অনুসরণকারী

শনিবার, ২৭ জুলাই, ২০২৪

কালরাত্রী



ট্রেন থেকে যখন নামলো মেহুলরা তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। আসলে ফরাক্কা পার হবার পর ধুলিয়ান নামে একটা স্টেশনে গাড়িটা বেশ অনেকক্ষ আটকেছিল। যখন ছাড়ল তখন প্রায় সুর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে অনির্বাণ আর মেহুল প্ল্যাটফর্মে নামতেই ট্রেনটা ছেড়ে দিল। ট্রেনটা চলে যাবার পর গোটা স্টেশনটা নিঝুম হয়ে গেল। মেহুল গজগজ করে উঠলো,বলেছিলাম! বলেছিলাম আমি। আজকে যেতে হবে না। এমনিতেই সারাদিন জুড়ে একের পর এক অঘটন ঘটে চলেছে। তার উপর বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মরা কাক গেটের সামনে পড়ে থাকা। বার বার বাধা পড়ছে। আজকের দিনটা যাত্রার জন্য ভালো নয়। মিলল তো?

অনির্বাণ বিরক্ত হয়ে বলল, আচ্ছা ট্রেন মাঝপথে বিগড়োলে কি সেটা আমার দোষ? আর মরা কাক, অঘটন এসব কবে থেকে মানতে শুরু করেছি আমরা? সকালে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল আর কাকটা কদিন ধরেই অসুস্থ ছিল। কদিন ধরেই দেখছিলাম সকালে বিস্কুট দিলে খাচ্ছিল না। হয়তো ঝড়ের দাপটে মরেছে। অকারণে টেনশন করছো তুমি। শোনো অভীকদার মেয়ের বিয়ে কালকে। কাল যদি বেরিয়ে আজকের মতোই অসুবিধা হত তাহলে কি বলতে তুমি?

রাখো তোমার অভীকদা!ঝাঁঝিয়ে উঠল মেহুল।মেয়ের বিয়ের দুদিন আগে নেমতন্ন দিয়ে আদিখ্যেতা দেখানো হচ্ছে। এতই যদি ভালোবাসেন তাহলে এতদিন কোনো খোঁজ নেন নি কেন?অনির্বাণ গম্ভীর গলায় বলল, আহ মেহুল! হচ্ছেটা কি? একটা ভালো মানুষের সম্পর্কে একি কথা তোমার? মনে রেখো এই অভীকদা ছিলো বলেই আজ আমাকে স্বামী হিসেবে পেয়েছ। আজ আমি যে এখানে তার পেছনে অভীকদার কতটা অবদান জানা আছে তোমার? মেহুল গজগজ করে বলল,জানি জানি। পুরোনো কাসুন্দি আর ঘাটতে হবে না। এতই যদি ভালোবাসেন একটা গাড়ি পাঠাতে পারতেন। এক কাজ করো এত রাতে তো আর গাড়ি পাবে না। তাও খোঁজ করে দেখো নাহলে রাতটা এখানেই কাটাতে হবে। বলে স্টেশনের বেঞ্চে বসল মেহুল। আর শরীর টানছে না। পেটে চারমাসের বাচ্চা নিয়ে আর কত ছোটাছুটি করা যায়? অনির্বাণ একটু দাঁড়াল তারপর স্টেশনের গেটের দিকে এগোল কোনো গাড়ি আছে কিনা দেখতে। সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখটা লেগে এল মেহুলের। আজকে আসার কোনো প্ল্যান ছিল না ওদের। কিন্তু অনির্বাণের মাসতুতো দাদার চিঠিটাই সব পাল্টে দিল।

অনির্বাণ অনাথ। মাসির বাড়িতে মানুষ। ওর মাসতুতো দাদা অভীক ওকে প্রায় কোলে পিঠে মানুষ করেছে। মাসতুতো হলেও নিজের দাদার মতোই দেখে তাকে অনির্বাণ। কলেজে পড়াকালীন ওদের প্রেম আর বাড়ির অমতে বিয়ে করায় বেশ কয়েক বছর মনোমালিন্য চলেছিল। সেই বরফ গলাতেই এই মন্ত্রণ। অনির্বাণও লুফে নিয়েছে এ আমন্ত্রণ। তবে মেহুলের পত্তি ছিল। আসলে জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোয় অনির্বাণের এই দাদা কোনো সাহায্য করেননি। এমনদিনও গেছে অনির্বাণ নিজে না খেয়ে কাটিয়েছে সারারাত। অনেক  কষ্টে একটা চাকরী জুটিয়ে অবশেষে এতদিনে সুখের মুখ দেখেছে। এই সময় হঠাৎ এই চিঠির কারসে বোঝে না। তাছাড়া আজকে আসার সময় একের পর এক অঘটন ঘটায় মনটা এমনিতেই অশান্ত হয়েছিল। আজ বার বার বারণ করছিল সে অনির্বাণকে বেরোতে। কিন্তু অনির্বাণ নাছোড়বান্দা। সে কোনো বারণ শুনল না। কতক্ষণ এভাবে বসেছিল জানে না সে কিন্তু হঠাৎ যেন ওর মনে হল কে যেন ওর শিঁওরে দাঁড়িয়ে আছে আর ওকে দেখছে। চোখ মেলে একটা মহিলাকে সত্যি সত্যিই ওর শিঁওরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠল মেহুল। ছোটো প্ল্যাটফর্মের দুপাশে দুটো পুরোনো সোডিয়াম ভেপার থাকায় আলো আঁধারীর মতো এখানে। তার উপর নিঃস্তব্ধ স্টেশন থাকায় একটা গা ছমছমে ভাব রয়েছে। এই অবস্থায় আচমকা এহেন মহিলার উপস্থিতিতে বুকটা কেঁপে উঠল মেহুলের

ধরমড় করে উঠে বসতেই মহিলা রিনরিনে কন্ঠস্বরে বললেন, আহা করছোটা কি বাছা? বসে থাকো! পোঁয়াতি মেয়ে মানুষকে এভাবে উঠতে আছে? তা হ্যা গা মেয়ে এখানকার তো মনে হচ্ছে না তোমাকে। কে তুমি? কোথা থেকে আসা হচ্ছে?” কন্ঠস্বর শুনে একটু আশস্ত হল মেহুল। যাক মহিলা স্থানীয় কেউ। এই রাতে হয়তো উনিও ওদের মতোই ট্রেন থেকে নেমেছেন। মেহুল হেসে বলল, আমি থাকি কলকাতায়। যাবো নিশীথপুর। ট্রেনটা লেট করল বলে এতক্ষণে পৌঁছেছি। আমার স্বামী গেছেন বাইরে গাড়ি আনতে। আপনি কি এখানেই থাকেন?মহিলা মৃদু হেসে জবাব দিলেন, তা বলতে পারো গাঁয়ের পুব দিকে যে কালী মন্দিরটা আচে তার পাশ দিয়ে মিনিট পাঁচেক হাটলেই আমার বাড়ি। তা হ্যা গা মেয়ে এত রাতে ট্রেন থেকে নেমেচো। এত রাতে গাড়ি পাবে তো তোমার বর?মেহুল কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় থমথমে মুখে অনির্বাণ এসে বলল, পেলাম না। অনেক রাত হয়েছে। একটাও গাড়ি তো দুর রাস্তায় কুকুর অবধি নেই। স্টেশনমাষ্টারের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম এত রাতে গাড়ি পাওয়া অসম্ভব।

তাহলে? রাতটা এই স্টেশনেই কাটাতে হবে? মেহুলের গলায় উদ্বেগের চিহ্ন। অনির্বাণ বলল, সেটা আরো রিস্কের হয়ে যাবে। স্টেশনমাষ্টার বলেছেন রাতে এই স্টেশনে নাকি শেঁয়াল, কুকুর ঘুরে বেড়ায়। ওনাকে অনেক বলাতে ওনার ঘরে আমাদের থাকতে দিতে রাজি হয়েছেন। আজ রাতটা যদি একটু কষ্ট করে…” অনির্বাণের কথা শেষ হবার আগেই মেহুল দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ইমপসিবল! ওই ঘরে আমি থাকব না। অনির্বাণ বলল, রাগ করে না সোনা, প্লিজ একটু বোঝো আমি নিরুপায়। মেহুল কড়া গলায় বলল,না মানে না। আমি জানি না তুমি কি করবে বাট ওই নোংরা ঘরে আমি কিছুতেই থাকব না। কেন তোমার দাদা আছেন কি করতে? তাকে ফোন করো!” এবার অনির্বাণও গম্ভীর গলায় বলল, “মেহুল! এ নিয়ে আমরা আগেও কথা বলেছি।” এই ভাবে যখন ঝগড়া লাগবার উপক্রম হয়েছে। এমন সময় ঐ মহিলা খিঁকখিঁক করে হেসে উঠলেন। সেই হাসিটা শোনামাত্র মেহুলের বুকটা কেঁপে উঠল। অনির্বাণও ঝগড়া থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল মহিলার দিকে।

মহিলা হাসতে হাসতে বললেন, বাপরে বাপ! ঝগড়া করতে পারোও বটে তোমরা। একদম আমি আর আমার উনির মতো। আচ্চা বেশ। আমিই একটা পথ বলে দিচ্চি। তোমরা দুজনেই আমার বাড়িতে থাকলে আপত্তি নেই তো? অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল, “আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না? কে আপনি?” মহিলা আবার খিঁকখিঁক করে হাসলেন। এবারের হাসিটা আরো বিকট। হাসিটায় এমন একটা কিছু ছিল যে অনির্বাণের ভ্রু আরো কুঁচকে গেল। এই জনমানবহীন স্টেশনে কারো থাকার তো কথা নয়। এমনকি ট্রেন থেকে নামার পর ওদের সাথে আর কাউকে প্ল্যাটফর্মে নামতে দেখেনি সে। ইনি কোথা থেকে এলেন? ভ্রু কুঁচকে মেহুলের দিকে তাকিয়ে ইশারায় মহিলার পরিচয় জিজ্ঞেস করল সে। মেহুল মাথা নাড়িয়ে জানাল সে জানে না।

মহিলা হাসি থামিয়ে বললেন, “এই তো মুশকিলে ফেলে দিলে বাছা! আমার নাম বললে তুমি চিনবে নাকো। আবার সোয়ামীর নামও মুকে আনতি পারবো না। তবে চিন্তার কিছু নেই গা। আমি তোমাদের গাঁয়েই থাকি। গাঁয়ের পুব দিকে যে শ্মশানকালী মন্দিরটা আচে তার পাশ দিয়ে মিনিট পাঁচেক হাটলেই আমার বাড়ি।

ভ্রুটা আরো কুঁচকে যায় অনির্বাণের। গাঁয়ের পুর্ব দিক মানে তো…! অনির্বাণের চিন্তার জাল সঙ্গে সঙ্গে ছিন্ন করে দিয়ে মহিলা আবার বলে ওঠেন, “সে তুমি দেকলেই চিনতে পারবে বাছা। হাজার হোক আমাদের গাঁয়ের ছেলে বলে কতা!”

“আপনি আমাকে চেনেন?” চমকে ওঠে অনির্বাণ। মহিলা আবার হেসে বলেন, “ওমা, চিনবো না কেন? সেই কত্ত ছোটো থেকে দেকচি তোমাকে। এই এইটুকু বয়সে শ্মশানের মাঠটায় খেলতে, কালীমন্দিরের আমগাছে আম নিতে গিয়ে কত্তবার তোমার দাদা মানে ঐ অভীক মিত্তিরের হাতে মারও খেয়েচ! সেই অভীক মিত্তিরেরই মেয়ের বিয়ে কাল! দেকতে দেকতে একরত্তি মেয়েটা কত্ত বড় হয়ে গেল! তুমিও তো দেকচি বিয়ে করে নতুন পোঁয়াতি বউ নিয়ে পেত্থমবার আমাদের গাঁয়ে এয়েচ।” অনির্বাণ অবাক হয়ে যায়। এতো সেই বহুযুগ আগের ঘটনা! এই মহিলা তাকে সেই সময়ে দেখেছেন? কই তার তো মনে পড়ছে না এনার সাথে সাক্ষাতের কথা। অথচ এই গ্রামের সবাইকে সে ভালো করে চেনে। অনির্বাণ মহিলাকে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় মহিলা বলে উঠলেন, ঐ দেখো কতা কইতে কইতে কত রাত হয়ে গেল। আমার কত্তা গাড়ি নিয়ে এসে পড়েচেন।এবার ওরাও যেন গরুর গাড়ির শব্দ শুনতে পেল। মহিলা এবার মেহুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, তাহলে ঐ কতাই রইল। আজ রাতে তোমরা দুজন আমাদের বাড়িতে থাকবে। এসো দিকি আমার সাথে। তা হ্যা গা ভালোমানুষের বাছারা? এই গরীব গাঁয়ের লোকের বাড়িতে একরাত থাকতে আপত্তি নেই তো?”

অনির্বাণ মৃদু আপত্তি করে বলতে যাচ্ছিল, না না সেকি কথা? আপনার অসুবিধে হতে পারে। আমরা রাতটুকু এখানে কোথাও ঠিক কাটিয়ে নিতে পারব।” কিন্তু ওকে থামিয়ে মেহুল বলল, না না আপত্তি নেই। তবে আপনার অসুবিধে হবে না তো?মহিলা হেসে বললেন, না গো মেয়ে আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না। ঘরে মানুষ বলতে আমরা দুজন কত্তা-গিন্নি। দুজনের জন্য কোনোক্রমে দিন চলে যায়। একজন তো থেকেও থাকেন না। আরেকজনের থাকা না থাকা সমান। ঘর তো ফাঁকাই পড়ে থাকে। কোনো অসুবিধে হবে না। বলে তিনি এগিয়ে গেলেন গেটের দিকে। কথাগুলোর শেষে যেন একটা হেঁয়ালিতে মেশানো বিষাদ মাখা ছিল।

অনির্বাণের মনে একটা খটকা থেকে গেল। সে মেহুলকে বলল, “Oh what's going on Mehul? why did you stop me? i think there is something fishy. একটা মহিলা যাকে চিনি না জানি না। গায়ে পড়ে আলাপ করলেন। আবার হুট করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। হতে পারে তিনি আমাকে চেনেন। কিন্তু আমার ওনাকে কিছুতেই মনে পড়ছে না। আমার মনে হচ্ছে কোথাও কোনো একটা গন্ডগোল আছে।মেহুল ঝাঁঝিয়ে বলল,তুমি থামো তো! কোথায় একজন আমাদের বিপদে সাহায্য করছেন। কোথায় কৃতজ্ঞ থাকবে তা না সব সময় এটা কেন ওটা কেন করে যাচ্ছ। শোনো থাকতে হলে তুমি থাকো এখানে। আমি চললাম।” বলে কোনো মতে উঠে দাঁড়িয়ে একটা ট্রলি ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে গেল মেহুল। কিছুক্ষণ মেহুলের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাকি লাগেজ নিয়ে এগোল অনির্বাণ।

অনির্বাণরা ব্যাগপত্র নিয়ে এগিয়ে দেখলো সত্যিই একটা গরুর গাড়ি দাঁড়িয়ে। ওরা গাড়ির কাছে এসে থমকে গেল। গাড়োয়ান হিসেবে যিনি বসে আছেন তাঁর পরনে প্রায় কিছু নেই। কেবল একটা ধুতি কোনোমতে পরা। ধবধবে সাদা শরীরের সর্বাঙ্গে রুদ্রাক্ষের মালা জড়ানোকাঁচা-পাকা দাঁড়ি-গোঁফ আর জটায় গোটা মুখটা ঢাকা। কোটরে থাকা অঙ্গারের মতো চোখে ওদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন ভদ্রলোক। কী ভয়ঙ্কর আর মর্মভেদী সেই দৃষ্টি! যেন অস্থিমজ্জার ভেতর পর্যন্ত পড়ে নিচ্ছেন তিনি। ভদ্রলোকের দৃষ্টি একবার অনির্বাণকে ছুঁয়ে চলে গেছে মেহুলের দিকে। বিশেষ করে মেহুলের গর্ভের দিকে তাঁর চোখ নিবদ্ধ। মেহুল একটু ভয় পেয়ে অনির্বাণের জামার হাতা খামচে ধরল। অনির্বাণের কেন জানে না মনে হল এই দৃষ্টি তার ভীষণ চেনা। এই ভয়ঙ্কর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি সে আগেও দেখেছে। কিন্তু কোথায় দেখেছে সেটা কিছুতেই মনে পড়ছে না।ওরা গাড়ির চালকের দিকে স্তম্ভিতভাবে তাকিয়ে আছে দেখে মহিলা বলে উঠলেন, ইনিই আমার সোয়ামী। অনির্বাণ একবার অস্ফুটে বলে উঠল, কিন্তু ইনি তো...!”

হ্যা উনি সন্নেসী। আজ থেকে অনেকবছর আগে উনি সন্নেস নেন। তবে উনি একা নন। ওনার সাথে মিও দীক্ষে নিয়ে ওনার সাধনসঙ্গিনীয়েচি। আমরা একসাথে সন্নেসধম্মো পালন করিঈশ্বরের আরাধনা করি। কেন গো ভালোমানুষের ছা? কোনো অসুবিধে আছে?শেষ কথায় একটু বিরক্তি প্রকাশ পেল মহিলার গলায়। অনির্বাণ কি একটা বলতে যাচ্ছিল মেহুল ওকে থামিয়ে বলল, না না কোনো অসুবিধে নেই। কিছু মনে করবেন না। আসলে ও একটু বেশীই কিন্তু কিন্তু করে।অনির্বাণ ফিসফিস করে মেহুলকে ইংরেজীতে বলল যাতে ওরা না বুঝতে পারে, “মেহুল বোঝার চেষ্টা করো আমার কেমন যেন একটা খটকা লাগছে। ভদ্রমহিলার স্বামীকে দেখে আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে সাধারণ কোনো সাধক তিনি নন। তাকে দেখে আমার সুবিধের মনে হচ্ছে না। ওনাদের উপর ভরসা করে আমরা বিপদে পড়ে যাবো না তো? প্লিজ আমার অন্তত একটা রিকোয়েস্ট রাখো মেহুল প্লিজ আজকের রাতটা কষ্ট করে এখানেই থেকে যাই চলো। একটা রাতের তো ব্যাপার! কাল সকালে নাহয় ফিরে যাবো।”

বিপদে আমরা তো এমনিতেই পড়ে আছি অনি! এই রাতদুপুরে জনমানবহীন স্টেশনে থাকার চেয়ে আর বড়ো বিপদ কি আসতে পারে? এখানে বসে থেকে বিপদের অপেক্ষা করার থেকে কোথাও আশ্রয় নেওয়াটা ভালো নয় কি? তাছাড়া এই বিপদে আমি আসতে চাইনি। তুমি আমাকে নিয়ে এসেছ।

- তুমি বুঝতে পারছ না মেহুল…!

- আহ তুমি থামবে? ওনারা শুনতে পেলে কী ভাববেন বলো তো? হাজার হোক এই বিপদের সময় ওনারা অন্তত আমাদের আশ্রয় দিতে চাইছেন। এইটুকুই বা কে করে? নাহলে তো ঐ স্টেশনমাস্টারের ঘরে রাত কাটাতে হত। মানছি ভদ্রলোককে দেখতে একটু ভয়ঙ্কর। কিন্তু হয়তো তার বাহ্যিক রূপটাই এরকম। ভেতর ভেতর উনিও ওনার স্ত্রীর মতোই অমায়িক। নাহলে এতদিন ধরে একসাথে আছেন কি করে? একটা মানুষকে বাইরে থেকে বিচার করা ঠিক না। তবে হ্যা ভদ্রলোক যদি একা থাকতেন তাহলে এখানেই থেকে যেতাম আমি। কিন্তু উনি তো একা থাকছেন না। ওনার সাথে ওনার স্ত্রীও থাকবেন। অতো ভয় না পেলেও চলবে।

ওরা ফিসফিস করে কথা বলছে দেখে মহিলা বলে উঠলেন, “কই হে তোমাদের গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর শেষ হল? শেষ হলে বলো আমরা রওনা দেব মেহুল এগিয়ে গিয়ে বলল, গরুর গাড়িতে কিছু অসুবিধে হবে না তো? মানে বুঝতেই পারছেন এই অবস্থায়…!” মহিলা একটু থমকে গিয়ে হাসলেন। তারপর বললেন, হবে না। এমন ভাবে খড়-বিচালী পেতে দিয়েচি যে তুলোর তোষকও হার মেনে যাবে। আর আমার সোয়ামী গরুর গাড়ি ভালোই চালান। একটুও ঝাকুনি টের পাবে নাকো। বলে মেহুল কে গাড়িতে তুলে ওর পাশে বসলেন। অনির্বাণ সমস্ত ব্যাগ পত্র গাড়ির পেছনে রেখে দিল। মহিলার স্বামীও গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির পেছনে এসে হাত লাগালেন। দুজনে মিলে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিলেন ব্যাগপত্র। তারপর সামনে গিয়ে বসলেন।

গাড়ি চলতে শুরু করলে অনির্বাণ বুঝল মহিলা মিথ্যে বলেননি। সন্ন্যাসী ভদ্রলোক সত্যিই দারুণ গাড়ি চালান। গরুর গলার ঘন্টি আর চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ না থাকলে মনে হতো যেন কোনো মোটর গাড়িতে বসে। গাড়িটা যেন উড়ে চলছে। বাতাসে শণশণ শব্দ ভেসে আসছে। মেহুল ততক্ষণে মহিলার সাথে মন খুলে গল্প জুড়ে দিয়েছে। ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও অনির্বাণের মন অন্যদিকে পড়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ওর মনে বেশ কয়েকটা খটকার জন্ম হয়েছে। হাজার চেষ্টা করেও কিছুতেই সেই খটকাগুলো তাড়াতে পারছে না সে। জনমানবহীন স্টেশনে হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই আচমকা এক অল্পচেনা মহিলা প্রায় মাটি ফুঁড়ে উদয় হয়ে মেহুলের সাথে খেজুরে আলাপ জুড়লেন। তারপর গায়ে পড়ে আচমকা নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিতে রাজি হয়ে গেলেন। আবার ওনার স্বামী নাকি সন্ন্যাসী। সব যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

গাড়িতে বসে বসে অনির্বাণ মেহুলের দিকে তাকিয়েছিল আর কথাগুলো ভাবছিল এমন সময় ওর খেয়াল হল ওর গায়ে কিসের যেন একটা মিহি অথচ গরম কিছু একটা উড়ে এসে বসছেপকেট থেকে মোবাইল বের করে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে অনির্বাণ দেখল ওর অনুমান সঠিক। সত্যিই বাতাসে অনেকটা পাউডারের মতো সাদা গুঁড়ো ভেসে আসছে। আরো আশ্চর্য হয়ে অনির্বাণ দেখল গুঁড়োগুলো উড়ে আসছে লোকটার গা থেকে। কি মনে হতে গুঁড়োগুলো আঙুল দিয়ে ঘষে নাকে ঠেকাতেই শরীরের সব স্নায়ুগুলো টানটান হয়ে গেল তার। জিনিসটা আসলে গুঁড়ো বা পাউডার নয়। ওগুলো ছাই! মড়া মানুষের ছাই! ভ্রু কুঁচকে সামনের দিকে তাকাল অনির্বাণ। খটকাটা আরো বেড়ে গেল তার।

******

বিছানায় শুঁয়ে শুঁয়ে একটা ঢেকুর ছাড়ল অনির্বাণ। আজকের ভোজনটা বেশ গুরুতরই হয়েছে। রাতের খাবারের আয়োজনটা সত্যি দারুণ ছিল। অতোরাতেও কি করে যেন মহিলার স্বামী যোগাড় করে আনলেন পাঁঠার মাংস। রান্নার স্বাদও হয়েছিল দারুমানতে হবে ভদ্রমহিলা সত্যি দারুণ রাঁধেন। এর আগেও মাংস খেয়েছে ওরা তবে এত ভালো স্বাদ পায় নি। এমনকি যে মেহুল রান্না নিয়ে এত খুঁতখুঁতে সে পর্যন্ত তৃপ্তি করে দুবার ভাত চেয়ে খেল। ভদ্রমহিলা নিজে দাঁড়িয়ে ওদের খাবার তদারক করেছেন। কষা মাংস আর গরম গরম ভাত খেয়ে ওরা যখন শুঁয়ে পড়েছে তখন প্রায় মাঝরাত। মেহুল এমনিতেই সারাদিনের জার্নিতে ক্লান্ত তার উপর খাওয়াটা বেশি হওয়ায় বিছানায় শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে। খড় বিচালী দিয়ে বেশ নরম বিছানায় শুলে ঘুম আসবারই কথা কিন্তু অনির্বাণের চোখে ঘুম নেই। ওর মনে কে যেন আজ একটা কুডাক দিচ্ছে। কোথাও একটা বড়ো গন্ডগোল হচ্ছে। কোথায় বুঝতে পারছে না। একের পর এক ঘটনাগুলো কে সাজাচ্ছে ও মাথার মধ্যে কিন্তু কিছুতেই সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। কোথায় যেন আটকে যাচ্ছে। খটকাগুলোকে কিছুতেই তাড়াতে পারছে না সে। এক সময় উঠে বসল অনির্বাণ। নাহ মাথাটা গরম হয়ে আসছে একটা সিগারেট না ধরালেই নয়।

জামার পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল অনির্বাণ। এই ঘরের বাপাশে একটা জানলা রয়েছে। জানলার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিতে দিতে ভাবতে লাগল মহিলার হাবভাবটা যেন ওর ভীষণ চেনা। আজ রান্না করতে করতে ঘোমটাটা খুলে গিয়েছিল তার। মেহুলের সাথে বসে গল্প করতে করতে সে দেখেছে মহিলা অপুর্ব সুন্দরী। গায়ের রং দুধে আলতায়, টিকালো নাক, টানা চোখ। হলদে সবুজ কটা চোখের মণি দেখে মনে হয় যেন কোনো আর্যনারী। হাসলে পরে গালে টোল পড়ে। বয়স যেন এক সময় থমকে গেছে। তবে আকর্ষণীয় জিনিস ওনার দাঁতগুলো। ক্যানাইন মানে মাংসছেঁড়ার দাঁতের উপরে দুপাশেই একজোড়া গজদাঁত। মহিলা মনে হয় অতিরিক্ত পান খান তাই দাঁতে লালচে ছোপ রয়েছে। ঐ চেহারা নিয়েই যত ধন্ধ তার মনে। কোথায় যেন দেখেছে তাঁকে। মনে করতে পারছে না। মহিলার বরও ভারী অদ্ভুত। তাকেও ভীষণ চেনা লাগছে তার, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না। ওদের নামিয়ে, রাতের খাবার জোগাড় করে গাড়িটা থেকে গরুগুলোকে খুলে কোথায় চলে গেলেন কে জানে?

সিগারেটটা শেষ করে জানলার বাইরে ফেলে দিয়ে শুতে যাবে এমন সময় একটা জিনিস খেয়াল হলে তার। আজকে চারিদিক যেন একটু বেশীই নিস্তব্ধ। অনির্বাণ যতই শহরে থাকুক না কেন সে গাঁয়ের ছেলে। সে জানে রাতেরবেলা গ্রামের একটা নির্দিষ্ট শব্দ, একটা ছন্দ থাকে। এই ছন্দ সে ছেলেবেলা থেকে উপলব্ধি করে আসছে। এই ব্যাপারটা মুখে বলে বোঝানো অসম্ভব। যারা গ্রামের ছেলে একমাত্র তারাই এই ছন্দ উপলব্ধি করতে পারে। গ্রামে আসার পর থেকে সেই ছন্দের কোনো নামগন্ধ পাচ্ছে না সে। তাছাড়া এতক্ষণ হয়ে গেল গ্রামে এসেছে অথচ কোনো রাতের পাখির ডাক সে শুনতে পায়নি। রাতের পাখি তো দুরস্থ, এমনকি একটা ঝিঁঝিঁ পর্যন্ত ডাকছে না। ব্যাপারটা কিরকম যেন অস্বাভাবিক ঠেকছে না? 

কথাগুলো একমনে ভাবতে ভাবতে অনির্বাণ বিছানায় শুয়ে খড়ের চালের দিকে তাকিয়েছিল হঠাৎ তার মনে হল জানলা দিয়ে কে যেন উঁকি দিল ওদের ঘরে। সঙ্গে সঙ্গে আড়চোখে জানলার দিকে তাকাল সে। ঘরের জানলা দিয়ে হাল্কা চাঁদের আলো আসায় অন্ধকারে চোখ প্রায় সয়ে এসেছে অনির্বাণের। সেই আলোয় সে দেখতে পেল জানলা দিয়ে একটা ছায়ামুর্তি ঘরে ঢুকছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। শরীরটা শক্ত করে চোখ আধবোঁজা করে মটকা মেরে শুয়ে রইল অনির্বাণ। ছায়ামুর্তিটা ক্রমশ এগিয়ে এল। তারপর একবার ওর মুখের দিকে তাকাল। একটা বোঁটকা গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল অনির্বাণের। তবুও সে মড়ার মতো পরে রইল ছায়ামুর্তি এবার মেহুলের দিকে এগিয়ে গেল। অনির্বাণ আড়চোখে দেখল ছায়ামুর্তিমাথাটা ধীরে ধীরে মেহুলের গলার দিকে এগোচ্ছে। আর থাকতে পারল না অনির্বাণ। ওর যা হয় হোক মেহুল আর ওর সন্তানের কোনো ক্ষতি হতে দিতে পারে না সে। ফোনের ফ্ল্যাশটা জ্বালিয়ে চিৎকার করে লে উঠল,কে?

ক্ষণিকের জন্য অনির্বাণের মনে হল যেন আশ্রয়দাত্রী ভদ্রমহিলাকে দেখল সে। তবে রাতে দেখা সেই সুন্দরী মধ্যবয়স্কা মহিলা নন। ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় যেন এক নরকের বিভীষিকা মনে হল তাঁকে। ফ্যাকাশে রক্তশুন্য মুখ। শ্বাপদের মতো চোখ। গজদাঁতগুলো যেন শ্বদন্তের মতো বেরিয়ে এসেছে। আলো পড়ার সাথে সাথে চমকে উঠলেন তিনি। তারপর জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে একলাফে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। ততক্ষণে অনির্বাণের চিৎকারে মেহুলের ঘুমও ভেঙেছে। চোখ মেলে নরকের ঐ জীবকে দেখামাত্র সে আর্তচিৎকার করে উঠল। অনির্বাণ হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল মেহুলকে। অনির্বাণের জামা খামচে ধরে ওর বুকে মুখ গুঁজে মেহুল কাঁপতে কাঁপতে জানলার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওটা কী? কী ছিলো ওটা? কি ভয়ঙ্কর মুখটা!”

অনির্বাণ মেহুলকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে বলল, কিছু না। ও কিছু না। কিছু হয়নি। ভয় পেও না মেহুল। আমি আছি তো। কিছু হবে না। বলে উঠে দাঁড়াল অনির্বাণ। মেহুলকে জড়িয়ে ধরে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল জানলার দিকে। সেই আলোয় বাইরে দেখে বুঝতে পেরেছে ওরা কোথায়। এতক্ষণ ধরে যে একটা খটকাটা ওর মাথাখারাপ করে দিয়েছিল সেটা মিটে গেছে। এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। এতক্ষণে মহিলাটিকে সে চিনতে পেরেছে। তার সেই সন্ন্যাসী স্বামীটাকেও চিনেছে সে। কেন তার দেহ দিয়ে ছাঁই উড়ে আসছিল তাও পরিস্কার এখন তার কাছে। যে জিনিসটা এতক্ষণ ধরে কিছুতেই মনে আসছিল না সেই জিনিসটা ঐ নরকের জীবন্ত বিভীষিকাকে দেখা মাত্র মনে পড়ে গেছে তার। ওর মনে পড়ে গেছে ছেলেবেলায় ঘটে যাওয়া এক ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা, যার মুলে ছিল এই সন্ন্যাসী আর তার স্ত্রীসবটা জানা সত্ত্বেও এতবছর পর আবার ওরা নিজেরই অজান্তে ওই মহিলার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে। এই ফাঁদ থেকে বেরোনো প্রায় অসম্ভব! পালাবার পথ প্রায় নেই বললেই চলে। ছেলেবেলায় এই জায়গাগুলোয় টইটই করে ঘুরে বেড়াতো বলে এই জায়গাটা ওর হাতের তালুর মতো চেনা। অনভ্যাসের ফলে আর অন্ধকার থাকায় একটু ভুলেই গিয়েছিল পথঘাটগুলো। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। কালীমন্দিরটা দেখেই আন্দাজ করা উচিত ছিলো তার। মেহুলের সাথে কথা বলতে বলতে খেয়ালই করে নি। আর কিছু করার নেই।

তাই কি? কোনো পথই কি নেই? মেহুলকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আচমকা থমকে গেল অনির্বাণ। তারপর নিজেকে প্রচণ্ডভাবে ভৎসর্না করল সে। ছিঃ! ছিঃ! এই বিপদের সময় কিসব আবোলতাবোল ভাবছে সে? কোথায় মাথা ঠাণ্ডা করে বেরোবার পথ খুঁজবে তা না কোথাকার এক পিশাচিণীর ভয়ে সে জুজু হয়ে যাচ্ছে? এই তার সাহস? এই তার পৌরুষ? এভাবে একটা সামান্য পিশাচিণীর কাছে সে হেরে যাবে? কিছুতেই না! কোথা থেকে একটা তীব্র জেদ চেপে বসল অনির্বাণের মাথায়। ওর মনে হল যেন ভেতরে সেই ছেলেবেলার ডানপিটে, জেদি, ডাকাবুকো অনির্বাণ আবার ফিরে আসছে। যে করেই হোক এখান থেকে ওদেরকে বেরোতেই হবে। হার মানলে চলবে না। এভাবে মেহুলদের চরম ক্ষতি সে হতে দেবে না, মরে গেলেও না।

চোয়াল শক্ত করে অনির্বাণ। কিছু একটা তো করতেই হবে। মেহুলদের এত বড়ো বিপদে ফেলে দিতে পারে না সে। চোয়াল শক্ত করে অনির্বাণ ফোন করে একটা বিশেষ নম্বরে। ভেবেছিল এখানে এসে দাদাকে সারপ্রাইজ দেবে, নিজে গিয়ে ভাঙবে এতবছর ধরে পাহাড়ের মতো অটুট থাকা দাদার অভিমানকেসে কারনেই এখানে পৌঁছনো মাত্র দাদাকে ফোন করেনি সে। কিন্তু পরিস্থিতিটাই বিপরীত হয়ে গেল। স্টেশনে নেমেই ফোনটা করলে এতকিছু হত না। দাদা নিশ্চয়ই গাড়ি পাঠাতেন। হয়তো নিজেই আসতেন। ভাবতে ভাবতে ফোনটা কানে ঠেকায় সে।

কিছুক্ষণ ফোনের ঘন্টি অকাতরে বেজে যাবার পর ওপার থেকে সাড়া পেতেই এক নিঃশ্বাসে সে বলে, দাদা আমি অনি। শোন একটা বড়ো বিপদে পড়েছি। আমরা এখন করালী কাপালিকের ডেরায়। কঙ্কাল ভৈরবের শ্মশাণে।” বলে সমস্ত ঘটনা জানায়। সবটা শোনার পর ওপাশ থেকে একটা উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শোনা গেলে একটু থেমে অনির্বাণ বলে, “সে আমি জানি। কিন্তু আমি পরোয়া করি না। মেহুলকে আমাকে বাঁচাতে হবেই দাদা। যে করেই হোক না কেন মেহুলকে নিয়ে আমি এখান থেকে বেরোবোই ঠিক করেছি। যদি আমি বেরোতে না পারি তাহলে মেহুলকে বের করে দেব। তোর কাছে শুধু একটাই অনুরোধ, আমার কিছু হলে মেহুলদের একটু দেখিস। কথাটা বলতে বলতে গলাটা একটু কেঁপে যায় অনির্বাণের। মেহুল অনির্বাণকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। ওপারের ব্যক্তিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোনটা কেটে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে মেহুলকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ভয় নেই মেহুল। আমি আছি তো!”

******

মোবাইলের কথা সেড়ে গুম হয়ে বসে রইলেন অভীকবাবু। একটু আগে ফোনে অনির কাছে যা শুনলেন তা নিজের কানে বিশ্বাস করতে পারছেন না। আবার করালী কাপালিক ফিরে এসেছে। কিন্তু এ যে একেবারেই অসম্ভব! কদিন ধরে অবশ্য কানাঘুষোয় শুনেছিলেন করালী কাপালিকের ডেরায় এক অপরূপ সুন্দরী মহিলাকে দেখা গেছে। এটাও শুনেছেন যে যারা ওকে দেখেছে তারা কেউ বেঁচে ফেরেনি। সবকটার রক্তশুন্য প্রায় খুবলে খাওয়া শরীর পাওয়া গেছে শ্মশানের সামনে। তিনি বিশ্বাস করেননি। ভেবেছিলেন হয়তো কোনো হিংস্র জন্তুর কাজ। গাঁয়ের কয়েকটা ছেলেপুলে নিয়ে গাঁয়ের সীমানায় পাহারা বসানোর পর জন্তুটার উপদ্রব কিছুটা হলেও কমেছিল। ভেবেছিলেন বিপদ হয়তো কেটে গেছে। কিন্তু এতদিন পর বিপদ যে আচমকা তাঁর দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াবে তা তিনি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি। তাঁরই আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে আজ অনি, বৌমা দুজনেই বিপদে পড়েছে। মেয়েটার গর্ভে অনির সন্তান। হতে পারে অনেক মনোমালিন্য, অনেক অভিমান জমে ছিল দুভায়ের মধ্যে, কিন্তু এত বছর পর অনির মুখে দাদা ডাকটা শুনে তাঁর সব অভিমান মুছে গেছে। তার মনে পড়ছে ছেলেবেলায় সব বিপদে কি ভাবে আগলে রাখতেন অনিকে। আজ এত বছর পর ভাইটা বিপদে পড়ে তাকে ডেকেছে। তিনি কি না গিয়ে থাকতে পারেন? না তিনি বসে থাকতে পারেন না। প্রাণ থাকতে ছোটোভাইটাকে এভাবে মরতে দিতে পারেন না তিনি। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। খাট থেকে নেমে দাঁড়ালেন অভীকবাবু। কি করে করবেন, কিভাবে বাঁচাবেন অনিকে জানেন না। শুধু এটুকু জানেন তাঁর অনি চরম বিপদে। যে করেই হোক বাঁচাতে হবে ওকে। দরকার পড়লে করালী কাপালিককে আবার মেরে বাঁচাবেন ওকে। ঘর থেকে বেরিয়ে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। কি মনে হতে আবার ঘরে ঢুকলেন। তারপর একটা রামদা হাতে বেরিয়ে এলেন তিনি। সদর দরজা ডিঙোতে যাবেন এমন সময় পেছন থেকে একটা মন্দ্রস্বর ভেসে এল, “এতরাতে কোথায় যাচ্ছেন অভীকদা?

পেছন ফিরে দেখলেন শাম্বর সেই তান্ত্রিক বন্ধুটা দাঁড়িয়ে। ছেলেটা ভারী ভালো। দুদিন হল এসেছে। কিন্তু এই দুদিনে গোটা বাড়ি মাত করে রেখেছে। খেয়াল করেছেন ছেলেটাকে দেখলে মন যেন অনেকটা আশস্ত হয়ে যায় ওনার। মনে হয় যেন যতক্ষণ ছেলেটা আছে ততক্ষণ কোনো অমঙ্গল ঘটবে না। ছেলেটাই ঘটতে দেবে না। তিনি অবাক হয়ে বললেন, এখনো ঘুমোওনি? ছেলেটা জবাবে বলে, “আজকের রাতটা ভীষণ গুরুত্বপুর্ণ। আজকের রাতটা যে জাগতে হবেই আমাকে। তাছাড়া এক আধ রাত না ঘুমোলে কিছু হয় না আমার।” ছেলেটার কথা মাঝে মাঝে বুঝতে পারেন না তিনি। তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকাতেই ছেলেটা বলে ওঠে, “আমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না। কোথায় যাচ্ছেন?অভীকবাবু সম্বিত ফিরে বললেন, আমি একটু কাজে যাচ্ছি। ভোরের আগেই ফিরে আসবো। তুমি চিন্তা করো না। যাও গিয়ে শুঁয়ে পড়ো। ছেলেটা এগিয়ে এসে বলে, এতরাতে তো আপনাকে ছেড়ে দিতে পারি না। বিশেষত আজকের রাতে। একটু বিরক্ত হন অভীকবাবু। একেই দেরী হয়ে গেছে তার উপর এভাবে গল্প করে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। তিনি বলেন,কেন আজ কি আছে? ছেলেটা অনুচ্চ কন্ঠে বলে, “আজ যে কালরাত্রী। আজ সকল অশুভ শক্তিরা জাগ্রত হয় শুভ শক্তিকে পরাজিত করতে। এই সময়টাতে কালের নিয়ম রক্ষা করতে সাক্ষাত মহাকালও নীরব থাকেন। এই সময় বাড়ির বাইরে বেরোনো মানে ভয়ংকর মৃত্যুকে গ্রহণ করে নেওয়া।

- কিন্তু আজ যে আমায় বেরোতেই হবে। আমার খুব কাছের একজন চরম বিপদে পড়েছে। আমার যা হয় হোক তাঁর কিছু হলে আমি সইতে পারব না।

- কে সে? কি হয়েছে তার?

ছেলেটা শান্ত হয়ে জানতে চায়।অতো সময় নেই আমার কাছে। ফিরে এসে বলব। আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে। বলে এগোন অভীকবাবু। পেছন পেছন ছেলেটাও বেরিয়ে আসে। চলুন পথে যেতে যেতে শুনে নেব। তবে আজ আপনাকে একা ছাড়তে রাজি নই আমি।বলে অভীকবাবুর সাথে পা মেলায়। অভীকবাবুর মন সায় দেয় তাতে। তার মন বলে একে বিশ্বাস করা যেতে পারে। এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, তবে শোনো…”

******

মেহুলকে জড়িয়ে ধরে আশস্ত করে অনির্বাণ। মেহুলের কান্না থামলেও তখনও সে ভয়ে কাঁপছে। অনির্বাণ একটু আগে ফোনে অভীকদাকে যা বলল এই একবিংশ শতাব্দীতে তা বাস্তবসম্মতভাবে অসম্ভব। কিন্তু একটু আগেই যে বিভীষিকাকে ও দেখল সেটাই বা অস্বীকার করে কি করে? এই মুহুর্তে নিজের প্রতি খুব রাগ হচ্ছে মেহুলের। অনির্বাণের কথা শুনে রাতটা স্টেশনে কাটালেই ভালো হত। এই মুহূর্তে নিজের আর নিজের সন্তানের জন্য বড়ো ভয় করছে তার। অনির্বাণ তখনও ওকে জড়িয়ে বসে আছে।

অনির্বাণ মৃদু গলায় বলে, “মেহুল?মেহুল কোনোমতে সাড়া দেয়, “হুম?অনির্বাণ বলে, ভয় পাচ্ছো মেহুল?মেহুল এবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অনির্বাণকে। অনির্বাণ হাল্কা হেসে বলে,ভয় কিসের? আমি তো আছি? যতক্ষণ আমি আছি তোমার আর আমাদের সন্তানের কিছু হবে না। আমি হতে দেব না। আমাদের বাঁচতে হবে মেহুল, তোমাদেরকে বাঁচতে হবে মেহুল। নিজেদের আর আমাদের সন্তানকে যদি বাঁচাতে হয় তাহলে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালাতে হবে। দাদাকে আমি ফোন করেছি। দাদা আসছে। আমাদের যে করেই হোক গ্রামের সীমানার মধ্যে পৌঁছতে হবে। একবার গ্রামের সীমানায় পৌঁছে গেলে আর চিন্তা নেই। তুমি তৈরী তো? মেহুল মাথা নাড়ায়। অনির্বাণ বলে, তাহলে চলো আর দেরী করা যাবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে বেরোতে হবে। বলে অনির্বাণ উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে।

ঘর থেকে বেরিয়ে একটু থমকে দাঁড়ায় অনির্বাণ। পেছন পেছন মেহুলও এগিয়ে আসে। বাইরের উঠোন জুড়ে কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই। এমনকি রাতের বেলা ওরা যে ঝকঝকে কুঁড়েঘর দেখেছিল সে সবের কিছুই নেই। পেছন ফিরে চাঁদের আলোয় ওরা দেখতে পায়, একটু আগেও যে ঘরটায় শুয়েছিল, বেরিয়ে আসা মাত্র সম্পুর্ণ ভোল পাল্টে গেছে সেই ঘরের। একটা ভাঙা, জীর্ণ কুঁড়েঘরের উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। অনির্বাণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারপর মোবাইলের ফ্ল্যাশটা জ্বালিয়ে মেহুলের হাত ধরে সে একটু একটু করে পা টিপে টিপে সামনের দিকে এগোয়।

কিছুদুর এগিয়ে গিয়ে একটা বাঁক পেরোতেই অনির্বাণ শ্মশানের মাঠের সামনে এসে দাঁড়ায়। অনির্বাণ তাকিয়ে দেখে চাঁদের ক্ষীণ আলোয় গোটা মাঠ ধুঁধুঁ করছে। অনির্বাণের মনে পড়ে ছেলেবেলায় এই মাঠে কত বল পিটিয়েছে ও। শ্মশানের পাশে বলে লোকজন বেশী আসতো না শুধু অনির্বাণ আর তার কয়েকজন ডাকাবুকো বন্ধুরা ছাড়া। একদিন এই খেলার সময়ই তো…! ভাবতে ভাবতে আচমকা বাস্তবের মাটিতে ফিরে আসে সে। তারপর মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলোয় পথ দেখে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাটতে থাকে। চারপাশে এক অসম্ভব নীরবতা ছড়িয়ে। যেন প্রকৃতি রুদ্ধশ্বাসে কোনো কিছুর অপেক্ষা করে চলেছে।

পথে দু-তিনবার মেহুল হোচট খেলে অনির্বাণ মোবাইলের আলো পেছনে দেখায় তারপর ধীরে ধীরে অথচ দ্রুত পদক্ষেপে এগোয় ওরা। একবার সামনের কালীমন্দির পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে আর চিন্তা নেই। কারণ ওটাই শ্মশানের সীমানা। ওটা পেরোলে আর এই পিশাচিণী কিছু করতে পারবে না। আলো দিয়ে দিক ঠিক করে এবার ওরা দ্রুত পায়ে হাটতে শুরু করে। মন্দিরের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যাবে এমন সময় মোবাইলের আলো নিভে যায়। অনির্বাণ ফোনটা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে বোঝে ব্যাটারির চার্জ শেষ। বিরক্ত হয় সে। এখনই চার্জ ফুরোতে হল? আরেকটু এগিয়ে গেলেই কালী মন্দির। সেটা পেরোলে আর চিন্তা ছিল না। অনির্বাণের চিন্তা নেই সে চাঁদের আলোয় এটুকু চলে যেতে পারবে। কিন্তু মেহুল পারবে না। কারণ একে অন্ধকারে চলার অভ্যেস নেই ওর তার উপর গর্ভবতী। কতক্ষণ হাটছে ওরা? মেরে কেটে পাঁচ মিনিট হবে। তাতেই মেহুল সাংঘাতিক হাঁপাচ্ছে। দাদা যে কতক্ষণে আসবে কে জানে? দাদা এলে মেহুলকে দুজনে মিলে ধরে নিয়ে যাওয়া যেত। মেহুলের দিকে তাকিয়ে এসব কথাই ভাবছিল অনির্বাণ। আচমকা মেহুলের গলার স্বরে সম্বিত ফেরে তার।

সামনের দিকে তাকিয়ে কি একটা দেখে ভয়ে মেহুল খামচে ধরেছে অনির্বাণের জামাটা। অনির্বাণ মেহুলের দিকে তাকাতেই সামনের দিকে ইশারা করে মেহুল। মেহুলের কথায় সামনে তাকাতেই হৃদপিন্ড স্তব্ধ হয়ে যায় অনির্বাণের। মন্দিরের আগে একটা আমগাছ। সেখানে একটা ডাল গাঁয়ের পথের দিকে নীচু হয়ে গেছেছেলেবেলায় সেই ডাল ধরেই মন্দিরের আমগাছে উঠে আম খেতো সে। চাঁদের ক্ষীণ আলোয় পিশাচিণীটাকে সেই ডালের উপর দেখতে পায় ওরা। পিশাচিণীটা অনেকটা বাদুড়ের মতো গাছের ডালটায় হেটমুন্ড হয়ে ঝুলে আছে। এই অন্ধকারেও শয়তানীটার হলদেটে সবুজ চোখদুটো জ্বলছে। প্রাণীটা একটা পাখিকে কাঁচা চিবিয়ে খাচ্ছে। দাঁত দিয়ে খুবলে খুবলে খাচ্ছে পাখিটার ডানা, মাথা। মুখের কষ দিয়ে তাজা রক্ত, পাখির পালক গড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে জমা হচ্ছে মাটিতে। একটু তাকিয়েই অনির্বাণ বুঝলো ওটা কি পাখি। অবশ্য এটাই তো ওদের প্রধান খাদ্য। পিশাচিণী মানুষের রক্তের চেয়েও বেশী ভালোবাসে কাকের মাংস। এছাড়া গর্ভবতী স্ত্রীর গর্ভস্থ ভ্রূণও তার অতীব প্রিয়খাদ্য। এই জন্যই তো ডেকে এনেছে ওদেরকে। আজ যদি কোনোভাবে অনির্বাণরা ঘুমিয়ে পড়ত তাহলে ওদের এই ঘুম আর কোনোদিন ভাঙত কিনা সন্দেহ।

পাখিটাকে খাবার পর অবশিষ্টাংশগুলো দূরে ছুঁড়ে ফেলে একটা ঢেকুর তোলে পিশাচিণী। তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে খলখল করে হেসে উঠে সে। তারপর ব্ল্যাকবোর্ডে চক বা নখ ঘষলে যে শব্দ হয় অবিকল সেই শব্দে বলে, “ধুর! রোজ রোজ কাক খেয়ে খেয়ে মুখে অরুচি ধরে গেল গা! হা! কতদিন ধরে মানুষের রক্ত খাই না। কতদিন হয়ে গেল ভ্রুণের কচি কচি মাংস চিবোইনি, ঘিলু খাইনি। আজ একটু চেইখে দেক ক্যামন লাগে। অ মেয়ে! ভয় পাসনি কো! একটুও লাগবেনি। ঐ তোদের ইনজিরি তে বলে না ঐ সূচ ফুঁটুনি যন্ত্র ওরমই লাগবে। তারপর আরামই আরাম! দেরী করিস নি তাড়াতাড়ি আয়! বলে হাতছানি দিয়ে খলখল করে হাসতে থাকে সেই পিশাচিণী।

অনির্বাণ বুঝতে পারে দুজনে একসাথে ঐ পথ দিয়ে যাওয়া অসম্ভব। একজন পেরোলেও আরেকজনকে ধরবেই ওই রাক্ষসীটা। আর কোনো পথ নেই। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল অনির্বাণ। তাহলে একটাই উপায়। পেছন ফিরে মেহুলকে বলে, আর দেরী করা যাবে না। শোনো মেহুল। যে করেই হোক আমাদের এক দমে ছুটে এই মন্দিরটা পেরোতেই হবেমন্দিরটা পেরোলে সোজা আঠাশ পা হেটে বাঁদিকে গিয়ে দশ পা হেটে যাবে। তারপর ডানদিকে গুনে গুনে একুশ পা হাটলেই মন্দিরের পুরোহিতের বাড়ি। পুরোহিতের বাড়ি আসার আগে যদি দাদাকে পেয়ে যাও তাহলে তো কথাই নেই। কিন্তু না পেলে যেভাবেই হোক না কেন সোজা পুরোহিতের বাড়িতে আশ্রয় নেবে। একদম ভয় পাবে না। আমি তো আছিই। চিন্তা নেই।

আর তুমি?মেহুল কাঁদো কাঁদো গলায় বলে। অনির্বাণ একটু থমকে মেহুলের দিকে তাকায়, তারপর বলে, “আমি ঠিক তোমার পেছনে থাকবো। তবে একটা কথা! যাই হয়ে যাক না কেন পুরোহিতের বাড়ি না পৌঁছনো পর্যন্ত কিছুতেই পেছনে তাকাবে না তুমি। কথা দাও মেহুল।” বলে মেহুলের দিকে নিজের হাত বাড়ায় অনির্বাণ। অনির্বাণের হাত ধরে মেহুল কেঁদে ফেলে। “সব আমার দোষ! সব কিছু আমার জন্য হয়েছে!” বলে অনির্বাণের হাত নিজের কপালে ঠেকায় সে। অনির্বাণ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “এই বোকা মেয়ে! একদম কাঁদবে না! আমি তো আছি। এতে তোমার কোনো দোষ নেই। সব ভগবানের ইচ্ছে। ওসব কথা বাদ দাও, এখন একটাই জিনিস matter করে আমার কাছে আর সেটা হল তোমাদের বাঁচানো। তোমাকে বাঁচতে হবে মেহুল। আমার জন্য, আমাদের সন্তানের জন্য। আমি বাবা হয়ে, একজন স্বামী হয়ে তোমাদের ক্ষতি হতে দিতে পারি না। আমার যা হয় হোক। তুমি কথা দাও, তুমি পেছন ফিরে তাকাবে না। Be strong Mehul! Promise me তুমি তাকাবে না। কি হলো? Promise me! মেহুল কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ায়। অনির্বাণ হেসে বলে, That's my girl! চলো যাওয়া যাক। বলে মেহুলের কপালে একটা চুমু খেয়ে দুজনে মিলে ছুটতে শুরু করে

অনির্বাণ ছুটতে ছুটতে স্প্রিন্ট টানতে শুরু করে। ছেলেবেলায় ত্রৈলোক্যমাষ্টার ওকে আদর করে মৃগশিখা বলতো। বদমাইসি করলে সেটা শাখামৃগ হয়ে যেত। কারণ ওর পায়ে যেমন হরিণের গতি, তেমনই হনুমানের মতো যখন তখন লাফিয়ে গাছে উঠে যাওয়া। স্কুলে হাই জাম্প, লংজাম্প আর দৌড়ে কতবার যে ও প্রথম হয়ে গাঁয়ের মান বাঁচিয়েছে তার ঠিক নেইবিয়ের পর একটু মোটা হয়ে গেলেও ইদানিং জিম করার ফলে শরীরটাকে সে কিশোর বয়সের আকারে ফিরিয়ে এনেছে। পায়ের সেই গতিকে সে আবার আয়ত্ত করেছে নিজের মধ্যে। এবার এই জন্মগত প্রতিভা কাজে লাগাতে হবে। যে করেই হোক ঐ পিশাচিণীকে ধরাশায়ী করে আটকাতে হবে। অন্তত যতক্ষ পর্যন্ত মেহুল মন্দির পার না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্তএকবার মেহুল চলে গেলে আর চিন্তা নেই। অনির্বাণ গতি বাড়ায় ক্রমশ জোরে আরও জোরে।

পিশাচিণীর প্রায় দশ মিটার কাছে পৌঁছে অনির্বাণ শূন্যে লাফিয়ে একটা লাথি ছুঁড়ে দিল পিশাচিণীর বুক লক্ষ্য করে। বাতাসে একটা মৃদু ধপ শব্দ হল। পিশাচিণীকে নিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল অনির্বাণ। পাশ দিয়ে মেহুল দৌড়ে গেল সোজা গাঁয়ের দিকে। পা-টা পিশাচিণীর বুকে লাগলেও অনির্বাণের মনে হল যেন কোনো পাথরে পা-টা সটান আছড়ে পড়েছে। মাটিতে শুঁয়ে অনির্বাণ দেখল মেহুলের ছায়াটা ক্রমশ দুরে চলে যাচ্ছে। পিশাচিণী মাটি থেকে উঠে মেহুলকে লক্ষ্য করে এগোতে যাচ্ছিল এমন সময় অনির্বাণ একটু গড়িয়ে গিয়ে অপর পা দিয়ে পিশাচিণীর পায়ে একটা মারাত্মক ল্যাং মারতেই সে মুখ থুবড়ে আবার মাটিতে পড়ে গেল। আর মাটিতে পড়ামাত্র অনির্বাণ নিজের সর্বশক্তি দিয়ে জাপটে ধরল পিশাচিণীর দুটো পা

শিকার ফস্কে যাচ্ছে দেখে গর্জে উঠল পিশাচিণী। তারপর নিজেকে অনির্বাণের হাত থেকে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগ কিন্তু অনির্বাণ নাছোড়বান্দা, কিছুতেই সে পিশাচিণীকে ছাড়বে না। পিশাচিণী যখন আচড়ে, কিল-ঘুষি, লাথি মেরেও নিজেকে ছাড়াতে পারল না তখন ওকে নিয়ে দু’হাতে ভর দিয়ে নিজেকে মাটিতে ঘষটে ঘষটে এগোতে লাগল। অনির্বাণ প্রাণপণ চেষ্টা করেও পিশাচিণীকে আটকাতে পারল না। একটা পরজীবী পশুর মতো ওকে টেনে হিচড়ে এগোতে লাগল পিশাচিণীটা। কিন্তু বেশীক্ষ এগোতে পারল না। মন্দিরটার কাছে আসামাত্র কিসে একটা ধাক্কা খেয়ে অনির্বাণকে নিয়ে পেছন দিকে ছিটকে গেল সে। সেই ধাক্কার চোটে বাতাসে কিছুক্ষণ ভেসে থাকার পর মাঠের উপর মুখ থুবড়ে আছড়ে পড়ল অনির্বাণ। তারপর মাথা তুলে দেখল মেহুল কালী মন্দির পার হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে ওর ছায়াটা। সে দিকে তাকিয়ে একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। পেরেছে! অবশেষে সে পেরেছে। নিজের সন্তান আর স্ত্রীকে বাঁচাতে পেরেছে সে। আর চিন্তা নেই। দাদা ঠিক বাঁচিয়ে নেবে মেহুলকে। এখন মরেও শান্তি।

নিজের শিকার হাতছাড়া হওয়ার আক্রোশে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে একটা রক্তজল করা গর্জন করে ওঠে পিশাচিণী। অনির্বাণের মনে হয় যেন সেই গর্জনে ওর কানের পর্দা ফেটে যাবে।  কিছুক্ষণ দাপাদাপি করার পর পেছন ফিরে অনির্বাণের শরীরটাকে এক হাতে তুলে আমগাছটা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে ফেলে পিশাচিণীআবার কিছুক্ষণ হাওয়া ভেসে উঠে সোজা গাছের গুড়িতে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অনির্বাণ। চোখের পলকে গাছের সামনে পৌঁছে পিশাচিণী অনির্বাণের চুলের মুঠি ধরে গর্জে ওঠে, সোয়ামী-ইস্তিরির খুব পেরেম না? খুব রক্ষেকত্তা হয়ে বাঁচানো হচ্চে! তোর পোয়াতি বউটা তো বেঁচে গেল! তোকে কে বাঁচাবে শুনি?বলে অনির্বাণকে দু’হাতে তুলে নিয়ে গাছের গুঁড়ি লক্ষ্য করে আবার ছুঁড়ে মারে পিশাচিণীগাছের গুঁড়িতে ধাক্কা খাওয়ামাত্র  কঁকিয়ে ওঠে অনির্বাণ। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মাটিতে শুয়ে পড়ে সে। মুখ দিয়ে ভলকে ভলকে রক্ত বেরিয়ে আসে তারসেটা দেখে পিশাচিণী খলখল করে একটা রক্তজল করা অট্টহাসি হেসে ঝাঁপিয়ে পড়ে অনির্বাণের উপর। আচড়ে, কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে তোলে ওর গোটা শরীর। অনির্বাণ হাজার প্রতিরোধ করলেও কিছুতেই ঠেকাতে পারে না পিশাচিণীকে। পিশাচিণী অনির্বাণের হাত দুটো একহাতে শক্ত করে চেপে ধরে, তারপর অনির্বাণের গলা লক্ষ্য করে কামড় দেওয়ার জন্য মুখটা এগিয়ে আনে। অনির্বাণ বোঝে তার অন্তিম সময় আসন্ন। সে মৃদু হেসে মেহুলের কথা ভাবতে ভাবতে চোখ বুঁজে ফেলে অন্তিম পরিনতিকে গ্রহণ করার জন্য।

হঠাৎ একটা নীলাভ আলোয় চারপাশ ভরে ওঠে। অনির্বাণের মনে হয় ওর উপর থেকে যেন কীসের ধাক্কায় ছিটকে সরে গেছে পিশাচিণীটা। চোখ মেলে দেখে সেই পিশাচিণী পাশে পড়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছে। ওর গোটা শরীরে নীলাভ পাউডারের মতো একটা পদার্থ ছড়ানো। সেই পদার্থে ক্রমশ পুড়ে যাচ্ছে তার শরীরটা। প্রচণ্ড যন্ত্রণার ফলে চারদিক কাঁপিয়ে আর্তচিৎকার করছে সে। ক্রমশ চিৎকার মিলিয়ে আসে বাতাসে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একসময় স্থির হয়ে যায় পিশাচিণীর দেহটা, তারপর ক্রমশ ছাই এর মতো বাতাসে মিলিয়ে যায়। ক্লান্তিতে চোখ বুঁজে আসে অনির্বাণেরজ্ঞান হারানোর আগে মেহুলের গলা শুনতে পায় সেকারা যেন ছুটে আসছে ওর দিকে। আর চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতে পারে না অনির্বাণ। জ্ঞান হারাবার আগে অনির্বাণের মনে হয় কে যেন ওর মাথাটা কোলে তুলে নিয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিটা কে সেটা বোঝার আগে জ্ঞান হারায় সে।

******

জ্ঞান ফেরার পর চোখ মেলে তাকিয়ে নিজেকে একটা ঘরে আবিষ্কার করে অনির্বাণ। সুর্যের নির্মল আলোয় ঘরটা আলোকিতএকটু যে উঠে বসবে তার জোরটুকু নেই অনির্বাণের। গোটা শরীর যন্ত্রণায় টাঁটিয়ে উঠেছে। বাপায়ে সাড় নেই একদম। চোখ মেলে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর একটু ধাতস্থ হয়ে চারদিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে অনেক লোকের উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে পায় সে। কান্নার শব্দে পাশ ফিরে দেখে বিছানার পাশে ওর হাত ধরে মেহুল বসে আছে। দেখেই বোঝা যায় সারারাত কেঁদে ভাসিয়েছে মেয়েটা। মেহুলকে দেখে বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করতেই অপর পাশ থেকে আরেকটা শক্ত হাত ওর বুক ছুঁয়ে ওকে শুইয়ে দিল। অনির্বাণ শুনতে পেল ওর দাদার কণ্ঠস্বর, একদম উঠবি না! চুপচাপ শুয়ে থাক। হাড়গোড় যেমন ভেঙেছিস, তেমনই গোটা বিয়েবাড়িটা এবার শুয়ে শুয়ে কাটাবি! এহ ভারী আমার বীরপুরুষ এসেছেন!আমার কিছু হয়ে গেলে মেহুলদের দেখিস!’ এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দেব তোর! বড্ড লায়েক হয়ে গেছ না তুমি? তোমার খবর আছে হতভাগা! এখন থেকে সুস্থ না হওয়া অবধি ঘরের বাইরে বেরোনো বন্ধ!

প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্যেও কন্ঠস্বরটা শুনে চোখ বুঁজে আনমনে হেসে ফেলে অনির্বাণ। কতদিন পর দাদার বকুনি শুনতে পাচ্ছে সে! ঠিক সেই ছেলেবেলার মতো! একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দাদার দিকে তাকায় সে। অভীকবাবু তখনও বলে চলেছেন, “আর বৌমা তোমারও বলিহারী! স্টেশনে পৌঁছে একটা ফোন করলেই তো চলে আসতাম আমিকোথায় স্টেশনে পৌঁছে আমাকে ফোন করবে তা নয়, তোমরা কিনা সোজা চলে গেলে একজন অজানা অচেনা মানুষের ঘরে? কেন আমরা কি মরে গেছি নাকি? অনিটা নাহয় বোকার হদ্দ। কিন্তু তুমি এই ভুলটা করলে কি করে?  যাক গে বিপদ থেকে তোমরা মানে মানে ফিরে এসেছ এই ঢের। তবে একটা কথা জেনে রাখো, যতদিন পর্যন্ত ও সুস্থ না হচ্ছে ততদিন তুমি এই বাড়িতে আমার মেয়ের মতো থাকবে। এটা শুধু তোমার অনিরই নয়, তোমারও বাড়ি। এই বাড়িতে যতটা অধিকার, যতটা আদর এবাড়ির মেয়েরা পেয়ে এসেছে। আজ থেকে তুমিও সেই আদর, সেই অধিকার পাবে। এটা আমি, অভীক মিত্তির কথা দিচ্ছে তোমাকে।”

অভীকবাবুর কথা শুনে মেহুলের কান্না আরো বেড়ে যায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে হেসে অনির্বাণ বলে, “বলেছিলাম না মেহুল? দাদা আমার যতই বাইরে থেকে রাগ করুক না কেন? ভেতর ভেতর একদম মাটির মানুষ! দেখলে তো? কিভাবে আমাকে বাদ দিয়ে তোমাকে আপন করে নিল? তোমারই বাজার এখন! লুটেপুটে নাও!” মেহুল অনির্বাণের হাত ধরে কাঁদতে থাকে। অভীকবাবু অনির্বাণের হাতে চাপড় মেরে বলেন, “এক থাপ্পড় মারব হতভাগা! আবার উল্টোপাল্টা কথা বলে মেয়েটাকে কাঁদাচ্ছিস!” তারপর মেহুলের মাথায় হাত বুলিয়ে ধরা গলায় বলেন, “ব্যস! ব্যস! আর কাঁদতে হবে না! বোকা মেয়ে কোথাকার! ওর কথা ধরতে আছে? পাজি ছেলে একটা! ওর কথায় একদম কাঁদবে না! যদি আবার কাঁদায় আমাকে বলবে, আমি ওকে দেখে নেব। এখন তুমি যাও। অনির কাছে আমরা আছি। আর কোনো চিন্তা নেই। সারারাত অনেক ধকল গেছে, ভালো করে ঘুম হয়নি, এখন একটু বিশ্রাম নেবে যাও। বিকেলে সবটা শুনবো তোমার কাছে। এই কে আছো? বৌমাকে মেয়েদের ঘরে নিয়ে যাও। আর এই যে তুমি। তোমায় কি বলে যে ধন্যবাদ দেব জানি না ভাই। কাল তুমি ছিলে বলেই ওদের বাঁচাতে পেরেছি। না হলে যে কি হত? ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠছে।

একটা মৃদুমন্দ্র অথচ নম্র স্বর শুনতে পায় অনির্বাণ,আরে আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন কেন অভীকদা। ধন্যবাদ পাওয়ার মতো কিছু করিনি আমি। আমি শুধু আপনার সাহায্য করেছি। এখন আমাদের দেখা উচিত অনির্বাণবাবুকে। উনি আগে সুস্থ হয়ে উঠুন। যেভাবে পিশাচিণীটা ক্ষেপে উঠে আক্রমণ করেছিল, আমাদের একটু দেরি হয়ে গেলে একটা ভালোমন্দ হতেই পারত। মা মহাকালী আর কালভৈরবের অসীম কৃপা যে কিছুই হয়নি।

বিকেলবেলা বাড়ির বারান্দায় সকলে চা নিয়ে বসেছে। বিয়েবাড়ির আয়োজন প্রায় শেষ। একটু পরেই বর এলে ব্যস্ততা শুরু হবে। তাই সব আয়োজন শেষ করে বাড়ির মেয়েরা সাজতে বসেছে। থেকে থেকে অন্দরমহল থেকে ওদের হাসির কলতান ভেসে আসছে। বাইরে প্রায় বাড়ির সকল পুরুষেরা সাজগোজ সেরে বারান্দায় বসে চায়ের কাপ হাতে গল্প করছে। অনির্বাণও সেজেগুজে অভীকবাবুর কাঁধে ভর দিয়ে ঘরের বাইরে এসে বারান্দার আরামকেদারায় বসেছে। দেখেই বোঝা যায় দুজনের মধ্যের দুরত্ব প্রায় ঘুঁচে গেছে। দুজনে পাশাপাশি বসে খোশমেজাজে গল্প করছেন। বেশিরভাগই পুরোনোদিনের কথা, আর গাঁয়ের লোকদের হালচালের খবর। বাতাসে সুস্বাদু সব খাবারের গন্ধ ভেসে আসছে। সব মিলিয়ে একটা আনন্দের আবহাওয়া। তবু একটা চাপা কানাঘুষো চলছে সকলের মধ্যে কালরাতের ঘটনা নিয়ে।

কথা বলতে বলতে অভীকবাবু বললেন, শোন অনি, আজ যে তুই বেঁচে আছিস তার একমাত্র কারণ এই যে ছেলেটা বসে আছে, এর জন্য।অনির্বাণ হেসে বলে, তা আর জানি না? আপনাকে আমি চিনি না তবুও বলছি আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আপনি না থাকলে হয়তো আমি কার রাতেই মারা পড়তাম।” ছেলেটা হেসে বলে, “এভাবে বলবেন না। ঈশ্বর তাকেই সাহায্য করেন যিনি নিজেকে নিজে সাহায্য করেন। আপনি যদি সাহস করে ফোনটা না করতেন তাহলে আমরা হয়তো জানতেও পারতাম না আপনাদের কথা। বলতে পারেন আপনার ফোন করাটাই আপনাদের বাঁচিয়েছেঅভীকবাবু বলেন, “সে তুমি যতই বলো! তুমি যে কতটা শক্তিধর তা আমি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। শক্তিধর না হলে ঐ ভয়ঙ্কর পিশাচিণীকে হত্যা করা অসম্ভব ছিল। আসলে এই গ্রামে আসার সময়ই ঐ আমগাছটা দেখে আর শ্মশানের নিস্তব্ধটা দেখেই খটকা লেগেছিল। পরে অভীকদাই সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন। বাকিটা আমি আন্দাজ করেছি আজ সকালে।

এমন সময় পাশ থেকে অনির্বাণের পিসতুতো ভাই শাম্ব বলে ওঠে, ওভাবে নয়! একেবারে শুরু থেকে বলো। ছেলেটা হেসে বলে, সবটা বলতে শুরু করলে রাত কাবাড় হয়ে যাবেআচ্ছা বেশ সংক্ষেপে বলছি। ঘটনার সুত্রপাত আজ থেকে চোদ্দবছর আগে। চোদ্দবছর আগে এ গ্রামের শ্মশানে সস্ত্রীক আশ্রয় নেন এক তান্ত্রিক। গ্রামের লোক প্রথমে কিন্তু কিন্তু করলেও পরে মেনে নেয় ওদেরকে। কারন ওদের ব্যবহার। স্বামী-স্ত্রী দুজনে গ্রামের সকলের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে চলতেন। বিশেষ করে তার স্ত্রীর অমায়িক ব্যবহার গ্রামের সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। তান্ত্রিক কারো সাতেপাঁচে থাকতেন না। স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামের এককোণে নিভৃতে মায়ের আরাধনা করতেন। গ্রামের লোকের দেওয়া চালডাল ফুটিয়ে খেতেন দুজনে। এমনিতে সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু একদিন একটা অঘটন ঘটে গেল। একদিন সকালে মাধুকরী করতে গিয়ে সাপের কামড়ে প্রাণ হারালেন তান্ত্রিকের স্ত্রী।

স্ত্রীর এই আকস্মিক মৃত্যুতে কার্যত দিশেহারা হয়ে যান তান্ত্রিক। নিজের স্ত্রীকে তিনি বড়ো ভালোবাসতেন। এতটাই যে কালের নিয়ম উপেক্ষা করে একের পর এক তন্ত্র প্রয়োগ করে বসেন নিজের স্ত্রীকে ফিরে পাবার জন্য। কিন্তু একে একে সব তন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়। হায় তখন যদি তিনি বুঝতেন যে জীবন-মৃত্যু মহাকালের হাতে। তার ইচ্ছে ছাড়া একটা গাছের পাতাও নড়ে না। সে যাই হোক একে একে সব রকম তন্ত্রে ব্যর্থ হবার পর অবশেষে একটা পথ বাকি রইল তার কাছে। নরবলির পথ। মা কালীর কাছে নরবালক বলি দিয়ে সেই বলি প্রসাদস্বরূপ রক্ত মৃতদেহকে খাইয়ে তার উপর শব সাধনা। এইভাবে সাধনা করে কোনোদিন সিদ্ধিলাভ হয় না। বরং বলিপ্রদত্ত মানুষের আত্মা রুষ্ট হয়। আর তান্ত্রিকের সাধনক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া এসব অসৎ উপায়ের সাধনা বেশীদিন চলেও না। তান্ত্রিকেরও এই সাধনা দীর্ঘদিন চলল না। গ্রামের বাচ্চারা একের পর এক উধাও হতে থাকলে গ্রামের লোকদের সন্দেহ হতে লাগল। তারপর একদিন ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা।

গ্রামের কয়েকজন ছেলে শ্মশা সংলগ্ন মাঠে একদিন ফুটবল খেলছিল। খেলতে খেলতে বলটা তান্ত্রিকের কুটিরের সামনে চলে যায়। একজন সেই বল আনতে গিয়ে অনেকক্ষণ না ফিরে আসায় বাকি ছেলেগুলোর সন্দেহ হয়। ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে ডাকাবুকো সে সকলকে অপেক্ষা করতে বলে এগিয়ে যায়। যাবার আগে সঙ্গীদের বলে যায় তারও যদি ফিরতে দেরী হয় তাহলে সকলে যেন গ্রামের লোকজন ডেকে আনে। অনেকক্ষ অপেক্ষা করার পরও ডাকাবুকো ছেলেটারও কোনো সাড়া না পেলে সকলে মিলে গ্রামে ফিরে যায়। এই ডাকাবুকো ছেলেটা আর কেউ নয়, আমাদের অনির্বাণবাবু।”

কিছুক্ষণ পর গ্রামের লোকেরা তান্ত্রিকের কুটিরে হানা দিয়ে তান্ত্রিককে হাতেনাতে ধরে ফেলে। তান্ত্রিক সেই দুই ছেলেকে ধরে বেঁধে বলি দিচ্ছিল। হয়তো সময় মতো গ্রামবাসীরা না পৌঁছলে বলি দিয়েও ফেলতো। তান্ত্রিককে ধরার পর গ্রামবাসীরা বুঝতে পারে কোন কারণে গ্রামের ছেলেরা উধাও হয়ে যাচ্ছে। ক্রোধোন্মত জনতা তান্ত্রিক আর তান্ত্রিকের স্ত্রীর মৃতদেহটাকে পুড়িয়ে দেয়।  তারপর গ্রামের পুরোহিতের নির্দেশে সেই মড়ামানুষের ছাঁইটাকে শ্মশানের পাশের নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

এরপর দীর্ঘ চোদ্দবছর কোনো উপদ্রব ছিল না। কিন্তু মাসদুয়েক আগে আবার এক নতুন উপদ্রব শুরু হয়। অবশ্য এর পেছনে কোনো মানুষের হাত ছিল না বলতে পারো ঘটনাটা সম্পুর্ণ কাকতালীয় বা প্রকৃতির আজব খেয়ালমাত্র। চোদ্দবছর আগে গ্রামবাসীরা তান্ত্রিক আর তার স্ত্রীর পোড়া ছাঁই নদীতে ফেললেও সেদিন সম্পুর্ণ ছাঁই নদীতে মেশেনি। বরং যে ভাঙা কুলোয় ছাঁইটা ফেলা হয়েছিল, কিছুটা অবশিষ্ট চিতাভষ্ম নিয়ে সেটা নদীর ধারেতে পড়েছিল।

“একদিন প্রকৃতির আপন খেয়ালে শ্মশানের পাশের নদীতে একটা নারীর মৃতদেহ ভেসে গ্রামের শ্মশানের পাড়ে এসে পৌঁছয় আর সেই মৃতদেহের সাথে সেই কুলোয় থাকা অবশিষ্ট চিতাভষ্মের স্পর্শ ঘটে। যার ফলে এই অঘটনটা ঘটে যায়। চিতাভষ্ম স্পর্শমাত্র সেই তান্ত্রিকের স্ত্রীর অতৃপ্ত আত্মা বাসা বাধে সেই নারীর মৃতদেহে। মৃতমানুষের দেহে অন্য আত্মার প্রাণসঞ্চার বড়ো ভয়ংকর বিষয়। সাধারণ আত্মা প্রবেশ করলেই গুণিনদের গলদঘর্ম হতে হয়, আর এখানে তো এমন এক অতৃপ্ত আত্মা যে কিনা একসময় নিয়মিত বলির রক্তপান করছিল, সেই আত্মা প্রবেশ করেছে। বুঝতেই পারছেন এরফলে কতটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটে গিয়েছিল। তান্ত্রিকের স্ত্রীর সেই ভয়ঙ্কর রক্তপিপাসু প্রেত মানবদেহরূপী আধার পেয়ে যাওয়ায় এক ভয়ঙ্কর পিশাচিণীতে পরিণত হয়।”

“ওভাবে মৃতদেহ সৎকার হওয়ায় বিদেহী অবস্থায় গ্রামের মানুষের উপর রাগ তো ছিলই। পিশাচিণীরূপ গ্রহণের পর সেটা প্রতিহিংসায় পরিণত হয়। আর তারই খেসারত দিতে হয় গ্রামবাসীদের। এই পিশাচিণীরা অপূর্ব রূপসী হবার সাথে সাথে অসম্ভব কুহক শক্তিসম্পন্না হয়। এদের মায়া বা কুহক থেকে বেরোনো প্রায় অসম্ভব। এই মেয়েটি রোজ নিজের রূপ বা কুহকের জালে জড়িয়ে শিকার ধরতকথার জালে বা রূপের মোহে হরণ করত বাস্তব বুদ্ধিটুকু। তারপর সুযোগ বুঝে সেই সব মানুষদের রক্ত পান করে হত্যা করত। অনির্বাণবাবুদের আশ্রয়ের টোপ দেখিয়ে নিয়ে গেছিল অবশ্য। তবে ওদের কুহকের বেশিরভাগই চিতাভষ্মকেন্দ্রীক তাই আসার দিন গারোয়ানের মানে সেই পিশাচিণীর স্বামীর দেহ থেকে ছাঁই উড়তে দেখেছিলেন অনির্বাণবাবু

আমার খটকা লেগেছিল গ্রামের সীমানায় আমগাছ আর শ্মশাটা দেখে। শ্মশান জায়গাটা এমনিতে নিরিবিলি হয় অথচ এই শ্মশানটা যেন একটু বেশীই নীরব। এমনকি পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে না। তাছাড়া এখানে আসার দিন ওই কালীমন্দিরে কিছুক্ষণের জন্য বসেছিলাম আমি। সেই সময়ই মন্দিরের পাশের আমগাছটার নীচে পাখির হাড়গোড় ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখিশুধু তাই নয় মন্দিরের চারপাশে অনেকগুলো অমঙ্গলের চিহ্ন দেখতে পাই। সব দেখে দুইয়ে দুইয়ে চার করতে সময় লাগেনি আমার। কালরাতে অভীকবাবুকে বেরোতে দেখে খটকা লাগে। ওনার পিছু নিয়ে চেপে ধরতেই উনি সবটা খুলে বলেন। সবটা জানার পর বুঝতে পারি অনির্বাণবাবু্দের ভয়ঙ্কর বিপদ আসন্ন। হয়তো পিশাচিণী কাল রাতেই আবার আক্রমণ করতে পারে। ঠিক করি যে করেই হোক ওনাদের বাঁচাতে হবেই। সেই মতো জিনিসপত্র নিয়ে আমরা শ্মশানের কাছে পৌঁছতেই মেহুলদেবীকে ছুটে আসতে দেখি। বাকিটা আপনারা জানেন।"

একটানা কথাগুলো বলে একটু থামে ছেলেটা। গোটা ঘর চুপ করে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর কথা শুনছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। শাম্ব জিজ্ঞেস করে, “সবই তো বুঝলাম। কিন্তু একটা জিনিস বুঝলাম না। ঐ নীলাভ তরলটা আসলে কী ছিল? যেটার ছোঁয়া লাগতেই অতো ভয়ঙ্কর একটা পিশাচিণী মুহূর্তের মধ্যে ছাঁই হয়ে গেল।” ছেলেটা মৃদু হেসে বলে, বেশি কিছু নয়,সামান্য কিছু রাসায়নিক যৌগ যা খোলা হাওয়ায় দাহ্য হয়ে ওঠে, অল্প কেরোসিন, কালকেউটের বিষ, গঙ্গাজল, আর চিতাভস্মের মিশ্রণ। পিশাচিণীর আধাররূপী মানবদেহ নষ্ট করার জন্য কিছুটা হলেও অব্যর্থ অস্ত্র। গায়ত্রী মন্ত্র অথবা নিদেন পক্ষে ওঁ নমঃ শিবায় বলে কিংবা কিছু না বলে প্রয়োগ করলেও চলে। তবে সত্যি কথা বলতে গেলে আমার দ্বারাও এইসব করা অসম্ভব হত যদি না অনির্বাণবাবু সেই কুহকের মায়া কাটিয়ে ফোনটা না করতেন, আর ভাতৃস্নেহের টানে অভীকবাবু ছুটে না যেতেন। অনির্বাণবাবু, আপনার দাদা আপনাকে সত্যিই ভালোবাসেন। নাহলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও এভাবে নিজের প্রাণের পরোয়া না করে ভাইকে রক্ষা করতে কে ছুটে যায়? এরকম ভাতৃস্নেহ আজকালকার স্বার্থপরযুগে বড্ড বিরল। ভাগ্য করে এযুগে এরকম একটা দাদা পেয়েছেন আপনি। এরকম মানুষ আজকাল পাওয়া যায় না।

অনির্বাণ মাথা নামিয়ে বসে থাকে। অভীকবাবু শক্ত করে নিজের ভায়ের একটা কাঁধ জড়িয়ে ধরেন। এমন সময় বাইরে শোরগোল পড়ে যায় বর এসেছে। অভীকবাবু উঠে এসে ছেলেটার হাত ধরে ধরা গলায় বলেন, তোমার এই ঋ আমি কোনোদিন ভুলব না। আজকে আমার পরিবারকে জুড়ে দিয়েছো বোম ভাই।

ছেলেটা প্রথমে থমকে যায় তারপর হো হো করে হাসতে হাসতে বলে, নাহ! আপনার উচ্চারণ আর পালটাতে পারলাম না। ওটা বোম নয় দাদা ব্যোম। আমার নাম ব্যোমকেশ মিত্র। কোনো বোম টোম নয়।

 

 

শনিবার, ১১ মার্চ, ২০২৩

হৃদয়ের রং



“Ladies and gentlemen, may I have your attention please? Thank you! আজ আমরা সকলে এখানে উপস্থিত হয়েছি আমার প্রিয় বন্ধু প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী‌ তথা লেখক প্রদীপ্ত সেনগুপ্তর নতুন বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানে। আপনারা সকলেই জানেন এই Modern Abstract Art-এর যুগেও যে সব শিল্পীরা Classical Art-এর ধারা আজও বজায় রেখেছেন তাদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য নাম হল প্রদীপ্ত সেনগুপ্ত। ওর আঁকা ‘Calcutta Diaries ’, ‘Memories of Monsoon’, ‘Devi in Footpath’ ইতিমধ্যে সাড়া ফেলে দিয়েছে শিল্পঅনুরাগীদের মধ্যে। শুধু তাই নয়, একজন ইলাস্ট্রেটর হিসেবে বেশ কিছু বইয়ের অলঙ্করণের কাজও নজর কেড়েছে পাঠকমহলে। কিন্তু আমার এই বন্ধুপ্রবরটি যে একজন ছবি আঁকিয়ে হওয়ার সাথে সাথে একজন ভালো লেখকও বটে, সে কথা অনেকেরই অজানা।…”

 

স্টেজের সামনে বসে অভয়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে আনমনে হাই তুলছিল প্রদীপ্ত। অভয় ব্যাটা কথাগুলো বলে দারুণ, কিন্তু একবার কারো প্রশংসা করতে শুরু করলে এমন রং চড়িয়ে বলে যে শ্রোতাদের মধ্যে আগে থেকেই একটা এক্সপেক্টেশন তৈরী হয়ে যায়। অথচ ছাপানোর সময় বইটার বিষয়বস্তু নিয়ে সবার আগে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল অভয় নিজে।

 

*****

 

অসম্ভব! এই ট্র্যাশ লেখা ‌আমি ছাপতে পারব না। মার্কেটে আমাদের পাব্লিকেশনের সামান্য হলেও একটা ইমেজ আছে ভাই। এই বইটা পাবলিশ করলে সেটুকুও আর থাকবে না।

 

তার মানে তুই বলতে চাস এই লেখা ছাপলে কেউ পড়বে না।

 

লেখা? কোথায় লেখা? এ তো কেচ্ছা! চটি বললেও ভুল হবে না। মানে তুই আর সাবজেক্ট পেলি না? প্রেমের গল্প, রহস্য গল্প, ভূতের গল্প বাদ দিয়ে সোজা ইয়ের গল্প? তাও আবার যার তার নয়, যার যার সাথে শুয়েছিস তাদের সাথে তোর যৌনজীবনের গল্প! আবার প্রথম গল্পটাই জাহ্নবী চক্রবর্তীকে নিয়ে! বইটা বেরোলে আমাদের কতটা হ্যারাসমেন্ট ফেস করতে হবে জানিস? আর কেউ কিছু করুক বা না করুক, জাহ্নবী কিন্তু তোকে ছেড়ে দেবে না। একটা বিচ্ছিরি স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে যাবি।

 

সে কারণেই তো স্থান-কাল-পাত্রের নাম পাল্টে দিয়েছি। তাছাড়া এটা তো ঠিক চটি নয়। বলতে পারিস ইরোটিকার ধাঁচে Semi Auto-Biography লিখেছি।  

 

কিন্তু এই সাবজেক্টই কেন? আর কোনো সাবজেক্ট ছিল না? আর তোর আত্মজীবনী মানে তো শুধু এই মেয়েগুলোর সাথে শোয়াটাই নয়! শান্তিনিকেতনের কলাভবনে কাটানো ছেলেবেলার গল্প, যাদবপুর ক্যাম্পাসে আমাদের কাটানো সেই দিনগুলো, তোর স্ট্রাগলিং পিরিয়ড, আরো কত কিছু তো আছে! সেসব নিয়েও তো লেখা যেত।

 

ও তুই বুঝবি না। রহস্য গল্প, প্রেমের গল্পে প্লট হিসেবে তেমন কোনো নতুনত্ব নেই। সেই হয় কোনো কাল্পনিক বা পৌরাণিক দেবী দেবতাকে নিয়ে রহস্য ফেঁদে জট পাকাও, তারপর ওটাকে ছাড়াও। আর প্রেমের গল্পে তো কটা আবেগে গদগদ মুহূর্ত আর কিছু Random সংলাপ দিলেই গল্প হিট! কাজেই ও দুটো Genre আমার জন্য নয়। আর ভূতের গল্প তো বাদই দিলাম। যে জিনিসটায় আমি বিশ্বাসই করি না সেটাকে নিয়ে গল্প লিখলে সেটা কতটা খাজা হবে সে আমি জানি। আসল পরিশ্রম হয় ইরোটিকায়। আর এখানেই চটি আর ইরোটিকার মধ্যে বিশাল ফারাক। চটিতে দুটো চরিত্রের মধ্যে তুই চাইলে যখন তখন রগরগে যৌন সুড়সুড়িমূলক সংলাপ কিংবা সরাসরি যৌনদৃশ্য যাকে বলে Uncensored Sequence উপস্থাপন করতে পারবি। কিন্তু এই নিয়মটা ইরোটিকার বেলায় খাটবে না। ইরোটিকায় তুই নিজের মতো করে পরিস্থিতিকে তৈরী করে চরিত্রদের সাজাতে পারলেও ওদের মধ্যে হওয়া ঘটনাক্রমটাকে যেমন তেমন করে সাজাতে পারবি না। এখানে তোকে পুরো দৃশ্যটাকে রূপক অর্থে সাজাতে হবে। এর জন্য ভাষার উপর আর শব্দচয়নের উপর মারাত্মক রকমের দখল চাই। মানে পাঠক বুঝতে পারবে যে দুটো চরিত্র সঙ্গমরত অবস্থায় পরস্পরের দেহকে উপভোগ করছে, কিংবা কোনো চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা নারী চরিত্রের নগ্ন দেহের বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে অথচ শব্দচয়নের জোরে আর গল্পের গতির-এর কারণে সেটাকে বিন্দুমাত্র অশ্লীল বলে মনে হবে না। এই জিনিসটা সকলে পারে না বস! কারণ ইরোটিকা জিনিসটা এতটাই সুক্ষ্ম সুতোর উপর দাঁড়িয়ে যে একচুল এদিক ওদিক হলে জিনিসটা বটতলার চটি হতে সময় নেবে না। লেখার জোরে ভীষণ বাজে কথাকেও শ্রুতিমধুর করা যায় ব্রাদার! নাহলে এই পোড়া পৃথিবীতে কামসূত্র লেখা হত না। বিবর, প্রজাপতি, লেডি চ্যাটার্লিস লাভারএর মতো কালজয়ী প্রাপ্তবয়স্ক সাহিত্য প্রকাশ পেত না। বুদ্ধদেব গুহ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা আর কলম ধরতেন না। অন্যান্য আর্টের মতো ইরোটিকাও এক ধরনের আর্ট ব্রাদার। তফাৎ এই যে এই Genre-তে লেখার কেউ সাহস করে না। তাছাড়া জাহ্নবী আমার সাথে যেটা করেছে সেটার একটা প্রতিকার না করা পর্যন্ত আমার শান্তি হবে না। জনসমক্ষে বড্ড ভালোমানুষীর যে মুখোশটা ও পরে ঘুরে বেড়ায় সেই মুখোশটা আমাকে খুলতেই হবে। লোকেও জানুক যাকে তারা পাশের বাড়ির মেয়ের নজরে দেখে, ভালোবাসে সেই মানুষটা কত বড়ো সুবিধেবাদী আর লোভী। যাকে ওরা মাথায় করে নাচে সেই মেয়েটা যে সুযোগ আর টাকা পেলে যার তার সাথে শুয়ে পড়তে পারে এটাও জানুক সকলে! ও যে কত বড়ো ধড়িবাজ মহিলা সেটা জনগণকে জানাবার সময় এসে গেছে।

 

কিন্তু জাহ্নবী যদি...

 

আইনি পদক্ষেপের কথা বলছিস তো? হবে না। ওর সাহস হবে না আমার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার। নিজের ইচ্ছেতে কে কেচ্ছায় জড়াতে চাইবে বলতো? আরে বাবা পাবলি ইমেজ বলেও তো একটা কথা আছে নাকি? আমাকে ডিফেম করতে এলে উল্টে পাবলিক বলবে ও বাবা! গল্পের মেয়েটা তুমি? এটা আসল ঘটনা? তার মানে তুমি শুয়েছ এর সাথে?” বিচ্ছিরি স্ক্যান্ডালে আমি জড়াবো না, জড়াবে ও। কেন জানিস? কারণটা হল এই পোড়া সমাজে একটা ছেলে দশটা মেয়ের সাথে শুলে যেমন চরিত্রহীন হয়, একটা মেয়ে দশটা ছেলের সাথে ‌শুলেও তেমনই চরিত্রহীন হয়। কিন্তু সমাজ ছেলেটার দিকে আঙুল তোলে না। বরং তারা আঙুল তোলে মেয়েটার দিকে। আর জাহ্নবী এটা জানে বলে পাবলিকের কাছে নিজের ইমেজ ডাউন করতে চাইবে না। বইপ্রকাশটাকে রীতিমতো নিমের পাঁচন গেলার মতো হজম করতে হবে ওকে। সো সেদিক থেকে নো চাপ। তুই জাস্ট বইটা পাব্লিসড কর তো! বাকিটা পরে দেখা যাবে।

 

*****

 

সেদিনের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আচমকা প্রদীপ্তর খেয়াল হল ডায়াসে দাঁড়িয়ে অভয় বলছে, “ইরোটিকা জিনিসটা এতটাই সুক্ষ্ম সুতোর উপর দাঁড়িয়ে যে একচুল এদিক ওদিক হলে জিনিসটা বটতলার চটি হতে সময় নেবে না। লেখার জোরে ভীষণ বাজে কথাকেও শ্রুতিমধুর করা যায়। নাহলে এই পোড়া পৃথিবীতে কামসূত্র লেখা হত না। বিবর, প্রজাপতি, লেডি চ্যাটার্লিস লাভারএর মতো কালজয়ী প্রাপ্তবয়স্ক সাহিত্য প্রকাশ পেত না। বুদ্ধদেব গুহ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা আর কলম ধরতেন না। অন্যান্য আর্টের মতো ইরোটিকাও এক ধরনের আর্ট। তফাৎ এই যে এই Genre-তে লেখার কেউ সাহস করে না।

 

কথাটা কানে যেতেই মনে মনে ফিক করে হেসে ফেলে প্রদীপ্ত। তারপর অভয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে, “হতভাগা আমার ডাইলগ ঝেপে আমার‌ই বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানে বলা হচ্ছে! দাঁড়াও প্রকাশক মশাই! বক্তৃতাটা একবার শেষ হোক তারপর তোমার হচ্ছে!

 

বইপ্রকাশের অনুষ্ঠান শেষ হবার পর সকলে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়ে হলের চারদিকে। পার্টির আয়োজক হিসেবে অতিথিদের অভ্যর্থনা করার জন্য অভয় ছুটে বেড়াতে থাকে হলের প্রতিটা কোণে। ক্রমশ মানুষের আড্ডা আর গসিপের উচ্ছ্বাসে গমগম করে ওঠে সমগ্র হলঘর। প্রদীপ্ত একটা অরেঞ্জ জুসের গ্লাস নিয়ে ঘরের এককোণে বসে ভীড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে আর চুপচাপ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে কতগুলো স্বার্থপর মানুষের আড্ডাটাকে। স্বার্থপরের দল সব! আজ ভদ্রতার মুখোশ পরে হইহই করে ফ্রিতে গিলতে চলে এসেছে। অথচ ওর Struggling Period-এর সময় এই মানুষগুলোই ওর কাজের বিন্দুমাত্র কদর করেনি। বরং সিকিউরিটিকে দিয়ে অর্ধচন্দ্র দিয়েছে ওকে। আজ ওর সাফল্য দেখে যতই ওরা গদগদ হোক না কেন? প্রদীপ্ত জানে ওর বইপ্রকাশ, বা বইয়ের বিষয় নিয়ে এই লোকগুলো বিন্দুমাত্র উৎসাহী নয়। শতকরা ৯০% এলিট পাবলিকদেরই তা থাকে না। বই তাদের কাছে জাস্ট একটা শোপিস মাত্র। জাস্ট শোকেসে সাজিয়ে রাখলে আশেপাশের লোকজনের কাছে শোঅফ করা যাবে বলেই বই কেনে এরা। যে কারণে সারাবছর কলেজস্ট্রিট প্রায় ফাঁকা হলেও বইমেলায় উপচে পড়া ভীড় হয় ফি বছর। প্রকাশকেরাও এটা জানেন বলে তাদের স্টকে থাকা সবচেয়ে ঝলমলে বইটা বইমেলায় দারুণভাবে প্রেজেন্ট করেন। আর এটা জানে বলেই সে এইভাবে বইপ্রকাশ করছে। জনপ্রিয় আর্টিস্টের আঁকা ছবি তো সকলেই সাজিয়ে রাখে। এবার যদি সেই কালেকশনে আর্টিস্টের লেখা বই হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা!

 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে জুসের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল প্রদীপ্ত। আচমকা একটা মহিলার কণ্ঠস্বরে ঘোরটা কাটতেই সে তাকিয়ে দেখে ওর সামনে সুনেত্রা রায় এসে দাঁড়িয়েছে। সুনেত্রা এই শহরের একজন উঠতি অভিনেত্রীদের একজন। ইন্ডাস্ট্রিতে ওর পাঁচ বছর হলেও ইতিমধ্যে দুটো মেগা সিরিয়াল, চারটে ওয়েব সিরিজ, আর একটা সিনেমায় অভিনয় করে অনেকের নজর কেড়েছে মেয়েটা। প্রদীপ্ত সুনেত্রার দিকে তাকাতেই মেয়েটা আবার বলে ওঠে, “একা বসে আছেন যে?” প্রদীপ্ত মৃদু হেসে বলে ওঠে, “প্রশ্নটা তো আমার করা উচিত। এত সুন্দর একটা বিকেলে আপনার মতো একজন সুন্দরী একা কেন?” জবাবে মেয়েটা হেসে বলে, “কী করব বলুন? কপাল মন্দ আমার। নাহলে এই ভালোবাসার দিনেও একা একা ঘুরতে হয়?” প্রদীপ্ত মুচকি হেসে বলে, “বলেন কী? এই ভালোবাসার শহরেও আপনার মতো প্রেমিকা নিজের মনের মানুষ খুঁজে পায়নি?”

 

পেলে কি আর আপনাকে বিরক্ত করতাম নাকি মশাই?

 

তাও বটে। অবশ্য আমার কপালটাও আপনার মতোই পোড়া জানেন? লোকে বলে আমার মতো বেরসিক মানুষ নাকি আর কোথাও নেই। যত প্রেম, যত প্যাশন সব ঐ ক্যানভাসেই আঁকা থাকে। বাস্তবে আমি নাকি ভীষণ কাটখোট্টা আনরোমান্টিক মানুষ। প্রেম নাকি আমার জীবনেই নেই।

 

আপনি আর আনরোমান্টিক? লোকে আপনাকে আড়ালে একালের রাজা রবি বর্মা বলে। তিনি কেমন মানুষ ছিলেন জানেন তো?

 

তাঁর বিন্দুমাত্র গুণ পেলে তো বর্তে যেতাম মিস.রায়।

 

সুনেত্রা ডাকলেও আপত্তি নেই।

 

আচ্ছা বেশ! কোথায় ছিলাম যেন? হ্যাঁ রাজা রবি বর্মা। তাঁর বিন্দুমাত্র গুণ পেলে তো বর্তে যেতাম সুনেত্রা। ওনার মতো প্রেমিক মানুষ সেকালে দুটো ছিল না। আর আমি? একটা রসকষহীন আনরোমান্টিক একটা মানুষ। যে কিনা তাঁর আঁকা অনুকরণ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। খেয়াল করলে দেখবেন আমার সাম্প্রতিক কাজগুলোতে ওনার প্রভাব স্পষ্ট বোঝা যায়।

 

তা ঠিক। আপনার এখনকার কাজে রাজা রবি বর্মার প্রভাবটা স্পষ্ট বোঝা যায়। তবে কী জানেন আপনার আগের কাজ গুলো এখনকার চেয়ে বেশি ভালো ছিল? সত্যি কথা বলতে গেলে আপনার প্রথমদিককার বেশ কিছু কাজ আমার ভালো লেগেছিল। তবে কাজগুলো এতটাই আন্ডাররেটেড যে তেমন প্রচারে আসেনি। অথচ একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে আপনার আগের কাজগুলো আপনার সাম্প্রতিক কাজের থেকে ফার বেটার।

 

মানে? ঠিক বুঝলাম না।

 

মানেটা হল আপনার আগেকার কাজে ভাবনার অনেকটা পরিসর থাকতো। অনেকগুলো দৃশ্য থাকতো। একাধিক চিত্রের মাধ্যমে একটা গোটা ল্যান্ডস্কেপ ফুটে উঠত ক্যানভাসে। একাধিক চিত্র এঁকে আপনি একটার পর একটা লার্জার দ্যান লাইফ কনসেপ্ট ফুটিয়ে তুলতেন তুলি আর পেনসিলের আঁচড়ের মাধ্যমে। এখনও তোলেন ঠিকই, বাট সেই আগের চার্মটা আর খুঁজে পাই না। বরং একটা কেজো, নিরস ভাবটাই বেশি থাকে। যেন ভীষণ তাড়াহুড়োয় শেষ করা।

 

প্রদীপ্ত এবার সুনেত্রার দিকে ভালো করে তাকায়। বা বলা ভালো সুনেত্রাকে আপাদমস্তক জরীপ করে নেয় সে। ভীড়ের মধ্যেও মেয়েটাকে একটু আলাদা বলে মনে হয় তার। চেহারাটা একটু বেটেখাঁটো হলেও বেশ চটক আছে মেয়েটার মধ্যে। পরনের কালো শিফন শাড়ি আর ডিপনেক স্লিভলেস ব্লাউজে উপচে পড়ছে বাঁধভাঙা যৌবন। প্রদীপ্ত সেদিকে একবার তাকিয়ে মনোনিবেশ করে মেয়েটার মুখের দিকে। মেয়েটার মুখটার গড়ন ভারী মিষ্টি। পানপাতার মতো মুখের গঠন, পদ্মের পাপড়ির মতো হাল্কা গোলাপি ঠোঁট, হাল্কা টিকালো নাক। তবে মেয়েটার শরীরের চেয়েও বেশি আবেদনময় হল ওর চোখদুটো। মারাত্মক এক্সপ্রেসিভ অথচ ভীষণ মায়ায় ভরা। সুনেত্রা, সার্থকনামাই বটে! সুনেত্রার দিকে তাকিয়ে খানিকটা অবাক হয়ে প্রদীপ্ত বলে,

 

হ্যাঁ, আসলে আগে ফ্রিল্যান্সার হবার কারণে আমি ছবি আঁকতাম মনের আনন্দে, ফলে কল্পনায় থাকা সব রং নিজের ইচ্ছে মতো উজার করে দিতাম ক্যানভাসে। পরে পাব্লিকেশন হাউজে জব করার সময় নানারকমের ডেডলাইন আর রাইটার, এডিটরের পছন্দ-অপছন্দের কথা খেয়াল রাখার ফলে সেটা আর করা হয়ে ওঠত না। ইচ্ছে থাকলেও নিজের মতো ছবি আঁকতে পারতাম না। এডিটরের মন মতো ছবি বা ইলাস্ট্রেশন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বা বলা ভালো তাড়াহুড়োয় এঁকে দিতে হত। পরে জবটা ছাড়লেও দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলে সেই জিনিসটা থেকে গেছে। বাট আপনি বুঝলেন কী করে? আপনিও ছবি আঁকেন নাকি? না মানে এইভাবে আমার আঁকার বিশ্লেষণ করাটা একজন পোড়খাওয়া শিল্পী ছাড়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

 

আঁকতাম। অনেক বছর আগে। কলেজে পড়ার সময় আমার সাবজেক্টই ছিল ফাইন আর্টস।

 

তাই নাকি? তাহলে আঁকা ছাড়লেন কেন?

 

ছাড়িনি তো! তবে ‌আজকাল আর বসা হয় না। সারাদিনের ব্যস্ত শিডিউল সামলে যখন বাড়ি ফিরি, আর ইচ্ছে করে না ক্যানভাসের সামনে দাঁড়াই।

 

আমার পুরোনো কাজের মধ্যে কোন কাজটা আপনার প্রিয় বললেন না তো।

 

বললে বিশ্বাস করবেন না। কারণ কাজটা সত্যিই ভীষণ আন্ডাররেটেড ছিল।

 

বটে? তা কোন সিরিজটা শুনি?

 

রাধারাণীর অভিসার সিরিজ।

 

হোয়াট?

 

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সুনেত্রার দিকে তাকিয়ে থাকে প্রদীপ্ত। স্বাভাবিকভাবেই অভিসারসিরিজটা ওরও ভীষণ প্রিয় কাজ ছিল। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে প্রথম এক্সিবিশন, প্রথমবার বাইরের লোকের কাছে নিজের শিল্পকে মেলে ধরা। যদিও এক্সিবিশন-টা তেমন সফল হয়নি তবে ওর কাজ অনেক গুণীজনের নজর কেড়েছিল। সেই দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে প্রদীপ্ত বলে ওঠে,

 

সে তো অনেক আগের ঘটনা। তাও প্রায় বছরদশেক হবে। আমার একদম প্রথম দিকের কাজ! আপনার আজও মনে আছে?

 

হুম। গোটা সিরিজটার মূল কনসেপ্ট ছিল জয়দেবের গীতগোবিন্দম্কাকতালীয়ভাবে যেটা আমারও প্রিয় সাবজেক্ট ছিল। কলেজ লাইফে এই কনসেপ্টে অনেক পোট্রেট, ল্যান্ডস্কেপ এঁকেছি। যদিও কোনোটাই আপনার মতো অতো ভালো নয়।

 

ওয়াও! দ্যাটস গুড! আপনার সাথে আলাপ করে বেশ ভালো লাগল সুনেত্রা। এই শহরে আপনার মতো একজন সুন্দরী মহিলা আমার কাজের অনুরাগী, আমার কাছে এর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি আর কিছু নেই।

 

ইটস মাই প্লেজার মি. সেনগুপ্ত।

 

ইউ ক্যান কল মি প্রদীপ্ত। আচ্ছা আমার একটা আবদার ছিল। অবশ্য আপনি যদি কিছু মনে না করেন।

 

এমা! ছিঃ! ছিঃ! মনে করার কী আছে? বলুন না!

 

না মানে আপনার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আপনার আঁকা ছবিগুলো একটু দেখতাম আর কি।

 

আপনি দেখবেন?

 

ইচ্ছে তো আছে। কিন্তু

 

বলে থমকে যায় প্রদীপ্ত। এইভাবে যেচে একজন সদ্যপরিচিত যুবতীর বাড়ি যেতে চাওয়াটা শোভন দেখায় না। অথচ বিষয়টা ভীষণ প্রিয় বলে ভদ্রমহিলার আঁকাগুলো দেখার লোভটাও ঝেড়ে ফেলতে পারছে না সে। সুনেত্রা সেটা বুঝতে পেরেই জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা আজ সন্ধ্যেবেলা আপনি কী করছেন?”

 

তেমন কিছুই নয়। ফাঁকাই আছি বলতে পারেন। কেন বলুন তো?

 

না মানে তাহলে একটা প্রস্তাব ছিল।

 

কীরকম প্রস্তাব?

 

বলছিলাম যে আপনার তেমন আপত্তি বা কাজ না থাকলে পার্টি শেষে কিন্তু বেরিয়ে পড়তে পারি আমরা। যাবেন নাকি?

 

সুনেত্রার প্রস্তাবে হতবাক হয়ে যায় প্রদীপ্ত। নিজের কানকে বিশ্বাস হয় না তার। কোনোমতে নিজেকে সামলে সে বলে, “কোথায়?” প্রদীপ্তর প্রশ্নের উত্তরে মুচকি হেসে সুনেত্রা বলে, “অভিসারে!

 

*****

 

— চমৎকার! মানে আমি জাস্ট... এই আপনি এক্সিবিশন করেন না কেন বলুন তো? এত সুন্দর সুন্দর আর্টগুলো এখানে হেলায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে আর আপনি সেটা হতেও দিচ্ছেন? That's not fair সুনেত্রা!

 

জানি কিন্তু কী করবো বলুন? পেশাগতভাবে আমি একজন সাধারণ পার্শ্ব-অভিনেত্রী। আহামরি কিন্তু আয় হয় না আমার। কাজেই এক্সিবিশন করার মতো সামর্থ্য বা অর্থ দুটোই আমার কাছে নেই। এদিকে প্যাশনটাও ছাড়তে পারি না। তাছাড়া আঁকা আমার কাছে একটা stress relief-এর মতো। সারাদিনের ইঁদুর দৌড়ের মাঝে একটুকরো শান্তি আর মন ভালো করার একটা মাধ্যম। যতই মনখারাপ হোক না কেন, ক্যানভাসের সামনে রং তুলি নিয়ে দাঁড়ালে সমস্ত মনখারাপ ভুলে যাই আমি। তখন কেন, কোন কারণে মনখারাপ হয়েছিল কিছু মনে থাকে না আমার। আমি হারিয়ে যাই নিজের কল্পনায় থাকা দৃশ্যপটের জগতে। যাকগে বাদ দিন ওসব কথা। নিজের প্রিয় শিল্পীকে নিজের কাজ দেখাতে পেরেছি এর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না।

 

কথা হচ্ছিল সুনেত্রার ফ্ল্যাটের স্টুডিওতে দাঁড়িয়ে। পার্টিতে সুনেত্রার প্রস্তাবে প্রথমে হচকিয়ে গেলেও পরে লোভনীয় প্রস্তাবটা হাতছাড়া করতে মন চায়নি প্রদীপ্তর। কোন মতে অভয়কে ম্যানেজ করে সুনেত্রাকে নিয়ে কেটে পড়েছিল সে। অভয় প্রথমে অবাক হলেও পরে মুচকি হেসে মাথা নেড়েছিল। সে তার বন্ধুরত্নটিকে হাঁড়ে হাঁড়ে চেনে। প্রদীপ্তর কথা শুনেই সে বুঝেছিল নির্ঘাত কোনো সুন্দরীর সাথে অভিসারে বেরোচ্ছে তার শিল্পী বন্ধুটি। তারপর সুনেত্রাকে দেখে হাসিটা আরো চওড়া হয়েছিল তার। প্রদীপ্তকে চোখ টিপে ইশারা করে অনুমতি দিয়েছিল সে। প্রদীপ্তরা বেরিয়ে যেতেই মুচকি হেসে সে বিড়বিড় করে আউড়ে নিচ্ছিল প্রদীপ্তর খুবই প্রিয় দুটি পংক্তি, “রতিসুখসারে গতমভিসারে মদনমনোহরবেশম্।/ ন কুরু নিতম্বিনি গমনবিলম্বনমনুসর তং হৃদয়েশম্।।

 

সুনেত্রার ফ্ল্যাটে পৌঁছে ওরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সোজা প্রবেশ করেছিল স্টুডিওতে। আর স্টুডিওতে প্রবেশ করার সাথে সাথে ভেতরের দৃশ্য দেখে থমকে গিয়েছিল প্রদীপ্ত। তারপর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল ঘরে থাকা আঁকাগুলোর দিকে। গোটা ঘরে সুনেত্রার শিল্পকর্ম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘরের দেওয়ালের উপর গ্রাফিতি থেকে সুন্দর আলপনা, পটচিত্র থেকে ওয়াল আর্ট কোনোটাই বাকি রাখেনি সুনেত্রা। এমনকি ঘরের এককোণে থাকা ডিভানের চাদরেও শিল্পের ছোঁয়া  সুস্পষ্ট।

 

সুনেত্রা নিজের মনের মতো করে সাজিয়েছে গোটা ঘরটাকে। ঘরের সাদা মার্বেলের মেঝে জুড়ে লাল রঙের একটা সুন্দর মান্ডালা আর্ট করা হয়েছে। সেই আর্টকে ঘিরেই সাজানো সুনেত্রার আঁকা ক্যানভাসগুলো। চিত্রগুলো প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা মনে হলেও একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে পরস্পরের সাথে ওদের একটা যোগাযোগ আছে। আর সেই কারণেই চিত্রগুলোকে ক্রমান্বয়ে সাজানো হয়েছে। ঠিক যেমনটা প্রথম প্রথম সে করত। ছোট ছোট চিত্রের সাহায্যে একটা বড়ো চিত্রের নির্মাণ। প্রদীপ্তর মনে হচ্ছিল যেন সে ভুল করে কোনো exhibition-এ ঢুকে পড়েছে। চিত্রগুলো দেখামাত্র সে বলে বসে, “চমৎকার! মানে আমি জাস্ট... এই আপনি এক্সিবিশন করেন না কেন বলুন তো? এত সুন্দর সুন্দর আর্টগুলো এখানে হেলায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে আর আপনি সেটা হতেও দিচ্ছেন? That's not fair সুনেত্রা!”

 

সুনেত্রার সাথে কথা বলতে বলতে প্রদীপ্ত একটা ক্যানভাসের সামনে এসে দাঁড়ায়। এতগুলো চিত্রের মাঝে একটা সাদা ক্যানভাস দেখে কিছুটা কৌতুহল হয় তার। কিছুক্ষণ চুপ করে ক্যানভাসটার দিকে থাকার পর প্রদীপ্ত বলে ওঠে, “আচ্ছা একটা প্রশ্ন করতে পারি?”

 

বলুন।

 

আচ্ছা এতগুলো ছবির মাঝে এই একটা ক্যানভাস ফাঁকা কেন? না মানে ছবিগুলো যে ক্রমানুসারে সাজানো তাতে তো মনে হল আপনি গীতগোবিন্দম্’-এর একটা বিশেষ সিন ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। আর আমি যতদূর আন্দাজ করতে পারছি এটা সম্ভবত গীতগোবিন্দম্’-এর সেই রাসলীলার মুহূর্তটা। যখন রাধা কৃষ্ণের সম্মুখে আত্মসমর্পণ করবেন। কানাইয়ের চরণে বসে উৎসর্গ করবেন নিজ মান, জীবন, নারীসুলভ লজ্জা। আর কৃষ্ণ সাদরে গ্রহণ করবেন তাঁর রাধারানীকে। ক্রম অনুযায়ী তো এখানে রাধা-কৃষ্ণের সেই অনুরাগের চিত্র থাকার কথা। সেটা আঁকেননি কেন?

 

এমনি ইচ্ছে হয়নি।

 

মানে? এত সুন্দর ছবিটা যে অসম্পূর্ণ থেকে গেল!

 

সে যাক। সম্পূর্ণ হয়ে গেলেই তো সব শেষ!

 

কিন্তু তাও কেমন যেন লাগছে আমার। ওটা থাকলে ভালো হত।

 

জানি। কিন্তু রাধাকৃষ্ণ আঁকতে হলে যে মডেল লাগবে মশাই। এমনি এমনি তো আর করা যেতে পারে না। তাছাড়া ওটা নিয়ে আমার আলাদা প্ল্যান আছে।

 

কী প্ল্যান?

 

মুচকি হেসে সুনেত্রা বলে, “সেটা তো বলা যাবে না। বলতে পারেন ওটা আমার একান্ত গোপনীয় ইচ্ছে।প্রদীপ্ত কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে থাকে সুনেত্রার দিকে, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনোনিবেশ করে পরের ছবিটার দিকে। সুনেত্রা কিছুক্ষণ স্টুডিওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পর বেরিয়ে আসে।

 

ছবি দেখার পালা শেষ হলে প্রদীপ্ত স্টুডিও থেকে বেরিয়ে বৈঠকখানায় বসতে গিয়ে দেখে এর মধ্যেই সুনেত্রা ওদের দুজনের জন্য কফি বানিয়ে ফেলেছে। সেন্টার টেবিলে প্লেটে সাজানো রয়েছে একাধিক কুকিজ, কেক, মিষ্টি। এতগুলো খাবার দেখে বিব্রত হয় সে।

 

আরে করেছেনটা কী? এতগুলো খাবার কে খাবে?

 

এই প্রথমবার আমার বাড়িতে এলেন। সামান্য কিছু মুখে না দিয়েই চলে যাবেন তা আবার হয় নাকি?

 

তাই বলে এত খাবার!

 

কোথায় এত? এ তো সামান্য খাবার। এইটুকুতে কিছু হয় না।

 

বলে একটা কফিমাগ আর কুকিজের প্লেটটা প্রদীপ্তর দিকে এগিয়ে দেয় সুনেত্রা। প্রদীপ্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হেসে কফিমাগটা তুলে নেয়। তারপর একটা চুমুক দিয়ে বলে, “বললেন না তো! ক্যানভাসটা নিয়ে আপনার কী প্ল্যান?” সুনেত্রা মৃদু হেসে বলে, “বললাম তো! ওটা আমার একান্ত গোপনীয় ইচ্ছে। যাকগে সে সব কথা থাক। গল্পগুলো কিন্তু আপনি বেশ ভালো লেখেন মশাই।প্রদীপ্ত কফিমাগে চুমুক দিয়ে চমকে ওঠে।

 

সেকি! এর মধ্যেই গোটা বই আপনার পড়া হয়ে গেছে? কখন পড়লেন?

 

উঁহু! পুরোটা পড়া হয়নি। আসলে আমার বদভ্যেস হল নতুন কোনো বই পেলেই সেটা পড়তে শুরু করে দিই। সেটা কবিতার বই হোক বা উপন্যাস। বইটা হাতে পাবার পর পার্টিতেই বসে পড়ছিলাম। সবে প্রথম গল্পটা পড়েছি। আর পড়ার সাথে সাথে বুঝেছি এগুলো নিছকই গল্প নয়, বাস্তব ঘটনা। চরিত্রদের নাম আর পটভূমি পাল্টে দিলেও জাহ্নবীদিকে চিনে নিতে অসুবিধে হয়নি আমার।

 

বটে! তা গল্পটা পড়ে কেমন লাগল আপনার?

 

কেমন আবার লাগবে? ভালোই লাগল!

 

ভালো লাগল? Strange! আপনার গা ঘিনঘিন করা অনুভূতি বা কোনোরকম অস্বস্তি হল না?

 

না। কেন বলুন তো?

 

প্রদীপ্ত কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। সুনেত্রা হেসে বলে, “আমি জানি আপনি কী বলতে চাইছেন প্রদীপ্ত। আপনি ভাবছেন একজন মহিলা হয়ে আরেকটা মহিলার জীবনের নোংরা কেচ্ছা ইরোটিকার আদলে পড়ার পরেও জিনিসটাকে আমি এতটা frankly নিচ্ছি কী করে? তাই তো? আপনার এই প্রশ্নের উত্তরটাও কিন্তু আপনার লেখা গল্পগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

 

কীভাবে?

 

প্রশ্নটা করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সুনেত্রার দিকে তাকায় প্রদীপ্ত। সুনেত্রা কফিমাগে একটা চুমুক দিয়ে বলে,

 

সত্যি কথা বলতে গেলে জাহ্নবীদিকে আমি আমার struggling period এর সময় থেকে চিনি। আর কেউ বা না জানুক আমি জানি আপনার আর জাহ্নবীদির সম্পর্কের ব্যাপারটা। এমনকি এটাও জানি জাহ্নবীদি কেন আপনাকে ডিচ করল। বাইরের জগতের কাছে ওর ইমেজটা বড্ড ভালো মেয়ের হলেও বাস্তবে সুযোগ পেলে ও কতটা ambitious হতে পারে সেটাও জানি। কাজেই এই বইটার উদ্দেশ্য আমার অজানা নয় and I think she deserves it, আর গল্পগুলো বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে লেখা হলেও সেখানে কাউকে defame, বা অপমান করা হয়নি। আপনি চাইলে সেটা করতে পারতেন। গল্পের ছলে আপনাদের যৌনজীবনের যে কথা আপনি লিখেছেন, চাইলে আসল নাম ব্যবহার করে কেচ্ছাটাকে আরো রসিয়ে লিখে লাইমলাইটে আসতে পারতেন। এতে আপনার প্রতিশোধ সফল হত ঠিকই কিন্তু স্যাটিসফ্যাকশন থাকতো না। আমরা শিল্পী মানুষ। আমাদের প্রতিটা কাজেই নিজের অজান্তেই একটা শিল্পের ছোঁয়া থেকে যায় প্রদীপ্ত। তা সে অভিনয় হোক বা অন্য কিছু। সেই শিল্পীসত্ত্বার তাগিদেই হোক বা জিনিসটাকে রসিয়ে লেখার লোভেই হোক আপনি আশ্রয় নিলেন ইরোটিকার। অবশ্য তার কারণও আছে। ইরোটিকার আসল মজা হল তার শব্দমাধুর্য ও দৃশ্যপটের গতিতে। দৃশ্যপট যতই পরিণতমনস্ক বা অশ্লীল হোক না কেন শব্দের মাধুর্যের কারণে সেটাকে কিছুতেই অশালীন বলে মনে হয় না। সে কারণেই ঘটনাগুলো বাস্তব বুঝতে পারলেও, চরিত্রদের চিনতে পারলেও আমার একবারের জন্যেও অস্বস্তিবোধ হয়নি। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে আপনি ফ্লাইং কালারে পাশ করে গেছেন মশাই।

 

প্রদীপ্ত একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকে সুনেত্রার দিকে। যে কথাটা অভয়কে বলে বলে বোঝাতে হয়েছিল, সেই সামান্য কথাটা মাত্র একটা গল্প পড়ে ধরে ফেলেছে মেয়েটা। হ্যাঁ, ঠিক এটাই করেছে সে। জাহ্নবী যখন ওকে ছেড়ে গেল তখন একটা বুনো রাগ চেপে বসেছিল ওর মাথায়। সেই রাগের কারণেই তো এই বইটা লেখা! গল্পগুলো সে এমনভাবে লিখেছে যাতে সকলের সামনে জাহ্নবীর মুখোশটাও খোলা যায়, অথচ জাহ্নবী কোনোরকম পদক্ষেপ না নিতে পারে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সে চুমুক দেয় কফিমাগে। তারপর মৃদু হেসে বলে, “থ্যাঙ্ক ইউ!

 

কীসের জন্য?

 

আমার point of view-টাকে বোঝার জন্য। আপনি তো আমাকে অবাক করে দিচ্ছেন সুনেত্রা। যে জিনিসটা আমার প্রকাশক বন্ধুকে convince করাতে আমার প্রায় একমাস লেগে গেল, সেই সহজ পয়েন্টটা মাত্র একটা গল্প পড়ে আপনি ধরে ফেললেন। হুম! অভিনেত্রী, শিল্পী, মনযোগী পাঠিকা। আর কী কী গুণ লুকিয়ে রেখেছেন বলুন তো?

 

প্রদীপ্তর কথায় খিলখিল করে হেসে ওঠে সুনেত্রা। তারপর বলে, “কেন বলব? জানেন না পুরাকালে নারীদের ৬৪টা কলা শিখতে হত। তারা একাধারে নৃত্যশিল্পী, গায়িকা, অভিনেত্রী, চিত্রকর, পাঠিকা, লেখিকা, যোদ্ধার মতো ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। এখন অবশ্য সেই রীতি নেই। এখন যে যেটা পারেন সেই ক্ষেত্রে খ্যাতি পাবার চেষ্টা করেন। যাকগে বাদ দিন ও কথা। আচ্ছা একটা জিনিস জানার ছিল।

 

বলুন।

 

আপনি গল্পের শুরুতে মানে আপনার আর জাহ্নবীদির মেক আউটের জায়গাগুলো আসার আগে বার বার গীতগোবিন্দম্’ quote করেছেন কেন?

 

প্রশ্নটা শোনামাত্র মুচকি হাসি খেলে যায় প্রদীপ্তর ঠোঁটে। সে মুচকি হেসে বলে, “সত্যিটা শুনবেন নাকি political correct উত্তরটা?”

 

সত্যিটাই বলুন।

 

কফিমাগে চুমুক দিয়ে কফিটা শেষ করে মুচকি হেসে প্রদীপ্ত বলে, “ওটা আমার মুদ্রাদোষ। লাভমেকিং এর সময় জাহ্নবীকে জাগরিত করতে গীতগোবিন্দম্’-এর কোটেশন ইউজ করতাম আমি।

 

হোয়াট?

 

উত্তরটা শোনামাত্র থমকে যায় সুনেত্রা। পরক্ষণে ব্যাপারটা বোঝামাত্র ওর গালদুটো লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। প্রদীপ্ত হাসতে হাসতে সোফায় হেলান দিয়ে বসে, “এবার বুঝলেন? কেন আমি আপনার আর্ট দেখে এত কৌতুহলী হচ্ছিলাম তখন? নিজের অজান্তেই আপনি গীতগোবিন্দম্’- এর আমার সবথেকে প্রিয় জায়গাটাকেই ফুটিয়ে তুলেছেন ক্যানভাসে।কথাটা বলে আপনমনে হাসতে হাসতে সে বলে ওঠে,

 

বিগলিতবসনং পরিহৃতরসনং ঘটয় জঘনমপিধানম্।/কিশলয়শয়নে পঙ্কজনয়নে নিধিমিব হর্ষনিধানম্।।

 

লজ্জায় সুনেত্রার আরক্ত মুখটা নিচে নেমে আসে

 

*****


বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানের পর প্রায় দুমাস কেটে গেছে। বইপ্রকাশের সময় প্রদীপ্ত আর জাহ্নবীর সম্পর্ক নিয়ে যতটুকু কানাঘুষো, চাপা গুঞ্জন উঠেছিল সময়ের সাথে সাথে সেটাও থিতু হয়ে গেছে। পরে অবশ্য বইয়ের স্টক নিয়ে অভয় একটু দুশ্চিন্তা করায় প্রদীপ্ত অভয়কে বলেছিল, “শোন, প্রতিটা পাবলিশিং হাউজের যেমন কিছু বেস্টসেলার থাকে, ঠিক তেমনই কিছু খাজা বইও থাকে যা জাস্ট শোকেসে, বইমেলায় তাক সাজানোর কাজে আসে। আমার এই বইটাও তাই। অতো ছাপতে হবে না। জাস্ট ১০০টা কপি As a limited edition হিসেবে ছেপে রাখ। বইপ্রকাশের পর একটু অ্যাড দিয়ে হাইপ ক্রিয়েট করলেই হবে।প্রদীপ্তর এই পরিকল্পনা অব্যর্থভাবে কাজে লেগে গেছে। বইপ্রকাশের দুমাসের মধ্যে সমস্ত কপি বিক্রি হয়ে গেছে। অবশ্য সেটা নিয়ে এখন প্রদীপ্তর কোনো মাথা ব্যথা নেই। সে এখন তার নতুন ছবির এক্সিবিশন-এর ইভেন্ট নিয়ে ব্যস্ত, বা বলা ভালো খানিকটা চিন্তিত। সামনের মাসের প্রথম রবিবার তার আঁকা ছবিগুলোর এক্সিবিশন শুরু হতে চলেছে। এই প্রথমবার নিজের চেনা ছক থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু করতে চলেছে সে। এবারের এক্সিবিশন-এর থিমটা কিছুটা অফবিট। প্রদীপ্ত এক্সিবিশন-টার নাম দিয়েছে স্বপ্নের ক্যানভাস

 

কফিশপে বসে কফি খেতে খেতে ইভেন্টের কথাই ভাবছিল সে। এমন সময় সে শুনতে পেল খুব কাছ থেকে কে যেন বলছে, “পৃথিবীটা শুধু গোলই নয় ছোটও বটে! আবার আমাদের দেখা হয়ে গেল দেখলেন?” প্রদীপ্ত তাকিয়ে দেখল ওর টেবিলের সামনে সুনেত্রা এসে দাঁড়িয়েছে। পরনে একটা অফ হোয়াইট শার্ট, জিন্স আর চোখে চশমা। আচমকা সুনেত্রাকে সামনে দেখামাত্র প্রথমে অবাক হয় প্রদীপ্ত। এই দুমাসে এক্সিবিশন-এর চাপে সুনেত্রার কথা প্রায় ভুলতে বসেছিল সে। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে মুচকি হেসে সে বলে, “তাই তো দেখছি। তা আপনি এখানে?” প্রদীপ্তর মুখোমুখি বসে সুনেত্রা বলে,

 

একটা ফটোশ্যুটের জন্য এসেছিলাম। একটু আগেই শ্যুট শেষ হতেই ধরাচুড়ো ছেড়ে বেরোতে যাবো দেখি আপনি এখানে বসে আছেন। যাক গে ওসব কথা বাদ দিন। কেমন আছেন বলুন? সামনেই তো আপনার এক্সিবিশন না?

 

ঐ চলে যাচ্ছে। আপাতত এক্সিবিশন-এর চাপে জর্জরিত। সারাদিন ওটার পেছনেই যাচ্ছে। ইভেন্ট অর্গানাইজার-দের সাথে মিটিং, বন্ধুবান্ধবদের, মিডিয়াদের নিমন্ত্রণ। জায়গাটার ডেকোরেশন সব কিছুর পেছনে দৌড়তে দৌড়তে পাগল হয়ে যাচ্ছি। আপনার কী খবর? আঁকা কতদূর?

 

আর আঁকা! সারাদিন শ্যুটিং, ডাবিং, জিম আর ফটোশ্যুটের ঠেলায় জেরবার হয়ে যাচ্ছি। দম ফেলার মতো সময় নেই আমার কাছে। সেই সকাল ৬টায় শ্যুটিং কল বলে ভোর বেলা উঠে কোনোমতে চোখেমুখে জল দিয়ে দৌড়োচ্ছি। ফিরতে ফিরতে ঘড়ির কাঁটার সাথে সাথে শরীরেরও বারোটা বেজে যাচ্ছে। নিজের জন্যই সময় পাচ্ছি না।

 

সেটাই তো স্বাভাবিক! অভিনয় জগতে ছুটি বলে কিছু হয় না। এখানে যতটা খাটবেন, যতটা লড়াই করবেন তত আপনার পথ প্রশস্ত আর খুঁটি শক্ত হবে। আপনাদের লাইনে মেয়েদের লড়াইটা ভীষণ টাফ। সবসময় নিজেকে presentable রাখতে হয় খাপ খোলা তরবারির মতো। একটু ঢিলেমি দিলেই আপনাকে সরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র সময় নেবে না পরিচালক, প্রযোজকরা।

 

জানি। সেকারণেই তো দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছি। এখন দেখা যাক ভাগ্য কতদূর পর্যন্ত সাথে থাকে। কম দিন তো হল না ইন্ডাস্ট্রিতে।

 

ওদের কথার মাঝে একটা ছেলে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে, “ম্যাডাম, সুবিনয়দা আপনাকে ডেকেছে।সুনেত্রা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে, “তুমি যাও, আমি আসছি।  ছেলেটা মাথা নেড়ে, “হ্যাপি বার্থডে ম্যাডাম!বলে ফিরে যায় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দলটার মাঝে। প্রদীপ্ত অবাক হয়ে সুনেত্রার দিকে তাকিয়ে বলে, “এই আজ আপনার জন্মদিন নাকি?” সুনেত্রা লাজুক হেসে মাথা নাড়ে।

 

এই যা! আগে জানলে আমিযাই হোক জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

 

ধন্যবাদ। চলুন এবার।

 

কোথায়?

 

কে কাটবো।

 

না আপনি যান। ওনারা আপনার জন্য আয়োজন করেছেন। সেখানে একজন অযাচিত মানুষ হিসেবে আমার থাকাটানা মানে ওনারা কী ভাববেন বলুন তো?

 

কেউ কিছু ভাববে না। আর আপনি কোনো অযাচিত মানুষ নন। আজকে আপনি আমার আমন্ত্রিত অতিথি কাম বন্ধু। তাছাড়া জন্মদিনটা আমার, আমি যাকে খুশি নিমন্ত্রণ করতে পারি। আপনি আসুন তো আমার সাথে।

 

আপনি বুঝতে পারছেন না সুনেত্রা।

 

বুঝতে চাইও না। আপনি আসুন আমার সাথে। একবার যখন পেয়েছি আজকে আর ছাড়ছি না আপনাকে। আর হ্যাঁ এবার থেকে আমাকে তুমি করে ডাকবেন। আমিও আপনাকে তুমি করে ডাকবো। আপনি ডাকটা বড্ড ফর্মাল শোনায়। আর বেশিক্ষণ কাউকে আপনি আজ্ঞে করার অভ্যেস আমার নেই।

 

কতদিন হল চেনেন আমাকে? এর মধ্যেই বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিচ্ছেন যে?

 

কতদিন ধরে চিনি, বা কতটা চিনি সেটা বন্ধুত্বে ম্যাটার করে না মশাই। ম্যাটার করে ভাবনাচিন্তার আর দৃষ্টিভঙ্গির মিলটা। সেটা মিলে গেলেই এক ঘন্টার চেনা মানুষটাও পরম কাছের হয়ে যায়। আবার ভাবনাচিন্তার মিল না হলে সারাজীবন পাশে থাকা মানুষটাও চরম অচেনা একজনে পরিণত হয়। যাক গে এখন এসব তত্ত্বকথা বলতে আর ভালো লাগছে না। আপনিতুমি এসো তো!

 

কিন্তু আমার কাছে যে তোমাকে দেওয়ার মতো কোনো উপহারও নেই।

 

সে আমি পরে চেয়ে নেব। উফ! তুমি আসবে?

 

প্রদীপ্ত হা করে তাকিয়ে থাকে সুনেত্রার দিকে। মেয়েটা হয় বড্ড সরল, নাহলে সরলতার অভিনয় চালিয়ে যাওয়া এক ধূর্ত মানুষ। নাহলে মাত্র দুই দিনের দেখাতেই এভাবে কেউ কোনো অচেনা বা স্বল্প চেনা মানুষকে কেউ আপন করে নেয়? মেয়েটা কতদিন হল চেনে ওকে? এর মধ্যেই গায়ে পড়ে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিচ্ছে। কে জানে? হয়তো এই বন্ধুত্বের পেছনেও কোনো স্বার্থ লুকিয়ে আছে। এই লাইনের মেয়েগুলোকে সে হাঁড়ে হাঁড়ে চেনে। স্বার্থ ছাড়া কেউ কাউকে অল্প পরিচয়ে এতটা আপন করে নিতে পারে না। আবার এমনটাও হতে পারে এটা একটা ফাঁদ। মেয়েটা জাহ্নবীর পরিচিত। হয়তো জাহ্নবীই ওকে পাঠিয়েছে প্রতিশোধ নিতে। নাঃ! কোনো সম্ভাবনাকেই ঝেড়ে ফেলা যাচ্ছে না। খুব সাবধানে খেলতে হবে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে প্রদীপ্ত কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে সুনেত্রার দিকে, তারপর আলতো হেসে সুনেত্রার সাথে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় ভীড়টার দিকে।

 

জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষ হতেই সকলে বেরিয়ে পড়ে যে যার গন্তব্যের দিকে। প্রদীপ্ত আর সুনেত্রা কফিশপ থেকে বেরিয়ে পার্কিং-য়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রদীপ্ত পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে জিজ্ঞেস করে, “তো এবার কোথায়? স্টুডিও নাকি জিম?” সুনেত্রা হেসে বলে, “আপাতত বাড়ি। আজকে আর জিম যেতে ইচ্ছে করছে না।প্রদীপ্ত কাঁধ নাচিয়ে বলে, “বেশ! এসো তোমাকে ড্রপ করে দিচ্ছি।

 

*****


কেটে গেছে গোটা একটা বছর। এই একবছরে প্রদীপ্তর জীবনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে। প্রথমত, পাঠকমহল থেকে বারংবার ওর লেখা বইটার দ্বিতীয় মুদ্রনের দাবি আসায় অবশেষে অভয় প্রদীপ্তর অনুমতিতেই দ্বিতীয় মুদ্রন ছাপতে শুরু করেছে। দ্বিতীয়ত, প্রদীপ্তর এক্সিবিশন চুড়ান্তভাবে সফল হবার পর শিল্পীমহলে ওর কিছুটা খ্যাতি বেড়েছে। আর তৃতীয়ত, প্রদীপ্তর জীবনে আবার আগমন ঘটেছে এক রহস্যময়ী নারীর। যদিও মেয়েটা কে জানা যায়নি। এমনকি অভয় পর্যন্ত প্রদীপ্তকে চেপে ধরতেই সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। তবে কানাঘুষোয় শোনা যায় প্রদীপ্ত নাকি সুযোগ পেলেই মাঝেমধ্যেই এই নারীর উদ্দেশ্যে অভিসারে বেরোয়। আজ এরকমই এক অভিসারের রাত। সন্ধ্যেবেলা অভয়ের দোকান থেকে বেরিয়ে গাড়ি করে বাড়ি ফেরার বদলে সে সোজা চলে এসেছে সেই রহস্যময়ীর বাড়িতে। তারপর সন্তর্পণে ঘরে ঢুকেই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছে সেই রহস্যময় প্রেয়সীকে। মেতে উঠেছে আদিম যৌনতার খেলায়।

 

অনেকক্ষণ পরে যখন রাত ক্রমশ গভীর হয়ে উঠেছে, রাস্তায় গাড়িঘোড়ার আনাগোনা আস্তে আস্তে কমতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময় কোমরে একটা তোয়ালে জড়িয়ে ব্যালকনিতে বসে ওয়াইন খেতে খেতে রাতের শহরটাকে দেখছিল প্রদীপ্ত। আলো-ছায়ায় ঘেরা শহরটার দিকে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করছিল নিজের struggling period এর সময়ের দিনগুলোর কথা। সে সময় এই দুকামরার ফ্ল্যাটের আরামপ্রদ জীবন, ঝাঁ চকচকে স্টুডিওর কথা ও ভাবতেও পারত না। যাদবপুরের সেই হোস্টেল, আর গ্রাজুয়েশনের পরে সন্তোষপুরের একটা এক কামরার ভাড়াবাড়িটাই ছিল ওর মাথা গোঁজার আশ্রয়। আর শহরের রাস্তাঘাট, ফুটপাথে পড়ে থাকা পরিবারগুলোই ছিল তার আঁকার সাবজেক্ট। খিদে পেলে রেস্তোরাঁয় যাবার দুঃসাহস না দেখিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা চায়ের দোকানে টোস্ট, পাউরুটি, কিংবা নুডলস দিয়ে খুন্নিবৃত্তি করতো সে। এই সময়়টাতেই জাহ্নবী ওর জীবনে এসেছিল। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী জাহ্নবী ওর চেয়ে এক বছরের জুনিয়র ছিল। কলেজ ফেস্টে একটা নাচের অনুষ্ঠানে সে প্রথম দেখেছিল জাহ্নবীকে। হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল মেয়েটাকে দেখে প্রথমে একটু বেশীই গায়ে পড়া মনে হয়েছিল তার। অথচ এই গায়ে পড়া মেয়েটাই কীভাবে যে ওর মনের গহীনে প্রবেশ করল, তা আজও জানে না প্রদীপ্ত। ওর আজও মনে আছে ওদের প্রেম নিবেদন, প্রথম চুমু, প্রথম মিলনের দিনগুলোর কথা। ওর মনে আছে মে মাসের এক উষ্ণ দুপুরে শান্তিনিকেতনের এক সস্তার হোটেলে প্রথমবার নিজেকে মেলে ধরেছিল জাহ্নবী। চরম সুখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিল প্রদীপ্তকে। প্রদীপ্তও হাল ছাড়েনি। নারীদেহরূপ নদীতে অবগাহন করতে করতে ক্রমশ জাহ্নবীকে পাগলিনী করে তুলেছিল সে। আদরের চিহ্নে ভরিয়ে দিয়েছিল জাহ্নবীর দেহের প্রতিটা দেহকোষকে। আদরের চরম মুহূর্তে জাহ্নবী আবদার করেছিল ওর একটা ন্যুড পোট্রেট এঁকে দেওয়ার। প্রদীপ্ত সে আবদারও রেখেছিল। সঙ্গম শেষে বিছানায় শুয়ে থাকা রতিক্লান্ত জাহ্নবীকে মনের মতো করে ফুটিয়ে তুলেছিল আঁকার খাতায়। হৃদয়ের রঙে ভরিয়ে তুলেছিল জাহ্নবীর দেহের প্রতিটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে।

 

আজও সেই মুহূর্তগুলোর কথা মনে করলে বুকটা হুহু করে ওঠে ঠিকই, কিন্তু প্রদীপ্ত জানে সেই মুহূর্তগুলো ওর জীবনের সবথেকে সুন্দর মুহূর্ত ছিল। প্রথমে বুঝতে না পারলেও শেষের দিকে প্রদীপ্ত বুঝতে পারছিল যে জাহ্নবীকে সকলে চেনে তার সাথে বাস্তবের জাহ্নবীর তফাৎ অনেকটাই। বাইরে থেকে জাহ্নবীর যতটা হাসিখুশি, পরোপকারী ভাবমূর্তি থাকুক না কেন বাস্তবে জাহ্নবী একজন আত্মকেন্দ্রীক, সুবিধেবাদী আর ambitious মানুষ। নিজের ভালো ছাড়া কিছুই বোঝে না সে। অভিনয় জগতে সুযোগ পাবার পর এই গুণগুলো আরো বেশী করে প্রকট হচ্ছিল প্রদীপ্তর সামনে। কিন্তু জাহ্নবীর প্রেমে সে এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে ওদের সম্পর্কের ফাটলটা সে টেরই পায়নি। টের পেল তখন যেদিন জাহ্নবী ওর বিবাহ প্রস্তাব নাকচ করে এক কথায় সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে বেরিয়ে গেল। প্রদীপ্তর মনে হচ্ছিল ওর সমস্ত জগতের রং কেউ যেন এক লহমায় শুষে নিয়েছে। সেদিন বুঝেছিল জাহ্নবীকে ভালোবেসে কতটা ঠকে গেছে সে। ভালোবাসার উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল তার। তারপর ওর জীবনে অনেক নারী এসেছে, আবার প্রয়োজন ফুরোতেই চলেও গেছে। কেউই আর ওর মনের গহীনে প্রবেশ করতে পারেনি। বলা ভালো প্রদীপ্ত নিজেই কাউকে আর প্রবেশ করতে দেয়নি। বরং প্রয়োজনের সুযোগ নিয়ে নিজের শারীরিক খিদেটুকু মিটিয়ে নিয়েছে সে

 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রাস্তার দিকে একটু অন্যমনস্কভাবে তাকিয়েছিল প্রদীপ্ত, আচমকা ওর সম্বিত ফিরল একটা ভীষণ চেনা ডাকে। পেছন ফিরে সে দেখল একটু আগে আদরের আতিশয্যে মেঝেতে লুটিয়ে পড়া বেডশিটটা দিয়ে কোনোমতে নিজের নগ্ন দেহের লজ্জা নিবারণ করে সুনেত্রা ব্যালকনির দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘরের মৃদু আলোয় ওর ফর্সা নির্লোম দেহের অনাবৃত অংশের বেশ কিছু জায়গায় জ্বলজ্বল করছে খানিকক্ষণ আগে ফেলে আসা প্রদীপ্তর আদরের চিহ্নগুলো। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসে প্রদীপ্ত। গত একবছর ধরে যে রহস্যময়ী নারীর সাথে তার দুরন্ত প্রেমপর্ব চলছে সেই নারী আর কেউ নয় সুনেত্রা নিজে। এই একবছরে দুজনের সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বেই আটকে থাকেনি। বরং সেটা গহীন প্রেমে পরিণত হয়েছে। অথচ একবছর আগেই তার মনে হচ্ছিল মেয়েটা হয় বড্ড সরল, নাহলে সরলতার অভিনয় চালিয়ে যাওয়া এক ধূর্ত মানুষ। নাহলে মাত্র দুই দিনের দেখাতেই এভাবে কেউ কোনো অচেনা বা স্বল্প চেনা মানুষকে এতটা আপন করে নেয় নাকি? সন্দেহ করেছিল এই গায়ে পড়ে মেলামেশা করার পেছনেও হয়তো কোনো স্বার্থ লুকিয়ে থাকতে পারে। কিংবা হয়তো মেয়েটা জাহ্নবীরই পাঠানো কোনো ফাঁদ। যে এসেছে জাহ্নবীর হয়ে প্রতিশোধ নিতে। এই বিনোদনের জগতের মেয়েদের সে হাঁড়ে হাঁড়ে চেনে। হাতে গোনা কয়েকজন বাদ দিলে প্রায় সবকটাই স্বার্থপর। নিজের আখেরটা গুছোনোর জন্য সব করতে পারে। নিজের শরীরের বিনিময়ে চেয়ে নিতে পারে একাধিক favor, কিংবা হয়তো ওকে সাফল্যের সিড়ির মতো ব্যবহার করতে পারে।

 

কিন্তু এই একবছরে মেয়েটাকে নানাভাবে পরখ করে সে বুঝেছে মেয়েটা সত্যিই সরল। ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে এতগুলো বছর থাকার ফলে শারীরিক ছুঁতমার্গটা না থাকলেও এই বিনোদন জগতের নোংরা পাঁক এখনও স্পর্শ করতে পারেনি মেয়েটাকে। আর এই সরলতাটাই মুগ্ধ করেছে প্রদীপ্তকে। ভালবাসার উপর প্রদীপ্তকে আবার বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে মেয়েটা। বলা ভালো এই সরলতার জন্যই মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেছে সে।

 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটা মৃদু হাসি হেসে গ্লাসে অবশিষ্ট ওয়াইনটুকু এক চুমুকে শেষ করে ঘরে ঢোকে প্রদীপ্ত। সুনেত্রাকে জড়িয়ে ধরে কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায়। তারপর ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলে ওঠে, “কী হল? বার্থ ডে গার্ল-এর আদরের সাধ এখনও মেটেনি বুঝি? আরো আদর চাই?” সুনেত্রা মুচকি হেসে বলে, “দেহের সাধ তো মিটে গেছে, মনের সাধ এখনও মেটেনি।প্রদীপ্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সুনেত্রার দিকে, তারপর বলে, “মানে?”

 

মানে আমি কিন্তু এখনও আমার জন্মদিনের উপহার পাইনি।

 

সেকি! গিফট দিলাম যে! পছন্দ হয়নি বুঝি?

 

হুম! কিন্তু আমার যে সোনাদানা বা শাড়ি চাই না।

 

তাহলে কী চাই?

 

যা চাইব দেবে?

 

আগে তুমি চেয়ে তো দেখো। আমার সাধ্যের মধ্যে থাকলে নিশ্চয়ই পাবে।

 

আমার এখনই চাই কিন্তু!

 

এখনই? কিন্তু এই মুহূর্তে তোমাকে একরাশ আদর ছাড়া আমার যে কিছু দেওয়ার নেই সুনেত্রা।

 

আছে গো আছে। তোমার কাছে এমন জিনিস আছে যা আর কারো কাছে নেই। একমাত্র তুমিই দিতে পারবে আমাকে।

 

বটে? তা কী চাই তোমার?

 

তোমাকে আমার একটা আবদার রাখতে হবে।

 

আবদার? তা কীরকম আবদার শুনি?

 

মনে আছে প্রথমবার যখন আমার কাজগুলো দেখতে এসে সাদা ক্যানভাস দেখে তুমি অবাক হয়েছিলে। আমি বলেছিলাম ওটা নিয়ে আমার একটা প্ল্যান আছে।

 

হুম। মনে আছে।

 

আমি চাই ছবিটা তুমি পূর্ণ করো।

 

হোয়াট?

 

আমি চাই আমার কাজে অন্তত আমার প্রিয় শিল্পী কাম প্রেমিকের হাতের ছোঁয়া থাকুক।

 

কিন্তু ওটা তো তোমার কাজ! তোমার স্বপ্ন! না সুনেত্রা এটা হয় না। একজন শিল্পীর কাজ আরেকজন শিল্পী শেষ করতে পারেন না। তাছাড়া রাধার অভিসারসিরিজটা আমি এক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভেবেছিলাম, আর তুমি আরেক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভেবে এঁকেছএখন যদি আবার আমি তুলি ধরি তাহলে

 

আমি কিছু শুনতে চাই না। তুমি ছবিটা আঁকবে ব্যস।

 

কিন্তু

 

কোনো কিন্তু নয়। এটাই আমার জন্মদিনের আবদার ব্যস। আর কিছু চাই না।

 

প্রদীপ্ত বার বার সুনেত্রাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, একজন শিল্পীর অসমাপ্ত কাজ আরেকজন শিল্পী শেষ করতে পারেন না। দুজন মানুষের চিন্তাভাবনার ফারাকটা ধরা পড়ে যায় আর্টে। কিন্তু সুনেত্রা নাছোড়বান্দা। সে কিছুতেই ছাড়বে না। অগত্যা প্রদীপ্ত এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, “আচ্ছা বেশ তুমি যখন চাইছ, তবে তাই হোক।

 

আমার আরেকটা আবদার আছে।

 

আরেকটা আবদার? বেশ বলে ফেল।

 

ছবিতে রাধা হিসেবে তুমি আমাকে আঁকবে।

 

সুনেত্রার দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে প্রদীপ্ত। ওর মনে পড়ে যায় বহুকাল আগের এক গ্রীষ্মের দুপুরে কথা। জাহ্নবীও ঠিক এভাবেই আদর শেষে ওর কাছে একটা পোট্রেট চেয়েছিল। অনেক বছর পর আবার সুনেত্রা এভাবে আবদার করল। সুনেত্রা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, “কী হল? আঁকবে না?” মুচকি হেসে সুনেত্রার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে প্রদীপ্ত বলে ওঠে, “আচ্ছা বেশ! তাই হবে।


*****

 

স্ট্যান্ডের উপর ক্যানভাসটা বসিয়ে প্যালেটে কিছুটা রং ঢেলে তুলি দিয়ে ব্লেন্ড করতে করতে নিজের কল্পনায় দৃশ্যপটটা ভাবছিল প্রদীপ্ত। এমন সময় সুনেত্রার কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে সুনেত্রা স্টুডিওর দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই এক বছরে সুনেত্রাকে একাধিক সাজে দেখেছে সে। আর প্রতিটা সাজের মধ্যে প্রসাধনহীনা সাজেই বেশ স্নিগ্ধ লেগেছে তার। সেই মতোই সে সুনেত্রাকে সেজে আসতে বলেছিল। প্রদীপ্ত তাকিয়ে দেখে ওর কথা মতোই চোখে হাল্কা কাজল আর ঠোঁটে অল্প পরিমাণে লিপস্টিক পরেছে সুনেত্রা। সদ্য ভেজা চুল, আর কপালে লেগে থাকা জলবিন্দু দেখে বোঝা যাচ্ছে সদ্য স্নান সেরে এসেছে সে। পরনে একটা লাল সুতোর কাজ করা শাড়ি ছাড়া সুনেত্রা সমগ্র শরীরে যে বিন্দুমাত্র সুতো নেই সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না প্রদীপ্তর। কারণ শাড়ির আঁচল দিয়ে সমগ্র শরীর ঢাকা থাকলেও সুনেত্রার দেহের প্রতিটা বাঁক ভেজা শাড়ির উপর থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। এর আগেও অনেক নারীকে নিয়ে পোট্রেট এঁকেছে প্রদীপ্ত। কারো কারো সাথে তো উদ্দাম সঙ্গমের পর সে মেতে উঠেছে শিল্পের খেলায়। তুলির কয়েকটা আঁচড়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছে নিজের শয্যাসঙ্গিনীদের নগ্ন দেহের অবয়বকে। সে সব কাজ দেখে কেউ আনন্দে পুলকিত হয়েছে, কেউ বা বিরক্ত হয়েছে, আবার কেউ পুনরায় কামাবিষ্ট হয়ে নিজের দেহটাকেই ক্যানভাসের মতো মেলে ধরে আবদার করেছে শিল্পটাকে দেহের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার জন্য। তারা প্রত্যেকেই সুন্দরী হলেও কাউকেই এতটা মোহময়ী লাগেনি তার। তাদের কারো মধ্যেই এই মেয়েটার মতো সারল্যে ভরা চাহনি ছিল না। এখানেই হয়তো একজন প্রেয়সী আর মডেলের মধ্যে পার্থক্য।  

 

কিছুক্ষণের জন্য সুনেত্রার দিকে মোহাবিষ্টের মতো তাকিয়ে ছিল প্রদীপ্ত। সম্বিত ফিরতেই সে সুনেত্রাকে সামনের ডিভানে বসতে বলে সে। প্যালেটে রংগুলো মেশাতে মেশাতে জিজ্ঞেস করে, “তুমি যে থিমের কথা বলেছ সে অনুযায়ী তিনটে Posture হয়। Frontal, Side face, Back view অবশ্য তুমি নিজেও একজন ফাইন আর্টসের স্টুডেন্ট। এসব তো তুমি জানোই। এবার তুমি ঠিক করো কোন Posture-টায় তুমি নিজেকে flaunt করতে চাও।প্রদীপ্তর কথামতো ডিভানে বসে কাঁধ থেকে আঁচলটা নামিয়ে নিয়ে বুকের কাছে জড়ো করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে side face ভঙ্গিমায় নিজেকে মেলে ধরে সুনেত্রা। প্যালেটে রং মেশাতে মেশাতে আড়চোখে ডিভানে বসা সুনেত্রার দিকে একবার তাকিয়ে ক্যানভাসে মনোনিবেশ করে প্রদীপ্ত।

 

কতক্ষণ ধরে এক ভঙ্গিমায় ঠায় বসেছিল জানে না সুনেত্রা। সময় যেন কাটতেই চাইছে না। এক একটা মুহূর্ত যেন এক একটা ঘন্টার মতো মনে হচ্ছে তার। সারাদিন ডাবিং, শ্যুটিংয়ের চাপে আর বিশ্রামের সুযোগ পায়নি সে। তার উপর বাড়ি ফিরে এসে ওরকম তুখোর প্যাশনেট সঙ্গম। সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে একটা ক্লান্তি ক্রমশ গ্রাস করছে তাকে। এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে থাকায় কিছু মনে না হলেও এখন একটানা বসে থাকার ফলে স্নায়ু আর মাংসপেশীগুলো ক্রমশ বিদ্রোহ করতে ‌শুরু করেছে। ক্যানভাসের ‌ওপারের মানুষটার অবশ্য তাতে কোনো হেলদোল নেই। একজন ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো বুঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে ওর পোট্রেট এঁকে চলেছে সে। মাঝে মাঝে আড়চোখে একঝলক তাকাচ্ছে ওর দিকে, পরক্ষণেই আবার বুঁদ হয়ে যাচ্ছে ক্যানভাসে। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর সুনেত্রা জিজ্ঞেস করে, “কতদূর হল?” ওপার থেকে জবাব ‌আসে, “আর একটু বাকি। ওয়েট! একদম নড়বে না।সুনেত্রা চুপ করে বসে থাকে, আর প্রদীপ্ত একমনে প্যালেট থেকে রঙ নিয়ে ‌অভ্যস্থ হাতে ক্যানভাসে তুলি বোলাতে থাকে। সাদা ক্যানভাসের উপর ক্রমশ তিলে তিলে ফুটে ওঠে একটা অপূর্ব ছবি। অনেকক্ষণ পর যখন সুনেত্রার সমগ্র দেহ যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ার উপক্রম ঠিক তখনই প্রদীপ্তর কন্ঠস্বর শুনতে পায় সে, “And we are done!” 

 

প্রদীপ্তর কথাটা শোনামাত্র ছবিটা দেখার জন্য বুকের কাছে জড়ো করা আঁচলটা আবার গায়ে জড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও ডিভানের উপর বসে পড়ে সুনেত্রা। একটানা হাটু মুড়ে বসে থাকার কারণে পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে‌। প্রদীপ্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরে রং-তুলি টেবিলে রেখে ছুটে ‌আসে সুনেত্রার কাছে‌। তারপর কোনো মতে সুনেত্রাকে জড়িয়ে ধরে পায়ে পায়ে নিয়ে আসে ক্যানভাসের সামনে।

 

ক্যানভাসের সামনে দাঁড়াতেই স্তব্ধ হয়ে যায় সুনেত্রা। ওর অন্যান্য আঁকা ছবিগুলোর মতো এই ছবিতেও কালো আর নীল রঙের আধিক্য থাকলেও সেটা সম্পূর্ণ ক্যানভাস দখল করেনি। বরং গোটা ক্যানভাসের চারদিকে থেকে একটা অপূর্ব মাধুর্যের সৃষ্টি করেছে। ছবিটার পটভূমি হচ্ছে নিধিবনের মাঝে রাধা-কৃষ্ণের মিলন ঘটার আগের মুহূর্ত। কানাইয়ের বাঁশীতে পাগলিনী হওয়া রাধারানী শ্বশুরবাড়ির মানসম্মান, কুলমর্যাদা, এমনকি নিজ আত্মসম্মান ত্যাগ করে ছুটে এসেছেন নিধিবনে গোপন অভিসারে। কানাইয়ের চরণে বসে উৎসর্গ করছেন নিজ মান, জীবন, নারী লজ্জা। ত্যাগ করছেন নিজের দেহের প্রতিটা আভূষণ, এমনকি নিজ দেহের লজ্জা নিবারণ হেতু অবস্থিত বস্ত্রের প্রতিও তার আর মোহ নেই। সেটাও তিনি অর্পণ করছেন তার কানাইয়ের চরণে। স্খলিতবসনা রাধার এহেন আত্মসমর্পণে কৃষ্ণ অভিভূত। নত হয়ে হাতের তর্জনী দিয়ে রাধার চিবুক ছুঁয়ে মুখটা নিজের দিকে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি।

 

ছবিটার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিল সুনেত্রা, এমন সময় সে টের পায় ওর ঘাড়ের কাছে প্রদীপ্ত ওর ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলছে, “ধীরসমীরে যমুনাতীরে বসতি বনে বনমালী।/ পীনপয়োধরপরিসরমর্দ্দনচঞ্চলকরযুগশালী।।

 

সুনেত্রা অনুভব করে ওর ঘাড়ের উপর বয়ে চলা প্রদীপ্তর প্রশ্বাসের উত্তাপকে। মুচকি হেসে সে বলে চলে, “পততি পতত্রে বিচলতি পত্রে শঙ্কিতভবদুপযানম্।/ রচয়তি শয়নং সচকিতনয়নং পশ্যতি তব পন্থানম্।।

 

প্রদীপ্ত সুনেত্রাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে মুখটাকে কাছে এনে বলে, “বিগলিতবসনং পরিহৃতরসনং ঘটয় জঘনমপিধানম্।/কিশলয়শয়নে  পঙ্কজনয়নে  নিধিমিব হর্ষনিধানম্।।

 

সুনেত্রা এবার তাকায় প্রদীপ্তর দিকে। ওদের দুজনের ঠোঁটের মাঝের ব্যবধান ক্রমশ কমে আসে। সুনেত্রা টের পায় প্রদীপ্তর গরম প্রশ্বাস ধীরে ধীরে আছড়ে পড়ছে ওর ঠোঁটের উপরে। সে চোখ বুঁজে বলে, “হরিরভিমানী রজনিরিদানীমিয়মপি যাতি বিরামম্।

 

প্রদীপ্ত আর দেরী করে না। মৃদু হেসে সুনেত্রার ঠোঁটের ফাকে নিজের ঠোঁট গুঁজে দেয় সে। তারপর সুনেত্রাকে কোলে তুলে ডিভানের উপর শুইয়ে শরীর থেকে শাড়িটা একটানে খুলে মেঝেতে ফেলে দেয়‌।

 

অনেকক্ষণ পর রঙে মাখামাখি হয়ে যাওয়া দুটো রতিক্লান্ত দেহ যখন পরস্পরকে ছেড়ে আলাদা হল ততক্ষণে রাত পেরিয়ে ভোর হতে চলেছে। পাশ ফিরে শুয়ে ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বিধ্বস্ত, রতিক্লান্ত সুনেত্রা বলে ওঠে, “ঘুমোলে নাকি?” পাশে চোখ বোঁজা অবস্থায় শুয়ে থাকা প্রদীপ্ত চোখ বোঁজা অবস্থায় বলে ওঠে, “উঁহু!

 

ছবিটা কিন্তু দারুণ হয়েছে। থ্যাঙ্ক ইউ! জন্মদিনে আমাকে এত সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার জন্য।

 

হুম।

 

আচ্ছা একটা প্রশ্ন ছিল। করবো?

 

উঁ?

 

কি তখন থেকে উঁ উঁ করে যাচ্ছো বলো তো?

 

উফ! শান্তিতে মুহূর্তটাকে উপভোগও করতে দেবে না এই মেয়েটা! খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন! এত প্রশ্ন আসে কোথা থেকে? তোমার অভিনয়ে না গিয়ে সাংবাদিকতায় যাওয়া উচিত ছিল। আরে বাবা আদরের পর এত কথা বলতে নেই। চুপ করে পরস্পরের উপস্থিতি আর স্পর্শটাকে অনুভব করতে হয়। নির্বাক হয়ে পরস্পরের হৃদস্পন্দন শুনতে হয়। তা না খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন! আচ্ছা ঠিক আছে কী বলছিলে বলো?

 

বলবো না। আমি তো খালি বকবক করি তাই না! এখন তো আমার গলাকে অসহ্য মনে হবেই।  আদরের পার্ট চুকে গেছে না!

 

ফালতু কথা বলবে না!

 

কি? আমি ফালতু কথা বলি?

 

বলোই তো! সারাদিন খালি বক বক করতে থাকো বকবকম পায়রার মতো। কী হল যাচ্ছো কোথায়?

 

ডিভানের উপর উঠে বসে সুনেত্রা। অভিমান ভরা গলায় বলে, “বেশ আমার কন্ঠস্বর যখন সহ্য হচ্ছে না। তখন আমি এখানে থাকবো না।সুনেত্রার হাত ধরে প্রদীপ্ত বলে ওঠে, “কোথাও যাবে না তুমি! আমার এখনও কথা শেষ হয়নি।

 

ছাড়ো আমাকে।

 

আমি বলছি যখন তুমি যাবে না। ব্যস।

 

ইস! কী করবে শুনি?

 

দেখবে? এই দেখো!

 

বলে সুনেত্রাকে নিজের বুকের উপর টেনে নেয় প্রদীপ্ত। তারপর সুনেত্রাকে জড়িয়ে বিছানার উপর শুইয়ে দিয়ে দুহাতে সুনেত্রার হাত চেপে ধরে। তারপর সুনেত্রার মুখের কাছে নিজের মুখ এনে বলে, “বললাম না। এখন যাওয়া চলবে না!প্রদীপ্তর বাহুডোরে ছটফট করতে করতে সুনেত্রা বলে, “ছাড়ো আমাকে! গা ধুতে হবে। সারা গায়ে রং লেগে চ্যাট চ্যাট করছে। তোমাকেও গা ধুতে হবে। নিজের চেহারাটা একবার আয়নায় দেখেছ? রং মেখে ভূত হয়ে শুয়ে আছে। কিম্ভুত কোথাকার! এরপর সারা শরীর কুটকুট করবে তো!

 

করুক। আমি পরোয়া করি না। তাছাড়া এই রং ধুয়ে কী হবে? আসল রংটাকে তো আর শতবার ধুলেও তোলা যাবে না।

 

কোন রংটাকে?

 

কেন? আমাদের হৃদয়ের রংটাকে?

 

বলে প্রদীপ্ত অঝোর বৃষ্টিধারার মতো নেমে আসে সুনেত্রার চোখে, গালে ঠোঁটের উপর। বাইরে তখন রাতের অন্ধকার কেটে সূচনা হয় নতুন ভোরের

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...