় আপনি আমাদেরকে মেরে পার পেয়ে যাবেন তা হবে না। একদিন এমন আসবে যখন আমার মতো আরেকজন আসবে যে আপনাকে শাস্তি দেবে। তার জন্যই লুকিয়ে রেখেছি অস্ত্রটা। সে এসে খুঁজে নেবে। এবং যাই হয়ে যাক না কেন শাস্তি আপনাকে পেতে হবে।”
প্রচণ্ড রাগে রিভলবারের বাট দিয়ে অগস্ত্যর মাথায় একটা আঘাত করে অশোক চৌধুরী। অগস্ত্য মাথায় হাত দিয়ে বসে যাওয়ার আগে তাকে ধরে ফেলে। তারপর ওর শার্টের কলার চেপে বলে,“Shut up! You bloody Petty Officer! অনেকক্ষণ ধরে দেখছি তোমার মুখের চোপা। কি ভেবেছটা কি নিজেকে? হিন্দি সিনেমার অফিসার? তোমাদের দুজনকে খুন করে পুঁতে দিলে কে দেখতে আসবে? কে সাজা দেবে শুনি? তোমার আইন?”
এবার প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্যেও রক্তাক্ত অগস্ত্য মুচকি হাসে। “কে বললো আপনাকে যে আইন আপনাকে শাস্তি দেবে? আমি বলেছি আপনি শাস্তি পাবেন তারমানে তো এ নয় যে আইন শাস্তি দেবে।”
অগস্ত্যর কথা বুঝতে পারে না অশোক চৌধুরী । সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “ মানে?”
এমন সময় সাঁই করে দুটো শব্দ হয় আর ষণ্ডা দুটো মাটিতে আছড়ে পড়ে। বেণীমাধব অবাক হয়ে দেখে ষণ্ডা দুটোর পিঠে তীর গেঁথে গিয়েছে। সে মাটিতে বসে পড়ে আর তখনই খোলা দরজা দিয়ে অব্যর্থ লক্ষ্যে আরো দুটো তীর ছুটে এসে বিঁধে যায় তার সামনের দুটো ষণ্ডার গলায়। দুজনে মাটিতে টলে পড়ে। অশোক চৌধুরী অবাক হয়ে আক্রোশে বলে, “What the hell is this? মদন হা করে বসে আছো কি? Shoot that busterd!”
মদনবাবু যেন এতক্ষণ সিনেমা দেখছিলেন এবার উঠে চকিতে রিভলবার বের করে তিনটে গুলি করলেন। না দরজার দিকে নয় দুটো ষণ্ডাকে একটা করে। আর অশোক চৌধুরীর সুস্থ পা'টার মালাইচাকিতে একটা করে! অশোক চৌধুরী মুখ থুবড়ে পড়ে যান। তার হাত থেকে রিভলবারটা পড়ে যায় মাটিতে। বেণীমাধব সেটা কুড়িয়ে নেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় অবাক হলেও পরক্ষণেই সামলে নিয়ে গর্জে ওঠে অশোক,“ Traitor! ”
“No Mr. Choudhury! I'm very much loyal to my duty. তাছাড়া একজন পুলিশ হয়ে আরেক পুলিশকে এভাবে মরতে দিতে পারি? ভাগ্যিস অগস্ত্য আমাকে একমাস আগে আপনার সাথে Patch Up করে আপনার প্রতিটা পদক্ষেপে নজর রাখতে বলেছিল? নাহলে আপনাকে ধরা অসম্ভব ছিল। অগস্ত্যর প্রতিটা পদক্ষেপ আপনার কানে তোলা, প্রমাণ আছে এটা বিশ্বাস করানো, অগস্ত্যকে এখানে আনা পুরোটাই প্রিপ্ল্যানড ছিলো আমাদের। ”
“মানে? কোনো প্রমাণ নেই?”
“Unfortunately এতদিন ছিলো না। তবে এখন আছে। আপনার সমস্ত কথা আমরা রেকর্ড করেছি। তাছাড়া বর্তমানে এ বাড়ি থেকেই আপনি আর্মস পাচার করেন খবর ছিলো। তার প্রমাণ আপনার গার্ডদের ওই বন্দুকগুলো। যতদুর জানি ওগুলোর কোনো লাইসেন্স নেই। আপনাকে গরাদের পেছনে পাঠানো সময়ের অপেক্ষা। তবে আমরা তা করবো না কারন আপনাকে গরাদের ওপারে পাঠানো সহজ কিন্তু রাখা কঠিন। আপনি জেলে গেলেও অচিরেই বেরিয়ে আসবেন। তাই আপনাকে আমরা অ্যারেষ্ট করবো না। তবে এটা ভাববেন না আপনি বেঁচে গেলেন! কিষুণ ভেতরে এসো। ”
ডাক শোনা মাত্র ক্রসবো হাতে কিষুণ ঘরের ভেতর ঢোকে। মদনবাবু জিজ্ঞেস করেন,“ ওরা এসেছে?”
কিষুণ মাথা নেড়ে বলে ,“হ্যা স্যার! অগস্ত্য স্যারের উপর হামলা করা হয়েছে শুনে ওরা পুরো ক্ষেপে গেছে। কাতারে কাতারে লোক আসছে। ”
“ ওকে ! অ্যাম্বুলেন্স?”
“রেডি!”
“বেশ আমরা অগস্ত্যকে নিয়ে যাচ্ছি এদিকটা তোমরা সামলে নাও। আর Make sure কেউ সন্দেহ না করতে পারে কেমন? যাও He is all yours.”
বলে অগস্ত্যকে নিয়ে এগিয়ে যান মদনবাবু আর বেণীমাধব। পেছনে অশোক চৌধুরী ভয়ার্ত কন্ঠে চেচাতে থাকে। “এভাবে আমাকে ছেড়ে যেতে পারেন না আপনারা! এরা আমায় ছিড়ে খাবে! প্লিজ অফিসার আমি অনুরোধ করছি এভাবে ছেড়ে যাবেন না। আমাকে অ্যারেস্ট করুন! প্লিজ যাবেন না! ”
থমকে দাঁড়ান মদনমোহন বাবু। পেছন ফিরে হেসে বলেন , “সরি স্যার ওটি করতে পারবো না। পাব্লিকের Outrage বড়ো মারাত্মক! আপনাকে নিয়ে গেলে থানা ভাঙচুর হতে পারে। একা আপনার জন্য গোটা থানার স্টাফদের বিপদে ফেলতে পারি না আমি। তাছাড়া ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আপনি না বাঘ? বাঘের কি জঙ্গলের পশুদের দ্বারা কোনো ক্ষতি হতে পারে? চিন্তা করবেন না এরা বেশি কষ্ট দেওয়ার আগেই আপনি মুক্তি পেয়ে যাবেন। আচ্ছা আসি তবে? আপনার সাথে দেখা করে ভালো লাগলো। ” বলে বেরিয়ে আসেন তিনজনে।
সদর দরজা পেরোতেই একটা ভীড় ঘিরে ধরে তাদের। প্রত্যেকের হাতে কাটারি, কুড়ুল,টাঙ্গি আর কাঁধে তীর ধনুক। সকলে একদৃষ্টে অগস্ত্যর দিকে তাকায়। অগস্ত্যর ডানপাশের রগ থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “ এ ছোটো দারোগা বাবুর মাথা থেইক্যে তো পুরো রক্ত বেরইঞ্চে রে ! কি করে লাইগ্লো বটে? ঐ অশোক চৌধুরী মেরেঞ্ছে নাকি?” মদনবাবু বেণীমাধবের হাতে আলতো চাপ দিয়ে ইশারা করেন। বেণীমাধব বুঝে যায় কি করতে হবে। সে গ্রামবাসীদের জানায় আজ অগস্ত্যর সাথে বড়ো দারোগাবাবু, কিষুণ আর সে এসেছিলো। অশোক চৌধুরী তাদের ঘুষ দিয়ে বশ করতে চায় যেমনটা সে প্রতিবার করে থাকে। কিন্তু অগস্ত্য আর বড়ো দারোগাবাবু অশোক চৌধুরীর এই প্রচেষ্টায় রেগে যান তিনজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। রেগে গিয়ে অশোক চৌধুরী অগস্ত্যকে আক্রমণ করে বসে। জবাবে কিষুণ আর বড়ো দারোগাবাবু মিলে অশোক চৌধুরীকে ধরে অগস্ত্যকে বাঁচান। তারপর অশোক চৌধুরী বলে সে নাকি ওদের দেখে নেবে। প্রত্যেককে নাকি মেরে পুঁতে দেবে। এই গাঁয়ের কেউ নাকি জানতে পারবে না। বলে মদনবাবুর দিকে তাকাতেই তিনি মাথা নাড়িয়ে সমর্থন করেন। কথায় কাজ হয়। সে বৃদ্ধ প্রচণ্ড রাগে গর্জে উঠে বলে, “তাই নাকি? এত সাহসটো হইঞ্ছে ওই শয়তানটোর? ঠিক আঞ্ছে! মুরাও দেইখ্যে লিবো কি কইর্যে ও ছোটো দারোগাবাবুটোর দিকে হাত বাড়ায়! বড়ো দারোগাবাবু! তুরা উয়াকে ডাগটরখানায় লিয়ে যা ক্যানে! মুরা ইদিকটো সামলাইঞ্ছি বটে। কি রে সুবাই এখুনো হা করে বইস্যে থাইকবি লাকি বটে? চল তো দেখি! কত দম হইঞ্ছে ঐ জমিন্দারের পুতের!” বলে এগিয়ে যায় বৃদ্ধটা। পেছন পেছন হইহই করে এগিয়ে যায় একপাল সশস্ত্র গ্রামবাসী। পেছনে পড়ে থাকে দুজন ষণ্ডা রক্ষীর অচৈতন্য দেহ।
অ্যাম্বুলেন্সে করে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলে উঠলো অগস্ত্য, “জানি না কাজটা ভালো হলো নাকি খারাপ। কিন্তু এছাড়া কোনো উপায় ছিলো না স্যার।”
অগস্ত্যর পাশে বসে ফার্স্ট এইড করতে করতে বললেন মদনবাবু, “ জানি। কিছু অর্থবান নরপিশাচরা আইনের ফাঁক দিয়ে চরম অপরাধ করেও পার পেয়ে যান। বঙ্কিমবাবু ভুল বলেন নি। আইন তাদের কাছে তামাশা মাত্র যা তারা টাকা খরচ করে দেখে থাকেন আর মনে করেন আমরা কিছু করতে পারবো না। এতে ওদের কিছু ক্ষতি হয়না বটে। কিন্তু সাধারন মানুষের আইনের উপর থেকে আমাদের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে যায়। ফলে মানুষ সহজে থানায় আসে না। অবশ্য এর খানিকটা দায় আমাদের। আমাদের ঔদাসিন্য জনগণকে আমাদের বিমুখ করে তুলেছে। জনগণের বিশ্বাস আমাদের ফেরাতে হবে। জানি দেরী হবে কিন্তু হাল ছাড়লে চলবে না। ”
অগস্ত্য চোখ বুঁজে বসে আছে দেখে মদনবাবু হেসে বললেন, “ Come on অগস্ত্য! Cheer up! মনে রেখো মাঝে মাঝে পুলিশ ডিপার্টমেণ্টে থেকে এমন কাজও করতে হয় যার অনুমতি আইন দেয় না। কিন্তু মানবিকতার জন্যে, ন্যায়ের জন্যে সে কাজ করলে কোনো অপরাধ হয় না। বরং এতে এই নরপিশাচদের মনে ভয় সৃষ্ট হয়। এবার আইন বাঁচিয়ে কি করে কাজটা করবে সেটা তোমার ব্যাপার। অশোক চৌধুরী একটা নরখাদক ছিলো। আর নরখাদককে মেরে ফেলাটাই দস্তুর। আর ওকে নিয়ে বিক্ষোভের বারুদ অনেকদিন ধরেই জমছিলো। আমরা শুধু সেই বারুদে আগুন দিয়েছি। বুড়োটাকে চিনতে পেরেছো?”
“হুম! রতন কিস্কু! জগাইয়ের গ্রামের শেষ জীবিত ব্যক্তি। কাল ওর সাথেই পরিকল্পনা করেছিলাম। বলেছিলাম রাত দশটার মধ্যে চৌধুরীর বনবাংলোর সামনে দাঁড়াতে। রাত বারোটার পরও যদি আমি না বেরোই তাহলে যেন ওরা বনবাংলোতে প্রবেশ করে। ” বলে অগস্ত্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়।
ওদিকে ততক্ষণে গ্রামবাসীরা অশোক চৌধুরী সমেত সবকটা ষণ্ডাকে কচুকাটা করে বনবাংলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। যেমন করে একবার চাঁপাকে মেরে জগাইয়ের ক্ষেতে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সদ্য বিকেলে তার্পিন তেলে পালিশ করা কাঠের বাড়িতে চটকরে আগুন ধরে মুহূর্তে তা পরিনত হয়েছে লেলিহান শিখায়। সে আগুনের দাপটে সকলে বাইরে বেরিয়ে এলেও বেরিয়ে আসে নি রতন। সে মনের আনন্দে নেচে চলেছে সে লেলিহান আগুনের সামনে। যেন আজ কোনো ভীষণ পরবের দিন। নাচতে নাচতে সে ক্লান্ত হয়ে উবু হয়ে শুয়ে পড়ে মাটিতে। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে অগ্নিদেবতাকে। তারপরেই ঘটে যায় একটা অদ্ভুত ঘটনা।
প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় অশোক চৌধুরীর বাড়িটা। সাথে সাথে পুড়ে ছাই হয়ে যায় আশেপাশের গাছপালা। বিস্ফোরণের পর সকলে হতচকিত হয়ে উকি দিয়ে দেখে একটু আগেও যেখানে শুয়েছিলো রতন কিস্কু। সেখানে শুয়ে আছে একটা দগ্ধ মৃতদেহ যার ঠোটে তখনো লেগে আছে মৃদু একটা হাসি।
বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর অগস্ত্যদের অ্যাম্বুলেন্সটাও দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মদনবাবু বললেন, “ ঐযে বলেছিলাম না বাড়িতেই চোরাচালানের অস্ত্র, বোমা লুকোনো আছে? সেটাতে বোধ হয় আগুন লেগে বাড়িটাই উড়ে গেলো। একবার ভেবে দেখো দেখি আমরা কিনা একটু আগে ঐ বারুদের স্তুপে দাঁড়িয়েছিলাম। এটাই বা কম থ্রিলিং নাকি? কি হে বেণীমাধব! কিছু বলো!”
বেণীমাধব লজ্জায় চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ আগেও এই দুজনের সম্বন্ধে কি সব ভাবছিলো সেসব এখন ভাবতেই লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে তার। লজ্জা মেশানো গলায় সে বলে, “আর কি বলবো স্যার? একেবারে বারুদের বাড়িতে বসে মাংসভাত খেয়েছি ভাবতেই রোমাঞ্চ হচ্ছে। কিন্তু কি করা যাবে স্যার? সেই স্মৃতিচিহ্নও মনে হচ্ছে বেশিক্ষণ থাকবে না।”
“কেন? থাকবে না কেন?” বেণীমাধবের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকান মদনবাবু।
“কারন স্যার খাবারটা বোধহয় আমার হজম হয় নি স্যার। ইয়ে মানে দু নম্বর পেয়ে গেছে। হারামজাদাটা মনে হয় আমার খাবারে জোলাপ... উ! এই ড্রাইভার একপাশ করে দাঁড় করাও তো গাড়িটা!” বলে পেট চেপে বসে পড়ে বেণীমাধব।
বেণীমাধবের কথা শুনে হেসে ফেলে অগস্ত্য। মদনবাবু প্রথমে অবাক হলেও পরক্ষনে হো হো করে হেসে ফেলেন।
- সাহেব তালুকদার
🅒Copyright by The Reader's Corner Of Saheb