অনুসরণকারী

শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২২

মহাপুজো

 






এ কাহিনী আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের। তখনও শহুরে আধুনিকতা, বিদ্যুতের আলো গ্রামাঞ্চলে সব জায়গায় এসে পৌঁছায়নি। লোকজন তখনও রাতের বেলা লন্ঠন, কুপির আলো ব্যবহার করতো। সাধারণ জীবনযাপন করতো। দিনে দুবেলা দুমুঠো ভাত আর দুটো মোটা কাপড়ে তাদের চলে যেত। যারা কর্মঠ ছিল তাদের চলে গিয়েছিল শহরে কারখানায় কাজ করতে। অল্প সংখ্যক লোকেরা থেকে গিয়েছিল গ্রামেই। তারা চাষবাস করে কোনোক্রমে খরচ চালাত। 

 

এই সময় মানুষজনের ভগবানের প্রতি, সাধুদের প্রতি ভক্তি ছিল নিখাঁদ। তারা সাধুসন্তদের ভক্তিশ্রদ্ধা করতো। তাঁদের সম্মানের আসনে বসাতো। এরকমই এক সাধু ছিলেন হলদিবাড়ির ধর্মানন্দ মহারাজ। প্রচলিত ছিল ধর্মানন্দ মহারাজের কাছে কেউ গেলে খালি হাতে ফিরতো না। ধর্মানন্দের কৃপায় তাদের সব মনোবাঞ্ছা পূরণ হতো। কালক্রমে একদিন ধর্মানন্দ বৃদ্ধ হলেন। ধীরে ধীরে দেহত্যাগের সময় এলে তাঁর একান্ত প্রিয় দুই শিষ্যকে আশ্রমের দায়িত্ব প্রদান করে অগণিত ভক্তদের কাঁদিয়ে দেহত্যাগ করলেন তিনি।

 

গুরুদেবের মৃত্যুর পর তাঁর দুই শিষ্য চন্দ্র ও রণদা দুজনে যথাক্রমে চন্দ্রধর ও রণদানন্দ নাম গ্রহণ করে আশ্রমের দায়িত্ব নিলেন। চন্দ্রধরের বরাবর ঈশ্বর চিন্তায় মন ছিল। তাই তিনি আশ্রমে জপতপ, যজ্ঞ পুজাদির পুরোহিত হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। অপরদিকে রণদানন্দ বৈষয়িক বুদ্ধিসম্পন্ন এবং ভক্তদের নয়নের মণি হওয়ায় ভক্তদের দীক্ষাদান, ও আশ্রমের বাহ্যিক সুরক্ষা ও পরিচালনের দায়িত্ব নিলেন। দুই শিষ্যের নিষ্ঠায়, ও ব্যবহারে মুগ্ধ হল সমগ্র আশ্রমের সদস্য তথা ভক্তকুল। যথারীতি ধর্মানন্দের চেয়েও বেশি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল এই দুই শিষ্যের।

 

এরকমই একদিন আশ্রমে বসে গুরুমন্ত্র জপ করছিলেন চন্দ্রধর হঠাৎ এক শিষ্য এসে খবর দিল জ্যোতিষী তর্কবাচস্পতির সাথে জলপাইগুড়ির চক্রবর্তী পরিবারের কর্তা তাদের নতুন পুত্রবধূকে নিয়ে এসেছেন। বিশ্রামাগারে তারা বিশ্রাম করছেন। দুই গুরুদেবের মধ্যে একজনের তারা দর্শন করতে চান।

 

কথাটা শোনামাত্র চন্দ্রধরের মনে পড়ে গেল কয়েক মাস আগের কথা। কয়েকমাস আগে একটা পুজো উপলক্ষে আশ্রমে ভক্তসমাগম চলাকালীন এক প্রৌঢ় তার পায়ে উপর পড়ে কেঁদে ফেলেছিল। কিছুতেই উঠছিল না। পোশাকআশাক দেখে দরিদ্র ব্রাহ্মণ মনে হয়েছিল তার। পরে ভক্তদের ভীড় কমার পর তার কক্ষে আলাপ হয়েছিল তর্কবাচস্পতিদের সাথে। তখনই জানতে পেরে‌ছিলেন পুরো ঘটনাটা। জলপাইগুড়ি শহরের অন্যতম ধনী পরিবার হলেন চক্রবর্তীরা। শহরের বুকে বড়োসড়ো কাপড়ের কারবার তাদের। জলপাইগুড়ি তো বটে কলকাতা বোম্বেতেও তাদের কাপড় যায়। এই চক্রবর্তীদের বর্তমান কর্তা বেনীমাধব চক্রবর্তীর কনিষ্ঠপুত্র সোমব্রতর বিবাহ স্থির হয়েছে নদীয়া নিবাসী জগমোহন ভট্টাচার্যের জ্যেষ্ঠ কন্যা ময়নার সাথে।

 

*****

 

জগমোহন গরীব ব্রাহ্মণ। যজমানি আর গ্রামের মন্দিরে পুজো করে তার অতি কষ্টে দিন কাটে। বাড়িতে আছে তার স্ত্রী আর দুই কন্যা ময়না ও অহনা। বড়ো মেয়ে ময়নাকে নবদ্বীপের রাইরাজা উৎসবে দেখেছিল সোমব্রত। প্রথম দেখাতেই মন দিয়ে ফেলেছে সে। উৎসব শেষে খোঁজ খবর নিয়ে সে একদিন পিতাকে নিয়ে হাজির হয় জগমোহনের বাড়িতে। জগমোহনকে প্রস্তাব দেয় ময়নার সাথে তার বিয়ে দেওয়ার জন্য।

 

জগমোহন গরীব মানুষ, মেয়ের বিয়ের চিন্তা নিয়ে এমনিতেই জেরবার ছিল সে। হঠাৎ এরকম প্রস্তাবে সে প্রথমে বিহ্বল হলেও পরে রাজি হয়ে যায়। দুই বাড়িতে ‌বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়। একসময় দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে জগমোহন চলে আসে জলপাইগুড়িতে। বেনীমাধবের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু করে যজমানির কাজ। এদিকে বর-কনে দুজনের কুষ্ঠি বিচার করতে বেনীমাধব কলকাতা থেকে নিয়ে আসেন তর্কবাচস্পতিকে। আর সেখানেই ঘটে অঘটন। 

 

কুষ্ঠিবিচার করে জ্যোতিষী জানান ময়নার জন্মছকে কিছু দোষ আছে। সেটাই বিয়ের বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার দোষ কাটাতে না পারলে সোমব্রতর সমূহ বিপদ হতে পারে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বাধা কাটাতে হবে। সবটা শোনার পর বিয়েবাড়িতে নেমে এল শ্মশানের নিস্তব্ধতা। বিশেষ করে জগমোহনের মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে বেচারা কত স্বপ্ন দেখেছিল মেয়েকে নিয়ে। এখন এত বড়ো সর্বনাশের কথা শোনার পর যেন ওর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। সে ঝাঁপিয়ে পড়ল জ্যোতিষীর পায়ের উপর। হাউমাউ করে কেঁদে বিচার চাইল। এদিকে সোমব্রত জানাল বিয়ে করলে সে ময়নাকেই করবে। বেনীমাধব কনিষ্ঠপুত্রকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন বলেই হয়তো ছেলের আবদার ফেলতে পারলেন না। তিনিও উপায় জানতে চাইলেন। জ্যোতিষী জানালেন এর উপায় একমাত্র জানতেন ধর্মানন্দ। কিন্তু তিনি বর্তমানে দেহ রেখেছেন। তাঁর অবর্তমানে তার দুই শিষ্যই পারেন সমাধান করতে। সেই কারণেই আশ্রমে ওদের ‌আগমন। 

 

ঘটনাটা শুনতে শুনতে সমাধান করে ফেলেছিলেন চন্দ্রধর। বেশি কিছু না, একটা স্বস্ত্যয়ন করে সেই যজ্ঞাবশেষ একটা মাদুলিতে নিয়ে পরলেই কেটে যাবে। সেটাই বলে এদেরকে রণদার কাছে পাঠাতেন, কিন্তু সোমব্রতের জেদের কথা শুনে থমকে গেলেন তিনি। ছেলেটা কী এমন দেখল মেয়েটার মধ্যে যে চরম বিপদের পরেও বিয়ে করতে চাইছে? কী এমন ‌আছে মেয়েটার মধ্যে? কথাটা মনে ‌আসতেই তিনি কৌতুহলবশত দেখতে চাইলেন ময়নাকে। অজুহাত হিসেবে বললেন ময়নাকে দেখলে বিপদের গুরুত্বটা আন্দাজ করতে পারবেন তিনি। বেনীমাধব জানালেন তারা পাত্রপাত্রী দুজনকেই নিয়ে এসেছেন আশীর্বাদের জন্য। বলে দরজার কাছে গিয়ে একটু গলা খাকড়াতেই একটা যুগল দেখা দিল। আর সেই যুগলের মধ্যে নারীমুর্তির দিকে তাকাতেই চমকে গেলেন চন্দ্রধর। পরক্ষণে নিজেকে সামলে চন্দ্রধর বলে উঠলেন, “আরে! এরা তো নেহাতই বাচ্চা! এখনই সংসার করবে কী করে? তা হ্যা গো জগমোহন মেয়ের বয়স কতো?” জগমোহন হাত কচলে জানালো, “মিথ্যে বলবো না গুরুদেব। তবে মেয়েমানুষের অল্পবয়সে বিয়ে হওয়াই ভালো। তাও তো ওকে নিজের বুকে আগলে রেখেছিলাম অনেকদিন। এই ফাল্গুনে আঠেরোতে পড়লো।” 

 

বেশ বেশ! তা কই হে! দূরে দাঁড়িয়ে ‌কেন? এসো! আমার সামনে এসো।

 

বলতেই দুজনে ‌এসে চন্দ্রধরের পা স্পর্শ করতেই স্নেহময় পিতার মতো দুজনের মাথায় হাত রেখে চন্দ্রধর বললেন, “মঙ্গল হোক! তোমাদের জুটি শিব-পার্বতীর মতো অক্ষয় হোক। আর ভয় নেই সব বিপদ কেটে যাবে। এখন যাও দুজনে গিয়ে ভোগপ্রসাদ খেয়ে এসো। রণদা, প্রসাদের সময় হয়ে এল। যাও সকলকে নিয়ে ভোগগৃহে বসাও। আমি আসছি। কথাটা শুনে রণদা বেরিয়ে গেলেন দুজনকে নিয়ে। চন্দ্রধর বসলেন তার আসনে ততক্ষণে তিনি তার ‌পরবর্তী পরিকল্পনা ভেবে ফেলেছেন। যে করেই হোক মেয়েটাকে তার চাই। আসনে বসে চন্দ্রধর জানালেন, “দেখুন চক্রবর্তী মশাই ব্যাপারটা সত্যিই গুরুতর হলেও আশার ‌আলো আছে‌। তর্কবাচস্পতি যা বলেছেন তা সত্য হলেও অতটা ভয়ের কিছু নেই। তবে দুটো কাজ করতে হবে। ‌আপাতত স্বস্ত্যয়‌ন করে দুটো মাদুলি দেবো আপনাদের। বর কনেকে সেটা পড়ে ‌থাকতে হবে প্র‌থম সন্তান জন্মের আগে পর্যন্ত। এতে প্রাথমিক বাধা কেটে যাবে। তবে জগমোহনের মেয়েকে দেখে যা বুঝলাম ও মেয়ে বেহুলার ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে। হাজার সাবধানতা থাকলেও কালরাত্রীতেই একটা ভয় থেকে যাচ্ছে।” 

 

এইটুকু বলে থামলেন চন্দ্রধর। জগমোহনের অবস্থা তখন শোচনীয়। এই একটু আগে বিপদ কাটাবার জন্য মাদুলির কথা শুনে নিশ্চিন্ত হলেও বর্তমানে আবার অন্ধকার নেমেছে মুখে। তর্কবাচস্পতি মাথা নেড়ে বললেন, “ঠিক তাই! ও মেয়ে মহাসতী। মহাপুরুষের আশীর্বাদে জন্ম ওর। ওকে বিয়ে করলে চক্রবর্তীমশাইদের উন্নতির সীমা থাকবে না। কিন্তু ঐ বাধাটাই যা ঝামেলা করছে। সে কারণেই আমরা এসেছি আপনার কাছে। দয়া করে একটা সমাধান করে দিন‌ আপনি!” 

 

আপনারা ভুল করছেন। আমি ঈশ্বর নই। বাঁচা-মরা সবই তাঁর হাতে। তিনিই সম‌স্যা দিয়ে পরীক্ষা নেন। আবার তিনিই সমাধান করান। আমরা তো নিমিত্ত মাত্র। তবে একটা কাজ করা যেতে পারে। তবে তার আগে আপনাদের অনুমতি চাই। 

 

বেনীমাধব মাথা নেড়ে বললেন, “কী রকম অনুমতি?” চন্দ্রধর হেসে বললেন, “খারাপভাবে নেবেন না। ময়নাকে কিন্তু ‌আমি মেয়ের চোখে দেখেছি।” 

 

সে তো বুঝলাম কীসের অনুমতি চাইছেন

 

আসলে ময়নার যে বিপদ সেটা কাটাতে হলে ওকে একটা বিশেষ পুজোয় বসতে হবে। পুজোটা হবে কালরাত্রীর রাতে। সেদিন সারারাত ওকে পুজোয় সংকল্প নিয়ে বসতে হবে। 

 

বেশ তো! বসুন না! এতে ‌অসুবিধে কোথায়

 

অসুবিধে ‌আছে বলেই তো আমি কুন্ঠিত। আসলে ঐ পুজোর সময় পুজাগৃহে পুরোহিত আর যিনি পুজোর সংকল্প নিয়েছেন তাদের বাদে ভিন্ন ব্যক্তির থাকা নিষেধ। তা সে যেই হোক না কেন। মানে ঘরে শুধু আমি, রণদা আর ময়না থাকবে। ঘরের দোর বন্ধ করে সমগ্র রাত জুড়ে পুজোটা হবে। তবে আমি আশ্বাস দিতে পারি ময়নার বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না। ওকে আমি কন্যারূপে দেখেছি যখন এতটুকু নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। 

 

কথাটা শেষ করামাত্র যেন ঘরের ভেতর নেমে এল গভীর নিস্তব্ধতা। যেন পিন পড়লেও শোনা যাবে। জগমোহন স্থবির হয়ে বসে রইল ওর জায়গায়। বেচারী ওর সর্বনাশের সমাধান চাইতে এসেছিল। এত বড়ো বিপদের মুখে পড়ে যাবে ভাবতে পারেনি। বেনীমাধবের ভ্রু কুঁচকে রইল। তিনি ঢোক গিলে বললেন, “এর মানেটা আপনি বুঝতে পারছেন?” 

 

বুঝতে পারছি বলেই তো অনুমতি চাইছি। 

 

যদি না বলি

 

তাহলে আর কি? ওদের বিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করুন চরম সর্বনাশের। যদি কালরাত্রীতে আপনার ছেলে বেঁচে যায় তাহলে দীর্ঘায়ু হবে। যদিও বাঁচার সম্ভাবনা কম। 

 

তাই বলে চক্রবর্তী বংশের বউ একরাত পরপুরুষের সাথে... 

 

সাবধান! আপনি যে অর্থে কথাটা বলছেন সেটা এখানে খাটে না চক্রবর্তী মশাই! এটা আশ্রম, এখানে প্রায় সকলেই ব্রহ্মচর্য ব্রত ধারণ করেছে। হ্যা যদি আমি কোনো কাপালিক বা তান্ত্রিক হতাম তাহলে হয়তো ভয়ের কারণ হতে পারতো আপনার। তাছাড়া ওকে আমি মেয়ের চোখে দেখেছি। একজন পিতা তার কন্যাকে কী করে... কথাটা ভাবতে একবারও লজ্জা করলো না আপনার

 

হিসহিসে কণ্ঠে কথাগুলো বলে থামলেন চন্দ্রধরতর্কবাচস্পতি একবার চেষ্টা করলেন, “আর কোনো পথ নেই?” 

 

ক্ষমা করবেন! এছাড়া আর কোনো পথ নেই। কিন্তু যা দেখছি চক্রবর্তী মশাই আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ অবস্থায় আর কিছু করার নেই। মানুষ যদি মানুষকে সামান্য বিশ্বাস না করতে পারে তাহলে আমার কিছু বলার নেই। আপনারা আসতে পারেন। ফেরার আগে ভোগপ্রসাদ খেয়ে যাবেন। 

 

বলে আসন থেকে নেমে চন্দ্রধর দরজার দিকে এগোতে যাবেন এমন সময় শুনতে পেলেন চক্রবর্তী মশাই বলছেন, “আমি রাজি! শুধু কথা দিন আমার বউমা...” 

 

অক্ষত ও কুমারী থাকবে। ওকে আমরা কেউ স্পর্শ পর্যন্ত করবো না এইটুকু আশ্বাস দিলাম। 

 

চক্রবর্তীমশাই কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বেশ! তবে তাই হোক।” বলে জগমোহনদের নিয়ে বেরিয়ে গেলেন আশ্রম থেকে। চন্দ্রধর বসে বসে তাদের যেতে দেখে মুচকি হেসে উঠলেন। অবশেষে অনেকদিন পর তার অভীষ্ট পূরণ হল। এতদিনে সাধনসঙ্গিনীর দেখা পেলেন তিনি। চোখ বুঁজে মেয়েটার মুখ মনে করার চেষ্টা করলেন তিনি। লম্বায় তার বুকের কাছাকাছি হবে মেয়েটা। শ্বেতশুভ্র বর্ণ দেহের। টানা টানা পদ্মের মতো চোখ, আর্যনারীদের মতো লম্বা টিকালো নাক, ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁট, কণ্ঠায় দুটো শঙ্খের ন্যায় দাগ। ক্ষীণ কোমর, বেলফলের মতো স্তনযুগল! এ যেন কালিদাসের বর্ণনা করা সাক্ষাত কোনো অপ্সরা বাঙালী সাজে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে! সোমব্রতের নজরের তারিফ না করে পারলেন না তিনি। কোনো সন্দেহ নেই, একেবারে খাসা হীরে তুলেছে ছেলে, কিন্তু এই কন্যা যে সংসারের জন্য নয়! এ কন্যা যে দেবভোগ্যা! সাধনসঙ্গিনী হবার উপযুক্ত গুণ এর মধ্যে! যদি সাধনসঙ্গিনী নাও হয় তাও এর গর্ভে যে জন্ম নেবে সে মহাতেজস্বী আর ক্ষণজন্মা হয়ে জন্মাবে। এই মেয়েকেই তার চাই! একে কিছুতেই চক্রবর্তীদের বঁধু হতে দেওয়া যাবে না। এই মেয়ের উপর একমাত্র তারই অধিকার থাকবে! ঈশ্বরের কৃপায় আশ্রমের ভাঁড়ার ভরে উঠলেও চন্দ্রধরের মনে শান্তি ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর প্রায় চারবছর কেটে গেলেও তিনি প্রকৃত সাধনসঙ্গিনীর সন্ধান পাননি। এই চারবছরে তিনি আর রণদা একাধিক নারীকে ভোগ করেছেন। কিন্তু কারো মধ্যেই সেই সুখ পাননি তিনি। রণদাকে বলে লাভ নেই। সে বৈষয়িক মানুষ, বাবার মতোই বাছবিচার নেই তার। দিনের শেষে ঘরে একাধিক অর্থ আর বিছানায় একটা সোমত্ত মেয়েমানুষ হলেই হয়ে যায় তার। কিন্তু তিনি অন্য ধাতুতে গড়া। নারীদেহে তার মোহ থাকলেও আসক্তি নেই তার চাই প্রকৃত সাধনসঙ্গিনী। এত দিনে বোধহয় সেই অভাবটাও পূরণ হতে চলেছে।

 

 

*****

 

এই পর্যন্ত বলে থামল ব্যোমকেশ। আমরা সকলে আজ অনেকদিন পর হাজির হয়েছি বালুর বাড়িতে। চা সহযোগে পুরোনো দিনের কথা বলতে বলতে ব্যোমকেশ ওর জীবনের প্রথমদিকের এক গল্প বলতে শুরু করেছিল। ব্যোমকেশ থামতেই আমি বললাম, “এক সেকেন্ড! এই তুমি বললে চন্দ্রধর নাকি সেই ধার্মিক মানুষ। তো তার মধ্যে…মানে।”

 

কথাটা শুনে মুচকি হেসে বলল, “ওরা অন্তত এই বিশ্বাসটাই ভক্তদের মনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আজকালকার ভাষায় যেটাকে ইমেজ বলে। ভক্তদের মনে সেটাই তৈরী করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবটা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। সাধুর বেশে থাকা ধর্মানন্দ বাস্তবে ছিলেন দুরাচারী, অর্থলিপ্সু ও প্রচণ্ড কামুক। সন্তানহীনা কত নারীকে যে তিনি পুজোর নামে ভোগ করেছেন তার হিসেব নেই। এমনকি আশ্রমের আবাসিক মহিলারাও বাদ যায়নি তার কাম ক্ষুধাগ্নির থেকে। আশ্রমের ভেতরের লোকদের কাছে কানাঘুষো শোনা যায় চন্দ্রধর আর রণদানন্দ আর কেউ নয়, তার আপন সন্তান। হয়তো সে কারণেই ওরা তাঁর এতটা প্রিয় ছিল। মানুষ হিসেবে পিতার কোনো গুণ না পেলেও দুটো জিনিস পেয়েছিলেন চন্দ্রধর আর রণদা। সেটা হল অপরিমিত কাম, ও প্রবল অর্থলিপ্সা। চন্দ্রধর ঈ‌শ্বরমতি হওয়ায় টাকাপয়সায় উৎসাহী না হলেও নারীদেহের প্রতি লোভ ছিল অসম্ভব। তবে তা ঈশ্বরকার্যের হেতু। পঞ্চমকার দ্বারা নারীদেহ ভোগ করতেন তিনি। ভাইয়ের মতো রণদা নারীদেহ ভোগ করতে পছন্দ করলেও তার চেয়ে অর্থ, সোনা এসবের প্রতি মোহ ছিল সাংঘাতিক। ধর্মানন্দের মৃত্যুর পর দুভাই যাকে বলে জাঁকিয়ে বসলেন পিতার সিংহাসনে। আর ভদ্রতার মুখোশ পরে চালিয়ে যেতে লাগলেন তাদের কারবার। কারো কোনো বিপদ বা কোনো ইচ্ছে থাকলে অর্থ আর ক্ষমতাবলে সেটা পূরণ করার পর চেয়ে নিলেন দক্ষিণা স্বরূপ অর্থ, কিংবা সেরকমই মূল্যবান জিনিস।

 

– এতো রীতিমতো বিশ্বাস নিয়ে খেলা! তখনকার যুগেও এসব ছিল?

 

– ছিল না বলেই তো ওদের এই রূপ কেউ বিশ্বাস করেনি। করলে ওদের ব্যবসা কবে লাটে উঠত! তাছাড়া মানুষ হিসেবে দুজনে ভীষণ ধুর্ত ছিলেন। ঝোপ বুঝে কোপটা মারতেন। যার ফলে খটকাটা কেউ ধরতে পারত না।

 

– ঠিক ভৈরবের মতো!

 

– একদম!

 

গল্পটা মাঝপথে থেমে যাওয়ায় শর্মিষ্ঠা বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, “উফ! তোমরা থামবে? ব্যোমকেশদা তারপর কী হল বলো?” ব্যোমকেশ মুচকি হেসে গাঁজার জয়েন্টে একটা লম্বা টান দিয়ে বলতে শুরু করল।

******

 

 

তারপর কেটে গেছে কয়েকমাস। ‌আশ্রমের কাজের চাপে ময়নার কথা ভুলেই গেছিলেন চন্দ্রধর। শিষ্যের কথায় সব মনে পড়ে গেল তার। তিনি শিষ্যকে বললেন রণদাকে একবার ডেকে পাঠাতে। রণদা আসতেই তিনি চক্রবর্তীদের নিজের কক্ষে নিয়ে আসতে বললেন। শিষ্য বেরিয়ে যেতেই রণদাকে যতটা সম্ভব ততটা সংক্ষিপ্ত করে নিজের পরিকল্পনা বোঝালেন চন্দ্রধর। সবটা বোঝার পর রণদার ঠোঁটেও এক ধুর্ত হাসি ফুটে উঠল। গতকালই তারা ফিরেছেন বেনারস থেকে। এবার একটা সম্মেলনের উদ্দেশ্যে চন্দ্রধরের সাথে তাকেও যেতে হয়েছিল। টানা পনেরোদিন নারীসঙ্গহীন হয়ে রয়েছেন তারা। আজ সেই শরীরের খিদে মিটবে নারীদেহে। সবটা শোনার পর তিনি বললেন, “তুমি যা বলবে তাই হবে তবে আগে আমি মেয়েটাকে ভোগ করবো!চন্দ্রধর হেসে জানালেন তাই হবে। 

 

কিছুক্ষণ পর কনের সাজে ময়নাকে ঘরে ঢুকতে দেখে রণদা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। চন্দ্রধরের কথা শুনে ‌মেয়েটার রূপ আন্দাজ করেছিলেন তিনি। তাই বলে এতটা? এতো সাক্ষাত কামদেবী! মেয়েটাকে দেখতেই ভেতরে কামক্ষুধা জেগে উঠল রণদার। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিতেই শুনলেন চন্দ্রধর বলছেন, "আগে চক্রবর্তীরা জলযোগ সেরে নিন, বিশ্রাম করুন। তারপর সব হবে। তবে ময়না মাকে পুজোর জন্য শুধু সরবত খেয়ে ‌থাকতে হবে এই যা।" এইভাবে কলাকুশল বিনিময়ের পর ওদের বিশ্রামাগারে পাঠিয়ে রণদাকে নিয়ে পুজোর জোগাড়ে লেগে পড়লেন চন্দ্রধর। 

 

*****

 

 

রাতের খাবারের পর সকলে ঘুমিয়ে পড়তেই ময়নাকে নিয়ে পুজাগৃহের সামনে এসে দাঁড়ালেন বেনীমাধব। চন্দ্রধর গৃহের ভেতরেই ছিলেন, তার অনুমতিতে পুজাগৃহে ঢুকলেন বেনীমাধব। ময়নাকে বসিয়ে কিছুক্ষণ পুজোর আয়োজন দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। আর তিনি বেরোতেই গৃহের দরজা লাগিয়ে দিলেন রণদা।

 

ঘরের দোর বন্ধ করে দিতেই চন্দ্রধর পুজো শুরু করে দিলেন। মাতৃপুজোয় যা যা উপাচার লাগে সব দিয়ে পুজো সেরে যজ্ঞে বসলেন চন্দ্রধর। ময়নার হাতে একটা লালসুতো বেঁধে মায়ের চরণের সিঁদুর কপালে পরিয়ে যজ্ঞকুণ্ডের ‌আগুনটাকে উসকে দিয়ে যজ্ঞে বসে মন্ত্রোচ্চারণের সাথে যজ্ঞে আহূতি দিতে লাগলেন তিনি। গোটা ঘর ভরে উঠল যজ্ঞের ধোঁয়া আর চন্দ্রধরের উদাত্ত মন্ত্রোচ্চারণে। প্রচণ্ড ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে উঠল ময়নার। আহূতি ছেড়ে দুহাতে চোখ ডলতে শুরু করল সে। এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন চন্দ্রধর। তিনি রণদাকে চোখের ইশারা করতেই রণদা উত্তরীয় দিয়ে নিজের মুখ ঢাকলেন। রণদার দেখাদেখি চন্দ্রধরও নিজের মুখ ঢেকে ঝোলা থেকে বের করে আনলেন এক বিশেষ গন্ধক। সেটা ঘিয়ে মিশিয়ে আগুনে আহূতি দিতেই গোটা ঘর ভরে উঠল একটা মিষ্টি গন্ধে। পরক্ষণেই ময়নার অচৈতন্য দেহটা লুটিয়ে পড়ল চন্দ্রধরের কোলে। চন্দ্রধর মৃদু হেসে তাকালেন রণদার দিকে।

 

******

 

সেদিন রাতে পুত্রবধূকে পুজোগৃহে রেখে আসার পর দু চোখের পাতা এক করতে পারেননি বেনীমাধব চক্রবর্তী। চক্রবর্তী বংশের বউ কিনা একরাতের জন্য দুজন পরপুরুষের সাথে থাকবে? চন্দ্রধর যতই আশ্বাস দিন না কেন, লোক সমাজ তো আর সেটা মানবে না। একটা বদনাম থেকেই যাবে সারাজীবন। কিন্তু তিনিও যে নিরুপায়! ছোটোখোকাকে তিনি বড্ড ভালোবাসেন। ছেলেটার মঙ্গলের জন্যই তো এত কিছু করতে হয়েছে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটু তন্দ্রামতো এসেছিল তার আচমকা একটা বুক হিম করা আর্তনাদ শুনে বিছানায় উঠে বসলেন তিনি। চিৎকারটা পুজাগৃহের থেকে এল মনে হল। তবে কি? এক লাফে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন বেনীমাধব। তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে ছুটে গেলেন পুজাগৃহের দিকে। কিন্তু বেশিদুর যেতে হল না। পুজাগৃহের কাছে আসতেই তিনি দেখতে পেলেন একটা ভীষণাকার নারীমুর্তি পায়ের নুপুরে প্রবল ঝঙ্কার তুলে বেরিয়ে আসছেন পুজাগৃহ থেকে। নারীমুর্তিকে দেখামাত্র থমকে গেলেন তিনি।


নারীমুর্তিটির গায়ের রঙ নীলচে রঙের। সমগ্র দেহ নানাবিধ অলংকার আর বহুমূল্য শাড়িতে আবৃত। ডানহাতে ধরা একটা প্রকাণ্ড খাঁড়া, বামহাতে একটা নরমুণ্ড। আলুলায়িত কেশে মুখটা ঢাকা থাকলেও তা যে ভীষণ ক্রূর এবং জিঘাংসার অভিব্যক্তিতে ভরা সেটা অন্ধকারের মধ্যেও বুঝতে পেলেন বেনীমাধব। আর সেটা বুঝতেই তিনি আর এগোলেন না। একটা ভয় জাঁকিয়ে বসল তার মনে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলতে লাগল এই মুহূর্তে এই নারীর সম্মুখে না যাওয়াই ভালো। তিনি পায়ে পায়ে ফিরে এলেন নিজের ঘরে। ফেরার সময় শুনতে পেলেন পেছনে এক নারীর কণ্ঠে রক্তজল করা তীব্র জান্তব হুঙ্কার।

 

পরদিন সকালে আশ্রমের আবাসিকদের চিৎকারে ঘুম ভাঙল তার। ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আশ্রমের সকলেই যেন কি একটা কারণে ভীষণরকম ভাবে আতঙ্কিত। কাল রাতের কথা মনে পড়তেই পুজাগৃহের দিকে ছুটে গেলেন তিনি। পুজাগৃহের সামনে গিয়ে যে দৃশ্যটা বেনীমাধব দেখলেন তার জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। পুজাগৃহের সামনে পড়ে আছে রণদা আর চন্দ্রধরের মুণ্ডহীন উলঙ্গ দেহ। দেখে মনে হচ্ছে যেন কেউ অমানুষিক জোরে দুজনের মাথা মুচড়ে নিয়েছে দেহ থেকে। সমগ্র পুজাগৃহের মেঝে রক্তে থই থই করছে। ঘরের এককোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে চক্রবর্তীবাবুর পুত্রবধূ ময়না।

 

*****

 

এইটুকু বলে ব্যোমকেশ একটু থামল। তারপর টেবিলে রাখা অ্যাশট্রে তে জয়েন্টের শেষ টুকরোটা গুঁজে দিয়ে বলল, “তারপরের ঘটনা বেশ সংক্ষিপ্ত। আশ্রমের দুজন অধ্যক্ষ্যের এরকম নৃশংস মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই আলোড়ন ফেলে দেয় চারদিকে। পুলিশ এলেও তারা তদন্ত করে কিছুই খুঁজে পায়নি। ময়নাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায় কাল যজ্ঞ চলাকালীন আচমকা অসুস্থ বোধ করে সে। তারপর তার আর কিছু মনে নেই। সেদিনই পুত্রবধূকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান চক্রবর্তীমশাই। কিন্তু সেদিনের ব্যাখ্যা তিনি কোনোদিন খুঁজে পাননি। সেই ভীষণদর্শনা নারীর জন্যই তার পুত্রবধূ রক্ষা পেলেও সেই নারী কে? তা তিনি কোনোদিন জানতে পারেননি। জানতে পারলেন অনেক বছর পর গুরুদেবের কাছে।

 

সেবার কী একটা কাজে আমি আর গুরুদেব জলপাইগুড়ি গিয়েছিলাম। সেখানেই আলাপ হয় আমাদের। কথা প্রসঙ্গে তিনি আমাদের গোটা ব্যাপারটা জানাতেই গুরুদেব জানান, ‘আপনি ভাগ্যবান! সারাজীবন তপস্যা করেও যিনি ধরা দেন না কোনো সাধকের কাছে সেই তিনি দেখা দিয়েছিলেন আপনাকে। জানিয়েছিলেন আপনার পুত্রবধূর সুরক্ষার কথা। আপনার পুত্রবধূ ময়না মা-ও মহা পুণ্যবতী। নাহলে মেয়ের বিপদে এভাবে মা ছুটে আসবেনই বা কেন? শুনুন আপনি যার বর্ণনা দিলেন তিনি আর কেউ নন সাক্ষাৎ দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় বিদ্যা, দেবী তারা। সাক্ষাৎ তারা মা ছুটে এসেছিলেন আপনার বংশের মান রক্ষা করতে।”

 

এতক্ষণ বালু চুপ করে থাকলেও এবার আর পারল না, “ধুস! তা আবার হয় নাকি? গুলগাপ্পি মারার আর জায়গা পেলে না? আমার মনে হয় ওটা আর কেউ নয় ময়না নিজেই ছিল। নিজের আব্রু রক্ষা করতেই ডেস্পারেট হয়ে দুজনকে খুন করে। কিন্তু খুন করার পর সম্বিত ফিরতেই পালাতে গিয়ে চক্রবর্তীবাবুর সামনে পড়ে গিয়ে নাটক করে। সেদিন ময়নাকেই দেখেছিলেন চক্রবর্তীবাবু।”

 

ব্যোমকেশ হেসে বলে, “বেশ মেনে নিলাম। কিন্তু তাই বলে একটা আঠেরো বছরের মেয়ে দুজন শক্তসমর্থ পুরুষকে এক কোপে মেরে দিল অথচ ওরা কোনো প্রতিরোধ করল না? তাছাড়া পুলিশ কিন্তু কোনো রকম অস্ত্র পায়নি। পরে পোষ্টমর্টেমে জানা যায় দুজনের মাথা মুচড়ে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছিল। একটা বাচ্চা মেয়ের পক্ষে এতটা অমানুষিক কাজ সম্ভব?”

 

বালু আরো কিছু বলতেই গিয়েও বলতে পারল না। ব্যোমকেশ চেয়ারের হেলান দিয়ে বসে বলল, “সে তুমি যতই যুক্তি সাজাও হে। সব যুক্তির বাইরেও একটা কিন্তু থেকেই যাবে। সাধে বলি বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। বাস্তব কথা কি জানো? মা আছেন! মন দিয়ে ডাকলে মা আসেন। মা আসেন!”  

 

 


শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২২

চতুরাননের কীর্তি






পুরানো সেই দিনের কথা, ভুলবি কি রে হায় ও সে…” বারান্দার টেবিলে রাখা ছোটো মিউজিক সিস্টেমটায় আস্তে করে রবীন্দ্র সঙ্গীত চালিয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বারান্দার এককোণে থাকা আরামকেদারাটায় বসলেন চতুরানন চক্রবর্তী ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে আরাম করে চা খেতে খেতে সুর্যোদয় দেখতে লাগলেন তিনি ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকার মিলিয়ে গিয়ে আকাশের এককোণ ক্রমশ ফরসা হতে লাগল আর একটা মৃদু বাতাস থেকে থেকে চতুরাননকে কাঁপিয়ে দিতে লাগল চা খাওয়া শেষ করে কাপটা মেঝেতে নামিয়ে গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিলেন তিনি শীতকাল আসতে এখনও একমাস দেরী হলেও ইদানিং ভোরের দিকটায় বেশ শীত অনুভব হচ্ছে তাঁর রাতের দিকে তো রীতিমতো মোটা কম্বল মুড়ি দিয়ে শুতে হচ্ছে অথচ উনি যে শীতকাতুরে এই বদনাম কেউ দিতে পারবে না চাকরী জীবনে একাধিক জায়গায় থেকেছেন তিনি শিমলার কনকনে ঠাণ্ডা হোক বা রাজস্থানের তীব্র গরম কোনোটাই বেশিদিন তাকে কাবু করে রাখতে পারেনি এককালে সামান্য একটা ওভারকোট আর মাফলার চাপিয়ে ২৫শে ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় দার্জিলিং-এর কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেও স্ত্রী বীণাপাণিকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন অথচ এই বৃদ্ধ বয়সে এসে সামান্য কলকাতার ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারেন না তিনি চাদর, সোয়েটার, মাফলার পরার পরেও ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপতে থাকেন পুরোনো দিনের কথা আজও মনে করলে মুখে মৃদু হাসি খেলে যায় তাঁর 

   

ভোরবেলা বারান্দায় বসে দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুনতে সেই সব দিনের কথা মনে করে সকালের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন চতুরানন এমন সময় শুনতে পেলেন রাস্তায় সাইকেলের ঘন্টির শব্দ নেহাত পেপারের ছেলেটা হবে ভেবে স্মৃতিচারণে আবার মন দিলেন তিনি কিছুক্ষণ পর আবার ভেসে এল সাইকেলের ঘন্টির শব্দ, এবার একাধিক সাইকেলের ক্রমাগত সাইকেলের ঘন্টির শব্দে ঘোরটা কেটে গেল তাঁর, এত সকালে আবার কে এল? চোখ মেলে দরজার সামনে সামনের দৃশ্য দেখে মুচকি হেসে ফেললেন তিনি কচিকাঁচার দল আজকে একেবারে সকাল সকাল হাজির হয়ে গেছে ওদের দেখামাত্র সোজা হয়ে বসলেন তিনি তারপর উঠে গিয়ে সদর দরজা খুলে দিতেই একে একে ভেতরে ঢুকে এলো ওরা বাগানের একপাশে সাইকেলগুলো রেখে একে একে ওরা এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে


সদর দরজা লাগিয়ে বারান্দায় উঠে এলেন চতুরানন কচিকাঁচার দল ততক্ষণে মাদুর পেতে বসে পড়েছে বারান্দায় অবসরের পর স্ত্রী বীণাপাণির কথায় একটা ছোটোখাটো টোলের মতো খুলেছেন চতুরানন স্থানীয় বাচ্চাদের পড়া দেখিয়ে দেওয়া, নানারকম হাতের কাজ শেখানো সবই চলে মাঝে মাঝে যখন কচিকাঁচার দলের পড়ার ইচ্ছে থাকে না তখন তিনি বসেন গল্প শোনাতে নিজের চাকরীজীবনের অভিজ্ঞতায় একাধিক ঘটনার সাক্ষী তিনি মাঝে মাঝে অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে সেই সব মণিমুক্তোর মতো গল্পগুলো ওদের শোনান তিনি কোনো কোনো গল্প ভীষণ মজার হয়, আবার কোনো কোনো গল্প ভীষণ কষ্টের কিন্তু প্রতিটা গল্পের শেষে ওদের জন্য কিছু শিক্ষামূলক উপদেশ থাকে  আজকেও এদেরকে তেমনই একটা গল্প বলবেন ভেবেছিলেন কিন্তু মিউজিক সিস্টেমটা বন্ধ করে আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বসামাত্র বাচ্চাগুলোর দিকে তাকাতেই অবাক হলেন চতুরানন ব্যাপারটা কী? আজকে বাচ্চাগুলোর মুখ এতো শুকনো লাগছে কেন? কিছু হয়েছে নাকি? ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করলেন চতুরানন, “কী ব্যাপার? সবকটা হুতোমপ্যাঁচা মার্কা মুখ করে বসে আছিস যে! কিছু বলবি নাকি?”


প্রশ্নটা শোনার পরেও বাচ্চাগুলো কোনো সাড়শব্দ দিচ্ছে না দেখে সোজা হয়ে বসলেন চতুরানন ব্যাপারখানা কী? অন্যদিন তো একেবারে কিচিরমিচির করে কানের পোকা নাড়িয়ে দেয় বাচ্চাগুলো আজ এত চুপচাপ কেন? চতুরানন মৃদু হেসে বললেন, আহা কী হয়েছে বলবি তো! এভাবে চুপ করে থাকলে চলবে? আর আজকে অনিল,অঞ্জন আর কার্তিক এলো না কেন? ওরা তো তোদের সাথে বিশেষ করে গজা আর তপনের সাথে ঘুরে বেড়ায় তা আজ হঠাৎ কী হল? তোরা এলি অথচ ওরা এল না! এই গজা-তপন, সত্যি করে বল! আবার কী কাণ্ড ঘটিয়েছিস তোরা?”


আমি বলছি মৃদুগলায় বলে মাথা তুলল গজা এই কচিকাঁচাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো হল গজা আর তপন দুজনেই এইবার ক্লাস ফাইভে উঠেছে পড়াশোনায় এমনি ভালো হলেও বদবুদ্ধি আর দুষ্টুমিতে একেবারে যাকে বলে মার্কামারা দুজনে এই দুজনকে বাগে আনতে চতুরাননবাবুকে কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি চতুরানন তাকালেন গজার দিকে গজা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে তারপর সটান বলে বসলো, দাদু আমাদের স্কুলটা নাকি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে মহিম কশাই নাকি স্কুল ভেঙে কীসব বাজার বানাবে, সত্যি নাকি দাদু? কালকে আমি, অনি, কেতো, অজু আর তপু স্কুলে গেছিলাম, গিয়ে দেখি কতগুলো লোক স্কুলের গেটের সামনে কিসব কাগজ সাটিয়ে তালা মেরে দিলআমরা এগিয়ে কিছু বলতে যেতেই মহিম কশাইয়ের লোকেরা আমাদের তাড়িয়ে দিল তপু জোর করতেই তপুকে ধরে পেটালো, অজু, কেতো অনি বাধা দিতে গিয়ে মার খেলতারপর মহিম কশাই জানাল স্কুল নাকি আর হবে না সত্যি নাকি দাদু?


সবটা শোনার পর ভ্রু জোড়া একটু কুঁচকে গেল চতুরাননের এই মহিম লোকটাকে বিলক্ষণ চেনেন তিনি মহিম কর্মকার এই এলাকায় মহিম কশাই নামেই বেশি পরিচিত আগে স্থানীয় বাজারে মাংস বিক্রি করত পরে এলাকার একজন অ্যান্টিসোশ্যালে পরিণত হয় একবার নাকি কাকে খুনের চেষ্টার অভিযোগে জেলেও গিয়েছিল তবে দশবছর হল সেসব কাজ ছেড়ে স্থানীয় এক নেতার কথায় প্রোমোটারিতে মন দিয়েছে বলে কানাঘুষো শুনেছেন চতুরানন সেই মহিম এবার স্কুলের দিকে হাত বাড়িয়েছে নাকি? তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে! এই এলাকায় দুটো মাত্র স্কুল একটা প্রাইমারী যেটা জয়ন্তবাবু চালান আরেকটা হাইস্কুল যেটা স্কুল কম বদমাসের আড্ডা হয়ে যাচ্ছে প্রাইমারী স্কুলটা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে তোআচমকা চতুরাননের ঘোর কাটলো গজার প্রশ্নে, “স্কুল বন্ধ হলে তো পড়াশুনো বন্ধ হয়ে যাবে দাদু! আবার আমাদের পড়া ভুলে কাজে লেগে পড়তে হবে তাই না দাদু?"


গজার দিকে তাকালেন চতুরানন বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে মায়া হল তার কোনোমতে নিজেকে সামলে গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন চতুরানন, “এটা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে ।‌ এক কাজ কর, আজ আর গল্প বলতে ইচ্ছে করছে নাতোরা বইও আনিস নি যে পড়াবো বরং তোরা এখন বাড়ি চলে যা। আজ তোদের ছুটি কাল সকালে কিন্তু তোদের পড়াবোআর শোনো আজ তাড়াতাড়ি ছাড়ছি‌, আর আজ ছুটি মানে এই‌ নয় যে সারাদিন টোটো করে ঘুরে বেড়াবেবাড়ির কাজ যেগুলো দিয়েছিলাম সেগুলো মুখস্ত করে আসবি কেমন? যা পালা!"


 

******

 

সন্ধ্যেবেলা চতুরানন দেখা করতে এলেন জয়ন্তবাবুর বাড়িতে জয়ন্তবাবু এই অঞ্চলে জয়ন্তমাষ্টার নামে পরিচিত গজাদের স্কুলটা এনার জমিতেই তৈরি আগে সদরে মাষ্টারি করলেও বর্তমানে অবসর নিয়ে বাড়ির এককোণে স্কুল খুলেছেন প্রায় বারোবছর হতে চলল যা বর্তমানে মহিমের হস্তগত হতে চলেছে জয়ন্তবাবুর পড়ার ঘরে দুহাত গুটিয়ে মাথা নীচু করে বসে আছেন চতুরাননজয়ন্তবাবু মাথা নামিয়ে একনাগারে নিঃশব্দে কেঁদে চলেছেনবেশ কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভাঙলেন চতুরানন নিজেই


আমি আর ভাবতে পারছি না! আপনি এতবড়ো ভুল করলেন কি করে? এতগুলো লোক থাকতে শেষে কিনা আপনি ঐ মহিমের কাছে হাত পাতলেন? একবার আমাদের বললেই তো পারতেন! অতোগুলো ছেলের কথা একবারও মনে পড়লো না আপনার?


আমার মাথা তখন কাজ করছিল নাএকমাত্র মেয়ে বুঝতেই পারছেন। মেয়েটাকে ওভাবে তিলে তিলে মরতে দেখে কোনো বাবা কি চুপ করে থাকতে পারে বলুন? ভেবেছিলাম ধীরে ধীরে শোধ করে দেবকিন্তু সুদে আসলে যে টাকাটা এত বেড়ে যাবে ভাবিনিবলে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন জয়ন্তবাবু


দশবছর আগে জয়ন্তবাবুর মেয়ে অসীমা একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারাত্মকভাবে জখম হয় মাথায় গুরুতর চোট থাকায় অপারেশন করাতে হয় তখন সদ্য অবসর প্রাপ্ত মেয়ের চিকিৎসার খরচ কীভাবে জোগাবেন বুঝতে পারছিলেন না জয়ন্তবাবু এমন সময় খানিকটা দেবদূতের মতো ওনার সামনে হাজির হয় মহিম অসীমার চিকিৎসার সমস্ত খরচ নিজের কাঁধে নিয়ে নেয় সে তারপর জয়ন্তবাবুর মেয়ে সুস্থ হতেই স্বমুর্তি ধরে সে পরিস্কারভাবে জানায় হয় জয়ন্তবাবুকে মহিমের টাকা ফেরত দিতে হবে নাহলে স্কুলের জমিটা লিখে দিতে হবে তাকে জয়ন্তবাবু বুঝতে পারেন নিজের অজান্তে তিনি মহিমের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন কিন্তু তখন আর কিছু করার নেই তিনি টাকাটা মাসে মাসে দিতে রাজি হন মহিম জানায় দশবছরের মধ্যে তার বকেয়া টাকাটা শোধ না হলে সে স্কুল জমিটা দখল নিয়ে নেবে সেই মতো একটা স্ট্যাম্প পেপারও নিয়ে আসে সে, জয়ন্তবাবু সই করতে বাধ্য হন তারপর দশবছর ধরে নিজের পেনসনের টাকা দিয়ে মহিমের ধার শোধ করে গেলেও সেই টাকার পরিমাণ বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং দিনের সাথে সাথে সুদের পরিমাণ বেড়ে গেছে


জয়ন্তবাবুর দিকে তাকিয়ে মায়া হল চতুরাননের ভদ্রলোক যে এভাবে ফেঁসে যাবেন ভাবতেই পারেননি ওনার জায়গায় চতুরানন থাকলে তিনিও একই কাজ করতেন কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার মুখ দিয়ে কিন্তু এভাবে তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায় না। কিছু তো একটা করতেই হবে কী করা যায়? এমন কিছু করতে হবে যাতে মহিম জব্দ হয় আবার স্কুলটাও বাঁচে জয়ন্তবাবুর বাড়ি থেকে ফেরার পথে চতুরানন চুপচাপ মনে মনে ভাবছিলেন, “কিছু একটা করতে হবে। কিছু একটা করতেই হবে"

 

******

 

বাড়ি ফিরে দেখলেন বীণা মোবাইলে সনতের সাথে কথা বলছেন। বছরে একবারই সনৎ বউ ছেলে নিয়ে বাড়ি ফেরে এই পুজোর সময় এবছরও আসার কথা তাই নিয়ে কথা চলছে


বীণা চতুরাননকে দেখে মোবাইলটা এগিয়ে দিলেন। চতুরানন ফোনে হু হা করে দু একটা কথা বলে ফোনটা ফেরত দিতে যাচ্ছিলেন হঠাৎ কি মনে হতে ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ নাতির সাথে কি গুজুরগুজুর করে কথা বলে ফোনটা ফেরত দিয়ে নিজের স্মার্টফোনটা নিয়ে চলে গেলেন শোওয়ার ঘরেবীণাপাণি আড়চোখে সেদিকে একবার তাকিয়ে আবার ফোনে মশগুল হয়ে গেলেন

 

******

 

ক্লাবের কালচারাল ফাংশনের দুদিন বাকি ঘরের ভেতর একা বসে টাকা গুনতে গুনছিল মহিম কাল ঘুমোতে ঘুমোতে বেশ রাত হয়ে গেছে এবছর চাঁদার ভার ছিল বিলুর উপরবিলু কালেকশনও করেছে মাইরি! একেবারে চার দিনে চল্লিশ লাখ! শেঠ পার্টিদের পকেট ফাঁকা করে দিয়েছে একেবারে আজকে একটু তাড়া থাকায় সকাল সকাল সেই টাকা ভালো করে গুনছে সেআজ সকালে ক্লাবের ছেলেদের হাতে বক্স আর আলোর টাকা দিতে হবেতারপর বাকিটা যাবে মদের দোকানে দামী মদের খোঁজেতাছাড়া আরেকটা কাজও আছে বটে


কথাটা ভাবামাত্র মুচকি হাসে মহিম স্কুলটা এত সহজে যে পেয়ে যাবে ভাবতে পারেনি সেদশবছর আগে মাষ্টারের মেয়ে যখন ওর গাড়ির তলায় এসে পড়লো তখন মারাত্মক ভয় পেলেও সামলে নিয়েছিল সে মেয়েটার খোঁজ নিতে হাসপাতালে লোক পাঠিয়েছিল মহিম বলে দিয়েছিল যদি টেঁসে যায় তাহলে টাকা দিয়ে মাষ্টারের মুখ বন্ধ করে দিতে কিন্তু লোকটা যখন জানালো মেয়েটা মরেনি তবে বাঁচাতে গেলে টাকা লাগবে তখন মনে মনে পরের অঙ্কটা কষতে অসুবিধে হয়নি মহিমেরঝপ করে অতো টাকা ইনভেস্ট করে ফেলেছিল সেইনভেস্টই বটে নাহলে চেনে না জানে না এমন একজনের পেছনে খামোখা টাকা নষ্ট করতে যাবে কেন সে?


পরে মাষ্টারকে চেপে ধরার পর যখন কিছু না ভেবে সইটা করে দিল তখন মহিমকে আর পায় কে? মনে মনে একপাক নেচে নিয়েছিল সেতারপর দশবছর মাষ্টারকে বোকা বানানোটা এমন আর কি সরল কাজ? মাষ্টারও বোকার মতো একটা জাল চুক্তিপত্রের ভিত্তিতে এতবছর তাকে টাকা দিয়ে এসেছে বেচারা বুঝতেই পারে নি এটা একটা ফাঁদ হঠাৎ ফোনের শব্দে ঘোর কাটে মহিমের পাঞ্জাবীর পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখে বিলু কল করেছে উফ! নির্ঘাত কোনো কেস করেছে! বিপদের সময় দাদাকে মনে পড়ে এদের! বিরক্ত হয়ে কলটা রিসিভ করে মহিম আর রিসিভ করামাত্র চমকে ওঠে! মনে হয় পায়ের তলার মাটিটা ভীষণভাবে দুলছে টাকাগুলো আলমারির ভেতরে সাজানো নোটের থাকের উপর রাখতে রাখতে কোনোমতে মহিমের গলা দিয়ে একটা শব্দ বেরোয়, “আসছি

 

******

 

স্কুলে কাছাকাছি পৌছে গেটের কাছে জটলা দেখে বাইক থামায় মহিম বিলু মহিমকে দেখে দৌড়ে আসে বিলুকে দেখে চমকে ওঠে মহিম কয়েক ঘন্টায় একি চেহারা হয়েছে বিলুর! মুখে চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ, দেখে মনে হয় যেন কোনো সর্বনাশ ঘটে গেছে বিলু কাছে এসে বলে, “দাদা! কিচাইন হয়ে গেছে! কাল রাতে মাষ্টার ফেসবুকে কীসব ভাষণ ঝেড়েছে সেই ভাষণের জোরে এম.এল., কাউন্সিলর সবাই সকাল সকাল মাষ্টারের বাড়িতে হাজির হয়ে গেছে ওরা নাকি বলছে স্কুলটা নাকি আবার খুলিয়ে ছাড়বে


চট করে ফোনটা বের করে ফেসবুক খোলে মহিম স্ক্রিনে দেখা যায় জয়ন্তবাবুর মুখ ভিডিওটা দেখতে থাকে সে ভিডিওটা দেখতে দেখতে ফোন বেজে ওঠে মহিমের এবার বউ ফোন করেছে ফোনটা কেটে বিলুকে নির্দেশ দেয় মহিম, শোন! এম.এল.এ চলে যাবার পর মাষ্টারের পরিবারকে গুম করে দিবি অন্তত যতক্ষণ পর্যন্ত স্কুলটা বিক্রি করতে না পারছি ততক্ষণ আর এই ভিডিওটা কে ছেড়েছে খুঁজে বের কর বহুত ফেমাস হবার সখ জেগেছে না? ফেমাস হবার সখ ঘুচিয়ে দেবো মাষ্টারেরবলতে বলতে আবার ফোনটা বেজে ওঠে বিরক্ত হয়ে মহিম দেখে বউ আবার কল করেছে বিরক্ত হয়ে কলটা রিসিভ করে বলে, “কী হয়েছেটা কী? কাজের সময় বার বার এত ফোন কীসের?”


বিলু দেখে পলকে মহিমের মুখ সাদা হয়ে গেছে দেখে মনে হচ্ছে বাড়িতে সাংঘাতিক কিছু ঘটে গেছে কলটা কেটে বিলুর দিকে তাকিয়ে মহিম অস্ফুটে বলে, “বাড়িতে পুলিশ এসেছে! সাথে ইনকাম ট্যাক্স

 

******

 

বিকেলের দিকে বারান্দায় চা খেতে খেতে গিন্নির সাথে কথা বলছিলেন চতুরানন আগামীকাল  সনৎ কাল বাড়ি ফিরছে দোতলার দুটো ঘর আজ কাজের লোককে দিয়ে পরিস্কার করিয়ে দিয়েছেন বীণা বাথরুমে সাবান, শ্যাম্পু সবই যথেষ্ট পরিমানে মজুত করা আছে নাতির জন্য, ছেলে-বৌমার জন্য একগাদা শীতের জামা কিনেছেন বীণাপাণি সেই নিয়েই কথা হচ্ছিল চতুরাননের সাথে এমন সময় সদর দরজায় শব্দ শুনে দুজনেই সামনে দিকে তাকালেন দেখলেন রমা আর নীলকমল এসেছেন রমা বীণাপাণির মেয়েবেলার বন্ধু মাঝে মধ্যেই ওদের সাথে দেখা করতে আসেন রমার স্বামী নীলকমল বর্তমানে ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে কর্মরত এই সামনের মাসেই অবসর নেবেন চতুরাননের সাথে স্ত্রীর সূত্রে আলাপ হলেও এখন দুজনের সম্পর্ক আরো গভীর হয়ে উঠেছে রমা আর নীলকমলের মেয়ে রিনির সাথেই নিয়ে হয়েছে সনতের


বীণাপাণি এগিয়ে গিয়ে সদর দরজা খুলে দিতেই রমা আর নীলকমল উঠে এলেন বারান্দার দিকে দুজনের দুহাতে দুটো ব্যাগ বারান্দায় ওঠা মাত্র বীণা হেসে বললেন, “করেছিস কিরে? এত খাবার কে আনে?” রমা টেবিলে ব্যাগটা রেখে বললেন, “তোর বেয়াইকে বল! আসার সময় গাড়ি থামিয়ে একগাদা খাবার কিনেছে বলে কিনা অনেক দিন পর কুটুমবাড়ি যাচ্ছি, খালি হাতে গেলে চলে?”


তাই বলে এত? সত্যি নীল তুমি পারো বটে!” বলে হাসেন বীণাপাণি


চতুরানন হেসে বলেন , “আহা! ভালোবেসে যখন এনেছে কী আর করা যাবে বলো? সবাইকে অল্প অল্প করে দিলে হয়ে যাবে


বীণাপাণি হেসে বলেন, “ঐ আশাতেই থাকো! এই ছাইপাঁশ তোমাকে একফোঁটা দেবো না আমি! একে কোলেস্টেরল আর সুগার দুটোই বাড়িয়েছ এসব খেলে আর দেখতে হবে না পুজো হাসপাতালে কাটাতে হবে


চতুরানন কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, “মানেটা কি? আমি কি কাটলেট পাবো না? পাবো না আমি কাটলেট?”


না পাবে না!” বলে হাসতে হাসতে রমাকে নিয়ে ভেতর চলে যান বীণাপাণি বারান্দায় চতুরানন আর নীলকমল দুজনে চুপ করে বসে থাকেন কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙ্গে নীলকমল বলে, “মিশন সাকসেসফুল মহিমের বাড়িতে আচমকা রেড করে প্রচুর ব্ল্যাকমানি পাওয়া গেছে প্রোমোটারির আড়ালে এমন কোনো কাজ নেই যা ও করতো না আপাতত ওর অফিস, ক্লাব, সব সিলড করা হয়েছে আর শুধু মাষ্টারমশাই একা নন ওনার মতো আরো অনেকে এভাবে প্রতারিত হয়েছেন মহিমের দ্বারা সকলের জমির কাগজ উদ্ধার করা হয়েছে মহিম প্রোমোটার আপাতত জেলে


কথাটা শোনামাত্র একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলেন চতুরানন গতপরশু জয়ন্তবাবুর বাড়ি থেকে ফেরার পর নাতির সাথে কথা বলতেই গিয়ে কি একটা মনে হওয়ায় নাতিকে আলাদা ভিডিও কল করতে বলেছিলেন তিনি নাতির কাছে শিখে নিয়েছিলেন কীভাবে ফেসবুকে লাইভ করে, কীভাবে ভিডিও রেকর্ডিং হয়, কীভাবে ফেক আইডি বানায় সবটা সবটা শিখে নেওয়ার পর ফোন করেছিলেন নীলকমলকে নীলকমল সবটা শোনার পর সমস্তটা পরিকল্পনা করেন সেই মতো গতকাল রাতে ফেক আইডি দিয়ে জয়ন্তবাবুর লাইভটা করেন তিনি তারপর নাতিকে জানাতেই সে নিজে শেয়ার করে ভিডিওটা ছড়িয়ে দেয় সমাজমাধ্যমে দেখতে দেখতে ভাইরাল হয়ে যায় ভিডিওটা যার ফলস্বরূপ নড়ে ওঠে প্রশাসন আর সেই চাপেই এলাকার এম.এল. থেকে নেতামন্ত্রীরা ভীড় জমান জয়ন্তবাবুর বাড়িতে আর সেই সুযোগে উপর মহলের আদেশে নীলকমল ফোর্স পাঠান মহিমের বাড়িতে নীলকমলের দিকে তাকিয়ে চতুরানন বলেন,


গুড! আর স্ট্যাম্প পেপারটা?


নীলকমল কিছুক্ষণ মুচকি মুচকি হাসেন তারপর বলেন, “ওম ফট স্বাহা!” চতুরানন হেসে বলেন, “যাক! শান্তি! ভাগ্যিস সেদিন দাদুভাইয়ের সাথে কথা বলার সময় মনে পড়লো বলে জানতে পারলাম ফেসবুকে একটা ভিডিও কি করে ভাইরাল হয়


তা ঠিক! এই মিশনের পুরো কৃতিত্ব ওর ওই তো একাই ভিডিওটাকে রীতিমতো ভাইরাল করে দিলো!


কাদের নাতি দেখতে হবে তো? কম্পিউটার নিয়ে তুখোর জ্ঞান দাদুভাইয়ের ভাবছি এবার কলকাতায় এলে দাদুভাইকে ট্রিট দেব কি বলো?” বলে হাসেন চতুরানন


নীলকমল হেসে বলেন, “তা আর বলতে!”

 


সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...