অনুসরণকারী

বুধবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২০

ঘরফেরত



কৃপিয়া ধিয়ান দিজে! ডাউন ২০১০১০১০ ডেলহি টু কলকাতা প্যাসেঞ্জার ট্রেন, প্ল্যাটফরম নম্বর দো পর খড়ি হ্যাঅ্যানাউন্সমেন্টটা শোনার সাথে সাথে ফুট ব্রিজ থেকে পায়ের গতি বাড়ালো সামসুল কিন্তু এই ভিড়ে অতো জোরে হাটা অসম্ভব তাও কোনোমতে ভিড় ঠেলে প্ল্যাটফর্মে নেমে দৌড়ে ট্রেনে ওঠা পর হাফ ছাড়লো সে  তারপর ভিড় ঠেলে কোনোমতে বাথরুমের সামনের দরজার পাশে করিডোরে বসার জায়গা  পেল সে

অবশ্য একাই নয় ওর মতো আরো অনেকে গাদাগাদি করে গোটা  কম্পার্টমেন্টে , গোটা ট্রেনে চেপেছে শুধু এই ট্রেনটাই নয় আরো অনেকে যেখানে যেখানে বাড়ি ফেরার কথা তারা সেই সেই গন্তব্য স্থলের ট্রেনে চেপে বসেছে ট্রেনে চাপার পর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল সামসুল  এই দিনও দেখতে হলো তাহলে হ্যা? রোজগারের আশায় মামার সাথে গ্রাম ছেড়েছিলো সে সেই রোজগার নেই বলে না খেতে পেয়ে মরতে বসায় বাড়ি ফিরতে হচ্ছে  ওর আজও মনে আছে সেদিনটার কথা

 উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর বাড়িতে বেকার বসে ছিলো ভাবছিলো এরপর কি করবে? তেমন মেধাবী নয় বলে স্কলারশিপ পায় নি সে আর আব্বু মারা যাবার পর বাড়ির একমাত্র রোজগেরে পড়াশুনোর সাথে সাথে কাজ চালিয়ে পরিবারের পেট চালানোর দায়ভারও সমান ভাবে সামলাচ্ছিলো সে কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজের পড়াশোনা খরচ চালানোর মতো  সামর্থ্য ওদের পরিবারে আর নেই তাই বাধ্য হয়ে পড়াশুনোর পাঠ চুকিয়ে লেগে পুরো দমে পড়েছিলো মামার সাথে কাজে কিন্তু তেমন রোজগার হচ্ছিলো না তাছাড়া মধু বেঁচে আর কতই বা রোজগার হয় তারপর প্রাণের ভয় তো আছেই  ওর আব্বুও তো মধু সংগ্রহ করতে গিয়েই দখিনরায়ের অনুচরের ভোগে লেগে গেল মামার কাছে শুনেছিলো আব্বু নাকি বনে অনেক ভেতরে চলে গিয়েছিল মামাদের ডাক শুনতে পায় নি

আব্বুকে খুব ভালোবাসতো সামসুল আব্বুও ওকে বলতো এই সব কাজে না জড়াতে সামসুল কে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিলো ওর আব্বুর ওর ছোটোবেলায় আব্বু প্রায় বলতো, “ তোকে বড়ো হতে হবে সামু, অনেক বড়ো ওই যে ভোটের সময় শার্ট, পাতলুন পড়ে বাবুরা আসে? ওই যে ঠান্ডার সময় বদর সারেং-এর লঞ্চে করে সাহেব, বিবিরা আসে ওদের মতো মস্ত বড়ো হতে হবে এই সব মউলেদের কাজ তুই একদম করবি না তুই পড়াশুনো করবি, অনেক বড়ো হবি, তারপর আমাদের কলকাতায় মস্ত বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখবি সেখানে কোনো বিপদ থাকবে না, কোনো অভাব থাকবে না, জলে-ডাঙ্গায় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা থাকবে না তোর বোনের বড়ো ঘরে নিকাহ হবে, তোর ভাইও তোর মতো অনেক পড়াশোনা করবে, তোর মাকে সোনার চুড়ি গড়িয়ে দেবো সেই চুড়িতে ঠুনঠুন শব্দ করে তোর মা রান্না করবে আর আমি আরাম করে বারান্দায় বসে সাদাকাঠি ফুঁকবো যেমন তোর  সইদুল চাচা ফুঁকে

 সামসুল কথাগুলো বেশি বুঝতো না আরো ঘন হয়ে আব্বুর কাঁধে মাথা রাখতো সে আব্বু হেসে ছোটো সামসুলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতো একটা নোনা ,সোঁদা-সোঁদা অথচ মিষ্টি গন্ধ আসতো আব্বুর গা থেকে পরে মামার সাথে গিয়ে দেখেছিলো সে আব্বুর দেহাংশের মধ্যে ডানহাতটাই অক্ষত অবশিষ্ট ছিলো বাকি শরীরটা হাটে বিক্রি হওয়া মাংসের মতো দেখাচ্ছিলো সবার ঘেন্না লাগলেও কেন জানে না সামসুলের ঘেন্না লাগে নি  তার মনে হচ্ছিল শুধু দেহাংশটুকুটাই ওর আব্বু নয় এই জঙ্গলটা, এই মৌচাকগুলো, এই বাঁদাবন সব জায়গায় ওর আব্বু জড়িয়ে আছে এমনকি ওর মধ্যেও ওর আব্বু মিশে আছে পরনের শার্টটা খুলে আব্বুর দেহাংশগুলো সেটায় করে নিয়ে এসেছিলো সে বাড়ির পেছনে দাফন করে দিয়েছিল ওর আব্বুকে

শার্টটা আজও সামসুলের কাছে আছে কখনো ভীষণ বিপদে পড়লে রক্তমাখা শার্টটা বের করে জড়িয়ে ধরে বসে সে  সে বিশ্বাস করে শার্টটা জড়িয়ে ধরে আব্বুকে ডাকলে আব্বু পথ বাতলে দেয় ওকে এই মাস প্রতিদিন শার্টটা বের করে জড়িয়ে ধরে বসে থেকেছে সে কিন্তু কোনো পথ খুঁজে পায় নি সে অবশেষে বাধ্য হয়েনা আর কষ্টের দিনের কথা ভাববে না সামসুল  অনেক কষ্টের দিন দেখেছে সে 

দেখতে দেখতে দিল্লীর এক একটা স্টেশন পার হচ্ছে আর সামসুলের মন ক্রমশ ভারী হয়ে যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত এই শহরের পাট চুকলো তাহলে! ওর মনে পড়ে যাচ্ছে বেশ কয়েকবছর আগের কথা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর পড়াশোনার পাট চুকিয়ে পুরোপুরি কাজে মন দিয়েছিলো সে  তপনকাকা, ইসমাইল চাচাদের সাথে সেও নেমে পড়েছিলো সুন্দরবনের বাঁদায় হয়ে উঠেছিলো একজন পাকা মউলে তখন তার মনে একটাই লক্ষ্য টাকা কামাতে হবে, অনেক টাকা আব্বুর স্বপ্ন পূরণ করতে হবে সামশেরকে মানুষ করতে হবে সাগিনার একটা ভালো ঘরে বিয়ে দিতে হবে আম্মিকে একজোড়া সোনার চুড়ি গড়িয়ে দিতে হবে, আর একটা ফোন হ্যা একটা ভাল দেখে ফোন নিতে হবে

গাঁয়ের মতিউরকে দেখেছে সে ইয়াবড়ো একটা ফোন নিয়ে ঘুরতে ফোনটায়  কোনো বোতাম নেই, কাঁচে আঙুল বোলালে কাজ হয় সামসুলের বড়ো শখ ওরকম একটা ফোনের মতিউরের মতো বড়ো নয় একটু ছোটো হলেই হবে গতবার গাঁয়ের তপন কাকার সাথে কলকাতায় গিয়েছিলো সে সে কি বিশাল বড়ো শহর! মনে পড়তেই মুচকি হাসে সামসুল কি ছেলেমানুষই না ছিলো তখন! নাহলে ওভাবে কেউ হারিয়ে যায়? সেই তপন কাকাকে খুঁজে পেতেই কি কান্না ওর! তখন কি আর জানতো কলকাতার থেকে বড়ো শহরে এসে কাজ করতে হবে ওকে

 

একদিন বাড়িতে ফিরে এসে দেখেছিলো ওর জালালমামা এসেছে আব্বু মারা যাবার পর জালালমামার মতো কয়েকজন গাঁ ছেড়ে বাইরে কাজে গিয়েছিলো যেমন প্রতিবছর গাঁয়ের ছেলেরা যায় মতিউর পর্যন্ত গতবছর বাইরে গিয়েছিলো গাঁ ছাড়ার আগের মামার সেই চেহারার সাথে এখনকার চেহারার আকাশপাতাল পার্থক্য ঝকঝকে জামাকাপড়, ঠোঁটে সিগারেট, আর গায়ে ফুলেল সেন্টের সুবাস  সামসুল মামার এহেন পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলো অপলকে ওর মামাকে দেখছিলো

সেদিন দুপুর বেলা সকলে বেশ আয়েশ করে খেয়েছিলো বাজার করে এনেছিলো মামা নিজে অনেকদিন পর পাতে মাংস পেয়ে খুশি হয়েছিলো সামশের আর সাগিনা খুশি হবারই কথা সামসুলের যা আয় তাতে মাসে একবার বাড়িতে মাংস আসে তাও যেদিন বেশি কামাই হয় সেদিন নাহলে মনের সুখে মুরগির ঠ্যাং চিবোতে চিবোতে মামা জিজ্ঞেস করেছি্লো,  “হ্যারে সামু! এখন কি করছিস? মানে পড়শোনা চলছে? না সব ছেড়ে দিয়ে ইসমাইলদের দলে ভিড়েছিস?” মৃদু হেসে সে সবটা জানিয়েছিলো সবটা শুনে মামা বলেছিলো, “তা শুধু মধুই বের করতে জানিস নাকি আরো কোনো কাজ জানা আছে?” ইসমাইল চাচার দলে মেশার আগে কদিন রাজমিস্ত্রির কাজও শিখেছিলো সামসুল মামাকে বলতেই মামা শুধু একটা, “হুম!” বলে থেমে গিয়েছিলো তারপর খাওয়াদাওয়ার পর নিজের পানের ডিবে থেকে একটা পান মুখে দিয়ে পেড়েছিলো প্রস্তাবখানা

প্রথমে মাকে, ভাই-বোনকে একা ছেড়ে যেতে হবে বলে একটু কিন্তু কিন্তু করেছিলো সামসুল ওর আম্মিও একটু আপত্তি তুলেছিলো বিদেশ-বিভুঁইয়ে সামসুলকে একা পাঠানোয় পরে অনেক বোঝানোয় দুজনে রাজি হয় মামার সাথে পরের সপ্তাহেই বেরিয়ে পরে সামসুল যাবার সময় আম্মি ওকে জড়িয়ে কেঁদেছিলও খুব ওরও চোখ শুকনো ছিলো না দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর কেটে গেলো রমজানের মাসে সে বাড়ি ফিরে আসে ঈদের পরের দিন ফিরে যায় কাজে এই পাঁচ বছরে একটু একটু করে টাকা জমিয়ে এক এক করে আব্বুর স্বপ্ন পূরণ করেছে সে মাটির বাড়ি ভেঙে পাকা বাড়ি তুলেছে, আম্মিকে সোনার চুড়ি গড়িয়ে দিয়েছে, সামশের আর সাগিনাকে কলকাতায় স্কুলে ভর্তি করেছে আর নিজের জন্য একটা ফোন কিনেছে এবছর একটা সেকেন্ড হ্যান্ড স্মার্টফোন কেনার কথা  সব ঠিকঠাকই চলছিলো গতবছর  আম্মিকে নিয়ে সে গিয়েছিলো কলকাতায়  নিউ মার্কেট থেকে ভাই-বোনের জন্য জামাকাপড় কিনেছিলো সাগিনার জন্য চুড়ি, সামশেরের জন্য ঘড়ি কিনেছিলো সে তখনও কি জানতো এই বছর অবস্থা এত খারাপ হয়ে যাবে  

এই বছর শুরুর দিকে কাজ করতে করতে কানাঘুষোয় শুনেছিলো কি একটা রোগ নাকি লেগেছে সারা দুনিয়ায় সেটার জন্য মড়ক লেগে যাচ্ছে দিল্লীতেও নাকি একজন এই রোগে আক্রান্ত তেমন গা করেনি সে কারন ফি বছরই কিছু না কিছু একটা রোগ লেগে থাকে এখানে গতবারও তো কি সোয়াইন ফ্লু নাকি একটা রোগ এসেছিলো যেমন হুট করে এসেছিলো তেমনই হুট করে চলে গেল ভেবেছিলো এটাও তেমনই হুট করে চলে যাবে কিন্তু দিন দিন অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে লাগলো ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে লাগলো বাড়িতে আম্মিও ওকে ফিরে আসতে বললেন কিন্তু এভাবে যে ফিরে আসা যায় না সেটা আম্মিকে বোঝাবে কি করে? চারদিকে কাজের বায়না নিয়ে বসে আছে ঠিকাদার এভাবে বললে তো ছুটি দেবে না এখন মনে হয় সেদিন আম্মির কথা শুনলেই ভালো করতো সে নাহলে এতোগুলো দিন না খেতে পেয়ে থাকতে হতো না 

আগ্রায় ট্রেন থামতে ঘোরটা কাটলো সামসুলের তাকিয়ে দেখলো গোটা আগ্রা স্টেশন শুনশান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কোথাও কোনো জনমানব নেই  কিছুক্ষন পর ট্রেনটা চলতে শুরু করলো ধীরে ধীরে পকেট থেকে ফোন বের করে দেখলো চার্জ শেষ হয়ে গেছে ফোনটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে রেখে দরজার বাইরের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সামসুল আচ্ছা আম্মি এখন কি করছে? জালালমামা কি গ্রামে ঠিকঠাক পৌছে গেছে? আর সামশের-সাগিনা? শুনেছে লকডাউনে নাকি স্কুল কলেজ সব বন্ধ লকডাউনের তিন দিন আগে নাকি ঘোষণা হয়েছিলো ওরা কি গ্রামে ফিরেছে? নাকি ওর মতো ওরাও সুযোগ পায় নি? কে জানে? বাড়ি ফিরে খোজ নিতে হবে

অবশ্য বাড়িতে কেউ জানে না যে সে ফিরছে ওই কাউকে জানায় নি বাড়ি ফিরে সবাইকে চমকে দেবে বলে লকডাউন! মাসছয়েক আগেও সে এই শব্দটার মানে জানতো না  ওর আজও মনে আছে সেই দিনটার কথা সেদিন ছিলো শনিবার প্রতি হপ্তার মতো সেই দিন সন্ধ্যের দিকে কাজ সেরে গিয়েছিলো ওর হপ্তার মজুরি নিতে  মজুরি নেবার সময় ঠিকাদার বলেছিলো  কালকের দিনটা কাজে আসতে হবে না কালকের দিন নাকি সরকার সবাইকে ছুটি দিয়েছে  দোকানপাটও নাকি বন্ধ একেই পরদিন রবিবার, তার উপর কাজে আসতে হবে না জেনে সবাই খুশি হয়েছিলো দুজন বাদে  সামসুল অবাক হয়েছিলো ঠিকাদারের কথায় যে ঠিকাদার রোদ,ঝড়-বৃষ্টিতে, এমন কি মরতে বসলেও কাজে আসতে বলে নাহলে ঝপ করে টাকা কেটে নেয় সেই ঠিকাদার কাজে আসতে নিষেধ করছে! ভ্রু কুঁচকেছিলো জালাল মামারও

টাকা পেয়ে সবাই বাজারে গিয়েছিলো বাজার করতে একে পরদিন রবিবার, তায় ছুটি সকলে দেদার মাংস, সবজি কিনে নিচ্ছিলো কিন্তু সে আর জালালমামা সে দিকের ধার মাড়ায় নি  বরং তারা মুদিখানায় গিয়ে মাসকাবারি জিনিস কিনে নিয়েছিলো আর সামসুল অবাক হয়ে দেখেছিলো বাজারের থেকে মুদিখানায় সেদিন যেন একটু বেশিই ভিড় ছিলো  কেন? সেটার জবাব পেয়েছিলো পরদিন রাতেই ঠিকাদার কে বার বার ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায় নি যারা খোঁজ নিতে গিয়েছিলো তারা গলির বাইরে যেতে পারেনি পুলিশের লাঠির বাড়ি খেয়ে ফিরে আসতে হয়েছে তারপর মাস দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছে অবস্থা ক্রমশ সঙ্গিন হওয়ায় একে একে ওদের সাথে আসা সব মজুররা বাস ট্রেনের তোয়াক্কা না করে পায়ে হেটে যে যার বাড়িতে ফিরে গেছে

ক্রমশ ওদের ভাঁড়ারেও যখন টান পরতে লাগলো কিন্তু উপার্জনের কোনো আশা দেখা গেলো না তখন জালালমামা ঠিক করলো যে সে গ্রামে ফিরে যাবে একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে জালালমামা ওকে জামাকাপড় গুছিয়ে নিতে বললো কিন্তু সামসুল যেতে চাইলো না কিনা এক রোগ এসেছে শহরের বাবুদের হাত ধরে তার জন্য সে কেন শহর ছেড়ে পালিয়ে যাবে? এরকম তো কত রোগই না আসে দিল্লীতে টীকা বেরোলে আবার উধাও হয়ে যায় এটারও বেরোবে আবার কাজ শুরু হলে তখন কি হবে? জালালমামার সাথে এই নিয়ে অনেক বাদানুবাদ হলো তার শেষে রাগ করে জালালমামাতুই মর তাহলে! আমি চললাম!” বলে নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে বেড়িয়ে গিয়েছিলো মামা সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসেছিলো সেদিন

******

হঠাৎ ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসলো সামসুল গরমে আতঙ্কে প্রবল ঘামছে কোনও মতে দরজার মাঝের খড়খড়িটা তুলে দিলো সে হাল্কা হাওয়া এসে ওর শরীরটা শীতল করে দিলো প্রায় কিন্তু ওর বুকের ভেতরটা তিরতির করে কেঁপে চলেছে  এটা কি দেখলো ? বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলো ভোর হতে বেশি দেরী নেই কিন্তু এরকম স্বপ্ন কেন? এরকম স্বপ্নের মানে কি? চোখ বুঁজে ধাতস্থ হবার চেষ্টা করলো সে কিন্তু কিছুক্ষণ আগে দেখা স্বপ্নটাই চোখের সামনে ভেসে উঠলো 

সে নদীর ধারে একটা উচুপাড়ওয়ালা জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে চারদিকে যতদুর দেখো নদীর স্রোত দেখা যাচ্ছে কিন্তু নদীটা আর পাঁচটা নদীর মতো নয় এই নদীর রঙ লাল হঠাৎ সে দেখলো একটা মানুষ নদীতে ভেসে আসছে মানুষটা বাচাঁর আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিন্তু নদীর স্রোতে কিছুতেই সাঁতার কেটে পারে আসতে পারছে না কিছুক্ষণ সেখানে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ তার মানুষটাকে চেনা চেনা লাগলো ভালো করে সে দেখার চেষ্টা করতেই চমকে গেলো কাকে দেখছে সে? এতো আম্মি! আপ্রাণ চেষ্টা করেও সাঁতার কেটে পাড়ে পৌছতে পারছে না ক্রমশ ভেসে চলে যাচ্ছে 

একমুহূর্ত সে দিকে তাকিয়ে নিজের কর্তব্য ঠিক করে নিলো সামসুল শরীরটাকে টান টান করে নিয়ে দেখে নিলো আম্মির ভাসমান শরীরটাকে তারপর একটা লম্বা লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো নদীর জলে তারপর ডুবসাঁতার দিয়ে এগোতে লাগলো আম্মির দিকে মাঝে মাঝে ভেসে দেখতে লাগলো আম্মির অবস্থানটা আম্মির কাছাকাছি পৌছতেই আম্মি চিৎকার করে উঠলো ওর নাম ধরে সামসুল প্রায় পৌছে গেছে ওর আম্মির কাছে এমন সময় একটা প্রকান্ড কালো হাত নদীর মাঝখান থেকে ভেসে উঠলো সামসুল কিছু ভাবার আগেই হাতটা আছড়ে পড়লো ওদের মাঝখানে যার ফলে নদীর জলে একটা ঢেউয়ের সৃষ্টি হলো আর তার অভিঘাতে দুজনে দুদিকে ছিটকে গেলো সামসুল ছিটকে নদীর পাড়ে আছড়ে পড়লো তারপর ঊঠে বসে দেখলো কালো হাতটা আম্মিকে ঘিরে ধরেছে ধীরে ধীরে আম্মি তলিয়ে যাচ্ছে অতল গভীরে

 

এই ছেলে ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? তাড়াতাড়ি ওঠো  আমাদের নামতে হবেবলে কে যেন ধাক্কা দিলো সামসুলকে সে চোখ খুলে দেখলো পাশে বসা মাঝবয়সি একটা লোক ওর দিকে তাকিয়ে  ওর দিকে তাকাতেই লোকটা হেসে বললো , “এই ভাবে ঘুমোলে চলবে? পরের স্টেশনে নামতে হবে তো?” তারমানে কলকাতা এসে গেছে? কিন্তু এত তাড়াতাড়ি তো পৌছোয় না ট্রেনটা  লোকটা ওর মনের কথা বুঝতে পেরে বললো, “কলকাতা এখনো দূর আছে কিন্তু ওখানে এখন নামলেই কেস চিত্তির হয়ে যাবে গেটের সামনে পুলিশ দাঁড়িয়ে দিল্লীতে যেমন চেকিং হলো তেমনই চেকিং হবে তারপর  চোদ্দ দিনের জন্য পাঠিয়ে দেবে অন্য জায়গায় বাড়ি পৌঁছতে পারবে না তাই বলছি পরের স্টেশন তালান্দুতে নাহলে মগরায় নেমে যাবে আমরাও তাই করবো  তারপর যে যার জায়গায় হয় পায়ে হেঁটে নয় গাড়িতে চল চল উঠে পড়ো  ” বলে তাড়া লাগালো লোকটা ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করতে কয়েক মুহূর্ত লাগলো সামসুলের তারপর উঠে দাঁড়ালো সে

******

বড়োরাস্তার মাঝে গাড়িটা আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লো কিছুক্ষণ পর গাড়ির খালাসী পেছনে ডালা খুলে বললো, “ট্যাংরাবিচি এসে গেছে নেমে পড়ুন ”  ব্যাগ কোলে নেমে পড়লো সামসুল তারপর ব্যাগ খুলে অবশিষ্ট সম্বলটুকু দিয়ে দিলো খালাসীর হাতে বাকিরা সেদিন তালান্দুতে নেমে গেলেও সে নামতে পারেনি নেমেছিলো একেবারে মগরাতে কিন্তু নেমে সুবিধে করতে পারেনি পুলিশ ধরে ফেলেছিল ওকে তারপর চেকিং, স্যানিটাইজিং, চোদ্দ দিনের জন্য আলাদা ঘরে থাকা, সব হয়েছে গতকাল বিকেলের দিকে ছুটি পেয়েছিলো সে কিন্তু সুন্দরবনের দিকে গাড়ি না থাকায় ট্রাক ধরে রাস্তায় গাড়ি পাল্টে পাল্টে আসতে হয়েছে তাকে গাড়ির চালকরাও সেয়ানা, ভাড়াও হেকেছে প্রচুর সামসুল প্রথমে কিন্তু কিন্তু করলেও অবশেষে রাজি হয়েছে কারন ওর কাছে বাড়ি ফেরাটাই আসল  একবার বাড়ি ঢুকতে পারলে আর চিন্তা নেই আগে যেমন করে খেটে খেতো সেভাবেই খাবে শুনেছে আগের মাসে নাকি সুন্দরবনের উপর দিয়ে বিশাল ঝড় গেছে কি যেন নাম মনে পড়ছে না তার বাড়ি ফিরে সামশেরকে জিজ্ঞেস করতে হবে

আম্মি অবশ্য বলেছিলো কি একটা ঝড় আসছে সব তছনছ হয়ে যাবে সে হেসে বলেছিলো ভাগ্যিস ওদের কাঁচাবাড়ি ভেঙে পাকা করে নিয়েছে নাহলে কি যে হতোএইসব ভাবতে ভাবতে সে খেয়াল করে সে গ্রামে ঢুকে পড়েছে  গ্রামে ঢুকে একটু থমকায় সে তারমানে এই গ্রামটাও ঝড়ের মুখে পড়েছিলো গোটা গ্রামে ঝড়ের চিহ্ন বিদ্যমান কারো বাড়ির দেয়াল ধ্বসে গেছে তো কারো চাল উড়ে গেছে  চারদিকে দেখতে দেখতে সে নিজের বাড়ির দিকে এগোতে থাকে

নিজের বাড়ির সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় সামসুল আহ! প্রায় একবছর পর নিজের বাড়িতে ফিরেছে সে বাড়িতেও ঝড়ের ছাপ বিদ্যমান এদিকে ওদিকে ডাল ভেঙে পড়ে আছে কিন্তু বাড়িটা এত থমথমে কেন? কেউ নেই নাকি? কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সামসুল ডাক দেয়, “আম্মি? আম্মি? কি ব্যাপার বাড়িতে কেউ নেই নাকি? আম্মি?” কিন্তু প্রত্যুত্তরে কোনো সাড়া না পেয়ে অবাক হয় সামসুল বেশ কিছুক্ষণ হাকডাক করার পর বাড়ির ভেতর থেকে কাতর স্বরে জবাব আসেকে?” কন্ঠস্বরটা শোনা মাত্র চিনতে পারে সামসুল যে জালালমামার গলা! সে এগিয়ে এসে বলে , “আমি সামু! মামা তুমি এখানে কি করছো?”

নিস্তব্ধতা খান খান করে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে চারটে বাক্য , “ ভেতরে আসিস না!... ফিরে যা!...কেউ বেঁচে নেই!... সবাই রোগে চলে গেছে!...” শব্দটা কানে আসা মাত্র মাথাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরে যায় সামসুলের সে ধপ করে বসে পড়ে মাটিতে ভেতর থেকে তীব্র হাঁপানির সাথে থেমে থেমে জালালমামা বলতে থাকে, “ পায়ে হেটে ২০দিনের মাথায় গাঁয়ে এসে পৌছইসেদিন আকাশ কালো করে মেঘ জমে  বৃষ্টি হচ্ছেসাথে তুমুল হাওয়াধুম জ্বরে বাড়িতে উঠলাম মাঝরাতে ঘরের চাল উড়ে গেলজ্বরে কাঁপতে কাঁপতে ভিজে তোদের বাড়িতে উঠলামপরদিন গোটা গ্রাম তছনছ বৃষ্টিতে ভিজে আরো তুমুল জ্বর এলো কদিন যেতে না যেতে তোর মামীও জ্বরে পড়লোতারপর একে একে তোর ভাই, বোন, তোর আম্মি পঞ্চায়েত থেকে , হাসপাতাল থেকে লোক এলোআমাদের সবাইকে নিয়ে চলে গেল আমরা সুস্থ হলেও সামশের আর তোর মামী হলো না  তিনদিনের জ্বরেওদের দাফন করে এলাম গাঁয়েগাঁয়ের লোক মানলো না একঘরে করে দিলো তোর বোন সহ্য করতে পারলো নাসামনের আমগাছেতোর আম্মি সহ্য করতে পারলো এটাবিষ খেয়ে  সামশের-সাগিনা সবাই গেছে আমিই ছিলামআর বোধহয়মামার কথা আর শেষ হলো না

সামসুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে ডাকলো, “ মামা?” সাড়া না পেয়ে বুঝলো ওর মামাও ওকে একা করে চলে গেছে ওকে খবরটা দেওয়ার জন্যই এতদিন বেঁচেছিলো সামসুল কিছুক্ষণ অচল পাথরের মতো চুপ করে বসে থাকলো তারপর উঠে দাঁড়ালো  তারপর বেরিয়ে গেলো নিজের বাড়ি থেকে আর ফেরার প্রয়োজন নেই তার কার জন্য ফিরবে? কেউই তো নেই! কেউ কোত্থাও নেই! মাঝরাস্তায় এসে সে অপ্রকৃতিস্থের মতো হেসে উঠলো তারপর এগোতে লাগলো অন্ধকারের দিকে

******

রাবিশ রাবিশ! তোমাকে একটা কাজ দিয়েছিলাম আমি আর তুমি এই গপ্প ফেঁদে এনেছো!” দাবড়ে উঠলেন সম্পাদক মহাশয়

কিন্তু স্যার!” আমতা আমতা করে বলে উঠলাম আমি

কি আমি? তুমি কি চাও বলো তো সরকার আমার পাব্লিকেশন বন্ধ করে দিক? এই বিতর্কিত লেখা ছাপলে কি হবে ভেবে দেখেছো? তুমি তো যাবেই তোমার সাথে আমাদের এই  পত্রিকাটাও যাবে! এত সত্যি কথা লিখতে নেই তার উপর কোনো হ্যাপি এন্ডিং নেই পাব্লিকও খাবে না শোনো এক কাজ করো লেখাটা ইরেজ করে একটা জম্পেশ প্রেমের বা গোয়েন্দা গল্প লেখো তো! কালকের মধ্যে চাই কিন্তু দাঁড়িয়ে আছো কেনো যাও!”

ঠিক আছে স্যার!”             

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এখানে মন্তব্য করুন

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...